আর্কাইভ

Archive for the ‘রাজনীতি’ Category

কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হারি

mata_hari_1মাহমুদ ফেরদৌস :১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর। ভোর বেলা। প্যারিসের সেইন্ট-ল্যজারে কারাগারের অভ্যন্তরের একটি সেল থেকে জাগিয়ে তোলা হলো এক বন্দীকে। হাতে দেওয়া হলো কাগজ, কলম, দোয়াত কালি আর খাম। বলা হলো, চাইলে দু’ খানা চিঠি লিখতে পারেন তিনি। নিজের কালো মোজা, উঁচু হিলের জুতাজোড়া, পশম আর মখমলের তৈরি পোশাক গুছিয়ে নিলেন তিনি। তারপর কাগজে হিজিবিজি লিখে জমা দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আমি প্রস্তুত।’

কিছুক্ষণ পরই ধূসর রঙের একটি সামরিক যান বের হলো কারাগার থেকে। ছুটলো প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক পুরোনো বন্দরে। গাড়ির ভেতর দু’ জন সেবিকা ও নিজের আইনজীবীর সঙ্গে বসে আছেন ৪১ বছর বয়সী ওই গোলন্দাজ নারী। পা অবদি লম্বা কোট তার পরনে। মাথায় টুপি।

গন্তব্যস্থলে তিনি যখন পৌঁছালেন তখন সময় সবে সকাল সাড়ে ৫টার চেয়ে একটু বেশি। তাকে দাঁড় করানো হলো ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ১২ ফরাসি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন নিজের বন্দুক হাতে নিয়ে। চোখ বাঁধার জন্য সাদা কাপড় দেওয়া হলো তাকে। কিন্তু তিনি নিতে চাইলেন না। ‘এটা কি পরতেই হবে?’ পাল্টা প্রশ্ন করলেন।

যখন তার দিকে বন্দুক তাক করে সৈন্যরা, তখনও তাদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়েছিলেন তিনি। তার এক হাত বেঁধে ফেলা হয়। অপর হাতে তিনি নিজের আইনজীবীর দিকে হাত নাড়েন। পরমুহূর্তেই সৈন্যদের রাইফেল গর্জে উঠে। পায়ে লাগে গুলি। হাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এক কর্মকর্তা এগিয়ে এসে রিভলবার বের করে তার মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

অথচ, এক দশক আগেও, এই নারীর পায়ের তলায় ছিল ইউরোপের বহু রাজধানী। তিনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য এক ‘রূপসী’। ভিনদেশি নগ্ন নাচের আবেদনে কাবু করে রেখেছিলেন কতশত মন্ত্রী, জেনারেল আর শিল্পপতিদের। ঘটনার দু’ বছর আগেও দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল তার। প্যারিসে এক প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটান তো, পরেরদিন হেগ শহরে আরেক প্রেমিকের সঙ্গে। রীতিমত আন্তর্জাতিক ‘সেক্স সিম্বল’ তিনি। নামেমাত্র পোশাক পরে নাচতেন। প্যারিসে তার নগ্ন নাচের আসর ছিল যেন তৎকালীন ইউরোপিয়ান অভিজাতদের ছোটখাটো সম্মেলন। মাতা হারি- এই এক নামে তাকে দুনিয়া চিনতো।

কিন্তু, এরপরই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পাল্টে গেল তার চেনাজানা জগত। তিনি অবশ্য ভেবেছিলেন আগের মতোই ইউরোপের ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে বরং তাকে মৃত্যুদ- পেতে হলো। তার অপরাধ? জার্মানির পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করা। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জার্মান প্রভুদের কাছে সরবরাহ করা। লুফে নিল পত্রপত্রিকাগুলো। তাকে দায়ী করা হলো হাজার হাজার মিত্রপক্ষীয় সৈন্যর মৃত্যুর কারণ হিসেবে।

কিন্তু আজ শত বছর পর ফরাসি সরকার যেসব নথিপত্র অবমুক্ত করেছে, তাতে এক ভিন্ন চিত্রই ফুটে উঠে। তার মৃত্যুর এত বছর ধরে তার সঙ্গে লেগে ছিল ডাবল এজেন্ট হওয়ার কলঙ্ক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ছিলেন স্রেফ একজন বলির পাঠা।

তার আসল নাম কিন্তু মাতা হারি নয়। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭৬ সালে। বাবা-মা নাম রাখেন মার্গারেথা জেল্লে। মাতা হারি নামটা কেন বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়েও আছে চমকপ্রদ তত্ব। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায়, এই নামের অর্থ ‘দিনের চোখ,’ অর্থাৎ সূর্য। আবার হারি নামে এক হিন্দু দেবতাও আছেন। তার আগে মাতা শব্দটিও লাগিয়ে থাকতে পারেন। দুই তত্বেরই ভিত্তি আছে। নিজেকে অনেক সময় তিনি জাভানিজ (ইন্দোনেশিয়ার একটি অঞ্চল) প্রিন্সেস বলে পরিচয় দিতেন। কখনও আবার ভারতের মন্দির নর্তকির মেয়ে হিসেবে। কিন্তু কখনই তিনি বলতেন না, তার জন্ম আসলে নেদারল্যান্ডে।

আর নেদারল্যান্ডে তার জন্মস্থান লিউওয়ার্ডেনের ফ্রাইজল্যান্ড মিউজিয়ামে তাকে নিয়ে শনিবার থেকে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে তার বিচারের অনেক নথিপত্র অবমুক্ত করা হয়। তার ব্যক্তিগত ও পারবারিক কয়েকটি চিঠিও প্রকাশ হয়। সবই আছে প্রদর্শনীতে। এসব নথিপত্র একসাথে মেলালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত এই গুপ্তচরের আরও বহু পরিচয় আছে।

ফ্রাইজল্যান্ড জাদুঘরের কিউরেটর হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“আমরা আসলে তার জীবনটা বুঝতে চেয়েছি। একজন বিশাল তারকা হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে। একজন শিশু হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে যিনি শুধু নর্তকিই ছিলেন না, বা গুপ্তচরই ছিলেন না। আমরা চাই তার পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে।”

তার জীবন ছিল প্রচ- ঘটনাবহুল, আর মর্মান্তিক। জন্ম হয়েছিল বেশ ধনী এক পরিবারে। কিন্তু তিনি যখন কিশোরী, অকস্মাৎ ধনসম্পদ হারিয়ে সংসারধর্ম ত্যাগ করেন তার পিতা। একলা মায়ের কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে সেই মা-ও মারা যান। অগত্যা, আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় হয় তার। ১৮ বছর বয়সে গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রুডলফ জন ম্যাকলিওডের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এই লোকের বয়স ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ। তার সঙ্গেই গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে এক সামরিক ঘাঁটিতে ৪ বছর ছিলেন তিনি। তখনই জাভানিজ ভাষায় তার হাতে খড়ি।

mata-hari-2তাদের দাম্পত্য জীবনকে ঝঞ্ঝাটময় বললে কম বলা হয়। প্রতিনিয়ত তিনি অকথ্য নির্যাতন সইতেন স্বামীর কাছ থেকে। নিজের ৩ বছর বয়সী ছেলেটাকে মারা যেতে দেখেন তিনি। সম্ভবত, গৃহকর্মীর দেওয়া বিষের কারণে। পরে এক মেয়ে হয় তার। ৪ বছর পর হল্যান্ডে ফিরলে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান মার্গারেথা (তার আসল নাম)। কিন্তু মেয়ের খরচ বহন করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে তিনি চলে যান প্যারিসে। মেয়েকে রেখে যান স্বামীর কাছে। নিজের এই মেয়েকে তিনি সবসময়ই মিস করতেন।

পরে প্যারিস থেকে নিজের প্রাক্তন স্বামীর এক কাজিনকে লেখা চিঠিতে মার্গারেথা জানান যে, সেখানে তিনি এক থিয়েটারে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি তাকে নামতে হয়েছে পতিতাবৃত্তিতেও। তিনি লিখেন, ‘ভেবো না যে, আমি আসলেই অনেক খারাপ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে আমি বাধ্য হয়েছি এ পথে নাম লেখাতে।’ তিনি নাকি এ-ও বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, যেসব নারী সংসার ছেড়ে পালান তারা পরবর্তী ঠিকানা হিসেবে প্যারিসকে খুঁজে পান।’ নিজের এই নর্তকি আর অভিনয় জীবনেই তিনি বেছে নেন ‘মাতা হারি’ নাম, যেটি পরে তার আসল নামকেও ছাপিয়ে যায়। এই জীবনেই তিনি অনেক অর্থ আর যশের মালিক হন। ভাবা হয়, জীবনের কোনো এক সময়ে তিনি মিলিয়নিয়ারও ছিলেন।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“তার বিরুদ্ধে যেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ, সেটি না থাকলেও, আজও  তাকে মানুষ স্মরণ করতো। গত শতাব্দীর প্রথমভাগে ইউরোপ জুড়ে তার যেই পরিচিতি ছিল, তাতেই তিনি অমর হয়ে থাকতেন। স্ট্রিপিং (নগ্ন নাচ)-কে তিনিই কমবেশি নাচের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কাছে তার ছবির অ্যালবাম আছে। তার ছবি সম্বলিত সংবাদপত্রের স্তূপ এখনও আছে। তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ইউরোপের সেলেব্রেটি ছিলেন।”

