আর্কাইভ

Archive for the ‘জীবনী’ Category

কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হারি

mata_hari_1মাহমুদ ফেরদৌস :১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর। ভোর বেলা। প্যারিসের সেইন্ট-ল্যজারে কারাগারের অভ্যন্তরের একটি সেল থেকে জাগিয়ে তোলা হলো এক বন্দীকে। হাতে দেওয়া হলো কাগজ, কলম, দোয়াত কালি আর খাম। বলা হলো, চাইলে দু’ খানা চিঠি লিখতে পারেন তিনি। নিজের কালো মোজা, উঁচু হিলের জুতাজোড়া, পশম আর মখমলের তৈরি পোশাক গুছিয়ে নিলেন তিনি। তারপর কাগজে হিজিবিজি লিখে জমা দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আমি প্রস্তুত।’

কিছুক্ষণ পরই ধূসর রঙের একটি সামরিক যান বের হলো কারাগার থেকে। ছুটলো প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক পুরোনো বন্দরে। গাড়ির ভেতর দু’ জন সেবিকা ও নিজের আইনজীবীর সঙ্গে বসে আছেন ৪১ বছর বয়সী ওই গোলন্দাজ নারী। পা অবদি লম্বা কোট তার পরনে। মাথায় টুপি।

গন্তব্যস্থলে তিনি যখন পৌঁছালেন তখন সময় সবে সকাল সাড়ে ৫টার চেয়ে একটু বেশি। তাকে দাঁড় করানো হলো ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ১২ ফরাসি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন নিজের বন্দুক হাতে নিয়ে। চোখ বাঁধার জন্য সাদা কাপড় দেওয়া হলো তাকে। কিন্তু তিনি নিতে চাইলেন না। ‘এটা কি পরতেই হবে?’ পাল্টা প্রশ্ন করলেন।

যখন তার দিকে বন্দুক তাক করে সৈন্যরা, তখনও তাদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়েছিলেন তিনি। তার এক হাত বেঁধে ফেলা হয়। অপর হাতে তিনি নিজের আইনজীবীর দিকে হাত নাড়েন। পরমুহূর্তেই সৈন্যদের রাইফেল গর্জে উঠে। পায়ে লাগে গুলি। হাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এক কর্মকর্তা এগিয়ে এসে রিভলবার বের করে তার মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

অথচ, এক দশক আগেও, এই নারীর পায়ের তলায় ছিল ইউরোপের বহু রাজধানী। তিনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য এক ‘রূপসী’। ভিনদেশি নগ্ন নাচের আবেদনে কাবু করে রেখেছিলেন কতশত মন্ত্রী, জেনারেল আর শিল্পপতিদের। ঘটনার দু’ বছর আগেও দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল তার। প্যারিসে এক প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটান তো, পরেরদিন হেগ শহরে আরেক প্রেমিকের সঙ্গে। রীতিমত আন্তর্জাতিক ‘সেক্স সিম্বল’ তিনি। নামেমাত্র পোশাক পরে নাচতেন। প্যারিসে তার নগ্ন নাচের আসর ছিল যেন তৎকালীন ইউরোপিয়ান অভিজাতদের ছোটখাটো সম্মেলন। মাতা হারি- এই এক নামে তাকে দুনিয়া চিনতো।

কিন্তু, এরপরই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পাল্টে গেল তার চেনাজানা জগত। তিনি অবশ্য ভেবেছিলেন আগের মতোই ইউরোপের ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে বরং তাকে মৃত্যুদ- পেতে হলো। তার অপরাধ? জার্মানির পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করা। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জার্মান প্রভুদের কাছে সরবরাহ করা। লুফে নিল পত্রপত্রিকাগুলো। তাকে দায়ী করা হলো হাজার হাজার মিত্রপক্ষীয় সৈন্যর মৃত্যুর কারণ হিসেবে।

কিন্তু আজ শত বছর পর ফরাসি সরকার যেসব নথিপত্র অবমুক্ত করেছে, তাতে এক ভিন্ন চিত্রই ফুটে উঠে। তার মৃত্যুর এত বছর ধরে তার সঙ্গে লেগে ছিল ডাবল এজেন্ট হওয়ার কলঙ্ক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ছিলেন স্রেফ একজন বলির পাঠা।

তার আসল নাম কিন্তু মাতা হারি নয়। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭৬ সালে। বাবা-মা নাম রাখেন মার্গারেথা জেল্লে। মাতা হারি নামটা কেন বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়েও আছে চমকপ্রদ তত্ব। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায়, এই নামের অর্থ ‘দিনের চোখ,’ অর্থাৎ সূর্য। আবার হারি নামে এক হিন্দু দেবতাও আছেন। তার আগে মাতা শব্দটিও লাগিয়ে থাকতে পারেন। দুই তত্বেরই ভিত্তি আছে। নিজেকে অনেক সময় তিনি জাভানিজ (ইন্দোনেশিয়ার একটি অঞ্চল) প্রিন্সেস বলে পরিচয় দিতেন। কখনও আবার ভারতের মন্দির নর্তকির মেয়ে হিসেবে। কিন্তু কখনই তিনি বলতেন না, তার জন্ম আসলে নেদারল্যান্ডে।

