আর্কাইভ

Archive for the ‘সাহিত্য’ Category

বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধ-বাসিনী’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ। শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করে

আমরা বহুকাল হইতে অবরোধ থাকিয়া থাকিয়া অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি সুতরাং অবরোধের বিরুদ্ধে বলিবার আমাদের- বিশেষত আমার কিছুই নাই। মেছোণীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, ‘পচা মাছের দুর্গন্ধ ভাল না মন্দ?’- সে কি উত্তর দিবে?

এস্থলে আমাদের ব্যক্তিগত কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা পাঠিকা ভগিনীদেরকে উপহার দিব- আশা করি, তাঁহাদের ভাল লাগিবে।

এস্থলে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে, গোটা ভারতবর্ষে কুলবালাদের অবরোধ কেবল পুরুষের বিরুদ্ধে নহে, মেয়েমানুষদের বিরুদ্ধেও। অবিবাহিতা বালিকাদিগকে অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া এবং বাড়ির চাকরানী ব্যতীত অপর কোন স্ত্রীলোকে দেখিতে পায় না।

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ।

শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করেন। মেম ত মেম-শাড়ী পরিহিতা খ্রীষ্টান বা বাঙ্গালী স্ত্রীলোক দেখিলেও তাঁহারা কামরায় গিয়া অর্গল বন্ধ করেন।

[১]

সে অনেক দিনের কথা- রংপুর জিলার অন্তর্গত পায়রাবন্দ নামক গ্রামের জমিদার বাড়িতে বেলা আন্দাজ ১টা-২টার সময় জমিদার কন্যাগণ জোহরের নামাজ পড়িবার জন্য ওজু করিতেছিলেন। সকলের ওজু শেষ হইয়াছে কেবল ‘আ’ খাতুন নাল্ফম্নী সাহেবজাদী তখনও আঙ্গিনায় ওজু করিতেছিলেন। আলতার মা বদনা হাতে তাঁহাকে ওজুর জন্য পানি ঢালিয়া দিতেছিল। ঠিক সেই সময় এক মস্ত লম্বাচৌড়া কাবুলী স্ত্রীলোক আঙ্গিনায় আসিয়া উপস্থিত! হায়, হায়, সে কি বিপদ! আলতার মার হাত হইতে বদনা পড়িয়া গেল- সে চেঁচাইতে লাগিল- ‘আউ আউ! মরদটা কেন আইল!’ সে স্ত্রীলোকটি হাসিয়া বলিল, ‘হে মরদানা! হাম মরদানা হায়?’ সেইটুকু শুনিয়াই ‘আ’ সাহেবজাদী প্রাণপণে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া তাঁহার চাচি আম্মার নিকট গিয়া মেয়েমানুষ হাঁপাইতে হাঁপাইতে ও কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, ‘চাচি আম্মা! পায়জামা পরা একটা মেয়ে মানুষ আসিয়াছে!!’ কর্ত্রী সাহেবা ব্যস্তভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘সে তোমাকে দেখিয়াছে?’ ‘আ’ সরোদনে বলিলেন ‘হ্যাঁ!’ অপর মেয়েরা নামাজ ভাঙিয়া শশব্যস্তভাবে দ্বারে অর্গল দিলেন- যাহাতে সে কাবুলী স্ত্রীলোক এ কুমারী মেয়েদের দেখিতে না পায়। কেহ বাঘ-ভালুকের ভয়েও বোধ হয় অমন কপাট বন্ধ করে না।

[২]

এদিকে মহিলা মহলে নিমন্ত্রিতাগণ খাইতে বসিলে দেখা গেল- হাশমত বেগম তাঁহার ছয় মাসের শিশুসহ অনুপস্থিত। কেহ বলিল, ছেলে ছোট বলিয়া হয়ত আসিলেন না। কেহ বলিল, তাঁহাকে আসিবার জন্য প্রস্তুত হইতে দেখিয়াছে- ইত্যাদি।

পরদিন সকালবেলা যথাক্রমে নিমন্ত্রিতাগণ বিদায় হইতে লাগিলেন- একে একে খালি পাল্ক্কী আসিয়া নিজ নিজ ‘সওয়ারী’ লইয়া যাইতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে একটা ‘খালি’ পাল্ক্কী আসিয়া দাঁড়াইলে তাহার দ্বার খুলিয়া দেখা গেল হাশমত বেগম শিশুপুত্রকে কোলে লইয়া বসিয়া আছেন। পৌষ মাসের দীর্ঘ রজনী তিনি ঐ ভাবে পাল্ক্কীতে বসিয়া কাটাইয়াছেন।

তিনি পাল্ক্কী হইতে নামিবার পূর্বেই বেহারাগণ পাল্ক্কী ফিরাইতে লইয়া গেল- কিন্তু তিনি নিজে ত টুঁ শব্দ করেনই নাই- পাছে তাঁহার কণ্ঠস্বর বেহারা শুনিতে পায়, শিশুকেও প্রাণপণ যত্নে কাঁদিতে দেন নাই- যদি তাহার কান্না শুনিয়া কেহ পাল্ক্কীর দ্বার খুলিয়া দেখে! কষ্টসাধ্য করিতে না পারিলে আর অবরোধবাসিনীর বাহাদুরী কি?

Advertisements

মাত্র একটি বই লিখেই যারা নাম কামিয়েছেন!

fame from one book only 1fame from one book only 2

গোলাম মোস্তফার কবিতায় রাসুলপ্রেম

calligraphy-1 chothiaড. এম এ সবুর : গোলাম মোস্তফা রাসুলপ্রেমিক কবি। ইসলাম-রাসুলপ্রেম তার সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার কবিতা-গানের বেশির ভাগই রাসুলপ্রেমে উজ্জীবিত। মহানবী হযরত মুহম্মদ সা. এর সিরাত রচনায় তার কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। তার রচিত বিশ্বনবী যেমন বাঙালি পাঠক সমাজে ব্যাপক সমাদৃত তেমনি তার রচিত ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ কবিতাটি মুসলিম ঘরে ঘরে ও মিলাদ মাহফিলে বহুল পঠিত। তাছাড়া রাসুল সা. এর প্রশংসায় তার রচিত ‘নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি আমার মোহাম্মদ রাসুল’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রাসুল’ ইত্যাদি গান-কবিতা মুসলিম সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়। রাসুল সা. এর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে তার সাহিত্য জীবনের শুরুর দিকেই তিনি ‘হযরত মোহাম্মদ’ কবিতা রচনা করেন। এ কবিতায় তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবের অন্ধকার অবস্থার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে রাসুল সা.কে সেই অন্ধকার বিদারক আখ্যা দিয়ে বলেন,

এই ঘোর দুর্দিনে এলো কে গো বিশ্বে,

উজলিয়া দশদিশি, তরাইতে নিঃস্বে!

