আর্কাইভ

Archive for the ‘সমাজ’ Category

কার্টুনঃ আধুনিক জীবন-যাপন…

these days 1athese days 1bthese days 1c

Advertisements

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধীরাই পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গের জন্য উন্মত্ত

undivided bengal mapমোহাম্মদ আবদুল গফুর :গত ১৬ অক্টোবর সোমবার যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দেশে পালিত হয়ে গেল বঙ্গভঙ্গ দিবস। ১৯০৫ সালে বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে এই দিনে প্রধানত শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তদানীন্তন বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীকে বিভক্ত করে ঢাকা রাজধানীসহ ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করা হলে দীর্ঘ অবহেলিত মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার উন্নয়নের কিঞ্চিৎ সুবিধা হবে বিবেচনা করে এ অঞ্চলের তদানীন্তন অবিসম্বাদিত জননেতা নবাব সলিমুল্লাহ এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পক্ষান্তরে এর ফলে কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদাররা পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এর বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন সৃষ্টি করে বসেন। 

ইতিহাস পাঠকদের জানা থাকার কথা, ১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের মধ্যদিয়ে এদেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত নব্য শাসকদের একটা নীতিই হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জমিদারী, আয়মাদারী, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রভৃতি সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে বেছে বেছে মুসলমানদের উৎখাত করে যেসব স্থানে ইংরেজ অনুগত হিন্দুদের বসানো। পলাশী বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক বছর পর ১৭৯৩ সালে পূর্বতন ভূমি-নীতি বদলিয়ে চিরস্থায়ীবন্দোবস্ত নামের নতুন ভূমি ব্যবস্থার মাধ্যমে যে নব্য জমিদার গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয় তার সিংহভাগই ছিল ইংরেজ অনুগত হিন্দু।

মুসলমানরাও সাতসমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে আসা ইংরেজদের শাসন কিছুতেই সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। মীর কাসিমের যুদ্ধ, মজনু শাহেব নেতৃত্বাধীন ফকীর আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধ, হাজী শরীয়তুল্লাহ-দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন প্রভৃতি ছাড়াও মহীশুরের হায়দার আলী-টিপু সুলতানদের লড়াই, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর নেতৃত্বাধীন জিহাদ আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত বিভিন্ন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন হারানো স্বাধীনতা ফিরে পেতে। কিন্তু বৃহত্তর প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের অসহযোগিতা এবং ইংরেজ শাসকদের প্রতি তাদের সমর্থনের ফলে মুসলমানদের এসব লড়াইয়ের প্রত্যেকটাতে তাদের পরাজয় হয়ে পড়ে এক অনিবার্য বাস্তবতা।

পক্ষান্তরে নব্য শাসকদের প্রতি এদেশের হিন্দু নেতৃবৃন্দের সমর্থনের ফলে ইংরেজরা তাদের স্বাভাবিক মিত্র হিসাবেই দেখতে পেয়েছেন এতদিন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ফলে এই মিত্রদের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়াতে ইংরেজ শাসকরা বিব্রত বোধ করতে থাকেন এবং মাত্র ছয় বছরের মাথায় ইংরেজ শাসকরা বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষণা করে পুরাতন মিত্রদের মনোরঞ্জনের প্রয়াস পান। বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষিত হওয়ায় পূর্ববঙ্গের অবিসম্বাদিত জননেতা নবাব সলিমুল্লাহ অত্যন্ত বিক্ষুদ্ধ হন। তাঁর ক্ষোভ প্রহসনের লক্ষ্যে তাঁর অন্যতম দাবী ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয় ইংরেজ সরকার।

কিন্তু এতেও কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের নিদারুন অসন্তোষ। বঙ্গ-ভঙ্গের বিরুদ্ধে তাদের যুক্তি (কুযুক্তি!) ছিল এর দ্বারা বঙ্গ-মাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ হবে। ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাদের কুযুক্তি ছিল এর দ্বারা নাকি বঙ্গ-সংস্কৃতি দ্বিখন্ডিত করার মত অন্যায় করা হবে। কিন্তু তাদের আরেকটি বক্তব্যে তাদের আসল মতলব ফাঁস হয়ে যায়। তাদের এ বক্তব্য ছিল : পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত মুসলমান চাষা-ভূষা, তাই তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ পূর্ববাংলার মানুষরা অশিক্ষিত চাষাভূষা, তারা অশিক্ষিত চাষাভূষাই থাক, তাদের শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই। তাদের এই বিদ্বেষী মনোভাবের দরুন প্রতিশ্রুতি ঘোষণার দীর্ঘ ১০ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯২১ সালে।

