আর্কাইভ

Archive for the ‘ভ্রমণ’ Category

উত্তমাশা অন্তরীপে ভ্রমণ

cape of good hopeআশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : গাড়িতে করে জোহানেসবার্গ পার্ক বাসস্টেশনে নামিয়ে দিল রানা ও তৌকির। এখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে বাস যায়।

লম্বা ভ্রমণে ঘুমানো মুশকিল, তবু আরামদায়ক একটা ঘুম দিলাম। সময় কাটাতে বাসের কাচ ভেদ করে রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য অবলোকন করতে লাগলাম। ছোট ছোট টিলার সারি, মাঝেমধ্যে কিছু বসতবাড়ি ছাড়া পুরো এলাকাই ফাঁকা মরুভূমির মতো। জনমানবের কোনো চিহ্ন নেই। ১৮ ঘণ্টায় ১৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাস ঠিকঠাকই পৌঁছল কেপটাউনে। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মাহমুদুল হাসান শিপলুর বন্ধু মাসুদ থাকে কেপটাউনে। নিজের গাড়ি নিয়ে বাসস্টেশনে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল সে। বাসায় যাওয়ার পথে একচক্কর শহরটা ঘুরিয়ে দেখাল। কিছু এলাকায় গাড়ির পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়াটা বেশ কঠিন। পাঁচ-ছয়বারের চেষ্টায় পার্ক করা যায়। ওর বাসার সঙ্গেই আছে একটি সুন্দর মসজিদ। মাসুদ জানাল, এই এলাকায় প্রচুর মুসলমান রয়েছে। বাংলাদেশির মালিকানাধীন ৫০টির মতো গ্রোসারির দোকান রয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হলো, পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার মুদি ব্যবসার পুরোটাই বোধ হয় আমাদের দখলে। ওই দেশের প্রতিটি শহরে বাংলাদেশি গ্রোসারির দোকান পাওয়া যায়। যদিও জীবন এখানে অনেক অনিশ্চয়তায় ভরা, তার পরও দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করাটা সহজ হওয়ায় বাংলাদেশিরা মোটামুটিভাবে সফল। যদিও এখন ইমিগ্রেশন আইন অনেক কড়াকড়ি। এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার পাসপোর্টধারী অনেক বাংলাদেশি অন্য দেশে চলে গেছেন।

দুপুরে খাবার খেয়ে মাসুদ বলল, বিকেলে ‘টেবিল মাউন্টটেন’-এর পাশে ‘সিগন্যাল হিল’-এ ঘুরতে যাব। সঙ্গী হিসেবে মাসুদের চাচাতো ভাই বাবলু। সে-ও দীর্ঘদিন ধরে আছে কেপটাউনে। আসার পথে একটা মাজার দেখলাম। কেপটাউনে মাজার যে আছে জানা ছিল না। যদিও পরে জেনেছি, ত্রিশটির মতো মাজার রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এগুলোকে বলা হয় ‘ক্রেগমাত’।

bolders bay beachবিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে ‘সিগন্যাল হিল’-এ চলে এলাম। এখান থেকে একসঙ্গে টেবিল মাউন্টটেন ও কেপটাউনের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। এখানে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখতে প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয়। এ ছাড়া জায়গাটাকে লোকে ‘লাভারস লেন’ও বলে থাকে। বিকেল হলেই প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখা মেলে এখানে।

সিগন্যাল হিল থেকে গেলাম ‘ক্যাম্পাস বে বিচ’। যাওয়ার রাস্তাটি অসাধারণ। টেবিল মাউন্টটেনের পাশেই এই সমুদ্রতীরের অবস্থান। যাত্রাপথে বেশ কিছু বিলাসবহুল বাড়িঘর নজর কাড়ল। শৌখিন ধনকুবেরদের বাড়ি। সাধারণত ছুটি কাটাতে এঁরা এখানে আসেন। অনেক বাড়িতে দেখলাম অফ সিজনের জন্য টু-লেট লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। অনেক গাড়ি ও বিদেশি পর্যটকদের সমাগম চোখে পড়ল সৈকতে। কেউ শুয়ে আছেন, কেউ বা কুকুর নিয়ে জগিং করছেন আবার কেউ মোবাইলে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। চারদিকে মানুষ এবং সবাই বিচ বিনোদনে ব্যস্ত।

