আর্কাইভ

Archive for the ‘ইতিহাস’ Category

অতীত : জানা না জানা

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

thinking 34ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী :এই গল্পটি আমার এক বন্ধুর মুখে শোনা। গল্পের ঘটনাস্থল দেশের উত্তরাঞ্চলের এক হাইস্কুল। জীবদ্দশায়ই ওই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সরকারের এক অবসরপ্রাপ্ত সচিবের বিদ্যোৎসাহী পিতা। আশপাশের মাইল পাঁচেকের মধ্যে কোনো হাইস্কুল ছিল না, পিছিয়ে পড়া নিজ এলাকার লোকদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যেই স্কুলের প্রতিষ্ঠা। পিতার অবর্তমানে দেখ-ভাল করতেন সচিব সাহেব। সরকারি অর্থে বেশ ভৌত নির্মাণ কাজও স্কুলে হয়েছে। ওই ধরনের ভৌত কাজ সচরাচর প্রত্যন্ত এলাকায় দেখা যায় না। প্রতিষ্ঠানটিতে এখন উচ্চ মাধ্যমিক অবধি পড়ানো হচ্ছে।

অবসরে চলে যাওয়ার পর গ্রামে গেলে প্রতি যাত্রায়ই স্কুলে যেতেন সচিব সাহেব। ভদ্রলোক ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন। ইতিহাস বিষয়ের একটি বইও নাকি লিখেছেন, বললেন বন্ধুটি। তবে ভাষার সুবোধ্যতার অভাবে বইটি পাঠকপ্রিয় হয়নি। যে উদ্দেশ্যে এই লেখাটি তৈরি। মাস তিনেক আগে দেশের বাড়ি গিয়ে স্কুলে গিয়েছিলেন ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করতে। স্কুল নিয়ে নতুন কোনো চিন্তা-ভাবনা আছে কি-না তাদের, এসব নিয়ে আলোচনা করতে। স্কুলে মিলনায়তন ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে সচিব সাহেব স্কুলের ক্লাস ঘরটির পারটেক্সের তৈরি মুভাবল পার্টিশনটি সরিয়ে ফেলতে বললেন (এভাবে চারটি কক্ষ একত্র করে হল কক্ষ বানিয়ে স্বাধীনতা দিবস, ভাষা শহীদ দিবস, বিজয় দিবস প্রভৃতি জাতীয় অনুষ্ঠান করা হয়)। সচিব সাহেবের ইচ্ছা ছাত্রছাত্রীদের বাংলাদেশের ইতিহাস বিষয়ে কিছু কথাবার্তা বলা। মঞ্চে সচিব সাহেবের পাশে বসলেন অধ্যক্ষ সাহেব ও সহকারী প্রধান শিক্ষক। সহকারী প্রধান শিক্ষক নবম-দশম এবং উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ইতিহাস পড়ান।

সচিব সাহেব নিচের দিক থেকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন, তারা কোন দেশের নাগরিক। সঙ্গে সঙ্গে কোরাস উত্তর বাংলাদেশের। তার আগে এ দেশ কারা শাসন করেছে, তার আগে কারা এ দেশে রাজত্ব করেছে? ইংরেজদের রাজত্বকাল পর্যন্ত মোটামুটি কোরাস উত্তরই ছিল। ওই কোরাসের গতি থামল এ দেশের মুসলিম শাসনামলের সময়ে এসে। দু’একজন ছাত্রের কাছ থেকে কোনো রকমে জবাব পেলেন সচিব সাহেব। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রশ্ন রেখে কোনোই জবাব এলো না মুসলিম আমলের আগে কারা এ দেশের রাজা-বাদশাহ ছিলেন, কারা রাজত্ব করেছেন ইত্যাদি প্রশ্নের। অগত্যা স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক সহকারী প্রধান শিক্ষককে সচিব সাহেব পরামর্শ দিলেন শাসকদের পূর্ববর্তী কালক্রম সম্পর্কে বলার জন্য। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটল তখন। কারণ ওই শিক্ষক মহোদয়েরও উত্তর জানা নেই। বিস্মিত হন সচিব সাহেব। তিনি উষ্মা প্রকাশ করেই সবার উদ্দেশে বললেন, এ দেশের ছয়-সাতশ’ বছরের ইতিহাস মাত্র তোমরা জান। অথচ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের এই দেশটিতে মানব বসতির ইতিহাসই তো প্রায় আট হাজার বছরের। নদ-নদী, খাল-বিলের দেশটিতে শিকারজীবী, কৃষিজীবী মানুষরা যে সভ্যতা গড়ে তুলেছিল একুশ শতকে এসে পেঁৗছতে তো অনেক পথ পেরোতে হয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষকরা এ কথা জানবে না কেন! সচিব সাহেবের দুঃখ সেখানেই।

বন্ধুটি বললেন, ওই ঘটনার পর থেকে সচিব সাহেব নাকি তিনি ওই স্কুলে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন। আদতেই আমাদের স্কুল-কলেজের ক’জন ইতিহাস শিক্ষক দেশটির অতীতের এসব কথা জানেন। আমাদের ছেলেমেয়েরা কী শিখছে স্কুল-কলেজে গিয়ে? এদের সবার বোধ হয় অতীত সম্পর্কে ধারণা এমন যে,মাটির নিচ থেকে উঠে এসেছে ঘরবাড়ি, দালানকোঠা সবকিছু। দেশের অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা হয়তো এই খণ্ডিত ইতিহাসই জানেন এবং তাই ছাত্রদের শেখান। ভূতাত্তি্বক প্রক্রিয়ায় কখন এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডের সৃষ্টি হয়, কখন থেকে মানব বসতির শুরু, এরপর কোন শাসকরা শাসন করেছেন,তা পরিষ্কার করে শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে বৈকি?

বর্তমান সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক একটি কোর্স ‘বাংলাদেশ অধ্যয়ন’ (বাংলাদেশ স্টাডিজ) চালু করেছে। উদ্দেশ্য, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ওই কোর্স সংযুক্ত করা হয়েছে। নিম্নশ্রেণি থেকেই বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা জানুক। শুধু মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক নয়, একেবারে প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরে ‘বাংলাদেশ অধ্যয়ন’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। সেখানে মতামত ব্যক্ত হয়েছে সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে তো বটেই, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মতো একাডেমিক ডিসিপ্লিনেও কোনো এক পর্যায়ে ওই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

শুধু স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কথাই বলছি কেন? একেবারে শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন পর্যন্ত আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার প্রমাণ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, বাঙালির বৃহত্তম অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালকে গণ্ডগোলের বছর বলায় উষ্মা প্রকাশ করে লিখেছিলেন, “কয়েক বছর আগে এক উপাচার্য মুক্তিযুদ্ধকে বলেন ‘গণ্ডগোলের বছর’। তিনি যে রাজাকার ছিলেন বা মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করতে চেয়েছেন, তা নয়; রিকশাওয়ালারা, শ্রমিকরা মুক্তিযুদ্ধকে ‘গণ্ডগোলের সময়’ই বলে থাকে (‘জলপাই রঙের অন্ধকার’হুমায়ুন আজাদ, সময় প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৯২, পৃ. ৭৮)।”

১৯৪৭-এ দেশভাগের পর খ্যাতনামা ঐতিহাসিকরা রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকার, নীহাররঞ্জন রায়, সরসী কুমার সরস্বতী, দীনেশচন্দ্র সরকার, প্রমোদলাল পাল প্রমুখ ভারতে চলে যাওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস চর্চা এক রকম থেমেই গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১-এর বিজয়ের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বেশ জোরেশোরেই ইতিহাস নিয়ে কাজ শুরু হয়। শুধু রাজধানী নয়; জেলা-উপজেলা পর্যায়েও আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার কাজ শুরু হতে দেখা যায়। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি দেশের ইতিহাস বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেসব বইয়ের পাঠক কতজন? তার পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। তবে সংখ্যা যে বেশি হবে না, তা বলাই বাহুল্য।

প্রায় এক দশক আগে জনপ্রিয় লেখক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ নামে একটি পুস্তিকা রচনা করে প্রকাশ করেছিলেন। সব মানুষের পাঠোপযোগী পুস্তিকাটি লক্ষাধিক কপি নামমাত্র মূল্যে দেশের সর্বত্র বিতরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। সবাই এ বই পড়ূক দেশবাসীর কাছে লেখকের সেই তাগিদ ছিল। সবাইকে তিনি বইটি পড়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

প্রায় দেড়শ’ বছর আগে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘বাঙালির ইতিহাস নেই।’ আমরা কিন্তু বলতে পারি,বাংলাদেশের বাঙালিদের ইতিহাস আছে। আছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। হোক তা অসম্পূর্ণ। পক্ষে-বিপক্ষে কথাবার্তা থাকতেই পারে সে ইতিহাস নিয়ে,সেটা বড় কথা নয়। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ই.জি. কালিংউডের ভাষায়, ইতিহাস হলো ‘রি-এনাক্টমেন্ট অব পাস্ট এক্সপেরিয়েন্স’। সে পর্যায়ের ইতিহাস হয়তো আমাদের এখনও রচিত হয়নি। তবু বলি, আমাদের দেশের ইতিহাস আছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই গাঙ্গেয় ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিল। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা এই ভূখণ্ডের মানুষের যে গৌরবময় অতীত আছে, ঐতিহ্য আছে, অর্থনৈতিক পরিকাঠামো আছে, নিজস্ব যে জীবনাচরণ আছে, সংস্কৃতি আছে,তা বাঁচানো ও সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা। আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সঙ্গীত-নাটক হবে আমাদের জল-হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার যুগে সবকিছু যেন হারিয়ে না যায়। বরং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম তো সে জন্যই।

সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় হলো, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। ঈপ্সিত লক্ষ্যে এখনও পেঁৗছানো সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়ত দেখছি, আমাদের দেশের মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে; মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থাসহ রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ড। দেশের এ অবস্থা কি চলতেই থাকবে? সবকিছুরই তো শেষ আছে। দেশের প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন দেশের অভিজ্ঞজনরা। তারা বলছেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হলে দেশকে ভালো করে জানতে হবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলছি। সরকারি এক ছুটির দিন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ; বাসায় আছি। আমার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করলেন স্ত্রী, নার্সারিতে পড়ূয়া ছেলেকে কোনোভাবে পড়ালেখার ছলে আটকে রাখতে হবে। তিনি ঘরকন্নার কাজ করতে পারছেন না। পুত্র মাঝে মধ্যে তার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। কিছুদিন আগেই মাত্র দেশের বাইরে থেকে ফিরেছি। ফেরার সময় বিদেশি কিছু চকোলেট নিয়ে এসেছিলাম। আমি পুত্রকে ডেকে আমার পড়ার ঘরে রাখা টবের পাতাবাহার গাছ দেখিয়ে বললাম, সে যদি এই গাছ নিয়ে ১০ লাইন লিখে দেয় তাহলে তাকে পাঁচটি চকোলেট দেব। চকোলেটের লোভে পুত্র রাজি হলো। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে লিখল। বিষয়টি আমি ডায়েরিতে নোট করে রেখেছিলাম। সে লিখেছে, ‘বাবার পড়ার ঘরে টব আছে। টবে পাতাবাহারের গাছ আছে। গাছে অনেক পাতা আছে। পাতায় অনেক রঙ আছে। পাতার সাথে ডাল আছে। সে ডাল ছোট ছোট। টবের মধ্যে মাটি আছে। মাটি ভেজা। সকালে বাবা গাছে পানি দেয়। এই পাতাবাহারের ফুল নেই।’ আমি পুত্রকে ডেকে বললাম, তোমার লেখা ঠিক হয়নি। একটি বিষয় বাদ গেছে। চকোলেটের লোভেই হয়তো সে পুনরায় লিখতে শুরু করল। এবার সে বাবার বিষয়টি বাদ দিয়ে লিখল,’মা সকালে টব বারান্দায় নেয়।’ তারপরও যখন বললাম, লেখা হয়নি; তখন সে মুখ ভার করে জানালার ধারে গিয়ে বলল, ‘আর লিখবও না, তোমার চকোলেটও নেব না।’ আমি তখন আদর করে তাকে কাছে ডেকে এনে বললাম, লেখা খুবই সুন্দর হয়েছে, কিন্তু একটা জিনিস তুমি লিখোনি। তখন তাকে আমি টবের কাছে নিয়ে গিয়ে মাটি খুঁড়ে শিকড় দেখালাম। বললাম, এই শিকড়ই গাছের প্রাণ। এখান থেকেই খাবার পেয়ে গাছটি বেঁচে আছে। পুত্র বিস্ময়ের সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,’বাবা, এই শিকড় তো দেখাই যায় না; লিখবো কী করে?’

পুত্রের অনুভূতির অনুবৃত্তি ধরে বলি, গোটা জাতিই আমরা ওই শিকড়ের সন্ধান জানি না। যারা জানি তারা তা আমলে আনি না। ইতিাসের অতীত জ্ঞান আমাদের নতুন করে পথ দেখালে সংকট অনেকটাই কেটে যাবে,বলছেন বিশিষ্টজনরা।

অধ্যাপক, রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মুসলিম বিশ্বে ভাস্কর্য

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

sculpture in muslim landsবহু দিন ধরে বহু ক্রোশ ব্যয় করি

দেখিতে গিয়েছি মক্কা-মদীনা

করিতে গিয়েছি হজ্ব

দেখা হয় নাই শুধু চক্ষু মেলিয়া

মুসলিম বিশ্বের এখানে-সেখানে

মূর্তি-ভাস্কর্য সাজ ।

===

qatar

saudi arabiairaqsyria

indonesia

iran

pakistan

malaysia

emirates

turkey

বইয়ের সংজ্ঞা ও বিশ্বের প্রাচীন বই

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

ancient booksমুম রহমান : সাহিত্যের ইতিহাসের যথার্থ দিন-তারিখ খুঁজে বের করা বড়ই দুষ্কর। কেননা, যখন লিপি আবিষ্কার হয়নি, অর্থাৎ লিখিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সাহিত্যের সৃষ্টি। সোজা বাংলায় বলা যেতে পারে, প্রাগৈতিহাসিক যুগেই সাহিত্য এসে গেছে। এটা ভাবা খুব অসঙ্গত নয় যে, মানুষের কথা বলা ও কল্পনার ক্ষমতার সাথে সাহিত্য জড়িত। মৌখিক সাহিত্যের ইতিহাস সুপ্রাচীন। গান, অভিনয়, আবৃত্তি ইত্যাদি নানা ভঙ্গিতেই মুখে মুখে সাহিত্য ছড়িয়েছে। অন্ধ কবি হোমারের মহাকাব্য মুখে মুখে গাওয়া হতো। রামায়ণ-মহাভারতও তাই। তারও আগে, মায়ের মুখের ঘুমপাড়ানি গান থেকে শুরু করে দাদা-দাদীর গল্প বলার ঐতিহ্যের মধ্যেও লুকিয়ে আছে সাহিত্যের অঙ্কুরোদগমের ইতিহাস।

ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম থেকে চতুর্থ শতকের সময়ে মানুষ লিখতে শুরু করেছে। পাথর, কাদামাটি (পরে যা পুড়িয়ে ফলক করা হতো), মৃৎপাত্র, গুহার দেয়াল, মন্দিরের দেয়াল-দুয়ার, খিলান, তালপাতা, প্যাপিরাস (মিশরে প্রাপ্ত এক ধরণের পাতা), চামড়া এমনকি শবাধারেও (কফিন) মানুষের লিখিত পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। উল্লেখ্য এর সবই যে সাহিত্য কিংবা গ্রন্থ হিসেবে বিবেচ্য তা নয়। কাজেই প্রাচীনতম বইয়ের কথা বলতে গেলে অন্য সংকট তৈরি হয়। আগে প্রাপ্ত লিপিমালা বই কিনা সেটা ভেবে দেখতে হয়। অভিধানের সংজ্ঞা মতে, একগুচ্ছ ছাপার কাগজ যা একটা নির্দিষ্ট বিষয় কিংবা মলাটের মধ্যে ধরে যায় তাকে বই বলে (দ্রষ্টব্য: ম্যারিয়াম-ওয়েবস্টার ডিকশনারি)। এই সংজ্ঞায় পোড়ামাটির ফলক বা ট্যাবলেট, স্ক্রল (চামড়া বা কাগজের তৈরি দীর্ঘ প্যাঁচানো বা গুটানো লেখা), প্রস্তরস্তম্ভ, শিলালিপি, কফিন, পিরামিড ইত্যাদি বইয়ের আওতায় পড়ে না; যদিও এর অনেকগুলোতেই সাহিত্য পদবাচ্য উপাদান আছে।

উল্লেখ্য, একাধিক ধর্মগ্রন্থও শুরুতে পাথরে বা ফলকে খোদাই করা হয়েছে, পরবর্তীতে যা ছাপার অক্ষরে বই হিসাবে গণ্য হয়েছে। অন্যদিকে, অনেক পণ্ডিত মনে করেন, বই হতে হলে লিখিত উপাদানের একটা নির্দিষ্ট বৈশ্বিক ভাবনা থাকতে হবে। ধরুন, হিসাবের খাতা, সেটা তো আর বই হিসাবে গণ্য হতে পারে না। খবরের কাগজে বইয়ের অনেক উপাদান থাকতে পারে, বৈশ্বিক বিষয়ও আছে, কিন্তু সেটাও বই নয়। বই হতে হলে তার যেমন সাহিত্য মূল্য দরকার তেমনি দরকার একটা সুনির্দিষ্ট বিষয়-ভাবনার প্রকাশ। সর্বোপরি, চিন্তাশীল কর্মের ফসল। নেহাতই তথ্যভাণ্ডার নয়, ভাবনার খোরাকও দেবে বই। অভিধান, বিশ্বকোষ ইত্যাদি ছাপার অক্ষরে এক মলাটে বই আকারে প্রকাশ হয়, তবে চরিত্রগত দিক থেকে তা বই নয়। ওগুলো তথ্যসূত্র হিসেবেই প্রয়োজনীয়- আলাদা করে পাঠ বিবেচ্য নয়। সেই বিবেচনায়, পাঠ যোগ্যতাও একটা বইয়ের বড় মাপকাঠি। পাঠকের জায়গা থেকে দেখলে অবশ্যই বইয়ের সংজ্ঞায়ন আরো বিস্তৃত হতে পারে। বই যে পৃথিবীতে কতো রকমের, ধরণের হতে পারে সে আলোচনা হতে পারে। এখানে বরং সোজাসুজি পৃথিবীর প্রাচীনতম কিছু বইয়ের সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

