আর্কাইভ

Archive for the ‘সমাজ’ Category

অতীত : জানা না জানা

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

thinking 34ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী :এই গল্পটি আমার এক বন্ধুর মুখে শোনা। গল্পের ঘটনাস্থল দেশের উত্তরাঞ্চলের এক হাইস্কুল। জীবদ্দশায়ই ওই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সরকারের এক অবসরপ্রাপ্ত সচিবের বিদ্যোৎসাহী পিতা। আশপাশের মাইল পাঁচেকের মধ্যে কোনো হাইস্কুল ছিল না, পিছিয়ে পড়া নিজ এলাকার লোকদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যেই স্কুলের প্রতিষ্ঠা। পিতার অবর্তমানে দেখ-ভাল করতেন সচিব সাহেব। সরকারি অর্থে বেশ ভৌত নির্মাণ কাজও স্কুলে হয়েছে। ওই ধরনের ভৌত কাজ সচরাচর প্রত্যন্ত এলাকায় দেখা যায় না। প্রতিষ্ঠানটিতে এখন উচ্চ মাধ্যমিক অবধি পড়ানো হচ্ছে।

অবসরে চলে যাওয়ার পর গ্রামে গেলে প্রতি যাত্রায়ই স্কুলে যেতেন সচিব সাহেব। ভদ্রলোক ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন। ইতিহাস বিষয়ের একটি বইও নাকি লিখেছেন, বললেন বন্ধুটি। তবে ভাষার সুবোধ্যতার অভাবে বইটি পাঠকপ্রিয় হয়নি। যে উদ্দেশ্যে এই লেখাটি তৈরি। মাস তিনেক আগে দেশের বাড়ি গিয়ে স্কুলে গিয়েছিলেন ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করতে। স্কুল নিয়ে নতুন কোনো চিন্তা-ভাবনা আছে কি-না তাদের, এসব নিয়ে আলোচনা করতে। স্কুলে মিলনায়তন ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে সচিব সাহেব স্কুলের ক্লাস ঘরটির পারটেক্সের তৈরি মুভাবল পার্টিশনটি সরিয়ে ফেলতে বললেন (এভাবে চারটি কক্ষ একত্র করে হল কক্ষ বানিয়ে স্বাধীনতা দিবস, ভাষা শহীদ দিবস, বিজয় দিবস প্রভৃতি জাতীয় অনুষ্ঠান করা হয়)। সচিব সাহেবের ইচ্ছা ছাত্রছাত্রীদের বাংলাদেশের ইতিহাস বিষয়ে কিছু কথাবার্তা বলা। মঞ্চে সচিব সাহেবের পাশে বসলেন অধ্যক্ষ সাহেব ও সহকারী প্রধান শিক্ষক। সহকারী প্রধান শিক্ষক নবম-দশম এবং উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ইতিহাস পড়ান।

সচিব সাহেব নিচের দিক থেকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন, তারা কোন দেশের নাগরিক। সঙ্গে সঙ্গে কোরাস উত্তর বাংলাদেশের। তার আগে এ দেশ কারা শাসন করেছে, তার আগে কারা এ দেশে রাজত্ব করেছে? ইংরেজদের রাজত্বকাল পর্যন্ত মোটামুটি কোরাস উত্তরই ছিল। ওই কোরাসের গতি থামল এ দেশের মুসলিম শাসনামলের সময়ে এসে। দু’একজন ছাত্রের কাছ থেকে কোনো রকমে জবাব পেলেন সচিব সাহেব। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রশ্ন রেখে কোনোই জবাব এলো না মুসলিম আমলের আগে কারা এ দেশের রাজা-বাদশাহ ছিলেন, কারা রাজত্ব করেছেন ইত্যাদি প্রশ্নের। অগত্যা স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক সহকারী প্রধান শিক্ষককে সচিব সাহেব পরামর্শ দিলেন শাসকদের পূর্ববর্তী কালক্রম সম্পর্কে বলার জন্য। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটল তখন। কারণ ওই শিক্ষক মহোদয়েরও উত্তর জানা নেই। বিস্মিত হন সচিব সাহেব। তিনি উষ্মা প্রকাশ করেই সবার উদ্দেশে বললেন, এ দেশের ছয়-সাতশ’ বছরের ইতিহাস মাত্র তোমরা জান। অথচ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের এই দেশটিতে মানব বসতির ইতিহাসই তো প্রায় আট হাজার বছরের। নদ-নদী, খাল-বিলের দেশটিতে শিকারজীবী, কৃষিজীবী মানুষরা যে সভ্যতা গড়ে তুলেছিল একুশ শতকে এসে পেঁৗছতে তো অনেক পথ পেরোতে হয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষকরা এ কথা জানবে না কেন! সচিব সাহেবের দুঃখ সেখানেই।

বন্ধুটি বললেন, ওই ঘটনার পর থেকে সচিব সাহেব নাকি তিনি ওই স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন। আদতেই আমাদের স্কুল-কলেজের ক’জন ইতিহাস শিক্ষক দেশটির অতীতের এসব কথা জানেন। আমাদের ছেলেমেয়েরা কী শিখছে স্কুল-কলেজে গিয়ে? এদের সবার বোধ হয় অতীত সম্পর্কে ধারণা এমন যে,মাটির নিচ থেকে উঠে এসেছে ঘরবাড়ি, দালানকোঠা সবকিছু। দেশের অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা হয়তো এই খণ্ডিত ইতিহাসই জানেন এবং তাই ছাত্রদের শেখান। ভূতাত্তি্বক প্রক্রিয়ায় কখন এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সৃষ্টি হয়, কখন থেকে মানব বসতির শুরু, এরপর কোন শাসকরা শাসন করেছেন,তা পরিষ্কার করে শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে বৈকি?

