আর্কাইভ

Archive for the ‘নারী’ Category

(রোবট) সোফিয়া, তুমিও সাবধান!

robot sofia commentsনিশাত সুলতানা : স্পেনের রানি সোফিয়া ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ভ্রমণে এসেছিলেন। রানি সোফিয়ার স্নিগ্ধ সৌন্দর্য আর অভিজাত ব্যক্তিত্বে দারুণভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম সে সময়। কোনো এক সময় বুঁদ হয়েছিলাম আরেক সোফিয়ায়। সে সোফিয়া হলেন হলিউডি অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন। একসময়ে দুনিয়া কাঁপানো এই ইতালিয়ান গায়িকা ও চলচ্চিত্রাভিনেত্রী আজও আমাদের অনেককে মুগ্ধ করে রেখেছেন। তবে এবার আমি মুগ্ধ হয়েছি অন্য এক সোফিয়ায়। ব্যতিক্রম হলো এই সোফিয়া মানবী নয়, যন্ত্রমানবী। যন্ত্রমানবী এই সোফিয়া বাংলাদেশে এসেছিল সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তথ্যপ্রযুক্তির মেলা ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’-তে অংশ নিতে। সোফিয়া বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই তাকে নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর সোফিয়াকে দেখলাম, মুগ্ধও হলাম। হয়তোবা তাকে যতটা মানবাকৃতিতে দেখব বলে প্রত্যাশা করেছিলাম, সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবে সোফিয়ার বর্তমান এই রূপইবা মন্দ কী! প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্বের উৎকর্ষের এক অনন্য দৃষ্টান্তের নাম সোফিয়া। আমি নিশ্চিত, আর কয়েক বছরের মধ্যেই সোফিয়া সমালোচনাকারীদের মুখে কুলুপ এঁটে আবির্ভূত হবে অন্য এক রূপে এবং অন্য এক সক্ষমতায়।

জানি না, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধিকারী যন্ত্রমানবী সোফিয়ার অনুভূতি আছে কি না বা সে স্পর্শ করলে সাড়া দেয় কি না। তবে এই যন্ত্রমানবী সোফিয়া আমার অনুভূতির জগতে যেভাবে নাড়া দিয়েছে, তা জীবিত কোনো সত্তার চেয়ে কোনো অংশে কম না; বরং বেশি। সোফিয়ার বাংলাদেশে আসার পূর্বাপর ঘটনা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেছে বাংলাদেশে নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কদর্য চিত্রটি। সোফিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত কলাকৌশলসংক্রান্ত বিস্ময়কে ছাপিয়ে বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে এমন কিছু বিষয়বস্তু, যা সমগ্র নারী জাতির প্রতি অবমাননাকর। সোফিয়াকে নিয়ে বেশ কিছু আদিরসাত্মক আলোচনায় নগ্নভাবে বেরিয়ে এসেছে ভোগবাদী ও লোলুপ পুরুষ চরিত্রটি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে রীতিমতো ঝড় উঠেছে সোফিয়ার আদ্যোপান্ত চুলচেরা বিশ্লেষণে। বারবার আলোচনায় এসেছে সোফিয়া দেখতে আদতেই অড্রে হেপবার্নের মত কি না! সে আলোচনায় বাদ যায়নি সোফিয়ার শারীরিক গঠন, চুলবিহীন মাথা, পোশাক, ওড়না, অন্তর্বাস, এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারের ইঙ্গিতও। অনেকেই সোফিয়ার কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এবং মুখের অভিব্যক্তি দেখে যতটা না বিস্মিত হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে তার বিয়ে এবং সন্তান লাভ করার ইচ্ছাসংক্রান্ত কথাবার্তায়। তার এই ইচ্ছা অনেক পুরুষকে আগ্রহী করে তুলেছে সোফিয়াকে বিয়ে করতে কিংবা তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে। ধিক এ রুচিবোধ! ধিক এ মানসিকতা!

যে সমাজে একজন শিশু থেকে বৃদ্ধা নারী ধর্ষণের শিকার হন, সেখানে হয়তো এটাই স্বাভাবিক। এখানে একজন রোবট নারীও বাদ যায় না পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে। এই দেশে এসে সোফিয়াকে মুখোমুখি হতে হয়েছে ‘উইল ইউ ম্যারি মি?/ তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ কিংবা ‘ডু ইউ নো, বয়েজ হ্যাভ আ ক্র্যাশ অন ইউ/ ছেলেরা যে তোমার জন্য পাগল, তা কি তুমি জানো?’—এ-জাতীয় প্রশ্নের। এমন অনেক প্রশ্নেরই উত্তর অজানা ছিল সোফিয়ার। জানি না, সোফিয়ার এই ধরনের অভিজ্ঞতা অন্য কোনো দেশে হয়েছে কি না! সোফিয়ার নির্মাতা বেচারা ডেভিড হ্যানসন হয়তো কখনো ভাবেনইনি যে বাংলাদেশে এসে সোফিয়াকে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। নিরুত্তর সোফিয়ার ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি কি আমাদের বিবেকে সামান্যতম নাড়াও দেয় না? আশ্চর্যজনকভাবে এই প্রশ্নগুলো এসেছে সমাজের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে। তাদের থেকে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রশ্ন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সাধারণ জনগণের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম। সোফিয়াকে নিয়ে যৌন উত্তেজক এবং আদিরসাত্মক মন্তব্যের রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলেছে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয়। জানি না, সোফিয়া যন্ত্রমানবী না হয়ে যদি যন্ত্রমানব হতো, তবে সে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতো কি না!

sofia jokes 1আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পারিপার্শ্বিকতা এবং পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা। এই সমাজে নিরাপদ নয় দুই বছরের কন্যাশিশু, কিশোরী, তরুণী, এমনকি ষাট বছর বয়সী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধাও। আজ যন্ত্রমানবী সোফিয়াকেও দেখা হচ্ছে বিকৃত যৌনাকাঙ্ক্ষা পূরণের বস্তু হিসেবে। পুরুষের এই আকাঙ্ক্ষা থেকে নারী রূপধারী যন্ত্রেরও কি মুক্তি নেই! নারী আর কতকাল বস্তুরূপে উপস্থাপিত হবে, উপেক্ষিত হবে তার বুদ্ধিমত্তা, আবেগ আর অনুভূতি? আর কতকাল শুধু কামনার দৃষ্টিতে নারীকে দেখা হবে? সোফিয়াকে বলতে চাই, সোফিয়া, তুমি এদের থেকে দূরে থাকো, সতর্ক থাকো, নিরাপদে থাকো। আমরা চাই না হতভাগা রূপার মতো তোমার ছিন্নবিচ্ছিন্ন ধর্ষিত কৃত্রিম দেহাংশ পড়ে থাক শালবনের নিকষ কালো অন্ধকারে।

নিশাত সুলতানা: কর্মসূচি সমন্বয়ক, জেন্ডার জাস্টিস ডাইভার্সিটি প্রোগ্রাম, ব্র্যাক।

Advertisements

বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধ-বাসিনী’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ। শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করে

আমরা বহুকাল হইতে অবরোধ থাকিয়া থাকিয়া অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি সুতরাং অবরোধের বিরুদ্ধে বলিবার আমাদের- বিশেষত আমার কিছুই নাই। মেছোণীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, ‘পচা মাছের দুর্গন্ধ ভাল না মন্দ?’- সে কি উত্তর দিবে?

এস্থলে আমাদের ব্যক্তিগত কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা পাঠিকা ভগিনীদেরকে উপহার দিব- আশা করি, তাঁহাদের ভাল লাগিবে।

এস্থলে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে, গোটা ভারতবর্ষে কুলবালাদের অবরোধ কেবল পুরুষের বিরুদ্ধে নহে, মেয়েমানুষদের বিরুদ্ধেও। অবিবাহিতা বালিকাদিগকে অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া এবং বাড়ির চাকরানী ব্যতীত অপর কোন স্ত্রীলোকে দেখিতে পায় না।

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ।

শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করেন। মেম ত মেম-শাড়ী পরিহিতা খ্রীষ্টান বা বাঙ্গালী স্ত্রীলোক দেখিলেও তাঁহারা কামরায় গিয়া অর্গল বন্ধ করেন।

[১]

