আর্কাইভ

Archive for the ‘ইসলাম’ Category

ঘনিষ্ঠতা অর্জনের আগে সতর্ক হোন

মনিরুল ইসলাম রফিক : সৎ জীবন যাপন মানুষের একটি কাক্সিক্ষত বিষয়। সৎ জীবন যাপনের মাধ্যমে দিনে দিনে বড় লোক হওয়া যায় না ঠিকই, তবে এতে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তা স্বর্গীয় ও অপরিমেয়। যারা দুনিয়া ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তায়ালার বিচারে ভয় পায় এবং তার পুরস্কারের আশাবাদী তাদের পক্ষে শত বাঁধা বিপত্তির মধ্যেও সৎ জীবন যাপন সম্ভব। এ বিষয়ে আমরা মহান নবী রাসুল (আ.) ও পরবর্তি আউলিয়ায়ে কেরাম (রহ.)-এর জীবন সমূহ উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারি।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন মাজীদে এবং হযরত মুহাম্মদ (স.) হাদীস শরীফে সৎ জীবন যাপনের জন্য জোর তাগিদ দিয়েছেন। বাস্তব ক্ষেত্রে সৎ জীবন যাপনে গড়ে উঠার জন্য এবং সৎ পথে দৃঢ় থাকার জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। আপনি যেহেতু সমাজের একজন। সেহেতু একটি সমাজে চতুর্দিকে অসততার বিষবাষ্পের মধ্যে আপনাকে সৎ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হলে পরিবেশ প্রতিবেশের আনুকূল্য অত্যাবশ্যক। একই সাথে চাই সৎ সঙ্গ, সৎ সংশ্রব।

অনেক সময় নিজে নির্দোষ, সৎ ও আদর্শবান হওয়া সত্বেও পরিবেশের কারণে অসৎ বন্ধু–বান্ধবদের দরুন অন্যায়কারী ও ঘৃণিতদের মধ্যে পরিগণিত হতে হয়। ইসলাম এ জন্য উপযুক্ত বন্ধু নির্বাচনের উপর গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবায় ইরশাদ করেছেন–হে মু’মিনগণ আল্লাহকে ভয় কর এবং সাদিক বা সৎ লোকের সঙ্গী হও।’

আয়াতে বিশেষভাবে সাদিকদের ঘনিষ্ঠ থাকার তাগিদ দেয়া হয়েছে। বস্তুত: ‘সাদিক’ বা সত্যবাদীগণ সর্বদা ন্যায়ের পথে অবিচল থাকে। তারা দুনিয়ার হীন স্বার্থকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। পরকালীন পুরস্কারের মানসে গোটা জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়। অপর অর্থে যারা সাদিক তারা ‘সালিহ’ ও অর্থাৎ তারা পরম সত্যব্রতী। তারা সৎ ভেতরে ও বাইরে, নিয়ত ও ইচ্ছায় এবং কথা ও কর্মে। এমন মানুষের সান্নিধ্য বরাবরই অন্যকে উন্নত জীবনের দিকে ধাবিত কওে, উৎসাহিত ও অনুপ্রেরণা যোগায়।

এটা নিশ্চিত যে, সৎ লোকের সাথে চললে সৎ হওয়া যায়। আর অসৎ লোকের সাথে চললে অসৎ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। কথায় বলে সৎ সঙ্গ স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গ সর্বনাশ।’ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন:‘ অসৎ সঙ্গীর চেয়ে একাকীত্ব ভাল আর একাকীত্বের চেয়ে সৎ সঙ্গী ভাল।’ বিশুদ্ধ হাদীস সংকলন তিরমিযী শরিফে বর্ণিত আছে, মহানবী হুজুরে পুর নূর (স.) বলেছেন: মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব চরিত্র) দ্বারা প্রভাবিত, সুতরাং কার সাথে তুমি বন্ধুত্ব করছ তা যাচাই করে নেবে। অর্থাৎ এক বন্ধুর প্রভাব অন্য বন্ধুর উপর পড়ে। সুতরাং স্বভাব চরিত্র দেখে বন্ধুত্ব করতে হবে। অনুকূল পারিপার্শ্বিকতা ও সৎ বন্ধুর সাহচর্যে মানুষ মর্র্যদার উচ্চাসন অর্জন করে। পক্ষান্তরে প্রতিকূল পারিপার্শ্বিকতা ও অসৎ বন্ধুর সংস্পর্শে সে মহাধ্বংসের অতল গহবরে তলিয়ে যেতে পারে।

তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক করে হযরত জাফর সাদিক (রহ.) বলেছেন, পাঁচ ব্যক্তির সাথে কখনো বন্ধুত্ব করবেনা। (১) মিথ্যাবাদী–কারণ তার কাছে প্রবঞ্চনা আর প্রতারণাই পাওয়া যাবে। (২) নির্বোধ–তার থেকে কোন উপকার আশা করা যায় না, বরং অপকারই পাবে। (৩) ভীরু– সে তোমাকে বিপদের সময় শত্রুর হাতে সমর্পণ করবে। (৪) পাপাচারী– সে তোমাকে এক লোকমা বা তার কমের বিনিময়ে বিক্রি করে ফেলবে। (৫) কৃপণ– সে একান্ত প্রয়োজনের সময় তোমাকে ত্যাগ করবে।

অটোম্যান সুলতান সুলেমান তার বড় ছেলে মুস্তফাকে দেশজয়ের অভিযানে প্রেরণের সময় যে মনোমুগ্ধকর উপদেশ দিয়েছিলেন তাও বেশ স্মরণযোগ্য। সুলতান সুলেমান বললেন : ‘বাহাদুর ছেলে আমার শোন, ঐশ্বর্যের চেয়ে দামি সম্পদ বুদ্ধিমত্তা, আর সবচেয়ে বড় দারিদ্র হচ্ছে মূর্খতা। নিরর্থক ভয় পাওয়া হচ্ছে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আর সবচেয়ে মূল্যবান বিষয় হৃদয়বান হওয়া। শোন, বোকার সাথে বন্ধুত্ব করতে যাবেনা। সে তোমার উপকারের চাইতে ক্ষতি করবে বেশি। কৃপণের সাথেও কখনো বন্ধুত্ব করবেনা। কারণ, সে বিপদের দিনে তোমার পাশে না থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে। সাবধান, কোন পরনিন্দাকারীকেও তোমার বন্ধু বানিও না। কারণ, সে নিজের প্রয়োজনে তোমাকে ব্যবহার করবে। আর সেই সাথে মিথ্যাবাদীর সাথেও কখনো বন্ধুত্ব করবেনা। কারণ সে মরীচিকার মত দূরের স্বপ্নে বিভোর করে কাছের জিনিসগুলোকে দূরে সরিয়ে দেবে।’

সৎ সঙ্গের মাধ্যমে একটি ব্যাপক ধরনের পার্থিব উপকারিতা যে নিহিত–তা এতক্ষণের আলোচনায় নিশ্চয় প্রতিভাত হয়েছে। পরকালীন জীবনের জন্যও সৎ সংশ্রব অবলম্বনের কোন বিকল্প নেই। অসৎ বন্ধুত্ব ও অসৎ সংশ্রব মানুষকে ক্রমেই দুনিয়ার লোভ–লালসার প্রতি আকন্ঠ নিমজ্জিত করে দেয়। ফলে তার আখিরাতেও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

হাদীসের বর্ণনায় দেখা যায়, দুনিয়াতে যারা সৎভাবে জীবন–যাপন করেছে এবং সৎ মানুষের সাথে উঠা বসা করেছে তারা পরকালে একই সাথে থাকার সুযোগ পাবে। পক্ষান্তরে অসৎ সঙ্গীগণ তাদের কর্মফলের ভিত্তিতে একই সাথে উঠবে এবং সকলে একে অপরের দোষে সম্পৃক্ত ও দোষী সাব্যস্ত হয়ে পড়বে।

এজন্য আল্লাহর রাসুলের (স.) মহান সাহাবাগণ (রাদি.) সর্বদা সৎ লোকদের সাথে উঠা–বসার সুযোগ খুঁজতেন এবং অসৎ সঙ্গী মুনাফিক, কপটভন্ডদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। পরবর্তীতে মহান আউলিয়ায়ে কেরামদের (রহ.) জীবনেও আমরা অনুরূপ আচরণ ও সদস্বভাব লক্ষ্য করি।

তিরমিযী শরীফে হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাদি.) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: যে ব্যক্তি যাকে ভালবাসে, (কিয়ামতের দিন) সে তার সাথেই থাকবে এবং সে যা অর্জন করেছে তাই পাবে।’ তিনি আরো বলেন, একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স.) এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? নবী (স.) নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজ শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেন কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে প্রশ্নকারী লোকটি কোথায়? সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই যে আমি, তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কিয়ামতের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছে? সে বললঃ হে আল্লাহর মহান রাসুল (স.)! আমি অবশ্য তেমন লম্বা (নফল) নামাযও পড়িনি, রোযাও (নফল) রাখিনি, তবে আমি নিশ্চয় আল্লাহ ও তার প্রিয় রাসূলকে ভালবাসি। রাসূল (স.) বললেন: আলমারউ মা মান আহাব্বা ইলাইহি– যে যাকে ভালবাসে, সে কিয়ামতের দিন তার সাথেই থাকবে।’ আর তুমিও যাকে ভালবাস তাঁর সাথেই থাকবে। অর্থাৎ আমার প্রতি ভালবাসার কারণে তুমি আমার সাথেই থাকবে ইনশাআল্লাহ।

