আর্কাইভ

Archive for the ‘বাংলাদেশ’ Category

বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রণযন্ত্র ও সংবাদপত্র

first bd printing pressজোবায়ের আলী জুয়েল : বাংলাদেশে প্রথম কোথায় মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল নির্দিষ্টভাবে তা’ জানা যায়নি। তবে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে বলতে পারি, বাংলাদেশে প্রথম মুদ্রণ যন্ত্রটি স্থাপিত হয়েছিল, ঢাকা থেকে বেশ দূরে আমাদের রংপুরে। এখানে উল্লেখ্য যে, পূর্ববঙ্গের প্রথম দুটি বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা থেকে নয়, রংপুর থেকে। স্বাভাবিকভাবে হওয়ার কথা ছিল “ঢাকা” থেকে। কারণ বাংলার দ্বিতীয় শহর ছিল তখন ঢাকা (কলকাতার পরেই)। এর সমাজতাত্ত্বিক কারণ কি বলতে পারবো না। শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, পত্রিকা দু’টির উদ্যোক্তা ছিলেন অর্থশালী জমিদার এবং তাঁর ছিলেন বিদ্যোৎসাহী। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দু’টি পত্রিকাই সৌখিন কোনো কারণে প্রকাশিত হয় নাই। সংবাদপত্র প্রকাশ ও প্রচারের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তাঁরা মুদ্রণ যন্ত্র ক্রয় করেছিলেন। না হলে দীর্ঘ দিন পত্রিকা দু’টি টিকে থাকতো না। পূর্ববঙ্গের একমাত্র পত্রিকা হিসেবে প্রথমে “রঙ্গপুর বার্তাবহ” এবং তারপর “রঙ্গুপুর দিক প্রকাশ”-কে অন্যান্যরাও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। কলকাতার তৎকালীন প্রধান প্রধান কাগজগুলিতে উদ্ধৃতি করা হতো এ দুটি পত্রিকার সংবাদ।

১৮৪৭ সালের আগস্ট (ভাদ্র ১২৫৪) মাসে রংপুর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল “রঙ্গপুর বার্তাবহ”। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, রংপুর কুন্ডি পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকাটি। তবে অন্যান্য সূত্র থেকে অনুমান করে নিতে পারি যে, কালীচন্দ্র রায় প্রাথমিকভাবে সাহায্য করলেও পত্রিকাটির মালিক ছিলেন এর সম্পাদক গুরুচরণ রায়। ১০ বছর একটানা ব্যবহৃত হয়েছিল মুদ্রণ যন্ত্রটি। তারপর মুদ্রণ যন্ত্রটির ভাগ্যে কি ঘটেছিল জানা যায়নি। অনেকের অনুমান, রংপুরের কাকীনার ভূগোলক বাটির জমিদার শম্ভুচরণ রায় চৌধুরী এটি কিনেছিলেন। কারণ, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রকাশ করেছিলৈন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বাংলা সংবাদপত্র “রঙ্গপুর দিক প্রকাশ” (১৮৬০ খ্রি:)। পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য নতুন মুদ্রণ যন্ত্র হয়তো তিনি আর আমদানী করেননি। নিজ অঞ্চলের মুদ্রণ যন্ত্রটিই কিনে নিয়েছিলেন। “রঙ্গপুর দিক প্রকাশ (১৮৬০ খ্রি:)” এর সম্পাদক ছিলেন মধুসূদন ভট্টাচার্য।

এখন পর্যন্ত যেসব প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণাদি পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে বলতে পারি, ১৮৫৭ সালের আগে পূর্ববঙ্গে ৩টি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায়, একটি রংপুরে যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। বাকী দুটি ঢাকায়। ঢাকার একটি মুদ্রণ যন্ত্র ছিল মিশনারীদের, অন্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। পূর্ব বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাট বা সত্তর দশকে মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হতে থাকে। এ মুদ্রণ যন্ত্রগুলির কেনো ধারাবাহিক ইতিহাস-কোথাও দেখা হয় নাই। সরকারি রিপোর্ট বা গেজেটিয়ারে মাঝে মাঝে দু’একটি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায় মাত্র। ঢাকায় সরাসরি মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৬ সালে।

১৮৫৭ খ্রিন্টাব্দে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল দুটি মুদ্রণ যন্ত্র। কিন্তু ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের একমাত্র রংপুর ছাড়া আর কোথাও মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংবাদ জানা যায় না।

“রঙ্গপুর বার্তাবহ যন্ত্র” চালু হওয়ার সামান্য পরে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল ছাপাখানা। সেটি ছিল ঢাকার প্রথম ছাপাখানাগুলোর অন্যতম। এটি এখন ঢাকা নগর যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কালো রঙ্গের এই প্রাচীন মুদ্রণ যন্ত্রটিতে আভিজাত্য ও প্রাচীনত্ব দুই-ই যেনো মিশে রয়েছে।

১৯ শতকের প্রথম দু’তিন দশকে বাংলাদেশে আরও কয়েকটি মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮২৫ সালের ২২ জানুয়ারি “সমাচার দর্পণ” পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায় যে তখন দেশিয় লোকের পরিচালনাধীন ১১টি ছাপাখানার উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঢাকার প্রথম মুদ্রণযন্ত্র “বাঙ্গলাযন্ত্র” স্থাপিত ১৮৬০ সালে (১৩২৫ বাংলাসনে “ঢাকা প্রকাশ” পত্রিকায় প্রকাশিত)। ১২৬৭ বাংলা সনে ঢাকার সাহিত্য শীর্ষক এক প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে, বাঙ্গলা যন্ত্রের (১৮৬০ খ্রি:) স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র, দীনবন্ধু মৌলিক, ভগবান চন্দ্র বসু (আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর পিতা) ও কাশী কান্ত চট্টোপাধ্যায়।

বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সর্বপ্রথম সাময়িক পত্র হলো মনোরঞ্জিকা (১৮৬০ খ্রি:) এই মাসিক সাময়িক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৪-১৯০৭ খ্রি:)। কবিতা কুসুমাবলী এবং নীলদর্পন ছাপা হয়েছিল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বাবু বাজারে স্থাপিত এই “বাঙ্গলা যন্ত্র” নামক ছাপাখানা থেকে।

first bd printing machine & newspapersপরবর্তীতে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে এর মধ্যে ঢাকায় আরো ৬টি মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল। পূর্ববঙ্গে সে সংখ্যা ছিল ৪টি রংপুর (১৮৪৭ খ্রি:), রাজশাহী (১৮৬৮ খ্রি:), যশোর (১৮৬৮ খ্রি:), গীরিশযন্ত্র (১৮৬৮ খ্রি:) রাজশাহী। সিপাহী বিদ্রোহের সময় লর্ড ক্যানিং মুদ্রাযন্ত্র বিষয়ক আইন প্রণয়ন করলে রঙ্গপুর বার্তাবহ প্রচার রহিত হয়।

“রঙ্গপুর বার্তাবহ” এর সম্পাদক আদালতে এসে জানিয়েছিলেন তিনি আর পত্রিকা প্রকাশ করবেন না। রঙ্গপুর বার্তাবহ এর মুদ্রণ যন্ত্র থেকে সম্ভবত: ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হতে থাকে “রঙ্গুপুর দিক প্রকাশ” ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে সরকারী সূত্র অনুযায়ী জানা যায় ঐ জেলায় মাত্র একটি মুদ্রণ যন্ত্র আছে। সেখানে থেকে প্রকাশিত হয় রঙ্গপুর দিক প্রকাশ (১৮৬০ খ্রি:)

