আর্কাইভ

Archive for the ‘বাংলাদেশ’ Category

বিদেশী ডক্টরেট ডিগ্রী সংস্কৃতি’র নেপথ্যে…

foreign PhD culture

Advertisements

সমসাময়িক কালের বাণী-চিরন্তনী

bani-torontoni -artbani-torontoni

বদর আউলিয়ার মাজার, চট্ট্রগ্রাম

রম্য-কথনঃ ঢাকা শহর আইস্যা আমার পরান জুড়াইছে…

10 unknown facts about dhaka

কার্টুন-রসঃ জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে চাইলে…

Forma-2.qxdForma-2.qxdForma-2.qxd

(জগা)খিচুড়ী প্রতিযোগিতা ২০১৭ ?!

ad -khichuri challenge

(রোবট) সোফিয়া, তুমিও সাবধান!

robot sofia commentsনিশাত সুলতানা : স্পেনের রানি সোফিয়া ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ভ্রমণে এসেছিলেন। রানি সোফিয়ার স্নিগ্ধ সৌন্দর্য আর অভিজাত ব্যক্তিত্বে দারুণভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম সে সময়। কোনো এক সময় বুঁদ হয়েছিলাম আরেক সোফিয়ায়। সে সোফিয়া হলেন হলিউডি অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন। একসময়ে দুনিয়া কাঁপানো এই ইতালিয়ান গায়িকা ও চলচ্চিত্রাভিনেত্রী আজও আমাদের অনেককে মুগ্ধ করে রেখেছেন। তবে এবার আমি মুগ্ধ হয়েছি অন্য এক সোফিয়ায়। ব্যতিক্রম হলো এই সোফিয়া মানবী নয়, যন্ত্রমানবী। যন্ত্রমানবী এই সোফিয়া বাংলাদেশে এসেছিল সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তথ্যপ্রযুক্তির মেলা ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’-তে অংশ নিতে। সোফিয়া বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই তাকে নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর সোফিয়াকে দেখলাম, মুগ্ধও হলাম। হয়তোবা তাকে যতটা মানবাকৃতিতে দেখব বলে প্রত্যাশা করেছিলাম, সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবে সোফিয়ার বর্তমান এই রূপইবা মন্দ কী! প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্বের উৎকর্ষের এক অনন্য দৃষ্টান্তের নাম সোফিয়া। আমি নিশ্চিত, আর কয়েক বছরের মধ্যেই সোফিয়া সমালোচনাকারীদের মুখে কুলুপ এঁটে আবির্ভূত হবে অন্য এক রূপে এবং অন্য এক সক্ষমতায়।

জানি না, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধিকারী যন্ত্রমানবী সোফিয়ার অনুভূতি আছে কি না বা সে স্পর্শ করলে সাড়া দেয় কি না। তবে এই যন্ত্রমানবী সোফিয়া আমার অনুভূতির জগতে যেভাবে নাড়া দিয়েছে, তা জীবিত কোনো সত্তার চেয়ে কোনো অংশে কম না; বরং বেশি। সোফিয়ার বাংলাদেশে আসার পূর্বাপর ঘটনা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেছে বাংলাদেশে নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কদর্য চিত্রটি। সোফিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত কলাকৌশলসংক্রান্ত বিস্ময়কে ছাপিয়ে বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে এমন কিছু বিষয়বস্তু, যা সমগ্র নারী জাতির প্রতি অবমাননাকর। সোফিয়াকে নিয়ে বেশ কিছু আদিরসাত্মক আলোচনায় নগ্নভাবে বেরিয়ে এসেছে ভোগবাদী ও লোলুপ পুরুষ চরিত্রটি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে রীতিমতো ঝড় উঠেছে সোফিয়ার আদ্যোপান্ত চুলচেরা বিশ্লেষণে। বারবার আলোচনায় এসেছে সোফিয়া দেখতে আদতেই অড্রে হেপবার্নের মত কি না! সে আলোচনায় বাদ যায়নি সোফিয়ার শারীরিক গঠন, চুলবিহীন মাথা, পোশাক, ওড়না, অন্তর্বাস, এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারের ইঙ্গিতও। অনেকেই সোফিয়ার কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এবং মুখের অভিব্যক্তি দেখে যতটা না বিস্মিত হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে তার বিয়ে এবং সন্তান লাভ করার ইচ্ছাসংক্রান্ত কথাবার্তায়। তার এই ইচ্ছা অনেক পুরুষকে আগ্রহী করে তুলেছে সোফিয়াকে বিয়ে করতে কিংবা তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে। ধিক এ রুচিবোধ! ধিক এ মানসিকতা!

