আর্কাইভ

Archive for the ‘সংস্কৃতি’ Category

বিদেশী ডক্টরেট ডিগ্রী সংস্কৃতি’র নেপথ্যে…

foreign PhD culture

Advertisements

পদ্মাবতী বিতর্ক: শিল্পের স্বাধীনতায় উগ্রবাদীদের হামলা

Padmavati_movie 2017চিন্ময় মুৎসুদ্দী: পদ্মাবতী নিয়ে ভারতের উগ্রবাদীদের কর্মকা- শিল্পের স্বাধীনতায় নয়া হস্তক্ষেপ। তুচ্ছ বিষয়কে সামনে এনে তারা তুলকালাম বাধিয়েছে শ্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। তবে পদ্মাবতী নিয়ে সর্বশেষ সুসংবাদ হলো সিনেমাটি নিষিদ্ধের আবেদন তৃতীয় বারের মতো খারিজ করে দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে বলেছেন, ‘এর নাক কাটব, ওর মুণ্ডু কাটব, এ জন্য পুরস্কার দেব, গণতন্ত্রে এসব বরদাশত করা হয় না। দেশের আইন এভাবে কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।’

ছবিটি মুক্তির ব্যাপারে বাধা দেওয়া আর ছবির পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যান্ড টিভি ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইএফটিডিএ) ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে ১৫ মিনিটের ব্ল্যাক আউট কর্মসূচি পালন করে। চলচ্চিত্র এবং দূরদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ২০টি সংস্থা ওই দিন বিকেল সোয়া ৪টা থেকে ১৫ মিনিট চলচ্চিত্র ও টিভি সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করা থেকে বিরত থাকে। ২৮ নভেম্বর কলকাতার টালিগঞ্জের ছবিপাড়ায় ১৫ মিনিটের জন্য প্রতীকী ধর্মঘট পালন করা হয় ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কারস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া এবং ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে।

এর আগে হরিয়ানা রাজ্যের বিজেপি নেতা সুরুজ পাল আমু পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাক কেটে নেওয়ার হুমকি দেন। মমতা পশ্চিমবঙ্গে চলচ্চিত্রটিকে স্বাগত জানিয়ে এর প্রিমিয়ার কলকাতায় করার প্রস্তাব দেন। মমতার প্রস্তাবটি আসে গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই ছবির মুক্তির ওপর রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরিপ্রেক্ষিতে। ওইসব রাজ্যে উগ্রবাদীরা মিছিল সমাবেশ করে ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি ও অভিনেত্রী দীপিকা পাড়–কোনের নাক, কান, মাথা কর্তনকারীদের জন্য বিশ কোটি টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। এই ডামাডোলে এরই মধ্যে এক সাধারণ নাগরিকের প্রাণ গেছে। নিহত ২৩ বছরের তরুণ চেতন সাহনি জয়পুরে গয়নার ব্যবসা করতেন। জয়পুরের বিখ্যাত নাহারগড় দুর্গের বুরুজ থেকে তার মরদেহ ঝুলছিল। তার মৃতদেহের পাশে লেখাছিল ‘আমরা শুধু কুশপুতুল লটকাই না।’ আর একটি পাথরে লেখা ছিল ‘পদ্মাবতীর বিরোধিতা’।

পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়া দূরে থাক, এখনও সেন্সর বোর্ড থেকে এ সিনেমা সম্পর্কে কোনো মন্তব্যই করা হয়নি। শুধুমাত্র একটা ধারণা থেকেই মাঠে নেমেছে উগ্রবাদী বিজেপি, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা বলছেন ‘আমাদের জাত্যাভিমানে চুনকালি লেপা হয়েছে, আমাদের দেবী মা পদ্মাবতিকে মন্দিরের পাদপিঠ থেকে নামিয়ে করে তোলা হয়েছে বাহরওয়ালি নাচনি, তাই পরিচালকের মুণ্ডু চাই.. ..’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সারা ভারতে ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে তারা। বানসালির পদ্মাবতী অচ্ছ্যুত হলে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (পদ্মিনী উপাখ্যান, ১৮৫৮), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ, ১৮৭৫), ক্ষিরোদাপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (পদ্মিনী, ১৯০৬) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রাজকাহিনী, ১৯০৯) প্রমুখের এসব রচনা নিষিদ্ধ করতে হয়। কারণ তারাও ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। ইতিহাসকে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন। ইতিহাসকে ভিত্তি করে তারা গল্প বুনেছেন।

সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে ইতিহাস কি কেউ ভিন্ন দৃষ্টিতে এখন দেখতে পারবে না? অতীতে এমন হয়েছে। সেজন্যই শিল্পের স্বাধীনতা মুক্তচিন্তার আলোকে বিবেচনা করা হয়। তথ্যই কেবল ইতিহাস নয়, কিংবদন্তিও ইতিহাসের অংশ। কোনো শিল্প মাধ্যমই ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে পেশ করে না। রানি পদ্মাবতী হয়তো তার জীবনে নাচেননি। নাচলেও এতটা ডিজিটাল ভেল্কি ছিল না। সিনেমার অনেকটাই পরিচালকের কল্পনা। আর ছবিটিও বানসালির ‘লাগ ঝমাঝম’ ভঙ্গিতে বলা একটি বলিউডি উপাখ্যান মাত্র। যেটা আমরা তার আরেকটি চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’-এ দেখেছি। পাঠককে এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, চলচ্চিত্রটিতে তিনি পার্বতী এবং চন্দ্রমুখীকে একসঙ্গে নাচিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এ কিন্তু এই ঘটনা ছিল না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- দেবদাস সাহিত্য, পদ্মাবতী ইতিহাস। সেক্ষেত্রে এই ইতিহাসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। অনেক ঐতিহাসিকই পদ্মাবতীর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি।

দূরদর্শনের সভাপতি রজত শর্মা একটি কথা বলেছেন যেটি প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বানসালীর গবেষণা পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর, বর্ণে বর্ণে বাস্তবনিষ্ঠ। কোনো বিকৃতি নেই।’ আর পরিচালক সুভাস ঝা বলেছেন, ‘সত্যিই সে সময় রমণীরা নাচতেন, অন্তরালে জেনানা রানিবাসে। সেখানে রাজা ছাড়া আর কোনো দর্শক থাকত না। সিনেমায় যে ‘ঘুমার’ নাচের দৃশ্য আছে, তাতে কোনো বাইরের মরদ নেই। তাই, ইতিহাস বিকৃতি ঘটেনি। এখন তিনটি পক্ষ। উগ্রবাদীরা বিপক্ষে। বানসালীকে সমর্থনকারী পক্ষ বলছেন বিকৃতি হয়নি। আরেক পক্ষ বিকৃতি হয়েছে কি হয়নি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছেন না, তারা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন- শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে। পদ্মাবতীর সমর্থনে তাই ইতিহাস বিকৃত হয়নি বলে সাফাই দিলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিল্পের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটিকেই মূখ্য করে দেখতে হবে। ইতিহাসকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অধিকার সমুন্নত রাখা জরুরি।

বাস্তব ও কল্পনার মিশেল নিয়ে তৈরি আশুতোষ গোয়ারিকর’র ‘যোধা আকবর’ (২০০৮) ছবিতে আকবরের সঙ্গে যোধাবাঈয়ের প্রেমের কাল্পনিক ঘটনা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেও ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠেনি। তখন ইউপিএল আমল। এখন কেন্দ্রে বিজেপি, বিভিন্ন রাজ্যে ক্রমে তারা ক্ষমতার হাত প্রসারিত করছে। ১৮ রাজ্য তাদের শাসনে। দেখা যাচ্ছে ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক শক্তি জোরেসোরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ইমেইজ আর থাকছে না। গত তিন বছরে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অসংখ্য হামলা সেটাই প্রমাণ করে। মুসলমানদের খাদ্যের ওপরও তারা বাধ সাধছেন। উত্তর প্রদেশে গরুর ব্যবসা করার দায়ে প্রাণ দিতে হয়েছে এক মুসলমান তরুণকে। এবার তারা শিল্পের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। বানসালী এরই মধ্যে বলেছেন, আলাউদ্দিন খিলজির স্বপ্নের রানি পদ্মাবতীর সঙ্গেঅহপযড়ৎ প্রেমের দৃশ্যটি ছবিতে নেই। এরপরও উগ্রবাদীদের এ ধরনের জঙ্গী আচরণ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা মুক্ত চিন্তা ও গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত বলেই মনে করি।

স্বাধীনতা মানে কী?

