Archive

Archive for the ‘সমাজ’ Category

সালতামামি ২০১৬ – প্রেক্ষিত সারা বিশ্ব

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন

text-saltamami-%e0%a7%aa

2016-review-562016-review-57

সালতামামি ২০১৬ – প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন

text-saltamami-%e0%a7%aa

2016-review-12016-review-22016-review-32016-review-4

ইংরেজী নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন

new-years-day-2017অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম : একটি জাতির সংস্কৃতি সেই জাতির নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস, আচারঅনুষ্ঠান, ধ্যানধারণা ইত্যাদি সামগ্রিক পরিচয় স্পষ্টভাবে ধরে রাখে এবং তা বিশ্ব দরবারে সেই জাতির আত্মপরিচয়কে বুলন্দ করে দেয়। মূলত সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আয়না। সংস্কৃতির বহুবিধ উপাদানের মধ্যে নববর্ষও অন্যতম। আমরা যাকে ইংরেজী সন বা খ্রিস্টাব্দ বলি, আসলে এটা হচ্ছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। বাংলা ভাষায় অব্দ শব্দের চেয়ে সন ও সাল দুটি বেশি পরিচিত ও সর্বাধিক প্রচলিত। সন শব্দটি আরবী এবং সাল শব্দটি ফারসী। সন ও সাল এই শব্দ দুটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যজাত, আমাদের তমদ্দুনীয় উৎস সঞ্জাত।

আমাদের দেশে বর্তমানে তিনটি সন প্রচলিত রয়েছে আর তা হচ্ছে হিজরী সন, বাংলা সন ও ইংরেজী সন। এখানে হিজরী সনের প্রচলন হয় যেদিন এখানে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে তখন থেকেই। এই হিজরী সন মুসলিম মননে পবিত্র সন হিসেবে গৃহীত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনা মুনওয়ারায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসের সেই দিগন্ত উন্মোচনকারী ঘটনাকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে এই হিজরী সন। ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে হযরত উমর রাদিআল্লাহু তায়ালা আন্হুর খিলাফতকালে তারই উদ্যোগে হিজরতের বছর থেকে হিসাব করে হিজরী সনের প্রবর্তন করা হয়। সেটা ছিল হিজরতের ১৭ বছর। যতদূর জানা যায়, তারই পরের বছর থেকে বাংলাদেশে সাংগঠিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়আর তখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা)-এর খিলাফতের মধ্য ভাগ। অবশ্য প্রায় ১০/১২ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশে সমুদ্রপথে ইসলামের খবর এসে পৌঁছতে থাকে। ইসলামের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে হিজরী সনেরও আগমন ঘটে, কারণ এই সনের বিভিন্ন মাসে ইসলামী আচারঅনুষ্ঠান, ইবাদতবন্দেগীর নির্দিষ্ট দিনরজনী, তারিখ ও নির্দিষ্ট মাস প্রভৃতি রয়েছে। এই হিজরী সনই বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত সবচেয়ে পুরনো সন।

১২০১ খ্রিস্টাব্দে সিপাহ্সালার ইখতিয়ারুদ্দীন মুহম্মদ বিন বখ্তিয়ার খিল্জী বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের বিজয় নিশান উড্ডীন করেনআর তখন থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরী সন বাংলাদেশে প্রচলিত হয়, যা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সুলতানী আমলে কি মুঘল আমলে রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে, আদানপ্রদান তথা সর্বক্ষেত্রে হিজরী সনই প্রচলিত ছিল। অবশ্য মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে ঋতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সৌর সনের তাকিদ রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে দেখা দেয়ায় হিজরী সনকেই সৌর গণনায় এনে একটি রাজস্ব বা ফসলী সনের প্রবর্তন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, হিজরী সন চান্দ্র সন হওয়ায় ঋতুর সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকে না।

সম্রাট আকবরের নির্দেশে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে আমীর ফতেহ্উল্লাহ সিরাজী সম্রাট আকবরের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বছর ৯৬৩ হিজরী মুতাবিক ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের নির্দিষ্ট তারিখ থেকে হিসাব করে হিজরী সনকে সৌর গণনায় এনে যে সনটি উদ্ভাবন করেন সেটাই আমাদের দেশে বাংলা সন নামে পরিচিত হয়। হিজরী সনের বছরের হিসাব ঠিক রেখেই এর মাসগুলো নেয়া হয় শকাব্দ থেকে। বৈশাখ মাসকে স্থির করা হয় বছরের প্রথম মাস।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকেই সম্রাট আকবরের ফরমানবলে রাজত্বের রাজস্ব আদায়ের সন হিসেবে তা প্রচলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে হিজরী সনের সৌরকরণ পঞ্জিকাটি ব্যাপকভাবে গৃহীত ও সমাদৃত হয়, যা একান্তভাবে বাংলার মানুষের নিজস্ব সন হিসেবে স্থান করে নিতে সমর্থ হয়। আর এখানে ইংরেজী সন এলো সেই ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে। একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে কিন্তু এখন পর্যন্ত ইংরেজী সনের গ্রহণযোগ্যতা তেমন একটা নেই। আবার শহর জীবনে বাংলা সনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। অবশ্য শহুরে জীবন কি গ্রামীণ জীবনে হিজরী সনের প্রচলন সমানভাবে বর্তমান। বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও সংহতির অন্যতম অবলম্বন এই হিজরী সন। আর এই হিজরী সন থেকে উৎসারিত বাংলা সন আমাদের জাতীয় জীবনে নিজস্বতার বৈভব এনে দিয়েছে।

