Archive

Archive for the ‘সংস্কৃতি’ Category

ইংরেজী নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন

new-years-day-2017অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম : একটি জাতির সংস্কৃতি সেই জাতির নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস, আচারঅনুষ্ঠান, ধ্যানধারণা ইত্যাদি সামগ্রিক পরিচয় স্পষ্টভাবে ধরে রাখে এবং তা বিশ্ব দরবারে সেই জাতির আত্মপরিচয়কে বুলন্দ করে দেয়। মূলত সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আয়না। সংস্কৃতির বহুবিধ উপাদানের মধ্যে নববর্ষও অন্যতম। আমরা যাকে ইংরেজী সন বা খ্রিস্টাব্দ বলি, আসলে এটা হচ্ছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। বাংলা ভাষায় অব্দ শব্দের চেয়ে সন ও সাল দুটি বেশি পরিচিত ও সর্বাধিক প্রচলিত। সন শব্দটি আরবী এবং সাল শব্দটি ফারসী। সন ও সাল এই শব্দ দুটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যজাত, আমাদের তমদ্দুনীয় উৎস সঞ্জাত।

আমাদের দেশে বর্তমানে তিনটি সন প্রচলিত রয়েছে আর তা হচ্ছে হিজরী সন, বাংলা সন ও ইংরেজী সন। এখানে হিজরী সনের প্রচলন হয় যেদিন এখানে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে তখন থেকেই। এই হিজরী সন মুসলিম মননে পবিত্র সন হিসেবে গৃহীত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনা মুনওয়ারায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসের সেই দিগন্ত উন্মোচনকারী ঘটনাকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে এই হিজরী সন। ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে হযরত উমর রাদিআল্লাহু তায়ালা আন্হুর খিলাফতকালে তারই উদ্যোগে হিজরতের বছর থেকে হিসাব করে হিজরী সনের প্রবর্তন করা হয়। সেটা ছিল হিজরতের ১৭ বছর। যতদূর জানা যায়, তারই পরের বছর থেকে বাংলাদেশে সাংগঠিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়আর তখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা)-এর খিলাফতের মধ্য ভাগ। অবশ্য প্রায় ১০/১২ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশে সমুদ্রপথে ইসলামের খবর এসে পৌঁছতে থাকে। ইসলামের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে হিজরী সনেরও আগমন ঘটে, কারণ এই সনের বিভিন্ন মাসে ইসলামী আচারঅনুষ্ঠান, ইবাদতবন্দেগীর নির্দিষ্ট দিনরজনী, তারিখ ও নির্দিষ্ট মাস প্রভৃতি রয়েছে। এই হিজরী সনই বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত সবচেয়ে পুরনো সন।

১২০১ খ্রিস্টাব্দে সিপাহ্সালার ইখতিয়ারুদ্দীন মুহম্মদ বিন বখ্তিয়ার খিল্জী বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের বিজয় নিশান উড্ডীন করেনআর তখন থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরী সন বাংলাদেশে প্রচলিত হয়, যা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সুলতানী আমলে কি মুঘল আমলে রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে, আদানপ্রদান তথা সর্বক্ষেত্রে হিজরী সনই প্রচলিত ছিল। অবশ্য মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে ঋতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সৌর সনের তাকিদ রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে দেখা দেয়ায় হিজরী সনকেই সৌর গণনায় এনে একটি রাজস্ব বা ফসলী সনের প্রবর্তন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, হিজরী সন চান্দ্র সন হওয়ায় ঋতুর সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকে না।

সম্রাট আকবরের নির্দেশে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে আমীর ফতেহ্উল্লাহ সিরাজী সম্রাট আকবরের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বছর ৯৬৩ হিজরী মুতাবিক ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের নির্দিষ্ট তারিখ থেকে হিসাব করে হিজরী সনকে সৌর গণনায় এনে যে সনটি উদ্ভাবন করেন সেটাই আমাদের দেশে বাংলা সন নামে পরিচিত হয়। হিজরী সনের বছরের হিসাব ঠিক রেখেই এর মাসগুলো নেয়া হয় শকাব্দ থেকে। বৈশাখ মাসকে স্থির করা হয় বছরের প্রথম মাস।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকেই সম্রাট আকবরের ফরমানবলে রাজত্বের রাজস্ব আদায়ের সন হিসেবে তা প্রচলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে হিজরী সনের সৌরকরণ পঞ্জিকাটি ব্যাপকভাবে গৃহীত ও সমাদৃত হয়, যা একান্তভাবে বাংলার মানুষের নিজস্ব সন হিসেবে স্থান করে নিতে সমর্থ হয়। আর এখানে ইংরেজী সন এলো সেই ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে। একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে কিন্তু এখন পর্যন্ত ইংরেজী সনের গ্রহণযোগ্যতা তেমন একটা নেই। আবার শহর জীবনে বাংলা সনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। অবশ্য শহুরে জীবন কি গ্রামীণ জীবনে হিজরী সনের প্রচলন সমানভাবে বর্তমান। বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও সংহতির অন্যতম অবলম্বন এই হিজরী সন। আর এই হিজরী সন থেকে উৎসারিত বাংলা সন আমাদের জাতীয় জীবনে নিজস্বতার বৈভব এনে দিয়েছে।

মুসলিম দুনিয়ার অনেক দেশেই হিজরী সনের চান্দ্র হিসাবের বৈশিষ্ট্যেই জাতীয় সন হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এমনকি এই সনের সৌর হিসাব এনে বাংলা সনের মতোই কোন কোন দেশে প্রচলিত রয়েছে, যেমন ইরানে হিজরী সনকে সৌর হিসাবে এনে সেখানে হিজরী সন প্রচলিত রয়েছে। ইরানে নওরোজ পালিত হয় হিজরী সনের শামসী বা সৌরকরণের হিসাবে আনা তাদের নিজস্ব প্রথম মাসের ১ তারিখে। আমাদের দেশে হিজরী সনের সৌর হিসাবের প্রথম মাস যেমন বৈশাখ মাস, তেমনি ওখানে হচ্ছে ফারবারদীন প্রথম মাস। এই মাসের ১ তারিখ ওদের হয় ২১ মার্চ। আর আমাদের ১ বৈশাখ হয় ১৪ এপ্রিল। আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষের যে আনন্দ বৈভব কি গ্রামে কি নগরেগঞ্জে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, ইংরেজী নববর্ষ কিন্তু শহুরে জীবনের মুষ্টিমেয় বিশেষ মহলে ছাড়া তা ব্যাপকভাবে কোথাও আলোড়ন সৃষ্টি করে না। তবুও ইংরেজী নববর্ষ আসে। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টার ঘণ্টা বাজার পর পরই ঘোষিত হয় এই ভিন ঐতিহ্যজাত নববর্ষের সূচনা মুহূর্ত, ঘোষিত হয় ইংরেজী নববর্ষের আগমন বারতা। মধ্যরাতের সেই মুহূর্তটা আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে কোনরূপ আনন্দআবেগ সৃষ্টি না করলেও খ্রীস্টান জগত ওই মুহূর্তে হ্যাপি নিউ ইয়ার উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এক হৈহুল্লোড়ে উল্লাস ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। ঘটে যায় কতই না অঘটন, ঘটে যায় কতই না পৈশাচিক কর্মকান্ড, মদ্যপানের নামে বহু স্থানে জীবন পানের মহড়াও চলে। ইংরেজী নববর্ষ আসে রাতের গভীরে নিকষ অন্ধকারে প্রচন্ড শীতের প্রবাহ মেখে।

ইংরেজী ক্যালেন্ডার যেহেতু আমাদের কাজকর্মের তারিখ নির্ধারণে, হিসাবনিকেষ সংরক্ষণে, আন্তর্জাতিক আদানপ্রদানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তাই এতে যতই ঔপনিবেশিক গন্ধ থাকুক না কেন, যতই এতে প্রায় ২০০ বছরের গোলামির জোয়ালের চিহ্ন থাকুক না কেন, আমরা এর থেকে মুক্ত হতে পারছি না এই কারণেই বোধ করি যে, আমরা স্বকীয়সত্তা সজাগ হওয়ার চেতনার কথা বললেও, আমরা নিজস্ব সংস্কৃতিকে সমুন্নত করার কথা বললেও তা যেন অবস্থার দৃষ্টিতে মনে হয় বাতকা কি বাত তথা কথার কথা। ইংরেজী নববর্ষ আমাদের স্কন্ধে সিন্দবাদের সেই দৈত্যটির মতো, সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে বসে আছে যে, আমরা একে ছাড়তে পারছি না। ইংরেজী নববর্ষ আমাদের নতুন দিনের হিসাব শুরু করায়, যদিও চিঠিপত্রে বাংলা তারিখ উল্লেখ করার নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু সেটাও কি কার্যত হচ্ছে?

আমরা যাকে ইংরেজী ক্যালেন্ডার বলি আদতে এর নাম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি প্রাচীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারটির সংস্কার সাধন করেন। এই গ্রেগরির নামে এই ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ লেখার শেষে যে এডি (.) লেখা হয় তা লাতিন এ্যানো ডোমিনি (অহহড় উড়সরহর)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এই এ্যানো ডোমিনির অর্থ আমাদের প্রভূত বছরে অর্থাৎ খ্রিস্টাব্দ। ডাইওনিসিয়াম একমিগুয়াস নামক এক খ্রীস্টান পাদ্রী জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ৫৩২ অব্দে যিশুখ্রিস্টের জন্ম বছর থেকে হিসাব করে এই খ্রিস্টাব্দ লিখন রীতি চালু করেন।

মানুষ আদিকাল থেকেই কোন না কোনভাবে দিনক্ষণ, মাসবছরের হিসাব রাখতে প্রয়াসী হয়েছে চাঁদ দেখে, নক্ষত্র দেখে, রাতদিনের আগমননির্গমন অবলোকন করে, ঋতু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে। সাধারণ কোন বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিন গণনা, মাস গণনা, বছর গণনার রীতি কালক্রমে চালু হয়েছে। তিথি, নক্ষত্র বিশ্লেষণ করার রীতিও আবিষ্কার হয়েছে, উদ্ভাবিত হয়েছে রাশিচক্র। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা চান্দ্র সন নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চান্দ্র সনে বছর হয় মোটামুটি ৩৫৪ দিনে আর সূর্যের হিসাবে যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা সৌর সন নামে পরিচিত হয়। সৌর সনের বছর হয় মোটামুটি ৩৬৫ দিনে। আমাদের দেশে ইংরেজী তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার যে ব্রিটিশ বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাত করে আমাদের ওপর গোলামির জোয়াল চাপিয়ে দেয়, সেই ব্রিটিশ এই ক্যালেন্ডার তাদের দেশ গ্রেট ব্রিটেনে চালু করে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। তারা যেখানেই তাদের উপনিবেশ স্থাপন করেছে, সেখানেই তারা তাদের পোশাকআশাক, শিক্ষাদীক্ষা, প্রশাসনিক কাঠামো, সংস্কৃতি যেমন চাপিয়ে দিয়েছে, তেমনি তাদের ক্যালেন্ডারটিও দিয়েছে, তারা প্রভু সেজে বসেছে আর নেটিভদের বানিয়েছে মোস্ট অবিডিয়েন্ট সারভেন্ট। এর থেকে কি আমরা নিজেদের উদ্ধার করতে পারব না? বল বীর/বল উন্নত মম শির/শির নিহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির এই বীরত্বব্যঞ্জক উচ্চারণ কি শুধু আমাদের জাতীয় কবির কবিতায় আবৃত্তির জন্য অনুরণিত হতে থাকবে, নাকি আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঝংকৃত হবে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখতে পারি না?

