কালের গর্ভে বিলীন আরেকটি বছর !

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন

new-year-rhymeশাহ মতিন টিপু : ৩১ ডিসেম্বর। এই বছরের শেষদিন আজ। আজকের দিনটি পার হলেই হারিয়ে যাবে গত এক বছর ধরে দেয়ালে টানানো ক্যালেন্ডারটির গুরুত্ব। সেখানে ঝুলবে আরেকটি নতুন ক্যালেন্ডার।

আজকের দিনটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আরেকটি বছর। স্মৃতির খেরোখাতা থেকে প্রাপ্তিঅপ্রাপ্তির হিসাব মুছে শুরু হবে নতুন বছর। অনেক ঘটনঅঘটন, প্রাপ্তিঅপ্রাপ্তি, চড়াইউৎরাই, উদ্বেগউৎকণ্ঠা ও আনন্দবেদনার সাক্ষী এই বিদায়ী বছর। নানা ঘটনা প্রবাহে আলোচিত ইংরেজি ২০১৬ সাল। সেইন্ট গ্রেগরি প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারের হিসাবে এখন সামনে সমাগত ২০১৭।

সময় এক প্রবহমান মহাসমুদ্র। কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়া, পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। তাই তো জীবন এত গতিময়। যে প্রত্যাশার বিশালতা নিয়ে ২০১৬এর প্রথম দিনটিকে বরণ করা হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার সব কি পূরণ হয়েছে?

বিদায়ী বছর প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির দোলাচলে নিয়েছে অনেক কিছু। তারপরও নতুন বছরের নতুন সূর্যালোকিত দিনের প্রতি অসীম প্রতীক্ষা ও প্রত্যাশা মানুষের মনে। নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন। চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় ধূসর হয়ে আসা গল্পগাঁথার সারি সারি চিত্রপট। কখনো বুকের ভেতর উঁকি দেয় একান্তই দুঃখযাতনা। কখনো পাওয়ার আনন্দে নেচে উঠে হৃদয়। এ বছরটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে আমাদের জীবনে, এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের।

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কথার মতই দুঃখ, কষ্ট সবকিছু কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে যাত্রার প্রেরণা পেতে চায় সবাই। নতুন বছরটি যেন সমাজ জীবন থেকে, প্রতিটি মানুষের মন থেকে সকল গ্লানি, অনিশ্চয়তা, হিংসা, লোভ ও পাপ দূর করে। রাজনৈতিক হানাহানি থেমে গিয়ে প্রিয় স্বদেশ যেন সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

বিদায়ী বছরে ভাল খবর যেমন ছিল, তেমনি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও কম ছিল না । দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রেই বিষ্ময়কর সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। সারা বিশ্বেই বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্ব সভায় বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ আসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দারিদ্র্য মুক্তির সাফল্য দেখতে বিশ্বব্যাংক প্রধানও বাংলাদেশ সফর করেছেন। মুগ্ধ হয়েছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক মানদন্ড বজায় রেখে। বেশ কয়েকজনের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যুদন্ডও কার্যকর করা হয়েছে। এতে জাতি হিসেবে সারাবিশ্বে যেমন আমাদের মর্যাদা বেড়েছে, তেমনি শহীদ পরিবারগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছে। কিছুটা হলেও মোছন হয়েছে জাতির গ্লানি। সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে অবনতির চিত্র লক্ষণীয়।

দুর্নীতি, দলীয়করণ, আমলাতোষণ, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অপকান্ড এখন পূর্বাপেক্ষা বেড়েছে। জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নেই মতৈক্য। সংকুচিত হয়ে গেছে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রগুলোও। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও অনেকের কাছে উপহাসের হয়েছে। তবে নাসিক নির্বাচন আশার আলো জ্বেলেছে। দেশস্বার্থে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক ঐক্য দরকার। তা এমন যে, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ফিরে আসুক গণতন্ত্রের সুস্থ ধারা, সুসংবাদ বয়ে আনুক সবার জন্য।

২০১৬ সালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য ছিল স্থানীয় সরকারের নানা পর্যায়ে এবং দলীয় প্রতীকে নির্বাচন। উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচন ছাড়াও হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুটি দলেরই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বছরের শেষ দিকে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংলাপে বসেছে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো। যা দেশে গণতন্ত্রের চর্চার পথে নতুন আশার আলো।

বছর জুড়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল জঙ্গিবাদ। সারা বিশ্বে যখন জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেখানে এর বিষবাষ্প থেকে মুক্ত ছিল না বাংলাদেশও। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি এবং শোলাকিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠীর বর্বরতা ও হত্যাকাণ্ড অবাক করেছে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বকে।

