আর্কাইভ

Archive for the ‘ধর্মীয়’ Category

লেবানন খেলায় ধরা খেয়ে গেল সৌদি

সবার নজর জেরুজালেমের দিকে। লেবাননকে নিয়ে খেলতে গিয়ে সৌদি আরব যে বড় ধরনের ধরা খেয়েছে, তা অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।

প্রায় এক মাস আগে সৌদি আরবে গিয়ে আকস্মিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি। তাঁকে পদত্যাগে সৌদি আরব বাধ্য করেছিল বলে বহুল প্রচার রয়েছে।

সৌদি আরবের এই পদক্ষেপকে তার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ইরানকে দমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই দেখা হয়। তবে এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে যা কিছু ঘটেছে, তা সৌদি আরবের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে।

লেবাননে ফিরে সাদ হারিরি তাঁর পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেন। দেশের স্বার্থে লেবাননের বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়ে যায়। তারা সমঝোতায় আসে। সাদ হারিরিকে নিয়ে কয়েক সপ্তাহের অনিশ্চয়তার ইতি ঘটে।

লেবাননের মন্ত্রিসভা বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, বৈরুত কোনো আঞ্চলিক দলাদলি বা দ্বন্দ্বের মধ্যে নেই।

লেবাননের জাতীয় রাজনীতির এমন নাটকীয় মোড়ে রিয়াদের দাবার চাল পুরাই মাঠে মারা গেছে।

অনেক দিন ধরেই সাদ হারিরিকে সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি আরব। রিয়াদ আশায় ছিল, সাদ হারিরি সৌদি আরবের হয়ে তেহরানের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবেন; ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে মোকাবিলা করবেন।

রিয়াদ হোঁচট খায়। ২০১৬ সালে লেবাননে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে জোট সরকার গঠিত হয়। সাদ হারিরি হন সরকারপ্রধান। তাঁর মন্ত্রিসভায় হিজবুল্লাহকেও রাখা হয়।

সাদ হারিরিকে দিয়ে হিজবুল্লাহকে বাগে আনার যে কৌশল সৌদি আরব নিয়েছিল, তা কাজে আসেনি। বরং ইরানপন্থী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীটির প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়েই চলছে। এতে স্পষ্টত রুষ্ট হয় রিয়াদ। এরই মধ্যে গত মাসের শুরুর দিকে সৌদি আরব যান সাদ হারিরি। সেখানে গিয়ে সবাইকে অবাক করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।

সাদ হারিরির ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবে নেমে বোকা বনে যান। রিয়াদে অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হবে—এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর সামনে আসে অবরোধের তালিকা। লেবাননের ১ লাখ ৬০ হাজার কর্মীকে সৌদি আরব থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেয় সৌদি আরব। লেবানন থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারে আঞ্চলিক ব্যবসায়ীদের চাপ দেওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে বসেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন সাদ হারিরি।

পদত্যাগের ঘোষণার পর প্রায় দুই সপ্তাহ রিয়াদে ছিলেন সাদ হারিরি। সৌদি আরবে তাঁর অবস্থান নিয়ে নানা গুজব ছড়ায়। তাঁকে বন্দী বা জিম্মি করে রাখা হয়েছিল বলেও কথিত আছে। তবে এ প্রসঙ্গে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য, সৌদি আরবে সাদ হারিরি আক্ষরিক অর্থে বন্দী ছিলেন না। কিন্তু সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ তাঁকে (সাদ হারিরি) বলেছিল,‘তুমি যদি লেবাননে যাও, আমরা তোমাকে হিজবুল্লাহর লোক বলে ধরে নেব। আর তোমার সরকারকে আমাদের শত্রু ভেবে নেব।’

লেবাননকে কাতারের মতো শায়েস্তা করার হুমকিও রিয়াদ দিয়েছিল বলে সাদ হারিরির ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি।

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ পর বৈরুতে ফিরে আসেন সাদ হারিরি। প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনের সঙ্গে বৈঠকের পর পদত্যাগের ঘোষণা স্থগিত করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন। ৫ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নেন। পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

প্যারিসভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্সের করিম বিতার মনে করেন, ইরানকে একটা শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছিল সৌদি আরব। কিন্তু রিয়াদের পরিকল্পনা বুমেরাং হয়েছে।

সৌদি আরবে থাকাকালে সাদ হারিরি সংকট নিয়ে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বক্তব্য আসে। সাদ হারিরি প্রশ্নে এই দুই দেশের বক্তব্যে চাপে পড়ে সৌদি আরব। রিয়াদ ভেবেছিল,‘তার তালেই ঘড়ির কাঁটা চলবে’। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি হয়নি; বরং বিপরীতই হয়েছে।

সাদ হারিরির দেশে ফেরার ব্যাপারে রিয়াদ একেবারেই নারাজ ছিল বলে একটি পশ্চিমা সূত্র জানায়। পরের ঘটনাবলি সম্পর্কে এই সূত্রের মন্তব্য, সাদ হারিরি এখন ফের লেবাননের প্রধানমন্ত্রী। আর তাঁর মন্ত্রিসভায় হিজবুল্লাহ বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছে।

ফ্রান্সের একটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, সৌদি আরবের তরুণ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বুঝতে পেরেছেন, লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তিনি একটু বেশিই খেলে ফেলেছেন। আর সেই সুবাদে সাদ হারিরি জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন।

সাদ হারিরির ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সৌদি আরব এখনো শেষ কথা বলেনি। লেবাননের ব্যাপারে সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বার্তা সংস্থা এএফপি অবলম্বনে সাইফুল সামিন

Advertisements

বদর আউলিয়ার মাজার, চট্ট্রগ্রাম

বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধ-বাসিনী’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ। শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করে

আমরা বহুকাল হইতে অবরোধ থাকিয়া থাকিয়া অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি সুতরাং অবরোধের বিরুদ্ধে বলিবার আমাদের- বিশেষত আমার কিছুই নাই। মেছোণীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, ‘পচা মাছের দুর্গন্ধ ভাল না মন্দ?’- সে কি উত্তর দিবে?

এস্থলে আমাদের ব্যক্তিগত কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা পাঠিকা ভগিনীদেরকে উপহার দিব- আশা করি, তাঁহাদের ভাল লাগিবে।

এস্থলে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে, গোটা ভারতবর্ষে কুলবালাদের অবরোধ কেবল পুরুষের বিরুদ্ধে নহে, মেয়েমানুষদের বিরুদ্ধেও। অবিবাহিতা বালিকাদিগকে অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া এবং বাড়ির চাকরানী ব্যতীত অপর কোন স্ত্রীলোকে দেখিতে পায় না।

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ।

শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করেন। মেম ত মেম-শাড়ী পরিহিতা খ্রীষ্টান বা বাঙ্গালী স্ত্রীলোক দেখিলেও তাঁহারা কামরায় গিয়া অর্গল বন্ধ করেন।

[১]

