আর্কাইভ

Archive for the ‘বিনোদন’ Category

কয়েক দশকের নাটকের চরিত্রগুলোর পর্যালোচনা

ora kodom ali 1a.jpg

ora kodom ali 1b

ora kodom ali 1c

Advertisements

মিডিয়া বা চলচ্চিত্রের মানুষের প্রতি হ্যাপির আহ্বান

happy amatullahবর্তমানে যারা মিডিয়াতে/চলচ্চিত্রে কাজ করছেন বা যারা করতে চাচ্ছেন এই লেখাটা তাদের জন্য।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু। দুনিয়ার যত মুসলিম বোন আছে সবাইকে আমি নিজের বোনই মনে করি। আমার বোন যখন ভুল কিছু করবে বা করতে চাইবে আমি নিশ্চয় তাকে হাসিমুখে সেই অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারবো না। আমার বলাটা তো আমাকে বলতেই হবে। শোনা না শোনা, মানা না মানা এটা তো যার যার বিষয়। কেউ ইচ্ছা করে আগুনে ঝাঁপ দিতে চাইলে আমি আটকাতে তো পারব না। এটা বলতে পারবো শুধু, এই আগুণ ধংস করে দেবে, সহ্য করা যাবে না। তবুও জেনেশুনে কেউ ঝাঁপ দিলে সেটা তার জিম্মাদারি।

কোরআনে নারীদের জন্য আলাদা একটি সূরা “আন নিসা”! আল্লাহু আকবার! কত বড় সম্মান! নারীর যে সম্মান ইসলামে আছে যা আর কোনো ধর্মে নেই। নারীরা খুব দামী। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল তা পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন।সুবাহানআল্লাহ!

আর আমরা আজকে বেপর্দা হয়ে সম্মান অর্জন করার চেষ্টা করছি।মিথ্যা সম্মানের পেছনে ছুটে মরছি।একটু চিন্তা করি, ধরলাম আমি/আপনি অনেক বড় নায়িকা হলাম, চলচিত্রে সর্বোচ্চ সম্মান অস্কার পেলাম। প্রচুর টাকা হলো।সারা পৃথিবীর মানুষের (মুমিনদের কাছে না) কাছে আইডল হলাম। আমাকে/আপনাকে এক পলক দেখার জন্য জীবন দিতেও রাজি অনেকে। প্রচুর ক্ষমতা হলো।এবং কোনো না কোনো দিন মরে গেলাম। তারপর?

ভাবতে পারেন? অন্ধকার কবরটাতে কেউ একটা লাইট জ্বালানোরও ক্ষমতা রাখে না। এত দামী দামী পোশাক পরতেন আপনি, সেই আপনার পোশাক হবে শুধু সাদা কাফনের কাপড়। কোথায় যাবে সম্মান? কোথায় থাকবে ক্যারিয়ার? কোথায় থাকবে হাজার হাজার, লাখ লাখ, কোটি কোটি ভক্তরা? তারা কি আপনাকে আজাব থেকে বাঁচাতে পারবে?

হযরত আবু সাইদ খুদুরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, অবশ্যই নাফরমান অর্থাৎ (বে নামাজি, বেপর্দা) নারীদের জন্য কবরে ৯৯ টি বিষাক্ত সর্প (সাপ) নির্ধারণ করা হয়। সেগুলো তাকে কেয়ামত পর্যন্ত কামড়াতে ও দংশন করতে থাকবে।যদি তাদের মধ্যে হতে কোন একটি সাপও পৃথিবীতে নিঃশ্বাস ফেলতো তাহলে জমিনে কোনো সবুজ তৃণলতা বা উদ্ভিদ জন্ম নিত না।(দারেমী) আর ইমাম তিরমিযী ও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন তবে ৯৯ এর স্থলে ৭০ এর কথা বলেছেন। (মেশকাত, হাদীস নং ১২৬)

আর জাহান্নামের কঠোর শাস্তি তো আছেই। পর্দা করাকে আমরা অমর্যাদা মনে করি। আফসোস! আমরা কোনো দামী জিনিস রাস্তাঘাটে খোলামেলা ভাবে নিয়ে চলি? দামী দামী গহনার জায়গা কেন তালাবদ্ধ আলমারি হয়? কেন শোপিস করে রাখি না? কেন? উত্তর নিজেরা খুঁজে দেখি। আমরা তো অনেক বেশি দামী কোনো জিনিসের সাথেও তুলনা করার মত না।আজ অবস্থা এমন যে এসবের সাথেও উদাহরণ টানতে হয়! আমরা নিজেরা নিজেদের এই অবস্থায় টেনে এনেছি।

আমরা একটা সাপ দেখলেই ভয়ে শেষ হয়ে যাই।সেই সাপের সৃষ্টিকর্তাকে ভয় পাই না? আমরা লিফটে কিছুক্ষণ আটকে থাকলে আমাদের অবস্থা কি হবে তা আল্লাহ জানেন।আর কবর কেমন হবে? নিশ্চিত কেউ সেখানে কোনো সাহায্য করতে পারবে না। একমাত্র আমল ছাড়া।

আমরা নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করি, আল্লাহ বলেছেন ঢেকে রাখতে! আমরা প্রেম (হারাম প্রেমকেও জিনা বলা হয়েছে, শারীরিক সম্পর্ক হোক বা না হোক) করি, আল্লাহ বলেছেন জ্বিনা না করতে! আমরা পুরুষদের মত পোশাক পরি, আল্লাহ বলেছেন আমরা যেন পুরুষদের সাদৃশ্য গ্রহণ না করি! আমরা সকালে নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে থাকি, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। আরও অসংখ্য জিনিস আছে।আমরা প্রতিনিয়ত আল্লাহর অবাধ্যতা করছি। সীমালঙ্ঘন করে যাচ্ছি।

এই দুনিয়ায় কেউ চিরদিন বেঁচে থাকতে পারবে না।আমিও না আপনিও না। যে দুনিয়া আমাদের জন্য অনন্তকাল বসবাসের জায়গা সেই জায়গার জন্য কি প্রস্তুতি নিচ্ছি? নাচ গানের তালিম? কোনো কাজে আসবে না বোন। ধ্বংস হয়ে যাব। আফসোস করব দুনিয়াতে আবার এসে আমল করার জন্য, আল্লাহর হুকুম মেনে চলার জন্য, কিন্তু সেটা কেবলই আফসোস। দুনিয়াতে আর আসা সম্ভব না। এত অল্প সময়ের অশ্লীলতার ঘোর কেটে যাবে যখন মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়াবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?সেই পর্যন্ত অপেক্ষার ফলাফল কি, তা কি এখনো বুঝতে পারছি না?

মৃত্যুর কোনো সময় নির্ধারিত নেই। যখন তখন মরণ হতে পারে। কালকে ভাল হবো এমন চিন্তা তো তারাই করবে যারা প্রকৃত মূর্খ।আর কত মানুষ তো এমনও চিন্তা করে রাখে যে, বয়স হলে পুরোপুরি ধর্ম মেনে চলবো! আহা! যদি একটু বুঝতো তারা! কবরে অনেক মানুষ এমন আছে যারা এমন ভেবেছিল তাদের কালকে আর আসেনি, বার্ধক্যও আসেনি। তার আগেই চলে গেল তওবা না করে।আল্লাহর নাফরমানির মধ্য দিয়ে। চিন্তা হয় না বোন? শুধু চিন্তা করলেই তো হবে না।তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসি ইনশাআল্লাহ!

