আর্কাইভ

Archive for the ‘কবিতা’ Category

বৃষ্টি নিয়ে ছোটমণিদের ছড়া কাটা…

অগাষ্ট 11, 2017 মন্তব্য দিন

rhyme - rain 2

রাসুল প্রেমিক কবি গোলাম মোস্তফা

ডিসেম্বর 10, 2016 মন্তব্য দিন

golam-mustafa. এম এ সবুর : বাংলা ভাষায় ইসলামি ভাবধারার সাহিত্য রচনায় গোলাম মোস্তফার ভূমিকা অনন্য। মহানবি হযরত মুহম্মদ সা. এর সিরাত রচনায় তার কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। সাহিত্যের সব শাখায় তার অবাধ বিচরণ থাকলেও কবি হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। আর তার কবিতাগানের বেশির ভাগই রাসুলপ্রেমে উজ্জীবিত। তার রচিত বিশ্বনবী গদ্য গ্রন্থখানি যেমন বাঙালি পাঠক সমাজে ব্যাপক সমাদৃত তেমনি তার রচিত ইয়া নবী সালাম আলাইকা কবিতাখানি মুসলিম ঘরে ঘরে মিলাদ মাহফিলে বহুল পঠিত। তাছাড়া রাসুল সা. এর প্রশংসায় তার রচিত নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি আমার মোহাম্মদ রাসুল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রাসুল ইত্যাদি গানকবিতা মুসলিম সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়। রাসুল সা. এর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে তার সাহিত্য জীবনের শুরুর দিকেই তিনি হযরত মোহাম্মদ কবিতা রচনা করেন। এ কবিতায় তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবের অন্ধকার অবস্থার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে রাসুল সা.কে সেই অন্ধকার বিদারক আখ্যা দিয়ে বলেন,

এই ঘোর দুর্দিনে এলো কে গো বিশ্বে,
উজলিয়া দশদিশি, তরাইতে নিঃস্বে!
মুখে তার প্রেমবাণী, করুণা ও সাম্য,
বিশ্বের মুক্তি ও কল্যাণ কাম্য।

প্রায় একই ধ্বণী উচ্চারিত হয়েছে তার ফাতেহাদোআজদহম কবিতায়। এতে তিনি হযরত মুহম্মদ সা. এর জন্মদিনের বর্ণনা দিয়ে এবং তাঁকে স্বাগত জানিয়ে লিখেন,

আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম।
দিকে দিকে উঠিতেছে নব ছন্দে বন্দনার গান
স্বাগতম! স্বাগতম! ধরণীর হে চিরকল্যাণ!

হরযত মুহম্মদ সা. শুধু মুসলিম কিংবা আরবদের জন্য নয় বরং বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তাই তাঁর জন্মোৎসব শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত নয় বরং বিশ্ববাসীর জাতীয় উৎসব। এ জন্য গোলাম মোস্তফা রাসুলের জন্মোৎসবে বিশ্বের সব মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন,

হে নিখিল ধরাবাসী! মুসলিমের লহ নিমন্ত্রণ,
এ উৎসব নহে শুধু আমাদের একান্ত কখন!
নাসারাখৃষ্টান এসো, এসো বৌদ্ধ চীন,
মহামানবের এ যে পরিপূর্ণ উৎসবের দিন।

রাসুলপ্রেমিক কবির কল্পনায় হযরতের জন্মদিনে বিশ্ব প্রকৃতিতে এক মহোৎসবের আয়োজন হয়েছিল। ঐতিহাসিকদালিলিক ভিত্তি না থাকলেও রাসুলভক্ত কবি মনে করেন তাঁর জন্মদিনে সারা বিশ্ব বেহেস্তের সুগন্ধিতে মোহিত হয়েছিল, সেদিন আকাশেবাতাসেও মহাআনন্দের জয়গান ধ্বনিত হয়েছিল; ফিরেস্তাগণও চঞ্চল চিত্তে সে আনন্দে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। কবির ভাষায় রাসুলের জন্মদিনের দৃশ্য এ রকম,

আকাশ দিয়েছে তার রক্ত রাঙা অরুণকিরণ,
বেহেশ্তের সুধাগন্ধ আনিয়াছে মৃদু সমীরণ;
ছুটাছুটি করিতেছে দিকে দিকে ফেরেশ্তার দল,
সারা চিত্ত তাহাদের আজিগো যে পুলক চঞ্চল!
এসেছে হাজেরা বিবি, আসিয়াছে বিবি মরিয়ম,
আমিনার গৃহে আজি বেহেশতের শোভা অনুপম!

মক্কার কুরাইশ বংশে হযরত মুহম্মদ সা.-এর জন্ম কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয় বরং আলকুরানের বর্ণনা মতে মহানবি সা. এর পূর্ব পুরুষ হযরত ইব্রাহীম ও তদীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আ.- এর প্রার্থনার ফল এবং হযরত ঈসা আ.-এর সুসংবাদ। আর গোলাম মোস্তফার ভাষায়,

আমিনা মায়ের কোলে খুদা রাখ্ল সে সওগাত
ইবরাহিমের দোয়া সে আর ঈসার সুসংবাদ

হযরত মুহম্মদ সা. চল্লিশ বছর বয়সে মক্কার অদূরে হেরা পর্বতে নবুওয়াত লাভ করেন। এ সময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত জিব্রাইল . মুহম্মদ সা.-এর নিকট প্রথম অহি নিয়ে আসেন। মহানবি সা.-এর নবুওয়াত লাভ ইসলামের ইতিহাসে তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এ নবুওয়াতের মাধ্যমে আধুনিক ইসলাম তথা মুহম্মদী শরিয়তের যাত্রা শুরু হয় এবং আইয়্যামে জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগের অবসানের সূত্রপাত ঘটে। নবুওয়াত লাভের ঐতিহাসিক এ ঘটনা কবি গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাসহালীতে বর্ণিত হয়েছে এভাবে

চক্রবালে উঠ্ল যেন ভাগ্যচাঁদিমা
দূর হ সব বিশ্ব হতে আঁধার কালিমা!
ছুট্ল না তা কিরণ বটে অল্প কিছুক্ষণ,
রেসালাতের চাঁদে ছিল মেঘের আবরণ;
কালের স্রোতে চল্লিশ সাল গুজরে গেল যেই
হেরাগিরির উর্ধে সে চাঁদ উদয় হল সেই!

নবুওয়াত লাভের মাধ্যমে হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদ প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়ে প্রথমে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকদের কাছে তাওহিদ তুলে ধরেন। কিন্তু কুরাইশ নেতা আবু জহল ও তার অনুসারীরা রাসুলের দাওয়াত কবুল করেনি বরং বিরোধীতা করেছে। এমনকি তাওহিদ প্রচার বন্ধ করার লক্ষ্যে হযরত মুহম্মদ সা. কে হত্যার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। আবু জহলের এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা গোলাম মোস্তফার লিখনীর মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে এভাবে

এ বিপুল সঙ্ঘমাঝে যে আজি দাঁড়াবে
ছিন্ন করি আনিবারে মোহাম্মদশির,
পঞ্চশত স্বর্ণমুদ্রা, শত উষ্ট্র সনে
সানন্দ হৃদয়ে তারে দিব উপহার।