কোডেক্স বলতে হাতে লেখা পুঁথি বোঝানো হয়। ছাপাখানার আগে হাতে লেখা পুঁথিই ছিলো জ্ঞান অর্জনের অন্যতম হাতিয়াড়। প্রাচীন বাইবেল থেকে শুরু করে, গ্রীক-রোমান সাহিত্যের একটা বড় অংশ হাতেই লেখা হয়েছে। কোডেক্সগুলো সচিত্রিতও বটে। ‘মাদ্রিদ কোডেক্স’ ১৮৬৯ সালে স্পেনের মাদ্রিদে আবিষ্কৃত হয়েছে। মায়া সভ্যতার পূর্ববতী যুগের একমাত্র টিকে থাকা এই পুঁথিটি সম্ভবত ষোড়শ শতকের স্পেন বিজয়ের আগে রচিত। এটি ইয়োকাটেকান ভাষায় রচিত। ইয়োকাতেক, ইৎজা, লাকানডোন এবং মোপান- এই সব মায়ান ভাষার সম্মিলিত রূপ ইয়োকাটেকান ভাষা। স্পেনের মাদ্রিদের মিউজো দ্যু আমেরিকাতে বইটি আজও সংরক্ষিত আছে। আরেকটি আলোচিত কোডেক্স হলে ‘কালিক্সটিনাস’। ফরাসী সন্ত আইমেরি পিঁকা ১২ শতকের মাঝামাঝি এই পুঁথি রচনা করেন বলে ধারণা করা হয়। এই গ্রন্থের পাঁচটি অধ্যায়ের প্রথম চারটিই ধর্মীয় বাণী। তবে এর পঞ্চম অধ্যায়টি আজ পর্যন্ত বেশি জনপ্রিয়। এই অধ্যায়টি স্পেনের ক্যাথিড্রাল অব সান্তিয়াগো দ্যু কমপোস্টেলা যাত্রার জন্যে তীর্যযাত্রীদের জন্যে নির্দেশনা হিসেবে রচিত হয়েছে। এটিকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের প্রথম ভ্রমণ নির্দেশনা বা ট্রাভেল গাইড। এই গাইডে বর্ণনা করা হয়েছে একজন ফরাসী কী করে স্পেনে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন না, কী করবেন, কী করবেন না ইত্যাদি। ২০১১ সালে এই মূল্যবান বইটি ক্যাথিড্রালের আর্কাইভ থেকে চুরি যায়। ধারণা করা হয়েছিলো এই বইটি চিরতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু এক বছর অনুসন্ধানের পর ক্যাথিড্রালের একজন প্রাক্তন ইলেকট্রিশিয়ানের বাড়ির গ্যারেজে আরো একাধিক মূল্যবান গ্রন্থ এবং এক মিলিয়ন ডলারসহ এই বইটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বর্তমানে আরো অধিক জোড়ালো নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বইটি ক্যাথিড্রাল অব সান্তিয়াগো দ্যু কমপোস্টেলায় সংরক্ষিত আছে।

‘কালিক্সটিনাস কোডেক্স’ প্রাচীন বইয়ের মধ্যে অন্যতম আলোচিত একটি বই। জার্মানির বাভারিয়ার উটা প্রদেশে প্রাপ্ত পুঁথি দ্য উটা কোডেক্সও একটি ধর্মীয় গ্রন্থ। এটি মূলত একটি লেকশোনারি। লেকশোনারি হলো বাইবেলের নির্বাচিত উক্তি বা অংশসমূহের সংকলন যা বিভিন্ন ধর্মীয় উপলক্ষে বা অনুষ্ঠানের সময় গীর্জায় গাওয়া বা আবৃত্তি করা হয়। ১০২৫ সালে রচিত এই কোডেক্সের বিশেষ উল্লেখযোগ্যতা হলো এটি দারূণ কারুকাজময়। একাদশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য খোদাই কর্মের অন্যতম নমুনা এটি। এর সোনার তৈরি আসল বাক্সটি যার মধ্যে বইটি সংরক্ষিত করা হয়েছে সেটি আজও অক্ষত আছে। এই পুঁথিটি জার্মানির মিউনিখে বাভারিয়ান স্টেট লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ত্রিনিতি কলেজ লাইব্রেরিতে রাখা আছে কেল্ট ভাষীদের প্রাচীনতম টিকে যাওয়া বই ‘বুক অব কেলস’। ৮০০ খ্রিস্টাব্দে কেল্ট সাধুরা স্কটল্যান্ডের দ্বীপ আয়োনাতে এই বইটি তৈরি করে পরবর্তীতে কেলস-এর মঠে নিয়ে আসেন। ধারণা করা হয় যে তিনজন চিত্রকর ও চারজন লিপিকর মিলে এই অনবদ্য নান্দনিক বইটি তৈরি করেছেন। কোডেক্স কেনানেনসিস, লেয়াবহার চিয়ানেনআসি ইত্যাদি নামেও এই বইটি পরিচিত। ল্যাটিন ভাষায় রচিত এই বই মূলত নতুন টেস্টামেনের চারপি গসপেল এবং তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে রচিত। পশ্চিমা লিপিবিদ্যা এবং আইকোনোগ্রাফির চূড়ান্ত বিকাশ লক্ষ্য করা যায় এই বইতে। দারূণ বর্ণিল সব ছবি ও লিপিমালা দিয়ে সাজানো এই বই আয়ারল্যান্ডের জাতীয় সম্পদ। সাধু-সন্তের ছবির পাশাপাশি এতে পৌরাণিক জীবজন্তু এবং নানা রকম আল্পনা, নকশা আঁকা আছে। খ্রিস্টিয় নানা রূপক-সংকেতের চিত্রায়ণ এই বই। ১৯৫৩ সাল থেকে চারখণ্ডের এই বইটি ডাবলিনের ত্রিনিতি কলেজ লাইব্রেরিতে প্রদর্শিত হয়ে আসছে, তবে এক সঙ্গে দুখণ্ডের বেশি প্রদর্শন করা হয় না।

স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে প্রাচীন বইটির নাম ‘কেলটিক সল্টার’। লাল, সবুজ, বেগুনি, সোনালী কারুকাজ করা ১১ শতকের এই বইটিও একটি উপাসনা পুস্তক। ছোট্ট পকেট সাইজের এই বইটি আসলে ল্যাটিন ভাষায় রচিত কিছু স্ত্রোত। এগুলো আজও পাঠ উপোযোগী। বইটির আদি বাঁধাই এখন আর নেই। ধারণা করা হয়, স্কটল্যান্ডের রানী মার্গারেটের জন্য এই বইটি তৈরি করা হয়েছিলো। বর্তমানে এটি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। ৮৪০ খ্রিস্টাব্দে রচিত ইহুদিদের প্রাচীন প্রার্থনার বই ‘সিডোয়ার’ আবিষ্কৃত হয়েছে ২০১২ সালে। পশুর চামড়ার তৈরি কাগজে (পার্চমেন্ট) মূদ্রিত এই বইয়ের ভাষা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইংরেজির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। সিডোয়ার শব্দের অর্থ অর্ডার, বাংলায় বলা যায় আদেশ, রীতি, শৃঙ্খলা, ক্রম ইত্যাদি। এটি আসলে ইহুদিদের প্রতিদিনের প্রার্থনা গ্রন্থ। প্রাচীন ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তোওরাত (আসমানী কিতাব)-এর কিছু অংশও এতে আছে। সন্ত ডানস্টন ছিলেন ইংল্যান্ডের গ্লাসটোনবেরি এবি’র মঠাধ্যক্ষ। তিনি ধর্মযাজকদের পাঠদানের জন্যে ল্যাটিন ভাষায় এই পুস্তক লিখেছিলেন। দশ শতকের সূচনা লগ্নে শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের জন্যেই ‘সেন্ট ডানসন্টনের ক্লাসবুক’ রচিত। ধারণা করা হয় এটি ৯৪৩-৯৫৭ সালের দিকে রচিত। এই বইয়ের অন্যতম আকর্ষণ সেন্ট ডাস্টনের একটি প্রতিকৃতি। ছবিতে দেখা যায় সেন্ট ডানস্টন স্বয়ং যিশুর পায়ের কাছে নত হয়ে বসে আছেন। সেন্ট ডানস্টন নিজেই এই ছবিটি এঁকেছেন। হাতে আঁকা ও লেখা এই বই গ্লাসটোনবেরি এবি’র মঠেই সংরক্ষিত ছিলো। ১৬০১ সালে এটি অক্সফোর্ডের বদলেইয়ান লাইব্রেরিতে স্থানান্তরিত হয়।

অক্সফোর্ডের বদলেইয়ান লাইব্রেরিতে রাখা সবচেয়ে প্রাচীন বই হলো ‘বেনেডিক্টাইল রুল’। ধারণা করা হয় ৭০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এটি রচিত। সেন্ট বেনেডিক্ট মধ্যযুগের ইংল্যান্ডের অন্যতম ধর্মগুরু। পাশ্চাত্য মঠকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশে তার ভূমিকা অন্যতম। এই বইতে মূলত সন্ত বেনেডিক্টের অনুসারীদের মঠের জীবন, তাদের জীবনাচার, ধর্মচর্চা ইত্যাদি প্রসঙ্গ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গরুর বাছুরের চামড়ায় খোদিত এটিই বেনেডিক্টের সবচেয়ে প্রাচীন রীতির গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।

