আর্কাইভ

Archive for the ‘নারী’ Category

বাংলা অত্যন্ত সুন্দর ও সুমধুর ভাষা

hannah ruth thompsonশেখ মেহেদী হাসান : আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাবিজ্ঞানী ড. হানা রুথ টমসন লন্ডন ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ও আফ্রিকান স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করছেন।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ বিষয়ে তার একাধিক গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা তার বাংলা ব্যাকরণ চমকিত করেছে গবেষকদের। বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য কিছু বইয়ের অনুবাদও করেছেন। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত আছেন।

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা জার্মানিতে। পড়াশোনার একটি পর্ব সেখানেই শেষ করেছেন?

আমার জন্ম হয়েছে জার্মানিতে। সেখানেই আমার বেড়ে ওঠা। জার্মানির সর্বোক ইউনিভার্সিটি থেকে ভাষাতত্ত্বে মাস্টার্স করেছি। তখন আমি ইংরেজি এবং জার্মান ভাষা নিয়ে গবেষণা করছিলাম। ভাষা নিয়ে গবেষণা করতে আমার খুব ভালো লাগে। তারপর ইংরেজি মানুষ কিথ টমসনকে বিয়ে করেছি। বিয়ের পর আমাদের তিনটি সন্তান হয়। ওদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। ১৯৯১ সালে আমার স্বামীর চাকরি হলো বাংলাদেশে ইংল্যান্ডভিত্তিক একটি উন্নয়ন প্রকল্পে। আমরা বাংলাদেশে চলে আসলাম। এখানে এসে বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে গেলাম। কি সুন্দর লাগছিল এই দেশ। এই দেশের মানুষ। বাঙালিদের মুখে অত্যন্ত সুন্দর ও সুমধুর বাংলা ভাষা শুনে সিদ্ধান্ত নেই আমি বাঙালিদের মতো বাংলা ভাষা শিখব।

বাংলা ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহী হলেন কীভাবে?

আমি প্রথম বাংলা শিখতে শুরু করি ১৯৯১ সালে। এর আগে বাংলা ভাষা সম্পর্কে কোনো ধারণা আমার ছিল না। আবার আমি যে বাংলা ভাষা শিখব, তা নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। তবে তখনো আমি আশা করিনি যে এই ভাষাটি আমার এত ভালো লেগে যাবে। বাংলা ভাষার যে সব শব্দ আমার আকর্ষণ করেছিল তার মধ্যে ‘প্রজাপতি’,‘বৃহস্পতিবার’,‘সাধারণত’,‘দুর্ভাগ্যবশত’ ইত্যাদি। এর সাউন্ডগুলো কি সুন্দর! আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, বাংলা অনেক সুন্দর ও জীবন্ত একটি ভাষা। আমরা তখন গুলশান এক নম্বরে থাকতাম। সন্তানদের লালন পালন ছাড়া আমার কোনো কাজ ছিল না। ফার্মগেটের গ্রিন রোডে অবস্থিত একটি ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টারে আমি বাংলা শিখতে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রতিদিন চার ঘণ্টা বাংলা শিখতাম। কিন্তু তাদের নিয়ম আমার ভালো লাগেনি। কারণ ক্লাস রুম খুব ছোট ছিল। আমার সঙ্গে বুড়া দুজন মানুষ ছিল। তারা কখনো কোনো বিদেশি ভাষা শেখেনি। অন্যদিকে আমি ছিলাম ভাষা বিশেষজ্ঞ। তাদের সঙ্গে ভাষা শিখতে আমার একটু অসুবিধা হচ্ছিল। আর শিক্ষাটা চলছিল খুব আস্তে আস্তে। দ্বিতীয় মাস থেকে ক্লাসের চার ঘণ্টার মধ্যে আমি দুই ঘণ্টা ক্লাসে আর বাকি দুই ঘণ্টা অন্য একজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাদাভাবে বসে কথা বলি। এভাবে মোটামুটি দ্রুতই বাংলা ভাষা শিখে যাই। বাংলা শেখা ও জানার মতো উপযুক্ত কোনো বই ছিল না। আমার আগ্রহ ছিল বাংলা ভাষার ভিতরকার সৌন্দর্যগুলো জানা। তখন রাস্তায়, দোকানে,স্টেশনে, বাজারে—বিচিত্র জায়গায় সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাংলা শিখেছি অনেক বেশি।

বাংলা অভিধান ও ব্যাকরণ বিষয়ে বই লেখার তাগিদ আপনার মধ্যে তৈরি হলো কী করে?

আমার ভাবনা ছিল বাংলা ভাষা শিখে একটা চাকরি ধরব। বাংলাদেশে আসার ছয় মাস পর এখানে বান্ধবী রুথের সঙ্গে আমি কাজ করতে চেয়েছিলাম। তখন সে আমাকে বলল,‘তুমি আমার সঙ্গে কাজ করবে না। তুমি বরং একটা বাংলা অভিধান লিখে দাও। তুমি যত তাড়াতাড়ি বাংলা শিখেছ, তেমনভাবে আমরা কেউ পারিনি। আমাদের জন্য তুমি একটা অভিধান লেখো। একটা ব্যবহারিক বাংলা ভাষার অভিধান আমাদের খুব দরকার।’ এটা আমার জীবনে খুব অদ্ভুত একটা ব্যাপার ছিল। তখন আমি এতটা বাংলা শিখিনি যে একটি বই লিখব? রুথের কথাটা ভেবে আস্তে আস্তে মনে হলো, আসলেই কাজটা আমি করতে পারি। কারণ নিজের জন্য আমি শেখার কিছু নিয়ম বানিয়েছিলাম। বাংলা ভোকবলারির বই ছিল। বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ইত্যাদি আলাদা করে লিখে রেখেছিলাম। মনে হলো, আমার নোটগুলো অন্যদের জন্য উপকার হবে।

