আর্কাইভ

Archive for the ‘রাজনীতি’ Category

‘মার্কিন নির্বাচন, ক্যামব্রিজ অ্যানালেটিকা, ফেসবুক

aggregateiQ২০১৪ সালে একটি পারসোনালিটি কুইজের মাধ্যমে পাঁচ কোটি ফেইসবুক গ্রাহকের তথ্য হাতিয়ে ট্রাম্পের প্রচারণায় কাজে লাগায় কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা। এই ফেইসবুক গ্রাহকদের অধিকাংশই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা।

জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে তৈরি করা ‘রিপন’ নামে সফটওয়্যারটির মাধ্যমে ভোটার ডেটাবেইজ, নির্দিষ্ট ভোটারদের টানতে কর্মকৌশল, প্রচার কার্যক্রম, তহবিল সংগ্রহ এবং সমীক্ষা পরিচালনার কাজ করে ট্রাম্প শিবির।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বিভিন্ন তৎপরতায় কানাডার সফটওয়্যার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এগ্রিগেটআইকিউ (এআইকিউ) জড়িত ছিল বলে অভিযোগ করেছেন ক্যামব্রিজ অ্যানালেটিকার সাবেক কর্মী ক্রিস্টোফার উইলি। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকানদের ভোট দিতে পারে এমন ভোটারদের খুঁজে বের করতে ‘রিপন’ নামে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করেছে। এতে বেহাত হওয়া ফেসবুকের তথ্যকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের তালিকা করা, বিশেষ ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রচারণা চালানো, অর্থ সংগ্রহের কাজ  ও জরিপ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এআইকিউ ও কেমব্রিজ অ্যানালেটিকা উভয় প্রতিষ্ঠানই উইলির দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

যুক্তরাজ্য সরকারের ডিজিটাল, কালচার, মিডিয়া অ্যান্ড স্পোর্ট কমিটির কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে ক্রিস্টোফার উইলি বলেছেন, ‘‘রিপন’ সফটওয়্যারটি যে এআইকিউ বানিয়েছে তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তাদের তৈরি অ্যালগোরিদম ব্যবহার করেই ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বেহাত হওয়া তথ্য কাজে লাগানো হয়েছে।’ খবরে আরও বলা হয়, ১৮৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রিপন শহরে রিপাবলিকান পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক শহরটির নামের সঙ্গে মিলিয়ে ভোটার প্রভাবিত করার সফটওয়্যারের নাম রাখা হয়েছিল ‘রিপন’। ওই সফটওয়ারটি ভোটারদের তালিকা করা, বিশেষ ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রচারণা চালানো, অর্থ সংগ্রহের কাজ  ও জরিপ করার জন্য ব্যবহৃত হত।

ফেসবুক স্ক্যান্ডাল কী বার্তা দিলো?

Facebook-2

ওসামা আল-শরীফ : ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ তথ্যবিষয়ক একটি কোম্পানিকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার বিষয় ফাঁস হওয়ার পরই এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, এসব তথ্য পরবর্তীকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্যের বের হয়ে যাওয়া বা ব্রেক্সিট-বিষয়ক গণভোটে সাধারণ মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করতে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়ে হস্তক্ষেপই শুধু নয়, বরং বিরক্তিকরভাবে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা। এমন প্রক্রিয়ায় তথ্য ফাঁস বন্ধ করা না গেলে এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।

উইকিলিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ একসময় ফেসবুককে বলেছিলেন ইতিহাসের ‘সবচেয়ে মনোযোগ আকর্ষণকারী নজরদারি যন্ত্র’। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতি মাসে ২.২ বিলিয়ন ব্যবহারকারী ফেসবুকে সক্রিয় থাকেন, এ তথ্য জানার পর যে-কেউ অ্যাসাঞ্জের এই মন্তব্যকে স্বাগত জানাতে পারেন।

ফেসবুকের বিরুদ্ধে আরো একটি অভিযোগ, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ এর ব্যবহারকারীদের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে, ফোনকল পর্যবেক্ষণ করে এবং অতীত ফোনকলের বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে। স্পষ্টভাবেই বলা যায়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের এমন নজির শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য প্ল্যাটফরমও ব্যবহারকারীর তথ্য অন্যায়ভাবে সংগ্রহ করে, অনুসরণ করে এবং বিক্রিও করে। এমন তথ্য এখন প্রকাশ্য গোপনীয় ব্যাপার। তবে এটা প্রমাণিত যে, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা নামে একটি প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ করেছে এবং ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় তা ব্যবহার করা হয়েছে।

নতুন এই তথ্য আসলে হিমবাহের চূড়া। বিগত বছরজুড়েই বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে যাচ্ছিলেন যে, গুগলের মতো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের অনুমতি দিচ্ছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- এই কোম্পানিগুলো ইন্টারনেটে সংবাদ, মতামত বা যেকোনো ঘটনাকেন্দ্রিক প্রচারণার তথ্য একান্ত নিজের মতো করে ব্যবহার করতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার মতো বিষয় বিবেচনায় নিলেই বোঝা যায়, এসব প্ল্যাটফরম কিভাবে মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করে চলেছে। আমরা কেবল ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মিথ্যা সংবাদ বা তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার ভূমিকার বিষয়টি জানা শুরু করেছি। ব্রেক্সিট-বিষয়ক গণভোটে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা মানুষকে কতটা প্রভাবিত করেছে, সে বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।

এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না যে, সরকারই সম্ভবত নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যে হস্তক্ষেপের অনুমোদন দিচ্ছে এবং এটি এক ধরনের ‘বড়ভাই’সুলভ আচরণ যা সব জায়গায় সব সময়ই দেখা যায়। আমাদের ডিজিটাল-ব্যবস্থার যে অগ্রযাত্রা ভঙ্গ করা সম্ভব নয় এবং প্রযুক্তিই সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দিতে বাধ্য করছে। কিন্তু বিশ্বজুড়েই গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য চিন্তার বিষয় হলো- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার এমন লঙ্ঘন গণতন্ত্রের ওপর চরম আঘাত হানতে পারে।

একটি বিষয় লক্ষণীয়, ভার্চুয়াল জগতে ব্যবহারকারীদের প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হয় এমন ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির মধ্যে ফেসবুকের বিষয়টি সর্বশেষ। সরকার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীরাও রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ও অন্যান্য স্পর্শকাতর তথ্য নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকির মধ্যে আছে। এমন আশা করাটাই সঙ্গত হবে যে, এ ক্ষেত্রে হ্যাকার বা শত্রুদেশ থেকে নিজেদের বাঁচাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোই একটা পরিকল্পনা বা নীতি গ্রহণ করবে।

আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি ঘটনাই ডিজিটাল মাধ্যমে চলে যাচ্ছে। তাহলে ব্যক্তিগত তথ্য কিভাবে নিরাপদে সংরক্ষিত হবে, তা নিয়ে যে-কেউ ভেবে অবাক হতেই পারে। ফেসবুকের তথ্য নিতে যেখানে অনুমোদন দেয়া হয় কিংবা অন্য তথ্য যেখানে চুরি হয়ে যায়, সেখানে এ বিষয় তো অবশ্যই দুশ্চিন্তারই যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার করতে পারে।

একইভাবে মজার ব্যাপার হলো, ফেসবুক স্ক্যান্ডালের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া আরব অঞ্চলে নেই বললেই চলে। ঝুঁকি থাকলেও ব্যবহারকারীরা ফেসবুক ছাড়তে চান না বলেই মনে হয়। সহজেই অনুমেয়, বেশির ভাগ আরব দেশেই এমন আসক্তিকে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় উল্লেখ করা যায় এভাবে- ‘যেখানে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ সবচেয়ে কম, সেখানেই ফেসবুক টুইটারে আসক্তি তত বেশি’।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এসব প্ল্যাটফর্ম জনগণকে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ নেয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করে। যেহেতু গতানুগতিক গণমাধ্যমগুলো তাদের জন্য সীমাবদ্ধ, তাই মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েন। এখানে তারা তাদের মতো প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এর মানে এই নয় যে, মানুষ অনলাইনে তাদের মতামত প্রকাশের জন্য দায়ী হবেন না। বরং আমরা দেখি, বিভিন্ন দেশের সরকার ইন্টারনেটে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও কার্যক্রম চালানো সীমাবদ্ধ করতে সাইবার অপরাধ আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

ফেসবুকের এ ঘটনা থেকে ব্যক্তি, সরকার ও সংস্থাগুলোকে শিক্ষা নিতে হবে, ডিজিটাল দুনিয়া আমাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে নানাভাবে। কিন্তু এই বিষয়টি আমাদের কাছে বিলাসিতাই মনে হয়, এমনকি এখানে মানুষের অধিকারকেই জবাবদিহিতা আর চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

 

