আর্কাইভ

Archive for the ‘জীবনযাপন’ Category

ভালোবাসার শহরে…

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

i love wallশান্তা তাওহিদা, প্যারিস থেকে : শহরজুড়ে যেন সারা বছরই প্রেমের মৌসুম চলে। সিন নদীর পার ধরে হেঁটে হেঁটে দেখার প্যারিস এ এক অন্য প্যারিস। সকালে সিন নদীর পানিতে সূর্যের স্পটিক হাসি আর রাতে আলো ঝলকানো হাজার হাজার তারা। এ রকম মুহূর্তটা অবশ্যই দাবি রাখে পরস্পরের হাতে হাত রেখে অতল চোখে হারিয়ে যাওয়ার। আমার যদিও সে সৌভাগ্য হয়নি। প্রায় সাত হাজার নয়শ কিলোমিটার দূরে ছিল আর একটা হাত। ভালোবাসার শহরে সে এক বেরসিক আমি!

দিন আর রাতের প্যারিসের মাঝে বিস্তর ফারাক। শুনে তা বুঝা যাবে না, এমনকি চোখে দেখেও না। এ কেবল অনুভবের। তবে প্যারিস শহর ঘুরে বেড়ানোটা ভোরে থেকে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে দুই রূপই দেখা যাবে। সিন নদীর কোল ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে শুরু হয় আমার প্যারিস সফর। পায়ে হাঁটার পথ থামে পন্ট দে আরটস সেতুতে। এটি পারিসের প্রথম ধাতব সেতু। নামকরণ করা হয়েছিল প্রথম ফরাস সম্রাটের নামানুসারে। এর এক পাশে ইনস্টিটিউট অফ ফ্রান্স আর অন্য পাশে ল্যুভর প্যালেসের কেন্দ্রীয় স্থাপনা। এ সেতুর আরেক নাম ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু। ভালোবাসাকে তালা-চাবি দিয়ে বন্দি করা যায় কিনা তা কেবল এখানকার প্রেমীরাই বলতে পারবেন। তালায় দুজনের নাম লিখে এ সেতুতে দুজনে মিলে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চাবিটা ছুড়ে ফেলে দেয় তারা ভালোবাসা নদীর জলে। কথিত আছে, এতে ভালোবাসা অমরতা পায়। সেতুর নিচের প্রবহমান ভালোবাসা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে চাবি খুঁজে নিয়ে সে তালা খুলে এমন সাধ্য কী আর কারো আছে বলুন? হতে পারে এটা ছেলেমানুষী। একদিন না হয় ভালোবেসে ছেলেমানুষ হলেন। ক্ষতি কি তাতে! বিষয়টা কিছুটা বুকের ঢিপঢিপানি নিয়ে ছোটবেলায় দেয়ালে যোগ চিহ্ন দিয়ে নামের আদ্যক্ষর লিখে রাখার মতো। এভাবেই হয়ত অবিনশ্বরতা পায় ভালোবাসা। মজার খবর হলো বেশ কিছু দিন আগে ভালোবাসার তালার ভারে সেতুটি প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা হয়েছিল। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হওয়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই কিছু ভালোবাসার ঝালর কেটে কমিয়ে দিয়ে ছিলেন। সেতুতে টানিয়ে দিয়েছেন সতর্কবাণীও। তাতে কি আর বুঝে পাগলপ্রেমি মন! ভালোবাসার শহরে ভালোবাসার তালা রোজই ঝুলছে। কার সাধ্য বাধা দেয়।

পন্ট দে আরটস সেতু নিয়ে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত ফরাসি সিনেমা ‘লে পন্ট দে আরটস’। ফরাসি এক তরুণ তরুণীর করুণ প্রেম কাহিনি নিয়ে এ সিনেমা। প্রেমিকের সঙ্গে অভিমান করে অভিমানি প্রেমিকা এ সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে ভালোবাসা নদীতে আত্মহত্যা করে। সইতে না পেরে প্রেমিকও একি সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয় প্রেমিকার সঙ্গে মিলনের আশায়। কেবল এই সেতু নয়, ভালোবাসা নদীর ওপর এরকম প্রায় ১১টি ভালোবাসার তালাবন্দি সেতু রয়েছে পুরো পারিসে । যারা প্যারিসে আসেন তাদের কাছে মন্টেমারে নামটা আগে থেকেই শোনা থাকতে পারে। জায়গাটা পারিসের উত্তর পাশে সিন নদীর কোল ঘেঁষে। পাবলো পিকাসো, ভিনসেন্ট ভ্যানগগ, ক্লোদ মনে নিভৃতে ছবি আঁকার জন্য এ পাশটা বেছে নিয়েছিলেন। ফরাসি ভাসায় এ জায়গাটার নাম মো মার্তে। পাহাড়ের উপরে রয়েছে এক মনোরম ব্যাসিলিকা। দুই নম্বর মেট্রো ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় এখানে। এখানে রয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য আরো একটি আকর্ষণ। ফরাসি ভাষায় জায়গাটার নাম ‘লে মর ডেস যে তাইমে’। বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমি তোমাক ভালোবাসি দেয়াল’। মন্টেমারে রিকটুশ বাগানে এ দেয়াল।

প্রায় চল্লিশ স্কয়ার মিটার দেয়ালের পুরোটা জুড়ে ৫০টি ভাষায় ৩১১ বার লেখা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। প্রেমিক-প্রেমিকারা নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাওয়ার এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এখানে। যে আগে খুঁজে পায় ভালোবাসার বার্তা তার ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি। নিজেদের ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা খুঁজে পাবার আনন্দে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মানুষকে। বাংলায় ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ লেখাটা দেয়ালের মাঝখানের অংশে রয়েছে দেখলাম। বিরহ ছাড়া ভালোবাসা অর্থহীন বলেই হয়ত কিছু লাল ভঙ্গুর হৃদয় ছড়িয়ে দেয়া রয়েছে পুরো দেয়ালের ৬১২টি টাইলস জুড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল ভঙ্গুর হৃদয় দেখে। মনে মনে প্রার্থনা করলাম পৃথিবীর সকল যুগলের জন্য। অমর হোক তাদের বন্ধন। ভঙ্গুর হৃদয়ের যাতনা তাদের যেন কোনোদিন স্পর্শ না করে। আমার ধারণা ছিল কেবল তরুণ-তরুণীরা ভালোবাসার দেয়ালের খুঁজে এখানে আসে। ভুল করলাম আবারও। এখানে আসেন প্রেমিক জুগল। আর প্রেমের যে কোনো বয়স নেই তা এখানে না আসলে আমার হয়ত কখন বুঝা হতো না। হাতে হাত রেখে ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক দিয়ে বহু প্রবীণ প্রেমিকাকে প্রেমিকের চোখে হারাতে দেখেছি সেখানে। এ যেন প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে পড়া।

প্যারিসের যেবার ভালোবাসার দেয়াল দেখতে গিয়েছিলাম সেটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক দিনের সফর। টের পাচ্ছেন তো একাকি আমার দেবদাস অবস্থা! আমি ছাড়া প্যারিস শহরটা বড় বেশিই রোমান্টিক। হা হা হা- তবে যে আকর্ষণে দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসে তার সাথে দেখা করার গল্পটা বরং আমার কাছে বেশি রোমান্টিক। দ্য টাউয়ার অব লাভ-ভালোবাসার আইফেল টাউয়ার। ৩২৪ মিটার উঁচু লোহার তৈরি এ টাউয়ারে মানুষ আসে প্রেমকে অমর করতে। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। উল্টো আমিই প্রেমে পড়ে গেলাম তার। একেবারে প্রথম দেখায় প্রেম যাকে বলে। প্রথম তার সাথে যখন দেখা হয়, তখন সে কুয়াসার চাদরে ঢাকা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তার সামনে মন্ত্রমুগ্ধ আমি। দ্বিতীয় বার যখন দেখা হলো তখন তিনি আকাশের নীলে রোদেলা আমার ফাগুন পুরুষ। আর তৃতীয় বার রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে আমার ভিনদেশি তারা। তার বিশালতার কাছে নিজেকে বড়ই সামান্য মনে হয়েছে।

সিন নদী পেরিয়ে যতই তার কাছে গিয়েছি ততই বদলে যেতে শুরু করে অনুভূতিটা। ‘আমি দূর হতে কেবল তোমায় ভালোবেসেছি’ কিছুটা এরকম অনুভূতি। দূর থেকেই তাকে বড় আকর্ষণীয় লাগছিল। এ যেন চিরায়ত মানব চরিত্র! কাছে পেলে সোনার মোহর হয়ে যায় মাটির মোহর! ‘কাছে গেলে যদি ভালোবাসা কমে যায় তবে দুরত্বই ভালো-এই বলে সেদিন সন্ধ্যায় তার সাথে হলো ছাড়াছাড়ি।

পরের বার প্যারিস গিয়ে তার অন্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে আইফেল টাউয়ারের চূড়ায় উঠার সৌভাগ্য হল। চূড়া থেকে দেখলাম ভালোবাসার অন্য আরেক প্যারিসকে। পুরো প্যারিসটা ৩৬০ ডিগ্রিতে চোখে বন্দি করতে সময় লাগল আর ঘণ্টাখানেক। আইফেল এর চূড়ায় যুগল স্যাম্পেনের হাতে চুম্বনরত তরুণ-তরুণীকে দেখে মনে হয়েছে ‘প্রেম পবিত্র-প্রেম মধুর’! চূড়া থেকে দেখে মনে হলো পৃথিবী আসলেই গোল। কমলা লেবুর মতো প্যারিস শহরটা মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। তবে মিলিয়ে যায়নি ভালোবাসা। কেবল সূর্যটা টুপ করে ডুব দিয়েছে সিন নদীতে আর সন্ধ্যা নেমেছে শন্ জিলেজের পথে পথে ভালোবাসার শহরের ভালোবাসারা এভাবেই বেঁচে থাকুক অনন্তকাল!

