আর্কাইভ

Archive for the ‘মিডিয়া’ Category

প্রজন্মকে আলোকিত করেছেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম

mustafa nurul islam.jpgড. রাহমান নাসির উদ্দিন : যাদের চিন্তা, কাজ, অবদান ও ভূমিকা মানুষ, সমাজ, বিদ্যা-জগৎ এবং সৃজনশীল পরিসরে উল্ল্যেখযোগ্য, অবদারিতভাবে অনস্বীকার্য, তারা লোকান্তরিত হলে, তাদের নিয়ে একটা অবিচুয়ারি বা ‘মৃত্যুত্তর কৃতজ্ঞতাপত্র’ লেখার একটা রীতি বিশ্বব্যাপী জারি আছে। অবিচুয়ারি শব্দের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় সদ্য মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির অবদান যথাযথ সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করে এবং তার কৃতিত্বকে স্বীকার করে তার সম্মানে একটি কৃতজ্ঞতাপত্র লেখা। এর মান, মাত্রা এবং উপস্থাপনারীতি নিয়ে খানিকটা অস্বস্তি থাকলেও বাংলাদেশে কমবেশি এর রীতির প্রচলন আছে। ‘গুণী মানুষের কদরের সংস্কৃতি’ হিসেবে সেটা সমাজের জন্য স্বাস্থ্যকর এবং যারা সৃজনশীল-মননশীল-জ্ঞানকল্পে ক্রিয়াশীল তাদের জন্যও প্রেরণাদায়ক। তাই সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে নিয়ে দু’কলম ‘মৃত্যুত্তর কৃতজ্ঞতাপত্র’ লেখার একটা আন্তরিক প্রয়াস এ লেখা, যা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের।

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ছিলেন শিক্ষক, ভাষাসংগ্রামী, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, টিভি ব্যক্তিত্ব, উপস্থাপক, সম্পাদক এবং একজন চমৎকার ‘বলিয়ে’। যারা লেখেন তারা যদি লিখিয়ে হন, যারা আঁকেন তারা যখন আঁকিয়ে হন, তাহলে যারা চমৎকার বলেন, তারা নিশ্চয় চমৎকার ‘বলিয়ে’। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ ‘বলিয়ে’, যার কথা মনোমুগ্ধকর, যার কথায় সাহিত্য থাকে, তথ্য থাকে, তত্ত্ব থাকে, স্যাটায়ার থাকে, চিন্তার খোরাক থাকে, বিদ্যমান বোঝাবুঝির ক্রিটিক থাকে এবং বিদ্যমান বোঝাবুঝির বাইরে গিয়ে বুঝবার প্রেরণা থাকে। গড্ডলিকা প্রবাহে ডুব না দিয়ে দৃশ্যমান-প্রবাহের বাইরে গিয়ে ভাবনা উপাদান থাকে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রায় ১৫ বছর ধরে তার গ্রন্থনা, পরিকল্পনা এবং উপস্থাপনায় প্রচারিত জনপ্রিয় টিভি-সেমিনার ‘মুক্তধারা’ আমার এ বক্তব্যের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। পরে এটিএন বাংলায় প্রচারিত ‘কথামালা’ সেই মুক্তধারারই নতুন এবং বর্ধিত যাত্রা হিসেবে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল প্রধানত অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের অপ্রথাগত চিন্তা, বিষয়-ভাবনা, বক্তা-নির্বাচন এবং তার আকর্ষণীয় উপস্থাপনারীতির কারণে।

তিনি সারাজীবন ধরে একটার পর একটা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি পড়াশোনা করেছেন কলকাতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে (সোয়াস)। শিক্ষকতা করেছেন সেন্ট গ্রেগরিজ ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকেরই অজানা যে, অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরও বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। এভাবেই অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম একের পর এক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন নতুন নতুন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবে। এ ছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন এবং জাতীয় জাদুঘরের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সাংবাদিকতা শুরু করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে। পরে তিনি দৈনিক সংবাদের সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে তিনি সাংবাদিক হিসেবে বেশিদিন অতিবাহিত করেননি। কেননা শিক্ষকতার নেশা তাকে সে পেশায় নিয়ে যায় এবং আমৃত্যু তিনি একজন আলোকদীপ্ত শিক্ষক ছিলেন, যিনি বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রমাগত আলোকিত করেছেন এ দেশের প্রজন্মকে। তিনি শ্রেণিকক্ষে আবদ্ধ সনাতন শিক্ষক ছিলেন না; শ্রেণিকক্ষের বাইরেও তিনি ছিলেন অসংখ্য তরুণের শিক্ষক। টিভি অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন সাহিত্য সভায়, নানা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে আয়োজন করেছেন নানা বক্তৃতামালার এবং নিত্য লেখালেখিতে। তার সম্পাদিত সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘সুন্দরম’ এখনও পর্যন্ত বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হিসেবে পরিগণিত এর সম্পাদনা গুণে, লেখার মানে, পরিশীলিত এবং পরিণত সাহিত্য প্রকাশ, প্রচার ও প্রসারের বিবেচনায়। তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘সাহিত্যিক’ নামে আরও একটি সাহিত্য পত্রিকা, যাও অল্প সময়ের মধ্যে গুণবিচারি পাঠকের বিপুল সমাদর পেয়েছিল। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম লিখেছেন প্রায় ৩০টিরও অধিক প্রবন্ধ গ্রন্থ ও প্রবন্ধ সংকলন। তার লেখার সাহিত্য মান, মননশীলতা, সৃজনশীলতা, চিন্তা-পদ্ধতি, পড়াশোনার গভীরতা, বিশ্নেষণী ক্ষমতা এবং শব্দ-চয়ন, বাক্য-বিন্যাস ও উপস্থাপনার রীতি তাকে তার সমকালে অন্য সাহিত্যিকদের থেকে আলাদা করেছে। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেন। যদিও পুরস্কারপ্রাপ্তি তার অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচ্য; কিন্তু তিনি কেবল পুরস্কারের জন্যই নয়, তার সৃষ্টিকর্ম এবং কর্মযজ্ঞই তাকে সমকালীন সাহিত্য পরিমণ্ডলে একজন সর্বজন-শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তাই তার দেহান্তর সমকালীন বাংলা সাহিত্যচর্চার জগতে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করবে নিঃসন্দেহে।

দেহান্তর জৈবিক প্রক্রিয়ার অনিবার্য পরিণতি। তাই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘যেতে নাহি দেব। হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়…।’ অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামকে আমরা যেতে দিতে চাইনি; কিন্তু তবুও তিনি চলে গেছেন এবং তাকে চলে যেতে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিশীল মানুষ কখনোই চলে যান না, তাদের দেহান্তর ঘটে বটে; কিন্তু তারা বেঁচে থাকেন তাদের সৃষ্টি ও কাজের ভেতর দিয়ে। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম দেহান্তর সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টি ও কাজের ভেতর দিয়ে। তাই সৃষ্টিশীল মানুষ মরেও অমর।

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisements

স্যাটেলাইট নিয়ে কোথায় লাফ দিচ্ছেন?

BB-1 satellite 3.pngশামসুল আলম : বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন নিয়ে বেশ উত্তেজনা ছড়াচ্ছে বিনা ভোটের সরকার। এ উপলক্ষে ঢাকায় আতশবাজি পোড়ানো হবে ১৬ কোটি টাকার। কিন্তু লাফ দৌড় দেয়ার আগে জেনে নিই কিছু ফ্যাক্টস-

১) বাংলাদেশের এই ‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইট প্রকল্পে মোট ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট এক হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি।

২) বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটি নির্মান করেছে ফ্রান্সের কোম্পানী থালেস এলিনিয়া। থালেসের সাথে চুক্তি হচ্ছে ২৪৯ মিলিয়ন ডলার। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল এয়ারফোর্স স্টেশন Falcon 9 FT (Block 5) থেকে উক্ষেপন করা হবে ১০ মে স্থানীয় সময় বিকেল ৪ টায়। বাংলাদেশের যে ধরনের স্যাটেলাইট, তার ডিজাইন খরচ ২৫ মিলিয়ন ডলার, নির্মান খরচ ১০ মিলিয়ন ডলার, আর উৎক্ষেপন খরচ ৩৯ মিলিয়ন ডলার (ছোট স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে)। সব মিলিয়ে ৮০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে সব কাজ শেষ। অথচ এই স্যাটেলাইটের জন্য বাংলাদেশ খরচ করছে তিন গুন ২৪৯ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশ টাকায় ২ হাজার কোটি টাকার মত। এর বাইরে আরও ৯’শ কোটি টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে- তা কেউ জানে না। জানতে পারে শেখ হাসিনা ও তার উপদেষ্টা পুত্র!

