আর্কাইভ

Archive for the ‘শিল্প’ Category

ভালোবাসার শহরে…

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

i love wallশান্তা তাওহিদা, প্যারিস থেকে : শহরজুড়ে যেন সারা বছরই প্রেমের মৌসুম চলে। সিন নদীর পার ধরে হেঁটে হেঁটে দেখার প্যারিস এ এক অন্য প্যারিস। সকালে সিন নদীর পানিতে সূর্যের স্পটিক হাসি আর রাতে আলো ঝলকানো হাজার হাজার তারা। এ রকম মুহূর্তটা অবশ্যই দাবি রাখে পরস্পরের হাতে হাত রেখে অতল চোখে হারিয়ে যাওয়ার। আমার যদিও সে সৌভাগ্য হয়নি। প্রায় সাত হাজার নয়শ কিলোমিটার দূরে ছিল আর একটা হাত। ভালোবাসার শহরে সে এক বেরসিক আমি!

দিন আর রাতের প্যারিসের মাঝে বিস্তর ফারাক। শুনে তা বুঝা যাবে না, এমনকি চোখে দেখেও না। এ কেবল অনুভবের। তবে প্যারিস শহর ঘুরে বেড়ানোটা ভোরে থেকে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে দুই রূপই দেখা যাবে। সিন নদীর কোল ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে শুরু হয় আমার প্যারিস সফর। পায়ে হাঁটার পথ থামে পন্ট দে আরটস সেতুতে। এটি পারিসের প্রথম ধাতব সেতু। নামকরণ করা হয়েছিল প্রথম ফরাস সম্রাটের নামানুসারে। এর এক পাশে ইনস্টিটিউট অফ ফ্রান্স আর অন্য পাশে ল্যুভর প্যালেসের কেন্দ্রীয় স্থাপনা। এ সেতুর আরেক নাম ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু। ভালোবাসাকে তালা-চাবি দিয়ে বন্দি করা যায় কিনা তা কেবল এখানকার প্রেমীরাই বলতে পারবেন। তালায় দুজনের নাম লিখে এ সেতুতে দুজনে মিলে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবিটা ছুড়ে ফেলে দেয় তারা ভালোবাসা নদীর জলে। কথিত আছে, এতে ভালোবাসা অমরতা পায়। সেতুর নিচের প্রবহমান ভালোবাসা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে চাবি খুঁজে নিয়ে সে তালা খুলে এমন সাধ্য কী আর কারো আছে বলুন? হতে পারে এটা ছেলেমানুষী। একদিন না হয় ভালোবেসে ছেলেমানুষ হলেন। ক্ষতি কি তাতে! বিষয়টা কিছুটা বুকের ঢিপঢিপানি নিয়ে ছোটবেলায় দেয়ালে যোগ চিহ্ন দিয়ে নামের আদ্যক্ষর লিখে রাখার মতো। এভাবেই হয়ত অবিনশ্বরতা পায় ভালোবাসা। মজার খবর হলো বেশ কিছু দিন আগে ভালোবাসার তালার ভারে সেতুটি প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা হয়েছিল। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হওয়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই কিছু ভালোবাসার ঝালর কেটে কমিয়ে দিয়ে ছিলেন। সেতুতে টানিয়ে দিয়েছেন সতর্কবাণীও। তাতে কি আর বুঝে পাগলপ্রেমি মন! ভালোবাসার শহরে ভালোবাসার তালা রোজই ঝুলছে। কার সাধ্য বাধা দেয়।

পন্ট দে আরটস সেতু নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত ফরাসি সিনেমা ‘লে পন্ট দে আরটস’। ফরাসি এক তরুণ তরুণীর করুণ প্রেম কাহিনি নিয়ে এ সিনেমা। প্রেমিকের সঙ্গে অভিমান করে অভিমানি প্রেমিকা এ সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে ভালোবাসা নদীতে আত্মহত্যা করে। সইতে না পেরে প্রেমিকও একি সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয় প্রেমিকার সঙ্গে মিলনের আশায়। কেবল এই সেতু নয়, ভালোবাসা নদীর ওপর এরকম প্রায় ১১টি ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু রয়েছে পুরো পারিসে । যারা প্যারিসে আসেন তাদের কাছে মন্টেমারে নামটা আগে থেকেই শোনা থাকতে পারে। জায়গাটা পারিসের উত্তর পাশে সিন নদীর কোল ঘেঁষে। পাবলো পিকাসো, ভিনসেন্ট ভ্যানগগ, ক্লোদ মনে নিভৃতে ছবি আঁকার জন্য এ পাশটা বেছে নিয়েছিলেন। ফরাসি ভাসায় এ জায়গাটার নাম মো মার্তে। পাহাড়ের উপরে রয়েছে এক মনোরম ব্যাসিলিকা। দুই নম্বর মেট্রো ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। এখানে রয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য আরো একটি আকর্ষণ। ফরাসি ভাষায় জায়গাটার নাম ‘লে মর ডেস যে তাইমে’। বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমি তোমাক ভালোবাসি দেয়াল’। মন্টেমারে রিকটুশ বাগানে এ দেয়াল।

প্রায় চল্লিশ স্কয়ার মিটার দেয়ালের পুরোটা জুড়ে ৫০টি ভাষায় ৩১১ বার লেখা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাওয়ার এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এখানে। যে আগে খুঁজে পায় ভালোবাসার বার্তা তার ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি। নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাবার আনন্দে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মানুষকে। বাংলায় ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ লেখাটা দেয়ালের মাঝখানের অংশে রয়েছে দেখলাম। বিরহ ছাড়া ভালোবাসা অর্থহীন বলেই হয়ত কিছু লাল ভঙ্গুর হৃদয় ছড়িয়ে দেয়া রয়েছে পুরো দেয়ালের ৬১২টি টাইলস জুড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল ভঙ্গুর হৃদয় দেখে। মনে মনে প্রার্থনা করলাম পৃথিবীর সকল যুগলের জন্য। অমর হোক তাদের বন্ধন। ভঙ্গুর হৃদয়ের যাতনা তাদের যেন কোনোদিন স্পর্শ না করে। আমার ধারণা ছিল কেবল তরুণ-তরুণীরা ভালোবাসার দেয়ালের খুঁজে এখানে আসে। ভুল করলাম আবারও। এখানে আসেন প্রেমিক জুগল। আর প্রেমের যে কোনো বয়স নেই তা এখানে না আসলে আমার হয়ত কখন বুঝা হতো না। হাতে হাত রেখে ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক দিয়ে বহু প্রবীণ প্রেমিকাকে প্রেমিকের চোখে হারাতে দেখেছি সেখানে। এ যেন প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে পড়া।

