আর্কাইভ

Archive for the ‘মিডিয়া’ Category

বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রণযন্ত্র ও সংবাদপত্র

first bd printing pressজোবায়ের আলী জুয়েল : বাংলাদেশে প্রথম কোথায় মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল নির্দিষ্টভাবে তা’ জানা যায়নি। তবে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে বলতে পারি, বাংলাদেশে প্রথম মুদ্রণ যন্ত্রটি স্থাপিত হয়েছিল, ঢাকা থেকে বেশ দূরে আমাদের রংপুরে। এখানে উল্লেখ্য যে, পূর্ববঙ্গের প্রথম দুটি বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা থেকে নয়, রংপুর থেকে। স্বাভাবিকভাবে হওয়ার কথা ছিল “ঢাকা” থেকে। কারণ বাংলার দ্বিতীয় শহর ছিল তখন ঢাকা (কলকাতার পরেই)। এর সমাজতাত্ত্বিক কারণ কি বলতে পারবো না। শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, পত্রিকা দু’টির উদ্যোক্তা ছিলেন অর্থশালী জমিদার এবং তাঁর ছিলেন বিদ্যোৎসাহী। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দু’টি পত্রিকাই সৌখিন কোনো কারণে প্রকাশিত হয় নাই। সংবাদপত্র প্রকাশ ও প্রচারের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তাঁরা মুদ্রণ যন্ত্র ক্রয় করেছিলেন। না হলে দীর্ঘ দিন পত্রিকা দু’টি টিকে থাকতো না। পূর্ববঙ্গের একমাত্র পত্রিকা হিসেবে প্রথমে “রঙ্গপুর বার্তাবহ” এবং তারপর “রঙ্গুপুর দিক প্রকাশ”-কে অন্যান্যরাও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। কলকাতার তৎকালীন প্রধান প্রধান কাগজগুলিতে উদ্ধৃতি করা হতো এ দুটি পত্রিকার সংবাদ।

১৮৪৭ সালের আগস্ট (ভাদ্র ১২৫৪) মাসে রংপুর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল “রঙ্গপুর বার্তাবহ”। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, রংপুর কুন্ডি পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকাটি। তবে অন্যান্য সূত্র থেকে অনুমান করে নিতে পারি যে, কালীচন্দ্র রায় প্রাথমিকভাবে সাহায্য করলেও পত্রিকাটির মালিক ছিলেন এর সম্পাদক গুরুচরণ রায়। ১০ বছর একটানা ব্যবহৃত হয়েছিল মুদ্রণ যন্ত্রটি। তারপর মুদ্রণ যন্ত্রটির ভাগ্যে কি ঘটেছিল জানা যায়নি। অনেকের অনুমান, রংপুরের কাকীনার ভূগোলক বাটির জমিদার শম্ভুচরণ রায় চৌধুরী এটি কিনেছিলেন। কারণ, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রকাশ করেছিলৈন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বাংলা সংবাদপত্র “রঙ্গপুর দিক প্রকাশ” (১৮৬০ খ্রি:)। পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য নতুন মুদ্রণ যন্ত্র হয়তো তিনি আর আমদানী করেননি। নিজ অঞ্চলের মুদ্রণ যন্ত্রটিই কিনে নিয়েছিলেন। “রঙ্গপুর দিক প্রকাশ (১৮৬০ খ্রি:)” এর সম্পাদক ছিলেন মধুসূদন ভট্টাচার্য।

এখন পর্যন্ত যেসব প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণাদি পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে বলতে পারি, ১৮৫৭ সালের আগে পূর্ববঙ্গে ৩টি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায়, একটি রংপুরে যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। বাকী দুটি ঢাকায়। ঢাকার একটি মুদ্রণ যন্ত্র ছিল মিশনারীদের, অন্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। পূর্ব বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাট বা সত্তর দশকে মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হতে থাকে। এ মুদ্রণ যন্ত্রগুলির কেনো ধারাবাহিক ইতিহাস-কোথাও দেখা হয় নাই। সরকারি রিপোর্ট বা গেজেটিয়ারে মাঝে মাঝে দু’একটি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায় মাত্র। ঢাকায় সরাসরি মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৬ সালে।

১৮৫৭ খ্রিন্টাব্দে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল দুটি মুদ্রণ যন্ত্র। কিন্তু ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের একমাত্র রংপুর ছাড়া আর কোথাও মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংবাদ জানা যায় না।

“রঙ্গপুর বার্তাবহ যন্ত্র” চালু হওয়ার সামান্য পরে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল ছাপাখানা। সেটি ছিল ঢাকার প্রথম ছাপাখানাগুলোর অন্যতম। এটি এখন ঢাকা নগর যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কালো রঙ্গের এই প্রাচীন মুদ্রণ যন্ত্রটিতে আভিজাত্য ও প্রাচীনত্ব দুই-ই যেনো মিশে রয়েছে।

১৯ শতকের প্রথম দু’তিন দশকে বাংলাদেশে আরও কয়েকটি মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮২৫ সালের ২২ জানুয়ারি “সমাচার দর্পণ” পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায় যে তখন দেশিয় লোকের পরিচালনাধীন ১১টি ছাপাখানার উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঢাকার প্রথম মুদ্রণযন্ত্র “বাঙ্গলাযন্ত্র” স্থাপিত ১৮৬০ সালে (১৩২৫ বাংলাসনে “ঢাকা প্রকাশ” পত্রিকায় প্রকাশিত)। ১২৬৭ বাংলা সনে ঢাকার সাহিত্য শীর্ষক এক প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে, বাঙ্গলা যন্ত্রের (১৮৬০ খ্রি:) স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র, দীনবন্ধু মৌলিক, ভগবান চন্দ্র বসু (আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর পিতা) ও কাশী কান্ত চট্টোপাধ্যায়।

বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সর্বপ্রথম সাময়িক পত্র হলো মনোরঞ্জিকা (১৮৬০ খ্রি:) এই মাসিক সাময়িক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৪-১৯০৭ খ্রি:)। কবিতা কুসুমাবলী এবং নীলদর্পন ছাপা হয়েছিল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বাবু বাজারে স্থাপিত এই “বাঙ্গলা যন্ত্র” নামক ছাপাখানা থেকে।

first bd printing machine & newspapersপরবর্তীতে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে এর মধ্যে ঢাকায় আরো ৬টি মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল। পূর্ববঙ্গে সে সংখ্যা ছিল ৪টি রংপুর (১৮৪৭ খ্রি:), রাজশাহী (১৮৬৮ খ্রি:), যশোর (১৮৬৮ খ্রি:), গীরিশযন্ত্র (১৮৬৮ খ্রি:) রাজশাহী। সিপাহী বিদ্রোহের সময় লর্ড ক্যানিং মুদ্রাযন্ত্র বিষয়ক আইন প্রণয়ন করলে রঙ্গপুর বার্তাবহ প্রচার রহিত হয়।

“রঙ্গপুর বার্তাবহ” এর সম্পাদক আদালতে এসে জানিয়েছিলেন তিনি আর পত্রিকা প্রকাশ করবেন না। রঙ্গপুর বার্তাবহ এর মুদ্রণ যন্ত্র থেকে সম্ভবত: ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হতে থাকে “রঙ্গুপুর দিক প্রকাশ” ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে সরকারী সূত্র অনুযায়ী জানা যায় ঐ জেলায় মাত্র একটি মুদ্রণ যন্ত্র আছে। সেখানে থেকে প্রকাশিত হয় রঙ্গপুর দিক প্রকাশ (১৮৬০ খ্রি:)

১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে “রঙ্গপুর” দিক প্রকাশের প্রচার সংখ্যা ছিল ২০০-এর মতো (উইলিয়াম হান্টারের গ্রন্থ থেকে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের স্ট্যাটিক্যাল আকাউন্স অব বেঙ্গল এর ৭ম খন্ডে রংপুর তথ্য)।

বৃহত্তর রংপুরে অবশ্য আরো ৪টি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাই। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত বই থেকে জানা যায়, ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম দিকে ৪/৫ মাইল দূরে হরিদেবপুরে ছিল “লোক রঞ্জন শাখা যন্ত্র”। বড়াই বাড়ি থেকে প্রকাশিত বইয়ে মুদ্রাকরের নাম পাওয়া গেছে, কিন্তু মুদ্রণ যন্ত্রের উল্লেখ নাই (সরকারি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী)। কুড়িগ্রামে ছিল বিভাকর যন্ত্র (১৮৯৪ খ্রি:) এবং মাহিগঞ্জ পদ্মাবর্তী যন্ত্র (১৮৯৪ খ্রি:)। তবে অনুমান করে নিতে পারি “লোক রঞ্জন” যন্ত্র আশির দশকে, বাকী ৩টি নব্বই দশকে এবং শেষোক্তটি নব্বই দশকের শেষে স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রংপুরে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থাপিত মুদ্রণ যন্ত্রের সংখ্যা ৬টি। নবাবগঞ্জেও একটি মুদ্রণযন্ত্রের নাম পাই “সরস্বতী যন্ত্র” (১৯০০ খ্রি.)।

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে এন্ডুজের ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয় ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের “এ গ্রামার অবদি বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ”। বাংলা প্রদেশে বাংলা অক্ষরে (ইংরেজি অক্ষরেও) ছাপা প্রথম বই হলো এটি। মুদ্রাকর ছিলেন ইংরেজ চালর্স ইউলিকন্স। বাংলা হরফ তৈরী করেছিলেন তিনি পঞ্চান্ন কর্মকারের সহায়তায়। এভাবেই হ্যালহেড, উইলকিনস্ আর পঞ্চান্ন কর্মকার বাংলা সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছেন।