রাবী বলেন, এ কথায়,সাহাবিরা এতই খুশি হলেন যে, ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানদের আর কোন ব্যাপারে এত খুশি হতে দেখিনি।’(৪/২২৭)।

কুরআনুল কারীমে এও বলা হয়েছে যে, পরকালে অপরাধীরা একে অপরের উপর দোষ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাবে এবং নিজেরা যাদের কারণে যাদের মাধ্যমে বিভ্রান্ত হয়েছে তাদের প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা ও ক্ষোভে ফেটে পড়বে। সূরা হা’মিম সিজদার ২৯নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ কাফেরেরা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! যে সব জ্বিন ও মানুষ আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল, তাদেরকে দেখিয়ে দাও, আমরা তাদেরকে পদদলিত করব, যাতে তারা যথেষ্ট অপমানিত হয়।

পক্ষান্তরে সৎকর্মশীল সৎ সংশ্রবকারীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে: যারা ঈমানদার এবং তাদের সন্তানেরা ঈমানে তাদের অনুগামী, আমি তাদেরকে তাদের পিতৃপুরুষদের সাথে মিলিত করে দেব এবং তাদের আমল বিন্দুমাত্রও হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী। (সূরা ত্বোর–আয়াত ২১)।

এজন্য মহাতœা ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেছেনঃ যার সাথে বন্ধুত্ব করবে তার মধ্যে অন্তত পাঁচটি গুণ থাকা চাই। বুদ্ধিমত্তা, সৎ স্বভাব, পাপাচারী না হওয়া, বিদআতী না হওয়া, দুনিয়াসক্ত না হওয়া।

অতএব, আমরা যেন সৎ জীবন–যাপনের স্বার্থে নিজেরা সৎ স্ঙ্গ, সুন্দর পরিবেশ বিনির্মাণের চেষ্টা করি এবং একই সাথে আমার–আপনার সন্তানদের সৎ বন্ধুবৎসলভাবে বেড়ে উঠার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। গত মার্চ ২০১৪ এর একটি আলোচিত ঘটনা । আগ্রাবাদ সিডিএতে কন্যার বন্ধুর হাতে নিহত হন মা মেয়ে দুইজন। অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে মোবাইলের মাধ্যমে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে প্রথমে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠা এবং এক পর্যায়ে বিভিন্ন রেস্ট হাউজে ডুবে ডুবে জল খাওয়া আর পরবর্তিতে দুইজনের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরিনতিতে এ নৃশংস হত্যাকান্ড। ১৮ বছরের নিচে যেখানে ধর্মীয় ও দেশীয় আইনে বিয়ে শাদী নিষিদ্ধ এসব কিশোর কিশোরীদের যথাযথ পরিপক্ষতা আসেনি বলে, যে বয়সে পিতা মাতাকে সন্তানদের আলাদা বিছানায় রাখতে বলা হয়েছে সে বয়সে পিতা মাতারা কোন আকলে সন্তানদের পর যুবকদের সংশ্রবে নিরবতা অবলম্বন করে মোবাইল হাতে দিয়ে তা ভাবতে অবাক লাগে। একই হাদীসে তিনি আরও সত্য কথাটি বলেছেন উপযুক্ত সন্তানদের বিলম্বিত বিয়ে শাদির কারণে তারা যদি বিপদগামী হয় এর পাপ ও দায় ভার পিতামাতাকে নিতে হবে। ’ আজকের অবক্ষয় থেকে বাচার জন্য ইসলামের মহান নবীর আদর্শই একমাত্র পথ।

লেখক : কলামিস্ট, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব

Advertisements

জ্ঞান সাগরের আরেক নাম ইমাম আবু হানিফা (রহ:)

আতিকুর রহমান নগরী : কুফা নগরী। ১১০ হিজরির শুরুর দিকে সেখানে তৎকালিন সময়ের বিশ্বনন্দিত, জগৎখ্যাত বড়বড় আলেম-উলামা ও ফুকাহাদের মাজমা বসতো। বিদগ্ধ মুফতি, মুহাদ্দিস, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও ব্যাকরণবিদদের পদচারনায় মুখর ছিল সেই মাজমা। বারো অথবা তেরো বছরের অসাধারণ মেধা ও স্মৃতি শক্তির অধিকারী, অদম্য জ্ঞান পিপাসু নুমান নামক একজন বালক প্রথমে প্রিয়নবী সা.’ র অন্যতম খাদেম ও জলিলুল কদর সাহাবী হযরত আনাস বিন মালেক রা.’র তত্বাবধানে পবিত্র কুরআন শরীফ হেফজ করে ইলমে কালামের দিকে মনোনিবেশ করেন। অত:পর হিজরী ১০০ সালে হযরত হাম্মাদ রা.’র দরসগাহে ভর্তি হয়ে একাধারে ১০ বছর ইলিম অর্জন করেন। পরে তিনি কুফা নগরীর আলেম-উলামা, ফুকাহাদের মাজমায় পা রাখেন। কুফা তখনকার সময়ে ইসলামি নগর হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। 

সেই কুফায় আগমনকারী নুমান নামের অদম্য জ্ঞান আহরনকারীই পরবর্তীতে ইমামে আযম হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন। সেই নুমান বিন সাবিতই হানাফি মাযহাবের গুরু। যাকে সমস্ত জাহানবাসী ইমাম আবু হানিফা নামেই জানে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.’র মূলধারার শিষ্য হযরত হাম্মাদ রা. ছিলেন তৎকালীন একজন ফিকহ শাস্ত্রের গুরু। তাঁর কাছ থেকে ইমাম আবু হানিফা রাহ. জ্ঞান আহরণ করেন। ফিকহ শাস্ত্রের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন কুফা থেকে বিজ্ঞ ফকিহদের কাছ থেকে। ১২০ হিজরিতে হযরত হাম্মাদ রা. ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন হযরত ইমাম আবূ হানিফা। এরপর থেকে ইমাম আযম রাহ.’র নেতৃত্বে পরিচালিত হতে থাকে কুফার ইলমি মারকায। যাকে তৎকালীন ফোকাহায়ে কেরাম ‘‘কেয়াসের প্রতিষ্ঠান’’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আমিরুল মুমিনুন হযরত অবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, হাফস ইবনে গিয়াস, ইমাম আবু ইউসূফ, ইমাম যুফার , হাসান ইবনে যিয়াদ, প্রমুখরা ছিলেন ইমাম আবূ হানিফা রা.’র মজলিসের মধ্যমনি।

ইমাম আবু হানিফা রাহ.। একটি সংগ্রামের নাম। একটি আলোকরশ্মির নাম। ইলমের একটি সাগরের নাম। একটি চেতনার নাম। কুরআন-হাদিস, ইজমা-কিয়াসের সমষ্টির নাম। জিহাদময় জীবনের নাম ইমাম আবু হানিফা। ইমাম আবু হানিফা তিনিই যার মাসআলার সমাধান দেখে চিনেছেন ইমাম আওযায়ী। যার সম্পর্কে ইমাম মক্কি ইব্রাহিম রাহ. বলেছেন, ‘যার জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিহাদ।’ দারুল হিজরতের (মদীনার) ইমাম মালেক রাহ. তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘যদি এই লোকটা কাঠের পালঙ্গকে যুক্তি দিয়ে স্বর্ণ বানাতে চান, পারবেন’।

যিনি সরাসরি চারজন সাহাবি এবং প্রায় চার সহস্রাধিক তাবেঈ মাশায়েখের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহন করেছেন। ফিকহ শাস্ত্রের অদ্বিতীয় পন্ডিত ছিলেন যে ইমাম আবু হানিফা। তাছাড়া ইলমে হাদীস, ইলমে কালাম, ইলমে বালাগাত, ইলমে নাহু, ইলমে সরফ, ইলমে তাফসীর প্রভৃতি বিষয়ে যার তুলনা তিনি শুধু নিজেই। সেই মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধর্মের নামে আগাছা লা-মাযহাবিরা বলে তিনি নাকি মুহাদ্দিস ছিলেন না। হাস্যকর এসব কথার প্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই তোমার কথা মতো ধরে নিলাম ইমাম আবু হানিফা মুহাদ্দিস ছিলেন না ঠিক। তিনি ছিলেন উস্তাযুল মুহাদ্দিসীন। শতশত মহান ব্যক্তিরা তাঁর কাছ থেকে হাদিসের দারস গ্রহণ করে স্বীয় যুগে জগৎখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন আটশত আশিজন শিষ্যের উস্তায। আমর ইবনে মাইমুনা, ইমাম যুফার, সুফিকুল শিরোমণি দাউদ তায়ী, হাববান ইবনে আলী, কাসেম ইবনে মায়ান, আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ., কযিউল কুযাত ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ বিদগ্ধ মুফতি-মুহাদ্দিস ও ফকিহবিদদের উস্তাদ ছিলেন ইমাম আযম রাহ.।

সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদিস সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। এবং ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র জ্ঞান সম্পর্কেও তাদের কোন ধারনা নেই। ইমামে আযম আবুূ হানিফা রাহ. যেভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন আজ পর্যন্ত কেউ এতসুন্দর সামাধান দিতে পারেনি এবং তাঁর প্রদত্ত কিয়াসগুলোর খন্ডন আজও কেউ করতে পারেনি।

ইমাম আওযায়ী রা. যিনি ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র সমকালিন মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহ. কে বললেন,‘কুফায় গজিয়ে উঠা এই বেদাআতির পরিচয় কি? যাকে আবু হানিফা উপনামে ডাকা হয়’? ইমামে আযম আবু হানিফা রাহ.’র প্রাণপ্রিয় শিষ্য ইবনে মুবারক এ কথা শুনে চুপ থাকেন, এ সময় তিনি কিছু জটিল ও দুর্বোধ্য মাসআলা বর্ণনা করেন এবং সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়ার দিক নির্ণয় করেন। ইমাম আওযায়ী রা. বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলেন, কে দিয়েছেন এই ফতোয়া? ইবনে মুবারক বলেন ইরাকের জনৈক শায়খ যার সাক্ষাতে এই মাসআলা ও ফতোয়া জেনেছি। ইমাম আওযায়ী রা. বলেন যিনি এই ফতোয়া দিয়েছেন তিনি মাশায়েখকুল শিরমণি। যাও তার কাছে গিয়ে আরো ইলিম হাসিল করো। ইবনে মুবারক বললেন, হযরত! সেই শায়খের নাম আবু হানিফা। পরবর্তীতে মক্কায় ইমামে আযমের সাথে ইমাম আওযায়ী রা. এর সাক্ষাৎ হয় এবং অনেক মাসআলা নিয়ে আলোচনা (তর্ক-বিতর্ক) হয়। অবশেষে ইমাম আওযায়ী রাহ. ইমাম আবু হানিফা রাহ. সম্পর্কে বলেন, ‘লোকটার গভীর জ্ঞান ও অসামান্য বুদ্ধি বিবেকের প্রতি খামোখাই সমালোচনার তীর ছুড়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। সত্যি বলতে কি আমি প্রকাশ্য ভুলের মাঝে ছিলাম। মহামানবের চরিত্রে এলজাম দিয়েছিলাম। লোকমুখে যা শুনেছি এর থেকে তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

লোকমুখে শুনে ইমাম আওযায়ী রা. ইমাম আবূ হানিফা রা. সর্ম্পকে সঠিক ধারনা পোষন করেননি। কিন্তু যখন ইমাম আবূ হানিফা রাহ.’র গভীর জ্ঞানের কথা শুনলেন তখন তিনি তাকে মাশায়েখকুল শিরমণি বলেছেন। আর আজকে যারা ইমাম আবূ হানিফা রাহ. সর্ম্পকে মন্তব্য করার মত দু:সাহস করে তাদের অস্তিত্ব ঠিক আছে কিনা খবর নাই। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা আধুনিক যুগের সংস্কারক।

অতএব পরিশেষে বলতে চাই যারা বলেন ইমাম আবু হানিফা রাহ. হাদিস জানতেন না। তিনি মুহাদ্দিস ছিলেন না। তাদের এসব কথার কোন ভিত্তি নেই। বরং যারা এসব কথা বলে তাদের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা যেখানে শেষ ইমাম আযম আবু হানিফা রাহ.’র জ্ঞান-চিন্তাভাবনা সেখান থেকে শুরু। ইমাম আবু হানিফা রাহ. সম্পর্কে কোনো কিল ও ক্বাল না করে বরং তাঁর প্রদত্ত মাসআলা তথা হানাফি মাযহাব অনুসারে নিজের জীবনকে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহিহ সমুঝ দান করুন। আমিন।

নজরুল সাহিত্যে মহররম – শেখ দরবার আলম

এক

নজরুল সাহিত্যে মোহররম, এই বিষয়টার ওপর যদি লিখতে হয় তা হলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় যে, ইসলাম কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে ছিল একটা আশ্রয়। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিই মুসলিম জাতিসত্তা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। তামাম বিশ্বের মুসলিম সভ্যতা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। কোরআন এবং সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। মুসলিম উম্মার ঐক্য ও সংহতি ছিল তাঁর কাছে একটা অত্যন্ত কাক্সিক্ষত বিষয়। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আদর্শ মানুষ ছিলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সাম্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের আর্থ-সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় যে সব জায়গায় উল্লেখ করেছেন সেইসব জায়গায় তিনি যে মুসলমান ঘরের সন্তান, এই কথাটুকু বলে ক্ষান্ত হতে চাননি। তিনি বারংবার বলেছেন এবং লিখেছেন যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং নবীর উম্মত; কিন্তু তিনি কবি সবার। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার। এদিক দিয়েও বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভূমিকা অনন্য।

দুই

বাংলা সাহিত্যে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের বাংলাভাষীদের মধ্যে ইশ্বর গুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত বড় বড় কবি-সাহিত্যিকরা জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী, মনুসংহিতার সমাজের কবি-সাহিত্যিক হিসাবে লেখালেখি করেছেন এবং সেইভাবেই মূলত কাজ করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বোধ হয় অনুশীলন সমিতির সভ্য মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো এবং অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ লোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো বলতে চাইতেন যে তিনি নাস্তিক। এ কথা বললে যথার্থ অহিন্দুদের কাছে এবং নাস্তিকদের কাছে হয়তো গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদী, শিখ, এ রকম কোন ধর্মাবলম্বীর কেউ নাস্তিক হইলে তাতে ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বিশ্বের মজুলম মুসলমানদের কারো কোনো উপকার হয় না। তাঁরা নিজ নিজ ধর্ম নিষ্ঠার সাথে পালন করলে তাতে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ তাদের কোনো ধর্ম গ্রন্থেই মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে বা কল্পনা করে জাতীয়তাবাদী হয়ে মজলুম মুসলমানদের অধিকার বঞ্চিত করে সাম্প্রায়িক হওয়ার এবং এর চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে ফ্যাসিবাদী হওয়ার কোনো সংস্থান নেই।

তিন

এই বাস্তবতাটা, এই সত্যটা আমাদের সবারই স্মরণ রাখা উচিত যে,হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাংলাভাষীর বাংলা ভাষা অনেকাংশে এক হলেও তৌহীদবাদী মুসলমানদের বাংলা ভাষা এবং পোত্তলিক হিন্দুদের বাংলাভাষা সর্বাংশে এক নয়। অনুরূপভাবে তৌহীদবাদী মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং পৌত্তলিক হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতি, সাংস্কৃতি সহাবস্থানের দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা উচিত। আমি এইসব কথাগুলো অপরিহার্য প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই লিখছি। কেননা, এই কথাগুলো সবারই চিন্তা করে দেখা উচিত।

জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজ প্রধান স্বাধীন ভারতে মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর পঠন-পাঠনের সংস্থান সেখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। সে সুযোগ এই মুসলিমপ্রধান দেশেও এখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানোর ফলে খোদ পাকিস্তান আমল থেকেই এ রকম একটা অবস্থা সৃষ্টি হতে পেরেছে। এ দেশে যারা ইসলামী আন্দোলন করেন তাঁরাও এই বিষয়টির দিকে কখনো নজর দেননি।

চার

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের এক জাতিতত্ত¡ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তামাম ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলমান সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুসলিম সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা ও এই মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য-সঙ্গীত মুছে ফেলার অংশ হিসেবে এ ক্ষেত্রে নজরুল চর্চার পথও রুদ্ধ করার বন্দোবস্ত হয়েছে। কিন্তু নিজ নিজ সমাজের মানুষ হলেও হিন্দুর ভাষা এবং সাহিত্য হবে এরকম এবং মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য হবে অন্য রকম।

পাঁচ

অন্যতম রবীন্দ্র জীবনীকার প্রশান্ত কুমার পাল কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত রবিজীবনীতে লিখেছেন যে, আধুনিক বাঙালি বলতে যাদেরকে বোঝায় তারা এসেছেন বৈদিক ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। ঠিক অনুরূপভাবে আমরা যদি অষ্টম শতাব্দী থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিকে চোখ রাখি তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারবো যে, সাহিত্যিক ও সমাজসেবী সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো, সাহিত্যিক-সাংবাদিক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের মতো এবং মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো, মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের মতো, মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানরাও এসেছেন ভারতের বাইরের সাধারণত আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্য এশিয়া থেকে। এভাবে আমরা দেখছি যে, আধুনিক বাঙালি হিন্দুদের যেমন রয়েছে বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের হিন্দু জাতিসত্তার উত্তরাধিকার; অনুরূপভাবে ঠিক তেমনি আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানদেরও রয়েছে মুসলমান সমাজের ইতহিাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার উত্তরাধিকার।

