আর্কাইভ

Archive for the ‘গ্রামবাংলা’ Category

হাওরের নাম হাকালুকি

সুমন্ত গুপ্ত : বর্ষাকালে একে হাওর না বলে সমুদ্র বলা যায় অনায়াসে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ হাওরে নানা প্রজাতির মাছ রয়েছে। বর্ষায় থৈথৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু স্থানগুলোতে অনেক পাখি আশ্রয় নেয়। আর শীতের সময় হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি মেলা বসায় হাওরের বুকে।

প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে, সঙ্গে মেঘের হুঙ্কার। তার মাঝেই আমরা বেরিয়ে পড়ি ঘুরতে। কিন্তু কোথায় যাব ঠিক করতে পারছিলাম না। আমার চার চাকার পাইলট মামুন বলল, দাদা, চলেন হাকালুকি হাওরে ঘুরে আসি। ভাবলাম কম খরচে ভ্রমণের জন্য হাকালুকি হাওর মন্দ নয়। আর বন্ধুরা যারা ঢাকা থেকে আসতে চান তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ট্রেনে করে সরাসরি ঢাকা থেকে মাইজগাঁও চলে আশা। জনপ্রতি ৩৪০ টাকা দিয়ে চলে আসতে পারবেন। আর সেখান থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারের পরেই পাবেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের ঠিকানা।

বর্ষায় হাওরগুলো অপরূপ রূপ ধারণ করে, তাই আর না বললাম না। আমরা ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারে নামলাম। পেট পূজা শেষ করে গেলাম নৌকাঘাটে। মানুষ কম, তারপরও বড় ছইওয়ালা ট্রলার নিলাম। চারদিকে থৈথৈ পানি। সাগরের মতো ঢেউ আর দূরে ছোট ছোট হাওর দ্বীপ যে কারও মনকে মুগ্ধ করবে; আমি বাজি ধরে বলতে পারি। হাওর হলো এমন একটি বিস্তীর্ণ এলাকা, যেখানে বৃষ্টি মৌসুমে থৈথৈ জলে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, সমুদ্রের মতো ঢেউ থাকে।

হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার পাঁচটি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। ২৩৮টি বিল ও নদী মিলে তৈরি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার একরের এ হাওর। বর্ষাকালে একে হাওর না বলে সমুদ্র বলা যায় অনায়াসে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ হাওরে নানা প্রজাতির মাছ রয়েছে। বর্ষায় থৈথৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু স্থানগুলোতে অনেক পাখি আশ্রয় নেয়। আর শীতের সময় হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি মেলা বসায় হাওরের বুকে।

হাকালুকি হাওরের বিলের পাড় ও কান্দায় বিদ্যমান জলাভূমি বন পানির নিচে ডুবে গিয়ে সৃষ্টি করেছে ডুবন্ত বন, যা ব্যবহৃত হয় মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে। হাওর এলাকার প্রতিটি মানুষ মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত। এমনকি ছোট বাচ্চারাও মাছ ধরছে।

আমাদের মাঝি সুনীল তার সুমধুর গলায় শাহ আবদুল করিমের গান ধরলেন গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান…। আমাদের সুনীল মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, হাকালুকি নাম কীভাবে হলো। তিনি বললেন, হাকালুকি হাওরের নামকরণ নিয়ে মজার মজার কল্পকাহিনী শোনা যায়। হাওর শব্দটি সংস্কৃত শব্দ সাগর-এর পরিবর্তিত রূপ বলে ধারণা করা হয়। হাওর শব্দের বংশপূর্ব শব্দ ছিল সাগর। এই সাগর থেকে পর্যায়ক্রমে সাগর>সাওর>হাওর শব্দে রূপান্তর হয়েছে। প্রচলিত একটা তথ্য আছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজা ওমর মাণিক্যের সৈন্যদের ভয়ে বড়লেখা এলাকার কুকি প্রধান হাঙ্গর সিং তখনকার এই হাওর এলাকায় জঙ্গলপূর্ণ ও কর্দমাক্ত এলাকায় ‘লুকি দেয়’ অর্থাৎ লুকিয়ে থাকে। কালক্রমে এই এলাকার নাম হয় ‘হাঙ্গর লুকি বা হাকালুকি’।

