আর্কাইভ

Archive for the ‘ইতিহাস’ Category

বিশ্বের প্রথম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী মারিয়া মিশেল

maria michelleআজ থেকে ২০০ বছর আগে জন্ম নিয়েছিলেন মারিয়া মিশেল। এই মহিলা গোটা যুক্তরাষ্ট্রে সাড়া ফেলে দেন। মার্কিন ইতিহাসে তিনি একজন পেশাদার নারী জ্যোতির্বিদ ছিলেন। ১৮৪৭ সালে তিনি নতুন ধূমকেতু আবিষ্কার করেন যা ‘মিস মিশেলের ধূমকেতু’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়—

মারিয়া মিশেলের জীবনের গল্পটা করুণ। বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি পান এবং সেই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তার গল্পের গতি যেন ভেনাস গ্রহের মতোই! পেছনের দিকে নিয়ে যায়। মারিয়া যখন ছোট, তখন নারীর বিজ্ঞানচর্চা ছিল স্বাভাবিক। তবে এই চর্চাকে পেশাদারিত্বে রূপ দেওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। আর হ্যাঁ, সে সময় ছিল না কোনো লিঙ্গ বৈষম্য। একদমই ছিল না। বিভিন্ন কারণে আঠারো শতকের শুরুর দিকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে নারীদের উৎসাহিত করা হতো। মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে বলা হতো সুইপিং দ্য স্কাই।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ মারিয়া মিশেল ১৮১৮ সালের ১ আগস্ট ম্যাসাচুসেটসের নান্টউইটে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নান্টউইটের একটি বিদ্যালয়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে অধ্যয়নের আগ্রহ জন্মে বাবা উইলিয়ামের সমর্থনে। মিশেলকে দুরবিনের ব্যবহার সম্পর্কে হাতেখড়ি শিক্ষা দেন বাবা উইলিয়াম। মা লিডিয়া মিশেল ছিলেন সাধারণ মহিলা। তাদের পরিবারকে বলা হতো কোয়াকার পরিবার। বাবা উইলিয়াম ও মা লিডিয়ার পরিবারে ছিল ৯ জন ছেলেমেয়ে। তারা বিশ্বাস করত ছেলে এবং মেয়ে উভয়েরই শিক্ষার প্রয়োজন আছে এবং উভয়কেই স্কুলে যেতে হবে। মিশেলের বাবা ছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং শিক্ষক।

১৮৩৬ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত মিশেল নান্টউইটের এথেনাম লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেন। রাতের অন্ধকার পেরিয়ে সকাল হলেই তিনি সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সৌরগ্রহণ, তারকা, বৃহস্পতি ও শনি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান আহরণের জন্য বিভিন্ন বই পড়তেন। তার বয়স যখন ১২, তখন তিনি সর্বপ্রথম বাবার সঙ্গে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আকাশ পর্যবেক্ষণের গুণাবলিগুলো মারিয়া মিশেল সযত্নে লালন করেছিলেন। মারিয়া ছিলেন তৎকালীন পেশাদার নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে সেরা। মিশেল আকাশের নক্ষত্রগুলোর একটি নকশা তৈরি করেছিলেন। উনিশ শতকে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুরস্কৃতও হন। যা কিনা তার নারী শিক্ষার্থীদের সামনে বিজ্ঞানের দুয়ার খুলে দেয়। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সে সময়ে নারী অগ্রগতির পথ সহজ এবং সুগম ছিল না। কারণ যখনই নারীরা এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখনকার সময়ের সামাজিক এবং আর্থিক প্রেক্ষাপট।

ইতিহাসবিদের মতে, তৎকালীন সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে নারীদের প্রবেশ তেমন কঠিন কিছু ছিল না। সময়টিকে নারীসুলভ বিজ্ঞানের সময় বলা হতো। যেন মহাকাশ ও নক্ষত্র নিয়ে গবেষণায় পুরুষের চাইতে নারীরাই অপেক্ষাকৃত বেশি এগিয়ে ছিল। ‘মারিয়া মিশেল অ্যান্ড দ্য সেক্সটিং অফ সায়েন্স’ বইটির লেখক, সাইমন্স কলেজের প্রফেসর রিনি বার্গল্যান্ড তার বইতে উল্লেখ করেন, ‘উনিশ শতকের শুরুতে আমেরিকার বিজ্ঞানচর্চায় নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করত। বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের মতো পুরুষরা অংশ নিত না। তখন বিজ্ঞানচর্চাকে নারীসুলভ রেওয়াজরীতিও মনে করা হতো।’

বাবার সাহচর্য এবং নিজের আগ্রহের ফলে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে মারিয়া মিশেলের প্রবেশ এবং বিচরণ বেশ সহজেই ত্বরান্বিত হয়েছিল। ১৮৪৭ সালে, পৃথিবী থেকে বহু দূরে অবস্থিত একটি ধূমকেতুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার জন্য সুইডেনের যুবরাজ মিশেলকে মেডেল প্রদান করে পুরস্কৃত করেছিলেন। তখন থেকেই ধূমকেতুটি ‘মিস মিশেলের ধূমকেতু’ নামে পরিচিতি পায়। এর পরের বছরই আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের সর্বপ্রথম নারী জ্যোতির্বিদ নির্বাচিত হন। এরপর যুক্ত হন আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্সের সঙ্গে। ১৮৫৬ সালে চল যান ইতালি। উদ্দেশ্য ভ্যাটিকান অবজারভেটরি থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ। অবজারভেটরি মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হলেও সেখানে নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এরপর তিনি পিটিশন দাখিল করেন। তার আত্মজীবনীমূলক লেখায় মিশেল বলেন, ‘সন্ন্যাস আশ্রমে থাকার ব্যাপারে আগ্রহ না থাকলেও, নিষেধাজ্ঞা থাকায় মনে জিদ চেপে বসে। দুই সপ্তাহ পর অবজারভেটরির কর্তারা তাকে ভেতরে প্রবেশাধিকার দেন। ১৯৫৪ সালের ২ মার্চ আরেক জার্নালে তার সুইপিং দ্য স্কাই সম্পর্কে জানা যায়, ‘গত রাতে তিন মেয়াদে প্রায় দুই ঘণ্টা যাবৎ ‘স্কাই সুইপ’ করেছিলাম। এটা খুব অসাধারণ একটি রাত ছিল— মেঘমুক্ত, পরিষ্কার এবং সুন্দর একটা আকাশ। আমার কাজ করতে বেশ ভালোই লাগছিল কিন্তু শীতল বাতাসে হঠাৎ আমার পিঠব্যথা করতে শুরু করে। তখন দুটি নেবুলা দেখতে পেয়েছিলাম যা আমার পিঠ ব্যথার কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।’

ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সূত্র মতে, যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন তাদের মধ্যে শতকরা ২৬ ভাগ হচ্ছেন নারী এবং আমেরিকার জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রফেসরদের মধ্যে চার ভাগের একভাগই নারী। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই মহীয়সী নারীর এত অবদান থাকলেও ১৮৭০ সালের শুরুতে মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। তবুও বিজ্ঞানচর্চা যখন পেশাদারিত্বে রূপান্তর হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। বিজ্ঞানমনস্ক নারীদের বিজ্ঞানচর্চার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখে মিশেল বসে ছিলেন না। ১৮৭২ সালে তিনি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য এডভান্সমেন্ট অফ উইমেন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে মৃত্যুর এক বছর আগ পর্যন্ত নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে যান। ১৯৩৭ সালে তার সম্মানে একটি গ্রহাণুর (১৪৫৫ মিশেলা) নামকরণ করা হয়। ২০১৩ সালে গুগল মিশেলের ১৯৫তম জন্মদিনে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে একটি ডুডল প্রকাশ করে।

Advertisements

ভারতে মুসলিমদের গরুপালনও দোষের !