শুধু ঘুরলেই তো চলবে না, আর তাই পেটপূজার জন্য গেলাম নান্দোসে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এটা বেশ জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড শপ। সত্যিই ওদের খাবার বেশ সুস্বাদু! দোকানগুলো খুবই সুন্দর, সার্ভিসও বেশ ভালো। মজার ব্যাপার হলো, খাবার শেষে আমাদের দুই লিটারের কোকা-কোলার অর্ধেকটা অব্যবহৃত ছিল, সেটি দিয়ে দেওয়া হলো ওয়েটারকে। সে তো ওটা পেয়ে দারুণ খুশি।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও নাকি ধান ভানে। বাঙালি-বাঙালি আড্ডা হবে না তা কি হয়? ওদের নিয়ে গেলাম স্থানীয় এক বাংলাদেশি ক্লাবে। ওখানে দল-মত-নির্বিশেষে কেপটাউনের বাংলাদেশিরা একত্রিত হয়, আড্ডা মারে, পুল খেলে। ওখানকার বেশির ভাগ লোকই দেখলাম শরীয়তপুর ও ফরিদপুর জেলার। সবার আন্তরিক ব্যবহার ও আতিথেয়তা ছিল মনে রাখার মতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্লাবটিতে রাজনৈতিক পোস্টারে ভরপুর থাকলেও দলীয় আলাপ-আলোচনার চেয়ে আড্ডা, খেলাধুলায় মশগুল সবাই।

পরদিন গেলাম উত্তমাশা অন্তরীপে। ইংরেজিতে অবশ্য জায়গাটাকে বলে ‘কেপ অব গুড হোপ’। সঙ্গী হিসেবে যোগ দিলেন অরুণ। মাসুদের বন্ধু। প্রথমেই ‘বোল্ডার বে বিচ’ গেলাম। ওখানকার ‘জ্যাকঅ্যাস পেঙ্গুইন’ দেখতে প্রতিবছর ৬০ হাজার পর্যটক আসেন। প্রবেশমূল্য ৭০ র‌্যান্ড। ভেতরে গিয়ে দেখতে পেলাম প্রচুর চীনা পর্যটক। কলকাতার এক বয়স্ক দম্পতিরও দেখা মিলল। এই সৈকতে অনেকে এক দিনের জন্য ক্যাম্প করে থাকেন। বড় বড় পাথরের পাশে ছোট ছোট পরিবারগুলো এক দিনের জন্য সংসার পাতে। পুকুরে গোসল করার মতো করে সাগরে যায় গোসল করতে।

ওখান থেকে এবার যাব উত্তমাশা অন্তরীপে। কেপ পয়েন্টে আসার পথে রাস্তার এক জায়গায় দেখলাম, সব গাড়ির গতি কমে যাচ্ছে। সামনে ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেলাম, বেশ কিছু বানর রাস্তার মাঝখানে বসে আছে। মাসুদ সবাইকে সাবধান করে বলল—যার যার মোবাইল ও ক্যামেরা যেন পকেটে রেখে দিই, কারণ সুযোগ পেলেই এসব কেড়ে নিয়ে পালায় বানরগুলো। বাবলু আস্তে করে গাড়ির জানালা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে উত্তমাশা অন্তরীপে এসে পৌঁছলাম। প্রবেশ করার জন্য টিকিট কাটতে হলো। চারদিকে বিশাল পাহাড়ের মাঝে গাড়ি দারুণ গতিতে ছুটে যাচ্ছে। দিগন্তজোড়া খালি মাঠ। দূর থেকে মনে হলো, আকাশে ছুঁয়ে আছে পাহাড়। প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন হয়েছে। সিটি সাইট সিয়িংয়ের দ্বিতল বাসও প্রচুর। তবে বেশির ভাগই চীনা পর্যটক দিয়ে বোঝাই। আজকাল ওরাই নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি দেশ ভ্রমণ করে থাকে।

