আর্কাইভ

Archive for the ‘বিজ্ঞান’ Category

বিশ্বের প্রথম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী মারিয়া মিশেল

maria michelleআজ থেকে ২০০ বছর আগে জন্ম নিয়েছিলেন মারিয়া মিশেল। এই মহিলা গোটা যুক্তরাষ্ট্রে সাড়া ফেলে দেন। মার্কিন ইতিহাসে তিনি একজন পেশাদার নারী জ্যোতির্বিদ ছিলেন। ১৮৪৭ সালে তিনি নতুন ধূমকেতু আবিষ্কার করেন যা ‘মিস মিশেলের ধূমকেতু’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়—

মারিয়া মিশেলের জীবনের গল্পটা করুণ। বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি পান এবং সেই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তার গল্পের গতি যেন ভেনাস গ্রহের মতোই! পেছনের দিকে নিয়ে যায়। মারিয়া যখন ছোট, তখন নারীর বিজ্ঞানচর্চা ছিল স্বাভাবিক। তবে এই চর্চাকে পেশাদারিত্বে রূপ দেওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। আর হ্যাঁ, সে সময় ছিল না কোনো লিঙ্গ বৈষম্য। একদমই ছিল না। বিভিন্ন কারণে আঠারো শতকের শুরুর দিকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে নারীদের উৎসাহিত করা হতো। মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে বলা হতো সুইপিং দ্য স্কাই।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ মারিয়া মিশেল ১৮১৮ সালের ১ আগস্ট ম্যাসাচুসেটসের নান্টউইটে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নান্টউইটের একটি বিদ্যালয়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে অধ্যয়নের আগ্রহ জন্মে বাবা উইলিয়ামের সমর্থনে। মিশেলকে দুরবিনের ব্যবহার সম্পর্কে হাতেখড়ি শিক্ষা দেন বাবা উইলিয়াম। মা লিডিয়া মিশেল ছিলেন সাধারণ মহিলা। তাদের পরিবারকে বলা হতো কোয়াকার পরিবার। বাবা উইলিয়াম ও মা লিডিয়ার পরিবারে ছিল ৯ জন ছেলেমেয়ে। তারা বিশ্বাস করত ছেলে এবং মেয়ে উভয়েরই শিক্ষার প্রয়োজন আছে এবং উভয়কেই স্কুলে যেতে হবে। মিশেলের বাবা ছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং শিক্ষক।

১৮৩৬ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত মিশেল নান্টউইটের এথেনাম লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেন। রাতের অন্ধকার পেরিয়ে সকাল হলেই তিনি সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সৌরগ্রহণ, তারকা, বৃহস্পতি ও শনি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান আহরণের জন্য বিভিন্ন বই পড়তেন। তার বয়স যখন ১২, তখন তিনি সর্বপ্রথম বাবার সঙ্গে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আকাশ পর্যবেক্ষণের গুণাবলিগুলো মারিয়া মিশেল সযত্নে লালন করেছিলেন। মারিয়া ছিলেন তৎকালীন পেশাদার নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে সেরা। মিশেল আকাশের নক্ষত্রগুলোর একটি নকশা তৈরি করেছিলেন। উনিশ শতকে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুরস্কৃতও হন। যা কিনা তার নারী শিক্ষার্থীদের সামনে বিজ্ঞানের দুয়ার খুলে দেয়। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সে সময়ে নারী অগ্রগতির পথ সহজ এবং সুগম ছিল না। কারণ যখনই নারীরা এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখনকার সময়ের সামাজিক এবং আর্থিক প্রেক্ষাপট।

ইতিহাসবিদের মতে, তৎকালীন সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে নারীদের প্রবেশ তেমন কঠিন কিছু ছিল না। সময়টিকে নারীসুলভ বিজ্ঞানের সময় বলা হতো। যেন মহাকাশ ও নক্ষত্র নিয়ে গবেষণায় পুরুষের চাইতে নারীরাই অপেক্ষাকৃত বেশি এগিয়ে ছিল। ‘মারিয়া মিশেল অ্যান্ড দ্য সেক্সটিং অফ সায়েন্স’ বইটির লেখক, সাইমন্স কলেজের প্রফেসর রিনি বার্গল্যান্ড তার বইতে উল্লেখ করেন, ‘উনিশ শতকের শুরুতে আমেরিকার বিজ্ঞানচর্চায় নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করত। বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের মতো পুরুষরা অংশ নিত না। তখন বিজ্ঞানচর্চাকে নারীসুলভ রেওয়াজরীতিও মনে করা হতো।’

বাবার সাহচর্য এবং নিজের আগ্রহের ফলে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে মারিয়া মিশেলের প্রবেশ এবং বিচরণ বেশ সহজেই ত্বরান্বিত হয়েছিল। ১৮৪৭ সালে, পৃথিবী থেকে বহু দূরে অবস্থিত একটি ধূমকেতুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার জন্য সুইডেনের যুবরাজ মিশেলকে মেডেল প্রদান করে পুরস্কৃত করেছিলেন। তখন থেকেই ধূমকেতুটি ‘মিস মিশেলের ধূমকেতু’ নামে পরিচিতি পায়। এর পরের বছরই আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের সর্বপ্রথম নারী জ্যোতির্বিদ নির্বাচিত হন। এরপর যুক্ত হন আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্সের সঙ্গে। ১৮৫৬ সালে চল যান ইতালি। উদ্দেশ্য ভ্যাটিকান অবজারভেটরি থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ। অবজারভেটরি মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হলেও সেখানে নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এরপর তিনি পিটিশন দাখিল করেন। তার আত্মজীবনীমূলক লেখায় মিশেল বলেন, ‘সন্ন্যাস আশ্রমে থাকার ব্যাপারে আগ্রহ না থাকলেও, নিষেধাজ্ঞা থাকায় মনে জিদ চেপে বসে। দুই সপ্তাহ পর অবজারভেটরির কর্তারা তাকে ভেতরে প্রবেশাধিকার দেন। ১৯৫৪ সালের ২ মার্চ আরেক জার্নালে তার সুইপিং দ্য স্কাই সম্পর্কে জানা যায়, ‘গত রাতে তিন মেয়াদে প্রায় দুই ঘণ্টা যাবৎ ‘স্কাই সুইপ’ করেছিলাম। এটা খুব অসাধারণ একটি রাত ছিল— মেঘমুক্ত, পরিষ্কার এবং সুন্দর একটা আকাশ। আমার কাজ করতে বেশ ভালোই লাগছিল কিন্তু শীতল বাতাসে হঠাৎ আমার পিঠব্যথা করতে শুরু করে। তখন দুটি নেবুলা দেখতে পেয়েছিলাম যা আমার পিঠ ব্যথার কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।’

ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সূত্র মতে, যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন তাদের মধ্যে শতকরা ২৬ ভাগ হচ্ছেন নারী এবং আমেরিকার জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রফেসরদের মধ্যে চার ভাগের একভাগই নারী। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই মহীয়সী নারীর এত অবদান থাকলেও ১৮৭০ সালের শুরুতে মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। তবুও বিজ্ঞানচর্চা যখন পেশাদারিত্বে রূপান্তর হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। বিজ্ঞানমনস্ক নারীদের বিজ্ঞানচর্চার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখে মিশেল বসে ছিলেন না। ১৮৭২ সালে তিনি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য এডভান্সমেন্ট অফ উইমেন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে মৃত্যুর এক বছর আগ পর্যন্ত নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে যান। ১৯৩৭ সালে তার সম্মানে একটি গ্রহাণুর (১৪৫৫ মিশেলা) নামকরণ করা হয়। ২০১৩ সালে গুগল মিশেলের ১৯৫তম জন্মদিনে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে একটি ডুডল প্রকাশ করে।

Advertisements

জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-সূফির অবদান

al-sufiকাজী আখতারউদ্দিন : রাতের আকাশে আমরা অসংখ্য তারা মিটমিট করতে দেখি— কিছু কিছু তারার নামও আমরা জানি। যেমন— অশ্বিনী, কৃত্তিকা, রোহিনী, উত্তরফাল্গুনী, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা থেকে শুরু করে রেবতী পর্যন্ত মোট ২৭টি নাম বাংলায় পাওয়া যায়। কিন্তু আকাশে অসংখ্য তারার মধ্যে কেবল ১০,০০০ তারা খালি চোখে দেখা যায়। আবার এর মধ্যেও কেবল কয়েকশত তারার নামকরণ করা হয়েছে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিকেল ইউনিয়ন মোট ৩১৩টি তারার নাম লিপিবদ্ধ করেছে, যার অধিকাংশই আরবি নামের। ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের সোনালী যুগে এসব তারার নামকরণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে ১০ শতকের মুসলিম বিজ্ঞানী আল-সূফির। আমরা ১৬৫টি তারার আরবি নাম পেয়েছি।

