আর্কাইভ

Archive for the ‘কৃষি’ Category

পাটের বিকল্প সন্ধানে…

jute alternative

Advertisements

আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদনে রেকর্ড; বাড়ছে তালিবানের রাজস্ব আয়

afghan poppy farm destruction২০১৭ সালে আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদনের রেকর্ড হতে চলেছে। অপরিবর্তিত থাকছে তার বিশ্বে সর্বোচ্চ আফিম উৎপাদক দেশের স্থান। আফিম উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি তাতে তালিবানের বৃহত্তর ভূমিকাও বজায় থাকছে। তাদের আয়ের সিংহভাগই আসে মাদক ব্যবসা থেকে। তালিবান যতই মাদক ব্যবসার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, ততই তাদের বেশির ভাগ যোদ্ধাই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতায় আসার ব্যাপারে কম আগ্রহ প্রকাশ করছে।

দীর্ঘদিন থেকেই আফগানিস্তান বিশ্বের বৃহত্তম আফিম উৎপাদক দেশ। হেরোইন তৈরিতে আফিম ব্যবহৃত হয়। তালিবান এ অঞ্চলের আফিম উৎপাদক ও পাচারকারীদের উপর কাছ থেকে কর আদায় ও তাদের নিরাপত্তা দেয়ার লাভজনক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে জঙ্গি গ্রুপটি এমন এক সময়ে লাভের পরিমাণ বাড়াতে মাদক ব্যবসায়ে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করেছে যখন তারা আফগান সরকার ও মার্কিন সমর্থকদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক সাফল্য অর্জন করছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্ট মতে, তালিবান মাদক ব্যবসার প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে পড়েছে। আফগান পুলিশ ও তাদের মার্কিন উপদেষ্টারা ক্রমেই বেশি সংখ্যায় হেরোইন পরিশোধন ল্যাব দেখতে পাচ্ছেন যেগুলো সহজেই অপসারণ করা যায়। আফগানিস্তানে ১৬ বছরের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শত শত কোটি ডলার ব্যয় করা সত্ত্বেও আফগানিস্তান কিছুকালের জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ পরিমাণ আফিম উৎপাদন করে। আফগান ও পাশ্চাত্য কর্মকর্তারা এখন বলছেন, আফিম সিরাপের আকারে আফগানিস্তানের বাইরে যাওয়ার আগে আফিমের কমপক্ষে অর্ধেকাংশ মরফিন বা হেরোইন আকারে দেশেই প্রক্রিয়াকৃত হয়। পাচারের জন্য আফিমের এ সব রূপ সহজ । তালিবানের কাছে তা অনেক বেশি মূল্যবান। জানা যায়, মাদক ব্যবসা থেকে তালিবানের আয়ের ৬০ শতাংশ আসে। মাদক পাচারের দিকে অধিক নজর দেয়ায় তালিবান এখন মাদক পাচার চক্রের স্থানে নিজেকে স্থাপিত করেছে।

ড্রাগস অ্যান্ড ল এনফোর্সমেন্ট বিষয়ক সাবেক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বছরের গোড়ার দিকে কাবুলে সাংবাদিকদের বলেন, তারা এ থেকে বেশি রাজস্ব পাবে যদি তা বিদেশে পাঠানোর আগেই প্রক্রিয়া করে। আমরা অল্প পরিমাণ মাদক নিয়ে কাজ করছি, কিন্তু প্রতি বছর শত শত কোটি ডলারের মাদক পাচার হচ্ছে যা থেকে তালিবান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব পাচ্ছে।

কালো স্যুপের ন্যায় এক কেজি অপরিশোধিত আফিমের জন্য একজন আফগান আফিম চাষী ১৬৩ ডলার পেয়ে থাকে। তা যখন পরিশোধিত হয়ে হেরোইন হয় তখন আঞ্চলিক বাজারে প্রতি কেজি ২ হাজার ৩শ’ থেকে ৩ হাজার ৫শ’ ডলারে বিক্রি হয়। ইউরোপে প্রতি কেজি হেরোইনের পাইকারি মূল্য প্রায় ৪৫ হাজার ডলার।

২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকে আফিম-পপি চাষ বেড়েছে। ২০১৬ সালে পপি চাষের এলাকা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তিন বছরের মধ্যে সে বছর বেশি জমিতে চাষ হয়। দি টাইমস জানায়, প্রাথমিক উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে ২০১৭ সাল আরেকটি উৎপাদন রেকর্ডের বছর যদিও সরকার দেশব্যাপী আফিম উৎপাদন হ্রাসের ব্যাপক চেষ্টা চালায়। আফিম প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ আটকের পরিমাণ বেড়েছে, অন্যদিকে আফিম থেকে উৎপাদিত মরফিন ও হেরোইনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি বলেছেন, মাদক না থাকলে অনেক আগেই আফগান যুদ্ধ শেষ হয়ে যেত। একজন জ্যেষ্ঠ আফগান কর্মকর্তা দি টাইমসকে বলেন, এখন হেলমন্দের একজন তালিবান কমান্ডার মাসে দশ লাখ ডলার আয় করে। শান্তির সময়ে সে কি তা পারত?

