আর্কাইভ

Archive for the ‘অর্থনীতি’ Category

চাকরির বাজারে হুমকি রোবট!

robot serving 3৩০ বছরের মধ্যে তারাই সেরা সিইও হবে : জ্যাক মা

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন : মানব শ্রম আর অফুরন্ত কাঁচামালের কল্যাণে আঠার শতকের মাঝামাঝিতে বিশ্বজুড়ে যে শিল্প বিপ্লবের সূচনা একুশ শতকে এসে তা এখন পরিপূর্ণ ডিজিটাল রূপায়ণের দিকে যাচ্ছে। আর এতে মানুষ নয়, নির্ভরতার বড় উৎস হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা রোবট।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে রোবট। এতে কম্পানিগুলোর একদিকে যেমন ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে অন্যদিকে কাজের গতিও বাড়ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে অদক্ষ চাকরি থেকে শুরু করে এমনকি জ্ঞানভিত্তিক উচ্চ দক্ষতার চাকরিও এখন রোবটের কাছে হাতছাড়া হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, স্বচালিত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পথে অনেকটাই সফল কম্পানিগুলো। অদূর ভবিষ্যতে আর ট্যাক্সি ভাড়া করতে হবে না, কিংবা বাস, ট্রাক চালাতে চালকের প্রয়োজন হবে না। রেস্টুরেন্ট-শপিং মলে মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছে রোবট, চিকিৎসাক্ষেত্রে রোবটিক সার্জারির অগ্রগতি এবং ক্যান্সার শনাক্তকরণ ও হার্টের পরিস্থিতি বুঝতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ৭০০ পেশার মধ্যে ৪৭ শতাংশ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে। চলতি বছর ম্যাককিনসে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে প্রযুক্তির যে অগ্রগতি চলছে তাতে বিশ্বের অর্ধেক কাজই এক সময় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দ্বারা সম্পাদিত হবে। তবে ম্যাককিনসের গবেষকরা এখনো মনে করেন বিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ চাকরি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হবে।

পিডাব্লিউসির আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ব্রিটেনে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চাকরি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে শেষ হয়ে যাবে। বিশেষ করে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং পাইকারি ও খুচরা বাজারে চাকরি বেশি লোপ পাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি বিশ্বের শ্রমশক্তিতে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলবে তা এসব প্রতিবেদনে এখনো পুরোপুরি উঠে আসেনি। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং সিলিকন ভ্যালিতে কারনেগি মেলন ইউনিভার্সিটির অনুষদ সদস্য ভিভেক ওয়াদওয়া বলেন, ‘এসব গবেষণায় কর্মসংস্থানে প্রযুক্তির প্রভাবকে এখনো ছোট করে দেখা হচ্ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।’

গত বছর ওয়ার্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) এক পূর্বাভাসে বলা হয়, রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জাগরণে শ্রমবাজার থেকে অন্তত ৫১ লাখ মানুষ চাকরি হারাবে। আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বের শীর্ষ ১৫ দেশ থেকে এ কর্মসংস্থান হারানোর ঘটনা ঘটবে।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের রাস্তায় নেমেছে চালকবিহীন ট্রাক। সিঙ্গাপুরের জুরং আইল্যান্ডে কেমিক্যাল শিল্প এলাকায় ট্রাকটি পণ্য পরিবহন শুরু করেছে। ক্যাটোয়েন নাটি নামক শিল্প কম্পানিটি জানায়, তারা ছয় মাস পরে আরো ১১টি চালকবিহীন ট্রাক কাজে লাগাবেন পণ্য পরিবহনে। ১২টি ট্রাকের মাধ্যমে বছরে ৩০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা যাবে। ক্যাটোয়েন নাটির সিইও কয়েন কারডন বলেন, চালকবিহীন ট্রাক নামানোর ফলে কম্পানির খরচ যেমন কমবে তেমনি সক্ষমতাও বাড়বে।

