আর্কাইভ

Archive for the ‘নারী’ Category

এই সব অসভ্যতা বন্ধ হবে কবে?

woman heckled in busমরিয়ম চম্পা : চলন্ত বাসে উঠার জন্য লড়াই চলছে। কেউ উঠতে পারছেন। কেউ পারছেন না। সবচেয়ে বেশি বিপাকে নারীরা। ভিড় ঠেলে বাসের কাছে পৌঁছানোই দায়। ধাক্কাধাক্কির ভোগান্তি। বাসের হেলপারের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ। রোববার সকাল সাড়ে ১০ টায় প্রায় একইরকম দৃশ্যের দেখা মেলে রাজধানীর ফার্মগেট, বাংলামোটর, ধানমন্ডি ও শাহ্‌বাগে।

অবশ্য এ চিত্র রোজকার দেখা যায়। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। এই হয়রানি। খোদ রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন নানা প্রয়োজনে নারীদের রাস্তায় বের হতে হয়। কেউ কর্মজীবী, কেউ শিক্ষার্থী, কেউবা নিজের আদরের সন্তানটিকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত এসব নারীর বড় অংশকেই কোনো না কোনো হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। এসব অঘটনগুলো ভেঙেচুরে দেয় নারীর মনোজগৎ। তছনছ করে দেয় নারীর আত্মবিশ্বাসকে। নানা মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন অনেকে।

নারীদের রাস্তাঘাটে চলাচল যেন এক ধরনের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের কথা অনেকটা আক্ষেপ করে শোনালেন একাধিক নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মিথিলা। মোহাম্মদপুর থেকে নিয়মিত ধানমন্ডি আসা-যাওয়া করেন তিনি। মিথিলা বলেন, বাসে উঠতে রীতিমতো লড়াই করতে হয়। ভিড় ঠেলে বাসে উঠা খুবই কষ্টকর। হেলপারদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণতো আছেই। ওরা বাসে উঠতে সাহায্য করার নামে পিঠে হাত দেয়। নিষেধ করলেও শোনে না। বলে না ধরলে পইরা গেলেতো দোষ দিবেন হেলপার আর ড্রাইভারের।

বাসে উঠার পর বসার আসন পাওয়া যায় না বেশির ভাগ দিন। মিনিবাসে তিন চারটি এবং বড় বাসে নয়টি সংরক্ষিত আসন থাকলেও পুরুষ যাত্রীরা ওইসব আসনে বসে থাকেন। আর উঠতে বললে বলেন, সমান অধিকার চাইলে দাঁড়িয়ে চলাফেরা করতে শিখুন। তিনি বলেন, কখনোও কখনোও বাসে ভিড় থাকলে হেলপাররা সিট খালি নেই বলে তুলতে চায় না। তাদের ধারণা নারী যাত্রীরা বাসে উঠতে-নামতে সময় বেশি নেয়। দাঁড়িয়ে যেতে বেশি জায়গা লাগে। সন্ধ্যার পর বাসে উঠা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

ফার্মগেট তেজতুরী বাজারের একটি ছাত্রী হোস্টেলে বাস করা নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ভর্তি কোচিং উপলক্ষে প্রথম হোস্টেলে উঠি। প্রথমদিকে কোচিং ক্লাস করতে যাওয়ার সময় হোস্টেলের গেটে ৫-৬ জন কম বয়সী ছেলে পথ আটকে বসে থাকতো। অনেক কষ্টে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে কোচিং এর গেট পর্যন্ত পৌঁছতে আরেক দফা হয়রানির শিকার হতে হতো ফুটপাতের হকার ও পথচারীদের দ্বারা। প্রথম একবছর ফার্মগেটের ওভারব্রিজের নিচ দিয়ে যেতে কেটেছে অপরিচিত ব্যক্তিদের ধাক্কা ও কটূক্তি শুনে। কখন যে শরীরে ধাক্কা দিয়ে অবুঝের মতো চলে যেতেন বুঝতেই পারতাম না। প্রায়সই হোস্টেলে ফিরে অনেক কান্না করতাম। মনে হতো পুরো শরীরটাই যেন নোংরা হয়ে গেছে। যেখানে ধাক্কা খেতাম সেই স্থানটা পানি দিয়ে বারবার ধুয়েও যেন স্বস্তি পেতাম না। এরপরই স্থির করতাম এই শহরেই থাকবো না। রাগে দুঃখে বাবাকে ফোন দিয়ে বলতাম বাবা আমি এখানে থাকতে চাই না। আমাকে এসে নিয়ে যাও। আমি ঢাকাতে আর পড়বো না। বাবা বলতেন মামনি, পরিবেশ পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনাটাও একধরনের পরীক্ষা। একপর্যায়ে মোটা ও শক্ত মলাটের একধরনের ব্যাংকের ডায়রি ব্যবহার করা শুরু করি। ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় যেভাবে বুকের সামনে বই আগলে রাখতাম ঠিক একই ভাবে ডায়রি ব্যবহার শুরু করি। যেন কোনো অপরিচিত পথচারী ধাক্কা দিলে বরং সে নিজেই ব্যথা পায়। এভাবে আরও কতোদিন শক্ত মলাটের ডায়রি ব্যবহার করতে হবে জানি না।

নারী অধিকারকর্মী কাশফিয়া ফিরোজ বলেন, ২০১৪ সালে একটি ‘বেইজ লাইন সার্ভে’ করা হয়। ২০১৭ সালে ‘নারীর সংবেদনশীল নগর পরিকল্পনা’- শিরোনামে বেসরকারি সংস্থা একশন এইড-এর প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা যায় হয়রানির নানা চিত্র। নগর উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প নকশা ও বাস্তবায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যাস্বল্পতার কারণে নারীবান্ধব নগর কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এর ফলে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, মার্কেট, পরিবহন ব্যবস্থা, পাবলিক টয়লেট, পার্ক ইত্যাদি গণপরিসরে নারীদের স্বাভাবিক উপস্থিতি ও বিচরণ যথেষ্ট সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। আরো হতাশার দিক হলো- একজন নারী কিন্তু একাধিকবার একাধিক ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যেমন গড়ে একজন নারী তিন মাসে ৪ থেকে ৫ বার অশোভন আচরণের সম্মুখীন হয়েছেন, একইভাবে ৪ থেকে ৫ বার অপরিচিতের কাছ থেকে কুপ্রস্তাব পেয়েছেন। এবং ২ থেকে ৩ বার অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের মতো হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন। যৌন হয়রানি বা নির্যাতন কোনো বিশেষ বয়সের নারীর ক্ষেত্রেই ঘটে না। কিশোরী বা প্রাপ্ত বয়স্ক সব বয়সের নারীর ক্ষেত্রেই এটা ঘটতে পারে।

সুমাইয়া খাতুন সুমী। পেশায় একজন ব্যাংকার। থাকেন পল্টনে। চাকরি করেন গাবতলীর একটি ব্যাংকে। পল্টন বাসস্ট্যান্ড থেকে ওয়েলকাম নইলে অন্য বাসে চড়ে গাবতলী যান। গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নেমে নিরাপদ রাস্তা পারাপারের জন্য তিনি গাবতলীর আন্ডারপাস ব্যবহার করতেন। কিন্তু অপর্যাপ্ত আলো এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি তা ব্যবহার থেকে বিরত রয়েছেন।

