Archive

Archive for the ‘সাহিত্য’ Category

রোকেয়ার উত্তরসূরী

ডিসেম্বর 10, 2016 মন্তব্য দিন

rokeya-stampরোখসানা চৌধুরী : বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনই এই উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদী যিনি ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ করেছিলেন একই সঙ্গে। কোনো বিশেষ ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থকে নয়, বরং সকল ধর্ম ও তার ধারকবাহকপ্রহরীরূপী পুরুষকে। অথচ তাঁর নাম নিয়েই ঘটে গেছে সবচেয়ে বড় বিভ্রাট। উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদীর নামের তিনচতুর্থাংশই কৃত্রিমভাবে আরোপিত। পিতৃপ্রদত্ত নামটি ছিল মোসাম্মৎ রুকাইয়া খাতুন। বিয়ের পর তিনি মিসেস আর. এস. হোসেন নামে লিখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তার বিদ্রোহী সত্তাকে আড়াল করে একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম ভদ্রমহিলা অবয়ব প্রদানের অভিপ্রায়ে বেগম রোকেয়া নামে তাঁকে পরিচিত করা হয়। বর্তমানে বেগম রোকেয়া এবং রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনদুটি নামই জনসমাজে প্রচলিত, যার একটি নামও তাঁর প্রকৃত পরিচয় বহন করে না। নামজনিত এই বিভ্রাট অত্র অঞ্চলের অবিকশিত, বিভ্রান্ত নারীবাদী ভাবনার প্রতীক হয়ে ধরা দেয়। রোকেয়াপরবর্তী দীর্ঘ শূন্যতার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রোকেয়াদর্শনের মূল আলোকপাত ঘটেছে প্রধানত তিনটি গ্রন্থে. সুলতানার স্বপ্ন, . পদ্মরাগ এবং ৩. অবরোধবাসিনী।
সুলতানার স্বপ্ন আখ্যানটি নারীবাদী বিশ্বের বা রাষ্ট্রের ভবিষৎ মেনিফেস্টো। পদ্মরাগ উপন্যাস বাস্তবতার সাথে সাযুজ্যতা রেখে তৎকালীন সম্ভাব্য স্বাধীন মনুষ্য অবয়বধারী নারীর রূপরেখা। অবরোধ ও পর্দাপ্রথা সম্পর্কে বেগম রোকেয়ার ভাবনা নিয়ে যত বিভ্রান্তি তার মোক্ষম উত্তর অবরোধবাসিনী গ্রন্থখানি স্বয়ং। তাঁর সমগ্র রচনাবলী এবং জীবনদর্শনে যে বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়েছে তা মোটের উপর নিম্নরূপ

. অবরোধপ্রথার অবলুপ্তি
. দপ্তর ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীপুরুষের সমন্বিত উদ্যোগ
. নারীর বিজ্ঞাননির্ভর কর্ম পরিকল্পনা
. নারীপুরুষের জড়তামুক্ত সহাবস্থান
. নারীর আত্মপ্রত্যয়ী ঋজু লিঙ্গনিরপেক্ষ শরীরী ভাষা (body language)
. দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত নারীর পরিবর্তিত বেশভূষা
. দেশজাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ছুৎমার্গবিহীন একত্রবাস তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্ময়কর প্রকাশ
. ক্ষুদ্র ও কৃষিশিল্পের সম্প্রসারণে নারীপুরুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক অলোচনা

স্থান স্বল্পতার জন্য রোকেয়ারচনার চুম্বক অংশবিশেষ পাঠকের জন্য বর্তমান প্রবন্ধে উপস্থাপন করা গেল:

. ধর্ম প্রসঙ্গে

যখনই কোন ভগ্নি মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন তখনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।তবেই দেখিতেছেন, এই ধর্মগ্রন্থগুলো পুরুষ রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। কোন স্ত্রী মুনির বিধানে হয়তো তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। ধর্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বর প্রেরিত কিনা কেহই নিশ্চিত বলিতে পারে না। যদি ঈশ্বর কোন দূত রমনী শাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত বোধ হয় কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না। এখন আমাদের আর ধর্মের নামে নতমস্তকে নরের অযথা প্রভূত্ব সহা উচিৎ নহে। আরও দেখ, যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ় সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক।

কেহ বলিতে পারেন যে, তুমি সামাজিক কথা কহিতে গিয়া ধর্ম লইয়া টানাটানি কর কেন? তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, ধর্ম শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমনীর উপর প্রভূত্ব করিতেছেন। তাই ধর্ম লইয়া টানাটানি করিতে বাধ্য হইলাম। (রোকেয়া, কাদির, ১৯৭৩, পৃ. ১১১৩)

. পুরুষের স্বরূপ উন্মোচনে

. কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য। (ডেলিশিয়াহত্যা, রোর, ১৬২)

. নারীস্থানে স্বয়ং শয়তানকেই (পুরুষ জাতি) শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, দেশে আর শয়তানী থাকিবে কি রূপে? (সুলতানার স্বপ্ন, ১৩৪)

. তাহারা কিছুই করিবে নাতাহারা কোন ভালো কাজের উপযুক্ত নহে। তাহাদিগকে ধরিয়া অন্তঃপুরে বন্দি করিয়া রাখুন। (, ১৩৫)

. নারী যাহা দশ বৎসরে করিতে পারে, পুরুষ তাহা শতবর্ষেও করিতে অক্ষম।

. ডাকাতি, জুয়াচুরি, পরস্বাপহরণ, পঞ্চমকার আদি কোন পাপের লাইসেন্স তাহাদের নাই। (রোর, ৩৩৪)

. নারীর উদ্দেশ্যে

. আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি (রোর, ২৭৭)। প্রাণীজগতের কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয় নহে। (রোর, ৮৪)

. আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলিএগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ। কারাগারে বন্দীগণ পায়ে লৌহনির্মিত বেড়ি পরে, আমরা স্বর্ণরৌপ্যের বেড়ি অর্থাৎ মল পরি। উহাদের হাতকড়ি, লৌহনির্মিত, আমাদের হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্মিত চুড়ি। কুকুরের গলে যে গলবন্ধ (dog-collar) দেখি উহারই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয়া চিক নির্মিত হইয়াছে। গোস্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া নাকাদড়ি পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের নোলক পরাইয়াছেন!! নোলক হইতেছে স্বামীর অস্তিত্বের (সধবার) নিদর্শন।

. স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দৈর্ঘ মাপেন, স্ত্রী তখন বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ প্রস্থ মাপেন। (পৃ. ২৮)

প্রশ্ন জাগে, রোকেয়ার এই সব বিস্ফোরকভাবনার উৎস কোথায়? ভাই ও স্বামীর সহায়তায় সামান্য বাংলাইংরেজী শিখবার যে ইতিহাস প্রচলিত তাতে অন্তত এই ধরণের র‌্যাডিক্যাল ভাবনার জন্ম নেয়াটা অসম্ভব বলেই মনে হয়। তাই হয়তো রোকেয়া প্রসঙ্গে ঐ সময়ে রবীন্দ্রনাথের নীরব থাকাটাও সঙ্গত বলে মনে হতে থাকে আমাদের। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হই না আর। কারণ, রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য সমকালীন বিশিষ্ট লেখকেরা রোকেয়া সম্পর্কে বিস্ময়কর নীরবতা পালন করেছেন। ঠাকুর পরিবারের মেয়েরা শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি বেশভূষার পরিবর্তন, একাকী বিলেত ভ্রমণ পর্যন্ত ঠাকুর পরিবারের বিদ্রোহ সীমায়িত ছিল। নারীপুরুষের সমতার কাছাকাছি কোন ধারণা তাদের পক্ষে থেকে উত্থাপিত হয়নি। বরং শিক্ষাকে তারা গ্রহণ করেছিলেন সমাজ ও পরিবারে নারীর ঐতিহ্যিক ভূমিকাকে আরো বেশি নিপুণভাবে পরিবেশন করতে। (রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া, গোলাম মুরশিদ পৃ. ১৮৬)

তাই রবীন্দ্ররচনাতেও সত্যিকার অর্থে কোনো উদ্যোগী নারীর প্রতিচ্ছবি চোখে পড়ে না। বিনোদিনী, চারু, সুচরিতা, ললিতা, লাবণ্যকেতকী, কুমুদিনীএরা প্রত্যেকেই লেখালেখি, সামাজিক সাংগঠনিক কাজের মত সৃজনশীল কাজের সাথে জড়িত থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই হৃদয়ঘটিত জটিলতার আবর্তনে ঘুরপাক খেতে খেতে জীবনের সকল সম্ভাবনা পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।

বেগম রোকেয়া যখন লিখছেন, তখন তার সামনে উদাহরণস্বরূপ রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর ছিলেন। যারা ঠিক নারীবাদী না হলেও নারীমুক্তির পথে প্রধান প্রধান বাধাগুলো অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে উপমহাদেশে রোকেয়ার কোন পূর্বসূরী ছিল না। পূর্বসূরী না থাকাটা যৌক্তিক কারণেই মেনে নেয়া যায়। কিন্তুু আজকের একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে ভাবতে হচ্ছে, সেই রোকেয়ার যথার্থ উত্তরসূরী কোথায়? রোকেয়াভাবমূর্তিকে মহিমান্বিত করলেও বাংলাদেশের সমাজ বা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে নিদেনপক্ষে নারী আন্দোলন কিংবা নারীর জীবন যাপনে প্রতিফলন কোথায়? যদিও আশান্বিত হবার মত পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছিলো।

