আর্কাইভ

Archive for the ‘শিক্ষা’ Category

রসালোচনাঃ বাংলা কিছু বাগধারায় লিঙ্গবৈষম্য

proverbs not right

Advertisements

বদলে গেছে কম্পিউটার প্রকৌশল

abdullah al-faruqueকম্পিউটার প্রকৌশল নিয়ে পড়ার আগ্রহ আছে বহু শিক্ষার্থীর। অনেকে পড়ছেন, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু প্রতিদিন আগের চেয়েও উন্নত হচ্ছে কম্পিউটার। বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা? এ প্রসঙ্গে লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইনের তড়িৎ প্রকৌশল ও কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক

কম্পিউটার যখন প্রথম তৈরি হয়, তার আকৃতি ছিল বিশাল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটা ছোট হতে শুরু করল। আমি যখন ছাত্র ছিলাম, তখন কম্পিউটারে আমরা যে ধরনের কাজ করতাম, এখন স্মার্টফোনেই তার চেয়েও জটিল কাজ করা যায়। এখন আস্ত একটা কম্পিউটার আপনার হাতঘড়ির মধ্যেই এঁটে যেতে পারে। এই যে কম্পিউটারের ছোট হয়ে আসা, এটা একটা বিরাট কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। আমরা যাকে বলছি ‘এম্বেডেড সিস্টেম’।

আমরা মানুষের চোখের ভেতর মাইক্রোপ্রসেসর ঢোকানোর চেষ্টা করছি। দেহের বিভিন্ন অংশে মাইক্রোপ্রসেসর বসানোর কাজ চলছে। গাড়ি এখন আর স্রেফ ‘ইলেকট্রো মেকানিক্যাল’ যন্ত্র নয়, গাড়ির মধ্যে প্রচুর মাইক্রোপ্রসেসর আছে। নতুন যে গাড়িগুলো বের হচ্ছে, এর বেশির ভাগই কম্পিউটারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আমরা এখন স্বয়ংক্রিয় যানবাহনের কথা বলছি। সমগ্র বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা কম্পিউটারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের কথা বলছি। প্রকৌশলের সব শাখায় কম্পিউটার ঢুকে পড়েছে। এটাই হলো আগামী দিনের কম্পিউটার প্রকৌশলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ আর সবচেয়ে বড় কাজের ক্ষেত্র।

আমি যেমন কাজ করছি ‘সাইবার ফিজিক্যাল সিস্টেম’ নিয়ে। কম্পিউটারকে সাধারণত বলা হয় ‘সাইবার সিস্টেম’। যেখানে হার্ডওয়্যার আছে, সফটওয়্যার আছে। কিন্তু এই কম্পিউটারই যখন অন্য কোনো যন্ত্র যেমন স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, স্মার্ট গ্রিড কিংবা মানুষের শরীরের ভেতর ঢুকে পড়ে, তাকে বলে ‘সাইবার ফিজিক্যাল সিস্টেম’।

আমি মনে করি, কম্পিউটার প্রকৌশলের ছাত্রদের এখন বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে জানতে হবে। শুধু প্রোগ্রামিং শিখে বা শুধু কম্পিউটার-বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করে এগিয়ে থাকা যাবে না। স্বয়ংক্রিয় কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, বায়োমেডিকেল ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে বিজ্ঞানের সব শাখায় কম্পিউটার প্রকৌশলী প্রয়োজন। এখন কম্পিউটার প্রকৌশলীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়, নতুন নতুন সমস্যার সমাধান করতে হয়। আগে প্রকৌশলের ভিন্ন ভিন্ন শাখায় প্রকৌশলীরা নিজেদের মতো করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। এখন তড়িৎকৌশল, যন্ত্রকৌশল, পুরকৌশল…সব শাখার প্রকৌশলীরা এক হয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। তাই এগিয়ে থাকতে হলে সব বিষয়েই জানতে হবে। অন্তত জানার ইচ্ছে বা আগ্রহ থাকতে হবে।

কাজটা কিন্তু খুব কঠিনও নয়। আমরা যখন বুয়েটে পড়তাম, আমরা জানতাম না, এমআইটির শিক্ষার্থীরা কী নিয়ে কাজ করছে? ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির একজন অধ্যাপক কী নিয়ে ভাবছেন? কম্পিউটারবিজ্ঞানীরা নতুন কী নিয়ে গবেষণা করছেন? বিশ্বসেরা জার্নালগুলোতে কোন প্রবন্ধ নিয়ে কথা হচ্ছে?