৩) বাংলাদেশের এই স্যাটেলাইটের জন্য কোনো নিজস্ব অরবিট বরাদ্দ নাই। এর আগে আইটিইউ বাংলাদেশকে নিরক্ষ রেখার ১০২ ডিগ্রি স্লট বরাদ্দ দেয়। কিন্তু প্রভাবশালী দেশের বাধার মুখে তা বাতিল হয়। বিকল্প হিসেবে ৬৯ ডিগ্রিতে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তাব দেওয়া হয় বাংলাদেশকে। কিন্তু তাতেও আপত্তি তোলে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন। পরে রাশিয়ান কোম্পানী ইন্টারস্পুটনিকের নিজস্ব ১১৯.১ ডিগ্রির স্লট প্রায় ২৮ মিলিয়ন ডলারে ১৫ বছরের জন্য ভাড়া নেয় বাংলাদেশ।

৪) জানা গেছে, ১১৯.১ ডিগ্রির অরবিটাল স্লটটি বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে (প্রায় ৩০ ডিগ্রি পূর্বে)। এটা ফিলিপাইনেরও অারও গভীরে। অরবিটাল স্লট বা নিরক্ষ রেখাটি অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু হয়ে ইন্দোনেশিয়া দিয়ে ফিলিপাইনের পশ্চিমাংশ এবং ভিয়েতনামের পূর্ব দিয়ে চীন হয়ে মঙ্গোলিয়া হয়ে রাশিয়ার ওপর দিয়ে চলে গেছে। ফলে অতোদূর থেকে স্বাভাবিকভাবেই স্যাটেলাইট বাংলাদেশের ফুটপ্রিন্ট (ছবি) গ্রহণে সমস্যা হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাই‌‌টির সাধারণ সম্পাদক এফ অার সরকার। তিনি বলেন, প্রায় ৩০ ডিগ্রি দূরে স্যাটেলাইট বসালে বাংলাদেশ থেকে তা অ্যাঙ্গুলার হয়ে যাবে। ‘অ্যাঙ্গুলার’ অবস্থান থেকে ছবি নিলে তা ভালো না হওয়ারই আশঙ্কা বেশি। বাংলাদেশের নিজস্ব অরবিটাল স্লটে (৮৮-৯১ ডিগ্রি) এরই মধ্যে রাশিয়ার দুটি, জাপান ও মালয়েশিয়ার একটি করে স্যাটেলাইট উৎক্ষেণ করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট থেকে ভালো সার্ভিস পাওয়া না গেলে বিদেশী স্যাটেলাইট থেকে এই সার্ভিস নিবে স্বাভাবিক।

৫) এই স্যাটেলাইট নির্মাণ প্রকল্পটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প। রাষ্ট্রীয় অর্থব্যয়ে এটা নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে এটি বিটিআরসির অধীনেই এর নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা। কিন্তু, সরকার কৌশলে এই স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিচ্ছে দরবেশ খ্যাত সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকোকে।

৬) একটি স্যাটেলাইটের সাধারন আয়ু ১৫ বছর। কাজেই লাভ লোকসান এই সময়ের মধ্যেই বের করতে হবে। বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অপারেটর ভাড়া বাবদ প্রতিবছর বিদেশি কোম্পানিকে ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে, যুক্তি সরকারের। এই টাকা বাঁচানোর কথা বলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশে নিজস্ব স্যাটেলাইট নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। স্যাটেলাইট না থাকলে ১৫ বছরে যেখানে খরচ হবে ২১০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে এই স্যাটেলাইটের পিছনে খরচ হবে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার+ প্রতিবছর রক্ষণাবেক্ষণ ও স্যাটেলাইট এবং অরবিট ইনশিওরেন্স খরচ। তাহলে এই প্রকল্প করার অর্থ কি?

৭) আওয়ামী সরকারের দাবি, এ কৃত্রিম উপগ্রহে রয়েছে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হবে। মাত্র সাত বছরেই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের খরচ ৩ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই উঠে আসবে বলে হিসেব করেছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী, স্যাটেলাইট থেকে আয়ের ৭০ শতাংশ আসবে বিদেশ থেকে। বাকি মাত্র ৩০ শতাংশ আয় আসবে স্থানীয় পর্যায় থেকে। ১১৯.১ ডিগ্রিতে স্যাটেলাইট বসলে তার ফুটপ্রিন্ট ভালোভাবে পাওয়া যাবে বার্মা, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, জাপান, কোরিয়া, চীন ও মঙ্গোলিয়া থেকে। অথচ এসব দেশগুলোর বেশির ভাগেরই নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে। অন্যদিকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুরের মত দেশের রয়েছে স্যাটেলাইটের কারখানা। এই দেশগুলো নিজেরাই বাণিজ্যিকভাবে স্যাটেলাইট ভাড়া দেয় দীর্ঘদিন ধরে। তাহলে এইসব দেশগুলো থেকে যে ব্যবসার গল্প করা হচ্ছে, তা কোনো দিনই আসবে না। মোটকথা, এই স্যাটেলাইট প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য তো লাভজনক হবেই না, উল্টো গলার কাটাও হতে পারে।

কাজেই, কোথায় লাফ দিচ্ছেন, দেখে শুনে দিয়েন!

এতো ভেতরের খবর না জানা থাকলেও শুরু থেকেই এই বঙ্গবন্ধু নামের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে আমার মনে হয়েছিলো এটা নিয়ে বড় ধরণের আর্থিক অনিয়ম হবে । এই প্রকল্প যে সঠিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করা হয়নি সেটা উপরের লেখা থেকে সুস্পষ্ট । আওয়ামী লীগ ভারত-রাশিয়া বান্ধব দল হিসেবে পরিচিত । তারা কেনো রাশিয়াকে দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে স্যাটেলাইট ডিজাইন ও নির্মাণ করিয়ে ভারতকে দিয়ে অনেক সুলভ মূল্যে উৎক্ষেপণ করালো না? এ প্রশ্ন সব সময়-ই মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে । “অন্যদিকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুরের মত দেশের রয়েছে স্যাটেলাইটের কারখানা।” — উপরের লেখায় এই বক্তব্য দ্বারা লেখক কি বোঝাতে চেয়েছেন?

বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটের আদ্যোপান্ত

BB-1 satellite 4তানিয়া তুষ্টি : স্বপ্নের স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু ১ মহাকাশ স্পর্শ করবে আজ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকাল চারটায় (বাংলাদেশ সময় ১১ মে, রাত ৩টা) মহাকাশের উদ্দেশে উড়াল দেবে। স্যাটেলাইট তৈরির কাজ শেষে গত ৩০ মার্চ এটি উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ এর ফ্যালকন ৯ রকেট ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চিং প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে মহাকাশের পথে উড়াল দেবে।এবার এক নজরে দেখে নেওয়া যাক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আদ্যোপান্ত।

মহাকাশ জয়ে বাংলাদেশ

রচিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মহাকাশ জয়ের গল্প। মহাকাশে নিজস্ব মালিকানার স্যাটেলাইট যাত্রার সব বন্দোবস্ত সমাপ্ত করেছে বাংলাদেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু ১। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হবে। উৎক্ষেপণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিটের মধ্যে। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ সফল হলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার সম্প্রসারণ আরও বেগবান হবে। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলাসহ যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তার নতুন মাত্রা যোগ হবে। স্যাটেলাইটভিত্তিক টেলিভিশন সেবা ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগবে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থান করা বাংলাদেশিদের মধ্যে এখন চলছে উৎসবের আমেজ। তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের একটি সরকারি প্রতিনিধি দল সেখানে অবস্থান করছে। আগামী ১৫ বছরের জন্য মহাকাশের স্থায়ী বাসিন্দা হবে ‘বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট’। বাংলাদেশ প্রথম স্যাটেলাইট নিয়ে কাজ শুরু করে ২০০৭ সালে। সে সময় মহাকাশের ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে কক্ষপথ বরাদ্দ চেয়ে জাতিসংঘের অধীন সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে (আইটিইউ) আবেদন করে। কিন্তু বাংলাদেশের ওই আবেদনে ২০টি দেশ আপত্তি জানায়। এরপর ২০১৩ সালে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটের বর্তমান কক্ষপথটি কেনা হয়। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ এই স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। জাতিসংঘের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর আউটার স্পেস অ্যাফেয়ার্সের (ইউএনওওএসএ) হিসাবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত মহাকাশে স্যাটেলাইটের সংখ্যা হয়েছে ৪ হাজার ৬৩৫। প্রতি বছরই স্যাটেলাইটের এ সংখ্যা ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এসব স্যাটেলাইটের কাজের ধরনও একেক রকমের। বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটটি বিভিন্ন ধরনের মহাকাশ যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা হবে। এ ধরনের স্যাটেলাইটকে বলা হয় ‘জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট’। পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে এ স্যাটেলাইট মহাকাশে ঘুরতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মুহূর্তটি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ দেশের সব কটি বেসরকারি টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করবে। দুর্লভ এ মুহূর্ত সরাসরি প্রচারের ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের সব জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সও উৎক্ষেপণ মুহূর্তটি সরাসরি সম্প্রচার করবে। কেনেডি স্পেস সেন্টারের দুটি স্থান থেকে আগ্রহী দর্শনার্থীরা এই উৎক্ষেপণ দেখতে পারবেন। একটি স্থান অ্যাপোলো সেন্টার, উৎক্ষেপণস্থল থেকে দূরত্ব ৬ দশমিক ২৭ কিলোমিটার। উৎক্ষেপণের দৃশ্য কেনেডি স্পেস সেন্টারের মূল দর্শনার্থী ভবন (মেইন ভিসিটর কমপ্লেক্স) থেকেও দেখা যাবে। উৎক্ষেপণস্থল থেকে এটির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের এ মুহূর্তের সাক্ষী হতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল কেনেডি স্পেস সেন্টারে উপস্থিত থাকবে।