যে সমাজে একজন শিশু থেকে বৃদ্ধা নারী ধর্ষণের শিকার হন, সেখানে হয়তো এটাই স্বাভাবিক। এখানে একজন রোবট নারীও বাদ যায় না পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে। এই দেশে এসে সোফিয়াকে মুখোমুখি হতে হয়েছে ‘উইল ইউ ম্যারি মি?/ তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ কিংবা ‘ডু ইউ নো, বয়েজ হ্যাভ আ ক্র্যাশ অন ইউ/ ছেলেরা যে তোমার জন্য পাগল, তা কি তুমি জানো?’—এ-জাতীয় প্রশ্নের। এমন অনেক প্রশ্নেরই উত্তর অজানা ছিল সোফিয়ার। জানি না, সোফিয়ার এই ধরনের অভিজ্ঞতা অন্য কোনো দেশে হয়েছে কি না! সোফিয়ার নির্মাতা বেচারা ডেভিড হ্যানসন হয়তো কখনো ভাবেনইনি যে বাংলাদেশে এসে সোফিয়াকে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। নিরুত্তর সোফিয়ার ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি কি আমাদের বিবেকে সামান্যতম নাড়াও দেয় না? আশ্চর্যজনকভাবে এই প্রশ্নগুলো এসেছে সমাজের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে। তাদের থেকে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রশ্ন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সাধারণ জনগণের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। সোফিয়াকে নিয়ে যৌন উত্তেজক এবং আদিরসাত্মক মন্তব্যের রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলেছে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয়। জানি না, সোফিয়া যন্ত্রমানবী না হয়ে যদি যন্ত্রমানব হতো, তবে সে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতো কি না!

sofia jokes 1আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পারিপার্শ্বিকতা এবং পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা। এই সমাজে নিরাপদ নয় দুই বছরের কন্যাশিশু, কিশোরী, তরুণী, এমনকি ষাট বছর বয়সী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধাও। আজ যন্ত্রমানবী সোফিয়াকেও দেখা হচ্ছে বিকৃত যৌনাকাঙ্ক্ষা পূরণের বস্তু হিসেবে। পুরুষের এই আকাঙ্ক্ষা থেকে নারী রূপধারী যন্ত্রেরও কি মুক্তি নেই! নারী আর কতকাল বস্তুরূপে উপস্থাপিত হবে, উপেক্ষিত হবে তার বুদ্ধিমত্তা, আবেগ আর অনুভূতি? আর কতকাল শুধু কামনার দৃষ্টিতে নারীকে দেখা হবে? সোফিয়াকে বলতে চাই, সোফিয়া, তুমি এদের থেকে দূরে থাকো, সতর্ক থাকো, নিরাপদে থাকো। আমরা চাই না হতভাগা রূপার মতো তোমার ছিন্নবিচ্ছিন্ন ধর্ষিত কৃত্রিম দেহাংশ পড়ে থাক শালবনের নিকষ কালো অন্ধকারে।

নিশাত সুলতানা: কর্মসূচি সমন্বয়ক, জেন্ডার জাস্টিস ডাইভার্সিটি প্রোগ্রাম, ব্র্যাক।