আর্কাইভ

Archive for the ‘শিক্ষা’ Category

প্রজন্মকে আলোকিত করেছেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম

mustafa nurul islam.jpgড. রাহমান নাসির উদ্দিন : যাদের চিন্তা, কাজ, অবদান ও ভূমিকা মানুষ, সমাজ, বিদ্যা-জগৎ এবং সৃজনশীল পরিসরে উল্ল্যেখযোগ্য, অবদারিতভাবে অনস্বীকার্য, তারা লোকান্তরিত হলে, তাদের নিয়ে একটা অবিচুয়ারি বা ‘মৃত্যুত্তর কৃতজ্ঞতাপত্র’ লেখার একটা রীতি বিশ্বব্যাপী জারি আছে। অবিচুয়ারি শব্দের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় সদ্য মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির অবদান যথাযথ সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করে এবং তার কৃতিত্বকে স্বীকার করে তার সম্মানে একটি কৃতজ্ঞতাপত্র লেখা। এর মান, মাত্রা এবং উপস্থাপনারীতি নিয়ে খানিকটা অস্বস্তি থাকলেও বাংলাদেশে কমবেশি এর রীতির প্রচলন আছে। ‘গুণী মানুষের কদরের সংস্কৃতি’ হিসেবে সেটা সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর এবং যারা সৃজনশীল-মননশীল-জ্ঞানকল্পে ক্রিয়াশীল তাদের জন্যও প্রেরণাদায়ক। তাই সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে নিয়ে দু’কলম ‘মৃত্যুত্তর কৃতজ্ঞতাপত্র’ লেখার একটা আন্তরিক প্রয়াস এ লেখা, যা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের।

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ছিলেন শিক্ষক, ভাষাসংগ্রামী, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, টিভি ব্যক্তিত্ব, উপস্থাপক, সম্পাদক এবং একজন চমৎকার ‘বলিয়ে’। যারা লেখেন তারা যদি লিখিয়ে হন, যারা আঁকেন তারা যখন আঁকিয়ে হন, তাহলে যারা চমৎকার বলেন, তারা নিশ্চয় চমৎকার ‘বলিয়ে’। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ ‘বলিয়ে’, যার কথা মনোমুগ্ধকর, যার কথায় সাহিত্য থাকে, তথ্য থাকে, তত্ত্ব থাকে, স্যাটায়ার থাকে, চিন্তার খোরাক থাকে, বিদ্যমান বোঝাবুঝির ক্রিটিক থাকে এবং বিদ্যমান বোঝাবুঝির বাইরে গিয়ে বুঝবার প্রেরণা থাকে। গড্ডলিকা প্রবাহে ডুব না দিয়ে দৃশ্যমান-প্রবাহের বাইরে গিয়ে ভাবনা উপাদান থাকে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রায় ১৫ বছর ধরে তার গ্রন্থনা, পরিকল্পনা এবং উপস্থাপনায় প্রচারিত জনপ্রিয় টিভি-সেমিনার ‘মুক্তধারা’ আমার এ বক্তব্যের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। পরে এটিএন বাংলায় প্রচারিত ‘কথামালা’ সেই মুক্তধারারই নতুন এবং বর্ধিত যাত্রা হিসেবে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল প্রধানত অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের অপ্রথাগত চিন্তা, বিষয়-ভাবনা, বক্তা-নির্বাচন এবং তার আকর্ষণীয় উপস্থাপনারীতির কারণে।

তিনি সারাজীবন ধরে একটার পর একটা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি পড়াশোনা করেছেন কলকাতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে (সোয়াস)। শিক্ষকতা করেছেন সেন্ট গ্রেগরিজ ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকেরই অজানা যে, অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরও বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। এভাবেই অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম একের পর এক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন নতুন নতুন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবে। এ ছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন এবং জাতীয় জাদুঘরের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সাংবাদিকতা শুরু করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে। পরে তিনি দৈনিক সংবাদের সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি সাংবাদিক হিসেবে বেশিদিন অতিবাহিত করেননি। কেননা শিক্ষকতার নেশা তাকে সে পেশায় নিয়ে যায় এবং আমৃত্যু তিনি একজন আলোকদীপ্ত শিক্ষক ছিলেন, যিনি বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রমাগত আলোকিত করেছেন এ দেশের প্রজন্মকে। তিনি শ্রেণিকক্ষে আবদ্ধ সনাতন শিক্ষক ছিলেন না; শ্রেণিকক্ষের বাইরেও তিনি ছিলেন অসংখ্য তরুণের শিক্ষক। টিভি অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন সাহিত্য সভায়, নানা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে আয়োজন করেছেন নানা বক্তৃতামালার এবং নিত্য লেখালেখিতে। তার সম্পাদিত সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘সুন্দরম’ এখনও পর্যন্ত বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হিসেবে পরিগণিত এর সম্পাদনা গুণে, লেখার মানে, পরিশীলিত এবং পরিণত সাহিত্য প্রকাশ, প্রচার ও প্রসারের বিবেচনায়। তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘সাহিত্যিক’ নামে আরও একটি সাহিত্য পত্রিকা, যাও অল্প সময়ের মধ্যে গুণবিচারি পাঠকের বিপুল সমাদর পেয়েছিল। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম লিখেছেন প্রায় ৩০টিরও অধিক প্রবন্ধ গ্রন্থ ও প্রবন্ধ সংকলন। তার লেখার সাহিত্য মান, মননশীলতা, সৃজনশীলতা, চিন্তা-পদ্ধতি, পড়াশোনার গভীরতা, বিশ্নেষণী ক্ষমতা এবং শব্দ-চয়ন, বাক্য-বিন্যাস ও উপস্থাপনার রীতি তাকে তার সমকালে অন্য সাহিত্যিকদের থেকে আলাদা করেছে। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেন। যদিও পুরস্কারপ্রাপ্তি তার অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচ্য; কিন্তু তিনি কেবল পুরস্কারের জন্যই নয়, তার সৃষ্টিকর্ম এবং কর্মযজ্ঞই তাকে সমকালীন সাহিত্য পরিমণ্ডলে একজন সর্বজন-শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তাই তার দেহান্তর সমকালীন বাংলা সাহিত্যচর্চার জগতে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করবে নিঃসন্দেহে।

দেহান্তর জৈবিক প্রক্রিয়ার অনিবার্য পরিণতি। তাই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘যেতে নাহি দেব। হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়…।’ অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে আমরা যেতে দিতে চাইনি; কিন্তু তবুও তিনি চলে গেছেন এবং তাকে চলে যেতে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিশীল মানুষ কখনোই চলে যান না, তাদের দেহান্তর ঘটে বটে; কিন্তু তারা বেঁচে থাকেন তাদের সৃষ্টি ও কাজের ভেতর দিয়ে। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম দেহান্তর সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টি ও কাজের ভেতর দিয়ে। তাই সৃষ্টিশীল মানুষ মরেও অমর।

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisements

পা দিয়ে লিখেই দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বেল্লাল !