সে অনেক দিনের কথা- রংপুর জিলার অন্তর্গত পায়রাবন্দ নামক গ্রামের জমিদার বাড়িতে বেলা আন্দাজ ১টা-২টার সময় জমিদার কন্যাগণ জোহরের নামাজ পড়িবার জন্য ওজু করিতেছিলেন। সকলের ওজু শেষ হইয়াছে কেবল ‘আ’ খাতুন নাল্ফম্নী সাহেবজাদী তখনও আঙ্গিনায় ওজু করিতেছিলেন। আলতার মা বদনা হাতে তাঁহাকে ওজুর জন্য পানি ঢালিয়া দিতেছিল। ঠিক সেই সময় এক মস্ত লম্বাচৌড়া কাবুলী স্ত্রীলোক আঙ্গিনায় আসিয়া উপস্থিত! হায়, হায়, সে কি বিপদ! আলতার মার হাত হইতে বদনা পড়িয়া গেল- সে চেঁচাইতে লাগিল- ‘আউ আউ! মরদটা কেন আইল!’ সে স্ত্রীলোকটি হাসিয়া বলিল, ‘হে মরদানা! হাম মরদানা হায়?’ সেইটুকু শুনিয়াই ‘আ’ সাহেবজাদী প্রাণপণে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া তাঁহার চাচি আম্মার নিকট গিয়া মেয়েমানুষ হাঁপাইতে হাঁপাইতে ও কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, ‘চাচি আম্মা! পায়জামা পরা একটা মেয়ে মানুষ আসিয়াছে!!’ কর্ত্রী সাহেবা ব্যস্তভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘সে তোমাকে দেখিয়াছে?’ ‘আ’ সরোদনে বলিলেন ‘হ্যাঁ!’ অপর মেয়েরা নামাজ ভাঙিয়া শশব্যস্তভাবে দ্বারে অর্গল দিলেন- যাহাতে সে কাবুলী স্ত্রীলোক এ কুমারী মেয়েদের দেখিতে না পায়। কেহ বাঘ-ভালুকের ভয়েও বোধ হয় অমন কপাট বন্ধ করে না।

[২]

এদিকে মহিলা মহলে নিমন্ত্রিতাগণ খাইতে বসিলে দেখা গেল- হাশমত বেগম তাঁহার ছয় মাসের শিশুসহ অনুপস্থিত। কেহ বলিল, ছেলে ছোট বলিয়া হয়ত আসিলেন না। কেহ বলিল, তাঁহাকে আসিবার জন্য প্রস্তুত হইতে দেখিয়াছে- ইত্যাদি।

পরদিন সকালবেলা যথাক্রমে নিমন্ত্রিতাগণ বিদায় হইতে লাগিলেন- একে একে খালি পাল্ক্কী আসিয়া নিজ নিজ ‘সওয়ারী’ লইয়া যাইতে লাগিল। কিছুক্ষণ পরে একটা ‘খালি’ পাল্ক্কী আসিয়া দাঁড়াইলে তাহার দ্বার খুলিয়া দেখা গেল হাশমত বেগম শিশুপুত্রকে কোলে লইয়া বসিয়া আছেন। পৌষ মাসের দীর্ঘ রজনী তিনি ঐ ভাবে পাল্ক্কীতে বসিয়া কাটাইয়াছেন।

তিনি পাল্ক্কী হইতে নামিবার পূর্বেই বেহারাগণ পাল্ক্কী ফিরাইতে লইয়া গেল- কিন্তু তিনি নিজে ত টুঁ শব্দ করেনই নাই- পাছে তাঁহার কণ্ঠস্বর বেহারা শুনিতে পায়, শিশুকেও প্রাণপণ যত্নে কাঁদিতে দেন নাই- যদি তাহার কান্না শুনিয়া কেহ পাল্ক্কীর দ্বার খুলিয়া দেখে! কষ্টসাধ্য করিতে না পারিলে আর অবরোধবাসিনীর বাহাদুরী কি?

পদ্মাবতী বিতর্ক: শিল্পের স্বাধীনতায় উগ্রবাদীদের হামলা

Padmavati_movie 2017চিন্ময় মুৎসুদ্দী: পদ্মাবতী নিয়ে ভারতের উগ্রবাদীদের কর্মকা- শিল্পের স্বাধীনতায় নয়া হস্তক্ষেপ। তুচ্ছ বিষয়কে সামনে এনে তারা তুলকালাম বাধিয়েছে শ্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। তবে পদ্মাবতী নিয়ে সর্বশেষ সুসংবাদ হলো সিনেমাটি নিষিদ্ধের আবেদন তৃতীয় বারের মতো খারিজ করে দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে বলেছেন, ‘এর নাক কাটব, ওর মুণ্ডু কাটব, এ জন্য পুরস্কার দেব, গণতন্ত্রে এসব বরদাশত করা হয় না। দেশের আইন এভাবে কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।’

ছবিটি মুক্তির ব্যাপারে বাধা দেওয়া আর ছবির পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যান্ড টিভি ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইএফটিডিএ) ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে ১৫ মিনিটের ব্ল্যাক আউট কর্মসূচি পালন করে। চলচ্চিত্র এবং দূরদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ২০টি সংস্থা ওই দিন বিকেল সোয়া ৪টা থেকে ১৫ মিনিট চলচ্চিত্র ও টিভি সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করা থেকে বিরত থাকে। ২৮ নভেম্বর কলকাতার টালিগঞ্জের ছবিপাড়ায় ১৫ মিনিটের জন্য প্রতীকী ধর্মঘট পালন করা হয় ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কারস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া এবং ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে।

এর আগে হরিয়ানা রাজ্যের বিজেপি নেতা সুরুজ পাল আমু পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাক কেটে নেওয়ার হুমকি দেন। মমতা পশ্চিমবঙ্গে চলচ্চিত্রটিকে স্বাগত জানিয়ে এর প্রিমিয়ার কলকাতায় করার প্রস্তাব দেন। মমতার প্রস্তাবটি আসে গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই ছবির মুক্তির ওপর রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরিপ্রেক্ষিতে। ওইসব রাজ্যে উগ্রবাদীরা মিছিল সমাবেশ করে ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি ও অভিনেত্রী দীপিকা পাড়–কোনের নাক, কান, মাথা কর্তনকারীদের জন্য বিশ কোটি টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। এই ডামাডোলে এরই মধ্যে এক সাধারণ নাগরিকের প্রাণ গেছে। নিহত ২৩ বছরের তরুণ চেতন সাহনি জয়পুরে গয়নার ব্যবসা করতেন। জয়পুরের বিখ্যাত নাহারগড় দুর্গের বুরুজ থেকে তার মরদেহ ঝুলছিল। তার মৃতদেহের পাশে লেখাছিল ‘আমরা শুধু কুশপুতুল লটকাই না।’ আর একটি পাথরে লেখা ছিল ‘পদ্মাবতীর বিরোধিতা’।

পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়া দূরে থাক, এখনও সেন্সর বোর্ড থেকে এ সিনেমা সম্পর্কে কোনো মন্তব্যই করা হয়নি। শুধুমাত্র একটা ধারণা থেকেই মাঠে নেমেছে উগ্রবাদী বিজেপি, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা বলছেন ‘আমাদের জাত্যাভিমানে চুনকালি লেপা হয়েছে, আমাদের দেবী মা পদ্মাবতিকে মন্দিরের পাদপিঠ থেকে নামিয়ে করে তোলা হয়েছে বাহরওয়ালি নাচনি, তাই পরিচালকের মুণ্ডু চাই.. ..’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সারা ভারতে ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে তারা। বানসালির পদ্মাবতী অচ্ছ্যুত হলে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (পদ্মিনী উপাখ্যান, ১৮৫৮), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ, ১৮৭৫), ক্ষিরোদাপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (পদ্মিনী, ১৯০৬) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রাজকাহিনী, ১৯০৯) প্রমুখের এসব রচনা নিষিদ্ধ করতে হয়। কারণ তারাও ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। ইতিহাসকে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন। ইতিহাসকে ভিত্তি করে তারা গল্প বুনেছেন।

সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে ইতিহাস কি কেউ ভিন্ন দৃষ্টিতে এখন দেখতে পারবে না? অতীতে এমন হয়েছে। সেজন্যই শিল্পের স্বাধীনতা মুক্তচিন্তার আলোকে বিবেচনা করা হয়। তথ্যই কেবল ইতিহাস নয়, কিংবদন্তিও ইতিহাসের অংশ। কোনো শিল্প মাধ্যমই ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে পেশ করে না। রানি পদ্মাবতী হয়তো তার জীবনে নাচেননি। নাচলেও এতটা ডিজিটাল ভেল্কি ছিল না। সিনেমার অনেকটাই পরিচালকের কল্পনা। আর ছবিটিও বানসালির ‘লাগ ঝমাঝম’ ভঙ্গিতে বলা একটি বলিউডি উপাখ্যান মাত্র। যেটা আমরা তার আরেকটি চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’-এ দেখেছি। পাঠককে এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, চলচ্চিত্রটিতে তিনি পার্বতী এবং চন্দ্রমুখীকে একসঙ্গে নাচিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এ কিন্তু এই ঘটনা ছিল না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- দেবদাস সাহিত্য, পদ্মাবতী ইতিহাস। সেক্ষেত্রে এই ইতিহাসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। অনেক ঐতিহাসিকই পদ্মাবতীর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি।

দূরদর্শনের সভাপতি রজত শর্মা একটি কথা বলেছেন যেটি প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বানসালীর গবেষণা পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর, বর্ণে বর্ণে বাস্তবনিষ্ঠ। কোনো বিকৃতি নেই।’ আর পরিচালক সুভাস ঝা বলেছেন, ‘সত্যিই সে সময় রমণীরা নাচতেন, অন্তরালে জেনানা রানিবাসে। সেখানে রাজা ছাড়া আর কোনো দর্শক থাকত না। সিনেমায় যে ‘ঘুমার’ নাচের দৃশ্য আছে, তাতে কোনো বাইরের মরদ নেই। তাই, ইতিহাস বিকৃতি ঘটেনি। এখন তিনটি পক্ষ। উগ্রবাদীরা বিপক্ষে। বানসালীকে সমর্থনকারী পক্ষ বলছেন বিকৃতি হয়নি। আরেক পক্ষ বিকৃতি হয়েছে কি হয়নি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছেন না, তারা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন- শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে। পদ্মাবতীর সমর্থনে তাই ইতিহাস বিকৃত হয়নি বলে সাফাই দিলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিল্পের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটিকেই মূখ্য করে দেখতে হবে। ইতিহাসকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অধিকার সমুন্নত রাখা জরুরি।

বাস্তব ও কল্পনার মিশেল নিয়ে তৈরি আশুতোষ গোয়ারিকর’র ‘যোধা আকবর’ (২০০৮) ছবিতে আকবরের সঙ্গে যোধাবাঈয়ের প্রেমের কাল্পনিক ঘটনা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেও ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠেনি। তখন ইউপিএল আমল। এখন কেন্দ্রে বিজেপি, বিভিন্ন রাজ্যে ক্রমে তারা ক্ষমতার হাত প্রসারিত করছে। ১৮ রাজ্য তাদের শাসনে। দেখা যাচ্ছে ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক শক্তি জোরেসোরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ইমেইজ আর থাকছে না। গত তিন বছরে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অসংখ্য হামলা সেটাই প্রমাণ করে। মুসলমানদের খাদ্যের ওপরও তারা বাধ সাধছেন। উত্তর প্রদেশে গরুর ব্যবসা করার দায়ে প্রাণ দিতে হয়েছে এক মুসলমান তরুণকে। এবার তারা শিল্পের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। বানসালী এরই মধ্যে বলেছেন, আলাউদ্দিন খিলজির স্বপ্নের রানি পদ্মাবতীর সঙ্গেঅহপযড়ৎ প্রেমের দৃশ্যটি ছবিতে নেই। এরপরও উগ্রবাদীদের এ ধরনের জঙ্গী আচরণ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা মুক্ত চিন্তা ও গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত বলেই মনে করি।

স্বাধীনতা মানে কী?

তসলিমা নাসরিন : ডিসেম্বরের ১ তারিখ চলে গেলো, ‘পদ্মাবতী’ মুক্তি পেলো না ভারতে। হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে হেরে গেলো গোটা ভারতবর্ষ। তাদের তাণ্ডব আর হুমকির সামনে মাথা নোয়ালো সেক্যুলার ভারত। ‘পদ্মাবতী’ নামে আদৌ কেউ ছিল, কোনও ঐতিহাসিকই বলেননি। সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জয়সীর লেখা কবিতা ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে তৈরি ‘পদ্মাবতী’। ‘পদ্মাবতী’ নামে হয়তো কেউ ছিল না কোনও কালে। মালিক মোহাম্মদ জয়সীই রচনা করেছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী পদ্মাবতীকে, যে পদ্মাবতীকে জয় করার লোভ করেছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি। রাজপুত হিন্দু রমণী মুসলিম শাসকের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার চেয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। এইরকম একটি গল্প নিয়েই সঞ্জয় লীলা বানসালি ‘পদ্মাবতী’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন। কিন্তু হিন্দু মৌলবাদীরা ক্ষুব্ধ, কারণ তারা শুনেছে ছবিতে দেখানো হয়েছে খিলজি আর পদ্মাবতীর ঘনিষ্ঠতা। ছবি না দেখে কী করে আমরা বলবো কী দেখানো হয়েছে। ‘গুজব’-এর যে কী অবিশ্বাস্য গুণ! মানুষ চোখ-কান বুজে গুজবকে অনায়াসে বিশ্বাস করে ফেলে।

সঞ্জয় লীলা বানসালি সহ আরও অনেকে, যারা পদ্মাবতী ছবিটি ঘরে বসে দেখেছেন, বলেছেন, ‘ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই, যে দৃশ্য দেখে হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে’। তারপরও শান্ত হয়নি হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠী। প্রথম দিকে না মানলেও, ধীরে ধীরে সরকারি দলের লোকেরাও মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিচ্ছেন। পদ্মাবতীকে নিষিদ্ধ করছেন। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া ছবিটিকে অযথাই শেকল পরানো হয়েছে।

