আর্কাইভ

Archive for the ‘সংস্কৃতি’ Category

‘রূপবান’ বদলে দিয়েছিলো ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট

roopban

Advertisements

ভারতে জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত একটি অভিনব ছবি

indian art

বিভাগ:সংস্কৃতি

মুসলিম বিশ্বে ভাস্কর্য

sculpture in muslim landsবহু দিন ধরে বহু ক্রোশ ব্যয় করি

দেখিতে গিয়েছি মক্কা-মদীনা

করিতে গিয়েছি হজ্ব

দেখা হয় নাই শুধু চক্ষু মেলিয়া

মুসলিম বিশ্বের এখানে-সেখানে

মূর্তি-ভাস্কর্য সাজ ।

===

qatar

saudi arabiairaqsyria

indonesia

iran

pakistan

malaysia

emirates

turkey

ভালোবাসার শহরে…

i love wallশান্তা তাওহিদা, প্যারিস থেকে : শহরজুড়ে যেন সারা বছরই প্রেমের মৌসুম চলে। সিন নদীর পার ধরে হেঁটে হেঁটে দেখার প্যারিস এ এক অন্য প্যারিস। সকালে সিন নদীর পানিতে সূর্যের স্পটিক হাসি আর রাতে আলো ঝলকানো হাজার হাজার তারা। এ রকম মুহূর্তটা অবশ্যই দাবি রাখে পরস্পরের হাতে হাত রেখে অতল চোখে হারিয়ে যাওয়ার। আমার যদিও সে সৌভাগ্য হয়নি। প্রায় সাত হাজার নয়শ কিলোমিটার দূরে ছিল আর একটা হাত। ভালোবাসার শহরে সে এক বেরসিক আমি!

দিন আর রাতের প্যারিসের মাঝে বিস্তর ফারাক। শুনে তা বুঝা যাবে না, এমনকি চোখে দেখেও না। এ কেবল অনুভবের। তবে প্যারিস শহর ঘুরে বেড়ানোটা ভোরে থেকে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে দুই রূপই দেখা যাবে। সিন নদীর কোল ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে শুরু হয় আমার প্যারিস সফর। পায়ে হাঁটার পথ থামে পন্ট দে আরটস সেতুতে। এটি পারিসের প্রথম ধাতব সেতু। নামকরণ করা হয়েছিল প্রথম ফরাস সম্রাটের নামানুসারে। এর এক পাশে ইনস্টিটিউট অফ ফ্রান্স আর অন্য পাশে ল্যুভর প্যালেসের কেন্দ্রীয় স্থাপনা। এ সেতুর আরেক নাম ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু। ভালোবাসাকে তালা-চাবি দিয়ে বন্দি করা যায় কিনা তা কেবল এখানকার প্রেমীরাই বলতে পারবেন। তালায় দুজনের নাম লিখে এ সেতুতে দুজনে মিলে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবিটা ছুড়ে ফেলে দেয় তারা ভালোবাসা নদীর জলে। কথিত আছে, এতে ভালোবাসা অমরতা পায়। সেতুর নিচের প্রবহমান ভালোবাসা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে চাবি খুঁজে নিয়ে সে তালা খুলে এমন সাধ্য কী আর কারো আছে বলুন? হতে পারে এটা ছেলেমানুষী। একদিন না হয় ভালোবেসে ছেলেমানুষ হলেন। ক্ষতি কি তাতে! বিষয়টা কিছুটা বুকের ঢিপঢিপানি নিয়ে ছোটবেলায় দেয়ালে যোগ চিহ্ন দিয়ে নামের আদ্যক্ষর লিখে রাখার মতো। এভাবেই হয়ত অবিনশ্বরতা পায় ভালোবাসা। মজার খবর হলো বেশ কিছু দিন আগে ভালোবাসার তালার ভারে সেতুটি প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা হয়েছিল। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হওয়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই কিছু ভালোবাসার ঝালর কেটে কমিয়ে দিয়ে ছিলেন। সেতুতে টানিয়ে দিয়েছেন সতর্কবাণীও। তাতে কি আর বুঝে পাগলপ্রেমি মন! ভালোবাসার শহরে ভালোবাসার তালা রোজই ঝুলছে। কার সাধ্য বাধা দেয়।

পন্ট দে আরটস সেতু নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত ফরাসি সিনেমা ‘লে পন্ট দে আরটস’। ফরাসি এক তরুণ তরুণীর করুণ প্রেম কাহিনি নিয়ে এ সিনেমা। প্রেমিকের সঙ্গে অভিমান করে অভিমানি প্রেমিকা এ সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে ভালোবাসা নদীতে আত্মহত্যা করে। সইতে না পেরে প্রেমিকও একি সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয় প্রেমিকার সঙ্গে মিলনের আশায়। কেবল এই সেতু নয়, ভালোবাসা নদীর ওপর এরকম প্রায় ১১টি ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু রয়েছে পুরো পারিসে । যারা প্যারিসে আসেন তাদের কাছে মন্টেমারে নামটা আগে থেকেই শোনা থাকতে পারে। জায়গাটা পারিসের উত্তর পাশে সিন নদীর কোল ঘেঁষে। পাবলো পিকাসো, ভিনসেন্ট ভ্যানগগ, ক্লোদ মনে নিভৃতে ছবি আঁকার জন্য এ পাশটা বেছে নিয়েছিলেন। ফরাসি ভাসায় এ জায়গাটার নাম মো মার্তে। পাহাড়ের উপরে রয়েছে এক মনোরম ব্যাসিলিকা। দুই নম্বর মেট্রো ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। এখানে রয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য আরো একটি আকর্ষণ। ফরাসি ভাষায় জায়গাটার নাম ‘লে মর ডেস যে তাইমে’। বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমি তোমাক ভালোবাসি দেয়াল’। মন্টেমারে রিকটুশ বাগানে এ দেয়াল।

প্রায় চল্লিশ স্কয়ার মিটার দেয়ালের পুরোটা জুড়ে ৫০টি ভাষায় ৩১১ বার লেখা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাওয়ার এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এখানে। যে আগে খুঁজে পায় ভালোবাসার বার্তা তার ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি। নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাবার আনন্দে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মানুষকে। বাংলায় ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ লেখাটা দেয়ালের মাঝখানের অংশে রয়েছে দেখলাম। বিরহ ছাড়া ভালোবাসা অর্থহীন বলেই হয়ত কিছু লাল ভঙ্গুর হৃদয় ছড়িয়ে দেয়া রয়েছে পুরো দেয়ালের ৬১২টি টাইলস জুড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল ভঙ্গুর হৃদয় দেখে। মনে মনে প্রার্থনা করলাম পৃথিবীর সকল যুগলের জন্য। অমর হোক তাদের বন্ধন। ভঙ্গুর হৃদয়ের যাতনা তাদের যেন কোনোদিন স্পর্শ না করে। আমার ধারণা ছিল কেবল তরুণ-তরুণীরা ভালোবাসার দেয়ালের খুঁজে এখানে আসে। ভুল করলাম আবারও। এখানে আসেন প্রেমিক জুগল। আর প্রেমের যে কোনো বয়স নেই তা এখানে না আসলে আমার হয়ত কখন বুঝা হতো না। হাতে হাত রেখে ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক দিয়ে বহু প্রবীণ প্রেমিকাকে প্রেমিকের চোখে হারাতে দেখেছি সেখানে। এ যেন প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে পড়া।