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, আফগানিস্তানে তাদের নতুন কৌশলের লক্ষ্য হচ্ছে তালিবানদের এটা বোঝানো যে যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভের কোনো উপায় নেই। তবে মাদক ব্যবসায় তাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা কাবুলের সাথে তাদের কিছু নেতাকে আলোচনায় অনুৎসাহী করেছে বলে মনে হচ্ছে।

জাতিসংঘ বলেছে, আফগানিস্তানের শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এ প্রবণতার আসল ভূমিকা রয়েছে। কারণ, মাদক থেকে পাওয়া অর্থ সরকারের সাথে সমঝোতার আলোচনায় বসতে তালিবানের কিছু নেতাকে নিরুৎসাহিত করছে।

তালিবান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য লাভের পর হেরোইন প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে উপস্থিত হয়েছে। ২০০১ সালের পর ২০১৬ সালে আফগানিস্তানের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ এলাকা দখল করে তালিবান। এ বছর সরকার আরো ৫ শতাংশ এলাকা হারিয়েছে। মার্কিন বিশেষ বাহিনী উপদেষ্টাদের সাথে কয়েকশ’ আফগান কমান্ডো মাদক প্রবাহ হ্রাসের জন্য কাজ করছে। কিন্তু মাদক চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত আফগান কর্মকর্তাদের জন্য অথবা নিরাপত্তা সমস্যার কারণে তাদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

আফগানিস্তানের উপ মাদক মন্ত্রী জাভিদ কায়েম বলেন, হেলমন্দে আমরা ২ থেকে ৩ হাজার হেক্টর জমির মাদক ধ্বংসের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছি। কিন্তু আমরা সেখানে কিছু করতে পারব না। কারণ হেলমন্দ একটি যুদ্ধ এলাকা।

হেলমন্দে আফগানিস্তানের ৮০ শতাংশ আফিম পপি উৎপন্ন হয়। এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেন, এটা এক বিরাট মাদক কারখানা। হেলমন্দ বলতে বোঝায় মাদক, পপি ও তালিবান।

মার্কিন ড্রাগ এনফোস্যমেন্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে আটককৃত হেরোইনের খুব সামান্য মাত্র অংশ দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে। অন্যদিকে ইউরোপের স্ট্রিটগুলোতে পাওয়া হেরোইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে আফগানিস্তান থেকে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, কানাডায় পাওয়া হেরোইনের ৯০ শতাংশ ও যুক্তরাজ্যের ৮৫ শতাংশ পরিমাণ হেরোইনের উৎস আফগানিস্তান। ২০১৭ সালের ইউরোপীয় মাদক রিপোর্ট মতে,ইউরোপে পাওয়া হেরোইনের অধিকাংশই আফগানিস্তান অথবা প্রতিবেশী ইরান ও পাকিস্তানে উৎপাদিত।

হেরোইন হচ্ছে ইউরোপের সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত মাদক। ইউরোপীয় মনিটরিং সেন্টার ফর ড্রাগস অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডিকশন-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ইউরোপে বছরে ৬শ’ কোটি থেকে ৭৮০ কোটি ইউরো মূল্যের খুচরা মাদক বিক্রি হয়।