মুখে তার প্রেমবাণী, করুণা ও সাম্য,

বিশ্বের মুক্তি ও কল্যাণ কাম্য।

প্রায় একই ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে তার ‘ফাতেহা-ই-দোআজদহম’ কবিতায়। এতে তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর জন্মদিনের বর্ণনা দিয়ে এবং তাঁকে স্বাগত জানিয়ে লিখেন, 

আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম।

দিকে দিকে উঠিতেছে নব ছন্দে বন্দনার গান

স্বাগতম! স্বাগতম! ধরণীর হে চিরকল্যাণ!

হরযত মুহম্মদ সা. শুধু মুসলিম কিংবা আরবদের জন্য নয় বরং বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তাই তাঁর জন্মোৎসব শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত নয় বরং বিশ্ববাসীর জাতীয় উৎসব। এ জন্য গোলাম মোস্তফা রাসুলের জন্মোৎসবে বিশ্বের সব মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, 

হে নিখিল ধরাবাসী! মুসলিমের লহ নিমন্ত্রণ,

এ উৎসব নহে শুধু আমাদের একান্ত কখন!

নাসারা-খৃষ্টান এসো, এসো বৌদ্ধ-চীন, 

মহামানবের এ যে পরিপূর্ণ উৎসবের দিন।

রাসুলপ্রেমিক কবির কল্পনায় হযরতের জন্মদিনে বিশ্ব প্রকৃতিতে এক মহোৎসবের আয়োজন হয়েছিল। ঐতিহাসিক-দালিলিক ভিত্তি না থাকলেও রাসুলভক্ত কবি মনে করেন তাঁর জন্মদিনে সারা বিশ্ব বেহেস্তের সুগন্ধিতে মোহিত হয়েছিল, সেদিন আকাশে-বাতাসেও মহাআনন্দের জয়গান ধ্বণিত হয়েছিল; ফিরেস্তাগণও চঞ্চল চিত্তে সে আনন্দে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। আর বেহেস্ত হতে বিশ্ব নারীনেত্রী বিবি হাজেরা এবং হযরত মরিয়ম আ. ধাই হয়ে এসেছিলেন। কবির ভাষায় রাসুলের জন্মদিনের দৃশ্য এ রকম, 

আকাশ দিয়েছে তার রক্ত রাঙা অরুণ-কিরণ,

বেহেশ্তের সুধা-গন্ধ আনিয়াছে মৃদু সমীরণ;

ছুটাছুটি করিতেছে দিকে দিকে ফেরেশ্তার দল, 

সারা চিত্ত তাহাদের আজিগো যে পুলক-চঞ্চল!

এসেছে ‘হাজেরা’ বিবি, আসিয়াছে বিবি ‘মরিয়ম’, 

আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম! 

মক্কার কুরাইশ বংশে হযরত মুহম্মদ সা.-এর জন্ম কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয় বরং আলকুরানের বর্ণনা মতে মহানবী সা. এর পূর্ব পুরুষ হযরত ইব্রাহীম ও তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আ.- এর প্রার্থনার ফল এবং হযরত ঈসা আ.- এর সুসংবাদ।  আর গোলাম মোস্তফার ভাষায়, 

‘আমিনা’ মা-র কোলে খুদা রাখ্ল সে সওগাত

‘ইবরাহিমের দোয়া’ সে আর ‘ঈসার সুসংবাদ’।

হযরত মুহম্মদ সা. চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার অদূরে হেরা পর্বতে নবুওয়াত লাভ করেন। এ সময় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে হযরত জিব্রাইল আ. মুহম্মদ সা.-এর নিকট প্রথম অহি নিয়ে আসেন। মহানবী সা.-এর নবুওয়াত লাভ ইসলামের ইতিহাসে তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এ নবুওয়াতের মাধ্যমে আধুনিক ইসলাম তথা মুহম্মদী শরিয়তের যাত্রা শুরু হয় এবং আইয়্যামে জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগের অবসানের সূত্রপাত ঘটে। নবুওয়াত লাভের ঐতিহাসিক এ ঘটনা কবি গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাস-ই-হালী তে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

চক্রবালে উঠ্ল যেন ভাগ্য-চাঁদিমা

দূর হ’ল সব বিশ্ব হতে আঁধার কালিমা!

ছুট্ল না তা কিরণ বটে অল্প কিছুক্ষণ, 

রেসালাতের চাঁদে ছিল মেঘের আবরণ; 

কালের স্রোতে চল্লিশ সাল গুজরে গেল যেই-

‘হেরা’- গিরির উর্ধ্বে সে চাঁদ উদয় হল সেই!

নবুওয়াত লাভের মাধ্যমে হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদ প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়ে প্রথমে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকদের কাছে তাওহিদ তুলে ধরেন। কিন্তু কুরাইশ নেতা আবু জহল ও তার অনুসারীরা রাসুলের দাওয়াত কবুল করেনি বরং বিরোধীতা করেছে। এমনকি তাওহিদ প্রচার বন্ধ করার লক্ষ্যে হযরত মুহম্মদ সা. কে হত্যার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। আবু জহলের এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা গোলাম মোস্তফার লিখনীর মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে এভাবে-

এ বিপুল সঙ্ঘ- মাঝে যে আজি দাঁড়াবে 

ছিন্ন করি আনিবারে মোহাম্মদ- শির, 

পঞ্চশত স্বর্ণমুদ্রা, শত উষ্ট্র সনে 

সানন্দ হৃদয়ে তারে দিব উপহার।

হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর মনোনীত নবী ও রাসুল। তাঁর রক্ষক আল্লাহ নিজে। মানুষের কোন ষড়যন্ত্র ও অনিষ্ট তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। যে কুরাইশরা হযরতকে নির্যাতন-নিপীড়ন করে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছিল এবং যারা রাসুল সা. কে হত্যা করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছিল; মাত্র আট বছর পর তারাই মক্কা বিজয়ের সময় মুহম্মদ সা.-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। যে উমর রা. মহানবীকে হত্যার জন্য মুক্ত তরবারী নিয়ে ছুটেছিল সে উমরই ইসলাম কবুল করে হযরতের একনিষ্ট সহচর, খলিফা হয়ে বিশ্বের বুকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। ঐতিহাসিক এসব ঘটনা কবি তুলে ধরেছেন এভাবে, 

তারপর এলো আরব-মরুতে খোদার রসূল-নূরুন্নবী,

কোরেশ আসিল কতল করিতে বিশ্বের সেই আলোক-রবি

বলো কে মরিল? মোহাম্মদ? না আততায়ী সেই কোরেশ জাতি। 

ঘাতক শেষে যে রক্ষক হয়ে ধারায় রাখিল অতুল খ্যাতি।

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন অসাধারণ গুণে গুণান্বি^ত একজন মহামানব। দুর্বলকে তিনি কখনও বঞ্চিত করেননি বরং সাহায্য করেছেন। পথ হারানো মানুষদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ধনী-গরিব তার কাছে ছিল অভিন্ন। তাঁর কাছে মানুষের কোন ভেদাভেদ ছিল না; ছিল না সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও বৈষম্য। ক্ষমা, দয়া-প্রেম ছিল তাঁর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা হযরত মুহম্মদ সা. কে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি উত্তম চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত’ (আলকুরআনুল কারীম, ৬৮:৪)। মহানবী হযরত মুহম্মদ সা.-এর উত্তম চরিত্রের গুণাবলীকে গোলাম মোস্তফা কবিতায় চিত্রিত করেছেন এভাবে- 

