আর্কাইভ

Archive for the ‘অর্থনীতি’ Category

মিয়ানমারের রাখাইনে চীনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অর্থনৈতিক স্বার্থ

কাইয়ুকফাইয়ু

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পশ্চিমে, যেখান থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে দেশটির সেনাবাহিনী ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালাচ্ছে, সেখানেই রয়েছে চীনা বিনিয়োগে কাইয়ুকফাইয়ু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)। ২০১৩ সালে মিয়ানমার ও চীনা সরকার যৌথভাবে এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে শিল্প ও অবকাঠামো তৈরির জন্য এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়। এই শিল্পাঞ্চলটি ১ হাজার ৭০০ হেক্টর এলাকা নিয়ে গঠিত। শিল্পাঞ্চলটির জন্য মূল বিনিয়োগ সরকারি পর্যায়ে হলেও এতে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিও জড়িত হয়। এদের মধ্যে রয়েছে চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সিটিক গ্রুপ। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তিনটি বৃহৎ প্রকল্প রয়েছে। যেগুলোর সঙ্গে চীনের স্বার্থ জড়িত।

গভীর সমুদ্র বন্দর

কাইয়ুকফাইয়ুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছে এই গভীর সমুদ্র বন্দর। এই প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

চলতি বছরের মে মানে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, সিটিক কনসোর্টিয়ামে তিনটি বড় চীনা কোম্পানি ও থাইল্যান্ডের একটি কোম্পানি রয়েছে। এই বন্দরটির ৭০-৮৫ শতাংশ মালিকানা চেয়েছে সিটিক গ্রুপ। বাকি অংশের মালিকানা থাকবে মিয়ানমার সরকারের কাছে।

অঞ্চলটিতে একটি বন্দর রয়েছে। যদিও এটি মূলত দেশীয় পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এবং বন্দর আকারেও ছোট। বন্দরটি গভীর সমুদ্র বন্দর হিসেবে পুনর্নির্মিত হলে এর বার্ষিক ক্ষমতা দাঁড়াবে  ৭দশমিক ৮ মিলিয়ন টন কার্গো এবং ৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন টিইইউ।

এই বন্দরটি চীনের বেল্প অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সামুদ্রিক অবকাঠামোর জন্য কৌশলগভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, পাকিস্তানের গোয়াদর ও শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে।

বন্দরটি পশ্চিমা দেশ থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য চীনের  বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করবে। এখন চীনকে তেল আমদানি করতে হয় বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্র পথ মালাকা প্রণালী দিয়ে। বন্দরটি হলে এই প্রণালী এড়িয়ে যেতে পারবে চীন।

তেল-গ্যাসের পাইপলাইন

petroleum-gas line burma

থেলং মিয়ানমার-চীনা তেল ও গ্যাস পাইপ লাইন প্রকল্প বলে পরিচিত এই প্রকল্পটি ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলারে নির্মিত হচ্ছে।  রাখাইনের উপকূল থেকে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ুনান প্রদেশে পর্যন্ত ৭৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন। ২০১০ সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের এপ্রিলে তা চালু করা হয়।

পাইপলাইনটির ৫১ শতাংশ মালিকানা চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের এবং মিয়ানমারের অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের ৪৯ শতাংশ। এই পাইপলাইন দিয়ে ২২ মিলিয়ন টন তেল পরিবহন করা হবে। বর্তর্মানে ১৩ মিলিয়ন টন তেল পরিবহন করা হচ্ছে। এছাড়া ১২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার প্রাকৃতিক গ্যাসও বহন করা হবে এই পাইপ লাইন দিয়ে।

এসব তেল আমদানি করা হয় আরব দেশ থেকে। বঙ্গোপসাগর হয়ে জাহাজে এসব তেল-গ্যাস এসে পৌঁছায় কাইয়ুকফাইয়ুতে।

শিল্পাঞ্চল

রাখাইনে দ্বিতীয় বৃহত্তম যে উন্নয়ন প্রকল্প সিটিক কনসোর্টিয়াম দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে হচ্ছে শিল্পাঞ্চল। এটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ২.৩ বিলিয়ন ডলার। রয়টার্সের খবর অনুসারে, এই প্রকল্পের ৫১ শতাংশ মালিকানা সিটিক গ্রুপের। ২০১৬ সালের শুরুতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।

২০-৩০ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হতে পারে। ১০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে শিল্পাঞ্চলটি গঠিত হচ্ছে। প্রথম ধাপে কৃষি, ইকোট্যুরিজম এবং শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হবে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

Advertisements

ভারতে আইটি সেক্টরে ধস, বাংলাদেশে উল্টো চিত্র

submarine cable routing 1ফিরোজ মান্না ॥ ভারতের আইটি সেক্টরে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। যদিও দেশটির আইটি সেক্টরটি বিস্ময়করভাবে বিকশিত হলেও এখন আর সেই অবস্থা নেই। এমন অবস্থার জন্য অটোমেশন পদ্ধতি দায়ী। অটোমেশনের ফলে দেশটিতে আইটি সেক্টরের কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হচ্ছে। আর কিছু কাজ করা হচ্ছে রোবোটের মাধ্যমে। ফলে দেশটিতে নিম্ন ও মাঝারি পর্যায়ের আইটি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেশিরভাগ কোম্পানি ছাঁটাই করে দিচ্ছে। ভারতে আইটি সেক্টরটিতে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় ক্রমাগত নিম্ন দিকে চলে যাচ্ছে। অটোমেশন পদ্ধতি চালুর পর আইটি কোম্পানির মালিকরা এক দিকে যেমন কর্মী ছাঁটাই করছে, অন্যদিকে কর্মীদের বেতনও কমিয়ে দিয়েছে। ভারতের ফ্রন্ট লাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এসব কারণই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে সেক্টরটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। আইটি সেক্টরকে সরকারীভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে এখানে আইটি সেক্টরে ধস নামার আশঙ্কা এখনই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সরকার নিজেও আইটি সেক্টর নিয়ে আশাবাদী। এই সেক্টরের মাধ্যমে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বলে বলা হচ্ছে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের আগেই দেশ পুরোপুরি আইটিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।

সরকার ভিশন ’২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বছরে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের টার্গেট নিয়েছে। আর ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য সরকার ৭০ হাজার আইটি বিশেষজ্ঞ তৈরি করার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। আর এই ৭০ হাজার বিশেষজ্ঞ আরও ২০ লাখ আইটি শিল্পে দক্ষ জনবল গড়ে তুলবে। ২০ লাখ আইটি জনবল আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৫০ বিলিয়নের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে। এই আয় জাতীয় আয়ে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে বলে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে। ভারতের দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতায় আইটি সেক্টর শীর্ষস্থান দখল করে ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস মাত্র ৮ বছরের। এই ৮ বছরে বাংলাদেশ আইটি সেক্টরে বড় রকমের অগ্রগতি অর্জন করেছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আইটি সেক্টর দিন দিন উন্নত হচ্ছে। দেশে গড়ে উঠেছে কয়েক শ’ সফটওয়্যার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর বিদেশে সফটওয়্যার শিল্প থেকে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। এসব সফটওয়্যার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার সরাসরি সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই ভারতের মতো বাংলাদেশে আইটি শিল্পে ধস নামার আশঙ্কা অনেক কম।

ভারতের ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত ‘লুজিং স্টিম’ (বাষ্প হারাচ্ছে) শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) ভারতের আইটি সেক্টর থেকে আয় হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। তবে প্রতিবছরই এই আয় কমে আসছে। ২০১২-১৩ সালে এ খাত থেকে মোট বৈদেশিক রফতানির ২০ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থ আয় করলেও ২০১৪-১৫ সালে মাত্র ৭ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থ আয় করতে সক্ষম হয়। ক্রমাগত ভারতের আইটি সেক্টরে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এই সেক্টর এখন খাদের কিনারে এসেছে। আইটি শিল্প অনেকটাই অস্থিত্ব সঙ্কটে ভুগছে। ভারতের যেসব শহর তথ্যপ্রযুক্তির জন্য বিখ্যাত ছিল, ওসব শহরের আইটি প্রতিষ্ঠানে গত কয়েক মাসে বড় ধরনের ধস নেমেছে। মূলত ২০০১ সাল থেকেই ভারতের আইটি সেক্টরে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতে সস্তায় দক্ষ আইটি কর্মী পাওয়ার কারণেই দেশটির এই খাতে ধীরে ধীরে বিকাশ হয়েছে। আইটি খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও সরকারের বেড়েছে। এক সময় এই আদায় ডাবল ডিজিটেও পৌঁছায়। ভারতের আইটি খাতের বিশেষজ্ঞরা এক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেছেন। পরে দেশীয় আইটি খাত বিকাশে নিয়োজিত হয়েছেন। ফলশ্রুতিতে ভারতের আইটি খাতে কর্মীদের দক্ষতা এসেছে। এসব দক্ষকর্মী পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের আইটি খাত বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন।