এসব ছিল ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাশের আগের কথা। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাশের পর অবস্থা অনেকটাই পালটে যায়। ঐ আইনে প্রদেশের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনেকটাই হস্তান্তরিত হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় প্রথম ১৯৩৭ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতেই এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে এরপর মুসলিম প্রধান এ প্রদেশে মুসলমানদের হাতেই সরকারের নেতৃত্ব থাকবে। বাস্তবেও দেখা যায় সেটাই। ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনআমলের শেষ দিনগুলোতে প্রথমে এ. কে. ফজলুল হক, তার পর খাজা নাজিমুদ্দিন, সর্বশেষে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলায় প্রাদেশিক প্রধান মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে সম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসনের অবসান হয়। এ সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সারিতে অবস্থান ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের। প্রথমটির দাবী ছিল ভারতকে অবিভক্ত কাঠামোতে স্বাধীনতা দিতে হবে। দ্বিতীয়টি অর্থাৎ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের দাবী ছিল : সমগ্র ভারতবর্ষকে হিন্দু ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে বিভক্ত করে উত্তর পশ্চিম ও পূর্ব দিকের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় একাধিক স্বতন্ত্র স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুসলিম লীগের এই প্রস্তাবই ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাস্তবতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও বৃটিশ সরকার এই লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই উপমহাদেশের স্বাধীনতার কাঠামো নির্বাচনে সম্মত হয়।

যদিও এই লাহোর প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তান শব্দ ছিল না, মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার খবর পর দিন হিন্দু পত্রিকাসমূহ প্রকাশিত হয় “পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত” এই শিরোনামে। পরবর্তীকালে মুসলিম লীগও লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত স্বাধীন রাষ্ট্রকে পাকিস্তান বলে স্বীকার করে নিয়ে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে পাকিস্তান আন্দোলন হিসাবেই গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালে বাস্তবে এ রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তা পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসাবেই পরিচিতি লাভ করে।

দেড় হাজার মাইলের অধিক দূরত্বে অবস্থিত ভৌগোলিকভাবে বৈরী-রাষ্ট্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুই ভূখন্ড মিলে একটি রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে প্রায় নেই বললেই চলে। এই বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় রেখেছিলেন লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক ও সমর্থক নেতারা। তাই লাহোর প্রস্তাবে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখিত ছিল যে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে যে একাধিক রাষ্ট্র গঠিত হবে তা হবে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম। তবে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ টিকেটে নির্বাচিত আইন সভার সদসদের নিয়ে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী কর্তৃক উত্থাপিত ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়, লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত একাধিকের বদলে আপাতত পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র হিসাবেই পরিচালিত হবে। জনাব সোহরওয়ার্দী তাঁর এই প্রস্তাব উত্থাপনকালে যে ভাষণ দেন, তাতে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছেন, পাকিস্তানই আপনার শেষ দাবী কিনা। এ প্রশ্নের কোন জবাব আমি দেব না। তবে একথা আমি অবশ্যই বলব বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানই আমার প্রধান দাবী।” অর্থাৎ তিনি অদূর ভবিষ্যতে উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পুর্বাঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাতিল করে দিলেন না।

