আর্কাইভ

Archive for the ‘রাজনীতি’ Category

সৌদি আরব নিয়ে কথা

Saudi_Arabia_mapআহমদুল ইসলাম চৌধুরী : ২৩ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জাতীয় দিবস। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে বাদশাহ আবদুল আজিজ তার অধিকৃত সমস্ত অঞ্চল নিয়ে তারই বংশের নামকরণে সৌদের আরব তথা সৌদি আরব নামকরণ করেন। সাথে সাথে নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা দিয়ে রাজতন্ত্রের সূচনা করেন। বর্তমান সৌদি আরবসহ জজিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপের বিশাল অঞ্চল শত শত বছর ইস্তাম্বুলস্থ তুর্কি সুলতানগণের অধীনে ছিল। অপরদিকে, বর্তমান সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল নজদ দীর্ঘ দিন সৌদ বংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তুর্কিরা তাদের হটিয়ে দিলে তারা কাতার, বাহরাইন হয়ে কুয়েতে আশ্রয় নেয়। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে বাদশাহ আবদুল আজিজ কিছু সহযোদ্ধা নিয়ে কুয়েত থেকে এসে রিয়াদ দখল করে। তুর্কি বাহিনীর সাথে প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে প্রায় ১০ বছর সময় যায়।

অতঃপর বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশাল সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে। ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্রিটিশের কাছ থেকে যুদ্ধাস্ত্র পেয়ে জজিরাতুল আরবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে। ফলশ্রুতিতে যুবক সাহসী পুত্র বাদশাহ ফয়সালের সহযোগিতা নিয়ে ছোট বড় অঞ্চল দখল করতে থাকে। অতপর অধিকৃত অঞ্চল সমূহকে সুসংগঠিত করে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে এসে সৌদি আরব নামকরণ ও রাজতন্ত্র প্রবর্তন করেন। সে হতে কঠোর হস্তে আইনের শাসন চালু করে। সাথে সাথে তুর্কিদের স্থলে ইবনে তায়মিয়া পরবর্তী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাব নজদীর ধর্মীয় মতাদর্শ শক্তভাবে প্রবর্তন করা হয়। তুর্কি আমলে জজিরাতুল আরবে আইনের শাসন খুবই দুর্বল ছিল, ছিল নিরাপত্তার অভাব। কিন্তু সৌদি রাজতন্ত্রীয় শাসন চালু হওয়ার পর তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের দ্বারা বিশাল সাম্রাজ্যে আইনের শাসন চালু হয়ে যায়। তবে এ সাম্রাজ্য আর্থিক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। এ প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট সময় নেয়।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে এসে তেল প্রাপ্তির সূচনা হলেও তার প্রকৃত মূল্য সৌদি আরব পেত না। পশ্চিমা বিশ্ব তথা ব্রিটিশরা নিয়ে যেত। তার পরেও তেলের মূল্য হজ্বযাত্রী থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রাসহ নানাভাবে সৌদি আরব পর্যায়ক্রমে এগিয়ে যেতে থাকে।

kings-of-saudi-arabiaএরই মধ্যে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে এসে বাদশাহ আবদুল আজিজ ইন্তেকাল করলে তার প্রথম পুত্র সউদ বাদশাহ হন। সউদের যোগ্যতার অভাবে বিশাল সাম্রাজ্যের বৃহত্তর স্বার্থে বাদশাহ আবদুল আজিজের তৎপরবর্তী পুত্র বাদশাহ ফয়সাল ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে এসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বাদশাহ ফয়সালের আমলে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে যুগের চাহিদায় রেডিও টেলিভিশন চালু নিয়ে দেশের ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে চরম মতবিরোধ শুরু হয়। অপরদিকে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মিশর–ইসরাইল যুদ্ধে বাদশাহ ফয়সাল মিশরের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকায় থাকা পরবর্তীতে তেল অবরোধ বাদশাহ ফয়সালের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমা বিশ্বের চক্রান্তে সৎ ভাইয়ের পুত্রের হাতে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিহত হন।

বস্তুতঃ বাদশাহ ফয়সাল অসাধারণ সাহসী ব্যক্তিত্ব ছিলেন, ছিলেন বিশাল সৌদি আরব প্রতিষ্ঠায় পিতার সহযোগী। আরও ছিলেন মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক। পশ্চিমা বিশ্ব তা বুঝতে পেরে ঘরের সন্তানকে শত্রু বানিয়ে এ মহান নেতাকে হত্যা করায় বলে প্রচার রয়েছে।

অতঃপর ক্ষমতায় এলেন তারই সৎ ভাই বাদশাহ খালেদ। তার ৭ বছরের বাদশাহী জীবনে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা সমূহের সূচনা বলা যাবে। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে হজ্বের দু’সপ্তাহ পর ধর্মীয় উগ্রবাদীর দ্বারা পবিত্র কাবাকে কেন্দ্র করে মসজিদুল হারম অবরোধ তাদের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা একটি কঠিন পরীক্ষা ছিল। যা ঘটেছে বাদশাহ ফয়সালকে শহীদ করার মাত্র ৪ বছরের মাথায়।

১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে খালেদ ইন্তেকাল করলে যুবরাজ ফাহাদ বাদশাহ হন। সুদাইরী পরিবারের মেয়ের সন্তান। এ পরিবারের খাসা মতান্তরে বাদশাহ আবদুল আজিজের নবম স্ত্রী। এ ঘরে ১৩ জন সন্তান সন্ততি জন্মগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে ৭ পুত্র রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে গিয়েছিল। এদেরকে সুদাইরী সেভেন বলা হয়। সুদাইরী সেভেনের বড় ভাই হচ্ছেন ফাহাদ। ফাহাদের দীর্ঘ বাদশাহী আমলে সৌদি আরবে উন্নয়নের জোয়ার বয়ে চলে, বিশেষ করে পবিত্র মদিনাকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়া তার অমর কীর্তি। যেখানে মাত্র ৪০/৫০ হাজার যেয়ারতকারী নামাজ পড়ার ধারণ ক্ষমতা না থাকায় রাস্তাঘাট পরিপূর্ণ হয়ে যেত। বর্তমান ৭/৮ লক্ষ যেয়ারতকারী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় অতি আরামে নামাজসহ এবাদত বন্দেগী করছেন। এটি বিশ্বের বুকে একটি দৃষ্টিনন্দন ইমারত। তার আরেক অবদান স্মরণযোগ্য। দুই হারমে লক্ষ লক্ষ হজ্ব ওমরা যেয়ারতকারীর জন্য জমজমের পানি খাওয়ার ব্যবস্থা।

পবিত্র মসজিদুল হারমে পশ্চিম দিকে বিশাল আকৃতির সম্প্রসারণও তার কীর্তি। তিনিই বাদশাহী লকবের স্থলে খাদেমুল হারামাইনিস শরীফাইন লকবকে বুকে ধারণ করে বিশ্বের বুকে প্রচারের মাধ্যমে আত্মতৃপ্তি লাভ করেছিলেন। অবশ্য বাদশাহ ফাহাদের আমলে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক কুয়েত দখল এর সুযোগে আমেরিকান সৈন্য সৌদি আরবের মাটিতে ঝেঁকে বসা তার একটি বেদনাদায়ক ঘটনা বলা যাবে। যোগ্য পুত্রের ইন্তেকাল রাষ্ট্রীয় নানান ঝড়ঝাঞ্ঝায় বাদশাহ ফাহাদ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনি পরিস্থিতিতে যুবরাজ আবদুল্লাহকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে হত। শেষ পর্যন্ত বাদশাহ ফাহাদ ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করলে যুবরাজ আবদুল্লাহ পূর্ণাঙ্গভাবে বাদশাহী ক্ষমতা লাভ করেন। রাষ্ট্রীয় কৌশলগত কারণে বা অন্যভাবে হোক বাদশাহ আবদুল আজিজ বিভিন্ন গোত্র প্রধানের মেয়েদেরকে বিয়ে করেছিলেন। তেমনিভাবে আবদুল্লাহর মাতা রিয়াদস্থ আল রশিদী বংশের কন্যা। এ রশিদী রিয়াদস্থ তুর্কি গভর্ণর তথা প্রতিনিধি। এদেরকে হটিয়ে বাদশাহ আবদুল আজিজ রিয়াদ দখল করেছিলেন। ইতিহাস বিশ্লেষকরা মনে করেন বাদশাহ ফয়সালের বিশাল ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবে বাদশাহ আবদুল্লাহর রাজ পরিবারে উত্থান।

