আর্কাইভ

Archive for the ‘সমাজ’ Category

ভারতে মুসলিমদের গরুপালনও দোষের !

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ভারতে সরকারিভাবে গরুজবাই নিষিদ্ধ। আগেও এনিয়ে ঝামেলা ছিল। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এ আইন চূড়ান্ত করা হয়। তবে লুকিয়ে ছাপিয়ে কোথাও না কোথাও গরুজবাই হয়েই থাকে। ঝামেলা বাঁধে এ নিয়েই। গরুর গোশত যে কেবল মুসলিম আর খৃস্টানদেরই প্রিয় এমন নয়। হিন্দু ব্রাহ্মণরা আগেও গরুমাংস খেতেন। এখনও খান। দক্ষিণ ভারতীয় ও কাশ্মিরী ব্রাহ্মণদের কাছে গোমাংস এখনও দারুণ জনপ্রিয় খাবার।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে বেশ কয়েকŸার ভারত গিয়েছি। কোলকাতাসহ ভুপাল, দিল্লি, নাগপুর, লক্ষেè, এলাহাবাদ, জৌনপুর প্রভৃতি শহর ঘুরেছি। সবখানেই গরুর গোশত পাওয়া যেতো। হোটেলে বিফ রান্না হতো। কোলকাতায় দারুণ স্বাদের গরুভুনা আর ক্ষিরিগুর্দা পাওয়া যেতো। ক্ষিরিগুর্দা মানে গাইগরুর দুধের থলেটা খুব চমৎকার করে রান্না হতো কোলকাতার দক্ষিণ ভারতীয় হোটেলগুলোতে। কোলকাতায় মাসের পর মাস অবস্থানকালে আমি প্রায়ই ক্ষিরিগুর্দার লোভে সাউথ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেরে নিতাম। বাঙালরাও গরুভুনা করতো। শুকনো করে। বেশ পোড়া পোড়া। অনেকটা কাবাবের মতো। সস্তায় পাওয়া যেতো। আমি দারুণ উপভোগ করেছি কোলকাতায় সেসময় বিফভুনা। এখন সেদিন নেই। ভয়াবহ সংকটে এখন গরু নিয়ে ভারতীয় মুসলিমরা।

আজকাল ভারতে মুসলিমরা গরুপালনও করতে পারেন না। জবাই তো দূরের কথা। কোনও মুসলিম গরু লালনপালন বা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে আনানেয়া করলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া হয়। এমনকি অনেককে হত্যার শিকারও হতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক এটাই। তবে আসামসহ ভারতের বেশ কয়েক জায়গায় এ অমানবিক আইনের প্রতিবাদে হিন্দুরাই গোহত্যার মাধ্যমে উৎসব করে মদসহযোগে গরুর গোশত ভক্ষণ করেছেন। তাহলে গরু জবাইয়ের অপরাধে মুসলিমদের হত্যা কেন? অথচ ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে গরু জবাই কিংবা গোমাংস ভক্ষণ আদৌ নিষিদ্ধ নয়।

দেখুন, ভারতীয় শাস্ত্রে এ প্রসঙ্গে কী রয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন: “এই ভারতবর্ষেই এমন একদিন ছিল যখন কোনও ব্রাহ্মণ গরুর মাংস না খেলে ব্রাহ্মণই থাকতে পারতেন না। যখন কোনও সন্ন্যাসী, রাজা, কিংবা বড় মানুষ বাড়িতে আসতেন, তখন সবচেয়ে ভালো ষাঁড়টিকে হত্যা করা হতো।” (Collected works of Swami Vivekananda, Advaita Asharama,1963, Vol III, page 172)

ঋগবেদের প্রাচীন ভাষ্যকার হিসেবে সায়নাচার্যের নাম বিখ্যাত। তাঁর আগেও বিভিন্ন ভাষ্যকার, যেমন স্কন্দস্বামী, নারায়ণ, প্রমুখ ঋগবেদের ভাষ্য রচনা করেছেন।

ভাষ্যকার আচার্য সায়ন লিখেছেন তার অনুবাদে, “You (O Indra), eat the cattle offered as oblations belonging to the worshippers who cook them for you. (Atharvaveda 9/4/1)”

হে ইন্দ্র গ্রহণ কর সেসব গরুর মাংস যা তোমাকে তোমার ভক্তরা রন্ধন করে উৎসর্গ করেছে।”

ঋগবেদ ১০/৮৬/১৩ তে গরুর মাংস রান্না করবার কথা পাওয়া যায়।

ঋগবেদের ১০/৮৬/১৪ শ্লোকে আছে, ইন্দ্রের জন্য গোবৎস উৎসর্গ করা হয়েছে।

Rig Veda 10.86.14 [Indra speaks :] The worshippers dress for me fifteen (and) twenty bulls : I eat them and (become) fat, they fill both sides of my belly; Indra is above all (the world).

উপনিষদেও গরু খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভালো সন্তান পাবার জন্য ষাঁড়ের মাংস খাওয়া উচিত।

Brihadaranyak Upanishad 6/4/18 suggests a ‘super-scientific’ way of giving birth to a super intelligent child.

এ ব্যাপারে আরও স্পষ্ট বিধান দিয়েছে মনুসংহিতা। মনুসংহিতা ৫/৪৪ শ্লোকে বলা হয়েছে, “শ্রুতিবিহিত যে পশুহত্যা, তাহাকে অহিংসাই বলিতে হইবে, যেহেতু বেদ ইহা বলিতেছে।”

অগ্নির কাছে নিবেদনে বলদ, ষাঁড় এবং দুগ্ধহীনা গাভী বলিদানের উল্লেখ আছে। (ঋগবেদ সংহিতা, /১৬২/১১১৩, /১৭/১১,১০/৯১/১৪)
মহাভারতেও গরু খাওয়ার কথা আছে, মহাভারত বন পর্ব, খণ্ড ২০৭, অনুবাদ করেছেন কিশোরীমোহন গাঙ্গুলী।

বিষ্ণুপুরাণ বলছে, ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাইয়ে হবিষ্য করালে পিতৃগণ ১১ মাস পর্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। আর এ স্থায়িত্ব কালই সবচেয়ে দীর্ঘ (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬)। বৃষের মাংস [বেদ:/১৬৪/৪৩], মহিষের মাংস [বেদ: /২৯/], অজের মাংস [বেদ:/১৬২/] খাওয়া হতো। তবে বেদে এও আছে যে, পরস্বিনী গাভী মানুষের ভজনীয় অর্থাৎ পূজনীয় [বেদ://]। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন ভিন্ন কথা: “You will be astonished if I tell you that, according to the old ceremonials, he is not a good Hindu who does not eat beef. On certain occasions he must sacrifice a bull and eat it. [The complete works of Swami Vivekananda, Volume 3, Pg 536]”

জগতগুরু আদি শংকরাচার্য, যিনি ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অদ্বৈত বেদান্ত শাখার প্রতিষ্ঠাতা। শংকরাচার্যের গীতাভাষ্য হিন্দু ধর্মীয় পন্ডিতমহলে অত্যন্ত বিখ্যাত। তিনি ব্রাহ্মসূত্র অধ্যায় ৩, পাদ্য ১, সূত্র ২৫ এ লিখেছেন, “যজ্ঞে পশুহত্যা পাপ হিসেবে বিবেচিত হবে না, কারণ শাস্ত্রই এর অনুমোদন দিয়েছে।”

বেদে স্পষ্টভাবে গরুর মাংস খাওয়ার কথা থাকলেও হিন্দুরা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।

হিন্দুরা হাজির করে ঋগ্বেদ (/৫৬/১৭) এই শ্লোক। ঋগবেদের ঐ শ্লোকে নাকি গোহত্যাকে মানুষ হত্যার সমকক্ষ বলা হয়েছে।

নীচে তুলসীরামের উক্ত শ্লোকের অনুবাদ দেখুন তো এ রকম কিছু আছে কিনা।

এরপর আবার হিন্দুরা, অথর্ববেদের (//১৫) এই শ্লোক দেখায়, যেখানে বলা হয়েছে: গোহত্যা ও ঘোড়া হত্যা উভয়ই নিষিদ্ধ। এখানে সত্য লুকিয়ে রেখে ঘোড়াসহ যে কোনও প্রাণির মাংস খেতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু সত্য হলো ঐ শ্লোকে বলা হয়েছে:
যারা বহিঃশত্রু (দেশকে আক্রমণ করবে) এবং প্রাণির মাংস তথা ঘোড়ার মাংস ও মানুষের মাংস খায় তাদের হত্যা কর।

ধারাবাহিকভাবে এই মন্ত্রগুলো যেমন ৭, , ৯ পড়লেই পরিষ্কার বোঝা যাবে।

অথর্ববেদের (//১৫) এই শ্লোকে স্পষ্টভাবে গরুর দুধগ্রহণকারীরও একই শাস্তি দেয়ার কথা আছে। তার মানে কি গরুর দুধ খাওয়াও বেদের নিষেধ ? এটি আরও স্পষ্ট আছে ১৭ নাম্বার মন্ত্রে, এখানে বলা গরুর দুধ যে খায় তার বুকে বর্শা মারার কথা।
এখন এই মন্ত্রগুলোর অর্থ সর্বজনীনভাবে নিলে হিন্দুরা কি বলবেন যে বেদ অনুসারে দুধ খাওয়াও মানা? এরপর হিন্দুরা ঋগবেদের ১/১৬৪/৮০ এবং অথর্ববেদের ৯/১০/২০ ও ৭/৭৩/১১ এইসব শ্লোক দেখিয়ে বলেন এইসব শ্লোকে গরুকে (আঘ্ন্যা) বলা হয়েছে। আঘ্ন্যা মানে যাকে হত্যা করা উচিত নয় । অথচ এসব শ্লোকে শুধুমাত্র মা গরুকে অর্থাৎ যে গরু থেকে দুধ পাওয়া যায় সেই গরুর প্রসঙ্গে (আঘ্ন্যা) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে অর্থাৎ যে গরু দুধ দেয় সেই গরু হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। দেখুন (ঋগবেদ ১/১৬৪/৮০) শ্লোকের তুলসীরামের অনুবাদ। তুলসীরাম লিখেছেন, Invioable (আঘ্ন্যা) as Mother Cow.
তুলসীরাম অথর্ববেদ ৯/১০/২০ শ্লোকেও একই কথা লিখেছেন, Invioable (আঘ্ন্যা) as Mother Cow. হাজির করা হয় ঋগবেদের ৮/১০১/১৫ এই শ্লোক…. (Do not kill the cow. Cow is innocent and aditi– that ought not to be cut into pieces).
মহাত্মা গান্ধী বলেছেন: “I know there are scholars who tell us that cow-sacrifice is mentioned in the Vedas. I… read a sentence in our Sanskrit text-book to the effect that Brahmins of old (period) used to eat beef. ( M.K.Gandhi, Hindu Dharma, New Delhi, 1991, p. 120).”

