আর্কাইভ

Archive for the ‘সাহিত্য’ Category

সাক্ষাৎকার : ইমদাদুল হক মিলন

imdadul haque milon interview

Advertisements

স্মরণঃ আলাউদ্দিন আল আজাদ

alauddin al azad 56

রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য আত্রাইয়ের পতিসর

tagore patisor houseকাজী আনিছুর রহমান রানীনগর (নওগাঁ) : ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে, চুকিয়ে দেব বেচা কেনা, মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা, বন্ধ হবে আনাগোনা এই ঘাটে, তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে, তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এসব মুখ নিঃসৃত কথাগুলো যেমন দম্ভহীন, তেমই অহঙ্কারমুক্ত। যা মানুষ মানুষের মাঝে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার বন্ধনকে মজবুত করে। হিংসা-নিন্দাকে দূরে সরিয়ে দেয়। সেই অহঙ্কারমুক্ত বিশ্বের জনমানুষের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব জমিদারি তার স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর আত্রাইয়ের পতিসরের কাচারি বাড়ি অপরূপ বর্ণিল সাজে সাজানো।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলে প্রতি বছরের মতো এবারো কবির পতিসর কাচারি বাড়ি প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয়েছে দিনব্যাপী নানা উৎসব। প্রতি বছরই পতিসরে নামে রবীন্দ্র ভক্তের ঢল। পরিণত হয় মানুষের মহামিলন মেলায়। সরকারিভাবে এক দিনের কর্মসূচি নিলেও এ মেলা চলে সপ্তাহ জুড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে কবিভক্তরা ছুটে আসেন তাদের প্রিয় কবির পতিসর কাচারি বাড়ি প্রাঙ্গণে। একে অপরের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতিচারণে লিপ্ত হন তারা। কবিগুরুর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলে এবার ব্যাপক প্রস্তুতি হাতে নেয়া হয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য কবির নিজস্ব জমিদারি নওগাঁর পতিসর যেন পর্যটনের অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কাচারি বাড়িতেই কবির ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। পতিসরে নাগর নদের পাড়কে মনোমুগ্ধকর করে তোলা হয়েছে। দীর্ঘ দিনেও পতিসরের তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন না হলেও স্থানীয় সংসদ সদস্য মো: ইসরাফিল আলমের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এবার যেন হাঁটি হাঁটি পা পা করে উন্নয়নের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব জমিদারি এলাকা কালিগ্রাম পরগনার সদর দফতর এই পতিসর। আর এই পতিসর নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার মনিয়ারি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম। নওগাঁ জেলা সদর থেকে ৩৬ কিলোমিটার ও আত্রাই উপজেলা সদর হয়ে ৫৫ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা অপ্রশস্ত পাকা সড়ক চলে গেছে নিঝুম-নিস্তব্ধ-নিভৃত পল্লীতে, কবির কাচারি বাড়ি জেলার আত্রাই উপজেলার মনিয়ারি ইউনিয়নের পতিসর গ্রামে। নওগাঁ ও আত্রাই থেকে মাইক্রো বাস, বাস, সিএনজি, টেম্পো, চার্জার, ভটভটিসহ বিভিন্ন যানবাহনে পতিসরে যাওয়া যায়।

tagore patisor bust

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উপলে প্রতি বছরই এখানে বসে মিলনমেলা। সপ্তাহখানেক চলে সেখানে রবীন্দ্র মেলা। এ সময় স্থানীয় ও এলাকাবাসীর বাড়িতে ভিড় জমান দূর-দূরান্ত থেকে আসা কবি ভক্ত, আত্মীয়স্বজন, অতিথিরা। একে অপরের সান্নিধ্যে এসে স্মৃতিচারণে লিপ্ত হন ফেলে আসা পুরনো দিনের কথায়। গ্রামের মানুষ মেয়ে-জামাতাকে নাইওরে আনে এ উৎসবে। জানা গেছে,১৯৩৭ সালে ২৭ জুলাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাজার হাজার প্রজাকে কাঁদিয়ে পতিসর তথা বাংলাদেশ থেকে শেষ বিদায় নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি প্রজাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘সংসার থেকে বিদায় নেয়ার পূর্বে তোমাদেরকে দেখার ইচ্ছা ছিল, তা আজ পূর্ণ হলো।’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নওগাঁর আত্রাইয়ের এই পতিসরে এসে তাঁর কাচারি বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা নাগর নদকে নিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’। এ ছাড়াও তার বিখ্যাত কবিতা ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’, ‘দুই বিঘা জমি’, ‘সন্ধ্যা’সহ অসংখ্য সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন এই পতিসরের কাচারি বাড়িতে বসে।

কবি বেলাল চৌধুরী স্মরণে…

belal choudhury 1abelal choudhury 1b

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ : লেখকের লেখক

syed waliullah 4১৯২২ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রাম শহরের নিকটবর্তী ষোলশহরের এক মুসলিম পরিবারে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ জন্মগ্রহণ করেন। ওয়ালীউল্লাহ’র বাবা-মা’র পরিবার ছিল পূর্ববাংলার উচ্চশিক্ষিত, সংস্কৃতিবান ও অভিজাত পরিবারগুলোর একটি। ওয়ালীউল্লাহ’র বাবা সৈয়দ আহমদউল্লাহ ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তিনি ছিলেন সাহসী, সরল এবং স্পষ্টভাষী। ১৯১২ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে সরাসরি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হন। তিনি এসডিও হিসেবে বিভিন্ন মহকুমায় কর্তব্য পালন করেন। তিনি বর্ধমানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে ১৯৪৪ সালে পদোন্নতি লাভ করেন এবং ১৯৪৫ সালে একই পদে ময়মনসিংহে বদলি হন। তিনি যখন ময়মনসিংহের এডিএম ছিলেন তখন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিত্সার জন্য কলকাতা যান এবং সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৩০ সালে ওয়ালীউল্লাহ’র বয়স যখন ৮ বছর তখন তাঁর মা মারা যান। তাঁর বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। বিমাতার সাথে ওয়ালীউল্লাহ’র সম্পর্ক ছিল খুবই নিবিড়। তাঁর বাবা মৃত্যুর সময় তেমন কোনো সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। তাই বাবার মৃত্যুতে ওয়ালীউল্লাহ’র পড়াশোনার ক্ষতি হয় এবং জীবনে অনেক বাধা-বিপত্তি আসে। বাবার মৃত্যুর পর সংসার চালানোর ভার এসে পড়ে তাঁর বড় ভাই নসরুল্লাহ ও ওয়ালীউল্লাহ’র ওপর এবং তাঁর পড়াশোনায় সমাপ্তি টানতে হয়।

সরকারি পদস্থ কর্মকর্তার সন্তান হিসেবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র শিক্ষাজীবন কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাই ওয়ালীউল্লাহ’র শিক্ষাজীবন কেটেছে তত্কালীন পূর্ববাংলা ও বর্তমান বাংলাদেশের নানা প্রান্তে। পিতার কর্মস্থল পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন ঘটেছে তাঁর স্কুলের। তাঁর স্কুলগুলো ছিল মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফেনী, ঢাকা, কৃষ্ণনগর, কুড়িগ্রাম, চিনসুরা, হুগলী, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জায়গায়। বিভিন্ন স্কুল ঘুরে ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন ওয়ালীউল্লাহ্। ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৪৩ সালে ডিসটিংশনসহ বিএ পাস করেন। তখন ওয়ালীউল্লাহ’র পিতা ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কিছুদিন পড়েছেন কৃষ্ণনগর কলেজেও। বিএ পাস করে তিনি কলকাতায় যান এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ অর্থনীতিতে ভর্তি হন। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৪৫ সালে তাঁর মামা খান সিরাজুল ইসলামের সহায়তায় ওয়ালীউল্লাহ্ কমরেড পাবলিশার্স নামে একটি প্রকাশনাসংস্থা চালু করেন। সে বছরই ইংরেজি দৈনিক ‘Statesman’ পত্রিকায় সাব-এডিটর হিসেবে সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাজগতে প্রবেশ করেন। তারপর ১৯৪৭ সালে আগস্টে পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের সহকারী বার্তা সম্পাদক হয়ে ঢাকায় আসেন। এর আগে তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল কলকাতায়। ১৯৫১ সালে দিল্লিতে পাকিস্তানি মিশনে।

