আর্কাইভ

Archive for the ‘স্বাস্থ্য’ Category

বাচ্চাদের জ্বর হলে করণীয়…

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

child fever infographics

রস রচনা – চিকুনগুনিয়ার সঙ্গে কদিন

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

chikungunya cr ronobiরফিকুন নবী : কীটপতঙ্গ-বিশারদদের বলতে শুনেছি যে এ বছর ‘ডেঙ্গু-এক্সপার্ট-এডিস’ মশা নাকি আগের চাইতে বিপজ্জনক অ্যাকটিভিটিতে নেমেছে। একই সঙ্গে তাদের তিনটি প্রকল্পে কাজ চলছে। চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও জিকা। এগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপক ব্যস্ততা যাচ্ছে তাদের। তবে ফার্স্ট প্রায়োরিটি চিকুনগুনিয়ায়। আমার ধারণা, এবারের মশা ডিজিটাল। তিনটি অপশন নিয়ে নেমেছে।

তারা কার্যপরিচালনা ও এক্সিকিউশনের মূল জায়গা নির্ধারণ করে নিয়েছে রাজধানী শহরকে। আর ডেরা বেঁধেছে আক্রমণ-সংক্রমণের জন্য বনেদি এলাকায়। তাদের প্রকোপ এতটাই দুর্বিনীত আর দুর্বিষহ যে প্রতিরোধ বা ধ্বংসে মনুষ্য-মস্তিষ্ক কোনো বুদ্ধি বের করার আগেই নিজেদের কাজ সিদ্ধি করে নিচ্ছে নির্বিঘ্নে। এই স্ট্র্যাটেজিতে তাদের সাফল্য শতকরা এক শ ভাগ।

আমাদের বিশারদদের মতে, তারা এখনো মানুষের মরে যাওয়া নিয়ে ভাবছে না। রোগে তেমন মৃত্যুসংবাদ নেই। শুধু প্রচণ্ড ব্যথার ভোগান্তিটাই রয়েছে মানুষের, মরছে না। এ ব্যাপারে পরিচিত একজন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ভুক্তভোগী বন্ধু বলেছেন, ‘নরকের শাস্তির প্রাথমিক প্র্যাকটিস। সেখানে নাকি ব্যথা-বেদনায় আধমরা হলেও পুনরায় মারা যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। যন্ত্রণা ভোগ করে যেতেই হবে। সেই রকমের টেস্টে আছি, ভাই।’

তো, মশা গবেষকদের কথায় জানলাম, ডেঙ্গুর পাশাপাশি এ বছর অ্যাডিশনাল বড় কাজটি হলো চিকুনগুনিয়া। প্রধান কাজই বলা যায়। এই রোগের বাহক এডিস মশার শরীরের সাইজ দেখলে আসলে বিশ্বাসই হয় না, এরা অত বড় ঘটনা ঘটাচ্ছে। নিতান্তই ক্ষুদ্র। শূককীট আর মূককীট অবস্থা থেকে মাত্রই অবয়ব পাওয়া। অতি ক্ষুদ্র। খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না। গায়ে বসলেই শুধু টের পাওয়া যায়।

বোঝাই যাচ্ছে যে বড়রা শিশুদের এই কাজে নামাচ্ছে। অনেকটা সন্ত্রাসীদের মতো। আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে বিদ্রোহীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নাকি এই দুর্মতি করে। তো, এই এডিস মশারা তো আফ্রিকা থেকেই এসেছে শোনা যায়। সবকিছুই শিখে এসেছে মনে হয়। তবে এই পিচ্চিরাই রক্ত চুষে চুষে ইয়া ঢোল পেট করে ফেলে নিমেষে। বড় আকার ধারণ করেছে। ছবিতে এ রকমটাই দেখা যায়।

এই ক্ষুদ্র মশকগোষ্ঠী এত শক্তিধর যে কোনো চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগিরকে মাসখানেকের জন্য অন্তত শয্যাশায়ী করে রাখার ক্ষমতা রাখে। কুস্তিগির না হলেও কয়েকজন ইয়া-দশাসই মানুষকে প্রায় নির্জীব হয়ে যেতে দেখেছি। দশাসই হলেও মশাসই এডিসের কাছে দারুণ কুপোকাত হয়েছেন। মোটাসোটা হলেও চিকুন থেকে রক্ষা পাননি।

আমি ততটা দশাসই নই। তবে যথেষ্ট ওজনদার। সুযোগ পেলেই এ রোগ-সে রোগে ধরার সুযোগ থাকেই। তাই রোগবালাইয়ের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করেই চলি। চিকুনগুনিয়া নিয়ে টিভিতে ডাক্তার আর বিশেষজ্ঞদের উপদেশ-পরামর্শে যা যা থাকে, সেসব আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। শুনেছি এর প্রতিষেধক নাকি তেমন নেই। কমপক্ষে দিন পাঁচেক ভুগতে হবে। এ কদিন একমাত্র সস্তায় প্যারাসিটামলের সঙ্গে লিটারকে লিটার পানি। তাই প্রতিরোধ আর সাবধানতাই একমাত্র প্রধান উপায়, কথাটা মেনে চলি। আমি কোনো ত্রুটি রাখি না। সব উপদেশকে শিরোধার্য করে চার মাস ধরে অগাধ খরচ-খরচা করে যাচ্ছি সরল বিশ্বাসে।

