আর্কাইভ

Archive for the ‘আন্তর্জাতিক’ Category

কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হারি

mata_hari_1মাহমুদ ফেরদৌস :১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর। ভোর বেলা। প্যারিসের সেইন্ট-ল্যজারে কারাগারের অভ্যন্তরের একটি সেল থেকে জাগিয়ে তোলা হলো এক বন্দীকে। হাতে দেওয়া হলো কাগজ, কলম, দোয়াত কালি আর খাম। বলা হলো, চাইলে দু’ খানা চিঠি লিখতে পারেন তিনি। নিজের কালো মোজা, উঁচু হিলের জুতাজোড়া, পশম আর মখমলের তৈরি পোশাক গুছিয়ে নিলেন তিনি। তারপর কাগজে হিজিবিজি লিখে জমা দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আমি প্রস্তুত।’

কিছুক্ষণ পরই ধূসর রঙের একটি সামরিক যান বের হলো কারাগার থেকে। ছুটলো প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক পুরোনো বন্দরে। গাড়ির ভেতর দু’ জন সেবিকা ও নিজের আইনজীবীর সঙ্গে বসে আছেন ৪১ বছর বয়সী ওই গোলন্দাজ নারী। পা অবদি লম্বা কোট তার পরনে। মাথায় টুপি।

গন্তব্যস্থলে তিনি যখন পৌঁছালেন তখন সময় সবে সকাল সাড়ে ৫টার চেয়ে একটু বেশি। তাকে দাঁড় করানো হলো ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ১২ ফরাসি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন নিজের বন্দুক হাতে নিয়ে। চোখ বাঁধার জন্য সাদা কাপড় দেওয়া হলো তাকে। কিন্তু তিনি নিতে চাইলেন না। ‘এটা কি পরতেই হবে?’ পাল্টা প্রশ্ন করলেন।

যখন তার দিকে বন্দুক তাক করে সৈন্যরা, তখনও তাদের উদ্দেশ্যে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়েছিলেন তিনি। তার এক হাত বেঁধে ফেলা হয়। অপর হাতে তিনি নিজের আইনজীবীর দিকে হাত নাড়েন। পরমুহূর্তেই সৈন্যদের রাইফেল গর্জে উঠে। পায়ে লাগে গুলি। হাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। এক কর্মকর্তা এগিয়ে এসে রিভলবার বের করে তার মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

অথচ, এক দশক আগেও, এই নারীর পায়ের তলায় ছিল ইউরোপের বহু রাজধানী। তিনি ছিলেন কিংবদন্তীতুল্য এক ‘রূপসী’। ভিনদেশি নগ্ন নাচের আবেদনে কাবু করে রেখেছিলেন কতশত মন্ত্রী, জেনারেল আর শিল্পপতিদের। ঘটনার দু’ বছর আগেও দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল তার। প্যারিসে এক প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটান তো, পরেরদিন হেগ শহরে আরেক প্রেমিকের সঙ্গে। রীতিমত আন্তর্জাতিক ‘সেক্স সিম্বল’ তিনি। নামেমাত্র পোশাক পরে নাচতেন। প্যারিসে তার নগ্ন নাচের আসর ছিল যেন তৎকালীন ইউরোপিয়ান অভিজাতদের ছোটখাটো সম্মেলন। মাতা হারি- এই এক নামে তাকে দুনিয়া চিনতো।

কিন্তু, এরপরই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। পাল্টে গেল তার চেনাজানা জগত। তিনি অবশ্য ভেবেছিলেন আগের মতোই ইউরোপের ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে বরং তাকে মৃত্যুদ- পেতে হলো। তার অপরাধ? জার্মানির পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করা। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জার্মান প্রভুদের কাছে সরবরাহ করা। লুফে নিল পত্রপত্রিকাগুলো। তাকে দায়ী করা হলো হাজার হাজার মিত্রপক্ষীয় সৈন্যর মৃত্যুর কারণ হিসেবে।

কিন্তু আজ শত বছর পর ফরাসি সরকার যেসব নথিপত্র অবমুক্ত করেছে, তাতে এক ভিন্ন চিত্রই ফুটে উঠে। তার মৃত্যুর এত বছর ধরে তার সঙ্গে লেগে ছিল ডাবল এজেন্ট হওয়ার কলঙ্ক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ছিলেন স্রেফ একজন বলির পাঠা।

তার আসল নাম কিন্তু মাতা হারি নয়। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭৬ সালে। বাবা-মা নাম রাখেন মার্গারেথা জেল্লে। মাতা হারি নামটা কেন বেছে নিয়েছিলেন, তা নিয়েও আছে চমকপ্রদ তত্ব। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায়, এই নামের অর্থ ‘দিনের চোখ,’ অর্থাৎ সূর্য। আবার হারি নামে এক হিন্দু দেবতাও আছেন। তার আগে মাতা শব্দটিও লাগিয়ে থাকতে পারেন। দুই তত্বেরই ভিত্তি আছে। নিজেকে অনেক সময় তিনি জাভানিজ (ইন্দোনেশিয়ার একটি অঞ্চল) প্রিন্সেস বলে পরিচয় দিতেন। কখনও আবার ভারতের মন্দির নর্তকির মেয়ে হিসেবে। কিন্তু কখনই তিনি বলতেন না, তার জন্ম আসলে নেদারল্যান্ডে।

আর নেদারল্যান্ডে তার জন্মস্থান লিউওয়ার্ডেনের ফ্রাইজল্যান্ড মিউজিয়ামে তাকে নিয়ে শনিবার থেকে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে তার বিচারের অনেক নথিপত্র অবমুক্ত করা হয়। তার ব্যক্তিগত ও পারবারিক কয়েকটি চিঠিও প্রকাশ হয়। সবই আছে প্রদর্শনীতে। এসব নথিপত্র একসাথে মেলালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত এই গুপ্তচরের আরও বহু পরিচয় আছে।

ফ্রাইজল্যান্ড জাদুঘরের কিউরেটর হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“আমরা আসলে তার জীবনটা বুঝতে চেয়েছি। একজন বিশাল তারকা হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে। একজন শিশু হিসেবে। একজন মানুষ হিসেবে যিনি শুধু নর্তকিই ছিলেন না, বা গুপ্তচরই ছিলেন না। আমরা চাই তার পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে।”