তসলিমা নাসরিন : ডিসেম্বরের ১ তারিখ চলে গেলো, ‘পদ্মাবতী’ মুক্তি পেলো না ভারতে। হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে হেরে গেলো গোটা ভারতবর্ষ। তাদের তাণ্ডব আর হুমকির সামনে মাথা নোয়ালো সেক্যুলার ভারত। ‘পদ্মাবতী’ নামে আদৌ কেউ ছিল, কোনও ঐতিহাসিকই বলেননি। সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জয়সীর লেখা কবিতা ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে তৈরি ‘পদ্মাবতী’। ‘পদ্মাবতী’ নামে হয়তো কেউ ছিল না কোনও কালে। মালিক মোহাম্মদ জয়সীই রচনা করেছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী পদ্মাবতীকে, যে পদ্মাবতীকে জয় করার লোভ করেছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি। রাজপুত হিন্দু রমণী মুসলিম শাসকের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার চেয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। এইরকম একটি গল্প নিয়েই সঞ্জয় লীলা বানসালি ‘পদ্মাবতী’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন। কিন্তু হিন্দু মৌলবাদীরা ক্ষুব্ধ, কারণ তারা শুনেছে ছবিতে দেখানো হয়েছে খিলজি আর পদ্মাবতীর ঘনিষ্ঠতা। ছবি না দেখে কী করে আমরা বলবো কী দেখানো হয়েছে। ‘গুজব’-এর যে কী অবিশ্বাস্য গুণ! মানুষ চোখ-কান বুজে গুজবকে অনায়াসে বিশ্বাস করে ফেলে।

সঞ্জয় লীলা বানসালি সহ আরও অনেকে, যারা পদ্মাবতী ছবিটি ঘরে বসে দেখেছেন, বলেছেন, ‘ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই, যে দৃশ্য দেখে হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে’। তারপরও শান্ত হয়নি হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠী। প্রথম দিকে না মানলেও, ধীরে ধীরে সরকারি দলের লোকেরাও মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিচ্ছেন। পদ্মাবতীকে নিষিদ্ধ করছেন। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া ছবিটিকে অযথাই শেকল পরানো হয়েছে।

আমি আর সবার মতো বলতে চাইছি না ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই। আমি বলতে চাইছি, যদি থাকেই, তাহলে ক্ষতি কী? ইতিহাসে পদ্মাবতীর কোনও উল্লেখই নেই, কিন্তু কাব্যে আছে বলে পদ্মাবতীকে আজ ঐতিহাসিক চরিত্র বলে ভেবে নেওয়া তো ঠিক নয়। সত্যিকার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকেই শিল্পী সাহিত্যিকরা নতুন করে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে চিরকালই লিখেছেন, এঁকেছেন। চলচ্চিত্রে, নাটকে, গানে চরিত্রগুলো বারবার এসেছে, সবসময় যে একই রূপে, একই গল্পে তা নয়। ইতিহাস নিয়ে প্রচুর চলচ্চিত্রই নির্মিত হয়েছে, যেগুলোতে রয়ে গেছে প্রচুর ভুল। ১৯৯৮ সালে শেখর কাপুর এলিজাবেথ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন, ওই ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন রানী এলিজাবেথ তাঁর  উপদেষ্টা স্যার উইলিয়াম সেসিলকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করেছেন। বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা ঘটেছিল, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্যার উইলিয়াম সেসিল রানীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে রানীর পাশে ছিলেন। পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গ সংগীত তারকা পিয়ানোবাদক মোজার্টের জীবন কাহিনি নিয়ে ‘আমেডিউস’ নামের চলচ্চিত্রে মোজার্টকে দেখানো হয়েছে একটা নষ্ট ছোঁড়া হিসেবে, বাস্তবে মোজার্ট মোটেও তা ছিলেন না। সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি  টাইটানিক ছবিতে জাহাজ দুর্ঘটনা সত্য , কিন্তু  জ্যাক ডোসন আর রোজের প্রেম কাহিনি সত্য নয়। ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ ছবিতে ব্রিটিশ  ট্রুপের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ‘ইউ-৫৭১’ ছবিতেও ব্রিটিশের বদলে আমেরিকান সৈন্য দেখানো হয়েছে। এসব নেহাতই ইতিহাস বিকৃতি। ইতিহাস বিকৃতি আরও কত যে ছবিতে প্রকট, গ্ল্যাডিয়েটর, ব্রেভহার্ট, দ্য পেট্রিয়ট, মারি আন্তোয়ানেত, সেক্সপিয়র ইন লাভ…। সমালোচকরা বিকৃতির এবং ভুল তথ্যের নিন্দে করেছেন। কেউ কেউ আবার শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ছবি নিষিদ্ধ করেননি, কেউ পরিচালকের মাথার মূল্য ঘোষণা করেননি, কেউ অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নাক-কান কেটে ফেলার ফতোয়া দেননি। এসব দেওয়া হচ্ছে ভারতের মতো নানা ধর্মের, নানা ভাষার, নানা রঙের মানুষের গণতন্ত্রে। আর কোনও দেশে না  হোক, খাজুরাহো আর ইলোরা অজন্তার দেশে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করাটা দেশকেই, দেশের শিল্পকেই, চরম অপমান করা।

ইতিহাসের রদ-বদল এবং বিকৃতি হামেশাই হচ্ছে। কেউ যখন আমরা সঠিক করে জানি না ঠিক কী ঘটেছিল সুদূর অতীতে, আমরা কল্পনা করে নিই অনেক ঘটনা। চার্লস ডিকেন্সকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘দ্য লাস্ট ডিকেন্স’, এডগার অ্যালেন পোকে নিয়ে ‘দ্য পো শ্যাডো’, এসব তো আছেই, আলেক্সান্দ্র দুমা লিখেছেন ‘কুইন মারগো’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘প্রথম আলো’। এরকম নানা বইয়ে মেশানো হয়েছে সত্যের সঙ্গে মিথ্যে, অথবা খানিকটা সত্যের সঙ্গে অজস্র কল্পনা। বইয়ে কতটুকু সত্য আর কতটুকু কল্পনা তা নিয়ে বিতর্ক হয় হোক। ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে শুধু তথ্যচিত্র হতে পারে, কোনও চলচ্চিত্র নয়। এ নিয়ে হোক বিতর্ক। হোক কলরব। আবারও বলছি, বিতর্ক হওয়া ভালো, কিন্তু বই বা চলচ্চিত্র, বা কোনও শিল্পকর্ম নিষিদ্ধ করা আর গণতন্ত্রকে নিষিদ্ধ করা একই জিনিস। আমরা গণতন্ত্র নিষিদ্ধ হোক চাই না।

মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে এখনও অধিকাংশ মানুষের কোনও ধারণা নেই। তারা গণতন্ত্র মানে এখনও বোঝে নির্বাচন, ভোটে হারা, ভোটে জেতা। মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে এখনও অধিকাংশ মানুষ রায় দেয়, মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অধিকার কারোর নেই। তারা বলতে চায়, কারওরই এমন কোনও কথা বলা বা কাজ করা উচিত নয়, যা দেখে বা পড়ে বা শুনে অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। এর মতো অগণতান্ত্রিক মন্তব্য আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। কেউই, বিশেষ করে প্রতিভাবান কেউ, সবাইকে খুশি করে বা সুখী করে চলতে পারে না। ভিন্ন মতে বিশ্বাস করে যারা, তাদের হয় মুখ বুজে থাকতে হবে অথবা মরে যেতে হবে।