(নাজনীন আক্তার হ্যাপির ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

সৌদি আরবে বিনোদন যুগের সূচনা

riyad cityscapeবিল ল’ : গত বছরের অক্টোবরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত প্রথম ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ উদ্যোগ নামক সম্মেলনে দ্যুতি ছড়ানো আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন হলিউডের সবচেয়ে বড় ট্যালেন্ট এজেন্সিগুলোর একটির সিইও অ্যারি এমানুয়েল। কোনো সন্দেহ নেই, পাঁচ তারকা রিজ কার্লটন হোটেলের বিলাসবহুল বলরুমে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মূল বক্তব্য তিনি উৎসুকভাবে শুনেছেন। কারণ, যুবরাজ সেখানে বিদেশি কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দেয়া সুযোগ-সুবিধার বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঘনিষ্ঠ, শিকাগোর মেয়র র‌্যাহম এমানুয়েলের ভাই অ্যারির একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল ওই সম্মেলনে। সেখানে তিনি মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং সৌদি আরবে একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়ার জন্য বিনোদন ও সংস্কৃতি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল ‘আমি মনে করি আপনারা লাইভ এন্টারটেইনমেন্ট ও মিউজিক দেখবেন, খাবার উৎসব, ফ্যাশন, আর্ট শো’ ইত্যাদিতে যাবেন এবং তাহলে দেখবেন ভিশন-২০৩০-এর সঙ্গে এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি একটি সম্পর্ক আছে, বিশেষত তারা যা হতে চায় তার সঙ্গে।’

নিজের কোম্পানি উইলিয়াম মরিস এন্ডেভারের জন্য এমানুয়েল অ্যারি যা চেয়েছিলেন, তা হল সৌদি আরবের সম্ভাবনাময় এন্টারটেইনমেন্ট শিল্পে বড় ভূমিকা রাখবে কোম্পানিটি। সর্বোপরি, ইসলামের কট্টর ওয়াহ্হাবি ব্যাখ্যার আওতায় কয়েক দশক ধরে দেশটি এন্টারটেইনমেন্ট-বিনোদনত্যাগী হয়ে পড়েছে। সেখানে কোনো সিনেমা ছিল না, থিয়েটার ছিল না; ছিল না কোনো জনপ্রিয় লাইভ মিউজিক কনসার্ট। কিন্তু এখন মোহাম্মদ বিন সালমান হাল ধরার পর সৌদি আরবে তার মতে ‘মডারেট ইসলাম’ ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেছেন। ফলে ভিত্তি গড়তে যাওয়া বিনোদন শিল্প এখন ভালো ও মনোরম একটি অবস্থানে পৌঁছার হাতছানি দিচ্ছে। দেশটিতে এ শিল্পের বিশাল বাজার সম্ভাবনা রয়েছে- কারণ, সৌদি আরবের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বয়সই ৩০-এর নিচে।

যেহেতু ভিশন-২০৩০ গ্রহণ করা হয়েছে-‘আমরা যথেষ্ট সচেতন যে, বর্তমানে থাকা সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক সুবিধা আমাদের নাগরিক ও বসবাসকারীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না, এমনকি সেগুলো আমাদের উন্নতির দিকে যাওয়া অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও নয়’। অন্যদিকে মোহাম্মদ বিন সালমানও এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন যে, তিনি যদি নিজেকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শীর্ষে রাখতে পারেন, তবে এখান থেকে প্রচুর আয় বের করা যেতে পারে। ভিশন-২০৩০ বলছে, বিনোদন খাত ২২ হাজার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করবে। আরও প্রলুব্ধ হওয়ার মতো বিষয় হল, এন্টারটেইনমেন্ট ও হলিডে রিসোর্টগুলোয় যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তাতে পর্যটন খাতকে উন্নত করা হচ্ছে, যাতে করে এটি সৌদি আরবে বার্ষিক ৫ কোটি পর্যটক টানতে পারে; এ সংখ্যা বর্তমানে হজে আসে-এমন পর্যটকের সংখ্যা বাদ দিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।

নিজের ক্ষমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুবরাজ কত বেশি বেপরোয়া, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে অসাধারণ বিবেচিত ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সম্মেলন রিটজ কার্লটন হোটেলে শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পরেই। ৪ নভেম্বর হোটেলটির অতিথিদের চলে যেতে বলার পর বিলাসবহুল হোটেলটি ২০০-এর বেশি ব্যবসায়ী ও রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যের জন্য কারাগারে পরিণত করা হয়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের তকমা দিয়ে তেমনটি করা হয়েছিল। দমন-পাকড়াও অভিযানটি পরিচালনা করা হয় দুর্নীতিবিরোধী কমিটির আদেশে, যার প্রধান মোহাম্মদ বিন সালমান। গ্রেফতার শুরু হওয়ার পর রাজকীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যাদের আটক করা হয়েছিল তার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ধনী যুবরাজ আল-ওয়ালিদ বিন তালাল, সালেহ আবদুল্লাহ কামাল এবং ওয়ালিদ আল-ইবরাহিমও ছিলেন। বড় ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগের পাশাপাশি এ তিনজনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় কমন-তা হল তারা সবাই বড় ধরনের এন্টারটেইনমেন্ট ও মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান বা প্রধান উদ্যোক্তা।

বিন তালালের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি হল রোতানা মিডিয়া সার্ভিসেস- যা রেডিও এবং টিভি স্টেশন, ম্যাগাজিন, মিথস্ক্রিয় মিডিয়া এবং মুভি ও মিউজিক ভিডিও সরবরাহের বহুবিদ কাজ করে থাকে। কামালের মিডিয়া হল-এআরটি, আরব রেডিও এবং টিভি স্টেশন, যার আওতায় আছে ওএসএনসহ অনেক চ্যানেল। এ ছাড়া তার কোম্পানি মুভি, মিউজিক ও স্পোর্টসের মতো পারিবারিক এন্টারটেইনমেন্ট সরবরাহ করে থাকে। আল-ইবরাহিম নিয়ন্ত্রণ করেন এমবিসি- মিডলইস্ট ব্রডকাস্টিং সেন্টার। এ কোম্পানিটি চিলড্রেনস নেটওয়ার্ক, ২৪ ঘণ্টা নিউজ এবং বিশেষায়িত চ্যানেল ‘দ্য নিউ আরব উইমেন’সহ অনেক চ্যানেল পরিচালনা করে থাকে।

কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের ‘যথাযথ প্রক্রিয়া’র মুখোমুখি করা হবে। প্রকৃতপক্ষে এ সংক্রান্ত যা কিছু সৌদি আরবে ঘটেছে, তা ছিল একটি কম্পন। পরে আটককৃতদের কেবল বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হয় এবং অনেকে এ পদ্ধতিতে মুক্তি নেয়। অন্যথায় তাদের ব্যবসা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তৎকালীন সৌদি আরব ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান যুবরাজ মিতেব ও সাবেক বাদশাহ আবদুল্লাহর এক ছেলেকে ১০০ কোটি ডলার পরিশোধের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হয় বলে খবর বেরিয়েছে। আল-ওয়ালিদ বিল তালাল তার ব্যবসা ছাড়তে রাজি হননি, ফলে তিনি আটক রয়ে গেছেন। ধারণা করা হয়, কামাল ও আল-ইবরাহিমকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