সুফিয়া কামাল সরাসরি রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলামের সদস্যরূপে, স্বপ্রতিষ্ঠিত রোকেয়া সদনের পরিচালনায়, পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে প্রত্যক্ষভাবে রোকেয়াপদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত শিখা গোষ্ঠির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বে জাতীয় মহিলা পরিষদ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নারী পুর্নবাসন, মেয়েদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করবার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ধর্মে ও পরিবারে নারীর অধস্তন অবস্থান, ধর্মীয় আইনে নারীর সন্তান ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার ইত্যাদি নারীমুক্তি প্রসঙ্গে মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা পরবর্তীসময়ে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ও মৌলবাদের আগ্রাসন ঘটে। খোদ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের নানা অনুষঙ্গকে বিতর্কিত করে তোলা হয়। স্বাভাকিভাবেই নারী মুক্তি অথবা নারী অধিকার প্রসঙ্গটি আন্দোলনের মূল ধারা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাধীনতার পর ধর্ষিতা বা নির্যাতিতা হবার বাইরে আর কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এমনকি সশস্ত্র নারী মুক্তিযোদ্ধারাও অধিকাংশই অপরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেছেন। বীর প্রতীক তারামন বিবিকে খুঁজে বের করে সম্মানিত করা হয়েছে স্বাধীনতার ২৫ বছর পর। তাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি অথবা উল্টো দিক থেকে নারীর জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে গভীর ভাবনায় খুব বেশি ইতিবাচক মনে হবার কথা না। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একাত্তর পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা দেশটির প্রশাসকগণ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায়। কিন্তুু পরিবারের অর্থনীতি, একই সাথে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সামলে তুলতে যে নারী ঘর থেকে বেরিয়ে এলোরাষ্ট্র সেই নারীর জন্য রাস্তাঘাট, যানবাহন, কর্মক্ষেত্রকোথাও নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা ভেবে দেখেনি। নারী যেপুরুষের (পিতা, স্বামী অথবা ভাই) ঘর থেকে বের হয় অথবা যেপুরুষের সাথে চলতে হয় (রাস্তাঘাট বা যানবাহন) এবং যাদের সাথে পরিবারের চাইতেও অধিক সময় ব্যয় করে (দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান) সেই পুরুষেরা আজও নারীকে তাদের অপ্রস্তুুত মানসিকতায় মাংসপিণ্ড ব্যতীত সহকর্মী ভাববার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ইভটিজিং, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপসহ নারীর প্রতি সহিংসতার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়ে আছে এভাবেই, যাকে মূল থেকে উৎপাটনের পরিকল্পনা করা হয়নি কখনোই। তাই নারী ঘরেবাইরে নিরাপত্তা, সম্মান, বা ন্যূনতম মানবিক অধিকারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তবে লড়াইটি অসংগঠিত, বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তএকথা প্রাজ্ঞজনেরাও স্বীকার করছেন।

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম (যুদ্ধাপরাধীদের বিচার), নীলিমা ইব্রাহিম (মুক্তিযুদ্ধে আহতনির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন) কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যূতে ফলপ্রসু অবদান রেখেছেন। কিন্তু এইসব ধারাবাহিকতাহীন বিবিধ আন্দোলন অথবা দেশজুড়ে গৃহকর্মীদের পোশাকশিল্প কারখানায় কর্মীরূপে রূপান্তরনারীমুক্তি কিংবা নারীর অধিকার প্রসঙ্গে রোকেয়া বর্ণিত নারীর সার্বিক জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। যেমনভাবে বেগম রোকেয়ার পরে আর কোনও লেখকের (নারী বা পুরুষ) রচনায় যথাযথ রূপে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের সাথে দ্বন্দ্বসংশিষ্টতার প্রেক্ষাপটে নারীর সম্ভাব্য স্বাধীন, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন অবয়বকে নিরূপণ করা যায়নি।

নব্বই দশকে এমত বিরাজমান স্থবির সময়ের মাঝপথে তসলিমা নাসরিনের আগমন পুরো পরিস্থিতিকে পাল্টে দেয়। ধর্ম, সমাজ ও পুরুষতন্ত্রকে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে তার প্রকাশিত আক্রমণাত্মক বক্তব্য নিয়ে দেশ ও বহির্বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মৌলবাদী ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রকাশ্যে তার হত্যামূল্য নির্ধারণ করলে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন। তার গ্রন্থগুলি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভের পাশাপাশি বাজেয়াপ্তও হয়। প্রশ্ন হচ্ছে তসলিমা নাসরীন যা যা বলেছিলেন, তা কি খুব অসম্ভব, উদ্ভট, আকস্মিক আবিষ্কৃত নতুন কোনো তত্ত্ব? ধর্ম, নারী এবং সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে তার আগেপরে ড. আহমদ শরীফ, . হুমায়ুন আজাদ, আরজ আলী মাতুব্বরসহ আরো বহু মনীষীই বিদ্বেষ, কটূক্তি, বিরুদ্ধভাব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাদের দেশত্যাগ করতে হয়নি। আমজনতার সমাবেশে এঁদের নাম পর্যন্ত অনেকে অবগত নন। প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে বেগম রোকেয়া একশ বছর আগেই মত প্রকাশ করেছেন। পার্থক্য হল রোকেয়াকে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর তসলিমা নাসরিন বক্তব্যকে আরো বেশি তথ্যপ্রমাণ সহকারে উপস্থাপন করাতে তার মাথার মূল্য ধার্য হয়ে গেছে।

বলে রাখা ভালো, বর্তমান আলোচনাটি তসলিমা নাসরীনকে নিয়ে নয়, তার রচনা কুশলতার বিচার নিয়েও নয়। কেবল একটি প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশে নারীবাদের উদ্ভববিকাশের আশ্চর্য পরস্পরহীনতার যোগসূত্র অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হওয়া যায়। অর্থাৎ রোকেয়া যদি তার রচনা প্রত্যাহার না করতেন, তবে মাথার মূল্য নির্ধারণের আগেই অজানা অন্ধকারে তাকে হারিয়ে যেতে হত। এই আশ্চর্য মূল্য নির্ধারণের দুর্ভেদ্য বেষ্টনীকে অতিক্রম করা যায়নি বলেই কি নারীবাদের সহজস্বাভাবিক বিবর্তন ঘটেনি অত্র অঞ্চলে? তসলিমা নাসরীনের আগমন ও উপস্থিতি তাই পূর্বাপর সংযোগবিচ্ছিন্ন। বেগম রোকেয়ার মতই। এক শতাব্দী আগের প্রেক্ষাপট বলেই তাকে মহিমার দৃষ্টিতে বিচার করা সম্ভব হচ্ছে।

কথা হচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের নারী গ্রন্থে এবং বেগম রোকেয়ার রচনাতেও যতখানি পুরুষবিদ্বেষ এবং ধর্ম বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে, ততখানি নয় তসলিমা নাসরীনে। একটি সাক্ষাৎকারে (৭১টিভি, ৮ আগষ্ট ২০১৪) তিনি সেই কথা স্বীকারও করেছেন। অথচ রোকেয়া নারীজীবন সম্পর্কে যেখানে থেমে গিয়েছিলেন, তসলিমা নাসরিন অন্য সব কিছুর সঙ্গে নারীর সেই অকথিত যৌনজীবন সম্পর্কে মুখ খুললেন। অপ্রস্তুত বাঙালি সমাজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত চমকে গেল। মূলত তসলিমা নাসরিনের বিবৃত নারীবাদের সমালোচনা হিসেবে দুটি বিষয়কে গণ্য করেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ কিংবা সমাজ তাত্ত্বিকেরা।

. দেশকালসমাজইতিহাসের প্রেক্ষিতে বাঙালি নারী মুক্তির বিষয়টি সমন্বিত করে দেখতে না পারা।

. ভাবনাসমূহের বিচ্ছিন্নতা, ব্যক্তিগত ক্ষোভের তীব্রতা সামগ্রিক বিষয়টির তত্ত্বীয় রূপদানে ব্যর্থতা।

তবে তাঁর এইসব সীমাবদ্ধতাকে সমাজের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দিক নির্দেশনার অপরিপক্কতার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ (নারী,পুরুষ ও সমাজ/পৃ.১২৩)। তাছাড়া, তার রচনাবলীর সামগ্রিক নিবিড় পাঠেরও অভাব রয়েছে বলে বোধ হয়। যেভাবে রোকেয়ারচনার বিদ্রোহী প্রতিবাদী অংশগুলো আজো জনসমাজে অজানিতই রয়ে গেছে। অর্ধশিক্ষিত জাতি, যারা আজো বিনোদন খুঁজে পায় দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান গ্রন্থে, অথবা ধর্মীয় গ্রন্থের (মাকছুদুল মোমেনীন) দাম্পত্য জীবন অংশে, তারা যে নারী রচিত গ্রন্থে নারীর যৌনজীবন সম্পর্কে উন্মুক্ত আলোচনায় গোপন আনন্দ খুঁজবে আর প্রকাশ্যে তার মৃত্যুদণ্ড দাবি করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে, বিচ্ছিন্নভাবে হলেও নারীর প্রধান দুটি শত্রু মৌলবাদ ও পুঁজিবাদকে চিহ্নিত করতে তিনি ভুল করেন নি।

দীর্ঘ গণআন্দোলন এবং সশস্ত্র একটি জনযুদ্ধের পরেও স্বাধীন দেশে নারীমুক্তির বিষয়টি কখনো গুরুত্ব পায়নি। তাই দেখা যায় অতীত ইতিহাসেও প্রীতিলতা কিংবা ইলা মিত্র অথবা একাত্তরের বীরযোদ্ধা তারামনদের যুদ্ধক্ষেত্রেও জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নারীকে মানসিকভাবে ভেঙেচুরে দেবার জন্য ধর্ষণ নামক নির্যাতনটিকে ক্রমাগত ব্যবহার করা হয়। ইলা মিত্রসহ অগনিত নারী যার শিকার ছিলেন। তারামন এবং আরো অনেককেই প্রথমে পরীক্ষাস্বরূপ রান্নার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে তারা যুদ্ধে যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে জয় করার যুদ্ধটি নারীর প্রথম যুদ্ধ। তা সংসারই হোক কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র। এতগুলো যুদ্ধে উত্তীর্ণ হওয়ার মাঝপথে মানসিক দাসত্বের কাছে পরাজিত হয়ে সংসারের একটি নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবরূপে নারী ঘরে ফিরে যায়। এই ফিরে যাওয়ার মিছিলটিই দীর্ঘ এবং হতাশাব্যঞ্জক।

