আর্কাইভ

Archive for the ‘ইতিহাস’ Category

বদর আউলিয়ার মাজার, চট্ট্রগ্রাম

Advertisements

মোঘলদের স্মৃতি-গাঁথা আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ

andorkilla shahi jame mosqueনিজাম সিদ্দিকী : চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ের এক পাশে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের অনন্য এক ঐতিহাসিক স্থাপনা। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ ভবন। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরোনো এই মসজিদ কালের সাক্ষী। আদি চট্টগ্রামের অস্তিত্ব ও নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মোঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের কাহিনী জড়িয়ে আছে এই আন্দরকিল্লার সঙ্গে।

জানা যায়, এক সময়ে এই কিল্লা বা কেল্লায় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিলো। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি মোঘল আমলে বাংলার সুবেদার বা প্রাদেশিক শাসনকর্তা শায়েস্তা খাঁ’র ছেলে বুজর্গ উমেদ খাঁ আন্দরকিল্লার অন্দরে বা ভিতরে প্রবেশ করার পর এর নাম হয় ‘আন্দরকিল্লা’। আর চট্টগ্রাম বিজয়ের সেই স্মৃতি ধরে রাখতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’।

কথিত আছে, ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম অঞ্চলের আরেক শাসক নবাব ইয়াসিন খাঁ এই জামে মসজিদটির কাছাকাছি পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের একটি টিলার ওপর আরেকটি পাকা মসজিদ তৈরি করে তার নাম রাখেন ‘কদম-রসূল’। তখন সাধারণ মানুষের কাছে এই মসজিদটিই বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে। এতে এক সময়ে প্রায় লোকশুণ্য হয়ে পড়ে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। এ অবস্থায় ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই মসজিদটিকে গোলাবারুদ রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ খাঁ’র আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদটি মুসলমানদের ব্যবহারের জন্য আবারও খুলে দেয়া হয়।

১৯২০ সালে প্রকাশিত চৌধুরী শ্রী পূর্ণচন্দ্র দেববর্মনের লেখা ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ বইটিতে বলা হয়েছে, হামিদুল্লাহ খাঁ ছিলেন চট্টগ্রামের একজন বড় জমিদার। তিনি ফরাসি ভাষায় ‘আহাদিসুল খাওয়ানিন’ বা তারিখে হামিদী লিখেছেন। ১৮৪২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামে শাসনকালে তিনি এ অঞ্চলের ডেপুটি কালেকটর হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

কুরআন মজীদ একাডেমীর সৌজন্যে মসজিদে টাঙানো একটি ব্যানারে লেখা রয়েছে, ১৭৬১ থেকে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৯৪ বছর বৃটিশ সরকার মসজিটিকে গোলাবারুদের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে।

জানা গেছে, বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় রয়েছে মসজিদটি। এ প্রসঙ্গে ব্যানারে উল্লেখ রয়েছে, চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদ অডিনেন্স ১৯৮৬-এর অধীনে ২ দশমিক ৪২৭৬ একর জায়গাসহ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি পরিচালনা করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

মোঘল রীতি অনুযায়ী তৈরি হয়েছে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। মসজিদটি দিল্লির ঐতিহাসিক­ জামে মসজিদের আদলে তৈরি। আর সেই একই রীতিতে বড় বড় পাথর ব্যবহার করে এই মসজিদটি নির্মিত হয় বলে একে ‘পাথরের মসজিদ’ও বলা হয়ে থাকে।

মসজিদের নির্মাণ শৈলি সম্পর্কে জানা যায়, সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩০ ফুট ওপরে ছোট একটি পাহাড়ের ওপর এর অবস্থান। মূল মসজিদের নকশা অনুযায়ী এটি ১৮ গজ (১৬ মিটার) দীর্ঘ। প্রস্থ ৭ দশমিক ৫ গজ (৬.৯ মিটার)। প্রতিটি দেয়াল প্রায় ২ দশমিক ৫ গজ (২.২ মিটার) পুরু। পশ্চিমের দেয়াল পোড়া মাটির তৈরি এবং বাকি তিনটি দেয়াল পাথরের তৈরি। মসজিদটির পূর্বে তিনটি ও উত্তর এবং দক্ষিণে একটি করে মোট ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদটিতে তিনটি মেহরাব থাকলেও সাধারণত মধ্যখানের ও সর্ববৃহৎ মেহরাবটিই ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

শুধু স্থাপত্য নিদর্শনেই নয় শৈল্পিক দিক থেকেও এই মসজিদটি এ অঞ্চলের এক অনন্য পুরাকীর্তি হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, এখানে চট্টগ্রামে মুসলিম বিজয়ের স্মারক হিসেবে শিলালিপিভিত্তিক যেসব স্থাপনা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের শিলালিপি অন্যতম। সে সময়ে মসজিদের মূল ইমারতের প্রবেশপথে কালো পাথরের গায়ে খোদাই করা সাদা অক্ষরে লেখা ফার্সি লিপির একটি শিলালিপি বসানো হয়েছিল। এর শিলালিপির লেখার বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায় এরকম : ‘হে জ্ঞানী, তুমি জগতবাসীকে বলে দাও, আজ এ দুনিয়ায় দ্বিতীয় কাবা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার প্রতিষ্ঠাকাল ১০৭৮ হিজরি (১৭৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)।’ এই শিলালিপি থেকে এর প্রতিষ্ঠাতার নামও পাওয়া যায়। বলা হয়, এই মসজিদে পাওয়া সব শিলালিপির সঙ্গে সিরিয়ার ‘রাক্কা নগর’-এর স্থাপত্যকলার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বর্তমানে শিলালিপিটি মসজিদের এক প্রান্তে বসানো রয়েছে।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণী থেকে জানা যায়, ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদ নির্মাণের পর থেকেই চট্টগ্রামের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে মসজিদটি তীর্থস্থান হয়ে ওঠে। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের ইমাম বা খতিব নিযুক্ত হতেন পবিত্র মদিনার আওলাদে রাসুলগণ। তখন রোজা, ফিতরা এবং ঈদের চাঁদ দেখার প্রশ্নে এই মসজিদের ফয়সালা চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ মেনে চলতেন। এই জামে মসজিদে প্রতি জুমার দিনে চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুসল্লি­রা এসে নামায আদায় করতেন। পবিত্র মাহে রমজানের শেষ জুমায় কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকেও মানুষের সমাগমের নজির রয়েছে।

