Archive

Archive for the ‘জীবনী’ Category

একাত্তরের বন্ধু সাংবাদিক মার্ক টালি

ডিসেম্বর 15, 2016 মন্তব্য দিন

mark-tullyসাইফ ইমন : একাত্তরের বিবিসি বলতে তৎকালীন সবাই মার্ক টালিকেই জানত। মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি ছিলেন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আশার আলো। যুদ্ধ চলাকালীন হারিকেন বা কুপির মিটি মিটি আলো জ্বালিয়ে রেডিওর এরিয়াল তুলে সকালসন্ধ্যা বিবিসিতে মার্ক টালির কথা শোনার জন্য উৎকণ্ঠিত থাকত পুরো দেশ। তিনি যখন কথা বলতেন পিনপতন নীরবতা সবদিকে। কী বলছেন তিনি! মুক্তিযোদ্ধারা নাকি একে একে নাজেহাল করে চলেছে পাকবাহিনীকে। তার কণ্ঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত প্রতিটি বাঙালির বুকে। ১৯৭১এ মার্ক টালির বয়স ছিল ৩৫ বছর। জীবনের ১০টি বছর বাঙালি পরিবেষ্টিত আঙিনায় কাটলেও পড়াশোনা করেন মার্লবরো ও ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। পাদ্রি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভর্তি হলেন লিঙ্কন থিওলজিক্যাল কলেজে, কিছু দূর এগোলেনও। তারপর বুঝতে পারলেন তার চাই গতিময় ও অনুসন্ধিত্সু জীবন। জীবনে চাই পদে পদে চ্যালেঞ্জ! তাই ১৯৬৪তে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বিবিসি রেডিওতে যোগ দেন মার্ক টালি। ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৫তে চলে এলেন দিল্লিতে। তখন থেকেই শুরু হলো তার পূর্ব পাকিস্তান পর্যবেক্ষণ।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিবিসি টিমে যারা কাজ করতেন তাদের অগ্রনায়কের আসনে ছিলেন এই মার্ক টালি। প্রতি মুহূর্তে বাঙালিদের চাঙ্গা করতে তার কণ্ঠের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রতি মুহূর্তে নিয়ে আসতেন তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা ভরপুর খবরাখবর। তার দাবি, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর হামলা চালানোর আগে হিসাবে ভুল করেছিল। এ প্রসঙ্গে মার্ক টালি বলেন, একাত্তরে বাঙালিদের ওপর আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিশাল ভুল করেছিল। আমি রাজশাহী গিয়েছিলাম এবং দেখেছিলাম সব গ্রাম আগুনে ভস্মীভূত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পুরো দেশকে ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করেছিল। পুরোদেশ যেন ভূতের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। খুব কাছ থেকে দেখছিলাম মানুষের সেই নিদারুণ কষ্ট। দগদগে ক্ষতগুলো! বাংলাদেশের অকৃতিম বন্ধু স্যার উইলিয়াম মার্ক টালিকে আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে আসছে বাংলাদেশের মানুষ।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্মাননা

সত্যিই অবিশ্বাস্য! চমৎকার লাগছে! বাংলাদেশের মানুষ আমাকে এই বিরল সম্মানে ভূষিত করেছে। আমি আমার সাধ্যমতো শিশু বাংলাদেশকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। এই সম্মাননা আমাকে আমার অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে! এক কথায় বলতে গেলে অনেক উত্তেজনাকর মুহূর্ত ছিল সেই দিনগুলো। এভাবেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্মাননা পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অকৃতিম এই বন্ধু। বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্মাননা নিতে ২০১২ সালের ১৮ ক্টোবর ঢাকায় আসেন স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি। এ ছাড়াও তিনি আরও কিছু সম্মাননায় ভূষিত হন। মার্ক টালি ১৯৮৫ সালে ওবিই পদবিতে ভূষিত হন। এরপর ১৯৯২ সালে পদ্মশ্রী পদক লাভ করেন। ২০০২ সালে নতুন বছরের সম্মাননা স্বরূপ নাইট উপাধি লাভ করেন। ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ পদক লাভ করেন। ভারতে অবস্থান করে তিনি ১৯৮৫ সালে তার প্রথম গ্রন্থ অমৃতসর : মিসেস গান্ধীজ লাস্ট ব্যাটেল প্রকাশ করেন। এতে তিনি তার সহকর্মী ও বিবিসি দিল্লির প্রতিনিধি সতীশ জ্যাকবকে নিয়ে এ গ্রন্থটি রচনা করেন। এ ছাড়াও ১৯৯২ সালে টালির অন্যতম সেরা গ্রন্থ নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া প্রকাশিত হয়।

বাঙালি মায়ের সন্তান

মার্ক টালির জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৫ অক্টোবর ধনাঢ্য ইংরেজ পরিবারে হলেও জন্মস্থান কিন্তু কলকাতায়। মার্ক টালির কেন এই বাংলাদেশের প্রতি নাড়ির বাঁধন অনেকেই হয়তো জানেন না। মার্ক টালির মা ছিলেন বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার মেয়ে। বাবা ব্রিটিশ রাজত্বে ব্যবসার সুবাদে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে পাট কিনতে আসতেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থায়িত্ব বেড়ে যায় তার মা বাঙালি বলে। তার পিতা ব্রিটিশ রাজের নিয়ন্ত্রণাধীন শীর্ষস্থানীয় অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ছিলেন। শৈশবের প্রথম দশকে ভারতে অবস্থান করেন। কিন্তু ভারতীয়দের সঙ্গে সামাজিকভাবে মেলামেশার সুযোগ পাননি তিনি।

ইংল্যান্ডের বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। টাইফোর্ড স্কুলে পড়ার পর ভর্তি হন মার্লবোরো কলেজে। এরপর ট্রিনিটি হলে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে বেশ কিছু দিন পড়াশোনা করেছেন তিনি। এরপর তিনি ক্যামব্রিজের চার্চ অব ইংল্যান্ডে পাদ্রি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লিঙ্কন থিওলজিক্যাল কলেজে দুই মেয়াদে পড়াশোনার পর এ চিন্তাধারা স্থগিত করেন। এখানে ভর্তি হয়ে খ্রিস্টান পাদ্রিদের আচরণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন।

ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন বা বিবিসির নয়া দিল্লি ব্যুরোর সাবেক প্রধান। ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে প্রধান পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। এর আগে বিবিসিতে প্রায় ৩০ বছর কর্মরত ছিলেন। দিল্লি ব্যুরোর প্রধান পদে ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন মার্ক টালি।

এছাড়াও তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। মার্ক টালি লন্ডনের ওরিয়েন্টাল ক্লাবের সদস্য।

সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৫ ডেসেম্বর ২০১৬

বহুমুখী নারী উদ্যোক্তা, সমাজসেবিকা ও শিক্ষাবিদ জয়া পতি

ডিসেম্বর 14, 2016 মন্তব্য দিন

joyapati-3joyapati

রোকেয়ার উত্তরসূরী

ডিসেম্বর 10, 2016 মন্তব্য দিন

rokeya-stampরোখসানা চৌধুরী : বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনই এই উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদী যিনি ধর্ম ও পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ করেছিলেন একই সঙ্গে। কোনো বিশেষ ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থকে নয়, বরং সকল ধর্ম ও তার ধারকবাহকপ্রহরীরূপী পুরুষকে। অথচ তাঁর নাম নিয়েই ঘটে গেছে সবচেয়ে বড় বিভ্রাট। উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদীর নামের তিনচতুর্থাংশই কৃত্রিমভাবে আরোপিত। পিতৃপ্রদত্ত নামটি ছিল মোসাম্মৎ রুকাইয়া খাতুন। বিয়ের পর তিনি মিসেস আর. এস. হোসেন নামে লিখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তার বিদ্রোহী সত্তাকে আড়াল করে একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম ভদ্রমহিলা অবয়ব প্রদানের অভিপ্রায়ে বেগম রোকেয়া নামে তাঁকে পরিচিত করা হয়। বর্তমানে বেগম রোকেয়া এবং রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনদুটি নামই জনসমাজে প্রচলিত, যার একটি নামও তাঁর প্রকৃত পরিচয় বহন করে না। নামজনিত এই বিভ্রাট অত্র অঞ্চলের অবিকশিত, বিভ্রান্ত নারীবাদী ভাবনার প্রতীক হয়ে ধরা দেয়। রোকেয়াপরবর্তী দীর্ঘ শূন্যতার প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রোকেয়াদর্শনের মূল আলোকপাত ঘটেছে প্রধানত তিনটি গ্রন্থে. সুলতানার স্বপ্ন, . পদ্মরাগ এবং ৩. অবরোধবাসিনী।
সুলতানার স্বপ্ন আখ্যানটি নারীবাদী বিশ্বের বা রাষ্ট্রের ভবিষৎ মেনিফেস্টো। পদ্মরাগ উপন্যাস বাস্তবতার সাথে সাযুজ্যতা রেখে তৎকালীন সম্ভাব্য স্বাধীন মনুষ্য অবয়বধারী নারীর রূপরেখা। অবরোধ ও পর্দাপ্রথা সম্পর্কে বেগম রোকেয়ার ভাবনা নিয়ে যত বিভ্রান্তি তার মোক্ষম উত্তর অবরোধবাসিনী গ্রন্থখানি স্বয়ং। তাঁর সমগ্র রচনাবলী এবং জীবনদর্শনে যে বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়েছে তা মোটের উপর নিম্নরূপ

