Archive

Archive for the ‘তথ্যপ্রযুক্তি’ Category

কী হচ্ছে টেলিভিশনে

ডিসেম্বর 6, 2016 মন্তব্য দিন

samia-rahmanসামিয়া রহমান : জীবনের সব ক্ষেত্রে পরাজিত এক লোক হতাশায় ভেঙে পড়ে মন খারাপ করে একা ঘরে বসেছিল। তার মনে হতে লাগল, সে এতই বোকা যে পৃথিবীতে তার বেঁচে থেকে আসলে কোনো লাভ নেই। এতটা বোকামি সে সারা জীবন করেছে যে পুরো পৃথিবীর মানুষ তাকে হেয় করে, ঘৃণা করে। মনে হতে লাগল, বেঁচে থেকে তার আর কী লাভ! কেউ তো নেই তার জীবনে— ভালোবাসার, ঝগড়া করার। লোকটি ভাবল সে আত্মহত্যা করবে। সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, মরেই যখন যাবে তার আগে পৃথিবীকে শেষবারের মতো দেখে নেওয়া দরকার। তার এ অবস্থার জন্য পৃথিবীও তো দায়ী। মনে মনে অনেক হম্বিতম্বি করে শেষ পর্যন্ত আর কিছু করতে না পেরে লোকটি টিভি অন করল। টেলিভিশনে তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনপরবর্তী বক্তৃতা দেখাচ্ছিল। সেই সঙ্গে ছিল সিএনএনের নির্বাচনপূর্ববর্তী ট্রাম্পের হেরে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণীর জরিপের তুলোধোনা করে চরম উত্তেজিত টকশো। ট্রাম্পের অহংকারী চিৎকার আর সিএনএনের অজস্র প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার আর টকশো দেখে জীবনে প্রথমবারের মতো লোকটির মনে হলো, আরে এই পৃথিবী তো বোকাদেরই আস্তানা। সবাই ট্রাম্পকে ঘৃণা করেও তাকেই তো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে, তাহলে ভবিষ্যতে সেও তো যে কোনো সময় খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে যেতে পারে।ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে তার মধুর উপলব্ধি, এই পৃথিবী বোকাদের স্বর্গ, বোকাদের বাস, হোক না তাতে বিশ্বের সর্বনাশ। নেহায়েতই কথার কথা। কিন্তু ঝাঁপি যখন খুললাম তখন আরও কিছু গুরুত্বহীন কথা শুনিয়ে দিই।

এনবিসি টেলিভিশন একবার প্লেন ক্রাশের ওপর একটি ভুল রিপোর্ট প্রচার করে চরম বিপদে পড়ে। রিপোর্টটি ছিল অনেকটা এ রকম— ৪৯ যাত্রীর সবাই প্লেন ক্রাশে সমুদ্রে ডুবে নিহত। চারদিক সমালোচনায় মুখর হলে এনবিসি দুঃখ প্রকাশ করে। ক্ষমা প্রকাশে তারা জানায়, আমরা জানতাম না আমাদের এখনো এত দর্শক আছে।

গল্প শেষ হয়নি, এক পরিবারের মা এবং ছোট কন্যা টেলিভিশন দেখছে। টেলিভিশনে চলছিল টকশো। যেনতেন টকশো নয়। তুমুল গরম উত্তেজিত আলোচনা। ট্রাম্প আর হিলারির পক্ষেবিপক্ষে। এক আলোচক বলেন, ‘আমেরিকার এখন চেঞ্জ দরকার। আর কতকাল ডেমোক্রেট শাসন চলবে!’ আর এক আলোচক আরও তড়পে বললেন, ‘অবশ্যই চেঞ্জ দরকার, তবে ট্রাম্পের মতো মানুষ যাতে আর বর্ণবাদী বিদ্বেষ না ছড়ায় তার জন্য চেঞ্জ দরকার।’ আর এক আলোচক কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, ‘আমি সব সময় চেঞ্জের পক্ষে সে যে বা যাই হোক না কেন।’ ক্লান্ত শিশুটি বলে উঠে, ‘মা ওদের মতো আমারও তো চেঞ্জ দরকার। আমার ন্যাপিটা চেঞ্জ করে দাও না।’

বিখ্যাত আমেরিকান স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান হেনরি ইয়াংম্যান একবার টেলিভিশন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘টেলিভিশন নিয়ে আমরা এত কথা বলি, কিন্তু আমরা কি কখনো খেয়াল করেছি টেলিভিশনের এমনই দুর্দশা যে এমনকি টেলিভিশনের নাটক বা গল্পের চরিত্রগুলো পর্যন্ত নিজেরা টেলিভিশন দেখে না।’

গণমাধ্যমের বোকা বাক্স টেলিভিশন নিয়ে মাতামাতি, উত্তেজনা, বিরাগ বা সমালোচনা নতুন নয়। এক সময়ের উত্তেজনা আজ অনেকটাই হতাশায় পরিণত হয়েছে। এমনকি শুধু দর্শক নয়, এ হতাশা কাজ করছে গণমাধ্যম কলাকুশলীদের মধ্যেও। কী হলো যে এত জনপ্রিয় মাধ্যম নিয়ে এত সমালোচনা বা একঘেয়েমির অভিযোগ?