সে অনেক দিনের কথা- রংপুর জিলার অন্তর্গত পায়রাবন্দ নামক গ্রামের জমিদার বাড়িতে বেলা আন্দাজ ১টা-২টার সময় জমিদার কন্যাগণ জোহরের নামাজ পড়িবার জন্য ওজু করিতেছিলেন। সকলের ওজু শেষ হইয়াছে কেবল ‘আ’ খাতুন নাল্ফম্নী সাহেবজাদী তখনও আঙ্গিনায় ওজু করিতেছিলেন। আলতার মা বদনা হাতে তাঁহাকে ওজুর জন্য পানি ঢালিয়া দিতেছিল। ঠিক সেই সময় এক মস্ত লম্বাচৌড়া কাবুলী স্ত্রীলোক আঙ্গিনায় আসিয়া উপস্থিত! হায়, হায়, সে কি বিপদ! আলতার মার হাত হইতে বদনা পড়িয়া গেল- সে চেঁচাইতে লাগিল- ‘আউ আউ! মরদটা কেন আইল!’ সে স্ত্রীলোকটি হাসিয়া বলিল, ‘হে মরদানা! হাম মরদানা হায়?’ সেইটুকু শুনিয়াই ‘আ’ সাহেবজাদী প্রাণপণে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া তাঁহার চাচি আম্মার নিকট গিয়া মেয়েমানুষ হাঁপাইতে হাঁপাইতে ও কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, ‘চাচি আম্মা! পায়জামা পরা একটা মেয়ে মানুষ আসিয়াছে!!’ কর্ত্রী সাহেবা ব্যস্তভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘সে তোমাকে দেখিয়াছে?’ ‘আ’ সরোদনে বলিলেন ‘হ্যাঁ!’ অপর মেয়েরা নামাজ ভাঙিয়া শশব্যস্তভাবে দ্বারে অর্গল দিলেন- যাহাতে সে কাবুলী স্ত্রীলোক এ কুমারী মেয়েদের দেখিতে না পায়। কেহ বাঘ-ভালুকের ভয়েও বোধ হয় অমন কপাট বন্ধ করে না।

[২]

এদিকে মহিলা মহলে নিমন্ত্রিতাগণ খাইতে বসিলে দেখা গেল- হাশমত বেগম তাঁহার ছয় মাসের শিশুসহ অনুপস্থিত। কেহ বলিল, ছেলে ছোট বলিয়া হয়ত আসিলেন না। কেহ বলিল, তাঁহাকে আসিবার জন্য প্রস্তুত হইতে দেখিয়াছে- ইত্যাদি।

পরদিন সকালবেলা যথাক্রমে নিমন্ত্রিতাগণ বিদায় হইতে লাগিলেন- একে একে খালি পাল্ক্কী আসিয়া নিজ নিজ ‘সওয়ারী’ লইয়া যাইতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে একটা ‘খালি’ পাল্ক্কী আসিয়া দাঁড়াইলে তাহার দ্বার খুলিয়া দেখা গেল হাশমত বেগম শিশুপুত্রকে কোলে লইয়া বসিয়া আছেন। পৌষ মাসের দীর্ঘ রজনী তিনি ঐ ভাবে পাল্ক্কীতে বসিয়া কাটাইয়াছেন।

তিনি পাল্ক্কী হইতে নামিবার পূর্বেই বেহারাগণ পাল্ক্কী ফিরাইতে লইয়া গেল- কিন্তু তিনি নিজে ত টুঁ শব্দ করেনই নাই- পাছে তাঁহার কণ্ঠস্বর বেহারা শুনিতে পায়, শিশুকেও প্রাণপণ যত্নে কাঁদিতে দেন নাই- যদি তাহার কান্না শুনিয়া কেহ পাল্ক্কীর দ্বার খুলিয়া দেখে! কষ্টসাধ্য করিতে না পারিলে আর অবরোধবাসিনীর বাহাদুরী কি?

কৃষককন্যা থেকে কিংবদন্তি জোয়ান অব আর্ক

রণক ইকরাম :

joan of ark 6যদি আমি দৈবানুগ্রহ না পেয়ে থাকি, তবে ঈশ্বর আমায় অনুগ্রহ করুন; আর যদি পেয়ে থাকি, তবে ঈশ্বর আমায় সেখানেই ঠাঁই দিন! — জোয়ান অব আর্ক

সেই দৈববাণী

ইতিহাসের অমর অনেক গল্পগাথার ছোঁয়া এর পূর্ববর্তী বিবরণে উল্লেখ থাকে। জোয়ান অব আর্কের বেলায়ও এরকমই একটি দৈববাণীর ঘটনা ঘটেছে।

কথিত আছে, জোয়ানের যখন মাত্র ১৩ বছর বয়স তখন একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। জোয়ান তখন মাঠে ভেড়ার পাল চরাচ্ছিলেন। দেবদূত মিকাইল তাকে বলেন, ‘সাহসী কিশোরী, তৈরি হও। তোমার সময় এসেছে যুদ্ধে যাওয়ার। তুমিই পারবে ইংরেজদের পরাজিত করে ফ্রান্সকে মুক্ত করতে। ’ জোয়ান তখন ভয় আর দ্বিধার সাগরে নিমজ্জিত। ভয় ভেঙে প্রশ্ন করেন— ‘আমি কী করে যুদ্ধ করব! আমার বয়স মাত্র ১৩!’ উত্তরে দেবদূত বলেন—‘ভয় কর না জোয়ান। সাহস সঞ্চয় কর। ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখ।’ এই দৈববাণীই তার জীবন পাল্টে দেয়। শুধু তাই নয়, তখন ফ্রান্সজুড়ে একটা প্রচলিত ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। সবাই বিশ্বাস করত, এক কুমারী মেয়ে ফ্রান্সকে রক্ষা করবে।

ঘটনা ১৪২৮ সালের। জোয়ান গেলেন চার্লসের সেনা কমান্ডার রবার্ট রড্রিকটের কাছে। জানালেন তিনি যুদ্ধ করতে চান। রবার্ট এতে রেগে গেলেন। কারণ তখন মেয়েদের জন্য যুদ্ধ ছিল নিষিদ্ধ। তাই রবার্ট সামন্ত ডেকে এনে জোয়ানকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে তাকে শাস্তি দেওয়ার কথাও বললেন। নিরাশ হয়ে জোয়ান সেখান থেকে ফিরে এলেন ঠিকই। কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, অরলিন্সের কাছে ফ্রান্স যুদ্ধে হেরে যাবে।

দ্রুতই ফলে গেল জোয়ানের কথা। ততদিনে দৈববাণী আর জোয়ানের তীব্র আত্মবিশ্বাস ছাপ ফেলেছে রবার্টের মনে। ফলে রবার্ট জোয়ানকে নিয়ে গেলেন ভবিষ্যৎ রাজা চার্লসের কাছে। এর আগে জোয়ানের চুল ছেঁটে ফেলা হলো। পরানো হলো ছেলেদের পোশাক।

সেখানে জোয়ান হাজির হলেন একজন নাইটের বেশে। ভবিষ্যৎ রাজার কাছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে একটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে পঞ্চক্রুশধারী তরবারি হাতে যুদ্ধে নামেন। সঙ্গী ৪০০০ সৈন্য।

১৪২৯ সালের ২৮ এপ্রিল অবরুদ্ধ নগরী অরল্যান্ডে প্রবেশ করেন জোয়ান। তিনি তৎকালীন ফ্রেঞ্চ নেতৃত্বের রক্ষণাত্মক রণকৌশল পরিহার করে আক্রমণাত্মক কৌশলে অরল্যান্ডকে মুক্ত করেন। খুব দ্রুতই জোয়ানের বিজয়গাথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কে জানত সেখান থেকেই আসলে নতুন ইতিহাস লেখার সূচনা করেছিলেন জোয়ান!

যেখানে একেবারে আলাদা

ইতিহাসের অমর চরিত্ররা বুঝি এমনই হয়। না হলে কেউ কখনো ভেবেছিল সাধারণ একটা মেয়ে পাল্টে দেবে ফরাসি ইতিহাস! জোয়ান অব আর্ক এর সেই গল্প সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়। যেখানে জীবনের সংগ্রাম আছে, উত্থান আছে, আবার আছে কঠিন পতনও। শত শত বছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহের কেন্দ্রে থাকা জনপদের কাপুরুষ রাজার শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিলেন জোয়ান। এ কাজ করতে গিয়ে ডাইনি আখ্যা পেয়েছেন। নারী হয়েও পুরুষের বেশে দিনাতিপাত করেছেন। শত শত বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন। গৃহত্যাগী হতে হয়েছে। ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে লাফিয়ে পলায়নের চেষ্টা করেছেন, অন্যায় বিচারের পরও ন্যায়বিচারের ভান ধরেছেন, ধর্মদ্রোহিতার অপবাদসহ আরও কত কী! শুধু তাই নয়, কয়েকবার তাকে শয়তানের দূত আখ্যা দিয়ে  মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এরকম শত শত বিপদেও নিজের আদর্শ থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি জোয়ান। এসব কারণে জোয়ান আর সবার থেকে একেবারেই আলাদা করে রেখেছেন নিজেকে। লিঙ্গবৈষম্য কিংবা কোনো প্রতিকূলতা নয়, বিশ্বাসে-সাহসে ভর করে অসম্ভবকে জয় করার অদম্য ইতিহাসই জোয়ানের ইতিহাস। আর এ কারণেই চলে যাওয়ার শত শত বছর পরও পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় এই বীর নারীকে।