জাপানের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক মিজুহু ফিন্যানশিয়াল গ্রুপ তাদের বৈশ্বিক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। কম্পানিটি দেশ ও বৈশ্বিক কার্যক্রম থেকে এক-তৃতীয়াংশ কর্মী ছাঁটাই করবে আগামী এক দশকে। আর তার স্থলাভিষিক্ত করা হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। জাপানের স্থানীয় দৈনিক ইয়োমিউরি পত্রিকা জানায়, বর্তমানে থাকা ৬০ হাজার কর্মী থেকে ১৯ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে ব্যাংকটি। এ নিয়ে কম্পানির এক মুখপাত্র বলেন, ক্লারিক্যাল চাকরিগুলো আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করব।

যন্ত্রমানব নিয়ে মানুষ যখন উদ্বেগে। সে আশঙ্কার পক্ষে আরো এক ধাপ এগিয়ে মত দিয়েছেন চীনা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলীবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা। সম্প্রতি চীনের একটি বাণিজ্যিক সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তব্যে জ্যাক মা বলেন, ‘৩০ বছরের মধ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সেরা সিইও বিবেচনায় টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের দখল নিতে যাচ্ছে কোনো রোবট।’

এ সময় যারা প্রযুক্তির আসন্ন উত্থানকালের প্রস্তুতি নিয়ে রাখেনি তাদের সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আগামী তিন দশকের মধ্যেই পৃথিবীতে আনন্দের চেয়ে নিরানন্দ অনুভূতিই বেড়ে যাবে অনেকখানি।’

জ্যাক মা বলেন, ‘মানুষের তুলনায় রোবটরা অনেক দ্রুতগতিসম্পন্ন ও বিচক্ষণ। তারা কখনো প্রতিযোগীদের ওপর রেগে গিয়ে আবেগতাড়িত কোনো কর্মকাণ্ডেও লিপ্ত হবে না। মানুষের অসাধ্য কাজগুলোকে সহজসাধ্য করে তুলবে যন্ত্র। এসব যন্ত্র একই সঙ্গে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুতে রূপান্তরিত হওয়ার বদলে মানুষের সহযোগীই হয়ে উঠবে।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বকে বদলে দেবে, যেমনিভাবে বিশ্বে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে যুগান্তকারী ইন্টারনেট। এ মন্তব্য করেছে এনভিআইডিআইএর অংশীদার সংস্থা ইএমইএর ভিপি রিচার্ড জ্যাকসন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী থেকে আধুনিক ব্যবসা বাণিজ্যে নেমে এসেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দৈনন্দিন ব্যবসায় এখন এটিকে কাজেও লাগাচ্ছে।

জ্যাকসন বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু নিজে একটি শিল্প হবে না, বরং প্রতিটি শিল্পের আবশ্যকীয় অংশে পরিণত হবে। প্রথম অবস্থায় এটিকে গ্রহণ করা নিয়ে অনেকেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান তাকিয়ে আছে অন্যরা কিভাবে এটিকে কাজে লাগাচ্ছে তা দেখতে। বিষয়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ইন্টারনেট যখন প্রথমে আসে তখনো অনেকেই এর ব্যবহার ঠিকভাবে করে উঠতে পারেনি। আর এখন ইন্টারনেট ছাড়া ব্যবসা কল্পনা করা যায়। তেমনিভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও আমাদের কাছে ক্রমান্বয়ে অপরিহার্য হয়ে উঠছে। মানুষের কাজের ধরন বদলে দেবে এটি।

এএফপি, রয়টার্স। ৪ ডিসেম্বর, ২০১৭

মানুষকে বেকার করে দেওয়ার অধিকার নেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঃ জাপানে প্রফেসর ইউনূস

আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সকে (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) কোনোভাবেই মানুষকে বেকার করার অধিকার দেওয়া যাবে না। সম্প্রতি জাপান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংস্থা আয়োজিত জাপান বিজ্ঞান কংগ্রেসে মূল বক্তার ভাষণে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এ কথা বলেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠান জাপান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংস্থা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্মসূচিতে দিকনির্দেশনা ও অর্থায়ন করে থাকে। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট প্রফেসর মিশিনারি হামাগুচি বিভিন্ন সামাজিক লক্ষ্য অর্জনে বিজ্ঞান গবেষণাকে কিভাবে জোরদার করা যায় সে বিষয়ে সংস্থাটিকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রফেসর ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানায়।