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনকেন্দ্রীক আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে তার গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়ই। অথচ, আজ এত বছর পর জানা যাচ্ছে যে, তিনি জার্মানদের কাছে তেমন কোনো তথ্যও দেননি। যেমন, হয়তো তিনি বলতেন যে, এই বসন্তে হামলা চালাতে পারে মিত্রবাহিনী। কিন্তু এই তথ্য সবারই জানা ছিল।

অথচ, হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে। মূলত, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার পরিচিতি প্রাপ্তি, জার্মানি ও ফ্রান্স – উভয় পক্ষের সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, আর যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপজুড়ে ঘোরাঘুরি- এ সবই তার বিপক্ষে কাজ করেছে। আর তার জীবনযাপনের ধরণ নিশ্চিতভাবেই তার পক্ষে যায়নি।

এতদিন ধরে অনেক ইতিহাসবিদই তাকে নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপক্ষে গিয়ে তার পক্ষালম্বন করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে আসলে বলি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধের পর নিজেদের অজস্র ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে একজন জুতসই গুপ্তচর দরকার ছিল ফরাসিদের, যাকে কিনা শূলে চড়ানো যাবে। আর নষ্টা চরিত্রের মাতা হারি এক্ষেত্রে ছিলেন পারফেক্ট বলি।

ফরাসি সেনারা এই ভয়েও ছিলেন যে, মাতা হারি ফরাসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার মেলামেশার কথাও ফাঁস করে দিতে পারেন। এদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ জেনারেলও ছিলেন। এ কারণেই তাকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।

আবার এ-ও সত্য যে, ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে অনেক ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়, ফরাসি গোয়েন্দারা আগেই বৃটিশদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তাকে জার্মান গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে। হাতেনাতে ধরতেই তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতেও এটাও জানা যায় যে, বৃটিশরা যেসব কারণে তাকে সন্দেহ করেছিল, তার কোনো যুক্তিযুক্ততা ছিল না। বৃটিশ গোয়েন্দারা তাকে লন্ডনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বলা হয়, প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও,তিনি একজন সাহসী ধাঁচের মহিলা, যাকে সন্দেহ থেকে ফেলা যায় না।

স্পেনের মাদ্রিদে জার্মান সামরিক অ্যাটাশে আর্নল্ড ভন কালের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এই আর্নল্ডই নিজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাতা হারিকে নিজেদের গুপ্তচর হিসেবে ইঙ্গিত দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান। এই টেলিগ্রাম ফরাসি কর্মকর্তাদের হাতে যায়। এটিই ছিল মাতা হারির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদই একে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন।

তাদের যুক্তি, ফরাসিরা যে জার্মান টেলিগ্রামে আড়ি পাততে পারেন, সেটা জার্মানরা অনেক আগ থেকেই জানতো। তাহলে, এমন সংবেদনশীল তথ্য টেলিগ্রামে কেন পাঠিয়েছিলেন আর্নল্ড ভ্যান? কারণ, তিনি চেয়েছিলেন যে, এই চিঠি ফরাসিদের হাতে পড়–ক। আর তারা এই চিঠির ভিত্তিতে নিজেদের গুপ্তচরকেই ফাঁসি দিয়ে দিক। হয়েছেও তাই।

আবার অনেকে বলেন, যেই টেলিগ্রামের কথা বলা হয়, সেটির অনুদিত অংশই প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে। সেটির জার্মান ভাষায় লেখা মূল কপি কোথায়? কেউ কি তবে, এসব জালিয়াতি করে বানিয়েছে মাতা হারিকে ফাঁসানোর জন্য?

তবে মামলার কৌঁসুলির কিছু নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, মাতা হারি নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, ১৯১৫ সালে যুদ্ধ চলাকালে হেগ শহরে জার্মানরা তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তখন তিনি যুদ্ধে আটকা পড়ে ফ্রান্সে ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছিলেন। তখনই আর্মস্টারডামে জার্মান এক কূটনীতিক ফ্রান্সে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে জার্মানির পক্ষে গুপ্তচরগিরি করার প্রস্তাব দেন। উপায় না পেয়ে তিনি রাজি হন। তিনি যুক্তি দেখান যে, মিত্রবাহিনীর প্রতিই তার আনুগত্য ছিল সবসময়। ফরাসি গোয়েন্দারা যখনই তার সাহায্য চেয়েছে, তখনই তিনি এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার এই যুক্তি ধোপে টেকেনি।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলছিলেন,“উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ছিল মাতা হারির। তাদের সঙ্গে ঘুরতেন, নাচতেন। এমনকি এক সঙ্গে থাকতেনও। অথচ, যুদ্ধের সময় যখন তিনি বিপদে পড়েন, ওই কর্মকর্তারাই তার বিরুদ্ধে চলে যান। এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে নিশ্চয়ই তার কষ্ট হয়েছিল।”

মৃত্যুদ- কার্যকরের পর কেউই মাতা হারির মৃতদেহ দাবি করতে আসেনি। তাই প্যারিসের এক মেডিকেল কলেজে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে এটি শিক্ষার্থীদের ব্যবচ্ছেদ শেখাতে ব্যবহৃত হতো। তার মাথার কঙ্কাল অবশ্য অ্যানাটমি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ২০ বছর আগে জাদুঘরে জিনিসপত্রের গণনা চলাকালে দেখা যায়, কঙ্কালটি নেই। ধারণা করা হয়, কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

(ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।)

Advertisements

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধীরাই পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গের জন্য উন্মত্ত

undivided bengal mapমোহাম্মদ আবদুল গফুর :গত ১৬ অক্টোবর সোমবার যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দেশে পালিত হয়ে গেল বঙ্গভঙ্গ দিবস। ১৯০৫ সালে বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে এই দিনে প্রধানত শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তদানীন্তন বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীকে বিভক্ত করে ঢাকা রাজধানীসহ ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করা হলে দীর্ঘ অবহেলিত মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার উন্নয়নের কিঞ্চিৎ সুবিধা হবে বিবেচনা করে এ অঞ্চলের তদানীন্তন অবিসম্বাদিত জননেতা নবাব সলিমুল্লাহ এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পক্ষান্তরে এর ফলে কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদাররা পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এর বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন সৃষ্টি করে বসেন। 

ইতিহাস পাঠকদের জানা থাকার কথা, ১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের মধ্যদিয়ে এদেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত নব্য শাসকদের একটা নীতিই হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জমিদারী, আয়মাদারী, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রভৃতি সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে বেছে বেছে মুসলমানদের উৎখাত করে যেসব স্থানে ইংরেজ অনুগত হিন্দুদের বসানো। পলাশী বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক বছর পর ১৭৯৩ সালে পূর্বতন ভূমি-নীতি বদলিয়ে চিরস্থায়ীবন্দোবস্ত নামের নতুন ভূমি ব্যবস্থার মাধ্যমে যে নব্য জমিদার গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয় তার সিংহভাগই ছিল ইংরেজ অনুগত হিন্দু।

মুসলমানরাও সাতসমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে আসা ইংরেজদের শাসন কিছুতেই সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। মীর কাসিমের যুদ্ধ, মজনু শাহেব নেতৃত্বাধীন ফকীর আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধ, হাজী শরীয়তুল্লাহ-দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন প্রভৃতি ছাড়াও মহীশুরের হায়দার আলী-টিপু সুলতানদের লড়াই, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর নেতৃত্বাধীন জিহাদ আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত বিভিন্ন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন হারানো স্বাধীনতা ফিরে পেতে। কিন্তু বৃহত্তর প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের অসহযোগিতা এবং ইংরেজ শাসকদের প্রতি তাদের সমর্থনের ফলে মুসলমানদের এসব লড়াইয়ের প্রত্যেকটাতে তাদের পরাজয় হয়ে পড়ে এক অনিবার্য বাস্তবতা।

পক্ষান্তরে নব্য শাসকদের প্রতি এদেশের হিন্দু নেতৃবৃন্দের সমর্থনের ফলে ইংরেজরা তাদের স্বাভাবিক মিত্র হিসাবেই দেখতে পেয়েছেন এতদিন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ফলে এই মিত্রদের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়াতে ইংরেজ শাসকরা বিব্রত বোধ করতে থাকেন এবং মাত্র ছয় বছরের মাথায় ইংরেজ শাসকরা বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষণা করে পুরাতন মিত্রদের মনোরঞ্জনের প্রয়াস পান। বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষিত হওয়ায় পূর্ববঙ্গের অবিসম্বাদিত জননেতা নবাব সলিমুল্লাহ অত্যন্ত বিক্ষুদ্ধ হন। তাঁর ক্ষোভ প্রহসনের লক্ষ্যে তাঁর অন্যতম দাবী ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয় ইংরেজ সরকার।