চার্লসের অভিষেক অনুষ্ঠানে দাঁড়ানো জোয়ান

উন্মাতাল চার্লস উত্তপ্ত ফ্রান্স

কোনো বিপ্লবই এমনি এমনি তৈরি হয় না। পেছনে থাকে হাজার বঞ্চনার নির্মম ইতিহাস। ব্যতিক্রম ছিল না জোয়ান অব আর্কও। জোয়ান যে সময়টাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস একেবারেই উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠেছিলেন। রাজক্ষমতার জন্য নিজের ভাই ডিউক লুইস অব অরল্যান্স ও চাচাতো ভাই জন দ্য ফিয়ারলেস এবং বারগুনডির ডিউক ভয়ঙ্কর কলহে লিপ্ত হন। ১৪০৭ সালে ডিউক অব বারগুনডির আদেশে ডিউক অব অরল্যান্সকে হত্যা করা হয়। ফলে প্রজারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এই অন্তর্কলহের সুযোগ নিলেন ইংরেজ রাজা পঞ্চম হেনরি। ১৪১৫ সালে তিনি ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের শহরগুলো দখল করে নেন। অন্যদিকে চার ভাই মারা যাওয়ার পর সপ্তম চার্লস মাত্র ১৪ বছর বয়সে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন। ১৪১৯ সালে বারগুনডিয়ানদের সঙ্গে তার শান্তিচুক্তি হলেও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বারগুনডিয়ানরা ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়। এর আগে ১৩৩৭ থেকে ১৪৫৩ শতবর্ষ ধরে চলা যুদ্ধে ফরাসিদের অবস্থা ছিল বাজে। ইংরেজদের কাছে একের পর এক পরাস্ত হতে থাকে ফরাসিরা। তখনই ফরাসিদের মুক্তির অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হন জোয়ান। ফ্রান্স থেকে ইংরেজদের হঠানোর কাজে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখেন। ফলে তিনি ফ্রান্সের জাতীয় হিরোইন হিসেবে সম্মানিত।

উন্মাদপ্রায় ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

ফ্রান্সের মিউজ নদীর তীরে ছোট্ট এক গ্রাম দমরেমি। এখানকারই এক সাধারণ কৃষক পরিবারে ১৪১২ সালের ৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন জোয়ান অব আর্ক। তার বাবা জ্যাক ডি আর্ক ও মাতা ইসাবেল রোমিই। তার বাবাকে মোটামুটি অবস্থাসম্পন্নই বলা চলে। নিজের ৫০ একর জমি ছাড়াও সরকারি চাকুরে হিসেবে গ্রামের চাষিদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন তিনি। জোয়ানদের গ্রামের পাশেই বারগুন্ডি নামে আরেকটি গ্রাম ছিল। সেই গ্রামে একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা বাস করত। তারা প্রায়ই আশপাশের গ্রামগুলোতে হানা দিত। একবার জোয়ানদের দমরেমি গ্রামেও হামলা চালায় ওরা। গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ফ্রান্স তখন ইংরেজদের শাসনাধীন। ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ হেনরি সিংহাসন দখল করলে ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লস পালিয়ে যান। এরকমই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে কেটেছে জোয়ানের। খুব ধার্মিকভাবে তার বেড়ে ওঠা, খামারের গবাদিপশুর দেখাশোনা আর সুই-সুতার খেলাতেই কেটেছে জোয়ানের শৈশব। তবে ১৩ বছর বয়সে শোনা দৈববাণী ও তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা জোয়ানের মনে ভালো ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তীতে সাহস এবং আত্মবিশ্বাসীর এক অদম্য প্রতীক হয়ে ওঠেন জোয়ান।

জোয়ানের শেষের শুরু

সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ ফ্রেঞ্চরা চেষ্টা করল ইংরেজদের অধিকার থেকে প্যারিস ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু সে দিনের যুদ্ধে জোয়ানের পা আহত হয় ক্রসবোর আঘাতে এবং এবারও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে নিতে লাগলেন। কিন্তু শত্রুর বিরুদ্ধে সব বীর বার বার জিতে না। ১৪৩০ সালের ২৩ মে বারগুন্ডিয়ানদের হাতে আটক হলেন জোয়ান। প্রাথমিকভাবে জোয়ান আত্মসমর্পণ করেননি। কিন্তু তাকে গ্রেফতার করা হলো। আটক অবস্থায় জোয়ান কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেন। এজন্য তাকে রাখা হলো টাওয়ারে। সেই ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে নিচের মাটিতে লাফিয়ে পড়েন জোয়ান। সেই দুর্গের চারদিকে পানিপূর্ণ পরিখা ছিল। তিনি সেখানে পড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। গুরুতর আহত না হলেও চলতে পারার মতো সুস্থ তিনি ছিলেন না যখন জ্ঞান ফিরল। ব্রিটিশ সরকার তাকে বারগুন্ডিয়ান ডিউক ফিলিপের কাছ থেকে ১০ হাজার পাউন্ডে কিনে নিল, যা এখনকার হিসাবে কয়েক মিলিয়ন ডলার। ইংরেজদের প্রধান শত্রুই ছিল জোয়ান অব আর্ক। বার বার ইংরেজদের পরাজয়ের কারণ হয়ে উঠছিলেন জোয়ান।

শুধু এই মেয়ের কারণেই ইংরেজ সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গেছে! কীভাবে তাদের আবার চাঙ্গা করা যায়? এবার ইংরেজরাও জোয়ানকে ডাইনি, জাদুকর হিসেবে প্রমাণ করার ফন্দি আঁটল।

কেবল কালো জাদুর সহায়তায়ই এই মেয়ে ইংরেজদের পরাজিত করেছে। এই বিশ্বাসটা খুব দ্রুত সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। সেখান থেকেই মূলত জোয়ানের বিজয়গাথা চূড়ান্ত সমাপ্তির দিকে এগোতে থাকে।

ষড়যন্ত্র যখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে

একদিকে জোয়ান একের পর এক সাফল্য পাচ্ছে, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে শুরু করল। তখনকার লোকজন কুসংস্কারে বিশ্বাস করত। জোয়ানের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে দেখে অনেকেই প্রচার করতে শুরু করল, জোয়ান আসলে একজন ডাইনি। অনেকে এটা বিশ্বাসও করতে লাগল। নিশ্চয়ই সে কালো জাদু করেছে। ফলে অল্পতেই আলোচনার ঝড় উঠল। তাকে চার্চের প্রতিনিধিদের সামনে পরীক্ষা দিতে হলো। প্রমাণ করতে হলো, জোয়ান কোনো ডাইনি নয়। পরীক্ষা পাসের পর জোয়ান হয়ে গেলেন সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন, নিলেন প্রশিক্ষণ। তারপরও ডাইনির অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে পারেননি জোয়ান, বরং সেটা ছিল শুরু মাত্র।

বলে রাখা ভালো, জোয়ান অব আর্কের সব যুদ্ধের পেছনেই ধর্মীয় চেতনা ছিল।

রাজসভার ধর্ম ব্যবসায়ী যাজকরা রাজাকে বোঝান যে, জোয়ানের এই ধর্মযুদ্ধ রাজাকে ফরাসিদের কাছে ‘ডেভিল’-এ পরিণত করবে। তত্ক্ষণাৎ রাজা জোয়ানকে ডেকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বলেন। কিন্তু একরোখা এবং জেদী জোয়ান রাজার আদেশ অমান্য করেই যুদ্ধ চালিয়ে যান।

ইংরেজরা যখন জানতে পারে, রাজার কথা অমান্য করে জোয়ান যুদ্ধ করছে তখন রাজসভার অন্য সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা জোয়ানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। মূলত এ ষড়যন্ত্রের কারণেই পরবর্তীতে বারগুন্ডিয়ানদের হাতে আটক হন জোয়ান। জোয়ান তখনো টের পাননি তিনি আসলে নানা মহলের নানা মানুষের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের শিকার। যে ষড়যন্ত্র পরবর্তীতে নির্দোষ জোয়ানের মৃত্যু ডেকে আনে।

