আর্কাইভ

Archive for the ‘শিল্প’ Category

বাঁশ দিয়ে প্রতিমা তৈরী করলেন মুসলমান শিল্পী

101 feet high durga statue 1a101 feet high durga statue 1b

Advertisements

৫৫০ বছরের পুরনো শাহী মসজিদ

shahi mosque 1a

shahi mosque 1b

জিন প্রযুক্তি ॥ পশুচর্ম ছাড়াই তৈরি হবে চামড়া

চামড়া তৈরি এক সুপ্রাচীন শিল্পকর্ম। চামড়ার তৈরি এ পর্যন্ত প্রাচীনতম যে জিনিসটি পাওয়া গেছে সেটি সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগের একটি জুতা যা আর্মেনিয়ার একটি গুহায় পাওয়া যায়। তবে মিসরীয় সমাধিগুলোর গায়ে উৎকীর্ণ চিত্রকর্মে দেখা যায় যে, চামড়া দিয়ে স্যান্ডেল থেকে শুরু করে বালতি এমনকি সামরিক উপকরণ পর্যন্ত নানা ধরনের জিনিস তৈরি করা হতো। পোশাক তৈরির কাজে পশুচর্মের ব্যবহার যে হাজার হাজার বছরের পুরনো কৌশল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

চামড়া তৈরির কাজটা আগে অত্যন্ত বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর লন্ডনে পশুর চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে মূত্র ও চুনের মিশ্রণে চুবিয়ে নেয়া হতো, যাতে করে মাংস বা পশমের কিছু লেগে থাকলে তা আলগা হয়ে যায়। পরে সেই চামড়া নরম ও সংরক্ষণ করার জন্য তাতে কুকুরের বিষ্ঠার প্রলেপ দিয়ে নেয়া হতো। এতে চারপাশের পরিবেশে এমন এক উগ্র ও কটু ‘গন্ধ’ ছড়িয়ে পড়ত যে, নগরীর মূল অংশে চামড়া তৈরির কারবার নিষিদ্ধ করে বাতাস যেদিকে প্রবাহিত হয় সেদিকে ও নদীর তীরে সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়। ভারত ও জাপানে চামড়া তৈরির কারবারে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ জড়িত ছিল।

চামড়ার আধুনিক উৎপাদন কৌশল অষ্টাদশ শতকের কৌশলের মতো ঘিনঘিনে ও শরীর গুলিয়ে দেয়ার মতো নয়। মূত্র, চুন ও কুকুরের বিষ্ঠার পরিবর্তে আজ ব্যবহৃত হচ্ছে ক্রোমিয়াম ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য। কিন্তু কিছু কিছু রাসায়নিক পদার্থ বড়ই উগ্র ও কটু এবং সেগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরও বটে। তার পরও চামড়া শিল্প এক বিশাল শিল্প। বার্ষিক চামড়া ব্যবসার মূল্য ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। এমন প্রলুব্ধকর এক ব্যবসা যে প্রযুক্তির উৎকর্ষে উৎসাহিত করবে এটাই স্বাভাবিক। সেই উন্নত প্রযুক্তির বদৌলতেই আজ পাকা চামড়া সত্যিকার অর্থে এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে চলেছে। এ থেকে যে কারোর ধারণা হতে পারে সেই প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিকল্পটি হয়ত সিনথেটিক পলিমারের কোন কিছু। কিন্তু না, তা নয়। সেই বিকল্পটি হচ্ছে এমন একটি জিনিস যা বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে স্বাভাবিক চামড়ার অনুরূপ। পার্থক্য এইটুকু যে সেই চামড়া পশুর গা থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হয় না, বরং তা কারখানায় উৎপাদন করা হয়।

পশু হত্যা না করেও কারখানায় চামড়া উৎপাদনে যে কৌশলটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি হলো জিন প্রকৌশল। কৌশলটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এই কৌশল অবলম্বনে যে প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে অগ্রসর তার নাম ‘মডার্ন মিডো’। এটি একটি মার্কিন কোম্পানি। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে কোম্পানির ৬০ জন স্টাফ নীরবে নিঃশব্দে চামড়ার এক নতুন রূপ উদ্ভাবন করেছে। অতঃপর তারা নিউজার্সির নাটলিতে এক ল্যাবরেটরিতে সেই চামড়ার পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে। কোম্পানিটা তার উৎপাদিত পণ্য দুই বছরের মধ্যে বাজারে আনতে পারবে বলে আশা করে।