এখনো এই মসজিদে প্রতি শুক্রবারে চট্টগ্রাম নগরীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসল্লির এখানে নামাজ আদায়ের জন্য আসেন বলে জানান মসজিদের বর্তমান খতিব সৈয়দ আনোয়ার হোসেন আল মাদানী। রমজানে বিশাল আকারে ইফতারের আয়োজন করা হয়। তখন এখানে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার মানুষের ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। কয়েকজন দানশীল ব্যক্তি এর খরচ বহন করেন। কিন্তু তাঁদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার নির্দেশনা রয়েছে সাধারণের কাছে।

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধররা…

এনামুল হক : প্রতিভাধর হওয়া আর অতি বুদ্ধিমান হওয়া দুটো আলাদা ব্যাপার। অতি বুদ্ধিমান ভূরি ভূরি আছে। তাতে খুব একটা যায় আসে না। আসল বিষয় হলো সৃজনশীলতা থাকা। কল্পনাকে যে কোন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করার ক্ষমতা থাকা। প্রতিভাধর ব্যক্তিদের সেই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকে। এখানেই প্রতিভাধরদের সঙ্গে অতি বুদ্ধিমানদের পার্থক্য।

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের কথাই ধরা যাক। তার অত বিশ্লেষণধর্মী ক্ষমতা ও দার্শনিক গভীরতা ছিল না। তথাপি আমেরিকার আলোকায়নের যুগে তিনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারক কূটনীতিক, বিজ্ঞানী, লেখক ও ব্যবসা স্ট্র্যাটেজিস্টে পরিণত করেছিলেন। ঘুড়ি উড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, আকাশের বজ্র হলো বিদ্যুত। সেই বজ্রকে বশে আনার জন্য তিনি একটা বড় উদ্ভাবন করেছিলেন। বের করেছিলেন বিশুদ্ধ জ্বালানি স্টোভ, উপসাগরীয় স্রোতের গতিপথ, বাইফোকাল গ্লাস, মনোমুগ্ধকর বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি।

এলবার্ট আইনস্টাইনও একই পথ অনুসরণ করেছিলেন। ছোটবেলায় কথা বলা শিখতে দেরি করেছিলেন। এতই দেরি যে বাবা-মা তাকে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। বাড়ির পরিচারিকা তাকে বলত হাবাগোবা। এক আত্মীয় বলত নির্বোধ। কর্তৃত্বের প্রতি তার এক বিদ্রোহীভাব কাজ করত যার জন্য এক স্কুলশিক্ষক তাকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কর্তৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা থেকেই তিনি প্রচলিত জ্ঞান ও ধারণা সম্পর্কে এমন সব প্রশ্ন তুলতেন যা শিক্ষাঙ্গনের অতি শিক্ষিত লোকেরাও কখনও চিন্তা করেনি। কথা বলতে শেখার কারণে ধীরগতির জন্যই প্রতিটি ঘটনাকে তিনি অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেতেন, যেগুলো অন্যরা ধ্রুব বলে মেনে নিত।

আইনস্টাইন একদা বলেছিলেন : ‘সাধারণ প্রাপ্তবয়স্করা স্থান ও কালের সমস্যা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাত না। কিন্তু আমার বিকাশ এত ধীরে ধীরে হয়েছিল যে, আমি যখন ইতোমধ্যে বড় হয়ে উঠেছি সে সময়ই আমি স্থান ও কাল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেছিলাম।’ সে কারণেই জুরিখ পলিটেকনিকে তার ক্লাসের ৫ জন ছাত্রের মধ্যে তিনি চতুর্থ হিসেবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সুইস পেটেন্ট অফিসে একজন তৃতীয় শ্রেণীর পরীক্ষক হিসেবে খেটে মরার সময়ই আইনস্টাইন সমকালীন পদার্থ বিজ্ঞানের দুটি মৌলিক তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়ে বিশ্বজগত সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। সে দুটি হলো আপেক্ষিক তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব। আর তা করতে গিয়ে তিনি ‘দি প্রিশ্মিপিয়া’ গ্রন্থে আইজ্যাক নিউটনের বর্ণিত অত্যতম মৌলিক একটি ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। আর সেটা হলো আমরা যেভাবেই দেখি না কেন সময় সেকেন্ডে সেকেন্ডে এগিয়ে চলে। আজ আইনস্টাইনের নাম তাই অসাধারণ প্রতিভার সমার্থক।

ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃজনশীল প্রতিভাধর বলা যেতে পারে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে। তিনি সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছিলেন। না, নিউটন বা আইনস্টাইনের মতো অতি মানবিক তাত্ত্বিক মেধাশক্তি তার ছিল না কিংবা তার বন্ধু লুকা প্যাসিওলির মতো গাণিতিক ক্ষমতাও তার ছিল না। কিন্তু ভিঞ্চির রোম্বিকুবোক টেহিড্রোনস এবং কয়েক ডজন আরও অন্যান্য বহুমুখী জ্যামিতিক আকারের ছবি বাস্তব রূপ লাভ করে যেগুলো ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কালক্রমে তিনি ভূগোল, এনাটমি ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই কাজ করেন। তার ‘ভাইট্রুবিয়ান ‘ম্যান’ ড্রয়িংটি ছিল স্মরণীয় যার জঠরে ছিল ভ্রণ। এ ছাড়াও তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ কিছু শিল্পকর্ম তৈরি করে গেছেন।

বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে জন্ম হওয়ায় ভিঞ্চি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। তিনি বহুলাংশেই ছিলেন স্বশিক্ষিত। আইনস্টাইনের মতো কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তার একটা সমস্যা ছিল। তিনি প্রচলিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং মধ্যযুগীয় গোঁড়ামিকে অগ্রাহ্য করতে শিখেছিলেন। তিনি মনে করতেন যে অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায়। সমস্যা-সমাধান বের করার এই পদ্ধতিটা কোন অংশেই কম বিপ্লবাত্মক ছিল না। এক শতাব্দী পর ফ্রান্সিস বেকন ও গ্যালিলিও গ্যালিলি এই একই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এই পদ্ধতি অনুশীলনের কারণে দ্য ভিঞ্চির স্থান সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের ওপরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। মেধাবীরা সেই লক্ষ্যে পৌঁছে থাকে, যে কারণে অন্য আর কেউ পৌঁছতে পারে না। প্রতিভাবানরা সেই লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করে থাকে, যা অন্য আর কেউ দেখতে পারে না।