তাছাড়া ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামের দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে মুসলিম লীগের জনাব হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী ও জনাব আবুল হাশিম এবং কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতার যৌথ উদ্যোগে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলে। বিশস্ত সূত্রে জানা যায়, এই উদ্যোগের প্রতি মুসলিম লীগের নেতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহরও সমর্থন ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল প্রমুখ অবাঙ্গালী নেতৃবৃন্দ এবং হিন্দু মহাসভার বাঙ্গালী নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর প্রবল বিরোধিতার কারণে এই উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সে সময় শেষোক্ত বাঙালী নেতা (শ্যামাপ্রসাদ) এমনও বলে ছিলেন, ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ হতেই হবে। নইলে বাংলার হিন্দুরা চিরতরে বাঙ্গালী মুসলমানের গোলামে পরিণত হবে। এতে কী প্রমাণিত হয়? প্রমাণিত হয় যে বাঙালী মুসলমানের চাইতে অবাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্ব তাঁর কাছে অধিক কাম্য ছিল।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধীরাই ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। যারা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ বলে বিবেচনা করতেন, তারা ১৯৪৭ সালে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদকে অবশ্য পালনীয় পূণ্য বলে বিবেচনা করেন কি শুধু তাদের মুসলিম বিদ্বেষের কারণে? আসলে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ তাদের কাছে কখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা রাজধানীসহ “পূর্ব বঙ্গ ও আসাম” নামের নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ব বঙ্গে অবস্থিত কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কায়ই তারা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করে ছিলেন। বঙ্গভঙ্গকে যদি তারা বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপই বিবেচনা করতেন, তা হলে মাত্র তিন দশক পর সাতচল্লিশে এসে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ করতে তারা মরিয়া হয়ে উঠতেন না।

সাতচল্লিশে এসে তারা বাঙ্গালী মুসলমানের পরিবর্তে অবাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্বকে বরণ করতে সার্বভৌম বাংলা আন্দোলনকে যেভাবে ব্যর্থ করে দেন, তাতে প্রমাণিত হয় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তারা যে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের অভিযোগ এনেছিলেন তা ছিল ভূয়া, আসলে পূর্ববঙ্গে অবস্থিত জমিদারীতে কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাই ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার মূল কারণ।

সাতচল্লিশে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে বাঙ্গালীদের বৃহত্তর সর্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরোধিতা করে অবাঙ্গালী ভারতীয় নেতৃত্বকে বরণ করে নেয়ার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের কথা ছিল একটা ডাহা মিথ্যা বাহানা। আসলে তারা চেয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নেহায়েৎ পার্থিব স্বার্থেই যে সেদিন তারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন, বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপের ভয়ে নয়, তা প্রমাণিত হয় সাতচল্লিশে যখন তারা ভঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জন্য উম্মত্ত হয়ে ওঠেন। আসলে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের বিষয় ১৯০৫ সালে তাদের কাছে কখনও আসল বিবেচ্য ছিল না। পূর্ববঙ্গে অবস্থিত জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কাই তাদের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ঠেলে দিয়েছিল। সাতচল্লিশে ঐরকম কোন আশঙ্কা না থাকায় তারা নিজেরা তথাকথিত বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জন্য উম্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন।

রসালোচনাঃ বাংলা কিছু বাগধারায় লিঙ্গবৈষম্য

proverbs not right

নানামুখী চাপের মুখে ঢাকা শহর…

dhaka under pressure 1adhaka under pressure 1b

নজরুল সাহিত্যে মহররম – শেখ দরবার আলম

এক

নজরুল সাহিত্যে মোহররম, এই বিষয়টার ওপর যদি লিখতে হয় তা হলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় যে, ইসলাম কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে ছিল একটা আশ্রয়। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিই মুসলিম জাতিসত্তা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। তামাম বিশ্বের মুসলিম সভ্যতা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। কোরআন এবং সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। মুসলিম উম্মার ঐক্য ও সংহতি ছিল তাঁর কাছে একটা অত্যন্ত কাক্সিক্ষত বিষয়। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আদর্শ মানুষ ছিলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সাম্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের আর্থ-সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় যে সব জায়গায় উল্লেখ করেছেন সেইসব জায়গায় তিনি যে মুসলমান ঘরের সন্তান, এই কথাটুকু বলে ক্ষান্ত হতে চাননি। তিনি বারংবার বলেছেন এবং লিখেছেন যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং নবীর উম্মত; কিন্তু তিনি কবি সবার। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার। এদিক দিয়েও বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভূমিকা অনন্য।