বর্তমান সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক একটি কোর্স ‘বাংলাদেশ অধ্যয়ন’ (বাংলাদেশ স্টাডিজ) চালু করেছে। উদ্দেশ্য, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ওই কোর্স সংযুক্ত করা হয়েছে। নিম্নশ্রেণি থেকেই বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা জানুক। শুধু মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক নয়, একেবারে প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরে ‘বাংলাদেশ অধ্যয়ন’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। সেখানে মতামত ব্যক্ত হয়েছে সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে তো বটেই, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মতো একাডেমিক ডিসিপ্লিনেও কোনো এক পর্যায়ে ওই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

শুধু স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কথাই বলছি কেন? একেবারে শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন পর্যন্ত আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার প্রমাণ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, বাঙালির বৃহত্তম অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালকে গণ্ডগোলের বছর বলায় উষ্মা প্রকাশ করে লিখেছিলেন, “কয়েক বছর আগে এক উপাচার্য মুক্তিযুদ্ধকে বলেন ‘গণ্ডগোলের বছর’। তিনি যে রাজাকার ছিলেন বা মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করতে চেয়েছেন, তা নয়; রিকশাওয়ালারা, শ্রমিকরা মুক্তিযুদ্ধকে ‘গণ্ডগোলের সময়’ই বলে থাকে (‘জলপাই রঙের অন্ধকার’হুমায়ুন আজাদ, সময় প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৯২, পৃ. ৭৮)।”

১৯৪৭-এ দেশভাগের পর খ্যাতনামা ঐতিহাসিকরা রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকার, নীহাররঞ্জন রায়, সরসী কুমার সরস্বতী, দীনেশচন্দ্র সরকার, প্রমোদলাল পাল প্রমুখ ভারতে চলে যাওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস চর্চা এক রকম থেমেই গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১-এর বিজয়ের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বেশ জোরেশোরেই ইতিহাস নিয়ে কাজ শুরু হয়। শুধু রাজধানী নয়; জেলা-উপজেলা পর্যায়েও আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার কাজ শুরু হতে দেখা যায়। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি দেশের ইতিহাস বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেসব বইয়ের পাঠক কতজন? তার পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। তবে সংখ্যা যে বেশি হবে না, তা বলাই বাহুল্য।

প্রায় এক দশক আগে জনপ্রিয় লেখক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ নামে একটি পুস্তিকা রচনা করে প্রকাশ করেছিলেন। সব মানুষের পাঠোপযোগী পুস্তিকাটি লক্ষাধিক কপি নামমাত্র মূল্যে দেশের সর্বত্র বিতরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। সবাই এ বই পড়ূক দেশবাসীর কাছে লেখকের সেই তাগিদ ছিল। সবাইকে তিনি বইটি পড়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

প্রায় দেড়শ’ বছর আগে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘বাঙালির ইতিহাস নেই।’ আমরা কিন্তু বলতে পারি,বাংলাদেশের বাঙালিদের ইতিহাস আছে। আছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। হোক তা অসম্পূর্ণ। পক্ষে-বিপক্ষে কথাবার্তা থাকতেই পারে সে ইতিহাস নিয়ে,সেটা বড় কথা নয়। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ই.জি. কালিংউডের ভাষায়, ইতিহাস হলো ‘রি-এনাক্টমেন্ট অব পাস্ট এক্সপেরিয়েন্স’। সে পর্যায়ের ইতিহাস হয়তো আমাদের এখনও রচিত হয়নি। তবু বলি, আমাদের দেশের ইতিহাস আছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই গাঙ্গেয় ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিল। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা এই ভূখণ্ডের মানুষের যে গৌরবময় অতীত আছে, ঐতিহ্য আছে, অর্থনৈতিক পরিকাঠামো আছে, নিজস্ব যে জীবনাচরণ আছে, সংস্কৃতি আছে,তা বাঁচানো ও সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা। আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সঙ্গীত-নাটক হবে আমাদের জল-হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার যুগে সবকিছু যেন হারিয়ে না যায়। বরং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম তো সে জন্যই।

সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় হলো, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। ঈপ্সিত লক্ষ্যে এখনও পেঁৗছানো সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়ত দেখছি, আমাদের দেশের মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে; মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থাসহ রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ড। দেশের এ অবস্থা কি চলতেই থাকবে? সবকিছুরই তো শেষ আছে। দেশের প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন দেশের অভিজ্ঞজনরা। তারা বলছেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হলে দেশকে ভালো করে জানতে হবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলছি। সরকারি এক ছুটির দিন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ; বাসায় আছি। আমার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করলেন স্ত্রী, নার্সারিতে পড়ূয়া ছেলেকে কোনোভাবে পড়ালেখার ছলে আটকে রাখতে হবে। তিনি ঘরকন্নার কাজ করতে পারছেন না। পুত্র মাঝে মধ্যে তার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। কিছুদিন আগেই মাত্র দেশের বাইরে থেকে ফিরেছি। ফেরার সময় বিদেশি কিছু চকোলেট নিয়ে এসেছিলাম। আমি পুত্রকে ডেকে আমার পড়ার ঘরে রাখা টবের পাতাবাহার গাছ দেখিয়ে বললাম, সে যদি এই গাছ নিয়ে ১০ লাইন লিখে দেয় তাহলে তাকে পাঁচটি চকোলেট দেব। চকোলেটের লোভে পুত্র রাজি হলো। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে লিখল। বিষয়টি আমি ডায়েরিতে নোট করে রেখেছিলাম। সে লিখেছে, ‘বাবার পড়ার ঘরে টব আছে। টবে পাতাবাহারের গাছ আছে। গাছে অনেক পাতা আছে। পাতায় অনেক রঙ আছে। পাতার সাথে ডাল আছে। সে ডাল ছোট ছোট। টবের মধ্যে মাটি আছে। মাটি ভেজা। সকালে বাবা গাছে পানি দেয়। এই পাতাবাহারের ফুল নেই।’ আমি পুত্রকে ডেকে বললাম, তোমার লেখা ঠিক হয়নি। একটি বিষয় বাদ গেছে। চকোলেটের লোভেই হয়তো সে পুনরায় লিখতে শুরু করল। এবার সে বাবার বিষয়টি বাদ দিয়ে লিখল,’মা সকালে টব বারান্দায় নেয়।’ তারপরও যখন বললাম, লেখা হয়নি; তখন সে মুখ ভার করে জানালার ধারে গিয়ে বলল, ‘আর লিখবও না, তোমার চকোলেটও নেব না।’ আমি তখন আদর করে তাকে কাছে ডেকে এনে বললাম, লেখা খুবই সুন্দর হয়েছে, কিন্তু একটা জিনিস তুমি লিখোনি। তখন তাকে আমি টবের কাছে নিয়ে গিয়ে মাটি খুঁড়ে শিকড় দেখালাম। বললাম, এই শিকড়ই গাছের প্রাণ। এখান থেকেই খাবার পেয়ে গাছটি বেঁচে আছে। পুত্র বিস্ময়ের সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,’বাবা, এই শিকড় তো দেখাই যায় না; লিখবো কী করে?’