এখন কিন্তু এসব জানা খুব সহজ। ইন্টারনেট সব সহজ করে দিয়েছে। অনলাইনে যে বিজ্ঞাননির্ভর জার্নালগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোতে ঢুঁ মারলেই শিক্ষার্থীরা জানতে পারবেন, এখনকার ‘ট্রেন্ড’ কী, প্রযুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ কী? জার্নালগুলোতে সব সময় আগামী দিনের প্রযুক্তি নিয়ে কথা হয়। শুধু এখনকার সময়ই নয়, ১০ বছর পরে টেকনোলজির ‘ট্রেন্ড’ কী হবে, সেসব নিয়েও আলোচনা থাকে জার্নালে। ছাত্রাবস্থায়ই বিজ্ঞাননির্ভর জার্নাল পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

একটা সময় দেখা যেত ভারতের আইআইটি (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) বা চীনের সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা নিতে ইউরোপ-আমেরিকার স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেতেন। বিশ্বমানের গবেষণার পাশাপাশি ওরা কিন্তু এখন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। ওদের লক্ষ্য এখন উদ্যোক্তা হওয়া। সিলিকন ভ্যালিতে দেখবেন অনেক ভারতীয়, চীনা শিক্ষার্থীদের নিজেদের ফার্ম আছে। ওরা ভবিষ্যৎ মার্ক জাকারবার্গ হওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের শিক্ষার্থীদেরও দৃষ্টি থাকতে হবে দূরে। বিজ্ঞান গবেষণায় ও উদ্যোক্তা হিসেবে নেতৃত্ব দিতে চাইলে, আগামী দিনের পৃথিবীতে কোন প্রযুক্তির প্রভাব থাকবে, সেটা বুঝে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। হয়তো একটু সময় লাগবে। কিন্তু এটা অসম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমি যেসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে দেখি, অনেকে ভালো করেন আবার অনেকে করেন না। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক সময় একটা ভয় কাজ করে। একজন কম্পিউটার প্রকৌশলীকে হয়তো একজন জীববিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করতে হতে পারে। তাই বলে ভয় পেলে চলবে না। গবেষণার জন্য আমাকে যেমন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এখন যাঁরা কম্পিউটার প্রকৌশল পড়ছেন, একদিন হয়তো তাঁদেরও এমন কাজ করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। আমি আগে শিখিনি তো কী হয়েছে? শিখে নেব। যাদের সাহস থাকে, তারাই এগিয়ে যায়।

আমার অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, তারা কখনো বলে না, ‘আমি তো এটা করিনি। আমি তো এটা পারি না।’ হয়তো নতুন একটা সমস্যা নিয়ে আমরা আলাপ করছি। শিক্ষার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের মত জানায়, আলোচনায় অংশ নেয়।

আজকাল ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি নিয়ে প্রচুর কথা হচ্ছে। আইওটি হলো যেকোনো সাইবার ফিজিক্যাল সিস্টেম নির্ভর প্রযুক্তিকে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া। সব যন্ত্রের ভেতর মাইক্রোপ্রসেসর, সেন্সর, যোগাযোগের ক্ষমতা ঢুকে পড়ছে। এর ফলে যেটা হয়েছে, ‘নিরাপত্তা’ নিয়েও এখন প্রকৌশলীদের ভাবতে হচ্ছে। ধরুন, একটা গাড়িতে যদি সফটওয়্যার থাকে, আমি কিন্তু আপনার গাড়ি হ্যাক করে ফেলতে পারব। মানবদেহের ভেতরে যদি কোনো কম্পিউটার সিস্টেম বসানো হয়, আমি একটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। আমি একটা পুরো শহরের বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। তাই ‘নিরাপত্তা’ও গবেষণার একটা বড় ক্ষেত্র। পরিসংখ্যান, তথ্য বিশ্লেষণ (ডেটা অ্যানালাইসিস)…এসব নিয়ে প্রচুর পড়তে হবে।

আমি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে ভীষণ আশাবাদী। নিশ্চয়ই আমাদের ছেলেমেয়েরা আগামী দিনের প্রযুক্তির দিকনির্দেশনায় একটা বড় ভূমিকা রাখবে। (অনুলিখিত)

মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক ২০০২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক করেছেন। কম্পিউটার প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর জার্মানির আকেন টেকনোলজি ইউনিভার্সিটিতে এবং পিএইচডি করেছেন কার্লসরুয়ে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে। গবেষণার জন্য থমাস আলভা এডিসন পেটেন্ট অ্যাওয়ার্ড, আই ট্রিপলই সিইডিএ আর্লি ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ডসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া আরভাইনের সাইবার ফিজিক্যাল সিস্টেমস ল্যাবের পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন এই বাংলাদেশি গবেষক। সম্প্রতি তিনি দেশে এসেছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক সম্পর্কে বিস্তারিত: aicps.eng.uci.edu