পদ্মাবতী ইতিহাসের অংশ নয়। অংশ হলেও তাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার অধিকার সবার আছে। সাধারণ মানুষের আছে, কবি সাহিত্যিকদের আছে, চলচ্চিত্র পরিচালকদের আছে। আর যদি ইতিহাসের অংশ না হয়, তাহলেও পদ্মাবতীকে  যেমন ইচ্ছে গড়ার স্বাধীনতা শিল্পীদের আছে। শিল্পীদের হাত থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিলে তাদের আর কিছুই থাকে না। একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক এবং কতটা সভ্য, তা নির্ভর করে সেই সমাজের নারীরা এবং শিল্পীরা কতটা স্বাধীন। পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে ভারতবর্ষের সমাজ এখনও পড়ে আছে অগণতন্ত্রের অন্ধকারে। ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের নাম ভারত’ –  এই  স্লোগান না দিয়ে বরং ‘গণতন্ত্র কাকে বলে’ তা শিখতে হবে ভারতবাসীকে। এও বুঝতে হবে,  তোমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে–এ সমস্যা তোমার, অন্য কারোর নয়। এই সমস্যার সমাধান তোমাকেই করতে হবে, অনুভূতির আঘাত নিয়ে ঝামেলা হলে নিজের অনুভূতির আঘাত নিজে সারাও। কিন্তু সহিংস হয়ে নয়, অন্যকে হুমকি দিয়ে নয়, অন্যকে শারীরিক আঘাত দিয়ে নয়।

মৌলবাদীদের যুক্তি অনেকটা ধর্ষকদের যুক্তির মতো। মেয়েরা ছোট পোশাক পরলে আমরা উত্তেজিত হই, সুতরাং আমরা ধর্ষণ করি। একইভাবে চলচ্চিত্রে এমন দৃশ্য দেখিয়েছ যা আমাদের অসন্তুষ্ট করে, উত্তেজিত করে, রাগান্বিত করে, সুতরাং তোমার চলচ্চিত্র আমরা নিষিদ্ধ করবো, তোমার মুন্ডু কেটে নেবো, তোমার নাক কেটে নেবো।

মৌলবাদীদের যুক্তিতে পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ আর মাথার মূল্য ধার্যকরণ মেনে নেওয়া মানে–ধর্ষকের যুক্তিতে ধর্ষণ মেনে নেওয়া। এ দুটোতে তফাৎ কিছু নেই। নারীর এবং শিল্পীর স্বাধীনতা অধিকাংশ মানুষ না মানলে সমাজে নারী এবং  শিল্পীদের বিরুদ্ধে যে বর্বরতা দেখি, সেই বর্বরতাই আজ দেখছি ভারতবর্ষে।

সব্যসাচী মুস্তাফা জামান আব্বাসী

mustafa zaman abbasi 3শাহীনুর রেজা : কিংবদন্তি ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের পুত্র মুস্তাফা জামান আব্বাসী একাধারে শিল্পী, সংগ্রাহক, উপস্থাপক, গবেষক, সাহিত্যিক, অনুবাদক ও দার্শনিক। বাংলা-ইংরেজি-উর্দু ভাষায় সমান দক্ষ প্রতিভাধর

মুস্তাফা জামান আব্বাসী ১৯৩৭ সালের ৮ ডিসেম্বর কুচবিহার জেলার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা ২ ভাই ১ বোন। বড় ভাই সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামাল (প্রয়াত), বোন কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান এবং মুস্তাফা জামান আব্বাসী।

অসাধারণ মেধার অধিকারী আব্বাসী বলরামপুর হাই স্কুল, কুচবিহারের জেনকিনস্ স্কুল, পার্ক সার্কাসের মডার্ন স্কুল, ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ ও সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স-মাস্টার্স করেন। মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১১তম এবং উচ্চমাধ্যমিকে ১৩তম ছিলেন। বিএ অনার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম আর এমএ পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন।

জন্মবাড়ি নিয়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসী বলেন, সবচেয়ে সুমধুর, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে মায়ার অঞ্জন ছড়ানো একটি নাম বলরাম। নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে বসন্তের সমীরণ যেন বয়ে যায় আমার শিরায়। একটি দক্ষিণমুখী বাড়ির আগদুয়ার ঘর, সুউচ্চ জামের সারি, আমের সারি, আমলকির মৌ, গোলাব জামের শিষ। ভিতর বাড়িতে উত্তরের ঘর—যেখানে আমার দাদু থাকেন, পশ্চিমের সারি সারি ঘর—যেখানে ছোট চাচা-চাচী থাকেন, বড় রান্নাঘর, গোলাঘর, দক্ষিণের ঘর—ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য। আর পুবের ঘর, আমার আশৈশব স্বপ্নের আশ্রয়। যেখানে আমার মা, বাবা, ভাইবোনের বাস। আমার জন্ম ওই ঘরটিতেই।

পূর্বে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, শস্যক্ষেত্র, যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজের সমারোহ, যার নাম দোলাবাড়ি, পাশে ঘন কাশবন। তারপর সরু রুপালি স্রোতের নদী, নাম কালজানি। রঙ মনে নেই, শুধু মনে পড়ে কালজানি। যখন আমার বয়স ৪/৫— নদীর কথা মনে পড়ে, নাম তার কালজানি।

এই বাড়িই আমার মনের বাড়ি। বৈঠকখানাটি বেশ বড়, সামনেই বারান্দা, চৌকি পাতা সেখানে। সজনে গাছের ধার ঘেঁষেই প্রশস্ত পুকুর। সারাদিন সেই  পুকুরে সাঁতার কাটা, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা—সাদা, লাল পুঁটি। চাদর দিয়ে ডারকা মাছ ধরা, আর সময় নিয়ে কৈ, মাগুর, শিং ধরার প্রচেষ্টা। কখনো কখনো বালতি ভর্তি করে মাছ চালান হতো রান্না ঘরে। তারপর রান্না হতো বাড়ি ভর্তি সবার জন্য।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় আব্বাসউদ্দীন আহমদ সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। বসবাস শুরু হয় পুরান ঢাকার নারিন্দায় ধোলাই খালের পাড়ে ৭৭ নং ঋষিকেশ দাস রোডে। তাঁর শৈশবের অনেক স্মৃতি পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে। এরপর ৬৮/১, পুরানা পল্টন, হিরামন মঞ্জিল। দাদির নামে বাড়ির নাম। দাদা মৌলভি জাফর আলী আহম্মদ।  নাতি আব্বাসী হজ করে এলে দাদা স্বপ্নে বললেন, কিরে, হজ করে এলি আমার সাথে দেখা করলি না। নাতী বগুড়ার রোটারীর অনুষ্ঠান থেকে সরাসরি বলরামপুরে। অনেকগুলো ফকির খাওয়ালেন, মৌলভি ডেকে মিলাদ দিলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষদের জন্য একটা মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিলেন ওই স্বপ্ন দেখার পর।

পরহেজগার, সুফিবাদি দৃষ্টিভঙ্গির ছবক মুস্তাফা জামান আব্বাসী পেয়েছেন পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে, বিশেষ করে পিতা আব্বাসউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে। তাঁর স্মৃতিতে—

