আর্কাইভ

Archive for the ‘চিকিৎসা’ Category

গোলমরিচের গোল কথা!

bell pepper nutrition

Advertisements

ঢাকা’র এপোলো হাসপাতালে এক ভুক্তভোগী’র তিক্ত অভিজ্ঞতা

apollo hospital dhakaভবিষ্যতে কেউ যদি ঢাকা এপোলো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন তাহলে দয়া করে একটু ভেবেচিন্তে আসবেন। এই হাসপাতাল হাসপাতাল না, এটা চিকিৎসার নামে একটা সম্পূর্ণ অনৈতিক, বাণিজ্যিক ধান্দা বাজির একটা বিশাল দালান।

আমার স্ত্রীকে ভুল তথ্য দিয়ে, ভয় পাইয়ে দিয়ে তারা আমার সম্পূর্ণ সুস্থ শিশুকে এক মাস আগে জন্ম দেয়ালো কোনো কারণ ছাড়াই। বলল বাচ্চার ওজন অনেক বেশি, আর আগে জন্ম হলে তাদের জন্য ম্যানেজ করা সহজ হবে। জন্মের পর দেখা গেল বাচ্চার ওজন অনেক কম এবং তাকে ইনকিউবেটরে রাখতে হবে। পরে বুঝলাম “ম্যানেজ” মানে হল শুধু মাত্র বিল বাড়ানোর জন্য আমাদেরকে আগে বাচ্চা জন্ম দেয়ালো।

একদিনের ভুমিষ্ট বাচ্চাকে এন্টিবায়োটিক, অক্সিজেন ইত্যাদি দিয়ে এক ভীতিকর অবস্থার সৃস্টি করল, বলল ইনফেকশন হতে পারে, ব্লাড কালচারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৭২ ঘণ্টা, পুরা সময় বাচ্চা ইন্টেন্সিভ কেয়ারে থাকবে। ৭২ ঘন্টা পর রিপোর্ট আসলো কোনো ইনফেকশন নাই। কেন একদিনের বাচ্চাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে তিনদিন আইসিঊ তে রাখা হল? কোনো উত্তর নাই। ফাইল দেখতে চাইলে বলল রিলিজের আগে দেখানোর নিয়ম নাই। পুরো নাটকটি তাদের সাজানো।

তারাই প্রথমে আমাদেরকে আগাম ডেলিভারী দিতে বাধ্য করল এই বলে বাচ্চার ওজন অতিরিক্ত, যাতে করে কিছু পয়সা অতিরিক্ত খসাতে পারে। কেনো তারা একটা বাচ্চার জীবন বিষিয়ে তুলে এই কাজটা করল? একবার ভাবলাম আমি ভুল করছি। পরে মেটারনীটি ডিপার্টমেন্টে দেখলাম তারা এই কাজ শতকরা ৬০% রোগীকে করাচ্ছে। যেই ডিপার্টমেন্ট সবচেয়ে হাসি খুশির জায়গা হওয়ার কথা সেখানে বিরাজ করছে এক ভীতিকর পরিস্থিতি। প্রত্যেক নতুন বাবা মার চোখে ব্যপক আতংক।

অন্য একজনের সাথে পরিচিত হলাম, বল্লেন তার ভাইকে অস্ত্রপচার করতে প্রাথমিক ভাবে অসফল হয় হাসপাতাল, পরে ভুল স্বীকার করে আবার করে। কিন্তু বিল ঠিকই ডাবল করছে। এখানে এমনও অভিযোগ আছে মৃত রোগি আনলে তারা তাকে দুইদিন ইন্টেন্সিভ কেয়ারে রেখে দেয়, এবং এর প্রমানও পাওয়া গেছে। পরে একটু অনুসন্ধান করতে বার্ষিক রিটার্ণ দেখলাম, চক্ষু চড়ক গাছ। তারা ২০১১ সালেই মুনাফা করে ২৬ কোটি টাকা! আয়ের শতকরা ৪০% আসে গাইনি ও অবস্ট্রেট্রিকস ডিপার্টমেন্ট থেকে!

সুতরাং উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার এপোলো হাসপাতালে যারা আসবেন তারা দয়া করে ভেবেচিন্তে আসবেন। এই কসাইখানা ব্যবসা চট্টগ্রামে যাওয়ার পায়তারা করছে এবং স্বল্প মূল্যে সিডিএ থেকে জমিও কিনেছে মানবিক প্রতিষ্ঠান নাম করে। এই এপোলো হাসপাতাল হল ব্যবসায়ী এম পি টিপু মুন্সি, শান্তা গ্রুপের মালিক, আর লংকা বাংলা ফাইনান্সের যৌথ প্রযোজনার এক ধান্দা বাজির দোকান যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম এস টি এস হোল্ডিং লিঃ তারা ভারতের তৃতীয় শ্রেনীর কিছু ডাক্তার এপোলো গ্রুপের সাথে যৌথ চুক্তির আওতায় এনে জনগণের সাথে ভাওতাবাজির এক ব্যাপক আয়োজন করেছে।

ভারতে এই ডাক্তারগুলোকে কেউ চেনা দুরে থাক চাকরি ও দেবে না। দূর্ভাগ্যের বিষয়,এই ব্যপক লূটতরাজ দেখার, নিয়ন্ত্রন করার সংস্থা (বিএমডিসি, ডীজি হেলথ) একেবারই নিস্ক্রিয়। তাই ঢাকা এপোলো হাসপাতালে আসার আগে সুচিন্তিত স্বিদ্ধান্ত নিন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান

young-muslimরায়হান রাশেদ : মানুষ সৃষ্টির প্রথম থেকেই চিকিৎসাশাস্ত্রের সূচনা। মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজনের তাগিদে জন্ম থেকেই চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়।