সৌদি রাষ্ট্রপদ্ধতির অস্পষ্টতার কারণে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত স্বার্থ কোথায় শেষ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ শুরু, তা চিহ্নিত করা অসম্ভব। তবে যে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট, তা হল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) প্রধান, অল-ইনকম্পাসিং কাউন্সিল ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ক্রাউন প্রিন্স, প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও দুর্নীতিবিরোধী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সব অর্থনৈতিক বিষয় বিন সালমানের হাত দিয়েই পাস হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে পিআইএফ এন্টারটেইনমেন্ট সেক্টরে ২৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়। বর্তমানে এমানুয়েলের কোম্পানি পিআইএফের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে যাচ্ছে, যেখানে কোম্পানির অংশীদারিত্বের জন্য ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এমানুয়েল অ্যারি চাচ্ছেন দৈবাৎ পাওয়া এ অর্থ দিয়ে কোম্পানিকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে, যাতে এরই মধ্যে কেনা আইএমজি বা আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপের স্পোর্টস গাড়ি, বিপুল স্পোর্টস সরঞ্জাম, ফ্যাশন ও লাইভ ইভেন্ট তৈরি করা যায়।

এ ছাড়া তিনি সৌদি আরবের সমৃদ্ধ অনুন্মোচিত অঞ্চলের দিকে মনোযোগ দিতে চান। বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে বাইরে যেতে পছন্দ করে’। ‘তারা পছন্দ করে সামাজিক বিভিন্ন বিষয়, তাই মুভি ও কনসার্ট হতে পারে বড় ভূমিকা পালনকারী আর স্পোর্টস হচ্ছে ভালো অনুঘটক।’ এসব কিন্তু ঢেকে রাখা হয়েছে। মোহাম্মদ বিন সালমানের নিয়ন্ত্রণাধীন পিআইএফ ফান্ডের সঙ্গে সংযুক্তি অবশ্যই স্বর্গে বিয়ের মতো দেখা যায়; কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এমানুয়েল অ্যারি হয়তো হোটেল রিটজ কার্লটনে গত বছর যা ঘটেছে, তা বিবেচনায় নিতে পারেন। সন্দেহ নেই, আটককৃতরা দুর্নীতি চর্চায় জড়িত ছিলেন; কিন্তু এটিই হচ্ছে সৌদি আরবের ব্যবসায়ী সমাজ ও শাসক পরিবারের নিত্যদিনের ঘটনা।

একটি সূত্র সম্প্রতি বাঁকা হাসি হেসে আমাকে বলেছে, ‘দেশের সবাই জানে গ্রেফতার করা হয়েছে বাছাইকৃতদের’। যা কিছুই ঘটেছে, আটককৃতদের মানবাধিকার, মুক্ত ও স্বচ্ছ শুনানি পাওয়ার অধিকার পদদলিত করা হয়েছে। তাদের ব্যবসা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পদ আটকে রাখা হয়েছে। তারা দেশ ছেড়ে যেতে অক্ষম। এমানুয়েল পুরোদস্তুর নিষ্ঠুর ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত; কিন্তু তিনি সম্ভবত নিজের ভালো মিল বা আরও বেশি খুঁজে পেতে পারেন মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে।

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ: সাইফুল ইসলম

বিল ল ’: মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ও বিবিসির সাবেক সাংবাদিক

রক ব্যান্ড বিটলস-এর ভারত ভ্রমণ কাহিনী

beatles india tour

বিয়ে বাড়ির বাজনা এবং সামাজিক বর্বরতা

জাফর সোহেল : ঢাকা একটি শহরের নাম। একটি দেশের রাজধানী। অথচ দেখেশুনে মনে হয় সারাদেশ থেকে বাছাই করে এখানে কিছু বোধ বিবেচনাহীন মানুষকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। রাজধানী ভরে উঠেছে এ ধরনের মানুষে। এদের মনোবৈকল্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মন বলে তাদের আদৌ কিছু আছে কি না এই প্রশ্ন তোলা যায়! মনহীন মানুষ কি মানুষ? শুধু একটা দেহ নিয়ে কি মানুষ হওয়া যায়? ঢাকা শহরে সম্ভবত এমন মানুষের সংখ্যাই এখন বেশি। এ ধরনের মানুষের সঙ্গে প্রাণহীন জঞ্জালের আসলে কোনো পার্থক্য নেই।

পুরান ঢাকার গোপীবাগে বিয়ে বাড়িতে হত্যার শিকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর স্বজন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে বলছিলেন: ‘সিনেমা দেখে না সিনেমা, ঐরকম। সবাই সিনেমা দেখতে ছিল। একটা লোকও এগিয়ে আসেনি। তারা অসুস্থ লোকটাকে মারতে মারতে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। কেউ একটা কথাও বলেনি!’

টেলিভিশনের নিউজ দেখতে দেখতে আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা সিনেমার মতোই মনে হচ্ছিল। পেশি শক্তির ব্যবহার; এমনকি বিয়ের মতো একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের দিনও কম দেখাতে রাজি নয় কিছু মানুষ। অন্যদিকে সিনেমার শুটিং দেখার বাইরে এই শহরের মানুষের যেন আর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই! কোনো বোধ নেই, অনুভূতি নেই। খবর দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, নিহত এই ভদ্রলোক কি তার প্রতিবেশীর বিয়েতে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন?

এবার ‘সিনেমা’র গল্পটিতে চলুন প্রবেশ করি। গল্পের পটভূমি, নায়ক-নায়িকা-ভিলেন সব পুরান ঢাকার গোপীবাগের। সেখানকার একটি বাড়িতে এক রাজকুমারের বিয়ে হবে। বিয়ের আগে গায়ে হলুদের রাত। বিয়ে বাড়িতে শুরু হয় রাজকুমারকে নিয়ে নানারকম ব্যস্ততা। এর মধ্যে বাড়ির ছাদে উঠতে থাকে ইয়া বড় বড় বাক্স। শব্দের কম্পন তোলা যেগুলোর কাজ। বাদ্য বাজনার তালে তালে এই বাক্সগুলো যত বেশি কম্পমান হবে তত এদের কদর। একসময় এদের ভূমিকা শুরু হয়ে যায়। এদের স্বাভাবিক মাত্রার কম্পনে সন্তুষ্ট হয় না রাজকুমার আর তার স্বজনরা। তারা আরও জোরে বিল্ডিং কাঁপিয়ে দেয়ার মাত্রায় তাদের চালিত করে। এতে বোবা বাক্সগুলো কষ্ট পেলেও, ফেটে গিয়ে মারা যাওয়ার (ধ্বংস হওয়ার) ভয় থাকলেও কিছু বলে না। কারণ তারা বলতে পারে না। সুতরাং তাদের সর্বোচ্চ শক্তির কম্পনে চারপাশ প্রকম্পিত হতে থাকে। এমন সময় বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে শোনা যায় গোঙানি। সদ্য হার্টে বাইপাস সার্জারি করা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী নাজমুল হক বুকে হাত দিয়ে গোঙাতে থাকেন। মধ্যরাতে বাবার বুকের ব্যথা বেড়ে যাওয়ার কারণ বুঝতে দেরি হয় না ছেলের। সাহস করে ছাদের ওপরে উঠে যান তিনি। উচ্চমাত্রার শব্দ দূষণের প্রতিবাদ করেন।

