আর্কাইভ

Archive for the ‘জীবনী’ Category

শিল্পী ভ্যান গগের চিত্র-রাজ্য পরিভ্রমণ…

van gogh world

Advertisements
বিভাগ:জীবনী, শিল্প

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধররা…

এনামুল হক : প্রতিভাধর হওয়া আর অতি বুদ্ধিমান হওয়া দুটো আলাদা ব্যাপার। অতি বুদ্ধিমান ভূরি ভূরি আছে। তাতে খুব একটা যায় আসে না। আসল বিষয় হলো সৃজনশীলতা থাকা। কল্পনাকে যে কোন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করার ক্ষমতা থাকা। প্রতিভাধর ব্যক্তিদের সেই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকে। এখানেই প্রতিভাধরদের সঙ্গে অতি বুদ্ধিমানদের পার্থক্য।

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের কথাই ধরা যাক। তার অত বিশ্লেষণধর্মী ক্ষমতা ও দার্শনিক গভীরতা ছিল না। তথাপি আমেরিকার আলোকায়নের যুগে তিনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারক কূটনীতিক, বিজ্ঞানী, লেখক ও ব্যবসা স্ট্র্যাটেজিস্টে পরিণত করেছিলেন। ঘুড়ি উড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, আকাশের বজ্র হলো বিদ্যুত। সেই বজ্রকে বশে আনার জন্য তিনি একটা বড় উদ্ভাবন করেছিলেন। বের করেছিলেন বিশুদ্ধ জ্বালানি স্টোভ, উপসাগরীয় স্রোতের গতিপথ, বাইফোকাল গ্লাস, মনোমুগ্ধকর বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি।

এলবার্ট আইনস্টাইনও একই পথ অনুসরণ করেছিলেন। ছোটবেলায় কথা বলা শিখতে দেরি করেছিলেন। এতই দেরি যে বাবা-মা তাকে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। বাড়ির পরিচারিকা তাকে বলত হাবাগোবা। এক আত্মীয় বলত নির্বোধ। কর্তৃত্বের প্রতি তার এক বিদ্রোহীভাব কাজ করত যার জন্য এক স্কুলশিক্ষক তাকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কর্তৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা থেকেই তিনি প্রচলিত জ্ঞান ও ধারণা সম্পর্কে এমন সব প্রশ্ন তুলতেন যা শিক্ষাঙ্গনের অতি শিক্ষিত লোকেরাও কখনও চিন্তা করেনি। কথা বলতে শেখার কারণে ধীরগতির জন্যই প্রতিটি ঘটনাকে তিনি অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেতেন, যেগুলো অন্যরা ধ্রুব বলে মেনে নিত।

আইনস্টাইন একদা বলেছিলেন : ‘সাধারণ প্রাপ্তবয়স্করা স্থান ও কালের সমস্যা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাত না। কিন্তু আমার বিকাশ এত ধীরে ধীরে হয়েছিল যে, আমি যখন ইতোমধ্যে বড় হয়ে উঠেছি সে সময়ই আমি স্থান ও কাল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেছিলাম।’ সে কারণেই জুরিখ পলিটেকনিকে তার ক্লাসের ৫ জন ছাত্রের মধ্যে তিনি চতুর্থ হিসেবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সুইস পেটেন্ট অফিসে একজন তৃতীয় শ্রেণীর পরীক্ষক হিসেবে খেটে মরার সময়ই আইনস্টাইন সমকালীন পদার্থ বিজ্ঞানের দুটি মৌলিক তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়ে বিশ্বজগত সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। সে দুটি হলো আপেক্ষিক তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব। আর তা করতে গিয়ে তিনি ‘দি প্রিশ্মিপিয়া’ গ্রন্থে আইজ্যাক নিউটনের বর্ণিত অত্যতম মৌলিক একটি ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। আর সেটা হলো আমরা যেভাবেই দেখি না কেন সময় সেকেন্ডে সেকেন্ডে এগিয়ে চলে। আজ আইনস্টাইনের নাম তাই অসাধারণ প্রতিভার সমার্থক।

ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃজনশীল প্রতিভাধর বলা যেতে পারে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে। তিনি সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছিলেন। না, নিউটন বা আইনস্টাইনের মতো অতি মানবিক তাত্ত্বিক মেধাশক্তি তার ছিল না কিংবা তার বন্ধু লুকা প্যাসিওলির মতো গাণিতিক ক্ষমতাও তার ছিল না। কিন্তু ভিঞ্চির রোম্বিকুবোক টেহিড্রোনস এবং কয়েক ডজন আরও অন্যান্য বহুমুখী জ্যামিতিক আকারের ছবি বাস্তব রূপ লাভ করে যেগুলো ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কালক্রমে তিনি ভূগোল, এনাটমি ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই কাজ করেন। তার ‘ভাইট্রুবিয়ান ‘ম্যান’ ড্রয়িংটি ছিল স্মরণীয় যার জঠরে ছিল ভ্রণ। এ ছাড়াও তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ কিছু শিল্পকর্ম তৈরি করে গেছেন।

বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে জন্ম হওয়ায় ভিঞ্চি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। তিনি বহুলাংশেই ছিলেন স্বশিক্ষিত। আইনস্টাইনের মতো কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তার একটা সমস্যা ছিল। তিনি প্রচলিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং মধ্যযুগীয় গোঁড়ামিকে অগ্রাহ্য করতে শিখেছিলেন। তিনি মনে করতেন যে অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায়। সমস্যা-সমাধান বের করার এই পদ্ধতিটা কোন অংশেই কম বিপ্লবাত্মক ছিল না। এক শতাব্দী পর ফ্রান্সিস বেকন ও গ্যালিলিও গ্যালিলি এই একই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এই পদ্ধতি অনুশীলনের কারণে দ্য ভিঞ্চির স্থান সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের ওপরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। মেধাবীরা সেই লক্ষ্যে পৌঁছে থাকে, যে কারণে অন্য আর কেউ পৌঁছতে পারে না। প্রতিভাবানরা সেই লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করে থাকে, যা অন্য আর কেউ দেখতে পারে না।