এই ব্যাপারে বলা যায়, মসকুইটো কয়েল কোম্পানি, কীটনাশক স্প্রে, মশা-জব্দে কারেন্টে চলা শিশির ওষুধ, কেরোসিন ইত্যাদির নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছুটা হলেও বেশ সমৃদ্ধ হতে সহায়তা করেছি।

সিটি করপোরেশনের পরামর্শ অনুযায়ী বাসার ফুলের টবের, টায়ারের, ড্রেন-ডোবার পানি ছা-পোষা লিমিটেড প্যাকেট খালি করে লোক লাগিয়ে পানিহীন করেছি। অতিপ্রিয় ফুল-ফলের গাছগাছালি, ঝোপঝাড় কর্তন করেছি। কোনো কোনোটা নিশ্চিহ্ন করতেও দ্বিধা করিনি।

তারপরও আতঙ্ক যায় না। শরীর একটু বিগড়ে যাওয়ার ভাব দেখলেই মনে হয়, এই বুঝি ধরল চিকুনগুনিয়া কিংবা ডেঙ্গুতে। মাস দেড়েক আগে তবু দীর্ঘমেয়াদি ভাইরাল জ্বরে ভুগলাম। বন্ধুদের অনেকেই চিকুনগুনিয়া ভেবে বাসায় আসা থেকে বিরত থাকল। কিন্তু আনন্দের কথা, ভাবনাটা সত্যি হয়নি।

জ্বরের পর বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম। কিন্তু দিন দশেক আগে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, বাম কনুইতে প্রচণ্ড ব্যথা। হাত ভাঁজ করা যায় না এমন দুরবস্থা। তবে কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করলাম যে ছবি আঁকার হাতটিতে ব্যাপারটি হয়নি।

ছবি আঁকা, লেখা—সবই তো ডান হাতে। শুধু বাথরুমের ক্রিয়াকর্ম ছাড়া বাম হাতের তো তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার নেই। এ-ও বললাম যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন টেনিস খেলোয়াড় ফেদেরারদের এই রোগ কোনো দিন ধরেছে, এমনটা শুনিনি!

হঠাৎ মনে পড়ল, আরে তাই তো! চার মাস ধরে তো র‍্যাকেট হাতে নিয়ে একটি খেলাই খেলছি। চীনে নির্মিত টেনিস র‍্যাকেটসদৃশ জিনিসটি। মশা মারার নতুন প্রযুক্তি। তা-ই দিয়ে শাঁই শাঁই করে ঘুরিয়ে এডিস মশা মারার খেলা চালিয়ে যাচ্ছি। খুব কাজ হয় না। সারা দিনে নেহাতই বোকাসোকা দু-তিনটি মারা পড়ে। তা-ও সেসব এডিস নাকি ইদানীং আলোচনায় পিছিয়ে পড়া এনোফিলিস, কে জানে! পরক্ষণেই মনে হলো, আরে সেটাও তো বাম হাতে ধরি না, ডান হাতেরই কাণ্ড! আসলে ন্যাটা না হলে ডান হাতেই সব। খাওয়াদাওয়া, ছবি আঁকা, লেখালেখি, হ্যান্ডশেক, সালাম—এমনকি সভা-সমিতিতে গরম বক্তৃতাকালে প্রয়োজনে দক্ষিণহস্তই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠানামা হয় মাইকের সামনে!

পরদিন ঘুম থেকে ওঠার পর সবকিছু গোলমাল হয়ে গেল। এবার ডান হাতের কনুই। সব হিসাব-নিকাশ ভন্ডুল। দুপুরে ব্যথা নিয়েই জরুরি কাজে বের হয়েছিলাম। গাড়ি করে বাসায় ফিরলাম। নামতে যাব, দেখি পুরো শরীর ঐরাবতী-ওজন ধরে বসে আছে। নিজের শরীর নিজেই চিনতে পারি না। তুলতেও পারি না। হাত, আঙুল, গোড়ালি, কোমর, পায়ের তলা, হাঁটু—কিছুই কাজ করছে না। এগুলো যেন আমার নয়, অন্য কারোর আওতায়। তবে মাথাটা শুধু তখনো নিজের আছে, বুঝতে পারলাম। কারণ, চট করেই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত পরিচিতজনদের বলা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। সিমটম মিলে যাচ্ছে হুবহু। বুঝলাম আমিতে আর আমি নেই। চিকুনগুনিয়া দখলে নিয়েছে শরীরটা। আমার হুকুমে কিছুই চলছে না। যা হোক, গাড়ি থেকে চ্যাংদোলা করে ঘরে নিয়ে আসার পর পরিচিত ডাক্তারকে ফোন করলাম। উনি পুরোটার ডেসক্রিপশন চাইলেন। বললাম সব। ডেসক্রিপশন শুনলেন কিন্তু প্রেসক্রিপশন দিতে পারলেন না। দিন পাঁচেক দেখতে বললেন। নিশ্চিত করলেন যে এডিসের কাণ্ডটাই ঘটেছে।