বঙ্গবন্ধু উৎক্ষেপণের ধাপ

বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট তৈরি হয়েছে ফ্রান্সের থ্যালাস এলিনিয়া স্পেস ফ্যাসিলিটিতে। স্যাটেলাইটের কাঠামো তৈরি, উৎক্ষেপণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূস্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানটির। স্যাটেলাইটটি তৈরির পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পর্যালোচনা ও হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরের জন্য বেছে নেওয়া হয় বিশেষ কার্গো বিমান। বিমানটি কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চ সাইটে পাঠানো হয়। মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ পরিচালনা, সফল ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কার্যত্রমের জন্য ইতিমধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। নতুন এই কোম্পানিতে কারিগরি লোকবল নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। মার্কিন রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স এই স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালে কেনেডি স্পেস সেন্টারে স্পেসএক্সের লঞ্চ প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ নিয়ে উড়বে ‘ফ্যালকন নাইন’ রকেট।

এই রকেটের রয়েছে চারটি অংশ। ওপরের অংশে থাকবে স্যাটেলাইট, তারপর থাকবে অ্যাডাপটর। এরপর স্টেজ ২ এবং সবচেয়ে নিচে থাকবে স্টেজ ১। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর রকেটের স্টেজ ১ খুলে নিচের দিকে নামতে থাকবে। এরপর চালু হবে স্টেজ ২। পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্টেজ ১ পৃথিবীতে এলেও স্টেজ ২ একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত স্যাটেলাইটকে নিয়ে গিয়ে মহাকাশেই থেকে যাবে। উৎক্ষেপণ দেখতে আগ্রহীদের অপেক্ষা করতে হবে উৎক্ষেপণ স্থানের তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে। সাত মিনিটের কম সময় রকেটটি দেখা যাবে। তার পরপরই উচ্চগতির রকেট চলে যাবে দৃষ্টিসীমার একদম বাইরে।

দুইটি ধাপে এই উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া শেষ হবে। প্রথম ধাপটি হলো লঞ্চ অ্যান্ড আরলি অরবিট ফেইজ (এলইওপি) এবং দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে স্যাটেলাইট ইন অরবিট। এলইওপি ধাপে ১০ দিন এবং পরের ধাপে ২০ দিন লাগবে। উৎক্ষেপণ স্থান থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে যাবে এই স্যাটেলাইট। ৩৫ হাজার ৭০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর রকেটের স্টেজ ২ খুলে যাবে। স্যাটেলাইট উন্মুক্ত হওয়ার পরপর এর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশনে চলে যাবে। এই তিন স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এর নিজস্ব কক্ষপথে (১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্পট) স্থাপন করা হবে।

স্যাটেলাইটটি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২০ দিন লাগবে। স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের গ্রাউন্ড স্টেশনে হস্তান্তর করা হবে। স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায়।

স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন কী

স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন বলতে সহজ ভাষায় বলা যায়, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান। এই ব্যবস্থায় শূন্যে উৎক্ষেপিত বিভিন্ন ধরনের স্যাটেলাইট ভূপৃষ্ঠ থেকে বিভিন্ন উচ্চতায় অবস্থান করে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। তথ্যের আদান-প্রদান হয় স্যাটেলাইটের সঙ্গে পৃথিবীতে স্থাপিত কোনো আর্থ স্টেশনের। কোনো ডিভাইসের অথবা একটি স্যাটেলাইটের সঙ্গে আরেকটি স্যাটেলাইটের যোগাযোগ হয়। অর্থাৎ সাধারণভাবে যোগাযোগ বলতে আমরা প্রেরক এবং প্রাপকের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানকে বুঝি। প্রতিটি স্যাটেলাইটের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারিত থাকে। এই সীমানার মধ্যেই স্যাটেলাইটটি ফোকাস করা থাকে এবং তার কাজের পরিসীমাও এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই সীমানাকে বলা হয় ফুটপ্রিন্ট। আবার কিছু স্যাটেলাইট তার সিগন্যালের দিক পরিবর্তন করে কাভারেজ অঞ্চল পরিবর্তনও করতে পারে। মহাকাশে নানারকম স্যাটেলাইটের অবস্থান রয়েছে। এর মধ্যে জিইও স্যাটেলাইট একটি নির্দিষ্ট গতিতে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৬০০০ কিলোমিটার ওপরে থাকে। জিইও স্যাটেলাইটের গড় আয়ু তাই ধরা হয় ১৫ বছর। ব্যবহার করা হয় টিভি ও রেডিও ব্রডকাস্টিং, আবহাওয়ার খবর জানতে এবং পৃথিবীর টেলিফোন ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে।

এলইও স্যাটেলাইটটি ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে কাছে থেকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। হাই কোয়ালিটি টেলিফোন কমিউনিকেশন কোম্পানি এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে।

এই স্যাটেলাইট জিও স্টেশনারি এবং লোয়ার আর্থ স্যাটেলাইটের মাঝামাঝি উচ্চতায় থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গড় উচ্চতা ১০০০০ কিলোমিটার। মাত্র ১২টি মিডিয়াম আর্থ স্যাটেলাইট দিয়েই পুরো পৃথিবীতে সংযোগ দেওয়া সম্ভব যা জিও স্টেশনারির চেয়ে বেশি হলেও লোয়ার আর্থের চেয়ে অনেক কম।

হম্যান স্যাটেলাইটগুলো উপবৃত্তাকার হয়। এটি মূলত জিও স্টেশনারী স্যাটেলাইট দ্বারা গন্তব্যের অরবিটে সিগন্যাল পাঠাতে ব্যবহৃত হয়।

লোয়ার আর্থ অরবিট স্যাটেলাইটও এটি ব্যবহার করে।

প্রোগ্র্যাড স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর ঘূর্ণনের দিকেই ঘুরতে থাকে। এগুলোর অরবিটের সঙ্গে পৃথিবীর কোণ এক সমকোণের চেয়ে কম।

রেট্রোগ্রাড স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর ঘূর্ণনের বিপরীত দিকে ঘুরতে থাকে। এগুলোর অরবিটের সঙ্গে পৃথিবীর কোণ এক সমকোণের চেয়ে বেশি।

পোলার স্যাটেলাইট কেন্দ্রাভিমুখী বলের কারণে এবং সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণের কারণে ক্রমাগত স্যাটেলাইটের ক্ষতি হতে থাকে।

এক নজরে বঙ্গবন্ধু

দেশের প্রথম স্যাটেলাইটটির ওজন তিন দশমিক ৭ মেট্রিক টন। এটি মহাকাশে অবস্থান করবে ১৫ বছর। সর্বমোট খরচ ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। মোট খরচে সরকারি অর্থ ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং বিদেশি অর্থায়ন থাকবে ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশকে এই ঋণ দিয়েছে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি। নিজস্ব কক্ষপথ ১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে স্থাপন করা হবে। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের পর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগবে প্রায় ২০ দিন। আমাদের স্যাটেলাইটে লেখা থাকবে বিবি এবং একটি সরকারি লোগো। বঙ্গবন্ধু ১ এর গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায়। স্যাটেলাইট তৈরির পুরো কাজটি বাস্তবায়িত হয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তত্ত্বাবধানে। তিনটি ধাপে এই কাজ হয়েছে। এগুলো হলো- স্যাটেলাইটের মূল কাঠামো তৈরি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি। বঙ্গবন্ধুু ১ স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। স্যাটেলাইট তৈরির কাজ শেষে গত ৩০ মার্চ এটি উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ এর ফ্যালকন ৯ রকেট ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চিং প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে মহাকাশের পথে উড়াল দেবে। স্যাটেলাইট তৈরি এবং ওড়ানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এ জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে তৈরি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। আর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে রাঙামাটির বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশন।

বিশ্বের স্যাটেলাইট কাহিনী

মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর উৎক্ষেপণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। উৎক্ষেপিত স্পুটনিক ১ নামের কৃত্রিম উপগ্রহটির নকশা করেছিলেন সের্গেই করালিওভ নামের একজন ইউক্রেনীয়। একই বছর সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে দ্বিতীয় কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক ২ উৎক্ষেপণ করে। স্পুটনিক ২ লাইকা নামের একটি কুকুর বহন করে নিয়ে যায়। অবশ্য উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে লাইকা মারা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনা সফল হয় ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। তাদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ এক্সপ্লোরার ১ এদিন মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়।