প্রফেসর ইউনূস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার লক্ষ্য ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভেবে দেখতে বিজ্ঞানীদের প্রতি আহ্বান জানান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি যদি গণহারে বেকারত্ব সৃষ্টি করে তাহলে তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না এমন প্রশ্ন তোলেন। কোন কোন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করা হবে তা নির্ধারণের জন্যও তিনি আহ্বান জানান। এছাড়া প্রফেসর ইউনূস বিজনেস ইউনিভার্সিটি অব জাপান এবং টেলিকম ফাউন্ডেশনের মধ্যে একটি সহযোগিতা চুক্তি নিয়েও আলোচনা করেন। তিনি জাপানে সম্ভাব্য সামাজিক ব্যবসা জয়েন্ট ভেঞ্চার পার্টনারদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং জাপানে গ্রামীণ আমেরিকার আদলে একটি গ্রামীণ রেপ্লিকেশন প্রগ্রাম ‘গ্রামীণ নিপ্পন’ চালুর উদ্দেশ্যে একটি প্রস্তুতিমূলক সভায়ও যোগ দেন।

Advertisements

অনলাইন ব্যবসা সর্বগ্রাসী হতে চলেছে!

amazon delivery truckআগামী বেশ কিছু দিন খদ্দেররা অনলাইনে কেনাকাটার পেছনে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবে। বিশেষ করে ১১ নবেম্বর চীনে সিঙ্গলস ডে’তে এবং আমেরিকার ব্ল্যাক ফ্রাইডে’তে অর্থাৎ থাঙ্কস গিভিংসের পরের দিন খদ্দেরদের ভিড় উপচে পড়েছে দোকানগুলোতে। আর সারা বিশ্বে বড় দিনের আগে জোর কেনাকাটার ব্যাপার তো আছেই। এসব কেনাকাটার এক বড় অংশ হবে অনলাইনে।

বস্তুতপক্ষে ই-কমার্সের এখন ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। গত এক দশক ধরে ই-কমার্স বছরে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এতে করে লজিস্টিক্স থেকে ভোগ্যপণ্য পর্যন্ত শিল্পগুলো দারুণভাবে ধাক্কা খাচ্ছে। ই-কমার্স শেষ পর্যন্ত কি পরিণাম ডেকে আনবে ব্যবসায়ে তা নিয়ে আমেরিকায় বিতর্কটা যত তীব্রভাবে হচ্ছে অন্য কোথাও সেভাবে হচ্ছে কিনা সন্দেহ। কারণ আমেরিকায় এ বছর ই-কমার্সের জন্য হাজার হাজার দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে প্রতি ৯টি পেশার মধ্যে একটি হচ্ছে খুচরা ব্যবসা।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো অনলাইন শপিং সবেমাত্র শুরু হয়েছে। গত বছর অনলাইনে কেনাকাটার পরিমাণ ছিল বিশ্বের খুচরা কেনাকাটার মাত্র সাড়ে ৮ শতাংশ। আর আমেরিকায় এই হারটা ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। ব্যবসা ও সমাজের ওপর এর প্রভাব হবে বিশাল। সেটা শুধু এই কারণে নয় যে খুচরা ব্যবসায়ে বিপুল সংখ্যক লোক নিয়োজিত এবং এই ব্যবসা বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত, উপরন্তু এর আরও একটি কারণ হলো অনলাইন শপিংয়ের সবচেয়ে বড় দুই দিকপাল আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা এবং এ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস অনলাইন শপিংকে কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের পুঞ্জীভূত ও সমন্বিত ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। এগুলো গড়ে ওঠার ফলে ব্যবসায়ে প্রতিযোগিতা বাড়বে না চাহিদায় টান ধরবে সেটাই প্রশ্ন।