প্রাচীন আরেকটি বই ‘সেন্ট কাথবার গসপেল’। এই বইয়ের আবিষ্কারের কাহিনি রীতিমতো রোমাঞ্চকর গল্প হতে পারে। ৬৯৮ খিস্টাব্দে দক্ষিণ পশ্চিম ইংল্যান্ডের লি-সফার্নে দ্বীপে ধর্মগুরু সেন্ট কাথবারের কফিনের সঙ্গে কবর দেয়া হয় তার প্রিয় গসপেল গ্রন্থটিও। ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ভাইকিং জলদস্যুদের হাতে ডারহাম ক্যাথিড্রালে হামলা হয় এবং কফিনসহ বইটি ছিনতাই হয়। পরবর্তীতে ১১০৪ সালে কফিন উন্মোচিত হলে বইটি আবার খুঁজে পাওয়া যায়। এই সময় ডারহ্যাম ক্যাথিড্রালে অন্যান্য দর্শনীয় বস্তুর সঙ্গে এটি সংরক্ষণ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ কেউ বেড়াতে এলে তার গলায় একটি চামড়ার ব্যাগসহ বইটি ধারণ করার সুযোগ পেতেন। অস্টম হেনরির রাজত্বকালে ১৫৩৬ থেকে ১৫৪১ নাগাদ মঠের গুরুত্ব ও প্রভাব কমতে থাকে। এ সময় বইটি সংগ্রাহকদের কাছে চলে যায়। এরও কয়েকশ বছর পর ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ লাইব্রেরি প্রদর্শনের জন্যে এটি ধার হিসেবে পায়। অবশেষে ২০১২ সালে একটি তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে ৯০ লাখ পাউন্ড দিয়ে ব্রিটেশ লাইব্রেরি বইটি কিনে নেয়। ব্রিটিশ লাইব্রেরির বরাতে জানা যায় যে এটি ইউরোপীয় সবচেয়ে প্রাচীন পূর্ণাঙ্গ বাঁধাই করা বই। ১৩৮ পৃষ্ঠার পকেটে বহনযোগ্য ছোট্ট এই খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় রচিত। অতি প্রাচীন এই বই এখনও বেশ ঝকঝকে অবস্থায় সুরক্ষিত আছে। এর সুদৃশ্য চামড়ার বাঁধাই পাশ্চাত্য বই বাঁধাইয়ের প্রাচীনতম ও সুন্দরতম উদাহরণ হয়ে আছে। জনের গসপেল নিয়ে মূদ্রিত এই বইটি ব্রিটিশ লাইব্রেরির ট্রেজার্স গ্যালারিতে গেলে দেখা যাবে। সম্প্রতি বইটির একটি ডিজিটাল সংস্করণ করা হয়েছে।

মিশরীয় প্রাচীন পুঁথি ‘নাদ হামাদি’ আবিষ্কার নিয়েও একটি গল্প হতে পারে। ১৯৪৫ সালে দুজন মিশরীয় কৃষক কাজ করতে গিয়ে পাথরের খাঁজের আড়ালে একটা সিল করা পাত্রের ভেতরে ১৩টি পুঁথি পান। প্যাপিরাস কাগজে লেখা চামড়ায় বাঁধানো এই পুঁথিগুলো পাওয়া যায় মিশরের নাগ হামাদি শহরে। সেই থেকে এর নাম হয় নাগ হামাদি পুঁথি। কপটিক ভাষায় রচিত এই গ্রন্থেরও বিষয়বস্তু প্রাচীন ইহুদি ও খিস্ট্রিয় ধর্মচিন্তা। ধারণা করা হয় চতুর্থ শতকের দিকে এই বইটি রচিত হয়েছে। এটি সম্ভবত কোন একটি গ্রিক বইয়ের অনুলিপি-পণ্ডিতদের এমন মতও আছে। মিশরের কায়রোতে কপটিক মিউজিয়ামে এই বইটি সুরক্ষিত আছে।

১৯৬৪ সালে এক খননকালে ইতালির পিয়ারগি থেকেও পাওয়া যায় তিনটি সোনার পাত। এই পাতগুলো ৫০০ খ্রিস্টাব্দের। তিনটি পাতের এক প্রান্তে ফুটো আছে। ধারণা করা হয়, এই ফুটোগুলোর মাধ্যমে পাত তিনটি একত্রে রাখা ছিলো। এই তিনটি পাতকে একত্রে ‘পিয়ারগি ট্যাবলেট’ বলা হয়। এর তিনটি পাতকে বইয়ের তিনটি পাতা মনে করা হয়ে থাকে। এর দুটো পাতের ভাষা প্রাচীন এত্রুস্কান এবং একটি পাতের ভাষা প্রাচীন ফিনেসিয়ান। এটিই বিশ্বের প্রথম দ্বিভাষিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। রোমের এত্রুস্কান জাতীয় যাদুঘরে এগুলো সংরক্ষিত আছে। ফিনেসীয় দেবী আসথারোতের প্রতি প্রাচীন কায়রোর রাজার নিবেদন হিসেবে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে।

৬৬০ খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘এত্রুস্কান’ স্বর্ণবইটিও আবিষ্কৃত হয় প্রায় ৭০ বছর আগে বুলগেরিয়ায় একটি খাল খননের সময়। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন একাধিক পৃষ্ঠার বই বলা হয়। ৬ পাতার এই বইটি ২৪ কেরেট সোনায় রচিত এবং একসাথে রিং দ্বারা বাধাই করা। আজ থেকে প্রায় তিনহাজার বছর আগে প্রাচীন এত্রুস্কান জাতি লিডিয়া থেকে অভিবাসন করে মধ্য ইতালিতে ছিলো। এদের আদিবাস ছিলো বর্তমান তুরস্কে। এত্রুস্কানদের নিজস্ব লিপির পাশাপাশি এই বইতে ঘোড়া, ঘোরসওয়ার, একটা সাইরেন, একটা বাঁশি ও সৈন্যের ছবিও আঁকা আছে। বর্তমানে বইটি বুলগেরিয়ার সোফিয়াতে জাতীয় ইতিহাস যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় রোমান জাতি ও ল্যাটিন ভাষার অবদান অনস্বীকার্য। ৬০০ খ্রিস্টাব্দে লেখা ‘লেইডেন হার্বারিয়া’ ল্যাটিন ভাষায় রচিত সবচেয়ে প্রাচীন বই। হার্ভ বা ভেষজ উদ্ভিদের উপর রচিত এই বইতে বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদের ওষুধি গুণাগুণ ও কার্যকারিতা লেখা হয়েছে। দক্ষিণ ইতালি কিংবা ফ্রান্সে রচিত হয়ে থাকতে পারে এই বইটি। বইটিতে বেশ কিছু দর্শণীয় ছবিও সংযুক্ত হয়েছে। উদ্ভিদবিদ্যার প্রাচীনতম এই বই ল্যাটিনদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অগ্রগামিতার প্রমাণ দেয়। তবে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় শুধু যে পাশ্চাত্য সভ্যতা এগিয়ে ছিলো তা তো নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে চৈনিক সভ্যতা অনেক বেশি অগ্রগামী ছিলো। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়,পাশ্চাত্যের ছাপাখানা আবিষ্কার কাগজ-কালির আবিষ্কারের বহু আগেই চীনারা এ সব আবিষ্কার করে ফেলেছিল। পাশ্চাত্য থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণেই চৈনিক সভ্যতার কথা আমরা অনেক পরে জেনেছি। চীনের প্রাচীনতম এক মূদ্রিত পুস্তক হলো ‘হীকসূত্র’।

পূর্ব এশিয়ার জেন বৌদ্ধ চর্চাকারীদের মহাযান ধারার জ্ঞানগ্রন্থ বজ্রসূত্র বা ‘হীরকসূত্র’ বা ডায়মণ্ডসূত্র আসলে প্রজ্ঞাপারমিতা বা জ্ঞানের পরিপূর্ণতার এক পুঁথি। সহস্র বছরের পুরনো এই বইটি এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত মূদ্রিত আকারের সবচেয়ে প্রাচীন পূঁথি। ব্রিটিশ লাইব্রেরি সংরক্ষিত এই পুঁথিটি সচিত্র। হীরা বা বজ্র যেমন সবকিছু কেটে ফেলতে পারে জ্ঞানও তেমনি সকল মায়া কেটে বাস্তবের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়-এ ধারণাটিকেই প্রতিকীভাবে বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। এই বইটি শুধু চীনে নয়, এশিয়ার নানা দেশেই প্রচলিত ছিলো। প্রাচীনকালেই সংস্কৃত, জাপানী, কোরিয়ান, মঙ্গোলীয়, ভিয়েতনামী ও তিব্বতি ভাষায়ও এর অনুবাদ হয়েছিলো। বৌদ্ধদের এই পবিত্র গ্রন্থটি বিংশ শতকে এসে চীনের এক গুহায় পাওয়া যায়। বইটি একটা স্ক্রলে ধূসর রঙের কাগজের উপর ছাপা, একটা কাঠের ঠ্যাঙ্গার উপর বসানো। ওয়াং জাই নামের এক ব্যক্তি প্রাচীন এই পবিত্র গ্রন্থটি ৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে অনুলিপি করেছিলেন।