সুমাইয়া খাতুন বলেন, পর্যাপ্ত আলো না থাকায় গাবতলী আন্ডারপাসের ভেতরে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের আনাগোনা বেশি। একদিন আন্ডারপাস দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি সেখানে বসে নেশা করছিল। তারা তাকে উদ্দেশ্য করে খারাপ কথা বলে। আন্ডারপাসের ভেতরে পরিবেশ ভালো না হওয়ার কারণে মেয়েরা এই আন্ডারপাস ব্যবহারও কম করে। এরপর থেকে তিনিও আর নিরাপত্তাহীনতার কারণে গাবতলীর আন্ডারপাস ব্যবহার করেন না। ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পারাপার হন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স এর সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নে নারীর চাহিদা এবং আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আসে না। এর কারণ নগর উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প নকশা ও বাস্তবায়নে নারীর অংশগ্রহণ কম। ফলে নারীবান্ধব নগর কাঠামো তৈরি হয়নি।

ঢাকা শহরে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া দরকার এ প্রসঙ্গে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্‌ কবীর বলেন, দেশে জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবেশ এখনও গড়ে ওঠেনি। স্কুল-কলেজের মেয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে আসা-যাওয়ার জন্য কোনো পাবলিক গাড়ি নেই। স্কুলে স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য বাথরুমের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বাথরুম নোংরা হওয়ার কারণে মেয়েরা তা ব্যবহার করা এড়িয়ে যায়। গার্মেন্টস কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ফুটপাতে যে সব নারী, মেয়ে, শিশু অবস্থান করেন তাদের পাবলিক টয়লেট নেই। এর ফলে ইউরিন ইনফেকশনে  ভোগেন তারা।

সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ঘরে নারী যেমন সুরক্ষা পাবে, তেমনি নারী ঘরের বাইরে সুরক্ষা পাবে। তাদের কেন্দ্রে রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। যেমন- কর্মস্থল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে নারী যাবেন তার যাতায়াতের নিরাপত্তার জন্য রাস্তাঘাট, ফুটপাত, পরিবহন কতখানি নিরাপদ। এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হবে। নারীর চলাচলে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট- রিকশা, বাস, টেম্পো, সিএনজি। সিএনজি, বেবিট্যাক্সি মেয়েদের চলাচলের জন্য কতটা নিরাপদ তা ট্রাফিক পুলিশকে দেখতে হবে। বাসে ড্রাইভার, হেলপার মেয়ে যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে কিনা তাও ট্রাফিক পুলিশেরই দেখার দায়িত্ব। এ ছাড়া মেয়েদের জন্য আলাদা বাসের পরিমাণ বাড়ানো দরকার। নইলে সাধারণ বাসে মেয়েদের আগে ওঠার ব্যবস্থা করা এবং তাদের সঙ্গে অসৌজন্য আচরণ কমানোর দায়িত্ব পরিবহন ম্যানেজমেন্টের।

ব্র্যাক-এর জেন্ডার প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর নিশাত সুলতানা বলেন, সম্প্রতি আমরা ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনা মুক্ত সড়ক’- শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। যেখানে দেখা গেছে গণপরিবহনে শতকরা ৯৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন।

ব্র্যাক’র সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ নাজমুল হোসেইন বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতার অংশ হিসেবে আমরা গাজীপুর, টাঙ্গাইল মহাসড়কের আশেপাশের ১০০ টি স্কুলে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। এসব স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা ও যৌন হয়রানি সম্পর্কে তথ্য জানানো ও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।  ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাস গবেষণাকর্মটি পরিচালিত হয়। ৪১৫ জন নারী এই জরিপে অংশগ্রহণ করেন। মূলত ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় নগর, উপনগর এবং গ্রামাঞ্চল এই তিন অঞ্চলের নিম্ন ও নিম্ন মধ্য আয়ের পরিবারের নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ওপর জরিপটি পরিচালনা করা হয়।

গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় মৌখিক, শারীরিক এবং অন্যান্য যৌন হয়রানির শিকার হন। এরমধ্যে ৬৬ শতাংশ নারী জানায়, ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারাই নারীরা বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ৩৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তারা ১৯-২৫ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। গণপরিবহনে নারী নির্যাতনে কারণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা, তদারকির (সিসিটিভি ফুটেজ মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকা) অভাবে নারীদের ওপর যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপরিবহন ব্যবহারকারী উত্তরদাতারা বলেন, শারীরিক যৌন হায়রানির মধ্যে রয়েছে ইচ্ছাকৃত স্পর্শ করা, চিমটি কাটা, কাছে ঘেঁষে দাঁড়ানো, আস্তে ধাক্কা দেয়া, নারীদের চুল স্পর্শ করা, কাঁধে হাত রাখা, হাত, বুক বা শরীরের অন্যান্য অংশ দিয়ে নারীর শরীর স্পর্শ করা ইত্যাদি। এসব ঘটনায় ৮১ শতাংশ নারী চুপ থাকেন। ৭৯ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার স্থান থেকে সরে আসেন।

Advertisements

থ্যালাসেমিয়াঃ একটি বংশগত রোগ

thalasemia diagnosis 1a

thalasemia diagnosis 1b

কে এই কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হারি?

mata-hari-2মাহমুদ ফেরদৌস : ১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর। ভোর বেলা। প্যারিসের সেইন্টল্যজারে কারাগারের অভ্যন্তরের একটি সেল থেকে জাগিয়ে তোলা হলো এক বন্দীকে। হাতে দেওয়া হলো কাগজ, কলম, দোয়াত কালি আর খাম। বলা হলো, চাইলে দু খানা চিঠি লিখতে পারেন তিনি। নিজের কালো মোজা, উঁচু হিলের জুতাজোড়া, পশম আর মখমলের তৈরি পোশাক গুছিয়ে নিলেন তিনি। তারপর কাগজে হিজিবিজি লিখে জমা দিয়ে দিলেন। বললেন, আমি প্রস্তুত।

কিছুক্ষণ পরই ধূসর রঙের একটি সামরিক যান বের হলো কারাগার থেকে। ছুটলো প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক পুরোনো বন্দরে। গাড়ির ভেতর দু জন সেবিকা ও নিজের আইনজীবীর সঙ্গে বসে আছেন ৪১ বছর বয়সী ওই গোলন্দাজ নারী। পা অবদি লম্বা কোট তার পরনে। মাথায় টুপি।

গন্তব্যস্থলে তিনি যখন পৌঁছালেন তখন সময় সবে সকাল সাড়ে ৫টার চেয়ে একটু বেশি। তাকে দাঁড় করানো হলো ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ১২ ফরাসি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন নিজের বন্দুক হাতে নিয়ে। চোখ বাঁধার জন্য সাদা কাপড় দেওয়া হলো তাকে। কিন্তু তিনি নিতে চাইলেন না। এটা কি পরতেই হবে?পাল্টা প্রশ্ন করলেন।

যখন তার দিকে বন্দুক তাক করে সৈন্যরা, তখনও তাদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়েছিলেন তিনি। তার এক হাত বেঁধে ফেলা হয়। অপর হাতে তিনি নিজের আইনজীবীর দিকে হাত নাড়েন। পরমুহূর্তেই সৈন্যদের রাইফেল গর্জে উঠে। পায়ে লাগে গুলি। হাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এক কর্মকর্তা এগিয়ে এসে রিভলবার বের করে তার মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

অথচ, এক দশক আগেও, এই নারীর পায়ের তলায় ছিল ইউরোপের বহু রাজধানী। তিনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য এক রূপসী। ভিনদেশি নগ্ন নাচের আবেদনে কাবু করে রেখেছিলেন কতশত মন্ত্রী, জেনারেল আর শিল্পপতিদের। ঘটনার দু বছর আগেও দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল তার। প্যারিসে এক প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটান তো, পরেরদিন হেগ শহরে আরেক প্রেমিকের সঙ্গে। রীতিমত আন্তর্জাতিক সেক্স সিম্বল তিনি। নামেমাত্র পোশাক পরে নাচতেন। প্যারিসে তার নগ্ন নাচের আসর ছিল যেন তৎকালীন ইউরোপিয়ান অভিজাতদের ছোটখাটো সম্মেলন। মাতা হারিএই এক নামে তাকে দুনিয়া চিনতো।

