Archive

Archive for the ‘নারী’ Category

নারী-পুরুষের সম্পর্কে চিড় ধরলে …

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

মানুষ আমি, আমার কেন পাখির মতো মন!

ফারজানা হুসাইন

extra-marital-4. গত সপ্তাহে কাজের ফাঁকে আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে কফি খাচ্ছি। হঠাৎ করে সে বলে উঠলো, আচ্ছা তোমার পার্টনার যদি তোমার সঙ্গে চিট করে তুমি কি এরপর আর তার সঙ্গে থাকবে?

আমি মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম, নাহ!

সে মাথা নাড়িয়ে বিষাদ বদনে বললো, এতই কি সহজ সিদ্ধান্ত নেওয়া? এত সহজে অনেকদিনের একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কি যায়?

না, একদমই সহজ নয়, তবে সামটাইস ইউ হ্যাভ টু বি ক্রুয়েল টু বি কাইন্ড টু ইউরসেলফ।

চিট করা বা সঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করা বলতে সোজাসুজিভাবে আমরা অন্য কারও সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বুঝি, আমাদের সনাতন সংস্কৃতিতে হয়তো অন্য কোনও নারী বা পুরুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়াও বোঝায়। আমার দৃষ্টিতে শঠতা মানে সততার অভাব, তা সে যে ধরনের অসততাই হোক। যে বিষয় বা বিষয়গুলো দু’জনের সম্পর্কের ভিত্তি তার প্রতি প্রবঞ্চনাকেই আমি মোটামুটিভাবে শঠতা বলব।

সঙ্গী যখন প্রতারণা করে, সেটা জেনে যাওয়ার পর স্বাভাবিক মানুষ যা করে তা হলো প্রশ্ন, হাজারটা প্রশ্ন, একের পর এক প্রশ্ন। কেন করলে এ রকম? কবে করেছ, কোথায় করেছ, কতবার করেছ, কার কার সঙ্গে করেছ—ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনও উত্তরগুলো পাওয়া যায়, কখনও যায় না। তবে এই প্রশ্নগুলো করার পেছনের কারণ উত্তর খুঁজে পাওয়া নয় মোটেই। বরং ঘটনার আকস্মিকতায় তীব্র ঘৃণা আর অপমানকে উগরে দেওয়া মাত্র।

এরপর শুরু হয় নিজেকে প্রশ্ন করা। আমার কোথায় খামতি ছিল যে, সে এমন করলো, এতদিনের সম্পর্কের কথা একবারও সে ভাবলো না? এত মায়াভালোবাসা তার কাছে তুচ্ছ?

এত এত প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে যায় হাসি, খাওয়ার ইচ্ছে, বিছানায় এপাশওপাশ করাই কেবল সার হয়—ঘুম সে তো কবেই গেছে দেশান্তরে। বই খোলা থাকে সামনে কিন্তু পাতা উল্টানো হয়ে ওঠে না, গরম চায়ের মগ ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়—ফ্যাকাশে স্তর জমে মগের ওপরে। খোলা টিভির চরিত্রগুলো নেচেগেয়ে যায় আপন মনে—কে তার খবর রাখে?

এক কথায় জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। সব শাস্তি আমরা নিজেকেই দেই, অথচ অপরাধটা আমরা করিনি একদমই। আমরা ভুলে যাই এ সময়ের প্রথম এবং প্রধান কাজ নিজেকে একেবারেই কষ্ট না দেওয়া বরং প্রিয় মানুষ শঠতা করলে ওই মুহূর্তে নিজেকে ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি দরকার। ভালোবাসার মানুষটা যে ভালোবাসতে ভুলে গেছে!

. একগামিতা প্রাণীর সহজাত বৈশিষ্ট্য নয়, জীবজগতে একগামী প্রাণীর দেখা মেলা ভার। আমাদের গুহাবাসী পূর্বপুরুষেরা বহুগামী ছিল। গোত্রসমাজ গড়ে ওঠার কালে ধর্মের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় একটি সুশৃঙ্খল সমাজ কাঠামো গড়ে দেওয়া, ভালোমন্দের সীমানা প্রাচীর গড়া। সেই মহৎ নির্মাতার ভূমিকায় ধর্ম সভ্য সমাজের ভিত্তি হিসেবে একগামিতার কথা শোনায়। আব্রাহামিক তিন ধর্মের মতো বাকি প্রায় সব বহুল প্রচলিত ধর্মই নারীর ওপর একগামিতার বোঝা চাপিয়েছে, অথচ পুরুষ পেয়েছে বৈবাহিক সূত্রে বহুগামিতার স্বীকৃতি।

ইসলাম সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করার অনুমোদন দেয়। রাধাকেবল কৃষ্ণের প্রেয়সী, হাজারখানেক স্ত্রী তার। ওদিকে মহাভারতের দ্রৌপদীর পাঁচস্বামীর কারণ বেচারির একাধিক পতিঈপ্সা নয় বরং ভাইদের সঙ্গে সবকিছু ভাগ করে নেওয়ার অর্জুনের প্রতিজ্ঞা।

