আর্কাইভ

Archive for the ‘বিজ্ঞান’ Category

উদার গণতন্ত্র ও মৌলবাদী ধর্মতন্ত্রের মহামিলন

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

শহিদুল ইসলাম : বাংলাদেশে সম্প্রতি সাম্প্রদায়িকতার যে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের অনেক ভালো ভালো কাজের দাবিকে যেন ব্যঙ্গ করছে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সবাই আশায় বুক বেঁধেছিল এই ভেবে যে, এবারে সাম্প্রদায়িকতার রাহুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। কিন্তু মানুষের সে আশা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে এ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা চলছে তা নতুন করে দেশবাসীকে পাকিস্তানি নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সরকার জিয়া, এরশাদ ও খালেদার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং আজকের পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, তাদের সেই রাজনীতিকে আরো শক্তিশালী করে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সেসব আক্রমণে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বর্তমান সরকারের ওপর তাদের আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেই আস্থার ফলে তারা তাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি আগলে নিজের দেশেই পড়ে ছিলেন। অনেকেই আজ তাদের জান-মাল-সম্মান বাঁচানোর জন্য দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এভাবে চললে বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের মতো হবে। মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর মানুষ এখানে থাকতে পারবে না।

দুই. ইতিহাসে প্রমাণ আছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা না করলে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। সে রাষ্ট্রে মানবিক গুণাবলির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সভ্যতার সূচনালগ্নে একবার ও চৌদ্দশ খ্রিস্টাব্দের ইতালির রেনেসাঁর পর দ্বিতীয়বার জ্ঞানবিজ্ঞান-দর্শন চর্চার জোয়ার এসেছিল। দেখা যায় প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সূচনায় ধর্মীয় কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। কারণ গ্রিকদের কোনো ধর্মগ্রন্থ ছিল না। সেটাই ছিল প্রথম যুগের গ্রিকদের স্বাধীনতার প্রধান শর্ত। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বিউরি বলছেন,‘হোমারের কবিতা ছিল ইহজাগতিক, ধর্মীয় নয় এবং ধর্মগ্রন্থের তুলনায় সেগুলো নীতিহীনতা ও বর্বরতা থেকে মুক্ত। হোমারের কর্তৃত্ব ছিল অপরিসীম কিন্তু তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বের মতো বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই বাইবেলের সমালোচনার মতো হোমারের সমালোচনা কখনো বাধার সম্মুখীন হয়নি।’ বিউরি আরো বলছেন,‘স্বাধীনতার আর একটি অভিব্যক্তি ও শর্ত হলো যাজকতন্ত্রের অনুপস্থিতি। সেদিন পুরোহিত শ্রেণি কখনো-ই এতটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। তাই তারা নিজেদের স্বার্থে সমাজের ওপর নির্যাতন চালাতে পারেনি কিংবা ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিতে পারেনি।’ তখন পুরোহিত শ্রেণি রাষ্ট্রের কর্মচারী। রাষ্ট্রের অধীন।

অবিকল একই ঘটনা ঘটে রেনেসাঁর পর। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও শিল্প-বিপ্লবের পর ইউরোপে প্রবল প্রতাপশালী পুরোহিত শ্রেণির শক্তি ধ্বংস করা হয় এবং ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা হয়। খ্রিস্টধর্ম টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার ফলে এটা সম্ভব হয়। তবে আদি সেই গ্রিক সমাজ মাত্র তিনশ বছর টিকেছিল। খ্রিস্টধর্ম উত্থানের পর পশ্চিমে দীর্ঘ এক হাজার বছরের অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হয়। এদিকে উনিশ শতকে রেনেসাঁর জয় নিশ্চিত হয়। ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ইউরোপ জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাঝে ইসলামের আবির্ভাবের পর ৯ম থেকে ১১ শতকে ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় জোয়ার আসে। সে জোয়ারও তিনশ বছরেই শুকিয়ে যায়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় তাহলো ইসলামি বিশ্বে যারা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা কেউই সূক্ষ্ম বিচারে মুসলমান ছিলেন না। ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের ওপর আক্রমণ তাই প্রমাণ করে। তারা সবাই ছিলেন যুক্তিবাদী যা ইসলামে কেবল নয় সব ধর্মে নিষিদ্ধ। আবার আধুনিক সভ্যতায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সময়কালও দুই/তিনশ বছরের বেশি নয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পশ্চিমে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে এবং বর্তমানে পশ্চিমে মৌলিক কাজের পরিমাপ সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। কারণ আবার পশ্চিমে বিশেষ করে আমেরিকায় ধর্মীয় ভাবাদর্শের নতুন করে উত্থানের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকার সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর ট্রাম্পের ঘোষণায় সেটাই প্রমাণ করে। তিনি পুরোহিতদের দাবি পূরণে বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সংসর্গ, সমলিঙ্গ-বিবাহ ও গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে নির্বাহী আদেশ দিতে যাচ্ছেন। সবার ধারণা আমেরিকান সাম্রাজ্যের দিন শেষ হতে চলেছে।

রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে বেগম রোকেয়াও ভেবেছিলেন। ১৩১১ সালে ‘নবনূর’ পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন,‘যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন।’ এটা কেবল নারীর ক্ষেত্রে সত্য নয়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্যও সত্য। নোবেল বিজয়ী একমাত্র মুসলিম বিজ্ঞানী প্রফেসর সালাম বলেছেন,‘ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ধারা সবচেয়ে দুর্বল।’ চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ মুসলিম পণ্ডিত ইবনে খলদুন। তারপর ইসলামি বিশ্বে আর কোনো মনীষীর জন্ম হলো না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পদের কোনো অভাব নেই। তারা বিশ্বের উচ্চতম ভবন নির্মাণ করে গর্ব প্রকাশ করেন। আলোয় ঝলমল শহর তৈরি করে বিদেশিদের বেড়ানোর সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্বমানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেননি। মোগল বাদশারা ‘তাজমহল’ তৈরি করেছেন, কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি। যুক্তিবাদ ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে মুসলমান হুজুরদের সে মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই প্রফেসর সালামকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিয়েছে আর মিসরের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিম মাহফুজকে মুসলমান বলে স্বীকারই করে না; বরং ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ গড়ে ইসলামের আদিযুগে ফিরে যেতে চাইছে মুসলমানরা।

