আর্কাইভ

Archive for the ‘সাহিত্য’ Category

বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রণযন্ত্র ও সংবাদপত্র

first bd printing pressজোবায়ের আলী জুয়েল : বাংলাদেশে প্রথম কোথায় মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল নির্দিষ্টভাবে তা’ জানা যায়নি। তবে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে বলতে পারি, বাংলাদেশে প্রথম মুদ্রণ যন্ত্রটি স্থাপিত হয়েছিল, ঢাকা থেকে বেশ দূরে আমাদের রংপুরে। এখানে উল্লেখ্য যে, পূর্ববঙ্গের প্রথম দুটি বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা থেকে নয়, রংপুর থেকে। স্বাভাবিকভাবে হওয়ার কথা ছিল “ঢাকা” থেকে। কারণ বাংলার দ্বিতীয় শহর ছিল তখন ঢাকা (কলকাতার পরেই)। এর সমাজতাত্ত্বিক কারণ কি বলতে পারবো না। শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, পত্রিকা দু’টির উদ্যোক্তা ছিলেন অর্থশালী জমিদার এবং তাঁর ছিলেন বিদ্যোৎসাহী। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দু’টি পত্রিকাই সৌখিন কোনো কারণে প্রকাশিত হয় নাই। সংবাদপত্র প্রকাশ ও প্রচারের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তাঁরা মুদ্রণ যন্ত্র ক্রয় করেছিলেন। না হলে দীর্ঘ দিন পত্রিকা দু’টি টিকে থাকতো না। পূর্ববঙ্গের একমাত্র পত্রিকা হিসেবে প্রথমে “রঙ্গপুর বার্তাবহ” এবং তারপর “রঙ্গুপুর দিক প্রকাশ”-কে অন্যান্যরাও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। কলকাতার তৎকালীন প্রধান প্রধান কাগজগুলিতে উদ্ধৃতি করা হতো এ দুটি পত্রিকার সংবাদ।

১৮৪৭ সালের আগস্ট (ভাদ্র ১২৫৪) মাসে রংপুর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল “রঙ্গপুর বার্তাবহ”। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, রংপুর কুন্ডি পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকাটি। তবে অন্যান্য সূত্র থেকে অনুমান করে নিতে পারি যে, কালীচন্দ্র রায় প্রাথমিকভাবে সাহায্য করলেও পত্রিকাটির মালিক ছিলেন এর সম্পাদক গুরুচরণ রায়। ১০ বছর একটানা ব্যবহৃত হয়েছিল মুদ্রণ যন্ত্রটি। তারপর মুদ্রণ যন্ত্রটির ভাগ্যে কি ঘটেছিল জানা যায়নি। অনেকের অনুমান, রংপুরের কাকীনার ভূগোলক বাটির জমিদার শম্ভুচরণ রায় চৌধুরী এটি কিনেছিলেন। কারণ, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রকাশ করেছিলৈন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বাংলা সংবাদপত্র “রঙ্গপুর দিক প্রকাশ” (১৮৬০ খ্রি:)। পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য নতুন মুদ্রণ যন্ত্র হয়তো তিনি আর আমদানী করেননি। নিজ অঞ্চলের মুদ্রণ যন্ত্রটিই কিনে নিয়েছিলেন। “রঙ্গপুর দিক প্রকাশ (১৮৬০ খ্রি:)” এর সম্পাদক ছিলেন মধুসূদন ভট্টাচার্য।

এখন পর্যন্ত যেসব প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণাদি পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে বলতে পারি, ১৮৫৭ সালের আগে পূর্ববঙ্গে ৩টি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায়, একটি রংপুরে যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। বাকী দুটি ঢাকায়। ঢাকার একটি মুদ্রণ যন্ত্র ছিল মিশনারীদের, অন্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। পূর্ব বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাট বা সত্তর দশকে মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হতে থাকে। এ মুদ্রণ যন্ত্রগুলির কেনো ধারাবাহিক ইতিহাস-কোথাও দেখা হয় নাই। সরকারি রিপোর্ট বা গেজেটিয়ারে মাঝে মাঝে দু’একটি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায় মাত্র। ঢাকায় সরাসরি মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৬ সালে।

১৮৫৭ খ্রিন্টাব্দে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল দুটি মুদ্রণ যন্ত্র। কিন্তু ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের একমাত্র রংপুর ছাড়া আর কোথাও মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংবাদ জানা যায় না।

“রঙ্গপুর বার্তাবহ যন্ত্র” চালু হওয়ার সামান্য পরে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল ছাপাখানা। সেটি ছিল ঢাকার প্রথম ছাপাখানাগুলোর অন্যতম। এটি এখন ঢাকা নগর যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কালো রঙ্গের এই প্রাচীন মুদ্রণ যন্ত্রটিতে আভিজাত্য ও প্রাচীনত্ব দুই-ই যেনো মিশে রয়েছে।