অর্থাৎ, “আমি জানি (কিছুসংখ্যক পন্ডিত আমাদের বলেছেন) বেদে গোউৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে। আমি আমাদের সংস্কৃত বইয়ে এরূপ বাক্য পড়েছি যে, পূর্বে ব্রাহ্মণরা গোমাংস ভক্ষণ করতেন। (হিন্দুধর্ম, এম.কে. গান্ধী, নিউ দিল্লি, ১৯৯১, পৃ. ১২০)
অতএব এবার নিশ্চয়ই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় গরুর গোশত খাওয়া ধর্মসম্মত।

অবশ্য বৌদ্ধযুগের আগ পর্যন্ত হিন্দুরা প্রচুর গোমাংস ভক্ষণ করতেন এ তথ্যও অনেকেই জানেন। ব্যাসঋষী স্বয়ং বলেছেন, ‘রন্তিদেবীর যজ্ঞে একদিন পাচক ব্রাক্ষ্মণগণ চিৎকার করে ভোজনকারীদের সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘মহাশয়গণ! অদ্য অধিক মাংসভক্ষণ করবেন না, কারণ অদ্য অতি অল্পই গোহত্যা করা হয়েছে; কেবলমাত্র একুশ হাজার গোহত্যা করা হয়েছে।’ (সাহিত্য সংহিতা৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা৪৭৬)

বৌদ্ধযুগের পূর্বপর্যন্ত হিন্দুরা যে প্রচুর গরুর গোশত খেতেন ডা. রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রণীত Beef in Ancient India গ্রন্থে, স্বামী ভুমানন্দ প্রণীত ‘সোহংগীত’, ‘সোহং সংহিতা, ‘সোহং স্বামী’ গ্রন্থগুলোতে, আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে পর্যন্ত গোহত্যা, গোভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখন অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেতো।

ডা. রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রণীত Beef in Ancient India গ্রন্থে, স্বামী ভুমানন্দ প্রণীত অনেক গ্রন্থে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে গোহত্যা, গোভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখন অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেতো। তাই অতিথির আরেক নাম ‘গোঘ্ন’।

বৌদ্ধসম্রাট অশোকের সময় থেকে গোহত্যা নিষিদ্ধ করা হয়। সুতরাং বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাব ২০০০ বছর আগে হলেও গোহত্যা আরও অনেক পরে নিষিদ্ধ হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্রাট অশোকের নিষেধাজ্ঞা হিন্দুরা মানছে কেন?

এটাও ধর্মীয় সংঘাতের ফল। বৌদ্ধধর্ম এতোই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, প্রচুর লোক, বিশেষ করে তথাকথিত “নীচ জাতি” আকৃষ্ট হয়েছিল, এই ধর্মের প্রতি । ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং ব্রাহ্মণরা প্রমাদ গুণলেন। তারাও পুরোপুরি মাছমাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়ে ভেকধারী হয়ে গেলেন।

মূলত এটা উত্তর ভারতেই হয়েছিল । তাই এখনও ওটা “গোবলয়” নামে খ্যাত।

বেশিদিনের কথা নয়, আলীবর্দির সময়ে রামপ্রসাদের গুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ একটা বই লেখেন। নাম ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’।

এতেও অষ্টবিধ মহামাংসের মধ্যে গোমাংস প্রথম বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋগবেদে ফিরে আসি। কি দেখছি? প্রথম মন্ডলের ১৬৪ সূক্তের ৪৩ নং শ্লোকে বৃষমাংস খাওয়ার কথা আছে। মহিষমাংসের উল্লেখ আছে পঞ্চমমলের ২৯ নং সূক্তের ৮ নং শ্লোকে।

মোষ বলি আজও হয় । নেপালে যারা মোষের মাংস খায়, তাদের ছেত্রী বলা হয়।

এছাড়া বনবাসকালে রামচন্দ্রের লাঞ্চের মেনু কী ছিল, অনেকেরই জানা নেই।

তিন রকমের মদ বা আসব হয়। যথা: গৌড়ি (গুড় থেকে তৈরি), পৌষ্টি (পিঠে পচিয়ে তৈরি) এবং মাধ্বি (মধু থেকে তৈরি)। এর সঙ্গে প্রিয় ছিলশূলপক্ব বা গোবৎসের মাংস।

উল্লেখ্য, কারুর বিশ্বাস বা অনূভুতিতে আঘাত দেবার জন্য নয়, শুধুমাত্র সত্য অবগতির জন্যই ভারতীয় শাস্ত্রাদির বাণী উদ্ধৃত করা হলো। যাদের ঘরে শাস্ত্রসমূহ আছে, তাঁরা অনুগ্রহ করে সেগুলোর পাতা উলটে দেখতে পারেন। এছাড়া আজকাল ইন্টারনেট বা গুগল সার্চ দিয়েও পরখ করে দেখতে পারেন। আসলে সত্য চিরদিন চেপে রাখা যায় না। এর আগুন বিলম্বে হলেও সর্বভুক হয়ে প্রকাশ পায়। প্রকটাকার ধারণ করে। এই হলো বাস্তবতা এবং সত্যের ধর্ম। এ আগুন ঠেকায় কার সাধ্য?

যাই হোক, ভারতের যে ক’জন গোমাংসের বড় ব্যবসায়ী আছেন, তাঁরা সবাই হিন্দু মাড়ওয়ারি। বিপুল পরিমাণ প্যাকেটজাত গোমাংস রফতানি করে হাজার হাজার কোটি রুপি উপার্জন করেন প্রতি বছর। এতে তাঁদের জাত যায় না। ধর্মেরও অবমাননা ঘটে না। দোষ শুধু মুসলিমরা গরু জবাই করলে। এখন ভারতে গরুপালন করলেও মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে। আগে এসব খবর মিডিয়ায় স্থান পেতো। এখন তাও প্রায় বন্ধ।

উল্লেখ্য, গরুর গোশতের ক্রাইসিস সব দেশেই। আমাদের দেশেও চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম। এমতাবস্থায় ভারতে যদি গরুর গোশত খাওয়া সত্য সত্যই বন্ধ করে তা আমাদের দেশে পাঠানো হয়, তবে কিছুটা হলেও কম দামে পাওয়া যেতো বৈকি।

Advertisements

চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিবিধ প্রতারণা

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : যুগ যুগ ধরে এ দেশের মানুষ চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতারিত হয়ে চলেছেন। ১৯৬০এর দশকে দেখেছি একশ্রেণীর ডাক্তারকবিরাজহেকিম নামধারী ব্যক্তি কোর্টকাচারি, হাটবাজারে মজমা জমিয়ে মানুষের হাতে ধুলাবালি ছাই পর্যন্ত ধরিয়ে দিত। বিষয়টা পরিষ্কার করে বলা যাক।

ছেলেবেলায় যখন পাবনা জিলা স্কুলে পড়তাম তখন টিফিন পিরিয়ডে প্রায়ই স্কুলের কাছেই জজকোর্ট প্রাঙ্গণে চলে আসতাম। কারণ হেকিমডাক্তার নামধারী লোকেরা সেখানে মজমা জমিয়ে মানুষকে আনন্দ দানের (Wondering entertainment) মাধ্যমে নিজেদের মতলব হাসিল করত। প্রথমে কিছু মজাদার খেলাধুলা, হাতসাফাই দেখিয়ে তারা লোক জড়ো করে, তারপর ওষুধের বাক্সপেটরা খুলে ধরে মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রলোভিত করত। ভিড় জমানো মানুষের বিভিন্ন রোগের সুযোগ গ্রহণ করে তাদেরকে ওইসব ডাক্তারহেকিম নিজেদের তৈরি বিভিন্ন ধরনের সালসা, সিরাপ, হালুয়া, বটিকা, পুরিয়া, তাবিজকবজ ধরিয়ে দিত। আর কোর্টকাচারিতে আসা লোকজনসহ সেখানে জড়ো হওয়া অন্যান্য মানুষও প্রলুব্ধ হয়ে সেসব ওষুধ কিনে নিয়ে ঘরে ফিরত। এভাবে দুপুরের মধ্যে সেখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ওইসব ডাক্তারহেকিম আবার বিকালবেলা একই কায়দায় হাটবাজারে গিয়ে ওষুধ বিক্রি করত। আমার নিজ এলাকার এমন দু’জন ডাক্তারও এ কাজে জড়িত থাকায় তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে আমি অনেকটাই জেনে গিয়েছিলাম। তাদের দু’জনই আমার চেয়ে বয়সে বেশ বড় হওয়া সত্ত্বেও লালু নামের একজনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠায় একদিন সে আমাকে বলেছিল, ওইদিন ছাই ও মোম দিয়ে ভরা তাবিজকবজ বিক্রি করে সে তিনশ’ টাকা রোজগার করেছে। সে সময়ে একজন দিনমজুরের দৈনিক মজুরি ছিল তিন টাকা! আবার অন্য একজন যাকে এলাকার লোক কাদের বাঙাল বলে জানত ও চিনত, সেও একদিন বলেছিল, খাবার সোডা, আটা ও শুকনো গুড় দিয়ে এক ধরনের পুরিয়া তৈরি করে সে পেটব্যথার রোগীদের কাছে তা বিক্রি করে!