প্যারিসের যেবার ভালোবাসার দেয়াল দেখতে গিয়েছিলাম সেটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক দিনের সফর। টের পাচ্ছেন তো একাকি আমার দেবদাস অবস্থা! আমি ছাড়া প্যারিস শহরটা বড় বেশিই রোমান্টিক। হা হা হা- তবে যে আকর্ষণে দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসে তার সাথে দেখা করার গল্পটা বরং আমার কাছে বেশি রোমান্টিক। দ্য টাউয়ার অব লাভ-ভালোবাসার আইফেল টাউয়ার। ৩২৪ মিটার উঁচু লোহার তৈরি এ টাউয়ারে মানুষ আসে প্রেমকে অমর করতে। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। উল্টো আমিই প্রেমে পড়ে গেলাম তার। একেবারে প্রথম দেখায় প্রেম যাকে বলে। প্রথম তার সাথে যখন দেখা হয়, তখন সে কুয়াসার চাদরে ঢাকা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তার সামনে মন্ত্রমুগ্ধ আমি। দ্বিতীয় বার যখন দেখা হলো তখন তিনি আকাশের নীলে রোদেলা আমার ফাগুন পুরুষ। আর তৃতীয় বার রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে আমার ভিনদেশি তারা। তার বিশালতার কাছে নিজেকে বড়ই সামান্য মনে হয়েছে।

সিন নদী পেরিয়ে যতই তার কাছে গিয়েছি ততই বদলে যেতে শুরু করে অনুভূতিটা। ‘আমি দূর হতে কেবল তোমায় ভালোবেসেছি’ কিছুটা এরকম অনুভূতি। দূর থেকেই তাকে বড় আকর্ষণীয় লাগছিল। এ যেন চিরায়ত মানব চরিত্র! কাছে পেলে সোনার মোহর হয়ে যায় মাটির মোহর! ‘কাছে গেলে যদি ভালোবাসা কমে যায় তবে দুরত্বই ভালো-এই বলে সেদিন সন্ধ্যায় তার সাথে হলো ছাড়াছাড়ি।

পরের বার প্যারিস গিয়ে তার অন্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে আইফেল টাউয়ারের চূড়ায় উঠার সৌভাগ্য হল। চূড়া থেকে দেখলাম ভালোবাসার অন্য আরেক প্যারিসকে। পুরো প্যারিসটা ৩৬০ ডিগ্রিতে চোখে বন্দি করতে সময় লাগল আর ঘণ্টাখানেক। আইফেল এর চূড়ায় যুগল স্যাম্পেনের হাতে চুম্বনরত তরুণ-তরুণীকে দেখে মনে হয়েছে ‘প্রেম পবিত্র-প্রেম মধুর’! চূড়া থেকে দেখে মনে হলো পৃথিবী আসলেই গোল। কমলা লেবুর মতো প্যারিস শহরটা মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। তবে মিলিয়ে যায়নি ভালোবাসা। কেবল সূর্যটা টুপ করে ডুব দিয়েছে সিন নদীতে আর সন্ধ্যা নেমেছে শন্ জিলেজের পথে পথে ভালোবাসার শহরের ভালোবাসারা এভাবেই বেঁচে থাকুক অনন্তকাল!

বাংলাদেশে ২০১ গম্বুজের মসজিদ !

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

201 domes mosque mk1201 domes mosque mk2

শিল্পকলার উন্নয়ন মুঘল সম্রাটদের ভূমিকা

অগাষ্ট 19, 2017 মন্তব্য দিন

ড.আব্দুস সাত্তার : বিশ্ব শিল্পের ইতিহাসে মুঘল শিল্পের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে। মুঘল মিনিয়েচার বা ক্ষুদ্রচিত্র বিশ্বের বিস্ময়। ক্যালিগ্রাফি চিত্রের ক্ষেত্রেও সুখ্যাতি পৃথিবীজুড়্ আের এসবের মূলে রয়েছে মুঘল সম্রাটদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং সহযোগিতা। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বাবর স্বল্পসময় রাজত্ব করলেও এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত ততটা পাকাপোক্ত করতে না পারলেও শিল্পকলার উন্নয়ন যে তখন থেকেই শুরু হয়েছে তা বিভিন্ন চিত্রে স্পষ্ট। ভোজসভা বা ভোজ উৎসবে সম্রাট বাবর নামক চিত্র এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। মূলত মুঘল সম্রাটগণ তাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্য এবং সভাসদদের কর্মকাণ্ডের চিত্র আঁকিয়ে নিতেন শিল্পীদের দিয়ে। এ জন্য শিল্পী নিয়োগ দেয়া হতো এবং তাদেরকে সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা হতো রাষ্ট্রীয়ভাবে। মুঘল সাম্রাজ্যের বিখ্যাত পণ্ডিত বা ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার গ্রন্থ আইন-ই-আকবরিতে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশন করেছেন। তিনি লিখেছেন-সম্রাট আকবর শিল্পকর্ম নির্মাণের জন্য এক শ’ চিত্রশিল্পীকে তার দরবারে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যারা পারস্যের দু’জন শিল্পী মীর সৈয়দ আলী এবং আব্দুস সামাদের অধীনে কাজ করতেন। ফলে সম্রাট আকবরের সময়কালে এসব শিল্পীর মাধ্যমে ভারতীয় এবং ইসলামিক ধারার সংমিশ্রণে বিশেষ ধরনের এক নবধারার শিল্পের সৃষ্টি হয়। যাকে মুঘল ধারা বা মুঘল ঐতিহ্যের শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নতুনভাবে সৃষ্ট এই মুঘল ঐতিহ্যের চিত্রকর্মে ঐশ্বরিক বা আধ্যাত্মিকতার অনুভূতি যেমন স্পষ্ট, তেমনি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। সম্রাট আকবর চেয়েছেন শিল্পী অঙ্কিত চিত্রে একজন দর্শক যেন পবিত্রতা, আধ্যাত্মিকতা এবং ইসলামের নীতি আদর্শের সন্ধান লাভ করতে সক্ষম হন। সম্রাট আকবরের এই ইচ্ছার প্রতিফলন যাতে চিত্রের সর্বত্র প্রকাশিত হয় সে চেষ্টাই করতেন দরবারের শিল্পীরা।