বেগম রোকেয়া এবং হুমায়ুন আজাদের রচনার যেখানে সাদৃশ্য দেখা যায় তা হলো তারা দুজনেই নারী মুক্তির ক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়নকে এতটা জোরালোভাবে প্রাধান্য দেন যেখানে পুরুষের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই ম্রিয়মান হয়ে পড়বে। উনিশশতক পূর্ব নারীর মত পুরুষের অস্তিত্ব সেখানে আবছায়ার আড়ালে ঝাপসা হয়ে থাকবে।

. নন্দনকাননতুল্য নারীস্থানে নারীর পূর্ণ আধিপত্য। পুরুষেরা মর্দানায় থাকিয়া রন্ধন করেন, শিশুদের খেলা দেন (সুলতানার স্বপ্ন/পৃ. ১১৩)

. পুরুষেরা বড় বড় কলকারখানায় যন্ত্রাদি পরিচালিত করেন; খাতাপত্র রাখেন– …তাহারা কেরানী ও মুটে মজুরের কাজ করিয়া থাকেন। (সুলতানার স্বপ্ন/পৃ. ১১৪) এদিক থেকে দুজনার ভাবনাই প্রবলভাবে র‌্যাডিক্যাল। হুমায়ুন আজাদ মাতৃত্বকে নারী মুক্তির পথে প্রতিবন্ধকরূপে উপস্থাপন করেছেন।

. নিজের ভবিষ্যতের জন্য নারীকে ত্যাগ করতে হবে পিতৃ ও পুরুষতন্ত্রের সমস্ত শিক্ষা ও দীক্ষা; ছেড়ে দিতে হবে সুমাতা, সুগৃহিনী, সতীর ধারণা; … তাকে কান ফিরিয়ে নিতে হবে পুরুষতন্ত্রের সমস্ত মধুর বচন থেকে, তাকে বর্জন করতে হবে পুরুষতন্ত্রের প্রিয় নারীত্ব। তাকে সাবধান হতে হবে পুরুষতন্ত্রের সমস্ত মহাপুরুষ সম্বন্ধে, সন্দেহের চোখে দেখতে হবে সবাইকে। কেননা কেউ তার মুক্তি চায়নি। (নারী/হু. আজাদ পৃ. ৩২৬)

. নারীর গর্ভধারণ একান্ত পাশবিক কাজ। নারীকে কি চিরকালই ধারণ করে যেতে হবে গর্ভ, পালন করে যেতে হবে পশুর ভূমিকা? …পুরুষতন্ত্রের শিক্ষার ফলে নারী আজো মনে করে গর্ভধারনেই তার জীবনের সার্থকতাগর্ভবতী হওয়ার মধ্যে জীবনের কোনা সার্থকতা, মহত্ত্ব, পূণ্য নেই। আমূল নারীবাদীরা মনে করেন মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর নয়, পুরুষকে উদ্ভাবন করতে হবে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প পথ; এবং কয়েক শ বছর পর গর্ভধারণ যে আদিম পাশবিক কাজ বলে গণ্য হবে তাতে সন্দেহ নেই। (/পৃ৩২০)

রোকেয়া পদ্মরাগ কিংবা সুলতানার স্বপ্নে যেভাবে নারীকে প্রশাসনিক দাপ্তরিক কাজে ব্যাপৃত দেখান সেখানে কোথাও নারীর মাতৃরূপটির উপস্থিতি নেই। অথবা ঘরেবাইরে নারীর একাধিক ভূমিকা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যেসব জটিলতা সৃষ্টি হয়ে থাকে সেই বিষয়গুলো সঙ্গত কারণেই তিনি দৃষ্টি এড়িয়ে গেছেন। নারী মুক্তির পথে বিবাহসংসারপুরুষতান্ত্রিক সমাজের সকল শৃঙ্খলকে তিনি উপেক্ষা করতে বলেছেন। তবে কি ধরে নেয়া যায়, র‌্যাডিক্যাল নারীবাদীদের মত তিনিও নারীপুরুষের জীববৈজ্ঞানিক বৈষম্যে বিশ্বাসী ছিলেন? রোকেয়া একটি বিষয়েই সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করে গেছেন। তা হল নারীর যৌনজীবন। হয়তো লেখালেখির শুরুতেই ধর্ম বিষয়ক বিদ্রোহ প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হয়ে সতর্ক হয়েছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় অবরোধ ও পর্দাপ্রথা নিয়ে ক্রমাগত স্ববিরোধী বক্তব্য প্রকাশে। নিদেনপক্ষে তিনি নারীশিক্ষার প্রকল্পটি চালু রাখতে মরণপণ করেছিলেন। (অন্যত্র জানা যায়, তিনি মেয়েদের জন্য কলেজ খুলতেও আগ্রহী ছিলেন।) তাই শেষ জীবনে অনেক রকমের আপোসকামিতার সঙ্গে সমঝোতা করতে থাকা এই যুগান্তরী মহামানবীর তীব্র ক্ষোভ অপ্রকাশিতও থাকেনি।

. আমার স্কুলটা আমার প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয়। একে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি সমাজের অযৌক্তিক নিয়ম কানুনগুলিও পালন করছি। (সওগত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনকে।)

. তবু পর্দা করছি কেন জানেন? বুড়ো হয়ে গেছি, মরে যাব। ইস্কুলটা এতদিন চালিয়ে এলাম, আমার মরার সঙ্গে সঙ্গে এও যদি মরে সেই ভয়ে। (ইব্রাহিম খাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকার)

. জীবনের ২৫ বছর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইতেছি। (রোর/৩৮০)

. হাড়ভাঙ্গা গাধার খাটুনিইহার বিনিময় কি জানিস? … ভাড় লিপকে হাত কালি অর্থাৎ উনুন লেপন করিলে উনুন তো বেশ পরিষ্কার হয়, কিন্তু যে লেপন করে তাহারই হাতে কালিতে কালো হইয়া যায়। আমার হাড়ভাঙা খাটুনির পরিবর্তে সমাজ বিস্ফারিত নেত্রে আমার খুঁটিনাটি ভুল ভ্রান্তির ছিদ্র অন্বেষণ করিতেই বদ্ধপরিকর। (রোর/পত্র/পৃ.৪৯৯)

বিদ্যাসাগর পরাধীন দেশে বিধবা বিবাহ আইন পাস করিয়েছিলেন (১৮৫৬) কিন্তু তার সার্থক প্রয়োগ দেখে যেতে পারেননি। এত বছর পর বিধবা বিবাহে কোন সামাজিক বা আইনি বাধা না থাকলেও যেনতেন ভাবে বিবাহ, সন্তান ও সংসারই যে নারীজীবনের প্রধান লক্ষ্য ও গন্তব্যসেই শৃঙ্খল থেকে নারী আজো বের হতে পারেনি। যেখানে এক শতাব্দী আগেই রোকেয়া উচ্চারণ করেছিলেন নারীমুক্তির অমোঘ বাণী:আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসার ধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে। (পদ্মরাগ/রোর/৪৫৩)

রোকেয়ারচনায় আধুনিক নারীর পূর্ণাঙ্গ জীবনের স্বয়ম্ভূ রূপরেখার নির্মাণ থাকলেও আজকের বাংলাদেশে সেই নারী কোথায়? শিক্ষাসুযোগঅধিকার সবকিছুই হয়তো প্রত্যাশিত রকমের বৈষম্যরহিত হয়ে যায়নি, কিন্তুু যতটুকু দূরত্ব পেরোনো গেছে, ছায়াভূতের মতো সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছে রোকেয়া কথিত ানসিক দাসত্বস্বয়ং নারীর সমাজের, উভয়ত। নারী আজ অবোরোধের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষিত, শিল্পিত, স্বাধীন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রীতদাসে রূপান্তরিত পুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণকারী ছায়ামূর্তি মাত্র। আজকের যুগের এই নারীদের জন্য রোকেয়ার কণ্ঠই পুনরায় প্রতিধ্বনিত হোক:অতএব জাগো, জাগো গো ভগিনী।

প্রথমে জাগিয়া উঠা সহজ নয় জানি; সমাজ মহা গোলযোগ বাধাইবে জানি, ভারতবাসী মুসলমান আমাদের জন্য কৎলএর (অর্থাৎ প্রাণদণ্ডের) বিধান দিবেন এবং হিন্দু চিতানল বা তুষানলের ব্যবস্থা দিবেন জানি! (এবং ভগ্নিদিগেরও জাগিবার ইচ্ছা নাই জানি!) কিন্তু সমাজের কল্যাণের নিমিত্ত জাগিতে হইবেই। কারামুক্ত হইয়াও গ্যালিলিও বলিয়াছিলেন, কিন্তু যাহাই হউক পৃথিবী ঘুরিতেছে (but nevertheless it does move)!! … সমাজের সমঝদার (reasonable) পুরুষেরা প্রাণদণ্ডের বিধান নাও দিতে পারেন, কিন্তু unreasonable অবলা সরলাগণ; (যাহারা যুক্তি তর্কের ধার ধারে না, তাহারা) শতমুখী ও আঁইস বঁটির ব্যবস্থা নিশ্চয় দিবেন, জানি!! (রোকেয়া রচনাবলী/পৃ.২০)

