আর্কাইভ

Archive for the ‘ধর্মীয়’ Category

হেরা পাহাড় ও তার গুহা

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

hera mountainপ্রথমত: পাহাড়টির পরিচয়:

মসজিদে হারাম থেকে পূর্ব-উত্তর কোণে ত্বায়েফ (সায়েল) রোডে মসজিদে হারাম হতে ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পার্শ্ববর্তী স্থান থেকে তার উচ্চতা ২৮১ মিটার, তার চূড়া উটের কুঁজের মতো এবং তার আয়তন হলো ৫ কিলোমিটার। তার কিবলার দিক বিস্তৃত ফাঁকা অংশ, যেখান থেকে মসজিদে হারাম দেখা যায়। গুহায় দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ মিটার।[1]

দ্বিতীয়ত: এর হাকীকত বা রহস্য:

হেরা পাহাড়, সেই পাহাড় যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ইবাদতের জন্য নির্জনতা অবলম্বন করতেন। সেখানে জিবরীল আলাইহিস সালাম অবতরণ করেন এবং সে হেরা গুহায় সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

﴿ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ ١ خَلَقَ ٱلۡإِنسَٰنَ مِنۡ عَلَقٍ ٢ ٱقۡرَأۡ وَرَبُّكَ ٱلۡأَكۡرَمُ ٣ ٱلَّذِي عَلَّمَ بِٱلۡقَلَمِ ٤ عَلَّمَ ٱلۡإِنسَٰنَ مَا لَمۡ يَعۡلَمۡ ٥﴾ [العلق: ١،  ٥] 

“তুমি পড় তোমার সেই রব্বের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড থেকে। পড় এবং তোমার রব্ব মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে (এমন জ্ঞান) যা সে জানতো না।” [সূরা আল-‘আলাক, আয়াত: ১-৫]

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, প্রথম দিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অহী প্রাপ্ত হন নিদ্রাযোগে সঠিক স্বপ্নের মধ্যে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা প্রত্যুষের আলো সদৃশ স্পষ্ট হয়ে দেখা দিত। অতঃপর তাঁর নিকট নির্জন ও নিঃসঙ্গ পরিবেশ পছন্দ হয়। কাজেই তিনি একাধারে কয়েক দিন পর্যন্ত নিজ পরিবারে অবস্থান না করে হেরা পর্বতের গুহায় নির্জন পরিবেশে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন। আর এই উদ্দেশ্যে তিনি প্রয়োজনীয় খাদ্যসমাগ্রী সাথে নিয়ে যেতেন। তারপর তিনি তাঁর জীবন সঙ্গিনী মহিয়সী বিবি খাদীজার নিকট ফিরে এসে আবার কয়েক দিনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী নিয়ে যেতেন। এভাবে হেরা গুহায় অবস্থানকালে তাঁর নিকট প্রকৃত সত্য (আল্লাহর অহী) সমাগত হয়। (আল্লাহর) ফিরিশতা জিবরীল আলাইহিস সালাম সেখানে আগমনপূর্বক তাঁকে বললেন, আপনি পড়ুন! রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না! তিনি বললেন, তখন আমাকে ফিরিশতা জিবরীল (আলাইহিস সালাম) জড়িয়ে ধরে এত কঠিনভাবে আলিঙ্গন করলেন যে তাতে আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন! তখন আমি পূর্বের ন্যায় বললাম, আমি তো পড়তে জানি না! তখন তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে  জড়িয়ে ধরে এত কঠিনভাবে আলিঙ্গন করলেন যে তাতে আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে  ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন! আমি পূর্বানুরূপ তখনও বললাম,  আমিতো পড়তে জানি না। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে তৃতীয়বার আলিঙ্গন করে ছেড়ে দিলেন। তারপর তিনি বললেন:

﴿ ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ ١ خَلَقَ ٱلۡإِنسَٰنَ مِنۡ عَلَقٍ ٢ ٱقۡرَأۡ وَرَبُّكَ ٱلۡأَكۡرَمُ ٣ ﴾ [العلق: ١،  ٣] 

“আপনি আপনার রব্বের নামে পড়ুন, যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাঁধা রক্ত হতে। আপনি পড়ুন ! আর আপনার রব্ব মহামহিমান্বিত! [সূরা আল-‘আলাক, আয়াত: ১-৩][2]

এ সেই পাহাড় যাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন:“স্থির হও হে হেরা।”

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হেরা পাহাড়ে অবস্থান করছেন এমন সময় পাহাড় নড়া-চড়া শুরু করে, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: হে হেরা স্থির হও, তোমার উপর তো একজন নবী, এক সিদ্দীক ও শহীদ রয়েছেন” সে সময় তার উপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর, উমার, উসমান, আলী, ত্বালহা, যুবায়ের ও সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম উপস্থিত ছিলেন।[3]

এ হেরা পাহাড়ের চূড়ায় যে গুহা রয়েছে, অহী অবতীর্ণ হওয়ার পর, এমনকি মক্কা বিজয়ের পর, কিংবা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হজের সময় বা তাঁর কোনো সাহাবী কখনও আসা-যাওয়া করেছেন বলে কোনো দলীল-প্রমাণ নেই।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: হেরা গুহায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হওয়ার পূর্বেই নির্জনতা গ্রহণ করত: ইবাদত করেন। অতঃপর আল্লাহ যখন তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালাত দ্বারা সম্মানিত করলেন, সৃষ্টির ওপর তাঁর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য ফরয করে দিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনেন সেই সর্বোত্তম সৃষ্টি মুহাজিরগণ মক্কায় বেশ কিছু বছর অবস্থান করেন; কিন্তু সে সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বা তাঁর কোনো সাহাবী হেরা পাহাড়ে যান নি। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করেন ও চারবার উমরা করেন। অথচ সেগুলোর কোনোটিতে না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, না তাঁর কোনো সাহাবী হেরা গুহায় আগমন করেন, না সেখানে তারা যিয়ারত করেন, না মক্কার পার্শ্ববর্তী কোনো স্থানের কোনো অংশ তাঁরা যিয়ারত করেন। অতএব, সেখানে মসজিদে হারাম, সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থান, মিনা, মুযদালিফা ও ‘আরাফাত ব্যতীত আর কোনো স্থানে কোনো ধরণের ইবাদত নেই।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীন ও অন্যান্য মহান উত্তরসূরীগণ অতিবাহিত হয়েছেন তারা হেরা গুহা বা এ ধরণের অন্য কোথাও সালাত বা দো‘আর জন্য গমন করেন নি।

