আর্কাইভ

Archive for the ‘শিক্ষা’ Category

আন্দালুসিয়াঃ যে ইতিহাস কথা বলে!

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

La-mezquita-cordovaড. মুহাম্মাদ সিদ্দিক : মার্কিন লেখক জ্যাসন ওয়েবস্টারের প্রখ্যাত বই ‘আন্দালুস’। স্পেনে যে এখনো প্রচুর মুসলিম প্রভাব রয়েছে তা তিনি প্রমাণ করেছেন তার বইয়ে। তিনি তার মতের সমর্থনে স্পেনীয় বুদ্ধিজীবী পেড্রোর মন্তব্যও টেনেছেন তার বইয়ে।

অধ্যাপক পেড্রো বলেন, স্পেন মুসলিম আমলে দার্শনিক অ্যারিস্টটল ও উচ্চতর গণিতকে ইউরোপে নিয়ে যায়। এই কথা কেনিথ কার্ক তার ‘সিভিলাইজেসন’ বইয়ে লিখেছেন। পেড্রো বলেন, শুধু খ্রিষ্টান স্পেনকেই দেখা, একটা সাধারণ ফাঁদ। আভিরস (ইবনে রুশদ), মাইমোনাইডস (ইহুদি বিদ্যান) ও ইবনুল আরাবি সবাই স্পেনীয়। এরা মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের তিনজন। বিশ বছর আগেও মনে করা হতো যে, তারা যেন কখনোই ছিলেন না অথবা মনে করা হতো যে, তারা তাদের লোক আরবদের লোক। অথচ এই জ্ঞানী ব্যক্তিদের প্রভাব এখনো অনুভূত হয়, বলেন প্রফেসর পেড্রো (‘আন্দালুস’ পৃষ্ঠা ৯৩) (ওয়েবস্টারের বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে)।

প্রফেসর পেড্রো বলেন, ‘বেশির ভাগ লোক যা মনে করে তার চেয়েও বেশি ঋণ ইসলামি দুনিয়ার প্রতি রয়েছে আমাদের। মুসিলম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা স্পেনে এক হয়েছিল বলেই ইউরোপ আঁধার যুগ থেকে বের হতে পারে। এই তিনটি ধর্ম ক্রুসেড যুদ্ধের আগে থেকেই একে অন্যের গলা কাটছিল। তবুও এই স্পেনে মহান মুহূর্ত এলো মানব ইতিহাসের যখন তারা একত্র হলো’ (মুসিলম আমলে) (পৃষ্ঠা ৯৪)

জ্যাসন ওয়েবস্টার লেখেন, ‘টলেডো (খ্রিষ্টান পুনর্দখলে গেলে) আরবি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ল্যাটিন ভাষার তরজমার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এবং প্রথমবার (মূল) ইউরোপবাসী মুসলিম অঙ্ক শাস্ত্রবিদ যেমন আল-খারিজমি, ইবনেসিনা (যাকে ইউরোপীয়রা বলত আভিসেনা ও যিনি ছিলেন পরিচিত চিকিৎসাবিদ্যা ও সঙ্গীতের ওপর লেখা বইয়ের জন্য বিখ্যাত) প্রমুখের সাথে পরিচিত হলো। প্রথমবার ইউরোপীয়রা অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর বই পড়তে সক্ষম হলো যখন ইউরোপীয় ভাষায় (যেমন ল্যাটিন) তরজমা হলো। এই বিদ্যাই পরে ইউরোপের পুনর্জাগরণের ভিত্তি তৈরি করে।’ (পৃষ্ঠা ৯৪-৯৫)। ওয়েবস্টার বলছেন যে, আরবি থেকে ল্যাটিনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই তরজমা হলে ইউরোপে এসব ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ব্যাপারটা হলো যে এর আগে কয়েক শ’ বছর ধরে আরবি ভাষাতে এই জ্ঞান-বিজ্ঞান স্পেনে পাঠ করা হতো। এই স্পেনীয় মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান ছাত্ররা পড়াশোনা করত।

ওয়েবস্টার লিখেছেন, ‘ইনকুইজিসন (রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান আদালতের কার্যকলাপ) হলো বহু পাইকারি সন্ত্রাস, বর্ণবাদ ও নৃতাত্ত্বিক জুলুমের (এখনিক কিনসিং) পূর্বরূপ, যা এই বিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে। এই ইনকুইজিসন স্পেনের ইহুদি ও মুসলমানিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে সবচেয়ে বেশি কার্যক্রম নেয়।’ (পৃষ্ঠা ৯৫)। তিনি আরো লেখেন, “(এ সময়ে স্পেনে) বিদ্বেষ প্রতিষ্ঠিত করা হলো, ধর্মীয় মতোপার্থক্য অবশ্যম্ভাবীভাবে নিশ্চিহ্ন করা হলো, মুক্ত চিন্তাকে পরিত্যাগ করা হলো, আর এসব করার হাল-হাতিয়ার হলো ইনকুইজিসন (রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান আদালত), তার সাথে অগ্নিসংযোগ, নানা ধরনের যাতনা প্রয়োগের যন্ত্রপাতি ও ভীতি ছড়ানো। সেই থেকে স্পেনে সবই ‘না’ ‘না’।” (পৃষ্ঠা ৯৫-৯৬)।