হযরত মুহম্মদ সা. আল্লাহর মনোনীত নবী ও রাসুল। তাঁর রক্ষক আল্লাহ নিজে। মানুষের কোন ষড়যন্ত্র ও অনিষ্ট তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। যে কুরাইশরা হযরতকে নির্যাতননিপীড়ন করে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছিল এবং যারা রাসুল সা. কে হত্যা করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছিল; মাত্র আট বছর পর তারাই মক্কা বিজয়ের সময় মুহম্মদ সা.-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। যে উমার রা. মহানবিকে হত্যার জন্য মুক্ত তরবারী নিয়ে ছুটেছিল সে উমারই ইসলাম কবুল করে হযরতের একনিষ্ট সহচর, খলিফা হয়ে বিশ্বের বুকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। ঐতিহাসিক এসব ঘটনা কবি তুলে ধরেছেন এভাবে,

তারপর এলো আরবমরুতে খোদার রসূলনূরন্নবী,
কোরেশ আসিল কতল করিতে বিশ্বের সেই আলোকরবি
বলো কে মরিল? মোহাম্মদ? না আততায়ী সেই কোরেশ জাতি।
ঘাতক শেষে যে রক্ষক হয়ে ধারায় রাখিল অতুল খ্যাতি।

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন অসাধারণ গুণে গুণান্বিত একজন মহামানব। দুর্বলকে তিনি কখনও বঞ্চিত করেননি বরং সাহায্য করেছেন। পথ হারানো মানুষদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ধনীগরিব তার কাছে ছিল অভিন্ন। তাঁর কাছে মানুষের কোন ভেদাভেদ ছিল না; ছিল না সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও বৈষম্য। ক্ষমা, দয়াপ্রেম ছিল তাঁর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ জন্য আল্লাহ তাআলা হযরত মুহম্মদ সা. কে বলেছেন, নিশ্চয়ই আপনি উত্তম চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত (আল কুরআনুল কারীম, ৬৮:)। মহানবি হযরত মুহম্মদ সা.-এর উত্তম চরিত্রের গুণাবলীকে গোলাম মোস্তফা কবিতায় চিত্রিত করেছেন এভাবে

দূর্বলে করে না সে নিপীড়ন হস্তে
আর্তেরে তুলে দেয় শুভাশীষ মস্তে,
ভ্রান্তরে বলে দেয় মঙ্গল পন্থা
রক্ষক, বীর নহে ভক্ষক হন্তা।
ভিক্ষুকে টেনে নেয় আপনার বক্ষে,
ছোটবড় ভেদজ্ঞান নাহি তার চোক্ষে,
মানুষের অকাতরে করে না সে ক্ষুদ্র,
হোক্ না সে বেদুইন হোক্ না সে শুদ্র।

রাসুল সা. ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি ছিলেন প্রেমভালবাসা, ক্ষমান্যায়ের মূর্তপ্রতীক। তাঁর প্রতিশোধ স্পৃহা ছিল না কখনও। যারা তাঁকে অত্যাচারনির্যাতনে জর্জরিত করেছিল তাদেরকেই উদার চিত্তে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাঁর ক্ষমার দৃষ্টান্ত অসংখ্য। মক্কা বিজয়ের দিনে সাধারণ ক্ষমা তারই উজ্জলতম নিদর্শন। মক্কার কাফির কুরাইশরা নিজেদের অপকর্মের কারণে মক্কা বিজয়ের দিনে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। যে কোন শাস্তির জন্য তারা প্রস্তুতও ছিল। কিন্তু ক্ষমার অনুপম আর্দশ মহানবি হযরত মুহম্মদ সা. সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। কবি গোলাম মোস্তফা হযরতের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা উল্লেখ করে বলেন,
কহিলেন নবী হাসি তখন

ভেবেছো ঠিকই বন্ধুগণ!

কঠোর দন্ড হবে বিধান!

ধরো সে দকহিনু সাফ

সব অপরাধ আজিকে মাফ,

যাও সবে, দিনু মুক্তিদান।

হযরত মুহম্মদ সা. ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবিরাসুল। সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ; রাসুলপ্রেমে নিমজ্জিত ও প্রবল আবেগে আপ্লুত হয়েও সে কথা ভুলে যাননি কবি গোলাম মোস্তফা। তবে হযরত মুহম্মদ সা. মানুষ হলেও সাধারণ মানুষ নন, তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসুল; যা মহানবি সা. নিজেই বলেছেন। আর তা গোলাম মোস্তফার ভাষায়,

আমার চেয়ে তোমরা ত কেউ বান্দাতে নও কম,

তুমিআমি একবরাবর দুর্বল ও অক্ষম।

তোমায় আমায় প্রভেদ যেটুক নয়ক সে অদ্ভুত

আমি শুধু বান্দা নহিআমি খোদার দূত।

ইসলামের মূলমন্ত্র তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। কিন্তু খৃষ্টানরা হযরত ঈসা আ. কে এবং ইহুদীরা হযরত ওযায়ের আ. কে আল্লাহর পুত্র বলে তাওহিদ পরিপন্থী বিশ্বাস করে। তাই হযরত মুহম্মদ সা. নিজেই তাঁর অনুসারীদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তারা যেন তাঁকে ইহুদীখৃষ্টানদের মত আল্লাহর পুত্র বলে ধারণা না করে। রাসুল সা.-এর এই নিষেধাজ্ঞা গোলাম মোস্তফা অনূদিত কাব্যগ্রন্থ মুসাদ্দাসহালী তে উল্লেখ আছে এভাবে,

নাসারাদের মতন কেহই পড়ো না ধোঁকায়

খুদার বেটা বলে যেন পূজো না আমায়।

মহানবি সা. এর অনুপম আদর্শ ও নির্দেশনাবলী অনুসরণ করে মুসলিমরা এক সময় উন্নতি ও সম্মানের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। কিন্ত বিশ শতকের মুসলিম সমাজ ছিল নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত। বিভিন্ন দেশে তারা ছিল দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও বিভিন্ন কুসংস্কারে অধঃপতিত ছিল মুসলিম সমাজ। বিশ শতকের মুসলমানদের এসব অধঃপতনের জন্য রাসূলের আদর্শচ্যুত হওয়ার বিষয় সমকালীন দার্শনিক ও কবি ইকবাল রচিত শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ আছে। আর তা গোলাম মোস্তফা অনুবাদ করেন এভাবে,

কারা, বল, ত্যাগ করেছে আমার পাক রাসূলের পাক বিধান,

মুহম্মদের পয়গাম আর তোমাদের কারো নাই স্মরণ।

তবে হতাশনিরাশ হওয়ার কারণ নাই, মুসলমানগণ আবারও রাসুলের আদর্শ অনুসরণ করলে তাদের হৃত গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। তাই কবি অধঃপতিত মুসলিমদেরকে রাসুলের ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন,

তুচ্ছরে আজ করগো উচ্চপ্রেমে ও পূণ্যে কর মহৎ

মুহম্মদের নামের আলোকে উজ্জ্বল কর সারা জগৎ।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ৯ ডিসেম্বর ২০১৬

বগুড়ায় উদ্ধার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ইংরেজী কবিতা

ডিসেম্বর 8, 2016 মন্তব্য দিন

সমুদ্র হক ॥ অতি পুরনো নথির স্তূপে মিলতে পারে অমূল্য রতন। তাইই হয়েছে, যা চমক জাগায়। হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে। বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। স্বগতোক্তিতে প্রশ্ন ওঠেইতিহাসের অমূল্য একটি রত্ন এতকাল অযতনে লুকিয়ে ছিল, যা উদ্ধার হওয়ার পরও কিছুকাল যত্নের সঙ্গেই লালিত ছিল। প্রকাশ হয়নি। এ প্রতিবেদনে তা উন্মুক্ত হলো।