আরেক কাহিনীতে জানা যায়, প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রচণ্ড এক ভূমিকম্পে ‘আকা’ নামে এক নৃপতি ও তার রাজত্ব মাটির নিচে তলিয়ে যায়। এই তলিয়ে যাওয়া নিম্নভূমির নাম হয় ‘আকালুকি বা হাকালুকি’। আরও এক ইতিহাস থেকে শোনা যায়, বড়লেখা উপজেলার পশ্চিমাংশে ‘হেংকেল’ নামে একটি উপজাতি বাস করত। ওই উপজাতি এলাকার নাম ছিল ‘হেংকেলুকি’। এটি পরে ‘হাকালুকি’ নাম ধারণ করে। অপর একটি জনশ্রুতি মতে, এক সময় এই হাওরের কাছাকাছি বসবাসকারী কুকি ও নাগা উপজাতি তাদের ভাষায় এই হাওরের নামকরণ করে ‘হাকালুকি’, যার পূর্ণ অর্থ লুকানো সম্পদ।

পাঁচটি উপজেলা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওরটি সিলেট ও সীমান্তবর্তী মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত। হাওরের ৪০ শতাংশ অংশ বড়লেখা, ৩০ শতাংশ কুলাউড়া, ১৫ শতাংশ ফেঞ্চুগঞ্জ, ১০ শতাংশ গোলাপগঞ্জ ও ৫ শতাংশ বিয়ানীবাজার উপজেলার অন্তর্গত। হাওরের আয়তন ২০ হাজার ৪০০ হেক্টর। ২৪০টি বিল নিয়ে গঠিত হাকালুকি হাওরের বিলগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বর্ষাকালে এই হাওর ধারণ করে এক অনবদ্য রূপ।

বিলের পানির মধ্যে ও চারধারে জেগে থাকা সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়া কিঞ্চিৎ উঁচু ভূমি বিলের পানিতে প্রতিচ্ছবি ফেলে সৃষ্টি করেছে অপরূপ দৃশ্যের। পড়ন্ত বিকেলে রক্তিম সূর্যের আলো, আরেক দিকে ত্রিপুরা রাজ্যের ছোট-বড় পাহাড়ের ঢালে লালচে আকাশ। রাখালের গরু নিয়ে বাড়ি ফেরা। কোথাও জেলেরা তীরে নৌকা ভেড়াচ্ছে। একদল জেলে নৌকার বৈঠা কাঁধে একপ্রান্তে জাল, অন্যপ্রান্তে মাছের ঝুড়ি বেঁধে গাঁয়ের বাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। পাখির দল এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে চলছে। আর কিছুক্ষণ পরেই ডুবে যাবে লাল সূর্য। ঘনিয়ে আসবে সন্ধ্যা। আর আমাদের ঘরে ফেরার সময় হয়ে এলো।

কীভাবে যাবেন

হাকালুকি যাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া উপবন এক্সপ্রেসে উঠে যাওয়া। নামতে হবে মাইজগাঁও স্টেশনে। এটি সিলেটের ঠিক আগের স্টেশন। ভাড়া নেবে ৩৪০ টাকা। মাইজগাঁও থেকে দুটি উপায়ে যাওয়া যায় হাকালুকি।

ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার হয়ে

মাইজগাঁও থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার। বাজারে নেমেই আল মুমিন রেস্টুরেন্টে বসে যাবেন। সেখানে ফ্রেশ হয়ে, হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা করে সামনের নৌকাঘাটে চলে আসুন। এখান থেকে নৌকা দরদাম করে উঠে পড়ুন সারা দিনের জন্য। বড় গ্রুপ হলে (১০-১৫ জন) বড় ছইওয়ালা ট্রলার নিন। দিনপ্রতি ভাড়া নিতে পারে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কিছু খাবার এবং পানি কিনে নিন, কারণ হাওরে কোনো দোকানপাট পাবেন না। তবে দয়া করে কোনো ধরনের প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট, খাদ্যদ্রব্য হাওরে ফেলে হাওরের পরিবেশকে দূষিত করবেন না। এবার নৌকায় উঠে কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিয়ে হাওরে ঘুরে বেড়ান। কুশিয়ারা পাড়ি দিতে প্রায় ৪০ মিনিট লাগবে।