১৭৮০ খৃস্টাব্দে জেমস্ আগাস্টাক হিকি বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র “বেঙ্গল গেজেট” ছেপেছিলেন।

বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে দেখা যায় “দিগদর্শনই” বাংলায় প্রকাশিত সর্বপ্রথম মাসিক পত্রিকা। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল এটি যশুয়া মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। “দিগদর্শনই” হলো ছাপার অক্ষরে প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র। এটি কেরীর শ্রী রামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে “দিগদর্শন” এক যুগান্তকারী ঘটনা। উইলিয়াম কেরী, জন ক্লাব মার্শম্যান, ফেলিকস্কেরী, জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, তারিণী চরণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তির আন্তরিক প্রচেষ্টায় “দিকদর্শন”… জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছায়।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের নাম ঢাকা নিউজ। ১৮৫৬ সালের ১৮ এপ্রিল এটি প্রকাশিত হয়। এই ইংরেজি সাপ্তাহিকটি বের হতো ঢাকা প্রেস থেকে। ঢাকায় প্রথম বাংলা সংবাদপত্র হলো “ঢাকা প্রকাশ”। ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার এটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১০০ বছর ধরে এই পত্রিকটি বেঁচে ছিল। এমন দীর্ঘায়ু পত্রিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত: দ্বিতীয়টি আর নেই। ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদার। পরবর্তীতে দীননাথ সেন, জগন্নাথ অগ্নিহোত্রী, গোবিন্দ্র প্রসাদ রায় এরাও এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

মুসলমান সম্পাদিত অবিভক্ত বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র হচ্ছে শেখ আলীমূল্লাহ সম্পাদিত “সমাচার সভারাজ্যেন্দ্র”। এটি ১৮৩১ সালের ৭ মার্চ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। “সমাচার সভারাজ্যেন্দ্র” ফারসী ও বাংলা ভাষাতেই প্রকাশিত হতো। এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো ১৫৭ নং কলিঙ্গায়। আর্থিক দৈন্যতার কারণে ১৮৩৫ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

মুসলমান সম্পাদিত বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র হচ্ছে “পারিল বার্তাবহ”। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন আনিছ উদ্দিন আহমদ । ১৮৭৪ সালে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের পারিল গ্রাম থেকে এই পাক্ষিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

পুরোপুরি দৈনিকের নিয়ে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা ছিল “দৈনিক আজাদ”। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর। প্রকাশক ছিলেন মাওলানা আকরাম খাঁ।

বাংলাদেশের এখন যতগুলো দৈনিক পত্রিকা রয়েছে তন্মদ্ধে সবচেয়ে পুরনো পত্রিকা হচ্ছে “দৈনিক সংবাদ” ও “দৈনিক ইত্তেফাক”। দৈনিক সংবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের ১৫ মে। ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী “ইত্তেফাক” বের করেন। তখন এটি ছিল সাপ্তাহিক। “ইত্তেফাক” দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর।

বাঙালীর জাতীয় জীবন ও বিকাশ ধারার ইতিহাসে ছাপাখানা ও সংবাদপত্র হচ্ছে প্রাণ শক্তির উৎসধারা। বাংলা ভাষা ও সংবাদপত্রের ইতিহাসে যে কয়েকজন বৈদেশিক মহান পুরুষ বাঙালী সমাজে প্রাত:স্মরণীয় ও পরম শ্রদ্ধেয় তাঁদের মধ্যে এক মহান পুরুষের নাম পাদরী উইলিয়াম কেরী, তারপরের জনই হলেন যশুয়া মার্সম্যান।

Advertisements

‘বেগম’-এর সত্তর বছর

begum-coverকাজী মদিনা : ১৯৪৭ সাল। কলকাতা হয়ে উঠেছে এক অশান্ত শহর। চারদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিধ্বস্ত কলকাতা মহানগর। এ রকম এক দুঃসময় মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ১৯৪৭ সালে ২০ জুলাই নারী জাগরণ, নতুন লেখিকা সৃষ্টি, সাহিত্য ও সৃজনশীলতায় নারীদের উৎসাহী করার লক্ষ্যে সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকা প্রকাশ করলেন। লেখিকাদের সমাজে ও জনসম্মুখে পরিচিত করার জন্য বেগম পত্রিকা প্রকাশ নারী জাগরণের এক যুগান্তকারী বিপ্লব। প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক মুক্তমনা, উদার, সাহিত্যপ্রেমী সাংবাদিক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাংবাদিকতার মাধ্যমে অবরোধবাসিনী নারীদের অচলায়তন ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার জন্য ১৯২৭ সালে মাসিক সওগাত পত্রিকায় ‘জানানা মহল’ নামে নারীদের জন্য একটি বিভাগ চালু করেন। পরবর্তী সময়ে শুধুমাত্র মেয়েদের লেখা নিয়ে বছরে একবার সওগাত পত্রিকা প্রকাশ করতেন। প্রথম সংখ্যাটি ১৯২৯ খিস্টাব্দে (বাংলা ১৩৩৭ সন) প্রকাশিত হয়। এভাবে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর সওগাত মহিলা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন উপলব্ধি করলেন মহিলাদের জন্য বছরে একটি সংখ্যাই যথেষ্ট নয়। সাহিত্যক্ষেত্রে মহিলাদের এগিয়ে নিতে হলে তাদের জন্য একটি পৃথক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। তিনি তাঁর একমাত্র কন্যা নূরজাহান বেগমকে একেবারে ছেলেবেলা থেকে পাশে রেখে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি দিয়েছেন। মহিলা সংখ্যা সওগাত প্রকাশনার কাজের সঙ্গে যুক্ত করে নুরজাহান বেগমকে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন। মহিলা সংখ্যা ‘সওগাত’-এর সঙ্গে আরও যুক্ত ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। একদিন মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সুফিয়া কামালকে ডেকে বললেন বছরে একবার যদি মহিলা সংখ্যা সওগাত বের করা হয় তাহলে মেয়েরা সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনে খুব বেশি অংশগ্রহণ করতে পারবে না। মেয়েদের নিজস্ব একটি পত্রিকা থাকলে লেখালেখির মধ্য দিয়েই পরস্পরকে জানতে পারবে। মেয়েদের জন্য একটি আলাদা পত্রিকা বের করা প্রয়োজন। সুফিয়া কামাল খুবই উৎসাহিত হলেন এবং সব রকম সহযোগিতা করার আশ্বাস দিলেন। মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন খুশি হলেন এবং বললেন। তাহলে তোমাকে প্রধান সম্পাদিকা করি এবং নূরজাহান বেগম ভারপ্রাপ্ত সম্পাদিকা থাকবে।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন কবি সুফিয়া কামাল এবং নূরজাহান বেগম এই তিনজনের গভীর আন্তরিকতা অক্লান্ত পরিশ্রম ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯৪৭ সালে ২০ জুলাই রবিবার (৩ শ্রাবণ, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ) বাংলা ভাষায় পরিচালিত প্রথম সচিত্র সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকা প্রকাশিত হয়। কুসংস্কার ও গোঁড়ামির যুগে বাংলার মুসলিম মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত সাপ্তাহিক বেগম প্রকাশ নারীদের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে এলো। প্রতিষ্ঠা দিবসে তৎকালীন নেতৃস্থানীয় মহিলারা শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। অধ্যাপিকা শামসুন নাহার মাহমুদ বলেন- আজ ভারতের মুসলমানের ভাগ্যাকাশে নতুন সূর্যের অভ্যুদয় হচ্ছে। বাংলার মেয়েদের হাতের মশাল যে কোন অংশে হীন তেজ হবে না। এ কথা জোর গলায় বলতে আর দ্বিধাবোধ করার কোন কারণ নেই। মিসেস এইচ এ হাকাম বলেন ‘যুগসন্ধিক্ষণে আপনাদের পরিচালনায় মুসলিম মহিলাদের সচিত্র সাপ্তাহিক বেগম-এর প্রকাশ আমাদের সামাজিক জীবনে নতুন ভাব ও আশার সঞ্চার করবে। বাংলা ভাষায় মুসলিম মহিলাদের এরূপ প্রগতিবাদী প্রচেষ্টা এই প্রথম।

বেগম সৈয়দ ফেরদৌস মহল শিরাজী বলেন,‘বাংলার ঘুমন্ত নারী শক্তিকে জাগিয়ে তুলবার ক্ষেত্রে বেগম এগিয়ে চলুক।’ মিসেস জাহানারা মজিদ বলেন, এই যুগসন্ধিক্ষণে আমাদের আশা-আকাক্সক্ষার দ্যুতি এবং নবজীবনের পথে আলোক সন্ধানী হবে বেগম।

