আর্কাইভ

Archive for the ‘সংস্কৃতি’ Category

প্রজন্মকে আলোকিত করেছেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম

mustafa nurul islam.jpgড. রাহমান নাসির উদ্দিন : যাদের চিন্তা, কাজ, অবদান ও ভূমিকা মানুষ, সমাজ, বিদ্যা-জগৎ এবং সৃজনশীল পরিসরে উল্ল্যেখযোগ্য, অবদারিতভাবে অনস্বীকার্য, তারা লোকান্তরিত হলে, তাদের নিয়ে একটা অবিচুয়ারি বা ‘মৃত্যুত্তর কৃতজ্ঞতাপত্র’ লেখার একটা রীতি বিশ্বব্যাপী জারি আছে। অবিচুয়ারি শব্দের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় সদ্য মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির অবদান যথাযথ সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করে এবং তার কৃতিত্বকে স্বীকার করে তার সম্মানে একটি কৃতজ্ঞতাপত্র লেখা। এর মান, মাত্রা এবং উপস্থাপনারীতি নিয়ে খানিকটা অস্বস্তি থাকলেও বাংলাদেশে কমবেশি এর রীতির প্রচলন আছে। ‘গুণী মানুষের কদরের সংস্কৃতি’ হিসেবে সেটা সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর এবং যারা সৃজনশীল-মননশীল-জ্ঞানকল্পে ক্রিয়াশীল তাদের জন্যও প্রেরণাদায়ক। তাই সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে নিয়ে দু’কলম ‘মৃত্যুত্তর কৃতজ্ঞতাপত্র’ লেখার একটা আন্তরিক প্রয়াস এ লেখা, যা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের।

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ছিলেন শিক্ষক, ভাষাসংগ্রামী, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, টিভি ব্যক্তিত্ব, উপস্থাপক, সম্পাদক এবং একজন চমৎকার ‘বলিয়ে’। যারা লেখেন তারা যদি লিখিয়ে হন, যারা আঁকেন তারা যখন আঁকিয়ে হন, তাহলে যারা চমৎকার বলেন, তারা নিশ্চয় চমৎকার ‘বলিয়ে’। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ ‘বলিয়ে’, যার কথা মনোমুগ্ধকর, যার কথায় সাহিত্য থাকে, তথ্য থাকে, তত্ত্ব থাকে, স্যাটায়ার থাকে, চিন্তার খোরাক থাকে, বিদ্যমান বোঝাবুঝির ক্রিটিক থাকে এবং বিদ্যমান বোঝাবুঝির বাইরে গিয়ে বুঝবার প্রেরণা থাকে। গড্ডলিকা প্রবাহে ডুব না দিয়ে দৃশ্যমান-প্রবাহের বাইরে গিয়ে ভাবনা উপাদান থাকে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রায় ১৫ বছর ধরে তার গ্রন্থনা, পরিকল্পনা এবং উপস্থাপনায় প্রচারিত জনপ্রিয় টিভি-সেমিনার ‘মুক্তধারা’ আমার এ বক্তব্যের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। পরে এটিএন বাংলায় প্রচারিত ‘কথামালা’ সেই মুক্তধারারই নতুন এবং বর্ধিত যাত্রা হিসেবে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল প্রধানত অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের অপ্রথাগত চিন্তা, বিষয়-ভাবনা, বক্তা-নির্বাচন এবং তার আকর্ষণীয় উপস্থাপনারীতির কারণে।

তিনি সারাজীবন ধরে একটার পর একটা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি পড়াশোনা করেছেন কলকাতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে (সোয়াস)। শিক্ষকতা করেছেন সেন্ট গ্রেগরিজ ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকেরই অজানা যে, অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরও বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। এভাবেই অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম একের পর এক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন নতুন নতুন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবে। এ ছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন এবং জাতীয় জাদুঘরের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সাংবাদিকতা শুরু করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে। পরে তিনি দৈনিক সংবাদের সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি সাংবাদিক হিসেবে বেশিদিন অতিবাহিত করেননি। কেননা শিক্ষকতার নেশা তাকে সে পেশায় নিয়ে যায় এবং আমৃত্যু তিনি একজন আলোকদীপ্ত শিক্ষক ছিলেন, যিনি বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রমাগত আলোকিত করেছেন এ দেশের প্রজন্মকে। তিনি শ্রেণিকক্ষে আবদ্ধ সনাতন শিক্ষক ছিলেন না; শ্রেণিকক্ষের বাইরেও তিনি ছিলেন অসংখ্য তরুণের শিক্ষক। টিভি অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন সাহিত্য সভায়, নানা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে আয়োজন করেছেন নানা বক্তৃতামালার এবং নিত্য লেখালেখিতে। তার সম্পাদিত সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘সুন্দরম’ এখনও পর্যন্ত বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হিসেবে পরিগণিত এর সম্পাদনা গুণে, লেখার মানে, পরিশীলিত এবং পরিণত সাহিত্য প্রকাশ, প্রচার ও প্রসারের বিবেচনায়। তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘সাহিত্যিক’ নামে আরও একটি সাহিত্য পত্রিকা, যাও অল্প সময়ের মধ্যে গুণবিচারি পাঠকের বিপুল সমাদর পেয়েছিল। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম লিখেছেন প্রায় ৩০টিরও অধিক প্রবন্ধ গ্রন্থ ও প্রবন্ধ সংকলন। তার লেখার সাহিত্য মান, মননশীলতা, সৃজনশীলতা, চিন্তা-পদ্ধতি, পড়াশোনার গভীরতা, বিশ্নেষণী ক্ষমতা এবং শব্দ-চয়ন, বাক্য-বিন্যাস ও উপস্থাপনার রীতি তাকে তার সমকালে অন্য সাহিত্যিকদের থেকে আলাদা করেছে। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেন। যদিও পুরস্কারপ্রাপ্তি তার অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচ্য; কিন্তু তিনি কেবল পুরস্কারের জন্যই নয়, তার সৃষ্টিকর্ম এবং কর্মযজ্ঞই তাকে সমকালীন সাহিত্য পরিমণ্ডলে একজন সর্বজন-শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তাই তার দেহান্তর সমকালীন বাংলা সাহিত্যচর্চার জগতে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করবে নিঃসন্দেহে।

দেহান্তর জৈবিক প্রক্রিয়ার অনিবার্য পরিণতি। তাই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘যেতে নাহি দেব। হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়…।’ অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে আমরা যেতে দিতে চাইনি; কিন্তু তবুও তিনি চলে গেছেন এবং তাকে চলে যেতে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিশীল মানুষ কখনোই চলে যান না, তাদের দেহান্তর ঘটে বটে; কিন্তু তারা বেঁচে থাকেন তাদের সৃষ্টি ও কাজের ভেতর দিয়ে। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম দেহান্তর সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টি ও কাজের ভেতর দিয়ে। তাই সৃষ্টিশীল মানুষ মরেও অমর।

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisements

ঢাকার হাজার বছরের প্রত্নপ্রমাণ নিখোঁজ !

coins from gupta reignতরুণ সরকার : ঢাকার হাজার বছরের বেশি সময়ের প্রাচীনত্বের প্রত্নপ্রমাণগুলো এখন নিখোঁজ। ব্রিটিশ আমলে পিলখানায় পাওয়া গিয়েছিল প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রা। চকবাজারে পাওয়া গিয়েছিল একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর বাসুদেব মূর্তি। তেজগাঁওয়ে পাওয়া গিয়েছিল সেন আমলের হরিশঙ্কর মূর্তি। ঢাকার এই সব প্রাচীন নিদর্শন এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকার প্রাচীনত্ব নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দুটি মত দেখা যায়। একদলের মতে, মুঘল রাজধানী হওয়ার আগে ঢাকায় নগরায়ণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে এইচ ই স্ট্যাপলটন, নলিনীকান্ত ভট্টশালী, আহমদ হাসান দানী, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া প্রমুখ পণ্ডিত ঢাকায় নগরায়ণের ইতিহাস হাজার বছরের প্রাচীন বলে মনে করেন এবং তাদের রচনায় ঢাকায় হাজার বছরের আগের নগরায়ণের প্রমাণ হিসেবে পিলখানা, তেজগাঁও ও চকবাজারে প্রাপ্ত উল্লিখিত প্রত্নসম্পদগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন।