সংখ্যা লিখন পদ্ধতির বৈচিত্র্যতা

Sonkha-likhonজাফর ইকবাল : লিখন পদ্ধতির আবিষ্কার নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে যতদূর জানা যায়, মিশরীয়রাই সর্বপ্রথম মোটামুটি পরিপূর্ণভাবে লেখার কৌশল আবিষ্কার করে। এর আগে ছবি আঁকিয়ে কিংবা মুখস্থ করে বিভিন্ন ঘটনা মনে রাখা হতো। সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা-সংখ্যা লেখার পদ্ধতি মিশরীয়রাই সর্বপ্রথম পূর্ণরূপে রপ্ত করতে শেখে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতাভেদে সংখ্যা লিখন পদ্ধতির বিভিন্ন রকম বৈচিত্র্যতা আসতে থাকে। পর্যায়ক্রমে সেই পরিবর্তনের ধারায় আমরা আজ লিখি ১,২,৩ কিংবা ১,২,৩। এবার সভ্যতাভেদে লিখন পদ্ধতি নিয়েই থাকছে আলোচনা।

মিশরীয়দের পদ্ধতি : মিশরীয়রা ভাষা ও সংখ্যা নির্দেশ করতে বিভিন্ন চিত্রলিপির সাহায্য নিত। এই চিত্রলিপিকে বলা হয় হায়রোগ্লিফিক। হায়রোগ্লিফিক শব্দটি মূলত গ্রিক ঐরবৎড় (পবিত্র) এবং এষুঢ়যবরহ (রেখাঙ্কন) শব্দ দুইটির সমন্বয় থেকে উৎপন্ন হয়েছে। মিশরীয়রা হায়রোগ্লিফিককে বলতো পবিত্রলিপি। প্রাচীন মিশরীয়রা এই ভাষাকে দেবভাষা বলে আখ্যায়িত করতো। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০-৩৪০০ অব্দে এই লিপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে এই লিপি মিশরীয় অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর এই লিপির সঙ্গে তৎকালীন প্রচলিত ধর্মের যোগসূত্র থাকায় লিপিগুলো ছিল অলঙ্করণ সমৃদ্ধ এবং লেখা হতো ডানদিক থেকে। তবে এই লিপির সাহায্যে হিসাব-নিকাশ ছিল বেশ কষ্টসাধ্য যে কারণে কয়েক শতকের মধ্যেই এই লিপি জনপ্রিয়তা হারায়। এরপর কিছুকাল অপেক্ষাকৃত সহজ ‘হায়ারোটিক’ লিপির উদ্ভব হয়। এই লিপিতে জন্মগ্রহণ করেছিল চিত্র থেকেই কিন্তু চিত্রকে পূর্ণভাবে প্রকাশ করে নয়। এরপর মিশরীয়রা সংখ্যা লেখা শুরু করে ‘ডিমোটিক’ লিপির সাহায্যে। এই লিপিই পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়ে মিশরীয়দের আধুনিক লিখন পদ্ধতির সূত্রপাত ঘটায়।

ব্যাবিলনীয়দের লিখন পদ্ধতি : খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের দিকে শুধু ব্যাবিলনীয়দের মধ্যেই নয় সুমেরু, মেসোপটেমিয়া, অ্যাসিরীয়র বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন একটি লিপির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এই লিপি ‘কিউনিফর্ম’ নামে পরিচিত। বাংলায় একে বলে কীলকাকৃতি লিপি। ল্যাটিন ঈঁহবঁং এবং ঋড়ৎসধ শব্দদুইটি থেকে এই শব্দের উদ্ভব। কাঁচা মাটির টালির ওপর সূচালো বস্তু দিয়ে মূলত এই লিপি লেখা হতো। কিউনিফর্ম লিপিতে এক, দশ এবং একশোর জন্য বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করা হতো। তবে এই লিপিতেও সমস্যা কম ছিল না। সে সময় পর্যন্ত শুন্যের ধারণা এই লিপিতে না থাকায় কোনো সংখ্যার অনুপস্থিতিতে প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। এই পদ্ধতিতে লেখার ব্যাপারে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধারণার প্রয়োগ দিক হল যোগ ও গুনের ধারণার সঙ্গে সঙ্গে বিয়োগের ধারণার বিকাশ। কারণ এই লিপিতে ১২ লেখার সময় দুটো এক চিহ্ন যোগ করা হতো। আবার ৮ লেখার সময় দশের সাথে দু’টো এক চিহ্ন বিয়োগ করা হতো। অর্থাৎ মূল সংখ্যাগুলো ধরা হতো ১, ১০, ১০০ এবং ১০০০। এই সংখ্যাগুলোরই আলাদা আলাদা চিহ্ন ছিল, বাকিগুলো প্রকাশ করা হতো যোগ কিংবা বিয়োগ দিয়ে।

