আর্কাইভ

Archive for the ‘ইতিহাস’ Category

বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রণযন্ত্র ও সংবাদপত্র

first bd printing pressজোবায়ের আলী জুয়েল : বাংলাদেশে প্রথম কোথায় মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল নির্দিষ্টভাবে তা’ জানা যায়নি। তবে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে বলতে পারি, বাংলাদেশে প্রথম মুদ্রণ যন্ত্রটি স্থাপিত হয়েছিল, ঢাকা থেকে বেশ দূরে আমাদের রংপুরে। এখানে উল্লেখ্য যে, পূর্ববঙ্গের প্রথম দুটি বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা থেকে নয়, রংপুর থেকে। স্বাভাবিকভাবে হওয়ার কথা ছিল “ঢাকা” থেকে। কারণ বাংলার দ্বিতীয় শহর ছিল তখন ঢাকা (কলকাতার পরেই)। এর সমাজতাত্ত্বিক কারণ কি বলতে পারবো না। শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, পত্রিকা দু’টির উদ্যোক্তা ছিলেন অর্থশালী জমিদার এবং তাঁর ছিলেন বিদ্যোৎসাহী। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দু’টি পত্রিকাই সৌখিন কোনো কারণে প্রকাশিত হয় নাই। সংবাদপত্র প্রকাশ ও প্রচারের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তাঁরা মুদ্রণ যন্ত্র ক্রয় করেছিলেন। না হলে দীর্ঘ দিন পত্রিকা দু’টি টিকে থাকতো না। পূর্ববঙ্গের একমাত্র পত্রিকা হিসেবে প্রথমে “রঙ্গপুর বার্তাবহ” এবং তারপর “রঙ্গুপুর দিক প্রকাশ”-কে অন্যান্যরাও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। কলকাতার তৎকালীন প্রধান প্রধান কাগজগুলিতে উদ্ধৃতি করা হতো এ দুটি পত্রিকার সংবাদ।

১৮৪৭ সালের আগস্ট (ভাদ্র ১২৫৪) মাসে রংপুর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল “রঙ্গপুর বার্তাবহ”। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, রংপুর কুন্ডি পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকাটি। তবে অন্যান্য সূত্র থেকে অনুমান করে নিতে পারি যে, কালীচন্দ্র রায় প্রাথমিকভাবে সাহায্য করলেও পত্রিকাটির মালিক ছিলেন এর সম্পাদক গুরুচরণ রায়। ১০ বছর একটানা ব্যবহৃত হয়েছিল মুদ্রণ যন্ত্রটি। তারপর মুদ্রণ যন্ত্রটির ভাগ্যে কি ঘটেছিল জানা যায়নি। অনেকের অনুমান, রংপুরের কাকীনার ভূগোলক বাটির জমিদার শম্ভুচরণ রায় চৌধুরী এটি কিনেছিলেন। কারণ, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রকাশ করেছিলৈন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বাংলা সংবাদপত্র “রঙ্গপুর দিক প্রকাশ” (১৮৬০ খ্রি:)। পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য নতুন মুদ্রণ যন্ত্র হয়তো তিনি আর আমদানী করেননি। নিজ অঞ্চলের মুদ্রণ যন্ত্রটিই কিনে নিয়েছিলেন। “রঙ্গপুর দিক প্রকাশ (১৮৬০ খ্রি:)” এর সম্পাদক ছিলেন মধুসূদন ভট্টাচার্য।

এখন পর্যন্ত যেসব প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণাদি পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে বলতে পারি, ১৮৫৭ সালের আগে পূর্ববঙ্গে ৩টি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায়, একটি রংপুরে যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। বাকী দুটি ঢাকায়। ঢাকার একটি মুদ্রণ যন্ত্র ছিল মিশনারীদের, অন্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। পূর্ব বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাট বা সত্তর দশকে মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হতে থাকে। এ মুদ্রণ যন্ত্রগুলির কেনো ধারাবাহিক ইতিহাস-কোথাও দেখা হয় নাই। সরকারি রিপোর্ট বা গেজেটিয়ারে মাঝে মাঝে দু’একটি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাওয়া যায় মাত্র। ঢাকায় সরাসরি মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৬ সালে।

১৮৫৭ খ্রিন্টাব্দে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল দুটি মুদ্রণ যন্ত্র। কিন্তু ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে পূর্ববঙ্গের একমাত্র রংপুর ছাড়া আর কোথাও মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংবাদ জানা যায় না।

“রঙ্গপুর বার্তাবহ যন্ত্র” চালু হওয়ার সামান্য পরে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছিল ছাপাখানা। সেটি ছিল ঢাকার প্রথম ছাপাখানাগুলোর অন্যতম। এটি এখন ঢাকা নগর যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কালো রঙ্গের এই প্রাচীন মুদ্রণ যন্ত্রটিতে আভিজাত্য ও প্রাচীনত্ব দুই-ই যেনো মিশে রয়েছে।

১৯ শতকের প্রথম দু’তিন দশকে বাংলাদেশে আরও কয়েকটি মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮২৫ সালের ২২ জানুয়ারি “সমাচার দর্পণ” পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায় যে তখন দেশিয় লোকের পরিচালনাধীন ১১টি ছাপাখানার উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঢাকার প্রথম মুদ্রণযন্ত্র “বাঙ্গলাযন্ত্র” স্থাপিত ১৮৬০ সালে (১৩২৫ বাংলাসনে “ঢাকা প্রকাশ” পত্রিকায় প্রকাশিত)। ১২৬৭ বাংলা সনে ঢাকার সাহিত্য শীর্ষক এক প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে, বাঙ্গলা যন্ত্রের (১৮৬০ খ্রি:) স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র, দীনবন্ধু মৌলিক, ভগবান চন্দ্র বসু (আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর পিতা) ও কাশী কান্ত চট্টোপাধ্যায়।

বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সর্বপ্রথম সাময়িক পত্র হলো মনোরঞ্জিকা (১৮৬০ খ্রি:) এই মাসিক সাময়িক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (১৮৩৪-১৯০৭ খ্রি:)। কবিতা কুসুমাবলী এবং নীলদর্পন ছাপা হয়েছিল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বাবু বাজারে স্থাপিত এই “বাঙ্গলা যন্ত্র” নামক ছাপাখানা থেকে।

first bd printing machine & newspapersপরবর্তীতে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে এর মধ্যে ঢাকায় আরো ৬টি মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়েছিল। পূর্ববঙ্গে সে সংখ্যা ছিল ৪টি রংপুর (১৮৪৭ খ্রি:), রাজশাহী (১৮৬৮ খ্রি:), যশোর (১৮৬৮ খ্রি:), গীরিশযন্ত্র (১৮৬৮ খ্রি:) রাজশাহী। সিপাহী বিদ্রোহের সময় লর্ড ক্যানিং মুদ্রাযন্ত্র বিষয়ক আইন প্রণয়ন করলে রঙ্গপুর বার্তাবহ প্রচার রহিত হয়।

“রঙ্গপুর বার্তাবহ” এর সম্পাদক আদালতে এসে জানিয়েছিলেন তিনি আর পত্রিকা প্রকাশ করবেন না। রঙ্গপুর বার্তাবহ এর মুদ্রণ যন্ত্র থেকে সম্ভবত: ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হতে থাকে “রঙ্গুপুর দিক প্রকাশ” ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে সরকারী সূত্র অনুযায়ী জানা যায় ঐ জেলায় মাত্র একটি মুদ্রণ যন্ত্র আছে। সেখানে থেকে প্রকাশিত হয় রঙ্গপুর দিক প্রকাশ (১৮৬০ খ্রি:)

১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে “রঙ্গপুর” দিক প্রকাশের প্রচার সংখ্যা ছিল ২০০-এর মতো (উইলিয়াম হান্টারের গ্রন্থ থেকে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের স্ট্যাটিক্যাল আকাউন্স অব বেঙ্গল এর ৭ম খন্ডে রংপুর তথ্য)।

বৃহত্তর রংপুরে অবশ্য আরো ৪টি মুদ্রণ যন্ত্রের খোঁজ পাই। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত বই থেকে জানা যায়, ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম দিকে ৪/৫ মাইল দূরে হরিদেবপুরে ছিল “লোক রঞ্জন শাখা যন্ত্র”। বড়াই বাড়ি থেকে প্রকাশিত বইয়ে মুদ্রাকরের নাম পাওয়া গেছে, কিন্তু মুদ্রণ যন্ত্রের উল্লেখ নাই (সরকারি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী)। কুড়িগ্রামে ছিল বিভাকর যন্ত্র (১৮৯৪ খ্রি:) এবং মাহিগঞ্জ পদ্মাবর্তী যন্ত্র (১৮৯৪ খ্রি:)। তবে অনুমান করে নিতে পারি “লোক রঞ্জন” যন্ত্র আশির দশকে, বাকী ৩টি নব্বই দশকে এবং শেষোক্তটি নব্বই দশকের শেষে স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রংপুরে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থাপিত মুদ্রণ যন্ত্রের সংখ্যা ৬টি। নবাবগঞ্জেও একটি মুদ্রণযন্ত্রের নাম পাই “সরস্বতী যন্ত্র” (১৯০০ খ্রি.)।