প্যারিসের যেবার ভালোবাসার দেয়াল দেখতে গিয়েছিলাম সেটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক দিনের সফর। টের পাচ্ছেন তো একাকি আমার দেবদাস অবস্থা! আমি ছাড়া প্যারিস শহরটা বড় বেশিই রোমান্টিক। হা হা হা- তবে যে আকর্ষণে দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসে তার সাথে দেখা করার গল্পটা বরং আমার কাছে বেশি রোমান্টিক। দ্য টাউয়ার অব লাভ-ভালোবাসার আইফেল টাউয়ার। ৩২৪ মিটার উঁচু লোহার তৈরি এ টাউয়ারে মানুষ আসে প্রেমকে অমর করতে। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। উল্টো আমিই প্রেমে পড়ে গেলাম তার। একেবারে প্রথম দেখায় প্রেম যাকে বলে। প্রথম তার সাথে যখন দেখা হয়, তখন সে কুয়াসার চাদরে ঢাকা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তার সামনে মন্ত্রমুগ্ধ আমি। দ্বিতীয় বার যখন দেখা হলো তখন তিনি আকাশের নীলে রোদেলা আমার ফাগুন পুরুষ। আর তৃতীয় বার রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে আমার ভিনদেশি তারা। তার বিশালতার কাছে নিজেকে বড়ই সামান্য মনে হয়েছে।

সিন নদী পেরিয়ে যতই তার কাছে গিয়েছি ততই বদলে যেতে শুরু করে অনুভূতিটা। ‘আমি দূর হতে কেবল তোমায় ভালোবেসেছি’ কিছুটা এরকম অনুভূতি। দূর থেকেই তাকে বড় আকর্ষণীয় লাগছিল। এ যেন চিরায়ত মানব চরিত্র! কাছে পেলে সোনার মোহর হয়ে যায় মাটির মোহর! ‘কাছে গেলে যদি ভালোবাসা কমে যায় তবে দুরত্বই ভালো-এই বলে সেদিন সন্ধ্যায় তার সাথে হলো ছাড়াছাড়ি।

পরের বার প্যারিস গিয়ে তার অন্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে আইফেল টাউয়ারের চূড়ায় উঠার সৌভাগ্য হল। চূড়া থেকে দেখলাম ভালোবাসার অন্য আরেক প্যারিসকে। পুরো প্যারিসটা ৩৬০ ডিগ্রিতে চোখে বন্দি করতে সময় লাগল আর ঘণ্টাখানেক। আইফেল এর চূড়ায় যুগল স্যাম্পেনের হাতে চুম্বনরত তরুণ-তরুণীকে দেখে মনে হয়েছে ‘প্রেম পবিত্র-প্রেম মধুর’! চূড়া থেকে দেখে মনে হলো পৃথিবী আসলেই গোল। কমলা লেবুর মতো প্যারিস শহরটা মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। তবে মিলিয়ে যায়নি ভালোবাসা। কেবল সূর্যটা টুপ করে ডুব দিয়েছে সিন নদীতে আর সন্ধ্যা নেমেছে শন্ জিলেজের পথে পথে ভালোবাসার শহরের ভালোবাসারা এভাবেই বেঁচে থাকুক অনন্তকাল!

আন্দালুসিয়াঃ যে ইতিহাস কথা বলে!

La-mezquita-cordovaড. মুহাম্মাদ সিদ্দিক : মার্কিন লেখক জ্যাসন ওয়েবস্টারের প্রখ্যাত বই ‘আন্দালুস’। স্পেনে যে এখনো প্রচুর মুসলিম প্রভাব রয়েছে তা তিনি প্রমাণ করেছেন তার বইয়ে। তিনি তার মতের সমর্থনে স্পেনীয় বুদ্ধিজীবী পেড্রোর মন্তব্যও টেনেছেন তার বইয়ে।

অধ্যাপক পেড্রো বলেন, স্পেন মুসলিম আমলে দার্শনিক অ্যারিস্টটল ও উচ্চতর গণিতকে ইউরোপে নিয়ে যায়। এই কথা কেনিথ কার্ক তার ‘সিভিলাইজেসন’ বইয়ে লিখেছেন। পেড্রো বলেন, শুধু খ্রিষ্টান স্পেনকেই দেখা, একটা সাধারণ ফাঁদ। আভিরস (ইবনে রুশদ), মাইমোনাইডস (ইহুদি বিদ্যান) ও ইবনুল আরাবি সবাই স্পেনীয়। এরা মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের তিনজন। বিশ বছর আগেও মনে করা হতো যে, তারা যেন কখনোই ছিলেন না অথবা মনে করা হতো যে, তারা তাদের লোক আরবদের লোক। অথচ এই জ্ঞানী ব্যক্তিদের প্রভাব এখনো অনুভূত হয়, বলেন প্রফেসর পেড্রো (‘আন্দালুস’ পৃষ্ঠা ৯৩) (ওয়েবস্টারের বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে)।

প্রফেসর পেড্রো বলেন, ‘বেশির ভাগ লোক যা মনে করে তার চেয়েও বেশি ঋণ ইসলামি দুনিয়ার প্রতি রয়েছে আমাদের। মুসিলম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা স্পেনে এক হয়েছিল বলেই ইউরোপ আঁধার যুগ থেকে বের হতে পারে। এই তিনটি ধর্ম ক্রুসেড যুদ্ধের আগে থেকেই একে অন্যের গলা কাটছিল। তবুও এই স্পেনে মহান মুহূর্ত এলো মানব ইতিহাসের যখন তারা একত্র হলো’ (মুসিলম আমলে) (পৃষ্ঠা ৯৪)

জ্যাসন ওয়েবস্টার লেখেন, ‘টলেডো (খ্রিষ্টান পুনর্দখলে গেলে) আরবি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ল্যাটিন ভাষার তরজমার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এবং প্রথমবার (মূল) ইউরোপবাসী মুসলিম অঙ্ক শাস্ত্রবিদ যেমন আল-খারিজমি, ইবনেসিনা (যাকে ইউরোপীয়রা বলত আভিসেনা ও যিনি ছিলেন পরিচিত চিকিৎসাবিদ্যা ও সঙ্গীতের ওপর লেখা বইয়ের জন্য বিখ্যাত) প্রমুখের সাথে পরিচিত হলো। প্রথমবার ইউরোপীয়রা অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর বই পড়তে সক্ষম হলো যখন ইউরোপীয় ভাষায় (যেমন ল্যাটিন) তরজমা হলো। এই বিদ্যাই পরে ইউরোপের পুনর্জাগরণের ভিত্তি তৈরি করে।’ (পৃষ্ঠা ৯৪-৯৫)। ওয়েবস্টার বলছেন যে, আরবি থেকে ল্যাটিনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই তরজমা হলে ইউরোপে এসব ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ব্যাপারটা হলো যে এর আগে কয়েক শ’ বছর ধরে আরবি ভাষাতে এই জ্ঞান-বিজ্ঞান স্পেনে পাঠ করা হতো। এই স্পেনীয় মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান ছাত্ররা পড়াশোনা করত।

ওয়েবস্টার লিখেছেন, ‘ইনকুইজিসন (রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান আদালতের কার্যকলাপ) হলো বহু পাইকারি সন্ত্রাস, বর্ণবাদ ও নৃতাত্ত্বিক জুলুমের (এখনিক কিনসিং) পূর্বরূপ, যা এই বিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে। এই ইনকুইজিসন স্পেনের ইহুদি ও মুসলমানিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে সবচেয়ে বেশি কার্যক্রম নেয়।’ (পৃষ্ঠা ৯৫)। তিনি আরো লেখেন, “(এ সময়ে স্পেনে) বিদ্বেষ প্রতিষ্ঠিত করা হলো, ধর্মীয় মতোপার্থক্য অবশ্যম্ভাবীভাবে নিশ্চিহ্ন করা হলো, মুক্ত চিন্তাকে পরিত্যাগ করা হলো, আর এসব করার হাল-হাতিয়ার হলো ইনকুইজিসন (রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান আদালত), তার সাথে অগ্নিসংযোগ, নানা ধরনের যাতনা প্রয়োগের যন্ত্রপাতি ও ভীতি ছড়ানো। সেই থেকে স্পেনে সবই ‘না’ ‘না’।” (পৃষ্ঠা ৯৫-৯৬)।

