আর্কাইভ

Archive for the ‘সমাজ’ Category

বিদেশী ডক্টরেট ডিগ্রী সংস্কৃতি’র নেপথ্যে…

foreign PhD culture

Advertisements

কার্টুন-রসঃ জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে চাইলে…

Forma-2.qxdForma-2.qxdForma-2.qxd

(রোবট) সোফিয়া, তুমিও সাবধান!

robot sofia commentsনিশাত সুলতানা : স্পেনের রানি সোফিয়া ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ভ্রমণে এসেছিলেন। রানি সোফিয়ার স্নিগ্ধ সৌন্দর্য আর অভিজাত ব্যক্তিত্বে দারুণভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম সে সময়। কোনো এক সময় বুঁদ হয়েছিলাম আরেক সোফিয়ায়। সে সোফিয়া হলেন হলিউডি অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন। একসময়ে দুনিয়া কাঁপানো এই ইতালিয়ান গায়িকা ও চলচ্চিত্রাভিনেত্রী আজও আমাদের অনেককে মুগ্ধ করে রেখেছেন। তবে এবার আমি মুগ্ধ হয়েছি অন্য এক সোফিয়ায়। ব্যতিক্রম হলো এই সোফিয়া মানবী নয়, যন্ত্রমানবী। যন্ত্রমানবী এই সোফিয়া বাংলাদেশে এসেছিল সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তথ্যপ্রযুক্তির মেলা ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’-তে অংশ নিতে। সোফিয়া বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই তাকে নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর সোফিয়াকে দেখলাম, মুগ্ধও হলাম। হয়তোবা তাকে যতটা মানবাকৃতিতে দেখব বলে প্রত্যাশা করেছিলাম, সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবে সোফিয়ার বর্তমান এই রূপইবা মন্দ কী! প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্বের উৎকর্ষের এক অনন্য দৃষ্টান্তের নাম সোফিয়া। আমি নিশ্চিত, আর কয়েক বছরের মধ্যেই সোফিয়া সমালোচনাকারীদের মুখে কুলুপ এঁটে আবির্ভূত হবে অন্য এক রূপে এবং অন্য এক সক্ষমতায়।

জানি না, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধিকারী যন্ত্রমানবী সোফিয়ার অনুভূতি আছে কি না বা সে স্পর্শ করলে সাড়া দেয় কি না। তবে এই যন্ত্রমানবী সোফিয়া আমার অনুভূতির জগতে যেভাবে নাড়া দিয়েছে, তা জীবিত কোনো সত্তার চেয়ে কোনো অংশে কম না; বরং বেশি। সোফিয়ার বাংলাদেশে আসার পূর্বাপর ঘটনা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেছে বাংলাদেশে নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কদর্য চিত্রটি। সোফিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত কলাকৌশলসংক্রান্ত বিস্ময়কে ছাপিয়ে বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে এমন কিছু বিষয়বস্তু, যা সমগ্র নারী জাতির প্রতি অবমাননাকর। সোফিয়াকে নিয়ে বেশ কিছু আদিরসাত্মক আলোচনায় নগ্নভাবে বেরিয়ে এসেছে ভোগবাদী ও লোলুপ পুরুষ চরিত্রটি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে রীতিমতো ঝড় উঠেছে সোফিয়ার আদ্যোপান্ত চুলচেরা বিশ্লেষণে। বারবার আলোচনায় এসেছে সোফিয়া দেখতে আদতেই অড্রে হেপবার্নের মত কি না! সে আলোচনায় বাদ যায়নি সোফিয়ার শারীরিক গঠন, চুলবিহীন মাথা, পোশাক, ওড়না, অন্তর্বাস, এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারের ইঙ্গিতও। অনেকেই সোফিয়ার কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এবং মুখের অভিব্যক্তি দেখে যতটা না বিস্মিত হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে তার বিয়ে এবং সন্তান লাভ করার ইচ্ছাসংক্রান্ত কথাবার্তায়। তার এই ইচ্ছা অনেক পুরুষকে আগ্রহী করে তুলেছে সোফিয়াকে বিয়ে করতে কিংবা তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে। ধিক এ রুচিবোধ! ধিক এ মানসিকতা!