দূর্বলে করে না সে নিপীড়ন হস্তে

আর্তেরে তুলে দেয় শুভাশীষ মস্তে, 

ভ্রান্তরে বলে দেয় মঙ্গলÑ পন্থা

রক্ষক, বীরÑ নহে ভক্ষক হন্তা।

ভিক্ষুকে টেনে নেয় আপনার বক্ষে,

ছোট-বড় ভেদ-জ্ঞান নাহি তার চোক্ষে,

মানুষের অকাতরে করে না সে ক্ষুদ্র,

হোক্ না সে বেদুইনÑ হোক্ না সে শূদ্র। 

রাসুল সা. ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি ছিলেন প্রেম-ভালবাসা, ক্ষমা-ন্যায়ের মূর্তপ্রতীক। তাঁর প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল না কখনও। যারা তাঁকে অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত করেছিল তাদেরকেই উদার চিত্তে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁর ক্ষমার দৃষ্টান্ত অসংখ্য। মক্কা বিজয়ের দিনে সাধারণ ক্ষমা তারই উজ্জলতম নিদর্শন। মক্কার কাফির কুরাইশরা নিজেদের অপকর্মের কারণে মক্কা বিজয়ের দিনে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। যে কোন শাস্তির জন্য তারা প্রস্তুতও ছিল। কিন্তু ক্ষমার অনুপম আর্দশ মহানবী হযরত মুহম্মদ সা. সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। কবি গোলাম মোস্তফা হযরতের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা উল্লেখ করে বলেন, 

কহিলেন নবী হাসি তখন-

“ভেবেছো ঠিকই বন্ধুগণ!

          কঠোর দন্ড হবে বিধান!

ধরো সে দ– কহিনু সাফ্-

সব অপরাধ আজিকে মাফ্,

          যাও সবে, দিনু মুক্তিদান।”

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী-রাসুল। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ; রাসুলপ্রেমে নিমজ্জিত ও প্রবল আবেগে আপ্লুত হয়েও সে কথা ভুলে যাননি কবি গোলাম মোস্তফা। তবে হযরত মুহম্মদ সা. মানুষ হলেও সাধারণ মানুষ নন, তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল; যা মহানবী সা. নিজেই বলেছেন। আর তা গোলাম মোস্তফার ভাষায়, 

আমার চেয়ে তোমরা ত কেউ বান্দাতে নও কম, 

তুমি-আমি এক- বরাবর দুর্বল ও অক্ষম। 

তোমায় আমায় প্রভেদ যেটুক নয়-ক সে অদ্ভুত

আমি শুধু বান্দা নহি- আমি খোদার দূত।

ইসলামের মূলমন্ত্র তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। কিন্তু খৃষ্টানরা হযরত ঈসা আ. কে এবং ইহুদীরা হযরত ওযায়ের আ. কে আল্লাহর পুত্র বলে তাওহিদ পরিপন্থী বিশ্বাস করে। তাই হযরত মুহম্মদ সা. নিজেই তাঁর অনুসারীদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তারা যেন তাঁকে ইহুদী-খৃষ্টানদের মত আল্লাহর পুত্র বলে ধারণা না করে। রাসুল সা.-এর এই নিষেধাজ্ঞা গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাস-ই-হালী তে উল্লেখ আছে এভাবে,

নাসারাদের মতন কেহই পড়ো না ধোঁকায়

খুদার বেটা বলে যেন পূজো না আমায়।

মহানবী সা. এর অনুপম আদর্শ ও নির্দেশনাবলী অনুসরণ করে মুসলিমরা এক সময় উন্নতি ও সম্মানের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। কিন্ত বিশ শতকের মুসলিম সমাজ ছিল নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত। বিভিন্ন দেশে তারা ছিল দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও বিভিন্ন কুসংস্কারে অধঃপতিত ছিল মুসলিম সমাজ। বিশ শতকের মুসলমানদের এসব অধঃপতনের জন্য রাসূলের আদর্শচ্যুত হওয়ার বিষয় সমকালীন দার্শনিক ও কবি ইকবাল রচিত শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ আছে। আর তা গোলাম মোস্তফা অনুবাদ করেন এভাবে, 

কারা, বল, ত্যাগ করেছে আমার পাক রাসূলের পাক বিধান,

মুহম্মদের পয়গাম আর তোমাদের কারো নাই স্মরণ।

তবে হতাশ-নিরাশ হওয়ার কারণ নাই, মুসলমানগণ আবারও রাসুলের আদর্শ অনুসরণ করলে তাদের হৃত গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। তাই কবি অধঃপতিত মুসলিমদেরকে রাসুলের ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, 

তুচ্ছরে আজ করগো উচ্চ- প্রেমে ও পূণ্যে কর মহৎ 

মুহম্মদের নামের আলোকে উজ্জ্বল কর সারা জগৎ।

কিছু সাহিত্যিক হাসি-তামাশা…

some humours 1asome humours 1b

অজানা লেখকের বই

anon booksআহমাদ শামীম : বইয়ের প্রচ্ছদে লেখা থাকে লেখকের নাম, এমনটাই নিয়ম। কিন্তু সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসে বিখ্যাত এমন অনেক বই আছে, যেগুলোর লেখকের নাম জানা নেই কারও। সাহিত্যবোদ্ধা ও গবেষকরা কিছু বইয়ের লেখক কে ছিলেন তা পরবর্তীকালে উদ্ঘাটন করতে পেরেছেন হয়তো। আবার অনেক বইয়ের লেখক আজ পর্যন্ত অজ্ঞাতনামাই রয়ে গেছেন। এমন কিছু বইয়ের গল্প নিয়ে এ রচনার সূত্রপাত।

