আর্কাইভ

Archive for the ‘বাংলাদেশ’ Category

শেষ বিকেলের মেয়ে – পর্যালোচনা

অগাষ্ট 20, 2017 মন্তব্য দিন

shes bikeleyer meyeরায়হান আতাহার : “শেষ বিকেলের মেয়ে” উপন্যাসটি জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস, যা ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের মূল চরিত্র কাসেদ যে কি না পেশায় একজন কেরানি। সাথে টুকটাক কবিতা লেখার অভ্যাস আছে তার। বৃদ্ধা মা আর এক দূর সম্পর্কীয় অসহায় বোন নাহারকে নিয়ে তার সংসার।

জাহানারা নামের একটি মেয়েকে কাসেদ ভালোবাসে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। মাঝে মাঝে জাহানারাদের বাড়িতে যায় সে।

জাহানারার জন্মদিনে কাসেদের সাথে পরিচয় হয় জাহানারার কাজিন শিউলির সাথে। শিউলির হাসি-খুশি ব্যবহার ও উচ্ছ্বলতা কাসেদের ভাল লাগে। কোন এক পর্যায়ে শিউলিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে সে। কিন্তু শিউলি আরেকজনের বাগদত্তা। তাই তাকে নিরাশ হতে হয়।

ওদিকে শিউলি ও জাহানারার সেতার মাস্টারকে নিয়ে জাহানারা ও কাসেদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি থেকে দূরত্ব তৈরি হয়।

এই উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র সালমা। সম্পর্কে কাসেদের আত্নীয়া সে। ছোটবেলা থেকে সালমা কাসেদকে ভালোবাসতো। কিন্তু কাসেদ বুঝতে পারেনি। ফলে সালমার বিয়ে হয়ে যায় অন্য এক জায়গায়। অনেক বছর বাদে যখন দুজনের দেখা হয় তখন সালমার কোলে ফুটফুটে একটি মেয়ে। কিন্তু বিবাহিত জীবনে সালমা সুখী ছিল না সে। উপন্যাসের এক পর্যায়ে সালমা কাসেদের সাথে দূরে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তখন কাসেদ দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।

অন্যদিকে অফিসের হেড কেরানি মকবুল সাহেবের মেজো মেয়ের প্রতিও দুর্বলতা ছিল কাসেদের। কিন্তু তার অফিসের বসের সাথে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সরে আসতে হয় তাকে।

এভাবে একাধিক মেয়ে আসে কাসেদের জীবনে। কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত কাসেদ বুঝে উঠতে পারে না কি করবে। এমতাবস্থায় কাসেদের মা মারা যান। ওদিকে নাহারেরও বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। ফলে কাসেদ একেবারে একা হয়ে যায়।

হঠাৎ একদিন শেষ বিকেলে তার দরজায় কড়া নেড়ে হাজির হয় মেয়ে। ঔপন্যাসিক এই মেয়েকেই “শেষ বিকেলের মেয়ে” বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু কে ছিল সেই মেয়ে? নাহার!

এটি যেন রবিঠাকুরের সেই বিখ্যাত লাইনগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়ঃ

বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ ব্যয় করি

দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

দেখা হয় নাই শুধু চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু এক পা ফেলিয়া

একটি ধানের শীষের উপর

একটি শিশির বিন্দু।

জহির রায়হানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে যত প্রোপাগান্ডা

অগাষ্ট 20, 2017 মন্তব্য দিন

http://egiye-cholo.com/zahir-raihan/

রাহমান রাদ : ”জহির রায়হান তো এক বিখ্যাত সাংবাদিক আছিল, বুঝলা? ফিল্মও ভি বানাইত। একাত্তর সালে গণ্ডগোলের সময় আওয়ামিলিগ নেতারা যখন পলায়া গিয়া কলকাতায় খারাপ পাড়ায় আকামকুকাম করতেছিল, তখন এই ব্যাটা হেইডি ভিডু কইরা একটা ফিল্মই বানায়া ফেললো। হের কাছে আরও তথ্য আছিল, ফাঁস কইরা দিতে চাইছিল। হ্যাঁর লাইগাই তো শেখ মুজিবে দেশে ফিরাই তারে গুম কইরা ফেললো। আহারে, বড় ভালো লোক আছিল!”

”এই যে আজ কিছু লোক গোলাম আজম সাহেব, নিজামী সাহেবদের বিরুদ্ধে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো জঘন্যতম অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালায়, আসল সত্যটা জানলে তো এদের পেট খারাপ হয়ে যাবে। আসল সত্যটা হচ্ছে, একাত্তরের গণ্ডগোলের সময় আসলে ভারতীয় সেনারা মুক্তিযোদ্ধার ছদ্মবেশে খুন, ধর্ষন করে পাকিস্তানী সেনাদের উপর দোষ চাপিয়েছিল। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের পর দেশে ফিরে যাবার সময় তারা সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। জহির রায়হান এসব জানতেন। তার কাছে সব প্রমান ছিল। আর সেগুলো ফাঁস করে দিতে চেয়েছিলেন বলেই শেখ মুজিবের নির্দেশে “র” এর এজেন্টরা তাকে গুম করে ফেলে। নইলে স্বাধীন দেশে একটা জলজ্যান্ত মানুষ কিভাবে গুম হয়ে যাবেন?”

প্রথম প্যারাটা ক্লাস নাইনে পড়ার সময় হামিদ স্যার “সময়ের প্রয়োজনে” পড়াতে গিয়ে বলেছিলেন। আর দ্বিতীয় প্যারাটা ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় “কিশোর কণ্ঠ” পাঠচক্রে শিবিরের এক সফেদসৌম্য চেহারার এক আদিম বর্বর পাষণ্ডের মুখে শোনা। অনেক দিন পর্যন্ত কথাগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল। তারপর একদিন “সময়ের প্রয়োজনে” গল্পটা পড়লাম। অনেকক্ষন চুপচাপ বইটা জড়িয়ে ধরে বসেছিলাম সেদিন। চোখের পানিতে পাতাগুলো ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে যে কত অসংখ্যবার গল্পটা পড়েছি, ইয়ত্তা নেই। মুসলিম বাজার বধ্যভূমিটার উপর বিশালকায় মসজিদটা কিংবা পাশেই ওই শাদা পানির পাম্পটা- কত দিন গিয়ে পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেছি, নিজেও জানি না। জহিরের কথা মনে পড়তো- ওই যে হালকা গড়নের সদা হাস্যোজ্জল মানুষটা, পকেটে মাত্র ছয় আনা নিয়ে একটা রঙিন সিনেমা বানিয়ে ফেলার সাহস করতো যেই বিস্ময়কর জাদুকর… সেই জহির রায়হানের কথা…

হাতের কাছে যা আছে, তাই দিয়েই সিনেমা বানাবো- এই ছিল মানুষটার মন্ত্র। অসম্ভব প্রতিভাধর ছিল, যা চাইতেন, নিখুঁত দক্ষতায় সেটা নামিয়েও আনতেন তিনি। ১৯৫৭ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে “জাগো হুয়া সাভেরা” দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখা সেই ছেলেটা তার পরের ১৩ বছর উপহার দিয়ে যান ‘সোনার কাজল’ (১৯৬২), ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘সঙ্গম’ (উর্দু : ১৯৬৪), ‘বাহানা’ (১৯৬৫), ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭) আর ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)’র মতো অসামান্য সব চলচ্চিত্র। অমিত প্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে এই সময়টাতেই একে একে প্রকাশিত হয় শেষ বিকেলের মেয়ে, আরেক ফাগুন, বরফ গলা নদী, আর কত দিন-এর মতো কালজয়ী সব উপন্যাস আর সূর্যগ্রহন (১৩৬২ বাংলা), তৃষ্ণা (১৯৬২), একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৭০) কয়েকটি মৃত্য এর মত অভূতপূর্ব সব গল্পগ্রন্থ। ৭০’রের শেষদিকে তার উপন্যাস “আর কত দিন” এর ইংরেজি ভাষান্তরিত চলচ্চিত্র “লেট দেয়ার বি লাইট”-এর কাজে হাত দেন জহির। কিন্তু একাত্তরের সেই অভূতপূর্ব বিভীষিকা থামিয়ে দেয় সব!

একাত্তর জহিরের জীবনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এক বিচিত্র সমীকরণের সামনে। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা প্রথম ১০ জনের একজন ক্র্যাক জহির রায়হান একাত্তরের পুরো সময়টা প্রাণ হাতে করে ছুটে বেড়িয়েছেন রক্তাক্ত বাঙলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি আর আদ্দিকালের একটা ক্যামেরা সম্বল করে বানিয়েছেন গণহত্যার উপর নির্মিত পৃথিবীর ইতিহাসের অবিসংবাদী সেরা পাঁচটি ডকুমেন্টরির একটি “স্টপ জেনসাইড” (নিজস্ব মতামত)। তুলে ধরেছিলেন পাকিস্তানীদের বর্বরতা আর নৃশংসতার এক অনবদ্য উপাখ্যান। “বার্থ অফ আ নেশন” ছিল তার সৃষ্টি, বাবুল চৌধুরীর ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন’ আর আলমগীর কবীরের ‘লিবারেশন ফাইটারস’ এর পেছনের কুশীলবও ছিলেন তিনি। একাত্তরের রক্তাক্ত জন্মইতিহাসের অসংখ্য অধ্যায়ের খবর জানা ছিল তার, তাই দেশে ফেরার পর যখন বুদ্ধিজীবি হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান এবং ঘাতকদের ধরার জন্য একটি কমিশন গঠন করলেন, তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দেরি করেনি আলবদরের ঘাতকবাহিনী।

এ বি এম খালেক মজুমদার ছিল ৭১-এর কুখ্যাত আল বদর কমান্ডার। জহির রায়হানের বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে কালো কাপড়ে চোখ বেধে তুলে নিয়ে যাবার সময় তাকে চিনে ফেলেছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার। সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে পান্না বলেছিলেন,

যখন ওকে (শহীদুল্লাহ কায়সার) অন্ধকার ঘর থেকে টান দিয়ে আমার সঙ্গে বারান্দায় নিয়ে এলো, পেছন থেকে ওর হাতটা ধরে আমিও বারান্দায় গেলাম। গিয়ে তাড়াতাড়ি সুইচটা অন করে দিলাম। সব আলো হয়ে গেল। সবার মুখে মুখোশ। আমার ননদ পাশ থেকে দৌড়ে এলো। ও তখন সন্তানসম্ভবা। উপায়ান্তর না পেয়ে একজনের মুখের কাপড়টা টান দিয়ে খুলে ফেলল। সে-ই ছিল খালেক মজুমদার (এ বি এম খালেক মজুমদার)