সৌদিতে নারীদের সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচরণ করা হয়

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

manal-al-shareefসৌদি আরবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গাড়ি চালানোর জন্য কারাদণ্ড পাওয়া এক নারী তাঁর দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলেছেন।

মানাল আল-শরিফ নামের ওই নারী বলেছেন, এখনকার সময়েও সৌদি আরবে নারীদের সঙ্গে ঠিক ক্রীতদাসের মতো আচরণ করা হয়।

নিষেধাজ্ঞা ভেঙে গাড়ি চালানোয় মানালকে নয় দিন কারাভোগ করতে হয়েছিল। পরে দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানে লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাতে পারছেন মানাল। এখন নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছেন মানাল। জানালেন, তিনি সৌদি আরবে প্রথম নারী আইটি নিরাপত্তা কনসালট্যান্ট হন। প্রায় এক দশক ধরে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোতে কাজ করেছেন।

ডেইলি মেইল অস্ট্রেলিয়াকে মানাল বলেছেন, একটি রক্ষণশীল সমাজ থেকে উঠে এসেছেন তিনি। তাদের ঘরের জানালা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হতো। বাড়ির চারদিক উঁচু দেয়ালে ঘেরা। নারীদের ঢেকে রাখা হতো। পুরুষ অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া সৌদি আরবে নারীদের জন্য কিছু করা খুবই কঠিন।

২০১১ সালে মানাল তাঁর গাড়ি চালানোর একটি ভিডিও ইউটিউবে তোলেন। ভিডিওটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। এক দিনে সাত লাখ মানুষ ভিডিওটি দেখে।

ভিডিও প্রকাশের পর জীবননাশের হুমকি পান মানাল। তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে অভিহিত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মুসলমানদের ভুল পথে নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। যত ধরনের গালি আছে, তা তাঁকে শুনতে হয়।

কারাদণ্ড হওয়ার পর মানাল তাঁর বাড়ি, সন্তান ও চাকরি হারান। শেষে দেশত্যাগ করেন। দ্বিতীয় স্বামী ও ছোট সন্তানকে নিয়ে সিডনিতে স্থায়ী হন। মানাল একটি স্মৃতিকথা লিখেছেন। নাম ‘ডারলিং টু ড্রাইভ’। এতে তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। নারী অধিকারকর্মী মানাল সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেয়েছেন। এতে তিনি ভীষণ খুশি। তিনি এখন মুক্তির স্বাদ উপভোগ করছেন।

বিখ্যাত টাইম সাময়িকীর বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন মানাল। নারীদের গাড়ি চালানোর বিষয়ে তিনি সরব। ‘ওমেন টু ড্রাইভ’ আন্দোলনের মাধ্যমে নারীদের গাড়ি চালানোর জন্য লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করতে আহ্বান জানাচ্ছেন মানাল।

মানুষ বড়-ই আজব চিজ !

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

peculiarity-of-people

রস রচনা – চিকুনগুনিয়ার সঙ্গে কদিন

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

chikungunya cr ronobiরফিকুন নবী : কীটপতঙ্গ-বিশারদদের বলতে শুনেছি যে এ বছর ‘ডেঙ্গু-এক্সপার্ট-এডিস’ মশা নাকি আগের চাইতে বিপজ্জনক অ্যাকটিভিটিতে নেমেছে। একই সঙ্গে তাদের তিনটি প্রকল্পে কাজ চলছে। চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও জিকা। এগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপক ব্যস্ততা যাচ্ছে তাদের। তবে ফার্স্ট প্রায়োরিটি চিকুনগুনিয়ায়। আমার ধারণা, এবারের মশা ডিজিটাল। তিনটি অপশন নিয়ে নেমেছে।

তারা কার্যপরিচালনা ও এক্সিকিউশনের মূল জায়গা নির্ধারণ করে নিয়েছে রাজধানী শহরকে। আর ডেরা বেঁধেছে আক্রমণ-সংক্রমণের জন্য বনেদি এলাকায়। তাদের প্রকোপ এতটাই দুর্বিনীত আর দুর্বিষহ যে প্রতিরোধ বা ধ্বংসে মনুষ্য-মস্তিষ্ক কোনো বুদ্ধি বের করার আগেই নিজেদের কাজ সিদ্ধি করে নিচ্ছে নির্বিঘ্নে। এই স্ট্র্যাটেজিতে তাদের সাফল্য শতকরা এক শ ভাগ।

আমাদের বিশারদদের মতে, তারা এখনো মানুষের মরে যাওয়া নিয়ে ভাবছে না। রোগে তেমন মৃত্যুসংবাদ নেই। শুধু প্রচণ্ড ব্যথার ভোগান্তিটাই রয়েছে মানুষের, মরছে না। এ ব্যাপারে পরিচিত একজন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ভুক্তভোগী বন্ধু বলেছেন, ‘নরকের শাস্তির প্রাথমিক প্র্যাকটিস। সেখানে নাকি ব্যথা-বেদনায় আধমরা হলেও পুনরায় মারা যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। যন্ত্রণা ভোগ করে যেতেই হবে। সেই রকমের টেস্টে আছি, ভাই।’

তো, মশা গবেষকদের কথায় জানলাম, ডেঙ্গুর পাশাপাশি এ বছর অ্যাডিশনাল বড় কাজটি হলো চিকুনগুনিয়া। প্রধান কাজই বলা যায়। এই রোগের বাহক এডিস মশার শরীরের সাইজ দেখলে আসলে বিশ্বাসই হয় না, এরা অত বড় ঘটনা ঘটাচ্ছে। নিতান্তই ক্ষুদ্র। শূককীট আর মূককীট অবস্থা থেকে মাত্রই অবয়ব পাওয়া। অতি ক্ষুদ্র। খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না। গায়ে বসলেই শুধু টের পাওয়া যায়।

বোঝাই যাচ্ছে যে বড়রা শিশুদের এই কাজে নামাচ্ছে। অনেকটা সন্ত্রাসীদের মতো। আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে বিদ্রোহীরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নাকি এই দুর্মতি করে। তো, এই এডিস মশারা তো আফ্রিকা থেকেই এসেছে শোনা যায়। সবকিছুই শিখে এসেছে মনে হয়। তবে এই পিচ্চিরাই রক্ত চুষে চুষে ইয়া ঢোল পেট করে ফেলে নিমেষে। বড় আকার ধারণ করেছে। ছবিতে এ রকমটাই দেখা যায়।

এই ক্ষুদ্র মশকগোষ্ঠী এত শক্তিধর যে কোনো চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগিরকে মাসখানেকের জন্য অন্তত শয্যাশায়ী করে রাখার ক্ষমতা রাখে। কুস্তিগির না হলেও কয়েকজন ইয়া-দশাসই মানুষকে প্রায় নির্জীব হয়ে যেতে দেখেছি। দশাসই হলেও মশাসই এডিসের কাছে দারুণ কুপোকাত হয়েছেন। মোটাসোটা হলেও চিকুন থেকে রক্ষা পাননি।

আমি ততটা দশাসই নই। তবে যথেষ্ট ওজনদার। সুযোগ পেলেই এ রোগ-সে রোগে ধরার সুযোগ থাকেই। তাই রোগবালাইয়ের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করেই চলি। চিকুনগুনিয়া নিয়ে টিভিতে ডাক্তার আর বিশেষজ্ঞদের উপদেশ-পরামর্শে যা যা থাকে, সেসব আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। শুনেছি এর প্রতিষেধক নাকি তেমন নেই। কমপক্ষে দিন পাঁচেক ভুগতে হবে। এ কদিন একমাত্র সস্তায় প্যারাসিটামলের সঙ্গে লিটারকে লিটার পানি। তাই প্রতিরোধ আর সাবধানতাই একমাত্র প্রধান উপায়, কথাটা মেনে চলি। আমি কোনো ত্রুটি রাখি না। সব উপদেশকে শিরোধার্য করে চার মাস ধরে অগাধ খরচ-খরচা করে যাচ্ছি সরল বিশ্বাসে।