ভারতের প্রথম মহাকাশ উপগ্রহ অ্যাস্ট্রোসাট। আবহাওয়া সংক্রান্ত কৃত্রিম উপগ্রহ ভ্যানগার্ড ২। ১৯৫৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এটি উৎক্ষেপিত হয়েছিল। এটি আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠাতে পারত। ১৯৬০ সালের ১ এপ্রিল টাইরোস ১ পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপিত হয়। এটি বিস্তারিতভাবে পৃথিবীর আবহাওয়া সংক্রান্ত ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়। ওই বছরই ২৩ নভেম্বর টাইরোস ২ পৃথিবী থেকে বিচ্ছুরিত ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি পরিমাপ করে এবং আবহাওয়ার ছবিও সংগ্রহ করে। ১৯৬১ সালের ১২ জুলাই নিক্ষিপ্ত টাইরোস ৩ আটলান্টিক মহাসাগরের হারিকেন ইথার নামক ঝড় প্রথম আবিষ্কার করে। এক্ষেত্রে হারিকেনের কারণে যেসব অঞ্চল আক্রান্ত হতে পারে সেসব অঞ্চলকে আগেই সতর্ক করা হয়। এই ধারাবাহিক উপগ্রহমালার অনেক উপগ্রহ নিক্ষিপ্ত হয় যা তাপমাত্রা নির্ণয় করে মহাকাশে ইলেকট্রনের ঘনত্বের পরিমাপ করে। টাইরোস উপগ্রহমালার পর ঈসা এবং তারপর নিঃশ্বাস উপগ্রহমালা মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হয়। ১৯৬৬ সালের ১৫ মে নিক্ষিপ্ত নিঃশ্বাস ২ উপগ্রহ পৃথিবীর উত্তাপের ভারসাম্য পরিমাপ করে। নিঃশ্বাস ১ হারিকেন ডেটার অনুসন্ধান দেয়। মানুষ জীবন ও ধনসম্পত্তির ক্ষতি প্রতিরোধ করার জন্য আবহাওয়া সংক্রান্ত স্যাটেলাইটগুলো হারিকেন, বন্যা ও অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে আগেই সতর্কতা প্রদান করে থাকে। প্রায় সব স্যাটেলাইট মেঘের ফটোগ্রাফ গ্রহণ করে। ম্যাগনেটিক টেপে সংবাদ জমা করে এবং তারপর টেলিমিটার দিয়ে গ্রাউন্ড স্টেশনে রক্ষিত কম্পিউটারে সোজাসুজি প্রেরণ করে। পৃথিবীর ওপর সে সময় অবস্থানকারী মেঘের প্রণালীর ছবি পুনরুৎপাদনে সক্ষম হয়। ২০০৯ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার কৃত্রিম উপগ্রহ ইরিডিয়াম ৩৩ এবং রাশিয়ার কসমস ২২৫১ উপগ্রহের ধাক্কা লাগে। ঘটনাটি ঘটে সাইবেরিয়ার ৭৮৯ কিলোমিটার ওপরে। কৃত্রিম উপগ্রহের সম্মুখ সংঘাতের ঘটনা এটিই প্রথম।

কৃত্রিম উপগ্রহ এমনভাবে পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান হয়, যাতে এর গতির সেন্ট্রিফিউগাল বা বহির্মুখীন শক্তি ওকে বাইরের দিকে গতি প্রদান করে। কিন্তু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি একে পৃথিবীর আওতার বাইরে যেতে দেয় না। যেহেতু মহাকাশে বায়ুুর অস্তিত্ব নেই, তাই এটি বাধাহীনভাবে পরিক্রমণ করে। কৃত্রিম উপগ্রহগুলো বৃত্তাকারে পরিক্রমণ করে না, তার গতি ডিম্বাকৃতির। টিভি ও বেতারসংকেত প্রেরণ এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহগুলো সাধারণত পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে। পৃথিবী থেকে বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে তথ্য পাঠানো হয়, কৃত্রিম উপগ্রহ সেগুলো গ্রহণ করে এবং বিবর্ধিত করে পৃথিবীতে প্রেরণ করে। কৃত্রিম উপগ্রহ দুইটি ভিন্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ ব্যবহার করে সিগনাল (তথ্য) গ্রহণ এবং পাঠানোর জন্য। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসা সিগনাল অনেক দুর্বল বা কম শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাই প্রথমে ডিশ এন্টেনা ব্যবহার করে সিগন্যালকে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং পরে রিসিভার দিয়ে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয়।

কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর উৎক্ষেপণের সময়ই পর্যাপ্ত জ্বালানি গ্রহণ করতে হয়। কারণ মহাকাশে রিফুয়েলিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে কিছু উপগ্রহ জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি ব্যবহার করে। এদের গায়ে সৌরকোষ লাগানো থাকে, যা ব্যবহার করে থেকে সে সূর্য থেকে তার প্রয়োজনীয় শক্তি গ্রহণ করে। এদিকে বাংলাদেশের তিন শিক্ষার্থীর তৈরি করা প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে উৎক্ষেপণের পর পৃথবীর কক্ষপথে প্রদক্ষিণ শুরু করেছে। ন্যানো স্যাটেলাইটটি পৃথিবী থেকে ৪০০ কিলোমিটার ওপরে অবস্থান করে। পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে সেটি সময় নেয় ৯০ মিনিটের মতো।

সাশ্রয় হবে ১৪ মি ডলার

আমাদের দেশে এখন প্রায় ৩০টি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে আছে। এসব চ্যানেল সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, এসব চ্যানেলের জন্য বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সফল হলে বিপুল পরিমাণ এই অর্থ সাশ্রয় হবে। উপরন্তু বিদেশে ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছেন বিটিআরসি। এই স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২০টি ভাড়া দেওয়ার জন্য রাখা হবে। পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ গঠন করা হয়েছে। এই কোম্পানি স্যাটেলাইটের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থার (আইটিইউ) ‘রিকগনিশন অব এক্সিলেন্স’ পুরস্কারও পেয়েছে।

= = =

বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড ব্রডকাস্টিং’ ক্যাটাগরির এ স্যাটেলাইট। অর্থাৎ, এটি যোগাযোগ এবং সম্প্রচার কাজেই মূলত ব্যবহার করা হবে। এ স্যাটেলাইটে থাকছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার সক্ষমতা। প্রতিটি ট্রান্সপন্ডার প্রায় ৩৬ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গের সমপরিমাণ। অর্থাৎ ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থেকে পাওয়া যাবে প্রায় এক হাজার ৪৪০ মেগাহার্টজ পরিমাণ বেতার তরঙ্গ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট থেকে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনে ব্যবহার করবে। আর ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্য রাখা হবে।

৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২৬টি হচ্ছে কেইউ ব্যান্ডের এবং ১৪টি সি ব্যান্ডের। গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বেতবুনিয়ায় স্থাপিত দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এর মধ্যে গাজীপুর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এবং বেতবুনিয়া বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হবে। এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছে পৃথক একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিবছর অন্যান্য দেশের স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করে। বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হলে এ অর্থ বাংলাদেশেই থেকে যাবে। ফলে বড় অঙ্কের টাকার বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। দেশের বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর স্যাটেলাইট ভাড়াবাবদ ব্যয়ও কমে আসবে। এ ছাড়া স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া যাবে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ। ফলে ব্যান্ডউইথের বিকল্প উৎসও পাওয়া যাবে। এই ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করে দেশের দুর্গম দ্বীপ, নদী ও হাওর এবং পাহাড়ি অঞ্চলে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা চালুও সম্ভব হবে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্বাভাবিক টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও উদ্ধারকর্মীরা স্যাটেলাইট ফোনে যোগাযোগ রেখে দুর্গত এলাকায় কাজ করতে সক্ষম হবেন।

বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার ভুটান, নেপাল ও এশিয়ার অন্য অংশে কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তানের মতো দেশেও ভাড়া দেওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আয় করতে সমর্থ হবে।