তার জীবন ছিল প্রচ- ঘটনাবহুল, আর মর্মান্তিক। জন্ম হয়েছিল বেশ ধনী এক পরিবারে। কিন্তু তিনি যখন কিশোরী, অকস্মাৎ ধনসম্পদ হারিয়ে সংসারধর্ম ত্যাগ করেন তার পিতা। একলা মায়ের কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। ১৫ বছর বয়সে সেই মা-ও মারা যান। অগত্যা, আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় হয় তার। ১৮ বছর বয়সে গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা রুডলফ জন ম্যাকলিওডের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এই লোকের বয়স ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ। তার সঙ্গেই গোলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে এক সামরিক ঘাঁটিতে ৪ বছর ছিলেন তিনি। তখনই জাভানিজ ভাষায় তার হাতে খড়ি।

mata-hari-2তাদের দাম্পত্য জীবনকে ঝঞ্ঝাটময় বললে কম বলা হয়। প্রতিনিয়ত তিনি অকথ্য নির্যাতন সইতেন স্বামীর কাছ থেকে। নিজের ৩ বছর বয়সী ছেলেটাকে মারা যেতে দেখেন তিনি। সম্ভবত, গৃহকর্মীর দেওয়া বিষের কারণে। পরে এক মেয়ে হয় তার। ৪ বছর পর হল্যান্ডে ফিরলে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান মার্গারেথা (তার আসল নাম)। কিন্তু মেয়ের খরচ বহন করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে তিনি চলে যান প্যারিসে। মেয়েকে রেখে যান স্বামীর কাছে। নিজের এই মেয়েকে তিনি সবসময়ই মিস করতেন।

পরে প্যারিস থেকে নিজের প্রাক্তন স্বামীর এক কাজিনকে লেখা চিঠিতে মার্গারেথা জানান যে, সেখানে তিনি এক থিয়েটারে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি তাকে নামতে হয়েছে পতিতাবৃত্তিতেও। তিনি লিখেন, ‘ভেবো না যে, আমি আসলেই অনেক খারাপ। দারিদ্র্যের কষাঘাতে আমি বাধ্য হয়েছি এ পথে নাম লেখাতে।’ তিনি নাকি এ-ও বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, যেসব নারী সংসার ছেড়ে পালান তারা পরবর্তী ঠিকানা হিসেবে প্যারিসকে খুঁজে পান।’ নিজের এই নর্তকি আর অভিনয় জীবনেই তিনি বেছে নেন ‘মাতা হারি’ নাম, যেটি পরে তার আসল নামকেও ছাপিয়ে যায়। এই জীবনেই তিনি অনেক অর্থ আর যশের মালিক হন। ভাবা হয়, জীবনের কোনো এক সময়ে তিনি মিলিয়নিয়ারও ছিলেন।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলেন,“তার বিরুদ্ধে যেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ, সেটি না থাকলেও, আজও  তাকে মানুষ স্মরণ করতো। গত শতাব্দীর প্রথমভাগে ইউরোপ জুড়ে তার যেই পরিচিতি ছিল, তাতেই তিনি অমর হয়ে থাকতেন। স্ট্রিপিং (নগ্ন নাচ)-কে তিনিই কমবেশি নাচের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কাছে তার ছবির অ্যালবাম আছে। তার ছবি সম্বলিত সংবাদপত্রের স্তূপ এখনও আছে। তিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ইউরোপের সেলেব্রেটি ছিলেন।”

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনকেন্দ্রীক আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে তার গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়ই। অথচ, আজ এত বছর পর জানা যাচ্ছে যে, তিনি জার্মানদের কাছে তেমন কোনো তথ্যও দেননি। যেমন, হয়তো তিনি বলতেন যে, এই বসন্তে হামলা চালাতে পারে মিত্রবাহিনী। কিন্তু এই তথ্য সবারই জানা ছিল।

অথচ, হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে। মূলত, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তার পরিচিতি প্রাপ্তি, জার্মানি ও ফ্রান্স – উভয় পক্ষের সেনাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, আর যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপজুড়ে ঘোরাঘুরি- এ সবই তার বিপক্ষে কাজ করেছে। আর তার জীবনযাপনের ধরণ নিশ্চিতভাবেই তার পক্ষে যায়নি।

এতদিন ধরে অনেক ইতিহাসবিদই তাকে নিয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণার বিপক্ষে গিয়ে তার পক্ষালম্বন করেছেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে আসলে বলি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, যুদ্ধের পর নিজেদের অজস্র ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে একজন জুতসই গুপ্তচর দরকার ছিল ফরাসিদের, যাকে কিনা শূলে চড়ানো যাবে। আর নষ্টা চরিত্রের মাতা হারি এক্ষেত্রে ছিলেন পারফেক্ট বলি।

ফরাসি সেনারা এই ভয়েও ছিলেন যে, মাতা হারি ফরাসি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার মেলামেশার কথাও ফাঁস করে দিতে পারেন। এদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ জেনারেলও ছিলেন। এ কারণেই তাকে তড়িঘড়ি করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে।

আবার এ-ও সত্য যে, ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এখানে অনেক ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়, ফরাসি গোয়েন্দারা আগেই বৃটিশদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তাকে জার্মান গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করে। হাতেনাতে ধরতেই তাকে জার্মানির বিরুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতেও এটাও জানা যায় যে, বৃটিশরা যেসব কারণে তাকে সন্দেহ করেছিল, তার কোনো যুক্তিযুক্ততা ছিল না। বৃটিশ গোয়েন্দারা তাকে লন্ডনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বলা হয়, প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও,তিনি একজন সাহসী ধাঁচের মহিলা, যাকে সন্দেহ থেকে ফেলা যায় না।

স্পেনের মাদ্রিদে জার্মান সামরিক অ্যাটাশে আর্নল্ড ভন কালের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে তার। এই আর্নল্ডই নিজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাতা হারিকে নিজেদের গুপ্তচর হিসেবে ইঙ্গিত দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান। এই টেলিগ্রাম ফরাসি কর্মকর্তাদের হাতে যায়। এটিই ছিল মাতা হারির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদই একে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন।

তাদের যুক্তি, ফরাসিরা যে জার্মান টেলিগ্রামে আড়ি পাততে পারেন, সেটা জার্মানরা অনেক আগ থেকেই জানতো। তাহলে, এমন সংবেদনশীল তথ্য টেলিগ্রামে কেন পাঠিয়েছিলেন আর্নল্ড ভ্যান? কারণ, তিনি চেয়েছিলেন যে, এই চিঠি ফরাসিদের হাতে পড়–ক। আর তারা এই চিঠির ভিত্তিতে নিজেদের গুপ্তচরকেই ফাঁসি দিয়ে দিক। হয়েছেও তাই।

আবার অনেকে বলেন, যেই টেলিগ্রামের কথা বলা হয়, সেটির অনুদিত অংশই প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে। সেটির জার্মান ভাষায় লেখা মূল কপি কোথায়? কেউ কি তবে, এসব জালিয়াতি করে বানিয়েছে মাতা হারিকে ফাঁসানোর জন্য?