স্পেনিশ বিশেষজ্ঞ পেড্রো মন্তব্য করলেন, ‘কিন্তু, ইনকুইজিসন পুরোপুরি সফলকাম হয়নি। ইনকুইজিসন স্পেনের ইমেজ বদলিয়েছে, এমনকি সম্ভবত যে ইমেজ স্পেন দুনিয়াকে দিতে চায়, তাও। তবে কয়েকটা মানুষকে জ্যান্ত পোড়ানো উপদ্বীপে মুসলমানদের ৯০০ বছরের হাজিরাকে হাওয়া করে দিতে পারে না। কিছু বিষয় ইনকুইজিটারদের চোখ থেকে এড়িয়ে যায়, কারণ সেগুলো ছিল লুকানো, ছদ্মবেশী ধর্মীয় আদালতেরও কাছে, এমনকি সেগুলোকে ‘খ্রিষ্টানি’ রেওয়াজ বলে চালানো হয় (অথচ তা নয়)। এমনকি অত্যাচারীদের হাত থেকে বাঁচতে দাবি করা হয় তারা খ্রিষ্টানদের চেয়েও বেশি বড় খ্রিষ্টান।’ (পৃষ্ঠা ৯৬)

পেড্রো বলতে থাকেন, ‘গত সপ্তাহে আমি ফরাসি সীমান্তে ফ্রান্সের লাইসির এক গির্জার ‘মাস’-এ (জামাতবদ্ধ প্রার্থনা) গিয়েছিলাম। লোকজন তেমন ছিল না (কারণ ধর্মের প্রতি অবহেলা)। পাদরি বাইবেল থেকে পড়ে ব্যাখ্যা করছিলেন। তবে আমাকে এটা চমৎকৃত করল যে, তিনি ভালোবাসা-প্রেম সম্পর্কে যা বলছিলেন তা ইবন আল-আরাবির মুখ নিঃসৃতের মতো। ইবন আল-আরাবি ছিলেন ইসলামি আধ্যাত্মিক বিদ্যান ও লেখক যিনি পাশ্চাত্যে ‘ডকটর ম্যাক্সিমাস’ এবং স্পেনীয়দের ভেতর ‘ওয়ান অব দ্য প্রেটেস্ট’। তিনি স্পেনের মুরসিয়া শহরে বার খ্রিষ্টান শতকে জন্মগ্রহণ করেন। তার লেখা এবং আরবিতে প্রচারিত মুহাম্মাদ সা:-এর বেহেশত ভ্রমণের ঘটনাবলির কাহিনীগুলো কবি দান্তেকে তার কাব্য ‘ডিভাইন কমেডি’ লিখতে সরাসরি প্রভাবান্বিত করেছে। একজন বিদ্যান বলেছেন যে, এটা হলো পশ্চিমা সাহিত্যে সবচেয়ে বড় একক উদাহরণ মুসলিম প্রভাবের। আন্দালুসিয়ার সব সুফি আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের ভেতর তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি নামকরা। তার জীবনী ও লেখালেখি নিয়ে সমগ্র দুনিয়ায় বহু গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। ‘প্রফেসর পেড্রো বলেন, ‘ইবন আল আরাবি লিখেছেন, ভালোবাসা হলো আমার বিশ্বাস, যে দিকেই তার উটকে ঘুরাই না কেন, তবু খাঁটি বিশ্বাসটা আমার। এগুলো কার কথা মনে হয়? যিশুর? ইবন আল আরাবি, যিশুÑ সবই এক। তাই বলি স্পেন এখনো মুসলমান দেশ।’ (পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭)।

প্রফেসর পেড্রো দৃঢ়ভাবে বললেন, খ্রিষ্টান ও মুসলমান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা এখানে (স্পেনে) একই কথা বলে।’ (পৃষ্ঠা ৯৭)। প্রমাণ হিসেবে তিনি দুটো বক্তব্য পেশ করলেন। প্রথমটা কবিতা, যা বাংলা ভাষায় তরজমা করলে এমন শোনাবে

‘প্রতিশ্রুত বেহেশত নয়
যা তোমাকে ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে, হে প্রভু,
দোজখের ভয়ও নয়
যা তোমার অবাধ্য হতে বাধা দেয়।’
পেড্রো বললেন, এখন শোনো :
‘হে প্রভু!
আমি যদি তোমার এবাদত করি দোজখের ভয়ে
তাহলে আমাকে দোজখেই ফেলে দাও, আর
আমি যদি বেহেশতের আশায় তোমার এবাদত করি,
বেহেশত থেকে আমাকে মাহরুম কর।’

পেড্রো বললেন, প্রথমে উল্লেখ করা কবিতাটি নামহীন কবির, তবে বিশ্বাস করা হয় এটা প্রখ্যাত স্পেনীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি সেন্ট জন অব দ্য ক্রসের, যিনি ষোল শতকে লেখেন। দ্বিতীয় বক্তব্যটা হলো মহিলা আলি ইরাকের রাবিয়া আল আদাউইয়ার (রাবিয়া বসরি) যিনি ৮০০ বছর আগে ছিলেন আরবে। এর একজন খ্রিষ্টান, অন্যজন মুসলিম, তবু তারা একই কথা বলেন। (আন্দালুস পৃষ্ঠা ৯৭-৯৮)

মার্কিন লেখক জ্যাসন ওয়েবস্টার স্পেনে মুসলিম ঐতিহ্য লক্ষ করে লিখলেন ‘আন্দালুস’ নামক গ্রন্থ। তার অভিজ্ঞতা সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

