আর্কাইভ

Archive for the ‘রাজনীতি’ Category

জেরুজালেম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাশেই থাকছে সৌদি আরব

salman-trumpজেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায় প্রায় সারা বিশ্ব যখন সোচ্চার তখন চুপ থাকতে পারেনি সৌদি আরবও। উপসাগরীয় ও আরব দেশগুলোর প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় রিয়াদও ওই ঘোষণাকে অন্যায্য ও দায়িত্বহীন আখ্যা দিয়েছে। তবে এরইমধ্যে জেরুজালেম সংক্রান্ত খবর প্রকাশে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে দেশটিতে। জর্ডানে থাকা সৌদি নাগরিকদের বলা হয়েছে প্রতিবাদ না করতে। এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, রিয়াদ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে অংশীদার হিসেবেই কাজ করছে। এছাড়া সৌদি যুবরাজের কথিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে মার্কিন মদদ, মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ট্রাম্পের অবস্থান মানতে মাহমুদ আব্বাসকে চাপ দেওয়া এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বসে মার্কিন স্টাইলের শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর আলোচনার মতো বিষয়গুলোও সামনে এসেছে পূর্ববর্তী কিছু প্রতিবেদনে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করায় মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভে ফুঁসলেও এ ইস্যুতে দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রের পাশেই থাকছে সৌদি আরব। ট্রাম্পের ওই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদ জানিয়েই ‘দায়িত্ব’ শেষ করেছে দেশটি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, রিয়াদ এখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।

৬ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করেন ট্রাম্প। প্রতিক্রিয়ায় ওই ঘোষণাকে ‘অন্যায্য ও দায়িত্বহীন’ সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করে সৌদি রয়েল কোর্ট। এই একই রয়েল কোর্ট একইসঙ্গে নিজ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর ট্রাম্পের এ স্বীকৃতি সংক্রান্ত খবর প্রচারে বিধিনিষেধ আরোপ করে। রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের সম্পাদকদের কাছে এ বিষয়ে নোটিস পাঠানো হয়েছে। এতে জেরুজালেম নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের খবর বেশি সময় ধরে প্রচার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আল আকসা মসজিদের জিম্মাদার জর্ডানে ব্যাপক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ওই ঘোষণার পরদিনই জর্ডানের সৌদি দূতাবাস থেকে দেশটিতে অবস্থানরত সৌদি নাগরিকদের ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ না নিতে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

জর্ডানের সৌদি দূতাবাসের অফিসিয়াল টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে জর্ডানে অবস্থানরত সৌদি নাগরিক এবং দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সৌদি শিক্ষার্থীদের জনসমাগম ও বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সৌদি আরব এখন যুক্তরাষ্ট্রের যে শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে এগুচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে সেটি নতুন কিছু নয়। গত নভেম্বরে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের রিয়াদ সফরকালে তাকে এ পরিকল্পনার ব্যাপারে অবহিত করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ইহুদি ধর্মাবলম্বী জামাতা জ্যারেড কুশনার ২০১৮ সালের গোড়ার দিকে একটি শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাশা করছেন। এ বিষয়ে অবস্থান জানাতে ফিলিস্তিনি নেতাকে দুই মাসের সময় বেঁধে দেন সৌদি যুবরাজ।

সৌদি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা না রেখে এবং জেরুজালেমকে রাজধানীর স্বীকৃতি না দিয়ে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা হবে। পূর্ব জেরুজালেমের বদলে এ রাষ্ট্রের রাজধানী হবে আবু দিস নামের একটি ফিলিস্তিনি এলাকা।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, এ প্রস্তাব মূলত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার অংশবিশেষ। মাহমুদ আব্বাস ও সৌদি যুবরাজের কথোপকথন শুনেছেন এমন এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমমটি বলছে, সৌদি আরব আব্বাসকে এমন একটি পরিকল্পনা দিয়েছে যা কোনও ফিলিস্তিনি নেতা গ্রহণ করতে পারেন না।

Dome of the Rock and Jerusalem.jpg

সৌদি আরবের প্রস্তাবে গাজা উপত্যকা এবং পশ্চিম তীরের কিছু অংশে সীমিত ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্ব, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য ফেরার অধিকার না রাখা, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা না করা এবং পশ্চিম তীরের বেশিরভাগ ইহুদি বসতি অক্ষুণ্ন রাখার কথা বলা হয়েছে।

এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে যেসব মানুষ শরণার্থী হয়েছেন তাদের আর নিজ ভূমিতে ফেরার কোনও সুযোগ থাকবে না।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওই প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেছেন ফিলিস্তিনের চার কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা জানান, ওই প্রস্তাব নিয়ে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মধ্যে ব্যাপক দর কষাকষি হয়েছে। তবে সৌদি যুবরাজ মাহমুদ আব্বাসকে আশ্বস্ত করে বলেন, ধৈর্য ধরুন। আপনি ভালো খবরই পাবেন। শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্কে নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। তবে দুই দেশের অভিন্ন শত্রু ইরানকে মোকাবিলায়ই এর একমাত্র কারণ নয়। বরং ট্রাম্পের ইসরায়েলবান্ধব জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের সম্পর্ক বেশ গভীর। মূলত কুশনারের সঙ্গে সম্পর্কের জেরেই নিজ দেশে রাজপরিবারের সদস্যদের ওপর গণগ্রেফতার চালানোর মতো ঝুঁকি নেওয়ার সাহস করেছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে সৌদি রয়েল কোর্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে তারা এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি।

বিষয়টি নিয়ে হোয়াইট হাউসেরও বক্তব্য জানার চেষ্টা করে রয়টার্স। তারা এর জবাব দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে বলা হয়, সৌদি যুবরাজকে শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে ফিলিস্তিনি নেতার সঙ্গে আলোচনা করতে বলেননি জ্যারেড কুশনার। তবে ফিলিস্তিনি নেতাদের আশঙ্কা, সৌদি যুবরাজ মূলত ইহুদি ধর্মাবলম্বী জ্যারেড কুশনারের অবস্থানই মাহমুদ আব্বাসের কাছে পুনরাবৃত্তি করেছেন। তারা বলছেন, সৌদি যুবরাজ যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে আর রাষ্ট্র গঠনের মতো উপাদান বিদ্যমান থাকে না।

ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের সিনিয়র ফেলো শাদি হামিদ। রয়টার্স’কে তিনি বলেন, অধিকাংশ আরব রাষ্ট্রই ট্রাম্পের এ ঘোষণা নিয়ে আপত্তি তুলবে না। কারণ আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় তারা এখন ইসরায়েলের সঙ্গে অধিক সংযুক্ত। এর মধ্যে বিশেষ করে ইরানকে জবাব দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের গোপন সম্পর্কের বিষয়টিও এখন নতুন কিছু নয়। এ বছরের নভেম্বরে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন, ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী ইউভাল স্টেইনিৎজ। দেশটির ‘আর্মি রেডিও’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘অনেক মুসলিম ও আরব দেশের সঙ্গে আমাদের সত্যিকার গোপন সম্পর্ক রয়েছে। এ নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। সৌদি আরবই চেয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্ক গোপন রাখতে। এতে আমাদের কোনও সমস্যা ছিল না।’ ইসরায়েলি মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর সৌদি আরবও বিষয়টি অস্বীকার করেনি।

ইসরায়েলি জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরবসহ কোনও আরব দেশ বা কোনও মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হলে আমরা তাদের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানাই। আমরা সে সম্পর্ক গোপন রাখি।’

সৌদি-ইসরায়েলের সম্পর্কের সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইরানকে প্রতিহত করতে সৌদিসহ আধুনিক আরব বিশ্বের যোগাযোগ আমাদেরকে সাহায্য করেছে। তেহরানের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর পরমাণু চুক্তির বিরুদ্ধেও আমাদের চেষ্টায় এই আরব দেশগুলো সহযোগিতা করেছে। এমনকি বর্তমানে সিরিয়ায় ইরানের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের কাজেও সুন্নি আরব বিশ্ব আমাদের পাশে রয়েছে।’

উল্লেখ্য, পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দেখতে চায় ফিলিস্তিন। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও শহরটিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে মেনে নেয়নি। এখন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েলবান্ধব ট্রাম্প প্রশাসন আর সৌদি আরব যদি একই এজেন্ডা বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করে সেটা ফিলিস্তিনিদের জন্য একটা বড় দুঃসংবাদ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সূত্র: রয়টার্স, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, মিডল ইস্ট মনিটর।

Advertisements

চা বিক্রেতা দেশ বিক্রেতা হন নি!

modi sold tea

সিনাই এত ঝুঁকিপূর্ণ কেন?

২০১৪ সালে ওলিয়াত সিনাই নামে স্থানীয় একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান হয়। তারা আইএসের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করে। সিনাইয়ের বেদুইনরা বহু বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবহেলিত ছিল। তাদের সেই ক্ষোভকেও কাজে লাগায় উগ্রবাদীরা।

সংঘবদ্ধ হয়ে এই পর্যন্ত বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। তাদের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। গত সেপ্টেম্বরে সিনাইয়ের আল-আরিস এলাকায় পুলিশের গাড়িবহরে আইএস সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের হামলায় ১৮ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছিলেন।

আর যেই মসজিদে হামলা হয়েছে তা সুফিবাদে বিশ্বাসী লোকদের কেন্দ্রস্থল। আইএস এবং এর অনুসারীরা সালাফিপন্থী। সুফিবাদের সমালোচক। এর আগেও সিনাইয়ে সুফিবাদে বিশ্বাসীরা মাঝেমধ্যে উগ্রবাদী হামলার শিকার হয়েছেন। সুফি মতবাদে বিশ্বাসী এক নেতাকে অপহরণের পর শিরশ্ছেদ করা হয়েছে।

sufi attacked in egypt

কৃষককন্যা থেকে কিংবদন্তি জোয়ান অব আর্ক

রণক ইকরাম :

joan of ark 6যদি আমি দৈবানুগ্রহ না পেয়ে থাকি, তবে ঈশ্বর আমায় অনুগ্রহ করুন; আর যদি পেয়ে থাকি, তবে ঈশ্বর আমায় সেখানেই ঠাঁই দিন! — জোয়ান অব আর্ক

সেই দৈববাণী

ইতিহাসের অমর অনেক গল্পগাথার ছোঁয়া এর পূর্ববর্তী বিবরণে উল্লেখ থাকে। জোয়ান অব আর্কের বেলায়ও এরকমই একটি দৈববাণীর ঘটনা ঘটেছে।

কথিত আছে, জোয়ানের যখন মাত্র ১৩ বছর বয়স তখন একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। জোয়ান তখন মাঠে ভেড়ার পাল চরাচ্ছিলেন। দেবদূত মিকাইল তাকে বলেন, ‘সাহসী কিশোরী, তৈরি হও। তোমার সময় এসেছে যুদ্ধে যাওয়ার। তুমিই পারবে ইংরেজদের পরাজিত করে ফ্রান্সকে মুক্ত করতে। ’ জোয়ান তখন ভয় আর দ্বিধার সাগরে নিমজ্জিত। ভয় ভেঙে প্রশ্ন করেন— ‘আমি কী করে যুদ্ধ করব! আমার বয়স মাত্র ১৩!’ উত্তরে দেবদূত বলেন—‘ভয় কর না জোয়ান। সাহস সঞ্চয় কর। ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখ।’ এই দৈববাণীই তার জীবন পাল্টে দেয়। শুধু তাই নয়, তখন ফ্রান্সজুড়ে একটা প্রচলিত ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। সবাই বিশ্বাস করত, এক কুমারী মেয়ে ফ্রান্সকে রক্ষা করবে।

ঘটনা ১৪২৮ সালের। জোয়ান গেলেন চার্লসের সেনা কমান্ডার রবার্ট রড্রিকটের কাছে। জানালেন তিনি যুদ্ধ করতে চান। রবার্ট এতে রেগে গেলেন। কারণ তখন মেয়েদের জন্য যুদ্ধ ছিল নিষিদ্ধ। তাই রবার্ট সামন্ত ডেকে এনে জোয়ানকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে তাকে শাস্তি দেওয়ার কথাও বললেন। নিরাশ হয়ে জোয়ান সেখান থেকে ফিরে এলেন ঠিকই। কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, অরলিন্সের কাছে ফ্রান্স যুদ্ধে হেরে যাবে।

দ্রুতই ফলে গেল জোয়ানের কথা। ততদিনে দৈববাণী আর জোয়ানের তীব্র আত্মবিশ্বাস ছাপ ফেলেছে রবার্টের মনে। ফলে রবার্ট জোয়ানকে নিয়ে গেলেন ভবিষ্যৎ রাজা চার্লসের কাছে। এর আগে জোয়ানের চুল ছেঁটে ফেলা হলো। পরানো হলো ছেলেদের পোশাক।

সেখানে জোয়ান হাজির হলেন একজন নাইটের বেশে। ভবিষ্যৎ রাজার কাছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে একটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে পঞ্চক্রুশধারী তরবারি হাতে যুদ্ধে নামেন। সঙ্গী ৪০০০ সৈন্য।

১৪২৯ সালের ২৮ এপ্রিল অবরুদ্ধ নগরী অরল্যান্ডে প্রবেশ করেন জোয়ান। তিনি তৎকালীন ফ্রেঞ্চ নেতৃত্বের রক্ষণাত্মক রণকৌশল পরিহার করে আক্রমণাত্মক কৌশলে অরল্যান্ডকে মুক্ত করেন। খুব দ্রুতই জোয়ানের বিজয়গাথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কে জানত সেখান থেকেই আসলে নতুন ইতিহাস লেখার সূচনা করেছিলেন জোয়ান!