তবে মামলার কৌঁসুলির কিছু নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, মাতা হারি নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেন, ১৯১৫ সালে যুদ্ধ চলাকালে হেগ শহরে জার্মানরা তাকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেয়। তখন তিনি যুদ্ধে আটকা পড়ে ফ্রান্সে ফেরার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছিলেন। তখনই আর্মস্টারডামে জার্মান এক কূটনীতিক ফ্রান্সে ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাকে জার্মানির পক্ষে গুপ্তচরগিরি করার প্রস্তাব দেন। উপায় না পেয়ে তিনি রাজি হন। তিনি যুক্তি দেখান যে, মিত্রবাহিনীর প্রতিই তার আনুগত্য ছিল সবসময়। ফরাসি গোয়েন্দারা যখনই তার সাহায্য চেয়েছে, তখনই তিনি এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার এই যুক্তি ধোপে টেকেনি।

হ্যান্স গ্রনিউগ বলছিলেন,“উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ছিল মাতা হারির। তাদের সঙ্গে ঘুরতেন, নাচতেন। এমনকি এক সঙ্গে থাকতেনও। অথচ, যুদ্ধের সময় যখন তিনি বিপদে পড়েন, ওই কর্মকর্তারাই তার বিরুদ্ধে চলে যান। এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে নিশ্চয়ই তার কষ্ট হয়েছিল।”

মৃত্যুদ- কার্যকরের পর কেউই মাতা হারির মৃতদেহ দাবি করতে আসেনি। তাই প্যারিসের এক মেডিকেল কলেজে মৃতদেহটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে এটি শিক্ষার্থীদের ব্যবচ্ছেদ শেখাতে ব্যবহৃত হতো। তার মাথার কঙ্কাল অবশ্য অ্যানাটমি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ২০ বছর আগে জাদুঘরে জিনিসপত্রের গণনা চলাকালে দেখা যায়, কঙ্কালটি নেই। ধারণা করা হয়, কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

(ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।)

Advertisements

ভিন্নরূপে দাসত্ব আধুনিক বিশ্বে

modern day slavery 4modern slavery 3

বিভিন্ন দেশে অদ্ভূত কিছু ট্রাফিক আইন !

মিয়ানমারের রাখাইনে চীনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অর্থনৈতিক স্বার্থ

কাইয়ুকফাইয়ু

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পশ্চিমে, যেখান থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে দেশটির সেনাবাহিনী ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালাচ্ছে, সেখানেই রয়েছে চীনা বিনিয়োগে কাইয়ুকফাইয়ু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)। ২০১৩ সালে মিয়ানমার ও চীনা সরকার যৌথভাবে এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে শিল্প ও অবকাঠামো তৈরির জন্য এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়। এই শিল্পাঞ্চলটি ১ হাজার ৭০০ হেক্টর এলাকা নিয়ে গঠিত। শিল্পাঞ্চলটির জন্য মূল বিনিয়োগ সরকারি পর্যায়ে হলেও এতে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিও জড়িত হয়। এদের মধ্যে রয়েছে চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সিটিক গ্রুপ। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তিনটি বৃহৎ প্রকল্প রয়েছে। যেগুলোর সঙ্গে চীনের স্বার্থ জড়িত।

গভীর সমুদ্র বন্দর

কাইয়ুকফাইয়ুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছে এই গভীর সমুদ্র বন্দর। এই প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

চলতি বছরের মে মানে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, সিটিক কনসোর্টিয়ামে তিনটি বড় চীনা কোম্পানি ও থাইল্যান্ডের একটি কোম্পানি রয়েছে। এই বন্দরটির ৭০-৮৫ শতাংশ মালিকানা চেয়েছে সিটিক গ্রুপ। বাকি অংশের মালিকানা থাকবে মিয়ানমার সরকারের কাছে।

অঞ্চলটিতে একটি বন্দর রয়েছে। যদিও এটি মূলত দেশীয় পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এবং বন্দর আকারেও ছোট। বন্দরটি গভীর সমুদ্র বন্দর হিসেবে পুনর্নির্মিত হলে এর বার্ষিক ক্ষমতা দাঁড়াবে  ৭দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্গো এবং ৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন টিইইউ।

এই বন্দরটি চীনের বেল্প অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সামুদ্রিক অবকাঠামোর জন্য কৌশলগভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, পাকিস্তানের গোয়াদর ও শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।

বন্দরটি পশ্চিমা দেশ থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য চীনের  বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে। এখন চীনকে তেল আমদানি করতে হয় বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্র পথ মালাকা প্রণালী দিয়ে। বন্দরটি হলে এই প্রণালী এড়িয়ে যেতে পারবে চীন।

তেল-গ্যাসের পাইপলাইন

petroleum-gas line burma

থেলং মিয়ানমার-চীনা তেল ও গ্যাস পাইপ লাইন প্রকল্প বলে পরিচিত এই প্রকল্পটি ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলারে নির্মিত হচ্ছে।  রাখাইনের উপকূল থেকে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ুনান প্রদেশে পর্যন্ত ৭৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন। ২০১০ সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের এপ্রিলে তা চালু করা হয়।

পাইপলাইনটির ৫১ শতাংশ মালিকানা চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের এবং মিয়ানমারের অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের ৪৯ শতাংশ। এই পাইপলাইন দিয়ে ২২ মিলিয়ন টন তেল পরিবহন করা হবে। বর্তর্মানে ১৩ মিলিয়ন টন তেল পরিবহন করা হচ্ছে। এছাড়া ১২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার প্রাকৃতিক গ্যাসও বহন করা হবে এই পাইপ লাইন দিয়ে।

এসব তেল আমদানি করা হয় আরব দেশ থেকে। বঙ্গোপসাগর হয়ে জাহাজে এসব তেল-গ্যাস এসে পৌঁছায় কাইয়ুকফাইয়ুতে।