গ্রিকদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতি : সংখ্যা লিখন পদ্ধতি নিয়ে গ্রিক এবং রোমানদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা উল্লেখ করার মতো। কারণ ১ এবং ১০-এর মাঝখানে তারাই ৫-কে মৌলিক সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করে তাকে আলাদা চিহ্নে প্রকাশ করতো। কিন্তু লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রথম শতকগুলোতে ১,৫, ১০, ৫০, ১০০, ৫০০ বাদে অন্য সংখ্যা প্রকাশে তারা মিশরীয় কিংবা ব্যাবিলনীয়দের মতো যোগ-বিয়োগ পন্থা এড়াতে পারেনি। এছাড়া শুন্যের ব্যবহার জানা না থাকার ফলে তাদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতি বেশি উন্নতি করতে পারেনি এবং তাদের সংখ্যা ছিল সসীম। যদিও পরবর্তীতে গ্রীকরা সংখ্যা লিখন পদ্ধতিতে এক থেকে নয় পর্যন্ত প্রতিটি অক্ষর আলাদা চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করেছিল, কিন্তু সেটা বেশ পরে।

মায়াদের সংখ্যা পদ্ধতি : সুদূর মধ্য আমেরিকায় এক প্রাচীন সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল যার নাম মায়া। এরা যে গণনা পদ্ধতির আবিষ্কার করেছিল তা অন্য সভ্যতা থেকে বেশ পৃথক ছিল। এদের পদ্ধতি ছিল বিশকেন্দ্রিক। মায়ারা শুন্যের ব্যবহার জানতো কিনা সেটা সঠিকভাবে বলা না গেলেও এটা ভালোভাবে বলা যায় যে তারা অন্য সভ্যতার থেকে বড় বড় সংখ্যা লিখতে পারতো। এরা এক এবং পাঁচ মৌলিক চিহ্নরূপে প্রকাশ করতো। এরা এক লিখতে একটি ডট ‘.’ এবং পাঁচ লিখতে একটি ‘-‘ ব্যাবহার করতো। আর বাকিসংখ্যা প্রকাশে যোগের পদ্ধতি ব্যাবহার করতো। 

রোমানদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতি : রোমানরা শূন্যের ব্যবহার না জানলেও সংখ্যা ব্যবহারে তাদের উদ্ভাবিত চিহ্ন বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। আজো পর্যন্ত রোমান হরফ বেশ ব্যবহৃত এবং সুপরিচিত। তাদের সংখ্যা প্রকাশে মৌলিক চিহ্ন ব্যবহার করা হতো এক (ও), পাঁচ (ঠ), দশ (ঢ), পঞ্চাশ (খ), একশো (ঈ), পাঁচশো (উ), এবং একহাজার (গ) এর ক্ষেত্রে। এই লিপিতে এক বোঝাতে ইংরেজি আই-এর মতো এবং পাঁচ বোঝাতে ভিএর মতো চিহ্নের ধারণা মনুষ্য হাত থেকেই উদ্ভব। তবে নান্দনিক এবং পরিচ্ছন্ন হওয়ায় রোমানদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতির কদর সে সময়ে বেশ রাজত্ব করেছিল।

চীনদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতি : মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতার মতো প্রাচ্য সভ্যতাতেও অতি প্রাচীনকাল থেকেই গণিত চর্চার প্রচলন ছিল। বর্তমান সময়ে চীনে সংখ্যা লিখন পদ্ধতিতে যেসব চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় তার সাথে চৈনিক সভ্যতার প্রথমদিকের সংখ্যা লিখন পদ্ধতির মিল থেকে অমিলই বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু চৈনিক সভ্যতার প্রাচীন গ্রন্থগুলোর দিকে তাকালে বিশেষ করে বিশিষ্ট চৈনিক গণিতজ্ঞ চ্যাং সাং, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ১৫২ সালে পরলোকগত হন, সেই চ্যাং সাং এর নয় খন্ডে বিভক্ত গণিতগ্রন্থ ‘চিউ-চ্যাং শুয়ান শু’-এর দিকে লক্ষ্য করলে চৈনিক সভ্যতার প্রথমদিকে সংখ্যা লিখন পদ্ধতির ধারণা পাওয়া যায়। এই লিপিতে ১,৫,৬,৭,৮,৯, ১০, ১০০, ১০০০ সংখ্যাগুলো লিখতে আলাদা আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। 