আর সর্বজনবিদিত যে, যদি তা শরী‘আতসম্মত হত বা এমন মুস্তাহাব আমলের অন্তর্ভুক্ত হত যাতে আল্লাহ নেকী দিবেন তবে এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষ অপেক্ষা বেশি জানতেন ও সাহাবীগণও এ সম্পর্কে জানতেন। আর সাহাবীগণ ছিলেন নেকীর কাজসমূহের ক্ষেত্র সর্বাধিক অবগত ও আগ্রহী। তা সত্ত্বেও যেহেতু তারা এ সবের কোনো কিছুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন নি, তাতে বুঝা যায় যে, এ পর্বত বা এ জাতীয় কোনো স্থানে গিয়ে ইবাদত করা হচ্ছে সেই সব নতুন নতুন আবিস্কৃত বিদ‘আতসমূহের অন্তর্ভুক্ত; যেগুলোকে তারা কোনো ইবাদত, নৈকট্য অর্জনের উপায় বা অনুসরণযোগ্য গণ্য করতেন না। সুতরাং যে সেগুলোকে কোনো ইবাদত, নৈকট্য অর্জনের উপায় বা অনুসরণযোগ্য গণ্য করল সে অবশ্যই তাদের হক পথের অনুসরণ পরিত্যাগ করে অন্য ভ্রান্ত পথের অনুসরণ করল এবং এমন নিয়ম-নীতি প্রবর্তন করল যার অনুমতি আল্লাহ প্রদান করেন নি।[4]

তৃতীয়ত: হেরা গুহায় কতিপয় হাজী দ্বারা যে সমস্ত বিদআত ও সুন্নাত বিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হয়:

হেরা পাহাড়ে কোনো কোনো হাজী বেশ কিছু বিদ‘আত ও সুন্নাত পরিপন্থী কার্যকলাপে পতিত হয়। আর তার কারণ হলো, এ পাহাড়ের পবিত্রতা ও ভিন্ন মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য আছে বলে তাদের ভ্রান্ত ধারণা, যার ভ্রান্ততা সম্পর্কে ইতোপূর্বে সতর্ক করা হয়েছে। হাজীগণ যেন এ সমস্ত বিদ‘আত ও কুসংস্কারে পতিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকে এজন্য নিম্নে তার কতিপয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হলো:

১। নেকীর উদ্দেশ্যে হেরা পাহাড় যিয়ারত করা,তার উপর আরোহণ ও তার পবিত্রতা ও ভিন্ন মর্যাদার বিশ্বাস পোষণ করা।

২. হেরা পাহাড়কে কিবলা করে উভয় হাত উঠিয়ে খুব করে দো‘আ করা।

৩. সেখানে সালাত আদায় করা।

৪. তার উপর বিভিন্ন নাম বা অন্য কিছু লেখা-লেখি করা।

৫. সেখানে ত্বাওয়াফ করা।

৬. সেখানকার গাছ-পালা ও পাথর দ্বারা বরকত গ্রহণ ও সেগুলোতে নেকড়া, সূতা বাঁধা।

৭. বিভিন্ন ভ্রান্ত বিশ্বাসে যেমন, যেন বার বার সেখানে আগমন করতে পারে। অমুক ব্যক্তি হজ করতে পারে, রোগ-ব্যাধি মুক্ত হয়, সন্তান প্রসব হয় না এমন মহিলার যেন সন্তান প্রসব হয় ইত্যাদি বিশ্বাসে ম্যাসেজ, কবিতা, চিত্র, নেকড়া ইত্যাদি স্থাপন করা, পয়সা দেওয়া।

এ ধরণের বিদ‘আত ও কুসংস্কার সেখানে ঘটে থাকে অথচ যে ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কোনো দলীল অবতীর্ণ করেন নি।

সমাপ্ত

[1] দেখুন: আল জামে আল-লাতীফ পৃ: ২৯৯ ইত্যাদি গ্রন্থ।

[2] সহীহ বুখারী: ১/৩, মুসলিম: ১/৯৭ নং ৪২২।

[3] সহীহ মুসলিম:৭/১২৮-৬৪০১।

[4] দেখুন: ইকতিদ্বাউস সিরাতিল মুসতাকীম:২/৩৩৩।

Source: IslamHouse.Com

বাংলাদেশে ২০১ গম্বুজের মসজিদ !

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

201 domes mosque mk1201 domes mosque mk2

উদার গণতন্ত্র ও মৌলবাদী ধর্মতন্ত্রের মহামিলন

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

শহিদুল ইসলাম : বাংলাদেশে সম্প্রতি সাম্প্রদায়িকতার যে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের অনেক ভালো ভালো কাজের দাবিকে যেন ব্যঙ্গ করছে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সবাই আশায় বুক বেঁধেছিল এই ভেবে যে, এবারে সাম্প্রদায়িকতার রাহুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। কিন্তু মানুষের সে আশা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে এ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা চলছে তা নতুন করে দেশবাসীকে পাকিস্তানি নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সরকার জিয়া, এরশাদ ও খালেদার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং আজকের পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, তাদের সেই রাজনীতিকে আরো শক্তিশালী করে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সেসব আক্রমণে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বর্তমান সরকারের ওপর তাদের আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেই আস্থার ফলে তারা তাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি আগলে নিজের দেশেই পড়ে ছিলেন। অনেকেই আজ তাদের জান-মাল-সম্মান বাঁচানোর জন্য দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এভাবে চললে বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের মতো হবে। মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর মানুষ এখানে থাকতে পারবে না।

দুই. ইতিহাসে প্রমাণ আছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা না করলে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। সে রাষ্ট্রে মানবিক গুণাবলির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সভ্যতার সূচনালগ্নে একবার ও চৌদ্দশ খ্রিস্টাব্দের ইতালির রেনেসাঁর পর দ্বিতীয়বার জ্ঞানবিজ্ঞান-দর্শন চর্চার জোয়ার এসেছিল। দেখা যায় প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সূচনায় ধর্মীয় কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। কারণ গ্রিকদের কোনো ধর্মগ্রন্থ ছিল না। সেটাই ছিল প্রথম যুগের গ্রিকদের স্বাধীনতার প্রধান শর্ত। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বিউরি বলছেন,‘হোমারের কবিতা ছিল ইহজাগতিক, ধর্মীয় নয় এবং ধর্মগ্রন্থের তুলনায় সেগুলো নীতিহীনতা ও বর্বরতা থেকে মুক্ত। হোমারের কর্তৃত্ব ছিল অপরিসীম কিন্তু তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বের মতো বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই বাইবেলের সমালোচনার মতো হোমারের সমালোচনা কখনো বাধার সম্মুখীন হয়নি।’ বিউরি আরো বলছেন,‘স্বাধীনতার আর একটি অভিব্যক্তি ও শর্ত হলো যাজকতন্ত্রের অনুপস্থিতি। সেদিন পুরোহিত শ্রেণি কখনো-ই এতটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। তাই তারা নিজেদের স্বার্থে সমাজের ওপর নির্যাতন চালাতে পারেনি কিংবা ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিতে পারেনি।’ তখন পুরোহিত শ্রেণি রাষ্ট্রের কর্মচারী। রাষ্ট্রের অধীন।