প্রাণীদেহ থেকে নেয়া চামড়ার তুলনায় কারখানায় উৎপাদিত চামড়ার বেশকিছু সুবিধা থাকার সম্ভাবনা আছে। একটা হলো, এই চামড়া সুবিধাজনক শিটে বানানো যাবে যার প্রান্তগুলো হবে সোজা। অন্যদিকে পশুর চামড়ার সীমাবদ্ধতা হলো সেগুলোর আকার পশুর দেহ অনুযায়ী অসম হয়। দ্বিতীয় সুবিধা হলো, স্বাভাবিক চামড়ার তুলনায় এগুলো অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ গুলোতে কোন দাগ, চিহ্ন ও অন্যান্য খুঁত থাকবে না, যা প্রকৃত চামড়ায় অনিবার্যভাবেই থেকে যায়। এক পশু থেকে আরেক পশুর স্বাভাবিক চামড়ার তারতম্য থাকে। কিন্তু এই চামড়ার ক্ষেত্রে এ জাতীয় কোন তারতম্য হবে না। এসব কিছুর ফলে অপচয় কমবে এবং গুণগত মান বাড়বে।

কারখানায় চামড়া তৈরির জন্য ‘মডার্ন মিডো’ ঈস্টের একটি স্টেইন দিয়ে কাজ শুরু করেছে। জিন প্রকৌশলের দ্বারা সেই ঈস্টটি এমনভাবে পরিবর্তিত করা হয়েছে, যার ফলে সেটি বোভাইন কোলাজেনের অনুরূপ একটি প্রোটিন তৈরি করতে পারে। কোলাজেন হচ্ছে প্রাণী দেহের প্রধান কাঠামোগত প্রোটিন। বিশেষ করে এটি গাত্রচর্মকে শক্তি ও স্থিতিস্থাপকতা যোগায়। এটি সব প্রোটিনের গঠনকারী উপাদান এ্যামাইনো এ্যাসিডের সুদীর্ঘ শৃঙ্খল দিয়ে গঠিত। এটা ত্রয়ীরূপে পাক খেয়ে নিয়ে ট্রিপল-হেলিস তৈরি করে এবং এই ট্রিপল-হেলিসও পরে পাক খেয়ে ফাইবার বা তন্তু তৈরি হয়।

পশুর চামড়ার ক্ষেত্রে এ্যামাইনো এ্যাসিডের শৃঙ্খলগুলোর সংশ্লেষণ ও পরবর্তীকালে সেগুলোর পাক খেয়ে আঁশ বা তন্তুতে পরিণত করার কাজটা বিশেষ কতগুলো সেল বা কোষ দিয়ে করা হয়, যেগুলোকে বলা হয় ফাইব্রোব্লাস্ট। ‘মডার্ন মিডো’র জৈব প্রকৌশলীরা এক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশল করায়ত্ত করেছেন। তা হলো তারা ফাইব্রোব্লাস্টের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এ্যামাইনো এ্যাসিডের শিকলগুলোকে আপনা আপনি একত্রে পাক খেয়ে তন্তু বা আঁশে পরিণত হতে দেয়। একবার আঁশ বা তন্তু তৈরি হয়ে গেলে সেগুলোকে আপনা থেকেই কয়েকটি স্তরে পরিণত হতে দেয়া এবং এভাবে কাঁচা চামড়ার শিট তৈরি করা কঠিন কিছু নয়।

জৈব প্রকৌশলীরা কি কৌশলে ফাইব্রোব্লাস্টের সাহায্য ছাড়াই আঁশ বা তন্তু তৈরি করতে পেরেছেন, তা অবশ্য জানাতে রাজি হননি। তবে কোম্পানির প্রধান প্রযুক্তি অফিসার ডেভ উইলিয়ামসন জানিয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় বিশাল বিশাল কারখানায় কোলাজেন তৈরি করা এবং পরে তা চামড়ায় রূপান্তরিত করার জন্য ছোট ছোট কারখানা বা ট্যানারিতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। দামের দিক দিয়ে এই নতুন চামড়াটি হবে পশুচর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক।

‘মডার্ন মিডো’র উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটা সুবিধা হলো এতে করে চামড়ার একটা শিটের বিভিন্ন অংশকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দান করা যাবে। এতে করে উৎপাদিত চামড়ার চেহারা ও পণ্যটি সম্পর্কে অনভূতি নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বদলানো যেতে পারে। যেমন একটি অংশকে শক্তভাবে এবং অন্য অংশটিকে নরমভাবে বানানো যেতে পারে। ফলে একটা শিট দিয়েই জুতার শক্ত অংশ এবং অন্য অংশ দিয়ে জুতার নরম অংশ তৈরি করা যেতে পারবে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