Advertisements

সিরিয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের বিমান হামলা এবং কিছু কথা

syria missile attack 2018 3মোহাম্মদ আবদুল গফুর :  সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাম্মামে সউদী আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সমাপনী কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনের কল্যাণে আমরা তা জানতে পেরেছি। এর প্রায় কাছাকাছি সময়ে আমরা আরও একটা সামরিক বাহিনী সংক্রান্ত খবরে জানতে পেরেছি। সিরিয়ায় যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের তিনটি নেতৃস্থানীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। একটি মুসলিম দেশ সিরিয়ায় হামলা চালায় তিনটি নেতৃস্থানীয় খৃস্টান দেশ এমন এক সময়ে যখন সিরিয়ার কাছাকাছি সৌদী আরবে সামরিক কুচকাওয়াজ চলে অথচ ওই হামলার কোন প্রতিবাদ হয় না। এর অর্থ যে মুসলিম বিশ্বের চরম অনৈক্য তা নতুন করে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।
সিরিয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের তিনটি নেতৃস্থানীয় দেশ যে যৌথ সামরিক হামলা চালায় সে হামলার লক্ষ্য ছিল দেশটির তিনটি স্থাপনা। এর একটি ছিল সিরিয়ার বিজ্ঞান গবেষণাগার। গত শুক্রবার পরিচালিত এই যৌথ হামলাকারীদের বক্তব্য ছিল এটি নাকি ছিল রাসায়নিক অস্ত্রাগার। এই হামলায় বিমান থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। রাশিয়া অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবী করলেও যুক্তরাষ্ট্র সে দাবী নাকচ করে দিয়েছে। সিরিয়া বলেছে হামলার লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবী তিনটি লক্ষ্যেই আঘাত সফল হয়েছে। হামলা প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল অবশ্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে। এদিকে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র প্রকল্প বন্ধ করতে জাতিসংঘে নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব সবাইকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে সিরিয়া সরকার দৌমায় রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে এই অভিযোগে পশ্চিমা বিশ্বের দেশ তিনটি এই হামলা চালায়। এর আগে একই ধরনের অভিযোগ ইরাকসহ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে এনে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। পরে সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। খবর বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স ও ডেইলী মেইল।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় সিরিয়ার তিনটি স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান থেকে অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার দুটি মিত্র দেশ। এবার যে হামলা চালানো হয়েছে সেটি এক বছর আগের হামলার চেয়েও ছিল শক্তিশালী। সেবার যুক্তরাষ্ট্র একাই ছিল, এবার সিরিয়ার তিনটি স্থাপনা লক্ষ্য করে যে হামলা চালানো হয়, তাতে তার সঙ্গে ছিল আরো দুটি মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। আগেরবার হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল একটি, আর এবার অন্তত তিনটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হামলার লক্ষ্য সফল হয়েছে বলে দাবী করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন সিরিয়া সরকার যদি ফের রাসায়নিক হামলা চালায় তা হলে আমরাও ফের হামলা চালাতে প্রস্তুত। তবে তার সফলতার দাবী নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে খোদ দেশটিতে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ায় সাবেক ওবামা প্রশাসনের সমালোচনা করেছে। যেসব স্থানে হামলা চালানো হয়েছে তার একটি মানচিত্রও প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সিরিয়ার দামেস্কের বারর্জেই রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, হোমসের পশ্চিমে হিমশিন জের রাসায়নিক অস্ত্র বাঙ্কার হামলার লক্ষ্য ছিল। এছাড়া কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়। সিরিয়ানরা বলছে, হামলা চালালেও কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিন দেশ মিলে ১০৫টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের মুখপাত্র ডানা বলেছেন প্রত্যেকটি হামলা সফল হয়েছে। হোমস শহরের দুটি স্থাপনার চিত্র স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তুলেছে ডিজিটানপ্পোর নামের একটি কোম্পানী। হামলার আগে শুক্রবার এবং হামলার পর শনিবারের ছবি প্রকাশ করেছে কোম্পানীটি। এতে দেখা যায় দু’টি স্থাপনাই ধ্বংস হয়ে গেছে। দামেস্কের বারজেহ রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে হামলা সম্পর্কে প্লানেট ডটকম জানিয়েছে, তাদের তোলা ছবিতে গবেষণা কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক মার্ক ওয়েনার জানান, হামলার পক্ষে দেশ তিনটি যেসব যুক্তি দেখাচ্ছে, তাতে প্রধানত জোর দেওয়া হচ্ছে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার উপর। তারা বলছে এই হামলার লক্ষ্য প্রেসিডেন্ট আসাদের বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে এরকম রাসায়নিক হামলা প্রতিরোধ করা। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছেন, এটা যুক্তরাজ্য করেছে তাদের নিজেদের জাতীয় স্বার্থ এবং সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থে। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে বিচার করলে এসব যুক্তি কিন্তু বিশ্বকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় জাতিসংঘ সনদ গৃহীত হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে।
জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী কোন দেশ আত্মরক্ষার্থে এবং কোন জনগোষ্ঠী, যারা নির্মূল হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে তাদের রক্ষায় সামরিক বল প্রয়োগ করতে পারে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং শৃংখলা বজায় রাখার মত বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনেও বল প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটা হতে হবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে। ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ সনদ পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিশোধ হিসাবে সামরিক বল প্রয়োগ বা কোন দেশকে শিক্ষা দেয়ার জন্য সামরিক হামলা করা যায় না।
১৯৮১ সালে ইসরাইল যখন ইরাকের পারমাণবিক চুন্নিতে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করে দেয়, তখন কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ তার নিন্দা করেছিল। কেনিয়া এবং তানজানিয়ার মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলার জবাবে ১৯৯৮ সালে সুদানের-এক কথিত রাসায়নিক অস্ত্র কারখানায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়। সেটারও নিন্দা করেছিল জাতিসংঘ। তিন দেশের যুক্তি যে রাসায়নিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে সিরিয়াকে বাধ্য করতে তারা এই হামলা চালিয়েছে। ২০১৩ সালে সিরিয়া রাসায়নিক অস্ত্র নিরোধ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদে সই করলেও তা মানছেনা।
গত ৭ এপ্রিল দৌমায় রাসায়নিক হামলা হয় বলে অভিযোগ পশ্চিমা বিশ্বের। এতে ৭০ জনের বেশী নিহত হয়েছিল। সিরিয়ার অরর্গানাইজেশন ফর দ্যা প্রহিবিশান অব ক্যামিকেল উইপন্স তদন্ত করার আগেই হামলা চালানো হয়। হামলার তদন্ত নিয়ে রাশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের তিন সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স যুক্তি দিচ্ছে যে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়ার কোন বাস্তব সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে তারা আন্তর্জাতিক শৃংখলা বজায় রাখার কাজটি করেছেন। কিন্তু এই যুক্তিটি যেন ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের যুক্তিটিকেই মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তরিও জতেরেস মনে করে দিয়েছেন নিরাপত্তা পরিষদের মূল ভূমিকাকে সবার শ্রদ্ধা জানাতে হবে।
হামলার বৈধতা নিয়ে যুক্তরাজ্যেও প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরোবি করবিন এই প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, হামলায় অংশ নেয়ার আগে পার্লামেন্টের অনুমোদন নেয়নি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের সরকার। প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুজুগে হামলায় অংশ নেবেন কেন, প্রশ্ন রেখেছেন তিনি। অন্যদিকে সিরিয়া সরকার যাতে রাসায়নিক অস্ত্র প্রকল্প বন্ধ করে তা কার্যকর করতে নিরাপত্তা পরিষদে নতুন প্রস্তাব আনছে ফ্রান্স। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এতে সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছে।
উপরে যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে তার উপসংহার টানতে এবার আমরা সমগ্র বিশ্বের সর্বশেষ পরিস্থিতির দিকে তাকাবো। সুক্ষ্ণ পর্যালোচনা করতে গেলে আমরা দেখি, আজকের বিশ্ব যেন সর্বত্রই বিশ্বশান্তির, মানবতার অবমূল্যায়নের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। আমরা যে মানুষ এবং সৃষ্টির সেরা হিসাবে আমাদের প্রধান কর্তব্য যে মানবতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া, তা যেন আমরা ভুলেই যেতে বসেছি। জোর যার মুল্লুক তারÑএই অমানবিক নীতিকে অবলম্বন করে পশ্চিমা বিশ্ব আজ মানবসমাজকে কোথায় টেনে নামিয়েছে। সেটার দিকে যদি আমরা তাকাই তা হলে দেখবো, মানবতা, মানবকল্যাণ, বিশ্বশান্তি এগুলো যেন আমরা ভুলেই গেছি। এই দু:খজনক অবস্থা থেকে আমরা যতদ্রুত মুক্তি পাই ততই আমাদের সবার জন্য মঙ্গল। সিরিয়ার সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির দৃষ্টান্ত থেকে আমরা যত দ্রুত ধ্বংস ও অকল্যাণে পথ পরিহার করে মানবতার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।

সিরিয়াতে মার্কিন ব্রিটেন ফ্রান্সের হামলা

syria attack schematic 2018শনিবার, সিরিয়ার দামেস্কে তখন ভোর ৪টা। টিভিতে সম্প্রচার শুরু হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণ। তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে আমি যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীকে সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের রাসায়নিক অস্ত্রের স্থাপনাগুলোয় আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছি। সিরিয়ায় বর্বরতার বিরুদ্ধে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একযোগে চালানো এই প্রতিক্রিয়া আমাদের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষমতাকে সংহত করবে। দানব আসাদের সমর্থক রাশিয়া ও ইরানকে নতুন করে ভাবাবে।’ এ ভাষণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের বারজাহ শহর তীব্র শব্দ ও ধোঁয়ায় কেঁপে ওঠে। মাত্র আট মিনিটের এ ভাষণের মধ্যেই অন্তত ছয়টি বিকট শব্দের বিস্ফোরণ হয়। ভাষণ শেষ হলেও থামেনি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। প্রায় ৭০ মিনিট ধরে চলেছে আকাশপথের এ হামলা। এতে শুধু সিরিয়াই কেঁপে ওঠেনি, কেঁপে উঠেছে পুরো বিশ্ব। কারণ পরাশক্তিগুলোর মুখোমুখি অবস্থানের কারণে কয়েক দিন ধরেই বিশ্বজুড়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে। সবাই শঙ্কিত, এগুলো কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিক্ষেপ করা প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র। ঘটনার পর ৪৮ ঘণ্টা কেটে গেলেও দূর হয়নি শঙ্কা। রাশিয়ার পাল্টা হুমকি বরং বাড়িয়েছে উদ্বেগ। খবর ছড়িয়েছে, মস্কো সরকারের বরাত দিয়ে রাশিয়ার সরকারি গণমাধ্যম নাগরিকদের খাবার মজুদ রাখার পরামর্শ দিয়েছে। তাহলে, সত্যিই কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়াচ্ছে বিশ্ব?

