স্বাধীনতা ও পলাশি ট্রাজেডি

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

plassey monument 2মাহমুদ ইউসুফ : ১৩৩৮ সাল থেকে ১৫৩৮ পর্যন্ত দুশ বছর বাঙলার পরিপূর্ণ স্বাধীনতাকাল। বাঙলার ১০ হাজার বছরের র্কীতিকালের এই দুশ বছর এক গৌরবময় অধ্যায়ের ইতিহাস। এ সময়ে বাঙলার সুলতানরা নিজেদের যোগ্যতা, শক্তি ও ঐশ^র্যের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ নৃপতিদের অন্যতম হয়ে উঠেছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় এবং রাজার নানা কর্তব্য পালনেও অপরিসীম দক্ষতা দেখিয়ে গিয়েছেন। তার ফলে বাঙলার জনসাধারণের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। এই আযাদ সুলতানি আমলের জন্ম দেন সুলতান ফখর উদ্দিন মুবারক শাহ। তিনি ১৩৩৮ সালে সোনারগাঁওয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খানের মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখল করে সোনারগাঁওকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। এর পূর্ণতা দেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। ১৩৫২ সালে তিনি সাতগাঁও, লাখনৌতি ও সোনাগাঁও ঐক্যবদ্ধ করে গড়ে তোলেন একীভূত বাঙলা সালতানাত। এর ফলে তিনি হলেন সমগ্র বাংলাদেশেরই শাহ বা শাহ-ই-বাঙলা। বাংলার বাইরে তিনি দুর্গম নেপাল ও উড়িষ্যা বা জাজনগরেও সফল অভিযান চালান। এছাড়া ত্রিহুত, শাহ চম্পারন, গোরক্ষপুর, কাশিও তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এই স্বাধীনতা অক্ষুন্ন থাকে ১৫৩৮ পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে বৃহৎ বাঙলা শাসন করেন ২২ জন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁদের প্রজ্ঞা, সাহস, রণদক্ষতা ও কলা কৌশলে বাঙলা হয়ে ওঠে সুপারপাওয়ার। শুধু ধন-ধান্যে নয়, শৌর্য-বীর্যেও বাঙালিরা হয়ে ওঠে দুনিয়াসেরা।

১৫৩৮ সালে পাঠান বীর শের খানের হাতে স্বাধীন সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহমুদ শাহ পরাজিত হন। তবে সুলতানি আমলের অবসান হলেও আযাদি অক্ষুণœ থাকে। পাঠান বীররা স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। আফগান-পাঠান আমল চলে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত। আফগান শাসনের শেষ চরিত্র দাউদ খান কররানি মসনদে বসেন ১৫৭২ সালে। তাঁর চার বছরের শাসনকাল বাঙলার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ট্রাজিককাল। বিয়োগান্তক কাহিনি, বেদনাদায়ক ইতিহাস।

১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ উড়িষ্যার তুকারায়ের যুদ্ধ ও মুগলমারির যুদ্ধ নামে খ্যাত। জায়গা দুটি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনিপুর জেলার দুটি গ্রাম। দুটি গ্রামের ব্যবধান আট মাইল। এই আট মাইল বিস্তৃত স্থানেই সংঘটিত হয় এই যুদ্ধ। বাঙলার ইতিহাসে এই যুদ্ধ তাৎপর্যপূর্ণ এজন্য যে, এ যুদ্ধেই আফগানরা দেশের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে এবং বাঙলায় আফগান শাসন; একই সাথে বাঙলার স্বাধীনতার অবসান ঘটে। আর ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই সংঘটিত হয় রাজমহলের যুদ্ধ। এ সমরে মুঘল সেনাপতি ছিলেন খানই জাহান হোসেন কুলি বেগ। আর আফগানদের নেতৃত্বে ছিলেন দাউদ খান কররানি। এ লড়াইয়ে বিজয়ী হয় মুঘল বাহিনী। পালাতে গিয়ে দাউদ খান কররানির ঘোড়ার পা কাদায় আটকে যায়। বন্দি হন দাউদ খান কররানি। মুঘল আমিরদের দাবি অনুসারে হত্যা করা হয় দাউদ খান কররানিকে এবং তাঁর ছিন্ন মুঘল আকবরের নিকট প্রেরিত হয়। একই সঙ্গে লুপ্ত হয় বাঙলার স্বাধীন সালতানাত। তদানীন্তন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মহানগর সোনারগাঁও তলিয়ে যায় অন্ধকারে। বাঙলা বরণ করে ভারতের অধীনতা। দিল্লির বেদীমূলের আশ্রয়ে যায় বাঙলা। বাঙালিদের কপালে জুটে পরাধীনতার তিলক। সোনার বাংলা হয় লুটপাট ক্ষেত্র। দিল্লির চাটার দলেরা এদেশের সহায় সম্পদ খুবড়ে খেতে থাকে। বাঙলার সম্পদ লুট হয়ে দিল্লি সমৃদ্ধ হতে থাকে।