কিন্তু, এরপরই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পাল্টে গেল তার চেনাজানা জগত। তিনি অবশ্য ভেবেছিলেন আগের মতোই ইউরোপের ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে বরং তাকে মৃত্যুদপেতে হলো। তার অপরাধ? জার্মানির পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করা। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জার্মান প্রভুদের কাছে সরবরাহ করা। লুফে নিল পত্রপত্রিকাগুলো। তাকে দায়ী করা হলো হাজার হাজার মিত্রপক্ষীয় সৈন্যর মৃত্যুর কারণ হিসেবে।

কিন্তু আজ শত বছর পর ফরাসি সরকার যেসব নথিপত্র অবমুক্ত করেছে, তাতে এক ভিন্ন চিত্রই ফুটে উঠে। তার মৃত্যুর এত বছর ধরে তার সঙ্গে লেগে ছিল ডাবল এজেন্ট হওয়ার কলঙ্ক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ছিলেন স্রেফ একজন বলির পাঠা।

তার আসল নাম কিন্তু মাতা হারি নয়। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭৬ সালে। বাবামা নাম রাখেন মার্গারেথা জেল্লে। মাতা হারি নামটা কেন বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়েও আছে চমকপ্রদ তত্ব। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায়, এই নামের অর্থ দিনের চোখ,অর্থাৎ সূর্য। আবার হারি নামে এক হিন্দু দেবতাও আছেন। তার আগে মাতা শব্দটিও লাগিয়ে থাকতে পারেন। দুই তত্বেরই ভিত্তি আছে। নিজেকে অনেক সময় তিনি জাভানিজ (ইন্দোনেশিয়ার একটি অঞ্চল) প্রিন্সেস বলে পরিচয় দিতেন। কখনও আবার ভারতের মন্দির নর্তকির মেয়ে হিসেবে। কিন্তু কখনই তিনি বলতেন না, তার জন্ম আসলে নেদারল্যান্ডে।

আর নেদারল্যান্ডে তার জন্মস্থান লিউওয়ার্ডেনের ফ্রাইজল্যান্ড মিউজিয়ামে তাকে নিয়ে শনিবার থেকে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে তার বিচারের অনেক নথিপত্র অবমুক্ত করা হয়। তার ব্যক্তিগত ও পারবারিক কয়েকটি চিঠিও প্রকাশ হয়। সবই আছে প্রদর্শনীতে। এসব নথিপত্র একসাথে মেলালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত এই গুপ্তচরের আরও বহু পরিচয় আছে।

ফ্রাইজল্যান্ড জাদুঘরের কিউরেটর হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,আমরা আসলে তার জীবনটা বুঝতে চেয়েছি। একজন বিশাল তারকা হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে। একজন শিশু হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে যিনি শুধু নর্তকিই ছিলেন না, বা গুপ্তচরই ছিলেন না। আমরা চাই তার পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে।

তার জীবন ছিল প্রচঘটনাবহুল, আর মর্মান্তিক। জন্ম হয়েছিল বেশ ধনী এক পরিবারে। কিন্তু তিনি যখন কিশোরী, অকস্মাৎ ধনসম্পদ হারিয়ে সংসারধর্ম ত্যাগ করেন তার পিতা। একলা মায়ের কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে সেই মাও মারা যান। অগত্যা, আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় হয় তার। ১৮ বছর বয়সে গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রুডলফ জন ম্যাকলিওডের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এই লোকের বয়স ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ। তার সঙ্গেই গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে এক সামরিক ঘাঁটিতে ৪ বছর ছিলেন তিনি। তখনই জাভানিজ ভাষায় তার হাতে খড়ি।

তাদের দাম্পত্য জীবনকে ঝঞ্ঝাটময় বললে কম বলা হয়। প্রতিনিয়ত তিনি অকথ্য নির্যাতন সইতেন স্বামীর কাছ থেকে। নিজের ৩ বছর বয়সী ছেলেটাকে মারা যেতে দেখেন তিনি। সম্ভবত, গৃহকর্মীর দেওয়া বিষের কারণে। পরে এক মেয়ে হয় তার। ৪ বছর পর হল্যান্ডে ফিরলে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান মার্গারেথা (তার আসল নাম)। কিন্তু মেয়ের খরচ বহন করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে তিনি চলে যান প্যারিসে। মেয়েকে রেখে যান স্বামীর কাছে। নিজের এই মেয়েকে তিনি সবসময়ই মিস করতেন।

পরে প্যারিস থেকে নিজের প্রাক্তন স্বামীর এক কাজিনকে লেখা চিঠিতে মার্গারেথা জানান যে, সেখানে তিনি এক থিয়েটারে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি তাকে নামতে হয়েছে পতিতাবৃত্তিতেও। তিনি লিখেন, ভেবো না যে, আমি আসলেই অনেক খারাপ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে আমি বাধ্য হয়েছি এ পথে নাম লেখাতে। তিনি নাকি এও বলেছিলেন, আমার মনে হয়, যেসব নারী সংসার ছেড়ে পালান তারা পরবর্তী ঠিকানা হিসেবে প্যারিসকে খুঁজে পান। নিজের এই নর্তকি আর অভিনয় জীবনেই তিনি বেছে নেন মাতা হারি নাম, যেটি পরে তার আসল নামকেও ছাপিয়ে যায়। এই জীবনেই তিনি অনেক অর্থ আর যশের মালিক হন। ভাবা হয়, জীবনের কোনো এক সময়ে তিনি মিলিয়নিয়ারও ছিলেন।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,তার বিরুদ্ধে যেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ, সেটি না থাকলেও, আজও তাকে মানুষ স্মরণ করতো। গত শতাব্দীর প্রথমভাগে ইউরোপ জুড়ে তার যেই পরিচিতি ছিল, তাতেই তিনি অমর হয়ে থাকতেন। স্ট্রিপিং (নগ্ন নাচ)-কে তিনিই কমবেশি নাচের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কাছে তার ছবির অ্যালবাম আছে। তার ছবি সম্বলিত সংবাদপত্রের স্তূপ এখনও আছে। তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ইউরোপের সেলেব্রেটি ছিলেন।

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনকেন্দ্রীক আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে তার গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়ই। অথচ, আজ এত বছর পর জানা যাচ্ছে যে, তিনি জার্মানদের কাছে তেমন কোনো তথ্যও দেননি। যেমন, হয়তো তিনি বলতেন যে, এই বসন্তে হামলা চালাতে পারে মিত্রবাহিনী। কিন্তু এই তথ্য সবারই জানা ছিল।

অথচ, হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে। মূলত, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার পরিচিতি প্রাপ্তি, জার্মানি ও ফ্রান্স উভয় পক্ষের সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, আর যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপজুড়ে ঘোরাঘুরিএ সবই তার বিপক্ষে কাজ করেছে। আর তার জীবনযাপনের ধরণ নিশ্চিতভাবেই তার পক্ষে যায়নি।

এতদিন ধরে অনেক ইতিহাসবিদই তাকে নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপক্ষে গিয়ে তার পক্ষালম্বন করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে আসলে বলি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধের পর নিজেদের অজস্র ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে একজন জুতসই গুপ্তচর দরকার ছিল ফরাসিদের, যাকে কিনা শূলে চড়ানো যাবে। আর নষ্টা চরিত্রের মাতা হারি এক্ষেত্রে ছিলেন পারফেক্ট বলি।