মজার বিষয় হলো, বেশির ভাগ পুরুষই তার নারী সঙ্গীকে অন্য কারও সঙ্গে প্রেম করাকে হয়ত ক্ষমা করতে পারে যদি না সেই মেয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। নারীর শারীরিক শুচিতা (!) পুরুষের আজীবনের আরাধ্য বস্তু। সীতার অগ্নিপরীক্ষা আর আয়েশার সতীত্বের প্রমাণের কথা পাওয়া যায় ধর্মগ্রন্থে। অথচ, বেশিরভাগ নারী আবার পুরুষের অন্য নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করাকে পুরুষ মানুষের শরীরের চাহিদা একটু বেশিই হয় বলে ধরে নেয় কিন্তু অন্য কোনও নারীর সঙ্গে তার পছন্দের পুরুষের অশারীরিক প্রেমকে মানতে পারে না একদমই। সুতরাং শরীর মনের সংঘাত নারী পুরুষ ভেদে ভিন্নতর।

সেই আদ্দিকালের শুধু নারীপুরুষের সম্পর্ক কেবল আর নেই আজ, পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রগতিপন্থী আমরা ও সচেতনভাবেই স্বীকার করে নিচ্ছি সমলিঙ্গের সম্পর্কগুলোকে। লিঙ্গ পরিচয় আর অভিযোজন এক বিস্ময় যেন আজ।

কথায়কথায় আমার কৈশোরের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমাদেরই সমবয়সী দু’জন কিশোরকিশোরী প্রেমে পড়ল স্কুলের শেষ ক্লাসেই। দু’জনই ভিন্নভিন্ন আবাসিক এক স্কুলকলেজের স্টুডেন্ট হওয়াতে প্রেম চলল পত্রালাপে। ছুটিতে বাড়ি ফিরলে দুজন কারও তোয়াক্কা না করেই শহরে রিকশা করে ঘুরে বেড়াতো, প্রেম করতো। তখন ছোট্ট মফস্বল শহরে এই লোক দেখানো প্রেম খুব ভালো চোখে দেখা হয়নি। মূল কাণ্ড ঘটলো কলেজের শেষ দিকে। মেয়েটিকে তার কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো সেই আবাসিক কলেজের আরেকটি মেয়ের সঙ্গে সমপ্রেমের ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়ার জন্য। গল্পের ডালপালা ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগেনি একদমই। স্বভাবতই বন্ধুমহলে বেশ কানাঘুষো চললো। শুনেছি পরের ছুটিতে ছেলেটি বাড়ি ফিরলে মেয়েটিকে হাতেকলমে পরীক্ষা দিতে হয়েছে তার বিষমকামিতার। হোক কিশোর, তবু সে প্রেমিক তো! ষোলসতেরোর দুই কিশোরকিশোরীর প্রগলভাময় প্রেম আর প্রমাণের নিষ্ঠুরতার সেই ঘটনা মনে পড়লে এখনও বিবমিষা জাগে। সেই ঘটনার বেশ কিছু মাস পর্যন্তও ছেলেটি আর মেয়েটির মধ্যে যোগাযোগ ছিল।

একটি বিষমকামী সম্পর্কে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে হয়ত মোটামুটি মেনে নেওয়া হয়। আর যাই হোক মেয়েটি অন্য কোনও ছেলের সঙ্গে তো আর সম্পর্ক করেনি; তাই প্রেমিকের চোখে প্রেমিকার সতীত্ব অটুট থাকে।

যাই হোক, গল্পের শুরুতে ফিরে আসি। যারা মনে করে হৃদয়ের ভাঙন কেবল আমাদেরই হয়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ফ্রিডম অব সেক্সস নয়, কেবল ফ্রি সেক্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জন্য বলি—শুরুর গল্পের আমার এই সহকর্মী গত তিন সপ্তাহজুড়ে ভয়াবহ মনোকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ঠিক বিষমকামী আমাদেরই মতোই। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—এই ভদ্রলোক একটি সমকামী ও সমপ্রেমী সম্পর্কে আছেন।

হায় হৃদয়ের ক্ষরণ! নারীপুরুষসমকামীসমপ্রেমী কাউকেই সে ছাড় দেয় না!

লেখক: আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ২২ ডিসেম্বর ২০১৬

বিয়ের বয়স নিয়ে সরকারের শুভংকরের ফাঁকিবাজি !

ডিসেম্বর 21, 2016 মন্তব্য দিন

child-marriage-3-art. তৌফিক জোয়ার্দার : ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে কন্যাশিশু সন্মেলনে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৯৭১ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ২২৩, যা বর্তমানে মাত্র ৩৭.এ নেমে এসেছে। শুধু শিশুমৃত্যুই নয়, বাংলাদেশ প্রায় সবগুলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয়েছ এবং এক্ষেত্রে বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এসব অর্জনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু এতসব অর্জনের পরও একটি বিষয়ে বাংলাদেশ আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। এটি হল, মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাড়ানো।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) রিপোর্ট, ২০১৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স হল ১৬.৬ বছর। শুধু এই একটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ায় বিভিন্ন সামাজিক সূচকের পরিমাপকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, উন্নয়নকর্মী ও গবেষকদের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলেছিল। একজন সচেতন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে এটা খুবই স্বাভাবিক।

এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে সরকার হঠাৎ করেই সব উন্নয়ন প্রপঞ্চের বিপরীত স্রোতে নৌকা ভাসাল। ঘোষণা করা হল, বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের লিগ্যাল বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা হবে। উন্নয়ন সেক্টরে কাজ করা একজন গবেষক হিসেবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অন্য অনেকের মতো আমিও চিন্তাভাবনা না করে পারিনি।