১৯৩৫ সাল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন শান্তি নিকেতনে বাস করতেন। জীবনের শেষের অধ্যায়ে তখন তিনি। জীবন সায়াহ্নে যে ঘরখানিতে তিনি থাকতেন তার নাম দিয়েছিলেন উত্তরায়ন কবিগুরুর রাইটিং প্যাডেও একটি মনোগ্রামের ডান ধারে লেখা ছিলউত্তরায়ন, শান্তি নিকেতন, বেঙ্গল। এই রাইটিং প্যাডে তিনি ফাউন্টেন পেনে (ঝরনা কলম) একটি ইংরেজী কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন ভারতবর্ষের ইলাসট্রেটেড ইন্ডিয়া পত্রিকায়। কবিতার কোন শিরোনাম ছিল না। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ১৯৩৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় কবিগুরুর রাইটিং প্যাডে নিজের হাতের লেখা সেই শিরোনামহীন কবিতা হুবহু ছাপিয়ে দেয়। পত্রিকা শিরোনাম দেয় পোয়েম বাই রবীন্দ্রনাথ স্পেশালি সেন্ট ফর আওয়ার উইকলি (রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা যা বিশেষভাবে আমাদের পত্রিকায় ছাপানোর জন্য তিনি পাঠিয়েছেন)

tagore-poem-bograইংরেজিতে কবিতাটি এ রকম

Yes it is my own wish that my seeking

may never come to its end

I desire not final fruits,

for they become a burden when gained.

They arrive in their own time,

they drop to the dust,

then comes the chance for my flowers

to blossom anew,

Let me not fear the struggle of endeavour

and be sure of the giving that is endless

and the delight of receiving

in constant recurrence.

-Rabindranath Tagore

এ কবিতাটির অর্থ (ভাব) করলে দাঁড়ায়

ইচ্ছা মোর যেন নাহি যায় থেমে

এই মোর আশা

চূড়ান্ত ফল চাই না আমি, সে তো বড় বোঝা

সময়েতে ফল ফলে যায়

তারপর ঝরে পড়ে যায় ধুলায় মিশে

ইহার পরে নতুন ফুলের সূযোগ আসে, নতুন করে ফোটার

চেষ্টা কিংবা লড়াই, এদের করি না ভয়

ত্যাগ আমার নিরন্তর, এই বিশ্বাসে স্থির আমি

প্রাপ্তির আনন্দও ধ্রুব অবিরাম জানি

কবিগুরুর নিজের হাতের লেখা এ কবিতা ইলাসট্রেটেড ইন্ডিয়া পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর বগুড়ার নওয়াব পরিবারের কোন এক সদস্য সেই পত্রিকাটি কিনে রাখেন, যা থাকে নওয়াব বাড়ির অনেক বই পুস্তক ও পত্রিকা সংগ্রহশালায়, যা স্তূপ হয়ে আছে। এক সময় দেশের প্রতিটি এলাকায় বনেদি পরিবারের বাড়িতে সংগ্রহশালা ছিল, যা ছিল একেকটি মিনি লাইব্রেরি। যেখানে মিলত অনেক মূল্যবান বইপুস্তক, কাগজের পাতা। বছর কয়েক আগে বগুড়ার গবেষক আব্দুর রহিম বগ্রা নওয়াব বাড়িতে পুরনো দিনের সংগ্রহশালায় প্রবেশাধিকার পান। এ সংগ্রহশালার দায়িত্বে ছিলেন সাইফুদ্দিন আহমদ। তিনি নওয়াব পরিবারের আলতাফ আলী চৌধুরী ও তদানীন্তন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়ার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরাখবর সংগ্রহ করা পত্রিকা যত্নে রাখতেন। আব্দুর রহিম বগ্রা সেই পত্রিকাগুলো ঘাটতে গিয়ে পেয়ে যান এক অমূল্য রতন। রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা কবিতা হুবহু ছাপা হয়েছে ইলাসট্রেটেড ইন্ডিয়া পত্রিকার ভেতরের পাতায়। আব্দুর রহিম বগ্রা পত্রিকার ওই পাতা যত্ন সহকারে সংগ্রহের শর্তে সাইফুদ্দিন আহমদের কাছে চান। তা নিয়ে তখনই লেমিনেটেড করে ফটো ফ্রেমের মধ্যে এঁটে ঘরে রেখে দেন।

দিনে দিনে তার সংগ্রহশালার অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। দিন কয়েক আগে তিনি এটি খুঁজে পান। কাকতালীয়ভাবে কথা প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদককে তিনি এ পাতাটির কথা বলেন। তখন কি আর বসে থাকা যায়।

বছর কয়েক আগে নওগাঁর পতিসরে কবিগুরুর ছেলে রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশনের এক ঘরে অনেক কাগজের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের লেখা আশীর্বাণী খুঁজে পাওয়া যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ৭৬ বছর বয়সে সর্বশেষ নওগাঁর পতিসরে আসেন ১৯৩৬ সালে। এ সময় তিনি ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র শিক্ষকদের উদ্দেশে আশীর্বাদ বাণী দেন। রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রাহক ও সাংস্কৃতিক কর্মী এম মতিউর রহমান মানুন এই বাণী খুঁজে পান, যা সংরক্ষিত আছে। সূত্র জানায়, রবীন্দ্র স্মৃতি উদ্ধারে দেশে ৩১ পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বাইরে আরও অনেক স্থানে রবীন্দ্রনাথের কোন স্মৃতি থাকতেও পারে। রবীন্দ্রনাথের ইংরেজীতে লেখা অনেক কবিতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ১৯১২ সালে কবিগুরু যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় রাজ্যে পদধূলি দেন। ইলিনয় রাজ্যের শিকাগো শহর থেকে প্রকাশিত এজরা পাউন্ডের পোয়েট্রি পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির ছয়টি কবিতা। ১৯৫৩ সালে বিশ্বের মানুষের কাছে রোমান্টিসিজমের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র গ্রেগরি পেক অড্রে হেপবার্ন অভিনীত রোমান হলিডে ছবিতে রবীন্দ্রনাথের অনন্ত প্রেম কবিতার প্রথম দুই পঙ্ক্তি ইংরেজীতে আবৃত্তি করেন গ্রেগরি পেক। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, তোমারেই যেন ভালো বাসিয়াছি শতরূপে, শতবার জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার যার ইংরেজী হয়েছে আই সিম টু হ্যাভ লাভড ইউ ইন নাম্বারলেস ফরমস, নাম্বারলেস টাইমস, ইন লাইফ, আফটার লাইফ, ইন এজ আফটার এজ ফরএভার।

কবিগুরু বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বকালের। মহাকালের পথ ধরেই যেন তার আবির্ভাব

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬

উনিশ শতকের মুসলিম কবি দাদ আলী মিঞা

ডিসেম্বর 5, 2016 মন্তব্য দিন

kobi-dad-ali-miah-koborঊনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি হিসাবে দাদ আলী বিশেষ স্থান অধিকার করেছিলেন। ব্যক্তিগত অনুরাগ ও অনুভূতিকে কবি দাদ আলী অপূর্ব ছন্দে প্রকাশ করে খ্যাতি অর্জন করেন। কবি দাদ আলী মিঞা ১৮৫২ সালে ২৬ জৈষ্ঠ ১২৫৯ বঙ্গাব্দে বর্তমান কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের আটিগ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মৃত নাদ আলী মিঞা। ছোটবেলায় কবির পিতা প্রচেষ্টায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষকের কাছে আরবী, ফারসী, উর্দু ও বাংলা শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি লোক কাহিনী, ধর্ম কাহিনী, ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা, এমনকি চিকিৎসা ও ফারায়েজ বিষয়েও কাব্য রচনা করেন।