সূত্রঃ বিজনেস ইনসাইডার

ইরানের কৃষিতে অবাক করা উন্নতি

agri field in iranসিরাজুল ইসলাম, তেহরান থেকে | ইরান বিশাল  দেশ। আয়তনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ১৩/১৪ গুণ বড়। তবে বিরাট অংশজুড়ে মরুভূমি। বাংলাদেশের মতো অতটা পলিযুক্ত উর্বর মাটি নেই এখানে। ইরানের দু’পাশে রয়েছে দুটো সাগর- দক্ষিণে পারস্য উপসাগর আর উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর। বেশির ভাগ জায়গায় পাহাড়। রাজধানী  তেহরান তো পুরোটাই পাহাড়ের ওপর। ধুলোমাটি পাওয়াই দুষ্কর। পাথুরে মাটি। ফলে বিশাল দেশ হলেও কৃষিকাজের জন্য ভূমির পরিমাণ সে তুলনায় অনেক কম। যা আছে তাও সব চাষের আওতায় নেই। যে জমি আছে তাতে কৃষিপণ্য উৎপাদন হয়  বেশ। এরমধ্যে আপেল, আঙ্গুর, খোরমা, পেস্তা, বেদানা, নাশপাতি, কমলা, তরমুজসহ নানা রকমের ফল উৎপাদিত হয় প্রচুর পরিমাণে। নিত্যপ্রয়োজনীয় শাক-সবজি সবই ইরান নিজে উৎপাদন করে। প্রধান খাদ্য হচ্ছে রুটি। সে কারণে প্রয়োজনীয় গম নিজেরা উৎপাদনের চেষ্টা করে আসছে। গত বিশ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি গম হয়েছে এবং এবার ইরান গম আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। আমদানি না করে বরং কয়েক লাখ টন গম রপ্তানি করা যাবে এবার।

ইরানের উত্তরাঞ্চলে কিছু ধান উৎপাদিত হয়। উত্তরাঞ্চলকে ফার্সিতে শোমাল বলে। এবার ইরানি সরকার ও কৃষকদের আপ্রাণ চেষ্টায় সেই শোমালে ধানের ফলনও বাম্পার হয়েছে। অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় এবার অনেক বেশি ধান হয়েছে। বাজারে ইরানি চালের দাম বেশ কমেছে। সবচেয়ে ভালোমানের যে চাল কিছুদিন আগেও বিক্রি হয়েছে বাংলাদেশি টাকার মানে প্রায় ৪০০ টাকায় সেই চালের দাম কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩১০ টাকায়। প্রতিবছর ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে চাল আমদানি করে ইরান। এবার বাম্পার ফলনের কারণে চাল আমদানিও কমে যাবে।

এ দেশের নিজস্ব খাদ্য ও কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে ডিম, দুধ, গোশত (গরু, ছাগল ও দুম্বার গোশত)। বাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় ব্রয়লার মুরগি, টার্কি ও কোয়েল পাখির গোশত। পাওয়া যায় উট পাখির গোশত; এমনকি উটের গোশতও। উটের  গোশতের দাম গরুর গোশতের মতোই। তবে গরু, ছাগল, দুম্বা ও উটের গোশতের দাম বাংলাদেশের  চেয়ে এখানে অনেক বেশি; অন্তত দ্বিগুণ। অবশ্য, তেহরানে ডিম ও দুধ বাংলাদেশের চেয়ে সস্তা। প্রচুর পরিমাণে পনির, মাখন, দই ও ঘোল (মাঠা) পাওয়া যায় ইরানে। এর সবই ইরানের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্য। এছাড়া, আরো নানা রকমের ফল, সবজি ও কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হয় চা এবং জাফরান। মাছ পাওয়া যায় মিঠা পানির ও লোনা পানির। মজার কথা হচ্ছে- পারস্য উপসাগরে কিছু ইলিশ মাছও পাওয়া যায়!

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী দেশের সংসদ সদস্য ও সরকারের মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেছিলেন- আমেরিকা ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে ইরানকে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। কারণ ওরা সব সময় অবরোধ/নিষেধাজ্ঞা দিয়েই রাখবে। এর মোকাবিলায় নিজেদের পণ্য থাকলে ওরা কিছুই করতে পারবে না। সর্বোপরি, পেটে না থাকলে কেউ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইবে না।

মহান ইমামের সেই কথা অনুসরণে ইরান এখন কৃষিতে বিশাল উন্নতি করেছে। যে পণ্য ইরানের মাটিতে উৎপাদন সম্ভব তার সবই হচ্ছে এখানে। এ কারণেই কাতারের ওপর অবরোধ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির পাশে খাদ্যের ভাণ্ডার নিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে ইরান। নিজের জনগণের চাহিদা পূরণ করেই এসব বাড়তি খাদ্যপণ্য কাতারে রপ্তানি করছে ইরান। প্রতিদিন সেখানে যাচ্ছে খাদ্যপণ্য কিন্তু ইরানের বাজারে ঘাটতি নেই। দেখেশুনে বলা যায়- সত্যিই কৃষিতে ইরানের উন্নতি অবাক করার মতো।

সূত্রঃ দৈনিক মানবজমিন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বিভাগ:কৃষি, খাদ্য

থাইল্যান্ডের সুস্বাদু ও জনপ্রিয় ফল রামবুটান

rambutan fruit 2

কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে লাল। দেখতে অনেকটা কদম ফুলের মতো। খোসা ছাড়ালে ভেতরের অংশটা লিচুর মতো। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। থাইল্যান্ডের সুস্বাদু ও জনপ্রিয় এ ফলের নাম রামবুটান।