মুসলিম দুনিয়ার অনেক দেশেই হিজরী সনের চান্দ্র হিসাবের বৈশিষ্ট্যেই জাতীয় সন হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এমনকি এই সনের সৌর হিসাব এনে বাংলা সনের মতোই কোন কোন দেশে প্রচলিত রয়েছে, যেমন ইরানে হিজরী সনকে সৌর হিসাবে এনে সেখানে হিজরী সন প্রচলিত রয়েছে। ইরানে নওরোজ পালিত হয় হিজরী সনের শামসী বা সৌরকরণের হিসাবে আনা তাদের নিজস্ব প্রথম মাসের ১ তারিখে। আমাদের দেশে হিজরী সনের সৌর হিসাবের প্রথম মাস যেমন বৈশাখ মাস, তেমনি ওখানে হচ্ছে ফারবারদীন প্রথম মাস। এই মাসের ১ তারিখ ওদের হয় ২১ মার্চ। আর আমাদের ১ বৈশাখ হয় ১৪ এপ্রিল। আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষের যে আনন্দ বৈভব কি গ্রামে কি নগরেগঞ্জে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, ইংরেজী নববর্ষ কিন্তু শহুরে জীবনের মুষ্টিমেয় বিশেষ মহলে ছাড়া তা ব্যাপকভাবে কোথাও আলোড়ন সৃষ্টি করে না। তবুও ইংরেজী নববর্ষ আসে। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টার ঘণ্টা বাজার পর পরই ঘোষিত হয় এই ভিন ঐতিহ্যজাত নববর্ষের সূচনা মুহূর্ত, ঘোষিত হয় ইংরেজী নববর্ষের আগমন বারতা। মধ্যরাতের সেই মুহূর্তটা আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে কোনরূপ আনন্দআবেগ সৃষ্টি না করলেও খ্রীস্টান জগত ওই মুহূর্তে হ্যাপি নিউ ইয়ার উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এক হৈহুল্লোড়ে উল্লাস ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। ঘটে যায় কতই না অঘটন, ঘটে যায় কতই না পৈশাচিক কর্মকান্ড, মদ্যপানের নামে বহু স্থানে জীবন পানের মহড়াও চলে। ইংরেজী নববর্ষ আসে রাতের গভীরে নিকষ অন্ধকারে প্রচন্ড শীতের প্রবাহ মেখে।

ইংরেজী ক্যালেন্ডার যেহেতু আমাদের কাজকর্মের তারিখ নির্ধারণে, হিসাবনিকেষ সংরক্ষণে, আন্তর্জাতিক আদানপ্রদানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তাই এতে যতই ঔপনিবেশিক গন্ধ থাকুক না কেন, যতই এতে প্রায় ২০০ বছরের গোলামির জোয়ালের চিহ্ন থাকুক না কেন, আমরা এর থেকে মুক্ত হতে পারছি না এই কারণেই বোধ করি যে, আমরা স্বকীয়সত্তা সজাগ হওয়ার চেতনার কথা বললেও, আমরা নিজস্ব সংস্কৃতিকে সমুন্নত করার কথা বললেও তা যেন অবস্থার দৃষ্টিতে মনে হয় বাতকা কি বাত তথা কথার কথা। ইংরেজী নববর্ষ আমাদের স্কন্ধে সিন্দবাদের সেই দৈত্যটির মতো, সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে বসে আছে যে, আমরা একে ছাড়তে পারছি না। ইংরেজী নববর্ষ আমাদের নতুন দিনের হিসাব শুরু করায়, যদিও চিঠিপত্রে বাংলা তারিখ উল্লেখ করার নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু সেটাও কি কার্যত হচ্ছে?

আমরা যাকে ইংরেজী ক্যালেন্ডার বলি আদতে এর নাম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি প্রাচীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারটির সংস্কার সাধন করেন। এই গ্রেগরির নামে এই ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ লেখার শেষে যে এডি (.) লেখা হয় তা লাতিন এ্যানো ডোমিনি (অহহড় উড়সরহর)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এই এ্যানো ডোমিনির অর্থ আমাদের প্রভূত বছরে অর্থাৎ খ্রিস্টাব্দ। ডাইওনিসিয়াম একমিগুয়াস নামক এক খ্রীস্টান পাদ্রী জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ৫৩২ অব্দে যিশুখ্রিস্টের জন্ম বছর থেকে হিসাব করে এই খ্রিস্টাব্দ লিখন রীতি চালু করেন।

মানুষ আদিকাল থেকেই কোন না কোনভাবে দিনক্ষণ, মাসবছরের হিসাব রাখতে প্রয়াসী হয়েছে চাঁদ দেখে, নক্ষত্র দেখে, রাতদিনের আগমননির্গমন অবলোকন করে, ঋতু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে। সাধারণ কোন বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিন গণনা, মাস গণনা, বছর গণনার রীতি কালক্রমে চালু হয়েছে। তিথি, নক্ষত্র বিশ্লেষণ করার রীতিও আবিষ্কার হয়েছে, উদ্ভাবিত হয়েছে রাশিচক্র। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা চান্দ্র সন নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চান্দ্র সনে বছর হয় মোটামুটি ৩৫৪ দিনে আর সূর্যের হিসাবে যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা সৌর সন নামে পরিচিত হয়। সৌর সনের বছর হয় মোটামুটি ৩৬৫ দিনে। আমাদের দেশে ইংরেজী তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার যে ব্রিটিশ বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাত করে আমাদের ওপর গোলামির জোয়াল চাপিয়ে দেয়, সেই ব্রিটিশ এই ক্যালেন্ডার তাদের দেশ গ্রেট ব্রিটেনে চালু করে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। তারা যেখানেই তাদের উপনিবেশ স্থাপন করেছে, সেখানেই তারা তাদের পোশাকআশাক, শিক্ষাদীক্ষা, প্রশাসনিক কাঠামো, সংস্কৃতি যেমন চাপিয়ে দিয়েছে, তেমনি তাদের ক্যালেন্ডারটিও দিয়েছে, তারা প্রভু সেজে বসেছে আর নেটিভদের বানিয়েছে মোস্ট অবিডিয়েন্ট সারভেন্ট। এর থেকে কি আমরা নিজেদের উদ্ধার করতে পারব না? বল বীর/বল উন্নত মম শির/শির নিহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির এই বীরত্বব্যঞ্জক উচ্চারণ কি শুধু আমাদের জাতীয় কবির কবিতায় আবৃত্তির জন্য অনুরণিত হতে থাকবে, নাকি আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঝংকৃত হবে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখতে পারি না?