ডাইনি থেকে মহামানবী

joan of ark 5জোয়ানের মৃত্যুর ২৫ বছর পর পোপ ক্যালিক্সটাস-৩ তার এ হত্যাকাণ্ডের বিচার নতুনভাবে শুরু করেন। সেই বিচারে জোয়ান নিষ্পাপ ও সন্ত বা সেইন্ট প্রমাণিত হন। চার্চ মিথ্যা রায় দিয়েছিল। তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়। ৫০০ বছর পর ১৯২০ সালে, ক্যাথলিক চার্চ জোয়ানকে একজন সেইন্ট হিসেবে ঘোষণা করে। তার মৃত্যুদিবস (৩০ মে) ক্যাথলিকরা এখন উদযাপন করে। ফ্রান্স এবং সেনাবাহিনীর প্যাট্রন সেইন্ট এখন জোয়ান। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের কারণে ফরাসিরা ফ্রান্স থেকে চিরতরে ইংরেজদের সব অধিকার ও চিহ্ন মুছে দেওয়ার প্রয়াস পায়। জোয়ানের স্মরণে ফ্রান্সে অনেক স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। তাকে ‘দ্য মেইড অব অরলিয়ন্স’ নামেও ডাকা হয়। ফ্রান্স ও খ্রিস্টান ধর্মের ইতিহাসে তিনি এক কিংবদন্তি চরিত্র। তার জীবনী নিয়ে অনেক গান লেখা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে নাটক ও সিনেমা।

জোয়ান অব আর্কের নামে অনেক জিনিসই পরবর্তীতে প্রচলিত হয়। যেমন—২০১৬ সালের মার্চে পুরনো একটা রিং নিয়ে দাবি করা হয়, এটা জোয়ান অব আর্কের ছিল এবং সেই রিং কেবল জোয়ানের নামের জন্য তিন লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়ে যায়! বলা হয়, আগুন ধরানোর আগে জোয়ান এ রিংটা খুলে দিয়েছিলেন কার্ডিনালকে। এ ছাড়াও ১৮৬৭ সালে এক জার ছাই আবিষ্কৃত হয় প্যারিসে, যেখানে লেখা ছিল সেটা নাকি জোয়ান অব আর্কের অবশেষ! এক সময়ের ডাইনি অপবাদের দায়ে পুড়ে মরা জোয়ান অব আর্ক আজ ফ্রান্সের জাতীয় বীর।

প্রহসনের বিচার

ইংরেজদের পরিকল্পনা আর চার্লসের সভাসদদের পূর্ববর্তী ষড়যন্ত্র ও নিষ্ক্রিয়তা জোয়ান অব আর্ককে ভয়ঙ্করভাবে ফাঁসিয়ে দিল। ডাইনিবিদ্যা চর্চা আর ধর্মহীনতার দায়ে অভিযুক্ত হলেন জোয়ান। এক ইংরেজ ধর্মজীবী পাদ্রির অধীনে ১৪৩১ সালের ৯ জানুয়ারি তার বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হয়। প্রহসনের এ বিচারে তাকে কোনো আইনজীবী দেওয়া হয়নি। বিচারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘তার ওপর ঈশ্বরের বিশেষ দয়া আছে’ তিনি এমন বিশ্বাস পোষণ করেন কিনা। জবাবে জোয়ান বলেছিলেন— ‘যদি আমি দৈবানুগ্রহ না পেয়ে থাকি, তবে ঈশ্বর আমায় অনুগ্রহ করুন; আর যদি পেয়ে থাকি, তবে ঈশ্বর আমায় সেখানেই ঠাঁই দিন!’ আসলে এ প্রশ্নটিই ছিল সাংঘাতিক চালাকিপূর্ণ। যদি জোয়ান বলতেন, ‘হ্যাঁ করি’, তবে তাকে ধর্মের বিরুদ্ধে যাওয়ার অভিযোগ আনতেন আর যদি জোয়ান বলতেন ‘না’ তবে বলা হতো তিনি নিজের অভিযোগ নিজেই স্বীকার করেছেন। চার্চের প্রতিনিধিরা তাকে স্বীকার করে নিতে বলল, সে কোনো স্বপ্ন দেখেনি, কেউ স্বপ্নে তাকে কিছু বলেনি। তারা তাকে সৈন্যের পোশাক খুলে ফেলতে বলল। কিন্তু জোয়ান কিছুই করলেন না। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার, ফ্রান্সের রাজা চার্লস আদৌ উদ্ধার করতে গেলেন না জোয়ানকে। ছলচাতুরীর বিচারে আদালত তাকে ১২ নম্বর আর্টিকেল অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত করে। বিচারে তার কার্যকলাপকে প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী আখ্যা দিয়ে তাকে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত করা হয়। কোনো আইনজীবী না থাকাতে জোয়ানকে রায় বিস্তারিত পড়ে শোনানো হয়নি। জোয়ান তখন বুঝতেও পারেননি, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

তিন তিনবার পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড

অন্য সব ডাইনির মতো জোয়ানের ভাগ্যেও অপেক্ষা করছিল আগুনে পুড়ে মৃত্যু। সিন নদীর তীরে ব্যস্ত লোকালয় রোয়াঁর বাজারে উইঞ্চেস্টারের কার্ডিনালের আদেশে জোয়ানকে পোড়ানো হলো। শুধু একবার পুড়িয়েই খ্যান্ত হয়নি। তাকে আবারও পোড়ানো হলো। তাতেও যখন তার দেহ ছাই হয়নি, তখন আদেশ হলো তৃতীয়বার পোড়ানোর। অবশেষে ছাই হয়ে গেল তার পুরো দেহ। সেই ছাই ছড়িয়ে দেওয়া হলো ফ্রান্সের সিন নদীতে। তার বয়স ছিল মাত্র ২৯। তারিখ ছিল ১৪৩১ সালের ৩০ মে।

নির্মম মৃত্যুর সে ক্ষণ

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথমেই জোয়ানকে একটি পিলারের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। জোয়ান গির্জার যাজকদের কাছে একটি ক্রুশ চান। জনৈক চাষি একটি ছোট্ট ক্রুশ তৈরি করে জোয়ানের পোশাকের সামনে ঝুলিয়ে দেন। এরপরই জোয়ানকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই টগবগে তরুণী জোয়ানের শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জোয়ানের মৃত্যুর পর ইংরেজরা তার কয়লা হয়ে যাওয়া শরীরকে প্রদর্শন করে, যাতে কেউ কোনো দিন দাবি না করতে পারে জোয়ান বেঁচে পালিয়ে গেছে। এরপর তার শরীর আরও দুবার পোড়ানো হয়। যাতে তার ছাইগুলো এত মিহি হয়ে যায় যে, কেউ তা সংগ্রহ করতে না পারে।

সত্যিকার যোদ্ধা হয়ে ওঠা

অরল্যান্ডকে মুক্ত করার পর একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করলেন জোয়ান। মে মাসের সাত তারিখে, লে তুরেলে দুর্গ অবরোধ করল ফ্রেঞ্চ বাহিনী। সে যুদ্ধে একটা তীর এসে জোয়ানের কাঁধে বিঁধে গেল, তিনি পড়ে গেলেন। কিন্তু এরপরই তিনি ফিরে এলেন এবং যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে ফ্রেঞ্চরা নব উদ্যমে আক্রমণ চালাল। সে দিন ইংল্যান্ড হেরে যায় যুদ্ধে। দুর্গ জয় করে নেয় ফ্রান্স। ইংরেজ সৈন্যদের কবল থেকে তুরেল বুরুজ শহর উদ্ধার করেন। এর পর পাতের যুদ্ধেও ইংরেজরা পরাজিত হয়। এরপর জোয়ানের পরিকল্পনা অনুযায়ী রেইমস নগরী বিজয়ের পালা। ঠিকই জোয়ানের নেতৃত্বে তারা জিতে নিল রেইমস। কেন এই নগরী? কারণ এই নগরীতেই ফ্রেঞ্চ রাজার অভিষেক অনুষ্ঠান হয়। ১৬ জুলাই নগরী হাতে আসার পর দিনই, ১৭ জুলাই ‘ভবিষ্যৎ-রাজা’ চার্লসের মাথায় মুকুট পরানো হয়। সে দিন থেকে তিনি ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লস। জোয়ানকে তার অসামান্য সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য ফ্রান্সের রাজসভায় একটি বিশেষ সম্মানিত পদ দেওয়া হয়। যদিও জোয়ান শিক্ষিত ছিলেন না, তারপরও তার মেধা এবং অসম্ভব বীরত্ব তাকে আলাদা করে তোলে।