অবিকল একই ঘটনা ঘটে রেনেসাঁর পর। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও শিল্প-বিপ্লবের পর ইউরোপে প্রবল প্রতাপশালী পুরোহিত শ্রেণির শক্তি ধ্বংস করা হয় এবং ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা হয়। খ্রিস্টধর্ম টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার ফলে এটা সম্ভব হয়। তবে আদি সেই গ্রিক সমাজ মাত্র তিনশ বছর টিকেছিল। খ্রিস্টধর্ম উত্থানের পর পশ্চিমে দীর্ঘ এক হাজার বছরের অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হয়। এদিকে উনিশ শতকে রেনেসাঁর জয় নিশ্চিত হয়। ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ইউরোপ জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাঝে ইসলামের আবির্ভাবের পর ৯ম থেকে ১১ শতকে ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় জোয়ার আসে। সে জোয়ারও তিনশ বছরেই শুকিয়ে যায়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় তাহলো ইসলামি বিশ্বে যারা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা কেউই সূক্ষ্ম বিচারে মুসলমান ছিলেন না। ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের ওপর আক্রমণ তাই প্রমাণ করে। তারা সবাই ছিলেন যুক্তিবাদী যা ইসলামে কেবল নয় সব ধর্মে নিষিদ্ধ। আবার আধুনিক সভ্যতায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সময়কালও দুই/তিনশ বছরের বেশি নয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পশ্চিমে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে এবং বর্তমানে পশ্চিমে মৌলিক কাজের পরিমাপ সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। কারণ আবার পশ্চিমে বিশেষ করে আমেরিকায় ধর্মীয় ভাবাদর্শের নতুন করে উত্থানের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকার সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর ট্রাম্পের ঘোষণায় সেটাই প্রমাণ করে। তিনি পুরোহিতদের দাবি পূরণে বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সংসর্গ, সমলিঙ্গ-বিবাহ ও গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে নির্বাহী আদেশ দিতে যাচ্ছেন। সবার ধারণা আমেরিকান সাম্রাজ্যের দিন শেষ হতে চলেছে।

রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে বেগম রোকেয়াও ভেবেছিলেন। ১৩১১ সালে ‘নবনূর’ পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন,‘যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন।’ এটা কেবল নারীর ক্ষেত্রে সত্য নয়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্যও সত্য। নোবেল বিজয়ী একমাত্র মুসলিম বিজ্ঞানী প্রফেসর সালাম বলেছেন,‘ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ধারা সবচেয়ে দুর্বল।’ চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ মুসলিম পণ্ডিত ইবনে খলদুন। তারপর ইসলামি বিশ্বে আর কোনো মনীষীর জন্ম হলো না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পদের কোনো অভাব নেই। তারা বিশ্বের উচ্চতম ভবন নির্মাণ করে গর্ব প্রকাশ করেন। আলোয় ঝলমল শহর তৈরি করে বিদেশিদের বেড়ানোর সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্বমানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেননি। মোগল বাদশারা ‘তাজমহল’ তৈরি করেছেন, কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি। যুক্তিবাদ ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে মুসলমান হুজুরদের সে মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই প্রফেসর সালামকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিয়েছে আর মিসরের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিম মাহফুজকে মুসলমান বলে স্বীকারই করে না; বরং ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ গড়ে ইসলামের আদিযুগে ফিরে যেতে চাইছে মুসলমানরা।

তিন. বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমে উৎপাদিত সম্পদে আমরা মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছি। কিন্তু সে অর্জনে আমাদের মতো শহুরে অলস বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদদের অবদান কতটুকু? তাদের শ্রমের ওপরই আমরা জীবনযাপন করছি। অন্যের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে আমরা বিশ্বের কাছে বাহবা কুড়াচ্ছি। এই আত্মসাতেরই আর এক নাম ‘গণতন্ত্র’। আরো সূক্ষ্মভাবে বললে বলতে হয় ‘উদার গণতন্ত্র’। ‘ইসলামের’ নামে হুজুররা যে রাজনীতি করছে, আমরা ‘উদার গণতন্ত্রের’ নামে সেই একই রাজনীতি করছি। এখানেই ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মতন্ত্র’ এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছে। তাদের মিলনই বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানি কায়দায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাদের উপাসনালয় ভাঙা হচ্ছে, দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। হুজুরদের দাবি মেনে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। হুজুরদের নির্দেশে শিশুদের পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছে। এতে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা লাখ লাখ মূর্তি ভাঙলেও হবে না। তাই আজ প্রশ্ন উঠেছে, আমরা পাকিস্তান ভাঙলাম কেন? আমরা কি কেবল পাঞ্জাবি ধনীর জায়গায় বাঙালি ধনী তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আজ একজন হিন্দুকে তার বাড়ির মহিলাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, তাহলে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম কেন? পাকিস্তানি হামলাকারীর বদলে বাঙালি হামলাকারীর অভয়ারণ্য তৈরির জন্য? কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন? চার লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

চার. অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘উদার গণতন্ত্র’ তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে গেছে। এই গণতন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদ মাত্র আটজন মানুষ দখল করে নিয়েছে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির অধ্যাপক জন রালস্টোন সাওল একখানা বই লিখেছেন যার নাম দিয়েছেন ‘ভলতেয়ার্স বাস্টার্ডস’-ভলতেয়ারের জারজ সন্তান হলো আজকের গণতন্ত্র। ভলতেয়ারের সময় এই গণতন্ত্রের প্রভূত মূল্য ছিল। কিন্তু সম্পদের ওপর মানুষের অধিকার স্থাপনের আইন আজ সে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছে। আজ সারা বিশ্বে ‘উদার গণতন্ত্র’ ও মৌলবাদী ‘ধর্মতন্ত্রের’ মহামিলন ঘটে গেছে। তাই পৃথিবী আজ ক্রমান্বয়ে মানুষের বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। যে দেশ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে তাকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্থানে স্থাপন করতে পারবে, আগামী বিশ্বের পরিচালকের আসনে তারাই বসবে। ‘উদার গণতন্ত্র’ পৃথিবীতে শান্তির পরিবর্তে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের বিলাসী জীবনের ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রয়োজন মেটাচ্ছে। মানুষ প্রকৃতিকে দখল করেছে। প্রতিটি দেশের সংখ্যাগুরু স¤প্রদায়কে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দখল করেছে। জলবায়ু বিষাক্ত করে তুলেছে। মনে হয় বর্তমান সভ্যতা তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধীরে অথচ স্থির পায়ে এগিয়ে চলেছে।

শহিদুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ইসলামের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক কী?

অগাষ্ট 19, 2017 মন্তব্য দিন

wahhabistsইব্রাহীম মল্লিক সুজন  : মক্কা ও মদিনা বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র নগরী। এই দুটি শহরই সৌদি আরবে অবস্থিত। ইসলামের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যর নিদর্শন হিসেবে সৌদি আরব বিশ্বে অদ্বিতীয়। আধুনিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সৌদি রাজবংশ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। অনেকেরই জানার আগ্রহ: ইসলামের সঙ্গে এই রাজবংশের সম্পর্ক কী? বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল বাছিরের সঙ্গে কথা বলেছে চ্যানেল আই অনলাইন।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের ইতিহাস হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।ইসলামের সঙ্গে সৌদি রাজবংশেরও সম্পর্ক রয়েছে। তবে,সৌদি রাজবংশের উপর ইসলামের যে অর্পিত দায়িত্ব ছিল তা পালন করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে এই অর্থে যে তারা শুধু ওহাবিজমকেই পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন।

‘ওহাবিজমের পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের আরও যে মতধারা রয়েছে সেগুলোর সমন্বয় করে যদি এরকম হতো যে, বিশ্বের বিশিষ্ট ওলামায় ক্বেরাম যারা আছেন, তাদেরকে নিয়ে এগুলো গবেষণা করে তারা যদি আমাদের সত্যিকারের ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন, তাহলে তাদের প্রতি আমাদের যে অভিযোগগুলো আছে, তা থেকে তারা মুক্তি পেতেন।’