আর নেদারল্যান্ডে তার জন্মস্থান লিউওয়ার্ডেনের ফ্রাইজল্যান্ড মিউজিয়ামে তাকে নিয়ে শনিবার থেকে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে তার বিচারের অনেক নথিপত্র অবমুক্ত করা হয়। তার ব্যক্তিগত ও পারবারিক কয়েকটি চিঠিও প্রকাশ হয়। সবই আছে প্রদর্শনীতে। এসব নথিপত্র একসাথে মেলালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত এই গুপ্তচরের আরও বহু পরিচয় আছে।

ফ্রাইজল্যান্ড জাদুঘরের কিউরেটর হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“আমরা আসলে তার জীবনটা বুঝতে চেয়েছি। একজন বিশাল তারকা হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে। একজন শিশু হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে যিনি শুধু নর্তকিই ছিলেন না, বা গুপ্তচরই ছিলেন না। আমরা চাই তার পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে।”

তার জীবন ছিল প্রচ- ঘটনাবহুল, আর মর্মান্তিক। জন্ম হয়েছিল বেশ ধনী এক পরিবারে। কিন্তু তিনি যখন কিশোরী, অকস্মাৎ ধনসম্পদ হারিয়ে সংসারধর্ম ত্যাগ করেন তার পিতা। একলা মায়ের কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে সেই মা-ও মারা যান। অগত্যা, আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় হয় তার। ১৮ বছর বয়সে গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রুডলফ জন ম্যাকলিওডের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এই লোকের বয়স ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ। তার সঙ্গেই গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে এক সামরিক ঘাঁটিতে ৪ বছর ছিলেন তিনি। তখনই জাভানিজ ভাষায় তার হাতে খড়ি।

mata-hari-2তাদের দাম্পত্য জীবনকে ঝঞ্ঝাটময় বললে কম বলা হয়। প্রতিনিয়ত তিনি অকথ্য নির্যাতন সইতেন স্বামীর কাছ থেকে। নিজের ৩ বছর বয়সী ছেলেটাকে মারা যেতে দেখেন তিনি। সম্ভবত, গৃহকর্মীর দেওয়া বিষের কারণে। পরে এক মেয়ে হয় তার। ৪ বছর পর হল্যান্ডে ফিরলে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান মার্গারেথা (তার আসল নাম)। কিন্তু মেয়ের খরচ বহন করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে তিনি চলে যান প্যারিসে। মেয়েকে রেখে যান স্বামীর কাছে। নিজের এই মেয়েকে তিনি সবসময়ই মিস করতেন।

পরে প্যারিস থেকে নিজের প্রাক্তন স্বামীর এক কাজিনকে লেখা চিঠিতে মার্গারেথা জানান যে, সেখানে তিনি এক থিয়েটারে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি তাকে নামতে হয়েছে পতিতাবৃত্তিতেও। তিনি লিখেন, ‘ভেবো না যে, আমি আসলেই অনেক খারাপ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে আমি বাধ্য হয়েছি এ পথে নাম লেখাতে।’ তিনি নাকি এ-ও বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, যেসব নারী সংসার ছেড়ে পালান তারা পরবর্তী ঠিকানা হিসেবে প্যারিসকে খুঁজে পান।’ নিজের এই নর্তকি আর অভিনয় জীবনেই তিনি বেছে নেন ‘মাতা হারি’ নাম, যেটি পরে তার আসল নামকেও ছাপিয়ে যায়। এই জীবনেই তিনি অনেক অর্থ আর যশের মালিক হন। ভাবা হয়, জীবনের কোনো এক সময়ে তিনি মিলিয়নিয়ারও ছিলেন।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“তার বিরুদ্ধে যেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ, সেটি না থাকলেও, আজও  তাকে মানুষ স্মরণ করতো। গত শতাব্দীর প্রথমভাগে ইউরোপ জুড়ে তার যেই পরিচিতি ছিল, তাতেই তিনি অমর হয়ে থাকতেন। স্ট্রিপিং (নগ্ন নাচ)-কে তিনিই কমবেশি নাচের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কাছে তার ছবির অ্যালবাম আছে। তার ছবি সম্বলিত সংবাদপত্রের স্তূপ এখনও আছে। তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ইউরোপের সেলেব্রেটি ছিলেন।”