সম্রাট আকবরের মুক্তমনা বৈপ্লবিক চিন্তাচেতনা এবং নীতি আদর্শ গোড়া ধর্মীয় ধ্যান ধারণার পরিবর্তে উদারতার শিক্ষার প্রবর্তন করে জীবনের সব ক্ষেত্রে। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার গ্রন্থ আইন-ই-আকবরিতে উল্লেখ করেছেন যে,সম্রাট আকবর একদিন এক জনসমাবেশে যারা চিত্রাঙ্কনকে নিরুৎসাহিত করেন, অনুমোদনহীন বলেন তাদের এ বক্তব্যকে যথাযথ নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি বরং বলেন যে, শিল্পীরা চিত্রকর্ম করতে গিয়ে নিজ ক্ষমতা এবং বুদ্ধির সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করে লজ্জিত হন এবং মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করেন। আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের কথা অনুভব করেন। এভাবেই শিল্পীরা আল্লাহর প্রতি অনুগত হন। সম্রাট আকবর আরো বলেন, শিল্পী যখন চিত্র চর্চা করেন তখন তিনি কোনো কিছুর আকার, আকৃতি, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কিংবা কর্ম নিয়ে ভাবেন,সেভাবেই কাজ করেন, কিন্তু তার পরেও তারা মহান সৃষ্টিকর্তার মতো রূপারোপ করতে না পারার বিষয়টি মর্মে উপলব্ধি করেন এবং সেই সাথে সেগুলোতে জীবন দান করার অক্ষমতার কথাও ভাবেন। এভাবেই শিল্পীরা তাদের চিত্রকর্মের মাধ্যমে আল্লাহ এবং তার অসীম ক্ষমতার কথা বারবার স্মরণ করেন।

সম্রাট আকবর চিত্রকর্মকে ভাষা হিসেবে গণ্য করতেন। তাই তিনি চিত্রের মাধ্যমে বিষয় উপস্থাপনের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে বিশাল গ্রন্থে অসংখ্য কাহিনী ও বক্তব্য প্রধান চিত্তাকর্ষক চিত্রের সমাহার ঘটেছে। যেমন দাস্তান-ই-আমির হামজা, আকবরনামা প্রভৃতি। বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য শিল্পী এসব হস্তলিখিত গ্রন্থ (ম্যানস্ক্রিপ্ট) অলঙ্করণের কাজ করতেন। দাস্তান-ই-আমির হামজার চিত্রাঙ্কনের কাজ সম্পন্ন করতে একদল শিল্পীর সময় লেগেছে ১৫ বছর। হস্তলিখিত এ গ্রন্থে ১৪০০ চিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। এসব চিত্রে নানা ধরনের কাহিনী বিধৃত হয়েছে। যেসব চিত্র দর্শনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কাহিনী বা গল্পের বক্তব্য। আকবরনামার একটি চিত্রের নাম ‘সম্রাট আকবরের হরিণ শিকার’। কোনো এক পাহাড়ি জঙ্গলে সম্রাট আকবর তার পরিবারের সদস্য ও অসংখ্য অনুচরদের নিয়ে হরিণ শিকারে ব্যস্ত। সম্রাটসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ঘোড়ার পিঠে উপবিষ্ট। অনেকেই বন্দুক-বল্লম হাতে হরিণকে তাড়া করছেন। ভীত সন্ত্রস্ত হরিণ সম্মুখ পানে ছুটে চলেছে। কোথাও বা সিংহ হরিণ ভক্ষণে ব্যস্ত। সম্রাট আকবর একটি হরিণকে লক্ষ করে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন। হরিণের সঙ্গে জঙ্গলের অন্যান্য ছোট বড় জীবজন্তুও ছুটছে প্রাণ বাঁচাতে। সব মিলে অপূর্ব শিকার দৃশ্যের চিত্র। এ চিত্রে কে কোথায় কী ভূমিকা পালন করছেন তা স্পষ্ট। এ চিত্রের বিষয় অনুধাবন করতে গ্রন্থে লেখা কোনো কাহিনী পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। চিত্র দেখেই বোঝা যায়, চিত্র দেখেই অনুধাবন করা যায় ঘটনার পরম্পরা। কারণ প্রতিটি চিত্রে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এবং গুরুত্বহীন বিষয়কেও এতটাই গুরুত্ব দিয়ে তুরে ধরা হয়েছে যে, যেকোনো অক্ষর জ্ঞানহীন দর্শকও চিত্রে কী ঘটছে তা স্পষ্টরূপে অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। শিল্পীরা কখনো কোনোরূপ সমস্যা অনুভব না করার কারণেই এতটা সূক্ষ্মভাবে প্রতিটি চিত্র অঙ্কন করতে সক্ষম হয়েছেন। সক্ষম হয়েছেন সম্রাটদের অকৃপণ উদারতার কারণে।

সম্রাট আকবর যে, শুধু ইসলামি চিত্রকলা নিয়েই ভেবেছেন তা নয়, তিনি হিন্দু ধর্ম নিয়েও ভেবেছেন এবং সে বিষয়েও চিত্রাঙ্কনের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গ্রন্থ ‘রজম-নামা’ অর্থাৎ মহাভারতের চিত্রাঙ্কনেরও ব্যবস্থা করেছেন। রজম-নামাতে ১৬৯টি দৃষ্টিনন্দন চিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। এই গ্রন্থের কাজ সম্পন্ন হয় ১৫৮৯ সালে। শিল্পী দাসোয়ন্তের নেতৃত্বে একদল শিল্পী এ কাজ সম্পন্ন করেন। কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে সম্রাট আকবর চার লাখ রুপি শিল্পীদের প্রদান করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