এ বছর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বিষয়টি সবচেয়ে আলোচিত ছিল, সেটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। সারা বিশ্বের আলোচিত এই নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। নানা কারণে বিতর্কিত এই প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কী কী প্রভাব পড়বে তার হিসাবনিকাশ চলছে এখনও।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ২০১৫১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭.১১ শতাংশ হওয়ার ঘোষণা আসে ২০১৬ সালে। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও সরেনি আলোচনা থেকে। অর্থনীতিতে স্বস্তির পরশ যেমন ছিল, তেমনি ছিল দুশ্চিন্তার কারণও। মোটা দাগে বলতে গেলে বছরটিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেকগুলো সূচক স্থিতিশীল ছিল। অর্থনীতির যেসব সূচক সরাসরি সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে, সেসব সূচকের বেশ কয়েকটি স্বস্তিদায়কই ছিল । ২০১৬ সালটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্যও ছিল খুব ভালো বছর। রাজস্ব আদায় হয়েছে নিজস্ব কৌশলমতোই। ব্যবসাবাণিজ্য চলেছে স্বাভাবিকভাবে। এর ফলে সারা বছরই রাজস্ব আদায়ের গতি ভালো ছিল।

কূটনৈতিক ও মানবিক দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীরা সেখানকার সেনাবাহিনীর গণহত্যা এবং দমননিপীড়নের মুখে বিভিন্নভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রেবেশ করার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমার সরকারকে চিঠিও দেয়া হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুপল্লীতে হামলার পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সব শেষ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালপল্লীতে আগুন তুলেছে মানবিকতার নতুন প্রশ্ন।

২০১৬ সালে দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ৫০০ স্কুলকলেজকে বেসরকারি থেকে সরকারিকরণ। সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও রয়েছে একটি বিশাল অর্জন। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে আমাদের পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ। এই উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

এত কিছুর পরও এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন নানা সমস্যার আবর্তে জর্জরিত। সমস্যা যেমন আছে গ্রামে, তেমনি আছে শহরতলি বা নাগরিক জীবনে। সব সমস্যাকে মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে চায়, এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালে কী ভুল ছিল তা শুধরে নিয়ে নতুন পথচলা শুরু হবে ২০১৭ সালে। নতুন বছর নিয়ে আসবে নতুন কিছুর বারতা। এই কামনা এ দেশের সব মানুষের।

সূত্রঃ রাইজিংবিডি ডট কম

নারী-পুরুষের সম্পর্কে চিড় ধরলে …

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

মানুষ আমি, আমার কেন পাখির মতো মন!

ফারজানা হুসাইন

extra-marital-4. গত সপ্তাহে কাজের ফাঁকে আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে কফি খাচ্ছি। হঠাৎ করে সে বলে উঠলো, আচ্ছা তোমার পার্টনার যদি তোমার সঙ্গে চিট করে তুমি কি এরপর আর তার সঙ্গে থাকবে?

আমি মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম, নাহ!

সে মাথা নাড়িয়ে বিষাদ বদনে বললো, এতই কি সহজ সিদ্ধান্ত নেওয়া? এত সহজে অনেকদিনের একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কি যায়?

না, একদমই সহজ নয়, তবে সামটাইস ইউ হ্যাভ টু বি ক্রুয়েল টু বি কাইন্ড টু ইউরসেলফ।

চিট করা বা সঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করা বলতে সোজাসুজিভাবে আমরা অন্য কারও সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বুঝি, আমাদের সনাতন সংস্কৃতিতে হয়তো অন্য কোনও নারী বা পুরুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়াও বোঝায়। আমার দৃষ্টিতে শঠতা মানে সততার অভাব, তা সে যে ধরনের অসততাই হোক। যে বিষয় বা বিষয়গুলো দু’জনের সম্পর্কের ভিত্তি তার প্রতি প্রবঞ্চনাকেই আমি মোটামুটিভাবে শঠতা বলব।

সঙ্গী যখন প্রতারণা করে, সেটা জেনে যাওয়ার পর স্বাভাবিক মানুষ যা করে তা হলো প্রশ্ন, হাজারটা প্রশ্ন, একের পর এক প্রশ্ন। কেন করলে এ রকম? কবে করেছ, কোথায় করেছ, কতবার করেছ, কার কার সঙ্গে করেছ—ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনও উত্তরগুলো পাওয়া যায়, কখনও যায় না। তবে এই প্রশ্নগুলো করার পেছনের কারণ উত্তর খুঁজে পাওয়া নয় মোটেই। বরং ঘটনার আকস্মিকতায় তীব্র ঘৃণা আর অপমানকে উগরে দেওয়া মাত্র।

এরপর শুরু হয় নিজেকে প্রশ্ন করা। আমার কোথায় খামতি ছিল যে, সে এমন করলো, এতদিনের সম্পর্কের কথা একবারও সে ভাবলো না? এত মায়াভালোবাসা তার কাছে তুচ্ছ?