জার্মানির মাইনজের ব্যক্তি জোহানেস গুটেনবার্গ বইয়ের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি ছাপাখানার আবিষ্কারক। মানব সভ্যতা ও জ্ঞান বিকাশের ইতিহাসে ছাপাখানা বা মূদ্রণযন্ত্রের ভূমিকা অপরিসীম। গুটেনবার্গের ছাপাখানার কল্যাণে একইসঙ্গে বহু বই ছাপা হতে লাগল। এর আগে বই বা পুঁথি ছাপা ছিলো বেশ জটিল কর্ম। প্রতিটি বইয়ের প্রতিটি অক্ষর হাতে লেখা সত্যিই সময়সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য ছিলো। বই তৈরি ছিলো ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘতর একটি প্রক্রিয়া। গুটেনবার্গ মূদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করে পুরো ব্যাপারটিকে সহজ ও সুলভ করে দিলেন। গুটেনবার্গ তার ছাপাখানায় নিজে যে বইটি প্রথম ছাপেন সেটি ছিলো বাইবেল। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকডর্সের তথ্যমতে এটি হলো ছাপার যন্ত্রের সবচেয়ে প্রাচীন বই। প্রায় সাড়ে ৫০০ বছরেরও পুরনো এই বইটি ছাপা হয়েছিলো আনুমানিক ১৪৫৪-১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে। ছাপার অক্ষরে মূদ্রিত এই বইটিকে যান্ত্রিকভাবে ছাপা হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বই হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও, উল্লেখ করা দরকার, প্রাচ্যে তার আগে থেকেই বই ছাপার ব্যবস্থা ছিলো।

চীনারা গুটেনবার্গেরও বহু আগেই ছাপাখানার আবিষ্কার করেছে। চীনের হীরকসূত্র (ডায়মন্ড সূত্র) ছাপা হওয়ার বিবেচনায় গুটেনবার্গের বাইবেলের চেয়ে পুরনো। যাহোক, গুটেনবার্গের হাতে ছাপা হওয়া ৫০টি বাইবেল আজও পাওয়া যায়। যার মধ্যে ২১টি পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষিত হয়েছে। এখানে বইয়ের শেষে চিত্রিত কপিটি নিউ ইয়র্কের পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত। নিলাম বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, এক কপি গুটেনবার্গ বাইবেলের দাম হতে পারে ১০ লাখ ডলার। নিউ ইয়র্কে মর্গান লাইব্রেরি মিউজিয়ামে গুটেনবার্গের ছাপা তিনটি বাইবেল সংরক্ষিত আছে। গুটেনবার্গের ছাপাখানা আর তার প্রথম ছাপা বই বাইবেল দিয়ে বিশ্বব্যাপী বইয়ের ব্যাপক বিস্তারের সূচনা হয়। আজ ডেস্কটপ পাবলিশিং-এর কল্যাণে বই ছাপা অনেক আয়েশসাধ্য হয়ে গেছে। কিন্তু প্রাচীনতম বইগুলোর কদর আজো অমলিন। এইসব প্রাচীন বই শুধু প্রকাশনা বা ছাপার ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বরং জ্ঞানের নানা ধারার চর্চারও পরিচায়ক।

সবার ওপরে আইন

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

ভাতের জন্য হাহাকার শুনেছি। খাবারের দাবিতে মিছিল করে নিরন্ন মানুষের খাদ্য গুদাম লুটের চেষ্টা, ৬০-৭০ দশকে মহাজনদের অত্যাচার নিয়ে কাব্যগাথা কত শুনেছি! নক্সালবাড়ি আন্দোলন এ অঞ্চলের কৃষকের শাসন ক্ষমতা দখলে আগুনের গল্প শুনিয়েছিল। এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ পেটভরে খেতে পারছে, পছন্দের জিনিসপত্র কিনতে পারছে। দেশজ কৃষিপণ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেকেই বিদেশী খাবার ও ফলমূল কিনছে। বাজার অর্থনীতি সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাকে রঙিন ও বিচিত্র করে তুলেছে। সবমিলিয়ে চমৎকার একটি দৃশ্যকল্প। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এখন হাহাকার শোনা যাচ্ছে অন্য একটি বিষয়ে।

বাজারে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক দেখলে মানুষ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে:দেশে কি আইন নেই!

বাসে-ট্রেনে-বিমানে অব্যবস্থা দেখলে মানুষের মুখে ধ্বনিত হয়: দেশে কি আইনের আকাল পড়েছে!

রাস্তায় ট্রাফিকের বেহাল অবস্থা দেখলে; হত্যা-রাহাজানি-মাস্তানি-অস্ত্রবাজি ও গুম-খুনের কথা শুনলে উদ্বিগ্ন স্বরে মানুষ বলে ওঠে: দেশ থেকে কি আইন-কানুন সব উঠে গেল?

এ থেকে বোঝা যায়, আইনের শাসনের জন্য সাধারণ মানুষের কতটা আকুতি। খেটে খাওয়া শ্রমিক ও কৃষক থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী, পোশাকধারী আইনশৃংখলা বাহিনী, ব্যবসায়ী, ছাত্র-শিক্ষক-গৃহিণী-সবারই আইনের শাসনের প্রতি থাকে গভীর প্রত্যাশা। আইন মেনে ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়ে যে দল সরকার পরিচালনা করে, তারা সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কুড়ায়। আস্থা অর্জন করে। প্রমাণিত সত্য-ব্যক্তি নয়, সবার ওপরে আইন।

প্রশ্ন হল, আইনের শাসন বলতে আমরা কী বুঝি? আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে আইনের শাসনের সার্বজনীন রূপ হচ্ছে-

১. সরকার ও তার কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের এজেন্ট, সাধারণ মানুষ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সবাই আইনের কাছে দায়বদ্ধ। ২. আইনগুলো স্বচ্ছ, স্থায়ী, প্রচারিত ও উত্তম।

৩. আইনের প্রয়োগ সবার ওপর সমভাবে ঘটে এবং প্রচলিত আইন মানুষের মৌলিক অধিকার ও জানমাল রক্ষায় যথেষ্ট কার্যকর।

৪. যে প্রক্রিয়ায় আইনগুলো প্রণীত হয়েছে এবং প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা সৎ ও দক্ষ।

৫. বিচারকার্য এমনভাবে সমাধা করা হচ্ছে, যা ন্যায় ও যথার্থ এবং সৎ ব্যক্তিদের দ্বারা তা পরিচালিত হচ্ছে; যাতে বিচার শেষে সাধারণ মানুষ ভাবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কোনো সরকারের ক্ষমতা সাধারণত আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়। সে অনুযায়ী শাসনতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটান সরকারি কর্মকর্তারা। আইন প্রয়োগকালে কোনোভাবেই যেন ব্যক্তিগত আবেগ বা অনুরাগ প্রাধান্য না পায়, সেটি দেখা জরুরি। আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হল দুর্নীতির অনুপস্থিতি। যেখানে দুর্নীতি, সেখানেই আইনের শাসন ক্ষয়িষ্ণু রূপ ধারণ করে। দুর্নীতি নানা ক্ষেত্রে প্রসারিত হতে পারে। হতে পারে সেটা ঘুষ বা অনৈতিক প্রভাব, যা ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের সংরক্ষণ প্রমাণ করে, দেশে আইনের শাসন বহাল রয়েছে। সমাজে আইনের শাসন বহাল থাকলে মানুষের চলাফেরা, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও চাকরি ক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ খুব সহজে তাদের অভিযোগ-অনুযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে পারে।

আইনের শাসনের মৌলিক দিক হল, সরকার দেশ পরিচালনা করবে আইন অনুযায়ী। বিষয়টি বোঝাতে সবাই বলেন,

: কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

অথচ ইংল্যান্ডের রানীকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। রানী ইচ্ছে করলে হাউস অব কমন্সে পাসকৃত আইন পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন। হাউস অব লর্ডসের রুলিং অগ্রাহ্য করতে পারেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ রাজা-রানীর কাছ থেকে এই ‘absolute sovereignty’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রতিস্থাপন করা হয়। আমেরিকার সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরই সরকারের কোনো একটি শাখাকে একেবারে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হয়নি। এক শাখার অতিরিক্ত ক্ষমতা বা আচরণ অন্য শাখা দ্বারা টেনে ধরার ব্যবস্থা রয়েছে। এজন্য সেখানে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ একে অপরের পরিপূরক। আইনের শাসনের প্রশ্নে তাই সেসব দেশে স্বস্তি বিরাজ করে। যে কোনো একটি বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ অন্য শাখা দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত হয়। তবে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় সংখ্যাগুরু দলের নেতা যেহেতু প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি আবার শাসন বিভাগেরও প্রধান, তাই আইন ও শাসন বিভাগে তার কর্তৃত্ব ঘটতেই পারে। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা অনেকগুণ বেড়ে যায়। নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, দফতর পরিচালনার বাজেট ইত্যাদি যদি বিচার বিভাগের হাতে থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে।