১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে “রঙ্গপুর” দিক প্রকাশের প্রচার সংখ্যা ছিল ২০০-এর মতো (উইলিয়াম হান্টারের গ্রন্থ থেকে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের স্ট্যাটিক্যাল আকাউন্স অব বেঙ্গল এর ৭ম খন্ডে রংপুর তথ্য)।

বৃহত্তর রংপুরে অবশ্য আরো ৪টি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাই। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত বই থেকে জানা যায়, ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম দিকে ৪/৫ মাইল দূরে হরিদেবপুরে ছিল “লোক রঞ্জন শাখা যন্ত্র”। বড়াই বাড়ি থেকে প্রকাশিত বইয়ে মুদ্রাকরের নাম পাওয়া গেছে, কিন্তু মুদ্রণ যন্ত্রের উল্লেখ নাই (সরকারি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী)। কুড়িগ্রামে ছিল বিভাকর যন্ত্র (১৮৯৪ খ্রি:) এবং মাহিগঞ্জ পদ্মাবর্তী যন্ত্র (১৮৯৪ খ্রি:)। তবে অনুমান করে নিতে পারি “লোক রঞ্জন” যন্ত্র আশির দশকে, বাকী ৩টি নব্বই দশকে এবং শেষোক্তটি নব্বই দশকের শেষে স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রংপুরে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থাপিত মুদ্রণ যন্ত্রের সংখ্যা ৬টি। নবাবগঞ্জেও একটি মুদ্রণযন্ত্রের নাম পাই “সরস্বতী যন্ত্র” (১৯০০ খ্রি.)।

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে এন্ডুজের ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয় ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের “এ গ্রামার অবদি বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ”। বাংলা প্রদেশে বাংলা অক্ষরে (ইংরেজি অক্ষরেও) ছাপা প্রথম বই হলো এটি। মুদ্রাকর ছিলেন ইংরেজ চালর্স ইউলিকন্স। বাংলা হরফ তৈরী করেছিলেন তিনি পঞ্চান্ন কর্মকারের সহায়তায়। এভাবেই হ্যালহেড, উইলকিনস্ আর পঞ্চান্ন কর্মকার বাংলা সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছেন।

১৭৮০ খৃস্টাব্দে জেমস্ আগাস্টাক হিকি বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র “বেঙ্গল গেজেট” ছেপেছিলেন।

বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে দেখা যায় “দিগদর্শনই” বাংলায় প্রকাশিত সর্বপ্রথম মাসিক পত্রিকা। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল এটি যশুয়া মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। “দিগদর্শনই” হলো ছাপার অক্ষরে প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র। এটি কেরীর শ্রী রামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে “দিগদর্শন” এক যুগান্তকারী ঘটনা। উইলিয়াম কেরী, জন ক্লাব মার্শম্যান, ফেলিকস্কেরী, জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, তারিণী চরণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তির আন্তরিক প্রচেষ্টায় “দিকদর্শন”… জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছায়।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের নাম ঢাকা নিউজ। ১৮৫৬ সালের ১৮ এপ্রিল এটি প্রকাশিত হয়। এই ইংরেজি সাপ্তাহিকটি বের হতো ঢাকা প্রেস থেকে। ঢাকায় প্রথম বাংলা সংবাদপত্র হলো “ঢাকা প্রকাশ”। ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার এটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১০০ বছর ধরে এই পত্রিকটি বেঁচে ছিল। এমন দীর্ঘায়ু পত্রিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত: দ্বিতীয়টি আর নেই। ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদার। পরবর্তীতে দীননাথ সেন, জগন্নাথ অগ্নিহোত্রী, গোবিন্দ্র প্রসাদ রায় এরাও এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

মুসলমান সম্পাদিত অবিভক্ত বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র হচ্ছে শেখ আলীমূল্লাহ সম্পাদিত “সমাচার সভারাজ্যেন্দ্র”। এটি ১৮৩১ সালের ৭ মার্চ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। “সমাচার সভারাজ্যেন্দ্র” ফারসী ও বাংলা ভাষাতেই প্রকাশিত হতো। এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো ১৫৭ নং কলিঙ্গায়। আর্থিক দৈন্যতার কারণে ১৮৩৫ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

মুসলমান সম্পাদিত বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র হচ্ছে “পারিল বার্তাবহ”। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন আনিছ উদ্দিন আহমদ । ১৮৭৪ সালে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের পারিল গ্রাম থেকে এই পাক্ষিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

পুরোপুরি দৈনিকের নিয়ে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা ছিল “দৈনিক আজাদ”। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর। প্রকাশক ছিলেন মাওলানা আকরাম খাঁ।

বাংলাদেশের এখন যতগুলো দৈনিক পত্রিকা রয়েছে তন্মদ্ধে সবচেয়ে পুরনো পত্রিকা হচ্ছে “দৈনিক সংবাদ” ও “দৈনিক ইত্তেফাক”। দৈনিক সংবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের ১৫ মে। ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী “ইত্তেফাক” বের করেন। তখন এটি ছিল সাপ্তাহিক। “ইত্তেফাক” দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর।

বাঙালীর জাতীয় জীবন ও বিকাশ ধারার ইতিহাসে ছাপাখানা ও সংবাদপত্র হচ্ছে প্রাণ শক্তির উৎসধারা। বাংলা ভাষা ও সংবাদপত্রের ইতিহাসে যে কয়েকজন বৈদেশিক মহান পুরুষ বাঙালী সমাজে প্রাত:স্মরণীয় ও পরম শ্রদ্ধেয় তাঁদের মধ্যে এক মহান পুরুষের নাম পাদরী উইলিয়াম কেরী, তারপরের জনই হলেন যশুয়া মার্সম্যান।

Advertisements

বাংলা অত্যন্ত সুন্দর ও সুমধুর ভাষা

hannah ruth thompsonশেখ মেহেদী হাসান : আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাবিজ্ঞানী ড. হানা রুথ টমসন লন্ডন ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ও আফ্রিকান স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করছেন।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ বিষয়ে তার একাধিক গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা তার বাংলা ব্যাকরণ চমকিত করেছে গবেষকদের। বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য কিছু বইয়ের অনুবাদও করেছেন। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত আছেন।

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা জার্মানিতে। পড়াশোনার একটি পর্ব সেখানেই শেষ করেছেন?

আমার জন্ম হয়েছে জার্মানিতে। সেখানেই আমার বেড়ে ওঠা। জার্মানির সর্বোক ইউনিভার্সিটি থেকে ভাষাতত্ত্বে মাস্টার্স করেছি। তখন আমি ইংরেজি এবং জার্মান ভাষা নিয়ে গবেষণা করছিলাম। ভাষা নিয়ে গবেষণা করতে আমার খুব ভালো লাগে। তারপর ইংরেজি মানুষ কিথ টমসনকে বিয়ে করেছি। বিয়ের পর আমাদের তিনটি সন্তান হয়। ওদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। ১৯৯১ সালে আমার স্বামীর চাকরি হলো বাংলাদেশে ইংল্যান্ডভিত্তিক একটি উন্নয়ন প্রকল্পে। আমরা বাংলাদেশে চলে আসলাম। এখানে এসে বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে গেলাম। কি সুন্দর লাগছিল এই দেশ। এই দেশের মানুষ। বাঙালিদের মুখে অত্যন্ত সুন্দর ও সুমধুর বাংলা ভাষা শুনে সিদ্ধান্ত নেই আমি বাঙালিদের মতো বাংলা ভাষা শিখব।

বাংলা ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহী হলেন কীভাবে?