বিদেশি এ ফল চাষে সফলতা পেয়েছেন নরসিংদীর শিবপুরের কৃষক জামাল উদ্দিন। তাঁর এ সফলতা আশা জাগিয়েছে এলাকার অন্য কৃষকদের মনে। অধিক লাভজনক আর নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর দৃষ্টিনন্দন এ ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে স্থানীয় কৃষকরা। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিকনির্দেশনা পেলে আগামী দিনে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুনত্ব যোগ করতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় এ ফল রামবুটান।

কৃষি বিভাগ বলছে, নরসিংদীর উঁচু বা টিলা এলাকার মাটি রামবুটান চাষের জন্য উপযোগী। এখানে রামবুটান চাষে নতুন দুয়ার খোলার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কামারটেক বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে কৃষক জামাল উদ্দিনের বাড়ি অষ্টাআনী গ্রামের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। জামাল উদ্দিন একজন আদর্শ কৃষক। তিনি লটকন, মাল্টা, কলম্বো লেবু, থাইল্যান্ডের পেয়ারা, কাঁঠাল, আমসহ বিভিন্ন প্রকারের ফলের পাশাপাশি সবজি, মাছ ও ধান চাষ করেন। এর সঙ্গে যোগ করেছেন রামবুটান। তাঁর আধা পাকা বাড়ির সামনে বিভিন্ন ফল ও ফুলের বাগান। তিনি শোনান বিদেশি ফল রামবুটান চাষের গল্প।

কাজের সন্ধানে প্রথমে মালয়েশিয়া ও পরে ব্রুনাই যান জামাল উদ্দিন। ২০০৬ সালে দেশে ফেরার সময় অন্য জিনিসের সঙ্গে এক কেজি রামবুটান ফল নিয়ে আসেন। সে ফলের বীজগুলো তিনি দেশীয় পদ্ধতিতে রোপণ করেন। পরে এ থেকে চারাও জন্মায়। প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে তাঁর লটকন বাগানের ভেতরেই ১৭টি রামবুটানের চারা রোপণ করেন। এর মধ্যে ১০টি চারা মারা যায়। বাকি সাতটি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে।

২০১২ সালে প্রথমবারের মতো এর মধ্য থেকে একটি গাছে ফুল আসে। আনন্দে মন ভরে যায় তাঁর। সেই গাছে অল্প পরিমাণে ফল ধরে। কিন্তু পরের বছরই ওই গাছটি থেকে প্রায় ১০ হাজার টাকার রামবুটান বিক্রি করেন। তৃতীয় বছর ফলন ধরে তিনটি গাছে। আর এ থেকে তিনি বিক্রি করেন প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল। পরের বছর বিক্রি হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকার রামবুটান। আর চলতি বছর পাঁচটি গাছ থেকে লক্ষাধিক টাকার ফল বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি।

জামাল উদ্দিন বলেন, প্রথম প্রথম স্থানীয় বাজারে এ অপরিচিত ফলের কদর ছিল না। ধীরে ধীরে এর পরিচিতি বাড়ায় ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে ফলটির। ঢাকা থেকে পাইকাররাও রামবুটান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বিদেশি ফলটি স্থানীয় বাজারে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা কেজি এবং প্রতি পিস ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের নরসিংদীর শিবপুর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম আরিফুল হক জানান, রামবুটান ফলটি লিচু পরিবারের। আদি নিবাস মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। ফলটির ওপরে হালকা চুলের মতো রয়েছে। যা দেখতে অনেকটা কদম ফুলের মতো। মালয় ভাষায় ‘রামবুট’ শব্দের অর্থ চুল। তাই অনেকে একে হেয়ারি লিচু, কেউ কেউ ফলের রানিও বলেন। ফলটির ভেতরে লিচুর মতো শাঁস থাকে। খেতে সুস্বাদু ও মুখরোচক। রয়েছে ওষধি গুণ।

রামবুটান ফলের শত্রু বাদুড়, ইঁদুর ও পাখি। এ জন্য গাছে জাল দিয়ে পেঁচিয়ে দিতে হয়। আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত গাছে ফল থাকে। গাছভেদে ৫০ থেকে ১০০ কেজি ফল পাওয়া যায়।