পুত্রের অনুভূতির অনুবৃত্তি ধরে বলি, গোটা জাতিই আমরা ওই শিকড়ের সন্ধান জানি না। যারা জানি তারা তা আমলে আনি না। ইতিাসের অতীত জ্ঞান আমাদের নতুন করে পথ দেখালে সংকট অনেকটাই কেটে যাবে,বলছেন বিশিষ্টজনরা।

অধ্যাপক, রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

কার্টুনঃ যানবাহন নিয়ে যতো যন্ত্রণা !

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

driving 1adriving 1b

সবার ওপরে আইন

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

ভাতের জন্য হাহাকার শুনেছি। খাবারের দাবিতে মিছিল করে নিরন্ন মানুষের খাদ্য গুদাম লুটের চেষ্টা, ৬০-৭০ দশকে মহাজনদের অত্যাচার নিয়ে কাব্যগাথা কত শুনেছি! নক্সালবাড়ি আন্দোলন এ অঞ্চলের কৃষকের শাসন ক্ষমতা দখলে আগুনের গল্প শুনিয়েছিল। এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ পেটভরে খেতে পারছে, পছন্দের জিনিসপত্র কিনতে পারছে। দেশজ কৃষিপণ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেকেই বিদেশী খাবার ও ফলমূল কিনছে। বাজার অর্থনীতি সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাকে রঙিন ও বিচিত্র করে তুলেছে। সবমিলিয়ে চমৎকার একটি দৃশ্যকল্প। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এখন হাহাকার শোনা যাচ্ছে অন্য একটি বিষয়ে।

বাজারে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক দেখলে মানুষ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে:দেশে কি আইন নেই!

বাসে-ট্রেনে-বিমানে অব্যবস্থা দেখলে মানুষের মুখে ধ্বনিত হয়: দেশে কি আইনের আকাল পড়েছে!

রাস্তায় ট্রাফিকের বেহাল অবস্থা দেখলে; হত্যা-রাহাজানি-মাস্তানি-অস্ত্রবাজি ও গুম-খুনের কথা শুনলে উদ্বিগ্ন স্বরে মানুষ বলে ওঠে: দেশ থেকে কি আইন-কানুন সব উঠে গেল?

এ থেকে বোঝা যায়, আইনের শাসনের জন্য সাধারণ মানুষের কতটা আকুতি। খেটে খাওয়া শ্রমিক ও কৃষক থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী, পোশাকধারী আইনশৃংখলা বাহিনী, ব্যবসায়ী, ছাত্র-শিক্ষক-গৃহিণী-সবারই আইনের শাসনের প্রতি থাকে গভীর প্রত্যাশা। আইন মেনে ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়ে যে দল সরকার পরিচালনা করে, তারা সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কুড়ায়। আস্থা অর্জন করে। প্রমাণিত সত্য-ব্যক্তি নয়, সবার ওপরে আইন।

প্রশ্ন হল, আইনের শাসন বলতে আমরা কী বুঝি? আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে আইনের শাসনের সার্বজনীন রূপ হচ্ছে-

১. সরকার ও তার কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের এজেন্ট, সাধারণ মানুষ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সবাই আইনের কাছে দায়বদ্ধ। ২. আইনগুলো স্বচ্ছ, স্থায়ী, প্রচারিত ও উত্তম।

৩. আইনের প্রয়োগ সবার ওপর সমভাবে ঘটে এবং প্রচলিত আইন মানুষের মৌলিক অধিকার ও জানমাল রক্ষায় যথেষ্ট কার্যকর।

৪. যে প্রক্রিয়ায় আইনগুলো প্রণীত হয়েছে এবং প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা সৎ ও দক্ষ।

৫. বিচারকার্য এমনভাবে সমাধা করা হচ্ছে, যা ন্যায় ও যথার্থ এবং সৎ ব্যক্তিদের দ্বারা তা পরিচালিত হচ্ছে; যাতে বিচার শেষে সাধারণ মানুষ ভাবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কোনো সরকারের ক্ষমতা সাধারণত আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়। সে অনুযায়ী শাসনতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটান সরকারি কর্মকর্তারা। আইন প্রয়োগকালে কোনোভাবেই যেন ব্যক্তিগত আবেগ বা অনুরাগ প্রাধান্য না পায়, সেটি দেখা জরুরি। আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হল দুর্নীতির অনুপস্থিতি। যেখানে দুর্নীতি, সেখানেই আইনের শাসন ক্ষয়িষ্ণু রূপ ধারণ করে। দুর্নীতি নানা ক্ষেত্রে প্রসারিত হতে পারে। হতে পারে সেটা ঘুষ বা অনৈতিক প্রভাব, যা ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের সংরক্ষণ প্রমাণ করে, দেশে আইনের শাসন বহাল রয়েছে। সমাজে আইনের শাসন বহাল থাকলে মানুষের চলাফেরা, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও চাকরি ক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ খুব সহজে তাদের অভিযোগ-অনুযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে পারে।

আইনের শাসনের মৌলিক দিক হল, সরকার দেশ পরিচালনা করবে আইন অনুযায়ী। বিষয়টি বোঝাতে সবাই বলেন,

: কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

অথচ ইংল্যান্ডের রানীকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। রানী ইচ্ছে করলে হাউস অব কমন্সে পাসকৃত আইন পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন। হাউস অব লর্ডসের রুলিং অগ্রাহ্য করতে পারেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ রাজা-রানীর কাছ থেকে এই ‘absolute sovereignty’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রতিস্থাপন করা হয়। আমেরিকার সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরই সরকারের কোনো একটি শাখাকে একেবারে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়নি। এক শাখার অতিরিক্ত ক্ষমতা বা আচরণ অন্য শাখা দ্বারা টেনে ধরার ব্যবস্থা রয়েছে। এজন্য সেখানে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ একে অপরের পরিপূরক। আইনের শাসনের প্রশ্নে তাই সেসব দেশে স্বস্তি বিরাজ করে। যে কোনো একটি বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ অন্য শাখা দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত হয়। তবে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় সংখ্যাগুরু দলের নেতা যেহেতু প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি আবার শাসন বিভাগেরও প্রধান, তাই আইন ও শাসন বিভাগে তার কর্তৃত্ব ঘটতেই পারে। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা অনেকগুণ বেড়ে যায়। নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, দফতর পরিচালনার বাজেট ইত্যাদি যদি বিচার বিভাগের হাতে থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে।

অনেক সময় আমেরিকা ও ব্রিটেনসহ অন্য গণতান্ত্রিক ধারার দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করা হয়। এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হল, বাংলাদেশ বাংলাদেশই। আমাদের শিক্ষিতের হার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা, দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাসন ও আইনসভার সার্বিক অবস্থা অনেকটাই ইউনিক। সম্পূর্ণ আলাদা। এখানকার বাজার-হাট, বাস-লঞ্চ-স্টিমার-রেল-বিমানের অবস্থা অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সেসব দেশে মানুষভর্তি বাস রাস্তার মাঝখানে সচরাচর দাঁড়ায় না। দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কোনো চালক বা তার সহকারী পালিয়ে যায় না, অথবা দুর্দশাগ্রস্ত যাত্রীদের মালামাল লুট হয়ে যায় না। অন্যান্য উন্নত দেশের নিয়োগ, বদলি, প্রমোশন ইত্যাদি বাংলাদেশের মতো নয়। সেসব দেশে মানুষ চাকরি গ্রহণ বা ছাড়তে অত দ্বিধা করে না। উন্নত দেশে বিরোধীদলীয় নেতারা সরকারি প্রতিনিধি দলের প্রধান হয়ে বিদেশে ভ্রমণ করেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচির প্রশংসা করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশে কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থায় দূতিয়ালি করেন।

আর আমাদের দেশে? ধরুন, টেনিস তারকা অ্যান্ডিমারে ৭০ বছর পর ব্রিটেনের উইম্বলডন টেনিসে একক শিরোপা জিতেছেন। এজন্য ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাকে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছেন। সেই অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতা যেভাবে সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীসহ সবার খোঁজখবর নিলেন, হেসে-নেচে-গেয়ে ও খেয়ে আসর মাতালেন, তাতে ওই আসরে কে আসলে প্রধানমন্ত্রী, তা সত্যিই বোঝা দায় উঠেছিল।

ব্রিটেনে-আমেরিকায় একজন মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারী আইনের অধীনে কাজ করেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তা সাধারণ নাগরিককে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেন। তবে তাকে চেক করেন, এমনকি গারদেও ভরেন! আমাদের দেশে আমরা সরকারি কর্মচারীদের ‘স্যার’ বলতে বলতে হয়রান। অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে এমপি-মন্ত্রীদের চলাচলে এত গাড়ি এবং প্রটোকল দেয়া হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে ড্রাইভারও দেয়া হয় না।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন তার দ্বিতীয় মেয়াদে শাসন বিভাগের কিছু বিষয় বিচার বিভাগের আওতাবহির্ভূত রাখার পক্ষে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বিচারালয় তাকে তার কিছু গোপন আলাপের টেপ হস্তান্তর করতে বলেছিলেন। নিক্সন তখন শাসন বিভাগের স্বাতন্ত্র্য এবং নিরাপদে কার্য সম্পাদনের বৈশিষ্ট রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের কর্তৃত্বের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সুপ্রিমকোর্ট প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারলেন না। আদেশ দিলেন, শাসন বিভাগের যে কোনো কাজ আদালত তদন্ত করে দেখতে পারবে। তাই গোপন কথোপকথনের টেপ ক্রিমিনাল তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তরিত হল। সেটাই বিখ্যাত ওয়াটারগেট কেলেংকারি।

আমেরিকার ফেডারেল জুডিসিয়ারি Due process, Reasonable care, undue Influence প্রত্যহ এসবের ব্যাখ্য করতে থাকেন, যাতে দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। বিচারকরা বলতে থাকেন-আইনের শাসন ততক্ষণ অক্ষুন্ন থাকবে, যতক্ষণ বিচারকরা শাসনতন্ত্রসহ অন্যান্য আইনের বিকল্প ব্যাখ্যা খোলা মনে দিতে পারবেন।

১২ ও ১৩ শতাব্দীর দিকে আইনের শাসনের প্রতিফলন ছিল স্রষ্টার নির্দেশিত পথ, যা ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা এবং মানবিক যুক্তিবাদের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হয়েছিল। ১৭ শতাব্দীতে ইংরেজ জাজ স্যার অ্যাডওয়ার্ড চোক জোর দিয়ে বলেন, রাজা কারও কাছে বাধ্যবাধক নন, শুধু স্রষ্টা এবং আইনের কাছে। আমেরিকান পণ্ডিত আলেকজেন্ডার হ্যামিলটন যুক্তি দেখান, জাজদের কোনো শক্তি নেই, ইচ্ছা নেই; আছে মাত্র বিচারিক দক্ষতা।

উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে রাজনীতিকরা ক্ষমতায় আরোহণের পর জনগণ বা দলকে কোনো রকম সতর্কতা বা যুক্তি দেখানো ছাড়াই নিষ্পেষণ করেন। এজন্যই সারা পৃথিবীতে স্বাধীনতার জন্য এখন আইনের শাসনের এত কদর। একটি দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের বড় চ্যালেঞ্জ হল, আইনের শাসনের বিধান সমুন্নত রাখা। অন্যদিকে শাসনতন্ত্রের বড় সার্থকতা তখনই, যখন তা দেশের জনগণ ও সরকার অকপটে তা মেনে চলে। চাপিয়ে দেয়া শাসনতন্ত্র বা সংখ্যাগরিষ্ঠের গোঁড়ামি অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের রাস্তায় ঠেলে দেয় অথবা আইন অমান্য ও প্রতিহতের শক্তি জোগায়। এজন্যই গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হলেও তা সংখ্যালঘিষ্ঠের সম্মতির ফসল। ডাইসির মতে, ইংল্যান্ডে জনগণ যেভাবে নিরাপদ বোধ করে এবং সরকারের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে, এটাই আইনের শাসন।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্র চর্চা বারবার হোঁচট খেলেও বর্তমানে তার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে এবং এক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিভিন্ন সমস্যার অবসান ঘটায়। স্বাবলম্বী নাগরিকরা যে পেশায় থাকুন না কেন, সৎ ও পরিচ্ছন জীবনযাপনের অনুপ্রেরণা অনুভব করেন। অনুভবের এ তাড়নার পাশাপাশি নেতা-নেত্রীরা যদি মানুষের অনুকরণীয় অবস্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়ে উঠেন, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম (অব.) : তুরস্কে দায়িত্বপালনকারী সাবেক সামরিক অ্যাটাসে

কবিতাঃ শিক্ষকের মর্যাদা

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

status of a teacher

ভালোবাসার শহরে…

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

i love wallশান্তা তাওহিদা, প্যারিস থেকে : শহরজুড়ে যেন সারা বছরই প্রেমের মৌসুম চলে। সিন নদীর পার ধরে হেঁটে হেঁটে দেখার প্যারিস এ এক অন্য প্যারিস। সকালে সিন নদীর পানিতে সূর্যের স্পটিক হাসি আর রাতে আলো ঝলকানো হাজার হাজার তারা। এ রকম মুহূর্তটা অবশ্যই দাবি রাখে পরস্পরের হাতে হাত রেখে অতল চোখে হারিয়ে যাওয়ার। আমার যদিও সে সৌভাগ্য হয়নি। প্রায় সাত হাজার নয়শ কিলোমিটার দূরে ছিল আর একটা হাত। ভালোবাসার শহরে সে এক বেরসিক আমি!

দিন আর রাতের প্যারিসের মাঝে বিস্তর ফারাক। শুনে তা বুঝা যাবে না, এমনকি চোখে দেখেও না। এ কেবল অনুভবের। তবে প্যারিস শহর ঘুরে বেড়ানোটা ভোরে থেকে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে দুই রূপই দেখা যাবে। সিন নদীর কোল ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে শুরু হয় আমার প্যারিস সফর। পায়ে হাঁটার পথ থামে পন্ট দে আরটস সেতুতে। এটি পারিসের প্রথম ধাতব সেতু। নামকরণ করা হয়েছিল প্রথম ফরাস সম্রাটের নামানুসারে। এর এক পাশে ইনস্টিটিউট অফ ফ্রান্স আর অন্য পাশে ল্যুভর প্যালেসের কেন্দ্রীয় স্থাপনা। এ সেতুর আরেক নাম ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু। ভালোবাসাকে তালা-চাবি দিয়ে বন্দি করা যায় কিনা তা কেবল এখানকার প্রেমীরাই বলতে পারবেন। তালায় দুজনের নাম লিখে এ সেতুতে দুজনে মিলে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবিটা ছুড়ে ফেলে দেয় তারা ভালোবাসা নদীর জলে। কথিত আছে, এতে ভালোবাসা অমরতা পায়। সেতুর নিচের প্রবহমান ভালোবাসা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে চাবি খুঁজে নিয়ে সে তালা খুলে এমন সাধ্য কী আর কারো আছে বলুন? হতে পারে এটা ছেলেমানুষী। একদিন না হয় ভালোবেসে ছেলেমানুষ হলেন। ক্ষতি কি তাতে! বিষয়টা কিছুটা বুকের ঢিপঢিপানি নিয়ে ছোটবেলায় দেয়ালে যোগ চিহ্ন দিয়ে নামের আদ্যক্ষর লিখে রাখার মতো। এভাবেই হয়ত অবিনশ্বরতা পায় ভালোবাসা। মজার খবর হলো বেশ কিছু দিন আগে ভালোবাসার তালার ভারে সেতুটি প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা হয়েছিল। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হওয়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই কিছু ভালোবাসার ঝালর কেটে কমিয়ে দিয়ে ছিলেন। সেতুতে টানিয়ে দিয়েছেন সতর্কবাণীও। তাতে কি আর বুঝে পাগলপ্রেমি মন! ভালোবাসার শহরে ভালোবাসার তালা রোজই ঝুলছে। কার সাধ্য বাধা দেয়।