শত শত বছর ধরে নাবিক, ভূপর্যটক ও নক্ষত্র পর্যবেক্ষণকারীদের কাছে তারার আরবি নাম ব্যবহারটি আরব-ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। নয় শতক থেকে পনরো শতক পর্যন্ত যে-সকল বিজ্ঞানী ইসলামিক স্পেন থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য প্রাচ্য হয়ে ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় আরবি ভাষায় কাজ করতেন, তারা বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছেন এবং ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের উপাদান যোগান দিয়েছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল এর মধ্যে অন্যতম একটি ক্ষেত্র।

বর্তমানে তারার যে আরবি ও আধুনিক নামগুলো পাশ্চাত্যজগতে ব্যবহূত হয়, তা মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-সূফি প্রবর্তিত তালিকা থেকে এসেছে। মধ্যযুগের ইউরোপে তিনি আজোলফি নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পুরো নাম আবুল হোসাইন আবদাল-রহমান ইবনে ওমর আল-সূফি। তাঁর যুগের অন্যতম বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি বর্তমানে স্বীকৃত। আল-সূফির জন্ম ইরানের রে নগরীতে ৭ ডিসেম্বর, ৯০৩ সালে, মৃত্যু ২৫ মে, ৯৮৬ শিরাজে। তাঁর নামে চন্দ্রপৃষ্ঠে আজোফি নামে একটি জ্বালামুখ এবং ১২৬২১ আল সূফি নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রহের নামকরণ করা হয়। তিনি আরবি ভাষায় লেখাপড়া করেন। বুয়াহিদ শাসকের আনুকূল্যে তিনি তাঁর নিজ দেশ এবং রাজ্যের রাজধানী বাগদাদে জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করেন। তাঁর মন্ত্রক ছিলেন বুয়াহিদ রাজ্যের উজির ইবন আল—আমিদ।

আল-সূফি বিখ্যাত গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমির তারার নামের তালিকার একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। এতে তিনি বিভিন্ন ভুল পর্যবেক্ষণ সংশোধন করেন এবং গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমি যেসব তারার নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি সেগুলো তাঁর তালিকায় যুক্ত করেন। আল-সূফি কিতাব সুওয়ার আল-কাওয়াকিব আল-থাবিতা বা দি বুক অফ কন্সটিলেশনস অফ দি ফিক্স্ড স্টার নামে (star cartography) কার্টোগ্রাফি— নক্ষত্র মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যার একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এটি ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ক্লাসিক গ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত হয়। গ্রন্থটিতে টলেমির ৪৮টি নক্ষত্রপুঞ্জের সমস্ত কিছু নিয়ে আলোচিত হয়েছে। এর সঙ্গে আছে নিজের আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ।  বিভিন্ন কারণে আল-সূফির পুস্তকটি সাড়া জাগিয়ে তোলে।

আল-সূফির গ্রন্থটি স্পেনের মাধ্যমেই প্রথমে পাশ্চাত্যে পরিচিত হয়। তখন স্পেনে খ্রিষ্টান ও মুসলিম রাজ্যগুলোর পাশাপাশিসহ অবস্থান ছিল। ক্ষমতা কিংবা এলাকা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে তখন কোন ধরনের ঠেলাঠেলি ছিল না বরং তারা একে অপরকে সহযোগিতা করতেন। ক্যাস্টিলের খ্রিষ্টান রাজা আলফোন্সো ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন মনোযোগী ছাত্র। তিনি আল-সূফির রচনাটি প্রাচীন স্পেনিশ ভাষায় অনুবাদের নির্দেশ দেন, যা লিব্রস দে লান এস্ট্রেলামস দে লা ওছুয়া এসপেরা (১২৫২-১২৫৬) নামে প্রকাশিত হয়। মুুসলিম বিশ্বেও আল-সূফির পুস্তকটি বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে।  ৯৬৪ সালে আল-সূফি আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রমণ্ডলী বা ছায়াপথ আন্দ্রোমেদা গ্যালেক্সি চিহ্নিত করেন। এছাড়া তিনি আ্যাাস্ট্রেলেব সম্পর্কে রচনা প্রকাশ করেন এবং এর বিভিন্ন ব্যবহারের কথা জানান— জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, হস্তরেখা, নৌপরিচালনাবিদ্যা, সার্ভে, সময়নিরূপণ, কিবলা এবং সালাত ইত্যাদি।

আল-সূফি চিরদিনের জন্য আকাশের তারা পর্যবেক্ষণের রীতি পরিবর্তিত করেন। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একজন হিসেবে তিনি তারা এবং নক্ষত্রমণ্ডলীকে উপলব্ধি করার সাধনায় নিজের জীবন উত্সর্গ করেছিলেন।  হাজার বছর পরও আল-সূফির পর্যবেক্ষণ এবং বিশদ কর্ম এখনো রাতের আকাশ দেখার বিষয়ে আমাদের সহায়তা করে।

এখানে কিছু তারার আরবি নাম দেওয়া হলো: আলজেবার, কিতালফা, আখিরআলনাহর, আল-আক্রাব, আকুবিনবাআল-জুবানা, আল-দাফিরাহ, আল-উজফুর. আল-আনাকআল আর্দ, আলবালদাহ, আলবালি, আলছিবা, আলকর, আলদিবারান, আলদিরামিন, আলিয়াথ, আলহানাহ, আলকালব আলরাই, আল কামর, আইন, আদিব, আলরুবা, আলআওয়াদ, আতিক, আসুজা, বাহাম, বাতনি কাইতুস, বাইদ, বানাত উন— নাআস, আলবোতাইন, কুরসিয়া আল-জাওযা, দানাবাউল-জাদি প্রভৃতি।  

(সূত্র: প্রকৌশলী ও ইসলামী লেখক ড. এ জহুর, জর্জ রবার্ট কেপল (১৯৯৮)— দি নাইট স্কাই অবজার্ভারস গাইড, ভলিউম ১, বুলেটিন অফ দি আই এই উ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন স্টার নেইমস নং ১। ২৮ জুলাই ২০১৬।)

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সামুদ্রিক শক্তির ব্যবহার

electricity from seaড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : একটি দেশের উন্নয়নের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক নিবিড়। আবার প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এ কারণে প্রচলিত জ্বালানি উৎসের পাশাপাশি বিকল্প বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।

আমাদের দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির নীতিমালায় জ্বালানির মূল উৎস হিসেবে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োমাস, হাইড্রো, বায়োফ্লুয়েল, জিয়োথারমাল, নদীর স্রোত, সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার বা টাইডাল ইত্যাদিকে শনাক্ত করা হয়েছে।

তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির উৎস হিসেবে এনার্জি মেটেরিয়াল নিয়ে সারা বিশ্বে গবেষণার কাজ চলছে। কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও পাওয়া গেছে। আমাদের দেশেও জ্বালানির বিকল্প উৎস হিসেবে এনার্জি মেটেরিয়াল নিয়ে গবেষণা ও এর প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। এজন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের গবেষণা কাজে সম্পৃক্ত করতে পারে। তবে এর জন্য পরিকল্পনা ও পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে।

অনেকে বলে থাকেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎয়ের সফলতার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ ও জোয়ার বা টাইডাল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি সেভাবে ভাবা হচ্ছে না।

এটি আমাদের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে সৃষ্টি হতে পারে। সরকারকে সমুদ্র বিজয়ের মাধ্যমে এ পরিকল্পনাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ এ ধরনের উৎস যেমন আমাদের দেশে আছে, তেমনি একে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার পরিবেশও রয়েছে। তবে কীভাবে টাইডাল এনার্জি বা পাওয়ারকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, সেই বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেরই তেমন কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই।

কাজেই এটির প্রক্রিয়াগত বিষয়টি জানার প্রয়োজন রয়েছে। চাঁদের আকর্ষণে সমুদ্রের পানি যখন ফুলে-ফেঁপে ওঠে তখন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পানির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে জোয়ারের সৃষ্টি হয়। প্রতি সাড়ে ১২ ঘণ্টা পরপর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় জোয়ারের সৃষ্টি হয়।

এ জোয়ারের কারণে ফুলে-ফেঁপে ওঠা বেশি পরিমাণ পানির মধ্যে স্থিতিশক্তি জমা থাকে। আবার আশপাশের এলাকা থেকে এ জায়গায় বিভিন্ন উৎস থেকে পানি এসে জমা হতে থাকলে তাতে প্রচুর পরিমাণে গতিশক্তিও থাকে। সবচেয়ে মাজার বিষয় হচ্ছে, চাঁদ যদি ধ্বংস হয়ে না যায় তবে এ শক্তিও ধ্বংস হবে না। চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে যতদিন ঘুরতে থাকবে এ শক্তিও ততদিন বিদ্যমান থাকবে।