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ভারতে সরকারিভাবে গরুজবাই নিষিদ্ধ। আগেও এনিয়ে ঝামেলা ছিল। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এ আইন চূড়ান্ত করা হয়। তবে লুকিয়ে ছাপিয়ে কোথাও না কোথাও গরুজবাই হয়েই থাকে। ঝামেলা বাঁধে এ নিয়েই। গরুর গোশত যে কেবল মুসলিম আর খৃস্টানদেরই প্রিয় এমন নয়। হিন্দু ব্রাহ্মণরা আগেও গরুমাংস খেতেন। এখনও খান। দক্ষিণ ভারতীয় ও কাশ্মিরী ব্রাহ্মণদের কাছে গোমাংস এখনও দারুণ জনপ্রিয় খাবার।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে বেশ কয়েকŸার ভারত গিয়েছি। কোলকাতাসহ ভুপাল, দিল্লি, নাগপুর, লক্ষেè, এলাহাবাদ, জৌনপুর প্রভৃতি শহর ঘুরেছি। সবখানেই গরুর গোশত পাওয়া যেতো। হোটেলে বিফ রান্না হতো। কোলকাতায় দারুণ স্বাদের গরুভুনা আর ক্ষিরিগুর্দা পাওয়া যেতো। ক্ষিরিগুর্দা মানে গাইগরুর দুধের থলেটা খুব চমৎকার করে রান্না হতো কোলকাতার দক্ষিণ ভারতীয় হোটেলগুলোতে। কোলকাতায় মাসের পর মাস অবস্থানকালে আমি প্রায়ই ক্ষিরিগুর্দার লোভে সাউথ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেরে নিতাম। বাঙালরাও গরুভুনা করতো। শুকনো করে। বেশ পোড়া পোড়া। অনেকটা কাবাবের মতো। সস্তায় পাওয়া যেতো। আমি দারুণ উপভোগ করেছি কোলকাতায় সেসময় বিফভুনা। এখন সেদিন নেই। ভয়াবহ সংকটে এখন গরু নিয়ে ভারতীয় মুসলিমরা।

আজকাল ভারতে মুসলিমরা গরুপালনও করতে পারেন না। জবাই তো দূরের কথা। কোনও মুসলিম গরু লালনপালন বা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে আনানেয়া করলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া হয়। এমনকি অনেককে হত্যার শিকারও হতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক এটাই। তবে আসামসহ ভারতের বেশ কয়েক জায়গায় এ অমানবিক আইনের প্রতিবাদে হিন্দুরাই গোহত্যার মাধ্যমে উৎসব করে মদসহযোগে গরুর গোশত ভক্ষণ করেছেন। তাহলে গরু জবাইয়ের অপরাধে মুসলিমদের হত্যা কেন? অথচ ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে গরু জবাই কিংবা গোমাংস ভক্ষণ আদৌ নিষিদ্ধ নয়।

দেখুন, ভারতীয় শাস্ত্রে এ প্রসঙ্গে কী রয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন: “এই ভারতবর্ষেই এমন একদিন ছিল যখন কোনও ব্রাহ্মণ গরুর মাংস না খেলে ব্রাহ্মণই থাকতে পারতেন না। যখন কোনও সন্ন্যাসী, রাজা, কিংবা বড় মানুষ বাড়িতে আসতেন, তখন সবচেয়ে ভালো ষাঁড়টিকে হত্যা করা হতো।” (Collected works of Swami Vivekananda, Advaita Asharama,1963, Vol III, page 172)

ঋগবেদের প্রাচীন ভাষ্যকার হিসেবে সায়নাচার্যের নাম বিখ্যাত। তাঁর আগেও বিভিন্ন ভাষ্যকার, যেমন স্কন্দস্বামী, নারায়ণ, প্রমুখ ঋগবেদের ভাষ্য রচনা করেছেন।

ভাষ্যকার আচার্য সায়ন লিখেছেন তার অনুবাদে, “You (O Indra), eat the cattle offered as oblations belonging to the worshippers who cook them for you. (Atharvaveda 9/4/1)”

হে ইন্দ্র গ্রহণ কর সেসব গরুর মাংস যা তোমাকে তোমার ভক্তরা রন্ধন করে উৎসর্গ করেছে।”

ঋগবেদ ১০/৮৬/১৩ তে গরুর মাংস রান্না করবার কথা পাওয়া যায়।

ঋগবেদের ১০/৮৬/১৪ শ্লোকে আছে, ইন্দ্রের জন্য গোবৎস উৎসর্গ করা হয়েছে।

Rig Veda 10.86.14 [Indra speaks :] The worshippers dress for me fifteen (and) twenty bulls : I eat them and (become) fat, they fill both sides of my belly; Indra is above all (the world).

উপনিষদেও গরু খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভালো সন্তান পাবার জন্য ষাঁড়ের মাংস খাওয়া উচিত।

Brihadaranyak Upanishad 6/4/18 suggests a ‘super-scientific’ way of giving birth to a super intelligent child.

এ ব্যাপারে আরও স্পষ্ট বিধান দিয়েছে মনুসংহিতা। মনুসংহিতা ৫/৪৪ শ্লোকে বলা হয়েছে, “শ্রুতিবিহিত যে পশুহত্যা, তাহাকে অহিংসাই বলিতে হইবে, যেহেতু বেদ ইহা বলিতেছে।”

অগ্নির কাছে নিবেদনে বলদ, ষাঁড় এবং দুগ্ধহীনা গাভী বলিদানের উল্লেখ আছে। (ঋগবেদ সংহিতা, /১৬২/১১১৩, /১৭/১১,১০/৯১/১৪)
মহাভারতেও গরু খাওয়ার কথা আছে, মহাভারত বন পর্ব, খণ্ড ২০৭, অনুবাদ করেছেন কিশোরীমোহন গাঙ্গুলী।

বিষ্ণুপুরাণ বলছে, ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাইয়ে হবিষ্য করালে পিতৃগণ ১১ মাস পর্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। আর এ স্থায়িত্ব কালই সবচেয়ে দীর্ঘ (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬)। বৃষের মাংস [বেদ:/১৬৪/৪৩], মহিষের মাংস [বেদ: /২৯/], অজের মাংস [বেদ:/১৬২/] খাওয়া হতো। তবে বেদে এও আছে যে, পরস্বিনী গাভী মানুষের ভজনীয় অর্থাৎ পূজনীয় [বেদ://]। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন ভিন্ন কথা: “You will be astonished if I tell you that, according to the old ceremonials, he is not a good Hindu who does not eat beef. On certain occasions he must sacrifice a bull and eat it. [The complete works of Swami Vivekananda, Volume 3, Pg 536]”

জগতগুরু আদি শংকরাচার্য, যিনি ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অদ্বৈত বেদান্ত শাখার প্রতিষ্ঠাতা। শংকরাচার্যের গীতাভাষ্য হিন্দু ধর্মীয় পন্ডিতমহলে অত্যন্ত বিখ্যাত। তিনি ব্রাহ্মসূত্র অধ্যায় ৩, পাদ্য ১, সূত্র ২৫ এ লিখেছেন, “যজ্ঞে পশুহত্যা পাপ হিসেবে বিবেচিত হবে না, কারণ শাস্ত্রই এর অনুমোদন দিয়েছে।”

বেদে স্পষ্টভাবে গরুর মাংস খাওয়ার কথা থাকলেও হিন্দুরা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।

হিন্দুরা হাজির করে ঋগ্বেদ (/৫৬/১৭) এই শ্লোক। ঋগবেদের ঐ শ্লোকে নাকি গোহত্যাকে মানুষ হত্যার সমকক্ষ বলা হয়েছে।

নীচে তুলসীরামের উক্ত শ্লোকের অনুবাদ দেখুন তো এ রকম কিছু আছে কিনা।

এরপর আবার হিন্দুরা, অথর্ববেদের (//১৫) এই শ্লোক দেখায়, যেখানে বলা হয়েছে: গোহত্যা ও ঘোড়া হত্যা উভয়ই নিষিদ্ধ। এখানে সত্য লুকিয়ে রেখে ঘোড়াসহ যে কোনও প্রাণির মাংস খেতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু সত্য হলো ঐ শ্লোকে বলা হয়েছে:
যারা বহিঃশত্রু (দেশকে আক্রমণ করবে) এবং প্রাণির মাংস তথা ঘোড়ার মাংস ও মানুষের মাংস খায় তাদের হত্যা কর।

ধারাবাহিকভাবে এই মন্ত্রগুলো যেমন ৭, , ৯ পড়লেই পরিষ্কার বোঝা যাবে।

অথর্ববেদের (//১৫) এই শ্লোকে স্পষ্টভাবে গরুর দুধগ্রহণকারীরও একই শাস্তি দেয়ার কথা আছে। তার মানে কি গরুর দুধ খাওয়াও বেদের নিষেধ ? এটি আরও স্পষ্ট আছে ১৭ নাম্বার মন্ত্রে, এখানে বলা গরুর দুধ যে খায় তার বুকে বর্শা মারার কথা।
এখন এই মন্ত্রগুলোর অর্থ সর্বজনীনভাবে নিলে হিন্দুরা কি বলবেন যে বেদ অনুসারে দুধ খাওয়াও মানা? এরপর হিন্দুরা ঋগবেদের ১/১৬৪/৮০ এবং অথর্ববেদের ৯/১০/২০ ও ৭/৭৩/১১ এইসব শ্লোক দেখিয়ে বলেন এইসব শ্লোকে গরুকে (আঘ্ন্যা) বলা হয়েছে। আঘ্ন্যা মানে যাকে হত্যা করা উচিত নয় । অথচ এসব শ্লোকে শুধুমাত্র মা গরুকে অর্থাৎ যে গরু থেকে দুধ পাওয়া যায় সেই গরুর প্রসঙ্গে (আঘ্ন্যা) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে অর্থাৎ যে গরু দুধ দেয় সেই গরু হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। দেখুন (ঋগবেদ ১/১৬৪/৮০) শ্লোকের তুলসীরামের অনুবাদ। তুলসীরাম লিখেছেন, Invioable (আঘ্ন্যা) as Mother Cow.
তুলসীরাম অথর্ববেদ ৯/১০/২০ শ্লোকেও একই কথা লিখেছেন, Invioable (আঘ্ন্যা) as Mother Cow. হাজির করা হয় ঋগবেদের ৮/১০১/১৫ এই শ্লোক…. (Do not kill the cow. Cow is innocent and aditi– that ought not to be cut into pieces).
মহাত্মা গান্ধী বলেছেন: “I know there are scholars who tell us that cow-sacrifice is mentioned in the Vedas. I… read a sentence in our Sanskrit text-book to the effect that Brahmins of old (period) used to eat beef. ( M.K.Gandhi, Hindu Dharma, New Delhi, 1991, p. 120).”