পন্ট দে আরটস সেতু নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত ফরাসি সিনেমা ‘লে পন্ট দে আরটস’। ফরাসি এক তরুণ তরুণীর করুণ প্রেম কাহিনি নিয়ে এ সিনেমা। প্রেমিকের সঙ্গে অভিমান করে অভিমানি প্রেমিকা এ সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে ভালোবাসা নদীতে আত্মহত্যা করে। সইতে না পেরে প্রেমিকও একি সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয় প্রেমিকার সঙ্গে মিলনের আশায়। কেবল এই সেতু নয়, ভালোবাসা নদীর ওপর এরকম প্রায় ১১টি ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু রয়েছে পুরো পারিসে । যারা প্যারিসে আসেন তাদের কাছে মন্টেমারে নামটা আগে থেকেই শোনা থাকতে পারে। জায়গাটা পারিসের উত্তর পাশে সিন নদীর কোল ঘেঁষে। পাবলো পিকাসো, ভিনসেন্ট ভ্যানগগ, ক্লোদ মনে নিভৃতে ছবি আঁকার জন্য এ পাশটা বেছে নিয়েছিলেন। ফরাসি ভাসায় এ জায়গাটার নাম মো মার্তে। পাহাড়ের উপরে রয়েছে এক মনোরম ব্যাসিলিকা। দুই নম্বর মেট্রো ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। এখানে রয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য আরো একটি আকর্ষণ। ফরাসি ভাষায় জায়গাটার নাম ‘লে মর ডেস যে তাইমে’। বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমি তোমাক ভালোবাসি দেয়াল’। মন্টেমারে রিকটুশ বাগানে এ দেয়াল।

প্রায় চল্লিশ স্কয়ার মিটার দেয়ালের পুরোটা জুড়ে ৫০টি ভাষায় ৩১১ বার লেখা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাওয়ার এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এখানে। যে আগে খুঁজে পায় ভালোবাসার বার্তা তার ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি। নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাবার আনন্দে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মানুষকে। বাংলায় ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ লেখাটা দেয়ালের মাঝখানের অংশে রয়েছে দেখলাম। বিরহ ছাড়া ভালোবাসা অর্থহীন বলেই হয়ত কিছু লাল ভঙ্গুর হৃদয় ছড়িয়ে দেয়া রয়েছে পুরো দেয়ালের ৬১২টি টাইলস জুড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল ভঙ্গুর হৃদয় দেখে। মনে মনে প্রার্থনা করলাম পৃথিবীর সকল যুগলের জন্য। অমর হোক তাদের বন্ধন। ভঙ্গুর হৃদয়ের যাতনা তাদের যেন কোনোদিন স্পর্শ না করে। আমার ধারণা ছিল কেবল তরুণ-তরুণীরা ভালোবাসার দেয়ালের খুঁজে এখানে আসে। ভুল করলাম আবারও। এখানে আসেন প্রেমিক জুগল। আর প্রেমের যে কোনো বয়স নেই তা এখানে না আসলে আমার হয়ত কখন বুঝা হতো না। হাতে হাত রেখে ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক দিয়ে বহু প্রবীণ প্রেমিকাকে প্রেমিকের চোখে হারাতে দেখেছি সেখানে। এ যেন প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে পড়া।

প্যারিসের যেবার ভালোবাসার দেয়াল দেখতে গিয়েছিলাম সেটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক দিনের সফর। টের পাচ্ছেন তো একাকি আমার দেবদাস অবস্থা! আমি ছাড়া প্যারিস শহরটা বড় বেশিই রোমান্টিক। হা হা হা- তবে যে আকর্ষণে দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসে তার সাথে দেখা করার গল্পটা বরং আমার কাছে বেশি রোমান্টিক। দ্য টাউয়ার অব লাভ-ভালোবাসার আইফেল টাউয়ার। ৩২৪ মিটার উঁচু লোহার তৈরি এ টাউয়ারে মানুষ আসে প্রেমকে অমর করতে। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। উল্টো আমিই প্রেমে পড়ে গেলাম তার। একেবারে প্রথম দেখায় প্রেম যাকে বলে। প্রথম তার সাথে যখন দেখা হয়, তখন সে কুয়াসার চাদরে ঢাকা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তার সামনে মন্ত্রমুগ্ধ আমি। দ্বিতীয় বার যখন দেখা হলো তখন তিনি আকাশের নীলে রোদেলা আমার ফাগুন পুরুষ। আর তৃতীয় বার রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে আমার ভিনদেশি তারা। তার বিশালতার কাছে নিজেকে বড়ই সামান্য মনে হয়েছে।

সিন নদী পেরিয়ে যতই তার কাছে গিয়েছি ততই বদলে যেতে শুরু করে অনুভূতিটা। ‘আমি দূর হতে কেবল তোমায় ভালোবেসেছি’ কিছুটা এরকম অনুভূতি। দূর থেকেই তাকে বড় আকর্ষণীয় লাগছিল। এ যেন চিরায়ত মানব চরিত্র! কাছে পেলে সোনার মোহর হয়ে যায় মাটির মোহর! ‘কাছে গেলে যদি ভালোবাসা কমে যায় তবে দুরত্বই ভালো-এই বলে সেদিন সন্ধ্যায় তার সাথে হলো ছাড়াছাড়ি।

পরের বার প্যারিস গিয়ে তার অন্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে আইফেল টাউয়ারের চূড়ায় উঠার সৌভাগ্য হল। চূড়া থেকে দেখলাম ভালোবাসার অন্য আরেক প্যারিসকে। পুরো প্যারিসটা ৩৬০ ডিগ্রিতে চোখে বন্দি করতে সময় লাগল আর ঘণ্টাখানেক। আইফেল এর চূড়ায় যুগল স্যাম্পেনের হাতে চুম্বনরত তরুণ-তরুণীকে দেখে মনে হয়েছে ‘প্রেম পবিত্র-প্রেম মধুর’! চূড়া থেকে দেখে মনে হলো পৃথিবী আসলেই গোল। কমলা লেবুর মতো প্যারিস শহরটা মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। তবে মিলিয়ে যায়নি ভালোবাসা। কেবল সূর্যটা টুপ করে ডুব দিয়েছে সিন নদীতে আর সন্ধ্যা নেমেছে শন্ জিলেজের পথে পথে ভালোবাসার শহরের ভালোবাসারা এভাবেই বেঁচে থাকুক অনন্তকাল!