. অবরোধপ্রথার অবলুপ্তি
. দপ্তর ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীপুরুষের সমন্বিত উদ্যোগ
. নারীর বিজ্ঞাননির্ভর কর্ম পরিকল্পনা
. নারীপুরুষের জড়তামুক্ত সহাবস্থান
. নারীর আত্মপ্রত্যয়ী ঋজু লিঙ্গনিরপেক্ষ শরীরী ভাষা (body language)
. দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত নারীর পরিবর্তিত বেশভূষা
. দেশজাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ছুৎমার্গবিহীন একত্রবাস তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্ময়কর প্রকাশ
. ক্ষুদ্র ও কৃষিশিল্পের সম্প্রসারণে নারীপুরুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক অলোচনা

স্থান স্বল্পতার জন্য রোকেয়ারচনার চুম্বক অংশবিশেষ পাঠকের জন্য বর্তমান প্রবন্ধে উপস্থাপন করা গেল:

. ধর্ম প্রসঙ্গে

যখনই কোন ভগ্নি মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন তখনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।তবেই দেখিতেছেন, এই ধর্মগ্রন্থগুলো পুরুষ রচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। কোন স্ত্রী মুনির বিধানে হয়তো তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। ধর্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বর প্রেরিত কিনা কেহই নিশ্চিত বলিতে পারে না। যদি ঈশ্বর কোন দূত রমনী শাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত বোধ হয় কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না। এখন আমাদের আর ধর্মের নামে নতমস্তকে নরের অযথা প্রভূত্ব সহা উচিৎ নহে। আরও দেখ, যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ় সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক।

কেহ বলিতে পারেন যে, তুমি সামাজিক কথা কহিতে গিয়া ধর্ম লইয়া টানাটানি কর কেন? তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, ধর্ম শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমনীর উপর প্রভূত্ব করিতেছেন। তাই ধর্ম লইয়া টানাটানি করিতে বাধ্য হইলাম। (রোকেয়া, কাদির, ১৯৭৩, পৃ. ১১১৩)

. পুরুষের স্বরূপ উন্মোচনে

. কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য। (ডেলিশিয়াহত্যা, রোর, ১৬২)

. নারীস্থানে স্বয়ং শয়তানকেই (পুরুষ জাতি) শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, দেশে আর শয়তানী থাকিবে কি রূপে? (সুলতানার স্বপ্ন, ১৩৪)

. তাহারা কিছুই করিবে নাতাহারা কোন ভালো কাজের উপযুক্ত নহে। তাহাদিগকে ধরিয়া অন্তঃপুরে বন্দি করিয়া রাখুন। (, ১৩৫)

. নারী যাহা দশ বৎসরে করিতে পারে, পুরুষ তাহা শতবর্ষেও করিতে অক্ষম।

. ডাকাতি, জুয়াচুরি, পরস্বাপহরণ, পঞ্চমকার আদি কোন পাপের লাইসেন্স তাহাদের নাই। (রোর, ৩৩৪)

. নারীর উদ্দেশ্যে

. আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি (রোর, ২৭৭)। প্রাণীজগতের কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয় নহে। (রোর, ৮৪)

. আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলিএগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ। কারাগারে বন্দীগণ পায়ে লৌহনির্মিত বেড়ি পরে, আমরা স্বর্ণরৌপ্যের বেড়ি অর্থাৎ মল পরি। উহাদের হাতকড়ি, লৌহনির্মিত, আমাদের হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্যনির্মিত চুড়ি। কুকুরের গলে যে গলবন্ধ (dog-collar) দেখি উহারই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয়া চিক নির্মিত হইয়াছে। গোস্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া নাকাদড়ি পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের নোলক পরাইয়াছেন!! নোলক হইতেছে স্বামীর অস্তিত্বের (সধবার) নিদর্শন।

. স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দৈর্ঘ মাপেন, স্ত্রী তখন বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ প্রস্থ মাপেন। (পৃ. ২৮)

প্রশ্ন জাগে, রোকেয়ার এই সব বিস্ফোরকভাবনার উৎস কোথায়? ভাই ও স্বামীর সহায়তায় সামান্য বাংলাইংরেজী শিখবার যে ইতিহাস প্রচলিত তাতে অন্তত এই ধরণের র‌্যাডিক্যাল ভাবনার জন্ম নেয়াটা অসম্ভব বলেই মনে হয়। তাই হয়তো রোকেয়া প্রসঙ্গে ঐ সময়ে রবীন্দ্রনাথের নীরব থাকাটাও সঙ্গত বলে মনে হতে থাকে আমাদের। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হই না আর। কারণ, রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য সমকালীন বিশিষ্ট লেখকেরা রোকেয়া সম্পর্কে বিস্ময়কর নীরবতা পালন করেছেন। ঠাকুর পরিবারের মেয়েরা শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি বেশভূষার পরিবর্তন, একাকী বিলেত ভ্রমণ পর্যন্ত ঠাকুর পরিবারের বিদ্রোহ সীমায়িত ছিল। নারীপুরুষের সমতার কাছাকাছি কোন ধারণা তাদের পক্ষে থেকে উত্থাপিত হয়নি। বরং শিক্ষাকে তারা গ্রহণ করেছিলেন সমাজ ও পরিবারে নারীর ঐতিহ্যিক ভূমিকাকে আরো বেশি নিপুণভাবে পরিবেশন করতে। (রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া, গোলাম মুরশিদ পৃ. ১৮৬)

তাই রবীন্দ্ররচনাতেও সত্যিকার অর্থে কোনো উদ্যোগী নারীর প্রতিচ্ছবি চোখে পড়ে না। বিনোদিনী, চারু, সুচরিতা, ললিতা, লাবণ্যকেতকী, কুমুদিনীএরা প্রত্যেকেই লেখালেখি, সামাজিক সাংগঠনিক কাজের মত সৃজনশীল কাজের সাথে জড়িত থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই হৃদয়ঘটিত জটিলতার আবর্তনে ঘুরপাক খেতে খেতে জীবনের সকল সম্ভাবনা পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।

বেগম রোকেয়া যখন লিখছেন, তখন তার সামনে উদাহরণস্বরূপ রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর ছিলেন। যারা ঠিক নারীবাদী না হলেও নারীমুক্তির পথে প্রধান প্রধান বাধাগুলো অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে উপমহাদেশে রোকেয়ার কোন পূর্বসূরী ছিল না। পূর্বসূরী না থাকাটা যৌক্তিক কারণেই মেনে নেয়া যায়। কিন্তুু আজকের একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে ভাবতে হচ্ছে, সেই রোকেয়ার যথার্থ উত্তরসূরী কোথায়? রোকেয়াভাবমূর্তিকে মহিমান্বিত করলেও বাংলাদেশের সমাজ বা রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে নিদেনপক্ষে নারী আন্দোলন কিংবা নারীর জীবন যাপনে প্রতিফলন কোথায়? যদিও আশান্বিত হবার মত পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছিলো।