বেউলফ

ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সাহত্যিকর্ম ‘বেউলফ’। অষ্টাদশ শতক থেকে নবম শতকের মধ্যবর্তী সময়ে লেখা এপিকধর্মী কাব্যগাথা বেউলফ-এর লেখক কে ছিলেন, তা আজ পর্যন্ত অজ্ঞাত। ধারণা করা হয়, দীর্ঘ এই কাব্যের রচয়িতা অ্যাংলো-সাক্সন সময়কার কোনো কবি। ৩১৮২ লাইনের এই দীর্ঘ কবিতার মূল নায়ক বেউলফ। তৎকালীন মধ্য ইউরোপের জিটস রাজ্যের বীর বেউলফকে ঘিরে কবিতার কাহিনী গড়ে উঠেছে। জিটসের পার্শ্ববর্তী রাজ্য দানেস যখন গ্রান্ডেল নামক এক ভয়ঙ্কর দৈত্যের আক্রমণের শিকার, তখন ওই রাজ্যের রাজা হর্থগারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে বেউলফ। দৈত্যকে হত্যার পর দৈত্যের মা’কেও হত্যা করে বেউলফ। দানেসের রাজার মৃত্যুতে ঘটনাক্রমে বেউলফই রাজা হয়ে সিংহাসনে বসে। এ ঘটনার ৫০ বছর পর আবারও এক দৈত্য দানেস আক্রমণ করে। দৈত্যকে হত্যা করতে গিয়ে বেউলফের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় দীর্ঘ এ কবিতা। ইংরেজি সাহিত্যের প্রাচীনতম চারটি পা ুলিপির একটি নোওয়েল কোডেক্সের অংশ নামহীন এই এপিক কাব্য তার প্রধান চরিত্র বেউলফ-এর নামেই বর্তমানে পরিচিত। ২০০৭ সালে বেউলফ অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

আলিফ লায়লা

আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ, আলী বাবা চল্লিশ চোর কিংবা নাবিক সিন্দবাদের সাতটি ভ্রমণের মতো জনপ্রিয় গল্প সবার মুখে মুখে ফেরে। এই গল্পগুলো মূলত আলিফ লায়লা বা আরব্য রজনীর গল্পগ্রন্থে সন্নিবেশিত আছে। ইসলামের সোনালি যুগ অর্থাৎ অষ্টম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে রচিত বিখ্যাত গ্রন্থের মূল লেখকের খোঁজ পাওয়া যায় না। কারণ কয়েকশ’ বছর ধরে গল্পগুলো বিভিন্ন লেখকের কলম ও মানুষের মুখে মুখে ঘুরে অবশেষে মলাটবন্দি হয়েছে। আরব, পারস্য, মিসর, আফ্রিকা, চীনসহ নানান অঞ্চলের লোকগাথার সংমিশ্রণে গল্পগুলো রচিত হয়েছে। ১৭০৬ সালে আলিফ লায়লার ইংরেজি অনুবাদ অ্যারাবিয়ান নাইটস প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত নানান ভাষায় অনূদিত হয়েছে সাহিত্যের এই অমূল্য গ্রন্থটি। স্যার গাওয়েইন অ্যান্ড দ্য গ্রিন নাইট মিডল ইংলিশ এজের শ্নোকধর্মী আলোচিত প্রেম আখ্যান ‘স্যার গাওয়েইন অ্যান্ড দ্য গ্রিন নাইট’। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষাংশে রচিত এ অ্যাখানের জনক অজ্ঞাতনামা কোনো এক সাহিত্যিক। গাওয়েইন পোয়েট বা পার্ল পোয়েট হিসেবে এ লেখকের পরিচিতি থাকলেও তার আসল নাম জানা যায়নি আজ পর্যন্ত। তিনটি আলাদা ভাগে আইরিশ, ওয়েল্‌স, ইংলিশ ও ফ্রেঞ্চ ঐতিহ্যের ধারায় রচিত ‘স্যার গাওয়েইন অ্যান্ড দ্য গ্রিন নাইট’ হিরোইক লিটারেচার জনরার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পার্ল, পিউরিটি ও পেশেন্সে শিরোনামের আরও তিনটি ধর্মীয় কবিতার সঙ্গে মধ্যযুগের একটি পাণ্ডুলিপিতে ‘স্যার গাওয়েইন অ্যান্ড দ্য গ্রিন নাইট’ লিপিবদ্ধ ছিল।

ল্যাজারিলো দ্য টর্মেস

১৫৫৪ সালে স্পেনের তিনটি শহর থেকে একযোগে প্রকাশিত হয় ‘ল্যাজারিলো দ্য টর্মেস’ শিরোনামের একটি উপন্যাস। লেখকের নামহীন ক্ষুদ্র উপন্যাসটি তৎকালীন স্পেনের ধর্ম অনুসারী শাসক মহলের জন্য তীব্র চপেটাঘাত হয়েই যেন আসে। সমাজের উঁচু বংশে জন্ম নেওয়া ল্যাজারো নামে ছোট একটি ছেলের গল্প বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসে। ল্যাজারো বাবার মৃত্যুর পর তাকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের কাজে নিয়োজিত হতে হয়। এই মানুষদে শঠতা, ধূর্ততা ও নেতিবাচক আচরণ ল্যাজারো ধীরে ধীরে আয়ত্তে নেয়। সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত ‘ল্যাজারিলো দ্য টর্মেস’ মূলত সমাজের সব শ্রেণির মানুষদের আচরণ ও তাদের চরিত্র উন্মোচনে প্রতীকধর্মী একটি উপন্যাস। এর ফলে ক্যাথলিক চার্চ ও স্পেনের শাসকদের রোষানলে পড়ে উপন্যাসটি নিষিদ্ধ হয়। ল্যাজারো চরিত্র এবং এ উপন্যাসে প্রভাবিত হয়ে পরবর্তী সময়ে মিগুইল দি সার্ভেন্তেসের ‘ডন কিহোতে’ এবং মার্ক টোয়েনের ‘অ্যাডভেঞ্চার অব হাকেলবেরি ফিন’ রচিত হয়েছে। ‘ল্যাজারিলো দ্য টর্মেস’-এর মূল লেখক অজ্ঞাত। কিন্তু ধারণা করা হয়, ওই সময়ের বেশ কয়েকজন সাহিত্যিকের যৌথ প্রয়াসেই রচিত হয়েছে উপন্যাসটি।

দ্য রোমান্স অব লাস্ট

চার্লি রবার্টস নামে এক অতি যৌন আকাঙ্ক্ষাতাড়িত লোকের গল্প নিয়ে বিতর্কিত উপন্যাস ‘দ্য রোমান্স অব লাস্ট’। ১৮৭৩-৭৬ সালে চার খণ্ডে প্রকাশিত এই ভিক্টোরিয়ান ইরোটিক নভেলের রচয়িতার উল্লেখ নেই। যৌন সুড়সুড়ি ও অসুস্থ যৌন বিকারকে উপজীব্য করে রচিত উপন্যাসটি নিয়ে সাহিত্য মহলে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। প্রথম প্রকাশের পর কয়েকটি সংস্করণে নানা অংশ বাদ দিয়ে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। ১৯৬৮ সালে ‘দ্য রোমান্স অব লাস্ট’-এর আনসেন্সরড এডিশন প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। উপন্যাসের আসল লেখক কে, তা জানা না গেলেও সাহিত্য বোদ্ধাদের সন্দেহে আছেন দু’জন। একজন উইলিয়াম সিম্পসন পটার, অন্যজন এডওয়ার্ড স্যালোন। দুই সাহিত্যিক ভদ্রলোকই ওই সময় ইরোটিক নভেলের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