পা দিয়ে লিখেই দাখিল পাস করেছে মেধাবী ছাত্র বেল্লাল আকন। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের উমিদপুর গ্রামের খলিল আকন ও হোসনে আরা বেগমের ছেলে বেল্লাল। জন্মগতভাবেই নেই দু’টি হাত। পা দু’টিতেও রয়েছে ত্রুটি।

শারিরীক প্রতিবন্ধী হয়েও মায়ের অনুপ্রেরণায় এগিয়ে চলেছে সে। পা দিয়ে লিখেই সফলতা অর্জন করেছে ইবতেদায়ি ও জেডিসি পরীক্ষায়। উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। তবে সে এবারের দাখিল পরীক্ষায় ৩.৮৫ পেয়েছে।

মেধাবী ছাত্র বেল্লাাল জানায়, শুধু ডান পায়ের আঙ্গুল দিয়ে লিখে পিএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছি। দাখিল পরীক্ষায় সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারিনি। কারণ শারিরীক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি বিধায় অর্থ সঙ্কট ছিল প্রকট। তবে নানা প্রতিবন্ধকতাকে পিছনে ফেলে মাধ্যমিক লেখাপাড়ার গন্ডি পার করেছি। এখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় আরও ভালো ফলাফল অর্জন করতে চাই।

বেল্লালের মা হোসনে আরা বেগম জানান, জন্মেও পর থেকে ওকে নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। গ্রামের লোকজন নানা রকমের অপকথা ছড়ায়। এ কারণে প্রথমদিকে বেল্লালকে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখতেন। এক শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় ছেলেকে লেখাপড়া করানোর সিদ্ধান্ত নেন। ঘরে বসে পড়াতে আর পায়ের আঙুলের মধ্যে চক দিয়ে সিলেটে লেখা শেখানোর অভ্যাস তৈরি করে ফেলি। বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের উমেদপুর মাদ্রাসায় তাকে ভর্তি করা হয়। তবে বেল্লাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে এতেই আমরা খুশি।

বেল্লালের পিতা খলিল আকন বলেন, আমার ছেলে প্রতিবন্ধী এটা বলতে পারছি না। মেধা ও দক্ষতা দিয়ে সমাজে বেল্লাল নিজেই নিজের স্থান তৈরি করে নিয়েছে।

উমিদপুর মাদ্রাসা সুপার মাওলানা মো. হাবিবুল্লাহ জানান, বেল্লাল যে ফলাফল পেয়েছে, এতেই আমার খুশি।

রানা প্লাজা ধসে ২০ এতিম কন্যার মা ইয়াসমিন

এতো অভাব-অভিযোগ-অনুযোগের মধ্যেও সমাজে ভালো মানুষের সংখ্যা একেবারে উবে যায়নি । এর জ্বাজল্যকর প্রমাণ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মতো জনসেবা প্রাদানকারী সংস্থা যে কাজের আঞ্জাম দেয়ার কথা খোদ রানা প্লাজার । এতিমদের তত্ত্বাবধান করতে ইসলামে বিশেষভাবে তাগিদ দেয়া হয়েছে ।

rana plaza yasmin haque

পাথালিয়া (সাভার) ঘুরে: এতিম শিশু শাহানা আক্তার (১০)। জন্মস্থান পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা গ্রামে। শাহানার পিতা ছিলেন রিকশাচালক শাহিন আলম।

শাহানাকে মায়ের গর্ভে রেখেই না মারা যান তিনি। এরপরেই সুখের সন্ধানে শাহানাকে নিয়ে মা আছমা খাতুন ঢাকায় আসেন। চাকরি নেন রানা প্লাজায়।

ভাগ্যেরে নির্মম পরিহাস। রানা প্লাজা ধসে নিহন হন আছমা। পৃথিবীতে মা-বাবা দুজনকে হারিয়ে এতিম হয়ে পড়ে শিশু শাহানা। এরপরে পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহায়তায় সাভার পাথালিয়ায় আঞ্জুমান আজিজুল ইসলাম বালিকা হোমে (এতিমখানা) ভর্তি হয় শাহানা।

২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই এতিমখানার উদ্বোধন করা হয়। এতিমখানাটিতে বর্তমানে শাহানার মতো বিভিন্ন বয়সের ২০টি এতিম মেয়েশিশু বড় হচ্ছে। ২০টি শিশু হোম সুপার নুরুন্নাহার ইয়াসমিনকে ‘মামনি’ বলে ডাকে। নিজের সন্তানের মতো করে প্রায় চারটি বছর আগলে রেখেছেন ইয়াসমিন। সকালে ঘুম থেকে ওঠানো, লেখা-পড়া করানো থেকে শুরু করে সব বিষয়ে দেখভাল করেন ইয়াসমিন।

ইয়াসমিনের নিজের একটি সন্তান আছে। শুদ্ধ হক ওর নাম। বর্তমানে ইয়াসমিন মনে করেন তার মোট সন্তান ২১টি। এর মধ্যে ২০টি মেয়ে ও একটি ছেলে। সবাই এতিমখানার পাশের নবীন গ্রিন ভিউ মডেল হাইস্কুলে পড়ালেখা করছে। নার্সারি থেকে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আছে এই এতিমখানায়।

সকালে ঘুম থেকে ওঠা, খাওয়া, স্কুল, পড়ালেখা সব কিছুই চলে নিয়ম অনুযায়ী। এসব এতিম কন্যার কোনো টাকা পয়সা খরচ হয় না। বিজিএমইএ এবং আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম সব খরচ বহন করে। আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামেরই একজন সদস্য ইয়াসমিন।

rana plaza orphans 1

হোম সুপার ইয়াসমিন বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের এই এতিমখানায় মোট ২০ জন ছাত্রী আছে। নার্সারি থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করানো হয়। রানা প্লাজায় আহত, নিহত ও নিখোঁজ তিন ধরনের শ্রমিকদের বাচ্চা আছে। ওরা সবাই আমাকে মামনি বলে ডাকে। ওরা আমার নিজের সন্তানের মতো। এই এতিমখানার শুরু থেকেই আমি আছি। আমি মনে করি আমার ২০টা মেয়ে একটা ছেলে। রোযা ও কোরবানির ঈদে সব সময় ওদের সঙ্গে থাকি। আজকে চারটি বছর কখনও চোখের আড়াল হতে দেইনি। দেশবাসীকে বলবো আপনারা আমাদের ২০ কন্যা ও এক ছেলের জন্য দোয়া করবেন।’

এতিমখানাটি নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে উঠেছে। সব সময় পড়ালেখায় ব্যস্ত থাকে শিক্ষার্থীরা। তবে অনেক সময় পিতা-মাতার কথা মনে করে কান্নায় ভেঙেও পড়ে ওরা। আর এমন সময় পিতা-মাতার ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসেন হোম সুপার ইয়াসমিন। এতিম বাচ্চাদের জন্মদিনে উৎসবের ব্যবস্থা করেন।

সবাই উৎসব আনন্দে এখানে দিন কাটায়। পিতা-মাতাকে ভুলিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন ইয়াসমিন। এই এতিমখানার অন্যতম মেধাবী পাপিয়া আক্তার(১৩)। জন্মস্থান বরিশালের হিজলায়। সে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। মা আনোয়ারা বেগম রানা প্লাজা ধসে নিহত হন। দিনমজুর বাবা ইউনুস মুন্সি গ্রামে থাকেন। এখন এতিমখানায় বেড়ে উঠছে পাপিয়া। তবু মা হারানো পাপিয়ার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন।

পাপিয়া বলে, আমি বড় হয়ে পাইলট হবো। আঞ্জুমান আজিজুল ইসলাম বালিকা হোম আমাকে সহায়তা করলে সেই স্বপ্ন পূরণ হবে।’

এই এতিমখানা থেকে ওদের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা শেষে কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করবে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম। এরপরে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করবে সংস্থাটি। এই বালিকাদের উচ্চশিক্ষার পর বিয়ের ব্যবস্থাও করবে সংস্থাটি।