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

রাসুল প্রেমিক কবি গোলাম মোস্তফা

ডিসেম্বর 10, 2016 মন্তব্য দিন

golam-mustafa. এম এ সবুর : বাংলা ভাষায় ইসলামি ভাবধারার সাহিত্য রচনায় গোলাম মোস্তফার ভূমিকা অনন্য। মহানবি হযরত মুহম্মদ সা. এর সিরাত রচনায় তার কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। সাহিত্যের সব শাখায় তার অবাধ বিচরণ থাকলেও কবি হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। আর তার কবিতাগানের বেশির ভাগই রাসুলপ্রেমে উজ্জীবিত। তার রচিত বিশ্বনবী গদ্য গ্রন্থখানি যেমন বাঙালি পাঠক সমাজে ব্যাপক সমাদৃত তেমনি তার রচিত ইয়া নবী সালাম আলাইকা কবিতাখানি মুসলিম ঘরে ঘরে মিলাদ মাহফিলে বহুল পঠিত। তাছাড়া রাসুল সা. এর প্রশংসায় তার রচিত নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি আমার মোহাম্মদ রাসুল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রাসুল ইত্যাদি গানকবিতা মুসলিম সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়। রাসুল সা. এর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে তার সাহিত্য জীবনের শুরুর দিকেই তিনি হযরত মোহাম্মদ কবিতা রচনা করেন। এ কবিতায় তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবের অন্ধকার অবস্থার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে রাসুল সা.কে সেই অন্ধকার বিদারক আখ্যা দিয়ে বলেন,

এই ঘোর দুর্দিনে এলো কে গো বিশ্বে,
উজলিয়া দশদিশি, তরাইতে নিঃস্বে!
মুখে তার প্রেমবাণী, করুণা ও সাম্য,
বিশ্বের মুক্তি ও কল্যাণ কাম্য।

প্রায় একই ধ্বণী উচ্চারিত হয়েছে তার ফাতেহাদোআজদহম কবিতায়। এতে তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর জন্মদিনের বর্ণনা দিয়ে এবং তাঁকে স্বাগত জানিয়ে লিখেন,

আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম।
দিকে দিকে উঠিতেছে নব ছন্দে বন্দনার গান
স্বাগতম! স্বাগতম! ধরণীর হে চিরকল্যাণ!

হরযত মুহম্মদ সা. শুধু মুসলিম কিংবা আরবদের জন্য নয় বরং বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তাই তাঁর জন্মোৎসব শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত নয় বরং বিশ্ববাসীর জাতীয় উৎসব। এ জন্য গোলাম মোস্তফা রাসুলের জন্মোৎসবে বিশ্বের সব মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন,

হে নিখিল ধরাবাসী! মুসলিমের লহ নিমন্ত্রণ,
এ উৎসব নহে শুধু আমাদের একান্ত কখন!
নাসারাখৃষ্টান এসো, এসো বৌদ্ধ চীন,
মহামানবের এ যে পরিপূর্ণ উৎসবের দিন।

রাসুলপ্রেমিক কবির কল্পনায় হযরতের জন্মদিনে বিশ্ব প্রকৃতিতে এক মহোৎসবের আয়োজন হয়েছিল। ঐতিহাসিকদালিলিক ভিত্তি না থাকলেও রাসুলভক্ত কবি মনে করেন তাঁর জন্মদিনে সারা বিশ্ব বেহেস্তের সুগন্ধিতে মোহিত হয়েছিল, সেদিন আকাশেবাতাসেও মহাআনন্দের জয়গান ধ্বনিত হয়েছিল; ফিরেস্তাগণও চঞ্চল চিত্তে সে আনন্দে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। কবির ভাষায় রাসুলের জন্মদিনের দৃশ্য এ রকম,

আকাশ দিয়েছে তার রক্ত রাঙা অরুণকিরণ,
বেহেশ্তের সুধাগন্ধ আনিয়াছে মৃদু সমীরণ;
ছুটাছুটি করিতেছে দিকে দিকে ফেরেশ্তার দল,
সারা চিত্ত তাহাদের আজিগো যে পুলক চঞ্চল!
এসেছে হাজেরা বিবি, আসিয়াছে বিবি মরিয়ম,
আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম!

মক্কার কুরাইশ বংশে হযরত মুহম্মদ সা.-এর জন্ম কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয় বরং আলকুরানের বর্ণনা মতে মহানবি সা. এর পূর্ব পুরুষ হযরত ইব্রাহীম ও তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আ.- এর প্রার্থনার ফল এবং হযরত ঈসা আ.-এর সুসংবাদ। আর গোলাম মোস্তফার ভাষায়,

আমিনা মায়ের কোলে খুদা রাখ্ল সে সওগাত
ইবরাহিমের দোয়া সে আর ঈসার সুসংবাদ

হযরত মুহম্মদ সা. চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার অদূরে হেরা পর্বতে নবুওয়াত লাভ করেন। এ সময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত জিব্রাইল . মুহম্মদ সা.-এর নিকট প্রথম অহি নিয়ে আসেন। মহানবি সা.-এর নবুওয়াত লাভ ইসলামের ইতিহাসে তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এ নবুওয়াতের মাধ্যমে আধুনিক ইসলাম তথা মুহম্মদী শরিয়তের যাত্রা শুরু হয় এবং আইয়্যামে জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগের অবসানের সূত্রপাত ঘটে। নবুওয়াত লাভের ঐতিহাসিক এ ঘটনা কবি গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাসহালীতে বর্ণিত হয়েছে এভাবে

চক্রবালে উঠ্ল যেন ভাগ্যচাঁদিমা
দূর হ সব বিশ্ব হতে আঁধার কালিমা!
ছুট্ল না তা কিরণ বটে অল্প কিছুক্ষণ,
রেসালাতের চাঁদে ছিল মেঘের আবরণ;
কালের স্রোতে চল্লিশ সাল গুজরে গেল যেই
হেরাগিরির উর্ধে সে চাঁদ উদয় হল সেই!

নবুওয়াত লাভের মাধ্যমে হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদ প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়ে প্রথমে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকদের কাছে তাওহিদ তুলে ধরেন। কিন্তু কুরাইশ নেতা আবু জহল ও তার অনুসারীরা রাসুলের দাওয়াত কবুল করেনি বরং বিরোধীতা করেছে। এমনকি তাওহিদ প্রচার বন্ধ করার লক্ষ্যে হযরত মুহম্মদ সা. কে হত্যার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। আবু জহলের এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা গোলাম মোস্তফার লিখনীর মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে এভাবে

এ বিপুল সঙ্ঘমাঝে যে আজি দাঁড়াবে
ছিন্ন করি আনিবারে মোহাম্মদশির,
পঞ্চশত স্বর্ণমুদ্রা, শত উষ্ট্র সনে
সানন্দ হৃদয়ে তারে দিব উপহার।

হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর মনোনীত নবী ও রাসুল। তাঁর রক্ষক আল্লাহ নিজে। মানুষের কোন ষড়যন্ত্র ও অনিষ্ট তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। যে কুরাইশরা হযরতকে নির্যাতননিপীড়ন করে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছিল এবং যারা রাসুল সা. কে হত্যা করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছিল; মাত্র আট বছর পর তারাই মক্কা বিজয়ের সময় মুহম্মদ সা.-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। যে উমার রা. মহানবিকে হত্যার জন্য মুক্ত তরবারী নিয়ে ছুটেছিল সে উমারই ইসলাম কবুল করে হযরতের একনিষ্ট সহচর, খলিফা হয়ে বিশ্বের বুকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। ঐতিহাসিক এসব ঘটনা কবি তুলে ধরেছেন এভাবে,

তারপর এলো আরবমরুতে খোদার রসূলনূরন্নবী,
কোরেশ আসিল কতল করিতে বিশ্বের সেই আলোকরবি
বলো কে মরিল? মোহাম্মদ? না আততায়ী সেই কোরেশ জাতি।
ঘাতক শেষে যে রক্ষক হয়ে ধারায় রাখিল অতুল খ্যাতি।

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন অসাধারণ গুণে গুণান্বিত একজন মহামানব। দুর্বলকে তিনি কখনও বঞ্চিত করেননি বরং সাহায্য করেছেন। পথ হারানো মানুষদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ধনীগরিব তার কাছে ছিল অভিন্ন। তাঁর কাছে মানুষের কোন ভেদাভেদ ছিল না; ছিল না সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও বৈষম্য। ক্ষমা, দয়াপ্রেম ছিল তাঁর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ জন্য আল্লাহ তাআলা হযরত মুহম্মদ সা. কে বলেছেন, নিশ্চয়ই আপনি উত্তম চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত (আল কুরআনুল কারীম, ৬৮:)। মহানবি হযরত মুহম্মদ সা.-এর উত্তম চরিত্রের গুণাবলীকে গোলাম মোস্তফা কবিতায় চিত্রিত করেছেন এভাবে

দূর্বলে করে না সে নিপীড়ন হস্তে
আর্তেরে তুলে দেয় শুভাশীষ মস্তে,
ভ্রান্তরে বলে দেয় মঙ্গল পন্থা
রক্ষক, বীর নহে ভক্ষক হন্তা।
ভিক্ষুকে টেনে নেয় আপনার বক্ষে,
ছোটবড় ভেদজ্ঞান নাহি তার চোক্ষে,
মানুষের অকাতরে করে না সে ক্ষুদ্র,
হোক্ না সে বেদুইন হোক্ না সে শুদ্র।

রাসুল সা. ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি ছিলেন প্রেমভালবাসা, ক্ষমান্যায়ের মূর্তপ্রতীক। তাঁর প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল না কখনও। যারা তাঁকে অত্যাচারনির্যাতনে জর্জরিত করেছিল তাদেরকেই উদার চিত্তে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁর ক্ষমার দৃষ্টান্ত অসংখ্য। মক্কা বিজয়ের দিনে সাধারণ ক্ষমা তারই উজ্জলতম নিদর্শন। মক্কার কাফির কুরাইশরা নিজেদের অপকর্মের কারণে মক্কা বিজয়ের দিনে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। যে কোন শাস্তির জন্য তারা প্রস্তুতও ছিল। কিন্তু ক্ষমার অনুপম আর্দশ মহানবি হযরত মুহম্মদ সা. সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। কবি গোলাম মোস্তফা হযরতের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা উল্লেখ করে বলেন,
কহিলেন নবী হাসি তখন

ভেবেছো ঠিকই বন্ধুগণ!

