আর্কাইভ

Archive for the ‘বিনোদন’ Category

পদ্মাবতী বিতর্ক: শিল্পের স্বাধীনতায় উগ্রবাদীদের হামলা

Padmavati_movie 2017চিন্ময় মুৎসুদ্দী: পদ্মাবতী নিয়ে ভারতের উগ্রবাদীদের কর্মকা- শিল্পের স্বাধীনতায় নয়া হস্তক্ষেপ। তুচ্ছ বিষয়কে সামনে এনে তারা তুলকালাম বাধিয়েছে শ্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। তবে পদ্মাবতী নিয়ে সর্বশেষ সুসংবাদ হলো সিনেমাটি নিষিদ্ধের আবেদন তৃতীয় বারের মতো খারিজ করে দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে বলেছেন, ‘এর নাক কাটব, ওর মুণ্ডু কাটব, এ জন্য পুরস্কার দেব, গণতন্ত্রে এসব বরদাশত করা হয় না। দেশের আইন এভাবে কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।’

ছবিটি মুক্তির ব্যাপারে বাধা দেওয়া আর ছবির পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যান্ড টিভি ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইএফটিডিএ) ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে ১৫ মিনিটের ব্ল্যাক আউট কর্মসূচি পালন করে। চলচ্চিত্র এবং দূরদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ২০টি সংস্থা ওই দিন বিকেল সোয়া ৪টা থেকে ১৫ মিনিট চলচ্চিত্র ও টিভি সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করা থেকে বিরত থাকে। ২৮ নভেম্বর কলকাতার টালিগঞ্জের ছবিপাড়ায় ১৫ মিনিটের জন্য প্রতীকী ধর্মঘট পালন করা হয় ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কারস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া এবং ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে।

এর আগে হরিয়ানা রাজ্যের বিজেপি নেতা সুরুজ পাল আমু পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাক কেটে নেওয়ার হুমকি দেন। মমতা পশ্চিমবঙ্গে চলচ্চিত্রটিকে স্বাগত জানিয়ে এর প্রিমিয়ার কলকাতায় করার প্রস্তাব দেন। মমতার প্রস্তাবটি আসে গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই ছবির মুক্তির ওপর রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরিপ্রেক্ষিতে। ওইসব রাজ্যে উগ্রবাদীরা মিছিল সমাবেশ করে ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি ও অভিনেত্রী দীপিকা পাড়–কোনের নাক, কান, মাথা কর্তনকারীদের জন্য বিশ কোটি টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। এই ডামাডোলে এরই মধ্যে এক সাধারণ নাগরিকের প্রাণ গেছে। নিহত ২৩ বছরের তরুণ চেতন সাহনি জয়পুরে গয়নার ব্যবসা করতেন। জয়পুরের বিখ্যাত নাহারগড় দুর্গের বুরুজ থেকে তার মরদেহ ঝুলছিল। তার মৃতদেহের পাশে লেখাছিল ‘আমরা শুধু কুশপুতুল লটকাই না।’ আর একটি পাথরে লেখা ছিল ‘পদ্মাবতীর বিরোধিতা’।

পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়া দূরে থাক, এখনও সেন্সর বোর্ড থেকে এ সিনেমা সম্পর্কে কোনো মন্তব্যই করা হয়নি। শুধুমাত্র একটা ধারণা থেকেই মাঠে নেমেছে উগ্রবাদী বিজেপি, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা বলছেন ‘আমাদের জাত্যাভিমানে চুনকালি লেপা হয়েছে, আমাদের দেবী মা পদ্মাবতিকে মন্দিরের পাদপিঠ থেকে নামিয়ে করে তোলা হয়েছে বাহরওয়ালি নাচনি, তাই পরিচালকের মুণ্ডু চাই.. ..’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সারা ভারতে ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে তারা। বানসালির পদ্মাবতী অচ্ছ্যুত হলে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (পদ্মিনী উপাখ্যান, ১৮৫৮), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ, ১৮৭৫), ক্ষিরোদাপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (পদ্মিনী, ১৯০৬) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রাজকাহিনী, ১৯০৯) প্রমুখের এসব রচনা নিষিদ্ধ করতে হয়। কারণ তারাও ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। ইতিহাসকে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন। ইতিহাসকে ভিত্তি করে তারা গল্প বুনেছেন।

সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে ইতিহাস কি কেউ ভিন্ন দৃষ্টিতে এখন দেখতে পারবে না? অতীতে এমন হয়েছে। সেজন্যই শিল্পের স্বাধীনতা মুক্তচিন্তার আলোকে বিবেচনা করা হয়। তথ্যই কেবল ইতিহাস নয়, কিংবদন্তিও ইতিহাসের অংশ। কোনো শিল্প মাধ্যমই ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে পেশ করে না। রানি পদ্মাবতী হয়তো তার জীবনে নাচেননি। নাচলেও এতটা ডিজিটাল ভেল্কি ছিল না। সিনেমার অনেকটাই পরিচালকের কল্পনা। আর ছবিটিও বানসালির ‘লাগ ঝমাঝম’ ভঙ্গিতে বলা একটি বলিউডি উপাখ্যান মাত্র। যেটা আমরা তার আরেকটি চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’-এ দেখেছি। পাঠককে এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, চলচ্চিত্রটিতে তিনি পার্বতী এবং চন্দ্রমুখীকে একসঙ্গে নাচিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এ কিন্তু এই ঘটনা ছিল না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- দেবদাস সাহিত্য, পদ্মাবতী ইতিহাস। সেক্ষেত্রে এই ইতিহাসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। অনেক ঐতিহাসিকই পদ্মাবতীর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি।

দূরদর্শনের সভাপতি রজত শর্মা একটি কথা বলেছেন যেটি প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বানসালীর গবেষণা পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর, বর্ণে বর্ণে বাস্তবনিষ্ঠ। কোনো বিকৃতি নেই।’ আর পরিচালক সুভাস ঝা বলেছেন, ‘সত্যিই সে সময় রমণীরা নাচতেন, অন্তরালে জেনানা রানিবাসে। সেখানে রাজা ছাড়া আর কোনো দর্শক থাকত না। সিনেমায় যে ‘ঘুমার’ নাচের দৃশ্য আছে, তাতে কোনো বাইরের মরদ নেই। তাই, ইতিহাস বিকৃতি ঘটেনি। এখন তিনটি পক্ষ। উগ্রবাদীরা বিপক্ষে। বানসালীকে সমর্থনকারী পক্ষ বলছেন বিকৃতি হয়নি। আরেক পক্ষ বিকৃতি হয়েছে কি হয়নি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছেন না, তারা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন- শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে। পদ্মাবতীর সমর্থনে তাই ইতিহাস বিকৃত হয়নি বলে সাফাই দিলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিল্পের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটিকেই মূখ্য করে দেখতে হবে। ইতিহাসকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অধিকার সমুন্নত রাখা জরুরি।

বাস্তব ও কল্পনার মিশেল নিয়ে তৈরি আশুতোষ গোয়ারিকর’র ‘যোধা আকবর’ (২০০৮) ছবিতে আকবরের সঙ্গে যোধাবাঈয়ের প্রেমের কাল্পনিক ঘটনা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেও ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠেনি। তখন ইউপিএল আমল। এখন কেন্দ্রে বিজেপি, বিভিন্ন রাজ্যে ক্রমে তারা ক্ষমতার হাত প্রসারিত করছে। ১৮ রাজ্য তাদের শাসনে। দেখা যাচ্ছে ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক শক্তি জোরেসোরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ইমেইজ আর থাকছে না। গত তিন বছরে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অসংখ্য হামলা সেটাই প্রমাণ করে। মুসলমানদের খাদ্যের ওপরও তারা বাধ সাধছেন। উত্তর প্রদেশে গরুর ব্যবসা করার দায়ে প্রাণ দিতে হয়েছে এক মুসলমান তরুণকে। এবার তারা শিল্পের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। বানসালী এরই মধ্যে বলেছেন, আলাউদ্দিন খিলজির স্বপ্নের রানি পদ্মাবতীর সঙ্গেঅহপযড়ৎ প্রেমের দৃশ্যটি ছবিতে নেই। এরপরও উগ্রবাদীদের এ ধরনের জঙ্গী আচরণ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা মুক্ত চিন্তা ও গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত বলেই মনে করি।

স্বাধীনতা মানে কী?

তসলিমা নাসরিন : ডিসেম্বরের ১ তারিখ চলে গেলো, ‘পদ্মাবতী’ মুক্তি পেলো না ভারতে। হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে হেরে গেলো গোটা ভারতবর্ষ। তাদের তাণ্ডব আর হুমকির সামনে মাথা নোয়ালো সেক্যুলার ভারত। ‘পদ্মাবতী’ নামে আদৌ কেউ ছিল, কোনও ঐতিহাসিকই বলেননি। সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জয়সীর লেখা কবিতা ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে তৈরি ‘পদ্মাবতী’। ‘পদ্মাবতী’ নামে হয়তো কেউ ছিল না কোনও কালে। মালিক মোহাম্মদ জয়সীই রচনা করেছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী পদ্মাবতীকে, যে পদ্মাবতীকে জয় করার লোভ করেছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি। রাজপুত হিন্দু রমণী মুসলিম শাসকের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার চেয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। এইরকম একটি গল্প নিয়েই সঞ্জয় লীলা বানসালি ‘পদ্মাবতী’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন। কিন্তু হিন্দু মৌলবাদীরা ক্ষুব্ধ, কারণ তারা শুনেছে ছবিতে দেখানো হয়েছে খিলজি আর পদ্মাবতীর ঘনিষ্ঠতা। ছবি না দেখে কী করে আমরা বলবো কী দেখানো হয়েছে। ‘গুজব’-এর যে কী অবিশ্বাস্য গুণ! মানুষ চোখ-কান বুজে গুজবকে অনায়াসে বিশ্বাস করে ফেলে।