সংস্থাটির আহ্বায়ক এমআই চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ২০ কন্যার উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করবো। আল্লাহর রহমতে আমাদের টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই। এই কন্যাদের বিয়ের সময় সাড়ে তিন লাখ টাকা করে ব্যয় করবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। কোনো কন্যা পথে থাকবে না। ২০ কন্যার স্থায়ী ঠিকানা করে দিয়েই আমরা দায়িত্ব শেষ করবো।’

হোমটি পরিচালনায়  আর্থিক সহায়তা হিসেবে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা দিচ্ছে বিজিএমইএ। এছাড়া খাওয়া বাবদ দৈনিক প্রতিটি শিশুর জন্য ১৬৬ টাকা করে ব্যয় করা হচ্ছে। এর পুরোটাই বহন করছে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম।আঞ্জুমান কর্তৃপক্ষ কন্যাশিশুদের থাকা-খাওয়া চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করছে। সবাই মিলে-মিশে ২০ কন্যার দায়িত্ব নিয়েছে।

বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের তথ্যমতে, প্রায় ৫ হাজার শ্রমিকের পরিবারে ৭০০ শিশু ছিল, যারা বর্তমানে হয় মা বা বাবা অথবা দাদি-নানির কাছে বেড়ে উঠছে। এ সংখ্যা আরও বেশি বলে তাদের ধারণা। এর মধ্যে নানা পর্যায়ে ৩শ শিশুর পড়ালেখার ব্যবস্থা করে দেওয়া সম্ভব হলেও বাকিদের খোঁজ কেউ রাখেননি।

তবে বিজিএমইএ বলছে, এই  শিশুরা বিজিএমইএর সঙ্গে যোগাযোগ করলে একটা ব্যবস্থা করা হবে। এমনকি রানা প্লাজা ধসে যেসব শিশু এতিম হয়েছে তাদের চাকরির জন্য বিজিএমইইএ’র দরজা খোলা।

এতিম শিশুদের প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন,রানা প্লাজা ধসে  এতিম হওয়া শিশুদের আমরা চাকরি দিয়ে দেবো। যার যে ধরণেরযোগ্যতা সেই অনুযায়ী চাকরি দিতে আমরা সহায়তা করবো।’

‘এখনও তো অনেক এতিম শিশু সহায়তার আওতায় আসেনি’ –এই কথার জবাবে তিনি বলেন, পাঁচ বছর পর এসব কথা ভুয়া। আমরা নানাভাবে সকল এতিম শিশুর দায়িত্ব নিয়েছি।তবে এখনও কেউ বাদ পড়ে থাকলে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো।’

হিংলিশ ভাষা যেমন !

hinglis

মাতৃভাষায় হাদিস চর্চার আগে যা জানা জরুরি

calligraphy-mohamed_rasollahআজকাল সৌদী থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত অথবা সৌদী প্রকাশনা থেকে প্রাপ্ত পুস্তকাদির বদৌলতে আমাদের সমাজে এমন একটি মত শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, এক শ্রেণীর লোকজন এক বাক্যে বলতে থাকে যে, আমাদের সহীহ হাদীস মেনে চলতে হবে বা ইমাম আবু হানিফা’র (রাঃ) একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি (“সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে সেটাই আমার মাজহাব”) ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে হানাফী মাজহাবের অনুসারীদের বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়া হয় । সাধারণ অর্থে একথা ঠিক আছে বটে কিন্তু সবক্ষেত্রে নয় ; স্থান-কাল-পাত্র পরিবর্তনের কারণে কিছু কিছু সহীহ হাদীস পালন অসম্ভব বা মনসুখ (রহিত) হয়ে গেছে । এই রহিত বা পরিবর্তিত (সুপারসিড) হবার ব্যাপার বুঝতে আছারের (সমসাময়িক কালের বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা) সাহায্য গ্রহণ করতে হয় । কারণ, একটি হাদীস সহীহ হলেও সেটা মানসুখ হয়ে থাকতে পারে যা ঐ হাদীসের রাবী (বর্ণনাকারী) না-ও জেনে থাকতে পারেন ।

এছাড়া সব সময় জয়িফ (দুর্বল) হাদীস মানেই পরিত্যাজ্য বিষয় নয় । নীচে সে আলোচনা বিস্তারিতভাবে এসেছে ।

= = =

মাহফুয আহমদ : হাদিসে রাসুল (সা.) হচ্ছে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বিতীয় মৌলিক উৎস। হাদিস ও সুন্নাহর অনুসরণ প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। শিক্ষিতদের জন্য হাদিস অধ্যয়নও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সৌভাগ্যের বিষয়। রাসুল (সা.)-এর ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী হিসেবে উলামায়ে কেরামের জন্য হাদিস ও সুন্নাহর প্রচার-প্রসার, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও এসবের সংরক্ষণ এক মহান দায়িত্ব। উম্মাহর নির্ভরযোগ্য আলিমরা সর্বযুগে এ গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছেন। আজকাল সাধারণ শিক্ষিত আমাদের অনেক বন্ধু কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন করতে আগ্রহী হচ্ছেন এবং সাধ্যমতো এগুলো থেকে উপকৃত হতে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আমরা তাঁদের ধন্যবাদ জানাই এবং উৎসাহিত করি। তবে প্রত্যেক জ্ঞান ও শাস্ত্রের নিজস্ব কিছু মৌলিক নীতিমালা থাকে, যেগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই বেশি জানেন; এগুলো জানা না থাকলে সাধারণ পাঠকরা অনেক সময় ভুল-ভ্রান্তির শিকার হতে পারেন। এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো—

এক. প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমেই সহিহ হাদিস সীমাবদ্ধ নয়। বরং অন্যান্য হাদিসগ্রন্থেও প্রচুর সহিহ হাদিস রয়েছে। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উভয়েই স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে আমরা সব সহিহ হাদিস আমাদের গ্রন্থে সন্নিবেশিত করিনি কিংবা করতে পারিনি এবং তা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। ইমাম বুখারি (রহ.) বলেন, ‘আমি এই কিতাবে (সহিহ বুখারিতে) সহিহ হাদিসই উল্লেখ করেছি। তবে এ ছাড়া অনেক সহিহ হাদিস রয়ে গেছে।’ (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা; জাহাবি, ১০/২৮৩, মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত, সপ্তম সংস্করণ, ১৪১০ হি.)

এমনিভাবে ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর শায়খ ইমাম আবু জুরআ রাজি ও ইমাম ইবনে ওয়ারা (রহ.)-এর কাছে যখন সহিহ মুসলিম সংকলনের সংবাদ পৌঁছে, তখন তাঁরা মন্তব্য করেছিলেন, ‘এটা আমাদের বিরুদ্ধে বেদয়াতিদের পথ সুগম করবে।’ যখন তাদের সামনে কোনো সহিহ হাদিস পেশ করা হয়, তখন তারা এই বলে প্রত্যাখ্যান করবে যে এটি তো সহিহ মুসলিমে নেই। তখন ইমাম মুসলিম (রহ.) আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘অর্থাৎ আমি তো এ কিতাবে আমার কাছে যারা হাদিস শিখতে আসবে, তাদের স্মরণ রাখার সুবিধার্থে কিছু হাদিস একত্রিত করেছি। আমি তো এ কথা বলিনি যে এ সমষ্টির বাইরের সব হাদিস দুর্বল, বরং এ কথা বলেছি যে এই হাদিসগুলো সহিহ।’ (প্রাগুক্ত, ১২/৫৭১)

এখানে ইমাম আবু জুরআ রাজি ও ইমাম ইবনে ওয়ারা (রহ.)-এর দূরদর্শিতার কথা চিন্তা করুন! তাঁদের কথা আজ আমাদের সমাজের কত নির্মম বাস্তবতা!