গত দুই দশকে আলিবাবা ও এ্যামাজন ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে ভিডিও পর্যন্ত আরও অনেক সার্ভিস যোগ করেছে। ভোক্তারাও এসব কোম্পানির প্লাটফর্ম ব্যবহার করার সম্ভাবনা বেশি হয়ে ওঠায় এদের ব্যবসায় পরস্পরের শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং আয়ের উৎসগুলোও বিভিন্নমুখী হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে তা হতেও শুরু করে দিয়েছে। এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে দুই মহাপরাক্রান্ত অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব ধরনের ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্রে বসে আছে। আমেরিকায় এ্যামাজন সপ্তাহের পর সপ্তাহ দেখিয়ে দিচ্ছে যে একটা উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন ই-কমার্স ফার্ম পরিণত বাজারের কি বিপর্যয় ঘটিয়ে দিতে পারে। চীনে আলিবাবা দেখিয়ে দিচ্ছে যে দ্রুত বর্ধিষ্ণু একটি অর্থনীতিতে একটা কোম্পানি কত নাটকীয়ভাবে ব্যবসার চেহারা পাল্টে দিতে পারে। ওরা যে শিল্পকে স্পর্শ করে সেই শিল্পই যে জয় লাভ করে তা নয়। তবে তা সুবিশাল প্রভাব রাখে।

একদিক থেকে দেখলে এতে করে প্রতিযোগিতা জোরদার হচ্ছে। এ্যামাজন ও আলিবাবার ই-কমার্স সাইটগুলো ক্ষুদে উৎপাদকদের পণ্য বিতরণ ও সম্ভাবনাময় ক্রেতা খুঁজে বের করার সহজ ও সস্তা উপায় যুগিয়ে বাজারে প্রবেশের পথে অন্তরায়গুলো কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় প্রস্তুতকারকরা বহুজাতিক বৃহৎ কোম্পানিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারছে। এতে ভোক্তারা লাভবান হচ্ছে। কেননা তারা আগের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণে ও ভাল মানের পণ্য বেছে নিতে পারছে।

কিন্তু বৃহৎ ই-কমার্স ফার্মগুলোর প্লাটফর্ম প্রসারিত হওয়ায় তাদের শক্তিমত্তা নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে। সস্তায় মূলধন বা পুঁজি লাভের সুযোগ থাকায় এ্যামাজন এখন পণ্যাগার, কৃত্রিম বুদ্ধি ও অন্যান্য ক্ষেত্রসহ বড় ধরনের বিনিয়োগে যেতে পারছে। যেমন গত বছর এ্যামাজন হোল ফুডস নামে একটি মুদি প্রতিষ্ঠান ১৩৭০ কোটি ডলার দিয়ে কিনে নিয়েছে। এতে অন্য প্রতিযোগীদের পাল্লা দিয়ে চলার জন্য বেগ পেতে হচ্ছে।

এমনটি মনে করার সার্বিক কারণ আছে যে ই-কমার্স আরও বিশাল আকার ধারণ করবে। ধনী দেশগুলোতে ইতোমধ্যে তা ব্যাপক রূপ নিয়েছে। আর গরিব দেশগুলোতে আয় বৃদ্ধি ও মোবাইল ফোনের বিস্তারের ফলে আরও বেশি সংখ্যক খদ্দের অনলাইনে চলে আসছে। চীনে অনলাইনে ব্যয় ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি হবে এবং মোট খুচরা বিক্রির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হবে অনলাইনে। আমেরিকায় অনলাইনে কেনাকাটার ভাগ গত বছরের প্রায় এক দশমাংশ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে এক-ষষ্ঠাংশে দাঁড়াবে। ব্রিটেনে এই ভাগটা বেড়ে এক-পঞ্চমাংশ হতে পারে। ই-কমার্সের বিরামহীন প্রসার একটা পর্যায়ে হয়ত তার স্বাভাবিক সীমানা ছাড়িয়ে যাবে। তখন হয়ত এটা আর অতটা আকর্ষণীয় হবে না। তবে সন্দেহ নেই এখনও ই-কমার্স বহুদূর যেতে পারে। তথাপি কতদূর যাবে, কত দ্রুত উপরে উঠবে, কোথায় সবচেয়ে ভাল করবে, এর প্রভাব কত বিশাল হবে এখনও তা পরিষ্কার নয়।