সুধী পাঠক, আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগের একটি মফস্বল শহরের ডাক্তারহেকিম নামধারী চিকিৎসকদের বিষয়ে একটু আলোকপাত করার জন্যই অতীতের উদাহরণ তুলে ধরা হল। কারণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে এ দেশে প্রতারণার রকমফের হয়েছে মাত্র! আর সে রকমফের পাল্টাতে পাল্টাতে এখন যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সে ক্ষেত্রেও প্রচুর প্রতারণা আছে!

৬০ বছর আগে মফস্বল শহরে শিক্ষিত ডাক্তার বলতে আমরা ন্যাশনাল, এলএমএফ পাস ডাক্তারকেই বুঝতাম। কালেভদ্রে একজন এমবি অথবা এমবিবিএস ডাক্তার সে সময়ে কোনো জেলায় থাকলেও থাকতে পারে। এ অবস্থায় বাল্যকালে আমার চিকিৎসা একজন এলএমএফ (লাইসেন্স ইন মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি) ডাক্তার দ্বারাই সম্পন্ন হতো। বিভিন্ন সময়ে তার কাছে গেলে ওই ডাক্তার সাহেব কাচের শিশিতে দাগ কেটে সিরাপ (ওষুধ) বানিয়ে দিতেন। আবার তারও আগে শিশুকালে জ্বর হলে হাতুড়ে গ্রাম্য ডাক্তার গঙ্গারাম (গঙ্গা ডাক্তার) বাবুর কুইনাইন ইনজেকশনে জ্বর সারত। কিন্তু সে কুইনাইনের ধকল আজও শরীরে হয়তো রয়েই গিয়েছে। কারণ কুইনাইন জ্বর সারালেও কুইনাইনকে সারানো যায় না! তাই আজ থেকে ৬০৬৫ বছর আগে আমি যে চিকিৎসা পেয়েছি তা হাটবাজার, কোর্টকাচারিতে মজা দেখানো ডাক্তারহেকিমের মতো না হলেও চিকিৎসার নামে সেসবই যে ছিল অপচিকিৎসা সে কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তাই বলে বর্তমানেও যে খুব ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি সে কথাও জোর দিয়ে বলতে পারছি না। বর্তমানেও আমাদের দেশে বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতালে, প্রতিটি জেলায় ক্লিনিকে চিকিৎসার নামে যা চলছে সেসব ক্ষেত্রেও অনেক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ এবং প্রমাণ আছে। এসব প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হলে ছোটখাটো রোগ ধরা পড়লেও প্রতারণার মাধ্যমে পরীক্ষানিরীক্ষার লিস্ট লম্বা করা হয় এবং একদিন বা দু’দিন সেখানে অবস্থানের প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও তা দীর্ঘায়িত করে ৫১০ দিনে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। অর্থাৎ বিপদেআপদে কেউ ওইসব হাসপাতালে ঢুকে পড়লে ছোটখাটো রোগের ক্ষেত্রেও লাখ টাকার নিচে বিল মিটিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসার কোনো উপায় নেই। বড়সড় কোনো অসুখ ধরা পড়লে তো কথাই নেই। সে ক্ষেত্রে ৫৭ লাখ বা ১০১২ লাখ টাকা বিল বানানোও ওইসব হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিচিত্র কিছু নয়! ওইসব হাসপাতাল ধনবান ব্যক্তিদের জন্য বিবেচিত হলেও বিপদেআপদে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজনকেও সেখানে যেতে হয়। এমনই একজন রোগীর সঙ্গে একবার ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে কথা হয়েছিল। মফস্বল থেকে আসা একজন নিম্নমধ্যবিত্ত ব্যক্তি জানিয়েছিলেন, সেখানে ভারত থেকে আগত ডাক্তার আছেন বিধায় এবং ভারতে ডাক্তার দেখাতে গেলে ভিসাসহ সঙ্গীসাথী নিয়ে ভ্রমণের ঝামেলা থাকায় তিনি এখানে এসেছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি এ কথাও জানালেন যে, ৩ লাখ টাকায় এক বিঘা ধানি জমি বিক্রি করে তবেই এখানে চিকিৎসা করাতে এসেছেন। কারণ মানুষমাত্রই বাঁচতে চায়। আর অসুখবিসুখের মতো বিপদে পড়লে সে অবশ্যই ধানি জমি, ভিটে জমি বিক্রি করে হলেও সেসব বিপদের মোকাবেলা করতে চায়। কিন্তু বিপদাপন্ন ওইসব ব্যক্তি আমাদের দেশের হাসপাতালে সুচিকিৎসা পান কিনা সে প্রশ্নটি থেকেই যায়। আর সে প্রশ্নের উত্তরও বোধহয় আমাদের সবারই জানা। আমার এক আত্মীয় মিরপুরের স্বনামধন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হলে তার হার্টে পেসমেকার লাগানোর প্রয়োজন পড়ে। আমি সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, এসব অপারেশন তার কাছে ডালভাতের মতো অত্যন্ত সহজ কাজ। তিনি এ ধরনের অপারেশনসহ দৈনিক ৪০৫০টি এনজিওগ্রাম করে থাকেন। অতঃপর নির্ধারিত অপারেশনের দিন (পেসমেকার লাগানোর দিন) আমি থাকতে না পেরে তিন দিন পর গিয়ে যা শুনেছিলাম, তাতে আমার চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হয়েছিল। কারণ পেসমেকার লাগানোর দিন সেই করিৎকর্মা ডাক্তার সাহেব অসুস্থ থাকায় তার সহকারীরা আমার আত্মীয়ের হার্টে পেসমেকার লাগিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ ওই ডাক্তার সাহেব আমার এক বন্ধুর ছোট ভাই এবং আমি তাকে বিশেষভাবে বলেও এসেছিলাম।

এসব ঘটনা ছাড়াও ঢাকার বড় বড় তিনটি বেসরকারি হাসপাতাল সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত যেসব অভিজ্ঞতা আছে এবং আমার কাছে যেসব প্রমাণপত্র আছে, সেসব উপস্থাপন করলেও বিরাট বড় ধান্দাবাজি ও প্রতারণার প্রমাণ মিলবে। যদিও সেসব কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, যেসব মানুষ ওইসব হাসপাতালে যাচ্ছেন, তারা সঠিক নিয়মে সঠিক খরচে সঠিক সময়ে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন কিনা? নাকি একজন রোগী গেলেই প্রয়োজনেঅপ্রয়োজনে একগাদা পরীক্ষানিরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দিয়ে কয়েকদিন সময় নষ্ট করার পাশাপাশি সিট ভাড়া বাড়িয়ে ভুক্তভোগীর অর্থের শ্রাদ্ধ করা হচ্ছে! যদি তাই হয়, তাহলে ওইসব হাসপাতালে দেশের মানুষ সুচিকিৎসা পাবেন কীভাবে? রোগী গেলেই যদি প্রতারণার মাধ্যমে বিল বাড়ানোর পাঁয়তারা করা হয় এবং বিষয়টি যদি ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এ দেশের রোগীরা যাবেন কোথায়? আর কতকালই বা এ দেশের মানুষ চিকিৎসার নামে বঞ্চনাপ্রতারণার শিকার হবেন? আর কতদিনই বা ডাক্তারি পেশার নামে, হাসপাতালক্লিনিক ব্যবসার নামে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনের ধান্দাবাজি অব্যাহত থাকবে? আর কতকাল ধরে ডাক্তার সাহেবরা রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার খরচের অর্থের ওপর থেকেও কমিশন গ্রহণ করবেন? ডাক্তার সাহেবরা এসব বিষয় স্বীকার করুন আর নাই করুন, যেহেতু বিষয়টি একটি ওপেন সিক্রেট, তাই আমরাও তাদের বিবেককে জাগ্রত করার প্রচেষ্টা হিসেবেই এখানে তা তুলে ধরলাম।

সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবদের কিছু ঘটনা, কিছু কথা তুলে ধরেই লেখাটি শেষ করতে চাই। কয়েকদিন আগে একটি ব্যাংকের একজন ম্যানেজার ভদ্রমহিলা জানালেন, তিনি পরপর দু’দিন আগারগাঁও সরকারি চক্ষু হাসপাতালে গিয়েও সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সাক্ষাৎ পাননি। ডাক্তার সাহেব নাকি সে সময়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকেন। তিনি অভিযোগ করে বললেন, ব্যাংকে চাকরি করে সময় বের করে পরপর দু’বার তার কাছে গিয়ে ফেরত আসার মর্মযাতনায় তিনি কাতর। বলা বাহুল্য, সরকারি হাসপাতালগুলোর ডাক্তার সাহেবদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। হাসপাতালের আশপাশের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দালাল নিয়োগ করা থেকে শুরু করে যথাসময়ে হাসপাতালে উপস্থিত না থাকা, রোগীদের প্রয়োজনীয় সময় না দেয়া, রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করা ইত্যাদি বিভিন্ন দোষে এসব ডাক্তার সাহেব দুষ্ট। পাবনা মানসিক হাসপাতালের আশপাশ ঘুরে দেখে এলাম সেখানকার ব্যক্তিগত দালানকোঠায় পর্যন্ত মানসিক রোগী ভর্তির সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। প্রশ্ন হল, ওইসব প্রাইভেট ভবনে গিয়ে রোগী দেখেন কারা, সরকারি মানসিক হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবরাই তো, নাকি? আর সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবরা অবলীলায় এসব করে চলেছেন, তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে। ড্যাব, এ্যাব ইত্যাদি বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে তারা সংগঠিত হয়ে যখন যে সরকার আসে তখন সেই সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে থাকেন। অনেক দিন আগে সকাল সাড়ে ১০টার সময় একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে নারীপুরুষ মিলিয়ে সেখানে প্রায় শ’খানেক ডাক্তারের উপস্থিতি দেখেই বুঝেছিলাম সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারির নামে আসলে তারা কী করেন? কারণ সকাল সাড়ে ১০টায় ওইসব ডাক্তার সাহেবের হাসপাতালে থাকার কথা।

উপসংহারে বলতে চাই, এসব ঘটনা উল্লেখের উদ্দেশ্য ডাক্তার সাহেবদের বিরুদ্ধে কোনো বিষোদ্গার করা নয়। আমি নিজেও একজন ডাক্তারের পিতা। দেশের ডাক্তারদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের মনে যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে তা বড় একটি সমস্যাই বটে। অবস্থায় আমরা ডাক্তারদের নীতিবোধকে সমুন্নত করার চেষ্টা করছি মাত্র। সেদিন একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে দেখলাম কীভাবে কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই, বাঙ্গালুরু যাওয়ার জন্য দেশের মানুষ বিমানের টিকিটের ওপর হামলে পড়ছেন। দিনের আগে যাওয়াআসার কোনো এয়ারলাইন্সেই টিকিট নেই। ব্যাংককসিঙ্গাপুরেও একই অবস্থা! চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেশের টাকা পানির মতো বিদেশে চলে যাচ্ছে। যার বেশিরভাগই যাচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। আর দেশের ডাক্তাররা তা চেয়ে চেয়ে দেখছেন। বারবারই যে প্রশ্নটি এসে যাচ্ছে তা হল, এখনও কি দেশের মানুষ দেশের ডাক্তারদের ওপর আস্থা রাখতে পারবেন না? সম্মানিত ডাক্তার সাহেবরা প্রশ্নটা আপনাদের কাছেই।

দৌড়াও, কিন্তু থামতে শেখো !