দুই. এ কথাও আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে কোনো বিষয়ে বাহ্যবিরোধপূর্ণ হাদিস যদি একাধিক হাদিসগ্রন্থে বিবৃত হয়, তাহলে নির্দিষ্ট কোনো গ্রন্থের হাদিসকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। সুতরাং কোনো বিষয়ের একটি হাদিস সহিহ বুখারি কিংবা সহিহ মুসলিমে আছে এবং একই বিষয়ের ভিন্ন একটি হাদিস সুনানে তিরমিজি অথবা অন্য কোনো গ্রন্থে বর্ণিত হয়, তাহলে প্রথম হাদিসটি শুধু সহিহ বুখারি বা সহিহ মুসলিমে হওয়ার কারণেই প্রাধান্য পাবে না। অবশ্য এটি ব্যাপক আলোচিত একটি বিষয়। এ প্রসঙ্গে মুহাদ্দিস আবদুর রশিদ নুমানি (রহ.)  তাঁর ‘আত-তাকিবাত আলা সাহিবিদ দিরাসাত’ গ্রন্থে বিস্তারিত ও প্রামাণিক আলোচনা করেছেন। (আল আজওইবাতুল ফাজিলা; আবদুল হাই লখনউভি, টীকা : আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, পৃ. ২০২-২০৪, মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যা, আলেপ্পো, ষষ্ঠ সংস্করণ ২০০৫ ঈ.)

তিন. জয়িফ হাদিস সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করা ঠিক নয় যে তা কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য হয় না। বরং মুসলিম উম্মাহর নির্ভরযোগ্য সব হাদিসবিদের মতে, ক্ষেত্রবিশেষে জয়িফ হাদিসও গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য হতে পারে। ফাজাইলে আমালের ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিসও যে গ্রহণযোগ্য, তা তো শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব মনীষীরই সিদ্ধান্ত। ইমাম নাওয়াওয়ি (রহ.) লেখেন, ‘মুহাদ্দিস ও ফকিহ আলিমরা বলেন, ফাজাইল, তারগিব ও তারহিব তথা ভালো কাজের উৎসাহ এবং মন্দ কাজ থেকে ভীতি প্রদর্শন সংক্রান্ত বিষয়ে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করা জায়েজই নয়; বরং মুস্তাহাব। তবে হাদিসের নামে মাউজু বা বানোয়াট কথার ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়।’ (আল আজকার; নাওয়াওয়ি, পৃ. ১৩, দারুল কলম আল আরাবি, প্রথম সংস্করণ ২০০২ ঈ.) নাওয়াওয়ি (রহ.) অন্যত্র বলেন, ‘সব আলিম এ বিষয়ে একমত যে ফাজাইলের ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করা যেতে পারে।’ (আল আরবাঈন; নাওয়াওয়ি, পৃ. ৪) আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ‘ফাজাইলে আমালের ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করার সুযোগ রয়েছে।’ (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া; সুয়ুতি, ২/১৯১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত, ১৯৮২ ঈ.)

অবশ্য ফাজাইলে আ’মালের ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করার জন্য নির্ধারিত কিছু শর্ত রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে আল্লামা আবদুল হাই লাখনোবি (রহ.) কর্তৃক রচিত এবং শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.)-এর টীকা-টিপ্পনী সংযোজিত ‘আল আজওইবাতুল ফাজিলা’ (পৃ. ৩৬-৫৯) প্রভৃতি গ্রন্থ দেখতে পারেন।

চার. জয়িফ হাদিসের আলোচনা প্রসঙ্গে এখানে আরেকটি কথা লক্ষণীয় যে মুহাদ্দিসদের মতে, ফাজাইলে আমাল ছাড়া আহকামে শারইয়্যাহর বেলায়ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিস গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য। নিচে এ রকম দুটি ক্ষেত্র নিয়ে আলোকপাত করা হলো—

ক. কোনো বিষয়ে সহিহ হাদিস পাওয়া না গেলে সে ক্ষেত্রে নিজ কিয়াস ও যুক্তির চেয়ে জয়িফ হাদিসই অগ্রগণ্য। আর এটা ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) প্রমুখ ইমামের নীতিগত সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া ইমাম আবু দাউদ (রহ.), ইমাম নাসায়ি (রহ.), ইমাম আবু হাতিম (রহ.) প্রমুখ মুহাদ্দিসও একই মত পোষণ করেছেন। আল্লামা ইবনে হাজম জাহিরি (রহ.) বলেন, ‘ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সব শিষ্য এ ব্যাপারে একমত যে আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাবে কিয়াস ও রায়ের তুলনায় জয়িফ হাদিসই অগ্রগণ্য।’ (মানাকিবুল ইমাম আবি হানিফা; জাহাবি, পৃ. ২১, মীর মুহাম্মদ কুতুবখানা, আরামবাগ, করাচি)

ইবনে হাজম অন্যত্র লেখেন,  ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন, জয়িফ হাদিসই আমাদের কাছে রায় ও যুক্তির চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।’ (আল মুহাল্লা; ইবনে হাজম, ৪/১৪৮, দারুল ফিকর, বৈরুত)

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘সুতরাং জয়িফ হাদিস ও আসারে সাহাবাকে কিয়াস ও রায়ের ওপর প্রাধান্য দেওয়া ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদ উভয়ের মূলনীতি ছিল।’ (ই’লামুল মুয়াক্কিয়িন; ইবনুল কায়্যিম, ১/৮১, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত)

খ. যদি কোনো জয়িফ হাদিস অনুযায়ী তাওয়ারুসে উম্মত তথা মুসলিম উম্মাহর নিরবচ্ছিন্ন কর্মধারা চলে আসে এবং আলেমরা এ হাদিস গ্রহণ করেন, তাহলে ওই জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করা জায়েজ তো বটেই, ওয়াজিবও হতে পারে। আরবের সমাদৃত লেখক, আল্লামা শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) বলেন, এখানে (আমল করা যাবে) এর মর্ম হলো—‘জরুরি ভিত্তিতে হাদিসটির ওপর আমল করা হবে এবং ওই আমল করাটা হাদিসকে সহিহর মানে উত্তীর্ণ করবে।’ শায়খ সেখানে এ বিষয়ের কয়েকটি নমুনাও পেশ করেছেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, সুনানে তিরমিজিতে হাদিস এসেছে : ‘খুনি নিহতের সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে না।’ ইমাম তিরমিজি (রহ.)  হাদিসটি সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন, ‘এই হাদিস সহিহ নয়। তদুপরি আলেমরা এই হাদিসের ওপর আমল করে থাকেন।’ (বিস্তারিত দেখুন—আল আজওইবাতুল ফাজিলা, পৃ. ৫০ ও ২২৮-২৩৮)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হলো যে বিভিন্ন পর্যায়ে জয়িফ হাদিসও কাজে আসে। আরবের স্বনামধন্য হাদিস গবেষক আল্লামা শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা হাফিজাহুল্লাহ তাঁর সাড়া-জাগানো গ্রন্থ ‘আসারুল হাদিসিশ শারিফ ফিখতিলাফিল আয়িম্মাতিল ফুকাহা’ (পৃ. ৩৬-৪১)-তে এ বিষয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। আগ্রহী পাঠক তা দেখে নিতে পারেন। মোটকথা, জয়িফ হাদিস আর মাওজু হাদিস এক নয়। মাওজু হাদিস সর্বাবস্থায় পরিত্যাজ্য, পক্ষান্তরে জয়িফ হাদিস বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য।  