রাজমহলের যুদ্ধে জয়ের পর দিল্লির নবাব বা প্রতিনিধিরা বাঙলা শাসন করে ১৮১ বছর। এই পৌনে দুশ বছরে দিল্লি সরকারের ছত্রছায়ায় বাঙলায় বর্ণহিন্দুদের উত্থান ঘটে। জমিদার, রাজা, মহারাজা, সেনাপতি, ব্যাংকার, মুৎসুদ্দি, মহাজনপদগুলো ক্রমে ক্রমে হিন্দুদের দখলে চলে যায়। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নবাব মুর্শিদকুলী খান। বর্ণহিন্দুরা সম্মিলিত ষড়যন্ত্র করে বাঙলায় মুসলিম নবাবদের উৎখাতের জন্য। তারা লর্ড ক্লাইভের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে হাত মিলায়। বাঙলা থেকে মুসলমান উৎখাতের জন্য ২৩ জুন ১৭৫৭ পলাশিতে ঐক্যবদ্ধ খ্রিস্টান-হিন্দু। অসম যুদ্ধ নাটকে নবাব সিরাজদৌলার পরাজয় ঘটে। শ্রী বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘ধর্মতত্ত’-এ বলেন,‘মুসলমানের পর ইংরেজ রাজা হইল। হিন্দু প্রজা তাহাতে কথা কহিল না। বরং হিন্দুরাই ইংরেজকে ডাকিয়া রাজ্যে বসাইল। হিন্দু সিপাহী ইংরেজের হইয়া লড়িয়া হিন্দু রাজ্য জয় করিয়া ইংরেজকে দিল। কেননা, হিন্দুর ইংরেজের উপর ভিন্ন জাতীয় বলিয়া কোন দ্বেষ নাই। আজিও ইংরেজের অধীন ভারতবর্ষ অত্যন্ত প্রভুভক্ত। ইংরেজ ইহার কারণ না বুঝিয়া মনে করে, হিন্দু দুর্বল বলিয়া কৃত্রিম প্রভুভক্ত।’ (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: প্রবন্ধসমগ্র, পৃ ১৯৩)

পলাশি ট্রাজেডির সমাপনান্তে শুরু হয় দিল্লির বদলে খ্রিস্টানদের কোম্পানির শাসন। মুসলিমদের সম্পদ দখলে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় কোম্পানি ও নেটিভ সম্প্রদায়। লর্ড ক্লাইভ গংদের চক্রান্তে হিন্দুসমাজ ফুলে ফেঁপে বেড়ে ওঠে। আর মুসলিমরা নি:শ্ব, কপর্দকশূণ্য হয়ে পড়ে। শোষিত, বঞ্চিত, নিগৃহীত হয়েও মুসলমানরা আযাদি সংগ্রাম চালিয়ে যায়। ভারতীয় ঐতিহাসিক গোলাম আহমাদ মোর্তজা বলেন, ‘নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের মতে (বৃটিশ বিরোধী আযাদির জিহাদে) মুসলমানদের বিদ্রোহ দমনে ৫ লক্ষ বিপ্লবীর ফাঁসি দেয়া হয়েছে। বৃটিশ বুদ্ধিজীবীরা এটাকে বেমালুম হজম না করে কিঞ্চিৎ স্বীকার করা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছেন। তাই ফিল্ড মার্শাল লর্ড রবার্ট তার Forty One Years in India পুস্তকে কিঞ্চিৎ স্বীকার করে লিখেছেন, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে মাত্র ২৭ হাজার মুসলমানের শুধু ফাঁসি দেয়া হয়েছে।’ (গোলাম আহমাদ মোর্তজা: এ সত্য গোপন কেন, পৃ ৪৭)