কিন্তু এতেও কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের নিদারুন অসন্তোষ। বঙ্গ-ভঙ্গের বিরুদ্ধে তাদের যুক্তি (কুযুক্তি!) ছিল এর দ্বারা বঙ্গ-মাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ হবে। ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাদের কুযুক্তি ছিল এর দ্বারা নাকি বঙ্গ-সংস্কৃতি দ্বিখন্ডিত করার মত অন্যায় করা হবে। কিন্তু তাদের আরেকটি বক্তব্যে তাদের আসল মতলব ফাঁস হয়ে যায়। তাদের এ বক্তব্য ছিল : পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত মুসলমান চাষা-ভূষা, তাই তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ পূর্ববাংলার মানুষরা অশিক্ষিত চাষাভূষা, তারা অশিক্ষিত চাষাভূষাই থাক, তাদের শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই। তাদের এই বিদ্বেষী মনোভাবের দরুন প্রতিশ্রুতি ঘোষণার দীর্ঘ ১০ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯২১ সালে।

এসব ছিল ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাশের আগের কথা। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাশের পর অবস্থা অনেকটাই পালটে যায়। ঐ আইনে প্রদেশের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনেকটাই হস্তান্তরিত হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় প্রথম ১৯৩৭ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতেই এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে এরপর মুসলিম প্রধান এ প্রদেশে মুসলমানদের হাতেই সরকারের নেতৃত্ব থাকবে। বাস্তবেও দেখা যায় সেটাই। ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনআমলের শেষ দিনগুলোতে প্রথমে এ. কে. ফজলুল হক, তার পর খাজা নাজিমুদ্দিন, সর্বশেষে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলায় প্রাদেশিক প্রধান মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে সম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসনের অবসান হয়। এ সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সারিতে অবস্থান ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের। প্রথমটির দাবী ছিল ভারতকে অবিভক্ত কাঠামোতে স্বাধীনতা দিতে হবে। দ্বিতীয়টি অর্থাৎ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের দাবী ছিল : সমগ্র ভারতবর্ষকে হিন্দু ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে বিভক্ত করে উত্তর পশ্চিম ও পূর্ব দিকের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় একাধিক স্বতন্ত্র স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুসলিম লীগের এই প্রস্তাবই ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাস্তবতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও বৃটিশ সরকার এই লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই উপমহাদেশের স্বাধীনতার কাঠামো নির্বাচনে সম্মত হয়।

যদিও এই লাহোর প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তান শব্দ ছিল না, মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার খবর পর দিন হিন্দু পত্রিকাসমূহ প্রকাশিত হয় “পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত” এই শিরোনামে। পরবর্তীকালে মুসলিম লীগও লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত স্বাধীন রাষ্ট্রকে পাকিস্তান বলে স্বীকার করে নিয়ে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে পাকিস্তান আন্দোলন হিসাবেই গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালে বাস্তবে এ রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তা পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসাবেই পরিচিতি লাভ করে।

দেড় হাজার মাইলের অধিক দূরত্বে অবস্থিত ভৌগোলিকভাবে বৈরী-রাষ্ট্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুই ভূখন্ড মিলে একটি রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে প্রায় নেই বললেই চলে। এই বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় রেখেছিলেন লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক ও সমর্থক নেতারা। তাই লাহোর প্রস্তাবে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখিত ছিল যে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে যে একাধিক রাষ্ট্র গঠিত হবে তা হবে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম। তবে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ টিকেটে নির্বাচিত আইন সভার সদসদের নিয়ে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী কর্তৃক উত্থাপিত ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়, লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত একাধিকের বদলে আপাতত পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র হিসাবেই পরিচালিত হবে। জনাব সোহরওয়ার্দী তাঁর এই প্রস্তাব উত্থাপনকালে যে ভাষণ দেন, তাতে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছেন, পাকিস্তানই আপনার শেষ দাবী কিনা। এ প্রশ্নের কোন জবাব আমি দেব না। তবে একথা আমি অবশ্যই বলব বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানই আমার প্রধান দাবী।” অর্থাৎ তিনি অদূর ভবিষ্যতে উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পুর্বাঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাতিল করে দিলেন না।

তাছাড়া ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামের দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে মুসলিম লীগের জনাব হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী ও জনাব আবুল হাশিম এবং কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতার যৌথ উদ্যোগে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলে। বিশস্ত সূত্রে জানা যায়, এই উদ্যোগের প্রতি মুসলিম লীগের নেতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহরও সমর্থন ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল প্রমুখ অবাঙ্গালী নেতৃবৃন্দ এবং হিন্দু মহাসভার বাঙ্গালী নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর প্রবল বিরোধিতার কারণে এই উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সে সময় শেষোক্ত বাঙালী নেতা (শ্যামাপ্রসাদ) এমনও বলে ছিলেন, ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ হতেই হবে। নইলে বাংলার হিন্দুরা চিরতরে বাঙ্গালী মুসলমানের গোলামে পরিণত হবে। এতে কী প্রমাণিত হয়? প্রমাণিত হয় যে বাঙালী মুসলমানের চাইতে অবাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্ব তাঁর কাছে অধিক কাম্য ছিল।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধীরাই ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। যারা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ বলে বিবেচনা করতেন, তারা ১৯৪৭ সালে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদকে অবশ্য পালনীয় পূণ্য বলে বিবেচনা করেন কি শুধু তাদের মুসলিম বিদ্বেষের কারণে? আসলে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ তাদের কাছে কখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা রাজধানীসহ “পূর্ব বঙ্গ ও আসাম” নামের নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ব বঙ্গে অবস্থিত কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কায়ই তারা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করে ছিলেন। বঙ্গভঙ্গকে যদি তারা বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপই বিবেচনা করতেন, তা হলে মাত্র তিন দশক পর সাতচল্লিশে এসে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ করতে তারা মরিয়া হয়ে উঠতেন না।

সাতচল্লিশে এসে তারা বাঙ্গালী মুসলমানের পরিবর্তে অবাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্বকে বরণ করতে সার্বভৌম বাংলা আন্দোলনকে যেভাবে ব্যর্থ করে দেন, তাতে প্রমাণিত হয় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তারা যে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের অভিযোগ এনেছিলেন তা ছিল ভূয়া, আসলে পূর্ববঙ্গে অবস্থিত জমিদারীতে কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাই ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার মূল কারণ।

সাতচল্লিশে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে বাঙ্গালীদের বৃহত্তর সর্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরোধিতা করে অবাঙ্গালী ভারতীয় নেতৃত্বকে বরণ করে নেয়ার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের কথা ছিল একটা ডাহা মিথ্যা বাহানা। আসলে তারা চেয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নেহায়েৎ পার্থিব স্বার্থেই যে সেদিন তারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন, বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপের ভয়ে নয়, তা প্রমাণিত হয় সাতচল্লিশে যখন তারা ভঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জন্য উম্মত্ত হয়ে ওঠেন। আসলে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের বিষয় ১৯০৫ সালে তাদের কাছে কখনও আসল বিবেচ্য ছিল না। পূর্ববঙ্গে অবস্থিত জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কাই তাদের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ঠেলে দিয়েছিল। সাতচল্লিশে ঐরকম কোন আশঙ্কা না থাকায় তারা নিজেরা তথাকথিত বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জন্য উম্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন।

নজরুল সাহিত্যে মহররম – শেখ দরবার আলম

এক

নজরুল সাহিত্যে মোহররম, এই বিষয়টার ওপর যদি লিখতে হয় তা হলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় যে, ইসলাম কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে ছিল একটা আশ্রয়। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিই মুসলিম জাতিসত্তা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। তামাম বিশ্বের মুসলিম সভ্যতা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। কোরআন এবং সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। মুসলিম উম্মার ঐক্য ও সংহতি ছিল তাঁর কাছে একটা অত্যন্ত কাক্সিক্ষত বিষয়। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আদর্শ মানুষ ছিলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সাম্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের আর্থ-সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় যে সব জায়গায় উল্লেখ করেছেন সেইসব জায়গায় তিনি যে মুসলমান ঘরের সন্তান, এই কথাটুকু বলে ক্ষান্ত হতে চাননি। তিনি বারংবার বলেছেন এবং লিখেছেন যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং নবীর উম্মত; কিন্তু তিনি কবি সবার। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার। এদিক দিয়েও বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভূমিকা অনন্য।