সঞ্জয় লীলা বানসালি সহ আরও অনেকে, যারা পদ্মাবতী ছবিটি ঘরে বসে দেখেছেন, বলেছেন, ‘ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই, যে দৃশ্য দেখে হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে’। তারপরও শান্ত হয়নি হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠী। প্রথম দিকে না মানলেও, ধীরে ধীরে সরকারি দলের লোকেরাও মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিচ্ছেন। পদ্মাবতীকে নিষিদ্ধ করছেন। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া ছবিটিকে অযথাই শেকল পরানো হয়েছে।

আমি আর সবার মতো বলতে চাইছি না ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই। আমি বলতে চাইছি, যদি থাকেই, তাহলে ক্ষতি কী? ইতিহাসে পদ্মাবতীর কোনও উল্লেখই নেই, কিন্তু কাব্যে আছে বলে পদ্মাবতীকে আজ ঐতিহাসিক চরিত্র বলে ভেবে নেওয়া তো ঠিক নয়। সত্যিকার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকেই শিল্পী সাহিত্যিকরা নতুন করে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে চিরকালই লিখেছেন, এঁকেছেন। চলচ্চিত্রে, নাটকে, গানে চরিত্রগুলো বারবার এসেছে, সবসময় যে একই রূপে, একই গল্পে তা নয়। ইতিহাস নিয়ে প্রচুর চলচ্চিত্রই নির্মিত হয়েছে, যেগুলোতে রয়ে গেছে প্রচুর ভুল। ১৯৯৮ সালে শেখর কাপুর এলিজাবেথ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন, ওই ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন রানী এলিজাবেথ তাঁর  উপদেষ্টা স্যার উইলিয়াম সেসিলকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করেছেন। বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা ঘটেছিল, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্যার উইলিয়াম সেসিল রানীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে রানীর পাশে ছিলেন। পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গ সংগীত তারকা পিয়ানোবাদক মোজার্টের জীবন কাহিনি নিয়ে ‘আমেডিউস’ নামের চলচ্চিত্রে মোজার্টকে দেখানো হয়েছে একটা নষ্ট ছোঁড়া হিসেবে, বাস্তবে মোজার্ট মোটেও তা ছিলেন না। সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি  টাইটানিক ছবিতে জাহাজ দুর্ঘটনা সত্য , কিন্তু  জ্যাক ডোসন আর রোজের প্রেম কাহিনি সত্য নয়। ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ ছবিতে ব্রিটিশ  ট্রুপের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ‘ইউ-৫৭১’ ছবিতেও ব্রিটিশের বদলে আমেরিকান সৈন্য দেখানো হয়েছে। এসব নেহাতই ইতিহাস বিকৃতি। ইতিহাস বিকৃতি আরও কত যে ছবিতে প্রকট, গ্ল্যাডিয়েটর, ব্রেভহার্ট, দ্য পেট্রিয়ট, মারি আন্তোয়ানেত, সেক্সপিয়র ইন লাভ…। সমালোচকরা বিকৃতির এবং ভুল তথ্যের নিন্দে করেছেন। কেউ কেউ আবার শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ছবি নিষিদ্ধ করেননি, কেউ পরিচালকের মাথার মূল্য ঘোষণা করেননি, কেউ অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নাক-কান কেটে ফেলার ফতোয়া দেননি। এসব দেওয়া হচ্ছে ভারতের মতো নানা ধর্মের, নানা ভাষার, নানা রঙের মানুষের গণতন্ত্রে। আর কোনও দেশে না  হোক, খাজুরাহো আর ইলোরা অজন্তার দেশে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করাটা দেশকেই, দেশের শিল্পকেই, চরম অপমান করা।