গিলাছড়া বাজার হয়ে কুশিয়ারা নদীর ৪০ মিনিট সময় বাঁচাতে চাইলে মাইজগাঁও থেকে সরাসরি ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে চলে আসতে পারেন গিলাছড়া বাজারে। এখান থেকেই হাওর শুরু। তবে সমস্যা হলো, এখানে বড় নৌকা পাওয়া যায় না। নৌকা আনতে হবে সেই ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার থেকেই। এখানকার লোকজন খুব অতিথিপরায়ণ।

Advertisements

ভ্রমণঃ খাগড়াছড়ি

khagrachhori 3ঋআজ  মোর্শেদ : ঈদের তৃতীয় দিন সন্ধ্যার পর মিরপুরে কোনো এক ছয়তলার ছাদে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে মেঘের ফাঁকে তারা দেখছিলাম। সঙ্গে সহজিয়া ব্যান্ডের গিটারিস্ট শিমুল আর ওর ছাত্র মিল্টন। এবারই প্রথম ঈদ থেকে ঈদ জানাজানি হলো। তবুও আমাদের ভেতর বিন্দুমাত্র ‘ঈদের’ কোনো আমেজ নেই! গুমোট আর স্যাঁতসেঁতে চারপাশ। নিজেরা আবোল-তাবোল প্রসঙ্গ তুলে একঘেয়ে সময় পার করছি। কথা প্রসঙ্গে হঠাৎ শিমুল প্রস্তাব ছুড়ল কোথাও ঘুরতে যাওয়া যায় কি-না। কী টেলিপ্যাথি! আমিও তখন এ রকম কিছু ভাবছিলাম আর বাকি থাকা মিল্টনও সাড়া দিতে দেরি করল না। আমরা তিনজন আর দুটি গিটার। ঠিক হলো খাগড়াছড়ি যাব। ওই শহরটা নাকি মিল্টনের চেনা। মোবাইল ফোনে সময় দেখে নিলাম। রাত সাড়ে ৯টা। জোগাড়যন্তর, খাওয়া-দাওয়া আর হাবিজাবি করে সিএনজি যখন সায়েদাবাদে তিন চাকা ঠেকাল, তখন রাত প্রায় ১২টা। ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে দ্রুত কাউন্টারের উদ্দেশে পা চালালাম। এদিক-সেদিক তন্নতন্ন করে কোথাও ৫২০ টাকায় খাগড়াছড়ি যাওয়ার সরাসরি কোনো বাস পেলাম না। ঠিক করলাম চট্টগ্রাম যাব। ওখানে যেতে পারলে কোনো একটা উপায় বের করা যাবে। ৪-৫টা কাউন্টার ঘুরে সাউদিয়া পরিবহনের রাত ১২টার টিকিট কেটে ফেললাম। ভাড়া ৪৮০ টাকা করে।

বাসে উঠে যে যার মতো সিটে বসে পড়লাম। আধেক জেগে আধেক ঘুমে যখন বারৈয়ারহাটে নামলাম, তখন রাত প্রায় ৪টা। সেখানে তিন রাস্তার মোড়ে একটা হোটেলে রুটি আর ডিমে ডিনার আর ব্রেকফাস্টের মাঝামাঝি একটা কিছু হলো। তারপর প্রায় মিনিট কুড়ি দাঁড়িয়ে একটা সংবাদপত্রবাহী মাইক্রোবাসের দেখা পেলাম। খাগড়াছড়ি যাবে। ভাড়া জনপ্রতি ২০০। তবে তিনজন মিলে ৫০০ টাকা দেব জানিয়ে উঠে পড়লাম। মাইক্রোবাসের একেবারে পেছনের সিটে পিঠ এলিয়ে দিয়ে ঠিক করলাম একটুও ঘুমাব না। চারপাশে শিশুতোষ পবিত্র আলো। ঢাকার জঞ্জালে ভারাক্রান্ত দু’চোখও চাইছিল না একটা দৃশ্যও যেন বাদ পড়ে। অচেনা পাহাড়ের প্রতিটি বাঁকেই বিস্ময় আর ওপরে মেঘের গড়াগড়ি। দেখতে দেখতে খাগড়াছড়ি দেড় ঘণ্টায় চলে এলাম। থাকার জন্য ৫০০ টাকায় একটা ডাবল বেডের হোটেল ভাড়া করা হলো। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহর ঘুরতে। ততক্ষণে তিনজনেরই প্রচুর খিদে লেগেছে। মিল্টন জানাল, ওর পরিচিত একটি আদিবাসী হোটেল আছে। সেখানে আদিবাসীদের পছন্দের নানা খাবার সুলভে পাওয়া যায়। গুইসাপ, সাপ, শূকর, মদসহ আরও নানা পদ। (গুইসাপ খেয়েছিলাম, বাসায় জানে না!) পাশাপাশি বাংলা খাবারও আছে। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার শুরু হলো শহর ঘোরা। ঠিক করলাম পরদিন যাব আলুটিলা গুহায়।