ফরাসি সেনারা এই ভয়েও ছিলেন যে, মাতা হারি ফরাসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার মেলামেশার কথাও ফাঁস করে দিতে পারেন। এদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ জেনারেলও ছিলেন। এ কারণেই তাকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।

আবার এও সত্য যে, ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে অনেক ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়, ফরাসি গোয়েন্দারা আগেই বৃটিশদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তাকে জার্মান গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে। হাতেনাতে ধরতেই তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতেও এটাও জানা যায় যে, বৃটিশরা যেসব কারণে তাকে সন্দেহ করেছিল, তার কোনো যুক্তিযুক্ততা ছিল না। বৃটিশ গোয়েন্দারা তাকে লন্ডনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বলা হয়, প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও,তিনি একজন সাহসী ধাঁচের মহিলা, যাকে সন্দেহ থেকে ফেলা যায় না।

স্পেনের মাদ্রিদে জার্মান সামরিক অ্যাটাশে আর্নল্ড ভন কালের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এই আর্নল্ডই নিজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাতা হারিকে নিজেদের গুপ্তচর হিসেবে ইঙ্গিত দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান। এই টেলিগ্রাম ফরাসি কর্মকর্তাদের হাতে যায়। এটিই ছিল মাতা হারির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদই একে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন।

তাদের যুক্তি, ফরাসিরা যে জার্মান টেলিগ্রামে আড়ি পাততে পারেন, সেটা জার্মানরা অনেক আগ থেকেই জানতো। তাহলে, এমন সংবেদনশীল তথ্য টেলিগ্রামে কেন পাঠিয়েছিলেন আর্নল্ড ভ্যান? কারণ, তিনি চেয়েছিলেন যে, এই চিঠি ফরাসিদের হাতে পড়ক। আর তারা এই চিঠির ভিত্তিতে নিজেদের গুপ্তচরকেই ফাঁসি দিয়ে দিক। হয়েছেও তাই।

আবার অনেকে বলেন, যেই টেলিগ্রামের কথা বলা হয়, সেটির অনুদিত অংশই প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে। সেটির জার্মান ভাষায় লেখা মূল কপি কোথায়? কেউ কি তবে, এসব জালিয়াতি করে বানিয়েছে মাতা হারিকে ফাঁসানোর জন্য?

তবে মামলার কৌঁসুলির কিছু নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, মাতা হারি নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, ১৯১৫ সালে যুদ্ধ চলাকালে হেগ শহরে জার্মানরা তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তখন তিনি যুদ্ধে আটকা পড়ে ফ্রান্সে ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছিলেন। তখনই আর্মস্টারডামে জার্মান এক কূটনীতিক ফ্রান্সে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে জার্মানির পক্ষে গুপ্তচরগিরি করার প্রস্তাব দেন। উপায় না পেয়ে তিনি রাজি হন। তিনি যুক্তি দেখান যে, মিত্রবাহিনীর প্রতিই তার আনুগত্য ছিল সবসময়। ফরাসি গোয়েন্দারা যখনই তার সাহায্য চেয়েছে, তখনই তিনি এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার এই যুক্তি ধোপে টেকেনি।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলছিলেন,উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ছিল মাতা হারির। তাদের সঙ্গে ঘুরতেন, নাচতেন। এমনকি এক সঙ্গে থাকতেনও। অথচ, যুদ্ধের সময় যখন তিনি বিপদে পড়েন, ওই কর্মকর্তারাই তার বিরুদ্ধে চলে যান। এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে নিশ্চয়ই তার কষ্ট হয়েছিল।

মৃত্যুদকার্যকরের পর কেউই মাতা হারির মৃতদেহ দাবি করতে আসেনি। তাই প্যারিসের এক মেডিকেল কলেজে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে এটি শিক্ষার্থীদের ব্যবচ্ছেদ শেখাতে ব্যবহৃত হতো। তার মাথার কঙ্কাল অবশ্য অ্যানাটমি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ২০ বছর আগে জাদুঘরে জিনিসপত্রের গণনা চলাকালে দেখা যায়, কঙ্কালটি নেই। ধারণা করা হয়, কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

(ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।)

চুলে রঙধনু সজ্জা !

rainbow colour hair 1a

rainbow colour hair 1b

ডা. লুৎফর রহমানের জীবন ও সাহিত্য

dr lutfor rahmanনাসির হেলাল : সত্য ও সুন্দরের পথ বাতলে দেয়ার জন্য কালে কালে কিছু মানুষের আগমন ঘটে পৃথিবীর মাটিতে। তারা অসত্য অসুন্দরের জয়-জয়কারের মধ্যেও তাদের সত্য সুন্দরের সাধনা চালিয়ে যান, মানুষকে সে পথে চলার জন্য আহ্বান করেন। ডা. লুৎফর রহমান ছিলেন এদেরই অন্যতম একজন। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়কে, মুসলিম যুব সমাজকে অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। 

‘বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে ডা. লুৎফর রহমানের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সত্য ও সুন্দরের সাধনায় নিবেদিতপ্রাণ লুৎফর রহমান তার বিশ্বাস ও আদর্শকে অকপটে তুলে ধরেছেন সাহিত্যের মাধ্যমে। সমাজকে তিনি দূর থেকে দেখেননি, দেখেছিলেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে। তাই এ অভিজ্ঞতাপ্রসূত আলোকরেখায় তার প্রতিটি রচনা সমুজ্জ্বল। বাংলার অধঃপতিত মানব সমাজকে মুক্তির পথ দেখাতেই তিনি জীবন উৎসগ করেছিলেন। সহজ, সরল ও হৃদয়গ্রাহী তার রচনাসমূহ চিন্তার গভীরতায়, দৃষ্টির উদারতায় বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদ শুধুমাত্র আমাদের সমাজ জীবনেই নয়, বরং জাতীয় জীবনেও সমভাবে সুদূরপ্রসারী জীবনেই বিস্তার করতে সমর্থ।’ (লুৎফর রহমান রচনাবলী, ১১ খ-, আবদুল কাদির সম্পাদিত, প্রসঙ্গ কথা, ১৯৭২, বাএ।)

ডা. লুৎফর রহমান তার ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে আমৃত্যু মানুষকে সত্য-সুন্দরের কথা বুঝাতে চেষ্টা করে গেছেন। বিশেষ করে তিনি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা কী? ইবাদত কী? ধর্ম কী? তা বুঝাবার চেষ্টা করেছেন কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে ভুল বুঝা হয়েছিল। তিনি ‘দুঃখের রাত্রি’ উপন্যাসের অষ্টম অধ্যায়ের শেষে নিজে স্বগোক্তি করেছেন-

‘হায় ক্ষুধা! তোমার যন্ত্রণায় মানুষ অস্থির, পাগল, লজ্জাহীন, বেশ্যা ও তস্কর হয়। তোমার প্রভাব অসীম। মানবের ক্ষুধাকে যে সম্ভ্রম করে, সে ধন্য। সে মহৎ, সে বীর। মানবের ক্ষুধাকে যে অশ্রদ্ধার চোখে দেখে, তারা নিষ্ঠুর, নরপিশাচ, ধিক তাদের ধর্মে, কর্মে। যারা দরিদ্রকে অভুক্ত রেখে নিজেদের সুখ বিলাসের জন্য, জমিদারী ও দাসদাসীর জন্য অন্যায় করে অর্থ শোষণ করে, ধিক তাদের জীবনে! হায়! এতো কথা বললাম, এত বক্তৃতা এত প্রচারের ফলেও মানুষকে এবং আজনজনকেও বুঝাতে পারলাম না, ধর্ম কি? ইচ্ছ হয় এই পাপ অত্যাচার-ভরা জগৎ ছেড়ে চলে যাই, অথবা ফকীরের বেশে মৌন হয়ে দেশে দেশে ফিরি। প্রাণের কথা একটি মানুষও গ্রহণ করে না। হায় অগ্নি। হায় দুঃখ! হায় সত্যের অনুভ’তির জ্বালা! আমার বুকখানি তোমরা পুড়িয়ে ছাই করে দিলে, কিন্তু মানুষকে একটুখানি বিচলিত করলে না! …. জীবনকে নির্মল, সত্যময়, সুন্দর, ঈশ্বরের যোগ্য, প্রেময় নিষ্পাপ নির্দোষ করে তোলাই সমস্ত মানবজাতির একমাত্র ধর্ম। … এই সাধারণ ধর্মের নাম আমি ইসলাম দিতে চাই। ইসলাম অর্থ শান্তি, মহাশান্তি।’