ভিঞ্চির সবচেয়ে প্রেরণাদায়ক বৈশিষ্ট্য ছিল তার কৌতূহল। নিজের নোটবইতে তিনি উত্তর খুঁজে বের করতে হবে, এমনি হাজারো প্রশ্ন লিখে রেখেছিলেন। যেমন একটা বৃত্তকে কিভাবে চতুষ্কোণ দিয়ে আকৃত করা যায়। এয়োর্টিক ভাল্ব কেন বন্ধ হয়ে যায়, আলো কিভাবে চোখে প্রক্রিয়াজাত হয় এমনি অসংখ্য প্রশ্ন। তার মহৎ লক্ষ্য ছিল আমাদের এই মহাবিশ্ব এবং সেখানে আমরা কিভাবে আছি সেই বিষয়সহ সবকিছুই জানার চেষ্টা করা। আকাশের রং কেন নীল এই প্রশ্ন ছোটবেলা থেকেই আমাদের জাগে। এক পর্যায়ে আমরা এ নিয়ে চিন্তা করা ছেড়ে দেই। দ্য ভিঞ্চি এ নিয়ে তার নোট বইয়ে পাতার পর পাতা লিখে গেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে পানির বাষ্পে আলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে নীল রঙের এক কুহেলী শেড তৈরি হয়। আইনস্টাইনও এই প্রশ্ন নিয়ে ধাঁধায় পড়েছিলেন। তিনি আলোর বর্ণালীর বিক্ষিপ্তরূপে ছড়িয়ে পড়ার এক গাণিতিক সূত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন।

দ্য ভিঞ্চি কখনই পর্যবেক্ষণ থেকে ক্ষান্ত হননি। অনেক ছোটখাটো ব্যাপারও তিনি লক্ষ্য করতেন যা আমরা সাধারণ মানুষরা খেয়াল করি না। যেমন পাত্রে পানি ঢালার সময় তিনি দেখতেন কেমন করে ঘূর্ণি সৃষ্টি হয়। ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানোর সময় তিনি বায়ুর ঘূর্ণি পরীক্ষা করতেন। এসব পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি তুলির টানে অসাধারণ কিছু শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন, ব্যাপ্টিজম অব ক্রাইস্ট ছবিতে যিশুর পায়ের গোড়ালিতে জর্দান নদীর জলরাশির লহরীর স্পর্শ কিংবা ডিলিউজ বা মহাপ্লাবন হলো তার এমনি ধরনের কিছু শিল্পকর্ম। তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা করেছিলেন কিভাবে হৃদপিন্ডের রক্তের আবর্তের কারণে এয়োর্টিক ভাল্ব বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর অঙ্কিত ‘ভাইট্রবিয়ান ম্যান’ হচ্ছে শরীরবৃত্তীয় সূক্ষ্মতার সঙ্গে বিস্ময়কর সৌন্দর্যের সংমিশ্রণ। বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মধ্যে যে যোগসূত্র এটাই তার এক চমৎকার নজির।

কিছু কিছু মানুষ একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। যেমন গণিতে লিওনহার্ড ইউলার কিংবা সঙ্গীতে মোজার্ট। তবে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রতিভাধর হলেন তারাই যারা প্রকৃতি জুড়ে অনন্ত সৌন্দর্যের মধ্যে একটা ধারা বা ছন্দ দেখতে পান। দ্য ভিঞ্চির প্রতিভা নানা ক্ষেত্র জুড়ে ব্যপ্ত। তিনি বিশীর্ণ দেহগুলোর মুখমন্ডল থেকে মাংস ছড়িয়ে নিয়ে যে পেশীর সাহায্যে ঠোঁট দুটো নড়ে সেটি অঙ্কন করে তারপর বিশ্বের সবচেয়ে স্মরণীয় হাসি সৃষ্টি করেন। এটাই বিখ্যাত মোনালিসার হাসি। তিনি মানব করোটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, হাড়গোর ও দন্তবাজি স্তরে স্তরে আঁকেন এবং এভাবে সেন্ট জেরোম এই ওয়াইল্ডারনেস ছবিতে সেন্ট জেরোমের দুঃখ-বেদনা-যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলেন। তিনি অপটিক্সের গণিত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে কিভাবে আলোক রশ্মী কর্ণিয়ার গায়ে আঘাত হেনে ঐন্দ্রজালিক ইলিউশন তৈরি করে সেটা তিনি দেখিয়েছেন ‘দি লাস্ট সাপার’ চিত্রকর্মে।

প্রতিভাধর হিসেবে মানব সভ্যতার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন কার্ল বঞ্চ। জিন বিজ্ঞানী এবং জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি ক্রিসপারের পথিকৃৎ জর্জ চার্চ অন্তত তাই মনে করেন। বড় বড় অনেক রসায়নবিদ যার হিসেবে ব্যবহারের জন্য নাইট্রোজেন গ্যাসকে এ্যামোনিয়ায় রূপান্তরের ব্যবহারিক প্রক্রিয়া খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হওয়ার পর কার্ল বঞ্চ পেরেছিলেন। তার এই উদ্ভাবন মানবজাতির খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতিতে বিপ্লব এনে দিয়েছে। আজ বিশ্বের ৭৫০ কোটি মানুষের মুখে পর্যাপ্ত খাদ্য যোগাতে বিপুল ফসল উৎপাদনে এ্যামোনিয়া যে কি বিশাল ভূমিকা রাখছে তা হয়ত আমরা কেউ ভেবেও দেখছি না।

আরেক অসাধারণ প্রতিভাধর মাদাম কুরি। ১৯০৩ সালে ড. কুরি ও তার স্বামী পিয়েরে এটমের অদৃশ্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার জন্য পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জয় করেন। কুরিই প্রথম এটমের এই বৈশিষ্ট্যর নাম রাখেন রেডিওএ্যাকটিভ বা তেজস্ক্রিয়। ১৯১১ সালে কুরি রেডিয়াম ও পোলোনিয়ামের উপাদানাবলী আবিষ্কারের জন্য দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার জেতেন এবং পারমাণবিক রসায়নের যুগের দুয়ার খুলে দেন। তার কন্যা ইরিন জুলিও কুরিও ১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।

শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধরদের তালিকায় স্টিভ জবসকে অন্তর্ভুক্ত না করলেই নয়। এই মার্কিন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবককে পার্সোনাল কম্পিউটার বিপ্লবের পথিকৃৎ বলা হয়। অনেকটা আইস্টাইনের মতো তিনিও কোন সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে হিমশিম খেলে ভায়োলিন বের করে সুর বাজাতেন। জবস বিশ্বাস করতেন, সৌন্দর্যের গুরুত্ব আছে এবং শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয় সবার মধ্যে, সম্পর্কযুক্ত থাকা উচিত। জবস ভারতে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ লাভের জন্য এসেছিলেন। এর ফলে ম্যাকিনটোস থেকে শুরু করে আইফোন পর্যন্ত তার তৈরি প্রতিটি পণ্যের মধ্যে এমন সৌন্দর্য ছিল যা ছিল চরিত্রগতভাবে প্রায় আধ্যাত্মিক।

সূত্র : টাইম

ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংস

ayodhya destruction rejoiceঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংসের ২৫তম কালো দিবস আজ বুধবার। শুধু হিন্দুস্থান ভূখন্ডেরই নয়, গোটা মুসলিম উম্মাহর আরেকটি বেদনাবহ দিন। এই দিবসটি ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশধারী কট্টর হিন্দু মৌলবাদী ভারতের প্রকৃত চেহারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। বিগত ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বাবরী মসজিদের ভূমিকে দ্বিখন্ডিত করে এক ভাগ রামমন্দিরের বলে বিভক্ত রায় দিয়ে নিন্দার ঝড় তুলে। ভারতীয় আদালতের একতরফা রায় বিশ্বের প্রতিটি মুসলমানের মনে আঘাত দেয়। নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর উগ্রবাদী হিন্দুদের আশকারা যেন বেড়ে যায়। নতুন করে হুংকার দেয়া হচ্ছে বাবরী মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণ করার। এতে করে ক্ষোভ দানা বাঁধছে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে।

অথচ দেশটির লিবারহান কমিশন তার রিপোর্টে বলেছে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র ছিল নিখুঁত। এর জন্য তৎকালীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতা ও পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, আরেক বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানী এবং সাবেক বিজেপি সভাপতি মুরলি মনোহর যোশীকে দায়ী করা হয়। ১৭ বছরে বিভিন্ন সরকার নানা অজুহাতে ৪৮ বার লিবারহান কমিশনের কার্যকালের মেয়াদ বৃদ্ধি করে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৯২ সালের আজকের দিনে ভারতের কংগ্রেস ক্ষমতাসীন থাকাকালে উগ্রবাদী হিন্দুরা উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা শহরে অবস্থিত ষোড়শ শতকের এই অনুপম মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনটি ধ্বংস করে। হিন্দু শাস্ত্রীয় রামের জন্মস্থান ও মন্দিরের স্থলে স¤্রাট বাবর মসজিদ নির্মাণ করেছেন মর্মে হাস্যকর অভিযোগ এনে কংগ্রেস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই নিন্দিত ধ্বংসকান্ড সংঘটিত হয়। ভারতের প্রথম মোঘল স¤্রাট বাবর ১৫২৮ সালে অযোধ্যা শহরে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। কিন্তু ঊনিশ শতকের গোড়া থেকেই নেতৃস্থানীয় হিন্দুরা তদস্থলে রামমন্দির ছিল বলে প্রোপাগান্ডা চালাতে থাকে। অব্যাহত প্রচারণার বদৌলতে অবস্থা এমন হয়, ১৯৪০ সালের পর থেকে সাধারণ হিন্দুরা বাবরী মসজিদের জায়গায় আগে রামের জন্মস্থানের স্মৃতিবাহী রামমন্দির ছিল বলে মনে করতে থাকে। বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদী হিন্দুরা বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে চুরমার করতে উদ্যত হলেও নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে কট্টর হিন্দুবাদী কংগ্রেস সরকারের মদদে উগ্র হিন্দুরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই এই অমার্জনীয় অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়। সেদিন মুম্বাই, আহমেদাবাদ, বেনারস এবং জয়পুরসহ বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দুই সহস্রাধিক মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। এ ঘটনায় সরকারকে বিবাদী করে মামলা পর্যন্ত হয়। ভারত সরকার মামলার রায় নিজেদের পক্ষে নিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ ও সর্বকৌশল অবলম্বন করে।

প্রত্নবিশারদরা বাবরী মসজিদের স্থলে রামমন্দির থাকার দাবিকে বরাবরই ‘মনগড়া’ ও ‘হাস্যকর’ অভিহিত করে। ঐতিহাসিক সত্যকে ভারতের কট্টর হিন্দুবাদী সরকার কখনোই আমলে নেয়নি। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার দশ দিন পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও ঘটনা তদন্তে লিবারহান কমিশন গঠন করলেও তাকে প্রভাবিত করার ব্যর্থ চেষ্টা অব্যাহত ছিল। লিবারহান কমিশনের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার বিচারে পরিচালিত তদন্তে কার্যক্রমের রিপোর্ট ২০০৯ সালের ৩০ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে দাখিল করা হলেও সরকার তা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। ঐ সময় লিবারহান কমিশনের রিপোর্টের বরাত দিয়ে ইংরেজী দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংসের সরকারি ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিলে সমগ্র ভারতে তুমুল হৈ চৈ পড়ে যায়। সেই লিবারহান কমিশনের রিপোর্টকে পায়ে দলে ও মুসলমানদের আবেদন খারিজ করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এক হতবুদ্ধিকর রায় দেয়। ঐ রায়ে বাবরী মসজিদের জমি রাম জন্মভূমির দাবিদারদের দেয়া হয়েছে। উক্ত রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মুসলমানরা বাবরী মসজিদ এলাকার এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করতে পারে।