সেই ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়ি ছিল আনন্দের হাট। ভোরবেলা সুললিত নামাজের ধ্বনি শুনে আমাদের ঘুম ভাঙত। আব্বার নামাজের সুরা বলার ভঙ্গিটি ছিল বড় মধুর। তিনি তাঁর গলার সমস্ত সুধা নামাজে ঢেলে দিতে পারতেন। নামাজ পড়তে দেখেছি অনেককে। নামাজের মধ্যে নিজের সংগীত সুর লালিত্য সমর্পণ করে সম্পূর্ণ  আত্মসমাহিত হয়ে নামাজ পড়তে একজনকেই দেখেছি। দীর্ঘক্ষণ থাকতেন জায়নামাজে। এশার নামাজ তাঁর প্রায়ই দীর্ঘ হতো। মাঝরাতে ঘুম ভেঙেও তাঁকে জায়নামাজে দেখেছি। এই গোপন নামাজটি তিনি অতি সন্তর্পণে পড়তেন। অনেক সময় মা-ও টের পেতেন না।

বৃহস্পতিবার বসতো হালকা-ই-জিকির। আসতেন বেশ কয়েকজন। পিয়ন, ছোট কেরানী, সাধারণ কিছু মানুষ। আব্বাকে জিজ্ঞেস করাতে বলতেন, বড় হলে জানতে পারবে।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী জানান, জীবনে তাঁর আর কিছু চাইবার নাই। আল্লাহ পাক তাঁকে সব কিছু দিয়েছেন। নিজেকে একজন পরিতৃপ্ত মানুষ মনে করেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি পিতা আব্বাসউদ্দীন আহমদের কাছে গান শিখেছেন। শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত গুণী ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খান প্রমুখের কাছে।

পিতা আব্বাসউদ্দীন আহমদ খুব সাদাসিদে মানুষ ছিলেন। সাধারণ জীবন যাপন করতেন। কম কাপড় ছিল তাঁর। দুটো পাজামা দুটো পাঞ্জাবি। সব সময় ধোয়া ইস্ত্রি করা থাকত। অফিসের জন্য দুই সেট সাদা শার্ট ও সাদা প্যান্ট। সাদা আচকান একটা অনুষ্ঠানের জন্য। জায়নামাজ, টুপি, তসবিহ একটি করে। হারমোনিয়াম সাধারণ। গ্রামোফোন এইচএমভি কোম্পানির দেওয়া। বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত আছে।

ভাবতে অবাক লাগে, যিনি এত উঁচুদরের শিল্পী, যাঁর গান আমজনতার মুখে মুখে, যাঁর এত প্রভাব-প্রতিপত্তি তিনি এতটা সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তাঁর একমাত্র গ্রন্থ ‘আব্বাসউদ্দীনের গান ও দিনলিপি’।

আব্বাসীর মা লুত্ফুন নেসা পিতার মতোই শৌখিন ছিলেন। তিনি সরু পাড়ের শাড়ি পরতেন। পরিমিত চা, পান-সুপারি খেতে পছন্দ করতেন। ঘর-কন্যার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত লিখতেন। ‘শেষ বিকেলের আলো’ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। নভেম্বর ১৯৮০-তে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘কিছু ফুল কিছু স্মৃতি’। ১৬টি প্রবন্ধে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতিমূলক এ গ্রন্থটি তিনি তাঁর তিন ছেলে-মেয়েকে উত্সর্গ করেছেন। তিন নম্বর বই ‘সময় কথা বলে’ জুন ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি তিনি তাঁর প্রিয় নাতি-নাতনিদের উত্সর্গ করেছেন।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের সাহিত্য ও সংগীতে সদম্ভ পদচারণা করে আসছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের জন্মলগ্ন থেকে তিনি সংগীত পরিবেশন করে আসছেন। এছাড়া চলচ্চিত্র, গ্রামোফোন রেকর্ড, দেশ-বিদেশের নানা সভায় বাংলাদেশের লোকসংগীত, ভাওয়াইয়া, চটকা, ভাটিয়ালি, দেহতত্ত্ব, মারফতি, মুর্শিদি, বাউল, লালন গানে তিনি কিংবদন্তি শিল্পী। তিনি এদেশের লোকসংগীতকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছেন। ভাই মোস্তাফা কামাল ও বোন ফেরদৌসী রহমান সম্পর্কে তাঁর বিশেষ মুগ্ধতা রয়েছে—

আমার ভাই মোস্তাফা কামাল, ভালোবাসায় আর্দ্র, মমতাময়, স্নেহশীল। উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর সর্বস্ব পরিবারের জন্য। বিশেষ করে আমার ও বোনের জন্য। অসুখ হলে পরিচর্যা ও খোঁজ-খবর নিয়েছেন পরিবারের সবার। আমার ভাইয়ের মতন ভাই হয় না। পেশায় ব্যারিস্টার, পরে বিচারপতি, শেষে প্রধান বিচারপতি। আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় দৃঢ় হলেও, বিনয় তাঁর ভূষণ। সাধারণ জনেরও তিনি আপন হয়ে যান অনায়াসে। তার সুকৃতির ছাপ তার চলনে-বলনে, চিন্তা-চেতনায়, বক্তৃতা-ব্যবহারে। মোস্তফা কামাল রচিত গ্রন্থ তিনটি।

আমার বোন ফেরদৌসী রহমান, সেরা শিল্পীদের অগ্রগণ্য। তার পঞ্চাশ বছরের শিল্পীজীবন উপলক্ষে প্রকাশিত গ্রন্থে স্মৃতিচারণ করেছি নানাভাবে। তাকে ভালোবাসতাম, তার সুখে সুখী, তার দুখে দুঃখী। পিঠাপিঠি হওয়ায় ছোটবেলা মারামারিও করেছি। আবার বড় হয়ে তার জন্যে করেছি অশ্রুপাত। তার তুলনা সে নিজেই। অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী ভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে আমার বোনের সময় দ্রুত কেটে যায়। বনানীতে পিতার নামাঙ্কিত ‘আব্বাসউদ্দীন সংগীত একাডেমি’ পরিচালনা করে সে।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী ১৯৬৩ সালের ২০ জানুয়ারি ভালোবাসার মানুষ আসমাকে বিয়ে করেন। বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাতিজি আসমা আব্বাসী একাধারে লেখক, সমাজসেবক, উপস্থাপিকা। আব্বাসী-আসমা’র দুই সন্তান। নিজ সন্তান সম্পর্কে আব্বাসী বলেন—

আমার চেয়েও তারা অনেক ভালো হয়েছে, কারণ তারা মেধাবী, মানুষের প্রতি দরদি ও যার যার ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। বড় মেয়ে আমেরিকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী; ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাস্টার্স। কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতা। আমেরিকা ভিত্তিক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পাখি’র সম্পাদক, দুই সন্তানের জননী। ছোট মেয়ে ‘ল-ইয়ার’।

পিতা আব্বাসউদ্দীন আহমদ চেয়েছিলেন, তাঁর সুদর্শন ছেলে সিনেমার নায়ক হোক। কারণ মাড়োয়ারিরা ‘ধ্রুব চলচ্চিত্রে’ তাঁকে চা বাগানের কুলী আর নজরুল ইসলামকে নারদের ভূমিকায় অভিনয় করিয়েছে। কিন্তু ছেলে ওদিকে পা বাড়াননি। শিল্প-সাহিত্য-ধর্মচর্চাসহ সকল শাখায় আব্বাসী অবাধ বিচরণ করেছেন।

উপস্থাপনায় মুস্তাফা জামান আব্বাসী এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। ‘ভরা নদীর বাঁকে’, ‘লৌকিক বাংলা’ তাঁর সফল টেলিভিশন অনুষ্ঠান। গত ৫০ বছর ধরে তিনি উপস্থাপনার সাথে যুক্ত আছেন। সহজ সরল প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি সংক্ষেপে একটি গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতেন।