সিন্ধুদের পদ্ধতি : একেবারেই প্রথম পর্যায়ে সিন্ধু সভ্যতায় সংখ্যা লিখন পদ্ধতি কেমন ছিল তা জানা যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসবশেষ থেকে যে লিখন পদ্ধতির লিপি পাওয়া গেছে তা আজো পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানসম্মত লিখন পদ্ধতির প্রকাশ ঘটে ভারতবর্ষে। প্রাচীন ভারতে সংখ্যা লিখন পদ্ধতির নমুনা পাওয়া যায় খরোষ্ঠী ও ব্রাহ্মী লিপিতে। ঐতিহাসিকদের মতে খরোষ্ঠী লিপি বহিরাগত। আর ব্রাহ্মী লিপি এ অঞ্চলের ভূমিজ। গণনায় এবং চিহ্ন প্রকাশে অন্য সভ্যতার মানুষদের থেকে ভারতীয়রা সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল কারণ তারাই শুন্যের আবিস্কারক। শুন্য আবিষ্কার হওয়ার ফলে তাদের গণনা প্রচুর পরিমাণে সমৃদ্ধ হল। ভারতীয় গণিত এবং গণনা পদ্ধতির সবচেয়ে বেশি বিকাশ ঘটে বৈদিক যুগে। এ সময় গণনা পদ্ধতিতে দশমিকের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া বড় বড় সংখ্যার নামকরণে বৈদিক হিন্দুরা ছিল পৃথিবীতে সবচেয়ে এগিয়ে। রোমান গণিতে মিলি বা এক হাজার, গ্রিক গণিতে মিরিয়াড বা দশ হাজারের উর্ধ্বে যখন কোনো সংখ্যার নাম নেই সে সময় বৈদিক যুগে ভারতীয়রা গুনেছে দশ হাজারের ঊর্ধ্বে, করেছে নামকরণ ও- নিযুত, প্রযুত, অর্বুদ, ন্যর্বুদ, সমুদ্র, মধ্য, অন্ত, পরার্ধ ইত্যাদি। প্রাচীন হিন্দুগ্রন্থ বাজসনেয়ী সংহিতা কিংবা তৈত্তরীয় সংহিতা এই শব্দগুলোর পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া যজুর্বেদেও সংখ্যার বিভিন্ন যেসব নাম উল্লেখ আছে সেগুলো সেযুগে আবিষ্কৃত হওয়া যেন অপার বিস্ময়ের। এছাড়া সংখ্যাকে ক্ষুদ্র করে বিভিন্নভাবে উপস্থাপনেও ভারতীয়দের জুড়ি নেই, যেমন যোজন, ক্রোশ, ধনু, হস্ত, যব, ত্রুটি, রেণু প্রভৃতি।

তবে ভারতীয়দের শূন্য আবিষ্কার এবং এক থেকে নয় পর্যন্ত বিভিন্ন চিহ্ন ব্যবহার করে সংখ্যা লিখন পদ্ধতি, সংখ্যার ধারণা এবং লিখন পদ্ধতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। এই শুন্য সম্বলিত লিখন পদ্ধতি প্রথমে ভারত থেকে আরবে যায়, পরে সেখান থেকে পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ অন্যসব লিখন পদ্ধতি পরোপুরি বর্জিত হয়ে এই পদ্ধতি বিভিন্ন ভাষার নিজস্ব স্টাইলে গৃহীত হয়। বর্তমানে সংখ্যা লেখার জন্য পৃথিবীর সকল ভাষাতেই তার নিজস্ব স্টাইলে ১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯,০ এই দশটি অঙ্ক প্রতীক সর্বজনস্বীকৃতভাবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রতীকগুলোকে ‘হিন্দু-আরব নিউমেরালস’ বলা হয়। ভারত থেকে শূন্যের ধারণা আবিষ্কৃত হয়ে যখন আরবে যায় তখন ‘শূন্য’ কে আরবি ভাষায় ডাকা হয় ‘সিফর’ যেটি পরবর্তীতে জেফিরো এবং সেখান থেকে ‘জিরো’ হয়। ইংরেজিতে সর্বপ্রথম জিরো শব্দটি ব্যবহৃত হয় ১৫৯৮ সালে। সবমিলিয়ে শূন্য আবিষ্কারের মাধ্যমে বিভিন্ন সভ্যতায় ব্যবহৃত সংখ্যা প্রকাশের বিভিন্ন ধরণকে পাল্টিয়ে দিয়ে এক সূত্রে গেঁথে গিয়েছে।