মানুষের ভালো ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা নির্ভর করে শারীরিক সুস্থতার ওপর। মন ফুরফুরে থাকার মধ্যে। আর কেউ পীড়িত বা রোগা থাকলে মন-মেজাজে, চলনে-বলনে হয়ে ওঠে অসাড়। এমন ব্যক্তি থেকে পৃথিবী ভালো কিছু আশা করতে পারে না। সুস্থ মানুষ মানেই সুস্থ পৃথিবী। সুতরাং মানুষ ও পৃথিবীকে সুস্থ-সুন্দর রাখতে চাই সুস্থ জীবন।

জগতের প্রথম মানুষরা পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মে খাদ্য সংগ্রহ ও রোগ-ব্যাধি মোকাবেলায় যে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল, তা থেকেই চিকিৎসাশাস্ত্রের সূত্রপাত। আর তখনকার চিকিৎসাপদ্ধতি ছিল তাদেরই আবিষ্কৃত ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি। রোগের সুস্থতার জন্য ঝাড়ফুঁক ছিল তাদের একমাত্র পথ্য।

এরপর মানুষের হাত ধরে আসে লতা-পাতা ও গাছগাছড়ার ব্যবহার। গাছের পাতা, গাছের গোটা ও ফলে খুঁজে পায় সুস্থতার নিরাময়। আজ পর্যন্ত পৃথিবীপাড়ার অলিগলিতে বনজ বা গাছগাছালির সাহায্যে চিকিৎসা অব্যাহত আছে।

হজরত ইদ্রিস (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে চিকিৎসাশাস্ত্র একটি অবকাঠামোর রূপ পায়। ইতিহাসবিদ আল কিফতি তাঁর ‘তারিখুল হুকামাত’-এ লিখেছেন,‘ইদ্রিস (আ.) হলেন প্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানী। এ বিষয়ে তাঁর কাছে ওহি আসে।’

ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)ও চিকিৎসাশাস্ত্রে রেখে যান যুগান্তকারী অবদান। তাঁর হাত ধরে চিকিৎসাশাস্ত্রে পূর্ণতা ও সজীবতা আসে। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তাঁর ওপর নাজিলকৃত কোরআন চিকিৎসাশাস্ত্রের আকরগ্রন্থ। মায়ের পেটের ভেতর বাচ্চার ধরন ও ধারণের কথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছে পবিত্র কোরআন। কোরআন জগতের বিস্ময়। চিকিৎসাশাস্ত্রে কোরআনের অবদান উল্লেখ করতে গিয়ে জার্মান পণ্ডিত ড. কার্ল অপিতজি তাঁর ‘Die Midizin Im Koran’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে কোরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে ৯৭টি সুরার ৩৫৫টি আয়াত চিকিৎসাবিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট। ৩৫৫টি আয়াতে মানবদেহের সব বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধান দেওয়া হয়েছে।

ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে অনেক থিওরি বর্ণনা করেছেন। রোগ নিরাময় ও উপশমের পদ্ধতি বলেছেন। নিজ হাতে চিকিৎসা করেছেন এবং নিজ আবিষ্কৃত পদ্ধতির ব্যবহার করেছেন। হাদিসের শ্রেষ্ঠতম গ্রন্থ বুখারি শরিফে ‘তিব্বুন নববী’ শীর্ষক অধ্যায়ে ৮০টি পরিচ্ছেদ রয়েছে। প্রতিটি পরিচ্ছেদের অধীনে হাদিস রয়েছে কয়েকটি করে। সব হাদিসই রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি, রোগ নিরাময় ও রোগ প্রতিরোধ কার্যাবলি সংবলিত। আর তিনি নিজ হাতে শিক্ষা দিয়েছেন সঙ্গীদের। Prof. Brown বলেন,‘নবী মুহাম্মদ (সা.) চিকিৎসাবিজ্ঞানকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন।’ রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা হিসেবে মহানবী (সা.) মোটামুটি পাঁচটি পদ্ধতি ব্যবহারের উল্লেখ করেছেন—১. হাজামাত বা রক্তমোক্ষণ পদ্ধতি। ২. লোলুদ বা মুখ দিয়ে ওষুধ ব্যবহার। ৩. সা’উত বা নাক দিয়ে ওষুধ ব্যবহার। ৪. মাসী’ঈ বা পেটের বিশোধনের জন্য ওষুধ ব্যবহার। ৫. কাওয়াই বা পেটের বিশোধনের ওষুধ ব্যবহার। আর ওষুধ হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছেন মধু, কালিজিরা, সামুদ্রিক কুন্তা বা বুড়, খেজুর, মান্না বা ব্যাঙের ছাতার মতো এক প্রকার উদ্ভিদ, উটের দুধ প্রভৃতি। (সূত্র : বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, মুহাম্মদ রহুল আমীন, পৃষ্ঠা ৬০)

ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দুনিয়ার জগতে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর হাসপাতাল ছিল অস্থায়ী। যুদ্ধের ময়দানে অসুস্থ বা জখম হওয়া ব্যক্তিদের জন্য তাঁবু করে সেখানে তাদের রোগ নিরাময়ে ওষুধ ব্যবহার ও সেবা-যত্ন করতেন। সাহাবিদের দিয়ে অসুস্থদের সেবা করাতেন।