ভারতে গত দুই দশক ধরে আইটি সেক্টরের বিকাশ হয়েছে। তবে ২০০১ সাল থেকে ২০০৮-০৯ পর্যন্ত এ খাতে বিকাশের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। বিশেষ করে চেন্নাই, হায়দরাবাদ, ব্যাঙ্গালুরু, পুনে ইত্যাদি শহরে এই সেক্টরের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। তবে এখন সেই বিকাশ অনেকটাই ভাটা পড়েছে। কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে দেশটিতে কর্মীরা চরম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ভারতের আইটি সমৃদ্ধ শহরগুলোতে সফটওয়্যার বিজ্ঞানীদের সংগঠনগুলো কর্মী ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে এই প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা কর্মী ছাঁটাইকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। তখন ইনফয়েস কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এন আর নারায়ণ মার্থি বিজ্ঞানীদের রহস্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, সফটওয়্যার শিল্পে যা ঘটেছে তা দুঃখজনক। কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীদের চাকরি ঠেকাতে পদক্ষে নেয়া উচিত ছিল। তিনি দাবি করেন, তার সহপ্রধান ২০০১ সালে নিম্ন বেতনের কর্মচারীদের চাকরি বাঁচিয়েছিলেন। বর্তমানে ভারতে সফটওয়্যার শিল্প অনেক ছোট হয়ে এসেছে। পাশাপাশি কর্মচারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। ভারতের চেন্নাই, হায়দারাবাদ, দিল্লী, ব্যাঙ্গালুরু ও পুনেতে আইটি সেক্টর থেকে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। এসব কোম্পানিগুলো থেকে ১০ থেকে ১৫ বছরের অভিজ্ঞ মাঝারি পর্যায়ের অনেক কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এ সব কর্মীর বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগ তুলে এদের ছাঁটাই করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। কোম্পানিগুলোর মালিকরা বলেছে, কর্মী ছাঁটাইয়ের কিছু কারণ হচ্ছে আইটি খাতে কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হচ্ছে। আবার কিছু কাজ হচ্ছে রোবোটের মাধ্যমে। ফলে অধীকসংখ্যক কর্মীর প্রয়োজন নেই বলে কিছু কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে।

বাংলাদেশে আইটি সেক্টরের বয়স খুব বেশি দিন আগের না। এরপরও তুলনা মূলকভাবে বাংলাদেশ আইটি সেক্টরে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। গত ৮ বছরের আইটি খাতে রফতানি হয়েছে ৭শ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৮ সাল নাগাদ আইসিটি সেক্টর থেকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি করা সম্ভব হবে। ২০২১ সাল নাগাদ রফতানি হবে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এজন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

ফ্রন্টলাইন বলছে, ভারতের অলাভজনক সংস্থা ন্যাশনাল এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এ্যান্ড সার্ভিস কোম্পানি (নাসকম) বলছে, আইটি শিল্প চলতি অর্থবছরে তুলনায় ২০১৮ অর্থবছরে ২০ থেকে ৩৮ শতাংশ কর্মসংস্থান কমে যাবে। আগামী অর্থবছরে এই খাতে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, যেখানে চলতি বছরে ১ দশমিক ৮ লাখ কর্মসংস্থান যোগ হয়েছিল। এই সেক্টরে এক বছরে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৪০ লাখ কর্মসংস্থানও যুক্ত হয়েছিল।

নাসকমের প্রেসিডেন্ট আর চন্দ্রশেখর বলেছেন, অটোমেশনের কারণেই এই খাতে চাকরি কমে যাচ্ছে। ভারতীয় আইটি শিল্প, অটোমেশন এবং ক্লায়েন্টের ডিজিটাল চাহিদার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এবং তারা অটোমেশন এবং খরচ কমানোর আশায় কর্মসংস্থান পুনর্গঠন করছে।

টিসিএস এবং ইনফোসিসে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে কর্মী সংখ্যা কমে যথাক্রমে ১৮০০ এবং ১৪১৪ হয়েছে। আর এই প্রতিষ্ঠান দুটি ভারতের এক-পঞ্চমাংশ সফটওয়্যার রফতানি করে যার মূল্য ১১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম সফটওয়্যার পরিষেবা রফতানিকারী প্রতিষ্ঠান উইপ্রোর প্রান্তিক হিসেবে ১৩০৯ জন বেড়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

নাসকম প্রধান আরও জানিয়েছেন, আইটি সেক্টরসহ প্রযুক্তির কারণে সব সেক্টরেই চাকরি কমে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে এবং একই ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আর এখন তাদের বেকারত্বের মাত্রা শূন্যের কাছাকাছি। এখানে (ভারতে) চাকরির ক্ষতি এবং কষ্ট থাকলেও শেষ পর্যন্ত এটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একমাত্র পথ বলে অভিমত প্রকাশ করেন চন্দ্রশেখর।

গত বছর ‘এইচএফএস রিসার্চ’ সংস্থা বস্টন, লন্ডন ও বেঙ্গালুরু থেকে এক যোগে ‘ফিউচার ওয়ার্কফোর্স ইমপ্যাক্ট মডেল’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যাতে তারা দেখিয়েছে যে পৃথিবীর আইটি ও বিজনেস সার্ভিস কোম্পানিগুলো আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অর্থাৎ বুদ্ধিমান যন্ত্রের সুবিধা নিয়ে তাদের ব্যবসা বাড়াতে পারছে কর্মীসংখ্যা কমিয়েই। এদের হিসেব অনুসারে ২০২১ সালের মধ্যে ভারতে সব চেয়ে ‘কম দক্ষতাসম্পন্ন’ কর্মীদের ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কর্মীর আর কোন জায়গা থাকবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই কাজের ক্ষেত্র সঙ্কোচনের অনুপাতটা হলো ৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার মানুষের জীবিকা। এই সব কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে, যন্ত্রের মাধ্যমে হবে, তার জন্য এত মানুষ লাগবে না। এর বিনিময়ে ভারত এই সময়ে ১ লাখ ৬০ হাজার চাকরির ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে (১৪ শতাংশ বৃদ্ধি) আর আমেরিকা হয়ত ১ লাখ ৭৩ হাজার (সাত শতাংশ বৃদ্ধি)। দেখাই যাচ্ছে, যত মানুষ কাজ হারাচ্ছে, তার চেয়ে কাজ পাচ্ছে অনেক কম মানুষ।

বাংলাদেশ সরকার ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের কাজ করে যাচ্ছে। ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন হলে আইটি সেক্টরে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ।

দেশের তরুণ-তরুণীরা আইটি সেক্টরে বড় অবদান রেখে যাচ্ছে। তারা নিজ উদ্যোগেই আউটসোর্সিং করে যাচ্ছে। এতে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে। বিষয়টি সরকারী পর্যায়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ নানা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে ৭০ হাজার আইটি বিশেষজ্ঞ তৈরি করার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। এই ৭০ হাজার বিশেষজ্ঞ ২০২১ সালের মধ্যে আইটি সেক্টরে ২০ লাখ দক্ষ জনবল তৈরি করবে। দক্ষ জনবল তৈরি হলে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে তখন বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক একটি অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আইসিটি সেক্টর থেকে আয় হবে। ভারত বিগত ৩০ বছরে আইটি শিল্প থেকে প্রায় দেড় শ’ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। আইটি সেক্টরের ইতিহাস মাত্র ৮ বছর আগের। সরকার বিভিন্নমুখী পরিকল্পনা,পলিসি প্রণয়ন এবং প্রকল্প গ্রহণের মধ্য দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা হচ্ছে। সারাদেশে ১ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪ কোটি ২৭ লাখ শিক্ষার্থীদের জন্য বিশাল পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সরকার সারা বাংলাদেশে সাড়ে ৫ হাজার কম্পিউটার ল্যাব, ২ হাজার ১টি শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করেছে। আগামী ৩ বছরে প্রাইমারি, হাইস্কুল ও কলেজ লেভেলে আরও ১৫ হাজার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। সরকার নানামুখী উদ্যোগের ফলে দেশ আইটি সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার আশা করছে আইটি সেক্টর দিন দিন উন্নত হচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশ আইটি সেক্টরে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।

কেরানীগঞ্জে জাহাজ তৈরীর কাজ হয় এখন

shipbuilding in keranigonj

কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ?

why nations fail -bookcoverচার বছর আগে বইটি প্রকাশের পরই বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। বইটির নাম কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ। ‘হোয়াই নেশনস ফেইল? দি অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রোসপারিটি অ্যান্ড প্রোভার্টি’। সেই পুরনো প্রশ্ন, মানুষ গরিব কেন? এটা তার নিয়তি নাকি অন্যকিছু? একই প্রশ্ন উঠেছে দেশ ও জাতির প্রশ্নে। কিছু দেশ ধনী, আর ধনী। তাদের টাকা-পয়সা, ধনদৌলত শুধু বাড়ে আর বাড়ে। আর কিছু দেশ দরিদ্রই থেকে যায়। তার উন্নয়নের নামে কত রাজনীতি হয়, কিন্তু গরিবেরা গরিবই থেকে যায়। এটা কেন? কী তার কারণ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন, বিশ্বখ্যাত দুই অর্থনীতিবিদ এসিমগলু এবং রবিনসন। তাদের নজর এড়ায়নি দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্যপীড়িত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো।

১৯৭২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কেনেথ জে এরো লিখেছেন, এসিমগলু এবং রবিনসন এই বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন যে, কেন একই রকম দেখতে রাষ্ট্রগুলো তাদের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক উন্নয়নে এতটা বেশি মতপার্থক্য দেখিয়ে থাকে। কোনো সমাজের উন্মুক্ততা এবং বিশেষ করে সৃজনশীল ধ্বংসযজ্ঞকে স্বাগত জানাতে উন্মুক্ত থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে এটা থাকে সেখানেই দেখা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সেখানে আইনের শাসন চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারক হিসেবে প্রতিয়মান হয়। যেখানে দুয়ার বন্ধ থাকে, সেখানে আইনের শাসন বাসা বাঁধে না। উন্নয়ন কিছু সময় একটা চাকচিক্য এনে দিতে পারে। কিন্তু তা টিকে থাকার গ্যারান্টি থাকে না। দুই লেখক ঐতিহাসিক পরম্পরার আলোকে এই সত্যের চেহারা উন্মোচন করেছেন। সব শুনে আপনাদের চোখ কপালে উঠবে। ভাবতে বসবেন, তাহলে আমরা যে একদিনের গণতন্ত্র উৎসব করি, তার কী মানে। এই চর্চাও তো নানা টানাপোড়েনের মধ্যে থাকে। তাহলে একজীবনে সুখের মুখ দেখার ভরসা কী?