সম্রাট আকবরের আর এক স্মরণীয় কীর্তির নাম ‘আকবর-নামা’। আকবর-নামা মূলত আকবরকে নিয়ে রচিত হস্তলিখিত (ম্যানস্ক্রিপ্ট) গ্রন্থ। গ্রন্থে সম্রাট আকবরের প্রশাস্তি গাওয়া হয়েছে। সম্রাট আকবরের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বলা যায় সম্রাট আকবরের শাসনকালের পুরো ঘটনা এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। আর এসব ঘটনার বর্ণনা করতে অসংখ্য শিল্পী অপূর্ব সুন্দর চিত্র এঁকেছেন। এ গ্রন্থে মুঘল সাম্রাজ্যের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সম্রাট আকবর ১৫৭৪ এ এক রেকর্ড অফিস স্থাপন করেন এবং তার দরবারের অভিজ্ঞ প্রবীণ কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করেন। ঐতিহাসিক পণ্ডিত আবুল ফজল এ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। তিনি এ গ্রন্থের প্রথম অংশ সম্পন্ন করে ১৫৯৬ সালে সম্রাট আকবরের হাতে অর্পণ করেন। সম্রাট আকবর এ গ্রন্থ রচনার সময় নিজেও খোঁজখবর রাখতেন। গ্রন্থের চিত্রগুলো কতটা সম্পন্ন হলো, চিত্রগুলো কেমন হলো, কী হওয়া উচিত,ইত্যাকার বিষয়ে শিল্পীদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দিতেন। পণ্ডিত আবুল ফজল সম্রাট আকবরের পরামর্শ কিংবা দিকনির্দেশনার কতটা বাস্তবায়ন হলো সে বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে সম্রাট আকবরকে জানাতেন এবং গ্রন্থের অংশগুলো উপস্থাপন করতেন। এসব তথ্য লাভের পর সম্রাট নিজে এসব বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন এবং চিত্রের নান্দনিক বিষয়ে এবং রঙ প্রয়োগের যৌক্তিকতা বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। ফলে কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীসহ সবাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সব কাজ সম্পন্ন করতেন। সম্রাট আকবর তার সময়কালে ২৪ হাজার ম্যানস্ক্রিপ্ট সংগ্রহ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। এসব ম্যানস্ক্রিপ্টের প্রতিটি সুন্দরভাবে লিখিত এবং অলঙ্কৃত ছিল। এসব ম্যানস্ক্রিপ্টের মধ্যে ছিল সম্রাটের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং সভাসদদের বিষয়ে বর্ণনামূলক অ্যালবাম। অ্যালবামের চিত্রগুলো চির বাস্তবধর্মী এবং জীবন্ত। চিত্রগুলোতে যৌবনদীপ্ত অভিব্যক্তি এবং নান্দনিক বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হতো। চিত্রের ব্যক্তির শরীরী সৌন্দর্য, উচ্চতা এবং অনুপাতকে গুরুত্ব দিয়ে অঙ্কন করা হতো। মাথার চুল এবং দাড়িও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিত্রিত হতো। যাতে কোনোরূপ অস্বাভাবিকতার কারণে ব্যক্তিবিশেষের চেহারার বিকৃতি না ঘটে। ফলে চিত্রগুলো জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। হয়েছে যথাযথ এবং রসসিক্ত।

সম্রাট আকবর স্বর্ণমুদ্রা প্রবর্তন এবং মুদ্রায় ক্যালিগ্রাফি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। সম্রাট আকবর চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি গুরুত্ব দিয়েছেন স্বর্ণমুদ্রার ক্ষেত্রেও। এসব মুদ্রা বিভিন্ন আকৃতির হতো। গোলাকার, বর্গাকার, আয়তাকার। এ ছাড়াও এক ধরনের মুদ্রা হতো যাকে মেহরাবি মুদ্রা বলা হয়। মুদ্রা প্রচলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সম্রাটদের নাম অমর করে রাখা। এ জন্য মুদ্রায় সম্রাটদের নাম খোদাই করা থাকত। এ ছাড়া চার খলিফা আবু বকর, ওমর, ওসমান এবং আলীর নামসংবলিত মুদ্রার প্রচলনও ছিল সে সময়। পবিত্র কুরআনের আয়াত অর্থাৎ কালেমার সাহায্যেও সুন্দর ক্যালিগ্রাফি সৃষ্টি করা হতো। কোনো রাজ্য কিংবা দেশ, শহর কিংবা দুর্গ দখল করলেও সেই বিজয় উপলক্ষেও নতুন নতুন মুদ্রার প্রচলন করা হতো। যাতে লতাপাতা-ফুল এবং পাখির চিত্র থাকত। এর অপর প্রান্তে থাকত সন, তারিখ এবং টাঁকশালের নাম। অপূর্ব সুন্দর হতো এসব মুদ্রা।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণকারী সম্রাট আকবর সর্বক্ষেত্রে মুঘল সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠা করার কারণে তার পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীরকে মুঘল সাম্রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনোরূপ বেগ পেতে হয়নি। ফলে তিনি শিল্প সংস্কৃতির উন্নয়নে মনোনিবেশ করার যথেষ্ট সময় এবং সুযোগ পেয়েছিলেন। বাবার মতো তিনিও অত্যন্ত শিল্পানুরাগী সম্রাট ছিলেন। ফলে চিত্রকলার উন্নয়নে শিল্পীদের সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চিত্রকর্ম ইরানের প্রভাবমুক্ত হয়ে পুরোমাত্রায় মুঘল ধারায় রূপান্তরিত হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীর ক্যালিগ্রাফি চিত্রের ব্যাপক প্রচলন করেন এবং ইসলামি শিল্পকলারও উন্নয়ন ঘটান।

ম্যানস্ক্রিপ্ট এবং প্রতিকৃতি চিত্রের যেমন উন্নয়ন সাধন করেন, তেমনি দেয়াল চিত্রেরও প্রচলন করেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। সম্রাট জাহাঙ্গীর তার প্রাসাদের দেয়ালে শিল্পীদের দ্বারা চিত্রাঙ্কন করিয়েছিলেন। রাজপুত্র হিসেবে জাহাঙ্গীর তার বাবা সম্রাট আকবরের শিল্পীদের ওয়ার্কশপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে বাবার আদর্শে যেমন নিজেকে গড়ে তুলেছেন, তেমনি শিল্পীদের প্রতিও অধিক শ্রদ্ধাশীল হতে পেরেছিলেন। শ্রদ্ধার সঙ্গে তিনি শিল্পীদের মূল্যায়নও করেছেন। তিনি তার ব্যক্তিগত শিল্পী হিসেবে ইরানের শিল্পী আগা রেজাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি দক্ষ শিল্পীদের পুরস্কৃত বা সম্মানিত করতেন। তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি স্বার্থকভাবে অলঙ্কৃত করার জন্য তিনি শিল্পী আবুল হাসানকে সম্মানিত করেছেন।