যে সমাজে একজন শিশু থেকে বৃদ্ধা নারী ধর্ষণের শিকার হন, সেখানে হয়তো এটাই স্বাভাবিক। এখানে একজন রোবট নারীও বাদ যায় না পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে। এই দেশে এসে সোফিয়াকে মুখোমুখি হতে হয়েছে ‘উইল ইউ ম্যারি মি?/ তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ কিংবা ‘ডু ইউ নো, বয়েজ হ্যাভ আ ক্র্যাশ অন ইউ/ ছেলেরা যে তোমার জন্য পাগল, তা কি তুমি জানো?’—এ-জাতীয় প্রশ্নের। এমন অনেক প্রশ্নেরই উত্তর অজানা ছিল সোফিয়ার। জানি না, সোফিয়ার এই ধরনের অভিজ্ঞতা অন্য কোনো দেশে হয়েছে কি না! সোফিয়ার নির্মাতা বেচারা ডেভিড হ্যানসন হয়তো কখনো ভাবেনইনি যে বাংলাদেশে এসে সোফিয়াকে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। নিরুত্তর সোফিয়ার ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি কি আমাদের বিবেকে সামান্যতম নাড়াও দেয় না? আশ্চর্যজনকভাবে এই প্রশ্নগুলো এসেছে সমাজের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে। তাদের থেকে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রশ্ন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সাধারণ জনগণের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। সোফিয়াকে নিয়ে যৌন উত্তেজক এবং আদিরসাত্মক মন্তব্যের রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলেছে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয়। জানি না, সোফিয়া যন্ত্রমানবী না হয়ে যদি যন্ত্রমানব হতো, তবে সে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতো কি না!

sofia jokes 1আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পারিপার্শ্বিকতা এবং পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা। এই সমাজে নিরাপদ নয় দুই বছরের কন্যাশিশু, কিশোরী, তরুণী, এমনকি ষাট বছর বয়সী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধাও। আজ যন্ত্রমানবী সোফিয়াকেও দেখা হচ্ছে বিকৃত যৌনাকাঙ্ক্ষা পূরণের বস্তু হিসেবে। পুরুষের এই আকাঙ্ক্ষা থেকে নারী রূপধারী যন্ত্রেরও কি মুক্তি নেই! নারী আর কতকাল বস্তুরূপে উপস্থাপিত হবে, উপেক্ষিত হবে তার বুদ্ধিমত্তা, আবেগ আর অনুভূতি? আর কতকাল শুধু কামনার দৃষ্টিতে নারীকে দেখা হবে? সোফিয়াকে বলতে চাই, সোফিয়া, তুমি এদের থেকে দূরে থাকো, সতর্ক থাকো, নিরাপদে থাকো। আমরা চাই না হতভাগা রূপার মতো তোমার ছিন্নবিচ্ছিন্ন ধর্ষিত কৃত্রিম দেহাংশ পড়ে থাক শালবনের নিকষ কালো অন্ধকারে।

নিশাত সুলতানা: কর্মসূচি সমন্বয়ক, জেন্ডার জাস্টিস ডাইভার্সিটি প্রোগ্রাম, ব্র্যাক।

বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধ-বাসিনী’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ। শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করে

আমরা বহুকাল হইতে অবরোধ থাকিয়া থাকিয়া অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি সুতরাং অবরোধের বিরুদ্ধে বলিবার আমাদের- বিশেষত আমার কিছুই নাই। মেছোণীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, ‘পচা মাছের দুর্গন্ধ ভাল না মন্দ?’- সে কি উত্তর দিবে?

এস্থলে আমাদের ব্যক্তিগত কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা পাঠিকা ভগিনীদেরকে উপহার দিব- আশা করি, তাঁহাদের ভাল লাগিবে।

এস্থলে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে, গোটা ভারতবর্ষে কুলবালাদের অবরোধ কেবল পুরুষের বিরুদ্ধে নহে, মেয়েমানুষদের বিরুদ্ধেও। অবিবাহিতা বালিকাদিগকে অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া এবং বাড়ির চাকরানী ব্যতীত অপর কোন স্ত্রীলোকে দেখিতে পায় না।

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ।

শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করেন। মেম ত মেম-শাড়ী পরিহিতা খ্রীষ্টান বা বাঙ্গালী স্ত্রীলোক দেখিলেও তাঁহারা কামরায় গিয়া অর্গল বন্ধ করেন।

[১]

সে অনেক দিনের কথা- রংপুর জিলার অন্তর্গত পায়রাবন্দ নামক গ্রামের জমিদার বাড়িতে বেলা আন্দাজ ১টা-২টার সময় জমিদার কন্যাগণ জোহরের নামাজ পড়িবার জন্য ওজু করিতেছিলেন। সকলের ওজু শেষ হইয়াছে কেবল ‘আ’ খাতুন নাল্ফম্নী সাহেবজাদী তখনও আঙ্গিনায় ওজু করিতেছিলেন। আলতার মা বদনা হাতে তাঁহাকে ওজুর জন্য পানি ঢালিয়া দিতেছিল। ঠিক সেই সময় এক মস্ত লম্বাচৌড়া কাবুলী স্ত্রীলোক আঙ্গিনায় আসিয়া উপস্থিত! হায়, হায়, সে কি বিপদ! আলতার মার হাত হইতে বদনা পড়িয়া গেল- সে চেঁচাইতে লাগিল- ‘আউ আউ! মরদটা কেন আইল!’ সে স্ত্রীলোকটি হাসিয়া বলিল, ‘হে মরদানা! হাম মরদানা হায়?’ সেইটুকু শুনিয়াই ‘আ’ সাহেবজাদী প্রাণপণে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া তাঁহার চাচি আম্মার নিকট গিয়া মেয়েমানুষ হাঁপাইতে হাঁপাইতে ও কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, ‘চাচি আম্মা! পায়জামা পরা একটা মেয়ে মানুষ আসিয়াছে!!’ কর্ত্রী সাহেবা ব্যস্তভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘সে তোমাকে দেখিয়াছে?’ ‘আ’ সরোদনে বলিলেন ‘হ্যাঁ!’ অপর মেয়েরা নামাজ ভাঙিয়া শশব্যস্তভাবে দ্বারে অর্গল দিলেন- যাহাতে সে কাবুলী স্ত্রীলোক এ কুমারী মেয়েদের দেখিতে না পায়। কেহ বাঘ-ভালুকের ভয়েও বোধ হয় অমন কপাট বন্ধ করে না।