কঠোর দন্ড হবে বিধান!

ধরো সে দকহিনু সাফ

সব অপরাধ আজিকে মাফ,

যাও সবে, দিনু মুক্তিদান।

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবিরাসুল। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ; রাসুলপ্রেমে নিমজ্জিত ও প্রবল আবেগে আপ্লুত হয়েও সে কথা ভুলে যাননি কবি গোলাম মোস্তফা। তবে হযরত মুহম্মদ সা. মানুষ হলেও সাধারণ মানুষ নন, তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল; যা মহানবি সা. নিজেই বলেছেন। আর তা গোলাম মোস্তফার ভাষায়,

আমার চেয়ে তোমরা ত কেউ বান্দাতে নও কম,

তুমিআমি একবরাবর দুর্বল ও অক্ষম।

তোমায় আমায় প্রভেদ যেটুক নয়ক সে অদ্ভুত

আমি শুধু বান্দা নহিআমি খোদার দূত।

ইসলামের মূলমন্ত্র তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। কিন্তু খৃষ্টানরা হযরত ঈসা আ. কে এবং ইহুদীরা হযরত ওযায়ের আ. কে আল্লাহর পুত্র বলে তাওহিদ পরিপন্থী বিশ্বাস করে। তাই হযরত মুহম্মদ সা. নিজেই তাঁর অনুসারীদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তারা যেন তাঁকে ইহুদীখৃষ্টানদের মত আল্লাহর পুত্র বলে ধারণা না করে। রাসুল সা.-এর এই নিষেধাজ্ঞা গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাসহালী তে উল্লেখ আছে এভাবে,

নাসারাদের মতন কেহই পড়ো না ধোঁকায়

খুদার বেটা বলে যেন পূজো না আমায়।

মহানবি সা. এর অনুপম আদর্শ ও নির্দেশনাবলী অনুসরণ করে মুসলিমরা এক সময় উন্নতি ও সম্মানের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। কিন্ত বিশ শতকের মুসলিম সমাজ ছিল নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত। বিভিন্ন দেশে তারা ছিল দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও বিভিন্ন কুসংস্কারে অধঃপতিত ছিল মুসলিম সমাজ। বিশ শতকের মুসলমানদের এসব অধঃপতনের জন্য রাসূলের আদর্শচ্যুত হওয়ার বিষয় সমকালীন দার্শনিক ও কবি ইকবাল রচিত শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ আছে। আর তা গোলাম মোস্তফা অনুবাদ করেন এভাবে,

কারা, বল, ত্যাগ করেছে আমার পাক রাসূলের পাক বিধান,

মুহম্মদের পয়গাম আর তোমাদের কারো নাই স্মরণ।

তবে হতাশনিরাশ হওয়ার কারণ নাই, মুসলমানগণ আবারও রাসুলের আদর্শ অনুসরণ করলে তাদের হৃত গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। তাই কবি অধঃপতিত মুসলিমদেরকে রাসুলের ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন,

তুচ্ছরে আজ করগো উচ্চপ্রেমে ও পূণ্যে কর মহৎ

মুহম্মদের নামের আলোকে উজ্জ্বল কর সারা জগৎ।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ৯ ডিসেম্বর ২০১৬

বেগম রোকেয়া’র “সুলতানা’র স্বপ্ন”র একটি অংশ

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

sultanas-dream-5

উনিশ শতকের মুসলিম কবি দাদ আলী মিঞা

ডিসেম্বর 5, 2016 মন্তব্য দিন

kobi-dad-ali-miah-koborঊনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি হিসাবে দাদ আলী বিশেষ স্থান অধিকার করেছিলেন। ব্যক্তিগত অনুরাগ ও অনুভূতিকে কবি দাদ আলী অপূর্ব ছন্দে প্রকাশ করে খ্যাতি অর্জন করেন। কবি দাদ আলী মিঞা ১৮৫২ সালে ২৬ জৈষ্ঠ ১২৫৯ বঙ্গাব্দে বর্তমান কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের আটিগ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মৃত নাদ আলী মিঞা। ছোটবেলায় কবির পিতা প্রচেষ্টায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষকের কাছে আরবী, ফারসী, উর্দু ও বাংলা শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি লোক কাহিনী, ধর্ম কাহিনী, ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা, এমনকি চিকিৎসা ও ফারায়েজ বিষয়েও কাব্য রচনা করেন।

যতদূর জানা যায়, কবি দাদ আলীর পিতা নাদ আলীও ছিলেন সাহিত্য অনুরাগী, লেখালেখিও করতেন। পিতার সাহিত্য বিষয় নিয়ে লেখালেখি এবং ২টি কষ্টের ঘটনা দাদ আলীকে কাব্য লেখার প্রতি অনুপ্রাণীত করে। ২টি ঘটনার একটি ছিলো পত্নীর আকস্মিক অকাল মৃত্যু এবং প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও অসুস্থতার কারণে মদিনা শরীফ জেয়ারত করতে যেতে না পারার কষ্ট থেকে সে বেদনায় কবি আশেকে রাসুল কাব্য লেখেন। তার কাব্যগুলোতে মদিনা জিয়ারতের হৃদয় বেদনার হাহাকার ও অশ্রুতে উচ্ছ্বাস প্রধান। এসব কষ্টের কথাগুলো তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যেও পাওয়া যায়।

কবি দাদ আলী মিঞার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, আশেকে রাসুল (১ম খন্ড, ২য় খন্ড), শান্তিকুঞ্জ, মসলা শিক্ষা, ভাঙ্গা প্রাণ (১ম ও ২য় খন্ড), দেওয়ানে দাদ, সমাজ শিক্ষা, ফারায়েজ (মুসলমানী দায়ভাগ পদ্যে লিখিত), সংগীত প্রসুন, উপদেশমালা, এলোপ্যাথিক জ্বর চিকিৎসা, আয়ুর্বেদ রত্ন, আখেরী মউত, জাতিশত্রু বড় শত্রু। কবি দাদ আলী রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে মুসলমানী দায়ভাগ নিয়ে লেখা ফারায়েজ কাব্যগ্রন্থটি তাঁকে আকাশচুম্মি জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

ইউসুফ আলী, এহসান আলী, মুনসুর আলী, ইদ্রিস আলী ও আমেনা বেগম নামের ৭ সন্তানের জনক ইসলামীক ঘরানার এই মহান কবি দাদ আলী ১৯৩৬ সালে ৫ পৌষ ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে আটিগ্রাম নিজ গ্রামে মৃত্যুবরন করেন। কবির ৭ সন্তানের কেউই বেঁচে নেই। বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে মহান এই কবির সঠিক ইতিহাস জানতে তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষনের জন্য কবির বাস্তুভিটা আটিগ্রামে কবি দাদ আলী স্মৃতি পাঠাগার নির্মাণ ও তার কবরটি সংরক্ষনের দাবি জানিয়েছে এলাকার সচেতন মহল।

দেশের ইসলামিক ঘরানার অন্যতম কবি দাদ আলী মিঞার মৃত্যুর ৮০ বছর অতিক্রান্ত হলেও এই মহান কবির বাস্তুভিটা ও সৃষ্টিশীল অমর কাব্যগ্রন্থগুলো সংরক্ষণে সরকারী কিংবা বেসরকারীভাবে কোন উদ্দোগ গ্রহণ করা হয়নি। কবির সন্তানরা জীবিত থাকাবস্তায় তাঁর মৃত্যু ও জন্ম দিবস পালন করলেও সন্তানদের কেউ বেঁচে না থাকায় অনেক বছর ধরে কবির জন্ম ও মৃত্যু দিবসটি আর পালন করা হয় না। এমনকি কবি ও কবি পত্নীর পাশাপাশি যে কবরটি রয়েছে অযত্ন আর অবহেলায় সেটিও আগাছায় ঢেকে গিয়ে ও ভেঙ্গেচুরে বিলিন হতে চলেছে।

মৃত্যুর ৭৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও এই মহান কবির বাস্তুভিটাও সৃষ্টিশীল অমর কাব্যগ্রন্থগুলো সংরক্ষণে সরকারিবেসরকারিভাবে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

কবির সন্তানরা জীবিত থাকাকালে তাঁর মৃত্যু ও জন্ম দিবস পালন করলেও সন্তানদের কেউ বেঁচে না থাকায় তাও আর পালন করা হয় না।
আটিগ্রামে কবির বাস্তুভিটায় কবি দাদ আলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে পাশা পাশি শায়িত কবি ও কবি পত্নীর কবর ওরয়েছে অযত্ন আর অবহেলায়। আগাছায় ঢেকে গিয়ে ভেঙ্গে চুরে বিলিন হতে চলেছে।

কবি দাদ আলীর আত্মীয় গোলাম জিলানী ও কবি ভক্ত গ্রাম্য চিকিৎসক কবি আব্দুর রাহীম (৬০) বলেন, গত গ্রায় ৪৫ বছর যাবৎ কবি দাদ আলীর স্মৃতি সংরক্ষনে বিভিন্ন সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করে আবেদন জানালেও কেউ কোন ভুমিকা রাখেনি।

এমনকি উক্ত গ্রামে কবি দাদ আলী মিঞা জামে মসজিদ ছিল। সেই মসজিদের ফলক থেকেও কবির নাম মুছে ফেলা হয়েছে। কবির মৃত্যুর পর তাঁর বিষয় সম্পত্তি এলাকার ভূমি দস্যুরা দখল করে নিয়েছে। উনিশ শতকের এই গুণী কবির নবীপ্রেম ও সাহিত্য সাধনার কারণে হাজারও বছর ধরে জাতি তাকে স্মরণ করবে।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ২১ নবেম্বর ২০১৬