উদার গণতন্ত্র ও মৌলবাদী ধর্মতন্ত্রের মহামিলন

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

শহিদুল ইসলাম : বাংলাদেশে সম্প্রতি সাম্প্রদায়িকতার যে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের অনেক ভালো ভালো কাজের দাবিকে যেন ব্যঙ্গ করছে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সবাই আশায় বুক বেঁধেছিল এই ভেবে যে, এবারে সাম্প্রদায়িকতার রাহুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। কিন্তু মানুষের সে আশা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে এ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা চলছে তা নতুন করে দেশবাসীকে পাকিস্তানি নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সরকার জিয়া, এরশাদ ও খালেদার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং আজকের পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, তাদের সেই রাজনীতিকে আরো শক্তিশালী করে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সেসব আক্রমণে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বর্তমান সরকারের ওপর তাদের আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেই আস্থার ফলে তারা তাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি আগলে নিজের দেশেই পড়ে ছিলেন। অনেকেই আজ তাদের জান-মাল-সম্মান বাঁচানোর জন্য দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এভাবে চললে বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের মতো হবে। মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর মানুষ এখানে থাকতে পারবে না।

দুই. ইতিহাসে প্রমাণ আছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা না করলে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। সে রাষ্ট্রে মানবিক গুণাবলির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সভ্যতার সূচনালগ্নে একবার ও চৌদ্দশ খ্রিস্টাব্দের ইতালির রেনেসাঁর পর দ্বিতীয়বার জ্ঞানবিজ্ঞান-দর্শন চর্চার জোয়ার এসেছিল। দেখা যায় প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সূচনায় ধর্মীয় কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। কারণ গ্রিকদের কোনো ধর্মগ্রন্থ ছিল না। সেটাই ছিল প্রথম যুগের গ্রিকদের স্বাধীনতার প্রধান শর্ত। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বিউরি বলছেন,‘হোমারের কবিতা ছিল ইহজাগতিক, ধর্মীয় নয় এবং ধর্মগ্রন্থের তুলনায় সেগুলো নীতিহীনতা ও বর্বরতা থেকে মুক্ত। হোমারের কর্তৃত্ব ছিল অপরিসীম কিন্তু তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বের মতো বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই বাইবেলের সমালোচনার মতো হোমারের সমালোচনা কখনো বাধার সম্মুখীন হয়নি।’ বিউরি আরো বলছেন,‘স্বাধীনতার আর একটি অভিব্যক্তি ও শর্ত হলো যাজকতন্ত্রের অনুপস্থিতি। সেদিন পুরোহিত শ্রেণি কখনো-ই এতটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। তাই তারা নিজেদের স্বার্থে সমাজের ওপর নির্যাতন চালাতে পারেনি কিংবা ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিতে পারেনি।’ তখন পুরোহিত শ্রেণি রাষ্ট্রের কর্মচারী। রাষ্ট্রের অধীন।

অবিকল একই ঘটনা ঘটে রেনেসাঁর পর। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও শিল্প-বিপ্লবের পর ইউরোপে প্রবল প্রতাপশালী পুরোহিত শ্রেণির শক্তি ধ্বংস করা হয় এবং ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা হয়। খ্রিস্টধর্ম টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার ফলে এটা সম্ভব হয়। তবে আদি সেই গ্রিক সমাজ মাত্র তিনশ বছর টিকেছিল। খ্রিস্টধর্ম উত্থানের পর পশ্চিমে দীর্ঘ এক হাজার বছরের অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হয়। এদিকে উনিশ শতকে রেনেসাঁর জয় নিশ্চিত হয়। ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ইউরোপ জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাঝে ইসলামের আবির্ভাবের পর ৯ম থেকে ১১ শতকে ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় জোয়ার আসে। সে জোয়ারও তিনশ বছরেই শুকিয়ে যায়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় তাহলো ইসলামি বিশ্বে যারা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা কেউই সূক্ষ্ম বিচারে মুসলমান ছিলেন না। ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের ওপর আক্রমণ তাই প্রমাণ করে। তারা সবাই ছিলেন যুক্তিবাদী যা ইসলামে কেবল নয় সব ধর্মে নিষিদ্ধ। আবার আধুনিক সভ্যতায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সময়কালও দুই/তিনশ বছরের বেশি নয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পশ্চিমে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে এবং বর্তমানে পশ্চিমে মৌলিক কাজের পরিমাপ সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। কারণ আবার পশ্চিমে বিশেষ করে আমেরিকায় ধর্মীয় ভাবাদর্শের নতুন করে উত্থানের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকার সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর ট্রাম্পের ঘোষণায় সেটাই প্রমাণ করে। তিনি পুরোহিতদের দাবি পূরণে বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সংসর্গ, সমলিঙ্গ-বিবাহ ও গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে নির্বাহী আদেশ দিতে যাচ্ছেন। সবার ধারণা আমেরিকান সাম্রাজ্যের দিন শেষ হতে চলেছে।

রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে বেগম রোকেয়াও ভেবেছিলেন। ১৩১১ সালে ‘নবনূর’ পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন,‘যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন।’ এটা কেবল নারীর ক্ষেত্রে সত্য নয়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্যও সত্য। নোবেল বিজয়ী একমাত্র মুসলিম বিজ্ঞানী প্রফেসর সালাম বলেছেন,‘ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ধারা সবচেয়ে দুর্বল।’ চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ মুসলিম পণ্ডিত ইবনে খলদুন। তারপর ইসলামি বিশ্বে আর কোনো মনীষীর জন্ম হলো না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পদের কোনো অভাব নেই। তারা বিশ্বের উচ্চতম ভবন নির্মাণ করে গর্ব প্রকাশ করেন। আলোয় ঝলমল শহর তৈরি করে বিদেশিদের বেড়ানোর সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্বমানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেননি। মোগল বাদশারা ‘তাজমহল’ তৈরি করেছেন, কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি। যুক্তিবাদ ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে মুসলমান হুজুরদের সে মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই প্রফেসর সালামকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিয়েছে আর মিসরের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিম মাহফুজকে মুসলমান বলে স্বীকারই করে না; বরং ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ গড়ে ইসলামের আদিযুগে ফিরে যেতে চাইছে মুসলমানরা।

