আর্কাইভ

Archive for the ‘ভ্রমণ’ Category

ফিরিঙ্গি বাজার

firingi bazar 2মো. রেয়াজুল হক : নতুন ব্রিজের পর প্রথমে বাঁয়ে তারপর ডানে মোড় নিয়েছে কর্নফুলী। এই মোড়েই ফিরিঙ্গিবাজার। ফিরিঙ্গি শব্দে ইতিহাস আছে।

ফারসি শব্দ ফারাঙ্গ। সাদা মানুষ বোঝায়। ফারাঙ্গ থেকে ফিরিঙ্গি এসেছে। আমরা ফিরিঙ্গি বলতে ইউরোপীয় বিশেষ পর্তুগিজদের বুঝে থাকি। এককালে ফিরিঙ্গিবাজারে পর্তুগিজরা ব্যবসা করত, থাকতও অনেকে।

ফিরিঙ্গিবাজার এলাকা

কোতোয়ালি থানার মোড় থেকে কর্ণফুলী দক্ষিণে। নদীর উত্তর পার ঘেঁষে সড়কটি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নাম। সড়কের বাম ধারে একটি খ্রিস্টীয় উপাসনালয়। চার্চের গা ঘেঁষে একটি গলি। গলির মুখেই এয়াকুব আলী দোভাষ ফ্রাইডে ফ্রি-ক্লিনিক। আরেকটু এগোলে জে এম সেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এরপর পাওয়া যায় আবু সাইদ দোভাষ জুমা মসজিদ। আরেকটু পরে দোভাষ মাঠ। দোভাষ মাঠে আছে কিছু ফলের আড়ত। তারপর কাঁচাবাজার। কাজী নজরুল ইসলাম সড়কটি ফিরিঙ্গি বাজার মোড়ে গিয়ে মিশেছে মেরিনার্স ড্রাইভ রোডের সঙ্গে। ওয়ার্ড কমিশনার কার্যালয় কাছেই। কমিশনার কার্যালয়ের উল্টোদিকে ডা. জাকির হোসেন হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। ফিরিঙ্গিবাজার এসব কিছু নিয়েই।

এবার ইতিহাস

পর্তুগিজ নাবিক ও পর্যটক ভাস্কো দা গামা ভারতে এসেছিলেন ১৪৯৮ সালে। ভারত আগমনের পর ১৫১১ সালে পর্তুগিজরা মালাক্কা দখল করে নেয়। পরে তারা চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে একটি কারখানা ও কাস্টমঘর স্থাপন করে। এর ফলে খুব দ্রুত প্রায় পাঁচ হাজার পর্তুগিজ বা ইউরোপীয় লোকের বসতি গড়ে ওঠে। পরে এরা কর্ণফুলীর দুই পারে এবং আরো পরে সন্দ্বীপের বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তারা দেয়াঙে বিশাল নৌ ও সামরিক দুর্গ স্থাপন করে। একসময় মোগল নৌবাহিনী পর্তুগিজদের সহায়তায় আরকানিদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর উদ্ধার করে। উল্লেখ্য, শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম দখলে আনেন ১৬৬৬ সালে। এর ফলে চট্টগ্রামে পর্তুগিজদের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হয়। ঢাকার দিকে সরে যেতে থাকে তারা। রেখে যায় ফিরিঙ্গিবাজার। ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডটির প্রতিষ্ঠা ১৯৩৭ সালে। এটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড। শহর চট্টগ্রামের আর দশটি এলাকার মতোই এখনকার ফিরিঙ্গিবাজার। কয়েকটি জায়গায় লোক বেশি ভিড় করে। সেগুলোর কথা একটু বেশি করে বলা যায়।

ব্রিজঘাট

মেরিনার্স ড্রাইভ রোডের ফলের আড়তগুলো ফেলে এগোলেই কর্ণফুলী নদীর একটি ঘাট। এটি ব্রিজঘাট হিসেবে পরিচিত। ওপারে দক্ষিণকূল বা চরপাথরঘাটা। এই ঘাট দিয়েই সাম্পানে করে মানুষের যাতায়াত। মালামালও যায়। সারা দিনই পারাপার চলে। সকালে শহরমুখী মানুষের ভিড় বেশি থাকে। তারাই আবার কাজ শেষে বিকেলে ফেরত যায়। নদীর পারেই আছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়নকেন্দ্র, বরফ বিক্রয়কেন্দ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিস।

firingi bazar church

কাঁচাবাজার

ফিরিঙ্গিবাজার মোড়ের একটু আগেই কাঁচাবাজার। দেশি ফলের আড়ত অনেক। কলা, জাম্বুরা, আখ, ডাব, নারিকেল কেনাবেচা চলে। কলার বিকিকিনি সবচেয়ে বেশি। ভাই ভাই ফার্মের মাঝি মোবারক হোসেনের সঙ্গে কথা হলো। বললেন, ‘বাংলা এবং চাঁপাকলা আসে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চন্দনাইশ থেকে। সাগরকলা আসে দিনাজপুর, মেহেরপুর ও মধুপুর থেকে। খুচরা বিক্রেতারা সারা শহর থেকেই আসে এখানে। কলার কাঁদি নিয়ে গিয়ে শহরের বিভিন্ন বাজারে খুচরা বিক্রি করে।’