যেখানে একেবারে আলাদা

ইতিহাসের অমর চরিত্ররা বুঝি এমনই হয়। না হলে কেউ কখনো ভেবেছিল সাধারণ একটা মেয়ে পাল্টে দেবে ফরাসি ইতিহাস! জোয়ান অব আর্ক এর সেই গল্প সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়। যেখানে জীবনের সংগ্রাম আছে, উত্থান আছে, আবার আছে কঠিন পতনও। শত শত বছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহের কেন্দ্রে থাকা জনপদের কাপুরুষ রাজার শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিলেন জোয়ান। এ কাজ করতে গিয়ে ডাইনি আখ্যা পেয়েছেন। নারী হয়েও পুরুষের বেশে দিনাতিপাত করেছেন। শত শত বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন। গৃহত্যাগী হতে হয়েছে। ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে লাফিয়ে পলায়নের চেষ্টা করেছেন, অন্যায় বিচারের পরও ন্যায়বিচারের ভান ধরেছেন, ধর্মদ্রোহিতার অপবাদসহ আরও কত কী! শুধু তাই নয়, কয়েকবার তাকে শয়তানের দূত আখ্যা দিয়ে  মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এরকম শত শত বিপদেও নিজের আদর্শ থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি জোয়ান। এসব কারণে জোয়ান আর সবার থেকে একেবারেই আলাদা করে রেখেছেন নিজেকে। লিঙ্গবৈষম্য কিংবা কোনো প্রতিকূলতা নয়, বিশ্বাসে-সাহসে ভর করে অসম্ভবকে জয় করার অদম্য ইতিহাসই জোয়ানের ইতিহাস। আর এ কারণেই চলে যাওয়ার শত শত বছর পরও পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় এই বীর নারীকে।

চার্লসের অভিষেক অনুষ্ঠানে দাঁড়ানো জোয়ান

উন্মাতাল চার্লস উত্তপ্ত ফ্রান্স

কোনো বিপ্লবই এমনি এমনি তৈরি হয় না। পেছনে থাকে হাজার বঞ্চনার নির্মম ইতিহাস। ব্যতিক্রম ছিল না জোয়ান অব আর্কও। জোয়ান যে সময়টাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস একেবারেই উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠেছিলেন। রাজক্ষমতার জন্য নিজের ভাই ডিউক লুইস অব অরল্যান্স ও চাচাতো ভাই জন দ্য ফিয়ারলেস এবং বারগুনডির ডিউক ভয়ঙ্কর কলহে লিপ্ত হন। ১৪০৭ সালে ডিউক অব বারগুনডির আদেশে ডিউক অব অরল্যান্সকে হত্যা করা হয়। ফলে প্রজারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এই অন্তর্কলহের সুযোগ নিলেন ইংরেজ রাজা পঞ্চম হেনরি। ১৪১৫ সালে তিনি ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের শহরগুলো দখল করে নেন। অন্যদিকে চার ভাই মারা যাওয়ার পর সপ্তম চার্লস মাত্র ১৪ বছর বয়সে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন। ১৪১৯ সালে বারগুনডিয়ানদের সঙ্গে তার শান্তিচুক্তি হলেও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বারগুনডিয়ানরা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়। এর আগে ১৩৩৭ থেকে ১৪৫৩ শতবর্ষ ধরে চলা যুদ্ধে ফরাসিদের অবস্থা ছিল বাজে। ইংরেজদের কাছে একের পর এক পরাস্ত হতে থাকে ফরাসিরা। তখনই ফরাসিদের মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হন জোয়ান। ফ্রান্স থেকে ইংরেজদের হঠানোর কাজে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখেন। ফলে তিনি ফ্রান্সের জাতীয় হিরোইন হিসেবে সম্মানিত।

উন্মাদপ্রায় ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

ফ্রান্সের মিউজ নদীর তীরে ছোট্ট এক গ্রাম দমরেমি। এখানকারই এক সাধারণ কৃষক পরিবারে ১৪১২ সালের ৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন জোয়ান অব আর্ক। তার বাবা জ্যাক ডি আর্ক ও মাতা ইসাবেল রোমিই। তার বাবাকে মোটামুটি অবস্থাসম্পন্নই বলা চলে। নিজের ৫০ একর জমি ছাড়াও সরকারি চাকুরে হিসেবে গ্রামের চাষিদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন তিনি। জোয়ানদের গ্রামের পাশেই বারগুন্ডি নামে আরেকটি গ্রাম ছিল। সেই গ্রামে একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা বাস করত। তারা প্রায়ই আশপাশের গ্রামগুলোতে হানা দিত। একবার জোয়ানদের দমরেমি গ্রামেও হামলা চালায় ওরা। গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ফ্রান্স তখন ইংরেজদের শাসনাধীন। ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ হেনরি সিংহাসন দখল করলে ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লস পালিয়ে যান। এরকমই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কেটেছে জোয়ানের। খুব ধার্মিকভাবে তার বেড়ে ওঠা, খামারের গবাদিপশুর দেখাশোনা আর সুই-সুতার খেলাতেই কেটেছে জোয়ানের শৈশব। তবে ১৩ বছর বয়সে শোনা দৈববাণী ও তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা জোয়ানের মনে ভালো ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তীতে সাহস এবং আত্মবিশ্বাসীর এক অদম্য প্রতীক হয়ে ওঠেন জোয়ান।