বাদশাহ আবদুল্লাহর আমলেও সৌদি আরবে বিশাল উন্নয়ন হয়। বিশেষ করে পবিত্র মক্কায় মসজিদুল হারম পুনঃ নির্মাণ উত্তর দিকে বিশাল আকারের সম্প্রসারণ এবং পবিত্র মদিনায় মসজিদে নববীর আবারও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ও উদ্যোগ উল্লেখ করার মত। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করলে সুদাইরী সেভেনের কনিষ্ঠ সন্তান তথা বাদশাহ আবদুল আজিজের ২৫তম পুত্র সালমান বাদশাহ হন। তার আমলে দু’বছর যেতে না যেতে সৌদি আরবের নানা ঘটনা ও সংস্কারের জন্য উল্লেখ হয়ে থাকবে। বিশেষ করে ইয়ামেনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। এতে ইয়ামেনী বংশীয় স্ত্রীর ছেলে যুবরাজ মুকরিনকে সরিয়ে দেয়া। গত জুন মাসে নিজ ভ্রাতা নায়েফের পুত্র মুহাম্মদকে সরিয়ে দিয়ে নিজ পুত্র মুহাম্মদ বিন সালমানকে উপ-যুবরাজ থেকে যুবরাজ মনোনীত করা, রাজ পরিবারের পাশাপাশি সৌদি আরবের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাদশাহ সালমান ক্ষমতা গ্রহণ করে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন হচ্ছে মনে হয়। বিশেষ করে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্র কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

মুসলিম বিশ্বে বিশেষ করে আরব রাষ্ট্র সমূহে রাজনৈতিক অবস্থা শোচনীয়। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন, ইরানের ব্যাপকভাবে উত্থান, শিয়া আধিপত্য টেকাতে ইয়ামেনের সাথে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত সৌদি আরবে এর প্রভাব ফেলবে স্বাভাবিক। ফলশ্রুতিতে সৌদি আরবকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এ কৌশলের নেতৃত্বে ৮২ বছরের বৃদ্ধ বাদশাহ সালমানের পুত্র ৩১ বছরের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের উপর সৌদি আরবের অনেক কিছু নির্ভর করবে।

Advertisements

ট্রাম্পের বই-এ ‘৯-১১’ হামলার ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো !

trump 911 bookমুহাম্মাদ আলী রেজা : সাম্প্রতিক সাড়া জাগানো খবর : টুইন টাওয়ার হামলার প্রায় দুই বছর আগেভাগে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বইতে ‘The America We Deserve’ প্রকাশ জানুয়ারি ২০০০ Nostrodomas -এর মতো ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- ওসামা বিন লাদেন টুইন টাওয়ারে হামলা চালাবেন। US Presidential hopeful Donald Trump “warned” of the horrific September 11 attack on the World Trade Center in a book published less than two years before the world’s worst terror strikes happened, it is being claimed. By JON AUSTIN PUBLISHED: 03:42, Tue, Feb 23, 2016। ট্রাম্পকে এখন বলা হচ্ছে ‘মডার্ন ডে নসট্রডোমাস।’ Alex Jones Radio Show সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন,‘আমি ওই বইতে বলেছি, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এই ব্যক্তি ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে।’

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, আসলে টুইন টাওয়ারে হামলা ছিল অভ্যন্তরীণ বিষয় (পরিকল্পনা) মাত্র। ‘নয়-এগারো’তে ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম হামলা হলেও এর নীলনকশা শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একই প্রতিষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এভাবে তখন এটা প্রমাণ করার চেষ্টা চলে যে, বিশ্বে জাতি হিসেবে মুসলমানরাই সন্ত্রাসী। তখন রিডার্স ডাইজেস্ট এক নিবন্ধে লিখেছিল, হামলার জন্য বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্র বাছাই করার লক্ষ্য হলো, এটা দেখানো যে, এটা মূলত সমগ্র বিশ্বসম্প্রদায়ের ওপরই আক্রমণ। কারণ,এখানে সব দেশের, সব জাতির এবং সব ধর্মের লোকেরা অবস্থান করেন। সিএনএনের প্রথম রিপোর্টে স্বীকার করা হয়- যদি বোমা হামলাকারীরা বাণিজ্যকেন্দ্র সমূলে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করত, তাহলে বিস্ফোরক রাস্তার সমতলে বসাত। ফলে শত শত মানুষ নিহত বা জখম হতো।

বাল্টিমোর নিউ ট্রেন্ড পত্রিকা লিখেছেন, বোমা হামলাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়, যার ফলে সবচেয়ে কম ক্ষতি হয়েছে এবং এর আওতার মধ্যে পড়েছে সবচেয়ে কম লোক। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্রে প্রথম হামলাটি আসলেই ছিল এক আগাম কৌশল। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল, প্রচারমাধ্যমে স্পর্শকাতর অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী’ ব্রান্ডে চিহ্নিত করে তাদের ব্যাপারে আমেরিকানদের সতর্ক ও উত্তেজিত করা। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে বিরামহীন ‘মিডিয়া ক্রুসেড’, যার লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা। ‘জিহাদ ইন আমেরিকা’ নামে এক ঘণ্টার ডকুমেন্টারি ফিল্ম পাবলিক টেলিভিশনে দেখিয়ে উত্তেজিত করা হলো আমেরিকানদের।‘ওয়াগ দ্য ডগ’ও ‘সিজ’ নামে তিন ঘণ্টার মুভি প্রেক্ষাগৃহে দেখান হয় সেই উদ্দেশ্যে। এগুলো আমার নিজেরই দেখা বলে এখানে উল্লেখ করছি।

৯-১১-এর একটা গোপন স্যাটেলাইট ইমেজ রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে। এমনটাই দাবি করলেন রাশিয়ান কূটনীতিকেরা। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে জঙ্গি হামলার এমন এক ছবি তার কাছে রয়েছে যা দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব যে, কাজটা আসলে করিয়েছিল আমেরিকাই। এই ছবি প্রমাণ করবে, বিশ্বের ভয়ঙ্করতম জঙ্গি হামলার দায় আসলে মার্কিন প্রশাসন ও মার্কিন গোয়েন্দাদের। এমনটাই দাবি করেছে রাশিয়া। আরো দাবি করা হয়েছে, এই হামলার পুরো দায়ভার পড়ে বুশ প্রশাসনের ঘাড়ে। আর এই হামলায় ওসামা বিন লাদেনের লোকজনকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল মাত্র।

রহস্য উদঘাটন : কেন বুশ ৯-১১ সুপার ড্রামা মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা করেছিলেন?

তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সুদূর পরিকল্পিত ৯-১১ সুপার ড্রামা মঞ্চস্থ হওয়ার প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়ায় প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হয়ে যায় : [সর্বনাশ!] ইসলাম এ দেশে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্ম। এটি আরো তীব্র হয়ে ওঠে যখন ক্লিনটন সরকার হোয়াইট হাউজে স্থায়ীভাবে ইসলামের প্রতীক চাঁদ-তারা পতাকা ওড়ায়। যেদিন ইসলামের এই পতাকা উত্তোলন করা হয়, পরের দিনই পতাকাটি হাইজ্যাক হয়ে যায়। মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়লে পরের দিন আবার চাঁদ-তারা পতাকা শোভা পায়। আর মিডিয়া খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, হোয়াইট হাউজ জানেই না- কে বা কারা এ কাজটি করেছে। তাদের অগোচরে এটাও কি সম্ভব হতে পারে? একই যুক্তিতে বলা যায়, বিশ্বের শীর্ষ সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে এক সাথে চারটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালানো ক্ষুব্ধ আরব মুসলমানদের পক্ষে কোনো পরিস্থিতিতেই কি সম্ভব? এটা কি বিশ্বাস করা যায়? আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এবং ১৯ জন বিমান ছিনতাইকারী বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে ‘নয়-এগারো’র মতো নজিরবিহীন ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার এমন ঘটনা কখনো ঘটাতে পারে কি? এসব বিশ্বাসযোগ্য হওয়া তো দূরের কথা, কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বর্ণনা এরকমই দেয়া হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর থেকে দু’টি ধর্মীয় পতাকা হোয়াইট হাউজে ওঠানো হতো। দেখতে দেখতে মুসলমানদের সংখ্যা ইহুদিদের টপকিয়ে যেতে দেখা যায়। সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে তিন ধর্মের পতাকা হোয়াইট হাউজে উড়বে। জন্স হপকিন্স যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। বাল্টিমোরে এর দু’টি ক্যাম্পাস। হোমউড ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির নিচ তলার দেয়ালে পরিবেশিত একটি নিউজ আমার নজরে পড়েছিল : প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এক লাখ ইসলাম গ্রহণ করছে। মিডিয়ায় দেখি : এই ধর্মান্তরিতদের মধ্যে বেশির ভাগই মহিলা। এ সময় একটি বই হাতে পাই : ‘ডটার অব অ্যানাদার ওয়ে’। লিখেছেন একজন খ্রিষ্টান মা। বইটিতে বিবৃত হয়েছে লেখিকা মিসেস অ্যানওয়ের অভিজ্ঞতাসহ নিজ কন্যা ও আমেরিকান অন্যান্য নারীর মুসলমান হতে চাওয়ার কাহিনী।