এ পর্যন্ত মুস্তাফা জামান আব্বাসীর ৫০টির মতো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। অধিকাংশ গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ বের হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো—‘মোহাম্মদ স.-এর জীবনী’; ‘সূর্য উঠেছে যেখানে’; ‘মুহাম্মদের নাম’; জালালউদ্দীন রুমীর কবিতার অনুবাদ ‘সুফা কবিতা’; বাংলার ভাওয়াইয়া গান ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’; প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড; মাওলানা রুমীর জীবনী ভিত্তিক উপন্যাস ‘রুমীর অলৌকিক বাগান’; শিল্পী-লেখকদের জীবনী ‘জীবন নদীর উজানে’; সংগীত বিষয়ক প্রবন্ধ ‘প্রাণের গীত’; বাংলার লোক সংগীতের ইতিহাস; ভাটির দেশের ভাটিয়ালী’সহ নানা গ্রন্থের রচয়িতা।

সম্পাদনা করেছেন ‘লোকসংগীত সংবাদ; ‘৫০ বছরের বাংলা ভাষা’, ‘দুয়ারে আইসাছে পালকী’ (আব্দুল লতিফের লোকসংগীত), সংগীত অ্যালবাম ‘ধন ধান্যে পুষ্পভরা’ এবং আব্বাসউদ্দীন আহমদের ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা ও দিনলিপি’।

মুস্তাফা জামান আব্বাসীর বিভিন্ন লেখা ও গ্রন্থ নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লেখক, সমালোচক, পত্র-পত্রিকা বিভিন্ন সময়  আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন ও মুহম্মদ ইউনূসের মন্তব্য তুলে ধরা হলো—

“…….. I did not realise that Mustafa Zaman Abbasi, a respected personality by his own right, has written such an excellent and revealing study of our National Poet” —Professor Muhammad Yunus, Nobel Laureate.

“Read your autobiography ‘Jibon Nadir Ujane’, It is a continuation of the fiery songs that we heard in your fathers voice. The book is excellent”—Professor Amartya Sen, Nobel Laureate.

লেখকের অনূদিত ৪৫১টি হাদিস এবং বাংলা ভাষায় মুহাম্মদ সা. সম্পর্কিত লিখিত সমগ্র গ্রন্থের তালিকা এ গ্রন্থের অন্যতম সংযোজন। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে অনন্যা প্রকাশনী। ইতোমধ্যে এ গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ মুদ্রিত হয়েছে। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত লেখকের নজরুলের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস ‘পুড়ির একাকী’ গ্রন্থের বেলায়ও একথা প্রযোজ্য।

তিনি ঢাকা রোটারি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এবং রোটারী জেলা—৩২৮০-র গভর্নর ছিলেন। অংশ নিয়েছেন ব্যাংকক, ম্যানিলা, টোকিওসহ বিভিন্ন শহরের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রোটারী সম্মেলনে। ১১ বছর ধরে তিনি সংগীতে বাংলাদেশ জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। এছাড়া লোকসাহিত্য পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো, ঢাকা ক্লাব ও গুলশান ক্লাবের আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির সদস্য, গুলশান ইয়থ ক্লাব ও গুলশান সোসাইটি সম্মানিত সদস্য।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী ১৯৯৫ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ছাড়াও অ্যাপেক্স ফাউন্ডেশন পুরস্কার, বিটিভি’র গোল্ড মেডেল, মানিক মিয়া অ্যাওয়ার্ড, নজরুল পদক, আব্বাসউদ্দীন সিলেট সংগীত পদক, লালন পরিষদ অ্যাওয়ার্ড, নজরুল একাডেমী পদক, চ্যানেল আই ও রবি’র আজীবন সম্মাননা, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও চ্যানেল আই-এর আজীবন সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হন।

সংগীত পরিবেশনের জন্য তিনি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, কোরিয়া, মায়ানমার, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, লিবিয়া, সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইরান, ইরাক, তুর্কি প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন।

আগামী ৮ ডিসেম্বর শুক্রবার মুস্তাফা জামান আব্বসীর ৮০ বছর পূর্ণ হবে। তাঁর জন্মবার্ষিকী শতবর্ষ ছাড়িয়ে যাক। তাঁর লেখনিতে, কণ্ঠের গানে বাংলা সাহিত্য-সংগীত অঙ্গন আরো সমৃদ্ধ হোক—এই আমাদের চাওয়া।

ধ্বংসের মুখে লালকুঠি

lalkuthi 1অযত্ন-অবহেলায় প্রাচীন স্থাপত্য লালকুঠি (নর্থব্রুক হল) এখন ধ্বংসের পথে। শ্রীহীন ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও লালকুঠির সেই জৌলুস আর নেই। লাল রংও মলিন হয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও সৌন্দর্যময় স্থাপত্যিক নিদর্শন ফরাশগঞ্জে অবস্থিত নর্থব্রুক হল। ১৮৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ঢাকা সফরে এলে তার সফরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এ ভবনটি টাউন হল হিসেবে নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন ঢাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা গভর্নর জেনারেল নর্থব্রুকের সম্মানে এ ভবনের নাম দেন নর্থব্রুক হল। ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকা পৌরসভা সংবর্ধনা দেয়। নর্থব্রুক হলের ভবনটি লাল রঙে রাঙানো ছিল। পরে নর্থব্রুক হলটিকে লালকুঠি নামে ডাকা হতো। এ ভবন সংলগ্ন সড়কটি নর্থব্রুক হল রোড নামে পরিচিত।

এক সময় পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ লালকুঠি। ৩৬৫টি আসনের হলরুমে নাটক ছাড়াও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সভা-সমাবেশের জন্য ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের বার্ষিক মিটিং উপলক্ষেও এ হল ব্যবহার করত। পুরান ঢাকা সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিক দিয়ে অগ্রণী ছিল। তাছাড়া সংস্কৃতি ও শিল্পকলার লীলাভূমি সুপ্রাচীন ঢাকা। সেই সময়ে এ নর্থব্রুক হলে প্রায় নিয়মিতই মঞ্চ নাটক অনুষ্ঠিত হতো। ষাটের দশকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এখানে নাটক চলত। বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রবীর মিত্র ষাটের দশকে লালকুঠিতে নিয়মিত নাট্যচর্চা করতেন। এ লালকুঠির নাটক থেকেই তিনি সিনেমায় এসেছিলেন।

১৮৭৯ সালের শেষের দিকে নর্থব্রুক হলের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও ১৮৮০ সালের ২৫ মে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সে সময়ে ঢাকার কমিশনার নর্থব্রুক হলের উদ্বোধন করেন।