এ্যামাজনের যাত্রা শুরু হয়েছিল বই বিক্রি দিয়ে। ১৯৯৯ সালে এক ব্যবসায় সাময়িকীতে প্রচ্ছদ কাহিনী বেরিয়েছিল ‘এ্যামাজন বোম্ব’ শিরোনামে। তখন বলা হয়েছিল এ্যামাজনের যতই প্রসার ঘটুক না কেন এই কোম্পানিকে ‘ওয়ালমার্ট’ এবং ‘বার্নস এ্যান্ড নোবল’-এর মতো মহাপরাক্রান্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে। কিন্তু এ্যামাজনের ক্রমপ্রসারের পরিধি যে কতদূর ব্যাপ্ত হবে তা কেউ তখন ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেনি। আজ এ্যামাজন এক বিশাল কনগ্লোমারেট। এই কনগ্লোমারেটের সবচেয়ে লাভজনক শাখা হলো ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসা। গত বছর এ্যামাজনের অপারেটিং আয়ের ৭৪ শতাংশ এখান থেকেই এসেছিল। এর প্রথম হেডকোয়ার্টার নিউইয়র্কে। দ্বিতীয় হেডকোয়ার্টার সিউলে। সেখানে এটি ৪০ হাজারেরও বেশি কর্মীর কর্মসংস্থান করেছে। বিশ্বব্যাপী এ্যামাজনের শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা আরও ৩ লাখ ৪০ হাজার। গত ৩০ জুন পর্যন্ত এক অর্থবছরে এ্যামাজন নতুন প্রযুক্তির পণ্যের ক্লাউড ও ই-কমার্স ব্যবসার পেছনে প্রায় ১৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে যা গুগলের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি এবং ফেসবুকের তিনগুণেরও বেশি।

তবে এ্যামাজনের সবচেয়ে বড় প্রভাবের ক্ষেত্র এখনও ই-কমার্স। গত বছর আমেরিকায় অনলাইনে কেনাকাটার পেছনে ব্যয় যত বেড়েছে তার অর্ধৈকেরও বেশি বেড়েছে এ্যামাজনের জন্য। পণ্যের খোঁজখবর গুগলে যত করা হয় তার চেয়ে বেশি করা হয় এ্যামাজনে।

alibaba singles day sales 1

ওদিকে চীনেও ই-কমার্সের রমরমা অবস্থা চলছে। গত বছর চীনে অনলাইনে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৬শ’ কোটি ডলার, তা আমেরিকা ও ব্রিটেনের অনলাইনে বিক্রি এক করলে যা দাঁড়ায় তার কাছাকাছি। ধারণা করা হচ্ছে যে ২০২০ সাল নাগাদ সে দেশে মোট খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে অনলাইনে বিক্রির ভাগ বেড়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়াবে। চীনের সবচেয়ে বড় নগরীগুলোর প্রায় ৮০ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা অনলাইনে কেনাকাটা করছে।

অনলাইনে উত্তরণের কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে আলিবাবা। কোম্পানির আয়ের বেশিরভাগ আসে বিজ্ঞাপন থেকে। এখন এটি ভোক্তাদের জীবনে এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যা এখনও আমেরিকা ও ইউরোপে দেখা যায়নি। কোম্পানিটি তার অনলাইন ব্যবসাকে বহুমুখী করতে প্রতিষ্ঠা করে সহযোগী প্রতিষ্ঠান তাও বাও, টি-মল, আলীপে, এন্ট ফিন্যান্সিয়াল ইত্যাদি। আলীপে কেনাকাটা, বিল পরিশোধ ও টাকা প্রেরণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় ৫২ কোটি চীনা এটা ব্যবহার করছে। এ্যামাজনের এ ধরনের কোন ব্যবস্থা নেই। ইউরোপীয়রা এখনও ক্রেডিট কার্ডই আঁকড়ে ধরে আছে। গত বছর আলীপের ব্যবহারকারীর সংখ্যা পেপালের চেয়ে আড়াইগুণ এবং এ্যাপলপের চাইতে ১১ গুণ বেশি ছিল। আলিবাবার অনলাইন বাজার ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। এতে নতুন নতুন সার্ভিসও যুক্ত হচ্ছে। এটা যে সব ধরনের পণ্যই শুধু বিক্রি করছে তা নয়। এটি স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও সার্ভিসেও ঢুকে পড়েছে। আলী হেলথ নামে এরই আরেক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এ ব্যবসা করছে। বিশ্বের বৃহত্তম হোটেল চেইন ম্যারিয়েটের সঙ্গেও যৌথ অংশীদারিত্বে যুক্ত হয়েছে আলিবাবা, এটি ইউকু নামে একটি ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটেরও মালিক। আলিবাবা ওয়েইনু নামে টুইটারের মতো সামাজিক মিডিয়া কোম্পানিতেও বিনিয়োগ করেছে যার গ্রাহকসংখ্যা ৩৬ কোটিরও বেশি। ডিডি নামে একটি রাইড শেয়ারিং সার্ভিসও আছে আলিবাবার। এভাবে আলিবাবার সাম্রাজ্য সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করছে। আলিবাবার প্রতিদ্বন্দ্বী যে নেই তা নয়। এ মুহূর্তে প্রধান দুই প্রতিযোগী জেডি ও টেনসেন্ট।