রাসুল (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যে কেউ কেউ চিকিৎসাব্যবস্থা জানতেন। এ বিষয়ে আলী (রা.)-এর নাম বিশেষভাবে পাওয়া যায়। ইসলামী খেলাফত আমলে মিসরের গভর্নর হজরত আমর ইবনুল আস (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসাবিষয়ক উপদেষ্টা ইয়াহইয়া আন নাহবি চিকিৎসাবিষয়ক অমূল্য গ্রন্থাবলি রচনা করেন। তিনি প্রথম আরব চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তিনি ইজিয়ান দ্বীপের কালজয়ী চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিপোক্রিটিস (৪৬০-৩৭৭ খ্রিস্টপূর্ব) এবং গ্যালেনের (২০০-১৩০ খ্রিস্টপূর্ব) গ্রন্থগুলোর ওপর গবেষণাধর্মী পুস্তকও প্রণয়ন করেছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অগ্রগতির এ ধারা উমাইয়া শাসনামলেও অব্যাহত থাকে। খালিদ ইবনে ইয়াজিদ বা জ্ঞানী খালেদের উদ্যোগে চিকিৎসাবিজ্ঞানসংক্রান্ত গ্রিক গ্রন্থগুলো আরবিতে অনূদিত হয়। খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজের উদ্যোগে চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থাবলিসহ প্রথম পাবলিক লাইব্রেরিটি সিরিয়ার দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই যুগে বসরার ইহুদি চিকিৎসাবিদ হারুন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে লেখেন বিখ্যাত ‘মেডিক্যাল ইনসাইক্লোপিডিয়া’। ইয়াজিদ ইবনে আহমদ ইবনে ইবরাহিম লেখেন ‘কিতাবুল উসুল আত তিব্ব’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থটি। খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান সর্বপ্রথম বিপুল অর্থ ব্যয় করে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এক বিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা আল মামুন ও মুতাসিমের আমলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূচনা বলতে যা বোঝায়, তা হয়েছিল আব্বাসীয় শাসনামলে। অধ্যাপক কে আলী লেখেন—‘আরবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত উন্নতি সাধিত হয় আব্বাসীয় আমলে। রাজধানী বাগদাদসহ বড় বড় শহরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়। সর্বপ্রথম আলাদা আলাদা ইউনিটে পুরুষ ও মহিলাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। যথাযথ চিকিৎসক কর্তৃক যাতে যথার্থ ওষুধ প্রয়োগ নিশ্চিত হয়, সে জন্যও চিকিৎসাবিষয়ক পরীক্ষক নিযুক্ত করা হয়।

নবম শতাব্দীতে মুসলিম মনীষীরাই সভ্যতার প্রকৃত পতাকার বাহক ছিলেন। নবম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ছিল মুসলিম মনীষীদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের স্বর্ণযুগ। এ শতাব্দীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন আবু আলী আল হুসাইন ইবনে সিনা। ইসলামের অন্যতম এ চিকিৎসাবিজ্ঞানী পুরো বিশ্বে চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক বলে সুপরিচিত। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। তাঁকে একই সঙ্গে ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান ও রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা তাঁদের জাতীয় জ্ঞানবীর হিসেবে দাবি করেন।

ইবনে সিনা ছাড়াও চিকিৎসাশাস্ত্রে মৌলিক গবেষণায় অভাবনীয় অবদান রাখেন প্রসিদ্ধ কয়েকজন মুসলিম মনীষী। তাঁদের মধ্যে হাসান ইবনে হাইসাম, আলবেরুনি (৯৭৩-১০৪৮), আলী ইবনে রাব্বান, হুনাইন ইবনে ইসহাক (চক্ষু বিশেষজ্ঞ), আবুল কাসেম জাহরাবি মেডিসিন ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ), জুহান্না বিন মাসওয়াই (চক্ষুশাস্ত্রের ওপর প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রণয়ন করেন), সিনান বিন সাবিত, সাবিত ইবনে কুরা, কুস্তা বিন লুকা, জাবির ইবনে হাইয়ান, আলী আত তাবারি, আর-রাজি, ইবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮), আলী ইবনে আব্বাস প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

ইবনে সিনা : সর্বকালের অন্যতম সেরা চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক আবু আলী হুসাইন ইবনে সিনা বর্তমানে উজবেকিস্তানের রাজধানী বুখারার কাছে (৯৮০-১০৩৭) জন্মগ্রহণ করেন। ইউরোপে আভিসিনা নামে পরিচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল কানুন ফিত তিবআরবজগ থেকে আনীত সর্বাধিক প্রভাবশালী গ্রন্থ। একে চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইবেল বলা হয়। ইবনে সিনার কানুন সম্পর্কে অধ্যাপক হিট্রি বলেন, কানুনের আরবি সংস্করণ ১৫৯৩ সালে রোমে প্রকাশিত হয়েছিল এবং এটি একটি প্রারম্ভিক যুগের মুদ্রিত গ্রন্থ। আরবি চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর স্থান অদ্বিতীয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর রচিত ১৬টি মৌলিক গ্রন্থের ১৫টিতে তিনি বিভিন্ন রোগের কারণ ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। মানবসভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর চেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ এখনো পর্যন্ত আর দ্বিতীয়টি নেই। পাঁচ খণ্ডে এবং ৮০০ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত এই চিকিৎসা বিশ্বকোষে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যেক যেন একসঙ্গে বেঁধে ফেলেছেন।

আলী আত-তাবারি : আলী আত তাবারি (৮৩৯-৯২০) ছিলেন মুসলিম খলিফা মুতাওয়াক্কিলের গৃহচিকিৎসক। তিনি খলিফার পৃষ্ঠপোষকতায় ‘ফেরদৌস উল হিকমা’ নামে একখানা বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থে শুধু চিকিৎসাশাস্ত্রই নয়-দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা সম্পর্কেও আলোচিত হয়েছে। এটি গ্রিক, ইরানি ও ভারতীয় শাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে।