আর এক আমেরিকান কমেডিয়ান ফ্রেড অ্যালেন বলেছিলেন, ‘টেলিভিশন হলো এমন এক মাধ্যম যেখানে কোনো ভালো কিছু দুর্লভ।’ তাই কি? ফ্রেড অ্যালেনের মতে, মজার বিষয় হলো টেলিভিশন এমন মাধ্যম যা সেলিব্রিটি বানায়। এমনই সেলিব্রিটি যে তার সারা জীবন পরিশ্রম করে পরিচিত হওয়ার জন্য। তারপর? তারা সানগ্লাসে মুখ ঢাকে যাতে তাদের চেহারা কেউ চিনতে না পারে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে সেখানেই। টেলিভিশনের চরিত্র কি এমনই দ্বান্দ্বিক, এমনই বিভ্রান্তিকর! তাহলে আর একটি গল্প বলি।

এক মহিলা অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে তার অফিসে দীর্ঘদিনের ছুটির আবেদন করল। বস ছুটি মঞ্জুর করায় সে মহাখুশি। বাসায় এসে ছুটির আনন্দে মহিলা তার বন্ধুদের সঙ্গে বাণিজ্য মেলায় গেল। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানে তখন টেলিভিশনের লাইভ কাভারেজ হচ্ছিল। যথারীতি মহিলার ইন্টারভিউসহ লাইভ কাভারেজ হলো। ফলাফলপরদিন তার ছুটি ক্যান্সেল।

টেলিভিশনের একঘেয়েমি, বৈচিত্র্যহীনতা, বিষয়বস্তুর দুর্বলতা নিয়ে হাজারো অভিযোগ থাকলেও টেলিভিশন কিন্তু মানুষ দেখছে। সেটি নিউ মিডিয়ার বদৌলতে মাধ্যম পরিবর্তন করে অন্যখানে হলেও, টেলিভিশনের অনুষ্ঠান তারা কোথাও না কোথাও দেখছে। অনলাইনের হিট বা শেয়ারের সংখ্যাই তার প্রমাণ। কিন্তু বিখ্যাত মার্কিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা, লেখক, মিউজিশিয়ান উডি অ্যালেন টেলিভিশনের ওপর এতটাই বিরক্ত ছিলেন যে বলতে দ্বিধা করেননি, ক্যালিফোর্নিয়ার মানুষেরা তাদের বাড়ির ময়লা বাইরে কোথাও ফেলে না বরং তা দিয়ে টিভি শো তৈরি করে।

গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে সমালোচনা বরাবরই ছিল। আমেরিকান টিভি অ্যাংকর, প্রযোজক, অভিনেতা, লেখক, গণমাধ্যম সমালোচক, কমেডিয়ান স্টিফেন কোলবার্ট পক্ষপাতিত্বের উদাহরণ দিতে গিয়ে ফক্স নিউজ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ফক্স নিউজ প্রত্যেক স্টোরির দুটি দিকই তুলে ধরে, এক হচ্ছে প্রেসিডেন্টের দিক এবং দ্বিতীয় হচ্ছে ভাইস প্রেসিডেন্টর দিক।’ হয়তো তিনি সিবিএস এ ছিলেন বলেই ফক্স নিউজের সমালোচনায় তার সমস্যা হয়নি।

কিন্তু সমস্যা কি শুধু পক্ষপাতিত্ব না কি বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যের দুর্বলতায়! সৃজনশীলতায় সংকট! প্রযুক্তিগত দুর্বলতা! নাকি দক্ষ সৃষ্টিশীল কর্মীর অভাব! এক সময় মনে করা হতো আধুনিক প্রযুক্তি টেলিভিশনে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেবে। কিন্তু দেখা গেছে খুব উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করেও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সফলতার মুখ দেখছে না। তাহলে সমস্যাটি কোথায়? আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যা অদ্ভুত সব সমস্যার চারণক্ষেত্র। পৃথিবী যত এগিয়ে যাচ্ছে, প্রযুক্তি যত বিকশিত হচ্ছে সমস্যার ধরনও তত বদলে যাচ্ছে। অনেকেই বলে থাকেন এত চ্যানেল, এত অনুষ্ঠান— কারা দেখবে বা কেন দেখবে? আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি তারা অনেকটা ‘দিন আনি দিন খাই’এর মতো কাজ করি। আমরা সংবাদ সাজাই, অনুষ্ঠান বানাই, কিন্তু চিন্তা করি না কেন আমরা এটা করছি। আমরা কীভাবে তৈরি করব তা নিয়ে যতটা চিন্তা করি, কিন্তু কেন এগুলো তৈরি করা হবে বা অডিয়েন্স কোন তাগিদে এগুলো দেখবে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাই না। আমরা আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগি। ধরেই নিই কিছু সংবাদ, কিছু টকশো, কিছু নাটক, চলতি ট্রেঅনুযায়ী গানের অনুষ্ঠান করলেই দর্শক হুমড়ি খাবে আমার চ্যানেলে। কিন্তু বোকা বাক্সের বোকামিতে দর্শকদের বোকা বানানোর দিন শেষ। বরং দর্শকরাই এখন বলা যায় বিভ্রান্ত করে টেলিভিশনকে। স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানে টেলিভিশন থেকে তারা মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