ইতিহাসের রদ-বদল এবং বিকৃতি হামেশাই হচ্ছে। কেউ যখন আমরা সঠিক করে জানি না ঠিক কী ঘটেছিল সুদূর অতীতে, আমরা কল্পনা করে নিই অনেক ঘটনা। চার্লস ডিকেন্সকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘দ্য লাস্ট ডিকেন্স’, এডগার অ্যালেন পোকে নিয়ে ‘দ্য পো শ্যাডো’, এসব তো আছেই, আলেক্সান্দ্র দুমা লিখেছেন ‘কুইন মারগো’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘প্রথম আলো’। এরকম নানা বইয়ে মেশানো হয়েছে সত্যের সঙ্গে মিথ্যে, অথবা খানিকটা সত্যের সঙ্গে অজস্র কল্পনা। বইয়ে কতটুকু সত্য আর কতটুকু কল্পনা তা নিয়ে বিতর্ক হয় হোক। ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে শুধু তথ্যচিত্র হতে পারে, কোনও চলচ্চিত্র নয়। এ নিয়ে হোক বিতর্ক। হোক কলরব। আবারও বলছি, বিতর্ক হওয়া ভালো, কিন্তু বই বা চলচ্চিত্র, বা কোনও শিল্পকর্ম নিষিদ্ধ করা আর গণতন্ত্রকে নিষিদ্ধ করা একই জিনিস। আমরা গণতন্ত্র নিষিদ্ধ হোক চাই না।

মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে এখনও অধিকাংশ মানুষের কোনও ধারণা নেই। তারা গণতন্ত্র মানে এখনও বোঝে নির্বাচন, ভোটে হারা, ভোটে জেতা। মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে এখনও অধিকাংশ মানুষ রায় দেয়, মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অধিকার কারোর নেই। তারা বলতে চায়, কারওরই এমন কোনও কথা বলা বা কাজ করা উচিত নয়, যা দেখে বা পড়ে বা শুনে অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। এর মতো অগণতান্ত্রিক মন্তব্য আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। কেউই, বিশেষ করে প্রতিভাবান কেউ, সবাইকে খুশি করে বা সুখী করে চলতে পারে না। ভিন্ন মতে বিশ্বাস করে যারা, তাদের হয় মুখ বুজে থাকতে হবে অথবা মরে যেতে হবে।

পদ্মাবতী ইতিহাসের অংশ নয়। অংশ হলেও তাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার অধিকার সবার আছে। সাধারণ মানুষের আছে, কবি সাহিত্যিকদের আছে, চলচ্চিত্র পরিচালকদের আছে। আর যদি ইতিহাসের অংশ না হয়, তাহলেও পদ্মাবতীকে  যেমন ইচ্ছে গড়ার স্বাধীনতা শিল্পীদের আছে। শিল্পীদের হাত থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিলে তাদের আর কিছুই থাকে না। একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক এবং কতটা সভ্য, তা নির্ভর করে সেই সমাজের নারীরা এবং শিল্পীরা কতটা স্বাধীন। পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে ভারতবর্ষের সমাজ এখনও পড়ে আছে অগণতন্ত্রের অন্ধকারে। ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের নাম ভারত’ –  এই  স্লোগান না দিয়ে বরং ‘গণতন্ত্র কাকে বলে’ তা শিখতে হবে ভারতবাসীকে। এও বুঝতে হবে,  তোমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে–এ সমস্যা তোমার, অন্য কারোর নয়। এই সমস্যার সমাধান তোমাকেই করতে হবে, অনুভূতির আঘাত নিয়ে ঝামেলা হলে নিজের অনুভূতির আঘাত নিজে সারাও। কিন্তু সহিংস হয়ে নয়, অন্যকে হুমকি দিয়ে নয়, অন্যকে শারীরিক আঘাত দিয়ে নয়।

মৌলবাদীদের যুক্তি অনেকটা ধর্ষকদের যুক্তির মতো। মেয়েরা ছোট পোশাক পরলে আমরা উত্তেজিত হই, সুতরাং আমরা ধর্ষণ করি। একইভাবে চলচ্চিত্রে এমন দৃশ্য দেখিয়েছ যা আমাদের অসন্তুষ্ট করে, উত্তেজিত করে, রাগান্বিত করে, সুতরাং তোমার চলচ্চিত্র আমরা নিষিদ্ধ করবো, তোমার মুন্ডু কেটে নেবো, তোমার নাক কেটে নেবো।

মৌলবাদীদের যুক্তিতে পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ আর মাথার মূল্য ধার্যকরণ মেনে নেওয়া মানে–ধর্ষকের যুক্তিতে ধর্ষণ মেনে নেওয়া। এ দুটোতে তফাৎ কিছু নেই। নারীর এবং শিল্পীর স্বাধীনতা অধিকাংশ মানুষ না মানলে সমাজে নারী এবং  শিল্পীদের বিরুদ্ধে যে বর্বরতা দেখি, সেই বর্বরতাই আজ দেখছি ভারতবর্ষে।