আমি প্রথম বাংলা শিখতে শুরু করি ১৯৯১ সালে। এর আগে বাংলা ভাষা সম্পর্কে কোনো ধারণা আমার ছিল না। আবার আমি যে বাংলা ভাষা শিখব, তা নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। তবে তখনো আমি আশা করিনি যে এই ভাষাটি আমার এত ভালো লেগে যাবে। বাংলা ভাষার যে সব শব্দ আমার আকর্ষণ করেছিল তার মধ্যে ‘প্রজাপতি’,‘বৃহস্পতিবার’,‘সাধারণত’,‘দুর্ভাগ্যবশত’ ইত্যাদি। এর সাউন্ডগুলো কি সুন্দর! আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, বাংলা অনেক সুন্দর ও জীবন্ত একটি ভাষা। আমরা তখন গুলশান এক নম্বরে থাকতাম। সন্তানদের লালন পালন ছাড়া আমার কোনো কাজ ছিল না। ফার্মগেটের গ্রিন রোডে অবস্থিত একটি ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টারে আমি বাংলা শিখতে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রতিদিন চার ঘণ্টা বাংলা শিখতাম। কিন্তু তাদের নিয়ম আমার ভালো লাগেনি। কারণ ক্লাস রুম খুব ছোট ছিল। আমার সঙ্গে বুড়া দুজন মানুষ ছিল। তারা কখনো কোনো বিদেশি ভাষা শেখেনি। অন্যদিকে আমি ছিলাম ভাষা বিশেষজ্ঞ। তাদের সঙ্গে ভাষা শিখতে আমার একটু অসুবিধা হচ্ছিল। আর শিক্ষাটা চলছিল খুব আস্তে আস্তে। দ্বিতীয় মাস থেকে ক্লাসের চার ঘণ্টার মধ্যে আমি দুই ঘণ্টা ক্লাসে আর বাকি দুই ঘণ্টা অন্য একজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাদাভাবে বসে কথা বলি। এভাবে মোটামুটি দ্রুতই বাংলা ভাষা শিখে যাই। বাংলা শেখা ও জানার মতো উপযুক্ত কোনো বই ছিল না। আমার আগ্রহ ছিল বাংলা ভাষার ভিতরকার সৌন্দর্যগুলো জানা। তখন রাস্তায়, দোকানে,স্টেশনে, বাজারে—বিচিত্র জায়গায় সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাংলা শিখেছি অনেক বেশি।

বাংলা অভিধান ও ব্যাকরণ বিষয়ে বই লেখার তাগিদ আপনার মধ্যে তৈরি হলো কী করে?

আমার ভাবনা ছিল বাংলা ভাষা শিখে একটা চাকরি ধরব। বাংলাদেশে আসার ছয় মাস পর এখানে বান্ধবী রুথের সঙ্গে আমি কাজ করতে চেয়েছিলাম। তখন সে আমাকে বলল,‘তুমি আমার সঙ্গে কাজ করবে না। তুমি বরং একটা বাংলা অভিধান লিখে দাও। তুমি যত তাড়াতাড়ি বাংলা শিখেছ, তেমনভাবে আমরা কেউ পারিনি। আমাদের জন্য তুমি একটা অভিধান লেখো। একটা ব্যবহারিক বাংলা ভাষার অভিধান আমাদের খুব দরকার।’ এটা আমার জীবনে খুব অদ্ভুত একটা ব্যাপার ছিল। তখন আমি এতটা বাংলা শিখিনি যে একটি বই লিখব? রুথের কথাটা ভেবে আস্তে আস্তে মনে হলো, আসলেই কাজটা আমি করতে পারি। কারণ নিজের জন্য আমি শেখার কিছু নিয়ম বানিয়েছিলাম। বাংলা ভোকবলারির বই ছিল। বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ইত্যাদি আলাদা করে লিখে রেখেছিলাম। মনে হলো, আমার নোটগুলো অন্যদের জন্য উপকার হবে।

তারপর বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে প্রথম গবেষণা গ্রন্থ রচনা করলেন?

hannah ruth thompson book coversরুথের কথায় আমি বাংলা ব্যাকরণ রচনায় আগ্রহী হলাম। বিষয়টি অন্যদের জানালে তারা পরামর্শ দিল রবীন্দ্রনাথ পড়তে হবে। অথচ আমি উচ্চমানের কোনো সাহিত্য করতে চাইনি, চেয়েছিলাম সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকরণ। পরে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার প্রধান লেখকদের বই পড়েছি। বুদ্ধদেব বসুর ‘মনের মতো মেয়ে’ উপন্যাস জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছি। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে হয়। কারণ বাচ্চাদের পড়াশোনার সমস্যা হচ্ছিল। তারপর ইংল্যান্ডে বসে বাংলা ব্যাকরণ বইটি লিখি। ১৯৯৯ সালে আমার প্রথম বই ‘এসেনশিয়াল এভরিডে বেঙ্গলি’ প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে। বাংলা একাডেমির তত্কালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক মনসুর মুসা আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। যতটা জানি, আমিই ছিলাম তাদের প্রথম বিদেশি লেখক। বইটা এখন একটু পুরনো হয়ে গেছে, তবে এখনো অনেকের কাজে লাগে। বইটি লিখতে গিয়ে আমি টের পেলাম, বাংলা ভাষা নিয়ে আরও বহু কাজের অবকাশ আছে আর আমি সেটি করতে চাই। মানে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে গবেষণা করতে চাই।

আপনি বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে উচ্চতর একাডেমিক গবেষণা করেছেন। সে বিষয়ে জানতে চাই।

বাংলা একাডেমি থেকে বইটি প্রকাশের পর আমি বাংলা ব্যাকরণের বই পড়তে শুরু করি। কিন্তু কোনো বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের মধ্যেই আমার অজস্র প্রশ্নের উত্তর মিলছিল না। আমি যা জানতে চাই, তা নিয়ে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে বুঝে নিতে হচ্ছিল। তখন লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান অধ্যাপক ড. উইলিয়াম রাদিচির সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি বললেন, তুমি আমার অধীনে পিএইচডি ভর্তি হয়ে যাও। ১৯৯৯ সালে ‘সিলেক্টিভ বাংলা গ্রামেটিক্যাল স্টাকচার’ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করি। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করব। আমার মাথায় বাংলা ভাষা ছাড়া আর কিছু ছিল না। চার বছর পর পিএইচডি ডিগ্রি হলো।

লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে শিক্ষকতা শুরু করলেন কখন?

পিএইচডি গবেষণার মাঝে আমি সোয়াসে বাংলা ভাষা শেখাতাম। ২০০২ সাল থেকে লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের নিয়মিত অধ্যাপক হিসেবে কাজ করি। দশ বছর শিক্ষকতার পর কাজটি ছেড়ে দেই। তারপর আমার স্বামীর সঙ্গে ২০১২ সালে সিয়ারালিওনে চলে যাই। ওদের ভাষা নিয়েও একটি গবেষণা করি। সেখানে বাঙালিদের নিয়ে বাংলা আড্ডার ব্যবস্থা করেছিলাম। আমরা সপ্তাহে একদিন বাঙালিদের নিয়ে বসতাম, বাংলা ভাষায় কথা বলতাম। পশ্চিম আফ্রিকার দেশে বসেও আমি বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেছি।

বিভিন্ন দেশের গবেষকরা যেখানে বাংলা ভাষা, প্রাচীন ও বাচনিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন আপনি ব্যাকরণ ও অভিধান বেছে নিলেন কেন?

