জহুরুল ইসলাম— একজন কিংবদন্তির কথা

zohurul islam 45অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদুল আজিজ : অল্প বয়স থেকেই অনেকবার শুনে শুনে মনের ভিতরে গেঁথে গিয়েছিল একটি নাম ‘জহুরুল ইসলাম’। তখন কেবল জানতাম তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি এবং সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

অনেক বছর পরে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি যোগ দিলাম জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে। সেটা ১৯৯৪ সাল। কলেজটি তার নিজ গ্রাম ভাগলপুরে যা বাজিতপুর উপজেলা এবং কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। সম্পূর্ণ শান্ত-সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে বিশাল ক্যাম্পাসে তখন হাসপাতাল ও কলেজের বিভিন্ন ইমারত নির্মাণের কাজ চলছে। এখানে আসার পর মরহুম জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে যতই জানতে পারি ততই বিস্ময়ে অবাক হতে থাকি। এ মানুষটি সম্পর্কে অল্প কথায় সবকিছু লেখা সম্ভব নয়, তবুও সাহস করে তার জীবন-চরিত ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

জহুরুল ইসলাম এ জনপদের একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি এবং শিক্ষাসহ সামাজিক উন্নয়নের প্রায় সর্বক্ষেত্রে নজিরবিহীন অনন্য উদাহরণ সৃষ্টিকারী এ বিস্ময়কর প্রতিভার জন্ম ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর পৌরসভার ভাগলপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

