আর্কাইভ

Archive for the ‘জীবনী’ Category

বিশ্বের প্রথম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী মারিয়া মিশেল

maria michelleআজ থেকে ২০০ বছর আগে জন্ম নিয়েছিলেন মারিয়া মিশেল। এই মহিলা গোটা যুক্তরাষ্ট্রে সাড়া ফেলে দেন। মার্কিন ইতিহাসে তিনি একজন পেশাদার নারী জ্যোতির্বিদ ছিলেন। ১৮৪৭ সালে তিনি নতুন ধূমকেতু আবিষ্কার করেন যা ‘মিস মিশেলের ধূমকেতু’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়—

মারিয়া মিশেলের জীবনের গল্পটা করুণ। বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি পান এবং সেই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তার গল্পের গতি যেন ভেনাস গ্রহের মতোই! পেছনের দিকে নিয়ে যায়। মারিয়া যখন ছোট, তখন নারীর বিজ্ঞানচর্চা ছিল স্বাভাবিক। তবে এই চর্চাকে পেশাদারিত্বে রূপ দেওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। আর হ্যাঁ, সে সময় ছিল না কোনো লিঙ্গ বৈষম্য। একদমই ছিল না। বিভিন্ন কারণে আঠারো শতকের শুরুর দিকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে নারীদের উৎসাহিত করা হতো। মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে বলা হতো সুইপিং দ্য স্কাই।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ মারিয়া মিশেল ১৮১৮ সালের ১ আগস্ট ম্যাসাচুসেটসের নান্টউইটে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নান্টউইটের একটি বিদ্যালয়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে অধ্যয়নের আগ্রহ জন্মে বাবা উইলিয়ামের সমর্থনে। মিশেলকে দুরবিনের ব্যবহার সম্পর্কে হাতেখড়ি শিক্ষা দেন বাবা উইলিয়াম। মা লিডিয়া মিশেল ছিলেন সাধারণ মহিলা। তাদের পরিবারকে বলা হতো কোয়াকার পরিবার। বাবা উইলিয়াম ও মা লিডিয়ার পরিবারে ছিল ৯ জন ছেলেমেয়ে। তারা বিশ্বাস করত ছেলে এবং মেয়ে উভয়েরই শিক্ষার প্রয়োজন আছে এবং উভয়কেই স্কুলে যেতে হবে। মিশেলের বাবা ছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং শিক্ষক।

১৮৩৬ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত মিশেল নান্টউইটের এথেনাম লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেন। রাতের অন্ধকার পেরিয়ে সকাল হলেই তিনি সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সৌরগ্রহণ, তারকা, বৃহস্পতি ও শনি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান আহরণের জন্য বিভিন্ন বই পড়তেন। তার বয়স যখন ১২, তখন তিনি সর্বপ্রথম বাবার সঙ্গে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আকাশ পর্যবেক্ষণের গুণাবলিগুলো মারিয়া মিশেল সযত্নে লালন করেছিলেন। মারিয়া ছিলেন তৎকালীন পেশাদার নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে সেরা। মিশেল আকাশের নক্ষত্রগুলোর একটি নকশা তৈরি করেছিলেন। উনিশ শতকে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুরস্কৃতও হন। যা কিনা তার নারী শিক্ষার্থীদের সামনে বিজ্ঞানের দুয়ার খুলে দেয়। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সে সময়ে নারী অগ্রগতির পথ সহজ এবং সুগম ছিল না। কারণ যখনই নারীরা এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখনকার সময়ের সামাজিক এবং আর্থিক প্রেক্ষাপট।

ইতিহাসবিদের মতে, তৎকালীন সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে নারীদের প্রবেশ তেমন কঠিন কিছু ছিল না। সময়টিকে নারীসুলভ বিজ্ঞানের সময় বলা হতো। যেন মহাকাশ ও নক্ষত্র নিয়ে গবেষণায় পুরুষের চাইতে নারীরাই অপেক্ষাকৃত বেশি এগিয়ে ছিল। ‘মারিয়া মিশেল অ্যান্ড দ্য সেক্সটিং অফ সায়েন্স’ বইটির লেখক, সাইমন্স কলেজের প্রফেসর রিনি বার্গল্যান্ড তার বইতে উল্লেখ করেন, ‘উনিশ শতকের শুরুতে আমেরিকার বিজ্ঞানচর্চায় নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করত। বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের মতো পুরুষরা অংশ নিত না। তখন বিজ্ঞানচর্চাকে নারীসুলভ রেওয়াজরীতিও মনে করা হতো।’

বাবার সাহচর্য এবং নিজের আগ্রহের ফলে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে মারিয়া মিশেলের প্রবেশ এবং বিচরণ বেশ সহজেই ত্বরান্বিত হয়েছিল। ১৮৪৭ সালে, পৃথিবী থেকে বহু দূরে অবস্থিত একটি ধূমকেতুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার জন্য সুইডেনের যুবরাজ মিশেলকে মেডেল প্রদান করে পুরস্কৃত করেছিলেন। তখন থেকেই ধূমকেতুটি ‘মিস মিশেলের ধূমকেতু’ নামে পরিচিতি পায়। এর পরের বছরই আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের সর্বপ্রথম নারী জ্যোতির্বিদ নির্বাচিত হন। এরপর যুক্ত হন আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্সের সঙ্গে। ১৮৫৬ সালে চল যান ইতালি। উদ্দেশ্য ভ্যাটিকান অবজারভেটরি থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ। অবজারভেটরি মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হলেও সেখানে নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এরপর তিনি পিটিশন দাখিল করেন। তার আত্মজীবনীমূলক লেখায় মিশেল বলেন, ‘সন্ন্যাস আশ্রমে থাকার ব্যাপারে আগ্রহ না থাকলেও, নিষেধাজ্ঞা থাকায় মনে জিদ চেপে বসে। দুই সপ্তাহ পর অবজারভেটরির কর্তারা তাকে ভেতরে প্রবেশাধিকার দেন। ১৯৫৪ সালের ২ মার্চ আরেক জার্নালে তার সুইপিং দ্য স্কাই সম্পর্কে জানা যায়, ‘গত রাতে তিন মেয়াদে প্রায় দুই ঘণ্টা যাবৎ ‘স্কাই সুইপ’ করেছিলাম। এটা খুব অসাধারণ একটি রাত ছিল— মেঘমুক্ত, পরিষ্কার এবং সুন্দর একটা আকাশ। আমার কাজ করতে বেশ ভালোই লাগছিল কিন্তু শীতল বাতাসে হঠাৎ আমার পিঠব্যথা করতে শুরু করে। তখন দুটি নেবুলা দেখতে পেয়েছিলাম যা আমার পিঠ ব্যথার কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।’

ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সূত্র মতে, যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন তাদের মধ্যে শতকরা ২৬ ভাগ হচ্ছেন নারী এবং আমেরিকার জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রফেসরদের মধ্যে চার ভাগের একভাগই নারী। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই মহীয়সী নারীর এত অবদান থাকলেও ১৮৭০ সালের শুরুতে মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। তবুও বিজ্ঞানচর্চা যখন পেশাদারিত্বে রূপান্তর হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। বিজ্ঞানমনস্ক নারীদের বিজ্ঞানচর্চার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখে মিশেল বসে ছিলেন না। ১৮৭২ সালে তিনি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য এডভান্সমেন্ট অফ উইমেন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে মৃত্যুর এক বছর আগ পর্যন্ত নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে যান। ১৯৩৭ সালে তার সম্মানে একটি গ্রহাণুর (১৪৫৫ মিশেলা) নামকরণ করা হয়। ২০১৩ সালে গুগল মিশেলের ১৯৫তম জন্মদিনে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে একটি ডুডল প্রকাশ করে।

Advertisements

জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-সূফির অবদান

al-sufiকাজী আখতারউদ্দিন : রাতের আকাশে আমরা অসংখ্য তারা মিটমিট করতে দেখি— কিছু কিছু তারার নামও আমরা জানি। যেমন— অশ্বিনী, কৃত্তিকা, রোহিনী, উত্তরফাল্গুনী, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা থেকে শুরু করে রেবতী পর্যন্ত মোট ২৭টি নাম বাংলায় পাওয়া যায়। কিন্তু আকাশে অসংখ্য তারার মধ্যে কেবল ১০,০০০ তারা খালি চোখে দেখা যায়। আবার এর মধ্যেও কেবল কয়েকশত তারার নামকরণ করা হয়েছে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিকেল ইউনিয়ন মোট ৩১৩টি তারার নাম লিপিবদ্ধ করেছে, যার অধিকাংশই আরবি নামের। ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের সোনালী যুগে এসব তারার নামকরণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে ১০ শতকের মুসলিম বিজ্ঞানী আল-সূফির। আমরা ১৬৫টি তারার আরবি নাম পেয়েছি।

শত শত বছর ধরে নাবিক, ভূপর্যটক ও নক্ষত্র পর্যবেক্ষণকারীদের কাছে তারার আরবি নাম ব্যবহারটি আরব-ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। নয় শতক থেকে পনরো শতক পর্যন্ত যে-সকল বিজ্ঞানী ইসলামিক স্পেন থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য প্রাচ্য হয়ে ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় আরবি ভাষায় কাজ করতেন, তারা বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছেন এবং ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের উপাদান যোগান দিয়েছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল এর মধ্যে অন্যতম একটি ক্ষেত্র।

বর্তমানে তারার যে আরবি ও আধুনিক নামগুলো পাশ্চাত্যজগতে ব্যবহূত হয়, তা মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-সূফি প্রবর্তিত তালিকা থেকে এসেছে। মধ্যযুগের ইউরোপে তিনি আজোলফি নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পুরো নাম আবুল হোসাইন আবদাল-রহমান ইবনে ওমর আল-সূফি। তাঁর যুগের অন্যতম বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি বর্তমানে স্বীকৃত। আল-সূফির জন্ম ইরানের রে নগরীতে ৭ ডিসেম্বর, ৯০৩ সালে, মৃত্যু ২৫ মে, ৯৮৬ শিরাজে। তাঁর নামে চন্দ্রপৃষ্ঠে আজোফি নামে একটি জ্বালামুখ এবং ১২৬২১ আল সূফি নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রহের নামকরণ করা হয়। তিনি আরবি ভাষায় লেখাপড়া করেন। বুয়াহিদ শাসকের আনুকূল্যে তিনি তাঁর নিজ দেশ এবং রাজ্যের রাজধানী বাগদাদে জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করেন। তাঁর মন্ত্রক ছিলেন বুয়াহিদ রাজ্যের উজির ইবন আল—আমিদ।

আল-সূফি বিখ্যাত গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমির তারার নামের তালিকার একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। এতে তিনি বিভিন্ন ভুল পর্যবেক্ষণ সংশোধন করেন এবং গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমি যেসব তারার নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি সেগুলো তাঁর তালিকায় যুক্ত করেন। আল-সূফি কিতাব সুওয়ার আল-কাওয়াকিব আল-থাবিতা বা দি বুক অফ কন্সটিলেশনস অফ দি ফিক্স্ড স্টার নামে (star cartography) কার্টোগ্রাফি— নক্ষত্র মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যার একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এটি ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ক্লাসিক গ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত হয়। গ্রন্থটিতে টলেমির ৪৮টি নক্ষত্রপুঞ্জের সমস্ত কিছু নিয়ে আলোচিত হয়েছে। এর সঙ্গে আছে নিজের আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ।  বিভিন্ন কারণে আল-সূফির পুস্তকটি সাড়া জাগিয়ে তোলে।

আল-সূফির গ্রন্থটি স্পেনের মাধ্যমেই প্রথমে পাশ্চাত্যে পরিচিত হয়। তখন স্পেনে খ্রিষ্টান ও মুসলিম রাজ্যগুলোর পাশাপাশিসহ অবস্থান ছিল। ক্ষমতা কিংবা এলাকা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে তখন কোন ধরনের ঠেলাঠেলি ছিল না বরং তারা একে অপরকে সহযোগিতা করতেন। ক্যাস্টিলের খ্রিষ্টান রাজা আলফোন্সো ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন মনোযোগী ছাত্র। তিনি আল-সূফির রচনাটি প্রাচীন স্পেনিশ ভাষায় অনুবাদের নির্দেশ দেন, যা লিব্রস দে লান এস্ট্রেলামস দে লা ওছুয়া এসপেরা (১২৫২-১২৫৬) নামে প্রকাশিত হয়। মুুসলিম বিশ্বেও আল-সূফির পুস্তকটি বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে।  ৯৬৪ সালে আল-সূফি আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রমণ্ডলী বা ছায়াপথ আন্দ্রোমেদা গ্যালেক্সি চিহ্নিত করেন। এছাড়া তিনি আ্যাাস্ট্রেলেব সম্পর্কে রচনা প্রকাশ করেন এবং এর বিভিন্ন ব্যবহারের কথা জানান— জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, হস্তরেখা, নৌপরিচালনাবিদ্যা, সার্ভে, সময়নিরূপণ, কিবলা এবং সালাত ইত্যাদি।

আল-সূফি চিরদিনের জন্য আকাশের তারা পর্যবেক্ষণের রীতি পরিবর্তিত করেন। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একজন হিসেবে তিনি তারা এবং নক্ষত্রমণ্ডলীকে উপলব্ধি করার সাধনায় নিজের জীবন উত্সর্গ করেছিলেন।  হাজার বছর পরও আল-সূফির পর্যবেক্ষণ এবং বিশদ কর্ম এখনো রাতের আকাশ দেখার বিষয়ে আমাদের সহায়তা করে।