বিশ্বকে বদলে দিতে চলেছে ব্যাটারি শিল্প

tesla S-battery pack.jpgমোটর গাড়ি শিল্পে আজ যে ব্যাপক রূপান্তর ঘটছে, ইন্টারনাল কমবাস্টন ইঞ্জিনের গাড়ির জায়গায় ইলেকট্রিক গাড়ির যে বিশাল পরিসরে প্রচলন হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তার মূলে রয়েছে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবস্থার অবিস্মরণীয় সম্প্রসারণ। বলা যেতে পারে এই ব্যাটারি শিল্প দুনিয়াকে বদলে দেয়ার উচ্চাভিলাষ নিয়ে এসেছে। বিদ্যুত কোম্পানিগুলোর বিদ্যুত মজুদ রাখার ও চাহিদা বৃদ্ধির সময় তা ছেড়ে দেয়ার ভাল ব্যবস্থা হতে পারে এই ব্যাটারি।

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্রথম বিক্রি শুরু হয় ২৬ বছর আগে সনি কোম্পানির ক্যামকর্ডারে। শুরুতেই বাজারমাত। অচিরেই লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কম্পিউটার, ফোন, কর্ডলেস পাওয়ারটুল, ই-সিগারেট ও আরও অনেক কিছুতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বে যত বেশি সাজসরঞ্জাম ব্যবহার হচ্ছে তত বেশি আজ প্রয়োজন হয়ে পড়ছে এই ব্যাটারির। গত বছর ভোগ্যপণ্যের জন্য যত লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন করতে হয়েছে সেগুলোর মোট বিদ্যুত ধারণক্ষমতা ছিল ৪৫ গিগাওয়াট-আওয়ার। ব্রিটেনে গড়ে প্রায় ৩৪ গিগাওয়াট-আওয়ার বিদ্যুত প্রয়োজন। সুতরাং ওইসব ব্যাটারির সবই চালু করা হলে সেগুলো দিয়েই ব্রিটেনকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুত যোগানো যেত। একই বছর ইলেকট্রিক কারের জন্য লিথিয়াম ব্যাটারির উৎপাদন ওই ক্ষমতার অর্ধেকের কিছু বেশিতে ২৫ গিগাওয়াট-আওয়ারে পৌঁছায়।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারির চাহিদা আগামী বছরের প্রথমদিকে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর ব্যাটারির চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাবে। তার মানে এই ব্যাটারি শিল্পের বিশাল সম্প্রসারণ ঘটতে চলেছে। বিশ্বে লিথিয়াম ব্যাটারির শীর্ষ পাঁচ প্রস্তুতকারক কোম্পানি হলো জাপানের প্যানাসনিক, দক্ষিণ কোরিয়ার এলজি কেম ও স্যামসাং এসডিআই এবং চীনের বিওয়াইডি ও সিএটিএল। এরা সবাই উৎপাদন বাড়াতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করছে। মোটর কোম্পানি টেলসা নেভাদায় প্যানাসনিকের সঙ্গে যৌথভাবে ৫শ’ কোটি ডলারের যে বিশাল গিগাফ্যাক্টরি তৈরি করছে ইতোমধ্যে সেটিতে বছরে ৪ গিগাওয়াট-আওয়ার এনার্জি তৈরি হচ্ছে। টেলসা বলছে যে, তাদের টার্গেট বছরে ৩৫ গিগাওয়াট-আওয়ার তৈরি করা। মাত্র ৪ বছর আগে এটাই সারা বিশ্বের সমস্ত যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।

গিগাফ্যাক্টরি শুধু গাড়ির জন্য নয়। গ্রিডকে বিদ্যুতের যোগান দেয়াও তার লক্ষ্য। টেলসা কোম্পানি অস্ট্রেলিয়ায় তার গ্রিডভিত্তিক বৃহত্তম বিদ্যুত স্থাপনা তৈরি করছে। এমনই স্থাপনা অন্যরাও অন্যান্য জায়গায় তৈরি করছে। বড় বড় কোম্পানি লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়ায় এর ইউনিটপ্রতি খরচ কমে আসছে। ২০১০ সালে ব্যাটারির মূল উপাদান লিথিয়াম-আয়ন সেলের খরচ ছিল কিলোওয়াট আওয়ারপিছু এক হাজার ডলারের বেশি। গত বছর সেই একই ইউনিটের খরচ ছিল ১৩০ থেকে ২শ’ ডলারের মধ্যে। টেলসা জানিয়েছে যে, তার মডেল ৩ সেলের খরচ আরও কম। খরচ কমে যাওয়াটাই যে একমাত্র উন্নতির বিষয় তা নয়। গবেষণা ও উন্নয়নে (আর এ্যান্ড ডি) বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের পরিণতিতে বিদ্যুত শক্তির ঘনত্ব বেড়ে গেছে অর্থাৎ কিলোগ্রামপিছু অধিক পরিমাণ শক্তি সংরক্ষণ করা যাচ্ছে এবং টেকসই ক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বোল্ট কোম্পানি এমন ব্যাটারি নিয়ে এসেছে যার ওয়ারেন্টি ৮ বছর।

উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় ব্যাটারি শুধু যে দামে সস্তা হচ্ছে তা নয়, এর গুণগত মানও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর শক্তি ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে কারখানার ব্যাটারি উৎপাদন ক্ষমতাও। এক হিসাবে দেখা যায় যে, গত বছর লিথিয়াম ব্যাটারির উৎপাদন চাহিদার চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি হয়েছে। বাজার লিথিয়াম ব্যাটারিতে সয়লাব হয়ে যাওয়ায় কিছু কোম্পানি লোকসান গুনেছে অথবা নামমাত্র মুনাফা করেছে। কিন্তু তারপরও বেশিরভাগ বড় কোম্পানি তাদের কারখানা ও বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে, যাদের উদ্দেশ্য হলো দাম আরও কমিয়ে আনা। এতে নিকট ভবিষ্যতে ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য আরও বেশি আশার সঞ্চার হয়েছে। কারণ এতে এই গাড়ির দাম আরও কিছু কমবে এবং বিক্রি বাড়বে। অতি আশাবাদীরা এমনও বলেন যে, আমেরিকায় এক সময় মানুষ যেমন সোনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, তেমনি নিকট ভবিষ্যতে ইলেকট্রিক গাড়ির জন্যও হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির জন্য কিছু মূল্যবান খনিজ উপাদান প্রয়োজন। যেমন লিথিয়াম, কোবাল্ট ইত্যাদি। একটা সেল তৈরির খরচের ৬০ শতাংশ এসব উপাদানের পেছনেই চলে যায়। এসব উপাদানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। লিথিয়ামের দাম ২০১৫ সাল থেকে চারগুণ বেড়েছে। ক্যাথোড তৈরির জন্য যে কোবাল্ট দরকার সেটির দামও একই সময় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ক্যাথোডের আরেক উপাদান নিকেলের দামও বাড়ছে। বিশ্বে লিথিয়ামের মজুদ কমপক্ষে ২১ কোটি টন বলে ধরা হয়। বর্তমানে বার্ষিক আহরণ হচ্ছে ১ লাখ ৮০ হাজার টন। বিশ্বে সর্বাধিক লিথিয়াম উৎপাদক দেশ চিলি। কোবাল্ট সেই তুলনায় দুষ্প্রাপ্য। বেশিরভাগ সরবরাহ আসে কঙ্গো থেকে। দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কোন কোন কোম্পানি কোবাল্টের বিকল্প সন্ধান করছে। তা ছাড়া পুরনো ব্যাটারির উপাদানগুলো রিসাইক্লিং করে ব্যাটারি শিল্পকে আরও বেশি টেকসই করে তোলা যেতে পারে।

লিথিয়াম ব্যাটারির দাম ও ওজন, এর বারবার চার্জ ও ডিসচার্জ করার ক্ষমতা, এর টেকসই ক্ষমতা ও নিরাপত্তার কাছে অন্য কোন ব্যাটারি ধারেকাছে ভিড়তে পারে না। তাছাড়া এই ব্যাটারির প্রযুক্তির প্রতিনিয়ত উন্নতি ঘটানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত ইলেকট্রিক গাড়ির লিথিয়াম ব্যাটারি হচ্ছে সিলিন্ডারের মতো একটি সেল, যাকে বলা হয় ১৮৬৫০। দেখতে রাইফেলের খোলের মতো। এটি ৬৫ মিলিমিটার লম্বা, ব্যাস ১৮ মিলিমিটার এবং এর এনার্জি ঘনত্ব সম্ভবত কিলোপ্রতি ২৫০ কিলোওয়াট-আওয়ার। সে তুলনায় পেট্রোলের এনার্জি ঘনত্ব প্রায় ৫০ গুণ বেশি। তবে ব্যাটারি সেলটি সেই পরিমাণ এনার্জির কয়েক শ’ বা কয়েক হাজার গুণ বেশি। টেলসা ও প্যানাসনিক এখন নতুন এক লিথিয়াম ব্যাটারি তৈরি করেছে। ২১৭০ নামের এই ব্যাটারি একটু বেশি লম্বা ও চওড়া। এটি হবে বাজারের প্রাপ্তিযোগ্য সর্বাধিক এনার্জি ঘনত্বসম্পন্ন ব্যাটারি। এই ব্যাটাারির কারণে টেলসা কোম্পানির মডেল ৩ ইলেকট্রিক গাড়ির খরচ আগের যে কোন গাড়ির তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসবে।