আরেক আইনষ্টাইনের আবির্ভাব হতে যাচ্ছে!

einstein of this era -1einstein of this era -2

পিএইচডি — সরল গরল কথা

phd -artপিএইচডি ডিগ্রিকে বাংলাদেশে যতটা বড় করে দেখা হয়, আসলে সেটা তেমন কিছুই না। পিএইচডি হলো গবেষণার হাতেখড়ি। এই সময়ে একজন মানুষ গবেষণা করার বিভিন্ন কলাকৌশল ও পদ্ধতি শেখে। অর্জিত গবেষণা–জ্ঞানকে পরবর্তীতে কর্মজীবনে প্রয়োগ করা হয়। ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে গলায় ঝুলিয়ে রাখার কিছু নেই। কিংবা এই ডিগ্রি অর্জনই জীবনের শেষ কথা নয়। আমি যখন স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করি, তখন সকাল-বিকেল ৬০–৭০ জন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হতো। তারা সবাই পিএইচডি-পোস্টডক। ওই ডিপার্টমেন্ট চলতই শুধু গবেষক দিয়ে। সেসব ছেলে-মেয়েদের ৯০ শতাংশের বয়স ২৪-২৮ বছর।

গবেষণা একটা পেশা। এই ধারণাটা আমাদের দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি। গবেষণা যারা করেন, তাঁরাই গবেষক, উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী। যেহেতু এটা একটা পেশা, তাই এর শুরু করতে হয় কাঁচা যৌবন থেকেই। পিএইচডি হলো গবেষণার প্রাথমিক ধাপ মাত্র। পিএইচডি শেষে শুরু করতে হয় স্বতন্ত্র গবেষণা। তাই সারা দুনিয়ায়, ২২-২৩ বছরেই ছেলে-মেয়েরা পিএইচডি শুরু করেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানান ত্রুটির কারণে, বহু শিক্ষার্থী চাইলেও সময়মতো সেটা শুরু করতে পারেন না।

পিএইচডির সময় একজন শিক্ষার্থী যে কয়েকটি বিষয় শেখেন—

১. একটা প্রজেক্ট কি করে ডিজাইন করতে হয়।

২. সে প্রজেক্ট থেকে পর্যাপ্ত ও সন্তুষ্টজনক ফলাফল দাঁড় করানো।

৩. প্রজেক্ট শেষে সেটাকে আর্টিকেল আকারে লেখা ও প্রকাশ করা।

৪. নিজের কাজকে উপস্থাপন করা।

৫. ফান্ড/গ্রান্টের জন্য রিসার্চ প্রপোজাল লিখতে শেখা।

এই বিষয়গুলো যত সঠিকভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে শেখা যায়, ততই ভবিষ্যতের পথ সুগম হয়।

পিএইচডির সময় ভালো জার্নালে পাবলিকেশনের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভালোভাবে কাজ শেখা। নতুন নতুন আইডিয়া উদ্ভাবন করতে শেখা। যে কোনো বিষয়কে বিভিন্নভাবে চিন্তা করতে পারা ও অসমাধানকৃত (Unsolved) বিষয়ের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা। কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখা। মানুষ যখন একটা যৌক্তিক প্রশ্ন করতে যায়, তাকে সে বিষয়টি নিয়ে ভালোভাবে জানতে হয়। প্রশ্ন করার ক্ষমতা মানুষকে স্মার্ট করে।

পিএইচডির সময় সে বিষয়গুলো বেশি বেশি করতে হয়—

১. নিজের গবেষণা ক্ষেত্রের (Research Area) প্রচুর আর্টিকেল পড়া।

২. খ্যাতনামা গবেষকদের কাজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা ও বোঝা।

৩. সময় সুযোগ মতো বিজ্ঞানী ও বড় বড় গবেষকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা এবং তাদের লেকচার শোনা। ৪. সহকর্মীদের সঙ্গে প্রচুর আলোচনা করা। কেউ যখন অন্যের সঙ্গে আলোচনা করে,তখনই তার নিজের দুর্বলতা সহজে উপলব্ধি করতে পারে। গবেষণায় ইগো নিয়ে আত্মকেন্দ্রিক হওয়া বিনাশী ও আত্মঘাতী।