এত এত প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে যায় হাসি, খাওয়ার ইচ্ছে, বিছানায় এপাশওপাশ করাই কেবল সার হয়—ঘুম সে তো কবেই গেছে দেশান্তরে। বই খোলা থাকে সামনে কিন্তু পাতা উল্টানো হয়ে ওঠে না, গরম চায়ের মগ ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়—ফ্যাকাশে স্তর জমে মগের ওপরে। খোলা টিভির চরিত্রগুলো নেচেগেয়ে যায় আপন মনে—কে তার খবর রাখে?

এক কথায় জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। সব শাস্তি আমরা নিজেকেই দেই, অথচ অপরাধটা আমরা করিনি একদমই। আমরা ভুলে যাই এ সময়ের প্রথম এবং প্রধান কাজ নিজেকে একেবারেই কষ্ট না দেওয়া বরং প্রিয় মানুষ শঠতা করলে ওই মুহূর্তে নিজেকে ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি দরকার। ভালোবাসার মানুষটা যে ভালোবাসতে ভুলে গেছে!

. একগামিতা প্রাণীর সহজাত বৈশিষ্ট্য নয়, জীবজগতে একগামী প্রাণীর দেখা মেলা ভার। আমাদের গুহাবাসী পূর্বপুরুষেরা বহুগামী ছিল। গোত্রসমাজ গড়ে ওঠার কালে ধর্মের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় একটি সুশৃঙ্খল সমাজ কাঠামো গড়ে দেওয়া, ভালোমন্দের সীমানা প্রাচীর গড়া। সেই মহৎ নির্মাতার ভূমিকায় ধর্ম সভ্য সমাজের ভিত্তি হিসেবে একগামিতার কথা শোনায়। আব্রাহামিক তিন ধর্মের মতো বাকি প্রায় সব বহুল প্রচলিত ধর্মই নারীর ওপর একগামিতার বোঝা চাপিয়েছে, অথচ পুরুষ পেয়েছে বৈবাহিক সূত্রে বহুগামিতার স্বীকৃতি।

ইসলাম সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করার অনুমোদন দেয়। রাধাকেবল কৃষ্ণের প্রেয়সী, হাজারখানেক স্ত্রী তার। ওদিকে মহাভারতের দ্রৌপদীর পাঁচস্বামীর কারণ বেচারির একাধিক পতিঈপ্সা নয় বরং ভাইদের সঙ্গে সবকিছু ভাগ করে নেওয়ার অর্জুনের প্রতিজ্ঞা।

মজার বিষয় হলো, বেশির ভাগ পুরুষই তার নারী সঙ্গীকে অন্য কারও সঙ্গে প্রেম করাকে হয়ত ক্ষমা করতে পারে যদি না সেই মেয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। নারীর শারীরিক শুচিতা (!) পুরুষের আজীবনের আরাধ্য বস্তু। সীতার অগ্নিপরীক্ষা আর আয়েশার সতীত্বের প্রমাণের কথা পাওয়া যায় ধর্মগ্রন্থে। অথচ, বেশিরভাগ নারী আবার পুরুষের অন্য নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করাকে পুরুষ মানুষের শরীরের চাহিদা একটু বেশিই হয় বলে ধরে নেয় কিন্তু অন্য কোনও নারীর সঙ্গে তার পছন্দের পুরুষের অশারীরিক প্রেমকে মানতে পারে না একদমই। সুতরাং শরীর মনের সংঘাত নারী পুরুষ ভেদে ভিন্নতর।

সেই আদ্দিকালের শুধু নারীপুরুষের সম্পর্ক কেবল আর নেই আজ, পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রগতিপন্থী আমরা ও সচেতনভাবেই স্বীকার করে নিচ্ছি সমলিঙ্গের সম্পর্কগুলোকে। লিঙ্গ পরিচয় আর অভিযোজন এক বিস্ময় যেন আজ।