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরিফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা)

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬

পাশ্চাত্য নয়, দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা চাই

আল ফাতাহ মামুন : আমরা শপথ করিতেছি যে, নববর্ষারম্ভে বিগত বছরের ঋণ শোধ করব এবং কৃষিকাজের যে সব সন্ত্রপাতি ও হাঁড়িবাসন ধার নিয়ে ছিলাম তাও ফিরিয়ে দেব। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে এভাবেই পুরোনো বছরের ঋণ শোধের শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপন হতো নতুন বছরের প্রথম দিনটি। এর পাঁচশো বছর পর অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব দুহাজার সনে ধারদেনা শোধের শপথ অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে নতুনরূপে নববর্ষ উদযাপন হয় ব্যবিলনিয়া দেশের ব্যবিলন নগরে। বর্তমান ইরাকের আল হিল্লা শহরের কাছেই ছিল ব্যবিলন নগরের অবস্থান। এগারো দিন ব্যাপী নববর্ষ উৎসবে নানা আয়োজনে মুখর থাকত ব্যবিলনিয়ার ব্যবিলন। শেষ দিন মারদুকের মন্দিরে থেকে নববর্ষের মিছিল শুরু হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর নববর্ষ ভবনে সামনে এসে শেষ হতো বর্ষবরণ আনন্দ মিছিল। নববর্ষের শুরুর ইতিহাস এমনটিই। এরপর নানান ঘাতপ্রতিঘাত ও সংঘাতসংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশে দেশে বিস্তার হতে থাকে নববর্ষ সংস্কৃতি। এরই ধারাবহিকতায় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইংরেজি নববর্ষ।

জানুয়ারি মাসের পহেলা তারিখ ইংরেজি বছরের প্রথম দিন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কল্যাণে (!) ইংরেজি নববর্ষ এখন অশ্লীলতা আর নোংরামির হাতেখড়ি হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। অবশ্য ইংরেজি নববর্ষের সঙ্গে উচ্ছৃংখলতার সম্পর্ক নতুন নয়। স্যার জেমস ফ্রেজার তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য গোল্ডেন বাও লেখেন, নববর্ষ উপক্ষে আমেরিকান আদিবাসী নারীপুরুষদের আচরণ ছিল কান্ডজ্ঞানহীন মানুষের মতো। বিভিন্ন সাজে সজ্জিত নারীপুরুষরা এ বাড়ি ও বাড়ি ছুটে বেড়াতো আর সামনে যা পেত ভেঙ্গে ফেলত। শুধু যে অন্যের সম্পদের ক্ষতি করতো তা নয়; নিজেদের কাপড়চোপড় এবং আসবাবপত্রও ভাঙচুর করতো তারা। পুরোনো বছরের সঞ্চয় ও সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন বছরে নতুন জীবন শুরু করোএ দর্শনই আমেরিকানদের উগ্রপথে বর্ষবরণে উদ্বুদ্ধ করে। সেখানকার আদিবাসীদের দেখাদেখি অভিবাসী আমেরিকানরাও নববর্ষে ভয়াবহ রকমের অস্বাভাবিকতা প্রদর্শন করতে লাগলো। অগ্ন্যুৎসব, শব্দ দূষণসহ নানান কর্মকান্ড করে ভীতিকর পরিস্থিতিতে ৩১ ডিসেম্বর রাত অতিবাহিত করে নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতো তারা।

সময় পাল্টেছে। দিন বদলেছে। এখন আর অন্যের বা নিজের আসবাবপত্র ভেঙ্গে নববর্ষ উদযাপন করা হয় না। এখন নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানানো হয় নিজেকে ধ্বংস করে। একত্রিশ ডিসেম্বর রাত বারোটার পরপরই নিউ ইয়ার উদযাপনে তরুণতরুণীরা ধর্ম নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নাচগান ও মদইয়াবায় মেতে ওঠে। না, ইউরোপআমেরিকা বা অন্য কোনো পাশ্চাত্য রাষ্ট্রের নববর্ষ উদযাপনের কথা বলছি না। বলছি, বারো আউলিয়ার পূণ্যভূমি বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন সম্পর্কে। ভাবতেও কষ্ট হয়! একটি ভিন্ন জাতির উৎসবকে কেন্দ্র করে কীভাবে আরেকটি জাতি নিজের বিশ্বাসসম্পদ ও সংস্কৃতিকে বিলিয়ে দেয়। আমরা বাঙালি। আমাদের আছে নিজস্ব সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফালগুন, নবান্ন উৎসবসহ বিভিন্ন উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় ও ধর্মীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির আকাশপাতাল ব্যধান। থার্টিফার্স্ট নাইট, ভেলেন্টাইনস ডেসহ ইংরেজি বিভিন্ন উৎসবঅনুষ্ঠান পালন করার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশীয় এবং ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠান সংকটাপন্ন করে তুলছি। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী নয়। ইন্দ্রীয় সুখ লাভ এবং জীবন উপভোগই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। এজন্য তারা কোনো আইন কিংবা বাধানিষেধের ধার ধারে না। তারা আরো বিশ্বাস করে, এ জীবনই শেষ জীবন। এরপর আর কোনো জীবন নেই। নেই জবাবদিহির মতো গুরু দায়িত্বও। অপরদিকে আমাদের দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী। তারা পরজীবনে জবাবদিহির বিষয়টি গভীরভাবে লালন করে এবং বাস্তর জীবনে এর কঠোর অনুশীলনের চেষ্টা করে। সুতরাং আমাদের এবং পশ্চিমাদের জীবনাচার এবং সংস্কৃতির যে বিরাট পার্থক্য থাকবে তা বলাই বাহুল্য।

আমাদের সঙ্গে বিশ্বাস ও চিন্তায় এত বৈপরিত্যপূর্ণ একটি জাতির সংস্কৃতি যখন আমরা চর্চা করতে থাকি তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিশ্বাসও আমাদের মনমননে গেঁথে যেতে থাকে। যে কারণে পাঁচ বছর আগের বাংলাদেশকে পাঁচ বছর পরের বাংলাদেশের সঙ্গে মেলাতে গেলে রীতিমত আঁতকে ওঠতে হয়। কয়েক বছর আগেও দৈনিক কাগজগুলোর একটি নিয়মিত শিরোনাম ছিলম্ভ্রম হারানোর ভয়ে তরুণী/গৃহবধূর আত্মহত্যা আর সাম্প্রতিক সময়ে ইউটিউব বা পর্ণ সাইটগুলোতে আমাদের দেশের মেয়েদের সম্ভ্রম দানের মিছিল দেখে নিজেকেই বিশ্বাস করাতে কষ্ট হয়, একদিন এ দেশের মেয়েরাই সম্ভ্রম বাঁচাতে আত্মাহুতি দিয়েছিল! আজকের এ জাতীয় অধঃপতন যে বিজাতীয় সংস্কৃতিরই পরিণাম ও ফায়দা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে যে কোন ধরনের নৈরাজ্য রোধে প্রতিবছরই সরকার ও আইনশৃৃংখলা বাহিনী তৎপর থাকেন। তবে আফসোস! অশ্লীলতা এবং কথিত তারুণ্যের উম্মাদনা রোধে কারোই কোনো ভাবনা থাকে না। বরং আইনশৃংখলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানেই নাচগান, মদপান ও শ্লীলতাহানির মতো ঘৃণ্য কাজগুলো ঘটে থাকে। কয়েক বছর আগে টিএসসি চত্বরে নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এসব অপসংস্কৃতি এদেশের তরুণতরুণীদের জন্য কতটা বিপদজনক। নিউ ইয়ার উদযাপনকে কেন্দ্র প্রতি বছরই শ্লীলতাহানির ঘটে, এবারও ঘটবে হয়তো। কিন্তু প্রশ্ন হলোআমরা যাকে শ্লীলতাহানি বলছি, আমাদের নারী সমাজও কি সেটিকে শ্লীলতাহানিই মনে করেন? যদি তাই হয়, তবে তো টিএসসির ঘটনার পর নিউ ইয়ার উৎসবে অংশগ্রহণ করা কোনো নারীর চিন্তায়ও আসার কথা নয়। কিন্তু হায়! ওই ঘটনার পর যেন নারীদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে।

এ লেখা পড়ে কোনো নারীবাদীর নাকে যে মৌলবাদীর গন্ধ লাগবে না, তা হলফ করে বলতে পারি না। তবে যে কথাটি আমি হলফ করে বলতে পারি তা হলোনারীবাদীদের মহান হৃদয়ে এ প্রশ্ন অবশ্যই জাগবে যে, নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে এত কথা বলছেন, কিন্তু যারা নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে সেই সব পশুদের ব্যাপারে কিছু বলছেন না কেন? আসলে যারা এমনটি করেছে তারা মানুষের পর্যায়ে পড়ে নাএ ব্যাপারে আমার কেন খোদ শয়তানেরও দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেদিন কোনো মানুষরূপী পশু তো বাসায় গিয়ে কোনো নারীর সম্ভ্রমহানি করেনি। বরং মেয়েরাই পশুর খাঁচায় এসে নিজ থেকে ধরা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমি শুধু বলছি, বোন! কুকুর হইতে সাবধান। এতে আমার কোনো অপরাধ হয়েছে বলে মনে হয় না।

ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। আমরা বাঙালির পাশাপাশি মুসলিমও। মুসলিম হিসেবে আমাদেরও রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং হিজরি সন। বিজাতীয় (অপ)সংস্কৃতি চর্চায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে দেশীয় এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চায় মুসলিম তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলেমওলামাদের বিশেষ ভূমিকা রাখার আহবান করছি। আরেকটি কথা। সামগ্রীক বিবেচনায় বিদায়ী বছর বিশ্ব মুসলমানের জন্য সুখকর ছিল না। উপভোগ্য তো নয়ই। মিয়ানমার, কাশ্মীর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আলেপ্পোর মুসলমানরা এখনো আঁতকে ওঠছে ১৬ ক্ষত দেখে। নতুন বছর পুরনো ক্ষতে সুখের প্রলেপ দেবে এই আশায় দিন গুনছে নির্যাতিত মুসলমান। মুসলিম বিশ্বের ঘোর অমানিশা দূর করে আলোকিত ভোরসুবহে সাদিক ফিরিয়ে আনুক নতুন বছরের প্রথম সূর্য। স্বাগতম ২০১৭।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডঃ বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করাই ছিল লক্ষ্য

ডিসেম্বর 13, 2016 মন্তব্য দিন

azad-27-12-71ডা. সারওয়ার আলী : মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লাখ মানুষ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী ধর্মভিত্তিক দলের সদস্যদের গণহত্যার শিকার হয়। এই শহীদদের ব্যাপকতম অংশ ছিল নিরস্ত্র সাধারণ জনগণ, বাঙালি সেনাইপিআরপুলিশ সদস্য, প্রাথমিক পর্যায়ে শরণার্থী শিশু ও নারী এবং অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা।

৯ মাসে সারা দেশে সংঘটিত এই গণহত্যায় নিহতদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবীরা। সব হত্যাকাণ্ডই সমান গুরুত্ববহ এবং স্বজনহারা সবার বেদনা দেশবাসীকে সমভাবে বহন করতে হবে। তাই প্রতিবছর, বিশেষ করে মার্চ ও ডিসেম্বরে আমরা সব শহীদের আত্মদানের প্রতি সম্মান জানাই। তবে আমরা বিজয়ের আগ মুহূর্তে শনাক্ত করে বিশিষ্ট সাংবাদিক, ডাক্তার, শিক্ষক ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর স্মরণে ১৪ ডিসেম্বর আলাদাভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করি। এর তাৎপর্য সম্যক উপলব্ধির জন্য পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ভাবাদর্শ এবং একাত্তরে গণহত্যার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী ও ধর্মাশ্রয়ী নেতৃত্বের রণনীতির বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। এর ফলে বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতাও বিবেচনা করা সম্ভব হবে।

সব দেশে নানা ধর্ম ও জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে, এমনকি ভারতবর্ষের মতো বহুজাতিক রাষ্ট্রও রয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে হাজার মাইল দূরত্বে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ‘মুসলমানদের স্বাধীন আবাসভূমি’র অবৈজ্ঞানিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভাবাদর্শে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। উভয় দেশে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে সৃষ্ট পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সম্ভবত এ গরমিলটি উপলব্ধি করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জন্মলগ্নেই ঘোষণা করেন যে আজ থেকে আমরা মুসলমান বা হিন্দু নই, আমরা সবাই পাকিস্তানি। এ ধারণাকে হয়তো স্বায়ত্তশাসিত গণতান্ত্রিক ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে কিছুকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারত। সে পথ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী গ্রহণ করেনি। ঐতিহাসিক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদের ভাষায়—আধুনিক রাষ্ট্রমাত্রই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে জাতিগত বৈষম্য বজায় রাখার জন্য প্রাথমিকভাবে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং পরিশেষে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করে সামরিক শাসনের আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই পাকিস্তানের ভাবাদর্শ রক্ষার জন্য তারা প্রথম আঘাত হানে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর।

এর ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সমর্থক মুক্তচিন্তার ছাত্রনেতা, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের দ্রুত মোহমুক্তি ঘটতে থাকে, যা আমরা লক্ষ করি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সুফিয়া কামাল কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তাধারা ও কার্যক্রমে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯৪৯ সালেই নিবন্ধে জানালেন —আমরা মুসলমান কিংবা হিন্দু সেটি যেমন সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য আমরা বাঙালি। এক বছরের মধ্যে সূচিত হলো ভাষা আন্দোলন। আমাদের ধর্ম পরিচয় ও জাতি পরিচয়ের মধ্যে কল্পিত দ্বন্দ্ব আবিষ্কার করার পাকিস্তানি শাসকবর্গের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হলো। একাত্তর অবধি পাকিস্তানের ভাবাদর্শ প্রত্যাখ্যান করে গড়ে উঠল গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী চরিত্রের রাজনীতিবিদ এবং ছাত্রদের আন্দোলন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার আন্দোলন এই জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গণআন্দোলনকে বেগবান করে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরে গণআন্দোলনের জন্ম দেয়। পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চলে সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের কার্যক্রম, আর তার অগ্রসেনানি মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা প্রায় শিক্ষাগুরুর মতো পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক ভাবাদর্শের মূলে কুঠারাঘাত করে চলেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্ম দেয়।

সমগ্র পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের শাসকরা তাদের পূর্বাঞ্চলের এই সংগ্রাম ভারত ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচারণার ফসল বলে আখ্যায়িত করে এবং এই চিন্তাধারায় মোহবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিশেষ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের শিক্ষক ও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা; যা যুদ্ধাপরাধের বিচারের অভিযোগনামায় স্পষ্ট হয়েছে। বিদেশি সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় ধর্মাশ্রয়ী আদর্শিক দলের নেতাকর্মীরা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করে হত্যা করে। তারই সর্বশেষ নিদর্শন পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করে হত্যাযজ্ঞ।

তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম নিছক একটি ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের রাষ্ট্রের বিপরীতে একটি সব ধর্মের সমঅধিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। আর এ সংগ্রামে দেশান্তরী ও অবরুদ্ধ দেশে থেকে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। অবশ্য স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও নতুন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পটভূমিতে এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। পাকিস্তানের মতাদর্শকে বহন করে এই অপশক্তি পবিত্র ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শের রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের জন্য শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন আজ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

লেখক : ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

সংস্কৃতি ধ্বংসের নীলনকশা হয় একাত্তরে

corpses-foundডা. এম এ হাসান : বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বুদ্ধিজীবী হত্যা শুধু ডিসেম্বর মাসেই হয়েছে বা আলবদর বাহিনীই হত্যা করেছে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যে গণহত্যার সূচনা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী—এরই অংশ ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই এ অঞ্চলে আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণআন্দোলন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের ফলে আইয়ুব খানকে সরিয়ে যখন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নেন তখন তিনি নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু এই নির্বাচন ছিল শুধুই একটি বহিরাবরণ এবং এখানকার গণজোয়ারকে নষ্ট করার একটি কৌশল। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা নানা গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং এখানকার মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহা দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। তাই পশ্চিম পাকিস্তানিরা নানা ছক করছিল। প্রথমত, তারা সমস্যাটাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের চিন্তা করেছিল। এ জন্য তারা দলগুলোকে বিভাজনের চিন্তা করে। তাদের অনুগতদের দিয়ে পাকিস্তানবিরোধীদের একটি তালিকা প্রণয়নের চেষ্টা করে। সেই তালিকায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যাঁরা অংশ নেন তাদের থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় যাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন তাঁদের চিহ্নিত করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ করে তখন তাদের ওপর নির্দেশ ছিল স্থানীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষকদের তালিকা তাদের কাছে প্রেরণ করার।

এই প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চের রাতে গণহত্যার একটি অংশ ছিল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বাহিনীর প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজ। এই তাজ ২৪ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ছিলেন। চট্টগ্রামে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে যেসব বাঙালি সেনা অফিসার ছিলেন তাঁদের ২৫ মার্চ রাতেই হত্যা করেন। তিনি বা তাঁর নির্দেশে সে রাতে প্রায় ৮০০ বাঙালি সেনা সদস্যকে হত্যা করা হয়। এরপর সে রাতেই তিনি চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় এসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ চালান। ২৬ মার্চ ভোরে তিনি জগন্নাথ হলে আসেন। জগন্নাথ হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশনা দেন কোন কোন শিক্ষককে হত্যা করা হবে। সেই শহীদ শিক্ষকদের একজন ছিলেন অধ্যাপক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব। যাঁকে আমি এবং আমার ভাই শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম, আমরা ২৭ তারিখে উদ্ধার করার চেষ্টা করি। ঘটনাটি আমি অত্যন্ত ভালোভাবে জানি, কারণ ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবের পালিত কন্যা ছিলেন আমার খালা। তিনি এবং পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকজনের সাক্ষ্য থেকে আমরা জানতে পারি, এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনোভাবেই তাত্ক্ষণিক ছিল না। এগুলো সবই ‘ভেরি মাচ টার্গেট কিলিং’।

নানা সাক্ষ্য এবং পরে আরো তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজ। আর তাজকে যিনি ওপর থেকে পরিচালনা করেছিলেন তিনি হলেন ব্রিগেডিয়ার জাহান জেড আরবার। এই আরবার ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সার্বিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি দেখছিলেন জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাও ফরমান আলী। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই এমন টার্গেট কিলিং হয়েছে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। গভর্নর হাউসে তাঁর একটি ডায়েরি পাওয়া গিয়েছিল। সেই ডায়েরির মধ্যে বিভিন্ন অধ্যাপকের নাম এবং নামের পাশে চিহ্ন দেওয়া ছিল। সেখানে অধ্যাপক ছাড়াও কিছু সাংবাদিক, চিকিৎসক ছিলেন। এটি সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা ছিল জেনারেল রাও ফরমান আলীর। আর রাও ফরমান আলী এসব করেছেন আরো সুপিরিয়র কমান্ডের নির্দেশে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড প্রথম দিকে পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা কার্যকর করেন। পরে তাঁরা একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’ করেন, সেই কিলিং স্কোয়াডে কাজ করেছে আলবদর বাহিনী। কিন্তু আমরা ধারণা করেছি, বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাঁদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল তাঁরা মূলত বাম ঘরানার এবং তাঁরা দেশকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। এছাড়া যাঁরা এই দেশকে আমেরিকাবিরোধী লবির দিকে নিতে পারেন তাঁদেরই বিশেষ করে টার্গেট করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনীর সহযোগিতা ছিল। সে সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যউপাত্ত আমার কাছে আছে। এখানে সরাসরি দুজন কাজ করেছেন, তাঁদের একজনের নাম আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তিনি একাত্তরের জুনজুলাইয়ের দিকে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন, তাঁর নাম মি. ডুইপ।