ডক্টরেট ডিগ্রিরও ভালো-খারাপ মান আছে। দুনিয়ার অসংখ্য প্রতিষ্ঠান পিএইচডি দেয়। ভালো প্রতিষ্ঠানে ভালো পড়াশোনা ও গবেষণা হয়। তাই প্রতিষ্ঠান ও গবেষকের খ্যাতি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ডক্টরেট ডিগ্রিতেও এখন প্রতারণা হয়। একবার এক লোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। বললেন, তিনি পিএইচডি করেছেন। তাকে প্রতিষ্ঠানের নাম জিজ্ঞেস করায় বললেন, তিনি অনলাইন থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি করেছেন! কী ভয়ংকর! অনলাইনের যুগে এই সব ডিগ্রি নিয়ে অনেকেই মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। টাকা দিয়ে অনলাইন থেকে সার্টিফিকেট নিচ্ছে। সেটা ঝুলিয়ে রেখে সবাইকে প্রতারিত করছে।

যারা গবেষক হতে চাও, বিশেষ করে তাদের জন্য পরামর্শ হলো—

১. যত দ্রুত সম্ভব পিএইচডি শুরু করতে হবে।

২. ব্যাচেলর বা মাস্টার্সেই গবেষণার হাতেখড়ি করতে হবে।

৩. গবেষণার ইচ্ছে থাকলে, ব্যাচেলর থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে।

৪. যে কোনো বিষয় নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন করা শিখতে হবে।

৫. বেশি বেশি গবেষণা আর্টিকেল পড়ার অভ্যাস গড়তে হবে।

পদোন্নতির জন্য কিংবা বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যারা পিএইচডি করেন তাদের বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। গবেষক হতে হলে পিএইচডি হলো সূচনা মাত্র। এই সূচনা হতে হবে সুন্দর। এর ভিত হতে হবে মজবুত। তাই বড় গবেষকের অধীন পিএইচডি করার লক্ষ্য ও চেষ্টা থাকতে হবে।

ড.রউফুল আলম: গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn), যুক্তরাষ্ট্র।

বিভাগ:শিক্ষা

বিশ্বের কিছু নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়

10 best universities

বৈজ্ঞানিক থিওরি বা তত্ত্ব বলতে কী বুঝায়?

scientific_theoryকোনো একটি বিষয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গড়ে ওঠা অনুমান বা ধারণা ও ধারনাসমষ্টির সারাংশই হল বৈজ্ঞানিক থিওরি বা তত্ত্ব।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের থিওরিই বৈজ্ঞানিক থিওরি। থিওরি বা তত্ত্ব কথাটি ভিন্ন কিছুও বুঝাতে পারে, কাকে আপনি জিজ্ঞেস করছেন সেই ভিত্তিতে।

সাধারণ মানুষ থিওরি বা তত্ত্ব শব্দটি দিয়ে যা বুঝায় তার চেয়ে একটু ভিন্নভাবেই শব্দটি ব্যবহার করেন বিজ্ঞানীরা। বেশিরভাগ মানুষই থিওরি বা তত্ত্ব বলতে সাধারণত বিশেষ কোনো ধারণা বা অনুমানকে বুঝান যা কেউ ব্যক্তিগতভাবে মনে পোষণ করেন।

কিন্তু বিজ্ঞানে থিওরি বা তত্ত্ব বলতে বুঝায় বাস্তব কোনো কিছুকে ব্যাখ্যা করার পদ্ধতিকে।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া
প্রতিটি বৈজ্ঞানিক শুরু হয় একটি অনুমান হিসেবে। বর্তমান গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এমন অব্যাখ্যাত ঘটনার প্রস্তাবিত সমাধানকে বলা হয় সায়েন্টিফিক হাইপোথিসিস বা বৈজ্ঞানকি অনুমান। অর্থাৎ অনুমান হলো এমন একটি ধারণা যা এখনো প্রমাণিত হয়নি। যদি কোনো অনুমানের স্বপক্ষে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগৃহীত হয় তাহলেই তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরের স্তরে প্রবেশ করে- বৈজ্ঞানিক থিওরি তা তত্ত্বে পরিণত হয়। এবং সেই তত্ত্বটিকে কোনো বাস্তব বিষয়ের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হলো পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব বিষয়ের ফ্রেমওয়ার্ক। তত্ত্ব বদলাতে পারে বা যে পদ্ধতিতে তা ব্যাখ্যা করে তাও বদলাতে পারে। কিন্তু চোখের দেখা বাস্তব কখনো বদলায় না।