পরদিন আমাদের সঙ্গে যোগ হলো স্থানীয় বন্ধু কামরুল ও বাবু। সবাই মিলে সকাল ১০টার দিকে আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহার উদ্দেশে রওনা করলাম। খাগড়াছড়ি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে লোকাল বাস যায় তারেং পর্যন্ত। ভাড়া ১৫ টাকা। সব দেখার জন্য বাসের ছাদে বসলাম। কিছুক্ষণ পর বাস চলে এলো আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে। মূল সড়কের পাশেই এই পর্যটন কেন্দ্র। গুহায় ঢুকতে হলে ১০ টাকায় টিকিট কাটতে হয়। স্থানীয় ভাষায় রহস্যময় ওই গুহাকে বলা হয় ‘মাকাই হাকর’। মানে দেবতার গুহা। আলো ছাড়া নাতিদীর্ঘ এই গুহা পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। টিকিট কাউন্টারের পাশ থেকে ৫টা মশাল ৫০ টাকায় কিনে নেওয়া হলো। শুক্রবার হওয়ায় পর্যটক সমাগমও ছিল অগণিত। ভেতরে ঢুকে মশালের আলোতে ছোটখাটো একটা গানের বিরতি নিলাম। আধা ঘণ্টা গান-বাজনার পর আবার হাঁটা। হিসাব করে দেখা গেল সম্পূর্ণ গুহা পার করতে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট সময় লাগে।

পরদিন গেলাম রিচাং ঝর্ণায়। আবারও খাগড়াছড়ি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে লোকাল বাসের ছাদে। ভাড়া পড়ল জনপ্রতি ১৫ টাকা। বাস যেখানে নামিয়ে দেয়, সেখান থেকে ঝর্ণা পর্যন্ত যেতে আধা ঘণ্টারও বেশি হাঁটতে হয়। হাঁটতে না চাইলে মোটরসাইকেলের ব্যবস্থা আছে। ঠিক করলাম মূল রাস্তা দিয়ে সরাসরি না গিয়ে ভেতর দিয়ে যাব। ভেতরের পথে হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম খুব নির্জন একটা গোসল করার জায়গা।

পাহাড়ের সবুজ শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি এখানে বিশ্রাম নেয়। তারপর আবার ঝর্ণার দিকে যায়। জায়গাটা আসলে গিরিপথের অংশ। এখানে কিছু সময় বসতে না বসতেই শুরু হলো অঝোর বৃষ্টি। আর দেরি না করে রিচাং ঝর্ণার খোঁজে পা বাড়ালাম। আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে লোমহর্ষক যাত্রাও এখান থেকে শুরু হলো। প্রবল বৃষ্টিতে অচেনা পিচ্ছিল পথে চলতে চলতে এমন ঢাল পেয়ে গেলাম, যেখানে মাত্র ৬ মিটার নামতে আমাদের প্রায় ৩০ মিনিট লেগেছিল। কারণ পা ফসকালেই মৃত্যু অথবা বড় ধরনের শারীরিক আঘাতের আশঙ্কা। শেষ পর্যন্ত কারও কোনো ক্ষতি ছাড়াই পেঁৗছে গেলাম রিচাং ঝর্ণায়।