বুদ্ধিজীবী হত্যার শেষ সময়টা শুরু হয় নভেম্বর মাসে দুজন ডাক্তারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তাঁরা হলেন ডা. আজহার ও ডা. হুমায়ুন। এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন জামায়াতে ইসলামীর একজন ডাক্তার, যিনি বদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ছিল শেষ টার্গেট। এ দুই দিন যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছিল সেই শহীদদের রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুরের আমবাগান, বাঙলা কলেজ, মিরপুর ৬ নম্বর, জল্লাদখানাসহ প্রায় ২০টি বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল মৌলবাদী শক্তিকে বিকশিত করা। যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আমাদের বিকাশ হয়েছিল আজ যখন তা নানা অপচেষ্টায় আটকে গেছে তখন মনে হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাটা সফল হয়েছে।

লেখক : আহ্বায়ক, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

৩ বছরেও ফেরানো যায়নি মঈনুদ্দীনআশরাফকে, দণ্ড কার্যকর অনিশ্চিত

moinudin-ashrafuzzamanউদিসা ইসলাম : একাত্তরে স্বাধীনতার ঠিক আগে বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে দেশ মেধাশূন্য করার নীলনকশা বাস্তবয়নকারী চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও,বিদেশে অবস্থান করায় তাদের দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানেরা বলছেন, দুই সাজাপ্রাপ্তকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে শক্ত উদ্যোগ নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই আবারও একটি আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা। আর প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা বলছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি এবং পলাতক আসামিদের জন্য গড়ে তোলা সেলএর মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার উদ্যোগ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে পলাতক আশরাফুজ্জামান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে, আর মঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। এই দুই আসামির অপরাধ ও সর্বোচ্চ সাজা হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য জানার পরও তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। তেমনি,বিভিন্ন দেশে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেল গঠনের পরও কাউকেই ফেরানো সম্ভব হয়নি। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতার ঢিলেমিকে দুষছেন কেউ কেউ।

আর এর সুযোগ নিয়ে আশরাফুজ্জামান খান গণমাধ্যমের মুখোমুখি না হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালীন সময়ে, কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন আলজাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে চৌধুরী মঈনুদ্দীন বলেছিলেন, ‘তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হবেন না।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল একটি কৌতুক। তারা একটি সাজানো বিচার করছে।’

বিজয়ের ঠিক আগে ১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ আলবদর বাহিনীর ‘চিফ এক্সিকিউটর’ ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান। আর চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ছিলেন সেই পরিকল্পনার ‘অপারেশন ইনচার্জ’। রায়ে বলা হয়, ‘আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীন যে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত ছিলেন, তা প্রসিকিউশনের তথ্যপ্রমাণে বেরিয়ে এসেছে।তারা কখনও নিজেরা হত্যায় অংশ নিয়েছে। কখনও জোরালো সমর্থন দিয়েছে ও উৎসাহ যুগিয়েছে।’ সে সময় আলবদর বাহিনীর ওপর ইসলামী ছাত্র সংঘের এই দুই নেতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

এই দুর্ধর্ষ দুই আসামিকে ফিরিয়ে আনতে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার উল্লেখ করে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তাদের ঔদ্ধত্য দেখে আসছি। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া আসামিদের কেন ফিরিয়ে আনা যাবে না, এনিয়ে দেশে বিদেশে মুক্তিযুদ্ধমনা যারা আছেন, সবার সম্মিলিত একটি আন্দোলনের ডাক আসা জরুরি।’

শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নূসরাত রাব্বী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এতদূর থেকে গিয়েছি বিচারে সাক্ষ্য দেবো বলে। যে দুই লোক দেশকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দিতে চেয়েছিল, তাদের দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে না, এটা খুবই হতাশাজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বিচার কার্যকর করতে দুইদেশের সরকারের মধ্যে একটি কমনআণ্ডারস্ট্যান্ডিং দরকার। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে উদ্যোগী করে তুলতে আমাদের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টির একটা আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সেল গঠন করেছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সেলের সদস্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা বলাবাহুল্য এই অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প নেই।’

এই মামলার প্রসিকিউটর শাহেদুর রহমান বলেন, ‘এই মামলাটি পরিচালনা সবচেয়ে কঠিন ছিল। আমাদের কাছে দালিলিক তথ্যপ্রমাণ ছিল, কিন্তু সেগুলো গুছিয়ে এনে উপস্থাপন করা সহজ ছিল না। আমরা সাজা নিশ্চিত করতে পেরেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামিদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী উদ্যোগ নেবে সেটি তাদের বিষয়। কিন্তু এরজন্য লেগে থাকার বিকল্প নেই।’

অবশেষে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদারকি সেল গঠন করে। এই সেলের অন্যতম সদস্য তদন্ত সংস্থার সিনিয়র তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সেল থেকে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও পরিস্থিতি যা, তাতে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না।’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

‘সুলতান সুলেমান’ নিয়ে গোলাম মাওলা রনি’র ভাবোচ্ছ্বাস !

ডিসেম্বর 12, 2016 মন্তব্য দিন

sultan-suleman-still-4জামাতশিবিরের অর্থায়নে প্রকাশিত দৈনিক নয়াদিগন্তে গোলাম মাওলারা সুলতান সুলেমান টিভি সিরিয়ালে চৌম্বক শক্তি আবিষ্কার করেছেন তার ভাষায় – “নাটকটিতে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক উপাখ্যান, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদবকায়দার প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি। রয়েছে নির্মল বিনোদন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জীবনধর্মী আরো অনেক বিষয়, যা দর্শকদের চৌম্বক শক্তির মতো টানতে থাকে। এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেগাসিরিয়াল থেকে আমাদের যেমন অনেক কিছু শেখার রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যও রয়েছে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ।সুলতান সুলেমান নিয়ে মাওলা বাবার এহেন মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায় তার রুচি জ্ঞানের বহর ! আজ দৈনিক যুগান্তর সুলতান সুলেমান নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে যা পড়লে এই টিভি সিরিয়াল দেখা থেকে বিরত থাকা উত্তম বলে মনে হবে । আমার পরের পোষ্টে যুগান্তরের প্রতিবেদনটি হুবহু উপস্থাপন করলাম পাঠকদের সুবিধার্থে ।

তুরস্ক ও এরদোগানের অন্ধ সমর্থক জামাতশিবির কর্মীরা বাংলাদেশের মানুষের ভেতর তুরস্কপ্রীতি জাগৃতিকরণে এই টিভি সিরিয়াল দেখার জন্য উৎসাহ যোগাবে তাতে সন্দেহ নেই যদিও এদের নেতাকর্মীদের জন্য এই সিরিয়াল দেখা শরীয়াহসম্মত হবে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চুপতা অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে !

আহলান! ওয়া সাহলান! ইয়া সুলতান সুলেমান!

sultan-suleman-actressগোলাম মাওলা রনি : বাংলাদেশের সর্বস্তরের টেলিভিশন দর্শকদের পক্ষ থেকে তুর্কি সুলতান সুলেমানকে স্বাগত জানাচ্ছি। সুলতান যখন আরব মুল্লুকে যেতেন, তখন রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা শাসক সুলেমান দ্য গ্রেট বা সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টকে আহলান! ওয়া সাহলান অর্থাৎ আমাদের গৃহে স্বাগতম বলে অভ্যর্থনা জানাতেন। হাজার হাজার সৈন্যের কুচকাওয়াজ, নহবতের সুরলহরী এবং কৃতজ্ঞ জনগণের হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে এগোতে গিয়ে মহামতি সুলেমান তার সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের হৃদয়ে কতটুকু আনন্দ সঞ্চারিত করতে পারতেন তা বলা না গেলেও তার মৃত্যুর ৪৫০ বছর পর তাকে নিয়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে যা হচ্ছে তা যদি তিনি জানতেন, তবে নিশ্চয়ই অতি মাত্রায় বিমুগ্ধ ও আনন্দিত হতেন।

তুর্কি অটোমান সালতানাতের গর্ব এবং ইসলামি তাহজিব তমদ্দুন ও কানুনের অন্যতম প্রধান রত্ন মহামতি সুলতান সুলেমানের রাজত্বকাল ছিল ৪৬ বছর। আধুনিক তুরস্ক, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার বৃহদংশ, পুরো মধ্যপ্রাচ্য, ইরানের কিয়দংশ, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, আলবেনিয়াসহ বলকান অঞ্চল এবং রোডসসহ পুরো ভূমধ্যসাগরে তার ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড তার অধীনতা মেনে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। অস্ট্রিয়া, ইতালি, এমনকি জার্মানি মূলত তার ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকত। পারস্য সম্রাট তাহমাউসপের সাথে সুলতানের বিরোধ ছিল বটে। কিন্তু সম্মুখ সমরে তিনি কোনো দিন সুলতানের মুখোমুখি হননি সব সময় পালিয়ে গেছেন নতুবা এড়িয়ে গেছেন। ফলে তৎকালীন দুনিয়ার একমাত্র সুপারপাওয়ার অটোমান সাম্রাজ্যের তলোয়ার, ঘোড়ার খুরের আওয়াজ এবং কামানের গোলার সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো বীর ধরাভূমে ছিলেন না।