অর্থাৎ, “আমি জানি (কিছুসংখ্যক পন্ডিত আমাদের বলেছেন) বেদে গোউৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে। আমি আমাদের সংস্কৃত বইয়ে এরূপ বাক্য পড়েছি যে, পূর্বে ব্রাহ্মণরা গোমাংস ভক্ষণ করতেন। (হিন্দুধর্ম, এম.কে. গান্ধী, নিউ দিল্লি, ১৯৯১, পৃ. ১২০)
অতএব এবার নিশ্চয়ই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় গরুর গোশত খাওয়া ধর্মসম্মত।

অবশ্য বৌদ্ধযুগের আগ পর্যন্ত হিন্দুরা প্রচুর গোমাংস ভক্ষণ করতেন এ তথ্যও অনেকেই জানেন। ব্যাসঋষী স্বয়ং বলেছেন, ‘রন্তিদেবীর যজ্ঞে একদিন পাচক ব্রাক্ষ্মণগণ চিৎকার করে ভোজনকারীদের সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘মহাশয়গণ! অদ্য অধিক মাংসভক্ষণ করবেন না, কারণ অদ্য অতি অল্পই গোহত্যা করা হয়েছে; কেবলমাত্র একুশ হাজার গোহত্যা করা হয়েছে।’ (সাহিত্য সংহিতা৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা৪৭৬)

বৌদ্ধযুগের পূর্বপর্যন্ত হিন্দুরা যে প্রচুর গরুর গোশত খেতেন ডা. রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রণীত Beef in Ancient India গ্রন্থে, স্বামী ভুমানন্দ প্রণীত ‘সোহংগীত’, ‘সোহং সংহিতা, ‘সোহং স্বামী’ গ্রন্থগুলোতে, আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে পর্যন্ত গোহত্যা, গোভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখন অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেতো।

ডা. রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রণীত Beef in Ancient India গ্রন্থে, স্বামী ভুমানন্দ প্রণীত অনেক গ্রন্থে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে গোহত্যা, গোভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখন অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেতো। তাই অতিথির আরেক নাম ‘গোঘ্ন’।

বৌদ্ধসম্রাট অশোকের সময় থেকে গোহত্যা নিষিদ্ধ করা হয়। সুতরাং বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাব ২০০০ বছর আগে হলেও গোহত্যা আরও অনেক পরে নিষিদ্ধ হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্রাট অশোকের নিষেধাজ্ঞা হিন্দুরা মানছে কেন?

এটাও ধর্মীয় সংঘাতের ফল। বৌদ্ধধর্ম এতোই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, প্রচুর লোক, বিশেষ করে তথাকথিত “নীচ জাতি” আকৃষ্ট হয়েছিল, এই ধর্মের প্রতি । ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং ব্রাহ্মণরা প্রমাদ গুণলেন। তারাও পুরোপুরি মাছমাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়ে ভেকধারী হয়ে গেলেন।

মূলত এটা উত্তর ভারতেই হয়েছিল । তাই এখনও ওটা “গোবলয়” নামে খ্যাত।

বেশিদিনের কথা নয়, আলীবর্দির সময়ে রামপ্রসাদের গুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ একটা বই লেখেন। নাম ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’।

এতেও অষ্টবিধ মহামাংসের মধ্যে গোমাংস প্রথম বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋগবেদে ফিরে আসি। কি দেখছি? প্রথম মন্ডলের ১৬৪ সূক্তের ৪৩ নং শ্লোকে বৃষমাংস খাওয়ার কথা আছে। মহিষমাংসের উল্লেখ আছে পঞ্চমমলের ২৯ নং সূক্তের ৮ নং শ্লোকে।

মোষ বলি আজও হয় । নেপালে যারা মোষের মাংস খায়, তাদের ছেত্রী বলা হয়।

এছাড়া বনবাসকালে রামচন্দ্রের লাঞ্চের মেনু কী ছিল, অনেকেরই জানা নেই।

তিন রকমের মদ বা আসব হয়। যথা: গৌড়ি (গুড় থেকে তৈরি), পৌষ্টি (পিঠে পচিয়ে তৈরি) এবং মাধ্বি (মধু থেকে তৈরি)। এর সঙ্গে প্রিয় ছিলশূলপক্ব বা গোবৎসের মাংস।

উল্লেখ্য, কারুর বিশ্বাস বা অনূভুতিতে আঘাত দেবার জন্য নয়, শুধুমাত্র সত্য অবগতির জন্যই ভারতীয় শাস্ত্রাদির বাণী উদ্ধৃত করা হলো। যাদের ঘরে শাস্ত্রসমূহ আছে, তাঁরা অনুগ্রহ করে সেগুলোর পাতা উলটে দেখতে পারেন। এছাড়া আজকাল ইন্টারনেট বা গুগল সার্চ দিয়েও পরখ করে দেখতে পারেন। আসলে সত্য চিরদিন চেপে রাখা যায় না। এর আগুন বিলম্বে হলেও সর্বভুক হয়ে প্রকাশ পায়। প্রকটাকার ধারণ করে। এই হলো বাস্তবতা এবং সত্যের ধর্ম। এ আগুন ঠেকায় কার সাধ্য?

যাই হোক, ভারতের যে ক’জন গোমাংসের বড় ব্যবসায়ী আছেন, তাঁরা সবাই হিন্দু মাড়ওয়ারি। বিপুল পরিমাণ প্যাকেটজাত গোমাংস রফতানি করে হাজার হাজার কোটি রুপি উপার্জন করেন প্রতি বছর। এতে তাঁদের জাত যায় না। ধর্মেরও অবমাননা ঘটে না। দোষ শুধু মুসলিমরা গরু জবাই করলে। এখন ভারতে গরুপালন করলেও মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে। আগে এসব খবর মিডিয়ায় স্থান পেতো। এখন তাও প্রায় বন্ধ।

উল্লেখ্য, গরুর গোশতের ক্রাইসিস সব দেশেই। আমাদের দেশেও চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম। এমতাবস্থায় ভারতে যদি গরুর গোশত খাওয়া সত্য সত্যই বন্ধ করে তা আমাদের দেশে পাঠানো হয়, তবে কিছুটা হলেও কম দামে পাওয়া যেতো বৈকি।

গর্ব ও গ্লানির আখ্যান স্পেনের আল হামরা

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ : মুসলিম জ্ঞানবিজ্ঞান সভ্যতার অনন্য অধ্যায় স্পেনের আন্দালুসিয়া। নগরীর গর্ব আল হামরা। আরবি কালাত আল হামরাঅর্থাৎ লাল কেল্লা বা বহুল প্রচলিত আল হামরা প্রাসাদ। পরম করুণাময়ের হাত যেন তাঁর সব সৌন্দর্যসুষমা এখানেই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিশ্ববাসীর কাছে আজও অপার বিস্ময় অনন্য সৃষ্টিসম্ভার আল হামরা।

১২৩৮ সালে মুহাম্মদ ইবনে নাসর (নাজার নামে পরিচিত, ১২৩৮১২৭৩ খ্রিস্টাব্দ) গ্রানাডা জয় করেন। তিনি তাঁর আবাসন প্রশাসনিক প্রয়োজনে প্রাসাদটি নির্মাণের সূচনা ঘটান। পরবর্তী ৩০০ বছরে বিভিন্ন মুসলিম শাসকের পরিকল্পনা পরিচর্যায় আল হামরার নান্দনিকতা পরিসর বৃদ্ধি পায় এবং এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়।