এখানে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর এসে মিলেছে। নাবিকদের কাছে এই জায়গাটি বেশ বিখ্যাত। উত্তমাশা অন্তরীপের পার্কিংয়ে বাবলু বসে ছিল। তবে যাঁরা হেঁটে যেতে ইচ্ছুক নন, তাঁদের জন্য রয়েছে ট্রাম সার্ভিস। আমরা হেঁটেই ধীরে ধীরে ওপরে উঠে গেলাম। ওপর থেকে চোখে পড়ল নিচের মনোরম দৃশ্য। এককথায় অসাধারণ।

Advertisements

খাগড়াছড়ি হেরিটেজ পার্ক

khagrachhori heritage park

বরফ রাজ্যের অভিজ্ঞতা পেতে যান ভারতের মোনালি

manali

রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পেতে যান মেমেঞ্চো

memencho water reservoir

উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে আরব বণিকদের ভূমিকা

horse rider arab

ড. মুহাম্মদ আবদুল হাননান : বাংলা ভাষায় যুদ্ধ-ইতিহাস নিয়ে ইতিহাসবিদরা খুব একটা কাজ করেছেন বলে মনে হয় না। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ইতিহাস লিখতে গিয়ে যুদ্ধের কথা এসেছে, কিন্তু আলাদাভাবে বিশেষ বিশেষ যুদ্ধ নিয়ে বড় কাজ এ দেশে হয়নি।

সত্যেন সেন এ ক্ষেত্রে একজন ব্যতিক্রমধর্মী ঐতিহাসিক; যদিও তাঁর প্রধান পরিচয় কথাসাহিত্যিক অথবা রাজনৈতিককর্মী কিংবা সংস্কৃতিসেবীও তাঁকে বলা যায়। তিনি ১৯৬৮ সালে রচনা করেন ‘মসলার যুদ্ধ’। নাম থেকে অনেক সময় বোঝা যায় না, এটা কী রকম একটা যুদ্ধ। কিন্তু এ গ্রন্থে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারতে সংঘটিত এক ভয়াবহ যুদ্ধের কাহিনি। এতে আরব বণিকদের এ দেশে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে ভূমিকাটিও উঠে এসেছে। যদিও সত্যেন সেন বাংলা-ভারতে ইসলাম প্রচার নিয়ে ইতিহাস লেখেননি, তিনি মধ্যযুগে মসলা বাণিজ্য নিয়ে ভারত-আরব ও ইউরোপের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তার একটি বিবরণ ইতিহাস থেকেও টেনেছেন। এতে দেখা যায়, আরব বণিকরা হাজার বছর আগে থেকেই এ দেশে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এসেছেন এবং এ দেশের সঙ্গে তাঁরা মিশেও গিয়েছিলেন। আর এর ফলে যখন হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আবির্ভূত হলেন, তখন এ আরব বণিকরাই বাণিজ্যের পাশাপাশি ইসলাম প্রচারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। ফলে বাংলা-ভারতে ইসলামের প্রসারটা ঘটেছিল সহজে ও সন্তর্পণে। আর এ কাজটা শুরু হয়েছিল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায়ই। সরাসরি সাহাবি (রা.)-দের জামাত বাংলাদেশ-ভারতে এসেছে, আবার এখানকার মানুষও মক্কা-মদিনায় গিয়ে সরাসরি মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরবর্তী যুগে খলিফাদের হাতে বাইয়াত হয়ে মুসলিম হয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, কেরালার রাজা পেরুমাল (পরিমল) প্রজাদের নিয়ে সরাসরি মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে বাইয়াত হয়ে মুসলিম হয়েছিলেন।