দেশে ফিরে দাদার নিখোঁজ হবার খবর পেয়ে একেবারে ভেঙ্গে পড়েন পাথরকঠিন মানুষ। দাদাই যে ছিল তার সবচেয়ে বড় আপনজন! দাদা আর নেই এটা তাকে কোনভাবেই বিশ্বাস করানো যায়নি। উদ্ভ্রান্তের মত খুঁজতে শুরু করেন দাদাকে। কয়েক দিনের মাথায় বুদ্ধিজীবি হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান এবং ঘাতকদের ধরার জন্য একটি কমিশন গঠন করেন তিনি। জহির ছিলেন এই কমিটির চেয়ারম্যান, সদস্য সচিব ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের বাশারত আলী। প্রতিদিন শত শত স্বজনহারা মানুষ আসতেন এই কমিটির অফিসে। জহিরের এই ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিশন প্রথমেই খালেককে গ্রেফতার করাতে সক্ষম হয়। খালেককে গ্রেফতার করাবার পর প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ শক্তির ব্যাপারে প্রায় সব তথ্যগুলো তিনি গুছিয়ে এনেছেন। এখন শুধু জাতির সামনে উন্মোচনের অপেক্ষা। এরপর আর জহিরকে বাঁচিয়ে রাখার ঝুকি নিয়ে চায়নি নিজামি-মুজাহিদের আলবদর কিলিং স্কোয়াড…

হঠাৎ একদিন সকালে একটা ফোন পেলেন জহির রায়হান। সেদিন ছিল ৩০ জানুয়ারী। এর কয়েকদিন আগ থেকেই রফিক নামের এক ব্যক্তি জহিরকে আশ্বাস দিয়ে আসছিল যে, শহিদুল্লাহ কায়সার বেঁচে আছেন। তাকে জীবিত পাওয়া যাবে। জহিরের চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির বহু বার এই রফিককে ফ্রড এবং ধাপ্পাবাজ বলে জহিরকে বোঝাতে চাইলেও দাদার শোকে পাগল প্রায় জহির তাতে কর্ণপাত করেননি। এটাই তার কাল হয়েছিল। দাদাকে শুধু একটাবারের জন্য ফিরে পেতে পৃথিবীর সবকিছু দিতে রাজি ছিলেন জহির। সেই সুযোগটাই নিয়েছিল ঘাতকেরা! রফিককে ৩০শে জানুয়ারির পর আর খুঁজেও পাওয়া যায়নি।

সেদিন সকালে ‘মাস্তানা’ নামে এক বিহারী নৃত্যপরিচালক তাকে ফোন দিয়ে জানায়, তার বড় ভাই শহিদুল্লাহ কায়সারসহ আরও কিছু বুদ্ধিজীবীকে মিরপুরে বিহারীরা আটকে রেখেছে। যদি সেই দিনের মধ্যে তিনি নিজে উপস্থিত না হন, তবে তার ভাইকে আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু মিরপুর তো বিহারীদের দখলে। কীভাবে তিনি সেই মৃত্যুপুরীতে যাবেন? কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেইদিনই বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব মইনুল হোসেন চৌধুরী সশরীরে এসে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন মিরপুরের বিহারীদের কাছে থাকা অস্ত্র উদ্ধার করে মিরপুর স্বাধীন করতে। সে উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট অভিযান চালাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী পুরো মিরপুর ঘিরে রেখেছিল। জহির ফোনটা রেখে বেরিয়ে গেলেন। সকালের নাস্তাটা ওভাবেই পড়ে রইল, ওই তার বেরিয়ে যাওয়া…

মিরপুর বিহারী এবং পাকিস্তানী সেনাদের দখলে থাকায় সেখানে সিভিলিয়ানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাই চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবিরসহ বাকিরা আর জহিরের সাথে মিরপুরে ঢুকতে পারেননি, সেনাদের কন্টিনজেন্টে একমাত্র সিভিলিয়ান ছিলেন জহির। সেনারা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো মিরপুর। এর মধ্যে মিরপুর সাড়ে এগারো নম্বর ধরে ১২ নম্বর সেকশনের দিকে যে দলটি গিয়েছিল তাতে ছিলেন জহির। দলটিতে ছিল প্রায় ৪৫-৫০ জন সেনা। গাড়িগুলো মিরপুর সাড়ে এগারো হতে ধীরে ধীরে মিরপুর ১২-এর দিকে অগ্রসর হতে হতে শাদা পানির ট্যাংকটার সামনে এসে থামে। হঠাৎই সকাল এগারোটার দিকে আচমকা কয়েকশো বিহারী এবং সাদা পোশাকের ছদ্মবেশে থাকা পাকিস্তান সেনারা ভারী অস্ত্র এবং ড্যাগার কিরিচ নিয়ে আল্লাহু আকবর স্লোগান দিতে দিতে এই দলটির উপর হামলা করে। প্রথমে ব্রাশফায়ারেই লুটিয়ে পড়েন জহির, একটু পর বিহারিগুলো প্রচণ্ড আক্রোশে জানোয়ারের হিংস্রতায় কুপিয়ে, খুঁচিয়ে, গুলি করে হত্যা করে প্রায় সবাইকে। তারপর কোপাতে কোপাতে লাশগুলো টেনে নিয়ে যায় মুসলিম বাজারের নুরী মসজিদের পেছনের ডোবার দিকে। বাঙলা ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারের খন্ডবিখন্ড দেহ পড়ে থাকে এক কচুরিপানা ভরা ডোবায়…

*

২৮ টা বছর ওরা জহিরের মৃত্যু নিয়ে মিথ্যাচার করেছে। একটা মিথ্যা একশবার বললে ধ্রুব সত্যের মতো শোনায়। ২৮টা বছর ধরে ওরা সত্যপুত্র যুধিষ্ঠির হয়ে শুনিয়েছে,

”একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর রাজাকার, আল-বদরেরা কোন গণহত্যা চালায়নি, সব করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা নাম ধারন করে। আওয়ামীলীগ নেতারা কলকাতার বেশ্যালয়ে ফুর্তি করেছে একাত্তরের নয়মাস, এই সকল তথ্য আর প্রমান জহির রায়হানের কাছে ছিল, তাই শেখ মুজিবের নির্দেশে “র” তাকে গুম করে ফেলে…”; ২৮টা বছর নিজামি-মুজাহিদ আর গোলাম আজমের মতো নিকৃষ্ট কীট এই জঘন্যতম মিথ্যাচার করে গেছে বিরামহীন, একটা দেশের জন্মপরিচয়কে মুছে ফেলতে চেয়েছে নিকৃষ্টতম ষড়যন্ত্রে…

তারপরই ১৯৯৯ সাল এলো…

১৯৯৯ সালে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে আবিষ্কৃত নূরী মসজিদ সম্প্রসারণ কাজ চলবার সময় শ্রমিকেরা মাটির সামান্য নিচে কংক্রিটের স্লাব দিয়ে মুড়ে দেওয়া একটা কুয়োর সন্ধান পায়। নির্মাণশ্রমিকরা কৌতূহলবশত স্লাবটা ভেঙ্গে ফেলার সাথে সাথে বেরিয়ে আসে ২৮ বছরের পুরনো নির্মম ইতিহাস। তিনটি মাথার খুলি এবং বেশকিছু হাড়সহ কাপড়চোপড় বেরিয়ে এলে শ্রমিকেরা ভয় পেয়ে যায়। আবিষ্কৃত হয় ৭১-এর এক অকল্পনীয় নির্মমতার ইতিহাস, কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫০০০ শহীদের শেষ ঠিকানা, মুসলিম বাজার নূরী মসজিদ বধ্যভূমি…

পরের দিন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপারটা হাইলাইট হলে সাড়া পড়ে যায় শহীদদের স্বজনদের মাঝে। খবরটা পৌঁছে যায় বাবার খোঁজে পাগলপ্রায় পুত্র অনল রায়হানের কাছেও। তৎকালীন ভোরের কাগজের রিপোর্টার জুলফিকার আলি মানিক এই খবরটি কাভার করছিলেন। অনলের সাথে কথা বলবার পর তিনি জোরে সোরে অনুসন্ধান শুরু করলেন। সম্মিলিত অনুসন্ধানে পাওয়া গেল ৩০ শে জানুয়ারির সেই যুদ্ধে উপস্থিত থাকা এক সেনাসদস্যের। আমির হোসেন নামের এই সৈন্য সেইদিনের সেই দুঃস্বপ্নের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন…

আমাদের সাথে যে সাংবাদিক ছিলেন, তিনি কালো মতো একটা প্যান্ট পরেছিলেন। সাদা জামা এবং তার ওপর হলুদ রঙের সোয়েটার ছিল তার গায়ে। আমাদের উপর যখন হামলা হয়, তখন দেখলাম বুকে হাত চেপে ধরে-ওখানে একটা দেয়াল ছিল, তার গায়ে পড়ে গেলেন। দেখলাম, ওনার কাপড় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তারপর আমি কিছুদূরে একটা গাছের পেছনে আশ্রয় নিয়ে দেখি কয়েকশো বিহারী ড্যাগার আর কিরিচ নিয়ে আল্লাহু আকবর স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসল। তারপর তারা মাটিতে পড়ে থাকা দেহগুলো কোপাতে কোপাতে টেনে পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে টেনে নিয়ে গেল। তারপর আর আমি সেই লাশগুলোকে খুঁজে পাইনি।

১৯৯৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জুলফিকার আলি মানিকের প্রতিবেদন ‘নিখোঁজ নন, গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান’’ হইচই ফেলে দেয় সর্বত্র। এদিকে একই বছরের ১৩ আগস্ট সাপ্তাহিক ২০০০ এ (বর্ষ ২ সংখ্যা ১৪) বাবার নিখোঁজরহস্য উন্মোচন করে প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের পুত্র অনল রায়হানের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন পিতার অস্থি’র সন্ধানে

অস্কার পুরস্কার বিতরণী মঞ্চ। উপস্থাপকের দিকে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ, টানটান উত্তেজনায় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। উপস্থাপকের ঠোঁটে রহস্যের হাসি। শেষ পর্যন্ত সেরা চলচ্চিত্রের নাম ঘোষিত হল, মনোনয়ন পাওয়া গুণী পরিচালকদের বিশ্বসেরা সব চলচ্চিত্রকে পেছনে ফেলে সকলের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ঘোষিত হল Mirpur-The Last Battlefield এর নাম। সেরা স্ক্রিপ্ট, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি,সেরা সঙ্গীত সহ আরো ছয়টি বিভাগে অস্কার জিতলো মুভিটা, এর মধ্যে সেরা পরিচালকও ছিল। সেরা স্ক্রিপ্টরাইটারের অস্কারে ঘোষিত হল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম, সেরা সঙ্গীত পরিচালকের ক্যাটাগরিতে অস্কার পেলেন প্রথিতজশা সুরকার ও সঙ্গীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদ, আর সেরা পরিচালকের নামটা উচ্চারন করতে গিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন উপস্থাপক… তারপর হঠাৎ গমগমে গলায় উচ্চারন করলেন, অ্যান্ড দ্যা অস্কার গোজ টু দ্যা ওয়ান অ্যান্ড অনলি, জহির রায়হান…

অপেক্ষায় হাস্যোজ্জ্বল উপস্থাপক, অপেক্ষায় অস্কারের ঝলমলে মঞ্চ, অপেক্ষায় পৃথিবী। শহীদুল্লাহ কায়সার, আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হানদের অপেক্ষায় মহাকাল। কোথায় ওঁরা? কোথায়?