তার বাবার নাম আফতাব উদ্দিন আহমেদ এবং মাতা রহিমা খাতুন।

জহুরুল ইসলামের শৈশব কেটেছে ভাগলপুর গ্রামে। স্থানীয় স্কুলে ৫ম শ্রেণি পড়ার পর সরারচর শিবনাথ হাইস্কুল ও পরবর্তীতে বাজিতপুর হাইস্কুলে পড়ালেখা করেন। চাচা মুর্শিদ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার পর রিপন হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর বর্ধমান জেলার একটি কলেজে ভর্তি হলেও চলে আসেন মুন্সীগঞ্জে এবং পড়ালেখা করেন হরগঙ্গা কলেজে। মেধাবী জহুরুল ইসলামের ছিল শিক্ষার প্রতি অসীম আগ্রহ কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও পারিবারিক দায়িত্ববোধ থেকে উচ্চশিক্ষা পরিহার করে চাকরিতে যোগ দেন ১৯৪৮ সালে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তৎকালীন সিঅ্যান্ডবিতে স্বল্প বেতনে যোগদান করেন। কিন্তু প্রখর দুরদর্শিতা ও অদম্য সাহসের অধিকারী এ মানুষটি নিজের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে নিজেই বড় কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। অল্পদিনের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করলেও অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে নিজের অধ্যবসায় ও প্রজ্ঞাবলে তার কর্মপরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। ‘বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন’ তার  প্রতিষ্ঠিত ইসলাম গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান। তৎকালীন পাকিস্তানে যেখানে সব ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের একচেটিয়া দখলে, সেই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে থেকেও জহুরুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন প্রথম শ্রেণির মানসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে। এ কোম্পানির প্রথমদিককার উল্লেখযোগ্য কিছু স্থাপনা তৈরির নিদর্শন হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশ ব্যাংক, পুরনো হাই কোর্ট ভবন, সুপ্রিম কোর্ট ভবন, গণভবন ইত্যাদি। অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং চ্যালেঞ্জিং মনোভাবের অধিকারী এ ব্যক্তিত্ব স্বল্প সময়ের কার্যাদেশে তৈরি করেন এমপি হোস্টেল, পুরনো সংসদ ভবন, খাদ্য গুদাম, বিভিন্ন সড়ক যা নির্মাণ শিল্পে এক বিরল দৃষ্টান্ত। তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশে-বিদেশে। সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গড়ে তোলেন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এবং বিস্তৃত করেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মপরিধি। দেশের মানুষের আবাসন সংকট নিরসনে প্রতিষ্ঠা করেন ইস্টার্ন হাউজিং যা এ খাতে প্রথম এবং অদ্বিতীয়। প্রতিষ্ঠা করেন ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন যা বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের অগ্রদূত। কৃষি উন্নয়নে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন মিলনার্স পাম্প ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ধীরে ধীরে তার কর্মকাণ্ড আরও বিস্তার লাভ করে। কয়েকটি পাটকল, ওষুধ শিল্প, গাড়ি সংযোজন কারখানা এবং আরও অনেক স্থাপনা গড়ে তোলেন।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তার কর্মোদ্যোগ আরও বিস্তৃতি লাভ করে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যেমন তিনি অবদান রাখতে থাকেন তেমনি দেশের বাইরেও তার প্রতিষ্ঠানসমূহের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে বিডিসি (বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন) মধ্যপ্রাচ্যে কাজ শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন বিশ্বমানের সড়ক, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টসহ অন্যান্য স্থাপনা। উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে নতুন প্রযুক্তিতে আবুধাবিতে পাঁচ হাজার বাড়ি নির্মাণ, ইরাক ও ইয়েমেনে উপশহর নির্মাণ ইত্যাদি। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে যেমন জহুরুল ইসলামের যশ-খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে অন্যদিকে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে বিনা খরচে কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে। আর বাংলাদেশ অর্জন করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এভাবে জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক এবং তার অবদানে আজও বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক জনশক্তি বিদেশে কর্মরত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা ছিল এ দূরদর্শী ও সাহসী পুরুষের সর্বক্ষণের পরিকল্পনা। নগরায়ণের ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর। বর্তমান ঢাকার নগর ভবন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের শপিং কমপ্লেক্স ও অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প তার উন্নত ও দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলীর নিদর্শন বহন করে। অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং কিংবদন্তি উদ্যোক্তা এ মহান ব্যক্তির সৃষ্টির নেশা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। কৃষি, পোলট্রি, ফিশারিজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি উন্মোচন করেন নতুন দিগন্তের, যার অনুপ্রেরণায় আজ দেশে এসব খাতে অন্যরা এগিয়ে এসেছেন। শুনেছি দূরদর্শী এ মানুষটির অনেক ভবিষ্যতে পরিকল্পনার মধ্যে ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মোটর গাড়ি কারখানা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে মধ্যম আয়ের মানুষও একটি ছোট গাড়ির মালিক হতে পারে। ঢাকার অদূরে সাভার থেকে পানি পরিশোধন করে ঢাকায় সরবরাহ করার চিন্তাও করেছিলেন তিনি। কর্মনিষ্ঠ জহুরুল ইসলাম নিজে যেমন কঠোর পরিশ্রম করতেন তেমনি চেয়েছেন তার সঙ্গের সবাই যেন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে। কাজে গাফিলতি কিংবা ফাঁকি তিনি বরদাশত করতে পারতেন না।

জহুরুল ইসলামের সব কর্মকাণ্ডে দেশপ্রেমের একটি পরিচ্ছন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সর্বজন বিদিত। সুবিদ আলী ছদ্মনামে তিনি লন্ডনে থেকেও দেশের মুক্তিযুদ্ধে যেমন বিপুল আর্থিক সাহায্য করেছেন তেমনি প্রেরণা জুগিয়েছেন স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে খুলেছিলেন অনেক লঙ্গরখানা। শুনেছি সঞ্চিত টাকা শেষ হয়ে গেলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পাঁচ মাস ধরে চালু রাখা হয়েছিল এসব লঙ্গরখানা। এ ধরনের দুঃসাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করে অভুক্ত মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিয়ে স্বাক্ষর রেখে গেছেন তার মানবপ্রেমের।

জহুরুল ইসলামকে বিশিষ্ট শিল্পপতি হিসেবে সবাই জানেন কিন্তু তার অতুলনীয় চারিত্রিক গুণাবলির কথা অনেকেই জানেন না। আত্মপ্রচারবিমুখ এ ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল অতুলনীয়। আকাশছোঁয়া যশ-খ্যাতি ও অর্থবিত্তের মালিক হয়েও যাপন করতেন এক সাধারণ জীবন। মানুষকে সাহায্য করতে তার হস্ত ছিল সব সময় প্রসারিত। নির্দ্বিধায় অকাতরে দান করতেন প্রকাশ্যে এবং গোপনে। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক ব্যক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। ধর্মপ্রাণ জহুরুল ইসলাম নামাজ-রোজা করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে, মসজিদ নির্মাণ করেছেন, নির্মাণে সাহায্য করেছেন, বহু আলেমকে নিজ খরচে হজে পাঠিয়েছেন। মরহুম জহুরুল ইসলামের চরিত্রের আরেকটি দিক ছিল তার অতিথিপরায়ণতা। তাকে আমি সামানাসামনি দুইবার দেখেছি দুটি অনুষ্ঠানে। অতিথিদের অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া সব ব্যাপারে তিনি নিজে তদারক করেছেন অত্যন্ত অমায়িকভাবে। শুনেছি খাবার সময় তিনি সবসময় কাউকে সঙ্গে নিয়ে খেতে পছন্দ করতেন।