ড. আবদুল বাছির  বলেন: তারা (সৌদি রাজবংশ) শুধু চেয়েছেন তাদের একদেশ ভিত্তিক আদর্শকে (ওহাবিজম) সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে। সার্বিক অর্থে তাদের এই আদর্শ অনেকটা খণ্ডিত। তারা শুধু ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। তাদের রাষ্ট্রের যে নামকরণ তারা করেছে ‘কিংডম অব সৌদি আরবিয়া’ তা ইসলামের কোন নিয়ম বা বিধান মেনে করা হয়নি।এটি ইসলাম অনুসারে ঠিকও নয়। তারা যে সেখানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে রেখেছেন, এটিও ইসলামের কোন বিধানের মধ্যে পড়ে না।’

সৌদি রাজবংশ ঐতিহাসিকভাবেই অমুসলিমদেরকে সব সময় প্রাধান্য দিয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন: শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা অমুসলিমদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলেছে। সৌদি আরবের বর্তমান যে পতাকা রয়েছে তাতে আড়াআড়িভাবে দুটি তলোয়ার রয়েছে, যার একটি হচ্ছে সৌদ পরিবারের অন্যটি হচ্ছে ওহাবি পরিবারের। এই দুটোর সিম্বল হচ্ছে সেটি। তার মানে বোঝা যায় ধর্মকে ব্যবহার করে তারা রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে।

আবদুল বাছির  বলেন: রিয়াদের কাছে অবস্থিত দিরিয়া নামের একটি কৃষি বসতির প্রধান ছিলেন মুহাম্মদ বিন সৌদ। এই উচ্চাভিলাষী মরুযোদ্ধা ১৭৪৪ সালে আরবের বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের (যিনি ওয়াহাবী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বেশি পরিচিত)সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে ‘দিরিয়া আমিরাত’ গঠন করেন। তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে শিরক-বিদাত পালনের অভিযোগ এনে এই দুইজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করেন।

‘ওই দিরিয়া আমিরাতই বিশ্বের প্রথম সৌদি রাজ্য। মুহাম্মদ বিন সৌদ তার পুত্র আবদুল আজিজের সাথে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মেয়ের বিয়ে দেন। এভাবেই সৌদ পরিবার ও ওয়াহাবী মতবাদের মিলনযাত্রা শুরু হয়। ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ বিন সৌদের মৃত্যু হলে তার ছেলে আবদুল আজিজ দিরিয়ায় ক্ষমতাসীন হয়।’

তিনি বলেন: হঠাৎ করে মোহাম্মদ বিন সৌদ এবং মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের কাছে মনে হল, বর্তমানে (তখন) যে ইসলাম চলছে তা সঠিক ইসলাম নয়। সেখানকার শেখের সাথে তাদের কথা হল। তারা এ বিষয়ে একমত হলেন যে বিষয়টির রাজনৈতিক দিক একজন এবং ধর্মীয় দিক অন্যজন দেখবেন। ফলে দু’জনের একজন ধর্মীয় এবং আরেকজন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যুক্ত হলেন। তাদের মতাদর্শ তারা মক্কা-মদিনায় সারা পৃথিবী থেকে যাওয়া মুসলিমদের মধ্যে যদি ছড়িয়ে দিতে কাজ করতে থাকলেন। এই দুইজনের বোঝাপড়া অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে হয়েছিল।

‘একসময়ে তারা মক্কা-মদিনা আক্রমণ করে বসলেন। এরপর তারা রিয়াদ নামের স্থানটিকে তাদের রাজধানী করলেন। তুর্কিরা এতে ক্ষিপ্ত হল। তারা মিশরের মোহাম্মদ আলী পাশাকে বললেন যে তারা যে কাজগুলো করছে তা প্রতিহত করা দরকার।’

মোহাম্মদ আলী পাশা তার ছেলে ইসমাইলকে পাঠালেন উদীয়মান মতাদর্শকে বিতাড়িত করার জন্য। ইসমাইল এসে সেখান থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করলেন। নতুন মতাদর্শের (ওহাবিজম) ধারক ও বাহকরা যে জায়গা দখল করেছিলেন তা ছেড়ে তারা কুয়েতে পালিয়ে গেলেন।

১৯০১ সালে কুয়েত থেকে সৌদ পরিবারের সন্তান আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ খুব সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে প্রায় ১০০ জন যোদ্ধাসহ রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে পুনরায় রিয়াদ দখল করে নিলেন। তার এই রিয়াদ দখল করার পেছনে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের ধর্মীয় যে মতাদর্শ ছিল সেটি যারা অনুসরণ করতেন, তাদেরকে বলা হতো মুসলিম ব্রাদারহুড। এরা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদকে সহায়তা করেছিলেন। দুই গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে সৌদের শক্তি বেশ বেড়ে যায়।

‘১৯১৬ সালে ব্রিটিশ সরকার দেখল, এটি তো একটি উদীয়মান শক্তি এবং এটি যেহেতু তুরস্কের বিরুদ্ধে আর ব্রিটিশদের শত্রু ছিল তুরস্ক সুতরাং এই শক্তিকে যদি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া যায়, তাহলে ওরাই তুর্কিদের ধ্বংস করবে। তাহলে ব্রিটিশদেরকে নতুন করে কোন শক্তি প্রয়োগ করতে হবে না। বরং তাদের লাভই হবে। সেজন্য তারা রিয়াদ দখল করা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদকে মেনে নিয়ে সমর্থন দেয়।’

ওই বছরই তাদের গ্রহণ করা অঞ্চলকে স্বীকৃতি দেয় ব্রিটিশরা। নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্মের মধ্য দিয়ে তুরস্কের আধিপত্য খর্ব হয়। কিন্তু হিজাজে (মক্কা-মদিনা) তখন তুরস্কের শাসক ছিলেন শহীদ ইবনে হোসেন ইবনে আলী ইতিহাসে তিনি শরীফ হোসেন নামে বেশি পরিচিত। তুর্কির সুলতান আবদুল হামিদ তাকে হেজাজের শাসক করেছিলেন এই কারণে যে মহানবী (স.)র পরিবারের সাথে তার যোগসূত্র ছিল এবং তাকে যদি হেজাজের গভর্নর করা হয় তাহলে পশ্চিম বিশ্ব ও সৌদি আরবের মানুষরা মহানবীর পরিবারের বলে তার প্রতি সহানুভূতি দেখাবে । কিন্তু শরীফ হোসনের মনে মনে একটা উদ্দেশ্য ছিল যে তিনি তুরস্কের অধীনে এখানকার প্রশাসক না হয়ে তিনি বংশীয় যে প্রাধান্য সেটি অর্জন করবেন এবং এখানকার স্বাধীন শাসক হবেন।