জোয়ানের শেষের শুরু

সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ ফ্রেঞ্চরা চেষ্টা করল ইংরেজদের অধিকার থেকে প্যারিস ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু সে দিনের যুদ্ধে জোয়ানের পা আহত হয় ক্রসবোর আঘাতে এবং এবারও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে নিতে লাগলেন। কিন্তু শত্রুর বিরুদ্ধে সব বীর বার বার জিতে না। ১৪৩০ সালের ২৩ মে বারগুন্ডিয়ানদের হাতে আটক হলেন জোয়ান। প্রাথমিকভাবে জোয়ান আত্মসমর্পণ করেননি। কিন্তু তাকে গ্রেফতার করা হলো। আটক অবস্থায় জোয়ান কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেন। এজন্য তাকে রাখা হলো টাওয়ারে। সেই ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে নিচের মাটিতে লাফিয়ে পড়েন জোয়ান। সেই দুর্গের চারদিকে পানিপূর্ণ পরিখা ছিল। তিনি সেখানে পড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। গুরুতর আহত না হলেও চলতে পারার মতো সুস্থ তিনি ছিলেন না যখন জ্ঞান ফিরল। ব্রিটিশ সরকার তাকে বারগুন্ডিয়ান ডিউক ফিলিপের কাছ থেকে ১০ হাজার পাউন্ডে কিনে নিল, যা এখনকার হিসাবে কয়েক মিলিয়ন ডলার। ইংরেজদের প্রধান শত্রুই ছিল জোয়ান অব আর্ক। বার বার ইংরেজদের পরাজয়ের কারণ হয়ে উঠছিলেন জোয়ান।

শুধু এই মেয়ের কারণেই ইংরেজ সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গেছে! কীভাবে তাদের আবার চাঙ্গা করা যায়? এবার ইংরেজরাও জোয়ানকে ডাইনি, জাদুকর হিসেবে প্রমাণ করার ফন্দি আঁটল।

কেবল কালো জাদুর সহায়তায়ই এই মেয়ে ইংরেজদের পরাজিত করেছে। এই বিশ্বাসটা খুব দ্রুত সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। সেখান থেকেই মূলত জোয়ানের বিজয়গাথা চূড়ান্ত সমাপ্তির দিকে এগোতে থাকে।

ষড়যন্ত্র যখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে

একদিকে জোয়ান একের পর এক সাফল্য পাচ্ছে, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে শুরু করল। তখনকার লোকজন কুসংস্কারে বিশ্বাস করত। জোয়ানের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে দেখে অনেকেই প্রচার করতে শুরু করল, জোয়ান আসলে একজন ডাইনি। অনেকে এটা বিশ্বাসও করতে লাগল। নিশ্চয়ই সে কালো জাদু করেছে। ফলে অল্পতেই আলোচনার ঝড় উঠল। তাকে চার্চের প্রতিনিধিদের সামনে পরীক্ষা দিতে হলো। প্রমাণ করতে হলো, জোয়ান কোনো ডাইনি নয়। পরীক্ষা পাসের পর জোয়ান হয়ে গেলেন সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন, নিলেন প্রশিক্ষণ। তারপরও ডাইনির অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে পারেননি জোয়ান, বরং সেটা ছিল শুরু মাত্র।

বলে রাখা ভালো, জোয়ান অব আর্কের সব যুদ্ধের পেছনেই ধর্মীয় চেতনা ছিল।

রাজসভার ধর্ম ব্যবসায়ী যাজকরা রাজাকে বোঝান যে, জোয়ানের এই ধর্মযুদ্ধ রাজাকে ফরাসিদের কাছে ‘ডেভিল’-এ পরিণত করবে। তত্ক্ষণাৎ রাজা জোয়ানকে ডেকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বলেন। কিন্তু একরোখা এবং জেদী জোয়ান রাজার আদেশ অমান্য করেই যুদ্ধ চালিয়ে যান।

ইংরেজরা যখন জানতে পারে, রাজার কথা অমান্য করে জোয়ান যুদ্ধ করছে তখন রাজসভার অন্য সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা জোয়ানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। মূলত এ ষড়যন্ত্রের কারণেই পরবর্তীতে বারগুন্ডিয়ানদের হাতে আটক হন জোয়ান। জোয়ান তখনো টের পাননি তিনি আসলে নানা মহলের নানা মানুষের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের শিকার। যে ষড়যন্ত্র পরবর্তীতে নির্দোষ জোয়ানের মৃত্যু ডেকে আনে।

ডাইনি থেকে মহামানবী

joan of ark 5জোয়ানের মৃত্যুর ২৫ বছর পর পোপ ক্যালিক্সটাস-৩ তার এ হত্যাকাণ্ডের বিচার নতুনভাবে শুরু করেন। সেই বিচারে জোয়ান নিষ্পাপ ও সন্ত বা সেইন্ট প্রমাণিত হন। চার্চ মিথ্যা রায় দিয়েছিল। তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়। ৫০০ বছর পর ১৯২০ সালে, ক্যাথলিক চার্চ জোয়ানকে একজন সেইন্ট হিসেবে ঘোষণা করে। তার মৃত্যুদিবস (৩০ মে) ক্যাথলিকরা এখন উদযাপন করে। ফ্রান্স এবং সেনাবাহিনীর প্যাট্রন সেইন্ট এখন জোয়ান। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের কারণে ফরাসিরা ফ্রান্স থেকে চিরতরে ইংরেজদের সব অধিকার ও চিহ্ন মুছে দেওয়ার প্রয়াস পায়। জোয়ানের স্মরণে ফ্রান্সে অনেক স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। তাকে ‘দ্য মেইড অব অরলিয়ন্স’ নামেও ডাকা হয়। ফ্রান্স ও খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাসে তিনি এক কিংবদন্তি চরিত্র। তার জীবনী নিয়ে অনেক গান লেখা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে নাটক ও সিনেমা।

জোয়ান অব আর্কের নামে অনেক জিনিসই পরবর্তীতে প্রচলিত হয়। যেমন—২০১৬ সালের মার্চে পুরনো একটা রিং নিয়ে দাবি করা হয়, এটা জোয়ান অব আর্কের ছিল এবং সেই রিং কেবল জোয়ানের নামের জন্য তিন লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়ে যায়! বলা হয়, আগুন ধরানোর আগে জোয়ান এ রিংটা খুলে দিয়েছিলেন কার্ডিনালকে। এ ছাড়াও ১৮৬৭ সালে এক জার ছাই আবিষ্কৃত হয় প্যারিসে, যেখানে লেখা ছিল সেটা নাকি জোয়ান অব আর্কের অবশেষ! এক সময়ের ডাইনি অপবাদের দায়ে পুড়ে মরা জোয়ান অব আর্ক আজ ফ্রান্সের জাতীয় বীর।