এবার আসি জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে। জনদরদি জহুরুল ইসলাম অন্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন এলাকা এবং আশপাশের জেলা ও বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্দশা ও হয়রানির কথা। মনের লালিত বাসনা থেকে তিনি ১৯৮৯ সালে নিজ গ্রাম ভাগলপুরে নির্মাণ শুরু করলেন একটি হাসপাতাল, সেই সঙ্গে ডিপ্লোমা নার্সিং ইনস্টিটিউট। ভাগলপুরের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে হাসপাতাল স্থাপনের কথা শুনে অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন, এমনকি নিজ পরিবারের মধ্যেও কেউ কেউ নাকি দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ী এ মানুষটি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন জনগণ সুলভে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা পাবে এবং কেউ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। একটি অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি গড়ে উঠেছিল এবং হাসপাতালকে সহায়তাদানের জন্য তৈরি করেছেন আফতাব বহুমুখী ফার্ম। ১৯৯০ সালে হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গরূপ ধারণ করে এবং বিভিন্ন বিভাগ চালু হয়। বর্তমানে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ এর অধিক এবং সব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বারা সুসজ্জিত। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে এ হাসপাতালে সুলভে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে।

প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত জহুরুল ইসলাম তার মেধা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে তার কর্মক্ষেত্রের সর্বত্র শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখে গেছেন। শিক্ষার প্রতি ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ আর তাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন অগণিত স্কুল-কলেজ। নিজ উপজেলা এবং ঢাকায় তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। সাহায্য করেছেন অকুষ্ঠচিত্তে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার প্রসারে তিনি দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন বিভিন্ন কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে। শিক্ষাক্ষেত্রে তার সর্বশেষ কীর্তি জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ বর্তমানে দেশের শ্রেষ্ঠ বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহের মধ্যে অন্যতম। এ পর্যন্ত ২১টি ব্যাচের দেশি-বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করে মানসম্পন্ন চিকিৎসক হিসেবে সর্বত্র বিশেষ সুনাম অর্জন করছে।

জহুরুল ইসলামের জীবনচরিত ও বিশাল কর্মকাণ্ড স্বল্প কথায় সহজে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। কিংবদন্তি উদ্যোক্তা, অক্লান্ত পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান এ মহাপুরুষের কর্মপরিকল্পনা ছিল অসীম যা তিনি সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। স্বল্প সময়ে তিনি যে বিশাল কীর্তির স্বাক্ষর রেখে গেছেন, মানবিক ও চারিত্রিক গুণাবলির যে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন তা বাঙালি জাতির আদর্শ, কর্মোদ্যোগ ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন এবং ভাগলপুরে নিজ গ্রামে সমাহিত হন। পরম করুণাময় তার আত্মার শান্তি দান করুন।

লেখক : অধ্যক্ষ, জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।

Advertisements

উত্তমাশা অন্তরীপে ভ্রমণ

cape of good hopeআশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : গাড়িতে করে জোহানেসবার্গ পার্ক বাসস্টেশনে নামিয়ে দিল রানা ও তৌকির। এখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে বাস যায়।