স্পেনিশ বিশেষজ্ঞ পেড্রো মন্তব্য করলেন, ‘কিন্তু, ইনকুইজিসন পুরোপুরি সফলকাম হয়নি। ইনকুইজিসন স্পেনের ইমেজ বদলিয়েছে, এমনকি সম্ভবত যে ইমেজ স্পেন দুনিয়াকে দিতে চায়, তাও। তবে কয়েকটা মানুষকে জ্যান্ত পোড়ানো উপদ্বীপে মুসলমানদের ৯০০ বছরের হাজিরাকে হাওয়া করে দিতে পারে না। কিছু বিষয় ইনকুইজিটারদের চোখ থেকে এড়িয়ে যায়, কারণ সেগুলো ছিল লুকানো, ছদ্মবেশী ধর্মীয় আদালতেরও কাছে, এমনকি সেগুলোকে ‘খ্রিষ্টানি’ রেওয়াজ বলে চালানো হয় (অথচ তা নয়)। এমনকি অত্যাচারীদের হাত থেকে বাঁচতে দাবি করা হয় তারা খ্রিষ্টানদের চেয়েও বেশি বড় খ্রিষ্টান।’ (পৃষ্ঠা ৯৬)

পেড্রো বলতে থাকেন, ‘গত সপ্তাহে আমি ফরাসি সীমান্তে ফ্রান্সের লাইসির এক গির্জার ‘মাস’-এ (জামাতবদ্ধ প্রার্থনা) গিয়েছিলাম। লোকজন তেমন ছিল না (কারণ ধর্মের প্রতি অবহেলা)। পাদরি বাইবেল থেকে পড়ে ব্যাখ্যা করছিলেন। তবে আমাকে এটা চমৎকৃত করল যে, তিনি ভালোবাসা-প্রেম সম্পর্কে যা বলছিলেন তা ইবন আল-আরাবির মুখ নিঃসৃতের মতো। ইবন আল-আরাবি ছিলেন ইসলামি আধ্যাত্মিক বিদ্যান ও লেখক যিনি পাশ্চাত্যে ‘ডকটর ম্যাক্সিমাস’ এবং স্পেনীয়দের ভেতর ‘ওয়ান অব দ্য প্রেটেস্ট’। তিনি স্পেনের মুরসিয়া শহরে বার খ্রিষ্টান শতকে জন্মগ্রহণ করেন। তার লেখা এবং আরবিতে প্রচারিত মুহাম্মাদ সা:-এর বেহেশত ভ্রমণের ঘটনাবলির কাহিনীগুলো কবি দান্তেকে তার কাব্য ‘ডিভাইন কমেডি’ লিখতে সরাসরি প্রভাবান্বিত করেছে। একজন বিদ্যান বলেছেন যে, এটা হলো পশ্চিমা সাহিত্যে সবচেয়ে বড় একক উদাহরণ মুসলিম প্রভাবের। আন্দালুসিয়ার সব সুফি আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের ভেতর তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি নামকরা। তার জীবনী ও লেখালেখি নিয়ে সমগ্র দুনিয়ায় বহু গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। ‘প্রফেসর পেড্রো বলেন, ‘ইবন আল আরাবি লিখেছেন, ভালোবাসা হলো আমার বিশ্বাস, যে দিকেই তার উটকে ঘুরাই না কেন, তবু খাঁটি বিশ্বাসটা আমার। এগুলো কার কথা মনে হয়? যিশুর? ইবন আল আরাবি, যিশুÑ সবই এক। তাই বলি স্পেন এখনো মুসলমান দেশ।’ (পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭)।

প্রফেসর পেড্রো দৃঢ়ভাবে বললেন, খ্রিষ্টান ও মুসলমান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা এখানে (স্পেনে) একই কথা বলে।’ (পৃষ্ঠা ৯৭)। প্রমাণ হিসেবে তিনি দুটো বক্তব্য পেশ করলেন। প্রথমটা কবিতা, যা বাংলা ভাষায় তরজমা করলে এমন শোনাবে

‘প্রতিশ্রুত বেহেশত নয়
যা তোমাকে ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে, হে প্রভু,
দোজখের ভয়ও নয়
যা তোমার অবাধ্য হতে বাধা দেয়।’
পেড্রো বললেন, এখন শোনো :
‘হে প্রভু!
আমি যদি তোমার এবাদত করি দোজখের ভয়ে
তাহলে আমাকে দোজখেই ফেলে দাও, আর
আমি যদি বেহেশতের আশায় তোমার এবাদত করি,
বেহেশত থেকে আমাকে মাহরুম কর।’

পেড্রো বললেন, প্রথমে উল্লেখ করা কবিতাটি নামহীন কবির, তবে বিশ্বাস করা হয় এটা প্রখ্যাত স্পেনীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি সেন্ট জন অব দ্য ক্রসের, যিনি ষোল শতকে লেখেন। দ্বিতীয় বক্তব্যটা হলো মহিলা আলি ইরাকের রাবিয়া আল আদাউইয়ার (রাবিয়া বসরি) যিনি ৮০০ বছর আগে ছিলেন আরবে। এর একজন খ্রিষ্টান, অন্যজন মুসলিম, তবু তারা একই কথা বলেন। (আন্দালুস পৃষ্ঠা ৯৭-৯৮)

মার্কিন লেখক জ্যাসন ওয়েবস্টার স্পেনে মুসলিম ঐতিহ্য লক্ষ করে লিখলেন ‘আন্দালুস’ নামক গ্রন্থ। তার অভিজ্ঞতা সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

স্পেনের অভ্যন্তরে সফরের সময় ওয়েবস্টার ও তার দল আলমেরিয়া এলাকার মরুভূমিসদৃশ পাহাড়ি এলাকায় এক খাবার দোকানে ঢুকলেন। সেখানে ওয়েবস্টারের সাথী মরোক্কোর জিনে নামক মুসলিম ব্যক্তি ‘আল্লাহ’ বললে খাবার দোকানের মহিলা কর্মচারী জবাবে বলল, ‘হোলা’ যা ‘আল্লাহ’ শব্দের গোপনীয় রূপ। ওয়েবস্টার তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘আমার আগ্রহ হলো যখন দেখি ইসলাম ও পশ্চিমা সংস্কৃতি মিশে যায়’। তিনি বললেন, ‘এটা এখানে হয়েছে, যেখানে আমরা এখন বসে আছি। মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা একসাথে বাস করত এবং একটা মহান সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল। (ওয়েবস্টারের মরোক্কোবাসী সাথী) জিনে বললেন, আপনি তো সব সময় ভাবেন মুসলমান ও খ্রিষ্টান, ইসলাম ও পশ্চিম নিয়ে কিভাবে অতীতে এসব ছিল আরো ভালো। …. কোনো বর্ণবাদ থাকবে না যদি খাবারঘরের এই মেয়েগুলো জানে যে, তাদের ভেতর রয়েছে মুসলমানিত্ব। (আন্দালুস পৃষ্ঠা ১০৮-১১০)। অর্থাৎ ওয়েবস্টার ও তার সাথী মরোক্কীয় প্রত্যক্ষ করেছেন যে স্পেনের মেয়েদের ভেতরে পর্যন্ত মুসলমানি ভাব-ভাষা রয়ে গেছে। তারা যে অতীত মুসলমানের বংশধর।

অন্য ধর্মের স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার একটা কবিতার বাংলা তরজমাতে এই মুসলিম মেয়েদের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে এভাবে। কবিতার নাম :

‘জায়েনের মুর-মেয়েরা’
[১৫ শ’ শতকের জনপ্রিয় গীতি]
জায়েনের তিনটি মুর-মেয়েকে আমি ভালোবাসি;
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েন।
কৃষ্ণকায়া অথচ সুন্দরী তিনটি যুবতী
জায়েনে জলপাই তুলতে গেল,
এবং দেখল যে তা নেই;
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েনা…
‘মশায়রা, তোমরা কারা,
আমার জীবন ছিনিয়ে নিচ্ছ?
একসময় মুর ছিলাম কিন্তু এখন খ্রিষ্টান,
জায়েনের ওরা বলল :
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েন।
(তরজমা : মোরশেদ শফিউল হাসান)