আলোকবর্তিকা অবলা বসু

abola basu 2তাহেরা বেগম জলি : মহান বিদ্যাসাগরের জন্মের ৪৫ বছর পর এবং মহীয়সী বেগম রোকেয়ার জন্মের ১৫ বছর আগে আমাদের দেশে জন্ম নিয়েছিলেন আর এক বিস্ময়নারী। তিনি বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর একান্ত সঙ্গী লেডি অবলা বসু। স্বামী মি. বসুর পাশাপাশি, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনিও নিজের কর্ম জগতে বিচরণ করেছেন এবং নিজের বলয়ে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য উজ্জ্বল। ক্ষণজন্মা এই নারী নিজের সমস্ত জীবনীশক্তি দিয়েই বুঝেছিলেন, নারী এবং শিশুদের জীবনের অন্ধকার দূর করার মধ্যেই নিহিত আছে, আমাদের সমাজ এবং জীবনের প্রাণশক্তি। বিদ্যাসাগর, অবলা বসু এবং বেগম রোকেয়া প্রায় সমসাময়িক কালে জন্ম নেয়া এই তিনজন মহান মানুষ,ধারাবাহিকভাবে নারী এবং শিক্ষা সঙ্কট নিয়ে লড়াই করে গেছেন। তারা প্রত্যেকেই জন্মদায় হিসেবেই মনে হয় পেয়েছিলেন নারী লাঞ্ছনা দূর করার দায়ভার এবং নিজের নিজের ক্ষেত্রেও তারা ছিলেন সভ্যতার সফল কারিগর।

বিদ্যাসাগর কাল ১৮২০ সেপ্টেম্বর ২৬-১৮৯৬ জুলাই ২৯, অবলা বসু কাল-১৮৬৫ ( মতান্তরে ১৮৬৪) আগস্ট ৮-১৯৫১ আগস্ট ২৬, বেগম রোকেয়া কাল-১৮৮০ ডিসেম্বর ৯-১৯৩২ ডিসেম্বর ৯। তাদের আবির্ভাব এবং কর্মযজ্ঞের ধারাবাহিকতা দেখলে মনে হবে, এ যেন সভ্যতা নির্মাণের রিলে রেস। যেন একজনের অসমাপ্ত কাজ অন্যজনের পরম মমতায় বহন করে নিয়ে চলা। স্মরণ করা যেতে পারে, এই তিনজনই নারীর অবরুদ্ধ জীবন এবং শিক্ষা সঙ্কটকে দেখেছিলেন সামাজিক সঙ্কটের কেন্দ্র হিসেবে। অবলা বসুর আগে এবং পরে যে দু’জন নারীবান্ধব সৈনিক দেখা দিয়েছিলেন আমাদের এই ধরা ধামে, তারা যে নারী জাতির জন্য কতখানি যুধ্যমান ছিলেন, সেই গৌরবময় অতীত প্রতি মুহূর্তে আমাদের আজও রোমাঞ্চিত করে।

তবে আজ আমাদের আলোচনার কেন্দ্র হবে শ্রীমতী বসু। কথাটা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক, বিদ্যাসাগরের পরে বাংলার নারী সমাজের মুক্তির দূত যদি অবলা বসুকেই বলা হয়, তবেই তাকে প্রকৃত সম্মান দেয়া হয়। কিন্তু কেন যে তাকে অতি যত্নে গ্রাম বাংলার নারী সমাজের কাছে অচেনা করে রাখা হয়েছে, তা ভেবে দেখবার বিষয় বা কেউ কেউ শুধু বিজ্ঞানী মি. বসুর সহধর্মিণী হিসেবেই তাকে দেখতে পছন্দ করেন। অথচ শ্রী বসু এবং তিনি ছিলেন পাশাপাশি চলমান দুই শক্তিধর মানুষ। বেগম রোকেয়া এবং অবলা বসুর মধ্যে বয়সের পার্থক্য মাত্র ১৫ বছরের। প্রায় সমসাময়িক সময়েই এই দুই দিকপাল ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নারী সমাজকে অন্ধকার মুক্ত করতে, নারী সমাজের শৃঙ্খল মুক্তির মহাযজ্ঞে। যখন মহীয়সী বেগম রোকেয়া এক হাতে বই-কলম এবং অন্য হাতে আলোর মশাল নিয়ে ছুটে চলেছেন বিরামহীন। তখন আলোকময়ী অবলা বসুও এক হাতে বই-কলম এবং অন্য হাতে আলোর মশাল হাতে সমান গতিতে ছুটে চলেছেন বাংলার পথে প্রান্তরে। একের পর এক তিনি গড়ে তুলেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার সংখ্যা হবে দু’শ’র ওপরে। অবলা বসুর অসাধারণ এই কীর্তি আজও আমাদের মনে বিস্ময় জাগায়। অবশ্য বিদ্যাসাগর থেকে রবীন্দ্রনাথ, এই সময় কাল পর্যন্ত আমাদের দেশে মহা জাগরণ উঠেছিল শিক্ষা এবং নারী মুক্তি আন্দোলনের। সে আজ আমাদের কাছে শুধুই সুখ স্মৃতি। বিশেষ করে নারী মুক্তি আন্দোলনের গৌরবময় সেই ধারাবাহিকতার আজ নির্মম ছন্দ পতন যে ঘটেছে, তা আমরা জীবন দিয়ে প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করছি।

আমাদের দেশের নারীদেহ আজ প্রায় শিয়াল শকুনের খাদ্য এবং শিক্ষাকে পরিণত হয়েছে ধনী সমাজে বিলাসী সামগ্রীতে। একবিংশ শতাব্দীর অধিকার সচেতন এই যুগেও আমাদের বাল্যবিবাহের কাছে করতে হচ্ছে আত্মসমর্পণ এবং তা আইনসম্মতভাবে! আজও আমাদের দেশের মেয়েরা বঞ্চিত হচ্ছে পিতৃ সম্পত্তি থেকে। অথচ ঠিক এর দেড় শ’ বছর আগে বাংলার আকাশে উদয় হয়েছিল অবলা বসু নামের উজ্জ্বল নক্ষত্রের। যিনি জীবনের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। কিন্তু আমরা, সেই অবলা বসুর স্বপ্নের দেশেই আজও হামাগুড়ি দিচ্ছি নিকষ কালো অন্ধকারে! এই দুঃখজনক রহস্যের উৎস কোথায়? তা অনেকটা গবেষণারই বিষয়! যাই হোক ফিরে আসি অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর পথযাত্রী অবলা বসুর কাছে।

বিক্রমপুরের বিখ্যাত দাশ পরিবারের সন্তান, নারী সমাজের পথিকৃৎ লেডি অবলা বসুর জন্ম ৮ আগস্ট ১৮৬৫ (মতান্তরে ১৮৬৪) বরিশালে। বাংলা ১২৭১ সালে। পদ্মার গর্ভে হারিয়ে যাওয়া বিক্রমপুরের ছোট্ট গ্রাম তেলিরবাগের দুর্গামোহন দাশ, যিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অন্ধকার সমাজের বিরুদ্ধে ছিলেন আপোসহীন যোদ্ধা। বহু বিবাহ বন্ধ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন ও নারী শিক্ষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের যোগ্য উত্তরসূরি। ব্রাহ্ম সমাজের মুখপাত্র এই দুর্গাদাশেরই কন্যা লেডি অবলা বসু। অবলা বসুর মাতা শ্রীমতী ব্রহ্মময়ী দাশ অবরুদ্ধ নারী সমাজের অন্ধকার ঘুচাতে, নিজের স্বকীয়তা নিয়ে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে ছিল তার আপোসহীন পদচারণা।

শ্রীমতী বসুর ভাই তৎকালীন প্রখ্যাত অ্যাডভোকেট জেনারেল সতিশ রঞ্জন দাশ। বোন ‘গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলের’ প্রতিষ্ঠাতা সরলা রায়।

গোপাল কৃষ্ণ গোখলে (গোখলে) এখানে কিছু আলোচনার দাবি রাখে। গোপাল কৃষ্ণ গোখলে ছিলেন ভারতীয় হিসেবে কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি। তবে তার থেকেও তার বড় পরিচয়, তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার দাবি নিয়ে ১৯১০ সালে প্রথম সরব হয়েছিলেন। নারী সমাজকে তখন ১০ বছর বয়সে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হতো। মি. গোখলেই প্রথম নারীদের এই প্রাপ্ত বয়স নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হন। সম্ভবত সেই কারণেই, বিদুষী দুই বোন, তাদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নারী এবং শিক্ষাবান্ধব মি. গোখলের নাম জড়িয়ে নেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং ভারতের পঞ্চম মুখ্য বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাশ ছিলেন অবলা বসুদের নিকটাত্মীয়।

অবলা বসুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বরিশালে। বরিশালেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন কলকাতার বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে বেথুন স্কুলে। বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় এবং বেথুন স্কুলের তিনি ছিলেন প্রথম ছাত্রীদের অন্যতম।