ভিঞ্চির সবচেয়ে প্রেরণাদায়ক বৈশিষ্ট্য ছিল তার কৌতূহল। নিজের নোটবইতে তিনি উত্তর খুঁজে বের করতে হবে, এমনি হাজারো প্রশ্ন লিখে রেখেছিলেন। যেমন একটা বৃত্তকে কিভাবে চতুষ্কোণ দিয়ে আকৃত করা যায়। এয়োর্টিক ভাল্ব কেন বন্ধ হয়ে যায়, আলো কিভাবে চোখে প্রক্রিয়াজাত হয় এমনি অসংখ্য প্রশ্ন। তার মহৎ লক্ষ্য ছিল আমাদের এই মহাবিশ্ব এবং সেখানে আমরা কিভাবে আছি সেই বিষয়সহ সবকিছুই জানার চেষ্টা করা। আকাশের রং কেন নীল এই প্রশ্ন ছোটবেলা থেকেই আমাদের জাগে। এক পর্যায়ে আমরা এ নিয়ে চিন্তা করা ছেড়ে দেই। দ্য ভিঞ্চি এ নিয়ে তার নোট বইয়ে পাতার পর পাতা লিখে গেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে পানির বাষ্পে আলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে নীল রঙের এক কুহেলী শেড তৈরি হয়। আইনস্টাইনও এই প্রশ্ন নিয়ে ধাঁধায় পড়েছিলেন। তিনি আলোর বর্ণালীর বিক্ষিপ্তরূপে ছড়িয়ে পড়ার এক গাণিতিক সূত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন।

দ্য ভিঞ্চি কখনই পর্যবেক্ষণ থেকে ক্ষান্ত হননি। অনেক ছোটখাটো ব্যাপারও তিনি লক্ষ্য করতেন যা আমরা সাধারণ মানুষরা খেয়াল করি না। যেমন পাত্রে পানি ঢালার সময় তিনি দেখতেন কেমন করে ঘূর্ণি সৃষ্টি হয়। ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানোর সময় তিনি বায়ুর ঘূর্ণি পরীক্ষা করতেন। এসব পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি তুলির টানে অসাধারণ কিছু শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন, ব্যাপ্টিজম অব ক্রাইস্ট ছবিতে যিশুর পায়ের গোড়ালিতে জর্দান নদীর জলরাশির লহরীর স্পর্শ কিংবা ডিলিউজ বা মহাপ্লাবন হলো তার এমনি ধরনের কিছু শিল্পকর্ম। তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা করেছিলেন কিভাবে হৃদপিন্ডের রক্তের আবর্তের কারণে এয়োর্টিক ভাল্ব বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর অঙ্কিত ‘ভাইট্রবিয়ান ম্যান’ হচ্ছে শরীরবৃত্তীয় সূক্ষ্মতার সঙ্গে বিস্ময়কর সৌন্দর্যের সংমিশ্রণ। বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মধ্যে যে যোগসূত্র এটাই তার এক চমৎকার নজির।

কিছু কিছু মানুষ একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। যেমন গণিতে লিওনহার্ড ইউলার কিংবা সঙ্গীতে মোজার্ট। তবে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রতিভাধর হলেন তারাই যারা প্রকৃতি জুড়ে অনন্ত সৌন্দর্যের মধ্যে একটা ধারা বা ছন্দ দেখতে পান। দ্য ভিঞ্চির প্রতিভা নানা ক্ষেত্র জুড়ে ব্যপ্ত। তিনি বিশীর্ণ দেহগুলোর মুখমন্ডল থেকে মাংস ছড়িয়ে নিয়ে যে পেশীর সাহায্যে ঠোঁট দুটো নড়ে সেটি অঙ্কন করে তারপর বিশ্বের সবচেয়ে স্মরণীয় হাসি সৃষ্টি করেন। এটাই বিখ্যাত মোনালিসার হাসি। তিনি মানব করোটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, হাড়গোর ও দন্তবাজি স্তরে স্তরে আঁকেন এবং এভাবে সেন্ট জেরোম এই ওয়াইল্ডারনেস ছবিতে সেন্ট জেরোমের দুঃখ-বেদনা-যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলেন। তিনি অপটিক্সের গণিত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে কিভাবে আলোক রশ্মী কর্ণিয়ার গায়ে আঘাত হেনে ঐন্দ্রজালিক ইলিউশন তৈরি করে সেটা তিনি দেখিয়েছেন ‘দি লাস্ট সাপার’ চিত্রকর্মে।

প্রতিভাধর হিসেবে মানব সভ্যতার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন কার্ল বঞ্চ। জিন বিজ্ঞানী এবং জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি ক্রিসপারের পথিকৃৎ জর্জ চার্চ অন্তত তাই মনে করেন। বড় বড় অনেক রসায়নবিদ যার হিসেবে ব্যবহারের জন্য নাইট্রোজেন গ্যাসকে এ্যামোনিয়ায় রূপান্তরের ব্যবহারিক প্রক্রিয়া খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হওয়ার পর কার্ল বঞ্চ পেরেছিলেন। তার এই উদ্ভাবন মানবজাতির খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতিতে বিপ্লব এনে দিয়েছে। আজ বিশ্বের ৭৫০ কোটি মানুষের মুখে পর্যাপ্ত খাদ্য যোগাতে বিপুল ফসল উৎপাদনে এ্যামোনিয়া যে কি বিশাল ভূমিকা রাখছে তা হয়ত আমরা কেউ ভেবেও দেখছি না।

আরেক অসাধারণ প্রতিভাধর মাদাম কুরি। ১৯০৩ সালে ড. কুরি ও তার স্বামী পিয়েরে এটমের অদৃশ্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার জন্য পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জয় করেন। কুরিই প্রথম এটমের এই বৈশিষ্ট্যর নাম রাখেন রেডিওএ্যাকটিভ বা তেজস্ক্রিয়। ১৯১১ সালে কুরি রেডিয়াম ও পোলোনিয়ামের উপাদানাবলী আবিষ্কারের জন্য দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার জেতেন এবং পারমাণবিক রসায়নের যুগের দুয়ার খুলে দেন। তার কন্যা ইরিন জুলিও কুরিও ১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।

শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধরদের তালিকায় স্টিভ জবসকে অন্তর্ভুক্ত না করলেই নয়। এই মার্কিন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবককে পার্সোনাল কম্পিউটার বিপ্লবের পথিকৃৎ বলা হয়। অনেকটা আইস্টাইনের মতো তিনিও কোন সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে হিমশিম খেলে ভায়োলিন বের করে সুর বাজাতেন। জবস বিশ্বাস করতেন, সৌন্দর্যের গুরুত্ব আছে এবং শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয় সবার মধ্যে, সম্পর্কযুক্ত থাকা উচিত। জবস ভারতে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ লাভের জন্য এসেছিলেন। এর ফলে ম্যাকিনটোস থেকে শুরু করে আইফোন পর্যন্ত তার তৈরি প্রতিটি পণ্যের মধ্যে এমন সৌন্দর্য ছিল যা ছিল চরিত্রগতভাবে প্রায় আধ্যাত্মিক।