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরিফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা)

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬

পাশ্চাত্য নয়, দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা চাই

আল ফাতাহ মামুন : আমরা শপথ করিতেছি যে, নববর্ষারম্ভে বিগত বছরের ঋণ শোধ করব এবং কৃষিকাজের যে সব সন্ত্রপাতি ও হাঁড়িবাসন ধার নিয়ে ছিলাম তাও ফিরিয়ে দেব। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে এভাবেই পুরোনো বছরের ঋণ শোধের শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপন হতো নতুন বছরের প্রথম দিনটি। এর পাঁচশো বছর পর অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব দুহাজার সনে ধারদেনা শোধের শপথ অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে নতুনরূপে নববর্ষ উদযাপন হয় ব্যবিলনিয়া দেশের ব্যবিলন নগরে। বর্তমান ইরাকের আল হিল্লা শহরের কাছেই ছিল ব্যবিলন নগরের অবস্থান। এগারো দিন ব্যাপী নববর্ষ উৎসবে নানা আয়োজনে মুখর থাকত ব্যবিলনিয়ার ব্যবিলন। শেষ দিন মারদুকের মন্দিরে থেকে নববর্ষের মিছিল শুরু হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর নববর্ষ ভবনে সামনে এসে শেষ হতো বর্ষবরণ আনন্দ মিছিল। নববর্ষের শুরুর ইতিহাস এমনটিই। এরপর নানান ঘাতপ্রতিঘাত ও সংঘাতসংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশে দেশে বিস্তার হতে থাকে নববর্ষ সংস্কৃতি। এরই ধারাবহিকতায় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইংরেজি নববর্ষ।

জানুয়ারি মাসের পহেলা তারিখ ইংরেজি বছরের প্রথম দিন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কল্যাণে (!) ইংরেজি নববর্ষ এখন অশ্লীলতা আর নোংরামির হাতেখড়ি হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। অবশ্য ইংরেজি নববর্ষের সঙ্গে উচ্ছৃংখলতার সম্পর্ক নতুন নয়। স্যার জেমস ফ্রেজার তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য গোল্ডেন বাও লেখেন, নববর্ষ উপক্ষে আমেরিকান আদিবাসী নারীপুরুষদের আচরণ ছিল কান্ডজ্ঞানহীন মানুষের মতো। বিভিন্ন সাজে সজ্জিত নারীপুরুষরা এ বাড়ি ও বাড়ি ছুটে বেড়াতো আর সামনে যা পেত ভেঙ্গে ফেলত। শুধু যে অন্যের সম্পদের ক্ষতি করতো তা নয়; নিজেদের কাপড়চোপড় এবং আসবাবপত্রও ভাঙচুর করতো তারা। পুরোনো বছরের সঞ্চয় ও সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন বছরে নতুন জীবন শুরু করোএ দর্শনই আমেরিকানদের উগ্রপথে বর্ষবরণে উদ্বুদ্ধ করে। সেখানকার আদিবাসীদের দেখাদেখি অভিবাসী আমেরিকানরাও নববর্ষে ভয়াবহ রকমের অস্বাভাবিকতা প্রদর্শন করতে লাগলো। অগ্ন্যুৎসব, শব্দ দূষণসহ নানান কর্মকান্ড করে ভীতিকর পরিস্থিতিতে ৩১ ডিসেম্বর রাত অতিবাহিত করে নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতো তারা।

সময় পাল্টেছে। দিন বদলেছে। এখন আর অন্যের বা নিজের আসবাবপত্র ভেঙ্গে নববর্ষ উদযাপন করা হয় না। এখন নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানানো হয় নিজেকে ধ্বংস করে। একত্রিশ ডিসেম্বর রাত বারোটার পরপরই নিউ ইয়ার উদযাপনে তরুণতরুণীরা ধর্ম নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নাচগান ও মদইয়াবায় মেতে ওঠে। না, ইউরোপআমেরিকা বা অন্য কোনো পাশ্চাত্য রাষ্ট্রের নববর্ষ উদযাপনের কথা বলছি না। বলছি, বারো আউলিয়ার পূণ্যভূমি বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন সম্পর্কে। ভাবতেও কষ্ট হয়! একটি ভিন্ন জাতির উৎসবকে কেন্দ্র করে কীভাবে আরেকটি জাতি নিজের বিশ্বাসসম্পদ ও সংস্কৃতিকে বিলিয়ে দেয়। আমরা বাঙালি। আমাদের আছে নিজস্ব সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফালগুন, নবান্ন উৎসবসহ বিভিন্ন উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় ও ধর্মীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির আকাশপাতাল ব্যধান। থার্টিফার্স্ট নাইট, ভেলেন্টাইনস ডেসহ ইংরেজি বিভিন্ন উৎসবঅনুষ্ঠান পালন করার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশীয় এবং ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠান সংকটাপন্ন করে তুলছি। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী নয়। ইন্দ্রীয় সুখ লাভ এবং জীবন উপভোগই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। এজন্য তারা কোনো আইন কিংবা বাধানিষেধের ধার ধারে না। তারা আরো বিশ্বাস করে, এ জীবনই শেষ জীবন। এরপর আর কোনো জীবন নেই। নেই জবাবদিহির মতো গুরু দায়িত্বও। অপরদিকে আমাদের দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী। তারা পরজীবনে জবাবদিহির বিষয়টি গভীরভাবে লালন করে এবং বাস্তর জীবনে এর কঠোর অনুশীলনের চেষ্টা করে। সুতরাং আমাদের এবং পশ্চিমাদের জীবনাচার এবং সংস্কৃতির যে বিরাট পার্থক্য থাকবে তা বলাই বাহুল্য।