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে এন্ডুজের ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয় ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের “এ গ্রামার অবদি বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ”। বাংলা প্রদেশে বাংলা অক্ষরে (ইংরেজি অক্ষরেও) ছাপা প্রথম বই হলো এটি। মুদ্রাকর ছিলেন ইংরেজ চালর্স ইউলিকন্স। বাংলা হরফ তৈরী করেছিলেন তিনি পঞ্চান্ন কর্মকারের সহায়তায়। এভাবেই হ্যালহেড, উইলকিনস্ আর পঞ্চান্ন কর্মকার বাংলা সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছেন।

১৭৮০ খৃস্টাব্দে জেমস্ আগাস্টাক হিকি বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র “বেঙ্গল গেজেট” ছেপেছিলেন।

বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে দেখা যায় “দিগদর্শনই” বাংলায় প্রকাশিত সর্বপ্রথম মাসিক পত্রিকা। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল এটি যশুয়া মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। “দিগদর্শনই” হলো ছাপার অক্ষরে প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র। এটি কেরীর শ্রী রামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে “দিগদর্শন” এক যুগান্তকারী ঘটনা। উইলিয়াম কেরী, জন ক্লাব মার্শম্যান, ফেলিকস্কেরী, জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, তারিণী চরণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তির আন্তরিক প্রচেষ্টায় “দিকদর্শন”… জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছায়।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের নাম ঢাকা নিউজ। ১৮৫৬ সালের ১৮ এপ্রিল এটি প্রকাশিত হয়। এই ইংরেজি সাপ্তাহিকটি বের হতো ঢাকা প্রেস থেকে। ঢাকায় প্রথম বাংলা সংবাদপত্র হলো “ঢাকা প্রকাশ”। ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার এটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১০০ বছর ধরে এই পত্রিকটি বেঁচে ছিল। এমন দীর্ঘায়ু পত্রিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত: দ্বিতীয়টি আর নেই। ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদার। পরবর্তীতে দীননাথ সেন, জগন্নাথ অগ্নিহোত্রী, গোবিন্দ্র প্রসাদ রায় এরাও এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

মুসলমান সম্পাদিত অবিভক্ত বাংলায় প্রথম সংবাদপত্র হচ্ছে শেখ আলীমূল্লাহ সম্পাদিত “সমাচার সভারাজ্যেন্দ্র”। এটি ১৮৩১ সালের ৭ মার্চ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। “সমাচার সভারাজ্যেন্দ্র” ফারসী ও বাংলা ভাষাতেই প্রকাশিত হতো। এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো ১৫৭ নং কলিঙ্গায়। আর্থিক দৈন্যতার কারণে ১৮৩৫ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

মুসলমান সম্পাদিত বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র হচ্ছে “পারিল বার্তাবহ”। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন আনিছ উদ্দিন আহমদ । ১৮৭৪ সালে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জের পারিল গ্রাম থেকে এই পাক্ষিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

পুরোপুরি দৈনিকের নিয়ে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা ছিল “দৈনিক আজাদ”। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর। প্রকাশক ছিলেন মাওলানা আকরাম খাঁ।

বাংলাদেশের এখন যতগুলো দৈনিক পত্রিকা রয়েছে তন্মদ্ধে সবচেয়ে পুরনো পত্রিকা হচ্ছে “দৈনিক সংবাদ” ও “দৈনিক ইত্তেফাক”। দৈনিক সংবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের ১৫ মে। ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী “ইত্তেফাক” বের করেন। তখন এটি ছিল সাপ্তাহিক। “ইত্তেফাক” দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর।

বাঙালীর জাতীয় জীবন ও বিকাশ ধারার ইতিহাসে ছাপাখানা ও সংবাদপত্র হচ্ছে প্রাণ শক্তির উৎসধারা। বাংলা ভাষা ও সংবাদপত্রের ইতিহাসে যে কয়েকজন বৈদেশিক মহান পুরুষ বাঙালী সমাজে প্রাত:স্মরণীয় ও পরম শ্রদ্ধেয় তাঁদের মধ্যে এক মহান পুরুষের নাম পাদরী উইলিয়াম কেরী, তারপরের জনই হলেন যশুয়া মার্সম্যান।

Advertisements

কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হারি

mata_hari_1মাহমুদ ফেরদৌস :১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর। ভোর বেলা। প্যারিসের সেইন্ট-ল্যজারে কারাগারের অভ্যন্তরের একটি সেল থেকে জাগিয়ে তোলা হলো এক বন্দীকে। হাতে দেওয়া হলো কাগজ, কলম, দোয়াত কালি আর খাম। বলা হলো, চাইলে দু’ খানা চিঠি লিখতে পারেন তিনি। নিজের কালো মোজা, উঁচু হিলের জুতাজোড়া, পশম আর মখমলের তৈরি পোশাক গুছিয়ে নিলেন তিনি। তারপর কাগজে হিজিবিজি লিখে জমা দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আমি প্রস্তুত।’

কিছুক্ষণ পরই ধূসর রঙের একটি সামরিক যান বের হলো কারাগার থেকে। ছুটলো প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক পুরোনো বন্দরে। গাড়ির ভেতর দু’ জন সেবিকা ও নিজের আইনজীবীর সঙ্গে বসে আছেন ৪১ বছর বয়সী ওই গোলন্দাজ নারী। পা অবদি লম্বা কোট তার পরনে। মাথায় টুপি।

গন্তব্যস্থলে তিনি যখন পৌঁছালেন তখন সময় সবে সকাল সাড়ে ৫টার চেয়ে একটু বেশি। তাকে দাঁড় করানো হলো ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ১২ ফরাসি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন নিজের বন্দুক হাতে নিয়ে। চোখ বাঁধার জন্য সাদা কাপড় দেওয়া হলো তাকে। কিন্তু তিনি নিতে চাইলেন না। ‘এটা কি পরতেই হবে?’ পাল্টা প্রশ্ন করলেন।

যখন তার দিকে বন্দুক তাক করে সৈন্যরা, তখনও তাদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়েছিলেন তিনি। তার এক হাত বেঁধে ফেলা হয়। অপর হাতে তিনি নিজের আইনজীবীর দিকে হাত নাড়েন। পরমুহূর্তেই সৈন্যদের রাইফেল গর্জে উঠে। পায়ে লাগে গুলি। হাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এক কর্মকর্তা এগিয়ে এসে রিভলবার বের করে তার মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

অথচ, এক দশক আগেও, এই নারীর পায়ের তলায় ছিল ইউরোপের বহু রাজধানী। তিনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য এক ‘রূপসী’। ভিনদেশি নগ্ন নাচের আবেদনে কাবু করে রেখেছিলেন কতশত মন্ত্রী, জেনারেল আর শিল্পপতিদের। ঘটনার দু’ বছর আগেও দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল তার। প্যারিসে এক প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটান তো, পরেরদিন হেগ শহরে আরেক প্রেমিকের সঙ্গে। রীতিমত আন্তর্জাতিক ‘সেক্স সিম্বল’ তিনি। নামেমাত্র পোশাক পরে নাচতেন। প্যারিসে তার নগ্ন নাচের আসর ছিল যেন তৎকালীন ইউরোপিয়ান অভিজাতদের ছোটখাটো সম্মেলন। মাতা হারি- এই এক নামে তাকে দুনিয়া চিনতো।

কিন্তু, এরপরই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পাল্টে গেল তার চেনাজানা জগত। তিনি অবশ্য ভেবেছিলেন আগের মতোই ইউরোপের ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে বরং তাকে মৃত্যুদ- পেতে হলো। তার অপরাধ? জার্মানির পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করা। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জার্মান প্রভুদের কাছে সরবরাহ করা। লুফে নিল পত্রপত্রিকাগুলো। তাকে দায়ী করা হলো হাজার হাজার মিত্রপক্ষীয় সৈন্যর মৃত্যুর কারণ হিসেবে।

কিন্তু আজ শত বছর পর ফরাসি সরকার যেসব নথিপত্র অবমুক্ত করেছে, তাতে এক ভিন্ন চিত্রই ফুটে উঠে। তার মৃত্যুর এত বছর ধরে তার সঙ্গে লেগে ছিল ডাবল এজেন্ট হওয়ার কলঙ্ক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ছিলেন স্রেফ একজন বলির পাঠা।

তার আসল নাম কিন্তু মাতা হারি নয়। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭৬ সালে। বাবা-মা নাম রাখেন মার্গারেথা জেল্লে। মাতা হারি নামটা কেন বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়েও আছে চমকপ্রদ তত্ব। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায়, এই নামের অর্থ ‘দিনের চোখ,’ অর্থাৎ সূর্য। আবার হারি নামে এক হিন্দু দেবতাও আছেন। তার আগে মাতা শব্দটিও লাগিয়ে থাকতে পারেন। দুই তত্বেরই ভিত্তি আছে। নিজেকে অনেক সময় তিনি জাভানিজ (ইন্দোনেশিয়ার একটি অঞ্চল) প্রিন্সেস বলে পরিচয় দিতেন। কখনও আবার ভারতের মন্দির নর্তকির মেয়ে হিসেবে। কিন্তু কখনই তিনি বলতেন না, তার জন্ম আসলে নেদারল্যান্ডে।