তিন. বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমে উৎপাদিত সম্পদে আমরা মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছি। কিন্তু সে অর্জনে আমাদের মতো শহুরে অলস বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদদের অবদান কতটুকু? তাদের শ্রমের ওপরই আমরা জীবনযাপন করছি। অন্যের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে আমরা বিশ্বের কাছে বাহবা কুড়াচ্ছি। এই আত্মসাতেরই আর এক নাম ‘গণতন্ত্র’। আরো সূক্ষ্মভাবে বললে বলতে হয় ‘উদার গণতন্ত্র’। ‘ইসলামের’ নামে হুজুররা যে রাজনীতি করছে, আমরা ‘উদার গণতন্ত্রের’ নামে সেই একই রাজনীতি করছি। এখানেই ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মতন্ত্র’ এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছে। তাদের মিলনই বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানি কায়দায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাদের উপাসনালয় ভাঙা হচ্ছে, দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। হুজুরদের দাবি মেনে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। হুজুরদের নির্দেশে শিশুদের পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছে। এতে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা লাখ লাখ মূর্তি ভাঙলেও হবে না। তাই আজ প্রশ্ন উঠেছে, আমরা পাকিস্তান ভাঙলাম কেন? আমরা কি কেবল পাঞ্জাবি ধনীর জায়গায় বাঙালি ধনী তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আজ একজন হিন্দুকে তার বাড়ির মহিলাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, তাহলে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম কেন? পাকিস্তানি হামলাকারীর বদলে বাঙালি হামলাকারীর অভয়ারণ্য তৈরির জন্য? কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন? চার লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

চার. অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘উদার গণতন্ত্র’ তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে গেছে। এই গণতন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদ মাত্র আটজন মানুষ দখল করে নিয়েছে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির অধ্যাপক জন রালস্টোন সাওল একখানা বই লিখেছেন যার নাম দিয়েছেন ‘ভলতেয়ার্স বাস্টার্ডস’-ভলতেয়ারের জারজ সন্তান হলো আজকের গণতন্ত্র। ভলতেয়ারের সময় এই গণতন্ত্রের প্রভূত মূল্য ছিল। কিন্তু সম্পদের ওপর মানুষের অধিকার স্থাপনের আইন আজ সে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছে। আজ সারা বিশ্বে ‘উদার গণতন্ত্র’ ও মৌলবাদী ‘ধর্মতন্ত্রের’ মহামিলন ঘটে গেছে। তাই পৃথিবী আজ ক্রমান্বয়ে মানুষের বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। যে দেশ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে তাকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্থানে স্থাপন করতে পারবে, আগামী বিশ্বের পরিচালকের আসনে তারাই বসবে। ‘উদার গণতন্ত্র’ পৃথিবীতে শান্তির পরিবর্তে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের বিলাসী জীবনের ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রয়োজন মেটাচ্ছে। মানুষ প্রকৃতিকে দখল করেছে। প্রতিটি দেশের সংখ্যাগুরু স¤প্রদায়কে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দখল করেছে। জলবায়ু বিষাক্ত করে তুলেছে। মনে হয় বর্তমান সভ্যতা তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধীরে অথচ স্থির পায়ে এগিয়ে চলেছে।

শহিদুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

আন্দালুসিয়াঃ যে ইতিহাস কথা বলে!

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

La-mezquita-cordovaড. মুহাম্মাদ সিদ্দিক : মার্কিন লেখক জ্যাসন ওয়েবস্টারের প্রখ্যাত বই ‘আন্দালুস’। স্পেনে যে এখনো প্রচুর মুসলিম প্রভাব রয়েছে তা তিনি প্রমাণ করেছেন তার বইয়ে। তিনি তার মতের সমর্থনে স্পেনীয় বুদ্ধিজীবী পেড্রোর মন্তব্যও টেনেছেন তার বইয়ে।

অধ্যাপক পেড্রো বলেন, স্পেন মুসলিম আমলে দার্শনিক অ্যারিস্টটল ও উচ্চতর গণিতকে ইউরোপে নিয়ে যায়। এই কথা কেনিথ কার্ক তার ‘সিভিলাইজেসন’ বইয়ে লিখেছেন। পেড্রো বলেন, শুধু খ্রিষ্টান স্পেনকেই দেখা, একটা সাধারণ ফাঁদ। আভিরস (ইবনে রুশদ), মাইমোনাইডস (ইহুদি বিদ্যান) ও ইবনুল আরাবি সবাই স্পেনীয়। এরা মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের তিনজন। বিশ বছর আগেও মনে করা হতো যে, তারা যেন কখনোই ছিলেন না অথবা মনে করা হতো যে, তারা তাদের লোক আরবদের লোক। অথচ এই জ্ঞানী ব্যক্তিদের প্রভাব এখনো অনুভূত হয়, বলেন প্রফেসর পেড্রো (‘আন্দালুস’ পৃষ্ঠা ৯৩) (ওয়েবস্টারের বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে)।

প্রফেসর পেড্রো বলেন, ‘বেশির ভাগ লোক যা মনে করে তার চেয়েও বেশি ঋণ ইসলামি দুনিয়ার প্রতি রয়েছে আমাদের। মুসিলম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা স্পেনে এক হয়েছিল বলেই ইউরোপ আঁধার যুগ থেকে বের হতে পারে। এই তিনটি ধর্ম ক্রুসেড যুদ্ধের আগে থেকেই একে অন্যের গলা কাটছিল। তবুও এই স্পেনে মহান মুহূর্ত এলো মানব ইতিহাসের যখন তারা একত্র হলো’ (মুসিলম আমলে) (পৃষ্ঠা ৯৪)

জ্যাসন ওয়েবস্টার লেখেন, ‘টলেডো (খ্রিষ্টান পুনর্দখলে গেলে) আরবি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ল্যাটিন ভাষার তরজমার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এবং প্রথমবার (মূল) ইউরোপবাসী মুসলিম অঙ্ক শাস্ত্রবিদ যেমন আল-খারিজমি, ইবনেসিনা (যাকে ইউরোপীয়রা বলত আভিসেনা ও যিনি ছিলেন পরিচিত চিকিৎসাবিদ্যা ও সঙ্গীতের ওপর লেখা বইয়ের জন্য বিখ্যাত) প্রমুখের সাথে পরিচিত হলো। প্রথমবার ইউরোপীয়রা অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর বই পড়তে সক্ষম হলো যখন ইউরোপীয় ভাষায় (যেমন ল্যাটিন) তরজমা হলো। এই বিদ্যাই পরে ইউরোপের পুনর্জাগরণের ভিত্তি তৈরি করে।’ (পৃষ্ঠা ৯৪-৯৫)। ওয়েবস্টার বলছেন যে, আরবি থেকে ল্যাটিনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই তরজমা হলে ইউরোপে এসব ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ব্যাপারটা হলো যে এর আগে কয়েক শ’ বছর ধরে আরবি ভাষাতে এই জ্ঞান-বিজ্ঞান স্পেনে পাঠ করা হতো। এই স্পেনীয় মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান ছাত্ররা পড়াশোনা করত।