পাঁচ. হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে সনদ বা সূত্র পর্যালোচনা করা একটি অপরিহার্য বিষয়। সনদ না থাকলে যার যা ইচ্ছা তা-ই হাদিস বলে চালিয়ে দিতে পারত। তবে এ কথাও জেনে রাখা দরকার যে ইসলামের প্রথম যুগগুলোতে মানুষের মধ্যে ধার্মিকতা ও সততা প্রবল থাকার কারণে তখনকার সনদগুলোতে তেমন দুর্বলতা পাওয়া যায় না, যেমনটি পরবর্তী সনদগুলোতে লক্ষ করা যায়। সুতরাং সনদের বাহানায় প্রমাণিত কোনো আমল অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) কতই না সুন্দর বলেছেন, ‘সনদ মূলত শরিয়তে নেই এমন বিষয়ের অনুপ্রবেশ থেকে প্রতিবন্ধকস্বরূপ, শরিয়তে প্রমাণিত কোনো বিষয় বের করার জন্য নয়।’ (দেখুন—বাসতুল ইয়াদাইন; কাশ্মীরি, পৃ. ২৬, মাআরিফুস সুনান; বানুরি, ৬/৩৮০, শায়খ আবু গুদ্দাহর ‘উজুবুল আমাল বিল হাদিসিজ জয়িফ…’ শীর্ষক প্রবন্ধ; আল আজওইবাতুল ফাজিলার সঙ্গে যুক্ত, পৃ. ২৩৮)

সর্বশেষ আরেকটি বিষয়ের প্রতি বিজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। তা হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে হাদিসগ্রন্থাদি প্রচুর সংখ্যায় প্রকাশিত ও সহজলভ্য হওয়া কিংবা ইন্টারনেট-অনলাইনে অনায়াসে হাদিসের সন্ধান পেয়ে যাওয়া কস্মিনকালেও পূর্ববর্তী মনীষীদের চেয়ে আমাদের হাদিস জ্ঞান বেশি হওয়ার প্রমাণ নয়। এ ধরনের চিন্তা করা মারাত্মক ভুল ও বাস্তবতা বিবর্জিত। শায়খুল ইসলাম হাফিজ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) অত্যন্ত সত্য কথা বলেছেন, ‘হাদিসের এসব গ্রন্থ সংকলিত হওয়ার আগে যেসব ইমাম অতিক্রান্ত হয়ে গেছেন, তাঁরা পরবর্তীদের চেয়ে অনেক বেশি হাদিসের জ্ঞান রাখতেন। কারণ, তাঁদের কাছে এমন বহু হাদিস ছিল, যা আমাদের পর্যন্ত মাজহুল (অজ্ঞাত) বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) সনদে পৌঁছেছে, কিংবা আদৌ পৌঁছেনি।’ (রাফউল মালাম আনিল আয়িম্মাতিল আ’লাম; ইবনে তাইমিয়া, পৃ. ১৮)             

অতএব, কোনো হাদিসের সনদের বাহ্যিক দুর্বলতা দেখে সেটি পরিত্যাজ্য জ্ঞান করা, দু-একটি হাদিসগ্রন্থ অধ্যয়ন করেই কোনো মাসয়ালায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, নিরবচ্ছিন্ন কর্মপন্থায় চলে আসা উম্মাহর কোনো আমলকে ভুল আখ্যায়িত করা এবং উম্মাহর অনুসৃত ইমামরা সম্পর্কে অযাচিত মন্তব্য করা কোনোক্রমেই সমীচীন নয়। বরং এসব তো ব্যক্তির জ্ঞানের অপরিপক্কতা, চিন্তার অগভীরতা, মানসিক রুগ্ণতা ও চারিত্রিক দুর্বলতার পরিচায়ক।

লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন

শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

একজন কবি শিক্ষাবিদ প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

zillur rahman siddiqui 2মৌরী তানিয়া : ‘চতুর্থ শ্রেণির পর একটা বৃত্তি পরীক্ষা ছিল, এবং আমরা যারা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছিলাম, নির্দিষ্ট সময়ে সবাই বৃত্তি পরীক্ষা দিতে যাব নিকটবর্তী ঝিনেদা শহরে, সেভাবেই প্রস্তুত হচ্ছিলাম। নতুন ওস্তাদজির থাকার ব্যবস্থা হলো আমাদের বহির্বাটিতে, অর্থাত্ খানকায়। দাদাজান আমার পড়াশোনার ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেল এই অভিনব ব্যবস্থায়, কারণ শমশের খান অবিলম্বে আমাকে নিয়ে পড়লেন। গণিতে তাঁর দক্ষতা ছিল, সেটা প্রমাণের জন্য তিনি আমাকেই বেছে নিলেন। পরীক্ষায় আমি তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। তাঁর আশা ছিল, গণিতে আমি একশ’র মধ্যে একশ’ই পাব। দেখা গেল, দুটি প্রশ্নে ভুল করেছি। এই ব্যর্থতায় আমি নিজে তেমন বিচলিত হইনি, কিন্তু আমার ওস্তাদজি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। সেই দৃশ্য আমাকে বিচলিত করেছিল। ঝিনেদায় আমার চাচার বাসায় আমরা সবাই উঠেছিলাম, আমার চাচা, আমাকে নয়, আমার ওস্তাদজিকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, আমি সে দৃশ্য ভুলিনি। ‘ওপরের এই কথাগুলো বলেছেন এদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। ছেলেবেলাতেই তাঁর ওস্তাদজি তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়েছিলেন। আর তাই তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন তিনি অঙ্কে একশতে একশই পাবেন। একশতে একশ না পাওয়ায় ওস্তাদজি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে ছেলেবেলায় ওস্তাদজির প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও পরবর্তী সময়ে তিনি একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ হিসেবে দেশবাসীর অনেক প্রত্যাশা পূরণ করেছিলেন। তিনি শুধু এদেশের অন্যতম শিক্ষাবিদই নন, তিনি একজন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক।

১৯২৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি (১০ ফাল্গুন) জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ঝিনাইদহ জেলার দুর্গাপুর গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তখন ঝিনাইদহ বৃহত্তর যশোর জেলায় ছিল। তিনি মায়ের প্রথম সন্তান না হলেও একদিক দিয়ে প্রথম, কারণ তাঁরও আগে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তাঁর মা। সে মেয়েটি আঁতুড়েই মারা যায়। প্রথম ও চতুর্থ অবস্থানে তাঁরা দুই ভাই, বাকি ছয় জন বোন।

তাঁদের একান্নবর্তী পরিবারে পরিবারপ্রধান ছিলেন তাঁর দাদাজান। দাদী না থাকায় পরিবারে একটা শূন্যতা রয়েই গিয়েছিল। বাড়ির বড় বউ হিসেবে অনেকটা দায়িত্ব বর্তেছিল তাঁর মায়ের ওপর। অন্দরমহল পরিচালনার এই দায়িত্ব তাঁর মা ভাগ করে নিতেন তাঁর ফুফুর সঙ্গে। তাঁর বাবা থাকতেন কলকাতার একটি ভাড়া বাসায়। তিনি কলকাতার নর্মাল স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।