অনেকেই বলেন টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে বড় ধরনের বিপ্লব আনতে হবে, নইলে দর্শক তা দেখবে না। ঘুরেফিরে সেই একই তো অনুষ্ঠান, একই সংবাদ। এর মধ্যে বিপ্লব আসবে কোথা থেকে বা কেমন করে আসবে! কিন্তু সমস্যা যত বড় বা গূঢ় হবে তার সমাধানও তত অদ্ভুত বা সৃজনশীল হওয়া উচিত। তাই নয় কি? বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু খরচ কমানো বা কিছু সাধারণ প্রচলিত দক্ষতা এখন আর একমাত্র প্রযোজ্য শর্ত নয়। বরং প্রয়োজন সৃষ্টিশীল চিন্তা আর তার বাস্তবায়ন যাকে আমরা বলি ক্রিয়েটিভ রেভোল্যুশন। আমাদের টেলিভিশনগুলো কতটা ভারতীয় বা পশ্চিমা গণমাধ্যমের বাইরে গিয়ে নতুন চিন্তাকে উৎসাহিত করতে পারছে? সৃজনশীল ভাবনা কি আসছে না? নাকি সৃজনশীল ভাবনাকে উৎসাহিত করার মতো বিপ্লবী ব্যবস্থাপনা আর নেই। কোনো রকমে সংবাদ বা অনুষ্ঠান প্রচারই কি আমাদের লক্ষ্য? যে কোনোভাবে ব্যবসা করাই কি সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি? নাকি জনগণের মধ্যে থেকে জনগণের ভাবনাকে তুলে আনায় অনাগ্রহ? আমরা টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কি এখন আর নতুন চিন্তাকে উৎসাহিত করছি না! পৃষ্ঠপোষকতার দুর্বলতা?

স্যার আন্থনি জে কে উদ্ধৃত করে মার্কিন লেখক জন ম্যাক্সওয়েল বলেছিলেন, ‘অসৃজনশীল চিন্তাও খুব সহজে ভুল উত্তর খুঁজে বের করতে পারে। কিন্তু ভুল প্রশ্নটি খুঁজে বের করা অনেক জরুরি কারণ সেই ভুল প্রশ্নটিই হচ্ছে নতুনত্বের, সৃজনশীলতার উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা’। ম্যাক্সওয়েল বলেছিলেন, ‘আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক উত্তরটি পাব না, যতক্ষণ না সঠিক প্রশ্নটি জানব।’ নতুন আইডিয়া তৈরি তাই কোনো দুর্ঘটনা নয়, ম্যাজিকও নয়। এটা ঘটতে হলে পরিবর্তন দরকার। স্বপ্ন শুধু দেখলেই হবে না। প্রয়োজন অন্তর্চক্ষুর উন্মোচন। সত্যের সঙ্গে, বাস্তবতার সঙ্গে তার সম্মেলন। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসনের কথাটি যদি বাংলায় ভেঙে বলি, এই গুরু বলে গিয়েছিলেন, ‘জিনিয়াস হলো এক পার্সেন্ট ঈশ্বর প্রদত্ত আর নিরানব্বই ভাগই ঘাম অর্থাৎ শ্রম।’ সেই ঘাম বা শ্রম আমরা কতটুকু দিচ্ছি বা এর সঙ্গে চিন্তার জোগান দিচ্ছি তো!