ডায়েরি অব অ্যান অক্সিজেন থিফ

২০০৬ সালে প্রকাশিত বেস্ট সেলার ডাচ নোবেল ‘ডায়েরি অব অ্যান অক্সিজেন থিফ’। আমস্টারডাম থেকে প্রকাশিত আত্মজীবনীধর্মী বইটির লেখক অজ্ঞাতনামা কেউ একজন। আয়ারল্যান্ডের বিজ্ঞাপনী সংস্থার এক কর্মীর জীবনের অভিজ্ঞতা ও নানা বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণিত হয়েছে বইটিতে। নামহীন মানুষটি চাকরি বদলের মাধ্যমে প্রথমে ইংল্যান্ড, পরে আমেরিকায় স্থায়ী হন। দুটি আলাদা শহরে বসবাসের অভিজ্ঞতা, ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে থাকার মনস্তাত্ত্বিক সংকট, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্য-মধ্যবিত্তে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে অন্য মানুষে রৃপান্তরিত হওয়া, আধুনিক জীবনের গ্যাঁড়াকলে বন্দি হওয়া, তার মাদকাসক্তি এবং নারীদের প্রতি তার মনোভাবসহ ব্যক্তি মানসের নানা গল্প দারুণভাবে উঠে এসেছে বইটিতে।

গো আস্ক এলিস

১৫ বছর বয়স্ক এক কিশোরীর মাদকাসক্তি এবং বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘গো আস্ক এলিস’। রচয়িতার নামহীন উপন্যাসটি ১৯৭১ সালে প্রকাশের পরপরই ইয়ং অ্যাডাল্ট পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে। বেস্ট সেলারের তকমা নিয়ে ‘গো আস্ক এলিস’ মাদকের ভয়াবহ পরিণামের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার কারণে মাদকবিরোধী টেক্সট হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় অল্প সময়ে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উপন্যাসটি মাদক ব্যবহারের খোলামেলা বর্ণনার কারণে সমালোচিতও হয়। তবুও গত চার দশকে উপন্যাসটির জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি মোটেও। বইটির লেখকের কোনো খোঁজ পাওয়া না গেলেও সমালোচকরা মনে করেন, ‘গো আস্ক এলিস’ বিয়েট্রেস স্পার্ক নামে এক নারীর লেখা।

দ্য অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যা ফ্লি

বেল্লা নামের উঠতি বয়সী সুন্দরী এক তরুণীর উন্মাতাল যৌনজীবনের গল্প নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘দ্য অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যা ফ্লি’। ১৮৮৭ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত বইটির লেখকের কোনো নাম ছিল না। উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণ এর বর্ণনাকারী হচ্ছে একটি রক্তচোষা নীল মাছি। মাছির জবানিতেই সব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। প্রথম প্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত একাধিক প্রকাশনী থেকে বেশ কয়েকটি সংস্করণ বের হয়েছে উপন্যাসটির। হয়েছে ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনুবাদও। ‘দ্য অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যা ফ্লি’র লেখক কে ছিলেন, তা প্রাথমিকভাবে জানা না গেলেও এক দল গবেষক খুঁজে বের করেছেন তাকে! ওই সময়কার লন্ডনের এক উকিলের কাজ ছিল এটি। আর ভদ্রলোকের নাম স্টানিসলাস ডি রোডস।

দ্য স্ট্রিং অব পার্লস

খুন, সন্দেহ আর প্রেমের জমজমাট রহস্যোপন্যাস। সুইনি টড নামে এক ভয়ঙ্কর খুনির গল্প নিয়ে ৭৩২ পৃষ্ঠার দীর্ঘ উপন্যাসটি বই আকারে ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৫০ সালে। বিখ্যাত এই রহস্য উপন্যাসের লেখক মূলত কে- সেটা আজ পর্যন্ত অজানা রয়ে গেছে। সাধারণ পাঠকদের কথা বিবেচনায় হালকা সাহিত্যের বাজারে ‘দ্য স্ট্রিং অব পার্লস’ ওই সময় বেশ জনপ্রিয়তা পায়। ১৮৪৬-৪৭ সালে উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘দ্য পিপলস পিরিওডিক্যাল অ্যান্ড ফ্যামেলি লাইব্রেরি’ ম্যাগাজিনে। সুইনি টড পেশায় নাপিত। তার দোকানে আসা কাস্টমারদের গলা কেটে গোপন কুঠরিতে ফেলে দিত এবং সেখান থেকে তাদের মাংস কেটে আবার তারই সহযোগী এক মাংস ব্যবসায়ীর দোকানে বিক্রি করত। এভাবে অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ হতে থাকে। জোহানা ওকলি নামে এক নারী তার প্রেমিকের নিখোঁজ হবার সূত্র ধরে সুইনি টডের রহস্যের উন্মোচন করে। ‘দ্য স্ট্রিং অব পার্লস’-এর আসল লেখক কে, তা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। সাহিত্য সমালোচকরা মনে করেন, উপন্যাসটির রচয়িতা তৎকালীন জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যিক জেমস ম্যালকম রাইমার। অনেকে মনে করেন, এর আসল লেখক থমাস পেকেট প্রেস্ট। তবে সন্দেহের তীর দ্বিতীয় জনের প্রতিই। কারণ জীবদ্দশায় নামে-বেনামে অসংখ্য রহস্য গল্পগ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন।

বিভাগ:সাহিত্য

লিটলম্যাগ-বদ্ধ দুয়ার ভাঙার হাতিয়ার

little mag

আলোকবর্তিকা অবলা বসু

abola basu 2তাহেরা বেগম জলি : মহান বিদ্যাসাগরের জন্মের ৪৫ বছর পর এবং মহীয়সী বেগম রোকেয়ার জন্মের ১৫ বছর আগে আমাদের দেশে জন্ম নিয়েছিলেন আর এক বিস্ময়নারী। তিনি বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর একান্ত সঙ্গী লেডি অবলা বসু। স্বামী মি. বসুর পাশাপাশি, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনিও নিজের কর্ম জগতে বিচরণ করেছেন এবং নিজের বলয়ে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য উজ্জ্বল। ক্ষণজন্মা এই নারী নিজের সমস্ত জীবনীশক্তি দিয়েই বুঝেছিলেন, নারী এবং শিশুদের জীবনের অন্ধকার দূর করার মধ্যেই নিহিত আছে, আমাদের সমাজ এবং জীবনের প্রাণশক্তি। বিদ্যাসাগর, অবলা বসু এবং বেগম রোকেয়া প্রায় সমসাময়িক কালে জন্ম নেয়া এই তিনজন মহান মানুষ,ধারাবাহিকভাবে নারী এবং শিক্ষা সঙ্কট নিয়ে লড়াই করে গেছেন। তারা প্রত্যেকেই জন্মদায় হিসেবেই মনে হয় পেয়েছিলেন নারী লাঞ্ছনা দূর করার দায়ভার এবং নিজের নিজের ক্ষেত্রেও তারা ছিলেন সভ্যতার সফল কারিগর।