তত্ত্বকে তুলনা করা যেতে পারে এমন একটি ঝুড়ির সঙ্গে যেখানে বিজ্ঞানীরা তাদের দেখা বাস্তব তথ্য এবং পর্যবেক্ষণ জমা করেন। এই ঝুড়ির আকার বদলে বিজ্ঞানীরা যখন আরো জানতে পারেন এবং আরো বাস্তব জড়ো করেন।

উদাহরণত মানুষের মধ্যে বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য একটা সময়ে বেশি ছিল বা আবার একটা সময়ে কম ছিল বা নাই হয়ে গেছে এমনটা দেখা যায়। অর্থাৎ বিবর্তন ঘটেছে। এখানে বিবর্তনটা হলো বাস্তব। যা কখনোই উল্টে যাবে না। কিন্তু এই বাস্তবকে ব্যাখ্যা করার যেসব তত্ত্ব সেসব হয়তো নতুন কোনো পর্যক্ষেণের মাধ্যমে পাওয়া নতুন বাস্তব তথ্যের কারণে বদলে যেতে পারে।

তত্ত্বের মৌলিক বিষয়গুলো
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে এর মতে, তত্ত্ব হলো ‘ব্যাপক পরিসরের ঘটনাসমুহের বা বাস্তব বিষয়সমুহের বিস্তৃত বা স্পষ্ট ও প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা। ’ তত্ত্বগুলো হয় সংক্ষিপ্ত, সুসঙ্গত, পদ্ধতিগত, পূর্বানুমান বা ভবিষ্যদ্বানীমূলক এবং বিস্তৃতভাবে প্রয়োগযোগ্য। অনেক সময় তা অনেক অনুমানকে সমন্বয় এবং সাধারণীকরণ করে।
যে কোনো বৈজ্ঞানিক থিওরি বা তত্ত্বই বাস্তবের যত্নশীল এবং যুক্তিসঙ্গত পরীক্ষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। বাস্তব এবং তত্ত্ব দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাস্তব হলো তা যা পর্যবেক্ষণ বা পরিমাপ করা যায়। আর তত্ত্ব হলো বাস্তব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা ও ভাষ্য।

পর্যবেক্ষণমূলক ফলাফল থেকে গড়ে ওঠা কোনো বক্তব্য, বিবৃতি বা ভাষ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। একটি ভালো তত্ত্ব, যেমন নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব, এর আছে ঐক্য। অর্থাৎ এটি অল্প সীমিত সংখ্যক সমস্যা-সমাধান কৌশল নিয়ে গঠিত যা ব্যাপক পরিসরের বৈজ্ঞানিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা যাবে। ভালো তত্ত্বের আরেকটি গুন হলো তা এমন কয়েকটি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে যেগুলো আলাদাভাবে পরীক্ষা করা যায়।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিবর্তন
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চুড়ান্ত ফলাফল নয় কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। অনুমানের মতোই তত্ত্বও প্রমাণ করা যেতে পারে বা বাতিল হয়ে যেতে পারে। নতুন নতুন বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে তত্ত্ব উন্নত হতে বা বদলে যেতে পারে। যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুমানের সঠিকতা আরো শক্তিশালী হয়।

তত্ত্ব হলো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি। এবং সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তকে বাস্তব ব্যবহারে লাগানোর উপায়। বৈজ্ঞানিকরা তত্ত্ব ব্যবহার করে নতুন নতুন উদ্ভাবন করেন বা কোনো রোগের ওষুধ বানান।

অনেকে ভাবেন তত্ত্ব আইন বা নিয়মে পরিণত হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তত্ত্ব এবং নিয়মের ভিন্ন এবং আলাদা ভুমিকা আছে। আইন বা নিয়ম হলো প্রাকৃতিক জগতে পর্যবেক্ষণে ধরা পড়া কোনো কিছুর বর্ণনা। এটি ব্যাখ্যা করেনা কেন কোনো কিছু সত্য। অন্যদিকে, তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত পর্যবেক্ষণগুলোকে ব্যাখা করে তত্ত্ব। অর্থাৎ প্রকৃতিতে কোনো কিছু বাস্তবে যেভাবে আছে বা ঘটে সেটা হলো আইন বা নিয়ম (NATURAL LAW)। আর সেই আইন বা নিয়মকে ব্যাখ্যা করা হয় তত্ত্ব দিয়ে। অর্থাৎ তা কীভাবে ঘটে বা কেন ঘটে সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে যেসব অনুমাণ বা ধারণা গড়ে তোলা হয় তাকেই থিওরি বা তত্ত্ব বলে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স