প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে ছাপা হয় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ছবি। সেই ধারাবাহিকতা আজও চলছে। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতি সংখ্যা বেগমের প্রচ্ছদে একজন মহিলার ছবি ছাপা হয়। প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়েছিল ৫০০ কপি। মূল্য চার আনা। সম্পাদকীয় লেখেন উভয়েই সুফিয়া কামাল ও নুরজাহান বেগম। সুফিয়া কামাল লেখেন স্তিমিত মুসলিম জীবনে আজ নতুন চেতনা দেখা দিয়েছে। দুই শত বছরের নিপীড়িত চেতনায় আজ দেখা দিয়েছে অপূর্ব নবজাগরণের দ্যোতনা। কৃষ্টির ধারাবাহন ও সমৃদ্ধি সাধনের একমাত্র সহায় সাহিত্য-সেই সাহিত্যের ক্ষেত্রে আজও আমরা প্রায় উদাসীন। ‘এই জন্যই বহুবিদ বাধাবিঘœ ও অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমরা সাপ্তাহিক বেগম লইয়া মুসলিম নারী সমাজের খেদমতে হাজির হইলাম।’ ‘বেগম-এর একটি উল্লেখযোগ্য সাধনা হইবে নতুন নতুন লেখিকা সৃষ্টি। উৎসাহী তরুণ- লেখিকাদের কাছে আমরা রচনা ও সর্বপ্রকার সহযোগিতার আহ্বান জানাই। সকলের সমবেত চেষ্টায় বেগম মুসলিম নারী সমাজের সত্যিকার খেদমতের যোগ্য হইয়া উঠুক।’

নূরজাহান বেগম লেখেন। মুসলিম সমাজ আজ এক কঠোর দায়িত্ব গ্রহণের সম্মুখীন। অর্জিত স্বাধীনতার সম্মান ও গৌরব অক্ষুণœœ রাখতে হলে কেবল পুরুষদেরই নয়, মুসলিম নারীকেও এগিয়ে আসতে হবে নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কাজে। এর জন্য চাই আমাদের মানসিক প্রসার, আশা-আকাক্সক্ষার ব্যাপ্তি আর জীবন সম্পর্কে এক স্থির ধারণা। জীবনের প্রতি পরিপূর্ণ দৃষ্টিপাত সম্ভব কেবল সাহিত্য ও শিল্পের মধ্যস্থতায়।… আল্লাহর রহমতে, বেগম সাপ্তাহিক পত্রিকারূপে প্রকাশিত হলো। নবজাগ্রত মুসলিম নারী সমাজের আন্তরিক সহযোগিতা পেয়ে বেগম-এর দ্রুত উন্নতি সম্পর্কে আমাদের কোন সন্দেহ নেই। মুসলিম নারী সমাজের বাণীবাহক হিসেবে প্রত্যেকেই বেগমের সমান দাবিদার। প্রথম চার মাস ‘বেগম’ সম্পাদিকা হিসেবে সুফিয়া কামালের নাম থাকলেও পত্রিকা প্রকাশের জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন নুরজাহান বেগম। কলকাতা তখন ছিল অশান্ত নগরী। লেখা সংগ্রহ করা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। ঘরে বসে ফোনের মাধ্যমে লেখা সংগ্রহ করা হতো। একটি পত্রিকা প্রকাশের জন্য একাধিক নিবন্ধ প্রবন্ধ প্রতিবেদন লিখতে হয় বিভিন্ন বিভাগ অনুযায়ী। লেখিকার অভাবের জন্য নূরজাহান বেগম বাবার পরামর্শ অনুযায়ী অনুবাদের কাজ শুরু করলেন। বিভিন্ন ইংরেজীর পত্রপত্রিকা থেকে নিজেদের প্রয়োজনমতো অনুবাদ করে প্রতিবেদন ছাপানো হতো। প্রখ্যাত লেখিকা মোতাহেরা বানুর দুই কন্যা লাসিমা বানু ও তাহমিনা বানু নুরজাহান বেগমের সঙ্গে একত্রে বেগমের কাজে সহায়তা করেন। মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া লেখাতে হাত দুই-বোনের ভালই ছিল।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন নিজ তত্ত্বাবধানে বেগমের সব কিছু দেখাশোনা করেন। কোন্ লেখার সঙ্গে কোন্ ছবি যাবে, কিভাবে লেখা সাজানো হবে সে সম্বন্ধে চূড়ান্ত মতামত দিতেন মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। নিজে একবার না দেখে কোন লেখাই তিনি প্রেসে দেয়ার অনুমতি দিতেন না। তবে সব কাজই নূরজাহান বেগমের হাত দিয়েই করা হতো।

প্রথমে বর্ষ ৪২ সংখ্যা পর্যন্ত বেগম কলকাতার ১২ নম্বর ওয়েলেসলী স্ট্রিট থেকে প্রকাশিত হয়। এরপর নিজস্ব ভবন ২০৩ নম্বর পার্কস্ট্রিটে বেগম কার্যালয় স্থানান্তরিত করা হয়। বেগম-এর নতুন কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে মহিলাদের প্রীতি সম্মিলনের আয়োজন করা হয়।

তখনকার দিনের প্রায় সব মহিলা সাহিত্যিক, সমাজকর্মী লেখিকা ও পাঠিকা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অধ্যাপিকা কল্যাণী সেন প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেন। বেগম সম্পাদিকা নূরজাহান বেগম জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন,মেয়েদের পরিচালিত এই পত্রিকার উন্নতির জন্য সর্বস্তরের মহিলাদের সাহায্য কামনা করি। মেয়েরা সাহিত্য চর্চা করুক। পড়ুক, লিখুক এবং জীবন সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সমাধানের চেষ্টা করুক এই উদ্দেশ্য নিয়েই ‘বেগম’-এর প্রকাশ। বেগম চায় দেশের মেয়েদের মধ্য থেকে কুসংস্কার দূর করে, অশিক্ষার অন্ধকার দূর করে জীবনের সমস্ত ভার স্বেচ্ছায় ও সাহসের সঙ্গে, সার্থকতার সঙ্গে বহন করার বাণী শোনাতে।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের উদ্দেশ্য ছিল গ্রামবাংলার বিশাল জনপদের নারীদের লেখালেখির চর্চায় উৎসাহিত করা। আর তাই বেগম পত্রিকায় গল্প-প্রবন্ধ ছাপানোর পাশাপাশি নারীদের চিন্তা, চেতনা, মনন বিকাশের জন্য বিভিন্ন বিভাগ রাখা হয়। প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার সূচীপত্রে ছিল গল্প, প্রবন্ধ সূচিশিল্প, চিত্রশালা, স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য। ভারতের খ্যাতিনামা নারীদের ছবি মুসলিম মহিলা ন্যাশনাল গার্ড নামে প্রবন্ধ ঘরকন্যা, বর্ষার দিনে, ছায়াছবির কথা, ইরানে নারী আন্দোলন, বয়স্ক মহিলাদের শিক্ষা, বিজ্ঞানের কথা, এবং দেশ বিদেশের খবর। প্রথম সংখ্যার কোন কবিতা ছাপা হয়নি। চিঠিপত্র বিভাগ খোলার পর প্রত্যন্ত এলাকার নারীরা চিঠি লিখে বেগমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেল। আর যখন ঈদ সংখ্যা ‘বেগম’-এ লেখিকাদের ছবিসহ লেখা প্রকাশ শুরু হয় তখন এর পাঠক সংখ্যা সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে প্রথম ঈদ সংখ্যা ‘বেগম’ প্রকাশিত হয়। ৬২টি রচনা ছিল। এক রঙা, তিন রঙা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আর্ট পেপারে ছাপা রঙিন ছবি ছিল। অঙ্গসজ্জা ছিল হোয়াইট প্রিন্টিংয়ে। মূল্য ছিল ২ টাকা। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মহিলাদের ছবি সংবলিত ঈদ সংখ্যা কলকাতায় দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৪৯ সালে বিশ্বনবী সংখ্যা সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘বেগম’ কলকাতা থেকে তিন বছর প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৫০ সালে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। প্রথম দিকে ৬৬ নম্বর লয়্যাল স্ট্রীটে সত্তগাত প্রেস, আর ‘বেগমে’র কার্যক্রম পরিচালিত হতো ৩৮ নম্বর শরৎগুপ্ত রোডের বাড়ি থেকে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শরৎগুপ্ত বাড়িতেই অনুষ্ঠিত হয়। লায়লা সামাদ লয়্যাল স্ট্রীটে আর নূরজাহান বেগম শরৎগুপ্ত রোডের বাড়িতে বসতেন। কিছুদিন পর লয়্যাল স্ট্রীট থেকেই বেগম পত্রিকার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যা আজও বিদ্যমান। বেগম পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই ঢাকায় গড়ে ওঠে মহিলা কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীর মহামিলন। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত এলাকার শুধু নারীদের জন্য নয় সমগ্র পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য বেগম পত্রিকা স্থাপন করল এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বেগম তো শুধু পত্রিকা নয়, সমাজ রূপান্তরের কাজটিও অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে করে গেছে। অচিরেই নারী-পুরুষ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে পত্রিকাটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলতেন এ ব্যবসা নয়। শুধু ভালবাসার অর্জন। নিজস্ব প্রেস থাকার কারণে নামমাত্র মূল্যে পত্রিকাটি বিক্রি করেছেন। বেগম যেমন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল একই সঙ্গে ব্যক্তিসত্তায় নূরজাহান আপা সর্বজনীন আপা হয়ে গেলেন। তিনি আমাদের মায়েদের আপা, আমাদের আপা, আমাদের কন্যাদেরও আপা।