সূত্র : টাইম

সব্যসাচী মুস্তাফা জামান আব্বাসী

mustafa zaman abbasi 3শাহীনুর রেজা : কিংবদন্তি ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদের পুত্র মুস্তাফা জামান আব্বাসী একাধারে শিল্পী, সংগ্রাহক, উপস্থাপক, গবেষক, সাহিত্যিক, অনুবাদক ও দার্শনিক। বাংলা-ইংরেজি-উর্দু ভাষায় সমান দক্ষ প্রতিভাধর

মুস্তাফা জামান আব্বাসী ১৯৩৭ সালের ৮ ডিসেম্বর কুচবিহার জেলার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা ২ ভাই ১ বোন। বড় ভাই সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামাল (প্রয়াত), বোন কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান এবং মুস্তাফা জামান আব্বাসী।

অসাধারণ মেধার অধিকারী আব্বাসী বলরামপুর হাই স্কুল, কুচবিহারের জেনকিনস্ স্কুল, পার্ক সার্কাসের মডার্ন স্কুল, ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ ও সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স-মাস্টার্স করেন। মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১১তম এবং উচ্চমাধ্যমিকে ১৩তম ছিলেন। বিএ অনার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম আর এমএ পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন।

জন্মবাড়ি নিয়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসী বলেন, সবচেয়ে সুমধুর, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে মায়ার অঞ্জন ছড়ানো একটি নাম বলরাম। নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে বসন্তের সমীরণ যেন বয়ে যায় আমার শিরায়। একটি দক্ষিণমুখী বাড়ির আগদুয়ার ঘর, সুউচ্চ জামের সারি, আমের সারি, আমলকির মৌ, গোলাব জামের শিষ। ভিতর বাড়িতে উত্তরের ঘর—যেখানে আমার দাদু থাকেন, পশ্চিমের সারি সারি ঘর—যেখানে ছোট চাচা-চাচী থাকেন, বড় রান্নাঘর, গোলাঘর, দক্ষিণের ঘর—ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য। আর পুবের ঘর, আমার আশৈশব স্বপ্নের আশ্রয়। যেখানে আমার মা, বাবা, ভাইবোনের বাস। আমার জন্ম ওই ঘরটিতেই।

পূর্বে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, শস্যক্ষেত্র, যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজের সমারোহ, যার নাম দোলাবাড়ি, পাশে ঘন কাশবন। তারপর সরু রুপালি স্রোতের নদী, নাম কালজানি। রঙ মনে নেই, শুধু মনে পড়ে কালজানি। যখন আমার বয়স ৪/৫— নদীর কথা মনে পড়ে, নাম তার কালজানি।

এই বাড়িই আমার মনের বাড়ি। বৈঠকখানাটি বেশ বড়, সামনেই বারান্দা, চৌকি পাতা সেখানে। সজনে গাছের ধার ঘেঁষেই প্রশস্ত পুকুর। সারাদিন সেই  পুকুরে সাঁতার কাটা, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা—সাদা, লাল পুঁটি। চাদর দিয়ে ডারকা মাছ ধরা, আর সময় নিয়ে কৈ, মাগুর, শিং ধরার প্রচেষ্টা। কখনো কখনো বালতি ভর্তি করে মাছ চালান হতো রান্না ঘরে। তারপর রান্না হতো বাড়ি ভর্তি সবার জন্য।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় আব্বাসউদ্দীন আহমদ সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। বসবাস শুরু হয় পুরান ঢাকার নারিন্দায় ধোলাই খালের পাড়ে ৭৭ নং ঋষিকেশ দাস রোডে। তাঁর শৈশবের অনেক স্মৃতি পুরান ঢাকাকে কেন্দ্র করে। এরপর ৬৮/১, পুরানা পল্টন, হিরামন মঞ্জিল। দাদির নামে বাড়ির নাম। দাদা মৌলভি জাফর আলী আহম্মদ।  নাতি আব্বাসী হজ করে এলে দাদা স্বপ্নে বললেন, কিরে, হজ করে এলি আমার সাথে দেখা করলি না। নাতী বগুড়ার রোটারীর অনুষ্ঠান থেকে সরাসরি বলরামপুরে। অনেকগুলো ফকির খাওয়ালেন, মৌলভি ডেকে মিলাদ দিলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষদের জন্য একটা মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিলেন ওই স্বপ্ন দেখার পর।

পরহেজগার, সুফিবাদি দৃষ্টিভঙ্গির ছবক মুস্তাফা জামান আব্বাসী পেয়েছেন পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে, বিশেষ করে পিতা আব্বাসউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে। তাঁর স্মৃতিতে—

সেই ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়ি ছিল আনন্দের হাট। ভোরবেলা সুললিত নামাজের ধ্বনি শুনে আমাদের ঘুম ভাঙত। আব্বার নামাজের সুরা বলার ভঙ্গিটি ছিল বড় মধুর। তিনি তাঁর গলার সমস্ত সুধা নামাজে ঢেলে দিতে পারতেন। নামাজ পড়তে দেখেছি অনেককে। নামাজের মধ্যে নিজের সংগীত সুর লালিত্য সমর্পণ করে সম্পূর্ণ  আত্মসমাহিত হয়ে নামাজ পড়তে একজনকেই দেখেছি। দীর্ঘক্ষণ থাকতেন জায়নামাজে। এশার নামাজ তাঁর প্রায়ই দীর্ঘ হতো। মাঝরাতে ঘুম ভেঙেও তাঁকে জায়নামাজে দেখেছি। এই গোপন নামাজটি তিনি অতি সন্তর্পণে পড়তেন। অনেক সময় মা-ও টের পেতেন না।

বৃহস্পতিবার বসতো হালকা-ই-জিকির। আসতেন বেশ কয়েকজন। পিয়ন, ছোট কেরানী, সাধারণ কিছু মানুষ। আব্বাকে জিজ্ঞেস করাতে বলতেন, বড় হলে জানতে পারবে।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী জানান, জীবনে তাঁর আর কিছু চাইবার নাই। আল্লাহ পাক তাঁকে সব কিছু দিয়েছেন। নিজেকে একজন পরিতৃপ্ত মানুষ মনে করেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি পিতা আব্বাসউদ্দীন আহমদের কাছে গান শিখেছেন। শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত গুণী ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খান প্রমুখের কাছে।