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনকেন্দ্রীক আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে তার গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়ই। অথচ, আজ এত বছর পর জানা যাচ্ছে যে, তিনি জার্মানদের কাছে তেমন কোনো তথ্যও দেননি। যেমন, হয়তো তিনি বলতেন যে, এই বসন্তে হামলা চালাতে পারে মিত্রবাহিনী। কিন্তু এই তথ্য সবারই জানা ছিল।

অথচ, হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে। মূলত, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার পরিচিতি প্রাপ্তি, জার্মানি ও ফ্রান্স – উভয় পক্ষের সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, আর যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপজুড়ে ঘোরাঘুরি- এ সবই তার বিপক্ষে কাজ করেছে। আর তার জীবনযাপনের ধরণ নিশ্চিতভাবেই তার পক্ষে যায়নি।

এতদিন ধরে অনেক ইতিহাসবিদই তাকে নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপক্ষে গিয়ে তার পক্ষালম্বন করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে আসলে বলি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধের পর নিজেদের অজস্র ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে একজন জুতসই গুপ্তচর দরকার ছিল ফরাসিদের, যাকে কিনা শূলে চড়ানো যাবে। আর নষ্টা চরিত্রের মাতা হারি এক্ষেত্রে ছিলেন পারফেক্ট বলি।

ফরাসি সেনারা এই ভয়েও ছিলেন যে, মাতা হারি ফরাসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার মেলামেশার কথাও ফাঁস করে দিতে পারেন। এদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ জেনারেলও ছিলেন। এ কারণেই তাকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।

আবার এ-ও সত্য যে, ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে অনেক ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়, ফরাসি গোয়েন্দারা আগেই বৃটিশদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তাকে জার্মান গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে। হাতেনাতে ধরতেই তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতেও এটাও জানা যায় যে, বৃটিশরা যেসব কারণে তাকে সন্দেহ করেছিল, তার কোনো যুক্তিযুক্ততা ছিল না। বৃটিশ গোয়েন্দারা তাকে লন্ডনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বলা হয়, প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও,তিনি একজন সাহসী ধাঁচের মহিলা, যাকে সন্দেহ থেকে ফেলা যায় না।

স্পেনের মাদ্রিদে জার্মান সামরিক অ্যাটাশে আর্নল্ড ভন কালের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এই আর্নল্ডই নিজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাতা হারিকে নিজেদের গুপ্তচর হিসেবে ইঙ্গিত দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান। এই টেলিগ্রাম ফরাসি কর্মকর্তাদের হাতে যায়। এটিই ছিল মাতা হারির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদই একে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন।

তাদের যুক্তি, ফরাসিরা যে জার্মান টেলিগ্রামে আড়ি পাততে পারেন, সেটা জার্মানরা অনেক আগ থেকেই জানতো। তাহলে, এমন সংবেদনশীল তথ্য টেলিগ্রামে কেন পাঠিয়েছিলেন আর্নল্ড ভ্যান? কারণ, তিনি চেয়েছিলেন যে, এই চিঠি ফরাসিদের হাতে পড়–ক। আর তারা এই চিঠির ভিত্তিতে নিজেদের গুপ্তচরকেই ফাঁসি দিয়ে দিক। হয়েছেও তাই।

আবার অনেকে বলেন, যেই টেলিগ্রামের কথা বলা হয়, সেটির অনুদিত অংশই প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে। সেটির জার্মান ভাষায় লেখা মূল কপি কোথায়? কেউ কি তবে, এসব জালিয়াতি করে বানিয়েছে মাতা হারিকে ফাঁসানোর জন্য?

তবে মামলার কৌঁসুলির কিছু নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, মাতা হারি নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, ১৯১৫ সালে যুদ্ধ চলাকালে হেগ শহরে জার্মানরা তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তখন তিনি যুদ্ধে আটকা পড়ে ফ্রান্সে ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছিলেন। তখনই আর্মস্টারডামে জার্মান এক কূটনীতিক ফ্রান্সে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে জার্মানির পক্ষে গুপ্তচরগিরি করার প্রস্তাব দেন। উপায় না পেয়ে তিনি রাজি হন। তিনি যুক্তি দেখান যে, মিত্রবাহিনীর প্রতিই তার আনুগত্য ছিল সবসময়। ফরাসি গোয়েন্দারা যখনই তার সাহায্য চেয়েছে, তখনই তিনি এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার এই যুক্তি ধোপে টেকেনি।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলছিলেন,“উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ছিল মাতা হারির। তাদের সঙ্গে ঘুরতেন, নাচতেন। এমনকি এক সঙ্গে থাকতেনও। অথচ, যুদ্ধের সময় যখন তিনি বিপদে পড়েন, ওই কর্মকর্তারাই তার বিরুদ্ধে চলে যান। এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে নিশ্চয়ই তার কষ্ট হয়েছিল।”