যতদূর জানা যায়, কবি দাদ আলীর পিতা নাদ আলীও ছিলেন সাহিত্য অনুরাগী, লেখালেখিও করতেন। পিতার সাহিত্য বিষয় নিয়ে লেখালেখি এবং ২টি কষ্টের ঘটনা দাদ আলীকে কাব্য লেখার প্রতি অনুপ্রাণীত করে। ২টি ঘটনার একটি ছিলো পত্নীর আকস্মিক অকাল মৃত্যু এবং প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও অসুস্থতার কারণে মদিনা শরীফ জেয়ারত করতে যেতে না পারার কষ্ট থেকে সে বেদনায় কবি আশেকে রাসুল কাব্য লেখেন। তার কাব্যগুলোতে মদিনা জিয়ারতের হৃদয় বেদনার হাহাকার ও অশ্রুতে উচ্ছ্বাস প্রধান। এসব কষ্টের কথাগুলো তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যেও পাওয়া যায়।

কবি দাদ আলী মিঞার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, আশেকে রাসুল (১ম খন্ড, ২য় খন্ড), শান্তিকুঞ্জ, মসলা শিক্ষা, ভাঙ্গা প্রাণ (১ম ও ২য় খন্ড), দেওয়ানে দাদ, সমাজ শিক্ষা, ফারায়েজ (মুসলমানী দায়ভাগ পদ্যে লিখিত), সংগীত প্রসুন, উপদেশমালা, এলোপ্যাথিক জ্বর চিকিৎসা, আয়ুর্বেদ রত্ন, আখেরী মউত, জাতিশত্রু বড় শত্রু। কবি দাদ আলী রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে মুসলমানী দায়ভাগ নিয়ে লেখা ফারায়েজ কাব্যগ্রন্থটি তাঁকে আকাশচুম্মি জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

ইউসুফ আলী, এহসান আলী, মুনসুর আলী, ইদ্রিস আলী ও আমেনা বেগম নামের ৭ সন্তানের জনক ইসলামীক ঘরানার এই মহান কবি দাদ আলী ১৯৩৬ সালে ৫ পৌষ ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে আটিগ্রাম নিজ গ্রামে মৃত্যুবরন করেন। কবির ৭ সন্তানের কেউই বেঁচে নেই। বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে মহান এই কবির সঠিক ইতিহাস জানতে তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষনের জন্য কবির বাস্তুভিটা আটিগ্রামে কবি দাদ আলী স্মৃতি পাঠাগার নির্মাণ ও তার কবরটি সংরক্ষনের দাবি জানিয়েছে এলাকার সচেতন মহল।

দেশের ইসলামিক ঘরানার অন্যতম কবি দাদ আলী মিঞার মৃত্যুর ৮০ বছর অতিক্রান্ত হলেও এই মহান কবির বাস্তুভিটা ও সৃষ্টিশীল অমর কাব্যগ্রন্থগুলো সংরক্ষণে সরকারী কিংবা বেসরকারীভাবে কোন উদ্দোগ গ্রহণ করা হয়নি। কবির সন্তানরা জীবিত থাকাবস্তায় তাঁর মৃত্যু ও জন্ম দিবস পালন করলেও সন্তানদের কেউ বেঁচে না থাকায় অনেক বছর ধরে কবির জন্ম ও মৃত্যু দিবসটি আর পালন করা হয় না। এমনকি কবি ও কবি পত্নীর পাশাপাশি যে কবরটি রয়েছে অযত্ন আর অবহেলায় সেটিও আগাছায় ঢেকে গিয়ে ও ভেঙ্গেচুরে বিলিন হতে চলেছে।

মৃত্যুর ৭৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও এই মহান কবির বাস্তুভিটাও সৃষ্টিশীল অমর কাব্যগ্রন্থগুলো সংরক্ষণে সরকারিবেসরকারিভাবে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

কবির সন্তানরা জীবিত থাকাকালে তাঁর মৃত্যু ও জন্ম দিবস পালন করলেও সন্তানদের কেউ বেঁচে না থাকায় তাও আর পালন করা হয় না।
আটিগ্রামে কবির বাস্তুভিটায় কবি দাদ আলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে পাশা পাশি শায়িত কবি ও কবি পত্নীর কবর ওরয়েছে অযত্ন আর অবহেলায়। আগাছায় ঢেকে গিয়ে ভেঙ্গে চুরে বিলিন হতে চলেছে।

কবি দাদ আলীর আত্মীয় গোলাম জিলানী ও কবি ভক্ত গ্রাম্য চিকিৎসক কবি আব্দুর রাহীম (৬০) বলেন, গত গ্রায় ৪৫ বছর যাবৎ কবি দাদ আলীর স্মৃতি সংরক্ষনে বিভিন্ন সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করে আবেদন জানালেও কেউ কোন ভুমিকা রাখেনি।

এমনকি উক্ত গ্রামে কবি দাদ আলী মিঞা জামে মসজিদ ছিল। সেই মসজিদের ফলক থেকেও কবির নাম মুছে ফেলা হয়েছে। কবির মৃত্যুর পর তাঁর বিষয় সম্পত্তি এলাকার ভূমি দস্যুরা দখল করে নিয়েছে। উনিশ শতকের এই গুণী কবির নবীপ্রেম ও সাহিত্য সাধনার কারণে হাজারও বছর ধরে জাতি তাকে স্মরণ করবে।

সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম, ২১ নবেম্বর ২০১৬

পারস্য কবি ওমর খৈয়াম

ডিসেম্বর 4, 2016 মন্তব্য দিন

omar-khaiyyam

কবি সিকান্দার আবু জাফর

ডিসেম্বর 3, 2016 মন্তব্য দিন

sikandar-abu-zafor. গুলশান আরা : ভাষা, ছন্দ, শব্দ দিয়ে কবিরা কবিতা লেখেন। নির্বাচিত শব্দ ব্যবহার করেন পাঠকের কল্পনা শক্তিকে উসকে দেয়ার জন্য। শব্দ কবির চেতনার বাহন হিসেবে কাজ করে। কবিতার ভাবটি আবেগ হয়ে পাঠকের মনে সাড়া জাগায়। সমাজ এবং সংসারের প্রত্যক্ষ সংঘাতের অভিজ্ঞতাকেও কবি ব্যক্ত করেন তার কবিতায়তার কাব্যে শব্দের আবেগময় প্রকাশে।
তেমনি একজন শব্দসচেতন, সমাজসচেতন সংগ্রামী কবি সিকান্দার আবু জাফর। তিনি তার কাব্যের মূল সুর খুঁজেছেন সমাজ সংঘাতের দুঃখ বেদনার মধ্যে। বক্তব্যে স্পষ্টভাষী এবং মেজাজে বলিষ্ঠ হওয়ার পক্ষপাতী সিকান্দার আবু জাফর। এ ধাঁচটি নজরুলের কাব্যাদর্শ থেকে এসেছে। চল্লিশ দশকে যাদের কবি জীবনের সূত্রপাত তারা জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে নজরুলের প্রভাব বলয় ছিন্ন করতে পারেননি। তবুও তার বক্তব্যকে অনায়াস নির্ভাবনায় প্রকাশ করতে সচেষ্ট সিকান্দার আবু জাফর। তার সময়ের বিকার ও অন্যায়কে একটি পরিহাস তিক্ততার মধ্যে প্রকাশ করেছেন কবিতায়।

সিকান্দার আবু জাফরের কাব্যগ্রন্থ ‘বৈরী বৃষ্টি’তে প্রথম কবিতার শেষ স্তবকের লাইনগুলো এরকম

ধ্বংসের রাহু পেয়েছে রাজ্যতার।
বিশ্ব মানবতার
দিকদিগন্তে একি ক্ষমাহীন ব্যাভিচার?
স্তব্ধ কৌতূহলে
অতীত যুগের পাতা ছিঁড়ে একে একে
ভাসাই তিক্ত বিস্মরণের জলে!’