দুই

বাংলা সাহিত্যে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের বাংলাভাষীদের মধ্যে ইশ্বর গুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত বড় বড় কবি-সাহিত্যিকরা জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী, মনুসংহিতার সমাজের কবি-সাহিত্যিক হিসাবে লেখালেখি করেছেন এবং সেইভাবেই মূলত কাজ করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বোধ হয় অনুশীলন সমিতির সভ্য মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো এবং অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ লোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো বলতে চাইতেন যে তিনি নাস্তিক। এ কথা বললে যথার্থ অহিন্দুদের কাছে এবং নাস্তিকদের কাছে হয়তো গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদী, শিখ, এ রকম কোন ধর্মাবলম্বীর কেউ নাস্তিক হইলে তাতে ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বিশ্বের মজুলম মুসলমানদের কারো কোনো উপকার হয় না। তাঁরা নিজ নিজ ধর্ম নিষ্ঠার সাথে পালন করলে তাতে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ তাদের কোনো ধর্ম গ্রন্থেই মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে বা কল্পনা করে জাতীয়তাবাদী হয়ে মজলুম মুসলমানদের অধিকার বঞ্চিত করে সাম্প্রায়িক হওয়ার এবং এর চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে ফ্যাসিবাদী হওয়ার কোনো সংস্থান নেই।

তিন

এই বাস্তবতাটা, এই সত্যটা আমাদের সবারই স্মরণ রাখা উচিত যে,হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাংলাভাষীর বাংলা ভাষা অনেকাংশে এক হলেও তৌহীদবাদী মুসলমানদের বাংলা ভাষা এবং পোত্তলিক হিন্দুদের বাংলাভাষা সর্বাংশে এক নয়। অনুরূপভাবে তৌহীদবাদী মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং পৌত্তলিক হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতি, সাংস্কৃতি সহাবস্থানের দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা উচিত। আমি এইসব কথাগুলো অপরিহার্য প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই লিখছি। কেননা, এই কথাগুলো সবারই চিন্তা করে দেখা উচিত।

জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজ প্রধান স্বাধীন ভারতে মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর পঠন-পাঠনের সংস্থান সেখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। সে সুযোগ এই মুসলিমপ্রধান দেশেও এখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানোর ফলে খোদ পাকিস্তান আমল থেকেই এ রকম একটা অবস্থা সৃষ্টি হতে পেরেছে। এ দেশে যারা ইসলামী আন্দোলন করেন তাঁরাও এই বিষয়টির দিকে কখনো নজর দেননি।

চার

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের এক জাতিতত্ত¡ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তামাম ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলমান সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুসলিম সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা ও এই মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য-সঙ্গীত মুছে ফেলার অংশ হিসেবে এ ক্ষেত্রে নজরুল চর্চার পথও রুদ্ধ করার বন্দোবস্ত হয়েছে। কিন্তু নিজ নিজ সমাজের মানুষ হলেও হিন্দুর ভাষা এবং সাহিত্য হবে এরকম এবং মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য হবে অন্য রকম।

পাঁচ

অন্যতম রবীন্দ্র জীবনীকার প্রশান্ত কুমার পাল কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত রবিজীবনীতে লিখেছেন যে, আধুনিক বাঙালি বলতে যাদেরকে বোঝায় তারা এসেছেন বৈদিক ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। ঠিক অনুরূপভাবে আমরা যদি অষ্টম শতাব্দী থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিকে চোখ রাখি তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারবো যে, সাহিত্যিক ও সমাজসেবী সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো, সাহিত্যিক-সাংবাদিক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের মতো এবং মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো, মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের মতো, মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানরাও এসেছেন ভারতের বাইরের সাধারণত আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্য এশিয়া থেকে। এভাবে আমরা দেখছি যে, আধুনিক বাঙালি হিন্দুদের যেমন রয়েছে বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের হিন্দু জাতিসত্তার উত্তরাধিকার; অনুরূপভাবে ঠিক তেমনি আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানদেরও রয়েছে মুসলমান সমাজের ইতহিাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার উত্তরাধিকার।