সত্যেন সেনের এই মসলার গ্রন্থটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন যুদ্ধ-কাহিনির অন্যতম। এ কাহিনিতে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন বাংলা-ভারতে আরব বণিকদের সমুদ্র বাণিজ্যের কথা :‘…কালিকটের বন্দরে অজস্র জাহাজের ভিড়। …আরব বণিক, গুজরাটের মুসলমান বণিক,এঁদের জাহাজই সংখ্যায় বেশি। চীনা বণিকদের জাহাজের আসা-যাওয়া আছে। …কিন্তু আরবের বণিকরা সব বণিককে ছাড়িয়ে উঠেছেন। বাণিজ্যে তাঁদের সঙ্গে কেউ এঁটে উঠতে পারে না। ’ (সত্যেন সেন : মসলার যুদ্ধ, দ্যু প্রকাশন, ঢাকা-২০১৬, পৃষ্ঠা ১৭) লেখক বর্ণনা করেছিলেন ১৪৮৮ খ্রিস্টাব্দের কথা। কিন্তু বর্ণনার পটভূমিটি দুই হাজার বছর আগের উপমহাদেশ :‘ভারতবর্ষের দক্ষিণতম প্রান্তে বর্তমান ম্যাঙ্গালোর থেকে কুমারিকা প্রণালি পর্যন্ত আরব সাগরতীরবর্তী যেই ভূভাগ, তার নাম মালাবার বা কেরল। …এই মালাবার অঞ্চল বহু প্রাচীন কাল থেকেই গোলমরিচের দেশ বলে খ্যাত। দুই হাজার বছর ধরে এখানকার বণিকরা মসলাপাতি, বস্ত্র, মণিমুক্তা, গজদন্ত প্রভৃতি পণ্যে জাহাজ বোঝাই করে নিয়ে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্য করে আসছে।’ (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৭)

মসলা বিষয়ে সমুদ্র বাণিজ্যে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন ইত্যাদির সঙ্গে বাংলাদেশের নামও জড়িয়ে রয়েছে। উপমহাদেশে পর্তুগিজদের সমুদ্র বাণিজ্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এফনসো অ্যালবুকার্কের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে ঐতিহাসিক লিখেছেন,‘জাভা, মোলাক্কাস ও ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য দ্বীপে এমন সব মসলা জন্মাত, যা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। সেই সব মসলা এসে জমত সেই মালাক্কার বন্দরে। এই মসলা নিয়ে বাণিজ্য করার আগে চীন, জাপান ও পশ্চিমে ভারতবর্ষ, আরব ও পারস্য থেকে বণিকরা এই বন্দরে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এ সম্পর্কে অ্যালবুকার্ক নিজেই লিখে গেছেন, প্রতিবছর মালাক্কায় ক্যাম্বে, চাওল, কালিকট, এডেন, মক্কা, জেদ্দা, করমণ্ডল, বাংলা, চীন গোর, …জাভা, পেন্ড ও অন্যান্য জায়গা থেকে জাহাজ আসে।’ (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা ৬৬)

আরবরা কিভাবে ও কখন ভারত সাম্রাজ্যে সমুদ্র বাণিজ্যে প্রবেশ করেছে, তার বিবরণ দিয়েছেন লেখক। সেটি ছিল একেবারে প্রাচীন ও আদিকাল :‘…প্রথম শতকে রোম সাম্রাজ্য ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। …ইউরোপের অন্ধকার যুগে এই সম্পর্কের ছেদ পড়ে গিয়েছিল। ইসলামের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আরব বণিকরা তাদের জায়গা দখল করে নিল। কিন্তু জায়গা দখল করে নিয়েই তারা ক্ষান্ত থাকেনি। দেশ-বিদেশের ঐশ্বর্য করায়ত্ত করার জন্য দুঃসাহসী আরব বণিকরা জীবন পণ করে দুরন্ত সমুদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন। ফলে আরব সাগর, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর আরব বণিকদের বাণিজ্য জাহাজে ছেয়ে গিয়েছিল।’ (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪)

বাংলাদেশ, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে এ পটভূমিটি জানা প্রয়োজন ছিল। ইতিহাসবিদ এসব অঞ্চলে আরব বণিকদের অবস্থান ও প্রভাবটিও বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আরব বণিকরা শুধু বাইরে থেকেই এখানে বাণিজ্য করতে আসেন না। অনেক আরব বণিক এখানে বাণিজ্য করতে এসে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছেন। ’ (মসলার যুদ্ধ, পৃষ্ঠা ৪৪)