এমন বিষাত্মক স্বগতোক্তি বাংলা কাব্যে নূতন নয়। কবি হৃদয়ের ক্ষোভ স্পন্দন বাঙালি পাঠক বহু শুনেছেন। তবে সিকান্দার আবু জাফরের এই উক্তি যেন কিছুটা অভিনব ঠেকলো কারণ এই সত্যের ভাষ্যকার হওয়ার যোগ্যতা তার স্নায়ুর অবিমিশ্র উপাদান। জীবনকে আলোড়িত করেই এই সত্য প্রকাশিত। তাই ‘দিক দিগন্তে’ শুধুমাত্র ‘ব্যভিচার’ দেখেই সময় কাটাতে পারেননি কবি বিক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চারণ করলেন দুটো বিশেষণ ‘ক্ষমাহীন’ ও ‘অকণ্ঠ’। এ উচ্চারণ শুধু মৌখিক আস্ফালন নয়, কবির চেতনা স্পন্দিত বিক্ষোভ এতেও সন্তুষ্ট না থাকতে পেরে নিজের অবিভাজ্য ব্যক্তি সক্রিয়তায় অবশেষে অতীতের পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে বিস্মরণের জলে ভাসিয়ে স্বস্তি পেলেন যেন। এই আত্মগত চেতনা ও সেই সঙ্গে বলিষ্ঠ বক্তব্যের যে সুরস্বতন্ত্র বিশেষত্ব সিকান্দার আবু জাফরের মধ্যে বিদ্যমান তাই তাকে নজরুল সংলগ্নতা থেকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করেছে। অবশ্য এই আত্মগত সুর যা শিল্পমন্ডিত করার সুযোগ তার হাতে এসেছিল, তা তিনি ক্ষেত্রবিশেষে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করলেও সব ক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেননি। দেখা গেছে, কখনও তিনি উচ্চকণ্ঠ, উপাদান ব্যবহারে নির্বিচার, কাব্যের শিল্পসত্তা সম্পর্কে একেবারে বেপরোয়া।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখবে
চাউল এসেছে ঘরে
তেল নুন চিনি অনেক এসেছে আরো
দুধ মাছ আর খাসির মাংশ
এনেছি জোগাড় করে।
সারাটা সকাল তোমার জননী
রান্নায় মশগুল।
(
এখন তুমি ঘুমাও/সমকাল)

যদিও সিকান্দার আবু জাফরের কবিতায় ছন্দ ও শব্দের ব্যবহারে একটা উজ্জ্বল সাবলীলতা আছে, তা সত্ত্বেও অনেক সময়েই তিনি গদ্য ও পদ্য উপাদানের পার্থক্য সম্পর্কে বেশ অসচেতন এবং অসাবধান।

কবিরা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাদের ধ্যানধারণা ব্যক্ত করবেন এটাই প্রত্যাশা। কবি কী ধরনের কথা বলছেন, কীভাবে বলছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ এবং বিবেচনার বিষয়। বাচন ভঙ্গিকে চিহ্নিত করা হয় আঙ্গিক হিসেবে। কবিতায় শিল্প গুণের প্রকাশ পায় ভাষায়, ইঙ্গিতে আর শব্দ ব্যঞ্জনায়। কবিরা নিরাকার ভাবকে সকার করেন উপযুক্ত শব্দ চয়নে। কিন্তু সিকান্দার আবু জাফর বার বার স্খলিত হয়েছেন কবিতার এই শিল্প সৌন্দর্য থেকে। যাপিত জীবন ধারণা পাঠকের মনে সঞ্চারিত করার অভিপ্রায় তাকে উত্তেজিতউদ্বেলিত করেছে ঠিকই, কিন্তু সুস্থিরতার অভাব বোধে কবিতা হয়েছে গদ্যধর্মী। এই একই কারণে সিকান্দার আবু জাফরের ছন্দও প্রায়ই অত্যন্ত গদ্যধর্মী। ‘ঈদের চিঠি’তে কবি লিখেছেন

বাপজান
ঈদের সালাম নিও। দোয়া কোরো আগামী বছর
কাটিয়ে উঠতে পারি যেন এই তিক্ত বছরের
সমস্ত ব্যর্থতা।
অন্তত: ঈদের দিনে সাদাসিদে লুঙ্গি একখানি
একটি পাঞ্জাবি আর সাদা গোলটুপি
তোমাকে পাঠাতে যেন পারি;
আর দিতে পারি পাঁচটি নগদ টাকা
এইটুকু পেলে
দশজন পড়শীর মাঝে
পুত্রের কৃতিত্ব ভেবে দু’টি অন্ধ চোখে
হয়তো আসবে ফিরে দৃষ্টির সান্তনা।’

কাব্যের কাব্যগুণ, শিল্পের শিল্প সৌন্দর্য সাহিত্যের মানদন্ডে অপরিহার্য বিবেচনা। শিল্পের বিচার এই ত্রুটিকে ক্ষমা করে না।
কবিতা একাধারে মনকে বিস্তৃত করে, কানকে সচেতন করে শব্দের ধ্বনি ব্যঞ্জনার পরিমন্ডলে। তাই কবিতা মামুলী ব্যাপার না হয়েহয়ে ওঠে শ্রাবন্তীর কারুকাজের মতো কঠিন আর অনিন্দ্য সৌন্দর্যের বাণীরূপ। প্রেম যখন ব্যক্তি থেকে নির্বিশেষে পরিব্যাপ্ত হয়, তখন শিল্প সুষমা ফুটে ওঠে। এক্ষেত্রে বলিষ্ঠ মেজাজ অথবা স্পষ্ট বক্তব্যের প্রয়োজন খুব জরুরি নয়। অথচ সিকান্দার আবু জাফরের প্রেমের কবিতাতেও এ ধাঁচটিও লক্ষ্যণীয়। যেমন,

তাকাতেই দেখি নাগালের গন্ডিতে
ইঙ্গিত আঁকা অমৃত কুম্ভ
তুমিই প্রথমে মেলেছো আমন্ত্রণ
মুহূর্তে তুমি প্রিয়া,
এবং তোমাকে আত্মদানের তখুনি উদ্দামতা।’

সুখের কথা এই যে, সিকান্দার আবু জাফর কোনো নির্দিষ্ট গন্ডিতে বা ছকে বাঁধা পড়ে থাকেননি। চল্লিশের দশক থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেন। সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত রেখে বিশেষ করে সময়ের প্রবাহমানতার সঙ্গে শুধু বিষয়ে নয়, আঙ্গিকের পরিবর্তনেও যোগ স্থাপনে সচেষ্ট। এখানেই তিনি সজীব কবি। তার কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা ১৩৭২’ স্পষ্টতই সিকান্দার আবু জাফরের পালা বদলের উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

কবিতায় তার এগিয়ে চলার কথাই বলে। এর পরেও তার লেখা নূতন কবিতার প্রায় প্রত্যেকটিতে যেন খোলস খুলে খুলে যুগের কাছাকাছি ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছেন। বক্তব্য, ভাষা ও শিল্প চেতনার প্রতি স্তরেই তার এই পরিপক্বতা লক্ষণীয় হয়ে ধরা পড়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সিকান্দার আবু জাফর হয়ে উঠেছেন পরিণততর কবি। কবিতায় যুগ যন্ত্রণার প্রতিফলন তাকে ঋদ্ধ করেছে/কাজী নজরুল ইসলামের মতো সিকান্দার আবু জাফরও সঙ্গীত রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। বহু জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উদ্দীপনা সঙ্গীত ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ গানটিও তার লেখা। এটি তিনি লিখেছিলেন ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময়।