দেশ বিভাগের পর সংস্কৃতানুরাগী মুসলিম মহিলাদের বেশিরভাগ সবাই কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। সওগাতের নারীমুক্তি আন্দোলনের ফলে মুসলিম বাংলার মহিলা সমাজে যে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে উঠেছিল তার কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা। মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সাহিত্যিক সংস্কৃতানুরাগী মহিলাদের মিলনের জন্য ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। প্রেসিডেন্ট পদে শামসুন নাহার মাহমুদ এবং সেক্রেটারি হলেন নূরজাহান বেগম। বেগম সুফিয়া কামাল হলেন এক নম্বর সদস্যা। মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান করে ক্লাব উদ্বোধন করা হয়। বিপুল সংখ্যক মহিলা কবি-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবী অনুষ্ঠানে সমবেত হয়েছিলেন। নূরজাহান বেগম- ‘বেগম ক্লাবের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে সারগর্ভ বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন-“‘বাংলার মহিলা সমাজের উন্নয়নের জন্য এ পর্যন্ত বেগম যা কিছু করেছে তা সুদূরপ্রসারী কার জন্য সাপ্তাহিক বেগম এর লেখিকা পৃষ্ঠপোষক ও অন্যান্য সাহিত্যিকের সমন্বয়ে গঠিত এই সমিতি। মহিলাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মান উন্নয়নের জন্য বেগম ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হলো। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ও উৎসব উদযাপন করা হবে। ভবিষ্যত উন্নয়নের জন্য সংঘবদ্ধভাবে চিন্তা করা। সম্মিলিত চেষ্টায় ও পারস্পরিক ভাবের আদান প্রদানের মাধ্যমে শক্তিশালী সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব হবে।”

বেগম ক্লাবের মাধ্যমে ৫০ দশকে নারীরা একসঙ্গে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন। বিভিন্ন স্থান থেকে নারীরা বেগম ক্লাবে এসেছেন। মন খুলে কথা বলেছেন। নিজেদের মত বিনিময় করার মতো একটি প্লাটফর্ম তৈরি করেছে বেগম ক্লাব সেই পঞ্চাশের দশকে। যেখানে নারীরা স্বাধীন মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠত করার প্রেরণা পেয়েছে। নিজ চিন্তা, চেতনা, মননকে সমসাময়িক রেখেছেন। বেগম ক্লাবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান পল্লী উন্নয়ন বিভাগ ও মুসলিম বিবাহ এবং পারিবারিক সংশোধনী আইন নিয়ে কাজ করা। বেগম ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে এসেছেন সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, রাজনীতিবিদ, নারীনেত্রী আশালতা সেন, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, রাজিয়া বানু, দৌলতুন নেসা, দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক আবদুস সালাম, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন, অর্ধ সাপ্তাহিক ‘পাকিস্তান’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ মোদাব্বের, কেন্দ্রীয় সরকারের রিজিওন্যাল পাবলিসিটি ডিরেক্টর শরিফুল হাসান প্রমুখ। বিদেশ থেকে এসেছেন শান্তি নিকেতনের শিল্পী ইলা ঘোষ। সুপর্ণা ঠাকুর। কণিকা বন্দোপাধ্যায়। উমা গান্ধী। ইলা চট্টোপাধ্যায়। শিবানী গুহ, মিত্রা দত্ত, রীতা গাঙ্গুলী, বেলা মিত্র। চীন থেকে লেখিকা মিস মারিয়া ইয়েন। ব্যাঙ্ককের সান্ত্রীসারণ’ পত্রিকার সম্পাদিকা মিস নীলওয়ান পিনতং, আন্তর্জাতিক লেখক সংঘের করাচী শাখার প্রতিনিধি ঔপন্যাসিক কোবরাতুল আয়েন হায়দার, ইংরেজ সাংবাদিক রাশব্রুক উইলিয়ামস ও মিসেস উইলিয়ামস। গণচীনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাদাম লিকে চোয়ান, ইন্দোনেশিয়ার তরুণ নেত্রী মিসেস তিতি মেমেত তানু মিজাজা। দুঃখের বিষয় এ রকম আলোকিত ক্লাবটি কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে এর সমস্ত কর্মকা- শ্লথ হয়ে গেল। নির্জীব হতে হতে একদিন স্থবির হয়ে গেল। নূরহাজান বেগম ২০০৫ সালে বেগম ক্লাব পনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস নেন। এখন যারা প্রতিষ্ঠিত নারী তারা পুরান ঢাকায় যেতে আগ্রহী নন। ব্যর্থ হলো নূরজাহান বেগমের প্রচেষ্টা। তিনি বড় দুঃখ পেয়েছিলেন। নূরজাহান বেগম কখনও সরাসরি রাজনীতি করেননি, পথে নামেননি। তবে নারী জাগরণ, নারীর ক্ষমতায়নে যে সব আন্দোলন হয়েছে সেখানে ‘বেগম’ পত্রিকা ছিল প্রধান মাধ্যম। ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা ছাপিয়ে নারীদের আলোকিত পথে হাঁটতে ব্রতী করেছে ‘বেগম’ পত্রিকা। নূরজাহান বেগম একেবারে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বেগম পত্রিকার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বড় মেয়ে ফ্লোরা নাসরিন খানের হাতে সম্পন্ন করলেও মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পত্রিকায় কার লেখা যাবে, কোন্ কোন্ বিষয় থাকবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন নূরজাহান বেগম। সেই যে ৪৭ সালে ২০ জুলাই একটি পত্রিকা প্রকাশিত হলো তা আজও সত্তর বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে আসছে। কাল পরিক্রমায় সাপ্তাহিক থেকে মাসিক হয়েছে। নূরজাহান বেগম বিশ্বাস করতেন জীবন নির্মাণে চাই শক্ত ভিত। এই ভিত গড়ার কাজটি তিনি সাংবাদিকতার মাধ্যমে করেছেন। বেগম পত্রিকার বেশিষ্ট্য হলো লেখিকা সৃষ্টি। আর তাই অখ্যাত অজ্ঞাত মেয়েদের উৎসাহ দেয়ার জন্য তাদের লেখা পরিমার্জন করে ‘বেগম’ পত্রিকায় ছাপা হয়। গ্রামবাংলার বিশাল জনপদের সাধারণ মানুষের উপযোগী করে বেগম পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। আর তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। শহরে নয় তবে গ্রামে আজও ঘরে ঘরে বেগম পত্রিকার পাঠক রয়েছে। সুদীর্ঘ সত্তর বছর কালব্যাপী বেগম পত্রিকার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে কয়েক শত মহিলা কবি, প্রাবন্ধিক, ঔপনাসিক ছোট গল্প লেখিকা, আলোক চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমাজ সংস্কারক। নারী সমাজের মুদ্রিত রূপরেখা বেগম পত্রিকা যেমন চিহ্নিত করেছে তেমনি আবার সমাজ বদলের কাজটি সচেতনভাবে করেছে। পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে চলার পথটি প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর করার দিকনির্দেশনা দিয়েছে বেগম পত্রিকা।

উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদি রথে চড়ে দীর্ঘ সত্তর বছরব্যাপী বেগম পত্রিকা নারী সমাজের চেতনার বিকাশ ও সমাজ প্রগতির কাজ নিরন্তর করে চলেছে। সত্তর বছরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সমগ্র নারী সমাজের পক্ষ থেকে ‘বেগম’ পত্রিকাকে জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

মার্কিন মিডিয়া মালিকদের একটি বিবরণ

us-media-controlবিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে আমেরিকায়,‘করপোরেট মিডিয়া’ বলে একটি কথা চালু আছে। করপোরেট মিডিয়া করপোরেশনের সিইও দ্বারা পরিচালিত এবং তারা মিডিয়াতে কনটেন্ট কী হবে, কাদের কাছে বিক্রি হবে এবং কত অর্থ সেখান থেকে আসবে তা নির্ধারণ করেন। করপোরেট মিডিয়া এবং মূলধারার মিডিয়ার সঙ্গে সংঘাত অনেকদিনের। মার্কিন মিডিয়া মালিকদের একটি বিবরণ দেখলেই বোঝা যাবে তাদের সংবাদমাধ্যমের অবস্থাটি আসলে কোথায়।

কমকাস্ট, এনবিসি, উনিভার্সাল পিকচার্স ও ফোকাস ফিচার্স’এর মালিক জেনারেল ইলেকট্রিক; নিউজকর্পের মালিকানাধীন আছে ফক্স, ওয়াল স্ট্রিট জর্নাল এবং নিউ ইয়র্ক পোস্ট; এবিসি, ইএসপিএন, মিরাম্যাক্স ও মার্ভেল স্টুডিওজের মালিক ডিজনি; এমটিভি, নিক জেআর, বিইটি, সিএমটি ও প্যারামাউন্ট পিকচার্সের মালিক ভিরাকম; টাইম ওয়ার্নারের মালিকানাধীন আছে সিএনএন, এইচবিও, টাইম ম্যাগাজিন ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স; এবং শেষে শো’টাইম, স্মিথসোনিয়ান চ্যানেল, এনএফএল ডট কম, জেওপার্ডি ও সিক্সটি মিনিট্’সের মালিক সিবিএস। এই ছয় করপোরেশন আমেরিকার নব্বই শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

আমেরিকার মানুষ সবচেয়ে বেশি যে টিভি চ্যানেলটি দেখে তা হলো এনবিসি। এই এনবিসির মালিক হচ্ছে জেনারেল ইলেকট্রিক। জেনারেল ইলেকট্রিক হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যারা তাদের পারমাণবিক দিকটি কারো কাছে প্রকাশ করতে চায় না। পশ্চিমারা যতই তাদের সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন বলুক না কেন, এমন একটি পারমানবিক অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানির টিভি চ্যানেল কতটা স্বাধীন হতে পারে তা আলোচনা সাপেক্ষ। অনেকে বলতে পারেন, হ্যাঁ তারা সরকারের হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীন। দেখা যায়, আমেরিকায় এবং সারা বিশ্বে সবচেয়ে পরিচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর মালিক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষেরা।