তারপর বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে প্রথম গবেষণা গ্রন্থ রচনা করলেন?

hannah ruth thompson book coversরুথের কথায় আমি বাংলা ব্যাকরণ রচনায় আগ্রহী হলাম। বিষয়টি অন্যদের জানালে তারা পরামর্শ দিল রবীন্দ্রনাথ পড়তে হবে। অথচ আমি উচ্চমানের কোনো সাহিত্য করতে চাইনি, চেয়েছিলাম সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকরণ। পরে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার প্রধান লেখকদের বই পড়েছি। বুদ্ধদেব বসুর ‘মনের মতো মেয়ে’ উপন্যাস জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছি। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে হয়। কারণ বাচ্চাদের পড়াশোনার সমস্যা হচ্ছিল। তারপর ইংল্যান্ডে বসে বাংলা ব্যাকরণ বইটি লিখি। ১৯৯৯ সালে আমার প্রথম বই ‘এসেনশিয়াল এভরিডে বেঙ্গলি’ প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে। বাংলা একাডেমির তত্কালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক মনসুর মুসা আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। যতটা জানি, আমিই ছিলাম তাদের প্রথম বিদেশি লেখক। বইটা এখন একটু পুরনো হয়ে গেছে, তবে এখনো অনেকের কাজে লাগে। বইটি লিখতে গিয়ে আমি টের পেলাম, বাংলা ভাষা নিয়ে আরও বহু কাজের অবকাশ আছে আর আমি সেটি করতে চাই। মানে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে গবেষণা করতে চাই।

আপনি বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে উচ্চতর একাডেমিক গবেষণা করেছেন। সে বিষয়ে জানতে চাই।

বাংলা একাডেমি থেকে বইটি প্রকাশের পর আমি বাংলা ব্যাকরণের বই পড়তে শুরু করি। কিন্তু কোনো বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের মধ্যেই আমার অজস্র প্রশ্নের উত্তর মিলছিল না। আমি যা জানতে চাই, তা নিয়ে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে বুঝে নিতে হচ্ছিল। তখন লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান অধ্যাপক ড. উইলিয়াম রাদিচির সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি বললেন, তুমি আমার অধীনে পিএইচডি ভর্তি হয়ে যাও। ১৯৯৯ সালে ‘সিলেক্টিভ বাংলা গ্রামেটিক্যাল স্টাকচার’ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করি। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করব। আমার মাথায় বাংলা ভাষা ছাড়া আর কিছু ছিল না। চার বছর পর পিএইচডি ডিগ্রি হলো।

লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে শিক্ষকতা শুরু করলেন কখন?

পিএইচডি গবেষণার মাঝে আমি সোয়াসে বাংলা ভাষা শেখাতাম। ২০০২ সাল থেকে লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের নিয়মিত অধ্যাপক হিসেবে কাজ করি। দশ বছর শিক্ষকতার পর কাজটি ছেড়ে দেই। তারপর আমার স্বামীর সঙ্গে ২০১২ সালে সিয়ারালিওনে চলে যাই। ওদের ভাষা নিয়েও একটি গবেষণা করি। সেখানে বাঙালিদের নিয়ে বাংলা আড্ডার ব্যবস্থা করেছিলাম। আমরা সপ্তাহে একদিন বাঙালিদের নিয়ে বসতাম, বাংলা ভাষায় কথা বলতাম। পশ্চিম আফ্রিকার দেশে বসেও আমি বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেছি।

বিভিন্ন দেশের গবেষকরা যেখানে বাংলা ভাষা, প্রাচীন ও বাচনিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন আপনি ব্যাকরণ ও অভিধান বেছে নিলেন কেন?

বিদেশি অনেকেই বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন। অন্য কোনো ভাষার ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করার জন্য একটা বিশেষ রকমের সাহস দরকার। তা ছাড়া সাহিত্য আমার কাছে একটা সাগরের মতো। সাহিত্য নিয়ে সারা জীবন আলোচনা করা সম্ভব। এই সাগরের মধ্যে আমরা ডুবে যাই। পায়ের তলায় কোনো মাটি পাই না। ভাষা আর ব্যাকরণ নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, নতুন কিছু ধরতে পারি, আমি যা বুঝতে পেরেছি, তা অন্যদের কাছে বুঝিয়ে বলতে পারি। আমার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, আমার বিদেশি ছাত্রদের জন্য কার্যকরী একটা বই লেখা, যাতে তারা ভালোভাবে বাংলা ভাষাটা শিখতে পারে। বাংলা শিখতে চাইলে যে পদ্ধতি বা নিয়মের প্রয়োজন হয়, তা আমি কোথাও খুঁজে পাইনি। তাই নিজের বিবেচনায় আমি প্রচুর উদাহরণ সংগ্রহ করেছি, ভাষা বিশ্লেষণ করেছি, আর কাজটাকে আপন করে নিয়েছি। এটাই একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।

বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান রচনার সময় আপনি কী কী সমস্যার মুখে পড়েছিলেন?