দুই

বাংলা সাহিত্যে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের বাংলাভাষীদের মধ্যে ইশ্বর গুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত বড় বড় কবি-সাহিত্যিকরা জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী, মনুসংহিতার সমাজের কবি-সাহিত্যিক হিসাবে লেখালেখি করেছেন এবং সেইভাবেই মূলত কাজ করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বোধ হয় অনুশীলন সমিতির সভ্য মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো এবং অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ লোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো বলতে চাইতেন যে তিনি নাস্তিক। এ কথা বললে যথার্থ অহিন্দুদের কাছে এবং নাস্তিকদের কাছে হয়তো গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদী, শিখ, এ রকম কোন ধর্মাবলম্বীর কেউ নাস্তিক হইলে তাতে ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বিশ্বের মজুলম মুসলমানদের কারো কোনো উপকার হয় না। তাঁরা নিজ নিজ ধর্ম নিষ্ঠার সাথে পালন করলে তাতে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ তাদের কোনো ধর্ম গ্রন্থেই মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে বা কল্পনা করে জাতীয়তাবাদী হয়ে মজলুম মুসলমানদের অধিকার বঞ্চিত করে সাম্প্রায়িক হওয়ার এবং এর চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে ফ্যাসিবাদী হওয়ার কোনো সংস্থান নেই।

তিন

এই বাস্তবতাটা, এই সত্যটা আমাদের সবারই স্মরণ রাখা উচিত যে,হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাংলাভাষীর বাংলা ভাষা অনেকাংশে এক হলেও তৌহীদবাদী মুসলমানদের বাংলা ভাষা এবং পোত্তলিক হিন্দুদের বাংলাভাষা সর্বাংশে এক নয়। অনুরূপভাবে তৌহীদবাদী মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং পৌত্তলিক হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতি, সাংস্কৃতি সহাবস্থানের দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা উচিত। আমি এইসব কথাগুলো অপরিহার্য প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই লিখছি। কেননা, এই কথাগুলো সবারই চিন্তা করে দেখা উচিত।

জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজ প্রধান স্বাধীন ভারতে মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর পঠন-পাঠনের সংস্থান সেখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। সে সুযোগ এই মুসলিমপ্রধান দেশেও এখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানোর ফলে খোদ পাকিস্তান আমল থেকেই এ রকম একটা অবস্থা সৃষ্টি হতে পেরেছে। এ দেশে যারা ইসলামী আন্দোলন করেন তাঁরাও এই বিষয়টির দিকে কখনো নজর দেননি।

চার

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের এক জাতিতত্ত¡ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তামাম ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলমান সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুসলিম সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা ও এই মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য-সঙ্গীত মুছে ফেলার অংশ হিসেবে এ ক্ষেত্রে নজরুল চর্চার পথও রুদ্ধ করার বন্দোবস্ত হয়েছে। কিন্তু নিজ নিজ সমাজের মানুষ হলেও হিন্দুর ভাষা এবং সাহিত্য হবে এরকম এবং মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য হবে অন্য রকম।

পাঁচ

অন্যতম রবীন্দ্র জীবনীকার প্রশান্ত কুমার পাল কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত রবিজীবনীতে লিখেছেন যে, আধুনিক বাঙালি বলতে যাদেরকে বোঝায় তারা এসেছেন বৈদিক ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। ঠিক অনুরূপভাবে আমরা যদি অষ্টম শতাব্দী থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিকে চোখ রাখি তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারবো যে, সাহিত্যিক ও সমাজসেবী সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো, সাহিত্যিক-সাংবাদিক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের মতো এবং মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো, মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের মতো, মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানরাও এসেছেন ভারতের বাইরের সাধারণত আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্য এশিয়া থেকে। এভাবে আমরা দেখছি যে, আধুনিক বাঙালি হিন্দুদের যেমন রয়েছে বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের হিন্দু জাতিসত্তার উত্তরাধিকার; অনুরূপভাবে ঠিক তেমনি আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানদেরও রয়েছে মুসলমান সমাজের ইতহিাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার উত্তরাধিকার।

ছয়

আরবী ভাষাভাষী এলাকা ইরাকের বাগদাদে থাকতে নজরুলের পূর্বপুরুষরা ছিলেন আরবভাষী। হিন্দুস্তানে অর্থাৎ ভারতে এসে তাঁর পূর্ব পুরুষরা এক সময়ে হয়েছিলেন ফার্সীভাষী। পরে উর্দুভাষী।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু পূর্ববর্তী সভাপতি এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদের পূর্বপুরুষরাও আরব থেকে এসেছিলেন। মওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবদ্দশায়ও তাঁদের পরিবারেরা, মওলানারা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন কেবল আরবী ভাষায়। মওলানা আবুল কালাম আজাদের পরিবারেরা পুরুষরা বাইরের মানুষজনদের সঙ্গে কথা বলতেন উর্দু ভাষায়।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাদের পরিবারে আরবি, ফার্সী এবং উর্দু ভাষার চর্চা ছিল। তাঁর আব্বা কাজী ফকীর আহমদ বাংলাভাষাও খুব ভালো মতো শিখেছিলেন। নজরুল তাঁর শৈশবে এবং বাল্যেই শিখেছিলেন আরবী, ফার্সী, উর্দু এবং বাংলা কাজী নজরুল ইসলামের যখন জন্ম হয় তখন তাদের পরিবারের লোকেরা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন উর্দু ভাষায়।

সাত

১৭৫৭-র ২৩ জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের আগে কথ্য বাংলা এবং দলিল দস্তাবেজ এবং চিঠিপত্রের বাংলা ছিল আরবি-ফার্সী শব্দবহুল বাংলা। তখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষরাও পরিবারিক পর্যায়েও ফার্সী ভাষা চর্চা করতেন। রাজভাষা হিসেবেও ব্যবহারিক জীবনে ফার্সী ভাষার চর্চা তো করতেনই।

পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের বেয়াল্লিশ বছর সাত মাস পর ক্রসেডের চেতনাসম্পন্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী খ্রিস্টান সমাজের পাদ্রী উইলিয়াম, কেরির নেতৃত্বে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশনে সংস্কৃতের পন্ডিত রামরাম বসুর তালিমে আরবী-ফার্সি শব্দ বর্জিত এবং সংস্কৃত শব্দ বহুল খ্রিস্টান ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সাবেক পাদুকা নির্মাতা পাদ্রী উইলিয়াম কেরী এর এক বছর দু’মাস পর ১৮০১-এর মে মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়ে অধীনস্ত সংস্কৃততজ্ঞ পন্ডিতদের সহযোগিতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলাভাষা শেখানোর জন্য আরবী ফার্সী শব্দ বর্জিত কেবল নয়, তামাম মুসলিম সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা বর্জিত পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করলেন। কালক্রমে এই ধরনের বাংলা পাঠ্যপুস্তকই স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সটির পাঠ্য হলো।

শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠার এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ বছর পর মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)-এর জন্ম। পাঠশালায় এবং স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে এবং সে সময়কার হিন্দুদের লেখা সাহিত্যে আরবী-ফার্সী বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল যে ধরনের বাংলা ভাষার প্রচলন মীর মশাররফ হোসেন দেখেছিলেন ঠিক সে ভাষাতেই তিনি ইসলামের ইতিহাসের কারবালার ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন “বিষাদ সিন্ধু”। (১৮৮৫-১৮৯১)।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম মীর মশাররফ হোসেনের জন্মের বাহান্ন বছর পর। তিনিও কেবল পাঠশালায় নয়, মক্তবে এবং স্কুলেও আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল বাংলাই শিখেছিলেন। হিন্দুদের লেখা অন্যান্য কাব্য এবং সাহিত্যেও শিখেছিলেন এই একই ভাষা। কিন্তু মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে তিনি যখন কাব্য ও সাহিত্য সৃষ্টি করলেন এবং গান লিখলেন তখন এই বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি বিধান করে তিনি সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ যথাসম্ভব বর্জন করে ব্যবহার করলেন প্রচুর আরবী-ফার্সী শব্দ।

প্রথমে শ্রীরামপুর মিশনে এবং পরে আরো ব্যাপকভাবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে খ্রিস্টান পাদ্রী এবং সংস্কৃতজ্ঞ হিন্দু পন্ডিতরা মিলে একশ বিশ বছর আগে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই যেমন দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, লিখিত বাংলা ভাষা হবে সম্পূর্ণরূপে আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দবহুল ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যে-সঙ্গীত হবে কেবল হিন্দু সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক হিন্দু জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য ও সঙ্গীত, ঠিক তেমনি এই ধারার বিপরীতে এর এক শত বিশ বছর পর সেনাবাহিনী মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলা মুল্লুকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর কবি কাজী নজরুল ইসলামও দেখিয়েছিলেন মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত বহুলাংশে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বাংশে তৎসম শব্দ অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দ বণ্টন করেও লেখা যায়।