১৯ শতকের প্রথম দু’তিন দশকে বাংলাদেশে আরও কয়েকটি মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮২৫ সালের ২২ জানুয়ারি “সমাচার দর্পণ” পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায় যে তখন দেশিয় লোকের পরিচালনাধীন ১১টি ছাপাখানার উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঢাকার প্রথম মুদ্রণযন্ত্র “বাঙ্গলাযন্ত্র” স্থাপিত ১৮৬০ সালে (১৩২৫ বাংলাসনে “ঢাকা প্রকাশ” পত্রিকায় প্রকাশিত)। ১২৬৭ বাংলা সনে ঢাকার সাহিত্য শীর্ষক এক প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে, বাঙ্গলা যন্ত্রের (১৮৬০ খ্রি:) স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র, দীনবন্ধু মৌলিক, ভগবান চন্দ্র বসু (আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর পিতা) ও কাশী কান্ত চট্টোপাধ্যায়।

বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সর্বপ্রথম সাময়িক পত্র হলো মনোরঞ্জিকা (১৮৬০ খ্রি:) এই মাসিক সাময়িক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৪-১৯০৭ খ্রি:)। কবিতা কুসুমাবলী এবং নীলদর্পন ছাপা হয়েছিল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বাবু বাজারে স্থাপিত এই “বাঙ্গলা যন্ত্র” নামক ছাপাখানা থেকে।

first bd printing machine & newspapersপরবর্তীতে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে এর মধ্যে ঢাকায় আরো ৬টি মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল। পূর্ববঙ্গে সে সংখ্যা ছিল ৪টি রংপুর (১৮৪৭ খ্রি:), রাজশাহী (১৮৬৮ খ্রি:), যশোর (১৮৬৮ খ্রি:), গীরিশযন্ত্র (১৮৬৮ খ্রি:) রাজশাহী। সিপাহী বিদ্রোহের সময় লর্ড ক্যানিং মুদ্রাযন্ত্র বিষয়ক আইন প্রণয়ন করলে রঙ্গপুর বার্তাবহ প্রচার রহিত হয়।

“রঙ্গপুর বার্তাবহ” এর সম্পাদক আদালতে এসে জানিয়েছিলেন তিনি আর পত্রিকা প্রকাশ করবেন না। রঙ্গপুর বার্তাবহ এর মুদ্রণ যন্ত্র থেকে সম্ভবত: ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হতে থাকে “রঙ্গুপুর দিক প্রকাশ” ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে সরকারী সূত্র অনুযায়ী জানা যায় ঐ জেলায় মাত্র একটি মুদ্রণ যন্ত্র আছে। সেখানে থেকে প্রকাশিত হয় রঙ্গপুর দিক প্রকাশ (১৮৬০ খ্রি:)

১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে “রঙ্গপুর” দিক প্রকাশের প্রচার সংখ্যা ছিল ২০০-এর মতো (উইলিয়াম হান্টারের গ্রন্থ থেকে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের স্ট্যাটিক্যাল আকাউন্স অব বেঙ্গল এর ৭ম খন্ডে রংপুর তথ্য)।

বৃহত্তর রংপুরে অবশ্য আরো ৪টি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাই। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত বই থেকে জানা যায়, ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম দিকে ৪/৫ মাইল দূরে হরিদেবপুরে ছিল “লোক রঞ্জন শাখা যন্ত্র”। বড়াই বাড়ি থেকে প্রকাশিত বইয়ে মুদ্রাকরের নাম পাওয়া গেছে, কিন্তু মুদ্রণ যন্ত্রের উল্লেখ নাই (সরকারি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী)। কুড়িগ্রামে ছিল বিভাকর যন্ত্র (১৮৯৪ খ্রি:) এবং মাহিগঞ্জ পদ্মাবর্তী যন্ত্র (১৮৯৪ খ্রি:)। তবে অনুমান করে নিতে পারি “লোক রঞ্জন” যন্ত্র আশির দশকে, বাকী ৩টি নব্বই দশকে এবং শেষোক্তটি নব্বই দশকের শেষে স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রংপুরে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থাপিত মুদ্রণ যন্ত্রের সংখ্যা ৬টি। নবাবগঞ্জেও একটি মুদ্রণযন্ত্রের নাম পাই “সরস্বতী যন্ত্র” (১৯০০ খ্রি.)।

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে এন্ডুজের ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয় ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের “এ গ্রামার অবদি বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ”। বাংলা প্রদেশে বাংলা অক্ষরে (ইংরেজি অক্ষরেও) ছাপা প্রথম বই হলো এটি। মুদ্রাকর ছিলেন ইংরেজ চালর্স ইউলিকন্স। বাংলা হরফ তৈরী করেছিলেন তিনি পঞ্চান্ন কর্মকারের সহায়তায়। এভাবেই হ্যালহেড, উইলকিনস্ আর পঞ্চান্ন কর্মকার বাংলা সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছেন।

১৭৮০ খৃস্টাব্দে জেমস্ আগাস্টাক হিকি বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র “বেঙ্গল গেজেট” ছেপেছিলেন।

বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে দেখা যায় “দিগদর্শনই” বাংলায় প্রকাশিত সর্বপ্রথম মাসিক পত্রিকা। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল এটি যশুয়া মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। “দিগদর্শনই” হলো ছাপার অক্ষরে প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র। এটি কেরীর শ্রী রামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে “দিগদর্শন” এক যুগান্তকারী ঘটনা। উইলিয়াম কেরী, জন ক্লাব মার্শম্যান, ফেলিকস্কেরী, জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, তারিণী চরণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তির আন্তরিক প্রচেষ্টায় “দিকদর্শন”… জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছায়।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের নাম ঢাকা নিউজ। ১৮৫৬ সালের ১৮ এপ্রিল এটি প্রকাশিত হয়। এই ইংরেজি সাপ্তাহিকটি বের হতো ঢাকা প্রেস থেকে। ঢাকায় প্রথম বাংলা সংবাদপত্র হলো “ঢাকা প্রকাশ”। ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার এটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১০০ বছর ধরে এই পত্রিকটি বেঁচে ছিল। এমন দীর্ঘায়ু পত্রিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত: দ্বিতীয়টি আর নেই। ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদার। পরবর্তীতে দীননাথ সেন, জগন্নাথ অগ্নিহোত্রী, গোবিন্দ্র প্রসাদ রায় এরাও এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