পরদিন সকালে বিয়ে বাড়ির রাজকুমার বর আর তার স্বজনরা নাজমুল আর তার ছেলেকে ডেকে পাঠান। কত বড় সাহস, রাত দুপুরে অপমান! বাবা-ছেলে নেমে আসেন। আর তখনই হার্টের রোগী বাবা আর ছেলের ওপর শুরু হয়ে যায় অ্যাকশন। হৃদযন্ত্রের অব্যবস্থপনায় আগে থেকেই নাকাল বয়োজ্যেষ্ঠ নাজমুল বুকের ভেতরের প্রাণপাখি আর ধরে রাখতে পারেন না। তার প্রাণপাখি আকাশে উড়াল দেয়। নিয়াজুল পড়ে যান। এমনভাবে পড়েন, যেখান থেকে তাকে টেনে তোলার সাধ্য কারো নেই।

সিনেমার গল্প শেষ। এবার নিহত নাজমুলের স্বজনের ক্ষোভের জায়গাটায় একটু যাই। একটা শহর। এখানে মানুষ আছে; মানুষের মিলিত সমাজ আছে। ন্যায় অন্যায় সমাজে থাকবেই। কিন্তু প্রকাশ্যে অন্যায় চললেও এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলবে না- এটা কোন ধরনের সমাজ? পৃথিবীর ইতিহাসে কি এমন কোনো সমাজ ছিল, যেখানে মানুষের বিপদে মানুষ এগিয়ে আসে না? হ্যাঁ ছিল, অরাজক দেশে। যেখানে শাসন বা অনুশাসন বলে আসলে কিছু কার্যকর থাকে না। যে যার মতো চলে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে শক্তিধরেরা যেমন খুশি তেমন আচরণ করে। দুর্বলেরা কেঁচোর মতো নিজেদের অর্ধেক মাটিতে ডুবিয়ে রাখে। সবলের কোদালে অপরাপর কেঁচোরা কচুকাটা হলেও অন্যরা মুখ লুকিয়ে থাকে। ঢাকা শহর কি একটি অরাজক দেশের অংশ? এখানেও যেভাবে সবলের কাছে দুর্বলের মার খাওয়া এবং আইনের শাসনের তোয়াক্কা না করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অন্যায় দেখেও সমাজের মানুষের নির্লিপ্ত থাকার ছবি সামাজিক বিপর্যয়ের কথা বলে। না হলে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে একেবারে আয়োজন করে পেটানো হচ্ছে আর মানুষ তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, সিনেমার শুটিংয়ের মতো! এ কথা ভাবা যায়?

আমরা ইতিহাস পড়ি। হাজার বছর আগে কীভাবে বিক্ষিপ্ত মানুষেরা সমাজ গঠন করেছিল; মিলেমিশে থাকতে শিখেছিল; একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস রপ্ত করেছিল। আমরা দাবি করি, দিনে দিনে মানুষের এই সমাজ ব্যবস্থা আরো দৃঢ় হয়েছে এবং হচ্ছে। দিন যত এগোয়, সমাজ নাকি তত সভ্য হয়, বন্ধন নাকি তত পোক্ত হয়। এই তার নমুনা? পুরান ঢাকার গোপীবাগের বিয়ে বাড়ি কোন সমাজের প্রতীভূ? সেখানকার বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া, সিনেমার শুটিংয়ের দর্শক প্রতিবেশী কোন সমাজ থেকে এসেছেন? বইয়ের জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তবতার মিল কোথায়? বাস্তবে তো আমরা দেখছি দিনে দিনে সমাজ সভ্য হওয়ার বদলে অসভ্য হচ্ছে; সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হওয়ার বদলে বন্ধন ছিঁড়ে যাচ্ছে। মিলন নয়, কীভাবে একে অপর থেকে পৃথক হওয়া যায় সেই চর্চা চলছে পরিবারে।

আবার আরেক দিক থেকে যদি দেখি, সমাজের মানুষ কখন নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করে? যখন সে দেখে, এরকম আরো দশটা ঘটনায় কারো কোনো বিচার হয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব ঘটনায় কিছু যায় আসে না। কিংবা যে কোনো প্রকার সম্পর্ক দিয়ে, সেটা অর্থ হোক বা ক্ষমতা, আইনের চোখ বেঁধে রাখা যায়। পুরান ঢাকার বিয়ে বাড়ির লোকেরাই কেবল নন, এই সমাজের অনেক মানুষই এখন মনে করে ‘আমার কিচ্ছু হবে না’। এই মানুষেরা সমাজের কাছ থেকে এক ধরনের ইনডেমনিটি পেয়ে যায়; প্রশাসনের কাছ থেকেও। ফলে এরা যখন কাউকে কানে ধরে উপর তলা থেকে নীচ তলায় নামিয়ে আনে, তখন কারো কিছু বলার থাকে না। মারধরের বেলায় এরা কি চোর-ছেঁচড়ার গায়ে হাত তুলছে, নাকি সজ্জন ব্যক্তির গায়ে হাত দিচ্ছে- দেখার কেউ থাকে না। এরা যা করে তাই ঠিক। এরা নিজেদের মনে করে সমাজের প্রশাসক। তাই যে কাউকে মারার যেমন এদের অধিকার আছে, তেমনি মেরে একেবারে পরপারে পাঠিয়ে দেয়ারও বিশেষ অধিকার এরা রাখে। ‘অনধিকার চর্চা’র মতো শব্দ তাদের অভিধানে নেই।

দেশে যে সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। বিষয়টি স্বীকার করে সংকটগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা নেয়াতেই রয়েছে এর সমাধান। একটা সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে সেখানে প্রকাশ্যে মানুষ পিটিয়ে মারার মতো ঘটনা ঘটতে পারে না। ঘটনার হোতারা এই সাহস পেত না। রাষ্ট্রে বসবাসরত একজন সুস্থ সামাজিক মানুষ কখনও ভাবতে পারে না- আমিই সব। আমাদের ওপর কথা বলার কেউ নেই। বিয়ে বাড়িতে বাদ্য বাজবে কি বাজবে না, বাজলে কোন মাত্রায় বাজবে; শব্দ দূষণ করা যাবে কি যাবে না; বিশেষ আবদারে কিছুটা দূষণের অনুমতি দিলেও তা কত মাত্রায় থাকবে; যেখানে অনুষ্ঠান হবে সেখানে বা আশপাশে হাসপাতাল আছে কি না, অসুস্থ মানুষ আছে কি না; প্রস্তাবিত আয়োজনে কমিউনিটির সবার সায় আছে কি না- এ ব্যাপারগুলো মীমাংসা করা কি এতই কঠিন?

বিয়ে বাড়িতে বাদ্য-বাজনার শখ যেমন অধিকার, তেমনি প্রতিবেশীরও আছে নিরুপদ্রব ঘুমের অধিকার। একজনের কারণে দশজনের কষ্ট হতে পারে না। তাছাড়া দেশে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন আছে। ফলে আপনার শখের নামে অত্যাচার প্রতিবেশী কেন সহ্য করবে? গোপীবাগের ঘটনায় জানা যায়, তারা কমিউনিটির কারো মতামতের তোয়াক্কা করেনি। যথেষ্ট সুযোগ সেখানে ছিল কিছু করার। গানের শব্দ যেমন কমানো যেত, তেমনি অনুরোধ করে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নেয়া যেত। কিন্তু ঐ যে ‘আমিই সব’ টাইপের চিন্তাভাবনা যেখানে ঢুকে গেছে, সেখানে কে কাকে অনুরোধ করবে? কে কার অনুমতি নেবে? সুতরাং সময় এসেছে যারা এমন ভাবে, তাদের উচিত শিক্ষা দেয়ার। যাতে তারা বুঝতে পারে-আমি আসলে কিছুই না। বরং সমাজের অন্য দশজনের মতো সাধারণ একজন।