মৃত্যুদ- কার্যকরের পর কেউই মাতা হারির মৃতদেহ দাবি করতে আসেনি। তাই প্যারিসের এক মেডিকেল কলেজে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে এটি শিক্ষার্থীদের ব্যবচ্ছেদ শেখাতে ব্যবহৃত হতো। তার মাথার কঙ্কাল অবশ্য অ্যানাটমি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ২০ বছর আগে জাদুঘরে জিনিসপত্রের গণনা চলাকালে দেখা যায়, কঙ্কালটি নেই। ধারণা করা হয়, কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

(ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।)

Advertisements

জ্ঞান সাগরের আরেক নাম ইমাম আবু হানিফা (রহ:)

আতিকুর রহমান নগরী : কুফা নগরী। ১১০ হিজরির শুরুর দিকে সেখানে তৎকালিন সময়ের বিশ্বনন্দিত, জগৎখ্যাত বড়বড় আলেম-উলামা ও ফুকাহাদের মাজমা বসতো। বিদগ্ধ মুফতি, মুহাদ্দিস, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও ব্যাকরণবিদদের পদচারনায় মুখর ছিল সেই মাজমা। বারো অথবা তেরো বছরের অসাধারণ মেধা ও স্মৃতি শক্তির অধিকারী, অদম্য জ্ঞান পিপাসু নুমান নামক একজন বালক প্রথমে প্রিয়নবী সা.’ র অন্যতম খাদেম ও জলিলুল কদর সাহাবী হযরত আনাস বিন মালেক রা.’র তত্বাবধানে পবিত্র কুরআন শরীফ হেফজ করে ইলমে কালামের দিকে মনোনিবেশ করেন। অত:পর হিজরী ১০০ সালে হযরত হাম্মাদ রা.’র দরসগাহে ভর্তি হয়ে একাধারে ১০ বছর ইলিম অর্জন করেন। পরে তিনি কুফা নগরীর আলেম-উলামা, ফুকাহাদের মাজমায় পা রাখেন। কুফা তখনকার সময়ে ইসলামি নগর হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। 

সেই কুফায় আগমনকারী নুমান নামের অদম্য জ্ঞান আহরনকারীই পরবর্তীতে ইমামে আযম হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। সেই নুমান বিন সাবিতই হানাফি মাযহাবের গুরু। যাকে সমস্ত জাহানবাসী ইমাম আবু হানিফা নামেই জানে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.’র মূলধারার শিষ্য হযরত হাম্মাদ রা. ছিলেন তৎকালীন একজন ফিকহ শাস্ত্রের গুরু। তাঁর কাছ থেকে ইমাম আবু হানিফা রাহ. জ্ঞান আহরণ করেন। ফিকহ শাস্ত্রের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন কুফা থেকে বিজ্ঞ ফকিহদের কাছ থেকে। ১২০ হিজরিতে হযরত হাম্মাদ রা. ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন হযরত ইমাম আবূ হানিফা। এরপর থেকে ইমাম আযম রাহ.’র নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে কুফার ইলমি মারকায। যাকে তৎকালীন ফোকাহায়ে কেরাম ‘‘কেয়াসের প্রতিষ্ঠান’’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আমিরুল মুমিনুন হযরত অবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, হাফস ইবনে গিয়াস, ইমাম আবু ইউসূফ, ইমাম যুফার , হাসান ইবনে যিয়াদ, প্রমুখরা ছিলেন ইমাম আবূ হানিফা রা.’র মজলিসের মধ্যমনি।

ইমাম আবু হানিফা রাহ.। একটি সংগ্রামের নাম। একটি আলোকরশ্মির নাম। ইলমের একটি সাগরের নাম। একটি চেতনার নাম। কুরআন-হাদিস, ইজমা-কিয়াসের সমষ্টির নাম। জিহাদময় জীবনের নাম ইমাম আবু হানিফা। ইমাম আবু হানিফা তিনিই যার মাসআলার সমাধান দেখে চিনেছেন ইমাম আওযায়ী। যার সম্পর্কে ইমাম মক্কি ইব্রাহিম রাহ. বলেছেন, ‘যার জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিহাদ।’ দারুল হিজরতের (মদীনার) ইমাম মালেক রাহ. তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘যদি এই লোকটা কাঠের পালঙ্গকে যুক্তি দিয়ে স্বর্ণ বানাতে চান, পারবেন’।