FUKUS attack of syria 2018

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স বলছে, সিরিয়া সরকারের ‘রাসায়নিক অস্ত্রের স্থাপনার’ বেশ কয়েকটিতে তাদের বিমান ও নৌবাহিনী কার্যকর হামলা চালিয়েছে। তারা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ১০৫টি। রাশিয়া মনে করছে, রাসায়নিক হামলা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সিরীয় সশস্ত্র বাহিনীর সফলতার কারণেই তাদের ওপর এ হামলা চালানো হয়েছে। মোট ১০৩টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের তথ্য নিশ্চিত করে ৭১টিকে গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছে রাশিয়া। দুই মিত্র যে দাবিই করুক, হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ৪০ জন এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। সন্তুষ্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রয়োজনে আরও হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান, জর্দান, বলিভিয়া এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। রাশিয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে,এ হামলার বদলা নেওয়া হবে। ক্ষিপ্ত রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিন্দা প্রস্তাবও আনে। তবে তার পক্ষে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে বলিভিয়া ও চীন ছাড়া আর কেউ ভোট দেয়নি। ফলে রাশিয়ার প্রস্তাবটি খারিজ হয়ে গেছে। কিন্তু দমেনি রাশিয়া।

syria attack protest LA 2018

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ হামলা চালায়। হামলায় অংশ নেয় চারটি ব্রিটিশ টর্নেডো ফাইটার জেট। এসব যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া হয় আটটি স্টর্ম শ্যাডো ক্রুজ মিসাইল। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, এ হামলায় টাইফুন ফাইটার জেটও ব্যবহার করা হয়েছে। সাইপ্রাসের রয়েল এয়ারফোর্স ঘাঁটি আকরোতিরি থেকে সিরিয়ার হোমসে রাসায়নিক অস্ত্রের ভাণ্ডার লক্ষ্য করে এসব বিমান উড়ে যায়।

এছাড়া সিরিয়া মিশনে অংশ নিয়েছে ফ্রান্সের রাফেল ফাইটার জেট। ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লে জানান, তাদের বিভিন্ন বিমান ঘাঁটি থেকে বিমানগুলো উড়ে গেছে। ব্রিটিশ টর্নেডোর মতো এ রাফেল বিমানগুলোও দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট। এগুলোতেও স্টর্ম শ্যাডো মিসাইল সংযুক্ত থাকেযা ২৫০ মাইলের বেশি উড়তে সক্ষম। এর অর্থ এই বিমানগুলোও সিরিয়ার আকাশসীমায় না পৌঁছেই দেশটিতে হামলা চালাতে সক্ষম। ফরাসি মিরেজ জেটও হামলায় অংশ নেয়। সব মিলিয়ে ফ্রান্সের যুদ্ধবিমানগুলো নয়টি মিসাইল ছুড়েছে।

সিরিয়া হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনী দুটি বি-১ বোমার ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। চার ইঞ্জিনবিশিষ্ট বি-১ ১৯টি জেএএসএসএম ক্রুজ মিসাইল ছুড়েছে। যেগুলো ৪৫০ কেজি ওয়ারহেড বহনে সক্ষম এবং এটি ৩৭০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের লক্ষ্যমাত্রায় আঘাত হানতে পারে।

পেন্টাগন আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি সাবমেরিন সিরিয়া হামলায় অংশ নেয়। লোহিত সাগর থেকে স্থলে টমাহক ক্রুজ মিসাইল ছোড়া হয় ৩০টি। এ ছাড়া ইউএসএস লাবুন ছোড়া হয় সাতটি। এর মধ্যে ইউএসএস হিগিনস ২৩টি টমাহক ছোড়ে উত্তর আরব সাগর থেকে।

পেন্টাগনে এক ব্রিফিংয়ে জেনারেল জোসেফ ডানফোর্ড বলেন,তিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। এগুলো হলো দামেস্কের বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার,হোমসে একটি রাসায়নিক অস্ত্রভাণ্ডার ও হোমসের পাশেই আরেক অস্ত্রভাণ্ডার।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছেন,যুক্তরাষ্ট্রের ছোড়া বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সিরিয়ার বিমানবাহিনী। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী কোনো ধরনের সাহায্য করেনি দাবি করেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সিরীয় সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি বিমান ঘাঁটি, শিল্প ও গবেষণা স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০৩টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন তারা। সিরিয়ার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ৭১টি ক্ষেপণাস্ত্রকে পথভ্রষ্ট বা আকাশেই আটকে দিয়েছে।

S-400 air defence missile system

রুশ সেনাবাহিনীর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। দামেস্কের পূর্বে জামরাইয়া বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া হয় ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র, সেগুলোর সবকটি গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। রাজধানীর দক্ষিণের মারজ রুহাইল বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। হোমসের শাইরাত বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া হয় ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র। সেগুলোও ভূপাতিত করা হয়। মেজেহ সামরিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ছোড়া নয়টির মধ্যে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। হোমসের বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্রের ১৩টিই ভূ-পাতিত করা হয়েছে। রুশ সেনা কর্মকর্তা রুডসকি বলেন, সিরিয়ার বারজেহ ও জারামানায় কথিত রাসায়নিক অস্ত্রের কর্মসূচি লক্ষ্য করে ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। সেগুলোর সাতটি ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ওই স্থাপনাগুলো আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উল্লসিত ট্রাম্প, ক্ষুব্ধ পুতিন : সিরিয়ায় হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইটারে বলেন, ‘মিশন সম্পন্ন’। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময়ও এই একই বাক্য ব্যবহার করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, যা তাকে একজন জেদি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পরিচিত করে তোলে। হামলার প্রশংসা করে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘অভিযানটি ছিল নিখুঁত। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের বিচক্ষণতার জন্য ধন্যবাদ। এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়া সম্ভব ছিল না।’

অন্যদিকে, সিরিয়ার সামরিক-বেসামরিক এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের বিমান হামলা জাতিসংঘের চুক্তি (ইউএন চার্টার) ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মার্কিন জোটের হামলার প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে পুতিন আরও বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের বিপক্ষে আগ্রাসন চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।’ তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সম্মিলিত হামলা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত নয়। এ হামলার মধ্য দিয়ে জাতিসংঘকে পাশ কাটানো হয়েছে। বিবৃতিতে পুতিন আরও দাবি করেন, সিরিয়া সংকটের এ সময়ে এমন হামলা আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাবে। এ হামলার পর সিরিয়া থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ছোটা শরণার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে।

stand-off missile

পক্ষে-বিপক্ষে বিশ্ব : সিরিয়ায় আর কোনো সামরিক অভিযানে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিলেও জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য হিসেবে মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে সমর্থন দিয়েছে জার্মানি। জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল বলেন, ভবিষ্যতে রাসায়নিক হামলার ব্যাপারে সিরিয়া সরকারকে সতর্ক করতে এ হামলার প্রয়োজন ছিল।

তবে সিরিয়ার হামলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতিতে বলা হয়, সিরিয়ার হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খোমেনি বলেন, এ হামলা অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এ অপরাধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের আমি পরিষ্কারভাবে অপরাধী বলছি।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাষ্ট্র জর্দান এ হামলাটাকে খুবই বিপজ্জনক আগ্রাসন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। জর্দানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়,এর মাধ্যমে সিরিয়ার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আরও নষ্ট হবে। ফলে এ অঞ্চলে কোণঠাসা হয়ে পড়া সন্ত্রাসবাদীরা আবারও বিস্তারের সুযোগ পাবে।

syria attack korbyn protest

খবরে বলা হচ্ছে, যুক্তরাজ্য হামলায় অংশ নিলেও এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র সরকারের এ অভিযানের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন লেবার নেতারা। অন্যদিকে, মার্কিন রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের একটা বড় অংশ ট্রাম্পের বর্তমান কার্যকলাপের সমর্থন জানাচ্ছেন। তবে নীতিনির্ধারকদের আরেকটি দল সাত বছর ধরে চলা সিরিয়া যুদ্ধকে ‘মার্কিন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অভাব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই দ্বিতীয় দলেরই একজন রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন। মিসাইল হামলার পর একটি বিবৃতিতে তিনি জানান, কেবল আকাশপথে হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মিশনে সফল হওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য সিরিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার প্রস্তাব খারিজ : সিরিয়ার দৌমায় সরকারি বাহিনীর সন্দেহভাজন রাসায়নিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের একযোগে চালানো বিমান হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনা রাশিয়ার প্রস্তাব খারিজ হয়ে গেছে। শনিবার মস্কোর আনা এ নিন্দা প্রস্তাবের পক্ষে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে বলিভিয়া ও চীন ছাড়া আর কেউ ভোট দেয়নি। পেরু, কাজাখস্তান, ইথিওপিয়া ও একোয়াটোরিয়াল গিনি ভোটদানে বিরত ছিল। অপরদিকে তিন স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ আট সদস্য বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ার পর জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসেলি নেবেনজিয়া পরিষদের স্থায়ী তিন সদস্যের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন,‘যে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলেন,তার ফলের জন্য কেন আপনারা অপেক্ষা করলেন না। আসলে সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাল। তবে আমি আশাবাদী উত্তেজিত মাথাগুলো এক সময় ঠাণ্ডা হয়ে আসবে।’