আর নেদারল্যান্ডে তার জন্মস্থান লিউওয়ার্ডেনের ফ্রাইজল্যান্ড মিউজিয়ামে তাকে নিয়ে শনিবার থেকে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে তার বিচারের অনেক নথিপত্র অবমুক্ত করা হয়। তার ব্যক্তিগত ও পারবারিক কয়েকটি চিঠিও প্রকাশ হয়। সবই আছে প্রদর্শনীতে। এসব নথিপত্র একসাথে মেলালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত এই গুপ্তচরের আরও বহু পরিচয় আছে।

ফ্রাইজল্যান্ড জাদুঘরের কিউরেটর হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“আমরা আসলে তার জীবনটা বুঝতে চেয়েছি। একজন বিশাল তারকা হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে। একজন শিশু হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে যিনি শুধু নর্তকিই ছিলেন না, বা গুপ্তচরই ছিলেন না। আমরা চাই তার পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে।”

তার জীবন ছিল প্রচ- ঘটনাবহুল, আর মর্মান্তিক। জন্ম হয়েছিল বেশ ধনী এক পরিবারে। কিন্তু তিনি যখন কিশোরী, অকস্মাৎ ধনসম্পদ হারিয়ে সংসারধর্ম ত্যাগ করেন তার পিতা। একলা মায়ের কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে সেই মা-ও মারা যান। অগত্যা, আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় হয় তার। ১৮ বছর বয়সে গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রুডলফ জন ম্যাকলিওডের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এই লোকের বয়স ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ। তার সঙ্গেই গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে এক সামরিক ঘাঁটিতে ৪ বছর ছিলেন তিনি। তখনই জাভানিজ ভাষায় তার হাতে খড়ি।

mata-hari-2তাদের দাম্পত্য জীবনকে ঝঞ্ঝাটময় বললে কম বলা হয়। প্রতিনিয়ত তিনি অকথ্য নির্যাতন সইতেন স্বামীর কাছ থেকে। নিজের ৩ বছর বয়সী ছেলেটাকে মারা যেতে দেখেন তিনি। সম্ভবত, গৃহকর্মীর দেওয়া বিষের কারণে। পরে এক মেয়ে হয় তার। ৪ বছর পর হল্যান্ডে ফিরলে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান মার্গারেথা (তার আসল নাম)। কিন্তু মেয়ের খরচ বহন করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে তিনি চলে যান প্যারিসে। মেয়েকে রেখে যান স্বামীর কাছে। নিজের এই মেয়েকে তিনি সবসময়ই মিস করতেন।

পরে প্যারিস থেকে নিজের প্রাক্তন স্বামীর এক কাজিনকে লেখা চিঠিতে মার্গারেথা জানান যে, সেখানে তিনি এক থিয়েটারে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি তাকে নামতে হয়েছে পতিতাবৃত্তিতেও। তিনি লিখেন, ‘ভেবো না যে, আমি আসলেই অনেক খারাপ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে আমি বাধ্য হয়েছি এ পথে নাম লেখাতে।’ তিনি নাকি এ-ও বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, যেসব নারী সংসার ছেড়ে পালান তারা পরবর্তী ঠিকানা হিসেবে প্যারিসকে খুঁজে পান।’ নিজের এই নর্তকি আর অভিনয় জীবনেই তিনি বেছে নেন ‘মাতা হারি’ নাম, যেটি পরে তার আসল নামকেও ছাপিয়ে যায়। এই জীবনেই তিনি অনেক অর্থ আর যশের মালিক হন। ভাবা হয়, জীবনের কোনো এক সময়ে তিনি মিলিয়নিয়ারও ছিলেন।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“তার বিরুদ্ধে যেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ, সেটি না থাকলেও, আজও  তাকে মানুষ স্মরণ করতো। গত শতাব্দীর প্রথমভাগে ইউরোপ জুড়ে তার যেই পরিচিতি ছিল, তাতেই তিনি অমর হয়ে থাকতেন। স্ট্রিপিং (নগ্ন নাচ)-কে তিনিই কমবেশি নাচের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কাছে তার ছবির অ্যালবাম আছে। তার ছবি সম্বলিত সংবাদপত্রের স্তূপ এখনও আছে। তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ইউরোপের সেলেব্রেটি ছিলেন।”

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনকেন্দ্রীক আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে তার গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়ই। অথচ, আজ এত বছর পর জানা যাচ্ছে যে, তিনি জার্মানদের কাছে তেমন কোনো তথ্যও দেননি। যেমন, হয়তো তিনি বলতেন যে, এই বসন্তে হামলা চালাতে পারে মিত্রবাহিনী। কিন্তু এই তথ্য সবারই জানা ছিল।

অথচ, হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে। মূলত, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার পরিচিতি প্রাপ্তি, জার্মানি ও ফ্রান্স – উভয় পক্ষের সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, আর যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপজুড়ে ঘোরাঘুরি- এ সবই তার বিপক্ষে কাজ করেছে। আর তার জীবনযাপনের ধরণ নিশ্চিতভাবেই তার পক্ষে যায়নি।

এতদিন ধরে অনেক ইতিহাসবিদই তাকে নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপক্ষে গিয়ে তার পক্ষালম্বন করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে আসলে বলি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধের পর নিজেদের অজস্র ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে একজন জুতসই গুপ্তচর দরকার ছিল ফরাসিদের, যাকে কিনা শূলে চড়ানো যাবে। আর নষ্টা চরিত্রের মাতা হারি এক্ষেত্রে ছিলেন পারফেক্ট বলি।

ফরাসি সেনারা এই ভয়েও ছিলেন যে, মাতা হারি ফরাসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার মেলামেশার কথাও ফাঁস করে দিতে পারেন। এদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ জেনারেলও ছিলেন। এ কারণেই তাকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।

আবার এ-ও সত্য যে, ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে অনেক ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়, ফরাসি গোয়েন্দারা আগেই বৃটিশদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তাকে জার্মান গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে। হাতেনাতে ধরতেই তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতেও এটাও জানা যায় যে, বৃটিশরা যেসব কারণে তাকে সন্দেহ করেছিল, তার কোনো যুক্তিযুক্ততা ছিল না। বৃটিশ গোয়েন্দারা তাকে লন্ডনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বলা হয়, প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও,তিনি একজন সাহসী ধাঁচের মহিলা, যাকে সন্দেহ থেকে ফেলা যায় না।

স্পেনের মাদ্রিদে জার্মান সামরিক অ্যাটাশে আর্নল্ড ভন কালের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এই আর্নল্ডই নিজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাতা হারিকে নিজেদের গুপ্তচর হিসেবে ইঙ্গিত দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান। এই টেলিগ্রাম ফরাসি কর্মকর্তাদের হাতে যায়। এটিই ছিল মাতা হারির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদই একে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন।

তাদের যুক্তি, ফরাসিরা যে জার্মান টেলিগ্রামে আড়ি পাততে পারেন, সেটা জার্মানরা অনেক আগ থেকেই জানতো। তাহলে, এমন সংবেদনশীল তথ্য টেলিগ্রামে কেন পাঠিয়েছিলেন আর্নল্ড ভ্যান? কারণ, তিনি চেয়েছিলেন যে, এই চিঠি ফরাসিদের হাতে পড়–ক। আর তারা এই চিঠির ভিত্তিতে নিজেদের গুপ্তচরকেই ফাঁসি দিয়ে দিক। হয়েছেও তাই।

আবার অনেকে বলেন, যেই টেলিগ্রামের কথা বলা হয়, সেটির অনুদিত অংশই প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে। সেটির জার্মান ভাষায় লেখা মূল কপি কোথায়? কেউ কি তবে, এসব জালিয়াতি করে বানিয়েছে মাতা হারিকে ফাঁসানোর জন্য?