আর-রাজি : মুসলিম চিকিৎসাবিদদের মধ্যে আবু বকর মুহাম্মদ বিন জাকারিয়া আর-রাজি (৮৬২-৯২৫) ছিলেন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একজন চিকিৎসাবিদ। দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। এর অর্ধেকই ছিল চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কীয়। প্রায় প্রতিটি রোগ সম্পর্কেই তিনি ছোট ছোট বই লিখে গেছেন। মানুষের কিডনি ও গলব্লাডারে কেন পাথর হয়, সে সম্পর্কে তিনি একটি মৌলিক তথ্যপূর্ণ বই লিখেছেন। লাশ কাটার বিষয়ে তিনি লিপিবদ্ধ করেন ‘আল জুদারি ওয়াল হাসবাহ’। এটি লাতিন ও ইউরোপের সব ভাষায় অনুবাদ করা হয়। শুধু ইংরেজি ভাষায়ই চল্লিশবার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় বইটি। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হচ্ছে ‘আল হাবি’। এতে সব ধরনের রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বইয়ে ২০টি খণ্ড আছে। আল হাবির নবম খণ্ড ইউরোপের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ষোলো শতক পর্যন্ত নির্দিষ্ট ছিল। বইটিতে তিনি প্রতিটি রোগ সম্পর্কে প্রথমে গ্রিক, সিরীয়, আরবি, ইরানি ও ভারতীয় চিকিৎসা প্রণালীর বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তারপর নিজের মতামত ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন।

আলী আল মাওসুলি : চক্ষু চিকিৎসায় মুসলমানদের মৌলিক আবিষ্কার রয়েছে। আলী আল মাওসুলি চোখের ছানি অপারেশনে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। জর্জ সার্টনও তাঁকে জগতের সর্বপ্রথম মুসলিম চক্ষু চিকিৎসক বলে অকপটে স্বীকার করেছেন। তাঁর ‘তাজকিরাতুল কাহহালিন’ চক্ষু চিকিৎসায় সবচেয়ে দুর্লভ ও মূল্যবান গ্রন্থ। চোখের ১৩০টি রোগ ও ১৪৩টি ওষুধের বর্ণনা রয়েছে এ বইয়ে। তিনিই প্রথম চোখের রোগের সঙ্গে পেট ও মস্তিষ্কের রোগের সম্পর্কিত হওয়ার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমনই গৌরবময় ইতিহাস আছে মুসলমানদের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে চতুর্দশ শতকে মুসলমানদের ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ সব কিছু থেকে আধিপত্য কমতে থাকে। চুরি হয়ে যায় অনেক থিওরি। ১৩০০ শতকে মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রগুলোতে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল সেনারা ৩০ বছর ধরে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তাতে অসংখ্য গ্রন্থাগার ও পুস্তাকালয় বিনষ্ট হয়। আজ যদি মুসলমানদের আবিষ্কার, থিওরি ও লিখিত গ্রন্থাদি থাকত, তাহলে বিশ্ব পেত সভ্যতার চূড়ান্ত পাঠ ও আশাতীত কিছু উদ্ভাবন। পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ পেত অভূতপূর্ব আরশি।

দীর্ঘদিনের অল্প জ্বর

মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা হলো ৯৮.৪ ফারেনহাইট। যখন শরীরের চেয়ে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় তাকে জ্বর বলে। অল্প অল্প জ্বর বলতে যখন শরীরের তাপমাত্রা থার্মোমিটারে ৯৯ থেকে ১০১ ফারেনহাইটের মধ্যে থাকে। বিভিন্ন কারণে শরীরে দীর্ঘদিন অল্প অল্প জ্বর থাকতে পারে তা হলো :

যক্ষ্ণা।

লিষ্ফোমা।

কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া।

এইচআইভি ইনফেকশন।

শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফোঁড়া। যেমন- ফুসফুসে ফোঁড়া, লিভারের ফোঁড়া।

কানেকটিভ টিসু্য রোগ যেমন- রিউমাটয়েড আর্থ্রাটিস, এসএলএ।

থাইরয়েড রোগ যেমন- হাইপারথাইরয়জ্জিম।

কৃত্রিম জ্বর।

ওষুধজনিত জ্বর।

আরও অন্যান্য কারণে যেমন- ফুসফুসে ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, কিডনি ক্যান্সার।