স্পেনের অভ্যন্তরে সফরের সময় ওয়েবস্টার ও তার দল আলমেরিয়া এলাকার মরুভূমিসদৃশ পাহাড়ি এলাকায় এক খাবার দোকানে ঢুকলেন। সেখানে ওয়েবস্টারের সাথী মরোক্কোর জিনে নামক মুসলিম ব্যক্তি ‘আল্লাহ’ বললে খাবার দোকানের মহিলা কর্মচারী জবাবে বলল, ‘হোলা’ যা ‘আল্লাহ’ শব্দের গোপনীয় রূপ। ওয়েবস্টার তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘আমার আগ্রহ হলো যখন দেখি ইসলাম ও পশ্চিমা সংস্কৃতি মিশে যায়’। তিনি বললেন, ‘এটা এখানে হয়েছে, যেখানে আমরা এখন বসে আছি। মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা একসাথে বাস করত এবং একটা মহান সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল। (ওয়েবস্টারের মরোক্কোবাসী সাথী) জিনে বললেন, আপনি তো সব সময় ভাবেন মুসলমান ও খ্রিষ্টান, ইসলাম ও পশ্চিম নিয়ে কিভাবে অতীতে এসব ছিল আরো ভালো। …. কোনো বর্ণবাদ থাকবে না যদি খাবারঘরের এই মেয়েগুলো জানে যে, তাদের ভেতর রয়েছে মুসলমানিত্ব। (আন্দালুস পৃষ্ঠা ১০৮-১১০)। অর্থাৎ ওয়েবস্টার ও তার সাথী মরোক্কীয় প্রত্যক্ষ করেছেন যে স্পেনের মেয়েদের ভেতরে পর্যন্ত মুসলমানি ভাব-ভাষা রয়ে গেছে। তারা যে অতীত মুসলমানের বংশধর।

অন্য ধর্মের স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার একটা কবিতার বাংলা তরজমাতে এই মুসলিম মেয়েদের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে এভাবে। কবিতার নাম :

‘জায়েনের মুর-মেয়েরা’
[১৫ শ’ শতকের জনপ্রিয় গীতি]
জায়েনের তিনটি মুর-মেয়েকে আমি ভালোবাসি;
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েন।
কৃষ্ণকায়া অথচ সুন্দরী তিনটি যুবতী
জায়েনে জলপাই তুলতে গেল,
এবং দেখল যে তা নেই;
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েনা…
‘মশায়রা, তোমরা কারা,
আমার জীবন ছিনিয়ে নিচ্ছ?
একসময় মুর ছিলাম কিন্তু এখন খ্রিষ্টান,
জায়েনের ওরা বলল :
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েন।
(তরজমা : মোরশেদ শফিউল হাসান)

ওয়েবস্টার তার ছোট দল নিয়ে আলমেরিয়া শহরের মুসলিম কিল্লায় গেলেন, যা এখনো আরবি ‘আল কাজাবা’ নামে পরিচিত। ভূমধ্যসাগরের তীরে এই কিল্লা,পাহাড়ের মাথায়। নিচে আলমেরিয়া শহর। ওয়েবস্টারের মরোক্কীয় সাথী জিনে বললেন, এত মরোক্কোর কিল্লাগুলোর মতো কিল্লা। এমনকি মুসলমানদের দ্বারা ইউরোপে নিয়ে যাওয়া গোলাপ ফুলের বাগিচাও সেখানে রয়েছে এখনো।

ওয়েবস্টার লেখেন যে আলমেরিয়ার প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হলো এই আল কাজাবা, এটা বিশাল একটা কিল্লা যা শহরের মাথায় পাহাড়ে নির্মিত। আন্দালুসিয়ার শ্রেষ্ঠ খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান এই আল কাজাবা দশ শতকে তৈরি করেন। ওয়েবস্টার লেখেন, খলিফা একটা সাধারণ বন্দর প্রহরা মিনারকে একটি বর্ধনশীল বন্দর ও বৃহৎ নগরীতে পরিণত করেন। এটা আল হামরা কিল্লার মতো নয় নেই এখানে কোনো কাঠে খোদাই করা ছাদ বা প্রাচীরে কোনো ‘আরাবেসক’ সজ্জা যে অলঙ্করণ মূর্তিবিহীন লতাপাতার অলঙ্করণ তবু এই আলমেরিয়া আল কাজাবা একটি বিশাল স্থাপনা,যা তাকিয়ে আছে নিচের শহরের দিকে। এটা অতীতের গৌরবকে স্মরণ করে দেয়। ‘আন্দালুস’ (পৃষ্ঠা ১১৩-১১৫)।

ওয়েবস্টার লেখেন যে আলমেরিয়ার বাড়িঘরগুলো একশো বছরের পুরনো, তবে বাড়ির স্থাপত্যে মুসলমানি আমলের পর কমই বদল হয়েছে। একসময়ে উত্তর মরোক্কোর শহরগুলোর মতো ছিল আলমেরিয়া শহর। এখন শূন্য ও মরুভূমিসদৃশ। কেমন একটা করুণ দৃশ্য। (পৃষ্ঠা ১১৩)। করুণ তো হবেই। ইনকুইজিসনের জুলুমের ছাপ কি নিশ্চিহ্ন হয়েছে?

বাণিজ্য আর নয়

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

coaching centreমো. ওসমান গনি : শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করা। তাহলে সে শিক্ষাটা অবশ্যই হতে হবে মানসম্মত। কিন্তু বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিং-বাণিজ্য মহামারী আকার ধারণ করেছে। স্কুল ও কলেজের এক শ্রেণির তথাকথিত শিক্ষক লাগামহীন কোচিং-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। কোমলমতি শিশুদের পরীক্ষায় নম্বর কম দিয়ে, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করে, বিভিন্ন কলা-কৌশল অবলম্বন করে এই শ্রেণির শিক্ষকরা তাদের কাছে শিক্ষার্থীদের পড়তে বাধ্য করছেন। এমনকি এ থেকে বাদ যাচ্ছে না, প্রাথমিক স্তরের কোমলমতি শিশুরাও। তাদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকরা। প্রাইভেট পড়ানো এবং কোচিং পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা থাকা সত্তে¡ও তা কোথাও প্রতিপালিত হচ্ছে না।

আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষাক্রম একটি যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম। পাঁচ বছর মেয়াদি শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা কী কী যোগ্যতা অর্জন করবে তা সুনির্দিষ্ট করা আছে; এগুলোকে বলা হয় প্রান্তিক-যোগ্যতা। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষায় ২৯টি প্রান্তিক-যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচ বছরব্যাপী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভিন্ন বিষয়ে ধাপে ধাপে এ যোগ্যতাগুলো অর্জন করবে বলে আশা করা হয়। প্রান্তিক-যোগ্যতাগুলোকে আবার বিভাজিত করা হয়েছে বিষয়ভিত্তিক প্রান্তিক-যোগ্যতায়। একটি বিষয়ভিত্তিক প্রান্তিক-যোগ্যতা কোন শ্রেণিতে কতটুকু অর্জন করবে তা-ও সুনির্দিষ্ট করা আছে। এগুলোকে বলা হয় শ্রেণিভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতা। যেহেতু প্রাথমিক শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক, তাই প্রাথমিক শিক্ষায় মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও শতভাগ যোগ্যতাভিত্তিক হওয়া উচিত। বর্তমানে ক্রমান্বয়ে শতভাগ যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার দিকে প্রাথমিক স্তরকে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন হলো, বছর শেষে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতাগুলো কতটুকু অর্জন করতে পারল তা যাচাই করা সেটিও আবার বেঞ্জামিন বস্নুমের শিখনের স্তরভিত্তিক (জ্ঞানমূলক, উপলব্ধিমূলক, প্রয়োগমূলক/উচ্চতর দক্ষতা) হতে হয়। আশা করা হয়, উপযুক্ত শিখন-শেখানোর মাধ্যমে শিক্ষকগণ বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট শ্রেণিভিত্তিক অর্জনোপযোগী যোগ্যতাগুলো অর্জন করাবেন। এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে সুস্পষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে।

এককালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রাইভেট টিউশন প্রচলিত ছিল শুধু ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে। এ টিউশনে বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পরীক্ষার আগের কয়েক মাস পড়ানো হতো। তখন প্রাইভেট শিক্ষকের মাসিক বেতন ছিল ২৫-৩০ টাকা। আর যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী গরিব ছিল তাদের থেকে শিক্ষকরা বেতন নিতেন না। তাদের বক্তব্য ছিল- আমি শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদেরকে জ্ঞান দান করে তাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়া হলো আমার কাজ। বর্তমানে বছরজুড়ে সব বিষয়ে, এমনকি ধর্ম-আরবি-চারুকলার মতো বিষয়েও প্রাইভেট পড়ার সংস্কৃতি চালু হয়েছে এবং এটা চালু হয়েছে প্লে, নার্সারি বা প্রথম শ্রেণি থেকেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এসব একাডেমিক কোচিং সেন্টার। ঢাকা ও দেশের বড় বড় শহরে অনেক শিক্ষক ফ্ল্যাট ভাড়া করে কোচিং সেন্টার চালাচ্ছেন। এসব ফ্ল্যাটে একসঙ্গে ৫০-৬০ জন ছাত্রছাত্রী পড়ানো হচ্ছে। কোচিং সেন্টার পরিচালনার দৃশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এটা কোনো স্কুলের সাধারণ ক্লাসরুম না কোচিং সেন্টার। সেখানে ক্লাসরুমের মতোই আছে হোয়াইট বোর্ড, মাইক্রোফোনসহ আধুনিক সাউন্ডসিস্টেম। কোনো কোনো শিক্ষক বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর চাপ সামলাতে একাধিক সহকারীও নিয়োগ করেছেন। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত এসব একাডেমিক কোচিং সেন্টার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকল্প হিসেবে ভূমিকা পালন করায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি যেমন কমেছে, তেমনি শিক্ষকরাও প্রতিষ্ঠানে সময় না দিয়ে ব্যক্তিগত কাজে (কোচিং বা টিউশনিতে) জড়িয়ে গেছেন। শহরের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মধ্যাহ্ন বিরতির পর চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাসে শিক্ষার্থী পাওয়াই যায় না।

গত শতকের নব্বই দশকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে বিশেষ প্রয়োজনে প্রাইভেট-কোচিং প্রচলিত হয়েছিল। সময়ের পরিবর্তনে নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে এমনটি মনে করেছিলেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো। সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় প্রাইভেট-কোচিং আরও ব্যাপকভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকদের একাংশ। শিক্ষার্থীদের পড়ার বিষয় বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যেরও সুযোগ বেড়েছে। ব্যবসাও হচ্ছে রমরমা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এসব কোচিং সেন্টারে শুধু গণিত ও ইংরেজি বিষয় নয়; সব বিষয়ে কোচিং করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয়। মূলত নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিটি বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করায় সমস্যা আরও বেশি হচ্ছে বলে আপাতদৃষ্টিতে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রাথমিক স্তরকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চালু করেছে সরকার। এ অবস্থায় বাস্তবতা হলো, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের প্রাইভেট-বাণিজ্য বা কোচিং-বাণিজ্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা। কোমলমতি শিশুদের কাছে স্কুলের মুক্ত আঙ্গিনাকে আনন্দময় করার বদলে স্কুলকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হচ্ছে দিন দিন। অনেক শিশু স্কুলের পরিবর্তে প্রাইভেট শিক্ষকের বন্দী কক্ষে সেরে নিচ্ছে পড়াশোনা। সমাপনী পরীক্ষার জন্য পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী সারা বছর স্কুলেই যায় না। শুধু বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। বছরের প্রথম মাস থেকেই শুরু হয় এসব প্রাইভেট বা কোচিং। অনেক অতি উৎসাহী অভিভাবক আবার তাদের সন্তানকে সকালে এক কোচিং এবং বিকেলে আরেক কোচিংয়ে পাঠান। অনেক অভিভাবক কোচিং এবং প্রাইভেট দুটিই চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে অভিভাবকদেরও গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত পড়ার বোঝা। প্রাইভেট না পড়লে বিদ্যালয়ে গিয়েও পাচ্ছে না শিক্ষকের সুদৃষ্টি। সরকারি প্রাইমারি স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শ্রেণিতেই ছলে-বলে-কৌশলে শিশুদের প্রাইভেটমুখী করছে একশ্রেণির শিক্ষা-ব্যবসায়ী কথিত শিক্ষক। প্রাথমিক স্তরের প্রাইভেট-কোচিং সেন্টারগুলো শিশুদের জন্য হয়েছে মরণফাঁদ। বেশিরভাগ প্রাইভেট-কোচিং সেন্টারে ক্লাস কার্যক্রম শুরু হয় দুপুরের পরে অথবা সন্ধ্যায়। সারা দিন ক্লান্তির পরে কোমলমতি শিশুদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হয় প্রাইভেট-কোচিং সেন্টারে। ব্যাগভর্তি বই-খাতা-পেন্সিল নিয়ে এসব শিশু সারাক্ষণ শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতায় ভোগে। অনেক শিক্ষার্থীই এ চাপ সহ্য করতে না পেরে আক্রান্ত হচ্ছে নানা ধরনের মানসিক সমস্যায়।