খাগড়াছড়ি গিয়ে সাজেক ঘুরে না এলে খুবই বোকার মতো কাজ হতো। কিন্তু সাজেক যাওয়ার খরচ শুনেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে গরিব হয়ে গেলাম! চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করতেই নাকি পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা প্রয়োজন। তবুও রাখে আল্লাহ মারে কে! দরকার হলে ৭০ কিলোমিটার হেঁটেই যাব পণ নিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে মাহেন্দ্রায় উঠলাম। উদ্দেশ্য দীঘিনালা। ভাড়া ৫০ টাকা। সেখানে নামার পর খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম রিজার্ভ না করেও যাওয়া যায়। তবে সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা পাওয়া নিশ্চিত নয়। ঝুঁকি নিলাম। দীঘিনালা থেকে চান্দের গাড়িতে রাঙামাটির বাঘাইহাট যেতে ২৫ টাকা লাগে। বাঘাইহাট থেকে সাজেকের জন্য আবারও চান্দের গাড়িতে উঠতে হয়। ভাড়া ১১০ টাকা। আর্মি চেকপোস্টে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে বিকেল ৪টার মধ্যেই চলে এলাম মেঘের দেশে। ঢুকতেই প্রথমে রুইলুই পাড়া। তারপর মারিশ্যা। একদম শেষ পাড়ার নাম কংলাক। এখানে লুসাইদের বাস। সাজেকের সব সৌন্দর্য কংলাক পাড়াতেই হামাগুড়ি খায়। ওখানে রক প্যারাডাইস নামে একটা কটেজ ভাড়া করা হলো। ১৫০০ টাকায় চারজন। ৩৬০ ডিগ্রি দেখার জন্য রক প্যারাডাইস আদর্শ। ওপারে ভারতের লুসাই পাহাড় আর এপারে রাঙামাটির সাজেক পাহাড়। সবখানেই ছেলে-বুড়ো মেঘ-বৃষ্টি নামার তাল গুনছে। রাতটা মেঘের সাম্রাজ্যে কাটিয়ে সকালেই রওনা দিলাম খাগড়াছড়ি হয়ে ঢাকার উদ্দেশে।

বাংলা সাহিত্যে বর্ষা বন্দনা

অলোক আচার্য্য :ঋতুচক্রে এখন বাংলায় বর্ষাকাল চলছে। বইয়ের হিসেবে আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্য অন্যরকম। বর্ষা শুরুর আগে থেকেই প্রবল বর্ষণ এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। আবার বর্ষা বিদায় নেয়ার পরেও একই চিত্র দেখা যায়। তবু বর্ষা ঋতু বর্ষা। একেবারে ভিন্ন। প্রকৃতির অপার প্রতীক্ষায় জেগে ওঠা বৃষ্টির ফোঁটায় বর্ষা ঝরে। বর্ষায় জেগে ওঠে প্রাণ। দূর হয় জঞ্জাল। বর্ষার শুরুতেই করা হয় আবাহন। বর্ষার গানে বর্ষাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। যেন এক রাজকীয় ব্যাপার। আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণের অঝর ধারায় ভেসে যাচ্ছে দেশ। মাঠের পর মাঠ বর্ষার জলে থৈ থৈ করছে। দিন পেরিয়ে গেলেও, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বর্ষার সে রূপ এখনো তেমনি আছে। সেই কালো মেঘে ঢেকে থাকা, অঝর ধারায় বৃষ্টি এসব কিছুই বর্ষার বৈশিষ্ট্য। তপ্ত গ্রীষ্মের প্রহর শেষে ধরণী যখন উত্তপ্ত, এক ফোঁটা বৃষ্টির জলের জন্য হাহাকার করছে প্রতিটি ধূলিকণা তখন এক পসলা বৃষ্টি নামে বাংলার বুকে। সেই বৃষ্টির জলরাশি বেয়ে নাকে আসে সোদা মাটির গন্ধ। আমরা প্রাণ ভরে শ্বাস নিই। মাটিরও যে গন্ধ হয় তা তো এই বর্ষার বৃষ্টিতেই বোঝা যায়!