আমাদের সঙ্গে বিশ্বাস ও চিন্তায় এত বৈপরিত্যপূর্ণ একটি জাতির সংস্কৃতি যখন আমরা চর্চা করতে থাকি তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিশ্বাসও আমাদের মনমননে গেঁথে যেতে থাকে। যে কারণে পাঁচ বছর আগের বাংলাদেশকে পাঁচ বছর পরের বাংলাদেশের সঙ্গে মেলাতে গেলে রীতিমত আঁতকে ওঠতে হয়। কয়েক বছর আগেও দৈনিক কাগজগুলোর একটি নিয়মিত শিরোনাম ছিলম্ভ্রম হারানোর ভয়ে তরুণী/গৃহবধূর আত্মহত্যা আর সাম্প্রতিক সময়ে ইউটিউব বা পর্ণ সাইটগুলোতে আমাদের দেশের মেয়েদের সম্ভ্রম দানের মিছিল দেখে নিজেকেই বিশ্বাস করাতে কষ্ট হয়, একদিন এ দেশের মেয়েরাই সম্ভ্রম বাঁচাতে আত্মাহুতি দিয়েছিল! আজকের এ জাতীয় অধঃপতন যে বিজাতীয় সংস্কৃতিরই পরিণাম ও ফায়দা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে যে কোন ধরনের নৈরাজ্য রোধে প্রতিবছরই সরকার ও আইনশৃৃংখলা বাহিনী তৎপর থাকেন। তবে আফসোস! অশ্লীলতা এবং কথিত তারুণ্যের উম্মাদনা রোধে কারোই কোনো ভাবনা থাকে না। বরং আইনশৃংখলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানেই নাচগান, মদপান ও শ্লীলতাহানির মতো ঘৃণ্য কাজগুলো ঘটে থাকে। কয়েক বছর আগে টিএসসি চত্বরে নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এসব অপসংস্কৃতি এদেশের তরুণতরুণীদের জন্য কতটা বিপদজনক। নিউ ইয়ার উদযাপনকে কেন্দ্র প্রতি বছরই শ্লীলতাহানির ঘটে, এবারও ঘটবে হয়তো। কিন্তু প্রশ্ন হলোআমরা যাকে শ্লীলতাহানি বলছি, আমাদের নারী সমাজও কি সেটিকে শ্লীলতাহানিই মনে করেন? যদি তাই হয়, তবে তো টিএসসির ঘটনার পর নিউ ইয়ার উৎসবে অংশগ্রহণ করা কোনো নারীর চিন্তায়ও আসার কথা নয়। কিন্তু হায়! ওই ঘটনার পর যেন নারীদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে।

এ লেখা পড়ে কোনো নারীবাদীর নাকে যে মৌলবাদীর গন্ধ লাগবে না, তা হলফ করে বলতে পারি না। তবে যে কথাটি আমি হলফ করে বলতে পারি তা হলোনারীবাদীদের মহান হৃদয়ে এ প্রশ্ন অবশ্যই জাগবে যে, নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে এত কথা বলছেন, কিন্তু যারা নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে সেই সব পশুদের ব্যাপারে কিছু বলছেন না কেন? আসলে যারা এমনটি করেছে তারা মানুষের পর্যায়ে পড়ে নাএ ব্যাপারে আমার কেন খোদ শয়তানেরও দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেদিন কোনো মানুষরূপী পশু তো বাসায় গিয়ে কোনো নারীর সম্ভ্রমহানি করেনি। বরং মেয়েরাই পশুর খাঁচায় এসে নিজ থেকে ধরা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমি শুধু বলছি, বোন! কুকুর হইতে সাবধান। এতে আমার কোনো অপরাধ হয়েছে বলে মনে হয় না।

ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। আমরা বাঙালির পাশাপাশি মুসলিমও। মুসলিম হিসেবে আমাদেরও রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং হিজরি সন। বিজাতীয় (অপ)সংস্কৃতি চর্চায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে দেশীয় এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চায় মুসলিম তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলেমওলামাদের বিশেষ ভূমিকা রাখার আহবান করছি। আরেকটি কথা। সামগ্রীক বিবেচনায় বিদায়ী বছর বিশ্ব মুসলমানের জন্য সুখকর ছিল না। উপভোগ্য তো নয়ই। মিয়ানমার, কাশ্মীর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আলেপ্পোর মুসলমানরা এখনো আঁতকে ওঠছে ১৬ ক্ষত দেখে। নতুন বছর পুরনো ক্ষতে সুখের প্রলেপ দেবে এই আশায় দিন গুনছে নির্যাতিত মুসলমান। মুসলিম বিশ্বের ঘোর অমানিশা দূর করে আলোকিত ভোরসুবহে সাদিক ফিরিয়ে আনুক নতুন বছরের প্রথম সূর্য। স্বাগতম ২০১৭।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬

কালের গর্ভে বিলীন আরেকটি বছর !