আমার সাথে যেসব মহিলার কথা হয়েছে, তারা জানেনই না এ রকম বই বাজারে আছে! এক মহিলা জানালেন, সবাই প্রশ্ন করে, কেন মুসলমান হলাম? আমিও ভাবছি এ সম্পর্কে বই লিখব। কিন্তু এ রকম বই দেখছি বাজারে এসে গেছে। তিনি এক সৌদি ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করেছেন। সৌদি আরবেও গিয়েছেন। বললেন : সৌদি আরবে মহিলারা আমাদের মতো ইসলাম সম্পর্কে এত ভালো জ্ঞান রাখে না। মূলত এর কারণ হচ্ছে- এখানে যারা মুসলমান হন, সব ধর্ম পড়াশোনা করে তার পরই ধর্মান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইন্টারনেটে একজন লিখেছেন : বইটি পেয়ে পড়ে দেখি, এ তো আমারই কথা। সাথে সাথে আব্বা-আম্মাকে কপি দিয়ে বলি, দেখ কেন আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। একজন আইরিশের সাথে পরিচয়, তিনি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে যতটা জানেন আমি তার মতো জানি না, যদিও আমার বাড়ি গোপালগঞ্জে হিন্দুপ্রধান এলাকায়। তিনি বললেন : সব ধর্মের তুলনামূলক পড়াশোনা করে তার পরে মুসলমান হয়েছি। বললেন, তার স্ত্রী তখনো খ্রিষ্টান থাকলেও জেনে শুনে পড়াশোনা করে অনেক পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

‘ডটার অব অ্যানাদার ওয়ে’ বইটি বিশ্বে বেশ সাড়া জাগায়। দেশে এসে এর বাংলা অনুবাদ “অন্য পথের কন্যারা” দেখতে পাই।

বর্তমান দুনিয়ায় একটি অপ্রকাশিত বিষয় হচ্ছে : আগে বিশ্বের সবাই প্রধানত কমিউনিজম, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক, আলোচনায় মেতে থাকত। ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানে দুনিয়াব্যাপী বর্তমানে কিন্তু জমে উঠেছে তুলনামূলক ধর্মের বিষয় বা বক্তব্য নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিতর্ক। এ কারণে বিশ্বের সব দেশে দেখা যাচ্ছে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাচ্ছেই।

পিউ রিসার্চ সেন্টার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনমত জরিপ পরিচালনাকরী একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এখন তুলনামূলকভাবে বিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল একমাত্র ধর্মবিশ্বাস হচ্ছে ইসলাম, যদিও বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হলো ইসলাম আর সবচেয়ে বেশি অনুসারী হলো খ্রিষ্টান ধর্মের।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বুশের প্রতিদ্বন্দ্বী আল গোর

সে নির্বাচনের বিতর্ক প্রতিযোগিতাটি ছিল রোমাঞ্চকর। বিতর্কের একটি বিষয় থেকে এটা স্পষ্ট যে, পরবর্তীকালে কেন বুশ সেই বিতর্কিত ক্রুসেডের ঘোষক এবং নাইন-ইলেভেনের পরিকল্পক হলেন? প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোর ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নিলেন গোঁড়া ইহুদি লিবারম্যানকে। বুশের কাছে স্পষ্ট হলো, ইহুদি সব ভোট অবশ্যই গোরের পাল্লায় যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবি খুবই সক্রিয় ও সুসংগঠিত। সে দেশে সাধারণত খ্রিষ্টান ভোট দুই ভাগে প্রায় সমানভাবে বিভক্ত হয়ে ভোটের ভারসাম্য বজায় রাখে দুই দলের মধ্যে। এতদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, ইহুদি ভোট যে দিকে মোড় নেয়, তারাই বিজয়ের হাসি হাসে। বুশ দেখলেন, কথা ঘুরিয়ে বললে সব মুসলমান ভোটারের ভোট অতি সহজে অনায়াসে পাওয়া যাবে। বিতর্কের সময় তিনি সরাসরি বললেন : ‘নিরাপত্তা আইনে সিক্রেট এভিডেন্সকে বৈষম্যমূলক মনে করি। ক্ষমতায় গেলে এটি বাতিল করব।’ জবাবে আল গোর বলেন : ‘আমি এটাকে বৈষম্যমূলক মনে করি না।’ এই লেখক তখন যুক্তরাষ্ট্রে বসে টিভিতে বিতর্কটির দর্শক ছিলেন।

মুসলমান ভোটারদের মনে হলো, বুশ তাদের পক্ষ নিয়েছেন। এই প্রথম মুসলমানেরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে জোটবদ্ধভাবে একদিকে ভোট প্রয়োগ করেন। এমনকি, বুশের পক্ষে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রচারে জড়িয়েও পড়েন। শেষে ইহুদি লবির সাথে প্রতিযোগিতায় বিজয় ছিনিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হলো, মুসলমানরাও মার্কিন মাটিতে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনে সক্ষম। মুসলিম ভোট ব্যাংকের শক্তির মহড়াকে বরং দেখা হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে। প্রচারমাধ্যম এটা লুফে নিলো। ইনভেস্টরস বিজনেস ডেইলি এক নিবন্ধে লিখেছিল ‘আমেরিকান মুসলমানদের জন্য এটা ছিল বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি।’ ক্ষমতা পেয়ে বুশ অবশ্য তার কথা আদৌ রক্ষা করেননি, বরং কার্যত নাইন-ইলেভেনের রূপকার হলেন।

নাইন-ইলেভেনে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দু’টি যাত্রীবাহী বিমান আছড়ে পড়েছিল নিউ ইয়র্কের বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্রে। অতঃপর আগুন, ধোঁয়া; তাসের ঘরের মতো দু’টি টাওয়ার ভেঙে পড়ে। ‘নয়-এগারো’র ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার দশক পূর্তির পরও বিবিসি, রয়টার, এএফপি পরিবেশিত সংবাদে প্রশ্ন করা হলো : আসলে কী ঘটেছিল ২০০১-এর এই দিনে? সত্যিই কি আলকায়েদা মার্কিন শৌর্যে আঘাত হেনেছিল, নাকি সবই পাতানো?

যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জোন্সের নেতৃত্বে ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর অভিযোগ : নিউ ইয়র্ক ও পেন্টাগনে সে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়, এটা ছিল ‘ভেতর থেকেই’ সংঘটিত। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে অধ্যাপক স্টিভেন বলেন, ভেঙে পড়া টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষার পর নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে সেখানে ভবন ধসিয়ে দেয়ার বিস্ফোরক ব্যবহারের।

কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতে, ৯-১১ ঘটনাটি ছিল একটি ষড়যন্ত্র। পেন্টাগনে আসলে বিমান নয়, রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কারণ, বিমানের যাত্রীদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, যাত্রী ও ক্রুদের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। মৃতদেহ পাওয়া গেলে উঘঅ পরীক্ষা করে অবশ্যই তাদের শনাক্ত করা হতো। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে ইরানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘নয়-এগারো’ হামলা ছিল গোয়েন্দা সংস্থার জটিল দৃশ্যকল্প ও কর্মকাণ্ড। আর পেন্টাগনে যে বিমানটি হামলা করেছিল, তার ধ্বংসাবশেষের খোঁজ পাওয়া গেল না’ কিংবা আরোহীদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের খোঁজ মিলল না কেন? একই দিনে আর একটি বিমান যুক্তরাষ্ট্রের একটি খেলার মাঠে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এর কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি-এ কথা উল্লেখ করে মাহাথির বলেন, বিমানটি কি শেষ পর্যন্ত হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? মার্কিন গণমাধ্যম ‘৯-১১’ ঘটনা সম্পর্কে রহস্যজনক নীরবতা বজায় রাখে। এর উদ্দেশ্য কী?