টেলসার প্রতিষ্ঠাতা এলোন মুস্ক আশা প্রকাশ করেছেন যে, তাদের যে গিগাফ্যাক্টরি তৈরি হচ্ছে সেটি হবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইমারত যেখান থেকে বছরে এক শ’ গিগাওয়াট-আওয়ার এনার্জি বেরিয়ে আসবে। অন্যান্য স্থানে আরও গিগাফ্যাক্টরি তৈরি হতে যাচ্ছে। পরবর্তীটি সম্ভবত হবে চীনে। এসব আয়োজন থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, ইলেকট্রিক গাড়ির যুগ এসে গেছে। সন্দেহ নেই এই গাড়িগুলো দিনকে দিন উন্নত হচ্ছে এবং দামেও হচ্ছে সস্তা। তবে সেগুলোর ব্যবহারে কিছু সীমাবদ্ধতাও থেকে যাচ্ছে। ব্রিটেনের কথাই ধরা যাক। সেখানে ৪৩ শতাংশ ইলেকট্রিক গাড়ির মালিকের অব স্ট্রিট পার্কিংয়ের সুবিধা নেই। তাছাড়া ঘরে ব্যাটারি চার্জ করার ব্যবস্থা নেই। ৯০ কিলোওয়াট-আওয়ারের ব্যাটরি চার্জ করার জন্য দরকার ১১ কিলোওয়াটের চার্জার। সময় লাগবে ৬ ঘণ্টা। সুতরাং বাসাবাড়িতে চার্জ করা সম্ভব নয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার দ্রুত ব্যাটারি চার্জ করার মতো স্টেশন, অনেকটা পেট্রোল স্টেশনের মতো। সেটা কত দিনে সম্ভব হবে সেটাই প্রশ্ন।

টেলসা ও অন্য বড় ব্যাটারি প্রস্তুতকারকদের গ্রিড স্টোরেজ প্রকল্পগুলো এখন বিদ্যুতের বাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। এগুলো উদ্বৃত্ত এনার্জি কাজে লাগানোর জন্য কন্ট্রাক্ট অফার করছে। টেলসার ব্যাটারি সোলার প্যানেল ও সোলার টাইলের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। লিফ কোম্পানির ব্যাটারিও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কলকারখানায় ব্যাকআপ বিদ্যুত যোগাতে পারে এবং এভাবে বায়ুদূষণকারী ডিজেল জেনারেটরের স্থান দখল করতে পারে এই ব্যাটারি। আমেরিকার কোন কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে এমন ব্যাটারি স্থাপনে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যেগুলো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুত বিক্রি করতে পারে। এটা হলো পিকআওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের একটি উপায়। তবে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে কিছু বিপত্তিও রয়েছে। একটি হলো অগ্নিকা-ের ঝুঁকি। গত বছর স্যামসাং গ্যালাক্সি ‘নোট-৭’ স্মার্টফোনে বিস্ফোরণের ঘটনা বিশ্ববাসীকে সাবধান করে দিয়েছে যে, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন হলে শর্টসার্কিট হয়ে আগুন লেগে যেতে পারে। অবশ্য নতুন উপাদানের ব্যবহার এবং ইলেকট্রোডগুলোর সিরামিকের কোটিং থাকায় গাড়ির ক্ষেত্রে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিরাপদ।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

প্রথম বাইসাইকেল বানিয়েছিল কে এবং কখন?

bike-1আপনি হয়তো ভাবতে পারেন বাইসাইকেলের মতো সরল একটি উদ্ভাবনের ইতিহাসও জটিলতামুক্ত। কিন্তু এর ইতিহাস নিয়েও আছে বিতর্ক এবং ভুল তথ্য। তবে প্রথম বাইসাইকেলটি দেখতে ঠিক আজকের মতোই ছিল।

১৪৫৮ সালে সর্বপ্রথম ইতালিয়ান প্রকৌশলী জিওভান্নি ফন্টানা মনুষ্যচালিত চাকার যান তৈরি করেন। সেটি ছিল চার চাকার একটি যান।

এর চারশ বছর পর ১৮১৩ সালে জার্মানির কার্ল ভন ড্রাইস চার চাকার মনুষ্যচালিত যান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৮১৭ সালে তিনি দুই চাকার একটি যান উদ্ভাবন করেন।

তার ওই উদ্ভাবন ছিল একটি বৈশ্বিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে। ১৮১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার টাম্বোরা পর্বত এর আগ্নেয়গিরি থেকে লাভার উদীরন হলে সারা পৃথিবীর আকাশে ছাই ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক ফসলহানি ঘটে।
ফলে ঘোড়াসহ অন্যান্য প্রাণী না খেয়ে মরতে থাকে। এসময় কার্ল ভন ড্রাইস এরও প্রিয় ঘোড়াটি মরে যায়।

দুটো কাঠের চাকা দুটো কাঠের ফ্রেমের সঙ্গে যুক্ত করে বানানো হয় প্রথম বাইসাইকেলটি। এতে কোনো গিয়ার বা পেড্যাল ছিল না। পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে চালানো হত সেটি। এর নাম ছিল হবি হর্স।