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : একটা গ্রিক উপকথা। আপনারা অনেকে হয়তো পড়েছেন। একটা খুবই সুন্দরী মেয়ে ছিল। দাফনি। অবিশ্বাস্য সুন্দরী। উপকথাতে তাই হয়। উপকথাতে কোনো খারাপ চেহারার মানুষ কখনো দেখা যায় না। কারণ উপকথার মধ্যে মানুষ তার স্বপ্নের পৃথিবীকে তৈরি করতে চায়। সেই স্বপ্নের পৃথিবী কুৎসিত হতে পারে না। তো সেই উপকথায় একটা নদী আছে। দাফনি হলো সেই নদীর রাজার মেয়ে। নদীর পাশে একটা বিশাল জঙ্গল। বিশাল অরণ্য। সেই অরণ্যে সে একা একা ঘুরে বেড়ায়। সেখানে যত সুদর্শন যুবককে দেখে, তাদের সঙ্গে সে প্রেমের অভিনয় করে। সেই যুবক যখন সম্পূর্ণভাবে তার প্রেমে মত্ত হয়ে ওঠে, তখন সে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে একটা পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করে। এ রকমভাবে তার দিন কাটছে। সে থামে না। একজন শেষ হলে আরেকজনের কাছে যায়, আরেকজন শেষ হলে আরেকজনের কাছে যায়।

এমন সময় হলো কী, সে চোখে পড়ে গেল অ্যাপোলো দেবতার। অ্যাপোলো দেবতা তাকে দেখেই তার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে গেল। মানুষই যখন মুগ্ধ, দেবতা তো আরও অনুভূতিশীল, তাই না? তার তো অবস্থা আরও করুণ! সে বলল, ‘দাফনি তুমি দাঁড়াও।’ দাফনি বুঝল যে এ দেবতা, একে সে এড়িয়ে যেতে পারবে না। তখন সে দৌড়াতে লাগল, তার হাত থেকে পালানোর জন্য। সেও দৌড়াচ্ছে, অ্যাপোলোও দৌড়াচ্ছে। কিন্তু অ্যাপোলোর সঙ্গে দৌড়ে তো তার পারার কথা নয়। অ্যাপোলো ক্রমে কাছে চলে এল। একসময় দাফনি টের পেল যে তার পেছনে অ্যাপোলোর ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

এমন সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। অরণ্য শেষ হয়ে গেল এবং দেখল যে সামনে সেই নদী। তখন দাফনি চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা আমাকে বাঁচাও।’ তখন দেখা গেল যে আস্তে আস্তে দাফনির পা মাটির মধ্যে গেড়ে গেল এবং পায়ের আঙুলগুলো শিকড়ের মতো হয়ে মাটির নিচে ছড়িয়ে গেল। তার হাতগুলো ডালের মতো হয়ে, আঙুলগুলো পাতার মতো হয়ে সমস্ত অবয়বটা গাছে পরিণত হলো। সে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল। তখন অ্যাপোলো বলল, দাফনি, তুমি এত দিন অস্থির ছিলে। এত দিন তুমি শুধু ছুটেছ। কাউকে তুমি দাওনি কিছুই। কারণ তোমার নিজেরও কিছু ছিল না। তুমি ছিলে একটা ঊর্ধ্বগতিসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু আজকে দেখো, তুমি দাঁড়িয়েছ। এই জন্য তুমি আজকে একটা বৃক্ষে পরিণত হয়েছ। এই জন্য দেখো আজ তোমার কত ডাল, কত পাতা এবং কত ফুল। আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি, বর দিচ্ছি, তুমি যেহেতু দাঁড়াতে পেরেছ, সুতরাং আজ থেকে এই গ্রিসের সমস্ত বীরদের মাথার মুকুট তোমার এই পাতা দিয়ে তৈরি হবে। দাফনি কী গাছ হয়ে গিয়েছিল? অলিভ। অলিভ গাছের পাতা দিয়ে মুকুট তৈরি হয়। গ্রিসে যত প্রেমিকপ্রেমিকা আছে, তারা তোমার ফুলের দ্বারা তাদের ভালোবাসা পরস্পরকে জানাবে।

ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমারও একটাই কথা—থামো। দৌড়াও, কিন্তু থামতে শেখো। দাঁড়াতে শেখো। গাছ হতে শেখো। গাছের মতো সমুন্নত, গাছের মতো পোশাকআবহ, গাছের মতো পাতায় ভরা, ফুলে ভরা, সৌন্দর্যে ভরা। তাহলে এই পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে কিছু দিতে পারবে। তা না হলে হাততালি এবং শিস দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। ধন্যবাদ।

রোগী জিম্মি করে অর্থ আদায় বকশিশ

আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা ব্যুরো : খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ফ্রি সার্ভিস কর্মী ও দালালদের বিরুদ্ধে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের হয়রানি, বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার নামে অর্থ আদায়, হাপাতালের সামনে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য করা এবং বকশিশ আতঙ্কে রোগীর আত্মীয়স্বজনরা। এসব হয়রানি বন্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দ্রুত সেবা নিশ্চিত এবং রোগীদের সহযোগিতার জন্য হাসপাতালে ফ্রি সার্ভিস কর্মী রাখে কর্তৃপক্ষ। এসব কর্মীর একটি বড় অংশ আউটডোর ডাক্তারদের এটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করলেও এদের বেশির ভাগই হাসপাতালের বাইরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল। রোগীরা ডাক্তার দেখিয়ে বের হলেই তাদের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকে। দিন শেষে ওই সব ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন পায় তারা। যেহেতু হাসপাতাল থেকে তারা কোনো সম্মানী পায় নাএ জন্য এসব বিষয় নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তাদের নিষেধ করেন না। এসব কর্মীর ড্রেসিং করা ও ওয়ার্ড পরিষ্কার করার কথা থাকলেও কোনো কাজই তারা ফ্রিতে করেন না। রীতিমতো জুলুম করে রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে বলে রোগী ও তাদের আত্মীয়রা অভিযোগ করেছেন। এদের বিরুদ্ধে জরুরি বিভাগে ট্রলি নিয়ে রোগী ওঠানামা করতে টাকা আদায় ও রান্নাঘর থেকে খাবার চুরির অভিযোগ হচ্ছে হরহামেশা। এছাড়াও হাসপাতালের স্টোর থেকে চুরি করে ওষুধ বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে ভর্তি রোগী জাহানারার স্বজন মনিরুল ইসলাম বলেন, তার স্ত্রীকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে ট্রলিতে করে প্রসূতি বিভাগে নিতে ১শ’ টাকা নিয়েছেন দু’জন। ৫০ টাকা দিতে চাইলে দুর্ব্যবহার শুরু করেন রোগীর সঙ্গে। তিনি বলেন, এ রকম ছোটখাটো কাজেও টাকা দিতে হচ্ছে তাদের। এর থেকে বেসরকারি হাসপাতালই ভালো। হাসপাতালে ভর্তি এক বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক আবদুল মালেক বলেন, এখানে কেবিন পরিষ্কার এবং ঝাড়ামোছার জন্যও পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে অর্থ দিতে হয়। তিনি ওঠার আগে একজনকে ১০০ টাকা দিতে হয়েছে। টাকা দিতে না চাইলে ওই সব পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা চেঁচামেচি শুরু করেন। পরে বাধ্য হয়ে ২০০ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকা দেন। এ ধরনের অভিযোগ করেছেন হাসপাতালের প্রায় অর্ধশত রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ডসহ বহির্বিভাগেও প্রতিদিন এ ধরনের হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। এদের নির্ধারিত কোনো পোশাক বা পরিচয়পত্র নেই। অফিসের তালিকায় কোনো নামপরিচয় নেই। নির্দিষ্ট কোনো নিয়োগদাতাও নেই। অথচ ওয়ার্ড মাস্টারকে টাকা দিলেই সে হাসপাতালের কর্মচারী। ফ্রি সার্ভিস হিসেবে রোগীদের পাশাপাশি পুরো হাসপাতালকেই জিম্মি করে ফেলেছে এরা।

সূত্রটি জানিয়েছে, এসব বহিরাগতকে প্রশ্রয় দিয়ে হাসপাতালে কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছেন ওয়ার্ড মাস্টার আতাউর। অভিযোগ রয়েছে, ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় ফ্রি সার্ভিস কর্মী নিয়োগ দেন তিনি। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে না জানিয়েই কর্মীদের কাজে লাগিয়ে দেন বিভিন্ন ওয়ার্ডে। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তিনি সবার আগে গিয়ে ওই কর্মীকে উদ্ধার করে এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বদলি করেন।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়ার্ড মাস্টার আতাউর রহমান। তিনি বলেন, প্রায় ৮০ জনকে ফ্রি সার্ভিস কর্মী হিসেবে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা নেই। যখন যেখানে প্রয়োজন হয় তখন সেখানে কর্র্মীদের কাজে লাগানো হয়। ওয়ার্ডের ডাক্তারদের প্রয়োজন হয় বলেই তাদের কাজে লাগানো হয়। এসব বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এসব বিষয় নিয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার এটিএম মোর্শেদ বলেন, ফ্রি সার্ভিস কর্মীদের দিয়ে রোগীরাই সেবা পায় বেশি। তবে তাদের রূঢ় আচরণ এবং অর্থ আদায়ের বিষয়টি আমাদের নজরেও এসেছে। আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব। তবে কতজন ফ্রি সার্ভিস কর্মী রয়েছে হাসপাতালে সে বিষয়ে বলতে পারেননি তিনি।

ক্যান্সারাক্রান্ত আলী বানাতের সর্বস্ব দান

ali banat

কার্টুন-রসঃ ঈদে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রভাব !