অন্যদিকে, জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ জানিয়েছেন। নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি সিরিয়ার জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।

সিরিয়াকে বাদ রেখে বসেছে আরব লীগ : সিরিয়া নিয়ে বিশ্বনেতাদের দ্বন্দ্ব ও সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আরব লীগ নেতারা রবিবার রিয়াদে শীর্ষ সম্মেলনে বসছে। তবে এ সম্মেলনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ডাকা হয়নি। তাকে বাইরে রেখেই আরব লীগ নেতারা সিরিয়ার বিষয়ে আলোচনা করবেন। যদিও আরব লীগ থেকে সিরিয়া বহিষ্কৃত।

আরব লীগের ২২ দেশকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরব তার পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ইরানকে মোকাবিলা করতে চায়। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশ সিরিয়া ও ইয়েমেনে এক ধরনের যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এ ছাড়া উভয় দেশ ইরাক ও লেবাননে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে।

সিরিয়া হামলায় কাতারের সহযোগিতা ‘লজ্জাজনক’: দামেস্ক

‘আল-উদেইদ_ বিমানঘাঁটি কাতারসিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা- সানাকে বলেছেন, সিরিয়ায় হামলা চালানো পশ্চিমা জঙ্গিবিমানগুলো কাতারের ‘আল-উদেইদ’ বিমানঘাঁটি থেকে আকাশে উড্ডয়ন করেছে।

সিরিয়ার সূত্রটি বলেছে, কাতারের এই লজ্জাজনক অবস্থানে দামেস্ক মোটেও বিস্মিত হয়নি। কারণ, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে কাতার বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। এ ছাড়া, এসব জঙ্গি গোষ্ঠীকে সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সব রকম সহযোগিতা দিয়েছে দোহা।

আল-উদেইদ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সেনাঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ ঘাঁটিতে ব্রিটেনসহ আরো কিছু দেশের সেনাও মোতায়েন রয়েছে। আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইরাকে সামরিক অভিযান পরিচালনার কাজে আমেরিকা আল-উদেইদ সেনাঘাঁটি ব্যবহার করে।

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের নিকটবর্তী দুমা শহরে দেশটির সেনাবাহিনী গত ৭ এপ্রিল রাসায়নিক হামলা করেছিল বলে দাবি করে পশ্চিমা শক্তিগুলো। ওই হামলার প্রতিক্রিয়ায় শনিবার ভোররতে সিরিয়ার বিভিন্ন সামরিক অবস্থানে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালায় আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেন।

সিরিয়া সরকার দুমায় রাসায়নিক হামলা চালানোর দাবিকে ‘রাসায়নিক মিথ্যাচার’ বলে অভিহিত করে বলেছে, পূর্ব গৌতায় সেনাবাহিনীর অগ্রাভিযান প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে রাসায়নিক হামলার কল্পকাহিনী প্রচার করেছে সন্ত্রাসী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমা সরকারগুলো।

এছাড়া, রাশিয়া বলেছে, সিরিয়ার দুমা শহরে রাসায়নিক হামলা চালানোর কোনো প্রমাণ মস্কোর কাছে নেই। ওই কথিত ঘটনাকে পুঁজি করে সিরিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালানোর ব্যাপারে আমেরিকাসহ ইউরোপীয় দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল রাশিয়া।

erdogan supported bombing

পুতিন-শি জিনপিংয়ের পুনর্নির্বাচন

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী : ভ্লাদিমির পুতিন পুনরায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন আর শি জিনপিংপুনরায়নির্বাচিত হয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তাতে বিশ্বব্যবস্থা নতুন কোনও ঝুঁকির মুখে পড়লো না। দুইবারের অধিক কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না অনুরূপ বিধি কংগ্রেস রহিত করে দিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এতে শি’র দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট থাকার ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেল।

মাও চীনে কমিউনিস্ট আন্দোলনের শীর্ষ নেতা ছিলেন। তিনিই চিয়াং কাইশেককে বিতাড়িত করে চীনে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার চিন্তাচেতনার আলোকে চীন বহুদিন চলেছে। চৌ এন লাইরা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে কখনও মাওয়ের চিন্তার সঙ্গে বিরোধ করেননি। কিন্তু দেং জিয়াও পিং মাওয়ের সঙ্গে বহু বিষয়ে দ্বিমত করতেন এবং শেষ পর্যন্ত বিতাড়িতও হয়েছিলেন। তবে প্ররোচনার পরও মাও দেংকে হত্যা করেননি, জীবনে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। মাওয়ের জীবনকাল পর্যন্ত দেং নাকি তাস খেলে জীবন অতিবাহিত করেছেন।

‘বিড়াল কালো কী সাদা তা মুখ্য বিষয় নয়, ইঁদুর ধরে কিনা তাই মুখ্য’- এ উক্তি দেংয়ের। আর এ কথা বলে তিনি বিতর্কিত হয়েছিলেন। তাকে সংশোধনবাদী বলা হতো। মাও অনমনীয় (rigid) ছিলেন, কিন্তু দেং প্রয়োজনে নমনীয় (flexible) হতে দ্বিধা করার পক্ষে ছিলেন না। তিনি রিজিডিটিকে স্থবিরতার মূল বলে মনে করতেন, সুতরাং সব সময় দেং তা পরিত্যাগের পক্ষে ছিলেন।

মাওয়ের মৃত্যুর পর তিনি যখন ক্ষমতা পেলেন তখন চীনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো প্রতিষ্ঠা করলেন। আর এ অঞ্চলগুলোতে তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য পুঁজিপতিদের আহ্বান জানালেন। আমেরিকার পুঁজিপতিরা শ্রমিকের বেতন বাড়াবার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া সব কারখানা নিয়ে গেলেন চীনে, সস্তা শ্রমের জন্য। শুধু আমেরিকার পুঁজিপতিরা নয়, ইউরোপও এলো। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এলো, এমনকি তাইওয়ানের পুঁজিপতিরাও ভিড় জমালো।

তাইওয়ানের পুঁজিপতিদের অভয় দিয়েছিলেন দেং। আজকে চীনের চোখ ঝলসানো উন্নয়ন দেংয়ের চিন্তার ফসল। হার্ডওয়্যারে চীন উন্নত বিশ্বের শীর্ষস্থানে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাদের উন্নয়ন অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। গত কংগ্রেস পর্যন্ত মাও ও দেং-ই ছিলেন চীন বিপ্লবের পরে মুখ্য নেতৃত্ব। এবারের কংগ্রেস শি জিনপিংকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ তারই চিন্তাচেতনার ফসল, যা বিশ্বের তিনটি মহাদেশের ৬১টি দেশকে নৌপথে এবং স্থলপথে যুক্ত করবে।

শি গত কংগ্রেসে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড-এর জন্য এক ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা বলেছেন। এ প্রকল্প তিন মহাদেশের ৬১টি দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করবে, আবার ওই সব দেশেও চীনসহ প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে সহজভাবে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারবে। শি বলেছেন, কোনও দেশের বন্দর ব্যবস্থার সঙ্গে এ দীর্ঘপথের সংযোগ স্থাপন করতে গিয়ে যদি অতিরিক্ত কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হয় তবে চীন সেখানেও অর্থ জোগান দিতে সম্মত রয়েছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট বিশ্বব্যাংকের আদলে ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছেন। আবার অনেক দেশের সঙ্গে চীনা নিজস্ব মুদ্রার মাধ্যমে লেনদেনের চুক্তি করছেন। এটা আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের একক মুদ্রা ডলারকে প্রতিযোগিতায় ফেলারই কৌশল। শি’র এ কৌশলে ডলারের অবস্থান দুর্বল হবে।

সোভিয়েতের পতনের আগে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই প্রতিযোগী পরাশক্তি ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। কিন্তু সোভিয়েতের নেতৃবৃন্দ কখনও চীনের মতো আমেরিকার সঙ্গে আর্থিক প্রতিযাগিতার জন্য ব্রিকস ব্যাংক গঠন বা নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন করার কোনও উদ্যোগ কখনও নেয়নি। চীনের শি কিন্তু আমেরিকার মূল শক্তিকে দুর্বল করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মাঝে ছিল অস্ত্রের প্রতিযোগিতা। তাতে কে বড় কে ছোট তা নির্ণয় করা ছিল মুশকিল। চীন কিন্তু অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় এখনও বহু পিছিয়ে রয়েছে। এখন বিশাল সেনাবাহিনী থাকলে হয় না। আধুনিক অস্ত্রেরও প্রয়োজন হয়। বিশ্বে এখনও আমেরিকা অন্যতম বৃহত্তর নৌশক্তি। প্রশান্ত মহাসাগরে তার ৬০% শতাংশ নৌশক্তি নিয়োজিত রেখে চীনকে বিরাট হুমকির মুখে রেখেছে।

আমেরিকার নৌবাহিনীর রণতরীর সংখ্যা ৩৮০টি। এরমধ্যে ১০টি হচ্ছে বিমানবাহিনী রণতরী। বিশ্বে আর কারও কাছে এতো রণতরী সজ্জিত নৌবাহিনী নেই। সারা বিশ্বে রয়েছে আমেরিকার স্বয়ংসম্পূর্ণ অসংখ্য নৌঘাঁটি। শি জিনপিংও এখন বিশ্বের সর্বত্র নৌঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। আমেরিকা চীনকে হুমকিতে রাখার ঠিকাদারি দিয়েছিল ভারতকে। গত চার বছর ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার সে উচ্ছ্বাসে ভর করে চলার চেষ্টা করেছেন। সে কারণে ভারত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনেসিয়েটিভে যোগদান করেনি,বরং চীনের পাল্টা পূর্বমুখী নতুন একটা বাণিজ্য পথ খোলার ইনিসিয়েটভ নিয়েছিল।