যখন পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে বা বেড়ে যায় তখন এটিকে যে কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আটকে রাখতে হবে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুসারে এ পানিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ছেড়ে দিলে তাতে প্রচুর পরিমাণে গতিশক্তির উদ্ভব ঘটবে।

এ গতিশক্তির সাহায্যে টারবাইনকে ঘোরানো হলে তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে পানি যখন নেমে যায় বা ভাটার সৃষ্টি হয় তখনও এতে যে গতিশক্তি থাকে তাকে কাজে লাগিয়েও বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। তবে এক্ষেত্রে টারবাইনগুলো নদী বা সমুদ্রের তলদেশে বসাতে হবে, যাতে করে টারবাইনগুলো দুই দিকেই ঘুরতে পারে। এ ধরনের পদ্ধতিকে টাইডালস্ট্রিম জেনারেটর বলা হয়ে থাকে।

জোয়ার ও ভাটার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যকে ভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। যদিও পানিকে আটকে রাখার ও তাকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ছেড়ে দেয়ার বিভিন্ন প্রক্রিয়া পৃথিবীতে রয়েছে, তবে এ প্রক্রিয়াকে কীভাবে সহজীকরণ করে আমাদের দেশের উপযোগী করা যায় সে বিষয়ে গবেষণা হতে পারে।

আবার এ আটকে রাখা পানির মধ্যে কীভাবে স্রোতের গতি বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি করা যায় সেই ধরনের সিস্টেম বা পদ্ধতির বিষয়টিও ভাবা যেতে পারে। যেমন বর্তমানে ডাইনামিক টাইডাল পাওয়ার পদ্ধতির বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। এ পদ্ধতিটি যৌথভাবে ১৯৯৭ সালে ডাচ প্রকৌশলী কিস হালস্ বারজেন এবং রব স্টেইন আবিষ্কার করেন। এ ধরনের পদ্ধতিতে কোনো ব্যারাজ নির্মাণ না করে সমুদ্রের উপকূলের সঙ্গে ২০-৩০ কিলোমিটার লম্বা টি-বাঁধ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

এ পদ্ধতি ব্যবহার করে ১৫ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু এ পদ্ধতিটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রক্রিয়াগতভাবে জটিল, তবে ব্যারাজ বা ডাইনামিক টাইডাল পদ্ধতি দুটিকে কীভাবে সহজে ও স্বল্প খরচে ব্যবহার করা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা হতে পারে।

এ দুটোর বিকল্প প্রক্রিয়ার বিষয়গুলোও গবেষণার মধ্যে আসতে পারে। বিভিন্ন দেশ টাইডাল পাওয়ারকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যাচ্ছে। ফ্রান্স বড় ধরনের ব্যারাজ নির্মাণ করে এর রান্স টাইটেল পাওয়ার স্টেশন থেকে ২৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সিহ্হা টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট থেকে ২৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার জিয়াংজিয়া, জিনডু উলডলমক, গাংওয়া আইল্যান্ড এবং একই দ্বীপের অন্য পাশে টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের গুজরাটে ৫০ মেগাওয়াটসম্পন্ন টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ যেসব দেশে সমুদ্র উপকূল রয়েছে তারাও এ পদ্ধতি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং নতুন নতুন প্রকল্প স্থাপন করে চলেছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের সুবিধা বিদ্যমান থাকলেও এখনও পর্যন্ত সেভাবে বিষয়টি ভাবা হয়নি।

ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য এ ধরনের টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট গড়ে তোলার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। আমাদের দেশের যেসব নদ-নদীর মোহনাগুলো বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেখানে এ দুই পদ্ধতির যে কোনো একটি ব্যবহার করা যেতে পারে। যেহেতু জোয়ারের উচ্চতা ও তার প্রবাহ আমাদের দেশের সামুদ্রিক ও নদীবহুল অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম, সেহেতু এটিকে কীভাবে স্ট্রাকচারাল বা গঠনগত উন্নয়নের মাধ্যমে বা পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে গতিশীল করা যায় সে বিষয়টি সমুদ্রবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের ভাবতে হবে।

তাদের সঙ্গে প্রকৌশলীদের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলে এটিকে আরও কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী করে তুলতে হবে। তবে ধারণা করা হয়, উইন্ড টারবাইনের মতো ছোট আকারের বহুসংখ্যক টাইডাল পাওয়ার জেনারেটর বসিয়ে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আমাদের দেশে সন্দ্বীপের জোয়ারের পানির উচ্চতা ২-৭ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়া এর স্রোতের গতিও যথেষ্ট ভালো থাকায় এটি টাইডাল পাওয়ারপ্লান্ট স্থাপনের সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা বলে বিবেচিত হয়েছে।

তবে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে তা যাতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি না করতে পারে সে বিষয়টিও পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। এ ধরনের টাইডাল পাওয়ারপ্লান্টের সুবিধা হল এতে কোনোরকম দূষণ সৃষ্টি হয় না। বর্তমান সময়ে দূষণের কারণে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় তা কমানোর ক্ষেত্রে ফসিল ফুয়েল বাদ দিয়ে এ ধরনের পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

অন্যদিকে সমুদ্রের ঢেউ ব্যবহার করে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের বিষয়টি নিয়েও ভাবা হচ্ছে, যা ওয়েভ পাওয়ার নামে পরিচিত। বিষয়টিকে সহজভাবে বলা যায়- যখন সমুদ্রের পানির ওপর দিয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়, তখন স্থির পানির মধ্যে তরঙ্গ বা ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।

বায়ুর এ শক্তি পানিতে পরিবাহিত হয়ে সেখানে গতিশক্তির সৃষ্টি করে। এ গতিশক্তিকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহার করে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে যে প্রান্ত থেকে ঢেউ বা স্রোত সৃষ্টি হচ্ছে তার আড়াআড়িভাবে অনেক ছোট ছোট ওয়াটার টারবাইন স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা থাকে।

যখন ঢেউ ওয়াটার টারবাইনের ওপর আছড়ে পড়ে তখন গতিশক্তির কারণে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ঢেউয়ের গতি, দৈর্ঘ্য ও পানির ঘনত্বের ওপর ওয়েভ এনার্জির কম-বেশি হওয়া নির্ভর করে। এগুলোর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমা ও বিভিন্ন স্রোতবাহী নদীর ম্যাপিং বা মানচিত্র শনাক্ত করে ওয়েভ এনার্জি উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন স্থান, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র, সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও বান্দরবান অঞ্চলের হাওর এলাকায় ওয়েভ এনার্জি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

সমুদ্রের জলসীমার নিচে ওয়াটার টারবাইন স্থাপন করেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহার না করে ফ্রি এনার্জি ধারণার মাধ্যমে কৃত্রিম স্রোত সৃষ্টি করেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পর্তুগালে পেলামিস ওয়েভ জেনারেটর ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এ কারণে পোর্তোর উত্তরে সি বিচে সাগরের পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত অনেক পেলামিস ওয়েভ কনভার্টার স্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের ওয়েভ এনার্জি ব্যবহারের ফলে ফসিল ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে ৬০ হাজার টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ থেকে পরিবেশ রক্ষা পাবে। এছাড়া সমুদ্রে ভাসমান ওয়াটার টারবাইন ব্যবহার করেও বড় বড় জাহাজ ও সমুদ্রাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

পশ্চিম সুইডেনের লাইসেকিলে সমুদ্রের মধ্যে বয়া কনভার্টার ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এছাড়াও বর্তমান সময়ে ১৫-২০ ধরনের বিভিন্ন টেকনোলজি ব্যবহার করে ওয়েভ এনার্জি ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশকেও এ সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। এখন দরকার সমুদ্রের জলসীমা ও জলস্রোতকে কেবল সৌন্দর্যের উপকরণে পরিণত না করে বাণিজ্যিক সম্পদে রূপান্তরিত করা। আর এটি যদি সম্ভব হয়, তবে টাইডাল ও ওয়েভ এনার্জির মাধ্যমে আমাদের দেশ বিদ্যুতে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে সক্ষম হবে, যা আমাদের উন্নত রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবে।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