তিনি যে পাঠশালায় পড়াশোনা করেছেন সেটির প্রতিষ্ঠাতা তাঁর দাদাজান। তাঁদের বাড়ির বহিরাঙ্গনেই পাঠশালার ঘরটি ছিল। তাঁর বাবার যখন স্কুলে যাওয়ার বয়স হলো তখনই তাঁর দাদাজান একটি পাঠশালার প্রয়োজন অনুভব করেন এবং এই পাঠশালাটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বাবা-চাচারা এখানেই পড়াশোনা করেন।

কলকাতার নর্মাল স্কুলে তাঁর বাবা ১৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। এরপর কলকাতার বাইরে তাঁর পোস্টিং শুরু হয়। ফলে গ্রামের পাঠশালার পাঠ শেষ করে বাবার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো শুরু হলো। চাকরিসূত্রে তাঁর বাবা যেখানে যান, বই খাতা নিয়ে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, তাঁর মা ও ভাইবোনরাও সেখানে যান। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণি তিনি পড়লেন বাঁকুড়া জেলা স্কুলে। এই স্কুলে পড়ার সময় স্কুলের ম্যাগাজিনের দুটি সংখ্যা বের হয়েছিল। প্রথমটিতে তাঁর কবিতা ‘প্রভাত’, দ্বিতীয়টিতে তাঁর প্রবন্ধ ‘যুদ্ধ’ ছাপানো হয়। দুটিতেই রচনার মূল কৃতিত্ব তাঁর বাবার, কারণ, কবিতার ওপর তিনি তাঁর ঘষা-মাজার কাজ যেভাবে করেছিলেন, তাতে শেষ পর্যন্ত সেটি আর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর রচনা বলে দাবি করা গেল না। আর প্রবন্ধটিও বলতে গেলে যৌথ রচনা, মূল কাঠামো তাঁর, আর পরিণত রূপ তাঁর বাবার। ম্যাগাজিনের সম্পাদনার দায়িত্বে যে শিক্ষকেরা ছিলেন, তাঁদের মনেও সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। এক বিকেলে খেলার মাঠ থেকে ডেকে নিয়ে তাঁরা তাঁকে সোজা জিজ্ঞেস করলেন, প্রবন্ধটি তাঁরই লেখা কি-না। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই হাঁ-সূচক জবাব দিয়ে পালিয়ে বাঁচলেন। কারণ এর সঙ্গে তাঁর বাবার সম্মান জড়িত ছিল।

বাঁকুড়ায় স্কুলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানও ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ব্যাপার। সেই অনুষ্ঠানেই তিনি প্রথম কবিতা আবৃত্তির সুযোগ পান, নজরুলের ‘শাতিল আরব’। যেমন কবিতায়, প্রবন্ধ রচনায়, তেমনি আবৃত্তিতেও তাঁর শিক্ষক ছিলেন তাঁর বাবা।

১৯৪০-৪১ সালে তাঁর বাবা আবার বদলি হলেন জলপাইগুঁড়ি। ১৯৪১ সালে জলপাইগুঁড়ি জেলা স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেন যশোর জেলা স্কুলে। ১৯৪৫ সালে দিলেন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা। স্টার মার্কসসহ ১ম বিভাগ পেয়ে ভর্তি হলেন

কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে, আইএ ক্লাসে। তখন থাকতেন বউবাজার মোড়ে অবস্থিত টেইলর হোস্টেলে। ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে ভয়াবহ দাঙ্গা হলো কলকাতায়। অরক্ষিত হয়ে পড়লেন তাঁরা। তখনকার ভয়াবহতা ও অসহায়ত্বের কথা এখনো ভুলতে পারেন না তিনি। হোস্টেল ছেড়ে কয়েকমাস নিরাশ্রয় জীবনযাপন শেষে মীর্জাপুর স্ট্রিটের মুসলমান ছাত্রদের কলেজ হোস্টেলে থাকলেন ৩ মাস।

আইএ পরীক্ষা দিলেন ১৯৪৭ সালে। লাভ করলেন প্রথম বিভাগ। দেশভাগের পর চলে এলেন ঢাকায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ অনার্স ক্লাসে ভর্তি হলেন। আর থাকতেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে।

১৯৫০ সালে বিএ অনার্স পরীক্ষায় ইংরেজি সাহিত্যের একমাত্র প্রথম শ্রেণিটি তিনিই লাভ করেছিলেন। ১৯৫১ সালের এমএ পরীক্ষায়ও একমাত্র প্রথম শ্রেণিটি তাঁর দখলে এল। এমএ পাস করার পর ১৯৫২ সালে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে প্রোগ্রাম সহকারী হিসেবে কাজ করলেন ৩-৪ মাস। ১৯৫১ সালেই বিয়ে করেন তিনি। ময়মনসিংহ শহরের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, প্রাক্তন এমএলএ আবদুল মজিদের কন্যা কায়সারকে। এই দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ে।

১৯৫২ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ডে গেলেন। পড়লেন অনার্স কোর্স। ১৯৫৪ সালে সমুদ্রপথে ফিরে এলেন দেশে। ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলেন। ঢাকা কলেজে তাঁর নিযুক্তি ছিল সরাসরি প্রফেসর পদে অক্সফোর্ডের ডিগ্রির সুবাদে। ১৯৫৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদানের পর পদোন্নতি পেয়ে বিভাগের রিডার ও বিভাগীয় প্রধান হলেন। ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিমন্ত্রণে দুই মাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেন। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত মুস্তাফা নূরউল ইসলামের সঙ্গে মিলে প্রকাশ করেন ত্রৈমাসিক ‘পূর্বমেঘ’। ১৯৬৭ সালে বাবা ফজলুর রহমান সিদ্দিকী মারা যান গ্রামের বাড়িতে। এ বছরই মিল্টনের বিখ্যাত গদ্যরচনা অ্যারিও প্যাজিটিকার অনুবাদ করেন তিনি। ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের খণ্ডকালীন পরিচালক।

১৯৭৩ সালে ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে মিল্টনের মৃত্যুর ত্রিশতবার্ষিকী পালন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নেন। ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রিগায় গিয়েছিলেন লেখক/কবি সম্মেলনে অংশ নিতে। সে সময় মস্কো, লেনিনগ্রাদ, তিবিলিসি, কিয়েভসহ অনেক শহরেই সফর করেছেন। ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৪ সালে ৪ বছরের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সেখানেই ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে পুনর্বার যোগ দেন। ১৯৮৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর, ১৯৯৫ সালের জানুয়ারির সময়টা ছিলেন বিশ্বভারতীর ভিজিটিং প্রফেসর। ২০০০ সালে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন, ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের একজন কর্মী।

এতসব দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চলতে থাকে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর লেখালেখি। কবিতা তাঁকে ছাত্রজীবন থেকেই টানত। স্কুলের আবৃত্তিতে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল নিয়মিত। দু-এক দিনের মধ্যে তিনি দীর্ঘ কবিতা মুখস্থ করে ফেলতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শেক্সপিয়রের ১৫৪টি সনেট অনুবাদ করেন। পাশাপাশি নিজের কবিতা লেখাও অব্যাহত রাখেন। তাঁর নিজের বিবেচনায়, তাঁর লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখের দাবি রাখে একটি দীর্ঘ কবিতা, ‘ফালগুন-চৈত্রের কবিতা’। এই কবিতায় তিনি নিজেকে যে সম্পূর্ণতায়, যে নিবিড়তায় দেখতে পান, তেমন আর কোনো কবিতায় নয়। কেউ যদি তাঁকে প্রশ্ন করেন, কোন একটি কবিতা আপনার নিজের কাছে প্রিয়, তিনি সহজেই বলবেন, ‘ফালগুন-চৈত্রের কবিতা’। এটি আছে তাঁর ‘আসন্ন বাস্তিল’ গ্রন্থে।