গত ২২ ও ২৩ মার্চ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত আলাপ-আলোচনায় বুঝা যাচ্ছে, ভারত চীনের সঙ্গে যে প্রতিযোগিতার মুড নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল এখন তা থেকে বিরত হচ্ছে। ভারত চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে সমঝোতার অবস্থানে থাকলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অনেকটা নিরাপদ অবস্থানে থাকে।

রাশিয়ায় পুতিন পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০০ সাল থেকে কোনও না কোনও প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। রাশিয়ায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে। শত ত্রুটি বিচ্যুতির পরও তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথ বেয়ে চলার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা ধনবাদী গোষ্ঠী চীনকে মনে করেছিল সস্তা শ্রমের বাজার আর রাশিয়াকে মনে করেছিলো কুঁজু হয়ে যাওয়া এক শক্তি। রাশিয়া আর কখনও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু উভয় চিন্তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর বরিস ইয়েলৎসিন মুক্তবাজার সংস্কারের কথা বলে হার্ভাডে শিক্ষিত পন্ডিতদের পরামর্শ শুনে রাশিয়ার পুরো অর্থনীতিটাকে গুটি কয়েক লোকের কব্জায় দিয়ে দিয়েছিল। এদের একজন (Mikhail Khodorkovsky)গুরুত্বপূর্ণ সাইবেরিয়ায় তেল ক্ষেত্রগুলোর মালিক হয়েছিল। পুতিন তাকে জবাবদিহির মধ্যে আনার ২০০৩ সালে উদ্যোগ নিলে সে পশ্চিমা করপোরেট হাউসগুলোর কাছে তেল ক্ষেত্রগুলো বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদের ওপর পুতিন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পুতিনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের স্বার্থ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্রের প্রধান নৌঘাঁটি ক্রিমিয়া ইউক্রেনের ভাগে চলে গেলে রাশিয়া খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল। রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে এ নৌঘাঁটি ৪০ বছরের জন্য ভাড়া নিয়েছিল। যেহেতু ক্রিমিয়ায় অধিকাংশ লোক ছিল রাশিয়ান বংশোদ্ভূত,পুতিন তাদেরকে দিয়ে স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করাতে পেরেছিলেন। গণভোটে ক্রিমিয়া স্বাধীন হওয়ার পর তারা সিদ্ধান্ত নেয় রাশিয়ার সঙ্গে যোগদান করবে। পুতিন কৌশলী মানুষ। এখন রাশিয়া মেরুদণ্ড সোজা করে পুনরায় বিশ্বনেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা অর্জন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তার প্রমাণ দিয়েছে।

চীন ও রাশিয়া সহমত পোষণ করে বহু বিষয়ে ঐক্যমতের সঙ্গে চলছে। পশ্চিমা ধনবাদী গোষ্ঠীর চরম বেদনা এখানেই। আমেরিকার একক প্রাধান্য বিশ্বব্যবস্থায় একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখন সে অবস্থা আর নেই। বিশ্বব্যবস্থার জন্য এটিই উত্তম।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

যুদ্ধবাজদের রুখতে পারবে কি ইরান?

US-Iran-flagsইভান দানিলভ : জন বোল্টন ও মাইক পম্পিওর নতুন নিয়োগ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। ইরান অবশ্যই এ যুদ্ধের একটি লক্ষ্য। তবে ওয়াশিংটনের যুদ্ধবাজদের হতাশ করার জন্য ইরানের কিছু সামর্থ্য রয়েছে।

ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের মতে, হোয়াইট হাউসের নবনিযুক্ত নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিজেই এক ‘জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি’। জন বোল্টন উত্তর কোরিয়া ও ইরানে সরকার বদল করতে চান। এর জন্য যা যা করা দরকার, সবই তিনি করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাইকেল ফুকসের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘যুদ্ধকালীন প্রশাসন’ গোছাচ্ছেন। এটি অবশ্যই শঙ্কিত হওয়ার মতো বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তাঁর প্রশাসনে নব্য রক্ষণশীল যুদ্ধবাজদের অন্তর্ভুক্ত করছেন। তাঁরা অনেক বছর ধরে বা অনেক দশক ধরে সারা দুনিয়ায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে ওকালতি করে আসছেন। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র রাশিয়া ও চীন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, অন্তত এ মুহূর্তে। কিন্তু ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। জন বোল্টন পাঁড় ইরানবিরোধী। অনেক দিন ধরেই ইরানের পেছনে লেগে আছেন তিনি। ট্রাম্প কিম জং উনের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা ভাবছেন। ফলে ইরানই এখন বড় টার্গেট।

তেলআবিবে এক সম্মেলনে ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী শাওল মোফাজ জানান, জন বোল্টন তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে ইরানে হামলা চালানো ইসরায়েলের জন্য অবশ্যকর্তব্য। মোফাজের তথ্য বিবেচনায় রাখা দরকার। বোল্টনের মনোভাব বদলেছে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। কাজেই ইরানের ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা কী, তা আঁচ করা সম্ভব। প্রথমে ‘পরমাণু চুক্তি’ বাতিল হবে, পরে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপিত হবে, তার পরের ধাপে সামরিক হামলা বাস্তবতা হয়ে দেখা দেবে। মধ্যপ্রাচ্যে আরো একটি যুদ্ধ এড়ানোর একমাত্র কার্যকর উপায় হলো ওয়াশিংটনের জন্য ‘নো উইন’ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।

ইরানকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা না থাকে। তা না হলে তার অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে। বৈদেশিক সমর্থনে সরকার বদলের প্রক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। যদি রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালে রাজি না হয়, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। ওয়াশিংটনের যুদ্ধবাজরা এ বিষয়ে ওয়াকিফহাল। ফলে তারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়িত চীনা ও ইউরোপীয় কম্পানিগুলোকে টার্গেট করতে পারে। ইইউর একটি বিশেষ বিধি রয়েছে—বহির্দেশীয় নিষেধাজ্ঞা থেকে ইউরোপীয় কম্পানিগুলো রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যে জড়িত ইউরোপীয় কম্পানিগুলো রক্ষার জন্যই এ বিধি প্রণয়ন করা হয়।

ইরানের ক্ষেত্রেও এ বিধির প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য বেশ কাঠখড় পোড়াতে হবে। ইইউর সঙ্গে কূটনৈতিক দূতিয়ালি নিবিড়ভাবে করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ আরোপ করলে ইউরোপীয় কম্পানিগুলো ক্ষতির মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রকে যদি এ কাজ করতে দেওয়া হয়, তাহলে বারবার তারা ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য ক্ষতিকর কাজ করবে—এ কথা ইইউ নেতাদের বোঝাতে হবে। এ কথাও বোঝাতে হবে যে ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইউরোপীয় কম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে তেল বাণিজ্য করতে না দেয়, তাহলে আখেরে ইউরোপই সমস্যায় পড়বে, বেশি দামে অন্যের তেল কিনতে হবে তাদের।

আরেকটি ভালো উপায় হতে পারে কোনো শক্তিধর রাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন জোগাড় করা, যাতে ট্রাম্প ভাবিত হন। যেমন—তেল বাণিজ্যে ডলার হটানোর চীনা উদ্যোগে পূর্ণ সমর্থন দিতে পারে ইরান। পঁচিশ বছরের প্রস্তুতির পর সম্প্রতি ইউয়ানভিত্তিক চুক্তির ব্যবস্থা চালু করেছে চীন। এখন তার দরকার বিক্রেতা। ইরান যদি এগিয়ে আসে, তাহলে চীন ইরানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নৈতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়বে। চীনকে ‘পর্যবেক্ষক’ থেকে ‘সক্রিয় সহযোগী’তে পরিণত করতে পারলে নিজেকে রক্ষার কার্যকর উপায় পাবে ইরান। এটাও স্মরণে রাখতে হবে, এ প্রক্রিয়ার কারণে ওয়াশিংটনের যুদ্ধবাজরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে।

ধর্মীয় ও ভূ-রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিও করতে হবে ইরানকে। আংকারায় পুতিন ও এরদোয়ানের সঙ্গে রুহানির সাক্ষাৎ এ বিবেচনাপ্রসূত বলে ধরে নেওয়া যায়। সামরিক অভিযান চালানোর আগে যুক্তরাষ্ট্র ‘সম্মতির কোয়ালিশন’ গঠনের চেষ্টা করে থাকে। ইরাকের ক্ষেত্রে করেছে, ইরানের ক্ষেত্রেও করার চেষ্টা করবে। তুরস্ক ও ইইউ যদি সঙ্গে না থাকে, তাহলে মাঠে নামা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে। আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই ইরানকে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে হবে এবং রাশিয়া, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তুরস্কের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।

আগামী ১২ মে ইরানের পরমাণু চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ট্রাম্পকে। যুদ্ধবাজরা যেভাবে প্রশাসনে ভিড়েছে, তাতে কূটনৈতিক সমাধানের আশা নেই বলা যায়। যদি যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ অনিবার্য এবং ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা শুরু হতে পারে।

লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক

সূত্র : স্পুটিনক ইন্টারন্যাশনাল

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

ভিয়েতনাম থেকে যেভাবে পালিয়েছিল মার্কিনীরা

us fleeing from vietnam১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ প্রায় শেষের পথে। উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট বাহিনী দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গনের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে। তিন দিক থেকে তারা ঘিরে রেখেছে পুরো নগরী। অবশিষ্ট মার্কিন সেনাদের সায়গন ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হল।

ক্যাপ্টেন স্টু হেরিংটন এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারেন চল্লিশ বছর আগে ৩০ এপ্রিলের সেই দিনটির কথা। ‘আমরা আর মাত্র ছয়জন সেখানে আছি। মেরিন সেনাদের বাদ দিয়ে যারা তখনো দূতাবাসের দেয়ালগুলো পাহারা দিচ্ছে। তারপর আমি এক সময় দূতাবাস ভবনের ছাদের দিকে তাকালাম। দেখলাম,একটা হেলিকপ্টার সেখান থেকে উড়ে যাচ্ছে। তখন আমি ভাবলাম, আমারও কি ওই হেলিকপ্টারে পালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল?’