পিতা আব্বাসউদ্দীন আহমদ খুব সাদাসিদে মানুষ ছিলেন। সাধারণ জীবন যাপন করতেন। কম কাপড় ছিল তাঁর। দুটো পাজামা দুটো পাঞ্জাবি। সব সময় ধোয়া ইস্ত্রি করা থাকত। অফিসের জন্য দুই সেট সাদা শার্ট ও সাদা প্যান্ট। সাদা আচকান একটা অনুষ্ঠানের জন্য। জায়নামাজ, টুপি, তসবিহ একটি করে। হারমোনিয়াম সাধারণ। গ্রামোফোন এইচএমভি কোম্পানির দেওয়া। বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত আছে।

ভাবতে অবাক লাগে, যিনি এত উঁচুদরের শিল্পী, যাঁর গান আমজনতার মুখে মুখে, যাঁর এত প্রভাব-প্রতিপত্তি তিনি এতটা সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তাঁর একমাত্র গ্রন্থ ‘আব্বাসউদ্দীনের গান ও দিনলিপি’।

আব্বাসীর মা লুত্ফুন নেসা পিতার মতোই শৌখিন ছিলেন। তিনি সরু পাড়ের শাড়ি পরতেন। পরিমিত চা, পান-সুপারি খেতে পছন্দ করতেন। ঘর-কন্যার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত লিখতেন। ‘শেষ বিকেলের আলো’ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। নভেম্বর ১৯৮০-তে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘কিছু ফুল কিছু স্মৃতি’। ১৬টি প্রবন্ধে ফেলে আসা জীবনের স্মৃতিমূলক এ গ্রন্থটি তিনি তাঁর তিন ছেলে-মেয়েকে উত্সর্গ করেছেন। তিন নম্বর বই ‘সময় কথা বলে’ জুন ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি তিনি তাঁর প্রিয় নাতি-নাতনিদের উত্সর্গ করেছেন।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের সাহিত্য ও সংগীতে সদম্ভ পদচারণা করে আসছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের জন্মলগ্ন থেকে তিনি সংগীত পরিবেশন করে আসছেন। এছাড়া চলচ্চিত্র, গ্রামোফোন রেকর্ড, দেশ-বিদেশের নানা সভায় বাংলাদেশের লোকসংগীত, ভাওয়াইয়া, চটকা, ভাটিয়ালি, দেহতত্ত্ব, মারফতি, মুর্শিদি, বাউল, লালন গানে তিনি কিংবদন্তি শিল্পী। তিনি এদেশের লোকসংগীতকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছেন। ভাই মোস্তাফা কামাল ও বোন ফেরদৌসী রহমান সম্পর্কে তাঁর বিশেষ মুগ্ধতা রয়েছে—

আমার ভাই মোস্তাফা কামাল, ভালোবাসায় আর্দ্র, মমতাময়, স্নেহশীল। উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর সর্বস্ব পরিবারের জন্য। বিশেষ করে আমার ও বোনের জন্য। অসুখ হলে পরিচর্যা ও খোঁজ-খবর নিয়েছেন পরিবারের সবার। আমার ভাইয়ের মতন ভাই হয় না। পেশায় ব্যারিস্টার, পরে বিচারপতি, শেষে প্রধান বিচারপতি। আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় দৃঢ় হলেও, বিনয় তাঁর ভূষণ। সাধারণ জনেরও তিনি আপন হয়ে যান অনায়াসে। তার সুকৃতির ছাপ তার চলনে-বলনে, চিন্তা-চেতনায়, বক্তৃতা-ব্যবহারে। মোস্তফা কামাল রচিত গ্রন্থ তিনটি।

আমার বোন ফেরদৌসী রহমান, সেরা শিল্পীদের অগ্রগণ্য। তার পঞ্চাশ বছরের শিল্পীজীবন উপলক্ষে প্রকাশিত গ্রন্থে স্মৃতিচারণ করেছি নানাভাবে। তাকে ভালোবাসতাম, তার সুখে সুখী, তার দুখে দুঃখী। পিঠাপিঠি হওয়ায় ছোটবেলা মারামারিও করেছি। আবার বড় হয়ে তার জন্যে করেছি অশ্রুপাত। তার তুলনা সে নিজেই। অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী ভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে আমার বোনের সময় দ্রুত কেটে যায়। বনানীতে পিতার নামাঙ্কিত ‘আব্বাসউদ্দীন সংগীত একাডেমি’ পরিচালনা করে সে।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী ১৯৬৩ সালের ২০ জানুয়ারি ভালোবাসার মানুষ আসমাকে বিয়ে করেন। বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাতিজি আসমা আব্বাসী একাধারে লেখক, সমাজসেবক, উপস্থাপিকা। আব্বাসী-আসমা’র দুই সন্তান। নিজ সন্তান সম্পর্কে আব্বাসী বলেন—

আমার চেয়েও তারা অনেক ভালো হয়েছে, কারণ তারা মেধাবী, মানুষের প্রতি দরদি ও যার যার ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। বড় মেয়ে আমেরিকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী; ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাস্টার্স। কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতা। আমেরিকা ভিত্তিক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পাখি’র সম্পাদক, দুই সন্তানের জননী। ছোট মেয়ে ‘ল-ইয়ার’।

পিতা আব্বাসউদ্দীন আহমদ চেয়েছিলেন, তাঁর সুদর্শন ছেলে সিনেমার নায়ক হোক। কারণ মাড়োয়ারিরা ‘ধ্রুব চলচ্চিত্রে’ তাঁকে চা বাগানের কুলী আর নজরুল ইসলামকে নারদের ভূমিকায় অভিনয় করিয়েছে। কিন্তু ছেলে ওদিকে পা বাড়াননি। শিল্প-সাহিত্য-ধর্মচর্চাসহ সকল শাখায় আব্বাসী অবাধ বিচরণ করেছেন।

উপস্থাপনায় মুস্তাফা জামান আব্বাসী এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। ‘ভরা নদীর বাঁকে’, ‘লৌকিক বাংলা’ তাঁর সফল টেলিভিশন অনুষ্ঠান। গত ৫০ বছর ধরে তিনি উপস্থাপনার সাথে যুক্ত আছেন। সহজ সরল প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি সংক্ষেপে একটি গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতেন।