উল্লিখিত প্রাচীন প্রত্নসম্পদের বর্তমান অবস্থান বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসবিষয়ক গবেষক এবং বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মিউজিয়ামসহ সংশ্নিষ্ট সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে খোঁজ করে কোনো সন্ধানই পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি রাজধানী ঢাকার প্রাচীন শিলালিপি এবং স্থাপত্য-সংশ্নিষ্ট অন্যান্য প্রত্নসম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। খোঁজ করতে গিয়ে তারাও উল্লিখিত প্রত্নসম্পদের সন্ধান পায়নি। কমিটির মতে, ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস চর্চা উপেক্ষিত হয়ে আসছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্নসম্পদ পিলখানায় প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রা। খ্রিষ্টীয় বিশ শতকের প্রথমভাগে এটি পাওয়া গিয়েছিল বিজিবি সদর দপ্তর চত্বরের একটি প্রাচীন পুকুরের কাছে। মুদ্রাটির প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের নিউ সিরিজ ষষ্ঠ খণ্ডে, প্রত্নতত্ত্ববিদ এইচ ই স্ট্যাপলটন-এর লেখা ‘কনট্রিবিউশন্স টু দ্য হিসট্রি অ্যান্ড এথনোলজি অব নর্থ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক প্রবন্ধের অংশ হিসেবে।

এইচ ই স্ট্যাপলটনের মতে, ঢাকায় মুঘল রাজধানী প্রতিষ্ঠার আগেই বসতি ছিল এবং পিলখানায় প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রাটি ঢাকার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে ধারণা দেয়। এইচ ই স্ট্যাপলটন তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, নবাব রশিদ খানের পুকুরের ১০০ গজ দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং সড়ক থেকে পাথর-ছোঁড়া দূরত্বে তিন বছর আগে মুদ্রাটি পাওয়া গিয়েছিল। মুঘল আমলে তৎকালীন ফৌজদার রশিদ খানের প্রাসাদ ও বাগান ছিল অঞ্চলটিতে। ফলে তখন অঞ্চলটি রশিদখাঁ কা বাগিচা এবং প্রাচীন পুকুরটি রশিদ খানের পুকুর নামে পরিচিতি লাভ করে। কোম্পানি আমলে অঞ্চলটি পরিচিত হয়ে ওঠে পিলখানা নামে। তখন এখানে হাতি সংগ্রহের সরকারি সংস্থার সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। বন্যহাতিকে এখানে পোষ মানানো হতো। পিলখানা পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার পর ব্রিটিশ আমলে অঞ্চলটি পরিণত হয় চাষাবাদের ভূমিতে। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে এখানে ‘স্পেশাল রিজার্ভ কোম্পানি’ নামে একটি সংস্থার সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। এর নাম বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হয়ে বর্তমান নাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা মিউজিয়াম, যার বর্তমান নাম বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। ঢাকা মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার আগে বাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রত্নসম্পদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নিদর্শন রক্ষিত হয়েছে কলকাতার কয়েকটি জাদুঘরে। পিলখানায় প্রাপ্ত প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রার বর্তমান অবস্থান বিষয়ে ভারতের কলকাতার ভারতীয় মিউজিয়াম, আশুতোষ মিউজিয়াম, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল মিউজিয়াম, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মিউজিয়াম, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ মিউজিয়ামসহ সংশ্নিষ্ট স্থানগুলোতে খোঁজ নিয়েছে ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি। খোঁজ নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে। কিন্তু খোঁজ পাওয়া যায়নি পিলখানায় প্রাপ্ত সেই প্রাচীন মুদ্রার।

পিলখানায় প্রাপ্ত প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রাটি এইচ ই স্ট্যাপলটন গুপ্ত আমলের বলে মত ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, মুদ্রার এক পিঠে রয়েছে ধনুকধারী রাজা। অপর পিঠে রয়েছে রানী বা দেবী। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, মুদ্রাটির ধরন সব অর্থেই নতুন। আহমদ হাসান দানী পিলখানায় প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রাটিকে অভিহিত করেছেন ‘গুপ্ত অনুকৃতি স্বর্ণমুদ্রা’ হিসেবে। তিনি মুদ্রাটিকে সপ্তম শতাব্দীর বলে উল্লেখ করেছেন। মুদ্রাতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উপপরিচালক ড. শরিফুল ইসলাম বাংলাদেশে প্রাপ্ত গুপ্ত আমলের মুদ্রা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মতে, পিলখানায় প্রাপ্ত প্রাচীন মুদ্রাটি ‘গুপ্ত-কুষাণ অনুকৃতি মুদ্রা’। তিনি আরও বলেন, গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের পর খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের প্রথমভাগে বঙ্গ-সমতট অঞ্চলে এক ধরনের মুদ্রা প্রচলিত ছিল, যার এক পিঠ ছিল গুপ্ত আমলের মুদ্রার অনুকৃতি এবং অপর পিঠে ছিল কুষান আমলের মুদ্রার অনুকৃতি। তিনি আরও জানান, এক পিঠে গুপ্ত ও এক পিঠ কুষান মুদ্রার অনুরূপ লেখাবিহীন এই মুদ্রা নিয়ে আগে বিভ্রান্তি ছিল। এ ধরনের মুদ্রাকে সম্প্রতি একাডেমিক মহলে গুপ্ত-কুষান অনুকৃতি মুদ্রা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল মিউজিয়ামের সংগ্রহে প্রতি বছরই বাড়ছে গুপ্ত-কুষান অনুকৃতি মুদ্রা। ইতিমধ্যে এ ধরনের অর্ধশতাধিক মুদ্রা সংগৃহীত হয়েছে।

ঢাকার প্রাচীনত্বের আরও একটি নিদর্শন চকবাজারের চুড়িহাট্টা মসজিদ চত্বরের মাটির নিচ থেকে প্রাপ্ত বাসুদেব মূর্তি। চুড়িহাট্টা মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার শাহ শুজার আমলে। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কারের জন্য চুড়িহাট্টা মসজিদের আঙিনা খননকালে পাথরের বাসুদেব মূর্তি পাওয়া যায়। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত রহমান আলী তায়েশের ‘তাওয়ারীখে ঢাকা’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, মূর্তিটি তখন মসজিদের সামনে রাস্তার পাশে রাখা ছিল। ব্রিটিশ আমলের শেষভাগে প্রকাশিত যতীন্দ্রমোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জে টি রেঙ্কিন সেই বাসুদেব মূর্তিটি সংগ্রহ করে রেখেছিলেন কালেক্টরেট অফিসে। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত ‘বাংলাপিডিয়া’য় উল্লেখ করা হয়, চুড়িহাট্টা মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে পাওয়া বাসুদেব মূর্তিটি রক্ষিত আছে কলকাতা ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে।

ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম বুলেটিন-এর ৩৭ খণ্ডে (২০০২ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশিত ‘পাল সেন স্কাল্পচারস ইন দি আর্কিওলজি সেকশন, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম’ শীর্ষক প্রবন্ধে ভারতীয় মিউজিয়ামে রক্ষিত প্রাচীন মূর্তির যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তাতে ঢাকায় প্রাপ্ত বাসুদেব মূর্তিটির উল্লেখ নেই। ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির একটি প্রতিনিধি দল কলকাতায় ভারতীয় মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, ঢাকা থেকে প্রাপ্ত কোনো বাসুদেব মূর্তি তাদের সংগ্রহে নেই। অতীতে ছিল কি-না এ বিষয়ে কোনো তথ্যও তাদের জানা নেই।