সরেজমিন লালকুঠিতে দেখা যায়, ভবনটির বিভিন্ন স্থানের দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। প্রধান ফটকের আস্তর খসে পড়ে ইট বেরিয়ে গেছে। চারপাশের বিভিন্ন দরজা-জানালা ভাঙাচোরা, ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা। কোথাও আবার পাখি বাসা বেঁধেছে। ভবনের ভেতরের অবস্থা আরও করুণ। ঢুকতেই মাকড়সার জালে জড়িয়ে যায় মাথা। কেয়ারটেকার বাতি জ্বালাতেই দেখা যায় বিভিন্ন স্থানে ঝুলছে মাকড়সার জাল। ধুলাবালিতে জরাজীর্ণ হয়ে আছে চারপাশ। তৈরি হয়েছে ইঁদুর ও ছুঁচোর অভয়াশ্রম। দেখেই অনুমান করা যায়, সর্বশেষ কবে এটি খোলা হয়েছিল। নাট্যমঞ্চটির অবস্থা খুবই শোচনীয়। মঞ্চটি এবড়োখেবড়ো। পাটাতনের নেই কোনো সামঞ্জস্যতা। কোথাও কোথাও কাঠ ভেঙে ফাঁকা পড়ে আছে। মঞ্চের পেছনের কিছু অংশ ভাঙা। মঞ্চের পর্দা নেই কতদিন ধরে, তা কেউ বলতে পারছে না। ছাদের কিছু অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়তে পড়তে কয়েক স্থানে সিলিং ধসে পড়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো সিলিংয়ের কাঠগুলো খসে পড়ছে। মঞ্চের বাম দিকেই কার্পেটগুলো বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পাশের বিভিন্ন স্থানের কার্পেটগুলোর অবস্থা একই ধরনের। ভেতরের বাতিগুলোও নষ্ট। একটি বাতি ছাড়া অন্য বাতিগুলো জ্বালানো সম্ভব হয়নি। ব্যবহার না থাকায় নষ্ট হয়ে অচল হয়ে আছে বেশিরভাগ ফ্যান। নেই কোনো সাউন্ড সিস্টেম। দুটি পোশাক পরিবর্তনের কক্ষের একটিও ভালো নেই। দুটি ফ্যানের একটি নষ্ট। অপরটিও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সিলিংয়ের বিভিন্ন অংশ খসে পড়েছে। হলরুমে ৬টি এসির সবকটিই নষ্ট।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে লালকুঠি। তারা বলেন, ১৪২ বছর আগে নির্মিত ঢাকার অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। দীর্ঘদিন ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় নষ্ট হচ্ছে এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম। এ বিষয়ে লালকুঠির দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক মো. আরিফুজ্জামান (প্রিন্স) যুগান্তরকে বলেন, লালকুঠিতে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। মঞ্চের ব্যবস্থাপনাও ভালো নয়। দুই বছর হল এর কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এখনই সংস্কার করা না হলে এর অভ্যন্তরে যে সরঞ্জাম অবশিষ্ট আছে, তা-ও নিঃশেষ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে হলটির ব্যবহার না থাকায় ভেতরের লাইট, ফ্যান, এসিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

স্থানীয় কাউন্সিলর মো. আরিফ হোসেন ছোটন যুগান্তরকে বলেন, লালকুঠি হলটি সংস্কারের অভাবে দুই বছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে সরকারের উপার্জনের একটি স্থান নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত লালকুঠি। পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু লালকুঠি। তিনি আশ্বাস দেন, যত দ্রুত সম্ভব এটির সংস্কারের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

মুনীর চৌধুরীর নাটক ‘কবর’

kabor drama sceneডঃ আশরাফ পিন্টুঃ বাংলাদেশর নাট্যসাহিত্যে মুনীর চৌধুরী (২৭ নবম্বর ১৯২৫১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) এক অবিস্মরণীয় নাম। অসাধারণ প্রতিভাধর এ নাট্যকার মৌলিক ও অনুবাদ নাটক দিয়ে বাংলা নাট্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি এ দেশের নবনাট্যের পথ দেখিয়েছেন। তার নাটকগুলো স্বদেশপ্রেম ও সমাজচেতনায় উদ্দীপ্ত। অল্পকাল ব্যবধানে দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর দুনিয়াব্যাপী চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন ঘটে; এর অনিবার্য প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যেও। শিক্ষিত-সচেতন মানুষ হিসেবে নাট্যকার মুনীর চৌধুরীও বিশ্বমননে স্নাত হয়েছিলেন। পৃথিবীখ্যাত নাট্যনির্মাতা ইবসেনের সামাজিক-বাস্তবতাবোধ, বার্নার্ড শর ব্যঙ্গাত্মক জীবন-জিজ্ঞাসা, পিরান্দেলো- ব্রেখট-বেকেটের প্রগাঢ় শিল্পলগ্নতা আর মন্মথ রায়ের ভাষার গভীরতা প্রভৃতি অগ্রসর ভাবনা-প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। আর এ কারণেই বিষয়-কাঠামো আর মঞ্চে পরিবেশনের কলা-কৌশলের দিক থেকে তার নাটকগুলো স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছে।

মুনীর চৌধুরী ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়ে অনেক নাটক ও একাঙ্কিকা লিখেছেন; তার মধ্যে ‘কবর’ অন্যতম। তার রক্তাক্ত প্রান্তর, চিঠি প্রভৃতি নাটক সবিশেষ সাফল্য লাভ করলেও জনমানুষের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রশংসা পেয়েছে ‘কবর’ নাটকটি। বিষয়-ভাবনা এবং পরিবেশন-শৈলীর কারণেই সম্ভবত এটির প্রচার ও প্রসার অসামান্য। ‘কবর’ গভীর জীবনবোধের আলোকে সজ্জিত একাঙ্গ নাটক। এ ধরনের নাটক অপেক্ষাকৃত আধুনিককালের সৃষ্টি। যেখানে সহজ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে অনায়াসে দেখে নেয়া যায় জীবনের রূপ-নিবিড়তা ও গন্ধ-গভীরতা। এখানে পাওয়া যায় সমকালের সহজ অনুভবের শিল্পঋদ্ধ জীবন নিষ্ঠ কথা।

‘কবর’ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত। ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নাটকটি রচিত হয়; তখন তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী জানা যায়, আরেক রাজবন্দী রণেশ দাশগুপ্ত মুনীর চৌধুরীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন জেলখানায় মঞ্চস্থ করা যায় এমন একটি নাটক লিখে দেয়ার জন্য। যেখানে দেশপ্রেম থাকবে, আলো-আঁধারি পরিবেশ থাকবে এবং নারী চরিত্র এমনভাবে থাকবে যাতে পুরুষ অভিনয় করতে পারে। মুনীর চৌধুরী রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধ মাথায় রেখেই ‘কবর’ নাটিকাটি রচনা করেছিলেন। তিনি তার স্মৃতিচারণে বলেছেন,‘জেলখানাতে নাটক রচনার অসুবিধা অবশ্যই ছিল। এ অসুবিধাটুকু সামনে ছিল বলেই তো ‘কবর’ নাটকটির আঙ্গিকে নতুনত্ব আনতে হয়েছে। আট-দশটি হারিকেন দিয়ে সাজাতে হবে সে কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই ‘কবর’ নাটকটিতে আলো-আঁধারি রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।’ নাটকটি সর্বপ্রথম ১৯৫৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি জেলখানাতে মঞ্চস্থ হয়েছিল।

‘কবর’ নাটকে গোরস্তানের অতিপ্রাকৃত রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পুরো ঘটনাই গোরস্তানের ভেতর সংঘটিত হয়েছে। নেতা আর ইন্সপেক্টর হাফিজের অর্ধ-মাতাল অবস্থায় সংলাপের মধ্য দিয়ে নাটকটি সামনের দিকে আগাতে থাকে। এর মধ্যে অশরীরী আত্মার মতো হঠাৎ এসে উপস্থিত হয় মুর্দা ফকির। মুর্দা ফকির ‘মুর্দা’ নয়, জীবিত। তবুও নেতা ও হাফিজ দুজনেই তাকে মনে মনে ভয় পায়। আপাতদৃষ্টিতে তার কথার মধ্যে পাগলামির সংমিশ্রণ আছে তবে এটা নাটকের বহিরাঙ্গ। তার প্রতিটি কথাই রূপকধর্মী। তার বুকে যে হাহাকার তা বিবেকেরই হাহাকার দেশ ও জাতির কান্না। মুর্দা ফকির নেতা ও হাফিজের কাছে বিদায় নিয়ে কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে এসে বলে,‘গন্ধ! তোমাদের গায়ে মরা মানুষের গন্ধ! তোমরা এখানে কি করছ? যাও, তাড়াতাড়ি কবরে যাও। ফাঁকি দিয়ে ওদের পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা বাইরে থেকে মজা লুটতে চাও, না? না, না আমার রাজ্যে এসব চলবে না।’