বিশ্বব্যাপী ইহুদী একাধিপত্যের একটি পরিসংখ্যান

greater israel project mapপৃথিবীতে ইহুদীদের মোট সংখ্যা দেড় কোটির মত।

একটি মাত্র ইহুদী রাষ্ট্র – ইসরাইল।

ইসরাইলে ইহুদীর সংখ্যা ৫৪ লাখ, অবশিষ্ট প্রায় এক কোটি ইহুদী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে।

এর মধ্যে আমেরিকাতে ৭০ লাখ, কানাডাতে ৪ লাখ আর ব্রিটেনে ৩ লাখ ইহুদী থাকে।

ইহুদীরা মার্কিন জনসংখ্যার মাত্র ২%, আর পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.২% অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি ৫০০ জনে একজন ইহুদী!কিন্তু জনসংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকা শহরের কাছাকাছি হলেও বিশ্বে ইহুদি সম্প্রদায় থেকে যুগে যুগে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য প্রতিভাবান ব্যক্তি।

প্রধান ধর্মগুলোর পর পৃথিবীতে যে মতবাদটি সবচেয়ে বেশী প্রভাব ফেলেছে সেই কমিউনিজমের স্বপ্নদ্রষ্টা কার্ল মার্কস ইহুদি সম্প্রদায় থেকে এসেছেন।

বিশ্বের মানুষকে মুগ্ধ করে রাখা যাদু শিল্পি হুডিনি ও বর্তমানে ডেভিড কপারফিল্ড এসেছেন একই কমিউনিটি থেকে।

এসেছেন আলবার্ট আইনস্টাইনের মত বিজ্ঞানী, যাকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলা হয় আর প্রফেসর নোয়াম চমস্কি – র মত শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক যাকে প্রদত্ত ডক্টরেটের সংখ্যা আশিটির ও বেশি।

এর অন্যতম কারণ সাধারণ আমেরিকান রা যেখানে হাইস্কুল পাশকেই যথেষ্ট মনে করে সেখানে আমেরিকান ইহুদীদের ৮৫% বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। আর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমনঃ ওআইসি-র ৫৭টি দেশে বিশ্ববিদ্যালয় আছে পাঁচ হাজারের মত, আর এক আমেরিকাতেই বিশ্ববিদ্যালয় আছে প্রায় ছয় হাজার এর কাছাকাছি।

ওআইসি ভুক্ত দেশগুলোর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও যেখানে The World University Ranking সাইট এর প্রথম ১০০টা বিশ্ববিদ্যালয়েরর মধ্যে স্থান পায়নি, সেখানে প্রথম একশোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে আমেরিকার ৪৫টা বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রথম দশটার মধ্যে সাতটা) যেখানে প্রথম ২০০ র মধ্যে ওআইসি-ভুক্ত ৫৭ টি মুসলিম দেশের একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে তুরস্কের Bogazici University (১৯৯ তম)সেখানে আমেরিকার বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ২০% স্টুডেন্টস ইহুদী সম্প্রদায় থেকে আসা।

আমেরিকান নোবেল বিজয়ীদের মোটামুটি ৪০% ইহুদী অর্থাৎ নোবেল বিজয়ী প্রতি চার থেকে পাঁচ জনের একজন ইহুদী।

আমেরিকার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসররা ইহুদী।

আমেরিকার উত্তর পূর্ব উপকূলের ১২ টি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়কে এক সাথে আইভি লীগ বলা হয়।

২০০৯ সালের ১টি জরিপে দেখা গেছে আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক’জন ভিসি-ই ইহুদী।

হতে পারে ইহুদীরা আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশ, কিন্তু আমেরিকান রাজনীতিতে তাদের প্রভাব একচেটিয়া। আমেরিকার ১০০ জন সিনেটরের ১৩ জন ইহুদী। এর চেয়ে ভয়ংকর তথ্য হল ইহুদীদের সমর্থন ব্যতীত কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হতে পারে না, কোন প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট থাকতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব যতখানি- আমেরিকান রাজনীতিতে ইহুদীদের প্রভাব তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নির্বাচনী ফাণ্ড বা তহবিল সংগ্রহ একটা বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ। বারাক ওবামা বা ক্লিনটন নিজের টাকায় প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন না। ডোনেশান এবং পার্টির টাকায় তাদের নির্বাচনী ব্যয় মিটাতে হয়েছে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী ফাণ্ড দাতা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে – AIPAC – America Israel Public Affairs Committee. ::

আমেরিকার এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলো ইহুদীদের দখলে। ফলে আমেরিকার কেউ চাইলেও এদের কিছু করতে পারবে না। বরং জুইশ কমিউনিটি বা ইহুদি সম্প্রদাকে হাতে না-রাখলে ক্ষমতায় টেকা যাবে না। এসব কারণে শুধু জুইশ কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টে প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করে যেতে হয়।

আমেরিকার রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে মূলতঃ কর্পোরেট হাউজগুলো। তারা প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বানাতে পারে, এবং প্রেসিডেন্টকে সরাতে পারে। এসব কর্পোরেট হাউজগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় এদের মালিক কিংবা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কম্পানিগুলোর মূল দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা চীফ এক্সজিকিউটিভ অফিসার, সিইও হলেন ইহুদী কমিউনিটির মানুষ।

এই কথা মাইক্রোসফটের ক্ষেত্রে যেমন সত্য তেমনি জাপানিজ কোম্পানি সনির আমেরিকান অফিসের জন্যও সত্য। প্রায় অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদে জুইশ আমেরিকানরা কাজ করছেন। জুইশ কমিউনিটির ক্ষমতাধর বিলিয়নেয়াররা মিলিতভাবে যে-কোনো ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারেন।

মিডিয়া জগতে যদি আপনি তাকান তাহলে দেখবেন;

CNN, AOL, HBO, Cartoon Network, New line cinema, Warner Bross, Sports illustrated, People – Gerald Levin – ইহুদী মালিক নিয়ন্ত্রিত।

ABC, Disney Channel, ESPN, Touchstone pictures – Michael Eisner – ইহুদী মালিক নিয়ন্ত্রিত।

Fox Network, National Geographic, 20th century Fox Rupert Murdoch – ইহুদী মালিক নিয়ন্ত্রিত।

Top 4 famous Newspapers of USA & their editors
New York Times – Arthur Sulzberger
New York Post – Rupert Murdoch
Washington Post – K.M. Graham
Wall street journal – Robert Thomson
সব কয়টি খবরের কাগজ ই ইহুদী মালিক নিয়ন্ত্রিত।

আপনার প্রিয় মিডিয়া ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা Mark Zuckerberg পর্যন্ত একজন ইহুদী।

ইরাকের বিরুদ্ধে আমেরিকার আগ্রাসনকে সাধারণ আমেরিকানদের কাছে বৈধ হিসেবে চিত্রায়িত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ফক্স নিউজ। বিশ্ববিখ্যাত মিডিয়া মুগলরুপার্ট মারডকের নিয়ন্ত্রণাধীন এরকম প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই জুইশদের সমর্থন দিয়ে এসেছে। রুপার্ট মারডকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সারা বিশ্বের ১৮৫ টি পত্রপত্রিকা ও অসংখ্য টিভি চ্যানেল। বলা হয় পৃথিবীর মোট তথ্য প্রবাহের ৬০% ই কোন ন কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রুপার্ট মারডকের The News Corporation.

টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যে এবিসি, স্পোর্টস চ্যানেল, ইএসপিএন, ইতিহাস বিষয়ক হিস্টৃ চ্যানেলসহ আমেরিকার প্রভাবশালী অধিকাংশ টিভি-ই ইহুদিরা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।

আমেরিকায় দৈনিক পত্রিকা বিক্রি হয় প্রতিদিন কমপক্ষে ৫৮ মিলিয়ন কপি। জাতীয় ও স্থানীয় মিলিয়ে দেড় হাজার পত্রিকা সেখানে প্রকাশিত হয়। এসব পত্রিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ পত্রিকা যে নিউজ সার্ভিসের সাহায্য নেয় তার নাম দি এসোসিয়েটেড প্রেস বা এপি (AP)। এ প্রতিষ্ঠানটি এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন এর ইহুদি ম্যানেজিং এডিটর ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল সিলভারম্যান। তিনি প্রতিদিনের খবর কী যাবে, না-যাবে তা ঠিক করেন।

আমেরিকার পত্রিকাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী তিনটি পত্রিকা হলো নিউইয়র্ক টাইমস্ , ওয়াল ষ্টৃট জার্ণাল এবং ওয়াশিংটন পোষ্ট। এ তিনটি পত্রিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে।

ওয়াটারগেট কেলেংকারীর জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলো ওয়াশিংটন পোষ্ট। এর বর্তমান সিইও ডোনাল্ড গ্রেহাম ইহুদি মালিকানার তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে কাজ করছেন। উগ্রবাদী ইহুদী হিসেবে তিনি পরিচিত। ওয়াশিংটন পোষ্ট আরও অনেক পত্রিকা প্রকাশ করে। এর মধ্যে আর্মিদের জন্যই করে ১১টি পত্রিকা। এই গ্রুপের আরেকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত। টাইম এর পরে বিশ্বের দ্বিতীয় প্রভাবশালী এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির নাম নিউজউইক।

আমেরিকার রাজনৈতিক জগতে প্রভাবশালী নিউইয়র্ক টাইমস্-এর প্রকাশক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইহুদিরা হয়ে আসছেন। বর্তমান প্রকাশক ও চেয়ারম্যান আর্থার সালজবার্গার প্রসিডেন্ট ও সিইও রাসেল টি লুইস এবং ভাইস চেয়ারম্যান মাইকেল গোলডেন সবাই ইহুদি।