ফলে তিনিও দেখলেন, এই মুহূর্তে স্বাধীন শাসক হওয়ার জন্য ব্রিটেনের সহযোগিতা বেশি দরকার।আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ এবং শরিফ হাসানের সঙ্গে ব্রিটিশদের যোগাযোগ হল। শরিফ হাসানের সঙ্গে হল প্রকাশ্যে দিনের বেলায়। আর আবদুল আজিজের সঙ্গে হল রাতের বেলায়।

ওহাবিজমের সমর্থনকারীরা কখনো চাইতো না কোন বিদেশি শক্তির সাথে আবদুল ইবনে আজিজের সঙ্গে কোন যোগাযোগ থাকুক। কারণ এটি তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে মেনে নেয়া কষ্টকর ছিল। এজন্য সৌদ যোগাযোগ করতেন রাতে এবং শরিফ হোসেন যোগযোগ করতেন দিনের বেলায়।

শরিফ হোসেনের সাথে ব্রিটিশদের ১২টি পত্র বিনিময় হয়েছিল। পরবর্তীতে রাশিয়ার মাধ্যমে এ বিষয় নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। তখন ওহাবিজমে বিশ্বাসীরা একটি সুযোগ পেয়ে যায় যে শরিফ হোসেন মুসলমানদের শাসক হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশদের সাথে যোগাযোগ করছে, সুতরাং তিনি সমগ্র মুসলানের শত্রু। তাকে প্রতিহত করতে হবে। তাকে যদি প্রতিহত করা যায় তাহলে মক্কা এবং মদিনায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাবে। যে ওহাবিজমকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্য তাদের ছিল, সেটি সফল হবে।

১৯২৪ সালে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে শরিফ হোসেনকে আক্রমণ করে। তখন তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কারণ ব্রিটেন তাকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেনি। ব্রিটিশরা তখন উদীয়মান আবদুল আজিজ ইবনে সৌদকে সহযোগিতা করাই তাদের কাছে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেছিল। কারণ ইতোমধ্যে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমান– এই রাষ্ট্রগুলো যে ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল তার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বাধা ছিল আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ।

সুতরাং, তাদের কাছে মনে হল: সৌদকে যদি সহযোগিতা করা যায় তাহলে এই রাষ্ট্রগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা তারা দিতে পারে। এজন্য তারা সৌদের পক্ষে চলে গেল এবং শরিফ হোসেনকে বলা হলো, ঠিক আছে আমরা যদি পরে কোন রাষ্ট্র তৈরি করতে পারি তাহলে আমরা সেখানে তোমাকে বা তোমার ছেলেদেরকে কর্তৃত্ব দিয়ে দেবো। সে অনুযায়ী পরবর্তীতে তারা ইরাক দখল করে সেখানে শরিফ হোসেনের ছেলে হোসেনকে শাসক হিসেবে নিয়োগ করেছিল। শরিফ হোসেনের পতন হল। তার পতনের মধ্য দিয়ে মক্কা মদিনায় আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

মুহাম্মদ বিন সৌদের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক। অন্যদিকে আবদুল ওহাব ইবনে নজদীর উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয়। এই ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থ এক হয় আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩২ সালে সেপ্টেম্বর মাসে আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ সৌদি আরব থেকে নিজের নামে শাসন পরিচালনা করতে থাকেন। এরপর ১৯৩৪ সালে রাষ্ট্রটির নাম দেয়া হয় ‘কিংডম অব সৌদি আরবিয়া’।

সৌদিতে নারীদের সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচরণ করা হয়

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

manal-al-shareefসৌদি আরবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গাড়ি চালানোর জন্য কারাদণ্ড পাওয়া এক নারী তাঁর দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলেছেন।

মানাল আল-শরিফ নামের ওই নারী বলেছেন, এখনকার সময়েও সৌদি আরবে নারীদের সঙ্গে ঠিক ক্রীতদাসের মতো আচরণ করা হয়।

নিষেধাজ্ঞা ভেঙে গাড়ি চালানোয় মানালকে নয় দিন কারাভোগ করতে হয়েছিল। পরে দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানে লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাতে পারছেন মানাল। এখন নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছেন মানাল। জানালেন, তিনি সৌদি আরবে প্রথম নারী আইটি নিরাপত্তা কনসালট্যান্ট হন। প্রায় এক দশক ধরে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোতে কাজ করেছেন।

ডেইলি মেইল অস্ট্রেলিয়াকে মানাল বলেছেন, একটি রক্ষণশীল সমাজ থেকে উঠে এসেছেন তিনি। তাদের ঘরের জানালা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হতো। বাড়ির চারদিক উঁচু দেয়ালে ঘেরা। নারীদের ঢেকে রাখা হতো। পুরুষ অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া সৌদি আরবে নারীদের জন্য কিছু করা খুবই কঠিন।

২০১১ সালে মানাল তাঁর গাড়ি চালানোর একটি ভিডিও ইউটিউবে তোলেন। ভিডিওটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। এক দিনে সাত লাখ মানুষ ভিডিওটি দেখে।

ভিডিও প্রকাশের পর জীবননাশের হুমকি পান মানাল। তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে অভিহিত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মুসলমানদের ভুল পথে নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। যত ধরনের গালি আছে, তা তাঁকে শুনতে হয়।

কারাদণ্ড হওয়ার পর মানাল তাঁর বাড়ি, সন্তান ও চাকরি হারান। শেষে দেশত্যাগ করেন। দ্বিতীয় স্বামী ও ছোট সন্তানকে নিয়ে সিডনিতে স্থায়ী হন। মানাল একটি স্মৃতিকথা লিখেছেন। নাম ‘ডারলিং টু ড্রাইভ’। এতে তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। নারী অধিকারকর্মী মানাল সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেয়েছেন। এতে তিনি ভীষণ খুশি। তিনি এখন মুক্তির স্বাদ উপভোগ করছেন।

বিখ্যাত টাইম সাময়িকীর বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন মানাল। নারীদের গাড়ি চালানোর বিষয়ে তিনি সরব। ‘ওমেন টু ড্রাইভ’ আন্দোলনের মাধ্যমে নারীদের গাড়ি চালানোর জন্য লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করতে আহ্বান জানাচ্ছেন মানাল।

মহাকবি কায়কোবাদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

শওকত আলী রতন দোহার (ঢাকা) : ‘মহাশ্মশান’ নামক মহাকাব্য লিখে বিশ^সাহিত্য অঙ্গনে কবি কায়কোবাদের নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ¦লজ¦ল করছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কবি কায়কোবাদ একজন খ্যাতিমান কবি হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। খ্যাতিমান এ কবি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা গ্রামে ১৮৫৭ সালে ২৫ ফেরুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫১ সালের ২১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। অন্য কবিদের চেয়ে কায়কোবাদ দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। কায়কোবাদ কবির সাহিত্যিক নাম হলেও তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৭০ সালে কায়কোবাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিরহ বিলাপ’ প্রকাশ হলে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কায়কোবাদ মূলত একজন গীতিকবি। এ ছাড়া সনেট, মহাকাব্য, কাহিনীকাব্য ও গানেও ছিলেন সমানভাবে পারদর্শী। তাই তৎকালীন কবিমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন কায়কোবাদ। মুসলমান কবিদের মধ্যে তিনিই প্রথম মহাকবি উপাধি লাভ করেন।