সুলতান সুলেমানের জীবদ্দশায় সুবেবাংলা অথবা দিল্লি সালতানাত কেমন ছিল, তা ইতিহাসের পাঠকেরা খুব ভালো করেই জানেন। সুলতান যদি ভারতবর্ষে আসতেন তবে আমাদের রাজাবাদশাহ, নওয়াব এবং জঙ্গবাহাদুরেরা কী করতেন, জানি না। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে যারা সুলতান সুলেমানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন তাদের কথাবার্তা, দাবিদাওয়া ও আবদারগুলো জনমনে ভারী কৌতূহলসংবলিত কৌতুকের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির কোনো নেতানেত্রী কিন্তু এই সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন একদল অভিনেতাঅভিনেত্রী ও কলাকুশলী। তারা দলবেঁধে গলা ফাটিয়ে আপত্তি সংবলিত আবদার জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কোনো বিদেশী সিরিয়ালের বাংলা ডাবিং, অর্থাৎ বাংলায় রূপান্তরিত সংলাপসহ সম্প্রচার করা যাবে না।

sultan-suleman-still-2বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের নাটকে রঙতামাশা, হাস্যরস ও কৌতুকাভিনয়ে বলতে গেলে দুর্ভিক্ষ লেগেছিল অথবা ওলাওঠা বিবির অভিশাপে মড়ক লেগেছিল। এক সময়ের খান জয়নুল, হাবা হাসমত, আলতাফ, টেলিসামাদ, রবিউল, আনিস প্রমুখের অনবদ্য অভিনয় এবং লোক হাসানোর প্রকৃতি প্রদত্ত গুণাবলির বদলে ইদানীংকালের জোর করে হাসানোর কাতুকুতু মার্কা সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গি দেখে দর্শকদের রুচি যখন বিচ্যুতির প্রান্তসীমায় পৌঁছে গিয়েছিল, তখন একশ্রেণীর দর্শক বেঁচে থাকার তাগিদে ভারতীয় চ্যানেলের ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে পড়েন এবং অন্য শ্রেণীর দর্শকেরা টেলিভিশন দেখাই ছেড়ে দিলেন।

ভারতীয় চ্যানেলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যে ও দৌরাত্ম্যে আমাদের সাহিত্যসংস্কৃতি, সমাজসংসার ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। হত্যা, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ব্যাংক লুট, লোক ঠকানো, মিথ্যাচার প্রভৃতি কবিরাহ গুনাহ রীতিমতো শৈল্পিক মর্যাদা পেয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে প্রচারিত হচ্ছে, যার মরণনেশায় পড়ে স্ত্রী স্বামীকে ত্যাগ করছে, স্বামী স্ত্রীকে মেরে ফেলছে। মা তার শিশুসন্তানকে মেরে ফেলছে টিভি সিরিয়াল দেখার সময় কান্না করার অপরাধে। অথবা স্ত্রী গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহনন করেছে এ কারণে যে, তার স্বামী তাকে টিভি সিরিয়াল দেখতে দেয়নি অথবা টিভি সিরিয়ালের এক নায়িকার মতো একটি জামা কিনে দেয়নি।

কতিপয় ভারতীয় চ্যানেলের কিছু অনুষ্ঠানের নেশা ভয়াল মাদক ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, মারিজুয়ানা, গাঁজা ইত্যাদির চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ব্যভিচার, পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা, ধর্ষণ, পরকীয়া, অবাধ যৌনাচার, অসম দৈহিক সম্পর্ক, অনৈতিক কিংবা অকল্পনীয় সম্পর্কগুলো প্রকাশ্যে এবং অবাধে এমনভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে, যা দেখে মানবিকতা আর অমানবিকতা, মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব একাকার হয়ে নারকীয় রূপ ধারণ করছে। বাবার ষাট বছর বয়সী বন্ধুর সাথে স্কুলপড়ুয়া কিশোরী কন্যার যৌনতা, সন্তানের চেয়েও কম বয়সী ছেলেদের সাথে ষাটোর্ধ্ব মহিলার ব্যভিচার হিন্দি চ্যানেলের দর্শকদের কাছে ভাতমাছ হয়ে গেছে। পূতপবিত্র পারিবারিক সম্পর্কের অনাদিকালের বিশুদ্ধতা ও নির্মলতাকে এক শ্রেণীর লম্পট কুলাঙ্গার এমনভাবে কলুষিত ও কলঙ্কিত করে তুলছে, যা প্রকাশ করার মতো রুচি এই নিবন্ধকারের নেই। আইয়ামে জাহেলিয়াতের জঘন্য যুগেও যেসব সম্পর্ককে পবিত্র ও বিশুদ্ধ মনে করা হতো, সেগুলোর মূলেও জ্ঞানপাপী নরাধমরা একের পর এক আঘাত হেনে চলেছে।

ভারতীয় সিরিয়ালগুলো আমাদের নীতিনৈতিকতা এবং মনমানসিকতার স্তর কতটা নিচে নামিয়ে ফেলেছে তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ঢাকার এক মধ্যবিত্ত দম্পতির ছয় বছরের ফুটফুটে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। স্বামীর বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের মতো আর স্ত্রী ত্রিশ। দুজনেই কথিত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং দেখতে উভয়েই বেশ সুন্দর। তারা প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন এবং বিবাহিত জীবনে মোটামুটি দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখেন। হঠাৎ তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক সমস্যা দেখা দিলো। এক রাতে স্ত্রী ঘুম থেকে জেগে দেখলেন স্বামী বিছানায় নেই। তিনি চুপি চুপি ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখলেন স্বামী হিন্দি সিরিয়াল দেখছেন এবং অত্যন্ত গর্হিত একটি অপকর্ম করছেন। লজ্জায় স্ত্রী কিছু বলতে পারলেন না। তিনি শোয়ার ঘরে ফিরে শিশু সন্তানটিকে জড়িয়ে ধরে বহুক্ষণ কাঁদলেন। পরের দিন রাগ করে বাবার বাড়ি চলে এলেন। স্ত্রীর ধারণা, তার স্বামীর মানসিকতা এমন পর্যায়ে বিকৃত হয়েছে যে, তার পক্ষে শিশু সন্তানকেও ধর্ষণ করা অসম্ভব নয়। অতএব, বিচ্ছেদ।

নাটক, সিনেমা, রিয়েলিটি শো, গেম শোর পাশাপাশি নৃত্য প্রতিযোগিতার নামে যা দেখানো হয় তা অশ্লীলতা ও নোংরামির মাত্রা অতিক্রম করে চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সাতআট বছরের বালকবালিকা বা তেরোচৌদ্দ বছরের কিশোরকিশোরীদের নৃত্য প্রতিযোগিতায় যে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেখানো হয় তা শৈল্পিক বিচারে কোনোমতেই নৃত্য হতে পারে না। বিকৃত মানসিকতা সৃষ্টি এবং একটি প্রজন্মকে নষ্ট করার সুগভীর চক্রান্ত ছাড়া ওসব বেহায়াপনার অন্য কোনো মূল্য রয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

sultan-suleman-still-5বাংলাদেশের সুলতান সুলেমানবিরোধীরা কোনো দিন কোনোকালে ভারতীয় অপসংস্কৃতির ভয়াবহ আগ্রাসন এবং বেলাগাম বিস্তার রোধে রাস্তায় নেমেছিলেন, এমন কথা কেউ কোনো দিন শোনেননি। বরং তাদের মধ্যে অনেকে ভারতীয় চ্যানেলের বিভিন্ন সিরিয়াল এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান নকল করে দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে প্রচার করছিলেন, যা দেখে সুস্থ সবল মানুষের দৈহিক ও মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে নামতে পারে তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠানের মানের অধোগতি এবং ভারতীয় চ্যানেলগুলোর নেশাময় বিকৃত অনুষ্ঠানমালার কারণে দর্শকেরা যখন হতাশার প্রান্তসীমায়, ঠিক সেই সময়ে দেশীয় একটি অটোমান সুলতান সুলেমানের জীবনের ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত কাহিনীনির্ভর মেগাসিরিয়াল বাংলায় অনুবাদ করে সম্প্রচার করে যাচ্ছে।

সুলতান সুলেমান বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত দশ বছরে যারা টিভি দেখেননি তারাও কাজকর্ম ফেলে বাংলায় ভাষান্তরিত সিরিয়াল দেখার জন্য যথাসময়ে টিভির সামনে হাজির হয়ে যান। পুরো পরিবার নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে টিভি দেখার, বিশেষ করে মাসের পর মাস ধরে একই আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগের ঐতিহ্য এ সমাজে খুব কমই দেখা গেছে। ধারাবাহিক নাটকটির নির্মাণশৈলী, সাজসজ্জা, অভিনেতাঅভিনেত্রীদের অনবদ্য অভিনয়, কাহিনী, সংলাপ এবং মঞ্চায়নের নিখুঁত মুনশিয়ানার কারণে দর্শকেরা নাটকটির প্রতিটি পর্ব দেখার সময় মনোজগতের ডানায় ভর করে চলে যান মহামতি সুলেমানের শাসনামলে। তার হেরেমে, রাজপ্রাসাদে অথবা অটোমান যুগের পথপ্রান্তর, রাস্তাঘাট, হাটবাজার কিংবা দরবার ও আদালতে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, তুরস্কে নির্মিত সুলতান সুলেমাননামক টিভি সিরিয়ালটি সারা দুনিয়ায় এযাবৎকালে নির্মিত মেগা সিরিয়ালগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের দর্শকপ্রিয়তা যোগ করলে এটি এক নম্বরে পৌঁছে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাটকটিতে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক উপাখ্যান, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদবকায়দার প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি। রয়েছে নির্মল বিনোদন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জীবনধর্মী আরো অনেক বিষয়, যা দর্শকদের চৌম্বক শক্তির মতো টানতে থাকে। এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেগাসিরিয়াল থেকে আমাদের যেমন অনেক কিছু শেখার রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যও রয়েছে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ।

বাংলাদেশের অভিনেতাঅভিনেত্রী, প্রযোজকপরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীরা কেন সুলতান সুলেমানের মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক বন্ধের জন্য রাজপথে নেমেছেন, তা বোধগম্য নয়। তবে দেশের জনগণ যে তাদের নিজ নিজ গৃহে সম্মানিত মেহমান হিসেবে সুলতান সুলেমান নাটকের পাত্রপাত্রীদের বরণ করে নিয়েছেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের অভিনেতাঅভিনেত্রীরা জনগণের সেই ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে যত তাড়াতাড়ি নিজেদের সংশোধন করে নেবেন, ততই সবার জন্য মঙ্গল।