তবে মামলার কৌঁসুলির কিছু নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, মাতা হারি নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, ১৯১৫ সালে যুদ্ধ চলাকালে হেগ শহরে জার্মানরা তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তখন তিনি যুদ্ধে আটকা পড়ে ফ্রান্সে ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছিলেন। তখনই আর্মস্টারডামে জার্মান এক কূটনীতিক ফ্রান্সে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে জার্মানির পক্ষে গুপ্তচরগিরি করার প্রস্তাব দেন। উপায় না পেয়ে তিনি রাজি হন। তিনি যুক্তি দেখান যে, মিত্রবাহিনীর প্রতিই তার আনুগত্য ছিল সবসময়। ফরাসি গোয়েন্দারা যখনই তার সাহায্য চেয়েছে, তখনই তিনি এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার এই যুক্তি ধোপে টেকেনি।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলছিলেন,“উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ছিল মাতা হারির। তাদের সঙ্গে ঘুরতেন, নাচতেন। এমনকি এক সঙ্গে থাকতেনও। অথচ, যুদ্ধের সময় যখন তিনি বিপদে পড়েন, ওই কর্মকর্তারাই তার বিরুদ্ধে চলে যান। এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে নিশ্চয়ই তার কষ্ট হয়েছিল।”

মৃত্যুদ- কার্যকরের পর কেউই মাতা হারির মৃতদেহ দাবি করতে আসেনি। তাই প্যারিসের এক মেডিকেল কলেজে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে এটি শিক্ষার্থীদের ব্যবচ্ছেদ শেখাতে ব্যবহৃত হতো। তার মাথার কঙ্কাল অবশ্য অ্যানাটমি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ২০ বছর আগে জাদুঘরে জিনিসপত্রের গণনা চলাকালে দেখা যায়, কঙ্কালটি নেই। ধারণা করা হয়, কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

(ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।)

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধীরাই পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গের জন্য উন্মত্ত

undivided bengal mapমোহাম্মদ আবদুল গফুর :গত ১৬ অক্টোবর সোমবার যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দেশে পালিত হয়ে গেল বঙ্গভঙ্গ দিবস। ১৯০৫ সালে বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষে এই দিনে প্রধানত শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তদানীন্তন বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীকে বিভক্ত করে ঢাকা রাজধানীসহ ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করা হলে দীর্ঘ অবহেলিত মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার উন্নয়নের কিঞ্চিৎ সুবিধা হবে বিবেচনা করে এ অঞ্চলের তদানীন্তন অবিসম্বাদিত জননেতা নবাব সলিমুল্লাহ এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পক্ষান্তরে এর ফলে কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদাররা পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এর বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন সৃষ্টি করে বসেন। 

ইতিহাস পাঠকদের জানা থাকার কথা, ১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের মধ্যদিয়ে এদেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত নব্য শাসকদের একটা নীতিই হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, জমিদারী, আয়মাদারী, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রভৃতি সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে বেছে বেছে মুসলমানদের উৎখাত করে যেসব স্থানে ইংরেজ অনুগত হিন্দুদের বসানো। পলাশী বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক বছর পর ১৭৯৩ সালে পূর্বতন ভূমি-নীতি বদলিয়ে চিরস্থায়ীবন্দোবস্ত নামের নতুন ভূমি ব্যবস্থার মাধ্যমে যে নব্য জমিদার গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয় তার সিংহভাগই ছিল ইংরেজ অনুগত হিন্দু।

মুসলমানরাও সাতসমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে আসা ইংরেজদের শাসন কিছুতেই সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। মীর কাসিমের যুদ্ধ, মজনু শাহেব নেতৃত্বাধীন ফকীর আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধ, হাজী শরীয়তুল্লাহ-দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন প্রভৃতি ছাড়াও মহীশুরের হায়দার আলী-টিপু সুলতানদের লড়াই, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর নেতৃত্বাধীন জিহাদ আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত বিভিন্ন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন হারানো স্বাধীনতা ফিরে পেতে। কিন্তু বৃহত্তর প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের অসহযোগিতা এবং ইংরেজ শাসকদের প্রতি তাদের সমর্থনের ফলে মুসলমানদের এসব লড়াইয়ের প্রত্যেকটাতে তাদের পরাজয় হয়ে পড়ে এক অনিবার্য বাস্তবতা।

পক্ষান্তরে নব্য শাসকদের প্রতি এদেশের হিন্দু নেতৃবৃন্দের সমর্থনের ফলে ইংরেজরা তাদের স্বাভাবিক মিত্র হিসাবেই দেখতে পেয়েছেন এতদিন। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ফলে এই মিত্রদের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়াতে ইংরেজ শাসকরা বিব্রত বোধ করতে থাকেন এবং মাত্র ছয় বছরের মাথায় ইংরেজ শাসকরা বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষণা করে পুরাতন মিত্রদের মনোরঞ্জনের প্রয়াস পান। বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষিত হওয়ায় পূর্ববঙ্গের অবিসম্বাদিত জননেতা নবাব সলিমুল্লাহ অত্যন্ত বিক্ষুদ্ধ হন। তাঁর ক্ষোভ প্রহসনের লক্ষ্যে তাঁর অন্যতম দাবী ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয় ইংরেজ সরকার।

কিন্তু এতেও কলিকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের নিদারুন অসন্তোষ। বঙ্গ-ভঙ্গের বিরুদ্ধে তাদের যুক্তি (কুযুক্তি!) ছিল এর দ্বারা বঙ্গ-মাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ হবে। ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাদের কুযুক্তি ছিল এর দ্বারা নাকি বঙ্গ-সংস্কৃতি দ্বিখন্ডিত করার মত অন্যায় করা হবে। কিন্তু তাদের আরেকটি বক্তব্যে তাদের আসল মতলব ফাঁস হয়ে যায়। তাদের এ বক্তব্য ছিল : পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত মুসলমান চাষা-ভূষা, তাই তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ পূর্ববাংলার মানুষরা অশিক্ষিত চাষাভূষা, তারা অশিক্ষিত চাষাভূষাই থাক, তাদের শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই। তাদের এই বিদ্বেষী মনোভাবের দরুন প্রতিশ্রুতি ঘোষণার দীর্ঘ ১০ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯২১ সালে।

এসব ছিল ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাশের আগের কথা। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন পাশের পর অবস্থা অনেকটাই পালটে যায়। ঐ আইনে প্রদেশের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনেকটাই হস্তান্তরিত হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় প্রথম ১৯৩৭ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতেই এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে এরপর মুসলিম প্রধান এ প্রদেশে মুসলমানদের হাতেই সরকারের নেতৃত্ব থাকবে। বাস্তবেও দেখা যায় সেটাই। ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনআমলের শেষ দিনগুলোতে প্রথমে এ. কে. ফজলুল হক, তার পর খাজা নাজিমুদ্দিন, সর্বশেষে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলায় প্রাদেশিক প্রধান মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে সম্রাজ্যবাদী বৃটিশ শাসনের অবসান হয়। এ সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সারিতে অবস্থান ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের। প্রথমটির দাবী ছিল ভারতকে অবিভক্ত কাঠামোতে স্বাধীনতা দিতে হবে। দ্বিতীয়টি অর্থাৎ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের দাবী ছিল : সমগ্র ভারতবর্ষকে হিন্দু ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে বিভক্ত করে উত্তর পশ্চিম ও পূর্ব দিকের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় একাধিক স্বতন্ত্র স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুসলিম লীগের এই প্রস্তাবই ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাস্তবতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও বৃটিশ সরকার এই লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই উপমহাদেশের স্বাধীনতার কাঠামো নির্বাচনে সম্মত হয়।

যদিও এই লাহোর প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তান শব্দ ছিল না, মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার খবর পর দিন হিন্দু পত্রিকাসমূহ প্রকাশিত হয় “পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত” এই শিরোনামে। পরবর্তীকালে মুসলিম লীগও লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত স্বাধীন রাষ্ট্রকে পাকিস্তান বলে স্বীকার করে নিয়ে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে পাকিস্তান আন্দোলন হিসাবেই গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালে বাস্তবে এ রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তা পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসাবেই পরিচিতি লাভ করে।

দেড় হাজার মাইলের অধিক দূরত্বে অবস্থিত ভৌগোলিকভাবে বৈরী-রাষ্ট্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুই ভূখন্ড মিলে একটি রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে প্রায় নেই বললেই চলে। এই বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় রেখেছিলেন লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক ও সমর্থক নেতারা। তাই লাহোর প্রস্তাবে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখিত ছিল যে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে যে একাধিক রাষ্ট্র গঠিত হবে তা হবে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম। তবে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ টিকেটে নির্বাচিত আইন সভার সদসদের নিয়ে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী কর্তৃক উত্থাপিত ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়, লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখিত একাধিকের বদলে আপাতত পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র হিসাবেই পরিচালিত হবে। জনাব সোহরওয়ার্দী তাঁর এই প্রস্তাব উত্থাপনকালে যে ভাষণ দেন, তাতে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছেন, পাকিস্তানই আপনার শেষ দাবী কিনা। এ প্রশ্নের কোন জবাব আমি দেব না। তবে একথা আমি অবশ্যই বলব বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানই আমার প্রধান দাবী।” অর্থাৎ তিনি অদূর ভবিষ্যতে উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পুর্বাঞ্চলে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাতিল করে দিলেন না।

তাছাড়া ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামের দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে মুসলিম লীগের জনাব হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী ও জনাব আবুল হাশিম এবং কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতার যৌথ উদ্যোগে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলে। বিশস্ত সূত্রে জানা যায়, এই উদ্যোগের প্রতি মুসলিম লীগের নেতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহরও সমর্থন ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল প্রমুখ অবাঙ্গালী নেতৃবৃন্দ এবং হিন্দু মহাসভার বাঙ্গালী নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর প্রবল বিরোধিতার কারণে এই উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সে সময় শেষোক্ত বাঙালী নেতা (শ্যামাপ্রসাদ) এমনও বলে ছিলেন, ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ হতেই হবে। নইলে বাংলার হিন্দুরা চিরতরে বাঙ্গালী মুসলমানের গোলামে পরিণত হবে। এতে কী প্রমাণিত হয়? প্রমাণিত হয় যে বাঙালী মুসলমানের চাইতে অবাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্ব তাঁর কাছে অধিক কাম্য ছিল।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধীরাই ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। যারা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ বলে বিবেচনা করতেন, তারা ১৯৪৭ সালে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদকে অবশ্য পালনীয় পূণ্য বলে বিবেচনা করেন কি শুধু তাদের মুসলিম বিদ্বেষের কারণে? আসলে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ তাদের কাছে কখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা রাজধানীসহ “পূর্ব বঙ্গ ও আসাম” নামের নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ব বঙ্গে অবস্থিত কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কায়ই তারা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন সৃষ্টি করে ছিলেন। বঙ্গভঙ্গকে যদি তারা বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপই বিবেচনা করতেন, তা হলে মাত্র তিন দশক পর সাতচল্লিশে এসে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপ করতে তারা মরিয়া হয়ে উঠতেন না।