[২]

এদিকে মহিলা মহলে নিমন্ত্রিতাগণ খাইতে বসিলে দেখা গেল- হাশমত বেগম তাঁহার ছয় মাসের শিশুসহ অনুপস্থিত। কেহ বলিল, ছেলে ছোট বলিয়া হয়ত আসিলেন না। কেহ বলিল, তাঁহাকে আসিবার জন্য প্রস্তুত হইতে দেখিয়াছে- ইত্যাদি।

পরদিন সকালবেলা যথাক্রমে নিমন্ত্রিতাগণ বিদায় হইতে লাগিলেন- একে একে খালি পাল্ক্কী আসিয়া নিজ নিজ ‘সওয়ারী’ লইয়া যাইতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে একটা ‘খালি’ পাল্ক্কী আসিয়া দাঁড়াইলে তাহার দ্বার খুলিয়া দেখা গেল হাশমত বেগম শিশুপুত্রকে কোলে লইয়া বসিয়া আছেন। পৌষ মাসের দীর্ঘ রজনী তিনি ঐ ভাবে পাল্ক্কীতে বসিয়া কাটাইয়াছেন।

তিনি পাল্ক্কী হইতে নামিবার পূর্বেই বেহারাগণ পাল্ক্কী ফিরাইতে লইয়া গেল- কিন্তু তিনি নিজে ত টুঁ শব্দ করেনই নাই- পাছে তাঁহার কণ্ঠস্বর বেহারা শুনিতে পায়, শিশুকেও প্রাণপণ যত্নে কাঁদিতে দেন নাই- যদি তাহার কান্না শুনিয়া কেহ পাল্ক্কীর দ্বার খুলিয়া দেখে! কষ্টসাধ্য করিতে না পারিলে আর অবরোধবাসিনীর বাহাদুরী কি?

পদ্মাবতী বিতর্ক: শিল্পের স্বাধীনতায় উগ্রবাদীদের হামলা

Padmavati_movie 2017চিন্ময় মুৎসুদ্দী: পদ্মাবতী নিয়ে ভারতের উগ্রবাদীদের কর্মকা- শিল্পের স্বাধীনতায় নয়া হস্তক্ষেপ। তুচ্ছ বিষয়কে সামনে এনে তারা তুলকালাম বাধিয়েছে শ্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। তবে পদ্মাবতী নিয়ে সর্বশেষ সুসংবাদ হলো সিনেমাটি নিষিদ্ধের আবেদন তৃতীয় বারের মতো খারিজ করে দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে বলেছেন, ‘এর নাক কাটব, ওর মুণ্ডু কাটব, এ জন্য পুরস্কার দেব, গণতন্ত্রে এসব বরদাশত করা হয় না। দেশের আইন এভাবে কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।’

ছবিটি মুক্তির ব্যাপারে বাধা দেওয়া আর ছবির পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যান্ড টিভি ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইএফটিডিএ) ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে ১৫ মিনিটের ব্ল্যাক আউট কর্মসূচি পালন করে। চলচ্চিত্র এবং দূরদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ২০টি সংস্থা ওই দিন বিকেল সোয়া ৪টা থেকে ১৫ মিনিট চলচ্চিত্র ও টিভি সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করা থেকে বিরত থাকে। ২৮ নভেম্বর কলকাতার টালিগঞ্জের ছবিপাড়ায় ১৫ মিনিটের জন্য প্রতীকী ধর্মঘট পালন করা হয় ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কারস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া এবং ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে।