১৯৫২ সালে দিল্লি থেকে বদলি হয়ে চলে যান অস্ট্রেলিয়ায়। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দুই বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। তারপর আবার ঢাকার আঞ্চলিক তথ্য দপ্তরে। ১৯৫৫ সালে ওয়ালীউল্লাহ্ আবার করাচি তথ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি হন। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তথ্য পরিচালক রূপে জাকার্তায় প্রেরণ করা হয় তাঁকে। দেড় বছর তিনি সেখানে পরিচালক পদে ছিলেন। দেড় বছর পর তাঁর পদটি বিলুপ্ত হয়ে গেলে পাকিস্তান সরকারের দ্বিতীয় সেক্রেটারির পদমর্যাদায় ওয়ালীউল্লাহেক জাকার্তার দূতাবাসে প্রেস এটাচি হিসেবে নিয়োগ দেন।

১৯৫৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাকার্তায়ই ছিলেন। সেখান থেকে পুনরায় করাচি আসেন। সেখানে ১৯৫৯ সালের মে মাস পর্যন্ত তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) থাকার পর তাঁকে লন্ডনে অস্থায়ীভাবে প্রেস এটাচি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এই সময় তাঁর দায়িত্বকাল ছিল ১৯৫৯ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত। অক্টোবরেই আবার বদলি হয় তাঁর। এবার চলে যান পশ্চিম জার্মানির বন-এ। সেখানেই পদোন্নতি হয় তাঁর ফার্স্ট সেক্রেটারি পোস্টে। সেখানে ফার্স্ট সেক্রেটারির পদমর্যাদায় ছিলেন ১৯৬১ সালের মার্চ পর্যন্ত। এপ্রিলে চলে আসেন প্যারিসে। সেখানে ১৯৬৭ সালের আগস্টে ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। এই পদে ছিলেন ১৯৭০ সালের শেষ দিন পর্যন্ত। তারপর তাঁর পদের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে পাকিস্তান সরকার ওয়ালীউল্লাহকে ইসলামাবাদে বদলির প্রস্তাব করে, কিন্তু রাজি না হওয়ায় মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত চাকরি ছাড়া জীবন-যাপন করেন প্যারিসেই।

চাকরির কারণে ওয়ালীউল্লাহকে নানা দেশ ঘুরতে হয়েছে। তারপরও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ছিল দেশভ্রমণের এক বিপুল নেশা। সময় ও সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তেন তিনি। বিশেষ করে তাঁর আগ্রহ ছিল হিস্পানি সভ্যতার দিকে। যে কারণে স্পেনে তিনি চাকরিসূত্রে বেশ কয়েকবার গেলেও বেড়াতেও গিয়েছেন আলাদা করে। এছাড়া চাকরিসূত্রে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্র তিনি ঘুরে দেখেছেন।

চাকরি সূত্রে যাওয়া ফ্রান্সেই ফরাসি দূতাবাসের কর্মকর্তা এ্যান মারির সাথে পরিচয় ঘটে ওয়ালীউল্লাহ’র। গড়ে ওঠে হূদ্যতাও। বিয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলেও তিনি কূটনৈতিক হওয়ায় রাষ্ট্র তাঁকে বিদেশি নাগরিক বিয়ে করার অনুমতি দেয় না। তাই পুনরায় বদলি হতে হয় তাঁকে। করাচিতে তথ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে এলে এ্যান মারি তিবোও প্যারিস থেকে চলে আসে করাচি। সেখানেই ১৯৫৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয় ইসলাম ধর্মমতে। এ সময় ধর্মান্তরিত হন এ্যান মারি। তাঁর নাম রাখা হয় আজিজা মোসাম্মত্ নাসরিন। তবে ব্যক্তি এ্যান মারি ওই কাবিননামা পর্যন্তই মুসলিম ছিলেন। ধর্ম কোনো বড় বিষয় হতে পারেনি তাঁদের সংসারে। ব্যক্তিগতভাবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তাই ধর্মান্ধতাকে তিনি ঘৃণা করতেন চরমভাবে। নিজের সংসারের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সাংসারিক জীবনে ওয়ালীউল্লাহ্ ছিলেন দুই সন্তানের জনক। প্রথম সন্তান কন্যা—সিমিন ওয়ালীউল্লাহ্ এবং দ্বিতীয় সন্তান পুত্র—ইরাজ ওয়ালীউল্লাহ্। এ্যান মারি তিবোর মা-বাবার প্রকৃত বাড়ি প্যারিসে নয়। তাঁদের বসবাস ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ডের সীমান্তবর্তী এলাকা গ্রিনোবেল-এ। সেই গ্রিনোবেলের ইউরিয়াজ নামক গ্রামেই লিখেছেন ‘চাঁদের অমাবস্যা’ উপন্যাসটি।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ছিলেন অন্তর্মুখী, নিঃসঙ্গ এবং অতিমাত্রায় সলজ্জ ও সংকোচপরায়ণ। তিনি ধীরে ধীরে প্রায় অস্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতেন, তবে খুব কম কথা বলতেন। কথার চেয়ে কাজ করার ঝোঁক ছিল বেশি। তাঁর চরিত্রে আভিজাত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্যাপক অনুশীলন, অধ্যয়নস্পৃহা ও কল্পনাপ্রিয়তা। নানা বৈচিত্র্যের সমন্বয়েই তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল—তিনি ভালো ছবি আঁকতেন। সাহিত্যের প্রতি যেমন তিনি শৈশব থেকে আগ্রহী ছিলেন, তেমনি স্কুলে পড়ার সময় থেকে ছবি আঁকা বা চিত্রশিল্পের দিকেও আগ্রহী ছিলেন। তাঁর চিত্রশিল্পের প্রতি আগ্রহ প্রথম প্রকাশ পায় ফেনী স্কুলে পড়ার সময়। স্কুলের হাতে লেখা ম্যাগাজিন ‘ভোরের আলো’র সমস্ত অলংকরণ ও অঙ্গসজ্জা তিনি নিজের হাতে করেছেন। খুব যত্ন সহকারে আঁকা তাঁর সেই কর্ম দেখেই বোঝা গিয়েছিল তিনি চিত্রশিল্পের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু অল্প বয়সেই সাহিত্যিক খ্যাতি না পেলে হয়তো তিনি চিত্রশিল্পীই হতেন। চিত্রশিল্পের প্রতি তাঁর আগ্রহ থেকেই পরবর্তীকালে চিত্র সমালোচনাও করেছেন ‘স্টেটসম্যান’-এ। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও পটুয়া কামরুল হাসানের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে তাঁর চিত্রশিল্পের আগ্রহের কারণেই। ওয়ালীউল্লাহ্ বেশকিছু ছবিও এঁকেছেন। কিন্তু বিভিন্নজনের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কারণে তাঁর ছবির কোনো প্রদর্শনী হয়নি।

চিত্রশিল্পী হিসেবে ওয়ালীউল্লাহ’র সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো তিনি তাঁর বেশ কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই এঁকেছেন। যেসব বইয়ের প্রচ্ছদ তিনি নিজে এঁকেছেন সেগুলো হলো—‘চাঁদের অমাবস্যা’ (১৯৬৪), ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প’ (১৯৬৫), ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮), ‘লালসালু’র ইংরেজি