মাদ্রিদের ৪৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে দারু নদীর তীরে সবুজশ্যামল এক পাহাড়ে অবস্থিত আল হামরা। মুহাম্মদ ইবনে নাসর (নাসরি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা) প্রাসাদটির নাম দেন আল হামরাঅর্থাৎ একটি লাল প্রাসাদ। কেননা তিনি যখন ওই প্রাসাদে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর দাড়ির রং ছিল লাল।

মুহাম্মদ ইবনে নাসর যখন বিজয়ীর বেশে গ্রানাডায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁকে স্বাগত জানিয়ে সমবেত জনতার উল্লাসধ্বনি ছিল মারহাবান লিননাসরঅর্থাৎআল্লাহর কৃপায় বিজয়ীকে সুস্বাগত জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘লা গালিবা ইল্লাল্লাহ’—অর্থাৎঅন্য কেউ বিজয়ী নয়, যদি না আল্লাহ চান। পরবর্তী সময়েলা গালিবা ইল্লাল্লাহবাক্যটি নাসরি বংশের স্লোগান হয়ে যায়। আল হামরার অলংকরণে বাক্যটি বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। মুহাম্মদ ইবনে নাসরের বিজয় নিয়ে দেশে দেশে প্রচলিত হয় অসংখ্য গীতিকবিতা গল্পগাথা। আল হামরার দেয়ালে দেয়ালে স্বর্ণ পাথরে খোদাই করা আরবি ক্যালিগ্রাফির অনুপম শিল্পনিদর্শন অত্যন্ত বিস্ময়কর দৃষ্টিনন্দন। পবিত্র কোরআন, হাদিস, আরবি কবিতা উপদেশাবলি আল হামরার কক্ষ, খুঁটি, মিনার ইত্যাদিকে সুশোভিত করেছে। কাজে ব্যবহৃত হয়েছে শত শত মণ স্বর্ণ, মূল্যবান হীরকখণ্ড মণিমুক্তা। যে মালভূমিতে আল হামরা অবস্থিত, তার দৈর্ঘ্য ৭৪০ মিটার (দুই হাজার ৪৩০ ফুট), প্রস্থ ২০৫ মিটার (৬৭০ ফুট) প্রাসাদটি পশ্চিমে উত্তরপশ্চিম থেকে পূর্বে দক্ষিণপূর্বে প্রসারিত এবং প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার (১৫ লাখ ৩০ হাজার ফুট) এলাকাজুড়ে অবস্থিত।

মধ্যযুগের আরব সাহিত্যসংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শাসনের সুদৃঢ় ভিত্তি সৌন্দর্যের স্মারক হিসেবে নভেম্বর ১৯৮৪ সালে আল হামরাকে ইউনেসকো মানবতার সাংস্কৃতিক বিশ্বঐতিহ্য ঘোষণা করেছে।

স্পেনে মুসলিম ঐতিহ্যের রয়েছে সোনালি অতীত। মহাকালের স্রোতে হারিয়ে গেছে ৭১১ থেকে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৭৮০ বছরের মুসলিম শাসনের গৌরবগাথা। ৩০ এপ্রিল ৭১১ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি জিয়াদ আল তারিক তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে স্পেন উপকূলের এক পাহাড়ে ঘাঁটি গাড়েন। পরে ওই পাহাড়ই জাবাল তারিক বা তারিকের পাহাড় নামে বিখ্যাত হয়, যার শাব্দিক রূপান্তর জিব্রাল্টা। পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে সেনাপতি তাঁর নৌকা পুড়িয়ে দেন। এতে অবাক সৈন্যদের জিজ্ঞাসায় তারিক বলেছিলেন—‘আমরা ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি। হয় বিজয়, নতুবা ধ্বংস।প্রসংগত, সৈন্যদের উদ্দেশে তারিকের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হলো—‘হে আমার যোদ্ধারা! কোথায় তোমরা পালাবে? তোমাদের পেছনে সাগর, সামনে শত্রু। তোমাদের আছে শুধু সাহস ধীশক্তি। মনে রেখো, দেশে তোমরা সেই এতিমদের চেয়েও হতভাগা, যাদের লোভী মালিকদের সঙ্গে টেবিলে বসতে হয়। তোমাদের সামনে শত্রু, যাদের সংখ্যা অগণ্য। কিন্তু তোমাদের তলোয়ার ছাড়া কিছুই নেই। তোমরা বেঁচে থাকতে পারবে, যদি শত্রুর হাত থেকে নিজেদের জীবনকে ছিনিয়ে আনতে পারো। ভেবো না, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব না। আমিই সবার সামনে থাকব এবং আমার বাঁচার সম্ভাবনাই সবচেয়ে ক্ষীণ।

তারিকের এমন মর্মস্পর্শী বক্তব্য মুসলমানদের স্পেন বিজয় সহজতর করে। তারা স্পেনের নামকরণ করে আন্দালুসিয়া। স্পেনে মুসলিম শাসনে কর্ডোভা হয়ে ওঠে ইউরোপের সবচেয়ে মনোরম জনপদ। প্রায় পাঁচ হাজার মিল ছিল শুধু কর্ডোভায়ই; অথচ ইউরোপে একটিও ছিল না। তখন ইউরোপের ৯৯ শতাংশ লোক অশিক্ষিত ছিল। পক্ষান্তরে শুধু কর্ডোভায়ই ছিল ৮০০ পাবলিক স্কুল। তৎকালের ইউরোপে গোসলখানার ধারণাই ছিল না। অথচ তখন মুসলমানরা কর্ডোভায় ৯০০ হামামখানা বা গণগোসলখানা বানিয়েছিলেন। দশম শতকে কর্ডোভায় ছিল ৭০০ মসজিদ, ৬০ হাজার প্রাসাদতুল্য বাড়ি। ছিল ৭০টি লাইব্রেরি, যার সবচেয়ে বড়টিতে ছিল ছয় লাখ পুস্তক। সে সময় আন্দালুসিয়ায় বছরে ৬০ হাজার পুস্তকপুস্তিকা প্রকাশিত হতো। অথচ ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, আজ স্পেনে মুসলমানদের অস্তিত্ব সংকট বিদ্যমান।

জানুয়ারি ১৪৯২। মুসলমানদের পরাজয়ের ধারায় সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে এই দিন। আন্দালুসিয়া, কর্ডোভাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার পতনের পর পতন ঘটে গ্রানাডার। জানুয়ারি ১৪৯২ তৎকালীন শাসক আবু আবদুল্লাহ (যিনি স্পেনে স্থানীয় পরিচয়ে ববদিল নামে পরিচিত ছিলেন) ফার্দিনান্দ ইসাবেলার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এতে স্পেনে ৭৮০ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। আমেরিকা বিজয়ী ক্রিস্টোফার কলম্বাস আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। এর পরই নেমে আসে স্পেনে মুসলিম নিধনের কালো অধ্যায়। শর্ত দেওয়া হয়, ধর্মান্তর নয়তো মৃত্যু। ঘোষণা করা হয়, যারা মসজিদে আশ্রয় নেবে, যারা জাহাজে আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ। এতে সরল বিশ্বাসে নিরীহ মুসলমানরা মসজিদে জাহাজে আশ্রয় নেন। তখনই ফার্দিনান্দ ইসাবেলার সৈন্যরা মসজিদের চারপাশে আগুন লাগিয়ে এবং জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে এক পৈশাচিক উল্লাসে মেতে ওঠে। আর শহীদ হন নিরপরাধ অসংখ্য মুসলিম নরনারী।

পরাজয়ের ধারায় মুসলিম শাসক আবু আবদুল্লাহ যখন বিজয়ীদের হাতে আল হামরার চাবি তুলে দেন, তখন তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন। কান্না দেখে আবদুল্লাহর মা বলেছিলেনপুরুষের মতো যা রক্ষা করতে পারোনি তুমি, তার জন্য নারীর মতো কাঁদতে পারো না তুমি।

আসলে আজকের স্পেন নীরব সাক্ষী স্পষ্ট প্রমাণ। শুধু আল হামরার দেয়াল মসজিদের গম্বুজে আল্লাহর নাম চিত্রিত করলেই তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় না। প্রায় ৮০০ বছরের শাসনাবসানে আজ স্পেনের বুকে জ্বলজ্বল করছে শুধু মুসলিম শাসকদের পরাজয় পরাধীনতার দুর্ভাগ্যরেখা কলঙ্কের ছাপ। হারিয়ে গেছে আল হামরার দ্যুতি সম্মান। নেই স্পেনের বুকে দাপিয়ে বেড়ানো মুসলমান। আছে শুধু স্মৃতিময় গ্রানাডা কর্ডোভা। বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কিত ইউরোপীয় দেশ স্পেন ছিল মুসলমানদের গর্বের আন্দালুসিয়া। এখন যা শুধুই এক স্মৃতিময় দীর্ঘশ্বাস।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।