এ ব্যাপারে বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমকালকে বলেন, আমরা রেকর্ড থেকে লিখেছিলাম। এখানে কোনো গ্যাপ থাকতে পারে। হতে পারে মূর্তিটি নিখোঁজ হয়ে গেছে অথবা হারিয়ে গেছে।
ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি ঢাকার চকবাজারে প্রাপ্ত বাসুদেব মূর্তি বিষয়ে আশুতোষ মিউজিয়াম, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল মিউজিয়াম, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মিউজিয়ামসহ ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু মূর্তিটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মূর্তিটি ঢাকা কালেক্টরেটে রাখা ও হস্তান্তর বিষয়ে কমিটির পক্ষ থেকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, মূর্তিটি সংগ্রহ ও হস্তান্তর বিষয়ে তারা কিছু বলতে পারছেন না। কারণ বাসুদেব মূর্তি বিষয়ে কোনো তথ্য ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে নেই।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, মন্দিরের স্থলে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদের শিলালিপিতে ‘কুফর ধ্বংস’ করার কথা উল্লেখ থাকা এবং পরবর্তীকালে মসজিদ চত্বরে মাটির নিচ থেকে বাসুদেব মূর্তি উদ্ধারের ঘটনা এখানে প্রাচীন মন্দিরের অস্তিত্বের সমর্থন পাওয়া যায়। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের পর এ দেশে আর পাথরের মূর্তি তৈরি করা হয়নি।

প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার মতে, তুর্কি অভিযানের আগে এখানে হয়তো মন্দির ছিল। তুর্কি অভিযানের ভয়ে মূর্তিটি মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। পরবর্তীকালে হয়তো অঞ্চলটি জনবিরল এলাকায় পরিণত হয়। পরিত্যক্ত মন্দিরটি একসময় ভগ্ন মন্দিরে পরিণত হয়। মুঘল আমলে ভগ্ন মন্দিরের স্থলে নির্মাণ করা হয় মসজিদ।

ঢাকায় প্রাচীন নগরায়ণের প্রমাণ হিসেবে পণ্ডিতরা তেজগাঁওয়ে প্রাপ্ত হরিশঙ্কর মূর্তিটির কথাও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকেন। মূর্তিটির কথা প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ইতিহাসবিদ ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর লেখা ‘সাম ফ্যাক্টস এবাউট ওল্ড ঢাকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে। ‘বেঙ্গল পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’ শীর্ষক জার্নালের ৪১ খণ্ড প্রথম অংশ ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধে ড. ভট্টশালী প্রাক-মুঘল যুগে, এমনকি প্রাক-মুসলিম যুগেও ঢাকায় নগরের অস্তিত্ব ছিল বলে মত দেন। প্রাক-মুসলিম যুগের ঢাকার নগরায়ণের প্রত্নপ্রমাণ হিসেবে প্রবন্ধে তিনি পিলখানায় প্রাপ্ত প্রাচীন মুদ্রা এবং তেজগাঁওয়ে প্রাপ্ত হরিশঙ্কর মূর্তির কথা উল্লেখ করেন।

তেজগাঁওয়ে একটি প্রাচীন পুকুর খননকালে হরিশঙ্কর মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল। ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, তেজগাঁওয়ে প্রাপ্ত হরিশঙ্কর মূর্তিটি সেন আমলের। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, কালো ক্লোরাইট পাথরের মূর্তিটির উচ্চতা আড়াই ফুট। মূর্তিটির অর্ধেক অংশ হরি বা বিষ্ণু এবং অর্ধেক অংশ শঙ্কর বা শিব।

নলিনীকান্ত ভট্টশালীর ‘সাম ফ্যাক্টস এবাউট ওল্ড ঢাকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে হরিশঙ্কর মূূর্তিটির প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে বলা হয়, রেললাইনের ব্রিক ওভার ব্রিজ থেকে ২ ফার্লং দূরে একটি প্রাচীন পুকুরে মূর্তিটি পাওয়া গেছে। ব্রিক ওভার ব্রিজটি তেজগাঁও রেলস্টেশন থেকে উত্তরে। তবে ব্রিক ওভার ব্রিজ থেকে ২ ফার্লং দূরে পুকুরের উল্লেখ করা হলেও ব্রিক ওভার ব্রিজ থেকে পুকুরটি কোন দিকে ভট্টশালীর প্রবন্ধে তা উল্লেখ নেই।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ড. ভট্টশালীর প্রবন্ধে উল্লিখিত ব্রিক ওভার ব্রিজ থেকে ২ ফার্লং দূরের প্রাচীন পুকুরটি বর্তমানে এলেনবাড়ি পুকুর নামে পরিচিত। বিজয় সরণি-তেজগাঁও লিংক রোড সংলগ্ন এলেনবাড়ি সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টার্স চত্বরের মাঝে প্রাচীন বৃক্ষ দ্বারা পরিবেষ্টিত পুকুরটি। বিজয় সরণি মোড় থেকে পুকুরটির দূরত্ব খুব কম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পুকুরটির দূরত্ব প্রায় ১৭০ গজ। রেললাইন থেকে দূরত্ব ২ ফার্লং।

বিজয় সরণি থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত উড়াল সড়ক নির্মাণের আগে তেজকুনিপাড়ায় রেললাইনের ওপর একটি ওভার ব্রিজ ছিল। সেই ওভার ব্রিজ থেকে এলেনবাড়ি পুকুর ছাড়া অন্য কোনো দিকে ২ ফার্লং বা এর কাছাকাছি দূরত্বে আর কোনো পুকুর নেই। এলেনবাড়ি অঞ্চলটি নগরীর অন্যতম প্রাচীন উঁচু ভূমি। আহমদ হাসান দানীর ‘ঢাকা এ রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস’ গ্রন্থে প্রকাশিত মানচিত্র থেকে জানা যায়, মুঘল আমলে অঞ্চলটিতে ছিল পর্তুগিজদের বাগানবাড়ি।

এ ব্যাপারে ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঢাকার প্রাচীনত্ব এখনও নির্ণিত হয়নি। ঢাকার প্রাচীনত্ব নির্ণয় এবং ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে প্রতিবেদন এবং গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশ কমিটির কাজের মূল লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, ঢাকার প্রাচীনত্ব বিষয়ে কমিটি ইতিমধ্যে বেশ তথ্য সংগ্রহ করেছে, পর্যায়ক্রমে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।

পহেলা বৈশাখ প্রসঙ্গে

boisakh celebration 2018 10বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী এই পহেলা বৈশাখ দিনটিকে বরণ করা হয় সর্বজনীন উৎসবের মধ্য দিয়ে। মানুষ মেতে ওঠে আনন্দে। এ বছরও উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে। প্রস্তুতি নিয়েছে এক শ্রেণীর মানুষ, যাদের মধ্যে শহুরে অবস্থাপন্নদের কথা উঠেছে বিশেষ কিছু কারণে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার বিলাসিতা। এর জন্য নগদ অর্থে মূল্যও তারা যথেষ্টই গুনছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে। 

যেমন গতকাল প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা পারের মাওয়ায় মৎস্য আড়তগুলোতে এরই মধ্যে প্রচুর ইলিশের মজুত তৈরি করেছে ব্যবসায়ীরা। এসব ইলিশ বিক্রিও করছে তারা যথেচ্ছ দামে। একজন ব্যবসায়ী দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের এক হালি অর্থাৎ চারটি ইলিশ বিক্রি করেছে ২৭ হাজার টাকায়। সে হিসাবে প্রতিটি ইলিশের দাম পড়েছে ৬ হাজার ৭৫০ টাকা। মাছগুলো কিনে নিয়ে গেছেন ঢাকা থেকে আগত একজন, যার পরিচিতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলার অপেক্ষা রাখে না। 

অথচ পহেলা বৈশাখের ইতিহাস কিন্তু এই শ্রেণীর মানুষের বিলাসিতা ও অপসংস্কৃতি কর্মকান্ডকে সমর্থন করে না। প্রসঙ্গক্রমে বঙ্গাব্দ তথা বাংলা বর্ষের ইতিহাস স্মরণ করা দরকার। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, বাংলা এই সালের সূচনা করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। উদ্দেশ্য ছিল ফসলের ঋতুর ভিত্তিতে খাজনা আদায় করা। এর ফলে কৃষকের পক্ষে খাজনা দেয়ার সময় অর্থাৎ কখন খাজনা দিতে হবে তা মনে রাখা সহজ হতো। সরকারও বছরের বিশেষ সময়ে সহজে খাজনা আদায় করতে পারতো। নববর্ষের উৎসবও শুরু হয়েছিল তখন থেকেই। এই তথ্যের আলোকে বলা যায়,নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ সম্পূর্ণরূপেই কৃষিভিত্তিক একটি দিন। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল সেটাও ছিল কৃষিভিত্তিক। 