শিল্পাঞ্চল

রাখাইনে দ্বিতীয় বৃহত্তম যে উন্নয়ন প্রকল্প সিটিক কনসোর্টিয়াম দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে হচ্ছে শিল্পাঞ্চল। এটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ২.৩ বিলিয়ন ডলার। রয়টার্সের খবর অনুসারে, এই প্রকল্পের ৫১ শতাংশ মালিকানা সিটিক গ্রুপের। ২০১৬ সালের শুরুতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।

২০-৩০ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হতে পারে। ১০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে শিল্পাঞ্চলটি গঠিত হচ্ছে। প্রথম ধাপে কৃষি, ইকোট্যুরিজম এবং শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হবে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

আবদুল করিম যখন রানির বন্ধু

victoria & abdul karim 1

রাসেল মাহ্‌মুদ :ভারতীয় এক তরুণ বাবুর্চির সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার। নামমাত্র নয়, বেশ পাকাপোক্ত বন্ধুত্ব। দুজনের একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, একে অন্যের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করাসহ কত কিছু!‘চাকরের’ সঙ্গে রানির এ সখ্য কি আর মেনে নেয় রানির লোকেরা? কীভাবে কী হলো যে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে যাওয়া এক বাবুর্চি হঠাৎ রানির প্রিয়পাত্রে পরিণত হলো?

ওষুধ খেতে না চাওয়া শিশুকে যেভাবে রসগোল্লায় ভরে ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়, হলিউড ছবি ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল সে রকম একটি প্রচেষ্টা। ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়া ও তাঁর ভারতীয় পাচক আবদুলের মিষ্টি বন্ধুত্বের ভেতরে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে ধবলধোলাই করা হয়েছে। পূর্বপুরুষেরা দুই শ বছর ভারত শাসন করেছিল, উত্তরপুরুষ চলচ্চিত্রকারেরা সেই সময়কে তির্যকভাবে তুলে এনেছেন সিনেমায় এবং পরিচালক স্টিফেন ফ্রেয়ারস এখানে আর ব্রিটিশ থাকতে পারেননি। বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠেছেন।

সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল ছবির গল্প। রানি ভিক্টোরিয়ার সুবর্ণজয়ন্তীতে ইংল্যান্ডে আনা হয়েছিল ভারতীয় বাবুর্চি আবদুলকে। রানির প্রতি যথাযথ সম্মান ও ভক্তির অভাব ছিল না আবদুলের। রানির হেঁটে যাওয়া পথকে কুর্নিশ করা, তাঁর পায়ে চুমু খাওয়া থেকে শুরু করে প্রায় সব আদব মেনে চলছিল আবদুল। অন্যদিকে আবদুলের প্রতি রানির আচরণ ছিল বিদেশি অতিথির মতো, যা ঠিক তাঁর সভাসদদের পছন্দ হচ্ছিল না। বর্ণবাদী আচরণের জন্য রানি বরং তাঁদের ভর্ৎসনাই করতে শুরু করেন।

এ তো গেল ছবির গল্প। রানি ভিক্টোরিয়ার সময়েই কিন্তু সব থেকে বেশি অত্যাচারিত হয়েছিল ভারত। ভারতের রাজনীতিবিদ শশী থারুরের ইনগ্লোরিয়াস এমপায়ার: হোয়াট দ্য ব্রিটিশ ডিড টু ইন্ডিয়া বইয়ে সেসব লেখা আছে। সে সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান নিচে নামিয়ে আনার পেছনেও ছিল ব্রিটিশদের কারসাজি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের শোষণে দারিদ্র্যসীমার এত নিচে নেমে গিয়েছিল ততকালীন ভারত, যার ফল ১৮৭৬-৭৮ এবং ১৮৯৯-১৯০০-এর দুর্ভিক্ষ এবং প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু। এ ছাড়া জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে ব্রিটিশ সেনারা হত্যা করেছিল প্রায় দুই হাজার লোককে।

ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল ছবিতে ঔপনিবেশিক দেশগুলোর ওপরে ব্রিটিশদের অমানবিকতাকে রসময় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। বলা যায় ভিক্টোরিয়া ও আবদুল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের অত্যাচারের একটি রঙিন দলিল। পূর্বপুরুষদের অত্যাচারের এই কাহিনি চলচ্চিত্রে দেখানো পরিচালকের জন্য একটু বিব্রতকর কি না কে জানে। কিন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায় যে তিনি এড়াতে পারেননি, তার প্রমাণ এই সিনেমা। এ ছবি দেখে কি অনুতপ্ত হবেন এখনকার অত্যাচারীরা? বার্মিজ চলচ্চিত্রকারেরা কি একসময় নির্মাণ করবেন রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের কাহিনি নিয়ে সিনেমা?

কাল মুক্তি পাচ্ছে হলিউড চলচ্চিত্র ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল। রানি চরিত্রে অভিনয় করা জুডি ডেঞ্চ বিভিন্ন সিনেমায় অনেকবার রানির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। জেমস বন্ড সিরিজের বেশ কিছু ছবিতে দেখা গেছে তাঁকে। আর আবদুল করিম চরিত্রের ভারতীয় অভিনেতা আলী ফজল আগে বেশ কিছু হিন্দি ভাষার ছবিতে কাজ করেছেন। হলিউডেও টুকটাক কাজ করেছেন। রানির বন্ধু চরিত্রেও দারুণ করেছেন তিনি।

ইনডিপেনডেন্ট অবলম্বনে

রানি ভিক্টোরিয়া উর্দু শেখেন যে কারণে

abdul karim & queen victoria

১৮৩৭ এর জুনে রাজা চতুর্থ উইলিয়াম মারা যাওয়ার পর আকস্মিকভাবে ব্রিটেনের রানির দায়িত্ব লাভ করেন ভিক্টোরিয়া। আর ১৮৭৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রয়েল টাইটেল অ্যাক্ট পাসের মাধ্যমে ভারতের সম্রাজ্ঞী হন রানি ভিক্টোরিয়া। তবে ভারতের সম্রাজ্ঞী হওয়ার পাশাপাশি ভারতের ইতিহাসে রানি ভিক্টোরিয়া অন্য এক কারণে বেশ আলোচিত। আর সেটা হলো অর্ধেক পৃথিবীর সম্রাজ্ঞী হয়েও তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক ভারতীয় ভৃত্যের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