এই ব্যাপারে বলা যায়, মসকুইটো কয়েল কোম্পানি, কীটনাশক স্প্রে, মশা-জব্দে কারেন্টে চলা শিশির ওষুধ, কেরোসিন ইত্যাদির নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছুটা হলেও বেশ সমৃদ্ধ হতে সহায়তা করেছি।

সিটি করপোরেশনের পরামর্শ অনুযায়ী বাসার ফুলের টবের, টায়ারের, ড্রেন-ডোবার পানি ছা-পোষা লিমিটেড প্যাকেট খালি করে লোক লাগিয়ে পানিহীন করেছি। অতিপ্রিয় ফুল-ফলের গাছগাছালি, ঝোপঝাড় কর্তন করেছি। কোনো কোনোটা নিশ্চিহ্ন করতেও দ্বিধা করিনি।

তারপরও আতঙ্ক যায় না। শরীর একটু বিগড়ে যাওয়ার ভাব দেখলেই মনে হয়, এই বুঝি ধরল চিকুনগুনিয়া কিংবা ডেঙ্গুতে। মাস দেড়েক আগে তবু দীর্ঘমেয়াদি ভাইরাল জ্বরে ভুগলাম। বন্ধুদের অনেকেই চিকুনগুনিয়া ভেবে বাসায় আসা থেকে বিরত থাকল। কিন্তু আনন্দের কথা, ভাবনাটা সত্যি হয়নি।

জ্বরের পর বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম। কিন্তু দিন দশেক আগে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, বাম কনুইতে প্রচণ্ড ব্যথা। হাত ভাঁজ করা যায় না এমন দুরবস্থা। তবে কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করলাম যে ছবি আঁকার হাতটিতে ব্যাপারটি হয়নি।

ছবি আঁকা, লেখা—সবই তো ডান হাতে। শুধু বাথরুমের ক্রিয়াকর্ম ছাড়া বাম হাতের তো তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার নেই। এ-ও বললাম যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন টেনিস খেলোয়াড় ফেদেরারদের এই রোগ কোনো দিন ধরেছে, এমনটা শুনিনি!

হঠাৎ মনে পড়ল, আরে তাই তো! চার মাস ধরে তো র‍্যাকেট হাতে নিয়ে একটি খেলাই খেলছি। চীনে নির্মিত টেনিস র‍্যাকেটসদৃশ জিনিসটি। মশা মারার নতুন প্রযুক্তি। তা-ই দিয়ে শাঁই শাঁই করে ঘুরিয়ে এডিস মশা মারার খেলা চালিয়ে যাচ্ছি। খুব কাজ হয় না। সারা দিনে নেহাতই বোকাসোকা দু-তিনটি মারা পড়ে। তা-ও সেসব এডিস নাকি ইদানীং আলোচনায় পিছিয়ে পড়া এনোফিলিস, কে জানে! পরক্ষণেই মনে হলো, আরে সেটাও তো বাম হাতে ধরি না, ডান হাতেরই কাণ্ড! আসলে ন্যাটা না হলে ডান হাতেই সব। খাওয়াদাওয়া, ছবি আঁকা, লেখালেখি, হ্যান্ডশেক, সালাম—এমনকি সভা-সমিতিতে গরম বক্তৃতাকালে প্রয়োজনে দক্ষিণহস্তই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠানামা হয় মাইকের সামনে!

পরদিন ঘুম থেকে ওঠার পর সবকিছু গোলমাল হয়ে গেল। এবার ডান হাতের কনুই। সব হিসাব-নিকাশ ভন্ডুল। দুপুরে ব্যথা নিয়েই জরুরি কাজে বের হয়েছিলাম। গাড়ি করে বাসায় ফিরলাম। নামতে যাব, দেখি পুরো শরীর ঐরাবতী-ওজন ধরে বসে আছে। নিজের শরীর নিজেই চিনতে পারি না। তুলতেও পারি না। হাত, আঙুল, গোড়ালি, কোমর, পায়ের তলা, হাঁটু—কিছুই কাজ করছে না। এগুলো যেন আমার নয়, অন্য কারোর আওতায়। তবে মাথাটা শুধু তখনো নিজের আছে, বুঝতে পারলাম। কারণ, চট করেই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত পরিচিতজনদের বলা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। সিমটম মিলে যাচ্ছে হুবহু। বুঝলাম আমিতে আর আমি নেই। চিকুনগুনিয়া দখলে নিয়েছে শরীরটা। আমার হুকুমে কিছুই চলছে না। যা হোক, গাড়ি থেকে চ্যাংদোলা করে ঘরে নিয়ে আসার পর পরিচিত ডাক্তারকে ফোন করলাম। উনি পুরোটার ডেসক্রিপশন চাইলেন। বললাম সব। ডেসক্রিপশন শুনলেন কিন্তু প্রেসক্রিপশন দিতে পারলেন না। দিন পাঁচেক দেখতে বললেন। নিশ্চিত করলেন যে এডিসের কাণ্ডটাই ঘটেছে।

হঠাৎ শিল্পী আবুল বারক আলভীর কথা মনে পড়ল। সদ্য মুক্তি পাওয়া ভুক্তভোগী বলে তাঁর এক্সপার্ট ওপিনিয়ন জানতে ফোন করলাম। তিনি যা বললেন তার সঙ্গে আমার অবস্থাটার হুবহু মিল। যে জিনিসটা বাদ ছিল কিছুক্ষণ পর তা-ও এল—এক শ দুই ডিগ্রি জ্বর। পূর্ণতা পেয়ে গেল এডিসের কুপোকাত করার সব প্রচেষ্টা। কমপ্লিট হলো কোর্স। চিকুনগুনিয়া আমাকেই গুনতিতে ধরে ফেলেছে।

ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন ব্লাড টেস্ট করিয়ে নিতে। শরীরের যে নট নড়ন-নট চড়ন দুর্বিষহ অবস্থা, তাতে রক্ত আছে কি নেই, চলাচল করছে কি না, তা-ই তো বোঝার উপায় নেই। নিঃসাড় শুয়ে থাকতে থাকতেই ভাবনাটা মাথায় এল যে সংশ্লিষ্ট মশারা কি পরীক্ষার জন্য রক্ত শরীরে বাকি রেখেছে!

তাছাড়া ক্লিনিকে যে সুই ফুটিয়ে রক্ত নেওয়ার ব্যাপার, তাতে আমার ভয় চিরকালের। ইনজেকশনেই ভীতি। এখন রোগে পড়ে সেই ভীতি কেটে গেছে অনেকটাই। মশারা ইনজেক্ট করে করে সেই ভয় কাটিয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে গত শতকের আশির দশকে একটা কার্টুন এঁকেছিলাম। সেটি মনে পড়ে মাঝে মাঝেই। এবারও মনে পড়ল। কার্টুনটি ছিল এই রকমের—টোকাই সঙ্গে এক বয়ামভর্তি মশা নিয়ে ডাক্তারকে বলছে, ‘ডাক্তার সাব, এই যে নেন। এগো পেটভর্তি আমার রক্ত। পরীক্ষার জন্য ধইরা আনছি।’ ইনজেকশন-ভীতির কারণে ওই ব্যবস্থা।

আমার মনে হচ্ছিল সেই কাজ এবার আমিই করি। কিন্তু মশাগুলোকে তো চোখেই দেখা যায় না এমন। ধরার উপায় নেই। অবশ্য পাঁচ দিনের অপেক্ষা করে দেখার পালা এখনো কাটেনি। চতুর্থ দিন চলছে। ইতিমধ্যে অনেকেই জেনে গেছে। ভয়ংকর রোগ জেনে বন্ধুদের আসা বন্ধ। লাভের দিক হলো যে পাওনাদারেরাও ভয়ে পা মাড়াচ্ছেন না এদিক।

এরই মাঝে কাকতালীয় একটি ঘটনা ঘটল। হঠাৎ দুপুরে মোবাইলটা বেজে উঠল। ধরলাম। অপর প্রান্তে পরিশীলিত কণ্ঠ। বললেন, ‘নবী ভাই, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? শহর সৌন্দর্যকরণ নিয়ে আমরা কয়েকজন একটু বসতে চাই। আপনাকে থাকতেই হবে। ব্যাপারটা জরুরি।’ বললাম, ‘আমি তো চিকুনগুনিয়ায় শয্যাশায়ী। তা কে বলছেন?

নাম না বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন তিনি, ‘সর্বনাশ, আপনাকেও ধরেছে? সরি নবী ভাই। সুস্থ হয়ে নিন, পরে আলাপ করব।

এ কথা বলা শেষে নিজের নামটি বললেন, ‘আমি আনিস বলছি। আনিসুল হক। মেয়র। ছাড়ি, ভালো থাকেন।

সামনে সকালের পত্রিকা। চোখ গেল প্রথম পৃষ্ঠায়। তাতে দেখি, দুই মেয়রের ওপরে কার্টুন আঁকা, মশা নিয়ে। বুঝলাম, তাঁরা হেভি সমালোচনার মধ্যে আছেন।

তবে আমি দুই ‘ম’-এর মধ্যে কে বড়, তুলনা করছিলাম—মানে ‘মেয়র’ না ‘মশা’। এই মুহূর্তে মশাই চ্যাম্পিয়ন!