বিদেশি অনেকেই বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন। অন্য কোনো ভাষার ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করার জন্য একটা বিশেষ রকমের সাহস দরকার। তা ছাড়া সাহিত্য আমার কাছে একটা সাগরের মতো। সাহিত্য নিয়ে সারা জীবন আলোচনা করা সম্ভব। এই সাগরের মধ্যে আমরা ডুবে যাই। পায়ের তলায় কোনো মাটি পাই না। ভাষা আর ব্যাকরণ নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, নতুন কিছু ধরতে পারি, আমি যা বুঝতে পেরেছি, তা অন্যদের কাছে বুঝিয়ে বলতে পারি। আমার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, আমার বিদেশি ছাত্রদের জন্য কার্যকরী একটা বই লেখা, যাতে তারা ভালোভাবে বাংলা ভাষাটা শিখতে পারে। বাংলা শিখতে চাইলে যে পদ্ধতি বা নিয়মের প্রয়োজন হয়, তা আমি কোথাও খুঁজে পাইনি। তাই নিজের বিবেচনায় আমি প্রচুর উদাহরণ সংগ্রহ করেছি, ভাষা বিশ্লেষণ করেছি, আর কাজটাকে আপন করে নিয়েছি। এটাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।

বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান রচনার সময় আপনি কী কী সমস্যার মুখে পড়েছিলেন?

সমস্যার। যেমন ধরা যাক, ‘নয়’ আর ‘নেই’-এর পার্থক্য কী? কেন আমরা বলি, ‘আমি চিঠিগুলো পাচ্ছি’, আবার একই সঙ্গে বলি, ‘আমার ভয় পাচ্ছে’? কেন বলি, ‘এই কাজ করা দরকার’, কিন্তু ‘এই কাজ করার দরকার নেই’? আমি জানি, প্রতিটি ভাষা আর তার ব্যাকরণের মধ্যে একটা যুক্তি আছে। বাংলা ভাষার মধ্যে সেই যুক্তিটা আমি বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে চেষ্টা, ধৈর্য আর অনেক সময় লাগে। নিজের ধারণাগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে সংশোধন করতে হয়; ঠিক করতে হয় নিজের ভুলগুলো। এভাবে ব্যাকরণের বেলায় যা অস্পষ্ট ছিল, আস্তে আস্তে সেটি স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সব সময় অবশ্যই সহজে উত্তর পাওয়া যায় না। তখন প্রশ্নগুলোকে ঘিরে একটা উপায় বানাতে হয়। সেসব বিশ্লেষণ করতে আমার খুব মজা লাগে।

আপনার নিজের লেখা বাংলা ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব কী?

আমার একটা সুবিধা এই যে আমি বাইরে থেকে এসেছি। ফলে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার ইতিহাস কিংবা সাধু ভাষা—এসব নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে হয়নি। আধুনিক ভাষার মধ্যে কী আছে, আধুনিক বাংলা ভাষার গঠনটা কেমন—আমি শুধু সেটাই বুঝতে চেষ্টা করছি। আর যাঁরা বাংলা শিখতে চান, তাঁদের জন্য আমি একটা উপায় ঠিক করতে চেয়েছি। বাংলা ভাষাটা তো আমি নিজেই শিখেছি। ফলে বাংলা ভাষা শিখতে গেলে কী কী সমস্যা হয়, কী কী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—তা আমি জানি। এই প্রেক্ষাপটটিই হয়তো আমার লেখা বাংলা ব্যাকরণের একটা বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের ব্যাকরণ চর্চা নিয়ে আপনার অভিমত কী?

বাংলাদেশে ব্যাকরণ বইয়ে উদাহরণগুলো অনেক বছর পুরনো। বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের চিন্তাগুলো কেমন একটা ফানুসের ভিতরে আটকে আছে। তাদের গবেষণা ঐতিহাসিক। তারা বাংলা ভাষা বুঝানোর জন্য সংস্কৃত থেকে উদাহরণ দেন। আমি মনে করি, স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের মাথায় সংস্কৃত থাকে না। ভাষা তো জীবিত একটা জিনিস। ভাষার ভিতরে পরিবর্তন হতে থাকে। সেই পরিবর্তন থেকে ব্যাকরণের বর্ণনা ও বিশ্লেষণে নতুন বিবেচনা নিয়ে আসতে হয়। নইলে জীবিত ভাষা ও ব্যাকরণের মধ্যে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ে। এখানে স্কুলের ব্যাকরণ বইয়ে সাধারণত দুটো অংশ দেখেছি ব্যাকরণ আর রচনা। রচনা অংশগুলোতে প্রতি বছর নতুন বিষয় ঢুকে পড়ে। কিন্তু ব্যাকরণ অংশে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই নতুন উপায় বের করতে হবে। বাচ্চাদের মুখের ভাষা নিয়ে ব্যাকরণ আরম্ভ করতে হবে। তা হলে বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে।

বর্তমানে কোনো গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকারের সঙ্গে একটি যৌথ গবেষণা করছি। বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা রাউটলেজ প্রকাশিত একটি বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের কাজ করছি।

কার্টুনঃ আধুনিক জীবন-যাপন…

these days 1athese days 1bthese days 1c

জ্ঞান সাগরের আরেক নাম ইমাম আবু হানিফা (রহ:)

আতিকুর রহমান নগরী : কুফা নগরী। ১১০ হিজরির শুরুর দিকে সেখানে তৎকালিন সময়ের বিশ্বনন্দিত, জগৎখ্যাত বড়বড় আলেম-উলামা ও ফুকাহাদের মাজমা বসতো। বিদগ্ধ মুফতি, মুহাদ্দিস, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও ব্যাকরণবিদদের পদচারনায় মুখর ছিল সেই মাজমা। বারো অথবা তেরো বছরের অসাধারণ মেধা ও স্মৃতি শক্তির অধিকারী, অদম্য জ্ঞান পিপাসু নুমান নামক একজন বালক প্রথমে প্রিয়নবী সা.’ র অন্যতম খাদেম ও জলিলুল কদর সাহাবী হযরত আনাস বিন মালেক রা.’র তত্বাবধানে পবিত্র কুরআন শরীফ হেফজ করে ইলমে কালামের দিকে মনোনিবেশ করেন। অত:পর হিজরী ১০০ সালে হযরত হাম্মাদ রা.’র দরসগাহে ভর্তি হয়ে একাধারে ১০ বছর ইলিম অর্জন করেন। পরে তিনি কুফা নগরীর আলেম-উলামা, ফুকাহাদের মাজমায় পা রাখেন। কুফা তখনকার সময়ে ইসলামি নগর হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। 