অযোধ্যায় যে বাবরী মসজিদ ছিল সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেন খোদ ভারতের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র। তিনি গতকাল আনন্দবাজার পত্রিকায় এক নিবন্ধে স্পষ্টত বলেছেন, “১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর দিনেদুপুরে অযোধ্যা বা ফৈজাবাদে একটি মোগলাই মসজিদ শ্রীরামের নামে এক দল করসেবক ভেঙে ফেলল, ঠুঁটো জগন্নাথের মতো সরকার বসে দেখল, আদভানীর মতো জাতীয় নেতারা অকূস্থলে উপস্থিত থেকেও নীরব থাকলেন, উমা ভারতীর মতো উঠতি নেতারা জিগির তুলে সরাসরি ধ্বংসে মদদ দিলেন। এই ইমারতি ধ্বংসকার্যের ছবিই তো ভারতীয় রাজনীতির একটি বহুল প্রচারিত পোস্টার। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে ছবিটি ফিরে ফিরে তুলে ধরা হয়। গুঁড়িয়ে দেয়া মসজিদের জায়গাটি ফাঁকা এখনও আছে, ওই রাম জন্মভূমিতে রামলালার মন্দির করতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত বলে দিয়েছেন যে, সামনের বছরের মধ্যেই মন্দির উঠে যাবে। উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের সরকার হিন্দুত্বের সুপবন জোতদার, অতএব সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে থাকা মামলা মিটিয়ে ফেলে রাম মন্দির তোলাটা শুধু একটু সময়ের ওয়াস্তা। ২০১৮-র ডিসেম্বরের মধ্যেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজ রাম মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটনেই উদ্যাপিত হবে, মোহন ভাগবত এ হেন আশ্বাস দিয়েছেন। মসজিদ ধ্বংস তো মন্দির নির্মাণের জন্যই। এক তœতœ-ইতিহাসের বস্তু সাক্ষ্যের পরিবর্তে কৌম ইতিহাসের বানিয়ে তোলা নিদর্শনকে বসানোর রাজনীতি ৬ ডিসেম্বর তারিখটিকে যেন স্মৃতির বুড়ি হিসাবে দাগিয়ে দিয়েছে।”

“৬ ডিসেম্বর তো রাজনৈতিক ব্যর্থতারই উদ্যাপন” শীর্ষক নিবন্ধে মি. ভদ্র আরো বলেন, “৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ আদৌ আকস্মিক নয়, প্রস্তুতি ছিল। আঠারো শতক থেকেই রামায়েতপন্থী সম্প্রদায়ের উত্থানে ফৈজাবাদকেই রাম জন্মভূমি বলে দাবি করা হয়। উনিশ শতকে হনুমানগড়ির সাধুদের সঙ্গে ফৈজাবাদের মৌলবীর সংঘর্ষ হয়, অযোধ্যার নবাব সৈন্য পাঠিয়ে হাঙ্গামা বন্ধ করেন। সতীনাথ ভাদুড়ির উপন্যাসেও রাম জন্মভূমির কথা উল্লেখিত হয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর ভারতে মসজিদের মধ্যেই রামলালার বিগ্রহ হাজিরা দেন। প্রয়োজনে অল্পবিস্তর পুজোআচ্চাও চলে। আবার আদালতের নির্দেশে দরজায় তালাও পড়ে। ১৯৮০-র দশক থেকে রামজন্মভূমি আন্দোলন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ চাগিয়ে তোলে, প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আনুকূল্যে মসজিদের তালাও খোলা হয়, ওই প্রাঙ্গণেই রামপূজা চলতে থাকে। রাজনৈতিক দল হিসাবে এ বার বিজেপি আন্দোলনে নেমে পড়ে। এখন কেবল প্রাঙ্গণ নয়, মসজিদ দখল করে মন্দির তুলতে হবে। ১৯৯০-তে করসেবকদের উপর মুলায়ম সরকার গুলী চালায়। একাধিক করসেবক মারাও যায়। সমিধ সংগ্রহ তো শেষ, এ বার শুধু অরণি কাষ্ঠে অগ্নিসংযোগ অপেক্ষিত ছিল, বাবরী মসজিদ ধ্বংস তো সেই অগ্নিসংযোগ মাত্র।”

মামলার শুনানি পিছিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি : পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে জানানো হয়, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৫তম কালো দিবেসর ঠিক আগের দিন গতকাল মঙ্গলবার আবেদনকারীদের আর্জি মেনে পিছিয়ে গেল অযোধ্যা মামলার চূড়ান্ত শুনানি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ফের এই মামলার শুনানি। অযোধ্যার বিতর্কিত জমি কার? এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয় এদিন বেলা ২টা থেকে। এই মামলায় ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ১৩টি আবেদন খতিয়ে দেখবে সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ।

২০১০-এর ৩০ সেপ্টেম্বর রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলায় রায় দেয় ইলাহাবাদ হাইকোর্ট। ওই রায়ে আদালত বলে, অযোধ্যায় রামজন্মভূমি ও বাবরি মসজিদের ২ দশমিক ৭৭ একরের বিতর্কিত জমি সুন্নী ওয়াকফ বোর্ড, হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধিত্ব করা রামলালা এবং নির্মোহী আখড়া- এই তিন পক্ষের মধ্যে ওই জমি সমান ভাগ করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, মামলার নথিপত্র পেশ করার জন্য আবেদনকারীদের কাছে এটিই (৮ ফেব্রুয়ারি) শেষ সুযোগ। এর পরে আর শুনানি পিছনো হবে না।

অবশ্য ওয়াকফ বোর্ড ও বাবরি অ্যাকশন কমিটির দাবি, সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বা সাত সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চে শুনানি হোক। অন্যথায় এ দিনের শুনানি বয়কট করবে তারা। আর লোকসভা নির্বাচনের পর শীর্ষ আদালতে শুনানি করার আবেদন করল সুন্নী ওয়াকফ বোর্ড।

আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা ও সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলে ২০১১-র ৯ মে কোর্টের দুই সদস্যের একটি বেঞ্চ ইলাবাবাদ হাইকোর্টের রায়ের উপরে স্থগিতাদেশ জারি করে বলে, উচ্চ আদালতের ওই রায় বিস্ময়কর, কারণ কোনও পক্ষই জমি ভাগ করে দিতে বলেনি। এর পরের ৬ বছরেও অযোধ্যার ওই বিতর্কিত জমির মালিকানা নিয়ে মামলার শুনানি শুরু করা যায়নি। চলতি বছরের মার্চে আদালতের বাইরে এই বিতর্কে নিষ্পত্তির কথা বলে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু,তাতে কোনও পক্ষই রাজি হয়নি। এর পর আগস্টে শিয়া সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়, বিতর্কিত জায়গার থেকে দূরে কোনো মুসলিম অধ্যুষিত স্থানে বাবরি মসজিদ তৈরি করা হোক। তাতে আপত্তি জানায় সুন্নী বোর্ড।