বিদ্যাসাগর কাল ১৮২০ সেপ্টেম্বর ২৬-১৮৯৬ জুলাই ২৯, অবলা বসু কাল-১৮৬৫ ( মতান্তরে ১৮৬৪) আগস্ট ৮-১৯৫১ আগস্ট ২৬, বেগম রোকেয়া কাল-১৮৮০ ডিসেম্বর ৯-১৯৩২ ডিসেম্বর ৯। তাদের আবির্ভাব এবং কর্মযজ্ঞের ধারাবাহিকতা দেখলে মনে হবে, এ যেন সভ্যতা নির্মাণের রিলে রেস। যেন একজনের অসমাপ্ত কাজ অন্যজনের পরম মমতায় বহন করে নিয়ে চলা। স্মরণ করা যেতে পারে, এই তিনজনই নারীর অবরুদ্ধ জীবন এবং শিক্ষা সঙ্কটকে দেখেছিলেন সামাজিক সঙ্কটের কেন্দ্র হিসেবে। অবলা বসুর আগে এবং পরে যে দু’জন নারীবান্ধব সৈনিক দেখা দিয়েছিলেন আমাদের এই ধরা ধামে, তারা যে নারী জাতির জন্য কতখানি যুধ্যমান ছিলেন, সেই গৌরবময় অতীত প্রতি মুহূর্তে আমাদের আজও রোমাঞ্চিত করে।

তবে আজ আমাদের আলোচনার কেন্দ্র হবে শ্রীমতী বসু। কথাটা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক, বিদ্যাসাগরের পরে বাংলার নারী সমাজের মুক্তির দূত যদি অবলা বসুকেই বলা হয়, তবেই তাকে প্রকৃত সম্মান দেয়া হয়। কিন্তু কেন যে তাকে অতি যত্নে গ্রাম বাংলার নারী সমাজের কাছে অচেনা করে রাখা হয়েছে, তা ভেবে দেখবার বিষয় বা কেউ কেউ শুধু বিজ্ঞানী মি. বসুর সহধর্মিণী হিসেবেই তাকে দেখতে পছন্দ করেন। অথচ শ্রী বসু এবং তিনি ছিলেন পাশাপাশি চলমান দুই শক্তিধর মানুষ। বেগম রোকেয়া এবং অবলা বসুর মধ্যে বয়সের পার্থক্য মাত্র ১৫ বছরের। প্রায় সমসাময়িক সময়েই এই দুই দিকপাল ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নারী সমাজকে অন্ধকার মুক্ত করতে, নারী সমাজের শৃঙ্খল মুক্তির মহাযজ্ঞে। যখন মহীয়সী বেগম রোকেয়া এক হাতে বই-কলম এবং অন্য হাতে আলোর মশাল নিয়ে ছুটে চলেছেন বিরামহীন। তখন আলোকময়ী অবলা বসুও এক হাতে বই-কলম এবং অন্য হাতে আলোর মশাল হাতে সমান গতিতে ছুটে চলেছেন বাংলার পথে প্রান্তরে। একের পর এক তিনি গড়ে তুলেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার সংখ্যা হবে দু’শ’র ওপরে। অবলা বসুর অসাধারণ এই কীর্তি আজও আমাদের মনে বিস্ময় জাগায়। অবশ্য বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ, এই সময় কাল পর্যন্ত আমাদের দেশে মহা জাগরণ উঠেছিল শিক্ষা এবং নারী মুক্তি আন্দোলনের। সে আজ আমাদের কাছে শুধুই সুখ স্মৃতি। বিশেষ করে নারী মুক্তি আন্দোলনের গৌরবময় সেই ধারাবাহিকতার আজ নির্মম ছন্দ পতন যে ঘটেছে, তা আমরা জীবন দিয়ে প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করছি।

আমাদের দেশের নারীদেহ আজ প্রায় শিয়াল শকুনের খাদ্য এবং শিক্ষাকে পরিণত হয়েছে ধনী সমাজে বিলাসী সামগ্রীতে। একবিংশ শতাব্দীর অধিকার সচেতন এই যুগেও আমাদের বাল্যবিবাহের কাছে করতে হচ্ছে আত্মসমর্পণ এবং তা আইনসম্মতভাবে! আজও আমাদের দেশের মেয়েরা বঞ্চিত হচ্ছে পিতৃ সম্পত্তি থেকে। অথচ ঠিক এর দেড় শ’ বছর আগে বাংলার আকাশে উদয় হয়েছিল অবলা বসু নামের উজ্জ্বল নক্ষত্রের। যিনি জীবনের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। কিন্তু আমরা, সেই অবলা বসুর স্বপ্নের দেশেই আজও হামাগুড়ি দিচ্ছি নিকষ কালো অন্ধকারে! এই দুঃখজনক রহস্যের উৎস কোথায়? তা অনেকটা গবেষণারই বিষয়! যাই হোক ফিরে আসি অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর পথযাত্রী অবলা বসুর কাছে।

বিক্রমপুরের বিখ্যাত দাশ পরিবারের সন্তান, নারী সমাজের পথিকৃৎ লেডি অবলা বসুর জন্ম ৮ আগস্ট ১৮৬৫ (মতান্তরে ১৮৬৪) বরিশালে। বাংলা ১২৭১ সালে। পদ্মার গর্ভে হারিয়ে যাওয়া বিক্রমপুরের ছোট্ট গ্রাম তেলিরবাগের দুর্গামোহন দাশ, যিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অন্ধকার সমাজের বিরুদ্ধে ছিলেন আপোসহীন যোদ্ধা। বহু বিবাহ বন্ধ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন ও নারী শিক্ষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের যোগ্য উত্তরসূরি। ব্রাহ্ম সমাজের মুখপাত্র এই দুর্গাদাশেরই কন্যা লেডি অবলা বসু। অবলা বসুর মাতা শ্রীমতী ব্রহ্মময়ী দাশ অবরুদ্ধ নারী সমাজের অন্ধকার ঘুচাতে, নিজের স্বকীয়তা নিয়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে ছিল তার আপোসহীন পদচারণা।

শ্রীমতী বসুর ভাই তৎকালীন প্রখ্যাত অ্যাডভোকেট জেনারেল সতিশ রঞ্জন দাশ। বোন ‘গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলের’ প্রতিষ্ঠাতা সরলা রায়।

গোপাল কৃষ্ণ গোখলে (গোখলে) এখানে কিছু আলোচনার দাবি রাখে। গোপাল কৃষ্ণ গোখলে ছিলেন ভারতীয় হিসেবে কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি। তবে তার থেকেও তার বড় পরিচয়, তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার দাবি নিয়ে ১৯১০ সালে প্রথম সরব হয়েছিলেন। নারী সমাজকে তখন ১০ বছর বয়সে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হতো। মি. গোখলেই প্রথম নারীদের এই প্রাপ্ত বয়স নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হন। সম্ভবত সেই কারণেই, বিদুষী দুই বোন, তাদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নারী এবং শিক্ষাবান্ধব মি. গোখলের নাম জড়িয়ে নেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং ভারতের পঞ্চম মুখ্য বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাশ ছিলেন অবলা বসুদের নিকটাত্মীয়।