আট

নজরুল সেনাবাহিনী থেকে কলকাতায় ফিরেছিলেন উনিশ শ’ বিশ সালের মার্চ মাসে। এর চার মাস পর ১৩৩৯ হিজরীর পহেলা মোহররম ছিল ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ৩০ ভাদ্র মোতাবেক ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর। নজরুল তখন শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত দৈনিক নবযুগের অন্যতম সহযোগী সম্পাদক। থাকেন কলকাতার ৮/এ টার্নার স্ট্রীটে তার সহকর্মী ও সুহৃদ মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে। সামনে ১০ মোহররম ১৩৩৯ হিজরী (৮ আশ্বিন ১৩২৭ মোতাবেক ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯২০) তারিখ শুক্রবার আশুরা। মাসিক মোসলেম ভারত এর প্রথম বর্ষ : প্রথম খন্ড : ষষ্ঠ সংখ্যার জন্য তিনি লিখলেন তার বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয় ইসলামী কবিতা মোহররম। প্রথম দুটো পঙক্তি লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, সেখানে কোনো তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ নেই। নজরুল শুরুতেই অত্যন্ত আবেগ ও দরদ দিয়ে এবং গভীর মমত্ববোধ মিশিয়ে লিখেছেন:

নীল সিয়া আস্মান লালে লাল দুনিয়া

আম্মা! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।

আরবী ফার্সী শব্দ বহুল এই বাংলা পড়ে কারো বলার সাধ্য নেই যে, বাঙলা ভাষা সংস্কৃতির দুহিতা। সংস্কৃতি শব্দ স্বদেশী শব্দ এবং আরবী ফার্সী শব্দ বিদেশী শব্দ। নত্ববিধান এবং ষত্ববিধান কেবল সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের জন্য প্রযোজ্য! ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ইন্তেকালের এবং ভাষাতত্ত্ববিদ সনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পরলোক গমনের এতোদিন পর এবং ধনিতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আবদুল হাই সাহেবের ইন্তেকালের এতদিন পর আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা বিভাগে যখন ভাষাতত্ত¡বিদ নেই, ধ্বনিতত্ত¡বিধ নেই, তখন কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকরণে আমাদের মুসল্লী প্রুফ রীডাররাও আমাদের শেখাচ্ছেন যে, ইরান বানানের মূর্ধন্য ণ মূধা বা মস্তক থেকে অর্থাৎ জিহবাগ্র তালুতে স্পৃষ্ট করে উচ্চার্য নয়; কেননা, এটা সংস্কৃতি বা তৎসম শব্দ নয়। আমাদের ওপর অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আরোপের লক্ষ্যে এ সবই এখন চলছে।

নজরুলের জীবদ্দশা সুস্থাবস্থায় বাংলাভাষী মুসলমানরাও যে বাংলাভাষী মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐহিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরস্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে সচেতন ছিলেন সেটা সাতচল্লিশের মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলিম মালিকানাধীন এবং মুসলিম সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলো লক্ষ করলেই উপলব্ধি করা যায়। বাংলা সাহিত্যে নজরুল একমাত্র বড় কবি যিনি প্রতিবেশী সমাজের জন্য কীর্তন, ভজন এবং স্যামাসঙ্গীত পর্যন্ত লিখেছিলেন। সেখানে নজরুল কোন আরবী ফার্সী শব্দ ব্যবহার করেননি। নজরুল বিশ্বাস করতেন যে বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষারও আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। বাংলাভাষী মুসলমানদের সংস্কৃতি ও বাংলাভাষী হিন্দুর সংস্কৃতি এক নয়। বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষা এবং সংস্কৃতির সর্বনাশ ঘটে গেছে ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্টের পর।

বাংলাভাষী মুসলমানদের মুসলমান হিসেবে বাঁচার অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলমান জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় উপযুক্ত মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করার অপরিহার্য প্রয়োজন আছে। নজরুলের মোহররম কবিতা উপলক্ষে এই উল্লেখটা করলাম।

লেখক : নজরুল গবেষক, ইতিহাসবিদ।

মিয়ানমারের রাখাইনে চীনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অর্থনৈতিক স্বার্থ

কাইয়ুকফাইয়ু

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পশ্চিমে, যেখান থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে দেশটির সেনাবাহিনী ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালাচ্ছে, সেখানেই রয়েছে চীনা বিনিয়োগে কাইয়ুকফাইয়ু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)। ২০১৩ সালে মিয়ানমার ও চীনা সরকার যৌথভাবে এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে শিল্প ও অবকাঠামো তৈরির জন্য এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়। এই শিল্পাঞ্চলটি ১ হাজার ৭০০ হেক্টর এলাকা নিয়ে গঠিত। শিল্পাঞ্চলটির জন্য মূল বিনিয়োগ সরকারি পর্যায়ে হলেও এতে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিও জড়িত হয়। এদের মধ্যে রয়েছে চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সিটিক গ্রুপ। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তিনটি বৃহৎ প্রকল্প রয়েছে। যেগুলোর সঙ্গে চীনের স্বার্থ জড়িত।

গভীর সমুদ্র বন্দর

কাইয়ুকফাইয়ুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছে এই গভীর সমুদ্র বন্দর। এই প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

চলতি বছরের মে মানে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, সিটিক কনসোর্টিয়ামে তিনটি বড় চীনা কোম্পানি ও থাইল্যান্ডের একটি কোম্পানি রয়েছে। এই বন্দরটির ৭০-৮৫ শতাংশ মালিকানা চেয়েছে সিটিক গ্রুপ। বাকি অংশের মালিকানা থাকবে মিয়ানমার সরকারের কাছে।

অঞ্চলটিতে একটি বন্দর রয়েছে। যদিও এটি মূলত দেশীয় পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এবং বন্দর আকারেও ছোট। বন্দরটি গভীর সমুদ্র বন্দর হিসেবে পুনর্নির্মিত হলে এর বার্ষিক ক্ষমতা দাঁড়াবে  ৭দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্গো এবং ৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন টিইইউ।

এই বন্দরটি চীনের বেল্প অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সামুদ্রিক অবকাঠামোর জন্য কৌশলগভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, পাকিস্তানের গোয়াদর ও শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।

বন্দরটি পশ্চিমা দেশ থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য চীনের  বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে। এখন চীনকে তেল আমদানি করতে হয় বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্র পথ মালাকা প্রণালী দিয়ে। বন্দরটি হলে এই প্রণালী এড়িয়ে যেতে পারবে চীন।

তেল-গ্যাসের পাইপলাইন

petroleum-gas line burma

থেলং মিয়ানমার-চীনা তেল ও গ্যাস পাইপ লাইন প্রকল্প বলে পরিচিত এই প্রকল্পটি ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলারে নির্মিত হচ্ছে।  রাখাইনের উপকূল থেকে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ুনান প্রদেশে পর্যন্ত ৭৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন। ২০১০ সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের এপ্রিলে তা চালু করা হয়।

পাইপলাইনটির ৫১ শতাংশ মালিকানা চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের এবং মিয়ানমারের অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের ৪৯ শতাংশ। এই পাইপলাইন দিয়ে ২২ মিলিয়ন টন তেল পরিবহন করা হবে। বর্তর্মানে ১৩ মিলিয়ন টন তেল পরিবহন করা হচ্ছে। এছাড়া ১২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার প্রাকৃতিক গ্যাসও বহন করা হবে এই পাইপ লাইন দিয়ে।

এসব তেল আমদানি করা হয় আরব দেশ থেকে। বঙ্গোপসাগর হয়ে জাহাজে এসব তেল-গ্যাস এসে পৌঁছায় কাইয়ুকফাইয়ুতে।

শিল্পাঞ্চল

রাখাইনে দ্বিতীয় বৃহত্তম যে উন্নয়ন প্রকল্প সিটিক কনসোর্টিয়াম দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে হচ্ছে শিল্পাঞ্চল। এটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ২.৩ বিলিয়ন ডলার। রয়টার্সের খবর অনুসারে, এই প্রকল্পের ৫১ শতাংশ মালিকানা সিটিক গ্রুপের। ২০১৬ সালের শুরুতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।

২০-৩০ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হতে পারে। ১০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে শিল্পাঞ্চলটি গঠিত হচ্ছে। প্রথম ধাপে কৃষি, ইকোট্যুরিজম এবং শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হবে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

আবদুল করিম যখন রানির বন্ধু

victoria & abdul karim 1

রাসেল মাহ্‌মুদ :ভারতীয় এক তরুণ বাবুর্চির সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার। নামমাত্র নয়, বেশ পাকাপোক্ত বন্ধুত্ব। দুজনের একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, একে অন্যের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করাসহ কত কিছু!‘চাকরের’ সঙ্গে রানির এ সখ্য কি আর মেনে নেয় রানির লোকেরা? কীভাবে কী হলো যে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে যাওয়া এক বাবুর্চি হঠাৎ রানির প্রিয়পাত্রে পরিণত হলো?