এদেশের মানুষের জীবনেও এর রয়েছে নানামুখী প্রভাব। দিনটিকে শুভ মনে করা হয় বলে অনেক কৃষক পহেলা বৈশাখে জমিতে হাল দেয়। অনেকে ফসলের বীজ বোনে, রোপণ করে শস্যের চারা। দোকানদার, মহাজন ও ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাবের সূচনা করে। সমাজের অন্যান্য শ্রেণী ও পেশার মানুষও দিনটিকে আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে উদযাপন করে। গ্রাম থেকে শহর-নগর-বন্দর পর্যন্ত সর্বত্র আয়োজিত হয় বৈশাখী মেলা। এসব মেলায় হরেক রকমের পণ্য নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসে কামার-কুমার ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা। মেলায় থাকে মাটির পুতুলসহ খেলনা এবং দই ও মুড়ি-মুড়কির মতো উপাদেয় নানা খাবার। মেলা পরিণত হয় সাধারণ মানুষের মিলন মেলায়। 

অর্থাৎ পান্তা এবং ২৭ হাজার টাকা হালির ইলিশ খাওয়া কখনো গ্রাম বাংলার তথা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ছিল না। এটা চালু করেছেন ফিলদি রিচেরা। বিষয়টিকে বাংলা নববর্ষের মূল চেতনার সঙ্গেও মেলানোর উপায় নেই। কারণ, গ্রাম বাংলার কোনো অঞ্চলেই বছরের এ সময়ে ইলিশ পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও কিছু মানুষ নিষিদ্ধ সে ইলিশকে নিয়েই মেতে ওঠেন। সঙ্গে আবার খান পান্তা ভাত! অথচ গ্রাম বাংলার মানুষ কখনো ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার কথা কল্পনা করতে পারে না। তারা পান্তা খায় নুন-পেঁয়াজ আর শুকনো মরিচ দিয়ে। সেটাও খায় বাধ্য হয়ে ভালো কিছু খাওয়ার উপায় নেই বলে। কেউই অন্তত ইলিশ খায় না, পায় না বলে খেতেও পারে না। অর্থাৎ পান্তা-ইলিশের সঙ্গে ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের কৃষক ও সাধারণ মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস ও সংস্কৃতির কোনো মিল নেই। 

আমরা মনে করি, নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের চিন্তা-বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী কর্মকান্ডের অবসান ঘটানো দরকার। একই দেশে নববর্ষ উদযাপনের এই বৈষম্য ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার এবং নববর্ষ উদযাপনের মূল অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে বলে আমরা মনে করি।

নববর্ষ,পহেলা বৈশাখ ও ইসলাম

boisakh parade statues 1.jpgমো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ : বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। অথচ বর্তমানে অস্বীকৃতি, অস্পষ্টতা ও অসংলগ্নতার ঘূর্ণাবর্তে পহেলা বৈশাখ হয়ে যাচ্ছে একপক্ষীয়। তাই আনুষ্ঠানিক বর্ষবরণে কারো অংশগ্রহণ বা কারো বিরত থাকার মধ্যে বিভক্তি রেখা আবিষ্কার কাম্য নয়। জাতিগতভাবে বিষয়টি বাধ্যতামূলক বা নিষিদ্ধকরণের পরিবর্তে এটিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকৃতি দেওয়াই যৌক্তিক। কেননা সংস্কৃতি কখনোই আরোপিত বিষয় নয়, বরং মানুষের সুকোমল প্রবৃত্তির বহুল চর্চা ও অনুশীলনের স্বাভাবিক প্রকাশ হলো সংস্কৃতি। সংস্কৃতির বিকাশ একটি নিরপেক্ষ কালোত্তীর্ণ-মানোত্তীর্ণ ধারণা ও সময়সাপেক্ষ অর্জন।

নববর্ষ, হোক তা বঙ্গাব্দ বা ইংরেজি বর্ষবরণ। নববর্ষ ঘিরে থাকে বিশেষ ব্যবস্থা। নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে দেওয়া হয় সারা দেশ। ভুবুজেলা ও মুখোশ ব্যবহার, মোটরসাইকেলে একাধিক আরোহী, সব ধরনের ব্যাগ বহন, বিকেল ৫টার পর উন্মুক্ত স্থানে সমাবেশসহ অনেক কিছুই থাকে নিষিদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতে থাকে বিশেষ সতর্কতা ও সিসি ক্যামেরার নজরদারি। তার পরও বৈশাখী উৎসবে থাকে প্রাণের ছোঁয়া, থাকে উচ্ছ্বাসের বাঁধভাঙা জোয়ার।

সংস্কৃত প্রবাদে আছে ‘আনন্দে নিয়ম নাস্তি’। তবে বৈশাখী উৎসবে যা যা করা হয়, তা নিয়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যার অবকাশ প্রসঙ্গে কেউ বলেন, উৎসবের সঙ্গে ধর্মের সংশ্লেষ নেই। কেউ বলেন, এটা স্রেফ বাঙালির সর্বজনীন চেতনা। অথচ নিরেট সত্য কথা হচ্ছে যে আমরা একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান। বাঙালিত্ব ও ঈমানি বিষয়ে দ্বন্দ্ব নেই বলেই তো ধমকের যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি আপসেরও দরকার হয় না। কেননা,ধর্মীয় চেতনা কখনোই এক দিনের বিশেষ বিষয় নয়। ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গে শৈথিল্যের অবকাশ রাখা হয়নি,এক দিনের জন্যও নয়।

mongol parade 2018

ইসলামের দৃষ্টিতে যেসব উৎসব-আয়োজন ও খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষের জীবন-সম্ভ্রমের নিরাপত্তা ঝুঁকি, নামাজ-ইবাদতের জন্য প্রতিবন্ধক, বিধর্মীদের অনুসরণ, সময় ও অর্থের অপচয়, জুয়া-লটারি, রং খেলা, উদ্দাম নৃত্য-গীত, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, উল্কি আঁকা, অবৈধ পণ্যের বিপণন ইত্যাদির বাহুল্য থাকে, তা একজন ঈমানদারের জন্য অশোভন। কেননা শরীর ও মনের বিকাশে যে সব কাজকর্মের ফলে ফরজ লঙ্ঘন অথবা হারামের অনুষঙ্গ তৈরি হয়, সে সব কিছুই ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ। একটি কবিরা গুনাহ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে যথেষ্ট। কবিরা গুনাহ তাওবা ছাড়া মাফ হয় না।

সুস্থ সংস্কৃতি হলো মানব মননের সুকোমল অভিব্যক্তি, যা ভূগোল ও বিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে পরিশীলিত ঐক্য ও বিবেকের জাগরণ ঘটায়। অথচ প্রিয়নবী (সা.)-এর নবুয়ত-পূর্ব জাহেলিয়াত বা ‘মূর্খতার যুগে’ উৎসব, আনন্দ-বিনোদনের মধ্যে ছিল না মানবতা-নৈতিকতার ছোঁয়া। উৎসবের বেলেল্লাপনার শিকার হয়ে বিশিষ্ট ও বয়োজ্যেষ্ঠ একজন সাহাবি গুরুতর আহত হওয়ার পটভূমিতেই সুরা মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াত নাজিল হয়। এ আয়াতের মাধ্যমে মদ, মূর্তি, জুয়া, লটারিকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি একে ‘ঘৃণিত শয়তানের কাজ’ বলা হয়েছে।