হঠাৎ শিল্পী আবুল বারক আলভীর কথা মনে পড়ল। সদ্য মুক্তি পাওয়া ভুক্তভোগী বলে তাঁর এক্সপার্ট ওপিনিয়ন জানতে ফোন করলাম। তিনি যা বললেন তার সঙ্গে আমার অবস্থাটার হুবহু মিল। যে জিনিসটা বাদ ছিল কিছুক্ষণ পর তা-ও এল—এক শ দুই ডিগ্রি জ্বর। পূর্ণতা পেয়ে গেল এডিসের কুপোকাত করার সব প্রচেষ্টা। কমপ্লিট হলো কোর্স। চিকুনগুনিয়া আমাকেই গুনতিতে ধরে ফেলেছে।

ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন ব্লাড টেস্ট করিয়ে নিতে। শরীরের যে নট নড়ন-নট চড়ন দুর্বিষহ অবস্থা, তাতে রক্ত আছে কি নেই, চলাচল করছে কি না, তা-ই তো বোঝার উপায় নেই। নিঃসাড় শুয়ে থাকতে থাকতেই ভাবনাটা মাথায় এল যে সংশ্লিষ্ট মশারা কি পরীক্ষার জন্য রক্ত শরীরে বাকি রেখেছে!

তাছাড়া ক্লিনিকে যে সুই ফুটিয়ে রক্ত নেওয়ার ব্যাপার, তাতে আমার ভয় চিরকালের। ইনজেকশনেই ভীতি। এখন রোগে পড়ে সেই ভীতি কেটে গেছে অনেকটাই। মশারা ইনজেক্ট করে করে সেই ভয় কাটিয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে গত শতকের আশির দশকে একটা কার্টুন এঁকেছিলাম। সেটি মনে পড়ে মাঝে মাঝেই। এবারও মনে পড়ল। কার্টুনটি ছিল এই রকমের—টোকাই সঙ্গে এক বয়ামভর্তি মশা নিয়ে ডাক্তারকে বলছে, ‘ডাক্তার সাব, এই যে নেন। এগো পেটভর্তি আমার রক্ত। পরীক্ষার জন্য ধইরা আনছি।’ ইনজেকশন-ভীতির কারণে ওই ব্যবস্থা।

আমার মনে হচ্ছিল সেই কাজ এবার আমিই করি। কিন্তু মশাগুলোকে তো চোখেই দেখা যায় না এমন। ধরার উপায় নেই। অবশ্য পাঁচ দিনের অপেক্ষা করে দেখার পালা এখনো কাটেনি। চতুর্থ দিন চলছে। ইতিমধ্যে অনেকেই জেনে গেছে। ভয়ংকর রোগ জেনে বন্ধুদের আসা বন্ধ। লাভের দিক হলো যে পাওনাদারেরাও ভয়ে পা মাড়াচ্ছেন না এদিক।

এরই মাঝে কাকতালীয় একটি ঘটনা ঘটল। হঠাৎ দুপুরে মোবাইলটা বেজে উঠল। ধরলাম। অপর প্রান্তে পরিশীলিত কণ্ঠ। বললেন, ‘নবী ভাই, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? শহর সৌন্দর্যকরণ নিয়ে আমরা কয়েকজন একটু বসতে চাই। আপনাকে থাকতেই হবে। ব্যাপারটা জরুরি।’ বললাম, ‘আমি তো চিকুনগুনিয়ায় শয্যাশায়ী। তা কে বলছেন?

নাম না বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন তিনি, ‘সর্বনাশ, আপনাকেও ধরেছে? সরি নবী ভাই। সুস্থ হয়ে নিন, পরে আলাপ করব।

এ কথা বলা শেষে নিজের নামটি বললেন, ‘আমি আনিস বলছি। আনিসুল হক। মেয়র। ছাড়ি, ভালো থাকেন।

সামনে সকালের পত্রিকা। চোখ গেল প্রথম পৃষ্ঠায়। তাতে দেখি, দুই মেয়রের ওপরে কার্টুন আঁকা, মশা নিয়ে। বুঝলাম, তাঁরা হেভি সমালোচনার মধ্যে আছেন।

তবে আমি দুই ‘ম’-এর মধ্যে কে বড়, তুলনা করছিলাম—মানে ‘মেয়র’ না ‘মশা’। এই মুহূর্তে মশাই চ্যাম্পিয়ন!

অথঃ টুথব্রাশ সমাচার…

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

toothbrush origin

toothbrush facts

যে কারণে পানির অপর নাম জীবন !

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

water drinking infographics

বুড়োরা সমাজের বোঝা নয় – আশীর্বাদ !