এ ঘোষণার পেছনে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য তারাই ভালো বলতে পারবে, তবে আমার ধারণা হচ্ছেকেউ হয়তো সরকারকে বুঝিয়েছেন, বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিলে বাল্যবিবাহিত মেয়েদের সংখ্যাও পরিসংখ্যানে কম দেখাবে। তখন কৃত্রিমভাবে হলেও বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ হ্রাসে সরকারের আপাত ব্যর্থতা আর আলাদাভাবে চোখে পড়বে না।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বিয়ের বয়স কম বলে এত যে সমালোচনা এবং সে সমালোচনা ধামাচাপা দিতে গিয়ে এতসব আয়োজন, বিয়ের সে বয়সটিই সঠিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছে কিনা? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এশিয়ান পপুলেশন স্টাডিজ নামক জার্নালে প্রখ্যাত গবেষক পিটার কে স্টিটফিল্ড, নাহিদ কামাল, কারার জুনায়েদ আহসান এবং কামরুন নাহার এমনটিই দাবি করেছেন।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে করা জরিপের সঙ্গে বাংলাদেশ উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) স্বাস্থ্য ও জনমিতিক অতন্দ্র তত্ত্বাবধান (ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভেইলেন্স) উপাত্তের তুলনা করে তারা দেখিয়েছেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের প্রায় দুইতৃতীয়াংশই বিয়ের সঠিক বয়স উল্লেখ করেননি। ৫৬% নারী বিয়ের বয়স কমিয়ে বলেছেন এবং ৭% বলেছেন বাড়িয়ে।

বিবাহিত নারীদের মধ্যে করা জরিপের ফল অনুযায়ী, তাদের উল্লেখ করা প্রথম বিয়ের বয়সের গড় পাওয়া গেছে ১৬.৮ বছর, যা বিডিএইচএস রিপোর্ট, ২০১৪তে উল্লিখিত ১৬.৬ বছরের খুবই কাছাকাছি। যেহেতু আইসিডিডিআরবি তাদের সার্ভেইলেন্স ব্যবস্থার অন্তর্গত প্রত্যেক মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও স্থানান্তরের তথ্য সেই ১৯৬৬ সাল থেকে সংরক্ষণ করে আসছে, তাই তাদের এলাকায় জরিপকৃত ১৯৬৬ বিবাহিত নারীর প্রকৃত বয়সও তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের প্রকৃত বয়স বের করে জরিপে উল্লিখিত বয়সের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, তাদের বিয়ের প্রকৃত গড় বয়স মোটেও ১৬.৮ বছর নয়, বরং ১৮.৬ বছর।

এমন একটি চমকপ্রদ ফলাফল গবেষকদের স্বভাবতই অত্যন্ত কৌতূহলী করে তোলে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারলেন, যেসব নারীর প্রকৃত বিয়ের বয়স যত বেশি, বিয়ের বয়স ভুল বলার বা কমিয়ে বলার প্রবণতাও তাদের তত বেশি। তারা আরও দেখলেন, যেসব নারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং যারা অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বলবিয়ের বয়স ভুল বলার প্রবণতাও তাদের বেশি। সবকিছু বিচারবিশ্লেষণ করে তারা তাদের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেনআমাদের সমাজে এখনও যৌতুকের প্রকোপ ব্যাপকভাবে রয়েছে, কাজেই যেসব মেয়ের বয়স যত বেশি, যৌতুকের পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই যৌতুক দিতে হয়েছেএমন নারীরা তাদের প্রকৃত বিয়ের বয়স কমিয়ে বলে থাকতে পারেন, যাতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কোনোভাবে জরিপ থেকে তার প্রকৃত বয়স জেনে বেশি বয়সের জন্য অধিক যৌতুকের জন্য চাপ দিতে না পারে (যদিও গবেষণার উপাত্ত গোপন রাখা হয়, তবে গ্রামের নারীরা এ বিষয়ে সম্ভবত নিশ্চিত হতে পারেনি)

গবেষণার প্রসঙ্গ এ কারণে উত্থাপন করলাম, যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার উপলব্ধি করতে পারেবিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিমভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে লিগ্যাল বয়সের নিচে বিয়ে হওয়া মেয়েদের সংখ্যা যে বাংলাদেশে কম, তা প্রমাণের চেয়ে কার্যকর উপায়ে এ লক্ষ্যটি অর্জিত হতে পারে।

প্রথমত, বর্তমানে সরকারের গৃহীত নানা সামাজিক পদক্ষেপ প্রকৃতই কাজ করছে, ফলে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাস্তবিকপক্ষেই অনেক বেড়েছে (১৯৯৪ সালের বিডিএইচএস রিপোর্ট অনুযায়ী ১৪.১ বছর)। কিন্তু নানা জরিপে যে কারণে এ উন্নয়ন প্রতিফলিত হতে পারছে না, তা অ্যাড্রেস করা বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দেয়ার থেকেও অধিক কার্যকর ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মান নিয়ন্ত্রণ করা। যে কোনো নাগরিকের প্রকৃত বয়স নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে জন্ম নিবন্ধন সনদ।