যিনি সরাসরি চারজন সাহাবি এবং প্রায় চার সহস্রাধিক তাবেঈ মাশায়েখের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহন করেছেন। ফিকহ শাস্ত্রের অদ্বিতীয় পন্ডিত ছিলেন যে ইমাম আবু হানিফা। তাছাড়া ইলমে হাদীস, ইলমে কালাম, ইলমে বালাগাত, ইলমে নাহু, ইলমে সরফ, ইলমে তাফসীর প্রভৃতি বিষয়ে যার তুলনা তিনি শুধু নিজেই। সেই মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধর্মের নামে আগাছা লা-মাযহাবিরা বলে তিনি নাকি মুহাদ্দিস ছিলেন না। হাস্যকর এসব কথার প্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই তোমার কথা মতো ধরে নিলাম ইমাম আবু হানিফা মুহাদ্দিস ছিলেন না ঠিক। তিনি ছিলেন উস্তাযুল মুহাদ্দিসীন। শতশত মহান ব্যক্তিরা তাঁর কাছ থেকে হাদিসের দারস গ্রহণ করে স্বীয় যুগে জগৎখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন আটশত আশিজন শিষ্যের উস্তায। আমর ইবনে মাইমুনা, ইমাম যুফার, সুফিকুল শিরোমণি দাউদ তায়ী, হাববান ইবনে আলী, কাসেম ইবনে মায়ান, আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ., কযিউল কুযাত ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ বিদগ্ধ মুফতি-মুহাদ্দিস ও ফকিহবিদদের উস্তাদ ছিলেন ইমাম আযম রাহ.।

সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদিস সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। এবং ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র জ্ঞান সম্পর্কেও তাদের কোন ধারনা নেই। ইমামে আযম আবুূ হানিফা রাহ. যেভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন আজ পর্যন্ত কেউ এতসুন্দর সামাধান দিতে পারেনি এবং তাঁর প্রদত্ত কিয়াসগুলোর খন্ডন আজও কেউ করতে পারেনি।

ইমাম আওযায়ী রা. যিনি ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র সমকালিন মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহ. কে বললেন,‘কুফায় গজিয়ে উঠা এই বেদাআতির পরিচয় কি? যাকে আবু হানিফা উপনামে ডাকা হয়’? ইমামে আযম আবু হানিফা রাহ.’র প্রাণপ্রিয় শিষ্য ইবনে মুবারক এ কথা শুনে চুপ থাকেন, এ সময় তিনি কিছু জটিল ও দুর্বোধ্য মাসআলা বর্ণনা করেন এবং সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়ার দিক নির্ণয় করেন। ইমাম আওযায়ী রা. বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলেন, কে দিয়েছেন এই ফতোয়া? ইবনে মুবারক বলেন ইরাকের জনৈক শায়খ যার সাক্ষাতে এই মাসআলা ও ফতোয়া জেনেছি। ইমাম আওযায়ী রা. বলেন যিনি এই ফতোয়া দিয়েছেন তিনি মাশায়েখকুল শিরমণি। যাও তার কাছে গিয়ে আরো ইলিম হাসিল করো। ইবনে মুবারক বললেন, হযরত! সেই শায়খের নাম আবু হানিফা। পরবর্তীতে মক্কায় ইমামে আযমের সাথে ইমাম আওযায়ী রা. এর সাক্ষাৎ হয় এবং অনেক মাসআলা নিয়ে আলোচনা (তর্ক-বিতর্ক) হয়। অবশেষে ইমাম আওযায়ী রাহ. ইমাম আবু হানিফা রাহ. সম্পর্কে বলেন, ‘লোকটার গভীর জ্ঞান ও অসামান্য বুদ্ধি বিবেকের প্রতি খামোখাই সমালোচনার তীর ছুড়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। সত্যি বলতে কি আমি প্রকাশ্য ভুলের মাঝে ছিলাম। মহামানবের চরিত্রে এলজাম দিয়েছিলাম। লোকমুখে যা শুনেছি এর থেকে তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

লোকমুখে শুনে ইমাম আওযায়ী রা. ইমাম আবূ হানিফা রা. সর্ম্পকে সঠিক ধারনা পোষন করেননি। কিন্তু যখন ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র গভীর জ্ঞানের কথা শুনলেন তখন তিনি তাকে মাশায়েখকুল শিরমণি বলেছেন। আর আজকে যারা ইমাম আবূ হানিফা রাহ. সর্ম্পকে মন্তব্য করার মত দু:সাহস করে তাদের অস্তিত্ব ঠিক আছে কিনা খবর নাই। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা আধুনিক যুগের সংস্কারক।

অতএব পরিশেষে বলতে চাই যারা বলেন ইমাম আবু হানিফা রাহ. হাদিস জানতেন না। তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন না। তাদের এসব কথার কোন ভিত্তি নেই। বরং যারা এসব কথা বলে তাদের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা যেখানে শেষ ইমাম আযম আবু হানিফা রাহ.’র জ্ঞান-চিন্তাভাবনা সেখান থেকে শুরু। ইমাম আবু হানিফা রাহ. সম্পর্কে কোনো কিল ও ক্বাল না করে বরং তাঁর প্রদত্ত মাসআলা তথা হানাফি মাযহাব অনুসারে নিজের জীবনকে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহিহ সমুঝ দান করুন। আমিন।