মুর্দা ফকিরের এই সংলাপের মধ্য দিয়েই নাটকটির সারসত্য প্রকাশিত হয়েছে। এখানে যারা জীবিত মূলত তারা প্রকৃত জীবিত নয়; জীবন্মৃত অবস্থায় তারা আছে-তারা জীবন্ত লাশ মাত্র। আর যাদের তারা অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে তারাই জীবিত চির জাগরূক। তাই তো লাশগুলো কবরে ঢুকতে চায় না, বিদ্রোহ করে। ওরা হাফিজের কথার প্রতিবাদ করে বলে,‘মিথ্যে কথা। আমরা মরিনি। আমরা মরতে চাইনি। আমরা মরব না।…কবরে যাব না।’

‘কবর’ নাটকের মুর্দা ফকির, মূর্তিদের (ভাষা আন্দোলনে শহীদেরা) হাহাকার শুধু নিজেদের নয়, তাদের জীবন-উৎসর্গ শুধু ব্যক্তির উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করার জন্য নয়, নয় শুধু ভাষা আন্দোলনে আবেগ-উচ্ছ্বাসে জড়িত। এখানে রাজনৈতিক অবস্থা, গোপন ছলনা এবং বাঙালীর অস্তিত্বের সংগ্রাম নাটকজুড়ে নিহিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক ও মুনীর চৌধুরীর ছাত্র আনিসুজ্জামানের উক্তিটি স্মর্তব্য,“পরিহাসতরল আবহাওয়ার ছদ্মাবরণের সাহায্যে দুটি করুণ দৃশ্যের সাঙ্গীকরণ নাটকীয়তা সৃষ্টিতে বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে। এ দুই অংশে এবং মুর্দা ফকিরের বৃত্তান্তে ভাষা আন্দোলনকে অতিক্রম করে মুনীর চৌধুরী আমাদের সামাজিক জীবনের বৃহত্তর দ্বন্দ্বের প্রতি অঙ্গুলি সঙ্কেত করেছেন।”

প্রগতিশীল চিন্তার লালনকারী নাট্যকার মুনীর তার নাটকে মানবতাবাদী ভাবনার প্রকাশ দেখাতে চেয়েছেন। রক্ষণশীলতা আর প্রগতিশীলতার যে দ্বন্দ্ব, তা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে। পরাক্রমশালী রাজনীতির দৌরাত্ম্য ও জনগণের অসহায়তা এবং আদর্শবাদী চিন্তাধারার মাহাত্ম্য রচিত হয়েছে নাটকটির সংলাপের অভিনবত্বে ও উপস্থাপনার চমৎকারিত্বে। রাজনৈতিক প্রতাপ, অহমিকা, জনগণের নাম করে নিজেদের উদরপূর্তি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ যে জাতিগতভাবে হীনম্মন্যতাকে লালন করে, তার বাস্তব চিত্র মুনীর চৌধুরী নির্মাণ করেছেন ‘কবর’ নাটকে।

‘কবর’ নাটকে মার্কিন নাট্যকার আর উইন শ’’র ‘বেরি দ্য ডেড’ (১৯৩৬) নাটকটির প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়। মুনীর চৌধুরীও নাটকটির অবচেতন প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। ওই নাটকে বিশ্বযুদ্ধে নিহত তরুণরা কবরে যেতে অস্বীকার করেছে। ‘কবর’ নাটকে শহীদেরাও কবরে যেতে অস্বীকার করেছে। আর উইন শ’’র নাটকটির সঙ্গে ‘কবর’-এর ভাবগত ঐক্যে কিছুটা মিল আছে বৈকি! কিন্তু ‘কবর’-এ মুনীর চৌধুরীর উদ্ভাবনী চিন্তা এবং রচনা কুশলতায় স্বকীয়তা বিদ্যমান। মৃত সৈনিকদের বিদ্রোহ শ’র নাটকে প্রত্যক্ষ ও বাস্তব রূপে উপস্থাপিত আর ‘কবর’-এ বাস্তবতার বিভ্রম সৃষ্টি করা হয়েছে নেতা ও ইন্সপক্টরকে অর্ধ-মাতাল অপ্রকৃতিস্থ করে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নাট্যকার মমতাজ উদদীন আহমদ বলেন, “‘…এই সুদূর এবং প্রান্তিক ভারসাম্যটির জন্য ‘কবর’কে অনুসারী নাটক বলা যাবে না। এমন হলে পৃথিবীর অধিকাংশ শ্রেষ্ঠ নাটককে কাহিনী ভাগের জন্য অনুকৃতির দায় বহন করতে হবে।”

পরিশেষে বলা যায়, ‘কবর’ নাটকে চমকপ্রদ রহস্যজাল, কৌতুকাবহ যেমন আছে তেমনি আছে এর অন্তর্মুখী বিষাদময় ঘটনা। এই কৌতুক আবহ থেকেই বিকশিত হয়েছে বিষাদাত্মক ঘটনা। রাজনীতি-সচেতন মুনীর চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করে নাটক রচনা করলেও তা সমাজের বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে বাঙালীর অস্তিত্বের সংগ্রামে পরিণত করছেন; আর এখানেই তার কৃতিত্ব।

পৃথিবীর ১০টি বিখ্যাত জাদুঘর

world's 10 best museums 1aworld's 10 best museums 1b

তাজমহলের ভবিষ্যৎ

erasing tajmahalতসলিমা নাসরিন : তাজমহল বিশাল এক প্রেমের সৌধ। সম্রাট শাহজাহান বানিয়েছেন স্ত্রী মমতাজ মহলকে ভালোবেসে। যদি ভালোই বাসতেন তিনি, অনেকের প্রশ্ন, তাহলে মমতাজ মহলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হবে জেনেও কেন বিয়ে করেছিলেন অন্য কাউকে, কেন মমতাজ মহলকে বিয়ে করার পরও বিয়ে করার লোভ সামলাতে পারেননি, কেন মমতাজের মৃত্যুর পরও উপপত্নী রাখলেন? যদি ভালোই বাসতেন, ১৯ বছরে ১৪টি সন্তান জন্ম দিতে মমতাজকে বাধ্য করেছিলেন কেন, ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই তো মমতাজের মৃত্যু হলো। যদি মমতাজকে তিনি ভালোই বাসতেন, এত উপপত্নী বা রক্ষিতাই তিনি কী করে রাখতেন! এসবের উত্তর যাই হোক না কেন, আমি মনে করি, ভালো না বাসলে তাজমহলের মতো সৌধ গড়ে তোলা যায় না। তাঁর সব ত্রুটি নিয়েই তিনি মমতাজকে ভালোবাসতেন। মমতাজ ছাড়া আর কোনও পত্নী বা উপপত্নীর জন্য তিনি সৌধ গড়েননি।

এই তাজমহল পৃথিবীর অন্যতম এক আশ্চর্য। এই তাজমহল ভারতের গৌরব। ভারত সম্পর্কে কিছু না জানলেও মানুষ তাজমহল সম্পর্কে জানেন। লক্ষ লক্ষ দেশি-বিদেশি মানুষ প্রতিবছর এই তাজমহল দেখতে আসেন। আর এই তাজমহলের নামই কিনা উত্তর প্রদেশের নতুন পর্যটন প্রচার পুস্তিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

তাজমহল তৈরি হয়েছে মুসলিম আমলে, সুতরাং হিন্দুত্ববাদীদের বক্তব্য, এই তাজমহল ভারতের গৌরব হতে পারে না। কারণ মোগল সম্রাটেরা হিন্দুদের নির্যাতন করেছে, হিন্দুদের হাজার হাজার মন্দির ভেঙে দিয়েছে। তাই তাজমহলের নাম বাদ দিয়ে পর্যটন পুস্তিকায় দেওয়া হয়েছে গোরক্ষপুর মঠের নাম। হিন্দুদের মঠ মন্দিরের নাম থাকবে পর্যটন পুস্তিকায়, মুসলমানদের সৌধ বা মসজিদের নাম থাকবে না, কারণ মুসলমানেরা হিন্দুদের নির্যাতন করেছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই বহিরাগত মুসলিমরা হিন্দুদের নির্যাতন করেছে। নির্যাতন তো ইংরেজরাও করেছে। কিন্তু যারা সম্রাট আকবরকে ঘৃণা করে, তারা কিন্তু লর্ড ক্লাইভের বিরুদ্ধে কিছু বলে না, যারা জাহাঙ্গীরকে ঘৃণা করছে, তারা হেস্টিংসের ব্যাপারে একেবারেই চুপ। এর মানে কি এই নয় যে অত্যাচারী ইংরেজকে যতটা অপছন্দ, অত্যাচারী মুসলিমকে তারও চেয়ে বেশি অপছন্দ!