Advertisements

মুনীর চৌধুরীর নাটক ‘কবর’

kabor drama sceneডঃ আশরাফ পিন্টুঃ বাংলাদেশর নাট্যসাহিত্যে মুনীর চৌধুরী (২৭ নবম্বর ১৯২৫১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) এক অবিস্মরণীয় নাম। অসাধারণ প্রতিভাধর এ নাট্যকার মৌলিক ও অনুবাদ নাটক দিয়ে বাংলা নাট্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি এ দেশের নবনাট্যের পথ দেখিয়েছেন। তার নাটকগুলো স্বদেশপ্রেম ও সমাজচেতনায় উদ্দীপ্ত। অল্পকাল ব্যবধানে দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর দুনিয়াব্যাপী চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন ঘটে; এর অনিবার্য প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যেও। শিক্ষিত-সচেতন মানুষ হিসেবে নাট্যকার মুনীর চৌধুরীও বিশ্বমননে স্নাত হয়েছিলেন। পৃথিবীখ্যাত নাট্যনির্মাতা ইবসেনের সামাজিক-বাস্তবতাবোধ, বার্নার্ড শর ব্যঙ্গাত্মক জীবন-জিজ্ঞাসা, পিরান্দেলো- ব্রেখট-বেকেটের প্রগাঢ় শিল্পলগ্নতা আর মন্মথ রায়ের ভাষার গভীরতা প্রভৃতি অগ্রসর ভাবনা-প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। আর এ কারণেই বিষয়-কাঠামো আর মঞ্চে পরিবেশনের কলা-কৌশলের দিক থেকে তার নাটকগুলো স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছে।

মুনীর চৌধুরী ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়ে অনেক নাটক ও একাঙ্কিকা লিখেছেন; তার মধ্যে ‘কবর’ অন্যতম। তার রক্তাক্ত প্রান্তর, চিঠি প্রভৃতি নাটক সবিশেষ সাফল্য লাভ করলেও জনমানুষের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রশংসা পেয়েছে ‘কবর’ নাটকটি। বিষয়-ভাবনা এবং পরিবেশন-শৈলীর কারণেই সম্ভবত এটির প্রচার ও প্রসার অসামান্য। ‘কবর’ গভীর জীবনবোধের আলোকে সজ্জিত একাঙ্গ নাটক। এ ধরনের নাটক অপেক্ষাকৃত আধুনিককালের সৃষ্টি। যেখানে সহজ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে অনায়াসে দেখে নেয়া যায় জীবনের রূপ-নিবিড়তা ও গন্ধ-গভীরতা। এখানে পাওয়া যায় সমকালের সহজ অনুভবের শিল্পঋদ্ধ জীবন নিষ্ঠ কথা।

‘কবর’ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত। ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নাটকটি রচিত হয়; তখন তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী জানা যায়, আরেক রাজবন্দী রণেশ দাশগুপ্ত মুনীর চৌধুরীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন জেলখানায় মঞ্চস্থ করা যায় এমন একটি নাটক লিখে দেয়ার জন্য। যেখানে দেশপ্রেম থাকবে, আলো-আঁধারি পরিবেশ থাকবে এবং নারী চরিত্র এমনভাবে থাকবে যাতে পুরুষ অভিনয় করতে পারে। মুনীর চৌধুরী রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধ মাথায় রেখেই ‘কবর’ নাটিকাটি রচনা করেছিলেন। তিনি তার স্মৃতিচারণে বলেছেন,‘জেলখানাতে নাটক রচনার অসুবিধা অবশ্যই ছিল। এ অসুবিধাটুকু সামনে ছিল বলেই তো ‘কবর’ নাটকটির আঙ্গিকে নতুনত্ব আনতে হয়েছে। আট-দশটি হারিকেন দিয়ে সাজাতে হবে সে কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই ‘কবর’ নাটকটিতে আলো-আঁধারি রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।’ নাটকটি সর্বপ্রথম ১৯৫৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি জেলখানাতে মঞ্চস্থ হয়েছিল।

‘কবর’ নাটকে গোরস্তানের অতিপ্রাকৃত রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পুরো ঘটনাই গোরস্তানের ভেতর সংঘটিত হয়েছে। নেতা আর ইন্সপেক্টর হাফিজের অর্ধ-মাতাল অবস্থায় সংলাপের মধ্য দিয়ে নাটকটি সামনের দিকে আগাতে থাকে। এর মধ্যে অশরীরী আত্মার মতো হঠাৎ এসে উপস্থিত হয় মুর্দা ফকির। মুর্দা ফকির ‘মুর্দা’ নয়, জীবিত। তবুও নেতা ও হাফিজ দুজনেই তাকে মনে মনে ভয় পায়। আপাতদৃষ্টিতে তার কথার মধ্যে পাগলামির সংমিশ্রণ আছে তবে এটা নাটকের বহিরাঙ্গ। তার প্রতিটি কথাই রূপকধর্মী। তার বুকে যে হাহাকার তা বিবেকেরই হাহাকার দেশ ও জাতির কান্না। মুর্দা ফকির নেতা ও হাফিজের কাছে বিদায় নিয়ে কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে এসে বলে,‘গন্ধ! তোমাদের গায়ে মরা মানুষের গন্ধ! তোমরা এখানে কি করছ? যাও, তাড়াতাড়ি কবরে যাও। ফাঁকি দিয়ে ওদের পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা বাইরে থেকে মজা লুটতে চাও, না? না, না আমার রাজ্যে এসব চলবে না।’

