আর্কাইভ

Archive for the ‘সাহিত্য’ Category

বইয়ের সংজ্ঞা ও বিশ্বের প্রাচীন বই

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

ancient booksমুম রহমান : সাহিত্যের ইতিহাসের যথার্থ দিন-তারিখ খুঁজে বের করা বড়ই দুষ্কর। কেননা, যখন লিপি আবিষ্কার হয়নি, অর্থাৎ লিখিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সাহিত্যের সৃষ্টি। সোজা বাংলায় বলা যেতে পারে, প্রাগৈতিহাসিক যুগেই সাহিত্য এসে গেছে। এটা ভাবা খুব অসঙ্গত নয় যে, মানুষের কথা বলা ও কল্পনার ক্ষমতার সাথে সাহিত্য জড়িত। মৌখিক সাহিত্যের ইতিহাস সুপ্রাচীন। গান, অভিনয়, আবৃত্তি ইত্যাদি নানা ভঙ্গিতেই মুখে মুখে সাহিত্য ছড়িয়েছে। অন্ধ কবি হোমারের মহাকাব্য মুখে মুখে গাওয়া হতো। রামায়ণ-মহাভারতও তাই। তারও আগে, মায়ের মুখের ঘুমপাড়ানি গান থেকে শুরু করে দাদা-দাদীর গল্প বলার ঐতিহ্যের মধ্যেও লুকিয়ে আছে সাহিত্যের অঙ্কুরোদগমের ইতিহাস।

ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম থেকে চতুর্থ শতকের সময়ে মানুষ লিখতে শুরু করেছে। পাথর, কাদামাটি (পরে যা পুড়িয়ে ফলক করা হতো), মৃৎপাত্র, গুহার দেয়াল, মন্দিরের দেয়াল-দুয়ার, খিলান, তালপাতা, প্যাপিরাস (মিশরে প্রাপ্ত এক ধরণের পাতা), চামড়া এমনকি শবাধারেও (কফিন) মানুষের লিখিত পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। উল্লেখ্য এর সবই যে সাহিত্য কিংবা গ্রন্থ হিসেবে বিবেচ্য তা নয়। কাজেই প্রাচীনতম বইয়ের কথা বলতে গেলে অন্য সংকট তৈরি হয়। আগে প্রাপ্ত লিপিমালা বই কিনা সেটা ভেবে দেখতে হয়। অভিধানের সংজ্ঞা মতে, একগুচ্ছ ছাপার কাগজ যা একটা নির্দিষ্ট বিষয় কিংবা মলাটের মধ্যে ধরে যায় তাকে বই বলে (দ্রষ্টব্য: ম্যারিয়াম-ওয়েবস্টার ডিকশনারি)। এই সংজ্ঞায় পোড়ামাটির ফলক বা ট্যাবলেট, স্ক্রল (চামড়া বা কাগজের তৈরি দীর্ঘ প্যাঁচানো বা গুটানো লেখা), প্রস্তরস্তম্ভ, শিলালিপি, কফিন, পিরামিড ইত্যাদি বইয়ের আওতায় পড়ে না; যদিও এর অনেকগুলোতেই সাহিত্য পদবাচ্য উপাদান আছে।

উল্লেখ্য, একাধিক ধর্মগ্রন্থও শুরুতে পাথরে বা ফলকে খোদাই করা হয়েছে, পরবর্তীতে যা ছাপার অক্ষরে বই হিসাবে গণ্য হয়েছে। অন্যদিকে, অনেক পণ্ডিত মনে করেন, বই হতে হলে লিখিত উপাদানের একটা নির্দিষ্ট বৈশ্বিক ভাবনা থাকতে হবে। ধরুন, হিসাবের খাতা, সেটা তো আর বই হিসাবে গণ্য হতে পারে না। খবরের কাগজে বইয়ের অনেক উপাদান থাকতে পারে, বৈশ্বিক বিষয়ও আছে, কিন্তু সেটাও বই নয়। বই হতে হলে তার যেমন সাহিত্য মূল্য দরকার তেমনি দরকার একটা সুনির্দিষ্ট বিষয়-ভাবনার প্রকাশ। সর্বোপরি, চিন্তাশীল কর্মের ফসল। নেহাতই তথ্যভাণ্ডার নয়, ভাবনার খোরাকও দেবে বই। অভিধান, বিশ্বকোষ ইত্যাদি ছাপার অক্ষরে এক মলাটে বই আকারে প্রকাশ হয়, তবে চরিত্রগত দিক থেকে তা বই নয়। ওগুলো তথ্যসূত্র হিসেবেই প্রয়োজনীয়- আলাদা করে পাঠ বিবেচ্য নয়। সেই বিবেচনায়, পাঠ যোগ্যতাও একটা বইয়ের বড় মাপকাঠি। পাঠকের জায়গা থেকে দেখলে অবশ্যই বইয়ের সংজ্ঞায়ন আরো বিস্তৃত হতে পারে। বই যে পৃথিবীতে কতো রকমের, ধরণের হতে পারে সে আলোচনা হতে পারে। এখানে বরং সোজাসুজি পৃথিবীর প্রাচীনতম কিছু বইয়ের সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

কোডেক্স বলতে হাতে লেখা পুঁথি বোঝানো হয়। ছাপাখানার আগে হাতে লেখা পুঁথিই ছিলো জ্ঞান অর্জনের অন্যতম হাতিয়াড়। প্রাচীন বাইবেল থেকে শুরু করে, গ্রীক-রোমান সাহিত্যের একটা বড় অংশ হাতেই লেখা হয়েছে। কোডেক্সগুলো সচিত্রিতও বটে। ‘মাদ্রিদ কোডেক্স’ ১৮৬৯ সালে স্পেনের মাদ্রিদে আবিষ্কৃত হয়েছে। মায়া সভ্যতার পূর্ববতী যুগের একমাত্র টিকে থাকা এই পুঁথিটি সম্ভবত ষোড়শ শতকের স্পেন বিজয়ের আগে রচিত। এটি ইয়োকাটেকান ভাষায় রচিত। ইয়োকাতেক, ইৎজা, লাকানডোন এবং মোপান- এই সব মায়ান ভাষার সম্মিলিত রূপ ইয়োকাটেকান ভাষা। স্পেনের মাদ্রিদের মিউজো দ্যু আমেরিকাতে বইটি আজও সংরক্ষিত আছে। আরেকটি আলোচিত কোডেক্স হলে ‘কালিক্সটিনাস’। ফরাসী সন্ত আইমেরি পিঁকা ১২ শতকের মাঝামাঝি এই পুঁথি রচনা করেন বলে ধারণা করা হয়। এই গ্রন্থের পাঁচটি অধ্যায়ের প্রথম চারটিই ধর্মীয় বাণী। তবে এর পঞ্চম অধ্যায়টি আজ পর্যন্ত বেশি জনপ্রিয়। এই অধ্যায়টি স্পেনের ক্যাথিড্রাল অব সান্তিয়াগো দ্যু কমপোস্টেলা যাত্রার জন্যে তীর্যযাত্রীদের জন্যে নির্দেশনা হিসেবে রচিত হয়েছে। এটিকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের প্রথম ভ্রমণ নির্দেশনা বা ট্রাভেল গাইড। এই গাইডে বর্ণনা করা হয়েছে একজন ফরাসী কী করে স্পেনে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন না, কী করবেন, কী করবেন না ইত্যাদি। ২০১১ সালে এই মূল্যবান বইটি ক্যাথিড্রালের আর্কাইভ থেকে চুরি যায়। ধারণা করা হয়েছিলো এই বইটি চিরতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু এক বছর অনুসন্ধানের পর ক্যাথিড্রালের একজন প্রাক্তন ইলেকট্রিশিয়ানের বাড়ির গ্যারেজে আরো একাধিক মূল্যবান গ্রন্থ এবং এক মিলিয়ন ডলারসহ এই বইটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বর্তমানে আরো অধিক জোড়ালো নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বইটি ক্যাথিড্রাল অব সান্তিয়াগো দ্যু কমপোস্টেলায় সংরক্ষিত আছে।

‘কালিক্সটিনাস কোডেক্স’ প্রাচীন বইয়ের মধ্যে অন্যতম আলোচিত একটি বই। জার্মানির বাভারিয়ার উটা প্রদেশে প্রাপ্ত পুঁথি দ্য উটা কোডেক্সও একটি ধর্মীয় গ্রন্থ। এটি মূলত একটি লেকশোনারি। লেকশোনারি হলো বাইবেলের নির্বাচিত উক্তি বা অংশসমূহের সংকলন যা বিভিন্ন ধর্মীয় উপলক্ষে বা অনুষ্ঠানের সময় গীর্জায় গাওয়া বা আবৃত্তি করা হয়। ১০২৫ সালে রচিত এই কোডেক্সের বিশেষ উল্লেখযোগ্যতা হলো এটি দারূণ কারুকাজময়। একাদশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য খোদাই কর্মের অন্যতম নমুনা এটি। এর সোনার তৈরি আসল বাক্সটি যার মধ্যে বইটি সংরক্ষিত করা হয়েছে সেটি আজও অক্ষত আছে। এই পুঁথিটি জার্মানির মিউনিখে বাভারিয়ান স্টেট লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ত্রিনিতি কলেজ লাইব্রেরিতে রাখা আছে কেল্ট ভাষীদের প্রাচীনতম টিকে যাওয়া বই ‘বুক অব কেলস’। ৮০০ খ্রিস্টাব্দে কেল্ট সাধুরা স্কটল্যান্ডের দ্বীপ আয়োনাতে এই বইটি তৈরি করে পরবর্তীতে কেলস-এর মঠে নিয়ে আসেন। ধারণা করা হয় যে তিনজন চিত্রকর ও চারজন লিপিকর মিলে এই অনবদ্য নান্দনিক বইটি তৈরি করেছেন। কোডেক্স কেনানেনসিস, লেয়াবহার চিয়ানেনআসি ইত্যাদি নামেও এই বইটি পরিচিত। ল্যাটিন ভাষায় রচিত এই বই মূলত নতুন টেস্টামেনের চারপি গসপেল এবং তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে রচিত। পশ্চিমা লিপিবিদ্যা এবং আইকোনোগ্রাফির চূড়ান্ত বিকাশ লক্ষ্য করা যায় এই বইতে। দারূণ বর্ণিল সব ছবি ও লিপিমালা দিয়ে সাজানো এই বই আয়ারল্যান্ডের জাতীয় সম্পদ। সাধু-সন্তের ছবির পাশাপাশি এতে পৌরাণিক জীবজন্তু এবং নানা রকম আল্পনা, নকশা আঁকা আছে। খ্রিস্টিয় নানা রূপক-সংকেতের চিত্রায়ণ এই বই। ১৯৫৩ সাল থেকে চারখণ্ডের এই বইটি ডাবলিনের ত্রিনিতি কলেজ লাইব্রেরিতে প্রদর্শিত হয়ে আসছে, তবে এক সঙ্গে দুখণ্ডের বেশি প্রদর্শন করা হয় না।