ওয়েবস্টার লিখেছেন, ‘ইনকুইজিসন (রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান আদালতের কার্যকলাপ) হলো বহু পাইকারি সন্ত্রাস, বর্ণবাদ ও নৃতাত্ত্বিক জুলুমের (এখনিক কিনসিং) পূর্বরূপ, যা এই বিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে। এই ইনকুইজিসন স্পেনের ইহুদি ও মুসলমানিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে সবচেয়ে বেশি কার্যক্রম নেয়।’ (পৃষ্ঠা ৯৫)। তিনি আরো লেখেন, “(এ সময়ে স্পেনে) বিদ্বেষ প্রতিষ্ঠিত করা হলো, ধর্মীয় মতোপার্থক্য অবশ্যম্ভাবীভাবে নিশ্চিহ্ন করা হলো, মুক্ত চিন্তাকে পরিত্যাগ করা হলো, আর এসব করার হাল-হাতিয়ার হলো ইনকুইজিসন (রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান আদালত), তার সাথে অগ্নিসংযোগ, নানা ধরনের যাতনা প্রয়োগের যন্ত্রপাতি ও ভীতি ছড়ানো। সেই থেকে স্পেনে সবই ‘না’ ‘না’।” (পৃষ্ঠা ৯৫-৯৬)।

স্পেনিশ বিশেষজ্ঞ পেড্রো মন্তব্য করলেন, ‘কিন্তু, ইনকুইজিসন পুরোপুরি সফলকাম হয়নি। ইনকুইজিসন স্পেনের ইমেজ বদলিয়েছে, এমনকি সম্ভবত যে ইমেজ স্পেন দুনিয়াকে দিতে চায়, তাও। তবে কয়েকটা মানুষকে জ্যান্ত পোড়ানো উপদ্বীপে মুসলমানদের ৯০০ বছরের হাজিরাকে হাওয়া করে দিতে পারে না। কিছু বিষয় ইনকুইজিটারদের চোখ থেকে এড়িয়ে যায়, কারণ সেগুলো ছিল লুকানো, ছদ্মবেশী ধর্মীয় আদালতেরও কাছে, এমনকি সেগুলোকে ‘খ্রিষ্টানি’ রেওয়াজ বলে চালানো হয় (অথচ তা নয়)। এমনকি অত্যাচারীদের হাত থেকে বাঁচতে দাবি করা হয় তারা খ্রিষ্টানদের চেয়েও বেশি বড় খ্রিষ্টান।’ (পৃষ্ঠা ৯৬)

পেড্রো বলতে থাকেন, ‘গত সপ্তাহে আমি ফরাসি সীমান্তে ফ্রান্সের লাইসির এক গির্জার ‘মাস’-এ (জামাতবদ্ধ প্রার্থনা) গিয়েছিলাম। লোকজন তেমন ছিল না (কারণ ধর্মের প্রতি অবহেলা)। পাদরি বাইবেল থেকে পড়ে ব্যাখ্যা করছিলেন। তবে আমাকে এটা চমৎকৃত করল যে, তিনি ভালোবাসা-প্রেম সম্পর্কে যা বলছিলেন তা ইবন আল-আরাবির মুখ নিঃসৃতের মতো। ইবন আল-আরাবি ছিলেন ইসলামি আধ্যাত্মিক বিদ্যান ও লেখক যিনি পাশ্চাত্যে ‘ডকটর ম্যাক্সিমাস’ এবং স্পেনীয়দের ভেতর ‘ওয়ান অব দ্য প্রেটেস্ট’। তিনি স্পেনের মুরসিয়া শহরে বার খ্রিষ্টান শতকে জন্মগ্রহণ করেন। তার লেখা এবং আরবিতে প্রচারিত মুহাম্মাদ সা:-এর বেহেশত ভ্রমণের ঘটনাবলির কাহিনীগুলো কবি দান্তেকে তার কাব্য ‘ডিভাইন কমেডি’ লিখতে সরাসরি প্রভাবান্বিত করেছে। একজন বিদ্যান বলেছেন যে, এটা হলো পশ্চিমা সাহিত্যে সবচেয়ে বড় একক উদাহরণ মুসলিম প্রভাবের। আন্দালুসিয়ার সব সুফি আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের ভেতর তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি নামকরা। তার জীবনী ও লেখালেখি নিয়ে সমগ্র দুনিয়ায় বহু গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। ‘প্রফেসর পেড্রো বলেন, ‘ইবন আল আরাবি লিখেছেন, ভালোবাসা হলো আমার বিশ্বাস, যে দিকেই তার উটকে ঘুরাই না কেন, তবু খাঁটি বিশ্বাসটা আমার। এগুলো কার কথা মনে হয়? যিশুর? ইবন আল আরাবি, যিশুÑ সবই এক। তাই বলি স্পেন এখনো মুসলমান দেশ।’ (পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭)।

প্রফেসর পেড্রো দৃঢ়ভাবে বললেন, খ্রিষ্টান ও মুসলমান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা এখানে (স্পেনে) একই কথা বলে।’ (পৃষ্ঠা ৯৭)। প্রমাণ হিসেবে তিনি দুটো বক্তব্য পেশ করলেন। প্রথমটা কবিতা, যা বাংলা ভাষায় তরজমা করলে এমন শোনাবে

‘প্রতিশ্রুত বেহেশত নয়
যা তোমাকে ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে, হে প্রভু,
দোজখের ভয়ও নয়
যা তোমার অবাধ্য হতে বাধা দেয়।’
পেড্রো বললেন, এখন শোনো :
‘হে প্রভু!
আমি যদি তোমার এবাদত করি দোজখের ভয়ে
তাহলে আমাকে দোজখেই ফেলে দাও, আর
আমি যদি বেহেশতের আশায় তোমার এবাদত করি,
বেহেশত থেকে আমাকে মাহরুম কর।’

পেড্রো বললেন, প্রথমে উল্লেখ করা কবিতাটি নামহীন কবির, তবে বিশ্বাস করা হয় এটা প্রখ্যাত স্পেনীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি সেন্ট জন অব দ্য ক্রসের, যিনি ষোল শতকে লেখেন। দ্বিতীয় বক্তব্যটা হলো মহিলা আলি ইরাকের রাবিয়া আল আদাউইয়ার (রাবিয়া বসরি) যিনি ৮০০ বছর আগে ছিলেন আরবে। এর একজন খ্রিষ্টান, অন্যজন মুসলিম, তবু তারা একই কথা বলেন। (আন্দালুস পৃষ্ঠা ৯৭-৯৮)