কার্ল ভন ড্রাইস তার এই আবিষ্কার জার্মানি থেকে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডে নিয়ে যান। যেখানে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সেমসময় ব্রিটিশ কোচ নির্মাতা ডেনিস জনসনও তার উদ্ভাবিত বাইসাইকেল বাজারে ছাড়েন। এর নাম ছিল ‘পেডেস্ট্রিয়ান কারিকলস’।

bike-2

১৮২০ সালের মধ্যে হবি হর্স নিষিদ্ধ করা হয় এই যুক্তিতে যে সেটি পথচারীদের জন্য বিপজ্জনক। ১৮৬০ সালে স্টিলের, চাকা, অপরিবর্তনীয় গিয়ার, পেড্যাল এবং কাঠের কাঠামো সহ ফের বাজারে আসে বাইসাইকেল। এর উদ্ভাবক কে ছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে। জার্মানির কার্ল কিচ নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন তিনিই প্রথম ১৮৬২ সাল পেড্যালযুক্ত বাইসাইকেল উদ্ভাবন করেন। কিন্তু এই ধরনের যানের প্রথম প্যাটেন্ট লাভ করেন ফরাসি উদ্ভাবক পিয়েরে লালামেন্ট। ১৮৬৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ছাড়ার জন্য প্যাটেন্ট পান।

১৮৬৪ সালে তিনি তার উদ্ভাবিত বাইসাইকেল প্রদর্শনী করেন। আর সেখান থেকেই প্যারিসের দুই ধনী শিল্পপতির ছেলে অ্যাইমে এবং রেনে অলিভার নিজেরা বাইসাইকেল তৈরি করার ধারণা পান।

এই দুইজন তাদের এক ক্লাসমেট জর্জ ডে লা বৌগলিজে এবং মিচৌক্স নামের একজন কামারকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাইসাইকেল বানানো শুরু করেন। তারা তাদের বাইসাইকেল বাজারে আনেন ১৮৬৭ সালে। তাদের উদ্ভাবন বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এরপর ১৮৭০ সালের মধ্যেই বাইসাইকেল ফ্রেম কাঠের বদলে ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হতে থাকে।

১৮৭০ সালে ইংরেজ উদ্ভাবক নিরাপদ বাইসাইকেলের ধারণা নিয়ে আসেন। ১৮৭১ সালেই তার বাইসাইকেল বাজারে আসে। ১৮৮৫ সালে তিনি রোভার নামের এক বাইসাইকেল বানান। ব্যবহারিক দিক থেকে এটিই ছিল প্রথম বাস্তব সম্মত ও নিরাপদ দুই চাকার যান।

১৮৮৯ সালে ২ লাখ বাইসাইকেল ব্যবহৃত হত। যা ১৮৯৯ সালে ১০ লাখে গিয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে রাস্তাও উন্নত করা হতে থাকে। ঘোড়ার গাড়ি চলার জন্য তৈরি রাস্তার চেয়েও ভালো রাস্তা দরকার হয় বাইসাইকেল চালানোর জন্য।

রেলরোড কম্পানিগুলো এই রাস্তা উন্নয়নের কাজ নেয়। কেননা কৃষকদের সঙ্গে ব্যাবসা-বাণিজ্যের যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নত করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। বাইসাইকেলই ছিল মোটরগাড়ির পূর্বসুরি।

কিন্তু ১৯০০ সালের মধ্যে মোটরযানের অগ্রগতিতে বাইসাইকেল ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। পরের ৫০ বছর শুধু শিশুরাই তখন সাইকেল ব্যবহার করত। ১৯৬৯ সালের দিকে গিয়ে আবার বাইসাইকেলের প্রতি প্রাপ্তবয়স্কদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। কারণ এটি পরিবেশ দূষণ করে না। ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ লাখ সাইকেল বানানো হয়। এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষদের ঘরের বাইরের একটি বিনোদনের উপকরণ হয়ে ওঠে।

এখন প্রতি বছর ১০ কোটি বাইসাইকেল বানানো হয়। আর বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটি বাইসাইকেল ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন বাইসাইকেলে ১ থেকে ৩৩ গিয়ার পর্যন্ত থাকে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

বাঁশের তৈরী জিনিসপত্রের সমাহার!

bamboo dooli

ogla -bamboo mat

bamboo horfa

bamboo furniture 2

ভালোবাসার শহরে…

i love wallশান্তা তাওহিদা, প্যারিস থেকে : শহরজুড়ে যেন সারা বছরই প্রেমের মৌসুম চলে। সিন নদীর পার ধরে হেঁটে হেঁটে দেখার প্যারিস এ এক অন্য প্যারিস। সকালে সিন নদীর পানিতে সূর্যের স্পটিক হাসি আর রাতে আলো ঝলকানো হাজার হাজার তারা। এ রকম মুহূর্তটা অবশ্যই দাবি রাখে পরস্পরের হাতে হাত রেখে অতল চোখে হারিয়ে যাওয়ার। আমার যদিও সে সৌভাগ্য হয়নি। প্রায় সাত হাজার নয়শ কিলোমিটার দূরে ছিল আর একটা হাত। ভালোবাসার শহরে সে এক বেরসিক আমি!