টেলিভিশন নাটক নিয়ে পুরো মিডিয়াপাড়ায় যে তেলেসমাতি চলছে, তা বন্ধ না করে ডাবিং করা সিরিয়াল বন্ধের দাবির আওয়াজ ধোপে টিকবে না। অতীব নিম্নমানের নাটক নির্মিত হচ্ছে। অন্য দিকে পুরো মিডিয়া জগতের বিনোদন ক্ষেত্রটি স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে। মাত্র এক থেকে দেড় লাখ টাকা দেয়া হয় একটি নাটক নির্মাণের জন্য। ঈদের বিশেষ নাটকের বাজেট দুই লাখ থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকার মধ্যে। এই স্বল্প বাজেটের সাথে সামাল দেয়ার জন্য পুরো নাটকপাড়া এবং শুটিং স্পটগুলোতে যে কী হয় তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই বলতে পারেন। নির্মিত নাটকগুলো কথিত সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়া প্রচারিত হয় না। পরিস্থিতি এতটাই অবনতির দিকে গেছে যে, ওই সিন্ডিকেট নাটকের নায়কনায়িকাসহ প্রধান পাত্রপাত্রীদের পর্যন্ত মনোনীত করে দেয়।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবর ও টকশোর অনুষ্ঠানগুলোর মান এখন আর কোনো মানদণ্ডে নেই। একটু শিক্ষিত ও সজ্জনরা বিবিসি, আলজাজিরা, সিএনএন, ফক্স নিউজ, ভারতের এনডিটিভি দেখেন। অনেকে আবার বিটিভির খবরের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। করপোরেট হাউজের মালিকানাধীন চ্যানেলগুলো নিজ নিজ মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী সব কিছু পরিচালনা করে থাকে। নাটকের চেয়েও বিশ্রী অবস্থার মধ্যে পড়েছে টকশোর অনুষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রেও বহু অভিযোগ শোনা যায়। শত অভিযোগের বিপরীতে রূঢ় বাস্তবতা হলো, টকশোর নামে যা দেখানোর চেষ্টা করা হয় তা আসলে কেউ দেখে না। কারণ ওগুলো আসলে দেখা যায় নাএমনকি দেখা উচিতও নয়।

আমার ধারণা, কোনো টিভি চ্যানেল যদি বিখ্যাত ল্যারি কিং লাইভ, ক্রিস্টিনা আমানপোর, বিবিসি হার্ড টক, সিমি গাড়োয়াল, কফি উইথ করণ, রজত শর্মার আপ কি আদালত ইত্যাদি সাড়া জাগানো বিদেশী টকশোগুলোর বাংলা ডাব প্রচার আরম্ভ করে, সেগুলো সুলতান সুলেমানের তুলনায় কম জনপ্রিয়তা পাবে না। আমরা এর আগে সাড়া জাগানো কিছু ইরানি ছবি, অস্কারপ্রাপ্ত ইংরেজি ছবিসহ নামকরা বিদেশী ছবি বাংলা ডাব অথবা বাংলা সাব টাইটেলসহ বিভিন্ন টিভিতে প্রচার হতে দেখেছি। ছবিগুলোর মান, শৈল্পিক আবেদন এবং বিনোদন কোনো দর্শকই ভুলতে পারেননি। সাউন্ড অব মিউজিক, দি মেসেজ, দি মেসেঞ্জার, স্বর্গীয় শিশু, বৃদ্ধাশ্রম প্রভৃতি শিল্পসম্মত ছবি থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি ওগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হয় তাহলে আর যাই হোক, লাভ হবে না।

সূত্রঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬

কী ভীষণ [সাংস্কৃতিক] আগ্রাসন!

ডিসেম্বর 12, 2016 মন্তব্য দিন

হানিফ সংকেত : বিশ্বায়ন বা মুক্ত অর্থনীতির যুগে আমরা অর্থনীতির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে আগ্রাসনের শিকার হচ্ছি তা হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। বিশেষ করে এই আগ্রাসন ঘটছে পরিবারগুলোতে। কৃত্রিম মোহে ভেঙে যাচ্ছে অনেক সুখের সংসার। এসবের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত চাকচিক্যময় এক অদ্ভুত সামাজিক চালচিত্র। গ্রাস করার ত্রাস সৃষ্টিতে উদ্যত এসব বিদেশি সিরিয়াল সিরিয়াল কিলারের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ, এরা ধ্বংস করছে ঘরসংসারসামাজিকতা এবং আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।

যৌথ পরিবারের একটি গৌরবময় ঐতিহ্য আছে আমাদের। ২০১৪ সালের ৫ ডিসেম্বর বিটিভিতে ইত্যাদি একটি পর্ব প্রচারিত হয়। ওই পর্বে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার একটি গ্রামের একটি যৌথ পরিবারের ওপর প্রতিবেদন দেখানো হয়। ওই পরিবারের গৃহকর্তা আবদুর রহমান। বয়স ১০৪ বছর। তাঁর পাঁচ সন্তান। সবাই বিবাহিত। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৪০। ২৫ কক্ষবিশিষ্ট বিরাট বাড়ি। এই বাড়িতেই পরিবারের সবাই থাকেন। এই বিশাল কিন্তু সুখসচ্ছলতায় ভরা পরিবারটির প্রধান আয়ের উৎস মত্স্য খামার।

এই পরিবারের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, রহমান সাহেবের পুত্রবধূ এবং নাতিনাতনিরা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে আনন্দিত চিত্তে রান্নাবান্নার কাজ করেন। প্রতিনিয়তই মনে হয় তাঁরা যেন বনভোজনের আমেজে আছেন। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই পরিবারের কয়েকজন সদস্যের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বিদেশি চ্যানেলের প্রভাবে অনেক পরিবারেই ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এই কুপ্রভাব থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? তাঁদের সোজাসাপটা জবাব ছিল, ওই চ্যানেলগুলো বন্ধ কইরা দেওয়া উচিত। এভাবে চলতে থাকলে ওই সব চ্যানেলের প্রভাবে একসময় যৌথ পরিবারই দেখা যাবে না। সে জন্য আমরা ওই সব চ্যানেল দেখি না।

এই উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির যুগে তাদের চ্যানেল বন্ধ করার দাবি পূরণ করা হয়তো সম্ভব নয়, তবে আমাদের দেশে এসব চ্যানেল অবাধে প্রচারের ব্যাপারে যে উদার ও উন্মুক্ত নিয়মনীতি রয়েছে, সেগুলোকে বোধ করি রোধ করা সম্ভব। এসব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মিডিয়ায় অনেক আলাপআলোচনা, সভাসমাবেশ, গোলটেবিল বৈঠক, টক শো, সংহতি সমাবেশ, শিল্পী সমাবেশ, মামলামোকদ্দমাসহ নানা ঘটনা ঘটে গেছে।

ত্রিশালের ওই একান্নবর্তী পরিবারের মতোভিনদেশি সিরিয়ালের আগ্রাসন আর ভীতি থেকেইঅনেকের দাবি, ভিনদেশি এসব চ্যানেল বন্ধ হোক গত কয়েক দিনের মিডিয়াসংশ্লিষ্ট আন্দোলনেও অনেকের মুখে এই কথা উচ্চারিত হয়েছে। চ্যানেলের ক্ষেত্রে যখনই এই বন্ধ শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখনই বলা হয় উন্মুক্ত আকাশ। বিশ্বায়নের যুগে এই বন্ধ সংস্কৃতি ঠিক নয়। স্বভাবতই তখন প্রশ্ন ওঠে, ভারতও একটি গণতান্ত্রিক দেশ। সেখানে কেন বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যাবে না। আমরাই বা এত উদার কেন? ওরা না দেখালে আমাদের দেখাতে হবে কেন? বিষয়টি আরও জটিল হলো যখন জানা গেল, ভারতে আমাদের চ্যানেল চালাতে হলে পাঁচ কোটি রুপি দিতে হবে আর আমাদের এখানে ওই সব চ্যানেল চলছে মাত্র দেড় লাখ টাকায়। কী অসম বাণিজ্য! ডিসেম্বরের ৩ তারিখে হাঙ্গেরি থেকে ফিরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তিনি নিজেই এই অসম হার দেখে বিস্মিত হয়েছেন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেছেন।

আশা করি, আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো ভারতে প্রদর্শন এবং ভারতীয় চ্যানেলগুলোর বাংলাদেশের প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ বৈষম্য রয়েছে, সেটা দূর হবে এবং আমাদের শিল্পীকলাকুশলী ও টিভি চ্যানেলের মালিকেরা এ ব্যাপারে একটি সুফল পাবেন। চ্যানেল প্রদর্শনের এই অসম বাণিজ্যের সঙ্গে আর একটি মারাত্মক অপরাধমূলক বেআইনি বাণিজ্য ছিল বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিদেশি চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন প্রচার। মিডিয়া ইউনিটির আন্দোলনের কারণে এদের কর্মকাণ্ড সরকারের নজরে আসে। ২০০৬ সালে এ সম্পর্কিত স্পষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও বিগত ১০টি বছরেও এই অপরাধ কারও নজরে এল না কেন, এই প্রশ্নটি অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাহলে প্রতিটি বিষয়ই কি আন্দোলন করে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করতে হবে? তবে আশার কথা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপের ফলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই বিষয়টির সুরাহা হয়েছে। এই দুটি বিষয়ই মিডিয়া জগতের জন্য আশার খবর ও সুখবর। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে দুদক ও এনবিআর এই চক্রের সন্ধানে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ। মিডিয়ার একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে খুবই কষ্ট হয় যখন শুনি সরকারি পুরো বাজেটের মধ্যে মিডিয়ার জন্য বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। এই বাজেট দিয়ে মিডিয়ার কী কল্যাণ হবে? অনেকেই বলেন, আমাদের কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু দুর্বল, বাইরের কনটেন্ট ভালো। এই কথাটিও পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়। কনটেন্ট ভালো করার পেছনে বাজেটও একটি কনটেন্ট। সুলতান সুলেমানএর সুলতান সাহেবের পোশাকের যে বাজেট, আমাদের এখানে পুরো এক ঘণ্টার নাটকেরও সেই বাজেট নেই। অন্যান্য বিষয় তো রয়েছেই। তা ছাড়া, মিডিয়া সম্পর্কিত জ্ঞান লাভ কিংবা উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের দেশে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানও নেই। ডাবকৃত বিদেশি সিরিয়াল বন্ধের ব্যাপারে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্সের যৌক্তিক হার পুনর্নির্ধারণসহ শিল্পীকলাকুশলীদের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণেও কর্তৃপক্ষের আন্তরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