এখানে কিছু তারার আরবি নাম দেওয়া হলো: আলজেবার, কিতালফা, আখিরআলনাহর, আল-আক্রাব, আকুবিনবাআল-জুবানা, আল-দাফিরাহ, আল-উজফুর. আল-আনাকআল আর্দ, আলবালদাহ, আলবালি, আলছিবা, আলকর, আলদিবারান, আলদিরামিন, আলিয়াথ, আলহানাহ, আলকালব আলরাই, আল কামর, আইন, আদিব, আলরুবা, আলআওয়াদ, আতিক, আসুজা, বাহাম, বাতনি কাইতুস, বাইদ, বানাত উন— নাআস, আলবোতাইন, কুরসিয়া আল-জাওযা, দানাবাউল-জাদি প্রভৃতি।  

(সূত্র: প্রকৌশলী ও ইসলামী লেখক ড. এ জহুর, জর্জ রবার্ট কেপল (১৯৯৮)— দি নাইট স্কাই অবজার্ভারস গাইড, ভলিউম ১, বুলেটিন অফ দি আই এই উ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন স্টার নেইমস নং ১। ২৮ জুলাই ২০১৬।)

ক্যান্সারাক্রান্ত আলী বানাতের সর্বস্ব দান

ali banat

ইমাম বোখারী (রহ.) এর শেষ প্রার্থনা

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী :“হে খোদা! এখন যদি আমার দুনিয়াতে থাকা তোমার নিকট কল্যাণকর না হয় তাহলে আমাকে তুলে উঠিয়ে নিয়ে যাও।“ সময়টা জোহরের পরে। দুনিয়ার মানুষের অত্যাচার-নিপীড়নে অতিষ্ট হয়ে ইমাম বোখারী এ দোয়া করেন এবং মাগরিব ও এশা এর মধ্যে দোয়া কবুল হয়। হঠাৎ তার শরীর হতে প্রচুর ঘাম নির্গত হতে থাকে এবং এশার নামাজের পর আশেখে রসুল আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যান। ঈদুল ফিতরের চাঁদ রাত। তাঁর বয়স হয়েছিল ১৩ দিন কম ৬২ বছর। হিজরী ২৬৫ সাল। ‘সমরখন্দ’ হতে তিন মাইল দূরে ‘খরতং’ নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। হিজরী ১৯৪ সালের ১৩ শাওয়াল তার জন্ম। তাঁর কোন সন্তান ছিল না। একটি বর্ণনা অনুযায়ী তিনি শাদীও করেননি। তাঁর নাম মোহাম্মদ; উপনাম আবু আব্দুল্লাহ। পিতার নাম ইসমাঈল। বোখারার অধিবাসী ছিলেন বলে আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ বোখারী নামেই তিনি ইতিহাসে খ্যাত।

তাঁর বংশ পরিচিতি :মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুগীরা ইবনে বরদাজবে। তিনি পারস্য বংশোদ্ভূত মজুসী বা অগ্নি উপাসক ছিলেন। বরদাজবের পুত্র মুগীরা বোখারার শাসনকর্তা ইয়ামান জুফীর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইমাম বোখারীর পিতা ইসমাঈল হজরত ইমাম মালেকের শাগরিদ ছিলেন। তিনি হাম্মাদ ইবনে জায়দ ও ইবনুল মোবারকের কাছ থেকেও হাদীস শ্রবণ করেন। 

বর্ণিত আছে যে, শৈশবে ইমাম ‘নাবীনা’ অর্থাৎ অন্ধ ছিলেন। তাঁর মায়ের দোয়ায় আল্লাহ তাকে দৃষ্টিশক্তি দান করেন। শৈশবেই তিনি পিতাকে হারান, মা তার লালন পালন করেন। প্রথম দিকে তিনি অর্থশালী ছিলেন। পৈত্রিক উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন।

ইমাম বোখারীর (রহ.) মধ্যে হাদীস হিফজ করার আগ্রহ দশ বছর বয়স হতেই শুরু হয়ে যায়। জন্মগতভাবে তিনি ছিলেন অসাধারণ ধীশক্তির অধিকারী। খোদা প্রদত্ত এ মেধা-প্রতিভা খুব কম লোকেরই ভাগ্যে আসে, দুনিয়ার ইতিহাসে এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। তাঁর ছয় লাখ সহীহ হাদীস সনদসহ মুখস্থ ছিল। তিনি এসব হাদীস সংগ্রহের জন্য হেজাজ, ইরাক, ইয়েমেন, খোরাসান, মিশর, সিরিয়া প্রভৃতি শহরে-গ্রামে-গঞ্জে, পাহাড়ে, জঙ্গলে এবং যেখানেই জানা গেছে যে, কোন বুজর্গের নিকট হাদীস আছে, তাদের কাছ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করার জন্য হাজার হাজার মাইল পদব্রজে সফর করেছেন। আরবের ভীষণ গরমে তাকে এসব দূরবর্তী স্থান ও দুর্গম এলাকা সফর করতে হয়েছে।

কথিত আছে যে, এসব স্থান সফরকালে কোন কোন সময় তাঁর প্রসাব রক্ত আকারে বের হতো, কিন্তু তিনি তা পরোয়া করতেন না, হাদীস সংগ্রহের নেশায় তিনি বিভোর ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি ছয় লাখ হাদীস সংগ্রহ করেন এবং মুখস্থ হয়ে যায়।
১৬ বছর বয়সে ইমাম বোখারী (রহ.) ইমাম অকী ও ইবনুল মোবারকের কিতাব মুখস্থ করে ফেলেন। অতঃপর মায়ের সঙ্গে হজের জন্য গমন করেন এবং হেজাজে শিক্ষা লাভ করেন এবং সেখানে ৬ বছর অবস্থানের পর প্রত্যাবর্তন করেন।

তাঁর হাদীস সংকলনে আত্মনিয়োগ করার ঘটনানাটিও বিস্ময়কর। ৬ লাখ হাদীসের জখীরা ছিল তাঁর সামনে এবং ১৬ বছর সময়ের মধ্যে হাদীস সংকলনের কাজ সমাপ্ত করেন। এ সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি কখনো মদীনার মসজিদে নববীতে বসে এবং কখনো খানা-ই-কাবায় বসে হাদীস সংকলন করতেন এবং এ কাজে তিনি অত্যন্ত সতর্কনীতি অনুসরণ করেন। এ সম্পর্কে সীরাত লেখক ও মোহাদ্দেসীন লিখেছেন যে, প্রত্যেক হাদীস লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ইমাম বোখারী গোসল করতেন, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তেন, ইস্তেখারা করতেন এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পর হাদীস লিপিবদ্ধ করতেন। এভাবে তিনি কিতাব সম্পূর্ণ করেন।
আল্লামা খতীব বাগদাদী তাঁর বিখ্যাত ‘তারিখে বাগদাদে’ ইমাম বোখারী (রহ.) এর অসাধারণ মেধা-প্রতিভা এবং ইমাম বোখারী (রহ.) বিদ্বেষী এক শ্রেণীর আলেমের জালিয়াতির এক অদ্ভুত কাহিনী লিখেছেন। যা সংক্ষেপে এই যে, যখন তিনি বাগদাদে গমন করেন তখন ‘সাজেশী উলামা’ দলের লোকেরা তাঁর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য একটি সূকৌশল অবলম্বন করেন। তাদের মধ্যে দশ জন দশটি হাদীস গলদ মুখস্থ করে বিভিন্ন সময় ইমাম বোখারীর (রহ.) সামনে পাঠ করেন। ইমাম সাহেব পঠিত সবকটি হাদীস বিকৃত হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর সনদ সহকারে প্রত্যেকটি ‘রেওয়ায়েত’ (বর্ণনা) মূল মতন (এবারত) সহ পেশ করেন, যাতে তাঁর বিরুদ্ধবাদীরাও অবাক ও বিস্মিত হয়ে যায়।