সেই কুফায় আগমনকারী নুমান নামের অদম্য জ্ঞান আহরনকারীই পরবর্তীতে ইমামে আযম হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। সেই নুমান বিন সাবিতই হানাফি মাযহাবের গুরু। যাকে সমস্ত জাহানবাসী ইমাম আবু হানিফা নামেই জানে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.’র মূলধারার শিষ্য হযরত হাম্মাদ রা. ছিলেন তৎকালীন একজন ফিকহ শাস্ত্রের গুরু। তাঁর কাছ থেকে ইমাম আবু হানিফা রাহ. জ্ঞান আহরণ করেন। ফিকহ শাস্ত্রের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন কুফা থেকে বিজ্ঞ ফকিহদের কাছ থেকে। ১২০ হিজরিতে হযরত হাম্মাদ রা. ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন হযরত ইমাম আবূ হানিফা। এরপর থেকে ইমাম আযম রাহ.’র নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে কুফার ইলমি মারকায। যাকে তৎকালীন ফোকাহায়ে কেরাম ‘‘কেয়াসের প্রতিষ্ঠান’’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আমিরুল মুমিনুন হযরত অবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, হাফস ইবনে গিয়াস, ইমাম আবু ইউসূফ, ইমাম যুফার , হাসান ইবনে যিয়াদ, প্রমুখরা ছিলেন ইমাম আবূ হানিফা রা.’র মজলিসের মধ্যমনি।

ইমাম আবু হানিফা রাহ.। একটি সংগ্রামের নাম। একটি আলোকরশ্মির নাম। ইলমের একটি সাগরের নাম। একটি চেতনার নাম। কুরআন-হাদিস, ইজমা-কিয়াসের সমষ্টির নাম। জিহাদময় জীবনের নাম ইমাম আবু হানিফা। ইমাম আবু হানিফা তিনিই যার মাসআলার সমাধান দেখে চিনেছেন ইমাম আওযায়ী। যার সম্পর্কে ইমাম মক্কি ইব্রাহিম রাহ. বলেছেন, ‘যার জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিহাদ।’ দারুল হিজরতের (মদীনার) ইমাম মালেক রাহ. তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘যদি এই লোকটা কাঠের পালঙ্গকে যুক্তি দিয়ে স্বর্ণ বানাতে চান, পারবেন’।

যিনি সরাসরি চারজন সাহাবি এবং প্রায় চার সহস্রাধিক তাবেঈ মাশায়েখের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহন করেছেন। ফিকহ শাস্ত্রের অদ্বিতীয় পন্ডিত ছিলেন যে ইমাম আবু হানিফা। তাছাড়া ইলমে হাদীস, ইলমে কালাম, ইলমে বালাগাত, ইলমে নাহু, ইলমে সরফ, ইলমে তাফসীর প্রভৃতি বিষয়ে যার তুলনা তিনি শুধু নিজেই। সেই মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধর্মের নামে আগাছা লা-মাযহাবিরা বলে তিনি নাকি মুহাদ্দিস ছিলেন না। হাস্যকর এসব কথার প্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই তোমার কথা মতো ধরে নিলাম ইমাম আবু হানিফা মুহাদ্দিস ছিলেন না ঠিক। তিনি ছিলেন উস্তাযুল মুহাদ্দিসীন। শতশত মহান ব্যক্তিরা তাঁর কাছ থেকে হাদিসের দারস গ্রহণ করে স্বীয় যুগে জগৎখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন আটশত আশিজন শিষ্যের উস্তায। আমর ইবনে মাইমুনা, ইমাম যুফার, সুফিকুল শিরোমণি দাউদ তায়ী, হাববান ইবনে আলী, কাসেম ইবনে মায়ান, আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ., কযিউল কুযাত ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ বিদগ্ধ মুফতি-মুহাদ্দিস ও ফকিহবিদদের উস্তাদ ছিলেন ইমাম আযম রাহ.।

সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদিস সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। এবং ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র জ্ঞান সম্পর্কেও তাদের কোন ধারনা নেই। ইমামে আযম আবুূ হানিফা রাহ. যেভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন আজ পর্যন্ত কেউ এতসুন্দর সামাধান দিতে পারেনি এবং তাঁর প্রদত্ত কিয়াসগুলোর খন্ডন আজও কেউ করতে পারেনি।

ইমাম আওযায়ী রা. যিনি ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র সমকালিন মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহ. কে বললেন,‘কুফায় গজিয়ে উঠা এই বেদাআতির পরিচয় কি? যাকে আবু হানিফা উপনামে ডাকা হয়’? ইমামে আযম আবু হানিফা রাহ.’র প্রাণপ্রিয় শিষ্য ইবনে মুবারক এ কথা শুনে চুপ থাকেন, এ সময় তিনি কিছু জটিল ও দুর্বোধ্য মাসআলা বর্ণনা করেন এবং সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়ার দিক নির্ণয় করেন। ইমাম আওযায়ী রা. বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলেন, কে দিয়েছেন এই ফতোয়া? ইবনে মুবারক বলেন ইরাকের জনৈক শায়খ যার সাক্ষাতে এই মাসআলা ও ফতোয়া জেনেছি। ইমাম আওযায়ী রা. বলেন যিনি এই ফতোয়া দিয়েছেন তিনি মাশায়েখকুল শিরমণি। যাও তার কাছে গিয়ে আরো ইলিম হাসিল করো। ইবনে মুবারক বললেন, হযরত! সেই শায়খের নাম আবু হানিফা। পরবর্তীতে মক্কায় ইমামে আযমের সাথে ইমাম আওযায়ী রা. এর সাক্ষাৎ হয় এবং অনেক মাসআলা নিয়ে আলোচনা (তর্ক-বিতর্ক) হয়। অবশেষে ইমাম আওযায়ী রাহ. ইমাম আবু হানিফা রাহ. সম্পর্কে বলেন, ‘লোকটার গভীর জ্ঞান ও অসামান্য বুদ্ধি বিবেকের প্রতি খামোখাই সমালোচনার তীর ছুড়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। সত্যি বলতে কি আমি প্রকাশ্য ভুলের মাঝে ছিলাম। মহামানবের চরিত্রে এলজাম দিয়েছিলাম। লোকমুখে যা শুনেছি এর থেকে তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

লোকমুখে শুনে ইমাম আওযায়ী রা. ইমাম আবূ হানিফা রা. সর্ম্পকে সঠিক ধারনা পোষন করেননি। কিন্তু যখন ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র গভীর জ্ঞানের কথা শুনলেন তখন তিনি তাকে মাশায়েখকুল শিরমণি বলেছেন। আর আজকে যারা ইমাম আবূ হানিফা রাহ. সর্ম্পকে মন্তব্য করার মত দু:সাহস করে তাদের অস্তিত্ব ঠিক আছে কিনা খবর নাই। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা আধুনিক যুগের সংস্কারক।

অতএব পরিশেষে বলতে চাই যারা বলেন ইমাম আবু হানিফা রাহ. হাদিস জানতেন না। তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন না। তাদের এসব কথার কোন ভিত্তি নেই। বরং যারা এসব কথা বলে তাদের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা যেখানে শেষ ইমাম আযম আবু হানিফা রাহ.’র জ্ঞান-চিন্তাভাবনা সেখান থেকে শুরু। ইমাম আবু হানিফা রাহ. সম্পর্কে কোনো কিল ও ক্বাল না করে বরং তাঁর প্রদত্ত মাসআলা তথা হানাফি মাযহাব অনুসারে নিজের জীবনকে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহিহ সমুঝ দান করুন। আমিন।

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধীরাই পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গের জন্য উন্মত্ত

undivided bengal mapমোহাম্মদ আবদুল গফুর :গত ১৬ অক্টোবর সোমবার যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দেশে পালিত হয়ে গেল বঙ্গভঙ্গ দিবস। ১৯০৫ সালে বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে এই দিনে প্রধানত শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তদানীন্তন বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীকে বিভক্ত করে ঢাকা রাজধানীসহ ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করা হলে দীর্ঘ অবহেলিত মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার উন্নয়নের কিঞ্চিৎ সুবিধা হবে বিবেচনা করে এ অঞ্চলের তদানীন্তন অবিসম্বাদিত জননেতা নবাব সলিমুল্লাহ এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পক্ষান্তরে এর ফলে কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদাররা পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এর বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন সৃষ্টি করে বসেন। 