কায়কোবাদের নামে ১৮৭৩ সালে ‘কুসুম কানন’, ১৮৯৬ সালে ২৩ বছর বয়সে অশ্রুমালা প্রকাশিত হলে কাব্যিক ভুবনে তিনি হয়ে ওঠেন স্মরণীয় ও বরণীয়। দীর্ঘ বিরতির পর ‘মহাশ্মশান’ (১৯০৪) প্রকাশ হলে তিনি মহাকবি উপাধি লাভ করেন। এরপর একে একে ‘শিব মন্দির’(১৯২১)‘অমিয় ধারা’(১৯২৩),‘শ্মশান ভস্ম’(১৯২৪),‘মহরম শরিফ’ (১৯৩২) প্রকাশিত হয়। কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় ‘প্রেমের ফুল’(১৯৭০),‘প্রেমের বাণী’(১৯৭০),‘প্রেম পরিজাত’(১৯৭০),‘মন্দাকিনী ধারা’(১৯৭০),‘গউছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ’ (১৯৭৯)। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ‘কায়কোবাদের রচনাবলী’র চতুর্থ খণ্ড প্রকাশ পায়। বাংলা সাহিত্যে কায়কোবাদের অসাধারণ অবদানের জন্য সারা দেশের মানুষের কাছে কবি সমাদৃত হলেও তার জন্মস্থান ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা গ্রামে অবহেলিত। আগলা গ্রামে কবির তেমন কোনো স্মৃতিচিহ্ন আর অবশিষ্ট নেই। যে স্মৃতিগুলো আজো কবিকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেগুলো নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। কবি ব্যবহার করেছেন এমন কোনো জিনিসপত্রও নেই। কবি মারা যাওয়ার পরপরই তার পৈতৃক বাড়ির একটি অংশ বিক্রি করলেও বাদবাকি অংশ বেদখল হয়ে যাওয়ায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে কবির পরবর্তী বংশধরদের পরিচয়। ওই বাড়িতে কবির বংশধরেরা বসবাস না করলেও কবির আমলের বেশ কয়েকটি বড় বড় আমগাছ রয়েছে, যা দেখলে কবির কথা মনে পড়ে যায়। ২০০৬ সালে জেলা পরিষদের উদ্যোগে কবির বাড়ির সামনের রাস্তাটি কবির নামে নামকরণ করে একটি ফলক নির্মাণ করা হলেও ফলকটি কে বা কারা ভেঙে ফেলেছে। ফলে রাস্তাটি যে কায়কোবাদের নামে করা হয়েছে সেটিও এক সময় মুছে যাবে। ১৯৭২ সালে সুবিদ আলী নামের জনৈক ব্যক্তি কায়কোবাদের সম্মানার্থে আগলা গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন কায়কোবাদ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের প্রায় চার শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে কিন্তু বিদ্যালয়ের পাঠাগারে কায়কোবাদের লেখা কোনো বই না থাকায় এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা কায়কোবাদ সম্পর্কে জানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা হলে তারা জানায়, মহাকবি কায়কোবাদ সম্পর্কে আমরা তেমন কিছুই জানি না। অথচ এ গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি কায়কোবাদ। আমরা যেহেতু কবির গ্রামের লোক সেজন্য কবির সম্পর্কে না জানলে লজ্জাজনক ব্যাপারে পরিণত হবে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আরো জানা যায় কায়কোবাদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয় না এই বিদ্যালয়ে। এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি এক রকম ক্ষিপ্ত ভাষায় বলেন, এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কবি পরিবারের লোকজনের কোনো অবদান নেই। কবির আত্মীয়স্বজন এই বিদ্যালয়ের কল্যাণ সাধনে কখনো এগিয়ে আসেননি। জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী কেন পালন করা হয় না -বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, বাজারে কায়কোবাদের অনেক বই রয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের জানার সুযোগ আছে, কাজেই বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠানের দরকার নেই।

কবির বাড়ির পশ্চিমে ১৯৮৩ সালে আগলা মাছপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত করা হয় কায়কোবাদ যুব কাব ও গণপাঠাগার। জায়গাটি বরাদ্দ দেন স্থানীয় বাবু হরিষচন্দ্র পোদ্দার। গত ১০ বছর ধরে পাঠাগারটির সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো দর্শনার্থী আগলা গ্রামে গেলে কবি সম্পর্কে কিছ্ইু জানতে পারেন না। পাঠাগারটি পুনরায় চালু করার ব্যাপারে বার বার উদ্যোগের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের মধ্যে জটিলতা থাকায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না পাঠাগারটি। নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলার চৌরাস্তায় কায়কোবাদের নামে গোল চত্বর নির্মাণ করা হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চত্বরটি সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরে স্বাধীনতা চত্বর স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে চত্বরটি পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়ে এলেও ১০ বছরেও তা বসানোর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাকিল আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, কায়কোবাদ আমাদের দেশের খ্যাতিমান কবিদের মধ্যে একজন। তার জন্মস্থানে স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য অনেক কিছুই থাকার কথা ছিল। কিন্তু সে রকম কিছুই চোখে পড়েনি নবাবগঞ্জে। চত্বর অপসারণের ব্যাপারে তিনি জানান, চত্বরটি যদি সরানো হয়ে থাকে তবে এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে আলোচনাসাপেক্ষে চত্বরটি নতুন করে স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি আরো জানান, কবি কায়কোবাদের নামে একটি জাদুঘর করার জন্য শিল্পকলা একাডেমিতে প্রস্তার পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই জাদুঘরের কাজ শুরু হবে।

কায়কোবাদরে নাতি টুটুল আলম কোরেশী বলেন, কবির বাড়িটি দখলমুক্ত করে করির নামে একটি পাঠাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হলে কবির সম্পর্কে জানতে পারবে এ অঞ্চলের পাঠক, ভক্ত ও অনুসারীরা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনেক কবিদের বছরে অন্তত দুইবার তাদের জীবন-দর্শন সম্পর্কে আলোচনা সভার আয়োজন করা হলেও কায়কোবাদের এরকম অনুষ্ঠান চোখে পড়ে না। কায়কোবাদ স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আরশাদ আলী বলেন, কায়কোবাদ নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা গ্রামের জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বলেই শত ধন্য আগলা গ্রামের মানুষ। কবি কায়কোবাদের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠন করা হলে তার জীবন সম্পর্কে জানতে পারবেন দেশবাসী। জানা গেছে, কবির বাড়ির সামনে যে মসজিদের আজান শুনে আজান কবিতাটি লিখেছিলেন সেটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলা ১৩০০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন জমিদার মজিদ মিয়া। নান্দনিক চীনা মাটির কারুকার্যে নির্মিত এই মসজিদটি। কবি এই মসজিদে নামাজ পড়তেন বলে স্থানীয় লোকদের কাছে জানা যায়। মসজিদ কবির আমলে প্রতিষ্ঠিত বলে অনেক দর্শনার্থী অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন এবং কবিকে কল্পনা করেন। আসছে ২১ জুলাই মহাকবি কায়কোবাদরে ৬৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ দিনটি যথাযথভাবে তার অগণিত পাঠক ও ভক্তরা শ্রদ্ধার সাথে পালন করবেন, সেই সাথে পরকালের তার মুক্তির প্রার্থনা করবেন এমনটাই কামনা।