বর্ষার নতুন জল পেয়ে বৃক্ষরাশি জেগে উঠেছে নতুন করে। যেন তারা এতদিন ধরে আকাশের কাছে প্রার্থনায় ছিল। কখন বৃষ্টি নেমে তাদের প্রাণ ফেরাবে। নদ-নদী-পুকুর সব পানিতে ভরে যায় এসময়। কাগজে-কলমে আমাদের ছয়টি ঋতু থাকলেও শীত, বসন্ত আর বর্ষার বাইরে অন্যসব ঋতুর উপস্থিতি যেন অনেকটা ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে। নদী তার যৌবন ফিরে পায় এই বর্ষায়। শুধু নদী কেন বর্ষার অপেক্ষায় তাকে আরও কত সৃষ্টি। যদিও বসন্ত আমাদের ঋতুর রাজা কিন্তু বর্ষার আদর বাংলায় একেবারে অন্যরকম। লেখক, কবি, সাহিত্যিক, গায়ক থেকে শুরু করে বর্ষা আর বৃষ্টিকে নিয়ে চিন্তা করে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে বর্ষাকে ভালোবাসে না সে নিতান্তই নিরস। বসন্ত ঋতুর রাজা হলেও বর্ষার ভালোবাসার সঙ্গে তুলনা হয় না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে প্রায় সবাই বর্ষা আর বৃষ্টি নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কবিগুরুর বর্ষার দিনে কবিতায় লিখেছেন

এমন দিনে তারে বলা যায়,
এমন ঘনঘোর বরিষায়-
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়
সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
নিভৃত নির্জন চারি ধার।
দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,
আকাশে জল ঝরে অনিবার-
জগতে কেহ যেন নাহি আর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত এবং পাঠ্যবইয়ে প্রচলিত সোনার তরী কবিতায়ও এঁকেছেন বর্ষার চিত্র। সেখানে লিখেছেন

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষরধারা
খরপরশা-
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

যদিও কবির এ কবিতাটিতে জীবনের কর্ম এবং ফসলের কথা বলা হয়েছে। তবে বর্ষার ব্যবহার করেই তা করা হয়েছে। তবে ছোটবেলায় পড়া একটা কবিতায় আষাঢ় এবং বর্ষাকে আরও বেশি পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্ষায় কখনো খুঁজেছেন গভীরতা, কখনো রোমান্টিকতা। কোথাও বা বর্ষার প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন। যেমন তার আষাঢ় কবিতায়

নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর
নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের
বাহিরে।
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,
আউশের ক্ষেত জলে ভরভর,
কালি মাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনিছে দেখ চাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের
বাহিরে।

আমাদের দেশে নাকি যে বৃষ্টি নামে তা বিশ্বে অন্য কোথাও হয় না। এই দেশের বৃষ্টি বর্ষার সাথে অন্য কোনো দেশের বৃষ্টির তুলনা হয় না। এই দেশে বৃষ্টি হয়েই তা শেষ হয়ে যায় না। বৃষ্টিতে বর্ষা আসে। বৃষ্টি ছাড়া বর্ষা যেন অসম্পূর্ণ এক ঋতু। আবার বর্ষা এলে বৃষ্টি চাই-ই চাই। বর্ষায় কবির কলমে কবিতা হয়, লেখকের গল্প হয় আবার গায়কের কণ্ঠে গানও হয়। এই হলো আমাদের বর্ষা। হাজার বছরের বাঙালির সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে বর্ষা।

ঊর্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও আরও অনেকেই বর্ষা বৃষ্টির গুণগান করেছেন। পল্লী কবি জসিমউদ্দীনও তার কবিতায় বর্ষার রূপ-বৈচিত্র্য বর্ণনা করেছেন। কবি তার পল্লী-বর্ষা নামক কবিতায় লিখেছেন

আজিকার রোদ ঘুমায়ে পড়েছে
ঘোলাটে মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে
ছল ছল জলধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়।

কবিতার সম্পূর্ণ অংশেই তিনি টেনেছেন বাংলার পল্লী গাঁয়ে বর্ষার সময়ে প্রকৃতির বর্ণনা। কদমফুল বর্ষার সময়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ষা এলেই মানুষ এক অজানা ভালোবাসায় সাড়া দেয়। তাই তো ঋতুরাজ বসন্তের চেয়ে অনেকেই বর্ষাকে ভালোবাসার সমার্থক মনে করেন। চিত্রকরের পটে আঁকা চিত্রে, শিল্পীর গানে বা কবির কবিতায় বর্ষা তাই চির যৌবন রূপ পেয়েছে।