১৮৮৩ সালে রানির স্কটিশ ভৃত্য জন ব্রাউনের মৃত্যুর পর অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন রানি ভিক্টোরিয়া। রানির এই নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য ভারত থেকে ভৃত্য আনার ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। ১৮৮৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনামলের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ বেশ ঘটা করে উদ্যাপন করতে ভারতীয় খাবার তৈরির জন্যই মূলত ভারতীয় ভৃত্য আনা হয়েছিল। সেই চাহিদা পত্র পেয়ে আগ্রার জেল সুপার তার বিশ্বস্ত ভৃত্য আব্দুল করিম এবং মোহাম্মদ বক্সকে ইংল্যান্ডে পাঠান।

চাকরিতে যোগদানের এক বছরের মধ্যেই রানীর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন আব্দুল করিম। রানির দরবারের বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত তিনি। যার কারণে শুধু খাসভৃত্যই নয়, রানিকে উর্দু ভাষা শেখাতে থাকে করিম। তবে আব্দুল করিমের কাছে উর্দু ভাষার শেখার পাশাপাশি আব্দুল করিমের সাথে গভীর প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েন রানি। উপহার স্বরূপ আব্দুল করিমকে মুন্সী এবং ভারতীয় বিষয়ের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন রানি। আব্দুলের প্রতি রানির এই অন্ধ প্রেমের কারণে আব্দুলকে তিনি প্রচুর অর্থ, জমিজমা এমনটি নাইট উপাধিও দিতে চেয়েছিলেন। তবে রয়্যাল কোর্টের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত আব্দুলকে নাইট উপাধি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন রানি। কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। তাই রানির মৃত্যুর পর শেষবার কফিনের মুখ আটকানোর আগে রানির মুখ দেখেন আব্দুল করিমই।

কুর্দি রাষ্ট্র হলে কী ঘটবে?

এ মাসের শেষ দিকে ইরাকি কুর্দিস্তানে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ভোট হতে যাচ্ছে। এতে তাদের সার্বভৌমত্বপ্রাপ্তির গতি বাড়তে পারে এবং তারা শেষমেশ এক শতাব্দীর দ্বন্দ্ব-সংঘাত, গণহত্যা ও নৃশংসতার পর একটি

রাষ্ট্র উপহার পেতে পারে। তবে গণভোটে কুর্দিদের স্বাধীনতার বোধ তৈরি হলেও এর কোনো তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। কারণ, এর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। এমনকি এতে প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকতা পেলেও। কিন্তু কুর্দিদের এই স্বাধীনতার দাবি আন্দোলন বিনা চ্যালেঞ্জে পার পাবে না। এর মধ্যে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিরোধ। তুরস্ক ও ইরান ঐতিহাসিকভাবে কুর্দিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছে, কখনো কখনো সশস্ত্রভাবে।

পশ্চিমা শক্তিগুলো উত্তর ইরাকে নো-ফ্লাই জোন প্রতিষ্ঠা করার পর ইরাকি কুর্দিস্তানের প্রতিবেশীরা পাথুরে জায়গায় আটকা পড়ে গেছে। সে কারণে কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপি) ও প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান (পিইউকে) স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, যেখানে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা চলে। সেখানকার প্রতিষ্ঠান ও পররাষ্ট্রনীতিও তাদের নিজস্ব।

১৯৯০-এর দশকে প্রতিকূল ভূরাজনৈতিক পরিবেশ সত্ত্বেও কুর্দিস্তান শক্তিশালী ও সম্পদ-সমৃদ্ধ প্রতিবেশী ও তাদের সেনাবাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ ছিল—এরা তখন অভিযান চালিয়ে কুর্দি রাষ্ট্র (কার্যত) শেষ করে দিতে পারত। ১৯৯২ সালের কুর্দি নির্বাচন ইরাকের ইতিহাসে প্রথম সে রকম নির্বাচন, যার বদৌলতে কুর্দিরা আজকের সার্বভৌমত্বের আন্দোলন করতে পারছে।

ঐতিহাসিক নির্বাচন ও পশ্চিম কর্তৃক নো-ফ্লাই জোন অঞ্চল আরোপ করা সত্ত্বেও শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের বাইরে ছিল না। কুর্দিস্তানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া তখনো শিশু পর্যায়ে ছিল। তখন কুর্দিরা চারপাশ থেকে বৈরী প্রতিবেশীদের দ্বারা অবরুদ্ধ ছিল। অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক—উভয় কারণেই তারা চাইত না এই উদীয়মান গণতন্ত্রের উন্নতি হোক। অনিবার্যভাবে তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া ও বাথ পার্টিগুলো এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। মূলত তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করেছে। তারা যেমন নানা কারসাজি করেছে, তেমনি প্রতিপক্ষ দলগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে।

এছাড়া একই সময়ে সেই ১৯৯০-এর দশক থেকে তুরস্কসহ ইরাকি কুর্দিস্তানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের কুর্দি সংগঠনগুলোকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বলা দরকার, তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) ৪০ বছর ধরে তুর্কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আবার কেডিপি ও পিউকে তুরস্কের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই পিকেকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। কারণ, পিকেকের কুর্দি জাতীয়তাবাদ মার্ক্সবাদী ঘরানার, যেখানে এরা সামাজিক ও উদার-গণতন্ত্রী ধারার। বারজানি ও তালাবানিরা তুর্কি পাসপোর্ট পেয়েছে। ফলে তারা ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে অবাধে চলাচল করতে পেরেছে। এমনকি তারা আঙ্কারায় আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বও করতে পেরেছে।

আজ আঙ্কারা ও কেরআজির মধ্যকার এই রাজনৈতিক সহযোগিতা মূলত এই সম্পর্কের সম্প্রসারণ। ২০০৩ সাল থেকে তুরস্ক একভাবে মেনে নিতে শুরু করেছে যে কুর্দি রাষ্ট্র অবশ্যম্ভাবী, যদিও সেই রাষ্ট্র আঙ্কারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বাঁধা থাকবে এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠবে। যারা তুরস্ক ও ইরান-প্রভাবিত বাগদাদ সরকারের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হয়ে উঠবে। তুরস্ক ছাড়াও উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অবস্থান নিয়েছে, যার কারণে তার পক্ষে ইরাকি কুর্দিস্তানের হাইড্রোকার্বন ব্যবহার করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ইরাকি কুর্দিস্তান স্বাধীন হয়ে গেলে বাগদাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই এরা সেটা রপ্তানি করতে পারবে।