অগাষ্ট 10, 2017 মন্তব্য দিন

মেডিক্যাল সায়েন্সের কল্যাণে (আল্লাহ’র ইচ্ছায়) আজ মানুষ বেশী দিন বেঁচে থাকছে – কর্মক্ষম-ও থাকছে । এতে সমাজে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে – পুঁজিবাদী সমাজ চিন্তিত হয়ে উঠছে । কিন্তু এই সমস্যার মানবিক সমাধান-ও আছে । অবসরের বয়স সীমা বাড়িয়ে বা তাদেরকে ভিন্নভাবে কাজে লাগিয়ে সমস্যাটা অনেকাংশেই সামাল দেয়া যায় । নীচে ইকোনমিষ্টের প্রবন্ধে সে কথা-ই তুলে ধরা হয়েছে ।
= = =
elderly peopleসারা বিশ্বেই বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে বিশেষ করে ৬৫ এবং তদুর্ধ বয়সী লোকের সংখ্যা। এটাকে সমাজের মস্ত মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দেখা হয়। কারণ, বুড়িয়ে যাওয়া মানেই তো তরুণদের ওপর বৃদ্ধদের নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়া। এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই প্রবৃদ্ধি, কর খাতে অর্জিত আয় ও শ্রমশক্তি কমে যাওয়া এবং পেনশন ও স্বাস্থ্যখাতে খরচ বেড়ে যাওয়া। সোজা কথায় মানুষ বুড়িয়ে যাওয়ার কারণে সমাজের ওপর সৃষ্টি হয় বাড়তি চাপ এবং এক ধরনের অভিশাপ। কিন্তু অভিশাপের বদলে তারা আশীর্বাদও হয়ে দাঁড়াতে পারে। সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদানও রাখতে পারে।

১৮০০ সালের আগে বিশ্বের কোন দেশেরই মানুষের গড় আয়ু ৪০-এর বেশি ছিল না। ১৯০০ সাল থেকে মানুষের গড় আয়ু যতটা বৃদ্ধি পায় আগে আর কখনও ততটা বাড়েনি। আয়ু বৃদ্ধি বা দীর্ঘায়ু হওয়া মানবজাতির বড় অর্জনগুলোর একটি। তারপরও এটাকে সমাজের এক মস্তো মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দেখা হয়। ১৯৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যার কারণ হিসেবে দেখা হয়। ১৯৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যার ৫ শতাংশের বয়স ছিল ৬৫ বছরের বেশি। ২০১৫ সালে এদের সংখ্যা ছিল ৮ শতাংশ। ২০৫০ সাল নাগাদ সেটা বেড়ে ১৬ শতাংশ হবে বলে ধারণা হয়। ধনী দেশগুলোর বুড়োদের সংখ্যা চীন বাদে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বেশি বাড়ছে। ব্রিটেনে শতবর্ষী লোকের সংখ্যা ১৯১৭ সালে ছিল মাত্র ২৪ জন। এখন প্রায় ১৫ হাজার। মানুষের আয়ুবৃদ্ধির একটা কারণ রিজেনারেটিভ ওষুধ উদ্ভাবনসহ জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে অগ্রগতি। ইদানীং মানুষের গড় আয়ুর উর্ধসীমাও বাড়ছে। ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত তা ৮৯ বছরে স্থির ছিল। তার পর থেকে তা ৮ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে ২০১০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৮৫ বছর উর্ধ নর-নারীর সংখ্যা ৬৫ উর্ধদের তুলনায় দ্বিগুণ বাড়বে।

গত দু’এক দশক ধরে এই বুড়োদের নিয়ে নানান হুঁশিয়ারি ও সতর্কবাণী উচ্চারিত হচ্ছে। এদেরকে ‘রূপালী মেয়াদী বোমা’ বা ‘ধূসর সুনামি’ বলেও আখ্যায়িত করা হচ্ছে। দীর্ঘায়ু মানুষদের পিছনে দীর্ঘদিন ধরে পেনশন ও চিকিৎসা খাতে যে ব্যয় হচ্ছে এবং হবে তার জন্য এদেরকে সমাজের জন্য বোঝা এবং আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, মানুষ যত দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে ততই তারা শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজ ও অর্থনীতির জন্যও অবদান রাখতে পারে। তবে তার জন্য ৬৫ উর্ধ নারী-পুরুষদের অর্থনীতিতে আরও সক্রিয় অংশগ্রহণকারীতে পরিণত করতে হবে।

এটা বাস্তব সত্য যে, এখন ৬৫ বছরের পুরুষরা তাদের একই বয়সের দাদাদের তুলনায় ভাল অবস্থায় আছে শরীর স্বাস্থ্যের দিক থেকে। জীবনের শেষ দিকে ক্রমাগত ক্রমবর্ধমান দৌর্বল্য ও ভগ্নস্বাস্থ্যের অধ্যায়টা কমে আসছে। অথচ বেশিরভাগ দেশে অবসর গ্রহণের বয়সটা পাল্টানো হয়নি। মনে রাখতে হবে ১৮৮০’র দশকে জার্মানিতে প্রথম অবসরভাতা লাভের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু হয়। প্রথমে তা প্রদেয় ছিল ৭০ বছর বয়স থেকে। পরে তা কমিয়ে করা হয় ৬৫ বছর। আজ ধনী বিশ্বে জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশই তাদের ৬৫তম জন্মদিন বেঁচে বর্তে পালনই যে শুধু করে তাই নয় তাদের বেশির ভাগই সুস্বাস্থ্য নিয়ে যাকে। অথচ ৬৫ বছর বয়সকে এখনও বৃদ্ধ বয়সের যাত্রাবিন্দু হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ধনী বিশ্বে অন্তত, প্রচলিত কর্মময় বয়সের শেষ এবং বুড়ো বয়সের শুরুর মধ্যে জীবনের এক নতুন স্তর বা পর্বের আবির্ভাব ঘটছে।