মুসলমান সম্পাদিত অবিভক্ত বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র হচ্ছে শেখ আলীমূল্লাহ সম্পাদিত “সমাচার সভারাজ্যেন্দ্র”। এটি ১৮৩১ সালের ৭ মার্চ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। “সমাচার সভারাজ্যেন্দ্র” ফারসী ও বাংলা ভাষাতেই প্রকাশিত হতো। এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো ১৫৭ নং কলিঙ্গায়। আর্থিক দৈন্যতার কারণে ১৮৩৫ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

মুসলমান সম্পাদিত বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র হচ্ছে “পারিল বার্তাবহ”। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন আনিছ উদ্দিন আহমদ । ১৮৭৪ সালে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের পারিল গ্রাম থেকে এই পাক্ষিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

পুরোপুরি দৈনিকের নিয়ে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা ছিল “দৈনিক আজাদ”। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর। প্রকাশক ছিলেন মাওলানা আকরাম খাঁ।

বাংলাদেশের এখন যতগুলো দৈনিক পত্রিকা রয়েছে তন্মদ্ধে সবচেয়ে পুরনো পত্রিকা হচ্ছে “দৈনিক সংবাদ” ও “দৈনিক ইত্তেফাক”। দৈনিক সংবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের ১৫ মে। ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী “ইত্তেফাক” বের করেন। তখন এটি ছিল সাপ্তাহিক। “ইত্তেফাক” দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর।

বাঙালীর জাতীয় জীবন ও বিকাশ ধারার ইতিহাসে ছাপাখানা ও সংবাদপত্র হচ্ছে প্রাণ শক্তির উৎসধারা। বাংলা ভাষা ও সংবাদপত্রের ইতিহাসে যে কয়েকজন বৈদেশিক মহান পুরুষ বাঙালী সমাজে প্রাত:স্মরণীয় ও পরম শ্রদ্ধেয় তাঁদের মধ্যে এক মহান পুরুষের নাম পাদরী উইলিয়াম কেরী, তারপরের জনই হলেন যশুয়া মার্সম্যান।

Advertisements

বাংলা অত্যন্ত সুন্দর ও সুমধুর ভাষা

hannah ruth thompsonশেখ মেহেদী হাসান : আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাবিজ্ঞানী ড. হানা রুথ টমসন লন্ডন ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ও আফ্রিকান স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করছেন।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ বিষয়ে তার একাধিক গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা তার বাংলা ব্যাকরণ চমকিত করেছে গবেষকদের। বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য কিছু বইয়ের অনুবাদও করেছেন। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত আছেন।

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা জার্মানিতে। পড়াশোনার একটি পর্ব সেখানেই শেষ করেছেন?

আমার জন্ম হয়েছে জার্মানিতে। সেখানেই আমার বেড়ে ওঠা। জার্মানির সর্বোক ইউনিভার্সিটি থেকে ভাষাতত্ত্বে মাস্টার্স করেছি। তখন আমি ইংরেজি এবং জার্মান ভাষা নিয়ে গবেষণা করছিলাম। ভাষা নিয়ে গবেষণা করতে আমার খুব ভালো লাগে। তারপর ইংরেজি মানুষ কিথ টমসনকে বিয়ে করেছি। বিয়ের পর আমাদের তিনটি সন্তান হয়। ওদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। ১৯৯১ সালে আমার স্বামীর চাকরি হলো বাংলাদেশে ইংল্যান্ডভিত্তিক একটি উন্নয়ন প্রকল্পে। আমরা বাংলাদেশে চলে আসলাম। এখানে এসে বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে গেলাম। কি সুন্দর লাগছিল এই দেশ। এই দেশের মানুষ। বাঙালিদের মুখে অত্যন্ত সুন্দর ও সুমধুর বাংলা ভাষা শুনে সিদ্ধান্ত নেই আমি বাঙালিদের মতো বাংলা ভাষা শিখব।

বাংলা ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহী হলেন কীভাবে?