বিশ্বসেরা মুসলিম আবিষ্কারক

মুসা আল খাওয়ারিজমি

পুরো নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমি। মধ্য এশিয়ার দীর্ঘতম এবং আরব সাগরে পতিত আমু দরিয়ার কাছে একটি দ্বীপের নিকটে খাওয়ারিজম নামক শহরে আনুমানিক ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পাটিগণিত, বীজগণিত, ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যামিতিতে প্রভৃত ভূমিকা রাখেন। মূলত বীজগণিতের জন্যই তিনি সবচেয়ে আলোচিত হন। তার ‘আল জাবর ওয়াল মুকাবিলা’ বই থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম। খলিফা মামুনের বিশাল লাইব্রেরিতে আল খাওয়ারিজমি চাকরি গ্রহণ করেন। এখানেই সম্ভবত তিনি বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। অসীম ধৈর্যসহকারে অধ্যয়ন করে তিনি বিজ্ঞানের যাবতীয় বিষয়ের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন একজন জগদ্বিখ্যাত গণিতবিদ। তার সময়ের গণিতের জ্ঞানকে তিনি এক অভাবনীয় সমৃদ্ধতর পর্যায়ে নিয়ে তোলেন। একজন গণিতবিদ হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য জ্যোতির্বিদ। ভূগোল বিষয়ে তার প্রজ্ঞা উৎকর্ষতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন বীজগণিত তথা অ্যালজেবরার জনক। তিনি প্রথম তার একটি বইয়ে এই অ্যালজেবরার নাম উল্লেখ করেন। বইটির নাম হলো ‘আল জাবর ওয়াল মুকাবিলা’। তিনি বিজ্ঞানবিষয়ক বহু গ্রিক ও ভারতীয় গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করেন। পাটিগণিত বিষয়ে তিনি একটি বই রচনা করেন, যা পরে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। তার হাতেই বীজগণিত পরে আরও সমৃদ্ধতর হয়। বর্তমান যুগ পর্যন্ত গণিতবিদ্যায় যে উন্নয়ন এবং এর সহায়তায় বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে উন্নতি ও আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে তার মূলে রয়েছে আল খাওয়ারিজমির উদ্ভাবিত গণিতবিষয়ক নীতিমালারই বেশি অবদান। তার রচিত বই ‘আল জাবর ওয়াল মুকাবিলা’ থেকে বীজগণিতের ইংরেজি নাম অ্যালজেবরা উৎপত্তি লাভ করে।

জাবির ইবনে হাইয়ান

বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান আলআজদি আস সুফি আলওমাবি। আরবের দক্ষিণাংশের বাসিন্দা আজদি গোত্রের হাইয়ান ছিলেন তার পিতা। চিকিৎসক পিতার সন্তান হলেও সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উমাইয়া খলিফা তার পিতাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে বাল্যকালে তিনি চরম দুঃখকষ্টের সম্মুখীন হন। শৈশবে কুফায় বসবাস করলেও পিতার মৃত্যুর পর তিনি দক্ষিণ আরবে স্বগোত্রে ফিরে আসেন। কুফায় বসবাসের সময় তিনি রসায়নশাস্ত্র গবেষণায় বিশেষ মনোযোগী হন। ওই পরিপ্রেক্ষিতে কুফায় একটি রসায়ন গবেষণাগারও প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম ইতিহাসবিদেরা ওই গবেষণাগারকে পৃথিবীর প্রথম রসায়নাগার বলে অভিহিত করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই প্রথম বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে রসায়নের প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলো চর্চা করার উপায় উদ্ভাবন করেন। রসায়নশাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি চিকিৎসা, খনিজ পদার্থ বিশেষত পাথর, দর্শন, যুদ্ধবিদ্যা, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে অবদান রাখেন। তিনি প্রায় ২ হাজার বই রচনা করেন। এর মধ্যে চিকিৎসা বিষয়ে বই প্রায় ৫০০।

আল বিরুনি

পারস্যের মনীষী আবু রায়হান আল বিরুনি। তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কাটিয়েছেন মধ্য এশিয়ায়। ২০ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ শুরু করেন। তিন বছর ধরে গোটা পারস্য চষে বেড়ান এবং বিভিন্ন পণ্ডিতের অধীনে পড়ালেখা করে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। ৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি জুরজানে (বর্তমানে ‘গুরগান’, উত্তর ইরানের একটি শহর) স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জীবনের পরবর্তী ১০ বছর তিনি উত্তর ইরানের এই ছোট্ট শহরেই বসবাস করেন, নিজের গবেষণা চালিয়ে যান, বই লেখেন এবং জ্ঞানার্জনে রত থাকেন। আল বিরুনি ভূবিদ্যার একজন পথিকৃৎ। তিনি শতাধিক বিভিন্ন ধরনের ধাতু ও রত্নপাথর সংগ্রহ করে সেগুলো পরীক্ষা করেন। একাদশ শতাব্দীতে আল বিরুনি তার বর্ণময় কর্ম ও গবেষণা জীবন চালিয়ে যান এবং বিভিন্ন বিষয়ের গবেষণায় নতুন নতুন ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রদান করেন— কীভাবে পৃথিবী এর কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। স্থিতিবিদ্যা ও গতিবিদ্যাকে একীভূত করে বলবিদ্যা নামক গবেষণার নতুন ক্ষেত্রের প্রবর্তন করেন তিনি।

ইবনে সিনা

৯৮০ খ্রিস্টাব্দে বোখারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী, দার্শনিক আবু আলী সিনা। বোখারা শহরটি সে সময় ছিল ইরানের অন্তর্ভুক্ত। ইবনে সিনা দর্শন, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে যুক্তিবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, অঙ্ক ইত্যাদি চর্চা করেছেন। তিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে সমকালীন জ্ঞানীগুণী, চিকিৎসক ও মনীষীদের পড়িয়েছেন। ফলে সহজেই বোঝা যায় তিনি ছিলেন সে সময়কার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক। কথিত আছে, ইবনে সিনা যখন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তেন তখন অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো তার মানসপটে স্বপ্নের মতো ভাসত। তার জ্ঞানের দরজা খুলে যেত। ঘুম থেকে উঠে তিনি সমস্যার সমাধান করে ফেলতেন! একজন বিখ্যাত চিকিৎসক হিসেবে সর্বত্র তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি আল মুজমুয়া নামে একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন। এর মধ্যে গণিত ছাড়া সব বিষয় লিপিবদ্ধ করেন। ইবনে সিনা পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যামিতি, গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি তার সময়ে পৃথিবীর সেরা চিকিৎসক।

ইবনে হাইসাম

প্রখ্যাত পদার্থবিদ, জ্যোতির্বিদ, প্রকৌশলী, গণিতবিদ, চিকিৎসাবিদ, দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী, আবু আলী আল হাসান ইবনে আল হাসান আল ইবনে হাইসাম। তিনি বসরায় জন্মগ্রহণ করায় আল বাসরি নামেও পরিচিত। আলোকবিজ্ঞানে অসামান্য সংযোজন ‘কিতাবুল মানাজির’এর ১৫১৬ অধ্যায়ে জ্যোতির্বিদ্যার আলোচনা রেখেছেন।

এ ছাড়া তার ‘মিজান আলহিকমাহ’ এবং ‘মাককাল ফি দ্য আলকামার’ গ্রন্থদ্বয়ে তিনি সর্বপ্রথম গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা চালান।

আল রাজি

আবুবকর মুহাম্মদ ইবন জাকারিয়া আল রাজি বা আল রাজি। তিনি ৮৪১ খ্রিস্টাব্দে ইরানের তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। রাজি ছিলেন একজন দক্ষ পারশিয়ান চিকিৎসক ও দার্শনিক। তিনি চিকিৎসাবিদ্যা, আল কেমি, পদার্থবিদ্যা ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর ১৮৪টিরও বেশি বই লিখেছেন।

তিনি সালফিউরিক অ্যাসিড আবিষ্কার করেন। তিনি ইথানল উৎপাদন, বিশোধন ও চিকিৎসায় এর ব্যবহার প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। তিনি একজন বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ছিলেন। তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেন।

আল বেতরুগি

নুর আদদীন ইবনে ইসহাক আল বেতরুগি। তিনি ইসলামের সোনালি যুগে মরক্কোয় জন্মগ্রহণ করেন। তার ব্যক্তিগত জীবনী খুব বেশি জানা যায়নি। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ। তিনি ‘স্লেশিয়াল মোশন’ নিয়ে যুগান্তকারী মতবাদ দিয়েছিলেন। তার সীমাবদ্ধতা থাকার পরও তিনি প্লেনটারি মোশন নিয়ে নিজস্ব থিওরি প্রদান করেছিলেন; যা এখন ঠিক।

ওমর খৈয়াম

অনেক ইতিহাসবিদের মতে সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর কিছু আগে ওমর খৈয়াম জন্ম গ্রহণ করেন। ওমর খৈয়ামের শৈশবের কিছু সময় কেটেছে অধুনা আফগানিস্তানের বালখ শহরে। সেখানে তিনি খোরাসানের অন্যতম সেরা শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত ইমাম মোয়াফেফ্ক নিশাপুরির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। দিনের বেলায় জ্যামিতি ও বীজগণিত পড়ানো, সন্ধ্যায় মালিক শাহর দরবারে পরামর্শ প্রদান এবং রাতে জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি জালালি বর্ষপঞ্জি সংশোধন— সবটাতে তার নিষ্ঠার কোনো কমতি ছিল না।