স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে প্রাচীন বইটির নাম ‘কেলটিক সল্টার’। লাল, সবুজ, বেগুনি, সোনালী কারুকাজ করা ১১ শতকের এই বইটিও একটি উপাসনা পুস্তক। ছোট্ট পকেট সাইজের এই বইটি আসলে ল্যাটিন ভাষায় রচিত কিছু স্ত্রোত। এগুলো আজও পাঠ উপোযোগী। বইটির আদি বাঁধাই এখন আর নেই। ধারণা করা হয়, স্কটল্যান্ডের রানী মার্গারেটের জন্য এই বইটি তৈরি করা হয়েছিলো। বর্তমানে এটি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। ৮৪০ খ্রিস্টাব্দে রচিত ইহুদিদের প্রাচীন প্রার্থনার বই ‘সিডোয়ার’ আবিষ্কৃত হয়েছে ২০১২ সালে। পশুর চামড়ার তৈরি কাগজে (পার্চমেন্ট) মূদ্রিত এই বইয়ের ভাষা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইংরেজির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। সিডোয়ার শব্দের অর্থ অর্ডার, বাংলায় বলা যায় আদেশ, রীতি, শৃঙ্খলা, ক্রম ইত্যাদি। এটি আসলে ইহুদিদের প্রতিদিনের প্রার্থনা গ্রন্থ। প্রাচীন ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোওরাত (আসমানী কিতাব)-এর কিছু অংশও এতে আছে। সন্ত ডানস্টন ছিলেন ইংল্যান্ডের গ্লাসটোনবেরি এবি’র মঠাধ্যক্ষ। তিনি ধর্মযাজকদের পাঠদানের জন্যে ল্যাটিন ভাষায় এই পুস্তক লিখেছিলেন। দশ শতকের সূচনা লগ্নে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের জন্যেই ‘সেন্ট ডানসন্টনের ক্লাসবুক’ রচিত। ধারণা করা হয় এটি ৯৪৩-৯৫৭ সালের দিকে রচিত। এই বইয়ের অন্যতম আকর্ষণ সেন্ট ডাস্টনের একটি প্রতিকৃতি। ছবিতে দেখা যায় সেন্ট ডানস্টন স্বয়ং যিশুর পায়ের কাছে নত হয়ে বসে আছেন। সেন্ট ডানস্টন নিজেই এই ছবিটি এঁকেছেন। হাতে আঁকা ও লেখা এই বই গ্লাসটোনবেরি এবি’র মঠেই সংরক্ষিত ছিলো। ১৬০১ সালে এটি অক্সফোর্ডের বদলেইয়ান লাইব্রেরিতে স্থানান্তরিত হয়।

অক্সফোর্ডের বদলেইয়ান লাইব্রেরিতে রাখা সবচেয়ে প্রাচীন বই হলো ‘বেনেডিক্টাইল রুল’। ধারণা করা হয় ৭০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এটি রচিত। সেন্ট বেনেডিক্ট মধ্যযুগের ইংল্যান্ডের অন্যতম ধর্মগুরু। পাশ্চাত্য মঠকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশে তার ভূমিকা অন্যতম। এই বইতে মূলত সন্ত বেনেডিক্টের অনুসারীদের মঠের জীবন, তাদের জীবনাচার, ধর্মচর্চা ইত্যাদি প্রসঙ্গ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গরুর বাছুরের চামড়ায় খোদিত এটিই বেনেডিক্টের সবচেয়ে প্রাচীন রীতির গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।

প্রাচীন আরেকটি বই ‘সেন্ট কাথবার গসপেল’। এই বইয়ের আবিষ্কারের কাহিনি রীতিমতো রোমাঞ্চকর গল্প হতে পারে। ৬৯৮ খিস্টাব্দে দক্ষিণ পশ্চিম ইংল্যান্ডের লি-সফার্নে দ্বীপে ধর্মগুরু সেন্ট কাথবারের কফিনের সঙ্গে কবর দেয়া হয় তার প্রিয় গসপেল গ্রন্থটিও। ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ভাইকিং জলদস্যুদের হাতে ডারহাম ক্যাথিড্রালে হামলা হয় এবং কফিনসহ বইটি ছিনতাই হয়। পরবর্তীতে ১১০৪ সালে কফিন উন্মোচিত হলে বইটি আবার খুঁজে পাওয়া যায়। এই সময় ডারহ্যাম ক্যাথিড্রালে অন্যান্য দর্শনীয় বস্তুর সঙ্গে এটি সংরক্ষণ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ কেউ বেড়াতে এলে তার গলায় একটি চামড়ার ব্যাগসহ বইটি ধারণ করার সুযোগ পেতেন। অস্টম হেনরির রাজত্বকালে ১৫৩৬ থেকে ১৫৪১ নাগাদ মঠের গুরুত্ব ও প্রভাব কমতে থাকে। এ সময় বইটি সংগ্রাহকদের কাছে চলে যায়। এরও কয়েকশ বছর পর ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ লাইব্রেরি প্রদর্শনের জন্যে এটি ধার হিসেবে পায়। অবশেষে ২০১২ সালে একটি তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে ৯০ লাখ পাউন্ড দিয়ে ব্রিটেশ লাইব্রেরি বইটি কিনে নেয়। ব্রিটিশ লাইব্রেরির বরাতে জানা যায় যে এটি ইউরোপীয় সবচেয়ে প্রাচীন পূর্ণাঙ্গ বাঁধাই করা বই। ১৩৮ পৃষ্ঠার পকেটে বহনযোগ্য ছোট্ট এই খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় রচিত। অতি প্রাচীন এই বই এখনও বেশ ঝকঝকে অবস্থায় সুরক্ষিত আছে। এর সুদৃশ্য চামড়ার বাঁধাই পাশ্চাত্য বই বাঁধাইয়ের প্রাচীনতম ও সুন্দরতম উদাহরণ হয়ে আছে। জনের গসপেল নিয়ে মূদ্রিত এই বইটি ব্রিটিশ লাইব্রেরির ট্রেজার্স গ্যালারিতে গেলে দেখা যাবে। সম্প্রতি বইটির একটি ডিজিটাল সংস্করণ করা হয়েছে।

মিশরীয় প্রাচীন পুঁথি ‘নাদ হামাদি’ আবিষ্কার নিয়েও একটি গল্প হতে পারে। ১৯৪৫ সালে দুজন মিশরীয় কৃষক কাজ করতে গিয়ে পাথরের খাঁজের আড়ালে একটা সিল করা পাত্রের ভেতরে ১৩টি পুঁথি পান। প্যাপিরাস কাগজে লেখা চামড়ায় বাঁধানো এই পুঁথিগুলো পাওয়া যায় মিশরের নাগ হামাদি শহরে। সেই থেকে এর নাম হয় নাগ হামাদি পুঁথি। কপটিক ভাষায় রচিত এই গ্রন্থেরও বিষয়বস্তু প্রাচীন ইহুদি ও খিস্ট্রিয় ধর্মচিন্তা। ধারণা করা হয় চতুর্থ শতকের দিকে এই বইটি রচিত হয়েছে। এটি সম্ভবত কোন একটি গ্রিক বইয়ের অনুলিপি-পণ্ডিতদের এমন মতও আছে। মিশরের কায়রোতে কপটিক মিউজিয়ামে এই বইটি সুরক্ষিত আছে।

১৯৬৪ সালে এক খননকালে ইতালির পিয়ারগি থেকেও পাওয়া যায় তিনটি সোনার পাত। এই পাতগুলো ৫০০ খ্রিস্টাব্দের। তিনটি পাতের এক প্রান্তে ফুটো আছে। ধারণা করা হয়, এই ফুটোগুলোর মাধ্যমে পাত তিনটি একত্রে রাখা ছিলো। এই তিনটি পাতকে একত্রে ‘পিয়ারগি ট্যাবলেট’ বলা হয়। এর তিনটি পাতকে বইয়ের তিনটি পাতা মনে করা হয়ে থাকে। এর দুটো পাতের ভাষা প্রাচীন এত্রুস্কান এবং একটি পাতের ভাষা প্রাচীন ফিনেসিয়ান। এটিই বিশ্বের প্রথম দ্বিভাষিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। রোমের এত্রুস্কান জাতীয় যাদুঘরে এগুলো সংরক্ষিত আছে। ফিনেসীয় দেবী আসথারোতের প্রতি প্রাচীন কায়রোর রাজার নিবেদন হিসেবে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে।

৬৬০ খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘এত্রুস্কান’ স্বর্ণবইটিও আবিষ্কৃত হয় প্রায় ৭০ বছর আগে বুলগেরিয়ায় একটি খাল খননের সময়। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন একাধিক পৃষ্ঠার বই বলা হয়। ৬ পাতার এই বইটি ২৪ কেরেট সোনায় রচিত এবং একসাথে রিং দ্বারা বাধাই করা। আজ থেকে প্রায় তিনহাজার বছর আগে প্রাচীন এত্রুস্কান জাতি লিডিয়া থেকে অভিবাসন করে মধ্য ইতালিতে ছিলো। এদের আদিবাস ছিলো বর্তমান তুরস্কে। এত্রুস্কানদের নিজস্ব লিপির পাশাপাশি এই বইতে ঘোড়া, ঘোরসওয়ার, একটা সাইরেন, একটা বাঁশি ও সৈন্যের ছবিও আঁকা আছে। বর্তমানে বইটি বুলগেরিয়ার সোফিয়াতে জাতীয় ইতিহাস যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় রোমান জাতি ও ল্যাটিন ভাষার অবদান অনস্বীকার্য। ৬০০ খ্রিস্টাব্দে লেখা ‘লেইডেন হার্বারিয়া’ ল্যাটিন ভাষায় রচিত সবচেয়ে প্রাচীন বই। হার্ভ বা ভেষজ উদ্ভিদের উপর রচিত এই বইতে বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদের ওষুধি গুণাগুণ ও কার্যকারিতা লেখা হয়েছে। দক্ষিণ ইতালি কিংবা ফ্রান্সে রচিত হয়ে থাকতে পারে এই বইটি। বইটিতে বেশ কিছু দর্শণীয় ছবিও সংযুক্ত হয়েছে। উদ্ভিদবিদ্যার প্রাচীনতম এই বই ল্যাটিনদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অগ্রগামিতার প্রমাণ দেয়। তবে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় শুধু যে পাশ্চাত্য সভ্যতা এগিয়ে ছিলো তা তো নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে চৈনিক সভ্যতা অনেক বেশি অগ্রগামী ছিলো। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়,পাশ্চাত্যের ছাপাখানা আবিষ্কার কাগজ-কালির আবিষ্কারের বহু আগেই চীনারা এ সব আবিষ্কার করে ফেলেছিল। পাশ্চাত্য থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণেই চৈনিক সভ্যতার কথা আমরা অনেক পরে জেনেছি। চীনের প্রাচীনতম এক মূদ্রিত পুস্তক হলো ‘হীকসূত্র’।