দিন আর রাতের প্যারিসের মাঝে বিস্তর ফারাক। শুনে তা বুঝা যাবে না, এমনকি চোখে দেখেও না। এ কেবল অনুভবের। তবে প্যারিস শহর ঘুরে বেড়ানোটা ভোরে থেকে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে দুই রূপই দেখা যাবে। সিন নদীর কোল ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে শুরু হয় আমার প্যারিস সফর। পায়ে হাঁটার পথ থামে পন্ট দে আরটস সেতুতে। এটি পারিসের প্রথম ধাতব সেতু। নামকরণ করা হয়েছিল প্রথম ফরাস সম্রাটের নামানুসারে। এর এক পাশে ইনস্টিটিউট অফ ফ্রান্স আর অন্য পাশে ল্যুভর প্যালেসের কেন্দ্রীয় স্থাপনা। এ সেতুর আরেক নাম ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু। ভালোবাসাকে তালা-চাবি দিয়ে বন্দি করা যায় কিনা তা কেবল এখানকার প্রেমীরাই বলতে পারবেন। তালায় দুজনের নাম লিখে এ সেতুতে দুজনে মিলে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবিটা ছুড়ে ফেলে দেয় তারা ভালোবাসা নদীর জলে। কথিত আছে, এতে ভালোবাসা অমরতা পায়। সেতুর নিচের প্রবহমান ভালোবাসা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে চাবি খুঁজে নিয়ে সে তালা খুলে এমন সাধ্য কী আর কারো আছে বলুন? হতে পারে এটা ছেলেমানুষী। একদিন না হয় ভালোবেসে ছেলেমানুষ হলেন। ক্ষতি কি তাতে! বিষয়টা কিছুটা বুকের ঢিপঢিপানি নিয়ে ছোটবেলায় দেয়ালে যোগ চিহ্ন দিয়ে নামের আদ্যক্ষর লিখে রাখার মতো। এভাবেই হয়ত অবিনশ্বরতা পায় ভালোবাসা। মজার খবর হলো বেশ কিছু দিন আগে ভালোবাসার তালার ভারে সেতুটি প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা হয়েছিল। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হওয়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই কিছু ভালোবাসার ঝালর কেটে কমিয়ে দিয়ে ছিলেন। সেতুতে টানিয়ে দিয়েছেন সতর্কবাণীও। তাতে কি আর বুঝে পাগলপ্রেমি মন! ভালোবাসার শহরে ভালোবাসার তালা রোজই ঝুলছে। কার সাধ্য বাধা দেয়।

পন্ট দে আরটস সেতু নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত ফরাসি সিনেমা ‘লে পন্ট দে আরটস’। ফরাসি এক তরুণ তরুণীর করুণ প্রেম কাহিনি নিয়ে এ সিনেমা। প্রেমিকের সঙ্গে অভিমান করে অভিমানি প্রেমিকা এ সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে ভালোবাসা নদীতে আত্মহত্যা করে। সইতে না পেরে প্রেমিকও একি সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয় প্রেমিকার সঙ্গে মিলনের আশায়। কেবল এই সেতু নয়, ভালোবাসা নদীর ওপর এরকম প্রায় ১১টি ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু রয়েছে পুরো পারিসে । যারা প্যারিসে আসেন তাদের কাছে মন্টেমারে নামটা আগে থেকেই শোনা থাকতে পারে। জায়গাটা পারিসের উত্তর পাশে সিন নদীর কোল ঘেঁষে। পাবলো পিকাসো, ভিনসেন্ট ভ্যানগগ, ক্লোদ মনে নিভৃতে ছবি আঁকার জন্য এ পাশটা বেছে নিয়েছিলেন। ফরাসি ভাসায় এ জায়গাটার নাম মো মার্তে। পাহাড়ের উপরে রয়েছে এক মনোরম ব্যাসিলিকা। দুই নম্বর মেট্রো ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। এখানে রয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য আরো একটি আকর্ষণ। ফরাসি ভাষায় জায়গাটার নাম ‘লে মর ডেস যে তাইমে’। বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমি তোমাক ভালোবাসি দেয়াল’। মন্টেমারে রিকটুশ বাগানে এ দেয়াল।