১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে বণিকের ছদ্মবেশে পর্তুগিজ ভাস্কো দা গামা ক্রুসেডীয় মনোভাব নিয়ে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষে পা রেখেছিলেন। তিনি এসে কী দেখলেন, কী অভিজ্ঞতা প্রথম পেলেন, কালিকটে (তৎকালীন ভারতের একটি প্রাচীন নৌবন্দর গবেষক) এসে ভাস্কো দা গামা নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করলেন। কালিকট বন্দর সম্পর্কে যেসব খবর তাঁরা সংগ্রহ করেছিলেন, তার মধ্যে প্রধান খবরটিই ছিল না। কালিকটে এসে আরব বণিকদের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি চমকে উঠলেন। আরো দেখলেন, এরা যে এখানে এসে শুধু পাকাপোক্তভাবে জায়গা করে নিয়েছে তা নয়, রাজসভার ওপরও তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এই আরবীয় মুসলমানরা তাঁদের নিকটতম শত্রু। (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭)

ভাস্কো দা গামা ও পর্তুগিজরা আরো একটি ভুল করেছিলেন। সেটি এই যে রোমের পোপের মতো তাঁরাও মনে করতেন, ভারতবর্ষের মানুষ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। সেই জন্য কালিকটের একটি হিন্দু মন্দিরকে গির্জা মনে করে তিনি উল্লসিত হয়ে উঠলেন। (মসলার যুদ্ধ, পৃষ্ঠা ৩৭)

পর্তুগালের তখন রাজা ছিলেন ডোম ম্যানুয়েল। তিনি নিজেকে ইথিওপিয়া, আরব, পারস্য ও ভারতের সমুদ্র এলাকার ‘প্রভু’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। আর খ্রিস্টানদের ধর্মনেতা রোমের পোপ সাহেবও পর্তুগিজদের ওপর তাঁর পবিত্র আশীর্বাদ ও সমর্থন বাণী পাঠান। পর্তুগিজরা ভারতবর্ষে তাদের বাণিজ্য ও খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সফর করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাহাজভর্তি সৈন্য ও যুদ্ধসামগ্রী পাঠাতে থাকে। প্রাথমিকভাবে তারা বাণিজ্য ঘাঁটি ও পাঁচজন পাদ্রির ধর্ম প্রচারের সুযোগ দাবি করে। কালিকটে স্থানীয় রাজা এর প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন। ইতিহাসবিদ সেন এর পর মন্তব্য করেছেন :‘পৃথিবীর সব দেশেই বণিকরা প্রাচীন কাল থেকে বাণিজ্য করে আসছে। কিন্তু এর আগে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেছে বলে শোনা যায়নি। …(পর্তুগিজদের রাজা) ডোম ম্যানুয়েল তো আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, কামানের গর্জনে আমাদের দাবি আদায় করে নেবে। …এ তো বর্বর জলদস্যুদের কাজ। কিন্তু মহামান্য পোপের বিধান অনুযায়ী পর্তুগালরাজ জলরাজ্যের অধিপতি। …সে থেকেই ভারত মহাসাগরের বুকে ভাস্কো দা গামা আর তাঁর সহচরদের নৃশংস যথেচ্ছাচার অব্যাহত গতিতে চলল। …মক্কা থেকে হজযাত্রীদের নিয়ে কয়েকটা নিরস্ত্র জাহাজ ফিরে আসছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে তারা পর্তুগিজ জাহাজের সামনে পড়ে গেল। জাহাজগুলো আটক করে সেগুলোর মধ্যে মালপত্র যা ছিল সব কিছু তুলে এনে জাহাজগুলোয় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু ভাস্কো দা গামার কড়া আদেশ ছিল, জাহাজে যেসব আরব আছে, তাদের যেন তুলে আনা না হয়। হতভাগা আরবরা সেই জাহাজের মধ্যে জ্বলে-পুড়ে মরল। ভাস্কো দা গামা পরম আনন্দে সেই দৃশ্য উপভোগ করলেন। (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৩৮-৪১)

পর্তুগিজ খ্রিস্টান বাহিনীর বর্বরতা কতটুকু ও তার মাত্রা কতখানি ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তার বিবরণ এ যুদ্ধ-ইতিহাসে দিতে গিয়ে সেন জানিয়েছেন, ‘গোয়া দখল করার পর অ্যালবুকার্ক পর্তুগাল রাজ ডোম ম্যানুয়েলের কাছে এ সম্পর্কে যে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছিলেন, গোয়ায় যেসব আরবি ছিল, আমরা তাদের সবাইকে হত্যা করেছি, আমাদের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি। আমরা তাদের মসজিদের মধ্যে আটকে রেখে, শেষে সেই মসজিদ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছি। (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬০)