দ্বিতীয়ত, নারীরা তাদের বয়স কমিয়ে বলার তাগিদ অনুভব করছেকারণ অধিক বয়সে বিয়ের ব্যাপারে সমাজে এক ধরনের ‘স্টিগমা’ বিরাজ করছে। এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে বিয়ের বয়স ও যৌতুক সংক্রান্ত সামাজিক মূল্যবোধ। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটলে দেশের নারীরা আর বয়স লুকানোর প্রয়োজন অনুভব করবে না।

সরকার সম্প্রতি ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ প্রণয়ন করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এ আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি এবং বাবামায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সাধারণভাবে বিয়ের লিগ্যাল বয়স আগের মতোই মেয়েদের জন্য ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে হয় না, সেখানে ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ কম বয়সে বিয়ের সুযোগটির অপব্যবহার ঘটতে পারে। তাই এ অনুবিধিটি বাতিল করার অনুরোধ জানাই।

সহকারী অধ্যাপক

জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬

‘৭১-এ নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণের কিছু স্থির-চিত্র

ডিসেম্বর 16, 2016 মন্তব্য দিন

women-speak-out-4

women-fighters-1

women-fighters-2

women-fighters-3

women-fighters-4

women-fighters-5

7_r2_c1

 

‘৭১-এ বাঙালি মায়েরা লন্ডনে বের করেছিলেন প্রতিবাদ মিছিল

ডিসেম্বর 16, 2016 মন্তব্য দিন

women-protest-in-london-03041971সাদাকালো একটা ছবি। কিছুটা বিবর্ণ। কিন্তু ৪৫ বছর ধরে সযত্নে এই ছবিটা সংরক্ষণ করে চলেছেন ফেরদৌস রহমান। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের এক অবিস্মরণীয় মূহুর্ত যেন ধরে রেখেছে ছবিটি।

৩রা এপ্রিল ১৯৭১। ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস অভিযান ও গণহত্যার খবর তখন আসতে শুরু করেছে। লন্ডন প্রবাসী বাঙালিরা হতবিহ্বল। সবাই উদ্বিগ্ন স্বদেশে ফেলে আসা স্বজনদের নিয়ে। কেউ বুঝতে পারছেন না কী ঘটছে, কী করা উচিৎ।

সেদিন লন্ডনের রাস্তায় দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। শাড়ি পরা প্রায় দুশো বাঙালি নারী রাস্তায় নেমে এসেছেন তাদের সন্তানদের নিয়ে। বাচ্চাদের পুশ চেয়ারে বসিয়ে মিছিল করে তারা চলেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দফতর দশ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের দিকে। পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে, সে ব্যাপারে বিশ্ব গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সেটাই প্রথম চেষ্টা।

সেদিনের মিছিলে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের এক বিরাট অংশ ছিলেন একেবারে সাধারণ গৃহিণী। তাদের অনেকের জন্য জীবনে সেটাই প্রথম মিছিল। কিন্তু তাদের তেজোদীপ্ত মুখ আর সংকল্প দেখে সেটা মনে হচ্ছিল না।

মিছিলের সংগঠকদের একজন ছিলেন ফেরদৌস রহমান। তার স্বামী তখন লন্ডনে পাকিস্তান হাই কমিশনের একজন কর্মকর্তা। ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ঢাকার গণহত্যার খবর পাওয়ার পর ৩১ মার্চ (১৯৭১) আমরা একটা মিটিং ডাকলাম। সেই মিটিং এ বসেই আমরা একটা সংগঠন করলাম, নাম দিলাম বাংলাদেশ উইমেন্স এসোসিয়েশন। মিসেস বকশ ছিলেন কমিটির কনভেনর আর মিসেস লুলু বিলকিস বানু ছিলেন উপদেষ্টা। আমি ছিলাম কমিটির জনসংযোগ সম্পাদক। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, তেসরা এপ্রিল আমরা মিছিল বের করব।’

ফেরদৌস রহমান আরও বলেন, ‘আমরা মহিলারাই যে প্রথম মিছিল বের করেছিলাম, তার একটা কারণ ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, আমরা শাড়ি পরা মহিলারা মিছিল করে রাস্তায় নামলে যত সহজে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবো, অন্যরা তা পারবে না।’

সত্যি সত্যি তাদের এই কর্মসূচী সেদিন সবার দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফ তখন এক তরুণ ছাত্র নেতা। তিনিও জানালেন, মহিলাদের আগে রাস্তায় নামানোর সিদ্ধান্তটি তারা সচেতনভাবেই নিয়েছিলেন। বললেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে মহিলাশিশুদের হত্যা করা হচ্ছে, এরকম একটা বার্তা পৌঁছে দেওয়া। তাই আমরা সবাইকে বলেছিলাম, শনিবার তেসরা এপ্রিল যেন সবাই মহিলাদের নিয়ে আসেন এমব্যাংকমেন্টের কাছে। সেখান থেকে সবাই মিছিল করে রানির প্রতি আহ্বান জানাবেন, তিনি যেন হস্তক্ষেপ করেন এই গণহত্যা বন্ধে।’

women-lead-trafalgar-square-04041971পরদিন ৪ঠা এপ্রিল লন্ডনে বাঙালিদের আরও বড় সমাবেশ হলো ট্রাফালগার স্কোয়ারে। সেই সমাবেশের জন্য আগে থেকে অনুমতি নিয়ে রেখেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা বদরুল হোসেন তালুকদার। সেই মিছিলে যোগ দিলেন কয়েক হাজার মানুষ।