তুরস্ক কুর্দি রাষ্ট্রের সম্ভাবনায় সক্রিয়ভাবে সমর্থন জোগাচ্ছে না, বরং ১৯৯০ সালে কুর্দিস্তান রিজিয়নাল গভর্নমেন্টের সঙ্গে তার যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেটাকে তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছে, যেখানে ইরাকি কুর্দিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। ১৯৯১ সালে কুর্দিরা স্বায়ত্তশাসন লাভ করার পর আঙ্কারা প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও তারা কুর্দিস্তানের অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্পদ বিনিয়োগ করেছে। তারা একটি পাইপলাইন নির্মাণে সহায়তা করেছে, যার মধ্য দিয়ে এরা স্বাধীনভাবে হাইড্রোকার্বন রপ্তানি করতে পারবে। এতে কুর্দিস্তান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছে, যদিও তারা জানে, এতে একদিন স্বাধীন কুর্দিস্তানের জন্ম হতে পারে।

আঙ্কারা সতর্কবার্তা দেবে, সম্ভবত হুমকিও। কিন্তু সেটা তার নিজস্ব কুর্দিস্তান ও পিকেকের সঙ্গে তার চলমান দ্বন্দ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। কুর্দি রাষ্ট্রের জন্মের মধ্য দিয়ে পিকেকে ও সিরিয়ায় তার সমমনা দলগুলো আরও শক্তিশালী হলেও তুরস্ক নিজ দেশ থেকে কুর্দিদের বেরিয়ে যাওয়া রোধ করার মতো শক্তিশালী জায়গায় আছে। এমনকি ইরান ও সিরিয়া থেকে কুর্দিদের বেরিয়ে যাওয়া রোধ করার মতো অবস্থায় তারা আছে। অনেকে সহজ-সরল যুক্তি দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে ইরাকসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের পতন ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু ব্যাপারটা হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যাপক প্রতিরোধ হবে।

ওদিকে গতিশীল অর্থনীতির বিপুল হাইড্রোকর্বন-সমৃদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কুর্দি রাষ্ট্র যার সঙ্গে আবার উপসাগরীয় দেশগুলোর ভালো সম্পর্ক আছে এমন একটি সম্ভাবনা ইরানের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। ইরানের মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে, এতে ইরাকে অর্থাৎ এই অঞ্চলে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে। এরপর কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে ইরানের কুর্দিরা চাঙা হয়ে উঠবে, যারা বিগত কয়েক বছরে ইরানি সরকারের ওপর বেশ কটি হামলা চালিয়েছে। বস্তুত, সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দিদের পুনর্জাগরণের সুযোগ বেড়েছে। এ ছাড়া ইরানের কুর্দিদের জীবনমানের তেমন উন্নয়ন হয়নি। সেখানে তারা ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে থাকে। অন্য কথায়, ইরাকে কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা যে অন্য কোথাও অনুসৃত হবে তার সম্ভাবনা কম। এর মানে হলো কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঢেউ যদি ইরানেও লাগে, তাহলে সেটা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ইরানের আছে।

এখন ভাষ্যের ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে জয়ের ব্যাপারটা কেআরজির ওপরই নির্ভর করছে। এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে তাদের শত্রু ও বন্ধুদের বোঝাতে হবে, কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে, সমস্যা নয়। আর ট্রাম্প প্রশাসন যেহেতু ইরানের ব্যাপারে যুদ্ধংদেহী হয়ে উঠছে, তাই কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা দেওয়ার আগে ইরানকে ভাবতে হবে।

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।

রাঞ্জ আলালদিন: দোহারা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অতিথি ফেলো।

iraq split

ট্রাম্পের বই-এ ‘৯-১১’ হামলার ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো !

trump 911 bookমুহাম্মাদ আলী রেজা : সাম্প্রতিক সাড়া জাগানো খবর : টুইন টাওয়ার হামলার প্রায় দুই বছর আগেভাগে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বইতে ‘The America We Deserve’ প্রকাশ জানুয়ারি ২০০০ Nostrodomas -এর মতো ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- ওসামা বিন লাদেন টুইন টাওয়ারে হামলা চালাবেন। US Presidential hopeful Donald Trump “warned” of the horrific September 11 attack on the World Trade Center in a book published less than two years before the world’s worst terror strikes happened, it is being claimed. By JON AUSTIN PUBLISHED: 03:42, Tue, Feb 23, 2016। ট্রাম্পকে এখন বলা হচ্ছে ‘মডার্ন ডে নসট্রডোমাস।’ Alex Jones Radio Show সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন,‘আমি ওই বইতে বলেছি, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এই ব্যক্তি ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে।’

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, আসলে টুইন টাওয়ারে হামলা ছিল অভ্যন্তরীণ বিষয় (পরিকল্পনা) মাত্র। ‘নয়-এগারো’তে ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম হামলা হলেও এর নীলনকশা শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একই প্রতিষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এভাবে তখন এটা প্রমাণ করার চেষ্টা চলে যে, বিশ্বে জাতি হিসেবে মুসলমানরাই সন্ত্রাসী। তখন রিডার্স ডাইজেস্ট এক নিবন্ধে লিখেছিল, হামলার জন্য বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্র বাছাই করার লক্ষ্য হলো, এটা দেখানো যে, এটা মূলত সমগ্র বিশ্বসম্প্রদায়ের ওপরই আক্রমণ। কারণ,এখানে সব দেশের, সব জাতির এবং সব ধর্মের লোকেরা অবস্থান করেন। সিএনএনের প্রথম রিপোর্টে স্বীকার করা হয়- যদি বোমা হামলাকারীরা বাণিজ্যকেন্দ্র সমূলে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করত, তাহলে বিস্ফোরক রাস্তার সমতলে বসাত। ফলে শত শত মানুষ নিহত বা জখম হতো।

বাল্টিমোর নিউ ট্রেন্ড পত্রিকা লিখেছেন, বোমা হামলাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়, যার ফলে সবচেয়ে কম ক্ষতি হয়েছে এবং এর আওতার মধ্যে পড়েছে সবচেয়ে কম লোক। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্রে প্রথম হামলাটি আসলেই ছিল এক আগাম কৌশল। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল, প্রচারমাধ্যমে স্পর্শকাতর অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী’ ব্রান্ডে চিহ্নিত করে তাদের ব্যাপারে আমেরিকানদের সতর্ক ও উত্তেজিত করা। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে বিরামহীন ‘মিডিয়া ক্রুসেড’, যার লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা। ‘জিহাদ ইন আমেরিকা’ নামে এক ঘণ্টার ডকুমেন্টারি ফিল্ম পাবলিক টেলিভিশনে দেখিয়ে উত্তেজিত করা হলো আমেরিকানদের।‘ওয়াগ দ্য ডগ’ও ‘সিজ’ নামে তিন ঘণ্টার মুভি প্রেক্ষাগৃহে দেখান হয় সেই উদ্দেশ্যে। এগুলো আমার নিজেরই দেখা বলে এখানে উল্লেখ করছি।