মুর্দা ফকিরের এই সংলাপের মধ্য দিয়েই নাটকটির সারসত্য প্রকাশিত হয়েছে। এখানে যারা জীবিত মূলত তারা প্রকৃত জীবিত নয়; জীবন্মৃত অবস্থায় তারা আছে-তারা জীবন্ত লাশ মাত্র। আর যাদের তারা অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে তারাই জীবিত চির জাগরূক। তাই তো লাশগুলো কবরে ঢুকতে চায় না, বিদ্রোহ করে। ওরা হাফিজের কথার প্রতিবাদ করে বলে,‘মিথ্যে কথা। আমরা মরিনি। আমরা মরতে চাইনি। আমরা মরব না।…কবরে যাব না।’

‘কবর’ নাটকের মুর্দা ফকির, মূর্তিদের (ভাষা আন্দোলনে শহীদেরা) হাহাকার শুধু নিজেদের নয়, তাদের জীবন-উৎসর্গ শুধু ব্যক্তির উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করার জন্য নয়, নয় শুধু ভাষা আন্দোলনে আবেগ-উচ্ছ্বাসে জড়িত। এখানে রাজনৈতিক অবস্থা, গোপন ছলনা এবং বাঙালীর অস্তিত্বের সংগ্রাম নাটকজুড়ে নিহিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক ও মুনীর চৌধুরীর ছাত্র আনিসুজ্জামানের উক্তিটি স্মর্তব্য,“পরিহাসতরল আবহাওয়ার ছদ্মাবরণের সাহায্যে দুটি করুণ দৃশ্যের সাঙ্গীকরণ নাটকীয়তা সৃষ্টিতে বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে। এ দুই অংশে এবং মুর্দা ফকিরের বৃত্তান্তে ভাষা আন্দোলনকে অতিক্রম করে মুনীর চৌধুরী আমাদের সামাজিক জীবনের বৃহত্তর দ্বন্দ্বের প্রতি অঙ্গুলি সঙ্কেত করেছেন।”

প্রগতিশীল চিন্তার লালনকারী নাট্যকার মুনীর তার নাটকে মানবতাবাদী ভাবনার প্রকাশ দেখাতে চেয়েছেন। রক্ষণশীলতা আর প্রগতিশীলতার যে দ্বন্দ্ব, তা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে। পরাক্রমশালী রাজনীতির দৌরাত্ম্য ও জনগণের অসহায়তা এবং আদর্শবাদী চিন্তাধারার মাহাত্ম্য রচিত হয়েছে নাটকটির সংলাপের অভিনবত্বে ও উপস্থাপনার চমৎকারিত্বে। রাজনৈতিক প্রতাপ, অহমিকা, জনগণের নাম করে নিজেদের উদরপূর্তি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ যে জাতিগতভাবে হীনম্মন্যতাকে লালন করে, তার বাস্তব চিত্র মুনীর চৌধুরী নির্মাণ করেছেন ‘কবর’ নাটকে।

‘কবর’ নাটকে মার্কিন নাট্যকার আর উইন শ’’র ‘বেরি দ্য ডেড’ (১৯৩৬) নাটকটির প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়। মুনীর চৌধুরীও নাটকটির অবচেতন প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। ওই নাটকে বিশ্বযুদ্ধে নিহত তরুণরা কবরে যেতে অস্বীকার করেছে। ‘কবর’ নাটকে শহীদেরাও কবরে যেতে অস্বীকার করেছে। আর উইন শ’’র নাটকটির সঙ্গে ‘কবর’-এর ভাবগত ঐক্যে কিছুটা মিল আছে বৈকি! কিন্তু ‘কবর’-এ মুনীর চৌধুরীর উদ্ভাবনী চিন্তা এবং রচনা কুশলতায় স্বকীয়তা বিদ্যমান। মৃত সৈনিকদের বিদ্রোহ শ’র নাটকে প্রত্যক্ষ ও বাস্তব রূপে উপস্থাপিত আর ‘কবর’-এ বাস্তবতার বিভ্রম সৃষ্টি করা হয়েছে নেতা ও ইন্সপক্টরকে অর্ধ-মাতাল অপ্রকৃতিস্থ করে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নাট্যকার মমতাজ উদদীন আহমদ বলেন, “‘…এই সুদূর এবং প্রান্তিক ভারসাম্যটির জন্য ‘কবর’কে অনুসারী নাটক বলা যাবে না। এমন হলে পৃথিবীর অধিকাংশ শ্রেষ্ঠ নাটককে কাহিনী ভাগের জন্য অনুকৃতির দায় বহন করতে হবে।”