দীর্ঘদিন জ্বর থাকলে তার অন্ত্মর্নিহিত কারণ জানার জন্য রোগীর কাছ থেকে বিস্ত্মারিত ইতিহাস নিতে হবে, এই জ্বর কখন আসে, কীভাবে আসে, কীভাবে চলে যায়, দিনের কোন ভাগে বেশি জ্বর থাকে, জ্বরের সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কিনা। যেমন দীর্ঘদিনের অল্প অল্প জ্বর, বিকালের দিকে আসে, রাতে থাকে, সকালে কমে যায়, ঘাম দিয়ে জ্বর ভালো হয়ে যায়, সাথে ৩ সপ্তাহের বেশি কাশি থাকে, কখনো কখনো কাশির সঙ্গে রক্ত যায়, শরীরের ওজন কমে যায়, খাবারে অরম্নচি থাকে, যক্ষ্ণা রোগীর সঙ্গে বসবাসের ইতিহাস থাকে, তাহলে সন্দেহ করা হয় তার যক্ষ্ণা হয়েছে। দীর্ঘদিনের জ্বরের ইতিহাসের সঙ্গে রাত্রে শরীর ঘামানোর ইতিহাস, ক্ষুধামন্দা, শরীরে চুলকানি, জন্ডিসের ইতিহাস, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গস্ন্যান্ড ফুলে যাওয়ার ইতিহাস থাকলে লিষ্ফোমা সন্দেহ করা হয়। অল্প অল্প জ্বরের সঙ্গে ডান দিকের ওপরের পেট ব্যথা, মাঝেমধ্যে পাতলা পায়খানার ইতিহাস, পরীক্ষা করে যদি জন্ডিস, লিভার বড় পাওয়া যায় তাহলে সন্দেহ করা হয় লিভারে ফোঁড়া হয়েছে। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, ঘাম দিয়ে জ্বর কমা, দুর্গন্ধযুক্ত হলুদ রঙের কাশি থাকলে সন্দেহ করা হয় ফুসফুসে ফোঁড়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের জ্বরের সঙ্গে যদি খাবার রম্নচি স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও ওজন কমে যায়, যে স্থানে জ্বর হয়েছে সেখানে বসবাসের ইতিহাস, মাটির ঘরে মেঝেতে থাকার ইতিহাস, পাশে গরম্নর ঘর থাকার ইতিহাস থাকলে এবং পরীক্ষা করে রক্তশূন্যতা, পেটের উপরিভাগে চাকা থাকলে সন্দেহ করা হয় কালাজ্বর। দীর্ঘদিনের জ্বরের ইতিহাসের সঙ্গে গিঁঠে গিঁঠে ব্যথা এবং সকালে ঘুম থেকে জাগার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা বেড়ে যায় এবং ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ব্যথার তীব্রতা কমে যাওয়ার ইতিহাস, মুখে ঘা, গায়ে লাল লাল দাগ ইতিহাস থাকলে কানেকটিভ টিসু্য রোগ যেমন- রিউমাটয়েড আর্থ্রাটিস, এসএলই হয়েছে সন্দেহ করা হয়। স্বাভাবিক রম্নচি থাকা সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া, সবসময় অস্থির লাগা, বুক ধড়ফড় করার ইতিহাস, গলার সামনের দিকে উঁচু হয়ে যাওয়া, ঢোক গেলার সঙ্গে সঙ্গে তা ওঠানামা করে, শরীর দুর্বল লাগার ইতিহাস বিশেষ করে মহিলাদের মাসিকে সমস্যার ইতিহাস থাকলে সন্দেহ করা হয় থাইরয়েডের রোগ, যেমন হাইপার থাইরয়েডিজম সন্দেহ করা হয়। দীর্ঘদিনের জ্বর, সঙ্গে শরীরের ওজন স্বাভাবিক থাকা, জ্বরের সঙ্গে নাড়ির স্পন্দন না বাড়া, স্বাভাবিক রম্নচি, ইচ্ছা করে থার্মোমিটারে জ্বর বাড়ানোর ইতিহাস অথবা ওষুধ খেয়ে জ্বর বাড়ানোর ইতিহাস থাকলে সন্দেহ করা হয় কৃত্রিম জ্বর। আরও বহুবিধ কারণে দীর্ঘকালীন অল্প অল্প জ্বর থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সঠিক ইতিহাস দিয়ে এবং সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করে বেশির ভাগ রোগ ভালো করা সম্ভব।

অন্য রকম স্বাস্থ্যনিবাস

sanatoriumঅমর্ত্য গালিব চৌধুরী : সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে স্যানাটোরিয়াম বা স্বাস্থ্যনিবাসগুলো খুব জনপ্রিয় ছিল। এগুলোর বেশ কিছু মুখ থুবড়ে পড়লেও বেশির ভাগই এখনো স্বাস্থ্যনিবাসের কাজ চমত্কারভাবে পালন করছে। অনেকেই ছুটি কাটান এসব স্যানাটোরিয়ামে।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে ছুটি কাটানো মানে এই নয় যে আপনি হেলে-দুলে ঘুরবেন কিংবা সাগরতীরে বসে রোদ গায়ে লাগাবেন। এখানকার অধিবাসীরা অলস বসে ছুটি কাটানোর চেয়ে এই সময়ে নিজের শরীরটা আরো পাকাপোক্ত করার ব্যাপারেই বেশি মনোযোগী।

এগুলো তাঁরা করেন নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্বাস্থ্যনিবাসে। এই স্বাস্থ্যনিবাসগুলো কিন্তু আধুনিক স্পা সেন্টারগুলোর মতোই জায়গা। এখানে আবার অত্যাধুনিক চিকিত্সার ব্যবস্থাও আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকার তথা কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্বাস করত, সারা বছরের কাজের ধকল সামলানোর সবচেয়ে ভালো পন্থা হচ্ছে স্বাস্থ্যনিবাসে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে কিছুদিন অবকাশ যাপন করা। এতে দেহ-মন আরো চনমনে ও ফুরফুরে হয়ে উঠবে। এই ভেবেই এমন স্বাস্থ্যনিবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে তা প্রায় ২৬ বছর হতে চলল। অনেক স্যানাটোরিয়াম এখনো চালু আছে, তবে বড় একটা অংশ বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হতে চলেছে। এগুলো শুধু রাশিয়ায়ই নয়, সারা সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সব প্রজাতন্ত্রেই দেখা যায়। বিশেষ করে রাশিয়ার সোচি অঞ্চলে অনেক সুদৃশ্য স্বাস্থ্যনিবাস এখনো চালু আছে। এসব স্বাস্থ্যনিবাস পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন ডাক্তাররা। তাঁরাই ঠিক করেন দিনে কতটা ব্যায়াম করবে, কে কতটা দৌড়াবে বা কী ধরনের ওষুধ আর খাবার খাবে। এর সঙ্গে আছে ম্যাসাজ বা কর্দম স্নানের ব্যবস্থা। কিছু কিছু স্বাস্থ্যনিবাস আবার কয়েক কাঠি বেশি সরেস। কোথাও আছে হালকা বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা, কোথাও আবার লবণের গুহায় গিয়ে বসে থাকা লাগে। কোথাও আলোর প্রভাবে শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলা হয়। কয়েকটিতে তো স্রেফ খনিজ তেল দিয়ে গোসলের ব্যবস্থাও রাখা আছে। এই স্বাস্থ্যনিবাস থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘কুরোরটোলোজি’। এটা হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের ওপর কী কী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে সেসম্পর্কিত বিদ্যা। সোভিয়েত স্বাস্থ্যনিবাসে এগুলোর চর্চা হতো একসময়। অতিথিদের রুটিনও এই কুরোরটোলোজি অনুসারেই করা হতো।