লম্বা ভ্রমণে ঘুমানো মুশকিল, তবু আরামদায়ক একটা ঘুম দিলাম। সময় কাটাতে বাসের কাচ ভেদ করে রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য অবলোকন করতে লাগলাম। ছোট ছোট টিলার সারি, মাঝেমধ্যে কিছু বসতবাড়ি ছাড়া পুরো এলাকাই ফাঁকা মরুভূমির মতো। জনমানবের কোনো চিহ্ন নেই। ১৮ ঘণ্টায় ১৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাস ঠিকঠাকই পৌঁছল কেপটাউনে। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মাহমুদুল হাসান শিপলুর বন্ধু মাসুদ থাকে কেপটাউনে। নিজের গাড়ি নিয়ে বাসস্টেশনে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল সে। বাসায় যাওয়ার পথে একচক্কর শহরটা ঘুরিয়ে দেখাল। কিছু এলাকায় গাড়ির পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়াটা বেশ কঠিন। পাঁচ-ছয়বারের চেষ্টায় পার্ক করা যায়। ওর বাসার সঙ্গেই আছে একটি সুন্দর মসজিদ। মাসুদ জানাল, এই এলাকায় প্রচুর মুসলমান রয়েছে। বাংলাদেশির মালিকানাধীন ৫০টির মতো গ্রোসারির দোকান রয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হলো, পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার মুদি ব্যবসার পুরোটাই বোধ হয় আমাদের দখলে। ওই দেশের প্রতিটি শহরে বাংলাদেশি গ্রোসারির দোকান পাওয়া যায়। যদিও জীবন এখানে অনেক অনিশ্চয়তায় ভরা, তার পরও দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করাটা সহজ হওয়ায় বাংলাদেশিরা মোটামুটিভাবে সফল। যদিও এখন ইমিগ্রেশন আইন অনেক কড়াকড়ি। এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার পাসপোর্টধারী অনেক বাংলাদেশি অন্য দেশে চলে গেছেন।

দুপুরে খাবার খেয়ে মাসুদ বলল, বিকেলে ‘টেবিল মাউন্টটেন’-এর পাশে ‘সিগন্যাল হিল’-এ ঘুরতে যাব। সঙ্গী হিসেবে মাসুদের চাচাতো ভাই বাবলু। সে-ও দীর্ঘদিন ধরে আছে কেপটাউনে। আসার পথে একটা মাজার দেখলাম। কেপটাউনে মাজার যে আছে জানা ছিল না। যদিও পরে জেনেছি, ত্রিশটির মতো মাজার রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এগুলোকে বলা হয় ‘ক্রেগমাত’।

bolders bay beachবিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে ‘সিগন্যাল হিল’-এ চলে এলাম। এখান থেকে একসঙ্গে টেবিল মাউন্টটেন ও কেপটাউনের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। এখানে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখতে প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয়। এ ছাড়া জায়গাটাকে লোকে ‘লাভারস লেন’ও বলে থাকে। বিকেল হলেই প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখা মেলে এখানে।

সিগন্যাল হিল থেকে গেলাম ‘ক্যাম্পাস বে বিচ’। যাওয়ার রাস্তাটি অসাধারণ। টেবিল মাউন্টটেনের পাশেই এই সমুদ্রতীরের অবস্থান। যাত্রাপথে বেশ কিছু বিলাসবহুল বাড়িঘর নজর কাড়ল। শৌখিন ধনকুবেরদের বাড়ি। সাধারণত ছুটি কাটাতে এঁরা এখানে আসেন। অনেক বাড়িতে দেখলাম অফ সিজনের জন্য টু-লেট লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। অনেক গাড়ি ও বিদেশি পর্যটকদের সমাগম চোখে পড়ল সৈকতে। কেউ শুয়ে আছেন, কেউ বা কুকুর নিয়ে জগিং করছেন আবার কেউ মোবাইলে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। চারদিকে মানুষ এবং সবাই বিচ বিনোদনে ব্যস্ত।

শুধু ঘুরলেই তো চলবে না, আর তাই পেটপূজার জন্য গেলাম নান্দোসে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এটা বেশ জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড শপ। সত্যিই ওদের খাবার বেশ সুস্বাদু! দোকানগুলো খুবই সুন্দর, সার্ভিসও বেশ ভালো। মজার ব্যাপার হলো, খাবার শেষে আমাদের দুই লিটারের কোকা-কোলার অর্ধেকটা অব্যবহৃত ছিল, সেটি দিয়ে দেওয়া হলো ওয়েটারকে। সে তো ওটা পেয়ে দারুণ খুশি।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও নাকি ধান ভানে। বাঙালি-বাঙালি আড্ডা হবে না তা কি হয়? ওদের নিয়ে গেলাম স্থানীয় এক বাংলাদেশি ক্লাবে। ওখানে দল-মত-নির্বিশেষে কেপটাউনের বাংলাদেশিরা একত্রিত হয়, আড্ডা মারে, পুল খেলে। ওখানকার বেশির ভাগ লোকই দেখলাম শরীয়তপুর ও ফরিদপুর জেলার। সবার আন্তরিক ব্যবহার ও আতিথেয়তা ছিল মনে রাখার মতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্লাবটিতে রাজনৈতিক পোস্টারে ভরপুর থাকলেও দলীয় আলাপ-আলোচনার চেয়ে আড্ডা, খেলাধুলায় মশগুল সবাই।