সামাজিক ব্যাধির মূল উৎস সীমাহীন লোভ

অগাষ্ট 18, 2017 মন্তব্য দিন

অরুণ কুমার বসাক : আমাদের দেশে অবক্ষয় এখন সর্বস্তরে বিদ্যমান। এর কারণ আমাদের মিশ্র মানসিকতা। আমরা প্রায় প্রত্যেকেই মুখ্য বা গৌণভাবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে বাধ্য হচ্ছি। বিশ্বায়নের যুগে আমরা বিভিন্ন দেশের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। এতে আমাদের মাইন্ডসেটের পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের আদি মানসিকতা ‘সাধারণ জীবনযাপন ও উচ্চতর চিন্তাভাবনা’ আর আমরা ধরে রাখতে পারছি না।

উন্নত দেশগুলোর জীবনযাত্রার মান আমাদের মানসিকতাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের কারণ সেখানকার জনগণের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গুণ আছে। যেমন- ক. মিথ্যা কথা না বলা, খ. নকল না করা, গ. সৃজনশীল হওয়া এবং ঘ. খুব পরিশ্রম করা। এ গুণগুলো অর্জন করতে হয় প্রাইমারি প্রশিক্ষণ থেকে। আমাদের দেশে সর্বস্তরের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় এ গুণগুলোকে যথাযথভাবে লালন কিংবা মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে শিক্ষায়তনগুলোয় ‘কোয়ালিটি’ প্রশিক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কোয়ালিটি মানবশক্তি কিংবা কোয়ালিটি পণ্য-উৎপাদন আশানুরূপভাবে হচ্ছে না।

মানবশক্তি কিংবা উৎপাদিত পণ্য রফতানিতে বিশ্ববাজারে আমরা সম্যকভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারছি না। তাই বিদ্যমান আর্থিক অনটনের মধ্যে আমাদের উন্নত জীবনযাত্রার চাহিদার কারণে দেশে প্রায়ই অস্থিরতা বিরাজ করে। তদুপরি আমাদের সাংস্কৃতিক কাঠামোতে বাল্যকাল থেকে সমাজ আরোপিত বিধিনিষেধের প্রভাবে আমরা অনেকেই মুক্ত চিন্তাভাবনায় দুর্বল হয়ে পড়ি বা বিভ্রান্তিতে পড়ি। এ অবস্থায় সার্বিকভাবে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংকটে দিশাহারা হয়ে আমরা প্রায়ই ‘রাজনীতির শিকার’ হচ্ছি এবং দেশের উন্নয়নে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বা ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। বর্তমান অবস্থায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু সে অনুপাতে আমাদের মানসম্মত উৎপাদনমুখী আয় বাড়ছে না। ফলে আমাদের বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, শৃঙ্খলিত হচ্ছি আমরা।

দেশে জীবনযাত্রার মান, গড় আয়ু, শিক্ষার হার বেড়েছে। ডিজিটাল যোগাযোগ সুবিধার কারণে গবেষণাও বেড়েছে। কিন্তু বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মানের গবেষণা কাজ হতো, তার ধারে কাছে আমরা যেতে পারছি না। উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। ১৯৪৭ সালে আমাদের ও ভারতের শিক্ষা-গবেষণার মান একই ছিল। এখন ভারতের তুলনায়ও অনেক পিছিয়ে পড়েছি আমরা। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় উপমহাদেশে বিজ্ঞান জাগরণের অগ্রদূত। দু’জনেই আমাদের মাটির মানুষ। আমরা তাদের উত্তরসূরি হয়েও কেন পিছিয়ে পড়ছি? শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘকালের অবহেলা ও নৈরাশ্য এর জন্য মূলত দায়ী। অন্যদিকে রাজনীতির নামে দলবাজি ও মিথ্যাচার আমাদের মাঝে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছে। নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আমাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অসহযোগিতার কারণে এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুরূহ।

শিক্ষাঙ্গনে আমাদের সংকট, আমরা শিক্ষকরা জ্ঞানদান করছি কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারছি না। এর কারণ- ক. আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘শেখার আনন্দ’ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছি, খ. আমরা ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলছি না, গ. সর্বস্তরে দীর্ঘকাল ধরে দুর্বল শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে, ঘ. পরীক্ষা পদ্ধতি সঠিক হচ্ছে না এবং ঙ. শিক্ষক ও কর্মকর্তাসহ সব রকম কর্মচারীর নিয়োগে নির্বাচন পদ্ধতি যুগোপযোগী হচ্ছে না। যারা ভালো তারাও নানা কারণে নিষ্ঠাবান হতে পারছেন না।

সমাজে সর্বব্যাধির মূল উৎস আমাদের সীমাহীন লোভ। লোভ সংবরণ করতে প্রয়োজন ‘আধ্যাত্মিকতা’কে আয়ত্ত করা। আধ্যাত্মিকতা শব্দটি ধর্মভিত্তিক। কিন্তু এর ব্যাপক অর্থ ‘জাগতিক লোভ’কে সংযত করা ধরলে আধ্যাত্মিকতা অর্জনের প্লাটফরম হতে পারে ধর্ম, রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রয়োজন যথার্থ পঠন ও পাঠন। পরিতাপের বিষয়, দেশে সাধারণভাবে এর কোনোটিতেই শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণ সঠিকভাবে হচ্ছে না। আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের মুক্তমন থাকে অর্থাৎ তাদের চিত্ত শুদ্ধ থাকে। মুক্তমনের ব্যক্তিরা বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চিত্ত-শুদ্ধ ব্যক্তি বাস্তব জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার যথাযথ সংমিশ্রণ প্রয়োগ করে মহীয়ান বা মহীয়সী হতে পারেন। কারণ এর শক্তি অসীম।

শিক্ষক, গবেষক, রাজনৈতিক নেতা, খেলোয়াড়, সাহিত্যিক, আধ্যাত্মিক নেতা, ধর্মীয় নেতা, ব্যবসায়ী- যাই বলি না কেন, সফল হতে হলে মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে। বাউল সম্রাট লালন শাহ, বিশ্বখ্যাত দার্শনিক লিও টলস্টয়, জর্জ বার্নার্ড শ, বারট্রান্ড রাসেল, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম, দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মহান ব্যক্তি ছিলেন। এছাড়া আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সমাজ-সংস্কারক ও আধ্যাত্মিক নেতা খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ (র.) এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. শেখ গোলাম মকসুদ হিলালী প্রণীত পুস্তকাদি পড়লেই স্পষ্ট হয় তারা মুক্তমনসম্পন্ন এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। ভিন্নমতকে অশ্রদ্ধা করেননি।

যে দেশে শিক্ষার মান ভালো সে দেশ সমৃদ্ধ। এক সময় ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণা পদ্ধতি শ্রেষ্ঠ ছিল বলেই তাদের সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সর্বোচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন আবেদনকারীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে বলে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হয়ে থাকে। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকদের পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে মনিটর করা হয় এবং সে অনুসারে পুরস্কার বা তিরস্কার প্রদান করা হয়ে থাকে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে পঠন-পাঠন ও গবেষণার ক্ষেত্র। আমাদের দেশে জলবায়ু কৃষিবান্ধব এবং জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে মানবশ্রম সস্তা। সুতরাং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত মানের হস্তশিল্প এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পর্কিত গবেষণার বিকাশে যথোপযুক্ত শিক্ষা কারিকুলাম (সিলেবাস) প্রণয়ন করা প্রয়োজন। মানসম্পন্ন গবেষণা, উপযুক্ত সিলেবাস প্রণয়ন এবং কার্যকর প্রশিক্ষণের জন্য অত্যাবশ্যক- ক. উপযুক্ত মানের শিক্ষক, খ. যথোপযুক্ত পরিবেশ এবং গ. জবাবদিহিতা। তবে অন্য দেশের কারিকুলাম হুবহু আমাদের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। আমরা শুধু দিকনির্দেশনা পেতে পারি।

আধুনিক বিজ্ঞানসহ সব রকমের শিক্ষা ও গবেষণা বহুমুখী বিধায় আমাদের আরেকটু তলিয়ে দেখা দরকার। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা উক্তি স্মরণ করছি- ‘গণিতের ছন্দ সমগ্র প্রকৃতির মধ্যে নিহিত আছে।’ ছন্দের বিভিন্ন স্বরূপ : সঙ্গীতে ছন্দ, গণিত ও ভৌতবিজ্ঞানে প্রতিসাম্য, আইন ও ধর্মে শৃঙ্খলা, সাহিত্যে হৃদয়গ্রহীতা এবং জীববিজ্ঞানে প্রজাতি- সবই সমার্থক। সঙ্গীতের ছন্দ একঘেয়েমির অবসান করে নতুন উদ্দীপনা জাগায়। একঘেয়েমিজাত ক্লান্তি দূর করার জন্যই আমাদের বিভিন্ন ছন্দে চলাফেরা করা দরকার। মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে নবরত্নের এক রত্ন ছিলেন বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত-গায়ক ‘মিয়া (পণ্ডিত) তানসেন’। কথিত আছে, তিনি ‘মেঘ মল্লার রাগ’ দিয়ে বৃষ্টি ঝরাতে পারতেন। অন্যদিকে বিশ্ববরেণ্য পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিস বলেছেন, ‘‘সঙ্গীতের তাল প্রকৃতিতে ‘মিল’-এর সন্ধান দেয়।’’

পদার্থবিজ্ঞানী মহলানবিস লন্ডনে গিয়ে ‘বাইয়োমেট্রিকা’ জার্নাল পড়ে পরিসংখ্যানের আকাশচুম্বী প্রয়োগ-শক্তি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তার যুগান্তকারী আবিষ্কার ‘মহলানবিস ডিস্ট্যান্স’ নৃবিজ্ঞানে, রোগনিদানে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে, অর্থনৈতিক সূচক-নির্ণয়ে, কৃষি উৎপাদনে, শিল্প-সূচক নিরূপণে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। ‘তাল’ এক ব্যক্তির মধ্যে বহুবিধ প্রতিভার জন্ম দেয়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলেন বহুদর্শী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। তিনি বিভিন্ন ছন্দে চলাফেরা করে কলা, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও চিকিৎসাসহ সবক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। দর্শন ছন্দ ও তালের সমন্বিত একটি বিষয়, তাই শক্তিশালী। আধুনিক দর্শন যুক্তিভিত্তিক। এর প্রভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে জাগরণ ঘটেছে এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশালতা ও সূক্ষ্মতা প্রতিভাত হয়েছে। আমাদের দেশের অতীতকালের গুরুগৃহের শিক্ষা আজ পাশ্চাত্যের ল্যাব ও পার্লার আলোচনায় রূপ নিয়েছে।

দর্শন সভ্যতার চাবিকাঠি। দর্শনের আদর্শ সব বিষয়ের জ্ঞানচর্চার শক্তি জোগায় এবং গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত করে। বিশেষ করে দর্শন বিজ্ঞানসহ সব গবেষণার শিকড়। অর্থনীতিতে ১৯৯৮ সালে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যুগপৎ অর্থনীতি ও দর্শনের প্রফেসর। ক্যামব্রিজে থাকাকালীন প্রফেসর সেন নিজের গবেষণায় ধ্যান-ধারণাকে প্রসারিত করার লক্ষ্যে দর্শনে পড়াশোনা করেছিলেন। পরম পরিতাপের বিষয়, দর্শন আজ আমাদের দেশে অত্যন্ত অবহেলিত, যা আমাদের দুরবস্থার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

ইদানীং সমগ্র দেশে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং সুদূর পল্লী অঞ্চলে বৈদ্যুতিক আলোর প্রভাবে জনজীবনে স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। উন্নয়নের এ গতিকে ধরে রাখতে প্রয়োজন আমাদের চিত্ত-শুদ্ধি ও সহযোগিতা। কিন্তু মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বেড়েই চলেছে। শিক্ষার পরিবেশ ও আমাদের পরিশ্রমবিমুখতা এজন্য দায়ী। খোদ রাজধানীর কঠোর জীবনযাপন ও প্রতিযোগিতা এখানকার বাসিন্দাদের কিছুটা কর্মমুখর হতে বাধ্য করে। তাছাড়া এখানে আন্তর্জাতিক বহুবিধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের সচেতনতা কিছুটা জাগ্রত থাকে। এতদসত্ত্বেও ঢাকায় সর্বক্ষেত্রে আশানুরূপ শিক্ষা ও গবেষণার মান বজায় থাকছে না। ঢাকার বাইরে জীবনযাপন অপেক্ষাকৃত সহজ ও চিত্ত-বিক্ষেপ কম। সেখানকার প্রকৃতিগতভাবে শান্ত পরিবেশ পঠন-পাঠন ও গবেষণার জন্য অনেক বেশি উপযুক্ত। এ কারণে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুবাদে ময়মনসিংহস্থ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অনেক উচ্চে স্থান করে নিয়েছে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। রাজশাহীতে শান্ত পরিবেশ এবং সস্তা জীবনযাপন থাকা সত্ত্বেও এখানকার মানুষ এর উপযুক্ত সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এখন আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য হবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে সমস্যার মোকাবেলা করা। কৃচ্ছ্রসহ সরল জীবনযাপন করে আমাদের প্রজন্মকে কষ্ট করার শিক্ষাদান করা। তবেই আমাদের সন্তানরা উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। তারা আমাদের ভবিষ্যৎ পতাকাবাহক। বিশ্ব প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করে তারা এ অঞ্চলকে গর্বিত করুক। এতেই আমরা পাব নির্মল আনন্দ।

অরুণ কুমার বসাক : প্রফেসর ইমেরিটাস, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ফেসবুকে লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের নেপথ্যে…

অগাষ্ট 13, 2017 মন্তব্য দিন

FB users graphএখানে দাবী করা হয়েছে যে, ফেসবুকের “লাইক” (এবং ইতিবাচক কমেন্ট) অনেকের মনের নানা রকম অনুভূতিকে পুরস্কৃত করে এবং সেজন্য আত্মতৃপ্তি আসে । তবে এটা অনেক সময় স্কুলে “উপস্থিতি জানান” দেয়ার মতো কাজ করে । তাই লাইক অনেক সময় আসলেই “লাইক” না করেও কেউ কেউ দিতে পারে ।

বেশী স্ট্যাটাস দেয়ার সাথে একাকিত্বে কম ভোগার যোগসূত্র টানার চেষ্টা হাস্যকর মনে হয়েছে ! একজন বিদ্বান ব্যক্তি বেশী স্ট্যাটাস দিতে উৎসাহী হতে পারে ।

মানুষের মন অনেক জটিল ব্যাপার । সবার মন-মানসিকতা এক পাল্লায় এনে সব সময় বিচার করা সম্ভব নয়।

= = =

মানব সভ্যতা প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ, আধুনিক যুগ পেরিয়ে পদার্পণ করেছে ফেসবুকে যুগে! তথ্যপ্রযুক্তির মোড়কবন্দী চলতি যুগটাই তো লাইক, শেয়ার, কমেন্ট ও লগ-ইনের। চিরস্থায়ী লগ-আউট বলে কিছু নেই। মানুষ ফেসবুকে ফিরে আসে, কী এক অজানা সম্মোহনী শক্তির শিকার হয়ে, বারবার। কিন্তু কেন?

একবার এক মিনিটের জন্য ফেসবুকে ঢুকে হঠাৎ খেয়াল করেন ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে! কেন এমন হয়? এমনি এমনি নিশ্চয়ই নয়। ফেসবুকে আঠার মতো লেগে থাকার নেপথ্যে রয়েছে নিখাদ বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের মারপ্যাঁচ।

ফেসবুকে লাইক, পোস্ট, কমেন্ট, শেয়ার এমনকি শুধু বাকিদের পোস্ট দেখে যাওয়ার ব্যক্তির মানসিকতা নিয়েও গবেষণা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বেশির ভাগই নির্দিষ্ট কিছু ধারা মেনে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ও পোস্ট করে থাকেন বলে ধারণা গবেষকদের। এ ছাড়া ফেসবুক যে আমাদের চুম্বকের মতো টানে, তার নেপথ্যেও রয়েছে নানা ধরনের মানসিকতা।

মস্তিষ্কের রসায়ন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে থাকার সময় আমাদের মস্তিষ্কে ঠিক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটে — গবেষকেরা অনেক দিন ধরেই এ প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন। সাম্প্রতিক এ গবেষণায় জানা গেছে, ফেসবুক এবং মানুষের মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’-এর মধ্যে আসলে নিবিড় এক সম্পর্ক রয়েছে। মস্তিষ্কের এ ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’-এর নাম ‘নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেনস’,যা আসলে আমাদের মনের নানা রকম অনুভূতিকে পুরস্কার দিয়ে থাকে। যেমন:আমরা অর্থ, যৌনতা, খাদ্য ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পছন্দ করি — আমাদের ‘নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেনস’ এসব অনুভূতিকে ছাড়পত্র দিয়ে থাকে।

ঠিক একই রকমভাবে, ফেসবুকে আমরা ইতিবাচক ফিডব্যাক পেলে ‘নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেনস’ সাড়া দেয়। ইতিবাচক ফিডব্যাক যত বেশি হবে, মস্তিষ্কের পুরস্কার বিতরণী কেন্দ্রের প্রভাবে আমরা তত বেশি সময় আঠার মতো লেগে থাকব ফেসবুকে। আসলে ‘নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেনসে-এর জন্যই আমরা ফেসবুককে এতটা ভালোবেসে থাকি।

আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে একাত্মতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জীবন নিয়ে গবেষণা করেছে ওয়াশিংটন ডিসির পিউ রিসার্চ সেন্টার। তাদের মতে, ৪৪ শতাংশ মানুষই দিনে অন্তত একবার তার পরিচিতদের পোস্টে ‘লাইক’ দিয়ে থাকে। ২৯ শতাংশ মানুষ এ কাজটা দিনে কয়েকবার করে থাকে। আসলে ফেসবুকে মানুষের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ‘লাইক’ অপশন। এ বস্তুতে ‘ক্লিক’ করলেই তার সঙ্গে আপনার মতামত কিংবা ইচ্ছা মিলে গেল।

‘সাইকোলজি টুডে’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গবেষকদের অভিমত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে যারা অধিক সময় কাটায়, ভার্চ্যুয়াল জগতে মানুষের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে তাদের একাত্মতা প্রকাশের শক্তি অনেক বেশি। ভার্চ্যুয়াল জগতের এ সামর্থ্যটুকু প্রভাব ফেলে তাদের বাস্তব জীবনেও। তবে ফেসবুকের ‘লাইক’ হলো খুচরো পয়সার মতো। যত খুশি খরচ করতে পারো, কিন্তু বিনিময়ে খুব বেশি প্রত্যাশা না থাকাই ভালো।

মন্তব্য করি কেন?

ফেসবুকে কোনো বিষয়ে কিছু বলার থাকলে আমরা মন্তব্য করে থাকি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, লাইকের চেয়ে মন্তব্য কিংবা টেক্সটের যোগাযোগ ক্ষমতা বেশি। অর্থাৎ দশটা লাইকের চেয়ে একটি ভালো মন্তব্য আপনাকে ফেসবুক কমিউনিটির সঙ্গে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক মইরা বার্ক সম্প্রতি এক গবেষণায় জানিয়েছেন, ফেসবুকে ‘লাইক’ হলো ‘ওয়ান ক্লিক কমিউনিকেশন’ এবং কমেন্ট বা চ্যাট হলো ‘কম্পোজড কমিউনিকেশন’। তাঁর মতে,‘ওয়ান ক্লিক কমিউনিকেশনে’ মানুষের একাকিত্ব দূর হয় না। সে তুলনায় ‘কম্পোজড কমিউনিকেশন’ অনেক বেশি কার্যকর। এছাড়া ফেসবুকে কোনো বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতেও ‘লাইকে’-এর চেয়ে মন্তব্যের কার্যক্ষমতা বেশি।

স্ট্যাটাস দেওয়ার নেপথ্যে…

অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, ফেসবুকে যে কোনো ধরনের স্ট্যাটাস আমাদের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। স্ট্যাটাস দিয়ে আমরা ভার্চ্যুয়াল জগতে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করে থাকি। গবেষকদের মতে, ফেসবুকে যারা বেশি বেশি স্ট্যাটাস দিয়ে থাকে, তারা কম একাকিত্বে ভুগে থাকে। সেটা স্ট্যাটাসে কোনো লাইক কিংবা মন্তব্য না পেলেও! তবে যারা কম কম স্ট্যাটাস দিয়ে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। স্ট্যাটাসে লাইক কিংবা মন্তব্য না পড়লে তারা ভেবে নেন যে সমাজে হয়তো তাদের কোনো অবস্থান কিংবা গ্রহণযোগ্যতা নেই।

শেয়ার দিই কেন?

নিউইয়র্ক টাইমসের গবেষণা অনুযায়ী, মজাদার কিংবা শিক্ষামূলক কোনো কিছু আমরা ভাগ নেওয়ার স্বার্থেই শেয়ার দিয়ে থাকি। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশই নিজেদের মানসিকতা ও ব্যক্তিত্ব বোঝাতে শেয়ার দিয়ে থাকেন। কারণ,আপনি কী ধরনের পোস্ট শেয়ার দিচ্ছেন, তার ওপর ভিত্তি করে আপনাকে যাচাই করেন বাকিরা। এছাড়া যোগাযোগ ধরে রাখা কিংবা আত্মতৃপ্তির জন্যও আমরা শেয়ার দিয়ে থাকি। এছাড়া কোনো সামাজিক ইস্যুতে সচেতনতা গড়ে তুলতে আমরা শেয়ার দিয়ে থাকি নানা রকম পোস্ট — দৈনিকটির গবেষণা অনুযায়ী এ ধরনের লোকের সংখ্যা ৮৪ শতাংশ।

ফেসবুক চর্চা নিয়ে কিছু প্রতিক্রিয়া

অগাষ্ট 11, 2017 মন্তব্য দিন

facebook-3আবু তাহের খান : কথিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা এবং একে ঘিরে নানা ধরনের বিতর্ক—দুই-ই দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে জনপ্রিয়তার ক্রমবর্ধমানতা এতটাই তুঙ্গে যে দেশে রাতে ঘুমানো মানুষের সংখ্যা বেশি, নাকি ফেসবুকে কাটানো রাতজাগা মানুষের সংখ্যা বেশি—সে নিয়ে রীতিমতো বিতর্ক হতে পারে। সেই সূত্রে এটাও এখন বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে অবাধ সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টির সুবাদে ফেসবুক থেকে সমাজ যতটা উপকৃত হচ্ছে, এর হুজুগে অপব্যবহারের কারণে এ ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে কি না। আর এ ধরনের দ্বিবিধ বিতর্ক সামনে রেখে সাম্প্রতিক ঈদের ছুটিতে পাওয়া সময়ের সামান্য ফুরসতকে কাজে লাগিয়ে ফেসবুকে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে এর চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, প্রবণতা, প্রভাব, প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয় যতটা সম্ভব নির্মোহভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি।

ফেসবুক নিঃসন্দেহে একটি ভালো যোগাযোগ মাধ্যম এবং এখানে মান-মানহীন নির্বিশেষে সব তথ্য ও মত অবাধে প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। অতএব, ধারণাগতভাবে এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক গণতান্ত্রিক চেতনার অনুগামী বিধায় এর বিস্তার অবশ্যই উৎসাহ দানযোগ্য। তা ছাড়া আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির উত্কর্ষপূর্ণ ব্যবহারেরও এটি একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। কিন্তু পাশাপাশি আবার এটাও মানতে হচ্ছে যে তথাকথিত এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় যতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে বা রাখতে পারছে, সে তুলনায় একদল মানুষকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে অনেক বেশি। ফেসবুকে অংশগ্রহণকারী মানুষদের কাছে ওই বলয়টিই তাদের পৃথিবী, তাদের সমাজ। বস্তুত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বলতে সেখানে প্রায় কিছুই নেই। বাস্তবের সমাজ মানুষের চিন্তা ও আচরণকে বিকশিত হতে সহায়তা করে। ফলে ফেসবুকে নিমগ্ন মানুষদের চিন্তা ও আচরণের প্রায় পুরোটাই এক ধরনের আড়ষ্টতা ও আবদ্ধতার দ্বারা আচ্ছন্ন। সেখানে চিন্তা ও আচরণের বিকাশ তো নেই-ই, বরং এ ক্ষেত্রে ক্ষয়িষ্ণুতার ধারাটিই অধিক প্রবল। অতএব, মর্গানের (লুইস হ্যানরি মর্গান) সংজ্ঞায়িত বিকাশমান সমাজের সঙ্গে তথাকথিত ফেসবুক সমাজের কোনো সামঞ্জস্যই নেই এবং সে কারণে এটি আসলে কোনো সমাজই নয়—সমাজবিচ্ছিন্ন একটি ক্ষুদ্র-সংকীর্ণ-গোপনীয় সামাজিক জীবনধারা মাত্র!

ফেসবুক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি হচ্ছে এই যে একে ঘিরে সৃষ্ট জীবনধারা সংশ্লিষ্টদের, বিশেষত তরুণদের একটি সংকীর্ণ আবদ্ধ চক্রের মধ্যে মোহাবিষ্ট করে রাখছে। এ আবদ্ধ চক্রে পড়ে উদ্দেশ্যহীন নিরর্থক কাজে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে, যা তাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজের সময়কেই শুধু ছেঁটে ফেলছে না, নিজেদের মেধা, চিন্তা ও মননশীলতার বোধও নষ্ট করে দিচ্ছে। কারণ ফেসবুক উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার অনুগামী নয়, গতানুগতিক আড়ষ্ট জীবনের মানহীন প্রদর্শনী মাত্র। আর মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে বিষয়টি দাঁড়ায় এই যে আড়ষ্ট জীবন মানুষের আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার জায়গাটিও ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ করে দেয়। যে তরুণ দিনের বেশির ভাগ সময় বাস্তব সমাজে বিচরণ না করে ফেসবুকে কাটায়, তার পক্ষে চাক্ষুষ সমাজের সমস্যা, ক্ষত ও অপূর্ণতাকে বোঝা কিছুতেই সম্ভব নয়। আর তা সে বুঝতে না পারলে তার মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। এবং একজন আকাঙ্ক্ষাবিহীন মানুষের মধ্যে স্বপ্ন ও সৃজনশীলতার বোধ কোনো দিনই গড়ে উঠবে না। উঠতে পারে না। অতএব, ফেসবুকের নানা উপকারিতার কথা মনে রেখেও স্বীকার করতে হবে, এ আচ্ছন্ন জীবন বৃহত্তর জীবনের সম্ভাবনাকে ক্রমেই সংকুচিত করে ফেলছে।