কাজাখস্তানের স্তেপ বা ককেশাসের পাহাড় কিংবা রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরের তীরে বালুকাবেলায় এমন স্বাস্থ্যনিবাসের উপস্থিতি সর্বত্র। বেছে বেছে এগুলো বানানো হয়েছে দারুণ সুন্দর সুন্দর জায়গায়, তার ওপর এদের অভ্যন্তরীণ আর বাহ্যিক অঙ্গসজ্জায়ও চোখে পড়ে অত্যন্ত উঁচু মানের শিল্পের ছাপ। কোনো কোনোটি সুদৃশ্য বহুতল ভবন, কোনোটি  সায়েন্স ফিকশনের অত্যাধুনিক বিল্ডিংয়ের আদলে আবার কোনোটি স্রেফ চৌকো বিশাল ব্লকের আকারে বানানো। কিরগিজস্তানের অরোরা স্বাস্থ্যনিবাসটি দেখতে জাহাজের মতো। আবার ক্রিমিয়ার দ্রুজবা স্বাস্থ্যনিবাসের ভবনটা যেন অতিকায় এক ফ্লাইং সসার।

সোভিয়েত ইউনিয়নে এই স্বাস্থ্যনিবাস প্রথার শুরুটা হয় সেই ১৯২০ সালের দিকে। ১৯২২ সালের লেবার কোডে বার্ষিক দুই সপ্তাহ ছুটি কাটানোর নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৩৬ সালে জোসেফ স্তালিন সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের এই ছুটি কাটানোর অধিকার নিশ্চিত করেন। ১৯৩৯ সালে এসে দেখা গেল, গোটা দেশে স্যানাটোরিয়ামের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আর ১৯৯০ সাল নাগাদ সোভিয়েত স্যানাটোরিয়ামগুলো বছরের যেকোনো সময়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে জায়গা দিতে পারত।

সোভিয়েত নীতিনির্ধারকদের কাছে ছুটিটা হৈ-হুল্লোড়, আমোদ-আহ্লাদে কাটানোটা বুর্জোয়া সংস্কৃতি ছিল। কাজেই সোভিয়েতরা ছুটির সময়টাতে নিজেদের শরীরটা আরো পোক্ত করার ব্যাপারেই বেশি মনোযোগ দিত। এই যেমন ১৯৬৬ সালে বিখ্যাত সোভিয়েত মডেল আন্তোনভ বলেছিলেন, ‘আমি বছরে একবারই ছুটি পাই, তাই ছুটির একটা দিনও অলস বসে নষ্ট করি না।

তা এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, পয়সা খরচ করে মানুষ কেন স্যানাটোরিয়ামে গিয়ে বসে থাকবে! মানুষের মনে তো ছুটি কাটানোর অন্য পরিকল্পনাও থাকতে পারে। সেখানেই হচ্ছে মজা। সোভিয়েত স্যানাটোরিয়ামে সরকারি কর্মীদের থাকা-খাওয়া ছিল নিখরচায়, সম্পূর্ণ ফ্রি। আর ছুটিও এক-দু দিনের না, পাক্কা ১৪ দিন পর্যন্ত এভাবে সরকারি খরচে অবকাশ কাটানো যেত। মানুষ যে ছুটির দিনগুলোর জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকবে এতে আর আশ্চর্য কী! তবে এখন অবশ্য বেশির ভাগ স্বাস্থ্যনিবাসে সময় কাটাতে চাইলেই অর্থ খরচ করতে হবে আপনাকে। তবে কোথাও কোথাও আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বেলারুশে এখনো দুই সপ্তাহ করে বিনা মূল্যে ছুটি কাটানোর প্রথাটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই স্বাস্থ্যবিধির এই অসাধারণ নিদর্শনগুলো দেখতে আসেন, ছুটি কাটিয়ে তরতাজা হয়ে ওঠেন। মারিয়াম ওমিদি নামের এক সাংবাদিক অনলাইনে অর্থ সংগ্রহ করে আলোকচিত্রীদের এই সব স্বাস্থ্যনিবাসের ছবি তুলতে উত্সাহিত করেন। গত বছর এখনো টিকে আছে এমন স্যানাটোরিয়ামগুলোর মধ্যে ৪০টির অদ্ভুত চিকিত্সার ছবি তোলেন আলোকচিত্রীরা। ওই ছবিগুলো নিয়ে ‘হলিডেজ ইন সোভিয়েত স্যানাটোরিয়াম’ নামের একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে।