ছয়

আরবী ভাষাভাষী এলাকা ইরাকের বাগদাদে থাকতে নজরুলের পূর্বপুরুষরা ছিলেন আরবভাষী। হিন্দুস্তানে অর্থাৎ ভারতে এসে তাঁর পূর্ব পুরুষরা এক সময়ে হয়েছিলেন ফার্সীভাষী। পরে উর্দুভাষী।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু পূর্ববর্তী সভাপতি এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদের পূর্বপুরুষরাও আরব থেকে এসেছিলেন। মওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবদ্দশায়ও তাঁদের পরিবারেরা, মওলানারা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন কেবল আরবী ভাষায়। মওলানা আবুল কালাম আজাদের পরিবারেরা পুরুষরা বাইরের মানুষজনদের সঙ্গে কথা বলতেন উর্দু ভাষায়।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাদের পরিবারে আরবি, ফার্সী এবং উর্দু ভাষার চর্চা ছিল। তাঁর আব্বা কাজী ফকীর আহমদ বাংলাভাষাও খুব ভালো মতো শিখেছিলেন। নজরুল তাঁর শৈশবে এবং বাল্যেই শিখেছিলেন আরবী, ফার্সী, উর্দু এবং বাংলা কাজী নজরুল ইসলামের যখন জন্ম হয় তখন তাদের পরিবারের লোকেরা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন উর্দু ভাষায়।

সাত

১৭৫৭-র ২৩ জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের আগে কথ্য বাংলা এবং দলিল দস্তাবেজ এবং চিঠিপত্রের বাংলা ছিল আরবি-ফার্সী শব্দবহুল বাংলা। তখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষরাও পরিবারিক পর্যায়েও ফার্সী ভাষা চর্চা করতেন। রাজভাষা হিসেবেও ব্যবহারিক জীবনে ফার্সী ভাষার চর্চা তো করতেনই।

পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের বেয়াল্লিশ বছর সাত মাস পর ক্রসেডের চেতনাসম্পন্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী খ্রিস্টান সমাজের পাদ্রী উইলিয়াম, কেরির নেতৃত্বে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশনে সংস্কৃতের পন্ডিত রামরাম বসুর তালিমে আরবী-ফার্সি শব্দ বর্জিত এবং সংস্কৃত শব্দ বহুল খ্রিস্টান ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সাবেক পাদুকা নির্মাতা পাদ্রী উইলিয়াম কেরী এর এক বছর দু’মাস পর ১৮০১-এর মে মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়ে অধীনস্ত সংস্কৃততজ্ঞ পন্ডিতদের সহযোগিতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলাভাষা শেখানোর জন্য আরবী ফার্সী শব্দ বর্জিত কেবল নয়, তামাম মুসলিম সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা বর্জিত পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করলেন। কালক্রমে এই ধরনের বাংলা পাঠ্যপুস্তকই স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সটির পাঠ্য হলো।

শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠার এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ বছর পর মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)-এর জন্ম। পাঠশালায় এবং স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে এবং সে সময়কার হিন্দুদের লেখা সাহিত্যে আরবী-ফার্সী বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল যে ধরনের বাংলা ভাষার প্রচলন মীর মশাররফ হোসেন দেখেছিলেন ঠিক সে ভাষাতেই তিনি ইসলামের ইতিহাসের কারবালার ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন “বিষাদ সিন্ধু”। (১৮৮৫-১৮৯১)।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম মীর মশাররফ হোসেনের জন্মের বাহান্ন বছর পর। তিনিও কেবল পাঠশালায় নয়, মক্তবে এবং স্কুলেও আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল বাংলাই শিখেছিলেন। হিন্দুদের লেখা অন্যান্য কাব্য এবং সাহিত্যেও শিখেছিলেন এই একই ভাষা। কিন্তু মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে তিনি যখন কাব্য ও সাহিত্য সৃষ্টি করলেন এবং গান লিখলেন তখন এই বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি বিধান করে তিনি সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ যথাসম্ভব বর্জন করে ব্যবহার করলেন প্রচুর আরবী-ফার্সী শব্দ।

প্রথমে শ্রীরামপুর মিশনে এবং পরে আরো ব্যাপকভাবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে খ্রিস্টান পাদ্রী এবং সংস্কৃতজ্ঞ হিন্দু পন্ডিতরা মিলে একশ বিশ বছর আগে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই যেমন দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, লিখিত বাংলা ভাষা হবে সম্পূর্ণরূপে আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দবহুল ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যে-সঙ্গীত হবে কেবল হিন্দু সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক হিন্দু জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য ও সঙ্গীত, ঠিক তেমনি এই ধারার বিপরীতে এর এক শত বিশ বছর পর সেনাবাহিনী মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলা মুল্লুকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর কবি কাজী নজরুল ইসলামও দেখিয়েছিলেন মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত বহুলাংশে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বাংশে তৎসম শব্দ অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দ বণ্টন করেও লেখা যায়।