বর্ষা নিয়ে কবি সাহিত্যিকদের উক্তিও কম নয়। মহাদেব সাহা বলেছেন কাগজ আবিষ্কারের আগে মানুষ প্রেমের কবিতা লিখে রেখেছে আকাশে। সেই ভালোবাসার কবিতা এই বৃষ্টি এই ভর বর্ষা। আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও বর্ষার প্রশংসা করেছেন। সে দেশে যবে বাদল ঝরে কাঁদে না কি প্রাণ একেলা ঘরে, বিরহ ব্যথা নাহি কি সেথা বাজে না বাঁশি নদীর তীরে। যুগ যুগ ধরে বর্ষা আর বৃষ্টির বিলাসে গা ভাসিয়ে বাঙালি বরণ করে নিয়েছে বর্ষাকে।

উপকূলে ঝড়ঝঞ্ঝা ঠেকাতে তালগাছ !

palm-tree-on-beach

বিয়ের বয়স নিয়ে সরকারের শুভংকরের ফাঁকিবাজি !

child-marriage-3-art. তৌফিক জোয়ার্দার : ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে কন্যাশিশু সন্মেলনে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৯৭১ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ২২৩, যা বর্তমানে মাত্র ৩৭.এ নেমে এসেছে। শুধু শিশুমৃত্যুই নয়, বাংলাদেশ প্রায় সবগুলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয়েছ এবং এক্ষেত্রে বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এসব অর্জনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু এতসব অর্জনের পরও একটি বিষয়ে বাংলাদেশ আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। এটি হল, মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাড়ানো।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) রিপোর্ট, ২০১৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স হল ১৬.৬ বছর। শুধু এই একটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ায় বিভিন্ন সামাজিক সূচকের পরিমাপকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, উন্নয়নকর্মী ও গবেষকদের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলেছিল। একজন সচেতন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে এটা খুবই স্বাভাবিক।

এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে সরকার হঠাৎ করেই সব উন্নয়ন প্রপঞ্চের বিপরীত স্রোতে নৌকা ভাসাল। ঘোষণা করা হল, বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের লিগ্যাল বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা হবে। উন্নয়ন সেক্টরে কাজ করা একজন গবেষক হিসেবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অন্য অনেকের মতো আমিও চিন্তাভাবনা না করে পারিনি।

এ ঘোষণার পেছনে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য তারাই ভালো বলতে পারবে, তবে আমার ধারণা হচ্ছেকেউ হয়তো সরকারকে বুঝিয়েছেন, বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিলে বাল্যবিবাহিত মেয়েদের সংখ্যাও পরিসংখ্যানে কম দেখাবে। তখন কৃত্রিমভাবে হলেও বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ হ্রাসে সরকারের আপাত ব্যর্থতা আর আলাদাভাবে চোখে পড়বে না।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বিয়ের বয়স কম বলে এত যে সমালোচনা এবং সে সমালোচনা ধামাচাপা দিতে গিয়ে এতসব আয়োজন, বিয়ের সে বয়সটিই সঠিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছে কিনা? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এশিয়ান পপুলেশন স্টাডিজ নামক জার্নালে প্রখ্যাত গবেষক পিটার কে স্টিটফিল্ড, নাহিদ কামাল, কারার জুনায়েদ আহসান এবং কামরুন নাহার এমনটিই দাবি করেছেন।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে করা জরিপের সঙ্গে বাংলাদেশ উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) স্বাস্থ্য ও জনমিতিক অতন্দ্র তত্ত্বাবধান (ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভেইলেন্স) উপাত্তের তুলনা করে তারা দেখিয়েছেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের প্রায় দুইতৃতীয়াংশই বিয়ের সঠিক বয়স উল্লেখ করেননি। ৫৬% নারী বিয়ের বয়স কমিয়ে বলেছেন এবং ৭% বলেছেন বাড়িয়ে।