পরিশেষে বলা যায়, ‘কবর’ নাটকে চমকপ্রদ রহস্যজাল, কৌতুকাবহ যেমন আছে তেমনি আছে এর অন্তর্মুখী বিষাদময় ঘটনা। এই কৌতুক আবহ থেকেই বিকশিত হয়েছে বিষাদাত্মক ঘটনা। রাজনীতি-সচেতন মুনীর চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করে নাটক রচনা করলেও তা সমাজের বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে বাঙালীর অস্তিত্বের সংগ্রামে পরিণত করছেন; আর এখানেই তার কৃতিত্ব।

৬০-এ পা দিলেন কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব

অন্য রকম স্বাস্থ্যনিবাস

sanatoriumঅমর্ত্য গালিব চৌধুরী : সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে স্যানাটোরিয়াম বা স্বাস্থ্যনিবাসগুলো খুব জনপ্রিয় ছিল। এগুলোর বেশ কিছু মুখ থুবড়ে পড়লেও বেশির ভাগই এখনো স্বাস্থ্যনিবাসের কাজ চমত্কারভাবে পালন করছে। অনেকেই ছুটি কাটান এসব স্যানাটোরিয়ামে।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে ছুটি কাটানো মানে এই নয় যে আপনি হেলে-দুলে ঘুরবেন কিংবা সাগরতীরে বসে রোদ গায়ে লাগাবেন। এখানকার অধিবাসীরা অলস বসে ছুটি কাটানোর চেয়ে এই সময়ে নিজের শরীরটা আরো পাকাপোক্ত করার ব্যাপারেই বেশি মনোযোগী।

এগুলো তাঁরা করেন নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্বাস্থ্যনিবাসে। এই স্বাস্থ্যনিবাসগুলো কিন্তু আধুনিক স্পা সেন্টারগুলোর মতোই জায়গা। এখানে আবার অত্যাধুনিক চিকিত্সার ব্যবস্থাও আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকার তথা কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্বাস করত, সারা বছরের কাজের ধকল সামলানোর সবচেয়ে ভালো পন্থা হচ্ছে স্বাস্থ্যনিবাসে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে কিছুদিন অবকাশ যাপন করা। এতে দেহ-মন আরো চনমনে ও ফুরফুরে হয়ে উঠবে। এই ভেবেই এমন স্বাস্থ্যনিবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে তা প্রায় ২৬ বছর হতে চলল। অনেক স্যানাটোরিয়াম এখনো চালু আছে, তবে বড় একটা অংশ বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হতে চলেছে। এগুলো শুধু রাশিয়ায়ই নয়, সারা সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সব প্রজাতন্ত্রেই দেখা যায়। বিশেষ করে রাশিয়ার সোচি অঞ্চলে অনেক সুদৃশ্য স্বাস্থ্যনিবাস এখনো চালু আছে। এসব স্বাস্থ্যনিবাস পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন ডাক্তাররা। তাঁরাই ঠিক করেন দিনে কতটা ব্যায়াম করবে, কে কতটা দৌড়াবে বা কী ধরনের ওষুধ আর খাবার খাবে। এর সঙ্গে আছে ম্যাসাজ বা কর্দম স্নানের ব্যবস্থা। কিছু কিছু স্বাস্থ্যনিবাস আবার কয়েক কাঠি বেশি সরেস। কোথাও আছে হালকা বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা, কোথাও আবার লবণের গুহায় গিয়ে বসে থাকা লাগে। কোথাও আলোর প্রভাবে শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলা হয়। কয়েকটিতে তো স্রেফ খনিজ তেল দিয়ে গোসলের ব্যবস্থাও রাখা আছে। এই স্বাস্থ্যনিবাস থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘কুরোরটোলোজি’। এটা হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের ওপর কী কী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে সেসম্পর্কিত বিদ্যা। সোভিয়েত স্বাস্থ্যনিবাসে এগুলোর চর্চা হতো একসময়। অতিথিদের রুটিনও এই কুরোরটোলোজি অনুসারেই করা হতো।