জীবদ্দশায় ওমরের খ্যাতি ছিল গণিতবিদ হিসেবে। তিনি প্রথম উপবৃত্ত ও বৃত্তের ছেদকের সাহায্যে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন। ওমরের আর একটি বড় অবদান ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্যের সমালোচনা, যা পরবর্তী সময়ে অইউক্লিডীয় জ্যামিতির সূচনা করে।

১০৭০ খ্রিস্টাব্দে তার পুস্তক মাকালাত ফি আল জার্ব আল মুকাবিলা প্রকাশিত হয়। এ পুস্তকে তিনি ঘাত হিসেবে সমীকরণের শ্রেণিকরণ করেন এবং দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানের নিয়মাবলি লিপিবদ্ধ করেন। ওমর খৈয়াম জ্যোতির্বিদ হিসেবেও সমধিক পরিচিত।

আল ফারাবি

বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল ফারাবির আসল নাম আবু নাসের মুহাম্মদ ইবনে ফারাখ আল ফারাবি। আল ফারাবির পিতা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। ইসলাম গ্রহণ ও রাজনৈতিক কারণে তার পূর্বপুরুষরা পারস্য ত্যাগ করে তুর্কিস্তানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ফারাবায়। সেখানে কয়েক বছর শিক্ষা লাভের পর শিক্ষার উদ্দেশ্যে চলে যান বোখারায়। এরপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি গমন করেন বাগদাদে।

সেখানে তিনি সুদীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর অধ্যয়ন ও গবেষণা করেন। জ্ঞানের অন্বেষণে তিনি ছুটে গিয়েছেন দামেস্কে, মিসরে এবং দেশবিদেশের আরও বহু স্থানে।

পদার্থবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতিতে তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে বিজ্ঞান ও দর্শনে তার অবদান ছিল সর্বাধিক। পদার্থবিজ্ঞানে তিনিই ‘শূন্যতার’ অবস্থান প্রমাণ করেছিলেন। দার্শনিক হিসেবে ছিলেন নিয় প্লেটনিস্টদের পর্যায়ে বিবেচিত।

আল বাত্তানি

৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মেসোপটেমিয়ার অন্তর্গত বাত্তান নামক স্থানে আল বাত্তানি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন অঙ্কশাস্ত্রবিদ ও জ্যোতির্বিদ। তিনিই সর্বপ্রথম নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়েছিলেন যে, এক সৌর বছর ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে হয়। তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, সূর্যের আপাত ব্যাসার্ধ বাড়ে ও কমে। সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কেও তার বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। আল বাত্তানি তার নিজস্ব উদ্ভাবিত যন্ত্র দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে সূর্য তার নিজস্ব কক্ষপথে গতিশীল।

এই মহান মনীষী ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ৭২ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। আল বাত্তানি ছিলেন একজন মশহুর জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ। তিনি জ্যোতির্বিদ্যাচর্চার জন্য নিজস্ব মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বহু বছর ধরে জ্যোতির্বিদ্যায় প্রচলিত ভুলগুলো সংশোধন করে এই শাখার অনেক সংস্কার ও উন্নতিসাধন করেন। পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদরা তাকে উল্লেখ করেছেন ‘আল বাতেজনিয়াজ’, ‘আল বাতেজনি’, ‘আল বাতেনিয়াজ’ ইত্যাদি নামে। তাই তার পরিচয় অনেকটাই ইতিহাসে হারিয়ে যেতে বসেছে।

ইবনুন নাফিস

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আইনশাস্ত্রে তার অবদান অবিস্মরণীয়। ইবনুন নাফিস মানবদেহে রক্তসঞ্চালন পদ্ধতি, ফুসফুসের সঠিক গঠন পদ্ধতি, শ্বাসনালি, হৃৎপিণ্ড, শরীরে শিরাউপশিরায় বায়ু ও রক্তের প্রবাহ ইত্যাদি সম্পর্কে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকে অবহিত করেন। তিনি মানবদেহে রক্ত চলাচল সম্পর্কে গ্যালেনের মতবাদের ভুল ধরিয়েছিলেন তিনি এবং এ সম্পর্কে নিজের মতবাদ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন।

বানু মুসা

বানু মুসাকে বলা হয় জ্যোতির্বিদদের মধ্যে বিস্ময়কর একজন। কারণ আর কিছুই নয়, তার সময়ে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। নবম শতকে বাগদাদের তিন মনীষীর একজন ছিলেন তিনি। এই তিনজনকে একত্রে বলা হতো মেশিনারি জগতের বিস্ময়। তারা পিরমাপক যন্ত্রের উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন।

আল সাইগ

প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ, যুক্তিবিদ, দার্শনিক, পদার্থবিদ, মনোবিজ্ঞানী, কবি এবং বিজ্ঞানী আবুবকর মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহিয়া ইবনে আল সাইগ। তবে তিনি ইবনে বাজ্জাহ নামে বেশি পরিচিত। তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। উদ্ভিদবিদ হিসেবেও তার সুনাম ছিল। আল সাইগের কবিতাগুলোও প্রশংসাযোগ্য।

আল কিন্দি

আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি ছিলেন কোরআন, হাদিস, ফিকাহ, ইতিহাস, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, রাজনীতি, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি নানা বিষয়ে বিশারদ। তিনি ছিলেন গ্রিক, হিব্রু, ইরানি, সিরিয়াক এমনকি আরবি ভাষায়ও ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন। তিনি নানা বিষয়ে ২৬৫ খানা গ্রন্থ রচনা করেন। তার বইগুলো এখনো বহুল পঠিত।

আল বলখি

মুসলিম জ্যোতির্বিদদের অগ্রগতি ছিল প্রশ্নাতীত। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই মুসলিম জ্যোতির্বিদদের সাফল্যের খোঁজ মিলেছিল। তাদেরই একজন জাফর ইবনে মুহাম্মদ আবু মাশার আল বলখি। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত পারশিয়ান জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক, গণিতবিদ। তিনি আল ফালাকি, আবুল মাশার, ইবনে বলখি নামেও পরিচিত। তার কাজ এখনো প্রশংসনীয়।

এক নজরে সেরা যারা

> রসায়নের জনক — জাবির ইবনে হাইয়ান

> বিশ্বের সেরা ভূগোলবিদ — আল বিরুনি

> আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক — ইবনে সিনা

> হৃদযন্ত্রে রক্ত চলাচল আবিষ্কারক — ইবনুন নাফিস

> বীজগণিতের জনক — আল খাওয়ারিজমি

> পদার্থবিজ্ঞানে শূন্যের অবস্থান নির্ণয়কারী — আল ফারাবি

> আলোকবিজ্ঞানের জনক — ইবনে আল হাইসাম

> অ্যানালিটিক্যাল জ্যামিতির জনক — ওমর খৈয়াম

> সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধারকারী — আল কিন্দি

> গুটিবসন্ত আবিষ্কারক — আল রাজি

> টলেমির মতবাদ ভ্রান্ত প্রমাণকারী — আল বাত্তানি

> ত্রিকোণমিতির জনক — আবুল ওয়াফা

> স্টাটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা — সাবেত ইবনে কোরা

> পৃথিবীর আকার ও আয়তন নির্ধারণকারী — বানু মুসা

> মিল্কিওয়ের গঠন শনাক্তকারী — নাসিরুদ্দিন তুসি

> অ্যালজেবরায় প্রথম উচ্চতর পাওয়ার ব্যবহারকারী — আবু কামিল

> ল অব মোশনের পথপ্রদর্শক — ইবনে বাজ্জাহ

> ঘড়ির পেন্ডুলাম আবিষ্কারক — ইবনে ইউনুস

> পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়কারী — আল ফারগানি

> পৃথিবীর প্রথম নির্ভুল মানচিত্র অঙ্কনকারী — আল ইদদিসি

> বিশ্বের প্রথম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের আবিষ্কারক —আল জাজারি

> সূর্যের সর্বোচ্চ উচ্চতার গতি প্রমাণকারী —আল জারকালি

> বীজগণিতের প্রতীক উদ্ভাবক — আল কালাসাদি

বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটের আদ্যোপান্ত

BB-1 satellite 4তানিয়া তুষ্টি : স্বপ্নের স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু ১ মহাকাশ স্পর্শ করবে আজ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকাল চারটায় (বাংলাদেশ সময় ১১ মে, রাত ৩টা) মহাকাশের উদ্দেশে উড়াল দেবে। স্যাটেলাইট তৈরির কাজ শেষে গত ৩০ মার্চ এটি উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ এর ফ্যালকন ৯ রকেট ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চিং প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে মহাকাশের পথে উড়াল দেবে।এবার এক নজরে দেখে নেওয়া যাক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আদ্যোপান্ত।