ছয়

আরবী ভাষাভাষী এলাকা ইরাকের বাগদাদে থাকতে নজরুলের পূর্বপুরুষরা ছিলেন আরবভাষী। হিন্দুস্তানে অর্থাৎ ভারতে এসে তাঁর পূর্ব পুরুষরা এক সময়ে হয়েছিলেন ফার্সীভাষী। পরে উর্দুভাষী।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু পূর্ববর্তী সভাপতি এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদের পূর্বপুরুষরাও আরব থেকে এসেছিলেন। মওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবদ্দশায়ও তাঁদের পরিবারেরা, মওলানারা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন কেবল আরবী ভাষায়। মওলানা আবুল কালাম আজাদের পরিবারেরা পুরুষরা বাইরের মানুষজনদের সঙ্গে কথা বলতেন উর্দু ভাষায়।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাদের পরিবারে আরবি, ফার্সী এবং উর্দু ভাষার চর্চা ছিল। তাঁর আব্বা কাজী ফকীর আহমদ বাংলাভাষাও খুব ভালো মতো শিখেছিলেন। নজরুল তাঁর শৈশবে এবং বাল্যেই শিখেছিলেন আরবী, ফার্সী, উর্দু এবং বাংলা কাজী নজরুল ইসলামের যখন জন্ম হয় তখন তাদের পরিবারের লোকেরা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন উর্দু ভাষায়।

সাত

১৭৫৭-র ২৩ জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের আগে কথ্য বাংলা এবং দলিল দস্তাবেজ এবং চিঠিপত্রের বাংলা ছিল আরবি-ফার্সী শব্দবহুল বাংলা। তখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষরাও পরিবারিক পর্যায়েও ফার্সী ভাষা চর্চা করতেন। রাজভাষা হিসেবেও ব্যবহারিক জীবনে ফার্সী ভাষার চর্চা তো করতেনই।

পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের বেয়াল্লিশ বছর সাত মাস পর ক্রসেডের চেতনাসম্পন্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী খ্রিস্টান সমাজের পাদ্রী উইলিয়াম, কেরির নেতৃত্বে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশনে সংস্কৃতের পন্ডিত রামরাম বসুর তালিমে আরবী-ফার্সি শব্দ বর্জিত এবং সংস্কৃত শব্দ বহুল খ্রিস্টান ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সাবেক পাদুকা নির্মাতা পাদ্রী উইলিয়াম কেরী এর এক বছর দু’মাস পর ১৮০১-এর মে মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়ে অধীনস্ত সংস্কৃততজ্ঞ পন্ডিতদের সহযোগিতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলাভাষা শেখানোর জন্য আরবী ফার্সী শব্দ বর্জিত কেবল নয়, তামাম মুসলিম সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা বর্জিত পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করলেন। কালক্রমে এই ধরনের বাংলা পাঠ্যপুস্তকই স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সটির পাঠ্য হলো।

শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠার এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ বছর পর মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)-এর জন্ম। পাঠশালায় এবং স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে এবং সে সময়কার হিন্দুদের লেখা সাহিত্যে আরবী-ফার্সী বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল যে ধরনের বাংলা ভাষার প্রচলন মীর মশাররফ হোসেন দেখেছিলেন ঠিক সে ভাষাতেই তিনি ইসলামের ইতিহাসের কারবালার ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন “বিষাদ সিন্ধু”। (১৮৮৫-১৮৯১)।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম মীর মশাররফ হোসেনের জন্মের বাহান্ন বছর পর। তিনিও কেবল পাঠশালায় নয়, মক্তবে এবং স্কুলেও আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল বাংলাই শিখেছিলেন। হিন্দুদের লেখা অন্যান্য কাব্য এবং সাহিত্যেও শিখেছিলেন এই একই ভাষা। কিন্তু মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে তিনি যখন কাব্য ও সাহিত্য সৃষ্টি করলেন এবং গান লিখলেন তখন এই বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি বিধান করে তিনি সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ যথাসম্ভব বর্জন করে ব্যবহার করলেন প্রচুর আরবী-ফার্সী শব্দ।

প্রথমে শ্রীরামপুর মিশনে এবং পরে আরো ব্যাপকভাবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে খ্রিস্টান পাদ্রী এবং সংস্কৃতজ্ঞ হিন্দু পন্ডিতরা মিলে একশ বিশ বছর আগে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই যেমন দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, লিখিত বাংলা ভাষা হবে সম্পূর্ণরূপে আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দবহুল ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যে-সঙ্গীত হবে কেবল হিন্দু সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক হিন্দু জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য ও সঙ্গীত, ঠিক তেমনি এই ধারার বিপরীতে এর এক শত বিশ বছর পর সেনাবাহিনী মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলা মুল্লুকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর কবি কাজী নজরুল ইসলামও দেখিয়েছিলেন মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত বহুলাংশে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বাংশে তৎসম শব্দ অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দ বণ্টন করেও লেখা যায়।

আট

নজরুল সেনাবাহিনী থেকে কলকাতায় ফিরেছিলেন উনিশ শ’ বিশ সালের মার্চ মাসে। এর চার মাস পর ১৩৩৯ হিজরীর পহেলা মোহররম ছিল ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ৩০ ভাদ্র মোতাবেক ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর। নজরুল তখন শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত দৈনিক নবযুগের অন্যতম সহযোগী সম্পাদক। থাকেন কলকাতার ৮/এ টার্নার স্ট্রীটে তার সহকর্মী ও সুহৃদ মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে। সামনে ১০ মোহররম ১৩৩৯ হিজরী (৮ আশ্বিন ১৩২৭ মোতাবেক ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯২০) তারিখ শুক্রবার আশুরা। মাসিক মোসলেম ভারত এর প্রথম বর্ষ : প্রথম খন্ড : ষষ্ঠ সংখ্যার জন্য তিনি লিখলেন তার বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয় ইসলামী কবিতা মোহররম। প্রথম দুটো পঙক্তি লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, সেখানে কোনো তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ নেই। নজরুল শুরুতেই অত্যন্ত আবেগ ও দরদ দিয়ে এবং গভীর মমত্ববোধ মিশিয়ে লিখেছেন:

নীল সিয়া আস্মান লালে লাল দুনিয়া

আম্মা! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।

আরবী ফার্সী শব্দ বহুল এই বাংলা পড়ে কারো বলার সাধ্য নেই যে, বাঙলা ভাষা সংস্কৃতির দুহিতা। সংস্কৃতি শব্দ স্বদেশী শব্দ এবং আরবী ফার্সী শব্দ বিদেশী শব্দ। নত্ববিধান এবং ষত্ববিধান কেবল সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের জন্য প্রযোজ্য! ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ইন্তেকালের এবং ভাষাতত্ত্ববিদ সনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পরলোক গমনের এতোদিন পর এবং ধনিতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আবদুল হাই সাহেবের ইন্তেকালের এতদিন পর আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা বিভাগে যখন ভাষাতত্ত¡বিদ নেই, ধ্বনিতত্ত¡বিধ নেই, তখন কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকরণে আমাদের মুসল্লী প্রুফ রীডাররাও আমাদের শেখাচ্ছেন যে, ইরান বানানের মূর্ধন্য ণ মূধা বা মস্তক থেকে অর্থাৎ জিহবাগ্র তালুতে স্পৃষ্ট করে উচ্চার্য নয়; কেননা, এটা সংস্কৃতি বা তৎসম শব্দ নয়। আমাদের ওপর অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আরোপের লক্ষ্যে এ সবই এখন চলছে।

নজরুলের জীবদ্দশা সুস্থাবস্থায় বাংলাভাষী মুসলমানরাও যে বাংলাভাষী মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐহিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরস্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে সচেতন ছিলেন সেটা সাতচল্লিশের মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলিম মালিকানাধীন এবং মুসলিম সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলো লক্ষ করলেই উপলব্ধি করা যায়। বাংলা সাহিত্যে নজরুল একমাত্র বড় কবি যিনি প্রতিবেশী সমাজের জন্য কীর্তন, ভজন এবং স্যামাসঙ্গীত পর্যন্ত লিখেছিলেন। সেখানে নজরুল কোন আরবী ফার্সী শব্দ ব্যবহার করেননি। নজরুল বিশ্বাস করতেন যে বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষারও আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। বাংলাভাষী মুসলমানদের সংস্কৃতি ও বাংলাভাষী হিন্দুর সংস্কৃতি এক নয়। বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষা এবং সংস্কৃতির সর্বনাশ ঘটে গেছে ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্টের পর।

বাংলাভাষী মুসলমানদের মুসলমান হিসেবে বাঁচার অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলমান জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় উপযুক্ত মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করার অপরিহার্য প্রয়োজন আছে। নজরুলের মোহররম কবিতা উপলক্ষে এই উল্লেখটা করলাম।

লেখক : নজরুল গবেষক, ইতিহাসবিদ।

মহররম ও আশুরা একটি তাত্ত্বিক সমীক্ষা

ashura sacrificeএ,কে,এম ফজলুর রহমান মুনশী : ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। মহররম শব্দটি আরবী ভাষায় ব্যবহার অনুসারে নাম বাচক বিশেষ্য নয়, বরং গুণবাচক বিশেষণ। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে প্রাচীন মক্কার বছরের প্রথম দু’টি মাস ছিল প্রথম সফর ও দ্বিতীয় সফর। প্রাচীন আরবী ভাষায় সাফারাইলি এই দ্বিবাচনিক রূপ দেখে তা’ স্পষ্টতই বুঝা যায়।