জহুরুল ইসলাম— একজন কিংবদন্তির কথা

zohurul islam 45অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদুল আজিজ : অল্প বয়স থেকেই অনেকবার শুনে শুনে মনের ভিতরে গেঁথে গিয়েছিল একটি নাম ‘জহুরুল ইসলাম’। তখন কেবল জানতাম তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি এবং সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

অনেক বছর পরে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি যোগ দিলাম জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে। সেটা ১৯৯৪ সাল। কলেজটি তার নিজ গ্রাম ভাগলপুরে যা বাজিতপুর উপজেলা এবং কিশোরগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। সম্পূর্ণ শান্ত-সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে বিশাল ক্যাম্পাসে তখন হাসপাতাল ও কলেজের বিভিন্ন ইমারত নির্মাণের কাজ চলছে। এখানে আসার পর মরহুম জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে যতই জানতে পারি ততই বিস্ময়ে অবাক হতে থাকি। এ মানুষটি সম্পর্কে অল্প কথায় সবকিছু লেখা সম্ভব নয়, তবুও সাহস করে তার জীবন-চরিত ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

জহুরুল ইসলাম এ জনপদের একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি এবং শিক্ষাসহ সামাজিক উন্নয়নের প্রায় সর্বক্ষেত্রে নজিরবিহীন অনন্য উদাহরণ সৃষ্টিকারী এ বিস্ময়কর প্রতিভার জন্ম ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর পৌরসভার ভাগলপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

তার বাবার নাম আফতাব উদ্দিন আহমেদ এবং মাতা রহিমা খাতুন।

জহুরুল ইসলামের শৈশব কেটেছে ভাগলপুর গ্রামে। স্থানীয় স্কুলে ৫ম শ্রেণি পড়ার পর সরারচর শিবনাথ হাইস্কুল ও পরবর্তীতে বাজিতপুর হাইস্কুলে পড়ালেখা করেন। চাচা মুর্শিদ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার পর রিপন হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর বর্ধমান জেলার একটি কলেজে ভর্তি হলেও চলে আসেন মুন্সীগঞ্জে এবং পড়ালেখা করেন হরগঙ্গা কলেজে। মেধাবী জহুরুল ইসলামের ছিল শিক্ষার প্রতি অসীম আগ্রহ কিন্তু অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও পারিবারিক দায়িত্ববোধ থেকে উচ্চশিক্ষা পরিহার করে চাকরিতে যোগ দেন ১৯৪৮ সালে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তৎকালীন সিঅ্যান্ডবিতে স্বল্প বেতনে যোগদান করেন। কিন্তু প্রখর দুরদর্শিতা ও অদম্য সাহসের অধিকারী এ মানুষটি নিজের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে নিজেই বড় কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। অল্পদিনের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করলেও অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে নিজের অধ্যবসায় ও প্রজ্ঞাবলে তার কর্মপরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। ‘বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন’ তার  প্রতিষ্ঠিত ইসলাম গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান। তৎকালীন পাকিস্তানে যেখানে সব ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের একচেটিয়া দখলে, সেই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে থেকেও জহুরুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন প্রথম শ্রেণির মানসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে। এ কোম্পানির প্রথমদিককার উল্লেখযোগ্য কিছু স্থাপনা তৈরির নিদর্শন হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশ ব্যাংক, পুরনো হাই কোর্ট ভবন, সুপ্রিম কোর্ট ভবন, গণভবন ইত্যাদি। অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং চ্যালেঞ্জিং মনোভাবের অধিকারী এ ব্যক্তিত্ব স্বল্প সময়ের কার্যাদেশে তৈরি করেন এমপি হোস্টেল, পুরনো সংসদ ভবন, খাদ্য গুদাম, বিভিন্ন সড়ক যা নির্মাণ শিল্পে এক বিরল দৃষ্টান্ত। তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশে-বিদেশে। সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গড়ে তোলেন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এবং বিস্তৃত করেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মপরিধি। দেশের মানুষের আবাসন সংকট নিরসনে প্রতিষ্ঠা করেন ইস্টার্ন হাউজিং যা এ খাতে প্রথম এবং অদ্বিতীয়। প্রতিষ্ঠা করেন ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন যা বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের অগ্রদূত। কৃষি উন্নয়নে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন মিলনার্স পাম্প ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ধীরে ধীরে তার কর্মকাণ্ড আরও বিস্তার লাভ করে। কয়েকটি পাটকল, ওষুধ শিল্প, গাড়ি সংযোজন কারখানা এবং আরও অনেক স্থাপনা গড়ে তোলেন।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তার কর্মোদ্যোগ আরও বিস্তৃতি লাভ করে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যেমন তিনি অবদান রাখতে থাকেন তেমনি দেশের বাইরেও তার প্রতিষ্ঠানসমূহের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে বিডিসি (বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন) মধ্যপ্রাচ্যে কাজ শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন বিশ্বমানের সড়ক, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টসহ অন্যান্য স্থাপনা। উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে নতুন প্রযুক্তিতে আবুধাবিতে পাঁচ হাজার বাড়ি নির্মাণ, ইরাক ও ইয়েমেনে উপশহর নির্মাণ ইত্যাদি। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে যেমন জহুরুল ইসলামের যশ-খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে অন্যদিকে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে বিনা খরচে কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করে। আর বাংলাদেশ অর্জন করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এভাবে জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক এবং তার অবদানে আজও বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক জনশক্তি বিদেশে কর্মরত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা ছিল এ দূরদর্শী ও সাহসী পুরুষের সর্বক্ষণের পরিকল্পনা। নগরায়ণের ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর। বর্তমান ঢাকার নগর ভবন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের শপিং কমপ্লেক্স ও অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প তার উন্নত ও দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলীর নিদর্শন বহন করে। অক্লান্ত পরিশ্রমী এবং কিংবদন্তি উদ্যোক্তা এ মহান ব্যক্তির সৃষ্টির নেশা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। কৃষি, পোলট্রি, ফিশারিজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি উন্মোচন করেন নতুন দিগন্তের, যার অনুপ্রেরণায় আজ দেশে এসব খাতে অন্যরা এগিয়ে এসেছেন। শুনেছি দূরদর্শী এ মানুষটির অনেক ভবিষ্যতে পরিকল্পনার মধ্যে ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মোটর গাড়ি কারখানা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে মধ্যম আয়ের মানুষও একটি ছোট গাড়ির মালিক হতে পারে। ঢাকার অদূরে সাভার থেকে পানি পরিশোধন করে ঢাকায় সরবরাহ করার চিন্তাও করেছিলেন তিনি। কর্মনিষ্ঠ জহুরুল ইসলাম নিজে যেমন কঠোর পরিশ্রম করতেন তেমনি চেয়েছেন তার সঙ্গের সবাই যেন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে। কাজে গাফিলতি কিংবা ফাঁকি তিনি বরদাশত করতে পারতেন না।