বিশ্বকে ফাঁকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নতুন কৌশলে চলমান রয়েছে বুশের সেই নাইন-ইলেভেন ক্রুসেড। এ কাজে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অগ্নিতে ঘৃত সংযোগ করছেন।

সিএআইআরের মুখপাত্র উইলফ্রেডো আমর রুইজ আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ‘এই কর্মকাণ্ডটি এখন একটি শিল্পের রূপ নিয়েছে। ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়ানোর এ কাজ থেকে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করা হচ্ছে। তারা কখনো কখনো নিজেদের ইসলামি বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করছে।’ ‘তারা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করছে যেন, মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। তারা আমেরিকানদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, মুসলমানেরা আমেরিকান কমিউনিটির অংশ নয় এবং তারা আমেরিকার বিশ্বস্ত নাগরিকও নয়।

তিনি বলছিলেন, এর দু’টি বিপজ্জনক দিক : একটি, ঘৃণা থেকে অপরাধ বৃদ্ধি করছে এবং অন্যটি হলো, মুসলমানদের বিপক্ষে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

লেখক : সাবেক পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

মুঘল বাদশাহ হুমায়ুনের ভাগ্য উত্থান-পতনের কাহিনী

emperor humayun portraitসৈয়দ আশফাকুল হাসান : শের শাহ সুরি যখন তাঁর বিজয়রথ চালাতে চালাতে আগ্রা এসে পৌঁছালেন, বাদশাহ হুমায়ুন লাহোরে পালিয়ে গেলেন। তারপর রচিত হলো এক দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস।

১৫৪০

যদিও পলাতক তবু তো বাদশাহ। নাসির উদ্দিন মুহাম্মদ। হুমায়ুন নামেই চেনা। মনোবল হারাননি একটুকু। পরিবার-পরিজনসহ তাঁর সঙ্গী ছিল বিরাট এক দল। তাতে পাইক-বরকন্দাজ আছে, সেনা সদস্যরাও আছে। শের শাহ হুমায়ুনকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলেন। আফগানদের কাছেও খবর পাঠিয়ে রেখেছিলেন যেন হুমায়ুনকে শান্তি না দেয়। শের শাহ নিজে একজন পাঠান বা পাখতুন। সুরি তাঁর গোত্রের নাম। শের উপাধি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল কারণ যৌবনে বাঘ মেরেছিলেন।

তাঁর আসল নাম ফরিদ খান। যা-ই হোক, হুমায়ুন একপর্যায়ে শের শাহের কাছে বার্তা পাঠালেন, আমি আপনার কাছে সব হিন্দুস্তান ছেড়ে এসেছি, আপনি লাহোরকে ছাড়ুন এবং পাঞ্জাবের সিরহিন্দকে আমাদের মাঝে সীমানা হিসেবে রাখুন। শের শাহ উত্তর দিলেন, আপনার জন্য আমি কাবুল ছেড়ে এসেছি, আপনি বরং সেখানে গিয়ে দেখুন। ওদিকে নিজের ভাই মির্জা কামরান হুমায়ুনকে কাবুলে প্রবেশ করতে দেবেন না বলে জানান। হুমায়ুনের সেনাদল কামরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পিতৃ আজ্ঞার (ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ করো না) কথা মনে রেখে হুমায়ুন মুলতানের পথ ধরলেন।

১৫৪১

sher shahসিন্ধুর তীর ধরে এগোতে থাকলেন হুমায়ুন। ভাই হিন্দালকে পাঠালেন দাদু নামে সিন্ধের এক জায়গার খবর নিতে। হিন্দাল সবুজ সংকেত দিলে তিনি দাদুতে ভাইয়ের সঙ্গে মিলিত হন এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। হিন্দালের এক শিক্ষকের মেয়ে হামিদা বানুও ছিল দলে। তখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর। হিন্দালের তাঁর প্রতি আগ্রহ ছিল। হুমায়ুনও বিয়ের প্রস্তাব দেন। হিন্দাল এতে খেপে যান। হামিদা বানুও গররাজি ছিলেন। অবশেষে ১৫৪১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হুমায়ুনের সঙ্গে হামিদার বিয়ে হয়। নবপরিণীতাকে নিয়ে বাদশাহ ভকর সিন্ধের দিকে রওনা হন। হিন্দাল ভাইয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে কান্দাহারের দিকে যাত্রা করেন।

১৫৪২

হুমায়ুন ভকর দখল করে নেন। তারপর সিন্ধুরই আরেক জায়গা সেহওয়ান দখল করতে যান। কিন্তু সিন্ধের শাসক শাহ হুসেইন হুমায়ুনকে বাধা দেন। সাত মাস সেহওয়ান অবরোধ করে রেখে ভকর ফিরে আসতে বাধ্য হন হুমায়ুন। তত দিনে হুমায়ুন বিপর্যস্ত। ভাবলেন, মক্কা যাত্রার কথা। তখনই যোধপুরের রাজা মালদেও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বার্তা পাঠান। হুমায়ুন তাই জয়সলমির হয়ে যোধপুর যাত্রা করেন। মাঝে জয়সলমিরের রানা আক্রমণ করে বসেন। তবে বাদশাহের বাহিনীর কাছে পরাজিত হন। বাদশাহ আজমীরের ধারে পৌঁছান। তখনই হুমায়ুন একটি বার্তা পান, মালদেওকে শের শাহ লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছেন। নাগর ও আলওয়ার দিয়ে দেবেন মালদেওকে যদি হুমায়ুনকে আশ্রয় না দেন। হুমায়ুন উপায় না দেখে অমরকোটের দিকে যাত্রা করেন। এই সময় হামিদার ঘোড়াটি মারা যায়। হামিদার তখন আট মাসের গর্ভাবস্থা।

পথ যায় মরুভূমিতে

hamida banooঅমরকোটের পথ ছিল খুব কষ্টের। পানির সমস্যা ছিল প্রকট। সঙ্গীদের অনেকেই ছিল পদযাত্রী। মালদেওয়ের বাহিনীও ছিল পেছনে। যা-ই হোক এক সময় অমরকোট পৌঁছাতে পারেন হুমায়ুন।

২২ আগস্ট ১৫৪২। হুমায়ুন অমরকোট পৌঁছান। রানা প্রসাদ ছিলেন শাসনকর্তা। তিনি বাদশাহকে অভ্যর্থনা জানান। ১৫ অক্টোবর ১৫৪২ হামিদা বানু এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। বাদশাহ পুত্রের নাম রাখলেন জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবর।

পারস্য যাত্রা ও সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার

অমরকোট থেকে ভকর যাওয়ার পথে শাহ হুসেইন আবার বাধা দিতে আসেন। ভয়ে বাদশাহর সৈন্যদের অনেকে পালিয়ে যায়। সমঝোতায় আসতে বাধ্য হন হুমায়ুন। সিন্ধ ছেড়ে কান্দাহারের পথে রওনা হন। এই সময় বৈরাম খান তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। মির্জা কামরানের অনুগত কান্দাহারের শাসনকর্তা হুমায়ুনকে পথে আক্রমণ করেন। বাদশাহ তখন হিন্দুকুশ পাহাড় বেয়ে পারস্য যাত্রা করেন। খুব ঠাণ্ডা ছিল তখন। বরফ পড়ছিল। খাবার ছিল না, আগুন জ্বালানোর কাঠ ছিল না। বাদশাহ এক পর্যায়ে পূর্ব ইরানের সিস্তানে পৌঁছাতে সমর্থ হন। পারস্যের শাহ তামাস্প বাদশাহকে সহযোগিতা দিতে সম্মত হন। পরে হুমায়ুন কান্দাহার, কাবুল, বালখ হয়ে হিন্দুস্তান এসে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।

humayun travel route

সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে সৌদি আরবের আওয়ামিয়া শহর

awamiya destroyedগত মে মাস থেকে সৌদি আরব নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটির আওয়ামিয়া শহর। দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিকসহ বহু মানুষ হতাহতের শিকার হয়েছে।

আওয়ামিয়া শহরের যেকোনো দৃশ্য দেখলে এখন মনে হয় সেটি ইরাক বা সিরিয়ার কোনো দৃশ্য। শহরটি বর্তমানে বাইরের লোকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সম্প্রতি অনুমতি পায় সংবাদ সংস্থা বিবিসি।