মার্কিন লেখক জ্যাসন ওয়েবস্টার স্পেনে মুসলিম ঐতিহ্য লক্ষ করে লিখলেন ‘আন্দালুস’ নামক গ্রন্থ। তার অভিজ্ঞতা সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

স্পেনের অভ্যন্তরে সফরের সময় ওয়েবস্টার ও তার দল আলমেরিয়া এলাকার মরুভূমিসদৃশ পাহাড়ি এলাকায় এক খাবার দোকানে ঢুকলেন। সেখানে ওয়েবস্টারের সাথী মরোক্কোর জিনে নামক মুসলিম ব্যক্তি ‘আল্লাহ’ বললে খাবার দোকানের মহিলা কর্মচারী জবাবে বলল, ‘হোলা’ যা ‘আল্লাহ’ শব্দের গোপনীয় রূপ। ওয়েবস্টার তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘আমার আগ্রহ হলো যখন দেখি ইসলাম ও পশ্চিমা সংস্কৃতি মিশে যায়’। তিনি বললেন, ‘এটা এখানে হয়েছে, যেখানে আমরা এখন বসে আছি। মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা একসাথে বাস করত এবং একটা মহান সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল। (ওয়েবস্টারের মরোক্কোবাসী সাথী) জিনে বললেন, আপনি তো সব সময় ভাবেন মুসলমান ও খ্রিষ্টান, ইসলাম ও পশ্চিম নিয়ে কিভাবে অতীতে এসব ছিল আরো ভালো। …. কোনো বর্ণবাদ থাকবে না যদি খাবারঘরের এই মেয়েগুলো জানে যে, তাদের ভেতর রয়েছে মুসলমানিত্ব। (আন্দালুস পৃষ্ঠা ১০৮-১১০)। অর্থাৎ ওয়েবস্টার ও তার সাথী মরোক্কীয় প্রত্যক্ষ করেছেন যে স্পেনের মেয়েদের ভেতরে পর্যন্ত মুসলমানি ভাব-ভাষা রয়ে গেছে। তারা যে অতীত মুসলমানের বংশধর।

অন্য ধর্মের স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার একটা কবিতার বাংলা তরজমাতে এই মুসলিম মেয়েদের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে এভাবে। কবিতার নাম :

‘জায়েনের মুর-মেয়েরা’
[১৫ শ’ শতকের জনপ্রিয় গীতি]
জায়েনের তিনটি মুর-মেয়েকে আমি ভালোবাসি;
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েন।
কৃষ্ণকায়া অথচ সুন্দরী তিনটি যুবতী
জায়েনে জলপাই তুলতে গেল,
এবং দেখল যে তা নেই;
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েনা…
‘মশায়রা, তোমরা কারা,
আমার জীবন ছিনিয়ে নিচ্ছ?
একসময় মুর ছিলাম কিন্তু এখন খ্রিষ্টান,
জায়েনের ওরা বলল :
আকসা, ফাতিমা ও ম্যারিয়েন।
(তরজমা : মোরশেদ শফিউল হাসান)

ওয়েবস্টার তার ছোট দল নিয়ে আলমেরিয়া শহরের মুসলিম কিল্লায় গেলেন, যা এখনো আরবি ‘আল কাজাবা’ নামে পরিচিত। ভূমধ্যসাগরের তীরে এই কিল্লা,পাহাড়ের মাথায়। নিচে আলমেরিয়া শহর। ওয়েবস্টারের মরোক্কীয় সাথী জিনে বললেন, এত মরোক্কোর কিল্লাগুলোর মতো কিল্লা। এমনকি মুসলমানদের দ্বারা ইউরোপে নিয়ে যাওয়া গোলাপ ফুলের বাগিচাও সেখানে রয়েছে এখনো।

ওয়েবস্টার লেখেন যে আলমেরিয়ার প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হলো এই আল কাজাবা, এটা বিশাল একটা কিল্লা যা শহরের মাথায় পাহাড়ে নির্মিত। আন্দালুসিয়ার শ্রেষ্ঠ খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান এই আল কাজাবা দশ শতকে তৈরি করেন। ওয়েবস্টার লেখেন, খলিফা একটা সাধারণ বন্দর প্রহরা মিনারকে একটি বর্ধনশীল বন্দর ও বৃহৎ নগরীতে পরিণত করেন। এটা আল হামরা কিল্লার মতো নয় নেই এখানে কোনো কাঠে খোদাই করা ছাদ বা প্রাচীরে কোনো ‘আরাবেসক’ সজ্জা যে অলঙ্করণ মূর্তিবিহীন লতাপাতার অলঙ্করণ তবু এই আলমেরিয়া আল কাজাবা একটি বিশাল স্থাপনা,যা তাকিয়ে আছে নিচের শহরের দিকে। এটা অতীতের গৌরবকে স্মরণ করে দেয়। ‘আন্দালুস’ (পৃষ্ঠা ১১৩-১১৫)।

ওয়েবস্টার লেখেন যে আলমেরিয়ার বাড়িঘরগুলো একশো বছরের পুরনো, তবে বাড়ির স্থাপত্যে মুসলমানি আমলের পর কমই বদল হয়েছে। একসময়ে উত্তর মরোক্কোর শহরগুলোর মতো ছিল আলমেরিয়া শহর। এখন শূন্য ও মরুভূমিসদৃশ। কেমন একটা করুণ দৃশ্য। (পৃষ্ঠা ১১৩)। করুণ তো হবেই। ইনকুইজিসনের জুলুমের ছাপ কি নিশ্চিহ্ন হয়েছে?