আমাদের চোখে চোখে লেলিহান অগ্নি
সকল বিরোধবিধ্বংসী।
এই কালো রাত্রির সুকঠিন অর্গল
কোন দিন আমরা যে ভাঙবোই
মুক্ত প্রাণের সাড়া অনবোই
আমাদের শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে
নূতন সূর্যশিখা জ্বলবেই।
চলবেই চলবেই
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।’

একজন বিপ্লবকামী কবি হিসেবে অসংখ্য গণসংগীত লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন কবি। প্রথমদিকে কলকাতায় ‘দৈনিক নবযুগে’ সাংবাদিকতা শুরু। দেশ বিভাগের পর রেডিও পাকিস্তানে চাকরি গ্রহণ। ১৯৫৩এ দৈনিক ইত্তেফাকের সহযোগী সম্পাদক, ১৯৫৪এ দৈনিক মিল্লাতের প্রধান সম্পাদক এবং ১৯৫৭১৯৭০ পর্যন্ত মাসিক ‘সমকাল’ (সেপ্টেম্বর১৯৫৭) পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। পঞ্চাশের দশকে ‘দৈনিক মিল্লাত’এর সম্পাদক ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর। শোনা যায়, ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়ার মালিকানাধীন ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকার মুদ্রণ প্রমাদ তখন ছিল এক প্রকার হাস্যরসের উৎস। সম্পাদক সাহেব এই দুর্নাম ঘোচাতে ছিলেন স্থিরচিত্ত। মুদ্রণ প্রমাদকারীকে চিহ্নিত করে তার ওই দিনের বেতন মাসিক বেতন থেকে কেটে হলেও মুদ্রণ প্রমাদ শুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সফল সম্পাদক কোনো গাফিলতির প্রশ্রয় দিতে পারেন নাএটাই সত্য। সিকান্দার আবু জাফর পত্রিকা সম্পাদনায় সাফল্যের পরিচয় দেন।

রুবাইয়াৎওমর খৈয়াম’ অনুবাদ প্রসঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলী মন্তব্য করেন ‘কাজীর অনুবাদই (কাজী নজরুল ইসলাম) সকল অনুবাদের কাজী। তা সত্ত্বেও সিকান্দার আবু জাফরের ওমর খৈয়াম অনুবাদ যথেষ্ট কৃতিত্বের দাবিদার। নাট্যকার হিসেবেও তিনি বাংলা সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। তার লেখা ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদৌল্লা’র একটি বিশেষ বৈশিষ্ট হলো মীর জাফর চরিত্রে অতি নবতর দৃষ্টিভঙ্গির আরোপ। সংলাপ ঐতিহাসিক আবাহ সৃষ্টিতে সক্ষম। ‘মহাকবি আলাওল’ তার একটি জীবনীভিত্তিক নাটক। এ নাটকে তিনি ঐতিহাসিকতার চেয়ে কল্পনার উপরে অধিক নির্ভরশীল। ১৯৬৬তে নাটকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

আধুনিক কবিতা মানুষের অনুভূতিতে বিপ্লব এনেছে, গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মূল্য নিরূপনের পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে, পৃথিবীকে নতুন বিশ্বাস ও বিস্ময়ে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের অস্তিত্বের অতলে অনবরত কত যে অনুভূতি আমাদের দেহে ও মনে উত্তাপ এনেছে, তাকে বোধের আয়ত্তে আনার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন আধুনিক কালের কবিগণ। তাই তাদের সুরে ও শব্দে বিচিত্র কৌশল, আশ্চর্য দুরূহতা এবং অপরিচয়ের তাৎপর্য। তারা তাদের কাব্যে যে নূতন আবহ এনেছেন, নতুন স্বাদ ও সংশয়তাতে কল্লোলমুখর হয়েছে কাব্যাঙ্গন।

সিকান্দার আবু জাফরও এনেছেন তার কবিতায় আধুনিকতার পরশ। সিকান্দার আবু জাফর শুধু কবি হিসেবেই খ্যাত নন, সাহিত্য মাসিক ‘সমকাল’এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও তার অবদান অবিস্মরণীয়। কারণ বাংলাদেশে আধুনিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সমকালের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পরিচয় থাকলেও কবি হিসেবেই তিনি অধিকতর উজ্জ্বল। খুলনার তেঁতুলিয়া গ্রামে ১৯১৯এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি, মৃত্যুবরণ করেন ঢাকায় ৫১৯৭৫এ।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ২ ডিসেম্বর ২০১৬

আবুল হাসানের রাজনৈতিক কবিতা ও বর্তমান

নভেম্বর 26, 2016 মন্তব্য দিন

abul-hasan-12মোমিন মেহেদী : আবুল হাসানের কবিতায় আমাদের জীবনের কথা এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে, জীবনদর্শনরুটিরুজিপ্রেমভালোবাসার কথা আসলেই নীরবে বয়ে চলে। বাংলাদেশে সাহিত্যসাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ গড়ে উঠতে উঠতে তিলোত্তমা মন নিয়ে এগিয়ে যায় আদর আয়েশ। বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে খ্রিস্টীয় গত শতকের সেভেনটিইসে যাঁরা কবিতা লিখছেন, অ্যাজ অ্যা টেনডেন্সি তাদের কবিতা সমাজরাজনীতির নিচে চাপা পড়ে গেছে বলে অভিযোগ আছে। আর সেই অভিযোগের হাত থেকে মুক্তির জন্য নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বিনয়ের সাথে তার কবিতা পাঠ করতে করতে কবি আবুল হাসানকে কাব্যজ কথা ভাবতে থাকি। ভাবনায় চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ, জন্মমৃত্যু জীবনযাপন, উচ্চারণগুলো শোকের, অসভ্য দর্শন, মিসট্রেসঃ ফ্রি স্কুল স্ট্রীট, উদিত দুঃখের দেশ, নিঃসঙ্গতা, গোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর, যুগলসন্ধি, বিচ্ছেদ, ঝিনুক নীরবে সহো, এপিটাফ, তোমার মৃত্যুর জন্য জ্যোস্নায় তুমি কথা বলছো না কেন, অপরিচিতি’র মতো অনন্য কবিতার চিত্রকল্প ভেসে ওঠে। কবি আবুল হাসান লিখেছেন :

সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র

মায়াবী করুণ

এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?

এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?

পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?

মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষ্ম তমোহর

কী অর্থ বহন করে এইসব মিলিত অক্ষর?

আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,

যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এঘরে ওঘরে যায়

সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী

তারা কেউ কেউ বলেছে আমাকে

এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,

একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,

তুই যার অনিচ্ছুক দাস!

হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,

নীল দীর্ঘশ্বাস কোনো মানুষের!

সত্যিই কি মানুষের?

তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত চিল, কোনোদিন

ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল?

ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?’

কবি মানে নির্মল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি শিক্ষার আলো জ্বালানোর প্রত্যয়ে অগ্রসর সবসময়। আর তাই চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন :

আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ

নইলে সরকারি লোক, পুলিশ বিভাগে চাকরি কোরেও

পুলিশি মেজাজ কেন ছিল না ওনার বলুন চলায় ও বলায়?