এ পর্যন্ত মুস্তাফা জামান আব্বাসীর ৫০টির মতো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। অধিকাংশ গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ বের হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো—‘মোহাম্মদ স.-এর জীবনী’; ‘সূর্য উঠেছে যেখানে’; ‘মুহাম্মদের নাম’; জালালউদ্দীন রুমীর কবিতার অনুবাদ ‘সুফা কবিতা’; বাংলার ভাওয়াইয়া গান ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’; প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড; মাওলানা রুমীর জীবনী ভিত্তিক উপন্যাস ‘রুমীর অলৌকিক বাগান’; শিল্পী-লেখকদের জীবনী ‘জীবন নদীর উজানে’; সংগীত বিষয়ক প্রবন্ধ ‘প্রাণের গীত’; বাংলার লোক সংগীতের ইতিহাস; ভাটির দেশের ভাটিয়ালী’সহ নানা গ্রন্থের রচয়িতা।

সম্পাদনা করেছেন ‘লোকসংগীত সংবাদ; ‘৫০ বছরের বাংলা ভাষা’, ‘দুয়ারে আইসাছে পালকী’ (আব্দুল লতিফের লোকসংগীত), সংগীত অ্যালবাম ‘ধন ধান্যে পুষ্পভরা’ এবং আব্বাসউদ্দীন আহমদের ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা ও দিনলিপি’।

মুস্তাফা জামান আব্বাসীর বিভিন্ন লেখা ও গ্রন্থ নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লেখক, সমালোচক, পত্র-পত্রিকা বিভিন্ন সময়  আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন ও মুহম্মদ ইউনূসের মন্তব্য তুলে ধরা হলো—

“…….. I did not realise that Mustafa Zaman Abbasi, a respected personality by his own right, has written such an excellent and revealing study of our National Poet” —Professor Muhammad Yunus, Nobel Laureate.

“Read your autobiography ‘Jibon Nadir Ujane’, It is a continuation of the fiery songs that we heard in your fathers voice. The book is excellent”—Professor Amartya Sen, Nobel Laureate.

লেখকের অনূদিত ৪৫১টি হাদিস এবং বাংলা ভাষায় মুহাম্মদ সা. সম্পর্কিত লিখিত সমগ্র গ্রন্থের তালিকা এ গ্রন্থের অন্যতম সংযোজন। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে অনন্যা প্রকাশনী। ইতোমধ্যে এ গ্রন্থের একাধিক সংস্করণ মুদ্রিত হয়েছে। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত লেখকের নজরুলের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস ‘পুড়ির একাকী’ গ্রন্থের বেলায়ও একথা প্রযোজ্য।

তিনি ঢাকা রোটারি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এবং রোটারী জেলা—৩২৮০-র গভর্নর ছিলেন। অংশ নিয়েছেন ব্যাংকক, ম্যানিলা, টোকিওসহ বিভিন্ন শহরের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রোটারী সম্মেলনে। ১১ বছর ধরে তিনি সংগীতে বাংলাদেশ জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। এছাড়া লোকসাহিত্য পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো, ঢাকা ক্লাব ও গুলশান ক্লাবের আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির সদস্য, গুলশান ইয়থ ক্লাব ও গুলশান সোসাইটি সম্মানিত সদস্য।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী ১৯৯৫ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ছাড়াও অ্যাপেক্স ফাউন্ডেশন পুরস্কার, বিটিভি’র গোল্ড মেডেল, মানিক মিয়া অ্যাওয়ার্ড, নজরুল পদক, আব্বাসউদ্দীন সিলেট সংগীত পদক, লালন পরিষদ অ্যাওয়ার্ড, নজরুল একাডেমী পদক, চ্যানেল আই ও রবি’র আজীবন সম্মাননা, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও চ্যানেল আই-এর আজীবন সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার ও পদকে ভূষিত হন।

সংগীত পরিবেশনের জন্য তিনি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, কোরিয়া, মায়ানমার, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, লিবিয়া, সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইরান, ইরাক, তুর্কি প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন।

আগামী ৮ ডিসেম্বর শুক্রবার মুস্তাফা জামান আব্বসীর ৮০ বছর পূর্ণ হবে। তাঁর জন্মবার্ষিকী শতবর্ষ ছাড়িয়ে যাক। তাঁর লেখনিতে, কণ্ঠের গানে বাংলা সাহিত্য-সংগীত অঙ্গন আরো সমৃদ্ধ হোক—এই আমাদের চাওয়া।

মাত্র একটি বই লিখেই যারা নাম কামিয়েছেন!

fame from one book only 1fame from one book only 2

গোলাম মোস্তফার কবিতায় রাসুলপ্রেম

calligraphy-1 chothiaড. এম এ সবুর : গোলাম মোস্তফা রাসুলপ্রেমিক কবি। ইসলাম-রাসুলপ্রেম তার সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার কবিতা-গানের বেশির ভাগই রাসুলপ্রেমে উজ্জীবিত। মহানবী হযরত মুহম্মদ সা. এর সিরাত রচনায় তার কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। তার রচিত বিশ্বনবী যেমন বাঙালি পাঠক সমাজে ব্যাপক সমাদৃত তেমনি তার রচিত ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ কবিতাটি মুসলিম ঘরে ঘরে ও মিলাদ মাহফিলে বহুল পঠিত। তাছাড়া রাসুল সা. এর প্রশংসায় তার রচিত ‘নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি আমার মোহাম্মদ রাসুল’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রাসুল’ ইত্যাদি গান-কবিতা মুসলিম সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়। রাসুল সা. এর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে তার সাহিত্য জীবনের শুরুর দিকেই তিনি ‘হযরত মোহাম্মদ’ কবিতা রচনা করেন। এ কবিতায় তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবের অন্ধকার অবস্থার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে রাসুল সা.কে সেই অন্ধকার বিদারক আখ্যা দিয়ে বলেন,

এই ঘোর দুর্দিনে এলো কে গো বিশ্বে,

উজলিয়া দশদিশি, তরাইতে নিঃস্বে!

মুখে তার প্রেমবাণী, করুণা ও সাম্য,

বিশ্বের মুক্তি ও কল্যাণ কাম্য।

প্রায় একই ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে তার ‘ফাতেহা-ই-দোআজদহম’ কবিতায়। এতে তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর জন্মদিনের বর্ণনা দিয়ে এবং তাঁকে স্বাগত জানিয়ে লিখেন, 

আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম।

দিকে দিকে উঠিতেছে নব ছন্দে বন্দনার গান

স্বাগতম! স্বাগতম! ধরণীর হে চিরকল্যাণ!