সুফিয়া কামাল সরাসরি রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলামের সদস্যরূপে, স্বপ্রতিষ্ঠিত রোকেয়া সদনের পরিচালনায়, পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার প্রতিবাদ ও আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে প্রত্যক্ষভাবে রোকেয়াপদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত শিখা গোষ্ঠির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বে জাতীয় মহিলা পরিষদ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নারী পুর্নবাসন, মেয়েদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করবার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ধর্মে ও পরিবারে নারীর অধস্তন অবস্থান, ধর্মীয় আইনে নারীর সন্তান ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার ইত্যাদি নারীমুক্তি প্রসঙ্গে মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা পরবর্তীসময়ে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ও মৌলবাদের আগ্রাসন ঘটে। খোদ স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের নানা অনুষঙ্গকে বিতর্কিত করে তোলা হয়। স্বাভাকিভাবেই নারী মুক্তি অথবা নারী অধিকার প্রসঙ্গটি আন্দোলনের মূল ধারা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাধীনতার পর ধর্ষিতা বা নির্যাতিতা হবার বাইরে আর কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এমনকি সশস্ত্র নারী মুক্তিযোদ্ধারাও অধিকাংশই অপরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেছেন। বীর প্রতীক তারামন বিবিকে খুঁজে বের করে সম্মানিত করা হয়েছে স্বাধীনতার ২৫ বছর পর। তাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি অথবা উল্টো দিক থেকে নারীর জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে গভীর ভাবনায় খুব বেশি ইতিবাচক মনে হবার কথা না। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একাত্তর পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা দেশটির প্রশাসকগণ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায়। কিন্তুু পরিবারের অর্থনীতি, একই সাথে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সামলে তুলতে যে নারী ঘর থেকে বেরিয়ে এলোরাষ্ট্র সেই নারীর জন্য রাস্তাঘাট, যানবাহন, কর্মক্ষেত্রকোথাও নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা ভেবে দেখেনি। নারী যেপুরুষের (পিতা, স্বামী অথবা ভাই) ঘর থেকে বের হয় অথবা যেপুরুষের সাথে চলতে হয় (রাস্তাঘাট বা যানবাহন) এবং যাদের সাথে পরিবারের চাইতেও অধিক সময় ব্যয় করে (দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান) সেই পুরুষেরা আজও নারীকে তাদের অপ্রস্তুুত মানসিকতায় মাংসপিণ্ড ব্যতীত সহকর্মী ভাববার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ইভটিজিং, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপসহ নারীর প্রতি সহিংসতার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়ে আছে এভাবেই, যাকে মূল থেকে উৎপাটনের পরিকল্পনা করা হয়নি কখনোই। তাই নারী ঘরেবাইরে নিরাপত্তা, সম্মান, বা ন্যূনতম মানবিক অধিকারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তবে লড়াইটি অসংগঠিত, বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তএকথা প্রাজ্ঞজনেরাও স্বীকার করছেন।

নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম (যুদ্ধাপরাধীদের বিচার), নীলিমা ইব্রাহিম (মুক্তিযুদ্ধে আহতনির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন) কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যূতে ফলপ্রসু অবদান রেখেছেন। কিন্তু এইসব ধারাবাহিকতাহীন বিবিধ আন্দোলন অথবা দেশজুড়ে গৃহকর্মীদের পোশাকশিল্প কারখানায় কর্মীরূপে রূপান্তরনারীমুক্তি কিংবা নারীর অধিকার প্রসঙ্গে রোকেয়া বর্ণিত নারীর সার্বিক জীবনদর্শনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেনি। যেমনভাবে বেগম রোকেয়ার পরে আর কোনও লেখকের (নারী বা পুরুষ) রচনায় যথাযথ রূপে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের সাথে দ্বন্দ্বসংশিষ্টতার প্রেক্ষাপটে নারীর সম্ভাব্য স্বাধীন, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন অবয়বকে নিরূপণ করা যায়নি।

নব্বই দশকে এমত বিরাজমান স্থবির সময়ের মাঝপথে তসলিমা নাসরিনের আগমন পুরো পরিস্থিতিকে পাল্টে দেয়। ধর্ম, সমাজ ও পুরুষতন্ত্রকে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে তার প্রকাশিত আক্রমণাত্মক বক্তব্য নিয়ে দেশ ও বহির্বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মৌলবাদী ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রকাশ্যে তার হত্যামূল্য নির্ধারণ করলে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন। তার গ্রন্থগুলি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভের পাশাপাশি বাজেয়াপ্তও হয়। প্রশ্ন হচ্ছে তসলিমা নাসরীন যা যা বলেছিলেন, তা কি খুব অসম্ভব, উদ্ভট, আকস্মিক আবিষ্কৃত নতুন কোনো তত্ত্ব? ধর্ম, নারী এবং সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে তার আগেপরে ড. আহমদ শরীফ, . হুমায়ুন আজাদ, আরজ আলী মাতুব্বরসহ আরো বহু মনীষীই বিদ্বেষ, কটূক্তি, বিরুদ্ধভাব প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাদের দেশত্যাগ করতে হয়নি। আমজনতার সমাবেশে এঁদের নাম পর্যন্ত অনেকে অবগত নন। প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে বেগম রোকেয়া একশ বছর আগেই মত প্রকাশ করেছেন। পার্থক্য হল রোকেয়াকে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর তসলিমা নাসরিন বক্তব্যকে আরো বেশি তথ্যপ্রমাণ সহকারে উপস্থাপন করাতে তার মাথার মূল্য ধার্য হয়ে গেছে।

বলে রাখা ভালো, বর্তমান আলোচনাটি তসলিমা নাসরীনকে নিয়ে নয়, তার রচনা কুশলতার বিচার নিয়েও নয়। কেবল একটি প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশে নারীবাদের উদ্ভববিকাশের আশ্চর্য পরস্পরহীনতার যোগসূত্র অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হওয়া যায়। অর্থাৎ রোকেয়া যদি তার রচনা প্রত্যাহার না করতেন, তবে মাথার মূল্য নির্ধারণের আগেই অজানা অন্ধকারে তাকে হারিয়ে যেতে হত। এই আশ্চর্য মূল্য নির্ধারণের দুর্ভেদ্য বেষ্টনীকে অতিক্রম করা যায়নি বলেই কি নারীবাদের সহজস্বাভাবিক বিবর্তন ঘটেনি অত্র অঞ্চলে? তসলিমা নাসরীনের আগমন ও উপস্থিতি তাই পূর্বাপর সংযোগবিচ্ছিন্ন। বেগম রোকেয়ার মতই। এক শতাব্দী আগের প্রেক্ষাপট বলেই তাকে মহিমার দৃষ্টিতে বিচার করা সম্ভব হচ্ছে।

কথা হচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের নারী গ্রন্থে এবং বেগম রোকেয়ার রচনাতেও যতখানি পুরুষবিদ্বেষ এবং ধর্ম বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে, ততখানি নয় তসলিমা নাসরীনে। একটি সাক্ষাৎকারে (৭১টিভি, ৮ আগষ্ট ২০১৪) তিনি সেই কথা স্বীকারও করেছেন। অথচ রোকেয়া নারীজীবন সম্পর্কে যেখানে থেমে গিয়েছিলেন, তসলিমা নাসরিন অন্য সব কিছুর সঙ্গে নারীর সেই অকথিত যৌনজীবন সম্পর্কে মুখ খুললেন। অপ্রস্তুত বাঙালি সমাজ প্রয়োজনের অতিরিক্ত চমকে গেল। মূলত তসলিমা নাসরিনের বিবৃত নারীবাদের সমালোচনা হিসেবে দুটি বিষয়কে গণ্য করেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ কিংবা সমাজ তাত্ত্বিকেরা।

. দেশকালসমাজইতিহাসের প্রেক্ষিতে বাঙালি নারী মুক্তির বিষয়টি সমন্বিত করে দেখতে না পারা।

. ভাবনাসমূহের বিচ্ছিন্নতা, ব্যক্তিগত ক্ষোভের তীব্রতা সামগ্রিক বিষয়টির তত্ত্বীয় রূপদানে ব্যর্থতা।

তবে তাঁর এইসব সীমাবদ্ধতাকে সমাজের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দিক নির্দেশনার অপরিপক্কতার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ (নারী,পুরুষ ও সমাজ/পৃ.১২৩)। তাছাড়া, তার রচনাবলীর সামগ্রিক নিবিড় পাঠেরও অভাব রয়েছে বলে বোধ হয়। যেভাবে রোকেয়ারচনার বিদ্রোহী প্রতিবাদী অংশগুলো আজো জনসমাজে অজানিতই রয়ে গেছে। অর্ধশিক্ষিত জাতি, যারা আজো বিনোদন খুঁজে পায় দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান গ্রন্থে, অথবা ধর্মীয় গ্রন্থের (মাকছুদুল মোমেনীন) দাম্পত্য জীবন অংশে, তারা যে নারী রচিত গ্রন্থে নারীর যৌনজীবন সম্পর্কে উন্মুক্ত আলোচনায় গোপন আনন্দ খুঁজবে আর প্রকাশ্যে তার মৃত্যুদণ্ড দাবি করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যি কথা বলতে গেলে, বিচ্ছিন্নভাবে হলেও নারীর প্রধান দুটি শত্রু মৌলবাদ ও পুঁজিবাদকে চিহ্নিত করতে তিনি ভুল করেন নি।

দীর্ঘ গণআন্দোলন এবং সশস্ত্র একটি জনযুদ্ধের পরেও স্বাধীন দেশে নারীমুক্তির বিষয়টি কখনো গুরুত্ব পায়নি। তাই দেখা যায় অতীত ইতিহাসেও প্রীতিলতা কিংবা ইলা মিত্র অথবা একাত্তরের বীরযোদ্ধা তারামনদের যুদ্ধক্ষেত্রেও জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নারীকে মানসিকভাবে ভেঙেচুরে দেবার জন্য ধর্ষণ নামক নির্যাতনটিকে ক্রমাগত ব্যবহার করা হয়। ইলা মিত্রসহ অগনিত নারী যার শিকার ছিলেন। তারামন এবং আরো অনেককেই প্রথমে পরীক্ষাস্বরূপ রান্নার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে তারা যুদ্ধে যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে জয় করার যুদ্ধটি নারীর প্রথম যুদ্ধ। তা সংসারই হোক কিংবা যুদ্ধক্ষেত্র। এতগুলো যুদ্ধে উত্তীর্ণ হওয়ার মাঝপথে মানসিক দাসত্বের কাছে পরাজিত হয়ে সংসারের একটি নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবরূপে নারী ঘরে ফিরে যায়। এই ফিরে যাওয়ার মিছিলটিই দীর্ঘ এবং হতাশাব্যঞ্জক।

বেগম রোকেয়া এবং হুমায়ুন আজাদের রচনার যেখানে সাদৃশ্য দেখা যায় তা হলো তারা দুজনেই নারী মুক্তির ক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়নকে এতটা জোরালোভাবে প্রাধান্য দেন যেখানে পুরুষের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই ম্রিয়মান হয়ে পড়বে। উনিশশতক পূর্ব নারীর মত পুরুষের অস্তিত্ব সেখানে আবছায়ার আড়ালে ঝাপসা হয়ে থাকবে।

. নন্দনকাননতুল্য নারীস্থানে নারীর পূর্ণ আধিপত্য। পুরুষেরা মর্দানায় থাকিয়া রন্ধন করেন, শিশুদের খেলা দেন (সুলতানার স্বপ্ন/পৃ. ১১৩)

. পুরুষেরা বড় বড় কলকারখানায় যন্ত্রাদি পরিচালিত করেন; খাতাপত্র রাখেন– …তাহারা কেরানী ও মুটে মজুরের কাজ করিয়া থাকেন। (সুলতানার স্বপ্ন/পৃ. ১১৪) এদিক থেকে দুজনার ভাবনাই প্রবলভাবে র‌্যাডিক্যাল। হুমায়ুন আজাদ মাতৃত্বকে নারী মুক্তির পথে প্রতিবন্ধকরূপে উপস্থাপন করেছেন।

. নিজের ভবিষ্যতের জন্য নারীকে ত্যাগ করতে হবে পিতৃ ও পুরুষতন্ত্রের সমস্ত শিক্ষা ও দীক্ষা; ছেড়ে দিতে হবে সুমাতা, সুগৃহিনী, সতীর ধারণা; … তাকে কান ফিরিয়ে নিতে হবে পুরুষতন্ত্রের সমস্ত মধুর বচন থেকে, তাকে বর্জন করতে হবে পুরুষতন্ত্রের প্রিয় নারীত্ব। তাকে সাবধান হতে হবে পুরুষতন্ত্রের সমস্ত মহাপুরুষ সম্বন্ধে, সন্দেহের চোখে দেখতে হবে সবাইকে। কেননা কেউ তার মুক্তি চায়নি। (নারী/হু. আজাদ পৃ. ৩২৬)

. নারীর গর্ভধারণ একান্ত পাশবিক কাজ। নারীকে কি চিরকালই ধারণ করে যেতে হবে গর্ভ, পালন করে যেতে হবে পশুর ভূমিকা? …পুরুষতন্ত্রের শিক্ষার ফলে নারী আজো মনে করে গর্ভধারনেই তার জীবনের সার্থকতাগর্ভবতী হওয়ার মধ্যে জীবনের কোনা সার্থকতা, মহত্ত্ব, পূণ্য নেই। আমূল নারীবাদীরা মনে করেন মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর নয়, পুরুষকে উদ্ভাবন করতে হবে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প পথ; এবং কয়েক শ বছর পর গর্ভধারণ যে আদিম পাশবিক কাজ বলে গণ্য হবে তাতে সন্দেহ নেই। (/পৃ৩২০)

রোকেয়া পদ্মরাগ কিংবা সুলতানার স্বপ্নে যেভাবে নারীকে প্রশাসনিক দাপ্তরিক কাজে ব্যাপৃত দেখান সেখানে কোথাও নারীর মাতৃরূপটির উপস্থিতি নেই। অথবা ঘরেবাইরে নারীর একাধিক ভূমিকা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যেসব জটিলতা সৃষ্টি হয়ে থাকে সেই বিষয়গুলো সঙ্গত কারণেই তিনি দৃষ্টি এড়িয়ে গেছেন। নারী মুক্তির পথে বিবাহসংসারপুরুষতান্ত্রিক সমাজের সকল শৃঙ্খলকে তিনি উপেক্ষা করতে বলেছেন। তবে কি ধরে নেয়া যায়, র‌্যাডিক্যাল নারীবাদীদের মত তিনিও নারীপুরুষের জীববৈজ্ঞানিক বৈষম্যে বিশ্বাসী ছিলেন? রোকেয়া একটি বিষয়েই সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করে গেছেন। তা হল নারীর যৌনজীবন। হয়তো লেখালেখির শুরুতেই ধর্ম বিষয়ক বিদ্রোহ প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হয়ে সতর্ক হয়েছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় অবরোধ ও পর্দাপ্রথা নিয়ে ক্রমাগত স্ববিরোধী বক্তব্য প্রকাশে। নিদেনপক্ষে তিনি নারীশিক্ষার প্রকল্পটি চালু রাখতে মরণপণ করেছিলেন। (অন্যত্র জানা যায়, তিনি মেয়েদের জন্য কলেজ খুলতেও আগ্রহী ছিলেন।) তাই শেষ জীবনে অনেক রকমের আপোসকামিতার সঙ্গে সমঝোতা করতে থাকা এই যুগান্তরী মহামানবীর তীব্র ক্ষোভ অপ্রকাশিতও থাকেনি।

. আমার স্কুলটা আমার প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয়। একে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি সমাজের অযৌক্তিক নিয়ম কানুনগুলিও পালন করছি। (সওগত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনকে।)

. তবু পর্দা করছি কেন জানেন? বুড়ো হয়ে গেছি, মরে যাব। ইস্কুলটা এতদিন চালিয়ে এলাম, আমার মরার সঙ্গে সঙ্গে এও যদি মরে সেই ভয়ে। (ইব্রাহিম খাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকার)

. জীবনের ২৫ বছর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইতেছি। (রোর/৩৮০)

. হাড়ভাঙ্গা গাধার খাটুনিইহার বিনিময় কি জানিস? … ভাড় লিপকে হাত কালি অর্থাৎ উনুন লেপন করিলে উনুন তো বেশ পরিষ্কার হয়, কিন্তু যে লেপন করে তাহারই হাতে কালিতে কালো হইয়া যায়। আমার হাড়ভাঙা খাটুনির পরিবর্তে সমাজ বিস্ফারিত নেত্রে আমার খুঁটিনাটি ভুল ভ্রান্তির ছিদ্র অন্বেষণ করিতেই বদ্ধপরিকর। (রোর/পত্র/পৃ.৪৯৯)

বিদ্যাসাগর পরাধীন দেশে বিধবা বিবাহ আইন পাস করিয়েছিলেন (১৮৫৬) কিন্তু তার সার্থক প্রয়োগ দেখে যেতে পারেননি। এত বছর পর বিধবা বিবাহে কোন সামাজিক বা আইনি বাধা না থাকলেও যেনতেন ভাবে বিবাহ, সন্তান ও সংসারই যে নারীজীবনের প্রধান লক্ষ্য ও গন্তব্যসেই শৃঙ্খল থেকে নারী আজো বের হতে পারেনি। যেখানে এক শতাব্দী আগেই রোকেয়া উচ্চারণ করেছিলেন নারীমুক্তির অমোঘ বাণী:আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসার ধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে। (পদ্মরাগ/রোর/৪৫৩)

রোকেয়ারচনায় আধুনিক নারীর পূর্ণাঙ্গ জীবনের স্বয়ম্ভূ রূপরেখার নির্মাণ থাকলেও আজকের বাংলাদেশে সেই নারী কোথায়? শিক্ষাসুযোগঅধিকার সবকিছুই হয়তো প্রত্যাশিত রকমের বৈষম্যরহিত হয়ে যায়নি, কিন্তুু যতটুকু দূরত্ব পেরোনো গেছে, ছায়াভূতের মতো সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছে রোকেয়া কথিত ানসিক দাসত্বস্বয়ং নারীর সমাজের, উভয়ত। নারী আজ অবোরোধের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষিত, শিল্পিত, স্বাধীন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রীতদাসে রূপান্তরিত পুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণকারী ছায়ামূর্তি মাত্র। আজকের যুগের এই নারীদের জন্য রোকেয়ার কণ্ঠই পুনরায় প্রতিধ্বনিত হোক:অতএব জাগো, জাগো গো ভগিনী।

প্রথমে জাগিয়া উঠা সহজ নয় জানি; সমাজ মহা গোলযোগ বাধাইবে জানি, ভারতবাসী মুসলমান আমাদের জন্য কৎলএর (অর্থাৎ প্রাণদণ্ডের) বিধান দিবেন এবং হিন্দু চিতানল বা তুষানলের ব্যবস্থা দিবেন জানি! (এবং ভগ্নিদিগেরও জাগিবার ইচ্ছা নাই জানি!) কিন্তু সমাজের কল্যাণের নিমিত্ত জাগিতে হইবেই। কারামুক্ত হইয়াও গ্যালিলিও বলিয়াছিলেন, কিন্তু যাহাই হউক পৃথিবী ঘুরিতেছে (but nevertheless it does move)!! … সমাজের সমঝদার (reasonable) পুরুষেরা প্রাণদণ্ডের বিধান নাও দিতে পারেন, কিন্তু unreasonable অবলা সরলাগণ; (যাহারা যুক্তি তর্কের ধার ধারে না, তাহারা) শতমুখী ও আঁইস বঁটির ব্যবস্থা নিশ্চয় দিবেন, জানি!! (রোকেয়া রচনাবলী/পৃ.২০)

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

মরহুম সিরাজুদ্দীন হোসেন – টোটাল নিউজ এডিটর

ডিসেম্বর 10, 2016 মন্তব্য দিন

total-news-editor

বিপ্লবী চিন্তাধারার সুফি মওলানা ভাসানী

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

সৈয়দ ইরফানুল বারী : তৌহিদ প্রশ্নে মওলানা ভাসানীকে কখনও উদাসীন থাকতে দেখিনি। সে তৌহিদ ওয়াহ্দাতুল অজুদের নাকি ওয়াহ্দাতুশ শুহুদেরএ প্রশ্নের জবাব এ লেখায় সম্ভব নয়। তবে এতটুকু লিখতেই হয়, মওলানা ভাসানী বিপ্লবী চিন্তাধারার একজন সুফি ছিলেন। আলেম সমাজ দূরদূরান্ত থেকে সন্তোষে আসতেন এবং নানা প্রশ্নের অবতারণা করতেন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে মহাচীনের প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাইএর মৃত্যুতে মওলানা ভাসানীর প্রেরিত বার্তার শেষ বাক্য গধু অষষধয নষবংং যরং ংড়ঁষ প্রসঙ্গে আলেমরা বললেন, যিনি স্রষ্টায় বিশ্বাসী নন, যিনি আত্মার অমরত্বে বিশ্বাসী নন তার জন্য এ মোনাজাত কেন? মওলানা ভাসানী অতিশয় সহজ ভাষায় বললেন, ৭০ কোটি মানুষের দেশ থেকে তারা সব নকল খোদা তাড়িয়েছে। এটাই বা কম কিসে? লাইলাহা আগে, তার পরে ইল্লাল্লাহ্। তোমরা তো নকল খোদার বেড়াজালে হাবুডুবু খাচ্ছ। আসল খোদার সন্ধান পাবে কীভাবে? ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবরে একই মাত্রার কথা বলেছিলেন ১৯৪০ দশকের তুখোড় রাজনীতিক, ষাটের দশকে ইসলামিক একাডেমির ডায়রেক্টর আবুল হাসিমকে। তিনি চীনের বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা টেপরেকর্ডারে মওলানা ভাসানীকে শুনাতে ঢাকা থেকে সন্তোষে এসেছিলেন। মনোযোগ সহকারে শুনে বললেন, খুব ভালো বলেছেন। কিন্তু একটা কথা বাদ পড়ে গেছে। আবুল হাসিম বললেন, বলুন শুনে রাখি। চান্স পেলে পরে বলব। মওলানা ভাসানী বললেন, আপনি বলতে পারতেন, চীনারা সব নকল খোদা ঝেঁটিয়ে তাড়িয়েছে। এ কাজ মস্ত ঈমানদারের কাজ। ময়দান থেকে আগাছা সাফ করা হয়েছে। এবার কেবল আসল খোদাকে বসিয়ে দিলেই তো হক্কুল ইবাদের সঙ্গে হক্কুল্লাহও আদায় হয়ে যায়। আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী, প্যাপিরাস সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৫৬।

এই দেশে, বাঙালি মুসলমানের মধ্যে আবির্ভূত প্রত্যেক বড় নেতা শেরে বাংলা, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শুধু রাজনীতির খাতিরে নয়, ধর্মীয় চেতনায়ও সবাই উদার, অসাম্প্রদায়িক। এদের দিয়ে যখন ইতিহাসের পর ইতিহাস সৃষ্টি হল, জাতিসত্তার বিকাশ হল, একটি সহনশীল, ধর্মপ্রাণ জাতি সৃষ্টি হল, তখন কেন ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর শক্তি আবির্ভূত হল? এ প্রশ্নের জবাব একশ দুইশ বছরে নয়, খুঁজতে হবে আদি দিনগুলোতে। এ শক্তির আবির্ভাব আকস্মিক বিপথগামিতা নয়। তারা একটি ইতিহাস, একটি মতাদর্শ ধারণ করে। তাই তাদের এত একমুখীনতা এবং নির্মম কঠোরতা। ভ্রান্ত মতাদর্শটির উদ্ভব চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.)-এর জীবিতকালেই হয়েছে। অভ্রান্ত আদর্শ অর্থাৎ হজরত আলীর (রা.) আদর্শ যেমন আজও আছে, তেমনি ভ্রান্ত মতাবলম্বীরাও টিকে আছে। ইতিহাসে এরা খারেজি সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। এদের প্রসঙ্গে ভারতের প্রখ্যাত গবেষক ও লেখক সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভি লিখেছেন, এ সম্প্রদায়ের স্বভাবপ্রকৃতিতে স্থূলবাদিতা, পরমত অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদিতা ও স্ববিরোধিতা এমন মূর্ত হয়ে উঠেছিল যা বিগত ধর্মগুলোর কোনো সম্প্রদায়ে কিংবা ইসলামের ইতিহাসে আত্মপ্রকাশকারী কোনো দলের মাঝে দেখা যায়নি। হজরত আলী (রা.)- জীবন খিলাফত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১৭৩।

খারেজি সম্প্রদায়ের লোকগুলো হজরত আলী (রা.)-এর সৈন্যবাহিনীর একটি বিদ্রোহী অংশ, যাদের বিরুদ্ধে তিনি চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন যা নাহরোয়ান যুদ্ধ নামে খ্যাত। এ যুদ্ধে খারেজিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব ও চিন্তাদর্শন নির্মূল হয়ে যায়নি। সৈয়দ নদভি আরও লিখেছেন, খারেজিরা ছিল খুবই স্থূল দৃষ্টির অধিকারী এবং অদূরদর্শী। প্রতিপক্ষের মতামতের ব্যাপারে তাদের চিন্তা ছিল খুবই সংকীর্ণ। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও তারা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের সাহস ও শৌর্যবীর্যের অধিকারী। কথায় ও কাজে ছিল অতি স্পষ্টবাদী। আকিদা ও বিশ্বাসের জন্য জীবন বিসর্জন করা ছিল তাদের কাছে অতি সহজ বিষয়। খেজুর গাছের নিচে পড়ে থাকা একটি খেজুর খেতে তারা মালিকের অনুমতি নেয়া হয়নি বলে ইতস্তত করত এবং মুখ থেকে থুথু করে ফেলে দিত; অথচ মুসলমানদের রক্তপাতের ব্যাপারে ছিল দ্বিধাহীন। তাদের চিন্তায় বিশ্বাসী নয়, শুধু এই অপরাধে যে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করার ব্যাপারে তারা মোটেও কুণ্ঠিত হতো না। আব্দুর রহমান ইব্ন মুলজিম হজরত আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)কে হত্যা করার পর দেখা গেল দিনরাত সে শুধু কোরআন তিলাওয়াত করছে। তিলাওয়াতের মর্ম হল, আলীকে খুন করা দোষের নয়। তিলাওয়াতকারী না হওয়াটা দোষের।

হাজার বছর টিকে থেকে এরাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের (১৬৯১১৭৬৫) নেতৃত্বে রাজনৈতিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। সৌদি আরব তার প্রমাণ। একই মতাদর্শের হলেও আইএস অর্থাৎ ইসলামিক স্টেটওয়ালারা খিলাফত বনাম রাজতন্ত্রের প্রশ্নে সৌদি আরবের প্রতি শত্রভাবাপন্ন। যারা শুরুতে খারেজি তারাই কালক্রমে হয়ে যায় সালাফি পরিচয়দানকারী। সালাফিরা আদর্শগত এবং রাজনৈতিকভাবে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাবের অনুসারী। আলীবিদ্বেষ দিয়ে শুরু করে তারা শেষ পর্যন্ত মহানবী (সা.)কে বড় ভাই তুল্য ভাববার আকিদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তৎস্থলে অর্থাৎ নবীর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য এবং একান্ত মহব্বৎ পোষণের পরিবর্তে সালাফিরা/ওয়াহ্হাবিগণ খারেজিদের কালিমালা হুকমা ইল্লাল্লাকে প্রকৃত ঈমান হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা মনে করে, তারাই শুধু তৌহিদ ধারণ করে আছে। মুসলমান হলেও বাকি সব মুশরিক। তাই হত্যাযোগ্য। সুফিদের প্রভাবে বাংলা অঞ্চলে এদের সংখ্যা ছিল স্বল্প। এখনও স্বল্প। কিন্তু মাজহাবপন্থী তরুণযুবাদের বিভ্রান্ত ও একমুখী করে হাজার বছর আগের খারেজিদের মতো হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। তবে এও সত্য, সালাফি/ওয়াহ্হাবি মাত্রই যুদ্ধংদেহী নয়। অধিকাংশই ঈমান ও আমল নিয়ে সন্তুষ্ট। এর পরও সংঘাত থেকেই গেছে।

এই হল হাজার বছরের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ভিত্তি যা বাংলাদেশের মতো উদারমানবতাবাদী সংস্কৃতির দেশে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে চমক সৃষ্টি করতে পেরেছে। এর অবসান কেবলমাত্র আইন দিয়ে হবে না। এর মোকাবিলায় শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর যুগপৎ আধ্যাত্মিকরাজনৈতিক চিন্তাধারাকে সামনে আনতে হবে; এ মতপথকে যারা বিকশিত করেছেন, যারা যুগের দাবি অনুযায়ী লালনপালন করেছেন তাদের প্রজ্ঞা ও কর্মকে জাতির কাছে রাষ্ট্রীয়ভাবে তুলে ধরতে হবে। আমি মনে করি, এতে প্রকারান্তরে মওলানা ভাসানীর ধর্মচিন্তার চর্চা, তার রাজনীতির মূল আবেদনের অনুশীলন দেশবাসী বিশেষ করে তরুণ শ্রেণী ও যুবসমাজ গ্রহণ করবে। একটি নতুন লড়াই এগিয়ে যাবে। একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৭৩৭৪।

লেখক : কোর্স টিচার, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল।

ব্যক্তিগত জীবনে কেমন ছিলেন বিশ্বনবী

ডিসেম্বর 9, 2016 মন্তব্য দিন

. মুহাম্মদ আবদুল হাননান : মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বগুণে গুণান্বিত অতি মহৎ একজন মানুষ ছিলেন এবং মানুষের দৃষ্টিতেও তিনি অত্যন্ত মর্যাদাশীল ছিলেন।

তাঁর চেহারা মোবারক পূর্ণিমার চাঁদের মতো ঝলমল করত।

মাঝারি গড়নবিশিষ্ট ব্যক্তি থেকে কিছুটা লম্বা, আবার অতি লম্বা থেকে খাটো ছিলেন তিনি।

মাথা মুবারক সুসংগতভাবে বড় ছিল। কেশ মুবারক সামান্য কুঞ্চিত ছিল, মাথার চুলে অনিচ্ছাকৃতভাবে আপনাআপনি সিঁথি হয়ে গেলে সেভাবেই রাখতেন, অন্যথায় ইচ্ছাকৃতভাবে সিঁঁথি তৈরি করার চেষ্টা করতেন না। চিরুনি ইত্যাদি না থাকলে এরূপ করতেন। আর চিরুনি থাকলে ইচ্ছাকৃত সিঁথি তৈরি করতেন। কেশ মুবারক লম্বা হলে কানের লতি অতিক্রম করে যেত।

শরীর মুবারকের রং ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল আর ললাট ছিল প্রশস্ত। ভ্রুদ্বয় বক্র, সরু ও ঘন ছিল। উভয় ভ্রু পৃথক পৃথক ছিল, মাঝখানে সংযুক্ত ছিল না। ভ্রুদ্বয়ের মাঝখানে একটি রগ ছিল, যা রাগের সময় ফুলে উঠত।

তাঁর নাসিকা উঁচু ছিল, যার ওপর একপ্রকার নূর ও চমক ছিল। যে প্রথম দেখত সে তাঁকে উঁচু নাকওয়ালা ধারণা করত। কিন্তু গভীরভাবে দৃষ্টি করলে বুঝতে পারত যে সৌন্দর্য ও চমকের দরুন উঁচু মনে হচ্ছে, আসলে উঁচু নয়।

দাড়ি মুবারক ভরপুর ও ঘন ছিল। চোখের মণি ছিল অত্যন্ত কালো। তাঁর গণ্ডদেশ সমতল ও হালকা ছিল এবং গোশত ঝুলন্ত ছিল না। তাঁর মুখ সুসংগতপূর্ণ প্রশস্ত ছিল।

তাঁর  দাঁত মুবারক চিকন ও মসৃণ ছিল এবং সামনের দাঁতগুলোর মধ্যে কিছু কিছু ফাঁক ছিল।

তাঁর গ্রীবা মুবারক সুন্দর ও সরু ছিল। তাঁর রং ছিল রুপার মতো সুন্দর ও স্বচ্ছ। তাঁর সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সামঞ্জস্যপূর্ণ ও মাংসল ছিল।

আর শরীর ছিল সুঠাম। তাঁর পেট ও বুক ছিল সমতল এবং বুক ছিল প্রশস্ত। উভয় কাঁধের মাঝখানে বেশ ব্যবধান ছিল। গ্রন্থির হাড়গুলো শক্ত ও বড় ছিল (যা শক্তিসামর্থ্যের একটি প্রমাণ)। শরীরের যে অংশে কাপড় থাকত না, তা উজ্জ্বল দেখাত। বুক থেকে নাভি পর্যন্ত চুলের সরু রেখা ছিল। তা ছাড়া বুকের উভয় অংশ ও পেট কেশমুক্ত ছিল। তবে উভয় বাহু, কাঁধ ও বুকের উপরিভাগে চুল ছিল।

তাঁর হাতের কবজি দীর্ঘ এবং হাতের তালু প্রশস্ত ছিল। শরীরের হাড়গুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সোজা ছিল। হাতের তালু ও উভয় পা কোমল ও মাংসল ছিল। হাতপায়ের আঙুলগুলো পরিমিত লম্বা ছিল। পায়ের তালু কিছুটা গভীর এবং কদম মুবারক এরূপ সমতল ছিল যে পরিচ্ছন্নতা ও মসৃণতার দরুন পানি আটকে থাকত না, সঙ্গে সঙ্গে গড়িয়ে পড়ত।

তিনি যখন পথ চলতেন, তখন শক্তি সহকারে পা তুলতেন এবং সামনের দিকে ঝুঁকে চলতেন, পা মাটির ওপর সজোরে না পড়ে আস্তে পড়ত। তাঁর চলার গতি ছিল দ্রুত এবং পদক্ষেপ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হতো, ছোট ছোট কদমে চলতেন না। চলার সময় মনে হতো যেন তিনি উচ্চভূমি থেকে নিম্নভূমিতে অবতরণ করছেন।

যখন কোনো দিকে মুখ ঘোরাতেন, তখন সম্পূর্ণ শরীরসহ ঘোরাতেন। তাঁর দৃষ্টি নত থাকত এবং আকাশ অপেক্ষা মাটির দিকে অধিক নিবদ্ধ থাকত।

সাধারণত চোখের এক পার্শ্ব দিয়ে তাকাতেন। অর্থাৎ লজ্জা ও শরমের দরুন কারো প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি খুলে তাকাতে পারতেন না।

চলার সময় তিনি সাহাবিদের সামনে রেখে নিজে পেছনে থাকতেন।

কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি আগে সালাম করতেন।

বিশ্বনবী (সা.) সর্বদা আখিরাতের চিন্তায় মশগুল থাকতেন। সর্বক্ষণ উম্মতের কল্যাণের কথা ভাবতেন। দুনিয়াবি জিনিসের মধ্যে তিনি কোনো প্রকার শান্তি ও স্বস্তি পেতেন না।

বিনা প্রয়োজনে কোনো কথা বলতেন না, বেশির ভাগ সময় চুপ থাকতেন। তিনি আদ্যপান্ত মুখ ভরে কথা বলতেন। জিহ্বার কোণ দিয়ে চাপা ভাষায় কথা বলতেন না যে অর্ধেক উচ্চারিত হবে আর অর্ধেক মুখের ভেতর থেকে যাবে, যেমন আজকাল অহংকারীরা করে থাকে।

তিনি এমন সারগর্ভ ভাষায় কথা বলতেন, যাতে শব্দ কম কিন্তু অর্থ বেশি থাকত। তাঁর কথা একটি অন্যটি থেকে পৃথক হতো। অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কথা বলতেন না, আবার প্রয়োজন অপেক্ষা এরূপ কমও না যে উদ্দেশ্যই পরিষ্কার বোঝা যায় না।

তিনি নরম মেজাজ ও স্বভাবের ছিলেন, কঠোর মেজাজি ছিলেন না। তিনি কাউকে হেয় করতেন না। আল্লাহর নিয়ামত যত সামান্যই হোক না কেন, তিনি তাকে বড় মনে করতেন। নিয়ামতের নিন্দা করতেন না, আবার মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসাও করতেন না। নিন্দা না করার কারণ যেহেতু আল্লাহ তাআলার নিয়ামত। আর অতিরিক্ত প্রশংসা না করার কারণ ছিল এই যে এতে লোভ হচ্ছে বলে সন্দেহ হতে পারে।

দ্বীনি বিষয় ও হকের ওপর হস্তক্ষেপ করা হলে তাঁর ক্রোধের সামনে কেউ টিকতে পারত না, যতক্ষণ না তিনি এর প্রতিকার করতেন, দ্বীনের ব্যাপারে তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হতো না।

তিনি দুনিয়া বা দুনিয়ার কোনো বিষয়ে রাগান্বিত হতেন না। কারণ তাঁর দৃষ্টিতে দুনিয়া ও দুনিয়াবি বিষয়ের কোনো গুরুত্ব ছিল না। তবে দ্বীনি বিষয় বা হকের ওপর কেউ হস্তক্ষেপ করলে ক্রোধে তাঁর চেহারা এরূপ পরিবর্তন হয়ে যেত যে তাঁকে কেউ চিনতে পারত না।

তিনি নিজের জন্য কখনো কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন না। নিজের জন্য প্রতিশোধও নিতেন না।

যখন কোনো কারণে কোনো দিকে ইশারা করতেন, তখন সম্পূর্ণ হাত দ্বারা ইশারা করতেন। বিনয়ের খেলাপ বলে আঙুল দ্বারা ইশারা করতেন না।

তিনি আশ্চর্যবোধকালে হাত মুবারক উল্টে দিতেন। কথা বলার সময় কখনো (কথার সঙ্গে) হাত নাড়তেন, কখনো ডান হাতের তালু দ্বারা বাঁ বৃদ্ধাঙুলির পেটে আঘাত করতেন।

কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হলে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন ও অমনোযোগিতা প্রকাশ করতেন অথবা তাকে মাফ করে দিতেন।

যখন তিনি খুশি হতেন, তখন লজ্জায় চোখ নিচু করে ফেলতেন। তাঁর বেশির ভাগ হাসি মুচকি হাসি হতো। আর সেই সময় তাঁর দাঁত মুবারক শিলার মতো শুভ্র ও উজ্জ্বল দেখাত।

মহানবী (সা.) ব্যক্তিগত প্রয়োজনে (অর্থাৎ আহারনিদ্রা ইত্যাদির জন্য) ঘরে যেতেন। এ ব্যাপারে তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি তাঁর ঘরে থাকাকালীন তিন ভাগে ভাগ করতেন

. এক ভাগ আল্লাহর ইবাদতের জন্য।

. এক ভাগ পরিবারপরিজনের হক আদায়ের জন্য।

. এক ভাগ নিজের (আরাম ও বিশ্রাম ইত্যাদির) জন্য।

তারপর নিজের অংশকেও নিজের মধ্যে ও উম্মতের অন্যান্য লোকের মধ্যে দুই ভাগ করতেন। অন্যদের জন্য যে ভাগ হতো, তাতে অবশ্য বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম (রা.) উপস্থিত হতেন এবং তাঁদের মাধ্যমে তাঁর কথাবার্তা সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছত।

তিনি তাদের কাছে (দ্বীনি ও দুনিয়াবি উপকারের) কোনো জিনিসই গোপন করতেন না। নির্দ্বিধায় সব রকমের উপকারী কথা বলে দিতেন।

উম্মতের এই অংশে তিনি জ্ঞানীগুণীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দিতেন এবং এই সময়কে তিনি তাদের মধ্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে বণ্টন করতেন। তাদের মধ্যে হয়তো কেউ একটি প্রয়োজন, কেউ দুটি এবং কেউ অনেক প্রয়োজন নিয়ে আসত। তিনি তাদের প্রয়োজনের প্রতি মনোযোগী হতেন এবং তাদের এমন কাজে মশগুল করতেন, যাতে তাদের ও পুরা উম্মতের সংশোধন ও উপকার হয়। তিনি তাদের কাছে সাধারণ লোকদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন ও প্রয়োজনীয় কথা তাদের বলে দিতেন এবং বলতেন, তোমাদের যারা উপস্থিত তারা যেন আমার কথাগুলো অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেয়।

তিনি আরো বলতেন, যারা (কোনো কারণবশত যেমন—পর্দা, দূরত্ব, লজ্জা ও দুর্বলতা ইত্যাদির দরুন) আমার কাছে তাদের প্রয়োজন পেশ করতে পারে না, তোমরা তাদের প্রয়োজন আমার কাছে পৌঁছে দিয়ো। যে ব্যক্তি এমন লোকের প্রয়োজন কোনো ক্ষমতাসীনের কাছে পৌঁছে দেয়, যে নিজে পৌঁছানোর ক্ষমতা রাখে না, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে দৃঢ়পদ রাখবেন। মহানবী (সা.)-এর কাছে উপকারী ও প্রয়োজনীয় বিষয়েরই আলোচনা হতো। এর বিপরীত অন্য কোনো বিষয় তিনি গ্রহণ করতেন না। জনসাধারণের প্রয়োজন ও উপকারী বিষয় ছাড়া অন্য অপ্রয়োজনীয় বিষয় তিনি শুনতেনও না।

সাহাবারা তাঁর কাছে দ্বীনি বিষয়ের প্রার্থী হয়ে আসতেন, তাঁরা কিছু না কিছু খেয়েই ফিরতেন। তিনি যেমন জ্ঞান দান করতেন, তেমনি কিছু না কিছু খাওয়াতেনও। তাঁরাও তাঁর কাছ থেকে কল্যাণের পথে মশাল ও দিশারি হয়ে বের হতেন। রাসুলে পাক (সা.) সাহাবা আজমাইনদের সালাম, কালাম ও ত্বোয়ামের (খাবার খাওয়ানো) বেশি বেশি আমল করার তাগিদ দিতেন। এর অর্থ হলো, তিনি বললেন, বেশি বেশি সালাম দাও, বেশি বেশি নেক কথা বলো এবং বেশি বেশি খানা খাওয়াও।

নবী করিম (সা.) প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া নিজের জবানকে ব্যবহার করতেন না। আগত ব্যক্তিদের মন রক্ষা করতেন, তাদের আপন করতেন, বিচ্ছিন্ন করতেন না। অর্থাৎ এমন ব্যবহার করতেন না, যাতে তারা চলে যায় অথবা দ্বীনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে যায়।

প্রত্যেক কওমের সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান করতেন এবং তাকেই তাদের অভিভাবক বা সরদার নিযুক্ত করে দিতেন।

লোকদের তাদের ক্ষতিকর জিনিস থেকে সতর্ক করতেন বা লোকদের পরস্পর মেলামেশায় সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে বলতেন আর নিজেও সতর্ক ও সাবধান থাকতেন।

তিনি কারো জন্য চেহারার প্রসন্নতা ও আপন সদাচারের কোনো পরিবর্তন করতেন না।

আপন সাহাবিদের খোঁজখবর নিতেন। লোকদের পারস্পরিক হাল অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেন ও তা সংশোধন করতেন।

ভালোকে ভালো বলতেন ও তার পক্ষে মদদ জোগাতেন। খারাপকে খারাপ বলতেন ও তাকে প্রতিহত করতেন।

প্রত্যেক বিষয়ে সমতা রক্ষা করতেন। আগে এক রকম, পরে আরেক রকম—এরূপ করতেন না।

সর্বদা লোকদের সংশোধনের প্রতি খেয়াল রাখতেন, যাতে তারা দ্বীনের কাজে অমনোযাগী না হয় বা হকপথ থেকে সরে না যায়।

প্রত্যেক অবস্থার জন্য তাঁর কাছে একটি বিশেষ বিধিনিয়ম ছিল। হক কাজে ত্রুটি করতেন না, আবার সীমা লঙ্ঘনও করতেন না।

লোকদের মধ্যে উত্কৃষ্ট ব্যক্তিবর্গই তাঁর কাছাকাছি থাকত। তাদের মধ্যে সেই তাঁর কাছে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হতো, যে লোকদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকামী হতো এবং তাঁর কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল সেই হতো যে লোকদের জন্য সর্বাধিক সহানুভূতিশীল ও সাহায্যকারী হতো।

মহানবী (সা.) সর্বদা আল্লাহর জিকির করতেন।

তিনি নিজের জন্য কোনো স্থানকে নির্দিষ্ট করতেন না এবং অন্য কাউকেও এরূপ করতে নিষেধ করতেন।

কোনো মজলিসে উপস্থিত হলে, যেখানেই জায়গা পেতেন বসে যেতেন এবং অন্যদেরও এরূপ করতে আদেশ করতেন।

তিনি মজলিসে উপস্থিত প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অংশ দিতেন। অর্থাৎ প্রত্যেকের সঙ্গে যথাযোগ্য হাসিমুখে কথাবার্তা বলতেন। তাঁর মজলিসের প্রত্যেক ব্যক্তি মনে করত যে তিনি তাকেই সবার অপেক্ষা বেশি সম্মান করছেন।

যে কেউ কোনো প্রয়োজনে তাঁর কাছে এসে বসত অথবা তাঁর সঙ্গে দাঁড়াত, তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর জন্য বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতেন, যতক্ষণ না সে নিজেই উঠে যেত বা চলে যেত।

কেউ কোনো জিনিস চাইলে তিনি দান করতেন অথবা (না থাকলে) নরম ভাষায় জবাব দিয়ে দিতেন।

তাঁর সদা হাসিমুখ সাধারণভাবে সবার জন্য ছিল। তিনি স্নেহমমতায় সবার জন্য পিতা সমতুল্য ছিলেন।

হকের বা অধিকারের বেলায় সবাই তাঁর কাছে সমান ছিল।

তাঁর মজলিস ছিল সহনশীলতা ও লজ্জাশীলতা এবং ধৈর্ষ ও আমানতদারীর এক অপরূপ নমুনা।

তাঁর মজলিসে কেউ উচ্চস্বরে কথা বলত না, কারো ইজ্জতহানি করা হতো না। প্রথমত তাঁর মজলিসে সবাই সংযত হয়ে বসত, যাতে কোনো ধরনের দোষত্রুটি হলে তা নিয়ে সমালোচনা বা তার প্রচার করা হতো না। মজলিসের সবাই পরস্পর সমঅধিকার লাভ করত। বংশমর্যাদা নিয়ে একে অপরের ওপর অহংকার করত না। তবে তাকওয়ার ভিত্তিতে একে অপরের ওপর মর্যাদা লাভ করত এবং একে অপরের প্রতি বিনয়নম্র ব্যবহার করত। তারা বড়দের সম্মান করত, ছোটদের প্রতি সদয় ব্যবহার করত, অভাবগ্রস্তদের প্রাধান্য দিত ও অপরিচিত মুসাফিরদের খাতিরযত্ন করত।

মহানবী (সা.) সদা হাসিখুশি থাকতেন, নম্রস্বভাবের ছিলেন, সহজেই অন্যদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতেন।

তিনি রূঢ় ও কঠোর ছিলেন না। চিৎকার করে কথা বলতেন না।

অশ্লীল কোনো কথা বলতেন না, কাউকেও দোষারোপ করতেন না।

অধিক হাসিঠাট্টা করতেন না।

মর্জির খেলাফ কেউ কিছু আশা করলে তাকে একেবারে নিরাশ ও বঞ্চিত করতেন না। বরং কিছু না কিছু দিয়ে দিতেন বা কোনো সান্ত্বনার কথা বলে দিতেন।

তিনি নিজেকে তিনটি বিষয় থেকে সম্পূর্ণরূপে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন—১. ঝগড়াবিবাদ, . বেশি কথা বলা, . অনর্থক বিষয়াদি থেকে।

অনুরূপ তিনটি বিষয় থেকে অন্যকেও বাঁচিয়ে রেখেছিলেন—১. তিনি কারো নিন্দা করতেন না, . কাউকে লজ্জা দিতেন না, . কারো দোষ তালাশ করতেন না।

তিনি এমন কথাই বলতেন, যাতে সওয়াব পাওয়া যায়।

যখন তিনি কথা বলতেন, তখন উপস্থিত সাহাবারা এমনভাবে মাথা ঝুঁকাইয়া বসতেন যেন তাঁদের মাথায় পাখি বসে রয়েছে। অর্থাৎ এমনভাবে স্থির হয়ে থাকতেন যেন সামান্য নড়াচড়া করলেই মাথার ওপর থেকে পাখি উড়ে যাবে।

যখন তিনি কথা বলতেন, তাঁরা চুপ থাকতেন আর যখন তিনি কথা শেষ করে চুপ করতেন, তখন তাঁরা কথা বলতেন। তাঁর কথার মাঝখানে তাঁরা কথা বলতেন না।

তাঁরা কোনো বিষয় নিয়ে তাঁর সম্মুখে কথা কাটাকাটি করতেন না।

যে কথা শুনে সবাই হাসতেন, তিনিও হাসতেন, যে বিষয়ে সবাই বিস্ময়বোধ করতেন, তিনিও তাতে বিস্ময় প্রকাশ করতেন।

অপরিচিত মুসাফিরের রুক্ষ কথাবার্তা ও অসংলগ্ন প্রশ্নাবলির ওপর ধৈর্য ধারণ করতেন। অপরিচিত মুসাফিররা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করত বলে তাঁর সাহাবিরা এরূপ মুসাফিরদের তাঁর মজলিসে নিয়ে আসতেন। যাতে তাদের প্রশ্নাবলির দ্বারা নতুন বিষয় জানা যায়।

মহানবী (সা.) বলতেন, কোনো অভাবী ব্যক্তিকে দেখলে তাকে সাহায্য করবে।

কেউ সামনাসামনি তাঁর প্রশংসা করুক, তিনি তা পছন্দ করতেন না, তবে কেউ তাঁর এহসানের প্রতিদান হিসেবে শুকরিয়াস্বরূপ প্রশংসা করলে তিনি চুপ থাকতেন। অর্থাৎ শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য বিধায় যেন তাকে তার কর্তব্য কাজে সুযোগ দিতেন।

তিনি কারো কথায় বাধা দিতেন না, যতক্ষণ না সে সীমা লঙ্ঘন করত। সীমা লঙ্ঘন করলে তিনি তাকে নিষেধ করতেন অথবা মজলিস থেকে উঠে যেতেন।

মহানবী (সা.)-এর নীরবতা চার কারণে হতো—১. সহনশীলতার কারণে, . সচেতনতার দরুন, . আন্দাজ করার উদ্দেশ্যে, . চিন্তাভাবনার জন্য।

(সূত্র : বিদায়া নিহায়া, কানজুল উম্মাল; মাওলানা সাদ : হায়াতুস সাহাবাহ, প্রথম খণ্ড, দারুল কিতাব, ঢাকা ও শামায়েলে তিরমিজি, আল কাউসার প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৭)

লেখক : সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদপ্তর

জয়ললিতাঃ অভিনেত্রী থেকে জননেত্রী

ডিসেম্বর 8, 2016 মন্তব্য দিন

joy-2joy-1joy-8joy-7joy-6joy-wealth

470-people-dead-for-joylolita