১৯৯২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গেরি এস বেকার লিখেছেন, লেখকদ্বয় দেখিয়েছেন, যখন দেশসমূহ তাদের সঠিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ার আগ্রহ দেখায়, তখন সেসব দেশে দেখা যায়, তারা একটি উন্মুক্ত বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাদের সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক উচ্চপদে আসীনের একটা প্রতিযোগিতা থাকে। থাকে একটি ব্যাপকভিত্তিক নির্বাচকমন্ডলী বা ভোটার। তারা নবীন রাজনৈতিক নেতাদের গ্রহণে কোনো সংকোচ দেখায় না। বরং নতুন প্রজন্মকে স্বাগত জানাতে বরণ ডালা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণে। গুম করে না।

২০১০ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পিটার ডায়মন্ড লিখেছেন, একটা দেশের কখনো সমৃদ্ধি আসতে পারে না। কিন্তু যদি টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করা লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত দুটো শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, একটি অংশগ্রহণমূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যারা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেবে।

দি এসেন্ট অব মানি বইয়ের লেখক নেইল ফার্গুসন লিখেছেন, যারা মনে করেন কোনো জাতির অর্থনীতির ভাগ্য তার ভৌগোলিক অবস্থা কিংবা সংস্কৃতি দ্বারা নির্দিষ্ট হয়ে থাকে, তাদের জন্য খারাপ সংবাদ এনেছেন ড্যারন এসিমগলু এবং জিম রবিনসন। তারা দেখিয়েছেন, মানুষের তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলোই এসবের জন্য দায়ী। কোনো একটি দেশ দরিদ্র কি ধনী, তা তাদের ভূন্ডখগত অবস্থান কিংবা আমাদের পূর্ব-পুরুষদের ধর্ম বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না। দি এন্ড অব হিস্টরি অ্যান্ড লাস্ট ম্যান অ্যান্ড অরজিনস অব পলিটিক্যাল অর্ডারস বইয়ের লেখক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা লিখেছেন,‘কেন কিছু দেশ ধনী আর কিছু দরিদ্র। তা ভূগোল, রোগবালাই বা সংস্কৃতি নির্ধারণ করে না। এটা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্র ও তার রাজনীতি।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট বৃটেন ও জার্মানির মতো দেশগুলো কেন ধনীই থাকছে। আর কেন সাব সাহারান আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তাদের অবস্থার মধ্যে কেন এত তফাৎ? কেন একদিকের জনগণের বিপুল আয়। আর অন্যদিকের জনগণের নিম্ন আয়? জীবন মান এতটাই নিচু? এ বইটি তার উত্তর খুঁজেছে।

২০১২ সালে বইটি যখন প্রকাশিত হয়, মধ্যপ্রাচ্য তখন আরব বসন্তে কাঁপছে। যার সূচনা ঘটিয়েছিল তথাকথিত জেসমিন বিপ্লব। এই জেসমিন বিপ্লবের সূচনায় ছিলেন একজন হকার। তার নাম মো. বোয়াজ্জি। সময়টা ২০১০ সালের ১৭ই ডিসেম্বর। তিনি প্রকাশ্যে রাস্তায় নিজেকে বলি দিয়েছিলেন। ২০১১ সালের ১৪ই জানুয়ারির মধ্যে প্রেসিডেন্ট বেন আলী, যিনি ১৯৮৭ সাল থেকে তিউনিসিয়া শাসন করছিলেন, তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তিউনিসিয়ার অভিজাত শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক চিন্তা-চেতনা ও জনরোষ শক্তিশালী হচ্ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

মিশরে হোসনি মোবারক,যিনি প্রায় ৩০ বছর কঠোরভাবে দেশ চালিয়েছিলেন। ২০১১ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি তিনি উৎখাত হন। বাহরাইন, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের শাসকদের ভাগ্য অনিশ্চিত, যখন এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তখন বইটির ভূমিকা লেখা হয়েছিল। ভূমিকায় লেখা হয়েছে, এসব দেশের অসন্তোষের বীজ তাদের দারিদ্র্যে নিহিত। মিশরীয় জনগণের আয়ের পরিমাণ হলো সেই পরিমাণ, যা কি না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের গড় আয়ের মাত্র ১২ শতাংশ। মিশরের ২০ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যে জীবন-যাপন করছে। মার্কিন-মিশর আয়ের বৈষম্য আমরা দেখি যতটা বিরাট, ততটা কিন্তু অন্য অঞ্চলের দেশগুলোর আয়ের সঙ্গে যদি তুলনা করা হয়, তখন দেখব আরে এটা তো খুব বেশি কম নয়। এর থেকেও শোচনীয় অবস্থা আছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়া, সিয়েরা লিওন এবং জিম্বাবুয়ের পার্থক্য আসমান জমিনের। এসব দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা দারিদ্র্যসীমায় বাস করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় মিশর কেন এত বেশি দরিদ্র? কি ধরনের টানাপোড়েন মিশরীয় জনগণকে অধিকতর সম্পদশালী হতে নিরুৎসাহিত করেছে? নীল নদের দেশ মিশরের অতীত এত গৌরবউজ্জ্বল হলেও কেন তাদের কড়াই টগবগিয়ে ফুটছে?

রাজনৈতিক অধিকার হরণ ছিল সবার মূলে (পর্ব-২)

মিসরের দারিদ্র্য কি নির্মূলের অযোগ্য নাকি এটা দূর করা চলে? আমরা দেখব কি করে মিসরীয়রা নিজেদের সমস্যা নিয়ে ভাবছেন, কেন তারা হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন? কায়রোতে কর্মরত ২৪ বছর বয়সী হামেদ। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কর্মরত। এই ভদ্রমহিলা তাহিরির স্কোয়ারের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।

‘আমরা দুর্নীতি, নিপীড়ন এবং খারাপ শিক্ষার যাতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছিলাম। আমরা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি যা দুর্নীতিগ্রস্ত।’ তাহিরির স্মৃতিচারণ করলেন মোসাব আল শামি। ২০ বছর বয়সী এই যুবা ফার্মেসির ছাত্র। ‘আমি আশা করি বছর শেষে আমরা একটি নির্বাচিত সরকার পাব এবং তাতে সার্বজনীন স্বাধীনতার নীতির প্রতিফলন ঘটবে। আর আমরা দুর্নীতির পাঁক থেকে মুক্তি পাব।’

তাহিরির স্কোয়ারের বিক্ষোভকারীরা একটি কণ্ঠে বিক্ষোভ করেছিলেন। আর তা হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে। সরকার যে জনগণকে তাদের পাবলিক সার্ভিস দিতে পারছিল না তার বিরুদ্ধে, সরকার যে সবার জন্য সমান সুবিধা দিতে পারছিল না, তার বিরুদ্ধে। তারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে মুখ খুলেছিলেন। রাজনৈতিক অধিকার যে তাদের কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও তারা সোচ্চার হয়েছিলেন।

২০১১ সালের ১৩ই জানুয়ারি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিচালক আল বারাদি টুইটার বার্তায় লিখেছিলেন, ‘তিউনেসিয়া: নিপীড়ন+সামাজিক বিচারের অভাব=একটি টাইম বোমা। তিউনিসীয় ও মিসরীয় জনগণ দেখলেন তারা একটি সমস্যাকে অভিন্নভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। তারা চিহ্নিত করতে পেরেছেন তাদের জীবনে কিসের অভিশাপ নেমে এসেছে। কেন তাদের সব থেকেও সংকটের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে? আর সেই কারণটি তারা সমস্বরে বলেছেন,আমরা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছি। তার মৌলিক কারণ হলো সরকার আমাদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করেছে। এক পর্যায়ে দেখা গেল প্রতিবাদকারীরা পদ্ধতিগত ভাবে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছেন। ওয়ায়েল খলিলই হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি প্রথম বারো দফা দাবি পোস্ট করেছিলেন। খলিল একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্লগার। যারা ভাবেন, পরিবর্তনের জন্য ডাক দিতে হলে তাকে পেশাদার রাজনীতিক হতে হবে, তাদের চোখ খুলে দিয়েছেন খলিল। পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে হলে কোনো দলে আপনাকে অবশ্যই নাম লেখাতে হবে, বিশ্ব সেই সময় পার করে এসেছে। এখন ইন্টারনেটের যুগ। পল্টনের সমাবেশে বড় দলের মঞ্চে ভাষণ না দিলে আপনাকে কেউ চিনবে না, সেই যুগ বাসি হয়ে গেছে। এখন আছে সদা জাগ্রত ডিজিটাল মঞ্চ। খলিল কিন্তু ব্লগার হিসেবেই মিসরীয় গণআন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। এই আন্দোলনের সবটারই ধরন ছিল একান্তভাবে রাজনৈতিক। ন্যূনতম মজুরির মতো কিছু ক্রান্তিকালীন দাবি ছিল, কিন্তু তা পরে বাস্তবায়ন করা হবে সেটাই সবার কাছে পরিষ্কার ছিল।