সাতচল্লিশে এসে তারা বাঙ্গালী মুসলমানের পরিবর্তে অবাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্বকে বরণ করতে সার্বভৌম বাংলা আন্দোলনকে যেভাবে ব্যর্থ করে দেন, তাতে প্রমাণিত হয় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তারা যে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের অভিযোগ এনেছিলেন তা ছিল ভূয়া, আসলে পূর্ববঙ্গে অবস্থিত জমিদারীতে কলিকাতা প্রবাসী হিন্দু জমিদারদের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কাই ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার মূল কারণ।

সাতচল্লিশে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে বাঙ্গালীদের বৃহত্তর সর্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরোধিতা করে অবাঙ্গালী ভারতীয় নেতৃত্বকে বরণ করে নেয়ার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের কথা ছিল একটা ডাহা মিথ্যা বাহানা। আসলে তারা চেয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। নেহায়েৎ পার্থিব স্বার্থেই যে সেদিন তারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন, বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের মত পাপের ভয়ে নয়, তা প্রমাণিত হয় সাতচল্লিশে যখন তারা ভঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জন্য উম্মত্ত হয়ে ওঠেন। আসলে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের বিষয় ১৯০৫ সালে তাদের কাছে কখনও আসল বিবেচ্য ছিল না। পূর্ববঙ্গে অবস্থিত জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কাই তাদের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ঠেলে দিয়েছিল। সাতচল্লিশে ঐরকম কোন আশঙ্কা না থাকায় তারা নিজেরা তথাকথিত বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের জন্য উম্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন।

নজরুল সাহিত্যে মহররম – শেখ দরবার আলম

এক

নজরুল সাহিত্যে মোহররম, এই বিষয়টার ওপর যদি লিখতে হয় তা হলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় যে, ইসলাম কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে ছিল একটা আশ্রয়। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিই মুসলিম জাতিসত্তা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। তামাম বিশ্বের মুসলিম সভ্যতা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। কোরআন এবং সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আশ্রয়। মুসলিম উম্মার ঐক্য ও সংহতি ছিল তাঁর কাছে একটা অত্যন্ত কাক্সিক্ষত বিষয়। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আদর্শ মানুষ ছিলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সাম্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের আর্থ-সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় যে সব জায়গায় উল্লেখ করেছেন সেইসব জায়গায় তিনি যে মুসলমান ঘরের সন্তান, এই কথাটুকু বলে ক্ষান্ত হতে চাননি। তিনি বারংবার বলেছেন এবং লিখেছেন যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং নবীর উম্মত; কিন্তু তিনি কবি সবার। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার। এদিক দিয়েও বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভূমিকা অনন্য।

দুই

বাংলা সাহিত্যে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের বাংলাভাষীদের মধ্যে ইশ্বর গুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত বড় বড় কবি-সাহিত্যিকরা জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী, মনুসংহিতার সমাজের কবি-সাহিত্যিক হিসাবে লেখালেখি করেছেন এবং সেইভাবেই মূলত কাজ করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বোধ হয় অনুশীলন সমিতির সভ্য মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো এবং অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ লোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের মতো ও যুগান্তর দলের সভ্যদের মতো বলতে চাইতেন যে তিনি নাস্তিক। এ কথা বললে যথার্থ অহিন্দুদের কাছে এবং নাস্তিকদের কাছে হয়তো গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদী, শিখ, এ রকম কোন ধর্মাবলম্বীর কেউ নাস্তিক হইলে তাতে ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বিশ্বের মজুলম মুসলমানদের কারো কোনো উপকার হয় না। তাঁরা নিজ নিজ ধর্ম নিষ্ঠার সাথে পালন করলে তাতে মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ তাদের কোনো ধর্ম গ্রন্থেই মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবে শনাক্ত করে বা কল্পনা করে জাতীয়তাবাদী হয়ে মজলুম মুসলমানদের অধিকার বঞ্চিত করে সাম্প্রায়িক হওয়ার এবং এর চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে ফ্যাসিবাদী হওয়ার কোনো সংস্থান নেই।

তিন

এই বাস্তবতাটা, এই সত্যটা আমাদের সবারই স্মরণ রাখা উচিত যে,হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাংলাভাষীর বাংলা ভাষা অনেকাংশে এক হলেও তৌহীদবাদী মুসলমানদের বাংলা ভাষা এবং পোত্তলিক হিন্দুদের বাংলাভাষা সর্বাংশে এক নয়। অনুরূপভাবে তৌহীদবাদী মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং পৌত্তলিক হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতি, সাংস্কৃতি সহাবস্থানের দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা উচিত। আমি এইসব কথাগুলো অপরিহার্য প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই লিখছি। কেননা, এই কথাগুলো সবারই চিন্তা করে দেখা উচিত।

জাতীয়তাবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজ প্রধান স্বাধীন ভারতে মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুর পঠন-পাঠনের সংস্থান সেখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। সে সুযোগ এই মুসলিমপ্রধান দেশেও এখানকার স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় নেই। মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানোর ফলে খোদ পাকিস্তান আমল থেকেই এ রকম একটা অবস্থা সৃষ্টি হতে পেরেছে। এ দেশে যারা ইসলামী আন্দোলন করেন তাঁরাও এই বিষয়টির দিকে কখনো নজর দেননি।

চার

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের এক জাতিতত্ত¡ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তামাম ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলমান সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুসলিম সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা ও এই মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য-সঙ্গীত মুছে ফেলার অংশ হিসেবে এ ক্ষেত্রে নজরুল চর্চার পথও রুদ্ধ করার বন্দোবস্ত হয়েছে। কিন্তু নিজ নিজ সমাজের মানুষ হলেও হিন্দুর ভাষা এবং সাহিত্য হবে এরকম এবং মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য হবে অন্য রকম।

পাঁচ

অন্যতম রবীন্দ্র জীবনীকার প্রশান্ত কুমার পাল কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত রবিজীবনীতে লিখেছেন যে, আধুনিক বাঙালি বলতে যাদেরকে বোঝায় তারা এসেছেন বৈদিক ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে। ঠিক অনুরূপভাবে আমরা যদি অষ্টম শতাব্দী থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিকে চোখ রাখি তাহলে আমরা উপলব্ধি করতে পারবো যে, সাহিত্যিক ও সমাজসেবী সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মতো, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো, সাহিত্যিক-সাংবাদিক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের মতো এবং মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো, মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের মতো, মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানরাও এসেছেন ভারতের বাইরের সাধারণত আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্য এশিয়া থেকে। এভাবে আমরা দেখছি যে, আধুনিক বাঙালি হিন্দুদের যেমন রয়েছে বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের হিন্দু জাতিসত্তার উত্তরাধিকার; অনুরূপভাবে ঠিক তেমনি আধুনিক বাংলাভাষী মুসলমানদেরও রয়েছে মুসলমান সমাজের ইতহিাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তার উত্তরাধিকার।

ছয়

আরবী ভাষাভাষী এলাকা ইরাকের বাগদাদে থাকতে নজরুলের পূর্বপুরুষরা ছিলেন আরবভাষী। হিন্দুস্তানে অর্থাৎ ভারতে এসে তাঁর পূর্ব পুরুষরা এক সময়ে হয়েছিলেন ফার্সীভাষী। পরে উর্দুভাষী।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু পূর্ববর্তী সভাপতি এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদের পূর্বপুরুষরাও আরব থেকে এসেছিলেন। মওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবদ্দশায়ও তাঁদের পরিবারেরা, মওলানারা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন কেবল আরবী ভাষায়। মওলানা আবুল কালাম আজাদের পরিবারেরা পুরুষরা বাইরের মানুষজনদের সঙ্গে কথা বলতেন উর্দু ভাষায়।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ) কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাদের পরিবারে আরবি, ফার্সী এবং উর্দু ভাষার চর্চা ছিল। তাঁর আব্বা কাজী ফকীর আহমদ বাংলাভাষাও খুব ভালো মতো শিখেছিলেন। নজরুল তাঁর শৈশবে এবং বাল্যেই শিখেছিলেন আরবী, ফার্সী, উর্দু এবং বাংলা কাজী নজরুল ইসলামের যখন জন্ম হয় তখন তাদের পরিবারের লোকেরা গৃহপরিবেশে কথাবার্তা বলতেন উর্দু ভাষায়।