দুরবস্থার কবলে মুসলিম বিশ্ব

. মুহাম্মদ সিদ্দিক : মুসলিম বিশ্বের বর্তমানে চলছে দুরবস্থা। সর্বত্র তারা পরাজিত ও অপমানিত। তবু হুঁশ নেই। টনক নড়ছে না। জিন্দা লাশের অবস্থা। মুসলমানদের অপমান করার সঙ্গে সঙ্গে কুরআন, নবী (সা🙂 ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রæপ চলছে। কারণসমূহ কমই আমরা খুঁজে দেখি, অথচ কারণ না জানলে প্রতিকার কিভাবে হবে।

আমরা এখন প্রধান কারণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। এগুলো হলো

() যোগ্যতার অভাব, জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা তথা গবেষণার প্রতি অবহেলা, প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা, শিক্ষার হার হতাশামূলক।
(
) বুদ্ধিবৃত্তিক (ইন্টেলেকচুয়াল পাওয়ার) দৈন্যতা। ফলে দেখা যায়, পাশ্চাত্য জগত, এমনকি এশিয়ার কিছু উন্নত দেশের মতোও মুসলিম বিশ্বে উঁচুস্তরের বইপুস্তক বের হয় না। যাও হয় জনগণ তেমন কিনেও না, পড়েও না। এক লেখকের পাঁচশ’ কপি বই বের করলে, মনে করা হয় যে যথেষ্ট হয়েছে। পাশ্চাত্যে ফালতু বইও মিলিয়ন কপি চলে। অথচ মধ্যযুগে মুসলমানদের লেখা বইয়ের জন্য ইউরোপ হুমড়ি খেয়ে পড়ত। মুসলমান বিদ্বানগণ ছিলেন ইউরোপের শিক্ষক।

গত তিনশ’ বছর ধরেই মুসলমানগণ পেছনের কাতারে। কবি নজরুল পর্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লিখেছেন

আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথা সে মুসলমান
কোথা সে আরিফ, অভেদ যাঁহার জীবনে মৃত্যুজ্ঞান।
যাঁর মুখে শুনি তৌহিদের কালাম
ভয়ে মৃত্যুও করিত সালাম।’

মুসলমানদের অযোগ্যতার কারণে অন্য জাতিগুলো প্রযুক্তির সাহায্যে মারণাস্ত্র তৈরি করে অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

() লেজুুড়বৃত্তির নীতি পালন করছে মুসলমান রাষ্ট্রগুলো। তাই তাদের নেই ইজ্জতের আসন।

() মুসলমানদের অনেকেই ইসলামি আদর্শ থেকে সরে গেছে। তাই এসেছে লেজুড়বৃত্তি।

() মুসলিম উম্মাহতে নেই আর ঐক্য।

() নেতৃত্বের ব্যর্থতা আর এক কারণ। অনেকে নেতারই নেই যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা। কিছু নেতাকে হত্যা করে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, যাদের অন্যতম সউদী আরবের বাদশাহ ফয়সাল।

() অমুসলমানদের যেমন বিশাল বিশাল রাষ্ট্র্র রয়েছে, মুসলমানদের নেই। বিশাল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইন্ডিয়া প্রভৃতির নিকট মুসলমান রাষ্ট্রগুলো ছোট। এদিকে তুরস্ক, সুদান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, এমনকি সউদী আরবকে পর্যন্ত টুকরা টুকরা করার নীলনকশা করা হচ্ছে।

() সিয়াসুন্নি বিরোধকে আরো উসকে দিয়ে শত্রæরা ফাঁয়দা হাসিল করছে।

() গণতন্ত্রহীনতা এর এক কারণ। বেশিরভাগ সরকারের উপর জনগণের আস্থা ও একাত্মতা নেই।

(১০) অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থপরতা ও শত্রুতা মুসলিম বিশ্বের জন্য হুমকি। তারা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী গোয়েন্দা টেকনিক ব্যবহার করছে, মালয়েশিয়রা পর্যন্ত মেধাবী ফিলিস্তিনিকে হত্যা করল ইসরাইলি গোয়েন্দারা।

(১১) মুসলিম নেতৃবৃন্দের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয় সম্পর্কে অপ্রতুল ধারণা ও জ্ঞান। পলাশী যুদ্ধের আগেপরে এই অবস্থা ছিল।

(১২) ইসরাইলসহ কিছু রাষ্ট্রের ‘এগ্রেসিভ (আক্রমণাত্মক) ও প্রতিরক্ষা নীতি মুসলমান রাষ্ট্রগুলোকে মাথা তুলতেই দিচ্ছে না ।

(১৩) হালে সউদী, মিসর, আমিরাত, প্রভৃতি রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইসরাইল কর্তৃক বাগে আনা।

(১৪) পাশ্চত্য কর্তৃক ইসরাইলের মাধ্যমে সন্ত্রাস রফতানি করে এখন মুসলমানদেরই সন্ত্রাসী বলা ।

(১৫) মুসলিম বিশ্বের গণমাধ্যমের দুর্বল অবস্থা। অন্যদিকে বিপক্ষের গণমাধ্যম সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বানাতে ওস্তাদ।
(
১৬) অনইসলামি আদর্শ, যেমনকম্যুনিজম, উগ্রজাতীয়তাবাদ ইত্যাদির প্রভাবপ্রতিপত্তি।

(১৭) খ্রিস্টানমিশনারীদের প্রচার ও ষড়যন্ত্র। ভ্যাটিকান ও তার বিশ্বব্যাপী কর্মচারী নেটওয়ার্ক, যা পররাষ্ট্রীয় কাঠামোতে হোক বা গির্জার আড়ালে হোক, একটা বড় বাঁধা ইসলামের প্রসারে। মুসলমানদের কেন্দ্র নেই, যা কামালপাশা আগেই খতম করেছেন। এই কার্যক্রম শুধু তুরস্ক নয়, সমগ্র উম্মাহকে দুর্বল করে দিয়েছে, অথচ একসময় ইউরোপ পর্যন্ত আরব ও তুর্কি খেলাফতের অধীন ছিল।

(১৮) পাশ্চাত্যের ক্রুসেডিয় মনোভাব এখনো রয়েছে। প্রমাণ হিসেবে পাঠ করতে পারেন জার্মান নওমুসলিম ও সাবেক জার্মানি রাষ্ট্রদূত মুরাদ উইলফ্রেজ হফম্যানের বই ‘ইসলাম ২০০০’।

বর্তমান যুগে মুসলমানদের দুরবস্থার আরো কারণ খুঁঁজে বের করা যেতে পারে। পরিস্থিতি খুবই হতাশাব্যঞ্জক।
বড় সমস্যাগুলো :

সবচেয়ে বড় সমস্যা এই মুহূর্তে রোহিঙ্গা সমস্যা। রোহিঙ্গারাও মুসলমান আর যেখানে তারা আশ্রয় নিয়েছে সেই বাংলাদেশও মুসলমান প্রধান। মুসলমান রাষ্ট্রগুলো যদি পরমাণু অস্ত্রসজ্জিত রাষ্ট্রগুলোর মতো শক্তিশালী হতো, তাহলে মিয়ানমার সোজা পথে আসত। কিন্তু বাস্তবতা হলো দুটি পরমাণু অস্ত্রসজ্জিত রাষ্ট্র তাদের পক্ষে। এমনকি তথ্যে প্রকাশ, উত্তর কোরিয়ার সাহায্যে মিয়ানমার পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

সমূহবিপদ বাংলাদেশের সামনে। এদিকে আসামের বাঙলাভাষী দেড় কোটি মুসলমানকে বিতাড়ন করা হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে বাধ্য।

সউদী আরব, মিসর ও আমিরাত এখন সরাসরি ইসরাইলের দালালে পরিণত হয়েছে। সেখানকার একনায়ক নেতাদের গদিই মুখ্য দেশজাতিধর্মের চেয়ে। শেষ জামানায় ইহুদিরা নাকি মক্কামদীনা ছাড়া সমগ্র আরব ভ‚মিই দখলে নেবে। তারই কি এই আলামত?