মিসরীয়দের যা পিছিয়ে রেখেছিল, তার মূল ছিল একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অকার্যকর রাষ্ট্র। হোসনি মোবারকের দীর্ঘ শাসনে সেখানে এমন একটি সমাজ গড়ে উঠেছিল, যেখানে মানুষ তাদের মেধা, অভিলাষ, উদ্ভাবনপটুতা এবং যে শিক্ষা তাদের প্রাপ্য ছিল তাতে ঘাটতি ছিল। একই সঙ্গে তাদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল যে, তাদের সমস্যার মূলে রাজনীতি। সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, দৈনন্দিন জীবনে তারা যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন, তার মূলে ছিল একটি বিশেষ অস্বাভাবিক অবস্থা। যেখানে একটি ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠীর কাছে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল। তারা দোহাই দিচ্ছিলেন তথাকথিত স্থিতিশীলতার। তারা দোহাই দিচ্ছিলেন প্রলম্বিত শাসনের। উন্নয়ন ও স্থিতি দীর্ঘমেয়াদি চাও? তাহলে দীর্ঘমেয়াদি শাসন দাও। এই যে শাসকের মন্ত্র।

আর জনগণ তাই সহজেই শনাক্ত করতে পারেন যে,তাদের জীবনের নানা স্তরে জগদ্দল পাথরের মতো যা চেপে বসেছে তার মূলে রয়েছে রাজনীতি। আর তাই তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন। তারা সংকল্পবদ্ধ হলেন,এই ক্ষমতাপূজারী কোটারি গোষ্ঠীকে হটাতে হবে। এভাবে তারা ঐক্যবদ্ধ হলেন যে,পরিবর্তন আনতেই হবে।

শুধু এই একটিই হয়ে উঠেছিল জনগণমন্ত্র। এমনটা কিন্তু মোটেই নয় যে, তাহিরির স্কোয়ারে যারা জড়ো হতে শুরু করেছিলেন, তারা আগে থেকে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। তারা বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্দীপ্ত ছিলেন। তারা কমিউনিস্ট কি ইসলামি কোনো সংগঠিত দলের দ্বারা নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিত ছিলেন না। তাদের কোনো সংগঠনগত পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। সবটাই ছিল মন ও মননে। কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ, যা অনেকের কাছে কোনো পরিবর্তন আনার জন্য পূর্বশর্ত মনে হয়, কারো মনে হয়,পরিবর্তনের জন্য কোনো একটি দলের আদর্শ দরকার, একটি দলের পতাকা কিংবা কোনো অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দরকার, তা কিন্তু মোটেই নয়, যারা সেদিন জড়ো হয়েছিলেন তারা ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। তারা শুধু একটি বিষয় বুঝেছিলেন,পরিবর্তন একটা আনতে হবে। আর সেটা হলো রাজনৈতিক পরিবর্তন। এছাড়া তাদের মধ্যে অন্য কোনো ঐক্যসূত্র ছিল না। যখন জানতে চাওয়া হবে মিসর গরিব কেন, অন্যান্য জাতি এগিয়ে যায়,মিসর কেন থমকে থাকে, তখন কিন্তু এর উত্তরে কোনো একটি নির্দিষ্ট উত্তর মেলে না। অধিকাংশ শিক্ষাবিদ এবং ভাস্যকার ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়ে থাকেন। কিছু লোক গুরুত্ব আরোপ করেন যে, মিসরের দারিদ্র্য প্রধানত তার ভৌগোলিক অবস্থান দ্বারা মূল্যায়িত হওয়া দরকার। এর কারণ দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখন্ড মরুভূমি,বৃষ্টিপাতের দারুণ অভাব, খরা লেগেই থাকে। তার মাটি ও জলবায়ু উৎপাদনশীল কৃষিকাজের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। অন্য অনেকে আবার মিসরের সংস্কৃতিগত কারণসমূহকেও বাধা হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন সংস্কৃতিই তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্তরায়। অনেকের মতে মিসরের সংস্কৃতিগত ও কর্মগত নৈতিকতার মধ্যে আপনি এমন কিছু উপাদান দেখতে পাবেন, যা তাদের নিজেদের নয়, বরং অন্যদের সমৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করার কাজে লাগে। আবার অর্থনৈতিক ও নীতি প্রণয়ন বিষয়ক পন্ডিতদের মধ্যে এই ধারণাও প্রবল যে, মিসরের শাসকরা আসলে জানেন না যে দেশটিকে কোন পথে টেকসই উন্নয়নের পথে নিতে হবে? অতীতে তারা ভুল নীতির দ্বারা দেশকে পরিচালিত হতে দিয়েছেন। এই শাসকরা যদি সঠিক ও উপযুক্ত উপদেষ্টাদের দ্বারা সঠিক উপদেশ পেতেন, তাহলে তারা দেশকে সমৃদ্ধি দিতে পারতেন। এই পন্ডিতরা যুক্তি দিয়েছেন যে,এই শাসকদের তাঁবেদাররা দেশকে এমনভাবে চালিত করেছে,যেখানে গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য লাভ করেছে। একটি সেতু কি কালভার্ট তৈরি করা হবে,স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে ঠিকাদার বাছাই পর্যন্ত সবটাতেই বিবেচনা ছিল ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ। সমাজের বা বৃহত্তর জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এই গোষ্ঠীর কাছে সবসময় অগ্রাধিকার পেয়েছে সেই সব স্বার্থরক্ষা, অথচ তাদের কাছে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের বিষয় সর্বদা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।

উত্তরে আইনের শাসন, দক্ষিণে ঘাটে ঘাটে তেল (পর্ব-৩)

আমরা এ বইয়ে দেখব, মিশরের চেয়ে বৃটেন কেন ধনী? সেটা কি ১৬৮৮ সালের বিপ্লবের ফসল? কেউ বলবেন, বৃটেনে বিপ্লব হয়েছিল কিন্তু মিশরে হয়নি। বৃটেনের বিপ্লব হয়েছে বলে তার রাজনীতির রূপান্তরকরণ ঘটেছে এবং সে কারণে দেশের অর্থনীতি বদলে গেছে। মানুষ লড়াই করেছে। তারা তাদের রাজনৈতিক আদায় করে নিয়েছে। আর সেই আদায় করে নেয়া অধিকার দিয়ে তারা তাদের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত করেছে। আর তার ফল হিসেবে এমন একটি ভিন্নমাত্রার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ট্রাজেক্টরি তৈরি করেছে, যা বয়ে এনেছে শিল্প বিপ্লব।

বৃটেনে শিল্প বিপ্লব এবং তার উৎকর্ষ সাধনের সুফল বা তার কোনো রেশ মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়নি। কারণ তখন মিশর ছিল ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের অধীনে। আর সেই শাসকগোষ্ঠী যেভাবে মিশরকে শাসন করেছিল, ঠিক সেই একই উপায় পরবর্তীকালে মোবারকের পরিবার বেছে নিয়েছিল। মিশরে ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের উৎখাত করেছিলেন নেপোলিয়ান বোনাপার্ট। সেটা ১৭৯৮ সালের কথা। কিন্তু দেশটি তখন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের কবলে পড়ে। আর তারাও ওসমানিয়া সাম্রাজ্যর নীতি অনুসরণ করে। আর সেই নীতি হলো মিশরের জনগণের স্বার্থের প্রতি উদাসীন থাকা। যদিও মিশরের জনগণ পরবর্তীকালে ওসমানিয়া এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং ১৯৫২ সালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও মিশরের এই বিপ্লবকে ইংল্যান্ডের ১৬৮৮ সালের বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। বিপ্লবীরা মিশরের রাজনীতির মৌলিক রূপান্তরকরণের পথে হাঁটেনি। তারা আসলে এমন এক শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, যারা আগেকার অভিজাত গোষ্ঠীরই ধারক-বাহক। তাই তাদের সঙ্গে ওসমানিয়া ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরই তুলনা করা চলে। মিশরের সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষায় তাদের কোনো টান ছিল না। এর ফল দাঁড়াল এই যে সমাজের মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন এলো না এবং মিশর আগের মতোই গরিব থেকে যায়।

এই বইয়ে আমরা দেখব, কীভাবে এই প্যাটার্নগুলো সময়ের ধারায় নিজেদের জন্য ‘রিপ্রডিউস’ করে এবং কেন মাঝেমধ্যে তাতে একটা পরিবর্তন আসে। যেমনটা আমরা দেখেছি, ১৬৮৮ সালের ইংল্যান্ডে এবং ১৭৮৯ সালের ফ্রান্সে। এটা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে যে,মিশরের আজকের পরিস্থিতিতে যদি পরিবর্তন এসে থাকে, তাহলে যে বিপ্লব মোবারককে উৎখাত করেছে,তা দেশটির ভেতরে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এতটা শক্তিশালী করবে কি না;যা সাধারণ মিশরীয় নাগরিকদের জন্য সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। মিশর তার অতীত ইতিহাসে নানা ধরনের বিপ্লব দেখেছে। কিন্তু তা কোনো পরিবর্তন বয়ে আনেনি। কারণ, সেই সব বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারীরা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের হাত থেকেই, যারা তাদের হাত থেকে একদা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল। সুতরাং অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এই যে, তারা আসলে একই পথের পথিক। শুধু ক্ষমতার হাত বদলই ঘটেছে। ব্যবস্থার কোনো বদল হয়নি এবং যখনই হাত বদল হয়েছে, তখনই তারা পুনরায় আগের অবস্থা টিকিয়ে রেখেছে। অবশ্য এটা একটা সত্যি কঠিন বিষয় যে সাধারণ নাগরিকের পক্ষে প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করা। আর যেভাবে সমাজ চলে আসছে তাকে বদলে ফেলাও সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন। কিন্ত অসম্ভব নয়। এই বইয়ে আমরা সেটাই দেখব। সাধারণ জনগণের কাছে কীভাবে ক্ষমতা এসেছে। যেটা আমরা দেখেছি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে। আমরা দেখেছি জাপান, বোৎসোয়ানা ও ব্র্রাজিলে। মৌলিকভাবে একটি দরিদ্র সমাজকে ধনী সমাজে রূপান্তরিত হতে হলে তার একধরনের রাজনৈতিক রূপান্তর দরকার এবং কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, এমন ঘটনা মিশরেও ঘটতে পারে।