= = =

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি ফ্লোরিডার কেপ ক্যানার্ভেল (কেনেডি স্পেস সেন্টার) থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। কাজটি সম্পন্ন হয়েছে আমেরিকার অ্যালান মাস্কের মালিকাধীন স্পেস এক্স কোম্পানির ফ্যালকন রকেটের মাধ্যমে। উৎক্ষেপণের ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মাথায় ১৫ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় আবর্তন পথে নিয়ে যায়। এরপর উপগ্রহটি তার সৌর প্যানেলটি আংশিক প্রসারিত করে। জেট প্রপালসন গতিপথটি ক্রমশ বৃত্তাকার করতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না উপগ্রহটি নিখুঁত বৃত্তাকার জিওস্টেশনারি অরবিট বা ভূস্থির কক্ষপথে সুনির্দিষ্ট স্থানে যথাযথ আবর্তন বেগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে উৎক্ষেপণোত্তর ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় ব্যয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে উপগ্রহটি তার সৌর প্যানেল এবং অ্যান্টেনাগুলো সম্পূর্ণভাবে মেলে দেবে। কক্ষপথের শূন্যতায় সৌর ও মহাজাগতিক বিকিরণে প্রাবল্য, চরম শীত-তাপ অবস্থার মুখোমুখি হবে এ স্যাটেলাইটটি। -১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে + ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার ওঠানামা হবে। এমন বিরূপ পরিবেশের মাঝেও উচ্চ প্রযুক্তিতে নির্মিত এই উপগ্রহটি ১৫ বছরের বেশি সময় থাকবে। এমনকি ১৮ বছর পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এর আওতা এলাকা বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মধ্য-এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে এর পরিসেবা পৌঁছাতে পারবে। এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৭৬৫ কোটি টাকা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্তের ভূপৃষ্ঠের ওপরে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায় ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমায় ক্লার্ক অরবিটে অবস্থান করবে। উপগ্রহটি সুস্থির বিন্দুতে পৌঁছে দীর্ঘ কার্যকালে চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণজনিত জটিলতার ফলে অবস্থানে কিছু বিচ্যুতির মুখোমুখি হবে। সেটি সংশোধনের জন্য সেখানে জেট প্রপালসনের কার্যক্রম আছে। পৃথিবীর ছায়ার কারণে সৌর প্যানেলগুলো প্রতিদিন একটি সময় সূর্যের আলো পাবে না। সেই সময়ের জন্য রিচার্জেবল ব্যাটারির ব্যবস্থাও উপগ্রহটিতে আছে। স্পেস এক্সের তিনটা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে তার গতি নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থির অবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। তারপরই এর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে আসবে। আজকের দিনে যখন এ অঞ্চলে টিভি সম্প্রচারে নতুন ব্যবস্থার প্রচলন হচ্ছে এবং ব্রডব্যান্ড ব্যবস্থার বিরাট উন্নয়ন ও ব্যাপ্তি হতে যাচ্ছে, তখন এ উপগ্রহের ভূমিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি টেলিভিশন কেন্দ্রগুলো এই উপগ্রহের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে প্রোগ্রাম আদান-প্রদান করতে পারবে।

ক্লার্ক অরবিট হচ্ছে ভূস্থির উপগ্রহের কক্ষপথ। এটি বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক ও পদার্থবিজ্ঞানী আর্থার. সি ক্লার্কের নামানুসারে হয়েছে। যোগাযোগ উপগ্রহ বা উপগ্রহের যোগাযোগ ব্যবস্থার ধারণা এসেছে ১৯৪৫ সালে তার এক লেখা থেকে। একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘এক্সট্রা-টেরিস্ট্রিয়াল রিলে’ শিরোনামে। আমরা জানি, পৃথিবী নিজ অক্ষে অর্থাৎ পৃথিবী উত্তর-দক্ষিণ মেরুদ্বয় বরাবর কল্পিত অক্ষকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ঘুরছে, যার ফলেই দিনরাত হচ্ছে, নক্ষত্রগুলোর উদয়-অস্ত হচ্ছে। এ ঘূর্ণনের ফলে পৃথিবীর বিষুবীয় পৃষ্ঠদেশ প্রতি সেকেন্ডে ৪৬৫ মিটার সরে যাচ্ছে। এখন পৃথিবীর ঘূর্ণনের সমান তালে যদি একটি কৃত্রিম উপগ্রহ বিষুব রেখার বরাবর ওপরে ঊর্ধ্বাকাশে নির্দিষ্ট উচ্চতায় (প্রায় ৩৫৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায়) ওই একই কৌণিক দ্রুতিতে সর্বদা ঘুরতে থাকে, তখন তাকে পৃথিবীর বুক থেকে স্থির বলে মনে হবে। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর অক্ষের সাপেক্ষে তার কৌণিক আবর্তন মহাকাশের স্যাটেলাইটের কৌণিক আবর্তন একই থাকবে। ফলে স্যাটেলাইটটি ভূস্থির স্যাটেলাইটে পরিণত হবে এবং ওই কক্ষপথকে ক্লার্ক অরবিট নামে অভিহিত করা হয়। এজন্য উপগ্রহটির বেগ হতে হবে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩.১ কিলোমিটর।

আমাদের ভূস্থির উপগ্রহের অবস্থান ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের যত কাছাকাছি হবে, ততটাই আমাদের সুবিধাজনক হবে এবং যথাসময়ে প্রকল্পটি হলে ৭৪ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশটি পেতাম। যে অবস্থানটি থেকে কার্য সম্পাদন অনেক সুবিধাজনক হতো। আর এতে কোনো অর্থ ব্যয় হতো না। বর্তমানের অবস্থান বা সেগমেন্টটি একটি রুশ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ বছরের জন্য ২২৯ কোটি টাকার বিনিময়ে লিজ নিতে হয়েছে। বর্তমানে আইটিইউ আমাদেরকে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের চাইতে নিকটতর কোনো অবস্থান বরাদ্দ করতে পারেনি। স্যাটেলাইট প্রকল্প ১৯৯৮-৯৯ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যখন নেওয়া হয়েছিল, তাতে যদি ২০০১ সালে বাধা না পড়ত তাতে অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থান পেতাম। বর্তমানে অবস্থানটি তির্যক এবং আমাদের মূল পরিসেবা গ্রহণকারী এলাকা থেকে একটু দূরে হওয়ায় উত্তম অবস্থান নয়। তবে এটাকে বর্তমানে সম্ভাব্য ‘সর্বোত্তম’ বলা হবে অবশ্যই।

জাকারবার্গের ফেসবুক শুনানি ছিল একটি ধোঁকা !

FB securityজেফার টিচাউট : ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ হটসিটে বসে আছেন। তাকে ঘিরে রয়েছে অনেক ক্যামেরা। জাকারবার্গ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার সেশনে সাক্ষ্য দিয়েছেন চলমান ক্যামব্রিজ অ্যানালাইটিকার তথ্যের গোপনীয়তা সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির বিষয়ে। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছুক ফেসবুক নির্বাহীকে কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে। অন্যথায় শুনানিটি ছিল ব্যর্থ। এটিকে সাজানোই হয়েছে ব্যর্থ করার জন্য। এটি এমন একটি শো ছিল, যা সাজানো হয়েছে ফেসবুক প্রধানকে কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াশিংটন ডিসিতে শাস্তি থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য। এটি ছিল এমন একটি শো যেখানে প্রকৃত শুনানির আগে শুনানির ভান করানো হয়েছে। এটি সাজানো হয়েছে পরিবর্তন ঘটানো ও বিভ্রান্তি তৈরির জন্য।

প্রত্যেক সিনেটরকে প্রশ্ন করার জন্য পাঁচ মিনিটের চেয়ে কম সময় দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, সেখানে ফলোআপের কোনো সুযোগ ছিল না। এমনকি বড় কিছু উদ্ঘাটনেরও সুযোগ ছিল না এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে অর্ধেক তুলে ধরার কিছু ধারণা এখান থেকে বেরিয়ে এসেছে। এটাকে তুলনা করা যেতে পারে বিল গেটসের মাইক্রোসফট শুনানি যাতে তিনি কয়েক দিনের জন্য আইনজীবী ও কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হয়েছেন এবং দ্য কেফাউভার শুনানি যা এক বছর ধরে চলেছে, তার সঙ্গে। পরিকল্পনা মোতাবেক এ মাত্রার একটি শুনানি আপনি একদিনে করতে পারেন না।

নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এ শুনানির সবচেয়ে বাজে মুহূর্ত ছিল যখন সিনেটররা প্রশ্ন করেন, ফেসবুককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন আইনকে জাকারবার্গ সমর্থন করবেন কিনা? জাকারবার্গ ‘সৎ’ বিজ্ঞাপন, গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন বা সাধারণভাবে তথ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রণ (জিডিপিআর) ইত্যাদিকে সমর্থন করেন কিনা, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আইন তৈরিকে তিনি সমর্থন করেন কিনা, সিনেটররা জাকারবার্গকে এটি জিজ্ঞাসা করার মাধ্যমে তাকে এমন এক ধরনের দার্শনিক সম্রাটের স্তরে উপনীত করেছেন, ফেসবুক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যার মতামত বিশেষ মর্যাদা বহন করে। এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ফেসবুক একচেটিয়া একটি কর্পোরেট জলহস্তী হিসেবে পরিচিত। এটি অন্তত ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের ব্যক্তিগত গোপন তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছে, বিদেশি প্রপাগান্ডা ছড়িয়েছে এবং বৈষম্যকে চিরস্থায়ী করেছে। আমাদের উচিত নয় আইনের ক্ষেত্রে ফেসবুকের অনুমোদন চাওয়া অথবা জাকারবার্গের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্র“তি কামনা করা। আমাদের উচিত তাকে গণতন্ত্রের প্রতি একটি বিপদ হিসেবে গণ্য করা এবং একটি প্রকৃত শুনানি পাওয়ার জন্য আমাদের সিনেটরদের কাছে দাবি করা।

সেরা সিনেটররা বুঝতে পেরেছেন যে, এটি একটি শো ছিল এবং তারা একে সেভাবেই দেখেছেন। সিনেটর জন কেনেডি বলেছেন, আপনার ইউসার অ্যাগ্রিমেন্ট ভঙ্গ করা হচ্ছে। অন্যদিকে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্রশ্ন করেছেন, আপনি কি একচেটিয়া কারবারি? জাকারবার্গ হাস্যরসাত্মকভাবে উত্তর দিয়েছেন, তিনি এমনটি ‘অনুভব’ করেন না। সিনেটর রিচার্ড ব্ল–মেনথাল বলেছেন, আমাদের আইন প্রয়োজন, প্রতিশ্রুতি বা ক্ষমা প্রার্থনা নয়।