ওয়েবস্টার তার ছোট দল নিয়ে আলমেরিয়া শহরের মুসলিম কিল্লায় গেলেন, যা এখনো আরবি ‘আল কাজাবা’ নামে পরিচিত। ভূমধ্যসাগরের তীরে এই কিল্লা,পাহাড়ের মাথায়। নিচে আলমেরিয়া শহর। ওয়েবস্টারের মরোক্কীয় সাথী জিনে বললেন, এত মরোক্কোর কিল্লাগুলোর মতো কিল্লা। এমনকি মুসলমানদের দ্বারা ইউরোপে নিয়ে যাওয়া গোলাপ ফুলের বাগিচাও সেখানে রয়েছে এখনো।

ওয়েবস্টার লেখেন যে আলমেরিয়ার প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হলো এই আল কাজাবা, এটা বিশাল একটা কিল্লা যা শহরের মাথায় পাহাড়ে নির্মিত। আন্দালুসিয়ার শ্রেষ্ঠ খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান এই আল কাজাবা দশ শতকে তৈরি করেন। ওয়েবস্টার লেখেন, খলিফা একটা সাধারণ বন্দর প্রহরা মিনারকে একটি বর্ধনশীল বন্দর ও বৃহৎ নগরীতে পরিণত করেন। এটা আল হামরা কিল্লার মতো নয় নেই এখানে কোনো কাঠে খোদাই করা ছাদ বা প্রাচীরে কোনো ‘আরাবেসক’ সজ্জা যে অলঙ্করণ মূর্তিবিহীন লতাপাতার অলঙ্করণ তবু এই আলমেরিয়া আল কাজাবা একটি বিশাল স্থাপনা,যা তাকিয়ে আছে নিচের শহরের দিকে। এটা অতীতের গৌরবকে স্মরণ করে দেয়। ‘আন্দালুস’ (পৃষ্ঠা ১১৩-১১৫)।

ওয়েবস্টার লেখেন যে আলমেরিয়ার বাড়িঘরগুলো একশো বছরের পুরনো, তবে বাড়ির স্থাপত্যে মুসলমানি আমলের পর কমই বদল হয়েছে। একসময়ে উত্তর মরোক্কোর শহরগুলোর মতো ছিল আলমেরিয়া শহর। এখন শূন্য ও মরুভূমিসদৃশ। কেমন একটা করুণ দৃশ্য। (পৃষ্ঠা ১১৩)। করুণ তো হবেই। ইনকুইজিসনের জুলুমের ছাপ কি নিশ্চিহ্ন হয়েছে?

ইংরেজী নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি

new-years-day-2017অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম : একটি জাতির সংস্কৃতি সেই জাতির নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস, আচারঅনুষ্ঠান, ধ্যানধারণা ইত্যাদি সামগ্রিক পরিচয় স্পষ্টভাবে ধরে রাখে এবং তা বিশ্ব দরবারে সেই জাতির আত্মপরিচয়কে বুলন্দ করে দেয়। মূলত সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আয়না। সংস্কৃতির বহুবিধ উপাদানের মধ্যে নববর্ষও অন্যতম। আমরা যাকে ইংরেজী সন বা খ্রিস্টাব্দ বলি, আসলে এটা হচ্ছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। বাংলা ভাষায় অব্দ শব্দের চেয়ে সন ও সাল দুটি বেশি পরিচিত ও সর্বাধিক প্রচলিত। সন শব্দটি আরবী এবং সাল শব্দটি ফারসী। সন ও সাল এই শব্দ দুটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যজাত, আমাদের তমদ্দুনীয় উৎস সঞ্জাত।

আমাদের দেশে বর্তমানে তিনটি সন প্রচলিত রয়েছে আর তা হচ্ছে হিজরী সন, বাংলা সন ও ইংরেজী সন। এখানে হিজরী সনের প্রচলন হয় যেদিন এখানে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে তখন থেকেই। এই হিজরী সন মুসলিম মননে পবিত্র সন হিসেবে গৃহীত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনা মুনওয়ারায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসের সেই দিগন্ত উন্মোচনকারী ঘটনাকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে এই হিজরী সন। ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে হযরত উমর রাদিআল্লাহু তায়ালা আন্হুর খিলাফতকালে তারই উদ্যোগে হিজরতের বছর থেকে হিসাব করে হিজরী সনের প্রবর্তন করা হয়। সেটা ছিল হিজরতের ১৭ বছর। যতদূর জানা যায়, তারই পরের বছর থেকে বাংলাদেশে সাংগঠিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়আর তখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা)-এর খিলাফতের মধ্য ভাগ। অবশ্য প্রায় ১০/১২ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশে সমুদ্রপথে ইসলামের খবর এসে পৌঁছতে থাকে। ইসলামের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে হিজরী সনেরও আগমন ঘটে, কারণ এই সনের বিভিন্ন মাসে ইসলামী আচারঅনুষ্ঠান, ইবাদতবন্দেগীর নির্দিষ্ট দিনরজনী, তারিখ ও নির্দিষ্ট মাস প্রভৃতি রয়েছে। এই হিজরী সনই বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত সবচেয়ে পুরনো সন।

১২০১ খ্রিস্টাব্দে সিপাহ্সালার ইখতিয়ারুদ্দীন মুহম্মদ বিন বখ্তিয়ার খিল্জী বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের বিজয় নিশান উড্ডীন করেনআর তখন থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরী সন বাংলাদেশে প্রচলিত হয়, যা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সুলতানী আমলে কি মুঘল আমলে রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে, আদানপ্রদান তথা সর্বক্ষেত্রে হিজরী সনই প্রচলিত ছিল। অবশ্য মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে ঋতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সৌর সনের তাকিদ রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে দেখা দেয়ায় হিজরী সনকেই সৌর গণনায় এনে একটি রাজস্ব বা ফসলী সনের প্রবর্তন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, হিজরী সন চান্দ্র সন হওয়ায় ঋতুর সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকে না।

সম্রাট আকবরের নির্দেশে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে আমীর ফতেহ্উল্লাহ সিরাজী সম্রাট আকবরের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বছর ৯৬৩ হিজরী মুতাবিক ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের নির্দিষ্ট তারিখ থেকে হিসাব করে হিজরী সনকে সৌর গণনায় এনে যে সনটি উদ্ভাবন করেন সেটাই আমাদের দেশে বাংলা সন নামে পরিচিত হয়। হিজরী সনের বছরের হিসাব ঠিক রেখেই এর মাসগুলো নেয়া হয় শকাব্দ থেকে। বৈশাখ মাসকে স্থির করা হয় বছরের প্রথম মাস।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকেই সম্রাট আকবরের ফরমানবলে রাজত্বের রাজস্ব আদায়ের সন হিসেবে তা প্রচলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে হিজরী সনের সৌরকরণ পঞ্জিকাটি ব্যাপকভাবে গৃহীত ও সমাদৃত হয়, যা একান্তভাবে বাংলার মানুষের নিজস্ব সন হিসেবে স্থান করে নিতে সমর্থ হয়। আর এখানে ইংরেজী সন এলো সেই ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে। একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে কিন্তু এখন পর্যন্ত ইংরেজী সনের গ্রহণযোগ্যতা তেমন একটা নেই। আবার শহর জীবনে বাংলা সনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। অবশ্য শহুরে জীবন কি গ্রামীণ জীবনে হিজরী সনের প্রচলন সমানভাবে বর্তমান। বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও সংহতির অন্যতম অবলম্বন এই হিজরী সন। আর এই হিজরী সন থেকে উৎসারিত বাংলা সন আমাদের জাতীয় জীবনে নিজস্বতার বৈভব এনে দিয়েছে।