প্রাচীন আরব বছরের প্রথম অর্ধ বছরে তিনটি মাস ছিল এবং এই তিনটি মাসের প্রত্যেকটিতে দু’টি করে মাস ছিল। অর্থাৎ দুই সফর, দুই রবী ও দুই জুমাদা। দুই সফরের প্রথমটি অলঙ্ঘনীয় পবিত্র মাসগুলোর (আশহুরে হুরুম) অন্যতম ছিল বলে এর গুণবাচক আখ্যা দেয়া হয়ে ছিল ‘মহররম’। ধীরে ধীরে তা-ই মাসের নাম হয়ে গেছে। এভাবেই প্রথম সফর মাসটি ‘মহররম’ মাস নামে এবং অলঙ্খনীয় মাসগুলোর প্রথম মাস হিসেবে কালের খাতায়, ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে।

মহান রাব্বুল আলামীন বছর ও সময় গণনার রীতি-পদ্ধতী চিরদিনের জন্য বিধিবদ্ধ করার লক্ষ্যে কুরআনুল কারীমের ৯নং সূরা তাওবাহ-এর ৩৬ ও ৩৭ নং আয়াতে ঘোষণা করেছেন : আকাশ-মন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় বারটি মাস রয়েছে। তন্মধ্যে চারটি হলো অলঙ্খনীয়। নিষিদ্ধ মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করবে, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে এবং জেনে রেখো, আল্লাহ মোত্তাকীদের সঙ্গে আছেন। এই যে (অলঙ্ঘনীয়) মাসকে পিছিয়ে দেয়া কেবল কুফুরীকে বৃদ্ধি করা মাত্র যা দ্বারা কাফেরগণকে বিভ্রান্ত করা হয়। তারা উহাকে কোন বছরে বৈধ করে এবং কোন বছরে অবৈধ করে, যাতে তারা আল্লাহপাক যেগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন, সে গুলোর গণনা পূর্ণ করতে পারে। অনন্তর আল্লাহপাক যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা হালাল করতে পারে। তাদের মন্দ কাজগুলোকে তাদের জন্য শোভনীয় করা হয়েছে; আল্লাহপাক অবশ্যই কাফির সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। (সূরা তাওবাহ: আয়াত নং ৩৬,৩৭, পারা ১০, রুকু-৫)।

পবিত্র মাসগুলোতে মুসলমানদের কর্তব্য নির্ধারণ করে আল কুরআনের ২নং সূরা বাকারাহ-এর ১৯৪নং আয়াতে ও ২১৭নং আয়াতে এবং ৫নং সূরা মায়িদাহ এর ২নং আয়াতে ও ৫৭ নং আয়াতে মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন : পবিত্র মাস পবিত্র মাসের বিনিময়ে, সমস্ত পবিত্র বিষয় যার অবমাননা নিষিদ্ধ তার জন্য রয়েছে কিসাসের ব্যবস্থা। সুতরাং যে কেউ তোমাদেরকে আক্রমণ করবে তোমরাও তাকে অনুরূপ আক্রমণ করবে এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রেখো, আল্লাহ মোত্তাকীদের সঙ্গে আছেন। আরও ইরশাদ হয়েছে : পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, বলুন, এতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাঁধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা মসজিদুল হারামে বাধা দান করা এবং এর বাসিন্দাকে উহা হতে বের করে দেয়া, আল্লাহর নিকট তদপেক্ষা অধিক অন্যায়, ফিতনা, হত্যা অপেক্ষা অধিক অন্যায়, তারা সর্বদা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে সে পর্যন্ত তোমাদেরকে ধর্ম হতে ফিরিয়ে না দেয়া, যদি তারা সক্ষম হয়। আরও ইরশাদ হয়েছে : তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। আরও ইরশাদ হয়েছে: যদি তোমরা মুমিন হও তবে আল্লাহকেই ভয় কর। মহররম ইসলামী আরবী সনের প্রথম মাস। এই মাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বরকতময়, ও ফযিলতের মাস। এই মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে মহান রাব্বুল আলামীন আল কুরআনের ৯ নং সূরা তাওবাহ এর ৩৬ নং আয়াতে ইরশাদ করেছেন : নিশ্চয়ই আকাশমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টির দিন হতে আল্লাহপাকের বিধানে মাসের সংখ্যা বারটি। তারমধ্যে চারটি মাস সম্মানীত ও অলঙ্খনীয় (যথা : জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব)। এই চারটি মাসের মধ্যে মহররম হলো অন্যতম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এই মাস যেমন বছরের প্রারম্ভ তেমনি সৃষ্টি জগতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই মাসে সম্পন্ন হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই মাসে বেদনা ও শোকের মাস, শোকরিয়া জ্ঞাপন ও নাজাত লাভের মাস, রহমত ও বরকতের মাস।

হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: সর্বোত্মম রোজা হলো রমযান মাসের রোজা। তারপর আল্লাহর মাস মহররম মাসের রোজা। (মিসকাত শরীফ এর/১৭৮ পৃ:)। হযরত আবু কাতাদাহ (রা:) হতে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোজার ওসিলায় আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত অতীতের এক বছরের সগীরা গোনাহ মাফ করে দেবেন। (মিশকাত শরীফ : ১/১৭৯)।

হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মহররম মাসের যে কোন তারিখে রোজা রাখবে, সে রোজার বিনিময়ে আল্লাহপাক তাকে একমাস রোজা রাখার সওয়াব দান করবেন। (তারীখ-ই কারবালা : ৯০ পৃ:)।

সুতরাং এ কথা খুবই প্রণিধানযোগ্য যে, নফল এবাদতের মাধ্যমে আল্লাহপাকের নৈকট্য লাভ করা সহজতর হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর অনুকরণ ও অনুসরণ পরিপূর্ণতা লাভ করে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) বর্ণিত হাদীস খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন : আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহপাক ও তাঁর রাসূলের অনুকরণ করা হতে হাত সরিয়ে নেবে, কিয়ামতের দিন নাজাতের জন্য তার সপক্ষে কোন দলিল থাকবে না। আর সে ব্যক্তি উপযুক্ত মোর্শেদের শিষ্য হওয়া ছাড়া মৃত্যু বরণ করবে, তার মৃত্যু হবে জাহেলী যুগের বেঈমান লোকদের মত। (সহীহ মুসলিম শরীফ : ২/১২৮ পৃ:)।

মহররম মাসে করণীয় নফল ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। তন্মেধ্যে রয়েছে প্রথম দশদিন রোজা রাখা, প্রত্যেহ সামর্থ অনুসারে নফল নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, যিকির-আজকার ও মোরাকাবা ও মোশাহাদায় নিমগ্ন থাকা। আশুরার দিন রোজা রাখার বিষয়টি সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট খুঁজে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা:) মদীনা মুনাওয়ারায় একদিন কতিপয় ইহুদীদের নিকট দিয়ে গমন করছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন তারা আশুরার দিবসের রোজা রেখেছে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কিসের রোজা? তারা উত্তর করল, এটা ঐদিন, যে দিন আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত হযরত মূসা (আ:) ও বনী-ইস্রাঈলকে নীল নদে নিমজ্জিত হওয়া থেকে উদ্ধার করেছেন। আর ফেরাউন ও তার সঙ্গী-সাথীদেরকে ডুবিয়ে মেরে ছিলেন। আর ঐ দিনে হযরত নূহ (আ:) এর নৌকা জুগী পর্বতে স্থিত হয়েছিল। ফলে হযরত মূসা (আ:) ও হযরত নূহ (আ:) আল্লাহপাকের অনুগ্রহের শোকরিয়া স্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন : হযরত মূসা (আ:)-এর ওপর আমার হকই বেশি এবং এইদিনে রোজা রাখার আমিই বেশি হকদার। আর সাহাবীদের বললেন : তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখ। আমিও রেখেছি। (মিশকাত শরীফ: ১/১৮০ পৃ:)।

ইসলামী আরবী সনের প্রথম মাস মহররম। এই মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। এই মাসের দশ তারিখে সংঘটিত হয়েছে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা। সে ঘটনা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও হৃদয়বিদারক। হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে আশুরার দিন শহীদ হয়েছিলেন বলেই সে আশুরার মর্যাদা ইসলামী শরীয়তে সমধিক তা নয়। বরং আশুরার দিনের মর্যাদার আরও কারণ আছে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত এমন অনেক মর্যাদাপূর্ণ ঘটনা রয়েছে যেগুলোর সাথে আশুরার দিবসটি ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত। নিম্নে আমরা সেগুলোর পরিচয় তুলে ধরতে প্রয়াস পাব। ইনশাআল্লাহ।

