আর্কাইভ

Archive for the ‘জীবনী’ Category

ক্ষমতা প্রেমের চেয়েও অনেক বেশি আবেগের

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

ওরিয়ানা ফালাচি। ইতালীয় বংশোদ্ভূত একজন সাংবাদিক। ৭০ দশকে দুনিয়া কাঁপিয়েছিলেন সাক্ষাৎকারভিত্তিক সাংবাদিকতা করে। বরেণ্য, বিতর্কিত রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কদের সাক্ষাৎকার নিতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছেন লৌহমানব ও লৌহমানবীদের। তার আক্রমণাত্মক প্রশ্ন অনেককে করেছে ক্ষীপ্ত। পরিণতিতে তাকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যেতে হয়েছে অনেক দেশ থেকে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে সত্য বের করার কৌশল থেকে কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। উপমহাদেশের তিনজন রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাক্ষাৎকার নিয়ে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরী গ্রন্থে তিনটি সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশে বইটির অনুবাদ করেছেন আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। বইটি ছেপেছে আহমদ পাবলিশিং হাউস। জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাক্ষাৎকার কিভাবে নিয়েছিলেন তার একটি চমকপ্রদ বয়ান রয়েছে বইতে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো

bhutto 21চমকে দেয়ার মতো আমন্ত্রণ। এসেছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর তরফ হতে এবং বুঝে উঠার কোনো উপায় ছিল না। আমাকে বলা হলো যত শিগগির সম্ভব আমাকে রাওয়ালপিন্ডি যেতে হবে। অবাক হলাম, কেন? প্রত্যেকটা সাংবাদিক কমপক্ষে একবার তাদের দ্বারা আহূত হবার স্বপ্ন দেখে যাদেরকে তারা অনুসন্ধান করবে। সেই ব্যক্তিত্বগুলো হারিয়ে যায় বা নেতিবাচক সাড়া দেয়। কিন্তু স্বপ্ন যুক্তিহীন এবং সন্দেহে তার পরিসমাপ্তি। ভুট্টো কেন আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর জন্যে কি আমার কাছে বার্তা দিতে চান? ইন্দিরা গান্ধীকে শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির সাথে চিত্রিত করার কারণে আমাকে শাস্তি দেবেন? প্রথম ধারণা দ্রুত নাকচ করলাম। শত্রুর সাথে যোগাযোগ করার জন্যে তার বাহকের প্রয়োজন নেই এ জন্যে সুইস বা রুশ কূটনীতিক আছেন। দ্বিতীয় ধারণাও বাতিল করে দিলাম। শিক্ষিত ও ভদ্রলোক বলে ভুট্টোর সুনাম আছে। এ ধরনের লোকেরা সাধারণত তাদের আমন্ত্রিত অতিথিকে হত্যা করে না। আমার তৃতীয় অনুমানটা হলো, তিনি হয়তো চান আমি তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। আমার হৃদয় চমৎকারিত্বে পূর্ণ হলো। বাংলাদেশের হতভাগ্য প্রেসিডেন্ট মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আমার নিবন্ধ পাঠের পরই ভুট্টোর মনে হয়তো বিষয়টা উদয় হয়েছিল। আমার সন্দেহের উপর বিজয়ী হলো আমার অনুসন্ধিৎসা এবং আমি আমন্ত্রণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম। আমন্ত্রণ গ্রহণ করেও তাকে জানতে দিলাম যে, তার অতিথি হলেও আমি সবার ক্ষেত্রে যে স্বাধীন বিচার বিবেচনায় লিখি, এক্ষেত্রেও তার কোন হেরফের হবে না এবং যে কোন ধরনের সৌজন্য বা তোষামোদে আমাকে কিনে ফেলা সম্ভব হবে না। ভুট্টো জবাব দিলেন : অবশ্যই, তাই হবে। এবং মানুষটি সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা হলো তাতেই।

এ মানুষটি সম্পর্কে পূর্ব ধারণা করা যায় না। অসম্ভব গোছের। নিজের মর্জিতে এবং অদ্ভুত সিদ্ধান্তে পরিচালিত হন। তীক্ষè বুদ্ধিমান। ধূর্ত, শিয়ালের মতো বুদ্ধিমান। মানুষকে মুগ্ধ করতে, বিভ্রান্ত করতেই যেন তার জন্ম। সংস্কৃতি, স্মরণশক্তি ও ঔজ্জ্বল্য দ্বারা লালিত তিনি। শহুরে আভিজাত্য তার জন্মাবধি। রাওয়ালপিন্ডি বিমানবন্দরে দু’জন সরকারি অফিসার আমাকে স্বাগত জানিয়ে অত্যন্ত আবেগের সাথে বললেন যে, প্রেসিডেন্ট আমাকে এক ঘণ্টার মধ্যে স্বাগত জানাবেন। তখন সকাল দশটা। গত আটচল্লিশ ঘণ্টা আমি বিনিদ্র কাটিয়েছি। আমি প্রতিবাদ করলাম; না এক ঘণ্টার মধ্যে নয়। আমার একটা ভালো গোসল এবং সুনিদ্রা প্রয়োজন। অন্য কারো কাছে এটা খুব অপমানজনক মনে হতো। তার কাছে নয়। তিনি সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত সাক্ষাৎ মুলতবি রাখলেন এই বলে যে, রাতে আহারটা আমার সাথেই করবেন বলে আশা করছেন। বুদ্ধিমত্তার সাথে সৌজন্য যোগ হলে তা অবদমনের সেরা অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। এটা অনিবার্যই যে তার সাথে সাক্ষাৎ আন্তরিকতাপূর্ণ হবে।

ভুট্টো আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন হাসি ছড়িয়ে খোলা হাত বাড়িয়ে। তিনি দীর্ঘ, মেদবহুল। তাকে দেখতে একজন ব্যাংকারের মতো, যে কাউকে পেতে চায় তার ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্যে। চুয়াল্লিশ বছর বয়সের চেয়েও অধিক বয়স্ক মনে হয় তাকে। তার টাক পড়ছে এবং অবশিষ্ট চুল পাকা। ঘন ভুরুর নিচে তার মুখটা বিরাট। ভারি গাল, ভারি ঠোঁট, ভারি চোখের পাতা। তার দু’চোখে রহস্যজনক দুঃখময়তা। হাসিতে কিছু একটা লাজুকতা।

বহু ক্ষমতাধর নেতার মতো লাজুকতায় তিনি দুর্বল ও পঙ্গু। তিনি আরো অনেক কিছু, ইন্দিরা গান্ধীর মতো। সবারই নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব। যতই তাকে পাঠ করা হোক, ততই অনিশ্চিত হতে হবে। দ্বিধায় পড়তে হবে। একটু ঘুরালে ফিরালে প্রিজমে যেমন একই বস্তু বিভিন্ন রূপে দেখা যায়, তিনি সে রকম। অতএব তাকে বহুভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এবং তার প্রতিটিই যথার্থ উদার, কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিস্ট, কমিউনিস্ট, নিষ্ঠাবান ও মিথ্যুক। নিঃসন্দেহে তিনি সমসাময়িককালের সবচেয়ে জটিল নেতাদের একজন এবং তার দেশে এ যাবৎ জন্মগ্রহণকারী নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শুধুই একজন। যে কেউ বলবে, ভুট্টোর কোনো বিকল্প নেই। ভুট্টো মরলে পাকিস্তান মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।

তার ব্যক্তিত্ব ইন্দিরা গান্ধীর চেয়ে বাদশাহ হোসেনকেই বেশি মনে করিয়ে দেবে। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট একটি দেশকে পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠে। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি মাটির পাত্র হিসেবে লৌহপাত্র দ্বারা, অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ দ্বারা দলিত মথিত। বাদশাহ হোসেনের মতো তিনি আত্মসমর্পণ না করতে বা কোনো কিছু ছেড়ে না দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো প্রতিরক্ষা ব্যুহ ছাড়াই বন্দি শিল্পীর মতো সাহসিকতার সাথে তিনি সবকিছু প্রতিরোধ করেন। অন্যভাবে তাকে দেখে জন কেনেডির কথা মনে পড়বে। কেনেডির মতো তিনি প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়েছেন, সে কারণে তার কাছে কিছুই অসম্ভব ছিল না। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বিজয় করাও নয়। এ জন্যে ব্যয় যাই হোক না কেন। কেনেডির মতো তার একটি স্বচ্ছন্দ, মধুর ও সুবিধা ভোগের শৈশব ছিল। কেনেডির মতো ক্ষমতার দিকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল জীবনের প্রারম্ভেই।

অভিজাত জমিদার পরিবারে তার জন্ম। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া-বার্কেলিতে এবং পরে বৃটেনে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি ডিগ্রি নিয়েছেন আন্তর্জাতিক আইনে। ত্রিশ বছর বয়সের পরই তিনি আইয়ুব খানের একজন মন্ত্রী হন, যদিও পরে তাকে অপছন্দ করেন। যখন তার বয়স চল্লিশের কিছু কম তখন আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের মন্ত্রীদের একজন ছিলেন। বেদনাদায়ক ধৈর্যের সাথে তিনি প্রেসিডেন্টের পদ পর্যন্ত পৌঁছেন। কিছু সহযোগীর দ্বারা এ পর্যন্ত আরোহণকে তিনি নিষ্কণ্টক রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ক্ষমতা প্রেমের চেয়েও অনেক বেশি আবেগের বস্তু। যারা ক্ষমতা ভালোবাসে তাদের পেট শক্ত, নাকটা আরো শক্ত। বদনামে তাদের কিছু আসে যায় না। ভুট্টো বদনামের তোয়াক্কা করতেন না। তিনি ক্ষমতা ভালোবাসেন। এ ধরনের ক্ষমতার প্রকৃতি আন্দাজ করা শক্ত। ক্ষমতা যে তার কাছে কি তা বুঝা যায় না। যারা সত্য বলে এবং বয়স্কাউটসুলভ নৈতিকতা প্রদর্শন করে এমন রাজনীতিবিদদের থেকে সতর্ক থাকার উপদেশ দেন তিনি। তার কথা শুনে এ বিশ্বাস হবে যে তার লক্ষ্য অত্যন্ত মহৎ এবং তিনি সত্যি সত্যি একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। কিন্তু করাচিতে তার সমৃদ্ধ জাঁকজমকপূর্ণ লাইব্রেরি দেখলেই বুঝা যাবে যে, মুসোলিনি ও হিটলার সম্পর্কিত গ্রন্থাবলী সম্মানের সাথে রূপালী বাঁধাই এ সমৃদ্ধ। যে যতেœর সাথে এগুলো সংরক্ষিত তাতে উপলব্ধি করা সহজ যে এগুলোর উপস্থিতি শুধু গ্রন্থ সংগ্রাহকের আগ্রহের কারণেই নয়। সন্দেহ ও ক্রোধ দানা বেঁধে উঠবে। তাকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে, তার সত্যিকার বন্ধু ছিলেন সুকর্ণ ও নাসের এই দুই ব্যক্তিই সম্ভবত সদিচ্ছা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন, কিন্তু তারা উদারনৈতিক ছিলেন না। ভুট্টোর গোপন স্বপ্ন একনায়ক হওয়া। রূপালী বাঁধাইয়ের গ্রন্থগুলো থেকেই তিনি কি একদিন তার জ্ঞান আহরণ করবেন? স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং বিরোধী দলের কোন রাজনৈতিক অর্থ কখনো ছিল না এমন একটি দেশ সম্পর্কে অজ্ঞ পাশ্চাত্যের লোকেরাই এ ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। এসবের বদলে সে দেশে বিরাজ করেছে দারিদ্র্য, অবিচার এবং নিপীড়ন।

ভুট্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎকার সমাপ্ত হয়েছে ছয় দিনে পাঁচটি পৃথক বৈঠকে। তার অতিথি হিসেবে তার সাথে কয়েকটি প্রদেশও সফর করেছি এ সময়ে। পাঁচটি বৈঠকে আলাপের সূত্রও হয়েছে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। প্রথম সাক্ষাৎকার বৈঠক হয় রাওয়ালপি-িতে, আমার উপস্থিতির দিন সন্ধ্যায়। দ্বিতীয় আলোচনা লাহোরের পথে বিমানে। তৃতীয় বৈঠক সিন্ধুর হালা শহরে। চতুর্থ এবং পঞ্চম বৈঠক করাচিতে। আমি সব সময় তার পাশে বসেছি, টেবিলেই হোক আর যাত্রাপথেই হোক এবং চাইলে আমি তার একটা চিত্রও আঁকতে পারতাম। ভুট্টোকে অধিকাংশ সময়ই দেখেছি পাকিস্তানি পোশাকে, হালকা সবুজ জামা এবং স্যান্ডেল পায়ে। সমাবেশে বক্তৃতার সময় মাইক্রোফোনের সামনে তিনি কর্কশভাবে চিৎকার করেন, প্রথমে উর্দু পরে সিন্ধিতে। বক্তৃতার সময় দু’হাত আকাশে ছুড়তে থাকেন। সবকিছুর মাঝে প্রকাশ করেন তার কর্তৃত্ব। হালার জনসমাবেশে অসংখ্য লোক যখন তার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে, শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গও সেখানে। কিন্তু তিনি কক্ষে বসে লিখছেন। যখন সভাস্থলে পৌঁছলেন তখন রাত। কার্পেটের উপর দিয়ে রাজপুত্রের মতো পা ফেলে তিনি এগিয়ে মঞ্চে উঠলেন। রাজপুত্রের মতোই আসন গ্রহণ করলেন এবং আমিও তার পাশে বসলাম- বেশ কিছু গোঁফওয়ালা লোকের পাশে আমিই একমাত্র মহিলা, যেন সুপরিকল্পিত একটা প্ররোচনা। আসনে বসে তিনি দলের নেতাদের অভ্যর্থনা জানালেন। সবশেষে একজন দরিদ্র লোক, তার সাথে নিয়ে এলো রঙ্গিন কাপড় ও মালায় সজ্জিত একটি বকরী। এটি তার সামনে কোরবানি করা হবে।

হজরত শাহ জালাল (রহ.) সম্পর্কে তথ্য বিভ্রাট

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

কে. এস সিদ্দিকী : এদেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব পীর মাশায়েখ আওলিয়া তথা সূফি সাধকের ভূমিকা ইতিহাস খ্যাত ও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে, তাদের মধ্যে সিলেটে চিরশায়িত হজরত শাহ জালাল (রহ.) ও তাঁর ৩৬০ সহযাত্রীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের বদৌলতে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের যে ঢেউ আরম্ভ হয় পরবর্তীতে তা সয়লাবের রূপ লাভ করে। ভিন্ন ধর্ম হতে দলে দলে লোক এসে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে সৌভাগ্য লাভ করতে থাকে। মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর প্রদর্শিত পথ ধরে পরবর্তী মাশায়েখ সূফি ও উলামায়ে কেরাম ইসলামের প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখে চলেছেন। হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর অগ্রণী ভূমিকার কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের মুসলমান মত ও পথ নির্বেশেষে অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা ও যথাযথ মর্যাদা সহকারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যিলকদ মাসের ২য় দশকের শেষ দিকে তাঁর ওফাত বার্ষিকী পালন করে থাকেন এবং হযরতের জীবন ও অবদানের কথা এবং তাঁর আদর্শ শিক্ষার কথা স্মরণ করে থাকেন। তিনি ইসলামের অমীয়বাণী প্রচারকালে কত লোক ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়েছিল সঠিক সংখ্যা অজানা।

হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর অসংখ্য কেরামত অলৌকিক বিস্ময়কর ঘটনাবলী পাঠ করে মুসলিম-অমুসলিম সবাই হতবাক হয়ে যায়। পৌত্তলিকতা কবলিত সে যুগের সামাজিক-নৈতিক অবক্ষয় এবং মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর আন্দোলন ও ভূমিকার কথা যারা জানে না অথবা জেনেও না জানার ভান করে, তারা ছাড়াও আরেক শ্রেণির লোক আমাদের এ সমাজে বাস করে, যাদেরকে ইসলাম বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করা যায়। এ শ্রেণির লোকেরাই হযরত শাহ জালাল (রহ.) ও তাঁর ৩৬০ সঙ্গীকে কুরুচিপূর্ণ অভিধায় চিহ্নিত করে।

কেননা শাহ জালাল (রহ.) এমন এক আধ্যাত্মিক সাধক ও কামেল পীর ছিলেন, যার তবলীগ প্রচারের ভূমিকার ওপর এযাবত বিভিন্ন ভাষায় বিস্তর বই পুস্তক রচিত ও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা ভাষা ছাড়াও আরবি, ফারসি, উর্দূ, এমনকি ইংরেজি ভাষায়ও বহু পুস্তক, পুস্তিকা রচিত হয়েছে। বিশেষত বাংলা ভাষায় স্বতন্ত্র জীবন চরিত ছাড়াও বিরাট আকারের বহু গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ বিপুল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এতদ্ব্যতীত বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার সম্পর্কিত প্রকাশিত সকল পুস্তক-পুস্তিকায় হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর ভূমিকা প্রাধান্য পেয়েছে। এখানে উদাহরণ হিসেবে আমরা কয়েকটি মাত্র বাংলা পুস্তকের নাম উল্লেখ করতে চাই। সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১। সৈয়দ মুর্তাজা আলী কৃত- হযরত শাহ জালাল (রহ.) ও সিলেটের ইতিহাস। ২। মুফতী আজহার উদ্দীন আহমদ রচিত শ্রী হট্টে, ইসলামের জ্যোতি। ৩। আবদুর রহিম রচিত শ্রীহট্ট, নূর। ৪। আবুদল ওহাব রচিত শ্রীহট্ট, শাহ জালাল। ৫। আবদুল মালিক চৌধুরী রচিত শ্রীহট্ট, শাহ জালাল। ৬। অমিত ভাত চৌধুরী রচিত, শাহ জালাল। ৭। নরেন্দ্র কুমার গুপু চৌধুরী রচিত শ্রীহট্ট, প্রতিভা।

ইসলামী বিশ্বকোষসহ আরো অসংখ্যা গ্রন্থ, পুস্তক-পুস্তিকা, পত্র-পত্রিকা, জার্নাল, ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সরকারি গেজেট, ইত্যাদিতে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর ওপর প্রচুর তথ্য উপাত্ত রয়েছে। এ যাবত বিশেষভাবে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার সংক্রান্ত বাংলা ভাষায় অসংখ্য বই পুস্তক-পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রত্যেকটিতে অল্প বিস্তর হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর ওপর আলোচনা স্থান পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে আলহাজ মাওলানা এম. ওবাইদুল হক সংকলিত বাংলাদেশের পীর আউলিয়াগণ এবং গোলাম সাকালায়েনের বাংলাদেশের সূফী সাধক গ্রন্থদ্বয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমোক্ত গ্রন্থে হযরত শাহ জালাল (রহ.) সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
সৈয়দ মুর্তাজা আলী, মাওলানা ওবাইদুল এবং গোলাম সাকালায়েন প্রমুখ সকলেই তাদের রচনায় হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর জীবন বৃত্তান্ত ও তার ভূমিকা আলোচনা করতে যে কটি প্রাচীন গ্রন্থ উপাখ্যানকে মূল ভিত্তি বা সূত্র হিসেবে অবলম্বন করেছেন সেগুলো হচ্ছে: ১। ইবনে বতুতার সফর নামায় বর্ণিত শাহ জালাল সংক্রান্ত বিবরণ। ২। হিজরী ১১২৪ সালে রওজাতুল সালেহীন সম্পাদন করেন হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর অনুচর হামিদ উদ্দিন নারুন্দ্রির জনৈক উত্তরাধীকারী দিল্লীর রাজা মূলতান ফররোখ সিয়ামের এর রাজত্বকালে। ৩। ১১৩৪ হিজরীতে আরো এক খানা গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। এটি হলো, তৎকালীন বাঙ্গালার সুবাদার জাফর খান নুসেরী ওরফে মুর্শিদ কুলি খানের নির্দেশে মঈদ উদ্দীন নামক হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর দর্গার জনৈক খাদেম কর্তৃক বিরচিত। উভয় গ্রন্থই সিলেটে প্রচলিত উপাখ্যানের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে প্রসিদ্ধ। ৪। ত্রিপুরার অধিবাসী নাসির উদ্দীন হায়দার নামক জনৈক মুনসিফ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে যখন দরগাহ মহল্লাতে অবস্থান করছিলেন তখন তিনি ‘সুহেলিয়ামন’ নাম দিয়ে উল্লেখিত উভয় গ্রন্থের একটি চুম্বক প্রস্তুত করেছিলেন। এই উভয় মূল গ্রন্থই বর্তমানে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে জানা যায়, কিন্তু ‘সুহেলিয়ামন’ এর উপাখ্যান এখনো দরগার খাদেমগণ কর্তৃক রক্ষিত হচ্ছে বলে মনে করা হয়।

‘সুহেলিয়ামন’ সম্পর্কে আরো একটি তথ্য জানিয়ে রাখতে চাই এবং তা এই, মাসিক আখতার নামক একটি উর্দূ সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ১৯২৪ সালে ‘সুহেলিয়ামন’ এর প্রথমাংশ ছাপা হয়েছিল। এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ময়মনসিংহের এক পাড়া-গাঁয়ে জন্মগ্রহণকারী মাহমুদুর রব সিদ্দিকী, যিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন ‘খালেদ বাঙালী’ নামে। তিনি মরহুম জাহেদ সিদ্দিকীর পিতা ছিলেন। জাহেদ সিদ্দিকী ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতারের উর্দূ সংবাদ পাঠক ছিলেন। অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের উর্দূ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও সংবাদ পাঠক ছিলেন। তার পিতা খালেদ বাঙালী ছিলেন পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থ প্রণেতা মাওলানা আবদুল হাই আখতারের পুত্র। পিতার নাম স্মরণে খালেদ বাঙালী ‘আখতার’ নামক পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন এবং এ পত্রিকায় তার প্রবন্ধের প্রথম লেখাটি ছাপা হয়েছিল, কিন্তু পত্রিকাটি প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সুহেলিয়ামন এর পরবর্তী অংশ আর প্রকাশিত হতে পারেনি। ‘আখতার’ সম্পাদক লেখার শেষে নাম উল্লেখ করেন সাইফী বাঙালী।

৫। ‘তাজকেরায়ে শায়খ সৈয়দ জালাল মোজাররদ কেনিয়ায়ী’ শীর্ষক ৬৩ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি উর্দূ পুস্তিকা রচনা করেছেন। ১৯৬৭ সালে সিলেট হতে প্রকাশিত এ পুস্তিকায় ‘গুলজারে আবরার’ গ্রন্থের পরিচয় প্রদান করা হয়েছে এইভাবে, মোহাম্মদ গাওসী ইবনে মূসা শাত্তারী মান্দভী কর্তৃক রচিত হিন্দুস্থানের আওলিয়ার ইতিহাস। হিজরী ১১৫৫ মোতাবেক ১৭৪২ সালে এটি ফারসি ভাষায় লিখিত এবং এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯২০। পুস্তিকা লেখকের মতে, এটি হযরত শাহ জালাল উদ্দীন মোজারবাদের জীবনী গ্রন্থ তার উৎস ‘শরহে নুজহাতুল আরওয়াহ’ যা শায়খ আলী কর্তৃক রচিত, যিনি ছিলেন শায়খ নুরুল হুদার বংশধর। শায়খ নুরুল হুদা ছিলেন হযরত শায়খ জালাল উদ্দীন মোজারবাদের একজন মুরীদ ও খলিফা। তার পূর্ণ নাম শায়খ নুরুল হুদা আবুল কারামাত সাঈদ হাসানী। শরহে নুজহাতুল আরওয়াহ আলী শের কর্তৃক হিজরী ৯৭৯ (১৫৭১ খ্রি.) সালে রচিত।

বস্তুতঃ ফারসি ভাষায় প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে হযরত শাহ জালাল (রহ.) সম্পর্কে তথ্য উপাত্তের আধিক্য বিদ্যমান থাকলেও কয়েকটি বিষয়ে পরস্পর বিরোধী তথ্যও রয়েছে। ফলে যারা সরাসরি ওসব তথ্য গ্রহণ করেছেন অথবা ওসব তথ্যের অনুবাদের আশ্রয় নিয়েছেন, তারাও সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়েছেন, অনেকে যথার্থতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন। বিরোধমূলক বা বিতর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে হযরত শাহ জালাল (রহ.) যার মাজার সিলেটে অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে তিনি কে ছিলেন এ বিতর্কের কারণ প্রধানত একই সময়কালের মধ্যে চারজন শাহ জালালের বিদ্যমান থাকা।

এ কারণে সিলেটে সমাহিত শাহ জালাল (রহ.) কে নিশ্চিত করার জন্য কোনো কোনো গবেষক লেখক চারজন শাহ জালালকে আলাদাভাবে চি‎িহ্নত করার চেষ্টা করেছেন, এ বিষয়ে বিতর্ক অবসানের এটি ছিল সঠিক উদ্যোগ। সিলেট বিজেতা শাহ জালাল (রহ.) এর জন্ম তারিখ নিয়ে বিতর্কের ফলে তার বয়স ১৫০ বছর পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। পক্ষান্তরে এটাকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে কেউ কেউ বিভিন্ন ফারসি কবিতা উদ্ধার করেছেন যার একটি ছত্রে আবজাদ পদ্ধতিতে মৃত্যু তারিখ পাওয়া যায়। উদাহরণ স্বরূপ বিখ্যাত উর্দূ কবি ও সাহিত্যিক আবদুল গফুর (ফরিদপুরের নবাব আবদুল লতিফের বড় ভাই) তার এক ফারসি কবিতায় আজাদ প্রণালীতে মৃত্যু তারিখ হিজরী ৮৯১ সাল নির্ণয় করেছেন। গবেষক লেখকগণ এ তারিখই সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন। আরো বিভিন্ন বিষয়ে সৃষ্ট বিরোধ বিতর্কের অবসান ঘটেছে বলে মনে করা হয় না।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নিজামউদ্দীন আওলিয়া নামক এক সাধকের সাথে হযরত শাহ জালাল (রহ.) এর সাক্ষাতের তথ্য। এ সাক্ষাতের ফলে যুগ নির্ণয়ে আরো কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের পীর আউলিয়াগণের লেখক সংশয়টি দূর করে দিয়েছেন এই বলে দিল্লীতে তখন নেযামুদ্দীন আওলিয়া নামীয় প্রসিদ্ধ নেযামুদ্দীন আওলিয়া যিনি বাবা ফরিদ (রহ.) এর মুরীদ ছিলেন তিনি নহেন (পৃ. ২৪৯)। ইতিহাসে এইরূপ বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, একই সময়কালের মধ্যে একই নামের ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্ব থাকেন নেযামুদ্দীন আওলিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। খোদ শাহ জালাল নামে একই যুগের চারজন আওলিয়া ছিলেন,যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং সিলেটের হযরত শাহ জালাল (রহ.) সম্পর্কিত বিতর্কিত সব বিষয়ের অবসান হওয়া উচিত।

গুলজারে আবরার গ্রন্থের বরাতে সৈয়দ মুর্তাজা আলী উল্লেখ করেছেন, শাহ জালাল মুজররদ কুতুববুদ এই ফারসী বাক্যাংশ থেকে আবজাদ প্রক্রিয়ায় গণনা দ্বারা তার ওফাতের তারিখ ৭৪০ হিজরী পাওয়া যায়। সুতরাং তিরোধানের সময় তাঁর বয়স উনসত্ত¡র বছর হয়েছিল। ২০ জিলকদ তারিখে তার ওফাত হয়। ঐ তারিখে প্রত্যেক বছর তার উরস পালন করা হয়। তিনি তার সঙ্গীদের শ্রী হট্টের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ও নিকটবর্তী জেলা সমূহে পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে প্রেরণ করেন। তারা স্ব স্ব প্রচার ক্ষেত্রে চিরস্থায়ীভাবে বাসস্থান নির্মাণ করে অবস্থান করেন। (পৃ. ২৪-২৫)

জাতীয় শোক দিবস পালন ও কিছু পর্যবেক্ষণ

অগাষ্ট 15, 2017 মন্তব্য দিন

mujib day 2“জন্ম-ই আমার আজন্ম পাপ”-এর স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুদিবস পালন করা নিয়ে এই দেশের জনগণ আজো পড়ে আছে এক গ্যাঁড়াকলে । এদিন অসম-বিপরীতধর্মী প্রান্তিক চিন্তাধারা ও কর্মকান্ডে অভ্যস্ত এক শ্রেণীর ভক্তরা যদি আতিশয্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় তাহলে আরেক শ্রেণীর অভক্তরা শেখ সাহেবকে তুলোধূনো করার নানা ফন্দি আঁটে।আর অধিকাংশ ইসলামপন্থীরা (স্বাধীনতা যুদ্ধে যাদের ছিলো হয়আদর্শিক বা সশস্ত্র বিরোধিতা)আপাতঃ বাহ্যিক নির্মোহতার আড়ালে আসলে বিরোধিতা-ই করে ধর্মীয় বিধি-নিষেধের দোহাই পেড়ে।

যে ব্যাপারটা “বাংলাদেশী জাতির পিতা” শেখ মুজিবুর রহমানের ১৫ আগষ্টের শোকদিবস পালনের বিরোধিতা করে তারা যে সত্যটি ভুলে থাকেন তা হচ্ছে, শেখ সাহেবের শাসনকালের নানা ধরণের দুর্নীতি, স্বজন-প্রীতি ও অপশাসনের প্রতিবাদ হিসেবে তাঁকে এবং তাঁর নিরাপরাধ সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনদের ঠান্ডা মাথায় নির্বিচারে হত্যা ও পরবর্তীতে হত্যাকান্ডের বিচার না করাটা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য ছিলো না ।

কিছু মুজিব-ভক্তদের আতিশয্যকে ব্যঙ্গত্মকভাবে মিডিয়ায় উপস্থাপন করে শোকদিবস পালনকে হাস্যস্পদ করে তোলার অপচেষ্টা মুজিব-আওয়ামী বিরোধীদের অসহমর্মিতা ও কুরূচির পরিচায়ক । তেমনিভাবে আসলেই ১৫ আগষ্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন হলেও সেটা জেদের বশবর্তী হয়ে আড়ম্বরপূর্ণভাবে ঐদিন-ই তাঁর জন্য পালন করাটাও গর্হিত বলেই গণ্য হবে । ব্যাপারটা এমন নয় যে,খালেদা জিয়া বা অন্যান্য যাদের জন্ম হয়েছে ১৫ আগষ্ট তারা শোক দিবসের কারণে  ঘরোয়াভাবে হলেও জন্মদিন পালন করতে পারবেন না । “অবশ্য-ই মানুষের কর্মের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল” – বুখারীর এক নম্বর হাদীসটিতে অনেক সমস্যার সমাধান আছে । বিদেশে এখন অনেক সামাজিক অনুষ্ঠান (যেমন, জন্মদিন -এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন,ঈদ ফেস্টিভাল-ফেয়ার)ছুটির দিনে করা হয় মানুষের অংশগ্রহণের সুবিধার্থে । অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইংল্যান্ডের রাণীর জন্মদিন পালন করা হয় বছরের বিভিন্ন মাসের বিভিন্ন দিনে!এতে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই – এমনকি রাণীমাতার-ও !

সবশেষে আমি অনাবশ্যক আবেগ-বিবর্জিত নির্মোহ দুটি উদ্ধৃতিমূলক মূল্যায়নঃ

১) ভাষাসৈনিক প্রফেসর আব্দুল গফুর-এর মূল্যায়নঃ

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

মোহাম্মদ আবদুল গফুর : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন প্রথম দেখি তখনও তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠেননি। তিনি ১৯৪৮ সালে তখন পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা। থাকেন কলকাতায়। পড়েন ইসলামিয়া কলেজে। আমি তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। থাকি ফরিদপুরের স্টুডেন্টস হোমে। ফরিদপুরে এলে তিনি অন্তত একবার স্টুডেন্টস হোমে আসতেন। তাঁকে তখন দেখলেও তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়নি। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলন কালে ঢাকায়।…

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় স্বাধীন বাংলাদেশের এ অভ্যুদয়ের পেছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের ছিল ঐতিহাসিক ভূমিকা।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালের পুরো নয় মাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জেলে বন্দী ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের জেলে আটক থাকলেও সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ তাঁর নামেই পরিচালিত হয়। তিনি তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে জীবন্ত ফিরে আসতে পারবেন,এ বিশ্বাস অনেকেরই ছিল না। এই ধারণার বশীভূত হয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানকারী মুজিবনগর সরকারকে ভারতের জমিনে পেয়ে তাকে দিয়ে এমন এক সাত দফা চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করে, যার মধ্যে ছিলঃ

(এক). মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বাধীন থাকবে মুক্তিবাহিনী।
(দুই). স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনী অবস্থান করবে (কত দিনের জন্য তা নির্দিষ্ট থাকবে না)।
(তিন). বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী থাকবে না।
(চার). বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
(পাঁচ). বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য থেকে একটি সংস্থা গঠন করা হবে।
(ছয়). মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি এসব সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা হবে। প্রয়োজনে ভারতীয় কর্মকর্তাদের দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করা হবে।
(সাত). ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অবাধ সীমান্ত বাণিজ্য চলবে।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে প্রথমেই লন্ডন যান। সেখানে গিয়ে মুজিবনগর সরকারের সাথে স্বাক্ষরিত ভারতের এই চুক্তির বিষয়ে অবহিত হন এবং এ বিষয়ে তাঁর ইতিকর্তব্যও স্থির করে ফেলেন।

লন্ডন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পথে নয়াদিল্লিতে স্বল্পকালীন যাত্রাবিরতিকালে তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রথম সুযোগেই প্রশ্ন করে বসেন, ম্যাডাম, আপনার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে কবে ফিরিয়ে আনবেন? ইন্দিরা গান্ধী জবাব দেন, “আপনি যখন বলবেন, তখনই”। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনীর দ্রুত অপসারণের পথ সহজ হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু যে প্রথম ঘোষণাটি দেন, সেটা ছিল, বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। এটা যে শুধু তাঁর ঘোষণা মাত্র ছিল না তার প্রমাণ তিনি দেন, কিছুদিন পর লাহোরে যে ইসলামিক সামিট হয় তাতে। ভারতের বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে তিনি ঐ সামিটে যোগ দেন। এখানে উল্লেখ্য যে, যে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য এতদিন ভারতীয় পত্রপত্রিকা তাঁর প্রশংসায় মুখর ছিল, লাহোর ইসলামিক সামিটে তিনি যেদিন যোগ দেন সেদিন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।

২) সাবেক কূটনীতিক ও ইতিহাস গবেষক ড.মুহম্মদ সিদ্দিক বলেনঃ

বঙ্গবন্ধুর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

ড.মুহাম্মাদ সিদ্দিক : ১৫ আগস্ট একটা দুঃখজনক দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন সেদিন। তিনি ছিলেন একজন ‘মিস আন্ডারস্টুড’ নেতা। না তাঁর বন্ধুরা, না তাঁর শত্রুরা তাঁকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

তিনি একটা সামরিক ‘কু’র মাধ্যমে নিহত হলেন। আর এক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও তেমনিভাবে। জিয়ার সময়ে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে আঠার-ঊনিশবার ‘কু’ হয়েছে। পরবর্তীতে বিডিআরে ‘কু’ হলে ৫৭ জন চৌকস সামরিক অফিসার নিহত হলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ সবগুলোর একই উদ্দেশ্য। একটি গোষ্ঠী নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, অস্ত্রবলে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছতে চায়। এই ঘটনাগুলো শুধু ‘কু’ নয়- মস্ত বড় ধরনের সন্ত্রাস, যেখানে রাষ্ট্রেরই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।…

বাঙালি বা বাংলাদেশি জাতি খুবই অস্থির মতিসম্পন্ন। তারা জাতীয় নেতাদের একটা যুক্তিসঙ্গত সময় দিতে কার্পণ্য করেছে। তারা বুঝল না যে, যদি শেখ সাহেব জীবিত দেশে না ফিরতেন তাহলে দেশের কি অবস্থা হতো। চিত্তরঞ্জন সুতারসহ অনেকে তো অখন্ড ভারত বাস্তবায়ন করতে অনুরোধ করেন ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। বুদ্ধিমতি ইন্দিরা বলেন,“ইয়ে না মুশকিল হায়”-এটা সম্ভবপর নয়। তবে শেখ জীবিত ফেরত না আসলে তাই হতো, ‘মুসকিল হতো’ অথবা আমাদের ভাগ্য হতো সিকিম-ভুটানের মতো। আসলে ইন্ডিয়ার নিকট বাংলাদেশ তো সিকিম-ভুটানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভুটানের ডুকলাম সীমান্ত চীন-ইন্ডিয়া প্রশ্নে তাই প্রমাণ করল। বাংলাদেশের সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশের করিডোর ছাড়া ভারত কোনোক্রমে পূর্ব-ভারত ধরে রাখতে পারবে না।…

শেখের অবর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষতি হয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলে, কাউকে নাক গলাতে দিতেন না। কারণ তিনি ছিলেন স্বদেশপ্রেমিক।

শেষে বলতে হয়, শেখ নেলসন ম্যান্ডেলার মতো উদারমনা ছিলেন। তাঁর ছিল একটা ভিশন। তাঁর ভেতর ছিল ধর্ম। তিনি মধ্যপন্থী নেতা ছিলেন,উগ্রবাদে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তবে কেউ কেউ তাঁকে ভুল বুঝে। এটা খুবই দুঃখজনক।

স্টালিনের করুণ পরিণতি !

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

josef stalin 11সাইফ ইমন :রুশ সমাজতন্ত্রী রাজনীতিবিদ জোসেফ স্টালিন। সাধারণ দরিদ্র মুচি পরিবারের সন্তান ছিলেন। ১৬ বছর বয়সে জর্জিয়ান অর্থাডক্স বৃত্তি পান। স্কুল ছাড়ার পর বিপ্লবী লেনিনের লেখা পড়ে মার্কসবাদী বিপ্লবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্টালিন। শুরুতে সমাজতান্ত্রিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সচিব হিসেবে স্টালিনের ক্ষমতা সীমিত ছিল। ধীরে ধীরে স্টালিন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নেন এবং পার্টির নেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের কারণে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। সমালোচিত এই শাসককে অনেকে বলেছেন,‘লৌহমানবখ্যাত নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক’। নিজের গুণকীর্তন করে বদলে দিতে চেয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস। তবে ইতিহাস তাকে ক্ষমা করেনি। ইস্পাত-কঠিন মনের এই মানুষটির করুণ মৃত্যু হয়েছিল।

জোসেফ স্টালিন একজন রুশ সমাজতন্ত্রী রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯২২ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে ওই সময়ে স্টালিনের নেতৃত্বে প্রচলিত রাজনৈতিক মতবাদ ‘স্টালিনবাদ’ নামে পরিচিত। এ মতবাদ গোটা বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয়। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে স্টালিনবাদ। শুরুতে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সচিব হিসেবে স্টালিনের ক্ষমতা সীমিত ছিল। ধীরে ধীরে স্টালিন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নেন এবং পার্টির নেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের কারণে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। ১৯৩০-এর দশকে স্টালিন নিজের ক্ষমতা শক্ত করার জন্য জনসাধারণের ওপর নিপীড়ন শুরু করেন। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায় এই নেতা প্রায় ১৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। শুধু ১৯৩২ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ মানুষ মারা যায় সরকারি বাহিনীর অত্যাচারে।

josef stalin 12ছদ্মনামে

লৌহমানবখ্যাত নিষ্ঠুর শাসক জোসেফ স্টালিন। ১৮৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বরে তার জন্ম। তিনি একজন সাধারণ দরিদ্র মুচি পরিবারের সন্তান ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ডানপিটে। স্টালিনের আসল নাম ‘জোসেফ বেসারিওনি জুগাসভিলি’। ‘স্টালিন’ ছিল তার ছদ্মনাম। এর আগে তাকে ‘কোবা’ এবং ‘সোসেলো’ নামেও ডাকা হতো। ১০ বছর বয়সে মিশন চার্চ স্কুল দিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন তিনি। তখন স্কুলে জর্জিয়ান শিশুদের রুশ ভাষা শিখতে বাধ্য করা হতো। কৈশোরের শুরুতেই মারাত্মক আঘাত আসে স্টালিনের জীবনে। মাত্র ১২ বছর বয়সে গাড়ি দুর্ঘটনায় স্টালিনের বাম হাতটি চিরদিনের জন্য অচল হয়ে যায়। একসময় স্টালিনের অত্যাচারী বাবা তার স্কুলে যওয়া বন্ধ করে তাকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্টালিনের মা তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্টালিন ১৬ বছর বয়সে জর্জিয়ান অর্থাডক্স বৃত্তি পান। কিন্তু সেখানে তিনি সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধাচরণ করেন। ১৮৯৯ সালে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকায় তিনি বহিষ্কার হন। তবে সোভিয়েত নথি থেকে জানা যায়, তৎকালীন নিষিদ্ধ বই পড়ার দায়ে এবং গণতান্ত্রিক পাঠচক্র গড়ে তোলায় তাকে বহিষ্কার করা হয়। স্কুল ছাড়ার পর বিপ্লবী লেনিনের লেখা পড়ে মার্কসবাদী বিপ্লবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্টালিন।

রাজনৈতিক উত্থান

১৯০৩ সালে লেনিনের বলশেভিকে যোগ দেন স্টালিন। কিছুকাল পরেই তার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য জারের সিক্রেট পুলিশের নজরে পড়েন। এরপর গড়ে তোলেন গুপ্ত প্রতিরোধ। বলশেভিক থেকে তাকে ককেশাস অঞ্চলের বিপ্লবী প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেখানেই তিনি গড়ে তোলেন গুপ্ত আধা-সামরিক বাহিনী। তার নেতৃত্বে গুপ্তহত্যা, ব্যাংক ডাকাতিসহ নানা ঘটনা ঘটে। ১৯০৭ সালে ‘তিফিলস’ ব্যাংক ডাকাতির জন্য চরমভাবে নিন্দিত হন তিনি। এতে স্টালিনের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপ্লবের সময় তিনি বহুবার ধরা পড়েছিলেন। এমনকি সাইবেরিয়াতে নির্বাসিত জীবন যাপন করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি কোনো না কোনোভাবে পালিয়ে আসতে সমর্থ হন। শেষবার যখন তিনি আটক হন তখন তাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাধ্যতামূলক রুশীয় সেনা দলে যোগদানের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তার অচল বাম হাতের জন্য সেই যুুদ্ধে যেতে হয়নি। ১৯১৮-১৯২২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার সিভিল ওয়ারের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের আধা সামরিক সংগঠনকে বলা হতো রেড আর্মি যা ১৯৩০ সালে বিশ্বের বৃহৎ সেনাবাহিনীর স্বীকৃতি পায়। ১৯২১ সালের রেড আর্মি দ্বারা জর্জিয়া আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন স্টালিন। ওই সফলতায় লেনিনের সঙ্গে স্টালিনের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। পরবর্তীতে পার্টির প্রতি আনুগত্য, দৃঢ় প্রত্যয়ী স্টালিনকে পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

১৯২২ সালে লেনিনের প্রথম স্ট্রোকের পর স্টালিন পার্টির প্রায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি লেনিনকে বাইরের পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এতে পার্টির অন্য বড় নেতারা বিরাগভাজন হন। লেনিনও ধীরে ধীরে স্টালিনের স্বেচ্ছাচারিতা, অসুলভ আচরণ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়েন। পরিশেষে পার্টির সর্বোচ্চ পদ থেকে সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেন। কিন্তু ধূর্ত স্টালিনের কূটচালে তা আর কখনো সম্ভব হয়নি। জনসম্মুখে লেনিনের শেষ ইচ্ছাপত্র সম্পূর্ণরূপে আর কখনো প্রকাশ হতে দেননি স্টালিন। উল্টোদিকে স্টালিন হয়ে ওঠেন চরম প্রভাবশালী নেতা। তার বিরুদ্ধাচরণ করলেই নেতাদের বহিষ্কার করেন। ট্রটেস্কির মতো নেতাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। সেই থেকে স্টালিনের দাম্ভিকতা শুরু। শুরু হয় চরম স্বেচ্ছাচারিতা আর নৃশংসতা। চলে ক্ষমতার শেষ দিন পর্যন্ত। তার তৈরি রুশ সিক্রেট পুলিশ ১৯৫৪ সালে কেজিবি বা কমিতেত গসুদারস্তবিন্নি বেজাপাদনোস্তি জন্ম নেয়। স্টালিন লেনিনের পাশাপাশি নিজের একটা ভিন্নধর্মী ইমেজ তৈরি করতে সচেষ্ট হন। তিনি নিজের নামে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক শহর ও গ্রামের নামকরণ করেন। স্টালিন শান্তি পুরস্কার নামে একটি পুরস্কারের প্রবর্তন করেন। স্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়নে কেন্দ্রীয় অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তদানিন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় সবটুকুই অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ছিল।

স্টালিন দ্রুত শিল্পায়ন ও কৃষিকার্যের কেন্দ্রীয়করণের মাধ্যমে পুরো দেশটি অল্প সময়ের মধ্যে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করেন। কিন্তু একই সময়ে অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের দরুন কোটি কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যান। স্টালিনের শাসনকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয় এবং নািস জার্মানির পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্টালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের দুই পরাশক্তির একটিতে পরিণত হয়, যা ৪০ বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্টালিন জাতীয় সংগীতে নিজের নাম ঢুকিয়ে দেন। নিজেকে মহৎ রূপে মানুষের হৃদয়ে প্রথিত করার জন্য সে সময়ের কবিতা, সাহিত্য, নাটক, সিনেমায় তাকে ভক্তি ভরে উপস্থাপন ও তার কর্মকাণ্ড মহান করে ফলাও করে প্রচার করতে বাধ্য করেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, স্টালিন ১৯৪৮ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন!

স্টালিন নতুন করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস লিখতে বাধ্য করেন যা ১৯১৭ বিপ্লব থেকে শুরু করে পরবর্তীকাল পর্যন্ত তাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। স্টালিনের মতে ‘ভাষা’ সামাজিক ভিত্তির কোনো অবকাঠামো নয়। সমাজের ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক, দার্শনিক, আইনগত, ধর্মীয়, শিল্পসাংস্কৃতিক বিভিন্ন মত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ সেই অর্থনৈতিক কাঠামোর অবকাঠামো।

স্টালিনের ভয়াবহতা

স্টালিন কেজিবির মাধ্যমে মেক্সিকোতে অবস্থানরত সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিভা ও লেনিনের ঘনিষ্ঠ সহচর লিওন ট্রটেস্কিকে হত্যা করেন। ট্রটেস্কি ছিলেন রুশ বিপ্লবের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং লেনিনের শিষ্য। রেড আর্মি গঠনেও ট্রটেস্কি প্রশংসিত ভুমিকা রেখেছিলেন। ১৯২০ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হলে স্টালিনের সঙ্গে ট্রটেস্কির বিরোধ শুরু হয়েছিল। ১৯৩০-এর দশকে স্টালিন নিজের ক্ষমতা শক্ত করার জন্য নিপীড়ন শুরু করেন। যার ফলে কমিউনিস্ট পার্টির শত্রু সন্দেহে লাখো মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়।

আবার সাইবেরিয়া ও কেন্দ্রীয় এশিয়ার নির্যাতন কেন্দ্রে নির্বাসিত করা হয় অনেক মানুষকে। রাশিয়ার অনেক জাতিগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি থেকে উত্খাত করে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। স্টালিনের কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এই অত্যাচার নিপীড়নে পরিবারের কেউ তাকে সমর্থন করত না। স্টালিনের শাসনামলে চার্চের ওপর দুর্যোগ নেমে আসে। ১৯১৭ সালে হিসাব মতে চার্চের সংখ্যা ছিল ৫৪ হাজার যা পরবর্তীতে মাত্র কয়েকশতে নেমে আসে। বহু চার্চ স্টালিনের নির্দেশে ধ্বংস করা হয় বলে মনে করেন ইতিহাস গবেষকরা। রোমান ক্যাথলিক চার্চ ব্যালস্টি, ইসলাম ও বৌদ্ধ ধর্মসহ অন্যান্য ধর্ম নিগৃহীত হয়। হাজার হাজার চার্চ, ইহুদি, গির্জা, মসজিদ, মন্দির হাজারো বৌদ্ধবিহার মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার পুরোহিত, যাজকদের হত্যা এবং আটক করা হয়। তার সময়ে অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সাইবেরিয়া, মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলে বহু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর গতানুগতিক জীবন ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়। এ ছাড়া কথিত জাতীয়তাবাদী উত্থান দমন অভিযান চালায় স্টালিন। যার ফলে সোভিয়েত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ উদ্বাস্তু হয়ে নানা দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্নতাবাদ, সোভিয়েত শাসনের বিরোধিতা এবং জার্মানদের সঙ্গে সহযোগিতা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে জড়িত হিসেবে নির্বাসনে পাঠানো হয় সেসব জাতিগোষ্ঠীকে। জাতীয় পরিচয় নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক লোককে সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। স্টালিনের শাসনামলে কত লাখ লোকের মৃত্যু ঘটেছে তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। ১৯২৬-৩৭ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

russia famine 1931-34১৯৩১ থেকে ১৯৩৪ সালের দুর্ভিক্ষে অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ১৯২৬ সালের আদমশুমারি তথ্য বলছে সোভিয়েত ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৭০ লাখ যা ১৯৩৭ সালের আদমশুমারিতে লোকসংখ্যা হয় আগের লোকসংখ্যার চেয়ে ১ কোটি ৪০ লাখ বেশি। এ আদমশুমারিকে চৌর্যবৃত্তির শুমারি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। গণনাকারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে আবার আদমশুমারি করা হয়। অনেকেই বলেন, স্টালিনের সরাসরি হস্তক্ষেপে এ আদমশুমারির লোকসংখ্যা ১৭ কোটি বলে অপপ্রচার করা হয়। বিশাল অঙ্কের মানুষের মৃত্যুতে জনসংখ্যা হ্রাস পায়। যার ফলে সত্যতা ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

হিটলার বনাম স্টালিন

josef stalin 14মানুষ হত্যা করে অথবা ভয় দেখিয়ে নিজের ক্ষমতার আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে হিটলার, স্টালিন দুজনেই ছিলেন পারদর্শী। দুজনকেই নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে পৃথিবীর মানুষ জানে। দুজনের বাল্যকাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কিছু মিল রয়েছে দুজনের মধ্যে। স্টালিন এবং হিটলারের বাল্যকালে কিছু অদ্ভুত মিল রয়েছে। দুজনেই অত্যাচারী মদ্যপ পিতার সন্তান।

মায়েরাই অনেক কষ্টে মানুষ করেছেন এবং জীবনের প্রথম থেকে দুজনই ব্যক্তিগত জীবনে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন। স্টালিনের মদ্যপ পিতা বেসেরিয়ান তাকে ১২ বছর বয়সে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে জুতার ফ্যাক্টরিতে কাজে দিয়েছিলেন। স্টালিনের মা কিটোভেন স্টালিনকে আবার স্কুলে ভর্তি করান। এই ঘটনায় স্টালিনের বাবা তার মাকে চিরতরে ত্যাগ করেন। অথচ স্টালিন ১৯৩৩ সালে মার মৃত্যুর পরও মাকে দেখতে যাননি। একবারের জন্যও তার মনে আসেনি তার শিক্ষার পেছনে তার মা কিটোভেনের আত্মত্যাগের কথা।

হিটলারের পিতা আলিয়জ হিটলার স্টালিনের বাবার মতো সমান অত্যাচারী ছিলেন। স্টালিন তবুও স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিলেন। তবে হিটলার হাইস্কুল পাসই করতে পারেননি। স্টালিনের মতো হিটলারের বাবাও চাইতেন ছেলে কাজে যোগ দিক। হিটলার বাবার হাতে প্রচণ্ড মার খেতেন। এক কথায় ছোটবেলা থেকে ফ্যামিলি ভায়োলেন্সের মধ্যেই বড় হয় এই দুই নিষ্ঠুর শাসক। হিটলারকে অনেকটা গণতান্ত্রিক পথেই হাঁটতে হয়েছে। কিন্তু স্টালিনকে রীতিমতো বিপ্লবী আন্দোলন করে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়েছিল। স্টালিন ছিলেন জর্জিয়ান আর হিটলার ছিলেন অস্ট্রিয়ান। দুজনই পৃথিবীর ইতিহাসে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে সমালোচিত হয়েছেন।

করুণ পরিণতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হঠাৎ করেই শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয় জোসেফ স্টালিনের । অতিরিক্ত ধূমপানের জন্য ‘অথেরোসেক্লরোসিস’ রোগে আক্রান্ত হন! ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে তিনি মস্তিষ্ক প্রদাহে আক্রান্ত হন। ১৯৫৩ সালের পয়লা মার্চে রাতে এক রেস্ট হাউসে ঘুমোতে গেলে তার ম্যাসিভ ব্রেইন স্ট্রোক হয়। তার দেহরক্ষী ও পাহারাদাররা ভেবেছিল রাত জাগরণের কারণে তিনি দীর্ঘক্ষণ ঘুমাচ্ছেন। আর তাকে ঘুমের মধ্যে ডাকাও নিষেধ ছিল কঠোরভাবে। তাই কেউ সাহস পায়নি স্টালিনের খোঁজ নেওয়ার বা তার শোবার ঘরে প্রবেশ করার। অনেক পরে সাহস করে এগিয়ে আসেন রেস্ট হাউসের এক কমান্ডার। রাত তখন ১০টা শয়ন কক্ষের দরজা খোলার পর দৃশ্যটা সত্যিই আতঙ্কিত করার মতো ছিল। কমান্ডারের চিৎকারে সবাই প্রবেশ করেন স্টালিনের শয়ন কক্ষে। দেখা যায় লৌহমানব স্টালিন তার নিজের মুত্র গায়ে মেখে মেঝেতে জবুথবু হয়ে পড়ে আছেন। কিন্তু তিনি তখনো বেঁচে ছিলেন। জোসেফ স্টালিনের শরীর পরিষ্কার করে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়। ২ মার্চ সকালে ডাক্তার এসে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ৫ মার্চ ১৯৫৩ সালে ৭৪ বছর বয়সে স্টালিন মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে ১৯৪৫ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে পয়লা মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিয়া, ভাবী প্রধানমন্ত্রী জর্জি মালেকভ ও নিকিতার সঙ্গে সারা রাত আড্ডা ও মুভি দেখেছিলেন জোসেফ স্টালিন। আড্ডা শেষে মস্কো সেন্টার থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে তার কুন্তোসভো রেস্ট হাউসে ঘুমাতে যান। তারপরই ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এক করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে জীবনাবসান ঘটে এই স্বৈরশাসকের।

প্রেমিক স্টালিন

josef stalin 13স্টালিনের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ দেখলে মনে হওয়ার কথা নয় এই মানুষটার মনেও দয়ামায়া কিংবা প্রেম বলতে কিছু একটা থাকতে পারে। অসীম ক্ষমতাশালী এই মানুষটির জীবনে যুদ্ধবিগ্রহ ছাপিয়ে প্রেমও এসেছিল। বলা হয়ে থাকে স্টালিন যখন ৩০ বছরের তরুণ তখন ১৩ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে তার প্রেম হয়েছিল। অবশ্য অনেকে দাবি করেন মেয়েটিকে স্টালিন ধর্ষণ করেছিল। লিডিয়া নামের এই মেয়েটিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত এই গল্পকে স্টালিন বিরোধীদের প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও স্টালিনের ব্যক্তিগত জীবন পর্যলোচনা করলে প্রেমের অনেক চিহ্ন নজরে আসবে। ব্যক্তি জীবনে স্টালিন দুটি বিয়ে করেন। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন ক্যাটরিনা ভ্যানিজ এবং আর দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যাডিজডা অ্যালিয়েভা। এর মধ্যে ক্যাটরিনার সঙ্গে মাত্র এক বছরের দাম্পত্যজীবন হলেও দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে মোটামুটি এক যুগ সংসার করেন স্টালিন। যার ঘরে তার প্রথম সন্তান ‘ইয়াকভ’ এর জন্ম হয়। কিন্তু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অল্প সময়েই মারা যায় ইয়াকভ। পরবর্তীতে এক মেয়ে এবং তিন ছেলের জন্ম দেন এই দম্পতি।

শৌখিন স্টালিন

josef stalin 15স্টালিন মদ খেতেন প্রচুর কিন্তু কখনোই মাতাল হতেন না। তার রাশিয়ান ভদকার থেকে জর্জিয়ান ওয়াইন অনেক প্রিয় ছিল। তবে রাশিয়ান ঐতিহ্যবাহী খাবার তিনি বেশ পছন্দ করতেন। তার প্রিয় ছবির ক্যাটাগরিতে ছিল আমেরিকান ‘ওয়েস্টার্ন ফিল্ম’। ছুটির অবসরে তিনি তার উচ্চ পদমর্যাদার রাজনৈতিক সহচরদের নিয়ে ‘ক্রেমলিন মুভি থিয়েটারে’ সিনেমা দেখতে যেতেন। স্টালিনের প্রিয় মুভির তালিকায় ছিল ‘চার্লি চ্যাপলিন’। তবে তিনি কখনোই চলচ্চিত্রে নগ্নতাকে পছন্দ করতেন না। স্টালিনের বিশ হাজার বইয়ে ঠাসা একখানা ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। দিনে সর্বোচ্চ ৫০০ পৃষ্ঠা অবধি পড়তেন বলে জানা যায়।

সর্বকালের সেরা ধনীর তালিকায় তার নাম

জোসেফ স্টালিন সর্বকালের সেরা ধনীর তালিকায় প্রথম সারিতেই অবস্থান করছেন। তার যে পরিমাণ সম্পদ ছিল যা দিয়ে তিনি বৈশ্বিক জিডিপির ৯.৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। বার্মিংহামের আলাবামা ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক জর্জ’ও লিবার বলেন, কোনো রকম চেক বা নগদ অর্থ ছাড়াই স্টালিন এই পৃথিবীর ছয় ভাগের একভাগ ভূমি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি পুরো দেশের সব সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতেন।

জোসেফ স্টালিন ছিলেন এমন একজন স্বৈরশাসক যার ছিল প্রবল ক্ষমতা। সেই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলকেও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। অবশ্য স্টালিনের সম্পদ আর গোটা সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পদকে দৃশ্যত আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। পরিসংখান অনুযায়ী স্টালিনের মৃত্যুর তিন বছর আগে অর্থাৎ ১৯৫০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির ৯.৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত সোভিয়েত ইউনিয়ন। ২০১৪ সালের হিসাবে এই সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। যার নিয়ন্ত্রণ ছিল জোসেফ স্টালিনের হাতে। যদিও এসব অর্থ সরাসরি স্টালিনের ছিল না তবে যে কোনো সময় তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থ ব্যবহার করতে পারতেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে তার সর্বময় ক্ষমতাবলে তিনি যা ইচ্ছা তাই পেতে পারতেন।

দেশবরেণ্য রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

sharif enamul kabir 2দেশবরেণ্য রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির ১৯৫৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার সাতাশিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির একজন দেশবরেণ্য রসায়নবিদ। বিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়

তার শৈশব-কৈশোরের সময়গুলো কেটেছে জাতির জনকের পূর্ণ ভূমিতে। ছোট বেলা থেকেই অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে লালন করেই তিনি বেড়ে ওঠেছেন। জন্মের কয়েক বছরের মাথায় বাবাকে হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। মায়ের স্নেহ ভালোবাসার মাঝে তিনি বেঁচে থাকার নতুন অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। বাবা সবসময় চাইতেন ছেলে পড়ালেখা করে তার মুখ উজ্জ্বল করুক। বাবার সেই স্বপ্নকে তিনি ছোট বেলা থেকেই নিজের মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছেন।

শরীফ এনামুল কবিরের শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের অন্য আট-দশটা সাধারণ ছেলের মতোই। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করতে বেশ পছন্দ করেন। গ্রামের মাটির রাস্তা, বর্ষার কাদা-পানি এসবের ভেতর দিয়েই তাকে স্কুলে যেতে হতো। হাইস্কুলে যেতেন নৌকা বেয়ে, প্রায় আড়াই মাইলের মতো পথ নৌকা বেয়ে স্কুলে যেতে হতো তাকে। ছাত্র জীবন থেকেই তার বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক ছিল।

নিজ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর তিনি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি জাহাঙ্গীরনগরে অর্গানোমেটালিক ও ক্লাস্টার রসায়নের ওপর গবেষণা শুরু করেন। তিনি আমেরিকা, ইল্যান্ড, সুইডেন ও জার্মানিতে একাধিক পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণাসম্পন্ন করেন। ভিজিটিং স্কলার হিসেবে তিনি ক্যালিফর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থ রিজে এ জে ডিমিং এর তত্ত্বাবধানে প্রফেসর এডওয়ার্ড রোজেনবার্গ ও প্রফেসর কেনেথ হার্ড-কাসলের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করেন। ১৯৯৪ সালে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এডওয়ার্ড রোসেনবার্গের গ্রুপে যোগদান করেন। অ্যালেকজান্ডার ফন হামবোল্ট স্কলার হিসেবে তিনি প্রফেসর হেনরি বারেনক্যাম্পের সঙ্গে ফ্রাইবুর্গ ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেন। এরপর তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিটিং প্রফেসর হিসেবে দুই বছর অধ্যাপনা করেন।

সারা দেশে যে কয়জন প্রথিতযশা রসায়নবিদ আছেন তাদের মধ্যে অনন্য সাধারণ অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির। তিনি বাংলাদেশের মোস্ট-সাইটেট রসায়ন গবেষক। গবেষণার জন্য তিনি দেশে ও বিদেশে সুপরিচিত। রসায়ন বিষয়ে তার বিভিন্ন গবেষণা প্রবন্ধ দেশের বাইরের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়।

তার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের ৩২০টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এ পর্যন্ত এমএসসি, এমফিল, পিএইচডি পর্যায়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর গবেষণা তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি সৃজনশীল কাজেও বেশ পারদর্শী।

বিজ্ঞানর্চায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ দেশবরেণ্য এ রসায়নবিদ বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সাইন্স এবং এমওগণি গোল্ড মেডেল লাভ করেছেন। ১৯৯০ ও ২০১১ সালে তিনি রসায়নে গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসংখ্য পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। অতি সম্প্রতি তিনি বিজ্ঞান গবেষণায় অনন্য অবদানের জন্য ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ৭ম আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক লাভ করেন।

গবেষণা ও শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ বারের ট্রেজারার, শিক্ষক সমিতির সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি, সিনেট সদস্য, সিন্ডিকেট সদস্য এবং ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবেও। বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সাইন্স, বাংলাদেশ ক্যামিকেল সোসাইটি, রয়েল সোসাইটি অব কেমেস্ট্রির ফেলো হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। এছাড়াও তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর আর্দশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ এর প্রতিষ্ঠাতা।

নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও অভিভাবক সুলভ ব্যবহার দিয়ে তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীর হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির তাদের কাছে যেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জীবন্ত কিংবদন্তি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ যাবৎ কাল পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক।

এই গুণী শিক্ষকের অবসর কাটে অবন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। অবসরে শিক্ষকতার পাশাপাশি লোখালেখি, গান শুনে সময় কাটান।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞান গবেষণার দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্ববৃহৎ ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ হাতে নেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি সম্পূর্ণ সেশনজট মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সারাদেশে পরিচিতি লাভ করে। এরপর আরো অনেক ভাইস চ্যান্সেলর আসলেও তারা কেউই এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। এছাড়া র‌্যাগিং নামক ভয়াবহ ব্যাধি থেকে তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়কে বের করে আনেন। তার সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ও গবেষণায় একটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার একগুচ্ছ কথা মালায়।

জিন্নাহর সেই বাড়ি এখন ভারতে ‘শত্রু সম্পত্তি’

অগাষ্ট 12, 2017 মন্তব্য দিন

jinnah house topviewমুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানে কায়েদ-এ-আজম বলা হয়। কিন্তু এই জিন্নাহকেই ভারতের বেশীর ভাগ মানুষ অপছন্দ করে। দেশটিতে তার নাম উচ্চারণ করাও হয়ে থাকে কিছুটা অশ্রদ্ধার সঙ্গেই। কারণ, তাকেই দেশভাগের জন্য দায়ী বলে মনে করেন ভারতীয়দের অনেকে। সেই সময়ের দাঙ্গায় কয়েক লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলেন, ছিন্নমূল হয়েছিলেন এক কোটিরও বেশী মানুষ। দেশভাগের সেই ক্ষত এখনও অনেকের মন থেকে মুছে যায়নি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জিন্নাহ নিজের তৈরি দেশ পাকিস্তানে চলে গেলেন, কিন্তু ভারতে ফেলে গেলেন নিজের একটি অতি প্রিয় জিনিস—মুম্বাইতে তার বাড়ি। ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে অন্য অনেক বিষয় নিয়ে যেমন বিবাদ রয়েছে, তেমনই বিবাদ রয়েছে জিন্নাহর বাড়ি নিয়েও। এই বাড়িতে থাকার সময়েই পাকিস্তান তৈরির পরিকল্পনা করেন জিন্নাহ, লড়াইটাও চলেছিল এখান থেকেই। সেজন্যই পাকিস্তান এই বাড়িটিকে তাদের সম্পত্তি বলে মনে করে।

পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কাছে মুম্বাইয়ে জিন্নাহ’র বাড়ি একটা ‘তীর্থস্থানের’ মতো। তবে ভারতের কাছে মুম্বাই শহরে জিন্নাহর ওই বাড়িটি চোখে বালি। এই বাড়িটিকেই দেশভাগের পরিকল্পনার মূল আড্ডা বলে মনে করা হয়। ভারত এই বাংলো বাড়িটিকে ‘শত্রু সম্পত্তি’ বলে চিহ্নিত করে রেখেছে। সরকারের দখলে থাকা বাংলো বাড়িটি এখন পরিত্যক্ত।

মুম্বাইয়ের এক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা জিন্নাহর বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলারও দাবি তুলেছেন। তিনি বলেন, দেশভাগের জন্য দায়ী যে জিন্নাহ, তিনি বানিয়েছিলেন বাড়িটি। দেশভাগের কারণে যে রক্তপাত ঘটেছে, এই বাড়ির দিকে তাকালে সে কথা মনে পড়ে যায়। সেজন্যই বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলা উচিত।

উল্লেখ্য, জিন্নাহর মুম্বাই শহরের প্রতি খুব টান ছিল। ইংল্যান্ড থেকে ফিরে সেখানেই বাস করতেন তিনি। ইউরোপীয় বাংলোর ধাঁচে তৈরি হয়েছিল ‘সাউথ কোর্ট’ নামের বাড়িটি। ১৯৩০ এর দশকে বাড়িটি বানাতে জিন্নাহর খরচ হয়েছিল দুই লাখ রুপি। দক্ষিণ মুম্বাইয়ের মালাবার হিলস এলাকার ঐ বাড়িটি থেকে সমুদ্র দেখা যায়। প্রখ্যাত আর্কিটেক্ট ক্লড বেটলী বাংলোটির ডিজাইন করেছিলেন। মিস্ত্রী আনা হয়েছিল ইতালি থেকে।

বাড়িটি তৈরির জন্য জিন্নাহ যতটা যত্ন নিয়েছিলেন, তা থেকেই বোঝা যায় যে তিনি স্থায়ীভাবে মুম্বাইতেই থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তিনি মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তুলে শোরগোল ফেলে দিলেন। সেই দাবি আদায় করেও ছাড়লেন। জিন্নাহর ধারণা ছিল দেশভাগের পরে ভারত আর পাকিস্তানের সম্পর্ক এতটাই ভাল হয়ে উঠবে যে তিনি ইচ্ছা হলেই মুম্বাইতে এসে নিজের বাড়িতে সময় কাটাতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটল অন্যরকম। দুই দেশের মধ্যে সীমানা তৈরি হতেই মানুষের মনেও উঁচু প্রাচীর গড়ে উঠল। তাই নিজের স্বপ্নের বাংলোয় ফিরে আসার স্বপ্নও অপূর্ণ রয়ে গেল।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা

দেশের প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা

অগাষ্ট 11, 2017 মন্তব্য দিন

nazmun ara sultana 5বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা দেশের ইতিহাসে আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি। হাইকোর্টেও তিনি ছিলেন প্রথম নারী বিচারপতি।

১৯৫০ সালের ৮ জুলাই মৌলভীবাজারের চৌধুরী আবুল কাশেম মঈনুদ্দীন ও বেগম রশীদা সুলতানা দীন দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন নাজমুন আরা সুলতানা। তারা তিন বোন ও দুই ভাই। ভাইবোনের সঙ্গে শৈশব-কৈশোরের সময়টা কেটেছে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে।

ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে এসএসসি, ১৯৬৭ সালে মুমিনুন্নেসা উইমেন্স কলেজ থেকে এইচএসসি এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।

মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। বাবার ইচ্ছা ছিল তার সন্তানদের কেউ একজন আইনজীবী হবে। বাবার স্বপ্নপূরণে বিএসসি পাসের পর তিনি মোমেনশাহী ল কলেজে ভর্তি হন। মা রশীদার উৎসাহে প্রতিকূলতা জয় করে বাবার স্বপ্ন পূরণে ১৯৭২ সালে এলএলবি পাস করেন তিনি।

১৯৭২ সালের জুলাইয়ে ময়মনসিংহ জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। স্বাধীন দেশে নারীদের বিচারক হওয়ার বিধান ছিল না। ১৯৭৪ সালে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। নাজমুন বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৫ সালের ২০ ডিসেম্বর মুনসেফ হন।

নিম্ন আদালতে দেশের প্রথম নারী বিচারক হিসেবে নাজমুন খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে সাবজজ হন। কয়েক দফা পদোন্নতির পর ১৯৯১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা জজ হন। কোনো নারীর জেলা জজ হওয়ার ঘটনা সেটাই ছিল প্রথম।

২০০০ সালের ২৮ মে তিনি হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর দুই বছর পর হাইকোর্টে স্থায়ী হন তিনি। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। দূরদর্শী এ বিচারপতি বাংলাদেশ মহিলা জজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

হাইকোর্ট বিভাগে তাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে নাজমুন আরা সুলতানা ফতোয়া বিষয়ক মামলা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ির মামলা, চারদলীয় জোট সরকার আমলে বাদপড়া ১০ বিচারপতির মামলা, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল সংক্রান্ত বিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলা এবং উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ বিষয়ক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিচারক ছিলেন।

নারী বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ উইমেন জাজেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডব্লিউজেএ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক নারী আইনজীবী সংস্থায় দু’বার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা সুদীর্ঘ কর্মজীবনে ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইতালি, জাপান, আমেরিকা, চীন, ইরান, ইরাক, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ড, পানামা ও হংকং সফর করেন।

ভুল বিচার করিনি কখনই

nazmun ara sultana 3বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতান :আল্লাহ আমাকে বিচারক বানিয়েছেন, এদেশের প্রথম নারী বিচারক। তবে আমার বিচারক হওয়ার পেছনে আমার মরহুম আব্বার ইচ্ছা ও আমার আম্মার প্রেরণা বড় ভূমিকা রেখেছে। আমার আব্বা আমাদের ৫ ভাই-বোনকে ছোট রেখেই মারা যান। আব্বার ইচ্ছা ছিল তার সন্তানদের মধ্যে একজন ব্যারিষ্টার হবে। কিন্তু আমার মায়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি তার কোন সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে ব্যারিষ্টারি পড়ানোর। আমার মনে হয়েছিল আমি আইন পড়লে আমার আব্বার ইচ্ছা খানিকটা পূরণ হবে। আমি ল’ কলেজে ভর্তি হলাম আম্মার উত্সাহে। মফস্বল শহরের ল’ কলেজ। রাত্রে ক্লাস হয়। ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত ৯ টার বেশি হয়ে যায়। ঐ সময় মফস্বল শহরে অল্প বয়সের কোন অবিবাহিত মেয়ে রাত ৯ টায় একা রিক্সায় করে বাড়ি ফিরবে-এটা খুব একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু আমার মায়ের সাহস ও প্রেরনায় আমি আইন পড়া চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম। ল’ পাশ করে ময়মনসিংহ জেলার প্রথম নারী আইনজীবি হিসেবে আমি আইন পেশায়ও যোগ দেই আমার অসীম সাহসী মায়ের প্রেরণায়।

ময়মনসিংহের জজ কোর্টে আমি প্রথম যেদিন আইনজীবি হিসাবে যোগদান করি সেদিনটির কথা আমার হূদয়ে গেঁথে আছে। ঐ দিনই বোধহয় আমার মনের কোণায় ইচ্ছাটা উঁকি দিয়েছিল -‘আমি কি জজ হতে পারি না?’ কিন্তু জানলাম আমি জজ হতে পারি না। বাংলাদেশে নারীরা জজ হতে পারে না। কিন্তু আমার মনের জজ হওয়ার প্রবল ইচ্ছাটা হয়তো জগত্কর্তাকে ছুঁয়েছিল। আমি ওকালতি শুরু করার বছর দেড়েকের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার নারীদের বিচারক না হওয়ার বিধানটি তুলে নেয়।

১৯৭৪ সালে সরকার বিচারক (মুন্সেফ) পদে নিয়োগের জন্য দরখাস্ত আহ্বান করে কাগজে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলো। আমি আবেদন করলাম। কিন্তু বেশ কিছুদিন হয়ে যায় কোন সাড়া পাইনা। ইতিমধ্যে আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমি স্বামীর সাথে তাঁর কর্মস্থল খুলনায় চলে যাই। খুলনায় যাওয়ার ১৪ দিন পরেই খবর যায় আমার মা খুব অসুস্থ। মার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমি সাথে সাথেই ময়মনসিংহ চলে আসি। আম্মা একটু সুস্থ হলে, আমি আম্মার বাসায় ঝুলানো লেটারবক্স  খুলে আমার অ্যাডমিট কার্ড পাই। কার্ডটি টি খুলে দেখলাম আর মাত্র ৬/৭ দিন পরেই আমার বি, সি, এস, লিখিত পরীক্ষা, ১০০০ মার্কস্ এর। ভয় পেলাম-এত অল্প সময়ের মধ্যে প্রিপারেশন নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া কি করে সম্ভব! আমার মা আমাকে সাহস জোগালেন। আমরা ঐ ব্যাচে মোট ১৮ জন নিয়োগ পেয়েছিলাম। আমি তৃতীয় হয়েছিলাম। তবে আমার ওপরের দুই জনের একজন চাকুরিতে যোগ না দেওয়ায় এবং অন্য জন অল্প কিছুদিন পরেই চাকুরি ছেড়ে দেওয়ায় আমি আমার ব্যাচের 1st man হিসাবেই ছিলাম। আমার আম্মা যদি ঐ সময় অসুস্থ হয়ে না পড়তেন তাহলে ঐ বিশেষ সময়টায়, বিয়ের মাত্র ১৫/২০ দিন পর, আমার খুলনা থেকে ঢাকায় আসা হতো না, বি, সি,এস, পরীক্ষাটা হয়তো দেওয়া হতো না-বিচারকও হওয়া হতো না। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাকে বিচারক করবেন বলেই হয়তো আমার আম্মা ঐ সময়টায় অসুস্থ হয়েছিলেন।

দেশের প্রথম নারী বিচারক হয়ে আমি খুলনার জজশীপে মুন্সেফ হিসাবে যোগদান করি ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে। ঐ সময়টায় এটি একটি বেশ গুরুত্ব্বপূর্ণ খবর হিসাবে দেশের খবরের কাগজগুলোতে ছাপা হয়েছিল। প্রতিক্রিয়া দুরকমেরই হয়েছিল। কেউ কেউ স্বাগত জানিয়েছিলেন আবার অনেকে নাক সিঁটকেছিলেন-‘নারী আবার বিচারক হতে পারে না কি-নারী আবার কী বিচার করবে?’ কর্মক্ষেত্রেও আমি এই দুরকমের আচরণই পেয়েছিলাম। অনেকের  কাছ থেকে অবজ্ঞা পেলেও অনেকের কাছ থেকেই আমি খুবই ভাল আচরণ পেয়েছি, উত্সাহ পেয়েছি, সাহায্য পেয়েছি। ঐ উত্সাহ, সাহায্যটুকু না পেলে হয়তো আমার বিচারক হিসাবে টিকে থাকাই সম্ভব হতো না।

প্রথম নারী বিচারক হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যাইনি – আল্লাহর কাছে তাই আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রথম নারী বিচারক হিসেবে আমি ব্যর্থ হলে হয়তো আজ বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ নারী বিচারক হতো না। বাংলাদেশের নারী বিচারকরা অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছু অসুবিধা-বিপদের সম্মুখীন হন যা দুর করার দায়িত্বে  উর্ধবতন যে পুরুষ বিচারকরা আছেন – তাঁরা অনেক সময়ই সে অসুবিধা, বিপদ বুঝতেই পারেন না বা বুঝতে চানই না। নারী বিচারকদের সুবিধা-অসুবিধা, বিপদ-সংকট ইত্যাদি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার জন্যই মূলত আমি ১৯৯০ সনে আমার কিছু নারী সহকর্মীদের সহযোগিতায় গঠন করি বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশন -যা এখন সারা বিশ্বের নারী বিচারকদের কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত সংগঠন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী বিচারকদের নিয়ে গঠিত হয়েছে International Association of Women Judges (IAWJ) যার বর্তমান সদস্য সংখ্য প্রায় ৫০০০। বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশন- International Association of Women Judges এর জন্মলগ্ন থেকেই এই সংগঠনটির সদস্য।

আমি বিশ্বাস করি আল্লাহর পরেই ন্যায় বিচারকের স্থান-যা সহীহ্ হাদিসে বর্ণিত আছে। জেনে বুঝে অবিচার করা বা অমনোযোগী হয়ে বা অবহেলা করে ভুল বিচার করা আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না। পক্ষাশ্রিত হয়ে বা কোন কারণে বা কারো দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে বিচার করা মহাপাপ। আমার আত্মতৃপ্তি-আমি জেনেবুঝে বা অবহেলা করে বা অমনোযোগী হয়ে বা পক্ষাশ্রিত বা প্রভাবান্বিত হয়ে ভুল বিচার, অন্যায় বিচার করিনি কখনই।

বিচারকদের সঠিক বিচার করার কাজে সহায়তা করার দায়িত্ব আইনজীবিদের। আইনজীবিদের সহায়তা ছাড়া একজন বিচারকের পক্ষে সঠিক বিচার করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। একজন বিচারক তাঁর জ্ঞান সমৃদ্ধ করেন আইনজীবীদের জ্ঞান থেকেই। বিজ্ঞ আইনজীবিরাই গড়ে তোলেন একজন দক্ষ বিচারক। আমার যেটুকু অর্জন তার সবটাই আইনজীবীদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞানের জন্যই।

(অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দেয়া সংবর্ধনার জবাবে। সংক্ষেপিত)