এবার আসি আমাদের টেলিভিশন প্রসঙ্গে। এত অনুষ্ঠান, চব্বিশ ঘণ্টা সংবাদ সম্প্রচার কিন্তু আদতে কি ঘটেছে বাংলাদেশের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে? কতজন মনোযোগী দর্শককে পাই আমরা আমাদের সঙ্গে? যদিও আমি আমার সহকর্মীদের মতো নিরাশাবাদী কণ্ঠে বলতে চাই না, যে কিছুই ঘটছে না বা কিছুই ঘটবে না। এখনো বিশাল সম্ভাবনা আছে এই গণমাধ্যমের। এখন পর্যন্ত গণমাধ্যম নীতিনির্ধারক/ব্যবস্থাপক বা আমরা কলাকুশলীরা একটা সেফ জোনে নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে কাজ করে যাচ্ছি। নতুন প্রযুক্তির সীমাহীন সম্ভাবনাকে পুরোদস্তুর কাজে না লাগিয়ে বরং সীমিত প্রাপ্তিতেই আত্মসন্তুষ্টিতে আছি। সম্ভবত সীমানা ভাঙার সীমাবদ্ধতার আতঙ্কে ভীত আমরা। সে কারণেই হয়তো দর্শকরা ছেড়ে যাচ্ছে আমাদের। হয়তো ভিন দেশে, হয়তো ভিন্ন মাধ্যমে। নতুন প্রযুক্তির বিপুল প্রভাব ও প্রসারে রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র পরিণত হয়েছে সনাতন গণমাধ্যমে। আমরা দর্শক হারানোর আতঙ্কে আছি অথচ এই সনাতন গণমাধ্যম যে অপার সম্ভাবনা নিয়ে মানসজগতে বিচরণ করে এসেছে তার ক্ষেত্র কিন্তু সত্যিকার অর্থে একটুও কমেনি। বরং নতুন প্রযুক্তি আমাদের আরও সুবিধা করে দিয়েছে ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করার। কিন্তু সে সম্ভাবনাকে কতটুকু কাজে লাগাতে পারছি আমরা? চিন্তাকে আমরা বাক্সবন্দী করে ফেলছি। বাক্সের বাইরের দুনিয়া নিয়ে আমরা ব্যস্ত বা চিন্তিত নই বলেই ‘আউট অব দ্য বক্স’ কিছু করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি।

সাইমন সিনেক তার বহুল বিক্রীত ‘দ্য গোল্ডেন সার্কেল’ বইটিতে লিখেছিলেন, যে কোনো কাজে আমরা কাজটি ‘কেন’ করছি জানার চেয়ে ব্যস্ত থাকি ‘কীভাবে’ কাজটি করব। অথচ ‘কেন’ এর মধ্যেই সব প্রশ্নের উত্তর নিহিত। আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা কি আদতেই কোনো পরিকল্পনার পেছনে ‘কেন’ পরিকল্পনা করা হচ্ছে বা ‘কেন’ সেটি গণমাধ্যমে প্রচারিত হবে এবং ‘কীভাবে’ এর বিষয়বস্তু সব প্রযুক্তি, ইন্ডাস্ট্রি ও অডিয়েন্সের ওপর প্রভাব ফেলবেতা কি কখনো ভেবে দেখি? ওই যে ম্যাক্সওয়েলের কথায় আবার ফিরে আসতে হয়। ভুল উত্তর তো গৎবাঁধা সব মানুষই বুঝতে পারে। কিন্তু ভুল প্রশ্নটি কি ধরতে পারি? আর সঠিক পথের সন্ধানে না গেলে যে বিদিশা হয়েই পথে পথে ঘুরতে হয়। সেই ঘেরাটোপেই বোধহয় আবদ্ধ আজ আমাদের প্রায় ২৯টি চ্যানেল। দর্শকদের অভিযোগ একই বিষয়বস্তু, একই অনুষ্ঠান, একই গল্প, ঘুরে ফিরে সেই একই মানুষের মুখ। কখনো সখনো দর্শক ফেরানোর চেষ্টায় চ্যানেলের চরিত্র বদলে ফেলে ভারতীয় অনুকরণে নাটক নির্মাণ। অথচ আমাদের টেলিভিশনে এখনো অসাধারণ সব মৌলিক নাটক বা অনুষ্ঠান হচ্ছে এবং হচ্ছে যে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ইউটিউবে তার হাজার হাজার হিট বা লাইক বা শেয়ার। তাহলে দর্শক কি মাধ্যম বদলে ফেলছে?

আজ ইন্টারনেটেও টেলিভিশন দেখা যায়। মোবাইলের মুঠোয় চলে এসেছে এখন টেলিভিশন। প্রচলিত ড্রইংরুম মিডিয়ার ধারণা থেকে বের হয়ে এসে প্রযুক্তির সহায়তায় টেলিভিশনকে মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়ার সময় এখন এসেছে। সময় এসেছে এই নীরব কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠীর কথা ভাবার, যারা হয়তো সময় নিয়ে টেলিভিশনের সামনে এসে বসে না, কিন্তু এই টেলিভিশনের সংবাদ, নাটক বা অনুষ্ঠানের তারা ভক্ত। এখানেই সুযোগ আছে আমাদের গণমাধ্যম কর্মীদের বিষয়বস্তুর উন্নয়নের। নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই এই উন্নয়ন। বৈপ্লবিক ভাবনা, অসাধারণ চিন্তা, সৃজনশীল আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানই পারবে এই জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত দর্শকের আসনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। প্রযুক্তি আর সৃষ্টিশীলতার মিলন এখানে জরুরি। আর তখনই টেলিভিশনকে আবারও জনপ্রিয়তার কাতারে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। সম্ভব হবে এই টেলিভিশনের অস্তিত্বহীনতার শোরগোলের বিনাশ করা।