গতকাল শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি অশোক ভূষণ এবং বিচারপতি আব্দুল নাজিরের বিশেষ বেঞ্চে ওই মামলায় ১৩টি আবেদনের উপর শুনানি শুরু হয়। রামলালার পক্ষে কে পরাশরণ, সি এস বৈদ্যনাথন এবং সৌরভ শামশেরি, উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষে এডিশনাল সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা শুনানির সময় উপস্থিত থাকেন। অন্য দিকে, অল ইন্ডিয়া সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড ও নির্মোহী আখড়া-সহ অন্যদের পক্ষে থাকেন কপিল সিব্বল, অনুপ জর্জ চৌধুরি, রাজীব ধবন ও সুশীল জৈন।

‘শৌর্য দিবস’ পালনের হুংকার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের : এদিকে, গুজরাটের ভোটের আগে, এ বার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৫ বছর পূর্তিকেও বড়সড় ভাবে পালন করতে চাইছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)। তারা আজকের দিনটিকে (৬ ডিসেম্বর) ‘শৌর্য দিবস’ হিসেবে তুলে ধরার ঘোষণা দিয়ে গতকাল হুঙ্কার দিয়েছে, “মন্দির-যোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণ হবেই”।

আনন্দবাজার পত্রিকা আরো জানায়, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকেই ওই দিনটি ‘শৌর্য দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে পরিষদ। কিন্তু তা কখনই বড়সড় আকারে হতে পারেনি। তবে এ বার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ২৫ বছরে অযোধ্যা ও লখনউয়ে বড় আকারে ‘শৌর্য দিবস’ পালনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

গুজরাট ভোটকে সামনে রেখে কিছু দিন থেকেই রামমন্দির নিয়ে হাওয়া তুলতে চাইছে সঙ্ঘ পরিবার। সম্প্রতি সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত মন্তব্য করেন, “অযোধ্যায় বিতর্কিত জমিতে রামমন্দিরই হবে”। এর পরেই ‘শৌর্য দিবস’-এর পরিকল্পনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পরিষদ। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা অম্বুজ ওঝা উসকানিমূলকভাবে বলেন, আজ লখনউয়ে ‘শৌর্য সংকল্প সভা’-র আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া, “অযোধ্যায় কেশবপূরমেও ওই দিন দুপুরে সাধুসন্তরা বৈঠকে বসতে চলেছেন।’’ এ জন্য পরিষদের দফতরে প্রস্তুতিও চলছে জোরকদমে। ক’দিন আগে উত্তরপ্রদেশের উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশবপ্রসাদ মৌর্যও অযোধ্যার বিতর্কিত এলাকায় রামমন্দির গড়ার জন্য সওয়াল করেছেন। তা পরিষদকে আরো উৎসাহিত করেছে।

তবে অযোধ্যায় বিতর্কিত স্থানে রামমন্দিরই হবে বলে মোহন ভাগবত যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন হায়দরাবাদের সাংসদ ও এআইএমআইএম নেতা আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। তিনি ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেন, “কে মোহন ভাগবত? তিনি কি দেশের প্রধান বিচারপতি? কোর্টে অযোধ্যার বিচার যখন চলছে, তখন কোন অধিকারে ভাগবত বলছেন, বিতর্কিত জায়গাতে রামমন্দিরই হবে।” পরিষদের আর এক শীর্ষস্থানীয় নেতা সুরেন্দ্র জৈন আগামী বছরের ১৮ অক্টোবর থেকে রামমন্দির নির্মাণের কথা কী ভাবে বললেন, সে প্রশ্নও তুলেছেন ওয়েইসি।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি বলছে মানবিক সংহতি মিথ্যা

Tawakkol Karmanতাওয়াক্কুল কারমান : মিয়ানমারে কী ঘটছে, তা নিয়ে কেউ আর বিতর্ক করছে না। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং বিশ্বের বড় দেশগুলো- সবাই একমত যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা জাতিগত নিধন ও গণহত্যার সুস্পষ্ট উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন মোতাবেক রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে কেবল অক্টোবর পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ। এ সংকট ক্রমাগতভাবে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। একদিকে মিয়ানমার সরকারের অসহিষ্ণুতা এবং বর্ণবাদী নীতিগুলো অটলভাবে চালিয়ে নেয়ার জোর অবস্থান আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে; অন্যদিকে বাস্তবতা হচ্ছে মিয়ানমারে কী ঘটছে তার প্রতি বিশ্বের আগ্রহ যথেষ্ট গভীর ও আন্তরিক নয়। সবচেয়ে মারাত্মক সত্য, যা রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি উন্মুক্ত করেছে তা হল- ‘মানবিক সংহতি’র আইডিয়া সম্ভবত বড় ধরনের একটি মিথ্যার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

যারা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও আদর্শ বিবেচনা না করে (আমিও তাদের একজন) মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে, তারা কঠিন ধাঁধার মোকাবেলা করছে। কেন এটি ঘটছে? কেন আপনার চোখের সামনে ঘটতে থাকা মানবিক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি বন্ধ হচ্ছে না? নির্দিষ্ট একটি জাতির ভোগান্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয়া ও মানবিক সংহতি প্রকাশের জন্য কি অবশ্যই পূরণ করতে হবে এমন কোনো অদৃশ্য শর্ত আছে?

আমি ভয় করছি, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ভয়ংকর কিছু হবে। কেবল ধনী ও শক্তিশালীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই কি

মানবিক সংহতি?