এর আগে হরিয়ানা রাজ্যের বিজেপি নেতা সুরুজ পাল আমু পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাক কেটে নেওয়ার হুমকি দেন। মমতা পশ্চিমবঙ্গে চলচ্চিত্রটিকে স্বাগত জানিয়ে এর প্রিমিয়ার কলকাতায় করার প্রস্তাব দেন। মমতার প্রস্তাবটি আসে গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই ছবির মুক্তির ওপর রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরিপ্রেক্ষিতে। ওইসব রাজ্যে উগ্রবাদীরা মিছিল সমাবেশ করে ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি ও অভিনেত্রী দীপিকা পাড়–কোনের নাক, কান, মাথা কর্তনকারীদের জন্য বিশ কোটি টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। এই ডামাডোলে এরই মধ্যে এক সাধারণ নাগরিকের প্রাণ গেছে। নিহত ২৩ বছরের তরুণ চেতন সাহনি জয়পুরে গয়নার ব্যবসা করতেন। জয়পুরের বিখ্যাত নাহারগড় দুর্গের বুরুজ থেকে তার মরদেহ ঝুলছিল। তার মৃতদেহের পাশে লেখাছিল ‘আমরা শুধু কুশপুতুল লটকাই না।’ আর একটি পাথরে লেখা ছিল ‘পদ্মাবতীর বিরোধিতা’।

পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়া দূরে থাক, এখনও সেন্সর বোর্ড থেকে এ সিনেমা সম্পর্কে কোনো মন্তব্যই করা হয়নি। শুধুমাত্র একটা ধারণা থেকেই মাঠে নেমেছে উগ্রবাদী বিজেপি, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা বলছেন ‘আমাদের জাত্যাভিমানে চুনকালি লেপা হয়েছে, আমাদের দেবী মা পদ্মাবতিকে মন্দিরের পাদপিঠ থেকে নামিয়ে করে তোলা হয়েছে বাহরওয়ালি নাচনি, তাই পরিচালকের মুণ্ডু চাই.. ..’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সারা ভারতে ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে তারা। বানসালির পদ্মাবতী অচ্ছ্যুত হলে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (পদ্মিনী উপাখ্যান, ১৮৫৮), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ, ১৮৭৫), ক্ষিরোদাপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (পদ্মিনী, ১৯০৬) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রাজকাহিনী, ১৯০৯) প্রমুখের এসব রচনা নিষিদ্ধ করতে হয়। কারণ তারাও ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। ইতিহাসকে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন। ইতিহাসকে ভিত্তি করে তারা গল্প বুনেছেন।

সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে ইতিহাস কি কেউ ভিন্ন দৃষ্টিতে এখন দেখতে পারবে না? অতীতে এমন হয়েছে। সেজন্যই শিল্পের স্বাধীনতা মুক্তচিন্তার আলোকে বিবেচনা করা হয়। তথ্যই কেবল ইতিহাস নয়, কিংবদন্তিও ইতিহাসের অংশ। কোনো শিল্প মাধ্যমই ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে পেশ করে না। রানি পদ্মাবতী হয়তো তার জীবনে নাচেননি। নাচলেও এতটা ডিজিটাল ভেল্কি ছিল না। সিনেমার অনেকটাই পরিচালকের কল্পনা। আর ছবিটিও বানসালির ‘লাগ ঝমাঝম’ ভঙ্গিতে বলা একটি বলিউডি উপাখ্যান মাত্র। যেটা আমরা তার আরেকটি চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’-এ দেখেছি। পাঠককে এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, চলচ্চিত্রটিতে তিনি পার্বতী এবং চন্দ্রমুখীকে একসঙ্গে নাচিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এ কিন্তু এই ঘটনা ছিল না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- দেবদাস সাহিত্য, পদ্মাবতী ইতিহাস। সেক্ষেত্রে এই ইতিহাসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। অনেক ঐতিহাসিকই পদ্মাবতীর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি।

দূরদর্শনের সভাপতি রজত শর্মা একটি কথা বলেছেন যেটি প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বানসালীর গবেষণা পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর, বর্ণে বর্ণে বাস্তবনিষ্ঠ। কোনো বিকৃতি নেই।’ আর পরিচালক সুভাস ঝা বলেছেন, ‘সত্যিই সে সময় রমণীরা নাচতেন, অন্তরালে জেনানা রানিবাসে। সেখানে রাজা ছাড়া আর কোনো দর্শক থাকত না। সিনেমায় যে ‘ঘুমার’ নাচের দৃশ্য আছে, তাতে কোনো বাইরের মরদ নেই। তাই, ইতিহাস বিকৃতি ঘটেনি। এখন তিনটি পক্ষ। উগ্রবাদীরা বিপক্ষে। বানসালীকে সমর্থনকারী পক্ষ বলছেন বিকৃতি হয়নি। আরেক পক্ষ বিকৃতি হয়েছে কি হয়নি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছেন না, তারা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন- শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে। পদ্মাবতীর সমর্থনে তাই ইতিহাস বিকৃত হয়নি বলে সাফাই দিলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিল্পের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটিকেই মূখ্য করে দেখতে হবে। ইতিহাসকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অধিকার সমুন্নত রাখা জরুরি।