ঘুরে আসুন বাংলার তাজমহল

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

banglar tajmahal 3বিশ্বের প্রাচীন সপ্তমাশ্চর্য আগ্রার তাজমহলের আদলে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার পেরাব গ্রামে নির্মিত হয়েছে অনুপমশৈলীর স্থাপত্যে বিশ্বের ২য় তাজমহল। বাংলার তাজমহল আগ্রার তাজমহলের মডেলেই গড়া হয়েছে। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। তাজমহলের মূল ভবন স্বচ্ছ ও দামি পাথরে মোড়ানো। এর অভ্যন্তরে চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক আহসানউল্লাহ মণি ও তার স্ত্রী রাজিয়া দু’জনের কবরের স্থান সংরক্ষিত আছে। চার কোণে চারটি বড় মিনার, মাঝখানে মূল ভবন, সম্পূর্ণ টাইলস করা। সামনে পানির ফোয়ারা, চারদিকে ফুলের বাগান, দুই পাশে দর্শনার্থীদের বসার স্থান। এখানে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রাজমণি ফিল্ম সিটি রেস্তোরাঁ, উন্নতমানের খাবার-দাবারের ব্যবস্থা। রয়েছে রাজমণি ফিল্ম সিটি স্টুডিও। ইচ্ছা করলে যে কোনো দর্শনার্থী এখানে ছবি তুলতে পারবে। তাজমহলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রী, জামদানি শাড়ি, মাটির গহনাসহ অন্যান্য পণ্যসামগ্রী। তাজমহলের কাছাকাছি পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম মিসরের পিরামিডের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে পিরামিড। করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর। এখানে ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও পাশেই রয়েছে, শুটিং স্পট সেখানে যে কোনো নাটক, সিনেমার সব ধরনের শুটিং করা সম্ভব। আরো রয়েছে, ২৫০ আসনবিশিষ্ট সিনেমা হল ও সেমিনার কক্ষ। সুইমিং পুলের কাজ চলছে, তার সঙ্গে পরিকল্পনা রয়েছে আইফেল টাওয়ার করার। বর্তমানে দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক ভিড় করছেন তাজমহল দর্শনের জন্য। তাজমহলের স্থান সহজে চেনার জন্য মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে নির্দেশনার সাইনবোর্ড। তাছাড়া তাজমহল দেখা শেষে মুড়াপাড়ার জমিদার বাড়ি, পানাম নগর, লোকশিল্প জাদুঘর, চৌদ্দার চর, জিন্দাপার্ক ঘুরে আসতে পারেন।

তাজমহল খোলার সময়সূচি ও টিকিট মূল্য: তাজমহল প্রতিদিন খোলা থাকে সকাল ১০ থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। জনপ্রতি প্রবেশ ফি ৫০ টাকা।

কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে বাংলার তাজমহলে খুব সহজেই যাওয়া যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে কুমিল্লা, দাউদকান্দি অথবা সোনারগাঁগামী যে কোনো গাড়িতে চড়ে মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে নামতে হয়। সেক্ষেত্রে ভাড়া লাগে ১৫ টাকা। সেখান থেকে সিএনজি বা স্কুটারে জনপ্রতি ২৫ টাকা ভাড়ায় সহজে যাওয়া যায় তাজমহলে।

অন্যভাবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে ভৈরব, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জগামী যে কোনো গাড়িতে চড়ে বরপা বাসস্ট্যান্ডে নামতে হয়, সেক্ষেত্রে ভাড়া হবে ২০ টাকা। এখান থেকে সিএনজি স্কুটারে জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়ায় পৌঁছে যেতে পারেন তাজমহলে।

ভালোবাসার শহরে…

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

i love wallশান্তা তাওহিদা, প্যারিস থেকে : শহরজুড়ে যেন সারা বছরই প্রেমের মৌসুম চলে। সিন নদীর পার ধরে হেঁটে হেঁটে দেখার প্যারিস এ এক অন্য প্যারিস। সকালে সিন নদীর পানিতে সূর্যের স্পটিক হাসি আর রাতে আলো ঝলকানো হাজার হাজার তারা। এ রকম মুহূর্তটা অবশ্যই দাবি রাখে পরস্পরের হাতে হাত রেখে অতল চোখে হারিয়ে যাওয়ার। আমার যদিও সে সৌভাগ্য হয়নি। প্রায় সাত হাজার নয়শ কিলোমিটার দূরে ছিল আর একটা হাত। ভালোবাসার শহরে সে এক বেরসিক আমি!