জহুরুল ইসলামের সব কর্মকাণ্ডে দেশপ্রেমের একটি পরিচ্ছন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সর্বজন বিদিত। সুবিদ আলী ছদ্মনামে তিনি লন্ডনে থেকেও দেশের মুক্তিযুদ্ধে যেমন বিপুল আর্থিক সাহায্য করেছেন তেমনি প্রেরণা জুগিয়েছেন স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে খুলেছিলেন অনেক লঙ্গরখানা। শুনেছি সঞ্চিত টাকা শেষ হয়ে গেলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পাঁচ মাস ধরে চালু রাখা হয়েছিল এসব লঙ্গরখানা। এ ধরনের দুঃসাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করে অভুক্ত মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিয়ে স্বাক্ষর রেখে গেছেন তার মানবপ্রেমের।

জহুরুল ইসলামকে বিশিষ্ট শিল্পপতি হিসেবে সবাই জানেন কিন্তু তার অতুলনীয় চারিত্রিক গুণাবলির কথা অনেকেই জানেন না। আত্মপ্রচারবিমুখ এ ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল অতুলনীয়। আকাশছোঁয়া যশ-খ্যাতি ও অর্থবিত্তের মালিক হয়েও যাপন করতেন এক সাধারণ জীবন। মানুষকে সাহায্য করতে তার হস্ত ছিল সব সময় প্রসারিত। নির্দ্বিধায় অকাতরে দান করতেন প্রকাশ্যে এবং গোপনে। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক ব্যক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। ধর্মপ্রাণ জহুরুল ইসলাম নামাজ-রোজা করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে, মসজিদ নির্মাণ করেছেন, নির্মাণে সাহায্য করেছেন, বহু আলেমকে নিজ খরচে হজে পাঠিয়েছেন। মরহুম জহুরুল ইসলামের চরিত্রের আরেকটি দিক ছিল তার অতিথিপরায়ণতা। তাকে আমি সামানাসামনি দুইবার দেখেছি দুটি অনুষ্ঠানে। অতিথিদের অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া সব ব্যাপারে তিনি নিজে তদারক করেছেন অত্যন্ত অমায়িকভাবে। শুনেছি খাবার সময় তিনি সবসময় কাউকে সঙ্গে নিয়ে খেতে পছন্দ করতেন।