জামাল উদ্দিনের এ অভিনব প্রচেষ্টা এলাকার মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছে উৎসাহ। অনেকে এ ফলের গাছ দেখতে জামালের বাড়িতে আসে। এলাকার অনেক চাষি এ ফল চাষে আগ্রহী। স্থানীয় নার্সারিগুলোয় পাওয়া যাচ্ছে রামবুটানের চারা।

জামাল উদ্দিনের প্রতিবেশী মজনু মিয়া বলেন, ‘রামবুটান চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন জামাল উদ্দিন। তাঁর সফলতা দেখে আমারও রামবুটানের বাগান করার ইচ্ছা জেগেছে। এরই মধ্যে বেশকিছু সংখ্যক চারা লাগিয়েছি। এ বছর একটি গাছে ফল এসেছে। সেই গাছ থেকে ১০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছি। ’

আরেক কৃষক আবু সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘খরচের তুলনায় রামবুটান চাষ লাভজনক হবে বলে আশা করছি। ’

শিবপুরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তেজেন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, ‘জামাল উদ্দিনের সফলতা দেখে এলাকার কৃষকরা রামবুটান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাচ্ছি এটা যাতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং সবাই যেন জামাল উদ্দিনের মতো সফলতা অর্জন করতে পারে। ’

নরসিংদীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক লতাফত হোসেন বলেন, ‘এখানকার উঁচু বা টিলা জমিতে রামবুটান চাষ বেশ সম্ভাবনাময়। এখানে রামবুটান চাষে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। আশা করি, শিগগিরই লটকনের পর নরসিংদীর রামবুটান রাঙাবে দেশবাসীকে। ’

কৃষিতে নীরব বিপ্লব ঘটেছে বাংলাদেশে !

চাল, মাছ ও ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়

paddy-harvesting-sunamganjতানভীর আহমেদ : স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যত অর্জন আছে, তার মধ্যে কৃষিতে অর্জন উল্লেখ করার মতো। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সঙ্গে দিন দিন কমছে আবাদযোগ্য জমি। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা উৎপাদনে বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। আর তা সম্ভব হয়েছে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নীতি ও বিনিয়োগের কারণে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের সুপ্রসারিত কৃষিনীতিতে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাণিজ্যিক কৃষি উন্নয়ন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং উন্নয়নসহ কৃষির আধুনিকীকরণ, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও স¤প্রসারণে গবেষণা সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া। অপরদিকে কৃষি জমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয় আর চাল ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম।

বর্তমান সরকারের পরপর দুই মেয়াদে চার দফায় সারের দাম কমানো হয়। ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, সেচের পানির ভর্তুকির টাকা সরাসরি কৃষকের একাউন্টে ট্রান্সফার করা হয় এবং সেই সঙ্গে ১ কোটি ৮২ লাখ কৃষকের মাঝে উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। যুগান্তকারী এসব পদক্ষেপের ফলে কৃষিতে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন তিন গুনেরও বেশি, গম দ্বিগুন, সবজি পাঁচ গুন এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুন। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। সরকারের যুগোপোযোগী পরিকল্পনা, পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষি বিজ্ঞানী ও স¤প্রসারণবিদদের যৌথ প্রয়াসেই এ সাফল্য।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. সেকেন্দার আলী ভোরের কাগজকে বলেন, কৃষক, কৃষিবিদ, কৃষি মন্ত্রণালয় ও সরকারের বাস্তব পদক্ষেপের ফলে দেশের কৃষি ক্ষেত্রে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছে। নতুন নতুন জাতের কৃষিবীজ উৎপাদনের ফলে পরনির্ভরশীলতা কমেছে আমাদের। আধুনিক পদ্ধতি ও যন্ত্রাংশ ব্যবহারও দেশের কৃষি বিপ্লবের অন্যতম কারণ। কৃষিক্ষেত্রে বর্তমানের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লব বিশ্বের মডেল হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোশারক হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ জন্য কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় বর্তমান সরকার। এরই অংশ হিসেবে সরকার কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নেয় এবং তা স্বল্পসময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করে। এছাড়া উন্নতমানের বীজ ব্যবহার করে কীভাবে বেশি উৎপাদন করা যায় সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।

চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে বাংলাদেশ : আমন, আউশ ও বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলনে বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। কৃষির এ সাফল্য সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বে গড় উৎপাদনশীলতা প্রায় তিন টন। আর বাংলাদেশে তা ৪ দশমিক ১৫ টন। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কায় চাল রপ্তানি শুরু করে সরকার। দুই দফায় প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রপ্তানি করা হয়। এছাড়া গত বছর ভয়াবহ ভূমিকম্পকবলিত নেপালে ১০ হাজার টন চাল সাহায্য হিসেবে পাঠানো হয়। এটা দেশের চাল উৎপাদনের সামর্থ্যরেই বহিঃপ্রকাশ।