মুসলিম দুনিয়ার অনেক দেশেই হিজরী সনের চান্দ্র হিসাবের বৈশিষ্ট্যেই জাতীয় সন হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এমনকি এই সনের সৌর হিসাব এনে বাংলা সনের মতোই কোন কোন দেশে প্রচলিত রয়েছে, যেমন ইরানে হিজরী সনকে সৌর হিসাবে এনে সেখানে হিজরী সন প্রচলিত রয়েছে। ইরানে নওরোজ পালিত হয় হিজরী সনের শামসী বা সৌরকরণের হিসাবে আনা তাদের নিজস্ব প্রথম মাসের ১ তারিখে। আমাদের দেশে হিজরী সনের সৌর হিসাবের প্রথম মাস যেমন বৈশাখ মাস, তেমনি ওখানে হচ্ছে ফারবারদীন প্রথম মাস। এই মাসের ১ তারিখ ওদের হয় ২১ মার্চ। আর আমাদের ১ বৈশাখ হয় ১৪ এপ্রিল। আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষের যে আনন্দ বৈভব কি গ্রামে কি নগরেগঞ্জে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, ইংরেজী নববর্ষ কিন্তু শহুরে জীবনের মুষ্টিমেয় বিশেষ মহলে ছাড়া তা ব্যাপকভাবে কোথাও আলোড়ন সৃষ্টি করে না। তবুও ইংরেজী নববর্ষ আসে। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টার ঘণ্টা বাজার পর পরই ঘোষিত হয় এই ভিন ঐতিহ্যজাত নববর্ষের সূচনা মুহূর্ত, ঘোষিত হয় ইংরেজী নববর্ষের আগমন বারতা। মধ্যরাতের সেই মুহূর্তটা আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে কোনরূপ আনন্দআবেগ সৃষ্টি না করলেও খ্রীস্টান জগত ওই মুহূর্তে হ্যাপি নিউ ইয়ার উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এক হৈহুল্লোড়ে উল্লাস ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। ঘটে যায় কতই না অঘটন, ঘটে যায় কতই না পৈশাচিক কর্মকান্ড, মদ্যপানের নামে বহু স্থানে জীবন পানের মহড়াও চলে। ইংরেজী নববর্ষ আসে রাতের গভীরে নিকষ অন্ধকারে প্রচন্ড শীতের প্রবাহ মেখে।

ইংরেজী ক্যালেন্ডার যেহেতু আমাদের কাজকর্মের তারিখ নির্ধারণে, হিসাবনিকেষ সংরক্ষণে, আন্তর্জাতিক আদানপ্রদানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তাই এতে যতই ঔপনিবেশিক গন্ধ থাকুক না কেন, যতই এতে প্রায় ২০০ বছরের গোলামির জোয়ালের চিহ্ন থাকুক না কেন, আমরা এর থেকে মুক্ত হতে পারছি না এই কারণেই বোধ করি যে, আমরা স্বকীয়সত্তা সজাগ হওয়ার চেতনার কথা বললেও, আমরা নিজস্ব সংস্কৃতিকে সমুন্নত করার কথা বললেও তা যেন অবস্থার দৃষ্টিতে মনে হয় বাতকা কি বাত তথা কথার কথা। ইংরেজী নববর্ষ আমাদের স্কন্ধে সিন্দবাদের সেই দৈত্যটির মতো, সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে বসে আছে যে, আমরা একে ছাড়তে পারছি না। ইংরেজী নববর্ষ আমাদের নতুন দিনের হিসাব শুরু করায়, যদিও চিঠিপত্রে বাংলা তারিখ উল্লেখ করার নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু সেটাও কি কার্যত হচ্ছে?

আমরা যাকে ইংরেজী ক্যালেন্ডার বলি আদতে এর নাম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি প্রাচীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারটির সংস্কার সাধন করেন। এই গ্রেগরির নামে এই ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ লেখার শেষে যে এডি (.) লেখা হয় তা লাতিন এ্যানো ডোমিনি (অহহড় উড়সরহর)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এই এ্যানো ডোমিনির অর্থ আমাদের প্রভূত বছরে অর্থাৎ খ্রিস্টাব্দ। ডাইওনিসিয়াম একমিগুয়াস নামক এক খ্রীস্টান পাদ্রী জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ৫৩২ অব্দে যিশুখ্রিস্টের জন্ম বছর থেকে হিসাব করে এই খ্রিস্টাব্দ লিখন রীতি চালু করেন।

মানুষ আদিকাল থেকেই কোন না কোনভাবে দিনক্ষণ, মাসবছরের হিসাব রাখতে প্রয়াসী হয়েছে চাঁদ দেখে, নক্ষত্র দেখে, রাতদিনের আগমননির্গমন অবলোকন করে, ঋতু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে। সাধারণ কোন বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিন গণনা, মাস গণনা, বছর গণনার রীতি কালক্রমে চালু হয়েছে। তিথি, নক্ষত্র বিশ্লেষণ করার রীতিও আবিষ্কার হয়েছে, উদ্ভাবিত হয়েছে রাশিচক্র। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা চান্দ্র সন নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চান্দ্র সনে বছর হয় মোটামুটি ৩৫৪ দিনে আর সূর্যের হিসাবে যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা সৌর সন নামে পরিচিত হয়। সৌর সনের বছর হয় মোটামুটি ৩৬৫ দিনে। আমাদের দেশে ইংরেজী তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার যে ব্রিটিশ বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাত করে আমাদের ওপর গোলামির জোয়াল চাপিয়ে দেয়, সেই ব্রিটিশ এই ক্যালেন্ডার তাদের দেশ গ্রেট ব্রিটেনে চালু করে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। তারা যেখানেই তাদের উপনিবেশ স্থাপন করেছে, সেখানেই তারা তাদের পোশাকআশাক, শিক্ষাদীক্ষা, প্রশাসনিক কাঠামো, সংস্কৃতি যেমন চাপিয়ে দিয়েছে, তেমনি তাদের ক্যালেন্ডারটিও দিয়েছে, তারা প্রভু সেজে বসেছে আর নেটিভদের বানিয়েছে মোস্ট অবিডিয়েন্ট সারভেন্ট। এর থেকে কি আমরা নিজেদের উদ্ধার করতে পারব না? বল বীর/বল উন্নত মম শির/শির নিহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির এই বীরত্বব্যঞ্জক উচ্চারণ কি শুধু আমাদের জাতীয় কবির কবিতায় আবৃত্তির জন্য অনুরণিত হতে থাকবে, নাকি আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঝংকৃত হবে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখতে পারি না?

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরিফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা)

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬

পাশ্চাত্য নয়, দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা চাই

আল ফাতাহ মামুন : আমরা শপথ করিতেছি যে, নববর্ষারম্ভে বিগত বছরের ঋণ শোধ করব এবং কৃষিকাজের যে সব সন্ত্রপাতি ও হাঁড়িবাসন ধার নিয়ে ছিলাম তাও ফিরিয়ে দেব। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে এভাবেই পুরোনো বছরের ঋণ শোধের শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপন হতো নতুন বছরের প্রথম দিনটি। এর পাঁচশো বছর পর অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব দুহাজার সনে ধারদেনা শোধের শপথ অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে নতুনরূপে নববর্ষ উদযাপন হয় ব্যবিলনিয়া দেশের ব্যবিলন নগরে। বর্তমান ইরাকের আল হিল্লা শহরের কাছেই ছিল ব্যবিলন নগরের অবস্থান। এগারো দিন ব্যাপী নববর্ষ উৎসবে নানা আয়োজনে মুখর থাকত ব্যবিলনিয়ার ব্যবিলন। শেষ দিন মারদুকের মন্দিরে থেকে নববর্ষের মিছিল শুরু হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর নববর্ষ ভবনে সামনে এসে শেষ হতো বর্ষবরণ আনন্দ মিছিল। নববর্ষের শুরুর ইতিহাস এমনটিই। এরপর নানান ঘাতপ্রতিঘাত ও সংঘাতসংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশে দেশে বিস্তার হতে থাকে নববর্ষ সংস্কৃতি। এরই ধারাবহিকতায় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইংরেজি নববর্ষ।