প্রহসনের বিচার

ইংরেজদের পরিকল্পনা আর চার্লসের সভাসদদের পূর্ববর্তী ষড়যন্ত্র ও নিষ্ক্রিয়তা জোয়ান অব আর্ককে ভয়ঙ্করভাবে ফাঁসিয়ে দিল। ডাইনিবিদ্যা চর্চা আর ধর্মহীনতার দায়ে অভিযুক্ত হলেন জোয়ান। এক ইংরেজ ধর্মজীবী পাদ্রির অধীনে ১৪৩১ সালের ৯ জানুয়ারি তার বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হয়। প্রহসনের এ বিচারে তাকে কোনো আইনজীবী দেওয়া হয়নি। বিচারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘তার ওপর ঈশ্বরের বিশেষ দয়া আছে’ তিনি এমন বিশ্বাস পোষণ করেন কিনা। জবাবে জোয়ান বলেছিলেন— ‘যদি আমি দৈবানুগ্রহ না পেয়ে থাকি, তবে ঈশ্বর আমায় অনুগ্রহ করুন; আর যদি পেয়ে থাকি, তবে ঈশ্বর আমায় সেখানেই ঠাঁই দিন!’ আসলে এ প্রশ্নটিই ছিল সাংঘাতিক চালাকিপূর্ণ। যদি জোয়ান বলতেন, ‘হ্যাঁ করি’, তবে তাকে ধর্মের বিরুদ্ধে যাওয়ার অভিযোগ আনতেন আর যদি জোয়ান বলতেন ‘না’ তবে বলা হতো তিনি নিজের অভিযোগ নিজেই স্বীকার করেছেন। চার্চের প্রতিনিধিরা তাকে স্বীকার করে নিতে বলল, সে কোনো স্বপ্ন দেখেনি, কেউ স্বপ্নে তাকে কিছু বলেনি। তারা তাকে সৈন্যের পোশাক খুলে ফেলতে বলল। কিন্তু জোয়ান কিছুই করলেন না। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার, ফ্রান্সের রাজা চার্লস আদৌ উদ্ধার করতে গেলেন না জোয়ানকে। ছলচাতুরীর বিচারে আদালত তাকে ১২ নম্বর আর্টিকেল অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করে। বিচারে তার কার্যকলাপকে প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী আখ্যা দিয়ে তাকে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত করা হয়। কোনো আইনজীবী না থাকাতে জোয়ানকে রায় বিস্তারিত পড়ে শোনানো হয়নি। জোয়ান তখন বুঝতেও পারেননি, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

তিন তিনবার পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড

অন্য সব ডাইনির মতো জোয়ানের ভাগ্যেও অপেক্ষা করছিল আগুনে পুড়ে মৃত্যু। সিন নদীর তীরে ব্যস্ত লোকালয় রোয়াঁর বাজারে উইঞ্চেস্টারের কার্ডিনালের আদেশে জোয়ানকে পোড়ানো হলো। শুধু একবার পুড়িয়েই খ্যান্ত হয়নি। তাকে আবারও পোড়ানো হলো। তাতেও যখন তার দেহ ছাই হয়নি, তখন আদেশ হলো তৃতীয়বার পোড়ানোর। অবশেষে ছাই হয়ে গেল তার পুরো দেহ। সেই ছাই ছড়িয়ে দেওয়া হলো ফ্রান্সের সিন নদীতে। তার বয়স ছিল মাত্র ২৯। তারিখ ছিল ১৪৩১ সালের ৩০ মে।

নির্মম মৃত্যুর সে ক্ষণ

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথমেই জোয়ানকে একটি পিলারের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। জোয়ান গির্জার যাজকদের কাছে একটি ক্রুশ চান। জনৈক চাষি একটি ছোট্ট ক্রুশ তৈরি করে জোয়ানের পোশাকের সামনে ঝুলিয়ে দেন। এরপরই জোয়ানকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই টগবগে তরুণী জোয়ানের শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জোয়ানের মৃত্যুর পর ইংরেজরা তার কয়লা হয়ে যাওয়া শরীরকে প্রদর্শন করে, যাতে কেউ কোনো দিন দাবি না করতে পারে জোয়ান বেঁচে পালিয়ে গেছে। এরপর তার শরীর আরও দুবার পোড়ানো হয়। যাতে তার ছাইগুলো এত মিহি হয়ে যায় যে, কেউ তা সংগ্রহ করতে না পারে।

সত্যিকার যোদ্ধা হয়ে ওঠা

অরল্যান্ডকে মুক্ত করার পর একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করলেন জোয়ান। মে মাসের সাত তারিখে, লে তুরেলে দুর্গ অবরোধ করল ফ্রেঞ্চ বাহিনী। সে যুদ্ধে একটা তীর এসে জোয়ানের কাঁধে বিঁধে গেল, তিনি পড়ে গেলেন। কিন্তু এরপরই তিনি ফিরে এলেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে ফ্রেঞ্চরা নব উদ্যমে আক্রমণ চালাল। সে দিন ইংল্যান্ড হেরে যায় যুদ্ধে। দুর্গ জয় করে নেয় ফ্রান্স। ইংরেজ সৈন্যদের কবল থেকে তুরেল বুরুজ শহর উদ্ধার করেন। এর পর পাতের যুদ্ধেও ইংরেজরা পরাজিত হয়। এরপর জোয়ানের পরিকল্পনা অনুযায়ী রেইমস নগরী বিজয়ের পালা। ঠিকই জোয়ানের নেতৃত্বে তারা জিতে নিল রেইমস। কেন এই নগরী? কারণ এই নগরীতেই ফ্রেঞ্চ রাজার অভিষেক অনুষ্ঠান হয়। ১৬ জুলাই নগরী হাতে আসার পর দিনই, ১৭ জুলাই ‘ভবিষ্যৎ-রাজা’ চার্লসের মাথায় মুকুট পরানো হয়। সে দিন থেকে তিনি ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লস। জোয়ানকে তার অসামান্য সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য ফ্রান্সের রাজসভায় একটি বিশেষ সম্মানিত পদ দেওয়া হয়। যদিও জোয়ান শিক্ষিত ছিলেন না, তারপরও তার মেধা এবং অসম্ভব বীরত্ব তাকে আলাদা করে তোলে।

সৌদি রাজপরিবারতন্ত্র

মিলু শামস : ৩২ বছর বয়সী সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে ১৭ জন যুবরাজ, চার জন বর্তমান এবং বেশ ক’জন সাবেক মন্ত্রী গ্রেফতার হওয়ার পর রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব আবার আলোচনায়। বছর দুয়েক আগে হজের আনুষ্ঠানিকতা শয়তানের উদ্দেশে পাথর ছোড়ার সময় বিশৃঙ্খলায় ১,২৩৫ জন হাজী মারা গেলে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সমালোচিত হয়েছিল সৌদি আরব। লেবাননভিত্তিক একটি আরবী দৈনিক এবং ইরানের তেহরান রেডিও ও অন্য একটি সংবাদ সংস্থা ওই ঘটনার পেছনে তখন দায়ী হিসেবে এই যুবরাজকে চিহ্নিত করেছিল। সে সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রয়াত বাদশা আবদুল আজিজের এক পৌত্রির লেখা চিঠিও মিডিয়ায় এসেছিল।