পূর্ব এশিয়ার জেন বৌদ্ধ চর্চাকারীদের মহাযান ধারার জ্ঞানগ্রন্থ বজ্রসূত্র বা ‘হীরকসূত্র’ বা ডায়মণ্ডসূত্র আসলে প্রজ্ঞাপারমিতা বা জ্ঞানের পরিপূর্ণতার এক পুঁথি। সহস্র বছরের পুরনো এই বইটি এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত মূদ্রিত আকারের সবচেয়ে প্রাচীন পূঁথি। ব্রিটিশ লাইব্রেরি সংরক্ষিত এই পুঁথিটি সচিত্র। হীরা বা বজ্র যেমন সবকিছু কেটে ফেলতে পারে জ্ঞানও তেমনি সকল মায়া কেটে বাস্তবের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়-এ ধারণাটিকেই প্রতিকীভাবে বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এই বইটি শুধু চীনে নয়, এশিয়ার নানা দেশেই প্রচলিত ছিলো। প্রাচীনকালেই সংস্কৃত, জাপানী, কোরিয়ান, মঙ্গোলীয়, ভিয়েতনামী ও তিব্বতি ভাষায়ও এর অনুবাদ হয়েছিলো। বৌদ্ধদের এই পবিত্র গ্রন্থটি বিংশ শতকে এসে চীনের এক গুহায় পাওয়া যায়। বইটি একটা স্ক্রলে ধূসর রঙের কাগজের উপর ছাপা, একটা কাঠের ঠ্যাঙ্গার উপর বসানো। ওয়াং জাই নামের এক ব্যক্তি প্রাচীন এই পবিত্র গ্রন্থটি ৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে অনুলিপি করেছিলেন।

জার্মানির মাইনজের ব্যক্তি জোহানেস গুটেনবার্গ বইয়ের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি ছাপাখানার আবিষ্কারক। মানব সভ্যতা ও জ্ঞান বিকাশের ইতিহাসে ছাপাখানা বা মূদ্রণযন্ত্রের ভূমিকা অপরিসীম। গুটেনবার্গের ছাপাখানার কল্যাণে একইসঙ্গে বহু বই ছাপা হতে লাগল। এর আগে বই বা পুঁথি ছাপা ছিলো বেশ জটিল কর্ম। প্রতিটি বইয়ের প্রতিটি অক্ষর হাতে লেখা সত্যিই সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য ছিলো। বই তৈরি ছিলো ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘতর একটি প্রক্রিয়া। গুটেনবার্গ মূদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করে পুরো ব্যাপারটিকে সহজ ও সুলভ করে দিলেন। গুটেনবার্গ তার ছাপাখানায় নিজে যে বইটি প্রথম ছাপেন সেটি ছিলো বাইবেল। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকডর্সের তথ্যমতে এটি হলো ছাপার যন্ত্রের সবচেয়ে প্রাচীন বই। প্রায় সাড়ে ৫০০ বছরেরও পুরনো এই বইটি ছাপা হয়েছিলো আনুমানিক ১৪৫৪-১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে। ছাপার অক্ষরে মূদ্রিত এই বইটিকে যান্ত্রিকভাবে ছাপা হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বই হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও, উল্লেখ করা দরকার, প্রাচ্যে তার আগে থেকেই বই ছাপার ব্যবস্থা ছিলো।

চীনারা গুটেনবার্গেরও বহু আগেই ছাপাখানার আবিষ্কার করেছে। চীনের হীরকসূত্র (ডায়মন্ড সূত্র) ছাপা হওয়ার বিবেচনায় গুটেনবার্গের বাইবেলের চেয়ে পুরনো। যাহোক, গুটেনবার্গের হাতে ছাপা হওয়া ৫০টি বাইবেল আজও পাওয়া যায়। যার মধ্যে ২১টি পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষিত হয়েছে। এখানে বইয়ের শেষে চিত্রিত কপিটি নিউ ইয়র্কের পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত। নিলাম বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, এক কপি গুটেনবার্গ বাইবেলের দাম হতে পারে ১০ লাখ ডলার। নিউ ইয়র্কে মর্গান লাইব্রেরি মিউজিয়ামে গুটেনবার্গের ছাপা তিনটি বাইবেল সংরক্ষিত আছে। গুটেনবার্গের ছাপাখানা আর তার প্রথম ছাপা বই বাইবেল দিয়ে বিশ্বব্যাপী বইয়ের ব্যাপক বিস্তারের সূচনা হয়। আজ ডেস্কটপ পাবলিশিং-এর কল্যাণে বই ছাপা অনেক আয়েশসাধ্য হয়ে গেছে। কিন্তু প্রাচীনতম বইগুলোর কদর আজো অমলিন। এইসব প্রাচীন বই শুধু প্রকাশনা বা ছাপার ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং জ্ঞানের নানা ধারার চর্চারও পরিচায়ক।

কবিতাঃ শিক্ষকের মর্যাদা

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

status of a teacher

শেষ বিকেলের মেয়ে – পর্যালোচনা

অগাষ্ট 20, 2017 মন্তব্য দিন

shes bikeleyer meyeরায়হান আতাহার : “শেষ বিকেলের মেয়ে” উপন্যাসটি জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস, যা ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের মূল চরিত্র কাসেদ যে কি না পেশায় একজন কেরানি। সাথে টুকটাক কবিতা লেখার অভ্যাস আছে তার। বৃদ্ধা মা আর এক দূর সম্পর্কীয় অসহায় বোন নাহারকে নিয়ে তার সংসার।

জাহানারা নামের একটি মেয়েকে কাসেদ ভালোবাসে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। মাঝে মাঝে জাহানারাদের বাড়িতে যায় সে।

জাহানারার জন্মদিনে কাসেদের সাথে পরিচয় হয় জাহানারার কাজিন শিউলির সাথে। শিউলির হাসি-খুশি ব্যবহার ও উচ্ছ্বলতা কাসেদের ভাল লাগে। কোন এক পর্যায়ে শিউলিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে সে। কিন্তু শিউলি আরেকজনের বাগদত্তা। তাই তাকে নিরাশ হতে হয়।

ওদিকে শিউলি ও জাহানারার সেতার মাস্টারকে নিয়ে জাহানারা ও কাসেদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি থেকে দূরত্ব তৈরি হয়।

এই উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র সালমা। সম্পর্কে কাসেদের আত্নীয়া সে। ছোটবেলা থেকে সালমা কাসেদকে ভালোবাসতো। কিন্তু কাসেদ বুঝতে পারেনি। ফলে সালমার বিয়ে হয়ে যায় অন্য এক জায়গায়। অনেক বছর বাদে যখন দুজনের দেখা হয় তখন সালমার কোলে ফুটফুটে একটি মেয়ে। কিন্তু বিবাহিত জীবনে সালমা সুখী ছিল না সে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে সালমা কাসেদের সাথে দূরে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তখন কাসেদ দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।

অন্যদিকে অফিসের হেড কেরানি মকবুল সাহেবের মেজো মেয়ের প্রতিও দুর্বলতা ছিল কাসেদের। কিন্তু তার অফিসের বসের সাথে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সরে আসতে হয় তাকে।

এভাবে একাধিক মেয়ে আসে কাসেদের জীবনে। কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত কাসেদ বুঝে উঠতে পারে না কি করবে। এমতাবস্থায় কাসেদের মা মারা যান। ওদিকে নাহারেরও বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। ফলে কাসেদ একেবারে একা হয়ে যায়।

হঠাৎ একদিন শেষ বিকেলে তার দরজায় কড়া নেড়ে হাজির হয় মেয়ে। ঔপন্যাসিক এই মেয়েকেই “শেষ বিকেলের মেয়ে” বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু কে ছিল সেই মেয়ে? নাহার!

এটি যেন রবিঠাকুরের সেই বিখ্যাত লাইনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়ঃ

বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ ব্যয় করি

দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

দেখা হয় নাই শুধু চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু এক পা ফেলিয়া

একটি ধানের শীষের উপর

একটি শিশির বিন্দু।

সেলিম আল দীন : নির্বাচিত লেখামালা

অগাষ্ট 19, 2017 মন্তব্য দিন

selimজাহিরুল ইসলাম : স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের নাট্যজগতে যেসব মানুষ অসামান্য অবদান রেখেছেন, সেলিম আল দীন তাদের অন্যতম। অনেকে তাকে আখ্যায়িত করেন বাংলাদেশের নাটকের প্রধান পুরুষ হিসেবে। এটা কোনোভাবেই অত্যুক্তি নয়। কেননা, নাটককে বলা হয় জীবনের দর্পণ। সেলিম আল দীনের নাটকগুলো সত্যিকার অর্থেই এ দেশের মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি। ভাষা প্রয়োগ ও চরিত্র চিত্রণে পাওয়া যায় যার সার্থকতা। বস্তুত, নাটক রচনায় তিনি শিকড় সন্ধান করেছেন। সেটা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির। আমরা দেখি, শুরু থেকেই তিনি ত্যাগ করেছেন পাশ্চাত্য নাট্যপ্রকরণ। প্রয়াসী হয়েছেন নিজস্ব নাট্যকৌশল নির্মাণে। এর প্রভাব স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে কীর্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, হরগজ, হাত হদাই, চাকা, যৈবতী কন্যার মন প্রভৃতি নাটকে। এসব নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শুধু পুনর্নির্মাণই করেননি; বলা যায় অনেক ক্ষেত্রে এটাকে উন্নীত করেছেন নতুন মাত্রায়।

একজন লেখক বা নাট্যকারের মধ্যে এ প্রবণতা কেবল তখনই দেখা যায়, যখন নিজের সাংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি থাকে তার সুগভীর বিশ্বাস ও ভক্তি। সেলিম আল দীনের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাচ্যের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীরভাবে তিনি আস্থাশীল ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নাটকের মাধ্যমে বাঙালিকে নতুন জীবনের সন্ধান দেওয়ার জন্য পাশ্চাত্যের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এখানকার মানুষের জীবনধারায় যেসব মৌলিক উপাদান রয়েছে, সেগুলো তুলে ধরার মাধ্যমেই সম্ভব সার্থক নাটক রচনা। বস্তুত, সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন, তাদের জন্যও এটা হতে পারে অনুসরণীয়। তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের স্বকীয়তাই শুধু স্পষ্ট হবে না; নিজেদের সাংস্কৃতির মৌলিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ উপাদান নিয়ে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সহজ হবে।

এটা ঠিক, শিকড় সন্ধানের জন্য তার সঙ্গে সংস্পর্শ থাকতে হয়। সেলিম আল দীনের নাট্য-চেতনার ভুবন গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্পর্শে। তিনি এ পর্যন্ত পেঁৗছতে পেরেছিলেন বলেই এর উচ্চমার্গীয় গুরুত্ব অনুভব করেছেন। আধুনিক মানুষের জীবন নগরমুখী। শুধু জীবিকার খোঁজে নয়; উন্নততর জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে মানুষ ছুটছে নগরপানে। সেখানে গিয়ে সে ভুলে যাচ্ছে তার শিকড়, নিজের সংস্কৃতি। বিজ্ঞজনরা বলেন, নিজের শিকড় ও সংস্কৃতিকে যে ধারণ করে না, সে কখনও আকাশ ছুঁতে পারে না। সে জন্য নগরমুখী ও নিজস্ব শিকড়-সংস্কৃতি বিস্মৃত মানুষকে তার সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দিতে নাট্যকাররা যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন, অন্য কারও পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। নাট্যকার হিসেবে সেলিম আল দীন এটা অনুভব করতে পেরেছিলেন যথাযথভাবে। এ জন্য এর যথার্থ চিত্রায়ন করতে তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট।