সায়গনের মার্কিন দূতাবাসে তখনো বহু মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায়। তাদের মধ্যে আছেন কয়েকশ দক্ষিণ ভিয়েতনামী,যারা মার্কিনীদের সহায়তা করেছে। কিন্তু এদের রেখেই নিজের পালানোর কথা ভাবতে হলো ক্যাপ্টেন স্টু হেরিংটনকে।

‘ভিয়েতনামে যে আমরা কত জীবন অপচয় করেছি,কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে বাধ্য হয়ে ভিয়েতনাম ছেড়ে পালাতে হচ্ছে। সেই মুহূর্তে অবশ্য এসব ভাবনা আমার মাথায় কাজ করছিল না। কারণ তখন আমরা পালানোর আয়োজন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। এসব ভাবনা ফিরে আসলো পরে। এই পুরো ভিয়েতনাম যুদ্ধের মানেটা কী দাঁড়ালো,কী ভীষণ ট্রাজিক এবং দুঃখজনক পুরো ব্যাপারটা,একেবারে শেষ মুহূর্তে সেই চিন্তা করছিলাম আমরা।’

ভিয়েতনাম যুদ্ধে উত্তরের কমিউনিস্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী যে পরাজিত হতে যাচ্ছে,সেটা এর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বুঝতে পারছিলেন ক্যাপ্টেন স্টু হেরিংটন। কমিউনিস্ট বাহিনী তখন সায়গনের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে। হাজার হাজার মানুষ পালাচ্ছে।

যদি সায়গনের পতন হয়,তাহলে মার্কিনীদের সহকর্মী ভিয়েতনামীদের ভাগ্যে কী ঘটবে, সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন স্টু হেরিংটন। কারণ যেসব ভিয়েতনামী মার্কিনীদের সহায়তা করেছে,তাদের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের নির্মম প্রতিশোধের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন।

সায়গনের মার্কিন দূতাবাসের কূটনীতিকরা তাদের প্রস্থানের যে পরিকল্পনা তৈরি করেছেন,সেখানে এই ভিয়েতনামীদের ব্যাপারে কী করা হবে, তার কোনো উল্লেখ নেই। স্বাভাবিকভাবেই স্টু হেরিংটন এবং সেনাবাহিনীর অন্য কর্মকর্তারা এদের ভাগ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন:

‘সে সময় ভিয়েতনামে আমাদের রাষ্ট্রদূত ছিলেন গ্রেয়াম মার্টিন। আর সবার মতো তিনিও কিন্ত তখন পর্যন্ত ঘটনার গুরুত্ব আর সেখান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়ার প্রয়োজন মোটেই বুঝতে পারছিলেন না বা বুঝলেও তা স্বীকার করতে চাইছিলেন না। ইভাকুয়েশন শব্দটা তখন কেউ ভুলেও উচ্চারণ করছে না। কারণ কূটনীতিকরা মনে করছিলেন,এ রকম উদ্ধার অভিযানের কথা ভাবা মানেই হচ্ছে নেতিবাচক চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়া। এ রকম চিন্তাকে মোটেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।’

‘আমি তখন আমার অধিনায়ককে বললাম,আমাদেরকেই এখন একটা নাটকীয় কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ দূতাবাসের লোকজনের যে পরিকল্পনা, সেটার ওপর আমরা নির্ভর করতে পারি না। সায়গনে শেষ দশ-বারো দিন সময় আমাদেরকে বার বার নিয়ম ভেঙে অনেক কিছু করতে হয়েছে। দূতাবাসের পেছন দিয়ে সবার অগোচরে কিভাবে দূতাবাসের ভিয়েতনামী কর্মীদের পাচার করা যায়,তার পথ খুঁজতে হয়েছে। কারণ আমরা মনে করেছি,এই ভিয়েতনামীদের প্রতি আমাদের একটা দায় আছে। দূতাবাসের যে পরিকল্পনা,সেখানে এই ভিয়েতনামীদের ব্যাপারে কী করা হবে,তার কোনো উল্লেখই ছিল না। আমরা সেটা হতে দিতে পারি না। তাই আমরা নিজেদের মতো করে এই পদক্ষেপ নিলাম।’

সায়গন থেকে সবাইকে আকাশপথে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা,তার সাংকেতিক নাম দেয়া হয়েছিল অপারেশন ফ্রিকোয়েন্ট উইন্ড। পেন্টাগন থেকে শেষ পর্যন্ত এই সংকেত এলো ২৯ এপ্রিল বিকেল বেলা।

‘দূতাবাসের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই প্রথম যে বিষয়টা আমার চোখে পড়ল,তা হলো সেখানে প্রচুর লোক। পুরো কম্পাউন্ড জুড়ে,প্রত্যেকটি বিল্ডিং এ,প্রত্যেকটি অফিসে গিজ গিজ করছে মানুষ। প্রায় আড়াই হাজার মানুষ,এদের বেশিরভাগই ভিয়েতনামী।’

পুরো মার্কিন দূতাবাস কম্পাউন্ড জুড়ে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। এর মধ্যে কিভাবে তারা উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা করলেন?

‘মার্কিন মেরিন বাহিনীকে অনেক চতুর কৌশল নিতে হয়েছে। গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে,গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাটাকে আমরা একটা ল্যান্ডিং জোনে রূপান্তরিত করেছি। ভিড় সামলানোর যত কায়দা-কৌশল,তার সব কিছু আমাদের অবলম্বন করতে হয়েছে। দূতাবাস কম্পাউন্ডের দেয়ালগুলো সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।’ 

মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস মিডওয়ে তখন ভিয়েতনামের উপকূলের দিকে ছুটছে। তবে এই জাহাজে তখন যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে বহন করা হচ্ছে অনেকগুলো হেলিকপ্টার। নৌবাহিনীর অফিসার ভার্ন জাম্পার ছিলেন সেই জাহাজে। 

‘আমেরিকার বিমানবাহী জাহাজ ‘ইউএসএস মিডওয়ে’থেকে যত হেলিকপ্টার উঠছিল আর নামছিল,সেগুলোর দায়িত্বে ছিলাম আমি। আমিই ছিলাম এই পুরো অপারেশনের কর্তা।’ 

সায়গন বিমানবন্দরের রানওয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা ছাড়া বিকল্প নেই। 

‘আমরা আমাদের এয়ারফোর্স ক্রুদের বললাম,তারা কেবল দিনের বেলাতেই বিমান নিয়ে উড়তে পারবে। রাতে বিমান চালানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই নিয়ম আমাদের ভাঙতে হয়েছিল। সূর্যাস্তের পর সারারাত ধরে এসব বিমানে লোক আনা হয়েছে।’ 

‘পার্কিং এরিয়াটা রাতে অন্ধকার থাকতো। তাই আমরা রাতে যেটা করতাম সেটার চারপাশে বৃত্তাকারে গাড়িগুলো পার্ক করতাম। যখন হেলিকপ্টার সেখানে নামতে আসতো,তখন আমরা গাড়িগুলোর হেডলাইট অন করে জায়গাটা আলোকিত করতাম। কিন্তু একটা পর্যায়ে গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেল। তখন আমরা দূতাবাসের ছাদে একটা স্লাইড প্রজেক্টার বসিয়ে সেটা চালু করলাম। আপনি হয়তো জানেন,একটা স্লাইড প্রজেক্টারের মধ্যে স্লাইড না থাকলে,সেখান থেকে কিন্তু বিরাট একটা চৌকোনা আলো বিচ্ছুরিত হয়। আমরা হেলিকপ্টার অবতরণের জায়গাটা এভাবেই আলোকিত করলাম। আমাদের ক্ষুদ্র দলটাকে তখন এ রকম বহু রকম অভিনব কৌশল নিতে হয়েছে।’ 

‘এত বেশি হেলিকপ্টার যাওয়া আসা করছিল যে,আমরা সেগুলো নামতে দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলাম। একটা পর্যায়ে আমি গুণে দেখেছি,আমাদের জাহাজ ঘিরে উড়ছিল ২১টি হেলিকপ্টার। এরা সবাই জাহাজে অবতরণের জন্য জায়গা খুঁজছিল।’ 

এর সবগুলোই যে মার্কিন বাহিনীর হেলিকপ্টার তা নয়। মার্কিনীদের দক্ষিণ ভিয়েতনামী সহযোগীরাও যে তখন যে যা পারছে তাতে চড়ে চড়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএসমিডওয়ের দিকে ছুটছিল,এটা কি সত্যি? 