মহাকাশ জয়ে বাংলাদেশ

রচিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মহাকাশ জয়ের গল্প। মহাকাশে নিজস্ব মালিকানার স্যাটেলাইট যাত্রার সব বন্দোবস্ত সমাপ্ত করেছে বাংলাদেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু ১। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হবে। উৎক্ষেপণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিটের মধ্যে। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ সফল হলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার সম্প্রসারণ আরও বেগবান হবে। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলাসহ যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তার নতুন মাত্রা যোগ হবে। স্যাটেলাইটভিত্তিক টেলিভিশন সেবা ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগবে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থান করা বাংলাদেশিদের মধ্যে এখন চলছে উৎসবের আমেজ। তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের একটি সরকারি প্রতিনিধি দল সেখানে অবস্থান করছে। আগামী ১৫ বছরের জন্য মহাকাশের স্থায়ী বাসিন্দা হবে ‘বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট’। বাংলাদেশ প্রথম স্যাটেলাইট নিয়ে কাজ শুরু করে ২০০৭ সালে। সে সময় মহাকাশের ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে কক্ষপথ বরাদ্দ চেয়ে জাতিসংঘের অধীন সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে (আইটিইউ) আবেদন করে। কিন্তু বাংলাদেশের ওই আবেদনে ২০টি দেশ আপত্তি জানায়। এরপর ২০১৩ সালে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটের বর্তমান কক্ষপথটি কেনা হয়। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ এই স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। জাতিসংঘের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর আউটার স্পেস অ্যাফেয়ার্সের (ইউএনওওএসএ) হিসাবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত মহাকাশে স্যাটেলাইটের সংখ্যা হয়েছে ৪ হাজার ৬৩৫। প্রতি বছরই স্যাটেলাইটের এ সংখ্যা ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এসব স্যাটেলাইটের কাজের ধরনও একেক রকমের। বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটটি বিভিন্ন ধরনের মহাকাশ যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা হবে। এ ধরনের স্যাটেলাইটকে বলা হয় ‘জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট’। পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে এ স্যাটেলাইট মহাকাশে ঘুরতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মুহূর্তটি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ দেশের সব কটি বেসরকারি টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করবে। দুর্লভ এ মুহূর্ত সরাসরি প্রচারের ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের সব জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সও উৎক্ষেপণ মুহূর্তটি সরাসরি সম্প্রচার করবে। কেনেডি স্পেস সেন্টারের দুটি স্থান থেকে আগ্রহী দর্শনার্থীরা এই উৎক্ষেপণ দেখতে পারবেন। একটি স্থান অ্যাপোলো সেন্টার, উৎক্ষেপণস্থল থেকে দূরত্ব ৬ দশমিক ২৭ কিলোমিটার। উৎক্ষেপণের দৃশ্য কেনেডি স্পেস সেন্টারের মূল দর্শনার্থী ভবন (মেইন ভিসিটর কমপ্লেক্স) থেকেও দেখা যাবে। উৎক্ষেপণস্থল থেকে এটির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের এ মুহূর্তের সাক্ষী হতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল কেনেডি স্পেস সেন্টারে উপস্থিত থাকবে।

বঙ্গবন্ধু উৎক্ষেপণের ধাপ

বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট তৈরি হয়েছে ফ্রান্সের থ্যালাস এলিনিয়া স্পেস ফ্যাসিলিটিতে। স্যাটেলাইটের কাঠামো তৈরি, উৎক্ষেপণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূস্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানটির। স্যাটেলাইটটি তৈরির পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পর্যালোচনা ও হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরের জন্য বেছে নেওয়া হয় বিশেষ কার্গো বিমান। বিমানটি কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চ সাইটে পাঠানো হয়। মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ পরিচালনা, সফল ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কার্যত্রমের জন্য ইতিমধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। নতুন এই কোম্পানিতে কারিগরি লোকবল নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। মার্কিন রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স এই স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালে কেনেডি স্পেস সেন্টারে স্পেসএক্সের লঞ্চ প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ নিয়ে উড়বে ‘ফ্যালকন নাইন’ রকেট।

এই রকেটের রয়েছে চারটি অংশ। ওপরের অংশে থাকবে স্যাটেলাইট, তারপর থাকবে অ্যাডাপটর। এরপর স্টেজ ২ এবং সবচেয়ে নিচে থাকবে স্টেজ ১। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর রকেটের স্টেজ ১ খুলে নিচের দিকে নামতে থাকবে। এরপর চালু হবে স্টেজ ২। পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্টেজ ১ পৃথিবীতে এলেও স্টেজ ২ একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত স্যাটেলাইটকে নিয়ে গিয়ে মহাকাশেই থেকে যাবে। উৎক্ষেপণ দেখতে আগ্রহীদের অপেক্ষা করতে হবে উৎক্ষেপণ স্থানের তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে। সাত মিনিটের কম সময় রকেটটি দেখা যাবে। তার পরপরই উচ্চগতির রকেট চলে যাবে দৃষ্টিসীমার একদম বাইরে।

দুইটি ধাপে এই উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া শেষ হবে। প্রথম ধাপটি হলো লঞ্চ অ্যান্ড আরলি অরবিট ফেইজ (এলইওপি) এবং দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে স্যাটেলাইট ইন অরবিট। এলইওপি ধাপে ১০ দিন এবং পরের ধাপে ২০ দিন লাগবে। উৎক্ষেপণ স্থান থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে যাবে এই স্যাটেলাইট। ৩৫ হাজার ৭০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর রকেটের স্টেজ ২ খুলে যাবে। স্যাটেলাইট উন্মুক্ত হওয়ার পরপর এর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশনে চলে যাবে। এই তিন স্টেশন থেকে স্যাটেলাইটটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এর নিজস্ব কক্ষপথে (১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্পট) স্থাপন করা হবে।

স্যাটেলাইটটি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২০ দিন লাগবে। স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের গ্রাউন্ড স্টেশনে হস্তান্তর করা হবে। স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায়।

স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন কী

স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন বলতে সহজ ভাষায় বলা যায়, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান। এই ব্যবস্থায় শূন্যে উৎক্ষেপিত বিভিন্ন ধরনের স্যাটেলাইট ভূপৃষ্ঠ থেকে বিভিন্ন উচ্চতায় অবস্থান করে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। তথ্যের আদান-প্রদান হয় স্যাটেলাইটের সঙ্গে পৃথিবীতে স্থাপিত কোনো আর্থ স্টেশনের। কোনো ডিভাইসের অথবা একটি স্যাটেলাইটের সঙ্গে আরেকটি স্যাটেলাইটের যোগাযোগ হয়। অর্থাৎ সাধারণভাবে যোগাযোগ বলতে আমরা প্রেরক এবং প্রাপকের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানকে বুঝি। প্রতিটি স্যাটেলাইটের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারিত থাকে। এই সীমানার মধ্যেই স্যাটেলাইটটি ফোকাস করা থাকে এবং তার কাজের পরিসীমাও এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই সীমানাকে বলা হয় ফুটপ্রিন্ট। আবার কিছু স্যাটেলাইট তার সিগন্যালের দিক পরিবর্তন করে কাভারেজ অঞ্চল পরিবর্তনও করতে পারে। মহাকাশে নানারকম স্যাটেলাইটের অবস্থান রয়েছে। এর মধ্যে জিইও স্যাটেলাইট একটি নির্দিষ্ট গতিতে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৬০০০ কিলোমিটার ওপরে থাকে। জিইও স্যাটেলাইটের গড় আয়ু তাই ধরা হয় ১৫ বছর। ব্যবহার করা হয় টিভি ও রেডিও ব্রডকাস্টিং, আবহাওয়ার খবর জানতে এবং পৃথিবীর টেলিফোন ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে।

এলইও স্যাটেলাইটটি ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে কাছে থেকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। হাই কোয়ালিটি টেলিফোন কমিউনিকেশন কোম্পানি এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে।

এই স্যাটেলাইট জিও স্টেশনারি এবং লোয়ার আর্থ স্যাটেলাইটের মাঝামাঝি উচ্চতায় থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গড় উচ্চতা ১০০০০ কিলোমিটার। মাত্র ১২টি মিডিয়াম আর্থ স্যাটেলাইট দিয়েই পুরো পৃথিবীতে সংযোগ দেওয়া সম্ভব যা জিও স্টেশনারির চেয়ে বেশি হলেও লোয়ার আর্থের চেয়ে অনেক কম।

হম্যান স্যাটেলাইটগুলো উপবৃত্তাকার হয়। এটি মূলত জিও স্টেশনারী স্যাটেলাইট দ্বারা গন্তব্যের অরবিটে সিগন্যাল পাঠাতে ব্যবহৃত হয়।