কাজাখস্তানের স্তেপ বা ককেশাসের পাহাড় কিংবা রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের তীরে বালুকাবেলায় এমন স্বাস্থ্যনিবাসের উপস্থিতি সর্বত্র। বেছে বেছে এগুলো বানানো হয়েছে দারুণ সুন্দর সুন্দর জায়গায়, তার ওপর এদের অভ্যন্তরীণ আর বাহ্যিক অঙ্গসজ্জায়ও চোখে পড়ে অত্যন্ত উঁচু মানের শিল্পের ছাপ। কোনো কোনোটি সুদৃশ্য বহুতল ভবন, কোনোটি  সায়েন্স ফিকশনের অত্যাধুনিক বিল্ডিংয়ের আদলে আবার কোনোটি স্রেফ চৌকো বিশাল ব্লকের আকারে বানানো। কিরগিজস্তানের অরোরা স্বাস্থ্যনিবাসটি দেখতে জাহাজের মতো। আবার ক্রিমিয়ার দ্রুজবা স্বাস্থ্যনিবাসের ভবনটা যেন অতিকায় এক ফ্লাইং সসার।

সোভিয়েত ইউনিয়নে এই স্বাস্থ্যনিবাস প্রথার শুরুটা হয় সেই ১৯২০ সালের দিকে। ১৯২২ সালের লেবার কোডে বার্ষিক দুই সপ্তাহ ছুটি কাটানোর নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৩৬ সালে জোসেফ স্তালিন সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের এই ছুটি কাটানোর অধিকার নিশ্চিত করেন। ১৯৩৯ সালে এসে দেখা গেল, গোটা দেশে স্যানাটোরিয়ামের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আর ১৯৯০ সাল নাগাদ সোভিয়েত স্যানাটোরিয়ামগুলো বছরের যেকোনো সময়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে জায়গা দিতে পারত।

সোভিয়েত নীতিনির্ধারকদের কাছে ছুটিটা হৈ-হুল্লোড়, আমোদ-আহ্লাদে কাটানোটা বুর্জোয়া সংস্কৃতি ছিল। কাজেই সোভিয়েতরা ছুটির সময়টাতে নিজেদের শরীরটা আরো পোক্ত করার ব্যাপারেই বেশি মনোযোগ দিত। এই যেমন ১৯৬৬ সালে বিখ্যাত সোভিয়েত মডেল আন্তোনভ বলেছিলেন, ‘আমি বছরে একবারই ছুটি পাই, তাই ছুটির একটা দিনও অলস বসে নষ্ট করি না।

তা এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, পয়সা খরচ করে মানুষ কেন স্যানাটোরিয়ামে গিয়ে বসে থাকবে! মানুষের মনে তো ছুটি কাটানোর অন্য পরিকল্পনাও থাকতে পারে। সেখানেই হচ্ছে মজা। সোভিয়েত স্যানাটোরিয়ামে সরকারি কর্মীদের থাকা-খাওয়া ছিল নিখরচায়, সম্পূর্ণ ফ্রি। আর ছুটিও এক-দু দিনের না, পাক্কা ১৪ দিন পর্যন্ত এভাবে সরকারি খরচে অবকাশ কাটানো যেত। মানুষ যে ছুটির দিনগুলোর জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকবে এতে আর আশ্চর্য কী! তবে এখন অবশ্য বেশির ভাগ স্বাস্থ্যনিবাসে সময় কাটাতে চাইলেই অর্থ খরচ করতে হবে আপনাকে। তবে কোথাও কোথাও আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বেলারুশে এখনো দুই সপ্তাহ করে বিনা মূল্যে ছুটি কাটানোর প্রথাটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই স্বাস্থ্যবিধির এই অসাধারণ নিদর্শনগুলো দেখতে আসেন, ছুটি কাটিয়ে তরতাজা হয়ে ওঠেন। মারিয়াম ওমিদি নামের এক সাংবাদিক অনলাইনে অর্থ সংগ্রহ করে আলোকচিত্রীদের এই সব স্বাস্থ্যনিবাসের ছবি তুলতে উত্সাহিত করেন। গত বছর এখনো টিকে আছে এমন স্যানাটোরিয়ামগুলোর মধ্যে ৪০টির অদ্ভুত চিকিত্সার ছবি তোলেন আলোকচিত্রীরা। ওই ছবিগুলো নিয়ে ‘হলিডেজ ইন সোভিয়েত স্যানাটোরিয়াম’ নামের একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে।

সুচিত্রা সেনের জন্মস্থানের বাড়ীর বর্তমান হালচাল

suchitra sen house 1asuchitra sen house 1b

‘রূপবান’ বদলে দিয়েছিলো ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট

roopban

দেশে ঈদ আনন্দের জন্য যেখানে যেতে পারেন…

eid recreation