অভয়মিত্র ঘাট

ফিরিঙ্গিবাজার মোড় থেকে ডানদিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে সিটি করপোরেশনের কসাইখানার সামনে দিয়ে নদীর দিকে কিছুদূর গেলে অভয়মিত্র ঘাট। বেশ কিছু কাঠের আড়ত আছে এখানে। এরপর বন্দরের কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা। বন্দর অফিসার্স কলোনি ফেলে সারদা শঙ্খমার্কা খাঁটি সরিষার তেল কারখানা, বন্দর ইলেকট্রিক সার্ভিস সেন্টার এবং বন কর্মকর্তার কার্যালয়। অভয়মিত্র ঘাট বেশি পরিচিত বেড়ানোর জায়গা হিসেবে। প্রতিদিন বিকেলেই অনেক মানুষ ভিড় করে। এখানকার নদীতে ছোট ছোট জাহাজ, ট্রলার নোঙর করা। সন্ধ্যার পর  ভাসমান জাহাজে বাতি জ্বলে ওঠে। পানিতে পড়ে তার ছায়া। ঢেউয়ে যায় ছড়িয়ে। শেষে মিলিয়ে যায়।

Advertisements

তুঘলকের রাজধানী জাঁহানপনা

tughluk 3মোহাম্মদ মাহবুবুর নূর : মুহম্মদ বিন তুঘলককে বলা হয় ম্যাড জিনিয়াস। যুদ্ধের ময়দানে থাকতেই বেশি পছন্দ করতেন এবং কোনো যুদ্ধেই হারেননি। বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগ ছিল। নিয়মিত তাঁর দরবারে ভিনদেশি দূতেরা হাজিরা দিত। এই তুঘলকেরই রাজধানী জাঁহানপনা। এর অর্থ জগতের আশ্রয়। দিল্লির চার নম্বর শহর এটি। এখনকার দিল্লি অষ্টম শহর। জাঁহানপনা বাদ দিলে আরো যে ছয়টি থাকে সেগুলোর নাম লালকোট, সিরি, তুঘলকাবাদ, ফিরোজাবাদ, দিনপনাহ ও শাহজাহানাবাদ। দিল্লি থেকে জাঁহানপনা যাওয়া যায় অটোরিকশায় চড়েই। বলতে হয় বেগমপুর গ্রামের কেল্লায় যাব।

বাকি আছে কিছু

জাঁহানপনার কিছু অংশ টিকে আছে এখনো। তারই খোঁজে চলেছি। মোঙ্গল আক্রমণ থেকে বাঁচতে তুঘলক লালকোট, সিরি, তুঘলকাবাদ ও রাজধানী জাঁহানপনাকে দেয়াল দিয়ে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। অর্থাভাবে অবশ্য এ বিশাল দেয়াল নির্মাণ শেষ করতে পারেননি। এখনো খিরকি গাঁয়ে দেয়ালের কিছু অবশেষ দেখা যায়। অলিগলি পেরিয়ে লোহার গেটের ভেতর দিয়ে পৌঁছলাম জাঁহানপনার বিজয়মণ্ডলের সামনে। এখানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার একটি সাইনবোর্ড আছে। আরেকটি বোর্ডে লেখা আছে ইবনে বতুতার কথা। তিনি এখানে এসেছিলেন।

ঘুরে ঘুরে দেখলাম

বিজয়মণ্ডলে আছে উঁচু একটি মঞ্চ। চুন, সুরকি আর পাথরের তৈরি। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। মঞ্চে ওঠার পর একজন মানুষ পেলাম। তিনি প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের গার্ড। এককোণে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। সামনে চোখ মেলে দিয়ে একটু দূরের খোলা প্রান্তরে সুফি শেখ হাসান তাহিরের সমাধি দেখতে পেলাম। সিকান্দার লোদীর শাসনামলে (১৪৮৯-১৫১৭) শেখ সাহেব এখানে বসবাস করতেন। আরো সিঁড়ি ভেঙে বিজয়মণ্ডলের ছাদে উঠলাম। ছাদে একটি আটকোনা ঘর আছে। বলা হয়ে থাকে তুঘলক এখান থেকে তাঁর সামরিক বাহিনীর অনুশীলন দেখতেন। বিজয়মণ্ডলের পাশেই আছে একটি বড় গম্বুজওয়ালা ভবন। ধারণা করা হয়, এটি ছিল বৈঠকখানা। সুলতানের সঙ্গে যাঁরা দেখা করতে আসতেন তাঁরা এখানে নাম-পরিচয় খাতায় উঠাতেন। তারপর ডাক না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। ঘরের ভেতর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলাম। বিজয়মণ্ডলের সঙ্গে একটি পথ এই ভবনের সঙ্গে যোগ করা ছিল। জাঁহানপনায় হাজার সুতুন বা হাজার স্তম্ভের ঘরও আছে। হাজার সুতুন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিরও ছিল, তবে সেটা তাঁর রাজধানী সিরিতে। হাজার সুতুনের বেশি কিছু আর অবশিষ্ট নেই। পিলারগুলো শুধু বিলাপ করছে।