ওষুধ খেতে না চাওয়া শিশুকে যেভাবে রসগোল্লায় ভরে ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়, হলিউড ছবি ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল সে রকম একটি প্রচেষ্টা। ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়া ও তাঁর ভারতীয় পাচক আবদুলের মিষ্টি বন্ধুত্বের ভেতরে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে ধবলধোলাই করা হয়েছে। পূর্বপুরুষেরা দুই শ বছর ভারত শাসন করেছিল, উত্তরপুরুষ চলচ্চিত্রকারেরা সেই সময়কে তির্যকভাবে তুলে এনেছেন সিনেমায় এবং পরিচালক স্টিফেন ফ্রেয়ারস এখানে আর ব্রিটিশ থাকতে পারেননি। বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠেছেন।

সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল ছবির গল্প। রানি ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণজয়ন্তীতে ইংল্যান্ডে আনা হয়েছিল ভারতীয় বাবুর্চি আবদুলকে। রানির প্রতি যথাযথ সম্মান ও ভক্তির অভাব ছিল না আবদুলের। রানির হেঁটে যাওয়া পথকে কুর্নিশ করা, তাঁর পায়ে চুমু খাওয়া থেকে শুরু করে প্রায় সব আদব মেনে চলছিল আবদুল। অন্যদিকে আবদুলের প্রতি রানির আচরণ ছিল বিদেশি অতিথির মতো, যা ঠিক তাঁর সভাসদদের পছন্দ হচ্ছিল না। বর্ণবাদী আচরণের জন্য রানি বরং তাঁদের ভর্ৎসনাই করতে শুরু করেন।

এ তো গেল ছবির গল্প। রানি ভিক্টোরিয়ার সময়েই কিন্তু সব থেকে বেশি অত্যাচারিত হয়েছিল ভারত। ভারতের রাজনীতিবিদ শশী থারুরের ইনগ্লোরিয়াস এমপায়ার: হোয়াট দ্য ব্রিটিশ ডিড টু ইন্ডিয়া বইয়ে সেসব লেখা আছে। সে সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান নিচে নামিয়ে আনার পেছনেও ছিল ব্রিটিশদের কারসাজি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের শোষণে দারিদ্র্যসীমার এত নিচে নেমে গিয়েছিল ততকালীন ভারত, যার ফল ১৮৭৬-৭৮ এবং ১৮৯৯-১৯০০-এর দুর্ভিক্ষ এবং প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু। এ ছাড়া জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে ব্রিটিশ সেনারা হত্যা করেছিল প্রায় দুই হাজার লোককে।

ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল ছবিতে ঔপনিবেশিক দেশগুলোর ওপরে ব্রিটিশদের অমানবিকতাকে রসময় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। বলা যায় ভিক্টোরিয়া ও আবদুল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের অত্যাচারের একটি রঙিন দলিল। পূর্বপুরুষদের অত্যাচারের এই কাহিনি চলচ্চিত্রে দেখানো পরিচালকের জন্য একটু বিব্রতকর কি না কে জানে। কিন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায় যে তিনি এড়াতে পারেননি, তার প্রমাণ এই সিনেমা। এ ছবি দেখে কি অনুতপ্ত হবেন এখনকার অত্যাচারীরা? বার্মিজ চলচ্চিত্রকারেরা কি একসময় নির্মাণ করবেন রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের কাহিনি নিয়ে সিনেমা?

কাল মুক্তি পাচ্ছে হলিউড চলচ্চিত্র ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল। রানি চরিত্রে অভিনয় করা জুডি ডেঞ্চ বিভিন্ন সিনেমায় অনেকবার রানির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। জেমস বন্ড সিরিজের বেশ কিছু ছবিতে দেখা গেছে তাঁকে। আর আবদুল করিম চরিত্রের ভারতীয় অভিনেতা আলী ফজল আগে বেশ কিছু হিন্দি ভাষার ছবিতে কাজ করেছেন। হলিউডেও টুকটাক কাজ করেছেন। রানির বন্ধু চরিত্রেও দারুণ করেছেন তিনি।

ইনডিপেনডেন্ট অবলম্বনে

রানি ভিক্টোরিয়া উর্দু শেখেন যে কারণে

abdul karim & queen victoria

১৮৩৭ এর জুনে রাজা চতুর্থ উইলিয়াম মারা যাওয়ার পর আকস্মিকভাবে ব্রিটেনের রানির দায়িত্ব লাভ করেন ভিক্টোরিয়া। আর ১৮৭৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রয়েল টাইটেল অ্যাক্ট পাসের মাধ্যমে ভারতের সম্রাজ্ঞী হন রানি ভিক্টোরিয়া। তবে ভারতের সম্রাজ্ঞী হওয়ার পাশাপাশি ভারতের ইতিহাসে রানি ভিক্টোরিয়া অন্য এক কারণে বেশ আলোচিত। আর সেটা হলো অর্ধেক পৃথিবীর সম্রাজ্ঞী হয়েও তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক ভারতীয় ভৃত্যের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

১৮৮৩ সালে রানির স্কটিশ ভৃত্য জন ব্রাউনের মৃত্যুর পর অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন রানি ভিক্টোরিয়া। রানির এই নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য ভারত থেকে ভৃত্য আনার ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। ১৮৮৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনামলের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ বেশ ঘটা করে উদ্যাপন করতে ভারতীয় খাবার তৈরির জন্যই মূলত ভারতীয় ভৃত্য আনা হয়েছিল। সেই চাহিদা পত্র পেয়ে আগ্রার জেল সুপার তার বিশ্বস্ত ভৃত্য আব্দুল করিম এবং মোহাম্মদ বক্সকে ইংল্যান্ডে পাঠান।

চাকরিতে যোগদানের এক বছরের মধ্যেই রানীর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন আব্দুল করিম। রানির দরবারের বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত তিনি। যার কারণে শুধু খাসভৃত্যই নয়, রানিকে উর্দু ভাষা শেখাতে থাকে করিম। তবে আব্দুল করিমের কাছে উর্দু ভাষার শেখার পাশাপাশি আব্দুল করিমের সাথে গভীর প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েন রানি। উপহার স্বরূপ আব্দুল করিমকে মুন্সী এবং ভারতীয় বিষয়ের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন রানি। আব্দুলের প্রতি রানির এই অন্ধ প্রেমের কারণে আব্দুলকে তিনি প্রচুর অর্থ, জমিজমা এমনটি নাইট উপাধিও দিতে চেয়েছিলেন। তবে রয়্যাল কোর্টের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত আব্দুলকে নাইট উপাধি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন রানি। কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। তাই রানির মৃত্যুর পর শেষবার কফিনের মুখ আটকানোর আগে রানির মুখ দেখেন আব্দুল করিমই।

যেভাবে হাতছাড়া স্বাধীন আরাকান

burma ethnic groups

মুফতি হুমায়ুন রশিদ : আজকের নির্যাতিত আরাকানের মুসলমানদের রয়েছে গৌরবময় অতীত। এক সময় আরাকান রাজ্যের রাজা বৌদ্ধ হলেও তিনি মুসলমান উপাধি গ্রহণ করতেন। তাঁর মুদ্রায় ফারসি ভাষায় লেখা থাকত কালেমা। আরাকান রাজদরবারে কাজ করতেন অনেক বাঙালি মুসলমান। বাংলার সঙ্গে আরাকানের ছিল গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক।

১৪০৬ সালে আরাকানের ম্রাউক-উ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নরমিখলা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে বাংলার তৎকালীন রাজধানী গৌড়ে চলে আসেন। গৌড়ের শাসক জালালুদ্দিন শাহ নরমিখলার সাহায্যে ৩০ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে তাঁকে বিতাড়নকারী বর্মি রাজাকে উত্খাতে সহায়তা করেন। নরমিখলা ইসলাম কবুল করেন ও মোহাম্মদ সোলায়মান শাহ নাম নিয়ে আরাকানের সিংহাসনে বসেন। ম্রাউক-উ রাজবংশ ১০০ বছর আরাকান শাসন করেছে। এর ফলে সেখানে মুসলিম ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, কবি ও শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পায়। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল রোসাং রাজদরবার।

মহাকবি আলাওল রোসাং দরবারের রাজকবি ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন মহাকাব্য পদ্মাবতী। এছাড়া সতী ময়না ও লোর-চন্দ্রানী, সয়ফুলমুলক, জঙ্গনামা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছিল রোসাং রাজদরবারের আনুকূল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায়। (সূত্র : রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস, এন এম হাবিব উল্লাহ্)

সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানিদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তী সময়ে চাটগাঁইয়া, রাখাইন, আরাকানি, বার্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের মিশ্রণে এই জাতি ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

রোহিঙ্গাদের বসবাসস্থল রাখাইন রাজ্য। এর আদি নাম আরাকান। এ নামকরণ স্মরণ করিয়ে দেয় মুসলিম ঐতিহ্যের কথা। কারণ ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তিকে একত্রে বলা হয় আরকান। আর এই আরকান থেকেই মুসলমানদের আবাস ভূমির নামকরণ করা হয়েছে আরাকান।

আরাকানে মুসলমানরা বার্মিজ মগদের চেয়ে সুপ্রাচীন। বর্মিদের কয়েক শ বছর আগে থেকে সেখানে মুসলমানদের বসবাস। আরাকানি সূত্রে জানা যায়, আরাকানে দশ কিংবা বারো শতকের আগে বর্মি অনুপ্রবেশ ঘটেনি। (Harvey, G E, History of Burma. p-137-313)

সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন পার্শ্ববর্তী উপকূলে আশ্রয় নেন। তাঁরা বলেন,‘আল্লাহর রহমতের বেঁচে গেছি।’ সেই ‘রহম’ থেকেই রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। কিন্তু আগে রোসাং ও রোয়াং শব্দ অধিক পরিচিত ছিল। এককালে চট্টগ্রামের মানুষ ‘রোয়াং’ যেত উপার্জনের জন্য। চট্টগ্রাম দীর্ঘ সময় আরাকানের অধীন ছিল। ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন,‘চট্টগ্রাম গোড়া থেকেই সম্ভবত আরাকানী শাসনে ছিল। আর ৯ শতকের শেষপাদে ৮৭৭ অব্দের পূর্বে কোনো সময়ে সমগ্র সমতট আরাকানী শাসনভুক্ত ছিল।’ (আহমদ শরীফ, চট্টগ্রামের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৯)

আরাকানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ইতিহাস বলছে, রোহিঙ্গারা আরাকানের ভূমিপুত্র। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। ১৭৮৫ সালের প্রথম দিকে মিয়ানমারের রাজা ভোধাপোয়া এটি দখল করে বার্মার (মিয়ানমার) করদ রাজ্যে পরিণত করে।

১৭৯৯ সালে প্রকাশিত ‘বার্মা সাম্রাজ্য’তে ব্রিটিশ ফ্রাঞ্চিজ বুচানন হ্যামিল্টন উল্লেখ করেন, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসারীরা (মুসলিম), যারা অনেক দিন ধরে আরাকানে বাস করছে, তাদের রুইঙ্গা (Rooinga) বা আরাকানের স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা আরাকানের মূল নিবাসী (Native of Arakan) বলা হয়। মগ জাতি কখনোই নিজেদের আরাকানের স্থানীয় বাসিন্দা বা আরাকানের মূল নিবাসী (Native of Arakan) উল্লেখ করেনি।

আরাকান ছিল বরাবরই স্বাধীন ও অতিশয় সমৃদ্ধ একটি দেশ। বাংলার প্রাচুর্যের কারণে যেমন ১৫০০ সালের শুরুতে এখানে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে, তেমনি ১৫০০ ও ১৬০০ সালে আরাকানে পর্তুগিজ ও ওলন্দাজদের আগমন ঘটে। ১৬০০ সালে ওলন্দাজরা আরাকান থেকে দাস ও চাল ক্রয় করত। তারা সেখানে নিয়ে আসত লোহা ও লৌহজাতসামগ্রী।

মিয়ানমারের বর্তমান বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের আগের নাম মগ। মগরা ঐতিহাসিকভাবেই বর্বর। মগ দস্যুরা বাংলার উপকূল থেকে লোকজন ধরে নিয়ে তাদের কাছে বিক্রি করত। মগদের বর্বরতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায় ড. আহমদ শরীফের লেখায়। তিনি লিখেছেন,‘মগ জলদস্যুরা জলপথে বাঙলাদেশের ভুলুয়া, সন্দ্বীপ, সংগ্রামগড়, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, বাকলা, যশোর, ভূষণা ও হুগলী লুণ্ঠন করত। তারা হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ ও বড়-ছোট-নির্বিশেষে ধরে নিয়ে যেত। হাতের তালু ফুঁড়ে বেত চালিয়ে গরু-ছাগলের মতো বেঁধে নৌকার পাটাতনে ঠাঁই দিত। মুরগীকে যেভাবে দানা ছিটিয়ে দেওয়া হয়, তাদেরও তেমনি চাউল ছুড়ে দেওয়া হত খাবার জন্যে। এ অবহেলা ও পীড়নের পরেও যারা বেঁচে থাকত তাদেরকে ভাগ করে নিত মগে-পর্তুগীজে।’ (চট্টগ্রামের ইতিহাস, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫১)

১৫৩১ সালে আরাকানের রাজা জেবুক শাহ পর্তুগিজ নৌসেনাদের সহায়তায় আরাকানে নৌবাহিনী গঠন করেন। উদ্দেশ্য ছিল, মোগলদের থেকে আরাকানকে রক্ষা করা। নৌসেনা গঠনের উদ্দেশ্য ছিল যেহেতু মোগল মুসলিম সেনাদের মোকাবেলা, তাই জেবুক শাহ তার নৌবাহিনীতে আরাকানের মুসলমানদের পরিবর্তে মগদের স্থান দেন। কিন্তু পরে এরা মানবিকতাবিবর্জিত হিংস্র জলদস্যুতে পরিণত হয়।

আরাকানের পতনকাল শুরু হয় ১৬৬০ সালে আরাকানের রাজা চন্দ্র সু ধর্মা কর্তৃক মোগল রাজপুত্র শাহসুজাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আরাকানে বিরাজ করে অস্থিরতা। মাঝখানে শান্তি ফিরে এলেও আরাকানি সামন্ত রাজাদের মধ্যে কোন্দল দেখা দেয়। সে সুযোগে ১৭৮৪ সালে বর্মি রাজা ভোধাপোয়া আরাকান দখলে নেন। ভোধাপোয়ার অত্যাচারে আরাকানের রাজা ঘা থানবি পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়ে বর্মিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সিনপিয়ার নেতৃত্বে আরাকান বিদ্রোহ তুঙ্গে পৌঁছে। ১৮১১ সালে সিনপিয়ার বাহিনী রাজধানী ছাড়া গোটা আরাকান দখলে নিলেও পরে পরাজিত হয় বর্মি রাজার সেনাদের কাছে।

আরাকানের বিদ্রোহ দমনের জন্য বর্মি রাজা ১৮১১ সালে গোটা বার্মায় প্রত্যেক পরিবার থেকে একজন যুবক, ২৫০ টাকা, একটি বন্দুক, ১০টি চকমকি পাথর, দুই সের বারুদ, সম ওজনের সিসা, দুইটি কুঠার, ১০টি লম্বা পেরেক সরবরাহের নির্দেশ জারি করেন। এভাবে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে তৎকালীন বর্মি রাজা সিনপিয়ার বাহিনীকে পরাজিত করে। ১৮১৫ সালে সিনপিয়ারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় আরাকানের স্বাধীনতা উদ্ধার আন্দোলন।

১৮২৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি বার্মা দখল করে। এরপর দীর্ঘ ১০০ বছর পর্যন্ত আরাকানিরা অনেকটা স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু ১৯৪২ সালে আরাকান জাপানিদের অধীনে চলে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মায় জাপানি সেনাদের দ্বারা এক লাখ ৭০ হাজার থেকে দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। নিহতদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা ছিল মুসলমান।

অবশেষে ১৯৪৫ সালে আবার ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে বার্মা। কিন্তু স্বাধীনতার মাধ্যমে বার্মা ব্রিটিশমুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুনভাবে আরাকানের ওপর হত্যা, নির্যাতন আর উচ্ছেদে মেতে ওঠে বর্মিরা। আরাকানবাসীদের বহিরাগত আখ্যা দিয়ে শুরু করে চরম হত্যাযজ্ঞ। বলা যায়, বার্মার স্বাধীনতা আরাকানের রোহিঙ্গাদের জন্য বয়ে আনে অভিশাপ।

‘রোহিঙ্গাদের উৎস ও বিকাশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন,‘রাজা ভোধাপোয়া আরাকান দখল করে বার্মার সঙ্গে যুক্ত করার আগে ১৪০৪ সাল থেকে ১৬২২ সাল পর্যন্ত ১৬ জন মুসলিম রাজা আরাকান শাসন করেন।’

১৭৮২ সালে ‘থামাদা’ আরাকানের রাজধানী ‘ম্রোহং’ দখল করে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত স্বাধীন আরাকান রাজ্য এরপর একেবারে ভেঙে পড়ে।

১৭৮৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বার্মার রাজা ভোধাপোয়া আরাকান আক্রমণ করে আরাকানকে বার্মার একটি প্রদেশে পরিণত করেন। সে সময় দুই লক্ষাধিক রাখাইনকে হত্যা করা হয়। পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়, যাতে এ জাতির পুনরুত্থানের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

ভোধাপোয়ার উচ্চ কর আরোপ আর বর্মি বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মগ-মুসলিম-নির্বিশেষে আরাকানের জনগণ পালিয়ে এসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বসবাস শুরু করে। মগরা একজোট হয়ে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল থেকে বর্মিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।

জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভুল

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জিন্নাহ আরাকানের ব্যাপারে সঠিক ভূমিকা গ্রহণ করলে আজ রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আরাকান মিয়ানামার থেকে আলাদা হতে চেয়েছিল। কেননা ঐতিহাসিকভাবে আরাকান মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল না। বার্মিজরা এক সময়ের স্বাধীন আরাকান দখলে নেয়। ব্রিটিশ উপনিবেশে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) সঙ্গে একীভূত হতেও মত দেয় আরাকান নেতৃত্ব। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে ১৯৪৬ সালে ‘আরাকান মুসলিম লীগ’ গঠন করে তারা। কিন্তু জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আরাকান বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেনি। পারেনি তার স্বাধীন অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনতে। পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত না করলেও সে সময় তাদের স্বাধীন থাকার সুযোগ করে দেওয়া যেত। কিন্তু এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। এর দায় জিন্নাহর। তিনি আদৌ মুসলিম ছিলেন কি না, সে ব্যাপারেই অনেকের সন্দেহ! জিন্নাহ ছিলেন খোজা মুসলিম। হিন্দু লোহানা জাতি থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছে তারা। এরা শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। বার্নার্ড লিউইস খোজাদের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন,‘এরা মুসলিম আচ্ছাদনের তলায় হিন্দু মনোভাবাপন্ন। (যশোবন্ত সিংহ,‘জিন্না ভারত দেশভাগ স্বাধীনতা’, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৬২)

লেখক : শিক্ষক, দারুল আরকাম,টঙ্গী, গাজীপুর।

কুর্দি রাষ্ট্র হলে কী ঘটবে?