লন্ডনভিত্তিক একটি সংগঠন স্বাধীনতা ট্রাস্টের আনসার আহমেদউল্লাহ বলেন, ‘সেসময় বাংলাদেশের বাইরে যুক্তরাজ্যেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই পুরো যুদ্ধের সময় ধরেই এভাবেই লন্ডন পরিণত হয় বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে।’

লন্ডনে বাংলাদেশের পক্ষে এই আন্দোলনে এবং বিশ্বজনমত গঠনে সেদিন বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরি। আবু সাঈদ চৌধুরি সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন।

একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ তখন তার অফিস এবং বাড়ি, দুটিই ছেড়ে দিয়েছিলেন বিভিন্ন বাংলাদেশি সংগঠনের অফিস করার জন্য। তার স্ত্রী জাহানারা বেগম তখন একেবারেই তরুণী, বিয়ের পর সদ্য এদেশে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘১১, গোরিং স্ট্রিট ছিল আমার স্বামীর পাট ব্যবসার অফিস। তিনি পুরো অফিস ছেড়ে দিলেন বাংলাদেশ আন্দোলনের জন্য। সেখানে বসেই আবু সাঈদ চৌধুরি তার সব কার্যক্রম চালাতেন।’

ব্রিটেনে তখন কাজ করেন বহু বাঙালি চিকিৎসক। ডা. হালিমা বেগম আলম এবং তার স্বামী ডা. মুহাম্মদ শামসুল আলম, দুজনেই তখন লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসকের পেশায় নিয়োজিত। ঢাকায় গণহত্যার মর্মান্তিক খবরের ধাক্কা সামলে উঠার পর তাদের মনে হলো, কিছু একটা করতেই হবে।

সব ডাক্তারদের মিলে গঠন করা হলো একটি সংগঠন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, লন্ডন থেকে তারা ঔষধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করে পাঠাবেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য। হালিমা বেগম বলেন, ‘’আমি তখন সার্জন হিসেবে কাজ করি। নার্সদের বললাম তারা যেসব যন্ত্রপাতি ফেলে দেয়, সেগুলো যেন আমাদের দেয়, যাতে সেগুলো আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঠাতে পারি। একই ভাবে বিভিন্ন ফার্মেসিতে গিয়ে সংগ্রহ করতাম মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ। কিন্তু অনেকে ভালো ভালো অপারেশনের সাজ সরঞ্জাম, মেয়াদ ফুরিয়ে যায়নি এমন ঔষধও আমাদের দিতো। এদের কাছে আমাদের অনেক কৃতজ্ঞতা।’

হালিমা বেগম আলম আরও জানান, মহিলারা তখন এক বিরাট ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশে আন্দোলনে। লন্ডনের প্রত্যেকটি এলাকায়, ব্রিটেনের প্রতিটি শহরে বাংলাদেশ অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির কার্যক্রমে মহিলারা অংশ নেন সক্রিয়ভাবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস এবং এখনকার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থা

ডিসেম্বর 15, 2016 মন্তব্য দিন

rayerbazar-5তসলিমা নাসরিন : বয়স অল্প ছিল একাত্তরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি নতুন পতাকা হাতে নিয়ে হাটে মাঠে ঘাটে স্বাধীনতার উৎসব করতাম। প্রতি বছর ষোলোই ডিসেম্বর এলে ভোররাত্তিরে উঠে বাড়ির ছাদে পতাকা উড়িয়ে দিতাম, আমার দেশের পতাকা। দেশটিকে একাত্তরের পর থেকে নিজেরই ভেবেছি। আমার দেশটি এখন আর আমার নয়। মনে মনে যদিও একে আমার বলেই ভাবি। খুব গোপনে, সন্তর্পণে ভাবি একে আমার বলেই। দেশের শত্রুরা আমাকে দেশ থেকে সেই দুদশক আগে তাড়িয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিল এ দেশ আমার নয়। এরা দেশের সেই শত্রুদেরই বান্ধব অথবা সন্তান যে শত্রুরা এ দেশের স্বাধীনতা চায়নি, যে শত্রুরা একাত্তরে ধর্ষণ করেছে আমাদের নারী, যে শত্রুরা হত্যা করেছে দেশের বুদ্ধিজীবী, হত্যা করেছে অগণিত নিরপরাধ মানুষ।

বর্বর শত্রুসেনা নির্যাতন করেছে আমাদের পরিবারের সবাইকে। লুট করেছে আমাদের বাড়িঘর, সহায় সম্পদ। শুধু প্রাণটুকু বাঁচাতে একাত্তরের নমাস এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে পালিয়ে বেড়িয়েছি। গভীর অন্ধকারে মোষের গাড়িতে চেপে অনাত্মীয় অপরিচিত বাড়িতে গিয়েছি, আশ্রয় চেয়েছি। শত্রুদের আগুনে গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে যেতে দেখেছি। যে শত্রুরা পাকিস্তানি বর্বর সেনা দিয়ে আমাদের বাড়ি লুট করিয়ে ছিল, অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছুঁড়ে দিয়েছিল আমাদের তারাই আজ দেশের আপনজন। আর আমি এবং আমার মতোরা আপাদমস্তক নিষিদ্ধ।