বিশ্ব টেলিভিশন দিবস চলে এসেছে প্রতি বছরের মতো। আবারও সমালোচনা, আবারও আত্মজিজ্ঞাসা। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়নের সেই প্রত্যয় নিয়ে দর্শকদের প্রতি গভীর ভালোবাসায় আমরা ক’জনা আছি টেলিভিশনের বৈপ্লবিক উন্নয়নে! শেষ করছি একটি জোকস দিয়ে। দুই বন্ধু কিঞ্চিৎ তরল অবস্থায় মদ্যপান করছিল আর টিভি দেখছিল। টিভিতে সে সময় সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। এক ব্যক্তি ২০ তলা বিল্ডিং থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করছে। দুই বন্ধুর একজন বলল, আমি বাজি ধরে বলতে পারি এই লোক আত্মহত্যা করবে। দ্বিতীয় বন্ধু বলল, না এই লোক আত্মহত্যা করবে না। টিভিতে দেখা গেল ব্যক্তিটি চোখ বন্ধ করে ছাদের কিনারায় দাঁড়াল আর ঝাঁপ দিল। দ্বিতীয় বন্ধু টাকা বের করে প্রথম বন্ধুকে দিয়ে বলল, আমি বাজিতে হেরে গেছি। প্রথম বন্ধু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, না এই টাকা আমি নিতে পারি না। আমি আসলে সংবাদটি দুপুরেই টিভিতে দেখে ফেলেছিলাম। দ্বিতীয় বন্ধু বলল, আরে তাতে কী হয়েছে আমিও তো সকালের বুলেটিনে সংবাদটি দেখেছিলাম, কিন্তু আমি ভাবতে পারিনি লোকটি একই ভুল দুবার করবে! আমরা গণমাধ্যম কর্মী, নীতিনির্ধারক, ব্যবস্থাপকরা কি একই ভুল বারবার করছি! কোন পথে হাঁটছি, জানি কি আমরা?

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

উঠতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম – স্ন্যাপচ্যাট

ডিসেম্বর 5, 2016 মন্তব্য দিন

snapchat-facts

২০৪৫ সালে যেমন হতে পারে জীবন ও জগৎ !

ডিসেম্বর 1, 2016 মন্তব্য দিন

world-2045

কার্টুন-রঙ্গঃ কম্পিউটারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে…

নভেম্বর 30, 2016 মন্তব্য দিন

computer-security-1computer-security-2computer-security-3

গুগল সার্চ ইঞ্জিনে কোড লাইনের সংখ্যা কতো?

নভেম্বর 30, 2016 মন্তব্য দিন

codelines-in-google

সফল এক নারী তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তার কথা

নভেম্বর 22, 2016 মন্তব্য দিন

nahida-enterprenuer

বাংলার প্রথম প্রোগ্রামার

নভেম্বর 21, 2016 মন্তব্য দিন

মোস্তাফা জব্বার : এই সেদিনও কেউ জানত না বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার কে? কার হাত ধরে ৫০ বছর আগে আমরা কম্পিউটারের যুগে পা ফেলেছিলাম সেটি বিস্মৃতপ্রায় অতীত। অতি সম্প্রতি বিষয়টি আমাদের মিডিয়ার নজরে পড়েছে। সেটিও একটি সম্মাননা পাবার পর। এই বিষয়টি দৈনিক সমকাল পত্রিকায় এভাবে বলা হয়েছে– “দেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হানিফউদ্দিন মিয়াকে মরণোত্তর সম্মাননা জানিয়েছে আইসিটি বিভাগ ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি। বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো২০১৫ শীর্ষক মেলার সমাপনী আয়োজনে হানিফউদ্দিন মিয়ার স্ত্রী ও সন্তানের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপো২০১৫ শীর্ষক মেলার সমাপনী আয়োজনে হানিফউদ্দিন মিয়ার সন্তান এবং স্ত্রীর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অনেকটা পাদপ্রদীপের আলোয় না থাকা প্রয়াত এই প্রোগ্রামার এ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন।” পত্রিকাটি আরও লিখেছে– “জানা গেছে, মূলত তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বারের প্রচেষ্টাতেই তাঁকে পুরস্কৃত করেছে আইসিটি বিভাগ ও বিসিএস। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী দেশের এই প্রথম প্রোগ্রামার সম্পর্কে কেন অজ্ঞাত ছিল দেশবাসী এমন প্রশ্নের উত্তরে মোস্তাফা জব্বার জানান, তিনি আসলে অনেকটা অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। তবে দেশের প্রতি তার টান ছিল অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রথম কম্পিউটারটি আসে ১৯৬৪ সালে [তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে]। সেটি ছিল আইবিএম মেইন ফ্রেম ১৬২০ কম্পিউটার। বৃহদাকৃতির ওই কম্পিউটারটি স্থাপন করতে দুটি বড় রুম ব্যবহার করতে হয়েছিল। ঢাউস আকারের সেই কম্পিউটারটিকে ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনে স্থাপন করা হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ডিজিটাল মেইনফ্রেম কম্পিউটার। এখানে বিশেষ উল্লেখ্য, বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটার আইবিএম ১৬২০ তার হাত ধরেই বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনে [টিএসসি সংলগ্ন] স্থাপিত হয়। পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা এবং দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বৈজ্ঞানিক তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ, প্রোগ্রাম উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং নানামুখী গবেষণা কাজে এটি ব্যবহার করেন। তবে ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটারটি কেন স্থাপিত হয়েছিল তা জানা প্রয়োজন। মোস্তাফা জব্বার জানান, পাকিস্তান সরকার তখন কম্পিউটারটি পশ্চিম পাকিস্তানে স্থাপনের পরিকল্পনা করে। তবে হানিফউদ্দিন মিয়া ছাড়া অন্য কেউ এ কম্পিউটার তদারকি এবং পরিচালনার যোগ্য ছিলেন না। এজন্য সরকার হানিফউদ্দিন মিয়াকে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার আহ্বান জানাল। তবে ওই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন হানিফউদ্দিন। ফলে কম্পিউটারটি ঢাকার আণবিক শক্তি কমিশনে স্থাপনে অনেকটা বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।”