বিবিসির সংবাদদাতা স্যালি নাবিলকে আওয়ামিয়া শহরে নেয়া হয় নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁজোয়া যানে করে।

বিবিসির প্রকাশিত একটি ভিডিওতে শহরের ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরা হয়েছে।

সৌদি সরকার বলছে, বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে এখনো উত্তেজনা আছে।

তবে আওয়ামিয়াতে বসবাসরত শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বহুদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

মে মাসে প্রকল্প চালুর জন্য নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে হস্তক্ষেপ করলে শিয়া গোষ্ঠীগুলো আপত্তি জানায়। কিন্তু তাতে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে জোরপূর্বক উচ্ছেদ চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ শিয়াদের। সরকার ও শিয়াদের দ্বন্দ্বের কারণে বিষয়টি সহিংসতায় রূপ নেয়। ফলে সাধারণ নাগরিকসহ বহু হতাহত হয়।

ষোড়শ সংশোধনীঃ চক্ষুষ্মানের অন্ধ সাজার গল্প

elephant seeing by blindsএবারের ঈদটা বেশ ভালোই গেছে, প্রিয়জনদের সঙ্গে খুশি ভাগাভাগিতে আড়াল হয়েছে দুঃখ-কষ্ট-ক্লান্তি-ভোগান্তি। তবে খেয়াল করে দেখুন, দৃশ্যান্তরালে গেছে একটি বিষয়- ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে প্রধান দুই দলের রাজনীতিকদের বক্তব্য-পালটা বক্তব্য, বাকবিতণ্ডা। ঈদের আগে প্রতিদিনই এ নিয়ে উত্তপ্ত বক্তব্য দিতেন তারা, গণমাধ্যমও গোগ্রাসে গিলত সেসব। এ পরিস্থিতির একটা সুফল অবশ্য এসেছে, সেটি হল- সুনাগরিকদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, আদালতের রায় নিয়ে নির্বিচার নিন্দা হতে পারে যদি, তাহলে গঠনমূলক সমালোচনা কেন করা যাবে না, তাতে আদালত অবমাননা হবে না। তবে কুফল যেটি হয়েছে সেটি হচ্ছে- কোন্ মাত্রা পর্যন্ত সমালোচনা করলে সেটিকে গঠনমূলক বলা যাবে এবং যা ইচ্ছা তা যে বলা যাবে না, সেই বোধটা একেবারেই হারিয়ে গেছে সাধারণ্যে। ম্লান হয়েছে রাষ্ট্রের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি এবং ফুটে উঠেছে রাজনীতিকদের সুবিধাবাদী বেপরোয়া দৃষ্টিভঙ্গি।

থেকে থেকে শীতনিদ্রায় থাকা বিএনপিকে রায় প্রকাশের পর আরেক দফায় সরব হয়ে উঠতে দেখা গেছে। রায়ে দলটির প্রতিষ্ঠাতাকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী আখ্যা দিয়ে তার শাসনামলকে অগণতান্ত্রিক, নোংরা রাজনীতির শাসনামল, ব্যানানা রিপাবলিক ইত্যাদি বলে বিদ্রূপ করা হলেও সেগুলোকে গায়ে না লাগিয়ে তারা লেগে পড়েছেন ক্ষমতাসীন দলের পেছনে আর পাল্টা হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের বিজ্ঞ রাজনীতিকরাও ‘কান নিয়েছে চিলে’ ভেবে রায়টি পড়ে দেখার বিন্দুমাত্র প্রয়োজনীয়তা বোধ না করেই কারণে-অকারণে রায়ের, বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির সমালোচনায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মাননীয় প্রধান বিচারপতিও আত্মরক্ষা করতে সুযোগমতো গণমাধ্যমের সামনে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। গণমাধ্যমেও প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে সেসব বক্তব্য এবং তার পর্যালোচনা আর দর্শক ও পাঠক উপভোগ করেছে তা, হয়েছে বিনোদিত। আর যাই হোক, সাধারণ মানুষের বিনোদনের খোরাক জোগানো নিশ্চয়ই এত কিছুর উদ্দেশ্য ছিল না। যাহোক, কথা হচ্ছে যে বিষয়বস্তুকে ঘিরে এত কিছু, সেই রায় ও তার পর্যালোচনায় কী গেল-এলো জনগণের? এর কতটাই বা প্রভাব ফেলল জনজীবনে বা জনমনে?

বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকল না সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে থাকল, তা নিয়ে ভাবার খুব আগ্রহ কেন থাকবে জনমনে, যেখানে আজ পর্যন্ত একজন বিচারপতিরও অপসারণের ঘটনা ঘটেনি বাংলাদেশে। এমনকি বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েই জাতীয় সংসদ থেকে কোনো আইন প্রণীত হয়নি এ পর্যন্ত এবং আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি আবদুল মতিনের নেতৃত্বে দেয়া এক রায়ে বিচারক নিয়োগের পদ্ধতি বলা থাকলেও সেটির বাইরে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের বিবেচনাতেই নিয়োগপ্রাপ্ত হন বিচারপতিগণ এমন অভিযোগ রয়েছে যেখানে, সেখানে অপসারণ কীভাবে হবে তা নিয়ে কেন ব্যাকুল হবে জনগণ? আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর বোরহান উদ্দিন খানের একটি কথা এখানে প্রাসঙ্গিক মনে হল; কোনো এক প্রসঙ্গে তিনি একদিন বলেছিলেন- ‘যে দেশে গরু চুরি হয় না, সে দেশে গরু চুরির আইন নিয়ে কারও মাথাব্যথা থাকে না’।

এ দেশের ইতিহাসে বিচারপতি অপসারণের নজির পাওয়া না গেলেও কেমন করে তারা অপসারিত হবেন, হঠাৎ করে সেই বিধান পরিবর্তনে তৎপর হয়ে উঠলেন ক্ষমতাসীনরা! বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবে সায় দেয় মন্ত্রিসভা, একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হয়েছিল ষোড়শ সংশোধনী, ৫ দিনের মাথায় ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। লক্ষণীয়, নিন্ম আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণসংক্রান্ত বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে গত বছরের ৭ নভেম্বর থেকে এ বছরের ২৭ জুলাই অর্থাৎ ৮ মাসেরও বেশি সময় লেগেছে সরকারের এবং তা-ও আদালতের প্রচণ্ড চাপের মুখে একরকম বাধ্য হয়ে গেজেট দাখিল করতে হয়েছে (আদালতের আপত্তিতে সেই গেজেটটি গৃহীত হয়নি)। পাস হওয়া সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেছিলেন সুপ্রিমকোর্টের ৯ আইনজীবী। প্রাথমিক শুনানির পর হাইকোর্ট ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর রুল দেন। রুলে ওই সংশোধনী কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। এই রুলের শুনানি শুরু হয় ২০১৫ সালের ২১ মে। শুনানি শেষে গত বছরের ৫ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ এবং এ বছরের ২ জুলাই সেই আপিল খারিজ করে দেন আদালত আর ১ আগস্ট প্রকাশিত হয় পূর্ণাঙ্গ রায়। এরই মধ্যে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণ প্রক্রিয়া কী হবে, তা ঠিক করে আইন কমিশন মার্চে নতুন এ আইনের খসড়া তৈরি করে। আইনটির বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও মতামতের জন্য মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয় আইনের খসড়া। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে মামলা বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে অভিমত না দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রধান বিচারপতি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আইন প্রণয়নের আগে সেটি নিয়ে আদালতের অভিমত নেয়া উচিত নয়। সে ক্ষেত্রে আইন হওয়ার পর আইনে অপসারণ প্রক্রিয়াটি কেমন রাখা হয়েছে সে বিষয়টি কি রায় দেয়ার আগে অন্তত একবার বিবেচনা করার মতো ছিল না? বলা চলে একরকম দ্রুতগতিতেই শেষ হয়েছে এতসব প্রক্রিয়া, যা সাধারণ মামলার ক্ষেত্রে দেখা যায় না। থাকগে।