নাট্যকার সেলিম আল দীন ছিলেন একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেসব নৈরাজ্য তার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল, সেগুলোর তিনি সমালোচনা করেছেন নাটকের মাধ্যমে; কোনোটিকে করেছেন বিদ্রূপ। এ ধরনের বিষয় তুলে ধরার জন্য লেখকের মধ্যে শুধু সাহস থাকলেই চলে না; জনসাধারণের প্রতি তার অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধও থাকতে হয়। এটা তার মধ্যে ছিল বলেই আমরা তাকে পাই একজন অকুণ্ঠ ও অন্যায়-নৈরাজ্যের প্রতি উচ্চকণ্ঠ নাট্যকার হিসেবে। বস্তুত, পথিকৃতের কাজ হলো পথ দেখানো। পরবর্তীকালে নতুন পথিকেরা সেই পথে হেঁটে তাকে উন্নততর রূপ দেয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বকীয় নাট্যজগৎ নিয়ে সেলিম আল দীন যে পথের সূচনা করেছেন, সেটাকে বিকশিত করা গেলে এ দেশের নাটক শুধু উন্নতই হবে না, মর্যাদাও লাভ করবে নানাদিক থেকে। দেশে এখন যেসব নাটক নির্মাণ হচ্ছে; বর্ণনাভঙ্গি, উপস্থাপনা ও চরিত্র চিত্রণে আগের তুলনায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষণীয়। কিন্তু সিংহভাগ ক্ষেত্রে সেগুলোর গল্পে গভীরতার অভাব স্পষ্ট। এর পেছনে নাটক রচয়িতা বা নির্মাতার যুক্তি থাকতে পারে; কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে,ওগুলো মানুষ জানে না। জানার উপায়ও তাদের নেই। যে গল্পটা উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটাই শুধু পেঁৗছে মানুষের কাছে। এ ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসেবে সেলিম আল দীন যে কৌশল দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, সেটার চর্চাই তাদের করতে হবে। তার সৃষ্টিগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শুধু দিকনির্দেশনাই নয়, অনুপ্রেরণাও। জন্মদিনে প্রয়াত এই মহান নাট্যকারের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

এক পূর্ণপ্রাজ্ঞহৃদয় – তুহিন তৌহিদ

‘রোদন করি না পাছে পাঁজর পাথর
ভেঙ্গেচুরে সমুদ্র প্লাবন হয়।’

এ পঙ্ক্তি দুটি বাংলা নাটকের প্রবাদপুরুষ সেলিম আল দীনের। কবিতায় হৃদয়ের দহনকে উন্মুক্ত করলেও, সবারই জানা, তার আরাধ্য ছিল নৈর্ব্যক্তিকতা; আর সেটা তিনি করেছেন নাটকের মাধ্যমেই। তিনি বাংলা নাটককে দিয়েছেন নতুন এক দিশা। তাকে কাছ থেকে দেখা বা সানি্নধ্যের সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু তার সৃষ্ট সাহিত্যে পেয়েছি তাকে। সেলিম আল দীনের ‘দিনলিপি’ পড়লে তার প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও জ্ঞানগর্ভ ভাবনার খোঁজ পাওয়া কিছুটা সহজ হয়।

কেমন ছিলেন ব্যক্তি সেলিম আল দীন? তিনি কী ভাবতেন- এসব বৃত্তান্তই তিনি দিনপঞ্জির পাতায় রেখে গেছেন। জানতেন, এক সময় এ দিনপঞ্জির দিকেও নজর দেবেন অনুসন্ধানীরা। যে ব্যাপ্তি তিনি নাট্য-সাহিত্য ও চিন্তায় ছড়িয়ে গেছেন, তা অল্প কথায় প্রকাশ করাটা খুবই ঝুঁকির কাজ।

বিশ্বসাহিত্যের ওপর সেলিম আল দীনের গভীর পাঠই তাকে দিয়েছে হীরকহৃদয়। চর্চায় নিঃসঙ্গ হলেও তিনি ছিলেন খুবই সামাজিক ও উদার; যারা তার কাছে গেছেন সেই অনুজরা অন্তত এটাই বলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জার্মান কবি গ্যেটেকে (জোহান উল্ফগ্যাং গ্যেটে) সব সময় উচ্চাসনে রেখেছেন তিনি। বিশেষ করে, রবীন্দ্রনাথের কথা বারবার উঠে এসেছে ‘দিনলিপি’র পাতায়। বলেছেন আন্তন চেখভ নিয়েও। তিনি লিখেছেন- ‘চেখভ উন্মীলনকালে দু’জন মানুষকে দেখেছিলাম- একজন আন্তত চেখভ, অন্যজন রবীন্দ্রনাথ। কোনো তুলনা চলে না দু’জনে। তবু দু’জন কীভাবে আমার কাছে বৃক্ষ হয়ে ওঠেন।’

সেলিম আল দীনের বিশেষ ভক্তি ছিল লালনের প্রতি। তিনি মিশেল ফুঁকো ও জ্যাঁ পল সার্ত্র্রের সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। অপরদিকে (ফ্রেডরিখ) হেগেল ও কার্ল মার্ক্সের প্রতি তার আকর্ষণের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। তিনি লিখছেন-

‘হিডগানস্টেইনের চেয়ে লালন জরুরি নয়- এমন কথা কে বলতে পারে। ফুঁকো নিয়ে সব মাতামাতি। এক নারকীয় দর্শন। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে সন্দেহপ্রবণ করে তোলার দর্শন।’

মানুষের মধ্যে সব সময় ঐক্য দেখতে চেয়েছেন মহান এ নাট্যকার। যে কোনো বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতাবিরোধী সুর পাওয়া যায় তার কথায়। তিনি ছিলেন সব মানুষের পক্ষে। গ্রামের নিষ্পেষিত, শোষিত মানুষের মধ্য দিয়ে এ বয়ান এলেও বলতে হবে, এটাই ছিল তার মূল দর্শন। তিনি লিখছেন- ‘একদা হেগেল, মার্ক্স মানুষকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিলেন। তার পর ক্রমান্বয়ে মানুষকে উন্মূল করার ভাবনা। সার্ত্রে কি সব মানুষের কথা বলেছেন? আত্মকেন্দ্রিক-আত্মহননকারী- স্বার্থপর- যৌনকাতর মানুষ।’

‘দিনলিপি’তে ব্যক্তিজীবনের নানা বৃত্তান্ত তুলে ধরলেও যেভাবে আত্মীয়স্বজনের প্রসঙ্গ এসেছে, সেভাবেই এসেছে তার আত্মা ও দর্শনের স্বজনদের প্রসঙ্গ। তিনি দেশের সাহিত্য-শিল্পাঙ্গনের অনেক ব্যক্তিত্বের কথা তুলে এনেছেন এর পাতায় পাতায়। অনেক নবীন কবি-সাহিত্যিকের কথাও এসেছে উদারভাবে, যা তাদের অনুপ্রেরণার বড় উৎস হয়ে থেকে গেছে।

১৮ আগস্ট সেলিম আল দীনের জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এ আগস্টেই দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়। ইতিহাসের ওপর গভীর পাঠ নেওয়া এ ‘নাটকের কবি’ স্মরণ করেন ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে। তিনি লিখেছেন,’হায় বাহাদুর শাহ! যে অখণ্ড মাতৃভূমির দাবি তোমার গজলে, সে কেবল নির্জন সুর হয়ে দূর প্রবাসে বর্মী বাতাসে রোদন করে। ব্রিটিশরা তোমার শেষ বংশধরকেও গুলি করে কবর দিয়েছে। এরা কারা, যারা ভারত ভাগ করেছে হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলিম, মুসলিমের বিরুদ্ধে হিন্দুকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।’

‘দিনলিপি’তে নিজের অনেক কবিতা সংযোজনও করেছেন তিনি। মিথের প্রতি, বিশেষ করে দেশীয় মিথের প্রতি তার আগ্রহ ছিল অপার। এ জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গেছেন তিনি। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে শৈশবে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তার। একবার তিনি নেত্রকোনায় গেলেন। উদ্দেশ্য গারোদের মিথ সংগ্রহ। এটা তিনি করেছিলেন একটি নৃত্যনাট্য রচনার জন্য। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা নৃত্যনাট্যের ‘পতিত দশা’ দেখে তাকে আফসোস করতে দেখা গেছে।

স্বপ্নের ঘোরে বিবিধ বেলুন – সোহেল নওরোজ

উপযুক্তের সঙ্গে জনপ্রিয় বিষয়টি সব সময় যায় না। সময় অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্তকে মূল্যায়ন করতে না পেরে পরে হাপিত্যেশ করে। মহাকাল সে আফসোস বয়ে বেড়ায়। জনপ্রিয়তার স্থূল মোহে আটকা না পড়ে নিত্যনতুন আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা অসামান্য এক প্রতিভা সেলিম আল দীন (১৮ আগস্ট, ১৯৪৯-১৪ জানুয়ারি, ২০০৮) বাংলা নাটকে ভিন্ন সব আঙ্গিক যোগ করে গেছেন, যা তার জীবদ্দশাতেই আলোচিত ও সমাদৃত হয়েছে। এই নাট্যাচার্যকে চিনতে না পারার আক্ষেপ অন্তত আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে না। বাংলা সাহিত্যের আধুনিককালের অন্যতম এ নাট্যকারের নিরীক্ষার বিষয় ছিল নাটক, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নাটকেই খুঁজেছেন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবন, তাদের আবহমানকালের আচার, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে নাটকে তুলে এনে করেছেন আত্মানুসন্ধান।

সাহিত্যের যে কোনো শাখায় চলতে হলে মানুষের পথ ধরে হাঁটতে হয়। জীবনের ধরনকে ধারণ করতে হয় নিজের মধ্যে। সে জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়া চলে অবিরাম। কখনও তাকে ভাঙতে হয়, কখনও দিতে হয় নতুন আঙ্গিক। বাস্তবতার সমান্তরাল লাইন থেকে বিচ্যুত না হয়ে জীবনের কথা বলে যাওয়ার কৌশলে যোগ হয় নতুনত্ব। এক জীবনে বিশাল এ পৃথিবীর খুব কমই ছোঁয়া যায়, আঁকা যায়। সেলিম আল দীন তা জানতেন বলেই সাধারণের জীবনযাপন করে গেছেন। মৌলিকতাকে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে ক্ষুদ্রের মধ্যেই জীবনকে আটকে রেখেছেন। নাট্য-সাধনার সঙ্গে আপস না করে জীবনের সঙ্গে আপস করেছেন। একাধারে নাটক রচনা, নির্দেশনা, গবেষণা, থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করেছেন। জীবন ও প্রকৃতি থেকে শিখে তা অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করার কাজটি এমনই নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেছেন যে, নাটক ও নাট্যতত্ত্বের একজন ‘গুরু’ হিসেবে তাকে স্মরণে রাখবে দীর্ঘকাল। তার নাটক ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