আলোড়ন তোলা দুই চিঠিতে হজের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে মিনায় শয়তানের উদ্দেশে পাথর ছোড়ার সময়ের ‘দুর্ঘটনা’র বর্ণনা ছিল। পাশাপাশি ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িত হওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে স্বজনপ্রীতির প্রসঙ্গও ছিল।

সে বছরের শুরুতে বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ মারা গেলে তার জায়গায় ভাই সালমান আল সৌদের অভিষেক হয়। তিনি ভাইয়ের ছেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন নায়েফকে তার উত্তরাধিকারী এবং নিজের ছেলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানকে তার ডেপুটি হিসেবে মনোনীত করেন। এ মনোনয়নের পেছনে নিকট-রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে কাজ করেছে এ দু’জনার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন নায়েফ যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ’র অন্যতম সহযোগী। এফবিআই এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অধীনে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী প্রশিক্ষণ রয়েছে তার।

শয়তানের উদ্দেশে পাথর ছুড়তে হাজীরা যখন মিনায় যাচ্ছিলেন তখন যুবরাজ সালমানও সেখানে গিয়েছিলেন বাবা বাদশা সালমান আল সৌদের সঙ্গে দেখা করতে। তার সঙ্গে ছিল প্রায় ৩৫০ জন দেহরক্ষী এবং পুলিশের বিশাল এক বহর। যুবরাজের চলার পথ মুক্ত রাখতে হাজীদের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি পথের দুটোই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

এতে হাজীরা ভয়াবহ বিশৃঙ্খলায় পড়েন। হঠাৎই সামনের পথ রুদ্ধ দেখে তারা থমকে দাঁড়ান এবং অনেকে পেছনে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু এগিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষের ভিড়ের চাপে পিষ্ট ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন ১,২৩৫ জন হাজী। আহতের সংখ্যাও মৃতের প্রায় কাছাকাছি। মৃতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন পরিসংখ্যানও রয়েছে।

শয়তানের উদ্দেশে পাথর ছোড়ার আনুষ্ঠানিকতা নিরাপদ ও সুসংগঠিত করার জন্য ২০০৬ সালে সৌদি সরকার মিনায় ১২তলা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে। যার কিছু অংশের কাজ এখনও চলছে। সেতুর বিভিন্ন তলায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টায় প্রায় ৩ লাখ হাজী পাথর ছুড়তে পারেন। এই সেতুতে যাওয়ার ৫টি পথের দুটি বন্ধ রাখা হয়েছিল যুবরাজের আগমন উপলক্ষে।

এসব তথ্য ধামাচাপা দেয়ার অনেক চেষ্টা করলেও ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। দায়িত্বহীনতা এবং অব্যবস্থাপনার জন্য অভিযোগের তীর যখন হজ কর্তৃপক্ষের দিকে তখন সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ আল শেখ তাদের পিঠ বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। সবকিছু হয়েছে ‘আল্লাহর ইচ্ছায়।’ এই আপ্ত বাক্যে তিনি সব অভিযোগ নাকচ করার চেষ্টা করেন। হজের শেষ দিন তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সৌদি সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী মোহাম্মদ বিন নায়েফকেও সে কথাই বলেছেন যে, এদের নিয়তিতে যা লেখা ছিল তাই ঘটেছে। এজন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়ী হতে পারেন না। অর্থাৎ অব্যবস্থাপনার দায় তারা স্বীকার করেননি। সৌদি শাসনে গ্র্যান্ড মুফতির কাজ হচ্ছে মূলত সৌদি রাজতন্ত্রের স্বার্থরক্ষা করা। এ উদ্দেশ্যেই ১৯৫৩ সালে সৌদি বাদশা আবদুল আজিজ সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার এ পদ সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু মুফতি বা অন্যান্য নেতা আত্মপক্ষ সমর্থনে যাই বলুন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবরাজের চিঠি সৌদি সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার চিত্রই তুলে ধরেছিল। ব্রিটিশ দৈনিক ‘ইন্ডিপেন্ডেট’কে এই যুবরাজ বলেছিলেন, সৌদি আরবের বারো যুবরাজের ৮ জনই বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজকে চান না। ৮৯ বছর বয়সী সালমানকে সরিয়ে এক সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ আহমেদ বিন আবদুল আজিজকে সিংহাসনে বসাতে চান। তার মতে, শতকরা ৭৫ ভাগ উলামা এবং ধর্মীয় নেতাও আহমেদকে পছন্দ করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’ ওই অব্যবস্থাপনারই আরেক চিত্র। অন্য খবরও আসছে। সপ্তাহ কয়েক আগে যুবরাজ সালমান আন্তর্জাতিক পরিম-লের কয়েকজন ব্যবসায়ীকে নিয়ে রিয়াদে বিনিয়োগ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে তিনি সৌদি আরবের আধুনিকায়নের কথা বলেন। তেলের বাইরে সৌদি অর্থনীতির জন্য ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খোঁজার কথা বলেন।

সালমান বিন আবদুল আজিজ বাদশাহর দায়িত্ব নেয়ায় রাজপরিবারে বিদ্রোহের গুঞ্জন চলছে। পত্র লেখক ওই যুবরাজ ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেছিলেন, শাসক হিসেবে সালমানের কিছু সিদ্ধান্তে তার ‘কাছের লোকেরা’ও অসন্তুষ্ট। নিজের ছেলে ৩০ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন সালমানকে ‘ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স’ বানানো, ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানো এবং হজ অব্যবস্থাপনায় সালমানের জনপ্রিয়তা আরও কমেছে। এসব কথা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনায় রাজপরিবারে বিদ্রোহের সুর শুধু নয়, গোটা সৌদি রাজতন্ত্রই কেঁপে উঠতে পারে বলে সে সময় অনেকে বলেছিলেন।