সেন তাঁর যুদ্ধ-ইতিহাসে এই অ্যালবুকার্কের একটি বক্তৃতাও উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে এ পর্তুগিজ প্রতিপক্ষের সামনে সদম্ভে ঘোষণা করছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা মুসলমান নও, তারা কোনো ভয় কোরো না। আমরা তাদের কিছু বলব না। কিন্তু মুসলমান যারা, তাদের একটাকেও আমরা ছাড়ব না। আর এই হতভাগা মুসলমানদের যারা সাহায্য করতে বা বাঁচাতে চেষ্টা করবে, তাদেরও একই গতি হবে। তোমরা ভালো মানুষরা যে যেখানে আছ, সেখানেই চুপ করে থাকো। তোমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখো, আমাদের কাজ আমরা করি। (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৭)

অ্যালবুকার্কের নির্দেশে পর্তুগিজ দস্যুরা সেদিন আরব বণিকদের জাহাজগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিল। পুড়ে মরে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য জাহাজের লোকরা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিন্তু পর্তুগিজরা উল্লাসের সঙ্গে জলচর প্রাণীর মতো মুসলমানদের সেদিন হত্যা করেছিল। সেন লিখেছেন, ‘চীনা ও হিন্দু বণিকরা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে সে দৃশ্য দেখল।’ (পৃষ্ঠা ৬৮) আর অ্যালবুকার্ক পৈশাচিকভাবে বক্তৃতায় বলতে থাকে—‘এভাবে আমরা সব আরবকে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করব, মুহাম্মদের ধর্মের শিক্ষা চিরদিনের মতোই নিভিয়ে দেব, যাতে এরপর তা আর কোনো দিন জ্বলে উঠতে না পারে। এভাবেই আমরা আমাদের প্রভুর পবিত্র কর্তব্য সম্পন্ন করব। ’ (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৮)

মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের আগে ও পরে আরব বণিকরা কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত তথা উপমহাদেশে এভাবে প্রবেশ করেননি, পর্তুগিজ, ইংরেজরা যেভাবে উপমহাদেশ দখল করেছে। আরব বণিকরা ইসলামের আবির্ভাবের পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং দুনিয়ার সর্বত্র যেসব স্থানে তাদের আগে থেকেই বাণিজ্য ছিল, সেসব স্থানে নতুন ধর্মের বার্তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীন ছিল একই রুটের বাণিজ্যপথ। ইসলামও এই একই রুটে আরব বণিকদের দ্বারা প্রবেশ করেছে। তাঁরা জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন, জনগণও তাঁদের বরণ করে নিয়েছিল। এসব ঘটনা তুর্কি শাসক বখতিয়ার খলজির আগমনের অনেক আগেই ঘটেছিল, অন্তত ৬০০ বছর আগেই ঘটেছিল। প্রচারক মুসলমান হয়েই আরব বণিকরা এ দেশে থেকেছেন, এ জন্য দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ ও জাতি দ্বারা বাংলা-ভারত শাসিত হলেও আরবদের দ্বারা কখনো শাসিত হয়নি। আরব প্রচারক মুসলমানদের সঙ্গে তুর্কি শাসক মুসলমানদের পার্থক্য এখানেই ছিল। বরং তুর্কিরা এ দেশে এসে একটি তৈরি জমিনই পায়, আরব মুসলমানরা ইসলাম প্রচার করে যে জমিনটা আগেই তৈরি করে রেখেছিলেন। তাঁরা এটা তৈরি করেছিলেন নীরবে, দাওয়াতের কাজ দ্বারা, নিজেদের আচার-ব্যবহার, লেনদেনের সৌহার্দ্য দ্বারা, যা সদ্য মুসলিম হয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে তাঁরা শিখে এসেছিলেন। ফলে খ্রিস্টান অধ্যুষিত ইউরোপে দস্যুতার বিরুদ্ধে অভিযানে তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। আর এটাই ছিল ইসলাম প্রচারক আরব বণিকদের এক ট্র্যাজেডি। সত্যেন সেন গভীর মর্মবেদনায় লিখেছেন সেই যুদ্ধ-ইতিহাস।