tughluk 1

তুঘলকদের কিছু কথা

১৩২১ থেকে ১৪১৪ সাল পর্যন্ত মোটমাট ১০৭ বছর তুঘলক বংশ দিল্লির গদিতে সমাসীন ছিল। প্রথম তিন তুঘলক গিয়াসউদ্দিন তুঘলক (১৩২১-১৩২৫), মুহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১) এবং ফিরোজ শাহ্ তুঘলক (১৩৫১-১৩৮৮) শাসন করেন ৬৭ বছর। দিল্লির পুরনো সাতটি রাজধানীর তিনটিই তাঁদের হাতে তৈরি। মুহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লির পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের দৌলতাবাদেও রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি চেয়েছিলেন জোড়া রাজধানী তৈরি করতে। দৌলতাবাদে তিনি একটি নতুন অভিজাত শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এরই ফলে বাহমনি বংশের উত্থান ঘটে। ইবনে বতুতা তখনকার দিল্লির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি কাজির দায়িত্বেও ছিলেন কিছুকাল। তাঁর লেখা থেকে পাচ্ছি, ১৩৩৪ সালের মার্চের দুর্ভিক্ষে দিল্লিতে ছয় মাস ধরে শস্য বিতরণের আদেশ দেন সুলতান। মুহম্মদ বিন তুঘলক পারস্য থেকে চীন পর্যন্ত সালতানাতের প্রসার ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে গদিতে বসেন ফিরোজ শাহ্ তুঘলক। তিনি ভারতের সেচ ব্যবস্থার জনক। তিনি পাথুরে দিল্লিকে শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেন। তুঘলকদের আমলের বেশির ভাগ সময় বাংলা দিল্লির সঙ্গেই যুক্ত ছিল।

ভ্রমণ-গ্রন্থঃ তিব্বতে সওয়া বছর

tibet tour‘তিব্বতে সওয়া বছর বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক অংশে অনুবাদক মলয় চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন- ‘লেখকের অনুরাগী বন্ধু শ্রী জয়চন্দ্র বিদ্যালঙ্কারের মতে এটি হিন্দি সাহিত্যের প্রথম ভ্রমণ কাহিনী। …আজ থেকে অর্ধশতাব্দী আগে,যখন তিব্বত ছিল এক নিষিদ্ধ দেশ,তখন পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন এক মহৎ সংকল্পে ব্রতী হয়ে,প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে গোপনে সে দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁর সেই নিষিদ্ধ যাত্রার বর্ণনা আজও আমাদের মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহে।’

রাহুল সাংকৃত্যায়ন শ্রীলংকায় ছিলেন ১৯২৭-২৮ সালের দিকে। অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা দুটোই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। এর আগে ১৯২৬ সালে একবার তিনি লাদাখে কয়েকদিনের জন্য গিয়েছিলেন।

তিব্বতে যাওয়ার জন্য তিনি সোজা পথ ব্যবহার করেননি। সরকারি পাসপোর্ট-ভিসায় ঝামেলা হবে এটা জেনেই তিনি অবৈধভাবে নেপালে ঢুকে সেখান থেকে তিব্বতে যাওয়ার মনঃস্থ করেন। শিবরাত্রির সময়ে নেপালে প্রচুর তীর্থযাত্রীর আগমন ঘটে। সেই সময়ে তাদের সাথে মিশে নেপালে প্রবেশের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। বই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। ভ্রমণকালেও তিনি বইয়ের সঙ্গ ছাড়তেন না। সিংহল থেকে নেপালে আসার সময় তিনি সাথে করে যে পরিমাণ বই এনেছিলেন,তার মোট ওজন ছিল পাঁচ মণ। শিবরাত্রির অনুষ্ঠান হতে আরও কয়েক মাস বাকি আছে বলে তিনি এই ফাঁকে পশ্চিম ও উত্তর ভারতের প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান যেমন- ইলোরা,অজন্তা,কনৌজ কোশাম্বী,সারনাথ,নালন্দা,বৈশালী লুম্বিনী প্রভৃতি জায়গায় ভ্রমণ করেন।

তিনি স্বদেশি সংস্কৃতির মহত্ত্ব ও ঐশ্বর্য সম্পর্কে সচেতন;তাই বিদেশি সংস্কৃতির বিজ্ঞাপন ও আস্টম্ফালন যে তাঁকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম নয়,সে কথাই তার চিন্তা ও সমাজ বিশ্নেষণের প্রধান বিষয়।

ধ্বংসাবশেষে পরিণত হওয়া নালন্দার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে হয়েছিল- ‘নালন্দা আমার rahul shankritayonস্বপ্ন,আমার প্রেরণা। এখানে কৃতবিদ্য মনীষী পি তদের চরণস্পর্শে পবিত্র হয়েছিল যে পথ,আমাকেও সেই পথেই তিব্বত যাত্রা করতে হবে।’

বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে নেপালবাসী ভারতীয়দের সে সময় সন্দেহের চোখে দেখত। তাই নেপালে প্রবেশ করে তিব্বতি ভোটদের ভাষা তিনি শিখে নেন এবং তাদের মতো পোশাক পরা শুরু করেন। তিব্বতিদের মতো স্নান করাও ছেড়ে দিয়েছিলেন।

নেপালে লুকিয়ে থেকে বন্ধুর পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে অনেক ক্লেশ স্বীকার করে তিনি তিব্বতে প্রবেশ করেন। তিব্বতের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজে নারীদের অবস্থান, ভিক্ষুজীবন, মঠের জীবনপ্রণালি, আহার-বিহার, বেশভূষা প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর ‘তিব্বতে সওয়া বছর’ বইয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। চীন,ভুটান,নেপাল ও মঙ্গোলিয়ার সাথে তিব্বতের সম্পর্ক,তথা দ্বন্দ্ব,ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা তার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টির আড়ালে থাকেনি।

বিভাগ:ভ্রমণ

ভুতুড়ে দ্বীপ রস আইল্যান্ড !