প্রায় চল্লিশ স্কয়ার মিটার দেয়ালের পুরোটা জুড়ে ৫০টি ভাষায় ৩১১ বার লেখা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাওয়ার এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এখানে। যে আগে খুঁজে পায় ভালোবাসার বার্তা তার ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি। নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাবার আনন্দে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মানুষকে। বাংলায় ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ লেখাটা দেয়ালের মাঝখানের অংশে রয়েছে দেখলাম। বিরহ ছাড়া ভালোবাসা অর্থহীন বলেই হয়ত কিছু লাল ভঙ্গুর হৃদয় ছড়িয়ে দেয়া রয়েছে পুরো দেয়ালের ৬১২টি টাইলস জুড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল ভঙ্গুর হৃদয় দেখে। মনে মনে প্রার্থনা করলাম পৃথিবীর সকল যুগলের জন্য। অমর হোক তাদের বন্ধন। ভঙ্গুর হৃদয়ের যাতনা তাদের যেন কোনোদিন স্পর্শ না করে। আমার ধারণা ছিল কেবল তরুণ-তরুণীরা ভালোবাসার দেয়ালের খুঁজে এখানে আসে। ভুল করলাম আবারও। এখানে আসেন প্রেমিক জুগল। আর প্রেমের যে কোনো বয়স নেই তা এখানে না আসলে আমার হয়ত কখন বুঝা হতো না। হাতে হাত রেখে ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক দিয়ে বহু প্রবীণ প্রেমিকাকে প্রেমিকের চোখে হারাতে দেখেছি সেখানে। এ যেন প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে পড়া।

প্যারিসের যেবার ভালোবাসার দেয়াল দেখতে গিয়েছিলাম সেটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক দিনের সফর। টের পাচ্ছেন তো একাকি আমার দেবদাস অবস্থা! আমি ছাড়া প্যারিস শহরটা বড় বেশিই রোমান্টিক। হা হা হা- তবে যে আকর্ষণে দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসে তার সাথে দেখা করার গল্পটা বরং আমার কাছে বেশি রোমান্টিক। দ্য টাউয়ার অব লাভ-ভালোবাসার আইফেল টাউয়ার। ৩২৪ মিটার উঁচু লোহার তৈরি এ টাউয়ারে মানুষ আসে প্রেমকে অমর করতে। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। উল্টো আমিই প্রেমে পড়ে গেলাম তার। একেবারে প্রথম দেখায় প্রেম যাকে বলে। প্রথম তার সাথে যখন দেখা হয়, তখন সে কুয়াসার চাদরে ঢাকা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তার সামনে মন্ত্রমুগ্ধ আমি। দ্বিতীয় বার যখন দেখা হলো তখন তিনি আকাশের নীলে রোদেলা আমার ফাগুন পুরুষ। আর তৃতীয় বার রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে আমার ভিনদেশি তারা। তার বিশালতার কাছে নিজেকে বড়ই সামান্য মনে হয়েছে।

সিন নদী পেরিয়ে যতই তার কাছে গিয়েছি ততই বদলে যেতে শুরু করে অনুভূতিটা। ‘আমি দূর হতে কেবল তোমায় ভালোবেসেছি’ কিছুটা এরকম অনুভূতি। দূর থেকেই তাকে বড় আকর্ষণীয় লাগছিল। এ যেন চিরায়ত মানব চরিত্র! কাছে পেলে সোনার মোহর হয়ে যায় মাটির মোহর! ‘কাছে গেলে যদি ভালোবাসা কমে যায় তবে দুরত্বই ভালো-এই বলে সেদিন সন্ধ্যায় তার সাথে হলো ছাড়াছাড়ি।

পরের বার প্যারিস গিয়ে তার অন্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে আইফেল টাউয়ারের চূড়ায় উঠার সৌভাগ্য হল। চূড়া থেকে দেখলাম ভালোবাসার অন্য আরেক প্যারিসকে। পুরো প্যারিসটা ৩৬০ ডিগ্রিতে চোখে বন্দি করতে সময় লাগল আর ঘণ্টাখানেক। আইফেল এর চূড়ায় যুগল স্যাম্পেনের হাতে চুম্বনরত তরুণ-তরুণীকে দেখে মনে হয়েছে ‘প্রেম পবিত্র-প্রেম মধুর’! চূড়া থেকে দেখে মনে হলো পৃথিবী আসলেই গোল। কমলা লেবুর মতো প্যারিস শহরটা মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। তবে মিলিয়ে যায়নি ভালোবাসা। কেবল সূর্যটা টুপ করে ডুব দিয়েছে সিন নদীতে আর সন্ধ্যা নেমেছে শন্ জিলেজের পথে পথে ভালোবাসার শহরের ভালোবাসারা এভাবেই বেঁচে থাকুক অনন্তকাল!