coaching-business কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর প্লে-নার্সারি থেকে কেজি-ফাইভ পর্যন্ত অধিকাংশ শিশু-শিক্ষার্থীই প্রাইভেট-কোচিংয়ের ফাঁদে আটকে থাকে। প্রাথমিকস্তরে এ প্রাইভেট-কোচিং শিশুদের শৈশবকে ধ্বংস করছে এবং সৃজনশীলতার বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করে তুলছে। একটি শিশু স্কুলে ভর্তি হয়েই জেনে যায় স্কুল তার জন্য যথেষ্ট নয়। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য তাকে দৌড়াতে হবে প্রাইভেট টিউটরের বাসায়। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক হওয়া সত্তে¡ও প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারগুলো নির্ধারিত যোগ্যতাগুলো অর্জনের দিকে নজর না দিয়ে পরীক্ষায় কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যায় সেদিকে নজর দিচ্ছে বেশি। পরীক্ষা নিতে সিদ্ধহস্ত এসব কোচিং সেন্টার সাপ্তাহিক পরীক্ষা, মাসিক পরীক্ষা, ত্রৈমাসিক পরীক্ষা, ষাণ¥াসিক পরীক্ষা, বিশেষ পরীক্ষা, মডেল টেস্ট ইত্যাদি নিতে পিছিয়ে থাকে না। এসব পরীক্ষায় ইচ্ছামতো ফি নেয়া হয় অভিভাবকদের কাছ থেকে। শুধু পরীক্ষা ফিই নয়, বেতনের ক্ষেত্রেও নেই কোনো নীতিমালা। এছাড়া বার্ষিক ভর্তি ফিসহ নানা খাত দেখিয়ে বছরে একটি মোটা অঙ্কের ফি হাতিয়ে নিচ্ছে অভিভাবকদের কাছ থেকে। শিক্ষার্থীদের ভিত্তি তৈরির দিকে তাদের কোনো নজর নেই, নেই নজর নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার দিকেও।

আরেকটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আকারে কোচিং ব্যবসা হচ্ছে। সেটি হলো নামিদামি স্কুলে ভর্তি নিয়ে। সরকারি ভালো স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাটা পিতামাতার জন্য সামাজিক মর্যাদার বিষয় এমন মনোভাব থেকেই নার্সারি ক্লাস পেরোতে না পেরোতেই শুরু হয় ভর্তি যুদ্ধের প্রস্তুতি। সেই সুযোগে রাজধানীর ভালো(!) স্কুলে এবং জেলা শহরের নামিদামি স্কুলগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ভর্তি মৌসুমকে টার্গেট করে শিক্ষা-বাণিজ্যে নেমেছেন শিক্ষক নামের এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। ভর্তির গ্যারান্টিসহ নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে অলিগলিতে খুলে বসেছেন ভর্তি-কোচিং সেন্টার। অভিভাবকরাও সন্তানকে পছন্দের স্কুলে ভর্তির আশায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন এসব কোচিং সেন্টারে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ১ম শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণিতে ভর্তির নিমিত্তে লিখিত পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অভিভাবকেরা রীতিমতো যুদ্ধে নামেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পিইসিই) এবং অন্যান্য শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে থেকেই, অনেকে বছরের শুরু থেকেই সন্তানকে ভর্তি-কোচিং করিয়ে থাকেন। অনেক অভিভাবক সন্তানকে এক কোচিংয়ে পড়িয়ে সন্তুষ্ট নন, সন্তানের ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় কোচিং করান ও প্রাইভেট পড়ান। আর এই সব কোচিং সেন্টারে নেয়া হচ্ছে মোটা অংকের ভর্তি ফি এবং শ্রেণিভেদে উচ্চহারে মাসিক বেতন।

শিক্ষার এই বাণিজ্যিকীকরণের মাশুল গুনতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য থেকে জানা যায়, কোচিংয়ের কারণে বর্তমানে শিক্ষা ব্যয়ের সিংহভাগই রাষ্ট্রের পরিবর্তে পরিবারের ওপর বর্তাচ্ছে। দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫৯ ভাগ ও সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত (এমপিওভুক্ত) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শির্ক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয়ের ৭১ ভাগই পরিবার নির্বাহ করে। এই ব্যয়ের সিংহভাগই যায় কোচিং-প্রাইভেটের পেছনে।