যেহেতু প্রত্যেক সিনেটরের সময় ছিল পাঁচ মিনিটের নিচে, জাকারবার্গ চেষ্টা করে গেছেন নিজের মিশন, দর্শন বা যা কিছু তিনি বিশ্বাস করেন সেগুলো বলে ঘড়ির কাঁটা সচল রাখতে। শুনানির ক্ষেত্রে কিছু ভালো প্রশ্ন ছিল; কিন্তু ফলোআপ করার সুযোগ একেবারে ছিল না বললেই চলে। আপনি জাকারবার্গকে ভালোমতো মাপতে পারেন সময় গণনার ক্ষেত্রে ভালো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিসেবে। যখন কম উত্তেজিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি সময়ক্ষেপণ করছিলেন।

উদাহরণস্বরূপ, সিনেটর হিরোনি ও বুকার উভয়ে ‘প্রোপ্রবলিকা’য় জুলিয়া অ্যাংউইনের করা জঘন্য রিপোর্ট তুলে ধরেছেন, যেখানে দেখানো হয়েছে চাকরিদাতা ও বাড়ির মালিকরা বৈষম্যমূলক বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ফেসবুক ব্যবহার করছেন। জাকারবার্গ কোম্পানির পক্ষ নিয়ে বলেছেন, তারা এগুলোর ব্যাপারে কঠোর ছিলেন এবং সেগুলো বন্ধ করতে তারা কমিউনিটিভিত্তিক বাধ্যবাধকতার ওপর নির্ভর করেছেন।

ফেসবুক যেসব টুল ব্যবহার করছে, তা বৈষম্যকে সহজ করে দিচ্ছে। ফেসবুকের মুনাফার সীমা বেঁধে দেয়া আছে। তাই চাইলে এটি সহজেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়ার কাজটি করতে পারে। কিন্তু ফেসবুক সেটা করতে চায় না।

হিরোনি ও বুকার এটি দেখাতে পারতেন শুনানিতে; কিন্তু অন্য সিনেটরদের মতো প্রশ্ন করার জন্য তাদের হাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল। জাকারবার্গ প্রশ্নগুলোর অস্পষ্ট জবাব দিয়েছেন। তাদের মন্তব্যগুলো কেমন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘কৌতূহলোদ্দীপক’ ছিল অথবা ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা যায়’- এমনসব জবাব দেয়ার মাধ্যমে তিনি সময় নষ্ট করেছেন।

কিছু শুনানি তো মনে হয় এভাবে সাজানো হয়েছে যে, জাকারবার্গ কতটুকু ভালো বা খারাপ মানুষ অথবা তার রাজনৈতিক দর্শন ভালো, খারাপ, এমনকি উদ্ভট কিনা, তা বের করে আনাই উদ্দেশ্য। জাকারবার্গ আমাকে আঘাত করেছেন আত্মসেবার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে। এটি অবশ্য তাকে একটি একচেটিয়া কর্পোরেট হাউসের সিইও বানায়নি; বরং তাকে গতানুগতিক একজন শিল্প-ডাকাতই বানিয়েছে।

ঘৃণা ছড়ানো প্রশ্নগুলোকে আমরা কীভাবে মোকাবেলা করতে পারি, এ ক্ষেত্রে তার মতামত কী- জাকারবার্গকে এমন দার্শনিক প্রশ্ন করার অর্থ হল তাকে একজন গ্রহণযোগ্য দার্শনিক সম্রাট ও চিন্তাবিদ শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত করা। গৃহ সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতাগুলো মেনে নেয়ার অর্থ হল শত কোটি ডলার মুনাফা কামানো একচেটিয়া ব্যবসায়ীর পরিবর্তে তাকে সীমিতসম্পদের একজন ভালো মনের অভিনেতা হিসেবে গণ্য করা।

আমার দৃষ্টিতে, ইনস্টাগ্রাম এবং অন্য সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী যেগুলোকে ফেসবুক কিনে নিয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে ফেসবুকের সম্পর্ক আমাদের ভেঙে দেয়া দরকার। অন্তত সামান্য পরিমাণে হলেও কিছু পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করা দরকার। আমাদের উচিত বৈষম্যের পথ খুলে দেয়ার জন্য ফেসবুককে দায়ী করা। আমাদের প্রয়োজন তথ্য পরিবর্তন ও ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করা।

কিন্তু এটিই যথেষ্ট নয়। ফেসবুকের এমন অনেক বিষয় আছে যা আমরা জানি না। আমরা জানি, আমাদের একচেটিয়া একটি কর্পোরেট হাউস আছে যা কিনা একাধিকবার নিয়মনীতির মারাত্মক লঙ্ঘন ঘটিয়েছে, যার ফলে করে আমাদের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা জানি না তাদের চিন্তাভাবনা কীভাবে সংবাদ সংস্থাগুলো বা বিভিন্ন বিষয়বস্তু নির্মাতাদের বিবেচনা করে। কীভাবে ফেসবুক তার নিজস্ব ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহার করে অথবা কীভাবে প্লাটফর্ম জুড়ে কেবল কয়েকটি উদাহরণ দেয়ার মাধ্যমে তাদের ট্র্যাকিং করে, তাও আমরা জানি না।

এখন প্রাথমিক লোক দেখানো শুনানি শেষ হয়েছে। আমাদের আসল শুনানি দরকার, যেখানে কোনো সিনেটরকে কয়েক মিনিট পর থেমে যেতে হবে না। আসল শুনানিতে আমাদের প্রত্যেক সিনেটরকে (যারা লাখ লাখ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে) সীমাহীন প্রশ্নের সুযোগ দেয়া হবে। যদি এটি করতে ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই মাস সময় কাটাতে হয়, তবে দুই মাসই কাটাতে দিন।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

জেফার টিচাউট : মার্কিন একাডেমিশিয়ান ও রাজনৈতিক কর্মী

একাত্তরের দুঃসাহসী রিপোর্টার অ্যান্থনি মাসকারেনহাস

Dolchut Issue-11-25-3-18=OK Monjur.qxd

Dolchut Issue-11-25-3-18=OK Monjur.qxd

 

পশ্চিমা গণমাধ্যম: প্রচারণা আর রটনার সিরিয়া যুদ্ধ

US propagandaঅবশেষে দৈনিক প্রথম আলো সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী নিবন্ধ প্রকাশ করলো যদিও এটি একটি অসম্পূর্ণ রচনা এবং যুদ্ধের মূল কারণের ওপর আলোকপাত করা হয়নি । হোয়াইট হেলমেটস-এর মতো যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত রামি আবদেল নামীয় এক ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত  সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস নামের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সমর্থিত অ্যাক্টিভিষ্ট গ্রুপের কথা বলা হয়নি । এই সংগঠন থেকে প্রতিদিন যুদ্ধের ময়দানের খবর তাদের মতো করে প্রচারিত হয় ।

একটি দেশের কিছু বিক্ষুদ্ধ জনগোষ্ঠী যদি অস্ত্র নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নামে তবে পশ্চিমা দেশে তাদের সাথে কি ধরণের আচরণ করা করবে সেটা মাথায় রাখলে আসাদ সরকারের বিদ্রোহ দমন বুঝতে সুবিধে হবে ।

= = =

সিরিয়ার যুদ্ধ বিভিন্ন ময়দানেই চলছে। একটা হলো অস্ত্রের লড়াইয়ের ময়দান। সেখানে চলছে কামান, মেশিনগান, ট্যাংকের গোলা। বিমান হামলায় শিশুদের রক্তে ভেসে যাচ্ছে সিরিয়ার মাঠ-প্রান্তর। আরেকটি হচ্ছে জনমতের ময়দান, যার প্রধান অস্ত্র গণমাধ্যম। সেখানেও লড়াই হচ্ছে বিস্তর, তা প্রচারণায় ভরপুর। সিরিয়ার যুদ্ধ হচ্ছে প্রচারণা আর রটনার যুদ্ধ। সব যুদ্ধেই মিথ্যা এক বড় অস্ত্র। সাদ্দামের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যার পরণতিতে দেশটা ধ্বংস হয়ে যায়। মূলধারার পশ্চিমা গণমাধ্যম সে ব্যাপারে অনুতপ্ত বলে মনে হয় না। নইলে সিরিয়া বিষয়েও তারা সতর্ক হতো। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের মতো করে তথ্য দিচ্ছে। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে হলে সিরিয়ার যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য পুরোপুরিই পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিকাশের কারণে এখন অনেক তথ্যই প্রকাশ হয়ে পড়ছে। এতে করে পশ্চিমা গণমাধ্যমের দ্বৈত চরিত্র অনেকটাই বেরিয়ে পড়ছে। বিতর্কিত হয়ে পড়েছে পশ্চিমের তথাকথিত নিরপেক্ষ গণমাধ্যম।

সিরিয়ার গৌতা যুদ্ধের কথা ধরা যাক। সেখানে রাশিয়া ও ইরানের সহযোগিতায় সিরিয়ার সরকারি বাহিনী গত মাসের শেষ দিকে ব্যাপক আকারে হামলা শুরু করে। গৌতার আগে আলেপ্পো, মাদাইয়া ও হোমসের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখেছি। সিরিয়ার হামলায় গৌতায় বেসামরিক মানুষ মারা গিয়েছে। শিশুদের নির্বিচারে হত্যার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। বাশার আল-আসাদের নিয়ন্ত্রিত বাহিনীর নৃশংসতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এসব শহর বাশার বাহিনী কাদের হাত থেকে মুক্ত করেছে বা করছে? বাশারের বাহিনী দাবি করছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে তারা লড়াই করছে। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমের খবরের আসছে ভিন্ন তথ্য। বলা হচ্ছে, বাশারের বাহিনী বিদ্রোহীদের দমন করছে। এই বিদ্রোহীরা হচ্ছে পশ্চিমা সমর্থক। তারা বাশারের বিরুদ্ধে তথাকথিত আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় আন্দোলন শুরু করেছিল। প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে? স্বভাবতই বাশারের বিরুদ্ধে? বাশারের বাহিনীকে কি তবে বিদ্রোহী, জঙ্গি ও কুর্দি—এই তিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে?