এই স্তর বা পর্বে ‘নবীন বৃদ্ধরা’ প্রায়শই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। অনেক ক্ষেত্রে তারা এখনও কাজ করে। স্বাস্থ্যবহির্ভূত বিভিন্ন ব্যাপারে অর্থব্যয় করে। তাঁরা আরও বেশিদিন উৎপাদনক্ষম থাকবে। সেটা স্রেফ এই কারণে নয় যে তাদের কাজ করার প্রয়োজন আছে। বরং এই কারণে যে তারা কাজ করতে চায় ও পারে। তাঁরা শ্রমিক ও ভোক্তা উভয় হিসাবে অর্থনীতিতে বিরাট মূল্য যোগ করতে পারে। কিন্তু ‘শিক্ষা-কর্ম-অবসর’ এই তিন পর্বের পুরনো জীবনচক্র সবার মনে এমনভাবে গেঁথে আছে যে নতুন এই পর্বের মানুষদের নিয়োগকর্তারা গ্রাহ্যের মধ্যে নিতে চায় না।

বয়স্ক মানুষদের সম্পর্কে সমাজে একটা নেতিবাচক ধারণা বিদ্যমান। যে মুহূর্তে কারোর বয়স ৬৫ বছর হয়ে যায় সেই মুহূর্ত থেকে তাদের সম্পর্কে ধারণাটাও পাল্টে যায়। তারা তখন অর্থনীতিতে নিট অবদানকারী থেকে নিট সুবিধাভোগীতে পরিণত হয় বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু তাদেরকে যদি অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ দেয়া যায় তাহলে এই অপবাদ থেকে তারা মুক্ত তো হতেই পারে উপরন্তু সমাজে প্রবৃদ্ধিতে অবদানও রাখতে পারে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়টি হলো অবসরের বয়সসীমাটা বাড়িয়ে দেয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্মজীবনকে পার্ট-টাইম করা।

ধনী দেশগুলোতে বিশেষ করে ইউরোপে পে-এস-ইউ-গো পাবলিক পেনশন স্কিম আছে যার কার্যত অর্থ হলো তরুণরা বুড়োদের জন্য অর্থ দেবে। কিন্তু বুড়োদের যদি আরও দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ থাকে তাতে যে বাড়তি প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি হবে তার সুফল তরুণ ও বুড়ো উভয়েই ভোগ করতে পারবে। ধনী বিশ্বে গড় ৬৫ বছর বয়সের মানুষরা এখন আরও ২০ বছর বেঁচে থাকার এবং এদের অর্ধেক অক্ষমতামুক্ত অবস্থায় বেঁচে থাকার আশা করতে পারে। এদের যদি অবসর গ্রহণ বিলম্বিত করা যায় তাহলে তারা সমাজের কাছে বোঝা হয়ে থাকবে তো নয়ই উপরন্তু নিজেদের তথা সমাজের জন্য আর্থিক অবদান রাখতে পারবে।

বুড়োদের জন্য কাজের সুযোগ রাখা যে সম্ভব সিউলের উপকণ্ঠে সি.জে লজিস্টিকস্ নামে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ডেলিভারি কোম্পানিই তার প্রমাণ। কর্মচারীদের অধিকাংশের বয়স সত্তুরের কোঠায়। একজনের বয়স তো ৭৭ বছর এই বয়স্ক লোকদের দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। এরা সংখ্যায় কম বাক্স বহন করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তরুণ সহকর্মীদের চেয়ে মন্থর। কিন্তু তাতে কোম্পানির কোন ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। কারণ প্রতি ডেলিভারির জন্য ওদের পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এতে এই বুড়োদের মাসিক যে আয় হয় তাতে ভালভাবেই চলে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো আইনজীবী, এ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রভৃতি পদে নিয়োগ দেয়ার সময় বুড়োদের মধ্যে প্রচুর রিক্রুট খুঁজে পায়। ওয়াহাব নামে নিউইয়র্কভিত্তিক একটি কোম্পানি শত শত প্রাক্তন ফাইন্যান্স ও বীমা কর্মীদের কাজ যুগিয়ে থাকে যাদের বেশির ভাগের বয়স ষাট ও সত্তরের কোঠায় এদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মেধা ও অভিজ্ঞতা।
বয়স্করা অর্থাৎ বুড়োরা শিল্প ও ব্যবসায় উদ্যোক্তাও হয়ে উঠছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায় আমেরিকায় আজ ৫৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী লোকদের নতুন কোম্পানি খুলে বসার সম্ভাবনা ২০ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি। ব্রিটেনে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠাতাদের ৪০ শতাংশের বয়স ৫০ বছরের ওপর এবং প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ৭০ বছরের ওপর। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়ও বয়স্করা বিশেষ করে কোম্পানি থেকে ছাঁটাই হওয়া লোকজন নিজেরা ব্যবসায় উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করছে।