এ মাসের শেষ দিকে ইরাকি কুর্দিস্তানে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ভোট হতে যাচ্ছে। এতে তাদের সার্বভৌমত্বপ্রাপ্তির গতি বাড়তে পারে এবং তারা শেষমেশ এক শতাব্দীর দ্বন্দ্ব-সংঘাত, গণহত্যা ও নৃশংসতার পর একটি

রাষ্ট্র উপহার পেতে পারে। তবে গণভোটে কুর্দিদের স্বাধীনতার বোধ তৈরি হলেও এর কোনো তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। কারণ, এর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি এতে প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকতা পেলেও। কিন্তু কুর্দিদের এই স্বাধীনতার দাবি আন্দোলন বিনা চ্যালেঞ্জে পার পাবে না। এর মধ্যে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিরোধ। তুরস্ক ও ইরান ঐতিহাসিকভাবে কুর্দিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছে, কখনো কখনো সশস্ত্রভাবে।

পশ্চিমা শক্তিগুলো উত্তর ইরাকে নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠা করার পর ইরাকি কুর্দিস্তানের প্রতিবেশীরা পাথুরে জায়গায় আটকা পড়ে গেছে। সে কারণে কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপি) ও প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান (পিইউকে) স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, যেখানে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা চলে। সেখানকার প্রতিষ্ঠান ও পররাষ্ট্রনীতিও তাদের নিজস্ব।

১৯৯০-এর দশকে প্রতিকূল ভূরাজনৈতিক পরিবেশ সত্ত্বেও কুর্দিস্তান শক্তিশালী ও সম্পদ-সমৃদ্ধ প্রতিবেশী ও তাদের সেনাবাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ ছিল—এরা তখন অভিযান চালিয়ে কুর্দি রাষ্ট্র (কার্যত) শেষ করে দিতে পারত। ১৯৯২ সালের কুর্দি নির্বাচন ইরাকের ইতিহাসে প্রথম সে রকম নির্বাচন, যার বদৌলতে কুর্দিরা আজকের সার্বভৌমত্বের আন্দোলন করতে পারছে।

ঐতিহাসিক নির্বাচন ও পশ্চিম কর্তৃক নো-ফ্লাই জোন অঞ্চল আরোপ করা সত্ত্বেও শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের বাইরে ছিল না। কুর্দিস্তানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া তখনো শিশু পর্যায়ে ছিল। তখন কুর্দিরা চারপাশ থেকে বৈরী প্রতিবেশীদের দ্বারা অবরুদ্ধ ছিল। অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক—উভয় কারণেই তারা চাইত না এই উদীয়মান গণতন্ত্রের উন্নতি হোক। অনিবার্যভাবে তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া ও বাথ পার্টিগুলো এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। মূলত তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করেছে। তারা যেমন নানা কারসাজি করেছে, তেমনি প্রতিপক্ষ দলগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে।

এছাড়া একই সময়ে সেই ১৯৯০-এর দশক থেকে তুরস্কসহ ইরাকি কুর্দিস্তানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের কুর্দি সংগঠনগুলোকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বলা দরকার, তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) ৪০ বছর ধরে তুর্কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আবার কেডিপি ও পিউকে তুরস্কের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই পিকেকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কারণ, পিকেকের কুর্দি জাতীয়তাবাদ মার্ক্সবাদী ঘরানার, যেখানে এরা সামাজিক ও উদার-গণতন্ত্রী ধারার। বারজানি ও তালাবানিরা তুর্কি পাসপোর্ট পেয়েছে। ফলে তারা ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে অবাধে চলাচল করতে পেরেছে। এমনকি তারা আঙ্কারায় আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বও করতে পেরেছে।

আজ আঙ্কারা ও কেরআজির মধ্যকার এই রাজনৈতিক সহযোগিতা মূলত এই সম্পর্কের সম্প্রসারণ। ২০০৩ সাল থেকে তুরস্ক একভাবে মেনে নিতে শুরু করেছে যে কুর্দি রাষ্ট্র অবশ্যম্ভাবী, যদিও সেই রাষ্ট্র আঙ্কারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বাঁধা থাকবে এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠবে। যারা তুরস্ক ও ইরান-প্রভাবিত বাগদাদ সরকারের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হয়ে উঠবে। তুরস্ক ছাড়াও উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অবস্থান নিয়েছে, যার কারণে তার পক্ষে ইরাকি কুর্দিস্তানের হাইড্রোকার্বন ব্যবহার করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ইরাকি কুর্দিস্তান স্বাধীন হয়ে গেলে বাগদাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই এরা সেটা রপ্তানি করতে পারবে।

তুরস্ক কুর্দি রাষ্ট্রের সম্ভাবনায় সক্রিয়ভাবে সমর্থন জোগাচ্ছে না, বরং ১৯৯০ সালে কুর্দিস্তান রিজিয়নাল গভর্নমেন্টের সঙ্গে তার যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেটাকে তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছে, যেখানে ইরাকি কুর্দিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। ১৯৯১ সালে কুর্দিরা স্বায়ত্তশাসন লাভ করার পর আঙ্কারা প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও তারা কুর্দিস্তানের অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্পদ বিনিয়োগ করেছে। তারা একটি পাইপলাইন নির্মাণে সহায়তা করেছে, যার মধ্য দিয়ে এরা স্বাধীনভাবে হাইড্রোকার্বন রপ্তানি করতে পারবে। এতে কুর্দিস্তান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছে, যদিও তারা জানে, এতে একদিন স্বাধীন কুর্দিস্তানের জন্ম হতে পারে।

আঙ্কারা সতর্কবার্তা দেবে, সম্ভবত হুমকিও। কিন্তু সেটা তার নিজস্ব কুর্দিস্তান ও পিকেকের সঙ্গে তার চলমান দ্বন্দ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। কুর্দি রাষ্ট্রের জন্মের মধ্য দিয়ে পিকেকে ও সিরিয়ায় তার সমমনা দলগুলো আরও শক্তিশালী হলেও তুরস্ক নিজ দেশ থেকে কুর্দিদের বেরিয়ে যাওয়া রোধ করার মতো শক্তিশালী জায়গায় আছে। এমনকি ইরান ও সিরিয়া থেকে কুর্দিদের বেরিয়ে যাওয়া রোধ করার মতো অবস্থায় তারা আছে। অনেকে সহজ-সরল যুক্তি দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে ইরাকসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের পতন ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু ব্যাপারটা হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যাপক প্রতিরোধ হবে।

ওদিকে গতিশীল অর্থনীতির বিপুল হাইড্রোকর্বন-সমৃদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কুর্দি রাষ্ট্র যার সঙ্গে আবার উপসাগরীয় দেশগুলোর ভালো সম্পর্ক আছে এমন একটি সম্ভাবনা ইরানের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। ইরানের মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে, এতে ইরাকে অর্থাৎ এই অঞ্চলে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে। এরপর কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে ইরানের কুর্দিরা চাঙা হয়ে উঠবে, যারা বিগত কয়েক বছরে ইরানি সরকারের ওপর বেশ কটি হামলা চালিয়েছে। বস্তুত, সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দিদের পুনর্জাগরণের সুযোগ বেড়েছে। এ ছাড়া ইরানের কুর্দিদের জীবনমানের তেমন উন্নয়ন হয়নি। সেখানে তারা ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে থাকে। অন্য কথায়, ইরাকে কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা যে অন্য কোথাও অনুসৃত হবে তার সম্ভাবনা কম। এর মানে হলো কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঢেউ যদি ইরানেও লাগে, তাহলে সেটা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ইরানের আছে।

এখন ভাষ্যের ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে জয়ের ব্যাপারটা কেআরজির ওপরই নির্ভর করছে। এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে তাদের শত্রু ও বন্ধুদের বোঝাতে হবে, কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে, সমস্যা নয়। আর ট্রাম্প প্রশাসন যেহেতু ইরানের ব্যাপারে যুদ্ধংদেহী হয়ে উঠছে, তাই কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা দেওয়ার আগে ইরানকে ভাবতে হবে।

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।

রাঞ্জ আলালদিন: দোহারা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অতিথি ফেলো।

iraq split