বাজপাখি মুঘল সম্রাটদের অতি প্রিয় পাখি। সম্রাট জাহাঙ্গীর এই পাখি খুব পছন্দ করতেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর পারস্য দেশ থেকে একটি বাজপাখি সংগ্রহ করেছিলেন। এই বাজপাখির সৌন্দর্যে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, এই পাখির রঙ এতই মনোমুগ্ধকর, এতই সুন্দর যে, ভাষায় তা প্রকাশ করা যায় না। বাজপাখির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর তার প্রিয় শিল্পী মনসুরকে সেই বাজপাখির চিত্র আঁকতে বলেন। সম্রাটের নির্দেশ পেয়ে তিনি অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে বাজপাখির চিত্র এঁকেছিলেন। অপূর্ব সুন্দর হয়েছিল। পাখির চিত্রটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। শিল্পী মনসুর অসংখ্য পাখির চিত্র এঁকেছেন। কারণ সম্রাট জাহাঙ্গীর পশুপাখি খুব পছন্দ করতেন। তিনি পছন্দ করতেন বলেই শিল্পী মনসুরকে দিয়ে সেগুলোর চিত্র আঁকিয়ে নিতেন। সাদা বক, তুর্কি মোরগ, হরিণসহ বহু চিত্র এঁকেছেন মনসুর এবং এসব চিত্র এঁকে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে তার প্রচেষ্টায় মুঘল শিল্পকলার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে মুঘল শিল্পের সুখ্যাতি। মুঘল সম্রাটদের প্রায় সবাই শিল্পকলার উন্নয়নে কমবেশি সহযোগিতা করেছেন।

খুলনা শিপইয়ার্ডে কোস্ট গার্ডের জন্য সেলফ প্রপেলড ফ্লোটিং ক্রেন

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

self-propelled floating craneনাছিম উল আলম : খুলনা শিপইয়ার্ডে বাংলাদেশ কোষ্ট গার্ডের জন্য একটি সেলফ প্রপেলড ফ্লোটিং ক্রেন-এর নির্মাণ কাজের সূচনা হচ্ছে আজ। প্রায় ৫০কোটি টাকার সম্পূর্ণ দেশীয় তহবিলে এ ক্রেন বাজটির কিল-লেয়িং করবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন নিরাপত্তা বিভাগের সচিব ড.কামাল উদ্দিন আহমেদ। খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর কে কামরুল হাসান-বিএন’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকছেন কোষ্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার এ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী-বিএন। খুলনা শিপয়ার্ডে কোষ্ট গার্ডের জন্য ২৭০কোটি টাকা ব্যায়ে ৩টি ইনশোর পেট্রোল ভেসেল-এর নির্মান কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ কোষ্ট গার্ড দেশের সমৃদ্ধ সমুদ্র সম্পদ রক্ষায় আমাদের নৌসীমা সহ উপকলীয় ও অভ্যন্তরীন এলাকায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে। কোষ্ট গার্ড ইতোমধ্যে দেশের উপকলীয় এলাকা সহ বিভিন্ন নদী বন্দর ও নৌ পথে আস্থা ও নির্ভরতার প্রতিকে পরিনত হয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে প্রতিবেশী ভারত ও মায়ানমারের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় কোষ্টগার্ডের দায়িত্ব ও ভূমিকা যথেষ্ঠ বেড়ে গেছে। প্রকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এ বিশাল সমুদ্র এলাকা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা করছেন সকলে। এ বিশাল সমুদ্র এলাকার নিরাপত্তা, সম্পদ আহরন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষে কোষ্টগার্ড তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের লক্ষে ২০১৫ থেকে ’৩০সাল পর্যন্ত স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদী তিনটি স্তরে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রনয়ন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোপূর্বে ৩টি ইনশোর পেট্রোল ভেসেল-এর নির্মািন কাজ শুরু হয়েছে খুলনা শিপইয়ার্ডে। এরই পরবর্তি কার্যক্রম হিসেবে একটি সেল্ফ প্রপেলড ফ্লোটিং ক্রেন নির্মাণ করতে যাচ্ছে খুলনা শিপইয়ার্ড।

ফ্রান্সের ব্যুরো অব ভেরিটাস-এর তত্ববধানে দেড় শতাধীক ফুট লম্বা ও ৫০ফুট প্রস্থ এ ক্রেন বার্জটির গভীরতা প্রায় ১০ফুট। আমেরিকায় তৈরী ৩৭৫অশ্ব শক্তির দুটি মূল ইঞ্জিন সমৃদ্ধ এ নৌযানটি ৫৮০টন পানি অপসারন করে ঘন্টায় প্রায় ৩০কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারবে। বার্জটিতে ৬৯ কিলোওয়াটের ২টি জেনারেটর সংজোযন করা হচ্ছে। যার মাধ্যমে প্রায় ৭৫টন উত্তলনক্ষম একটি সয়ংক্রীয় ক্রেন পরিচালন সম্ভব হবে। ২৫ জন জনবল সমৃদ্ধ এ নৌযানটিতে ইকো সাউন্ডার, নেভিগেশনাল রাডার ছাড়াও অত্যাধুনিক ভিএইচএফ ও এইচএফ বেতার যোগোযোগ ব্যবস্থাও সংযোজন করা হবে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ কোষ্ট গার্ড তার টহল নৌযানসমুহের সাহায্যে দেশের অভ্যন্তরীন ও উপকলীয় এলাকায় নিয়মিত টহল প্রদানের মাধ্যমে চোরাচালান বিরোধী অভিযান এবং ইলিশ সহ মৎস সম্পদ রক্ষা ও আইন-শৃংখলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছ। নির্মিতব্য ক্রেন বার্জটি কোষ্ট গার্ডের যে কোন নৌযানের দূর্ঘটনা পরিবর্তি উদ্ধার অভিযান সহ দূর্যোগ পরবর্তি উদ্ধার তৎপড়তায়ও অংশ নেবে ।

বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর নিয়ন্ত্রনাধীন খুলনা শিপইয়ার্ড ইতোমধ্যে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী ও কোষ্ট গার্ডের জন্য একাধীন নৌযান নির্মানকাজ সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর জন্য ৫টি পেটোল ক্রাফট-এর নির্মাণ কাজ সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করার পরে বর্তমানে বড় মাপের আরো দুটি অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করছে। এছাড়াও নৌ বাহিনীর চীন থেকে সংগ্রহ করা সাবমেরিন-এর জন্য দুটি সাবমেরিন টাগও তৈরী করছে খুলনা শিপইয়াড। প্রতিষ্ঠানটি গত অর্থ বছরে এযাবতকালের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করে। শিপইয়ার্ডটি গত কয়েক বছর ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ করদাতার সম্মানও অর্জন করে চলেছে।

১৯৯৯সালের ৩ অক্টোবর বর্তমান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেড় শতাধীক কোটি টাকার দায় দেনা ও লোকসানের বোঝা নিয়ে মৃতপ্রায় খুলনা শিপইয়ার্ডকে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেন। সব লোকসানের বোঝা ও লোকসান কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গত ১৬ বছরে আরো দু শতাধীক কোটি টাকা মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। নৌ নির্মান প্রতিষ্ঠানটিতে এ পর্যন্ত ৭২০টি বিভিন্ন ধরনের নৌযান নির্মাণ ছাড়াও আরো দুই সহশ্রাধিক নৌযানের মেরামত সম্পন্ন হয়েছে।