ইতিহাস পাঠকদের জানা থাকার কথা, ১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের মধ্যদিয়ে এদেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত নব্য শাসকদের একটা নীতিই হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জমিদারী, আয়মাদারী, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রভৃতি সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে বেছে বেছে মুসলমানদের উৎখাত করে যেসব স্থানে ইংরেজ অনুগত হিন্দুদের বসানো। পলাশী বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক বছর পর ১৭৯৩ সালে পূর্বতন ভূমি-নীতি বদলিয়ে চিরস্থায়ীবন্দোবস্ত নামের নতুন ভূমি ব্যবস্থার মাধ্যমে যে নব্য জমিদার গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয় তার সিংহভাগই ছিল ইংরেজ অনুগত হিন্দু।

মুসলমানরাও সাতসমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে আসা ইংরেজদের শাসন কিছুতেই সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। মীর কাসিমের যুদ্ধ, মজনু শাহেব নেতৃত্বাধীন ফকীর আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধ, হাজী শরীয়তুল্লাহ-দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন প্রভৃতি ছাড়াও মহীশুরের হায়দার আলী-টিপু সুলতানদের লড়াই, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর নেতৃত্বাধীন জিহাদ আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত বিভিন্ন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন হারানো স্বাধীনতা ফিরে পেতে। কিন্তু বৃহত্তর প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের অসহযোগিতা এবং ইংরেজ শাসকদের প্রতি তাদের সমর্থনের ফলে মুসলমানদের এসব লড়াইয়ের প্রত্যেকটাতে তাদের পরাজয় হয়ে পড়ে এক অনিবার্য বাস্তবতা।

পক্ষান্তরে নব্য শাসকদের প্রতি এদেশের হিন্দু নেতৃবৃন্দের সমর্থনের ফলে ইংরেজরা তাদের স্বাভাবিক মিত্র হিসাবেই দেখতে পেয়েছেন এতদিন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ফলে এই মিত্রদের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়াতে ইংরেজ শাসকরা বিব্রত বোধ করতে থাকেন এবং মাত্র ছয় বছরের মাথায় ইংরেজ শাসকরা বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষণা করে পুরাতন মিত্রদের মনোরঞ্জনের প্রয়াস পান। বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষিত হওয়ায় পূর্ববঙ্গের অবিসম্বাদিত জননেতা নবাব সলিমুল্লাহ অত্যন্ত বিক্ষুদ্ধ হন। তাঁর ক্ষোভ প্রহসনের লক্ষ্যে তাঁর অন্যতম দাবী ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয় ইংরেজ সরকার।

কিন্তু এতেও কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের নিদারুন অসন্তোষ। বঙ্গ-ভঙ্গের বিরুদ্ধে তাদের যুক্তি (কুযুক্তি!) ছিল এর দ্বারা বঙ্গ-মাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ হবে। ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাদের কুযুক্তি ছিল এর দ্বারা নাকি বঙ্গ-সংস্কৃতি দ্বিখন্ডিত করার মত অন্যায় করা হবে। কিন্তু তাদের আরেকটি বক্তব্যে তাদের আসল মতলব ফাঁস হয়ে যায়। তাদের এ বক্তব্য ছিল : পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত মুসলমান চাষা-ভূষা, তাই তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ পূর্ববাংলার মানুষরা অশিক্ষিত চাষাভূষা, তারা অশিক্ষিত চাষাভূষাই থাক, তাদের শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই। তাদের এই বিদ্বেষী মনোভাবের দরুন প্রতিশ্রুতি ঘোষণার দীর্ঘ ১০ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯২১ সালে।

এসব ছিল ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাশের আগের কথা। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাশের পর অবস্থা অনেকটাই পালটে যায়। ঐ আইনে প্রদেশের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনেকটাই হস্তান্তরিত হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় প্রথম ১৯৩৭ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতেই এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে এরপর মুসলিম প্রধান এ প্রদেশে মুসলমানদের হাতেই সরকারের নেতৃত্ব থাকবে। বাস্তবেও দেখা যায় সেটাই। ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনআমলের শেষ দিনগুলোতে প্রথমে এ. কে. ফজলুল হক, তার পর খাজা নাজিমুদ্দিন, সর্বশেষে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলায় প্রাদেশিক প্রধান মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে সম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসনের অবসান হয়। এ সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সারিতে অবস্থান ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের। প্রথমটির দাবী ছিল ভারতকে অবিভক্ত কাঠামোতে স্বাধীনতা দিতে হবে। দ্বিতীয়টি অর্থাৎ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের দাবী ছিল : সমগ্র ভারতবর্ষকে হিন্দু ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে বিভক্ত করে উত্তর পশ্চিম ও পূর্ব দিকের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় একাধিক স্বতন্ত্র স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুসলিম লীগের এই প্রস্তাবই ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাস্তবতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও বৃটিশ সরকার এই লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই উপমহাদেশের স্বাধীনতার কাঠামো নির্বাচনে সম্মত হয়।

যদিও এই লাহোর প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তান শব্দ ছিল না, মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার খবর পর দিন হিন্দু পত্রিকাসমূহ প্রকাশিত হয় “পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত” এই শিরোনামে। পরবর্তীকালে মুসলিম লীগও লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত স্বাধীন রাষ্ট্রকে পাকিস্তান বলে স্বীকার করে নিয়ে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে পাকিস্তান আন্দোলন হিসাবেই গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালে বাস্তবে এ রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তা পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসাবেই পরিচিতি লাভ করে।

দেড় হাজার মাইলের অধিক দূরত্বে অবস্থিত ভৌগোলিকভাবে বৈরী-রাষ্ট্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুই ভূখন্ড মিলে একটি রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে প্রায় নেই বললেই চলে। এই বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় রেখেছিলেন লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক ও সমর্থক নেতারা। তাই লাহোর প্রস্তাবে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখিত ছিল যে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে যে একাধিক রাষ্ট্র গঠিত হবে তা হবে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম। তবে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ টিকেটে নির্বাচিত আইন সভার সদসদের নিয়ে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী কর্তৃক উত্থাপিত ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়, লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত একাধিকের বদলে আপাতত পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র হিসাবেই পরিচালিত হবে। জনাব সোহরওয়ার্দী তাঁর এই প্রস্তাব উত্থাপনকালে যে ভাষণ দেন, তাতে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছেন, পাকিস্তানই আপনার শেষ দাবী কিনা। এ প্রশ্নের কোন জবাব আমি দেব না। তবে একথা আমি অবশ্যই বলব বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানই আমার প্রধান দাবী।” অর্থাৎ তিনি অদূর ভবিষ্যতে উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পুর্বাঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাতিল করে দিলেন না।