FIFA affect on eid 1a

FIFA affect on eid 1b

FIFA affect on eid 1c

ইসলাম নারী মুক্তির একমাত্র সমাধান

তাহনিয়া ত্বরিক : মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নারীকে প্রকৃতির অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। নারী কেবলমাত্র একটি সত্তার নাম নয় বরং সে একটি চালিকা শক্তি যাকে ছাড়া পৃথিবী স্তব্ধ-স্থবির। সভ্যতা বিনির্মাণে যুগে যুগে পুরুষের পাশাপাশি নারীও অবদান রেখে এসেছে সমানাংশে। প্রত্যেক যুগেই নারী তার মেধা, বুদ্ধি, যোগ্যতা, শ্রম এবং মমতার সংমিশ্রণে গড়ে তুলেছে ভবিষ্যতের বুনিয়াদ। জন্ম দিয়েছে নতুন ইতিহাসের। জাতি গঠনের ক্ষেত্রেও নারীর অবদান এককভাবে স্বীকৃত। কিন্তু বিনিময়ে কেবলই অবিচার জুটেছে অবলা নারীর ভাগ্যে। প্রাপ্তির খাতায় বেড়েছে শুধুই শূন্যতা। তার চারিধার ঘিরে গড়ে উঠা সমস্যার আকড়, মাকড়সার জালের মত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। হাজারো প্রতিবন্ধকতা, ঝড়-ঝঞ্ঝা মুহূর্মুহু স্থবির করে দিচ্ছে নারীর চলমান গতিকে। পর্যদস্তু করছে নারীর স্থিতিশীল অবস্থানকে। অবস্থার উন্নয়নে, ভাগ্য পরিবর্তনে, সময়ের সাথে সাথে প্রণীত হয়েছে বিভিন্ন নীতিমালা, হাতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন আইন। কিন্তু পরিবর্তন ঘটেনি নারীর অবস্থার। তাই একবিংশ শতাব্দীর আলো ঝলমলে পৃথিবীতে দাঁড়িয়েও নারী আজ বড় অসহায়। বড় বিপর্যস্ত। আজ আধুনিক বিশ্বের নারী সমাজকে প্রতিটি পদক্ষেপে নানান সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে।

আধুনিক বিশ্বে নারী সমস্যার ভয়াবহ চিত্র

– ইংল্যান্ডে প্রতি ৪ জনে তিন জন মেয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বেশির ভাগ নির্যাতনকারী হয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা সহকর্মী।
– ভারতের নারী ভ্রুণ হত্যা এবং নারী সন্তান হত্যার জন্য, বিগত শতকে ৫০ মিলিয়ন নারী নিখোঁজ রয়েছে। ২০০০ সালে পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে ১০০০ নারীকে খুন বা Honour Killing করা হয়েছে।
– বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে কমপক্ষে ১২.৫ লাখ অবিবাহিত কিশোরী গর্ভ ধারণ করে।
– সুসভ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি হাজারে ৩০৭ জন নারী সহকর্মীদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। সেখানে প্রতি মিনিটে একজন নারী হারায় তার সম্ভ্রম।
– ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৮ জন নারী লাঞ্ছনার শিকার হয় এবং ১৪ জন নির্যাতিত হয়।
– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের শতকরা ৫০ জন বিয়ের আগে সতীত্ব নষ্ট  করে এবং ১০ জনে ৫ জনের বিবাহ তালাকে পর্যবসিত হয়।
– সৌন্দর্যের লীলাভূমি ফ্রান্সে ২৪০ টিরও বেশী সেক্সক্লাব রয়েছে।
– নারী দিবসের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়কারী চীনও কন্যা সন্তান রফতানী করে আয় করে ১৫০ কোটি ডলার।
– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০-১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোর আত্মহত্যার চিত্র শতকরা ৭৬ ভাগ।
– অস্ট্রিয়ায় কর্মস্থলে শতকরা ৮০ জনের মত মহিলা জীবনে একবার কিংবা একাধিকবার বিভিন্ন মাত্রার যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
– জার্মানীতে কর্মস্থলে শতকরা ৭২ জনের মত মহিলা জীবনে একবার কিংবা একাধিকবার বিভিন্ন মাত্রার যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
– লুক্সেমবার্গে জীবনে অন্তত একবার ৭৮% মেয়ের যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
– হল্যান্ডেও একই অবস্থা উপরন্তু ৩৬% মেয়েরা রীতিমত ভায়োলেন্সের শিকার হন।
– সম্প্রতি চলন্ত বাসে গণধর্ষণের শিকার ভারতকন্যা নামধারী জ্যোতি সিং পান্ডে বিশ্বের নির্যাতিত নারীদের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি (সূত্র : ইন্টারনেট)

আমার বাংলাদেশে নারীর অবস্থা : নারী কেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যার বিষবাষ্পে জর্জরিত আমাদের প্রিয় এ জন্মভূমির চারপাশ। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চব্বিশ বছরে এ দেশে পতিতালয় বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার। ২০১২ সালের জানুয়ারী থেকে নভেম্বর মাসে নারী নির্যাতনের কয়েকটি চিত্র নিম্নরূপ, যদিও বাস্তব অবস্থা আরো অনেক বেশি ভয়াবহ :

–    শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার    – ৪৮৫ জন
–    শারীরিকভাবে গণলাঞ্ছনার শিকার – ১৫৬ জন
–    লাঞ্ছনার পর হত্যা     – ১৯০ জন
–    শ্লীলতাহানি     – ১৯০ জন
–    এসিডদগ্ধ     –   ৬১ জন
–    নারী অপহরণ     – ১১৫ জন
–    যৌন নির্যাতন     –  ৩৮ জন
–    গৃহপরিচারিকা হত্যা     –  ১৬ জন
–    নারী ও শিশু পাচার     –  ১৮ জন
–    পতিতালয়ে বিক্রি     –  ১৩ জন
–    উত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা     –  ১৫ জন
–    যৌতুকের কারণে হত্যা     –   ২৮২ জন
–    শারীরিক নির্যাতন     –  ৩৭৮ জন
–    নারী হত্যা     –  ৮৩৫ জন
–    উত্যক্ত     –    ৪৩ জন
–    বাল্যবিবাহ     –    ৮৪ জন

১. শারীরিক সমস্যা

ক. মানসিক নির্যাতন : পরিবার ও পরিবারের বাইরে একজন নারীকে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় প্রতিনিয়তই। কোথাও একজন মা, একজন স্ত্রী, ছেলের বউ, কখনো শাশুড়ী, কখনো বোন, কখনো কন্যা হিসেবে এই মানসিক নির্যাতনের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর। এই নির্যাতন যেমন পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দ্বারা হচ্ছে তেমনি নারী কর্তৃকও হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা মুখবুঁজে সহ্য করে পড়ে থাকলেও উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর নারীদের আশ্রয় বৃদ্ধাশ্রমে ও বস্তিতে। নিম্নবিত্তরা বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তি। কখনো নারী পাচারকারীদের খপ্পড়ে পড়ে নিরুদ্দেশে পাড়ি দেয় অজানা পথে।

খ. শারীরিক নির্যাতন : মানসিক নির্যাতনের মধ্যেই থেমে নেই নারীদের সমস্যাগুলো বরং উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত তিনশ্রেণীর পরিবারগুলোতেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। শারীরিক নির্যাতনের ফলাফল কখনো পঙ্গুত্ব, অন্ধত্ব, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঠেকে। সাম্প্রতিককালে ডা: শামারুখ, অভিনেত্রী লোপা ও প্রকৌশলী ইয়াসমিন হত্যার ঘটনা তার নির্মম চিত্র।
গ. পারিবারিক বৈষম্যনীতি : পারিবারিক পরিবেশে নারীকে যেমন চরম লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হতে হয় তেমনি সাদা-কালোর পার্থক্যের কারণেও তাকে অপমান, লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হয়। নারীর মত প্রকাশের স্বাধীনতা অধিকাংশ পরিবারগুলোতেই অনুপস্থিত।
ঘ. যৌতুক : যৌতুক সমাজের একটি সংক্রামক ব্যাধি। শিক্ষার হার দ্রুতগতিতে বাড়লেও আধুনিক শিক্ষিত সমাজেই কনেপক্ষের কাছে বরপক্ষ যৌতুক বাবদ আসবাবপত্র, জিনিসপত্র, শাড়ি, স্বর্ণালংকার ও মোটা অংকের টাকা দাবি করে থাকে। বর্তমান সময়ে মেয়ের সুখের জন্য একে গিফট’ নাম দিয়ে বরপক্ষ থেকে কনের বাবার কাছে এ অন্যায় আবদারের প্রচলন শুরু হয়েছে। যাদের সামর্থ্য ন্যূনতম আছে নিজ সন্তানের ভবিষ্যত কল্যাণের কথা ভেবে ধারদেনা করে হলেও যৌতুকের দাবি মিটিয়ে থাকেন। কিন্তু বরপক্ষের প্রত্যাশা আরো বেড়ে যায়। ফলে লাগামহীন এ চাহিদা মিটাতে না পারলে কনের উপর নেমে আসে অত্যাচার, নির্যাতনের স্টিমরোলার। অনেকক্ষেত্রেই তাদেরকে মৃত্যুবরণ পর্যন্ত করতে হয়। দেশীয় আইনে ১৯৮০ ও ২০০০ সালে এ নির্যাতন প্রতিরোধে আইন পাশ হলেও মিলছেনা প্রতিকার। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের (১১-গ) ধারানুযায়ী যৌতুকের দাবীদারকে অপরাধী গণ্য করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(খ) ধারানুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ-, সর্বনিম্ন ৫ বছর এবং একই সঙ্গে অর্থদ-ে দ-িত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন)