আর এই সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন সুষ্ঠু নীতিমালা। যে নীতি মালায় আবদ্ধ না থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ২০০৬ সালের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইনের মতো ফাইলের জন্য আইন না করে এর যথার্থ প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি চ্যানেলগুলোরও বিজ্ঞাপননির্ভরতা কমাতে হবে। সে জন্য রয়েছে অনেক পথ। এ ব্যাপারে পেচ্যানেলের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, শিল্প এবং শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আগে এই ক্ষেত্রটাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আমরা সেই আশ্বাসও পেয়েছি মিডিয়া ইউনিটির তৃতীয় সংহতি সভায় মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। সুতরাং এ কথা বলা যায়, মিডিয়ার সুদিন আসছে। কোনো অনৈতিক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি ও প্রতারণা মিডিয়ার এই অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দিতে পারবে না। আমাদের শিল্পসংস্কৃতিইতিহাসঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে মিডিয়া একটি বড় ভূমিকা রাখে। তাই টেলিভিশনশিল্পকে রক্ষার জন্য ভিনদেশি আগ্রাসন প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

এই দেশ আমাদের, এই মাটি আমাদের। আকাশ সংস্কৃতির এই উন্মুক্ত আগ্রাসনে পরাজিত হয়ে গা ভাসিয়ে দেবে পরধন লোভী পরাশ্রয়ী দুর্বলেরা। কিন্তু আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অনন্ত অক্ষয় সম্পদ এবং সামাজিকতা আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়। এই আত্মপরিচয়ের অহংকার আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন শিল্পীকলাকুশলীচ্যানেলের মালিকসবার সম্মিলিত উদ্যোগ ঐক্য। আসছে নতুন বছর। ভবিষ্যতে আমরা যাবতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা, বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ভুলে লালন করব দেশীয় সংস্কৃতিকে। সব আগ্রাসনকে দূরে ঠেলে দিয়ে দেশকে ভালোবেসে, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারায় জেগে উঠব আমরা নিরন্তর।

হানিফ সংকেত: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস ২০১৬

ডিসেম্বর 11, 2016 মন্তব্য দিন

mountain-artistsworld-mountain-day-2016world-mountain-day-2016-sm

সিন্ধু সভ্যতা লোকসমাজ ও শিল্পকর্ম

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

indus-civilisationসুদীপ্ত সালাম : নতুনপুরাতন কোনো প্রস্তর যুগেই সভ্যতা গড়ে ওঠেনি। তার প্রধান কারণ সে সময় মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরি হয়নি। সংগঠিত হওয়ার মতো অবস্থাও হয়তো ছিল না। তখন বিচ্ছিন্নতাই ছিল নিয়তি। বরফ যুগের বরফ গলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষে মানুষে যে বিচ্ছিন্নতা তাও উবে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে শুরু হয় সভ্যতার গোড়াপত্তনপ্রধানত এশিয়া ও ইউরোপে।

মানুষে মানুষে মূল্যবান সম্বন্ধকে রবীন্দ্রনাথ যথার্থ সভ্যতা বলে মনে করতেন। আর এই ভারতবর্ষে তিনি সেই যথার্থ সভ্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রভেদের মধ্যে ঐক্যস্থাপন করা, নানা পথকে একই লক্ষ্যের অভিমুখীন করিয়া দেয়া এবং বহুর মধ্যে এককে নিঃসংশয়রূপে অন্তররূপে উপলব্ধি করাবাইরে যে সব পার্থক্য প্রতীয়মান হয় তাকে নষ্ট না করে তার ভিতরকার নিগূঢ় যোগকে অধিকার করাকে তিনি ভারতবর্ষের প্রধান সার্থকতা মনে করতেন। ভারত উপমহাদেশ ইতিহাসের ঊষালগ্নেও আমরা এ কথার সত্যতা খুঁজে পাই।

আমরা জানি, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের শেকড় সিন্ধুসভ্যতায় গিয়ে ঠেকেছে। কমপক্ষে ৩ হাজার খ্রিস্টপূর্বে সিন্ধু নদের অববাহিকায় এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। আনুমানিক ২ হাজার ৩শ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তা পূর্ণতা লাভ করে। আর এই সভ্যতার স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় দেড় হাজার বছর।

১৯২২২৩ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মোন্টগোমেরী জেলার হরপ্পা নামক গ্রামে সিন্ধুসভ্যতার একটি নগর এবং সিন্ধু প্রদেশের লরকানা শহরে মহেঞ্জোদাড়ো নগর আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, সিন্ধুসভ্যতা উত্তর থেকে দক্ষিণে ১ হাজার ১শ কিলোমিটার এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে দেড় হাজার কিলোমিটার ভূখণ্ড নিয়ে বিস্তৃত ছিল। এ যাবৎ ৮০টিরও বেশি স্থানে এই সভ্যতার চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এই সভ্যতার শিল্পকর্মকে বুঝতে হলে এই নিদর্শনগুলো জানা জরুরি। সিন্ধুসভ্যতার নগর ব্যবস্থাপনা আমাদের অনেক তথ্য সরবরাহ করেছে। হরপ্পা শহরটি ২৫০ একর স্থান নিয়ে গঠিত। অনেক গবেষক মনে করেন এর বিস্তৃতি ৪৯৫ একর পর্যন্ত। হরপ্পার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার এবং মহেঞ্জোদাড়ো নগরের জনসংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখের মতো ছিল বলে গবেষকরা মনে করেন। উভয় শহরই ২০ ফুট উঁচু কাঁচা ইটের ভিত্তির ওপর নির্মিত। আকস্মিকভাবে এখানে বসতি স্থাপন করা হয়নি। দুটো শহরেরই পশ্চিম দিকে নগরদুর্গ (citadel) ছিল। প্রশাসনিক ভবনগুলো দুর্গের ভেতরে স্থাপন করা হয়। নগরদুর্গের নিচে ছিল সাধারণ মানুষের বসতি তথা শহর। রাস্তা ও অলিগলি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। মহেঞ্জোদাড়োতে ৯ ফুট থেকে ৩৪ ফুট পর্যন্ত চওড়া রাস্তা আবিষ্কৃত হয়েছে। রাস্তার দুপাশে সরকারি বেসরকারি ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। ঘরবাড়িগুলো এক লাইনে সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়। ভবনের আকৃতি দেখে নাগরিকদের শ্রেণীবিন্যাস অনুমান করা যায়। দুকক্ষবিশিষ্ট ভবন যেমন ছিল তেমনি বহু কক্ষবিশিষ্ট প্রাসাদ ভবনেরও নিদর্শন মিলেছে। কোনো কোনো ভবন দোতলাবিশিষ্ট, কোনো ভবন তার চেয়েও উঁচু ছিল। প্রতিটি ভবনেই স্নানাগার, কূপ, আঙ্গিনা ইত্যাদি ছিল। হরপ্পায় একটি শস্যভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি দৈর্ঘ্যে ১৬৯ এবং প্রস্থে ১৩৫ ফুট ছিল। ধারণা করা হয়, বন্যার হাত থেকে শস্যভাণ্ডার রক্ষা করতে উঁচু বেদির ওপর তা স্থাপন করা হয়। মহেঞ্জোদাড়োতে ৮৫ প্রস্থ এবং ৯৭ ফুট দৈর্ঘ্য আয়তনের একটি বৃহৎ ভবনের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। চারকোণা স্তম্ভ ও বিশাল কক্ষবিশিষ্ট একটি বড় ভবনের ভগ্নাংশও আবিষ্কৃত হয়েছে। আরও পাওয়া যায় একটি বিশাল আকৃতির স্নানাগার (ঞযব ৎেবধঃ ইধঃয) এটি দৈর্ঘ্যে ১২ মিটার, প্রস্থে ৭ মিটার এবং এর গভীরতা আড়াই মিটার। শহর দুটির ঘরবাড়ি, রাস্তা, কূপ, নর্দমা ও অন্যান্য ভবন পোড়া ইট দিয়ে বানানো হয়েছিল।

শহরগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আমাদের বিস্মিত করে। পানি নিষ্কাশনের জন্য রাস্তার নিচে নর্দমা তৈরি করা হয়েছিল। নোংরা পানির সঙ্গে যে সব আবর্জনা যায় সেগুলো আটকাতে নর্দমার বিভিন্ন স্থানে গর্ত রাখা হয়েছে।

বর্তমান শহুরে মানুষের মনোজগৎ ইটপাথরের মতোই রুক্ষ ও প্রাণহীন। একই বাড়িতে থাকি কিন্তু এক ঘর আরেক ঘরের খবর রাখে না। ফলে এখানকার সমাজ ব্যবস্থা ভঙ্গুর ও অস্থির। অথচ গ্রামগুলো টিকে আছে। মানুষে মানুষে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন এই টিকে থাকার প্রধান নিয়ামক। সিন্ধুসভ্যতার নগর ব্যবস্থা দেখে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি, সিন্ধুবাসীরা শৃংখলাবদ্ধ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিল। জনসাধারণের মধ্যে অনৈক্য থাকলে নগর ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনার সুপরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না। ভেদাভেদ প্রকোট থাকলে অনেক লোকের জন্য বিশাল কিন্তু সাধারণ (common) স্নানাগার নির্মাণ করা যেত না। আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি এই সভ্যতায় শস্যভাণ্ডার ছিল। এ থেকে বুঝা যায় চাহিদার বেশি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হতো। কেন না কৃষি কাজের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ছিল। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আরও ছিল সিন্ধু, ইরাবতী, শতদ্রু, ভোগভো প্রভৃতি নদী। বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিতে এবং জ্বালানির চাহিদা মেটাতে কাঠের জন্য বেশি দূরে যেতে হতো না বলে অনেকে মনে করেন। কারণ সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলেই পর্যাপ্ত গাছ ছিল বলে ধারণা করা যায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য এবং সমাজে স্থিতিশীলতা না থাকলে এত অগ্রসর ও সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারতো না।

তবে তাদের নগর ব্যবস্থা যতই শহুরে হোক না কেন তারা যে মানসিক দিক থেকে গ্রামীণ তার প্রমাণ রয়েছে। তাদের পুরো অর্থনীতি কৃষি ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করতো। ফলে নগরবাসী হলেও তাদের সংস্কৃতি ও শিল্পকলা লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর।