ফেসবুক সমাজের সদস্যদের মধ্যে যেসব তথ্য, মতামত ও চিন্তা-ভাবনার লেনদেন হয়, সেসবের মান নিয়েও সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলি, এসব লেনদেনে যাঁরা অংশগ্রহণ করেন, তাঁদের বেশির ভাগের অপরিপক্ব ও অতি মামুলি চিন্তা-ভাবনার মান বাস্তব জীবনের গড়পড়তা জীবনমানের চেয়ে অনেক বেশি নিম্নবর্তী। ফলে এখান থেকে তরুণদের পক্ষে শেখার বা শিখে অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো প্রায় তেমন কোনো সুযোগই নেই। বরং এ ধরনের মানহীন চিন্তা-ভাবনার লেনদেনের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসবাসের ফলে এটাকেই তারা জীবনের জন্য গ্রহণীয় মান বলে ধরে নেয়, যাকে পুঁজি করে আদর্শ মানের প্রতিযোগিতায় তারা আর নিজেদের যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় না। এটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে তো বটেই, জাতীয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।

ফেসবুক সদস্যদের দৈনন্দিন প্রদর্শনীর প্রধান উপকরণগুলোর মধ্যে থাকছে নিজেদের পোশাক-আশাক, খাওয়াদাওয়া, কেনাকাটা, সাজগোজ, ভ্রমণ ইত্যাদির ছবি ও এসব নিয়ে মন্তব্য। আর কখনো কখনো থাকছে অতীতচারণ। যুক্তি ও বিজ্ঞান বলে যে এসবই হচ্ছে নতুন চিন্তা-ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতায় অক্ষম মানুষের আলস্য ও অসহায়ত্বের ফসল। মানুষ যখন আর নতুন কিছু ভাবতে পারে না বা তার ভাবনায় সে রকম আর কিছু আসে না, তখনই সে ছবি বা আত্মকথনের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে। আর যখন সে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, তখনই সে স্মৃতিবিধূরতার মধ্যে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। আর এ উভয় ধরনের স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছে ফেসবুক গোষ্ঠীর সদস্যরা। এ মন্তব্যের বিপরীতে ভিন্নতর কোনো দৃষ্টান্ত থাকলে সংশ্লিষ্টরা সপ্রমাণ এগিয়ে আসবেন বলে আশা রাখি।

তবে হ্যাঁ, সচেতন ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ হিসেবে ফেসবুকের ইতিবাচক দিকগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা ও ব্যবহার করতে হবে। আর তা করার জন্যই সর্বাগ্রে উপরোল্লিখিত নেতিবাচক অনুষঙ্গগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অতি বয়সী মানুষ নিজেদের শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে ও নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য ফেসবুকের আশ্রয় নিতে পারেন। বস্তুত ফেসবুকের মতো মাধ্যম হওয়া উচিত অতি বয়সীদেরই আশ্রয়স্থল। কিন্তু তরুণরা তাদের জীবনের মূল্যবান সময় প্রায় অযথা এর পেছনে ব্যয় করে নিজেদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা এভাবে বিসর্জন দেবে কেন? এটি তাদের জন্য আত্মাহুতির শামিল। অতএব, তরুণদের প্রতি বিশেষ আহ্বান, ফেসবুকে বয়সীরা যত খুশি সময় ব্যয় করে করুক, তারা (তরুণরা) যেন তা না করে। কারণ তরুণরাই হচ্ছে স্বপ্ন ও সৃজনশীলতার প্রতীক।

খ্রিস্টীয় আঠারো, উনিশ ও বিশ শতকের একটি বড় অংশজুড়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বৃহৎ অংশকে উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল ইংরেজ, ওলন্দাজ ও ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তাদের সে জৌলুস আজ আর বর্তমান পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই। কিন্তু পুঁজিবাদী শক্তি তার নয়া সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের অংশ হিসেবে আমাদের মতো ভোক্তাপ্রধান দেশের মানুষকে ফেসবুকের মতো ভোগ্য উপকরণে বুঁদ করে রেখে (ফেসবুকের প্রান্তিক উপযোগের কথা অস্বীকার করা হচ্ছে না) নিজেদের দেশে উচ্চতর গবেষণা, উদ্ভাবন ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মতো সৃজনশীল কাজে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে ও সফল হচ্ছে। আর তারই ফলে আমরা শুধু তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও উপকরণের ভোক্তা হচ্ছি মাত্র, আবিষ্কারক হতে পারছি না কিছুতেই। অতএব, সে অবস্থা থেকে বেরোতে হলে শুধু ফেসবুক নয়, ফেসবুকের মতো অন্যান্য বুঁদ হয়ে থাকা অনুষঙ্গের ব্যাপারেও আমাদের অবিলম্বে বিশেষত রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সচেতন হতে হবে।

তরুণরা যে ফেসবুকে এত অর্থহীন সময় ব্যয় করছে, তার জন্য তাদের মোটেও দোষ দেওয়া যায় না। সমপরিমাণ সময় এর চেয়ে আনন্দের সঙ্গে ব্যয় করার উন্নততর বিকল্প আমরা তাদের সামনে তুলে ধরতে পারছি না বলেই তারা এটি করছে এবং তারা তা করছে অনেকটাই হুজুগের বশে, তার সমবয়সী অন্যদের সঙ্গে তাল মেলানোর লক্ষ্যে। অতএব, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী পর্যায়ের মানুষদের আশু কর্তব্য হবে আমাদের তরুণদের সামনে ফেসবুকের চেয়েও আনন্দদায়ক কিন্তু চিন্তা ও মননের বিকাশের জন্য সহায়ক উত্তম কোনো বিকল্প তুলে ধরা। কাজটি কঠিন, তবে মোটেও অসম্ভব নয়। আর এটাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে এ লেখা কোনোভাবেই ফেসবুকের বিরুদ্ধে নয়, এর উপযোগ ও অনুপযোগের কার্যকারিতা নিয়ে মাত্র।

লেখক : পরিচালক, সিডিসি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ফেইসবুক যখন শঙ্কার নাম!

facebook-1শাহরীয়া : বিশ্বজুড়ে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ২০০ কোটি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের খুঁটিনাটি তথ্যের অনেক কিছুই আছে ফেইসবুকের কাছে। তাই ফেইসবুক শুধু আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, আদতে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানও। ব্যবহারকারীর গতিবিধির সবটাই নজরে থাকে ফেইসবুকের।

ফেইসবুক কিভাবে আমাদের কাছ থেকে তথ্য সংরক্ষণ করে তার একটি ম্যাপ প্রকাশ করেছে যুগোস্লাভিয়ার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান শেয়ার ল্যাব। বেশ কয়েক বছর ধরেই এখানে কাজ করছেন সার্বিয়ার নোভি সাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ভ্লাদান জোলের। বনলু ও সহকর্মী বেলগ্রেডকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে গবেষণা করছেন ফেইসবুক নিয়ে। সহকারী হিসেবে দলে আছেন সাইবার ফরেনসিক বিষয়ে আরো কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। ফেইসবুকের তথ্যভান্ডারের বিশালতার ব্যাপারে আগেভাগেই কিছুটা ধারণা করতে পেরেছিলেন জোলের। কিন্তু আসল তথ্য হাতে পেয়ে হতভম্ব হয়েছেন তিনি। সদ্য এক যুগ পেরোনো সিলিকন ভ্যালির ফেইসবুক কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে ৩০০ পেটাবাইট (এক হাজার গিগাবাইটে এক পেটাবাইট) ডাটা।

জোলের বলেন, ফেইসবুককে এত লাভবান করার পেছনে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ব্যবহারকারীদের। ফোনের অ্যাপস, ওয়াই-ফাই সংযোগ ও অডিও রেকর্ডিংয়ের অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের লাইক, শেয়ার, কমেন্ট, সার্চ, স্ট্যাটাস, ছবি, বন্ধুসহ বিভিন্ন তালিকা আমরা তুলে দিচ্ছি ফেইসবুকের হাতে। এ কারণে ব্যবহারকারীর পছন্দ-অপছন্দ নির্ভুলভাবে ধরতে পারে ফেইসবুক। কোরিয়ান খাবার পছন্দ না চায়নিজ, কাজের পরিধি কিংবা বাচ্চার বয়স কত তা নির্ণয় করার ক্ষমতাও রাখে ফেইসবুক। কোনো কিছু আপলোড, ট্যাগ ও কমেন্ট পোস্ট করা মানেই আমরা ফেইসবুককে সাহায্য করছি। আমাদের পছন্দ আর অপছন্দের তথ্য তুলে দিচ্ছি সাইটটির হাতে। এ তথ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জটিল অ্যালগরিদমকে (কম্পিউটারসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়) আরো শক্তিশালী করে। জোলেরের মতে, এটা আমাদের আচরণকে একটি পণ্যে রূপান্তরিত করছে। ফেইবুকের হাতে কী কী তথ্য আছে তার একটি চিত্র আঁকতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির যে নথি পাওয়া গেছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য।