অনুবাদ ‘Tree Without Roots’-এর প্রচ্ছদও তিনি নিজে এঁকেছেন। শৈশবে ছবি আঁকার স্বীকৃতিস্বরূপ পুরষ্কারও পেয়েছেন তিনি। ওয়ালীউল্লাহ’র আরও একটি দুর্লভ গুণ হলো—তিনি ভালো কাঠখোদাই ও ভালো ছুতোর মিস্ত্রির কাজ জানতেন। নিজের ঘরদোরের টুকিটাকি আসবাবপত্র তিনি নিজের হাতে বানাতেন। তাঁর হাতের কাঠের কাজ দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারত না যে এ কোনো শৌখিন মিস্ত্রির কর্ম। জীবনকে, জীবনের পরিবেশকে, যতটা সম্ভব শিল্পিত করার প্রয়াসই ছিল ওয়ালীউল্লাহ’র একমাত্র সাধনা।

শৈশব থেকে শুরু করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে তাঁর বড় মামা খানবাহাদুর সিরাজুল ইসলামের সান্নিধ্যে। তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরুর প্রেরণা তিনি এই মামার কাছ থেকে পেয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম ছিলেন একাধারে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারী ও আইনবিদ; আর চাকরি জীবনে তিনি ছিলেন আইন সচিব। তাঁর স্ত্রী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র বড় মামী রাহাত আরা বেগম ছিলেন একজন খ্যাতিমান উর্দু লেখিকা ও রবীন্দ্র-সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী। তিনি উর্দুতে রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ গল্প ছাড়াও ‘ডাকঘর’ (১৯১২) নাটক অনুবাদ করেন। রবীন্দ্র সাহিত্য ও বরীন্দ্র সংস্কৃতি পরিস্নাত মামাবাড়ির পরিবেশ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহেক প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল সন্দেহ নেই।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চাকুরে। সেই সময় ব্রিটিশ ভারতের কোনো সরকারি চাকুরেকে ইংরেজ সাম্রাজ্যের আত্মপক্ষ বলেই বিবেচনা করা হতো। মহকুমা কিংবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাই যেমন পারতেন না অনায়াসে সাধারণ জনগণের সঙ্গে মিশতে, তেমনি তাঁর ছেলেমেয়েরাও একটি সুনির্দিষ্ট গণ্ডি অতিক্রম করতে পারতেন না। সাধারণ ছেলেমেয়েদের সাথে তাঁদের ছেলেমেয়েদের মেশার কোনো সুযোগ ছিল না। সরকারি নীতিমালার দ্বারাই তাঁদের জীবন, আচরণ, কার্মকাণ্ড ও চলাচলের সীমা নিয়ন্ত্রিত ও নির্ধারিত হতো। ফলে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে পারতেন না। যার কারণে তাঁর জীবন হয়ে পড়ে খুব একাকী ও নিঃসঙ্গ। আর এই একাকী জীবনের নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে ওঠে বই। বইকেই তিনি পরম বন্ধু মনে করেন এবং বইয়ের সঙ্গেই তিনি তাঁর অধিকাংশ সময় কাটান। আর এই পরম বন্ধুটির সঙ্গে থাকতে থাকতে তিনি এক সময় শুরু করেন লেখালেখি এবং হয়ে ওঠেন এদেশের সুনামধন্য সাহিত্যিক।

waliullah books

সাহিত্য সাধনায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ছিলেন সিরিয়াস ধরনের একজন লেখক। কোনো গল্প বা উপন্যাস লিখেই তিনি প্রকাশের দিকে মনোযোগ দিতেন না। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লালসালু’ লেখার পর তিনি তা বন্ধুদের পড়ে শোনাতেন। কেউ বিরূপ সমালোচনা করলে এবং সে সমালোচনা যদি তিনি নিজে মনে করতেন সঙ্গত, সঙ্গে সঙ্গে সে অংশ ছিঁড়ে ফেলতেন। আবার লিখতেন। অর্থাত্ লেখক হিসেবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ আত্মম্ভর ছিলেন না। অন্যের গঠনমূলক ও সঙ্গত সমালোচনার প্রতি তিনি ছিলেন সহিষ্ণু, শ্রদ্ধাশীল ও নমনীয় এবং প্রয়োজনে নিজের রচনার পাঠ-পরিবর্তনেও দ্বিধা করতেন না।

ওই সময়কার সেরা প্রকাশনা সংস্থা ‘পূর্বাসা’ থেকে বের হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়নচারা’ (১৯৪৫)। পরবর্তীকালে ওয়ালীউল্লাহ’র মামার ও নিজের প্রকাশনা ‘কমরেড পাবলিশার্স’ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লালসালু’ (১৯৪৮)। নওরোজ কিতাবিস্তান প্রকাশ করে দ্বিতীয় উপন্যাস ‘চাঁদের অমাবস্যা’ (১৯৬৪), দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প’ (১৯৬৫) ও তৃতীয় উপন্যাস ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮)। প্রথম নাটক ‘বহিপীর’ বের হয় ১৯৬০ সালে। দ্বিতীয় নাটক ‘তরঙ্গ-ভঙ্গ’ প্রকাশ পায় ১৯৬৪ সালে। তৃতীয় ও সর্বশেষ নাটক ‘উজানে মৃত্যু’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে। এছাড়া জনাব কলিমুল্লাহ কর্তৃক ‘লালসালু’র উর্দু অনুবাদ ‘Lal Shalu’ প্রকাশ পায় ১৯৬০ সালে। এ্যান মারি থিবো ১৯৬১ সালে ‘L’ Arbe sans raciness’ নামে ‘লালসালু’র ফরাসি অনুবাদ করেন এবং ‘লালসালু’র ইংরেজি অনুবাদ ‘Tree Without Roots’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। উল্লেখ্য, ‘লালসালু’র জার্মান ও চেক অনুবাদও বের হয়েছে।

শিবনারায়ণ রায়ের মতে, প্রথম যুগের মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে যিনি বাংলা ভাষায় সম্ভবত সবচাইতে মৌলিক ও প্রতিভাবান ঔপন্যাসিক তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। ওয়ালীউল্লাহ’র তিনটি উপন্যাস বেশ আলোড়িত হওয়ায় তাঁর ছোট গল্পগুলোর কীর্তি তেমন চোখে পড়ে না। বস্তুত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ছোট গল্পে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন ভিন্ন রকমের এক ব্যক্তি হিসেবে। তাঁর গল্পের বিষয়বস্তুর পরিধি বিস্তৃত নয়, বরং অল্প কয়েকটি ছাড়া মধ্যবিত্তের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ। কিন্তু শিল্পী হিসেবে তিনি স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। তাঁর ছোট গল্পে ব্যক্তি ও সমাজ খুব ঘনিষ্ঠভাবেই উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর ভাষাও নিজস্ব-চিহ্নিত; কারো থেকে ধার করা নয়। সমাজের বিভিন্ন সমস্যার মতোই ব্যক্তির অন্তর্জগতের সমস্যাও উপেক্ষণীয় নয়। ওয়ালীউল্লাহ্ ব্যক্তির সেই অন্তঃপুরের ছবি আঁকতে চেয়েছেন তাঁর উপন্যাসের মতো ছোটগল্পেও। যদিও অকাল মৃত্যুর কারণে তাঁর কাজের পরিমাণ বিপুল নয়, কিন্তু কাজের গুণে তিনি সমগ্র বাংলা ছোট গল্পকে সাহিত্যের একটি বড় বিষয়বস্তুতে রূপান্তরিত করেছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র প্রথম উপন্যাস ‘লালসালু’ একটি অসামান্য গ্রন্থ। দেশ-বিদেশে বাংলা কথাসাহিত্যের এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে কাজ করে।