পারস্য কবি ওমর খৈয়াম

ডিসেম্বর 4, 2016 মন্তব্য দিন

omar-khaiyyam

বাংলা উপন্যাসের প্রথম কারিগর

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

parichand-mitraকুতুবউদ্দিন আহমেদ : দেখতে দেখতে বাংলা উপন্যাসের বয়স পাঁচদশ বছর নয়, প্রায় দেড়শ’ বছর পার হয়েছে। সে বিবেচনায় বাংলা উপন্যাসের বয়স খুব যে বেশি হয়েছে তা বলা যায় না। মহাকালের বিচারে, সাহিত্যের উৎকর্ষমাত্রায় দেড়শ’ বছর এমন আর কী বয়স হতে পারে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, উৎকর্ষের বিচারে বাংলা উপন্যাস কতদূর এগিয়েছে? প্রকৃত প্রস্তাবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে গেলে বলা যায় যে বাংলা উপন্যাস যথেষ্ট পরিপুষ্ট হয়েছে। শুধু পরিপুষ্ট হয়েছে বললেই মনের ভাবটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয় না; বলতে হয় যথেষ্ট পরিমাণে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে। জোর দিয়েই বলা যায় যে বিশ্বের আর সব শক্তিশালী ভাষা থেকে বাংলা উপন্যাস কোনো দিক থেকেই পিছিয়ে নেই। এর ইতিহাসের ঝুঁড়িতে রয়েছে অসংখ্য পরিপুষ্ট, বলবান ও সার্থক উপন্যাস। এর কারণ সম্পর্কে কী বলা যায়? এর কারণ খুঁজতে গেলে নানাবিধ কারণ বের হয়ে আসতে পারে। তবে সম্ভবত প্রধান কারণটি হতে পারে যে বাঙালি আবেগপ্রবণ, বাঙালি ভাবুক, বাঙালি কল্পনাবিলাসী, বাঙালি বোহেমিয়ান, বাঙালি সহসা লাভক্ষতির হিসেব কষে না, বাঙালি কথার কাঙাল। এজাতিকে এধরনের অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত করা যেতে পারে। বাঙালির এসবকটি গুণই স্বভাবজাত বা বলা যায় জন্মগত। তাই বলা যায় বাঙালি জন্মই নেয় সাহিত্যিক সত্তা নিয়ে; বাকি থাকে কেবল বিকাশটুকু। তাই একটু বিকাশের পথ পেলেই বাঙালির অনেকেই বড়বড় সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন। এরই ধারাবাহিকতায় কিনা ঠিক বলা যায় না, বাঙালির মধ্য থেকে বের হয়ে এসেছেন বড়বড় ঔপন্যাসিক; তাদের কেউ কেউ আবার বলা যায়, বিশ্বমানের ঔপন্যাসিকে উন্নীত হয়েছেন।

কালে কালে পথ পথিক সৃষ্টি করে না, পথিকই পথের স্রষ্টা। কিন্তু পথের সৃষ্টিটা বড় কঠিনকর্ম। সকলেই পথ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় না, সকলের ভাগ্যে সে সৌভাগ্য জোটেও না। তবে পথ যারা সৃষ্টি করে, তারা সাধারণ কোনো মানুষ নয়। আটপৌরে কোনো মানুষ পথের স্রষ্টা হতে পারে না। নতুন পথের স্রষ্টা যাঁরা, তাঁদের নাম মহাকাল স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখে।

প্যারিচাঁদ মিত্র এমনই একজন যুগান্তকারী স্রষ্টা; যিনি বাংলা উপন্যাসের পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন; এবং তিনিই এ পথের প্রথম পথিক। মহাকাল তাঁকে স্বর্ণের জ্বলজ্বলে অক্ষরে লিখে রেখেছে। বলা বাহুল্য বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস ‘আলালের ঘরের দুলাল’ [ ১৮৫৮ ] তাঁরই সৃষ্টি।

প্যারিচাঁদ নিজেই ছিলেন একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। পত্রিকাটি প্রকাশ করা হয়েছিল তৎকালীন অবহেলিত নারীসমাজের দুঃখসুখের কথা লিখতে; নাম ছিল ‘মাসিক পত্রিকা’ [১৮৫৪]। প্যারিচাঁদের এপত্রিকাটিতেই ধারাবাহিক প্রকাশ হতে থাকে আলালের ঘরের দুলাল। পত্রিকাটির প্রথমবর্ষের ৭ম সংখ্যা থেকে অর্থাৎ ১৮৫৫’র ফেব্রুয়ারি থেকে এটি প্রকাশ হতে থাকে; শেষ হয় ১৮৫৭’র জুনে অর্থাৎ তয় বর্ষের ১২শ সংখ্যায়। ১৮৫৮ সালে এটি সর্বজনীনভাবে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়।

প্যারিচাঁদ উপন্যাসটি লিখতে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন কয়েকটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে। তিনি ছিলেন তৎকালীন কলকাতার সমাজ হিতৈষী ব্যক্তিত্ব। নানান সামাজিক কর্মকাে তিনি বলা যায় অস্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সামাজিক নানান কর্মকাে জড়িয়েছিলেন বলেই সামাজিক সমস্যাগুলো তিনি প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিনেন। এবং সামাজিক এসমস্যাগুলোকে উপজীব্য করেই তিনি লিখেছেন আলালের ঘরের দুলাল। নিছক মনের আনন্দে সাহিত্যসৃষ্টি তার উদ্দেশ্য ছিল না। গ্রন্থটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি লিখে জানিয়েছেন

অন্যান্য পুস্তক অপেক্ষা উপন্যাসাদি পাঠ করিতে প্রায় সকল লোকেই মনে স্বভাবত অনুরাগ জন্মিয়া থাকে এবং যে স্থলে এতদ্দেশীয় অধিকাংশ লোক কোন পুস্তাকাদি পাঠ করিয়া সময়ক্ষেপণ করিতে রত নহে সে স্থলে উক্তপ্রকার গ্রন্থের অধিক আবশ্যক, এতদ্বিবেচনায় এই ক্ষুদ্র পুস্তকখানি রচিত হইল।’

উপন্যাসটির ঢ়ৎবভধপবএ তিনি তৎকালীন প্রচলিত শিক্ষা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ওঃ পযরবভষু ঃৎবধঃং ড়ভ ঃযব ঢ়বৎহরপরড়ঁং বভভবপঃং ড়ভ ধষষড়রিহম পযরষফৎবহ ঃড় নব রসঢ়ৎড়ঢ়বৎষু নৎড়ঁমযঃ ঁঢ়, রিঃয ৎবসধৎশং ড়হ ঃযব বীরংঃরহং ংুংঃবস ড়ভ বফঁপধঃরড়হ, ড়হ ংবষভ ভড়ৎসধঃরড়হ ধহফ ৎবষরমরড়ঁং পঁষঃঁৎব—’

হিন্দুদের পারিবারিক জীবন ও তাদের প্রচলিত বাকরীতি সম্পর্কেও তিনি তুলে ধরে বলেছেন,
ঞযব ড়িৎশ যধং নববহ ৎিরঃঃবহ রহ ধ ংরসঢ়ষব ংঃুষব, ধহফ ঃড় ভড়ৎবরমহবৎং ফবংরৎড়ঁং ড়ভ ধপয়ঁরৎরহম ধহ রফরড়সধঃরপ শহড়ষিবফমব ড়ভ ঃযব ইবহমধষর ষধহমঁধমব ধহফ ধহ ধপয়ঁধরহঃধহপব রিঃয ঐরহফঁ ফড়সবংঃরপ ষরভব, রঃ রিষষ ঢ়বৎযধঢ়ং নব ভড়ঁহফ ঁংবভঁষ.’

উপন্যাসটির বিষয়বস্তু তৎকালীন সমাজের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি। কলকাতাস্থ বৈদ্যবাটির ধনাঢ্য ব্যক্তি বাবুরাম বাবুর পুত্র মতিলাল তার পিতামাতার অত্যধিক আদরে এবং উপযুক্ত শাসনের অভাবে কুসঙ্গে পড়ে কেমন অধঃপাতে গেল সেই বিষয়টিকেই লেখক উপজীব্য করেছেন। পরে অবশ্য তিনি দেখিয়েছেন নানা দুঃখভোগের মধ্যদিয়ে একদিকে যেমন মতিলালের বিবেক দংশন ঘটেছে, সেইসঙ্গে এক পুণ্যাত্মা ব্যক্তির সাহচর্যে সে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। যে মতিলাল তার মাকে চপেটাঘাত করায় মনঃদুঃখে তার জননী গৃহত্যাগিনী হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই জননীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, দেখা হয়েছে তার পতœীর সঙ্গে এমনকি তার ছোটভাই রামলালের সঙ্গেও। গ্রন্থটিতে যে আখ্যান উপস্থাপিত হয়েছে তাতে নতুনত্ব তেমন কিছু নেই, তাছাড়া আখ্যানের বৈচিত্র্যেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অভাব রয়েছে চিন্তার গভীরতারও। তবে নিপুণ কথার বুননে লেখক শেষপর্যন্ত উপন্যাসটিকে মনোগ্রাহী করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। সম্ভবত বাংলা ভাষার এই গ্রন্থখানিই সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষের দোড়গোড়া পর্যন্ত ব্যাপকভাবে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিল; এবং প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

উপন্যাসটির চরিত্রগুলোকে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একভাগে পড়ে আদর্শভ্রষ্ট, নীতিজ্ঞান বিবর্জিত, অমানবিক, স্বার্থপর, স্ত্রৈণ মানুষগুলো। অপরভাগে পড়ে উদারনীতিপরায়ণ, মানবিকগুণে মিত, ন্যায়নীতিবোধসম্পন্ন আদর্শপরায়ণ মানুষগুলো।
প্রথম পর্যায়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চরিত্রটি হচ্ছে ঠকচাচা। তাছাড়া মতিলাল, বাঞ্ছারাম, বক্রেশ্বর বাহুল্য, হলধর, গদাধর প্রমুখ চরিত্রগুলোও এই পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

দ্বিতীয় পর্যায়ের চরিত্রগুলো বরদা, রামপাল, বেণীবাবু প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।