সবজি উৎপাদনে তৃতীয় : দেশে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটে গেছে গত এক যুগে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। এক সময় দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের যশোরেই কেবল সবজির চাষ হতো। এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই সবজির চাষ হচ্ছে। এখন দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, এ কৃষক পরিবারগুলোর প্রায় সবাই কমবেশি সবজি চাষ করেন।

জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়ারবুকতথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হারে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে বাংলাদেশে, বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। পাশাপাশি একই সময়ে সবজির মোট উৎপাদন বৃদ্ধির বার্ষিক হারের দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে ২০ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক সবজি খাওয়া বা ভোগের পরিমাণ ছিল ৪২ গ্রাম।

মাছ ও ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ বাংলাদেশ : মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ। এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। জাটকা সংরক্ষণসহ নানা উদ্যোগের ফলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ৫২ হাজার টন বেড়ে সাড়ে তিন লাখ টন হয়েছে। মাছের দাম সাধারণ ক্রেতার সামর্থ্যরে মধ্যে থাকায় গত ১০ বছরে দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ শতভাগ বেড়েছে। অপরদিকে ছাগল উৎপাদনেও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে পঞ্চম। বাংলাদেশের ব্লুাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিশ্বের সেরা জাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

ফল উৎপাদন : বিভিন্ন ধরনের ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০০৬০৭ অর্থবছরে দেশে আমের উৎপাদন ছিল ৭ লাখ ৮১ হাজার টন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে ৫০ প্রজাতির ফল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্যই কেবল নয়, আলু এখন দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসলও। এফএওর স¤প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৮২ লাখ ১০ হাজার টন আলু উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে অষ্টম স্থানে। কিছুদিন আগেও যেখানে বিশ্বের ২০টি দেশ থেকে বাংলাদেশকে আলু আমদানি করতে হতো। গত বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের আলু রপ্তানি হয়েছে।

ফসলের জাত উদ্ভাবন : ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা মোট ১৩টি প্রতিক‚ল পরিবেশে সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম জেনেটিকেলি মোডিফাইড ফসল বিটি বেগুনের চারটি জাত অবমুক্ত করে। যার মধ্যে বেগুনের প্রধান শত্রু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী জিন প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মাধ্যমে আলুর নাবি ধসা রোগের প্রতিরোধী জিন প্রতিস্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।

তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ইকৃষি : গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ইকৃষি খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার জানালা। কৃষি তথ্য সার্ভিস দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে ২৪৫টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র (এআইসিসি) স্থাপন করেছে। এছাড়া ২৫৪টি উপজেলার ২৫৪টি আইপিএম/ আইসিএম কৃষক ক্লাবকে এআইসিসিতে রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষি তথ্যকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনলাইনে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে মুঠোফোনের জোয়ারে ভাসছে এদেশ। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ১৬১২৩ নম্বরে যে কোনো মোবাইল থেকে ফোন করে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য বিষয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট অফলাইন/অনলাইনে সার সুপারিশ নির্দেশিকা প্রদান করছে। আখ চাষিরা মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে ইপুঁজিসেবা গ্রহণ করছেন। এমনকি ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেশবিদেশের কৃষি তথ্যসেবা পাওয়া যাচ্ছে।

পুষ্টিতে বাঙালি : এক সময় বলা হতো ‘দুধে ভাতে বাঙালি’ কিংবা বলা হতো ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। বর্তমান সরকার তার সুপ্রসারিত কৃষি নীতিতে শুধু দুধে ভাতে বা মাছে ভাতে সীমিত নয়, পুষ্টিতে বাঙালি হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত হতে চায়। সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ অনুয়ায়ী ২০১৩ সালের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও বর্তমান জনগণবান্ধব সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

এফএও স্বীকৃতি : দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বিশ্বের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে। এফএওর জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষির অভিযোজনবিষয়ক প্রতিবেদন বলেছে, আগামী দিনগুলোয় বিশ্বের যে দেশগুলোতে খাদ্য উৎপাদন বাড়তে পারে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও এরই মধ্যে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে।

একটি বাড়ি একটি খামার : অর্থনৈতিক উন্নয়নে পল্লী অঞ্চলে নতুন ধারা চালু করার লক্ষ্যে এক হাজার একশ ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প শুরু করে সরকার। প্রকল্পটি চালু থাকবে আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত। সমন্বিত গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কার্যাবলীর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলাই হচ্ছে এই প্রকল্পের লক্ষ্য। দেশের ৬৪ জেলার চারশ ৯০ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