ফিলিস্তিনের সমূহ বিপদ এখন। কারণ ইসরাইল নয়, একটা মুসলিম দেশ সউদী আরব এর কারণ। সউদী আরব ফিলিস্তিনিদের বলছে ইসরাইলের নিকট নতজানু হতে।

সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রে এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুসলিমবিরোধী প্রেসিডেন্ট গদিতে। তিনি ইসরাইল ছাড়া কিছুই বোঝেন না। তিনি সর্বত্র ইসলামি টেররিস্ট দেখেন। তাঁর চোখে খ্রিস্টান, হিন্দু টেররিস্ট চোখে পড়ে না। ট্রাম্পের হঠাৎ করে নেয়া যে কোনো কঠিন পদক্ষেপ মুসলিম বিশ্বের সমূহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। ট্রাম্পের শিরায় জার্মান রক্ত।

এদিকে ট্রাম্প সউদী আরব ও ইসরাইল ইরান ধ্বংসের অ্যাজেন্ডা নিয়ে এগুচ্ছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, কেন পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো ইরানকে হুমকি দিচ্ছে? ইসরাইলের সুস্পষ্ট রেফারেন্সে মধ্যপ্রাচ্যের সব পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। উদ্দেশ্য, এই অঞ্চলে ইসরাইলকে একমাত্র পারমাণবিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। (তথ্য রয়টার্স)

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি সাবেক গোয়েন্দা প্রধান মাইক পম্পেও প্রথম দফাতেই যান ইসরাইল, সউদী আরব ও জর্ডান। প্রত্যেক জায়গায় তিনি ইরানকে তীব্র ভাষায় দোষারোপ করে বলেছেন, বিশ্বে সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক হলো ইরান। তিনি এ দাবিও করেন, ইরানকে কখনোই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দেয়া হবে না।

ইসরাইল ও ট্রাম্প গংয়ের এই নীতির তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান তীব্র সমালোচনা করেন। তবে এরদোগানকেই যে আবার দ্বিতীয়বার হত্যার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র চালাবে না তার নিশ্চয়তা নেই। আমরা আগেই বলেছি, ইসরাইল তথা পাশ্চাত্য এখন গোয়েন্দা সন্ত্রাস ব্যবহার করে পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতির অংশ হিসেবে। এই কৌশল আমরা পলাশীর যুদ্ধের আগে ও পরেও দেখেছি।

পাশ্চাত্য মুসলমানদের ভেতর অনৈক্য সৃষ্টি করে সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, সোমালিয়া, আফগানিস্তান প্রভৃতি মুসলিম দেশে দোজখের অবস্থা সৃষ্টি করেছে। আর হতভাগা মুসলমানরা পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র অনুধাবনেই ব্যর্থ। কি ব্যর্থ নেতৃত্ব চলছে এইসব দেশে। উত্তর কোরিয়াকে শিক্ষা দিতে লিবিয়া মডেল প্রয়োগ করা হবে, বলেন মার্কিন কট্টরপন্থ’ী নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোল্টন। এই বোল্টনই আফগানিস্তানের অন্যতম খুনি। লিবিয়া মডেলের উদাহরণ টানাই হলো মুসলমানদের কাটা ঘায়ে লবণের ছিঁটা দেয়া। এটা মুসলমানদের সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘মাইন্ডসেট’ আর কি।

এদিকে চীনেও অশান্তি। মুসলমানেরা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টিতে ইচ্ছুক। কিন্তু সে স্থানীয় মুসলমানদের উপর নির্যাতন করছে। তাদের রোজা পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না। আর রোহিঙ্গাদের প্রতি চীন রাশিয়ার অনৈতিক অবস্থান হতাশাব্যঞ্জক।

সামগ্রিক পরিস্থিতি অবলোকন করে বলতে হয়, যদি মুসলমানেরা নিজেদের অনৈক্য ভুলে এক না হয়, তাহলে নবী (সা🙂 শেষ যুগের হতভাগা মুসলমানদের সম্পর্কে যা বলেছিলেন, তাই অপেক্ষা করছে। ওআইসিকে এখনই শক্তিশালী না করলে আরো বড় বিপদ রয়েছে। যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন সমন্বিত পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি অবলম্বন করতে পারে, ওআইসি কেন পারবে না। অথচ আল্লাহ ও রাসূল (সা🙂 মুসলমানদের সিঁসাঢালা প্রাচীরসম ঐক্যের উপদেশ দিয়েছেন।

লেখক : ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক

রাশিয়ায় বাড়ছে মুসলিম

mosque-ru-st_petersburgমঈন উদ্দিন খান : ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলিমের বসবাস রাশিয়ায়। দেশটির মোট জনসংখ্যা ১৪ কোটি। এর মধ্যে ২.৩ কোটি মুসলিম। এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। অনেকের মতে, বর্তমান হারে বাড়তে থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে প্রতি পাঁচজন রাশানের একজন হবে মুসলিম।

রাশিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি শেখ রবি গায়নেতিন গত মার্চে এক অনুষ্ঠানে বলেন, মুসলিম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির প্রধান দু’টি কারণ হচ্ছে মুসলমান পরিবারগুলোর মধ্যে উচ্চ জন্মহার এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের আগমন।

গায়নেতিন বলেন, ‘সপ্তম শতাব্দীতে রাশিয়ায় ইসলামের আগমন ঘটেছিল। আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ইন্তেকালের ২২ বছর পরে তার অনুসারীরা রাশিয়া এসেছিলেন।’

তিনি বলেন, তারা এসেছিল বর্তমানের ডারবেন্ট শহরে। এটি দাগেস্তানের দক্ষিণে অবস্থিত এবং রাশিয়ায় প্রথম আজান প্রচার করা হয়েছিল দাগেস্তানের ভূখণ্ডেই।’

তিনি আরো বলেন, রাশিয়ার জাতীয়তা ও জাতিগত গ্রুপের ৫৮ জনেরও বেশি জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ইসলামের অনুসারী রয়েছে রাশিয়ান রাজ্য তাতারস্থান, বাশকোস্তোস্তান, উত্তর ককেশাসের প্রজাতন্ত্রে।

বর্তমান রাশিয়ার রাজ্য ‘ভলগা বুলগেরিয়ায়’ ৯২২ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয় বলে তিনি জানান।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রুশ মুসলিমদের ইতিহাস রাশিয়ায় প্রায় ১,১০০ বছরের। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতেই কমপক্ষে ২৫৩৫ লাখের মতো মুসলিমের বসবাস।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে রাশিয়ায় ইসলামের জাগরণ বেড়েছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়ায় ছিল ৩০০টি মসজিদ আর এখন আট হাজারেরও বেশি মসজিদ আছে। আরো নিত্যনতুন মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে। ১৯৯১ সালের আগে রাশিয়াতে কোনো মাদরাসা ছিল না। আর এখন ৫০৬০টি মাদরাসা আছে এবং সেগুলোতে কমপক্ষে ৫০ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা করছে। ১৯৯১ সালে রাশিয়া থেকে হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০। আর এখন ২০ হাজারের বেশি। রুশরা, রাশিয়া থেকে হজযাত্রীর সংখ্যা আরো বেশি করার অনুরোধ জানিয়েছে সৌদি আরবকে।

রাশিয়াতে মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঋণাত্মক। প্রতিটি রুশ নারী গড়ে ১.৪টি সন্তান জন্ম দেয়। আর রাজধানী মস্কোয় তো আরো ভয়াবহ অবস্থা। সেখানে প্রতিটি রুশ নারী গড়ে ১.১টি সন্তানের জন্ম দেন। রাশিয়ার মুসলিমদের ৯৫ ভাগের বেশি রাশিয়ার আদিবাসী। রাশিয়ার ১৮২টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫৭টি আদিবাসী মুসলিম। তারা প্রায় ১,১০০ বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করে এবং বর্তমান রাশিয়ার বিরাট একটা অংশের শাসন [ভলগাবুলগেরিয়া, ক্রিমিয়া, তাতার ইত্যাদি] তারা করত।

রুশ মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের হার অন্য রুশ নারীদের থেকে অনেক বেশি। আর স্থানভেদে পার্থক্য আছে। প্রতিটি রুশ মুসলিম নারী গড়ে সন্তান জন্ম দেন ২.১টি। তাতার মুসলিম নারী গড়ে সন্তান জন্ম দেন ছয়টি। চেচেন, ইনগুশ মুসলিম নারী গড়ে সন্তান জন্ম দেন ১০টি। যেখানে রুশ মেয়েরা সন্তান জন্ম দিতে চাচ্ছে না সেখানে রুশ মুসলিম নারীদের সন্তান জন্মের হার অবাক করার মতো। আদিবাসী রুশ মুসলিম নারী ছাড়াও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো [মধ্যে এশিয়ার উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান প্রভৃতি] থেকে রাশিয়াতে মুসলিম পুরুষ ও নারী কাজের জন্য সাগরের ঢেউয়ের মতো আসতেই আছে। এদের সন্তানেরা রাশিয়ার নাগরিক হয়ে যাচ্ছে এবং রাশিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা বাড়াচ্ছে।

এ ছাড়া রাশিয়ার অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা ইসলাম গ্রহণ করছে এবং রাশিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা বাড়াচ্ছে ।