দিন আর রাতের প্যারিসের মাঝে বিস্তর ফারাক। শুনে তা বুঝা যাবে না, এমনকি চোখে দেখেও না। এ কেবল অনুভবের। তবে প্যারিস শহর ঘুরে বেড়ানোটা ভোরে থেকে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে দুই রূপই দেখা যাবে। সিন নদীর কোল ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে শুরু হয় আমার প্যারিস সফর। পায়ে হাঁটার পথ থামে পন্ট দে আরটস সেতুতে। এটি পারিসের প্রথম ধাতব সেতু। নামকরণ করা হয়েছিল প্রথম ফরাস সম্রাটের নামানুসারে। এর এক পাশে ইনস্টিটিউট অফ ফ্রান্স আর অন্য পাশে ল্যুভর প্যালেসের কেন্দ্রীয় স্থাপনা। এ সেতুর আরেক নাম ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু। ভালোবাসাকে তালা-চাবি দিয়ে বন্দি করা যায় কিনা তা কেবল এখানকার প্রেমীরাই বলতে পারবেন। তালায় দুজনের নাম লিখে এ সেতুতে দুজনে মিলে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবিটা ছুড়ে ফেলে দেয় তারা ভালোবাসা নদীর জলে। কথিত আছে, এতে ভালোবাসা অমরতা পায়। সেতুর নিচের প্রবহমান ভালোবাসা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে চাবি খুঁজে নিয়ে সে তালা খুলে এমন সাধ্য কী আর কারো আছে বলুন? হতে পারে এটা ছেলেমানুষী। একদিন না হয় ভালোবেসে ছেলেমানুষ হলেন। ক্ষতি কি তাতে! বিষয়টা কিছুটা বুকের ঢিপঢিপানি নিয়ে ছোটবেলায় দেয়ালে যোগ চিহ্ন দিয়ে নামের আদ্যক্ষর লিখে রাখার মতো। এভাবেই হয়ত অবিনশ্বরতা পায় ভালোবাসা। মজার খবর হলো বেশ কিছু দিন আগে ভালোবাসার তালার ভারে সেতুটি প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা হয়েছিল। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হওয়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই কিছু ভালোবাসার ঝালর কেটে কমিয়ে দিয়ে ছিলেন। সেতুতে টানিয়ে দিয়েছেন সতর্কবাণীও। তাতে কি আর বুঝে পাগলপ্রেমি মন! ভালোবাসার শহরে ভালোবাসার তালা রোজই ঝুলছে। কার সাধ্য বাধা দেয়।

পন্ট দে আরটস সেতু নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত ফরাসি সিনেমা ‘লে পন্ট দে আরটস’। ফরাসি এক তরুণ তরুণীর করুণ প্রেম কাহিনি নিয়ে এ সিনেমা। প্রেমিকের সঙ্গে অভিমান করে অভিমানি প্রেমিকা এ সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে ভালোবাসা নদীতে আত্মহত্যা করে। সইতে না পেরে প্রেমিকও একি সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয় প্রেমিকার সঙ্গে মিলনের আশায়। কেবল এই সেতু নয়, ভালোবাসা নদীর ওপর এরকম প্রায় ১১টি ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু রয়েছে পুরো পারিসে । যারা প্যারিসে আসেন তাদের কাছে মন্টেমারে নামটা আগে থেকেই শোনা থাকতে পারে। জায়গাটা পারিসের উত্তর পাশে সিন নদীর কোল ঘেঁষে। পাবলো পিকাসো, ভিনসেন্ট ভ্যানগগ, ক্লোদ মনে নিভৃতে ছবি আঁকার জন্য এ পাশটা বেছে নিয়েছিলেন। ফরাসি ভাসায় এ জায়গাটার নাম মো মার্তে। পাহাড়ের উপরে রয়েছে এক মনোরম ব্যাসিলিকা। দুই নম্বর মেট্রো ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। এখানে রয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য আরো একটি আকর্ষণ। ফরাসি ভাষায় জায়গাটার নাম ‘লে মর ডেস যে তাইমে’। বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমি তোমাক ভালোবাসি দেয়াল’। মন্টেমারে রিকটুশ বাগানে এ দেয়াল।