‘হ্যাঁ,এটা সত্যি। অনেক হেলিকপ্টারের জ্বালানি প্রায় ফুরিয়ে আসছিল। যদি এর মধ্যে কোনো একটা জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে জাহাজের ডেকে বিধ্বস্ত হতো, তাহলে কিন্তু বহু লোক মারা যেতে পারতো। কিন্তু আমি আপনাকে বলতে পারি,একজন মানুষও মারা যায়নি। সেখানে অনেক ছোট বাচ্চা ছিল। এরা ফ্লাইট ডেকের ওপর দিয়ে ছোটাছুটি করছিল। কিন্তু তাদের সবাই অক্ষত ছিল। এটা আসলেই বিস্ময়কর এক ঘটনা।’ 

আকাশ পথে যখন হেলিকপ্টারগুলো উড়ে আসছে,তখন আরও হাজার হাজার মানুষ তীরে এসে ভিড় করেছে। এরা অনেকে জেলে নৌকায় চড়ে পর্যন্ত দক্ষিণ চীন সমূদ্রে নোঙ্গর করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজের দিকে যাচ্ছে। 

‘হেলিকপ্টার কিন্তু ভীষণভাবে কাঁপে এবং প্রচুর শব্দ তৈরি করে। যারা কোনোদিন হেলিকপ্টারে চড়েননি,তারা কিন্তু ভয় পাবেন। এই যে শত শত লোক হেলিকপ্টারে চড়ে আসছিল,তাদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল,তারা কতটা বিচলিত। এরা নিজেদের দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে,কিন্তু তারা জানে না,তাদের সামনে কী আছে।’

ইউএসএস মিডওয়ে যখন এ রকম পালিয়ে আসা মানুষে পরিপূর্ণ,তখন সেখানে হেলিকপ্টার অবতরণের মতো ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়লো। তখন জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে,এমন কিছু হেলিকপ্টার তাদের সমূদ্র ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলো।

‘অনেক হেলিকপ্টার আমাদের জাহাজ থেকে ঠেলে সমূদ্রে ফেলে দিতে হয়েছে। এর মধ্যে একটা ছিল চিনুক হেলিকপ্টার। যত হেলিকপ্টার আমরা সাগরে ফেলে দিয়েছিলাম,তার মূল্য হবে আনুমানিক ৭০ লাখ ডলার।’

‘না,আমাদের মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। আমাদের যেকোনো একটা এইচ ফিফটি থ্রি হেলিকপ্টারে গড়ে ৫০ জন লোক থাকে। আমরা তখন ভাবছি,একটা হেলিকপ্টারের মূল্য হচ্ছে ৫০টা মানুষের জীবন। কাজেই আমাদের কারও মনেই কোনো দ্বিধা ছিল না।’

৩০ এপ্রিল ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে এক নতুন নির্দেশ এসে পৌঁছাল। মার্কিন মেরিন কমান্ডোদের বলা হলো, ভিয়েতনামী সহকর্মীদের উদ্ধারের চেষ্টা বাদ দিয়ে তাদের এখন প্রত্যেক মার্কিন নাগরিককে নিয়ে সায়গন ছাড়তে হবে। মার্কিন দূতাবাসে তখনো ৪২০ জন ভিয়েতনামী উদ্ধারের অপেক্ষায়। তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে স্টু হেরিংটন সবাইকে ফেলে রওনা হলেন ছাদে অপেক্ষমাণ এক হেলিকপ্টারের দিকে:

‘আমি একটা অজুহাত খুঁজে বের করলাম। আমি বললাম, আমাকে প্রস্রাব করতে যেতে হবে। আমি দূতাবাস ভবনের ভেতরে ঢুকে ছাদে উঠলাম। সেখানে একটি হেলিকপ্টার ছিল। সেই হেলিকপ্টারেও ৫০ জনের মতো ভিয়েতনামীর জায়গা হতে পারতো। কিন্তু ভোর সাড়ে ৫টায় এটি আকাশে উড়ল আমিসহ পাঁচজনকে নিয়ে। তখনো ৪২০ জন ভিয়েতনামী দূতাবাসে উদ্ধারের অপেক্ষায় আছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক কূটনীতিকও সেখানে আছেন। এরা সবাই পার্কিং লটে অপেক্ষা করছে। কিন্তু তাদের রেখেই প্রায় শূন্য এক হেলিকপ্টারে আমরা সেখান থেকে চলে এলাম।’

সায়গনের ওপর দিয়ে যখন তাদের হেলিকপ্টার উড়ে যাচ্ছে,স্টু হেরিংটনের কাছে তখন স্পষ্ট হয়ে গেছে,ভিয়েতনাম যুদ্ধে তাদের চরম পরাজয় ঘটেছে। যুদ্ধে তার বহু সহকর্মীকে হারিয়েছেন। এখন ভিয়েতনামী সহকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে তাদের পালাতে হচ্ছে। তার সেই মুহূর্তের অনুভূতি কেমন ছিল? 

‘আমার নিজেকে অসুস্থ মনে হচ্ছিল। আমার মন এতটাই বিক্ষিপ্ত ছিল যে,আমার ভীষণ খারাপ লাগছিল। এই লোকগুলোকে আমি কথা দিয়েছিলাম,তাদের সবার ব্যবস্থা করে তারপর আমি দূতাবাস ছাড়ব। সারারাত ধরে বহুবার আমি তাদের এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কথা আমরা রাখিনি।’ 

ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওই শেষ কয়েকদিনে সাত হাজারের বেশি মানুষকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়েছিল সায়গন থেকে। সেদিন যারা এই উদ্ধার অভিযান চালিয়েছিলেন,তাদের বীরত্বগাঁথা কিন্তু ঢাকা পড়ে গেল মার্কিনীদের গ্লানিময় পরাজয়ের খবরের আড়ালে। সায়গনের মার্কিন দূতাবাস কম্পাউন্ড থেকে শেষ মার্কিন হেলিকপ্টার আকাশে উড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেটি দখল করে নিল কমিউনিস্ট বাহিনী। সেদিনই কমিউনিস্টরা সায়গনের নতুন নামকরণ করলো ‘হো চি মিন সিটি’।

‘তাদের রেখেই আমরা সেখান থেকে চলে এলাম। ওদের দেয়া কথা আমি যে রাখতে পারিনি,সেটা ছিল খুবই বেদনাদায়ক। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বিষাদময় ঘটনা।’

স্টু হেরিংটন এবং ভার্ন জাম্পার,দুজনেই মার্কিন সামরিক বাহিনীতে সফল ক্যারিয়ার শেষে অবসর নিয়েছেন। ভার্ন জাম্পার এখন সান ডিয়েগোতে ইউএসএস মিডওয়ে মিউজিয়ামে পর্যটকদের জন্য ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

‘বাম’ থেকে ‘রাম’ রাজনীতির পথে হাঁটছে পশ্চিমবঙ্গ?

riot assam 1ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বেশ কয়েকটি এলাকায় রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-সংঘর্ষ ঘটেছে গত সপ্তাহে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫ জনের, পুলিশ কর্মকর্তাসহ আহত হয়েছেন আরো অনেকে। ভাঙা হয়েছে বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বহু দোকান – বাড়িঘর।

কেন দাঙ্গা শুরু হল রামনবমীকে কেন্দ্র করে, তা নিয়ে উঠে আসছে নানা তত্ত্ব, যার মধ্যে একটা কথা সকলেই বলছেন – এর পিছনে ধর্ম নেই, রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই।

রামচন্দ্র- দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে রয়েছেন, বিশেষত উত্তর ভারতে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এটা নতুন।

পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প শহর আসানসোলে যেদিন রামনবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হল, সেই সময়ে সেখানে হাজির কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক যে ছবি তুলেছেন, তাতে দেখা গেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষ একদিকে রামনবমীর মিছিল নিয়ে যাচ্ছেন, মাঝখানে মাঠে হাতে-গোনা কয়েকজন পুলিশ কর্মী। আর অন্যদিকে জড়ো হয়েছেন প্রচুর সংখ্যায় মুসলমান ।

হঠাৎই শুরু হয় সংঘর্ষ। সেই সংঘর্ষের পরের অবস্থা নিজের চোখেই দেখেছিলাম পরের দিন দুপুরে।

যখন ওই এলাকায় পৌঁছলাম, চোখে পড়ছিল কোথাও জ্বলে যাওয়া দোকান, পুড়ে যাওয়া গাড়ির কঙ্কাল বা রাস্তার ধারে বাতি-স্তম্ভে ঝুলছে ভেঙ্গে দেওয়া ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা।

রেল-কর্মীদের আবাসনে একের পর এক কোয়ার্টার তালাবন্ধ। তবুও ছিলেন কয়েকজন নারী পুরুষ।

তারা অভিযোগ করছিলেন যে কীভাবে রামনবমীর মিছিলের ওপরে পাথর ছোঁড়া শুরু হয়। কেউ বর্ণনা দিচ্ছিলেন কীভাবে ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার পানের দোকান।

আসানসোলে সহিংসতার চিহ্ন

একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “বহু বছর তো আছেন এই এলাকায়। আগে কখনও এরকম সংঘর্ষ হয়েছে?”

উত্তরে তিনি বললেন, “আগে হয়তো ছোটখাটো অশান্তি হয়েছে, কিন্তু এত বড় দাঙ্গা হয় নি।”

জানতে চেয়েছিলাম, তাহলে এবার দাঙ্গা হওয়ার কারণ কি? জবাবে ওখানে হাজির ৪/৫ জন একসঙ্গেই বললেন, “এটা রাজনীতির ব্যাপার।”

ওই আবাসনের বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছিলেন কাছেই গড়ে তোলা একটা শিবিরে। তাদেরই কয়েকজন বলছিলেন, “আমার মিষ্টির দোকানটা লুট করে জ্বালিয়ে দিল। পাশাপাশি আরও দশ-বারোটা দোকান জ্বালিয়ে দিয়েছে। চার-পাঁচটা গাড়িও জ্বালিয়েছে। ভয়ে পালিয়ে এসেছি বাড়ি থেকে।”

ওই রেল কলোনি পেরিয়ে বেশ কিছুটা হেঁটে গিয়েছিলাম কুরেশী মহল্লায়। সেখানে নানা জায়গায় জটলা চোখে পড়ল।

হিন্দু প্রধান এলাকায় যেমন অনেকেরই অভিযোগের তীর মুসলমানদের দিকে, তেমন কুরেশী মহল্লায় শুনছিলাম পাল্টা অভিযোগ।

তাদের কথায়, “আমরা কোনদিন হিন্দুদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি নি। দুর্গাপুজোর সময়ে আমরা মুসলমানরা ওদের জল খাওয়ার ব্যবস্থা করি। এখানেও তো এতগুলো হিন্দু বাড়ি, দোকান আছে, জ্বালিয়েছি আমরা একটাও? ওরা কেন মিছিল থেকে আমাদের গালিগালাজ করতে থাকল?”