স্থানীয় মুসলিম নেতাদের অভিমত, যেভাবে চলছে, তাতে ২০৩৫২০৪০ সালের মধ্যেই রাশিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-সূফির অবদান

al-sufiকাজী আখতারউদ্দিন : রাতের আকাশে আমরা অসংখ্য তারা মিটমিট করতে দেখি— কিছু কিছু তারার নামও আমরা জানি। যেমন— অশ্বিনী, কৃত্তিকা, রোহিনী, উত্তরফাল্গুনী, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা থেকে শুরু করে রেবতী পর্যন্ত মোট ২৭টি নাম বাংলায় পাওয়া যায়। কিন্তু আকাশে অসংখ্য তারার মধ্যে কেবল ১০,০০০ তারা খালি চোখে দেখা যায়। আবার এর মধ্যেও কেবল কয়েকশত তারার নামকরণ করা হয়েছে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রনমিকেল ইউনিয়ন মোট ৩১৩টি তারার নাম লিপিবদ্ধ করেছে, যার অধিকাংশই আরবি নামের। ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের সোনালী যুগে এসব তারার নামকরণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে ১০ শতকের মুসলিম বিজ্ঞানী আল-সূফির। আমরা ১৬৫টি তারার আরবি নাম পেয়েছি।

শত শত বছর ধরে নাবিক, ভূপর্যটক ও নক্ষত্র পর্যবেক্ষণকারীদের কাছে তারার আরবি নাম ব্যবহারটি আরব-ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। নয় শতক থেকে পনরো শতক পর্যন্ত যে-সকল বিজ্ঞানী ইসলামিক স্পেন থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য প্রাচ্য হয়ে ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় আরবি ভাষায় কাজ করতেন, তারা বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছেন এবং ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের উপাদান যোগান দিয়েছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল এর মধ্যে অন্যতম একটি ক্ষেত্র।

বর্তমানে তারার যে আরবি ও আধুনিক নামগুলো পাশ্চাত্যজগতে ব্যবহূত হয়, তা মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-সূফি প্রবর্তিত তালিকা থেকে এসেছে। মধ্যযুগের ইউরোপে তিনি আজোলফি নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পুরো নাম আবুল হোসাইন আবদাল-রহমান ইবনে ওমর আল-সূফি। তাঁর যুগের অন্যতম বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি বর্তমানে স্বীকৃত। আল-সূফির জন্ম ইরানের রে নগরীতে ৭ ডিসেম্বর, ৯০৩ সালে, মৃত্যু ২৫ মে, ৯৮৬ শিরাজে। তাঁর নামে চন্দ্রপৃষ্ঠে আজোফি নামে একটি জ্বালামুখ এবং ১২৬২১ আল সূফি নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রহের নামকরণ করা হয়। তিনি আরবি ভাষায় লেখাপড়া করেন। বুয়াহিদ শাসকের আনুকূল্যে তিনি তাঁর নিজ দেশ এবং রাজ্যের রাজধানী বাগদাদে জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করেন। তাঁর মন্ত্রক ছিলেন বুয়াহিদ রাজ্যের উজির ইবন আল—আমিদ।

আল-সূফি বিখ্যাত গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমির তারার নামের তালিকার একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। এতে তিনি বিভিন্ন ভুল পর্যবেক্ষণ সংশোধন করেন এবং গ্রিক জ্যোতির্বিদ টলেমি যেসব তারার নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি সেগুলো তাঁর তালিকায় যুক্ত করেন। আল-সূফি কিতাব সুওয়ার আল-কাওয়াকিব আল-থাবিতা বা দি বুক অফ কন্সটিলেশনস অফ দি ফিক্স্ড স্টার নামে (star cartography) কার্টোগ্রাফি— নক্ষত্র মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যার একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এটি ইসলামিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি ক্লাসিক গ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত হয়। গ্রন্থটিতে টলেমির ৪৮টি নক্ষত্রপুঞ্জের সমস্ত কিছু নিয়ে আলোচিত হয়েছে। এর সঙ্গে আছে নিজের আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণ।  বিভিন্ন কারণে আল-সূফির পুস্তকটি সাড়া জাগিয়ে তোলে।

আল-সূফির গ্রন্থটি স্পেনের মাধ্যমেই প্রথমে পাশ্চাত্যে পরিচিত হয়। তখন স্পেনে খ্রিষ্টান ও মুসলিম রাজ্যগুলোর পাশাপাশিসহ অবস্থান ছিল। ক্ষমতা কিংবা এলাকা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে তখন কোন ধরনের ঠেলাঠেলি ছিল না বরং তারা একে অপরকে সহযোগিতা করতেন। ক্যাস্টিলের খ্রিষ্টান রাজা আলফোন্সো ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের একজন মনোযোগী ছাত্র। তিনি আল-সূফির রচনাটি প্রাচীন স্পেনিশ ভাষায় অনুবাদের নির্দেশ দেন, যা লিব্রস দে লান এস্ট্রেলামস দে লা ওছুয়া এসপেরা (১২৫২-১২৫৬) নামে প্রকাশিত হয়। মুুসলিম বিশ্বেও আল-সূফির পুস্তকটি বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে।  ৯৬৪ সালে আল-সূফি আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রমণ্ডলী বা ছায়াপথ আন্দ্রোমেদা গ্যালেক্সি চিহ্নিত করেন। এছাড়া তিনি আ্যাাস্ট্রেলেব সম্পর্কে রচনা প্রকাশ করেন এবং এর বিভিন্ন ব্যবহারের কথা জানান— জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, হস্তরেখা, নৌপরিচালনাবিদ্যা, সার্ভে, সময়নিরূপণ, কিবলা এবং সালাত ইত্যাদি।

আল-সূফি চিরদিনের জন্য আকাশের তারা পর্যবেক্ষণের রীতি পরিবর্তিত করেন। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একজন হিসেবে তিনি তারা এবং নক্ষত্রমণ্ডলীকে উপলব্ধি করার সাধনায় নিজের জীবন উত্সর্গ করেছিলেন।  হাজার বছর পরও আল-সূফির পর্যবেক্ষণ এবং বিশদ কর্ম এখনো রাতের আকাশ দেখার বিষয়ে আমাদের সহায়তা করে।

এখানে কিছু তারার আরবি নাম দেওয়া হলো: আলজেবার, কিতালফা, আখিরআলনাহর, আল-আক্রাব, আকুবিনবাআল-জুবানা, আল-দাফিরাহ, আল-উজফুর. আল-আনাকআল আর্দ, আলবালদাহ, আলবালি, আলছিবা, আলকর, আলদিবারান, আলদিরামিন, আলিয়াথ, আলহানাহ, আলকালব আলরাই, আল কামর, আইন, আদিব, আলরুবা, আলআওয়াদ, আতিক, আসুজা, বাহাম, বাতনি কাইতুস, বাইদ, বানাত উন— নাআস, আলবোতাইন, কুরসিয়া আল-জাওযা, দানাবাউল-জাদি প্রভৃতি।  

(সূত্র: প্রকৌশলী ও ইসলামী লেখক ড. এ জহুর, জর্জ রবার্ট কেপল (১৯৯৮)— দি নাইট স্কাই অবজার্ভারস গাইড, ভলিউম ১, বুলেটিন অফ দি আই এই উ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন স্টার নেইমস নং ১। ২৮ জুলাই ২০১৬।)

ইমাম বোখারী (রহ.) এর শেষ প্রার্থনা

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী :“হে খোদা! এখন যদি আমার দুনিয়াতে থাকা তোমার নিকট কল্যাণকর না হয় তাহলে আমাকে তুলে উঠিয়ে নিয়ে যাও।“ সময়টা জোহরের পরে। দুনিয়ার মানুষের অত্যাচার-নিপীড়নে অতিষ্ট হয়ে ইমাম বোখারী এ দোয়া করেন এবং মাগরিব ও এশা এর মধ্যে দোয়া কবুল হয়। হঠাৎ তার শরীর হতে প্রচুর ঘাম নির্গত হতে থাকে এবং এশার নামাজের পর আশেখে রসুল আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যান। ঈদুল ফিতরের চাঁদ রাত। তাঁর বয়স হয়েছিল ১৩ দিন কম ৬২ বছর। হিজরী ২৬৫ সাল। ‘সমরখন্দ’ হতে তিন মাইল দূরে ‘খরতং’ নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। হিজরী ১৯৪ সালের ১৩ শাওয়াল তার জন্ম। তাঁর কোন সন্তান ছিল না। একটি বর্ণনা অনুযায়ী তিনি শাদীও করেননি। তাঁর নাম মোহাম্মদ; উপনাম আবু আব্দুল্লাহ। পিতার নাম ইসমাঈল। বোখারার অধিবাসী ছিলেন বলে আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ বোখারী নামেই তিনি ইতিহাসে খ্যাত।