জাহেলিয়াত বা ‘মূর্খতার যুগে’ আরবরা যুদ্ধবিদ্যা, অতিথি সেবা, পশুপালন, দেশভ্রমণ, আন্তর্দেশীয় ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদিতে ছিল বিখ্যাত। শিল্প-সাহিত্যেও তারা কম যায়নি। ইতিহাসখ্যাত ছিল সে সময়ের ‘উকাজের মেলা’। কবিতা উৎসবের সর্বশ্রেষ্ট সাতটি কবিতা স্থান পেয়ে ছিল পবিত্র কাবার দেয়ালে। যাকে বলা হয় ‘সাবউল মুয়াল্লাকাত’। ইরানে ছিল নববর্ষ পালন ও ঘৌড়দৌড় উপলক্ষে প্রচলিত দুটি উৎসব ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’। অথচ এত সব কিছুর কোথাও ছিল না সুস্থ বিবেকবোধের চর্চা; বরং সংস্কৃতির নামে ছিল অপসংস্কৃতির অবাধ্যতা। খাদ্যের সঙ্গে মিশে থাকা চুল, কাঁকড়জাতীয় বস্তু যেমন অখাদ্য, তেমনি সংস্কৃতির মধ্যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশই বা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা জরুরি।

boisakh 445

প্রাণ ও প্রকৃতির সর্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষ। আমরা ভাগ্যবান, আমাদের বর্ষপঞ্জি আছে, ইংরেজদের নেই। তারা ব্যবহার করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ‘সন’ ও ‘তারিখ’ আরবি শব্দ। ‘সাল’ ফারসি শব্দ। এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলা সনের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পৃক্ততার কথা। বর্ষ পরিক্রমা প্রসঙ্গে আল কোরআনের বাণী : ‘তিনি সূর্যকে প্রচণ্ড দীপ্তি দিয়ে/চাঁদ বানিয়ে দিলেন স্নিগ্ধতা ভরে/বছর গণনা ও হিসাবের তরে।’ (কাব্যানুবাদ, ইউনুস : ০৫)

পবিত্র কোরআনে ১২ মাসে এক বছর প্রসঙ্গে আছে ‘নভোমণ্ডল-ভূমণ্ডল সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই আল্লাহ ১২টি মাস নির্ধারণ করেছেন…।’ (সুরা তাওবা,আয়াত : ৩৬)।

আয়াতটি নাজিলের পটভূমিতে জানা যায়, জানাদা ইবনে আউফ (রা.) প্রকৃতির স্বাভাবিক রীতিতে বিঘ্ন ঘটিয়ে বছরের শুরুতে ঘোষণা করত—‘এ বছর ১৩ মাসে’, ‘ওই বছর ১৪ মাসে’ বা ‘১১ মাসে’ ইত্যাদি। উদ্দেশ্য, যুদ্ধবিরতি পালনে বিঘোষিত ‘সম্মানিত মাস চারটি’কে এড়িয়ে যাওয়া।

আমাদের দেশেও ‘আঠারো মাসে বছর’—এমন কথা প্রচলিত আছে। কথিত আছে ‘শের-ই-মৈশুর’খ্যাত টিপু সুলতান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় সৈন্যদের বেতন দিতেন ৩৫ দিনে মাস হিসাব করে।

মানুষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা স্মরণ করে সময়-তারিখ বলে, যেমন সংগ্রামের বছর, বন্যার বছর, আকালের বছর, আবিসিনিয়ায় আবরাহার হস্তিবাহিনী ধ্বংস হওয়ার ফলে চালু হয় ‘হস্তিবর্ষ’। ইতিহাসে দেখা যায়, বিশেষ ঘটনাকেন্দ্রিক সন ব্যবস্থার প্রচলন। যেমন—হজরত ঈসা (আ.) স্মরণে খ্রিস্টাব্দ বা ঈসায়ী সন। প্রিয়নবী (সা.)-এর হিজরতের বছর ৬২২ খ্রিস্টাব্দকে প্রথম বছর ধরে ঘটনার ১৭ বছর পর হজরত ওমর (রা.) হিজরি সন প্রবর্তন করেন।

১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলা বিজয়ের ফলে হিজরি সন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়। তবে চান্দ্র ও সৌরবর্ষের গণনা রীতিতে পার্থক্যে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। পৃথিবী নিজ কক্ষপথে ঘুরতে সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। আবার চন্দ্রকলার হ্রাস-বৃদ্ধিতে সময় লাগে প্রায় ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা। যে কারণে এক চান্দ্র বছর হতে সময় লাগে প্রায় ৩৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট। চান্দ্র মাসভিত্তিক বছরে ১০ থেকে ১১ দিনের তারতম্যে প্রতিবছর সন-তারিখের হিসাব মেলাতে সমস্যা হয়। তখন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে সম্রাট আকবরের সভাসদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি একটি নতুন সৌরসন উদ্ভাবন করেন। তিনি হিজরির ৩৫৪ দিনের পরিবর্তে ৩৬৫ দিন ধরে যে নতুন সন উদ্ভাবন করেন, তা-ই ‘বাংলা সন’। সম্রাট আকবর ফরমান জারির মাধ্যমে এই নতুন সন গণনা করেন, যার সূচনা ধরা হয় তাঁরই মসনদে আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯৯২ মতান্তরে ৯৯৩ হিজরিকে। আকবরের ‘ফসলি সন’ যখন চালু হয়, তখন সুবে বাংলায় মহররম ছিল বৈশাখ মাস। সে জন্যই নতুন সনের প্রথম মাস হয়ে যায় বৈশাখ। ১৯৫৪ খ্রি. ‘যুক্তফ্রন্ট’ সরকার গঠিত হলে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন।

boisakhi mongol parade 3

ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণে সন-তারিখের প্রচলন মুসলিম শাসকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মহীশুরের শাসক টিপু সুলতান প্রিয়নবী (সা.)-এর নবুয়ত লাভের বর্ষকে সূচনায় এনে বিশেষ রীতিতে ‘মুহাম্মদী সন’ প্রবর্তন করেন। আকবরের ‘ফসলি সন’ গণনা রীতিতে চট্টগ্রাম ও আরাকানে প্রচলিত হয় ‘মগি সন’। পার্বত্য জনপদে ‘বৈসাবি’ নামে বর্ষবরণের রীতি প্রচলিত। পার্বত্য তিনটি উৎসবের আদ্যাক্ষর দিয়ে গঠিত শব্দ ‘বৈসাবি’। ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক, বৈসু বা বাইসু ও মারমাদের কাছে সাংগ্রাই, অন্যদিকে চাকমা ও তঞ্চঙ্গাদের কাছে বিজু নামে পরিচিত উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ বা ‘বৈসাবি’। হিজরি সনের আদলে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত হয়েছিল ‘বিলায়তি সন’, ‘আসলি সন’, ‘ইলাহি সন’ ও ‘জালালি সন’ ইত্যাদি। এসব সন গণনারীতির সঙ্গে প্রিয়নবী (সা.)-এর স্মৃতি ও ইসলাম-মুসলিম ঐতিহ্যের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত স্পস্ট।

আমরা মুসলমান। মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। ইসলামী সংস্কৃতি মহান আল্লাহর আদেশ ও প্রিয়নবী (সা.)-এর আদর্শিক চেতনায় উজ্জীবিত এবং ইহ ও পারলৌকিক শান্তি-মুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত। অন্যদিকে বৈশাখী উৎসব নিছক এক দিনের সস্তা বিনোদনের বিষয় নয়, বৈশাখী উৎসব আমাদের জাতীয় পরিচিতি সংরক্ষণের ডাক দেয়। বাংলা নববর্ষের ক্রমবিবর্তনে রয়েছে মুসলিম ঐতিহ্য ও পুরনোকে মুছে ফেলে নতুন শপথে পথ চলার অঙ্গীকার। মুসলিম লোকভাবনাসমৃদ্ধ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় নববর্ষের আবাহন ধ্বনিত হয়েছে—‘আইল নতুন বছর লইয়া নব সাজ,/কুঞ্জে ডাকে কোকিল-কেকা বনে গন্ধরাজ।’

অথবা ‘বৈশাখ মাসেতে গাছে আমের কড়ি/পুষ্প ফুটে পুষ্প ডালে ভ্রমর গুঞ্জরি।’ (কমলা পালা)