বাস্তবতা হচ্ছে, কে কার বিপক্ষে লড়াই করছে, তার বিভাজন করা খুবই জটিল বিষয়। স্পষ্টতই বলা যায়, সেখানে দুটি পক্ষ লড়াই করছে। বাশারের নিয়ন্ত্রিত বাহিনী ও বাশারের বিপক্ষ শক্তি। এই বিপক্ষ শক্তিই কখনো গণতন্ত্রকামী বিদ্রোহী, কখনো ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠাকারী আইএস বা কখনো কুর্দি বিদ্রোহী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছ। এরা সবাই বাশারের বিরুদ্ধে লড়লেও নিজেদের মধ্যেও এদের লড়াই আছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম কখনোই বিষয়টি পরিষ্কার করেনি; বরং গোটা পরিস্থিতি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। যেমন দামেস্কের রাসায়নিক গ্যাস প্রয়োগের কথাই ধরা যাক। প্রথমে পশ্চিমা গণমাধ্যম প্রচার করল, বাশার বাহিনী গ্যাস প্রয়োগ করেছে। কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই। পরে দেখা গেল, এই গ্যাস প্রয়োগ করেছিল বিদ্রোহীরা। এবং ওই অস্ত্র এসেছিল ব্রিটেন থেকে সৌদি আরবের মাধ্যমে। তখন কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যম এ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করেনি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাও নীরব রইল। সম্প্রতি গৌতাতেও গ্যাস প্রয়োগের খবর দেখেছি। অভিযোগও যথারীতি বাশারের বাহিনীর বিরুদ্ধেই। শিশুদের আহত-নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ছবিও ভেসে এল। পরে দেখা গেল, অধিকাংশ ছবিই হয় অন্য কোনো সময়ের কিংবা অন্য কোনো দেশের। এরপর আওয়াজটাও স্তিমিত হয়ে এল।

গৌতার লড়াই নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম এমন একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেখানে বিদ্রোহীদের সঙ্গে বাশারের বাহিনীর লড়াই হচ্ছে। পশ্চিমাবিরোধী শিবিরের গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, গৌতা কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে জঙ্গিগোষ্ঠী জয়েশ আল ইসলাম, ফেইলাক আল রাহমান, আহার আল শামস। জয়েশ আল ইসলাম হচ্ছে সৌদি সমর্থনপুষ্ট সালাফিস্টদের সংগঠন। এরা বাশারকে ফেলে দিয়ে ইসলামি খেলাফত কায়েম করতে চায়। এসব জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে এক দিকে যেমন আল কায়েদার সংযোগ রয়েছে, আবার নূর আল দিন আল জেনকির মতো জঙ্গি সংগঠন মার্কিন অস্ত্র সহায়তা পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমাদের খবরে এসবের বিস্তারিত নেই। পশ্চিমাদের খবরে বলা হচ্ছে, গৌতা থেকে সাধারণ জনতা বের হতে চাইছে না। কিন্তু কখনোই এটি বলা হয়নি যে জঙ্গিরা নিরীহ জনতাকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। যাঁরা বের হতে চাইছেন, তাঁদের বের হতে দিচ্ছে না।

সিরিয়ার যুদ্ধকে ঘিরে প্রোপাগান্ডা প্রচারণার জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সারথিরা। তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন প্রোপাগান্ডা। পশ্চিমা মিডিয়ার বড় অংশটাই এই প্রোপাগান্ডা প্রচারের মুখপত্রে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকারী দল হোয়াইট হেলমেটের কথাই ধরা যাক। এদের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অর্থায়ন। হোয়াইট হেলমেট মূলত জঙ্গি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে কাজ করে। এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি এই দলের কোনো কোনো স্থানীয় সদস্যের বিরুদ্ধে নৃশংস কার্যকলাপে অংশ নেওয়ার ভিডিওচিত্রও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যমে এসব খবর আসেনি।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের খবরের বড় উৎস হচ্ছে জঙ্গিগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্বঘোষিত ‘মিডিয়া অ্যাকটিভিস্ট’রা। প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে জঙ্গি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গণমাধ্যমের প্রবেশ নিষেধ, সেখানে ওই মিডিয়া অ্যাকটিভিস্টরা কতটুকু প্রকৃত তথ্য দিচ্ছে? কেউ কেউ অভিযোগ করে থাকেন, এই মিডিয়া অ্যাকটিভিস্টরা প্রকৃত অর্থে জঙ্গিদের মিডিয়া সেলের সদস্য। পশ্চিমা গণমাধ্যম নির্দ্বিধায় এসব সেলের সংবাদ প্রকাশ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরাক সরকার যখন জঙ্গিদের হাত থেকে মসুল, তিরকিত বা ফাল্লুজা পুনর্দখল করে, তখন পশ্চিমদের গণমাধ্যমে রীতিমতো একে বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সিরিয়ায় যখন একের পর এক জঙ্গি-নিয়ন্ত্রিত শহরের পতন ঘটছে, তখন পশ্চিমা গণমাধ্যম ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়টিকেই সামনে তুলে ধরছে। গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ আরবে ন্যাটো বাহিনীর থেকে কেউ বেশি করেনি। সিরিয়ার জঙ্গিদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সমর্থন, সহায়তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। কার্যত, পশ্চিমা গণমাধ্যম জঙ্গি সমর্থনকারীদের বিভিন্ন এজেন্ডাকেই সামনে নিয়ে আসছে।

বলছি না যে বাশারের বাহিনীও হত্যাযজ্ঞ করছে না বা বাশার বাহিনীর সরবরাহ করা সব তথ্যই সঠিক। তবে যদি প্রশ্ন করা হয়, সিরিয়ার যুদ্ধ পশ্চিমের গণমাধ্যমে কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? উত্তর হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী তথাকথিত নিরপেক্ষ সংবাদের উৎস পশ্চিমা গণমাধ্যমও যে আমাদের সঠিক তথ্য না দিয়ে একপেশে তথ্য দিচ্ছে, এটিও এখন দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। কখনো কখনো মিথ্যাচারও করছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম এই তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’ নিয়ে প্রশ্ন করেনি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করে উত্তর খোঁজার চেষ্টাও করেনি—জঙ্গিদের এত অর্থ, অস্ত্রের উৎস কী। ঝাঁ-চকচকে গাড়ি নিয়ে সিরিয়ায় জঙ্গিরা কীভাবে একের পর এক শহর দখলে নিল? অথচ সারা বিশ্বেই মুক্ত সাংবাদিকতা, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার সবক দিয়ে বেড়ায় এই পশ্চিমা গণমাধ্যম।

ড. মারুফ মল্লিক: রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর কনটেমপোরারি কনসার্নস, জার্মানি।

সৌদি আরবে বিনোদন যুগের সূচনা

riyad cityscapeবিল ল’ : গত বছরের অক্টোবরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত প্রথম ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ উদ্যোগ নামক সম্মেলনে দ্যুতি ছড়ানো আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন হলিউডের সবচেয়ে বড় ট্যালেন্ট এজেন্সিগুলোর একটির সিইও অ্যারি এমানুয়েল। কোনো সন্দেহ নেই, পাঁচ তারকা রিজ কার্লটন হোটেলের বিলাসবহুল বলরুমে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মূল বক্তব্য তিনি উৎসুকভাবে শুনেছেন। কারণ, যুবরাজ সেখানে বিদেশি কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দেয়া সুযোগ-সুবিধার বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঘনিষ্ঠ, শিকাগোর মেয়র র‌্যাহম এমানুয়েলের ভাই অ্যারির একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল ওই সম্মেলনে। সেখানে তিনি মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং সৌদি আরবে একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বিনোদন ও সংস্কৃতি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল ‘আমি মনে করি আপনারা লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট ও মিউজিক দেখবেন, খাবার উৎসব, ফ্যাশন, আর্ট শো’ ইত্যাদিতে যাবেন এবং তাহলে দেখবেন ভিশন-২০৩০-এর সঙ্গে এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি একটি সম্পর্ক আছে, বিশেষত তারা যা হতে চায় তার সঙ্গে।’