১৯৬৭ সালে ইউনেস্কোতে ‘প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট’ হিসেবে যোগদানের পর থেকেই পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র মতান্তর শুরু হয়, যা ক্রমান্বয়ে এক সম্মুখ বিরোধে রূপ নেয়। ইউনেস্কোর কোটা অনুযায়ী পাকিস্তান থেকে যখন একজনের জন্য চাকরি নির্ধারিত ছিল ওই পদে, তখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকেই সে পদে নিযুক্ত হবার কথা। এ কারণেই বাঙালি-বিদ্বেষী পাকিস্তান সরকার তাঁর চাকরি অনুমোদন করেনি। এ-সময় পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত ছিলেন জনৈক পাঞ্জাবি। তিনি ছিলেন ঘোরতর বাঙালি-বিরোধী। সরকারের নির্দেশ অনুসারে তিনি ওয়ালীউল্লাহ’র চাকরিচ্যুতির ব্যাপারে ইউনেস্কোর সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ করতে থাকে। এক পর্যায়ে এমন হুমকিও প্রদান করা হয়েছিল যে, ওয়ালীউল্লাহেক দূতাবাসে ফেরত না পাঠালে পাকিস্তান ইউনেস্কো থেকে বেরিয়ে আসবে। গত্যন্তর না দেখে, বিশেষ করে একজন ব্যক্তির জন্যে একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত অবাঞ্ছিত বিবেচনা করে ইউনেস্কো ওয়ালীউল্লাহকে ব্যাংককে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেয়; যা তাঁর জন্য ছিল আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। এমতাবস্থায় ব্যাংককে যেতে অস্বীকৃতি জানালে ইউনেস্কোতে ওয়ালীউল্লাহ’র কর্মকাল শেষ হয়েছে বলে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করেন ইউনেস্কোর বিরুদ্ধে। পাকিস্তানিদের চক্রান্তে মামলার রায় তাঁর বিপক্ষে যায় এবং তিনি চাকরি হারান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন বেকার। তারপরও যখন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানিদের আক্রমণ শুরু হয় তিনি সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ান। নিজের স্বল্প উপার্জন থেকে যখন যেটুকু সম্ভব কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে পাঠাতেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে প্রতিদিন অসংখ্য স্বদেশির মৃত্যুর সংবাদে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র মানসিক উদ্বেগ, উত্তেজনা তীব্ররূপ ধারণ করে; তিনি আক্রান্ত হন হাইপার টেনশনে। বেশ কিছুকাল ধরে ডায়াবেটিসের রোগী থাকায় তাঁর আর সুস্থ অবস্থায় ফেরত আসা হয়নি। ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর মধ্য রাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সুনীল বড় লেখক ছিলেন, মানুষ হিসেবে মোটে নয়

মৃত্যুর পরপর বলে কথাগুলো বাজে লাগাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের একটা বাজে স্বভাব আছে যে আমরা মানুষকে মহান না বানিয়ে ছাড়ি না। খেয়াল করে দেখেন তসলিমা কিন্তু একবারও লেখক সুনীলকে ছোট করেননি। তিনি বলেছেন মানুষ সুনীলের কথা। তর্কটা ওখানে হতে পারতো। তা না হয়ে আমরা তসলিমাকেই আলোচনায় নিয়েআসছি। আমরা প্রিয় লেখক বা শিল্পীদের যাবতীয় দূর্বলতার উদ্র্ধে ধরি বলেই এমনটা করি। আর সুনীলের মৃত্যুতে অন্যদের কপট আচরণ সম্পর্কে তসলিমা যা বলেছেন তার সাথে আমি ব্যাক্তিগতভাবে একমতদ মারা যাওয়ার পর আমরা দেখেছি। সারাজীবন যারা শুধু ব্যাক্তি না লেখক হিসেবেও তাকে বাজেভাবে সমালোচনা করেছে তারাও দিবারাত্র টেলিভিশনে, পত্রিকায় প্রশংসা এবং আহাজারিতে সয়লাব করে দিয়েছে। এই প্রবণতাটা আমাদের মাঝে বেশিই বলতে হবে।

মৃতদের মহান বানানোর খেলা আমরা ভালোই জানি। শুধু ভুলে যাই আমরা কেউই ভুলের উদ্র্ধে না। কেউ এটা ধরিয়ে দিলে আমরা তার উপরেও চড়াও হই। তসলিমার লেখাটা ভালো লাগলো মূলত এই কারণে যে, অন্তত একজন লেখকের প্রতি সম্মান জানালো পরিমিতি রেখে। লেখকের মর্যাদা দিয়ে। যেখানে লেখক একজন মানুষ। ভালো মন্দের বিচারটা আপেক্ষিক। তসলিমাকে আঘাত না করে তার তোলা অভিযোগকে খণ্ডন করলে তা যৌক্তিক হবে।