আর আমরা যারা সিনেমার শুটিংয়ের দর্শক তাদেরও ভাবতে হবে, বুঝতে হবে-  কেঁচোর মতো মুখ লুকিয়ে থাকলেই কিংবা বোবা জন্তুর মতো চুপ করে থাকলেই বেঁচে যাওয়া যাবে না। আজ নাজমুল ঘটনার শিকার হয়েছেন কাল আপনিও হতে পারেন। পিঠের ওপর প্রতিবেশীর মারের দাগ কেবল নাজমুলের পরিবারকে নিতে হয়নি। এ দাগ আমাদের সবার পিঠেই লেগেছে। কষ্ট করে পেছনে হাত দিয়ে দেখুন। মন খুলে ভাবুন বুঝতে পারবেন।

পদ্মাবতী বিতর্ক: শিল্পের স্বাধীনতায় উগ্রবাদীদের হামলা

Padmavati_movie 2017চিন্ময় মুৎসুদ্দী: পদ্মাবতী নিয়ে ভারতের উগ্রবাদীদের কর্মকা- শিল্পের স্বাধীনতায় নয়া হস্তক্ষেপ। তুচ্ছ বিষয়কে সামনে এনে তারা তুলকালাম বাধিয়েছে শ্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। তবে পদ্মাবতী নিয়ে সর্বশেষ সুসংবাদ হলো সিনেমাটি নিষিদ্ধের আবেদন তৃতীয় বারের মতো খারিজ করে দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে বলেছেন, ‘এর নাক কাটব, ওর মুণ্ডু কাটব, এ জন্য পুরস্কার দেব, গণতন্ত্রে এসব বরদাশত করা হয় না। দেশের আইন এভাবে কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।’

ছবিটি মুক্তির ব্যাপারে বাধা দেওয়া আর ছবির পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যান্ড টিভি ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইএফটিডিএ) ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে ১৫ মিনিটের ব্ল্যাক আউট কর্মসূচি পালন করে। চলচ্চিত্র এবং দূরদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ২০টি সংস্থা ওই দিন বিকেল সোয়া ৪টা থেকে ১৫ মিনিট চলচ্চিত্র ও টিভি সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করা থেকে বিরত থাকে। ২৮ নভেম্বর কলকাতার টালিগঞ্জের ছবিপাড়ায় ১৫ মিনিটের জন্য প্রতীকী ধর্মঘট পালন করা হয় ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কারস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া এবং ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে।

এর আগে হরিয়ানা রাজ্যের বিজেপি নেতা সুরুজ পাল আমু পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাক কেটে নেওয়ার হুমকি দেন। মমতা পশ্চিমবঙ্গে চলচ্চিত্রটিকে স্বাগত জানিয়ে এর প্রিমিয়ার কলকাতায় করার প্রস্তাব দেন। মমতার প্রস্তাবটি আসে গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই ছবির মুক্তির ওপর রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরিপ্রেক্ষিতে। ওইসব রাজ্যে উগ্রবাদীরা মিছিল সমাবেশ করে ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি ও অভিনেত্রী দীপিকা পাড়–কোনের নাক, কান, মাথা কর্তনকারীদের জন্য বিশ কোটি টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। এই ডামাডোলে এরই মধ্যে এক সাধারণ নাগরিকের প্রাণ গেছে। নিহত ২৩ বছরের তরুণ চেতন সাহনি জয়পুরে গয়নার ব্যবসা করতেন। জয়পুরের বিখ্যাত নাহারগড় দুর্গের বুরুজ থেকে তার মরদেহ ঝুলছিল। তার মৃতদেহের পাশে লেখাছিল ‘আমরা শুধু কুশপুতুল লটকাই না।’ আর একটি পাথরে লেখা ছিল ‘পদ্মাবতীর বিরোধিতা’।

পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়া দূরে থাক, এখনও সেন্সর বোর্ড থেকে এ সিনেমা সম্পর্কে কোনো মন্তব্যই করা হয়নি। শুধুমাত্র একটা ধারণা থেকেই মাঠে নেমেছে উগ্রবাদী বিজেপি, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা বলছেন ‘আমাদের জাত্যাভিমানে চুনকালি লেপা হয়েছে, আমাদের দেবী মা পদ্মাবতিকে মন্দিরের পাদপিঠ থেকে নামিয়ে করে তোলা হয়েছে বাহরওয়ালি নাচনি, তাই পরিচালকের মুণ্ডু চাই.. ..’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সারা ভারতে ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে তারা। বানসালির পদ্মাবতী অচ্ছ্যুত হলে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (পদ্মিনী উপাখ্যান, ১৮৫৮), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ, ১৮৭৫), ক্ষিরোদাপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (পদ্মিনী, ১৯০৬) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রাজকাহিনী, ১৯০৯) প্রমুখের এসব রচনা নিষিদ্ধ করতে হয়। কারণ তারাও ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। ইতিহাসকে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন। ইতিহাসকে ভিত্তি করে তারা গল্প বুনেছেন।

সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে ইতিহাস কি কেউ ভিন্ন দৃষ্টিতে এখন দেখতে পারবে না? অতীতে এমন হয়েছে। সেজন্যই শিল্পের স্বাধীনতা মুক্তচিন্তার আলোকে বিবেচনা করা হয়। তথ্যই কেবল ইতিহাস নয়, কিংবদন্তিও ইতিহাসের অংশ। কোনো শিল্প মাধ্যমই ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে পেশ করে না। রানি পদ্মাবতী হয়তো তার জীবনে নাচেননি। নাচলেও এতটা ডিজিটাল ভেল্কি ছিল না। সিনেমার অনেকটাই পরিচালকের কল্পনা। আর ছবিটিও বানসালির ‘লাগ ঝমাঝম’ ভঙ্গিতে বলা একটি বলিউডি উপাখ্যান মাত্র। যেটা আমরা তার আরেকটি চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’-এ দেখেছি। পাঠককে এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, চলচ্চিত্রটিতে তিনি পার্বতী এবং চন্দ্রমুখীকে একসঙ্গে নাচিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এ কিন্তু এই ঘটনা ছিল না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- দেবদাস সাহিত্য, পদ্মাবতী ইতিহাস। সেক্ষেত্রে এই ইতিহাসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। অনেক ঐতিহাসিকই পদ্মাবতীর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি।

দূরদর্শনের সভাপতি রজত শর্মা একটি কথা বলেছেন যেটি প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বানসালীর গবেষণা পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর, বর্ণে বর্ণে বাস্তবনিষ্ঠ। কোনো বিকৃতি নেই।’ আর পরিচালক সুভাস ঝা বলেছেন, ‘সত্যিই সে সময় রমণীরা নাচতেন, অন্তরালে জেনানা রানিবাসে। সেখানে রাজা ছাড়া আর কোনো দর্শক থাকত না। সিনেমায় যে ‘ঘুমার’ নাচের দৃশ্য আছে, তাতে কোনো বাইরের মরদ নেই। তাই, ইতিহাস বিকৃতি ঘটেনি। এখন তিনটি পক্ষ। উগ্রবাদীরা বিপক্ষে। বানসালীকে সমর্থনকারী পক্ষ বলছেন বিকৃতি হয়নি। আরেক পক্ষ বিকৃতি হয়েছে কি হয়নি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছেন না, তারা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন- শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে। পদ্মাবতীর সমর্থনে তাই ইতিহাস বিকৃত হয়নি বলে সাফাই দিলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিল্পের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটিকেই মূখ্য করে দেখতে হবে। ইতিহাসকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অধিকার সমুন্নত রাখা জরুরি।