ওরা চট জলদি হত্যা করেছিল বুদ্ধিজীবীদের। আজ ওরা নিরাপদে, নিশ্চিন্তে, ভেবেচিন্তে বুদ্ধিজীবী হত্যার ছক আঁকে এবং এক এক করে বুদ্ধিজীবী হত্যা করে। ওরা ধরা পড়ে না, ওরা ধিকৃত হয় না, লাঞ্ছিত হয় না। সত্য বলতে কী, ওদের কোনও শাস্তি হয় না। আমি যদি দেশে থাকতাম, অনেক বছর আগেই ওরা আমাকে কুপিয়ে মেরে ফেলত। বাংলাদেশ যখন প্রতিবছর চৌদ্দই ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পালন করে, তখন আমি ভাবি এই দিবস শুধু একটি দিনে বা দিবসে কেন সীমাবদ্ধ? মুক্তচিন্তা বা মুক্তবুদ্ধির মানুষদের দেশের সর্বত্র প্রায়ই হত্যা করা হচ্ছে কুপিয়ে। নৃশংসতার সাধারণত সীমা থাকে, এই নৃশংসতা সীমাহীন। বছরের যে কোনো দিনেই খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা, আমাদের মুক্তচিন্তকরা। শুধু মৌলবাদীরাই যে আমাদের নির্যাতন করছে তা নয়, বাকস্বাধীনতাবিরোধী আইন বানিয়ে মুক্তচিন্তকদের গ্রেফতার করছে সরকার, জেলেও পুরছে।

একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে, লক্ষ করছি, তারাও আজ কাঁদছে, যারা এখনকার মুক্তচিন্তকদের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি। এর নাম ভণ্ডামো নয়তো? একাত্তরে মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম আমরা বাঙালিরা। যুদ্ধ করেছিলাম পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন করেছিলাম, বাংলাদেশ তার নাম। বাংলাদেশ এই নামটি উচ্চারণ করলেই এক সময় ময়ূরের মতো নাচতো মন। সেই মন কোথায় আজ? সেই মন কিন্তু ভিনভাষী ভিনদেশি কেউ এসে নষ্ট করেনি, নষ্ট করেছি আমরাই। আমরাই স্বাধীনতার শত্রুদের আদর আপ্যায়ন করেছি। আমরাই আমাদের ধর্ষক আর খুনিদের বড় আসন দিয়েছি বসতে। প্রতিদিনই তো আমরা আমাদের অসাম্প্রদায়িক আদর্শকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দেখছি, কিন্তু কিছু বলছি না। যে সন্ত্রাসীরা আমাদের হত্যা করেছিল, তাদের পুনর্বাসন আমরাই করেছি, আমরাই এখন ওদের হাতে নিজেদের খুন হয়ে যাওয়া দেখছি। দেখছি কিন্তু কিছু বলছি না। বলছি না কারণ আমরাও ভেতরে ভেতরে একটু আধটু মৌলবাদী, আমরাও ভেতরে ভেতরে একটু আধটু সাম্প্রদায়িক। এই আমরাটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি মাননীয় মন্ত্রীবৃন্দ।

সাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্রটি নিজেকে অনেকটাই বদলে নিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার দিকে বলে কয়েই যাত্রা শুরু করেছে। আজ তার একটি রাষ্ট্রধর্ম আছে। স্বাধীন আর পরাধীন রাষ্ট্রের শাসকে আজ আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে, শাসকেরা জানে, মৌলবাদীদের আশীর্বাদের প্রয়োজন। আমাদের ক্ষমতালোভী শাসকেরা গদি রক্ষার্থে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে ওলামা লীগ, হেফাজতে ইসলাম নামক ভয়ংকর মৌলবাদী দলগুলোকে। এর শুরুটা অবশ্য হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। আমার বিরুদ্ধে যখন লাখো মৌলবাদীর মিছিল হল, আমার মাথার মূল্য নির্ধারণ করা হল, প্রকাশ্যে আমাকে হত্যার হুমকি দেয়া হল তখন সরকার মৌলবাদীদের পক্ষ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিল এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করল। সরকারের না হয় গদির লোভ ছিল। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করেছিলাম তখনকার সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী সমাজ সরকারের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ তো করেননি উল্টো কী দরকার ছিল ওভাবে লেখার জাতীয় মন্তব্য করে বিষয়টিকে আমার ব্যক্তিগত সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গেছেন। আজকের বাংলাদেশ সেই এড়িয়ে যাওয়ারই ফল। একের পর এক প্রগতিশীল ব্লগার, লেখক, শিক্ষক, ছাত্র হত্যার পরও তাঁরা নীরব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। দেশ মৌলবাদীদের দখলে যাচ্ছে যাক, তাতে তাঁদের কিচ্ছু যায় আসে না। তাঁরা মেতে আছেন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক এবং নানা পদক পুরস্কার নিয়ে। অঢেল অর্থ থাকার পরও তাঁরা চিকিত্সার জন্য সরকারি অর্থের আশায় থাকেন। এঁদের বুদ্ধিজীবী বলতে আমার বাঁধে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, গুলশান ক্যাফেয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী ঘটনার পর সরকারের তত্পরতা দেখে ভেবেছিলাম এবার অন্তত তারা মৌলবাদজঙ্গিবাদ তোষণ বন্ধ করবে। অথচ ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই অন্যতম আসামি হাসনাত ও তাহমিদ মুক্তি পেয়ে যায়। নিজেদেরকে জিম্মি দাবি করলেও ঘটনার বিভিন্ন ছবি ভিডিওতে তাদের হাতে অস্ত্র ও জঙ্গিদের সাথে নিশ্চিন্তে হেঁটে বেড়াতে দেখা গেছে। এ রকম ভয়ংকর অপরাধীদেরও জামিন মঞ্জুর হয়ে যায়। অথচ বই সম্পাদনার দায়ে রোদেলা প্রকাশনীর মালিক শামসুজোহা মানিকের এখনও জামিন মঞ্জুর হয় না। হত্যাকাণ্ড মেনে নিচ্ছে সরকার, কিন্তু ভিন্নমত মানছে না। কতটা অসভ্য হলে, অজ্ঞ হলে, অশিক্ষিত হলে এ সম্ভব, তা অনুমান করতে পারি।