বাস্তব ও কল্পনার মিশেল নিয়ে তৈরি আশুতোষ গোয়ারিকর’র ‘যোধা আকবর’ (২০০৮) ছবিতে আকবরের সঙ্গে যোধাবাঈয়ের প্রেমের কাল্পনিক ঘটনা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেও ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠেনি। তখন ইউপিএল আমল। এখন কেন্দ্রে বিজেপি, বিভিন্ন রাজ্যে ক্রমে তারা ক্ষমতার হাত প্রসারিত করছে। ১৮ রাজ্য তাদের শাসনে। দেখা যাচ্ছে ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক শক্তি জোরেসোরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ইমেইজ আর থাকছে না। গত তিন বছরে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অসংখ্য হামলা সেটাই প্রমাণ করে। মুসলমানদের খাদ্যের ওপরও তারা বাধ সাধছেন। উত্তর প্রদেশে গরুর ব্যবসা করার দায়ে প্রাণ দিতে হয়েছে এক মুসলমান তরুণকে। এবার তারা শিল্পের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। বানসালী এরই মধ্যে বলেছেন, আলাউদ্দিন খিলজির স্বপ্নের রানি পদ্মাবতীর সঙ্গেঅহপযড়ৎ প্রেমের দৃশ্যটি ছবিতে নেই। এরপরও উগ্রবাদীদের এ ধরনের জঙ্গী আচরণ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা মুক্ত চিন্তা ও গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত বলেই মনে করি।

স্বাধীনতা মানে কী?

তসলিমা নাসরিন : ডিসেম্বরের ১ তারিখ চলে গেলো, ‘পদ্মাবতী’ মুক্তি পেলো না ভারতে। হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে হেরে গেলো গোটা ভারতবর্ষ। তাদের তাণ্ডব আর হুমকির সামনে মাথা নোয়ালো সেক্যুলার ভারত। ‘পদ্মাবতী’ নামে আদৌ কেউ ছিল, কোনও ঐতিহাসিকই বলেননি। সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জয়সীর লেখা কবিতা ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে তৈরি ‘পদ্মাবতী’। ‘পদ্মাবতী’ নামে হয়তো কেউ ছিল না কোনও কালে। মালিক মোহাম্মদ জয়সীই রচনা করেছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী পদ্মাবতীকে, যে পদ্মাবতীকে জয় করার লোভ করেছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি। রাজপুত হিন্দু রমণী মুসলিম শাসকের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার চেয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। এইরকম একটি গল্প নিয়েই সঞ্জয় লীলা বানসালি ‘পদ্মাবতী’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন। কিন্তু হিন্দু মৌলবাদীরা ক্ষুব্ধ, কারণ তারা শুনেছে ছবিতে দেখানো হয়েছে খিলজি আর পদ্মাবতীর ঘনিষ্ঠতা। ছবি না দেখে কী করে আমরা বলবো কী দেখানো হয়েছে। ‘গুজব’-এর যে কী অবিশ্বাস্য গুণ! মানুষ চোখ-কান বুজে গুজবকে অনায়াসে বিশ্বাস করে ফেলে।

সঞ্জয় লীলা বানসালি সহ আরও অনেকে, যারা পদ্মাবতী ছবিটি ঘরে বসে দেখেছেন, বলেছেন, ‘ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই, যে দৃশ্য দেখে হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে’। তারপরও শান্ত হয়নি হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠী। প্রথম দিকে না মানলেও, ধীরে ধীরে সরকারি দলের লোকেরাও মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিচ্ছেন। পদ্মাবতীকে নিষিদ্ধ করছেন। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া ছবিটিকে অযথাই শেকল পরানো হয়েছে।