তিন. বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমে উৎপাদিত সম্পদে আমরা মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছি। কিন্তু সে অর্জনে আমাদের মতো শহুরে অলস বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদদের অবদান কতটুকু? তাদের শ্রমের ওপরই আমরা জীবনযাপন করছি। অন্যের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে আমরা বিশ্বের কাছে বাহবা কুড়াচ্ছি। এই আত্মসাতেরই আর এক নাম ‘গণতন্ত্র’। আরো সূক্ষ্মভাবে বললে বলতে হয় ‘উদার গণতন্ত্র’। ‘ইসলামের’ নামে হুজুররা যে রাজনীতি করছে, আমরা ‘উদার গণতন্ত্রের’ নামে সেই একই রাজনীতি করছি। এখানেই ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মতন্ত্র’ এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছে। তাদের মিলনই বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানি কায়দায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাদের উপাসনালয় ভাঙা হচ্ছে, দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। হুজুরদের দাবি মেনে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। হুজুরদের নির্দেশে শিশুদের পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছে। এতে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা লাখ লাখ মূর্তি ভাঙলেও হবে না। তাই আজ প্রশ্ন উঠেছে, আমরা পাকিস্তান ভাঙলাম কেন? আমরা কি কেবল পাঞ্জাবি ধনীর জায়গায় বাঙালি ধনী তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আজ একজন হিন্দুকে তার বাড়ির মহিলাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, তাহলে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম কেন? পাকিস্তানি হামলাকারীর বদলে বাঙালি হামলাকারীর অভয়ারণ্য তৈরির জন্য? কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন? চার লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

চার. অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘উদার গণতন্ত্র’ তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে গেছে। এই গণতন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদ মাত্র আটজন মানুষ দখল করে নিয়েছে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির অধ্যাপক জন রালস্টোন সাওল একখানা বই লিখেছেন যার নাম দিয়েছেন ‘ভলতেয়ার্স বাস্টার্ডস’-ভলতেয়ারের জারজ সন্তান হলো আজকের গণতন্ত্র। ভলতেয়ারের সময় এই গণতন্ত্রের প্রভূত মূল্য ছিল। কিন্তু সম্পদের ওপর মানুষের অধিকার স্থাপনের আইন আজ সে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছে। আজ সারা বিশ্বে ‘উদার গণতন্ত্র’ ও মৌলবাদী ‘ধর্মতন্ত্রের’ মহামিলন ঘটে গেছে। তাই পৃথিবী আজ ক্রমান্বয়ে মানুষের বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। যে দেশ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে তাকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্থানে স্থাপন করতে পারবে, আগামী বিশ্বের পরিচালকের আসনে তারাই বসবে। ‘উদার গণতন্ত্র’ পৃথিবীতে শান্তির পরিবর্তে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের বিলাসী জীবনের ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রয়োজন মেটাচ্ছে। মানুষ প্রকৃতিকে দখল করেছে। প্রতিটি দেশের সংখ্যাগুরু স¤প্রদায়কে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দখল করেছে। জলবায়ু বিষাক্ত করে তুলেছে। মনে হয় বর্তমান সভ্যতা তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধীরে অথচ স্থির পায়ে এগিয়ে চলেছে।

শহিদুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

সৌদিতে নারীদের সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচরণ করা হয়

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

manal-al-shareefসৌদি আরবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গাড়ি চালানোর জন্য কারাদণ্ড পাওয়া এক নারী তাঁর দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলেছেন।

মানাল আল-শরিফ নামের ওই নারী বলেছেন, এখনকার সময়েও সৌদি আরবে নারীদের সঙ্গে ঠিক ক্রীতদাসের মতো আচরণ করা হয়।

নিষেধাজ্ঞা ভেঙে গাড়ি চালানোয় মানালকে নয় দিন কারাভোগ করতে হয়েছিল। পরে দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানে লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাতে পারছেন মানাল। এখন নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছেন মানাল। জানালেন, তিনি সৌদি আরবে প্রথম নারী আইটি নিরাপত্তা কনসালট্যান্ট হন। প্রায় এক দশক ধরে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোতে কাজ করেছেন।

ডেইলি মেইল অস্ট্রেলিয়াকে মানাল বলেছেন, একটি রক্ষণশীল সমাজ থেকে উঠে এসেছেন তিনি। তাদের ঘরের জানালা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হতো। বাড়ির চারদিক উঁচু দেয়ালে ঘেরা। নারীদের ঢেকে রাখা হতো। পুরুষ অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া সৌদি আরবে নারীদের জন্য কিছু করা খুবই কঠিন।

২০১১ সালে মানাল তাঁর গাড়ি চালানোর একটি ভিডিও ইউটিউবে তোলেন। ভিডিওটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। এক দিনে সাত লাখ মানুষ ভিডিওটি দেখে।

ভিডিও প্রকাশের পর জীবননাশের হুমকি পান মানাল। তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে অভিহিত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মুসলমানদের ভুল পথে নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। যত ধরনের গালি আছে, তা তাঁকে শুনতে হয়।

কারাদণ্ড হওয়ার পর মানাল তাঁর বাড়ি, সন্তান ও চাকরি হারান। শেষে দেশত্যাগ করেন। দ্বিতীয় স্বামী ও ছোট সন্তানকে নিয়ে সিডনিতে স্থায়ী হন। মানাল একটি স্মৃতিকথা লিখেছেন। নাম ‘ডারলিং টু ড্রাইভ’। এতে তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। নারী অধিকারকর্মী মানাল সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেয়েছেন। এতে তিনি ভীষণ খুশি। তিনি এখন মুক্তির স্বাদ উপভোগ করছেন।

বিখ্যাত টাইম সাময়িকীর বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন মানাল। নারীদের গাড়ি চালানোর বিষয়ে তিনি সরব। ‘ওমেন টু ড্রাইভ’ আন্দোলনের মাধ্যমে নারীদের গাড়ি চালানোর জন্য লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করতে আহ্বান জানাচ্ছেন মানাল।