সমস্যার। যেমন ধরা যাক, ‘নয়’ আর ‘নেই’-এর পার্থক্য কী? কেন আমরা বলি, ‘আমি চিঠিগুলো পাচ্ছি’, আবার একই সঙ্গে বলি, ‘আমার ভয় পাচ্ছে’? কেন বলি, ‘এই কাজ করা দরকার’, কিন্তু ‘এই কাজ করার দরকার নেই’? আমি জানি, প্রতিটি ভাষা আর তার ব্যাকরণের মধ্যে একটা যুক্তি আছে। বাংলা ভাষার মধ্যে সেই যুক্তিটা আমি বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে চেষ্টা, ধৈর্য আর অনেক সময় লাগে। নিজের ধারণাগুলো পরীক্ষার মাধ্যমে সংশোধন করতে হয়; ঠিক করতে হয় নিজের ভুলগুলো। এভাবে ব্যাকরণের বেলায় যা অস্পষ্ট ছিল, আস্তে আস্তে সেটি স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সব সময় অবশ্যই সহজে উত্তর পাওয়া যায় না। তখন প্রশ্নগুলোকে ঘিরে একটা উপায় বানাতে হয়। সেসব বিশ্লেষণ করতে আমার খুব মজা লাগে।

আপনার নিজের লেখা বাংলা ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব কী?

আমার একটা সুবিধা এই যে আমি বাইরে থেকে এসেছি। ফলে সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার ইতিহাস কিংবা সাধু ভাষা—এসব নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে হয়নি। আধুনিক ভাষার মধ্যে কী আছে, আধুনিক বাংলা ভাষার গঠনটা কেমন—আমি শুধু সেটাই বুঝতে চেষ্টা করছি। আর যাঁরা বাংলা শিখতে চান, তাঁদের জন্য আমি একটা উপায় ঠিক করতে চেয়েছি। বাংলা ভাষাটা তো আমি নিজেই শিখেছি। ফলে বাংলা ভাষা শিখতে গেলে কী কী সমস্যা হয়, কী কী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—তা আমি জানি। এই প্রেক্ষাপটটিই হয়তো আমার লেখা বাংলা ব্যাকরণের একটা বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের ব্যাকরণ চর্চা নিয়ে আপনার অভিমত কী?

বাংলাদেশে ব্যাকরণ বইয়ে উদাহরণগুলো অনেক বছর পুরনো। বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের চিন্তাগুলো কেমন একটা ফানুসের ভিতরে আটকে আছে। তাদের গবেষণা ঐতিহাসিক। তারা বাংলা ভাষা বুঝানোর জন্য সংস্কৃত থেকে উদাহরণ দেন। আমি মনে করি, স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের মাথায় সংস্কৃত থাকে না। ভাষা তো জীবিত একটা জিনিস। ভাষার ভিতরে পরিবর্তন হতে থাকে। সেই পরিবর্তন থেকে ব্যাকরণের বর্ণনা ও বিশ্লেষণে নতুন বিবেচনা নিয়ে আসতে হয়। নইলে জীবিত ভাষা ও ব্যাকরণের মধ্যে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ে। এখানে স্কুলের ব্যাকরণ বইয়ে সাধারণত দুটো অংশ দেখেছি ব্যাকরণ আর রচনা। রচনা অংশগুলোতে প্রতি বছর নতুন বিষয় ঢুকে পড়ে। কিন্তু ব্যাকরণ অংশে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই নতুন উপায় বের করতে হবে। বাচ্চাদের মুখের ভাষা নিয়ে ব্যাকরণ আরম্ভ করতে হবে। তা হলে বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে।

বর্তমানে কোনো গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকারের সঙ্গে একটি যৌথ গবেষণা করছি। বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা রাউটলেজ প্রকাশিত একটি বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের কাজ করছি।

Advertisements

কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হারি

mata_hari_1মাহমুদ ফেরদৌস :১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর। ভোর বেলা। প্যারিসের সেইন্ট-ল্যজারে কারাগারের অভ্যন্তরের একটি সেল থেকে জাগিয়ে তোলা হলো এক বন্দীকে। হাতে দেওয়া হলো কাগজ, কলম, দোয়াত কালি আর খাম। বলা হলো, চাইলে দু’ খানা চিঠি লিখতে পারেন তিনি। নিজের কালো মোজা, উঁচু হিলের জুতাজোড়া, পশম আর মখমলের তৈরি পোশাক গুছিয়ে নিলেন তিনি। তারপর কাগজে হিজিবিজি লিখে জমা দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আমি প্রস্তুত।’

কিছুক্ষণ পরই ধূসর রঙের একটি সামরিক যান বের হলো কারাগার থেকে। ছুটলো প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক পুরোনো বন্দরে। গাড়ির ভেতর দু’ জন সেবিকা ও নিজের আইনজীবীর সঙ্গে বসে আছেন ৪১ বছর বয়সী ওই গোলন্দাজ নারী। পা অবদি লম্বা কোট তার পরনে। মাথায় টুপি।

গন্তব্যস্থলে তিনি যখন পৌঁছালেন তখন সময় সবে সকাল সাড়ে ৫টার চেয়ে একটু বেশি। তাকে দাঁড় করানো হলো ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ১২ ফরাসি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন নিজের বন্দুক হাতে নিয়ে। চোখ বাঁধার জন্য সাদা কাপড় দেওয়া হলো তাকে। কিন্তু তিনি নিতে চাইলেন না। ‘এটা কি পরতেই হবে?’ পাল্টা প্রশ্ন করলেন।