আমি আর সবার মতো বলতে চাইছি না ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই। আমি বলতে চাইছি, যদি থাকেই, তাহলে ক্ষতি কী? ইতিহাসে পদ্মাবতীর কোনও উল্লেখই নেই, কিন্তু কাব্যে আছে বলে পদ্মাবতীকে আজ ঐতিহাসিক চরিত্র বলে ভেবে নেওয়া তো ঠিক নয়। সত্যিকার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকেই শিল্পী সাহিত্যিকরা নতুন করে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে চিরকালই লিখেছেন, এঁকেছেন। চলচ্চিত্রে, নাটকে, গানে চরিত্রগুলো বারবার এসেছে, সবসময় যে একই রূপে, একই গল্পে তা নয়। ইতিহাস নিয়ে প্রচুর চলচ্চিত্রই নির্মিত হয়েছে, যেগুলোতে রয়ে গেছে প্রচুর ভুল। ১৯৯৮ সালে শেখর কাপুর এলিজাবেথ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন, ওই ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন রানী এলিজাবেথ তাঁর  উপদেষ্টা স্যার উইলিয়াম সেসিলকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করেছেন। বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা ঘটেছিল, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্যার উইলিয়াম সেসিল রানীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে রানীর পাশে ছিলেন। পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গ সংগীত তারকা পিয়ানোবাদক মোজার্টের জীবন কাহিনি নিয়ে ‘আমেডিউস’ নামের চলচ্চিত্রে মোজার্টকে দেখানো হয়েছে একটা নষ্ট ছোঁড়া হিসেবে, বাস্তবে মোজার্ট মোটেও তা ছিলেন না। সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি  টাইটানিক ছবিতে জাহাজ দুর্ঘটনা সত্য , কিন্তু  জ্যাক ডোসন আর রোজের প্রেম কাহিনি সত্য নয়। ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ ছবিতে ব্রিটিশ  ট্রুপের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ‘ইউ-৫৭১’ ছবিতেও ব্রিটিশের বদলে আমেরিকান সৈন্য দেখানো হয়েছে। এসব নেহাতই ইতিহাস বিকৃতি। ইতিহাস বিকৃতি আরও কত যে ছবিতে প্রকট, গ্ল্যাডিয়েটর, ব্রেভহার্ট, দ্য পেট্রিয়ট, মারি আন্তোয়ানেত, সেক্সপিয়র ইন লাভ…। সমালোচকরা বিকৃতির এবং ভুল তথ্যের নিন্দে করেছেন। কেউ কেউ আবার শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ছবি নিষিদ্ধ করেননি, কেউ পরিচালকের মাথার মূল্য ঘোষণা করেননি, কেউ অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নাক-কান কেটে ফেলার ফতোয়া দেননি। এসব দেওয়া হচ্ছে ভারতের মতো নানা ধর্মের, নানা ভাষার, নানা রঙের মানুষের গণতন্ত্রে। আর কোনও দেশে না  হোক, খাজুরাহো আর ইলোরা অজন্তার দেশে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করাটা দেশকেই, দেশের শিল্পকেই, চরম অপমান করা।

ইতিহাসের রদ-বদল এবং বিকৃতি হামেশাই হচ্ছে। কেউ যখন আমরা সঠিক করে জানি না ঠিক কী ঘটেছিল সুদূর অতীতে, আমরা কল্পনা করে নিই অনেক ঘটনা। চার্লস ডিকেন্সকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘দ্য লাস্ট ডিকেন্স’, এডগার অ্যালেন পোকে নিয়ে ‘দ্য পো শ্যাডো’, এসব তো আছেই, আলেক্সান্দ্র দুমা লিখেছেন ‘কুইন মারগো’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘প্রথম আলো’। এরকম নানা বইয়ে মেশানো হয়েছে সত্যের সঙ্গে মিথ্যে, অথবা খানিকটা সত্যের সঙ্গে অজস্র কল্পনা। বইয়ে কতটুকু সত্য আর কতটুকু কল্পনা তা নিয়ে বিতর্ক হয় হোক। ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে শুধু তথ্যচিত্র হতে পারে, কোনও চলচ্চিত্র নয়। এ নিয়ে হোক বিতর্ক। হোক কলরব। আবারও বলছি, বিতর্ক হওয়া ভালো, কিন্তু বই বা চলচ্চিত্র, বা কোনও শিল্পকর্ম নিষিদ্ধ করা আর গণতন্ত্রকে নিষিদ্ধ করা একই জিনিস। আমরা গণতন্ত্র নিষিদ্ধ হোক চাই না।

মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে এখনও অধিকাংশ মানুষের কোনও ধারণা নেই। তারা গণতন্ত্র মানে এখনও বোঝে নির্বাচন, ভোটে হারা, ভোটে জেতা। মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে এখনও অধিকাংশ মানুষ রায় দেয়, মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অধিকার কারোর নেই। তারা বলতে চায়, কারওরই এমন কোনও কথা বলা বা কাজ করা উচিত নয়, যা দেখে বা পড়ে বা শুনে অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। এর মতো অগণতান্ত্রিক মন্তব্য আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। কেউই, বিশেষ করে প্রতিভাবান কেউ, সবাইকে খুশি করে বা সুখী করে চলতে পারে না। ভিন্ন মতে বিশ্বাস করে যারা, তাদের হয় মুখ বুজে থাকতে হবে অথবা মরে যেতে হবে।

পদ্মাবতী ইতিহাসের অংশ নয়। অংশ হলেও তাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার অধিকার সবার আছে। সাধারণ মানুষের আছে, কবি সাহিত্যিকদের আছে, চলচ্চিত্র পরিচালকদের আছে। আর যদি ইতিহাসের অংশ না হয়, তাহলেও পদ্মাবতীকে  যেমন ইচ্ছে গড়ার স্বাধীনতা শিল্পীদের আছে। শিল্পীদের হাত থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিলে তাদের আর কিছুই থাকে না। একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক এবং কতটা সভ্য, তা নির্ভর করে সেই সমাজের নারীরা এবং শিল্পীরা কতটা স্বাধীন। পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে ভারতবর্ষের সমাজ এখনও পড়ে আছে অগণতন্ত্রের অন্ধকারে। ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের নাম ভারত’ –  এই  স্লোগান না দিয়ে বরং ‘গণতন্ত্র কাকে বলে’ তা শিখতে হবে ভারতবাসীকে। এও বুঝতে হবে,  তোমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে–এ সমস্যা তোমার, অন্য কারোর নয়। এই সমস্যার সমাধান তোমাকেই করতে হবে, অনুভূতির আঘাত নিয়ে ঝামেলা হলে নিজের অনুভূতির আঘাত নিজে সারাও। কিন্তু সহিংস হয়ে নয়, অন্যকে হুমকি দিয়ে নয়, অন্যকে শারীরিক আঘাত দিয়ে নয়।

মৌলবাদীদের যুক্তি অনেকটা ধর্ষকদের যুক্তির মতো। মেয়েরা ছোট পোশাক পরলে আমরা উত্তেজিত হই, সুতরাং আমরা ধর্ষণ করি। একইভাবে চলচ্চিত্রে এমন দৃশ্য দেখিয়েছ যা আমাদের অসন্তুষ্ট করে, উত্তেজিত করে, রাগান্বিত করে, সুতরাং তোমার চলচ্চিত্র আমরা নিষিদ্ধ করবো, তোমার মুন্ডু কেটে নেবো, তোমার নাক কেটে নেবো।

মৌলবাদীদের যুক্তিতে পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ আর মাথার মূল্য ধার্যকরণ মেনে নেওয়া মানে–ধর্ষকের যুক্তিতে ধর্ষণ মেনে নেওয়া। এ দুটোতে তফাৎ কিছু নেই। নারীর এবং শিল্পীর স্বাধীনতা অধিকাংশ মানুষ না মানলে সমাজে নারী এবং  শিল্পীদের বিরুদ্ধে যে বর্বরতা দেখি, সেই বর্বরতাই আজ দেখছি ভারতবর্ষে।

ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংস

ayodhya destruction rejoiceঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংসের ২৫তম কালো দিবস আজ বুধবার। শুধু হিন্দুস্থান ভূখন্ডেরই নয়, গোটা মুসলিম উম্মাহর আরেকটি বেদনাবহ দিন। এই দিবসটি ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশধারী কট্টর হিন্দু মৌলবাদী ভারতের প্রকৃত চেহারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। বিগত ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বাবরী মসজিদের ভূমিকে দ্বিখন্ডিত করে এক ভাগ রামমন্দিরের বলে বিভক্ত রায় দিয়ে নিন্দার ঝড় তুলে। ভারতীয় আদালতের একতরফা রায় বিশ্বের প্রতিটি মুসলমানের মনে আঘাত দেয়। নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর উগ্রবাদী হিন্দুদের আশকারা যেন বেড়ে যায়। নতুন করে হুংকার দেয়া হচ্ছে বাবরী মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণ করার। এতে করে ক্ষোভ দানা বাঁধছে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে।