চিকিৎসা সেবা নিয়ে কিছু কথা

medical costমিহির কুমার রায় – সম্প্রতি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরে এক বেসরকারী হাসপাতালের রোগিণীর বাচ্চা প্রসবের ঘটনা; প্রথমটির বিবরণে প্রকাশ এক রোগিণী বাচ্চা প্রসবের নিমিত্তে এলাকার একটি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং চিকিৎসক নির্ধারিত তারিখে রোগিণীর অপারেশন সম্পন্ন করে একটি বাচ্চা প্রসব করিয়ে রোগিণীকে যথারীতি অব্যাহতি দিয়ে দেন কিন্তু রোগিণীর পেটে গোলাকার বৃত্তাকার একটা কিছুর অনুভব হলে রোগিণী আবার সেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তিনি টিউমার শনাক্ত করে রোগিণীকে বিদায় করে দেন। কিন্তু রোগিণী ক্রমাগতভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রায় এক মাস পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়। সেই হাসপাতালের চিকিৎসক পরীক্ষা করে রোগিণীর পেটে আরও একটি বাচ্চার অস্তিত্ব খুঁজে পান। এরই মধ্যে বাচ্চাটির মৃত্যু হয় এবং সে অবস্থাতেই অস্ত্রোপচার করে বাচ্চা প্রসব করা হয়। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় চিকিৎসকের অদক্ষতা তথা অবহেলায় রোগীটির জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণ ও যমজ বাচ্চা শনাক্তকরণের ব্যর্থতা। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বিপুল সাড়া পড়ে যায় এবং প্রশাসন, স্থানীয় নেতৃত্ব, জন প্রতিনিধিগণ এর বিচার বিভাগীয় তদন্ত তথা চিকিৎসকের বিচার দাবি করেন। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ প্রদান করে, যা একটি গতানুগতিক প্রক্রিয়া এবং সাংবাদিকের ভাষ্য দোষী চিকিৎসকের আর কিছু হবে না এবং এভাবেই এ সকল দোষী ব্যক্তি পাড় পেয়ে যাচ্ছে প্রশাসনের সহযোগিতায়। অথচ একই চিকিৎসকের অবহেলাজনিত কারণে বাচ্চার মৃত্যু তথা ক্ষতিগ্রস্ত রোগিণীর কাজটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিধায় ফৌজদারি আইনে চিকিৎসককে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করা যেত। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। চিকিৎসক কর্তৃক রোগিণী নিগ্রহ তথা শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় পাওয়া যায়, যা এ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি কুৎসিত রূপ।

এ তো গেল মফস্বলের ঘটনা। খোদ ঢাকা শহরের একটি নামকরা ক্লিনিকে হার্টের চিকিৎসার জন্য রোগী যথাসময়ে চিকিৎসকের কাছে যান। রোগী দেখার চিকিৎসা ফি এক হাজার টাকা। সিরিয়াল অনুসারে রোগীর নাম ডাকা হলো এবং চেম্বারের ভেতরে গিয়ে তিনি দেখলেন চিকিৎসক ফেসবুকে গেম খেলছেন। কিছুক্ষণ পর রোগী চিকিৎসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে তিনি রোগীর দিকে দৃষ্টি ফেরান এবং সার্বিক বিষয়টি জানতে চান। নির্দিষ্ট সময়ে কথোপকথন শেষ হলে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিয়ে রোগীকে বিদায় করে দেন। সেই নির্ধারিত রোগী ওষুধ ক্রয়ের জন্য নির্ধারিত দোকানে গেলে সেখানকার বিক্রেতা এই ওষুধ নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে বসে এই বলে যে এসব ওষুধের ব্যবস্থাপত্র সঠিক হয়নি। এই কথা শুনে রোগী আবার নির্ধারিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং সার্বিক বিষয়টির বিবরণ দেন। তখন সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আবার তার প্রদেয় ব্যবস্থাপত্রে পরিবর্তন করে আবার নতুন ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে সংযোজন করেন। এই অবস্থায় রোগীর মনে সন্দেহ দেখা দেয়ায় এই ব্যবস্থাপত্রের কোন ওষুধই তিনি ক্রয় করেননি এবং সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন আমরা এখন কোথায় যাব?

আরেক রোগী কানের রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের এক নামকরা চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হয়ে তার চেম্বারে যান বিকেল ৪টায়। কিন্তু চিকিৎসক তার চেম্বারে প্রবেশ করেন রাত ৮টায়। এরই মধ্যে রোগীদের অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্ধারিত রোগী চিকিৎসকের চেম্বারে প্রবেশ করে রাত ৯টায়। যেখানে রোগী তার অবস্থা নিয়ে মাত্র তিন মিনিট কথা বলার সুযোগ পান এবং এই চিকিসকের প্রতি আস্থা বা ভরসা করতে পারেননি। কিন্তু কেন এমন হবে?

সম্প্রতি ঢাকার আজিমপুরের সরকারী মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রে এক দরিদ্র মহিলা সন্তান প্রসবের জন্য ভর্তি হতে এলে টাকা না দেয়ার কারণে তাকে সেখানকার আয়া/সেবিকারা ঘর থেকে বের করে দেয়। পরবর্তীতে ক্লিনিকের বারান্দায় রোগিণী একটি বাচ্চা প্রসব করেন এবং ক্লিনিকের সকল রোগীরা একসঙ্গে জড়ো হয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান। বিষয়টি মিডিয়াতে এলে তখন এই সরকারী ক্লিনিকের তত্ত্বাবধায়ককে (মহিলা চিকিৎসক) ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন দোষীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখন প্রশ্ন হলো, কেন আয়া কিংবা সেবিকানির্ভর চিকিৎসালয় যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক যার কারণে দরিদ্র রোগীরা সরকারী হাসপাতালে কোন সেবা পায় না।

বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা মানবিকতার ভিত্তিতে এখনও সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে ওঠেনি যা ভারতে অনেক আগেই শুরু হয়ে অনেক সফলতার স্বাক্ষর বহন করেছে। এখানে উল্লেখ্য, পশ্চিম বাংলায় সরকারী চিকিৎসকগণের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের কোন সুযোগ নেই এবং বেসরকারী খাতে কোন প্রকার মেডিক্যাল কলেজেও নেই, যা বাংলাদেশে রয়েছে। যার ফলে সেখানে মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে, যা মানবিকতা তথা নৈতিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। অপরদিকে বাংলাদেশে মেডিক্যাল শিক্ষা বিদেশে স্বীকৃত নয় মানের মানদন্ডের বিচারে। তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক নয় যে আমরা কি মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা চাই কিংবা চিকিৎসাসেবা চাই? এই প্রশ্নটি নিয়ে আমাদের ভাবনার এখনই প্রকৃষ্ট সময়। কারণ দুই হাজার একুশ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এক অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণে বর্তমান সরকার রূপকল্প (ভিশন ২০২১) অনুযায়ী স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দৈনিক ন্যূনতম ২১২২ কিলো. ক্যালরির উর্ধে খাদ্যের সংস্থান, সর্বপ্রকার ব্যাধি নির্মূলকরণ, সকলের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, গড় আয়ু ৭০ বছরে উন্নীতকরণ, মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাসকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে সরকারের অনেক সাফল্য রয়েছে যেমন দেশব্যাপী স্বাস্থ্য পরিচর্যা তথা অবকাঠামো নির্মাণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের হ্রাস, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার কমানো ইত্যাদি।

এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমত- স্বাস্থ্যনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, যা হবে মানবিক, নৈতিক, ব্যয়সাশ্রয়ী ও সমাজমুখী। যদিও কাজটি কঠিন তবুও সম্ভব। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকারের প্রতিশ্রুতি জরুরী। আশির দশকের মাঝামাঝি দেশে স্বাস্থ্যনীতিতে আমূল পরিবর্তনের এক উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সরকারী চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ। তখনকার সরকার সমর্থন দিলেও বিএমএর আন্দোলনের মুখে তা আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি;

দ্বিতীয়ত- চিকিৎসকদের প্রশাসনিক কাঠামোতে অমানবিক বা অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরার চিত্রগুলো বন্ধ করতে হবে যেমন চিকিৎসক-হাসপাতাল-ওষুধ কোম্পানির মধ্যে যে লেনদেন স্বার্থ স্বাস্থ্যখাতে গড়ে উঠেছে তা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো প্রশাসনিকভাবে বিষয়টিকে মোকাবেলা করা অর্থাৎ উপজেলা পর্যায়ে টিএইচএ, জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন ও জাতীয় পর্যায়ে মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদফতর বিষয়টির ব্যাপারে তদারকি ব্যবস্থা (সড়হরঃড়ৎরহম) জোরদার করবে এবং সরকারের ওষুধ প্রশাসন দফতরে এ ব্যাপারে নজরদারি বাড়াবে।

তৃতীয়ত- চিকিৎসকদের নৈতিকতা (ethics) বা মানবিকতা যাচাইয়ের কোন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ দেশে আছে বলে মনে হয় না, অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রয়েছে। ফলে চিকিৎসা পেশা এক অনৈতিক অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন আর এ কারণে প্রতিনিয়তই বলি হচ্ছে রোগীরা এবং প্রতারিত হচ্ছে গোটা সমাজ। এর একটি স্থায়ী সমাধান জরুরী। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। প্রায়শই শোনা যায় চিকিৎসক দ্বারা রোগী লাঞ্ছিত কিংবা রোগীর লোকজন দ্বারা চিকিৎসক লাঞ্ছিত যা খুবই অনাকাক্সিক্ষত।

চতুর্থত- বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভের তথ্য মতে, বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে শতকরা ২৩ ভাগ বাচ্চা প্রসবজনিত অপারেশন হয় এবং শতকরা ৭৭ ভাগ হয় বেসরকারী ক্লিনিকে যা টাকার অঙ্কে রোগীর ওপর এক আর্থিক চাপ অথচ এটি সম্পূর্ণ উল্টোও হতে পারত। কিন্তু তা হয়ে উঠছে না কারণ এ সকল বেসরকারী ক্লিনিক সরকারী চিকিৎসকের নিজের বা তার নিকটতম আত্মীয় দ্বারা পরিচালিত। এই ক্লিনিক ব্যবসা কিংবা রোগ নির্ণয় কেন্দ্র (diagnostic centre) ব্যবসা এমন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে যার মানের কথা বলাইবাহুল্য। এই ব্যবস্থার আরও একটি কুৎসিত রূপ হলো ভুয়া মেডিক্যাল সার্টিফিকেট প্রদান অর্থের বিনিময়ে অথবা এক সিনিয়র চিকিৎসকের প্যাড/সিল ব্যবহার করে জুনিয়র চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দেয়া যা সম্পূর্ণ অনৈতিক। এই সকল অনুশীলন বন্ধের জন্য সামাজিক সচেতনতা জরুরী।

পঞ্চমত- রোগী হয়ে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে যাতে রোগে আক্রান্ত না হওয়া যায় সেটাই শ্রেয়। তার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়মাবলি পালনসহ পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ।

সব শেষে বলা যায়, স্বাস্থ্য মানব সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ সূচক যাকে মানসিকতার আলোকে সাজাতে হবে এই হোক চিকিৎসক সমাজের কাছে প্রত্যাশা।

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ

মানসিক চাপ থেকে রেহাই পেতে…

stress reduction infographics