এখনকার সময়ে বিদেশ মানেই স্বর্গ। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য পাকিস্তানই ছিল স্বর্গ। কিন্তু হানিফউদ্দিন সেই স্বর্গের হাতছানি প্রত্যাখ্যান করেন। এদেশে ক’জন এমন মানুষ ছিল বা এখনও আছে? ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তে তার জন্মস্থান নাটোরের সিংড়ার হুলহুলিয়া গ্রামে ডিজিটাল হাব স্থাপনের কাজ শুরু হচ্ছে। গ্রামটি এখন শতভাগ শিক্ষিত মানুষের গ্রাম। আরও একটি সুখবর হচ্ছে তার সঙ্গে কাজ করেছিলেন এমন আরও একজনের সন্ধান আমরা পেয়েছি, যার নাম মুহম্মদ মুসা।

সমকাল হানিফউদ্দিন মিয়ার শিক্ষা ও পেশা নিয়ে আরও লিখেছে– “কম্পিউটারের সঙ্গে সখ্য হলো কীভাবে হানিফউদ্দিন মিয়ার এটি জানতে হলে ফিরে যেতে হবে তার তারুণ্যে। বাংলাদেশের গৌরব, নাটোরের এই কৃতী সন্তান পরমাণু বিজ্ঞানী হানিফউদ্দিন মিয়া ১৯২৯ সালের ১ নবেম্বর নাটোরের সিংড়ার হুলহুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুল শিক্ষক পিতা রজব আলী তালুকদারের দুই পুত্র ও এক কন্যাসন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ তিনি। সংসারে অভাব না থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য জায়গির থাকতে হয় তাকে। ১৯৪৬ সালে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএসসিতেও প্রথম বিভাগ লাভ করেন। এরপর ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এমএসসি পরীক্ষায় ফলিত গণিতে প্রথম শ্রেণীতে স্বর্ণপদকসহ প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৯৬০ সালে ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন থিওরি এ্যান্ড অটোমেশন, চেকোস্লোভাক একাডেমি অব সায়েন্স, প্রাগ থেকে এ্যানালগ কম্পিউটার টেকনিক এবং ডিজিটাল কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে সিস্টেম এ্যানালাইসিস, নিউমেরাল ম্যাথমেটিকস, এ্যাডভান্স কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, অপারেশন রিসার্চে এমআইটি [যুক্তরাষ্ট্র] কম্পিউটার সেন্টার থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে আইবিএম রিসার্চ সেন্টার লন্ডন থেকে অপারেটিং সিস্টেম ও সিস্টেম প্রোগ্রামিংয়ে ট্রেনিং করেন। তারপর তিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় [ওঅঈঊ] প্রোগ্রামার এ্যানালিস্ট হিসেবে এ্যানালাইসিস, ডিজাইন, সফটওয়্যার ইমপ্লিমেশন অব কম্পিউটার এ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামসংক্রান্ত বিষয়ে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খকালীন শিক্ষকতা করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তিনি অঙ্ক শাস্ত্র ও কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। পারিবারিক জীবনে স্ত্রী ফরিদা বেগম ও এক পুত্র এবং দুই কন্যা সন্তানের জনক দেশের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার মোঃ হানিফউদ্দিন মিয়া। পুত্র শরীফ হাসান দীর্ঘ ২৩ বছর সিমেন্স বাংলাদেশে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে একটি বেসরকারী হাউজিং কোম্পানিতে কাজ করছেন। অন্যদিকে তার মেয়ে ডোরা শিরিন পেশায় একজন ডাক্তার। আর অপর মেয়ে নিতা শাহীন গৃহিণী। নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার হুলহুলিয়া গ্রামের এই কৃতীসন্তান বাংলাদেশ এ্যাটোমিক এনার্জি কমিশনের কম্পিউটার সার্ভিস ডিভিশনের ডিরেক্টর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয় কম্পিউটার সায়েন্স ও নিউমেরাল ম্যাথমেটিকস থাকা সত্ত্বেও শিল্পসাহিত্যসহ আরও নানাবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের প্রতি তার ছিল অপরিসীম আগ্রহ। তিনি বাংলা ও ইংলিশ ছাড়া উর্দু, আরবি, হিন্দী, জার্মান ও রাশিয়ান ভাষা জানতেন। এদিকে ২০০১ সালে দেশে ব্যবহ্যত প্রথম কম্পিউটারটিকে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। এর এক বছর আগে ২০০০ সালে নিজ গ্রাম হুলহুলিয়া হাইস্কুলে দুটি আইবিএম ডেস্কটপ কম্পিউটার উপহার দেন তিনি। এরপর থেকেই এই গ্রাম থেকে ডাক্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে কম্পিউটার প্রকৌশলীর সংখ্যা। ছোট্ট এই গ্রাম থেকে বেড়ে উঠেছেন শতাধিক প্রকৌশলী। ২০০৭ সালের ১১ মার্চ না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। তবে মৃত্যুর পূর্বে তিনি বিভিন্ন সময়ে গণিতশাস্ত্র ও কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশ গণিত সমিতিরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। বাংলাদেশ কম্পিউটার বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সঙ্গে মোহাম্মদ হানিফউদ্দিন মিয়ার নাম গভীরভাবে সম্পৃক্ত।”