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন

new-year-rhymeশাহ মতিন টিপু : ৩১ ডিসেম্বর। এই বছরের শেষদিন আজ। আজকের দিনটি পার হলেই হারিয়ে যাবে গত এক বছর ধরে দেয়ালে টানানো ক্যালেন্ডারটির গুরুত্ব। সেখানে ঝুলবে আরেকটি নতুন ক্যালেন্ডার।

আজকের দিনটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আরেকটি বছর। স্মৃতির খেরোখাতা থেকে প্রাপ্তিঅপ্রাপ্তির হিসাব মুছে শুরু হবে নতুন বছর। অনেক ঘটনঅঘটন, প্রাপ্তিঅপ্রাপ্তি, চড়াইউৎরাই, উদ্বেগউৎকণ্ঠা ও আনন্দবেদনার সাক্ষী এই বিদায়ী বছর। নানা ঘটনা প্রবাহে আলোচিত ইংরেজি ২০১৬ সাল। সেইন্ট গ্রেগরি প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারের হিসাবে এখন সামনে সমাগত ২০১৭।

সময় এক প্রবহমান মহাসমুদ্র। কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়া, পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। তাই তো জীবন এত গতিময়। যে প্রত্যাশার বিশালতা নিয়ে ২০১৬এর প্রথম দিনটিকে বরণ করা হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার সব কি পূরণ হয়েছে?

বিদায়ী বছর প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির দোলাচলে নিয়েছে অনেক কিছু। তারপরও নতুন বছরের নতুন সূর্যালোকিত দিনের প্রতি অসীম প্রতীক্ষা ও প্রত্যাশা মানুষের মনে। নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন। চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় ধূসর হয়ে আসা গল্পগাঁথার সারি সারি চিত্রপট। কখনো বুকের ভেতর উঁকি দেয় একান্তই দুঃখযাতনা। কখনো পাওয়ার আনন্দে নেচে উঠে হৃদয়। এ বছরটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে আমাদের জীবনে, এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের।

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কথার মতই দুঃখ, কষ্ট সবকিছু কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে যাত্রার প্রেরণা পেতে চায় সবাই। নতুন বছরটি যেন সমাজ জীবন থেকে, প্রতিটি মানুষের মন থেকে সকল গ্লানি, অনিশ্চয়তা, হিংসা, লোভ ও পাপ দূর করে। রাজনৈতিক হানাহানি থেমে গিয়ে প্রিয় স্বদেশ যেন সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

বিদায়ী বছরে ভাল খবর যেমন ছিল, তেমনি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও কম ছিল না । দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রেই বিষ্ময়কর সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। সারা বিশ্বেই বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্ব সভায় বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ আসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দারিদ্র্য মুক্তির সাফল্য দেখতে বিশ্বব্যাংক প্রধানও বাংলাদেশ সফর করেছেন। মুগ্ধ হয়েছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক মানদন্ড বজায় রেখে। বেশ কয়েকজনের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যুদন্ডও কার্যকর করা হয়েছে। এতে জাতি হিসেবে সারাবিশ্বে যেমন আমাদের মর্যাদা বেড়েছে, তেমনি শহীদ পরিবারগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছে। কিছুটা হলেও মোছন হয়েছে জাতির গ্লানি। সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে অবনতির চিত্র লক্ষণীয়।

দুর্নীতি, দলীয়করণ, আমলাতোষণ, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অপকান্ড এখন পূর্বাপেক্ষা বেড়েছে। জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নেই মতৈক্য। সংকুচিত হয়ে গেছে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রগুলোও। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও অনেকের কাছে উপহাসের হয়েছে। তবে নাসিক নির্বাচন আশার আলো জ্বেলেছে। দেশস্বার্থে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক ঐক্য দরকার। তা এমন যে, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ফিরে আসুক গণতন্ত্রের সুস্থ ধারা, সুসংবাদ বয়ে আনুক সবার জন্য।

২০১৬ সালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য ছিল স্থানীয় সরকারের নানা পর্যায়ে এবং দলীয় প্রতীকে নির্বাচন। উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচন ছাড়াও হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুটি দলেরই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বছরের শেষ দিকে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংলাপে বসেছে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো। যা দেশে গণতন্ত্রের চর্চার পথে নতুন আশার আলো।

বছর জুড়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল জঙ্গিবাদ। সারা বিশ্বে যখন জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেখানে এর বিষবাষ্প থেকে মুক্ত ছিল না বাংলাদেশও। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি এবং শোলাকিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠীর বর্বরতা ও হত্যাকাণ্ড অবাক করেছে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বকে।

এ বছর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বিষয়টি সবচেয়ে আলোচিত ছিল, সেটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। সারা বিশ্বের আলোচিত এই নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। নানা কারণে বিতর্কিত এই প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কী কী প্রভাব পড়বে তার হিসাবনিকাশ চলছে এখনও।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ২০১৫১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭.১১ শতাংশ হওয়ার ঘোষণা আসে ২০১৬ সালে। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও সরেনি আলোচনা থেকে। অর্থনীতিতে স্বস্তির পরশ যেমন ছিল, তেমনি ছিল দুশ্চিন্তার কারণও। মোটা দাগে বলতে গেলে বছরটিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেকগুলো সূচক স্থিতিশীল ছিল। অর্থনীতির যেসব সূচক সরাসরি সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে, সেসব সূচকের বেশ কয়েকটি স্বস্তিদায়কই ছিল । ২০১৬ সালটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্যও ছিল খুব ভালো বছর। রাজস্ব আদায় হয়েছে নিজস্ব কৌশলমতোই। ব্যবসাবাণিজ্য চলেছে স্বাভাবিকভাবে। এর ফলে সারা বছরই রাজস্ব আদায়ের গতি ভালো ছিল।

কূটনৈতিক ও মানবিক দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীরা সেখানকার সেনাবাহিনীর গণহত্যা এবং দমননিপীড়নের মুখে বিভিন্নভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রেবেশ করার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমার সরকারকে চিঠিও দেয়া হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুপল্লীতে হামলার পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সব শেষ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালপল্লীতে আগুন তুলেছে মানবিকতার নতুন প্রশ্ন।

২০১৬ সালে দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ৫০০ স্কুলকলেজকে বেসরকারি থেকে সরকারিকরণ। সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও রয়েছে একটি বিশাল অর্জন। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে আমাদের পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ। এই উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

এত কিছুর পরও এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন নানা সমস্যার আবর্তে জর্জরিত। সমস্যা যেমন আছে গ্রামে, তেমনি আছে শহরতলি বা নাগরিক জীবনে। সব সমস্যাকে মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে চায়, এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালে কী ভুল ছিল তা শুধরে নিয়ে নতুন পথচলা শুরু হবে ২০১৭ সালে। নতুন বছর নিয়ে আসবে নতুন কিছুর বারতা। এই কামনা এ দেশের সব মানুষের।

সূত্রঃ রাইজিংবিডি ডট কম

নারী-পুরুষের সম্পর্কে চিড় ধরলে …

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

মানুষ আমি, আমার কেন পাখির মতো মন!