অবলা বসুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বরিশালে। বরিশালেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন কলকাতার বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে বেথুন স্কুলে। বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় এবং বেথুন স্কুলের তিনি ছিলেন প্রথম ছাত্রীদের অন্যতম।

তিনি ১৮৮১ সালে ২০ টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বাবা দুর্গামোহন দাশের ইচ্ছা, কন্যা অবলা ডাক্তার হবে। তৎকালীন সময়ে কলকাতায় নারীদের ডাক্তারি শিক্ষার সুযোগ না থাকায়, অবলা বসু ১৮৮২ সালে মাদ্রাজে যান ডাক্তারি পড়তে। অসুস্থতাজনিত কারণে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারি পড়া তার আর হয়ে ওঠে না। ডাক্তারি পাঠ অসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসতে হয় তাকে। তবে সেখানে তিনি ডাক্তারি বিদ্যার ওপর দুই বছরের একটি নির্দিষ্ট কোর্স শেষ করেছিলেন। এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজের পক্ষ থেকে তাকে একটি ‘সার্টিফিকেট অফ অনার’ দেয়া হয়েছিল।

অতঃপর ১৮৮৭ সালে বিজ্ঞানাচার্জ জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে অবলা বসু বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯১০ সালে লেডি অবলা বসু ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের সম্পাদিকা হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি স্কুলটি পরিচালনা করেন। নতুন করে সাজিয়ে সেই স্কুলটিকে তিনি করে তুলেছিলেন আরও গতিশীল। একই সঙ্গে দিদি সরলা রায়ের পাশে দাঁড়িয়ে, গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলটি প্রতিষ্ঠার কাজে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তিনি নিজেকে যুক্ত করেন ।

লেডি অবলা বসু ১৯১৯ সালে ‘নারী শিক্ষা সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই সংগঠনের মাধ্যমে মুরলীধর মহাবিদ্যালয় এবং গ্রাম এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দু’শ’ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে এই সকল দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তার সম্বন্ধ শুধু মসির সঙ্গেই নয়, অসি ধরার দুঃসাহসিক কাজেও তিনি সিদ্ধহস্ত। তার সমসাময়িক কালে বিধবাদের দুর্বিষহ জীবন বড় ভাবিয়ে তুলেছিল মহীয়সী এই বঙ্গকন্যাকে। তাই শিক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি বিধবাদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘বিদ্যাসাগর বাণীভবন’ ‘মহিলা শিল্পভবন’ ও ‘ বাণীভবন ট্রেনিং স্কুল নামের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলেন তিনি। যেখানে বিধবাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলে, তার তৈরি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত বিধবাদের নিয়োগ দেয়া হতো। তাছাড়া ‘নারী শিক্ষা সমিতি’র মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও তিনি পরিচালনা করতেন। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, লেডি অবলা বসু স্বামীর মৃত্যুর পর, তার সঞ্চিত এক লাখ টাকা দিয়ে ‘অ্যাডালটস প্রাইমারি এডুকেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ভগিনী নিবেদিতার নাম।

তৎকালীন বাংলার নারী মুক্তি এবং নারী শিক্ষা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে অবলা বসু ছিলেন একটি পরিচিত দুরন্ত মুখ। অথচ আজ তিনি আমাদের সমাজে প্রায় অচেনা হিসেবেই পড়ে আছেন! সে সময়কার জনপ্রিয় ইংরেজী পত্রিকা ‘মডার্ন রিভিউ’-এ নারী শিক্ষা এবং নারী স্বাধীনতার ওপর তার বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। বিভিন্ন বাংলা সাময়িক পত্রিকায় বেরিয়েছিল তার কিছু প্রবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনী। অবলা বসুর বিভিন্ন সময়ে লেখা কিছু প্রবন্ধ একটি সঙ্কলনেই পাওয়া যায়- শকুন্তলা শাস্ত্রি প্রকাশিত ‘বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র ও লেডি বসুর প্রবন্ধাবলী’ নামে। ১৩০২ থেকে ১৩৩২ এই সময়কালের মধ্যে ‘মুকুল এবং প্রবাসী পত্রিকায় নিজের ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিখে তিনি দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন, নারী যদি মানুষ হওয়ার সংগ্রাম করে, তবে সে কত উঁচুতে উঠতে পারে এবং জীবনকেও দেখতে পারে কতভাবে। ঠিক এইখানটাতেই তিনি প্রকৃতই নারী সমাজের অগ্রদূত। বাংলা ১৩০২ অগ্রহায়ণ ও পৌষ সংখ্যার মুকুল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তার কাশ্মীর ভ্রমণ কাহিনী। এই কাহিনী লিখতে গিয়ে, শুরুতে অবলা শিশুদের উদ্দেশে লিখেছিলেন,‘ইংলন্ড প্রভৃতি সুসভ্য দেশের বালক বালিকাগণ বাল্যকাল হইতেই ভ্রমণ বৃত্তান্ত পড়িতে ভালবাসে, তাহার সুফল হয় এই যে, বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া তাহারা নূতন দেশ আবিষ্কারের জন্য প্রাণ পর্যন্ত ত্যাগ করিতে প্রস্তুত হয়। …. আমাদের এই ভ্রমণ বৃত্তান্ত পাঠ করিয়া এতটা না হইলেও আশা করি তোমাদের মধ্যে অনেকের মনে নানা স্থান ভ্রমণ করিয়া প্রকৃতির শোভা দেখিবার আগ্রহ জন্মিবে।’

এখান থেকে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, অবলার চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাস করত আমাদের শিশুরা। কিভাবে শিশুদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তা ছিল অবলার জীবনের ধ্যানজ্ঞান। ভ্রমণকেও জীবন গড়ে তোলার উপায় হিসেবে দেখতে পাওয়া, অবলার এই বিচক্ষণতার পরিচয়, তাকে চিনতে আমাদের সাহায্য করে। ভ্রমণ, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল তার জীবনের কর্মশক্তির অন্যতম উৎস।