তাছাড়া ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামের দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে মুসলিম লীগের জনাব হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী ও জনাব আবুল হাশিম এবং কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতার যৌথ উদ্যোগে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলে। বিশস্ত সূত্রে জানা যায়, এই উদ্যোগের প্রতি মুসলিম লীগের নেতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহরও সমর্থন ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল প্রমুখ অবাঙ্গালী নেতৃবৃন্দ এবং হিন্দু মহাসভার বাঙ্গালী নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর প্রবল বিরোধিতার কারণে এই উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সে সময় শেষোক্ত বাঙালী নেতা (শ্যামাপ্রসাদ) এমনও বলে ছিলেন, ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ হতেই হবে। নইলে বাংলার হিন্দুরা চিরতরে বাঙ্গালী মুসলমানের গোলামে পরিণত হবে। এতে কী প্রমাণিত হয়? প্রমাণিত হয় যে বাঙালী মুসলমানের চাইতে অবাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্ব তাঁর কাছে অধিক কাম্য ছিল।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধীরাই ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। যারা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ বলে বিবেচনা করতেন, তারা ১৯৪৭ সালে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদকে অবশ্য পালনীয় পূণ্য বলে বিবেচনা করেন কি শুধু তাদের মুসলিম বিদ্বেষের কারণে? আসলে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ তাদের কাছে কখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা রাজধানীসহ “পূর্ব বঙ্গ ও আসাম” নামের নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ব বঙ্গে অবস্থিত কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কায়ই তারা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করে ছিলেন। বঙ্গভঙ্গকে যদি তারা বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপই বিবেচনা করতেন, তা হলে মাত্র তিন দশক পর সাতচল্লিশে এসে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ করতে তারা মরিয়া হয়ে উঠতেন না।

সাতচল্লিশে এসে তারা বাঙ্গালী মুসলমানের পরিবর্তে অবাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্বকে বরণ করতে সার্বভৌম বাংলা আন্দোলনকে যেভাবে ব্যর্থ করে দেন, তাতে প্রমাণিত হয় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তারা যে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের অভিযোগ এনেছিলেন তা ছিল ভূয়া, আসলে পূর্ববঙ্গে অবস্থিত জমিদারীতে কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাই ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার মূল কারণ।

সাতচল্লিশে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে বাঙ্গালীদের বৃহত্তর সর্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরোধিতা করে অবাঙ্গালী ভারতীয় নেতৃত্বকে বরণ করে নেয়ার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের কথা ছিল একটা ডাহা মিথ্যা বাহানা। আসলে তারা চেয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নেহায়েৎ পার্থিব স্বার্থেই যে সেদিন তারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন, বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপের ভয়ে নয়, তা প্রমাণিত হয় সাতচল্লিশে যখন তারা ভঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জন্য উম্মত্ত হয়ে ওঠেন। আসলে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের বিষয় ১৯০৫ সালে তাদের কাছে কখনও আসল বিবেচ্য ছিল না। পূর্ববঙ্গে অবস্থিত জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কাই তাদের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ঠেলে দিয়েছিল। সাতচল্লিশে ঐরকম কোন আশঙ্কা না থাকায় তারা নিজেরা তথাকথিত বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জন্য উম্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন।

জহুরুল ইসলাম— একজন কিংবদন্তির কথা

zohurul islam 45অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদুল আজিজ : অল্প বয়স থেকেই অনেকবার শুনে শুনে মনের ভিতরে গেঁথে গিয়েছিল একটি নাম ‘জহুরুল ইসলাম’। তখন কেবল জানতাম তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি এবং সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

অনেক বছর পরে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি যোগ দিলাম জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে। সেটা ১৯৯৪ সাল। কলেজটি তার নিজ গ্রাম ভাগলপুরে যা বাজিতপুর উপজেলা এবং কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। সম্পূর্ণ শান্ত-সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে বিশাল ক্যাম্পাসে তখন হাসপাতাল ও কলেজের বিভিন্ন ইমারত নির্মাণের কাজ চলছে। এখানে আসার পর মরহুম জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে যতই জানতে পারি ততই বিস্ময়ে অবাক হতে থাকি। এ মানুষটি সম্পর্কে অল্প কথায় সবকিছু লেখা সম্ভব নয়, তবুও সাহস করে তার জীবন-চরিত ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

জহুরুল ইসলাম এ জনপদের একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি এবং শিক্ষাসহ সামাজিক উন্নয়নের প্রায় সর্বক্ষেত্রে নজিরবিহীন অনন্য উদাহরণ সৃষ্টিকারী এ বিস্ময়কর প্রতিভার জন্ম ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর পৌরসভার ভাগলপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

তার বাবার নাম আফতাব উদ্দিন আহমেদ এবং মাতা রহিমা খাতুন।

জহুরুল ইসলামের শৈশব কেটেছে ভাগলপুর গ্রামে। স্থানীয় স্কুলে ৫ম শ্রেণি পড়ার পর সরারচর শিবনাথ হাইস্কুল ও পরবর্তীতে বাজিতপুর হাইস্কুলে পড়ালেখা করেন। চাচা মুর্শিদ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার পর রিপন হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর বর্ধমান জেলার একটি কলেজে ভর্তি হলেও চলে আসেন মুন্সীগঞ্জে এবং পড়ালেখা করেন হরগঙ্গা কলেজে। মেধাবী জহুরুল ইসলামের ছিল শিক্ষার প্রতি অসীম আগ্রহ কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও পারিবারিক দায়িত্ববোধ থেকে উচ্চশিক্ষা পরিহার করে চাকরিতে যোগ দেন ১৯৪৮ সালে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তৎকালীন সিঅ্যান্ডবিতে স্বল্প বেতনে যোগদান করেন। কিন্তু প্রখর দুরদর্শিতা ও অদম্য সাহসের অধিকারী এ মানুষটি নিজের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে নিজেই বড় কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। অল্পদিনের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করলেও অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে নিজের অধ্যবসায় ও প্রজ্ঞাবলে তার কর্মপরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। ‘বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন’ তার  প্রতিষ্ঠিত ইসলাম গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান। তৎকালীন পাকিস্তানে যেখানে সব ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের একচেটিয়া দখলে, সেই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে থেকেও জহুরুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন প্রথম শ্রেণির মানসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে। এ কোম্পানির প্রথমদিককার উল্লেখযোগ্য কিছু স্থাপনা তৈরির নিদর্শন হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশ ব্যাংক, পুরনো হাই কোর্ট ভবন, সুপ্রিম কোর্ট ভবন, গণভবন ইত্যাদি। অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং চ্যালেঞ্জিং মনোভাবের অধিকারী এ ব্যক্তিত্ব স্বল্প সময়ের কার্যাদেশে তৈরি করেন এমপি হোস্টেল, পুরনো সংসদ ভবন, খাদ্য গুদাম, বিভিন্ন সড়ক যা নির্মাণ শিল্পে এক বিরল দৃষ্টান্ত। তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশে-বিদেশে। সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গড়ে তোলেন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এবং বিস্তৃত করেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মপরিধি। দেশের মানুষের আবাসন সংকট নিরসনে প্রতিষ্ঠা করেন ইস্টার্ন হাউজিং যা এ খাতে প্রথম এবং অদ্বিতীয়। প্রতিষ্ঠা করেন ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন যা বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের অগ্রদূত। কৃষি উন্নয়নে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন মিলনার্স পাম্প ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ধীরে ধীরে তার কর্মকাণ্ড আরও বিস্তার লাভ করে। কয়েকটি পাটকল, ওষুধ শিল্প, গাড়ি সংযোজন কারখানা এবং আরও অনেক স্থাপনা গড়ে তোলেন।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তার কর্মোদ্যোগ আরও বিস্তৃতি লাভ করে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যেমন তিনি অবদান রাখতে থাকেন তেমনি দেশের বাইরেও তার প্রতিষ্ঠানসমূহের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে বিডিসি (বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন) মধ্যপ্রাচ্যে কাজ শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন বিশ্বমানের সড়ক, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টসহ অন্যান্য স্থাপনা। উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে নতুন প্রযুক্তিতে আবুধাবিতে পাঁচ হাজার বাড়ি নির্মাণ, ইরাক ও ইয়েমেনে উপশহর নির্মাণ ইত্যাদি। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে যেমন জহুরুল ইসলামের যশ-খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে অন্যদিকে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে বিনা খরচে কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে। আর বাংলাদেশ অর্জন করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এভাবে জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক এবং তার অবদানে আজও বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক জনশক্তি বিদেশে কর্মরত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা ছিল এ দূরদর্শী ও সাহসী পুরুষের সর্বক্ষণের পরিকল্পনা। নগরায়ণের ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর। বর্তমান ঢাকার নগর ভবন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের শপিং কমপ্লেক্স ও অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প তার উন্নত ও দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলীর নিদর্শন বহন করে। অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং কিংবদন্তি উদ্যোক্তা এ মহান ব্যক্তির সৃষ্টির নেশা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। কৃষি, পোলট্রি, ফিশারিজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি উন্মোচন করেন নতুন দিগন্তের, যার অনুপ্রেরণায় আজ দেশে এসব খাতে অন্যরা এগিয়ে এসেছেন। শুনেছি দূরদর্শী এ মানুষটির অনেক ভবিষ্যতে পরিকল্পনার মধ্যে ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মোটর গাড়ি কারখানা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে মধ্যম আয়ের মানুষও একটি ছোট গাড়ির মালিক হতে পারে। ঢাকার অদূরে সাভার থেকে পানি পরিশোধন করে ঢাকায় সরবরাহ করার চিন্তাও করেছিলেন তিনি। কর্মনিষ্ঠ জহুরুল ইসলাম নিজে যেমন কঠোর পরিশ্রম করতেন তেমনি চেয়েছেন তার সঙ্গের সবাই যেন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে। কাজে গাফিলতি কিংবা ফাঁকি তিনি বরদাশত করতে পারতেন না।