তাহিরির স্কয়ারের আরেক প্রতিবাদকারীর নাম হলো রেদা মেতওয়ালি। তার যুক্তি হলো, ‘আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন, মুসলিম এবং খ্রিস্টানরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আপনি দেখতে পাচ্ছেন, নবীন ও প্রবীণরা জোট বেঁধেছে। তারা সবাই একটা বিষয় (পরিবর্তন) চাইছে।’ আমরা দেখব, মিশরীয় সমাজে এ ধরনের একটি ব্যাপকভিত্তিক আন্দোলন, সেটা কিন্তু অন্যান্য দেশে সংঘটিত যে রাজনৈতিক রূপান্তরের কথা আমরা বলছি, সেখানেও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে ছিল। আমরা যদি বুঝতে পারি যে, একটি জাতির জীবনে কখন এবং কেন ওই ধরনের ক্রান্তিকাল সংঘটিত হয়, তাহলে আমরা এটা বুঝতে একটা ভাল অবস্থানে পৌঁছতে পারব যে, কখন আমরা আশা করব যে অতীতের মতোই এ ধরনের আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে এবং কখন আমরা আশা করতে পারি যে, তা সাফল্যের মুখ দেখবে এবং লাখ লাখ জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে।

১.কত ঘনিষ্ঠ যদিও তাতে কত পার্থক্য -রিওগ্রান্ডি উপত্যাকার অর্থনীতি

নোগালেস শহরটি কাঁটাতার দিয়ে বিভক্ত করা হয়েছে। শহরটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। আপনি যদি এর পাশে দাঁড়ান আর উত্তর দিকে নজর দেন, তাহলে নোগালেস আপনার চোখে পড়বে। এটি অ্যারিজোনার সান্তাক্রুজ কাউন্টিতে অবস্থিত। এই শহরের বাসিন্দাদের গড় বার্ষিক আয় প্রায় ৩০ হাজার ডলার। বেশির ভাগ টিনএজাররা স্কুলগামী এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের অধিকাংশ হাইস্কুল পেরোনো গ্র্যাজুয়েট। এসব সত্ত্বেও এখানকার মানুষেরা আক্ষেপ করে থাকেন যে, মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কতটা অপ্রতুল। শহরের মানুষেরা অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যবান। বিশ্বমানের তুলনায় তাদের গড় আয়ুষ্কাল বেশি। বাসিন্দাদের অনেকেরই বয়স ৬৫ বছরের বেশি এবং তাদের রয়েছে, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার। সরকারের দেয়া সুযোগ-সুবিধার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা অন্যতম। বিদ্যুৎ,টেলিফোন, পয়নিস্কাশন ব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য এবং তার সঙ্গে এমন একটি সড়ক ব্যবস্থা; যা তাদের আঞ্চলিক শহরগুলোকে তো বটেই বাদবাকি আমেরিকার সঙ্গেও যুক্ত করেছে। কোনো প্রকারের ভয়-ভীতি ছাড়াই অত্যন্ত নিরাপদে নোগালেসের জনগণ যেখানে খুশি সেখানে ভ্রমণ করতে পারেন। তারা সর্বদা চুরি-রাহাজানি বা ছিনতাইয়ের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকেন না। তারা একটুও উদ্বিগ্ন হন না এটা ভেবে যে,বাড়ি বা ব্যবসায়ে তাদের করা বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাঝে মধ্যে কিছু দুর্নীতি এবং অদক্ষতা সত্ত্বেও সরকারই তাদের জীবনে বড় ভরসা। সরকারই তাদের কাছে নির্ভরশীল এজেন্ট। তারা চাইলেই ভোট দিয়ে তাদের মেয়র, কংগ্রেসম্যান ও সিনেটরদের বদলাতে পারেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তারা ভোট দিয়ে এটা নিশ্চিত করতে পারেন যে, তাদের দেশকে কে নেতৃত্ব দেবে। গণতন্ত্র তাদের কাছে একটা সেকেন্ড ন্যাচার বা দ্বিতীয় প্রকৃতগত বিষয়।

ওপরে যে কাঁটাতারের কথা উল্লেখ করেছিলাম, তার পাশে দাঁড়িয়ে এবার নজর দিন দক্ষিণে। এবারে কিন্তু একটা ভিন্নতা চোখে পড়বে। নোগালেস শহরটির দক্ষিণ প্রান্ত মেক্সিকোর মধ্যে পড়েছে। সুতরাং নোগালেস যুক্তরাষ্ট্রের এরিজনার অঙ্গরাজ্যের শহর, আবার নোগালেস মেক্সিকোর সনোরা প্রদেশের শহর। এখন দুটি দেশ হওয়ার কারণে দুই শহরের মানুষেরা এত কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও তাদের আয়ে কিন্তু বৈষম্য ঘটেছে এবং সেটা ব্যাপক। মেক্সিকোর অংশের শহরের মানুষের আয় যুক্তরাষ্ট্রের অংশের শহরের মানুষের আয়ের থেকে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। তাদের বেশির ভাগ বয়স্ক মানুষের হাইস্কুল ডিগ্রি নেই এবং বহু শিশু-কিশোর স্কুলে যায় না। মায়েরা শিশুর মৃত্যুর উচ্চহারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। আর তাদের দুর্দশাগ্রস্ত জনস্বাস্থ্যর ব্যবস্থার অর্থই হলো, এটা জেনে কারও বিস্মিত না হওয়া যে, নোগালেসের বাসিন্দাদের আয়ুষ্কাল তাদের উত্তরের প্রতিবেশীদের চেয়ে অনেক কম। বহু ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। কাঁটাতারের দক্ষিণের রাস্তার পরিস্থিতি করুণ,আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই বাজে, অপরাধের হার বেশি এবং দোকানপাট খোলা একটি ঝুঁকিপূর্ণ তৎপরতা এবং সেটা আপনার দোকানে কোনো ডাকাতি হবে শুধু এ ভেবে নয়, একটি দোকান খোলার জন্য আপনাকে অনুমতি জোগাড় করতে হলে ঘাটে ঘাটে ‘তেল’ দিতে হবে। সনোরার নোগালেস শহরের বাসিন্দারা তাই রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি এবং অপুটতা নিয়েই কায়ক্লেশে জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

যদিও তাঁদের রক্তের উত্তরাধিকার অভিন্ন (পর্ব-৪)

why nations fail2 -bookcover

তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, অ্যারিজোনার নোগালেসের বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষরা কারা ছিলেন, তারা কোথা থেকে এসেছেন, সেদিকে নজর দেবো? ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের নাতি-নাতনি হওয়ার কারণেও কি তারা একটি উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পেরেছে। আর দক্ষিণের বাসিন্দারা কি অ্যাজটেক্সদের উত্তরসূরি? সেটা কিন্তু মোটেই নয়। বরং সত্য এটাই সীমান্তের উভয় পাশের বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষরা একই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। ১৮২১ সালে স্পেন থেকে মেক্সিকো স্বাধীনতা লাভ করে। মেক্সিকোর একটি এলাকার নাম ‘স্টেট অব ভেজা ক্যালিফোর্নিয়া’। ‘লজ ডোজ নোগালেস’ এই প্রশাসনিক এলাকারই একটি অংশ। ১৮৪৬-৪৮ সালে মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধের পরেও তার প্রশাসনিক মর্যাদার কোনো হেরফের ঘটেনি। তবে ১৮৫৩ সালে গ্যাডসডেন ক্রয়ের পরে এই এলাকায় মার্কিন সীমান্তের বিস্তৃতি ঘটে। লেফটেন্যান্ট এন. মিখলার এখানকার সীমান্ত অঞ্চলের জরিপ করেছিলেন। তিনি তার রিপোর্টে ‘লজ নোগালেসের অনিন্দ্য সুন্দর উপত্যকা’ সম্পর্কে একটি বর্ণনা দেন। আর সেই থেকেই সীমান্তের দুই পাশে দুটি শহর বেড়ে উঠতে শুরু করে। দুই শহরের মানুষের পূর্বপুরুষরা একই রক্তের উত্তরাধিকার বহন করেছে। তাদের খাবার অভিন্ন এবং এটা বলা আমাদের জন্য ঝামেলাপূর্ণ, কিন্তু তবুও বলব, উভয় শহরের ‘সংস্কৃতি’ অভিন্ন।