অনেকে বুঝতে শুরু করেছেন, মানবিক সংহতি মুসলিম পর্যন্ত বিস্তৃত হয় না। এ মত কতটুকু সঠিক, তা বিবেচনা ছাড়াই বলা যায়, এটি সন্দেহের একটি নির্দেশক এবং এটি কোনো ভালো বিষয় নয়। এর বাইরেও মিয়ানমার প্রশাসন প্রতিদিন ভয়ংকর যে সহিংসতা সংঘটিত করার পরও এমন মিত্র খুঁজে পাচ্ছে। যারা তাদের কৃতকর্মকে সমর্থন ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, তা-ও একটি সমস্যা। রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য মিয়ানমার প্রশাসনের দায়িত্ব স্পষ্ট এবং যা কিছু ঘটছে তা অস্বীকার করে দেয়া মিয়ানমারের বিবৃতি সর্বৈব মিথ্যা।

অত্যাচারের মুখেও মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য নিজের অতীতকে উৎসর্গ করা যোদ্ধা, মিয়ানমার সরকারের নেতা ও সাবেক নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি- একজন মানুষ নিজেকে কত ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলতে পারে তার বড় উদাহরণ যার বিষয়ে আমাদের ধারণা ছিল, যা কিছুই ঘটুক তিনি নিজের মূলনীতি সমুন্নত রাখবেন।

এটি সত্যিকারার্থেই বিয়োগান্ত, সু চি বাস্তবতার প্রকাশ্য বিরোধিতা করছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সহিংসতা ও জাতিগত নিধনের বিষয়গুলো অস্বীকার করছেন। সু চি অন্তত মানবাধিকারের বা তার নিজের সম্মানের জন্য লড়াই ও বিজয় অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের জাতি ও এর সামরিক বাহিনীর জন্য লড়াই করাকেই বেছে নিলেন, যাদের একটি ভিশন হল বৈচিত্র্যকে বর্জন, প্রান্তিকীকরণ ও প্রত্যাখ্যান করা। অনেক বেশি মর্যাদা দেয়া হতো এমন একজন নারীর কী বিয়োগান্ত সমাপ্তি!

সারা বিশ্ব দেখেছে কীভাবে গোটা গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং গ্রামবাসীদের হত্যা বা বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে; গণহত্যা চালানো হয়েছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে। কে এমন যুক্তি গ্রহণ করতে পারে? আমি মনে করি, কেউ সেটা পারে না।

সত্য হল, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধী ও প্রতিপক্ষকে শোষণ এবং অত্যাচারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘাঁটিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য। এটি একটি পুরনো ধোঁকা, যা সবাই প্রকাশ্যে বুঝতে পারে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাহসী হতে হবে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের দিকে।

নিজেদের আখের গোছানোর জন্য ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা থেকে একনায়ক শাসকদের বিরত রাখতে হবে। কেবল তা-ই নয়, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ সংঘটন করছে, তাদের সত্যিকারের জবাবদিহিতার আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। এখনই রোহিঙ্গাবিরোধী সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে, এমন বহু আহ্বান জানানো হয়েছে। একে ইতিবাচক উন্নতি হিসেবে দেখা যায়, যদিও তা এসেছে অনেক পরে- একেবারে না হওয়া থেকে দেরিতে হওয়া তো ভালো।

এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও মিয়ানমার প্রশাসন সম্ভবত এমন আহ্বানে সাড়া দেবে না, যতক্ষণ না সেখানে ঘটতে থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসী ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করবে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এমন একটি বাহিনী, যারা এখনও সেখানে হামলা-গুলি করে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা কোনো অপরাধ দেখতে পাচ্ছে না।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি আমাদের দেখিয়েছে জাতিসংঘের একটি সদস্য দেশ কীভাবে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ নীতি তৈরি করতে পারে আন্তর্জাতিক কোনো পারিপার্শ্বিকতা ছাড়াই। ফলে যদি সত্যিকারের শুদ্ধতার গতিপথ আমাদের দেখতে হয়, তবে মিয়ানমার প্রশাসনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অবশ্যই বাড়াতে হবে।

এটিই সঠিক সময় মিয়ানমার বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নেয়ার। যে দেশটি বর্ণবাদী নীতিমালার প্রসার ঘটাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে আমাদের শান্ত হয়ে থাকা কোনোভাবেই উচিত নয়। এটিই সঠিক সময় এমন একটি মানবিক ট্র্যাজেডি বন্ধ করার, যা কিনা কয়েক দশক ধরে চলছে অযৌক্তিকভাবে।

কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে; যে শরণার্থীরা মাত্র দুই মাস আগে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিপীড়নমূলক অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কিন্তু এ চুক্তি (যদি তা বাস্তবায়িত হয়ও) যথেষ্ট নয়, যাতে মনে হচ্ছে কোনোকিছুই ঘটেনি।

এটি সত্য, মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির বিরুদ্ধে চলমান ট্র্যাজেডি বন্ধ করতে হলে প্রত্যাবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মিয়ানমার সরকার এমন কী নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, জাতিগত নিধন অভিযান তারা পুনরায় ঘটাবে না?

মানবতা ও ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ না জেনেই রোহিঙ্গারা যুগের পর যুগ বেঁচে আছে। এর কিছু অংশ যদি তারা এখনও খুঁজে না পায়, তবে কি তা আশ্চর্যজনক হবে না? এটি উপলব্ধি করতে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের অবশ্যই কাজ করতে হবে, কেবল তাদের জন্য নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই।

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

তাওয়াক্কুল কারমান : নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইয়েমেনের সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

ডাকটিকিটের জন্ম ইতিহাস

stamp origin

বিভাগ:ইতিহাস

প্রধান বিচারপতির প্রতি ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর হেদায়েত

কে. এস. সিদ্দিকী : হজরত ইমাম কাজী আবু ইউসুফ (রহ.) ছিলেন হজরত ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) এর শীর্ষস্থানীয় শাগরিদ, হানাফী মাজহাবের অন্যতম স্তম্ভ এবং ইসলামের প্রথম প্রধান বিচারপতি। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি জগত বিখ্যাত। আব্বাসীর খেলাফতের প্রাথমিক যুগে তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। হিজরী ১৮২ সালের ৫ রবিউল আউয়াল তিনি ইন্তেকাল করেন।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োজিত থাকাকালে ইমাম আবু ইউসূফের (রহ.)-এর নামে মোহতারাম ওস্তাদ ইমামুল মুরসালিন হজরত আবু হানিফা (রহ.) একখানা ঐতিহাসিক পত্র প্রেরণ করেন, যা সকলের সাথে কীভাবে চলতে হবে, আচরণ করতে হবে, তা বর্ণিত হয়েছে । হেদায়েতনামা নামে খ্যাত এ গুরুত্বপূর্ণ পত্রখানা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আজও সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো কোনো আরবী গ্রন্থে এর পূর্ণ বিবরণ রয়েছে যার অনুবাদ-সারাংশ বিভিন্ন ভাষায় সংকলন হয়েছে । প্রধান বিচারপতি ও প্রিয় ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে হজরত ইমাম আজম (রহ.) বলেন:

হে প্রিয় ইয়াকুব !

সুলতানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, তার মানমর্যাদার কথা মনে রাখবে। এবং হ্যাঁ, তার নিকট সব সময় এবং সর্বাবস্থায় যাতায়াত করবে না। যদি তুমি তার নিকট অধিক আসা-যাওয়া করতে থাকো, তাহলে তোমার মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে এবং তুমি তার দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হবে। তোমার সম্মান-গুরুত্ব হ্রাস পাবে। আগুন থেকে যেভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়, তেমনিভাবে তার থেকে সাবধানে থাকবে। আগুন দ্বারা উপকৃত হবে, কিন্তু তা হতে দূরে থাকবে, নিকটবর্তী হলে পুড়ে যাওয়ার আশংকাও থাকে এবং হ্যাঁ, তার সামনে দীর্ঘ কথাবার্তা হতেও বিরত থাকবে।

সুলতানের দরবারে যদি তোমার অপরিচিত লোকজন উপস্থিত থাকে, তাহলে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করবে। কারণ যখন তোমার এই কথা জানা নেই যে, তারা কোন মর্যাদা-সম্মানের লোক, তবে তাদের সম্বোধনের সময় তাদের যথাযথ মর্যাদা অনুযায়ী আচরণ প্রদর্শিত নাও হতে পারে। যদি তারা তোমার চেয়ে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়, তুমি যদি তার খেয়াল না রাখো এটা হবে অসদাচারণ, আর যদি তারা মামুলি বা সাধারণ লোক হয়, কিন্তু তুমি তাদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন করো তাহলে সুলতানের দৃষ্টিতে তুমি অধম ও গুরুত্বহীন প্রতিপন্ন হয়ে যাবে।

ত্বরিত বিচার পদ গ্রহণ করবে না: সুলতান যদি তোমাকে বিচারকের পদ পেশ করেন, তবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা গ্রহণ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, তিনি তোমার চিন্তাধারার সঙ্গে একমত, তোমার ইজতেহাদ, চিন্তাধারা মানেন, তোমার মতবাদ সমর্থন করেন, যাতে তোমাকে এমন কথা না বলতে হয়, যা তোমার মত ও রায়ের পরিপন্থী। যে পদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য তোমার নেই, তা কিছুতেই তুমি গ্রহণ করবে না। সুলতানের তল্পী বাহক তোশামোদীদের সঙ্গে বেশি দহরম-মহরম করবে না। লোকদের কেবল প্রশ্নের জবাব দেবে- অতিরিক্ত কিছু বলবে না, কারবার করবে না। কারবারের সঙ্গে অধিক সংযোগ রাখবে না। যেন লোকেরা এইরূপ ধারণা পোষণ না করে যে, তোমার অর্থলোভ আছে এবং তোমাকে ঘুষখোর মনে করতে পারে। সাধারণ লোকজনের সামনে হাসবে না, এমনকি অধিক মুচকি হাসিও না। বাজারে কম যাতায়াত করবে। কমবয়সী ছেলেদের সাথে কথাবার্তা বিনা প্রয়োজনে বলবে না। মেলামেশাও করবে না। কেননা, এটি হচ্ছে একটি বড় ফেতনা ও বিপদের কারণ। তবে বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলাতে পারো এবং তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারো। দোকানে বসবে না। সড়ক পথে উঠাবসা করবে না। বাজারে পানাহার করবে না, মসজিদেও না, বেহেশতিদের (যারা পানি পান করায়) কাছ থেকে চলার পথে পানি পান করবে না।

ইমাম আজম তার ভক্ত ছাত্র ও প্রধান বিচারপতিকে এসব ছাড়াও আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান উপদেশ প্রদান করেন, যা নিম্নরূপ: রেশমী কাপড় পরবে না, অলংকার ব্যবহার করবে না। এ দ্বারা ঔদ্ধত্য সৃষ্টি হয়। যদি একাধিক বিয়ে করো তাহলে প্রত্যেক স্ত্রীকে আলাদা গৃহে রাখবে। দ্বিতীয় বিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত করবে না যতক্ষণ না তোমার পূর্ণ বিশ্বাস হবে যে, তুমি অতিরিক্ত ব্যয় বহনে সক্ষম হবে এবং এ ব্যয়ভার সহজে বহন করতে পারবে।

প্রথমে জ্ঞান অর্জন করবে, অতঃপর অর্থ লাভের চেষ্ট করবে, ধন-সম্পদ লাভের পূর্বেই বিয়ে করবে। আল্লাহকে ভয় করতে থাকবে। আমানতে তসরুফ করবে না। আম-খাস তথা সর্বস্তরের লোকদের সৎ পথের দিকে আহবান করতে থাকবে। সাধারণ লোকদের সঙ্গে দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে কথাবার্তা বলবে না, দশ বছরই যদি অর্থহীন ও দারিদ্র্যে অতিবাহিত হয়ে যায় তা হলেও জ্ঞানার্জন হতে বিরত থাকবে না।

যদি বাজারী লোক ও সর্বসাধারণ তোমার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতে চায়, তাহলে তাদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে না। এভাবে তোমার মর্যাদা হ্রাস পাবে।

সত্য কথা বলতে কাউকে ভয় করবে না, চাই সে সুলতানই হোক না কেন, যা বলবে- যখন বাহাস-বিতর্ক করবে কিংবা মোনাজারা বিতর্কে অবতীর্ণ হবে তখন দলীল প্রমাণ সামনে রাখবে। যাদের সঙ্গে বাহাস-বিতর্কে লিপ্ত হবে তাদের ওস্তাদবৃন্দ ও শায়খদের প্রতি কোনো তিরস্কার বা কটুক্তি করবে না।

নিজের জাহের-বাতেন প্রকাশ গোপন রাখবে। অধিক হাসবে না, এতে অন্তর মরে যায়। চলার সময় ধীরগতিতে চলবে। লাফিয়ে লাফিয়ে চলবে না। তাড়াহুড়া করে বা দ্রুত কাজ করবে না। চিৎকার করে কথা বলবে না। চিল্লিয়ে কোনো কাজ হয় না। উত্তমরূপে কোরআন তেলাওয়াত করবে। অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করবে। সর্বাবস্থায় তার শোকর গুজারী করবে। (অসমাপ্ত)