ঙ. তালাক : তালাক নারী নির্যাতনের রেকর্ডে যোগ করেছে আরেকটি নির্মমতা। প্রতিবছর কয়েক হাজার নারী তালাকপ্রাপ্তা হয়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হয়। কখনো কখনো উপায়হীন হয়ে পা বাড়ায় অন্ধকার জগতে। তালাকের পিছনে অনেক বড় কারণ খুব কমই দেখা যায়। সামান্য কারণেই অনেক সময় তালাকের ঘটনা ঘটে। কথা কাটাকাটি থেকে রাগের বশে তালাক দেয়ার ঘটনা খুব স্বাভাবিক চিত্র।

চ. অনার কিলিং : পরিবার বা বংশের সম্মানহানির দায়ে পরিবারের কোন সদস্যকে হত্যা করাই অনার কিলিং নামে পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই অনার কিলিং প্রচলিত। পাকিস্তান, জর্ডান, লেবানন, মরক্কো, সিরিয়ান রিপাবলিক, এমনকি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানের মতো উন্নত দেশগুলোতেও অনার কিলিং এর খবর পাওয়া যায়। নারীরাই প্রধাণত এই অনার কিলিং এর শিকার।

যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পৃথিবীতে প্রতি বছর অনার কিলিং এর নামে প্রায় ৫০০০ জনকে হত্যা করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার নারীবাদী সংগঠনের এক হিসেব মতে প্রতি বছর ২০,০০০ এর উপর মেয়েকে অনার কিলিং এর নামে হত্যা করা হয়।

অনার কিলিং-এর প্রবণতা গোড়া হিন্দু সমাজে সব থেকে বেশি। সতীদাহ প্রথা ছিল অনার কিলিং এর নিষ্ঠুর চিত্র। ব্রিটিশ আগমনের পর এ অনার কিলিং ভারতে বন্ধ হলেও একবিংশ শতাব্দীতেও ঘটছে এ ধরণের ঘটনা। উত্তর ভারতের ভাগলপুর অনার কিলিং-এর জন্য কুখ্যাত। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)

ছ. নারীর অবমূল্যায়ন : পারিবারিক ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই নারীর অবদান, পরিশ্রম, কষ্টকে খাটো করে দেখা হয়। অনেক সময় চাকুরিজীবী মহিলার বেতনের টাকাটাও স্বামী জোর করে নিয়ে নেয়। ন্যূনতম খরচের স্বাধীনতাও তার থাকেনা। এভাবে নারীকে অবমূল্যায়ন করা হয় পদে পদে।

জ. পরকীয়া : পারিবারিক গ-িতে পর্দাহীনতা, অবাধ মেলামেশা ও মিডিয়ার প্রভাবের কারণে দিন দিন পরকীয়ার হার বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে পরিবারে সৃষ্টি হচ্ছে ভাঙনের এবং বৈধ স্ত্রীরা হচ্ছেন নির্যাতিত।

২. সামাজিক সমস্যা

ক. ইভটিজিং : পথেঘাটে প্রকাশ্যে নারীকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, শিস ও অপমানজনক কথার মাধ্যমে বিরক্ত ও বিব্রত করার নাম ইভটিজিং। বিভিন্ন বয়সের পুরুষের দ্বারা ইভটিজিংএর শিকার নারীরা মানসিক পীড়ন থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এমনকি জীবনের ইতিও ঘটাতে বাধ্য হচ্ছে।

খ. যৌন নির্যাতন : কন্যাশিশু থেকে বৃদ্ধা বয়সী নারীরা পর্যন্ত যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাস, ট্রেন, গৃহ কোন স্থানই নিরাপদ আর নেই। ভারতে চলন্ত বাসে মেডিকেল ছাত্রীকে পাশবিক নির্যাতন একই সময়ে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে গার্মেন্টস কর্মীকে মাস রেইপের ঘটনায় নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা সহজেই অনুমেয়।

গ. এসিড সন্ত্রাস : পুরুষ তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে না পেরে অধিকাংশ সময়ই নারীদের এসিড নিক্ষেপ করে। এতে অসংখ্য নারীর দৈহিক বিকৃতির মাধ্যমে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে বাধ্য হয়, আবার অনেক সময় ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।

ঘ. খুন : দ্বন্দ¡-কলহ, পরকীয়া, লোভ, অ্যাফেয়ার ইত্যাদি নানা কারণে নারীর খুন হওয়ার ঘটনা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঙ. সামাজিক বৈষম্য : আধুনিক সমাজে যদিও নারীকে অবাধ বিচরণের সুযোগ দেয়া হয়েছে তথাপি সুযোগ সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে নারী বৈষম্যের শিকার।

চ. পৃথক শিক্ষাঙ্গন  ও কর্মক্ষেত্রের অভাব : সমাজের নিত্যকার বাস্তবতায় নারীর জন্য পৃথক শিক্ষাঙ্গন ও কর্মক্ষেত্রের দাবী অনিবার্য। কিন্তু এ দুটির অভাব নারীকে নির্যাতন ও বৈষম্যের খোরাক হিসেবে উপস্থাপন করছে। ফলে ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, শ্লীলতাহানি, রেপ, পারিবারিক অশান্তি, পরকীয়া, তালাক, মান-সম্মানের ভয়ে আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এ অবস্থার উত্তরণে সম্প্রতি ভারতের কয়েকটি রাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আটসাট পোশাক পরিধানের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। বৃটেনের কয়েকটি কোম্পানীর অফিসে মিনি স্কার্ট পরিধানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সম্প্রতি গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৫% স্কুল ছাত্রী সহশিক্ষার অভিশাপ থেকে মুক্তি চায়- যারা তাদের সহপাঠীদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার।

৩. অর্থনৈতিক সমস্যা

ক. সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত : অধিকাংশ পরিবারগুলোতে নারীর কোন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই। স্বামীরা তাদের আয় থেকে নারীদের প্রয়োজন পূরণের জন্য দেন না। ফলে নারী চাকুরিক্ষেত্রে যেতে বাধ্য হয়।

খ. উপার্জনের ক্ষেত্রে বৈষম্য : চাকুরিক্ষেত্রেও নারী বৈষম্যের শিকার হয় চরমভাবে। একই পোস্ট ও পজিশনে থাকলেও পুরুষের তুলনায় নারীর বেতন কম, সম্মানও পুরুষের ভাগেই বেশি থাকে।

গ. উত্তরাধিকার বঞ্চিত : পিতার সম্পত্তি থেকে ছেলে মেয়ে উভয়ই অংশীদার। কিন্তু ছেলে তার অংশ ষোলআনা পেলেও নারীকে পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে নারী তার ন্যায্য অধিকার চাইলে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয় এবং তাকে ছোটলোক, স্বার্থপর ও লোভী আখ্যা দেয়া হয়। এ যেন পাওনাদারকেই চোর উপাধি দেয়া।

নারীর সমস্যার কারণসমূহ

উপরোক্ত সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করে এর পেছনের কারণগুলো পাওয়া যায় নিম্নরূপঃ

– ইসলামের সুমহান বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে এর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন।
– মহান আল্লাহ প্রদত্ত নারীর মর্যাদা ও অধিকারের ব্যাপারে অসচেতনতা।
– আল্লাহভীতির অভাব সমাজের ব্যক্তিদের নারীজাতির প্রতি দায়িত্বহীন করে তুলেছে।
– সমাজে নারীর সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে ব্যর্থতা।
– মূল্যবোধের অবনতি ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয়।
– সহশিক্ষা ও নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষা কাঠামো
– নারীবান্ধব সুস্থ সমাজ গঠনে উদ্যোক্তার অভাব।
– অশ্লীল লেখনী, সিনেমা, পর্ণোগ্রাফির সহজলভ্যতা।
– তথাকথিত নারী স্বাধীনতা ও অযৌক্তিক সমানাধিকার দাবীর মাধ্যমে নারীর কাঁধে দ্বিগুণ থেকে ৪গুণ বোঝা চাপিয়ে দেয়া।
– নিজের সম্মান মর্যাদার প্রতি নারীর উদাসীনতা।

সমস্যার প্রেক্ষিতে ইসলামই একমাত্র সমাধান : আজ থেকে ১৪শত বছর আগে জীবন্ত প্রোত্থিত কন্যাশিশুকে বাঁচাতে আরবের বুকে উদিত হয়েছিল যে আলোকরশ্মির তা আজও আমাদের মাঝে বর্তমান। মহামুক্তির সনদ আল কুরআনের পূর্ণ অনুসরণই নারীকে যাবতীয় সমস্যার আবর্ত থেকে বের করে দেখাতে পারে মুক্তির রাজপথ, এনে দিতে পারে কাক্সিক্ষত শান্তি, কল্যাণ ও মর্যাদা এবং অধিকার। এ লক্ষ্যে ইসলামের গৃহীত পদক্ষেপগুলো নিম্নরূপ:

১. গৃহের পরিবেশে নারীর করণীয় : মহান আল্লাহ তায়ালা নারীকে গৃহের শোভা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। নারীদের আসল কর্মক্ষেত্র হল গৃহ। সাধারণত তারা ঘরের মধ্যেই অবস্থান করবে। ঘরের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব তাদের। স্বামীর অবর্তমানে তার ঘর-সংসারের প্রতি যত্নবান হয়ে এবং সজাগ দৃষ্টি রাখবে, সন্তান-সন্তুতিদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত করে গড়ে তুলবে। নারীর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো এখানে যে সে তার সন্তানদের আল্লাহর দ্বীনের সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলবে। তাই তাকে এমন চারিত্রিক গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে যে, সন্তান তার কোলে দৃষ্টি মেলেই যেন পূর্ণ ইসলামী পরিবেশ দেখতে পায়। রাসূল (সাঃ) বলেছেন- তোমাদের মধ্য থেকে যে বাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থান করবে সে মুজাহিদের মর্যাদা লাভ করবে।”
অন্য একটি হাদীসে এসেছে- “যে নারী তার স্বামীর সংসারের প্রতি যত্নবান, সন্তানদের আল্লাহভীরু হিসেবে গড়ে তোলে এবং নিজের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে নারী আল্লাহর জান্নাতের যে দরজা দিয়ে খুশি  প্রবেশ করবে।”

ঈমানদার পুরুষগণ তো আমিই দৃঢ়পদে ও স্থিরচিত্তে আল্লাহর পথে সময় দিতে পারবে এবং ঘর-সংসারের দিক থেকে পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে। যে নারী তার স্বামীকে এই নিশ্চয়তা দিবে সে নারী সেই সম্মান মর্যাদাই অর্জন করবে, যে মর্যাদা তার স্বামী আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে অর্জন করবে। তবে পারিবারিক জীবনে নারীকে যেন সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয় এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে সেজন্য ইসলাম নিম্নোক্ত বিধান দিয়েছে- ঘরই মূল কর্মক্ষেত্র হলেও প্রয়োজনের আলোকে ঘরের বাহিরে যাবে। এক্ষেত্রে সৌন্দর্য প্রদর্শন না করা।

“আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করোনা। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” (সূরা আল আহযাব : ৩৩)

মাহরাম পুরুষ ব্যতীত অন্যদের সাথে পর্দা রক্ষা করে চলা। প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা ও এক্ষেত্রে মিহি সুরে কথা না বলা, দৃষ্টিশক্তির হেফাজত করা ও চোখ অবনমিত রাখা, সৌন্দর্য প্রকাশ না করা।

“আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুড়, নিজেদের ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, মালিকানাধীন দাস-দাসী, অধীনস্থ যৌন কামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” (সূরা আন নূর : ৩১)

নারীর ঘরে অন্যরা অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করবে- “হে মুমিনগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসী এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি তারা যেন অবশ্যই তিন সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের সালাতের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক খুলে রাখ এবং ইশার সালাতের পর; এই তিনটি তোমাদের (গোপনীয়তার) সময়। তাই তিন সময়ের পর (অন্য কোন সময়ে বিনা অনুমতিতে আসলে তোমাদের এবং তাদের কোন দোষ নেই। তোমাদের একে অন্যের কাছে যাতায়াত করতেই হয়। এভাবে আল্লাহ তোমাদের উদ্দেশ্যে তার আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রাজ্ঞময়। আর তোমাদের যেমনভাবে তাদের অগ্রজের অনুমতি প্রার্থনা করত। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তার আয়াত সমূহ বর্ণনা করেন। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রাজ্ঞময়।” (সূরা আন নূর : ৩১)

২. বহিরাঙ্গনে নারীর অবস্থান ও সীমা : নারীর মূল অংগন তার ঘর হলেও তারা ইসলামের বিপরীত মতামত, আদর্শ ও বিধি বিধানের অসারতা প্রমাণ করে সাহিত্য রচনা করে, পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করবে। পর্দার বিধানের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে লিখবে। ইসলামী বিধি-বিধান পালনে অন্যান্য নারীদের উদ্বুদ্ধ করবে, তাদের ইসলাম অনুশীলনের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইসলামী শিক্ষার প্রচার ও প্রসার ঘটাবে, দেশ ও জাতির জন্য স্বীয় মেধা ও শ্রম দিয়ে জাতীয় উন্নতিতে অবদান রাখবে, রাষ্ট্রীয় পরিষদের স্বতন্ত্রভাবে একমাত্র নারীদের দ্বারা নির্বাচিত নারী প্রতিষ্ঠান থাকবে এবং তারা নারীদের স্বার্থ ও ন্যায়সঙ্গত দাবীসমূহ পরিষদের সম্মুখে পেশ করবে। যাবতীয় নারী প্রতিষ্ঠান যেমন স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মুসাফিরখানা প্রভৃতি নারীর তত্ত্বাবধানে চলবে। পুরুষদের ক্ষেত্রে পুরুষের তত্ত্বাবধানে চলবে। সামরিক শিক্ষা, সামরিক কার্যকলাপে প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ করার কঠিন দায়িত্ব ইসলাম নারীকে দেয়নি। এসব কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে। কারণ নারীর প্রকৃতিগত কোমলতা ও মায়ের অসীম মমতা। নারীর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার অর্থই হলো আদর্শ সুনাগরিক তৈরির কারখানা থেকে তাকে বের করে নিয়ে আসা এবং তার নারী প্রকৃতিকে হত্যা করা। তবে যখন তার জীবন, সতীত্ব ও সম্ভ্রম হারানোর আশংকা দেখা দেয় সেক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার অনুমতি দিয়েছে। সেই সাথে প্রাথমিক চিকিৎসা, নার্সিং বিষয়ে জ্ঞানার্জন ও যুদ্ধাহতদের সেবা করার অনুমতি দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নীতিমালা মেনে চলতে হবে-

– দৃষ্টিশক্তির হেফাজত করবে।
– নিজের সৌন্দর্যকে সুরক্ষিত রাখবে পর্দার আড়ালে।
– পর্দায় আবৃত হলেও নারী এবং পুরুষ একাকী মিলিত হবে না। একাকী দীর্ঘ সফর করবে না।
– মাহরাম পুরুষকে সঙ্গে রাখবে। বর্তমান সময়ের আলোকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ইসলামের এই নীতিমালায় অভ্যস্থ না হওয়ায় এটা মেনে চলা দূরূহ ব্যাপার। যথাসম্ভব মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। অন্ততঃ রাতে সফর করবে না, সাথে অন্য কোন নারী আত্মীয় হলেও সাথে নিবে, যদি একাকী সফর করতে বাধ্য হয়।

“আর মুমিনদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা আন নূর : ৩১)

“আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।” (সূরা আল আহযাব : ৩২)

“আর যখন নবীপত্নীদের কাছে কোন সামগ্রী চাইবে তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে; এটি তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র।”

৩. পুরুষের সংযত আচরণ : নারীর চলাফেরায় ইসলাম যেমন নীতিমালা বেঁধে দিয়েছে তেমন পুরুষকেও দিয়েছে দৃষ্টিশক্তির হেফাজত, লজ্জাস্থানের হেফাজত করা পুরুষের উপর বাধ্যতামূলক নীতি।

“মুমিন পুরুষদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। এটি তাদের জন্য বিশুদ্ধ নীতি। তারা যা কিছু করে আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা আন নূর : ৩০)

আপন স্ত্রী কিংবা কোন মাহরাম মহিলাকে ছাড়া অপর কোন মহিলাকে নজরভরে দেখা কোন পুরুষের জন্য জায়েয নয়। একবার নজর পড়া ক্ষমাযোগ্য। আবার নজর দেয়া ক্ষমাযোগ্য নয়। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ধরণের দেখাকে চোখের যিনা বলে আখ্যায়িত করেছেন।

“মানুষ তার ইন্দ্রিয়গুলোর মাধ্যমে যিনা করে থাকে। দেখা হচ্ছে চোখের যিনা। ফুসলানো কণ্ঠের যিনা। তৃপ্তির সাথে পর নারীর কথা শুনা কানের যিনা। হাত দ্বারা স্পর্শ করা হাতের যিনা। অবৈধ উদ্দেশ্যে পথ চলা পায়ের যিনা। যিনার এইসব অনুসঙ্গ পালিত হওয়ার পর লজ্জাস্থান তাকে পূর্ণতা দান করে কিংবা পূর্ণতা দান করা থেকে বিরত থাকে।” (সহীহ মুসলিম, সহীহ আল বুখারী, সুনানু আবী দাউদ)

৪. মহিলাদের সংযত আচরণ : মহান আল্লাহ বলেন- “মুমিন মহিলাদেরকে বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজাত করে।”

মহিলারা এমনভাবে পা মেরে চলবে না যাতে তাদের লুকানো সাজ-সৌন্দর্যের লোকেরা জেনে ফেলে। মহান আল্লাহ বলেন- “এবং তারা যেন তাদের পা এমনভাবে না মেরে চলে যাতে তাদের লুকানো সাজ-সৌন্দর্যের কথা লোকেরা জেনে ফেলে। আর মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর নিকট তওবা কর। আশা করা যায় তোমরা কল্যাণ লাভ করবে।” (সূরা আন নূর : ৩১)

মহিলারা প্রয়োজনে ভিন্ন পুরুষের সাথে কথা বলতে পারেন, কিন্তু মিহি স্বরে বলবে না।

মহান আল্লাহ বলেন- “ওহে নবীর স্ত্রীরা, তোমরা তো অন্য কোন মহিলার মতো নও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর তাহলে মিহি স্বরে কথা বলো না যা অন্তরে ব্যাধি আছে এমন লোককে প্রলুব্ধ করবে, বরং সোজা-স্পষ্ট কথা বল।” (সূরা আল আহযাব : ৩২)

ঘরে বাইরে উপরোক্ত নীতিমালার অনুসরণ নারীর পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করে দিতে সক্ষম।

৫. নারী পুরুষের মর্যাদার যথাযথ মূল্যায়ন : ইসলামে নারী এবং পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমরা পুরুষ হও বা নারী, আমি তোমাদের কারো কাজ বিনষ্ট করবোনা। এটা নারীর প্রকতিগত অবস্থানকে সামনে রেখে ইসলাম তার দায়-দায়ীত্বের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। এটা নারীর অবমূল্যায়ন বা পরাধীনতা নয় এটা তার মর্যাদা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই সেদিনও নারী যাদের দৃষ্টিতে মানুষ হিসেবেই পরিগণিত ছিলনা, তারাই আজ নারী স্বাধীনতা, নারীর সমানাধিকারের শ্লোগান দিয়ে বলে যে, ‘ইসলাম নারীকে বঞ্চিত করেছে।’ প্রকৃতপক্ষে এই অযৌক্তিক সমানাধিকার ও স্বাধীনতা নারীকে পুরুষের মহলে সহজলভ্য করার এক কার্যকরী উপায় মাত্র। ধিক! তাদের এই ঘৃণ্য চক্রান্তের প্রতি!!