কথায়কথায় আমার কৈশোরের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমাদেরই সমবয়সী দু’জন কিশোরকিশোরী প্রেমে পড়ল স্কুলের শেষ ক্লাসেই। দু’জনই ভিন্নভিন্ন আবাসিক এক স্কুলকলেজের স্টুডেন্ট হওয়াতে প্রেম চলল পত্রালাপে। ছুটিতে বাড়ি ফিরলে দুজন কারও তোয়াক্কা না করেই শহরে রিকশা করে ঘুরে বেড়াতো, প্রেম করতো। তখন ছোট্ট মফস্বল শহরে এই লোক দেখানো প্রেম খুব ভালো চোখে দেখা হয়নি। মূল কাণ্ড ঘটলো কলেজের শেষ দিকে। মেয়েটিকে তার কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো সেই আবাসিক কলেজের আরেকটি মেয়ের সঙ্গে সমপ্রেমের ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়ার জন্য। গল্পের ডালপালা ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগেনি একদমই। স্বভাবতই বন্ধুমহলে বেশ কানাঘুষো চললো। শুনেছি পরের ছুটিতে ছেলেটি বাড়ি ফিরলে মেয়েটিকে হাতেকলমে পরীক্ষা দিতে হয়েছে তার বিষমকামিতার। হোক কিশোর, তবু সে প্রেমিক তো! ষোলসতেরোর দুই কিশোরকিশোরীর প্রগলভাময় প্রেম আর প্রমাণের নিষ্ঠুরতার সেই ঘটনা মনে পড়লে এখনও বিবমিষা জাগে। সেই ঘটনার বেশ কিছু মাস পর্যন্তও ছেলেটি আর মেয়েটির মধ্যে যোগাযোগ ছিল।

একটি বিষমকামী সম্পর্কে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে হয়ত মোটামুটি মেনে নেওয়া হয়। আর যাই হোক মেয়েটি অন্য কোনও ছেলের সঙ্গে তো আর সম্পর্ক করেনি; তাই প্রেমিকের চোখে প্রেমিকার সতীত্ব অটুট থাকে।

যাই হোক, গল্পের শুরুতে ফিরে আসি। যারা মনে করে হৃদয়ের ভাঙন কেবল আমাদেরই হয়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ফ্রিডম অব সেক্সস নয়, কেবল ফ্রি সেক্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জন্য বলি—শুরুর গল্পের আমার এই সহকর্মী গত তিন সপ্তাহজুড়ে ভয়াবহ মনোকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ঠিক বিষমকামী আমাদেরই মতোই। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—এই ভদ্রলোক একটি সমকামী ও সমপ্রেমী সম্পর্কে আছেন।

হায় হৃদয়ের ক্ষরণ! নারীপুরুষসমকামীসমপ্রেমী কাউকেই সে ছাড় দেয় না!

লেখক: আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ২২ ডিসেম্বর ২০১৬

কমিকসঃ থরথর মহারাজ

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

king-trembling-1king-trembling-2king-trembling-3

বিভাগ:কৌতুক

উপকূলে ঝড়ঝঞ্ঝা ঠেকাতে তালগাছ !

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

palm-tree-on-beach

শাহদেরগাঁও জামে মসজিদ

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

shahdergaon-mosque-1shahdergaon-mosque-2

ফেসবুকে ধর্ম প্রচারের নামে প্রতারণা

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

যুবায়ের আহমাদ : কালের আবর্তনে ফেসবুক একটি বড় যোগাযোগমাধ্যম হয়ে গেছে। দেশবিদেশের লাখো মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে ফেসবুক। বিশ্বের ১৬০ কোটি (প্রায়) মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করে। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পাঁচ কোটি সাত লাখেরও বেশি। ফেসবুক ব্যবহারকারীর পরিমাণ এক কোটি ৭০ লাখ। (দৈনিক যুগান্তর : ১১১১২০১৫) এ তো এক বছর আগের হিসাব। এক বছরে আরো অনেক বেড়েছে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা।

ফেসবুকের উন্মুক্ত এই বিশাল মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে সুযোগসন্ধানী মহল। অপরাধকারীরা যেমন তাদের অপরাধ বাস্তবায়নে জাল বিস্তার করছে, তেমনি বিভিন্ন ভ্রান্ত মতাবলম্বীও তাদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে ব্যবহার করছে ফেসবুককে। অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে ফেসবুক। সরলপ্রাণ মানুষকে বোকা বানিয়ে মিথ্যা প্রচার করার জন্য গুজব এবং ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে তারা। কখনো দেখা যায় যে ‘ইসলাম প্রচারের’ দোহাই দিয়ে করা হচ্ছে এসব কাজ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুয়া আইডি কিংবা পেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ফেসবুক উন্মাদনা এখন চরমে।