যৌনতাবিষয়ক আগ্রহ, রাজনৈতিক যোগাযোগ, সামাজিক অবস্থান, ভ্রমণসূচিসহ আরো অনেক বিষয়ে বিশ্লেষণ করে ফেইসবুক আমাদের জাতিগত মিল খুঁজে বের করে। কোনো কিছু পোস্ট করা থেকে শুরু করে পেইজে লাইক দেওয়া এবং অনলাইনে আমাদের গতিবিধি কী রকম তাও লক্ষ্য করছে ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ফেইসবুকে লগইন করতে বলা সাইটগুলো। আর এ তথ্যগুলোই প্রবেশ করছে অ্যালগরিদম প্রক্রিয়ায়।

এখানেই শেষ নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা অ্যাপগুলোকে ‘অনুমতি’ দেওয়ার মাধ্যমেও  ফেইসবুককে তথ্য দেয়। যেগুলো দিয়ে ফোনের এসএমএস, অনুমোদনবিহীনভাবে ডাউনলোড করা ফাইল এবং আমাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থানও জেনে যায় ফেইসবুক।

কয়েক বছর ধরেই ফেইসবুক বলে আসছে, তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে তারা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাদের দাবি, ফেইসবুকের ডাটা ডেভেলপাররা ব্যবহার করতে পারে না। কারণ প্রতিটি দেশেই তাদের ‘প্রাইভেসি প্রটেকশন আইন’ মেনে চলতে হয়। বিষয়বস্তুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফেইসবুকে হাজার হাজার নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জোলের বলেন, তথ্যের যে ভান্ডার গড়া হয়েছে তাতে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী হবে, সেটা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। তথ্যগুলো একটি প্রতিষ্ঠানের হাতেই থাকবে। ফেইসবুকের বর্তমান নেতৃত্ব দায়িত্ববান ও আস্থাভাজন; কিন্তু আগামী ২০ বছর পর যখন নতুন নেতৃত্ব আসবে, তখন কী হবে?

প্রযুক্তি আইন ও পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ জুলিয়া পাওয়েল বলেছেন, টেক জায়ান্টগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি বা স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষমতাশালী। অনেকেই ভাবতে পারেন, মার্ক জাকারবার্গের রাজত্বে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু সব সময়ই ব্যাপারটি একই রকম থাকবে সে নিশ্চয়তাও দেওয়া যাচ্ছে না। সব কিছুর আগে জনপ্রিয়তাকে বেশি প্রাধান্য দিতে ফেইসবুক আমাদের মানসিকভাবে প্ররোচিত করে। ফলে নিয়ম-কানুনের গুরুত্ব, অনীহা ও পছন্দগুলোর বিকল্প কমে যাচ্ছে। শেয়ার ল্যাব টেক জায়ান্টগুলোর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যে গবেষণা করছে, তা আসলেই কৃতিত্বপূর্ণ। কিন্তু জোলের এটি স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন, এ সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টগুলোর বাণিজ্যিক গোপনীয়তা ভেদ করে কোনো অ্যালগরিদম প্রক্রিয়া চালছে কি না তাও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

ফেসবুক কৌতুক

Facebook-2আনিসুল হক :বাংলাদেশের তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ব্যবহার করে। সম্প্রতি প্রথম আলো পরিচালিত এক জরিপে এটা জানা গেছে। তথ্য হিসেবে এটা নতুন নয়। শুধু প্রথম আলো ফেসবুক পেজেরই লাইক প্রায় সোয়া কোটি। বাংলাদেশে তাহলে কত কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে? শুধু ঢাকা শহরেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে সোয়া দুই কোটি মানুষ।

ফেসবুক ব্যবহার করা ভালো না খারাপ? এই প্রশ্নের উত্তর দুই কোটি বছর আগে থেকেই প্রাণীদের জানা। যেকোনো জিনিস তুমি ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারো, খারাপ কাজেও ব্যবহার করতে পারো। নির্ভর করছে তোমার ওপর। যেমন…কী ভাবছেন, ছুরির কথা বলব? না, ওটা বেশি পুরোনো। ধরা যাক, অক্সিজেন খুব ভালো। কিন্তু বাতাসে যদি ২০ শতাংশের বদলে ১০০ শতাংশ অক্সিজেন থাকে, আমরা মারা যাব। বা ধরুন, পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু কাউকে যদি ২০ জগ পানি খাওয়ানো যায়, সে মারা যাবে।

ফেসবুক ভালো। এটা দিয়ে পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে পাওয়া যায়, নতুন বন্ধুত্ব হয়; সত্য, সুন্দর, চমৎকার কথা, ছবি, ভিডিও প্রচার করা যায়; রক্তদানের নেটওয়ার্ক গড়া যায়, বন্যার্ত মানুষের সাহায্য করা যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়। ফেসবুক নিঃসঙ্গের সঙ্গী, বন্ধুহীনের বন্ধু, কর্মহীনের কাজ।

আবার ফেসবুক এই দেশে রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার কারণ হয়েছে, সিলেট অঞ্চলে অশান্তি ডেকে এনেছে। ফেসবুকের কারণে ঘর ভেঙেছে, সেলফি তুলতে গিয়ে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে, ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বের করে লোক মারা গেছে।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটা বলেন, কাজের কথা দিয়ে জীবন সুন্দর হয় না, বাজে কথা দিয়েই শিল্প ও সৌন্দর্য তৈরি হয়, তেমনি অপ্রয়োজনেই যদি কেউ একটা সুন্দর ছবি বা ফটো বা কথা প্রকাশ করে, সেটাও তো মূল্যবান। তবে তাই হোক। বাজে কথা হোক। হাসি-তামাশা হোক। কৌতুক বলি। ফেসবুক নিয়ে এই কৌতুকগুলো ইন্টারনেটে পেয়েছি।

১. আমি একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলব। এর নাম হবে ‘নোবডি’। কেউ যখন বিরক্তিকর কিছু পোস্ট করবে, আমি তাতে সবার আগে লাইক দেব। তখন তার দেয়ালে উঠবে, নোবডি লাইকস ইট।

২. প্রতিটা সফল ছাত্রের পেছনে আছে একটা ডি-অ্যাক্টিভেটেড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট।

৩. ফেসবুক একটা কারাগারের মতো। কারণ, তোমার একটা ফটো আইডি আছে, তুমি সারাক্ষণ লিখে থাকো দেয়ালে আর তোমাকে যারা পোক করে, তাদের কাউকেই তুমি চেনো না।

৪. গুগল+ হলো জিমের মতো। আমরা সবাই এতে যোগ দিয়েছি, কিন্তু কেউ এটা ব্যবহার করি না। (হা হা হা। এইটা পড়ে আমি তিন মিনিট হেসেছি। আজকের গদ্যকার্টুন আমি লিখছি জিম ফাঁকি দিয়ে। আর আমারও গুগল+ আছে, যাতে আমি বহুদিন ঢুকি না।)

৫. দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকেরা খুবই চিন্তিত। অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকেরা আশান্বিত। কারণ, কাগজ উঠে যাবে। এক টিসু্য পেপার মিলের মালিক হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, খোকা, তুমি মোবাইল ফোন নিয়ে বাথরুমে যাচ্ছ কেন?

৬. আচ্ছা, আপনি না হয় এখন অফিসে বসে এই লেখাটা পড়ছেন ফেসবুক পোস্ট থেকে। আপনার কি দুশ্চিন্তা হয় না, ফেসবুকের কর্মচারীরা অফিস টাইমে ফাঁকি দেওয়ার জন্য কী করবেন?

এবার কতগুলো সমস্যার সমাধান দিই।

সমস্যা: আমার ঘাড়ে ব্যথা করে।

ফেসবুক ডি-অ্যাক্টিভেট করুন।

সমস্যা: আমার মা ফেসবুক খুলেছেন।

তাঁকে ব্লক করুন।

সমস্যা: আমার বস ফেসবুক খুলেছেন।

তাঁকে লাইক দিতে থাকুন। ইন ফ্যাক্ট, লাভ দিতে থাকুন।

আজকের স্লোগান: ত্যাগের আনন্দ তুলনাহীন। ট্যাগ করার অভ্যাস ত্যাগ করুন।

পুনশ্চ: জাকারবার্গকে ধন্যবাদ। তিনি ফেসবুক আবিষ্কার করেছেন। তা না হলে আজকে ৬৬৭ জনকে ফোন করে জানাতে হতো যে আজকে আমি কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ রেঁধেছি।

আমি এই লেখাটা লিখতে পারলাম, কারণ আমি আমার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডি-অ্যাক্টিভেটেড করে রেখেছি। তবে পেজ চালু আছে।

এবার একটা ধাঁধা। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা দেড় কোটি। ফেসবুক ব্যবহারকারী কেন সোয়া দুই কোটি?

যাঁরা উত্তরটা পেরেছেন, তাঁরা এই লেখাটার নিচে লাইক দিন:)