বিশ্বের অর্থনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াল ষ্টৃট জার্নাল। আঠার লাখেরও বেশী কপি চলা এই পত্রিকার ইহুদি প্রকাশক ও চেয়ারম্যান পিটার আর কান তেত্রিশটিরও বেশী পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন।

বাংলা ব্লগ দিবস উদযাপন

bangla-blog-day

‘সুলতান সুলেমান’ নিয়ে দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন

অবিলম্বে ‘সুলতান সুলেমান’র সম্প্রচার বন্ধের দাবি

দেশীয় সংস্কৃতিতে ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

sultan-suleman-bangla-dubbingশনিবার রাত দশটা। দীপ্ত টিভির পর্দায় শুরু হল বাংলায় ডাবিং করা তুর্কি সিরিয়াল ‘সুলতান সুলেমান’। শাহজাদা মুস্তফার জন্য হেরেমখানায় আনা হয়েছে এক দাসীকে। সাজিয়েগুছিয়ে তাকে রাত্রিযাপনের জন্য পাঠানো হয় শাহজাদার কাছে।

বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক ছাড়াই তারা একসঙ্গে রাত্রিযাপন করেন। সকালের দৃশ্যে দেখানো হয় সেই দাসী এবং শাহজাদা বিছানায় শুয়ে একই চাদরের নিচে অন্তরঙ্গ আলাপ করছেন। শাহজাদার গভবর্তী স্ত্রী কেঁদে কেঁদে যখন তার শাশুড়িকে দাসীর সঙ্গে এভাবে রাত্রিযাপন নিয়ে অনুযোগ করেন তখন শাশুড়ি উল্টো তার বউমাকে ভর্ৎসনা করেন।

আর এক দৃশ্যে দেখা যায়, সুলতান সুলেমানের এক স্ত্রী সুলতানা তার খাসবাঁদীকে হত্যার চেষ্টা করছেন। কারণ সুলেমান এখন এই খাসবাঁদীর প্রেমে পাগল এবং তার সঙ্গেই বেশি রাত্রিযাপন করেন। আর এটা সহ্য করতে পারছেন না সুলতানা।

এছাড়া সিরিয়ালটির শুরুর দিকে দেখানো হয়েছে, সুলতান সুলেমানের মাও এভাবে ছেলের ঘরে দাসীদের পাঠাতেন। তিনি নিজে এবং তার পিতাও বিয়ের আগে বহু দাসীকে ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করেন।

এভাবে প্রায় প্রতিদিনই হেরেম থেকে নারীদের (যারা দাসী নামে পরিচিত) শাহজাদা ও সুলতানের মনোরঞ্জনে রাত্রিযাপনের জন্য পাঠানো হয়। এই ধরনের নেতিবাচক কুরুচিকর কাহিনীতে ভরপুর দৃশ্যই দেখানো হচ্ছে দীপ্ত টিভির নিয়মিত সিরিয়াল ‘সুলতান সুলেমান’এ।

sultan-suleiman-episode-67তাই ইসলাম ধর্ম ও দেশের সংস্কৃতিবিরোধী এই সিরিয়াল বন্ধের দাবি উঠেছে দেশের বিশিষ্টজন, ইতিহাসবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন দর্শকদের মহল থেকে। তারা বলছেন, দেশীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এই সিরিয়াল। কেউ কেউ মনে করেন, এটিও দেশীয় সংস্কৃতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র।

শুধু তাই নয়, প্রশ্ন উঠেছে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে একজন মুসলমান শাসকের জীবনের এই ধরনের চরিত্র উপস্থাপন করা সিরিয়াল সম্প্র্রচারের যৌক্তিকতা নিয়েও। এছাড়া এর সত্যতা নিয়ে তো প্রশ্ন রয়েছেই।

দর্শকদের অনেকে অভিযোগ করেন, ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের অন্যতম দিকপাল সুলতান সুলেমানকে নিয়ে মেরাল ওকেয় ও ইয়িল্মায শাহিন রচিত সুলতান সুলেমান নির্মাণের সময় বিনোদন উপস্থাপন করতে গিয়ে শাসক সুলতান সুলেমানকে অনেকটাই আড়ালে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

বিপরীতে হেরেমের কূটচাল, যৌনতা, দাসদাসীদের দৈনন্দিন জীবনাচার এবং সুলতানাদের স্নায়ুযুদ্ধ দিয়ে বিনোদন জোগান দেয়ার স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে হেরেমের নানা বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে খোলামেলাভাবে।

সিরিজজুড়ে অন্দরমহলের প্রাধান্যের কারণে একজন সুশাসক সুলতানকে আড়াল করে রমণীকাতর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। আর এসব দেখে শুরুর দিকে দর্শকের অনেকে এক ধরনের বিনোদন অনুভব করলেও এখন তা ক্ষোভঅসন্তোষে রূপ নিয়েছে।

বেসরকারি চ্যানেল দীপ্ত টিভিতে গত বছর নভেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই সিরিয়ালটি এবং পরে আরও কিছু ডাবিং করা সিরিয়াল দেশের অভিনয় শিল্পী, নির্মাতা ও কলাকৌশলীদের আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দেশের শিল্পী কলাকৌশলীদের যে আন্দোলন গণজাগরণ তৈরি করেছে তার পেছনে এসব সিরিয়াল অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া জানা গেছে, সিরিয়ালটি নিয়ে খোদ তুরস্কে নানা অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে।

sultan-suleman-still-1সুলতান সুলেমান প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘তুর্কি শাসনের অন্তরালের জগৎ নৈতিকতার দিক থেকে নানাভাবে এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ। সেগুলোর প্রতিফলন সুলতান সুলেমান নামের এই সিরিয়ালে রয়েছে, আমি দেখেছি। কিন্তু এটা কোনো রুচিশীলতার পরিচয় বহন করে না। আমার কাছে অন্তত ভালো লাগেনি। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য অনেক কিছুকেই বাণিজ্যিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে।’

বিশিষ্ট নাট্যজন ও নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, ‘ইসলামের নাম দিয়ে অশ্লীলতা প্রদর্শন করা হচ্ছে। মা আর মেয়ে একসঙ্গে হেরেমখানায় প্রবেশ করছে। এটা কি আমাদের সংস্কৃতি? এটা কোনোভাবেই আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। এসবের খুব বাজে প্রভাব পড়ছে সমাজে। ডিভোর্সের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কিশোরতরুণরা এগুলো দেখে বিপথগামী হচ্ছে। অবিলম্বে সুলতান সুলেমানসহ ডাবিং করা সব সিরিয়ালের সম্প্র্রচার বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।’

নাট্যজন আতাউর রহমান বলেন, ‘সুলতান সুলেমানে আমাদের সংস্কৃতি শেকড়ের কিছু নেই। তবে সব ডাবিং সিরিয়াল বন্ধ করার কথা আমি বলছি না। ডাবিং করা ভালো, কিছুও তো আমরা দেখেছি। মনে রাখতে হবে আমাদের ভালো নাটক দিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আমাদের নাটকের মান পড়েছে। সেখানেই ভালো করার ব্যাপারে আমাদের জোর দেয়া উচিত।’

এ ব্যাপারে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর যুগান্তরকে বলেন, আমি একটি কথাই বলব, দেশে মানসম্মত প্রযোজনা থাকলে এই ধরনের ডাবিং করা সিরিয়াল দেখা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্য আমাদের কোয়ালিটি প্রডাকশনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এদিকে দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ সুলতান সুলেমানের মতো সিরিয়াল কিভাবে সম্প্রচারের অনুমতি পেল সে ব্যাপারে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে জানার চেষ্টা করলে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করা হলে কেউ কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

sultan-suleiman-meriem-uzeril-hurremতবে সিরিয়ালটি প্রচারে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার দিকনির্দেশনা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪এর তৃতীয় অধ্যায়ের সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার অধ্যায়ের ৩..১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, দেশীয় সংস্কৃতি, ঐহিত্য ও ভাবধারার প্রতিফলন এবং এর সঙ্গে জনসাধারণের নিবিড় যোগসূত্র স্থাপন ও আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ধারাকে দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে সংস্কৃতি বিকাশের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।

আরেক জায়গায় ৩..৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দেশীবিদেশী ছবি অনুষ্ঠানে অশ্লীল দৃশ্য, হিংসাত্মক, সন্ত্রাসমূলক এবং দেশীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। ৫..১২ এর অনুচ্ছেদে বলা হয়, অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন দেশের প্রচলিত আইন, রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কিন্তু সুলতান সুলেমানের ক্ষেত্রে এসবের অনেক কিছুই মানা হচ্ছে না

ধানমণ্ডি এলাকার বাসিন্দা সাবরিনা মিশু নামে একজন গৃহিণী যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘শুরুতে সুলতান সুলেমান দেখতাম। কিন্তু পরে যখন দেখলাম এখানে নারীকে ভোগ্য পণ্যের মতো হেরেমের মধ্য দিয়ে দেখানো হচ্ছে তখন দেখা বন্ধ করে দিই। আরও ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে এই সিরিয়ালে একাধিক স্ত্রী রাখার বিষয়টিকে উৎসাহ দিয়ে দেখানো হয়েছে।’

এদিকে এসব অভিযোগের ব্যাপারে দীপ্ত টিভির সিইও কাজী উরফি আহমদ বলেন, ‘আমরা দর্শকদের পছন্দের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই সিরিয়ালটি প্রচার করছি এবং মানুষ স্টার জলসা বা ভারতীয় অন্যান্য চ্যানেল না দেখে এটি দেখছে। তবে আমি স্বীকার করছি, আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে কিছু কিছু বিষয় যায় না।’