নিজের কোম্পানি উইলিয়াম মরিস এন্ডেভারের জন্য এমানুয়েল অ্যারি যা চেয়েছিলেন, তা হল সৌদি আরবের সম্ভাবনাময় এন্টারটেইনমেন্ট শিল্পে বড় ভূমিকা রাখবে কোম্পানিটি। সর্বোপরি, ইসলামের কট্টর ওয়াহ্হাবি ব্যাখ্যার আওতায় কয়েক দশক ধরে দেশটি এন্টারটেইনমেন্ট-বিনোদনত্যাগী হয়ে পড়েছে। সেখানে কোনো সিনেমা ছিল না, থিয়েটার ছিল না; ছিল না কোনো জনপ্রিয় লাইভ মিউজিক কনসার্ট। কিন্তু এখন মোহাম্মদ বিন সালমান হাল ধরার পর সৌদি আরবে তার মতে ‘মডারেট ইসলাম’ ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেছেন। ফলে ভিত্তি গড়তে যাওয়া বিনোদন শিল্প এখন ভালো ও মনোরম একটি অবস্থানে পৌঁছার হাতছানি দিচ্ছে। দেশটিতে এ শিল্পের বিশাল বাজার সম্ভাবনা রয়েছে- কারণ, সৌদি আরবের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বয়সই ৩০-এর নিচে।

যেহেতু ভিশন-২০৩০ গ্রহণ করা হয়েছে-‘আমরা যথেষ্ট সচেতন যে, বর্তমানে থাকা সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক সুবিধা আমাদের নাগরিক ও বসবাসকারীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না, এমনকি সেগুলো আমাদের উন্নতির দিকে যাওয়া অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও নয়’। অন্যদিকে মোহাম্মদ বিন সালমানও এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন যে, তিনি যদি নিজেকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শীর্ষে রাখতে পারেন, তবে এখান থেকে প্রচুর আয় বের করা যেতে পারে। ভিশন-২০৩০ বলছে, বিনোদন খাত ২২ হাজার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করবে। আরও প্রলুব্ধ হওয়ার মতো বিষয় হল, এন্টারটেইনমেন্ট ও হলিডে রিসোর্টগুলোয় যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তাতে পর্যটন খাতকে উন্নত করা হচ্ছে, যাতে করে এটি সৌদি আরবে বার্ষিক ৫ কোটি পর্যটক টানতে পারে; এ সংখ্যা বর্তমানে হজে আসে-এমন পর্যটকের সংখ্যা বাদ দিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।

নিজের ক্ষমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুবরাজ কত বেশি বেপরোয়া, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে অসাধারণ বিবেচিত ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলন রিটজ কার্লটন হোটেলে শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পরেই। ৪ নভেম্বর হোটেলটির অতিথিদের চলে যেতে বলার পর বিলাসবহুল হোটেলটি ২০০-এর বেশি ব্যবসায়ী ও রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যের জন্য কারাগারে পরিণত করা হয়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের তকমা দিয়ে তেমনটি করা হয়েছিল। দমন-পাকড়াও অভিযানটি পরিচালনা করা হয় দুর্নীতিবিরোধী কমিটির আদেশে, যার প্রধান মোহাম্মদ বিন সালমান। গ্রেফতার শুরু হওয়ার পর রাজকীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যাদের আটক করা হয়েছিল তার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ধনী যুবরাজ আল-ওয়ালিদ বিন তালাল, সালেহ আবদুল্লাহ কামাল এবং ওয়ালিদ আল-ইবরাহিমও ছিলেন। বড় ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগের পাশাপাশি এ তিনজনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় কমন-তা হল তারা সবাই বড় ধরনের এন্টারটেইনমেন্ট ও মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান বা প্রধান উদ্যোক্তা।

বিন তালালের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি হল রোতানা মিডিয়া সার্ভিসেস- যা রেডিও এবং টিভি স্টেশন, ম্যাগাজিন, মিথস্ক্রিয় মিডিয়া এবং মুভি ও মিউজিক ভিডিও সরবরাহের বহুবিদ কাজ করে থাকে। কামালের মিডিয়া হল-এআরটি, আরব রেডিও এবং টিভি স্টেশন, যার আওতায় আছে ওএসএনসহ অনেক চ্যানেল। এ ছাড়া তার কোম্পানি মুভি, মিউজিক ও স্পোর্টসের মতো পারিবারিক এন্টারটেইনমেন্ট সরবরাহ করে থাকে। আল-ইবরাহিম নিয়ন্ত্রণ করেন এমবিসি- মিডলইস্ট ব্রডকাস্টিং সেন্টার। এ কোম্পানিটি চিলড্রেনস নেটওয়ার্ক, ২৪ ঘণ্টা নিউজ এবং বিশেষায়িত চ্যানেল ‘দ্য নিউ আরব উইমেন’সহ অনেক চ্যানেল পরিচালনা করে থাকে।

কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের ‘যথাযথ প্রক্রিয়া’র মুখোমুখি করা হবে। প্রকৃতপক্ষে এ সংক্রান্ত যা কিছু সৌদি আরবে ঘটেছে, তা ছিল একটি কম্পন। পরে আটককৃতদের কেবল বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হয় এবং অনেকে এ পদ্ধতিতে মুক্তি নেয়। অন্যথায় তাদের ব্যবসা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তৎকালীন সৌদি আরব ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান যুবরাজ মিতেব ও সাবেক বাদশাহ আবদুল্লাহর এক ছেলেকে ১০০ কোটি ডলার পরিশোধের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হয় বলে খবর বেরিয়েছে। আল-ওয়ালিদ বিল তালাল তার ব্যবসা ছাড়তে রাজি হননি, ফলে তিনি আটক রয়ে গেছেন। ধারণা করা হয়, কামাল ও আল-ইবরাহিমকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

সৌদি রাষ্ট্রপদ্ধতির অস্পষ্টতার কারণে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত স্বার্থ কোথায় শেষ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ শুরু, তা চিহ্নিত করা অসম্ভব। তবে যে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট, তা হল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) প্রধান, অল-ইনকম্পাসিং কাউন্সিল ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ক্রাউন প্রিন্স, প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও দুর্নীতিবিরোধী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সব অর্থনৈতিক বিষয় বিন সালমানের হাত দিয়েই পাস হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে পিআইএফ এন্টারটেইনমেন্ট সেক্টরে ২৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়। বর্তমানে এমানুয়েলের কোম্পানি পিআইএফের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে যাচ্ছে, যেখানে কোম্পানির অংশীদারিত্বের জন্য ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এমানুয়েল অ্যারি চাচ্ছেন দৈবাৎ পাওয়া এ অর্থ দিয়ে কোম্পানিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে, যাতে এরই মধ্যে কেনা আইএমজি বা আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপের স্পোর্টস গাড়ি, বিপুল স্পোর্টস সরঞ্জাম, ফ্যাশন ও লাইভ ইভেন্ট তৈরি করা যায়।

এ ছাড়া তিনি সৌদি আরবের সমৃদ্ধ অনুন্মোচিত অঞ্চলের দিকে মনোযোগ দিতে চান। বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে বাইরে যেতে পছন্দ করে’। ‘তারা পছন্দ করে সামাজিক বিভিন্ন বিষয়, তাই মুভি ও কনসার্ট হতে পারে বড় ভূমিকা পালনকারী আর স্পোর্টস হচ্ছে ভালো অনুঘটক।’ এসব কিন্তু ঢেকে রাখা হয়েছে। মোহাম্মদ বিন সালমানের নিয়ন্ত্রণাধীন পিআইএফ ফান্ডের সঙ্গে সংযুক্তি অবশ্যই স্বর্গে বিয়ের মতো দেখা যায়; কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এমানুয়েল অ্যারি হয়তো হোটেল রিটজ কার্লটনে গত বছর যা ঘটেছে, তা বিবেচনায় নিতে পারেন। সন্দেহ নেই, আটককৃতরা দুর্নীতি চর্চায় জড়িত ছিলেন; কিন্তু এটিই হচ্ছে সৌদি আরবের ব্যবসায়ী সমাজ ও শাসক পরিবারের নিত্যদিনের ঘটনা।

একটি সূত্র সম্প্রতি বাঁকা হাসি হেসে আমাকে বলেছে, ‘দেশের সবাই জানে গ্রেফতার করা হয়েছে বাছাইকৃতদের’। যা কিছুই ঘটেছে, আটককৃতদের মানবাধিকার, মুক্ত ও স্বচ্ছ শুনানি পাওয়ার অধিকার পদদলিত করা হয়েছে। তাদের ব্যবসা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পদ আটকে রাখা হয়েছে। তারা দেশ ছেড়ে যেতে অক্ষম। এমানুয়েল পুরোদস্তুর নিষ্ঠুর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত; কিন্তু তিনি সম্ভবত নিজের ভালো মিল বা আরও বেশি খুঁজে পেতে পারেন মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে।

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ: সাইফুল ইসলম

বিল ল ’: মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ও বিবিসির সাবেক সাংবাদিক