লোয়ার আর্থ অরবিট স্যাটেলাইটও এটি ব্যবহার করে।

প্রোগ্র্যাড স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর ঘূর্ণনের দিকেই ঘুরতে থাকে। এগুলোর অরবিটের সঙ্গে পৃথিবীর কোণ এক সমকোণের চেয়ে কম।

রেট্রোগ্রাড স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর ঘূর্ণনের বিপরীত দিকে ঘুরতে থাকে। এগুলোর অরবিটের সঙ্গে পৃথিবীর কোণ এক সমকোণের চেয়ে বেশি।

পোলার স্যাটেলাইট কেন্দ্রাভিমুখী বলের কারণে এবং সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণের কারণে ক্রমাগত স্যাটেলাইটের ক্ষতি হতে থাকে।

এক নজরে বঙ্গবন্ধু

দেশের প্রথম স্যাটেলাইটটির ওজন তিন দশমিক ৭ মেট্রিক টন। এটি মহাকাশে অবস্থান করবে ১৫ বছর। সর্বমোট খরচ ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। মোট খরচে সরকারি অর্থ ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং বিদেশি অর্থায়ন থাকবে ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশকে এই ঋণ দিয়েছে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি। নিজস্ব কক্ষপথ ১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে স্থাপন করা হবে। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের পর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগবে প্রায় ২০ দিন। আমাদের স্যাটেলাইটে লেখা থাকবে বিবি এবং একটি সরকারি লোগো। বঙ্গবন্ধু ১ এর গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায়। স্যাটেলাইট তৈরির পুরো কাজটি বাস্তবায়িত হয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তত্ত্বাবধানে। তিনটি ধাপে এই কাজ হয়েছে। এগুলো হলো- স্যাটেলাইটের মূল কাঠামো তৈরি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি। বঙ্গবন্ধুু ১ স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। স্যাটেলাইট তৈরির কাজ শেষে গত ৩০ মার্চ এটি উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ এর ফ্যালকন ৯ রকেট ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চিং প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে মহাকাশের পথে উড়াল দেবে। স্যাটেলাইট তৈরি এবং ওড়ানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এ জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে তৈরি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। আর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে রাঙামাটির বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশন।

বিশ্বের স্যাটেলাইট কাহিনী

মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর উৎক্ষেপণ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। উৎক্ষেপিত স্পুটনিক ১ নামের কৃত্রিম উপগ্রহটির নকশা করেছিলেন সের্গেই করালিওভ নামের একজন ইউক্রেনীয়। একই বছর সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে দ্বিতীয় কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক ২ উৎক্ষেপণ করে। স্পুটনিক ২ লাইকা নামের একটি কুকুর বহন করে নিয়ে যায়। অবশ্য উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে লাইকা মারা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনা সফল হয় ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। তাদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ এক্সপ্লোরার ১ এদিন মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়।

ভারতের প্রথম মহাকাশ উপগ্রহ অ্যাস্ট্রোসাট। আবহাওয়া সংক্রান্ত কৃত্রিম উপগ্রহ ভ্যানগার্ড ২। ১৯৫৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এটি উৎক্ষেপিত হয়েছিল। এটি আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠাতে পারত। ১৯৬০ সালের ১ এপ্রিল টাইরোস ১ পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপিত হয়। এটি বিস্তারিতভাবে পৃথিবীর আবহাওয়া সংক্রান্ত ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়। ওই বছরই ২৩ নভেম্বর টাইরোস ২ পৃথিবী থেকে বিচ্ছুরিত ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি পরিমাপ করে এবং আবহাওয়ার ছবিও সংগ্রহ করে। ১৯৬১ সালের ১২ জুলাই নিক্ষিপ্ত টাইরোস ৩ আটলান্টিক মহাসাগরের হারিকেন ইথার নামক ঝড় প্রথম আবিষ্কার করে। এক্ষেত্রে হারিকেনের কারণে যেসব অঞ্চল আক্রান্ত হতে পারে সেসব অঞ্চলকে আগেই সতর্ক করা হয়। এই ধারাবাহিক উপগ্রহমালার অনেক উপগ্রহ নিক্ষিপ্ত হয় যা তাপমাত্রা নির্ণয় করে মহাকাশে ইলেকট্রনের ঘনত্বের পরিমাপ করে। টাইরোস উপগ্রহমালার পর ঈসা এবং তারপর নিঃশ্বাস উপগ্রহমালা মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হয়। ১৯৬৬ সালের ১৫ মে নিক্ষিপ্ত নিঃশ্বাস ২ উপগ্রহ পৃথিবীর উত্তাপের ভারসাম্য পরিমাপ করে। নিঃশ্বাস ১ হারিকেন ডেটার অনুসন্ধান দেয়। মানুষ জীবন ও ধনসম্পত্তির ক্ষতি প্রতিরোধ করার জন্য আবহাওয়া সংক্রান্ত স্যাটেলাইটগুলো হারিকেন, বন্যা ও অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে আগেই সতর্কতা প্রদান করে থাকে। প্রায় সব স্যাটেলাইট মেঘের ফটোগ্রাফ গ্রহণ করে। ম্যাগনেটিক টেপে সংবাদ জমা করে এবং তারপর টেলিমিটার দিয়ে গ্রাউন্ড স্টেশনে রক্ষিত কম্পিউটারে সোজাসুজি প্রেরণ করে। পৃথিবীর ওপর সে সময় অবস্থানকারী মেঘের প্রণালীর ছবি পুনরুৎপাদনে সক্ষম হয়। ২০০৯ সালে ১০ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার কৃত্রিম উপগ্রহ ইরিডিয়াম ৩৩ এবং রাশিয়ার কসমস ২২৫১ উপগ্রহের ধাক্কা লাগে। ঘটনাটি ঘটে সাইবেরিয়ার ৭৮৯ কিলোমিটার ওপরে। কৃত্রিম উপগ্রহের সম্মুখ সংঘাতের ঘটনা এটিই প্রথম।

কৃত্রিম উপগ্রহ এমনভাবে পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান হয়, যাতে এর গতির সেন্ট্রিফিউগাল বা বহির্মুখীন শক্তি ওকে বাইরের দিকে গতি প্রদান করে। কিন্তু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি একে পৃথিবীর আওতার বাইরে যেতে দেয় না। যেহেতু মহাকাশে বায়ুুর অস্তিত্ব নেই, তাই এটি বাধাহীনভাবে পরিক্রমণ করে। কৃত্রিম উপগ্রহগুলো বৃত্তাকারে পরিক্রমণ করে না, তার গতি ডিম্বাকৃতির। টিভি ও বেতারসংকেত প্রেরণ এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহগুলো সাধারণত পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে। পৃথিবী থেকে বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে তথ্য পাঠানো হয়, কৃত্রিম উপগ্রহ সেগুলো গ্রহণ করে এবং বিবর্ধিত করে পৃথিবীতে প্রেরণ করে। কৃত্রিম উপগ্রহ দুইটি ভিন্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ ব্যবহার করে সিগনাল (তথ্য) গ্রহণ এবং পাঠানোর জন্য। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসা সিগনাল অনেক দুর্বল বা কম শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাই প্রথমে ডিশ এন্টেনা ব্যবহার করে সিগন্যালকে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং পরে রিসিভার দিয়ে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয়।

কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর উৎক্ষেপণের সময়ই পর্যাপ্ত জ্বালানি গ্রহণ করতে হয়। কারণ মহাকাশে রিফুয়েলিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে কিছু উপগ্রহ জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি ব্যবহার করে। এদের গায়ে সৌরকোষ লাগানো থাকে, যা ব্যবহার করে থেকে সে সূর্য থেকে তার প্রয়োজনীয় শক্তি গ্রহণ করে। এদিকে বাংলাদেশের তিন শিক্ষার্থীর তৈরি করা প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে উৎক্ষেপণের পর পৃথবীর কক্ষপথে প্রদক্ষিণ শুরু করেছে। ন্যানো স্যাটেলাইটটি পৃথিবী থেকে ৪০০ কিলোমিটার ওপরে অবস্থান করে। পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে সেটি সময় নেয় ৯০ মিনিটের মতো।

সাশ্রয় হবে ১৪ মি ডলার

আমাদের দেশে এখন প্রায় ৩০টি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে আছে। এসব চ্যানেল সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, এসব চ্যানেলের জন্য বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সফল হলে বিপুল পরিমাণ এই অর্থ সাশ্রয় হবে। উপরন্তু বিদেশে ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছেন বিটিআরসি। এই স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২০টি ভাড়া দেওয়ার জন্য রাখা হবে। পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ গঠন করা হয়েছে। এই কোম্পানি স্যাটেলাইটের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থার (আইটিইউ) ‘রিকগনিশন অব এক্সিলেন্স’ পুরস্কারও পেয়েছে।