অত্যন্ত সতর্ক ও গুরুত্ব সহকারে ইমাম সাহেব কর্তৃক লিপিবদ্ধ করা হাদীসগুলোর সংখ্যা চার হাজারের কিছু বেশি, যা সংক্ষেপে ‘বোখারী শরীফ’ নামে বিশ^খ্যাত। তিনি সমকালীন এক হাজার আশি জন মোহাদ্দেসীরনের কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। খোদ তাঁর কাছ থেকে এক লাখ লোক হাদীস শ্রবণ করেন। আগেই বলা হয়েছে যে, ইমাম বোখারীর (রহ.) ছয় লাখ হাদীস মুখস্থ ছিল এবং এ ছয় লাখ হাদীসের জখীরা সামনে রেখে হাদীস সংকলন শুরু করেছিলেন। কিতাব সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি তা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইবনে মুঈন এবং ইবনুল মাদিনীর সামনে পেশ করেন এবং তাঁরা সবাই প্রশংসা করেন এবং বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ঐক্যমত পোষণ করেন, তবে চারটি হাদীস নিয়ে বিতর্ক থাকে। ইবনে হাজার বলেন, বিতর্কিত এ হাদীসও সত্য।

সে যুগের মোহাদ্দেসীনে কেরাম সর্বসম্মতভাবে বলেছেন যে, ‘আছাহ হুল কুতুবে বাদা কিতাবিল্লাহি আছ ছাহীহুল বোখারী’। অর্থাৎ কোরআন হাকীমের পর বিশুদ্ধতম কিতাব সহীহ বোখারী। সহীহ বলতে কেবল লিখিত আকারে সহীহ বা বিশুদ্ধতম নয়, এ কিতাবের ভাব-ভঙ্গি ও সাহিত্যের দিক থেকেও অতি উত্তম, আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী। বিখ্যাত বৈয়াকরণ আল্লামা রাজি (৬৮৬) বলেন; ‘খাটি আরবী জানতে হলে কোরআন, অতঃপর সহীহ বোখারী এবং হেদায়া পড়তে হবে।’ এ স্বীকৃতি সত্য ও বাস্তবতার স্বীকৃতি। বস্তুত সকল দিক বিবেচনায় সহীহ বোখারী এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি। কোরআন এর ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলোর পর সর্বাধিক ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং অহরহ হচ্ছে বোখারী শরীফের। হাদীস শাস্ত্রে ‘আমীরুল মোমেনীন’ সহ আরও বহু উপাধিতে ভ‚ষিত এ মহান হাদীস বিশারদের শেষ জীবনে নিজের দেশেই নানা বিপদ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ‘খালকে কোরআন’ অর্থাৎ কোরআন ‘কাদীম’ এ না ‘হাদেস’ এ বিষয়ে ইমাম সাহেবের মত ছিল কোরআন ‘কাদীম’ অর্থাৎ সৃষ্ট নয়, আদি। এ বিষয়ে ইমাম জুহলীর সাথে তাঁর মত বিরোধ দেখা দেয় এবং তিনি ইমাম সাহেব সম্পর্কে শাসকের কান ভারি করেন বলেও অভিযোগ আছে। অতঃপর বোখারার শাসকের সাথে তাঁর মন কষাকষি হয়। বোখারার শাসক ইমামকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। ইমাম সাহেব সেখান হতে সমরখন্দ চলে যান। সেখানে তিনি আল্লাহর দরবারে যে প্রার্থনা করেন তা এবং ঈদ রজনিতে তাঁর ইন্তেকাল হওয়ার কথা নিবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে।

তারিক রামাদানের বিরুদ্ধে তৃতীয় ধর্ষণের অভিযোগ খারিজ

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত তারিক রামাদানের বিরুদ্ধে তৃতীয় ধর্ষণের অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন ফরাসি আদালত। মঙ্গলবার তার আইনজীবী এ তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে দুটি ধর্ষণের অভিযোগে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।

আইনজীবী ইমানুয়েল মারসিগনি বলেন, রামাদানের কাছ থেকে পাওয়া ব্যাখ্যা ও তথ্যউপাত্ত পাওয়ার পর তৃতীয় অভিযোগটি তদন্তের দরকার নেই বলে মনে করেছেন ম্যাজিস্ট্রেট।

রামাদানের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে তার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের লিয়েনের হোটেলে এক দুপুরে একজন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু লন্ডন থেকে রামাদানকে বহনকারী বিমান ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের আগে লিয়নে পৌঁছায়নি।

এ বিষয়ে যথাযথ তথ্যপ্রমাণ ফরাসি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছিলেন রামাদান। কিন্তু সেই নথি মামলার ফাইল থেকে হারিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ফরাসি পুলিশ।

এর পর ফরাসি আইন লঙ্ঘন করে তাকে নির্জন কারাবাস দেয়া হয়েছে। সেখানে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর রামাদানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তা সত্ত্বেও তাকে জামিন দেয়া হয়নি।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছেঅক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকালীন ইসলাম শিক্ষা বিভাগের এ অধ্যাপক তার মুসলিম পরিচয়ের কারণে ফরাসি কর্তৃপক্ষের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন কিনা।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০০৯ সালে ফ্রান্সের লিয়নে ও ২০১২ সালে প্যারিসে দুই নারী তার হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে একটি অপরাধ তদন্ত হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট ফর এ জাস্ট ওয়ার্ল্ডের প্রেসিডেন্ট ড. চন্দ্র মুজাফফর বলেন, অধ্যাপক তারিক রামাদান ফ্রান্সে প্রহসনের বিচারের শিকার হচ্ছেন। তারিক রামাদানের বিরুদ্ধে দুই নারীর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ জন্যই ৩১ জানুয়ারি তিনি স্বেচ্ছায় প্যারিসে পুলিশের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, তার জবাব দিতেই তিনি সেদিন পুলিশের কাছে যান।

নিজের অভিযোগের তদন্তে কর্তৃপক্ষকে তিনি পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। এর পরও তাকে বিচারবহির্ভূত নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হচ্ছে বলে জানান চন্দ্র মুজাফফর।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন

এবনে গোলাম সামাদ : রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা নিয়ে অনেক ভেবেছেন। তার বয়স যখন ৩১ বছর, তখন তিনি ‘শিক্ষার হেরফের’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। যাতে তিনি বলেন, ‘বাল্যকাল হইতে যদি ভাষাশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভাবশিক্ষা হয় এবং ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জীবনযাত্রা নিয়মিত হইতে থাকে, তবেই আমাদের সমস্ত জীবনের মধ্যে একটা যথার্থ সামঞ্জস্য হইতে পারেআমরা বেশ সহজ মানুষের মতো হইতে পারি এবং সকল বিষয়ের একটা যথাযথ পরিমাণ ধরিতে পারি’। তিনি তার এই প্রবন্ধে কিছু আগে আরও বলেন যে, ‘চিন্তাশক্তি এবং কল্পনাশক্তি জীবনযাত্রানির্বাহের পক্ষে দুইটি অত্যাবশ্যক শক্তি তাহাতে আর সন্দেহ নাই। অর্থাৎ যদি মানুষের মতো মানুষ হইতে হয় তবে ওই দুটো পদার্থ জীবন হইতে বাদ দিলে চলে না। অতএব বাল্যকাল হইতে চিন্তা ও কল্পনার চর্চা না করিলে কাজের সময় যে তাহাকে হাতের কাছে পাওয়া যাবে না এ কথা অতি পুরাতন।’

রবীন্দ্রনাথের মতে তার সময়ে যে শিক্ষাব্যবস্থা দেশে চলেছিল, তাতে হতে পারত না চিন্তা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ। তাই তিনি তার পরবর্তী জীবনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করতে চান যে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হতে পারবে চিন্তা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ। তার কাছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় ছাত্রদের কেবলই কিছু তথ্য প্রদান করা নয়; তথ্য নিয়ে ভাবতে শেখানো। যুক্তি বলতে বোঝায় বিভিন্ন ঘটনাবলির মধ্যে সম্বন্ধ নির্ণয়কে। শিক্ষার লক্ষ্য হতে হবে বিভিন্ন ঘটনাবলির মধ্যে সম্বন্ধ নির্ণয়ের ক্ষমতা বাড়ানো। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি ভাষার পরিবর্তে শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের প্রস্তাব রাখেন। কারণ, এর ফলে জ্ঞান সহজেই তাদের চেতনার অংশ হয়ে উঠবে। ফলে অনেক সহজেই পারবে তার প্রয়োগ ঘটাতে।

রবীন্দ্রনাথ তার ‘শিক্ষার হেরফের’ লেখেন রাজশাহী শহরে বসে (রামপুর বোয়ালিয়া)। তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেছিলেন তদানীন্তন রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের এক সভায়। যা অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী সরকারি কলেজের একটি কক্ষে। রাজশাহী সরকারি কলেজ তখন বিবেচিত ছিল একটি উৎকৃষ্ট শিক্ষপ্রতিষ্ঠান হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ রাজশাহী শহরে এসেছেন অনেকবার। এসেছেন প্রধানত তার জমিদারির কাজে। রাজশাহী জেলা ছিল তখন রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ মিলিয়ে। রাজশাহী শহর ছিল রাজশাহী জেলার সদর।

রবীন্দ্রনাথের জমিদারি ছিল নওগাঁর কালীগ্রাম মৌজায়। কালীগ্রাম মৌজার একটি গ্রামের নাম হল পতিসর। যেখানে অবস্থিত ছিল কালীগ্রাম মৌজার জমিদারির তহশিল। কালীগ্রামের জমিদারি ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রধান জমিদারি। যা তিনি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর কালীগ্রামের জমিদারি ক্রয় করেন ১৮৩০ সালে। রবীন্দ্রনাথ রাজশাহী শহরে বসেই কেবল যে শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, তা নয়। লিখেছিলেন তার একাধিক বিখ্যাত কবিতা। যেমন– ‘সুখ’, ‘ঝুলন’, ‘এবার ফিরাও মোরে’ এবং ‘সমুদ্রের প্রতি’। আমি এসব কথা বলছি কেননা, এসব কবিতা তিনি যেসব জায়গায় বসে লিখেছিলেন, আমি আমার বর্তমান প্রবন্ধটি লিখছি তার খুব সন্নিকটস্থ মাটিতে বসে। তাই আমার মনে আসছে এসব কবিতার কথা। যদিও তার শিক্ষাদর্শনের সাথে এসবের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শন নিয়ে আমি কিছু লিখছি, কেননা আমাদের প্রধানমন্ত্রী ক’দিন আগে গিয়েছিলেন বিশ্বভারতীতে; সেখানে বাংলাদেশের টাকায় নির্মিত বাংলাদেশ ভবন উন্মোচনের জন্য।

রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে কলকাতা থেকে ১০০ মাইল দূরে বিরভুম জেলার বোলপুর স্টেশনের কাছে কিছু জমি কিনে স্থাপন করেন শান্তিনিকেতন আশ্রম। পরে রবীন্দ্রনাথ সেখানে স্থাপন করেন ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নামের একটি বিদ্যালয়। এরপর ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি ওই জায়গায় স্থাপন করেন বিশ্বভারতী নামে বিশ্ববিদ্যালয়। রবীন্দ্রনাথের স্থাপিত ব্রহ্মচর্যাশ্রমে কেবলমাত্র পড়তে পারত ব্রাহ্ম ও উচ্চ বর্ণের হিন্দু ছাত্ররা। মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু ছাত্ররাও নয়। উচ্চ বণের্র হিন্দু বলতে বোঝাত, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ এবং বৈদ্য বর্ণের হিন্দুদের। রবীন্দ্রনাথ এ সময় বর্ণাশ্রম জাতিভেদ প্রথায় আস্থাবান ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি বিশ্বভারতী স্থাপন করেন, তখন তিনি এর দ্বার উন্মোচিত করেন সবার জন্যই।

রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন লেখাপড়ার উদ্দেশ্য হলো মননশক্তি বাড়ানো। কিন্তু তিনি বিশ্বভারতীর সাথে যুক্ত করেন শ্রীনিকেতন নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। এর লক্ষ্য হয় কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে পল্লীর উন্নয়ন। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর প্রথম পরিচালক ছিলেন লেনার্ড কে এল্মহার্স্ট। রবীন্দ্রনাথ শ্রীনিকেতন স্থাপন করেছিলেন ১৯২২ সালে। এটাকে ঠিক বিশ্বভারতীর অংশ বলা যায় না। কারণ, এখানে বিদ্যাদানের ব্যাপারে অনুসরণ করা হতো এবং এখনও হয় পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে; বিশ্বভারতীর মতো তপবনের পরিবেশে নয়। অবশ্য বিশ্বভারতীর সেই আদি তপবনের পরিবেশ এখন আর নেই। বিশ্বভারতী চলেছে প্রধানত রবীন্দ্রনাথের কালীগ্রামের জমিদারির আয় থেকে। কিন্তু কালীগ্রামের কৃষক প্রজারা এর দ্বারা কোনোভাবেই উপকৃত হতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ ১১ বার বিশ্বভ্রমণ করেছেন। তারও অর্থ জুগিয়েছে প্রধানত কালীগ্রাম। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার এই জমিদারিতে মনে রাখারা মতো কিছু করেননি। তিনি তার প্রজাদের শিক্ষিত করে তুলতে চাননি। ভেবেছেন কৃষক প্রজারা শিক্ষিত হলে বাড়বে কৃষক প্রজার অসন্তোষ। কঠিন হবে জমিদারি রক্ষা। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল জমিদার হিসেবে খুবই প্রজাপীড়ক। এদের প্রজাপীড়নের খবর ছাপান কাঙ্গাল হরিনাথ, তার ‘গ্রামবার্তা’ পত্রিকায়। যা পড়ে ক্ষুব্ধ হন রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ভাড়াটে গুণ্ডা নিযুক্ত করেন কাঙ্গাল হরিনাথকে খুন করার জন্য। কিন্তু সফল হতে পারেন না।

বাংলাভাষী মুসলমানের মধ্যে সর্ব প্রথম খুব উন্নতমানের বাংলা গদ্য লেখেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮১৯১২)। তিনি বাংলা গদ্য লিখতে শেখেন কাঙ্গাল হরিনাথের কাছ থেকে। অর্থাৎ বাংলাভাষী মুসলমানের সাহিত্য সাধনার আছে একটা পৃথক ইতিহাস। কিন্তু আজ প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, বাংলাভাষী মুসলমানের সাহিত্য সাধনার পেছনে আছে রবীন্দ্রনাথের অশেষ দান। যেটা ঐতিহাসিক সত্য নয়। যেমন সত্য নয়, বাংলাভাষী মুসলমানের ওপর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব। ১৯১১ সালে ৪ সেপ্টেম্বর স্থাপিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। এই সমিতি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে ১৯১৩ সালে। সমিতির অফিস স্থাপিত হয় কলকাতায় ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। করাচি থেকে হাবিলদার কবি কাজী নজরুল ইসলাম এসে ওঠেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে। কেননা, তার কলকাতায় থাকার কোনো জায়গা ছিল না। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিকে নির্ভর করে অগ্রসর হয়েছে বাংলাভাষী মুসলমানের সাহিত্য চর্চা। এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কোনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু এখন প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ নাকি ছিলেন আমাদের সাহিত্য চর্চার মূল অনুপ্রেরণা। যা আদৌ সত্য নয়। রীন্দ্রনাথকে ঘিরে এখন শুরু হয়েছে এমন এক রাজনীতি, যা হতে পারে বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট অমঙ্গলজনক।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে কেবল যে মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে লেখাপড়া হয়েছে, তা নয়। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ তার বড় ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিলাতে পাঠিয়েছিলেন আইসিএস হবার জন্য। তিনি ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম আইসিএস। তিনি রবীন্দ্রনাথকেও বিলাতে পাঠিয়েছিলেন আইসিএস হবার জন্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তা হতে পারেননি। ঠাকুর পরিবার একদিকে বলেছেন, ব্রিটিশবিরোধী কথা, আবার অন্যদিকে হতে চেয়েছেন তার শাসনযন্ত্রের অংশ। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু নিজের ছেলে রথিন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইলিনয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান পড়তে। রথিন্দ্রনাথ সেখান থেকে জীববিজ্ঞানে বিএস ডিগ্রি নেন। রবীন্দ্রনাথ একদিকে বলেছেন, পাশ্চাত্য শিক্ষা বিভ্রান্তিকর। কিন্তু সেই সাথে আবার নিজ পুত্রকে পাঠিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষালাভ করতে। ভরসা করেননি বিশ্বভারতীতে তার উচ্চশিক্ষা লাভ হতে পারবে বলে। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে অনেক ব্যাপারেই থাকতে দেখা যায় আত্মসঙ্গতির অভাব। সাবেক পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক স্থানে (১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ সালে) ব্রিটিশ শাসনামলে বৈশাখী মেলায় চলেছিল গুলি। মারা গিয়েছিল বহুলোক।

রবীন্দ্রনাথ জালিয়ানওয়ালাবাগের এই গুলি চলার প্রতিবাদ করে ছেড়েছিলেন তার স্যার উপাধি। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার যখন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবি’ উপন্যাস বাজেয়াপ্ত করে, রবীন্দ্রনাথ তখন প্রতিবাদ করতে অস্বীকার করেন। বলেন, প্রবল প্রতাপ ব্রিটিশ রাজের বিপক্ষে শরৎচন্দ্রের এরকম উপন্যাস লেখা মোটেও উচিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথ নন, শরৎচন্দ্র বাংলাভাষী মুসলমান পাঠকের মনে অনেক গভীরভাবে নানা বিষয়ে রেখাপাত করেছিলেন। কিন্তু তাকে নিয়ে আজ সেভাবে আলোচনা হচ্ছে না। এক রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে মূল্যায়ন করার চেষ্টা হচ্ছে সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে।

আমরা আলোচনা করছিলাম রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন এখন আর ভারতে আদ্রিত নয়। কিন্তু আমরা রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীতে করলাম যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করে ‘বাংলাদেশ ভবন’। জানি না কিভাবে বাংলাদেশ এর দ্বারা উপকৃত হতে পারবে।

এক খণ্ড জাফরনামা

মোহাম্মদ কায়কোবাদ : . মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রায় ১৮ বছর পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী দেশে সবচেয়ে নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান বেলল্যাব এবং সবচেয়ে বেশি নোবেলঘন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্যালটেকে চাকরি করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের, রাজনৈতিক বিভেদে বিধ্বস্ত মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে এলেন বৃষ্টিতে ভেজার জন্য, ব্যাঙের ডাক শোনার জন্য, কর্দমাক্ত পথে হাঁটার জন্য।

একেবারেই স্বেচ্ছায় উন্নত জীবনব্যবস্থায় অভ্যস্ত দুটি ছোট ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে, তাও আবার রাজধানী থেকে দূরে দেশের এক কোণে সিলেটে সদ্যস্থাপিত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আমাদের শিশুকিশোর, তরুণতরুণী, এখনকার অনেক পিতামাতাকে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করেছে, আমাদের অনেকেরই জীবনে গুণগত পরিবর্তন এনেছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে তার এমন কিছু উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পেরেছি যা কখনও কল্পনাও করতে পারি নাই। জাফর ভাইকে নিয়ে তরুণ প্রজন্মের উচ্ছ্বাস রয়েছে, আবেগ রয়েছে যা মধ্যবয়সীদের মধ্যেও বিস্তৃত। এমনকি প্রবীণদের জন্যও তিনি ভরসাস্থল হয়ে উঠেছেন। যদিও তিনি সর্বক্ষণই সাধারণ মানুষ নিয়ে ভাবেন, সাধারণ ছেলেমেয়ের কথা বলেন, তার অনেক কর্মকাণ্ডেই অসাধারণত্বের ছাপ রয়েছে। এর কিছু বিষয় আমি জানি যা সবার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।

. সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার সামর্থ্য বোধকরি কম লোকের মধ্যেই আছে। কোনো বিষয় সম্পর্কে তার জানা থাকলে সেখানে তার মতামত আছে। সাধারণত আমাদের জন্য বেশিরভাগ বিষয়ই ধূসর, অথবা নানা পার্থিব কারণে মতামত প্রদানে আমরা বিরত থাকি।

জাফর ভাইয়ের এই গাবাঁচানো অভ্যাসটি নেই, তাই সেনাসমর্থিত শাসনামলে তিনি মইনুদ্দিনফখরুদ্দিন সরকারের সমালোচনা করতে পিছ পা হননি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বিশ্বজিতের লাল শার্ট’ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের প্রতিরোধহীন আস্ফালন ও দৌরাত্ম্য নিয়ে লিখেছেন। নানা পার্থিব সমস্যায় পড়বেন মনে করে কখনও লেখা থামাননি।

. ছেলেমেয়েদের কতজন শুধুই গণিত অলিম্পিয়াড করতে আসে তা না জানলেও সবাই যে জাফর স্যারকে দেখতে আসে, তার সঙ্গে ছবি তুলতে আসে, তার মনোমুগ্ধকর কথা শুনতে আসে, স্বপ্ন দেখতে আসে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। একবার নটর ডেম কলেজে অনুষ্ঠানরত ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে এক ছেলে জিজ্ঞাসা করল জাফর স্যার আসবেন কিনা। উত্তরে আমি ইতস্তত করতেই সে হতাশ হয়ে বলে বসল আসাটাই ভুল হয়েছে।

জাফর ভাই অবশ্য পরে ঘটনাটি জেনে দুঃখ পেয়েছিলেন, আসতে পারেননি বলে নয় বরং ছেলেটির অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণে নির্লিপ্ততার জন্য। জাফর ভাই ছেলেমেয়েদের আবেগ বুঝতে পারেন, তাকে গুরুত্বও দেন। তাই তো সিলেট থেকে ঢাকা আসেন শুধু রংপুর, দিনাজপুর, বরিশাল, কুষ্টিয়া, খুলনাসহ দেশের সব অঞ্চলে অনুষ্ঠেয় অলিম্পিয়াডসহ ছেলেমেয়েদের অন্যান্য অনুষ্ঠানে গিয়ে তাদের উৎসাহিত করেন। ছেলেমেয়েদের অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য তিনি তার অতি পুরনো মাইক্রোবাসে প্রতি বছরই অন্তত পৃথিবীর পরিধির সমান দূরত্ব পরিভ্রমণ করেন।

. চট্টগ্রামের এক ছোট্ট ছেলের খুব শখ জাফর ভাইয়ের অটোগ্রাফ নেয়ার। সুযোগের অভাবে ধৈর্যচ্যুত হয়ে বইতে নিজেই একটি শুভেচ্ছাবাণী লিখে স্বাক্ষরে মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছে। জাফর স্যারের সান্নিধ্য প্রাপ্তির তীব্রতা এতই বেশি। জাফর ভাই অবশ্য ঘটনাটি জেনে তাকে বেশকিছু বই উপহার দিয়েছিলেন স্বপ্নের অটোগ্রাফসহ! হুমায়ূন আহমেদ এবং জাফর ভাই বাংলাদেশে বইপড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন, অটোগ্রাফ শিকারি তৈরি করেছেন, তাদের নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস তা বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগেও তৈরি হয়নি।

. পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি নিয়ে জাফর ভাই খুবই বিব্রত। এই কাজের সঙ্গে তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও এর দায়ভার থেকে নিজেকে তিনি অব্যাহতি দিতে পারেননি। এ নিয়ে পত্রিকায় অনেক লিখে অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন।

পরীক্ষার্থীরা এ বিষয়ে অনুযোগ, নালিশের তীর তার দিকেই ছাড়ে। ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো এক রাত সাড়ে দশটার দিকে বুয়েটের সিএসই বিভাগের সদ্যবিদায়ী বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সোহেল রহমানের সঙ্গে জাফর ভাইয়ের বাসায় উপস্থিত। জাফর ভাই প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি তুললেন এবং কীভাবে এই অভিশাপ থেকে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠেয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের মুক্তি দেয়া যায় তার একটি কার্যকর উদ্যোগের অংশ হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করতে বললেন।

এর মধ্যে ৩ মার্চ দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকে আক্রমণ করা হল। সভার তারিখ নির্ধারিত হল ৭ মার্চ। ৬ মার্চ ইয়াসমীন ভাবিকে ফোন করে বললাম সিএমএইচে নিশ্চয়ই অনেক কড়াকড়ি। উপরন্তু জাফর ভাইয়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তড়িৎ গতিতে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেয়ায় সিএমএইচে তার গতিবিধিতে কড়াকড়ির কোনো শৈথিল্য হবে না। এরপরও ৭ তারিখের সভার জন্য কিছু পরামর্শ থাকলে আমাদের জানাতে অনুরোধ করলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারলাম তিনি বিছানায় বসে দুটি চিঠি লিখেছেন যার একটি সভায় পাঠ করার জন্য। আমি বিশ্বাস করি চিঠিটি সভায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়েছে। এরকমভাবে আক্রান্ত একজন চিকিৎসারত মানুষ যখন শারীরিক ও মানসিক ক্ষতকে তোয়াক্কা না করে দুটি চিঠি লিখতে পারেন, দেশের প্রতি, শিক্ষার প্রতি, জাতির প্রতি, প্রজন্মের প্রতি তার দায়বদ্ধতার মাত্রা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না।

. এই দুর্ঘটনার অনেকদিন পর আমি ‘নিজের মাপের’ একটি প্রশ্ন করলাম, ‘জাফর ভাই, কিরকম ব্যথা পেয়েছিলেন?’ বলেছিলেন, সত্য বলব? কোনো ব্যথা পাইনি। আমার দেহের অগুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থানের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফোঁড়াও আমার চোখ ও মনকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন রাখে। জাফর ভাইয়ের মন দেহাতীত, দেহোত্তর, দেহের ক্ষুদ্রবৃহৎ পরিবর্তন নেহায়েত মামুলি ব্যাপার।

দুনিয়ায় কত ভালো কাজ আছে তা ছেড়ে না জানি কত দুঃখে আক্রমণকারী ছেলেটি কেন এই খারাপ কাজটি বেছে নিয়েছে এই প্রশ্নটি বরং তাকে অনেক বেশি বিব্রত করেছে, পীড়া দিয়েছেপিঠের গভীর আঘাত, মাথার ক্ষত কিংবা হাতের ব্যথা এগুলো নিয়ে ভাবার সময় কই?

. সিলেট থেকে ঢাকা ফিরব জাফর ভাইয়ের মাইক্রোবাসে। পথে ক্ষণে ক্ষণে পুলিশের গাড়ির পরিবর্তন। তার জন্য এই আয়োজনে তিনি খুবই বিব্রত। আমাকে বললেন তার অসুস্থতার সময় আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো তার অসুস্থতার সংবাদ ঘটা করে প্রচার করেছে।

দেশে কত সমস্যা, তা বাদ দিয়ে তার ক্ষুদ্র, তুচ্ছ অসুস্থতার বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে জেনে তার বিব্রতবোধের মাত্রা আকাশচুম্বী। কোনো টিভি চ্যানেল যদি নিতান্তই কোনো গৌণ সংবাদে আমার নাম উচ্চারণ করে তাহলে মাটিতে আমার পা পড়বে কিনা সন্দেহ। আর অসংখ্য চ্যানেলের মুখ্য সংবাদের নায়ক হয়েও তিনি বিব্রত!

. বেড়িবাঁধ দিয়ে ঢাকা শহরে প্রবেশ করতে পাইকারি ফলের দোকান থেকে কিছু ডাব কিনেছি। বুয়েটে গিয়ে তো আমার ফের বের হওয়া সম্ভব হবে না, তাই ডাবগুলো জাফর ভাইয়ের বাসায় পৌঁছে দিতে অনুরোধ করলাম গাড়ির চালককে। ৩০৪০ ফুট দূরে দাঁড়ানো ডাবওয়ালা বলল জাফর স্যার না?

আমি তাকে দুটি ডাব দিলাম। হয়তো ডাব বিক্রেতার অক্ষরজ্ঞান নেই, জাফর ভাইয়ের কোনো বইও তার পড়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু গত আড়াই দশক ধরে নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য, সমাজের জন্য যে স্বপ্নের জাল বুনে চলেছেন তা দেশের সব স্তরের মানুষকে স্পর্শ করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে, আশান্বিত করেছে, তিনি তাদের ভরসাস্থল হয়েছেন, জাতির বিবেক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেনকোনো ক্ষমতায় নয়, ভয়ে নয়, নেহায়েত ভালোবাসা দিয়ে, হৃদয়ের ঔদার্য দিয়ে দেশের লাখ লাখ তরুণ, কিশোর, যুবক, মধ্যবয়সী এমনকি প্রবীণদের হৃদয়ে স্থান পেয়েছেন।

. অনেকদিন আগের কথা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাব গণিত অলিম্পিয়াড করতে। জাফর ভাই আসবেন সিলেট থেকে, আমরা ঢাকা থেকে। পথিমধ্যে জানলাম তার গাড়ি দুর্ঘটনাকবলিত। জাফর ভাই আহত সবাইকে হাসপাতালে নিয়েছেন। জাফর ভাইয়ের ধারণা অন্যদের ক্ষত তার থেকেও গুরুতর অথচ চিকিৎসকরা তার ক্ষত সারাতে ব্যস্ত বিধায় তিনি খুবই বিব্রতবোধ করেছেন। নিজের সমস্যা নিয়ে বলতে নেই, পরের কারণে স্বার্থ দিয়ে বলি

. একবার হবিগঞ্জ যাব গণিত অলিম্পিয়াড করতে। গণিত অলিম্পিয়াড শেষে আয়োজকরা বিদায়ের সময় জাফর ভাইয়ের হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিলেন। জাফর ভাই তাতে স্বাক্ষর করে জিজ্ঞাসা করলেন কী আছে। বলা হল টাকা। তিনি বললেন হবিগঞ্জের গরিব ছাত্রদের যেন বৃত্তি দেয়া হয়। আরেকজন বলল অনেক টাকা। উত্তরে বললেন তাহলে অনেক ছাত্রকে বৃত্তি দেবেন। বিভিন্ন সময়ে অনেক অর্থ পুরস্কার পেয়েছেন, তাও নিশ্চয়ই নিজের কাজে ব্যয় করেননি।

একবার রোটারি ক্লাব তাকে অর্থ পুরস্কার প্রদান করল। বক্তব্যে তিনি বললেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা ফান্ডের অভাব। তাই তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরস্কারের অর্থ দিয়ে দেবেন। তখন আয়োজকরা জানালেন পুরস্কারের টাকা যা বলা হয়েছিল তার থেকে অনেক বেশি। তা শুনে তিনি বললেন গবেষণার জন্য তাহলে আরও ভালো হবে।

১০. দেশের প্রথম ক্যাম্পাস ব্যাকবোন নেটওয়ার্ক, প্রথম জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড, দাবার অলিম্পিয়াড শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে। ঢাকার বাইরে কেবল শাহজালাল থেকে এসিএম আইসিপিসিএর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেছে। শিক্ষকদের নিয়ে সমাজ ও জগৎ নিয়ে মঙ্গলবারের আড্ডাসহ ছাত্রদের যে নানারকম সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেছেন, মোবাইলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনপত্র গ্রহণের ব্যবস্থা করে ভর্তিচ্ছু ছাত্র এবং তাদের অভিভাবকদের দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের যাতে করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বারবার ভর্তি পরীক্ষা দিতে না হয় তার জন্য একটি উদ্যোগ নিয়েছেন, যার সফল বাস্তবায়নে নিশ্চয়ই পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ভোগান্তি অনেক কমবে। এগুলো জাফর ভাইয়ের সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার কয়েকটি উদ্যোগ মাত্র।

১১. আমি ভাবলাম আমেরিকার বেলল্যাব আর ক্যালটেক থেকে সরাসরি সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় কেমন করে হয়? ধীরে ধীরে খাপ খাওয়ানের জন্য হলেও অন্তত ঢাকায় একবার পা রাখা উচিত ছিল। জাফর ভাইকে বললাম ঢাকায় চলে আসেন, এখানে আরও বেশি উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হবে। লোভনীয় সুযোগও ছিল।

তাছাড়া তার ছেলেমেয়েরা বাবামায়ের সান্নিধ্যও পাবে। আমার স্থূল অনুভূতিজাত প্রশ্নের সহজ উত্তর ‘ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকি’। আমরা যেখানে প্রয়োজনে বিষয়, পেশা পরিবর্তন করে রাজধানীর বাসিন্দা হতে চাই, সেখানে তার ত্যাগী উদার মনোভাব অবশ্যই আমাদের জন্য অনুকরণীয়।

অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হল, জাফর ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরাও তার মতো জীবনদর্শনে বিশ্বাসী। যাদের জাফর ভাইয়ের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে আমি নিশ্চিত, তাদের প্রত্যেকেরই তার মধ্যে অতিমানবীয় নিঃস্বার্থ, উদার আচরণ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে।

একজন মানুষ কতটা উদার হতে পারে, কতটা নিঃস্বার্থ হতে পারে, কথা ও কাজে একজনের কতটা মিল থাকতে পারে, কতটা বিবেকতাড়িত হতে পারে, কতটা সমাজসচেতন হতে পারে, অন্যায়ের কতটা প্রতিবাদী হতে পারে, নৈরাশ্যের মধ্যে কতটা স্বপ্ন দেখতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি শতায়ু হয়ে আমাদের সমাজকে ঔদার্যে, ভালোবাসায়, মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করুন এই কামনা করছি।

. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বুয়েট