ন্যানো টেকনোলজির সম্ভাবনা

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

nano-particlesসারা মজুমদার : আমরা জানি জীবের অন্যতম কেন্দ্রীয় সংগঠন হচ্ছে কোষ। কোষের খবর যত ভালো জানা সম্ভব হবে আমরা তত জীবকে ভালোভাবে বুঝতে পারব। এ বোঝাটা বা জ্ঞান শুধু জীব সম্পর্কে জানতেই আমাদের সাহায্য করবে তা নয়। পাশাপাশি নানা ধরনের সমস্যা মানে জীবের জটিল রোগগুলো থেকে দেবে আমাদের সমাধানের পথ। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা ন্যানো ‘ওয়্যারট্যাপ’ নামে ক্ষুদ্র ট্রানজিস্টর তৈরি করেছেন তা আসলে বিজ্ঞানের বদৌলতে সুন্দর ভবিষ্যতেরই আরেক নাম। সম্প্রতি বিজ্ঞান পত্রিকা ন্যাচারের মাধ্যমে জানা গেছে যে বিজ্ঞানীরা ন্যানো ‘ওয়্যারট্যাপ’ নিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন। গবেষকদের মাধ্যমে আগেই জানা গেছে, এ ন্যানো ‘ওয়্যারট্যাপ’ জীবিত কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ এবং রিয়েল টাইমে কোষের কার্যক্রম মনিটর করতে পারে। কোষের বায়োলজিক্যাল ফাংশনগুলো ‘শুনতে’ পারে এ ওয়্যারট্যাপ।

গবেষকদের সূত্রে ন্যাচার সংবাদমাধ্যমটি আরো জানিয়েছে, গবেষকরা সিলিকন ন্যানোওয়্যারস ব্যবহার করে হেয়ারপিন আকৃতির ট্রানজিস্টর তৈরি করেছেন। এ ট্রানজিস্টর নাকি ভাইরাসের চেয়েও আকারে ক্ষুদ্র। এ ট্রানজিস্টরটি কোষের মধ্যে মুক্তভাবেই ভেসে বেড়াতে পারবে এবং কোষের কাজকর্মের বিষয়টি মনিটর করবে।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ন্যানোসায়েন্টিস্ট চার্লস লেইবার জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র এ ডিভাইসটি কোনোভাবেই ক্ষতিকর নয়। কারণ এ ট্রানজিস্টরের তারগুলো সেল মেমব্রেন দিয়ে ঢেকে রাখা থাকে। এর ফলে কোষের সঙ্গে সহজেই প্রাকৃতিকভাবে মিশে যায় এ ডিভাইসটি। গবেষকদের বরাতে জানা গেছে, এ পদ্ধতি ব্যবহারে কোষের কার্যক্রম জানতে সুচাকৃতির কোনো কিছু শরীরের ভেতর প্রবেশ করাতে হবে না। আর কোষের কোনো ক্ষতিও হবে না। বিভিন্ন টক্সিন এবং ড্রাগের ফলে কোষের প্রতিক্রিয়াও জানা যাবে এ ডিভাইসটি ব্যবহারে।

অর্থাৎ জীবদেহের গঠন ও কাজের একক কোষ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে এ বিশেষ ধরনের ন্যানো প্রযুক্তির কল্যাণে। ওয়ারট্যাপের মেমোরিতে থাকা তথ্য বা ওয়ারট্যাপ থেকে ধারণকৃত তথ্যকে কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারে কোষের একটি ভার্চুয়াল পরিবেশ তৈরি সম্ভব হবে।

এভাবে কোষীয় পর্যায়ে জীবদেহকে দেখতে পারার বিষয়টি চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আরো সহজতর করবে। কোষের কার্যক্রমের ব্যাঘাতের কারণেই জীবদেহের মারাত্মক সব রোগ হয়ে থাকে। তাই কোষের কার্যক্রমের অস্বাভাবিকতা আবিষ্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ ন্যানো ওয়ারট্যাপ। পাশাপাশি অনেক কল্পবিজ্ঞানী লেখক এবং ভিডিও গেম নির্মাতা প্রযুক্তিটির বেশ প্রশংসা করেছেন।

বিভাগ:বিজ্ঞান

দেশবরেণ্য রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

sharif enamul kabir 2দেশবরেণ্য রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির ১৯৫৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার সাতাশিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির একজন দেশবরেণ্য রসায়নবিদ। বিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়

তার শৈশব-কৈশোরের সময়গুলো কেটেছে জাতির জনকের পূর্ণ ভূমিতে। ছোট বেলা থেকেই অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে লালন করেই তিনি বেড়ে ওঠেছেন। জন্মের কয়েক বছরের মাথায় বাবাকে হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। মায়ের স্নেহ ভালোবাসার মাঝে তিনি বেঁচে থাকার নতুন অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। বাবা সবসময় চাইতেন ছেলে পড়ালেখা করে তার মুখ উজ্জ্বল করুক। বাবার সেই স্বপ্নকে তিনি ছোট বেলা থেকেই নিজের মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছেন।

শরীফ এনামুল কবিরের শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের অন্য আট-দশটা সাধারণ ছেলের মতোই। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করতে বেশ পছন্দ করেন। গ্রামের মাটির রাস্তা, বর্ষার কাদা-পানি এসবের ভেতর দিয়েই তাকে স্কুলে যেতে হতো। হাইস্কুলে যেতেন নৌকা বেয়ে, প্রায় আড়াই মাইলের মতো পথ নৌকা বেয়ে স্কুলে যেতে হতো তাকে। ছাত্র জীবন থেকেই তার বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক ছিল।

নিজ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর তিনি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি জাহাঙ্গীরনগরে অর্গানোমেটালিক ও ক্লাস্টার রসায়নের ওপর গবেষণা শুরু করেন। তিনি আমেরিকা, ইল্যান্ড, সুইডেন ও জার্মানিতে একাধিক পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণাসম্পন্ন করেন। ভিজিটিং স্কলার হিসেবে তিনি ক্যালিফর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থ রিজে এ জে ডিমিং এর তত্ত্বাবধানে প্রফেসর এডওয়ার্ড রোজেনবার্গ ও প্রফেসর কেনেথ হার্ড-কাসলের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করেন। ১৯৯৪ সালে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এডওয়ার্ড রোসেনবার্গের গ্রুপে যোগদান করেন। অ্যালেকজান্ডার ফন হামবোল্ট স্কলার হিসেবে তিনি প্রফেসর হেনরি বারেনক্যাম্পের সঙ্গে ফ্রাইবুর্গ ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেন। এরপর তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিটিং প্রফেসর হিসেবে দুই বছর অধ্যাপনা করেন।

সারা দেশে যে কয়জন প্রথিতযশা রসায়নবিদ আছেন তাদের মধ্যে অনন্য সাধারণ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির। তিনি বাংলাদেশের মোস্ট-সাইটেট রসায়ন গবেষক। গবেষণার জন্য তিনি দেশে ও বিদেশে সুপরিচিত। রসায়ন বিষয়ে তার বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ দেশের বাইরের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়।

তার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের ৩২০টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এ পর্যন্ত এমএসসি, এমফিল, পিএইচডি পর্যায়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর গবেষণা তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি সৃজনশীল কাজেও বেশ পারদর্শী।