অথচ দেশটির লিবারহান কমিশন তার রিপোর্টে বলেছে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র ছিল নিখুঁত। এর জন্য তৎকালীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতা ও পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, আরেক বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানী এবং সাবেক বিজেপি সভাপতি মুরলি মনোহর যোশীকে দায়ী করা হয়। ১৭ বছরে বিভিন্ন সরকার নানা অজুহাতে ৪৮ বার লিবারহান কমিশনের কার্যকালের মেয়াদ বৃদ্ধি করে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৯২ সালের আজকের দিনে ভারতের কংগ্রেস ক্ষমতাসীন থাকাকালে উগ্রবাদী হিন্দুরা উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা শহরে অবস্থিত ষোড়শ শতকের এই অনুপম মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনটি ধ্বংস করে। হিন্দু শাস্ত্রীয় রামের জন্মস্থান ও মন্দিরের স্থলে স¤্রাট বাবর মসজিদ নির্মাণ করেছেন মর্মে হাস্যকর অভিযোগ এনে কংগ্রেস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই নিন্দিত ধ্বংসকান্ড সংঘটিত হয়। ভারতের প্রথম মোঘল স¤্রাট বাবর ১৫২৮ সালে অযোধ্যা শহরে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। কিন্তু ঊনিশ শতকের গোড়া থেকেই নেতৃস্থানীয় হিন্দুরা তদস্থলে রামমন্দির ছিল বলে প্রোপাগান্ডা চালাতে থাকে। অব্যাহত প্রচারণার বদৌলতে অবস্থা এমন হয়, ১৯৪০ সালের পর থেকে সাধারণ হিন্দুরা বাবরী মসজিদের জায়গায় আগে রামের জন্মস্থানের স্মৃতিবাহী রামমন্দির ছিল বলে মনে করতে থাকে। বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদী হিন্দুরা বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে চুরমার করতে উদ্যত হলেও নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে কট্টর হিন্দুবাদী কংগ্রেস সরকারের মদদে উগ্র হিন্দুরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই এই অমার্জনীয় অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়। সেদিন মুম্বাই, আহমেদাবাদ, বেনারস এবং জয়পুরসহ বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দুই সহস্রাধিক মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। এ ঘটনায় সরকারকে বিবাদী করে মামলা পর্যন্ত হয়। ভারত সরকার মামলার রায় নিজেদের পক্ষে নিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ ও সর্বকৌশল অবলম্বন করে।

প্রত্নবিশারদরা বাবরী মসজিদের স্থলে রামমন্দির থাকার দাবিকে বরাবরই ‘মনগড়া’ ও ‘হাস্যকর’ অভিহিত করে। ঐতিহাসিক সত্যকে ভারতের কট্টর হিন্দুবাদী সরকার কখনোই আমলে নেয়নি। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার দশ দিন পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও ঘটনা তদন্তে লিবারহান কমিশন গঠন করলেও তাকে প্রভাবিত করার ব্যর্থ চেষ্টা অব্যাহত ছিল। লিবারহান কমিশনের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার বিচারে পরিচালিত তদন্তে কার্যক্রমের রিপোর্ট ২০০৯ সালের ৩০ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে দাখিল করা হলেও সরকার তা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। ঐ সময় লিবারহান কমিশনের রিপোর্টের বরাত দিয়ে ইংরেজী দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংসের সরকারি ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিলে সমগ্র ভারতে তুমুল হৈ চৈ পড়ে যায়। সেই লিবারহান কমিশনের রিপোর্টকে পায়ে দলে ও মুসলমানদের আবেদন খারিজ করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এক হতবুদ্ধিকর রায় দেয়। ঐ রায়ে বাবরী মসজিদের জমি রাম জন্মভূমির দাবিদারদের দেয়া হয়েছে। উক্ত রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মুসলমানরা বাবরী মসজিদ এলাকার এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করতে পারে।

অযোধ্যায় যে বাবরী মসজিদ ছিল সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেন খোদ ভারতের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র। তিনি গতকাল আনন্দবাজার পত্রিকায় এক নিবন্ধে স্পষ্টত বলেছেন, “১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর দিনেদুপুরে অযোধ্যা বা ফৈজাবাদে একটি মোগলাই মসজিদ শ্রীরামের নামে এক দল করসেবক ভেঙে ফেলল, ঠুঁটো জগন্নাথের মতো সরকার বসে দেখল, আদভানীর মতো জাতীয় নেতারা অকূস্থলে উপস্থিত থেকেও নীরব থাকলেন, উমা ভারতীর মতো উঠতি নেতারা জিগির তুলে সরাসরি ধ্বংসে মদদ দিলেন। এই ইমারতি ধ্বংসকার্যের ছবিই তো ভারতীয় রাজনীতির একটি বহুল প্রচারিত পোস্টার। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে ছবিটি ফিরে ফিরে তুলে ধরা হয়। গুঁড়িয়ে দেয়া মসজিদের জায়গাটি ফাঁকা এখনও আছে, ওই রাম জন্মভূমিতে রামলালার মন্দির করতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত বলে দিয়েছেন যে, সামনের বছরের মধ্যেই মন্দির উঠে যাবে। উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের সরকার হিন্দুত্বের সুপবন জোতদার, অতএব সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে থাকা মামলা মিটিয়ে ফেলে রাম মন্দির তোলাটা শুধু একটু সময়ের ওয়াস্তা। ২০১৮-র ডিসেম্বরের মধ্যেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজ রাম মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটনেই উদ্যাপিত হবে, মোহন ভাগবত এ হেন আশ্বাস দিয়েছেন। মসজিদ ধ্বংস তো মন্দির নির্মাণের জন্যই। এক তœতœ-ইতিহাসের বস্তু সাক্ষ্যের পরিবর্তে কৌম ইতিহাসের বানিয়ে তোলা নিদর্শনকে বসানোর রাজনীতি ৬ ডিসেম্বর তারিখটিকে যেন স্মৃতির বুড়ি হিসাবে দাগিয়ে দিয়েছে।”

“৬ ডিসেম্বর তো রাজনৈতিক ব্যর্থতারই উদ্যাপন” শীর্ষক নিবন্ধে মি. ভদ্র আরো বলেন, “৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ আদৌ আকস্মিক নয়, প্রস্তুতি ছিল। আঠারো শতক থেকেই রামায়েতপন্থী সম্প্রদায়ের উত্থানে ফৈজাবাদকেই রাম জন্মভূমি বলে দাবি করা হয়। উনিশ শতকে হনুমানগড়ির সাধুদের সঙ্গে ফৈজাবাদের মৌলবীর সংঘর্ষ হয়, অযোধ্যার নবাব সৈন্য পাঠিয়ে হাঙ্গামা বন্ধ করেন। সতীনাথ ভাদুড়ির উপন্যাসেও রাম জন্মভূমির কথা উল্লেখিত হয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর ভারতে মসজিদের মধ্যেই রামলালার বিগ্রহ হাজিরা দেন। প্রয়োজনে অল্পবিস্তর পুজোআচ্চাও চলে। আবার আদালতের নির্দেশে দরজায় তালাও পড়ে। ১৯৮০-র দশক থেকে রামজন্মভূমি আন্দোলন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ চাগিয়ে তোলে, প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আনুকূল্যে মসজিদের তালাও খোলা হয়, ওই প্রাঙ্গণেই রামপূজা চলতে থাকে। রাজনৈতিক দল হিসাবে এ বার বিজেপি আন্দোলনে নেমে পড়ে। এখন কেবল প্রাঙ্গণ নয়, মসজিদ দখল করে মন্দির তুলতে হবে। ১৯৯০-তে করসেবকদের উপর মুলায়ম সরকার গুলী চালায়। একাধিক করসেবক মারাও যায়। সমিধ সংগ্রহ তো শেষ, এ বার শুধু অরণি কাষ্ঠে অগ্নিসংযোগ অপেক্ষিত ছিল, বাবরী মসজিদ ধ্বংস তো সেই অগ্নিসংযোগ মাত্র।”

মামলার শুনানি পিছিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি : পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে জানানো হয়, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৫তম কালো দিবেসর ঠিক আগের দিন গতকাল মঙ্গলবার আবেদনকারীদের আর্জি মেনে পিছিয়ে গেল অযোধ্যা মামলার চূড়ান্ত শুনানি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ফের এই মামলার শুনানি। অযোধ্যার বিতর্কিত জমি কার? এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয় এদিন বেলা ২টা থেকে। এই মামলায় ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ১৩টি আবেদন খতিয়ে দেখবে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ।

২০১০-এর ৩০ সেপ্টেম্বর রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলায় রায় দেয় ইলাহাবাদ হাইকোর্ট। ওই রায়ে আদালত বলে, অযোধ্যায় রামজন্মভূমি ও বাবরি মসজিদের ২ দশমিক ৭৭ একরের বিতর্কিত জমি সুন্নী ওয়াকফ বোর্ড, হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধিত্ব করা রামলালা এবং নির্মোহী আখড়া- এই তিন পক্ষের মধ্যে ওই জমি সমান ভাগ করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, মামলার নথিপত্র পেশ করার জন্য আবেদনকারীদের কাছে এটিই (৮ ফেব্রুয়ারি) শেষ সুযোগ। এর পরে আর শুনানি পিছনো হবে না।

অবশ্য ওয়াকফ বোর্ড ও বাবরি অ্যাকশন কমিটির দাবি, সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বা সাত সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চে শুনানি হোক। অন্যথায় এ দিনের শুনানি বয়কট করবে তারা। আর লোকসভা নির্বাচনের পর শীর্ষ আদালতে শুনানি করার আবেদন করল সুন্নী ওয়াকফ বোর্ড।

আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা ও সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে ২০১১-র ৯ মে কোর্টের দুই সদস্যের একটি বেঞ্চ ইলাবাবাদ হাইকোর্টের রায়ের উপরে স্থগিতাদেশ জারি করে বলে, উচ্চ আদালতের ওই রায় বিস্ময়কর, কারণ কোনও পক্ষই জমি ভাগ করে দিতে বলেনি। এর পরের ৬ বছরেও অযোধ্যার ওই বিতর্কিত জমির মালিকানা নিয়ে মামলার শুনানি শুরু করা যায়নি। চলতি বছরের মার্চে আদালতের বাইরে এই বিতর্কে নিষ্পত্তির কথা বলে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু,তাতে কোনও পক্ষই রাজি হয়নি। এর পর আগস্টে শিয়া সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়, বিতর্কিত জায়গার থেকে দূরে কোনো মুসলিম অধ্যুষিত স্থানে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হোক। তাতে আপত্তি জানায় সুন্নী বোর্ড।

গতকাল শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি অশোক ভূষণ এবং বিচারপতি আব্দুল নাজিরের বিশেষ বেঞ্চে ওই মামলায় ১৩টি আবেদনের উপর শুনানি শুরু হয়। রামলালার পক্ষে কে পরাশরণ, সি এস বৈদ্যনাথন এবং সৌরভ শামশেরি, উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষে এডিশনাল সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা শুনানির সময় উপস্থিত থাকেন। অন্য দিকে, অল ইন্ডিয়া সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড ও নির্মোহী আখড়া-সহ অন্যদের পক্ষে থাকেন কপিল সিব্বল, অনুপ জর্জ চৌধুরি, রাজীব ধবন ও সুশীল জৈন।

‘শৌর্য দিবস’ পালনের হুংকার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের : এদিকে, গুজরাটের ভোটের আগে, এ বার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৫ বছর পূর্তিকেও বড়সড় ভাবে পালন করতে চাইছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)। তারা আজকের দিনটিকে (৬ ডিসেম্বর) ‘শৌর্য দিবস’ হিসেবে তুলে ধরার ঘোষণা দিয়ে গতকাল হুঙ্কার দিয়েছে, “মন্দির-যোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণ হবেই”।

আনন্দবাজার পত্রিকা আরো জানায়, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকেই ওই দিনটি ‘শৌর্য দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে পরিষদ। কিন্তু তা কখনই বড়সড় আকারে হতে পারেনি। তবে এ বার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৫ বছরে অযোধ্যা ও লখনউয়ে বড় আকারে ‘শৌর্য দিবস’ পালনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

গুজরাট ভোটকে সামনে রেখে কিছু দিন থেকেই রামমন্দির নিয়ে হাওয়া তুলতে চাইছে সঙ্ঘ পরিবার। সম্প্রতি সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত মন্তব্য করেন, “অযোধ্যায় বিতর্কিত জমিতে রামমন্দিরই হবে”। এর পরেই ‘শৌর্য দিবস’-এর পরিকল্পনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পরিষদ। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা অম্বুজ ওঝা উসকানিমূলকভাবে বলেন, আজ লখনউয়ে ‘শৌর্য সংকল্প সভা’-র আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া, “অযোধ্যায় কেশবপূরমেও ওই দিন দুপুরে সাধুসন্তরা বৈঠকে বসতে চলেছেন।’’ এ জন্য পরিষদের দফতরে প্রস্তুতিও চলছে জোরকদমে। ক’দিন আগে উত্তরপ্রদেশের উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশবপ্রসাদ মৌর্যও অযোধ্যার বিতর্কিত এলাকায় রামমন্দির গড়ার জন্য সওয়াল করেছেন। তা পরিষদকে আরো উৎসাহিত করেছে।

তবে অযোধ্যায় বিতর্কিত স্থানে রামমন্দিরই হবে বলে মোহন ভাগবত যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন হায়দরাবাদের সাংসদ ও এআইএমআইএম নেতা আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। তিনি ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেন, “কে মোহন ভাগবত? তিনি কি দেশের প্রধান বিচারপতি? কোর্টে অযোধ্যার বিচার যখন চলছে, তখন কোন অধিকারে ভাগবত বলছেন, বিতর্কিত জায়গাতে রামমন্দিরই হবে।” পরিষদের আর এক শীর্ষস্থানীয় নেতা সুরেন্দ্র জৈন আগামী বছরের ১৮ অক্টোবর থেকে রামমন্দির নির্মাণের কথা কী ভাবে বললেন, সে প্রশ্নও তুলেছেন ওয়েইসি।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি বলছে মানবিক সংহতি মিথ্যা

Tawakkol Karmanতাওয়াক্কুল কারমান : মিয়ানমারে কী ঘটছে, তা নিয়ে কেউ আর বিতর্ক করছে না। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং বিশ্বের বড় দেশগুলো- সবাই একমত যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা জাতিগত নিধন ও গণহত্যার সুস্পষ্ট উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন মোতাবেক রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে কেবল অক্টোবর পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ। এ সংকট ক্রমাগতভাবে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। একদিকে মিয়ানমার সরকারের অসহিষ্ণুতা এবং বর্ণবাদী নীতিগুলো অটলভাবে চালিয়ে নেয়ার জোর অবস্থান আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে; অন্যদিকে বাস্তবতা হচ্ছে মিয়ানমারে কী ঘটছে তার প্রতি বিশ্বের আগ্রহ যথেষ্ট গভীর ও আন্তরিক নয়। সবচেয়ে মারাত্মক সত্য, যা রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি উন্মুক্ত করেছে তা হল- ‘মানবিক সংহতি’র আইডিয়া সম্ভবত বড় ধরনের একটি মিথ্যার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

যারা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও আদর্শ বিবেচনা না করে (আমিও তাদের একজন) মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে, তারা কঠিন ধাঁধার মোকাবেলা করছে। কেন এটি ঘটছে? কেন আপনার চোখের সামনে ঘটতে থাকা মানবিক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি বন্ধ হচ্ছে না? নির্দিষ্ট একটি জাতির ভোগান্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয়া ও মানবিক সংহতি প্রকাশের জন্য কি অবশ্যই পূরণ করতে হবে এমন কোনো অদৃশ্য শর্ত আছে?

আমি ভয় করছি, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ভয়ংকর কিছু হবে। কেবল ধনী ও শক্তিশালীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই কি

মানবিক সংহতি?

অনেকে বুঝতে শুরু করেছেন, মানবিক সংহতি মুসলিম পর্যন্ত বিস্তৃত হয় না। এ মত কতটুকু সঠিক, তা বিবেচনা ছাড়াই বলা যায়, এটি সন্দেহের একটি নির্দেশক এবং এটি কোনো ভালো বিষয় নয়। এর বাইরেও মিয়ানমার প্রশাসন প্রতিদিন ভয়ংকর যে সহিংসতা সংঘটিত করার পরও এমন মিত্র খুঁজে পাচ্ছে। যারা তাদের কৃতকর্মকে সমর্থন ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, তা-ও একটি সমস্যা। রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য মিয়ানমার প্রশাসনের দায়িত্ব স্পষ্ট এবং যা কিছু ঘটছে তা অস্বীকার করে দেয়া মিয়ানমারের বিবৃতি সর্বৈব মিথ্যা।

অত্যাচারের মুখেও মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য নিজের অতীতকে উৎসর্গ করা যোদ্ধা, মিয়ানমার সরকারের নেতা ও সাবেক নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি- একজন মানুষ নিজেকে কত ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলতে পারে তার বড় উদাহরণ যার বিষয়ে আমাদের ধারণা ছিল, যা কিছুই ঘটুক তিনি নিজের মূলনীতি সমুন্নত রাখবেন।

এটি সত্যিকারার্থেই বিয়োগান্ত, সু চি বাস্তবতার প্রকাশ্য বিরোধিতা করছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সহিংসতা ও জাতিগত নিধনের বিষয়গুলো অস্বীকার করছেন। সু চি অন্তত মানবাধিকারের বা তার নিজের সম্মানের জন্য লড়াই ও বিজয় অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের জাতি ও এর সামরিক বাহিনীর জন্য লড়াই করাকেই বেছে নিলেন, যাদের একটি ভিশন হল বৈচিত্র্যকে বর্জন, প্রান্তিকীকরণ ও প্রত্যাখ্যান করা। অনেক বেশি মর্যাদা দেয়া হতো এমন একজন নারীর কী বিয়োগান্ত সমাপ্তি!

সারা বিশ্ব দেখেছে কীভাবে গোটা গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং গ্রামবাসীদের হত্যা বা বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে; গণহত্যা চালানো হয়েছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে। কে এমন যুক্তি গ্রহণ করতে পারে? আমি মনে করি, কেউ সেটা পারে না।

সত্য হল, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধী ও প্রতিপক্ষকে শোষণ এবং অত্যাচারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘাঁটিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য। এটি একটি পুরনো ধোঁকা, যা সবাই প্রকাশ্যে বুঝতে পারে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাহসী হতে হবে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের দিকে।

নিজেদের আখের গোছানোর জন্য ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা থেকে একনায়ক শাসকদের বিরত রাখতে হবে। কেবল তা-ই নয়, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ সংঘটন করছে, তাদের সত্যিকারের জবাবদিহিতার আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। এখনই রোহিঙ্গাবিরোধী সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে, এমন বহু আহ্বান জানানো হয়েছে। একে ইতিবাচক উন্নতি হিসেবে দেখা যায়, যদিও তা এসেছে অনেক পরে- একেবারে না হওয়া থেকে দেরিতে হওয়া তো ভালো।

এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও মিয়ানমার প্রশাসন সম্ভবত এমন আহ্বানে সাড়া দেবে না, যতক্ষণ না সেখানে ঘটতে থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসী ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করবে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এমন একটি বাহিনী, যারা এখনও সেখানে হামলা-গুলি করে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা কোনো অপরাধ দেখতে পাচ্ছে না।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি আমাদের দেখিয়েছে জাতিসংঘের একটি সদস্য দেশ কীভাবে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ নীতি তৈরি করতে পারে আন্তর্জাতিক কোনো পারিপার্শ্বিকতা ছাড়াই। ফলে যদি সত্যিকারের শুদ্ধতার গতিপথ আমাদের দেখতে হয়, তবে মিয়ানমার প্রশাসনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অবশ্যই বাড়াতে হবে।

এটিই সঠিক সময় মিয়ানমার বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নেয়ার। যে দেশটি বর্ণবাদী নীতিমালার প্রসার ঘটাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে আমাদের শান্ত হয়ে থাকা কোনোভাবেই উচিত নয়। এটিই সঠিক সময় এমন একটি মানবিক ট্র্যাজেডি বন্ধ করার, যা কিনা কয়েক দশক ধরে চলছে অযৌক্তিকভাবে।

কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে; যে শরণার্থীরা মাত্র দুই মাস আগে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিপীড়নমূলক অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কিন্তু এ চুক্তি (যদি তা বাস্তবায়িত হয়ও) যথেষ্ট নয়, যাতে মনে হচ্ছে কোনোকিছুই ঘটেনি।

এটি সত্য, মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির বিরুদ্ধে চলমান ট্র্যাজেডি বন্ধ করতে হলে প্রত্যাবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মিয়ানমার সরকার এমন কী নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, জাতিগত নিধন অভিযান তারা পুনরায় ঘটাবে না?

মানবতা ও ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ না জেনেই রোহিঙ্গারা যুগের পর যুগ বেঁচে আছে। এর কিছু অংশ যদি তারা এখনও খুঁজে না পায়, তবে কি তা আশ্চর্যজনক হবে না? এটি উপলব্ধি করতে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের অবশ্যই কাজ করতে হবে, কেবল তাদের জন্য নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই।

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

তাওয়াক্কুল কারমান : নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইয়েমেনের সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

নামাজের সুন্নত

salah_calligraphyমাওলানা ইসমাঈল : নামাজ পড়া ফরজ; কিন্তু যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে নামাজ পড়ার এখতিয়ার কারো নেই। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার মতো নামাজ পড়ো।’ নামাজের প্রকৃত ফজিলত পেতে হলে অবশ্যই রাসুল (সা.)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী নামাজ পড়তে হবে।

নামাজে দাঁড়ানোর সময়ের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সুন্নত

(১) উভয় পায়ের আঙুল কিবলামুখী করে রাখা এবং উভয় পায়ের মাঝখানে চার আঙুল, ঊর্ধ্বে এক বিঘত পরিমাণ ফাঁক রাখা। (২) তাকবিরে তাহরিমার সময় চেহারা কিবলার দিকে রেখে নজর সিজদার জায়গায় রাখা এবং হাত ওঠানোর সময় মাথা না ঝুঁকানো। (৩) উভয় হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির মাথা কানের লতি পর্যন্ত ওঠানো। (৪) হাত ওঠানোর সময় আঙুলগুলো ও হাতের তালু কিবলামুখী রাখা। (৫) আঙুলগুলো স্বাভাবিক রাখা। অর্থাৎ একেবারে মিলিয়ে না রাখা, আবার বেশি ফাঁক ফাঁক করেও না রাখা। (৬) ইমামের তাকবিরে তাহরিমা বলার সঙ্গে সঙ্গে মোক্তাদির তাকবিরে তাহরিমা বলা। তবে লক্ষ রাখতে হবে, যেন ইমামের তাকবিরে তাহরিমার আগে মোক্তাদির তাকবিরে তাহরিমা বলা শেষ না হয়।

এরূপ হলে মোক্তাদির নামাজ হবে না। (৭) হাত বাঁধার সময় ডান হাতের তালু বাঁ হাতের পিঠের (পাতার) ওপর রাখা। (৮) ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কনিষ্ঠাঙ্গুলি দ্বারা গোলাকার বৃত্ত বানিয়ে বাঁ হাতের কবজি ধরা। (৯) অবশিষ্ট তিন আঙুল বাঁ হাতের ওপর স্বাভাবিকভাবে বিছিয়ে রাখা। (১০) নাভির নিচে হাত বাঁধা। (১১) ছানা পড়া।

(বুখারি, হাদিস : ৭৩৪, ফাতাওয়া আলমগিরি : ১/৭৩, তিরমিজি, হাদিস : ৩০৪, ২৫২ নাসায়ি, হাদিস : ৮৯২, মুস্তাদরাক : ১৭৬১, ৮৫৬, মুসলিম, হাদিস : ৩৯১, আবু দাউদ, হাদিস : ৭২৬, ৭৫৬, ৭৭৫, ফাতহুল কাদির : ১/২৫০)

নামাজের কেরাতের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সুন্নত

(১) প্রথম রাকাতে ছানা পড়ার পর পূর্ণ আউজুবিল্লাহ পড়া। (২) প্রতি রাকাতে সুরা ফাতিহা ও সুরা মেলানোর আগে পূর্ণ বিসমিল্লাহ পড়া। (৩) সুরা ফাতিহার পর সবার জন্য নীরবে ‘আমিন’ বলা। (৪) ফরজ নামাজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে শুধু সুরা ফাতিহা পড়া।

(বুখারি, হাদিস : ৭৭৬, ৭৮০, মুসলিম, হাদিস : ৭৩৩, আবু দাউদ, হাদিস : ৭৬৪)

রুকুর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সুন্নত

(১) তাকবির বলা অবস্থায় রুকুতে যাওয়া। (২) উভয় হাত দ্বারা হাঁটু ধরা। (৩) হাতের আঙুলগুলো ফাঁক করে ছড়িয়ে রাখা। (৪) উভয় হাত সম্পূর্ণ সোজা রাখা, কনুই বাঁকা না করা। (৫) পায়ের গোছা, হাঁটু ও ঊরু সম্পূর্ণ সোজা রাখা। হাঁটু সামনের দিকে বাঁকা না করা। (৬) মাথা, পিঠ ও কোমর সমান রাখা এবং পায়ের দিকে নজর রাখা। (৭) রুকুতে কমপক্ষে তিনবার রুকুর তাসবিহ পড়া। (৮) রুকু থেকে ওঠার সময় ইমামের ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’, মোক্তাদির ‘রাব্বানা লাকাল হামদ’ এবং একাকী নামাজ আদায়কারীর উভয়টি বলা। (বুখারি, হাদিস : ৭৮৯, ৭৯০, ৮২৮, আবু দাউদ, হাদিস : ৭৩১, ৭৩৪, ৮৬৩, ফাতাওয়া আলমগিরি : ১/১২)

সিজদার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সুন্নত

(১) তাকবির বলা অবস্থায় সিজদায় যাওয়া। (২) হাঁটু থেকে আনুমানিক এক হাত দূরে উভয় হাত রাখা এবং হাতের আঙুলগুলো কিবলামুখী করে সম্পূর্ণরূপে মিলিয়ে রাখা। (৩) উভয় বৃদ্ধাঙ্গুলির মাথা বরাবর নাক রাখা। (৪) দুই হাতের মাঝে সিজদা করা এবং দৃষ্টি নাকের অগ্রভাগের দিকে রাখা। (৫) সিজদায় পেট ঊরু থেকে এবং উভয় বাহু পাঁজর থেকে পৃথক রাখা। (৬) কনুই মাটি ও হাঁটু থেকে পৃথক রাখা। (৭) সিজদায় কমপক্ষে তিনবার সিজদার তাসবিহ পড়া। (৮) তাকবির বলা অবস্থায় সিজদা থেকে ওঠা।

(বুখারি, হাদিস : ৮০৩, ৮০৭, ৮২২, ৮২৫, মুসলিম, হাদিস : ৪০১, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৬৬২, ১৮৮৮২, ১৮৮৮০)

নামাজে বসার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সুন্নত

(১) বাঁ পা বিছিয়ে তার ওপর বসা। ডান পা সোজাভাবে খাড়া রাখা। উভয় পায়ের আঙুলগুলো সাধ্যমতো কিবলার দিকে মুড়িয়ে রাখা। (২) উভয় হাত রানের ওপর হাঁটু বরাবর রাখা এবং দৃষ্টি দুই হাঁটুর মাঝ বরাবর রাখা। (৩) ‘আশহাদু’ বলার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুলির মাথা একসঙ্গে মিলিয়ে গোলাকার বৃত্ত বানানো এবং অনামিকা ও কনিষ্ঠাঙ্গুলিদ্বয় মুড়িয়ে রাখা এবং ‘লা ইলাহা’ বলার সময় শাহাদাত আঙুল সামান্য উঁচু করে ইশারা করা। অতঃপর ‘ইল্লাল্লাহু’ বলার সময় আঙুলের মাথা সামান্য ঝুঁকানো। হাঁটুর সঙ্গে না লাগানো। (৪) আখেরি বৈঠকে আত্তাহিয়াতু পড়ার পর দরুদ শরিফ ও দোয়া মাছুরা পড়া। (৫) উভয় সালাম কিবলার দিক থেকে শুরু করা এবং সালামের সময় দৃষ্টি কাঁধের দিকে রাখা। (৬) ইমামের উভয় সালামে মোক্তাদি, ফেরেশতা ও নামাজি জিনদের প্রতি সালাম করার নিয়ত করা। (৭) মোক্তাদিদের উভয় সালামে ইমাম, অন্যান্য মুসল্লি, ফেরেশতা ও নামাজি জিনদের প্রতি সালাম করার নিয়ত করা। (৮) একাকী নামাজি ব্যক্তি শুধু ফেরেশতাদের প্রতি সালাম করার নিয়ত করা। (৯) মোক্তাদিদের ইমামের সালাম ফেরানোর পরপরই সালাম ফেরানো। (১০) ইমামের দ্বিতীয় সালাম ফেরানো শেষ হলে মাসবুকের ছুটে যাওয়া নামাজ আদায়ের জন্য দাঁড়ানো। (বুখারি, হাদিস : ৮৩৪, ৮৩৮, মুসলিম, হাদিস : ৫৮২, ৪৩১, নাসায়ি, হাদিস : ১১৫৮, আবু দাউদ, হাদিস : ৭২৬, তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৭৭, মুসান্নাফ, হাদিস : ৩১৪৯, ৩১৪০, ৩১৫৬)

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আম্বরশাহ আল ইসলামিয়া, কারওয়ান বাজার, ঢাকা।