১৯৫০ সালের দিকে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী যখন অনার্স  তৃতীয় বর্ষে, তখন আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশীদ খানের সম্পাদনায় বের হয় ‘নতুন কবিতা’ নামে কবিতা সংকলন। ১২ বা ১৩ জন কবির কারো ৫টা, কারো ৬টা কবিতা স্থান পায় সে সংকলনে। প্রত্যেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে বইয়ের মুদ্রণব্যয় বহন করলেন। সে সংকলন অনেকের নজরে পড়ল। বিশেষ করে অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা তাঁদের সম্পর্কে উত্সাহী হয়ে উঠলেন। ওই সময় আবদুল গণি হাজারী ও মাহবুব জামাল জাহেদীর সম্পাদনায় ‘মুক্তি’ বলে একটি সাহিত্য পত্রিকা বেরিয়েছিল। এর পিছনে ছিলেন জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা। সেখানে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়।

যদিও অন্যের কবিতার অনুবাদ, তবু ‘শেক্সপীয়রের সনেট’ তিনি তাঁর সমগ্র কবি-কর্মেরই অংশ বলে মনে করেন। আর এই অনুবাদকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি শেক্সপিয়রকে যেভাবে চিনেছেন, তাঁর মনের ও তাঁর কবিকর্মের যে ঘনিষ্ঠ পরিচয় পেয়েছেন, সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। কবিতা লেখা ও ‘শেক্সপীয়রের সনেট’ অনুবাদের পাশাপাশি চলতে থাকে তাঁর প্রবন্ধ লেখার কাজ। বেশকিছু প্রবন্ধের বইও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর।

তাঁর প্রকাশিত বইগুলো হলো—১৯৭১ সালে অ্যারিও প্যাজেটিকা অনুবাদ, ভূমিকা, টিকা; ১৯৭৩ সালে স্যামসন অ্যাগনিমটিজ মিল্টন, কাব্যানুবাদ; ১৯৭৫ সালে হূদয়ে জনপদে, কবিতা; ১৯৭৬ সালে শব্দের সীমানা, প্রবন্ধ; ১৯৭৬ সালে মুহূর্তের কবিতা : ফররুখ আহমেদ-সম্পাদনা; ১৯৭৭ সালে শেক্সপীয়রের সনেট, ভূমিকা ও কাব্যানুবাদসহ; ১৯৭৮ সালে হে বন্য স্বপ্নেরা, ফররুখ আহমেদ-সম্পাদনা; ১৯৮৩ সালে Literature of Bangladesh and other essays; ১৯৮৪ সালে আমার দেশ আমার ভাষা, প্রবন্ধ সংকলন; ১৯৮৪ সালে চাঁদ ডুবে গেলে, কবিতা; ১৯৮৫ অনুবাদ, ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা সিরিজ; ১৯৮৫ সালে দ্য টেম্পেস্ট শেক্সপীয়র, ভূমিকাসহ অনুবাদ; ১৯৮৬ সালে বাংলা প্রবন্ধ পরিচয়,সংকলক ও সম্পাদক; ১৯৮৮ সালে আসন্ন বাস্তিল, কবিতা; ১৯৮৯ সালে শান্তিনিকেতনে তিন মাস, জার্নাল; ১৯৯১ সালে বাঙালীর আত্মপরিচয়, প্রবন্ধ; ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমি ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি, সম্পাদক; ১৯৯৪ সালে প্রবাসে প্রতিদিন, ভ্রমণ দিনলিপি; ১৯৯৭ সালে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ছিলাম; ১৯৯৭ সালে Visions and revisions; ২০০০ সালে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা : সংকট ও সম্ভাবনা; ২০০১ সালে কবিতা সংগ্রহ; ২০০১ সালে Quest For a Civil Society, নির্বাচিত প্রবন্ধ; ২০০৩ সালে আমার চলার পথে, আত্মজীবনী; ২০০৪ সালে গ্রামের নাম খিদিরপুর, প্রবন্ধ।

বাংলা একাডেমির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে ’৭৩-পরবর্তী তাঁর কর্মজীবনের দ্বিতীয় পর্বে। একাত্তরেই তাঁর প্রথম বই, ‘মিল্টনের অ্যারিও প্যাজিটিকা’ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড। বোর্ড ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমির সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। ’৭৩-এ তাঁর দ্বিতীয়

মিল্টন-অনুবাদ, স্যামসন অ্যাগনিসটিজ প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। ছিয়াত্তর-সাতাত্তর-এ তাঁর অনূদিত শেক্সপীয়রের সনেট প্রকাশিত হতে থাকে একাডেমির পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’-এ। এরপর আশির দশকে একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর অনুবাদ, ভাষাশহীদ গ্রন্থমালা সিরিজে এবং তাঁর সম্পাদিত ‘বাংলা প্রবন্ধ পরিচয়’। তবে এই প্রকাশনার ধারায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি। এই অভিধানটির সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য ছিলেন তিনি। এটি প্রকাশের সাথে সাথে আশাতীতভাবে সমাদৃত হলো এবং অল্পদিনের মধ্যে অভিধানটি বাংলা একাডেমির সফলতম প্রকাশনা হিসেবে স্বীকৃতি পেল।

১৯৭৭ সালে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী লাভ করেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৭৯ সালে কবিতার জন্য পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ১৯৯০ সালে কাজী মাহবুবুল্লাহ বেগম জেবুন্নিসা ট্রাস্ট পুরস্কার পান। ১৯৯৮ সালে গ্রহণ করেন অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার। ২০১০ সালে তিনি অর্জন করেন স্বাধীনতা পুরস্কার।

১১ নভেম্বর ২০১৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন বহুগুণে গুণান্বিত এই ব্যক্তিত্ব।

সিভিল এভিয়েশনের নজরদারি না থাকায় দুর্ঘটনা

us-bangla dashআজাদ সুলায়মান ॥ দেশের ফ্লাইং ক্লাবগুলোর অব্যবস্থা ও স্বেচ্ছাচারিতার খেসারত দিচ্ছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। সিভিল এভিয়েশনের সর্বক্ষণিক নজরদারি না থাকা ও সেফটি ইস্যুতে শিথিলতার দরুন একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তাদের মতে-আইকাও এবং সিভিল এভিয়েশনের নিয়ম মেনে চলছেনা এসব ফ্লাইং ক্লাব। বিশেষ করে নারী পাইলটদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে যতটুকু সতর্কতামূূলক পদক্ষেপ নেয়া বাধ্যতামূলক, সেটা মানা হয়নি বলেই নারী পাইলটদের হাতেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত বিমান দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছেন নারী পাইলটরাই। ক্যাপ্টেন রোখসানা, জাকিয়া সুলতানা চমন, ডলি, ফারিয়া লারা, তামান্না ও পৃথুলা। অদক্ষ প্রশিক্ষকের সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ উড়োজাহাজে প্রশিক্ষণে বাধ্য করায় অধিকাংশ নারী পাইলটকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