কাল বাংলাদেশে বিজয় দিবস পালন করা হবে। যে মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমরা নমাস লড়াই করে জয়ী হয়েছিলাম, আমাদের স্বাধীন দেশে সেই মৌলবাদী অপশক্তিই আজ স্বাধীনতা উপভোগ করছে। তাদের আছে শতভাগ বাকস্বাধীনতা। আর আমরা যারা সমাজকে সুস্থ করতে চাই, নারী পুরুষের সমানাধিকার চাই, মানবাধিকার চাই, মানুষে মানুষে সমতা চাই, তারা আজ দেশের শত্রু, আমাদের বাকস্বাধীনতা নেই বললেই চলে। আমাদের পুরনো শত্রুরাই আজ দেশের হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে বসে আছে, তারাই আজ জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট। তারা আজ বুদ্ধিজীবীদের গালি পাড়ুক, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করুক, তাদের সাত খুন মাফ।

তাদের বাক স্বাধীনতায় কেউ বাধা দিয়েছে? এই যে সগৌরবে লেখকের মাথার দাম ঘোষণা করছে ওরা, কেউ বলেছে ওদের যে এ অন্যায়, কেউ ওদের গ্রেফতার করেছে? আমার মাথার দাম যে লোকটি ঘোষণা করেছিল প্রথম, তাকে আওয়ামী লীগ আমন্ত্রণ জানিয়ে দলে ভিড়িয়েছে, বড় নেতা বানিয়েছে। আর কত অকল্যাণ দেখতে হবে বেঁচে থেকে? এ দেশকে এখন আমার দেশ বলতে লজ্জা হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস, আর বিজয় দিবস নিতান্তই অর্থহীন দুটো দিবস আজ।

আমরা দেশটির আদর্শই ধরে রাখতে পারিনি। যারা সেই আদর্শকে কুপিয়ে হত্যা করেছে, তারাই আজ সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি কোন পথে যাবে, তারাই সিদ্ধান্ত নেয় এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা কী লিখবেন, কী লিখবেন না, কী বলবেন, কী বলবেন না। দেশটিতে কে বাস করবেন, কে করবেন না। কে বাঁচবেন, কে বাঁচবেন না। তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তাদের সিদ্ধান্তের বিপরীত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষমতাসীনদেরও নেই।

মত প্রকাশঅপ্রকাশ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এসে যদি দেখি আমাদের অর্জন কী—তাহলে নিঃসন্দেহে অনেক পরিসংখ্যান চলে আসবে। অর্থনৈতিকভাবে আমাদের দৃঢ় অবস্থানই বারবার আলোচনায় আসবে। কিন্তু গণতন্ত্রের পথে চলার ঘাটতিগুলো কতটা দূর করতে পেরেছি, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে।

মত প্রকাশের যে অধিকার, তাই এখন সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে বলে মনে করছি। লিখতে গিয়ে, বলতে গিয়ে কত অভিজিৎ রায়কে মরতে হলো, কতজনকে দেশ ছাড়তে হলো! সরকারের বাইরেও যে মত প্রকাশের ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো শক্তি থাকে, এটা তার প্রমাণ। সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল বা মহল, যারাই মানুষের নিজের কথা বলা এবং জানানোর অধিকারকে অস্বীকার করে, তারা চরিত্রে অত্যন্ত হিংস্র হয়ে থাকে। মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার প্রচণ্ড ক্ষমতা আছে তাদের।

অবশ্য অনেকেই বলবেন, মত প্রকাশের একটা সীমা থাকতে হয়। যা খুশি বলার অধিকার দেওয়া হয়নি কোথাও। কোনও কথা বা বক্তব্য, যদি বড় আকারের সহিংসতা, রক্তপাত বা নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে এবং তার ফলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, তবে হয়তো তার প্রচার বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা দরকার। তবে বাংলাদেশে বেশি উদ্বেগ ধর্ম নিয়ে লেখালেখিতে। যারা এই বিষয়ে লেখালেখি করেন, তাদের প্রতি প্রায় সবার উপদেশ থাকে, তারা যেন কারও অনভূতিতে আঘাত না করেন। যারা এমন নসিহত করছেন, তারা তাদের নিজস্ব ধর্মের বাইরে অন্য ধর্ম নিয়ে বিরামহীন কটাক্ষ করে যাচ্ছেন বা কটাক্ষ দেখে চুপ করে থাকেন। তখন এই অনুভূতির প্রশ্ন ওঠে না।