প্যারিচাঁদ মিত্র ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুলাই কলকাতার এক সফল ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন নামকরা ব্যবসায়ী রামনারায়ণ মিত্র। শৈশবে প্যারিচাঁদ সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষা শেখেন। তার বয়স যখন ১৩, তখন তিনি তৎকালীন হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। হিন্দু কলেজের বিখ্যাত অধ্যাপক হেনরি ডিভিয়ার ডিরোজিওকে সরাসরি শিক্ষক হিসেবে পান। তবে তিনি ইয়ংবেঙ্গল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। ছাত্র হিসেবে তিনি মেধাবী ছিলেন কিন্তু নাস্তিক ছিলেন না। তিনি যোগসাধনা, ধ্যান ইত্যাদির পক্ষপাতি ছিলেন। অলৌকিকতায় ছিল তার গভীর বিশ্বাস। ভারতীয় আচারঐতিহ্যের প্রতি ছিল তার গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা। বলা যায় প্যারিচাঁদ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন তৈরিতে নিয়োজিত ছিলেন। হয়তো এ কারণেই তিনি বাংলা উপন্যাসের মডেল না থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি অনুসরণে বাংলা উপন্যাস লিখনে হাত দিয়েছিলেন।

১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন; ‘ঈধষপঁঃঃধ চঁনষরপ খরনৎধৎু’ এ সহকারী গ্রন্থগারিক হিসেবে যোগদান করেন। ১৮৪৭এ একই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান ও সেক্রেটারি পদে উন্নীত হন।

প্যারিচাঁদ কলকাতার যাবতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। জ্ঞানোর্পাজিকা সভার [১৯৩৮] তিনি যুগ্মসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বেঙ্গলব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির [১৮৪৩] সম্পাদক পদে নিয়োজিত ছিলেন; ব্রিটিশইন্ডিয়া এসোসিয়শেনের [১৮৫১] কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন, পশুক্লেশ নিবারণী সভার সম্পাদক পদে আসীন ছিলেন। বঙ্গদেশীয় সামাজিক বিজ্ঞানসভার যুগ্মসম্পাদক ছিলেন ১৮৬৭ থেকে ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো এবং বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবেও তাকে দেখা গেছে [১৮৬৮১৮৭০]। মূলত তারই চেষ্টায় ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে পশুক্লেশ নিবারণ আইন, আইনসভায় পাশ হয়। ‘থিওসফিকাল সোসাইটি’র বঙ্গীয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন ১৮৮২ সালে।

প্যারিচাঁদের বড় একটি পরিচয়, তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী, মানবহিতৈষী, মানবদরদি, নিষ্ঠাবান সংগঠক, দেশ, জাতি ও ঐতিহ্যের প্রকৃত একজন ধারক ও বাহক। তবু সবকিছু ছাপিয়ে প্যারিচাঁদ একজন লেখক; বাংলা উপন্যাসের স্থপতি; আলালের ঘরের দুলালের স্রষ্টা। আলালের ঘরের দুলালের পরেও তিনি পাঠকের চাহিদার কথা চিন্তা করে বেশ কিছু পুস্তক রচনায় হাত দিয়েছিলেন। এই পুস্তকগুলোও যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল। গ্রন্থগুলো : মদ খাওয়া বড় দায় জাত থাকার কি উপায় [১৮৫৯], রামারঞ্জিকা [১৮৬০], কৃষিপাঠ [১৮৬১], গীতাঙ্কুর [১৮৬১], যৎকিঞ্চিত [১৮৬৫], অভেদী [১৮৭১], ডেভিড হেয়ারের জীবনচরিত [১৮৭৮], এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্বাবস্থা [১৮৭৯], আধ্যাত্মিকা [১৮৮০], বামাতোষিণী [১৮৮১]

প্যারিচাঁদ মিত্র উনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণে অনেকটাই নেতৃস্থানীয়। তৎকালীন বিভিন্ন প্রগতিমূলক কাজের সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ট যোগ। তার চোখে পড়েছে এমন হিতৈষী কাজ তিনি ফেলে রেখে পাশ কাটিয়ে যাননি। সমাজ ও মানুষের প্রতি ছিল তার অসংবাদিত দায়বদ্ধতা। তিনি দেশকে ভালবেসেছেন, দেশের মানুষকে ভালবেসেছেন, দেশের সংস্কৃতিকে ভালবেসেছেন, দেশের ঐতিহ্যকে ভালবেসেছেন। নারী শিক্ষার প্রতি ছিল তার বিশেষ নজর। তার পিতামহ, জননী এবং জননীস্থানীয়রা বাংলা পড়তে জানতেন, লিখতে জানতেন; এমনকি তার স্ত্রীও বাংলায় ভালো পড়তে ও লিখতে পারতেন। ওই সময়ে নারীরা পড়বে, জানবে এমন কোনো লিখিত গ্রন্থ ছিল না। তাই তিনি স্ত্রী শিক্ষার উপযোগী করে গ্রন্থ লেখায় হাত দেন। বাল্যবিবাহের ঘোরবিরোধী ছিলেন তিনি। পরিবেশ সচেতনাও ছিল তার প্রচরকমের। মদ্যপানের ঘোরবিরোধী ছিলেন, মদ্যপানরোধে তিনি বেশকিছু লেখাতেও হাত দেন। এককথায় প্যারিচাঁদ ছিলেন অতি সামাজিক মানুষ, সমাজকে তিনি দেখেছেন একেবারেই নিজের করে; আর এখানেই তার জীবনের চরমতম সার্থকতা; লেখক হিসেবে যেমন সার্থক হয়েছেন ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এ।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ২ ডিসেম্বর ২০১৬

কবি সিকান্দার আবু জাফর

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

sikandar-abu-zafor. গুলশান আরা : ভাষা, ছন্দ, শব্দ দিয়ে কবিরা কবিতা লেখেন। নির্বাচিত শব্দ ব্যবহার করেন পাঠকের কল্পনা শক্তিকে উসকে দেয়ার জন্য। শব্দ কবির চেতনার বাহন হিসেবে কাজ করে। কবিতার ভাবটি আবেগ হয়ে পাঠকের মনে সাড়া জাগায়। সমাজ এবং সংসারের প্রত্যক্ষ সংঘাতের অভিজ্ঞতাকেও কবি ব্যক্ত করেন তার কবিতায়তার কাব্যে শব্দের আবেগময় প্রকাশে।
তেমনি একজন শব্দসচেতন, সমাজসচেতন সংগ্রামী কবি সিকান্দার আবু জাফর। তিনি তার কাব্যের মূল সুর খুঁজেছেন সমাজ সংঘাতের দুঃখ বেদনার মধ্যে। বক্তব্যে স্পষ্টভাষী এবং মেজাজে বলিষ্ঠ হওয়ার পক্ষপাতী সিকান্দার আবু জাফর। এ ধাঁচটি নজরুলের কাব্যাদর্শ থেকে এসেছে। চল্লিশ দশকে যাদের কবি জীবনের সূত্রপাত তারা জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে নজরুলের প্রভাব বলয় ছিন্ন করতে পারেননি। তবুও তার বক্তব্যকে অনায়াস নির্ভাবনায় প্রকাশ করতে সচেষ্ট সিকান্দার আবু জাফর। তার সময়ের বিকার ও অন্যায়কে একটি পরিহাস তিক্ততার মধ্যে প্রকাশ করেছেন কবিতায়।

সিকান্দার আবু জাফরের কাব্যগ্রন্থ ‘বৈরী বৃষ্টি’তে প্রথম কবিতার শেষ স্তবকের লাইনগুলো এরকম

ধ্বংসের রাহু পেয়েছে রাজ্যতার।
বিশ্ব মানবতার
দিকদিগন্তে একি ক্ষমাহীন ব্যাভিচার?
স্তব্ধ কৌতূহলে
অতীত যুগের পাতা ছিঁড়ে একে একে
ভাসাই তিক্ত বিস্মরণের জলে!’

এমন বিষাত্মক স্বগতোক্তি বাংলা কাব্যে নূতন নয়। কবি হৃদয়ের ক্ষোভ স্পন্দন বাঙালি পাঠক বহু শুনেছেন। তবে সিকান্দার আবু জাফরের এই উক্তি যেন কিছুটা অভিনব ঠেকলো কারণ এই সত্যের ভাষ্যকার হওয়ার যোগ্যতা তার স্নায়ুর অবিমিশ্র উপাদান। জীবনকে আলোড়িত করেই এই সত্য প্রকাশিত। তাই ‘দিক দিগন্তে’ শুধুমাত্র ‘ব্যভিচার’ দেখেই সময় কাটাতে পারেননি কবি বিক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চারণ করলেন দুটো বিশেষণ ‘ক্ষমাহীন’ ও ‘অকণ্ঠ’। এ উচ্চারণ শুধু মৌখিক আস্ফালন নয়, কবির চেতনা স্পন্দিত বিক্ষোভ এতেও সন্তুষ্ট না থাকতে পেরে নিজের অবিভাজ্য ব্যক্তি সক্রিয়তায় অবশেষে অতীতের পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে বিস্মরণের জলে ভাসিয়ে স্বস্তি পেলেন যেন। এই আত্মগত চেতনা ও সেই সঙ্গে বলিষ্ঠ বক্তব্যের যে সুরস্বতন্ত্র বিশেষত্ব সিকান্দার আবু জাফরের মধ্যে বিদ্যমান তাই তাকে নজরুল সংলগ্নতা থেকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করেছে। অবশ্য এই আত্মগত সুর যা শিল্পমন্ডিত করার সুযোগ তার হাতে এসেছিল, তা তিনি ক্ষেত্রবিশেষে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করলেও সব ক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। দেখা গেছে, কখনও তিনি উচ্চকণ্ঠ, উপাদান ব্যবহারে নির্বিচার, কাব্যের শিল্পসত্তা সম্পর্কে একেবারে বেপরোয়া।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখবে
চাউল এসেছে ঘরে
তেল নুন চিনি অনেক এসেছে আরো
দুধ মাছ আর খাসির মাংশ
এনেছি জোগাড় করে।
সারাটা সকাল তোমার জননী
রান্নায় মশগুল।
(
এখন তুমি ঘুমাও/সমকাল)