কিন্তু দুই শহরের মধ্যে আসল পার্থক্যটা কোথায়, তার একটি সহজ ব্যাখ্যা নিশ্চয় আছে। আর সেটা যে আপনি অনুধাবন করতে পারছেন, সেই বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। আর সেটি হলো সীমান্ত। একটি সীমান্তরেখাই দুই শহরকে আলাদা করেছে সব দিক থেকে। অ্যারিজোনা অংশের মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোয়। আমেরিকার মাটিতে থেকে তাদের প্রত্যেকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী পেশা বেছে নিতে পারেন। তারা স্কুলে যেতে পারেন। বাড়াতে পারেন কর্মদক্ষতা এবং তারা তাদের চাকুরেদাতাদের উৎসাহ যোগাতে পারেন, যাতে তারা প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন। কারণ, তারা জানেন প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ঘটলে তাদের বেতন স্ফীত হবে। একইসঙ্গে তারা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন। এর ফলে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে পারেন। তারা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি বসাতে পারেন। আবার অসদাচারণ করলে তারা ভোট দিয়ে তাদের সরাতেও পারেন। এর ফলে রাজনীতিকরা নাগরিকদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে সদা জাগ্রত থাকেন। ভোটাররা যাতে বেজার না হন, সেজন্য তারা সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলেন। জনস্বাস্থ্য থেকে সড়ক এবং সড়ক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পর্যন্ত সবটাই তাদের খেয়ালে রাখতে হয়। মানুষ কী ভাবছে, সেদিকে তাদের নজরদারি না থাকলে তারা তাদের গদির টলানি টের পান।

কিন্তু সনোরার নোগালেসবাসীরা ততটা ভাগ্যবান নন। তারা একটি ভিন্ন জগতে বাস করেন। তাদের সেই জগত গড়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সেকারণে দুই শহরের মানুষেরা ভিন্ন ভিন্ন প্রণোদনা লাভ করেন তাদের চারপাশের চেনা জগত থেকে। উত্তরের ব্যবসায়ীরা যতটাই উদ্যমী, দক্ষিণের ব্যবসায়ীরা ততটাই হতোদ্যম। সুতরাং তারা মানুষ হিসেবে একই রক্ত-মাংসের হলেও তাদের চেনাজগত তাদের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে, তারাও সেভাবে নিজেদের পরিচালিত করেন। আর সেকারণেই উত্তরের অর্থনীতি একরকম, দক্ষিণের অর্থনীতি আরেকভাবে গড়ে উঠেছে।

প্রশ্ন হল কী কারণে আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে ব্যবসাবান্ধব হতে পারল, আর মেক্সিকো তথা গোটা দক্ষিণ আমেরিকায় সেটা হতে পারল না। এর উত্তর ঔপনিবেশিক আমলের গোড়ায় দুই সমাজ কীভাবে গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে নিহীত। সেই সময়ে একটি প্রতিষ্ঠানগত বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব আজ পর্যন্ত চলমান রয়েছে। এই যে বৈচিত্র্য সেটা বুঝতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই উত্তর ও লাতিন আমেরিকায় কী করে উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল সেদিকে নজর দিতে হবে।

বুয়েন্স আয়ার্সের প্রতিষ্ঠা

জুয়ান দিয়াজ দ্য সেলিস পাল তুলেছিলেন ১৫১৬ সালের গোড়াতে। তিনি একজন স্পেনীয় নাবিক। তাঁর পূর্বমুখী যাত্রায় তিনি (সেলিস) স্পেনের জন্য যে ভূখন্ডের সন্ধান পেয়েছিলেন, সেখানে তিনি নদীর নামকরণ করেছিলেন ‘রিভার অব সিলভার’। আদিতে এর নাম ছিল রিও দি লা প্লাতা। সিলভার নাম দিয়েছিলেন তার কারণ হলো স্থানীয় বাসিন্দরা নদী থেকে সিলভার কুড়াতেন। এসময় তিনি এর দুই পাশে যে আদিবাসীদের দেখা পেয়েছিলেন, তাদের ভূখন্ড ছিল আজকের উরুগুয়ে এবং আধুনিক আর্জেন্টিনার পম্পাস অঞ্চল। উভয় স্থানে নবাগতদের জন্য অপেক্ষা করেছিল বৈরিতা। এসব অঞ্চলের স্থানীয়রা ছিলেন শিকারি, যারা ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে বাস করতেন। তারা কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অধীনে ছিলেন না। সোলিস তাঁর স্বদেশ স্পেনের জন্য নতুন ভূখন্ড অধিগ্রহণে উদ্যোগী হলে উরুগুয়ের একদল মানুষ তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল।

১৫৩৪ সালে স্পেনীয়রা ওই ভূখন্ড অধিগ্রহণে পুনরায় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা সহজে হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। পেদ্রো দ্য মেনদোজার নেতৃত্বে স্পেন একদল বসতিস্থাপনকারীকে সেখানে প্রেরণ করে। তারা একই বছরে বুয়েন্স আয়ার্সের দিকে একটি শহর গড়ে তোলে। সেটা ইউরোপীয়দের জন্য একটি আদর্শ স্থান হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। বুয়েনস এয়ারসের আক্ষরিক অর্থ হলো সুবাতাস। শহরটির জলবায়ু ও তাপমাত্রা বসবাসের জন্য অনুকূল ছিল। তবে সেই সময়ে যেসব স্পেনীয় সেখানে গিয়েছিলেন, তারা বেশি দিন টেকেননি। তার কারণ তারা উত্তম আবহাওয়ার পরশ পেতে নয়, তারা গিয়েছিলেন সম্পদ আহরণের উদ্দেশ্যে। তারা জবরদস্তি শ্রমসুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালায়। উরুগুয়ের মানুষেরা তাদের একদম সুনজরে দেখেনি। কুয়েরান্ডির লোকেরাও নয়। উভয় এলাকার মানুষ স্পেনীয়দের খাবার ও অন্যান্য রসদ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি তারা ধরা পড়ার পরেও শ্রম বিকোতে রাজি ছিল না। তারা তাদের তীর-ধনুক দিয়ে নবাগতদের ওপর আক্রমণ চালায়। স্পেনীয়রা দ্রুত খাদ্যাভাবে পড়ল। তারা ভাবতেই পারেনি যে, এমন অবস্থায় তাদের পড়তে হবে। তারা যে স্বপ্ন নিয়ে বুয়েন্স আয়ার্সে এসেছিলেন, তারা দেখলেন, সেই স্বপ্নের শহর এটা নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জবরদস্তি শ্রমে ভেড়ানো যাবে না। আবার ওই এলাকায় রৌপ্য বা স্বর্ণ কোনোটিই আহরণ করার নেই। আর তাদের নাবিক সোলিস যে রৌপ্যের সন্ধান পেয়েছিলেন, তা দেখা গেল সেটা ওই এলাকার  নয়, বরং তার উৎস হলো আরো পশ্চিমে আন্দিজের ইঙ্কা রাজ্যে অবস্থিত।

স্পেনীয়রা তখন নতুন পথের সন্ধান শুরু করে। তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম চালানোর পাশাপাশি তারা নতুন নতুন সমুদ্র অভিযানে বের হয়। এর লক্ষ্য নতুন জায়গা খুঁজে বের করা, যেখানে অনাবিষ্কৃত সম্পদ রয়েছে। রয়েছে সস্তা শ্রম। ১৫৩৭ সালে এরকম একটি অভিযাত্রার নেতৃত্ব দেন জুয়ান দ্য আয়োলাস। তিনি ইনকা যাওয়ার পথে পারানা নদী খুঁজে পেয়েছিলেন। এই যাত্রায় তিনি গুরানি নামীয় এক গোত্রের সন্ধান পান, যারা একটি কৃষি অর্থনীতি তৈরি করেছিল। এর ভিত্তি ছিল যব এবং কাসাভা (গ্রীষ্মমন্ডলীয় উদ্ভিদ)। মি. আয়রাস দ্রুত বুঝতে পারলেন যে, উরুগুয়ে ও কুয়েরেন্দির চেয়ে এই জনগোষ্ঠী একেবারেই আলাদা। তাই তারা তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন এবং তাদের সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত লড়াই শেষে সেখানে একটি নগর প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। আর সেই নগরটিই হল আজকের প্যারাগুয়ের রাজধানী। (চলবে)

প্রসঙ্গঃ কর্পোরেট কালচার

জহিরুল মোঃ ইমরুল কায়েস : বেসরকারী কোম্পানী পরিবেশে ‘কর্পোরেট কালচার’ একটি জনপ্রিয় টার্ম। কোন বেসরকারী কোম্পানীতে কর্পোরেট কালচার আছে কী – নেই তার সুস্পষ্ট মানদন্ডের বিধান না থাকলেও শুধু ইশারা আঙ্গিকে এক চাকুরীজীবী আরেক চাকুরীজীবীকে বুঝাতে চান তাঁদের নিজ নিজ কোম্পানীর কর্পোরেট কালচারের বর্তমান অবস্থা বা তার আনুসঙ্গিক বাতাবরণের নমুনা। যে কোন কোম্পানীর কর্পোরেট কালচার ইতিবাচক হলে সে কোম্পানীর ব্যবসায়িক সুনাম দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর তরতর করে কোম্পানীর ডালাপালাও মেলে। কোম্পানীর পুঁজি ও পরিশোধিত মূলধন যত জাঁকালো হোক না কোন সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর কাজের যথাযথ পরিবেশ না থাকলে সে কোম্পানী বেশী দূর এগোতে পারে না। কালের পরিক্রমায় সে কোম্পানী হোঁচট খাবেই খাবে। আর, একটি ছোট বা মাঝারী মাপের কোম্পানীতে কাজের পর্যাপ্ত পরিবেশ থাকলে কোম্পানীর কর্মচারীরাই অনুবন্ধী কোম্পানীর দ্রুত উন্নয়নে নিজেকে সঁপে দিবে। আর সে ছোট কোম্পানীগুলো বড় মাপের হতে চাইলে বাধারও সম্মুখীন হয় না। অর্থাৎ একটি কোম্পানীর উন্নতি অবনতি হওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানীর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বা আধুনিক পরিভাষায় ‘কর্পোরেট কালচার’ বিরাট ভূমিকা পালন করে। আসুন, একটু জেনে নেওয়া যাক কর্পোরেট কালচার আসলে কী এবং কেন?