তসলিমা নাসরিন : যে কোনও মৃত্যুই খুব বেদনার৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবর শুনে গত কাল আমি চমকেছি , বেদনাবোধ করেছি৷ বার বার ভেবেছি , কত লোক খামোকাই বেঁচে আছে , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আরও কিছু বছর বেঁচে থাকলেই পারতেন , লিখতে পারতেন আরও কিছু লেখা৷ আজকাল আটাত্তর বা ঊনআশি বছর বয়সকে মৃত্যুর উপযুক্ত বয়স বলে মনে হয় না৷ দীর্ঘকাল চলত্শক্তিহীন অবস্থায় বিছানায় পড়ে না থাকলে , মাথা সম্পূর্ণ অকেজো না হয়ে গেলে , বয়স নব্বইয়ের ওপর না উঠলে মৃত্যুকে মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হয়৷ প্রায় অর্ধেক দিন টেলিভিশন খোলা ছিল৷ টেলিভিশনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শেষ দিককার কিছু ছবি দেখে অবাক হয়েছি৷ তাঁর স্বাস্থ্য যে এত ভেঙে পড়েছিল , আমার জানা ছিল না৷ বড়ই রুগ্ন এবং অসুস্থ দেখাচ্ছিল৷ জানি না কোনও কঠিন অসুখে ভুগছিলেন কি না৷ অবাক হয়েছি আরও একটি কারণে৷ শিল্পী -সাহিত্যিকদের মধ্যে দু’একজন , যাঁদের আমি ব্যক্তিগত ভাবে জানি ভীষণ নিন্দা করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের , তাঁরা ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন৷ প্রকাশ্যে মনের কথা বলার লোক এত কমে যাচ্ছে চারদিকে৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা -গল্প -উপন্যাস -নিবন্ধ পড়ছি সেই কিশোর -বয়স থেকে৷ তাঁর খুব কম লেখাই আছে , যে গুলোকে ‘যাচ্ছেতাই ’ বা ‘কিচ্ছু হয়নি ’ বলে নাকচ করে দিয়েছি৷ তাঁর যে জিনিসটা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত , তা হল নাস্তিকতা নিয়ে তাঁর লুকোছাপা না করা৷ ধর্মনিরপেক্ষতা , দেশভাগ , মুক্তিযুদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান , বাংলা এবং বাঙালি , নাস্তিক্যবাদ , অস্তিত্ববাদ ইত্যাদি নিয়ে তাঁর যে মত ছিল , তা একেবারেই আমার মত৷ এত মতের মিল যাঁর সঙ্গে , তাঁর সঙ্গে বিরোধ কেন ! অবশ্য বিরোধটা আমার দিক থেকে কখনও ছিল না৷ তিনিই গোপনে গোপনে আমার পায়ের তলার মাটি সরাতে চেষ্টা করছিলেন৷ কেন করছিলেন , কী প্রয়োজন ছিল তাঁর , আজও জানি না৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চিনি বাংলাদেশ থেকেই৷ আশির দশকের শেষ দিকে পরিচয়৷ বাংলাদেশে দেখা হত , কলকাতায় বেড়াতে এলেও দেখা হত৷ বাড়িতে নেমন্তন্ন করতেন৷ কবিতা এবং কলাম লিখে তখন আমার বেশ নাম হয়েছে দেশে৷ তার পর বিরানব্বইয়ের ‘আনন্দ পুরস্কার ’ পাওয়ার পর তো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আবারও দেখা হল৷ অনেককে বলতেও শুনেছি , ‘সুনীলই তো তসলিমাকে আনন্দ পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছে৷ ’ আমিও তাই ভেবেছিলাম৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ করতে দেখিনি৷ বেশ কয়েক বছর পরে অবশ্য জেনেছিলাম সুনীল গঙ্গোপাাধ্যায়ই ‘আনন্দ পুরস্কার ’ কমিটির দশ জন সদস্যের মধ্যে একমাত্র সদস্য যিনি ৷ আমার পুরস্কার পাওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন৷ শুধু বিরানব্বইয়ে নয় , দু’হাজার সালেও বিরোধিতা করেছেন , যখন দ্বিতীয়বার ‘আনন্দ পুরস্কার ’ পেয়েছি৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখে অবশ্য কখনও আমি বুঝতে পারিনি তিনি গোপনে গোপনে আমার বিরুদ্ধে কাজ করেন৷ বন্ধুর মতো , শুভাকাঙ্ক্ষীর মতো , দাদার মতো , পিতার মতো তিনি পাশে ছিলেন বলেই বিশ্বাস করতাম৷ অবশ্য সব ভাবনার অবসান হল , যখন তিনি প্রকাশ্যে আমার ‘দ্বিখণ্ডিত ’ বইটি নিষিদ্ধ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবদার করলেন এবং বইটি শেষ অব্দি নিষিদ্ধ করিয়ে ছাড়লেন৷ একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে ভয়ঙ্কর হূদয়বিদারক আর কী হতে পারে , যখন সে প্রত্যক্ষ করে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ লেখক তার বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে গিয়ে , মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে এই অজুহাতে তার বই নিষিদ্ধ করার জন্য রাজা -মন্ত্রীর কাছে দৌড়ায় ! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অবিশ্বাস্য বিরোধিতা সত্ত্বেও , কখনও দেখা হলে স্বভাবসুলভ সশ্রদ্ধ আন্তরিক ব্যবহারই ৷ যে গৃহহীন মানুষটা পশ্চিমবঙ্গকে ভালবেসে সব ছেড়েছুড়ে এসেছিল , তাকেই কি না তাড়িয়ে দেওয়ার ষ ..ডযন্ত্র ! রাজনীতিতে কত কাণ্ডই ঘটে! কিন্ত্ত তাই বলে সাহিত্যিকরা আচরণ করবেন রাজনীতিকের মতো !৷ করেছি৷ কখনও আমি ভুলে যাইনি তিনি আমার প্রিয় লেখক , কিশোর বয়স থেকে আমি তাঁর লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি , কখনও ভুলে যাইনি অন্য একশ বিষয়ে তাঁর মতের সঙ্গে মেলে আমার মত৷ নিজেকে বুঝিয়েছি৷ তিনি মুখে আমার লেখা ভীষণ পছন্দ করেন বললেও হয়তো সত্যিকার পছন্দ করতেন না , সেই কারণেই আমার পুরস্কার পাওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন৷ নিজেকে বুঝিয়েছি , মুক্ত চিন্তার পক্ষে বললেও তিনি হয়তো আমার লেখা পছন্দ করতেন না বলে আমার বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন , এই যাওয়ার অধিকার হয়তো তাঁর আছেই৷ কলকাতায় দু’হাজার চার সাল থেকে নিজের মতো বাস করতে শুরু করেছি সাহিত্যের গুরুকে গুরুপ্রণাম না করেই৷ তার পর আমার নিষিদ্ধ হওয়া ‘দ্বিখণ্ডিত ’কে হাইকোর্ট থেকে মুক্ত করিয়ে এনেছি৷ আমার স্পর্ধার ফল অবশ্য পেতে শুরু করেছি শীঘ্র৷ লক্ষ্য করলাম আমি প্রায় সবখানে ব্রাত্য৷ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বন্ধুরা , যারা এক সময় আমারও বন্ধু ছিল , আমাকে রীতিমত ত্যাজ্য করেছেন৷ ধীরে ধীরে কিছু পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা বন্ধ হয়ে গেল , কিছু প্রকাশক আমার বই প্রকাশও বন্ধ করে দিলেন৷ আমি অনেকটা একঘরে৷ এক সময় তো সরকার থেকে চাপ এল আমি যেন কলকাতা ছেড়ে চলে যাই৷ যে গৃহহীন মানুষটা পশ্চিমবঙ্গকে ভালোবেসে সব ছেড়েছুড়ে এসেছিল , তাকেই কি না তাড়িয়ে দেওয়ার ষ ..ডযন্ত্র ! ৷ রাজনীতিতে কত কাণ্ডই ঘটে! কিন্ত্ত তাই বলে সাহিত্যিকরা আচরণ করবেন রাজনীতিকের মতো ! যখন আমি পশ্চিমবঙ্গের মাটি কামড়ে পড়েছিলাম , বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন , পুলিশ কমিশনার প্রসূন মুখোপাধ্যায় আমাকে তাড়াবার নানা রকম আয়োজন করে হেরে যাচ্ছেন , তখন স্বয়ং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ফোন করে আমাকে বলেছেন রাজ্য ছাড়তে৷ বলেছেন , ‘‘আমাদের কাছে খবর আছে , তোমাকে মেরে ফেলার জন্য এক দল লোক তৈরি হচ্ছে , তুমি রাজ্য ছাড়ো ’’৷ ঠিক যেমন ‘দ্বিখণ্ডিত ’ নিষিদ্ধ করার জন্য ‘আজকাল ’ পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন , ‘‘আমাদের কাছে খবর আছে , এই বইয়ের জন্য দাঙ্গা বাধবে , তাই আমরা বই নিষিদ্ধ করেছি , স্ফুলিঙ্গকে বারুদের কাছে যেতে দিইনি ’’৷ শাসকের সুরে কথা বলতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়৷ এই সমাজ সাংঘাতিক নোংরা , পুরুষতান্ত্রিক বলে সুনীলকে ‘বড় মানুষ ’ আখ্যা দিয়ে গুণকীর্তন করে চাটুকাররা৷ যারা সুনীলের যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছে , তারা মুখ বুজে থাকলেও জানে এবং মানে যে সুনীল মানুষ হিসেবে বড় ছিলেন না৷ সে দিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে এবং আরও মেয়েকে সুনীল যৌন হেনস্থা করেছেন , এ কথা বলার পর সুনীলকে দোষ দেওয়ার বদলে লোকেরা দোষ দিল আমাকে৷ ছি ছি করল আমাকে ! সুনীলও দিব্যি অস্বীকার করলেন খবর৷ যেমন অস্বীকার করেন আমার বই নিষিদ্ধ করার জন্য তিনি যে উঠে পড়ে লেগেছিলেন , সে সব ঐতিহাসিক ঘটনা৷ এত বড় লেখক কী নির্দ্বিধায় মিথ্যে বলেন ! আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই৷ আজ যদি কোনও সভ্য দেশে কোনও পুরুষ লেখকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আসে , লোকেরা লেখককে , সে যত ব .ড লেখকই হোক না কেন , ছি ছি করবে৷ কিন্ত্ত এ দেশে উল্টো ! হবে না কেন , এখনও ধর্ষিতা হলে ধর্ষণের জন্য বেশির ভাগ লোক ধর্ষিতাকেই দোষী সাব্যস্ত করে৷ এ দেশের থেকে এর চেয়ে ভালো আশা করার কী -ই -বা আছে !যত শত্রুতাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় করুন না কেন , আমি নিজেকে তাঁর থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখেছিলাম , তাঁর শত্রুতা করিনি বা তাঁর পাকা ধানে মই দিইনি৷ আমি বিশ্বাস করি , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক৷ আমি হয়তো কাছ থেকে তাঁর চরিত্রের মন্দ দিকটা দেখেছি , বাইরের লোকদের তা দেখা সম্ভব হয় না বলে ভাল দিকটাই দেখেন৷ তাতে কী ? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা তাঁরা যেমন ভালোবাসেন , আমিও তেমন বাসি৷ এবং এ -ও জানি , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মধ্যে যদি সামান্য কোনও সততা থেকে থাকে , তিনি নীরবে নিভৃতে আমার সততার কারণে আমাকে মনে মনে শ্রদ্ধা করেছেন৷ তাঁর অজস্র চাটুকার ছিল৷ চাটুকাররা প্রতিদিন তাঁর কাছে ভিড় করত৷ ওদের ছাড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের রাত কাটেনি দিন কাটেনি , কিন্ত্ত ওদের তিনি খুব ভালোবাসতেন বা শ্রদ্ধা করতেন বলে আমার কখনও মনে হয়নি৷