ফারজানা হুসাইন

extra-marital-4. গত সপ্তাহে কাজের ফাঁকে আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে কফি খাচ্ছি। হঠাৎ করে সে বলে উঠলো, আচ্ছা তোমার পার্টনার যদি তোমার সঙ্গে চিট করে তুমি কি এরপর আর তার সঙ্গে থাকবে?

আমি মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম, নাহ!

সে মাথা নাড়িয়ে বিষাদ বদনে বললো, এতই কি সহজ সিদ্ধান্ত নেওয়া? এত সহজে অনেকদিনের একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কি যায়?

না, একদমই সহজ নয়, তবে সামটাইস ইউ হ্যাভ টু বি ক্রুয়েল টু বি কাইন্ড টু ইউরসেলফ।

চিট করা বা সঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করা বলতে সোজাসুজিভাবে আমরা অন্য কারও সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বুঝি, আমাদের সনাতন সংস্কৃতিতে হয়তো অন্য কোনও নারী বা পুরুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়াও বোঝায়। আমার দৃষ্টিতে শঠতা মানে সততার অভাব, তা সে যে ধরনের অসততাই হোক। যে বিষয় বা বিষয়গুলো দু’জনের সম্পর্কের ভিত্তি তার প্রতি প্রবঞ্চনাকেই আমি মোটামুটিভাবে শঠতা বলব।

সঙ্গী যখন প্রতারণা করে, সেটা জেনে যাওয়ার পর স্বাভাবিক মানুষ যা করে তা হলো প্রশ্ন, হাজারটা প্রশ্ন, একের পর এক প্রশ্ন। কেন করলে এ রকম? কবে করেছ, কোথায় করেছ, কতবার করেছ, কার কার সঙ্গে করেছ—ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনও উত্তরগুলো পাওয়া যায়, কখনও যায় না। তবে এই প্রশ্নগুলো করার পেছনের কারণ উত্তর খুঁজে পাওয়া নয় মোটেই। বরং ঘটনার আকস্মিকতায় তীব্র ঘৃণা আর অপমানকে উগরে দেওয়া মাত্র।

এরপর শুরু হয় নিজেকে প্রশ্ন করা। আমার কোথায় খামতি ছিল যে, সে এমন করলো, এতদিনের সম্পর্কের কথা একবারও সে ভাবলো না? এত মায়াভালোবাসা তার কাছে তুচ্ছ?

এত এত প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে যায় হাসি, খাওয়ার ইচ্ছে, বিছানায় এপাশওপাশ করাই কেবল সার হয়—ঘুম সে তো কবেই গেছে দেশান্তরে। বই খোলা থাকে সামনে কিন্তু পাতা উল্টানো হয়ে ওঠে না, গরম চায়ের মগ ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়—ফ্যাকাশে স্তর জমে মগের ওপরে। খোলা টিভির চরিত্রগুলো নেচেগেয়ে যায় আপন মনে—কে তার খবর রাখে?

এক কথায় জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। সব শাস্তি আমরা নিজেকেই দেই, অথচ অপরাধটা আমরা করিনি একদমই। আমরা ভুলে যাই এ সময়ের প্রথম এবং প্রধান কাজ নিজেকে একেবারেই কষ্ট না দেওয়া বরং প্রিয় মানুষ শঠতা করলে ওই মুহূর্তে নিজেকে ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি দরকার। ভালোবাসার মানুষটা যে ভালোবাসতে ভুলে গেছে!

. একগামিতা প্রাণীর সহজাত বৈশিষ্ট্য নয়, জীবজগতে একগামী প্রাণীর দেখা মেলা ভার। আমাদের গুহাবাসী পূর্বপুরুষেরা বহুগামী ছিল। গোত্রসমাজ গড়ে ওঠার কালে ধর্মের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় একটি সুশৃঙ্খল সমাজ কাঠামো গড়ে দেওয়া, ভালোমন্দের সীমানা প্রাচীর গড়া। সেই মহৎ নির্মাতার ভূমিকায় ধর্ম সভ্য সমাজের ভিত্তি হিসেবে একগামিতার কথা শোনায়। আব্রাহামিক তিন ধর্মের মতো বাকি প্রায় সব বহুল প্রচলিত ধর্মই নারীর ওপর একগামিতার বোঝা চাপিয়েছে, অথচ পুরুষ পেয়েছে বৈবাহিক সূত্রে বহুগামিতার স্বীকৃতি।

ইসলাম সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করার অনুমোদন দেয়। রাধাকেবল কৃষ্ণের প্রেয়সী, হাজারখানেক স্ত্রী তার। ওদিকে মহাভারতের দ্রৌপদীর পাঁচস্বামীর কারণ বেচারির একাধিক পতিঈপ্সা নয় বরং ভাইদের সঙ্গে সবকিছু ভাগ করে নেওয়ার অর্জুনের প্রতিজ্ঞা।