তথ্যসুত্র-

  1. ডেথ অফ আ জিনিয়াস
  2. জামাতে মওদুদীর খালেক মজুমদারঃ এ ঘাতককে চিনে রাখুন
  3. জহির রায়হানঃ হারিয়ে যাওয়া এক সুর্যসন্তান
  4. জহির রায়হান : অন্তর্ধান বিষয়ে ১৯৭২ সালের একটি লেখা
  5. লেট দেয়ার বি লাইট
  6. জহির রায়হানের ছেলে অনিল রায়হানের প্রতিবেদন- পিতার অস্থি’র সন্ধানে 

সোনাদিয়া দ্বীপ : অপরূপ সৌন্দর্যের হাতছানি যেখানে

অগাষ্ট 19, 2017 মন্তব্য দিন

সোহেল মো. ফখরুদ-দীন : বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের সর্বশেষ জেলা কক্সবাজার। কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হিসেবে পরিচিত। আমাদের পর্যটন নগরী এ কক্সবাজার। কক্সবাজার জেলার অন্যতম একটি দ্বীপের নাম সোনাদিয়া। স্থানীয় ভাষায় সোনাদিয়ার চর বলে। এটি মহেশখালী উপজেলায় অবস্থিত। কক্সবাজার জেলা বাংলাদেশের একটি প্রাচীন সমৃদ্ধ শহর। রামু উপজেলা তার আদি নিদর্শন। রামুতে স্বয়ং গৌতম বুদ্ধের আগমনের অস্তিত্ব সংরক্ষিত আছে রামকোট বিহারে। প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় সভ্যতার স্মারক ঐতিহ্যবাহী আদিনাথ মন্দির, মহেশখালী সাগর দ্বীপ আদিনাথ পাহাড়ে অবস্থিত।

চট্টগ্রাম ও বাংলায় মুসলমান আগমন ও মুসলমান মিশনারী হিসেবে পরিচিত হযরত বদর আউলিয়া (বদর পীর) সমুদ্র পথে আগমনের চিহ্ন বদর মোকাম কক্সবাজারে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রাচীন আরাকানী সভ্যতার স্মারকসহ পুরো কক্সবাজারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর স্মারক নিয়ে এই শহর পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। কক্সবাজারের আকর্ষনীয় স্থানসমূহের মধ্যে সোনাদিয়া দ্বীপ অন্যতম। এরপরেও সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মহেশখালী দ্বীপ, কুতুবদিয়া দ্বীপ, মাতারবাড়ী দ্বীপ, ছেঁড়া দ্বীপ উল্লেখযোগ্য। নয়নাভিরাম দ্বীপ কক্সবাজারের সোনাদিয়া পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। কক্সবাজার যারাই আসেন তারা যদি সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমণ না করেন তাহলে পরিপূর্ণতা আসবে না। সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রকৃতির অদ্ভুত সব সৌন্দর্য মানুষকে প্রতিনিয়ত কাছে টানছে। যেন স্রষ্টার সৃষ্টি সব কিছু দিয়ে সাজানো হয়েছে কক্সবাজারের দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে জেগে ওঠা সোনাদিয়া দ্বীপ। কক্সবাজার জেলা থেকে মহেশখালীর দূরত্ব ১২ কিলোমিটার মাত্র। কক্সবাজার থেকে উত্তর-পশ্চিমে এবং মহেশখালি দ্বীপের দক্ষিণে সোনাদিয়া দ্বীপটির অবস্থান। আর মহেশখালী থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে সাগরের বুকে সোনাদিয়া দ্বীপটি অবস্থিত। দ্বীপটির আয়তন ৯ বর্গকিলোমিটার।

ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় বনের সমন্বয়ে গঠিত এই সুন্দর দ্বীপটি। সাগরের গাঢ় নীল জল, লাল কাঁকড়া, কেয়া বন, সামুদ্রিক পাখি সবমিলিয়ে এক ধরনের রোমাঞ্চিত পরিবেশ সবসময় বিরাজ করে এই দ্বীপে। এ দ্বীপের পানি এতোটাই স্বচ্ছ ও টলটলে, দেখে মনে হবে যেনো কোনো কাঁচের ওপর দিয়ে নৌযানটি এগিয়ে চলেছে। যা দেখলে শত বছরের দুঃখ-কষ্ট এক নিমিষেই ভুলে যেতে বাধ্য। সমুদ্র থেকে সৃষ্টি হয়ে ভিতরের দিকে গিয়ে নদীটি কয়েকটি শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে সম্ভবত। দুপাশে সবুজ বন। এসব বনে রয়েছে কেওড়া, হারগোজা, উড়িঘাস এবং কালো ও সাদা বৃক্ষ। এই দ্বীপে তেমন জনবসতি এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে এই দ্বীপের বেশির ভাগ লোকই জেলে সম্প্রদায়ের। যাদের জীবিকা নির্বাহ হয় সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণের মাধ্যমে। আরো কিছু লোক দেখা যায় যারা লবণ চাষ করেও জীবিকা নির্বাহ করে। এই দ্বীপে নেই কোনো হাট-বাজার। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের একমাত্র ভরসা ছোট ছোট মুদি দোকানগুলো। দ্বীপটির পশ্চিম দিকে সবুজ ঘাসে মোড়ানো খোলা মাঠ, নির্জনতা ও অফুরন্ত বাতাস, সব মিলিয়ে মন প্রশান্তিতে ভরে যাবে। এই দ্বীপের খোলা মাঠে বসলে মনে হবে যেনো অজানা-অচেনা কোনো দ্বীপে আপনি একা। চারপাশে লাল কাঁকড়ার ছুটাছুটির দৃশ্যগুলো খুবই মনোরম।

সবকিছুই মনে হবে সিনেমার দৃশ্যের মতো। সোনাদিয়া দ্বীপের সূর্যাস্তও অসাধারণ। সন্ধ্যায় সাদা পালক দুলিয়ে সারি সারি বক উড়ে যায় আপন ঠিকানায়। নীল আকাশের কপালে কে যেন দেয় লাল টিপ। আস্তে আস্তে যখন সূর্য হারিয়ে যায় সাগরের বুকে, তৈরি হয় এক মোহনীয় পরিবেশ।

এখানে রাত্রিযাপন হতে পারে আপনার জীবনের সেরা রাতের একটি। তবে এখানে কোনো হোটেল-মোটেল এখনো গড়ে উঠেনি। এলাকাটি তেমন নিরাপদও নয়। স্থানীয় কোনো প্রশাসন চোখে পড়ার মতো পরিদর্শনে দেখা যায় না। পর্যটকদের ভয় ওখানে। তবে ছোটখাট বিচ্ছিন্ন চুরি ছাড়া তেমন কোনো বড় ঘটনার নজির নেই। এ দ্বীপে যাওয়ার জন্য ঢাকা চট্টগ্রাম হয়ে দেশের যে কোনো স্থান থেকে বাস বা অন্য কোনো বাহনে করে প্রথমে যেতে হবে কক্সবাজার। কক্সবাজার কস্তুরী ঘাট থেকে স্পিডবোট বা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে তারপর যেতে হবে মহেশখালী।

মহেশখালী গোরকঘাটা থেকে ঘটিভাঙা পর্যন্ত পথটুকু যেতে হবে বেবিট্যাক্সিতে করে। মহেশখালীর গোরকঘাটা থেকে ঘটিভাঙার দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার। সেখান থেকে আবার ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে সোনাদ্বিয়া দ্বীপে যেতে হয়। ঘটিভাঙা নেমে ছোট নৌকায় সোনাদিয়া চ্যানেল পার হলেই নয়নাভিরাম দ্বীপ সোনাদিয়া । যেখানে সৌন্দর্যের হাতছানি আপনার মনকে দেবে প্রশান্তি। দল বেঁধে কিংবা পরিবা-পরিজন নিয়ে সোনাদিয়া দ্বীপে ঘুরে আসতে পারেন। স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করে গেলে ভ্রমণ হবে নিরাপদ ও আনন্দময়।

 লেখক : সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র (সিএইচআরসি), সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ, ঢাকা

সেলিম আল দীন : নির্বাচিত লেখামালা

অগাষ্ট 19, 2017 মন্তব্য দিন

selimজাহিরুল ইসলাম : স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের নাট্যজগতে যেসব মানুষ অসামান্য অবদান রেখেছেন, সেলিম আল দীন তাদের অন্যতম। অনেকে তাকে আখ্যায়িত করেন বাংলাদেশের নাটকের প্রধান পুরুষ হিসেবে। এটা কোনোভাবেই অত্যুক্তি নয়। কেননা, নাটককে বলা হয় জীবনের দর্পণ। সেলিম আল দীনের নাটকগুলো সত্যিকার অর্থেই এ দেশের মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি। ভাষা প্রয়োগ ও চরিত্র চিত্রণে পাওয়া যায় যার সার্থকতা। বস্তুত, নাটক রচনায় তিনি শিকড় সন্ধান করেছেন। সেটা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির। আমরা দেখি, শুরু থেকেই তিনি ত্যাগ করেছেন পাশ্চাত্য নাট্যপ্রকরণ। প্রয়াসী হয়েছেন নিজস্ব নাট্যকৌশল নির্মাণে। এর প্রভাব স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে কীর্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, হরগজ, হাত হদাই, চাকা, যৈবতী কন্যার মন প্রভৃতি নাটকে। এসব নাটকের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শুধু পুনর্নির্মাণই করেননি; বলা যায় অনেক ক্ষেত্রে এটাকে উন্নীত করেছেন নতুন মাত্রায়।

একজন লেখক বা নাট্যকারের মধ্যে এ প্রবণতা কেবল তখনই দেখা যায়, যখন নিজের সাংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি থাকে তার সুগভীর বিশ্বাস ও ভক্তি। সেলিম আল দীনের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাচ্যের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীরভাবে তিনি আস্থাশীল ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নাটকের মাধ্যমে বাঙালিকে নতুন জীবনের সন্ধান দেওয়ার জন্য পাশ্চাত্যের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এখানকার মানুষের জীবনধারায় যেসব মৌলিক উপাদান রয়েছে, সেগুলো তুলে ধরার মাধ্যমেই সম্ভব সার্থক নাটক রচনা। বস্তুত, সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন, তাদের জন্যও এটা হতে পারে অনুসরণীয়। তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের স্বকীয়তাই শুধু স্পষ্ট হবে না; নিজেদের সাংস্কৃতির মৌলিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ উপাদান নিয়ে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সহজ হবে।

এটা ঠিক, শিকড় সন্ধানের জন্য তার সঙ্গে সংস্পর্শ থাকতে হয়। সেলিম আল দীনের নাট্য-চেতনার ভুবন গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্পর্শে। তিনি এ পর্যন্ত পেঁৗছতে পেরেছিলেন বলেই এর উচ্চমার্গীয় গুরুত্ব অনুভব করেছেন। আধুনিক মানুষের জীবন নগরমুখী। শুধু জীবিকার খোঁজে নয়; উন্নততর জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে মানুষ ছুটছে নগরপানে। সেখানে গিয়ে সে ভুলে যাচ্ছে তার শিকড়, নিজের সংস্কৃতি। বিজ্ঞজনরা বলেন, নিজের শিকড় ও সংস্কৃতিকে যে ধারণ করে না, সে কখনও আকাশ ছুঁতে পারে না। সে জন্য নগরমুখী ও নিজস্ব শিকড়-সংস্কৃতি বিস্মৃত মানুষকে তার সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দিতে নাট্যকাররা যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন, অন্য কারও পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। নাট্যকার হিসেবে সেলিম আল দীন এটা অনুভব করতে পেরেছিলেন যথাযথভাবে। এ জন্য এর যথার্থ চিত্রায়ন করতে তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট।

নাট্যকার সেলিম আল দীন ছিলেন একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেসব নৈরাজ্য তার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল, সেগুলোর তিনি সমালোচনা করেছেন নাটকের মাধ্যমে; কোনোটিকে করেছেন বিদ্রূপ। এ ধরনের বিষয় তুলে ধরার জন্য লেখকের মধ্যে শুধু সাহস থাকলেই চলে না; জনসাধারণের প্রতি তার অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধও থাকতে হয়। এটা তার মধ্যে ছিল বলেই আমরা তাকে পাই একজন অকুণ্ঠ ও অন্যায়-নৈরাজ্যের প্রতি উচ্চকণ্ঠ নাট্যকার হিসেবে। বস্তুত, পথিকৃতের কাজ হলো পথ দেখানো। পরবর্তীকালে নতুন পথিকেরা সেই পথে হেঁটে তাকে উন্নততর রূপ দেয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বকীয় নাট্যজগৎ নিয়ে সেলিম আল দীন যে পথের সূচনা করেছেন, সেটাকে বিকশিত করা গেলে এ দেশের নাটক শুধু উন্নতই হবে না, মর্যাদাও লাভ করবে নানাদিক থেকে। দেশে এখন যেসব নাটক নির্মাণ হচ্ছে; বর্ণনাভঙ্গি, উপস্থাপনা ও চরিত্র চিত্রণে আগের তুলনায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষণীয়। কিন্তু সিংহভাগ ক্ষেত্রে সেগুলোর গল্পে গভীরতার অভাব স্পষ্ট। এর পেছনে নাটক রচয়িতা বা নির্মাতার যুক্তি থাকতে পারে; কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে,ওগুলো মানুষ জানে না। জানার উপায়ও তাদের নেই। যে গল্পটা উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটাই শুধু পেঁৗছে মানুষের কাছে। এ ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসেবে সেলিম আল দীন যে কৌশল দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, সেটার চর্চাই তাদের করতে হবে। তার সৃষ্টিগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শুধু দিকনির্দেশনাই নয়, অনুপ্রেরণাও। জন্মদিনে প্রয়াত এই মহান নাট্যকারের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

এক পূর্ণপ্রাজ্ঞহৃদয় – তুহিন তৌহিদ

‘রোদন করি না পাছে পাঁজর পাথর
ভেঙ্গেচুরে সমুদ্র প্লাবন হয়।’

এ পঙ্ক্তি দুটি বাংলা নাটকের প্রবাদপুরুষ সেলিম আল দীনের। কবিতায় হৃদয়ের দহনকে উন্মুক্ত করলেও, সবারই জানা, তার আরাধ্য ছিল নৈর্ব্যক্তিকতা; আর সেটা তিনি করেছেন নাটকের মাধ্যমেই। তিনি বাংলা নাটককে দিয়েছেন নতুন এক দিশা। তাকে কাছ থেকে দেখা বা সানি্নধ্যের সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু তার সৃষ্ট সাহিত্যে পেয়েছি তাকে। সেলিম আল দীনের ‘দিনলিপি’ পড়লে তার প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও জ্ঞানগর্ভ ভাবনার খোঁজ পাওয়া কিছুটা সহজ হয়।

কেমন ছিলেন ব্যক্তি সেলিম আল দীন? তিনি কী ভাবতেন- এসব বৃত্তান্তই তিনি দিনপঞ্জির পাতায় রেখে গেছেন। জানতেন, এক সময় এ দিনপঞ্জির দিকেও নজর দেবেন অনুসন্ধানীরা। যে ব্যাপ্তি তিনি নাট্য-সাহিত্য ও চিন্তায় ছড়িয়ে গেছেন, তা অল্প কথায় প্রকাশ করাটা খুবই ঝুঁকির কাজ।

বিশ্বসাহিত্যের ওপর সেলিম আল দীনের গভীর পাঠই তাকে দিয়েছে হীরকহৃদয়। চর্চায় নিঃসঙ্গ হলেও তিনি ছিলেন খুবই সামাজিক ও উদার; যারা তার কাছে গেছেন সেই অনুজরা অন্তত এটাই বলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জার্মান কবি গ্যেটেকে (জোহান উল্ফগ্যাং গ্যেটে) সব সময় উচ্চাসনে রেখেছেন তিনি। বিশেষ করে, রবীন্দ্রনাথের কথা বারবার উঠে এসেছে ‘দিনলিপি’র পাতায়। বলেছেন আন্তন চেখভ নিয়েও। তিনি লিখেছেন- ‘চেখভ উন্মীলনকালে দু’জন মানুষকে দেখেছিলাম- একজন আন্তত চেখভ, অন্যজন রবীন্দ্রনাথ। কোনো তুলনা চলে না দু’জনে। তবু দু’জন কীভাবে আমার কাছে বৃক্ষ হয়ে ওঠেন।’

সেলিম আল দীনের বিশেষ ভক্তি ছিল লালনের প্রতি। তিনি মিশেল ফুঁকো ও জ্যাঁ পল সার্ত্র্রের সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। অপরদিকে (ফ্রেডরিখ) হেগেল ও কার্ল মার্ক্সের প্রতি তার আকর্ষণের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। তিনি লিখছেন-

‘হিডগানস্টেইনের চেয়ে লালন জরুরি নয়- এমন কথা কে বলতে পারে। ফুঁকো নিয়ে সব মাতামাতি। এক নারকীয় দর্শন। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে সন্দেহপ্রবণ করে তোলার দর্শন।’

মানুষের মধ্যে সব সময় ঐক্য দেখতে চেয়েছেন মহান এ নাট্যকার। যে কোনো বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতাবিরোধী সুর পাওয়া যায় তার কথায়। তিনি ছিলেন সব মানুষের পক্ষে। গ্রামের নিষ্পেষিত, শোষিত মানুষের মধ্য দিয়ে এ বয়ান এলেও বলতে হবে, এটাই ছিল তার মূল দর্শন। তিনি লিখছেন- ‘একদা হেগেল, মার্ক্স মানুষকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিলেন। তার পর ক্রমান্বয়ে মানুষকে উন্মূল করার ভাবনা। সার্ত্রে কি সব মানুষের কথা বলেছেন? আত্মকেন্দ্রিক-আত্মহননকারী- স্বার্থপর- যৌনকাতর মানুষ।’

‘দিনলিপি’তে ব্যক্তিজীবনের নানা বৃত্তান্ত তুলে ধরলেও যেভাবে আত্মীয়স্বজনের প্রসঙ্গ এসেছে, সেভাবেই এসেছে তার আত্মা ও দর্শনের স্বজনদের প্রসঙ্গ। তিনি দেশের সাহিত্য-শিল্পাঙ্গনের অনেক ব্যক্তিত্বের কথা তুলে এনেছেন এর পাতায় পাতায়। অনেক নবীন কবি-সাহিত্যিকের কথাও এসেছে উদারভাবে, যা তাদের অনুপ্রেরণার বড় উৎস হয়ে থেকে গেছে।

১৮ আগস্ট সেলিম আল দীনের জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এ আগস্টেই দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়। ইতিহাসের ওপর গভীর পাঠ নেওয়া এ ‘নাটকের কবি’ স্মরণ করেন ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে। তিনি লিখেছেন,’হায় বাহাদুর শাহ! যে অখণ্ড মাতৃভূমির দাবি তোমার গজলে, সে কেবল নির্জন সুর হয়ে দূর প্রবাসে বর্মী বাতাসে রোদন করে। ব্রিটিশরা তোমার শেষ বংশধরকেও গুলি করে কবর দিয়েছে। এরা কারা, যারা ভারত ভাগ করেছে হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলিম, মুসলিমের বিরুদ্ধে হিন্দুকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।’

‘দিনলিপি’তে নিজের অনেক কবিতা সংযোজনও করেছেন তিনি। মিথের প্রতি, বিশেষ করে দেশীয় মিথের প্রতি তার আগ্রহ ছিল অপার। এ জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গেছেন তিনি। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে শৈশবে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তার। একবার তিনি নেত্রকোনায় গেলেন। উদ্দেশ্য গারোদের মিথ সংগ্রহ। এটা তিনি করেছিলেন একটি নৃত্যনাট্য রচনার জন্য। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা নৃত্যনাট্যের ‘পতিত দশা’ দেখে তাকে আফসোস করতে দেখা গেছে।

স্বপ্নের ঘোরে বিবিধ বেলুন – সোহেল নওরোজ

উপযুক্তের সঙ্গে জনপ্রিয় বিষয়টি সব সময় যায় না। সময় অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্তকে মূল্যায়ন করতে না পেরে পরে হাপিত্যেশ করে। মহাকাল সে আফসোস বয়ে বেড়ায়। জনপ্রিয়তার স্থূল মোহে আটকা না পড়ে নিত্যনতুন আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা অসামান্য এক প্রতিভা সেলিম আল দীন (১৮ আগস্ট, ১৯৪৯-১৪ জানুয়ারি, ২০০৮) বাংলা নাটকে ভিন্ন সব আঙ্গিক যোগ করে গেছেন, যা তার জীবদ্দশাতেই আলোচিত ও সমাদৃত হয়েছে। এই নাট্যাচার্যকে চিনতে না পারার আক্ষেপ অন্তত আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে না। বাংলা সাহিত্যের আধুনিককালের অন্যতম এ নাট্যকারের নিরীক্ষার বিষয় ছিল নাটক, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নাটকেই খুঁজেছেন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবন, তাদের আবহমানকালের আচার, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে নাটকে তুলে এনে করেছেন আত্মানুসন্ধান।

সাহিত্যের যে কোনো শাখায় চলতে হলে মানুষের পথ ধরে হাঁটতে হয়। জীবনের ধরনকে ধারণ করতে হয় নিজের মধ্যে। সে জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়া চলে অবিরাম। কখনও তাকে ভাঙতে হয়, কখনও দিতে হয় নতুন আঙ্গিক। বাস্তবতার সমান্তরাল লাইন থেকে বিচ্যুত না হয়ে জীবনের কথা বলে যাওয়ার কৌশলে যোগ হয় নতুনত্ব। এক জীবনে বিশাল এ পৃথিবীর খুব কমই ছোঁয়া যায়, আঁকা যায়। সেলিম আল দীন তা জানতেন বলেই সাধারণের জীবনযাপন করে গেছেন। মৌলিকতাকে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে ক্ষুদ্রের মধ্যেই জীবনকে আটকে রেখেছেন। নাট্য-সাধনার সঙ্গে আপস না করে জীবনের সঙ্গে আপস করেছেন। একাধারে নাটক রচনা, নির্দেশনা, গবেষণা, থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা করেছেন। জীবন ও প্রকৃতি থেকে শিখে তা অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করার কাজটি এমনই নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেছেন যে, নাটক ও নাট্যতত্ত্বের একজন ‘গুরু’ হিসেবে তাকে স্মরণে রাখবে দীর্ঘকাল। তার নাটক ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

সেলিম আল দীন শুধু নাটকের গণ্ডিতে আটকে না থেকে এ দেশের নাট্যশিল্পকে বিশ্বনাট্যের রূপ দিতে অন্যদের সঙ্গে গড়ে তোলেন ঢাকা থিয়েটার ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। বাংলা জনপদের প্রান্তিক গোষ্ঠীর জীবন নিয়ে চর্চা ও নির্মাণে সমধিক মনোযোগ ছিল সেলিম আল দীনের। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক এথনিক থিয়েটারের উদ্ভাবন করেছেন তিনি। নাট্যবিষয়ক বহু গবেষণাকর্ম রয়েছে তার। বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ বাংলা নাট্যকোষ সংগ্রহ, সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেছেন। শিল্পাদর্শে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী এ নাট্যকার সমকালীন বিশ্বের শিল্পধারায় নন-জেনরিক শিল্পধারার প্রবর্তনে সচেষ্ট ছিলেন। বাংলা নাটককে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা ও পাশ্চাত্য-প্রভাবমুক্ত করে নান্দনিকতার চরম উৎকর্ষে পেঁৗছে দিতে তার প্রয়াস অনস্বীকার্য। এর পাশাপাশি তিনি টেলিভিশনের জন্য নাটক রচনা, চলচ্চিত্রের সংলাপ রচনা ও মঞ্চনাট্যের নির্দেশনা দিয়ে পুরস্কৃত ও সংবর্ধিত হয়েছেন বহুবার।

সেলিম আল দীনের নাটকের মধ্যে অন্যরকম এক গন্ধ আছে; যা খুব আকর্ষণ করে কাছে টেনে নেয়, পরক্ষণেই ভাবনার অতলান্তে ফেলে দেয়। তার নাটকে ভিন্ন ধরনের রঙ আছে। যে রঙে জীবনের কথা লেখা থাকে। খুব স্পষ্ট কিন্তু গভীর সে জীবনকে দেখতে কখনও যৈবতী কন্যার মন পড়তে হয়, কখনও ধারণ করতে হয় জন্ডিসের চোখ। এ যেন এক আশ্চর্য খেলা! বাংলার আলো-বাতাস গায়ে মেখে প্রকৃতির শৃঙ্খলে বেড়ে ওঠা মানুষটিই ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল ভেঙে বাংলা নাটকের নিজস্ব আঙ্গিক খুঁজে ফিরেছেন জীবনভর। স্র্রষ্টা এবং দ্রষ্টা হয়ে শিল্পকে দিয়েছেন নতুন উচ্চতা। তার সৃষ্টির মৌলিকত্বে শিল্পের অনন্ত মুক্তির পথ পাওয়া যায় বলেই কি-না বারবার ফিরে এসে দেখে নিতে হয় নিজেদের শেকড়ের বিন্যাস, স্বপ্নের ঘোরে বিবিধ বেলুনের ওড়াউড়ি দেখে চকিত হতে হয়-এই বুঝি সময় এলো নতুন ছাঁচে নিজেকে গড়ার!

পূর্বপুরুষের সমৃদ্ধ শস্যক্ষেত – আলমগীর মাসুদ

বাংলা নাটকের প্রবাদপুরুষ সেলিম আল দীন নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন নাটকে। শুধু সমৃদ্ধ নয়, আমৃত্যু নাটকের মধ্যেই নিজেকে নতুন আঙ্গিকের এক স্বতন্ত্র কারিগর হিসেবে নিজের নামটি গোটা বিশ্বে উপস্থাপন করেছেন। যৈবতী কন্যার মন, ধাবমান, কীর্তনখোলা, প্রাচ্য, নিমজ্জনের স্রষ্টা যেমন তিনি; অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ও গ্রাম থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নিজের জাতকে চিনিয়ে দিয়েছেন গোটা বাঙালিকে। শিল্প-সৃষ্টির এই কারিগররা আর যা-ই করুন; সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে তারা তাদের সৃষ্টিকে একেক বিষয়ে একেকটা ইতিহাসের পথে রেখে যান। আচার্য সেলিম আল দীন শুধু শহর নয়; গ্রামের সংস্কৃতিময় মানুষদের কাছেও তিনি তার নাটককে আকাশ সমান করে তুলেছেন। প্রত্যেক অঞ্চলের জনগোষ্ঠী সেলিম আল দীনকে চিনেছে, তার নাটক দেখেছে, নাটকের চরিত্র হয়েছে। লোকেশন হিসেবেও সেসব জায়গা বিদ্যমান। বলা যায়, নাটকের এই বরপুত্র একটা আয়নার মধ্যে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে একটা বার্তা পেঁৗছে দিতে চেয়েছেন এবং পেরেছেনও। তিনি চিন্তা আর ধ্যানের মধ্যে নিজেকে জাগ্রত রাখতেন অষ্ট প্রহর। যেমন, একটি মানুষের কাছে সেলিম আল দীন নামটি অচেনা হলে তিনি বলে ওঠেন, ‘সেলিম আল দীনের নাম শোনোনি! তাহলে তোমার তো এ অঞ্চলে থাকাই উচিত নয়। এখানে ঘাস কি ইটেরাও আমাকে চেনে।’ বাহ! কী জোর দিয়ে নিজেকে চিনাচ্ছেন! আশ্চর্য হলেও সত্য, তিনি একজন অচেনা মানুষের মধ্যে কীভাবে রোমান্টিকতার সঙ্গে নিজেকে পরিচয় করে তোলেন, সেসব গুণ তার ছিল। তাহলে কি বলা যায় না, একজন সেলিম আল দীন এখানেই ঈশ্বরের চরিত্র হয়ে ওঠেন? তারপর চোখ মেলে নিজের কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে স্রষ্টা বানিয়ে রাখতে জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন আজকের আমাদের হাতে আসা গানে ও নাটকে।

সেলিম আল দীন ছাত্রদের কাছেও সমান জনপ্রিয় ছিলেন। তার প্রমাণ, স্যারকে ভালোবেসে ছাত্রদের দেওয়া মৌসুমি ফলে জাহাঙ্গীরনগরের স্যারের কোয়ার্টার থেকে অন্য রকম এক সুঘ্রাণ নাকে এসে লাগত। তবে তিনি নিজেকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখেননি। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি সহজে পেঁৗছেছেন। পেঁৗছানোর চেষ্টা করেছেন অবিরাম। আর এই চেষ্টার মধ্যে সফলতাও পেয়েছেন। স্রষ্টার রূপান্তর হয়ে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন বরাবরই সামনের কাতারে। আর নাটকের মধ্যে তো তিনি মুচি, কামার, জেলে, চাষা, শ্রমিকদের চিত্র তুলতে গিয়ে নিজেকে বাংলা নাটকের এক শক্তিমান নাট্যকারের মধ্যে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন। তাই সেলিম আল দীন কেবল স্কুল-কলেজ, সাহিত্য, নাটকে শিক্ষক থাকেননি। তিনি মেহনতি মানুষের শরীরের ঘামের মতো। তার জ্ঞানকে জাত, ধর্ম এবং সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ জন্য একজন সেলিম আল দীন ফিরে ফিরে আসেন কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সমালোচক, উপস্থাপক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, সাংবাদিক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পাঠকদের মুখে, মনে, আলোচনায়, স্মৃতি ও লেখকদের কলমে। বলতে সন্দেহ নেই, সেলিম আল দীন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন শক্তিমান নাট্যকারের সম্মান পেতেন। কারণ আমরা দেখেছি এবং দেখছি, সমাজে মাতবরের যেমন খবরদারি থাকে; সাহিত্যে বলেন, কি নাটক মঞ্চেও এমন খবরদারি রয়েছে তার দখলে। যে খবরদারির রোষানলে পড়ে অনেকে ত্যাগ করে তার পছন্দের জায়গাটুকু! কিন্তু আচার্য সেলিম আল দীন বাংলা মঞ্চ কি নাটকের উঁচ্চ স্থানে থেকেও তিনি কখনও খবরদারি করতেন না। বরং তিনি হাত ধরে, ভালোবাসা দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে সবার স্বপ্ন ও কাজকে সহযোগিতা করেছেন। এখানেও সেলিম আল দীন তার সুচিন্তার মধ্য দিয়ে এক আধ্যাত্মিকতা লাভ করেছেন সবার কাছে। এখানে বলা যায় অর্থ, যশ, পুরস্কার, খ্যাতির মধ্যে থেকেও নিজের স্বভাব-চরিত্রকে বিক্রি করেননি। আর শিক্ষিত, ক্ষমতালোভী, ধান্ধাবাজদের মতো তো হনইনি; বলা যায়, এদের কালচার সংস্পর্শ থেকে নিজেকে দূরে রেখে শ্রেণি-গোষ্ঠী নয়; ধ্যান, চিন্তা, নাটকের কাজে একই সঙ্গে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের রাস্তায় পা রেখেছেন। গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাতারে নিজে যেমন হেঁটেছেন, তার নাটকও এদের মধ্যে পেঁৗছে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

আযানের সময় সংযত হওয়া জরুরি

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

কে ঐ শোণালো মোরে

আযানের ধ্বনি

মর্মে মর্মে সুর

বাজিলো কি সুমধুর…

আজানের সময় মুসলমানদের করণীয়

মুফতি মাহমুদ হাসান : পৃথিবীর সবচেয়ে সুমধুর ধ্বনির নাম আজান—এটি মুসলিম-অমুসলিম-নির্বিশেষে কোটি মানুষের উপলব্ধি। তা হবে না কেন? এ আজান তো সৃষ্টির প্রতি মহান সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার আহ্বান। একজন মানুষকে যখন তার মহান মালিকের প্রতি আহ্বান করা হয়, তার উপলব্ধি তখন কেমন হতে পারে? তাই আজানের আওয়াজ শুধু মুসলমানের অন্তরেই নাড়া দেয় না, বরং তা অমুসলিমের অন্তরকেও আকর্ষণ করে। যুগে যুগে যার অজস্র উদাহরণ রয়েছে। হ্যাঁ, হিংসুক ও নিন্দুকের কথা ভিন্ন। আল্লাহর ভাষায়,‘যার অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দেন, সে (হেদায়েতের) আলো থেকে বঞ্চিত হবেই। ’

তাই ইসলামে আজানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আজান শুনে আজানের জবাব দেওয়ারও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। আজান শ্রবণকারীরও মৌখিকভাবে আজানের উত্তর দেওয়া সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,‘যখন তোমরা আজান শুনবে, এর জবাবে মুয়াজ্জিনের অনুরূপ তোমরাও বলবে। ’ (বুখারি, হাদিস :৬১১)

আজানের জবাব দেওয়ার পদ্ধতি

আজানের জবাব দেওয়ার পদ্ধতি হলো, মুয়াজ্জিন প্রত্যেকটি বাক্য বলে থামার পর শ্রোতা ওই বাক্যটি নিজেও অনুরূপভাবে বলবে। কিন্তু মুয়াজ্জিন ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ’ ও ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ বলার সময় শ্রোতা ‘লা হাওলা ওয়া লা কুউওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ’ বলবে। এটাই বিশুদ্ধ অভিমত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস :৩৮৫)

তবে কোনো কোনো বর্ণনায় ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ’ ও ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ বলার সময়ও মুয়াজ্জিনের অনুরূপ বলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (কিতাবুদ দোয়া, তাবারানি, হাদিস : ৪৫৮)

আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউমের জবাব

ইসলামী ফিকহের বিভিন্ন কিতাবের বর্ণনামতে, ফজরের আজানে ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’-এর জবাবে ‘সাদাকতা ও বারারতা’ পড়বে। কিন্তু হাদিস ও সুন্নাহে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই বিশুদ্ধ মতানুসারে এর জবাবেও মুয়াজ্জিনের অনুরূপ ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ বলাই উত্তম। কেননা হাদিস শরিফে এসেছে, আজানের জবাবে তোমরাও মুয়াজ্জিনের অনুরূপ বলবে। (তাকরিরাতে রাফেয়ি : ১/৪৭ আহসানুল ফাতাওয়া :১০/২০৬)

প্রচলিত কিছু ভুল

এক. কেউ কেউ আজানে ‘আল্লাহু আকবার’-এর জবাবে ‘কাল্লা জালালুহু’ পড়ে থাকে। এটি সুন্নাহপরিপন্থী। (ইমদাদুল আহকাম :১/৪১৬)

দুই. অনেকেই আজানের সময় জবাব দিতে গিয়ে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’-এর জবাবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলে থাকে। এটিও উচিত নয়। কেননা এ সময় দরুদ পড়ার নির্দেশ নেই। বরং তখনো মুয়াজ্জিনের অনুরূপ ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’ বলাই সুন্নাত। (আলবাহরুর রায়েক :১/২৭৩, আহসানুল ফাতাওয়া :২/২৭৮)

এই দরুদ পাঠ করবে আজান শেষ হওয়ার পর।

তিন. আমাদের দেশে আজানে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’ বলার সময় অনেকেই বৃদ্ধাঙুলে চুমু খেয়ে চোখে মুছে থাকে। কেউ কেউ আবার সঙ্গে ‘কুররাত আইনি’—এ দোয়াও পড়ে থাকে। অথচ ইসলামী শরিয়তে এর কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং এটি বর্জনীয়। (আল মাকাসিদুল হাসানা, পৃষ্ঠা-৬০৬, ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৫/২৫৯)

চার. প্রসিদ্ধ আছে, আজানের জবাব না দিলে বা আজানের সময় কথা বললে বেঈমান হয়ে যায় কিংবা বেঈমান অবস্থায় মারা যাওয়ার ভয় আছে—এরূপ কোনো বর্ণনা হাদিসের কিতাবে নেই। সুতরাং এটি ভ্রান্ত বিশ্বাস। (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া :৫/৪৩০)

যারা আজানের জবাব দেবে না

নামাজ আদায়কারী, পানাহার অবস্থায়, ইস্তিনজাকারী, স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত, মহিলাদের ঋতুকালীন ইত্যাদি সময়। তবে অনেক আলেমের মতে, আজানের পরক্ষণেই যদি উল্লিখিত কাজ থেকে অবসর হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আজানের জবাব দিয়ে দেওয়া উত্তম। কোরআন তেলাওয়াতকারী তেলাওয়াত সাময়িক বন্ধ রেখে আজানের জবাব দেওয়া উত্তম। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৩৯৭)

জুমার দ্বিতীয় আজানের জবাব

জুমার দ্বিতীয় আজানের সময় যখন খতিব সাহেব মিম্বরে উপবিষ্ট থাকেন, তখন ফেকাহবিদদের নির্ভরযোগ্য মতানুযায়ী জুমার দ্বিতীয় আজানের জবাব মৌখিক না দেওয়াটাই উত্তম। তা সত্ত্বেও কেউ দিতে চাইলে মনে মনে জবাব দিতে পারে। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/২৯৯, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া :২/৫৮)

আজানের সময় দুনিয়াবি কথা ও কাজে লিপ্ত থাকা

আজানের সময় চুপ থাকা সুন্নত। একান্ত প্রয়োজন না হলে সাধারণ দ্বিনি ও দুনিয়াবি কথা বা কাজে লিপ্ত থাকা অনুচিত। বক্তৃতা বা সেমিনার চলাকালে আজান হলে সাময়িক তা স্থগিত রাখবে। ওয়াজ বা কোনো দ্বিনি মাহফিল চলাকালেও তা সাময়িক বন্ধ রেখে সবাইকে আজানের জবাব দেওয়া উত্তম। মনে রাখতে হবে, একজন আজানের জবাব দিলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায় না। কেননা আজানের জবাব দেওয়া শ্রবণকারী সব মুসলমানের জন্য সুন্নত। আর আজানের জবাব দেওয়া সুন্নতে কেফায়া নয়। (ফাতহুল কাদির : ১/২৪৮, রদ্দুল মুহতার : ১/৩৯৯, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া :৫/৪২৭)

রেডিও-টেলিভিশনের আজানের জবাব

মুয়াজ্জিনের আজান রেডিও-টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হলে তার জবাব দেওয়া সুন্নাত। রেকর্ড করা হলে তার জবাব দেওয়া সুন্নাত নয়। (বাদায়েউস সানয়ে : ১/৬৪৬, আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল :১/১৭০)

আজানের পর দোয়া

আজানের পর দরুদ শরিফ ও দোয়া পাঠ করা সুন্নাত। হাদিস শরিফে এর ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,‘যে ব্যক্তি আজানের পর আল্লাহুম্মা রাব্বা হাজিহিদ…’ এ দোয়াটি পাঠ করবে, তার জন্য আখিরাতে আমার সুপারিশ অবধারিত।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১৪) অন্য বর্ণনায় রয়েছে,‘তোমরা মুয়াজ্জিনের অনুরূপ শব্দে আজানের জবাব দাও, অতঃপর দরুদ পাঠ করো, এরপর আমার জন্য বেহেশতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থানের জন্য দোয়া করো, আশা করি, আল্লাহ তাআলা আমাকেই সে স্থান দান করবেন। যে ব্যক্তি এ দোয়া করবে, তার জন্য আখিরাতে আমার সুপারিশ অবধারিত। ’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৮৪)

আজানের পর হাত তুলে মুনাজাত

আজানের পর দরুদ শরিফ পড়ে একটি বিশেষ দোয়া পড়ার কথা হাদিস শরিফে রয়েছে, তবে আজানের পর হাত তুলে দোয়া পড়া ও মুনাজাত করার কথা হাদিসে নেই। (ফয়জুল বারি : ২/১৬৭, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া :১৬/২০৮)

একামতের জবাব দেওয়াও মুস্তাহাব

আজানের মতো মুসল্লিদের একামতের জবাব দেওয়াও মুস্তাহাব। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/৫৭) একামতের জবাবও আজানের অনুরূপ। শুধু একামতের মধ্যে ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’-এর জবাবে’ ‘আক্বামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা’ বলবে। হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত,‘একবার হজরত বেলাল (রা.) একামত দিচ্ছিলেন, তখন নবী করিম (সা.)-ও তাঁর সঙ্গে আজানের অনুরূপ উত্তর দিয়েছেন, তবে ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ বলার সময় বলেন,‘আক্বামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা’। (আবু দাউদ, হাদিস :৫২৮)

লেখক : ফতোয়া গবেষক,ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার

এসআর শানু খান : যুগের পরিক্রমায় বিদেশি কালচারের সংস্পর্শে আমাদের সমাজের যে আজ কি হাল হয়েছে সেটা ভাবতে গেলে চোখ কপালে উঠে। আজ আমরা টেলিভিশন ছাড়া যেন কোনো কিছু চিন্তাই করতে পারি না। বাড়িতে একটা টেলিভিশন সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি চ্যানেল সংযোজিত ক্যাবল নেটওয়ার্ক না থাকলে সেই বাড়িটাকে এখন ভুতুড়ে বাড়ি বলে মনে হয়। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়। দিনের পর দিন বাজারে যেমন বিভিন্ন চ্যানেল সংবলিত ক্যাবল নেটওয়ার্কেও অভাব হচ্ছে না ঠিক তেমনিভাবে দিন যাচ্ছে আর বাজারে নিরঙ্কুশভাবে বেড়ে চলছে বিভিন্ন নামের ডেকোরেশন।

ডেকোরেশনের মানে এখন আর শুধু চেয়ার টেবিল নয় এখন ডেকোরেশনের দোকান মানেই বড় বড় বিল্ডিং-এর মতো কোম্পানি বক্স। হাতির সূরের মতো লম্বা লম্বা সব মাইক ছেলের গালে ভাত, মেয়ের কান ফুটানো, ছেলের সুন্নাতে খুৎনা, মেয়ের গায়ে হলুদ, মেয়ের বিয়ে এমন সব অনুষ্ঠান মানেই তিন চার সপ্তাহব্যাপী বড় বড় সাউন্ড বক্স বাড়ি এনে ফুল গিয়ারে গান-বাজনা করা। গান-বাজনা করাটা এখন এতটাই জরুরি কালচার হয়ে পড়েছে যে বাড়িতে পোষা মুরগিটা প্রথম ডিম পাড়লেও মন চাই মাইক ভাড়া করে এনে কয়েকদিন গান বাজায়।

একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বিনোদনের প্রয়োজন আছে। এটা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই বিনোদনেরও যে একটা সীমা থাকার দরকার আছে। শখের বশে বিনোদন করতে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকে ভুলে গেলে। নিজের ধর্মকে অমান্য করলে তো আর হবে না। অন্য সব যেমন তেমন ধর্মীয় ব্যাপারে মানুষের সিরিয়াস হয়ে যাবার বিষয়টা কিন্তু একটা সহজাত প্রবৃত্তি। এই পৃথীবির সব মানুষই কি নাস্তিক নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়লেও কোনো মানুষই ধর্মের অবমাননা মেনে নিতে চাইবেন না।

বনের পশুরা বনের বিভিন্ন অংশে তার শিকার খোঁজার জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও তার কিন্তু একটা নিজস্ব ধর্ম আছে। নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো কোনোভাবেই ডিঙ্গিয়ে চলেন না। সৃষ্টির সেরা জীব আশরাফুল মাখলুকাত পদবি ঘাড়ে নিয়ে মানুষ কেমন করে যে নিজের ভীতটা ভুলে যায় ভুলে থাকে বা থাকতে পারে সেটা কিন্তু একটু ভাবার বিষয়।

আশপাশে লক্ষ্য করুন গান-বাজনার উৎপাতে আযান শোনা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। বিনোদনের জগতে মানুষ নিজেকে এমনভাবে ডুবিয়ে নিয়েছেন যে কখন আযান হয় সেই জ্ঞানটাও আজ হারিয়ে ফেলেছেন। গান-বাজনা আরামছে চালিয়ে যাচ্ছেন বিরতিহীনভাবে। দেশীয় যে চ্যানেলগুলো আছে এগুলোর বেশির ভাগই আযানমুক্ত অবিরত ধায়ায় বিজ্ঞাপনযুক্ত। চ্যানেলগুলোর সারাদিনের সিডিউলে শত শত প্রোগ্রাম স্থান পেলেও দিনের পাঁচ ওয়াক্ত আযানের জন্য পাঁচ মিনিট করে বরাদ্দ করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। দেশীয় চ্যানেলগুলো বেশির ভাগই ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলোকে ফলো করবার চেষ্টা করে থাকেন। যেহেতু ইন্ডিয়ান চ্যালেনগুলোতে আযান বলে কোনো শব্দ নাই। যেহেতু বাজারের চায়ের দোকানগুলোতে টিভি বন্ধ হওয়ার কোনো লাইন নাই।

মসজিদে মুয়াজ্জিন আযান দিচ্ছেন আর এ পাশে চায়ের দোকানগুলো ফুল ভলিউমে চলছে টিভি। আযানের প্রতি আমাদের বিন্দুমাত্র যে সম্মান নাই সেটার প্রমাণ দিতেই কিন্তু এতসব আয়োজন। হায় আফসোস অন্য ধর্মাবলম্বী লোকদের কথা নাই বা বললাম একজন মুসলমানের সন্তান, আযান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জানা লোকগুলো কেমনে পারে এই আযানকে অসম্মান করতে। ক্যামনে পারে নিজের ধর্মের সম্মানে আঘাত আনতে।

আযানের সময় মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে আযান পাঠ করবার ফযীলত জানা থাকতেও কেন আমরা সেটা করিনা। কেন আমার নিজেদেরকে নিজের প্রভুর থেকে দূরে সরিয়ে নিতে এতটা মরিয়া হয়ে পড়েছি।

তাই কর্তৃপক্ষের নিকট আকুল আবেদন যথাবিহিত সম্মানপূর্বক যথাযথ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আযানের সময় টিভি-সিডি গান-বাজনা বন্ধ রাখার জন্য কড়া আইন জারি করুন। এবং পুলিশিং তত্তাবধানের মাধ্যমে হলেও গ্রামগঞ্জের হাটবাজারগুলোর টিভির দোকানসহ বাড়ির উপর গান-বাজনা করার উপর জরুরি আইন চালু করে ধর্মের আবমাননা হ্রাস করুন।

মানুষ বড়-ই আজব চিজ !

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

peculiarity-of-people

ক্ষমতা প্রেমের চেয়েও অনেক বেশি আবেগের

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

ওরিয়ানা ফালাচি। ইতালীয় বংশোদ্ভূত একজন সাংবাদিক। ৭০ দশকে দুনিয়া কাঁপিয়েছিলেন সাক্ষাৎকারভিত্তিক সাংবাদিকতা করে। বরেণ্য, বিতর্কিত রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কদের সাক্ষাৎকার নিতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছেন লৌহমানব ও লৌহমানবীদের। তার আক্রমণাত্মক প্রশ্ন অনেককে করেছে ক্ষীপ্ত। পরিণতিতে তাকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যেতে হয়েছে অনেক দেশ থেকে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সত্য বের করার কৌশল থেকে কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। উপমহাদেশের তিনজন রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাক্ষাৎকার নিয়ে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরী গ্রন্থে তিনটি সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশে বইটির অনুবাদ করেছেন আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। বইটি ছেপেছে আহমদ পাবলিশিং হাউস। জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাক্ষাৎকার কিভাবে নিয়েছিলেন তার একটি চমকপ্রদ বয়ান রয়েছে বইতে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো

bhutto 21চমকে দেয়ার মতো আমন্ত্রণ। এসেছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর তরফ হতে এবং বুঝে উঠার কোনো উপায় ছিল না। আমাকে বলা হলো যত শিগগির সম্ভব আমাকে রাওয়ালপিন্ডি যেতে হবে। অবাক হলাম, কেন? প্রত্যেকটা সাংবাদিক কমপক্ষে একবার তাদের দ্বারা আহূত হবার স্বপ্ন দেখে যাদেরকে তারা অনুসন্ধান করবে। সেই ব্যক্তিত্বগুলো হারিয়ে যায় বা নেতিবাচক সাড়া দেয়। কিন্তু স্বপ্ন যুক্তিহীন এবং সন্দেহে তার পরিসমাপ্তি। ভুট্টো কেন আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর জন্যে কি আমার কাছে বার্তা দিতে চান? ইন্দিরা গান্ধীকে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির সাথে চিত্রিত করার কারণে আমাকে শাস্তি দেবেন? প্রথম ধারণা দ্রুত নাকচ করলাম। শত্রুর সাথে যোগাযোগ করার জন্যে তার বাহকের প্রয়োজন নেই এ জন্যে সুইস বা রুশ কূটনীতিক আছেন। দ্বিতীয় ধারণাও বাতিল করে দিলাম। শিক্ষিত ও ভদ্রলোক বলে ভুট্টোর সুনাম আছে। এ ধরনের লোকেরা সাধারণত তাদের আমন্ত্রিত অতিথিকে হত্যা করে না। আমার তৃতীয় অনুমানটা হলো, তিনি হয়তো চান আমি তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। আমার হৃদয় চমৎকারিত্বে পূর্ণ হলো। বাংলাদেশের হতভাগ্য প্রেসিডেন্ট মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আমার নিবন্ধ পাঠের পরই ভুট্টোর মনে হয়তো বিষয়টা উদয় হয়েছিল। আমার সন্দেহের উপর বিজয়ী হলো আমার অনুসন্ধিৎসা এবং আমি আমন্ত্রণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম। আমন্ত্রণ গ্রহণ করেও তাকে জানতে দিলাম যে, তার অতিথি হলেও আমি সবার ক্ষেত্রে যে স্বাধীন বিচার বিবেচনায় লিখি, এক্ষেত্রেও তার কোন হেরফের হবে না এবং যে কোন ধরনের সৌজন্য বা তোষামোদে আমাকে কিনে ফেলা সম্ভব হবে না। ভুট্টো জবাব দিলেন : অবশ্যই, তাই হবে। এবং মানুষটি সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা হলো তাতেই।

এ মানুষটি সম্পর্কে পূর্ব ধারণা করা যায় না। অসম্ভব গোছের। নিজের মর্জিতে এবং অদ্ভুত সিদ্ধান্তে পরিচালিত হন। তীক্ষè বুদ্ধিমান। ধূর্ত, শিয়ালের মতো বুদ্ধিমান। মানুষকে মুগ্ধ করতে, বিভ্রান্ত করতেই যেন তার জন্ম। সংস্কৃতি, স্মরণশক্তি ও ঔজ্জ্বল্য দ্বারা লালিত তিনি। শহুরে আভিজাত্য তার জন্মাবধি। রাওয়ালপিন্ডি বিমানবন্দরে দু’জন সরকারি অফিসার আমাকে স্বাগত জানিয়ে অত্যন্ত আবেগের সাথে বললেন যে, প্রেসিডেন্ট আমাকে এক ঘণ্টার মধ্যে স্বাগত জানাবেন। তখন সকাল দশটা। গত আটচল্লিশ ঘণ্টা আমি বিনিদ্র কাটিয়েছি। আমি প্রতিবাদ করলাম; না এক ঘণ্টার মধ্যে নয়। আমার একটা ভালো গোসল এবং সুনিদ্রা প্রয়োজন। অন্য কারো কাছে এটা খুব অপমানজনক মনে হতো। তার কাছে নয়। তিনি সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত সাক্ষাৎ মুলতবি রাখলেন এই বলে যে, রাতে আহারটা আমার সাথেই করবেন বলে আশা করছেন। বুদ্ধিমত্তার সাথে সৌজন্য যোগ হলে তা অবদমনের সেরা অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। এটা অনিবার্যই যে তার সাথে সাক্ষাৎ আন্তরিকতাপূর্ণ হবে।

ভুট্টো আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন হাসি ছড়িয়ে খোলা হাত বাড়িয়ে। তিনি দীর্ঘ, মেদবহুল। তাকে দেখতে একজন ব্যাংকারের মতো, যে কাউকে পেতে চায় তার ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্যে। চুয়াল্লিশ বছর বয়সের চেয়েও অধিক বয়স্ক মনে হয় তাকে। তার টাক পড়ছে এবং অবশিষ্ট চুল পাকা। ঘন ভুরুর নিচে তার মুখটা বিরাট। ভারি গাল, ভারি ঠোঁট, ভারি চোখের পাতা। তার দু’চোখে রহস্যজনক দুঃখময়তা। হাসিতে কিছু একটা লাজুকতা।

বহু ক্ষমতাধর নেতার মতো লাজুকতায় তিনি দুর্বল ও পঙ্গু। তিনি আরো অনেক কিছু, ইন্দিরা গান্ধীর মতো। সবারই নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব। যতই তাকে পাঠ করা হোক, ততই অনিশ্চিত হতে হবে। দ্বিধায় পড়তে হবে। একটু ঘুরালে ফিরালে প্রিজমে যেমন একই বস্তু বিভিন্ন রূপে দেখা যায়, তিনি সে রকম। অতএব তাকে বহুভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এবং তার প্রতিটিই যথার্থ উদার, কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিস্ট, কমিউনিস্ট, নিষ্ঠাবান ও মিথ্যুক। নিঃসন্দেহে তিনি সমসাময়িককালের সবচেয়ে জটিল নেতাদের একজন এবং তার দেশে এ যাবৎ জন্মগ্রহণকারী নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শুধুই একজন। যে কেউ বলবে, ভুট্টোর কোনো বিকল্প নেই। ভুট্টো মরলে পাকিস্তান মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।

তার ব্যক্তিত্ব ইন্দিরা গান্ধীর চেয়ে বাদশাহ হোসেনকেই বেশি মনে করিয়ে দেবে। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট একটি দেশকে পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠে। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি মাটির পাত্র হিসেবে লৌহপাত্র দ্বারা, অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ দ্বারা দলিত মথিত। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি আত্মসমর্পণ না করতে বা কোনো কিছু ছেড়ে না দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো প্রতিরক্ষা ব্যুহ ছাড়াই বন্দি শিল্পীর মতো সাহসিকতার সাথে তিনি সবকিছু প্রতিরোধ করেন। অন্যভাবে তাকে দেখে জন কেনেডির কথা মনে পড়বে। কেনেডির মতো তিনি প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়েছেন, সে কারণে তার কাছে কিছুই অসম্ভব ছিল না। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বিজয় করাও নয়। এ জন্যে ব্যয় যাই হোক না কেন। কেনেডির মতো তার একটি স্বচ্ছন্দ, মধুর ও সুবিধা ভোগের শৈশব ছিল। কেনেডির মতো ক্ষমতার দিকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল জীবনের প্রারম্ভেই।

অভিজাত জমিদার পরিবারে তার জন্ম। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া-বার্কেলিতে এবং পরে বৃটেনে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি ডিগ্রি নিয়েছেন আন্তর্জাতিক আইনে। ত্রিশ বছর বয়সের পরই তিনি আইয়ুব খানের একজন মন্ত্রী হন, যদিও পরে তাকে অপছন্দ করেন। যখন তার বয়স চল্লিশের কিছু কম তখন আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের মন্ত্রীদের একজন ছিলেন। বেদনাদায়ক ধৈর্যের সাথে তিনি প্রেসিডেন্টের পদ পর্যন্ত পৌঁছেন। কিছু সহযোগীর দ্বারা এ পর্যন্ত আরোহণকে তিনি নিষ্কণ্টক রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ক্ষমতা প্রেমের চেয়েও অনেক বেশি আবেগের বস্তু। যারা ক্ষমতা ভালোবাসে তাদের পেট শক্ত, নাকটা আরো শক্ত। বদনামে তাদের কিছু আসে যায় না। ভুট্টো বদনামের তোয়াক্কা করতেন না। তিনি ক্ষমতা ভালোবাসেন। এ ধরনের ক্ষমতার প্রকৃতি আন্দাজ করা শক্ত। ক্ষমতা যে তার কাছে কি তা বুঝা যায় না। যারা সত্য বলে এবং বয়স্কাউটসুলভ নৈতিকতা প্রদর্শন করে এমন রাজনীতিবিদদের থেকে সতর্ক থাকার উপদেশ দেন তিনি। তার কথা শুনে এ বিশ্বাস হবে যে তার লক্ষ্য অত্যন্ত মহৎ এবং তিনি সত্যি সত্যি একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু করাচিতে তার সমৃদ্ধ জাঁকজমকপূর্ণ লাইব্রেরি দেখলেই বুঝা যাবে যে, মুসোলিনি ও হিটলার সম্পর্কিত গ্রন্থাবলী সম্মানের সাথে রূপালী বাঁধাই এ সমৃদ্ধ। যে যতেœর সাথে এগুলো সংরক্ষিত তাতে উপলব্ধি করা সহজ যে এগুলোর উপস্থিতি শুধু গ্রন্থ সংগ্রাহকের আগ্রহের কারণেই নয়। সন্দেহ ও ক্রোধ দানা বেঁধে উঠবে। তাকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে, তার সত্যিকার বন্ধু ছিলেন সুকর্ণ ও নাসের এই দুই ব্যক্তিই সম্ভবত সদিচ্ছা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন, কিন্তু তারা উদারনৈতিক ছিলেন না। ভুট্টোর গোপন স্বপ্ন একনায়ক হওয়া। রূপালী বাঁধাইয়ের গ্রন্থগুলো থেকেই তিনি কি একদিন তার জ্ঞান আহরণ করবেন? স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং বিরোধী দলের কোন রাজনৈতিক অর্থ কখনো ছিল না এমন একটি দেশ সম্পর্কে অজ্ঞ পাশ্চাত্যের লোকেরাই এ ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। এসবের বদলে সে দেশে বিরাজ করেছে দারিদ্র্য, অবিচার এবং নিপীড়ন।

ভুট্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎকার সমাপ্ত হয়েছে ছয় দিনে পাঁচটি পৃথক বৈঠকে। তার অতিথি হিসেবে তার সাথে কয়েকটি প্রদেশও সফর করেছি এ সময়ে। পাঁচটি বৈঠকে আলাপের সূত্রও হয়েছে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। প্রথম সাক্ষাৎকার বৈঠক হয় রাওয়ালপি-িতে, আমার উপস্থিতির দিন সন্ধ্যায়। দ্বিতীয় আলোচনা লাহোরের পথে বিমানে। তৃতীয় বৈঠক সিন্ধুর হালা শহরে। চতুর্থ এবং পঞ্চম বৈঠক করাচিতে। আমি সব সময় তার পাশে বসেছি, টেবিলেই হোক আর যাত্রাপথেই হোক এবং চাইলে আমি তার একটা চিত্রও আঁকতে পারতাম। ভুট্টোকে অধিকাংশ সময়ই দেখেছি পাকিস্তানি পোশাকে, হালকা সবুজ জামা এবং স্যান্ডেল পায়ে। সমাবেশে বক্তৃতার সময় মাইক্রোফোনের সামনে তিনি কর্কশভাবে চিৎকার করেন, প্রথমে উর্দু পরে সিন্ধিতে। বক্তৃতার সময় দু’হাত আকাশে ছুড়তে থাকেন। সবকিছুর মাঝে প্রকাশ করেন তার কর্তৃত্ব। হালার জনসমাবেশে অসংখ্য লোক যখন তার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে, শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গও সেখানে। কিন্তু তিনি কক্ষে বসে লিখছেন। যখন সভাস্থলে পৌঁছলেন তখন রাত। কার্পেটের উপর দিয়ে রাজপুত্রের মতো পা ফেলে তিনি এগিয়ে মঞ্চে উঠলেন। রাজপুত্রের মতোই আসন গ্রহণ করলেন এবং আমিও তার পাশে বসলাম- বেশ কিছু গোঁফওয়ালা লোকের পাশে আমিই একমাত্র মহিলা, যেন সুপরিকল্পিত একটা প্ররোচনা। আসনে বসে তিনি দলের নেতাদের অভ্যর্থনা জানালেন। সবশেষে একজন দরিদ্র লোক, তার সাথে নিয়ে এলো রঙ্গিন কাপড় ও মালায় সজ্জিত একটি বকরী। এটি তার সামনে কোরবানি করা হবে।