৬. পুরুষকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে মূল্যায়ন : ইসলাম পুরুষকে নারীর তত্ত্বাবধায়ক ঘোষণা দিয়ে তার উপর নারীর সমস্ত দায়-দায়িত্বের বোঝা অর্পণ করেছে। দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে পুরুষকে কঠিন জবাবদিহিতারও সম্মুখীন হতে হবে। প্রয়োজনে উদ্ধত নারীকে শাসনের অধিকারও পুরুষের আছে। তবে এই তত্ত্বাবধায়ন সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। দায়িত্ব পালনের ছলে যেন শোষক হয়ে না যায় ইসলাম সে ব্যাপারেও কড়া নজরদারি রাখে।

“পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পূণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর আড়ালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হেফাযত করেছেন। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর এবং তাদেরকে (মৃদু) প্রহার কর। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমুন্নত মহান।”

প্রকৃতপক্ষে ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর যা সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের অনিবার্য শর্ত। সেজন্য নারীকে তার প্রাপ্যদানের সাথে সাথে তাদের উপর পুরুষের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দিয়ে মূলত: ভারসাম্যপূর্ণ বন্ধন সৃষ্টি করা হয়েছে।

৭. সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণ : ইসলাম নারীকে সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার প্রদান করেছে। আল কুরআন বলছে- “পিতা মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে তা থেকে কম হোক বা বেশি হোক- নির্ধারিত হারে।” (সূরা আন নিসা : ৭)

আমাদের সমাজে নারীর উত্তরাধিকারের ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত। এটা ভয়াবহ পাপ এবং নারীর প্রতি যুলুমেরই নামান্তর। মহান আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার থেকে নারীকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ।

৮. নারীর যথাযথ মূল্যায়ন : ইসলাম নারীকে যে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে তার সঠিক মূল্যায়নই নারীর যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। ইসলামে নারীর মর্যাদা সংক্ষেপে নিম্নরূপ :

মা হিসাবে মর্যাদা : রাসূল (সা.)-কে একজন জিজ্ঞাসা করলেন আমার সর্বাপেক্ষা সদ্ব্যবহার পাওয়ার যোগ্য কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি জানতে চাইলো, তারপর কে? রাসূল (সা.) বললেন, তোমার মা। লোকটি জানতে চাইলো, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জানতে চাইলো, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা। (সহীহ বুখারী)
এভাবে ইসলাম পিতার চেয়ে মাতাকে সম্মান-মর্যাদার দিক দিয়ে তিনগুণ বেশি মর্যাদার অধিকারী করেছেন।

কন্যা শিশুর মর্যাদা : যে কন্যা সন্তানের ভাগ্যে জীবন্ত প্রোত্থিত হওয়া অনিবার্য ছিল তার সম্পর্কে ইসলামের ঘোষণা-আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তানকে কিংবা অনুরূপ তিনটি বোনকে লালন-পালন করেছে, শিষ্ঠাচার শিক্ষা দিয়েছে, স্বাবলম্বী না হওয়া পর্যন্ত এদের সাথে সদয় ব্যবহার করেছে, মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে দিয়েছেন।”

স্ত্রী হিসাবে মর্যাদা : বিবাহের পর স্ত্রীর সকল ধরণের দায়দায়িত্ব পুরুষের উপর চাপিয়ে ইসলাম স্ত্রীর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে। স্বামীর ব্যাপারে স্ত্রীর মূল্যায়নকে সর্বোচ্চ মান প্রদান করে ইসলাম মূলত: নারীকে সর্বোত্তম মর্যাদা দান করা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন- তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।”

৯. আল্লাহভীতির প্রশিক্ষণ : মহান আল্লাহকে ভয় করার মাধ্যমে পুরুষ এবং নারী উভয়ই তাদের সমস্ত সমস্যা দূর করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন- “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছে বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর।” (সূরা আন নিসা : ১)

১০. অপরাধ নিরসনে ইসলামী শাস্তি আইন প্রয়োগ : নারী নির্যাতনকারী, নারীর উপর অপবাদ রটনাকারী, ব্যভিচারী ব্যভিচারিনী প্রত্যেকের কুরআনী আইনে শাস্তি নিশ্চিত করলেই সমাজে নারী কেন্দ্রিক যাবতীয় অপরাধের মূলোৎপাটন ঘটবে। যেমন ব্যাভিচারের শাস্তি সম্পর্কে কুরআন মাজীদে ঘোষণা-“ব্যভিচারিনী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশ’টি করে বেত্রাঘাত কর। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক তবে আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের আযাব প্রত্যক্ষ করে।” (সূরা আন নূর : ২)

সতী নারীর উপর অপবাদ আরোপের শাস্তি সম্পর্কে আল কুরআন বলছে- “আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চার জন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনোই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।” (সূরা আন নূর : ৪)

১১. নৈতিক পবিত্রতা রক্ষায় বিয়ের অনুষ্ঠান : ইসলাম অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে নারী-পুরুষের অবৈধ মেলামেশাকে নিষিদ্ধ করেছে এবং বিয়ের বিধানের মাধ্যমে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সহজাত প্রকৃতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে ও পবিত্র উপায়ে পরিচালনা করার সুযোগ দিয়েছে। তাদের জৈবিক সত্তাকে অস্বীকার না করে কিছু নীতিমালা ঠিক করে দিয়েছে। যেমন- কুরআন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যে, “তোমরা মোহরানা পরিশোধ করে বিবাহের মাধ্যমে তাদের রক্ষক হবে। গোপনে যৌনাচার এবং লুকিয়ে প্রেম করতে পারবে না।” (সূরা আল মায়িদাহ : ৫)

ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন উমর (রা.) খুতবাতে বললেন- কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নিভৃতে সময় না কাটায়, কেননা তাদের মধ্যে তৃতীয়জন হয় শয়তান। (আত তিরমিযী)

– অ্যাফেয়ার করা যাবে না।
– প্রাপ্ত বয়সে উপনীত হলে বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
– নির্জনে কোন স্থানে কোন পুরুষ কোন নারীর সাথে সাক্ষাত করবে না।

১২. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বর্জন : ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির প্রয়োজনেই নারী-পুরুষের মধ্যে সহজাত প্রবৃত্তি সৃষ্টি করা হয়েছে যেমন, তেমনি একে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে পর্দার মাধ্যমে যাতে সমাজে ফিতনা-ফ্যাসাদের সৃষ্টি না হয়। ইসলাম ঠিক  করে দিয়েছে দৃষ্টির বিধান, চোখের বিধান, কানের ও অন্তরের বিধান, এটাও ঠিক করে দিয়েছে কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলেও যেন পর্দার আড়াল থেকে চাওয়া হয়। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার চিত্রই এমন যে, নারী-পুরুষের শিক্ষাঙ্গণ, পরিবহন, কর্মক্ষেত্র সবই এক। এক সাথে অবাধ বিচরণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার ফলশ্রুতিতে পরিবারে ভাঙ্গন, পালিয়ে বিয়ে ও কয়েকদিন পর লাশ হয়ে ফেরার এখন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেজন্য আমাদের নিজেদের রক্ষায় নিজেদের পদক্ষেপ নিতে হবে-

– মেয়েদের সার্কেলেই বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ রাখা।
– যাবতীয় প্রয়োজন মেয়ে বান্ধবীদেরকে সাথে নিয়ে সম্পাদনের চেষ্টা করা।
– নিরূপায় হলে কথা বললেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত না বলা এবং অবশ্যই একাকী না যাওয়া।
– হাসি-ঠাট্টা, সৌন্দর্য প্রকাশ মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা।
– অন্তরে আল্লাভীতি সর্বদা জাগ্রত রাখা।

শেষকথা : আধুনিক বিশ্ব নানান আইন প্রণয়ন করেও নারী সমস্যার সামান্যতম সমাধান করতে পারেনি। নারীবাদীরা তাদের মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তা দিয়ে মূলত নারীকে কেবল ভোগের পণ্যে পরিণত করেছে। তাদের সমস্যাবলীর কোনরূপ সমাধান না করেই আকুণ্ঠ সমস্যার কঠিন আবর্তে তাদেরকে নিক্ষেপ করেছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথই হচ্ছে মহান স্রষ্টা প্রদত্ত নারীজাতির মান-সম্ভ্রমের গ্যারান্টি ইসলামী জীবন বিধান, ইসলামী নারীনীতিও ইসলামী দিক নির্দেশনার হুবহু অনুসরণ।

সমাজের সমস্ত অশ্লীলতা, অনৈতিকতা, নারীদের সকল সমস্যা প্রতিরোধ ইসলামের রয়েছে নিজস্ব বিধি বিধান। একমাত্র এই বিধি বিধান সমাজে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই নারী জাতি ফিরে পেতে পারে তার কাক্সিক্ষত মুক্তি ও স্বাধীনতা যা মানব রচিত কোন আইনের দ্বারা অর্জন করা সম্ভবপর নয়। আর নারীকে যারা কঠিন সমস্যার মধ্যে ঠেলে দিয়ে অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করেছে তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহর ঘোষণা-

“নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার দয়া না থাকত, (তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে) আর নিশ্চয় আল্লাহ বড় মেহেরবান, পরম দয়ালু। হে মুমিনগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। আর যে শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করবে, নিশ্চয় সে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে। আর যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার দয়া না থাকত। তাহলে তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারতেনা। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, পবিত্র করেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও জ্ঞানী।” (সূরা আন নূর : ১৯-২১)