১৯৬০ এর দশকে প্রাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান অনুসন্ধান মূলক কাজে সহায়তার জন্য নানাবিধ সংস্থার জন্ম হয়। ব্যবসার মধ্যে পেশাদারিত্বমূলক সাংস্কৃতিক সচেতনতা বাড়ানোই ছিল মূলত এ সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য। কালক্রমে ১৯৮০ দশকের শুরুতে ‘কর্পোরেট কালচার’ শব্দটি আত্মপ্রকাশ করে। আর ৯০ এ দশকে এসে কর্পোরেট কালচারটি পশ্চিমা বিভিন্ন বেসরকারী কোম্পানীর কর্মপরিবেশে পরিচিতি লাভ করে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। নব্বই দশকের মাঝামাঝি আমাদের দেশেও ’কর্পোরেট কালচার’ শব্দটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে কর্পোরেট সেক্টরে স্থান করে নেয়। কোম্পানীর প্রকৃত চরিত্র বুঝানোর জন্য এবং তা সবার নিকট বোধগম্য করার জন্য কোম্পানীর পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সমাজতত্ত্ববিদ ও শিক্ষাবিদ দ্বারা এই ’কর্পোরেট কালচার’ শব্দটি বহুলভাবে ব্যবহৃত ও প্রচারিত হয়।

প্রথম থেকেই ’কর্পোরেট কালচার’ শুধুমাত্র সচরাচর সাধারণ বিশ্বাস বা আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কোম্পানীর ভিত্তি, পণ্যের মানদন্ডের পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা কৌশল, কর্মচারীদের যোগাযোগের ক্ষেত্র বা পরিবেশ, মালিক-কর্মচারী সম্পর্ক, কাজের পরিবেশ, কোম্পানীর মনোভাব,কোম্পানীর দৃষ্টিলব্ধ লোগো বা চিহ্ন, কোম্পানীর ট্রেডমার্ক, মিশন স্টেটম্যান, কোম্পানীর নীতিমালা, কর্মীদের জন্য প্রণোদনা ও পুরস্কার, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন, কর্মচারীদের টিমবিল্ডিং গঠনে সহায়তা প্রদান, এমনকি কোম্পানীর সিইও’র সামগ্রিক আচরণ বিধিও কর্পোরেট কালচারের অর্ন্তভূক্ত হয়। আর,২০১৭ সালে এসে কর্পোরেট কালচার শুধূমাত্র কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা, ব্যবস্থাপনা পরিচালনা পর্ষদ বা কোম্পানীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি। মূলত এখন কর্পোরেট কালচার বলতে জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব, আর্ন্তজাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, কোম্পানীর আকার বা পণ্যের গতি-প্রকৃতিসহ ইত্যাদিকে বুঝায়।

কর্পোরেট কালচার হলো,কোম্পানীর কর্মচারী এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এমন নৈতিক আচরণ ও বিশ্বাসকে বোঝায় যে আচরণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর ব্যবসায়িক লেনদেন ও যোগাযোগ পরিচালিত হয়। কর্পোরেট কালচার আসলে পুরোপুরি সজ্ঞায়িত কোন বিষয় নয়, সে হিসেবে এটি এমনই হতে হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কর্পোরেট কালচার বলতে এমন এক সংস্কৃতিকে বুঝায় যে পরিবেশের মাধ্যমে কোম্পানী এমন লোকদেরকে নিয়োগ দেয় যাঁদের সংমিশ্রীয় বৈশিষ্ট্যগুলো সময়ের সাথে সাথে সাংগঠনিকভাবে কোম্পানীর কল্যাণার্থে বিকশিত হয়।

মূলতঃ কর্পোরেট কালচার হল “একটি কোম্পানীর ব্যাপক মূল্যবোধ,বিশ্বাস ও মনোভাবের প্রতিফলন। যে অনুচিন্তার মাধ্যমে কোম্পানীর বৈশিষ্ট্যকে চরিত্রাঙ্কণ করে আর সেভাবে চর্চার নির্দেশনা দেয়।” এ সংমিশ্রীয় এবং সমন্বিত বৈশিষ্ট্যগুলিই একটি ফার্ম বা কোম্পানীর কর্পোরেট কালচারে পরিণত হয়। অনেক কোম্পানীতে কর্পোরেট কালচার বলতে ড্রেস কোড, দৈনন্দিন কর্মঘন্টা, কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা, কর্মী নিয়োগ পদ্ধতি, বার্ষিক টার্নওভার, অফিস সেটআপ, মক্কেলগণের সন্তুষ্টি, অপারেশনসহ নানান দিক বিবেচিত হয়।

কর্পোরেট কালচারের জন্য গুগল বেশ সুপরিচিত। গুগল কর্মচারীদের জন্য টেলিকমিউটিং (বাসা বা যেকোন জায়গা থেকে কাজ করার সুবিধা),ফ্লেক্স টাইম (নিজের মতো করে কর্মঘন্টা ঠিক করে কাজ করা), পরিবারের সদস্যদের টিউশন ফি পরিশোধ, কর্মচারীদের জন্য বিনামূল্যে লাঞ্চ, অন সাইট ডাক্তারের ব্যবস্থা, কর্মচারীদের জন্য মটর ওয়েল ও গাড়ীর ফিটনেস সুবিধা প্রদান, ম্যাসাজ ও হেয়ার স্টাইল সুবিধাসহ ন্যূনতম ১০০টি সেবা প্রদান করে। কর্পোরেট কালচারের জন্য টুইটার, এডেলম্যান, ফেসবুক, সাউথ্ওয়েষ্ট এয়ারলাইন্স, সেভরণ, এ্যাপেল কিংবা নাইকির মতো বড় বড় কোম্পানীগুলোর নাম একদম প্রথম দিকে। ফোর্বসের অনুসন্ধানকারীরা উপরোক্ত কোম্পানীগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও পর্যালোচনা সাপেক্ষে কর্পোরেট কালচারের এ তালিকা বিন্যস্ত করেছেন। কর্পোরেট কালচারের জন্য উপরোক্ত নামগুলি যেমনি বিখ্যাত তেমনিভাবে খারাপ দাপ্তরিক পরিবেশের জন্য ওয়াশিংটনের সিয়াটলে প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনের খ্যাতিও বিশ্বব্যাপী।

আমাজনের নিজস্ব কাজের পরিবেশ খুব অগোছালো। যেমন তারা ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইটের (৩৮ ডিগ্রী সে.) মধ্যে কর্মচারীদের কাজ করান, মালামার চুরি হওয়ার ভয়ে ওয়্যারহাউজের দরজা গুলো বন্ধ করে রাখেন। আলো বাতাসহীন এ অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে কাজ করতে গিয়ে আমাজনের কর্মচারীরা প্রায় সময়ই পানিশূন্যতা ও অবসন্নতা রোগে ভোগেন। কিছু কিছু ওয়ার্কারদেরকে তারা ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ডেলিভারী পণ্যের ট্রলি সমেত ক্লায়েন্টদের নিকট পাঠান,সময়মত পণ্য ডেলিভারী করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে তারা লাঞ্ছিত ও ভর্ৎসনা করতে পিছপা হন না। এছাড়া সহযোগিদের মধ্যে অকল্যাণকর কাজের প্রতিযোগিতা সৃষ্টিকরণ, ব্যবস্থাপনায় অস্বাভাবিকতা, অবসর সময় কিংবা মধ্যরাত্রেও কর্মবন্টন, উদ্দীপনামূলক কর্ম পরিকল্পনার পরিবর্তে সমালোচনা মূখর কর্পোরেট কালচার এ কোম্পানীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আরো অনেক অনেক বদ কালচার আছে বিশ্বখ্যাত এ জায়ান্ট ই-কমার্স কোম্পানীটির। সেজন্য উক্ত কোম্পানীতে যারা অতীতে কাজ করেছিলেন এবং বর্তমানেও যারা কাজ করেন প্রায় কর্মচারীই আমাজনকে তাঁদের নিজের কোম্পানী বলে মনে করেন না। প্রভুত্ববাদী আচরণের জন্য আমাজনের খ্যাতি এখন বিশ্বজোড়া। কর্মচারীদের প্রতি এহেন আচরণ আমাজনকে সাফল্য বা ব্যর্থতার কোন পথে নিয়ে যায় তা সময়েই বলে দিবে। এজন্য কর্মচারীরা সুযোগ পেলেই এ কোম্পানী ত্যাগ করেন।

সুতরাং আপনি যদি আপনার কর্মীদের অনুপ্রাণিত ও সেবা প্রদান করতে চান তাহলে আপনার কর্মক্ষেত্রের কর্পোরেট কালচার সমৃদ্ধি করুন। কর্পোরেট কালচারের সমৃদ্ধি ঘটলে কর্মচারীদের মনে অধিকার জন্মায়। যে অধিকারের বলে কোম্পানীর প্রতি তাদের আনুগত্য বৃদ্ধি পায় এবং কোম্পানী পরিবর্তনের মানসিকতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্রাস পায়।

উপসাগরীয় যুদ্ধ ব্রিটিশ অস্ত্র বিক্রির ‘অনুপম সুযোগ’

UK arms sales to saudi 2গোপন নথিতে তথ্য : ব্রিটেনের তাজা গোলাবারুদের পাল্লার প্রদর্শনী ও সত্যিকার পরীক্ষার সুযোগ ছিল ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ * সেই যুদ্ধকে যুক্তরাজ্য মৃত্যু ও ধ্বংসের মধ্যে লাভের সুযোগ হিসেবে দেখেছে ।