ইসলাম মানবতার র্ধম, শান্তির ধর্ম, মানুষ ও সৃষ্ট জীবের কল্যাণ সাধনায়ই ইসলামের মূল উদ্দেশ্য। আমরা মুসলমানরা আজ ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে দূরে। যারা নিজেদেরকে মুমীন, ঈমানদার, বোগর্জ মনে করি তারাও ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ কিত তা জানি কিনা সে বিষয়ে প্রচুর সন্দেহ রয়েছে। ইবাদত বলতে কি বুঝায় সেটাও আমরা ঠিক মত বুঝি না। আমরা মনে করি নামায, রোযা, হজ, যাকাত আদায়ের মধ্যেই ইবাদত সীমাবদ্ধ। অথচ ইবাদতের দু’টি দিক রয়েছে, একটা হক্কুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর হক্ব, অপরটি হক্কুল ইবাদ অর্থাৎ বান্দার হক। আমরা সবাই নামায, রেপাযা, হজ আদায়ের চেষ্টা করি। কিন্তু হক্কুল ইবাদ প্রায় সকলেই এড়িয়ে অথবা না বুঝার কারণে করি না।

উল্লেখ্য যে, হক্কুল্লাহর বিষয়ে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে আল্লাহ ইচ্ছে করলে তার বান্দাহকে মাফ করে দিবেন। কিন্তু হক্কুল ইবাদের বিষয়ে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি তিনি মাফ করবেন না, যতক্ষণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা মাফ না করবেন! এ থেকে বুঝা যায়, হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক তথা, সৃষ্টির সেবার মধ্য দিয়েই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন পূর্ণতা পায়। ডা. লুৎফর রহমান আমৃত্যু তার লেখালেখির মাধ্যমে এ কথাটি বুঝাতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বড়ই দুঃখে বলিতেছি, আমরা কেবল চিরাচরিত ব্যথায় অন্ধের ন্যায় রোযা-নামাজ পালন করিতেছি। অতি অজ্ঞ, অন্ধ আমরা, তাই ধর্মকর্ম ও নামায রোজার কোন ক্রিয়াই আমাদের জীবনে দৃষ্ট হয় না…। মুসলমান কেবল অন্ধের ন্যায় অর্থহীন রোযা-নামাজ লইয়া জায়নামাযে বসিয়া জীবন ভোর করিয়া দিতেছে।… নামাজ যে মুসলমান পালন করে, সে কখনও প্রেমিক না হইয়া পারে না…। মুর্খের ন্যায় কোন নামাযই পড়িও না, তোমার ঐ নামায পালনের কোনই অর্থ হয় না। যে উদ্দেশ্যে রোযা-নামাজয, তাহার একটিও তোমার দ্বারা পালন হইতেছে না। হায় মূর্খ! কেবল ওযু গোসল করিলে, তোমার অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করিলে না?’ (স্বর্গ তোরণ-এর ভূমিকা)

ডা. লুৎফর রহমান ছিলেন প্রকৃতপক্ষে একজন উঁচুমানের সংস্কারক। তিনি তার উচ্চজীবন, উন্নতজীবন, মহৎজীবন, সত্যজীবন, মহাজীবন, ছেলেদের মহত্বকথা প্রভৃতি গ্রন্থগুলোর প্রতিটি বাক্যে রয়েছে মানবজাতির জন্য সঠিক পথের দিশা, সঠিক পথের আহ্বান। তার রচনাকে অনেকেই ঋষি বাক্য মনে করেন। আসল কথা হলো, ডা. লুৎফর রহমান কুরআন-হাদীসের বক্তব্যকেই নিজের মত করে তার রচনাতে স্থান দিয়েছেন।

লেখকের সমসাময়িক সময়ে বাঙালি মুসলিম সমাজ শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক পিছিয়েছিল, অর্থনৈতিকভাবে ছিল আরও পিছিয়ে। এই পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্যই ছিল তার সাহিত্য সাধনা, সাংবাদিকতা ইত্যাদি।

হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে উভয় সম্প্রদায়ের নারীরা ছিল অনেকটাই অবরুদ্ধ। বিশেষ করে পর্দা প্রথার নামে মুসলিম মেয়েরা ছিল নিগৃহীত। ডা. লুৎফর রহমানের হৃদয়ে এ অবহেলিত নারী জাতির জন্য ছিল অপরিসীম ভালোসা। তিনি চরিত্রহীন মেয়েদের ভালো পথে আনার জন্য, সুস্থজীবনে ফিরে আসার জন্য নারীতীর্থ নামে একটি আশ্রম পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অন্যদিকে তাদের জবিনের করুণ কাহিনী, অন্ধকার জীবনের গাঁথা তুলে ধরার জন্য তিনি সম্পাদনা করতেন ‘নারী শক্তি’ নামে একটি পত্রিকা। 

সব মিলিয়ে ডা. লুৎফর রহমানের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল মানবজাতির জন্য কল্যাণের পথ বাতলে দেয়া। তিনি আমৃত্যু তার কলম চালিয়েছেন সুন্দরকে তুলে ধরার জন্য। এসব করতে গিয়ে তিনি অনেকের কাছেই অপ্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি তার পিতা ময়েনউদ্দীন জোয়ারদারও তাকে ভুল বুঝেছিলেন। আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত করা হয়। যে কারণে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাকে ধুকে ধুকে মৃত্যুকে স্বাগত জানাতে হয়েছিল। অর্থকষ্টের কারণে তার সমস্ত পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়, নারীতীর্থ, নারী শক্তি বন্ধ হয়ে যায়। যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে বিনাপথে, বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে একদিন মৃত্যুকে আলিঙ্ঘন করেন। শেষ জীবনে তার আর্থিক কষ্ট এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, তিনি লেখার জন্য কাগজ কিনতে পারতেন না, তাই তিনি ঠোঙা ইত্যাদি সংগ্রহ করে তার অপর পিঠে লিখতেন। জানা যায়, এমন প্রচুর লেখা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

ডা. লুৎফর রহমান যখনই ইন্তেকাল করেন (৩১ মার্চ ১৯৩৬ খৃ.) তখন তার সন্তানেরা ছিল সবাই শিশু। বড়জনের বয়সই ছিল ১১/১২ বছরের মত। স্ত্রী ছিলেন শিশু সন্তানদের নিয়ে দিশেহারা। অন্যদিকে পারিবারিক পরিবেশ ছিল তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ বৈরী। যে কারণে লুৎফর রহমানের অপ্রকাশিত লেখালেখি সংরক্ষিত হয়নি। অপরদিকে প্রকাশিত লেখা সাধারণত কলকাতার পত্র-পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল, যেগুলো তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না। যে কারণে ডা. লুৎফর রহমানের রচনাসমূহ আজ পর্যন্ত সঠিকভাবে সংগৃহীত হয়নি। বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে ৩ খন্ডে লুৎফর রহমান রচনাবলী প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও ১ম খন্ড (১৯৭২) প্রকাশিত হওয়ার পর অন্য দুটো খন্ড আর আলোর মুখ দেখেনি। ফলে পাঠকের কাছে আজ পর্যন্ত লুৎফর রহমানের লেখার সিংহভাগই অধরাই থেকে গেছে। বিষয়টি জাতির জন্য নিঃসন্দেহে অকল্যাণকর। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ডা. লুৎফর রহমান রচনাবলী দিশা দিতে পারে এ বিশ্বাস সামনে রেখে বাংলা একাডেমশীর মত প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে এসে পুনঃউদ্যোগ নেয়া উচিত তা প্রকাশ করার।