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর

নববর্ষের (১৪২৫) শুভেচ্ছা…

boisakh greeting 1425-8

নববর্ষ উৎসব লোক ও নগর সংস্কৃতি

ড. আশরাফ পিন্টু : উৎসবের আদি ইতিহাস অনুসন্ধান করলে পাওয়া যায় ‘উৎসব’ হলো বৈদিক ঋষিদের ‘সোমরস’ নিষ্কাশনের এক আনন্দ-উদ্বেল লোকাচার। ‘সোমরস’ বৈদিক সোম যজ্ঞানুষ্ঠানের অপরিহার্য অঙ্গ ছিল। কালক্রমে এ উৎসব শব্দের অর্থ বদলে গেছে। এখন উৎসব বলতে ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় আনন্দানুষ্ঠানকেই বোঝায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের উৎসব রয়েছে। এগুলোকে ধর্মীয়, সামাজিক ও জাতীয় বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করা যায়। ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে রয়েছে মুসলমানদের দুই ঈদ, হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা, চৈত্র সংক্রান্তি, খ্রিষ্টানদের বড়দিন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বুদ্ধপূর্ণিমা ইত্যাদি। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে এ উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি উৎসব, যা ওরা বাংলা নববর্ষের দিনেই পালন করে থাকে। জাতীয় উৎসবের মধ্যে আছে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উদযাপন। আর সামাজিক বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে অন্যতম হলো বাংলা নববর্ষের উৎসব। এ উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসীও এ উৎসব পালন করে থাকে।

মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই ভারতবর্ষে নববর্ষ পালিত হতো। তখন সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।

ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের ল্েয সম্রাট আকবর বাংলা সালের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার করার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সাল এবং আরবি সালের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সাল চালু করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। তবে এ গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬ খ্রি:) থেকে। প্রথমে এ সালের নাম ছিল ফসলি সাল, পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

মূলত সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করাতেন। এ উপলে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা মানে পুরনো বইয়ের হিসাবের পাঠ চুকিয়ে নতুন হিসাব বই খোলা। প্রকৃতপে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। বর্তমানে গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সব স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করিয়ে থাকেন। এই প্রথাটি এখনো অনেকাংশে প্রচলিত আছে।
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ ইংরেজি সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পয়লা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পয়লা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।

নববর্ষে উৎসব গ্রামীণ জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নববর্ষের দিন গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় বর্ণাঢ্য মেলা বসে। মেলায় বিভিন্ন লোকজ খাবার খই, মুড়ি, বাতাসা এবং লোকজ খেলনা যেমন মাটির তৈরী পুতুল, আম, কাঁঠাল, বাঁশের বাঁশি ইত্যাদি কেনাবেচায় সাধারণ মানুষ মুখর হয়ে ওঠে। এ ছাড়া নাগরদোলা, পুতুলনাচ ইত্যাদি আনন্দ অনুষ্ঠানে নববর্ষের এ দিনটিতে ছোট-বড় সবাই আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই দিনেই শুরু হয় ব্যবসায়ীদের ঐতিহ্যবাহী শুভ হালখাতা। প্রতিটি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানেই ক্রেতাদের মিষ্টান্ন সহযোগে আপ্যায়ন করানো হয়। মূলত নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, বিভিন্ন লোকশিল্পজাত পণ্য, মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এ মেলায় বিনোদনের জন্য বাউল শিল্পী বা বয়াতিদের উপস্থিতি থাকে। তারা পালাগান, জারিগান, কবিগান ও মুর্শিদিগানসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক গান পরিবেশন করে দর্শকদের আনন্দ দিয়ে থাকেন। ফলে এই মেলা বাঙালিদের কাছে সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়।

বর্তমানে নাগরিক জীবনেও লোক ও নগর-সংস্কৃতির মিশ্রণে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষের উৎসব পালিত হয়ে থাকে। শহরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের বটমূলে নববর্ষকে স্বাগত জানাতে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করে থাকেন। এ দিন সব বয়সের পুরুষেরা পাজামা-পাঞ্জাবি, নারীরা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোঁপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে। বর্তমানে ইলিশের দুর্মূল্য হলেও শহরে সবাই একসাথে বসে পান্তা-ইলিশ খাওয়া একটা বিশেষ ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।

নববর্ষের উৎসব সর্বজনীন হলেও বর্তমানে উৎসবের গায়ে যুগ পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। উৎসব যেখানে অনাবিল হৃদয় আবেগের প্রাধান্য ছিল, ছিল প্রীতিময়তা, সেখানে কৃত্রিমতা তাকে গ্রাস করেছে। হৃদয়হীন আচার-অনুষ্ঠান আর চোখ-ঝলসানো চাকচিক্য আজ উৎসবের বৈশিষ্ট্য। নগর সভ্যতার যান্ত্রিকতায় আজ আমাদের হৃদয়-ঐশ্বর্য লুণ্ঠিত। তাই উৎসবের মহতী কল্যাণী রূপটি কালো পর্দায় আচ্ছন্ন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী। কিন্তু উৎসবের দিন মানুষ বৃহৎ, সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহৎ…।’ আমরা যেন এই বৃহৎ হৃদয়ের অধিকারী হয়ে চিরায়ত লোকসংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে সর্বজনীন নববর্ষ উৎসব পালন করতে পারি এটাই কাম্য।

জাপানের শিক্ষা ও সংস্কৃতি

 

japanese-people-sapporoঅবাক করা দেশ জাপান…..!!

আমরা কি একটু চেষ্টা করতে পারিনা….??

একটু  সময়  নিয়ে  পড়ুন  আর  ভাবুন ………

(১) জাপানের স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিদিন তাদের শিক্ষকদের সাথে অন্তত ১৫ মিনিট ধরে তাদের স্কুল পরিষ্কারে সহায়তা করে। যা তাদের একটি পরিচ্ছন্ন জাতি হিসেবে চিহ্নিত ও প্রতিষ্ঠিত করে ।

(২) জাপানে আবর্জনা ক্লিনারদের হেলথ ইঞ্জিনিয়ার বলে ( মেথর বা ঝাড়ুদার বলে না ), তারা ‎৫০০০-৮০০০ ডলার মাসিক বেতন পায়।

(৩) জাপানিরা রাস্তায় ময়লা ফেলে না, তাদের ধূমপায়ীরা ব্যাগে করে ছাইদানি নিয়ে ঘুরে, জাপানের রাস্তায়  সিগারেটের ছাই পর্যন্ত ফেলা নিষিদ্ধ !

(৪) জাপানের কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই এবং প্রতি বছর শত শত ভূমিকম্প হয় তবুও তারা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিসম্পন্ন দেশ।

(৫) হিরোশিমায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারমানবিক বোমা হামলার মাত্র ১০ বছরের মাথায় হিরোশিমা তার আগের অবস্থানে ফিরে আসে।

(৬) জাপানে রেস্টুরেন্ট ও ট্রেনে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ।

(৭) জাপানে শিক্ষাজীবনের প্রথম ৬ বছর শেখানো হয় নৈতিকতা ও আচার-ব্যবহার সম্পর্কিত বিষয় যাতে কীভাবে মানুষের সাথে আচার-ব্যবহার করতে হবে তা শিক্ষার্থীরা জানতে পারে।

(৮) বিশ্বের একটি ধনী দেশ হয়েও তারা ঘরে কোন কাজের মানুষ রাখেনা। সকল কাজের দায়িত্ব মা, বাবাকে নিতে হয় আর সহযোগিতা করে ছেলে-মেয়েরা।

(৯) জাপানে শিক্ষাজীবনের প্রথম ৩ বছর কোন পরীক্ষা হয়না। কারণ তারা মনে করে লেখাপড়া চরিত্র গঠনের জন্য, পরীক্ষা নেওয়ার জন্য নয়।

(১০) জাপানিরা খাবার অপচয় করে না,রেস্টুরেন্টে গেলে দেখবেন । মানুষ যার যতটুকু দরকার এর বেশি নেয় না ও খায় না।