আমি আর সবার মতো বলতে চাইছি না ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই। আমি বলতে চাইছি, যদি থাকেই, তাহলে ক্ষতি কী? ইতিহাসে পদ্মাবতীর কোনও উল্লেখই নেই, কিন্তু কাব্যে আছে বলে পদ্মাবতীকে আজ ঐতিহাসিক চরিত্র বলে ভেবে নেওয়া তো ঠিক নয়। সত্যিকার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকেই শিল্পী সাহিত্যিকরা নতুন করে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে চিরকালই লিখেছেন, এঁকেছেন। চলচ্চিত্রে, নাটকে, গানে চরিত্রগুলো বারবার এসেছে, সবসময় যে একই রূপে, একই গল্পে তা নয়। ইতিহাস নিয়ে প্রচুর চলচ্চিত্রই নির্মিত হয়েছে, যেগুলোতে রয়ে গেছে প্রচুর ভুল। ১৯৯৮ সালে শেখর কাপুর এলিজাবেথ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন, ওই ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন রানী এলিজাবেথ তাঁর  উপদেষ্টা স্যার উইলিয়াম সেসিলকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করেছেন। বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা ঘটেছিল, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্যার উইলিয়াম সেসিল রানীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে রানীর পাশে ছিলেন। পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গ সংগীত তারকা পিয়ানোবাদক মোজার্টের জীবন কাহিনি নিয়ে ‘আমেডিউস’ নামের চলচ্চিত্রে মোজার্টকে দেখানো হয়েছে একটা নষ্ট ছোঁড়া হিসেবে, বাস্তবে মোজার্ট মোটেও তা ছিলেন না। সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি  টাইটানিক ছবিতে জাহাজ দুর্ঘটনা সত্য , কিন্তু  জ্যাক ডোসন আর রোজের প্রেম কাহিনি সত্য নয়। ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ ছবিতে ব্রিটিশ  ট্রুপের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ‘ইউ-৫৭১’ ছবিতেও ব্রিটিশের বদলে আমেরিকান সৈন্য দেখানো হয়েছে। এসব নেহাতই ইতিহাস বিকৃতি। ইতিহাস বিকৃতি আরও কত যে ছবিতে প্রকট, গ্ল্যাডিয়েটর, ব্রেভহার্ট, দ্য পেট্রিয়ট, মারি আন্তোয়ানেত, সেক্সপিয়র ইন লাভ…। সমালোচকরা বিকৃতির এবং ভুল তথ্যের নিন্দে করেছেন। কেউ কেউ আবার শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ছবি নিষিদ্ধ করেননি, কেউ পরিচালকের মাথার মূল্য ঘোষণা করেননি, কেউ অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নাক-কান কেটে ফেলার ফতোয়া দেননি। এসব দেওয়া হচ্ছে ভারতের মতো নানা ধর্মের, নানা ভাষার, নানা রঙের মানুষের গণতন্ত্রে। আর কোনও দেশে না  হোক, খাজুরাহো আর ইলোরা অজন্তার দেশে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করাটা দেশকেই, দেশের শিল্পকেই, চরম অপমান করা।

ইতিহাসের রদ-বদল এবং বিকৃতি হামেশাই হচ্ছে। কেউ যখন আমরা সঠিক করে জানি না ঠিক কী ঘটেছিল সুদূর অতীতে, আমরা কল্পনা করে নিই অনেক ঘটনা। চার্লস ডিকেন্সকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘দ্য লাস্ট ডিকেন্স’, এডগার অ্যালেন পোকে নিয়ে ‘দ্য পো শ্যাডো’, এসব তো আছেই, আলেক্সান্দ্র দুমা লিখেছেন ‘কুইন মারগো’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘প্রথম আলো’। এরকম নানা বইয়ে মেশানো হয়েছে সত্যের সঙ্গে মিথ্যে, অথবা খানিকটা সত্যের সঙ্গে অজস্র কল্পনা। বইয়ে কতটুকু সত্য আর কতটুকু কল্পনা তা নিয়ে বিতর্ক হয় হোক। ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে শুধু তথ্যচিত্র হতে পারে, কোনও চলচ্চিত্র নয়। এ নিয়ে হোক বিতর্ক। হোক কলরব। আবারও বলছি, বিতর্ক হওয়া ভালো, কিন্তু বই বা চলচ্চিত্র, বা কোনও শিল্পকর্ম নিষিদ্ধ করা আর গণতন্ত্রকে নিষিদ্ধ করা একই জিনিস। আমরা গণতন্ত্র নিষিদ্ধ হোক চাই না।

মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে এখনও অধিকাংশ মানুষের কোনও ধারণা নেই। তারা গণতন্ত্র মানে এখনও বোঝে নির্বাচন, ভোটে হারা, ভোটে জেতা। মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে এখনও অধিকাংশ মানুষ রায় দেয়, মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অধিকার কারোর নেই। তারা বলতে চায়, কারওরই এমন কোনও কথা বলা বা কাজ করা উচিত নয়, যা দেখে বা পড়ে বা শুনে অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। এর মতো অগণতান্ত্রিক মন্তব্য আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। কেউই, বিশেষ করে প্রতিভাবান কেউ, সবাইকে খুশি করে বা সুখী করে চলতে পারে না। ভিন্ন মতে বিশ্বাস করে যারা, তাদের হয় মুখ বুজে থাকতে হবে অথবা মরে যেতে হবে।

