Archive

Archive for the ‘ধর্মীয়’ Category

শাহদেরগাঁও জামে মসজিদ

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

shahdergaon-mosque-1shahdergaon-mosque-2

ফেসবুকে ধর্ম প্রচারের নামে প্রতারণা

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন

যুবায়ের আহমাদ : কালের আবর্তনে ফেসবুক একটি বড় যোগাযোগমাধ্যম হয়ে গেছে। দেশবিদেশের লাখো মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে ফেসবুক। বিশ্বের ১৬০ কোটি (প্রায়) মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করে। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পাঁচ কোটি সাত লাখেরও বেশি। ফেসবুক ব্যবহারকারীর পরিমাণ এক কোটি ৭০ লাখ। (দৈনিক যুগান্তর : ১১১১২০১৫) এ তো এক বছর আগের হিসাব। এক বছরে আরো অনেক বেড়েছে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা।

ফেসবুকের উন্মুক্ত এই বিশাল মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে সুযোগসন্ধানী মহল। অপরাধকারীরা যেমন তাদের অপরাধ বাস্তবায়নে জাল বিস্তার করছে, তেমনি বিভিন্ন ভ্রান্ত মতাবলম্বীও তাদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে ব্যবহার করছে ফেসবুককে। অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে ফেসবুক। সরলপ্রাণ মানুষকে বোকা বানিয়ে মিথ্যা প্রচার করার জন্য গুজব এবং ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে তারা। কখনো দেখা যায় যে ‘ইসলাম প্রচারের’ দোহাই দিয়ে করা হচ্ছে এসব কাজ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুয়া আইডি কিংবা পেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ফেসবুক উন্মাদনা এখন চরমে।

আমিন না লিখে যাবেন না’; ‘মুসলমান হলে আমিন না লিখে যাবেন না’ ‘ছুবহানাল্লাহ, আল্লাহর কী কুদরত!’ ‘এটা নবীজির পাত্র, আমিন না লিখে যাবেন না’—এমন লেখার সঙ্গে আল্লাহ কিংবা রাসুল (সা.)-এর নাম কিংবা কালিমা খচিত ছবি হয়তো ফেসবুক ইউজারমাত্রই দেখেছেন। এসব ভুয়া পোস্ট দিয়েই অনেকে ফেসবুকে ‘ইসলাম প্রচার’ করছেন। অনেকেই সরলপ্রাণে লাইককমেন্টও করেছেন। অসুস্থ বা রুগ্ণ শিশুর ছবি দিয়ে লিখে দেয়, ‘আমিন না লিখে যাবেন না। ’ ভাবখানা এমন যে, এখানে লাইক দিলেই জান্নাত। প্রশ্ন হলো, এখানে রুগ্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আমিন বলার কী সম্পর্ক? নবীজি (সা.)-এর পাত্রের সঙ্গে আমিন বলার কী সম্পর্ক?

পাশাপাশি কয়েকটি ধর্মীয় গ্রন্থের ছবি দিয়ে বলা হয়, ‘আপনি কোনটির সাপোর্টার?’ কখনো দেখা যায় এমসিকিউয়ের মতো প্রশ্ন। আপনার রব কে? এক. আল্লাহ। দুই. ভগবান। তিন. গড। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, হৃদয়ে ঝাঁকুনি দেওয়ার মতো প্রশ্ন, ‘আপনি কি মুসলমান?’ মুসলমান হলে লাইক না দিয়ে যাবেন না। আবেগী ফেসবুকাররা এখানে ধুমছে লাইক দিচ্ছেন। এগুলো ইসলাম নিয়ে ইসলামের পরিভাষা ‘আমিনকে’ নিয়ে উপহাস করা ছাড়া কিছুই নয়। কখনো দেখা যায়, অশুদ্ধ বা জাল হাদিস তুলে ধরে বলা হয়, ‘লাইক দিন, যদি জান্নাতে যেতে চান। ’ অথচ মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করা যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়। ’ (সহিহ বুখারি)

পোস্টটি শেয়ার করলে, ‘আমিন লিখলে অমঙ্গল থেকে বাঁচা যাবে; মনোবাসনা পূর্ণ হবে, শেয়ার না করলে, আমিন না লিখলে ব্যবসায় লোকসান হবে, সন্তান মারা যাবে’—এমন শিরকপূর্ণ কথাবার্তাও থাকে কথিত ইসলাম প্রচারে। আমিন লিখলেই মনোবাসনা পূর্ণ হবে, না লিখলে ক্ষতি—এটা কোরআনসুন্নাহর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কেননা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্ট দেন, তবে তিনি ছাড়া তা অপসারণকারী কেউ নেই। পক্ষান্তরে যদি তোমার মঙ্গল করেন, তবুও তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। ’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৭)

মূলত এসব পোস্টের মাধ্যমে মানুষকে শিরকে লিপ্ত করা হচ্ছে। একটি আমিন বলা বা শেয়ারই মানুষকে অমঙ্গল থেকে বাঁচাতে পারে—এমন ধারণা তো সম্পূর্ণ শিরক। অনেকেই সরল মনে অযাচিতভাবেই লিপ্ত হচ্ছে শিরকের মতো ক্ষমার অযোগ্য মারাত্মক অন্যায়ে। শিরককারীর জন্য জান্নাত হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন। তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (শিরকের মতো) অত্যাচারকারীদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই। ’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৭২)

ভুয়া সংবাদের অন্যতম উৎস হয়ে গেছে ফেসবুক। এখানে সবাই যেন সাংবাদিক। ফেসবুকের উন্মুক্ত মাধ্যমে যা ইচ্ছা তাই পোস্ট করা যায় বলে একে সুযোগ হিসেবে নিয়ে ভুয়া সংবাদ পোস্ট করেন। প্রায়ই দেখা যায়, ‘মক্কা শরিফের খাদেম স্বপ্নে দেখেছেনশেয়ার করলে এই পুরস্কার। ’ কয়েক দিন আগে দেখা গেল অং সান সু চির হিজাব পরা ছবি। নিচে লেখা—‘ইসলাম গ্রহণ করেছেন অং সান সু চি। ’ সারা পৃথিবীর কেউ জানে না। কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পেল না সেই খবর, কিন্তু বাঙালির ফেসবুক দখল করে নিল সু চির হিজাবি ছবি! একজন কমেন্টে প্রশ্ন করলেন, ‘এই খবর পৃথিবীর কোনো মিডিয়া পেল না, আপনি কোত্থেকে পেলেন?’ জবাব দেওয়া হলো, ইহুদিনাসারারা কি ইসলাম গ্রহণের খবর প্রচার করবে? কথায় কিন্তু যুক্তি আছে।

আরেকবার দেখা গেল, ‘এবার সনাতন ধর্ম গ্রহণ করলেন নওয়াজ শরিফের ভাতিজি। সবাই আশীর্বাদ করুন। ’ ‘যজ্ঞ করে ইসলাম ছেড়ে রফিক এখন হিন্দু রাজু। দেখামাত্রই পোস্টটি শেয়ার ও দাদাকে আশীর্বাদ করুন। ’ এসব ছবি নিছক ফটোশপের কারসাজি। ছবিটি ভালোভাবে দেখলে বোঝা যাবে যে কাজটা এত নিপুণভাবে করা যে তা কোনো আনাড়ি ধর্মপ্রিয় ফেসবুকারের কাজ নয়। বরং খুব ঝানু কেউ মুসলমানদের হাসির পাত্র বানানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজটা করেছে। প্রথমত, যাঁরা এ ধরনের পোস্ট দিয়ে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে খেলা করছেন, তাঁরা মারাত্মক অন্যায় করছেন। মিথ্যা বলা, লেখা, প্রচার করা ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ কবিরা গুনাহ। একটি কবিরা গুনাহই একজন মানুষকে জাহান্নামে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহর কথা বলব না? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, মাতাপিতার অবাধ্যতা, এরপর তিনি ঠেস দিয়ে বসে বললেন এবং শোনো! মিথ্যা কথা। তিনি (মিথ্যা কথা) বারবার বলতে লাগলেন। ’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

অনেক সময় লাইক বা কমেন্ট পাওয়ার জন্য এ ধরনের মিথ্যা বা গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়। লাইককমেন্ট পাওয়ার লোভ এক ধরনের মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। তারা যেন লাইককমেন্টের কাঙাল। ফলে বেশি লাইক পেতে ধর্মীয় অনুভূতি আর গুজবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, লাইক বা কমেন্ট কী মহামূল্যবান জিনিস যে মিথ্যা প্রচার করে লাইক বা কমেন্ট পেতেই হবে! কী উপকার হবে এতে? মিথ্যা কথা বলা বা মিথ্যা প্রচারের মধ্য দিয়ে অতি সাময়িক ফায়দা লাভ হলেও মূলত এর দীর্ঘকালীন ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন। কারণ মিথ্যা ফাঁস হয়ে গেলে মিথ্যাবাদীর জন্য বয়ে আনে মারাত্মক লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগ। পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেক মিথ্যাবাদী পাপীর জন্য। ’ (সুরা : জাসিয়া, আয়াত : )

কখনো দেখা য়ায়, মিথ্যা দিয়ে কেউ কাউকে হাসাতে চায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কঠিন দুর্ভোগ তার জন্য, যে মিথ্যা ও অলীক কথা বলে লোককে হাসাতে চায়। তার জন্য কঠিন দুর্ভোগ, তার জন্য কঠিন দুর্ভোগ। ’ (তিরমিজি, আবু দাউদ)

এ ধরনের মিথ্যাচার মুনাফেকির আলামত। যিনি এ ধরনের মিথ্যা পোস্ট দেবেন, তিনি যতই ইসলামের দরদি সেজে নিজেকে একজন একনিষ্ঠ মুসলমান হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করুন না কেন, তার কাজটি প্রমাণ করছে যে তিনি একজন মুনাফিক। রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি (অর্থাৎ কোনো মুমিনের দ্বারা এ কাজগুলো সংঘটিত হবে না। যদি কেউ এ কাজগুলো করে সে আর মুমিন নয়, বরং সে হলো মুনাফিক) . কথা বললে মিথ্যা বলে। ২. ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে। ৩. তার কাছে আমানত রাখা হলে সে এর খিয়ানত করে। ’ (বুখারি ও মুসলিম)

যুগে যুগে মিথ্যা বলে, মিথ্যা প্রচার করে মুনাফিকরাই ইসলামের বেশি ক্ষতি করেছে। ইসলামকে হাসির পাত্র বানিয়েছে। মহানবী (সা.)-কেও তারাই বেশি কষ্ট দিয়েছে।

এ বিষয়ে আমাদের করণীয় হলো, কোনো সংবাদভিত্তিক পোস্টে লাইক বা কমেন্ট করার আগে সংবাদটির উৎস জানতে হবে যে তা কোনো সঠিক উৎস থেকে এসেছে কি না। অনেক আবেগপ্রবণ ফেসবুকারই লাইক বা কমেন্ট শেষে এসব মিথ্যা পোস্ট শেয়ারও করে যাচ্ছেন। অথচ একজন মুসলমানের জন্য কারো নিয়ে আসা এ ধরনের কোনো খবর যাচাই না করে বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই। মুমিন তো কোনো গুজবে কান দিতে পারে না। পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি যদি তোমাদের কাছে কোনো খবর নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে। যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। ’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : )

একটি মেয়ের ছবি দিয়ে লিখে দেওয়া হলো, ‘এই হিজাবি বোনটির জন্য কত লাইক? সবাই লিখুন মাশাআল্লাহ। সেই ছবিতে ‘মাশাআল্লাহ’ লেখা কমেন্টের ধুম পড়ে গেল। শেয়ারের ঝড়ে ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুক কমিউনিটিজুড়ে। এ নিয়ে ধর্মবিরাগী অনলাইন এক্টিভিস্টরা হাসাহাসি করে মজাও নিচ্ছেন বেশ। উপহাসের পাত্র বানিয়ে দেওয়া হলো হিজাবকে। এ জন্য যারা এসব কথার সত্যতা না জেনেই প্রচার করবেন, তাঁরাও নবীজি (সা.)-এর ভাষায় মিথ্যাবাদী বলে প্রতীয়মান হবেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যাই শুনবে (সত্যতা যাচাই না করে) তাই বর্ণনা করবে। ’ (সহিহ মুসলিম)

সত্যতা যাচাই না করেই ‘ইসলাম প্রচার’ করতে গিয়ে কত বড় গুনাহর ভাগী হয়ে যাচ্ছেন—ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন।

লেখক : খতিব, বাইতুশ শফীক মসজিদ, বোর্ড বাজার (. গনি রোড), গাজীপুর

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬

এক জামাত-শিবির কর্মীর মনোবেদনা ! আহা…

ডিসেম্বর 17, 2016 মন্তব্য দিন

war-criminalsএকাত্তুরে আমরা ভুল করিনি” বলে গর্বোদ্ধত উচ্চারণকারী স্বাধীনতাবিরোধী নর্দমার কীট জামাতশিবিরের এক ছদ্মনামধারী কমরেড (আসল নাম দেবার সাহস নেই !) বিজয় দিবসে তাদের মানবতাবিরোধী নেতাদের কুশপুত্তলিকা ও ছবিতে জুতার মালা দিয়ে জনগণ ঘৃণা প্রকাশ করায় গাত্রদাহ শুরু হয়েছে ; আর তাই খিস্তিখেউড় করে মনের ঝাল মেটাবার চেষ্টা করেছে এই পাকিপন্থী নাদান ।

এই নর্দমার কীট পাবলিককে বিভ্রান্ত করার জন্য ইসলাম অবমাননার বাহানা তুলে আনার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে ভাবখানা এমন যেন সে ছাড়া আর কেউ ইসলাম বোঝে না । “ইসলাম গেলো গেলো” রব তুলে এবং ভারতজুজু ভয় দেখিয়ে এই পাষন্ডগুলো একাত্তুরে পাকি হানাদার বাহিনীর সশস্ত্র সহযোগী হয়ে হত্যাগুমনির্যাতনধর্ষণে মেতে উঠেছিলো । বাঙালীর আত্মরক্ষার সংগ্রাম তাদের দৃষ্টিতে ছিলো দাঙাহাঙ্গামা । তাদের কাছে সেটা ছিলো জিহাদ” ; সুতরাং এদেশের নারীরা ছিলো তাদের জন্য গণিমতের মাল !

jamaat-misuses-islamস্বাধীনতা যুদ্ধে জামাতশিবিরের অপকর্ম তুলে ধরতে অনেক আগে থেকেই তাদের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বিভিন্ন সময়ে (শুধুমাত্র স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসে নয়) পত্রিকার পাতায় বা প্রতিবাদ মিছিলে পাকিস্তানী ষ্টাইলের দাঁড়িটুপি ও পায়জামাপাঞ্জাবী পরিহিত করে তুলে ধরা হয়ে থাকে ; টুপিতে অনেক সময় পাকিস্তানী পতাকা অংকন করে দেয়া হয় বা হাতে/মাথায় পাকিস্তানী পতাকা সেঁটে দেয়া কার্টুন আঁকা হয় তাদের পাকিস্তানপ্রীতি বোঝাবার জন্য ; এগুলো নতুন কিছু নয় । এখানে মূর্তি বা কুশপুত্তলিকা বানানো বা দাঁড়িটুপির ব্যবহারের উদ্দেশ্য ইসলাম অবমাননা নয় বরং পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র এবং যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন। আল্লাহ মানুষের মনের খবর রাখেন । বুখারীর ১ং হাদীসে যেমন বলা হয়েছে, “অবশ্যই মানুষের কর্মের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল” । সুতরাং এখানে দাঁড়িটুপির ব্যবহার কোনক্রমেই ইসলাম অবমাননার কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি । কিন্তু মতলববাজ এই নাদানের ঘিলুতে তা আসেনি । টুপিপাঞ্জাবী কবে থেকে সুন্নতি লেবাস হলো ? রাসুলুল্লাহ (রা) তো কোনদিন টুপিপাঞ্জাবী পড়েননি ! যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামান সাধারণত যদি পাশ্চাত্য পোষাক পড়ে বাইরে যেতো তাহলে সুন্নতি লেবাসের প্রতি তার কতো দরদ ছিলো তা বোঝা যায় । না, আসলে এই নাদান মিথ্যাচার করে গেছে । কামারুজ্জামান সৌদী ষ্টাইলের আলখেল্লা (থোব বা দিসদাসা) পড়তো যা সুন্নতি পোষাক না !

সাহস নেই এই নর্দমার কীটের জনসমক্ষে এসে প্রতিবাদ করার ; তাই শুধু অনলাইনে রাগে ফোঁসফাঁস করা ; অন্যদের গালে থাপড়ানোর দুঃসাহস দেখানো । মুসলিমদের জন্য দরদ দেখানো । অথচ মওদূদীর এই নর্দমার কীটগুলো তো নিজেদের ছাড়া অন্যদের মুসলমান হিসেবেই গণ্য করে না ।

দাঁড়ি টুপি ও রাজাকার, ইসলামকে হেয় করার একটি চক্রান্ত

jamaat-war71বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস আসলেই ইসলামকে অপমানিত করার মহা সুযোগ পায় একটি চেতনাবাজ গোষ্ঠী। গতকালও তাঁর ব্যাতিক্রম হয়নি! প্রতিবারের মত এবারও ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে দেশব্যাপী মনের স্বাদ মিটিয়ে দাঁড়ি টুপি আর পাঞ্জাবীকে জুতা দিয়ে সন্মানীত করলো চেতনাবাজেরা! মুসলিমদের বাপের ভাগ্য কোরআন শরীফ এনে এখানে যুক্ত করেনি!

প্রথম ছবিটায় মুর্তির সামনে ইসলামের লেবাসকে জুতার মালা দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে! দেখে মনে হচ্ছে মুর্তির সামনে ইসলামকে পদদলিত করাই এদের মুল উদ্দেশ্য! এ যেন বিশেষ গোষ্ঠীর একটি মহা সুযোগের দিন। রাজাকারের ছুতো দিয়ে এমন বিশেষ কিছু দিনে তাঁরা ইসলামকে অপমানিত করার মহা সুযোগ হাতে পায়

পরের ছবি গুলো আপনাদের বহুল পরিচিত তথাকতিথ রাজাকার কমাণ্ডারের তিনটি ছবি। শুরুতে আছেন

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ক্লিনশেভ করা একজন ব্যাক্তি। এই যদি রাজাকারের চেহারা হয়ে থাকে তাহলে রাজাকারের চরিত্র দিতে দাঁড়ি টুপি পাঞ্জাবী বাধ্যতামুলক হয়ে দাঁড়ায় কেন? চেতনাবাজদের এদিন জুতানোর একটি কর্মসুচী মুসলিমদের রাখা দরকার..

দ্বিতীয় ছবিটি নাকি আঃ কাদের মোল্লা। এই ছবি দেখিয়ে জামায়াতের এই নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মেনে নিলাম ইনিই কাদের মোল্লা! দেখুন ছবিটি কেমন! ক্লিনশেভ, ব্যাক ব্রাশ চুল, শার্টপ্যান্ট পরিহিত চোখে সানগ্রাস দিয়ে তিনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন নিয়াজির সাথে! কতিথ কসাই কাদের যদি এমন হয় তাহলে এখন রাজাকারের চিত্র আনতে বিশাল দাঁড়ি টুপি আনো কোন পাশ দিয়া!!! শিশুদের মনে দাঁড়ি টুপি পাঞ্জাবীকে খারাপ জিনিস হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে চাও! এদিন সকাল বিকাল কানের নিচে থাপড়ানির কিছু কর্মসূচী রাখা জরুরী

তৃতীয় ছবিটি কামারুজ্জামান। চিরদিন তিনি পাশ্চাত্য ড্রেসে চলাফেরা করেছেন। কোর্ট টাই ছাড়া তিনি সাধারনত বাহিরে যেতেন না! এই যদি হয়ে থাকে রাজাকারের ছবি তাহলে তুমি দাঁড়ি টুপি দিয়ে রাজাকার বানাও কিভাবে? তল পেটের কিছুটা নিচে কিছু লাথির ব্যবস্থা করলে এমন ভুল সাধারনত হতোনা চেতনাবাজদের

স্বাধীনতা যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে ছিল না। পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে ছিল। যুদ্ধ করে এদেশ স্বাধীন করেছে মুসলিমরা। আহত হয়েছে মুসলিমরা, পঙ্গু হয়েছে মুসলিমরা, যুদ্ধ করেছে মুসলিমরা! যুদ্ধে বীর শ্রেষ্ঠের সন্মান পেয়েছে শুধুই মুসলিমরা। আবার এখন অপমানিত করা হয় মুসলিমদের! কি আজিব এক পরিস্থিতি!!!

সুন্নতি লেবাসে জুতার মালা দিয়ে দেশব্যাপী মুর্তির সামনে যে আকাম গুলা করতেছেন এগুলো বন্ধ করুন। অনেক হইছে চেতনার চাষ! এইবার খ্যামা দিতে হইবেক জনাব!

কমরেড মাহমুদ

http://www.bdnatun.net/newsdetail/detail/34/267139

সৌদির বিরুদ্ধে জার্মানিতে সালাফিদের সহযোগিতার অভিযোগ

ডিসেম্বর 15, 2016 মন্তব্য দিন
salafist-demo-solingen-germany-010512

A Salafist demo in Solingen, Germany dated May 1, 2012

সরাফ আহমেদ : জার্মানিতে উগ্রপন্থী সালাফি আদর্শের অনুসারী ইসলামি সংগঠন বা দ্য ট্রু রিলিজিয়নকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর ওই ধর্মীয় সংগঠনটিকে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে আর্থিকভাবে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। চার সপ্তাহ আগে জার্মানিতে এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার পর জার্মানি সরকার সৌদি আরবকে এই ধরনের সন্ত্রাসী ইসলামি সংগঠনগুলোকে আর্থিক অনুদান বা সহযোগিতা না করতে অনুরোধ করেছে।

জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছেন, দেশটিতে সালাফি আদর্শের ন্যূনতম ১০ হাজার অনুসারী রয়েছে। এরা মসজিদ নির্মাণ, ধর্মীয় প্রশিক্ষণ, ধর্মীয় প্রচার ও গবেষণা কাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দীর্ঘদিন থেকে আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থা আরও জানিয়েছে, সালাফি অনুসারীদের দ্বারা যেন জার্মানিতে অবস্থানরত শরণার্থীরা সেদিকে ঝুঁকে না পড়ে সেদিকে তাদের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।

জার্মানির দুটি গোয়েন্দা সংস্থা সালাফিদের আর্থিক সহযোগিতার ব্যাপারে কুয়েতের রিভাইভাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি, কাতারের শেখ ঈদ চ্যারিটি ফাউন্ডেশন ও সৌদি আরবের মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ নামের সংগঠনগুলোকে শনাক্ত এবং আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে। সালাফি আন্দোলন বা দ্য ট্রু রিলিজিয়ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে জার্মানির ছোটবড় শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে ধর্মীয় বইপুস্তক বিতরণ এবং ধর্মীয় বিষয় নিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে আলোচনা করে আসছিলেন।

সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোথার ডা ম্যাজেয়ার গত মাসে বলেছিলেন, জার্মানির মতো গণতান্ত্রিক দেশে মৌলবাদী কোনো আন্দোলনকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিপূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্য ট্রু রিলিজিয়ন সংগঠনটির বিরুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো এবং সিরিয়া ও ইরাকে গিয়ে আইএসের পক্ষে লড়াই করতে ১৪০ জন জার্মান তরুণকে প্ররোচিত করার অভিযোগ রয়েছে।

german-salafists

দৈনিক প্রথম আলো, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস এবং এখনকার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থা

ডিসেম্বর 15, 2016 মন্তব্য দিন

rayerbazar-5তসলিমা নাসরিন : বয়স অল্প ছিল একাত্তরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি নতুন পতাকা হাতে নিয়ে হাটে মাঠে ঘাটে স্বাধীনতার উৎসব করতাম। প্রতি বছর ষোলোই ডিসেম্বর এলে ভোররাত্তিরে উঠে বাড়ির ছাদে পতাকা উড়িয়ে দিতাম, আমার দেশের পতাকা। দেশটিকে একাত্তরের পর থেকে নিজেরই ভেবেছি। আমার দেশটি এখন আর আমার নয়। মনে মনে যদিও একে আমার বলেই ভাবি। খুব গোপনে, সন্তর্পণে ভাবি একে আমার বলেই। দেশের শত্রুরা আমাকে দেশ থেকে সেই দুদশক আগে তাড়িয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিল এ দেশ আমার নয়। এরা দেশের সেই শত্রুদেরই বান্ধব অথবা সন্তান যে শত্রুরা এ দেশের স্বাধীনতা চায়নি, যে শত্রুরা একাত্তরে ধর্ষণ করেছে আমাদের নারী, যে শত্রুরা হত্যা করেছে দেশের বুদ্ধিজীবী, হত্যা করেছে অগণিত নিরপরাধ মানুষ।

বর্বর শত্রুসেনা নির্যাতন করেছে আমাদের পরিবারের সবাইকে। লুট করেছে আমাদের বাড়িঘর, সহায় সম্পদ। শুধু প্রাণটুকু বাঁচাতে একাত্তরের নমাস এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে পালিয়ে বেড়িয়েছি। গভীর অন্ধকারে মোষের গাড়িতে চেপে অনাত্মীয় অপরিচিত বাড়িতে গিয়েছি, আশ্রয় চেয়েছি। শত্রুদের আগুনে গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে যেতে দেখেছি। যে শত্রুরা পাকিস্তানি বর্বর সেনা দিয়ে আমাদের বাড়ি লুট করিয়ে ছিল, অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছুঁড়ে দিয়েছিল আমাদের তারাই আজ দেশের আপনজন। আর আমি এবং আমার মতোরা আপাদমস্তক নিষিদ্ধ।

ওরা চট জলদি হত্যা করেছিল বুদ্ধিজীবীদের। আজ ওরা নিরাপদে, নিশ্চিন্তে, ভেবেচিন্তে বুদ্ধিজীবী হত্যার ছক আঁকে এবং এক এক করে বুদ্ধিজীবী হত্যা করে। ওরা ধরা পড়ে না, ওরা ধিকৃত হয় না, লাঞ্ছিত হয় না। সত্য বলতে কী, ওদের কোনও শাস্তি হয় না। আমি যদি দেশে থাকতাম, অনেক বছর আগেই ওরা আমাকে কুপিয়ে মেরে ফেলত। বাংলাদেশ যখন প্রতিবছর চৌদ্দই ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পালন করে, তখন আমি ভাবি এই দিবস শুধু একটি দিনে বা দিবসে কেন সীমাবদ্ধ? মুক্তচিন্তা বা মুক্তবুদ্ধির মানুষদের দেশের সর্বত্র প্রায়ই হত্যা করা হচ্ছে কুপিয়ে। নৃশংসতার সাধারণত সীমা থাকে, এই নৃশংসতা সীমাহীন। বছরের যে কোনো দিনেই খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা, আমাদের মুক্তচিন্তকরা। শুধু মৌলবাদীরাই যে আমাদের নির্যাতন করছে তা নয়, বাকস্বাধীনতাবিরোধী আইন বানিয়ে মুক্তচিন্তকদের গ্রেফতার করছে সরকার, জেলেও পুরছে।

একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে, লক্ষ করছি, তারাও আজ কাঁদছে, যারা এখনকার মুক্তচিন্তকদের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি। এর নাম ভণ্ডামো নয়তো? একাত্তরে মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম আমরা বাঙালিরা। যুদ্ধ করেছিলাম পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন করেছিলাম, বাংলাদেশ তার নাম। বাংলাদেশ এই নামটি উচ্চারণ করলেই এক সময় ময়ূরের মতো নাচতো মন। সেই মন কোথায় আজ? সেই মন কিন্তু ভিনভাষী ভিনদেশি কেউ এসে নষ্ট করেনি, নষ্ট করেছি আমরাই। আমরাই স্বাধীনতার শত্রুদের আদর আপ্যায়ন করেছি। আমরাই আমাদের ধর্ষক আর খুনিদের বড় আসন দিয়েছি বসতে। প্রতিদিনই তো আমরা আমাদের অসাম্প্রদায়িক আদর্শকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দেখছি, কিন্তু কিছু বলছি না। যে সন্ত্রাসীরা আমাদের হত্যা করেছিল, তাদের পুনর্বাসন আমরাই করেছি, আমরাই এখন ওদের হাতে নিজেদের খুন হয়ে যাওয়া দেখছি। দেখছি কিন্তু কিছু বলছি না। বলছি না কারণ আমরাও ভেতরে ভেতরে একটু আধটু মৌলবাদী, আমরাও ভেতরে ভেতরে একটু আধটু সাম্প্রদায়িক। এই আমরাটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি মাননীয় মন্ত্রীবৃন্দ।

সাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্রটি নিজেকে অনেকটাই বদলে নিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার দিকে বলে কয়েই যাত্রা শুরু করেছে। আজ তার একটি রাষ্ট্রধর্ম আছে। স্বাধীন আর পরাধীন রাষ্ট্রের শাসকে আজ আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে, শাসকেরা জানে, মৌলবাদীদের আশীর্বাদের প্রয়োজন। আমাদের ক্ষমতালোভী শাসকেরা গদি রক্ষার্থে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে ওলামা লীগ, হেফাজতে ইসলাম নামক ভয়ংকর মৌলবাদী দলগুলোকে। এর শুরুটা অবশ্য হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। আমার বিরুদ্ধে যখন লাখো মৌলবাদীর মিছিল হল, আমার মাথার মূল্য নির্ধারণ করা হল, প্রকাশ্যে আমাকে হত্যার হুমকি দেয়া হল তখন সরকার মৌলবাদীদের পক্ষ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিল এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করল। সরকারের না হয় গদির লোভ ছিল। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করেছিলাম তখনকার সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী সমাজ সরকারের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ তো করেননি উল্টো কী দরকার ছিল ওভাবে লেখার জাতীয় মন্তব্য করে বিষয়টিকে আমার ব্যক্তিগত সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গেছেন। আজকের বাংলাদেশ সেই এড়িয়ে যাওয়ারই ফল। একের পর এক প্রগতিশীল ব্লগার, লেখক, শিক্ষক, ছাত্র হত্যার পরও তাঁরা নীরব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। দেশ মৌলবাদীদের দখলে যাচ্ছে যাক, তাতে তাঁদের কিচ্ছু যায় আসে না। তাঁরা মেতে আছেন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক এবং নানা পদক পুরস্কার নিয়ে। অঢেল অর্থ থাকার পরও তাঁরা চিকিত্সার জন্য সরকারি অর্থের আশায় থাকেন। এঁদের বুদ্ধিজীবী বলতে আমার বাঁধে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, গুলশান ক্যাফেয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী ঘটনার পর সরকারের তত্পরতা দেখে ভেবেছিলাম এবার অন্তত তারা মৌলবাদজঙ্গিবাদ তোষণ বন্ধ করবে। অথচ ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই অন্যতম আসামি হাসনাত ও তাহমিদ মুক্তি পেয়ে যায়। নিজেদেরকে জিম্মি দাবি করলেও ঘটনার বিভিন্ন ছবি ভিডিওতে তাদের হাতে অস্ত্র ও জঙ্গিদের সাথে নিশ্চিন্তে হেঁটে বেড়াতে দেখা গেছে। এ রকম ভয়ংকর অপরাধীদেরও জামিন মঞ্জুর হয়ে যায়। অথচ বই সম্পাদনার দায়ে রোদেলা প্রকাশনীর মালিক শামসুজোহা মানিকের এখনও জামিন মঞ্জুর হয় না। হত্যাকাণ্ড মেনে নিচ্ছে সরকার, কিন্তু ভিন্নমত মানছে না। কতটা অসভ্য হলে, অজ্ঞ হলে, অশিক্ষিত হলে এ সম্ভব, তা অনুমান করতে পারি।

কাল বাংলাদেশে বিজয় দিবস পালন করা হবে। যে মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমরা নমাস লড়াই করে জয়ী হয়েছিলাম, আমাদের স্বাধীন দেশে সেই মৌলবাদী অপশক্তিই আজ স্বাধীনতা উপভোগ করছে। তাদের আছে শতভাগ বাকস্বাধীনতা। আর আমরা যারা সমাজকে সুস্থ করতে চাই, নারী পুরুষের সমানাধিকার চাই, মানবাধিকার চাই, মানুষে মানুষে সমতা চাই, তারা আজ দেশের শত্রু, আমাদের বাকস্বাধীনতা নেই বললেই চলে। আমাদের পুরনো শত্রুরাই আজ দেশের হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে বসে আছে, তারাই আজ জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট। তারা আজ বুদ্ধিজীবীদের গালি পাড়ুক, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করুক, তাদের সাত খুন মাফ।

তাদের বাক স্বাধীনতায় কেউ বাধা দিয়েছে? এই যে সগৌরবে লেখকের মাথার দাম ঘোষণা করছে ওরা, কেউ বলেছে ওদের যে এ অন্যায়, কেউ ওদের গ্রেফতার করেছে? আমার মাথার দাম যে লোকটি ঘোষণা করেছিল প্রথম, তাকে আওয়ামী লীগ আমন্ত্রণ জানিয়ে দলে ভিড়িয়েছে, বড় নেতা বানিয়েছে। আর কত অকল্যাণ দেখতে হবে বেঁচে থেকে? এ দেশকে এখন আমার দেশ বলতে লজ্জা হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস, আর বিজয় দিবস নিতান্তই অর্থহীন দুটো দিবস আজ।

আমরা দেশটির আদর্শই ধরে রাখতে পারিনি। যারা সেই আদর্শকে কুপিয়ে হত্যা করেছে, তারাই আজ সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি কোন পথে যাবে, তারাই সিদ্ধান্ত নেয় এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা কী লিখবেন, কী লিখবেন না, কী বলবেন, কী বলবেন না। দেশটিতে কে বাস করবেন, কে করবেন না। কে বাঁচবেন, কে বাঁচবেন না। তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তাদের সিদ্ধান্তের বিপরীত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষমতাসীনদেরও নেই।

মত প্রকাশঅপ্রকাশ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এসে যদি দেখি আমাদের অর্জন কী—তাহলে নিঃসন্দেহে অনেক পরিসংখ্যান চলে আসবে। অর্থনৈতিকভাবে আমাদের দৃঢ় অবস্থানই বারবার আলোচনায় আসবে। কিন্তু গণতন্ত্রের পথে চলার ঘাটতিগুলো কতটা দূর করতে পেরেছি, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে।

মত প্রকাশের যে অধিকার, তাই এখন সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে বলে মনে করছি। লিখতে গিয়ে, বলতে গিয়ে কত অভিজিৎ রায়কে মরতে হলো, কতজনকে দেশ ছাড়তে হলো! সরকারের বাইরেও যে মত প্রকাশের ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো শক্তি থাকে, এটা তার প্রমাণ। সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল বা মহল, যারাই মানুষের নিজের কথা বলা এবং জানানোর অধিকারকে অস্বীকার করে, তারা চরিত্রে অত্যন্ত হিংস্র হয়ে থাকে। মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার প্রচণ্ড ক্ষমতা আছে তাদের।

অবশ্য অনেকেই বলবেন, মত প্রকাশের একটা সীমা থাকতে হয়। যা খুশি বলার অধিকার দেওয়া হয়নি কোথাও। কোনও কথা বা বক্তব্য, যদি বড় আকারের সহিংসতা, রক্তপাত বা নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে এবং তার ফলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, তবে হয়তো তার প্রচার বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা দরকার। তবে বাংলাদেশে বেশি উদ্বেগ ধর্ম নিয়ে লেখালেখিতে। যারা এই বিষয়ে লেখালেখি করেন, তাদের প্রতি প্রায় সবার উপদেশ থাকে, তারা যেন কারও অনভূতিতে আঘাত না করেন। যারা এমন নসিহত করছেন, তারা তাদের নিজস্ব ধর্মের বাইরে অন্য ধর্ম নিয়ে বিরামহীন কটাক্ষ করে যাচ্ছেন বা কটাক্ষ দেখে চুপ করে থাকেন। তখন এই অনুভূতির প্রশ্ন ওঠে না।

যারা ধর্মীয় রাষ্ট্র করতে চায় বাংলদেশকে, তারা কিংবা সরকারে থাকা ব্যক্তিবর্গ, তারা খুব কমই মানতে চান যে, কেউ যে কোনও মত প্রকাশ করতে পারেন স্বাধীনভাবে যদি না তিনি তা করতে গিয়ে সহিংসতার পথ বেছে নেন। বাংলাদেশের সংবিধানে মত প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত। আছে তথ্য অধিকারের মতো আইনও। এরপরও মত প্রকাশের পথে প্রতিবন্ধক অনেক আইন আছে কিংবা নতুন নতুন আইন প্রণীত হচ্ছে। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা রয়েছে সেটির অপব্যবহার দেখছি প্রতিনিয়ত। এই আইন ব্যবহার করে যখনতখন যাকে তাকে ইচ্ছামতো বিপদে ফেলার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। এই রকম ধারা মত প্রকাশের অধিকারকে খর্ব করার অস্বাভাবিক ক্ষমতা দিয়েছে বলা যায়।

ব্লগার, লেখকদের যারা হত্যা করছে তার পেছনে আছে বৃহত্তর রাজনৈতিক তৎপরতা, যে রাজনীতি বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়। এই চক্রটা খুবই শক্তিশালী ও সক্রিয়। মত প্রকাশের পথে এরাই বড় বাধা। এদের হাতে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব গেলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? দেশকে বাঁচিয়ে রাখাই কষ্টকর হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে যে কেউ যখনতখন হরানির শিকার হতে পারেন।

ধর্মীয় অনুভূতির নামে যারা গলা টিপে ধরে বা হত্যা করে যে কোনও কিছুতেই এই ভাবাবেগ ব্যবহার করতে পারে। আর ক্ষমতাসীনরা পারে রাষ্ট্রদ্রোহের ব্যাখ্যা খুঁজতে। বিরুদ্ধ মত ও সমালোচনা দমনের অনেক ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে আছে। আমাদের ৪৫ বছরের স্বাধীনভাবে পথ চলার এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমনে নানা ধারা ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

তবে বড় সমস্যা হলো ক্ষোভ প্রকাশের সংস্কৃতি। আমরা ক্রমেই একটা ক্ষুব্ধ জাতিতে পরিণত হচ্ছি। যে কোনও ছুঁতোয় ক্ষোভের সহিংস প্রকাশ এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়াটির ভয়ঙ্কর সহিংস প্রকাশ আমরা দেখে চলেছি। আর এদের ভয়ে রাষ্ট্র ভীত কিংবা এদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এদের দাপটে বই নিষিদ্ধ হয়, বই মেলা থেকে বই প্রত্যাহার হয়ে যায়, সেই প্রকাশক জেল খাটেন। এদের দাবির মুখে দাউদ হায়দার, তসলিমা নাসরিনসহ অনেক লেখককে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। লেখার জবাব লেখার মাধ্যমে না দিয়ে হুমকি আর পেশিশক্তির জোরে সবকিছু করে এই গোষ্ঠী। স্বাধীনতার এত বছর পর এসে এই সমস্যাকে গণতন্ত্রের পথে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে হয়। আর আছে রাজনীতির দাপট। আইনের বাইরে শুধু রাজনীতির পরিচয়ের কারণে অনেকের দাপট চোখে পড়ার মতো। রাজনীতির ভেতরে এমনসব চরিত্র আছে, যারা অতিমানবে পরিণত হয়েছেন এবং তারা সমস্ত সমালোচনার ঊর্ধ্বে।

ইতিহাস কিংবা ব্যক্তি কোনও বিষয়েই নির্মোহভাবে, নিরপেক্ষভাবে কোনও কিছু প্রকাশ করা যায় না এখন। সমাজে বহু ধর্মের মানুষ থাকে। দেশের ইতিহাসে নানা রাজনীতি নানা সময় প্রভাব ফেলেছে। মানুষের অনুভূতির বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার সবারই। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কিংবা ইতিহাসের কোনও বিষয়ে বা চরিত্র সম্পর্কে যদি খোলামেলা আলোচনা করা না যায়, তাহলে কোন পথে হাঁটছি আমরা? আমরা কেবলই স্পর্শকাতর, অসহিষ্ণু ও রসবোধহীন হয়ে উঠছি?

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি

আল্লামা আহমদ শফীকে তার কাছের লোকেরাই ডোবাচ্ছে ?!

ডিসেম্বর 12, 2016 মন্তব্য দিন

allamah-safi-4মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্পর্কীয় বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দেশের আলেম উলামা, পীরমাশায়েখের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি হলেও কাক্সিক্ষত বিষয়ে তাদের ঐক্য তেমন দেখা যায় না। এদিক দিয়ে গত ১০ ডিসেম্বর হাটহাজারিতে অনুষ্ঠিত উলামা সম্মেলন ছিল ব্যতিক্রম। এতে দীর্ঘদিন যাবত বিচ্ছিন্ন মেরুতে অবস্থানকারী আলেম নেতৃবৃন্দ হঠাৎ করেই যেভাবে কথিত ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেলেন তা মূলত দেশ ও জাতির জন্য এক অশনিসংকেত ছাড়া আর কিছু নয়। গতকাল ইনকিলাবে প্রেরিত এক বিবৃতিতে তওহীদি জনতা বাংলাদেশের যুগ্ম আহ্বায়ক মোসাদ্দেক বিল্লাহ এসব কথা বলেন। তিনি হেফাজতে ইসলামের আমির, হাটহাজারি মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফীর সভাপতিত্বে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ, মাওলানা আবদুল হালীম বোখারী প্রমুখের বৈঠক এবং কিছু প্রমাণিত ধর্ম ও সমাজবিরোধী আলেমের সমন্বয়ে কওমী মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সংবাদে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, শাহবাগে গমনকে যিনি তার জীবনের সেরা পুণ্যময় কাজ বলে মন্তব্য করে, ১৬ কোটি মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কার কুড়িয়ে, এক অবাঞ্ছিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন তাকে সাথে নিয়ে আল্লামা শফী ঈমানদার জনগণের কী স্বার্থ উদ্ধার করবেন তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। যেসব দালাল আল্লামা শফীর দস্তখত নকল ও তার নামের অন্যায় ব্যবহার করে কওমী কমিশনের নামে প্রতারণা করল, যারা আলেমউলামা, পীরমাশায়েখের বিরুদ্ধে গিয়ে নাস্তিকমুরতাদ চক্রের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে অভিশপ্ত দরবারি আলেম সাব্যস্ত হল, তারা কি হাটহাজারি গিয়ে আল্লামা শফীসহ দেশের শীর্ষ আলেমদের সামনে ভুল স্বীকার করে, জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করেছে ? যদি না হয় তাহলে এদের সাথে নিয়ে কিসের ঐক্যবদ্ধ কমিটি আর সরকারের সাথে কিসের লিয়াজোঁ কমিটি হল ? কারা কোন অধিকার বলে শাহবাগ ও শাপলা চত্বরকে একাকার করে দিল ? অসংখ্য শহীদের রক্ত, লাখো মানুষের কষ্ট, ঘাম ও সংগ্রাম আর ধর্মপ্রাণ কোটি মানুষের আহাজারি আর চোখের পানিকে তারা কী মূল্য দিলেন। আল্লামা শফী কি করে নাস্তিকমুরতাদদের আস্থাভাজন ইমাম ও পছন্দের আলেম ফরিদউদ্দিন মাসুদ গংএর সাথে হাত মিলাতে পারলেন। বিপরীত দুই মেরুর আলেমরা কোন নেপথ্য শক্তির ইংগিতে কোন উদ্দেশ্যে এক হয়ে যাচ্ছে, ধর্মপ্রাণ জনগণ তাও জানতে চায়। শীর্ষ আলেমরা অতীতে ঈমানী আবেগ নিয়ে জাতিকে যত কথা বলেছেন, যত উদ্বুদ্ধ করেছেন সবই কি তাহলে মিথ্যা ? শাপলা চত্বরে ভীত সন্ত্রস্ত মজলুম মানুষের কষ্ট ও জীবনদান, অগণিত মানুষের রক্ত, ঘাম, অশ্রু ও হাহাকার পেছনে ফেলে আল্লামা শফী এবং তার উপদেষ্টা ও সহকর্মীরা কোন হাতের ইশারায় তাদের চির আদর্শিক প্রতিপক্ষের সাথে হাত মিলালেন। কোন শক্তির কলকাঠিতে ‘বাঘেমোষে এক ঘাটে পানি খাওয়ার’ পরিবেশ তৈরি হল তওহীদি জনতা তাও জানতে চায়।

বিষয়টি নিয়ে আরো কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন বিবৃতি দিয়েছেন। অনেকেই ইনকিলাবকে দুই বিপরীত মতাদর্শের আলেমদের ঐক্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অনুরোধ করেছেন। এ বিষয়ে নেপথ্যের সব কাহিনী নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের অনুরোধও করেছেন তারা। ইনকিলাব এ বিষয়ে বিশদ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করবে। এ পর্যায়ে কথা হয় রাজধানীর বিশিষ্ট আলেম ও খতীব, মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা কামাল উদ্দিন গাজীর সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, আল্লামা আহমদ শফী আমাদের সকলের মুরব্বী, তিনি কেন কী করছেন তা সঠিকভাবে না জেনে আমাদের মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে ১০ তারিখের বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ আমরা এখনও পাইনি। শুনেছি, সরকার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানেই দীর্ঘদিন ধরেই শাহবাগ ও শাপলা চত্বরের দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা চলছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট, হেফাজতে ইসলাম এখন সম্পূর্ণরূপে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কওমী মাদরাসাও সরকারের আওতায় নেয়া হবে। দেশের আলেমউলামা ও তওহীদি জনতাকে আল্লামা আহমদ শফীর মাধ্যমে সরকার তাদের সমর্থক বানাতে চাইছে। কওমী মাদরাসাগুলোও সরকার তার আয়ত্তে নেয়ার জন্য আল্লামা শফীর মাধ্যমে বিপরীত মেরুর সব আলেমকে ঐক্যবদ্ধ করে আগামী নির্বাচনের মাঠ সমান করার কাজে নিয়োজিত করতে চাইছে। এ যোগাযোগগুলো তদারক করছেন প্রধানমন্ত্রীর দফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগের ধর্ম সম্পাদক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে দায়িত্ব প্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি। বেফাক ও হেফাজতের কিছু দায়িত্বশীলের সাথে আমরা কথা বলে জানতে পেরেছি ৬ এপ্রিল, ২০১৩’র পর থেকে গত তিন বছর ঈমানী আন্দোলন তথা নাস্তিকমুরতাদবিরোধী গণজাগরণের গোটা বিষয়টিকে পুঁজি করে হেফাজতের এক শ্রেণীর লোক নিজেদের পকেট ভারী করেছে। দফায় দফায় কর্মসূচি দেয়া ও স্থগিত করা, মামলা খাওয়া ও রেহাই পাওয়া, সরকারী নানা কর্তৃপক্ষ ও সংস্থার কাছ থেকে সুযোগসুবিধা নেওয়া ইত্যাদি কাজ খুব নিপুণ ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। এসব নিয়ে মিডিয়া একসময় সোচ্চার থাকলেও বর্তমানে অনেকটাই নীরব। বলা হয়, আল্লামা শফীর খুব কাছের লোকেরা নানাভাবে অর্থ সম্পদ ও সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে বর্ষীয়ান এ অভিভাবকের ব্যক্তিত্ব ও ইমেজের মারাত্মক ক্ষতি করে ফেলেছেন। সরকারী মহলেও এখন হেফাজত নেতার সে প্রথম দিককার ভাবগাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধাবোধ নেই। সরকারের এক ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও পুলিশের উপর মহল থেকে রাজধানীর শীর্ষ আলেমদের বৈঠকে মন্তব্য করা হয়েছে যে, আল্লামা শফীর লোকজনের পেছনে আমরা অনেক বড় বিনিয়োগ করে ফেলেছি। যার ফলে আন্দোলনের আর কোন পথ খোলা নেই। এসব প্রসঙ্গ হেফাজতের কেন্দ্রীয় ফোরামে তোলেন না কেন প্রতিবেদকের এ প্রশ্নের জবাবে মাওলানা জামালউদ্দিন গাজী বলেন, এ সবই ‘ওপেনসিক্রেট’। আমরা শত সহস্র ছাত্র, ভক্ত আল্লামা শফীকে তার খোদাপ্রদত্ত জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার আসনেই আমৃত্যু দেখতে চাই। কিন্তু তার কাছের লোকেরাই যদি তাকে ছোট করে তখন আমাদের আর কী করার থাকে ? আল্লামা শফীকে তার কাছের লোকেরাই ডোবাচ্ছে। এ বিষয়ে বেফাক ও হেফাজতের মুরব্বীদের খোঁজখবর রাখতে হবে, খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে আল্লামা শফীর ইমেজ রক্ষায় ভূমিকা নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কওমী ইসলামী আন্দোলনের আহ্বায়ক শায়খুল হাদীস মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ৬ এপ্রিল, ২০১৩’র পর থেকে আল্লামা শফীর যে আপসকামী ভূমিকা তার উপযুক্ত কারণ রয়েছে। তিনি নিজ প্রতিষ্ঠান, সন্তান ও সম্পদের সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের ধর্মীয় পরিবেশপরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্যই ‘সরকারের সাথে শত্রুতা নয়’ নীতি বেছে নিয়েছেন। কিন্তু তার উচিত ছিল ‘আন্দোলন ও সংগ্রাম’ নামক কঠিন কাজগুলো অতীত জীবনের মতই সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা। হঠাৎ তিনি আন্দোলনে নামলেন, কিন্তু নেতাসুলভ সাহস দেখাতে পারলেন না। তিনি একজন নীতিবান আদর্শ ব্যক্তি, কিন্তু আল্লাহর পথে জীবন দেয়ার বা পদবী, সম্মান, সন্তানসম্পদ ইত্যাদি কোরবানী করার মত সাহস তার নেই। তার সন্তান ও কাছের লোকদের উপরও তার নিয়ন্ত্রণ নেই। যে জন্য শাপলা চত্বর ট্রাজেডির পর থেকে তার ভূমিকা জাতিকে শুধু হতাশই করেছে। বর্তমানে তিনি যে শাহবাগী গ্রুপের সাথে একীভূত হয়ে কওমী মাদরাসার নিয়ন্ত্রণ ইসলাম বিদ্বেষী বিশ্বশক্তির হাতে তুলে দেয়ার পথে এগুচ্ছেন, এ নিয়ে জাতি তার অনুপুংখ ব্যাখ্যা আশা করে। সরকারের লোকজনের সাথে তার যে নিঃশর্ত গভীর সম্পর্ক এর ভিত্তি কী তা তাকেই স্পষ্ট করতে হবে। সরকার কি তার ১৩ দফা মেনে নিয়েছে ? সংবিধানে কি আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপিত হয়েছে ? তার দেয়া পাঠ্যসূচি সংশোধনের দাবি কি পূরণ করা হয়েছে? যদি জবাব নেতিবাচক হয়ে থাকে তাহলে তিনি কোন হিসাবে সরকারের এত প্রিয়ভাজন হয়ে গেলেন। সরকারও তার এতটা আস্থাভাজন কিসের ভিত্তিতে হল ? কোন নেপথ্য ইশারায় তার মাদরাসা ও অফিস এখন শাহবাগ ও শাপলা চত্বরের মিলনকেন্দ্র? শহীদের রক্ত ও আহতের কান্না কি এত দ্রুতই তার স্মৃতি থেকে মুছে গেল।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

নফরদের [অর্থাৎ পাকিস্তানপন্থীদের] মন

ডিসেম্বর 12, 2016 মন্তব্য দিন

pak-sympathমুনতাসীর মামুন : বিজয়ের ৪৫ বছর পরও এই লেখা লিখতে হচ্ছে। তাতে মনে হচ্ছে, প্রায় দু’দশক আগে যে লেখা লিখেছিলাম ক্ষুব্ধ হয়ে তার যৌক্তিকতা আছে। লিখেছিলাম, বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ছিলেন, বিধ্বস্ত দেশটিকে একটি ভিত্তি দিয়ে গেছেন। কিন্তু তখনও তো ছিল ষোড়শ বাহিনী, তখনও তো ছিল দখল আর লুটপাট আর হিংস্রতা এবং বঙ্গবন্ধু বিরোধিতা। ঐ জটিল ও সংঘাতময় সময়ে যদি তিনি না থাকতেন তাহলে দেশের অস্তিত্ব থাকত কিনা সন্দেহ। তবে তাতে অবশ্য খুশি হত পাকিস্তান ও তার মিত্ররা এবং বাঙালী নফররা।

এই নফরদের সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তানী সময়েই। হ্যাঁ, আমরাও পাকিস্তানে ছিলাম কিন্তু পাকিস্তানত্ব ছুড়ে ফেলতে আমরা দ্বিধা করিনি। কিন্তু যারা নফর থাকতে চেয়েছে তারা নফরই রয়ে গেল। খাঁচার পাখি ছেড়ে দিলেও নাকি খাঁচায় ফিরে আসে বা উড়ে গেলেও বেশিদিন বাঁচে কিনা সন্দেহ। এই নফররাও স্বাধীনতায় বাঁচতে চায়নি। নফরত্ব ধরে রাখতে চেয়েছে, এমনকী যারা স্বাধীন হয়েছেন বলে মনে করেন তাদের মনের এক কোণেও সেই নফর যুগের প্রতি একটু ভালোবাসা রয়ে গেছে। যেন সেই হিন্দি ফিল্ম ‘দিল দিয়া দর্দ লিয়া’র মতো। কোথায় যেন একটু বেদনা কুরে কুরে খায় ঘুণপোকার মতো। নূরজাহানের সেই একটি গান ছিল না ‘দিল দিলই তো হ্যায় পাথ্থর তো নেহি।’ গণহত্যা করেছ, ধর্ষণ করেছ, পৃথিবীতে যত রকমের নিপীড়ন আছে তাও করেছ, বুট দিয়ে লাথি মেরে ‘শূয়ারকা বাচ্চা’ বলেছ, তারপরও দিল তো পাথর নয়, ভালোবাসা যায় না।

তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জিয়াউর রহমান যিনি নফরদের রাজত্ব বা নফররাজ কায়েম করেছিলেন এবং এই রাজত্ব হস্তান্তর করেছিলেন এরশাদের কাছে। তারপর খালেদা জিয়া ও নফরদের নেতা নিজামীর কাছে। মাঝে মাঝে মনে হয় ২৫ বছর আমরা নফরদের অধীনে থাকলাম কীভাবে? না, শুধু রাজনীতিবিদদের দোষ দিলে চলবে না। আমরাও কমবেশি দায়ী। আমরা কি নিজ নিজ অবস্থান থেকে নফররাজ অস্বীকার করতে চেয়েছি। হত্যা, বুদ্ধিজীবীদের যতটুকু সম্ভব তারা করেছেন, সেটি এ দেশের বৈশিষ্ট্য, ব্যতিক্রমও বটে কিন্তু নিয়ম তো নয়। এরা করেছেন, ক্ষমতার কাছেধারে যাননি কিন্তু সব আমলেই অনাদৃত থেকেছেন। তবে, হ্যাঁ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ক্ষমতার বাইরে থাকলে তাদের কদর বাড়ে।

এই নফররা তো জনগণের একটি বেশ বড় অংশ। নফর নেতারা কমপক্ষে শতকরা ৩০ ভাগ ছোটা ছোটা নফর সৃষ্টি করতে পেরেছেন। জিয়াউর রহমানের কথা মনে হলে তাদের চোখে আঁসু আসে। তিনি যে শুধু মুক্তিযোদ্ধা নিধন নয়, পাকিস্তানী টুপি পরিয়ে দিতে চাইলেন বাঙালীদের সেটি মনে আসে না।

নফররা তাদের স্মৃতি অমলিন রাখার জন্য সুক্ষ্ম স্থ’ূল অনেক কাজ করে গেছে। তার একটি হলো জাতীয় সংসদ ভবন এলাকাকে গোরস্থানে পরিণত করা। তাদের পাশে নানা ভবন, স্থাপনা, বিদ্যাপিঠ, সড়ক করে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কারও এমনকি সরকারেরও মনে হয়নি এত বছরে যে, স্বাধীন দেশে তাদের নামে কিছু থাকার মানে তাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা।

আজ থেকে বছর বিশেক আগে শাহরিয়ার কবির ও আমি খুলনা গিয়েছিলাম একসঙ্গে, নির্মূল কমিটির সভা করতে। এর আগেও খুলনা গিয়েছি, কিন্তু সেবার দেখলাম, যে প্রধান সড়ক দিয়ে যাচ্ছি তার নাম খান এ সবুর রোড। প্রেসক্লাবে পৌঁছে সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা এত কিছুর প্রতিবাদ করেন। এটির প্রতিবাদ করলেন না।’ এখানে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি সড়ক নেই, চার নেতার নামে নেই কিন্তু সবুর খানের নামে আছে। আওয়ামী লীগ, বামপন্থী, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন কতোজনকে জিজ্ঞেস করলাম। সবার একই উত্তর, উনি খুলনাকে পাকিস্তানে এনেছেন। সবুর খান কীভাবে আনলেন খুলনাকে পাকিস্তানে? তিনি ছিলেন মুসলিম লীগের মাস্তান। কিন্তু মিল সৃষ্টি করে গেছেন। সেই মিল এখনও চালু। তখনই মনে হল, দিল দিয়া দর্দ লিয়া। শাহরিয়ারকে বললাম, ঘাতকদালাল নির্মূল করবে কীভাবে এরা যে মনের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

এলো আওয়ামী লীগ আমল, এদিকে কারও খেয়ালই হল না। বিষয়টি যে গুরুত্বপূর্ণ তাও মনে হয়নি কারও। তারপর যখন আওয়ামী লীগের পপুলার মেয়র হলেন, তখন আমি আর শাহরিয়ার রিট করলাম। তখন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী ছিলেন বেঞ্চে। তিনি বললেন, খান এ সবুর রোডের এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজ হলসহ স্বাধীনতা বিরোধী সবার নাম মুছে ফেলতে হবে। খুব সম্ভব তার পর পরই তাকে রিটের বেঞ্চ থেকে অবমুক্ত করা হয়।

আমরা তো মহাখুশি। কিন্তু নাম বদল হয় না। আওয়ামী মেয়রের কাছে অনেক দেনদরবার হল। খুলনার বিএমএর সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলমের নেতৃত্বে অনেক মিছিলটিছিল হল, তিনিও আওয়ামী নেতা, কিছু হল না। আমি তখন ডা. বাহারুলকে বলেছিলাম, যিনি ভোটের কারণে পাকিস্তানী এজেন্ডা পূরণ করতে চান তিনি পরের বার জিতবেন না। জেতেনওনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এজেন্ডাটা পূরণ করলেন না ক্ষমতায় থাকাকালীন। কারণ, সবুর খানের প্রতি দরদ। অনেক মুক্তিযোদ্ধার গহীন গভীরে এরকম নফর মন লুক্কায়িত থাকে।

সরকারের যেসব সচিবকে এসব বিষয়ে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছিল তারা বিষয়টিকে পাত্তাও দিলেন না। হাইকোর্ট জনস্বার্থমূলক এ রকম অনেক রায় দেয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা অগ্রাহ্য হয় এবং অগ্রাহ্য যে হচ্ছে তা দেখার মতোও কোন মনিটরিং সেল নেই। খুলনার কোন রাজনৈতিক দল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোন সংস্থা এ আদেশ মানতে রাজি হয়নি। তাদের মনোভাব, ‘দিল দিলই তো হ্যায় পাত্থর তো নেহি।’ আজ যখন এ লেখা লিখছি, তখন পৃথিবীতে অনেক দেশে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী দিবস। বিশ্ব হাত ধোওয়া দিবসও পালিত হয় বাংলাদেশে নিয়মিত, গণহত্যা দিবস পালিত হয় না। এ বিষয়ে আমাদের দেয়া বিবৃতিও কোন পত্রিকা ছাপেনি। অথচ এই গণহত্যার কারণে সৃষ্টি বাংলাদেশের। দক্ষিণাঞ্চলেও সবচেয়ে নৃশংস ও বড় বড় গণহত্যা হয়েছে ১৯৭১ সালে।

সে কারণেই বাংলাদেশের প্রথম গণহত্যানিপীড়ন আর্কাইভ ও জাদুঘর আমরা খুলনায়ই শুরু করি। ভাড়া বাড়িতে আমরা আর কার্যক্রম চালাতে পারছিলাম না। তখন পরিত্যক্ত একটি বাড়ির জন্য আবেদন করি। খুলনার প্রশাসনের কর্তারা সবচেয়ে ভগ্নপ্রায় বাড়িটি এর জন্য নির্দিষ্ট করে এবং আমরা যাতে সেটিও না পাই তার জন্য প্রক্রিয়াগত যত রকমের বাধা সৃষ্টি করা দরকার তা করে। এরা সব মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আমলা। আসলে তাদের দোষ দিই না। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের অবস্থা কী হয়েছিল তারা তা দেখেছেন। যে বিচার বিভাগের হম্বিতম্বি আজকাল শুনি তারাও ১/১১এর বিচারকের অবিচার সম্পর্কে মুখ খোলেন না। আওয়ামী লীগ আমলে যে কদিন মন্ত্রী হয়েছেন তার থেকে বেশিদিন বিপাকে থেকেছেন। সুতরাং নিরপেক্ষ বা বিএনপির পক্ষে থাকা যে বেহ্তর তা তারা জানেন। অথচ প্রচুর চেষ্টার পর যখন এ সংক্রান্ত ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কাছে যায় তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা বরাদ্দ করেন। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ হয়ত মনে কষ্ট পাবেন, জননেত্রী শেখ হাসিনাও হয়ত, কিন্তু কথাটা বলেই ফেলি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সমর্থকদের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে আলাদা করে দেখেন যতই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হন না কেন। হয়ত এসব কারণেই।

খান এ সবুরের নামে সড়ক বাতিল করার জন্য আবারও আমি সম্পূরক রিট করি। এবার আদালত ক্ষুব্ধ হন এবং সেই পুরনো আদেশ পুনর্ব্যক্ত করে। শাহ আজিজের নাম বাতিল হয় কিন্তু সবুরের নয়। আরও পরে, সেই ডাঃ শেখ বাহারুল ও ছাত্রলীগের কিছু কর্মী এখন সবুর খানের নামের ফলক উপড়ে ফেলে। সাইন বোর্ডে কালো কালি লেপে দেয়। তখন অনেকে নাম বাতিল করে।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ভবন চাঁদা তুলে ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কিছু অনুদানে সংস্কার করে আমরা জাদুঘর চালু করেছি। প্রশাসনের কর্তাদের অনেক অনুরোধ করেছি, এমপিদেরও, কেউ আসেননি। সপ্তাহ দুয়েক আগে এইচটি ইমাম সেই জাদুঘর পরিদর্শনে গেলে সমস্ত কর্মকর্তা ও ছোটখাটো নেতারা সময় পেয়েছিলেন জাদুঘরে আসার। আমাদের সান্ত¡না, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আমাদের প্রধান দর্শক। এটাই তো আমরা চেয়েছিলাম।

না, সম্পূরক আদেশ দেয়ার পরও সরকার কোন নির্দেশ দেয়নি এসব নাম মুছে ফেলার। অথচ সারা দেশে অনেক স্থাপনা, ভবন, বিদ্যাপিঠে বাঙালীর শত্রুদের, পরাজিত শক্তির আন্ডাবাচ্চাকাচ্চাদের নামগুলো জ্বলজ্বল করছে। এ শর্তই দেয়া হচ্ছে এরা শত্রু নয়, ১৯৭১ সালে মিথ্যা মিথ্যা ‘কেচ্ছা’ এদের নামে বানান হয়েছে। ১৯৭১ সালের এইসব ‘কেচ্ছা’ সত্যি হলে এসব নাম থাকে কি করে? বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া স্বাধীন দেশে কেউ পরাজিতগণহত্যাকারীদের নাম অম্লান রাখার জন্য ‘সৌধ’ করে?

আমি জানি, এর উত্তর কারও পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়।

নফররাজের বৃত্ত থেকে বেরুবার জন্য বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে না, তা কিন্তু নয়। কিন্তু সেগুলো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা, সামগ্রিক নয়। যেমন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অভাবিতভাবে বৃদ্ধি, তাদের প্রচুর সুযোগসুবিধা দেয়া ইত্যাদি। অন্যদিকে, জামায়াত নিষিদ্ধে আগ্রহ নেই তাদের। শিক্ষার ক্ষেত্রে মাদ্রাসাকে গুরুত্ব দেয়া, একদিকে জঙ্গীমৌলবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, অন্যদিকে মাদ্রাসায় জঙ্গীবাদ ও জিহাদ কেন প্রয়োজন তা পড়ানো। জামায়াতবিএনপি নফররাজ দৃঢ় করার জন্য নানা ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং নিচ্ছে। সেগুলো এখন ফল পাচ্ছে। ধর্মকে ব্যবহার এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধের সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি ইসলামীকরণ ও সামরিকায়ন হচ্ছে। সেনাবাহিনীর তিনটি সংস্থা প্রশাসন ভাগ করে নিয়েছে। উড্ডয়ন সব বিমান বাহিনী, জলপথ সব নৌবাহিনী, বাকি সব সেনাবাহিনী। নফররাজের মূল দর্শন হচ্ছে পাকিস্তানকে মানা। আমাদের পোশাক, ক্ষমতায় সামরিকদের ক্ষমতায়ন, বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ, দৃষ্টিভঙ্গিতে এ নফররাজের বিভিন্ন বিষয় পরিস্ফুট হচ্ছে। এখন সারাদেশে বিজয়সেনা থেকে ওয়াজ মাহফিল বেশি হচ্ছে। এবং সেখানে নেতৃত্বে আছেন আওয়ামী নেতাএমপিরা। পরিসংখ্যান ব্যুরো সংখ্যাতত্ত্ব বলে, দেশের ৫২ ভাগ মানুষ জানেন না বিজয় দিবস কি? এর কারণ কিছু নয়, সর্ব পর্যায়ে, সর্বস্তরে ইতিহাস পড়ানোতে অনীহা। কারণ, পাকিস্তানে ইতিহাস পড়ানো হয় না। এখানে কেন হবে? তথাকথিত ইসলামী হুঙ্কার উঠলেই সরকার হাঁটু গেড়ে বসে। এটি খুবই ইন্টারেস্টিং যে, ১৪ দল বিভিন্নভাবে জামায়াতবিএনপির এজেন্ডাই পালনে আগ্রহী। বিএনপিজামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়ার কী দরকার? আরও অনেক কিছুর উল্লেখ করা যায়। কিন্তু স্পেসের অভাব ও ভীতু হওয়ার কারণে পরিধি বাড়ালাম না।

এটা মানি, বাংলাদেশে আবার অন্যায্য বা অন্যায় কিছু একেবারে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া হয় না। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। নফরদের নাম উজ্জ্বল করার বিপরীতেও দু’ একজন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

হাইকোর্টের আদেশও যখন দু’বার মানা হলো না এবং যখন প্রায় ব্যর্থ, তখন দেখি নতুন একটি সংবাদপত্র ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ ‘রাজাকারের দিবস’ নামে প্রথম পাতায় একটি কলাম শুরু করে। পত্রিকাটির সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমি নফরদের কিছু নাম যোগাড় করি সেগুলো বিজয় দিবসেও জ্বলজ্বল করবে। এবং আরেকটি সম্পূরক রিট করি। আদালত আবারও একই নির্দেশ দেয় আগেও যখন তা কার্যকর হয়নি এখনও হবে কিনা সন্দেহ। তবুও আশা করতে দোষ কি! আমার জানা মতে যে কুড়িজনের নামে সড়কস্থাপনাফলক আছে তারা হলেন স্বাধীনতাবিরোধী। তারা হলেন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দপ্রাপ্ত বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও নেতা আবদুল আলিম, মৃত্যুদকার্যকর করা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতা সৈয়দ কায়সার আলী, মৌলভীবাজারের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এনএম ইউসুফ আলী। অপরদিকে সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া খান মজলিস, ফরিদপুরের আবদুর রাজ্জাক মিয়া, মৌলভীবাজারের মাহতাব উল্লাহ, গাইবান্ধার আবদুল আজিজ (ঘোড়া মারা আজিজ) ও আবদুল জব্বার, নোয়াখালীর তরিকুল্লাহ, ঝিনাইদহের মিয়া মনসুর আলী, কুমিল্লার রেজাউর রহমান, নাটোরের আবদুর সাত্তার খান মধু মিয়া ও কাছির উদ্দিন, ঢাকা দক্ষিণের মোঃ তামিমুল এহসান ও মোহাম্মদ উল্লাহ (হাফিজ্জি হুজুর), নেত্রকোনার আবদুর রহমান, মেহেরপুরের মিয়া মনসুর আলী ও সাবদার আলী এবং ঝিনাইদহের সফি আহমেদ। পরের দিন মানবকণ্ঠ ও জনকণ্ঠের সংবাদ অনুযায়ী শাহজাদপুরে সাইফুদ্দিন এহিয়া খান মজলিসের নামফলক অপসারণ করে ছাত্রলীগ। সারাদেশে তরুণদের এ ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল যা পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল নামে যে সংস্থা আছে তাদের এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়া উচিত ছিল। দেয়নি, কারণ তারা শুধু সুবিধা পেতে আগ্রহী, আদর্শিক বিষয়ে নয়। বামপন্থী বা কি বলে যেন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোও নয়। কারণ, মফস্বলের কোন কিছু নিউজ হয় না।

এসব বোধ থেকে নতুন প্রজন্ম কতটা দূরে চলে গেছে এটি তার উদাহরণ। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, মুক্তিযোদ্ধা বলে যারা পরিচিত তারাও। তবে আশার খবর, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে [আবারও সেই প্রধানমন্ত্রী] ৯টি কলেজের নাম পরিবর্তনের কথা বলা হয় যেগুলো নফরদের নামে করা হয়েছে। সেগুলো হলো টাঙ্গাইলের বাসাইলের এমদাদ হামিদা ডিগ্রী কলেজ, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ধর্মপুর আবদুল জব্বার ডিগ্রী কলেজ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের মাওলানা সাইফুদ্দিন এহিয়া ডিগ্রী কলেজ, নাটোরের নলডাঙ্গার ডাঃ নাসির উদ্দিন তালুকদার কলেজ, সাতক্ষীরা সদরের বাটকেখালী এমএ গফুর মডেল কলেজ, মেহেরপুরের মুজিবনগর আনন্দবাস মিয়া মনসুর একাডেমি, হবিগঞ্জের মাধবপুরের সৈয়দ সঈদ উদ্দিন ডিগ্রী কলেজ, চট্টগ্রামের লোহাগড়ার মোস্তাফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং রাঙ্গুনিয়ার সেলিনা কাদের চৌধুরী ডিগ্রী কলেজ। [যুগান্তর, .১২.১৬]

একটি বিষয় নিজেদের কাছে পরিষ্কার হওয়া উচিত। নফর সংস্কৃতি ও উন্নয়ন এজেন্ডা একসঙ্গে চলে কিনা। পদ্মা সেতু হলো, জিডিপি বাড়ল, একটার জায়গায় বছরে দুটি জামা পরলাম কিন্তু মানসিকভাবে নফরই রয়ে গেলাম, সমাজসংস্কৃতিতে নফর সংস্কৃতি পরিপুষ্ট করলাম বা পাকিস্তানী মানসকেই পুষ্ট করলাম তা হলে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে, নফরই যদি থাকব তাহলে ১৯৭১ সালের দরকার কি ছিল?

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