তিনি দাবি করেন, বাস্তবতা হচ্ছে, ইতিহাসে এমন তথ্যই রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নাটকীয়তা আনতে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা এসেছে, এটা ঠিক। তবে একটি সিরিয়াল সংস্কৃতিসহ সব ধ্বংস করছে আমি এমনটা মানতে নারাজ।’

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

‘সুলতান সুলেমান’ নিয়ে গোলাম মাওলা রনি’র ভাবোচ্ছ্বাস !

sultan-suleman-still-4জামাতশিবিরের অর্থায়নে প্রকাশিত দৈনিক নয়াদিগন্তে গোলাম মাওলারা সুলতান সুলেমান টিভি সিরিয়ালে চৌম্বক শক্তি আবিষ্কার করেছেন তার ভাষায় – “নাটকটিতে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক উপাখ্যান, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদবকায়দার প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি। রয়েছে নির্মল বিনোদন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জীবনধর্মী আরো অনেক বিষয়, যা দর্শকদের চৌম্বক শক্তির মতো টানতে থাকে। এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেগাসিরিয়াল থেকে আমাদের যেমন অনেক কিছু শেখার রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যও রয়েছে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ।সুলতান সুলেমান নিয়ে মাওলা বাবার এহেন মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায় তার রুচি জ্ঞানের বহর ! আজ দৈনিক যুগান্তর সুলতান সুলেমান নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে যা পড়লে এই টিভি সিরিয়াল দেখা থেকে বিরত থাকা উত্তম বলে মনে হবে । আমার পরের পোষ্টে যুগান্তরের প্রতিবেদনটি হুবহু উপস্থাপন করলাম পাঠকদের সুবিধার্থে ।

তুরস্ক ও এরদোগানের অন্ধ সমর্থক জামাতশিবির কর্মীরা বাংলাদেশের মানুষের ভেতর তুরস্কপ্রীতি জাগৃতিকরণে এই টিভি সিরিয়াল দেখার জন্য উৎসাহ যোগাবে তাতে সন্দেহ নেই যদিও এদের নেতাকর্মীদের জন্য এই সিরিয়াল দেখা শরীয়াহসম্মত হবে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চুপতা অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে !

আহলান! ওয়া সাহলান! ইয়া সুলতান সুলেমান!

sultan-suleman-actressগোলাম মাওলা রনি : বাংলাদেশের সর্বস্তরের টেলিভিশন দর্শকদের পক্ষ থেকে তুর্কি সুলতান সুলেমানকে স্বাগত জানাচ্ছি। সুলতান যখন আরব মুল্লুকে যেতেন, তখন রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা শাসক সুলেমান দ্য গ্রেট বা সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টকে আহলান! ওয়া সাহলান অর্থাৎ আমাদের গৃহে স্বাগতম বলে অভ্যর্থনা জানাতেন। হাজার হাজার সৈন্যের কুচকাওয়াজ, নহবতের সুরলহরী এবং কৃতজ্ঞ জনগণের হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে এগোতে গিয়ে মহামতি সুলেমান তার সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের হৃদয়ে কতটুকু আনন্দ সঞ্চারিত করতে পারতেন তা বলা না গেলেও তার মৃত্যুর ৪৫০ বছর পর তাকে নিয়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে যা হচ্ছে তা যদি তিনি জানতেন, তবে নিশ্চয়ই অতি মাত্রায় বিমুগ্ধ ও আনন্দিত হতেন।

তুর্কি অটোমান সালতানাতের গর্ব এবং ইসলামি তাহজিব তমদ্দুন ও কানুনের অন্যতম প্রধান রত্ন মহামতি সুলতান সুলেমানের রাজত্বকাল ছিল ৪৬ বছর। আধুনিক তুরস্ক, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার বৃহদংশ, পুরো মধ্যপ্রাচ্য, ইরানের কিয়দংশ, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, আলবেনিয়াসহ বলকান অঞ্চল এবং রোডসসহ পুরো ভূমধ্যসাগরে তার ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড তার অধীনতা মেনে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। অস্ট্রিয়া, ইতালি, এমনকি জার্মানি মূলত তার ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকত। পারস্য সম্রাট তাহমাউসপের সাথে সুলতানের বিরোধ ছিল বটে। কিন্তু সম্মুখ সমরে তিনি কোনো দিন সুলতানের মুখোমুখি হননি সব সময় পালিয়ে গেছেন নতুবা এড়িয়ে গেছেন। ফলে তৎকালীন দুনিয়ার একমাত্র সুপারপাওয়ার অটোমান সাম্রাজ্যের তলোয়ার, ঘোড়ার খুরের আওয়াজ এবং কামানের গোলার সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো বীর ধরাভূমে ছিলেন না।

সুলতান সুলেমানের জীবদ্দশায় সুবেবাংলা অথবা দিল্লি সালতানাত কেমন ছিল, তা ইতিহাসের পাঠকেরা খুব ভালো করেই জানেন। সুলতান যদি ভারতবর্ষে আসতেন তবে আমাদের রাজাবাদশাহ, নওয়াব এবং জঙ্গবাহাদুরেরা কী করতেন, জানি না। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে যারা সুলতান সুলেমানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন তাদের কথাবার্তা, দাবিদাওয়া ও আবদারগুলো জনমনে ভারী কৌতূহলসংবলিত কৌতুকের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির কোনো নেতানেত্রী কিন্তু এই সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন একদল অভিনেতাঅভিনেত্রী ও কলাকুশলী। তারা দলবেঁধে গলা ফাটিয়ে আপত্তি সংবলিত আবদার জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কোনো বিদেশী সিরিয়ালের বাংলা ডাবিং, অর্থাৎ বাংলায় রূপান্তরিত সংলাপসহ সম্প্রচার করা যাবে না।

sultan-suleman-still-2বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের নাটকে রঙতামাশা, হাস্যরস ও কৌতুকাভিনয়ে বলতে গেলে দুর্ভিক্ষ লেগেছিল অথবা ওলাওঠা বিবির অভিশাপে মড়ক লেগেছিল। এক সময়ের খান জয়নুল, হাবা হাসমত, আলতাফ, টেলিসামাদ, রবিউল, আনিস প্রমুখের অনবদ্য অভিনয় এবং লোক হাসানোর প্রকৃতি প্রদত্ত গুণাবলির বদলে ইদানীংকালের জোর করে হাসানোর কাতুকুতু মার্কা সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গি দেখে দর্শকদের রুচি যখন বিচ্যুতির প্রান্তসীমায় পৌঁছে গিয়েছিল, তখন একশ্রেণীর দর্শক বেঁচে থাকার তাগিদে ভারতীয় চ্যানেলের ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে পড়েন এবং অন্য শ্রেণীর দর্শকেরা টেলিভিশন দেখাই ছেড়ে দিলেন।

ভারতীয় চ্যানেলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যে ও দৌরাত্ম্যে আমাদের সাহিত্যসংস্কৃতি, সমাজসংসার ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। হত্যা, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ব্যাংক লুট, লোক ঠকানো, মিথ্যাচার প্রভৃতি কবিরাহ গুনাহ রীতিমতো শৈল্পিক মর্যাদা পেয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে প্রচারিত হচ্ছে, যার মরণনেশায় পড়ে স্ত্রী স্বামীকে ত্যাগ করছে, স্বামী স্ত্রীকে মেরে ফেলছে। মা তার শিশুসন্তানকে মেরে ফেলছে টিভি সিরিয়াল দেখার সময় কান্না করার অপরাধে। অথবা স্ত্রী গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহনন করেছে এ কারণে যে, তার স্বামী তাকে টিভি সিরিয়াল দেখতে দেয়নি অথবা টিভি সিরিয়ালের এক নায়িকার মতো একটি জামা কিনে দেয়নি।

কতিপয় ভারতীয় চ্যানেলের কিছু অনুষ্ঠানের নেশা ভয়াল মাদক ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, মারিজুয়ানা, গাঁজা ইত্যাদির চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ব্যভিচার, পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা, ধর্ষণ, পরকীয়া, অবাধ যৌনাচার, অসম দৈহিক সম্পর্ক, অনৈতিক কিংবা অকল্পনীয় সম্পর্কগুলো প্রকাশ্যে এবং অবাধে এমনভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে, যা দেখে মানবিকতা আর অমানবিকতা, মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব একাকার হয়ে নারকীয় রূপ ধারণ করছে। বাবার ষাট বছর বয়সী বন্ধুর সাথে স্কুলপড়ুয়া কিশোরী কন্যার যৌনতা, সন্তানের চেয়েও কম বয়সী ছেলেদের সাথে ষাটোর্ধ্ব মহিলার ব্যভিচার হিন্দি চ্যানেলের দর্শকদের কাছে ভাতমাছ হয়ে গেছে। পূতপবিত্র পারিবারিক সম্পর্কের অনাদিকালের বিশুদ্ধতা ও নির্মলতাকে এক শ্রেণীর লম্পট কুলাঙ্গার এমনভাবে কলুষিত ও কলঙ্কিত করে তুলছে, যা প্রকাশ করার মতো রুচি এই নিবন্ধকারের নেই। আইয়ামে জাহেলিয়াতের জঘন্য যুগেও যেসব সম্পর্ককে পবিত্র ও বিশুদ্ধ মনে করা হতো, সেগুলোর মূলেও জ্ঞানপাপী নরাধমরা একের পর এক আঘাত হেনে চলেছে।