প্রাইভেট-কোচিংয়ের চাপে স্কুলবিমুখ হওয়ার এ মানসিকতা পরবর্তী সময়ে উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও তার মনে বদ্ধমূল থাকে। এ কারণেই উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার দিন-দিন বাড়ছে। শহরাঞ্চলের কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যতীত গ্রামের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীর উপস্থিতি হতাশাজনক। প্রাথমিকস্তরের শিক্ষকেরা যদি শিশুদের প্রাইভেট কিংবা কোচিং করানো বন্ধ করেন এবং শতভাগ শিশুকে স্কুলমুখী করতে যত্মবান হন, তবে পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুলমুখী হওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হবে। প্রাইভেট বা কোচিংমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে। তাই প্রাথমিকস্তরে সর্বাগ্রে প্রাইভেট-কোচিং বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। প্রাথমিকস্তরে প্রাইভেট-কোচিং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত। শিশুর শৈশব এবং বেড়ে ওঠার অমিত সম্ভাবনাকে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত রাখার জন্য সব মহলের আন্তরিক সদিচ্ছা ও ঐকান্তিকতা একান্ত জরুরি। শিশুদের জন্য স্কুলের আঙ্গিনাকে আনন্দময় ও অনুকূল করার পাশাপাশি তাদের অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

২০১২ সালের ২০ জুন ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে অনুসারে কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠান প্রধানের লিখিত অনুমতিসাপেক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন। এই নীতিমালা লংঘন করলে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করা হবে। কিন্তু বর্তমানে নীতিমালা সরকারি কাগজেই সীমাবদ্ধ, এর তেমন কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

জ্ঞান বিতরণের কাজটি এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যের প্রধান উপকরণে। কাজেই মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিবোধের উন্নয়ন না ঘটিয়ে শুধু আইন প্রণয়ন করে যে অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয় তা আমরা নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এ পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা ও কথাবার্তা কম হয়নি। কিন্তু সদিচ্ছার অভাব, নৈতিকতার অভাব, অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শিতা ও দুর্নীতির ঘূর্ণাবর্তে এর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। প্রাইভেট ও কোচিং বন্ধসহ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের আন্তরিকতা ও সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

বিশ্বব্যাপী ইহুদী একাধিপত্যের একটি পরিসংখ্যান

অগাষ্ট 15, 2017 মন্তব্য দিন

greater israel project mapপৃথিবীতে ইহুদীদের মোট সংখ্যা দেড় কোটির মত।

একটি মাত্র ইহুদী রাষ্ট্র – ইসরাইল।

ইসরাইলে ইহুদীর সংখ্যা ৫৪ লাখ, অবশিষ্ট প্রায় এক কোটি ইহুদী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে।

এর মধ্যে আমেরিকাতে ৭০ লাখ, কানাডাতে ৪ লাখ আর ব্রিটেনে ৩ লাখ ইহুদী থাকে।

ইহুদীরা মার্কিন জনসংখ্যার মাত্র ২%, আর পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.২% অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি ৫০০ জনে একজন ইহুদী!কিন্তু জনসংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকা শহরের কাছাকাছি হলেও বিশ্বে ইহুদি সম্প্রদায় থেকে যুগে যুগে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য প্রতিভাবান ব্যক্তি।

প্রধান ধর্মগুলোর পর পৃথিবীতে যে মতবাদটি সবচেয়ে বেশী প্রভাব ফেলেছে সেই কমিউনিজমের স্বপ্নদ্রষ্টা কার্ল মার্কস ইহুদি সম্প্রদায় থেকে এসেছেন।

বিশ্বের মানুষকে মুগ্ধ করে রাখা যাদু শিল্পি হুডিনি ও বর্তমানে ডেভিড কপারফিল্ড এসেছেন একই কমিউনিটি থেকে।

এসেছেন আলবার্ট আইনস্টাইনের মত বিজ্ঞানী, যাকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলা হয় আর প্রফেসর নোয়াম চমস্কি – র মত শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক যাকে প্রদত্ত ডক্টরেটের সংখ্যা আশিটির ও বেশি।

এর অন্যতম কারণ সাধারণ আমেরিকান রা যেখানে হাইস্কুল পাশকেই যথেষ্ট মনে করে সেখানে আমেরিকান ইহুদীদের ৮৫% বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। আর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমনঃ ওআইসি-র ৫৭টি দেশে বিশ্ববিদ্যালয় আছে পাঁচ হাজারের মত, আর এক আমেরিকাতেই বিশ্ববিদ্যালয় আছে প্রায় ছয় হাজার এর কাছাকাছি।

ওআইসি ভুক্ত দেশগুলোর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও যেখানে The World University Ranking সাইট এর প্রথম ১০০টা বিশ্ববিদ্যালয়েরর মধ্যে স্থান পায়নি, সেখানে প্রথম একশোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে আমেরিকার ৪৫টা বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রথম দশটার মধ্যে সাতটা) যেখানে প্রথম ২০০ র মধ্যে ওআইসি-ভুক্ত ৫৭ টি মুসলিম দেশের একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে তুরস্কের Bogazici University (১৯৯ তম)সেখানে আমেরিকার বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ২০% স্টুডেন্টস ইহুদী সম্প্রদায় থেকে আসা।

আমেরিকান নোবেল বিজয়ীদের মোটামুটি ৪০% ইহুদী অর্থাৎ নোবেল বিজয়ী প্রতি চার থেকে পাঁচ জনের একজন ইহুদী।

আমেরিকার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসররা ইহুদী।

আমেরিকার উত্তর পূর্ব উপকূলের ১২ টি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়কে এক সাথে আইভি লীগ বলা হয়।

২০০৯ সালের ১টি জরিপে দেখা গেছে আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক’জন ভিসি-ই ইহুদী।