৯-১১-এর একটা গোপন স্যাটেলাইট ইমেজ রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে। এমনটাই দাবি করলেন রাশিয়ান কূটনীতিকেরা। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে জঙ্গি হামলার এমন এক ছবি তার কাছে রয়েছে যা দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব যে, কাজটা আসলে করিয়েছিল আমেরিকাই। এই ছবি প্রমাণ করবে, বিশ্বের ভয়ঙ্করতম জঙ্গি হামলার দায় আসলে মার্কিন প্রশাসন ও মার্কিন গোয়েন্দাদের। এমনটাই দাবি করেছে রাশিয়া। আরো দাবি করা হয়েছে, এই হামলার পুরো দায়ভার পড়ে বুশ প্রশাসনের ঘাড়ে। আর এই হামলায় ওসামা বিন লাদেনের লোকজনকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল মাত্র।

রহস্য উদঘাটন : কেন বুশ ৯-১১ সুপার ড্রামা মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা করেছিলেন?

তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সুদূর পরিকল্পিত ৯-১১ সুপার ড্রামা মঞ্চস্থ হওয়ার প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়ায় প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হয়ে যায় : [সর্বনাশ!] ইসলাম এ দেশে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্ম। এটি আরো তীব্র হয়ে ওঠে যখন ক্লিনটন সরকার হোয়াইট হাউজে স্থায়ীভাবে ইসলামের প্রতীক চাঁদ-তারা পতাকা ওড়ায়। যেদিন ইসলামের এই পতাকা উত্তোলন করা হয়, পরের দিনই পতাকাটি হাইজ্যাক হয়ে যায়। মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়লে পরের দিন আবার চাঁদ-তারা পতাকা শোভা পায়। আর মিডিয়া খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, হোয়াইট হাউজ জানেই না- কে বা কারা এ কাজটি করেছে। তাদের অগোচরে এটাও কি সম্ভব হতে পারে? একই যুক্তিতে বলা যায়, বিশ্বের শীর্ষ সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে এক সাথে চারটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালানো ক্ষুব্ধ আরব মুসলমানদের পক্ষে কোনো পরিস্থিতিতেই কি সম্ভব? এটা কি বিশ্বাস করা যায়? আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এবং ১৯ জন বিমান ছিনতাইকারী বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে ‘নয়-এগারো’র মতো নজিরবিহীন ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার এমন ঘটনা কখনো ঘটাতে পারে কি? এসব বিশ্বাসযোগ্য হওয়া তো দূরের কথা, কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বর্ণনা এরকমই দেয়া হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর থেকে দু’টি ধর্মীয় পতাকা হোয়াইট হাউজে ওঠানো হতো। দেখতে দেখতে মুসলমানদের সংখ্যা ইহুদিদের টপকিয়ে যেতে দেখা যায়। সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে তিন ধর্মের পতাকা হোয়াইট হাউজে উড়বে। জন্স হপকিন্স যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। বাল্টিমোরে এর দু’টি ক্যাম্পাস। হোমউড ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির নিচ তলার দেয়ালে পরিবেশিত একটি নিউজ আমার নজরে পড়েছিল : প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এক লাখ ইসলাম গ্রহণ করছে। মিডিয়ায় দেখি : এই ধর্মান্তরিতদের মধ্যে বেশির ভাগই মহিলা। এ সময় একটি বই হাতে পাই : ‘ডটার অব অ্যানাদার ওয়ে’। লিখেছেন একজন খ্রিষ্টান মা। বইটিতে বিবৃত হয়েছে লেখিকা মিসেস অ্যানওয়ের অভিজ্ঞতাসহ নিজ কন্যা ও আমেরিকান অন্যান্য নারীর মুসলমান হতে চাওয়ার কাহিনী।

আমার সাথে যেসব মহিলার কথা হয়েছে, তারা জানেনই না এ রকম বই বাজারে আছে! এক মহিলা জানালেন, সবাই প্রশ্ন করে, কেন মুসলমান হলাম? আমিও ভাবছি এ সম্পর্কে বই লিখব। কিন্তু এ রকম বই দেখছি বাজারে এসে গেছে। তিনি এক সৌদি ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করেছেন। সৌদি আরবেও গিয়েছেন। বললেন : সৌদি আরবে মহিলারা আমাদের মতো ইসলাম সম্পর্কে এত ভালো জ্ঞান রাখে না। মূলত এর কারণ হচ্ছে- এখানে যারা মুসলমান হন, সব ধর্ম পড়াশোনা করে তার পরই ধর্মান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইন্টারনেটে একজন লিখেছেন : বইটি পেয়ে পড়ে দেখি, এ তো আমারই কথা। সাথে সাথে আব্বা-আম্মাকে কপি দিয়ে বলি, দেখ কেন আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। একজন আইরিশের সাথে পরিচয়, তিনি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে যতটা জানেন আমি তার মতো জানি না, যদিও আমার বাড়ি গোপালগঞ্জে হিন্দুপ্রধান এলাকায়। তিনি বললেন : সব ধর্মের তুলনামূলক পড়াশোনা করে তার পরে মুসলমান হয়েছি। বললেন, তার স্ত্রী তখনো খ্রিষ্টান থাকলেও জেনে শুনে পড়াশোনা করে অনেক পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

‘ডটার অব অ্যানাদার ওয়ে’ বইটি বিশ্বে বেশ সাড়া জাগায়। দেশে এসে এর বাংলা অনুবাদ “অন্য পথের কন্যারা” দেখতে পাই।

বর্তমান দুনিয়ায় একটি অপ্রকাশিত বিষয় হচ্ছে : আগে বিশ্বের সবাই প্রধানত কমিউনিজম, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক, আলোচনায় মেতে থাকত। ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানে দুনিয়াব্যাপী বর্তমানে কিন্তু জমে উঠেছে তুলনামূলক ধর্মের বিষয় বা বক্তব্য নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিতর্ক। এ কারণে বিশ্বের সব দেশে দেখা যাচ্ছে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাচ্ছেই।