জানুয়ারি মাসের পহেলা তারিখ ইংরেজি বছরের প্রথম দিন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কল্যাণে (!) ইংরেজি নববর্ষ এখন অশ্লীলতা আর নোংরামির হাতেখড়ি হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। অবশ্য ইংরেজি নববর্ষের সঙ্গে উচ্ছৃংখলতার সম্পর্ক নতুন নয়। স্যার জেমস ফ্রেজার তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য গোল্ডেন বাও লেখেন, নববর্ষ উপক্ষে আমেরিকান আদিবাসী নারীপুরুষদের আচরণ ছিল কান্ডজ্ঞানহীন মানুষের মতো। বিভিন্ন সাজে সজ্জিত নারীপুরুষরা এ বাড়ি ও বাড়ি ছুটে বেড়াতো আর সামনে যা পেত ভেঙ্গে ফেলত। শুধু যে অন্যের সম্পদের ক্ষতি করতো তা নয়; নিজেদের কাপড়চোপড় এবং আসবাবপত্রও ভাঙচুর করতো তারা। পুরোনো বছরের সঞ্চয় ও সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন বছরে নতুন জীবন শুরু করোএ দর্শনই আমেরিকানদের উগ্রপথে বর্ষবরণে উদ্বুদ্ধ করে। সেখানকার আদিবাসীদের দেখাদেখি অভিবাসী আমেরিকানরাও নববর্ষে ভয়াবহ রকমের অস্বাভাবিকতা প্রদর্শন করতে লাগলো। অগ্ন্যুৎসব, শব্দ দূষণসহ নানান কর্মকান্ড করে ভীতিকর পরিস্থিতিতে ৩১ ডিসেম্বর রাত অতিবাহিত করে নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতো তারা।

সময় পাল্টেছে। দিন বদলেছে। এখন আর অন্যের বা নিজের আসবাবপত্র ভেঙ্গে নববর্ষ উদযাপন করা হয় না। এখন নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানানো হয় নিজেকে ধ্বংস করে। একত্রিশ ডিসেম্বর রাত বারোটার পরপরই নিউ ইয়ার উদযাপনে তরুণতরুণীরা ধর্ম নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নাচগান ও মদইয়াবায় মেতে ওঠে। না, ইউরোপআমেরিকা বা অন্য কোনো পাশ্চাত্য রাষ্ট্রের নববর্ষ উদযাপনের কথা বলছি না। বলছি, বারো আউলিয়ার পূণ্যভূমি বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন সম্পর্কে। ভাবতেও কষ্ট হয়! একটি ভিন্ন জাতির উৎসবকে কেন্দ্র করে কীভাবে আরেকটি জাতি নিজের বিশ্বাসসম্পদ ও সংস্কৃতিকে বিলিয়ে দেয়। আমরা বাঙালি। আমাদের আছে নিজস্ব সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফালগুন, নবান্ন উৎসবসহ বিভিন্ন উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় ও ধর্মীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির আকাশপাতাল ব্যধান। থার্টিফার্স্ট নাইট, ভেলেন্টাইনস ডেসহ ইংরেজি বিভিন্ন উৎসবঅনুষ্ঠান পালন করার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশীয় এবং ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠান সংকটাপন্ন করে তুলছি। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী নয়। ইন্দ্রীয় সুখ লাভ এবং জীবন উপভোগই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। এজন্য তারা কোনো আইন কিংবা বাধানিষেধের ধার ধারে না। তারা আরো বিশ্বাস করে, এ জীবনই শেষ জীবন। এরপর আর কোনো জীবন নেই। নেই জবাবদিহির মতো গুরু দায়িত্বও। অপরদিকে আমাদের দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী। তারা পরজীবনে জবাবদিহির বিষয়টি গভীরভাবে লালন করে এবং বাস্তর জীবনে এর কঠোর অনুশীলনের চেষ্টা করে। সুতরাং আমাদের এবং পশ্চিমাদের জীবনাচার এবং সংস্কৃতির যে বিরাট পার্থক্য থাকবে তা বলাই বাহুল্য।

আমাদের সঙ্গে বিশ্বাস ও চিন্তায় এত বৈপরিত্যপূর্ণ একটি জাতির সংস্কৃতি যখন আমরা চর্চা করতে থাকি তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিশ্বাসও আমাদের মনমননে গেঁথে যেতে থাকে। যে কারণে পাঁচ বছর আগের বাংলাদেশকে পাঁচ বছর পরের বাংলাদেশের সঙ্গে মেলাতে গেলে রীতিমত আঁতকে ওঠতে হয়। কয়েক বছর আগেও দৈনিক কাগজগুলোর একটি নিয়মিত শিরোনাম ছিলম্ভ্রম হারানোর ভয়ে তরুণী/গৃহবধূর আত্মহত্যা আর সাম্প্রতিক সময়ে ইউটিউব বা পর্ণ সাইটগুলোতে আমাদের দেশের মেয়েদের সম্ভ্রম দানের মিছিল দেখে নিজেকেই বিশ্বাস করাতে কষ্ট হয়, একদিন এ দেশের মেয়েরাই সম্ভ্রম বাঁচাতে আত্মাহুতি দিয়েছিল! আজকের এ জাতীয় অধঃপতন যে বিজাতীয় সংস্কৃতিরই পরিণাম ও ফায়দা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে যে কোন ধরনের নৈরাজ্য রোধে প্রতিবছরই সরকার ও আইনশৃৃংখলা বাহিনী তৎপর থাকেন। তবে আফসোস! অশ্লীলতা এবং কথিত তারুণ্যের উম্মাদনা রোধে কারোই কোনো ভাবনা থাকে না। বরং আইনশৃংখলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানেই নাচগান, মদপান ও শ্লীলতাহানির মতো ঘৃণ্য কাজগুলো ঘটে থাকে। কয়েক বছর আগে টিএসসি চত্বরে নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এসব অপসংস্কৃতি এদেশের তরুণতরুণীদের জন্য কতটা বিপদজনক। নিউ ইয়ার উদযাপনকে কেন্দ্র প্রতি বছরই শ্লীলতাহানির ঘটে, এবারও ঘটবে হয়তো। কিন্তু প্রশ্ন হলোআমরা যাকে শ্লীলতাহানি বলছি, আমাদের নারী সমাজও কি সেটিকে শ্লীলতাহানিই মনে করেন? যদি তাই হয়, তবে তো টিএসসির ঘটনার পর নিউ ইয়ার উৎসবে অংশগ্রহণ করা কোনো নারীর চিন্তায়ও আসার কথা নয়। কিন্তু হায়! ওই ঘটনার পর যেন নারীদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে।

এ লেখা পড়ে কোনো নারীবাদীর নাকে যে মৌলবাদীর গন্ধ লাগবে না, তা হলফ করে বলতে পারি না। তবে যে কথাটি আমি হলফ করে বলতে পারি তা হলোনারীবাদীদের মহান হৃদয়ে এ প্রশ্ন অবশ্যই জাগবে যে, নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে এত কথা বলছেন, কিন্তু যারা নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে সেই সব পশুদের ব্যাপারে কিছু বলছেন না কেন? আসলে যারা এমনটি করেছে তারা মানুষের পর্যায়ে পড়ে নাএ ব্যাপারে আমার কেন খোদ শয়তানেরও দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেদিন কোনো মানুষরূপী পশু তো বাসায় গিয়ে কোনো নারীর সম্ভ্রমহানি করেনি। বরং মেয়েরাই পশুর খাঁচায় এসে নিজ থেকে ধরা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমি শুধু বলছি, বোন! কুকুর হইতে সাবধান। এতে আমার কোনো অপরাধ হয়েছে বলে মনে হয় না।

ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। আমরা বাঙালির পাশাপাশি মুসলিমও। মুসলিম হিসেবে আমাদেরও রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং হিজরি সন। বিজাতীয় (অপ)সংস্কৃতি চর্চায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে দেশীয় এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চায় মুসলিম তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলেমওলামাদের বিশেষ ভূমিকা রাখার আহবান করছি। আরেকটি কথা। সামগ্রীক বিবেচনায় বিদায়ী বছর বিশ্ব মুসলমানের জন্য সুখকর ছিল না। উপভোগ্য তো নয়ই। মিয়ানমার, কাশ্মীর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আলেপ্পোর মুসলমানরা এখনো আঁতকে ওঠছে ১৬ ক্ষত দেখে। নতুন বছর পুরনো ক্ষতে সুখের প্রলেপ দেবে এই আশায় দিন গুনছে নির্যাতিত মুসলমান। মুসলিম বিশ্বের ঘোর অমানিশা দূর করে আলোকিত ভোরসুবহে সাদিক ফিরিয়ে আনুক নতুন বছরের প্রথম সূর্য। স্বাগতম ২০১৭।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডঃ বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করাই ছিল লক্ষ্য

azad-27-12-71ডা. সারওয়ার আলী : মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লাখ মানুষ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী ধর্মভিত্তিক দলের সদস্যদের গণহত্যার শিকার হয়। এই শহীদদের ব্যাপকতম অংশ ছিল নিরস্ত্র সাধারণ জনগণ, বাঙালি সেনাইপিআরপুলিশ সদস্য, প্রাথমিক পর্যায়ে শরণার্থী শিশু ও নারী এবং অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা।

৯ মাসে সারা দেশে সংঘটিত এই গণহত্যায় নিহতদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবীরা। সব হত্যাকাণ্ডই সমান গুরুত্ববহ এবং স্বজনহারা সবার বেদনা দেশবাসীকে সমভাবে বহন করতে হবে। তাই প্রতিবছর, বিশেষ করে মার্চ ও ডিসেম্বরে আমরা সব শহীদের আত্মদানের প্রতি সম্মান জানাই। তবে আমরা বিজয়ের আগ মুহূর্তে শনাক্ত করে বিশিষ্ট সাংবাদিক, ডাক্তার, শিক্ষক ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর স্মরণে ১৪ ডিসেম্বর আলাদাভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করি। এর তাৎপর্য সম্যক উপলব্ধির জন্য পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ভাবাদর্শ এবং একাত্তরে গণহত্যার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী ও ধর্মাশ্রয়ী নেতৃত্বের রণনীতির বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। এর ফলে বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতাও বিবেচনা করা সম্ভব হবে।

সব দেশে নানা ধর্ম ও জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে, এমনকি ভারতবর্ষের মতো বহুজাতিক রাষ্ট্রও রয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে হাজার মাইল দূরত্বে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ‘মুসলমানদের স্বাধীন আবাসভূমি’র অবৈজ্ঞানিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভাবাদর্শে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। উভয় দেশে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে সৃষ্ট পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সম্ভবত এ গরমিলটি উপলব্ধি করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জন্মলগ্নেই ঘোষণা করেন যে আজ থেকে আমরা মুসলমান বা হিন্দু নই, আমরা সবাই পাকিস্তানি। এ ধারণাকে হয়তো স্বায়ত্তশাসিত গণতান্ত্রিক ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে কিছুকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারত। সে পথ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী গ্রহণ করেনি। ঐতিহাসিক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদের ভাষায়—আধুনিক রাষ্ট্রমাত্রই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে জাতিগত বৈষম্য বজায় রাখার জন্য প্রাথমিকভাবে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং পরিশেষে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করে সামরিক শাসনের আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই পাকিস্তানের ভাবাদর্শ রক্ষার জন্য তারা প্রথম আঘাত হানে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর।

এর ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সমর্থক মুক্তচিন্তার ছাত্রনেতা, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের দ্রুত মোহমুক্তি ঘটতে থাকে, যা আমরা লক্ষ করি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সুফিয়া কামাল কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তাধারা ও কার্যক্রমে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯৪৯ সালেই নিবন্ধে জানালেন —আমরা মুসলমান কিংবা হিন্দু সেটি যেমন সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য আমরা বাঙালি। এক বছরের মধ্যে সূচিত হলো ভাষা আন্দোলন। আমাদের ধর্ম পরিচয় ও জাতি পরিচয়ের মধ্যে কল্পিত দ্বন্দ্ব আবিষ্কার করার পাকিস্তানি শাসকবর্গের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হলো। একাত্তর অবধি পাকিস্তানের ভাবাদর্শ প্রত্যাখ্যান করে গড়ে উঠল গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী চরিত্রের রাজনীতিবিদ এবং ছাত্রদের আন্দোলন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার আন্দোলন এই জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গণআন্দোলনকে বেগবান করে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরে গণআন্দোলনের জন্ম দেয়। পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চলে সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের কার্যক্রম, আর তার অগ্রসেনানি মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা প্রায় শিক্ষাগুরুর মতো পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক ভাবাদর্শের মূলে কুঠারাঘাত করে চলেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্ম দেয়।

সমগ্র পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের শাসকরা তাদের পূর্বাঞ্চলের এই সংগ্রাম ভারত ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচারণার ফসল বলে আখ্যায়িত করে এবং এই চিন্তাধারায় মোহবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিশেষ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের শিক্ষক ও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা; যা যুদ্ধাপরাধের বিচারের অভিযোগনামায় স্পষ্ট হয়েছে। বিদেশি সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় ধর্মাশ্রয়ী আদর্শিক দলের নেতাকর্মীরা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করে হত্যা করে। তারই সর্বশেষ নিদর্শন পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করে হত্যাযজ্ঞ।

তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম নিছক একটি ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের রাষ্ট্রের বিপরীতে একটি সব ধর্মের সমঅধিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। আর এ সংগ্রামে দেশান্তরী ও অবরুদ্ধ দেশে থেকে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। অবশ্য স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও নতুন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পটভূমিতে এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। পাকিস্তানের মতাদর্শকে বহন করে এই অপশক্তি পবিত্র ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শের রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের জন্য শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন আজ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

লেখক : ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

সংস্কৃতি ধ্বংসের নীলনকশা হয় একাত্তরে

corpses-foundডা. এম এ হাসান : বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বুদ্ধিজীবী হত্যা শুধু ডিসেম্বর মাসেই হয়েছে বা আলবদর বাহিনীই হত্যা করেছে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যে গণহত্যার সূচনা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী—এরই অংশ ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই এ অঞ্চলে আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণআন্দোলন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের ফলে আইয়ুব খানকে সরিয়ে যখন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নেন তখন তিনি নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু এই নির্বাচন ছিল শুধুই একটি বহিরাবরণ এবং এখানকার গণজোয়ারকে নষ্ট করার একটি কৌশল। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা নানা গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং এখানকার মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহা দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। তাই পশ্চিম পাকিস্তানিরা নানা ছক করছিল। প্রথমত, তারা সমস্যাটাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের চিন্তা করেছিল। এ জন্য তারা দলগুলোকে বিভাজনের চিন্তা করে। তাদের অনুগতদের দিয়ে পাকিস্তানবিরোধীদের একটি তালিকা প্রণয়নের চেষ্টা করে। সেই তালিকায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যাঁরা অংশ নেন তাদের থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় যাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন তাঁদের চিহ্নিত করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ করে তখন তাদের ওপর নির্দেশ ছিল স্থানীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষকদের তালিকা তাদের কাছে প্রেরণ করার।