(১) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কলিজার টুকরা, জান্নাতী যুবকদের মর্যাদার সাইয়্যেদেনা ইমাম হুসাইন (রা.) ৬১ হিজরির ১০ই মহররম শুক্রবার আশুরার দিনে কারবালা প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গীদের মধ্যে ঐদিন ৭২ জন সত্যের নির্ভীক সৈনিক ও শাহাদাত বরণ করেন। তখন ইমাম হুসাইন (রা.)এর বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর ৬ মাস ১৫ দিন। (আল বিদায়া ওয়ান নেহায়া : ১/১৩২ পৃষ্ঠা)।

(২) মহররম মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত হযরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.)-এর তাওবাহ কবুল করেছিলেন। এই দম্পতি যুগল আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের নিকট বিনীতভাবে আরজ করেছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের উপর অন্যায়-অত্যাচার করেছি। আপনি যদি ক্ষমা না করেন ও দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো। (সুরা আ’রাফ : ক্রমিক নং-৭, আয়াত ২৩, পারা ৮, রুকু-২)।

(৩) আশুরার দিবসে হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদী পাহাড়ে অবস্থান করেছিল এবং তাঁর সাথীগণ জমিনে অবতরণ করেছিলেন এবং অবিশ্বাসী কাফেররা চিরতরে ধ্বংস হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে হযরত কাতাদাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে : রজব মাসের ১০ তারিখে হযরত নূহ (আ.) নৌকায় আরোহণ করেছিলেন এবং ১৫০ দিন ভ্রমণ করার পর নৌকাটি জুদী পর্বতের ওপর স্থিতিলাভ করে। সেখানে নৌকাটি একমাস অবস্থান করে। আশুরা দিবসে হযরত নূহ (আ.) দলবলসহ নৌকা থেকে জমিনে অবতরণ করেছিলেন। (সুরা হুদ : ক্রমিক নং-১১, আয়াত- ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৪, পারা-১২, রুকু-৪) এবং সুরা মুমিনুন : ক্রমিক নং-২৩, আয়াত ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, পারা-১২, রুকু-২)।

(৪) হযরত ইব্রাহীম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুন্ড হতে আশুরার দিবসেই মুক্তিলাভ করেছিলেন। জ্বলন্ত আগুন ফুলবাগানে পরিণত হয়েছিল। মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন : আমি হুকুম করলাম, হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের ওপর শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও। সঙ্গে সঙ্গে এই অনল কুÐটি হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জান্নাতে পরিণত হয়ে গেল। (সুরা আম্বিয়া, ক্রমিক নং-২১, আয়াত-৬৮, ৬৯, ৭০, পারা-১৭, রুকু-৫)।

(৫) হযরত মুসা (আ.) আশুরার দিন সদলবলে নীল নদ অতিক্রম করেছিলেন এবং আল্লাহদ্রোহী ফেরাউন ও তার সেনা বাহিনী নীলনদে নিমজ্জিত হয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেছিল। আর হযরত মুসা সর্বপ্রথম সেদিন আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের সাথে কথা বলেছিলেন, সে দিনটি ছিল আশুরার দিন। (সুরা ত্বাহা, ক্রমিক নং-২০, আয়াত-৭৭, ৭৮, পারা-১৬, রুকু-৪ এবং সুরা যুখরুফ, ক্রমিক নং-৪৩, আয়াত-৫৫, ৫৬, পারা-২৫, রুকু-৫)।

(৬) হযরত আইয়্যুব (আ:) দীর্ঘ ১৮ বছর যাবত কঠিন রোগ ভোগের পর আশুরার দিবসে আরোগ্য লাভ করেন। হযরত আইয়্যুব (আ:) ছিলেন হযরত ইসহাক (আ:) এর পৌত্র। তিনি ছিলেন সম্পদশালী, মস্তবড় ইবাদতকারী ও ধৈর্যশীল বান্দাহ। তাঁর এক হাজার ঘোড়া, দুই হাজার উট, এক হাজার ভারবাহী গাধা, এক হাজার গবাদি পশু, দশ হাজার বকরী এবং খেদমতগার হিসেবে পাঁচ শত দাস-দাসী ছিল। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত তাঁকে পরীক্ষায় ফেললেন। এক সময় তাঁর সকল ছেলে-মেয়ে মারা গেল। স্ত্রীগণ যার যার বাবার বাড়ীতে পাড়ি জমালেন, বিবি রহিমা ছাড়া। এ সময় তিনি কঠিন কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হলেন। বিবি রহিমা তাঁর খেদমত করতে লাগলেন। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত হযরত আইয়্যুব (আ:) এর প্রতি সুপ্রসন্ন হলেন এবং তাকে পরিপূর্ণ সুস্থ করে ছিলেন এবং সকল ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দিলেন। সে দিনটি ছিল মহররমের দশ তাখির, আশুরার দিন। (সূরা সোয়াদ:) ক্রমিক নং-৩৮, আয়াত-৪১, ৪২, ৪৩ পারা-২৩, রুকু-৪, সূরা আম্বিয়া: ক্রমিক নং ২১, আয়াত ৮৩, ৮৪, পারা ১৭, রুকু ৬)।

(৭) হযরত ইয়াকুব (আ:) তাঁর অতি আদবের সন্তান হযরত ইউসুফ (আ:) কে হারিয়ে বহুকাল ধরে যাতনা ভোগ করেছিলেন। হযরত ইউসুফ (আ:) আশুরার দিনেই অন্ধকার কূপ হতে উদ্ধার লাভ করেছিলেন এবং হযরত ইয়াকুব (আ:) আশুরার দিনেই দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন। অবশেষে আশুরার দিনেই পিতা ও পুত্রের মিলন ঘটেছিল। (সূরা ইউসুফ : ক্রমিক নং ১২, আয়াত ১৫-১০০, পারা-১২-১৩, রুকু-২-১১)।

(৮) হযরত দাউদ (আ:)-এর দোয়া আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আশুরার দিনে কবুল করেছিলেন এবং তার প্রতি রহমত বর্ষণ করেছিলেন। (সূরা সোয়াদ: ক্রমিক নং ৩৮, আয়াত ২৪, ২৫,পারা-২৩ রুকু-২)।

(৯) হযরত মরিয়ম (আ:) এর গর্ভ হতে হযরত ঈসা রুহুল্লাহ (আ:) এই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন আশুরার দিনেই। (সূরা আলে ইমরান: ক্রমিক নং ৩, আয়াত ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫, ৪৬, পারা ৩, রুকু-৫)।

(১০) হযরত ইউনুস (আ:) চল্লিশ দিন মাছের পেটে অবস্থান করার পর আশুরার দিনেই মুক্তিলাভ করেছিলেন। (সূরা আম্বিয়া: ক্রমিক নং ২১, আয়াত ৮৭, ৮৮, পারা ১৭, রুকু-৬)।

(১১) হযরত ইদ্রিস (আ:) কে জান্নাত হতে দুনিয়ায় পাঠানোর পর কান্নাকাটি করলে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত তাকে চতুর্থ আকাশে তুলে নেন আশুরার দিনেই। (সূরা মারয়াম : ক্রমিক নং ১৯, আয়াত ৫৬, ৬৭, ৫৮; পারা ১৬, রুকু-৪)।

(১২) হযরত সুলায়মান (আ:) আশুরার দিনেই সিংহাসন লাভ করেন এবং মানববসতী পূর্ণ গোটা বিশ্বের সম্রাট পদে আসীন হন। হযরত সুলায়মান (আ:) হাতের আংটি হারিয়ে সাময়িকভাবে সাম্রাজ্য হারা হলে মহান রাব্বুল ইজ্জত পুনরায় আশুরার দিনেই তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন। (সূরা নামল: ক্রমিক নং-২৭, আয়াত ১৫-৪৪, পারা-১৯, রুকু-২, ৩)।

(১৩) আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত সাগর, পাহাড়, প্রাণীকুল, আসমান, জমিন, তন্মদ্যস্থ সকল বস্তু আশুরার দিনেই সৃষ্টি করেছেন। (সূরা- নামল: ক্রমিক নং ২৭, আয়াত ৬০, ৬১, ৬২, ৬৩, ৬৪, পারা-২০, রুকু-৫)।

(১৪) হযরত ঈসা (আ:)কে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বহু অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী করে দুনিয়ার প্রেরণ করেছিলেন। হযরত ঈসা (আ:) জন্ম লাভের পর হতে দীর্ঘ তেত্রিশটি বছর ধরে দুনিয়ার মানুষকে হেদায়েতের পথে আহবান করেছিলেন। কিন্তু দুনিয়ার মানুষ তাঁর আহবানে সাড়া দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁকে আশুরায় দিনেই আসমানে তুলে নেন। (সূরা আলে ইমরান: ক্রমিক নং ৩, আয়াত ৫৫, ৫৬, পারা-৩, রুকু-৬)।

(১৫) মহররমের দশ তারিখ আশুরার দিনেই কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। সৃষ্টি জগতের সব কিছু ভেঙ্গে চুড়ে একাকার হয়ে যাবে। এক আল্লাহ ছাড়া সকল বস্তুর বিলুপ্তি সাধিত হবে। (সূরা-ইয়াসীন, ক্রমিক নং ৩৬, আয়াত ৫১, ৫২, ৫৩, পারা-২৩, রুকু-৪)।

উপর্যুক্ত আলোচনার নিরিখে এ কথা স্পষ্টই বলা যায় যে, মহররম মাসের দশ তারিখ আশুরার দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমামন্ডিত। এই দিন বিশ্বাসী বান্দাহদের উচিত বেশি বেশি করে নফল নামায আদায় করা, আশুরার রোজা রাখা এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বাস্তব জীবনের সর্বত্র তা আমলে পরিণত করা। কেননা সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়ে গেলেও এমন বহু বিষয় আছে, যা কালের খাতায়, ইতিহাসের পাতায় চিরকাল ভাস্বর হয়ে ফুটতে থাকে। মহররম ও আশুরা এরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর ব্যত্যয় হওয়ার জো নেই।

এবার অন্তপুরের বাইরে সৌদী মহিলারা !