সিভিল এভিয়েশনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জেনারেল এভিয়েশন সেক্টরে এ যাবত যত দুর্ঘটনা ঘটেছে- সবকটিরই তদন্তে ফ্লাইং ক্লাবগুলোর অবহেলা ও সঠিক পরিকল্পনাকে দায়ী করা হয়েছে। সর্বশেষ রাজশাহীতে যে দুর্ঘটনায় প্রশিক্ষণার্থী তামান্না ও প্রশিক্ষক শাহেদ কামাল নিহত হন- সেটার তদন্তেও ফ্লাইং ক্লাবের সঠিক পরিকল্পনা, যান্ত্রিক ত্রুটি ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করা হয়েছে। ওই দুর্ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ভর দুপুরে যে সময়টাতে নিহতদ্বয়ের বিশ্রামে থাকার কথা সে সময়ে তারা ফ্লাইং করতে যান। প্রশিক্ষক শাহেদ কামাল একজন দক্ষ পাইলট হলেও তিনি মানসিকভাবে কিছুটা চাপের মুখে ছিলেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগের তদন্ত চলায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন। তারপরও তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওই ফ্লাইটে পাঠানো হয়। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ওই দুর্ঘটনার কদিন আগেই তিনি ইজি ফ্লাই নামের একটি কার্গো কোম্পানিতে যোগ দেন। এ অবস্থায় মাত্র চার দিনের জন্য তামান্নাসহ আরও ১০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে ‘সলো ট্রেনিং’ করানোর জন্য তিনি রাজশাহী যান। মাত্র চারদিনেই এত সংখ্যক প্রশিক্ষণার্থীকে সলো (এককভাবে ফ্লাই করানো) করানোর কঠিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি বেশ অবসাদগ্রস্ত ছিলেন। যে কারণে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে তিনি সেদিন দুর্ঘটনার মুখে পড়েন। এ বিষয়ে সিভিল এভিয়েশন সূত্র জানায়, সে সময় শাহেদের বিরুদ্ধে একটি ঘটনার তদন্ত চলছিল। এমনিতে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। এমন অবস্থায় তাকে রাজশাহীতে গিয়ে ১০ জনকে সলো করানোর মতো কঠিন দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া ঠিক হয়নি।

এ প্রসঙ্গে যমুনা নদীতে পড়ে প্রাণ হারানো অপর পাইলট কামরুল ইসলাম সম্পর্কেও সিভিল এভিয়েশনের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন,‘তার কোন ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং প্র্যাকটিস ছিলনা। কারণ সে সময়ে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে ফুলটাইম ইন্সট্রাক্টর ছিলনা। এতে সর্বক্ষণিক ইমার্জেন্সি প্র্যাকটিস করানো হত না। কামরুল নিজেও এ প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হন। তার যদি এ ট্রেনিং থাকত তাহলে- তিনি বেশ নিরাপদেই যমুনার চরে ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং করতে পারতেন। ওই ঘটনায় তিনি প্রাণ হারালেও তার সহযোগী পাইলট শামসুদ্দিন ভাগ্যজোরে প্রাণে রক্ষা পান । এখন তিনি একটি বেসরকারী এয়ারলাইন্সে কর্মরত। এ বিষয়ে একজন পাইলট জানান, কোন ধরনের ইন্সট্রাক্টর ছাড়া দুজন পাইলটকে এ ধরনের প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজে ঢাকা থেকে রাজশাহী পাঠানো আদৌ ঠিক হয়নি। যদিও দুজনেরই পিপিএল ( প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্স) ছিল, তবুও তাদের কাছে এ ধরনের ফ্লাইং ঝুঁকিপূর্ণই ছিল । সে সময়েও বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে কোন ফুলটাইম ইন্সট্রাক্টর ছিলনা।

এ সব দুর্ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব একাডেমির বেশ কিছু অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে ওঠে। তদন্তকারীরা অবাক হয়েছেন- দেশের প্রধান ও প্রথম এই একাডেমির প্রধান চীফ ইঞ্জিনিয়ার রুমির কোন এ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোন ডিগ্রী নেই। উপরন্তু মাত্র অষ্টম শ্রেণী পাস এই চীফ ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একটি ডিপ্লোমা সনদ দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে কাজ করতে করতে সনাতনী কায়দায় কিছুটা অভিজ্ঞতা অর্জনই তার মূল যোগ্যতা। এহেন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির ওপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে ফ্লাইং ক্লাবের এতগুলো প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুদায়িত্ব। এটা তদন্তকারীদের কাছেও অবিশ্বাস্য ঠেকেছে।

সিভিল এভিয়েশন জানায়, অন্যান্য ফ্লাইং ক্লাবগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয় যেখানে, আইকাও ও সিভিল এভিয়েশনের নিয়মনীতি ও শর্তাদি পদে পদে লঙ্ঘন হচ্ছে। সম্প্রতি সিভিল এভিয়েশনের একটি টিম পরিদর্শনের সময় দেখতে পায় গ্যালাক্সি ফ্লাইং ক্লাব নামের একটি প্রতিষ্ঠানে গত কয়েক মাস ধরে কোন প্রশিক্ষকই নেই। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী নজরুলের স্বেচ্ছাচারিতা, নানা অরাজকতা ও অনিয়মের প্রতিবাদে পর পর ইস্তফা দেন চীফ অব ইন্সট্রাক্টটর (সিজিআই), চীফ ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর (সিএফআই) ও হেড অফ ট্রেনিং (এইচটি)। আজও এ সব পদ শূন্য রেখেই একাডেমির কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে চালানো হচ্ছে। অথচ আইকাও এবং সিভিল এভিয়েশনের রুলস হচ্ছে এ ধরনের পদ শূন্য রেখে কিছুতেই উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের কাজ চালানো যায়না। এটা বিপজ্জনক। এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি রেখে প্রশিক্ষণ দেয়াটা প্রশিক্ষকের জন্যও নিরাপদ নয় বলে জানিয়েছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে-প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ যেভাবে আলু-পটলের ব্যবসার মতো গায়ের জোরে ফ্লাইং ব্যবসা করছেন- তাতে খেসারত দিতে হচ্ছে যমুনা নদীতে পড়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো কামরুল ইসলামের মতো পাইলটকে।

এ প্রসঙ্গে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের ফ্লাইং ক্লাবগুলোকে প্রশিক্ষণের বিষয়ে আরও সতর্ক ও পেশাদারি হতে হবে। এমনও অভিযোগ পাওয়া গেছে-প্রশিক্ষণ বিমানে ফ্লাইং করার সময়ে ককপিটে বসে প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী দুজনেই সেলফি তোলার মতো কৌতূহলী কাজেও ব্যস্ত থেকেছে। যেখানে তাদের এক মুহূর্তের অন্যমনস্কতায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে সেখানে তাদেরকে ককপিটে বসে মোবাইল ফোনে সেলফি তোলার মতো ছেলেমিপনা কতোটা ভয়ঙ্কর তা যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করতে না পারে তাহলে এর চেয়ে আর দুর্ভাগ্য কি হতে পারে।

তিনি সিভিল এভিয়েশনকে এ সেক্টরে আরও বেশি মনোযোগী ও তদারকি বাড়ানোর পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হলে ফ্লাইং ক্লাবগুলোকে তাদের মতো করে পলিসি তৈরি করলে চলবে না। সরকারী বেসরকারী সব ধরনের ফ্লাইং ক্লাবকেই আইকাও ও সিভিল এভিয়েশনের সব শর্ত ও নিয়ম মেনে চলতে হবে।