মিডিয়া বা চলচ্চিত্রের মানুষের প্রতি হ্যাপির আহ্বান

happy amatullahবর্তমানে যারা মিডিয়াতে/চলচ্চিত্রে কাজ করছেন বা যারা করতে চাচ্ছেন এই লেখাটা তাদের জন্য।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু। দুনিয়ার যত মুসলিম বোন আছে সবাইকে আমি নিজের বোনই মনে করি। আমার বোন যখন ভুল কিছু করবে বা করতে চাইবে আমি নিশ্চয় তাকে হাসিমুখে সেই অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারবো না। আমার বলাটা তো আমাকে বলতেই হবে। শোনা না শোনা, মানা না মানা এটা তো যার যার বিষয়। কেউ ইচ্ছা করে আগুনে ঝাঁপ দিতে চাইলে আমি আটকাতে তো পারব না। এটা বলতে পারবো শুধু, এই আগুণ ধংস করে দেবে, সহ্য করা যাবে না। তবুও জেনেশুনে কেউ ঝাঁপ দিলে সেটা তার জিম্মাদারি।

কোরআনে নারীদের জন্য আলাদা একটি সূরা “আন নিসা”! আল্লাহু আকবার! কত বড় সম্মান! নারীর যে সম্মান ইসলামে আছে যা আর কোনো ধর্মে নেই। নারীরা খুব দামী। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল তা পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন।সুবাহানআল্লাহ!

আর আমরা আজকে বেপর্দা হয়ে সম্মান অর্জন করার চেষ্টা করছি।মিথ্যা সম্মানের পেছনে ছুটে মরছি।একটু চিন্তা করি, ধরলাম আমি/আপনি অনেক বড় নায়িকা হলাম, চলচিত্রে সর্বোচ্চ সম্মান অস্কার পেলাম। প্রচুর টাকা হলো।সারা পৃথিবীর মানুষের (মুমিনদের কাছে না) কাছে আইডল হলাম। আমাকে/আপনাকে এক পলক দেখার জন্য জীবন দিতেও রাজি অনেকে। প্রচুর ক্ষমতা হলো।এবং কোনো না কোনো দিন মরে গেলাম। তারপর?

ভাবতে পারেন? অন্ধকার কবরটাতে কেউ একটা লাইট জ্বালানোরও ক্ষমতা রাখে না। এত দামী দামী পোশাক পরতেন আপনি, সেই আপনার পোশাক হবে শুধু সাদা কাফনের কাপড়। কোথায় যাবে সম্মান? কোথায় থাকবে ক্যারিয়ার? কোথায় থাকবে হাজার হাজার, লাখ লাখ, কোটি কোটি ভক্তরা? তারা কি আপনাকে আজাব থেকে বাঁচাতে পারবে?

হযরত আবু সাইদ খুদুরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, অবশ্যই নাফরমান অর্থাৎ (বে নামাজি, বেপর্দা) নারীদের জন্য কবরে ৯৯ টি বিষাক্ত সর্প (সাপ) নির্ধারণ করা হয়। সেগুলো তাকে কেয়ামত পর্যন্ত কামড়াতে ও দংশন করতে থাকবে।যদি তাদের মধ্যে হতে কোন একটি সাপও পৃথিবীতে নিঃশ্বাস ফেলতো তাহলে জমিনে কোনো সবুজ তৃণলতা বা উদ্ভিদ জন্ম নিত না।(দারেমী) আর ইমাম তিরমিযী ও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন তবে ৯৯ এর স্থলে ৭০ এর কথা বলেছেন। (মেশকাত, হাদীস নং ১২৬)

আর জাহান্নামের কঠোর শাস্তি তো আছেই। পর্দা করাকে আমরা অমর্যাদা মনে করি। আফসোস! আমরা কোনো দামী জিনিস রাস্তাঘাটে খোলামেলা ভাবে নিয়ে চলি? দামী দামী গহনার জায়গা কেন তালাবদ্ধ আলমারি হয়? কেন শোপিস করে রাখি না? কেন? উত্তর নিজেরা খুঁজে দেখি। আমরা তো অনেক বেশি দামী কোনো জিনিসের সাথেও তুলনা করার মত না।আজ অবস্থা এমন যে এসবের সাথেও উদাহরণ টানতে হয়! আমরা নিজেরা নিজেদের এই অবস্থায় টেনে এনেছি।

আমরা একটা সাপ দেখলেই ভয়ে শেষ হয়ে যাই।সেই সাপের সৃষ্টিকর্তাকে ভয় পাই না? আমরা লিফটে কিছুক্ষণ আটকে থাকলে আমাদের অবস্থা কি হবে তা আল্লাহ জানেন।আর কবর কেমন হবে? নিশ্চিত কেউ সেখানে কোনো সাহায্য করতে পারবে না। একমাত্র আমল ছাড়া।

আমরা নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করি, আল্লাহ বলেছেন ঢেকে রাখতে! আমরা প্রেম (হারাম প্রেমকেও জিনা বলা হয়েছে, শারীরিক সম্পর্ক হোক বা না হোক) করি, আল্লাহ বলেছেন জ্বিনা না করতে! আমরা পুরুষদের মত পোশাক পরি, আল্লাহ বলেছেন আমরা যেন পুরুষদের সাদৃশ্য গ্রহণ না করি! আমরা সকালে নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে থাকি, আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। আরও অসংখ্য জিনিস আছে।আমরা প্রতিনিয়ত আল্লাহর অবাধ্যতা করছি। সীমালঙ্ঘন করে যাচ্ছি।

এই দুনিয়ায় কেউ চিরদিন বেঁচে থাকতে পারবে না।আমিও না আপনিও না। যে দুনিয়া আমাদের জন্য অনন্তকাল বসবাসের জায়গা সেই জায়গার জন্য কি প্রস্তুতি নিচ্ছি? নাচ গানের তালিম? কোনো কাজে আসবে না বোন। ধ্বংস হয়ে যাব। আফসোস করব দুনিয়াতে আবার এসে আমল করার জন্য, আল্লাহর হুকুম মেনে চলার জন্য, কিন্তু সেটা কেবলই আফসোস। দুনিয়াতে আর আসা সম্ভব না। এত অল্প সময়ের অশ্লীলতার ঘোর কেটে যাবে যখন মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়াবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?সেই পর্যন্ত অপেক্ষার ফলাফল কি, তা কি এখনো বুঝতে পারছি না?

মৃত্যুর কোনো সময় নির্ধারিত নেই। যখন তখন মরণ হতে পারে। কালকে ভাল হবো এমন চিন্তা তো তারাই করবে যারা প্রকৃত মূর্খ।আর কত মানুষ তো এমনও চিন্তা করে রাখে যে, বয়স হলে পুরোপুরি ধর্ম মেনে চলবো! আহা! যদি একটু বুঝতো তারা! কবরে অনেক মানুষ এমন আছে যারা এমন ভেবেছিল তাদের কালকে আর আসেনি, বার্ধক্যও আসেনি। তার আগেই চলে গেল তওবা না করে।আল্লাহর নাফরমানির মধ্য দিয়ে। চিন্তা হয় না বোন? শুধু চিন্তা করলেই তো হবে না।তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসি ইনশাআল্লাহ!