তাঁর বংশ পরিচিতি :মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুগীরা ইবনে বরদাজবে। তিনি পারস্য বংশোদ্ভূত মজুসী বা অগ্নি উপাসক ছিলেন। বরদাজবের পুত্র মুগীরা বোখারার শাসনকর্তা ইয়ামান জুফীর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইমাম বোখারীর পিতা ইসমাঈল হজরত ইমাম মালেকের শাগরিদ ছিলেন। তিনি হাম্মাদ ইবনে জায়দ ও ইবনুল মোবারকের কাছ থেকেও হাদীস শ্রবণ করেন। 

বর্ণিত আছে যে, শৈশবে ইমাম ‘নাবীনা’ অর্থাৎ অন্ধ ছিলেন। তাঁর মায়ের দোয়ায় আল্লাহ তাকে দৃষ্টিশক্তি দান করেন। শৈশবেই তিনি পিতাকে হারান, মা তার লালন পালন করেন। প্রথম দিকে তিনি অর্থশালী ছিলেন। পৈত্রিক উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন।

ইমাম বোখারীর (রহ.) মধ্যে হাদীস হিফজ করার আগ্রহ দশ বছর বয়স হতেই শুরু হয়ে যায়। জন্মগতভাবে তিনি ছিলেন অসাধারণ ধীশক্তির অধিকারী। খোদা প্রদত্ত এ মেধা-প্রতিভা খুব কম লোকেরই ভাগ্যে আসে, দুনিয়ার ইতিহাসে এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। তাঁর ছয় লাখ সহীহ হাদীস সনদসহ মুখস্থ ছিল। তিনি এসব হাদীস সংগ্রহের জন্য হেজাজ, ইরাক, ইয়েমেন, খোরাসান, মিশর, সিরিয়া প্রভৃতি শহরে-গ্রামে-গঞ্জে, পাহাড়ে, জঙ্গলে এবং যেখানেই জানা গেছে যে, কোন বুজর্গের নিকট হাদীস আছে, তাদের কাছ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করার জন্য হাজার হাজার মাইল পদব্রজে সফর করেছেন। আরবের ভীষণ গরমে তাকে এসব দূরবর্তী স্থান ও দুর্গম এলাকা সফর করতে হয়েছে।

কথিত আছে যে, এসব স্থান সফরকালে কোন কোন সময় তাঁর প্রসাব রক্ত আকারে বের হতো, কিন্তু তিনি তা পরোয়া করতেন না, হাদীস সংগ্রহের নেশায় তিনি বিভোর ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি ছয় লাখ হাদীস সংগ্রহ করেন এবং মুখস্থ হয়ে যায়।
১৬ বছর বয়সে ইমাম বোখারী (রহ.) ইমাম অকী ও ইবনুল মোবারকের কিতাব মুখস্থ করে ফেলেন। অতঃপর মায়ের সঙ্গে হজের জন্য গমন করেন এবং হেজাজে শিক্ষা লাভ করেন এবং সেখানে ৬ বছর অবস্থানের পর প্রত্যাবর্তন করেন।

তাঁর হাদীস সংকলনে আত্মনিয়োগ করার ঘটনানাটিও বিস্ময়কর। ৬ লাখ হাদীসের জখীরা ছিল তাঁর সামনে এবং ১৬ বছর সময়ের মধ্যে হাদীস সংকলনের কাজ সমাপ্ত করেন। এ সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি কখনো মদীনার মসজিদে নববীতে বসে এবং কখনো খানা-ই-কাবায় বসে হাদীস সংকলন করতেন এবং এ কাজে তিনি অত্যন্ত সতর্কনীতি অনুসরণ করেন। এ সম্পর্কে সীরাত লেখক ও মোহাদ্দেসীন লিখেছেন যে, প্রত্যেক হাদীস লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ইমাম বোখারী গোসল করতেন, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তেন, ইস্তেখারা করতেন এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পর হাদীস লিপিবদ্ধ করতেন। এভাবে তিনি কিতাব সম্পূর্ণ করেন।
আল্লামা খতীব বাগদাদী তাঁর বিখ্যাত ‘তারিখে বাগদাদে’ ইমাম বোখারী (রহ.) এর অসাধারণ মেধা-প্রতিভা এবং ইমাম বোখারী (রহ.) বিদ্বেষী এক শ্রেণীর আলেমের জালিয়াতির এক অদ্ভুত কাহিনী লিখেছেন। যা সংক্ষেপে এই যে, যখন তিনি বাগদাদে গমন করেন তখন ‘সাজেশী উলামা’ দলের লোকেরা তাঁর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য একটি সূকৌশল অবলম্বন করেন। তাদের মধ্যে দশ জন দশটি হাদীস গলদ মুখস্থ করে বিভিন্ন সময় ইমাম বোখারীর (রহ.) সামনে পাঠ করেন। ইমাম সাহেব পঠিত সবকটি হাদীস বিকৃত হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর সনদ সহকারে প্রত্যেকটি ‘রেওয়ায়েত’ (বর্ণনা) মূল মতন (এবারত) সহ পেশ করেন, যাতে তাঁর বিরুদ্ধবাদীরাও অবাক ও বিস্মিত হয়ে যায়।

অত্যন্ত সতর্ক ও গুরুত্ব সহকারে ইমাম সাহেব কর্তৃক লিপিবদ্ধ করা হাদীসগুলোর সংখ্যা চার হাজারের কিছু বেশি, যা সংক্ষেপে ‘বোখারী শরীফ’ নামে বিশ^খ্যাত। তিনি সমকালীন এক হাজার আশি জন মোহাদ্দেসীরনের কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। খোদ তাঁর কাছ থেকে এক লাখ লোক হাদীস শ্রবণ করেন। আগেই বলা হয়েছে যে, ইমাম বোখারীর (রহ.) ছয় লাখ হাদীস মুখস্থ ছিল এবং এ ছয় লাখ হাদীসের জখীরা সামনে রেখে হাদীস সংকলন শুরু করেছিলেন। কিতাব সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি তা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইবনে মুঈন এবং ইবনুল মাদিনীর সামনে পেশ করেন এবং তাঁরা সবাই প্রশংসা করেন এবং বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ঐক্যমত পোষণ করেন, তবে চারটি হাদীস নিয়ে বিতর্ক থাকে। ইবনে হাজার বলেন, বিতর্কিত এ হাদীসও সত্য।

সে যুগের মোহাদ্দেসীনে কেরাম সর্বসম্মতভাবে বলেছেন যে, ‘আছাহ হুল কুতুবে বাদা কিতাবিল্লাহি আছ ছাহীহুল বোখারী’। অর্থাৎ কোরআন হাকীমের পর বিশুদ্ধতম কিতাব সহীহ বোখারী। সহীহ বলতে কেবল লিখিত আকারে সহীহ বা বিশুদ্ধতম নয়, এ কিতাবের ভাব-ভঙ্গি ও সাহিত্যের দিক থেকেও অতি উত্তম, আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী। বিখ্যাত বৈয়াকরণ আল্লামা রাজি (৬৮৬) বলেন; ‘খাটি আরবী জানতে হলে কোরআন, অতঃপর সহীহ বোখারী এবং হেদায়া পড়তে হবে।’ এ স্বীকৃতি সত্য ও বাস্তবতার স্বীকৃতি। বস্তুত সকল দিক বিবেচনায় সহীহ বোখারী এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি। কোরআন এর ব্যাখ্যা গ্রন্থগুলোর পর সর্বাধিক ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং অহরহ হচ্ছে বোখারী শরীফের। হাদীস শাস্ত্রে ‘আমীরুল মোমেনীন’ সহ আরও বহু উপাধিতে ভ‚ষিত এ মহান হাদীস বিশারদের শেষ জীবনে নিজের দেশেই নানা বিপদ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ‘খালকে কোরআন’ অর্থাৎ কোরআন ‘কাদীম’ এ না ‘হাদেস’ এ বিষয়ে ইমাম সাহেবের মত ছিল কোরআন ‘কাদীম’ অর্থাৎ সৃষ্ট নয়, আদি। এ বিষয়ে ইমাম জুহলীর সাথে তাঁর মত বিরোধ দেখা দেয় এবং তিনি ইমাম সাহেব সম্পর্কে শাসকের কান ভারি করেন বলেও অভিযোগ আছে। অতঃপর বোখারার শাসকের সাথে তাঁর মন কষাকষি হয়। বোখারার শাসক ইমামকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। ইমাম সাহেব সেখান হতে সমরখন্দ চলে যান। সেখানে তিনি আল্লাহর দরবারে যে প্রার্থনা করেন তা এবং ঈদ রজনিতে তাঁর ইন্তেকাল হওয়ার কথা নিবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে।