আর্কাইভ

Archive for the ‘পরিবেশ’ Category

রম্য-কথনঃ ঢাকা শহর আইস্যা আমার পরান জুড়াইছে…

10 unknown facts about dhaka

Advertisements

পরিবেশগত ভয়াবহ পরিবর্তন!

hot weatherসালেহা চৌধুরী : বিজ্ঞানী, ভূগোল পণ্ডিত, আবহাওয়া অফিস, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী সকলের ধারণা, ১০ থেকে ২৫ বছরের ভেতরে এই পৃথিবীতে ভয়াবহ পরিবর্তন হবে। এখন থেকে সতর্ক না হলে এই পরিবর্তন ঠেকানো যাবে না। প্রথমেই রাজনীতিবিদদের ধারণা, ১০ বছরের ভেতরেই এসব হবে। যেমন রাশিয়া খণ্ড খণ্ড হবে। এই বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশটি আর বড় থাকবে না। রাশিয়ার ফেডারেশন ভেঙে যাবে। ছোট ছোট দেশে বিভক্ত হবে রাশিয়া। জার্মানিতে সমস্যা হবে। ইউরো সেই সমস্যার কারণ হবে। ইউরোপের অন্য দেশের জনসংখ্যা কমলেও পোল্যান্ডে কমবে না এবং ভবিষ্যতে পোল্যান্ড ইউরোপের অন্য দেশগুলোর ওপরে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে চারটি ইউনিয়ন হবে। টার্কি ও আমেরিকার মধ্যে একটা ভালো সমঝোতা ও বন্ধুত্ব হবে। ‘ব্লাকসির’ ওপরে ক্ষমতা নিয়ে সমঝোতা। চীন সমুদ্রের পাশের দেশগুলো সমৃদ্ধ; তবে দেশের ভেতরের দেশগুলোতে অর্থাভাব হবে। ওরা কমিউনিজমে বিশ্বাস হারাবে। বলছেন সেসব রাজনীতিবিদ, এক চীনের ভেতর জন্ম নেবে ১৬টি নতুন চীন। জাপান ‘নাভাল’ বা নৌবাহিনীর ক্ষমতায় অনেক বিশাল হয়ে শীর্ষে চলে যাবে।

জল-হাওয়া ও ভৌগোলিক পরিবর্তনও হবে অনেক। দূষণ বাড়বে কলকারখানা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। দক্ষিণ মেরু সরে যাচ্ছে, গলে যাচ্ছে। এতে পৃথিবীতে একটা বড় পরিবর্তন আসবে। কার্বন যেভাবে বাতাস ও পরিবেশকে শেষ করছে, তা বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ সীমায় চলে যাবে- প্রতিদিন যে তেল, গ্যাস ব্যবহার হয় তার কারণে। ১৮৭০ থেকে ২০১৬ সালের ভেতর ৫ বিলিয়ন টন ফসিল ফুয়েল বা তেল, গ্যাস পুড়ে বাতাসে দূষণ হয়েছে।

নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। চারভাগের এক ভাগ নদী সাগরে যেতে পারে না। বনভূমি নষ্ট হওয়ার কোনো শেষ নেই। আরাল সির ৭০ ভাগ পানি শেষ। এ ছাড়া ভারত ও চীন কাঠ, গোবর পুড়িয়ে আরও দূষণ করছে। বাতাসে সিও-২ গ্যাসের পরিমাণ এত বেড়ে গেছে, এখন পরিবেশ ঠিক রাখাই মুশকিল। এই গ্যাসটির গাছপালার জন্য দরকার। তবে এখন যা জমেছে তেমন বেশি নয়। প্লাস্টিক নামের এক ভয়াবহ জিনিস আবিস্কারের ফলে এমন হয়েছে- হিসাব এই ৫.২ বিলিয়ন প্লাস্টিক সাগরে ভাসে। যার ওজন ২৬৪.৯৪০ টন। এগুলো সাগরকে শেষ করবে। বন কাটার জন্য সিও-২ গ্যাস গাছ টেনে নিতে পারছে না। বাড়তি গ্যাসগুলো বাতাস ভারি করছে। গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অনেক ঝড় ও খরা এসব বাড়তেই থাকবে। গাছ কাটার ফলে যা হয় সেটা এবার বলছি- আমাদের পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখতে গাছের প্রয়োজন অনেক। সে কথা পৃথিবীর লোক জানে। তবু প্রতিদিন যে পরিমাণ গাছ কেটে ফেলা হয়, সে পরিমাণ লাগানো হয় না। প্রতি বছর ১৩ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি কেটে ফেলা হয়। যে জায়গার পরিমাণ গ্রিস দেশের সমান। বাংলাদেশের গাছ কেটে ফেলা হয় নির্মমভাবে। শালবন, সুন্দরবন সবকিছু শেষ হতে চলেছে। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৩০ হাজার ঝাউগাছ কেটে ফেলা হয়েছিল টেকনাফ এলাকায়। শুনতে পাই, শেখ হাসিনা নাকি এই ঘটনায় মর্মাহত এবং অপরাধীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, যেন ভবিষ্যতে ওরা এমন না করে। এরপরও তো গাছ কাটার কমতি নেই। গাছের কারণে আমাদের পৃথিবীতে কার্বন ডাইঅক্সাইড বা সিও গ্যাসের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এই সিও-২-কে গ্রিনহাউস গ্যাসও বলা হয়। গাছ কাটার কারণ- মানুষের জন্য জায়গার প্রয়োজন। আবার কখনও গাছ কেটে ব্যবসা করে অনেকে। প্রতিদিন যে পরিমাণ গাছ কাটা হয় হয়তো একদিন পৃথিবী গাছশূন্য হয়ে যাবে। তখন? পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য। ব্রিটেন এ কথা জানে। তারা নিয়মিত গাছ লাগায়। তবু সেখানে গাছের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এই পৃথিবীর ৩০ ভাগ বনভূমির দেশগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, ব্রাজিল, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইন্দোনেশিয়া, পেরু ও ভারত। এই পৃথিবীর ৩০ ভাগ জায়গা বনভূমিতে ঢাকা। কিন্তু ৩০ ভাগের পরিমাণ আস্তে আস্তে কমতে শুরু করেছে। এখন ঠিক কতভাগ বনভূমি সেটাও জানা যাবে।

আমাদের উচিত যেখানে যতটুকু খালি জায়গা আছে গাছ লাগানো। বাড়ির সামনে-পেছনে-ছাদে-ব্যালকনিতে। কত সব গাছ আছে যা থেকে দামি ওষুধও পাওয়া যায়। উইলো থেকে আসপিরিন। অর্জুন থেকে হার্টের ওষুধ। আর্নিকা গাছ থেকে ভাঙাচোরা মেরামতির ওষুধ। আরও কত কি। আমার বাড়িতে এই গাছের গুণাগুণের একটি বিশাল কলেবর বই আছে। পড়তে পড়তে অবাক হয়ে ভাবি, এই পৃথিবীতে কেবল গাছই তো মানুষের সব অসুখ সারাতে পারে।

deforestationরেনফরেস্ট এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অরণ্য। যার পরিমাণ ২.৫ মিলিয়ন স্কয়ার মাইল। একে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস বা ‘লাংগস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। কারণ আমাজনের রেনফরেস্ট এই পৃথিবীতে যত অক্সিজেন প্রয়োজন তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ সরবরাহ করে। গাছ অক্সিজেন দেয়। টেনে নেয় পৃথিবীর ক্ষতিকারক গ্যাস কার্বন ডাইঅক্সাইড। এই কার্বন যত বাড়বে পৃথিবী তত বেশি ভয়াবহ জায়গা হয়ে উঠবে। এবার একটা গাছ কতটা কার্বন টেনে নেয় নিজের শরীরে বা ধরে রাখে তার একটা হিসাব। একশ’ বছরে একটা গাছ দুই টন কার্বন ডাইঅক্সাইড টেনে নেয়। ৫০ বছরে টেনে নেয় এক টন কার্বন। ২৫ বছরে টানে .৫ কার্বন ডাইঅক্সাইড। দশ বছরে টেনে নেয় ০.২ টন কার্বন এবং পাঁচ বছরে টেনে নেয় ০.১ টন কার্বন। গাছের নিচে দিয়ে হাঁটতে গেলে শরীর জুড়িয়ে যায় কেন আমাদের? ওরা আর কিছু নয় কেবল আমাদের জন্য বিতরণ করে অক্সিজেন আর সবুজ আশ্বাস।

এই গাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে ২০০২-এর সেপ্টেম্বর মাসে একটা বড় কনফারেন্স হয় জোহানেসবার্গে। যাকে বলা যেতে পারে ‘ওয়ার্ল্ড সামিট।’ সেখানে প্রধান বিষয় ছিল- সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফরেস্ট। গাছ যেভাবে শেষ হতে চলেছে সে নিয়ে শঙ্কিত প্রায় পৃথিবীর সব দেশের মানুষ।

আমাদের আজকের কার্বনের কারণে পায়ের ছাপ কালো। কারণ বাতাস ক্রমাগত দূষিত হয়ে উঠছে। সেটা এখন সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ কার্বনময়। বাড়িঘরগুলো মুছে দেওয়ার পরও খালি পায়ে হাঁটলে পা কালো হয় কেন? কারণ বাতাসে কার্বন বেড়েই চলেছে।

এসবের কি সমাধান নেই? হয়তো আছে। খনিজ তেল-গ্যাস না খরচ করে আমরা যদি সূর্য থেকে তাপ নিই, বাতাস থেকে এনার্জি সংগ্রহ করি, তাহলে হয়তো পৃথিবীর অবস্থা আর একটু ভালো হতে পারে। গাছ না কেটে গাছের সংখ্যা বাড়ানো, গাড়ির সংখ্যা কমানো। ভাবা যায় বর্তমানে বাংলাদেশের রাস্তায় আরও যদি গাড়ি নামে? নামবেই। আইন না করলে সেটা কমবে না। যদি কেউ গাড়ি তেল ছাড়া বা গ্যাস ছাড়া চালাতে পারেন, তাহলে আশার কথা। একটা এরোপ্লেন সৌরশক্তিতে চলেছে। অনেক জায়গা এখন সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীল। এসব বাড়ানো, আল্লাহর দান সূর্য-বাতাসকে কাজে লাগানো, যে এনার্জি বা শক্তি সূর্যে, বাতাসে, ঢেউয়ে, পানিতে, পৃথিবীর তাপে (জিও থার্মাল এনার্জি), তাকে ধরে ফেলা শিখতে হবে। পৃথিবীতে এসবই মুক্তি। যে এনার্জি ব্যবহার করতে করতে ক্ষয় হয় না, তাকেই বলা হয় ‘রিনিউয়েবল এনার্জি’। সূর্যটা আরও আট বিলিয়ন বছর ওইভাবে আকাশে ঝুলে থাকবে। ওকে কাজে লাগানো অবশ্যই দরকার। বাতাসকে কাজে লাগানো আর এসব কাজে লাগানোর আরও একটি উপকারী দিকে হলো, এসব এনার্জি পেতে পানি খরচ একেবারেই নেই। ফলে যেটা হবে সে এই- এই পৃথিবীর পানি খরচের একশ’ ভাগের পঞ্চাশ ভাগে কমে যাবে। দূষণ কমে যাবে। আমাদের শরীর-স্বাস্থ্য ভালো হবে বলে আশা করা যায়।

আর আমাদের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী? কিছু অঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাবে। পৃথিবীর আরও নানা জায়গার মতো। জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ একটা অঙ্কে পৌঁছাতে পারে। যেসব অঞ্চল ডুবে যাবে সেসব জায়গার মানুষজনের পুনর্বাসন করাতে হবে- রোহিঙ্গাদের মতো। তারপরও যেটুকু বাংলাদেশ থাকবে, সেটুকু ভালোই থাকবে বলে আশা করা যায়। তারপরও মানুষজন পাগলের মতো ছুটে এ-দেশে ও-দেশে যেতে চাইবে। সেটা কতটা পারবে আমি কী করে বলি? আমার হাতে তো কোনো ক্রিস্টাল বল নেই।

ধ্বংসের মুখে লালকুঠি

lalkuthi 1অযত্ন-অবহেলায় প্রাচীন স্থাপত্য লালকুঠি (নর্থব্রুক হল) এখন ধ্বংসের পথে। শ্রীহীন ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও লালকুঠির সেই জৌলুস আর নেই। লাল রংও মলিন হয়ে গেছে। রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও সৌন্দর্যময় স্থাপত্যিক নিদর্শন ফরাশগঞ্জে অবস্থিত নর্থব্রুক হল। ১৮৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ঢাকা সফরে এলে তার সফরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এ ভবনটি টাউন হল হিসেবে নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন ঢাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা গভর্নর জেনারেল নর্থব্রুকের সম্মানে এ ভবনের নাম দেন নর্থব্রুক হল। ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকা পৌরসভা সংবর্ধনা দেয়। নর্থব্রুক হলের ভবনটি লাল রঙে রাঙানো ছিল। পরে নর্থব্রুক হলটিকে লালকুঠি নামে ডাকা হতো। এ ভবন সংলগ্ন সড়কটি নর্থব্রুক হল রোড নামে পরিচিত।

এক সময় পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ লালকুঠি। ৩৬৫টি আসনের হলরুমে নাটক ছাড়াও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সভা-সমাবেশের জন্য ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের বার্ষিক মিটিং উপলক্ষেও এ হল ব্যবহার করত। পুরান ঢাকা সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিক দিয়ে অগ্রণী ছিল। তাছাড়া সংস্কৃতি ও শিল্পকলার লীলাভূমি সুপ্রাচীন ঢাকা। সেই সময়ে এ নর্থব্রুক হলে প্রায় নিয়মিতই মঞ্চ নাটক অনুষ্ঠিত হতো। ষাটের দশকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এখানে নাটক চলত। বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রবীর মিত্র ষাটের দশকে লালকুঠিতে নিয়মিত নাট্যচর্চা করতেন। এ লালকুঠির নাটক থেকেই তিনি সিনেমায় এসেছিলেন।

১৮৭৯ সালের শেষের দিকে নর্থব্রুক হলের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও ১৮৮০ সালের ২৫ মে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সে সময়ে ঢাকার কমিশনার নর্থব্রুক হলের উদ্বোধন করেন।

সরেজমিন লালকুঠিতে দেখা যায়, ভবনটির বিভিন্ন স্থানের দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। প্রধান ফটকের আস্তর খসে পড়ে ইট বেরিয়ে গেছে। চারপাশের বিভিন্ন দরজা-জানালা ভাঙাচোরা, ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা। কোথাও আবার পাখি বাসা বেঁধেছে। ভবনের ভেতরের অবস্থা আরও করুণ। ঢুকতেই মাকড়সার জালে জড়িয়ে যায় মাথা। কেয়ারটেকার বাতি জ্বালাতেই দেখা যায় বিভিন্ন স্থানে ঝুলছে মাকড়সার জাল। ধুলাবালিতে জরাজীর্ণ হয়ে আছে চারপাশ। তৈরি হয়েছে ইঁদুর ও ছুঁচোর অভয়াশ্রম। দেখেই অনুমান করা যায়, সর্বশেষ কবে এটি খোলা হয়েছিল। নাট্যমঞ্চটির অবস্থা খুবই শোচনীয়। মঞ্চটি এবড়োখেবড়ো। পাটাতনের নেই কোনো সামঞ্জস্যতা। কোথাও কোথাও কাঠ ভেঙে ফাঁকা পড়ে আছে। মঞ্চের পেছনের কিছু অংশ ভাঙা। মঞ্চের পর্দা নেই কতদিন ধরে, তা কেউ বলতে পারছে না। ছাদের কিছু অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়তে পড়তে কয়েক স্থানে সিলিং ধসে পড়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো সিলিংয়ের কাঠগুলো খসে পড়ছে। মঞ্চের বাম দিকেই কার্পেটগুলো বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পাশের বিভিন্ন স্থানের কার্পেটগুলোর অবস্থা একই ধরনের। ভেতরের বাতিগুলোও নষ্ট। একটি বাতি ছাড়া অন্য বাতিগুলো জ্বালানো সম্ভব হয়নি। ব্যবহার না থাকায় নষ্ট হয়ে অচল হয়ে আছে বেশিরভাগ ফ্যান। নেই কোনো সাউন্ড সিস্টেম। দুটি পোশাক পরিবর্তনের কক্ষের একটিও ভালো নেই। দুটি ফ্যানের একটি নষ্ট। অপরটিও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সিলিংয়ের বিভিন্ন অংশ খসে পড়েছে। হলরুমে ৬টি এসির সবকটিই নষ্ট।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে লালকুঠি। তারা বলেন, ১৪২ বছর আগে নির্মিত ঢাকার অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। দীর্ঘদিন ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় নষ্ট হচ্ছে এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম। এ বিষয়ে লালকুঠির দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক মো. আরিফুজ্জামান (প্রিন্স) যুগান্তরকে বলেন, লালকুঠিতে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। মঞ্চের ব্যবস্থাপনাও ভালো নয়। দুই বছর হল এর কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এখনই সংস্কার করা না হলে এর অভ্যন্তরে যে সরঞ্জাম অবশিষ্ট আছে, তা-ও নিঃশেষ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে হলটির ব্যবহার না থাকায় ভেতরের লাইট, ফ্যান, এসিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

স্থানীয় কাউন্সিলর মো. আরিফ হোসেন ছোটন যুগান্তরকে বলেন, লালকুঠি হলটি সংস্কারের অভাবে দুই বছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে সরকারের উপার্জনের একটি স্থান নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত লালকুঠি। পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু লালকুঠি। তিনি আশ্বাস দেন, যত দ্রুত সম্ভব এটির সংস্কারের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

নদী ও সাগর নিয়ে কিছু চমকপ্রদ কথা

সালেহা চৌধুরী : সবচেয়ে বেশি নদী থাকায় বাংলাদেশকে পৃথিবীর অন্যতম নদীমাতৃক দেশ বলা হয়েছে। ওদের হিসাবে বাংলাদেশে সব মিলিয়ে সাতশ’ বা আটশ’টি নদী আছে। এখন আর তা নেই। কমতে কমতে সব মিলিয়ে বোধ করি চারশ’ হয়েছে। কেউ একজন বলছিলেন, পদ্মা নদীতে ব্রিজ করার দরকার কী? একদিন তো চর পড়তে পড়তে ওই নদী স্থলভূমি হয়ে যাবে। মন্দ বলেননি।

ভারত আমাদের ৫৭টি নদীকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফারাক্কা, বরাক নদীর ওপরে টিপাইমুখ বাঁধ। এখন ভারতে ৫২টি নতুন বাঁধ হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে। শৃঙ্খলিত হবে আরও কত নদী। বাংলাদেশে এরপর আর যেগুলো আছে, দিন দিন নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। মোট কথা শুকিয়ে যাচ্ছে। এগুলো ঠিক করতে ড্রেজিং দরকার। নদীর তলা পরিস্কার করা, স্রোতকে অব্যাহত রাখা, এসব হচ্ছে। আরও হবে ও হওয়া দরকার। কীভাবে বুড়িগঙ্গা মরে যাচ্ছে! ভাবতেও দুঃখ লাগে। পৃথিবীর অনেক সভ্যতার মতোই বুড়িগঙ্গা নদীর পাশে গড়ে উঠেছিল সেই আদি শহর ঢাকা। যেমন করে কপোতাক্ষের পাশে গড়ে উঠেছিল মহাস্থান সভ্যতা, সিন্ধুর পারে সিন্ধু সভ্যতা বা ‘ইনডাসভ্যালি সিভিলাইজেশন’। নীল নদের পাশে মিসরের সভ্যতা। এখন আর যাতায়াতের জন্য তেমন করে নদীর প্রয়োজন হয় না। তাই নদীর কাজ এখন আর সভ্যতা গড়ার নয়, সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার। জীবনকে সমৃদ্ধ করার। আমাদের জীবনকে সজল করার।

ভারতের কী খবর? বাঁধটাধ দিয়ে তারা কি খুব সুখে আছে? মনে হয় না। ওখানে শতকরা পঁচিশ ভাগ নদী শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে উঠছে। ১৫ বছর পর যা হবে সেটা এই বর্তমানে যে পানি আছে তার অর্ধেক হয়ে যাবে পানির পরিমাণ। ক্রুশবিদ্ধ নদী শেষ হবে।

গঙ্গা এখন সবচেয়ে বিপন্ন নদী। এখন সে ময়লায় পরিপূর্ণ। ‘মা তেরি গঙ্গা ময়লি’ একেবারে সত্যি। গোদাবরি নদী দৈর্ঘ্য-প্রস্থ হারিয়ে ছোট নদী হয়ে গেছে। আরও হবে। কাবেরির ৪০ ভাগ পানি কমে গেছে, প্রায় মরুপথে ধারা হারানোর অবস্থা তার। নর্মদার ৬০ ভাগ পানি প্রায় শেষ। অন্যান্য নদীও তাই। পৃথিবীর সবখানেই বিপন্ন নদী। কারণ অনেক। এর ওপর আছে আবহাওয়া পরিবর্তন বা ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’।সবচেয়ে মজার ঘটনা, কোনো একটি নদী কোনো এক দেশেই থাকে না। চলে যায় নানা দেশ পার হয়ে সাগরে। এখন ব্রহ্মপুত্রে চীন বাঁধ দিয়েছে। ভারত উদ্বিঘ্ন। চীন ও ভারতের মধ্যে ‘পানি চুক্তি’ থাকার ফলে তারা ভাবছে, এতে ভারতে এসে ব্রহ্মপুত্র কতটা পানি হারাবে। কারণ চীন বিরাট একটি ‘হাইড্রোইলেকট্রিক’ প্রজেক্ট করছে। কাজেই যে নদী ভারতের অরুণাচল ও আসাম বেয়ে প্রবাহিত সেই অঞ্চল নিয়েই চিন্তা। তিব্বত, নেপাল দিয়েও চলে গেছে এই বিশাল পুরুষ নদী। এক সময় এই ব্রহ্মার পুত্র বাংলাদেশে আসে। বঙ্গোপসাগরে শেষ আশ্রয়। বাংলাদেশ ভারতের ‘পানি চুক্তি’ ঠিকমতো কাজ করে না। তাই তো আজ এ দেশ কখনও খরায় আক্রান্ত আবার কখনও প্লাবনে শেষ।

এবার আমি নদী নিয়ে কতগুলো মজার তথ্য দিতে চাই।

হীরা কিন্তু প্রথমে খনিতে নয়, নদীর তলায় পাওয়া গিয়েছিল। আমাজন নামের বিশাল নদীর চার কিলোমিটার নিচে আছে আর একটি আমাজন নদী। দৈর্ঘ্য ৬০০০ কিলোমিটার। কিন্তু প্রস্থে ওপরের আমাজনের চেয়ে কয়েকশ’ গুণ বেশি। ভাবা যায়?

প্রতি বছর মেকং নদীতে ‘ফায়ার বল’ দেখা যায়। থাইল্যান্ডের এসব ফায়ার বলকে বলে নাগা ‘ফায়ার বল’। সবাই বলে, মিথিন গ্যাসের কারণে এমন হয়। এ নিয়ে অনেক গল্প আছে। সবচেয়ে পুরনো যে নদী আমেরিকাতে তার নাম এখন নতুন নদী। আর এর চেয়ে পুরনো নদী নাইল বা নীল। বছরে তিন সপ্তাহ জোয়ার আমাজন নদীকে ফুলে-ফেঁপে বড় করে। তখন ঢেউ ওঠে অনেক উঁচুতে। কিন্তু এটা হয় বছরে মাত্র তিন সপ্তাহ। পূর্ণ চন্দ্র নাকি এমন কাজ করে। বছরে তিন সপ্তাহ কেন? ভাবছি।

স্লোভানিয়ায় মার্টিন স্ট্রেল বলে একজন আছেন, যিনি সাঁতারে ওস্তাদ। সাঁতরে পুরো আমাজন, মিসিসিপি, ডানিয়ুব, ইয়াংসি নদী পাড়ি দিয়েছেন। বলছি প্রস্থে নয় দৈর্ঘ্যে। কেমন করে? ভাবতে থাকুন।

মোঙ্গলদের কথা তো আমরা সবাই জানি। যাদের ভয়ে চীনের প্রাচীর হয়েছিল। ওরা ছিলেন ভয়ানক শক্তিশালী ও দুর্ধর্ষ। ওরা একবার একটি দেশকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল। পুরো দেশ যে নদীর ওপর নির্ভরশীল তার স্রোত উল্টে একেবারে বিপরীত দিকে নিয়ে গিয়েছিল, যেন পুরো দেশ কষ্ট পায়। কী কঠিন ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান।

এই পৃথিবীতে ১৭টি দেশ আছে, যেখানে কোনো নদী নেই। এর মধ্যে সৌদি আরব প্রধান। দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াজিন নদীকে বলা হয় মৃতের নদী। কারণ এখানে শত শত মৃতদেহ ভেসে এসেছিল। সাতটি মস্ত বড় নদীকে একত্র করলে যে পানি হয়, তেমন পানি আছে আমাজন নদীতে।

বছরে ছয় মাস ভেনিজুয়েলার কাটাকম্ব নদীর মুখে দশ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎপাত হয়। যাকে বলে ‘লাইটনিং’। প্রায় প্রতিদিন একশ’টিরও বেশি ‘লাইটনিং’বা বিজলি চমক। আর এই চমক চলছে একশ’ বছর ধরে। ‘দি নিউ মাদ্রিদে’ ভূমিকম্প এত ভয়ানক এক ঘটনা, যা মিসিসিপির গতিকে উল্টোপথে নিয়ে গিয়েছিল। তবে এখানে কোনো মোঙ্গল ছিল না।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এক দল ইঞ্জিনিয়ার শিকাগো নদীর গতিকে পরিবর্তন করে উল্টোপথে নিয়ে গিয়েছিল। যে কাজ করেছিল দীর্ঘদিন আগে মোঙ্গলরা। মনে হয় ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিল এই মোঙ্গলরা। যারা মোগলদের পূর্বসূরি। টেমস নদী একমাত্র নদী, যা দীর্ঘদিন আগে শোধন করা হয়। এর দূষিত পানির কারণে নদীর পাশে কেউ এলে নাকে কাপড় দিতে হতো। এর মধ্যে কোনো প্রাণ বাঁচত না। লন্ডন শহরের ‘সুয়েজ’ এই নদীতে এসে পড়ত। এখন? এখানে কাগজের টুকরো ফেললে তার জরিমানা হয়। রাস্তায় যেমন লিটারিং নিষেধ, এই নদীতেও তাই। ফেলেই দেখুন না কেন? এই তো সেদিন একজন চারশ’ পাউন্ড জরিমানা দিয়েছেন।

এবার একটি মজার কথা। রোয়াল্ড ডালের ‘চার্লি অ্যান্ড দি চকলেট ফ্যাক্টরি’সিনেমা হয়। এখানে ছিল একটি চকলেটের নদীর কথা। সিনেমা করতে গিয়ে পরিচালক ঠিক সত্যিকারের চকলেট দিয়ে একটি নদী তৈরি করেছিলেন। কতগুলো বা কতখানি চকলেট লেগেছিল, কে বলতে পারবে?

এবার বলছি দূষিত পানির কথা। ৭০ ভাগ কলকারখানার ময়লা ফেলা হয় সমুদ্রে। ফলে ভালো পানি দূষিত হয়। ৩২০ মিলিয়ন চীনের মানুষ কোনো পরিশুদ্ধ পানি পায় না। দূষণ পানি খেতে হয় তাদের। সমুদ্রে ময়লার সঙ্গে প্রচুর প্লাস্টিক ফেলা হয়, যা কখনও গলে না। যাকে বলা হয় ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েস্ট’ সেসব।

বাংলাদেশের ৮০ ভাগ পানি আর্সেনিকে দূষিত। ইউনিসেফের হিসাব, প্রতি বছর ৩০০ শিশু দূষিত পানি খেয়ে মারা যায়। ব্রিটেনে টেলিভিশনে একটি চ্যারিটি খুব যত্ন করে দেখায়। সেটা হলো ‘ওয়াটার অ্যাড’। আফ্রিকার শিশুদের কথাই সেখানে বলা হয় বেশি। কী সব পানি পান করছে শিশুরা। একদিন আমি আর আমার মেয়ে ঠিক করলাম, এই চ্যারিটিতে আমরা নিয়মিত টাকা দেব। ব্যাংকে বলা হলো। প্রতি মাসে যেন অল্প কিছু টাকা ‘ওয়াটার অ্যাডে’ যায় (ঘটনাটি বললাম এই কারণে, এই ‘ওয়াডার অ্যাড’ চ্যারিটির প্রধান কথা, তারা পৃথিবীর প্রতিটি শিশুকে বিশুদ্ধ পানি পার করাবেন, ভাবছেন। পারলে আপনারাও এগিয়ে আসতে পারেন)। একটি প্রবন্ধে আমি বলেছিলাম, এই পৃথিবীর একটি মূল্যবান সম্পদ কমে আসছে। সে সম্পদ পানি। আগে চাপকল পানি দিত। এখন সে চাপকল পানি দেয় না। তাকে অনেক গভীরে নিয়ে যেতে হয়। তারপর তাকে ভার্টিক্যালভাবে পানি তোলার ব্যবস্থা করতে হয়। এখন সেটাও কাজ করে না। আরও গভীর থেকে পানি টেনে তুলতে হচ্ছে। বরেন্দ্র নামের একটি পানি তোলার মেশিনে। ভাবুন তো এরপর কী হবে?

হিসাব এমন, ২০২৫ সালে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ বিশুদ্ধ পানি পাবে না। এবার আমি পানি বিশুদ্ধ রাখার কারণে কী হয় তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলছি। আমরা গেছি গ্রিসের একটি সুন্দর দ্বীপ জাকিনটসে বেড়াতে। সেখানে ছোট স্টিমারে সমুদ্র-ভ্রমণ। আমাদের স্টিমার চলেছে এজিয়ান সির মাঝখান দিয়ে। কিন্তু আশ্চর্য, গভীর নীল সমুদ্রে টার্টল কা কচ্ছপের সারি দেখাই সবার ইচ্ছা। হঠাৎ একজন আমাকে বলল, চকলেটের কাগজ সমুদ্রে ফেলছেন? ফাইন হবে। অবাক কাণ্ডই বটে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ১.২ ট্রিলিয়ন ময়লা ফেলে নদীতে, সেই পৃথিবীতে এমন ঘটনা। এই ট্রিলিয়ন ময়লার বেশিরভাগ সুয়েজ বা মলমূত্র। এরপর আছে তেল তুলতে সমুদ্র-দূষণ। আসলে এই দূষণেই শেষ হবো আমরা। বাতাসে দূষণ, পানিতে দূষণ।

সব বাঁধ দেওয়া ক্রুশবিদ্ধ নদী যদি একদিন বলে, আমাদের যেতে দাও। আমাদের গতি বন্ধ করো না। আমাদের নিজের গতিতে ‘পাগলপারা’ হয়ে চলতে দাও, তাহলে কী হবে?

ব্রিটেন প্রবাসী কথাসাহিত্যিক

মস্কোর ব্যাগেল হাউস

moscow bagel house 1নাবীল অনুসূর্য : ডোনাটের মতো দেখতে এক রকম রুটি আছে। নাম ব্যাগেল। গোল রুটির মাঝখানে ফুটো। রাশিয়ায় দুটি বাড়ি আছে এমন আকৃতির। স্থানীয় লোকজন আদর করে বাড়ি দুটিকে বলে ‘ব্যাগেল হাউস’। অবশ্য ব্যাগেল হাউস শুধু এই আকৃতির জন্যই নয়, বরং বেশি বিখ্যাত এদের বিশালত্বের জন্য। ৯ তলা বাড়ি দুটির একেক তালায় আছে ৯ শর বেশি অ্যাপার্টমেন্ট। সেগুলোতে যাওয়ার জন্য গেট আছে ২০টি করে। অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নানা সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় সব সেবার ব্যবস্থাও আছে। আছে প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের দোকান। আর ফার্মেসি, লন্ড্রি, স্টুডিও, পোস্ট অফিস ইত্যাদি আছে একটি করে। মাঝের বিশাল চত্বরজুড়ে খেলার মাঠ আর সবুজ উদ্যান। মানে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে এই বিল্ডিং কম্পাউন্ড থেকে বের হওয়ার দরকারই নেই।

এই স্বয়ম্ভূ বাড়ি বানানোর কৃতিত্ব দুই রাশান ভদ্রলোকের। স্থপতি এভগেনি স্তামো ও প্রকৌশলী আলেকজান্ডার মারকেলোভ। তাঁদের মাথায় এ ধরনের বাড়ি বানানোর ভাবনা আসে সত্তরের দশকের শুরুতে। ১৯৭২ সালেই প্রথম ব্যাগেল হাউসটা তাঁরা বানিয়ে ফেলেন। একেবারে রাজধানী মস্কোতেই। দেড় শ মিটার আয়তনের একদম আংটির মতো আকৃতির একটা বাড়ি। সেটি নগর কর্তৃপক্ষের ভীষণ পছন্দও হলো। বিশেষ করে তত দিনে ১৯৮০ সালের অলিম্পিক যে মস্কোতে হচ্ছে, তা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষ তাই ঠিক করল, অলিম্পিক উপলক্ষে পাশাপাশি এমন পাঁচটা বাড়ি বানানো হবে। পাঁচটি বৃত্তাকার বাড়ি মিলে তৈরি হবে অলিম্পিক রিং।

সে উদ্দেশ্যে কাজও শুরু হলো। কিন্তু দোভজহিয়োনকা স্ট্রিটে দ্বিতীয় বাড়িটির কাজ শেষ হতে হতে ১৯৭৯ সাল হয়ে গেল। তত দিনে প্রজেক্টের কপালও ফুটো হয়ে গেছে। কারণ ইতিমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। তাই এই ভীষণ খরুচে পরিকল্পনা থেকে কর্তৃপক্ষ সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। তা ছাড়া বাড়িগুলো বানাতে যেমন খরচ, দেখভাল করতেও তা-ই। আকারে বিশাল এবং সব সুযোগ-সুবিধা আছে বটে; কিন্তু বসবাস করার জন্য খুব একটা সুবিধার নয়। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়ার জন্য ২০টি গেটের কোনটি দিয়ে ঢুকতে হবে, তারপর কোন পথে গেলে সেই অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া যাবে, তা রীতিমতো এক ধাঁধাই বটে। আর সবচেয়ে বড় কথা, পাঁচটি বিল্ডিং একত্র করে যে অলিম্পিক রিংটা তৈরি হবে, সেটি এখানে ঘুরতে আসার মানুষরা তো দেখতে পারবেই না, এমনকি অনেক ওপর থেকে ছবি তোলা না হলে তা বোঝাই সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে তাই পাঁচটা নয়, দুটিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেল ব্যাগেল হাউসের সংখ্যা।

ওজোন দিবসের ওজন!

ozone day thoughts

উত্তমাশা অন্তরীপে ভ্রমণ

cape of good hopeআশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : গাড়িতে করে জোহানেসবার্গ পার্ক বাসস্টেশনে নামিয়ে দিল রানা ও তৌকির। এখান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে বাস যায়।

লম্বা ভ্রমণে ঘুমানো মুশকিল, তবু আরামদায়ক একটা ঘুম দিলাম। সময় কাটাতে বাসের কাচ ভেদ করে রাস্তার দুই পাশের দৃশ্য অবলোকন করতে লাগলাম। ছোট ছোট টিলার সারি, মাঝেমধ্যে কিছু বসতবাড়ি ছাড়া পুরো এলাকাই ফাঁকা মরুভূমির মতো। জনমানবের কোনো চিহ্ন নেই। ১৮ ঘণ্টায় ১৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাস ঠিকঠাকই পৌঁছল কেপটাউনে। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মাহমুদুল হাসান শিপলুর বন্ধু মাসুদ থাকে কেপটাউনে। নিজের গাড়ি নিয়ে বাসস্টেশনে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল সে। বাসায় যাওয়ার পথে একচক্কর শহরটা ঘুরিয়ে দেখাল। কিছু এলাকায় গাড়ির পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়াটা বেশ কঠিন। পাঁচ-ছয়বারের চেষ্টায় পার্ক করা যায়। ওর বাসার সঙ্গেই আছে একটি সুন্দর মসজিদ। মাসুদ জানাল, এই এলাকায় প্রচুর মুসলমান রয়েছে। বাংলাদেশির মালিকানাধীন ৫০টির মতো গ্রোসারির দোকান রয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হলো, পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার মুদি ব্যবসার পুরোটাই বোধ হয় আমাদের দখলে। ওই দেশের প্রতিটি শহরে বাংলাদেশি গ্রোসারির দোকান পাওয়া যায়। যদিও জীবন এখানে অনেক অনিশ্চয়তায় ভরা, তার পরও দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করাটা সহজ হওয়ায় বাংলাদেশিরা মোটামুটিভাবে সফল। যদিও এখন ইমিগ্রেশন আইন অনেক কড়াকড়ি। এরই মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার পাসপোর্টধারী অনেক বাংলাদেশি অন্য দেশে চলে গেছেন।

দুপুরে খাবার খেয়ে মাসুদ বলল, বিকেলে ‘টেবিল মাউন্টটেন’-এর পাশে ‘সিগন্যাল হিল’-এ ঘুরতে যাব। সঙ্গী হিসেবে মাসুদের চাচাতো ভাই বাবলু। সে-ও দীর্ঘদিন ধরে আছে কেপটাউনে। আসার পথে একটা মাজার দেখলাম। কেপটাউনে মাজার যে আছে জানা ছিল না। যদিও পরে জেনেছি, ত্রিশটির মতো মাজার রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এগুলোকে বলা হয় ‘ক্রেগমাত’।

bolders bay beachবিশ-পঁচিশ মিনিটের মধ্যে ‘সিগন্যাল হিল’-এ চলে এলাম। এখান থেকে একসঙ্গে টেবিল মাউন্টটেন ও কেপটাউনের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। এখানে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখতে প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম হয়। এ ছাড়া জায়গাটাকে লোকে ‘লাভারস লেন’ও বলে থাকে। বিকেল হলেই প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখা মেলে এখানে।

সিগন্যাল হিল থেকে গেলাম ‘ক্যাম্পাস বে বিচ’। যাওয়ার রাস্তাটি অসাধারণ। টেবিল মাউন্টটেনের পাশেই এই সমুদ্রতীরের অবস্থান। যাত্রাপথে বেশ কিছু বিলাসবহুল বাড়িঘর নজর কাড়ল। শৌখিন ধনকুবেরদের বাড়ি। সাধারণত ছুটি কাটাতে এঁরা এখানে আসেন। অনেক বাড়িতে দেখলাম অফ সিজনের জন্য টু-লেট লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। অনেক গাড়ি ও বিদেশি পর্যটকদের সমাগম চোখে পড়ল সৈকতে। কেউ শুয়ে আছেন, কেউ বা কুকুর নিয়ে জগিং করছেন আবার কেউ মোবাইলে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। চারদিকে মানুষ এবং সবাই বিচ বিনোদনে ব্যস্ত।

শুধু ঘুরলেই তো চলবে না, আর তাই পেটপূজার জন্য গেলাম নান্দোসে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এটা বেশ জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড শপ। সত্যিই ওদের খাবার বেশ সুস্বাদু! দোকানগুলো খুবই সুন্দর, সার্ভিসও বেশ ভালো। মজার ব্যাপার হলো, খাবার শেষে আমাদের দুই লিটারের কোকা-কোলার অর্ধেকটা অব্যবহৃত ছিল, সেটি দিয়ে দেওয়া হলো ওয়েটারকে। সে তো ওটা পেয়ে দারুণ খুশি।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও নাকি ধান ভানে। বাঙালি-বাঙালি আড্ডা হবে না তা কি হয়? ওদের নিয়ে গেলাম স্থানীয় এক বাংলাদেশি ক্লাবে। ওখানে দল-মত-নির্বিশেষে কেপটাউনের বাংলাদেশিরা একত্রিত হয়, আড্ডা মারে, পুল খেলে। ওখানকার বেশির ভাগ লোকই দেখলাম শরীয়তপুর ও ফরিদপুর জেলার। সবার আন্তরিক ব্যবহার ও আতিথেয়তা ছিল মনে রাখার মতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্লাবটিতে রাজনৈতিক পোস্টারে ভরপুর থাকলেও দলীয় আলাপ-আলোচনার চেয়ে আড্ডা, খেলাধুলায় মশগুল সবাই।

পরদিন গেলাম উত্তমাশা অন্তরীপে। ইংরেজিতে অবশ্য জায়গাটাকে বলে ‘কেপ অব গুড হোপ’। সঙ্গী হিসেবে যোগ দিলেন অরুণ। মাসুদের বন্ধু। প্রথমেই ‘বোল্ডার বে বিচ’ গেলাম। ওখানকার ‘জ্যাকঅ্যাস পেঙ্গুইন’ দেখতে প্রতিবছর ৬০ হাজার পর্যটক আসেন। প্রবেশমূল্য ৭০ র‌্যান্ড। ভেতরে গিয়ে দেখতে পেলাম প্রচুর চীনা পর্যটক। কলকাতার এক বয়স্ক দম্পতিরও দেখা মিলল। এই সৈকতে অনেকে এক দিনের জন্য ক্যাম্প করে থাকেন। বড় বড় পাথরের পাশে ছোট ছোট পরিবারগুলো এক দিনের জন্য সংসার পাতে। পুকুরে গোসল করার মতো করে সাগরে যায় গোসল করতে।

ওখান থেকে এবার যাব উত্তমাশা অন্তরীপে। কেপ পয়েন্টে আসার পথে রাস্তার এক জায়গায় দেখলাম, সব গাড়ির গতি কমে যাচ্ছে। সামনে ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেলাম, বেশ কিছু বানর রাস্তার মাঝখানে বসে আছে। মাসুদ সবাইকে সাবধান করে বলল—যার যার মোবাইল ও ক্যামেরা যেন পকেটে রেখে দিই, কারণ সুযোগ পেলেই এসব কেড়ে নিয়ে পালায় বানরগুলো। বাবলু আস্তে করে গাড়ির জানালা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে উত্তমাশা অন্তরীপে এসে পৌঁছলাম। প্রবেশ করার জন্য টিকিট কাটতে হলো। চারদিকে বিশাল পাহাড়ের মাঝে গাড়ি দারুণ গতিতে ছুটে যাচ্ছে। দিগন্তজোড়া খালি মাঠ। দূর থেকে মনে হলো, আকাশে ছুঁয়ে আছে পাহাড়। প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন হয়েছে। সিটি সাইট সিয়িংয়ের দ্বিতল বাসও প্রচুর। তবে বেশির ভাগই চীনা পর্যটক দিয়ে বোঝাই। আজকাল ওরাই নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি দেশ ভ্রমণ করে থাকে।

এখানে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর এসে মিলেছে। নাবিকদের কাছে এই জায়গাটি বেশ বিখ্যাত। উত্তমাশা অন্তরীপের পার্কিংয়ে বাবলু বসে ছিল। তবে যাঁরা হেঁটে যেতে ইচ্ছুক নন, তাঁদের জন্য রয়েছে ট্রাম সার্ভিস। আমরা হেঁটেই ধীরে ধীরে ওপরে উঠে গেলাম। ওপর থেকে চোখে পড়ল নিচের মনোরম দৃশ্য। এককথায় অসাধারণ।