সেলিম আল দীন শুধু নাটকের গণ্ডিতে আটকে না থেকে এ দেশের নাট্যশিল্পকে বিশ্বনাট্যের রূপ দিতে অন্যদের সঙ্গে গড়ে তোলেন ঢাকা থিয়েটার ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। বাংলা জনপদের প্রান্তিক গোষ্ঠীর জীবন নিয়ে চর্চা ও নির্মাণে সমধিক মনোযোগ ছিল সেলিম আল দীনের। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক এথনিক থিয়েটারের উদ্ভাবন করেছেন তিনি। নাট্যবিষয়ক বহু গবেষণাকর্ম রয়েছে তার। বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ বাংলা নাট্যকোষ সংগ্রহ, সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেছেন। শিল্পাদর্শে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী এ নাট্যকার সমকালীন বিশ্বের শিল্পধারায় নন-জেনরিক শিল্পধারার প্রবর্তনে সচেষ্ট ছিলেন। বাংলা নাটককে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা ও পাশ্চাত্য-প্রভাবমুক্ত করে নান্দনিকতার চরম উৎকর্ষে পেঁৗছে দিতে তার প্রয়াস অনস্বীকার্য। এর পাশাপাশি তিনি টেলিভিশনের জন্য নাটক রচনা, চলচ্চিত্রের সংলাপ রচনা ও মঞ্চনাট্যের নির্দেশনা দিয়ে পুরস্কৃত ও সংবর্ধিত হয়েছেন বহুবার।

সেলিম আল দীনের নাটকের মধ্যে অন্যরকম এক গন্ধ আছে; যা খুব আকর্ষণ করে কাছে টেনে নেয়, পরক্ষণেই ভাবনার অতলান্তে ফেলে দেয়। তার নাটকে ভিন্ন ধরনের রঙ আছে। যে রঙে জীবনের কথা লেখা থাকে। খুব স্পষ্ট কিন্তু গভীর সে জীবনকে দেখতে কখনও যৈবতী কন্যার মন পড়তে হয়, কখনও ধারণ করতে হয় জন্ডিসের চোখ। এ যেন এক আশ্চর্য খেলা! বাংলার আলো-বাতাস গায়ে মেখে প্রকৃতির শৃঙ্খলে বেড়ে ওঠা মানুষটিই ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল ভেঙে বাংলা নাটকের নিজস্ব আঙ্গিক খুঁজে ফিরেছেন জীবনভর। স্র্রষ্টা এবং দ্রষ্টা হয়ে শিল্পকে দিয়েছেন নতুন উচ্চতা। তার সৃষ্টির মৌলিকত্বে শিল্পের অনন্ত মুক্তির পথ পাওয়া যায় বলেই কি-না বারবার ফিরে এসে দেখে নিতে হয় নিজেদের শেকড়ের বিন্যাস, স্বপ্নের ঘোরে বিবিধ বেলুনের ওড়াউড়ি দেখে চকিত হতে হয়-এই বুঝি সময় এলো নতুন ছাঁচে নিজেকে গড়ার!

পূর্বপুরুষের সমৃদ্ধ শস্যক্ষেত – আলমগীর মাসুদ

বাংলা নাটকের প্রবাদপুরুষ সেলিম আল দীন নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন নাটকে। শুধু সমৃদ্ধ নয়, আমৃত্যু নাটকের মধ্যেই নিজেকে নতুন আঙ্গিকের এক স্বতন্ত্র কারিগর হিসেবে নিজের নামটি গোটা বিশ্বে উপস্থাপন করেছেন। যৈবতী কন্যার মন, ধাবমান, কীর্তনখোলা, প্রাচ্য, নিমজ্জনের স্রষ্টা যেমন তিনি; অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ও গ্রাম থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নিজের জাতকে চিনিয়ে দিয়েছেন গোটা বাঙালিকে। শিল্প-সৃষ্টির এই কারিগররা আর যা-ই করুন; সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে তারা তাদের সৃষ্টিকে একেক বিষয়ে একেকটা ইতিহাসের পথে রেখে যান। আচার্য সেলিম আল দীন শুধু শহর নয়; গ্রামের সংস্কৃতিময় মানুষদের কাছেও তিনি তার নাটককে আকাশ সমান করে তুলেছেন। প্রত্যেক অঞ্চলের জনগোষ্ঠী সেলিম আল দীনকে চিনেছে, তার নাটক দেখেছে, নাটকের চরিত্র হয়েছে। লোকেশন হিসেবেও সেসব জায়গা বিদ্যমান। বলা যায়, নাটকের এই বরপুত্র একটা আয়নার মধ্যে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে একটা বার্তা পেঁৗছে দিতে চেয়েছেন এবং পেরেছেনও। তিনি চিন্তা আর ধ্যানের মধ্যে নিজেকে জাগ্রত রাখতেন অষ্ট প্রহর। যেমন, একটি মানুষের কাছে সেলিম আল দীন নামটি অচেনা হলে তিনি বলে ওঠেন, ‘সেলিম আল দীনের নাম শোনোনি! তাহলে তোমার তো এ অঞ্চলে থাকাই উচিত নয়। এখানে ঘাস কি ইটেরাও আমাকে চেনে।’ বাহ! কী জোর দিয়ে নিজেকে চিনাচ্ছেন! আশ্চর্য হলেও সত্য, তিনি একজন অচেনা মানুষের মধ্যে কীভাবে রোমান্টিকতার সঙ্গে নিজেকে পরিচয় করে তোলেন, সেসব গুণ তার ছিল। তাহলে কি বলা যায় না, একজন সেলিম আল দীন এখানেই ঈশ্বরের চরিত্র হয়ে ওঠেন? তারপর চোখ মেলে নিজের কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে স্রষ্টা বানিয়ে রাখতে জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন আজকের আমাদের হাতে আসা গানে ও নাটকে।

সেলিম আল দীন ছাত্রদের কাছেও সমান জনপ্রিয় ছিলেন। তার প্রমাণ, স্যারকে ভালোবেসে ছাত্রদের দেওয়া মৌসুমি ফলে জাহাঙ্গীরনগরের স্যারের কোয়ার্টার থেকে অন্য রকম এক সুঘ্রাণ নাকে এসে লাগত। তবে তিনি নিজেকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখেননি। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি সহজে পেঁৗছেছেন। পেঁৗছানোর চেষ্টা করেছেন অবিরাম। আর এই চেষ্টার মধ্যে সফলতাও পেয়েছেন। স্রষ্টার রূপান্তর হয়ে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন বরাবরই সামনের কাতারে। আর নাটকের মধ্যে তো তিনি মুচি, কামার, জেলে, চাষা, শ্রমিকদের চিত্র তুলতে গিয়ে নিজেকে বাংলা নাটকের এক শক্তিমান নাট্যকারের মধ্যে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। তাই সেলিম আল দীন কেবল স্কুল-কলেজ, সাহিত্য, নাটকে শিক্ষক থাকেননি। তিনি মেহনতি মানুষের শরীরের ঘামের মতো। তার জ্ঞানকে জাত, ধর্ম এবং সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ জন্য একজন সেলিম আল দীন ফিরে ফিরে আসেন কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সমালোচক, উপস্থাপক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, সাংবাদিক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পাঠকদের মুখে, মনে, আলোচনায়, স্মৃতি ও লেখকদের কলমে। বলতে সন্দেহ নেই, সেলিম আল দীন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন শক্তিমান নাট্যকারের সম্মান পেতেন। কারণ আমরা দেখেছি এবং দেখছি, সমাজে মাতবরের যেমন খবরদারি থাকে; সাহিত্যে বলেন, কি নাটক মঞ্চেও এমন খবরদারি রয়েছে তার দখলে। যে খবরদারির রোষানলে পড়ে অনেকে ত্যাগ করে তার পছন্দের জায়গাটুকু! কিন্তু আচার্য সেলিম আল দীন বাংলা মঞ্চ কি নাটকের উঁচ্চ স্থানে থেকেও তিনি কখনও খবরদারি করতেন না। বরং তিনি হাত ধরে, ভালোবাসা দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে সবার স্বপ্ন ও কাজকে সহযোগিতা করেছেন। এখানেও সেলিম আল দীন তার সুচিন্তার মধ্য দিয়ে এক আধ্যাত্মিকতা লাভ করেছেন সবার কাছে। এখানে বলা যায় অর্থ, যশ, পুরস্কার, খ্যাতির মধ্যে থেকেও নিজের স্বভাব-চরিত্রকে বিক্রি করেননি। আর শিক্ষিত, ক্ষমতালোভী, ধান্ধাবাজদের মতো তো হনইনি; বলা যায়, এদের কালচার সংস্পর্শ থেকে নিজেকে দূরে রেখে শ্রেণি-গোষ্ঠী নয়; ধ্যান, চিন্তা, নাটকের কাজে একই সঙ্গে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের রাস্তায় পা রেখেছেন। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাতারে নিজে যেমন হেঁটেছেন, তার নাটকও এদের মধ্যে পেঁৗছে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

মানুষ বড়-ই আজব চিজ !

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

peculiarity-of-people

“পথের দাবী” উপন্যাসটি কেন্দ্র করে শরৎবাবুর প্রতিবাদ লিপি

অগাষ্ট 14, 2017 মন্তব্য দিন

বিস্মিত হতে হয় শরৎ বাবু কতোটা সাহসী ছিলেন সেটা জেনে ; রবি ঠাকুর এই বিষয়ে তাঁর কাছে ছিলেন একেবারে নস্যি । তবে দেরীতে হলেও বিশ্বকবির বোধোদয় হয়েছিল – ব্রিটিশ রাজ কর্তৃক জালিয়ানওয়ালাবাগের নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করতে তিনি নাইট উপাধি ত্যাগ করেছিলেন…

“পথের দাবী” উপন্যাসটি লেখার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ভর্ৎসনা করেছিলেন একটি পত্র লিখে। তিনি বলেছিলেন শরৎ সাহিত্যে “রাজনীতি” করছেন। সাহিত্য রাজনীতির জায়গা নয়। পথের দাবী উপন্যাস ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করলে তার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ কিছু লিখতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন।

শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের উক্ত পত্রের উত্তরে তাঁকে একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠিতে আমরা খুঁজে পাই একজন ভারতীয় ভলতেয়ারের মন।