আবু ইসহাকের অভিধানচর্চা ও সাহিত্যখ্যাতি

abu ishaq 7মৌরী তানিয়া : প্রথম দিকে খুব বেশিদূর যেতে চাননি তিনি। লিখতে বসেছিলেন বিশেষিত শব্দের ছোটখাটো একটা অভিধান। লিখতে লিখতে তিরিশ বছর কেটে গেল। কখন কেটে গেল টেরই পেলেন না। নিজের বিশাল কাজ দেখে পরে নিজেই অবাক হয়ে গেলেন। শেষ দিকে এসে এ কাজে পুরো পরিবার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

কাজটাও বেশ অদ্ভুত। নানা ধরনের বইপুস্তক ও পত্রপত্রিকা চষে শব্দ বের করতেন। শব্দগুলো ছোট ছোট কার্ডে লিখে নিতেন। কার্ডগুলো রাখতেন গুঁড়ো দুধের খালি কৌটায়। পরে সেগুলো বাছাই করে সুতোয় মালা গেঁথে সাজাতেন। এই মালা গাঁথার কাজ ও বিশেষিত শব্দের কার্ড গুছিয়ে দিতেন স্ত্রী, কন্যা, পুত্র ও নাতি-নাতনিরা। এভাবে দুই লাখেরও বেশি বিশেষিত শব্দ নিয়ে মালা গাঁথলেন তিনি। শব্দের এই মালাগুলো পুস্তক আকারে রূপ নিয়ে হলো বাংলা ভাষার মূল্যবান সম্পদ ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’। শুধু এই অভিধানই নয়, আরো অনেক কিছু রচনা করেছেন আবু ইসহাক। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রগুলোর একটির নাম আবু ইসহাক।

বাংলা সাহিত্যে যাঁরা লিখেছেন কম, কিন্তু যা লিখেছেন তা অসাধারণ, তাঁদেরই একজন তিনি। সব মিলিয়ে তিনটি উপন্যাস, ছোটগল্পের দুটি সংকলন, একটি নাটক, একটি স্মৃতিকথা ও একটি অভিধান রচনা করেছেন আবু ইসহাক। এর বাইরে অগ্রন্থিত আরও কিছু রচনা আছে। মাত্র ২০ বছর বয়সে লেখা প্রথম উপন্যাস ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ দিয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যসমাজে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন আবু ইসহাক।

১৯২৬ সালের ১ নভেম্বর (১৫ কার্তিক ১৩৩৩ বাংলা) শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানাধীন শিরঙ্গল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবু ইসহাক। তাঁর বাবা মৌলভী মোহাম্মদ এবাদুল্লাহ কাঠের ব্যবসা করতেন। এছাড়া গ্রামের কিছু কৃষি জমির মালিকও ছিলেন মোহাম্মদ এবাদুল্লাহ। আবু ইসাহাকের মা আতহারুন্নিসা ছিলেন সাধারণ একজন গৃহবধূ। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আবু ইসহাক ছিলেন পঞ্চম। আবু ইসহাকের বাবা কাঠের ব্যবসায়ী হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকাশের কথা চিন্তা করে তিনি ওই সময়ের বিখ্যাত দুটি বাংলা সাময়িকপত্রের গ্রাহক হয়েছিলেন। নিয়মিত গ্রাহক হওয়ায় ‘সওগাত’ ও ‘দেশ’ পত্রিকা নিয়মিত পেতেন আবু ইসহাক ও তাঁর ভাইবোনেরা।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের গ্রামগুলোর অধিকাংশই ছিল অনগ্রসর। এক্ষেত্রে খানিকটা ব্যতিক্রম ছিল নড়িয়া গ্রাম। নড়িয়ায় তখন বেশকিছু সম্পন্ন ও সংস্কৃতিমনা পরিবার ছিল। এসব পরিবারের সাথে আবু ইসহাকদের পরিবারের সুসম্পর্ক ছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমাজকর্ম কর্মসূচির অন্যতম সহযোগী সুধীরচন্দ্র কর ছিলেন নড়িয়া গ্রামের সন্তান। আবু ইসহাকের সহপাঠী ছিলেন সুধীরচন্দ্র করের ছোটভাই সুভাষচন্দ্র কর। সহপাঠী সুভাষের মাধ্যমে তাঁদের পারিবারিক সংগ্রহ থেকে অনেক বইপত্র পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। আবু ইসহাকের বড়ভাইয়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল প্রতিবেশী জমিদার বাড়ির ছেলে ফুটবলার গোষ্ঠ পালের। গোষ্ঠ পালদের বিশাল পারিবারিক লাইব্রেরি থেকে বইপত্র ধার নেওয়ার সুযোগ পেতেন আবু ইসহাক। এছাড়া আবু ইসহাকদের স্কুলের (উপসী বিজারি তারাপ্রসন্ন উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়) লাইব্রেরিতে সমকালীন পত্রপত্রিকা ও বইপুস্তক ছিল। এখান থেকেও বইপত্র পড়ার সুযোগ পেতেন তিনি। শৈশব ও কৈশোরে পত্রপত্রিকা ও পুস্তক পাঠের এসব সুযোগ সাহিত্যিক আবু ইসহাকের মানস গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। ছোটবেলা থেকেই কবিতা ও গল্প লেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৪০ সালে আবু ইসহাক যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখনই ‘অভিশাপ’ নামের একটি গল্প তিনি পাঠিয়েছিলেন কলকাতা থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘নবযুগ’ পত্রিকায়। ওই পত্রিকায় ওই বছরের কোনো এক রবিবারে তাঁর গল্পটি ছাপা হয়। এটিই আবু ইসহাকের প্রথম প্রকাশিত লেখা।