যখন তার দিকে বন্দুক তাক করে সৈন্যরা, তখনও তাদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়েছিলেন তিনি। তার এক হাত বেঁধে ফেলা হয়। অপর হাতে তিনি নিজের আইনজীবীর দিকে হাত নাড়েন। পরমুহূর্তেই সৈন্যদের রাইফেল গর্জে উঠে। পায়ে লাগে গুলি। হাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এক কর্মকর্তা এগিয়ে এসে রিভলবার বের করে তার মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

অথচ, এক দশক আগেও, এই নারীর পায়ের তলায় ছিল ইউরোপের বহু রাজধানী। তিনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য এক ‘রূপসী’। ভিনদেশি নগ্ন নাচের আবেদনে কাবু করে রেখেছিলেন কতশত মন্ত্রী, জেনারেল আর শিল্পপতিদের। ঘটনার দু’ বছর আগেও দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল তার। প্যারিসে এক প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটান তো, পরেরদিন হেগ শহরে আরেক প্রেমিকের সঙ্গে। রীতিমত আন্তর্জাতিক ‘সেক্স সিম্বল’ তিনি। নামেমাত্র পোশাক পরে নাচতেন। প্যারিসে তার নগ্ন নাচের আসর ছিল যেন তৎকালীন ইউরোপিয়ান অভিজাতদের ছোটখাটো সম্মেলন। মাতা হারি- এই এক নামে তাকে দুনিয়া চিনতো।

কিন্তু, এরপরই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পাল্টে গেল তার চেনাজানা জগত। তিনি অবশ্য ভেবেছিলেন আগের মতোই ইউরোপের ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে বরং তাকে মৃত্যুদ- পেতে হলো। তার অপরাধ? জার্মানির পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করা। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জার্মান প্রভুদের কাছে সরবরাহ করা। লুফে নিল পত্রপত্রিকাগুলো। তাকে দায়ী করা হলো হাজার হাজার মিত্রপক্ষীয় সৈন্যর মৃত্যুর কারণ হিসেবে।

কিন্তু আজ শত বছর পর ফরাসি সরকার যেসব নথিপত্র অবমুক্ত করেছে, তাতে এক ভিন্ন চিত্রই ফুটে উঠে। তার মৃত্যুর এত বছর ধরে তার সঙ্গে লেগে ছিল ডাবল এজেন্ট হওয়ার কলঙ্ক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ছিলেন স্রেফ একজন বলির পাঠা।

তার আসল নাম কিন্তু মাতা হারি নয়। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭৬ সালে। বাবা-মা নাম রাখেন মার্গারেথা জেল্লে। মাতা হারি নামটা কেন বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়েও আছে চমকপ্রদ তত্ব। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায়, এই নামের অর্থ ‘দিনের চোখ,’ অর্থাৎ সূর্য। আবার হারি নামে এক হিন্দু দেবতাও আছেন। তার আগে মাতা শব্দটিও লাগিয়ে থাকতে পারেন। দুই তত্বেরই ভিত্তি আছে। নিজেকে অনেক সময় তিনি জাভানিজ (ইন্দোনেশিয়ার একটি অঞ্চল) প্রিন্সেস বলে পরিচয় দিতেন। কখনও আবার ভারতের মন্দির নর্তকির মেয়ে হিসেবে। কিন্তু কখনই তিনি বলতেন না, তার জন্ম আসলে নেদারল্যান্ডে।

আর নেদারল্যান্ডে তার জন্মস্থান লিউওয়ার্ডেনের ফ্রাইজল্যান্ড মিউজিয়ামে তাকে নিয়ে শনিবার থেকে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে তার বিচারের অনেক নথিপত্র অবমুক্ত করা হয়। তার ব্যক্তিগত ও পারবারিক কয়েকটি চিঠিও প্রকাশ হয়। সবই আছে প্রদর্শনীতে। এসব নথিপত্র একসাথে মেলালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত এই গুপ্তচরের আরও বহু পরিচয় আছে।

ফ্রাইজল্যান্ড জাদুঘরের কিউরেটর হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“আমরা আসলে তার জীবনটা বুঝতে চেয়েছি। একজন বিশাল তারকা হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে। একজন শিশু হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে যিনি শুধু নর্তকিই ছিলেন না, বা গুপ্তচরই ছিলেন না। আমরা চাই তার পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে।”

তার জীবন ছিল প্রচ- ঘটনাবহুল, আর মর্মান্তিক। জন্ম হয়েছিল বেশ ধনী এক পরিবারে। কিন্তু তিনি যখন কিশোরী, অকস্মাৎ ধনসম্পদ হারিয়ে সংসারধর্ম ত্যাগ করেন তার পিতা। একলা মায়ের কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে সেই মা-ও মারা যান। অগত্যা, আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় হয় তার। ১৮ বছর বয়সে গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রুডলফ জন ম্যাকলিওডের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এই লোকের বয়স ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ। তার সঙ্গেই গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে এক সামরিক ঘাঁটিতে ৪ বছর ছিলেন তিনি। তখনই জাভানিজ ভাষায় তার হাতে খড়ি।

mata-hari-2তাদের দাম্পত্য জীবনকে ঝঞ্ঝাটময় বললে কম বলা হয়। প্রতিনিয়ত তিনি অকথ্য নির্যাতন সইতেন স্বামীর কাছ থেকে। নিজের ৩ বছর বয়সী ছেলেটাকে মারা যেতে দেখেন তিনি। সম্ভবত, গৃহকর্মীর দেওয়া বিষের কারণে। পরে এক মেয়ে হয় তার। ৪ বছর পর হল্যান্ডে ফিরলে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান মার্গারেথা (তার আসল নাম)। কিন্তু মেয়ের খরচ বহন করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে তিনি চলে যান প্যারিসে। মেয়েকে রেখে যান স্বামীর কাছে। নিজের এই মেয়েকে তিনি সবসময়ই মিস করতেন।