বিজ্ঞানর্চায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ দেশবরেণ্য এ রসায়নবিদ বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সাইন্স এবং এমওগণি গোল্ড মেডেল লাভ করেছেন। ১৯৯০ ও ২০১১ সালে তিনি রসায়নে গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসংখ্য পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। অতি সম্প্রতি তিনি বিজ্ঞান গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ৭ম আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক লাভ করেন।

গবেষণা ও শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ বারের ট্রেজারার, শিক্ষক সমিতির সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি, সিনেট সদস্য, সিন্ডিকেট সদস্য এবং ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবেও। বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সাইন্স, বাংলাদেশ ক্যামিকেল সোসাইটি, রয়েল সোসাইটি অব কেমেস্ট্রির ফেলো হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। এছাড়াও তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর আর্দশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ এর প্রতিষ্ঠাতা।

নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও অভিভাবক সুলভ ব্যবহার দিয়ে তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীর হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির তাদের কাছে যেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জীবন্ত কিংবদন্তি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ যাবৎ কাল পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক।

এই গুণী শিক্ষকের অবসর কাটে অবন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। অবসরে শিক্ষকতার পাশাপাশি লোখালেখি, গান শুনে সময় কাটান।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞান গবেষণার দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্ববৃহৎ ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ হাতে নেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি সম্পূর্ণ সেশনজট মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সারাদেশে পরিচিতি লাভ করে। এরপর আরো অনেক ভাইস চ্যান্সেলর আসলেও তারা কেউই এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। এছাড়া র‌্যাগিং নামক ভয়াবহ ব্যাধি থেকে তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়কে বের করে আনেন। তার সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ও গবেষণায় একটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার একগুচ্ছ কথা মালায়।

যে কারণে পানির অপর নাম জীবন !

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

water drinking infographics

ওয়ার্মহোল ও মহাকাশ ভ্রমণ

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

worm-holeআফরিন জাহান :ওয়ার্মহোল হলো তত্ত্বীয়ভাবে পাওয়া এমন একটি সংক্ষিপ্ত গমনপথ যা স্থান-কালের ভেতর দিয়ে মহাবিশ্বের এক স্থান থেকে দীর্ঘ দূরত্বে অন্য স্থানে ভ্রমণ অনুমোদন করে। কিন্তু মানুষের জন্য এই ভ্রমণ কাজটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে, কারণ উচ্চমাত্রার বিকিরণ এবং বাইরের পদার্থের সঙ্গে বিপজ্জনক সংযোগের দরুন এসব ওয়ার্মহোল যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সমীকরণগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও নাথান রোজেন ১৯৩৫ সালে প্রস্তাব করেন, স্থান-কালের অভ্যন্তরে এক প্রকার সেতুর (নৎরফমবং) অস্তিত্ব রয়েছে। এ পথগুলোকেই বলা হয় আইনস্টাইন রোজেন সেতু অথবা ওয়ার্মহোল যা স্থান-কালের দুটি বিন্দুকে সংযুক্ত করে। তত্ত্বীয়ভাবে দীর্ঘ পথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই গমনপথগুলো ব্যবহার করে দূরত্ব এবং সময় দুটোই ব্যাপক হারে হ্রাস করা যায়।

ওয়ার্মহোলে লম্বা একটা গলার দুই প্রান্তে দুটি মুখ থাকে। এগুলো অনেকটা উপগোলাকার আর গলাটি সোজাসুজি বিস্তৃত কিন্তু ভেতরে একটু মোচড়ানোও হতে পারে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব গাণিতিকভাবে ওয়ার্মহোলের অস্তিত্বের ভবিষ্যদ্বাণী করে যেখানে ওয়ার্মহোলের দুই মুখে দুটি বস্ন্যাকহোল থাকবে। যা হোক, একটি মৃত্যুকালীন নক্ষত্র চুপসে গিয়ে বস্ন্যাকহোলে পরিণত হওয়ার সময় নিজে থেকে কোনো ওয়ার্মহোল সৃষ্টি করতে পারে না।

ওয়ার্মহোল শুধু মহাবিশ্বের দুটি পৃথক অঞ্চলকেই সংযুক্ত করে না বরং দুটি মহাবিশ্বকেও সংযুক্ত করতে পারে। কয়েকজন বিজ্ঞানী অনুমান করেছেন, যদি ওয়ার্মহোলের কোনো মুখ একটি নির্দিষ্ট উপায়ে গতিশীল হয় তবে এর দ্বারা সময় পরিভ্রমণ সম্ভব। তবে ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং এমনটি সম্ভব নয় বলে যুক্তি দেখিয়েছেন। ওয়ার্মহোল তত্ত্বটি এখনো একটি তত্ত্বীয় প্রকল্প। আজ পর্যন্ত কেউ এর অস্তিত্ব পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।

বিজ্ঞানীরা মৌলিক পদার্থগুলোর জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসেছেন । এককালে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া বাকি সব মৌলিক পদার্থ তৈরি হয়েছে নক্ষত্রগুলোর মধ্যেই। সুপারনোভা বিস্ফোরণের উদাহরণ টেনেছেন তারা। এ বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রের ভেতর সৃষ্টি হয় অকল্পনীয় মাত্রায় তাপ ও চাপ। এ বিরাট চাপ ও তাপশক্তির কারণে সেখানে অনবরত নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া সংঘটিত হচ্ছে। ফিউশন প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রের ভেতরে মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসগুলো পরস্পরের যুক্ত হয়ে তৈরি হয় নতুন নতুন মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াস। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে নিউক্লিওসিনথেসিস। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি লাল দৈত্যের ভেতরেও নিউক্লিওসিনথেসিস লক্ষ্য করেছেন।

মাঝেমধ্যে লাল দৈত্যের গভীরতম অঞ্চল থেকে নির্গত হয় গ্যাস। সেই গ্যাসে কার্বন এবং নানা রকম উদ্ভট ধরনের মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এদের মধ্যে কিছু কিছু নিউক্লিয়াস একেবারে বিরল মৌলের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় টেকনেসিয়াম। এ মৌলটির কোনো স্থিতিশীল অতেজস্ক্রিয় আইসোটোপ নেই। এর তেজস্ক্রিয়তার অর্ধায়ু মোটামুটি ২০ লাখ বছর। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, যেসব লাল দৈত্যে এ টেকনেসিয়ামের দেখা মিলেছে তাদের বয়স হাজার কোটি বছরের মতো। সুতরাং বলা যায়, ওইসব নক্ষত্রের যখন জন্ম হয়, তখন সেগুলোয় টেকনেসিয়ামের অস্তিত্ব ছিল না। টেকনেসিয়ামের জন্ম হয়েছিল অনেক পরে। তা না হয়ে যদি নক্ষত্রগুলোর জন্মের সময় এ মৌল সৃষ্টি হতো, তাহলে লাল দৈত্যের পৃষ্ঠের দিকে যেসব গ্যাস আছে তাতে টেকনেসিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া যেত! এ ধরনের ব্যাপার লক্ষ্য করেই বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, লাল দৈত্যের মৌলিক পদার্থ তৈরির ক্ষমতা আছে।