হিন্দু মুসলমানের ঘৃণার ফলে ভারত ভাগ হয়েছে। এই ঘৃণার ফলে দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। পাকিস্তানে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে। হিন্দু মেয়েদের অপহরণ করে জোর জবরদস্তি ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। হিন্দুরা ভয়ে দেশ ছাড়ছে। বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের কট্টর মুসলমান যেমন ঘৃণা করে হিন্দুকে, ভারতের কট্টর হিন্দুও তেমন ঘৃণা করে মুসলমানকে। ভারতবর্ষে কট্টর হিন্দুরা আগে এত ক্ষমতা পায়নি, তাই তাদের ঘৃণার প্রকাশও খুব একটা দেখতে পাইনি। এইবার দেখছি গো-রক্ষকদের তাণ্ডব, গোমাংস খাওয়ার অভিযোগ তুলে মুসলমানদের খুন করা, হিন্দু মৌলবাদ, হিন্দুর কুসংস্কার ইত্যাদির নিন্দে করেছেন বলে কয়েকজন মুক্তচিন্তকের খুন হয়ে যাওয়া।

ভারতের কংগ্রেস আর সিপিএম নেতারা বলেছেন,‘পর্যটন পুস্তিকায় তাজমহলের নাম না থাকাটা একপ্রকার তামাশা, আর বাজেট তহবিল থেকে তাজমহল বাদ পড়ার ঘটনা দুঃখজনক। এই ঘটনা পুরোপুরি ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্ট। ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকার। তাজমহলের সঙ্গে জাতপাত, সম্প্রদায়ের কোনও যোগ নেই। এ দেশে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে বাস করে। এভাবে তাজমহলের নাম বাদ দেওয়া থেকে বিজেপি সরকারের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। রাম দিয়ে শাহজাহানকে ঢাকতে চাইছে বিজেপি। তাই শাহজাহানের প্রেমের সৌধ তাজমহল এখন মেরুকরণের রাজনীতির মধ্যমণি। ’

উত্তরপ্রদেশ সরকার আগ্রার চেয়ে অযোধ্যা নিয়ে ভাবছেন বেশি। অযোধ্যায় রামরাজ্য বানানো হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছেন “ভারতীয় সংস্কৃতির অনুকূল নয় তাজমহল।” উত্তরপ্রদেশের বিজেপি বিধায়ক সংগীত সোম তো আরো ভয়ঙ্কর কথা বলে দিয়েছেন। বলেছেন তাজমহল ভারতীয় সংস্কৃতিতে কলঙ্ক চিহ্ন। এই কলঙ্ককে সমূলে উৎপাটন করা উচিত। শাহজাহান হিন্দুদের খতম করতে চেয়েছিলেন, সুতরাং তাজমহলের ইতিহাসই বদলে ফেলা দরকার। আরেক নেতা বিনয় কাটিয়া বলেছেন, শিবের মন্দির ভেঙে বানানো হয়েছে তাজমহল, এই মন্দিরের নাম ছিল তেজোমহল। মুসলমান নেতারা বসে নেই। সমাজবাদী পার্টির আজম খান বলেছেন,“শুধু তাজমহল কেন, গুঁড়িয়ে ফেলা হোক সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন, লালকেল্লাও। সেগুলোও বহন করছে গোলামির ইতিহাস। সেগুলোও দাসত্বের প্রতীক। ”

মেরুকরণের এই রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি আগ্রায় তাজমহল দেখতে যাবেন। তাজমহলের জন্য অর্থ বরাদ্দও করবেন। তবে জানিয়ে দিয়েছেন একটি কারণেই তিনি তাজমহলকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা হলো, তাজমহল ভারতের শ্রমিকদের পরিশ্রমের ফসল। মুখ্যমন্ত্রী গুরুত্ব দিতে চান অযোধ্যাকে। সরযূ নদীর তীরে প্রায় ১০০ মিটার উঁচু রামের মূর্তি স্থাপনের তোড়জোড় করছেন। ভবিষ্যতে রাম-মাহাত্ম্য এমন প্রচার করা হবে যে অযোধ্যার গুরুত্ব তাজমহলের চেয়ে বেড়ে যাবে। বিজেপির অনেকে বলছেন, এই মুহূর্তে গোটা দুনিয়ায় তাজমহলই পর্যটনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাই রাতারাতি তাজমহলকে উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। কিন্তু ভারতের হিন্দু সংস্কৃতির ধারক হিসেবে অযোধ্যাকেই ভবিষ্যতে গড়ে তোলা হবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে।

হিন্দুত্ববাদীরা মনে করছেন, বাবরি মসজিদের মতো করে তাজমহলের নিষ্পত্তি যদি সহজ না হয়, তবে বরং হিন্দু মন্দির হিসেবে তাজমহলকে অধিকার করা জরুরি। ভারতের একটি মুসলিম স্থাপত্য নিয়ে পৃথিবীর এত উচ্ছ্বাস দেখতে তারা রাজি নন। তাজমহলকে ভারতের সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে তাঁরা কিছুতেই মানবেন না। তাজমহলকে ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু হতে হবে, তাহলেই এই স্থাপত্য নিয়ে হিন্দুরা গর্ব করবেন। হিন্দুত্ববাদীরা বলেন, তাজমহল যেমন হিন্দু মন্দির ছিল, মক্কার কাবাও একসময় হিন্দু মন্দির ছিল। টুইটার ফেসবুকজুড়ে মুসলিম মৌলবাদীরা যেমন তাদের হিন্দু বিদ্বেষ ছড়িয়ে বেড়ান। হিন্দু মৌলবাদীরাও এখন তাই করছেন, মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। তাজমহলের ইতিহাস রচনা করছেন। সাধারণ হিন্দুরা বিশ্বাস করছেন এই ইতিহাস।

১৯৮৯ সালে পি এন ওক নামে এক লোক বলেছিলেন, তাজমহল আসলে তেজোমহল নামের একটি শিবমন্দির, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেও একসময় একটি শিবমন্দির ছিল। এই পি এন ওককে কেউ তখন গুরুত্ব দেননি। আজ তাঁর সেই হাস্যকর দাবিগুলোকেই অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তাজমহলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি খানিকটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। যে হারে মুসলিম বিদ্বেষী হয়ে উঠছে হিন্দুরা, মনে হয় তাজমহল যত্নহীন পড়ে থাকবে, নয় একে শিবমন্দিরই বানিয়ে ফেলা হবে। শুনেছি কিছুদিন আগে তাজমহলে গিয়ে কয়েকজন হিন্দু মৌলবাদী শিবের মন্ত্র পড়ে পুজো টুজো দিয়ে এসেছেন। এটি যে আরো ঘটবে না তা হলফ করে বলা যায় না। হিন্দুত্ববাদী নেতারা সাধারণ হিন্দুর মাথা নষ্ট করছেন প্রতিদিন। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশ যদি মুসলিম রাষ্ট্র হতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশ কেন হিন্দু রাষ্ট্র হবে না! এই হলো তাদের কথা। মৌলবাদীরা কোনও দেশের মঙ্গল আনে না, না মুসলমানের দেশে, না হিন্দুর দেশে। আশা করি দুর্যোগ কাটবে।