প্রায় চল্লিশ স্কয়ার মিটার দেয়ালের পুরোটা জুড়ে ৫০টি ভাষায় ৩১১ বার লেখা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাওয়ার এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এখানে। যে আগে খুঁজে পায় ভালোবাসার বার্তা তার ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি। নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাবার আনন্দে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মানুষকে। বাংলায় ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ লেখাটা দেয়ালের মাঝখানের অংশে রয়েছে দেখলাম। বিরহ ছাড়া ভালোবাসা অর্থহীন বলেই হয়ত কিছু লাল ভঙ্গুর হৃদয় ছড়িয়ে দেয়া রয়েছে পুরো দেয়ালের ৬১২টি টাইলস জুড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল ভঙ্গুর হৃদয় দেখে। মনে মনে প্রার্থনা করলাম পৃথিবীর সকল যুগলের জন্য। অমর হোক তাদের বন্ধন। ভঙ্গুর হৃদয়ের যাতনা তাদের যেন কোনোদিন স্পর্শ না করে। আমার ধারণা ছিল কেবল তরুণ-তরুণীরা ভালোবাসার দেয়ালের খুঁজে এখানে আসে। ভুল করলাম আবারও। এখানে আসেন প্রেমিক জুগল। আর প্রেমের যে কোনো বয়স নেই তা এখানে না আসলে আমার হয়ত কখন বুঝা হতো না। হাতে হাত রেখে ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক দিয়ে বহু প্রবীণ প্রেমিকাকে প্রেমিকের চোখে হারাতে দেখেছি সেখানে। এ যেন প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে পড়া।

প্যারিসের যেবার ভালোবাসার দেয়াল দেখতে গিয়েছিলাম সেটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক দিনের সফর। টের পাচ্ছেন তো একাকি আমার দেবদাস অবস্থা! আমি ছাড়া প্যারিস শহরটা বড় বেশিই রোমান্টিক। হা হা হা- তবে যে আকর্ষণে দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসে তার সাথে দেখা করার গল্পটা বরং আমার কাছে বেশি রোমান্টিক। দ্য টাউয়ার অব লাভ-ভালোবাসার আইফেল টাউয়ার। ৩২৪ মিটার উঁচু লোহার তৈরি এ টাউয়ারে মানুষ আসে প্রেমকে অমর করতে। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। উল্টো আমিই প্রেমে পড়ে গেলাম তার। একেবারে প্রথম দেখায় প্রেম যাকে বলে। প্রথম তার সাথে যখন দেখা হয়, তখন সে কুয়াসার চাদরে ঢাকা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তার সামনে মন্ত্রমুগ্ধ আমি। দ্বিতীয় বার যখন দেখা হলো তখন তিনি আকাশের নীলে রোদেলা আমার ফাগুন পুরুষ। আর তৃতীয় বার রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে আমার ভিনদেশি তারা। তার বিশালতার কাছে নিজেকে বড়ই সামান্য মনে হয়েছে।

সিন নদী পেরিয়ে যতই তার কাছে গিয়েছি ততই বদলে যেতে শুরু করে অনুভূতিটা। ‘আমি দূর হতে কেবল তোমায় ভালোবেসেছি’ কিছুটা এরকম অনুভূতি। দূর থেকেই তাকে বড় আকর্ষণীয় লাগছিল। এ যেন চিরায়ত মানব চরিত্র! কাছে পেলে সোনার মোহর হয়ে যায় মাটির মোহর! ‘কাছে গেলে যদি ভালোবাসা কমে যায় তবে দুরত্বই ভালো-এই বলে সেদিন সন্ধ্যায় তার সাথে হলো ছাড়াছাড়ি।

পরের বার প্যারিস গিয়ে তার অন্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে আইফেল টাউয়ারের চূড়ায় উঠার সৌভাগ্য হল। চূড়া থেকে দেখলাম ভালোবাসার অন্য আরেক প্যারিসকে। পুরো প্যারিসটা ৩৬০ ডিগ্রিতে চোখে বন্দি করতে সময় লাগল আর ঘণ্টাখানেক। আইফেল এর চূড়ায় যুগল স্যাম্পেনের হাতে চুম্বনরত তরুণ-তরুণীকে দেখে মনে হয়েছে ‘প্রেম পবিত্র-প্রেম মধুর’! চূড়া থেকে দেখে মনে হলো পৃথিবী আসলেই গোল। কমলা লেবুর মতো প্যারিস শহরটা মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। তবে মিলিয়ে যায়নি ভালোবাসা। কেবল সূর্যটা টুপ করে ডুব দিয়েছে সিন নদীতে আর সন্ধ্যা নেমেছে শন্ জিলেজের পথে পথে ভালোবাসার শহরের ভালোবাসারা এভাবেই বেঁচে থাকুক অনন্তকাল!