সে সময় বাংলাদেশ-ভারত উপমহাদেশে পর্যায়ক্রমে সুলতানি ও মোগল শাসন চলছিল। এই শাসকরা ছিলেন ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন। ইসলাম প্রচারে তাঁদের বিশেষ কোনো ভূমিকা ছিল না, এমনকি যাঁরা তাবলিগ (ইসলাম প্রচার) করছিলেন, তাঁদেরও খোঁজখবর ও সমর্থন দেওয়া-নেওয়া থেকে তাঁরা ছিলেন উন্নাসিক। ফলে পাঁচ-ছয় শ বছর একটানা বিভিন্ন জাতির মুসলিম দ্বারা উপমহাদেশ শাসিত হলেও রাজা-বাদশাহ-সম্রাটদের দ্বারা ইসলাম সর্বজনীনের দ্বারে পৌঁছেনি। আর যখন এসব কথিত মুসলিম শাসক ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টানদের হাতে পরাজিত হয়ে সিংহাসন হারিয়েছেন, তখন দেখা গেল ভারত একটি অমুসলিমদের দেশ। তবু বাংলা-ভারতে যাঁদের ঘরে ইসলামের বাণী পৌঁছে গিয়েছিল, তাঁদের পেছনে মেহনত করার এক দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়েছিল আরব বণিক ও আরব মুসলমানদের। এভাবে আরবদের রক্তে ও ঘামে বাংলা-ভারতের মুসলিম সমাজের ঈমানি ঐতিহ্য এখনো সিক্ত হয়ে আছে।

মুঘল বাদশাহ হুমায়ুনের ভাগ্য উত্থান-পতনের কাহিনী

emperor humayun portraitসৈয়দ আশফাকুল হাসান : শের শাহ সুরি যখন তাঁর বিজয়রথ চালাতে চালাতে আগ্রা এসে পৌঁছালেন, বাদশাহ হুমায়ুন লাহোরে পালিয়ে গেলেন। তারপর রচিত হলো এক দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস।

১৫৪০

যদিও পলাতক তবু তো বাদশাহ। নাসির উদ্দিন মুহাম্মদ। হুমায়ুন নামেই চেনা। মনোবল হারাননি একটুকু। পরিবার-পরিজনসহ তাঁর সঙ্গী ছিল বিরাট এক দল। তাতে পাইক-বরকন্দাজ আছে, সেনা সদস্যরাও আছে। শের শাহ হুমায়ুনকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলেন। আফগানদের কাছেও খবর পাঠিয়ে রেখেছিলেন যেন হুমায়ুনকে শান্তি না দেয়। শের শাহ নিজে একজন পাঠান বা পাখতুন। সুরি তাঁর গোত্রের নাম। শের উপাধি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল কারণ যৌবনে বাঘ মেরেছিলেন।

তাঁর আসল নাম ফরিদ খান। যা-ই হোক, হুমায়ুন একপর্যায়ে শের শাহের কাছে বার্তা পাঠালেন, আমি আপনার কাছে সব হিন্দুস্তান ছেড়ে এসেছি, আপনি লাহোরকে ছাড়ুন এবং পাঞ্জাবের সিরহিন্দকে আমাদের মাঝে সীমানা হিসেবে রাখুন। শের শাহ উত্তর দিলেন, আপনার জন্য আমি কাবুল ছেড়ে এসেছি, আপনি বরং সেখানে গিয়ে দেখুন। ওদিকে নিজের ভাই মির্জা কামরান হুমায়ুনকে কাবুলে প্রবেশ করতে দেবেন না বলে জানান। হুমায়ুনের সেনাদল কামরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পিতৃ আজ্ঞার (ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ করো না) কথা মনে রেখে হুমায়ুন মুলতানের পথ ধরলেন।