তিনি ১৮৮১ সালে ২০ টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বাবা দুর্গামোহন দাশের ইচ্ছা, কন্যা অবলা ডাক্তার হবে। তৎকালীন সময়ে কলকাতায় নারীদের ডাক্তারি শিক্ষার সুযোগ না থাকায়, অবলা বসু ১৮৮২ সালে মাদ্রাজে যান ডাক্তারি পড়তে। অসুস্থতাজনিত কারণে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারি পড়া তার আর হয়ে ওঠে না। ডাক্তারি পাঠ অসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসতে হয় তাকে। তবে সেখানে তিনি ডাক্তারি বিদ্যার ওপর দুই বছরের একটি নির্দিষ্ট কোর্স শেষ করেছিলেন। এই কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজের পক্ষ থেকে তাকে একটি ‘সার্টিফিকেট অফ অনার’ দেয়া হয়েছিল।

অতঃপর ১৮৮৭ সালে বিজ্ঞানাচার্জ জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে অবলা বসু বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯১০ সালে লেডি অবলা বসু ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের সম্পাদিকা হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি স্কুলটি পরিচালনা করেন। নতুন করে সাজিয়ে সেই স্কুলটিকে তিনি করে তুলেছিলেন আরও গতিশীল। একই সঙ্গে দিদি সরলা রায়ের পাশে দাঁড়িয়ে, গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলটি প্রতিষ্ঠার কাজে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তিনি নিজেকে যুক্ত করেন ।

লেডি অবলা বসু ১৯১৯ সালে ‘নারী শিক্ষা সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই সংগঠনের মাধ্যমে মুরলীধর মহাবিদ্যালয় এবং গ্রাম এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দু’শ’ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে এই সকল দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তার সম্বন্ধ শুধু মসির সঙ্গেই নয়, অসি ধরার দুঃসাহসিক কাজেও তিনি সিদ্ধহস্ত। তার সমসাময়িক কালে বিধবাদের দুর্বিষহ জীবন বড় ভাবিয়ে তুলেছিল মহীয়সী এই বঙ্গকন্যাকে। তাই শিক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি বিধবাদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘বিদ্যাসাগর বাণীভবন’ ‘মহিলা শিল্পভবন’ ও ‘ বাণীভবন ট্রেনিং স্কুল নামের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলেন তিনি। যেখানে বিধবাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলে, তার তৈরি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত বিধবাদের নিয়োগ দেয়া হতো। তাছাড়া ‘নারী শিক্ষা সমিতি’র মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও তিনি পরিচালনা করতেন। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, লেডি অবলা বসু স্বামীর মৃত্যুর পর, তার সঞ্চিত এক লাখ টাকা দিয়ে ‘অ্যাডালটস প্রাইমারি এডুকেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ভগিনী নিবেদিতার নাম।

তৎকালীন বাংলার নারী মুক্তি এবং নারী শিক্ষা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে অবলা বসু ছিলেন একটি পরিচিত দুরন্ত মুখ। অথচ আজ তিনি আমাদের সমাজে প্রায় অচেনা হিসেবেই পড়ে আছেন! সে সময়কার জনপ্রিয় ইংরেজী পত্রিকা ‘মডার্ন রিভিউ’-এ নারী শিক্ষা এবং নারী স্বাধীনতার ওপর তার বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। বিভিন্ন বাংলা সাময়িক পত্রিকায় বেরিয়েছিল তার কিছু প্রবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনী। অবলা বসুর বিভিন্ন সময়ে লেখা কিছু প্রবন্ধ একটি সঙ্কলনেই পাওয়া যায়- শকুন্তলা শাস্ত্রি প্রকাশিত ‘বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র ও লেডি বসুর প্রবন্ধাবলী’ নামে। ১৩০২ থেকে ১৩৩২ এই সময়কালের মধ্যে ‘মুকুল এবং প্রবাসী পত্রিকায় নিজের ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিখে তিনি দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন, নারী যদি মানুষ হওয়ার সংগ্রাম করে, তবে সে কত উঁচুতে উঠতে পারে এবং জীবনকেও দেখতে পারে কতভাবে। ঠিক এইখানটাতেই তিনি প্রকৃতই নারী সমাজের অগ্রদূত। বাংলা ১৩০২ অগ্রহায়ণ ও পৌষ সংখ্যার মুকুল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তার কাশ্মীর ভ্রমণ কাহিনী। এই কাহিনী লিখতে গিয়ে, শুরুতে অবলা শিশুদের উদ্দেশে লিখেছিলেন,‘ইংলন্ড প্রভৃতি সুসভ্য দেশের বালক বালিকাগণ বাল্যকাল হইতেই ভ্রমণ বৃত্তান্ত পড়িতে ভালবাসে, তাহার সুফল হয় এই যে, বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া তাহারা নূতন দেশ আবিষ্কারের জন্য প্রাণ পর্যন্ত ত্যাগ করিতে প্রস্তুত হয়। …. আমাদের এই ভ্রমণ বৃত্তান্ত পাঠ করিয়া এতটা না হইলেও আশা করি তোমাদের মধ্যে অনেকের মনে নানা স্থান ভ্রমণ করিয়া প্রকৃতির শোভা দেখিবার আগ্রহ জন্মিবে।’

এখান থেকে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, অবলার চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাস করত আমাদের শিশুরা। কিভাবে শিশুদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তা ছিল অবলার জীবনের ধ্যানজ্ঞান। ভ্রমণকেও জীবন গড়ে তোলার উপায় হিসেবে দেখতে পাওয়া, অবলার এই বিচক্ষণতার পরিচয়, তাকে চিনতে আমাদের সাহায্য করে। ভ্রমণ, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল তার জীবনের কর্মশক্তির অন্যতম উৎস।

পৃথিবীর দেশে দেশে ঘুরেছেন অবলা। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু যখন তার বিজ্ঞানের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য ছুটছেন বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে। প্রায় সব জায়গাতেই তার সঙ্গী ছিলেন অবলা এবং অবলার এই ভ্রমণ যে শুধুই স্বামীসঙ্গ ছিল না, তিনি জীবনভর তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন তার প্রতিটি পদক্ষেপে। তার ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, তিনি ১৯৩২ সালের প্রবাসীতে লিখিত আকারে প্রকাশ করেছিলেন ‘বাঙ্গালী মহিলার পৃথিবী ভ্রমণ’ নামে। তার এই লেখায় তাদের ইউরোপ ভ্রমণের কারণ এবং বিজ্ঞানী সমাজে তাদের গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘বহুদেশ ভ্রমণে দেশ সেবার নানা উপাদান সংগ্রহ করিতে পারিয়াছি। সে কথা বলিতে গেলে ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ হইতে আরম্ভ করিতে হয়। সেই বৎসর আচার্য বসু মহাশয় অদৃশ্য আলোক সম্বন্ধে তাহার নূতন আবিষ্ক্রিয়া বৈজ্ঞানিক সমাজে প্রদর্শন করিবার জন্য ব্রিটিশ এসোসিয়েশনে আহূত হন। তাহার সহিত আমিও যাই। এই আমার প্রথম ইউরোপ যাত্রা। ইহার পর ৫/৬ বার তাহার সহিত পৃথিবীব্যাপী ভ্রমণে বাহির হইয়াছি। আমার ভ্রমণকালের মধ্যে পৃথিবীর ইতিহাস নানাভাবে ভাঙ্গিয়াছে ও গড়িয়াছে, এক আমার বয়সেই ইউরোপে কত কত পরিবর্তন দেখিলাম।

ভারতীয় বিজ্ঞানের আধুনিক ধারাকে, অক্লান্ত পরিশ্রমে পশ্চিমি দুনিয়ায় পরিচিত করে তুলেছিলেন বাঙালী বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। এই উপলক্ষেই তাদের ইউরোপ ভ্রমণ এবং অবশ্যই এই ভ্রমণ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা তবে এই ভ্রমণ আজও চেতনার গভীর থেকে আমরা দেখতে পেরেছি বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। অবলা বসুর বয়ানে সেই দুঃখবোধ ফুটে ওঠার চিহ্ন আমরা দেখতে পাই। ‘এতকাল তো ভারতবাসী বিজ্ঞানে অক্ষম এই অপবাদ বহুকণ্ঠে বিঘোষিত হইয়াছে, আজ বাঙ্গালী এই প্রথম বিজ্ঞান সমরে বিশ্বের সম্মুখে যুঝিতে দণ্ডায়মান। ফল কী হইবে ভাবিয়া আশংকায় আমার হৃদয় কাঁপিতেছিল, হাত-পা ঠাণ্ডা হইয়া আসিতেছিল। তারপর যে কী হইল সে সম্বন্ধে আমার মনে স্পষ্ট কোন ছবি আজ আর নাই। তবে ঘন ঘন করতালি শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম যে,পরাভব স্বীকার করিতে হয় নাই। বরং জয়ই হইয়াছে।’ এই ভ্রমণের এই সময় কালেই কলকাতায় ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা তাদের মনে ঠাঁই করে নিয়েছিল।