শিল্পাঞ্চল আসানসোল অথবা কয়লাখনি অঞ্চল রাণীগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা দেখা যায় নি।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভূমি চুরুলিয়ার খুব কাছের শহর আসানসোলের আনুষ্ঠানিক নামই সৌভ্রাতৃত্বের শহর। কিন্তু গত সপ্তাহের দাঙ্গার পরে সাধারণ মানুষও ভাবছেন যে কবে কীভাবে পাল্টে গেল তাদের চেনা শহরটা?

প্রশ্নটা রেখেছিলাম আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইউনাইটেড রিলিজিয়নস ইনিশিয়েটিভের ভারতের সমন্বয়ক ও আসানসোল লাগোয়া বর্ণপুরের বাসিন্দা বিশ্বদেব চক্রবর্তীর কাছে।

রামনবমী উৎসবে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের মিছিল

এটা আমাদের কাছেও খুব আশ্চর্যের। যেভাবে আমরা ছোট থেকে সবাই বড় হয়েছি, সবার সঙ্গে মেলামেশা করেছি, তাতে এই শহরে এরকম সাম্প্রদায়িক অশান্তি হওয়ার কথা নয়। তবে তৃণমূল স্তরে কাজ করতে গিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে টের পাচ্ছিলাম যে একটা কিছু দানা বাঁধছে। তবে বারুদের স্তূপটা যে এত তাড়াতাড়ি জ্বলে উঠবে, সেটা আন্দাজ করা যায় নি। এর জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতারা দায়ী – কোন ধর্মের মানুষের এতে কোন ভূমিকা নেই।”

তৃণমূল কংগ্রেসের শিল্পাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও আসানসোল শহরের মেয়র জিতেন্দ্র তেওয়ারী বলছিলেন গত সপ্তাহে যা ঘটেছে, তার পরেও শিল্পাঞ্চলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি অটুটই রয়েছে।

তার কথায়, “এত কিছুর পরেও বলব যে আসানসোলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রয়েছে। আপনি হিন্দু প্রধান এলাকায় গিয়ে দেখুন সেখানে যাতে মুসলমানরা নিরাপদে থাকেন, তার ব্যবস্থা করছে হিন্দুরা, আবার মুসলমান এলাকাতেও একই ঘটনা। তাহলে এটা তদন্ত করে দেখা দরকার যে রামনবমীকে কেন্দ্র করে অশান্তিটা বাইরে থেকে এসে কারা বাঁধাল?”

রামনবমীকে কেন্দ্র করে আগে কোন দিন শুনেছেন আসানসোল অথবা পশ্চিমবঙ্গের কোথাও সংখ্যালঘুদের ওপরে আক্রমণ হয়েছে, কারও মৃত্যু হয়েছে? চিরাচরিতভাবেই তো অস্ত্র নিয়ে মিছিল হয়। ওটা তো আমাদের পুজোর অঙ্গ – কাউকে আক্রমণ করার জন্য নয়। এবার হঠাৎ করে রাজ্য প্রশাসন এই অস্ত্র নিয়ে মিছিল করাকে কেন্দ্র করে এত বড় ইস্যু কেন তৈরি করল?” প্রশ্ন পশ্চিম বর্ধমান জেলা বিজেপির মুখপাত্র প্রশান্ত চক্রবর্তীর।

বাড়তি নিরাপত্তা

BJP election religion

গত সপ্তাহে দাঙ্গা যে শুধু আসানসোল শিল্পাঞ্চলে হয়েছে, তা নয়। পশ্চিমবঙ্গের নানা এলাকাতেই ছড়িয়ে পড়েছিল রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে সেই অশান্তি।

কলকাতায় বসে সেই সব ঘটনার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অধ্যাপক মীরাতুন নাহারের মনে হয়েছে, “একদিকে রয়েছে এমন একটি দল, যারা মুখোশ খুলে ফেলে একেবারে সরাসরি এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটানোর ব্যবস্থা করছে। ওই দলটি হিন্দু জাতি রক্ষার জন্য রামনবমীর মতো নানা ইস্যুতে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যা করার কাজে নিজেদের নিমগ্ন রেখেছে। এটাই তাদের যেন জাতীয় কর্তব্য। আবার অন্য একটি দল, যারা দেখাতে চায় যে এই রাজ্যের মুসলমানদের প্রতি তাদের সহানুভূতি আছে, এই বিষয়ে তারা কোন আপোষ করবে না। তার ফলে আবার অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা ধর্মান্ধ, গোঁড়া, তাদের ইন্ধন যোগানো হচ্ছে। এটা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না।”

মিসেস নাহার যে দল দুটির নাম না করে ঘটনাগুলির বিশ্লেষণ করছিলেন, সেই দুটি দলের নাম করেই বলছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের প্রধান মুহম্মদ কামরুজ্জামান।

সবটাই ক্ষমতা দখলের লড়াই। কিন্তু যেভাবে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়ই রামনবমীর মিছিল করল, সেটা বাংলার জন্য একটা অশুভ ইঙ্গিত। এ রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তো মমতা ব্যানার্জীর প্রশাসনের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রদর্শন করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কী করে মুসলিম এলাকাগুলোর মধ্যে দিয়ে ওই সব অস্ত্র হাতে মিছিল যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল? সেই প্রশ্নের জবাব আমরা পাচ্ছি না।”

অনেকেই অভিযোগ করছেন, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজেরাও রামনবমীর মিছিল করার মাধ্যমে সরাসরি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সক্রিয় হয়ে মস্ত ভুল করেছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস।

কথা বলেছিলাম রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিত ভট্টাচার্যের সঙ্গে।

বিজেপি যে হিন্দুত্বের রাজনীতি করতে চায়, তাকে মোকাবিলা করতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস যদি নরম হিন্দুত্বের পথে হাঁটেন, সেটা কিন্তু আগুনকে ডেকে আনা। সারা ভারতেই বিজেপি এই রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন, এটা তাদের চেনা মাঠ। সেই মাঠে কেন তৃণমূল খেলতে নামবে? রাজনৈতিক ভাবে বিজেপির বিরোধিতা করতে হলে তো তৃণমূল কংগ্রেসের উচিত ছিল নিজেদের চেনা রাজনীতির ময়দানে বিজেপিকে নিয়ে আসা। এই ভুল যদি তৃণমূল কংগ্রেস না শোধরায়, ওই আগুনে তারাও পুড়বে একদিন,” বলছিলেন বিশ্বজিত ভট্টাচার্য।

ram-politics

ধর্মভিত্তিক এই রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে নতুন হলেও কলকাতার চারুচন্দ্র কলেজের অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, রামকে কেন্দ্র করে রাজনীতি মোটেই ভারতে নতুন নয়। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও রাজনীতিতে রামকে নিয়ে এসেছেন একভাবে, আবার বিজেপিও পশ্চিমবঙ্গে শক্তি বাড়াতে আঁকড়ে ধরেছে সেই রামচন্দ্রকেই।

পশ্চিমবঙ্গে পায়ের তলার জমি শক্ত করতে বিজেপির কিছু ইস্যু দরকার। নানা বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতা করা বা বিরোধী রাজনীতিকে এখানে যেভাবে জায়গা দেওয়া হচ্ছে না বলে তারা মনে করছে, এগুলো তো আছেই। কিন্তু ভোট বাড়ানোর জন্য তাদের এর বাইরেও কিছু ইস্যু প্রয়োজন। সেরকমই একটা ইস্যু হচ্ছে রাম। কোন একসময়ে তিনি হয়তো শুধুই মহাকাব্যিক চরিত্র ছিলেন, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই রাম ভারতীয় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছেন। পশ্চিমবঙ্গেও গত কয়েক বছর ধরে যে আকারে রামনবমীর মিছিল দেখছি, তাতে এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে রাম এই রাজ্যেও রাজনীতিতে এসে পড়েছেন,” বলছিলেন অধ্যাপক নন্দ।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছে।

তবে রামনবমী এবং রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে যে দাঙ্গা, তার মধ্যেই হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির এক অনন্য নজির তৈরি করেছেন আসানসোল শহরেরই এক ইমাম।

ওই দাঙ্গার পরের দিন ১৬ বছর বয়সী ছেলের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার পরেও মুহম্মদ ইমদাদুল্লা রশিদী মাইক হাতে এলাকায় বলে বেরিয়েছেন যে তার ছেলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কেউ যেন দাঙ্গা না লাগায়।

ওই মহুয়াডাঙ্গাল এলাকায় দাঙ্গা ছড়ায় নি সেদিন।

ইমাম রশিদিকে যেমন সেলাম করছেন ওই এলাকার হিন্দু মুসলমান, তেমনই কবিতা বা গানের মধ্যে দিয়ে সেলাম জানিয়েছেন মন্দাক্রান্তা সেন আর কবীর সুমন।

দাঙ্গাবাজদের কাছেও সম্ভবত পৌঁছেছে ওই বার্তা। তাই আপাতত স্তিমিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ।

বিবিসি বাংলা