ross island 1a

ross island 1b

ross island 1c

উত্তরে দু’টি চক্কর দিয়ে ত্রিভুবনে আছড়ে পড়ে প্লেন

us-bangla landing pathইকরাম-উদ দৌলা : দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্লেন দুর্ঘটনা হয় গত ১২ মার্চ কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে। সেদিন ইউএস-বাংলার বিএস-২১১ ফ্লাইটটি উত্তর দিকে দু’টি চক্কর দিয়ে রানওয়েতে নামতে গিয়ে আছড়ে পড়ে।

তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) কর্মকর্তা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সিসিটিভি’র তথ্য বিশ্লেষণের পর এমন তথ্যই পেয়েছেন।

ত্রিভুবন এয়ারপোর্টটি রানওয়ে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর। যেখানে উত্তর দিকের রানওয়েকে বলা হয় টুজিরো (২০) আর দক্ষিণ দিকের অংশকে বলা জিরোটু (০২)। সাধারণত জিরোটু’র দিক থেকেই ফ্লাইটগুলো অবতরণ করে। আর টুজিরো দিয়ে উড়ে যায়। তবে ব্যতিক্রম হলে দু’দিক থেকেই নামে এবং উড়ে।

গত ১২ মার্চ দুর্ঘটনার আগে এটিসি থেকে দুইবার দু’দিক থেকে ইউএস বাংলার পাইলট আবিদ সুলতানকে নামাতে বলা হয়, যা ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে। পাইলট পরবর্তীতে টুজিরো দিয়েই নামার অনুমতি চায়। এটিসি পাইলটকে উত্তর-পূর্ব দিকে চক্কর দিতে বলে। পাইলট সেটি ঠিকমতই করেন। এরপর তিনি উত্তর পশ্চিমে এসে আরেকটি চক্কর দিয়ে নিচের দিকে নামতে থাকেন। যে সময় এটিসি টাওয়ারের খুব কাছে চলে আসে প্লেন। সেখান থেকে নিরাপদে সরে এসে রানওয়েতে আড়াআড়িভাবে অবতরণ করার চেষ্টা করে।

প্লেনটি নামে বিমানবন্দরের ফায়ার ভেহিক্যাল বিল্ডিংয়ের ১৫০ মিটার সামনে রানওয়ের বাঁ পাশে। সেখানে স্পর্শ করেই প্লেনটি রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে যায় বাইরে।

us-bangla landing marks

তদন্ত কমিটির হাতে এমন একটি গ্রাফ চিত্রও রয়েছে। যা বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। গ্রাফে ওপরে ডান দিকে গোল মার্ক দিয়ে দেখানো হচ্ছে রানওয়ের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি চক্কর দিয়ে প্লেনটি। আর বা দিকে গোল মার্ক দিয়ে দেখানো হচ্ছে উত্তর-পশ্চিম দিকে একটি চক্কর দিয়েছে প্লেনটি। উত্তর-পশ্চিমে চক্কর দিয়েই আড়াআড়িভাবে দক্ষিণে নেমে এসে রানওয়ের স্টার চিহ্নিত অংশে প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়।

ত্রিভুবন বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজ কুমার ছেত্রী বাংলানিউজকে এমন তথ্য জানিয়েছেন। তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং প্লেন আছড়ে পড়ার গ্রাফ চিত্র ছাড়াও এটিসি-পাইলটের কথোপকথনও বিশ্লেষণ শুরু করেছে। আর চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পেতে কমপক্ষে দু’মাস সময় লাগবে বলেও জানান ছেত্রী।

প্লেন দুর্ঘটনাটি ত্রিভুবন বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে তৃতীয় বৃহত্তর দুর্ঘটনা। এ পর্যন্ত বিমানবন্দরের ভেতরে-বাইরে প্রায় ৭০টি দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

ফ্লাইট বিএস-২১১ বিধ্বস্ত হলে চার ক্রুসহ ৬৭ যাত্রীর মধ্যে ৪৯ জন নিহত হন। এদের মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি,একজন চীনা ও ২২ জন নেপালি নাগরিক রয়েছে। অবশিষ্ট ২২ জনও কমবেশি আহত হন।

ইউএস বাংলা বিমান দুর্ঘটনা

মৃত্যু থেকে ফিরে আসা ৭ যাত্রীর লোমহর্ষক বর্ণনা

নেপালের কাঠমান্ডের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ৪ ক্রুসহ ৬৭ জন যাত্রীর মধ্যে ৫০ জন যাত্রীই নিহত হন। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছেন কয়েকজন মাত্র। তবে বেঁচে ফিরে আসতে পারলে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সময়কার লোমহর্ষক সেই মুহূর্তগুলো কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তারা। বার বার দুর্ঘটনার কথা মনে করে শিউরে উঠছেন বেঁচে ফেরা মানুষগুলো।

আর এদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। এতো বড় একটি দুর্ঘটনাটি থেকে বেঁচে ফিরে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তারা এখনো বেঁচে আছেন। বিধ্বস্ত ইউএস বাংলা থেকে বেঁচে ফেরা ৭ যাত্রী জানালেন তাদের লোমহর্ষক বর্ণনা। বিধ্বস্ত ইউএস বাংলা বিমান থেকে বেঁচে ফেরা সনম শাকিয়া নামে বিমান যাত্রী বলেন, বিমানটি একবার ওপরে, একবার নিচে, একবার ডানে, একবার বাঁয়ে পাক খাচ্ছিল। প্রথমে আমি ভাবলাম, বিমান নামার সময় মনে হয় এমনটাই ঘটে থাকে। পরে যখন বিমানটি বিস্ফোরণ হয় তখন আমি জানালা দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলাম।
বেচেঁ যাওয়া আর এক যাত্রী শাহরীন আহমেদ (২৯)। যিনি বর্তমানে কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন তিনি। বেড়ানোর উদ্দেশে নেপাল যাচ্ছিলেন তার এক বন্ধুর সাথে। কিন্তু দুর্ঘনার হাত থেকে তিনি বেঁচে ফিরলেও তার বন্ধু নিহত হন।