ময়নার সঙ্গে ময়নাতদন্তের সম্পর্ক কী?

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

মোহাম্মদ আমিন : ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দটি শুনবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চোখে ময়না পাখির চিত্র ভেসে ওঠে। কিন্তু ময়নাতদন্তে একটি মৃতদেহের যে ব্যবচ্ছেদ করা হয়, তার সঙ্গে ময়নাপাখির কী সম্পর্ক থাকতে পারে, সেটি আমরা চিন্তা করি না কিংবা চিন্তা করেও এর কোনো কূল করতে পারি না। দেখা যাক ময়নাতদন্তের সঙ্গে ময়না পাখির যোগসূত্র আসলে কোথায় নাকি আদৌ কোনো যোগসূত্রই নেই!

‘ময়না’ ও ‘তদন্ত’ শব্দ দুটির সমন্বয়ে ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দ গঠিত। ‘তদন্ত’ শব্দের অর্থ কোনো বিষয়ে তদন্ত করে সত্য নিরূপণ। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ‘ময়না’ শব্দের তিনটি অর্থ আছে। ‘ময়না’ যখন দেশি শব্দ তখন এর অর্থ, কালো পালকাবৃত শালিকজাতীয় পাখি। ‘ময়না’ যখন সংস্কৃত শব্দ তখন এর অর্থ, ডাকিনি বা খল স্বভাবের নারী। অভিধানে সংস্কৃত ‘ময়না’ শব্দ দ্বারা বাংলা লোকসংগীতের রাজা মানিকচন্দ্রের জাদুবিদ্যায় পারদর্শী পত্নীকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘ময়না’ যখন আরবি শব্দ তখন এর অর্থ অনুসন্ধান। আরবি ‘মুআইনা’ শব্দের অর্থ চোখ দিয়ে, চোখের সামনে, প্রত্যক্ষভাবে, পরিষ্কারভাবে। বাংলায় এসে শব্দটি তার আসল রূপ হারালেও অন্তর্নিহিত অর্থ পুরোপুরি হারায়নি। ‘মুআইনা’ বাংলায় এসে ‘ময়না’ হয়ে গেলেও ‘অনুসন্ধান’ অর্থ নিয়ে সে তার মূল অর্থকে আরও ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছে। এভাবে শব্দার্থের নানা পরিবর্তন ঘটে।

‘ময়নাতদন্ত’ শব্দের ‘ময়না’ বাংলা ও সংস্কৃত ‘ময়না’ নয়। এটি হচ্ছে ‘আরবি’ ময়না। মূলত আরবি ‘মুআইনা’ শব্দ থেকে বাংলায় অনুসন্ধান অর্থে ব্যবহৃত ‘ময়না’ শব্দের উদ্ভব। এই আরবি ‘ময়না’ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ‘তদন্ত’ শব্দ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দটি। যার অর্থ, অস্বাভাবিক বা আকস্মিক মৃত্যুর কারণ উদঘাটনের উদ্দেশ্যে শবব্যবচ্ছেদ। বাংলায় ব্যবহৃত ‘ময়নাতদন্ত’ শব্দটির ইংরেজি অর্থ ‘পোস্ট-মর্টেম’ এবং এর অর্থ মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে একটি মৃতদেহের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। দেশি ময়না পাখি বা শালিক হতে ময়নাতদন্ত শব্দের উৎপত্তিবিষয়ক বর্ণনা আদৌ সত্য নয়।

বাংলাদেশে ২০১ গম্বুজের মসজিদ !

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

201 domes mosque mk1201 domes mosque mk2

বাচ্চাদের জ্বর হলে করণীয়…

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

child fever infographics

উদার গণতন্ত্র ও মৌলবাদী ধর্মতন্ত্রের মহামিলন

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

শহিদুল ইসলাম : বাংলাদেশে সম্প্রতি সাম্প্রদায়িকতার যে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের অনেক ভালো ভালো কাজের দাবিকে যেন ব্যঙ্গ করছে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সবাই আশায় বুক বেঁধেছিল এই ভেবে যে, এবারে সাম্প্রদায়িকতার রাহুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। কিন্তু মানুষের সে আশা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে এ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা চলছে তা নতুন করে দেশবাসীকে পাকিস্তানি নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সরকার জিয়া, এরশাদ ও খালেদার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং আজকের পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, তাদের সেই রাজনীতিকে আরো শক্তিশালী করে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সেসব আক্রমণে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বর্তমান সরকারের ওপর তাদের আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেই আস্থার ফলে তারা তাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি আগলে নিজের দেশেই পড়ে ছিলেন। অনেকেই আজ তাদের জান-মাল-সম্মান বাঁচানোর জন্য দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এভাবে চললে বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের মতো হবে। মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর মানুষ এখানে থাকতে পারবে না।