আমি প্রথম বাংলা শিখতে শুরু করি ১৯৯১ সালে। এর আগে বাংলা ভাষা সম্পর্কে কোনো ধারণা আমার ছিল না। আবার আমি যে বাংলা ভাষা শিখব, তা নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। তবে তখনো আমি আশা করিনি যে এই ভাষাটি আমার এত ভালো লেগে যাবে। বাংলা ভাষার যে সব শব্দ আমার আকর্ষণ করেছিল তার মধ্যে ‘প্রজাপতি’,‘বৃহস্পতিবার’,‘সাধারণত’,‘দুর্ভাগ্যবশত’ ইত্যাদি। এর সাউন্ডগুলো কি সুন্দর! আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, বাংলা অনেক সুন্দর ও জীবন্ত একটি ভাষা। আমরা তখন গুলশান এক নম্বরে থাকতাম। সন্তানদের লালন পালন ছাড়া আমার কোনো কাজ ছিল না। ফার্মগেটের গ্রিন রোডে অবস্থিত একটি ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টারে আমি বাংলা শিখতে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রতিদিন চার ঘণ্টা বাংলা শিখতাম। কিন্তু তাদের নিয়ম আমার ভালো লাগেনি। কারণ ক্লাস রুম খুব ছোট ছিল। আমার সঙ্গে বুড়া দুজন মানুষ ছিল। তারা কখনো কোনো বিদেশি ভাষা শেখেনি। অন্যদিকে আমি ছিলাম ভাষা বিশেষজ্ঞ। তাদের সঙ্গে ভাষা শিখতে আমার একটু অসুবিধা হচ্ছিল। আর শিক্ষাটা চলছিল খুব আস্তে আস্তে। দ্বিতীয় মাস থেকে ক্লাসের চার ঘণ্টার মধ্যে আমি দুই ঘণ্টা ক্লাসে আর বাকি দুই ঘণ্টা অন্য একজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাদাভাবে বসে কথা বলি। এভাবে মোটামুটি দ্রুতই বাংলা ভাষা শিখে যাই। বাংলা শেখা ও জানার মতো উপযুক্ত কোনো বই ছিল না। আমার আগ্রহ ছিল বাংলা ভাষার ভিতরকার সৌন্দর্যগুলো জানা। তখন রাস্তায়, দোকানে,স্টেশনে, বাজারে—বিচিত্র জায়গায় সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাংলা শিখেছি অনেক বেশি।

বাংলা অভিধান ও ব্যাকরণ বিষয়ে বই লেখার তাগিদ আপনার মধ্যে তৈরি হলো কী করে?

আমার ভাবনা ছিল বাংলা ভাষা শিখে একটা চাকরি ধরব। বাংলাদেশে আসার ছয় মাস পর এখানে বান্ধবী রুথের সঙ্গে আমি কাজ করতে চেয়েছিলাম। তখন সে আমাকে বলল,‘তুমি আমার সঙ্গে কাজ করবে না। তুমি বরং একটা বাংলা অভিধান লিখে দাও। তুমি যত তাড়াতাড়ি বাংলা শিখেছ, তেমনভাবে আমরা কেউ পারিনি। আমাদের জন্য তুমি একটা অভিধান লেখো। একটা ব্যবহারিক বাংলা ভাষার অভিধান আমাদের খুব দরকার।’ এটা আমার জীবনে খুব অদ্ভুত একটা ব্যাপার ছিল। তখন আমি এতটা বাংলা শিখিনি যে একটি বই লিখব? রুথের কথাটা ভেবে আস্তে আস্তে মনে হলো, আসলেই কাজটা আমি করতে পারি। কারণ নিজের জন্য আমি শেখার কিছু নিয়ম বানিয়েছিলাম। বাংলা ভোকবলারির বই ছিল। বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ইত্যাদি আলাদা করে লিখে রেখেছিলাম। মনে হলো, আমার নোটগুলো অন্যদের জন্য উপকার হবে।

তারপর বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে প্রথম গবেষণা গ্রন্থ রচনা করলেন?

hannah ruth thompson book coversরুথের কথায় আমি বাংলা ব্যাকরণ রচনায় আগ্রহী হলাম। বিষয়টি অন্যদের জানালে তারা পরামর্শ দিল রবীন্দ্রনাথ পড়তে হবে। অথচ আমি উচ্চমানের কোনো সাহিত্য করতে চাইনি, চেয়েছিলাম সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকরণ। পরে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার প্রধান লেখকদের বই পড়েছি। বুদ্ধদেব বসুর ‘মনের মতো মেয়ে’ উপন্যাস জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছি। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে হয়। কারণ বাচ্চাদের পড়াশোনার সমস্যা হচ্ছিল। তারপর ইংল্যান্ডে বসে বাংলা ব্যাকরণ বইটি লিখি। ১৯৯৯ সালে আমার প্রথম বই ‘এসেনশিয়াল এভরিডে বেঙ্গলি’ প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে। বাংলা একাডেমির তত্কালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক মনসুর মুসা আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। যতটা জানি, আমিই ছিলাম তাদের প্রথম বিদেশি লেখক। বইটা এখন একটু পুরনো হয়ে গেছে, তবে এখনো অনেকের কাজে লাগে। বইটি লিখতে গিয়ে আমি টের পেলাম, বাংলা ভাষা নিয়ে আরও বহু কাজের অবকাশ আছে আর আমি সেটি করতে চাই। মানে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে গবেষণা করতে চাই।

আপনি বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে উচ্চতর একাডেমিক গবেষণা করেছেন। সে বিষয়ে জানতে চাই।

বাংলা একাডেমি থেকে বইটি প্রকাশের পর আমি বাংলা ব্যাকরণের বই পড়তে শুরু করি। কিন্তু কোনো বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের মধ্যেই আমার অজস্র প্রশ্নের উত্তর মিলছিল না। আমি যা জানতে চাই, তা নিয়ে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে বুঝে নিতে হচ্ছিল। তখন লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান অধ্যাপক ড. উইলিয়াম রাদিচির সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি বললেন, তুমি আমার অধীনে পিএইচডি ভর্তি হয়ে যাও। ১৯৯৯ সালে ‘সিলেক্টিভ বাংলা গ্রামেটিক্যাল স্টাকচার’ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করি। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করব। আমার মাথায় বাংলা ভাষা ছাড়া আর কিছু ছিল না। চার বছর পর পিএইচডি ডিগ্রি হলো।

লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে শিক্ষকতা শুরু করলেন কখন?