অনেক সময় আমেরিকা ও ব্রিটেনসহ অন্য গণতান্ত্রিক ধারার দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করা হয়। এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হল, বাংলাদেশ বাংলাদেশই। আমাদের শিক্ষিতের হার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা, দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাসন ও আইনসভার সার্বিক অবস্থা অনেকটাই ইউনিক। সম্পূর্ণ আলাদা। এখানকার বাজার-হাট, বাস-লঞ্চ-স্টিমার-রেল-বিমানের অবস্থা অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সেসব দেশে মানুষভর্তি বাস রাস্তার মাঝখানে সচরাচর দাঁড়ায় না। দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কোনো চালক বা তার সহকারী পালিয়ে যায় না, অথবা দুর্দশাগ্রস্ত যাত্রীদের মালামাল লুট হয়ে যায় না। অন্যান্য উন্নত দেশের নিয়োগ, বদলি, প্রমোশন ইত্যাদি বাংলাদেশের মতো নয়। সেসব দেশে মানুষ চাকরি গ্রহণ বা ছাড়তে অত দ্বিধা করে না। উন্নত দেশে বিরোধীদলীয় নেতারা সরকারি প্রতিনিধি দলের প্রধান হয়ে বিদেশে ভ্রমণ করেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচির প্রশংসা করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশে কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থায় দূতিয়ালি করেন।

আর আমাদের দেশে? ধরুন, টেনিস তারকা অ্যান্ডিমারে ৭০ বছর পর ব্রিটেনের উইম্বলডন টেনিসে একক শিরোপা জিতেছেন। এজন্য ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাকে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছেন। সেই অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতা যেভাবে সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীসহ সবার খোঁজখবর নিলেন, হেসে-নেচে-গেয়ে ও খেয়ে আসর মাতালেন, তাতে ওই আসরে কে আসলে প্রধানমন্ত্রী, তা সত্যিই বোঝা দায় উঠেছিল।

ব্রিটেনে-আমেরিকায় একজন মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারী আইনের অধীনে কাজ করেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তা সাধারণ নাগরিককে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেন। তবে তাকে চেক করেন, এমনকি গারদেও ভরেন! আমাদের দেশে আমরা সরকারি কর্মচারীদের ‘স্যার’ বলতে বলতে হয়রান। অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে এমপি-মন্ত্রীদের চলাচলে এত গাড়ি এবং প্রটোকল দেয়া হয় না। ক্ষেত্রবিশেষে ড্রাইভারও দেয়া হয় না।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন তার দ্বিতীয় মেয়াদে শাসন বিভাগের কিছু বিষয় বিচার বিভাগের আওতাবহির্ভূত রাখার পক্ষে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বিচারালয় তাকে তার কিছু গোপন আলাপের টেপ হস্তান্তর করতে বলেছিলেন। নিক্সন তখন শাসন বিভাগের স্বাতন্ত্র্য এবং নিরাপদে কার্য সম্পাদনের বৈশিষ্ট রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের কর্তৃত্বের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সুপ্রিমকোর্ট প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারলেন না। আদেশ দিলেন, শাসন বিভাগের যে কোনো কাজ আদালত তদন্ত করে দেখতে পারবে। তাই গোপন কথোপকথনের টেপ ক্রিমিনাল তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তরিত হল। সেটাই বিখ্যাত ওয়াটারগেট কেলেংকারি।

আমেরিকার ফেডারেল জুডিসিয়ারি Due process, Reasonable care, undue Influence প্রত্যহ এসবের ব্যাখ্য করতে থাকেন, যাতে দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। বিচারকরা বলতে থাকেন-আইনের শাসন ততক্ষণ অক্ষুন্ন থাকবে, যতক্ষণ বিচারকরা শাসনতন্ত্রসহ অন্যান্য আইনের বিকল্প ব্যাখ্যা খোলা মনে দিতে পারবেন।

১২ ও ১৩ শতাব্দীর দিকে আইনের শাসনের প্রতিফলন ছিল স্রষ্টার নির্দেশিত পথ, যা ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা এবং মানবিক যুক্তিবাদের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হয়েছিল। ১৭ শতাব্দীতে ইংরেজ জাজ স্যার অ্যাডওয়ার্ড চোক জোর দিয়ে বলেন, রাজা কারও কাছে বাধ্যবাধক নন, শুধু স্রষ্টা এবং আইনের কাছে। আমেরিকান পণ্ডিত আলেকজেন্ডার হ্যামিলটন যুক্তি দেখান, জাজদের কোনো শক্তি নেই, ইচ্ছা নেই; আছে মাত্র বিচারিক দক্ষতা।

উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে রাজনীতিকরা ক্ষমতায় আরোহণের পর জনগণ বা দলকে কোনো রকম সতর্কতা বা যুক্তি দেখানো ছাড়াই নিষ্পেষণ করেন। এজন্যই সারা পৃথিবীতে স্বাধীনতার জন্য এখন আইনের শাসনের এত কদর। একটি দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের বড় চ্যালেঞ্জ হল, আইনের শাসনের বিধান সমুন্নত রাখা। অন্যদিকে শাসনতন্ত্রের বড় সার্থকতা তখনই, যখন তা দেশের জনগণ ও সরকার অকপটে তা মেনে চলে। চাপিয়ে দেয়া শাসনতন্ত্র বা সংখ্যাগরিষ্ঠের গোঁড়ামি অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের রাস্তায় ঠেলে দেয় অথবা আইন অমান্য ও প্রতিহতের শক্তি জোগায়। এজন্যই গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হলেও তা সংখ্যালঘিষ্ঠের সম্মতির ফসল। ডাইসির মতে, ইংল্যান্ডে জনগণ যেভাবে নিরাপদ বোধ করে এবং সরকারের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে, এটাই আইনের শাসন।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্র চর্চা বারবার হোঁচট খেলেও বর্তমানে তার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে এবং এক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিভিন্ন সমস্যার অবসান ঘটায়। স্বাবলম্বী নাগরিকরা যে পেশায় থাকুন না কেন, সৎ ও পরিচ্ছন জীবনযাপনের অনুপ্রেরণা অনুভব করেন। অনুভবের এ তাড়নার পাশাপাশি নেতা-নেত্রীরা যদি মানুষের অনুকরণীয় অবস্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়ে উঠেন, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম (অব.) : তুরস্কে দায়িত্বপালনকারী সাবেক সামরিক অ্যাটাসে

স্বাধীনতা ও পলাশি ট্রাজেডি

অগাষ্ট 23, 2017 মন্তব্য দিন

plassey monument 2মাহমুদ ইউসুফ : ১৩৩৮ সাল থেকে ১৫৩৮ পর্যন্ত দুশ বছর বাঙলার পরিপূর্ণ স্বাধীনতাকাল। বাঙলার ১০ হাজার বছরের র্কীতিকালের এই দুশ বছর এক গৌরবময় অধ্যায়ের ইতিহাস। এ সময়ে বাঙলার সুলতানরা নিজেদের যোগ্যতা, শক্তি ও ঐশ^র্যের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ নৃপতিদের অন্যতম হয়ে উঠেছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় এবং রাজার নানা কর্তব্য পালনেও অপরিসীম দক্ষতা দেখিয়ে গিয়েছেন। তার ফলে বাঙলার জনসাধারণের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। এই আযাদ সুলতানি আমলের জন্ম দেন সুলতান ফখর উদ্দিন মুবারক শাহ। তিনি ১৩৩৮ সালে সোনারগাঁওয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খানের মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখল করে সোনারগাঁওকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। এর পূর্ণতা দেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। ১৩৫২ সালে তিনি সাতগাঁও, লাখনৌতি ও সোনাগাঁও ঐক্যবদ্ধ করে গড়ে তোলেন একীভূত বাঙলা সালতানাত। এর ফলে তিনি হলেন সমগ্র বাংলাদেশেরই শাহ বা শাহ-ই-বাঙলা। বাংলার বাইরে তিনি দুর্গম নেপাল ও উড়িষ্যা বা জাজনগরেও সফল অভিযান চালান। এছাড়া ত্রিহুত, শাহ চম্পারন, গোরক্ষপুর, কাশিও তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এই স্বাধীনতা অক্ষুন্ন থাকে ১৫৩৮ পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে বৃহৎ বাঙলা শাসন করেন ২২ জন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁদের প্রজ্ঞা, সাহস, রণদক্ষতা ও কলা কৌশলে বাঙলা হয়ে ওঠে সুপারপাওয়ার। শুধু ধন-ধান্যে নয়, শৌর্য-বীর্যেও বাঙালিরা হয়ে ওঠে দুনিয়াসেরা।

১৫৩৮ সালে পাঠান বীর শের খানের হাতে স্বাধীন সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহমুদ শাহ পরাজিত হন। তবে সুলতানি আমলের অবসান হলেও আযাদি অক্ষুণœ থাকে। পাঠান বীররা স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। আফগান-পাঠান আমল চলে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত। আফগান শাসনের শেষ চরিত্র দাউদ খান কররানি মসনদে বসেন ১৫৭২ সালে। তাঁর চার বছরের শাসনকাল বাঙলার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ট্রাজিককাল। বিয়োগান্তক কাহিনি, বেদনাদায়ক ইতিহাস।