বাস্তব ও কল্পনার মিশেল নিয়ে তৈরি আশুতোষ গোয়ারিকর’র ‘যোধা আকবর’ (২০০৮) ছবিতে আকবরের সঙ্গে যোধাবাঈয়ের প্রেমের কাল্পনিক ঘটনা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেও ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠেনি। তখন ইউপিএল আমল। এখন কেন্দ্রে বিজেপি, বিভিন্ন রাজ্যে ক্রমে তারা ক্ষমতার হাত প্রসারিত করছে। ১৮ রাজ্য তাদের শাসনে। দেখা যাচ্ছে ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক শক্তি জোরেসোরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ইমেইজ আর থাকছে না। গত তিন বছরে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অসংখ্য হামলা সেটাই প্রমাণ করে। মুসলমানদের খাদ্যের ওপরও তারা বাধ সাধছেন। উত্তর প্রদেশে গরুর ব্যবসা করার দায়ে প্রাণ দিতে হয়েছে এক মুসলমান তরুণকে। এবার তারা শিল্পের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। বানসালী এরই মধ্যে বলেছেন, আলাউদ্দিন খিলজির স্বপ্নের রানি পদ্মাবতীর সঙ্গেঅহপযড়ৎ প্রেমের দৃশ্যটি ছবিতে নেই। এরপরও উগ্রবাদীদের এ ধরনের জঙ্গী আচরণ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা মুক্ত চিন্তা ও গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত বলেই মনে করি।

স্বাধীনতা মানে কী?

তসলিমা নাসরিন : ডিসেম্বরের ১ তারিখ চলে গেলো, ‘পদ্মাবতী’ মুক্তি পেলো না ভারতে। হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে হেরে গেলো গোটা ভারতবর্ষ। তাদের তাণ্ডব আর হুমকির সামনে মাথা নোয়ালো সেক্যুলার ভারত। ‘পদ্মাবতী’ নামে আদৌ কেউ ছিল, কোনও ঐতিহাসিকই বলেননি। সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জয়সীর লেখা কবিতা ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে তৈরি ‘পদ্মাবতী’। ‘পদ্মাবতী’ নামে হয়তো কেউ ছিল না কোনও কালে। মালিক মোহাম্মদ জয়সীই রচনা করেছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী পদ্মাবতীকে, যে পদ্মাবতীকে জয় করার লোভ করেছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি। রাজপুত হিন্দু রমণী মুসলিম শাসকের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার চেয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। এইরকম একটি গল্প নিয়েই সঞ্জয় লীলা বানসালি ‘পদ্মাবতী’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন। কিন্তু হিন্দু মৌলবাদীরা ক্ষুব্ধ, কারণ তারা শুনেছে ছবিতে দেখানো হয়েছে খিলজি আর পদ্মাবতীর ঘনিষ্ঠতা। ছবি না দেখে কী করে আমরা বলবো কী দেখানো হয়েছে। ‘গুজব’-এর যে কী অবিশ্বাস্য গুণ! মানুষ চোখ-কান বুজে গুজবকে অনায়াসে বিশ্বাস করে ফেলে।

সঞ্জয় লীলা বানসালি সহ আরও অনেকে, যারা পদ্মাবতী ছবিটি ঘরে বসে দেখেছেন, বলেছেন, ‘ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই, যে দৃশ্য দেখে হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে’। তারপরও শান্ত হয়নি হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠী। প্রথম দিকে না মানলেও, ধীরে ধীরে সরকারি দলের লোকেরাও মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিচ্ছেন। পদ্মাবতীকে নিষিদ্ধ করছেন। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া ছবিটিকে অযথাই শেকল পরানো হয়েছে।

আমি আর সবার মতো বলতে চাইছি না ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই। আমি বলতে চাইছি, যদি থাকেই, তাহলে ক্ষতি কী? ইতিহাসে পদ্মাবতীর কোনও উল্লেখই নেই, কিন্তু কাব্যে আছে বলে পদ্মাবতীকে আজ ঐতিহাসিক চরিত্র বলে ভেবে নেওয়া তো ঠিক নয়। সত্যিকার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকেই শিল্পী সাহিত্যিকরা নতুন করে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে চিরকালই লিখেছেন, এঁকেছেন। চলচ্চিত্রে, নাটকে, গানে চরিত্রগুলো বারবার এসেছে, সবসময় যে একই রূপে, একই গল্পে তা নয়। ইতিহাস নিয়ে প্রচুর চলচ্চিত্রই নির্মিত হয়েছে, যেগুলোতে রয়ে গেছে প্রচুর ভুল। ১৯৯৮ সালে শেখর কাপুর এলিজাবেথ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন, ওই ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন রানী এলিজাবেথ তাঁর  উপদেষ্টা স্যার উইলিয়াম সেসিলকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করেছেন। বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা ঘটেছিল, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্যার উইলিয়াম সেসিল রানীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে রানীর পাশে ছিলেন। পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গ সংগীত তারকা পিয়ানোবাদক মোজার্টের জীবন কাহিনি নিয়ে ‘আমেডিউস’ নামের চলচ্চিত্রে মোজার্টকে দেখানো হয়েছে একটা নষ্ট ছোঁড়া হিসেবে, বাস্তবে মোজার্ট মোটেও তা ছিলেন না। সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি  টাইটানিক ছবিতে জাহাজ দুর্ঘটনা সত্য , কিন্তু  জ্যাক ডোসন আর রোজের প্রেম কাহিনি সত্য নয়। ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ ছবিতে ব্রিটিশ  ট্রুপের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ‘ইউ-৫৭১’ ছবিতেও ব্রিটিশের বদলে আমেরিকান সৈন্য দেখানো হয়েছে। এসব নেহাতই ইতিহাস বিকৃতি। ইতিহাস বিকৃতি আরও কত যে ছবিতে প্রকট, গ্ল্যাডিয়েটর, ব্রেভহার্ট, দ্য পেট্রিয়ট, মারি আন্তোয়ানেত, সেক্সপিয়র ইন লাভ…। সমালোচকরা বিকৃতির এবং ভুল তথ্যের নিন্দে করেছেন। কেউ কেউ আবার শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ছবি নিষিদ্ধ করেননি, কেউ পরিচালকের মাথার মূল্য ঘোষণা করেননি, কেউ অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নাক-কান কেটে ফেলার ফতোয়া দেননি। এসব দেওয়া হচ্ছে ভারতের মতো নানা ধর্মের, নানা ভাষার, নানা রঙের মানুষের গণতন্ত্রে। আর কোনও দেশে না  হোক, খাজুরাহো আর ইলোরা অজন্তার দেশে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করাটা দেশকেই, দেশের শিল্পকেই, চরম অপমান করা।