পরে প্যারিস থেকে নিজের প্রাক্তন স্বামীর এক কাজিনকে লেখা চিঠিতে মার্গারেথা জানান যে, সেখানে তিনি এক থিয়েটারে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি তাকে নামতে হয়েছে পতিতাবৃত্তিতেও। তিনি লিখেন, ‘ভেবো না যে, আমি আসলেই অনেক খারাপ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে আমি বাধ্য হয়েছি এ পথে নাম লেখাতে।’ তিনি নাকি এ-ও বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, যেসব নারী সংসার ছেড়ে পালান তারা পরবর্তী ঠিকানা হিসেবে প্যারিসকে খুঁজে পান।’ নিজের এই নর্তকি আর অভিনয় জীবনেই তিনি বেছে নেন ‘মাতা হারি’ নাম, যেটি পরে তার আসল নামকেও ছাপিয়ে যায়। এই জীবনেই তিনি অনেক অর্থ আর যশের মালিক হন। ভাবা হয়, জীবনের কোনো এক সময়ে তিনি মিলিয়নিয়ারও ছিলেন।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“তার বিরুদ্ধে যেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ, সেটি না থাকলেও, আজও  তাকে মানুষ স্মরণ করতো। গত শতাব্দীর প্রথমভাগে ইউরোপ জুড়ে তার যেই পরিচিতি ছিল, তাতেই তিনি অমর হয়ে থাকতেন। স্ট্রিপিং (নগ্ন নাচ)-কে তিনিই কমবেশি নাচের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কাছে তার ছবির অ্যালবাম আছে। তার ছবি সম্বলিত সংবাদপত্রের স্তূপ এখনও আছে। তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ইউরোপের সেলেব্রেটি ছিলেন।”

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনকেন্দ্রীক আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে তার গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়ই। অথচ, আজ এত বছর পর জানা যাচ্ছে যে, তিনি জার্মানদের কাছে তেমন কোনো তথ্যও দেননি। যেমন, হয়তো তিনি বলতেন যে, এই বসন্তে হামলা চালাতে পারে মিত্রবাহিনী। কিন্তু এই তথ্য সবারই জানা ছিল।

অথচ, হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে। মূলত, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার পরিচিতি প্রাপ্তি, জার্মানি ও ফ্রান্স – উভয় পক্ষের সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, আর যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপজুড়ে ঘোরাঘুরি- এ সবই তার বিপক্ষে কাজ করেছে। আর তার জীবনযাপনের ধরণ নিশ্চিতভাবেই তার পক্ষে যায়নি।

এতদিন ধরে অনেক ইতিহাসবিদই তাকে নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপক্ষে গিয়ে তার পক্ষালম্বন করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে আসলে বলি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধের পর নিজেদের অজস্র ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে একজন জুতসই গুপ্তচর দরকার ছিল ফরাসিদের, যাকে কিনা শূলে চড়ানো যাবে। আর নষ্টা চরিত্রের মাতা হারি এক্ষেত্রে ছিলেন পারফেক্ট বলি।

ফরাসি সেনারা এই ভয়েও ছিলেন যে, মাতা হারি ফরাসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার মেলামেশার কথাও ফাঁস করে দিতে পারেন। এদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ জেনারেলও ছিলেন। এ কারণেই তাকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।

আবার এ-ও সত্য যে, ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে অনেক ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়, ফরাসি গোয়েন্দারা আগেই বৃটিশদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তাকে জার্মান গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে। হাতেনাতে ধরতেই তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতেও এটাও জানা যায় যে, বৃটিশরা যেসব কারণে তাকে সন্দেহ করেছিল, তার কোনো যুক্তিযুক্ততা ছিল না। বৃটিশ গোয়েন্দারা তাকে লন্ডনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বলা হয়, প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও,তিনি একজন সাহসী ধাঁচের মহিলা, যাকে সন্দেহ থেকে ফেলা যায় না।

স্পেনের মাদ্রিদে জার্মান সামরিক অ্যাটাশে আর্নল্ড ভন কালের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এই আর্নল্ডই নিজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাতা হারিকে নিজেদের গুপ্তচর হিসেবে ইঙ্গিত দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান। এই টেলিগ্রাম ফরাসি কর্মকর্তাদের হাতে যায়। এটিই ছিল মাতা হারির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদই একে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন।

তাদের যুক্তি, ফরাসিরা যে জার্মান টেলিগ্রামে আড়ি পাততে পারেন, সেটা জার্মানরা অনেক আগ থেকেই জানতো। তাহলে, এমন সংবেদনশীল তথ্য টেলিগ্রামে কেন পাঠিয়েছিলেন আর্নল্ড ভ্যান? কারণ, তিনি চেয়েছিলেন যে, এই চিঠি ফরাসিদের হাতে পড়–ক। আর তারা এই চিঠির ভিত্তিতে নিজেদের গুপ্তচরকেই ফাঁসি দিয়ে দিক। হয়েছেও তাই।

আবার অনেকে বলেন, যেই টেলিগ্রামের কথা বলা হয়, সেটির অনুদিত অংশই প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে। সেটির জার্মান ভাষায় লেখা মূল কপি কোথায়? কেউ কি তবে, এসব জালিয়াতি করে বানিয়েছে মাতা হারিকে ফাঁসানোর জন্য?