us-bangla dash

সাংবাদিকদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওই দুপুর আড়াইটার দিকে কাঠমান্ডু পৌঁছে পাইলট প্রথমে ল্যান্ড করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি। পরে আকাশে কিছুক্ষণ ঘোরার পর যখন দ্বিতীয়বার ল্যান্ড করার চেষ্টা করেন, তখন বিমানের একপাশ উঁচু হয়ে যায়। তখনই আমি বললাম, বাঁ দিকটা উঁচু হলো কেন! আর তখনই ক্রাশ হয়ে গেল। এরপরই বাইরে হঠাৎ প্রচন্ড আগুন দেখতে পেলাম। আর আমাদের কেবিন ধোঁয়ায় ভরে গেল এবং বিকট শব্দে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটল। আগুন লাগার প্রায় ২০ মিনিট পর উদ্বারকারীরা সাহায্য করতে আসেন। সে পর্যন্ত বিমানের ভেতরেই বসেছিলাম। প্রচন্ড ভয় লাগছিল আর হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করছিলাম।

শাহরীন আহমেদ কাঁদতে কাঁদতে আরো বলেন, ‘বিমানে থাকা মানুষগুলো পুড়ে যাচ্ছিল। তারা চিৎকার করছিল এবং বিমান থেকে পড়ে যাচ্ছিল। আমি জ্বলন্ত বিমান থেকে তিনজনকে লাফ দিতে দেখেছি। এটা ভীষণ ভয়ানক পরিস্থিতি ছিল। এরপর সৌভাগ্যবশত কেউ আমাকে সেখান থেকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যায়।

স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির পরিবারের ৫ জন মিলে কাঠমান্ডু ঘুরতে গিয়েছিলেন সৈয়দা কামরুন্নাহার স্বর্ণা। সাভারের গণস্বাস্থ্য মেডিকেল থেকে কয়েক দিন আগে এমবিবিএস পাস করেছেন। স্বামী মেহেদী হাসান জীবনবাজি রেখে বাঁচিয়েছেন তাকে। দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন ভাসুর (স্বামীর বড় ভাই) ও ভাসুরের আড়াই বছরের সন্তানকে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তার জা। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পাওয়া স্বর্ণা বর্তমানে কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ (কেএমসি) হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। বুধবার সকালে আইসিইউতে গিয়ে বাংলাদেশি সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি স্বেচ্ছায় কথা বলতে রাজি হন। দুর্ঘটনার সময় ফ্লাইটের ভেতরের অভিজ্ঞতার বর্ণনার অডিও রেকর্ড স্বর্ণার অনুমতি নিয়ে ধারণ করা হয়েছে।
আমরা ১৪ নম্বর সিটে বসেছিলাম। পাঁচজন পাঁচটি সিটে ছিলাম। ১৪-এ এবং ১৪-সি’তে আমি আর আমার স্বামী, ১৪-ডি এবং ১৪-এফ সিটে আমার ভাইয়া ও ভাবি বসেছিলেন। ভাবি জানালার পাশে ছিলেন। প্রথমে আমি জানালার কাছে বসলেও ল্যান্ডিংয়ের সময় আমার স্বামী জানালার কাছে বসে।

অবতরণের সময় প্লেনটা একটু ঝাঁকি খেয়েছে। কেবিন ক্রুরা ল্যান্ডিংয়ের ঘোষণা ছাড়া কোনো ঘোষণা দেয়নি, কোনো সতর্ক সংকেত দেয়নি। তবে ওনারা বুঝতে পারছিলেন প্লেনটা ভালোভাবে চলছে না। প্লেন এয়ারপোর্টে আসার পর দেখছি রানওয়ে ও অন্যান্য প্লেন বাঁকা হয়ে আছে। বুঝতে পারছিলাম আমাদের প্লেনটিই বাঁকা হয়েছিল। এরপরও পাইলট প্লেনটা ল্যান্ড করানোর চেষ্টা করেছেন, বাঁকা থেকে সোজা করার চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণ পর আবার প্লেনটা কাঁপছিল, সঙ্গে সঙ্গে সামনের চার-পাঁচটা গ্লাস ভেঙে গেল, সামনের যাত্রীরা বলছিল ‘ব্লাস্ট ব্লাস্ট’। তখন প্লেনটি পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। আমার পায়ের নিচে আগুন ধরে গিয়েছিল। আমি তখন চিৎকার করে বলছিলাম, ‘আমি মরতে চাই না। আমি আগুনে পুড়ে মরতে চাই না।’ আমার স্বামী তখন কেডস পরা অবস্থায় পা দিয়ে জানালা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন।
বিপদের সময় মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। আমার স্বামী অনেকটা মাথা খাটিয়ে চেষ্টা করেছে ওখান থেকে আমাকে বের করার। প্লেনের সামনের অংশটা ভেঙে গিয়েছিল। আমাদের কাছাকাছি চার-পাঁচটি সিটও ভেঙে গিয়েছিল, সেই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সেই জায়গা থেকে আলো আসছিল। তখন আমার স্বামী কোনো মতে ওইদিক দিয়ে বের হয়েছে। তারপর উনি (স্বামী) আমাকে ডাকলেন, ‘তুমি আস।’ তখন ভাবি এগিয়ে এসে ওই ফাঁকাটা দিয়ে ঢুকে গেছেন। আমি বের হতে পারিনি। ওই সময় আমার মাথার উপর বক্সটা ভেঙে গিয়েছিল (মাথার ওপর হ্যান্ড ব্যাগেজ রাখার কেবিন)। সে সময় আমি আমার ভাসুরকে দেখতে পাচ্ছিলাম। উনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, শিশুটা ছিটকে পড়ে গিয়েছিল।