হরযত মুহম্মদ সা. শুধু মুসলিম কিংবা আরবদের জন্য নয় বরং বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তাই তাঁর জন্মোৎসব শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত নয় বরং বিশ্ববাসীর জাতীয় উৎসব। এ জন্য গোলাম মোস্তফা রাসুলের জন্মোৎসবে বিশ্বের সব মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, 

হে নিখিল ধরাবাসী! মুসলিমের লহ নিমন্ত্রণ,

এ উৎসব নহে শুধু আমাদের একান্ত কখন!

নাসারা-খৃষ্টান এসো, এসো বৌদ্ধ-চীন, 

মহামানবের এ যে পরিপূর্ণ উৎসবের দিন।

রাসুলপ্রেমিক কবির কল্পনায় হযরতের জন্মদিনে বিশ্ব প্রকৃতিতে এক মহোৎসবের আয়োজন হয়েছিল। ঐতিহাসিক-দালিলিক ভিত্তি না থাকলেও রাসুলভক্ত কবি মনে করেন তাঁর জন্মদিনে সারা বিশ্ব বেহেস্তের সুগন্ধিতে মোহিত হয়েছিল, সেদিন আকাশে-বাতাসেও মহাআনন্দের জয়গান ধ্বণিত হয়েছিল; ফিরেস্তাগণও চঞ্চল চিত্তে সে আনন্দে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। আর বেহেস্ত হতে বিশ্ব নারীনেত্রী বিবি হাজেরা এবং হযরত মরিয়ম আ. ধাই হয়ে এসেছিলেন। কবির ভাষায় রাসুলের জন্মদিনের দৃশ্য এ রকম, 

আকাশ দিয়েছে তার রক্ত রাঙা অরুণ-কিরণ,

বেহেশ্তের সুধা-গন্ধ আনিয়াছে মৃদু সমীরণ;

ছুটাছুটি করিতেছে দিকে দিকে ফেরেশ্তার দল, 

সারা চিত্ত তাহাদের আজিগো যে পুলক-চঞ্চল!

এসেছে ‘হাজেরা’ বিবি, আসিয়াছে বিবি ‘মরিয়ম’, 

আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম! 

মক্কার কুরাইশ বংশে হযরত মুহম্মদ সা.-এর জন্ম কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয় বরং আলকুরানের বর্ণনা মতে মহানবী সা. এর পূর্ব পুরুষ হযরত ইব্রাহীম ও তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আ.- এর প্রার্থনার ফল এবং হযরত ঈসা আ.- এর সুসংবাদ।  আর গোলাম মোস্তফার ভাষায়, 

‘আমিনা’ মা-র কোলে খুদা রাখ্ল সে সওগাত

‘ইবরাহিমের দোয়া’ সে আর ‘ঈসার সুসংবাদ’।

হযরত মুহম্মদ সা. চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার অদূরে হেরা পর্বতে নবুওয়াত লাভ করেন। এ সময় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে হযরত জিব্রাইল আ. মুহম্মদ সা.-এর নিকট প্রথম অহি নিয়ে আসেন। মহানবী সা.-এর নবুওয়াত লাভ ইসলামের ইতিহাসে তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এ নবুওয়াতের মাধ্যমে আধুনিক ইসলাম তথা মুহম্মদী শরিয়তের যাত্রা শুরু হয় এবং আইয়্যামে জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগের অবসানের সূত্রপাত ঘটে। নবুওয়াত লাভের ঐতিহাসিক এ ঘটনা কবি গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাস-ই-হালী তে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

চক্রবালে উঠ্ল যেন ভাগ্য-চাঁদিমা

দূর হ’ল সব বিশ্ব হতে আঁধার কালিমা!

ছুট্ল না তা কিরণ বটে অল্প কিছুক্ষণ, 

রেসালাতের চাঁদে ছিল মেঘের আবরণ; 

কালের স্রোতে চল্লিশ সাল গুজরে গেল যেই-

‘হেরা’- গিরির উর্ধ্বে সে চাঁদ উদয় হল সেই!

নবুওয়াত লাভের মাধ্যমে হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদ প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়ে প্রথমে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকদের কাছে তাওহিদ তুলে ধরেন। কিন্তু কুরাইশ নেতা আবু জহল ও তার অনুসারীরা রাসুলের দাওয়াত কবুল করেনি বরং বিরোধীতা করেছে। এমনকি তাওহিদ প্রচার বন্ধ করার লক্ষ্যে হযরত মুহম্মদ সা. কে হত্যার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। আবু জহলের এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা গোলাম মোস্তফার লিখনীর মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে এভাবে-

এ বিপুল সঙ্ঘ- মাঝে যে আজি দাঁড়াবে 

ছিন্ন করি আনিবারে মোহাম্মদ- শির, 

পঞ্চশত স্বর্ণমুদ্রা, শত উষ্ট্র সনে 

সানন্দ হৃদয়ে তারে দিব উপহার।

হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর মনোনীত নবী ও রাসুল। তাঁর রক্ষক আল্লাহ নিজে। মানুষের কোন ষড়যন্ত্র ও অনিষ্ট তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। যে কুরাইশরা হযরতকে নির্যাতন-নিপীড়ন করে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছিল এবং যারা রাসুল সা. কে হত্যা করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছিল; মাত্র আট বছর পর তারাই মক্কা বিজয়ের সময় মুহম্মদ সা.-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। যে উমর রা. মহানবীকে হত্যার জন্য মুক্ত তরবারী নিয়ে ছুটেছিল সে উমরই ইসলাম কবুল করে হযরতের একনিষ্ট সহচর, খলিফা হয়ে বিশ্বের বুকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। ঐতিহাসিক এসব ঘটনা কবি তুলে ধরেছেন এভাবে, 

তারপর এলো আরব-মরুতে খোদার রসূল-নূরুন্নবী,

কোরেশ আসিল কতল করিতে বিশ্বের সেই আলোক-রবি

বলো কে মরিল? মোহাম্মদ? না আততায়ী সেই কোরেশ জাতি। 

ঘাতক শেষে যে রক্ষক হয়ে ধারায় রাখিল অতুল খ্যাতি।

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন অসাধারণ গুণে গুণান্বি^ত একজন মহামানব। দুর্বলকে তিনি কখনও বঞ্চিত করেননি বরং সাহায্য করেছেন। পথ হারানো মানুষদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ধনী-গরিব তার কাছে ছিল অভিন্ন। তাঁর কাছে মানুষের কোন ভেদাভেদ ছিল না; ছিল না সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও বৈষম্য। ক্ষমা, দয়া-প্রেম ছিল তাঁর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা হযরত মুহম্মদ সা. কে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি উত্তম চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত’ (আলকুরআনুল কারীম, ৬৮:৪)। মহানবী হযরত মুহম্মদ সা.-এর উত্তম চরিত্রের গুণাবলীকে গোলাম মোস্তফা কবিতায় চিত্রিত করেছেন এভাবে- 