১৭৪৪ সালে মোহাম্মদ বিন সৌদ সৌদি রাজপরিবারের গোড়াপত্তন করেন। তার নামে দেশের নাম হয় সৌদি আরব। বর্তমান সময়ে এসে সারাদেশে এ পরিবারের ১৫ হাজার সদস্য থাকলেও রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে ২,০০০ সদস্যের মধ্যে। এই দীর্ঘ কালপরিক্রমায় সৌদি রাজবংশের শাসন স্থায়ী করতে রাজতান্ত্রিক এ ব্যবস্থাকে ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। পদাধিকার বলে সৌদি বাদশাহ মক্কা এবং মদিনায় মুসলমানদের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ-উল হারাম এবং মসজিদ-ই নববীর রক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এতে ‘মুসলিম বিশ্বে’র শাসন ব্যবস্থাকে ইসলামসম্মত এবং রাজপরিবারকে ইসলামের রক্ষক হিসেবে পবিত্র একটি ভাবমূর্তি তৈরি হয়। ওই ভাবমূর্তি সৌদি আরবকে মুসলিম বিশ্বের নেতা বানিয়েছে এবং সৌদি রাজতন্ত্রকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরিসীম অবদান রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবসার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরব। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন ইত্যাদি দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক যেসব চক্রান্ত বাস্তবায়ন করেছে তার প্রত্যক্ষ সহযোগী সৌদি আরব। তেলসমৃদ্ধ দেশ কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও আরব আমিরাতকে সঙ্গে নিয়ে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুতি জনগোষ্ঠীর ওপর আগ্রাসন চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে এফ-পনেরো জঙ্গী বিমান, এ্যাপাচে হেলিকপ্টার গানশিপ, সাঁজোয়া যান এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ক্লাস্টার বোমা যোগান দিয়েছে।

অনেক আগ্রাসন প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর সে চালায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবসা চাঙ্গা রাখতে। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, নারী অধিকার, মানবাধিকার, পরমত সহিষ্ণুতা সৌদি আরবে নেই। সংবাদপত্র ও সরকারী বিধিনিষেধের পরিধির মধ্যে থেকে সংবাদ পরিবেশন করে। খবর প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, এরপরও আশ্চর্যজনকভাবে দেশটি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্যানেলের প্রধান নিয়োজিত হয় এবং এ সিদ্ধান্তকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র তার দেশের পক্ষে স্বাগত জানালে বিশ্ববাসী বুঝে নেয় মাসতুতো ভাইয়ের বড় ভাই যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস-আগ্রাসন চালানোর বেলায় ভাল মানুষী একটি মুখোশ পরে নিলেও সৌদি আরব ওসব বালাইয়ের ধার ধারে না। তাতে দু’দেশের মধ্যে গলায় গলায় ভাব রাখায় কোন অসুবিধাও হয় না।

লিবিয়ায় নিলামে দাস হিসেবে বিক্রি হচ্ছে!

libya slave trade market

লিবিয়ায় আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসীদের দাস হিসেবে নিলামের ভিডিও ফুটেজ দেখে বিশ্বনেতারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে হয়ত দেরি করেননি, কিন্তু মানবাধিকার কর্মীরা কয়েক মাস আগেই এ বিপদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যদিও তাতে কেউই কর্ণপাত করেননি।

সাহায্য কর্মী, মানবাধিকার গ্রপ ও বিশ্লেষকগণ বলছেন, তারা যুদ্ধ কবলিত লিবিয়ায় অভিবাসীদের ধর্ষণ, নির্যাতন ও জোরপূর্বক কাজ করানোর ব্যাপারে চিৎকার করে আসছেন।

সিএনএন গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে ত্রিপোলির কাছে তরুণ আফ্রিকান অভিবাসীদের দাস হিসেবে নিলামে বিক্রি করার ছবি তুলেছে। ১৪ নভেম্বর সে ফুটেজ সম্প্রচার করার পর পশ্চিমা ও আফ্রিকান নেতাদের মধ্যে নিন্দার জোয়ার শুরু হয়।

এ ছবি দেখে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুয়েটেরেস মন্তব্য করেছেন ভয়াবহ। আফ্রিকান ইউনিয়ন প্রধান বলেছেন- অপমানজনক। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এ নিলামকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ফ্রান্স এ ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এনজিও ও বিশেষজ্ঞরা বিশ^নেতাদের ভন্ড বলে অভিযুক্ত করেছে।

থিংক ট্যাংক লা আফ্রিক দ্য আইদিস-এর সেনেগালি বিশ্লেষক হামিদু অ্যান বলেন, সাধারণ মানুষের সাথে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যেকেই ব্যাপারটি জানেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পশ্চিম আফ্রিকা পরিচালক আলিউন টাইন বলেন, লিবিয়াতে জিম্মিকরণ, সহিংসতা, নির্যাতন ও ধর্ষণ সংঘটিত হচ্ছে। তাছাড়া আমরা অভিবাসীদের দাসত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছি।

২০১১ সালে মোয়াম্মর গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার পর লিবিয়া গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিপতিত হওয়ার পাশাপাশি ইউরোপগামী সাব সাহারান আফ্রিকানদের এক বিশাল ট্রানজিট কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

ইইউ উদ্বাস্তু স্রোত ঠেকাতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ২০১৫ সাল থেকে ১৫ লাখেরও বেশি উদ্বাস্তু লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। তবে নেতৃবৃন্দ ভূমধ্যসাগরের অপর পারে আশ্রয় প্রার্থীদের জন্য সমাধান খুঁজে বের করতে হিমসিম খাচ্ছেন।

এ মাসে লিবিয়ার কোস্টগার্ডদের প্রশিক্ষণ দেয়া নিয়ে ইইউ জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান বলেন, এর ফলে অভিবাসীদের ভয়ংকর কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।

ইইউর সমর্থনে ইতালি এক বিতর্কিত চুক্তির অংশ হিসেবে অভিবাসী বহনকারী বোটগুলোকে বাধা দেয়ার জন্য লিবিয়ার কোস্টগার্ডকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এর ফলে জুলাই থেকে ইউরাপে অভিবাসী আগমন ৭০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু জাতিসংঘ অভিযোগ করেছে যে এ নীতির ফলে অভিবাসীদের লিবিয়াতে ফিরিয়ে নেয়ার পর তারা নির্যাতন, ধর্ষণ, বলপূর্বক শ্রমদান ও চাঁদাবাজির ঝুঁকির শিকার হচ্ছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন বলেন, লিবিয়াতে অভিবাসীরা যে অকল্পনীয় ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সে ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না।

ব্রাসেলস থেকে ইইউ জাতিসংঘকে পাল্টা জানিয়েছে যে তাদের কোস্টগার্ড প্রশিক্ষণ অভিবাসীদের জীবন রক্ষায় সাহায্য করছে। এ বছর ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ৩ হাজারেরও বেশি অভিবাসী সাগরে ডুবে মারা গেছে। ইইউ লিবিয়া থেকে ১০ হাজার অভিবাসীকে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যেতে সাহায্য করেছে বলে দাবি করা হয়।