পিএইচডি গবেষণার মাঝে আমি সোয়াসে বাংলা ভাষা শেখাতাম। ২০০২ সাল থেকে লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের নিয়মিত অধ্যাপক হিসেবে কাজ করি। দশ বছর শিক্ষকতার পর কাজটি ছেড়ে দেই। তারপর আমার স্বামীর সঙ্গে ২০১২ সালে সিয়ারালিওনে চলে যাই। ওদের ভাষা নিয়েও একটি গবেষণা করি। সেখানে বাঙালিদের নিয়ে বাংলা আড্ডার ব্যবস্থা করেছিলাম। আমরা সপ্তাহে একদিন বাঙালিদের নিয়ে বসতাম, বাংলা ভাষায় কথা বলতাম। পশ্চিম আফ্রিকার দেশে বসেও আমি বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেছি।

বিভিন্ন দেশের গবেষকরা যেখানে বাংলা ভাষা, প্রাচীন ও বাচনিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন আপনি ব্যাকরণ ও অভিধান বেছে নিলেন কেন?

বিদেশি অনেকেই বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন। অন্য কোনো ভাষার ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করার জন্য একটা বিশেষ রকমের সাহস দরকার। তা ছাড়া সাহিত্য আমার কাছে একটা সাগরের মতো। সাহিত্য নিয়ে সারা জীবন আলোচনা করা সম্ভব। এই সাগরের মধ্যে আমরা ডুবে যাই। পায়ের তলায় কোনো মাটি পাই না। ভাষা আর ব্যাকরণ নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, নতুন কিছু ধরতে পারি, আমি যা বুঝতে পেরেছি, তা অন্যদের কাছে বুঝিয়ে বলতে পারি। আমার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, আমার বিদেশি ছাত্রদের জন্য কার্যকরী একটা বই লেখা, যাতে তারা ভালোভাবে বাংলা ভাষাটা শিখতে পারে। বাংলা শিখতে চাইলে যে পদ্ধতি বা নিয়মের প্রয়োজন হয়, তা আমি কোথাও খুঁজে পাইনি। তাই নিজের বিবেচনায় আমি প্রচুর উদাহরণ সংগ্রহ করেছি, ভাষা বিশ্লেষণ করেছি, আর কাজটাকে আপন করে নিয়েছি। এটাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।

বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান রচনার সময় আপনি কী কী সমস্যার মুখে পড়েছিলেন?

সমস্যার। যেমন ধরা যাক, ‘নয়’ আর ‘নেই’-এর পার্থক্য কী? কেন আমরা বলি, ‘আমি চিঠিগুলো পাচ্ছি’, আবার একই সঙ্গে বলি, ‘আমার ভয় পাচ্ছে’? কেন বলি, ‘এই কাজ করা দরকার’, কিন্তু ‘এই কাজ করার দরকার নেই’? আমি জানি, প্রতিটি ভাষা আর তার ব্যাকরণের মধ্যে একটা যুক্তি আছে। বাংলা ভাষার মধ্যে সেই যুক্তিটা আমি বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে চেষ্টা, ধৈর্য আর অনেক সময় লাগে। নিজের ধারণাগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে সংশোধন করতে হয়; ঠিক করতে হয় নিজের ভুলগুলো। এভাবে ব্যাকরণের বেলায় যা অস্পষ্ট ছিল, আস্তে আস্তে সেটি স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সব সময় অবশ্যই সহজে উত্তর পাওয়া যায় না। তখন প্রশ্নগুলোকে ঘিরে একটা উপায় বানাতে হয়। সেসব বিশ্লেষণ করতে আমার খুব মজা লাগে।

আপনার নিজের লেখা বাংলা ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব কী?

আমার একটা সুবিধা এই যে আমি বাইরে থেকে এসেছি। ফলে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার ইতিহাস কিংবা সাধু ভাষা—এসব নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে হয়নি। আধুনিক ভাষার মধ্যে কী আছে, আধুনিক বাংলা ভাষার গঠনটা কেমন—আমি শুধু সেটাই বুঝতে চেষ্টা করছি। আর যাঁরা বাংলা শিখতে চান, তাঁদের জন্য আমি একটা উপায় ঠিক করতে চেয়েছি। বাংলা ভাষাটা তো আমি নিজেই শিখেছি। ফলে বাংলা ভাষা শিখতে গেলে কী কী সমস্যা হয়, কী কী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—তা আমি জানি। এই প্রেক্ষাপটটিই হয়তো আমার লেখা বাংলা ব্যাকরণের একটা বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের ব্যাকরণ চর্চা নিয়ে আপনার অভিমত কী?