বিবাহিত নারীদের মধ্যে করা জরিপের ফল অনুযায়ী, তাদের উল্লেখ করা প্রথম বিয়ের বয়সের গড় পাওয়া গেছে ১৬.৮ বছর, যা বিডিএইচএস রিপোর্ট, ২০১৪তে উল্লিখিত ১৬.৬ বছরের খুবই কাছাকাছি। যেহেতু আইসিডিডিআরবি তাদের সার্ভেইলেন্স ব্যবস্থার অন্তর্গত প্রত্যেক মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও স্থানান্তরের তথ্য সেই ১৯৬৬ সাল থেকে সংরক্ষণ করে আসছে, তাই তাদের এলাকায় জরিপকৃত ১৯৬৬ বিবাহিত নারীর প্রকৃত বয়সও তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের প্রকৃত বয়স বের করে জরিপে উল্লিখিত বয়সের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, তাদের বিয়ের প্রকৃত গড় বয়স মোটেও ১৬.৮ বছর নয়, বরং ১৮.৬ বছর।

এমন একটি চমকপ্রদ ফলাফল গবেষকদের স্বভাবতই অত্যন্ত কৌতূহলী করে তোলে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারলেন, যেসব নারীর প্রকৃত বিয়ের বয়স যত বেশি, বিয়ের বয়স ভুল বলার বা কমিয়ে বলার প্রবণতাও তাদের তত বেশি। তারা আরও দেখলেন, যেসব নারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং যারা অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বলবিয়ের বয়স ভুল বলার প্রবণতাও তাদের বেশি। সবকিছু বিচারবিশ্লেষণ করে তারা তাদের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেনআমাদের সমাজে এখনও যৌতুকের প্রকোপ ব্যাপকভাবে রয়েছে, কাজেই যেসব মেয়ের বয়স যত বেশি, যৌতুকের পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই যৌতুক দিতে হয়েছেএমন নারীরা তাদের প্রকৃত বিয়ের বয়স কমিয়ে বলে থাকতে পারেন, যাতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কোনোভাবে জরিপ থেকে তার প্রকৃত বয়স জেনে বেশি বয়সের জন্য অধিক যৌতুকের জন্য চাপ দিতে না পারে (যদিও গবেষণার উপাত্ত গোপন রাখা হয়, তবে গ্রামের নারীরা এ বিষয়ে সম্ভবত নিশ্চিত হতে পারেনি)

গবেষণার প্রসঙ্গ এ কারণে উত্থাপন করলাম, যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার উপলব্ধি করতে পারেবিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিমভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে লিগ্যাল বয়সের নিচে বিয়ে হওয়া মেয়েদের সংখ্যা যে বাংলাদেশে কম, তা প্রমাণের চেয়ে কার্যকর উপায়ে এ লক্ষ্যটি অর্জিত হতে পারে।

প্রথমত, বর্তমানে সরকারের গৃহীত নানা সামাজিক পদক্ষেপ প্রকৃতই কাজ করছে, ফলে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাস্তবিকপক্ষেই অনেক বেড়েছে (১৯৯৪ সালের বিডিএইচএস রিপোর্ট অনুযায়ী ১৪.১ বছর)। কিন্তু নানা জরিপে যে কারণে এ উন্নয়ন প্রতিফলিত হতে পারছে না, তা অ্যাড্রেস করা বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দেয়ার থেকেও অধিক কার্যকর ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মান নিয়ন্ত্রণ করা। যে কোনো নাগরিকের প্রকৃত বয়স নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে জন্ম নিবন্ধন সনদ।

দ্বিতীয়ত, নারীরা তাদের বয়স কমিয়ে বলার তাগিদ অনুভব করছেকারণ অধিক বয়সে বিয়ের ব্যাপারে সমাজে এক ধরনের ‘স্টিগমা’ বিরাজ করছে। এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে বিয়ের বয়স ও যৌতুক সংক্রান্ত সামাজিক মূল্যবোধ। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটলে দেশের নারীরা আর বয়স লুকানোর প্রয়োজন অনুভব করবে না।

সরকার সম্প্রতি ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ প্রণয়ন করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এ আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি এবং বাবামায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সাধারণভাবে বিয়ের লিগ্যাল বয়স আগের মতোই মেয়েদের জন্য ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে হয় না, সেখানে ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ কম বয়সে বিয়ের সুযোগটির অপব্যবহার ঘটতে পারে। তাই এ অনুবিধিটি বাতিল করার অনুরোধ জানাই।

সহকারী অধ্যাপক

জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬

বিলুপ্ত হবার পথে গ্রামাঞ্চলের ঢেঁকি…

dheki

সুরেলা ভরত পাখী

jharvorot