তবে মামলার কৌঁসুলির কিছু নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, মাতা হারি নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, ১৯১৫ সালে যুদ্ধ চলাকালে হেগ শহরে জার্মানরা তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তখন তিনি যুদ্ধে আটকা পড়ে ফ্রান্সে ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছিলেন। তখনই আর্মস্টারডামে জার্মান এক কূটনীতিক ফ্রান্সে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে জার্মানির পক্ষে গুপ্তচরগিরি করার প্রস্তাব দেন। উপায় না পেয়ে তিনি রাজি হন। তিনি যুক্তি দেখান যে, মিত্রবাহিনীর প্রতিই তার আনুগত্য ছিল সবসময়। ফরাসি গোয়েন্দারা যখনই তার সাহায্য চেয়েছে, তখনই তিনি এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার এই যুক্তি ধোপে টেকেনি।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলছিলেন,“উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ছিল মাতা হারির। তাদের সঙ্গে ঘুরতেন, নাচতেন। এমনকি এক সঙ্গে থাকতেনও। অথচ, যুদ্ধের সময় যখন তিনি বিপদে পড়েন, ওই কর্মকর্তারাই তার বিরুদ্ধে চলে যান। এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে নিশ্চয়ই তার কষ্ট হয়েছিল।”

মৃত্যুদ- কার্যকরের পর কেউই মাতা হারির মৃতদেহ দাবি করতে আসেনি। তাই প্যারিসের এক মেডিকেল কলেজে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে এটি শিক্ষার্থীদের ব্যবচ্ছেদ শেখাতে ব্যবহৃত হতো। তার মাথার কঙ্কাল অবশ্য অ্যানাটমি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ২০ বছর আগে জাদুঘরে জিনিসপত্রের গণনা চলাকালে দেখা যায়, কঙ্কালটি নেই। ধারণা করা হয়, কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

(ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।)

বিমান দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক নারী

9_r7_c4

এবার অন্তপুরের বাইরে সৌদী মহিলারা !

8_r2_c48_r2_c1

আবদুল করিম যখন রানির বন্ধু

victoria & abdul karim 1

রাসেল মাহ্‌মুদ :ভারতীয় এক তরুণ বাবুর্চির সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার। নামমাত্র নয়, বেশ পাকাপোক্ত বন্ধুত্ব। দুজনের একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, একে অন্যের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করাসহ কত কিছু!‘চাকরের’ সঙ্গে রানির এ সখ্য কি আর মেনে নেয় রানির লোকেরা? কীভাবে কী হলো যে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে যাওয়া এক বাবুর্চি হঠাৎ রানির প্রিয়পাত্রে পরিণত হলো?

ওষুধ খেতে না চাওয়া শিশুকে যেভাবে রসগোল্লায় ভরে ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়, হলিউড ছবি ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল সে রকম একটি প্রচেষ্টা। ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়া ও তাঁর ভারতীয় পাচক আবদুলের মিষ্টি বন্ধুত্বের ভেতরে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে ধবলধোলাই করা হয়েছে। পূর্বপুরুষেরা দুই শ বছর ভারত শাসন করেছিল, উত্তরপুরুষ চলচ্চিত্রকারেরা সেই সময়কে তির্যকভাবে তুলে এনেছেন সিনেমায় এবং পরিচালক স্টিফেন ফ্রেয়ারস এখানে আর ব্রিটিশ থাকতে পারেননি। বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠেছেন।

সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল ছবির গল্প। রানি ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণজয়ন্তীতে ইংল্যান্ডে আনা হয়েছিল ভারতীয় বাবুর্চি আবদুলকে। রানির প্রতি যথাযথ সম্মান ও ভক্তির অভাব ছিল না আবদুলের। রানির হেঁটে যাওয়া পথকে কুর্নিশ করা, তাঁর পায়ে চুমু খাওয়া থেকে শুরু করে প্রায় সব আদব মেনে চলছিল আবদুল। অন্যদিকে আবদুলের প্রতি রানির আচরণ ছিল বিদেশি অতিথির মতো, যা ঠিক তাঁর সভাসদদের পছন্দ হচ্ছিল না। বর্ণবাদী আচরণের জন্য রানি বরং তাঁদের ভর্ৎসনাই করতে শুরু করেন।