আমিন না লিখে যাবেন না’; ‘মুসলমান হলে আমিন না লিখে যাবেন না’ ‘ছুবহানাল্লাহ, আল্লাহর কী কুদরত!’ ‘এটা নবীজির পাত্র, আমিন না লিখে যাবেন না’—এমন লেখার সঙ্গে আল্লাহ কিংবা রাসুল (সা.)-এর নাম কিংবা কালিমা খচিত ছবি হয়তো ফেসবুক ইউজারমাত্রই দেখেছেন। এসব ভুয়া পোস্ট দিয়েই অনেকে ফেসবুকে ‘ইসলাম প্রচার’ করছেন। অনেকেই সরলপ্রাণে লাইককমেন্টও করেছেন। অসুস্থ বা রুগ্ণ শিশুর ছবি দিয়ে লিখে দেয়, ‘আমিন না লিখে যাবেন না। ’ ভাবখানা এমন যে, এখানে লাইক দিলেই জান্নাত। প্রশ্ন হলো, এখানে রুগ্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আমিন বলার কী সম্পর্ক? নবীজি (সা.)-এর পাত্রের সঙ্গে আমিন বলার কী সম্পর্ক?

পাশাপাশি কয়েকটি ধর্মীয় গ্রন্থের ছবি দিয়ে বলা হয়, ‘আপনি কোনটির সাপোর্টার?’ কখনো দেখা যায় এমসিকিউয়ের মতো প্রশ্ন। আপনার রব কে? এক. আল্লাহ। দুই. ভগবান। তিন. গড। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, হৃদয়ে ঝাঁকুনি দেওয়ার মতো প্রশ্ন, ‘আপনি কি মুসলমান?’ মুসলমান হলে লাইক না দিয়ে যাবেন না। আবেগী ফেসবুকাররা এখানে ধুমছে লাইক দিচ্ছেন। এগুলো ইসলাম নিয়ে ইসলামের পরিভাষা ‘আমিনকে’ নিয়ে উপহাস করা ছাড়া কিছুই নয়। কখনো দেখা যায়, অশুদ্ধ বা জাল হাদিস তুলে ধরে বলা হয়, ‘লাইক দিন, যদি জান্নাতে যেতে চান। ’ অথচ মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করা যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়। ’ (সহিহ বুখারি)

পোস্টটি শেয়ার করলে, ‘আমিন লিখলে অমঙ্গল থেকে বাঁচা যাবে; মনোবাসনা পূর্ণ হবে, শেয়ার না করলে, আমিন না লিখলে ব্যবসায় লোকসান হবে, সন্তান মারা যাবে’—এমন শিরকপূর্ণ কথাবার্তাও থাকে কথিত ইসলাম প্রচারে। আমিন লিখলেই মনোবাসনা পূর্ণ হবে, না লিখলে ক্ষতি—এটা কোরআনসুন্নাহর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কেননা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্ট দেন, তবে তিনি ছাড়া তা অপসারণকারী কেউ নেই। পক্ষান্তরে যদি তোমার মঙ্গল করেন, তবুও তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। ’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৭)

মূলত এসব পোস্টের মাধ্যমে মানুষকে শিরকে লিপ্ত করা হচ্ছে। একটি আমিন বলা বা শেয়ারই মানুষকে অমঙ্গল থেকে বাঁচাতে পারে—এমন ধারণা তো সম্পূর্ণ শিরক। অনেকেই সরল মনে অযাচিতভাবেই লিপ্ত হচ্ছে শিরকের মতো ক্ষমার অযোগ্য মারাত্মক অন্যায়ে। শিরককারীর জন্য জান্নাত হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন। তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (শিরকের মতো) অত্যাচারকারীদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৭২)

ভুয়া সংবাদের অন্যতম উৎস হয়ে গেছে ফেসবুক। এখানে সবাই যেন সাংবাদিক। ফেসবুকের উন্মুক্ত মাধ্যমে যা ইচ্ছা তাই পোস্ট করা যায় বলে একে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ভুয়া সংবাদ পোস্ট করেন। প্রায়ই দেখা যায়, ‘মক্কা শরিফের খাদেম স্বপ্নে দেখেছেনশেয়ার করলে এই পুরস্কার। ’ কয়েক দিন আগে দেখা গেল অং সান সু চির হিজাব পরা ছবি। নিচে লেখা—‘ইসলাম গ্রহণ করেছেন অং সান সু চি। ’ সারা পৃথিবীর কেউ জানে না। কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পেল না সেই খবর, কিন্তু বাঙালির ফেসবুক দখল করে নিল সু চির হিজাবি ছবি! একজন কমেন্টে প্রশ্ন করলেন, ‘এই খবর পৃথিবীর কোনো মিডিয়া পেল না, আপনি কোত্থেকে পেলেন?’ জবাব দেওয়া হলো, ইহুদিনাসারারা কি ইসলাম গ্রহণের খবর প্রচার করবে? কথায় কিন্তু যুক্তি আছে।