সাত

১৭৫৭-র ২৩ জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের আগে কথ্য বাংলা এবং দলিল দস্তাবেজ এবং চিঠিপত্রের বাংলা ছিল আরবি-ফার্সী শব্দবহুল বাংলা। তখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষরাও পরিবারিক পর্যায়েও ফার্সী ভাষা চর্চা করতেন। রাজভাষা হিসেবেও ব্যবহারিক জীবনে ফার্সী ভাষার চর্চা তো করতেনই।

পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের বেয়াল্লিশ বছর সাত মাস পর ক্রসেডের চেতনাসম্পন্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী খ্রিস্টান সমাজের পাদ্রী উইলিয়াম, কেরির নেতৃত্বে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশনে সংস্কৃতের পন্ডিত রামরাম বসুর তালিমে আরবী-ফার্সি শব্দ বর্জিত এবং সংস্কৃত শব্দ বহুল খ্রিস্টান ধর্মীয় গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সাবেক পাদুকা নির্মাতা পাদ্রী উইলিয়াম কেরী এর এক বছর দু’মাস পর ১৮০১-এর মে মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়ে অধীনস্ত সংস্কৃততজ্ঞ পন্ডিতদের সহযোগিতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলাভাষা শেখানোর জন্য আরবী ফার্সী শব্দ বর্জিত কেবল নয়, তামাম মুসলিম সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা বর্জিত পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করলেন। কালক্রমে এই ধরনের বাংলা পাঠ্যপুস্তকই স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সটির পাঠ্য হলো।

শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠার এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ বছর পর মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)-এর জন্ম। পাঠশালায় এবং স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে এবং সে সময়কার হিন্দুদের লেখা সাহিত্যে আরবী-ফার্সী বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল যে ধরনের বাংলা ভাষার প্রচলন মীর মশাররফ হোসেন দেখেছিলেন ঠিক সে ভাষাতেই তিনি ইসলামের ইতিহাসের কারবালার ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন “বিষাদ সিন্ধু”। (১৮৮৫-১৮৯১)।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম মীর মশাররফ হোসেনের জন্মের বাহান্ন বছর পর। তিনিও কেবল পাঠশালায় নয়, মক্তবে এবং স্কুলেও আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দ বহুল বাংলাই শিখেছিলেন। হিন্দুদের লেখা অন্যান্য কাব্য এবং সাহিত্যেও শিখেছিলেন এই একই ভাষা। কিন্তু মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে তিনি যখন কাব্য ও সাহিত্য সৃষ্টি করলেন এবং গান লিখলেন তখন এই বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি বিধান করে তিনি সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ যথাসম্ভব বর্জন করে ব্যবহার করলেন প্রচুর আরবী-ফার্সী শব্দ।

প্রথমে শ্রীরামপুর মিশনে এবং পরে আরো ব্যাপকভাবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে খ্রিস্টান পাদ্রী এবং সংস্কৃতজ্ঞ হিন্দু পন্ডিতরা মিলে একশ বিশ বছর আগে উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই যেমন দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, লিখিত বাংলা ভাষা হবে সম্পূর্ণরূপে আরবি-ফার্সী শব্দ বর্জিত সংস্কৃত শব্দবহুল ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যে-সঙ্গীত হবে কেবল হিন্দু সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক হিন্দু জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য ও সঙ্গীত, ঠিক তেমনি এই ধারার বিপরীতে এর এক শত বিশ বছর পর সেনাবাহিনী মুসলিমপ্রধান অবিভক্ত বাংলা মুল্লুকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর কবি কাজী নজরুল ইসলামও দেখিয়েছিলেন মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত বহুলাংশে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বাংশে তৎসম শব্দ অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দ বণ্টন করেও লেখা যায়।

আট

নজরুল সেনাবাহিনী থেকে কলকাতায় ফিরেছিলেন উনিশ শ’ বিশ সালের মার্চ মাসে। এর চার মাস পর ১৩৩৯ হিজরীর পহেলা মোহররম ছিল ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ৩০ ভাদ্র মোতাবেক ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর। নজরুল তখন শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত দৈনিক নবযুগের অন্যতম সহযোগী সম্পাদক। থাকেন কলকাতার ৮/এ টার্নার স্ট্রীটে তার সহকর্মী ও সুহৃদ মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে। সামনে ১০ মোহররম ১৩৩৯ হিজরী (৮ আশ্বিন ১৩২৭ মোতাবেক ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯২০) তারিখ শুক্রবার আশুরা। মাসিক মোসলেম ভারত এর প্রথম বর্ষ : প্রথম খন্ড : ষষ্ঠ সংখ্যার জন্য তিনি লিখলেন তার বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয় ইসলামী কবিতা মোহররম। প্রথম দুটো পঙক্তি লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, সেখানে কোনো তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ নেই। নজরুল শুরুতেই অত্যন্ত আবেগ ও দরদ দিয়ে এবং গভীর মমত্ববোধ মিশিয়ে লিখেছেন:

নীল সিয়া আস্মান লালে লাল দুনিয়া

আম্মা! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।

আরবী ফার্সী শব্দ বহুল এই বাংলা পড়ে কারো বলার সাধ্য নেই যে, বাঙলা ভাষা সংস্কৃতির দুহিতা। সংস্কৃতি শব্দ স্বদেশী শব্দ এবং আরবী ফার্সী শব্দ বিদেশী শব্দ। নত্ববিধান এবং ষত্ববিধান কেবল সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের জন্য প্রযোজ্য! ভাষাতত্ত্ববিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ইন্তেকালের এবং ভাষাতত্ত্ববিদ সনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পরলোক গমনের এতোদিন পর এবং ধনিতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আবদুল হাই সাহেবের ইন্তেকালের এতদিন পর আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা বিভাগে যখন ভাষাতত্ত¡বিদ নেই, ধ্বনিতত্ত¡বিধ নেই, তখন কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকরণে আমাদের মুসল্লী প্রুফ রীডাররাও আমাদের শেখাচ্ছেন যে, ইরান বানানের মূর্ধন্য ণ মূধা বা মস্তক থেকে অর্থাৎ জিহবাগ্র তালুতে স্পৃষ্ট করে উচ্চার্য নয়; কেননা, এটা সংস্কৃতি বা তৎসম শব্দ নয়। আমাদের ওপর অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আরোপের লক্ষ্যে এ সবই এখন চলছে।

নজরুলের জীবদ্দশা সুস্থাবস্থায় বাংলাভাষী মুসলমানরাও যে বাংলাভাষী মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐহিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরস্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে সচেতন ছিলেন সেটা সাতচল্লিশের মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলিম মালিকানাধীন এবং মুসলিম সম্পাদিত সাময়িকপত্রগুলো লক্ষ করলেই উপলব্ধি করা যায়। বাংলা সাহিত্যে নজরুল একমাত্র বড় কবি যিনি প্রতিবেশী সমাজের জন্য কীর্তন, ভজন এবং স্যামাসঙ্গীত পর্যন্ত লিখেছিলেন। সেখানে নজরুল কোন আরবী ফার্সী শব্দ ব্যবহার করেননি। নজরুল বিশ্বাস করতেন যে বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষারও আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। বাংলাভাষী মুসলমানদের সংস্কৃতি ও বাংলাভাষী হিন্দুর সংস্কৃতি এক নয়। বাংলাভাষী মুসলমানদের ভাষা এবং সংস্কৃতির সর্বনাশ ঘটে গেছে ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্টের পর।

বাংলাভাষী মুসলমানদের মুসলমান হিসেবে বাঁচার অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্ট পূর্ববর্তীকালের মুসলমান জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটির পাঠ্য তালিকায় উপযুক্ত মর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করার অপরিহার্য প্রয়োজন আছে। নজরুলের মোহররম কবিতা উপলক্ষে এই উল্লেখটা করলাম।

লেখক : নজরুল গবেষক, ইতিহাসবিদ।

মহররম ও আশুরা একটি তাত্ত্বিক সমীক্ষা

ashura sacrificeএ,কে,এম ফজলুর রহমান মুনশী : ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। মহররম শব্দটি আরবী ভাষায় ব্যবহার অনুসারে নাম বাচক বিশেষ্য নয়, বরং গুণবাচক বিশেষণ। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে প্রাচীন মক্কার বছরের প্রথম দু’টি মাস ছিল প্রথম সফর ও দ্বিতীয় সফর। প্রাচীন আরবী ভাষায় সাফারাইলি এই দ্বিবাচনিক রূপ দেখে তা’ স্পষ্টতই বুঝা যায়।

প্রাচীন আরব বছরের প্রথম অর্ধ বছরে তিনটি মাস ছিল এবং এই তিনটি মাসের প্রত্যেকটিতে দু’টি করে মাস ছিল। অর্থাৎ দুই সফর, দুই রবী ও দুই জুমাদা। দুই সফরের প্রথমটি অলঙ্ঘনীয় পবিত্র মাসগুলোর (আশহুরে হুরুম) অন্যতম ছিল বলে এর গুণবাচক আখ্যা দেয়া হয়ে ছিল ‘মহররম’। ধীরে ধীরে তা-ই মাসের নাম হয়ে গেছে। এভাবেই প্রথম সফর মাসটি ‘মহররম’ মাস নামে এবং অলঙ্খনীয় মাসগুলোর প্রথম মাস হিসেবে কালের খাতায়, ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে।