বাংলাদেশে ব্যাকরণ বইয়ে উদাহরণগুলো অনেক বছর পুরনো। বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের চিন্তাগুলো কেমন একটা ফানুসের ভিতরে আটকে আছে। তাদের গবেষণা ঐতিহাসিক। তারা বাংলা ভাষা বুঝানোর জন্য সংস্কৃত থেকে উদাহরণ দেন। আমি মনে করি, স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের মাথায় সংস্কৃত থাকে না। ভাষা তো জীবিত একটা জিনিস। ভাষার ভিতরে পরিবর্তন হতে থাকে। সেই পরিবর্তন থেকে ব্যাকরণের বর্ণনা ও বিশ্লেষণে নতুন বিবেচনা নিয়ে আসতে হয়। নইলে জীবিত ভাষা ও ব্যাকরণের মধ্যে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ে। এখানে স্কুলের ব্যাকরণ বইয়ে সাধারণত দুটো অংশ দেখেছি ব্যাকরণ আর রচনা। রচনা অংশগুলোতে প্রতি বছর নতুন বিষয় ঢুকে পড়ে। কিন্তু ব্যাকরণ অংশে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই নতুন উপায় বের করতে হবে। বাচ্চাদের মুখের ভাষা নিয়ে ব্যাকরণ আরম্ভ করতে হবে। তা হলে বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে।

বর্তমানে কোনো গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকারের সঙ্গে একটি যৌথ গবেষণা করছি। বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা রাউটলেজ প্রকাশিত একটি বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের কাজ করছি।

রসালোচনাঃ বাংলা কিছু বাগধারায় লিঙ্গবৈষম্য

proverbs not right

বিখ্যাত লেখকদের অদ্ভূত পেশা…

weird habits 1aweird habits 1bweird habits 1c

নজরুল সাহিত্যে মহররম – শেখ দরবার আলম

এক

নজরুল সাহিত্যে মোহররম, এই বিষয়টার ওপর যদি লিখতে হয় তা হলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় যে, ইসলাম কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে ছিল একটা আশ্রয়। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিই মুসলিম জাতিসত্তা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। তামাম বিশ্বের মুসলিম সভ্যতা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। কোরআন এবং সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। মুসলিম উম্মার ঐক্য ও সংহতি ছিল তাঁর কাছে একটা অত্যন্ত কাক্সিক্ষত বিষয়। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আদর্শ মানুষ ছিলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সাম্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের আর্থ-সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় যে সব জায়গায় উল্লেখ করেছেন সেইসব জায়গায় তিনি যে মুসলমান ঘরের সন্তান, এই কথাটুকু বলে ক্ষান্ত হতে চাননি। তিনি বারংবার বলেছেন এবং লিখেছেন যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং নবীর উম্মত; কিন্তু তিনি কবি সবার। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার। এদিক দিয়েও বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভূমিকা অনন্য।

দুই

বাংলা সাহিত্যে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের বাংলাভাষীদের মধ্যে ইশ্বর গুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত বড় বড় কবি-সাহিত্যিকরা জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী, মনুসংহিতার সমাজের কবি-সাহিত্যিক হিসাবে লেখালেখি করেছেন এবং সেইভাবেই মূলত কাজ করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বোধ হয় অনুশীলন সমিতির সভ্য মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো এবং অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ লোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো বলতে চাইতেন যে তিনি নাস্তিক। এ কথা বললে যথার্থ অহিন্দুদের কাছে এবং নাস্তিকদের কাছে হয়তো গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদী, শিখ, এ রকম কোন ধর্মাবলম্বীর কেউ নাস্তিক হইলে তাতে ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বিশ্বের মজুলম মুসলমানদের কারো কোনো উপকার হয় না। তাঁরা নিজ নিজ ধর্ম নিষ্ঠার সাথে পালন করলে তাতে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ তাদের কোনো ধর্ম গ্রন্থেই মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে বা কল্পনা করে জাতীয়তাবাদী হয়ে মজলুম মুসলমানদের অধিকার বঞ্চিত করে সাম্প্রায়িক হওয়ার এবং এর চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে ফ্যাসিবাদী হওয়ার কোনো সংস্থান নেই।

তিন

এই বাস্তবতাটা, এই সত্যটা আমাদের সবারই স্মরণ রাখা উচিত যে,হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাংলাভাষীর বাংলা ভাষা অনেকাংশে এক হলেও তৌহীদবাদী মুসলমানদের বাংলা ভাষা এবং পোত্তলিক হিন্দুদের বাংলাভাষা সর্বাংশে এক নয়। অনুরূপভাবে তৌহীদবাদী মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং পৌত্তলিক হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতি, সাংস্কৃতি সহাবস্থানের দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা উচিত। আমি এইসব কথাগুলো অপরিহার্য প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই লিখছি। কেননা, এই কথাগুলো সবারই চিন্তা করে দেখা উচিত।

জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজ প্রধান স্বাধীন ভারতে মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর পঠন-পাঠনের সংস্থান সেখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। সে সুযোগ এই মুসলিমপ্রধান দেশেও এখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানোর ফলে খোদ পাকিস্তান আমল থেকেই এ রকম একটা অবস্থা সৃষ্টি হতে পেরেছে। এ দেশে যারা ইসলামী আন্দোলন করেন তাঁরাও এই বিষয়টির দিকে কখনো নজর দেননি।