আরেকবার দেখা গেল, ‘এবার সনাতন ধর্ম গ্রহণ করলেন নওয়াজ শরিফের ভাতিজি। সবাই আশীর্বাদ করুন। ’ ‘যজ্ঞ করে ইসলাম ছেড়ে রফিক এখন হিন্দু রাজু। দেখামাত্রই পোস্টটি শেয়ার ও দাদাকে আশীর্বাদ করুন। ’ এসব ছবি নিছক ফটোশপের কারসাজি। ছবিটি ভালোভাবে দেখলে বোঝা যাবে যে কাজটা এত নিপুণভাবে করা যে তা কোনো আনাড়ি ধর্মপ্রিয় ফেসবুকারের কাজ নয়। বরং খুব ঝানু কেউ মুসলমানদের হাসির পাত্র বানানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজটা করেছে। প্রথমত, যাঁরা এ ধরনের পোস্ট দিয়ে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে খেলা করছেন, তাঁরা মারাত্মক অন্যায় করছেন। মিথ্যা বলা, লেখা, প্রচার করা ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ কবিরা গুনাহ। একটি কবিরা গুনাহই একজন মানুষকে জাহান্নামে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহর কথা বলব না? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, মাতাপিতার অবাধ্যতা, এরপর তিনি ঠেস দিয়ে বসে বললেন এবং শোনো! মিথ্যা কথা। তিনি (মিথ্যা কথা) বারবার বলতে লাগলেন। ’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

অনেক সময় লাইক বা কমেন্ট পাওয়ার জন্য এ ধরনের মিথ্যা বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়। লাইককমেন্ট পাওয়ার লোভ এক ধরনের মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। তারা যেন লাইককমেন্টের কাঙাল। ফলে বেশি লাইক পেতে ধর্মীয় অনুভূতি আর গুজবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, লাইক বা কমেন্ট কী মহামূল্যবান জিনিস যে মিথ্যা প্রচার করে লাইক বা কমেন্ট পেতেই হবে! কী উপকার হবে এতে? মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা প্রচারের মধ্য দিয়ে অতি সাময়িক ফায়দা লাভ হলেও মূলত এর দীর্ঘকালীন ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন। কারণ মিথ্যা ফাঁস হয়ে গেলে মিথ্যাবাদীর জন্য বয়ে আনে মারাত্মক লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগ। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেক মিথ্যাবাদী পাপীর জন্য। ’ (সুরা : জাসিয়া, আয়াত : )

কখনো দেখা য়ায়, মিথ্যা দিয়ে কেউ কাউকে হাসাতে চায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কঠিন দুর্ভোগ তার জন্য, যে মিথ্যা ও অলীক কথা বলে লোককে হাসাতে চায়। তার জন্য কঠিন দুর্ভোগ, তার জন্য কঠিন দুর্ভোগ। ’ (তিরমিজি, আবু দাউদ)

এ ধরনের মিথ্যাচার মুনাফেকির আলামত। যিনি এ ধরনের মিথ্যা পোস্ট দেবেন, তিনি যতই ইসলামের দরদি সেজে নিজেকে একজন একনিষ্ঠ মুসলমান হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করুন না কেন, তার কাজটি প্রমাণ করছে যে তিনি একজন মুনাফিক। রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি (অর্থাৎ কোনো মুমিনের দ্বারা এ কাজগুলো সংঘটিত হবে না। যদি কেউ এ কাজগুলো করে সে আর মুমিন নয়, বরং সে হলো মুনাফিক) . কথা বললে মিথ্যা বলে। ২. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে। ৩. তার কাছে আমানত রাখা হলে সে এর খিয়ানত করে। ’ (বুখারি ও মুসলিম)

যুগে যুগে মিথ্যা বলে, মিথ্যা প্রচার করে মুনাফিকরাই ইসলামের বেশি ক্ষতি করেছে। ইসলামকে হাসির পাত্র বানিয়েছে। মহানবী (সা.)-কেও তারাই বেশি কষ্ট দিয়েছে।

এ বিষয়ে আমাদের করণীয় হলো, কোনো সংবাদভিত্তিক পোস্টে লাইক বা কমেন্ট করার আগে সংবাদটির উৎস জানতে হবে যে তা কোনো সঠিক উৎস থেকে এসেছে কি না। অনেক আবেগপ্রবণ ফেসবুকারই লাইক বা কমেন্ট শেষে এসব মিথ্যা পোস্ট শেয়ারও করে যাচ্ছেন। অথচ একজন মুসলমানের জন্য কারো নিয়ে আসা এ ধরনের কোনো খবর যাচাই না করে বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। মুমিন তো কোনো গুজবে কান দিতে পারে না। পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো খবর নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে। যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। ’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : )

একটি মেয়ের ছবি দিয়ে লিখে দেওয়া হলো, ‘এই হিজাবি বোনটির জন্য কত লাইক? সবাই লিখুন মাশাআল্লাহ। সেই ছবিতে ‘মাশাআল্লাহ’ লেখা কমেন্টের ধুম পড়ে গেল। শেয়ারের ঝড়ে ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুক কমিউনিটিজুড়ে। এ নিয়ে ধর্মবিরাগী অনলাইন এক্টিভিস্টরা হাসাহাসি করে মজাও নিচ্ছেন বেশ। উপহাসের পাত্র বানিয়ে দেওয়া হলো হিজাবকে। এ জন্য যারা এসব কথার সত্যতা না জেনেই প্রচার করবেন, তাঁরাও নবীজি (সা.)-এর ভাষায় মিথ্যাবাদী বলে প্রতীয়মান হবেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যাই শুনবে (সত্যতা যাচাই না করে) তাই বর্ণনা করবে। ’ (সহিহ মুসলিম)

সত্যতা যাচাই না করেই ‘ইসলাম প্রচার’ করতে গিয়ে কত বড় গুনাহর ভাগী হয়ে যাচ্ছেন—ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন।

লেখক : খতিব, বাইতুশ শফীক মসজিদ, বোর্ড বাজার (. গনি রোড), গাজীপুর

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬

বিয়ের বয়স নিয়ে সরকারের শুভংকরের ফাঁকিবাজি !

ডিসেম্বর 21, 2016 মন্তব্য দিন

child-marriage-3-art. তৌফিক জোয়ার্দার : ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে কন্যাশিশু সন্মেলনে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৯৭১ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ২২৩, যা বর্তমানে মাত্র ৩৭.এ নেমে এসেছে। শুধু শিশুমৃত্যুই নয়, বাংলাদেশ প্রায় সবগুলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয়েছ এবং এক্ষেত্রে বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এসব অর্জনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু এতসব অর্জনের পরও একটি বিষয়ে বাংলাদেশ আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। এটি হল, মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাড়ানো।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) রিপোর্ট, ২০১৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স হল ১৬.৬ বছর। শুধু এই একটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ায় বিভিন্ন সামাজিক সূচকের পরিমাপকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, উন্নয়নকর্মী ও গবেষকদের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলেছিল। একজন সচেতন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে এটা খুবই স্বাভাবিক।

এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে সরকার হঠাৎ করেই সব উন্নয়ন প্রপঞ্চের বিপরীত স্রোতে নৌকা ভাসাল। ঘোষণা করা হল, বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের লিগ্যাল বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা হবে। উন্নয়ন সেক্টরে কাজ করা একজন গবেষক হিসেবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অন্য অনেকের মতো আমিও চিন্তাভাবনা না করে পারিনি।

এ ঘোষণার পেছনে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য তারাই ভালো বলতে পারবে, তবে আমার ধারণা হচ্ছেকেউ হয়তো সরকারকে বুঝিয়েছেন, বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিলে বাল্যবিবাহিত মেয়েদের সংখ্যাও পরিসংখ্যানে কম দেখাবে। তখন কৃত্রিমভাবে হলেও বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ হ্রাসে সরকারের আপাত ব্যর্থতা আর আলাদাভাবে চোখে পড়বে না।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বিয়ের বয়স কম বলে এত যে সমালোচনা এবং সে সমালোচনা ধামাচাপা দিতে গিয়ে এতসব আয়োজন, বিয়ের সে বয়সটিই সঠিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছে কিনা? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এশিয়ান পপুলেশন স্টাডিজ নামক জার্নালে প্রখ্যাত গবেষক পিটার কে স্টিটফিল্ড, নাহিদ কামাল, কারার জুনায়েদ আহসান এবং কামরুন নাহার এমনটিই দাবি করেছেন।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে করা জরিপের সঙ্গে বাংলাদেশ উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) স্বাস্থ্য ও জনমিতিক অতন্দ্র তত্ত্বাবধান (ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভেইলেন্স) উপাত্তের তুলনা করে তারা দেখিয়েছেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের প্রায় দুইতৃতীয়াংশই বিয়ের সঠিক বয়স উল্লেখ করেননি। ৫৬% নারী বিয়ের বয়স কমিয়ে বলেছেন এবং ৭% বলেছেন বাড়িয়ে।