১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ উড়িষ্যার তুকারায়ের যুদ্ধ ও মুগলমারির যুদ্ধ নামে খ্যাত। জায়গা দুটি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনিপুর জেলার দুটি গ্রাম। দুটি গ্রামের ব্যবধান আট মাইল। এই আট মাইল বিস্তৃত স্থানেই সংঘটিত হয় এই যুদ্ধ। বাঙলার ইতিহাসে এই যুদ্ধ তাৎপর্যপূর্ণ এজন্য যে, এ যুদ্ধেই আফগানরা দেশের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে এবং বাঙলায় আফগান শাসন; একই সাথে বাঙলার স্বাধীনতার অবসান ঘটে। আর ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই সংঘটিত হয় রাজমহলের যুদ্ধ। এ সমরে মুঘল সেনাপতি ছিলেন খানই জাহান হোসেন কুলি বেগ। আর আফগানদের নেতৃত্বে ছিলেন দাউদ খান কররানি। এ লড়াইয়ে বিজয়ী হয় মুঘল বাহিনী। পালাতে গিয়ে দাউদ খান কররানির ঘোড়ার পা কাদায় আটকে যায়। বন্দি হন দাউদ খান কররানি। মুঘল আমিরদের দাবি অনুসারে হত্যা করা হয় দাউদ খান কররানিকে এবং তাঁর ছিন্ন মুঘল আকবরের নিকট প্রেরিত হয়। একই সঙ্গে লুপ্ত হয় বাঙলার স্বাধীন সালতানাত। তদানীন্তন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মহানগর সোনারগাঁও তলিয়ে যায় অন্ধকারে। বাঙলা বরণ করে ভারতের অধীনতা। দিল্লির বেদীমূলের আশ্রয়ে যায় বাঙলা। বাঙালিদের কপালে জুটে পরাধীনতার তিলক। সোনার বাংলা হয় লুটপাট ক্ষেত্র। দিল্লির চাটার দলেরা এদেশের সহায় সম্পদ খুবড়ে খেতে থাকে। বাঙলার সম্পদ লুট হয়ে দিল্লি সমৃদ্ধ হতে থাকে।

রাজমহলের যুদ্ধে জয়ের পর দিল্লির নবাব বা প্রতিনিধিরা বাঙলা শাসন করে ১৮১ বছর। এই পৌনে দুশ বছরে দিল্লি সরকারের ছত্রছায়ায় বাঙলায় বর্ণহিন্দুদের উত্থান ঘটে। জমিদার, রাজা, মহারাজা, সেনাপতি, ব্যাংকার, মুৎসুদ্দি, মহাজনপদগুলো ক্রমে ক্রমে হিন্দুদের দখলে চলে যায়। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নবাব মুর্শিদকুলী খান। বর্ণহিন্দুরা সম্মিলিত ষড়যন্ত্র করে বাঙলায় মুসলিম নবাবদের উৎখাতের জন্য। তারা লর্ড ক্লাইভের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে হাত মিলায়। বাঙলা থেকে মুসলমান উৎখাতের জন্য ২৩ জুন ১৭৫৭ পলাশিতে ঐক্যবদ্ধ খ্রিস্টান-হিন্দু। অসম যুদ্ধ নাটকে নবাব সিরাজদৌলার পরাজয় ঘটে। শ্রী বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘ধর্মতত্ত’-এ বলেন,‘মুসলমানের পর ইংরেজ রাজা হইল। হিন্দু প্রজা তাহাতে কথা কহিল না। বরং হিন্দুরাই ইংরেজকে ডাকিয়া রাজ্যে বসাইল। হিন্দু সিপাহী ইংরেজের হইয়া লড়িয়া হিন্দু রাজ্য জয় করিয়া ইংরেজকে দিল। কেননা, হিন্দুর ইংরেজের উপর ভিন্ন জাতীয় বলিয়া কোন দ্বেষ নাই। আজিও ইংরেজের অধীন ভারতবর্ষ অত্যন্ত প্রভুভক্ত। ইংরেজ ইহার কারণ না বুঝিয়া মনে করে, হিন্দু দুর্বল বলিয়া কৃত্রিম প্রভুভক্ত।’ (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: প্রবন্ধসমগ্র, পৃ ১৯৩)

পলাশি ট্রাজেডির সমাপনান্তে শুরু হয় দিল্লির বদলে খ্রিস্টানদের কোম্পানির শাসন। মুসলিমদের সম্পদ দখলে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় কোম্পানি ও নেটিভ সম্প্রদায়। লর্ড ক্লাইভ গংদের চক্রান্তে হিন্দুসমাজ ফুলে ফেঁপে বেড়ে ওঠে। আর মুসলিমরা নি:শ্ব, কপর্দকশূণ্য হয়ে পড়ে। শোষিত, বঞ্চিত, নিগৃহীত হয়েও মুসলমানরা আযাদি সংগ্রাম চালিয়ে যায়। ভারতীয় ঐতিহাসিক গোলাম আহমাদ মোর্তজা বলেন, ‘নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের মতে (বৃটিশ বিরোধী আযাদির জিহাদে) মুসলমানদের বিদ্রোহ দমনে ৫ লক্ষ বিপ্লবীর ফাঁসি দেয়া হয়েছে। বৃটিশ বুদ্ধিজীবীরা এটাকে বেমালুম হজম না করে কিঞ্চিৎ স্বীকার করা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছেন। তাই ফিল্ড মার্শাল লর্ড রবার্ট তার Forty One Years in India পুস্তকে কিঞ্চিৎ স্বীকার করে লিখেছেন, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে মাত্র ২৭ হাজার মুসলমানের শুধু ফাঁসি দেয়া হয়েছে।’ (গোলাম আহমাদ মোর্তজা: এ সত্য গোপন কেন, পৃ ৪৭)

উদার গণতন্ত্র ও মৌলবাদী ধর্মতন্ত্রের মহামিলন

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

শহিদুল ইসলাম : বাংলাদেশে সম্প্রতি সাম্প্রদায়িকতার যে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের অনেক ভালো ভালো কাজের দাবিকে যেন ব্যঙ্গ করছে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সবাই আশায় বুক বেঁধেছিল এই ভেবে যে, এবারে সাম্প্রদায়িকতার রাহুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া গেল। কিন্তু মানুষের সে আশা যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে এ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা চলছে তা নতুন করে দেশবাসীকে পাকিস্তানি নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সরকার জিয়া, এরশাদ ও খালেদার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি ভাবাদর্শকে পরাস্ত করতে পারেনি। বরং আজকের পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, তাদের সেই রাজনীতিকে আরো শক্তিশালী করে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সেসব আক্রমণে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বর্তমান সরকারের ওপর তাদের আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেই আস্থার ফলে তারা তাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি আগলে নিজের দেশেই পড়ে ছিলেন। অনেকেই আজ তাদের জান-মাল-সম্মান বাঁচানোর জন্য দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এভাবে চললে বাংলাদেশের অবস্থা পাকিস্তানের মতো হবে। মুসলমান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর মানুষ এখানে থাকতে পারবে না।

দুই. ইতিহাসে প্রমাণ আছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা না করলে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। সে রাষ্ট্রে মানবিক গুণাবলির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সভ্যতার সূচনালগ্নে একবার ও চৌদ্দশ খ্রিস্টাব্দের ইতালির রেনেসাঁর পর দ্বিতীয়বার জ্ঞানবিজ্ঞান-দর্শন চর্চার জোয়ার এসেছিল। দেখা যায় প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সূচনায় ধর্মীয় কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। কারণ গ্রিকদের কোনো ধর্মগ্রন্থ ছিল না। সেটাই ছিল প্রথম যুগের গ্রিকদের স্বাধীনতার প্রধান শর্ত। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বিউরি বলছেন,‘হোমারের কবিতা ছিল ইহজাগতিক, ধর্মীয় নয় এবং ধর্মগ্রন্থের তুলনায় সেগুলো নীতিহীনতা ও বর্বরতা থেকে মুক্ত। হোমারের কর্তৃত্ব ছিল অপরিসীম কিন্তু তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বের মতো বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই বাইবেলের সমালোচনার মতো হোমারের সমালোচনা কখনো বাধার সম্মুখীন হয়নি।’ বিউরি আরো বলছেন,‘স্বাধীনতার আর একটি অভিব্যক্তি ও শর্ত হলো যাজকতন্ত্রের অনুপস্থিতি। সেদিন পুরোহিত শ্রেণি কখনো-ই এতটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। তাই তারা নিজেদের স্বার্থে সমাজের ওপর নির্যাতন চালাতে পারেনি কিংবা ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিতে পারেনি।’ তখন পুরোহিত শ্রেণি রাষ্ট্রের কর্মচারী। রাষ্ট্রের অধীন।