(নাজনীন আক্তার হ্যাপির ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

একটু না হয় কষ্ট ই সই!

বুয়েট থেকে পাশ করে কিছু কারনে আমার দেশে থাকতে হলো। আমার মা বাবা কে ছেড়ে যাওয়া টা সম্ভব ছিলো না ওই সময়। অনেকে হায়ার স্টাডিজ এর জন্য বিদেশ চলে গেলো। আবার আমরা বন্ধু রা কেউ কেউ বাংলাদেশে রয়ে গেলাম। আমি পাশ করার সাথে সাথেই একটা চাকরী পেয়ে গেলাম। যদি ও ঢাকার বাইরে। আমার যথেষ্ট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বাবা একপ্রকার জোর করেই পাঠালেন। বাবা একটা কথা ই বল্লেন, মিল কারখানায় কিছু দিন কাটিয়ে আসো, অনেক এক্সপেরিয়েন্স হবে। মানুষ ঠেকে শেখে, তুমি ও ঠেকে শিখবা। বাবার আদেশ শিরোধার্য, চলে গেলাম টাঙ্গাইলের এক স্পিনিং মিলে।

প্রথম প্রথম আমার কান্না চলে আসতো। অসহ্য কষ্ট। প্রচন্ড গরমে টানা আট ঘন্টা ডিউটি। তাও আবার শিফটের চাকুরী। নাইট শিফট মানে রাত ১০ টা থেকে ভোর ৬ টা। আমি ছিলাম প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার। স্পিনিং মিলে তুলা থেকে ইয়ার্ন তৈরী হয়। এর প্রোসেস বেশ লম্বা। আমি ছিলাম রিং স্পিনিং সেকশনে। সবচেয়ে যন্ত্রণাময় সেকশন। আকাশে বাতাসে তুলার আশ উড়ছে। নাক মুখ বন্ধ হয়ে আসে। আর কাজ ছিলো শ্রমিক দের সাথে। তাও আবার আমার সেকশনে ৪৫ জন শ্রমিক। এর মধ্যে বেশীর ভাগই মেয়ে। সবচেয়ে যন্ত্রণা ছিলো এদের ঝাড়ি মারা যেতো না। বকা দিলে ই ঘাড়ত্যাড়া করে গ্যাট ধরে থাকবে। আর যেহেতু কন্টিনিউয়াস প্রসেস, কাজে একটু ঢিলা দিলে পুরা প্রসেসে বারোটা বেজে যায়। আমি কূল কিনারা না পেয়ে চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করলাম। আমার দুঃস্বপ্ন ছিলো রিং স্পিনিং সেকশনের মহিলা শ্রমিক গুলা। মাঝে মাঝে সিনিয়র কলিগ দের সাথে কথা বলতাম। উনারা বিভিন্ন টিপস দিতেন। প্রথমত টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক রা বান্দরের মতো। বেশী আস্কারা দিলে মাথায় উঠে উকুন বাছা শুরু করবে, উকুন না পেলে চুল টেনে ছিড়বে। সো আস্কারা দেয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত এরা জন্মই হইসে কথা না শুনার জন্য। এদের শায়েস্তার উপায় একটা ই। কাজ থেকে বের করে দুই তিন দিন ঘুরানো। মিল কারখানায় এল,ডব্লিউ,পি নামক শাস্তি আছে। যার মানে লিভ উইথআউট পে। সহজ বাংলায় ছুটি নিয়া বাতাস খা, বেতন পাবি না। এই পদ্ধতি তে এরা ঘায়েল।

আমি চালু করলাম এই পদ্ধতি, ম্যাজিকের মতো কাজ হলো। মাস দুয়েক পর আমার জব ভালো লাগা শুরু করলো। এদের সাথে দা-কুমড়া সম্পর্কের অবসান ঘটলো। আমি একটা জিনিস বের করলাম, এদের আই,ডি নাম্বার ধরে না ডেকে নাম ধরে ডাকলে খুব সন্মানিত বোধ করে। আমি ধীরে ধীরে ৪৫ জনের নাম মুখস্ত করে ফেল্লাম। আসমা, জমিরন, রাহেলা, হনুফা, তসলিমা, ঝর্না, শিরিন, লাভলী… এক সময় এদের সাথে গল্প করে এমন এক অবস্থা হলো, আমি কোনো অর্ডার দিলে এরা এক সাথে তিন জন ছুটে আসে, কে কাজ টা করবে। এক দিন আমার শিফটে প্রোডাকশন টার্গেট ছিলো ৭ টন। মোটামুটি অনেক বেশী। টার্গেট ফিল আপ না হলে ঝামেলা লেগে যাবে। কারন কাল এম,ডি নিজে প্রোডাকশনের সাথে মিটিং এ বসবে। আমি নতুন মানুষ, এই অবস্থায় আমি যদি টার্গেট অ্যাচিভ করতে না পারি, আমার ব্যাপারে সবাই প্রশ্ন তুলবে। আর টেক্সটাইল মিল মানে ই অনেক রকম পলিটিক্স, যাতে বলি হয় আমার মতো নতুন ইঞ্জিনিয়ার গুলো।

সেই দিন টা আমার মনে আছে। প্রচন্ড বৃষ্টি ছিলো। এর উপর নাইট শিফট। আমি ফ্লোরে গিয়ে দেখি আগের শিফট অনেক কাজ বাকী রেখে চলে গেছে। আর আমার শিফটে ৪৫ জনের যায়গায় ৩২ জন ওয়ার্কার এসেছে। আমার হাত পা অসাড়। বৃষ্টির কারনে অনেক ওয়ার্কার আসে নাই, এই ব্যাপারে কিছু বলার নাই। আমি আগের শিফটের বাকী কাজ শেষ করতেই ১ ঘন্টা খেয়ে ফেল্লাম। এরপর ডাক দিলাম আসমা কে। অনেক করুণ কন্ঠে বল্লাম, “আজ সাত টন প্রোডাকশন দিতে হবে। এমন এক দিনে তোমাদের অনুরোধ করলাম, যেই দিনে লোক নাই, সময় ও নাই। কাজ না করতে পারলে তোমাদের কোনো সমস্য নাই, কারন কাজ টা এই কয় জন মিলে করা সম্ভব না আমি জানি। শুধু মনে কইরো, আজ ৩২ না, ৩৩ জন ওয়ার্কার, আমি সহ।”

আমার কথা শুনে আসমা বল্লো, “স্যার, আইজ সাড়ে সাত টন নামামু, আপনে আমাগোর উপ্রে ছাইড়া দেন, এক এক জন দুই টা কইরা লাইন দেখুম। (সাধারনত এক ওয়ার্কার এক লাইন করে দেখে, মোট ছিলো ৪০ লাইন)

সেই রাতে আমি ও নিজের হাতে ববিনের ট্রলি ঠেলেছি। নিজের হাতে রোভিং (ইয়ার্ন যা থেকে তৈরী হয়) লোড করেছি। আর আমার সেই ৩২ জন ওয়ার্কার? মাঝে টিফিন ব্রেকে ওরা খেতেও যায় নি কেউ! ভোর পাচ টা চল্লিশে আমাদের পৌনে আট টন সুতা রেডী।

আমি বাক্য হারা। হনুফা আমাকে বলে, “স্যার আপনের অসন্মান হইবো, এই টা কহনো হইবো না।”