আমরা দেখলাম, রায় প্রকাশিত হতে না হতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে কথার ফুলঝুরি। আর যখন বাক্যবাণের এমন লড়াই চলছে, তখন দেশের ত্রিশটি জেলার মানুষ স্মরণকালের ভয়াবহতম বন্যায় আক্রান্ত। মানুষের বসতভিটা ছাপিয়ে বন্যার পানি যতই দুর্ভোগ বয়ে আনুক না কেন, সেই দুর্ভোগ নিয়ে প্রত্যাশিত সহমর্মিতা ফিকে হয়ে গেছে রাজনীতির মাঠের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে তর্কবিতর্কে। আওয়ামী লীগের ভাষ্য, এই রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে, জনগণ তা মেনে নেবে না আর বিএনপির দাবি- এই রায়ে জনগণের বিজয় হয়েছে। নিজের কথাকে জনগণের বক্তব্য হিসেবে চালিয়ে দেয়ার পুরনো এই কৌশল রাজনীতিকরা পরিহার তো করতেই পারছেন না বরং পৌনপুনিকভাবে তা প্রয়োগ করে চলেছেন। আবার দেখুন, মাননীয় প্রধান বিচারপতি পূর্ণাঙ্গ রায়ের ৩৪৩ পৃষ্ঠায় বলছেন, ‘People from all walks of life repose faith upon it (Supreme Court) all the time…’ অর্থাৎ সর্বস্তরের মানুষ সব সময় সুপ্রিমকোর্টের ওপর আস্থা রাখে। একই পৃষ্ঠায় তিনি আরও বলছেন, ‘The people express hope that the Supreme Court would serve as a laboratory for political, economical, democratical change in the country as a whole. Under such situation aû change in its supervisory power is given to the Executive, the people’s hope and aspiration would be trampled.’

দ্বিতীয় বাক্যটির সঠিক গঠন নিয়ে আমি confused, তবে মাননীয় প্রধান বিচারপতি নিশ্চয়ই বোঝাতে চেয়েছেন- জনগণ আশা রাখে সুপ্রিমকোর্ট সার্বিকভাবে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করবে। এমন অবস্থায় যদি সুপ্রিমকোর্টের এই তদারকি করার ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে দেয়া হয়, তাহলে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ধূলিসাৎ হবে। মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা- তিনি কী করে বুঝলেন জনগণের মনের কথা?

ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আলোচনায় অন্ধের হাতি দেখার গল্পটা কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। গল্পটি সবার জানা, তা-ও বলি। হাতি কেমন দেখতে তা জানার জন্য তিন অন্ধ গেছে একটা হাতির কাছে। তারা যেহেতু চোখে দেখতে পায় না, সুতরাং হাত দিয়ে হাতির শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে জেনে নিল হাতি দেখতে কেমন। ফিরে এসে কে কেমন বুঝল তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করল এবং তখনই বেধে গেল বিপত্তি। যে অন্ধ ব্যক্তিটি হাতির পা স্পর্শ করেছিল সে বলল, হাতি দেখতে খাম্বার মতো; হাতির শরীর স্পর্শ করেছিল যে, সে বলল, তুই তো কিছুই বুঝিসনি, হাতি দেখতে দেয়ালের মতো; যে কান স্পর্শ করেছিল, সে বলল, দূর বোকার দল, হাতি হচ্ছে বিরাট কুলোর মতো।

গল্পের চরিত্রগুলো অন্ধ বটে। শেষ প্রশ্নটা তাই করি- উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যারা কথা বলছেন, তারাও কি অন্ধ? হতে পারে, স্বল্পবধির যেমন কখনও কখনও কথা না শোনার ভান করতে পাথরবধির সাজে, রায়ের প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকারীরা তেমন চক্ষুষ্মান হয়েও অন্ধ সেজেছেন।

শারমিন চৌধুরী : সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি; সাংবাদিক

= = =

# বাংলাদেশের দুটি সামরিক সরকারের পটভুমি সম্পুরন আলাদা – এদের একটি হয়েছিল সময়ের প্রয়োজনে, অপরটি ক্ষমতার জবরদখল, দুটি র ফলাফল ও আলাদা – সরলী করন যুক্তি সংগত নয়. নিজের পাপটা সবসময় সময়ের প্রয়োজনেই হয়। পৃথিবীর সব সামরিক শাসক নিজের হ্মমতা দখলকে সময়ের প্রয়োজন বলেই দাবি করেছে।

# ”বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী লিখেছেন, জিয়া-এরশাদের স্বৈরশাসনে বাংলাদেশের সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী চরিত্র হারিয়েছিল।”——এখন খুশিতে বিএনপি আরও বেশী করে মিষ্টি খাইতে পারে। ঐ রায়ে জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতা জবরদখলকারী, নোংরা রাজনীতির তল্পিবাহক, প্রহসনের গণভোট করার প্রতিভূ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপরও বিএণপি এই রায় নিয়ে রাজনীতি করছে শুধু দেশের মানুশ যেন রায়টি আর ভালোভাবে না পড়ে এবং বিএণপি পিছন পিছন অন্ধকারে হাতরাতে থাকে।

স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি বাড়াল ব্রিটেন

BAE fighter aircraftব্রিটেন গত ২২ মাসে রফতানি করেছে প্রায় পাঁচশ’ কোটি পাউন্ড স্টারলিং সমপরিমাণ অস্ত্র। রক্ষণশীল দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতার আসার পর অস্ত্র রফতানির ব্যবসা দেশটিতে রমরমা হয়ে ওঠে। এ সব অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা সৌদি আরবসহ আরো কয়েকটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার।

সৌদি আরবের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই অস্ত্র বিক্রি করেছে ব্রিটিশ সরকার। ক্ষমতায় আসা আগে ব্রিটেনের কাছ থেকে ৬৮ কোটি পাউন্ড স্টারলিংয়ের অস্ত্র কিনেছে সৌদি আরব। কিন্তু গত ২২ মাসে এ অস্ত্র কেনার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২০ কোটি পাউন্ড স্টারলিং। ব্রিটিশ সরকার এবারে বিশ্বের অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিক দেশেও অস্ত্র বিক্রির তৎপরতা বাড়িয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে।

পূর্ব লন্ডনের এক্সেলে প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মেলার আগে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিশ্বের এ ধরণের যে সব মেলা হয় তার মধ্যে এক্সেলের মেলাকে অন্যতম বৃহৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ মেলায় অংশ নেয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার যে সব দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে মিশর, বাহরাইন এবং সৌদি আরব।

এদিকে, ব্রিটেন সে সব দেশের কাছে অস্ত্র রফতানি করছে তাদের সবারই মানবাধিকার সংক্রান্ত রেকর্ড বিতর্কিত বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান।

এছাড়া, মানবাধিকার কর্মীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি করছে। দেশটির মানবাধিকার সংক্রান্ত রেকর্ডের ভিত্তিতে এ দাবি করা হয়। সাইবার নজরদারি সংক্রান্ত প্রযুক্তি দেশটির কাছে বিক্রির বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার আলোচনা করছে। এ প্রযুক্তি দেশটির মানুষের ওপর অহেতুক নজরদারিতে ব্যবহার হয় বলে অভিযোগ করছেন তারা।

মিয়ানমারে গণহত্যা, আমরা কী করতে পারি?

rohingya stop genocideমিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যে সুপরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ নির্যাতন চলছে, তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, আসল ঘটনা গণহত্যা। নির্বিচারে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলছে, পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, আর চলছে নারী ধর্ষণ। কেউ কেউ বলতে চাইছে, এটি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, বৌদ্ধদের সঙ্গে মুসলমানদের বিরোধ। মোটেই তা নয়, রোহিঙ্গাদের মধ্যে হিন্দুও আছে, তারাও একইভাবে নির্যাতিত হচ্ছে।

মিয়ানমার সরকার প্রচার করছে, রোহিঙ্গারা জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত। ভাবটা এ রকমের যে এরা আইএসের সঙ্গে যুক্ত, তাই দমন করাটা কর্তব্য। সরকার যে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তা বর্ণবাদী গণহত্যা, যার চরিত্র ফ্যাসিবাদী। মিয়ানমারের সংখ্যাগুরুরা চায় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করে তাদের ভৌত সম্পদ, জায়গাজমি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরবাড়ি—সবকিছু দখল করে নিজেদের সম্পদ বাড়াবে। এরা লুণ্ঠনকারী।