চার

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের এক জাতিতত্ত¡ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তামাম ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলমান সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুসলিম সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা ও এই মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য-সঙ্গীত মুছে ফেলার অংশ হিসেবে এ ক্ষেত্রে নজরুল চর্চার পথও রুদ্ধ করার বন্দোবস্ত হয়েছে। কিন্তু নিজ নিজ সমাজের মানুষ হলেও হিন্দুর ভাষা এবং সাহিত্য হবে এরকম এবং মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য হবে অন্য রকম।

পাঁচ

অন্যতম রবীন্দ্র জীবনীকার প্রশান্ত কুমার পাল কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত রবিজীবনীতে লিখেছেন যে, আধুনিক বাঙালি বলতে যাদেরকে বোঝায় তারা এসেছেন বৈদিক ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। ঠিক অনুরূপভাবে আমরা যদি অষ্টম শতাব্দী থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিকে চোখ রাখি তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারবো যে, সাহিত্যিক ও সমাজসেবী সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো, সাহিত্যিক-সাংবাদিক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের মতো এবং মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো, মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের মতো, মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানরাও এসেছেন ভারতের বাইরের সাধারণত আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্য এশিয়া থেকে। এভাবে আমরা দেখছি যে, আধুনিক বাঙালি হিন্দুদের যেমন রয়েছে বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের হিন্দু জাতিসত্তার উত্তরাধিকার; অনুরূপভাবে ঠিক তেমনি আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানদেরও রয়েছে মুসলমান সমাজের ইতহিাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার উত্তরাধিকার।

ছয়

আরবী ভাষাভাষী এলাকা ইরাকের বাগদাদে থাকতে নজরুলের পূর্বপুরুষরা ছিলেন আরবভাষী। হিন্দুস্তানে অর্থাৎ ভারতে এসে তাঁর পূর্ব পুরুষরা এক সময়ে হয়েছিলেন ফার্সীভাষী। পরে উর্দুভাষী।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু পূর্ববর্তী সভাপতি এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদের পূর্বপুরুষরাও আরব থেকে এসেছিলেন। মওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবদ্দশায়ও তাঁদের পরিবারেরা, মওলানারা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন কেবল আরবী ভাষায়। মওলানা আবুল কালাম আজাদের পরিবারেরা পুরুষরা বাইরের মানুষজনদের সঙ্গে কথা বলতেন উর্দু ভাষায়।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাদের পরিবারে আরবি, ফার্সী এবং উর্দু ভাষার চর্চা ছিল। তাঁর আব্বা কাজী ফকীর আহমদ বাংলাভাষাও খুব ভালো মতো শিখেছিলেন। নজরুল তাঁর শৈশবে এবং বাল্যেই শিখেছিলেন আরবী, ফার্সী, উর্দু এবং বাংলা কাজী নজরুল ইসলামের যখন জন্ম হয় তখন তাদের পরিবারের লোকেরা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন উর্দু ভাষায়।

সাত

১৭৫৭-র ২৩ জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের আগে কথ্য বাংলা এবং দলিল দস্তাবেজ এবং চিঠিপত্রের বাংলা ছিল আরবি-ফার্সী শব্দবহুল বাংলা। তখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষরাও পরিবারিক পর্যায়েও ফার্সী ভাষা চর্চা করতেন। রাজভাষা হিসেবেও ব্যবহারিক জীবনে ফার্সী ভাষার চর্চা তো করতেনই।

পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের বেয়াল্লিশ বছর সাত মাস পর ক্রসেডের চেতনাসম্পন্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী খ্রিস্টান সমাজের পাদ্রী উইলিয়াম, কেরির নেতৃত্বে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশনে সংস্কৃতের পন্ডিত রামরাম বসুর তালিমে আরবী-ফার্সি শব্দ বর্জিত এবং সংস্কৃত শব্দ বহুল খ্রিস্টান ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সাবেক পাদুকা নির্মাতা পাদ্রী উইলিয়াম কেরী এর এক বছর দু’মাস পর ১৮০১-এর মে মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়ে অধীনস্ত সংস্কৃততজ্ঞ পন্ডিতদের সহযোগিতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলাভাষা শেখানোর জন্য আরবী ফার্সী শব্দ বর্জিত কেবল নয়, তামাম মুসলিম সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা বর্জিত পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করলেন। কালক্রমে এই ধরনের বাংলা পাঠ্যপুস্তকই স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সটির পাঠ্য হলো।

শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠার এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ বছর পর মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)-এর জন্ম। পাঠশালায় এবং স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে এবং সে সময়কার হিন্দুদের লেখা সাহিত্যে আরবী-ফার্সী বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল যে ধরনের বাংলা ভাষার প্রচলন মীর মশাররফ হোসেন দেখেছিলেন ঠিক সে ভাষাতেই তিনি ইসলামের ইতিহাসের কারবালার ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন “বিষাদ সিন্ধু”। (১৮৮৫-১৮৯১)।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম মীর মশাররফ হোসেনের জন্মের বাহান্ন বছর পর। তিনিও কেবল পাঠশালায় নয়, মক্তবে এবং স্কুলেও আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল বাংলাই শিখেছিলেন। হিন্দুদের লেখা অন্যান্য কাব্য এবং সাহিত্যেও শিখেছিলেন এই একই ভাষা। কিন্তু মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে তিনি যখন কাব্য ও সাহিত্য সৃষ্টি করলেন এবং গান লিখলেন তখন এই বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি বিধান করে তিনি সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ যথাসম্ভব বর্জন করে ব্যবহার করলেন প্রচুর আরবী-ফার্সী শব্দ।