কুয়েতে ১৯৯০ সালে ইরাকি অভিযানকে উপসাগরীয় দেশগুলোয় অস্ত্র বিক্রির ‘অুনপম সুযোগ’ হিসেবে দেখেছিল ব্রিটিশ সরকার। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সরকারের কিছু গোপন নথি জনসম্মুখে আসার পর এ কথা জানা গেছে। যুক্তরাজ্য সরকারের আর্কাইভ (ন্যাশনাল আর্কাইভস) থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত নথির বরাতে দ্য গার্ডিয়ান এ খবর দিয়েছে।

ন্যাশনাল আর্কাইভের জনসম্মুখে আসা নথিগুলোয় দেখা যায়, ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের দামামা বেধে উঠলে ব্রিটেনের মন্ত্রী আর সরকারি কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় ব্রিটেনের অস্ত্রের বাজার বৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। তারা চেয়েছিল, এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ যেন ব্রিটিশ অস্ত্র প্রস্তুতকারকরা নিতে পারে।

ওই নথিতে সেই সময়ের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচারকে দেয়া প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রী অ্যালান ক্লার্কের গোপন ব্রিফিং রয়েছে। যুদ্ধের প্রাক্কালে উপসাগরীয় দেশগুলো সফর করে এসে সেই ব্রিফিং করেছিলেন তিনি।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের ওইসব প্রচেষ্টার কারণে লাভই হয়েছিল ব্রিটেনের। ওই যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্ত্র বিক্রির বিরাট সুযোগ পেয়ে যায়, যা আজ অবধি বহাল আছে।

UK judiciary OKays arms sale to Saudisব্রিটিশ সরকারের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে দেশটি ৬০০ কোটি পাউন্ডের অস্ত্র বিক্রি করেছে, যা বিশ্বের মোট অস্ত্র ব্যবসার ৯ ভাগ। ব্রিটেনের অর্ধেক অস্ত্রই রফতানি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। ব্রিটেন এখন আমেরিকার পরই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র বিক্রেতা।

১৯৯০ সালের ১৯ আগস্ট ‘সিক্রেট’ নামে লেখা একটি চিঠি জমা দিয়েছিলেন ক্লার্ক। ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী কুয়েতে আক্রমণ করার কয়েক দিন পর মার্গারেট থেচারের কাছে ওই ব্যক্তিগত চিঠিটি জমা দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে ক্লার্ক লিখেছেন, এ যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের কাছ থেকে যে প্রতিক্রিয়া আসবে, তা ডিফেন্স এক্সপোর্ট সার্ভিসেস অর্গানাইজেশনের (এখন ড্রিইএসও নামে পরিচিত) জন্য ‘অনুপম সুযোগ’ তৈরি করবে। ক্লার্ক লিখেছিলেন,‘আমরা সেনা মোতায়েনের যে ধরনের সিদ্ধান্তই নিই না কেন, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এটা ডিইএসওর জন্য অনুপম সুযোগ- তাজা গোলাবারুদের পাল্লার প্রদর্শনী ও সত্যিকার পরীক্ষারও (সুযোগ)।’

সংকটের শুরুতেই কী ধরনের অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি হতে পারে, তার একটি তালিকাও যোগ করেন ক্লার্ক। তিনি লিখেছেন, আমাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করলে এসব অস্ত্রের বিক্রি বাড়বে।’

অন্য নথিগুলোয় দেখা গেছে, সে সময়কার কাতারের আমির ও বাহরাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে অস্ত্র রফতানি বৃদ্ধি নিয়ে আলাপ করেছিলেন ক্লার্ক। পরে আরও কিছু ব্রিফিংয়ে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত,সৌদি আরব, মিসর এবং জর্ডানকে সম্ভাব্য ব্রিটিশ অস্ত্রের ক্রেতা হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন। ক্যাম্পেইন এগেইন্সট আর্মস ট্রেডের গবেষক জো লো বলেছেন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি রফতানির জন্য এখনও এ দেশগুলোকে টার্গেট করে থাকে যুক্তরাজ্য। তিনি বলেন, সময়টা হয়তো বদলে গেছে; কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি আজও একই রয়ে গেছে। ফাঁস তথ্য বলে দিচ্ছে, প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধকে যুক্তরাজ্য আসন্ন মানবিক বিপর্যয় হিসেবে না দেখে মৃত্যু ও ধ্বংসের মধ্যে অস্ত্র কোম্পানিগুলোর লাভের সুযোগ হিসেবে দেখেছে।

সে বছর ৭ আগস্টের এক গোপনীয় নথিতে দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এ সময় তারা সম্ভাব্য যেসব অস্ত্র বিক্রি আদেশ পাবেন বলে জানান সেগুলো হল- আবুধাবির কাছ থেকে ৩৬টি ওয়েস্টল্যান্ড ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার, যার অর্থমূল্য ৩২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। ওমান ওয়ারিয়র ডেজার্ট ফাইটিং যানবাহন কিনতে পারে, যার মূল্য সাড়ে পাঁচ কোটি পাউন্ড এবং চ্যালেঞ্জার টু ট্যাংকেরও আদেশও দেবে বলে আশা করা হয়।

protesting arms sale to saudisবাহরাইন ব্রিটেনের কাছ থেকে হক জঙ্গিবিমান কিনতে পারে। সৌদি আরব ২০ কোটি পাউন্ডে সাতটি হোভারক্রাফট কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে। ক্লার্ক জানান, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের আগেই গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় অস্ত্র বিক্রির একটি ভালো বিপণন কৌশল হতে পারে। এসব তথ্য ভাগাভাগি করতে প্রতি সপ্তাহে একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে উপসাগরীয় দেশগুলোয় পাঠানোর সুপারিশ করেন ক্লার্ক। তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজাদের দ্রুত অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়ার কথাও লিখেছেন নথিতে। ক্লার্ক বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে বোঝাতে হবে, তারা ফ্রান্সের চেয়ে দ্রুত অস্ত্র সরবরাহ করতে সক্ষম। অস্ত্র বিক্রির বাজারে ফ্রান্স ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী।

‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মুহাম্মদ’ থেকে ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’!

mahindra muhammad logoভারতের গাড়ি কোম্পানিগুলির মধ্যে এক অতি পরিচিত নাম ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’। বিশ্বের সব থেকে বড় ট্রাক্টর প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’। কয়েকশো কোটি ডলার সম্পত্তির অধিকারী এই কোম্পানি। এদের তৈরি ট্রাক্টর ভারতের কৃষকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

কিন্তু জানেন কি এই কোম্পানির নাম এক সময়ে ছিল ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মুহাম্মদ’? আর সেখান থেকে দেশভাগ, ভারত – পাকিস্তানের স্বাধীনতা – এসব কারণে তা আজ হয়ে উঠেছে ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’।

কোম্পানিটি চালু হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। পাঞ্জাবের লুধিয়ানাতে কে.সি মাহিন্দ্রা, জে.সি মাহিন্দ্রা আর মালিক গুলাম মুহাম্মদ ইস্পাত কারখানা হিসেবে এই কোম্পানির পত্তন করেন।

‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’র চেয়ারম্যান কেশব মাহিন্দ্রা বিবিসিকে বলছিলেন, “কে.সি মাহিন্দ্রা আর জে.সি মাহিন্দ্রা মি: গুলাম মুহাম্মদকে কোম্পানির অংশীদার বানিয়েছিলেন, কারণ তারা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের একটা বার্তা পৌঁছে দেবে সবার কাছে। সংস্থায় মি: মুহাম্মদের অংশীদারিত্ব কমই ছিল, কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তাঁর নামটা কোম্পানিতে ব্যবহার করা হয়েছিল।”

দেশ ভাগের একদম ঠিক আগে যখন পাকিস্তানের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, তখনও গুলাম মুহাম্মদ আর মাহিন্দ্রা পরিবারের মধ্যে বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে। ব্যবসাও ভালোই চলছে তখন।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে মালিক গুলাম মুহাম্মদ পাকিস্তানে চলে গেলেন। তিনি সে দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন।

দেশ যখন ভাগ হল, তখন ব্যবসাও ভাগ হয়ে গেল। ১৯৪৮ সালে ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মুহাম্মদ’ নাম পাল্টে করা হলো ‘মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা’।

গুলাম মুহাম্মদ নিজের অংশীদারিত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন তখন। তবে দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক দেশভাগের পরেও অটুট ছিল। শুধু ব্যবসাই আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

কেশব মাহিন্দ্রার কথায়, “মালিক গুলাম মুহাম্মদ যখন পাকিস্তানে চলে গেলেন, তখন আমাদের পরিবারের সবাই খুব অবাক হয়েছিলাম। এটাও খারাপ লেগেছিল যে উনি আগে থেকে আমাদের পরিবারকে কিছু জানাননি যে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা।”

১৯৫১ সালে মালিক গুলাম মুহাম্মদ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন। ব্যবসা আলাদা হয়ে গেলেও মাহিন্দ্রা পরিবারের সঙ্গে পুরনো সম্পর্কটা তিনি ভোলেননি।

১৯৫৫ সালে দিল্লির রাজপথে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রথম সামরিক প্যারেডে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন।

“গুলাম মুহাম্মদ দিল্লিতে এসে প্রথম ফোনটা করেছিলেন আমার ঠাকুমাকে। দুই পরিবারের বন্ধুত্বটা আগের মতোই রয়ে গেছে,” বলছিলেন কেশব মাহিন্দ্রা।

বিবিসি বাংলা