রোহিঙ্গা বিতাড়নের ঘটনা নতুন নয়। এ কাজ মিয়ানমারের সামরিক স্বৈরশাসকেরা আমোদের সঙ্গেই করত; আশা করা গিয়েছিল যে গণতন্ত্র এলে নিপীড়নের অবসান ঘটবে। বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক চাপ ও ভেতরের গণ-আন্দোলনের মুখে সামরিক শাসকেরা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের দখলদারি থেকে পশ্চাদপসরণ করেছে, ক্ষমতায় এসেছেন নির্বাচিত জননেত্রী, ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’, শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারে বিভূষিত অং সান সু চি। কিন্তু তাতে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি; তাদের ওপর নিপীড়ন বরং বেড়েছে। সামরিক সরকারের উদ্বেগ ছিল সু চির দলের শক্তি ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতার মোকাবিলা করা। তারা সে কাজকেই কর্তব্য করে তুলেছিল। এখন যে নির্বাচিত সরকার এসেছে, দেশে-বিদেশে তার কোনো প্রতিপক্ষ নেই, তাই দুর্বল রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে নিজেদের লোকদের বসানোর কাজে তারা মহা উৎসাহে অবতীর্ণ হয়েছে। জবাবদিহির ক্ষেত্রে অবৈধ, দখলদার ও স্বৈরাচারী সামরিক শাসকদের তবু একটা আত্মসচেতনতা ছিল; বৈধ, নির্বাচিত ও জনপ্রিয় সরকারের চিত্তাকাশে সেটুকুও নেই।

অং সান সু চি নিজে প্রথমে নীরব ছিলেন, যেন দেখতে পাচ্ছেন না; পরে তিনি সরব হয়েছেন। উৎপীড়িতের পক্ষে নয়, উৎপীড়কের পক্ষে। তাঁর রূপ এখন জাতীয়তাবাদীর। এই জাতীয়তাবাদ বর্ণবাদী, এর স্বভাবটা পুঁজিবাদী। অতীতে হিটলার ছিলেন এর শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই পথেরই পথিক। ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত ইয়াহিয়া খানকে আমরা ওই রূপেই দেখেছি। সামরিক জান্তার হাতে বন্দী অবস্থায় সু চি নিঃসঙ্গ ছিলেন, এখন আর তা নন; এখন তিনি মুক্ত এবং সারা বিশ্বে যত পুঁজিবাদী-ফ্যাসিবাদী শাসক আছেন, সবাই তাঁর সঙ্গী। পুঁজিবাদ এখন রূপ নিয়েছে সংকোচহীন ফ্যাসিবাদের। বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদী সুবিধাভোগীরা সুবিধাবঞ্চিতদের ওপর যতভাবে পারা যায় নিপীড়ন করছে। মিয়ানমারেও ওই একই ঘটনা, পোশাকটাই যা আলাদা।

নিপীড়নকারী সরকার বলছে, রোহিঙ্গারা দুষ্কৃতকারী। একাত্তর সালে পাঞ্জাবি হানাদারদের চোখে বাংলাদেশের সব মানুষই ছিল প্রকাশ্য অথবা ছদ্মবেশী দুষ্কৃতকারী। মুষ্টিমেয় লোক ছিল তাদের সহযোগী; তাদেরও তারা সম্ভাব্য দুষ্কৃতকারী বলেই জানত, মুখে যা-ই বলুক না কেন। ‘দুষ্কৃতকারী’দের দমনকাজ একাত্তরে ভীষণভাবে চলেছে। সেটা ছিল গণহত্যা। মিয়ানমার সরকার এখন যা করছে, সেটাও গণহত্যাই। প্রাণভয়ে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল এক কোটি। শরণার্থীদের এই বিপুল বোঝা বহন করা ভারতের পক্ষে মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। তাদের কষ্ট হয়েছে। কিন্তু বিপন্ন মানুষদের তারা আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, যত্ন œনিয়েছে। তারা জানত যে শরণার্থীরা শখ করে আসেনি, প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেছে। ভারত সরকারের চেষ্টা ছিল, বাংলাদেশিরা যাতে নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরে যেতে পারে, সেটা দেখা। সে জন্য তারা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে, বিশ্ববাসীকে সমস্যাটা কী তা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি সংগ্রহ করেছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তাদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছে। আশা করেছে শরণার্থীরা শিগগিরই ফিরে যেতে পারবে। ঘটেছেও সেটাই। নয় মাসেই সমস্যার সমাধান পাওয়া গেছে।

সেদিন বিপন্ন বাংলাদেশিদের সংখ্যা ছিল অনেক। কিন্তু তবু পুঁজিবাদী বিশ্বের সরকারগুলো সাড়া দেয়নি। সেসব দেশের মানুষ ছিল বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বের মানুষ নির্যাতনের সবটা খবর পায়নি, যেটুকু পেয়েছে, তা-ও খণ্ডিত। মিডিয়ার পক্ষে যথোপযুক্তরূপে সাড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। মিডিয়া ছিল পুঁজিবাদীদের নিয়ন্ত্রণে এবং পুঁজিবাদীদের ছিল একই রা; সেটি হলো দুষ্কৃতকারীরা রাষ্ট্রের অখণ্ডতা নষ্ট করতে তৎপর হয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করাটা দরকার। মিডিয়ার কর্মীরা ছিলেন সহানুভূতিশীল; নির্যাতনের খবর যতটুকু সম্ভব তাঁরাই বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্য একাধিক। সংখ্যায় তারা অধিক নয়; তারা খুবই দরিদ্র এবং বিশ্বের অবহেলিত একটি প্রান্তে তাদের বসবাস। বিশ্ব তাদের খবর রাখে না, বিশ্ব তাদের গুরুত্ব দেয় না। তাদের পক্ষে বলবে এমন মানুষের ভীষণ অভাব। তদুপরি যে সরকার তাদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে, সেটি গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত। গণতান্ত্রিক কেবল এই অর্থে যে এটি ক্ষমতায় এসেছে নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচিত মানেই যে গণতান্ত্রিক নয়, এটি বহুবার বহু ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে, প্রমাণিত হচ্ছে মিয়ানমারেও। ওদিকে বাংলাদেশিদের পাশে তবু ভারত ছিল, রোহিঙ্গাদের পাশে প্রতিবেশী বাংলাদেশও নেই। এমনই তাদের দুর্ভাগ্য।

রোহিঙ্গাদের দুর্দশা পরিসংখ্যানের হিসাবে পরিণত হয়েছে। কতজন এল, কতজন রয়েছে নো ম্যানস ল্যান্ডে, কত লাশ দেখা গেছে নাফ নদীতে ভাসতে—এসব খবর তা–ও পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে কী ঘটছে, তা জানার উপায় নেই। সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে, তাদের উৎসাহও সীমিত, তদুপরি তাদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না পরিদর্শনের। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক থেকে হাজার হাজার শরণার্থী যাচ্ছে ইউরোপে, কোথাও পথ খোলা, কোথাও বন্ধ; পানিতে ডুবে ও রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। তাদের মানবিক দুর্দশার খবরটা তবু জানছে বিশ্ববাসী, কিন্তু রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে কী ঘটছে, তা জানানোর উন্মুক্ত উপায় নেই। সিরিয়ার শরণার্থী পরিবারের একটি শিশু অমানবিক বিপদের মধ্যে মুখ থুবড়ে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিল সমুদ্রের ধারে; তার ছবি সারা বিশ্ব দেখেছে। শিউরে উঠেছে, ধিক্কার দিয়েছে শিশু হত্যাকারীদের। এমন বর্বরতা রোহিঙ্গাদের একটি-দুটি নয়, বহু শিশুর ভাগ্যে ঘটেছে; কিন্তু তাদের খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছায়নি, পৌঁছালেও তারা প্রাণবন্ত শিশু থাকে না, প্রাণহীন সংখ্যায় পরিণত হয়।

২.