প্রথমে শ্রীরামপুর মিশনে এবং পরে আরো ব্যাপকভাবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে খ্রিস্টান পাদ্রী এবং সংস্কৃতজ্ঞ হিন্দু পন্ডিতরা মিলে একশ বিশ বছর আগে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই যেমন দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, লিখিত বাংলা ভাষা হবে সম্পূর্ণরূপে আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দবহুল ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যে-সঙ্গীত হবে কেবল হিন্দু সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক হিন্দু জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য ও সঙ্গীত, ঠিক তেমনি এই ধারার বিপরীতে এর এক শত বিশ বছর পর সেনাবাহিনী মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলা মুল্লুকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর কবি কাজী নজরুল ইসলামও দেখিয়েছিলেন মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত বহুলাংশে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বাংশে তৎসম শব্দ অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দ বণ্টন করেও লেখা যায়।

আট

নজরুল সেনাবাহিনী থেকে কলকাতায় ফিরেছিলেন উনিশ শ’ বিশ সালের মার্চ মাসে। এর চার মাস পর ১৩৩৯ হিজরীর পহেলা মোহররম ছিল ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ৩০ ভাদ্র মোতাবেক ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর। নজরুল তখন শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত দৈনিক নবযুগের অন্যতম সহযোগী সম্পাদক। থাকেন কলকাতার ৮/এ টার্নার স্ট্রীটে তার সহকর্মী ও সুহৃদ মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে। সামনে ১০ মোহররম ১৩৩৯ হিজরী (৮ আশ্বিন ১৩২৭ মোতাবেক ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯২০) তারিখ শুক্রবার আশুরা। মাসিক মোসলেম ভারত এর প্রথম বর্ষ : প্রথম খন্ড : ষষ্ঠ সংখ্যার জন্য তিনি লিখলেন তার বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয় ইসলামী কবিতা মোহররম। প্রথম দুটো পঙক্তি লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, সেখানে কোনো তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ নেই। নজরুল শুরুতেই অত্যন্ত আবেগ ও দরদ দিয়ে এবং গভীর মমত্ববোধ মিশিয়ে লিখেছেন:

নীল সিয়া আস্মান লালে লাল দুনিয়া

আম্মা! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।

আরবী ফার্সী শব্দ বহুল এই বাংলা পড়ে কারো বলার সাধ্য নেই যে, বাঙলা ভাষা সংস্কৃতির দুহিতা। সংস্কৃতি শব্দ স্বদেশী শব্দ এবং আরবী ফার্সী শব্দ বিদেশী শব্দ। নত্ববিধান এবং ষত্ববিধান কেবল সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের জন্য প্রযোজ্য! ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ইন্তেকালের এবং ভাষাতত্ত্ববিদ সনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পরলোক গমনের এতোদিন পর এবং ধনিতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আবদুল হাই সাহেবের ইন্তেকালের এতদিন পর আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা বিভাগে যখন ভাষাতত্ত¡বিদ নেই, ধ্বনিতত্ত¡বিধ নেই, তখন কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকরণে আমাদের মুসল্লী প্রুফ রীডাররাও আমাদের শেখাচ্ছেন যে, ইরান বানানের মূর্ধন্য ণ মূধা বা মস্তক থেকে অর্থাৎ জিহবাগ্র তালুতে স্পৃষ্ট করে উচ্চার্য নয়; কেননা, এটা সংস্কৃতি বা তৎসম শব্দ নয়। আমাদের ওপর অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আরোপের লক্ষ্যে এ সবই এখন চলছে।

নজরুলের জীবদ্দশা সুস্থাবস্থায় বাংলাভাষী মুসলমানরাও যে বাংলাভাষী মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐহিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরস্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে সচেতন ছিলেন সেটা সাতচল্লিশের মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলিম মালিকানাধীন এবং মুসলিম সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলো লক্ষ করলেই উপলব্ধি করা যায়। বাংলা সাহিত্যে নজরুল একমাত্র বড় কবি যিনি প্রতিবেশী সমাজের জন্য কীর্তন, ভজন এবং স্যামাসঙ্গীত পর্যন্ত লিখেছিলেন। সেখানে নজরুল কোন আরবী ফার্সী শব্দ ব্যবহার করেননি। নজরুল বিশ্বাস করতেন যে বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষারও আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। বাংলাভাষী মুসলমানদের সংস্কৃতি ও বাংলাভাষী হিন্দুর সংস্কৃতি এক নয়। বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষা এবং সংস্কৃতির সর্বনাশ ঘটে গেছে ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্টের পর।

বাংলাভাষী মুসলমানদের মুসলমান হিসেবে বাঁচার অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলমান জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় উপযুক্ত মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করার অপরিহার্য প্রয়োজন আছে। নজরুলের মোহররম কবিতা উপলক্ষে এই উল্লেখটা করলাম।

লেখক : নজরুল গবেষক, ইতিহাসবিদ।

চয়নিকাঃ মসনবী শরীফ

masnavi poem

কবি, গীতিকার ও সুরকার রজনীকান্ত সেন

rajonikanto sen