“…..আপনি লিখেছেন ইংরাজ রাজের প্রতি পাঠকের মন অপ্রসন্ন হয়ে ওঠে। ওঠবারই কথা। কিন্তু এ যদি আমি অসত্য প্রচারের মধ্য দিয়ে করবার চেষ্টা করতাম লেখক হিসাবে তাতে আমার লজ্জা ও অপরাধ দুইই ছিল। কিন্তু জ্ঞানতঃ তা আমি করিনি। করলে politicianদের propaganda হতো, কিন্তু বই হতো না। নানা কারণে বাঙলা ভাষায় এ ধরনের বই কেউ লেখে না। আমি যখন লিখি এবং ছাপাই তার সমস্ত ফলাফল জেনেই করেছিলাম। সামান্য সামান্য অজুহাতে ভারতের সর্বত্রই যখন বিনা বিচারে অথবা বিচারের ভান করে কয়েদ নির্বাসন প্রভৃতি লেগেই আছে তখন আমি যে অব্যাহতি পাবো অর্থাৎ রাজপুরুষেরা আমাকেই ক্ষমা করে চলবেন এ দুরাশা আমার ছিলনা। আজও নেই। তাঁদের হাতে সময়ের টানাটানি নেই, সুতরাং আগে পিছের জন্য কিছুই যায় আসে না। এ আমি জানি এবং জানার হেতুও আছে। কিন্তু এ থাক। এ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু বাঙলা দেশের গ্রন্থকার হিসাবে গ্রন্থের মধ্যে যদি মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে থাকি, এবং তৎ-সত্ত্বেও যদি রাজরোষে শাস্তিভোগ করতে হয় ত করতেই হবে– তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি, কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়? প্রতিবাদেরও দন্ড আছে, এবং মনে করি তারও পুনরায় প্রতিবাদ হওয়া আবশ্যক। নইলে গায়ের জোরকেই প্রকারান্তরে ন্যায্য বলে স্বীকার করা হয়। এই জন্যই প্রতিবাদ চেয়েছিলাম। শাস্তির কথাও ভাবিনি এবং প্রতিবাদের জোরেই যে এ বই আবার ছাপা হবে কল্পনাও করিনি।

চুরি ডাকাতির অপরাধে যদি জেল হয় তার জন্যেও হাইকোর্টে আপিল করা চলে, কিন্তু আবেদন যদি অগ্রাহ্যই হয়, তখন দুই বছর না হয়ে তিন বছর হলো কেন এ নিয়ে বিলাপ করা সাজে না। রাজবন্দীরা জেলের মধ্যে দুধ-ছানা-মাখন পায়না বলে কিম্বা মুসলমান কয়েদীরা মোহরমের তাজিয়ার পয়সা পাচ্ছে আমরা দুর্গোৎসবে খরচ পাইনা কেন এই বলে চিঠি লিখে কাগজে কাগজে রোদন করায় আমি লজ্জা বোধ করি, কিন্তু মোটা ভাতের বদলে যদি jail authority ঘাসের ব্যবস্থা করে, তখন হয়ত তাদের লাঠির চোটে তা চিবোতে পারি, কিন্তু ঘাসের ডেলা কণ্ঠরোধ না করা পর্যন্ত অন্যায় বলে প্রতিবাদ করাও আমি কর্তব্য বলে মনে করি।

কিন্তু বইখানা আমার একার লেখা সুতরাং দায়িত্বও একার। যা বলা উচিত মনে করি, তা বলতে পেরেছি কিনা সেটাই আসল কথা। নইলে ইংরেজ সরকারের ক্ষমাশীলতার প্রতি আমার কোন নির্ভরতা ছিল না। আমার সমস্ত সাহিত্যসেবাটাই এই ধরনের। যা উচিত মনে করেছি তাই লিখে গেছি।

আপনি লিখেছেন আমাদের দেশের রাজারা এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের অন্যান্য রাজশক্তি কারও ইংরেজ গভর্ণমেন্টের মত সহিষ্ণুতা নেই। এ কথা অস্বীকার করার অভিজ্ঞতা আমার নেই। কিন্তু এ আমার প্রশ্নই নয়। আমার প্রশ্ন ইংরেজ রাজশক্তির এই বই বাজেয়াপ্ত করবার justification যদি থাকে, পরাধীন ভারতবাসীর পক্ষে প্রোটেস্ট করবার justification তেমনি আছে।

আমার মনে হয় আপনি এই অবিচার করেছেন যে, আমি যেন শাস্তি এড়ানোর ভয়েই প্রতিবাদের ঝড় তুলতে চেয়েছি এবং সেই ফাঁকে গা-ঢাকা দেবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তা বাস্তবিক নয়। দেশের লোক যদি প্রতিবাদ না করে, আমাকে করতে হবে। কিন্তু সে হৈ-চৈ করে নয়, আর একখানা বই লিখে।….”

শতবর্ষের আলোকে শরৎচন্দ্র / সম্পা : মিহির আচার্য ( শুকসারি প্রকাশন / ১৯৮২)

রোকেয়ার উত্তরসূরী

ডিসেম্বর 10, 2016 মন্তব্য দিন

rokeya-stampরোখসানা চৌধুরী : বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনই এই উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদী যিনি ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ করেছিলেন একই সঙ্গে। কোনো বিশেষ ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থকে নয়, বরং সকল ধর্ম ও তার ধারকবাহকপ্রহরীরূপী পুরুষকে। অথচ তাঁর নাম নিয়েই ঘটে গেছে সবচেয়ে বড় বিভ্রাট। উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদীর নামের তিনচতুর্থাংশই কৃত্রিমভাবে আরোপিত। পিতৃপ্রদত্ত নামটি ছিল মোসাম্মৎ রুকাইয়া খাতুন। বিয়ের পর তিনি মিসেস আর. এস. হোসেন নামে লিখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তার বিদ্রোহী সত্তাকে আড়াল করে একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম ভদ্রমহিলা অবয়ব প্রদানের অভিপ্রায়ে বেগম রোকেয়া নামে তাঁকে পরিচিত করা হয়। বর্তমানে বেগম রোকেয়া এবং রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনদুটি নামই জনসমাজে প্রচলিত, যার একটি নামও তাঁর প্রকৃত পরিচয় বহন করে না। নামজনিত এই বিভ্রাট অত্র অঞ্চলের অবিকশিত, বিভ্রান্ত নারীবাদী ভাবনার প্রতীক হয়ে ধরা দেয়। রোকেয়াপরবর্তী দীর্ঘ শূন্যতার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রোকেয়াদর্শনের মূল আলোকপাত ঘটেছে প্রধানত তিনটি গ্রন্থে. সুলতানার স্বপ্ন, . পদ্মরাগ এবং ৩. অবরোধবাসিনী।
সুলতানার স্বপ্ন আখ্যানটি নারীবাদী বিশ্বের বা রাষ্ট্রের ভবিষৎ মেনিফেস্টো। পদ্মরাগ উপন্যাস বাস্তবতার সাথে সাযুজ্যতা রেখে তৎকালীন সম্ভাব্য স্বাধীন মনুষ্য অবয়বধারী নারীর রূপরেখা। অবরোধ ও পর্দাপ্রথা সম্পর্কে বেগম রোকেয়ার ভাবনা নিয়ে যত বিভ্রান্তি তার মোক্ষম উত্তর অবরোধবাসিনী গ্রন্থখানি স্বয়ং। তাঁর সমগ্র রচনাবলী এবং জীবনদর্শনে যে বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়েছে তা মোটের উপর নিম্নরূপ

. অবরোধপ্রথার অবলুপ্তি
. দপ্তর ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীপুরুষের সমন্বিত উদ্যোগ
. নারীর বিজ্ঞাননির্ভর কর্ম পরিকল্পনা
. নারীপুরুষের জড়তামুক্ত সহাবস্থান
. নারীর আত্মপ্রত্যয়ী ঋজু লিঙ্গনিরপেক্ষ শরীরী ভাষা (body language)
. দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত নারীর পরিবর্তিত বেশভূষা
. দেশজাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ছুৎমার্গবিহীন একত্রবাস তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্ময়কর প্রকাশ
. ক্ষুদ্র ও কৃষিশিল্পের সম্প্রসারণে নারীপুরুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক অলোচনা

স্থান স্বল্পতার জন্য রোকেয়ারচনার চুম্বক অংশবিশেষ পাঠকের জন্য বর্তমান প্রবন্ধে উপস্থাপন করা গেল:

. ধর্ম প্রসঙ্গে

যখনই কোন ভগ্নি মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন তখনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।তবেই দেখিতেছেন, এই ধর্মগ্রন্থগুলো পুরুষ রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। কোন স্ত্রী মুনির বিধানে হয়তো তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। ধর্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বর প্রেরিত কিনা কেহই নিশ্চিত বলিতে পারে না। যদি ঈশ্বর কোন দূত রমনী শাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত বোধ হয় কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না। এখন আমাদের আর ধর্মের নামে নতমস্তকে নরের অযথা প্রভূত্ব সহা উচিৎ নহে। আরও দেখ, যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ় সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক।

কেহ বলিতে পারেন যে, তুমি সামাজিক কথা কহিতে গিয়া ধর্ম লইয়া টানাটানি কর কেন? তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, ধর্ম শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমনীর উপর প্রভূত্ব করিতেছেন। তাই ধর্ম লইয়া টানাটানি করিতে বাধ্য হইলাম। (রোকেয়া, কাদির, ১৯৭৩, পৃ. ১১১৩)

. পুরুষের স্বরূপ উন্মোচনে

. কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য। (ডেলিশিয়াহত্যা, রোর, ১৬২)

. নারীস্থানে স্বয়ং শয়তানকেই (পুরুষ জাতি) শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, দেশে আর শয়তানী থাকিবে কি রূপে? (সুলতানার স্বপ্ন, ১৩৪)

. তাহারা কিছুই করিবে নাতাহারা কোন ভালো কাজের উপযুক্ত নহে। তাহাদিগকে ধরিয়া অন্তঃপুরে বন্দি করিয়া রাখুন। (, ১৩৫)

. নারী যাহা দশ বৎসরে করিতে পারে, পুরুষ তাহা শতবর্ষেও করিতে অক্ষম।

. ডাকাতি, জুয়াচুরি, পরস্বাপহরণ, পঞ্চমকার আদি কোন পাপের লাইসেন্স তাহাদের নাই। (রোর, ৩৩৪)

. নারীর উদ্দেশ্যে

. আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি (রোর, ২৭৭)। প্রাণীজগতের কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয় নহে। (রোর, ৮৪)

. আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলিএগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ। কারাগারে বন্দীগণ পায়ে লৌহনির্মিত বেড়ি পরে, আমরা স্বর্ণরৌপ্যের বেড়ি অর্থাৎ মল পরি। উহাদের হাতকড়ি, লৌহনির্মিত, আমাদের হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্মিত চুড়ি। কুকুরের গলে যে গলবন্ধ (dog-collar) দেখি উহারই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয়া চিক নির্মিত হইয়াছে। গোস্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া নাকাদড়ি পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের নোলক পরাইয়াছেন!! নোলক হইতেছে স্বামীর অস্তিত্বের (সধবার) নিদর্শন।

. স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দৈর্ঘ মাপেন, স্ত্রী তখন বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ প্রস্থ মাপেন। (পৃ. ২৮)