(১১) জাপানের ট্রেন দেরি করে আসার গড় সময় বছরে ৭ সেকেন্ড! তারা প্রতিটা সেকেন্ডের হিসেব করে চলে।

(১২) জাপানে শিক্ষার্থীদের খাওয়ার জন্য আধ ঘন্টা বিরতি দেয়া হয় যা সঠিক হজমের জন্য প্রয়োজনীয়। কারণ তারা ছাত্র-ছাত্রীদের জাতির ভবিষ্যৎ মনে করে থাকে।

(১৩) দীর্ঘজীবী মানুষের তালিকায় জাপানের অবস্থান তৃতীয়। গড়ে প্রায় ৮৩ বছর বাঁচে জাপানিরা।

(১৪) জাপানিদের আত্মসম্মানবোধ খুব বেশি। সম্মানের খাতিরে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার অনেক উদাহরণ রয়েছে দেশটিতে। জাপানের বেশ কয়জন প্রধানমন্ত্রী অল্প কয়টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন । কথা দিয়ে সে কথা রক্ষার ব্যাপারে তারা এতটাই কঠোর।

(১৫) টাইটানিক জাহাজডুবি থেকে যে কয়জন জাপানি বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছিলেন, দেশে ফিরে তাদের প্রবল জনরোষের সম্মুখীন হতে হয়। “সহযাত্রীদের বাঁচাতে যদি নাই পারলে, তবে তাদের সাথেই প্রাণ কেন দিলে না!” এই ছিল জনতার আক্ষেপ!

(১৬) নির্ধারিত সময়ের পরও কাজ করার জন্য “ওভারটাইম” নামে একটি শব্দ প্রচলিত দুনিয়া জুড়ে রয়েছে, শুধুমাত্র জাপানে এই শব্দটির কোন অর্থ নেই। জাপানিরা স্বভাবগতভাবেই অফিসের সময় শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে কাজ নিয়ে। ঊর্ধতন কর্মকর্তার আগে অফিস ত্যাগ করার কথা কল্পনাতেও ভাবতে পারে না তারা, যত জরুরী তাড়াই থাকুক না কেন ঘরে ফেরার।

(১৭) সাধারণত আমাদের দেশে অফিসে ঘুমানো খুবই খারাপ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু জাপানে এর সম্পূর্ণ উল্টো! জাপানে অফিসে ঘুমালে ভাবা হয় ঘুমন্ত ব্যক্তির ওপর কাজের প্রচুর চাপ ছিল। তখন বসের সামনে তার ভাবমূর্তি খারাপ না হয়ে আরও ভালো হয় !

(১৮) অনেক সময় সমস্যা মোকাবিলায় বা দুশ্চিন্তায় আরামের জন্য একক বিছানায় থাকার প্রবণতা চলে আসে। জাপান এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় ক্যাপসুল হোটেল তৈরি করে থাকে, যেখানে শুধু একটি বিছানার সমপরিমাণ স্থান রয়েছে। তবে এই ঘরে ওয়াইফাই সুবিধা রয়েছে । এই ক্যাপসুল হোটেল শুধু ছেলেদের জন্য তৈরি করা হয়।

(১৯) জাপান অনেক উন্নত দেশ। হয়তো ভাবতে পারেন তাদের জমি অনেক উর্বর। যেখানে প্রচুর ফসল ফলে। কিন্তু তা নয়। জাপানে শতকরা ৭০ ভাগ ভূমি হচ্ছে পাহাড়ি। এ ছাড়াও দেশটিতে ২০০-এর মতো আগ্নেয়গিরি রয়েছে!

(২০) জাপানে মোট প্রকাশিত বইয়ের ২০% হচ্ছে কমিকস বই।

(২১) সন্তান দত্তক বা পালক সন্তান গ্রহণ তো পুরো বিশ্বেই রয়েছে। জাপানে মোট দত্তক গ্রহণের শতকরা ৯৮ ভাগের বয়স ২০-৩০ বছর! অর্থাৎ তারা বয়স্কদের দত্তক গ্রহণ করে! ব্যবসায়িক পরিবার কিন্তু ছেলে নেই, তখন তারা দত্তক নেয়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে, যদি নিজের ছেলে বাবা-মা রাখতে অক্ষম হয় তবে অন্য একজনের ছেলে নিয়ে আসে।

(২২) জাপানে শ্রম আইন বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক ভাল। এজন্য কোন কোম্পানি চাইলেই তার কর্মী বিদায় করতে পারে না। এজন্য মোটা অঙ্কের টাকা গুণতে হবে! তাই বলে কোম্পানির মালিক পক্ষরাও কিন্তু বোকা নন। তারা যে কর্মীকে ছাঁটাই করতে চান তাকে বিরক্তিকর কাজ দিয়ে থাকেন। হতে পারে সারাদিন টিভি পর্দার সামনে বসিয়ে রাখা। এসবের জন্য আবার আলাদা শাস্তি – কক্ষ রয়েছে।

(২৩) আমাদের দেশে সাধারণত দাঁত সঠিক ও সুন্দর গঠনের হতে হয়। কিন্তু জাপানে গত কয়েক বছর আগে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে যুবক-যুবতীরা তাদের দাঁতের গঠন সৌন্দর্য না বাড়িয়ে ত্রুটিপূর্ণ আকার দিয়ে সৌন্দর্য আরো কমিয়ে ফেলে ।

(২৪) জাপানে স্বাক্ষরতার হার শতকরা ১০০ ভাগ। তাদের পত্রিকায় আমাদের দেশের মত সংবাদ দুর্ঘটনা, রাজনীতি, সিনেমার সংবাদ ইত্যাদি ছাপানো হয় না। সেখানে শুধু প্রয়োজনীয় ও আধুনিক জগৎ সম্পর্কে সংবাদ ছাপা হয়।

(সংগৃহীত)

সৌদি আরবে বিনোদন যুগের সূচনা

riyad cityscapeবিল ল’ : গত বছরের অক্টোবরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত প্রথম ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ উদ্যোগ নামক সম্মেলনে দ্যুতি ছড়ানো আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন হলিউডের সবচেয়ে বড় ট্যালেন্ট এজেন্সিগুলোর একটির সিইও অ্যারি এমানুয়েল। কোনো সন্দেহ নেই, পাঁচ তারকা রিজ কার্লটন হোটেলের বিলাসবহুল বলরুমে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মূল বক্তব্য তিনি উৎসুকভাবে শুনেছেন। কারণ, যুবরাজ সেখানে বিদেশি কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দেয়া সুযোগ-সুবিধার বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঘনিষ্ঠ, শিকাগোর মেয়র র‌্যাহম এমানুয়েলের ভাই অ্যারির একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল ওই সম্মেলনে। সেখানে তিনি মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং সৌদি আরবে একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বিনোদন ও সংস্কৃতি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল ‘আমি মনে করি আপনারা লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট ও মিউজিক দেখবেন, খাবার উৎসব, ফ্যাশন, আর্ট শো’ ইত্যাদিতে যাবেন এবং তাহলে দেখবেন ভিশন-২০৩০-এর সঙ্গে এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি একটি সম্পর্ক আছে, বিশেষত তারা যা হতে চায় তার সঙ্গে।’

নিজের কোম্পানি উইলিয়াম মরিস এন্ডেভারের জন্য এমানুয়েল অ্যারি যা চেয়েছিলেন, তা হল সৌদি আরবের সম্ভাবনাময় এন্টারটেইনমেন্ট শিল্পে বড় ভূমিকা রাখবে কোম্পানিটি। সর্বোপরি, ইসলামের কট্টর ওয়াহ্হাবি ব্যাখ্যার আওতায় কয়েক দশক ধরে দেশটি এন্টারটেইনমেন্ট-বিনোদনত্যাগী হয়ে পড়েছে। সেখানে কোনো সিনেমা ছিল না, থিয়েটার ছিল না; ছিল না কোনো জনপ্রিয় লাইভ মিউজিক কনসার্ট। কিন্তু এখন মোহাম্মদ বিন সালমান হাল ধরার পর সৌদি আরবে তার মতে ‘মডারেট ইসলাম’ ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেছেন। ফলে ভিত্তি গড়তে যাওয়া বিনোদন শিল্প এখন ভালো ও মনোরম একটি অবস্থানে পৌঁছার হাতছানি দিচ্ছে। দেশটিতে এ শিল্পের বিশাল বাজার সম্ভাবনা রয়েছে- কারণ, সৌদি আরবের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বয়সই ৩০-এর নিচে।