ইতিহাসের রদ-বদল এবং বিকৃতি হামেশাই হচ্ছে। কেউ যখন আমরা সঠিক করে জানি না ঠিক কী ঘটেছিল সুদূর অতীতে, আমরা কল্পনা করে নিই অনেক ঘটনা। চার্লস ডিকেন্সকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘দ্য লাস্ট ডিকেন্স’, এডগার অ্যালেন পোকে নিয়ে ‘দ্য পো শ্যাডো’, এসব তো আছেই, আলেক্সান্দ্র দুমা লিখেছেন ‘কুইন মারগো’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘প্রথম আলো’। এরকম নানা বইয়ে মেশানো হয়েছে সত্যের সঙ্গে মিথ্যে, অথবা খানিকটা সত্যের সঙ্গে অজস্র কল্পনা। বইয়ে কতটুকু সত্য আর কতটুকু কল্পনা তা নিয়ে বিতর্ক হয় হোক। ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে শুধু তথ্যচিত্র হতে পারে, কোনও চলচ্চিত্র নয়। এ নিয়ে হোক বিতর্ক। হোক কলরব। আবারও বলছি, বিতর্ক হওয়া ভালো, কিন্তু বই বা চলচ্চিত্র, বা কোনও শিল্পকর্ম নিষিদ্ধ করা আর গণতন্ত্রকে নিষিদ্ধ করা একই জিনিস। আমরা গণতন্ত্র নিষিদ্ধ হোক চাই না।

মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে এখনও অধিকাংশ মানুষের কোনও ধারণা নেই। তারা গণতন্ত্র মানে এখনও বোঝে নির্বাচন, ভোটে হারা, ভোটে জেতা। মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে এখনও অধিকাংশ মানুষ রায় দেয়, মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অধিকার কারোর নেই। তারা বলতে চায়, কারওরই এমন কোনও কথা বলা বা কাজ করা উচিত নয়, যা দেখে বা পড়ে বা শুনে অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। এর মতো অগণতান্ত্রিক মন্তব্য আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। কেউই, বিশেষ করে প্রতিভাবান কেউ, সবাইকে খুশি করে বা সুখী করে চলতে পারে না। ভিন্ন মতে বিশ্বাস করে যারা, তাদের হয় মুখ বুজে থাকতে হবে অথবা মরে যেতে হবে।

পদ্মাবতী ইতিহাসের অংশ নয়। অংশ হলেও তাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার অধিকার সবার আছে। সাধারণ মানুষের আছে, কবি সাহিত্যিকদের আছে, চলচ্চিত্র পরিচালকদের আছে। আর যদি ইতিহাসের অংশ না হয়, তাহলেও পদ্মাবতীকে  যেমন ইচ্ছে গড়ার স্বাধীনতা শিল্পীদের আছে। শিল্পীদের হাত থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিলে তাদের আর কিছুই থাকে না। একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক এবং কতটা সভ্য, তা নির্ভর করে সেই সমাজের নারীরা এবং শিল্পীরা কতটা স্বাধীন। পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে ভারতবর্ষের সমাজ এখনও পড়ে আছে অগণতন্ত্রের অন্ধকারে। ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের নাম ভারত’ –  এই  স্লোগান না দিয়ে বরং ‘গণতন্ত্র কাকে বলে’ তা শিখতে হবে ভারতবাসীকে। এও বুঝতে হবে,  তোমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে–এ সমস্যা তোমার, অন্য কারোর নয়। এই সমস্যার সমাধান তোমাকেই করতে হবে, অনুভূতির আঘাত নিয়ে ঝামেলা হলে নিজের অনুভূতির আঘাত নিজে সারাও। কিন্তু সহিংস হয়ে নয়, অন্যকে হুমকি দিয়ে নয়, অন্যকে শারীরিক আঘাত দিয়ে নয়।

মৌলবাদীদের যুক্তি অনেকটা ধর্ষকদের যুক্তির মতো। মেয়েরা ছোট পোশাক পরলে আমরা উত্তেজিত হই, সুতরাং আমরা ধর্ষণ করি। একইভাবে চলচ্চিত্রে এমন দৃশ্য দেখিয়েছ যা আমাদের অসন্তুষ্ট করে, উত্তেজিত করে, রাগান্বিত করে, সুতরাং তোমার চলচ্চিত্র আমরা নিষিদ্ধ করবো, তোমার মুন্ডু কেটে নেবো, তোমার নাক কেটে নেবো।

মৌলবাদীদের যুক্তিতে পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ আর মাথার মূল্য ধার্যকরণ মেনে নেওয়া মানে–ধর্ষকের যুক্তিতে ধর্ষণ মেনে নেওয়া। এ দুটোতে তফাৎ কিছু নেই। নারীর এবং শিল্পীর স্বাধীনতা অধিকাংশ মানুষ না মানলে সমাজে নারী এবং  শিল্পীদের বিরুদ্ধে যে বর্বরতা দেখি, সেই বর্বরতাই আজ দেখছি ভারতবর্ষে।

মুনীর চৌধুরীর নাটক ‘কবর’

kabor drama sceneডঃ আশরাফ পিন্টুঃ বাংলাদেশর নাট্যসাহিত্যে মুনীর চৌধুরী (২৭ নবম্বর ১৯২৫১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১) এক অবিস্মরণীয় নাম। অসাধারণ প্রতিভাধর এ নাট্যকার মৌলিক ও অনুবাদ নাটক দিয়ে বাংলা নাট্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি এ দেশের নবনাট্যের পথ দেখিয়েছেন। তার নাটকগুলো স্বদেশপ্রেম ও সমাজচেতনায় উদ্দীপ্ত। অল্পকাল ব্যবধানে দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর দুনিয়াব্যাপী চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন ঘটে; এর অনিবার্য প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যেও। শিক্ষিত-সচেতন মানুষ হিসেবে নাট্যকার মুনীর চৌধুরীও বিশ্বমননে স্নাত হয়েছিলেন। পৃথিবীখ্যাত নাট্যনির্মাতা ইবসেনের সামাজিক-বাস্তবতাবোধ, বার্নার্ড শর ব্যঙ্গাত্মক জীবন-জিজ্ঞাসা, পিরান্দেলো- ব্রেখট-বেকেটের প্রগাঢ় শিল্পলগ্নতা আর মন্মথ রায়ের ভাষার গভীরতা প্রভৃতি অগ্রসর ভাবনা-প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। আর এ কারণেই বিষয়-কাঠামো আর মঞ্চে পরিবেশনের কলা-কৌশলের দিক থেকে তার নাটকগুলো স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছে।

মুনীর চৌধুরী ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়ে অনেক নাটক ও একাঙ্কিকা লিখেছেন; তার মধ্যে ‘কবর’ অন্যতম। তার রক্তাক্ত প্রান্তর, চিঠি প্রভৃতি নাটক সবিশেষ সাফল্য লাভ করলেও জনমানুষের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রশংসা পেয়েছে ‘কবর’ নাটকটি। বিষয়-ভাবনা এবং পরিবেশন-শৈলীর কারণেই সম্ভবত এটির প্রচার ও প্রসার অসামান্য। ‘কবর’ গভীর জীবনবোধের আলোকে সজ্জিত একাঙ্গ নাটক। এ ধরনের নাটক অপেক্ষাকৃত আধুনিককালের সৃষ্টি। যেখানে সহজ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে অনায়াসে দেখে নেয়া যায় জীবনের রূপ-নিবিড়তা ও গন্ধ-গভীরতা। এখানে পাওয়া যায় সমকালের সহজ অনুভবের শিল্পঋদ্ধ জীবন নিষ্ঠ কথা।