হতে পারে ইহুদীরা আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশ, কিন্তু আমেরিকান রাজনীতিতে তাদের প্রভাব একচেটিয়া। আমেরিকার ১০০ জন সিনেটরের ১৩ জন ইহুদী। এর চেয়ে ভয়ংকর তথ্য হল ইহুদীদের সমর্থন ব্যতীত কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হতে পারে না, কোন প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট থাকতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব যতখানি- আমেরিকান রাজনীতিতে ইহুদীদের প্রভাব তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নির্বাচনী ফাণ্ড বা তহবিল সংগ্রহ একটা বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ। বারাক ওবামা বা ক্লিনটন নিজের টাকায় প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন না। ডোনেশান এবং পার্টির টাকায় তাদের নির্বাচনী ব্যয় মিটাতে হয়েছে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী ফাণ্ড দাতা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে – AIPAC – America Israel Public Affairs Committee. ::

আমেরিকার এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলো ইহুদীদের দখলে। ফলে আমেরিকার কেউ চাইলেও এদের কিছু করতে পারবে না। বরং জুইশ কমিউনিটি বা ইহুদি সম্প্রদাকে হাতে না-রাখলে ক্ষমতায় টেকা যাবে না। এসব কারণে শুধু জুইশ কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টে প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করে যেতে হয়।

আমেরিকার রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে মূলতঃ কর্পোরেট হাউজগুলো। তারা প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বানাতে পারে, এবং প্রেসিডেন্টকে সরাতে পারে। এসব কর্পোরেট হাউজগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় এদের মালিক কিংবা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কম্পানিগুলোর মূল দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা চীফ এক্সজিকিউটিভ অফিসার, সিইও হলেন ইহুদী কমিউনিটির মানুষ।

এই কথা মাইক্রোসফটের ক্ষেত্রে যেমন সত্য তেমনি জাপানিজ কোম্পানি সনির আমেরিকান অফিসের জন্যও সত্য। প্রায় অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদে জুইশ আমেরিকানরা কাজ করছেন। জুইশ কমিউনিটির ক্ষমতাধর বিলিয়নেয়াররা মিলিতভাবে যে-কোনো ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারেন।

মিডিয়া জগতে যদি আপনি তাকান তাহলে দেখবেন;

CNN, AOL, HBO, Cartoon Network, New line cinema, Warner Bross, Sports illustrated, People – Gerald Levin – ইহুদী মালিক নিয়ন্ত্রিত।

ABC, Disney Channel, ESPN, Touchstone pictures – Michael Eisner – ইহুদী মালিক নিয়ন্ত্রিত।

Fox Network, National Geographic, 20th century Fox Rupert Murdoch – ইহুদী মালিক নিয়ন্ত্রিত।

Top 4 famous Newspapers of USA & their editors
New York Times – Arthur Sulzberger
New York Post – Rupert Murdoch
Washington Post – K.M. Graham
Wall street journal – Robert Thomson
সব কয়টি খবরের কাগজ ই ইহুদী মালিক নিয়ন্ত্রিত।

আপনার প্রিয় মিডিয়া ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা Mark Zuckerberg পর্যন্ত একজন ইহুদী।

ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকার আগ্রাসনকে সাধারণ আমেরিকানদের কাছে বৈধ হিসেবে চিত্রায়িত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ফক্স নিউজ। বিশ্ববিখ্যাত মিডিয়া মুগলরুপার্ট মারডকের নিয়ন্ত্রণাধীন এরকম প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই জুইশদের সমর্থন দিয়ে এসেছে। রুপার্ট মারডকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সারা বিশ্বের ১৮৫ টি পত্রপত্রিকা ও অসংখ্য টিভি চ্যানেল। বলা হয় পৃথিবীর মোট তথ্য প্রবাহের ৬০% ই কোন ন কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রুপার্ট মারডকের The News Corporation.

টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যে এবিসি, স্পোর্টস চ্যানেল, ইএসপিএন, ইতিহাস বিষয়ক হিস্টৃ চ্যানেলসহ আমেরিকার প্রভাবশালী অধিকাংশ টিভি-ই ইহুদিরা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।

আমেরিকায় দৈনিক পত্রিকা বিক্রি হয় প্রতিদিন কমপক্ষে ৫৮ মিলিয়ন কপি। জাতীয় ও স্থানীয় মিলিয়ে দেড় হাজার পত্রিকা সেখানে প্রকাশিত হয়। এসব পত্রিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ পত্রিকা যে নিউজ সার্ভিসের সাহায্য নেয় তার নাম দি এসোসিয়েটেড প্রেস বা এপি (AP)। এ প্রতিষ্ঠানটি এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন এর ইহুদি ম্যানেজিং এডিটর ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল সিলভারম্যান। তিনি প্রতিদিনের খবর কী যাবে, না-যাবে তা ঠিক করেন।

আমেরিকার পত্রিকাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী তিনটি পত্রিকা হলো নিউইয়র্ক টাইমস্ , ওয়াল ষ্টৃট জার্ণাল এবং ওয়াশিংটন পোষ্ট। এ তিনটি পত্রিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে।

ওয়াটারগেট কেলেংকারীর জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলো ওয়াশিংটন পোষ্ট। এর বর্তমান সিইও ডোনাল্ড গ্রেহাম ইহুদি মালিকানার তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে কাজ করছেন। উগ্রবাদী ইহুদী হিসেবে তিনি পরিচিত। ওয়াশিংটন পোষ্ট আরও অনেক পত্রিকা প্রকাশ করে। এর মধ্যে আর্মিদের জন্যই করে ১১টি পত্রিকা। এই গ্রুপের আরেকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত। টাইম এর পরে বিশ্বের দ্বিতীয় প্রভাবশালী এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির নাম নিউজউইক।

আমেরিকার রাজনৈতিক জগতে প্রভাবশালী নিউইয়র্ক টাইমস্-এর প্রকাশক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইহুদিরা হয়ে আসছেন। বর্তমান প্রকাশক ও চেয়ারম্যান আর্থার সালজবার্গার প্রসিডেন্ট ও সিইও রাসেল টি লুইস এবং ভাইস চেয়ারম্যান মাইকেল গোলডেন সবাই ইহুদি।