১৫৪১

sher shahসিন্ধুর তীর ধরে এগোতে থাকলেন হুমায়ুন। ভাই হিন্দালকে পাঠালেন দাদু নামে সিন্ধের এক জায়গার খবর নিতে। হিন্দাল সবুজ সংকেত দিলে তিনি দাদুতে ভাইয়ের সঙ্গে মিলিত হন এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। হিন্দালের এক শিক্ষকের মেয়ে হামিদা বানুও ছিল দলে। তখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর। হিন্দালের তাঁর প্রতি আগ্রহ ছিল। হুমায়ুনও বিয়ের প্রস্তাব দেন। হিন্দাল এতে খেপে যান। হামিদা বানুও গররাজি ছিলেন। অবশেষে ১৫৪১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হুমায়ুনের সঙ্গে হামিদার বিয়ে হয়। নবপরিণীতাকে নিয়ে বাদশাহ ভকর সিন্ধের দিকে রওনা হন। হিন্দাল ভাইয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে কান্দাহারের দিকে যাত্রা করেন।

১৫৪২

হুমায়ুন ভকর দখল করে নেন। তারপর সিন্ধুরই আরেক জায়গা সেহওয়ান দখল করতে যান। কিন্তু সিন্ধের শাসক শাহ হুসেইন হুমায়ুনকে বাধা দেন। সাত মাস সেহওয়ান অবরোধ করে রেখে ভকর ফিরে আসতে বাধ্য হন হুমায়ুন। তত দিনে হুমায়ুন বিপর্যস্ত। ভাবলেন, মক্কা যাত্রার কথা। তখনই যোধপুরের রাজা মালদেও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বার্তা পাঠান। হুমায়ুন তাই জয়সলমির হয়ে যোধপুর যাত্রা করেন। মাঝে জয়সলমিরের রানা আক্রমণ করে বসেন। তবে বাদশাহের বাহিনীর কাছে পরাজিত হন। বাদশাহ আজমীরের ধারে পৌঁছান। তখনই হুমায়ুন একটি বার্তা পান, মালদেওকে শের শাহ লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছেন। নাগর ও আলওয়ার দিয়ে দেবেন মালদেওকে যদি হুমায়ুনকে আশ্রয় না দেন। হুমায়ুন উপায় না দেখে অমরকোটের দিকে যাত্রা করেন। এই সময় হামিদার ঘোড়াটি মারা যায়। হামিদার তখন আট মাসের গর্ভাবস্থা।

পথ যায় মরুভূমিতে

hamida banooঅমরকোটের পথ ছিল খুব কষ্টের। পানির সমস্যা ছিল প্রকট। সঙ্গীদের অনেকেই ছিল পদযাত্রী। মালদেওয়ের বাহিনীও ছিল পেছনে। যা-ই হোক এক সময় অমরকোট পৌঁছাতে পারেন হুমায়ুন।

২২ আগস্ট ১৫৪২। হুমায়ুন অমরকোট পৌঁছান। রানা প্রসাদ ছিলেন শাসনকর্তা। তিনি বাদশাহকে অভ্যর্থনা জানান। ১৫ অক্টোবর ১৫৪২ হামিদা বানু এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। বাদশাহ পুত্রের নাম রাখলেন জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবর।

পারস্য যাত্রা ও সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার

অমরকোট থেকে ভকর যাওয়ার পথে শাহ হুসেইন আবার বাধা দিতে আসেন। ভয়ে বাদশাহর সৈন্যদের অনেকে পালিয়ে যায়। সমঝোতায় আসতে বাধ্য হন হুমায়ুন। সিন্ধ ছেড়ে কান্দাহারের পথে রওনা হন। এই সময় বৈরাম খান তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। মির্জা কামরানের অনুগত কান্দাহারের শাসনকর্তা হুমায়ুনকে পথে আক্রমণ করেন। বাদশাহ তখন হিন্দুকুশ পাহাড় বেয়ে পারস্য যাত্রা করেন। খুব ঠাণ্ডা ছিল তখন। বরফ পড়ছিল। খাবার ছিল না, আগুন জ্বালানোর কাঠ ছিল না। বাদশাহ এক পর্যায়ে পূর্ব ইরানের সিস্তানে পৌঁছাতে সমর্থ হন। পারস্যের শাহ তামাস্প বাদশাহকে সহযোগিতা দিতে সম্মত হন। পরে হুমায়ুন কান্দাহার, কাবুল, বালখ হয়ে হিন্দুস্তান এসে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।

humayun travel route

ইউরোপের কিছু নয়নাভিরাম প্রাসাদ

5 most beautiful palaces on europe