পদ্মাবতী ইতিহাসের অংশ নয়। অংশ হলেও তাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার অধিকার সবার আছে। সাধারণ মানুষের আছে, কবি সাহিত্যিকদের আছে, চলচ্চিত্র পরিচালকদের আছে। আর যদি ইতিহাসের অংশ না হয়, তাহলেও পদ্মাবতীকে  যেমন ইচ্ছে গড়ার স্বাধীনতা শিল্পীদের আছে। শিল্পীদের হাত থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিলে তাদের আর কিছুই থাকে না। একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক এবং কতটা সভ্য, তা নির্ভর করে সেই সমাজের নারীরা এবং শিল্পীরা কতটা স্বাধীন। পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে ভারতবর্ষের সমাজ এখনও পড়ে আছে অগণতন্ত্রের অন্ধকারে। ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের নাম ভারত’ –  এই  স্লোগান না দিয়ে বরং ‘গণতন্ত্র কাকে বলে’ তা শিখতে হবে ভারতবাসীকে। এও বুঝতে হবে,  তোমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে–এ সমস্যা তোমার, অন্য কারোর নয়। এই সমস্যার সমাধান তোমাকেই করতে হবে, অনুভূতির আঘাত নিয়ে ঝামেলা হলে নিজের অনুভূতির আঘাত নিজে সারাও। কিন্তু সহিংস হয়ে নয়, অন্যকে হুমকি দিয়ে নয়, অন্যকে শারীরিক আঘাত দিয়ে নয়।

মৌলবাদীদের যুক্তি অনেকটা ধর্ষকদের যুক্তির মতো। মেয়েরা ছোট পোশাক পরলে আমরা উত্তেজিত হই, সুতরাং আমরা ধর্ষণ করি। একইভাবে চলচ্চিত্রে এমন দৃশ্য দেখিয়েছ যা আমাদের অসন্তুষ্ট করে, উত্তেজিত করে, রাগান্বিত করে, সুতরাং তোমার চলচ্চিত্র আমরা নিষিদ্ধ করবো, তোমার মুন্ডু কেটে নেবো, তোমার নাক কেটে নেবো।

মৌলবাদীদের যুক্তিতে পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ আর মাথার মূল্য ধার্যকরণ মেনে নেওয়া মানে–ধর্ষকের যুক্তিতে ধর্ষণ মেনে নেওয়া। এ দুটোতে তফাৎ কিছু নেই। নারীর এবং শিল্পীর স্বাধীনতা অধিকাংশ মানুষ না মানলে সমাজে নারী এবং  শিল্পীদের বিরুদ্ধে যে বর্বরতা দেখি, সেই বর্বরতাই আজ দেখছি ভারতবর্ষে।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি বলছে মানবিক সংহতি মিথ্যা

Tawakkol Karmanতাওয়াক্কুল কারমান : মিয়ানমারে কী ঘটছে, তা নিয়ে কেউ আর বিতর্ক করছে না। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং বিশ্বের বড় দেশগুলো- সবাই একমত যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা জাতিগত নিধন ও গণহত্যার সুস্পষ্ট উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন মোতাবেক রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে কেবল অক্টোবর পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ। এ সংকট ক্রমাগতভাবে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। একদিকে মিয়ানমার সরকারের অসহিষ্ণুতা এবং বর্ণবাদী নীতিগুলো অটলভাবে চালিয়ে নেয়ার জোর অবস্থান আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে; অন্যদিকে বাস্তবতা হচ্ছে মিয়ানমারে কী ঘটছে তার প্রতি বিশ্বের আগ্রহ যথেষ্ট গভীর ও আন্তরিক নয়। সবচেয়ে মারাত্মক সত্য, যা রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি উন্মুক্ত করেছে তা হল- ‘মানবিক সংহতি’র আইডিয়া সম্ভবত বড় ধরনের একটি মিথ্যার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

যারা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও আদর্শ বিবেচনা না করে (আমিও তাদের একজন) মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে, তারা কঠিন ধাঁধার মোকাবেলা করছে। কেন এটি ঘটছে? কেন আপনার চোখের সামনে ঘটতে থাকা মানবিক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি বন্ধ হচ্ছে না? নির্দিষ্ট একটি জাতির ভোগান্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয়া ও মানবিক সংহতি প্রকাশের জন্য কি অবশ্যই পূরণ করতে হবে এমন কোনো অদৃশ্য শর্ত আছে?

আমি ভয় করছি, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ভয়ংকর কিছু হবে। কেবল ধনী ও শক্তিশালীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই কি

মানবিক সংহতি?

অনেকে বুঝতে শুরু করেছেন, মানবিক সংহতি মুসলিম পর্যন্ত বিস্তৃত হয় না। এ মত কতটুকু সঠিক, তা বিবেচনা ছাড়াই বলা যায়, এটি সন্দেহের একটি নির্দেশক এবং এটি কোনো ভালো বিষয় নয়। এর বাইরেও মিয়ানমার প্রশাসন প্রতিদিন ভয়ংকর যে সহিংসতা সংঘটিত করার পরও এমন মিত্র খুঁজে পাচ্ছে। যারা তাদের কৃতকর্মকে সমর্থন ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, তা-ও একটি সমস্যা। রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য মিয়ানমার প্রশাসনের দায়িত্ব স্পষ্ট এবং যা কিছু ঘটছে তা অস্বীকার করে দেয়া মিয়ানমারের বিবৃতি সর্বৈব মিথ্যা।