মজার বিষয় হলো, বেশির ভাগ পুরুষই তার নারী সঙ্গীকে অন্য কারও সঙ্গে প্রেম করাকে হয়ত ক্ষমা করতে পারে যদি না সেই মেয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। নারীর শারীরিক শুচিতা (!) পুরুষের আজীবনের আরাধ্য বস্তু। সীতার অগ্নিপরীক্ষা আর আয়েশার সতীত্বের প্রমাণের কথা পাওয়া যায় ধর্মগ্রন্থে। অথচ, বেশিরভাগ নারী আবার পুরুষের অন্য নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করাকে পুরুষ মানুষের শরীরের চাহিদা একটু বেশিই হয় বলে ধরে নেয় কিন্তু অন্য কোনও নারীর সঙ্গে তার পছন্দের পুরুষের অশারীরিক প্রেমকে মানতে পারে না একদমই। সুতরাং শরীর মনের সংঘাত নারী পুরুষ ভেদে ভিন্নতর।

সেই আদ্দিকালের শুধু নারীপুরুষের সম্পর্ক কেবল আর নেই আজ, পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রগতিপন্থী আমরা ও সচেতনভাবেই স্বীকার করে নিচ্ছি সমলিঙ্গের সম্পর্কগুলোকে। লিঙ্গ পরিচয় আর অভিযোজন এক বিস্ময় যেন আজ।

কথায়কথায় আমার কৈশোরের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমাদেরই সমবয়সী দু’জন কিশোরকিশোরী প্রেমে পড়ল স্কুলের শেষ ক্লাসেই। দু’জনই ভিন্নভিন্ন আবাসিক এক স্কুলকলেজের স্টুডেন্ট হওয়াতে প্রেম চলল পত্রালাপে। ছুটিতে বাড়ি ফিরলে দুজন কারও তোয়াক্কা না করেই শহরে রিকশা করে ঘুরে বেড়াতো, প্রেম করতো। তখন ছোট্ট মফস্বল শহরে এই লোক দেখানো প্রেম খুব ভালো চোখে দেখা হয়নি। মূল কাণ্ড ঘটলো কলেজের শেষ দিকে। মেয়েটিকে তার কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো সেই আবাসিক কলেজের আরেকটি মেয়ের সঙ্গে সমপ্রেমের ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়ার জন্য। গল্পের ডালপালা ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগেনি একদমই। স্বভাবতই বন্ধুমহলে বেশ কানাঘুষো চললো। শুনেছি পরের ছুটিতে ছেলেটি বাড়ি ফিরলে মেয়েটিকে হাতেকলমে পরীক্ষা দিতে হয়েছে তার বিষমকামিতার। হোক কিশোর, তবু সে প্রেমিক তো! ষোলসতেরোর দুই কিশোরকিশোরীর প্রগলভাময় প্রেম আর প্রমাণের নিষ্ঠুরতার সেই ঘটনা মনে পড়লে এখনও বিবমিষা জাগে। সেই ঘটনার বেশ কিছু মাস পর্যন্তও ছেলেটি আর মেয়েটির মধ্যে যোগাযোগ ছিল।

একটি বিষমকামী সম্পর্কে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে হয়ত মোটামুটি মেনে নেওয়া হয়। আর যাই হোক মেয়েটি অন্য কোনও ছেলের সঙ্গে তো আর সম্পর্ক করেনি; তাই প্রেমিকের চোখে প্রেমিকার সতীত্ব অটুট থাকে।

যাই হোক, গল্পের শুরুতে ফিরে আসি। যারা মনে করে হৃদয়ের ভাঙন কেবল আমাদেরই হয়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ফ্রিডম অব সেক্সস নয়, কেবল ফ্রি সেক্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জন্য বলি—শুরুর গল্পের আমার এই সহকর্মী গত তিন সপ্তাহজুড়ে ভয়াবহ মনোকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ঠিক বিষমকামী আমাদেরই মতোই। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—এই ভদ্রলোক একটি সমকামী ও সমপ্রেমী সম্পর্কে আছেন।

হায় হৃদয়ের ক্ষরণ! নারীপুরুষসমকামীসমপ্রেমী কাউকেই সে ছাড় দেয় না!

লেখক: আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ২২ ডিসেম্বর ২০১৬

বিয়ের বয়স নিয়ে সরকারের শুভংকরের ফাঁকিবাজি !

ডিসেম্বর 21, 2016 মন্তব্য দিন

child-marriage-3-art. তৌফিক জোয়ার্দার : ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে কন্যাশিশু সন্মেলনে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৯৭১ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ২২৩, যা বর্তমানে মাত্র ৩৭.এ নেমে এসেছে। শুধু শিশুমৃত্যুই নয়, বাংলাদেশ প্রায় সবগুলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয়েছ এবং এক্ষেত্রে বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এসব অর্জনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু এতসব অর্জনের পরও একটি বিষয়ে বাংলাদেশ আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। এটি হল, মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাড়ানো।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) রিপোর্ট, ২০১৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স হল ১৬.৬ বছর। শুধু এই একটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ায় বিভিন্ন সামাজিক সূচকের পরিমাপকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, উন্নয়নকর্মী ও গবেষকদের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলেছিল। একজন সচেতন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে এটা খুবই স্বাভাবিক।

এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে সরকার হঠাৎ করেই সব উন্নয়ন প্রপঞ্চের বিপরীত স্রোতে নৌকা ভাসাল। ঘোষণা করা হল, বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের লিগ্যাল বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা হবে। উন্নয়ন সেক্টরে কাজ করা একজন গবেষক হিসেবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অন্য অনেকের মতো আমিও চিন্তাভাবনা না করে পারিনি।