যদিও সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায় ছন্দ ও শব্দের ব্যবহারে একটা উজ্জ্বল সাবলীলতা আছে, তা সত্ত্বেও অনেক সময়েই তিনি গদ্য ও পদ্য উপাদানের পার্থক্য সম্পর্কে বেশ অসচেতন এবং অসাবধান।

কবিরা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাদের ধ্যানধারণা ব্যক্ত করবেন এটাই প্রত্যাশা। কবি কী ধরনের কথা বলছেন, কীভাবে বলছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ এবং বিবেচনার বিষয়। বাচন ভঙ্গিকে চিহ্নিত করা হয় আঙ্গিক হিসেবে। কবিতায় শিল্প গুণের প্রকাশ পায় ভাষায়, ইঙ্গিতে আর শব্দ ব্যঞ্জনায়। কবিরা নিরাকার ভাবকে সকার করেন উপযুক্ত শব্দ চয়নে। কিন্তু সিকান্দার আবু জাফর বার বার স্খলিত হয়েছেন কবিতার এই শিল্প সৌন্দর্য থেকে। যাপিত জীবন ধারণা পাঠকের মনে সঞ্চারিত করার অভিপ্রায় তাকে উত্তেজিতউদ্বেলিত করেছে ঠিকই, কিন্তু সুস্থিরতার অভাব বোধে কবিতা হয়েছে গদ্যধর্মী। এই একই কারণে সিকান্দার আবু জাফরের ছন্দও প্রায়ই অত্যন্ত গদ্যধর্মী। ‘ঈদের চিঠি’তে কবি লিখেছেন

বাপজান
ঈদের সালাম নিও। দোয়া কোরো আগামী বছর
কাটিয়ে উঠতে পারি যেন এই তিক্ত বছরের
সমস্ত ব্যর্থতা।
অন্তত: ঈদের দিনে সাদাসিদে লুঙ্গি একখানি
একটি পাঞ্জাবি আর সাদা গোলটুপি
তোমাকে পাঠাতে যেন পারি;
আর দিতে পারি পাঁচটি নগদ টাকা
এইটুকু পেলে
দশজন পড়শীর মাঝে
পুত্রের কৃতিত্ব ভেবে দু’টি অন্ধ চোখে
হয়তো আসবে ফিরে দৃষ্টির সান্তনা।’

কাব্যের কাব্যগুণ, শিল্পের শিল্প সৌন্দর্য সাহিত্যের মানদন্ডে অপরিহার্য বিবেচনা। শিল্পের বিচার এই ত্রুটিকে ক্ষমা করে না।
কবিতা একাধারে মনকে বিস্তৃত করে, কানকে সচেতন করে শব্দের ধ্বনি ব্যঞ্জনার পরিমন্ডলে। তাই কবিতা মামুলী ব্যাপার না হয়েহয়ে ওঠে শ্রাবন্তীর কারুকাজের মতো কঠিন আর অনিন্দ্য সৌন্দর্যের বাণীরূপ। প্রেম যখন ব্যক্তি থেকে নির্বিশেষে পরিব্যাপ্ত হয়, তখন শিল্প সুষমা ফুটে ওঠে। এক্ষেত্রে বলিষ্ঠ মেজাজ অথবা স্পষ্ট বক্তব্যের প্রয়োজন খুব জরুরি নয়। অথচ সিকান্দার আবু জাফরের প্রেমের কবিতাতেও এ ধাঁচটিও লক্ষ্যণীয়। যেমন,

তাকাতেই দেখি নাগালের গন্ডিতে
ইঙ্গিত আঁকা অমৃত কুম্ভ
তুমিই প্রথমে মেলেছো আমন্ত্রণ
মুহূর্তে তুমি প্রিয়া,
এবং তোমাকে আত্মদানের তখুনি উদ্দামতা।’

সুখের কথা এই যে, সিকান্দার আবু জাফর কোনো নির্দিষ্ট গন্ডিতে বা ছকে বাঁধা পড়ে থাকেননি। চল্লিশের দশক থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেন। সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত রেখে বিশেষ করে সময়ের প্রবাহমানতার সঙ্গে শুধু বিষয়ে নয়, আঙ্গিকের পরিবর্তনেও যোগ স্থাপনে সচেষ্ট। এখানেই তিনি সজীব কবি। তার কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা ১৩৭২’ স্পষ্টতই সিকান্দার আবু জাফরের পালা বদলের উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

কবিতায় তার এগিয়ে চলার কথাই বলে। এর পরেও তার লেখা নূতন কবিতার প্রায় প্রত্যেকটিতে যেন খোলস খুলে খুলে যুগের কাছাকাছি ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছেন। বক্তব্য, ভাষা ও শিল্প চেতনার প্রতি স্তরেই তার এই পরিপক্বতা লক্ষণীয় হয়ে ধরা পড়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সিকান্দার আবু জাফর হয়ে উঠেছেন পরিণততর কবি। কবিতায় যুগ যন্ত্রণার প্রতিফলন তাকে ঋদ্ধ করেছে/কাজী নজরুল ইসলামের মতো সিকান্দার আবু জাফরও সঙ্গীত রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। বহু জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উদ্দীপনা সঙ্গীত ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ গানটিও তার লেখা। এটি তিনি লিখেছিলেন ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময়।

আমাদের চোখে চোখে লেলিহান অগ্নি
সকল বিরোধবিধ্বংসী।
এই কালো রাত্রির সুকঠিন অর্গল
কোন দিন আমরা যে ভাঙবোই
মুক্ত প্রাণের সাড়া অনবোই
আমাদের শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে
নূতন সূর্যশিখা জ্বলবেই।
চলবেই চলবেই
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।’

একজন বিপ্লবকামী কবি হিসেবে অসংখ্য গণসংগীত লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন কবি। প্রথমদিকে কলকাতায় ‘দৈনিক নবযুগে’ সাংবাদিকতা শুরু। দেশ বিভাগের পর রেডিও পাকিস্তানে চাকরি গ্রহণ। ১৯৫৩এ দৈনিক ইত্তেফাকের সহযোগী সম্পাদক, ১৯৫৪এ দৈনিক মিল্লাতের প্রধান সম্পাদক এবং ১৯৫৭১৯৭০ পর্যন্ত মাসিক ‘সমকাল’ (সেপ্টেম্বর১৯৫৭) পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। পঞ্চাশের দশকে ‘দৈনিক মিল্লাত’এর সম্পাদক ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর। শোনা যায়, ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়ার মালিকানাধীন ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকার মুদ্রণ প্রমাদ তখন ছিল এক প্রকার হাস্যরসের উৎস। সম্পাদক সাহেব এই দুর্নাম ঘোচাতে ছিলেন স্থিরচিত্ত। মুদ্রণ প্রমাদকারীকে চিহ্নিত করে তার ওই দিনের বেতন মাসিক বেতন থেকে কেটে হলেও মুদ্রণ প্রমাদ শুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সফল সম্পাদক কোনো গাফিলতির প্রশ্রয় দিতে পারেন নাএটাই সত্য। সিকান্দার আবু জাফর পত্রিকা সম্পাদনায় সাফল্যের পরিচয় দেন।

রুবাইয়াৎওমর খৈয়াম’ অনুবাদ প্রসঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলী মন্তব্য করেন ‘কাজীর অনুবাদই (কাজী নজরুল ইসলাম) সকল অনুবাদের কাজী। তা সত্ত্বেও সিকান্দার আবু জাফরের ওমর খৈয়াম অনুবাদ যথেষ্ট কৃতিত্বের দাবিদার। নাট্যকার হিসেবেও তিনি বাংলা সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। তার লেখা ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদৌল্লা’র একটি বিশেষ বৈশিষ্ট হলো মীর জাফর চরিত্রে অতি নবতর দৃষ্টিভঙ্গির আরোপ। সংলাপ ঐতিহাসিক আবাহ সৃষ্টিতে সক্ষম। ‘মহাকবি আলাওল’ তার একটি জীবনীভিত্তিক নাটক। এ নাটকে তিনি ঐতিহাসিকতার চেয়ে কল্পনার উপরে অধিক নির্ভরশীল। ১৯৬৬তে নাটকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

আধুনিক কবিতা মানুষের অনুভূতিতে বিপ্লব এনেছে, গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মূল্য নিরূপনের পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে, পৃথিবীকে নতুন বিশ্বাস ও বিস্ময়ে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের অস্তিত্বের অতলে অনবরত কত যে অনুভূতি আমাদের দেহে ও মনে উত্তাপ এনেছে, তাকে বোধের আয়ত্তে আনার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন আধুনিক কালের কবিগণ। তাই তাদের সুরে ও শব্দে বিচিত্র কৌশল, আশ্চর্য দুরূহতা এবং অপরিচয়ের তাৎপর্য। তারা তাদের কাব্যে যে নূতন আবহ এনেছেন, নতুন স্বাদ ও সংশয়তাতে কল্লোলমুখর হয়েছে কাব্যাঙ্গন।

সিকান্দার আবু জাফরও এনেছেন তার কবিতায় আধুনিকতার পরশ। সিকান্দার আবু জাফর শুধু কবি হিসেবেই খ্যাত নন, সাহিত্য মাসিক ‘সমকাল’এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও তার অবদান অবিস্মরণীয়। কারণ বাংলাদেশে আধুনিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সমকালের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পরিচয় থাকলেও কবি হিসেবেই তিনি অধিকতর উজ্জ্বল। খুলনার তেঁতুলিয়া গ্রামে ১৯১৯এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি, মৃত্যুবরণ করেন ঢাকায় ৫১৯৭৫এ।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ২ ডিসেম্বর ২০১৬