আট

নজরুল সেনাবাহিনী থেকে কলকাতায় ফিরেছিলেন উনিশ শ’ বিশ সালের মার্চ মাসে। এর চার মাস পর ১৩৩৯ হিজরীর পহেলা মোহররম ছিল ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ৩০ ভাদ্র মোতাবেক ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর। নজরুল তখন শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত দৈনিক নবযুগের অন্যতম সহযোগী সম্পাদক। থাকেন কলকাতার ৮/এ টার্নার স্ট্রীটে তার সহকর্মী ও সুহৃদ মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে। সামনে ১০ মোহররম ১৩৩৯ হিজরী (৮ আশ্বিন ১৩২৭ মোতাবেক ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯২০) তারিখ শুক্রবার আশুরা। মাসিক মোসলেম ভারত এর প্রথম বর্ষ : প্রথম খন্ড : ষষ্ঠ সংখ্যার জন্য তিনি লিখলেন তার বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয় ইসলামী কবিতা মোহররম। প্রথম দুটো পঙক্তি লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, সেখানে কোনো তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ নেই। নজরুল শুরুতেই অত্যন্ত আবেগ ও দরদ দিয়ে এবং গভীর মমত্ববোধ মিশিয়ে লিখেছেন:

নীল সিয়া আস্মান লালে লাল দুনিয়া

আম্মা! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।

আরবী ফার্সী শব্দ বহুল এই বাংলা পড়ে কারো বলার সাধ্য নেই যে, বাঙলা ভাষা সংস্কৃতির দুহিতা। সংস্কৃতি শব্দ স্বদেশী শব্দ এবং আরবী ফার্সী শব্দ বিদেশী শব্দ। নত্ববিধান এবং ষত্ববিধান কেবল সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের জন্য প্রযোজ্য! ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ইন্তেকালের এবং ভাষাতত্ত্ববিদ সনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পরলোক গমনের এতোদিন পর এবং ধনিতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আবদুল হাই সাহেবের ইন্তেকালের এতদিন পর আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা বিভাগে যখন ভাষাতত্ত¡বিদ নেই, ধ্বনিতত্ত¡বিধ নেই, তখন কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকরণে আমাদের মুসল্লী প্রুফ রীডাররাও আমাদের শেখাচ্ছেন যে, ইরান বানানের মূর্ধন্য ণ মূধা বা মস্তক থেকে অর্থাৎ জিহবাগ্র তালুতে স্পৃষ্ট করে উচ্চার্য নয়; কেননা, এটা সংস্কৃতি বা তৎসম শব্দ নয়। আমাদের ওপর অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আরোপের লক্ষ্যে এ সবই এখন চলছে।

নজরুলের জীবদ্দশা সুস্থাবস্থায় বাংলাভাষী মুসলমানরাও যে বাংলাভাষী মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐহিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরস্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে সচেতন ছিলেন সেটা সাতচল্লিশের মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলিম মালিকানাধীন এবং মুসলিম সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলো লক্ষ করলেই উপলব্ধি করা যায়। বাংলা সাহিত্যে নজরুল একমাত্র বড় কবি যিনি প্রতিবেশী সমাজের জন্য কীর্তন, ভজন এবং স্যামাসঙ্গীত পর্যন্ত লিখেছিলেন। সেখানে নজরুল কোন আরবী ফার্সী শব্দ ব্যবহার করেননি। নজরুল বিশ্বাস করতেন যে বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষারও আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। বাংলাভাষী মুসলমানদের সংস্কৃতি ও বাংলাভাষী হিন্দুর সংস্কৃতি এক নয়। বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষা এবং সংস্কৃতির সর্বনাশ ঘটে গেছে ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্টের পর।

বাংলাভাষী মুসলমানদের মুসলমান হিসেবে বাঁচার অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলমান জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় উপযুক্ত মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করার অপরিহার্য প্রয়োজন আছে। নজরুলের মোহররম কবিতা উপলক্ষে এই উল্লেখটা করলাম।

লেখক : নজরুল গবেষক, ইতিহাসবিদ।

ভিন্নরূপে দাসত্ব আধুনিক বিশ্বে

modern day slavery 4modern slavery 3

এবার অন্তপুরের বাইরে সৌদী মহিলারা !

8_r2_c48_r2_c1