যেহেতু ভিশন-২০৩০ গ্রহণ করা হয়েছে-‘আমরা যথেষ্ট সচেতন যে, বর্তমানে থাকা সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক সুবিধা আমাদের নাগরিক ও বসবাসকারীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না, এমনকি সেগুলো আমাদের উন্নতির দিকে যাওয়া অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও নয়’। অন্যদিকে মোহাম্মদ বিন সালমানও এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন যে, তিনি যদি নিজেকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শীর্ষে রাখতে পারেন, তবে এখান থেকে প্রচুর আয় বের করা যেতে পারে। ভিশন-২০৩০ বলছে, বিনোদন খাত ২২ হাজার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করবে। আরও প্রলুব্ধ হওয়ার মতো বিষয় হল, এন্টারটেইনমেন্ট ও হলিডে রিসোর্টগুলোয় যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তাতে পর্যটন খাতকে উন্নত করা হচ্ছে, যাতে করে এটি সৌদি আরবে বার্ষিক ৫ কোটি পর্যটক টানতে পারে; এ সংখ্যা বর্তমানে হজে আসে-এমন পর্যটকের সংখ্যা বাদ দিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।

নিজের ক্ষমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুবরাজ কত বেশি বেপরোয়া, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে অসাধারণ বিবেচিত ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলন রিটজ কার্লটন হোটেলে শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পরেই। ৪ নভেম্বর হোটেলটির অতিথিদের চলে যেতে বলার পর বিলাসবহুল হোটেলটি ২০০-এর বেশি ব্যবসায়ী ও রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যের জন্য কারাগারে পরিণত করা হয়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের তকমা দিয়ে তেমনটি করা হয়েছিল। দমন-পাকড়াও অভিযানটি পরিচালনা করা হয় দুর্নীতিবিরোধী কমিটির আদেশে, যার প্রধান মোহাম্মদ বিন সালমান। গ্রেফতার শুরু হওয়ার পর রাজকীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যাদের আটক করা হয়েছিল তার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ধনী যুবরাজ আল-ওয়ালিদ বিন তালাল, সালেহ আবদুল্লাহ কামাল এবং ওয়ালিদ আল-ইবরাহিমও ছিলেন। বড় ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগের পাশাপাশি এ তিনজনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় কমন-তা হল তারা সবাই বড় ধরনের এন্টারটেইনমেন্ট ও মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান বা প্রধান উদ্যোক্তা।

বিন তালালের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি হল রোতানা মিডিয়া সার্ভিসেস- যা রেডিও এবং টিভি স্টেশন, ম্যাগাজিন, মিথস্ক্রিয় মিডিয়া এবং মুভি ও মিউজিক ভিডিও সরবরাহের বহুবিদ কাজ করে থাকে। কামালের মিডিয়া হল-এআরটি, আরব রেডিও এবং টিভি স্টেশন, যার আওতায় আছে ওএসএনসহ অনেক চ্যানেল। এ ছাড়া তার কোম্পানি মুভি, মিউজিক ও স্পোর্টসের মতো পারিবারিক এন্টারটেইনমেন্ট সরবরাহ করে থাকে। আল-ইবরাহিম নিয়ন্ত্রণ করেন এমবিসি- মিডলইস্ট ব্রডকাস্টিং সেন্টার। এ কোম্পানিটি চিলড্রেনস নেটওয়ার্ক, ২৪ ঘণ্টা নিউজ এবং বিশেষায়িত চ্যানেল ‘দ্য নিউ আরব উইমেন’সহ অনেক চ্যানেল পরিচালনা করে থাকে।

কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের ‘যথাযথ প্রক্রিয়া’র মুখোমুখি করা হবে। প্রকৃতপক্ষে এ সংক্রান্ত যা কিছু সৌদি আরবে ঘটেছে, তা ছিল একটি কম্পন। পরে আটককৃতদের কেবল বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হয় এবং অনেকে এ পদ্ধতিতে মুক্তি নেয়। অন্যথায় তাদের ব্যবসা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তৎকালীন সৌদি আরব ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান যুবরাজ মিতেব ও সাবেক বাদশাহ আবদুল্লাহর এক ছেলেকে ১০০ কোটি ডলার পরিশোধের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হয় বলে খবর বেরিয়েছে। আল-ওয়ালিদ বিল তালাল তার ব্যবসা ছাড়তে রাজি হননি, ফলে তিনি আটক রয়ে গেছেন। ধারণা করা হয়, কামাল ও আল-ইবরাহিমকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

সৌদি রাষ্ট্রপদ্ধতির অস্পষ্টতার কারণে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত স্বার্থ কোথায় শেষ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ শুরু, তা চিহ্নিত করা অসম্ভব। তবে যে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট, তা হল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) প্রধান, অল-ইনকম্পাসিং কাউন্সিল ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ক্রাউন প্রিন্স, প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও দুর্নীতিবিরোধী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সব অর্থনৈতিক বিষয় বিন সালমানের হাত দিয়েই পাস হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে পিআইএফ এন্টারটেইনমেন্ট সেক্টরে ২৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়। বর্তমানে এমানুয়েলের কোম্পানি পিআইএফের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে যাচ্ছে, যেখানে কোম্পানির অংশীদারিত্বের জন্য ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এমানুয়েল অ্যারি চাচ্ছেন দৈবাৎ পাওয়া এ অর্থ দিয়ে কোম্পানিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে, যাতে এরই মধ্যে কেনা আইএমজি বা আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপের স্পোর্টস গাড়ি, বিপুল স্পোর্টস সরঞ্জাম, ফ্যাশন ও লাইভ ইভেন্ট তৈরি করা যায়।

এ ছাড়া তিনি সৌদি আরবের সমৃদ্ধ অনুন্মোচিত অঞ্চলের দিকে মনোযোগ দিতে চান। বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে বাইরে যেতে পছন্দ করে’। ‘তারা পছন্দ করে সামাজিক বিভিন্ন বিষয়, তাই মুভি ও কনসার্ট হতে পারে বড় ভূমিকা পালনকারী আর স্পোর্টস হচ্ছে ভালো অনুঘটক।’ এসব কিন্তু ঢেকে রাখা হয়েছে। মোহাম্মদ বিন সালমানের নিয়ন্ত্রণাধীন পিআইএফ ফান্ডের সঙ্গে সংযুক্তি অবশ্যই স্বর্গে বিয়ের মতো দেখা যায়; কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এমানুয়েল অ্যারি হয়তো হোটেল রিটজ কার্লটনে গত বছর যা ঘটেছে, তা বিবেচনায় নিতে পারেন। সন্দেহ নেই, আটককৃতরা দুর্নীতি চর্চায় জড়িত ছিলেন; কিন্তু এটিই হচ্ছে সৌদি আরবের ব্যবসায়ী সমাজ ও শাসক পরিবারের নিত্যদিনের ঘটনা।

একটি সূত্র সম্প্রতি বাঁকা হাসি হেসে আমাকে বলেছে, ‘দেশের সবাই জানে গ্রেফতার করা হয়েছে বাছাইকৃতদের’। যা কিছুই ঘটেছে, আটককৃতদের মানবাধিকার, মুক্ত ও স্বচ্ছ শুনানি পাওয়ার অধিকার পদদলিত করা হয়েছে। তাদের ব্যবসা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পদ আটকে রাখা হয়েছে। তারা দেশ ছেড়ে যেতে অক্ষম। এমানুয়েল পুরোদস্তুর নিষ্ঠুর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত; কিন্তু তিনি সম্ভবত নিজের ভালো মিল বা আরও বেশি খুঁজে পেতে পারেন মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে।

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ: সাইফুল ইসলম

বিল ল ’: মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ও বিবিসির সাবেক সাংবাদিক