বিশ্বের অর্থনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াল ষ্টৃট জার্নাল। আঠার লাখেরও বেশী কপি চলা এই পত্রিকার ইহুদি প্রকাশক ও চেয়ারম্যান পিটার আর কান তেত্রিশটিরও বেশী পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন।

দেশবরেণ্য রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

sharif enamul kabir 2দেশবরেণ্য রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির ১৯৫৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার সাতাশিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির একজন দেশবরেণ্য রসায়নবিদ। বিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়

তার শৈশব-কৈশোরের সময়গুলো কেটেছে জাতির জনকের পূর্ণ ভূমিতে। ছোট বেলা থেকেই অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে লালন করেই তিনি বেড়ে ওঠেছেন। জন্মের কয়েক বছরের মাথায় বাবাকে হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। মায়ের স্নেহ ভালোবাসার মাঝে তিনি বেঁচে থাকার নতুন অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। বাবা সবসময় চাইতেন ছেলে পড়ালেখা করে তার মুখ উজ্জ্বল করুক। বাবার সেই স্বপ্নকে তিনি ছোট বেলা থেকেই নিজের মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছেন।

শরীফ এনামুল কবিরের শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের অন্য আট-দশটা সাধারণ ছেলের মতোই। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করতে বেশ পছন্দ করেন। গ্রামের মাটির রাস্তা, বর্ষার কাদা-পানি এসবের ভেতর দিয়েই তাকে স্কুলে যেতে হতো। হাইস্কুলে যেতেন নৌকা বেয়ে, প্রায় আড়াই মাইলের মতো পথ নৌকা বেয়ে স্কুলে যেতে হতো তাকে। ছাত্র জীবন থেকেই তার বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক ছিল।

নিজ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর তিনি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি জাহাঙ্গীরনগরে অর্গানোমেটালিক ও ক্লাস্টার রসায়নের ওপর গবেষণা শুরু করেন। তিনি আমেরিকা, ইল্যান্ড, সুইডেন ও জার্মানিতে একাধিক পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণাসম্পন্ন করেন। ভিজিটিং স্কলার হিসেবে তিনি ক্যালিফর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থ রিজে এ জে ডিমিং এর তত্ত্বাবধানে প্রফেসর এডওয়ার্ড রোজেনবার্গ ও প্রফেসর কেনেথ হার্ড-কাসলের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করেন। ১৯৯৪ সালে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এডওয়ার্ড রোসেনবার্গের গ্রুপে যোগদান করেন। অ্যালেকজান্ডার ফন হামবোল্ট স্কলার হিসেবে তিনি প্রফেসর হেনরি বারেনক্যাম্পের সঙ্গে ফ্রাইবুর্গ ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেন। এরপর তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিটিং প্রফেসর হিসেবে দুই বছর অধ্যাপনা করেন।

সারা দেশে যে কয়জন প্রথিতযশা রসায়নবিদ আছেন তাদের মধ্যে অনন্য সাধারণ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির। তিনি বাংলাদেশের মোস্ট-সাইটেট রসায়ন গবেষক। গবেষণার জন্য তিনি দেশে ও বিদেশে সুপরিচিত। রসায়ন বিষয়ে তার বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ দেশের বাইরের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়।

তার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের ৩২০টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এ পর্যন্ত এমএসসি, এমফিল, পিএইচডি পর্যায়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর গবেষণা তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি সৃজনশীল কাজেও বেশ পারদর্শী।

বিজ্ঞানর্চায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ দেশবরেণ্য এ রসায়নবিদ বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সাইন্স এবং এমওগণি গোল্ড মেডেল লাভ করেছেন। ১৯৯০ ও ২০১১ সালে তিনি রসায়নে গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসংখ্য পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। অতি সম্প্রতি তিনি বিজ্ঞান গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ৭ম আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক লাভ করেন।

গবেষণা ও শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ বারের ট্রেজারার, শিক্ষক সমিতির সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি, সিনেট সদস্য, সিন্ডিকেট সদস্য এবং ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবেও। বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সাইন্স, বাংলাদেশ ক্যামিকেল সোসাইটি, রয়েল সোসাইটি অব কেমেস্ট্রির ফেলো হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। এছাড়াও তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর আর্দশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ এর প্রতিষ্ঠাতা।

নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও অভিভাবক সুলভ ব্যবহার দিয়ে তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীর হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির তাদের কাছে যেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জীবন্ত কিংবদন্তি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ যাবৎ কাল পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক।

এই গুণী শিক্ষকের অবসর কাটে অবন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। অবসরে শিক্ষকতার পাশাপাশি লোখালেখি, গান শুনে সময় কাটান।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞান গবেষণার দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্ববৃহৎ ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ হাতে নেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি সম্পূর্ণ সেশনজট মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সারাদেশে পরিচিতি লাভ করে। এরপর আরো অনেক ভাইস চ্যান্সেলর আসলেও তারা কেউই এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। এছাড়া র‌্যাগিং নামক ভয়াবহ ব্যাধি থেকে তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়কে বের করে আনেন। তার সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ও গবেষণায় একটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার একগুচ্ছ কথা মালায়।

ভিন্নধর্মী কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান…

ডিসেম্বর 19, 2016 মন্তব্য দিন

different-type-schools

বহুমুখী নারী উদ্যোক্তা, সমাজসেবিকা ও শিক্ষাবিদ জয়া পতি

ডিসেম্বর 14, 2016 মন্তব্য দিন

joyapati-3joyapati

১৭৮ বছরের পুরনো যশোর জিলা স্কুল

ডিসেম্বর 14, 2016 মন্তব্য দিন

jessore-zila-school