মহান রাব্বুল আলামীন বছর ও সময় গণনার রীতি-পদ্ধতী চিরদিনের জন্য বিধিবদ্ধ করার লক্ষ্যে কুরআনুল কারীমের ৯নং সূরা তাওবাহ-এর ৩৬ ও ৩৭ নং আয়াতে ঘোষণা করেছেন : আকাশ-মন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় বারটি মাস রয়েছে। তন্মধ্যে চারটি হলো অলঙ্খনীয়। নিষিদ্ধ মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করবে, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে এবং জেনে রেখো, আল্লাহ মোত্তাকীদের সঙ্গে আছেন। এই যে (অলঙ্ঘনীয়) মাসকে পিছিয়ে দেয়া কেবল কুফুরীকে বৃদ্ধি করা মাত্র যা দ্বারা কাফেরগণকে বিভ্রান্ত করা হয়। তারা উহাকে কোন বছরে বৈধ করে এবং কোন বছরে অবৈধ করে, যাতে তারা আল্লাহপাক যেগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন, সে গুলোর গণনা পূর্ণ করতে পারে। অনন্তর আল্লাহপাক যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা হালাল করতে পারে। তাদের মন্দ কাজগুলোকে তাদের জন্য শোভনীয় করা হয়েছে; আল্লাহপাক অবশ্যই কাফির সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। (সূরা তাওবাহ: আয়াত নং ৩৬,৩৭, পারা ১০, রুকু-৫)।

পবিত্র মাসগুলোতে মুসলমানদের কর্তব্য নির্ধারণ করে আল কুরআনের ২নং সূরা বাকারাহ-এর ১৯৪নং আয়াতে ও ২১৭নং আয়াতে এবং ৫নং সূরা মায়িদাহ এর ২নং আয়াতে ও ৫৭ নং আয়াতে মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন : পবিত্র মাস পবিত্র মাসের বিনিময়ে, সমস্ত পবিত্র বিষয় যার অবমাননা নিষিদ্ধ তার জন্য রয়েছে কিসাসের ব্যবস্থা। সুতরাং যে কেউ তোমাদেরকে আক্রমণ করবে তোমরাও তাকে অনুরূপ আক্রমণ করবে এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রেখো, আল্লাহ মোত্তাকীদের সঙ্গে আছেন। আরও ইরশাদ হয়েছে : পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, বলুন, এতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাঁধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা মসজিদুল হারামে বাধা দান করা এবং এর বাসিন্দাকে উহা হতে বের করে দেয়া, আল্লাহর নিকট তদপেক্ষা অধিক অন্যায়, ফিতনা, হত্যা অপেক্ষা অধিক অন্যায়, তারা সর্বদা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে সে পর্যন্ত তোমাদেরকে ধর্ম হতে ফিরিয়ে না দেয়া, যদি তারা সক্ষম হয়। আরও ইরশাদ হয়েছে : তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। আরও ইরশাদ হয়েছে: যদি তোমরা মুমিন হও তবে আল্লাহকেই ভয় কর। মহররম ইসলামী আরবী সনের প্রথম মাস। এই মাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বরকতময়, ও ফযিলতের মাস। এই মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে মহান রাব্বুল আলামীন আল কুরআনের ৯ নং সূরা তাওবাহ এর ৩৬ নং আয়াতে ইরশাদ করেছেন : নিশ্চয়ই আকাশমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টির দিন হতে আল্লাহপাকের বিধানে মাসের সংখ্যা বারটি। তারমধ্যে চারটি মাস সম্মানীত ও অলঙ্খনীয় (যথা : জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব)। এই চারটি মাসের মধ্যে মহররম হলো অন্যতম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এই মাস যেমন বছরের প্রারম্ভ তেমনি সৃষ্টি জগতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই মাসে সম্পন্ন হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই মাসে বেদনা ও শোকের মাস, শোকরিয়া জ্ঞাপন ও নাজাত লাভের মাস, রহমত ও বরকতের মাস।

হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: সর্বোত্মম রোজা হলো রমযান মাসের রোজা। তারপর আল্লাহর মাস মহররম মাসের রোজা। (মিসকাত শরীফ এর/১৭৮ পৃ:)। হযরত আবু কাতাদাহ (রা:) হতে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোজার ওসিলায় আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত অতীতের এক বছরের সগীরা গোনাহ মাফ করে দেবেন। (মিশকাত শরীফ : ১/১৭৯)।

হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মহররম মাসের যে কোন তারিখে রোজা রাখবে, সে রোজার বিনিময়ে আল্লাহপাক তাকে একমাস রোজা রাখার সওয়াব দান করবেন। (তারীখ-ই কারবালা : ৯০ পৃ:)।

সুতরাং এ কথা খুবই প্রণিধানযোগ্য যে, নফল এবাদতের মাধ্যমে আল্লাহপাকের নৈকট্য লাভ করা সহজতর হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর অনুকরণ ও অনুসরণ পরিপূর্ণতা লাভ করে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) বর্ণিত হাদীস খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন : আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহপাক ও তাঁর রাসূলের অনুকরণ করা হতে হাত সরিয়ে নেবে, কিয়ামতের দিন নাজাতের জন্য তার সপক্ষে কোন দলিল থাকবে না। আর সে ব্যক্তি উপযুক্ত মোর্শেদের শিষ্য হওয়া ছাড়া মৃত্যু বরণ করবে, তার মৃত্যু হবে জাহেলী যুগের বেঈমান লোকদের মত। (সহীহ মুসলিম শরীফ : ২/১২৮ পৃ:)।

মহররম মাসে করণীয় নফল ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। তন্মেধ্যে রয়েছে প্রথম দশদিন রোজা রাখা, প্রত্যেহ সামর্থ অনুসারে নফল নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, যিকির-আজকার ও মোরাকাবা ও মোশাহাদায় নিমগ্ন থাকা। আশুরার দিন রোজা রাখার বিষয়টি সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট খুঁজে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা:) মদীনা মুনাওয়ারায় একদিন কতিপয় ইহুদীদের নিকট দিয়ে গমন করছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন তারা আশুরার দিবসের রোজা রেখেছে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কিসের রোজা? তারা উত্তর করল, এটা ঐদিন, যে দিন আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত হযরত মূসা (আ:) ও বনী-ইস্রাঈলকে নীল নদে নিমজ্জিত হওয়া থেকে উদ্ধার করেছেন। আর ফেরাউন ও তার সঙ্গী-সাথীদেরকে ডুবিয়ে মেরে ছিলেন। আর ঐ দিনে হযরত নূহ (আ:) এর নৌকা জুগী পর্বতে স্থিত হয়েছিল। ফলে হযরত মূসা (আ:) ও হযরত নূহ (আ:) আল্লাহপাকের অনুগ্রহের শোকরিয়া স্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন : হযরত মূসা (আ:)-এর ওপর আমার হকই বেশি এবং এইদিনে রোজা রাখার আমিই বেশি হকদার। আর সাহাবীদের বললেন : তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখ। আমিও রেখেছি। (মিশকাত শরীফ: ১/১৮০ পৃ:)।

ইসলামী আরবী সনের প্রথম মাস মহররম। এই মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। এই মাসের দশ তারিখে সংঘটিত হয়েছে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা। সে ঘটনা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও হৃদয়বিদারক। হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে আশুরার দিন শহীদ হয়েছিলেন বলেই সে আশুরার মর্যাদা ইসলামী শরীয়তে সমধিক তা নয়। বরং আশুরার দিনের মর্যাদার আরও কারণ আছে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত এমন অনেক মর্যাদাপূর্ণ ঘটনা রয়েছে যেগুলোর সাথে আশুরার দিবসটি ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত। নিম্নে আমরা সেগুলোর পরিচয় তুলে ধরতে প্রয়াস পাব। ইনশাআল্লাহ।

(১) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কলিজার টুকরা, জান্নাতী যুবকদের মর্যাদার সাইয়্যেদেনা ইমাম হুসাইন (রা.) ৬১ হিজরির ১০ই মহররম শুক্রবার আশুরার দিনে কারবালা প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গীদের মধ্যে ঐদিন ৭২ জন সত্যের নির্ভীক সৈনিক ও শাহাদাত বরণ করেন। তখন ইমাম হুসাইন (রা.)এর বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর ৬ মাস ১৫ দিন। (আল বিদায়া ওয়ান নেহায়া : ১/১৩২ পৃষ্ঠা)।

(২) মহররম মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত হযরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.)-এর তাওবাহ কবুল করেছিলেন। এই দম্পতি যুগল আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের নিকট বিনীতভাবে আরজ করেছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের উপর অন্যায়-অত্যাচার করেছি। আপনি যদি ক্ষমা না করেন ও দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো। (সুরা আ’রাফ : ক্রমিক নং-৭, আয়াত ২৩, পারা ৮, রুকু-২)।