অত্যাচারের মুখেও মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য নিজের অতীতকে উৎসর্গ করা যোদ্ধা, মিয়ানমার সরকারের নেতা ও সাবেক নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি- একজন মানুষ নিজেকে কত ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলতে পারে তার বড় উদাহরণ যার বিষয়ে আমাদের ধারণা ছিল, যা কিছুই ঘটুক তিনি নিজের মূলনীতি সমুন্নত রাখবেন।

এটি সত্যিকারার্থেই বিয়োগান্ত, সু চি বাস্তবতার প্রকাশ্য বিরোধিতা করছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সহিংসতা ও জাতিগত নিধনের বিষয়গুলো অস্বীকার করছেন। সু চি অন্তত মানবাধিকারের বা তার নিজের সম্মানের জন্য লড়াই ও বিজয় অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের জাতি ও এর সামরিক বাহিনীর জন্য লড়াই করাকেই বেছে নিলেন, যাদের একটি ভিশন হল বৈচিত্র্যকে বর্জন, প্রান্তিকীকরণ ও প্রত্যাখ্যান করা। অনেক বেশি মর্যাদা দেয়া হতো এমন একজন নারীর কী বিয়োগান্ত সমাপ্তি!

সারা বিশ্ব দেখেছে কীভাবে গোটা গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং গ্রামবাসীদের হত্যা বা বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে; গণহত্যা চালানো হয়েছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে। কে এমন যুক্তি গ্রহণ করতে পারে? আমি মনে করি, কেউ সেটা পারে না।

সত্য হল, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধী ও প্রতিপক্ষকে শোষণ এবং অত্যাচারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘাঁটিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য। এটি একটি পুরনো ধোঁকা, যা সবাই প্রকাশ্যে বুঝতে পারে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাহসী হতে হবে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের দিকে।

নিজেদের আখের গোছানোর জন্য ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা থেকে একনায়ক শাসকদের বিরত রাখতে হবে। কেবল তা-ই নয়, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ সংঘটন করছে, তাদের সত্যিকারের জবাবদিহিতার আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। এখনই রোহিঙ্গাবিরোধী সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে, এমন বহু আহ্বান জানানো হয়েছে। একে ইতিবাচক উন্নতি হিসেবে দেখা যায়, যদিও তা এসেছে অনেক পরে- একেবারে না হওয়া থেকে দেরিতে হওয়া তো ভালো।

এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও মিয়ানমার প্রশাসন সম্ভবত এমন আহ্বানে সাড়া দেবে না, যতক্ষণ না সেখানে ঘটতে থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসী ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করবে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এমন একটি বাহিনী, যারা এখনও সেখানে হামলা-গুলি করে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা কোনো অপরাধ দেখতে পাচ্ছে না।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি আমাদের দেখিয়েছে জাতিসংঘের একটি সদস্য দেশ কীভাবে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ নীতি তৈরি করতে পারে আন্তর্জাতিক কোনো পারিপার্শ্বিকতা ছাড়াই। ফলে যদি সত্যিকারের শুদ্ধতার গতিপথ আমাদের দেখতে হয়, তবে মিয়ানমার প্রশাসনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অবশ্যই বাড়াতে হবে।

এটিই সঠিক সময় মিয়ানমার বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নেয়ার। যে দেশটি বর্ণবাদী নীতিমালার প্রসার ঘটাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে আমাদের শান্ত হয়ে থাকা কোনোভাবেই উচিত নয়। এটিই সঠিক সময় এমন একটি মানবিক ট্র্যাজেডি বন্ধ করার, যা কিনা কয়েক দশক ধরে চলছে অযৌক্তিকভাবে।

কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে; যে শরণার্থীরা মাত্র দুই মাস আগে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিপীড়নমূলক অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কিন্তু এ চুক্তি (যদি তা বাস্তবায়িত হয়ও) যথেষ্ট নয়, যাতে মনে হচ্ছে কোনোকিছুই ঘটেনি।

এটি সত্য, মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির বিরুদ্ধে চলমান ট্র্যাজেডি বন্ধ করতে হলে প্রত্যাবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মিয়ানমার সরকার এমন কী নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, জাতিগত নিধন অভিযান তারা পুনরায় ঘটাবে না?

মানবতা ও ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ না জেনেই রোহিঙ্গারা যুগের পর যুগ বেঁচে আছে। এর কিছু অংশ যদি তারা এখনও খুঁজে না পায়, তবে কি তা আশ্চর্যজনক হবে না? এটি উপলব্ধি করতে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের অবশ্যই কাজ করতে হবে, কেবল তাদের জন্য নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই।

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

তাওয়াক্কুল কারমান : নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইয়েমেনের সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

কার্টুন-রসঃ তখন বনাম এখন

then vs now 1then vs now 2then vs now 3

বিভাগ:কৌতুক, সমাজ