জহুরুল ইসলামের সব কর্মকাণ্ডে দেশপ্রেমের একটি পরিচ্ছন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সর্বজন বিদিত। সুবিদ আলী ছদ্মনামে তিনি লন্ডনে থেকেও দেশের মুক্তিযুদ্ধে যেমন বিপুল আর্থিক সাহায্য করেছেন তেমনি প্রেরণা জুগিয়েছেন স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে খুলেছিলেন অনেক লঙ্গরখানা। শুনেছি সঞ্চিত টাকা শেষ হয়ে গেলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পাঁচ মাস ধরে চালু রাখা হয়েছিল এসব লঙ্গরখানা। এ ধরনের দুঃসাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করে অভুক্ত মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিয়ে স্বাক্ষর রেখে গেছেন তার মানবপ্রেমের।

জহুরুল ইসলামকে বিশিষ্ট শিল্পপতি হিসেবে সবাই জানেন কিন্তু তার অতুলনীয় চারিত্রিক গুণাবলির কথা অনেকেই জানেন না। আত্মপ্রচারবিমুখ এ ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল অতুলনীয়। আকাশছোঁয়া যশ-খ্যাতি ও অর্থবিত্তের মালিক হয়েও যাপন করতেন এক সাধারণ জীবন। মানুষকে সাহায্য করতে তার হস্ত ছিল সব সময় প্রসারিত। নির্দ্বিধায় অকাতরে দান করতেন প্রকাশ্যে এবং গোপনে। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক ব্যক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। ধর্মপ্রাণ জহুরুল ইসলাম নামাজ-রোজা করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে, মসজিদ নির্মাণ করেছেন, নির্মাণে সাহায্য করেছেন, বহু আলেমকে নিজ খরচে হজে পাঠিয়েছেন। মরহুম জহুরুল ইসলামের চরিত্রের আরেকটি দিক ছিল তার অতিথিপরায়ণতা। তাকে আমি সামানাসামনি দুইবার দেখেছি দুটি অনুষ্ঠানে। অতিথিদের অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া সব ব্যাপারে তিনি নিজে তদারক করেছেন অত্যন্ত অমায়িকভাবে। শুনেছি খাবার সময় তিনি সবসময় কাউকে সঙ্গে নিয়ে খেতে পছন্দ করতেন।

এবার আসি জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে। জনদরদি জহুরুল ইসলাম অন্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন এলাকা এবং আশপাশের জেলা ও বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্দশা ও হয়রানির কথা। মনের লালিত বাসনা থেকে তিনি ১৯৮৯ সালে নিজ গ্রাম ভাগলপুরে নির্মাণ শুরু করলেন একটি হাসপাতাল, সেই সঙ্গে ডিপ্লোমা নার্সিং ইনস্টিটিউট। ভাগলপুরের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে হাসপাতাল স্থাপনের কথা শুনে অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন, এমনকি নিজ পরিবারের মধ্যেও কেউ কেউ নাকি দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ী এ মানুষটি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন জনগণ সুলভে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা পাবে এবং কেউ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। একটি অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি গড়ে উঠেছিল এবং হাসপাতালকে সহায়তাদানের জন্য তৈরি করেছেন আফতাব বহুমুখী ফার্ম। ১৯৯০ সালে হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গরূপ ধারণ করে এবং বিভিন্ন বিভাগ চালু হয়। বর্তমানে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ এর অধিক এবং সব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বারা সুসজ্জিত। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে এ হাসপাতালে সুলভে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে।

প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত জহুরুল ইসলাম তার মেধা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে তার কর্মক্ষেত্রের সর্বত্র শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখে গেছেন। শিক্ষার প্রতি ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ আর তাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন অগণিত স্কুল-কলেজ। নিজ উপজেলা এবং ঢাকায় তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। সাহায্য করেছেন অকুষ্ঠচিত্তে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার প্রসারে তিনি দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন বিভিন্ন কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে। শিক্ষাক্ষেত্রে তার সর্বশেষ কীর্তি জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ বর্তমানে দেশের শ্রেষ্ঠ বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহের মধ্যে অন্যতম। এ পর্যন্ত ২১টি ব্যাচের দেশি-বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করে মানসম্পন্ন চিকিৎসক হিসেবে সর্বত্র বিশেষ সুনাম অর্জন করছে।

জহুরুল ইসলামের জীবনচরিত ও বিশাল কর্মকাণ্ড স্বল্প কথায় সহজে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। কিংবদন্তি উদ্যোক্তা, অক্লান্ত পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান এ মহাপুরুষের কর্মপরিকল্পনা ছিল অসীম যা তিনি সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। স্বল্প সময়ে তিনি যে বিশাল কীর্তির স্বাক্ষর রেখে গেছেন, মানবিক ও চারিত্রিক গুণাবলির যে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন তা বাঙালি জাতির আদর্শ, কর্মোদ্যোগ ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন এবং ভাগলপুরে নিজ গ্রামে সমাহিত হন। পরম করুণাময় তার আত্মার শান্তি দান করুন।

লেখক : অধ্যক্ষ, জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।

খাগড়াছড়ি হেরিটেজ পার্ক

khagrachhori heritage park