(৩) আশুরার দিবসে হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদী পাহাড়ে অবস্থান করেছিল এবং তাঁর সাথীগণ জমিনে অবতরণ করেছিলেন এবং অবিশ্বাসী কাফেররা চিরতরে ধ্বংস হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে হযরত কাতাদাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে : রজব মাসের ১০ তারিখে হযরত নূহ (আ.) নৌকায় আরোহণ করেছিলেন এবং ১৫০ দিন ভ্রমণ করার পর নৌকাটি জুদী পর্বতের ওপর স্থিতিলাভ করে। সেখানে নৌকাটি একমাস অবস্থান করে। আশুরা দিবসে হযরত নূহ (আ.) দলবলসহ নৌকা থেকে জমিনে অবতরণ করেছিলেন। (সুরা হুদ : ক্রমিক নং-১১, আয়াত- ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৪, পারা-১২, রুকু-৪) এবং সুরা মুমিনুন : ক্রমিক নং-২৩, আয়াত ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, পারা-১২, রুকু-২)।

(৪) হযরত ইব্রাহীম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুন্ড হতে আশুরার দিবসেই মুক্তিলাভ করেছিলেন। জ্বলন্ত আগুন ফুলবাগানে পরিণত হয়েছিল। মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন : আমি হুকুম করলাম, হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের ওপর শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও। সঙ্গে সঙ্গে এই অনল কুÐটি হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জান্নাতে পরিণত হয়ে গেল। (সুরা আম্বিয়া, ক্রমিক নং-২১, আয়াত-৬৮, ৬৯, ৭০, পারা-১৭, রুকু-৫)।

(৫) হযরত মুসা (আ.) আশুরার দিন সদলবলে নীল নদ অতিক্রম করেছিলেন এবং আল্লাহদ্রোহী ফেরাউন ও তার সেনা বাহিনী নীলনদে নিমজ্জিত হয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেছিল। আর হযরত মুসা সর্বপ্রথম সেদিন আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের সাথে কথা বলেছিলেন, সে দিনটি ছিল আশুরার দিন। (সুরা ত্বাহা, ক্রমিক নং-২০, আয়াত-৭৭, ৭৮, পারা-১৬, রুকু-৪ এবং সুরা যুখরুফ, ক্রমিক নং-৪৩, আয়াত-৫৫, ৫৬, পারা-২৫, রুকু-৫)।

(৬) হযরত আইয়্যুব (আ:) দীর্ঘ ১৮ বছর যাবত কঠিন রোগ ভোগের পর আশুরার দিবসে আরোগ্য লাভ করেন। হযরত আইয়্যুব (আ:) ছিলেন হযরত ইসহাক (আ:) এর পৌত্র। তিনি ছিলেন সম্পদশালী, মস্তবড় ইবাদতকারী ও ধৈর্যশীল বান্দাহ। তাঁর এক হাজার ঘোড়া, দুই হাজার উট, এক হাজার ভারবাহী গাধা, এক হাজার গবাদি পশু, দশ হাজার বকরী এবং খেদমতগার হিসেবে পাঁচ শত দাস-দাসী ছিল। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত তাঁকে পরীক্ষায় ফেললেন। এক সময় তাঁর সকল ছেলে-মেয়ে মারা গেল। স্ত্রীগণ যার যার বাবার বাড়ীতে পাড়ি জমালেন, বিবি রহিমা ছাড়া। এ সময় তিনি কঠিন কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হলেন। বিবি রহিমা তাঁর খেদমত করতে লাগলেন। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত হযরত আইয়্যুব (আ:) এর প্রতি সুপ্রসন্ন হলেন এবং তাকে পরিপূর্ণ সুস্থ করে ছিলেন এবং সকল ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দিলেন। সে দিনটি ছিল মহররমের দশ তাখির, আশুরার দিন। (সূরা সোয়াদ:) ক্রমিক নং-৩৮, আয়াত-৪১, ৪২, ৪৩ পারা-২৩, রুকু-৪, সূরা আম্বিয়া: ক্রমিক নং ২১, আয়াত ৮৩, ৮৪, পারা ১৭, রুকু ৬)।

(৭) হযরত ইয়াকুব (আ:) তাঁর অতি আদবের সন্তান হযরত ইউসুফ (আ:) কে হারিয়ে বহুকাল ধরে যাতনা ভোগ করেছিলেন। হযরত ইউসুফ (আ:) আশুরার দিনেই অন্ধকার কূপ হতে উদ্ধার লাভ করেছিলেন এবং হযরত ইয়াকুব (আ:) আশুরার দিনেই দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন। অবশেষে আশুরার দিনেই পিতা ও পুত্রের মিলন ঘটেছিল। (সূরা ইউসুফ : ক্রমিক নং ১২, আয়াত ১৫-১০০, পারা-১২-১৩, রুকু-২-১১)।

(৮) হযরত দাউদ (আ:)-এর দোয়া আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আশুরার দিনে কবুল করেছিলেন এবং তার প্রতি রহমত বর্ষণ করেছিলেন। (সূরা সোয়াদ: ক্রমিক নং ৩৮, আয়াত ২৪, ২৫,পারা-২৩ রুকু-২)।

(৯) হযরত মরিয়ম (আ:) এর গর্ভ হতে হযরত ঈসা রুহুল্লাহ (আ:) এই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন আশুরার দিনেই। (সূরা আলে ইমরান: ক্রমিক নং ৩, আয়াত ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫, ৪৬, পারা ৩, রুকু-৫)।

(১০) হযরত ইউনুস (আ:) চল্লিশ দিন মাছের পেটে অবস্থান করার পর আশুরার দিনেই মুক্তিলাভ করেছিলেন। (সূরা আম্বিয়া: ক্রমিক নং ২১, আয়াত ৮৭, ৮৮, পারা ১৭, রুকু-৬)।

(১১) হযরত ইদ্রিস (আ:) কে জান্নাত হতে দুনিয়ায় পাঠানোর পর কান্নাকাটি করলে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত তাকে চতুর্থ আকাশে তুলে নেন আশুরার দিনেই। (সূরা মারয়াম : ক্রমিক নং ১৯, আয়াত ৫৬, ৬৭, ৫৮; পারা ১৬, রুকু-৪)।

(১২) হযরত সুলায়মান (আ:) আশুরার দিনেই সিংহাসন লাভ করেন এবং মানববসতী পূর্ণ গোটা বিশ্বের সম্রাট পদে আসীন হন। হযরত সুলায়মান (আ:) হাতের আংটি হারিয়ে সাময়িকভাবে সাম্রাজ্য হারা হলে মহান রাব্বুল ইজ্জত পুনরায় আশুরার দিনেই তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন। (সূরা নামল: ক্রমিক নং-২৭, আয়াত ১৫-৪৪, পারা-১৯, রুকু-২, ৩)।

(১৩) আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত সাগর, পাহাড়, প্রাণীকুল, আসমান, জমিন, তন্মদ্যস্থ সকল বস্তু আশুরার দিনেই সৃষ্টি করেছেন। (সূরা- নামল: ক্রমিক নং ২৭, আয়াত ৬০, ৬১, ৬২, ৬৩, ৬৪, পারা-২০, রুকু-৫)।

(১৪) হযরত ঈসা (আ:)কে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বহু অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী করে দুনিয়ার প্রেরণ করেছিলেন। হযরত ঈসা (আ:) জন্ম লাভের পর হতে দীর্ঘ তেত্রিশটি বছর ধরে দুনিয়ার মানুষকে হেদায়েতের পথে আহবান করেছিলেন। কিন্তু দুনিয়ার মানুষ তাঁর আহবানে সাড়া দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মহান রাব্বুল আলামীন তাঁকে আশুরায় দিনেই আসমানে তুলে নেন। (সূরা আলে ইমরান: ক্রমিক নং ৩, আয়াত ৫৫, ৫৬, পারা-৩, রুকু-৬)।

(১৫) মহররমের দশ তারিখ আশুরার দিনেই কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। সৃষ্টি জগতের সব কিছু ভেঙ্গে চুড়ে একাকার হয়ে যাবে। এক আল্লাহ ছাড়া সকল বস্তুর বিলুপ্তি সাধিত হবে। (সূরা-ইয়াসীন, ক্রমিক নং ৩৬, আয়াত ৫১, ৫২, ৫৩, পারা-২৩, রুকু-৪)।

উপর্যুক্ত আলোচনার নিরিখে এ কথা স্পষ্টই বলা যায় যে, মহররম মাসের দশ তারিখ আশুরার দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমামন্ডিত। এই দিন বিশ্বাসী বান্দাহদের উচিত বেশি বেশি করে নফল নামায আদায় করা, আশুরার রোজা রাখা এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বাস্তব জীবনের সর্বত্র তা আমলে পরিণত করা। কেননা সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়ে গেলেও এমন বহু বিষয় আছে, যা কালের খাতায়, ইতিহাসের পাতায় চিরকাল ভাস্বর হয়ে ফুটতে থাকে। মহররম ও আশুরা এরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর ব্যত্যয় হওয়ার জো নেই।

স্মার্টফোন যেসব যন্ত্রপাতিকে অপ্রয়োজনীয় করে দিয়েছে !

smartphone made them extinct

৫৫০ বছরের পুরনো শাহী মসজিদ

shahi mosque 1a

shahi mosque 1b