হজরত শাহ জালাল (রহ.) সম্পর্কে তথ্য বিভ্রাট

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

কে. এস সিদ্দিকী : এদেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব পীর মাশায়েখ আওলিয়া তথা সূফি সাধকের ভূমিকা ইতিহাস খ্যাত ও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে, তাদের মধ্যে সিলেটে চিরশায়িত হজরত শাহ জালাল (রহ.) ও তাঁর ৩৬০ সহযাত্রীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের বদৌলতে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের যে ঢেউ আরম্ভ হয় পরবর্তীতে তা সয়লাবের রূপ লাভ করে। ভিন্ন ধর্ম হতে দলে দলে লোক এসে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে সৌভাগ্য লাভ করতে থাকে। মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর প্রদর্শিত পথ ধরে পরবর্তী মাশায়েখ সূফি ও উলামায়ে কেরাম ইসলামের প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখে চলেছেন। হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর অগ্রণী ভূমিকার কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের মুসলমান মত ও পথ নির্বেশেষে অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা ও যথাযথ মর্যাদা সহকারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যিলকদ মাসের ২য় দশকের শেষ দিকে তাঁর ওফাত বার্ষিকী পালন করে থাকেন এবং হযরতের জীবন ও অবদানের কথা এবং তাঁর আদর্শ শিক্ষার কথা স্মরণ করে থাকেন। তিনি ইসলামের অমীয়বাণী প্রচারকালে কত লোক ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়েছিল সঠিক সংখ্যা অজানা।

হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর অসংখ্য কেরামত অলৌকিক বিস্ময়কর ঘটনাবলী পাঠ করে মুসলিম-অমুসলিম সবাই হতবাক হয়ে যায়। পৌত্তলিকতা কবলিত সে যুগের সামাজিক-নৈতিক অবক্ষয় এবং মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর আন্দোলন ও ভূমিকার কথা যারা জানে না অথবা জেনেও না জানার ভান করে, তারা ছাড়াও আরেক শ্রেণির লোক আমাদের এ সমাজে বাস করে, যাদেরকে ইসলাম বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করা যায়। এ শ্রেণির লোকেরাই হযরত শাহ জালাল (রহ.) ও তাঁর ৩৬০ সঙ্গীকে কুরুচিপূর্ণ অভিধায় চিহ্নিত করে।

কেননা শাহ জালাল (রহ.) এমন এক আধ্যাত্মিক সাধক ও কামেল পীর ছিলেন, যার তবলীগ প্রচারের ভূমিকার ওপর এযাবত বিভিন্ন ভাষায় বিস্তর বই পুস্তক রচিত ও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা ভাষা ছাড়াও আরবি, ফারসি, উর্দূ, এমনকি ইংরেজি ভাষায়ও বহু পুস্তক, পুস্তিকা রচিত হয়েছে। বিশেষত বাংলা ভাষায় স্বতন্ত্র জীবন চরিত ছাড়াও বিরাট আকারের বহু গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ বিপুল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এতদ্ব্যতীত বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার সম্পর্কিত প্রকাশিত সকল পুস্তক-পুস্তিকায় হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর ভূমিকা প্রাধান্য পেয়েছে। এখানে উদাহরণ হিসেবে আমরা কয়েকটি মাত্র বাংলা পুস্তকের নাম উল্লেখ করতে চাই। সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১। সৈয়দ মুর্তাজা আলী কৃত- হযরত শাহ জালাল (রহ.) ও সিলেটের ইতিহাস। ২। মুফতী আজহার উদ্দীন আহমদ রচিত শ্রী হট্টে, ইসলামের জ্যোতি। ৩। আবদুর রহিম রচিত শ্রীহট্ট, নূর। ৪। আবুদল ওহাব রচিত শ্রীহট্ট, শাহ জালাল। ৫। আবদুল মালিক চৌধুরী রচিত শ্রীহট্ট, শাহ জালাল। ৬। অমিত ভাত চৌধুরী রচিত, শাহ জালাল। ৭। নরেন্দ্র কুমার গুপু চৌধুরী রচিত শ্রীহট্ট, প্রতিভা।

ইসলামী বিশ্বকোষসহ আরো অসংখ্যা গ্রন্থ, পুস্তক-পুস্তিকা, পত্র-পত্রিকা, জার্নাল, ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সরকারি গেজেট, ইত্যাদিতে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর ওপর প্রচুর তথ্য উপাত্ত রয়েছে। এ যাবত বিশেষভাবে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার সংক্রান্ত বাংলা ভাষায় অসংখ্য বই পুস্তক-পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রত্যেকটিতে অল্প বিস্তর হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর ওপর আলোচনা স্থান পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে আলহাজ মাওলানা এম. ওবাইদুল হক সংকলিত বাংলাদেশের পীর আউলিয়াগণ এবং গোলাম সাকালায়েনের বাংলাদেশের সূফী সাধক গ্রন্থদ্বয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমোক্ত গ্রন্থে হযরত শাহ জালাল (রহ.) সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
সৈয়দ মুর্তাজা আলী, মাওলানা ওবাইদুল এবং গোলাম সাকালায়েন প্রমুখ সকলেই তাদের রচনায় হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর জীবন বৃত্তান্ত ও তার ভূমিকা আলোচনা করতে যে কটি প্রাচীন গ্রন্থ উপাখ্যানকে মূল ভিত্তি বা সূত্র হিসেবে অবলম্বন করেছেন সেগুলো হচ্ছে: ১। ইবনে বতুতার সফর নামায় বর্ণিত শাহ জালাল সংক্রান্ত বিবরণ। ২। হিজরী ১১২৪ সালে রওজাতুল সালেহীন সম্পাদন করেন হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর অনুচর হামিদ উদ্দিন নারুন্দ্রির জনৈক উত্তরাধীকারী দিল্লীর রাজা মূলতান ফররোখ সিয়ামের এর রাজত্বকালে। ৩। ১১৩৪ হিজরীতে আরো এক খানা গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। এটি হলো, তৎকালীন বাঙ্গালার সুবাদার জাফর খান নুসেরী ওরফে মুর্শিদ কুলি খানের নির্দেশে মঈদ উদ্দীন নামক হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর দর্গার জনৈক খাদেম কর্তৃক বিরচিত। উভয় গ্রন্থই সিলেটে প্রচলিত উপাখ্যানের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে প্রসিদ্ধ। ৪। ত্রিপুরার অধিবাসী নাসির উদ্দীন হায়দার নামক জনৈক মুনসিফ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে যখন দরগাহ মহল্লাতে অবস্থান করছিলেন তখন তিনি ‘সুহেলিয়ামন’ নাম দিয়ে উল্লেখিত উভয় গ্রন্থের একটি চুম্বক প্রস্তুত করেছিলেন। এই উভয় মূল গ্রন্থই বর্তমানে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে জানা যায়, কিন্তু ‘সুহেলিয়ামন’ এর উপাখ্যান এখনো দরগার খাদেমগণ কর্তৃক রক্ষিত হচ্ছে বলে মনে করা হয়।