এ তো গেল ছবির গল্প। রানি ভিক্টোরিয়ার সময়েই কিন্তু সব থেকে বেশি অত্যাচারিত হয়েছিল ভারত। ভারতের রাজনীতিবিদ শশী থারুরের ইনগ্লোরিয়াস এমপায়ার: হোয়াট দ্য ব্রিটিশ ডিড টু ইন্ডিয়া বইয়ে সেসব লেখা আছে। সে সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান নিচে নামিয়ে আনার পেছনেও ছিল ব্রিটিশদের কারসাজি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের শোষণে দারিদ্র্যসীমার এত নিচে নেমে গিয়েছিল ততকালীন ভারত, যার ফল ১৮৭৬-৭৮ এবং ১৮৯৯-১৯০০-এর দুর্ভিক্ষ এবং প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু। এ ছাড়া জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে ব্রিটিশ সেনারা হত্যা করেছিল প্রায় দুই হাজার লোককে।

ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল ছবিতে ঔপনিবেশিক দেশগুলোর ওপরে ব্রিটিশদের অমানবিকতাকে রসময় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। বলা যায় ভিক্টোরিয়া ও আবদুল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের অত্যাচারের একটি রঙিন দলিল। পূর্বপুরুষদের অত্যাচারের এই কাহিনি চলচ্চিত্রে দেখানো পরিচালকের জন্য একটু বিব্রতকর কি না কে জানে। কিন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায় যে তিনি এড়াতে পারেননি, তার প্রমাণ এই সিনেমা। এ ছবি দেখে কি অনুতপ্ত হবেন এখনকার অত্যাচারীরা? বার্মিজ চলচ্চিত্রকারেরা কি একসময় নির্মাণ করবেন রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের কাহিনি নিয়ে সিনেমা?

কাল মুক্তি পাচ্ছে হলিউড চলচ্চিত্র ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল। রানি চরিত্রে অভিনয় করা জুডি ডেঞ্চ বিভিন্ন সিনেমায় অনেকবার রানির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। জেমস বন্ড সিরিজের বেশ কিছু ছবিতে দেখা গেছে তাঁকে। আর আবদুল করিম চরিত্রের ভারতীয় অভিনেতা আলী ফজল আগে বেশ কিছু হিন্দি ভাষার ছবিতে কাজ করেছেন। হলিউডেও টুকটাক কাজ করেছেন। রানির বন্ধু চরিত্রেও দারুণ করেছেন তিনি।

ইনডিপেনডেন্ট অবলম্বনে

রানি ভিক্টোরিয়া উর্দু শেখেন যে কারণে

abdul karim & queen victoria

১৮৩৭ এর জুনে রাজা চতুর্থ উইলিয়াম মারা যাওয়ার পর আকস্মিকভাবে ব্রিটেনের রানির দায়িত্ব লাভ করেন ভিক্টোরিয়া। আর ১৮৭৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রয়েল টাইটেল অ্যাক্ট পাসের মাধ্যমে ভারতের সম্রাজ্ঞী হন রানি ভিক্টোরিয়া। তবে ভারতের সম্রাজ্ঞী হওয়ার পাশাপাশি ভারতের ইতিহাসে রানি ভিক্টোরিয়া অন্য এক কারণে বেশ আলোচিত। আর সেটা হলো অর্ধেক পৃথিবীর সম্রাজ্ঞী হয়েও তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক ভারতীয় ভৃত্যের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

১৮৮৩ সালে রানির স্কটিশ ভৃত্য জন ব্রাউনের মৃত্যুর পর অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন রানি ভিক্টোরিয়া। রানির এই নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য ভারত থেকে ভৃত্য আনার ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। ১৮৮৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনামলের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ বেশ ঘটা করে উদ্যাপন করতে ভারতীয় খাবার তৈরির জন্যই মূলত ভারতীয় ভৃত্য আনা হয়েছিল। সেই চাহিদা পত্র পেয়ে আগ্রার জেল সুপার তার বিশ্বস্ত ভৃত্য আব্দুল করিম এবং মোহাম্মদ বক্সকে ইংল্যান্ডে পাঠান।

চাকরিতে যোগদানের এক বছরের মধ্যেই রানীর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন আব্দুল করিম। রানির দরবারের বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত তিনি। যার কারণে শুধু খাসভৃত্যই নয়, রানিকে উর্দু ভাষা শেখাতে থাকে করিম। তবে আব্দুল করিমের কাছে উর্দু ভাষার শেখার পাশাপাশি আব্দুল করিমের সাথে গভীর প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েন রানি। উপহার স্বরূপ আব্দুল করিমকে মুন্সী এবং ভারতীয় বিষয়ের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন রানি। আব্দুলের প্রতি রানির এই অন্ধ প্রেমের কারণে আব্দুলকে তিনি প্রচুর অর্থ, জমিজমা এমনটি নাইট উপাধিও দিতে চেয়েছিলেন। তবে রয়্যাল কোর্টের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত আব্দুলকে নাইট উপাধি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন রানি। কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। তাই রানির মৃত্যুর পর শেষবার কফিনের মুখ আটকানোর আগে রানির মুখ দেখেন আব্দুল করিমই।

নাসায় প্রথম সৌদি নারী

মিশাল আশেমিমরি

প্রথম সৌদি নারী হিসেবে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায় কাজের সুযোগ পেয়েছেন মিশাল আশেমিমরি। এ জন্য তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড। এক টুইট বার্তায় বলা হয় তিনি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণীয় মডেল।

নাসায় কাজের সুযোগ পাওয়ার পর মিশাল গণমাধ্যমকে জানান, ছয় বছর বয়সে মহাকাশের স্বপ্ন আমার চোখে বেঁধে যায়। জানতাম না মহাকাশ কী। কিন্তু ওনাইজা মরুভূমির রাতের আকাশে জ্বলা নক্ষত্রগুলো আমার চোখে স্বপ্ন এঁকে দেয়। আর সে স্বপ্ন এখন বাস্তব।