আমার চাকুরী জীবনের টিম মেম্বার এই পঁয়তাল্লিশ জন অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত শ্রমিক। যারা মাঝে মাঝে আমার জন্য পিঠা, পায়েস রান্না করে নিয়ে আসতো। কেউ কেউ গাছের আম, নারিকেল অথবা কামরাঙ্গা ব্যাগ ভরে নিয়ে আসতো। বিনিময়ে তাদের প্রত্যাশা ছিলো একটু মমতা, একটু কোমল গলায় কথা। টেক্সটাইল মিলের ওয়ার্কারদের যে কী পরিমান কষ্ট করতে হয়, তা কেউ না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। এদের কেউ কেউ নিজের প্রচন্ড জ্বর, বাচ্চার অসুখ রেখে কাজ করতে আসে। কেউ কেউ না খেয়ে আসে। কেউ কেউ একটু পয়সা বাচানোর জন্য টিফিন খায় না। কারো কারো এতো বেশী কষ্ট যে নিজের কষ্ট কে হাস্যকর মনে হয়।

আমি এর হয়তো কিছুই জানতাম না। জেনেছি এদের সাথে মিশে।

রাশেদা, ও পাচ নম্বর মেশিনে কাজ করতো। চুপচাপ মেয়ে। কাজে খুব দক্ষ। জানলাম ও খুব ভালো ছাত্রী। এস,এস,সি দেবে কিছু দিন পর। আমার কাছে খুব ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে এলো। “স্যার আমি পরীক্ষা দিমু, মাঝে পরীক্ষার দিন গুলান ছুটি লাগবো।”

আমি হেসে ফেল্লাম। ওকে পাচশ টাকা দিয়ে বল্লাম, “দোয়া করি, ভালো মতো পরীক্ষা দাও, আর এই টাকা টা দিয়ে পছন্দ মতো কিছু কিনে খেও, তোমার ছুটি পাশ”

বোকা মেয়ে টা কেঁদে ফেল্লো। আমি চুরান্ত পর্যায়ের অপ্রস্তুত। হয়তো এতো সামান্য স্নেহ টুকু ও কারো কাছ থেকে পায়নি।

তিন দিন পরই রাশেদা কাজে এলো। আমি তো খুব ই অবাক। আমাকে দেখে ও আড়ালে চলে গেলো। যা জানলাম তা হলো, রাশেদার স্বামী ওকে এস,এস,সি পরীক্ষা দিতে দেবে না। কারন বেশী শিক্ষিত বউ থাকা অশান্তির কারন। কিন্তু রাশেদা জেদ করেছিলো। আর এই কারনে ওর শ্বাশুরী ওর পিঠে জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ চেপে ধরেছিলো। রাশেদার পরীক্ষা দেয়া হয় নি। এরপর থেকে রাশেদা পড়াশুনা বাদ দিয়েছিলো। ও এক বার আমাকে বলেছিলো ও নার্স হয়ে সবার সেবা করতে চায়।

হনুফা ছিলো খুব ই চঞ্চল একটা মেয়ে। ঠাশ ঠাশ কথা বলতো। কাজে ছিলো অসাধারন। ও মেটারনিটি লিভে যাবে। আমি ই সব পাশ করিয়ে জি,এম স্যার কে বলে অ্যাডভান্স টাকার ব্যবস্থা করে ওর হাতে তুলে দিলাম। যাবার সময় আমাকে সালাম করে গেলো। আমি যথারীতি অপ্রস্তুত! সে আমাকে বল্লো, “স্যার আমার বাচ্চা রে দেখবার আইবেন! আমার বাড়ি এই থন এক কিলো। না আইলে আমি রাগ করুম। আপনের আইতেই হইবো”

আমি বুক টা কেমন করে উঠলো। আমি এতো ভালোবাসার যোগ্য না। খুব সাধারন একটা ছেলে। এরা আমাকে অনেক বেশী উপরে স্থান দিয়েছে।

ঠিক সময় মতো ও এলো। ওর বাচ্চা টা কে দেখতে যাওয়া হয়নি। হনুফা কে দেখে আমি বেশ একটা ভয় ই পেলাম। না জানি কি বলে!

নাহ! ও কিছুই বল্লো না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ওর বাচ্চার খবর। ক্লান্ত দৃষ্টি তে তাকালো। বাচ্চা টা কে নিয়ে ও বাবার বাড়ি চলে এসেছে। ছেলে বাচ্চা হয় নাই বলে ওর শ্বশুর বাড়ির মানুষ ওকে লাথি মেরে ওই রাতেই বাচ্চা সহ বের করে দিয়েছিলো যে রাতে ওর কোল জুড়ে বাচ্চা টা এসেছিলো। ওর বাচ্চাকে বুকে নিয়ে তিন চার কিলো হেটে ওর বাবার বাড়ি গিয়েছিলো। ঠিক তার তিন দিন পর হনুফার স্বামী আরেক টা বিয়ে করে। হনুফার স্বপ্ন ছিলো টাকা জমিয়ে স্বামীর জন্য একটা সাইকেল কিনবে। স্বামীর অফিস যেতে খুব ই সমস্যা হয়। সে ঐ চিন্তায় প্রায় ই বিচলিত থাকতো।

ঝর্ণা তিন দিন ধরে কাজে আসে না। নাইট শিফটে মাঝে মাঝে ই ওয়ার্কার রা হুট হাট আসে না। তিন দিন পর বিধ্বস্ত ঝর্ণা কাজে এলো। অন্যদের কাছ থেকে যা শুনলাম তাতে আমার গা টা গুলিয়ে গেলো। তিন দিন আগে ও ফ্যাক্টরি তে আসছিলো, পথে এক যুবক তার দুই বন্ধু মিলে তাকে জোড় করে টেনে নিয়ে পাশবিক অত্যাচার চালায়।

সে কাউ কে ঘটনা বলে নাই ভয়ে, কিন্তু ঘটনা সবাই জেনে যায়। এরপর পুলিশের কাছে তো বিচার যায় ই নাই বরং “অসভ্য” চালচলনের জন্য ঝর্নাকে সবার সামনে মাফ চাইতে হলো। ঝর্ণা এখন পাথর হয়ে গেছে। ফড়িং এর মতো উড়ে উড়ে যে কাজ করতো, সে হঠাৎ করেই যেনো বুড়িয়ে গেছে।

ঝর্নার কিছুদিন পর বিয়ে হবার কথা ছিলো। সংসার করার কথা ছিলো। যে যুবক তার বন্ধু দের নিয়ে পশুর মতো কাজ টা করেছিলো, সেই পশু টার সাথেই তার বিয়ে হবার কথা ছিলো।

এই প্রতি টা ঘটনা দিনের মতো সত্য আর প্রতি টা ঘটনার পর এরা সবাই পেটের দায়ে আবার কাজে ফিরে এসেছে। আবার এরা পরম মমতায় সুতা বানিয়েছে, মেশিনে ববিন লাগিয়েছে। ওদের চোখের জল মিলে মিশে গেছে প্রতিটা সুতার সাথে। যে সুতা রপ্তানি হয়েছে এইচ,এন,এম, ভার্সাচে, পিয়েরে কার্ডিন, টমি হিল্ফিগারের মতো নামীদামী ব্র‍্যান্ডে।

সেই ব্র‍্যান্ডের শার্ট পড়ে আমরা আমাদের স্ত্রীর সাথে, প্রেমিকার সাথে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করি। আর রাশেদা, হনুফা ঝর্না রা সুতা বানিয়ে যায়।

আমার আজ অনেক কষ্টেও কষ্ট লাগে না। অনেক দুঃখেও চোখে পানি আসেনা। কারন আমাদের দুঃখ বিলাস ওদের হাসায়। আর ওদের কষ্ট আমাদের অবাক করে।

(c) Sabbir Emon, Mohammadpur, 2015