চেয়ার থেকে ঘরোয়া ধূলো, হারিকেনের চিমনীগুলো মুছে ফেলার মতোন তিনি

আস্তে কেন চাকরবাকর এই আমাদের প্রভু নফর সম্পর্কটা সরিয়ে দিতেন?

থানার যত পেশাধারী, পুলিশ সেপাই অধীনস্থ কনেস্টবল

সবার তিনি এক বয়সী এমনভাবে তাস দাবাতেন সারা বিকাল।

মায়ের সঙ্গে ব্যবহারটা ছিল যেমন ব্যর্থ প্রেমিক

কৃপা ভিক্ষা নিতে এসেছে নারীর কাছে!

আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ

নইলে দেশে যখন তাঁর ভাইয়েরা জমিজমার হিশেব কষছে লাভ অলাভের

ব্যক্তিগত স্বার্থ সবার আদায় কোরে নিচ্ছে সবাই

বাবা তখন উপার্জিত সবুজ ছিপের সুতো পেঁচিয়

মাকে বোলছেন এ্যাই দ্যাখো তো

জলের রংএর সাথে এবার সুতোটা খাপ খাবে না?

কোথায় কাদের ঐতিহাসিক পুকুর বাড়ি, পুরনো সিঁড়ি

অনেক মাইল হেঁটে যেতেন মাছ ধরতে!

আমি যখন মায়ের মুখে লজ্জাব্রীড়া, ঘুমের ক্রীড়া

ইত্যাদি মিশেছিলুম, বাবা তখন কাব্যি কোরতে কম করেননি মাকে নিয়ে

শুনেছি শাদা চামেলী নাকি চাপা এনে পরিয়ে দিতেন রাত্রিবেলায় মায়ের খোপায়!

মা বোলতেন বাবাকে তুমি এই সমস্ত লোক দ্যাখো না?

ঘুষ খাচ্ছে, জমি কিনছে, শনৈঃ শনৈঃ উপরে উঠছে,

কতরকম ফন্দি আটছে কত রকম সুখে থাকছে,

তুমি এসব লোক দ্যাখোনা?

বাবা তখন হাতের বোনা চাঁদর গায়ে বেরিয়ে কোথায়

কবি গানের আসরে যেতেন মাঝরাত্তিরে

লোকের ভিড়ে সামান্য লোক, শিশিরগুলো চোখে মাখতেন!’

এমন সব সম্ভাবনার রাতহীন আলোকিত দিনের গল্প প্রতিনিয়ত বলা কেবলমাত্র কবিদের পক্ষেই বলা সম্ভব। সত্যসুন্দর ও সাহসের সাথে তৈরি হওয়া আমাদের প্রতিটি পর্ব বয়ে চলবে বিদগ্ধ ভালোবাসার সাথে। ষাটের দশকে কবিতার রাজত্ব তখন কতটা সম্মৃদ্ধ ছিলো, তা নিয়ে একটু আধটু পড়াশোনা করলেই জানা যাবে। যেমন কবি আবুল হাসানের রক্তভাবনার কাব্যজ উচ্চারণ

এখন তিনি পরাজিত, কেউ দ্যাখে না একলা মানুষ

চিলেকোঠার মতোন তিনি আকাশ দ্যাখেন, বাতাস দ্যাখেন

জীর্ণ ব্যর্থ চিবুক বিষন্ন লাল রক্তে ভাবুক রোদন আসে,

হঠাৎ বাবা কিসের ত্রাসে দুচোখ ভাসান তিনিই জানেন!

একটি ছেলে ঘুরে বেড়ায় কবির মতো কুখ্যাত সব পাড়ায় পাড়ায়

আর ছেলেরা সবাই যে যার স্বার্থ নিয়ে সরে দাঁড়ায়

বাবা একলা শিরঃদাঁড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন, কী যে ভাবেন,

প্রায়ই তিনি রাত্রি জাগেন, বসে থাকেন চেয়ার নিয়ে

চামেলী হাতে ব্যর্থ মানুষ, নিম্নমানের মানুষ!

মানুষ যে নিম্নমানেরও হতে পারে; তা আজ থেকে কয়েক যুগ আগে লিখে গেছেন কবি আবুল হাসান। ‘জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন :

মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না,

আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে

আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,

সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন

কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?

আধিপত্যে এত লোভ? পত্রিকা তো কেবলি আপনাদের

ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর…’

এখন যেমন মানুষ ভালো নেই, দুর্নীতিধান্দাবাজিসন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নিজেদেরকে জড়িত করেছে। তখনও মানুষ ভালো ছিলো না; ভালো ছিলো না বলেই কবি আবুল হাসান নিজের চোখের সামনে নির্মম ঘটনাগুলোকে দেখতে দেখতে লিখেছেন বিভিন্ন কাব্যজ কথা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনসংগ্রামে যারা ত্যাগের রাজত্ব নির্মাণ করেছেন, একইভাবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতাস্বাধীকারের প্রতিটি মুহূর্তে যারা জীবনপণ লড়েছেন, সেই লড়াকুদের জীবন নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে ইতিহাস সবসময়ই প্রমাণ দিয়েছে যে, যখনই অন্যায়ের উত্থান হয়েছে, সাথে সাথে পতনও নির্মিতক হয়েছে ছন্দিতনন্দিত তানে। উচ্চারণগুলো শোকের :

এই অনবদ্যতায় আমাদেরকে তিনি দিয়ে গেছেন, লক্ষ্মী বউটিকে

আমি আজ আর কোথাও দেখিনা,

হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে

কোথাও দেখি না;

কতগুলো রাজহাঁস দেখি,

নরম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি,

কতগুলো মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখি না

শিশুটিকে কোথাও দেখি না!

তবে কি বউটি রাজহাঁস?’

সবুজের সামিয়ানা টাঙানো নতুন সম্ভাবনার দেশে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে বিনম্র ভালোবাসায়শ্রদ্ধায়। আর এই ভালোবাসা ছিলো বলেই কবি আবুল হাসানের প্রতিতার কবিতার প্রতি অমোঘ প্রীতি আজো বয়ে চলছে নদীর মতো। ভালোবাসাপ্রেম আর রাষ্ট্র দেশমানুষ নিয়ে অবিরত তার লেখনিগুলো সৃষ্টি হয়েছে শব্দজ ঘর নির্মাণের মধ্য দিয়ে। তার প্রকাশিত কবিতার বই : রাজা যায় রাজা আসে (১৯৭২), যে তুমি হরণ করো (১৯৭৪), পৃথক পালঙ্ক (১৯৭৫) এবং রচনা সসমগ্র (১৯৯৪)। বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৫) এবং একুশে পদক (১৯৮২) পেয়েছেন নতুন প্রজন্মের উদাহরণ কবি আবুল হাসান। সাংবাদিকতার পেশায় দৈনিক ইত্তেফাক, গণবাংলা এবং দৈনিক জনপদে কাজ করছেন। ঢাকার তৎকালীন সুন্দরী ও বিদুষী সুরাইয়া খানমএর প্রেমিক হিসাবে ব্যাপক পরিচিত কবি আবুল হাসানকে নিয়ে অনেকেই অনেক লেখা লিখেছেন, নিজের মতো করে মূল্যায়ন করেছেন; কবিপ্রাবন্ধিক শাহ মতিন টিপু লিখেছেন : “

মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা,

আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে

আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,

সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন

কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন? (জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন)

এই লাইন কটিই আবুল হাসানকে চিনিয়ে দেয় আমাদের। বলে দেয় তার কবিতার শক্তিমত্তার কথা।”

কবির আবুল হাসানের জন্ম ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট টুঙ্গীপাড়ার বর্নি গ্রামে নানার বাড়িতে। আবুল হাসানের প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া, পরবর্তীতে আবুল হাসান নামে কবি খ্যাতি অর্জন করেন। ডাকনাম ছিল ‘টুকু’। বাবার চাকরির সুবাদে ফরিদপুর থেকে ঢাকা আসেন। আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন। আরমানিটোলা স্কুলে পড়ালেখার সময় থেকেই আবুল হাসান নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন সম্পন্ন করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই হাসান সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি ঢাকার তরুণ কবিদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে আসেন। তিনি নির্মাণ করেছেন নিরন্তর কাব্যজ ভুবন ঠিক এভাবে :

উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো!