প্রশ্ন জাগে, রোকেয়ার এই সব বিস্ফোরকভাবনার উৎস কোথায়? ভাই ও স্বামীর সহায়তায় সামান্য বাংলাইংরেজী শিখবার যে ইতিহাস প্রচলিত তাতে অন্তত এই ধরণের র‌্যাডিক্যাল ভাবনার জন্ম নেয়াটা অসম্ভব বলেই মনে হয়। তাই হয়তো রোকেয়া প্রসঙ্গে ঐ সময়ে রবীন্দ্রনাথের নীরব থাকাটাও সঙ্গত বলে মনে হতে থাকে আমাদের। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হই না আর। কারণ, রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য সমকালীন বিশিষ্ট লেখকেরা রোকেয়া সম্পর্কে বিস্ময়কর নীরবতা পালন করেছেন। ঠাকুর পরিবারের মেয়েরা শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি বেশভূষার পরিবর্তন, একাকী বিলেত ভ্রমণ পর্যন্ত ঠাকুর পরিবারের বিদ্রোহ সীমায়িত ছিল। নারীপুরুষের সমতার কাছাকাছি কোন ধারণা তাদের পক্ষে থেকে উত্থাপিত হয়নি। বরং শিক্ষাকে তারা গ্রহণ করেছিলেন সমাজ ও পরিবারে নারীর ঐতিহ্যিক ভূমিকাকে আরো বেশি নিপুণভাবে পরিবেশন করতে। (রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া, গোলাম মুরশিদ পৃ. ১৮৬)

তাই রবীন্দ্ররচনাতেও সত্যিকার অর্থে কোনো উদ্যোগী নারীর প্রতিচ্ছবি চোখে পড়ে না। বিনোদিনী, চারু, সুচরিতা, ললিতা, লাবণ্যকেতকী, কুমুদিনীএরা প্রত্যেকেই লেখালেখি, সামাজিক সাংগঠনিক কাজের মত সৃজনশীল কাজের সাথে জড়িত থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই হৃদয়ঘটিত জটিলতার আবর্তনে ঘুরপাক খেতে খেতে জীবনের সকল সম্ভাবনা পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।

বেগম রোকেয়া যখন লিখছেন, তখন তার সামনে উদাহরণস্বরূপ রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর ছিলেন। যারা ঠিক নারীবাদী না হলেও নারীমুক্তির পথে প্রধান প্রধান বাধাগুলো অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে উপমহাদেশে রোকেয়ার কোন পূর্বসূরী ছিল না। পূর্বসূরী না থাকাটা যৌক্তিক কারণেই মেনে নেয়া যায়। কিন্তুু আজকের একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে ভাবতে হচ্ছে, সেই রোকেয়ার যথার্থ উত্তরসূরী কোথায়? রোকেয়াভাবমূর্তিকে মহিমান্বিত করলেও বাংলাদেশের সমাজ বা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে নিদেনপক্ষে নারী আন্দোলন কিংবা নারীর জীবন যাপনে প্রতিফলন কোথায়? যদিও আশান্বিত হবার মত পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছিলো।

সুফিয়া কামাল সরাসরি রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলামের সদস্যরূপে, স্বপ্রতিষ্ঠিত রোকেয়া সদনের পরিচালনায়, পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে প্রত্যক্ষভাবে রোকেয়াপদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত শিখা গোষ্ঠির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বে জাতীয় মহিলা পরিষদ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নারী পুর্নবাসন, মেয়েদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করবার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ধর্মে ও পরিবারে নারীর অধস্তন অবস্থান, ধর্মীয় আইনে নারীর সন্তান ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার ইত্যাদি নারীমুক্তি প্রসঙ্গে মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা পরবর্তীসময়ে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ও মৌলবাদের আগ্রাসন ঘটে। খোদ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের নানা অনুষঙ্গকে বিতর্কিত করে তোলা হয়। স্বাভাকিভাবেই নারী মুক্তি অথবা নারী অধিকার প্রসঙ্গটি আন্দোলনের মূল ধারা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাধীনতার পর ধর্ষিতা বা নির্যাতিতা হবার বাইরে আর কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এমনকি সশস্ত্র নারী মুক্তিযোদ্ধারাও অধিকাংশই অপরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেছেন। বীর প্রতীক তারামন বিবিকে খুঁজে বের করে সম্মানিত করা হয়েছে স্বাধীনতার ২৫ বছর পর। তাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি অথবা উল্টো দিক থেকে নারীর জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে গভীর ভাবনায় খুব বেশি ইতিবাচক মনে হবার কথা না। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একাত্তর পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা দেশটির প্রশাসকগণ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায়। কিন্তুু পরিবারের অর্থনীতি, একই সাথে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সামলে তুলতে যে নারী ঘর থেকে বেরিয়ে এলোরাষ্ট্র সেই নারীর জন্য রাস্তাঘাট, যানবাহন, কর্মক্ষেত্রকোথাও নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা ভেবে দেখেনি। নারী যেপুরুষের (পিতা, স্বামী অথবা ভাই) ঘর থেকে বের হয় অথবা যেপুরুষের সাথে চলতে হয় (রাস্তাঘাট বা যানবাহন) এবং যাদের সাথে পরিবারের চাইতেও অধিক সময় ব্যয় করে (দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান) সেই পুরুষেরা আজও নারীকে তাদের অপ্রস্তুুত মানসিকতায় মাংসপিণ্ড ব্যতীত সহকর্মী ভাববার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ইভটিজিং, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপসহ নারীর প্রতি সহিংসতার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়ে আছে এভাবেই, যাকে মূল থেকে উৎপাটনের পরিকল্পনা করা হয়নি কখনোই। তাই নারী ঘরেবাইরে নিরাপত্তা, সম্মান, বা ন্যূনতম মানবিক অধিকারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তবে লড়াইটি অসংগঠিত, বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তএকথা প্রাজ্ঞজনেরাও স্বীকার করছেন।

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম (যুদ্ধাপরাধীদের বিচার), নীলিমা ইব্রাহিম (মুক্তিযুদ্ধে আহতনির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন) কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যূতে ফলপ্রসু অবদান রেখেছেন। কিন্তু এইসব ধারাবাহিকতাহীন বিবিধ আন্দোলন অথবা দেশজুড়ে গৃহকর্মীদের পোশাকশিল্প কারখানায় কর্মীরূপে রূপান্তরনারীমুক্তি কিংবা নারীর অধিকার প্রসঙ্গে রোকেয়া বর্ণিত নারীর সার্বিক জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। যেমনভাবে বেগম রোকেয়ার পরে আর কোনও লেখকের (নারী বা পুরুষ) রচনায় যথাযথ রূপে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের সাথে দ্বন্দ্বসংশিষ্টতার প্রেক্ষাপটে নারীর সম্ভাব্য স্বাধীন, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন অবয়বকে নিরূপণ করা যায়নি।

নব্বই দশকে এমত বিরাজমান স্থবির সময়ের মাঝপথে তসলিমা নাসরিনের আগমন পুরো পরিস্থিতিকে পাল্টে দেয়। ধর্ম, সমাজ ও পুরুষতন্ত্রকে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে তার প্রকাশিত আক্রমণাত্মক বক্তব্য নিয়ে দেশ ও বহির্বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মৌলবাদী ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রকাশ্যে তার হত্যামূল্য নির্ধারণ করলে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন। তার গ্রন্থগুলি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভের পাশাপাশি বাজেয়াপ্তও হয়। প্রশ্ন হচ্ছে তসলিমা নাসরীন যা যা বলেছিলেন, তা কি খুব অসম্ভব, উদ্ভট, আকস্মিক আবিষ্কৃত নতুন কোনো তত্ত্ব? ধর্ম, নারী এবং সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে তার আগেপরে ড. আহমদ শরীফ, . হুমায়ুন আজাদ, আরজ আলী মাতুব্বরসহ আরো বহু মনীষীই বিদ্বেষ, কটূক্তি, বিরুদ্ধভাব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাদের দেশত্যাগ করতে হয়নি। আমজনতার সমাবেশে এঁদের নাম পর্যন্ত অনেকে অবগত নন। প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে বেগম রোকেয়া একশ বছর আগেই মত প্রকাশ করেছেন। পার্থক্য হল রোকেয়াকে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর তসলিমা নাসরিন বক্তব্যকে আরো বেশি তথ্যপ্রমাণ সহকারে উপস্থাপন করাতে তার মাথার মূল্য ধার্য হয়ে গেছে।

বলে রাখা ভালো, বর্তমান আলোচনাটি তসলিমা নাসরীনকে নিয়ে নয়, তার রচনা কুশলতার বিচার নিয়েও নয়। কেবল একটি প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশে নারীবাদের উদ্ভববিকাশের আশ্চর্য পরস্পরহীনতার যোগসূত্র অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হওয়া যায়। অর্থাৎ রোকেয়া যদি তার রচনা প্রত্যাহার না করতেন, তবে মাথার মূল্য নির্ধারণের আগেই অজানা অন্ধকারে তাকে হারিয়ে যেতে হত। এই আশ্চর্য মূল্য নির্ধারণের দুর্ভেদ্য বেষ্টনীকে অতিক্রম করা যায়নি বলেই কি নারীবাদের সহজস্বাভাবিক বিবর্তন ঘটেনি অত্র অঞ্চলে? তসলিমা নাসরীনের আগমন ও উপস্থিতি তাই পূর্বাপর সংযোগবিচ্ছিন্ন। বেগম রোকেয়ার মতই। এক শতাব্দী আগের প্রেক্ষাপট বলেই তাকে মহিমার দৃষ্টিতে বিচার করা সম্ভব হচ্ছে।

কথা হচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের নারী গ্রন্থে এবং বেগম রোকেয়ার রচনাতেও যতখানি পুরুষবিদ্বেষ এবং ধর্ম বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে, ততখানি নয় তসলিমা নাসরীনে। একটি সাক্ষাৎকারে (৭১টিভি, ৮ আগষ্ট ২০১৪) তিনি সেই কথা স্বীকারও করেছেন। অথচ রোকেয়া নারীজীবন সম্পর্কে যেখানে থেমে গিয়েছিলেন, তসলিমা নাসরিন অন্য সব কিছুর সঙ্গে নারীর সেই অকথিত যৌনজীবন সম্পর্কে মুখ খুললেন। অপ্রস্তুত বাঙালি সমাজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত চমকে গেল। মূলত তসলিমা নাসরিনের বিবৃত নারীবাদের সমালোচনা হিসেবে দুটি বিষয়কে গণ্য করেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ কিংবা সমাজ তাত্ত্বিকেরা।

. দেশকালসমাজইতিহাসের প্রেক্ষিতে বাঙালি নারী মুক্তির বিষয়টি সমন্বিত করে দেখতে না পারা।

. ভাবনাসমূহের বিচ্ছিন্নতা, ব্যক্তিগত ক্ষোভের তীব্রতা সামগ্রিক বিষয়টির তত্ত্বীয় রূপদানে ব্যর্থতা।