‘কবর’ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত। ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নাটকটি রচিত হয়; তখন তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী জানা যায়, আরেক রাজবন্দী রণেশ দাশগুপ্ত মুনীর চৌধুরীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন জেলখানায় মঞ্চস্থ করা যায় এমন একটি নাটক লিখে দেয়ার জন্য। যেখানে দেশপ্রেম থাকবে, আলো-আঁধারি পরিবেশ থাকবে এবং নারী চরিত্র এমনভাবে থাকবে যাতে পুরুষ অভিনয় করতে পারে। মুনীর চৌধুরী রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধ মাথায় রেখেই ‘কবর’ নাটিকাটি রচনা করেছিলেন। তিনি তার স্মৃতিচারণে বলেছেন,‘জেলখানাতে নাটক রচনার অসুবিধা অবশ্যই ছিল। এ অসুবিধাটুকু সামনে ছিল বলেই তো ‘কবর’ নাটকটির আঙ্গিকে নতুনত্ব আনতে হয়েছে। আট-দশটি হারিকেন দিয়ে সাজাতে হবে সে কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই ‘কবর’ নাটকটিতে আলো-আঁধারি রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।’ নাটকটি সর্বপ্রথম ১৯৫৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি জেলখানাতে মঞ্চস্থ হয়েছিল।

‘কবর’ নাটকে গোরস্তানের অতিপ্রাকৃত রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পুরো ঘটনাই গোরস্তানের ভেতর সংঘটিত হয়েছে। নেতা আর ইন্সপেক্টর হাফিজের অর্ধ-মাতাল অবস্থায় সংলাপের মধ্য দিয়ে নাটকটি সামনের দিকে আগাতে থাকে। এর মধ্যে অশরীরী আত্মার মতো হঠাৎ এসে উপস্থিত হয় মুর্দা ফকির। মুর্দা ফকির ‘মুর্দা’ নয়, জীবিত। তবুও নেতা ও হাফিজ দুজনেই তাকে মনে মনে ভয় পায়। আপাতদৃষ্টিতে তার কথার মধ্যে পাগলামির সংমিশ্রণ আছে তবে এটা নাটকের বহিরাঙ্গ। তার প্রতিটি কথাই রূপকধর্মী। তার বুকে যে হাহাকার তা বিবেকেরই হাহাকার দেশ ও জাতির কান্না। মুর্দা ফকির নেতা ও হাফিজের কাছে বিদায় নিয়ে কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে এসে বলে,‘গন্ধ! তোমাদের গায়ে মরা মানুষের গন্ধ! তোমরা এখানে কি করছ? যাও, তাড়াতাড়ি কবরে যাও। ফাঁকি দিয়ে ওদের পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা বাইরে থেকে মজা লুটতে চাও, না? না, না আমার রাজ্যে এসব চলবে না।’

মুর্দা ফকিরের এই সংলাপের মধ্য দিয়েই নাটকটির সারসত্য প্রকাশিত হয়েছে। এখানে যারা জীবিত মূলত তারা প্রকৃত জীবিত নয়; জীবন্মৃত অবস্থায় তারা আছে-তারা জীবন্ত লাশ মাত্র। আর যাদের তারা অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে তারাই জীবিত চির জাগরূক। তাই তো লাশগুলো কবরে ঢুকতে চায় না, বিদ্রোহ করে। ওরা হাফিজের কথার প্রতিবাদ করে বলে,‘মিথ্যে কথা। আমরা মরিনি। আমরা মরতে চাইনি। আমরা মরব না।…কবরে যাব না।’

‘কবর’ নাটকের মুর্দা ফকির, মূর্তিদের (ভাষা আন্দোলনে শহীদেরা) হাহাকার শুধু নিজেদের নয়, তাদের জীবন-উৎসর্গ শুধু ব্যক্তির উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করার জন্য নয়, নয় শুধু ভাষা আন্দোলনে আবেগ-উচ্ছ্বাসে জড়িত। এখানে রাজনৈতিক অবস্থা, গোপন ছলনা এবং বাঙালীর অস্তিত্বের সংগ্রাম নাটকজুড়ে নিহিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক ও মুনীর চৌধুরীর ছাত্র আনিসুজ্জামানের উক্তিটি স্মর্তব্য,“পরিহাসতরল আবহাওয়ার ছদ্মাবরণের সাহায্যে দুটি করুণ দৃশ্যের সাঙ্গীকরণ নাটকীয়তা সৃষ্টিতে বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে। এ দুই অংশে এবং মুর্দা ফকিরের বৃত্তান্তে ভাষা আন্দোলনকে অতিক্রম করে মুনীর চৌধুরী আমাদের সামাজিক জীবনের বৃহত্তর দ্বন্দ্বের প্রতি অঙ্গুলি সঙ্কেত করেছেন।”

প্রগতিশীল চিন্তার লালনকারী নাট্যকার মুনীর তার নাটকে মানবতাবাদী ভাবনার প্রকাশ দেখাতে চেয়েছেন। রক্ষণশীলতা আর প্রগতিশীলতার যে দ্বন্দ্ব, তা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে। পরাক্রমশালী রাজনীতির দৌরাত্ম্য ও জনগণের অসহায়তা এবং আদর্শবাদী চিন্তাধারার মাহাত্ম্য রচিত হয়েছে নাটকটির সংলাপের অভিনবত্বে ও উপস্থাপনার চমৎকারিত্বে। রাজনৈতিক প্রতাপ, অহমিকা, জনগণের নাম করে নিজেদের উদরপূর্তি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ যে জাতিগতভাবে হীনম্মন্যতাকে লালন করে, তার বাস্তব চিত্র মুনীর চৌধুরী নির্মাণ করেছেন ‘কবর’ নাটকে।

‘কবর’ নাটকে মার্কিন নাট্যকার আর উইন শ’’র ‘বেরি দ্য ডেড’ (১৯৩৬) নাটকটির প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়। মুনীর চৌধুরীও নাটকটির অবচেতন প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। ওই নাটকে বিশ্বযুদ্ধে নিহত তরুণরা কবরে যেতে অস্বীকার করেছে। ‘কবর’ নাটকে শহীদেরাও কবরে যেতে অস্বীকার করেছে। আর উইন শ’’র নাটকটির সঙ্গে ‘কবর’-এর ভাবগত ঐক্যে কিছুটা মিল আছে বৈকি! কিন্তু ‘কবর’-এ মুনীর চৌধুরীর উদ্ভাবনী চিন্তা এবং রচনা কুশলতায় স্বকীয়তা বিদ্যমান। মৃত সৈনিকদের বিদ্রোহ শ’র নাটকে প্রত্যক্ষ ও বাস্তব রূপে উপস্থাপিত আর ‘কবর’-এ বাস্তবতার বিভ্রম সৃষ্টি করা হয়েছে নেতা ও ইন্সপক্টরকে অর্ধ-মাতাল অপ্রকৃতিস্থ করে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নাট্যকার মমতাজ উদদীন আহমদ বলেন, “‘…এই সুদূর এবং প্রান্তিক ভারসাম্যটির জন্য ‘কবর’কে অনুসারী নাটক বলা যাবে না। এমন হলে পৃথিবীর অধিকাংশ শ্রেষ্ঠ নাটককে কাহিনী ভাগের জন্য অনুকৃতির দায় বহন করতে হবে।”

পরিশেষে বলা যায়, ‘কবর’ নাটকে চমকপ্রদ রহস্যজাল, কৌতুকাবহ যেমন আছে তেমনি আছে এর অন্তর্মুখী বিষাদময় ঘটনা। এই কৌতুক আবহ থেকেই বিকশিত হয়েছে বিষাদাত্মক ঘটনা। রাজনীতি-সচেতন মুনীর চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করে নাটক রচনা করলেও তা সমাজের বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে বাঙালীর অস্তিত্বের সংগ্রামে পরিণত করছেন; আর এখানেই তার কৃতিত্ব।