এই প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চের রাতে গণহত্যার একটি অংশ ছিল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বাহিনীর প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজ। এই তাজ ২৪ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ছিলেন। চট্টগ্রামে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে যেসব বাঙালি সেনা অফিসার ছিলেন তাঁদের ২৫ মার্চ রাতেই হত্যা করেন। তিনি বা তাঁর নির্দেশে সে রাতে প্রায় ৮০০ বাঙালি সেনা সদস্যকে হত্যা করা হয়। এরপর সে রাতেই তিনি চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় এসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ চালান। ২৬ মার্চ ভোরে তিনি জগন্নাথ হলে আসেন। জগন্নাথ হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশনা দেন কোন কোন শিক্ষককে হত্যা করা হবে। সেই শহীদ শিক্ষকদের একজন ছিলেন অধ্যাপক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব। যাঁকে আমি এবং আমার ভাই শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম, আমরা ২৭ তারিখে উদ্ধার করার চেষ্টা করি। ঘটনাটি আমি অত্যন্ত ভালোভাবে জানি, কারণ ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবের পালিত কন্যা ছিলেন আমার খালা। তিনি এবং পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকজনের সাক্ষ্য থেকে আমরা জানতে পারি, এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনোভাবেই তাত্ক্ষণিক ছিল না। এগুলো সবই ‘ভেরি মাচ টার্গেট কিলিং’।

নানা সাক্ষ্য এবং পরে আরো তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজ। আর তাজকে যিনি ওপর থেকে পরিচালনা করেছিলেন তিনি হলেন ব্রিগেডিয়ার জাহান জেড আরবার। এই আরবার ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সার্বিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি দেখছিলেন জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাও ফরমান আলী। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই এমন টার্গেট কিলিং হয়েছে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। গভর্নর হাউসে তাঁর একটি ডায়েরি পাওয়া গিয়েছিল। সেই ডায়েরির মধ্যে বিভিন্ন অধ্যাপকের নাম এবং নামের পাশে চিহ্ন দেওয়া ছিল। সেখানে অধ্যাপক ছাড়াও কিছু সাংবাদিক, চিকিৎসক ছিলেন। এটি সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা ছিল জেনারেল রাও ফরমান আলীর। আর রাও ফরমান আলী এসব করেছেন আরো সুপিরিয়র কমান্ডের নির্দেশে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড প্রথম দিকে পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা কার্যকর করেন। পরে তাঁরা একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’ করেন, সেই কিলিং স্কোয়াডে কাজ করেছে আলবদর বাহিনী। কিন্তু আমরা ধারণা করেছি, বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাঁদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল তাঁরা মূলত বাম ঘরানার এবং তাঁরা দেশকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। এছাড়া যাঁরা এই দেশকে আমেরিকাবিরোধী লবির দিকে নিতে পারেন তাঁদেরই বিশেষ করে টার্গেট করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনীর সহযোগিতা ছিল। সে সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যউপাত্ত আমার কাছে আছে। এখানে সরাসরি দুজন কাজ করেছেন, তাঁদের একজনের নাম আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তিনি একাত্তরের জুনজুলাইয়ের দিকে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন, তাঁর নাম মি. ডুইপ।

বুদ্ধিজীবী হত্যার শেষ সময়টা শুরু হয় নভেম্বর মাসে দুজন ডাক্তারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তাঁরা হলেন ডা. আজহার ও ডা. হুমায়ুন। এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন জামায়াতে ইসলামীর একজন ডাক্তার, যিনি বদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ছিল শেষ টার্গেট। এ দুই দিন যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছিল সেই শহীদদের রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুরের আমবাগান, বাঙলা কলেজ, মিরপুর ৬ নম্বর, জল্লাদখানাসহ প্রায় ২০টি বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল মৌলবাদী শক্তিকে বিকশিত করা। যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আমাদের বিকাশ হয়েছিল আজ যখন তা নানা অপচেষ্টায় আটকে গেছে তখন মনে হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাটা সফল হয়েছে।

লেখক : আহ্বায়ক, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

৩ বছরেও ফেরানো যায়নি মঈনুদ্দীনআশরাফকে, দণ্ড কার্যকর অনিশ্চিত

moinudin-ashrafuzzamanউদিসা ইসলাম : একাত্তরে স্বাধীনতার ঠিক আগে বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে দেশ মেধাশূন্য করার নীলনকশা বাস্তবয়নকারী চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও,বিদেশে অবস্থান করায় তাদের দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানেরা বলছেন, দুই সাজাপ্রাপ্তকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে শক্ত উদ্যোগ নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই আবারও একটি আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা। আর প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা বলছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি এবং পলাতক আসামিদের জন্য গড়ে তোলা সেলএর মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার উদ্যোগ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে পলাতক আশরাফুজ্জামান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে, আর মঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। এই দুই আসামির অপরাধ ও সর্বোচ্চ সাজা হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য জানার পরও তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। তেমনি,বিভিন্ন দেশে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেল গঠনের পরও কাউকেই ফেরানো সম্ভব হয়নি। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতার ঢিলেমিকে দুষছেন কেউ কেউ।

আর এর সুযোগ নিয়ে আশরাফুজ্জামান খান গণমাধ্যমের মুখোমুখি না হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালীন সময়ে, কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন আলজাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে চৌধুরী মঈনুদ্দীন বলেছিলেন, ‘তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হবেন না।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল একটি কৌতুক। তারা একটি সাজানো বিচার করছে।’

বিজয়ের ঠিক আগে ১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ আলবদর বাহিনীর ‘চিফ এক্সিকিউটর’ ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান। আর চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ছিলেন সেই পরিকল্পনার ‘অপারেশন ইনচার্জ’। রায়ে বলা হয়, ‘আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীন যে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত ছিলেন, তা প্রসিকিউশনের তথ্যপ্রমাণে বেরিয়ে এসেছে।তারা কখনও নিজেরা হত্যায় অংশ নিয়েছে। কখনও জোরালো সমর্থন দিয়েছে ও উৎসাহ যুগিয়েছে।’ সে সময় আলবদর বাহিনীর ওপর ইসলামী ছাত্র সংঘের এই দুই নেতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

এই দুর্ধর্ষ দুই আসামিকে ফিরিয়ে আনতে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার উল্লেখ করে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তাদের ঔদ্ধত্য দেখে আসছি। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া আসামিদের কেন ফিরিয়ে আনা যাবে না, এনিয়ে দেশে বিদেশে মুক্তিযুদ্ধমনা যারা আছেন, সবার সম্মিলিত একটি আন্দোলনের ডাক আসা জরুরি।’

শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নূসরাত রাব্বী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এতদূর থেকে গিয়েছি বিচারে সাক্ষ্য দেবো বলে। যে দুই লোক দেশকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দিতে চেয়েছিল, তাদের দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে না, এটা খুবই হতাশাজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বিচার কার্যকর করতে দুইদেশের সরকারের মধ্যে একটি কমনআণ্ডারস্ট্যান্ডিং দরকার। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে উদ্যোগী করে তুলতে আমাদের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টির একটা আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সেল গঠন করেছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সেলের সদস্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা বলাবাহুল্য এই অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প নেই।’

এই মামলার প্রসিকিউটর শাহেদুর রহমান বলেন, ‘এই মামলাটি পরিচালনা সবচেয়ে কঠিন ছিল। আমাদের কাছে দালিলিক তথ্যপ্রমাণ ছিল, কিন্তু সেগুলো গুছিয়ে এনে উপস্থাপন করা সহজ ছিল না। আমরা সাজা নিশ্চিত করতে পেরেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামিদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী উদ্যোগ নেবে সেটি তাদের বিষয়। কিন্তু এরজন্য লেগে থাকার বিকল্প নেই।’

অবশেষে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদারকি সেল গঠন করে। এই সেলের অন্যতম সদস্য তদন্ত সংস্থার সিনিয়র তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সেল থেকে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও পরিস্থিতি যা, তাতে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না।’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