8_r2_c48_r2_c1

৫৫০ বছরের পুরনো শাহী মসজিদ

shahi mosque 1a

shahi mosque 1b

উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে আরব বণিকদের ভূমিকা

horse rider arab

ড. মুহাম্মদ আবদুল হাননান : বাংলা ভাষায় যুদ্ধ-ইতিহাস নিয়ে ইতিহাসবিদরা খুব একটা কাজ করেছেন বলে মনে হয় না। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ইতিহাস লিখতে গিয়ে যুদ্ধের কথা এসেছে, কিন্তু আলাদাভাবে বিশেষ বিশেষ যুদ্ধ নিয়ে বড় কাজ এ দেশে হয়নি।

সত্যেন সেন এ ক্ষেত্রে একজন ব্যতিক্রমধর্মী ঐতিহাসিক; যদিও তাঁর প্রধান পরিচয় কথাসাহিত্যিক অথবা রাজনৈতিককর্মী কিংবা সংস্কৃতিসেবীও তাঁকে বলা যায়। তিনি ১৯৬৮ সালে রচনা করেন ‘মসলার যুদ্ধ’। নাম থেকে অনেক সময় বোঝা যায় না, এটা কী রকম একটা যুদ্ধ। কিন্তু এ গ্রন্থে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারতে সংঘটিত এক ভয়াবহ যুদ্ধের কাহিনি। এতে আরব বণিকদের এ দেশে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে ভূমিকাটিও উঠে এসেছে। যদিও সত্যেন সেন বাংলা-ভারতে ইসলাম প্রচার নিয়ে ইতিহাস লেখেননি, তিনি মধ্যযুগে মসলা বাণিজ্য নিয়ে ভারত-আরব ও ইউরোপের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তার একটি বিবরণ ইতিহাস থেকেও টেনেছেন। এতে দেখা যায়, আরব বণিকরা হাজার বছর আগে থেকেই এ দেশে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এসেছেন এবং এ দেশের সঙ্গে তাঁরা মিশেও গিয়েছিলেন। আর এর ফলে যখন হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আবির্ভূত হলেন, তখন এ আরব বণিকরাই বাণিজ্যের পাশাপাশি ইসলাম প্রচারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। ফলে বাংলা-ভারতে ইসলামের প্রসারটা ঘটেছিল সহজে ও সন্তর্পণে। আর এ কাজটা শুরু হয়েছিল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায়ই। সরাসরি সাহাবি (রা.)-দের জামাত বাংলাদেশ-ভারতে এসেছে, আবার এখানকার মানুষও মক্কা-মদিনায় গিয়ে সরাসরি মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরবর্তী যুগে খলিফাদের হাতে বাইয়াত হয়ে মুসলিম হয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, কেরালার রাজা পেরুমাল (পরিমল) প্রজাদের নিয়ে সরাসরি মুহাম্মদ (সা.)-এর হাতে বাইয়াত হয়ে মুসলিম হয়েছিলেন।

সত্যেন সেনের এই মসলার গ্রন্থটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন যুদ্ধ-কাহিনির অন্যতম। এ কাহিনিতে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন বাংলা-ভারতে আরব বণিকদের সমুদ্র বাণিজ্যের কথা :‘…কালিকটের বন্দরে অজস্র জাহাজের ভিড়। …আরব বণিক, গুজরাটের মুসলমান বণিক,এঁদের জাহাজই সংখ্যায় বেশি। চীনা বণিকদের জাহাজের আসা-যাওয়া আছে। …কিন্তু আরবের বণিকরা সব বণিককে ছাড়িয়ে উঠেছেন। বাণিজ্যে তাঁদের সঙ্গে কেউ এঁটে উঠতে পারে না। ’ (সত্যেন সেন : মসলার যুদ্ধ, দ্যু প্রকাশন, ঢাকা-২০১৬, পৃষ্ঠা ১৭) লেখক বর্ণনা করেছিলেন ১৪৮৮ খ্রিস্টাব্দের কথা। কিন্তু বর্ণনার পটভূমিটি দুই হাজার বছর আগের উপমহাদেশ :‘ভারতবর্ষের দক্ষিণতম প্রান্তে বর্তমান ম্যাঙ্গালোর থেকে কুমারিকা প্রণালি পর্যন্ত আরব সাগরতীরবর্তী যেই ভূভাগ, তার নাম মালাবার বা কেরল। …এই মালাবার অঞ্চল বহু প্রাচীন কাল থেকেই গোলমরিচের দেশ বলে খ্যাত। দুই হাজার বছর ধরে এখানকার বণিকরা মসলাপাতি, বস্ত্র, মণিমুক্তা, গজদন্ত প্রভৃতি পণ্যে জাহাজ বোঝাই করে নিয়ে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্য করে আসছে।’ (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৭)

মসলা বিষয়ে সমুদ্র বাণিজ্যে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন ইত্যাদির সঙ্গে বাংলাদেশের নামও জড়িয়ে রয়েছে। উপমহাদেশে পর্তুগিজদের সমুদ্র বাণিজ্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এফনসো অ্যালবুকার্কের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে ঐতিহাসিক লিখেছেন,‘জাভা, মোলাক্কাস ও ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য দ্বীপে এমন সব মসলা জন্মাত, যা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। সেই সব মসলা এসে জমত সেই মালাক্কার বন্দরে। এই মসলা নিয়ে বাণিজ্য করার আগে চীন, জাপান ও পশ্চিমে ভারতবর্ষ, আরব ও পারস্য থেকে বণিকরা এই বন্দরে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এ সম্পর্কে অ্যালবুকার্ক নিজেই লিখে গেছেন, প্রতিবছর মালাক্কায় ক্যাম্বে, চাওল, কালিকট, এডেন, মক্কা, জেদ্দা, করমণ্ডল, বাংলা, চীন গোর, …জাভা, পেন্ড ও অন্যান্য জায়গা থেকে জাহাজ আসে।’ (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা ৬৬)

আরবরা কিভাবে ও কখন ভারত সাম্রাজ্যে সমুদ্র বাণিজ্যে প্রবেশ করেছে, তার বিবরণ দিয়েছেন লেখক। সেটি ছিল একেবারে প্রাচীন ও আদিকাল :‘…প্রথম শতকে রোম সাম্রাজ্য ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। …ইউরোপের অন্ধকার যুগে এই সম্পর্কের ছেদ পড়ে গিয়েছিল। ইসলামের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আরব বণিকরা তাদের জায়গা দখল করে নিল। কিন্তু জায়গা দখল করে নিয়েই তারা ক্ষান্ত থাকেনি। দেশ-বিদেশের ঐশ্বর্য করায়ত্ত করার জন্য দুঃসাহসী আরব বণিকরা জীবন পণ করে দুরন্ত সমুদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন। ফলে আরব সাগর, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর আরব বণিকদের বাণিজ্য জাহাজে ছেয়ে গিয়েছিল।’ (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৪)

বাংলাদেশ, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে এ পটভূমিটি জানা প্রয়োজন ছিল। ইতিহাসবিদ এসব অঞ্চলে আরব বণিকদের অবস্থান ও প্রভাবটিও বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আরব বণিকরা শুধু বাইরে থেকেই এখানে বাণিজ্য করতে আসেন না। অনেক আরব বণিক এখানে বাণিজ্য করতে এসে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছেন। ’ (মসলার যুদ্ধ, পৃষ্ঠা ৪৪)

১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে বণিকের ছদ্মবেশে পর্তুগিজ ভাস্কো দা গামা ক্রুসেডীয় মনোভাব নিয়ে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষে পা রেখেছিলেন। তিনি এসে কী দেখলেন, কী অভিজ্ঞতা প্রথম পেলেন, কালিকটে (তৎকালীন ভারতের একটি প্রাচীন নৌবন্দর গবেষক) এসে ভাস্কো দা গামা নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করলেন। কালিকট বন্দর সম্পর্কে যেসব খবর তাঁরা সংগ্রহ করেছিলেন, তার মধ্যে প্রধান খবরটিই ছিল না। কালিকটে এসে আরব বণিকদের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি চমকে উঠলেন। আরো দেখলেন, এরা যে এখানে এসে শুধু পাকাপোক্তভাবে জায়গা করে নিয়েছে তা নয়, রাজসভার ওপরও তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এই আরবীয় মুসলমানরা তাঁদের নিকটতম শত্রু। (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭)