মিশাল আশহেমিমরি পেশায় মাহাকাশযান ইঞ্জিনিয়ার। এর আগে তিনি মিয়ামি ভিত্তিক মিশাল অ্যারো স্পেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মিশাল এরআগে রেইথিউন মিসাইল সিস্টেমের অ্যারোডাইনামিক্স ডিপার্টমেন্টের হয়ে কাজ করেছেন। ২২টি রকেট প্রোগ্রামে অবদানও রেখেছেন তিনি। তার পেশাদারি অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার ক্ষেত্রগুলো হলো- অ্যারোডায়নামিক্স, বায়ু টানেল পরীক্ষা, গাড়ির ডিজাইন,ভবিষ্যদ্বাণী সিমুলেশন ও বিশ্লেষণ এবং রকেট স্টেজ-সেপারেশন বিশ্লেষণ। এ ছাড়া কম্পিউটেশনাল টুল ডেভলপমেন্টের কাজেও তার গভীর আগ্রহ রয়েছে।

আশেমিমরি ২০০৬ সালে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফলিত গণিতশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

বৌদ্ধ তরুণী ও মুসলিম যুবকের বিয়ে, তারপর…

নতুন সমস্যায় উপত্যকা। লাদাখে এক বৌদ্ধধর্মাবলম্বী যুবতীর সঙ্গে মুসলিম যুবকের বিয়ে নিয়ে ক্রমাগত চড়ছে উত্তেজনার পারদ। এই বিবাহ নিয়ে ভারতের লাদাখের বৌদ্ধ ও মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে উত্তেজনা এতটাই বেড়েছে যে লাদাখ বুদ্ধিস্ট অ্যাসোসিয়েশন দ্বারস্থ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির।

লাদাখের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দাবি, তাদের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে বিবাহিত ওই বৌদ্ধ মেয়েটিকে। এই বিয়ে তারা মানতে রাজি নন। এবিষয়ে সমাধানের রাস্তা খুঁজে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির কাছেও চিঠি পাঠায় ওই বৌদ্ধ সংগঠন। ২০১৫ সালে হওয়া এই বিয়েতে ওই বৌদ্ধ যুবতী ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে ফের একবার অশান্ত হয়ে উঠছে লাদাখ।

তবে অনড় ওই বিবাহিতা। তার দাবি, তিনি নিজের ইচ্ছায় এই বিয়ে করেছেন। এই ধর্মও গ্রহণ করেছেন স্বেচ্ছায়। ফলে যুক্তিতে পিছিয়ে যাচ্ছেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। তাই হুমকি-হুঁশিয়ারিতেই আপাতত থেমে আছে গোটা ঘটনা। যদিও, পরিস্থিতি ছাই চাপা আগুনের মতো। স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তরফে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, ওই মহিলা যদি বিয়ে নাকচ করে চলে না আসেন, তাহলে চরম পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে তাকে।

লাদাখ বৌদ্ধ সংগঠন ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মেহেবুবা মুফতির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে তারা দাবি জানিয়েছে, এখনই বাতিল করে দেওয়া হোক তিরিশ বছর বয়সী ওই মহিলা শিফা ও ৩২ বছরের কারগিলের বাসিন্দা মোর্তাজা আগার বিয়ে। শিফার আগে নাম ছিল স্ট্যানজিন স্যালডন। ২০১৫ সালে বিয়ের পর ধর্ম পরিবর্তন করেন তিনি। নতুন নাম হয় শিফা।

ওই সংগঠনের অভিযোগ, এলাকার মুসলিম ছেলেরা বৌদ্ধ ধর্মের তরুণীদের প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে ধর্ম পরিবর্তন করে বিয়ে করছে। এইধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ওই বৌদ্ধ সংগঠন। এদিকে এই সংগঠনের অভিযোগ প্রসঙ্গে শিফার দাবি, তাকে কেউ ধর্ম পরিবর্তন করতে বাধ্য করেননি। বরং তিনি ভালবেসে, স্বেচ্ছায় নিজের ধর্ম পরিবর্তন করেছেন। তাঁর আবেদন ধর্মের চোখ দিয়ে নয়, মন থেকে ভালবাসতে হবে প্রত্যেককে। তাঁর আরও দাবি,ধর্ম বেছে নেওয়ার অধিকার মানুষের নিজের হাতে থাকা উচিত। তাতে অন্তত এই পৃথিবী থেকে জাত-পাত আর ধর্মের নামে হানাহানি বন্ধ হবে বলে তিনি মনে করেন।

এই দম্পতির পাশে দাঁড়িয়েছে আদালত। মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন নাইমা মাহজুরের বিবৃতি অনুযায়ী ২০১৫ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর শিফা ২০১৬ সালে বেঙ্গালুরুতে বিয়ে করে। জম্মু- কাশ্মীর হাইকোর্টের কাছে সম্মতি নিয়ে আগাকে তিনি বিয়ে করেছেন বলে দাবি করেছেন শিফা। এবিষয়ে তার বিবৃতিও রেকর্ড আছে। আদালত এই দম্পতিকে বিরক্ত না করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে ধর্মের হাত এত সহজে হয়তো শান্তি দেবে না তাদের। সেই আশঙ্কাই করছেন এই দম্পতি।