পরদিন গেলাম উত্তমাশা অন্তরীপে। ইংরেজিতে অবশ্য জায়গাটাকে বলে ‘কেপ অব গুড হোপ’। সঙ্গী হিসেবে যোগ দিলেন অরুণ। মাসুদের বন্ধু। প্রথমেই ‘বোল্ডার বে বিচ’ গেলাম। ওখানকার ‘জ্যাকঅ্যাস পেঙ্গুইন’ দেখতে প্রতিবছর ৬০ হাজার পর্যটক আসেন। প্রবেশমূল্য ৭০ র‌্যান্ড। ভেতরে গিয়ে দেখতে পেলাম প্রচুর চীনা পর্যটক। কলকাতার এক বয়স্ক দম্পতিরও দেখা মিলল। এই সৈকতে অনেকে এক দিনের জন্য ক্যাম্প করে থাকেন। বড় বড় পাথরের পাশে ছোট ছোট পরিবারগুলো এক দিনের জন্য সংসার পাতে। পুকুরে গোসল করার মতো করে সাগরে যায় গোসল করতে।

ওখান থেকে এবার যাব উত্তমাশা অন্তরীপে। কেপ পয়েন্টে আসার পথে রাস্তার এক জায়গায় দেখলাম, সব গাড়ির গতি কমে যাচ্ছে। সামনে ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেলাম, বেশ কিছু বানর রাস্তার মাঝখানে বসে আছে। মাসুদ সবাইকে সাবধান করে বলল—যার যার মোবাইল ও ক্যামেরা যেন পকেটে রেখে দিই, কারণ সুযোগ পেলেই এসব কেড়ে নিয়ে পালায় বানরগুলো। বাবলু আস্তে করে গাড়ির জানালা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে উত্তমাশা অন্তরীপে এসে পৌঁছলাম। প্রবেশ করার জন্য টিকিট কাটতে হলো। চারদিকে বিশাল পাহাড়ের মাঝে গাড়ি দারুণ গতিতে ছুটে যাচ্ছে। দিগন্তজোড়া খালি মাঠ। দূর থেকে মনে হলো, আকাশে ছুঁয়ে আছে পাহাড়। প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন হয়েছে। সিটি সাইট সিয়িংয়ের দ্বিতল বাসও প্রচুর। তবে বেশির ভাগই চীনা পর্যটক দিয়ে বোঝাই। আজকাল ওরাই নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি দেশ ভ্রমণ করে থাকে।

এখানে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর এসে মিলেছে। নাবিকদের কাছে এই জায়গাটি বেশ বিখ্যাত। উত্তমাশা অন্তরীপের পার্কিংয়ে বাবলু বসে ছিল। তবে যাঁরা হেঁটে যেতে ইচ্ছুক নন, তাঁদের জন্য রয়েছে ট্রাম সার্ভিস। আমরা হেঁটেই ধীরে ধীরে ওপরে উঠে গেলাম। ওপর থেকে চোখে পড়ল নিচের মনোরম দৃশ্য। এককথায় অসাধারণ।

মানসিক চাপ থেকে রেহাই পেতে…

stress reduction infographics

খাগড়াছড়ি হেরিটেজ পার্ক

khagrachhori heritage park

রসালোচনাঃ বাংলা কিছু বাগধারায় লিঙ্গবৈষম্য

proverbs not right

বিখ্যাত লেখকদের অদ্ভূত পেশা…

weird habits 1aweird habits 1bweird habits 1c

সুচিত্রা সেনের জন্মস্থানের বাড়ীর বর্তমান হালচাল

suchitra sen house 1asuchitra sen house 1b