বিদেশের কথা লিখতে গিয়ে প্রকৃতির নানা বর্ণনার পাশাপাশি ঘুরে ফিরে ছোটদের কথাই লিখেছেন অবলা। ‘ইতালির লুপ্তনগরী।’ তার সেরা বিদেশ ভ্রমণ কাহিনী।

জগদীশচন্দ্র এবং অবলার একমাত্র সন্তান জন্মের পরেই মারা যায়। পরবর্তী জীবনে আর কোন সন্তান তাদের জীবনে আসেনি। সমাজের হাজারো শিশুদের মধ্যে অবলা খুঁজে নিয়েছিলেন সন্তানের অপূর্ণতা। আমরা যে নৈর্ব্যক্তিক মাতৃত্ব-পিতৃত্বের কথা বইয়ে পড়েছি, সেই নৈর্ব্যক্তিক পিতৃত্ব-মাতৃত্বের মহান সৌন্দর্য ধরা দিয়েছিল বসু দম্পতির উচ্চতর মানবিক জীবনে।

ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর, পম্পেই নগরী অবলা বসুর মনে বলতে গেলে ঝড় তুলেছিল। একবার-সারাদিন সেই মৃত নগরী ঘুরে, সন্ধ্যায় শেষ বারের মতো শহরটার দিকে তাকিয়ে তার কল্পনায় ভেসে উঠলো ‘একটি গৃহ ক্রমে ক্রমে ভস্মে ঢাকিয়া যাইতেছিল। সেই গৃহে একটি নারী দু’হাতে তার শিশুটিকে উচ্চে ধরিয়া রহিয়াছিল। ভস্মস্তূপ ক্রমে ক্রমে উচ্চ হইয়া দুঃখিনী মাতাকে নিমজ্জিত করিতেছিল। কিন্তু সেই অগ্নির প্রসার হইতে শিশুকে রক্ষা করিতে হইবে। জ্বলন্ত ভস্মস্তূপ তিল তিল করিয়া দগ্ধ করিয়াও জননীকে একেবারে অবসন্ন করিতে পারে নাই। কী যেন এক মহাশক্তি, দুঃসহ যন্ত্রণা দমন করিয়া রাখিয়াছিল! মাতার হস্ত দুইটি মৃত্যু যন্ত্রণাতেও অবশ হইয়া পড়ে নাই। দুই সহস্র বৎসর পরে সেই ঊর্ধ্বত্থিত করপুটে সন্তানটি পাওয়া গিয়াছে। সেই মাতার স্নেহস্পর্শে যেন অতীত বর্তমানের সহিত মিলিয়া গেলো। একই দুঃখে, একই স্নেহে, একই মমতায় সেকাল ও একাল, পূর্ব ও পশ্চিম যেন বান্ধা পড়িলো! তখন পম্পেইর মৃত রাজ্য সঞ্জীবিত হইয়া উঠিলো এবং রাজপথ আমার চক্ষে অকস্মাৎ লোকজন পূর্ণ হইলো!

অবলা বসুর সৃষ্টিশীল জীবন আমাদের চেতনায় এই বলে প্রতিধ্বনি তোলে, ‘শ্রীমতী অবলা বসু হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃতই বাংলার পরমাত্মীয়। একাধারে আমরা তাকে পেয়েছি নারী সমাজের যুধ্যমান পথিকৃৎ হিসেবে। অন্যদিকে তিনি ছিলেন শিশু জীবনের কাণ্ডারি। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, বাঙ্গালী বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে তিনি ক্লান্তিহীন ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর পথে পথে। আবার আমরা দেখি কি পরম মমতায় তার জীবনের পরতে পরতে মিশে ছিলো আমাদের সন্তানেরা। এ কথা না বললেই নয়, বাংলার নারী সমাজের বেদনা দূর করতে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রকৃত সৈনিকরূপেই। আজ এই ঘোর অন্ধকারে, আমাদের অবলা বসুর দিকে ফিরে তাকাতেই হবে। যে দেশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, লেডি অবলা বসু, মহীয়সী বেগম রোকেয়ার আবির্ভাব ঘটে, সেই দেশের নারী বা শিশুদের জীবনে অন্ধকার কিছুতেই স্থায়ীরূপ পেতে পারে না। আমাদের নারী এবং শিশুসমাজের জীবন, মানবিক অধিকারে উন্নীত করার লড়াইয়ে, শক্তিমান অবলা বসু আজ হয়ে উঠুন আমাদের আঁধারের আলো।

এনহেদুয়ান্না : পৃথিবীর প্রথম কবি

enhenduannaকাজী জহিরুল ইসলাম : চন্দ্রদেবী সুয়েনের মন্দিরে ধ্যানমগ্ন এক যুবতী, পদ্মাসনে উপবিষ্ট। দুই হাতের করতল সংযুক্ত, ঈষৎ উত্তোলিত। বুকের দুপাশে নগ্ন স্তনের ওপর দুগাছি কালো চুল। সুডৌল বাহুযুগল, উন্মুক্ত পিঠ এবং ঊরুসন্ধির সঙ্গমস্থলে স্ফীত নিতম্ব, যা শ্বেতপাথরের ওপর ছড়ানো এক তাল মসৃণ মাংসপিণ্ডের মতো পড়ে আছে। ধু ধু প্রান্তরে মৌন সন্ন্যাসীর মতো দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি ন্যাড়া বৃক্ষ। গোধূলিলগ্ন। সূর্যাস্তের এক চিলতে লাল আভা এসে পড়েছে দেবী সুয়েনের কপালে শোভিত মুকুটের ওপর। প্রার্থনামগ্ন আক্কাদিয়ান যুবতীর নগ্ন অবয়ব থেকে এক অলৌকিক আলোর উজ্জ্বল আভা বিকীর্ণ হচ্ছে। পেছনে সম্রাট সারগনের নেতৃত্বে আক্কাদ সাম্রাজ্যের গণ্যমান্য লোকজন। চন্দ্র দেবীর কাছে আজ ওদের একটিই প্রার্থনা—তিনি যেন এই সাম্রাজ্যকে অসুর লুগাল এনের হাত থেকে রক্ষা করেন।

ওপরে বর্ণিত দৃশ্যটি আজ থেকে ৪ হাজার ২৭৪ বছর আগের, অর্থাৎ যিশুর জন্মের ২২৫৮ বছর আগের। এই প্রার্থনাসভার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যে নারী, তাঁর নাম এনহেদুয়ান্না। তখন তিনি ২৭ বছরের পূর্ণ যুবতী। এনহেদুয়ান্না শব্দের অর্থ অন্তরীক্ষ দেবী। তিনি আক্কাদের সম্রাট সারগন ও তাঁর স্ত্রী রানি তাশলুলতুমের মেয়ে। অন্য এক মতে, এনহেদুয়ান্না সম্রাট সারগনের (যাঁকে পৃথিবীর সম্রাট বলে অভিবাদন জানানো হতো) মেয়ে নন, তবে রক্তের সম্পর্কিত আত্মীয়া।

এনহেদুয়ান্না ছিলেন অসম্ভব মেধাবী মানুষ; এক নারী, যিনি প্রার্থনাসংগীত ও কবিতা লিখতে পারতেন বলে তৎকালীন সমাজ তাঁকে দেবী হিসেবে পূজা করত। তাঁর পিতা সম্রাট সারগন কন্যা এনহেদুয়ান্নাকে রাজ্যের প্রধান পুরোহিতের সম্মানে ভূষিত করেন। এই পদটি মর্যাদা পেত রাজ্যের সবচেয়ে সম্মানিত পদ হিসেবে।

সারগনের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র রামিস সম্রাট হলেও এনহেদুয়ান্না তাঁর স্বপদে বহাল থাকেন। ২২৮৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে জন্মগ্রহণকারী এই নারীই এযাবৎকালের আবিষ্কৃত প্রথম লেখক বা কবি। তিনি ৪২টি স্তবগান রচনা করেন, যা পরবর্তীকালে ৩৭টি প্রস্তরখণ্ড থেকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তিনি দেবী ইনানার স্তুতি করে আরও বেশ কিছু শ্লোক রচনা করেন।