বাংলার জামদানি শাড়ি সারা বিশ্বে সমাদৃত

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

jamdani saree 3মো. ওসমান গনি: বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যের লোকজ ও গৌরবময় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ জামদানি শাড়ি। এ শাড়ি দেশে-বিদেশে সমস্ত বাঙালি নারীর কাছে অতি প্রিয় শাড়ি। এ শাড়ি একদিকে যেমন রমণীদের কাছে প্রিয়, তেমনি এ শাড়ি বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করাতে রয়েছে তার বিশাল ভূমিকা। এ শাড়ি এখন বিদেশে বাঙালি রমণীদের দেখাদেখি বিদেশিরাও ব্যবহার শুরু করেছে। দিন দিন বিদেশে এ শাড়ির চাহিদা বাড়ছে। রেশম, সুতা, জরি এবং শিল্পীর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি জামদানি শাড়ি প্রাচীনকালের মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে বাঙালি নারীদের অতি প্রিয়। বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ইতোমধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে জামদানি। তবে জামদানি কারিগরদের অভিযোগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কাঁচামাল ও উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, দেশি কাপড়ের বাজার তৈরিতে সঙ্কট, নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রচালিত তাঁতের সঙ্গে সক্ষমতায় পেরে না ওঠা, বিপণন ব্যর্থতা, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের অভাব ও পুঁজি সঙ্কটে ধুঁকে ধুঁকে চলছে সম্ভাবনাময় এ পণ্যটি। অভিজ্ঞরা মনে করছেন জামদানি ও তাঁত শাড়ির ফ্যাশন ও ডিজাইনে বৈচিত্র্য এনে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। তাদের মতে, রফতানি ও বিক্রি বাড়াতে জামদানি শাড়ির দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা এবং ঐতিহ্যবাহী এ শাড়ির রঙ ও নকশার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে গবেষণা চালানো উচিত। সর্বজনস্বীকৃত জামদানির বহুমুখী ব্যবহার, আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম ও ঐতিহ্যের কারণে জনপ্রিয়তা ও চাহিদা অনেক বেড়েছে। রফতানি হচ্ছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে বাঙালি। গুণগত মান, রঙ ও বাহারি ডিজাইনের কারণে বাংলাদেশি জামদানির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাঙালি নারীদের মধ্যে জামদানি শাড়ির প্রচলন বেড়ে চলেছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অধিক পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আনাসহ এ পণ্য ভারতের সঙ্গে আমাদের আমদানি-রফতানি ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রফতানি ও বিক্রি বাড়াতে জামদানি শাড়ির দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা এবং ঐতিহ্যবাহী এ শাড়ির রঙ ও নকশার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে গবেষণা চালানো উচিত। জামদানি কার্পাস তুলা দিয়ে প্রস্তুত এক ধরনের সুবস্ত্র। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীদের কাছে অতি পরিচিত। মসলিনের ওপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। ‘জামদানি’ শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। জাম অর্থ ফুল আর দানি হচ্ছে ধারক। এমনই এক সুন্দর অর্থ বহন করছে জামদানি শাড়ি। খ্রিস্টাব্দ তৃতীয় শতক থেকেই জামদানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। ‘ঘরেতে এলো না সে তো, মনে তার নিত্য আসা যাওয়া, পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর’-রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁশী’ কবিতার সদাগরি অফিসের কেরানি যুবকটির না পাওয়া প্রিয়ার পরনে যে ঢাকাই শাড়ি, তার জন্য আকুতি সব বঙ্গ ললনার। জামদানি মূলত ইতিহাসখ্যাত সেই ঢাকাই শাড়ি মসলিনেরই একটি প্রজাতি। জামদানি ঢাকা জেলার বিশেষ ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে জড়িয়ে রয়েছে জামদানি শিল্পের নাম। বাংলাদেশের অহঙ্কার হিসেবে চিহ্নিত এ শিল্পের ভেতরের যে ঐশ্বর্য ছড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্যে, তার ধারক হয়ে আজও জনপ্রিয়তায় অনন্য হয়ে আছে জামদানি বয়ন। মসলিনের পরিপূরক হয়ে ফ্যাশন ঐতিহ্যে বসতি গেড়েছিল যে জামদানি তা ক্রমেই বাংলার তাঁতিদের আপন মমতায় আর সুনিপুণ দক্ষতায় হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যের পাশাপাশি আভিজাত্যের পোশাক। গত বছর ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধন পেয়েছে জামদানি। বিসিকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর (ডিপিডিটি) জামদানিকে এ নিবন্ধন দেয়। জামদানি এটি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পণ্য মসলিনের পঞ্চম সংস্করণ। একে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের মাধ্যমে দেশীয় ঐতিহ্যগত সুরক্ষার পথে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে গেল। তবে কষ্টের কথা হচ্ছে, জামদানির ইতিহাসও মসলিনের মতোই অস্বচ্ছ ও অস্পষ্ট। বাংলার ঐতিহ্যমণ্ডিত এ শাড়ি সম্পর্কে বাঙালির ইতিহাস নীরব নিথর। জামদানির তথ্য জানার জন্য হাত পাততে হয় বিদেশি গবেষক ও পর্যটকদের বিচ্ছিন্ন বর্ণনা এবং স্থানীয়ভাবে শ্রুত কাহিনি, প্রবীণ তাঁতিদের ঝাপসা স্মৃতির কাছে। জামদানির নামকরণেও রয়েছে বিভিন্ন মতবাদ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকেও বঙ্গ থেকে সোনারগাঁ বন্দরের মাধ্যমে মসলিনের মতো সুবস্ত্র ইউরোপে রফতানি হতো। তবে মসলিন শব্দটির উত্পত্তি সম্ভবত ইরাকের মসুল শহর থেকে। আর জামদানি শব্দটি এসেছে পারস্য থেকে। ঢাকাই মসলিনের পরই ছিল ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ির সুনাম। পৃথিবীজুড়ে জামদানি শাড়ির গ্রহণযোগ্যতা সর্বজনস্বীকৃত। এটি একান্তভাবে ঢাকার নিজস্ব কাঁচামালে তৈরি এবং ঢাকার তাঁত শিল্পীদের মৌলিক শিল্পবোধ এবং ধ্যান-ধারণার সৃষ্টি। পৃথিবীর আর কোনো দেশের তাঁতিদের পক্ষে এ শাড়ি তৈরি সম্ভব হয়নি। এর কারণ পারিবারিক পরিমণ্ডলে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে শিল্পভুবন সৃষ্টি হয়েছে তা আর কোথাও পাওয়া যায় না। তাছাড়া শীতলক্ষ্যার পানি থেকে তৈরি হওয়া বাষ্প সুতার প্রস্তুতি এবং কাপড় বোনার জন্য অনুকূল। প্রাচীনকাল থেকেই এ ধরনের কাপড় তৈরির জন্য শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় বরাবর পুরাতন সোনারগাঁ অঞ্চলটিই ছিল ব্যাপক উত্পাদন কেন্দ্র। বর্তমানে রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ এবং সিদ্ধিরগঞ্জের প্রায় ১৫৫টি গ্রামে এই শিল্পের নিবাস। প্রাচীন সময়ে জামদানি বয়নে একমাত্র মুসলিম কারিগররাই ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। এখনও মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকই এ শিল্পের দক্ষতার সঙ্গে জড়িত। প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ১৪শ’ শতকে লেখা তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে সোনারগাঁয়ের বস্ত্রশিল্পের প্রশংসা করতে গিয়ে মসলিন ও জামদানির কথা বলেছেন। জামদানি বিখ্যাত ছিল তার বিচিত্র নকশার কারণে। প্রতিটি নকশার ছিল ভিন্ন ভিন্ন নাম। পান্নাহাজার, বুটিদার, দুবলিজাল, তেরসা, ঝালর, ময়ূরপাখা, কলমিলতা, পুঁইলতা, কল্কাপাড়, কচুপাতা, আঙুরলতা, প্রজাপতি, শাপলাফুল, জুঁইবুটি, চন্দ্রপাড়, হংসবলাকা, শবনম, ঝুমকা, জবাফুল-এমনই নানা রকম নাম ছিল এসব নকশার। ভিন্ন জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের বয়নশিল্প হিসেবে প্রাচ্যের বয়নশিল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল জামদানি মোটিফ। এ মোটিফে খুব সহজেই কাপড়ের ভেতর ছায়ার মাঝে তৈরি করা যায় নকশার প্রতিবিম্ব। জামদানি শাড়ির আগের সব বিখ্যাত ও অবিস্মরণীয় নকশা ও বুননের অনেকগুলোই বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। নবীন কারিগররা অধিকাংশ নকশাই বুনতে জানেন না। বর্তমান জামদানি শাড়ির পাড়ে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে করলা পাইড়, কনকা, করলা, ইঞ্চি ও মদন পাড়। শাড়ির শরীরে চলতি সময়ে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে সন্দেশ, জুঁই, ছিদার, গোলাপফুল ও চিরাবুটি নকশা। জামদানি তাঁতিরা সপ্তাহে ১৫০০ টাকা বা মাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন। এতে করে তাদের সংসার চলছে না। বর্তমানে যে তাঁত রয়েছে সেগুলোও বন্ধ হওয়ার পথে। জামদানি শাড়ি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, ভারতীয় নকল শাড়ির কাছে ঢাকাই জামদানি শাড়ি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। কারণ, ইন্ডিয়ান জামদানি শাড়ি ক্রেতারা ঠিকভাবে চিনতে পারে না। আবার পলিয়েস্টার সুতা দিয়ে তৈরির কারণে দামেও সস্তা। যেখানে সিল্ক সুতা দিয়ে তৈরির কারণে ঢাকাই শাড়ির দাম বেশি পড়ে। এছাড়া পুঁজির অভাব, সুতার দাম বাড়তি, তাঁতিদের মজুরি কম হওয়াতে অনেকে এ শিল্প থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে দিন দিন কমছে তাঁত। সরকার উদ্যোগ নিয়ে যদি ভারতীয় জামদানি শাড়িকে ঢাকায় আসা বন্ধ করার ব্যবস্থা করত তবে দেশের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। তাঁতিদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হলে জামদানি শিল্পীরা আবার পুনরুজ্জীবিত হবে। জামদানি শাড়ির ঐতিহ্য ফিরে আসবে। দেশ-বিদেশে জামদানি রফতানি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করা সম্ভব হবে। পুঁজি সঙ্কটে পড়ে অনেক তাঁতি তাদের শেষ সম্বল তাঁত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের শাহজাদপুর কাপড়ের হাটের মতো ঐতিহ্যবাহী বাবুরহাট, গাউছিয়া হাট, টাঙ্গাইলের করোটিয়া, বাজিতপুর, বল্লারামপুরহাট, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর কাপড়ের হাট, সোহাগপুর কাপড়ের হাট পাবনার আতাইকুলা হাট, কুষ্টিয়ার পোড়াদহ হাট, কুমারখালী হাটসহ দেশের বড় কাপড়ের হাটে বেচাকেনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বরেণ্য পণ্ডিত এলাম ডান্ডিসের বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হতে পারে, কিন্তু লোকসংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বলতে পারি-অবশ্যই পৃথিবীর সম্পদশালী দেশগুলোর একটি’। এই তাঁত শিল্পের হাত ধরেই আন্তর্জাতিক মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বিবি রাসেল। রফতানি পণ্যের তালিকায়ও তাঁতজাত পণ্যের তুলনা নেই। দেশীয় তাঁতের শাড়ি টেকসইও বেশি। আমাদের তৈরি তাঁতসামগ্রী পুরো বিশ্বে ব্র্যান্ডেড পণ্য হিসেবে সমাদৃত হলেও আমাদের সীমাহীন অবহেলার কারণে এই শিল্প আজ বিপন্ন হতে বসেছে। বিদেশি নিম্নমানের পোশাকে সয়লাব হয়ে গেছে বাজার। পার্শ্ববর্তী দেশের নিম্নমানের পোশাকের বাজার সৃষ্টি করার লক্ষ্যে একটি মহল দেশীয় তাঁত শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁত শিল্পকে বিশ্ববাজারে আগের সেই অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য সরকারের উচিত তাঁত বস্ত্র শিল্প পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করা। আমদানি নিষিদ্ধ করা হলে দেশীয় তাঁত শিল্প বাঁচবে। শ্রমিক বাঁচবে। আমাদের দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থে বিদেশি নকল জামদানি শাড়ি-কাপড় আমদানি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের দেশের কাপড় আমদানিকারকদের বিদেশি কাপড় আমদানি কমিয়ে দেশের পণ্য বিক্রিতে দেশবাসী উত্সাহ জোগাতে হবে। জামদানি শিল্পের সঙ্গে জড়িত তাঁতিদের সরকারিভাবে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে তাঁতিরা আমাদের দেশের গৌরবময় এ জামদানি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে। এতে যে শুধু তাঁতিদের লাভ হবে তা নয়, এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে পারলে একদিকে যেমন কমবে আমাদের দেশের বেকারত্ব, অপরদিকে এ শিল্পে তৈরি পণ্যসামগ্রী বিদেশে রফতানি করে চাঙ্গা হবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির।

‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মুহাম্মদ’ থেকে ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’!

অগাষ্ট 14, 2017 মন্তব্য দিন

mahindra muhammad logoভারতের গাড়ি কোম্পানিগুলির মধ্যে এক অতি পরিচিত নাম ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’। বিশ্বের সব থেকে বড় ট্রাক্টর প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’। কয়েকশো কোটি ডলার সম্পত্তির অধিকারী এই কোম্পানি। এদের তৈরি ট্রাক্টর ভারতের কৃষকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

কিন্তু জানেন কি এই কোম্পানির নাম এক সময়ে ছিল ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মুহাম্মদ’? আর সেখান থেকে দেশভাগ, ভারত – পাকিস্তানের স্বাধীনতা – এসব কারণে তা আজ হয়ে উঠেছে ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’।

কোম্পানিটি চালু হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। পাঞ্জাবের লুধিয়ানাতে কে.সি মাহিন্দ্রা, জে.সি মাহিন্দ্রা আর মালিক গুলাম মুহাম্মদ ইস্পাত কারখানা হিসেবে এই কোম্পানির পত্তন করেন।

‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’র চেয়ারম্যান কেশব মাহিন্দ্রা বিবিসিকে বলছিলেন, “কে.সি মাহিন্দ্রা আর জে.সি মাহিন্দ্রা মি: গুলাম মুহাম্মদকে কোম্পানির অংশীদার বানিয়েছিলেন, কারণ তারা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের একটা বার্তা পৌঁছে দেবে সবার কাছে। সংস্থায় মি: মুহাম্মদের অংশীদারিত্ব কমই ছিল, কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তাঁর নামটা কোম্পানিতে ব্যবহার করা হয়েছিল।”

দেশ ভাগের একদম ঠিক আগে যখন পাকিস্তানের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, তখনও গুলাম মুহাম্মদ আর মাহিন্দ্রা পরিবারের মধ্যে বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে। ব্যবসাও ভালোই চলছে তখন।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে মালিক গুলাম মুহাম্মদ পাকিস্তানে চলে গেলেন। তিনি সে দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন।

দেশ যখন ভাগ হল, তখন ব্যবসাও ভাগ হয়ে গেল। ১৯৪৮ সালে ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মুহাম্মদ’ নাম পাল্টে করা হলো ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’।

গুলাম মুহাম্মদ নিজের অংশীদারিত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন। তবে দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক দেশভাগের পরেও অটুট ছিল। শুধু ব্যবসাই আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

কেশব মাহিন্দ্রার কথায়, “মালিক গুলাম মুহাম্মদ যখন পাকিস্তানে চলে গেলেন, তখন আমাদের পরিবারের সবাই খুব অবাক হয়েছিলাম। এটাও খারাপ লেগেছিল যে উনি আগে থেকে আমাদের পরিবারকে কিছু জানাননি যে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা।”

১৯৫১ সালে মালিক গুলাম মুহাম্মদ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন। ব্যবসা আলাদা হয়ে গেলেও মাহিন্দ্রা পরিবারের সঙ্গে পুরনো সম্পর্কটা তিনি ভোলেননি।

১৯৫৫ সালে দিল্লির রাজপথে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রথম সামরিক প্যারেডে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন।

“গুলাম মুহাম্মদ দিল্লিতে এসে প্রথম ফোনটা করেছিলেন আমার ঠাকুমাকে। দুই পরিবারের বন্ধুত্বটা আগের মতোই রয়ে গেছে,” বলছিলেন কেশব মাহিন্দ্রা।

বিবিসি বাংলা

সালতামামি ২০১৬ – প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন

text-saltamami-%e0%a7%aa

2016-review-12016-review-22016-review-32016-review-4