যারা ধর্মীয় রাষ্ট্র করতে চায় বাংলদেশকে, তারা কিংবা সরকারে থাকা ব্যক্তিবর্গ, তারা খুব কমই মানতে চান যে, কেউ যে কোনও মত প্রকাশ করতে পারেন স্বাধীনভাবে যদি না তিনি তা করতে গিয়ে সহিংসতার পথ বেছে নেন। বাংলাদেশের সংবিধানে মত প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত। আছে তথ্য অধিকারের মতো আইনও। এরপরও মত প্রকাশের পথে প্রতিবন্ধক অনেক আইন আছে কিংবা নতুন নতুন আইন প্রণীত হচ্ছে। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা রয়েছে সেটির অপব্যবহার দেখছি প্রতিনিয়ত। এই আইন ব্যবহার করে যখনতখন যাকে তাকে ইচ্ছামতো বিপদে ফেলার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। এই রকম ধারা মত প্রকাশের অধিকারকে খর্ব করার অস্বাভাবিক ক্ষমতা দিয়েছে বলা যায়।

ব্লগার, লেখকদের যারা হত্যা করছে তার পেছনে আছে বৃহত্তর রাজনৈতিক তৎপরতা, যে রাজনীতি বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়। এই চক্রটা খুবই শক্তিশালী ও সক্রিয়। মত প্রকাশের পথে এরাই বড় বাধা। এদের হাতে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব গেলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? দেশকে বাঁচিয়ে রাখাই কষ্টকর হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে যে কেউ যখনতখন হরানির শিকার হতে পারেন।

ধর্মীয় অনুভূতির নামে যারা গলা টিপে ধরে বা হত্যা করে যে কোনও কিছুতেই এই ভাবাবেগ ব্যবহার করতে পারে। আর ক্ষমতাসীনরা পারে রাষ্ট্রদ্রোহের ব্যাখ্যা খুঁজতে। বিরুদ্ধ মত ও সমালোচনা দমনের অনেক ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে আছে। আমাদের ৪৫ বছরের স্বাধীনভাবে পথ চলার এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমনে নানা ধারা ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

তবে বড় সমস্যা হলো ক্ষোভ প্রকাশের সংস্কৃতি। আমরা ক্রমেই একটা ক্ষুব্ধ জাতিতে পরিণত হচ্ছি। যে কোনও ছুঁতোয় ক্ষোভের সহিংস প্রকাশ এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়াটির ভয়ঙ্কর সহিংস প্রকাশ আমরা দেখে চলেছি। আর এদের ভয়ে রাষ্ট্র ভীত কিংবা এদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এদের দাপটে বই নিষিদ্ধ হয়, বই মেলা থেকে বই প্রত্যাহার হয়ে যায়, সেই প্রকাশক জেল খাটেন। এদের দাবির মুখে দাউদ হায়দার, তসলিমা নাসরিনসহ অনেক লেখককে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। লেখার জবাব লেখার মাধ্যমে না দিয়ে হুমকি আর পেশিশক্তির জোরে সবকিছু করে এই গোষ্ঠী। স্বাধীনতার এত বছর পর এসে এই সমস্যাকে গণতন্ত্রের পথে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে হয়। আর আছে রাজনীতির দাপট। আইনের বাইরে শুধু রাজনীতির পরিচয়ের কারণে অনেকের দাপট চোখে পড়ার মতো। রাজনীতির ভেতরে এমনসব চরিত্র আছে, যারা অতিমানবে পরিণত হয়েছেন এবং তারা সমস্ত সমালোচনার ঊর্ধ্বে।

ইতিহাস কিংবা ব্যক্তি কোনও বিষয়েই নির্মোহভাবে, নিরপেক্ষভাবে কোনও কিছু প্রকাশ করা যায় না এখন। সমাজে বহু ধর্মের মানুষ থাকে। দেশের ইতিহাসে নানা রাজনীতি নানা সময় প্রভাব ফেলেছে। মানুষের অনুভূতির বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার সবারই। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কিংবা ইতিহাসের কোনও বিষয়ে বা চরিত্র সম্পর্কে যদি খোলামেলা আলোচনা করা না যায়, তাহলে কোন পথে হাঁটছি আমরা? আমরা কেবলই স্পর্শকাতর, অসহিষ্ণু ও রসবোধহীন হয়ে উঠছি?

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি

বহুমুখী নারী উদ্যোক্তা, সমাজসেবিকা ও শিক্ষাবিদ জয়া পতি

ডিসেম্বর 14, 2016 মন্তব্য দিন

joyapati-3joyapati

স্বাস্থ্য-কথাঃ নারীদের মাইগ্রেনে ভোগা

ডিসেম্বর 14, 2016 মন্তব্য দিন

women-migration-sufferers