উৎপাটিত রোহিঙ্গারা স্রোতের মতো চলে আসছে বাংলাদেশের সীমান্তে। আগেও এসেছে, শত শত; এখন আসছে হাজার হাজার। বাংলাদেশের পক্ষে এত শরণার্থীকে জায়গা দেওয়া কঠিন কাজ। বাংলাদেশ তাহলে কী করবে? নিস্পৃহভাবে যে দেখবে সে উপায় নেই। এই স্রোতকে প্রতিহত করার, আর্ত মানুষকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা বাংলাদেশ করছে, কিন্তু সক্ষম হচ্ছে না। হবেও না। বাংলাদেশের পক্ষে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিয়ে উপায় নেই। প্রথম কারণ, কাজটা হবে অমানবিক; দ্বিতীয় কারণ, কাজটা অসম্ভব।

মানুষ কেন শরণার্থী হয়, বাংলাদেশের মানুষ সেটা জানে। একাত্তরের কথা তাদের পক্ষে কোনো দিনই এবং কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। লাখ লাখ বাঙালি যে সেদিন শরণার্থী হয়েছিল, তা কাজের খোঁজে বা সুবিধার লোভে নয়, প্রাণের ভয়ে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। গণহত্যার মুখোমুখি হয়ে তারা বিষয়-সম্পত্তি, ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল, এমনকি আপনজনকেও ফেলে রেখে প্রাণ বাঁচাতেই পালিয়ে আসছে। তারা মারা পড়ছে, হারিয়ে যাচ্ছে, দগ্ধ হচ্ছে। মৃতের লাশ, আহত মানুষ, বিপন্ন শিশু ও বৃদ্ধকে মাথায় করে, কোলে করে নিয়ে তারা ছুটছে আশ্রয়ের সন্ধানে, নৌকা ডুবে যাওয়ায় অনেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের আশ্রয় না দিলে তারা যাবে কোথায়? আমরা আজ যদি বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিই, তাহলে কেবল নিজেদের ইতিহাস থেকেই নয়, অন্তর্গত মনুষ্যত্ব থেকেও বিচ্যুত হব।

কিন্তু আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারটা তো সাময়িক। দেখতে হবে গণহত্যা যাতে থামে এবং শরণার্থীরা যাতে নিরাপদে ও সসম্মানে নিজেদের দেশে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর জন্য প্রথম ও প্রধান কাজ ঘটনার বাস্তবতা ও ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। বিষয়টিকে জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের কাছে নিয়ে যাওয়া চাই। ঘটনা যে মোটেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়, সুপরিকল্পিত গণহত্যা, সেটা বুঝিয়ে দিতে হবে। কথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করা চাই, তারা যাতে মিয়ানমারের স্বৈরাচার সরকারের ওপর সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করে গণহত্যা থামিয়ে শরণার্থীদের ফেরত নিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারে। শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলা করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সব সাহায্য ও পুনর্বাসন সংস্থার কাছ থেকে বস্তুগত সহায়তা চাওয়াটাও যে আশু ও জরুরি কর্তব্যের মধ্যেই পড়বে, সেটা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না।

মূল দায়িত্ব সরকারেরই। কিন্তু সরকারকে উদ্বুদ্ধ করা চাই, যাতে তার আলস্য ভাঙে, সরকার যাতে কালবিলম্ব না করে তার কর্তব্যে ব্রতী হয়। কারা করবেন এ কাজ? নিশ্চয়ই তাঁরা করবেন না, যাঁরা মনে করেন যে রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য একটা উটকো ঝামেলা, অথচ বলতে পারবেন না আমাদের পক্ষে করণীয়টা কী। বড়জোর বলবেন, সীমান্ত প্রহরা আরও জোরদার করতে হবে, ঠেলা-ধাক্কাটা আরও শক্ত হাতে দেওয়া চাই। কিন্তু তাতে তো সমস্যার কোনো সমাধান নেই। প্রাণভয়ে পালানো এসব মানুষ বন্যার স্রোতের মতোই প্রবল, বাঁধের ওপর তারা তো আছড়ে পড়বেই; আর বাঁধটা তো শেষ পর্যন্ত মানবিকই, যতই সে নিশ্ছিদ্র হওয়ার চেষ্টা করুক না কেন। ‘অনুপ্রবেশ’ বলি আর যা-ই বলি, ঘটনা ঘটবেই, এখন যেমন ঘটেছে। শক্ত হৃদয় ওই দলের একাংশ বলবে যে রোহিঙ্গারা নিচু সংস্কৃতির মানুষ, তারা এসে মাদক ব্যবসা করবে, জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত হবে, চুরি-ডাকাতি বাদ রাখবে না, এমনকি ভোটার সেজে রাজনীতিতে পর্যন্ত ঢুকে পড়বে।

এরা ভুলে যায় যে বিপন্ন রোহিঙ্গারা ওই সব কাজ করার জন্য শরণার্থী হয়নি। শরণার্থী হয়েছে বর্ণবাদী সরকারের বন্দুকের মুখে। রোহিঙ্গারা অপরাধ করার জন্য বাংলাদেশে পাড়ি জমায়নি, তাদের স্থানীয় মুনাফালোভীরা নিজেদের স্বার্থে অপরাধে জড়িত করছে। শরণার্থীদের জন্য কাজ নেই, উপার্জনের উপায় নেই, তাই তারা শিকার হচ্ছে মুনাফালোভীদের চক্রান্তে। প্রকৃত অপরাধী হচ্ছে মিয়ানমারের সরকার, যারা এই গণহত্যায় লিপ্ত। পাকিস্তানের বর্তমান শাসকেরা যেভাবে তাদের রাষ্ট্রকে হিন্দুশূন্য করার কাজটা সম্পন্ন করে এখন খ্রিষ্টানশূন্য করার কাজে নেমেছে। মিয়ানমার সরকারও হয়তো তার চেয়েও দ্রুত ও প্রকাশ্য পদ্ধতিতে তাদের রাষ্ট্রকে রোহিঙ্গাশূন্য করার ব্রত নিয়েছে। এ কাজে তারা বিলক্ষণ সফল হবে, যদি না তাদের নিবৃত্ত করা যায়।

বাংলাদেশ সরকারকে তাদের কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্বটা তাই নিতে হবে দেশের বিবেকবান মানুষকেই। অর্থাৎ তেমন মানুষদের, যাঁরা পুঁজিবাদকে চেনেন এবং জানেন যে বিশ্বের অন্যত্র যেমন, মিয়ানমারেও তেমনি শরণার্থী সমস্যাটা মুনাফালোভী ও মনুষ্যত্ববিরোধী পুঁজিবাদীরাই তৈরি করে। তাঁরা জানেন যে ১৯৭১-এর পাকিস্তানি হানাদার ও ২০১৭-এর মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগকর্তাদের ভেতরে নামেই যা পার্থক্য, ভেতরে তারা একই। এ-ও তাদের জানা আছে যে জলবায়ু পরিবর্তনে ধরিত্রী যে এখন বিপন্ন, তার কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বের উন্নয়ন তৎপরতা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। পুঁজিবাদবিরোধী মানুষের এখন অনেক কর্তব্য; মূল কর্তব্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে ভেঙে সামাজিক মালিকানার ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করা। মিয়ানমারের অসহায় মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই দাঁড়ানো বটে। এক কথায় এ দায়িত্ব বামপন্থীদেরই, সারা বিশ্বে এবং বাংলাদেশে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদ্‌যাপন জাতীয় কমিটি।

===

# এখানে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছাড়া অার কোন উপাদান নেই। অার সেই বিদ্বেষই বিজেপি অার সূচিকে এক সূরে কথা বলাচ্ছে। এই বিদ্বেষ বাংলাদেশের মানুষের জন্য উদ্বেগজনক।

# আমাদের মেরুদন্ড থাকলে আমরা অনেক কিছুই করতে পারি । সর্বশেষ আপডেটেড স্যাটেলাইট থেকে তোলা গণহত্যা এবং ঘর বাড়ি জালিয়ে দেবার ছবি ইউটিউবে রয়েছে যা জাতিসংঘের কাছে তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে দাত ভাংগা জবাব দিতে পারি ।

# রোহিঙ্গারা গোষ্ঠীগতভাবে গভীর সমস্যায় আছে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যাওয়াটা আমাদের সরকারের জন্য সুবিবেচনা হবে না যদি এই দাঙ্গার পিছনে রোহিঙ্গাদের অন্তর্গত ইন্ধন থাকে। বিশেষত কফি আনানের রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক্কালে ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের ২০ টি সেনা চৌকিতে রোহিঙ্গা সলিডারিটি আর্মির হামলার অভিযোগের বিষয়টি রোহিঙ্গা নেতাদের পরিষ্কার করতে হবে। মুদ্রার উভয় পাশ না দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা বাংলাদেশের জন্য বুমেরাং হতে পারে।

# দেশে যখন খাদ্য সংকট তখন মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে আমরা কী বা ভূমিকা গ্রহন করতে পারি ! শক্ত কথা বলার, শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার শক্তিই বা কোথায় যখন আমাদের খাদ্যমন্ত্রী মহাদয় মিয়ানমারে গিয়েছেন চাল আমদানির চুক্তি করতে !! আগে তো চাল কেনা তারপর না হয় মানবতার কথা বলা !!