বয়স্ক শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা যে তরুণদের তুলনায় কম হয় সেটা সর্বক্ষেত্রে সত্য নয়। যেখানে কায়িক শ্রমের ব্যাপার থাকে সেখানে এটা সত্য হতে পারে তবে এমন অনেক ক্ষেত্র আছে সেখানে বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের পারদর্শিতা কমে না বরং ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ে।

বুড়োদের কারণে ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতে পারে। ধনী দেশগুলোতে বুড়োরা ব্যবসায়ীদের কাছে স্পষ্টতই ‘রূপালী ডলারের’ সুযোগ বয়ে আনে। আমেরিকায় আয়ের যে অংশটা খরচ হয় তার ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী বয়স্করা। কারণ তাদের অবসরের সময় প্রচুর। হাতে নগদ টাকাও কম নয়। যেসব পরিবার প্রধানের বয়স ষাট বছরের বেশি বিশ্বব্যাপী সেসব পরিবারের ব্যয় ২০২০ সাল নাগাদ ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ষাটোর্ধদের এ্যাডভেঞ্চারমূলক ভ্রমণ আমেরিকায় জমজমাট ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পর্যটন শিল্পে ৬৫-৭৪ বয়সসীমার লোকরাই সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে এখন থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে উন্নত বিশ্বের নগরগুলোতে ভোগ-ব্যবহারের যে প্রবৃদ্ধি ঘটবে তার সিংহভাগটাই হবে ষাটোর্ধদের তরফ থেকে।

তবে মানুষের আয়ু যতই বাড়ুক না কেন তার শেষ অধ্যায়টা প্রায়শই অতি নিরাপদ। ধনী বিশ্বে ৮০ বছর বয়স থেকে প্রতি পাঁচজনের একজন কোন না কোন ধরনের স্মৃতিবিভ্রম, চারজনের একজন দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা এবং পাঁচজনের চারজন শ্রবণ সমস্যায় পড়বে। যারা ৯০ বছরে পৌঁছাতে পারবে যাদের অধিকাংশই অন্তত একটা না একটা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেবে যেটাকে শারীরিক অক্ষমতা বলা চলে। অনেকের এক সঙ্গে একাধিক সমস্যাও হতে পারে। গরিব ও স্বল্প শিক্ষিতদের মধ্যে এই সমস্যাগুলো প্রায়শ আগেভাগে দেখা দেয়।

আগের দিনগুলোতে বুড়োরা তাদের জীবনের এই শেষ অধ্যায়টি বাড়িতে উত্তরোত্তর নির্ভরশীল পর্যায়ে কাটাত। আত্মীয়স্বজনরাই তাঁদের দেখাশোনা করত। কালক্রমে এল নাসিং হোম ও ওল্ড হোম। আজ প্রযুক্তি বুড়োদের জীবনকে উন্নততর করার বিরাট প্রতিশ্রুতি ধারণা করে অছে যারা বুড়োদের দেখাশোনা করছে তাদের জন্যও এই প্রযুক্তি সহায়ক হয়ে উঠেছে এর ফলে বুড়োরা নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে এবং সেইসঙ্গে আরও দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ জীবন কাটাতে পারবে। বুড়োদের জীবনের এই শেষ অধ্যায়টি উন্নত করে তোলার মতো প্রযুক্তির অস্তিত্ব আছে। তার মধ্যে মাত্র দুটি হলো স্মার্ট হোম এবং অনডিমান্ড ইকোনমি মূলত এগুলো তরুণদের লক্ষ্য করে উদ্ভাবিত হলেও বুড়োদের জীবনেও বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে।

দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায় নেদারল্যান্ডসের রটারডাম শহরের একটি আবাসিক এলাকায় ৬ লাখ জনি নামের ৮৭ বছরের এক বৃদ্ধের বাড়িটিকে ৮টি সেন্সর দিয়ে সাইবার ক্যাসেলে পরিণত করা হয়েছে। তাঁর সন্তানরা সবাই পঞ্চাশোর্ধ। তাঁরা জনি কখন বিছানা থেকে উঠে, টয়লেট যায়, খাবার খায় বা বাড়ি থেকে বের হয় সবই এ্যাপ দিয়ে দেখতে পারে। কোন সমস্যা হলেই টের পেয়ে যায়। জনি এখন নিজেকে অনেক নিরাপদ ভাবেন। একা বাস করা বুড়োদের জন্য তো এমন ব্যবস্থা এক বিশাল সুবিধা। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির বেশিরভাগেরই অস্তিত্ব আছে-অন্তত নমুনা রূপে। সমস্যাটা হচ্ছে সেই প্রযুক্তিকে দরকারের মানুষটির কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রোভাইডার পাওয়া।