পিউ রিসার্চ সেন্টার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনমত জরিপ পরিচালনাকরী একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এখন তুলনামূলকভাবে বিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল একমাত্র ধর্মবিশ্বাস হচ্ছে ইসলাম, যদিও বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হলো ইসলাম আর সবচেয়ে বেশি অনুসারী হলো খ্রিষ্টান ধর্মের।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বুশের প্রতিদ্বন্দ্বী আল গোর

সে নির্বাচনের বিতর্ক প্রতিযোগিতাটি ছিল রোমাঞ্চকর। বিতর্কের একটি বিষয় থেকে এটা স্পষ্ট যে, পরবর্তীকালে কেন বুশ সেই বিতর্কিত ক্রুসেডের ঘোষক এবং নাইন-ইলেভেনের পরিকল্পক হলেন? প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোর ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নিলেন গোঁড়া ইহুদি লিবারম্যানকে। বুশের কাছে স্পষ্ট হলো, ইহুদি সব ভোট অবশ্যই গোরের পাল্লায় যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবি খুবই সক্রিয় ও সুসংগঠিত। সে দেশে সাধারণত খ্রিষ্টান ভোট দুই ভাগে প্রায় সমানভাবে বিভক্ত হয়ে ভোটের ভারসাম্য বজায় রাখে দুই দলের মধ্যে। এতদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, ইহুদি ভোট যে দিকে মোড় নেয়, তারাই বিজয়ের হাসি হাসে। বুশ দেখলেন, কথা ঘুরিয়ে বললে সব মুসলমান ভোটারের ভোট অতি সহজে অনায়াসে পাওয়া যাবে। বিতর্কের সময় তিনি সরাসরি বললেন : ‘নিরাপত্তা আইনে সিক্রেট এভিডেন্সকে বৈষম্যমূলক মনে করি। ক্ষমতায় গেলে এটি বাতিল করব।’ জবাবে আল গোর বলেন : ‘আমি এটাকে বৈষম্যমূলক মনে করি না।’ এই লেখক তখন যুক্তরাষ্ট্রে বসে টিভিতে বিতর্কটির দর্শক ছিলেন।

মুসলমান ভোটারদের মনে হলো, বুশ তাদের পক্ষ নিয়েছেন। এই প্রথম মুসলমানেরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে জোটবদ্ধভাবে একদিকে ভোট প্রয়োগ করেন। এমনকি, বুশের পক্ষে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রচারে জড়িয়েও পড়েন। শেষে ইহুদি লবির সাথে প্রতিযোগিতায় বিজয় ছিনিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হলো, মুসলমানরাও মার্কিন মাটিতে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনে সক্ষম। মুসলিম ভোট ব্যাংকের শক্তির মহড়াকে বরং দেখা হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে। প্রচারমাধ্যম এটা লুফে নিলো। ইনভেস্টরস বিজনেস ডেইলি এক নিবন্ধে লিখেছিল ‘আমেরিকান মুসলমানদের জন্য এটা ছিল বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি।’ ক্ষমতা পেয়ে বুশ অবশ্য তার কথা আদৌ রক্ষা করেননি, বরং কার্যত নাইন-ইলেভেনের রূপকার হলেন।

নাইন-ইলেভেনে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দু’টি যাত্রীবাহী বিমান আছড়ে পড়েছিল নিউ ইয়র্কের বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্রে। অতঃপর আগুন, ধোঁয়া; তাসের ঘরের মতো দু’টি টাওয়ার ভেঙে পড়ে। ‘নয়-এগারো’র ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার দশক পূর্তির পরও বিবিসি, রয়টার, এএফপি পরিবেশিত সংবাদে প্রশ্ন করা হলো : আসলে কী ঘটেছিল ২০০১-এর এই দিনে? সত্যিই কি আলকায়েদা মার্কিন শৌর্যে আঘাত হেনেছিল, নাকি সবই পাতানো?

যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জোন্সের নেতৃত্বে ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর অভিযোগ : নিউ ইয়র্ক ও পেন্টাগনে সে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়, এটা ছিল ‘ভেতর থেকেই’ সংঘটিত। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে অধ্যাপক স্টিভেন বলেন, ভেঙে পড়া টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষার পর নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে সেখানে ভবন ধসিয়ে দেয়ার বিস্ফোরক ব্যবহারের।

কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতে, ৯-১১ ঘটনাটি ছিল একটি ষড়যন্ত্র। পেন্টাগনে আসলে বিমান নয়, রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কারণ, বিমানের যাত্রীদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, যাত্রী ও ক্রুদের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। মৃতদেহ পাওয়া গেলে উঘঅ পরীক্ষা করে অবশ্যই তাদের শনাক্ত করা হতো। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে ইরানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘নয়-এগারো’ হামলা ছিল গোয়েন্দা সংস্থার জটিল দৃশ্যকল্প ও কর্মকাণ্ড। আর পেন্টাগনে যে বিমানটি হামলা করেছিল, তার ধ্বংসাবশেষের খোঁজ পাওয়া গেল না’ কিংবা আরোহীদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের খোঁজ মিলল না কেন? একই দিনে আর একটি বিমান যুক্তরাষ্ট্রের একটি খেলার মাঠে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এর কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি-এ কথা উল্লেখ করে মাহাথির বলেন, বিমানটি কি শেষ পর্যন্ত হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? মার্কিন গণমাধ্যম ‘৯-১১’ ঘটনা সম্পর্কে রহস্যজনক নীরবতা বজায় রাখে। এর উদ্দেশ্য কী?

বিশ্বকে ফাঁকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নতুন কৌশলে চলমান রয়েছে বুশের সেই নাইন-ইলেভেন ক্রুসেড। এ কাজে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অগ্নিতে ঘৃত সংযোগ করছেন।

সিএআইআরের মুখপাত্র উইলফ্রেডো আমর রুইজ আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ‘এই কর্মকাণ্ডটি এখন একটি শিল্পের রূপ নিয়েছে। ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়ানোর এ কাজ থেকে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করা হচ্ছে। তারা কখনো কখনো নিজেদের ইসলামি বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করছে।’ ‘তারা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করছে যেন, মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। তারা আমেরিকানদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, মুসলমানেরা আমেরিকান কমিউনিটির অংশ নয় এবং তারা আমেরিকার বিশ্বস্ত নাগরিকও নয়।

তিনি বলছিলেন, এর দু’টি বিপজ্জনক দিক : একটি, ঘৃণা থেকে অপরাধ বৃদ্ধি করছে এবং অন্যটি হলো, মুসলমানদের বিপক্ষে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

লেখক : সাবেক পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