দূর্বলে করে না সে নিপীড়ন হস্তে

আর্তেরে তুলে দেয় শুভাশীষ মস্তে, 

ভ্রান্তরে বলে দেয় মঙ্গলÑ পন্থা

রক্ষক, বীরÑ নহে ভক্ষক হন্তা।

ভিক্ষুকে টেনে নেয় আপনার বক্ষে,

ছোট-বড় ভেদ-জ্ঞান নাহি তার চোক্ষে,

মানুষের অকাতরে করে না সে ক্ষুদ্র,

হোক্ না সে বেদুইনÑ হোক্ না সে শূদ্র। 

রাসুল সা. ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি ছিলেন প্রেম-ভালবাসা, ক্ষমা-ন্যায়ের মূর্তপ্রতীক। তাঁর প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল না কখনও। যারা তাঁকে অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত করেছিল তাদেরকেই উদার চিত্তে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁর ক্ষমার দৃষ্টান্ত অসংখ্য। মক্কা বিজয়ের দিনে সাধারণ ক্ষমা তারই উজ্জলতম নিদর্শন। মক্কার কাফির কুরাইশরা নিজেদের অপকর্মের কারণে মক্কা বিজয়ের দিনে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। যে কোন শাস্তির জন্য তারা প্রস্তুতও ছিল। কিন্তু ক্ষমার অনুপম আর্দশ মহানবী হযরত মুহম্মদ সা. সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। কবি গোলাম মোস্তফা হযরতের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা উল্লেখ করে বলেন, 

কহিলেন নবী হাসি তখন-

“ভেবেছো ঠিকই বন্ধুগণ!

          কঠোর দন্ড হবে বিধান!

ধরো সে দ– কহিনু সাফ্-

সব অপরাধ আজিকে মাফ্,

          যাও সবে, দিনু মুক্তিদান।”

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী-রাসুল। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ; রাসুলপ্রেমে নিমজ্জিত ও প্রবল আবেগে আপ্লুত হয়েও সে কথা ভুলে যাননি কবি গোলাম মোস্তফা। তবে হযরত মুহম্মদ সা. মানুষ হলেও সাধারণ মানুষ নন, তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল; যা মহানবী সা. নিজেই বলেছেন। আর তা গোলাম মোস্তফার ভাষায়, 

আমার চেয়ে তোমরা ত কেউ বান্দাতে নও কম, 

তুমি-আমি এক- বরাবর দুর্বল ও অক্ষম। 

তোমায় আমায় প্রভেদ যেটুক নয়-ক সে অদ্ভুত

আমি শুধু বান্দা নহি- আমি খোদার দূত।

ইসলামের মূলমন্ত্র তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। কিন্তু খৃষ্টানরা হযরত ঈসা আ. কে এবং ইহুদীরা হযরত ওযায়ের আ. কে আল্লাহর পুত্র বলে তাওহিদ পরিপন্থী বিশ্বাস করে। তাই হযরত মুহম্মদ সা. নিজেই তাঁর অনুসারীদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তারা যেন তাঁকে ইহুদী-খৃষ্টানদের মত আল্লাহর পুত্র বলে ধারণা না করে। রাসুল সা.-এর এই নিষেধাজ্ঞা গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাস-ই-হালী তে উল্লেখ আছে এভাবে,

নাসারাদের মতন কেহই পড়ো না ধোঁকায়

খুদার বেটা বলে যেন পূজো না আমায়।

মহানবী সা. এর অনুপম আদর্শ ও নির্দেশনাবলী অনুসরণ করে মুসলিমরা এক সময় উন্নতি ও সম্মানের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। কিন্ত বিশ শতকের মুসলিম সমাজ ছিল নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত। বিভিন্ন দেশে তারা ছিল দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও বিভিন্ন কুসংস্কারে অধঃপতিত ছিল মুসলিম সমাজ। বিশ শতকের মুসলমানদের এসব অধঃপতনের জন্য রাসূলের আদর্শচ্যুত হওয়ার বিষয় সমকালীন দার্শনিক ও কবি ইকবাল রচিত শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ আছে। আর তা গোলাম মোস্তফা অনুবাদ করেন এভাবে, 

কারা, বল, ত্যাগ করেছে আমার পাক রাসূলের পাক বিধান,

মুহম্মদের পয়গাম আর তোমাদের কারো নাই স্মরণ।

তবে হতাশ-নিরাশ হওয়ার কারণ নাই, মুসলমানগণ আবারও রাসুলের আদর্শ অনুসরণ করলে তাদের হৃত গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। তাই কবি অধঃপতিত মুসলিমদেরকে রাসুলের ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, 

তুচ্ছরে আজ করগো উচ্চ- প্রেমে ও পূণ্যে কর মহৎ 

মুহম্মদের নামের আলোকে উজ্জ্বল কর সারা জগৎ।

প্রধান বিচারপতির প্রতি ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর হেদায়েত

কে. এস. সিদ্দিকী : হজরত ইমাম কাজী আবু ইউসুফ (রহ.) ছিলেন হজরত ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) এর শীর্ষস্থানীয় শাগরিদ, হানাফী মাজহাবের অন্যতম স্তম্ভ এবং ইসলামের প্রথম প্রধান বিচারপতি। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি জগত বিখ্যাত। আব্বাসীর খেলাফতের প্রাথমিক যুগে তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। হিজরী ১৮২ সালের ৫ রবিউল আউয়াল তিনি ইন্তেকাল করেন।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োজিত থাকাকালে ইমাম আবু ইউসূফের (রহ.)-এর নামে মোহতারাম ওস্তাদ ইমামুল মুরসালিন হজরত আবু হানিফা (রহ.) একখানা ঐতিহাসিক পত্র প্রেরণ করেন, যা সকলের সাথে কীভাবে চলতে হবে, আচরণ করতে হবে, তা বর্ণিত হয়েছে । হেদায়েতনামা নামে খ্যাত এ গুরুত্বপূর্ণ পত্রখানা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আজও সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো কোনো আরবী গ্রন্থে এর পূর্ণ বিবরণ রয়েছে যার অনুবাদ-সারাংশ বিভিন্ন ভাষায় সংকলন হয়েছে । প্রধান বিচারপতি ও প্রিয় ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে হজরত ইমাম আজম (রহ.) বলেন:

হে প্রিয় ইয়াকুব !

সুলতানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তার মানমর্যাদার কথা মনে রাখবে। এবং হ্যাঁ, তার নিকট সব সময় এবং সর্বাবস্থায় যাতায়াত করবে না। যদি তুমি তার নিকট অধিক আসা-যাওয়া করতে থাকো, তাহলে তোমার মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে এবং তুমি তার দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হবে। তোমার সম্মান-গুরুত্ব হ্রাস পাবে। আগুন থেকে যেভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়, তেমনিভাবে তার থেকে সাবধানে থাকবে। আগুন দ্বারা উপকৃত হবে, কিন্তু তা হতে দূরে থাকবে, নিকটবর্তী হলে পুড়ে যাওয়ার আশংকাও থাকে এবং হ্যাঁ, তার সামনে দীর্ঘ কথাবার্তা হতেও বিরত থাকবে।

সুলতানের দরবারে যদি তোমার অপরিচিত লোকজন উপস্থিত থাকে, তাহলে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করবে। কারণ যখন তোমার এই কথা জানা নেই যে, তারা কোন মর্যাদা-সম্মানের লোক, তবে তাদের সম্বোধনের সময় তাদের যথাযথ মর্যাদা অনুযায়ী আচরণ প্রদর্শিত নাও হতে পারে। যদি তারা তোমার চেয়ে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়, তুমি যদি তার খেয়াল না রাখো এটা হবে অসদাচারণ, আর যদি তারা মামুলি বা সাধারণ লোক হয়, কিন্তু তুমি তাদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন করো তাহলে সুলতানের দৃষ্টিতে তুমি অধম ও গুরুত্বহীন প্রতিপন্ন হয়ে যাবে।

ত্বরিত বিচার পদ গ্রহণ করবে না: সুলতান যদি তোমাকে বিচারকের পদ পেশ করেন, তবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তিনি তোমার চিন্তাধারার সঙ্গে একমত, তোমার ইজতেহাদ, চিন্তাধারা মানেন, তোমার মতবাদ সমর্থন করেন, যাতে তোমাকে এমন কথা না বলতে হয়, যা তোমার মত ও রায়ের পরিপন্থী। যে পদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য তোমার নেই, তা কিছুতেই তুমি গ্রহণ করবে না। সুলতানের তল্পী বাহক তোশামোদীদের সঙ্গে বেশি দহরম-মহরম করবে না। লোকদের কেবল প্রশ্নের জবাব দেবে- অতিরিক্ত কিছু বলবে না, কারবার করবে না। কারবারের সঙ্গে অধিক সংযোগ রাখবে না। যেন লোকেরা এইরূপ ধারণা পোষণ না করে যে, তোমার অর্থলোভ আছে এবং তোমাকে ঘুষখোর মনে করতে পারে। সাধারণ লোকজনের সামনে হাসবে না, এমনকি অধিক মুচকি হাসিও না। বাজারে কম যাতায়াত করবে। কমবয়সী ছেলেদের সাথে কথাবার্তা বিনা প্রয়োজনে বলবে না। মেলামেশাও করবে না। কেননা, এটি হচ্ছে একটি বড় ফেতনা ও বিপদের কারণ। তবে বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলাতে পারো এবং তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারো। দোকানে বসবে না। সড়ক পথে উঠাবসা করবে না। বাজারে পানাহার করবে না, মসজিদেও না, বেহেশতিদের (যারা পানি পান করায়) কাছ থেকে চলার পথে পানি পান করবে না।

ইমাম আজম তার ভক্ত ছাত্র ও প্রধান বিচারপতিকে এসব ছাড়াও আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান উপদেশ প্রদান করেন, যা নিম্নরূপ: রেশমী কাপড় পরবে না, অলংকার ব্যবহার করবে না। এ দ্বারা ঔদ্ধত্য সৃষ্টি হয়। যদি একাধিক বিয়ে করো তাহলে প্রত্যেক স্ত্রীকে আলাদা গৃহে রাখবে। দ্বিতীয় বিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত করবে না যতক্ষণ না তোমার পূর্ণ বিশ্বাস হবে যে, তুমি অতিরিক্ত ব্যয় বহনে সক্ষম হবে এবং এ ব্যয়ভার সহজে বহন করতে পারবে।

প্রথমে জ্ঞান অর্জন করবে, অতঃপর অর্থ লাভের চেষ্ট করবে, ধন-সম্পদ লাভের পূর্বেই বিয়ে করবে। আল্লাহকে ভয় করতে থাকবে। আমানতে তসরুফ করবে না। আম-খাস তথা সর্বস্তরের লোকদের সৎ পথের দিকে আহবান করতে থাকবে। সাধারণ লোকদের সঙ্গে দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে কথাবার্তা বলবে না, দশ বছরই যদি অর্থহীন ও দারিদ্র্যে অতিবাহিত হয়ে যায় তা হলেও জ্ঞানার্জন হতে বিরত থাকবে না।

যদি বাজারী লোক ও সর্বসাধারণ তোমার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতে চায়, তাহলে তাদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে না। এভাবে তোমার মর্যাদা হ্রাস পাবে।

সত্য কথা বলতে কাউকে ভয় করবে না, চাই সে সুলতানই হোক না কেন, যা বলবে- যখন বাহাস-বিতর্ক করবে কিংবা মোনাজারা বিতর্কে অবতীর্ণ হবে তখন দলীল প্রমাণ সামনে রাখবে। যাদের সঙ্গে বাহাস-বিতর্কে লিপ্ত হবে তাদের ওস্তাদবৃন্দ ও শায়খদের প্রতি কোনো তিরস্কার বা কটুক্তি করবে না।

নিজের জাহের-বাতেন প্রকাশ গোপন রাখবে। অধিক হাসবে না, এতে অন্তর মরে যায়। চলার সময় ধীরগতিতে চলবে। লাফিয়ে লাফিয়ে চলবে না। তাড়াহুড়া করে বা দ্রুত কাজ করবে না। চিৎকার করে কথা বলবে না। চিল্লিয়ে কোনো কাজ হয় না। উত্তমরূপে কোরআন তেলাওয়াত করবে। অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করবে। সর্বাবস্থায় তার শোকর গুজারী করবে। (অসমাপ্ত)

চা বিক্রেতা দেশ বিক্রেতা হন নি!

modi sold tea