এবার আসি জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে। জনদরদি জহুরুল ইসলাম অন্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন এলাকা এবং আশপাশের জেলা ও বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্দশা ও হয়রানির কথা। মনের লালিত বাসনা থেকে তিনি ১৯৮৯ সালে নিজ গ্রাম ভাগলপুরে নির্মাণ শুরু করলেন একটি হাসপাতাল, সেই সঙ্গে ডিপ্লোমা নার্সিং ইনস্টিটিউট। ভাগলপুরের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে হাসপাতাল স্থাপনের কথা শুনে অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন, এমনকি নিজ পরিবারের মধ্যেও কেউ কেউ নাকি দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ী এ মানুষটি তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন জনগণ সুলভে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা পাবে এবং কেউ যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। একটি অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি গড়ে উঠেছিল এবং হাসপাতালকে সহায়তাদানের জন্য তৈরি করেছেন আফতাব বহুমুখী ফার্ম। ১৯৯০ সালে হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গরূপ ধারণ করে এবং বিভিন্ন বিভাগ চালু হয়। বর্তমানে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ এর অধিক এবং সব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বারা সুসজ্জিত। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে এ হাসপাতালে সুলভে মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে।

প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত জহুরুল ইসলাম তার মেধা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে তার কর্মক্ষেত্রের সর্বত্র শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখে গেছেন। শিক্ষার প্রতি ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ আর তাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন অগণিত স্কুল-কলেজ। নিজ উপজেলা এবং ঢাকায় তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। সাহায্য করেছেন অকুষ্ঠচিত্তে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার প্রসারে তিনি দরিদ্র মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন বিভিন্ন কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে। শিক্ষাক্ষেত্রে তার সর্বশেষ কীর্তি জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ বর্তমানে দেশের শ্রেষ্ঠ বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহের মধ্যে অন্যতম। এ পর্যন্ত ২১টি ব্যাচের দেশি-বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করে মানসম্পন্ন চিকিৎসক হিসেবে সর্বত্র বিশেষ সুনাম অর্জন করছে।

জহুরুল ইসলামের জীবনচরিত ও বিশাল কর্মকাণ্ড স্বল্প কথায় সহজে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। কিংবদন্তি উদ্যোক্তা, অক্লান্ত পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান এ মহাপুরুষের কর্মপরিকল্পনা ছিল অসীম যা তিনি সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। স্বল্প সময়ে তিনি যে বিশাল কীর্তির স্বাক্ষর রেখে গেছেন, মানবিক ও চারিত্রিক গুণাবলির যে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন তা বাঙালি জাতির আদর্শ, কর্মোদ্যোগ ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন এবং ভাগলপুরে নিজ গ্রামে সমাহিত হন। পরম করুণাময় তার আত্মার শান্তি দান করুন।

লেখক : অধ্যক্ষ, জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।

বিখ্যাত লেখকদের অদ্ভূত পেশা…

weird habits 1aweird habits 1bweird habits 1c

সুচিত্রা সেনের জন্মস্থানের বাড়ীর বর্তমান হালচাল

suchitra sen house 1asuchitra sen house 1b

নাসায় প্রথম সৌদি নারী

মিশাল আশেমিমরি

প্রথম সৌদি নারী হিসেবে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায় কাজের সুযোগ পেয়েছেন মিশাল আশেমিমরি। এ জন্য তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড। এক টুইট বার্তায় বলা হয় তিনি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণীয় মডেল।

নাসায় কাজের সুযোগ পাওয়ার পর মিশাল গণমাধ্যমকে জানান, ছয় বছর বয়সে মহাকাশের স্বপ্ন আমার চোখে বেঁধে যায়। জানতাম না মহাকাশ কী। কিন্তু ওনাইজা মরুভূমির রাতের আকাশে জ্বলা নক্ষত্রগুলো আমার চোখে স্বপ্ন এঁকে দেয়। আর সে স্বপ্ন এখন বাস্তব।

মিশাল আশহেমিমরি পেশায় মাহাকাশযান ইঞ্জিনিয়ার। এর আগে তিনি মিয়ামি ভিত্তিক মিশাল অ্যারো স্পেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মিশাল এরআগে রেইথিউন মিসাইল সিস্টেমের অ্যারোডাইনামিক্স ডিপার্টমেন্টের হয়ে কাজ করেছেন। ২২টি রকেট প্রোগ্রামে অবদানও রেখেছেন তিনি। তার পেশাদারি অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতার ক্ষেত্রগুলো হলো- অ্যারোডায়নামিক্স, বায়ু টানেল পরীক্ষা, গাড়ির ডিজাইন,ভবিষ্যদ্বাণী সিমুলেশন ও বিশ্লেষণ এবং রকেট স্টেজ-সেপারেশন বিশ্লেষণ। এ ছাড়া কম্পিউটেশনাল টুল ডেভলপমেন্টের কাজেও তার গভীর আগ্রহ রয়েছে।

আশেমিমরি ২০০৬ সালে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফলিত গণিতশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

বাদশাহ আলমগীরঃ সংক্ষিপ্ত জীবনী

emperor alamgir