= = =

বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড ব্রডকাস্টিং’ ক্যাটাগরির এ স্যাটেলাইট। অর্থাৎ, এটি যোগাযোগ এবং সম্প্রচার কাজেই মূলত ব্যবহার করা হবে। এ স্যাটেলাইটে থাকছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার সক্ষমতা। প্রতিটি ট্রান্সপন্ডার প্রায় ৩৬ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গের সমপরিমাণ। অর্থাৎ ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থেকে পাওয়া যাবে প্রায় এক হাজার ৪৪০ মেগাহার্টজ পরিমাণ বেতার তরঙ্গ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট থেকে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনে ব্যবহার করবে। আর ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্য রাখা হবে।

৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২৬টি হচ্ছে কেইউ ব্যান্ডের এবং ১৪টি সি ব্যান্ডের। গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বেতবুনিয়ায় স্থাপিত দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এর মধ্যে গাজীপুর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এবং বেতবুনিয়া বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হবে। এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছে পৃথক একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিবছর অন্যান্য দেশের স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করে। বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হলে এ অর্থ বাংলাদেশেই থেকে যাবে। ফলে বড় অঙ্কের টাকার বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। দেশের বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর স্যাটেলাইট ভাড়াবাবদ ব্যয়ও কমে আসবে। এ ছাড়া স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া যাবে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ। ফলে ব্যান্ডউইথের বিকল্প উৎসও পাওয়া যাবে। এই ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করে দেশের দুর্গম দ্বীপ, নদী ও হাওর এবং পাহাড়ি অঞ্চলে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা চালুও সম্ভব হবে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্বাভাবিক টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও উদ্ধারকর্মীরা স্যাটেলাইট ফোনে যোগাযোগ রেখে দুর্গত এলাকায় কাজ করতে সক্ষম হবেন।

বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার ভুটান, নেপাল ও এশিয়ার অন্য অংশে কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তানের মতো দেশেও ভাড়া দেওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আয় করতে সমর্থ হবে।

= = =

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি ফ্লোরিডার কেপ ক্যানার্ভেল (কেনেডি স্পেস সেন্টার) থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। কাজটি সম্পন্ন হয়েছে আমেরিকার অ্যালান মাস্কের মালিকাধীন স্পেস এক্স কোম্পানির ফ্যালকন রকেটের মাধ্যমে। উৎক্ষেপণের ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মাথায় ১৫ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় আবর্তন পথে নিয়ে যায়। এরপর উপগ্রহটি তার সৌর প্যানেলটি আংশিক প্রসারিত করে। জেট প্রপালসন গতিপথটি ক্রমশ বৃত্তাকার করতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না উপগ্রহটি নিখুঁত বৃত্তাকার জিওস্টেশনারি অরবিট বা ভূস্থির কক্ষপথে সুনির্দিষ্ট স্থানে যথাযথ আবর্তন বেগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে উৎক্ষেপণোত্তর ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় ব্যয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে উপগ্রহটি তার সৌর প্যানেল এবং অ্যান্টেনাগুলো সম্পূর্ণভাবে মেলে দেবে। কক্ষপথের শূন্যতায় সৌর ও মহাজাগতিক বিকিরণে প্রাবল্য, চরম শীত-তাপ অবস্থার মুখোমুখি হবে এ স্যাটেলাইটটি। -১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে + ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার ওঠানামা হবে। এমন বিরূপ পরিবেশের মাঝেও উচ্চ প্রযুক্তিতে নির্মিত এই উপগ্রহটি ১৫ বছরের বেশি সময় থাকবে। এমনকি ১৮ বছর পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এর আওতা এলাকা বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মধ্য-এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে এর পরিসেবা পৌঁছাতে পারবে। এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৭৬৫ কোটি টাকা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্তের ভূপৃষ্ঠের ওপরে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায় ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমায় ক্লার্ক অরবিটে অবস্থান করবে। উপগ্রহটি সুস্থির বিন্দুতে পৌঁছে দীর্ঘ কার্যকালে চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণজনিত জটিলতার ফলে অবস্থানে কিছু বিচ্যুতির মুখোমুখি হবে। সেটি সংশোধনের জন্য সেখানে জেট প্রপালসনের কার্যক্রম আছে। পৃথিবীর ছায়ার কারণে সৌর প্যানেলগুলো প্রতিদিন একটি সময় সূর্যের আলো পাবে না। সেই সময়ের জন্য রিচার্জেবল ব্যাটারির ব্যবস্থাও উপগ্রহটিতে আছে। স্পেস এক্সের তিনটা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে তার গতি নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থির অবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। তারপরই এর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে আসবে। আজকের দিনে যখন এ অঞ্চলে টিভি সম্প্রচারে নতুন ব্যবস্থার প্রচলন হচ্ছে এবং ব্রডব্যান্ড ব্যবস্থার বিরাট উন্নয়ন ও ব্যাপ্তি হতে যাচ্ছে, তখন এ উপগ্রহের ভূমিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি টেলিভিশন কেন্দ্রগুলো এই উপগ্রহের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে প্রোগ্রাম আদান-প্রদান করতে পারবে।

ক্লার্ক অরবিট হচ্ছে ভূস্থির উপগ্রহের কক্ষপথ। এটি বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক ও পদার্থবিজ্ঞানী আর্থার. সি ক্লার্কের নামানুসারে হয়েছে। যোগাযোগ উপগ্রহ বা উপগ্রহের যোগাযোগ ব্যবস্থার ধারণা এসেছে ১৯৪৫ সালে তার এক লেখা থেকে। একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘এক্সট্রা-টেরিস্ট্রিয়াল রিলে’ শিরোনামে। আমরা জানি, পৃথিবী নিজ অক্ষে অর্থাৎ পৃথিবী উত্তর-দক্ষিণ মেরুদ্বয় বরাবর কল্পিত অক্ষকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ঘুরছে, যার ফলেই দিনরাত হচ্ছে, নক্ষত্রগুলোর উদয়-অস্ত হচ্ছে। এ ঘূর্ণনের ফলে পৃথিবীর বিষুবীয় পৃষ্ঠদেশ প্রতি সেকেন্ডে ৪৬৫ মিটার সরে যাচ্ছে। এখন পৃথিবীর ঘূর্ণনের সমান তালে যদি একটি কৃত্রিম উপগ্রহ বিষুব রেখার বরাবর ওপরে ঊর্ধ্বাকাশে নির্দিষ্ট উচ্চতায় (প্রায় ৩৫৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায়) ওই একই কৌণিক দ্রুতিতে সর্বদা ঘুরতে থাকে, তখন তাকে পৃথিবীর বুক থেকে স্থির বলে মনে হবে। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর অক্ষের সাপেক্ষে তার কৌণিক আবর্তন মহাকাশের স্যাটেলাইটের কৌণিক আবর্তন একই থাকবে। ফলে স্যাটেলাইটটি ভূস্থির স্যাটেলাইটে পরিণত হবে এবং ওই কক্ষপথকে ক্লার্ক অরবিট নামে অভিহিত করা হয়। এজন্য উপগ্রহটির বেগ হতে হবে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩.১ কিলোমিটর।

আমাদের ভূস্থির উপগ্রহের অবস্থান ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের যত কাছাকাছি হবে, ততটাই আমাদের সুবিধাজনক হবে এবং যথাসময়ে প্রকল্পটি হলে ৭৪ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশটি পেতাম। যে অবস্থানটি থেকে কার্য সম্পাদন অনেক সুবিধাজনক হতো। আর এতে কোনো অর্থ ব্যয় হতো না। বর্তমানের অবস্থান বা সেগমেন্টটি একটি রুশ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ বছরের জন্য ২২৯ কোটি টাকার বিনিময়ে লিজ নিতে হয়েছে। বর্তমানে আইটিইউ আমাদেরকে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের চাইতে নিকটতর কোনো অবস্থান বরাদ্দ করতে পারেনি। স্যাটেলাইট প্রকল্প ১৯৯৮-৯৯ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যখন নেওয়া হয়েছিল, তাতে যদি ২০০১ সালে বাধা না পড়ত তাতে অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থান পেতাম। বর্তমানে অবস্থানটি তির্যক এবং আমাদের মূল পরিসেবা গ্রহণকারী এলাকা থেকে একটু দূরে হওয়ায় উত্তম অবস্থান নয়। তবে এটাকে বর্তমানে সম্ভাব্য ‘সর্বোত্তম’ বলা হবে অবশ্যই।

অ্যান্টার্ক্টিকায় বরফ গলায় মহাবিপর্যয় !

antarctic ice melting

কার্টুন-রসঃ আগামী দিনে রোবটের সাথে বাতচিৎ

future conversation 1a

future conversation 1b

future conversation 1c

future conversation 1d

future conversation 1e

future conversation 1f

future conversation 1g