লিবিয়ায় শ্রমদাসসহ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার পর গাম্বিয়ায় কারামো কেইটা দেশে ফিরে ইউরোপ গমনের ব্যাপারে তরুণদের সতর্ক করার জন্য একটি গ্রæপ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেপ্টেম্বরে এএফপিকে তিনি বলেন, লিবিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গদের কোনো অধিকার নেই। তিনি বলেন, আমাদের বিভিন্ন কৃষি খামারে নিয়ে যাওয়া হত যেখানে লিবীয়রা আমাদের দাস হিসেবে বিক্রি করত। আমরা বিনা পয়সায় খামারে কাজ করেছি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসী বিষয়ক সংস্থা এপ্রিল রিপোর্টে এমন বাজারের কথা বলে যেখানে অভিবাসীদের বিক্রির পণ্য করা হয়। কয়েকমাস পর চিকিৎসা সেবা সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স -এর প্রধান জোয়ানে লিউ ইউরোপীয় সরকারগুলোর কাছে লেখা খোলা চিঠিতে বিকাশমান অপহরণ, নির্যাতন ও চাঁদাবাজি ব্যবসা সম্পর্কে সতর্ক করেন।

তিনি প্রশ্ন করেন, অভিবাসী স্রোত রোধে তাদের প্রচেষ্টায় ব্যস্ত ইউরোপীয় সরকারগুলো কি ধর্ষণ, নির্যাতন ও দাসত্বের মূল্য দিতে রাজি? আমরা এ কথা বলতে পারি না যে আমরা এ ব্যাপারে জানতাম না।

অ্যামনেস্টির টাইন বলেন, যে কোনো মূল্যে অভিবাসীদের আগমন রোধের প্রচেষ্টা নেয়া ইউরোপ লিবিয়ার ভয়াবহ পরিস্থিতির মৌলিক দায় বহন করে। এমনকি অন্যরাও। তিনি বলেন, আফ্রিকার দেশগুলো তাদের তরুণদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশে রাখার জন্য কিছু করছে না।

বিশ্লেষক হামিদু অ্যান আরো বলেন, আফ্রিকার মাগরেব দেশগুলোতে ধারাবাহিক বর্ণবাদের পাশাপাশি উন্মোচিত বিপর্যয়ের জন্য আফ্রিকান নেতারা আংশিক দায়ী। এটা চলতে পারে না। তিনি বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সম্মুখীন হয়ে আপনারা তার নিন্দা করছেন না।

এ কেলেংকারি জানাজানি হওয়ার পর ক্ষুদ্র দেশ রুয়ান্ডা লিবিয়া থেকে ৩০ হাজার আফ্রিকানকে গ্রহণ করেছে।

অভিবাসী কমিশনার দিমিত্রিস আভরামোপুলাস বৃহস্পতিবার এএফপিকে বলেন যে ইইউ গুরুত্ব দিয়ে এ সমস্যার সমাধান বের করার জন্য কাজ করছে।

টাইন বলেন, ২৯-৩০ নভেম্বর আবিদজানে অনুষ্ঠেয় ইইউ-এইউ শীর্ষবৈঠকে দাসত্বের বিষয়টি আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকা প্রয়োজন। নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদু ইসুফু ইতোমধ্যেই এ ধারণা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমাদের নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে যে কিভাবে মানব পাচার সংগঠিত করা হয় এবং এর পিছনে কে। তিনি বলেন, প্রত্যেককে অবশ্যই তার দায়িত্ব নিতে হবে।

চীনবিরোধী ‘ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

korea protest against trump 1গৌতম দাস : চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মেগা সফরে এশিয়াতে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ ছিল- ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলন মিলিয়ে সম্ভবত আরো দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও আছেন। এর বাইরে, ট্রাম্পের এই সফরে যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির মুখ্য ফোকাস।

সফরগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। এর একটা অংশে ছিল ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পন্থায়, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান ব্যবসাবাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। এর সাথে ছিল উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক- এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামা প্রশাসন বলেছিলেন, তার ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখানে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের কর্মসূচি। সেটা ওবামার হাতে গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হলো, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি। এটাকে আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হতো। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া প্রতিক্রিয়া হলো, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল- সেটাই মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

চীন ঠেকানো- এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হলো, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও এটা আর থাকছে না; এই ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি স্টাডি ও গবেষণায় নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই আমেরিকার চীন ঠেকানোর চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া (আর ঠেকানো সম্ভব নয় বলে) অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। যেমন, এই পদক্ষেপ হিসেবে এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হিসেবে ভারতের পিঠে হাত রাখা, কাছে টেনে ফেভার করে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো- এই নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে সে আমেরিকা ‘একটি ক্ষেত্রে অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

manila protest against trump

যে কোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অনেকে ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক বৈঠক হয়েছে। মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে। ব্যাপারটা অনেকটা সে রকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেটা হলো, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী প্রকাশ্য নিরাপত্তা জোটের আদলে আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক হয়ে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর নাম দেননি। মিডিয়ায় এটাকে কোয়াড ব্লক (ইংরেজি কোয়াড মানে চার- চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও এখান থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। একটি কোয়াড করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চারের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন এটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা কোয়াড, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায়- (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানের ভিন্নতা নিরসনের আগেই তারা একসাথে বসে গিয়েছিলেন। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন।

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান কী তা বোঝার দিক থেকে, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, দুনিয়া একই কিন্তু দুটি বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক তখন দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ওই শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া এবার একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে এলো। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের- পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করেছি। আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কের কোনো অবশেষও নেই এমন কালের জাতীয়তাবাদ ধারণা আমরা সবাই ওতপ্রোতভাবে পরস্পর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। সে পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই বর্তমান যুগে। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই জটিল। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। আবার চীনের বিরুদ্ধে বাকি সবার স্বার্থ-ঝগড়া একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন- ভারত ও অস্ট্রেলিয়া ব্যাংক বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আর চীনের সাথে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরুদ্ধে রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশনে’ সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হলো ভারত। আর চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাক্সক্ষা তো ভারতেরও আছে। আর সেই আকাক্সক্ষা পূরণের দিক থেকে দেখলে, ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থ বোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে অচল। একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

protest in tokyo 2017

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী- এসবের জবাব উত্তর এখন জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক ও রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতির নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব? আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড- এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র- চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী- এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? চীন-ভারত মোটা দাগে এক দিকে আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়।

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলে কিছু নেই। ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর। তিনি বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’। হতে পারে হয়তো; তবে সেটা রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা একমত নন কেন? সব ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে- এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ কি নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? ‘গণতন্ত্রবোধ ভারতের রাষ্ট্রসীমার’ ভেতরেই কেবল কাজ করে? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই? আর উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!