দুই. ইতিহাসে প্রমাণ আছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা না করলে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। সে রাষ্ট্রে মানবিক গুণাবলির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সভ্যতার সূচনালগ্নে একবার ও চৌদ্দশ খ্রিস্টাব্দের ইতালির রেনেসাঁর পর দ্বিতীয়বার জ্ঞানবিজ্ঞান-দর্শন চর্চার জোয়ার এসেছিল। দেখা যায় প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সূচনায় ধর্মীয় কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। কারণ গ্রিকদের কোনো ধর্মগ্রন্থ ছিল না। সেটাই ছিল প্রথম যুগের গ্রিকদের স্বাধীনতার প্রধান শর্ত। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বিউরি বলছেন,‘হোমারের কবিতা ছিল ইহজাগতিক, ধর্মীয় নয় এবং ধর্মগ্রন্থের তুলনায় সেগুলো নীতিহীনতা ও বর্বরতা থেকে মুক্ত। হোমারের কর্তৃত্ব ছিল অপরিসীম কিন্তু তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বের মতো বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই বাইবেলের সমালোচনার মতো হোমারের সমালোচনা কখনো বাধার সম্মুখীন হয়নি।’ বিউরি আরো বলছেন,‘স্বাধীনতার আর একটি অভিব্যক্তি ও শর্ত হলো যাজকতন্ত্রের অনুপস্থিতি। সেদিন পুরোহিত শ্রেণি কখনো-ই এতটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। তাই তারা নিজেদের স্বার্থে সমাজের ওপর নির্যাতন চালাতে পারেনি কিংবা ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিতে পারেনি।’ তখন পুরোহিত শ্রেণি রাষ্ট্রের কর্মচারী। রাষ্ট্রের অধীন।

অবিকল একই ঘটনা ঘটে রেনেসাঁর পর। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও শিল্প-বিপ্লবের পর ইউরোপে প্রবল প্রতাপশালী পুরোহিত শ্রেণির শক্তি ধ্বংস করা হয় এবং ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা হয়। খ্রিস্টধর্ম টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার ফলে এটা সম্ভব হয়। তবে আদি সেই গ্রিক সমাজ মাত্র তিনশ বছর টিকেছিল। খ্রিস্টধর্ম উত্থানের পর পশ্চিমে দীর্ঘ এক হাজার বছরের অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হয়। এদিকে উনিশ শতকে রেনেসাঁর জয় নিশ্চিত হয়। ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ইউরোপ জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাঝে ইসলামের আবির্ভাবের পর ৯ম থেকে ১১ শতকে ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় জোয়ার আসে। সে জোয়ারও তিনশ বছরেই শুকিয়ে যায়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় তাহলো ইসলামি বিশ্বে যারা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা কেউই সূক্ষ্ম বিচারে মুসলমান ছিলেন না। ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের ওপর আক্রমণ তাই প্রমাণ করে। তারা সবাই ছিলেন যুক্তিবাদী যা ইসলামে কেবল নয় সব ধর্মে নিষিদ্ধ। আবার আধুনিক সভ্যতায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সময়কালও দুই/তিনশ বছরের বেশি নয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পশ্চিমে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে এবং বর্তমানে পশ্চিমে মৌলিক কাজের পরিমাপ সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। কারণ আবার পশ্চিমে বিশেষ করে আমেরিকায় ধর্মীয় ভাবাদর্শের নতুন করে উত্থানের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকার সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর ট্রাম্পের ঘোষণায় সেটাই প্রমাণ করে। তিনি পুরোহিতদের দাবি পূরণে বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সংসর্গ, সমলিঙ্গ-বিবাহ ও গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে নির্বাহী আদেশ দিতে যাচ্ছেন। সবার ধারণা আমেরিকান সাম্রাজ্যের দিন শেষ হতে চলেছে।

রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে বেগম রোকেয়াও ভেবেছিলেন। ১৩১১ সালে ‘নবনূর’ পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন,‘যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন।’ এটা কেবল নারীর ক্ষেত্রে সত্য নয়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্যও সত্য। নোবেল বিজয়ী একমাত্র মুসলিম বিজ্ঞানী প্রফেসর সালাম বলেছেন,‘ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ধারা সবচেয়ে দুর্বল।’ চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ মুসলিম পণ্ডিত ইবনে খলদুন। তারপর ইসলামি বিশ্বে আর কোনো মনীষীর জন্ম হলো না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পদের কোনো অভাব নেই। তারা বিশ্বের উচ্চতম ভবন নির্মাণ করে গর্ব প্রকাশ করেন। আলোয় ঝলমল শহর তৈরি করে বিদেশিদের বেড়ানোর সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্বমানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেননি। মোগল বাদশারা ‘তাজমহল’ তৈরি করেছেন, কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি। যুক্তিবাদ ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে মুসলমান হুজুরদের সে মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই প্রফেসর সালামকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিয়েছে আর মিসরের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিম মাহফুজকে মুসলমান বলে স্বীকারই করে না; বরং ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ গড়ে ইসলামের আদিযুগে ফিরে যেতে চাইছে মুসলমানরা।

তিন. বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমে উৎপাদিত সম্পদে আমরা মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছি। কিন্তু সে অর্জনে আমাদের মতো শহুরে অলস বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদদের অবদান কতটুকু? তাদের শ্রমের ওপরই আমরা জীবনযাপন করছি। অন্যের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে আমরা বিশ্বের কাছে বাহবা কুড়াচ্ছি। এই আত্মসাতেরই আর এক নাম ‘গণতন্ত্র’। আরো সূক্ষ্মভাবে বললে বলতে হয় ‘উদার গণতন্ত্র’। ‘ইসলামের’ নামে হুজুররা যে রাজনীতি করছে, আমরা ‘উদার গণতন্ত্রের’ নামে সেই একই রাজনীতি করছি। এখানেই ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মতন্ত্র’ এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছে। তাদের মিলনই বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানি কায়দায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাদের উপাসনালয় ভাঙা হচ্ছে, দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। হুজুরদের দাবি মেনে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। হুজুরদের নির্দেশে শিশুদের পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছে। এতে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা লাখ লাখ মূর্তি ভাঙলেও হবে না। তাই আজ প্রশ্ন উঠেছে, আমরা পাকিস্তান ভাঙলাম কেন? আমরা কি কেবল পাঞ্জাবি ধনীর জায়গায় বাঙালি ধনী তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আজ একজন হিন্দুকে তার বাড়ির মহিলাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, তাহলে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম কেন? পাকিস্তানি হামলাকারীর বদলে বাঙালি হামলাকারীর অভয়ারণ্য তৈরির জন্য? কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন? চার লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

চার. অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘উদার গণতন্ত্র’ তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে গেছে। এই গণতন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদ মাত্র আটজন মানুষ দখল করে নিয়েছে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির অধ্যাপক জন রালস্টোন সাওল একখানা বই লিখেছেন যার নাম দিয়েছেন ‘ভলতেয়ার্স বাস্টার্ডস’-ভলতেয়ারের জারজ সন্তান হলো আজকের গণতন্ত্র। ভলতেয়ারের সময় এই গণতন্ত্রের প্রভূত মূল্য ছিল। কিন্তু সম্পদের ওপর মানুষের অধিকার স্থাপনের আইন আজ সে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছে। আজ সারা বিশ্বে ‘উদার গণতন্ত্র’ ও মৌলবাদী ‘ধর্মতন্ত্রের’ মহামিলন ঘটে গেছে। তাই পৃথিবী আজ ক্রমান্বয়ে মানুষের বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। যে দেশ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে তাকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্থানে স্থাপন করতে পারবে, আগামী বিশ্বের পরিচালকের আসনে তারাই বসবে। ‘উদার গণতন্ত্র’ পৃথিবীতে শান্তির পরিবর্তে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের বিলাসী জীবনের ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রয়োজন মেটাচ্ছে। মানুষ প্রকৃতিকে দখল করেছে। প্রতিটি দেশের সংখ্যাগুরু স¤প্রদায়কে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দখল করেছে। জলবায়ু বিষাক্ত করে তুলেছে। মনে হয় বর্তমান সভ্যতা তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধীরে অথচ স্থির পায়ে এগিয়ে চলেছে।

শহিদুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।