এ ঘোষণার পেছনে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য তারাই ভালো বলতে পারবে, তবে আমার ধারণা হচ্ছেকেউ হয়তো সরকারকে বুঝিয়েছেন, বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিলে বাল্যবিবাহিত মেয়েদের সংখ্যাও পরিসংখ্যানে কম দেখাবে। তখন কৃত্রিমভাবে হলেও বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ হ্রাসে সরকারের আপাত ব্যর্থতা আর আলাদাভাবে চোখে পড়বে না।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বিয়ের বয়স কম বলে এত যে সমালোচনা এবং সে সমালোচনা ধামাচাপা দিতে গিয়ে এতসব আয়োজন, বিয়ের সে বয়সটিই সঠিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছে কিনা? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এশিয়ান পপুলেশন স্টাডিজ নামক জার্নালে প্রখ্যাত গবেষক পিটার কে স্টিটফিল্ড, নাহিদ কামাল, কারার জুনায়েদ আহসান এবং কামরুন নাহার এমনটিই দাবি করেছেন।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে করা জরিপের সঙ্গে বাংলাদেশ উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) স্বাস্থ্য ও জনমিতিক অতন্দ্র তত্ত্বাবধান (ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভেইলেন্স) উপাত্তের তুলনা করে তারা দেখিয়েছেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের প্রায় দুইতৃতীয়াংশই বিয়ের সঠিক বয়স উল্লেখ করেননি। ৫৬% নারী বিয়ের বয়স কমিয়ে বলেছেন এবং ৭% বলেছেন বাড়িয়ে।

বিবাহিত নারীদের মধ্যে করা জরিপের ফল অনুযায়ী, তাদের উল্লেখ করা প্রথম বিয়ের বয়সের গড় পাওয়া গেছে ১৬.৮ বছর, যা বিডিএইচএস রিপোর্ট, ২০১৪তে উল্লিখিত ১৬.৬ বছরের খুবই কাছাকাছি। যেহেতু আইসিডিডিআরবি তাদের সার্ভেইলেন্স ব্যবস্থার অন্তর্গত প্রত্যেক মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও স্থানান্তরের তথ্য সেই ১৯৬৬ সাল থেকে সংরক্ষণ করে আসছে, তাই তাদের এলাকায় জরিপকৃত ১৯৬৬ বিবাহিত নারীর প্রকৃত বয়সও তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের প্রকৃত বয়স বের করে জরিপে উল্লিখিত বয়সের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, তাদের বিয়ের প্রকৃত গড় বয়স মোটেও ১৬.৮ বছর নয়, বরং ১৮.৬ বছর।

এমন একটি চমকপ্রদ ফলাফল গবেষকদের স্বভাবতই অত্যন্ত কৌতূহলী করে তোলে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারলেন, যেসব নারীর প্রকৃত বিয়ের বয়স যত বেশি, বিয়ের বয়স ভুল বলার বা কমিয়ে বলার প্রবণতাও তাদের তত বেশি। তারা আরও দেখলেন, যেসব নারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং যারা অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বলবিয়ের বয়স ভুল বলার প্রবণতাও তাদের বেশি। সবকিছু বিচারবিশ্লেষণ করে তারা তাদের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেনআমাদের সমাজে এখনও যৌতুকের প্রকোপ ব্যাপকভাবে রয়েছে, কাজেই যেসব মেয়ের বয়স যত বেশি, যৌতুকের পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই যৌতুক দিতে হয়েছেএমন নারীরা তাদের প্রকৃত বিয়ের বয়স কমিয়ে বলে থাকতে পারেন, যাতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কোনোভাবে জরিপ থেকে তার প্রকৃত বয়স জেনে বেশি বয়সের জন্য অধিক যৌতুকের জন্য চাপ দিতে না পারে (যদিও গবেষণার উপাত্ত গোপন রাখা হয়, তবে গ্রামের নারীরা এ বিষয়ে সম্ভবত নিশ্চিত হতে পারেনি)

গবেষণার প্রসঙ্গ এ কারণে উত্থাপন করলাম, যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার উপলব্ধি করতে পারেবিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিমভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে লিগ্যাল বয়সের নিচে বিয়ে হওয়া মেয়েদের সংখ্যা যে বাংলাদেশে কম, তা প্রমাণের চেয়ে কার্যকর উপায়ে এ লক্ষ্যটি অর্জিত হতে পারে।

প্রথমত, বর্তমানে সরকারের গৃহীত নানা সামাজিক পদক্ষেপ প্রকৃতই কাজ করছে, ফলে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাস্তবিকপক্ষেই অনেক বেড়েছে (১৯৯৪ সালের বিডিএইচএস রিপোর্ট অনুযায়ী ১৪.১ বছর)। কিন্তু নানা জরিপে যে কারণে এ উন্নয়ন প্রতিফলিত হতে পারছে না, তা অ্যাড্রেস করা বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দেয়ার থেকেও অধিক কার্যকর ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মান নিয়ন্ত্রণ করা। যে কোনো নাগরিকের প্রকৃত বয়স নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে জন্ম নিবন্ধন সনদ।

দ্বিতীয়ত, নারীরা তাদের বয়স কমিয়ে বলার তাগিদ অনুভব করছেকারণ অধিক বয়সে বিয়ের ব্যাপারে সমাজে এক ধরনের ‘স্টিগমা’ বিরাজ করছে। এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে বিয়ের বয়স ও যৌতুক সংক্রান্ত সামাজিক মূল্যবোধ। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটলে দেশের নারীরা আর বয়স লুকানোর প্রয়োজন অনুভব করবে না।

সরকার সম্প্রতি ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ প্রণয়ন করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এ আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি এবং বাবামায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সাধারণভাবে বিয়ের লিগ্যাল বয়স আগের মতোই মেয়েদের জন্য ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে হয় না, সেখানে ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ কম বয়সে বিয়ের সুযোগটির অপব্যবহার ঘটতে পারে। তাই এ অনুবিধিটি বাতিল করার অনুরোধ জানাই।

সহকারী অধ্যাপক

জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬

বেকারত্বের জ্বালা মেটাতে চাইলে পড়ুন…

ডিসেম্বর 19, 2016 মন্তব্য দিন

unemployment-problem