মহাবিশ্ব সৃষ্টির গোড়ার দিকে পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিল মহাজাগতিক মেঘ। হাইড্রোজেনের মেঘ। সেসব মেঘ মহাকর্ষ বলের আকর্ষণের প্রভাবে প্রথমে পুঞ্জীভূত এবং পরে ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করে। ফলে পুঞ্জীভূত হাইড্রোজেনের ঘনত্ব এবং তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। একসময় তাপমাত্রা এমন অবস্থায় আসে যখন এর প্রভাবে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলো পরস্পর যুক্ত হতে শুরু করে। এভাবে দুটো হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস যুক্ত হয়ে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। এভাবে হাইড্রোজেন পুঞ্জীভূত হয়ে তৈরি করে ফেলে বিরাট বিরাট সব নক্ষত্র। নিউক্লিয়ার ফিউশনের ফলে গ্যাস নিউক্লিয়াসগুলো যুক্ত হওয়ার সময় বিরাট পরিমাণ তাপশক্তি নির্গত হয়। এ কারণে হাইড্রোজেনের যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে হাইড্রোজেনের প্রজ্বলনও বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাজাগতিক গ্যাস সংকুচিত হয়ে আমাদের সূর্যের নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৩ কোটি বছর।

একটা নক্ষত্র কতকাল জ্বলবে, তা নির্ভর করে নক্ষত্রের ভেতরকার হাইড্রোজেনের মোট পরিমাণের ওপর। শুধু হাইড্রোজেনই নক্ষত্রের জন্মকালের সঙ্গী,তখন যে নক্ষত্রের ভেতর হাইড্রোজেন যত বেশি, তার ভরও তত বেশি। তাহলে এক কথায় হিসাবটা দাঁড়াচ্ছে,যে নক্ষত্রের ভরের ওপর নির্ভর করছে সে কতকাল জ্বলবে। সূর্যের কথাই ধরা যাক, এর বয়স ৪৫০ কোটি বছর। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা, সূর্যের জন্মকালে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন এর ভেতর পুঞ্জীভূত হয়েছিল, স্বাভাবিক প্রজ্বলনে তা নিঃশেষ হতে ১ হাজার কোটি বছর সময় লাগবে। বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখেছেন, কোনো নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের তিনগুণ হয়, তাহলে সেই নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের জ্বলন মাত্র ২ কোটি বছরেই ফুরিয়ে যাবে। কারণ ভর বেশি হলে মহাকর্ষীয় শক্তিও বেড়ে যায়। ফলে কেন্দ্রীয় অঞ্চলের হাইড্রোজেনের ওপর আরো বেশি মাত্রায় চাপ পড়ে। তাই হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলো দ্রুত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়। সেই অনুপাতে তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পায় প্রচ-ভাবে। সে কারণে হাইড্রোজেনের জ্বলন চলে খুবই দ্রুততালে।

বিভাগ:বিজ্ঞান

এক মহান বিজ্ঞানী লেঃ জেনারেল করিম করিমভ

অগাষ্ট 10, 2017 মন্তব্য দিন

karimovজহিরুল মোহাম্মদ ইমরুল কায়েস : লেঃ জেনারেল করিম করিমভ ১৯১৭ সালের ১৪ই নভেম্বর আজারবাইজানের রাজধানী বাকু’তে জন্মগ্রহণ করা এক মহান মহাকাশ বিজ্ঞানীর নাম। কিন্তু ক’জনেই বা আমরা এ মহান বিজ্ঞানীর নাম এবং তাঁর মহান কীর্তিকলাপগুলো সম্বন্ধে জানি?

না জানারই কথা। এ বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তি জীবন জুড়ে আড়ালে থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বর্তমান রাশিয়ার মহাকাশ বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে একাগ্রচিত্তে কাজ করে গেছেন। দীর্ঘকাল তিনি সোভিয়েত মহাকাশ এবং রকেট বিজ্ঞানের প্রাণপুরুষ হলেও ১৯৮৭ সালে রাশিয়ার সুপ্রাচীন পাক্ষিক প্রাভদা পত্রিকায় তাঁর নামটি প্রকাশিত না হলে চিরকালের জন্যই তিনি হয়ত আমাদের কাছে অচেনা রয়ে যেতেন।

১৯৮৫ সালে সাবেক সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্ভাচেভ কর্তৃক ‘ব্যাপক তথ্য প্রচার চর্চা’ বা গ্ল্যাসনোস্ট ও প্রেরত্রয়িকা নীতি প্রবর্তনের ফলে কয়েকবছর পর সোভিয়েতের সাধারণ মানুষ তাঁর নামটি জানতে পারে। জীবনব্যাপী তিনি গোপনে থেকে মহাকাশ বিজ্ঞানের উৎকর্ষ উন্নয়নে কাজ করেছিলেন বলে বর্তমান রাশিয়ার ভূখন্ডে তিনি ‘সিক্রেট’ বা ‘গুপ্ত জেনারেল’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। যে কোন মিশনের পূর্বে প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় সকলপ্রকার আলোক চিত্রশিল্পী থেকে তাঁকে লুকিয়ে রাখা হত এবং প্রয়োজন হলে শুধুমাত্র তাঁর কন্ঠটি প্রকাশ করত। আবার সেক্ষেত্রেও আরেকজন মহাকাশচারীর ছবি তাঁর কন্ঠের সাথে মিলিয়ে দেখানো হত। দীর্ঘ পঁচিশ বছর তিনি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ স্টেট কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে কাজ করলেও তাঁর জন্মস্থান স্বয়ং আজারবাইজানও জানত না যে,তাদের নাগরিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ স্টেট কমিশনের এক নম্বর ব্যক্তি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই তিনি সোভিয়েত মহাকাশ বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত হন। সেইসাথে মনুষ্যবাহী ও মনুষ্যবিহীন মহাকাশ আন্তঃগ্রহ স্টেশনসহ আনুষঙ্গিক কর্মযজ্ঞের দায়িত্বে ছিলেন এই বিজ্ঞ ব্যক্তি। অবসর গ্রহণের পরে তিনি ‘দি ওয়ে অব স্পেশ’ নামে একটি বইও লিখেছেন, যেখানে রাশিয়ার মহাকাশ বিজ্ঞানের জন্ম থেকে শুরু করে কিভাবে এ বিভাগে রাশিয়া উন্নতিসাধন করেছে তার বিশদ বিবরণ তিনি দিয়েছেন। এই বইটির ইংরেজী সংস্করণও বাজারে আছে।

উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত চাঁদে রূশদের যত বড় বড় মিশন ছিল তার সবকটিতেই জেনারেল রহিম রহিমভের জোরালো ভূমিকা ছিল। উল্লেখ্য যে,সাবেক সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টালিনের সময়কালে রুশ মহাকাশ গবেষণা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে ১৯৫৩ সালের ৫ মার্চ জোসেফ স্টালিনের মৃত্যু পরবর্তী নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং ব্রেজনেভের সময়কালে রুশ মহাকাশ গবেষণায় ব্যাপক গতি পায়। করিমভও ঐসময়ে আরো বেশী করে নিজকে আত্মনিয়োগ করার সুযোগ পান। সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐ সময়কালের উল্লেখযোগ্য মিশনগুলো ছিল – ১৯৫৭ সালের ৪ই অক্টোবর ‘স্পুটনিক’ গ্রহে প্রথম স্যাটেলাইট পাঠানো, ১৯৬১ সালের ১২ই এপ্রিল প্রথম মানব হিসেবে ইউরী গ্যাগারিনকে পাঠানো, ১৯৬৩ সালের ১৬ই জুন প্রথম মহিলা নভোচারী হিসাবে ভেলেনথিনা তেরেসকুভাকে চাঁদে পাঠানো, ১২ অক্টোবর ১৯৬৪ ইং সালে তিন সদস্য বিশিষ্ট নাবিক দল কোমারভ, ইউঘিরভ আর ফিউকটিসটভ কে চাঁদে পাঠানো, মহাকাশে মানুষের প্রথম পদচারণা যান এবং ডকিং ফ্যাসিলিটি সমন্বয়ে বেলায়েভ এবং লিওনভকে নিয়ে ১৯৬৫ সালের ১৮ই মার্চ মঙ্গলগ্রহে পাঠানো, প্রথম মনুষ্যবাহী মহাকাশ স্টেশন, একটি স্পেশ শাটলের প্রথম টেস্ট ফ্লাইটসহ যাবতীয় রুশ মহাকাশ বিজ্ঞানের উপরোক্ত পুরো ‘বিশ্বে প্রথম’ মিশনের মূল কারিগর ছিলেন এই করিম করিমভ।

এতসব দুনিয়া কাঁপানো কর্ম সম্পাদনের পরেও তিনি নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার জন্যে আড়ালে থেকে যান। করিমভকে কখনো প্রকাশ্য না করলেও পশ্চিমা বিশ্ব কিন্তু সব সময় সন্দেহ করত রাশিয়ার এই মহাকাশ বিজ্ঞানের উন্নতির পেছনে কোন না কোন ’গুপ্ত’ ব্যক্তি জড়িত আছেন। পরবর্তীতে তাদের সেই ধারণাই সত্যি হয়েছিল। করিমভ সোভিয়েত রাশিয়ার মহাকাশ বিজ্ঞানের অন্যতম জনক হিসেবে স্বীকৃত।

করিম করিমভ প্রথমজীবনে ১৯৪২ সালের আজারবাইজান ইন্ড্যাস্ট্রিয়াল ইনস্টিউট থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর ঝারঝিনস্কি আর্টিলারী একাডেমিতে তাঁর পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। সেখানে পড়াশোনা কালেই তিনি মহাকাশ বিজ্ঞানের জটিল ধ্যান-ধারণায় জড়িয়ে পড়েন। রকেট প্রযুক্তির একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কাতয়ুসা রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে কাজ করতেন। ঐখানে কাজ করার সময় তাঁর কর্মগুলো এতই নিখুঁত ছিল যে, সোভিয়েতের সর্বোচ্চ মান ‘লাল তারকা’ শ্রেণিভুক্ত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রাক্তন সোভিয়েতের আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল কার্যক্রমের সাথেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ক্রমবর্ধমান মিসাইল শিল্প উন্নতির সময়ে ১৯৬০ সালে তিনি রাষ্ট্রের গোপন মিসাইল টেস্টিং দপ্তর ও পরমাণু মিসাইল পরীক্ষার দেখভালও করেন। ১৯৬৬ সালে সাজ্র্ইে কুরুলেভ মৃত্যুবরণ করলে ১৯৬৪ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন নতুনভাবে স্থাপিত দপ্তর সেন্ট্রাল ডাইরক্টরেট অব ইউএসএসআর স্টেট কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ পান এবং ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি এ কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ অলংকৃত করেন।

প্রাক্তন সোভিয়েত বা বর্তমান রাশিয়ায় মহাকাশ বিজ্ঞানে তাঁর যে অবদান, তা অবিস্মরণীয়। রুশ সরকারও তাঁর এ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ হিরো অব দি সোস্যালিস্ট লেবার, সোভিয়েতের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, স্ট্যালিন এবং লেনিন পুরস্কার, প্রাক্তন সোভিয়েত আর্মির লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে ভূষিত করেন।
১৯৯১ সালে অবসর গ্রহণের পর রাশিয়ান ফেডারেল স্পেশ এজেন্সি তাঁকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এতোসব জটিল কাজের মূল প্রকৌশলী করিম করিমভ ২০০৩ ইং সালের ২৯ শে মার্চ মস্কোতে ৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

জীবনভর আড়ালে থাকা এবং নিরবে নিঃশব্দে প্রস্থানের পরেও একমাত্র কর্মগুণের কারণে মহাকাশ বিজ্ঞানী করিম করিমভকে শেষ পর্যন্ত আর লুকিয়ে রাখা যায় নি। তাঁর এ মহানকর্ম মানুষের মনকে জাগরুক করে রাখবে দীর্ঘদিন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। তাঁর এই সৃষ্টিশীল কৃতিত্বগুলো মানুষের কল্যাণে ব্যয়িত হবে অনন্তকাল ধরে। নতুন প্রজন্ম এ মহা কর্মবীরের কর্মকান্ডগুলো আরো বিচার বিশ্লেষণ করে মহাকাশ বিজ্ঞানের অজানা বিষয়গুলোকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবেন এ প্রত্যাশা রইল।