বিবাহিত নারীদের মধ্যে করা জরিপের ফল অনুযায়ী, তাদের উল্লেখ করা প্রথম বিয়ের বয়সের গড় পাওয়া গেছে ১৬.৮ বছর, যা বিডিএইচএস রিপোর্ট, ২০১৪তে উল্লিখিত ১৬.৬ বছরের খুবই কাছাকাছি। যেহেতু আইসিডিডিআরবি তাদের সার্ভেইলেন্স ব্যবস্থার অন্তর্গত প্রত্যেক মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও স্থানান্তরের তথ্য সেই ১৯৬৬ সাল থেকে সংরক্ষণ করে আসছে, তাই তাদের এলাকায় জরিপকৃত ১৯৬৬ বিবাহিত নারীর প্রকৃত বয়সও তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের প্রকৃত বয়স বের করে জরিপে উল্লিখিত বয়সের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, তাদের বিয়ের প্রকৃত গড় বয়স মোটেও ১৬.৮ বছর নয়, বরং ১৮.৬ বছর।

এমন একটি চমকপ্রদ ফলাফল গবেষকদের স্বভাবতই অত্যন্ত কৌতূহলী করে তোলে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারলেন, যেসব নারীর প্রকৃত বিয়ের বয়স যত বেশি, বিয়ের বয়স ভুল বলার বা কমিয়ে বলার প্রবণতাও তাদের তত বেশি। তারা আরও দেখলেন, যেসব নারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং যারা অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বলবিয়ের বয়স ভুল বলার প্রবণতাও তাদের বেশি। সবকিছু বিচারবিশ্লেষণ করে তারা তাদের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেনআমাদের সমাজে এখনও যৌতুকের প্রকোপ ব্যাপকভাবে রয়েছে, কাজেই যেসব মেয়ের বয়স যত বেশি, যৌতুকের পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই যৌতুক দিতে হয়েছেএমন নারীরা তাদের প্রকৃত বিয়ের বয়স কমিয়ে বলে থাকতে পারেন, যাতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কোনোভাবে জরিপ থেকে তার প্রকৃত বয়স জেনে বেশি বয়সের জন্য অধিক যৌতুকের জন্য চাপ দিতে না পারে (যদিও গবেষণার উপাত্ত গোপন রাখা হয়, তবে গ্রামের নারীরা এ বিষয়ে সম্ভবত নিশ্চিত হতে পারেনি)

গবেষণার প্রসঙ্গ এ কারণে উত্থাপন করলাম, যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার উপলব্ধি করতে পারেবিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিমভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে লিগ্যাল বয়সের নিচে বিয়ে হওয়া মেয়েদের সংখ্যা যে বাংলাদেশে কম, তা প্রমাণের চেয়ে কার্যকর উপায়ে এ লক্ষ্যটি অর্জিত হতে পারে।

প্রথমত, বর্তমানে সরকারের গৃহীত নানা সামাজিক পদক্ষেপ প্রকৃতই কাজ করছে, ফলে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাস্তবিকপক্ষেই অনেক বেড়েছে (১৯৯৪ সালের বিডিএইচএস রিপোর্ট অনুযায়ী ১৪.১ বছর)। কিন্তু নানা জরিপে যে কারণে এ উন্নয়ন প্রতিফলিত হতে পারছে না, তা অ্যাড্রেস করা বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দেয়ার থেকেও অধিক কার্যকর ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মান নিয়ন্ত্রণ করা। যে কোনো নাগরিকের প্রকৃত বয়স নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে জন্ম নিবন্ধন সনদ।

দ্বিতীয়ত, নারীরা তাদের বয়স কমিয়ে বলার তাগিদ অনুভব করছেকারণ অধিক বয়সে বিয়ের ব্যাপারে সমাজে এক ধরনের ‘স্টিগমা’ বিরাজ করছে। এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে বিয়ের বয়স ও যৌতুক সংক্রান্ত সামাজিক মূল্যবোধ। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটলে দেশের নারীরা আর বয়স লুকানোর প্রয়োজন অনুভব করবে না।

সরকার সম্প্রতি ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ প্রণয়ন করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এ আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি এবং বাবামায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সাধারণভাবে বিয়ের লিগ্যাল বয়স আগের মতোই মেয়েদের জন্য ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে হয় না, সেখানে ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ কম বয়সে বিয়ের সুযোগটির অপব্যবহার ঘটতে পারে। তাই এ অনুবিধিটি বাতিল করার অনুরোধ জানাই।

সহকারী অধ্যাপক

জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