‘সুহেলিয়ামন’ সম্পর্কে আরো একটি তথ্য জানিয়ে রাখতে চাই এবং তা এই, মাসিক আখতার নামক একটি উর্দূ সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ১৯২৪ সালে ‘সুহেলিয়ামন’ এর প্রথমাংশ ছাপা হয়েছিল। এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ময়মনসিংহের এক পাড়া-গাঁয়ে জন্মগ্রহণকারী মাহমুদুর রব সিদ্দিকী, যিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন ‘খালেদ বাঙালী’ নামে। তিনি মরহুম জাহেদ সিদ্দিকীর পিতা ছিলেন। জাহেদ সিদ্দিকী ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতারের উর্দূ সংবাদ পাঠক ছিলেন। অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের উর্দূ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও সংবাদ পাঠক ছিলেন। তার পিতা খালেদ বাঙালী ছিলেন পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থ প্রণেতা মাওলানা আবদুল হাই আখতারের পুত্র। পিতার নাম স্মরণে খালেদ বাঙালী ‘আখতার’ নামক পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন এবং এ পত্রিকায় তার প্রবন্ধের প্রথম লেখাটি ছাপা হয়েছিল, কিন্তু পত্রিকাটি প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সুহেলিয়ামন এর পরবর্তী অংশ আর প্রকাশিত হতে পারেনি। ‘আখতার’ সম্পাদক লেখার শেষে নাম উল্লেখ করেন সাইফী বাঙালী।

৫। ‘তাজকেরায়ে শায়খ সৈয়দ জালাল মোজাররদ কেনিয়ায়ী’ শীর্ষক ৬৩ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি উর্দূ পুস্তিকা রচনা করেছেন। ১৯৬৭ সালে সিলেট হতে প্রকাশিত এ পুস্তিকায় ‘গুলজারে আবরার’ গ্রন্থের পরিচয় প্রদান করা হয়েছে এইভাবে, মোহাম্মদ গাওসী ইবনে মূসা শাত্তারী মান্দভী কর্তৃক রচিত হিন্দুস্থানের আওলিয়ার ইতিহাস। হিজরী ১১৫৫ মোতাবেক ১৭৪২ সালে এটি ফারসি ভাষায় লিখিত এবং এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯২০। পুস্তিকা লেখকের মতে, এটি হযরত শাহ জালাল উদ্দীন মোজারবাদের জীবনী গ্রন্থ তার উৎস ‘শরহে নুজহাতুল আরওয়াহ’ যা শায়খ আলী কর্তৃক রচিত, যিনি ছিলেন শায়খ নুরুল হুদার বংশধর। শায়খ নুরুল হুদা ছিলেন হযরত শায়খ জালাল উদ্দীন মোজারবাদের একজন মুরীদ ও খলিফা। তার পূর্ণ নাম শায়খ নুরুল হুদা আবুল কারামাত সাঈদ হাসানী। শরহে নুজহাতুল আরওয়াহ আলী শের কর্তৃক হিজরী ৯৭৯ (১৫৭১ খ্রি.) সালে রচিত।

বস্তুতঃ ফারসি ভাষায় প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে হযরত শাহ জালাল (রহ.) সম্পর্কে তথ্য উপাত্তের আধিক্য বিদ্যমান থাকলেও কয়েকটি বিষয়ে পরস্পর বিরোধী তথ্যও রয়েছে। ফলে যারা সরাসরি ওসব তথ্য গ্রহণ করেছেন অথবা ওসব তথ্যের অনুবাদের আশ্রয় নিয়েছেন, তারাও সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়েছেন, অনেকে যথার্থতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন। বিরোধমূলক বা বিতর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে হযরত শাহ জালাল (রহ.) যার মাজার সিলেটে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে তিনি কে ছিলেন এ বিতর্কের কারণ প্রধানত একই সময়কালের মধ্যে চারজন শাহ জালালের বিদ্যমান থাকা।

এ কারণে সিলেটে সমাহিত শাহ জালাল (রহ.) কে নিশ্চিত করার জন্য কোনো কোনো গবেষক লেখক চারজন শাহ জালালকে আলাদাভাবে চি‎িহ্নত করার চেষ্টা করেছেন, এ বিষয়ে বিতর্ক অবসানের এটি ছিল সঠিক উদ্যোগ। সিলেট বিজেতা শাহ জালাল (রহ.) এর জন্ম তারিখ নিয়ে বিতর্কের ফলে তার বয়স ১৫০ বছর পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। পক্ষান্তরে এটাকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে কেউ কেউ বিভিন্ন ফারসি কবিতা উদ্ধার করেছেন যার একটি ছত্রে আবজাদ পদ্ধতিতে মৃত্যু তারিখ পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ বিখ্যাত উর্দূ কবি ও সাহিত্যিক আবদুল গফুর (ফরিদপুরের নবাব আবদুল লতিফের বড় ভাই) তার এক ফারসি কবিতায় আজাদ প্রণালীতে মৃত্যু তারিখ হিজরী ৮৯১ সাল নির্ণয় করেছেন। গবেষক লেখকগণ এ তারিখই সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন। আরো বিভিন্ন বিষয়ে সৃষ্ট বিরোধ বিতর্কের অবসান ঘটেছে বলে মনে করা হয় না।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নিজামউদ্দীন আওলিয়া নামক এক সাধকের সাথে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর সাক্ষাতের তথ্য। এ সাক্ষাতের ফলে যুগ নির্ণয়ে আরো কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের পীর আউলিয়াগণের লেখক সংশয়টি দূর করে দিয়েছেন এই বলে দিল্লীতে তখন নেযামুদ্দীন আওলিয়া নামীয় প্রসিদ্ধ নেযামুদ্দীন আওলিয়া যিনি বাবা ফরিদ (রহ.) এর মুরীদ ছিলেন তিনি নহেন (পৃ. ২৪৯)। ইতিহাসে এইরূপ বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, একই সময়কালের মধ্যে একই নামের ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্ব থাকেন নেযামুদ্দীন আওলিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। খোদ শাহ জালাল নামে একই যুগের চারজন আওলিয়া ছিলেন,যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং সিলেটের হযরত শাহ জালাল (রহ.) সম্পর্কিত বিতর্কিত সব বিষয়ের অবসান হওয়া উচিত।

গুলজারে আবরার গ্রন্থের বরাতে সৈয়দ মুর্তাজা আলী উল্লেখ করেছেন, শাহ জালাল মুজররদ কুতুববুদ এই ফারসী বাক্যাংশ থেকে আবজাদ প্রক্রিয়ায় গণনা দ্বারা তার ওফাতের তারিখ ৭৪০ হিজরী পাওয়া যায়। সুতরাং তিরোধানের সময় তাঁর বয়স উনসত্ত¡র বছর হয়েছিল। ২০ জিলকদ তারিখে তার ওফাত হয়। ঐ তারিখে প্রত্যেক বছর তার উরস পালন করা হয়। তিনি তার সঙ্গীদের শ্রী হট্টের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ও নিকটবর্তী জেলা সমূহে পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে প্রেরণ করেন। তারা স্ব স্ব প্রচার ক্ষেত্রে চিরস্থায়ীভাবে বাসস্থান নির্মাণ করে অবস্থান করেন। (পৃ. ২৪-২৫)