অবিকল একই ঘটনা ঘটে রেনেসাঁর পর। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন ও শিল্প-বিপ্লবের পর ইউরোপে প্রবল প্রতাপশালী পুরোহিত শ্রেণির শক্তি ধ্বংস করা হয় এবং ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করা হয়। খ্রিস্টধর্ম টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার ফলে এটা সম্ভব হয়। তবে আদি সেই গ্রিক সমাজ মাত্র তিনশ বছর টিকেছিল। খ্রিস্টধর্ম উত্থানের পর পশ্চিমে দীর্ঘ এক হাজার বছরের অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হয়। এদিকে উনিশ শতকে রেনেসাঁর জয় নিশ্চিত হয়। ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ইউরোপ জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মাঝে ইসলামের আবির্ভাবের পর ৯ম থেকে ১১ শতকে ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় জোয়ার আসে। সে জোয়ারও তিনশ বছরেই শুকিয়ে যায়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় তাহলো ইসলামি বিশ্বে যারা জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা কেউই সূক্ষ্ম বিচারে মুসলমান ছিলেন না। ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদের ওপর আক্রমণ তাই প্রমাণ করে। তারা সবাই ছিলেন যুক্তিবাদী যা ইসলামে কেবল নয় সব ধর্মে নিষিদ্ধ। আবার আধুনিক সভ্যতায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সময়কালও দুই/তিনশ বছরের বেশি নয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পশ্চিমে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় ভাটা পড়তে শুরু করে এবং বর্তমানে পশ্চিমে মৌলিক কাজের পরিমাপ সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। কারণ আবার পশ্চিমে বিশেষ করে আমেরিকায় ধর্মীয় ভাবাদর্শের নতুন করে উত্থানের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকার সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর ট্রাম্পের ঘোষণায় সেটাই প্রমাণ করে। তিনি পুরোহিতদের দাবি পূরণে বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সংসর্গ, সমলিঙ্গ-বিবাহ ও গর্ভপাত নিষিদ্ধ করে নির্বাহী আদেশ দিতে যাচ্ছেন। সবার ধারণা আমেরিকান সাম্রাজ্যের দিন শেষ হতে চলেছে।

রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে বেগম রোকেয়াও ভেবেছিলেন। ১৩১১ সালে ‘নবনূর’ পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন,‘যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন।’ এটা কেবল নারীর ক্ষেত্রে সত্য নয়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্যও সত্য। নোবেল বিজয়ী একমাত্র মুসলিম বিজ্ঞানী প্রফেসর সালাম বলেছেন,‘ইসলামি বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার ধারা সবচেয়ে দুর্বল।’ চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ মুসলিম পণ্ডিত ইবনে খলদুন। তারপর ইসলামি বিশ্বে আর কোনো মনীষীর জন্ম হলো না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পদের কোনো অভাব নেই। তারা বিশ্বের উচ্চতম ভবন নির্মাণ করে গর্ব প্রকাশ করেন। আলোয় ঝলমল শহর তৈরি করে বিদেশিদের বেড়ানোর সুযোগ তৈরি করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্বমানের একটা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেননি। মোগল বাদশারা ‘তাজমহল’ তৈরি করেছেন, কিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেননি। যুক্তিবাদ ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে মুসলমান হুজুরদের সে মনোভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই প্রফেসর সালামকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিয়েছে আর মিসরের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক নাগিম মাহফুজকে মুসলমান বলে স্বীকারই করে না; বরং ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ গড়ে ইসলামের আদিযুগে ফিরে যেতে চাইছে মুসলমানরা।

তিন. বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমে উৎপাদিত সম্পদে আমরা মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছি। কিন্তু সে অর্জনে আমাদের মতো শহুরে অলস বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদদের অবদান কতটুকু? তাদের শ্রমের ওপরই আমরা জীবনযাপন করছি। অন্যের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে আমরা বিশ্বের কাছে বাহবা কুড়াচ্ছি। এই আত্মসাতেরই আর এক নাম ‘গণতন্ত্র’। আরো সূক্ষ্মভাবে বললে বলতে হয় ‘উদার গণতন্ত্র’। ‘ইসলামের’ নামে হুজুররা যে রাজনীতি করছে, আমরা ‘উদার গণতন্ত্রের’ নামে সেই একই রাজনীতি করছি। এখানেই ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মতন্ত্র’ এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছে। তাদের মিলনই বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানি কায়দায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাদের উপাসনালয় ভাঙা হচ্ছে, দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। হুজুরদের দাবি মেনে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানো হয়েছে। হুজুরদের নির্দেশে শিশুদের পাঠ্যপুস্তক রচিত হয়েছে। এতে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা লাখ লাখ মূর্তি ভাঙলেও হবে না। তাই আজ প্রশ্ন উঠেছে, আমরা পাকিস্তান ভাঙলাম কেন? আমরা কি কেবল পাঞ্জাবি ধনীর জায়গায় বাঙালি ধনী তৈরি করার জন্য বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? আজ একজন হিন্দুকে তার বাড়ির মহিলাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়, তাহলে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম কেন? পাকিস্তানি হামলাকারীর বদলে বাঙালি হামলাকারীর অভয়ারণ্য তৈরির জন্য? কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন? চার লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

চার. অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘উদার গণতন্ত্র’ তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে গেছে। এই গণতন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদ মাত্র আটজন মানুষ দখল করে নিয়েছে। তাই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির অধ্যাপক জন রালস্টোন সাওল একখানা বই লিখেছেন যার নাম দিয়েছেন ‘ভলতেয়ার্স বাস্টার্ডস’-ভলতেয়ারের জারজ সন্তান হলো আজকের গণতন্ত্র। ভলতেয়ারের সময় এই গণতন্ত্রের প্রভূত মূল্য ছিল। কিন্তু সম্পদের ওপর মানুষের অধিকার স্থাপনের আইন আজ সে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছে। আজ সারা বিশ্বে ‘উদার গণতন্ত্র’ ও মৌলবাদী ‘ধর্মতন্ত্রের’ মহামিলন ঘটে গেছে। তাই পৃথিবী আজ ক্রমান্বয়ে মানুষের বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। যে দেশ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে তাকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্থানে স্থাপন করতে পারবে, আগামী বিশ্বের পরিচালকের আসনে তারাই বসবে। ‘উদার গণতন্ত্র’ পৃথিবীতে শান্তির পরিবর্তে অশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের বিলাসী জীবনের ‘অপ্রয়োজনীয়’ প্রয়োজন মেটাচ্ছে। মানুষ প্রকৃতিকে দখল করেছে। প্রতিটি দেশের সংখ্যাগুরু স¤প্রদায়কে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দখল করেছে। জলবায়ু বিষাক্ত করে তুলেছে। মনে হয় বর্তমান সভ্যতা তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধীরে অথচ স্থির পায়ে এগিয়ে চলেছে।

শহিদুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যৌনদাসীদের প্রথম ভিডিও প্রকাশ

অগাষ্ট 21, 2017 মন্তব্য দিন

chinese comfort women for japaneseদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাদের মনোরঞ্জনের জন্য বাধ্যতামুলকভাবে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল অসংখ্য নারীকে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের মাঝ থেকে সেনারা শয্যাসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতো এদের কাউকে। এদেরকে বলা হতো ‘কমফোর্ট ওমেন’ বা স্বস্তি দেয়া নারী।

এমনই কিছু যৌনদাসীর প্রথম ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। ওই ভিডিওটি ১৮ সেকেন্ডের। ফুটেজটি দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের অর্থায়নে কিছু গবেষক পেয়েছেন সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইন ইউএস আর্কাইভে। এটি চীনে ধারণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। এতে দেখা যায়, লাইনে দাঁড়ানো বেশ কিছু নারীর সঙ্গে কথা বলছে এক চীনা সেনা সদস্য। তার উদ্দেশ্য কি তা বোঝা যায় নি। তবে ১৯৪৪ সালে মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল কোরিয়ার সাত জন নারীকে। তাদের সঙ্গে সেনা কর্মকর্তা কথা বলছেন তাকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনীর একজন চীনা ক্যাপ্টেন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক কর্মীদের দাবি, জাপানের সেনাবাহিনীর সদস্যদের মনোরঞ্জন করতে দুই লাখ নারীকে জোর করে ঠেলে দেয়া হয়েছিল পতিতালয়ে। আর এতে যারা থাকতেন তাদেরকে বলা হতো কমফোর্ট ওমেন। এসব নারীর বেশির ভাগকে নেয়া হতো কোরিয়া থেকে। এছাড়াও ছিলেন চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের নারী, যুবতীরা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সেনাবাহিনীর জন্য নারীদের জোরপূর্বক যৌনদাসী বানানো হয়েছিল এর স্বপক্ষে ফটোগ্রাফ রয়েছে। আছে জীবিতদের সাক্ষ্য। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া যে ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে তার গবেষকরা বলেছেন, এই ফুটেজটি চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে ধারণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সেনারা। ইউনান প্রদেশটি তখন ছিল জাপানের অধীনে।

নারীদের এভাবে জোর করে যৌনদাসী বানানোর বিষয়ে জাপানের ক্ষমা না চাওয়া ও ক্ষতিপূরণ না দেয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্কে টান পড়েছে। ২০১৫ সালে দেশ দুটি একটি ঐকমত্যে আসে। তার অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষা চায় টোকিও। একই সঙ্গে নির্যাতিতদের ১০০ কোটি ইয়েন দিতে রাজি হয়। তারপরও এর উত্তাপ রয়েছে।

সম্প্রতি বুশানে জাপানের কনসুলেটের সামনে একটি ‘কমফোর্ট ওমেন’-এর মূতি বসায় জাপান। এ নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়োজিত জাপানের রাষ্ট্রদূতকে সাময়িক সময়ের জন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।