তবে তাঁর এইসব সীমাবদ্ধতাকে সমাজের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দিক নির্দেশনার অপরিপক্কতার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ (নারী,পুরুষ ও সমাজ/পৃ.১২৩)। তাছাড়া, তার রচনাবলীর সামগ্রিক নিবিড় পাঠেরও অভাব রয়েছে বলে বোধ হয়। যেভাবে রোকেয়ারচনার বিদ্রোহী প্রতিবাদী অংশগুলো আজো জনসমাজে অজানিতই রয়ে গেছে। অর্ধশিক্ষিত জাতি, যারা আজো বিনোদন খুঁজে পায় দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান গ্রন্থে, অথবা ধর্মীয় গ্রন্থের (মাকছুদুল মোমেনীন) দাম্পত্য জীবন অংশে, তারা যে নারী রচিত গ্রন্থে নারীর যৌনজীবন সম্পর্কে উন্মুক্ত আলোচনায় গোপন আনন্দ খুঁজবে আর প্রকাশ্যে তার মৃত্যুদণ্ড দাবি করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে, বিচ্ছিন্নভাবে হলেও নারীর প্রধান দুটি শত্রু মৌলবাদ ও পুঁজিবাদকে চিহ্নিত করতে তিনি ভুল করেন নি।

দীর্ঘ গণআন্দোলন এবং সশস্ত্র একটি জনযুদ্ধের পরেও স্বাধীন দেশে নারীমুক্তির বিষয়টি কখনো গুরুত্ব পায়নি। তাই দেখা যায় অতীত ইতিহাসেও প্রীতিলতা কিংবা ইলা মিত্র অথবা একাত্তরের বীরযোদ্ধা তারামনদের যুদ্ধক্ষেত্রেও জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নারীকে মানসিকভাবে ভেঙেচুরে দেবার জন্য ধর্ষণ নামক নির্যাতনটিকে ক্রমাগত ব্যবহার করা হয়। ইলা মিত্রসহ অগনিত নারী যার শিকার ছিলেন। তারামন এবং আরো অনেককেই প্রথমে পরীক্ষাস্বরূপ রান্নার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে তারা যুদ্ধে যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে জয় করার যুদ্ধটি নারীর প্রথম যুদ্ধ। তা সংসারই হোক কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র। এতগুলো যুদ্ধে উত্তীর্ণ হওয়ার মাঝপথে মানসিক দাসত্বের কাছে পরাজিত হয়ে সংসারের একটি নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবরূপে নারী ঘরে ফিরে যায়। এই ফিরে যাওয়ার মিছিলটিই দীর্ঘ এবং হতাশাব্যঞ্জক।

বেগম রোকেয়া এবং হুমায়ুন আজাদের রচনার যেখানে সাদৃশ্য দেখা যায় তা হলো তারা দুজনেই নারী মুক্তির ক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়নকে এতটা জোরালোভাবে প্রাধান্য দেন যেখানে পুরুষের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই ম্রিয়মান হয়ে পড়বে। উনিশশতক পূর্ব নারীর মত পুরুষের অস্তিত্ব সেখানে আবছায়ার আড়ালে ঝাপসা হয়ে থাকবে।

. নন্দনকাননতুল্য নারীস্থানে নারীর পূর্ণ আধিপত্য। পুরুষেরা মর্দানায় থাকিয়া রন্ধন করেন, শিশুদের খেলা দেন (সুলতানার স্বপ্ন/পৃ. ১১৩)

. পুরুষেরা বড় বড় কলকারখানায় যন্ত্রাদি পরিচালিত করেন; খাতাপত্র রাখেন– …তাহারা কেরানী ও মুটে মজুরের কাজ করিয়া থাকেন। (সুলতানার স্বপ্ন/পৃ. ১১৪) এদিক থেকে দুজনার ভাবনাই প্রবলভাবে র‌্যাডিক্যাল। হুমায়ুন আজাদ মাতৃত্বকে নারী মুক্তির পথে প্রতিবন্ধকরূপে উপস্থাপন করেছেন।

. নিজের ভবিষ্যতের জন্য নারীকে ত্যাগ করতে হবে পিতৃ ও পুরুষতন্ত্রের সমস্ত শিক্ষা ও দীক্ষা; ছেড়ে দিতে হবে সুমাতা, সুগৃহিনী, সতীর ধারণা; … তাকে কান ফিরিয়ে নিতে হবে পুরুষতন্ত্রের সমস্ত মধুর বচন থেকে, তাকে বর্জন করতে হবে পুরুষতন্ত্রের প্রিয় নারীত্ব। তাকে সাবধান হতে হবে পুরুষতন্ত্রের সমস্ত মহাপুরুষ সম্বন্ধে, সন্দেহের চোখে দেখতে হবে সবাইকে। কেননা কেউ তার মুক্তি চায়নি। (নারী/হু. আজাদ পৃ. ৩২৬)

. নারীর গর্ভধারণ একান্ত পাশবিক কাজ। নারীকে কি চিরকালই ধারণ করে যেতে হবে গর্ভ, পালন করে যেতে হবে পশুর ভূমিকা? …পুরুষতন্ত্রের শিক্ষার ফলে নারী আজো মনে করে গর্ভধারনেই তার জীবনের সার্থকতাগর্ভবতী হওয়ার মধ্যে জীবনের কোনা সার্থকতা, মহত্ত্ব, পূণ্য নেই। আমূল নারীবাদীরা মনে করেন মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর নয়, পুরুষকে উদ্ভাবন করতে হবে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প পথ; এবং কয়েক শ বছর পর গর্ভধারণ যে আদিম পাশবিক কাজ বলে গণ্য হবে তাতে সন্দেহ নেই। (/পৃ৩২০)

রোকেয়া পদ্মরাগ কিংবা সুলতানার স্বপ্নে যেভাবে নারীকে প্রশাসনিক দাপ্তরিক কাজে ব্যাপৃত দেখান সেখানে কোথাও নারীর মাতৃরূপটির উপস্থিতি নেই। অথবা ঘরেবাইরে নারীর একাধিক ভূমিকা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যেসব জটিলতা সৃষ্টি হয়ে থাকে সেই বিষয়গুলো সঙ্গত কারণেই তিনি দৃষ্টি এড়িয়ে গেছেন। নারী মুক্তির পথে বিবাহসংসারপুরুষতান্ত্রিক সমাজের সকল শৃঙ্খলকে তিনি উপেক্ষা করতে বলেছেন। তবে কি ধরে নেয়া যায়, র‌্যাডিক্যাল নারীবাদীদের মত তিনিও নারীপুরুষের জীববৈজ্ঞানিক বৈষম্যে বিশ্বাসী ছিলেন? রোকেয়া একটি বিষয়েই সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করে গেছেন। তা হল নারীর যৌনজীবন। হয়তো লেখালেখির শুরুতেই ধর্ম বিষয়ক বিদ্রোহ প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হয়ে সতর্ক হয়েছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় অবরোধ ও পর্দাপ্রথা নিয়ে ক্রমাগত স্ববিরোধী বক্তব্য প্রকাশে। নিদেনপক্ষে তিনি নারীশিক্ষার প্রকল্পটি চালু রাখতে মরণপণ করেছিলেন। (অন্যত্র জানা যায়, তিনি মেয়েদের জন্য কলেজ খুলতেও আগ্রহী ছিলেন।) তাই শেষ জীবনে অনেক রকমের আপোসকামিতার সঙ্গে সমঝোতা করতে থাকা এই যুগান্তরী মহামানবীর তীব্র ক্ষোভ অপ্রকাশিতও থাকেনি।

. আমার স্কুলটা আমার প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয়। একে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি সমাজের অযৌক্তিক নিয়ম কানুনগুলিও পালন করছি। (সওগত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনকে।)

. তবু পর্দা করছি কেন জানেন? বুড়ো হয়ে গেছি, মরে যাব। ইস্কুলটা এতদিন চালিয়ে এলাম, আমার মরার সঙ্গে সঙ্গে এও যদি মরে সেই ভয়ে। (ইব্রাহিম খাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকার)

. জীবনের ২৫ বছর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইতেছি। (রোর/৩৮০)

. হাড়ভাঙ্গা গাধার খাটুনিইহার বিনিময় কি জানিস? … ভাড় লিপকে হাত কালি অর্থাৎ উনুন লেপন করিলে উনুন তো বেশ পরিষ্কার হয়, কিন্তু যে লেপন করে তাহারই হাতে কালিতে কালো হইয়া যায়। আমার হাড়ভাঙা খাটুনির পরিবর্তে সমাজ বিস্ফারিত নেত্রে আমার খুঁটিনাটি ভুল ভ্রান্তির ছিদ্র অন্বেষণ করিতেই বদ্ধপরিকর। (রোর/পত্র/পৃ.৪৯৯)

বিদ্যাসাগর পরাধীন দেশে বিধবা বিবাহ আইন পাস করিয়েছিলেন (১৮৫৬) কিন্তু তার সার্থক প্রয়োগ দেখে যেতে পারেননি। এত বছর পর বিধবা বিবাহে কোন সামাজিক বা আইনি বাধা না থাকলেও যেনতেন ভাবে বিবাহ, সন্তান ও সংসারই যে নারীজীবনের প্রধান লক্ষ্য ও গন্তব্যসেই শৃঙ্খল থেকে নারী আজো বের হতে পারেনি। যেখানে এক শতাব্দী আগেই রোকেয়া উচ্চারণ করেছিলেন নারীমুক্তির অমোঘ বাণী:আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসার ধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে। (পদ্মরাগ/রোর/৪৫৩)

রোকেয়ারচনায় আধুনিক নারীর পূর্ণাঙ্গ জীবনের স্বয়ম্ভূ রূপরেখার নির্মাণ থাকলেও আজকের বাংলাদেশে সেই নারী কোথায়? শিক্ষাসুযোগঅধিকার সবকিছুই হয়তো প্রত্যাশিত রকমের বৈষম্যরহিত হয়ে যায়নি, কিন্তুু যতটুকু দূরত্ব পেরোনো গেছে, ছায়াভূতের মতো সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছে রোকেয়া কথিত ানসিক দাসত্বস্বয়ং নারীর সমাজের, উভয়ত। নারী আজ অবোরোধের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষিত, শিল্পিত, স্বাধীন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রীতদাসে রূপান্তরিত পুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণকারী ছায়ামূর্তি মাত্র। আজকের যুগের এই নারীদের জন্য রোকেয়ার কণ্ঠই পুনরায় প্রতিধ্বনিত হোক:অতএব জাগো, জাগো গো ভগিনী।

প্রথমে জাগিয়া উঠা সহজ নয় জানি; সমাজ মহা গোলযোগ বাধাইবে জানি, ভারতবাসী মুসলমান আমাদের জন্য কৎলএর (অর্থাৎ প্রাণদণ্ডের) বিধান দিবেন এবং হিন্দু চিতানল বা তুষানলের ব্যবস্থা দিবেন জানি! (এবং ভগ্নিদিগেরও জাগিবার ইচ্ছা নাই জানি!) কিন্তু সমাজের কল্যাণের নিমিত্ত জাগিতে হইবেই। কারামুক্ত হইয়াও গ্যালিলিও বলিয়াছিলেন, কিন্তু যাহাই হউক পৃথিবী ঘুরিতেছে (but nevertheless it does move)!! … সমাজের সমঝদার (reasonable) পুরুষেরা প্রাণদণ্ডের বিধান নাও দিতে পারেন, কিন্তু unreasonable অবলা সরলাগণ; (যাহারা যুক্তি তর্কের ধার ধারে না, তাহারা) শতমুখী ও আঁইস বঁটির ব্যবস্থা নিশ্চয় দিবেন, জানি!! (রোকেয়া রচনাবলী/পৃ.২০)

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