সূত্রঃ দৈনিক ভোরের কাগজ, ৫ ডিসেম্বর ২০১৬

মাকাল ফলেরও কিন্তু গুণ আছে!

makal-fruitমাকাল ফল। এই নামটির সঙ্গে হয়তো কমবেশি সবার পরিচয় আছে। কিন্তু মাকাল ফল দেখেনি এমন মানুষেরও সংখ্যাও একেবারে কম হবে না। বাংলা বাগধারায় মাকাল ফল একটি বিশেষ উপমা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। বাইরে সুন্দর, ভিতরে কিছুই নেই। যে মানুষগুলো দেখতে সুন্দর কিন্তু তাদেরকে দিয়ে কোনো কাজের কাজ হয় না, তাদেরকেই মাকাল ফলের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। তবে বিশেষ উপমা হিসেবে ব্যবহার হলেও এই ফলটি কিন্তু একেবারে অপ্রয়োজনীয় নয়। মাকাল ফল ও গাছের রয়েছে ঔষধি গুণ। তাছাড়া পাখিদের অন্যতম প্রিয় খাবার মাকাল ফল। পাকা মাকাল ফলের সৌন্দর্য যে কাউকে বিমোহিত করে।

মাকাল ফলের ইংরেজিতে নাম Colocynth, Cucumber-এর দ্বিপদী নাম। এর বৈজ্ঞানিক নাম Citrullus colocynthis। পৃথিবীতে এই পরিবারের ৪২টি প্রজাতি পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে রয়েছে ১২টি প্রজাতি। এ গাছের জন্মস্থান তুর্কি। তুর্কি থেকে এশিয়া মহাদেশ ও আফ্রিকা মহাদেশে এ গাছটির বিস্তার ঘটে। এটি একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। মাকাল ফলের গাছ লতানো আকৃতির হয়। জঙ্গল বা বাড়ির বড় বড় গাছকে অাঁকরে ধরে মাকাল গাছ বেড়ে ওঠে। একটি পরিপূর্ণ গাছ ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। চৈত্রবৈশাখ মাসে মাকাল গাছে সাদা ধবধবে ফুল ধরে। শ্রাবণভাদ্র মাসে ফল সম্পূর্ণ পরিপক্ব হয়। মাকাল ফল দেখতে গোলাকৃতির। কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ, কিছুদিন পর হলুদ ও ফলটি পাকার পড়ে লাল রং ধারণ করে। এক সময় গ্রাম বাংলার রাস্তার পাশে ঝোপঝাড়ে অনেক মাকাল গাছ দেখা যেত। কিন্তু এখন নগরায়ণের ফলে শিল্পকারখানার প্রসার ঘটায় গ্রামের রাস্তার পাশে ঝোপঝাড় কমে গেছে যে কারণে এই ফলটি আজ বিলুপ্ত হওয়ার পথে।

মাকাল ফল পাখিদের অন্যতম প্রিয় খাবার। তাছাড়া এটি একটি পরিবেশবান্ধব গাছ। এই ফল ও গাছের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ।

মাকাল গাছের শিকড় কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমের ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে।

কফ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে, নাক ও কানের ক্ষত উপশমে মাকাল গাছ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

জন্ডিস, দেহে পানি জমা (শোথ রোগে), স্তনের প্রদাহ, প্রস্রাবের সমস্যা, বাত ব্যথা, পেট ফুলা এবং শিশুদের অ্যাজমা নিরাময়ে মাকাল গাছের ফলমূলকাণ্ড বিশেষ ভূমিকা আছে।

মাকাল ফলের বীজের তেল সাপের কামড়, বিছার কামড়, পেটের সমস্যা (আমাশয়, ডায়রিয়া), মৃগীরোগ এবং সাবান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যায়।

মাকাল ফলের বীজের তেল চুলের বৃদ্ধি ও চুল কালো করতে কার্যকর।

মাকাল ফলের বিচি ও অাঁশ শুকিয়ে গুঁড়ো করে পানিতে দ্রবীভূত করে ফসলে প্রয়োগ করলে পোকামাকড়, ইঁদুর ও রোগবালাই দমনে বিষ হিসেবে কাজ করে থাকে।

কমলায় রঙিন নানিয়ারচর

orange farming.jpgহিমেল চাকমা : কমলা বাগান করে এখন লাখপতি রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক্ষং এলাকার নম কার্বারীপাড়া গ্রামের মধুসূদন তালুকদার। এখন তার বাগানের গাছে ঝুলছে বড় বড় রঙিন কমলা। দুর্গম পাহাড়ে কমলার এ ফলনে অবাক কৃষি বিভাগও। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে এমন কমলা রাঙ্গামাটি জেলায় দেখা যায়নি।