বুড়িয়ে যাওয়া আশীর্বাদ না অভিশাপ? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে বুড়োদের কারা জীবনকে কিভাবে দেখছে তার ওপর। নৈরাশ্যবাদীদের কাছে বার্ধক্য অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার অনেকে আছেন যারা বার্ধক্যকে ইতিবাচক চোখে দেখেন। তাদের কাছে বুড়িয়ে যাওয়া মানেই জীবনের বাধা বিপত্তিগুলোকে অতিক্রম করে আসা। এটাই হলো শক্তির পরিচায়ক। তাদের মতে বুড়িয়ে যাওয়া মানে জীবনকে কখনই ভিন্নভাবে দেখা নয় বরং জীবনের অর্থকে আরও ভাল ও গভীরভাবে উপলব্ধি করা। তারা মনে করেন যে বার্ধক্য তাদের সক্রিয় কায়িক শ্রম থেকে সরিয়ে নিলেও মানসিক শ্রম থেকে নয়। বার্ধক্য এই শ্রেণীর মানুষকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে দেয় বটে। তবে তাদের মনকে আরও সক্ষম করে তোলে। বার্ধক্য এদের শারীরিক আনন্দকে হরণ করে নেয় না- শুধু এদের শারীরিক আনন্দলাভের শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। এরা বার্ধক্যকে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাওয়া হিসেবে দেখে না বরং জীবনের এক অধ্যায় থেকে অন্য অধ্যায়ে উত্তরণ হিসেবে দেখে।

দীর্ঘায়ু মানুষদের জীবন যেমন দীর্ঘতর তেমনি তাদের কাজ করার ও আনন্দ-বিনোদনের সুযোগও থাকে বেশি। এতে ব্যক্তিজীবন, সমাজ জীবন ও অর্থনীতি সবই সমৃদ্ধ হয়। মানবজাতি দীর্ঘায়ু হওয়ার সুফলগুলোকে কাজে লাগতে পারবে কিনা তা নির্ভর করছে এসব সুযোগকে কিভাবে সদ্ব্যবহার করা যায় তার ওপর।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

তিন যুগে ঢাকার জলাভূমি গায়েব !

অগাষ্ট 10, 2017 মন্তব্য দিন

water retainers outএটা ঠিক যে, জলাবদ্ধতা সৃষ্টির জন্য আমাদের যত্রতত্র ময়লা ফেলে সিওয়ারেজ লাইনের মুখ বন্ধ রাখা অনেকাংশে দায়ী । তবে সেটাই একমাত্র কারণ নয় । নগর পরিকল্পনার সময় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা বিবেচনায় আনা হয়নি — প্রতিটি এলাকায় যে আয়তনের জলাধার ব্যবস্থা থাকা দরকার তা রাখা হয়নি যা উন্নত দেশগুলোতে আছে। যতোটুকু ছিলো তা ভরাট করে বাড়ী-ঘর বানানো হয়েছে । ময়লা ফেলার আধার (বিন) পর্যাপ্ত সংখ্যায় সঠিক স্থানে থাকতে হবে এবং সেগুলো নিয়মিত খালি রাখতে হবে । মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে গণ-সচেতনা বাড়াতে হবে – – প্রয়োজন হলে সিঙ্গাপুরের মতো জরিমানার প্রচলন করতে হবে ।
===
রাজীব আহাম্মদ : গত তিন যুগে রাজধানী ঢাকার জলাভূমির অর্ধেকেরও বেশি গায়েব হয়ে গেছে। ১৯৭৮ সালে ঢাকায় নদী ও খালের আয়তন ছিল ২৯ বর্গকিলোমিটার। ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটারে। খাল ও নদীর মোট আয়তনের দুই-তৃতীয়াংশই ভরাট হয়ে গেছে। ১৯৭৮ সালে নিম্ন ও জলাভূমির আয়তন ছিল ১৩০ দশমিক ১৭ বর্গকিলোমিটার। ২০১৪ সালে তা কমে হয়েছে ৮১ দশমিক ৩৩ বর্গকিলোমিটার।

১৯৭৮ সালে ঢাকার মোট আয়তনের ৫২ ভাগই ছিল নদী, খাল ও নিম্নভূমি। ২০০৯ সালের তথ্যানুযায়ী, ৩৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজধানীর মাত্র ২১ ভাগ ছিল জলাভূমি। ৬৫ শতাংশ জলাভূমি কমেছে তিন দশকে। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বাস্তব চিত্র আরও খারাপ বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

২০০৯ সালে ‘প্রি অ্যান্ড পোস্ট আরবান ওয়েটল্যান্ড এরিয়া ইন ঢাকা সিটি : বাংলাদেশ, এ রিমোট সেনসিং অ্যান্ড জিআইএস অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. জিএম তরিকুল ইসলাম। তিনি গবেষণায় দেখান, ১৯৭৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে ঢাকা মহানগর এলাকায় ১৮ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার নদী ও খালের আয়তন কমেছে। জলাভূমি কমেছে ৭৬ দশমিক ৬৭ বর্গকিলোমিটার। তিন দশকে ঢাকার নদী, খাল ও জলাভূমির ৬৫ শতাংশই ভরাট হয়ে গেছে।

অধ্যাপক তরিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তিনি ও তার সহকর্মীরা ‘জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম’ (জিআইএস) বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষণা করেন। এতে ঢাকার যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে স্পষ্ট-তিন দশকে রাজধানীর জল ধারণের ক্ষমতা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে। ঢাকার মানচিত্র থেকে ‘নীল’ রঙ হারিয়ে যাচ্ছে।