ভাস্কো দা গামা ও পর্তুগিজরা আরো একটি ভুল করেছিলেন। সেটি এই যে রোমের পোপের মতো তাঁরাও মনে করতেন, ভারতবর্ষের মানুষ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। সেই জন্য কালিকটের একটি হিন্দু মন্দিরকে গির্জা মনে করে তিনি উল্লসিত হয়ে উঠলেন। (মসলার যুদ্ধ, পৃষ্ঠা ৩৭)

পর্তুগালের তখন রাজা ছিলেন ডোম ম্যানুয়েল। তিনি নিজেকে ইথিওপিয়া, আরব, পারস্য ও ভারতের সমুদ্র এলাকার ‘প্রভু’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। আর খ্রিস্টানদের ধর্মনেতা রোমের পোপ সাহেবও পর্তুগিজদের ওপর তাঁর পবিত্র আশীর্বাদ ও সমর্থন বাণী পাঠান। পর্তুগিজরা ভারতবর্ষে তাদের বাণিজ্য ও খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সফর করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাহাজভর্তি সৈন্য ও যুদ্ধসামগ্রী পাঠাতে থাকে। প্রাথমিকভাবে তারা বাণিজ্য ঘাঁটি ও পাঁচজন পাদ্রির ধর্ম প্রচারের সুযোগ দাবি করে। কালিকটে স্থানীয় রাজা এর প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন। ইতিহাসবিদ সেন এর পর মন্তব্য করেছেন :‘পৃথিবীর সব দেশেই বণিকরা প্রাচীন কাল থেকে বাণিজ্য করে আসছে। কিন্তু এর আগে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেছে বলে শোনা যায়নি। …(পর্তুগিজদের রাজা) ডোম ম্যানুয়েল তো আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, কামানের গর্জনে আমাদের দাবি আদায় করে নেবে। …এ তো বর্বর জলদস্যুদের কাজ। কিন্তু মহামান্য পোপের বিধান অনুযায়ী পর্তুগালরাজ জলরাজ্যের অধিপতি। …সে থেকেই ভারত মহাসাগরের বুকে ভাস্কো দা গামা আর তাঁর সহচরদের নৃশংস যথেচ্ছাচার অব্যাহত গতিতে চলল। …মক্কা থেকে হজযাত্রীদের নিয়ে কয়েকটা নিরস্ত্র জাহাজ ফিরে আসছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে তারা পর্তুগিজ জাহাজের সামনে পড়ে গেল। জাহাজগুলো আটক করে সেগুলোর মধ্যে মালপত্র যা ছিল সব কিছু তুলে এনে জাহাজগুলোয় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু ভাস্কো দা গামার কড়া আদেশ ছিল, জাহাজে যেসব আরব আছে, তাদের যেন তুলে আনা না হয়। হতভাগা আরবরা সেই জাহাজের মধ্যে জ্বলে-পুড়ে মরল। ভাস্কো দা গামা পরম আনন্দে সেই দৃশ্য উপভোগ করলেন। (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৩৮-৪১)

পর্তুগিজ খ্রিস্টান বাহিনীর বর্বরতা কতটুকু ও তার মাত্রা কতখানি ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তার বিবরণ এ যুদ্ধ-ইতিহাসে দিতে গিয়ে সেন জানিয়েছেন, ‘গোয়া দখল করার পর অ্যালবুকার্ক পর্তুগাল রাজ ডোম ম্যানুয়েলের কাছে এ সম্পর্কে যে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছিলেন, গোয়ায় যেসব আরবি ছিল, আমরা তাদের সবাইকে হত্যা করেছি, আমাদের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি। আমরা তাদের মসজিদের মধ্যে আটকে রেখে, শেষে সেই মসজিদ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছি। (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬০)

সেন তাঁর যুদ্ধ-ইতিহাসে এই অ্যালবুকার্কের একটি বক্তৃতাও উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে এ পর্তুগিজ প্রতিপক্ষের সামনে সদম্ভে ঘোষণা করছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা মুসলমান নও, তারা কোনো ভয় কোরো না। আমরা তাদের কিছু বলব না। কিন্তু মুসলমান যারা, তাদের একটাকেও আমরা ছাড়ব না। আর এই হতভাগা মুসলমানদের যারা সাহায্য করতে বা বাঁচাতে চেষ্টা করবে, তাদেরও একই গতি হবে। তোমরা ভালো মানুষরা যে যেখানে আছ, সেখানেই চুপ করে থাকো। তোমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখো, আমাদের কাজ আমরা করি। (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৭)

অ্যালবুকার্কের নির্দেশে পর্তুগিজ দস্যুরা সেদিন আরব বণিকদের জাহাজগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিল। পুড়ে মরে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য জাহাজের লোকরা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিন্তু পর্তুগিজরা উল্লাসের সঙ্গে জলচর প্রাণীর মতো মুসলমানদের সেদিন হত্যা করেছিল। সেন লিখেছেন, ‘চীনা ও হিন্দু বণিকরা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে সে দৃশ্য দেখল।’ (পৃষ্ঠা ৬৮) আর অ্যালবুকার্ক পৈশাচিকভাবে বক্তৃতায় বলতে থাকে—‘এভাবে আমরা সব আরবকে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করব, মুহাম্মদের ধর্মের শিক্ষা চিরদিনের মতোই নিভিয়ে দেব, যাতে এরপর তা আর কোনো দিন জ্বলে উঠতে না পারে। এভাবেই আমরা আমাদের প্রভুর পবিত্র কর্তব্য সম্পন্ন করব। ’ (মসলার যুদ্ধ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৮)

মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের আগে ও পরে আরব বণিকরা কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত তথা উপমহাদেশে এভাবে প্রবেশ করেননি, পর্তুগিজ, ইংরেজরা যেভাবে উপমহাদেশ দখল করেছে। আরব বণিকরা ইসলামের আবির্ভাবের পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং দুনিয়ার সর্বত্র যেসব স্থানে তাদের আগে থেকেই বাণিজ্য ছিল, সেসব স্থানে নতুন ধর্মের বার্তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীন ছিল একই রুটের বাণিজ্যপথ। ইসলামও এই একই রুটে আরব বণিকদের দ্বারা প্রবেশ করেছে। তাঁরা জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন, জনগণও তাঁদের বরণ করে নিয়েছিল। এসব ঘটনা তুর্কি শাসক বখতিয়ার খলজির আগমনের অনেক আগেই ঘটেছিল, অন্তত ৬০০ বছর আগেই ঘটেছিল। প্রচারক মুসলমান হয়েই আরব বণিকরা এ দেশে থেকেছেন, এ জন্য দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ ও জাতি দ্বারা বাংলা-ভারত শাসিত হলেও আরবদের দ্বারা কখনো শাসিত হয়নি। আরব প্রচারক মুসলমানদের সঙ্গে তুর্কি শাসক মুসলমানদের পার্থক্য এখানেই ছিল। বরং তুর্কিরা এ দেশে এসে একটি তৈরি জমিনই পায়, আরব মুসলমানরা ইসলাম প্রচার করে যে জমিনটা আগেই তৈরি করে রেখেছিলেন। তাঁরা এটা তৈরি করেছিলেন নীরবে, দাওয়াতের কাজ দ্বারা, নিজেদের আচার-ব্যবহার, লেনদেনের সৌহার্দ্য দ্বারা, যা সদ্য মুসলিম হয়ে মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে তাঁরা শিখে এসেছিলেন। ফলে খ্রিস্টান অধ্যুষিত ইউরোপে দস্যুতার বিরুদ্ধে অভিযানে তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। আর এটাই ছিল ইসলাম প্রচারক আরব বণিকদের এক ট্র্যাজেডি। সত্যেন সেন গভীর মর্মবেদনায় লিখেছেন সেই যুদ্ধ-ইতিহাস।

সে সময় বাংলাদেশ-ভারত উপমহাদেশে পর্যায়ক্রমে সুলতানি ও মোগল শাসন চলছিল। এই শাসকরা ছিলেন ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন। ইসলাম প্রচারে তাঁদের বিশেষ কোনো ভূমিকা ছিল না, এমনকি যাঁরা তাবলিগ (ইসলাম প্রচার) করছিলেন, তাঁদেরও খোঁজখবর ও সমর্থন দেওয়া-নেওয়া থেকে তাঁরা ছিলেন উন্নাসিক। ফলে পাঁচ-ছয় শ বছর একটানা বিভিন্ন জাতির মুসলিম দ্বারা উপমহাদেশ শাসিত হলেও রাজা-বাদশাহ-সম্রাটদের দ্বারা ইসলাম সর্বজনীনের দ্বারে পৌঁছেনি। আর যখন এসব কথিত মুসলিম শাসক ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টানদের হাতে পরাজিত হয়ে সিংহাসন হারিয়েছেন, তখন দেখা গেল ভারত একটি অমুসলিমদের দেশ। তবু বাংলা-ভারতে যাঁদের ঘরে ইসলামের বাণী পৌঁছে গিয়েছিল, তাঁদের পেছনে মেহনত করার এক দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়েছিল আরব বণিক ও আরব মুসলমানদের। এভাবে আরবদের রক্তে ও ঘামে বাংলা-ভারতের মুসলিম সমাজের ঈমানি ঐতিহ্য এখনো সিক্ত হয়ে আছে।