অনেক মানুষের মাথা দেখতে পাচ্ছিলাম। তারা বের হওয়ার চেষ্টা করছিল অথবা বের হতে পারছিল না। কারণ তারা শরীর নাড়াতে পারছিল না। ভাইয়া (ভাসুর) যেখানে ছিল সেখান থেকে আগুন জ্বলছিল, ধোঁয়া এসে আমার নাকে লাগছিল। মনে হচ্ছিল এ আগুনে পুড়েই তো মরে যাব। এরপর আমার মাথাটা কোনো মতে প্লেনের ভাঙা অংশ দিয়ে বের করি। আমার হাসব্যান্ড যতটুকু গিয়েছিল ততটুকু আবার ফেরত এসেছে তারপর আমার হাত ধরে টেনে বের করেছে। তা না হলে আমি বের হতে পারতাম না, কারণ আমার শরীরে কোনো শক্তি ছিল না। বের হওয়ার পর ঘাসের উপর পড়েছিলাম।

প্লেনটি ক্রাশ এবং ভেতরে ধোঁয়া সৃষ্টি হলেও কোনো অক্সিজেন মাস্ক বের হয়নি। ইমার্জেন্সি অ্যালার্মও দেয়নি। একটা প্লেনে অক্সিজেন মাস্ক থাকবে না? যখন দুর্ঘটনায় পড়বে তখন অক্সিজেন মাস্ক তো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হওয়ার কথা। অক্সিজেন থাকলে অনেক মানুষ সুস্থ থাকত, অন্তত শ্বাস নিতে পারত। যদি অক্সিজেন মাস্ক থাকত তবে অনেকে সজ্ঞান থাকত এবং বের হতে পারত। মানুষ বেরই হতে পারেনি। আমি ধোঁয়া খেয়েছি, আমি বুঝতে পারছি। ধোঁয়ার কারণে মাথাটা ঘুরে উঠে, কিছু বোঝা যায় না, অজ্ঞান অজ্ঞান লাগে।

আমার পর আরও দুই-তিনজন মানুষ বের হয়েছিল। আমরা বের হওয়ার ২ মিনিটের মাথায় বড় একটা শব্দ হয়। চোখের সামনে বিধ্বস্ত প্লেনের আগুন জ্বলতে দেখছিলাম। যারা উদ্ধারের জন্য গিয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিস, তাদের আমার অভিজ্ঞ মনে হলো না। তারা আগুন কন্ট্রোলে আনতে পারছিল না। তাদের কেউ ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল না। একটু ব্লাস্ট হলেই সবাই পেছনে দৌড়ে চলে যাচ্ছিল।

প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক বাংলাদেশি মেহেদি হাসান। প্রথমবারের মতো বিমান ভ্রমণ করছিলেন তিনি। তার স্ত্রী, এক আত্মীয় এবং ওই আত্মীয়ের মেয়ে সঙ্গে ছিল। মেহেদি বলেন, আমার সিটটি পেছনে ছিল। আমি আগুন দেখে পরিবারকে খুঁজতে শুরু করলাম। আমরা জানালা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। আমাদেরকে উদ্ধার করতে পারে এমন মানুষকে খুঁজছিলাম। আমি আর আমার স্ত্রীকে উদ্ধার করা হলো। কিন্তু আত্মীয়দের পাওয়া যায়নি।

বসন্ত বহরা নামে আরেক যাত্রী বিমান বিধ্বস্তের সময়কার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘হঠাৎ করেই বিমানটি প্রচন্ড রকম কাঁপতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটে। আমি জানালার কাছে ছিলাম। সেটি ভাঙতে পারায় আমি প্রাণে রক্ষা পাই। তারপর আর কিছু মনে নেই।’

কেশব পান্ডে নামের এক নেপালি যাত্রী বলেন, ‘বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর আমি বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমার হাত ও পা আটকে যাওয়াতে বরে হতে পারছিলাম না। আমার সিট ছিল জরুরি নির্গমন দরজার পাশেই। সম্ভবত সেখান দিয়েই উদ্ধারকর্মীরা আমাকে বের করেছেন। এর বেশি কিছু মনে নেই ।

আশীষ রণজিৎ নামের এক যাত্রী বলেন,আমি এয়ার হোস্টেজকে জিজ্ঞাসা করি, কী হচ্ছে, সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো? তিনি আমাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বোঝান, সব ঠিক আছে। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, তাঁর চেহারার মধ্যে আতঙ্ক ফুটে উঠেছে।

ভয়াল রানওয়ে!

dangerous airports 1a

dangerous airports 1b.jpg

নদী, তুমি কোন কথা কও?

river- feniশেখ রোকন : গত দেড় দশকে দেশ ও বিদেশে অনেক নদী পরিভ্রমণ করেছেন। নদীর সঙ্গীন অবস্থার পাশাপাশি সৌন্দর্যও চোখে পড়েছে এ সময়। আলোকচিত্র: মোহাম্মদ আবদুল বাতেন