এ গবেষণায় ২০০৯ সাল নাগাদ তথ্য রয়েছে। গত আট বছরে পরিস্থিতি কতটা বদলেছে,এ প্রশ্নে অধ্যাপক তরিকুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। যদি উন্নতি হতো, তাহলে ঢাকায় জলজট হতো না। জলজট প্রমাণ করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কতটা খারাপ হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০০৯ সালের পর ঢাকার পূর্বাঞ্চলে নতুন আবাসিক এলাকার জন্য নিচু জমি ও জলাভূমি ভরাট হয়েছে। মিরপুর, কালশী এলাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা ভরাট করেছে আবাসন কোম্পানিগুলো।

সাতারকুল, বাড্ডা, মোহাম্মদপুরের বছিলার নিম্নাঞ্চলও ভরাট করা হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য। অপরিকল্পিত উন্নয়নের উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক তরিকুল ইসলাম বলেন, পূর্বাঞ্চলে বন্যা ঠেকাতে ‘ইস্টার্ন বাইপাস’ নামে বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রামপুরা, বাড্ডা এলাকার পানি নামার কোনো পথ থাকবে না। তিনি গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ২০০৯ সালে ঢাকার আয়তনের ২১ ভাগ জলাভূমি টিকে ছিল। এখন তা অনেক কম।

২০০৯ সালের পরও যে নদী, খাল, জলাভূমি কমেছে_ তা সরকারি গবেষণাতেই স্পষ্ট। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ১৯৭৮ সালে ঢাকায় জলাভূমির আয়তন ছিল ২৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার। নিম্নভূমি ছিল ১৩৫ দশমিক ২৮ বর্গ কিলোমিটার। খাল ও নদী ছিল ২৯ বর্গকিলোমিটার। ২০১৪ সালে জলাভূমি কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটারে। নিম্নভূমি দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক বর্গকিলোমিটারে। ওই বছর নদী ও খালের আয়তন ছিল ১০ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার। এ হিসাবে ২০০৯ সালের পর পরবর্তী পাঁচ বছরে খালবিল ও জলাভূমি কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। এ হার অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ ঢাকায় জলাভূমি ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে সতর্ক করা হয়েছে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের প্রতিবদনে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যপক ড. এম মনোয়ার হোসাইন সমকালকে বলেন, ঢাকায় যে প্রতিদিন জলাভূমি কমছে; খালবিল, নদী ভরাট হচ্ছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই, কোনো গবেষণারও দরকার নেই। খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন সব খাল দখল হচ্ছে, নদী ভরাট হচ্ছে। নিচু ও জলাভূমি ভরাট করে ভবন তোলা হচ্ছে।

খাল ও নদী উদ্ধারে ২০১০ সালে ছয়টি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে সরকার। এরও আগে খাল ও নদী দখলকারীদের চিহ্নিত করা হয়। ১০ হাজারের বেশি দখলদারের তালিকা করা হয়। কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হয়। অভিযানের কয়েক দিনের মধ্যেই দখল আগের রূপ নেয়। প্রতি বর্ষায় রাজধানীতে জলাবদ্ধতায় ভুগতে হয় নগরবাসীকে। জলজট সৃষ্টি হলে সরকারের তরফ থেকে তাৎক্ষণিক আশ্বাস দেওয়া হয়-খাল, নদী দখলমুক্ত করা হবে। বর্ষার পর তা সবাই ভুলে যান। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাছের খান বলেন, এ দুষ্টচক্রে আটকা পড়েছে জলাভূমি উদ্ধার কার্যক্রম।

ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, ঘণ্টায় ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই শহরের প্রধান সড়ক তলিয়ে যাচ্ছে। গত বুধবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় মাত্র ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে শহরের প্রায় সব প্রধান সড়ক কয়েক ঘণ্টার জন্য ডুবে যায়। যদিও ওয়াসার দাবি, ঘণ্টায় ১৫ থেকে ২০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা রয়েছে তাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হকের অভিমত, ওয়াসার সক্ষমতার দাবি কাগুজে। সংস্থাটির পানি নিষ্কাশনের ততটা ক্ষমতা নেই, যতটা তারা দাবি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুব জানান, বৃষ্টির পানি তিনটি উপায়ে নিষ্কাশিত হয়। পানির একটি অংশ মাটি শুষে নেয়; আরেকটি অংশ জলাধারে জমা হয়। বাকি অংশ খালের মাধ্যমে নদীতে চলে যায়। কিন্তু রাজধানীতে খোলা মাটির পরিমাণ খুবই নগণ্য। টপ সয়েল (খোলা জমি) কংক্রিটে ঢাকা পড়ায় মাটি পানি শোষণ করতে পারছে না। বিল ও নিম্নাঞ্চল ভরাট হওয়ায় পানি ধারণের জায়গা নেই। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নদীতেও নামতে পারছে না।

পালং শাকের পুষ্টিগুণ

জানুয়ারি 1, 2017 মন্তব্য দিন

palong-spinach