পৃথিবীর দেশে দেশে ঘুরেছেন অবলা। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু যখন তার বিজ্ঞানের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য ছুটছেন বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে। প্রায় সব জায়গাতেই তার সঙ্গী ছিলেন অবলা এবং অবলার এই ভ্রমণ যে শুধুই স্বামীসঙ্গ ছিল না, তিনি জীবনভর তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন তার প্রতিটি পদক্ষেপে। তার ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, তিনি ১৯৩২ সালের প্রবাসীতে লিখিত আকারে প্রকাশ করেছিলেন ‘বাঙ্গালী মহিলার পৃথিবী ভ্রমণ’ নামে। তার এই লেখায় তাদের ইউরোপ ভ্রমণের কারণ এবং বিজ্ঞানী সমাজে তাদের গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘বহুদেশ ভ্রমণে দেশ সেবার নানা উপাদান সংগ্রহ করিতে পারিয়াছি। সে কথা বলিতে গেলে ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ হইতে আরম্ভ করিতে হয়। সেই বৎসর আচার্য বসু মহাশয় অদৃশ্য আলোক সম্বন্ধে তাহার নূতন আবিষ্ক্রিয়া বৈজ্ঞানিক সমাজে প্রদর্শন করিবার জন্য ব্রিটিশ এসোসিয়েশনে আহূত হন। তাহার সহিত আমিও যাই। এই আমার প্রথম ইউরোপ যাত্রা। ইহার পর ৫/৬ বার তাহার সহিত পৃথিবীব্যাপী ভ্রমণে বাহির হইয়াছি। আমার ভ্রমণকালের মধ্যে পৃথিবীর ইতিহাস নানাভাবে ভাঙ্গিয়াছে ও গড়িয়াছে, এক আমার বয়সেই ইউরোপে কত কত পরিবর্তন দেখিলাম।

ভারতীয় বিজ্ঞানের আধুনিক ধারাকে, অক্লান্ত পরিশ্রমে পশ্চিমি দুনিয়ায় পরিচিত করে তুলেছিলেন বাঙালী বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। এই উপলক্ষেই তাদের ইউরোপ ভ্রমণ এবং অবশ্যই এই ভ্রমণ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা তবে এই ভ্রমণ আজও চেতনার গভীর থেকে আমরা দেখতে পেরেছি বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। অবলা বসুর বয়ানে সেই দুঃখবোধ ফুটে ওঠার চিহ্ন আমরা দেখতে পাই। ‘এতকাল তো ভারতবাসী বিজ্ঞানে অক্ষম এই অপবাদ বহুকণ্ঠে বিঘোষিত হইয়াছে, আজ বাঙ্গালী এই প্রথম বিজ্ঞান সমরে বিশ্বের সম্মুখে যুঝিতে দণ্ডায়মান। ফল কী হইবে ভাবিয়া আশংকায় আমার হৃদয় কাঁপিতেছিল, হাত-পা ঠাণ্ডা হইয়া আসিতেছিল। তারপর যে কী হইল সে সম্বন্ধে আমার মনে স্পষ্ট কোন ছবি আজ আর নাই। তবে ঘন ঘন করতালি শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম যে,পরাভব স্বীকার করিতে হয় নাই। বরং জয়ই হইয়াছে।’ এই ভ্রমণের এই সময় কালেই কলকাতায় ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা তাদের মনে ঠাঁই করে নিয়েছিল।

বিদেশের কথা লিখতে গিয়ে প্রকৃতির নানা বর্ণনার পাশাপাশি ঘুরে ফিরে ছোটদের কথাই লিখেছেন অবলা। ‘ইতালির লুপ্তনগরী।’ তার সেরা বিদেশ ভ্রমণ কাহিনী।

জগদীশচন্দ্র এবং অবলার একমাত্র সন্তান জন্মের পরেই মারা যায়। পরবর্তী জীবনে আর কোন সন্তান তাদের জীবনে আসেনি। সমাজের হাজারো শিশুদের মধ্যে অবলা খুঁজে নিয়েছিলেন সন্তানের অপূর্ণতা। আমরা যে নৈর্ব্যক্তিক মাতৃত্ব-পিতৃত্বের কথা বইয়ে পড়েছি, সেই নৈর্ব্যক্তিক পিতৃত্ব-মাতৃত্বের মহান সৌন্দর্য ধরা দিয়েছিল বসু দম্পতির উচ্চতর মানবিক জীবনে।

ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর, পম্পেই নগরী অবলা বসুর মনে বলতে গেলে ঝড় তুলেছিল। একবার-সারাদিন সেই মৃত নগরী ঘুরে, সন্ধ্যায় শেষ বারের মতো শহরটার দিকে তাকিয়ে তার কল্পনায় ভেসে উঠলো ‘একটি গৃহ ক্রমে ক্রমে ভস্মে ঢাকিয়া যাইতেছিল। সেই গৃহে একটি নারী দু’হাতে তার শিশুটিকে উচ্চে ধরিয়া রহিয়াছিল। ভস্মস্তূপ ক্রমে ক্রমে উচ্চ হইয়া দুঃখিনী মাতাকে নিমজ্জিত করিতেছিল। কিন্তু সেই অগ্নির প্রসার হইতে শিশুকে রক্ষা করিতে হইবে। জ্বলন্ত ভস্মস্তূপ তিল তিল করিয়া দগ্ধ করিয়াও জননীকে একেবারে অবসন্ন করিতে পারে নাই। কী যেন এক মহাশক্তি, দুঃসহ যন্ত্রণা দমন করিয়া রাখিয়াছিল! মাতার হস্ত দুইটি মৃত্যু যন্ত্রণাতেও অবশ হইয়া পড়ে নাই। দুই সহস্র বৎসর পরে সেই ঊর্ধ্বত্থিত করপুটে সন্তানটি পাওয়া গিয়াছে। সেই মাতার স্নেহস্পর্শে যেন অতীত বর্তমানের সহিত মিলিয়া গেলো। একই দুঃখে, একই স্নেহে, একই মমতায় সেকাল ও একাল, পূর্ব ও পশ্চিম যেন বান্ধা পড়িলো! তখন পম্পেইর মৃত রাজ্য সঞ্জীবিত হইয়া উঠিলো এবং রাজপথ আমার চক্ষে অকস্মাৎ লোকজন পূর্ণ হইলো!

অবলা বসুর সৃষ্টিশীল জীবন আমাদের চেতনায় এই বলে প্রতিধ্বনি তোলে, ‘শ্রীমতী অবলা বসু হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃতই বাংলার পরমাত্মীয়। একাধারে আমরা তাকে পেয়েছি নারী সমাজের যুধ্যমান পথিকৃৎ হিসেবে। অন্যদিকে তিনি ছিলেন শিশু জীবনের কাণ্ডারি। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, বাঙ্গালী বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে তিনি ক্লান্তিহীন ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর পথে পথে। আবার আমরা দেখি কি পরম মমতায় তার জীবনের পরতে পরতে মিশে ছিলো আমাদের সন্তানেরা। এ কথা না বললেই নয়, বাংলার নারী সমাজের বেদনা দূর করতে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রকৃত সৈনিকরূপেই। আজ এই ঘোর অন্ধকারে, আমাদের অবলা বসুর দিকে ফিরে তাকাতেই হবে। যে দেশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, লেডি অবলা বসু, মহীয়সী বেগম রোকেয়ার আবির্ভাব ঘটে, সেই দেশের নারী বা শিশুদের জীবনে অন্ধকার কিছুতেই স্থায়ীরূপ পেতে পারে না। আমাদের নারী এবং শিশুসমাজের জীবন, মানবিক অধিকারে উন্নীত করার লড়াইয়ে, শক্তিমান অবলা বসু আজ হয়ে উঠুন আমাদের আঁধারের আলো।