নদী কি আসলেই কথা বলে? প্রশ্নটা প্রথম করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। ‘রাইসর্ষের খেত সকালে উজ্জ্বল হলো- দুপুরে বিবর্ণ হ’য়ে গেল/তারি পাশে নদী; নদী, তুমি কোন কথা কও?’ হেরম্যান হেস তার বিশ্বখ্যাত ‘সিদ্ধার্থ’ উপন্যাসে এর উত্তর রয়েছে যে, নদী আসলেই কথা বলে। কেবল কথা বলা নয়, আমাদের ঘরের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহও তার ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে দেখিয়েছেন, নদী মানুষের মতোই গুমরে গুমরে কাঁদে। কল্লোলিনী নামের সার্থকতা প্রমাণ করে অনেক নদীকে হাসতে দেখেছি কতবার! জৈবিক মানুষের মতো নদীর জন্ম-মৃত্যুও রয়েছে; মধ্যরাতে কুড়িগ্রামের যাত্রাপুর ঘাটে বসে সত্তরোর্ধ্ব আবদুল আজিজ আমাকে শিখিয়েছিলেন- ‘পানির জন্ম হয় পুষ মাসে’। সামনে ঘন কুয়াশায় ঢাকা ব্রহ্মপুত্র তার জলন্ত বিড়ি ও প্রজ্ঞার আগুনে আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছিল, মনে আছে।

গত দেড় দশকে দেশ-বিদেশের কত নদীই তো দেখলাম! বাড়ির কাছের সোনাভরি থেকে দূর হিমালয়ের সুবর্ণসিড়ি; ত্রিপুরার রাইমা থেকে ইউরোপের রাইন। ক’দিন আগে মোটাদাগে হিসাব করে দেখি, সশরীরে পরিভ্রমণ করেছি, এমন নদ-নদীর সংখ্যা তিনশ ছুঁই ছুঁই।

river- jadukata

চোখের সামনে নদীর দুর্দশাও যেন দুর্দমনীয় হয়ে উঠছে ক্রমশ। ঢাকায় থাকতে গিয়ে না চাইলেও দখলে-দূষণে জেরবার বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু দেখতে হয়। বগুড়ার সারিয়াকান্দি বা কুড়িগ্রামের চিলমারীতে যমুনার ধপাস ধপাস ভাঙনের শব্দ কতবার বুকের মধ্যে এসে শেলের আঘাতের মতো লেগেছে! ফারাক্কার কারণে যৌবন হারানো গঙ্গার আর্তনাদ দেখেছি চাঁপাইনবাগঞ্জের শিবপুরের চরপাকায় গিয়ে। নদীর সেই আর্তচিৎকারকেও আমরা ভাঙন হিসেবেই জানি। অপরিকল্পিত জলকপাটের কারণে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত পাবনার ইছামতীর মতো কতশত ছোট নদী এখন ধুঁকছে। অবিমৃষ্যকারী আড়াআড়ি বাঁধের নিচে চাপা পড়ে বড়ালের মতো বিপুল নদীও শীর্ণকায় হতে দেখেছি। আবার সেই বাঁধ অপসারণের মতো অনুপ্রেরণা জাগানিয়া আন্দোলনও আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে।

এত অত্যাচার সত্ত্বেও আমাদের দেশে কিছু নদী এখনও সুন্দর। একেবারে রবীন্দ্রনাথের ‘ভরা নদী ক্ষুরধারা খর পরসা’ এখনও টিকে রয়েছে। এখনও সেগুলো সোনালি ধানভর্তি ‘সোনার তরী’ বয়ে নিয়ে আসে কৃষকের কাছে। কে না জানে, ভরা নদী মানে নতুন পানিতে মাছের উলল্গাস; ভরা নদী মানে গ্রাম্য কিশোরীর অবাধ সাঁতার। দেখেছি, ভরা নদীর চারপাশের ঘাস ও গাছপালা কীভাবে গাঢ় সবুজ হয়ে ওঠে। আর নদী যদি না ভরে, তাহলে এখনও দু’কূল উপচানো পানির মাধ্যমে পলির পরশ পেয়ে ভূমি উর্বর হয় কীভাবে? কীভাবে বিল-ঝিলে মাছের প্রজনন হয়? ভরা নদীর চারপাশের বাতাসে যে ভেজা স্বাদ, তা কেবল নদীর কাছে গেলেই মেলে। কতবার দেখেছি, বর্ষা ও শরতে আকাশের মেঘ-ভেলা নদীর জলেও খেলা করে, মায়া তৈরি করে।

river- shandya

এমন মায়াময় নদীর প্রথম দেখা পেয়েছিলাম নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরে গিয়ে। ঢাকা থেকে যেতে যেতে দুখী চেহারার তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, খিরু, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র দেখে দেখে সোমেশ্বরী গিয়ে চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল। সীমান্তের ওপাশের গারো পাহাড় থেকে শান্তভাবে নেমে সৌম্যকান্তি নিয়ে বয়ে চলছে কংসের দিকে। কোথাও কোথাও বালি ও চর পিঠ দেখাচ্ছে বটে, তাতেও যেন শ্যামল ছায়া। নদীটি মেঘালয়ে সিমসাং নামে পরিচিত।