ভারতীয় সিরিয়ালগুলো আমাদের নীতিনৈতিকতা এবং মনমানসিকতার স্তর কতটা নিচে নামিয়ে ফেলেছে তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ঢাকার এক মধ্যবিত্ত দম্পতির ছয় বছরের ফুটফুটে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। স্বামীর বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের মতো আর স্ত্রী ত্রিশ। দুজনেই কথিত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং দেখতে উভয়েই বেশ সুন্দর। তারা প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন এবং বিবাহিত জীবনে মোটামুটি দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখেন। হঠাৎ তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক সমস্যা দেখা দিলো। এক রাতে স্ত্রী ঘুম থেকে জেগে দেখলেন স্বামী বিছানায় নেই। তিনি চুপি চুপি ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখলেন স্বামী হিন্দি সিরিয়াল দেখছেন এবং অত্যন্ত গর্হিত একটি অপকর্ম করছেন। লজ্জায় স্ত্রী কিছু বলতে পারলেন না। তিনি শোয়ার ঘরে ফিরে শিশু সন্তানটিকে জড়িয়ে ধরে বহুক্ষণ কাঁদলেন। পরের দিন রাগ করে বাবার বাড়ি চলে এলেন। স্ত্রীর ধারণা, তার স্বামীর মানসিকতা এমন পর্যায়ে বিকৃত হয়েছে যে, তার পক্ষে শিশু সন্তানকেও ধর্ষণ করা অসম্ভব নয়। অতএব, বিচ্ছেদ।

নাটক, সিনেমা, রিয়েলিটি শো, গেম শোর পাশাপাশি নৃত্য প্রতিযোগিতার নামে যা দেখানো হয় তা অশ্লীলতা ও নোংরামির মাত্রা অতিক্রম করে চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সাতআট বছরের বালকবালিকা বা তেরোচৌদ্দ বছরের কিশোরকিশোরীদের নৃত্য প্রতিযোগিতায় যে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেখানো হয় তা শৈল্পিক বিচারে কোনোমতেই নৃত্য হতে পারে না। বিকৃত মানসিকতা সৃষ্টি এবং একটি প্রজন্মকে নষ্ট করার সুগভীর চক্রান্ত ছাড়া ওসব বেহায়াপনার অন্য কোনো মূল্য রয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

sultan-suleman-still-5বাংলাদেশের সুলতান সুলেমানবিরোধীরা কোনো দিন কোনোকালে ভারতীয় অপসংস্কৃতির ভয়াবহ আগ্রাসন এবং বেলাগাম বিস্তার রোধে রাস্তায় নেমেছিলেন, এমন কথা কেউ কোনো দিন শোনেননি। বরং তাদের মধ্যে অনেকে ভারতীয় চ্যানেলের বিভিন্ন সিরিয়াল এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান নকল করে দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে প্রচার করছিলেন, যা দেখে সুস্থ সবল মানুষের দৈহিক ও মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে নামতে পারে তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠানের মানের অধোগতি এবং ভারতীয় চ্যানেলগুলোর নেশাময় বিকৃত অনুষ্ঠানমালার কারণে দর্শকেরা যখন হতাশার প্রান্তসীমায়, ঠিক সেই সময়ে দেশীয় একটি অটোমান সুলতান সুলেমানের জীবনের ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত কাহিনীনির্ভর মেগাসিরিয়াল বাংলায় অনুবাদ করে সম্প্রচার করে যাচ্ছে।

সুলতান সুলেমান বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত দশ বছরে যারা টিভি দেখেননি তারাও কাজকর্ম ফেলে বাংলায় ভাষান্তরিত সিরিয়াল দেখার জন্য যথাসময়ে টিভির সামনে হাজির হয়ে যান। পুরো পরিবার নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে টিভি দেখার, বিশেষ করে মাসের পর মাস ধরে একই আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগের ঐতিহ্য এ সমাজে খুব কমই দেখা গেছে। ধারাবাহিক নাটকটির নির্মাণশৈলী, সাজসজ্জা, অভিনেতাঅভিনেত্রীদের অনবদ্য অভিনয়, কাহিনী, সংলাপ এবং মঞ্চায়নের নিখুঁত মুনশিয়ানার কারণে দর্শকেরা নাটকটির প্রতিটি পর্ব দেখার সময় মনোজগতের ডানায় ভর করে চলে যান মহামতি সুলেমানের শাসনামলে। তার হেরেমে, রাজপ্রাসাদে অথবা অটোমান যুগের পথপ্রান্তর, রাস্তাঘাট, হাটবাজার কিংবা দরবার ও আদালতে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, তুরস্কে নির্মিত সুলতান সুলেমাননামক টিভি সিরিয়ালটি সারা দুনিয়ায় এযাবৎকালে নির্মিত মেগা সিরিয়ালগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের দর্শকপ্রিয়তা যোগ করলে এটি এক নম্বরে পৌঁছে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাটকটিতে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক উপাখ্যান, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদবকায়দার প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি। রয়েছে নির্মল বিনোদন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জীবনধর্মী আরো অনেক বিষয়, যা দর্শকদের চৌম্বক শক্তির মতো টানতে থাকে। এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেগাসিরিয়াল থেকে আমাদের যেমন অনেক কিছু শেখার রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যও রয়েছে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ।

বাংলাদেশের অভিনেতাঅভিনেত্রী, প্রযোজকপরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীরা কেন সুলতান সুলেমানের মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক বন্ধের জন্য রাজপথে নেমেছেন, তা বোধগম্য নয়। তবে দেশের জনগণ যে তাদের নিজ নিজ গৃহে সম্মানিত মেহমান হিসেবে সুলতান সুলেমান নাটকের পাত্রপাত্রীদের বরণ করে নিয়েছেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের অভিনেতাঅভিনেত্রীরা জনগণের সেই ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে যত তাড়াতাড়ি নিজেদের সংশোধন করে নেবেন, ততই সবার জন্য মঙ্গল।

টেলিভিশন নাটক নিয়ে পুরো মিডিয়াপাড়ায় যে তেলেসমাতি চলছে, তা বন্ধ না করে ডাবিং করা সিরিয়াল বন্ধের দাবির আওয়াজ ধোপে টিকবে না। অতীব নিম্নমানের নাটক নির্মিত হচ্ছে। অন্য দিকে পুরো মিডিয়া জগতের বিনোদন ক্ষেত্রটি স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে। মাত্র এক থেকে দেড় লাখ টাকা দেয়া হয় একটি নাটক নির্মাণের জন্য। ঈদের বিশেষ নাটকের বাজেট দুই লাখ থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকার মধ্যে। এই স্বল্প বাজেটের সাথে সামাল দেয়ার জন্য পুরো নাটকপাড়া এবং শুটিং স্পটগুলোতে যে কী হয় তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই বলতে পারেন। নির্মিত নাটকগুলো কথিত সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়া প্রচারিত হয় না। পরিস্থিতি এতটাই অবনতির দিকে গেছে যে, ওই সিন্ডিকেট নাটকের নায়কনায়িকাসহ প্রধান পাত্রপাত্রীদের পর্যন্ত মনোনীত করে দেয়।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবর ও টকশোর অনুষ্ঠানগুলোর মান এখন আর কোনো মানদণ্ডে নেই। একটু শিক্ষিত ও সজ্জনরা বিবিসি, আলজাজিরা, সিএনএন, ফক্স নিউজ, ভারতের এনডিটিভি দেখেন। অনেকে আবার বিটিভির খবরের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। করপোরেট হাউজের মালিকানাধীন চ্যানেলগুলো নিজ নিজ মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী সব কিছু পরিচালনা করে থাকে। নাটকের চেয়েও বিশ্রী অবস্থার মধ্যে পড়েছে টকশোর অনুষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রেও বহু অভিযোগ শোনা যায়। শত অভিযোগের বিপরীতে রূঢ় বাস্তবতা হলো, টকশোর নামে যা দেখানোর চেষ্টা করা হয় তা আসলে কেউ দেখে না। কারণ ওগুলো আসলে দেখা যায় নাএমনকি দেখা উচিতও নয়।

আমার ধারণা, কোনো টিভি চ্যানেল যদি বিখ্যাত ল্যারি কিং লাইভ, ক্রিস্টিনা আমানপোর, বিবিসি হার্ড টক, সিমি গাড়োয়াল, কফি উইথ করণ, রজত শর্মার আপ কি আদালত ইত্যাদি সাড়া জাগানো বিদেশী টকশোগুলোর বাংলা ডাব প্রচার আরম্ভ করে, সেগুলো সুলতান সুলেমানের তুলনায় কম জনপ্রিয়তা পাবে না। আমরা এর আগে সাড়া জাগানো কিছু ইরানি ছবি, অস্কারপ্রাপ্ত ইংরেজি ছবিসহ নামকরা বিদেশী ছবি বাংলা ডাব অথবা বাংলা সাব টাইটেলসহ বিভিন্ন টিভিতে প্রচার হতে দেখেছি। ছবিগুলোর মান, শৈল্পিক আবেদন এবং বিনোদন কোনো দর্শকই ভুলতে পারেননি। সাউন্ড অব মিউজিক, দি মেসেজ, দি মেসেঞ্জার, স্বর্গীয় শিশু, বৃদ্ধাশ্রম প্রভৃতি শিল্পসম্মত ছবি থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি ওগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হয় তাহলে আর যাই হোক, লাভ হবে না।

সূত্রঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