abu ishaq books 1

১৯৪২ সালে শরীয়তপুর জেলার উপসী বিজারী তারাপ্রসন্ন উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি নিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন আবু ইসহাক। ১৯৪৪ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। সময়টি ছিল বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বের জন্যই গভীরতর সংকটের। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর অন্যদিকে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির রাজনীতি। পারিবারিক আর্থিক সংকট ও রাজনীতিবিদদের উত্সাহে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই আবু ইসহাক চাকরিতে যোগ দেন। বাংলা সরকারের বেসরকারি সরবরাহ বিভাগের পরিদর্শকের চাকরি নিয়ে তিনি চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ থেকে কলকাতা এবং পরে পাবনা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় আবু ইসহাকের কর্মস্থল ছিল পাবনা। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। দেশভাগের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বেসরকারি সরবরাহ বিভাগ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। আবু ইসহাককে আত্মীকরণ করা হয় পুলিশ ও নিরাপত্তা বিভাগে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সরকারি চাকুরেদের অনেকের পদোন্নতি ঘটলেও আবু ইসহাকের ক্ষেত্রে ঘটে পদাবনতি। আগে ছিলেন পরিদর্শক, পুলিশ বিভাগে আত্মীকরণের পর হন সহকারী পরিদর্শক। একই পদে থেকে যেতে হয় দীর্ঘ আট বছর। এই চাকরিতে ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত আবু ইসহাকের কর্মস্থল ছিল তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা। ১৯৫৬ সালে তাঁর ভাগ্যে পদোন্নতি জোটে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিদর্শক করে তাঁকে করাচিতে বদলি করা হয়। ১৯৬০ সালে চাকরিরত অবস্থায় করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন তিনি। এরপর আবু ইসহাকের বেশ কয়েক দফা দ্রুত পদোন্নতি ঘটে। ১৯৬৬ সালে তাঁকে রাওয়ালপিন্ডিতে বদলি করা হয়। ১৯৬৯ সালে সহকারী কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে করাচি থেকে বদলি করা হয় ইসলামাবাদে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তিনি ইসলামাবাদেই ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে না থাকলেও বাঙালি হওয়ার কারণে আবু ইসহাককে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচার চেষ্টায় লড়তে হয়েছে তাঁকে। পাকিস্তানে আটকে পড়া অবস্থা থেকে আবু ইসহাক বহু কষ্টে পালিয়ে যান আফগানিস্তানে। ভারত ও আফগানিস্তান সরকারের সহায়তায় ১৯৭৩ সালে কাবুল ও নয়াদিল্লি হয়ে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন। দেশে ফেরার পর বাংলাদেশের নবগঠিত নিরাপত্তা বিভাগ তাঁকে যথার্থ সম্মানের সাথে বরণ করে নেয়। তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) উপপরিচালক করা হয়। এর পরে ১৯৭৪ সালে তিনি মিয়ানমারের (বার্মা) আকিয়াব শহরে বাংলাদেশ কনসুলেটে ভাইস কনসাল হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৬ সালে আবু ইসহাক কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সালে তাঁকে আবার বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং এনএসআই’র খুলনা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে খুলনার খালিশপুর এলাকায় ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ নামে একটি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন আবু ইসহাক। সে বাড়িতে অবশ্য তিনি বেশিদিন থাকেননি। ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর চাকরি থেকে অবসর নেন তিনি। অবসর নেওয়ার পর থেকে মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত ঢাকার বড় মগবাজার এলাকার ‘তাহমিনা মঞ্জিল’ নামের একটি ভাড়া বাসায় অবস্থান করেছেন। আবু ইসহাক ২০০৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রবিবার রাত ৯টা ১৫ মিনিটে ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ দিবসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দেশের এই কৃতী সন্তানকে শেষ শ্রদ্ধা জানায় সর্বস্তরের মানুষ। ঢাকার মিরপুরে বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আবু ইসহাক।

আবু ইসহাক দাম্পত্যজীবন শুরু করেন ১৯৫০ সালে। পাকিস্তানে থাকার সময় স্ত্রী সালেহা ইসহাক ছিলেন ইসলামাবাদ সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের শিক্ষিকা। দেশে ফেরার পর শিক্ষকতা করেছেন মতিঝিল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই স্কুল থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। আবু ইসহাক ও সালেহা ইসহাক দম্পতির তিন সন্তান। তাঁরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

আবু ইসহাক তাঁর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে খুব যত্নবান ছিলেন। ছেলেমেয়েদেরকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো প্রাইভেট টিউটর না দিয়ে নিজেই তাঁদেরকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করেছেন। বাবার স্মৃতিচারণ করে মুশতাক কামিল বলেন, “আমাদের একটা কথা তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘জন্মগত প্রতিভাবান বলে তেমন কিছু নেই। কালেভদ্রে দুয়েকজন তেমন হয়। বাকি সবাইকে পরিশ্রম করতে হয়। সফলতা পেতে চাইলে সবাইকে পরিশ্রম করতে হবে।’”

শুধু নিজের পরিবারের প্রতি নয়, অন্যান্য মানুষের প্রতিও আবু ইসহাক সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। পাকিস্তানে ‘বাঙালি রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটি’র কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। পাকিস্তানের জেলে আটকে পড়া বাঙালিদের ছাড়িয়ে আনার জন্য আইনি সহযোগিতা থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে সাহায্য করার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন আবু ইসহাক।

আবু ইসহাকের শখ ছিল মাছ ধরা, শিকার করা এবং মৌমাছি পালন। এছাড়া আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি। করাচিতে থাকাকালীন সমমনা পড়ুয়া বাঙালিদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রবাসী পাঠচক্র। পাঠচক্রের সদস্যদের বাসায় প্রতি মাসে চক্রাকারে আড্ডা বসত।

বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য আবু ইসহাক ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮১ সালে আবু ইসহাককে সুন্দরবন সাহিত্য পদক দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন তিনি। ২০০৬ সালে আবু ইসহাক নাটক বিভাগে শিশু একাডেমী পদক পান। এছাড়া অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

আবু ইসহাকের উপন্যাস ও গল্পের অনুবাদ এবং সেগুলো অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র দেশের বাইরে থেকে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ উর্দু ও চেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। উপন্যাসটির উর্দু অনুবাদ ‘আসেবি ঘর’ ১৯৬৯ সালে হাবিব ব্যাংক সাহিত্য পদক লাভ করে।

‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ অবলম্বনে ১৯৭৯ সালে চলচ্চিত্রকার মসিহউদ্দিন শাকের একই নামে যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সেটি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কারসহ সাতটি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাঁচটি পুরস্কার লাভ করে। আবু ইসহাকের লেখা ‘মহাপতঙ্গ’ গল্প অবলম্বনে ইংরেজি ভাষায় নির্মিত কার্টুন ছবি “হু ফ্লিউ ওভার দ্য স্প্যারো’স নেস্ট” সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৮১ সালের চলচ্চিত্র উত্সবে মানবিক আবেদন সৃষ্টির জন্য শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায়ই আবু ইসহাক গল্প ও কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর এসব লেখার বেশকিছু স্কুলের দেয়াল পত্রিকা ‘প্রভাতী’-তে ছাপা হয়েছে। স্কুলের গণ্ডির বাইরে তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘নবযুগ’ পত্রিকায় ছাপা ‘অভিশাপ’ নামের সেই গল্পটিই তাঁকে সাহিত্যিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় ‘সওগাত’ ও ‘আজাদ’ পত্রিকায় তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি গল্প ছাপা হয়। ওই সময় কলেজ বার্ষিকীতে তাঁর অনুবাদ করা একটি কবিতাও ছাপা হয়েছিল।

উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর বেসরকারি সরবরাহ বিভাগের পরিদর্শকের চাকরি নিয়ে আবু ইসহাক প্রথম কাজ শুরু করেন নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জ তখন দুর্ভিক্ষ কবলিত। নারায়ণগঞ্জে তাঁর বন্ধু কবি আনিসুল হক চৌধুরী দেশের দুর্ভিক্ষের চিত্র একটি উপন্যাসের মাধ্যমে তুলে ধরার ব্যাপারে তাঁকে উত্সাহিত করেন। আবু ইসহাকের সংবেদশীল মনেও বাংলাদেশের মানুষের দুর্যোগ, দুর্ভোগ, কুসংস্কার ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির খপ্পরে পড়ে দেশের অধিকাংশ মানুষই তখন বাঁচার আশায় দিশেহারা। নারায়ণগঞ্জে থাকার সময় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের ট্রেনের একশ্রেণির যাত্রীর মধ্যে এই দিশেহারাদের দেখছিলেন আবু ইসহাক। যারা নিঃস্ব হয়ে পেটের ভাত জোগাড়ের আশায় শহরে গিয়েছিল, কিন্তু শহরে কোনো ভরসা না পেয়ে তারা গ্রামে ফিরে আসে। গ্রামে ফিরেও তারা বাঁচার আশ্বাস পায় না। এইসব দিশেহারা, নিঃস্ব, অসহায় মানুষদের নিয়ে আবু ইসহাক নারায়ণগঞ্জে থাকাকালেই ১৯৪৪ সালে তাঁর প্রথম ও অন্যতম উপন্যাস ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ রচনার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চার বছর পর ১৯৪৮ সালে এটি লেখার কাজ শেষ হয়। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত এটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় ‘নওবাহার’ নামক মাসিক পত্রিকায়। উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় রচনার সাত বছর পর ১৯৫৫ সালে। প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় কলকাতা থেকে এবং পরে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’-তে এমন অনেক কিছুই আছে যা দেশে ও বিদেশে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

আবু ইসহাকের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’। ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ লেখা শুরু করেছিলেন ১৯৬০ সালে এবং শেষ করেন ১৯৮৫ সালে। এটি প্রথমে বাংলা একাডেমির পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’-এ প্রকাশিত হয় ‘মুখরমাটি’ নামে। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় এটির নাম রাখা হয় ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ অর্থাত্ দেশভাগের আগের সময়কে এ উপন্যাসে ধারণ করা হয়েছে। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা নতুন চরের দখল নিয়ে এ উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।

আবু ইসহাকের তৃতীয় ও সর্বশেষ উপন্যাস ‘জাল’। ১৯৮৮ সালে ‘আনন্দপত্র’ নামের একটি পত্রিকার ঈদসংখ্যায় এটি প্রথম ছাপা হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এর পরের বছর। প্রকাশের দিক থেকে তৃতীয় উপন্যাস হলেও এটি লেখা হয় ১৯৫০-এর দশকে। এটি লেখার সময় পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আবু ইসহাক কয়েকটি জাল নোটের মামলার তদন্ত করছিলেন। শোনা যায়, ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ প্রকাশের জন্য প্রকাশকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতেই তিনি গোয়েন্দা কাহিনির আদলে লিখেছিলেন ‘জাল’। পরে ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ এতটাই আলোড়ন তোলে যে তিনি নিজের নামের প্রতি অবিচার হতে পারে ভেবে ‘জাল’কে প্রকাশ না করে বাক্সবন্দি করে রাখেন দীর্ঘ ৩৪ বছর।

আবু ইসহাকের সঙ্গে সাহিত্যের পাঠকের পরিচয় তাঁর গল্পের মাধ্যমে। তবে দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের তুলনায় তাঁর গল্পের সংখ্যা খুব বেশি নয়। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ মাত্র দুটি ‘হারেম’ (১৯৬২) ও ‘মহাপতঙ্গ’ (১৯৬৩)। ২০০১ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘স্মৃতিবিচিত্রা’কে অনেকেই গল্প সংকলন হিসেবে বিবেচনায় আনেন। ‘স্মৃতিবিচিত্রা’য় আসলে তিনি নিজের জীবনের স্মৃতিই তুলে ধরেছেন নকশাধর্মী রচনার আদলে।

আবু ইসহাক রচিত একমাত্র নাটক ‘জয়ধ্বনি’। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে তিনি এটি রচনা করেন। বাংলা একাডেমির কিশোর পত্রিকা ‘ধানশালিকের দেশ’-এ এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। নাতি-নাতনিদের আবদারে তিনি এটি রচনা করেন। মীজানুর রহমানের ‘ত্রৈমাসিক পত্রিকা’র পক্ষী সংখ্যায় ১৯৮৮-৮৯ সালে প্রকাশিত ‘একটি ময়নার আত্মকাহিনী’ নামে তাঁর লেখা গল্প এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতার ছাপ পড়েছে এ নাটকে।

আবু ইসহাকের অপ্রকাশিত রচনার সংখ্যাও খুব বেশি নয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কিছু গল্প, একটি ইংরেজি অভিধানের পাণ্ডুলিপি, কিছু প্রবন্ধ এবং ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’-এর অপ্রকাশিত অংশ, এসব মিলিয়ে অপ্রকাশিত রচনাগুলো নিয়ে মাত্র দু-এক খণ্ডেই রচনাসমগ্র প্রকাশ করা সম্ভব।

আবু ইসহাকের অভিধানচর্চার একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বিশ শতকের ষাটের দশকের শুরুর দিকে (১৯৬২ সালে) চাকরিসূত্রে তিনি পাকিস্তানের করাচিতে ছিলেন। ওই সময়ে করাচিতে বাঙালিদের সাহিত্য সংগঠন প্রবাসী পাঠচক্রের একটি মাসিক সাহিত্যসভার আয়োজন ছিল আবু ইসহাকের বাসায়। ওই সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৫৮-১৯৭৯)। তিনি তখন পাকিস্তান সরকারের উর্দু ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের পরিকল্পনাধীন উর্দু ভাষার অভিধান প্রণয়নের জন্য উর্দু শব্দের ব্যুত্পত্তি নির্ণয়ে নিয়োজিত। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা একাডেমির পরিকল্পনাধীন আঞ্চলিক ভাষার অভিধান নিয়ে তখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে আবু ইসহাকের আলোচনা হয়। ড. এনামুল হকের নেতৃত্বে বাংলা একাডেমি তখন ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের কাজ করছে। ওই দিন আবু ইসহাক কথায় কথায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বাংলা ভাষায় বিশেষণে বিশেষিত একটি অভিধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। ওই আলোচনায় ড. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘করতে পারলে তো ভালোই হয়। তবে আমার বয়সে তা সম্ভব নয়।…যদি কেউ করতে পারে তবে ভালো কাজ হবে বলে মনে করি। তবে অভিধানের নামে যেন ওয়ার্ডবুক না হয়।’

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এসব কথাই আবু ইসহাকের মনে নাড়া দিয়ে যায়। ওইদিনই তিনি বিশেষণে বিশেষিত বাংলা শব্দের একটি অভিধান প্রণয়নের ব্যাপারে মনে মনে সংকল্প করেন। ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’-এর ব্যঞ্জনবর্ণ অংশের ‘কৃতজ্ঞতা স্বীকার’ করতে গিয়ে আবু ইসহাক লিখেছেন, ‘১৯৬২ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনের বিক্ষিপ্ত অবসরে এবং ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত অবসরজীবনে সার্বক্ষণিকভাবে শুধু বিশেষিত শব্দ ও বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকদের রচনা থেকে প্রয়োগ উদাহরণ সংগ্রহ করেছিলাম। অভিধান সংকলনের কাজ শুরু করি ১৯৯১ সালে।’ ১৯৯৩ সালের জুনে বাংলা একাডেমি থেকে অভিধানটির প্রথম অংশ (স্বরবর্ণ) প্রকাশিত হয়। ১৯৯৮ সালে বাংলা একাডেমি ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’-এর ব্যঞ্জনবর্ণ অংশ (ক থেকে ঞ) প্রকাশ করে। বিশাল এই অভিধানের বাকি অংশ প্রকাশে উদ্যোগী ছিল বাংলা একাডেমি। আবু ইসহাকের আকস্মিক মৃত্যুতে অভিধানের কাজ মাঝপথে থেমে যায় এবং বাকি অংশগুলো প্রকাশে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। আবু ইসহাক তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। পুরো অভিধানের পৃষ্ঠাসংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি হতো বলে ধারণা করেছিলেন আবু ইসহাক। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু আমাদের এ রকম একটি বিশাল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করেছে।