সুমেরু ভাষার ইনানাই আক্কাদিয়ান ভাষার ইস্তার, পরবর্তীকালে গ্রিকরা যাঁকে আফ্রোদিতি বলে শনাক্ত করে এবং রোমানরা তাঁকে ডাকে ভেনাস বলে, তিনি ছিলেন প্রেমের দেবী। দেবী ইনানার স্তুতি স্তাবকে সমৃদ্ধ এনহেদুয়ান্নার কবিতাগুলোই প্রার্থনাসভা-সংগীতের ভিত্তি নির্মাণ করে। সেই দিক থেকে তিনি ধর্মাবতারের কাজ করেছেন। তাঁর ওপর রাজা সারগনের ছিল পূর্ণ আস্থা। এনহেদুয়ান্নার মাধ্যমেই তিনি সুমেরু দেব-দেবীদের স্থলে আক্কাদিয়ান দেব-দেবীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজটি করেছিলেন, রাজ্য নিষ্কণ্টক রাখার জন্য এর প্রয়োজন হয়েছিল। এনহেদুয়ান্নার কাব্যপ্রতিভা তৎকালীন মেসিপটেমিয়ার নারীদের শিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করে এবং রাজবংশের নারীদের কবিতা লিখতে উৎসাহিত করে। একসময় এটা প্রায় অবধারিতই হয়ে ওঠে যে রাজকন্যা ও রাজবধূরা অবশ্যই কবিতা লিখতে জানবেন। যদিও তাঁর সমসাময়িককালে আর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো নারী কবির সন্ধান পাওয়া যায়নি। এতে এটাও প্রতীয়মান হয় যে পার্শি বি শেলির কথাই ঠিক, কবিতা একটি ঐশ্বরিক বা স্বর্গীয় ব্যাপার। তিনি অবশ্য স্বর্গীয় বলতে বুঝিয়েছেন মানুষের স্বর্গীয় অনুভূতির কথা।

এনহেদুয়ান্না সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ পল ক্রিওয়াসজেক বলেন,‘তাঁর কম্পোজিশন, যদিও এই আধুনিককালেই কেবল পুনরুদ্ধার করা হলো, সর্বকালের অনুনয়মূলক প্রার্থনার মডেল। ব্যাবিলনীয়দের মাধ্যমে এর প্রভাব হিব্রু বাইবেলে এবং প্রাচীন গ্রিক প্রার্থনাসংগীতেও এসে পড়েছে। ইতিহাসের প্রথম কবি এনহেদুয়ান্নার ভীরু শ্লোকগুলোর প্রভাব প্রথম দিকের খ্রিষ্টান চার্চেও শোনা যেত।’

তখনকার প্রেক্ষাপটে নিয়মতান্ত্রিক প্রার্থনা মানুষের মধ্যে মানবতাবোধ তৈরিতে সহায়ক ছিল। রাজ্যে ও সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। যদিও দেব-দেবীরা যাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকতেন, অর্থাৎ রাজা বা গোত্রপ্রধানগণ ধর্মের নামে জনগণকে প্রতারিতও করতেন। তা সত্ত্বেও ধর্মই মানুষের অস্থির চিত্তকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একমাত্র উপায় ছিল। সেই দিক থেকে পৃথিবীর প্রথম কবি এনহেদুয়ান্না প্রার্থনা শ্লোক বা দেব-দেবীর স্তুতিবাক্য রচনা করে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন মানব সভ্যতার জন্য।

২২৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন পৃথিবীর প্রথম কবি এই মহীয়সী নারী। তিনি কোনো পুরুষ সঙ্গী গ্রহণ করেছিলেন কি না বা কোনো সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন কি না—এ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা না গেলেও এটা অনুমিত যে রাজ্যের প্রধান পুরোহিত হওয়ার কারণে হয়তো সংসারের মতো জাগতিক মায়ার বাঁধনে তিনি জড়াননি।

এই লেখায় পৃথিবীর প্রথম কবি এনহেদুয়ান্নার কিছু শ্লোকের বাংলা অনুবাদ উপস্থাপনের চেষ্টা করছি। অনুবাদগুলো আমি করেছি ইংরেজি থেকে। এনহেদুয়ান্না যে পদ্ধতিতে লিখেছিলেন, সেই পদ্ধতিকে বলা হতো কিউনিফর্ম পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ৩৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে লিখতে শুরু করে মেসিপটেমিয়ার অধিবাসীরা।

এনহেদুয়ান্নার শ্লোক

১.

আমি তোমার এবং সব সময় তোমারই থাকব

তোমার হৃদয় আমার জন্যে শীতল হোক,

তোমার চেতনা, সমবেদনা আমার প্রতি

                        করুণার্দ্র হোক

তোমার কঠিন শাস্তির স্বাদ আমি উপলব্ধি করেছি।

(তৃতীয় লাইনের কিছু অংশ উদ্ধার করা যায়নি। ‘করুণার্দ্র’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে চরণকে অর্থবহ করার জন্য। এনহেদুয়ান্নার শ্লোক: ১২)

২.

আমার দেবী, আমি ভূমণ্ডলে তোমার মহানুভবতা ও মহিমা ঘোষণা করছি

আমি চিরকাল তোমার মহানুভবতার

                        গুণগান করে যাব।

(শ্লোক: ১৩)

৩.

রানি যে বড় কাজগুলো করেন তা নিজের জন্য

তিনি জড়ো করেন নিজের স্বর্গ-মর্ত্য

তিনি মহান দেবীর প্রতিদ্বন্দ্বী।

(শ্লোক: ১৬)

৪.

দেবরাজ, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং বাতাসের দেবী এই মহাবিশ্বকে করেছে তোমার দিকে ধাবমান

হে দেবীদের দেবী ইনানা, তোমার পদতলে

                        অর্পিত মহাবিশ্ব

তুমিই নির্ধারণ করো রাজকন্যাদের ভাগ্য।

(শ্লোক: ১৮)

৫.

মহীয়সী, তুমি সুমহান, তুমি গুরুত্বপূর্ণ

ইনানা তুমি মহান, তুমি গুরুত্বপূর্ণ

আমার দেবী, তোমার মহানুভবতা উদ্ভিন্ন

আমার দোহাই তোমার হৃদয় ফিরে যাক যথাস্থানে।

(শ্লোক: ১৯)

রোহিঙ্গা নির্যাতনের সচিত্র উপাখ্যান…

rohingya oppression illustrated

অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গা তরুণীরা

rohingya women prostitutionশান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সেনাবাহিনী দেশটির আরকান রাজ্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা করে দেশত্যাগে বাধ্য করছে। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে ঢুকছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা।

মানবিক কারণে এসকল সাধারণ জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশও আশ্রয় দিয়েছে। আগস্ট থেকে এখনো অনুপ্রবেশ করা ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গার অধিকাংশই নারী ও শিশু। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় অবস্থান করছেন তারা। তবে বিপত্তিও ঘটেছে। সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপকর্মে।

পুরুষদের পাশাপাশি টাকা আয় করে উন্নত জীবনের আশায় রোহিঙ্গা তরুণীরা নানা ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা তরুণীরা নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ায় সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে শঙ্কা কক্সবাজার পুলিশ প্রশাসনের। বিশেষ করে উন্নত জীবনের আশায় তারা আশ্রয় শিবির ত্যাগের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে দাবি পুলিশের।

গত কয়েকদিনে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে শতাধিক রোহিঙ্গা তরুণীকে ‘উদ্ধার’ এবং অন্তত ৫০ জন দালালকে সাজা দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ধরনের সামাজিক অপরাধ দমনে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইডস, হেপাটাইস ‘বি’র মতো নানা ধরনের প্রাণঘাতি রোগের প্রকোপ রয়েছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৬৫ জনকে এইডস রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

জঙ্গি কার্যক্রমে রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইয়াবা চালানেও ব্যবহৃত হচ্ছে রোহিঙ্গারা। এদিকে টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের হাতে বাংলাদেশি সিম তুলে দিচ্ছেন স্থানীয়রা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশপাশের এলাকায় কোনও ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই এসব সিম বিক্রি করতে দেখা গেছে। আর নিবন্ধন না থাকায় এসব সিম ব্যবহার করে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউ কেউ। রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য দালালদের দারস্ত হয়। এ দালালরাই তাদের বন, জঙ্গল, পাহাড় ও নদী পাড় করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশে ব্যবহৃত সিম ও মোবাইলের ব্যবস্থাও তারা টাকার বিনিময়ে করে দেন। তাই কখনও কখনও বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই এদেশের সিম পান তারা। এছাড়া মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

তরুণীদের অনৈতিক কাজে জড়ানোর ব্যাপারে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আফরাজুল হক টটুল বলেন, ‘রোহিঙ্গা তরুণীরা বলছেন, মিয়ানমারে তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এখন উন্নত জীবনের আশায় এ অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছেন। রোহিঙ্গা তরুণীদের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার হার ক্রমশ বাড়তে থাকায় গেল এক সপ্তাহ ধরে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এরইমধ্যে বিভিন্ন হোটেল থেকে শতাধিক রোহিঙ্গা তরুণীকে উদ্ধারের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেয়া হয়েছে ৫০ জন দালালকে’।