হানিফউদ্দিন মিয়াকে নিয়ে আমার নিজের খুব ছোট স্মৃতিচারণ রয়েছে। ’৯৭ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রথম আমাকে কম্পিউটার বিষয়ক একটি অনুষ্ঠান করার অনুমতি প্রদান করে। বাংলাদেশে কম্পিউটার নিয়ে এর আগে আর কোন অনুষ্ঠান হয়নি। তবে আমি এর আগেও এমন একটি অনুষ্ঠান করার চেষ্টা করে আসছিলাম। কিন্তু ৯৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকার আমাকে পছন্দ না করায় এবং ’৯৬ পরবর্তী সরকারের সহানুভূতি পাওয়ায় বিটিভির একজন প্রখ্যাত প্রযোজককে আমার এই অনুষ্ঠানটি করতে দেয়া হয়। সেই প্রযোজক লুৎফর রহমান তালুকদার এখন আর বিটিভিতে নেই। তবে তার সহকারী বরকত এখনও আমার কম্পিউটার অনুষ্ঠান করে। বরকত সেই অনুষ্ঠানের কথা এটিও বরকত এখনও মনে করতে পারে। আমরা যে সাভার গিয়েছিলাম এবং আমার আরামবাগ অফিসে যে শূটিং করেছিলাম সেটি এখনও বরকত মনে করতে পারে। হানিফউদ্দিন মিয়ার কথাও বরকত ভোলেনি।

কম্পিউটার অনুষ্ঠানটি বরাবরই শিক্ষামূলক। তবে প্রথম কয়েকটি অনুষ্ঠান আমি একটু ভিন্ন মাত্রায় করার কথা ভেবেছিলাম। সেজন্যই আমি ’৬৪ সালে বাংলাদেশে আসা প্রথম কম্পিউটার নিয়ে আমার প্রথম টিভি অনুষ্ঠানটি সাজাই। তখনই জানা গেল কম্পিউটারটি সাভারের পরমাণু শক্তি কমিশনে আছে। আমরা সেখানে যাব ভাবলাম। লুৎফর ভাই বিটিভির আউটডোর ক্যামেরা ইউনিট বরাদ্দ নেন। আমি চাইলাম সেই কম্পিউটার যিনি প্রথম ব্যবহার করেন তার একটি সাক্ষাতকার নেব। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির প্রথম সভাপতি এসএম কামালের কাছে খোঁজ পেলাম মোঃ হানিফউদ্দিন মিয়ার। পরে জানলাম বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির দ্বিতীয় সভাপতি সাজ্জাদ হোসেনের ভায়রা তিনি। সাজ্জাদ ভাই পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন এবং হানিফউদ্দিন সেই বিয়ের অনুঘটক ছিলেন।

সেই সাক্ষাতকারটি ছিল বাংলাদেশের কম্পিউটারের ইতিহাসে এক বড় ধরনের মাইলফলক। কারণ, হানিফউদ্দিন সেদিন বলেছিলেন এদেশে কম্পিউটার আসার কথা। আমি অবাক হয়েছিলাম এটি জেনে যে, তিনি বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের লাহোরে যেতে রাজি না হওয়ায় আমরা কম্পিউটারটি পাই। আমি স্মরণ করতে পারি, ভিডিও ক্যামেরার সামনে সেটি তার প্রথম কথা বলা। অনেকটাই লাজুক টাইপের এই মানুষটির ব্যবহার এতটাই অমায়িক ছিল যে, আমি অভিভূত হয়ে যাই। এরপর বহুদিন তার খবর রাখিনি। কামাল ভাই কম্পিউটার সমিতির আশপাশে থাকলেও সাজ্জাদ ভাই অনেকটা দূরে সরে যাওয়ায় আমি আর তার খবর নিতে পারিনি। আমি জানতাম তিনি উত্তরায় থাকেন। আর কোন সংযোগ আমার ছিল না। কিন্তু ২০১৪ সালে বাংলাদেশে কম্পিউটার আসার ৫০ বছর পূর্তিতে আমি হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি, কেমন করে এই সুবর্ণজয়ন্তীটি আমরা উদ্যাপন করতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার যে, আমি তখন কোন প্ল্যাটফরম খুঁজে পাইনি সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি উদ্যাপন করার জন্য। পরমাণু শক্তি কমিশন সেটি উদ্যাপন করেনি।

২০১৫ সালের শুরুতে আমি সাভারের পিএটিসিতে সরকারী কর্মকর্তাদের একটি ব্যাচের ক্লাস নিতে গেলে সেখানে আমি হানিফউদ্দিনের কথা বলি। বস্তুত আমি ’৯৭ সালের পর যখনই সুযোগ পেয়েছি তখনই হানিফউদ্দিন মিয়ার কথা বলেছি। ক্লাস শেষে বেরিয়ে আসার পর এক তরুণ এসে জানাল তার বাড়ি হুলহুলিয়া গ্রামে, যে গ্রামে হানিফউদ্দিন জন্ম নিয়েছেন এবং যেখানে তার কবরও আছে। আমি তার কাছে হানিফউদ্দিনের বংশধরদের কারও ঠিকানা চাইলাম। তিনি তার ছেলে শরীফ হাসান সুজার ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা দিলেন। সেদিন মনে হলো হাতে আকাশের চাঁদ পেলাম।

এমনিতেই ২০১৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি থাকাকালে বাংলাদেশে কম্পিউটার আসার ৫০ বছর উদযাপনের জন্য চেষ্টা করি। তার আগে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির ২৫ বছর উদযাপনের জন্যও চেষ্টা করি। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অবস্থা আমার সহায়ক হয়নি। তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে আর কিছু না হোক দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মানুষের কাছে অন্তত হানিফউদ্দিন মিয়ার নামটা পৌঁছানো দরকার। এক কথায় যদি বলি তবে এর সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের সকলের দুয়ারে দুয়ারে আমি ঘুরেছি। আমি বেসিসবিসিএসপরমাণু শক্তি কমিশন, আইসিটি ডিভিশন সবাইকেই সুবর্ণজয়ন্তীর কথা বলেছি। জাতীয় বিজ্ঞান পরিষদ দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্তও নেয়। কিন্তু কোনটাই কার্যকর হয়নি। একেবারে শেষ চেষ্টাটি কাজে লেগেছে। ২০১৫ সালে আইসিটি ডিভিশন ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি যখন বাংলাদেশ আইসিটি এক্সপোর আয়োজন করে তখন কোন এক কারণে আমি সেমিনার কমিটির চেয়ারম্যান হই। সেই সুবাদে এই ডিভিশনের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমদ পলকের সঙ্গে কথা হয়। পলককে হানিফউদ্দিনের কথা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এতে সম্মতি প্রদান করেন। এই ডিভিশনের কর্মকর্তারা আমার ঘাড়ে একটি বাড়তি দায়িত্ব দিলেন তার পরিবারকে খুঁজে বের করার। আমি সেই কাজটিও করলাম। জানা গেল যে, তার স্ত্রী মারাত্মকভাবে অসুস্থ। সম্মাননা দেবার আগের রাতে আমি সেই মহিলার সঙ্গে কথা বললাম।

তিনি আসতে রাজি হননি। কিন্তু একরকম জোর করেই আমি তাকে রাজি করালাম এবং সেদিন ১৭ জুন ২০১৫ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে কেবল তিনি আসেননি, তার তৃতীয় প্রজন্ম ছেলের ছেলে নাতি ইরফানকেও নিয়ে এলেন। আমি মনে করি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক ঘটনা। ইরফান সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিল, আমি জানতাম না আমার দাদা এত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। সত্যিকার অর্থে আমরাও জানতাম না তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসএর চেয়ারম্যান, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক ॥

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ২০ নভেম্বর ২০১৬