বৃহস্পতিবার নম কার্বারীপাড়ায় মধুসূদনের কমলা বাগানে গিয়ে দেখা যায় গাছের ডালে ডালে ঝুলছে রঙিন কমলা। কমলা বাগানের যেদিকে চোখ যায় সেদিকে রঙিন কমলা। কমলার ভারে নূয়ে পড়েছে ডালপালা। ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করতে বাঁশের খুঁটি দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে কমলার ডালপালাগুলো। এক একটি কমলার ওজন ২শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ গ্রাম। স্বাদেও মিষ্টি।
মধুসূদন তালুকদার বলেন, এ বছর তিনি ঘরে বসে ৬ লাখ টাকার কমলা বিক্রি করেছেন। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিক্রি করেছেন ১৪ লাখ টাকার কমলা। ব্যবসায়ীরা বাগান থেকে কমলা পেড়ে নিয়ে যায়।

মধুসূদন বলেন, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা আর বাজারে দাম না থাকায় বাগানে নষ্ট হয়ে যেত আম, কাঁঠাল ও কলা। কিন্তু বাজারে একটি কমলার দাম ১৫২০ টাকা। পরিবহনও সহজ। এটি মাথায় রেখে ২০০৭ সালে ২ একর পাহাড়ে ৭শ’ কমলার চারা লাগাই। ২০১৩ সালে কিছু গাছে কমলা ধরে। ২০১৪ সাল থেকে বাগানের অর্ধেক গাছে ফলন আসতে শুরু করেছে। কমলা বিক্রির জন্য তার আর চিন্তা করতে হয় না। সময় আসলে ব্যবসায়ীরা চলে আসেন। অগ্রিম টাকা দিয়ে তারাই বাগানটি দেখাশোনা করে দিচ্ছেন।

কমলায় রঙিন নানিয়ারচরমধুসূদন বলেন, সেপ্টেম্বরঅক্টোবরের দিকে রাতের বেলায় এক ধরনের পোকা কমলার ক্ষতি করে। ফলে কমলাগুলো ঝরে পড়ে। কোনো কীটনাশকে এগুলো মরে না। তাই এই পোকা দমনে তিনি রাত জেগে পাহারা দিতেন এবং পোকাগুলো মেরে ফেলতেন। এ পোকার আক্রমণ না হলে আরো কিছু টাকা পেতেন।

কমলা ব্যবসায়ী জ্যোতিরঞ্জন চাকমা বলেন, এখন গাছ থেকে কমলা ঝরে পড়ার সম্ভবনা নেই। তাই পরিপক্ব কমলা ছিড়ে তারা বাজারে তুলছেন। মধুসূদনের বাগানের কমলা বর্তমানে রাঙ্গামাটি শহরে পিস প্রতি বিক্রি করছেন ২৫৩০ টাকা। আকারে বড় ও স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় মানুষ সহজে এ কমলা কিনে নিচ্ছেন।

এদিকে মধুসূদনের সফলতা দেখে অন্যরা ঝুঁকছেন কমলা বাগানের প্রতি। নম কার্বারীপাড়ার উজ্জ্বল চাকমা (৪৪) ও শান্তি রঞ্জন চাকমা (৪৫) বলেন, মধুসূদনকে দেখে এলাকায় এখন কমলা বাগান করছেন।

রাঙ্গামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক রমনী কান্তি চাকমা বলেন, জেলায় কমলা বাগানের এলাকা ৭৬০ হেক্টর। এর মধ্যে কমলা উৎপাদনে বর্তমানে রাঙ্গামাটির শীর্ষস্থান দখল করেছে নানিয়াচরের সাবেক্ষং। স্বাদে মিষ্টি আকারে বড় হওয়ায় কমলার বাজার দখল করেছে নানিয়াচরের কমলা। নানিয়াচরের মাটি কমলা চাষের জন্য উপযোগী বলছে কৃষি অফিস। এক সময় সাজেকের কমলা বিখ্যাত হলেও এখন নানিয়াচরের কমলা সেই স্থান দখল করে নিয়েছে।

পোকা দমন ও সার প্রয়োগ বিষয়ে কমলা বাগানিরা কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আরো লাভবান হবেন। কৃষি বিভাগ বাগানিদের পরামর্শ দিতে সব সময় প্রস্তুত আছে।

সূত্রঃ দৈনিক মানবকন্ঠ, ২৮ নভেম্বর ২০১৬