অবশ্য সবার আগে বলতে হয় ব্রহ্মপুত্রের কথা। নানা নামে ও চরিত্রে তিব্বত, অরুণাচল, আসাম বেয়ে আমারই বাড়ির পাশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রৌমারী থেকে কুড়িগ্রাম বা রংপুরের মতো শহরগুলোতে যেতে শৈশব থেকেই ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিতে হতো নৌকায়। বড় হয়ে জেনেছি, ব্রহ্মপুত্র হচ্ছে ‘মহানদী’। সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন ‘পিতামহ ব্রহ্মপুত্র’। তবে ব্রহ্মপুত্রের সৌন্দর্য ঠিক ভালোবেসে মুগ্ধ হওয়ার মতো নয়; বরং শ্রদ্ধা ও সমীহ মিশ্রিত ভালোলাগা কাজ করে। এর বিশালত্ব, এর বিপুল প্রবাহ, এর গর্জন, এর ভাঙন ক্ষমতা, এর দু’কূল ছাপানো বন্যা, এর দুই পাড়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য- সবই শ্রদ্ধা ও সমীহ জাগানিয়া।

river- shari

বাংলাদেশের আরেকটি চমৎকার নদী সারি চোখে পড়েছিল সিলেট শহর থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে কোম্পানীগঞ্জের দিকে যেতে যেতে। আসলে যাচ্ছিলাম ওই এলাকায় প্রবাহিত ধলা ও পিয়াইন নদী দেখতে। পথে সালুটিকর বাজারের আগে, পাগলামুড়ার কাছে পড়েছিল সারি নদী অনেকটা অকস্মাৎ। এই নদী দেখার স্মৃতি এখনও অম্লান; হালকা নীলচে প্রবাহ সকালের রোদে ঝকঝক করতে করতে বয়ে চলছে আমাদের সমানে। নদীর পাড়ে, ঢালের ওপর একটি পাথর ভাঙার মেশিন। ঢালের নিচে, পানির কাছাকাছি আয়োজন কর মাছ ধরার বড়শি পেতে বসে আছেন কয়েকজন। মেঘালয়ের মাইনথ্রু গোটা জৈন্তিয়া পাহাড়ি জেলা ঘুরে জৈন্তাপুরের কাছে সারি নামে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে। পরবর্তীতে গোয়াইনঘাট ঘুরে ছাতকে সুরমা নদীর সঙ্গে মিশেছে।

সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে বিশ্বম্ভরপুরের দিকে যেতে ফতেহপুরের কাছে পথে পড়ে রক্তি নদী। উজানে এই নদীরই নাম যাদুকাটা, শান্ত জলে যাদুর মায়া। মেঘালয়ের ঢেউ খেলানো পাহাড়ের ছায়ায় প্রশান্তি নিয়ে বয়ে চলে। বিশ্বম্ভরপুরের চিনাকান্দি বাজারের কাছে মেঘালয়ের পাহাড় যেন হাতের কাছে। তারপরই যাদুকাটা নদী। যাদুকাটার আদি নাম রেণুকা। কেউ কেউ বলেন, এই পুণ্যতোয়া নদীতে স্নান করলে জাদু-টোনা কাটা যায়। তাই এর নাম যাদুকাটা। ভারতের খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ে এর উৎপত্তি।

কাকতালীয়ভাবে সন্ধ্যা নদীর দেখা পেয়েছিলাম সন্ধ্যার আগে আগে। দুপুরের মরা রোদে গাবখান সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সহযাত্রী বলেছিলেন, ওই যে দূরে সন্ধা, সুগন্ধা ও ধানসিড়ি মিলিত হয়েছে। জীবনানন্দের ধানসিড়িই আসলে দেখতে যাচ্ছিলাম। মত পাল্টিয়ে আগে সন্ধ্যা দেখতে নেমে গিয়েছিলাম। সেই সন্ধ্যা সার্থক হয়েছিল।

river- shangkha

বান্দরবানে গিয়ে দেখেছিলাম শঙ্খ নদী। অনেকের বিবেচনায় একটি পাহাড়ি নদীর সব সৌন্দর্য এখনও অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে এই একটি নদী। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন, সবুজের ভেতরে পড়ে রয়েছে রূপালি ফিতা। কোনো কিশোরী এখনই হাতে তুলে নিয়ে চুল বাঁধতে পারে।

আর বান্দরবানে যাওয়ার পথে পড়েছিল ফেনী নদী। নদীটির সৌন্দর্যের সঙ্গে রয়েছে গাম্ভীর্যও। ফেনী নদী ছিল প্রাচীন আরাকান ও বঙ্গের সীমান্তরেখা। একটি দৃশ্য এখনো চোখে লেগে আছে। ফেনী নদীর তীরে হেলানো একটি জামগাছে দোলনা বেঁধে খেলছিল দু’জন কিশোরী। দুলে দুলে নদীর বুক থেকে ফিরে আসছিল মাটিতে। ঠিক যেন ইতিহাসের আকাশ থেকে বর্তমানের মাটিতে ফিরে আসা। ফেনীর ঐতিহাসিকতা মাথায় থাকার কারণেই এমন ভাবনা এসেছিল কি-না কে জানে!

এই লেখার ভাবনা অবশ্য ১৪ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস’ সামনে রেখে। লিখছি মনে করিয়ে দিতে যে, এখনও অনেক নদী অনেক সুন্দর। সেগুলো দেখতে গেলে কেবল বাংলাদেশের নদ-নদীর আদি ও অকৃত্রিম রূপ উদ্ভাসিত হবে না; ইতিমধ্যে বিপন্ন নদীগুলোর আসল রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদও তৈরি হবে।

জীবনানন্দ দাশের প্রশ্নের উত্তরে খোদ নদীগুলো সেই কথাই বলছে।

river- brahmaputra