সিন্ধুসভ্যতায় কোনো মন্দির বা উপাসনালয়ের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ভাস্কর্য, পুতুল ও সিলমোহর দেখে অনুমান করা যায় যে, সিন্ধুবাসীরা প্রকৃতি পূজক ছিল। গাছ, পশুপাখি, আগুন, জল প্রভৃতির পূজা করত। তিন শিং বিশিষ্ট এক দেবতার প্রতিকৃতি সংবলিত সিলমোহর পাওয়া গেছে। তার চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন পশুর অবস্থান। অনেক গবেষক মনে করেন, সিন্ধুবাসীরা এই দেবতার পূজা করত। এই দেবতাই পরবর্তীকালে হিন্দুদের মহাদেব বা পশুপতি হিসেবে পরিপূর্ণতা পেয়েছে বলে অনেকে মত দিয়েছেন। আমরা জানি শিব হল নিচু শ্রেণীর (প্রধানত কৃষিজীবী) মানুষের ত্রাণকর্তা। সিন্ধুসভ্যতার সেই ত্রয়ীশিং বিশিষ্ট দেবতাই যদি শিবের পূর্বসূরি হয়ে থাকে তাহলেও আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সিন্ধুবাসীরা বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল না। তাদের দৃষ্টি ছিল ভূমিসংলগ্ন। এ থেকেও আমরা বলতে পারি সিন্ধুবাসীদের আচারপ্রথা ছিল লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর।

শান্তিপ্রিয় লোকসমাজের মানুষের মানসিকতার ছাপ তাদের শিল্পকর্মেও লক্ষ্য করি। সিন্ধুসভ্যতা থেকে প্রধানত চার প্রকার শিল্পকর্মের নিদর্শন পাই। ভাস্কর্য, তৈজসপত্র, সিলমোহর ও অলংকার। ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে মহেঞ্জোদাড়ো থেকে পাওয়া নকশাখচিত পুরোহিত রাজার চুনাপাথরের আবক্ষ মূর্তি। এটি ১৭ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার লম্বা। তার চোখ আধো খোলা, মুখে সৌম্য ও প্রজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট। এই রাজা যুদ্ধজয়ের গর্বে গৌরবান্বিত নয়, শিল্পী তাকে মহান করারও চেষ্টা করেননি। এই আবক্ষ মূর্তির ব্যক্তিত্বকে শান্তিপ্রিয় লোকসমাজেরই প্রতিনিধি বলে মনে হয়।

ভাস্কর্য হিসেবে আরও রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্য ভঙ্গিতে নগ্ন নারী মূর্তি। মাত্র ১১ সেন্টিমিটার লম্বা এই ভাস্কর্যটি বেশকিছু তথ্য দেয়। মূর্তির সাজসজ্জা আছে, হাতে অনেক চুড়ি আছে, গলায় মাদুলি, হাতের উপরের অংশে আছে বাজুবন্ধ কিন্তু বিলাসিতার ছাপ নেই। রাজকীয় তো নয়ই।

প্রাপ্ত ভাস্কর্যের মধ্যে মস্তক ও বাহুহীন মিনিয়েচার মূর্তিও উল্লেখ্যযোগ্য। কাঁধের কাছে সকেট রয়েছে। হাত ও মাথা স্থাপন করতে এই সকেট কাজে লাগতো। লাল চুনাপাথরের এই ভাস্কর্যটি ৩৩ ইঞ্চি লম্বা। এটি হরপ্পা থেকে পাওয়া যায়। এটি কোনো যোদ্ধা বা রাজার প্রতিকৃতি নয়। এটি হয়তো কোনো দেবতার ফিগার। কেন না পরবর্তী সময়ে তৈরি কালো পাথরের বিষ্ণু ও অন্যান্য দেবতার ভাস্কর্যের সঙ্গে এই ভাস্কর্যের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।

আরেকটি হল ধূসর চুনাপাথরের পুরুষ নৃত্যশিল্পীর ভাস্কর্য। ৪ ইঞ্চি লম্বা এই ভাস্কর্যটি হরপ্পা থেকে পাওয়া যায়। এই ভাস্কর্যটিরও হাতমাথা পাওয়া যায়নি। এটিও কোনো দেবতার ইমেজ হতে পারে। দুটো ভাস্কর্যই সিন্ধুসভ্যতার পরের দিকের নিদর্শন।

সিন্ধুসভ্যতা থেকে পাওয়া মাটির তৈরি মূর্তিগুলো এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বেশিরভাগই গ্রামবাংলার টেপাপুতুলের মতো দেখতে। মাটির তৈরি কিছু খেলনারও সন্ধান মিলেছে। যেগুলোর সঙ্গে আবহমান লোকজ খেলনার মিল রয়েছে।

সিন্ধুসভ্যতায় চিত্রকলা ছিল কিনা জানা যায়নি। কিন্তু নাগরিকরা টেরাকোটা পদ্ধতিনির্ভর তৈজসপত্র ব্যবহার করত। মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা থেকে বিভিন্ন নকশা এবং আকৃতির থালা, বাটি, বাসন, কাপ, অলংকৃতপাত্র পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, সেগুলোর ওপর প্রধানত লাল ও কালো রঙ দিয়ে হাতে আঁকা বিভিন্ন মোটিফ ও নকশাও রয়েছে। কিছু পাত্র আছে বাহারি রঙিন (নীল, লাল, সবুজ ও হলুদ) থালা, বাটি, বাসন, কাপের যথার্থ আকৃতি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সে সময় এ সব তৈরিতে মৃৎশিল্পীরা চাকার ব্যবহার করত। বানানো শেষে মাটির পাত্রগুলোকে আগুনে পোড়ানো হতো। কিছু পাত্র রোদে শুকানো হতো। সেই তৈজসপত্রগুলো ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে, বিশেষ করে লোকসমাজে।

মহেঞ্জোদাড়োর থেকে প্রাপ্ত সিলমোহরগুলোকে ভারতবর্ষের প্রথম শিল্পকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে না। সিন্ধুসভ্যতায় লেখার নিদর্শন নেই। পাওয়া গেছে কিছু দুর্বোধ্য সাংকেতিক চিহ্ন (আড়াইশ থেকে ৫শ) সেগুলোর পাঠোদ্ধার না হওয়ায় এখন পর্যন্ত সিলমোহরগুলো কি তথ্য বহন করছে তা জানা যায়নি। তাই বলে সিলমোহরগুলোর শিল্পমূল্য অগ্রাহ্য করার উপায়ও নেই। ধারণা করা হয় সিলগুলো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হতো। অনেকে মনে করেন, এগুলো এক প্রকার অলংকার। সিলমোহরে বিভিন্ন পশুর প্রতিকৃতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খোদাই করা রয়েছে। কিছু সিলমোহরে রয়েছে বিভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতি। আর কিছু সিলমোহরে রয়েছে কাল্পনিক দেবদেবীর ফিগার। অনেকের ধারণা, এই পশুফিগারগুলো সিন্ধুসভ্যতার মানুষের টোটেম বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এগুলো নরম পাথরে তৈরি (steatite stone), খোদাইয়ের পর চকচকে ও শক্ত করতে এগুলোকে পোড়ানো হতো। তিন শিংবিশিষ্ট এক দেবতার কথা আগেই বলা হয়েছে। সিলমোহরগুলোর ইমেজ (ষাঁড়, হাতি, বাঘ, গণ্ডার, গাছ ইত্যাদি) আমাদের লোকায়ত জীবনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিকবৃন্দ এ বিষয়ে একমত যে, সিন্ধুসভ্যতার লোকেরা প্রচুর পরিমাণে অলংকার ব্যবহার করত। ইতিপূর্বে আলোচিত ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্যভঙ্গিতে থাকা নারী মূর্তিটিও তার সাক্ষ্য বহন করছে। পুঁতির মালা, হার, কানের দুল, মাদুলি, শাঁখের চুড়ি ইত্যাদি। তৎকালীন কারিগররা কার্নেলিয়ন (carnelian) পাথর পুড়িয়ে লাল করত। সেগুলো ঠাণ্ডা হলে পুঁতির আকৃতি দেয়া এবং ছিদ্র করা হতো। অলংকারের বেশিরভাগই লোকজ। ধাতুর তৈরি গহনা বেশি দেখা যায়নি।

অন্যান্য সভ্যতায় আমরা যুদ্ধ ও যোদ্ধার চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্য দেখেছি। কিন্তু দ্বন্দ্ব বা হিংসাকে ফুটিয়ে তুলেছে এমন কোনো শিল্পকর্ম আমরা এই সভ্যতায় দেখি না। বিলাসিতা এবং ঐশ্বর্যের ছাপও এই সভ্যতার শিল্পকলায় মেলে না। যুদ্ধজয়ের কথা নেই, নেই মিসরীয়দের মতো রাজা বা যোদ্ধাকে মহান করে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস।

সিন্ধু উপত্যকায় মানুষেরা অস্ত্রের চেয়ে যন্ত্রপাতি বেশি ব্যবহার করতো বলে মনে হয়। ছুরি, কুঠার, তীরধনুক, বর্শা, গুলতি ছাড়া তেমন কোনো অস্ত্রের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। আর পাওয়া গেছে কাস্তে, বাটালি, করাত, জুতা সেলাই করার সুই ইত্যাদি। ঢাল, তলোয়ার, বর্ম ইত্যাদি সামরিক অস্ত্রের নিদর্শন নেই। নেই কোনো অস্ত্রাগারের চিহ্নও। কারণ তারা এসবের প্রয়োজন অনুভব করেনি। তারা ছিল শান্তিপ্রিয়। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল বলে মনে হয়। এই উপত্যকাবাসীদের সঙ্গে মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, ইরান, দক্ষিণভারত, রাজস্থান, গুজরাট ও বালুচিস্তানের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। মেসোপটেমিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক থাকার নিদর্শন রয়েছে।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি নানা পথকে একই লক্ষ্যের অভিমুখীন করে দেয়া সিন্ধুসভ্যতার মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। উদার লোকসংস্কৃতির চর্চার ফলেই এই অসাধ্য কাজটি করতে পেরেছিল। তাই তাদের শিল্পকলাচর্চাও কর্তার ইচ্ছায় কর্মের বেড়াজাল থেকে বের হতে পেরেছে এবং সম্ভবত প্রথমবারের মতো শিল্পী আপন মনে শিল্পকর্ম তৈরির সুযোগ পেয়েছিল। অন্তত সিন্ধুসভ্যতার ছোট ছোট মাটির পুতুল, তৈজসপত্র ও খেলনাগুলো আমাদের এভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে।

নবীনদের তুলিতে দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র

ডিসেম্বর 6, 2016 মন্তব্য দিন

war-wall-mural-1war-wall-mural-2