মানুষের লোকালয়ে ললিতলোভনকান্তি কবিদের মতো

তুমি বেঁচে থাকো

তুমি ফের ঘুরে ঘুরে ডাকো সুসময়!

রমণীর বুকের স্তনে আজ শিশুদের দুধ নেই প্রেমিক পুরুষ তাই

দুধ আনতে গেছে দূর বনে!’

কবিরা বরাবরই হয়ে থাকেন নিবেদিত আলো। এই আলো ছড়িয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মনের গভীরে স্থান করে নিয়েছেন। এছাড়াও কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লা যখন নির্মমতার রাজনীতি দেখতে দেখতে লিখেছেন. ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’র মতো অনবদ্য কবিতা। তারও অনেক আগে ক্ষয়ে যাওয়া আমাদের তৎকালীন নিয়ে কবি আবুল হাসান লিখেছেন :

পিতৃপুরুষের কাছে আমাদের ঋণ আমরা শোধ করে যেতে চাই!

এইভাবে নতজানু হতে চাই ফল ভরা নত বৃক্ষে শস্যের শোভার দিনভর

তোমার ভিতর ফের বালকের মতো ঢের অতীতের হাওয়া

খেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চাই!’

ইচ্ছের ডানায় ভর করে রাজনীতিকরা না চললেও কবিরা চলেন নির্লোভ হয়ে। যে কারণে সবুজ দিঘীর ঘন শিহরণ? হলুদ শটির বন? রমণীর রোদে দেয়া শাড়ি দেখতে ও দেখাতে বড্ড পরিপক্ব হয়ে এগিয়ে গেছেন সমসাময়িক কবিদেরকে পেছনে ফেলে বহু বহু দূর। কর্মজীবনের কথা আসলে জানা যায়, কবি আবুল হাসান ১৯৬৯ সালে তিনি দৈনিক ‘ইত্তেফাক’এ সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৭২ সালে ‘গণবাংলা’ পত্রিকায় যোগ দেন। ‘গণবাংলা’য় সাহিত্য বিভাগে শহীদ কাদরীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৩ সালে যোগ দেন আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক ‘জনপদ’ পত্রিকায়। এ পত্রিকায় আবুল হাসান সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘জনপদ’ পত্রিকায় তিনি ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাহিত্য সম্পাদনা করেন। এই দেড় বছরে ‘জনপদ’ পত্রিকায় আবুল হাসানের অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছেএর মধ্যে আছে কবিতা, প্রবন্ধ এবং উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ। এই পত্রিকায় তিনি ‘আপন ছায়া’ এবং ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক দুটি উপসম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক কলামটির প্রথম চার সংখ্যা তিনি ‘ভ্রামণিক’ ছদ্মনামে লিখেছেন। ১৯৭৪ সালে সহসম্পাদক হিসেবে দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগ দেন। ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় তিনি ‘আড়ালে অন্তরালে’ এবং ‘বৈরী বর্তমান’ শীর্ষক দুটি উপসম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘ফসলবিলাসী হাওয়ার জন্য কিছু ধান চাই’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ রচনা করে সেই সময় তিনি লেখক হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

১৯৭০ সালটি আবুল হাসানের জীবনে বিশেষ তাৎপর্যবহ। কারণ ‘শিকারী লোকটা’ শিরোনামে একটি কবিতার জন্য এ সময় তিনি সমগ্র এশিয়াভিত্তিক এক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। পরে ওই কবিতাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সমগ্র পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের কবিতাসঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৭০) শীর্ষক ওই গ্রন্থে তদানীন্তন পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধি আবুল হাসানের কবিতা স্থান পায়। কবি আবুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ‘রাজা যায় রাজা আসে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আবুল হাসানের কবি খ্যাতি বিস্তার লাভ করে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘যে তুমি হরণ করো’ প্রকাশ হয় ১৯৭৪ সালে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আবুল হাসান তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’র পান্ডুলিপি তৈরি থেকে শুরু করে প্রুফ দেখা সবটাই করেছেন। ‘পৃথক পালঙ্ক’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র আটাশ বছর বয়সে আবুল হাসান মৃত্যুবরণ করলেও কাব্যজ জীবনের পরিধি এতটাই বিস্তৃত করেছিলেন যে, কাজের মাঝে জীবিত ছিলেন নিরন্তর। আর একারণেই মৃত্যুর পর তার কাব্যজ জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় অনেকগুণ। তারই সুবাদে তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। আর মৃত্যুরও দশ বছর পর ১৯৮৫ সালে নওরোজ সাহিত্য সংসদ প্রকাশ করে ‘আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা’ গ্রন্থটি। কবি হলেও আবুল হাসান বেশকিছু সার্থক ছোটগল্প রচনা করেছেন। মৃত্যুর পনের বছর পর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তার নয়টি গল্পের সঙ্কলন ‘আবুল হাসান গল্পসংগ্রহ’। ‘ওরা কয়েকজন’ শীর্ষক একটি কাব্যনাটক তাঁর মৃত্যুর পর সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’(১২.১২.১৯৭৫) প্রকাশিত হয়, যা স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয় ১৯৮৮ সালে। জার্মানি থেকে ফিরে এসে আবুল হাসান ‘কুক্কুরধাম’ নামে একটি বৃহৎ কাব্য রচনার পরিকল্পনা করেন। এর বেশকিছু অংশ তিনি রচনাও করেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি তা আর শেষ করতে না পারলেও সমৃদ্ধ করেছেন সম্ভাবনার প্রতি পর্বকে। স্বল্পপরিসর জীবনে মাত্র দশ বছরের সাহিত্যসাধনায় আবুল হাসান নির্মাণ করেছেন এক ঐশ্বর্যময় সৃষ্টিসম্ভার, যার ভিতর দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। তিনি নির্মলেন্দু গুণকে উৎসর্গ করে ‘অসভ্য দর্শন’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন :

দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে তাও রাজনীতি,

দেবদারু কেটে নিচ্ছে নরোম কুঠার তাও রাজনীতি,’

কবি আবুল হাসানের এই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্নের উত্তরও আজো দিতে পারেনি নির্মমতার রাজনীতি। যে কারণে নির্মমতার রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে পা রাখতে তৈরি হচ্ছে বর্তমানের রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ। তাদের কাছে ছাত্রযুবজনতাআবালবৃদ্ধবণিতার মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য নিবেদিত থেকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। শপথ করেছে দেশ বাঁচাতেমানুষ বাঁচাতে তারা রাজনীতির নামে সকল অপরাজনীতির রাস্তা বন্ধ করতে জীবন দিয়ে হলেও এগিয়ে যাবে। কেননা, বায়ান্নকে প্রেরণাএকাত্তরকে চেতনা করে এগিয়ে যেতে যেতে তারা জাতির সকল শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জীবনদর্শন নিয়ে গবেষণা করে এগিয়ে চলছে…