আলিবাবা বাইরেও তার কার্যক্রম ছড়িয়ে দিচ্ছে। ২০১৪ সালে এ্যামাজন বৈশ্বিক পরিসরে বাজার বিস্তারের এমন পদক্ষেপে ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে ৫শ’ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। দেখাদেখি দু’মাস পরে আলিবাবা দিল্লীতে গিয়ে হাজির হয় এবং ভারতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট কোম্পানি পেটিএমএ ৫

হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। অনলাইন ব্যবসার এই দুই অধীশ্বর ভারতে বাজার দখল নিয়ে রীতিমতো তুমুল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এভাবে বিশ্বের দেশে দেশে তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের অনলাইন ব্যবসা।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

বিলিয়ন ডলারের সন্ধানে কাজী আইটি!

kazi ITমোজাহেদুল ইসলাম : তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে যারা তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে তাদের অবদান রয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণে। আমাদের দেশে যতগুলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তার মধ্যে কাজী আইটি সেন্টার লি. একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠান। মাইক কাজী হলেন এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বর্তমান অবস্থা ও প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয় মাইক কাজীর সঙ্গে।

মাইক কাজী। কাজী আইটি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও হিসেবে বর্তমানে তিনি দায়ীত্ব পালন করছেন। বিগত ৩০ বছর যুক্তরাষ্ট্রে তিনি বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি কাজী আইটি কো. কার্যক্রম বাংলাদেশেও শুরু করেছেন। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করার শুরুর দিকের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মাইক কাজী বলেন,‘আমি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টা কাটিয়েছি যুক্তরাষ্ট্রে। আমাদের দেশেও তথ্যপ্রযুক্তিতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। দেশের জন্য আমি কিছু করতে চাই ভেবেই এদেশে আমি আমার অফিসিয়াল বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেছি। কাজ শুরুর প্রথম দিকে সামন্য সমস্যা হলেও বর্তমানে সব ঠিকঠাক চলছে।’

দেশের পাশাপাশি চালু রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাজও। সেখানে তিনি যে ধরনের কাজ করে থাকেন তার বর্ণনায় তিনি বলেন,‘যুক্তরাষ্ট্রে আমার কার্যক্রম চালু রয়েছে। সেখানে আমার অফিসে শতাধিক লোক কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যাক অফিসের কাজগুলো আমার প্রতিষ্ঠান করে থাকে। বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যাংকের জমানত (মরগেজ) সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমরা সমাধান করি তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে।’

কাজী আইটি বাংলাদেশে বিপুল পরিমান কর্মসংস্থান সৃষ্ঠি করেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধাপে এক হাজারের অধিক লোকবল নিয়োগ দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। লোকবল নিয়োগের পূর্বে প্রার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি নিজ উদ্যেগে ট্রেনিং করিয়ে স্কিলড তৈরি করে নিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে মাইক কাজী বলেন,‘আমরা যে ধরনের লোকবল নিয়োগ দিয়ে থাকি তাদেরকে অবশ্যই স্নাতক ডিগ্রির অধিকারী হতে হয়, যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে কোন বিষয়ে স্নাতক হলেই হবে। একটি বিশেষ দিক আমরা গুরুত্ব দিয়ে থাকি আর তা হলো- প্রার্থীকে অবশ্যই ভালো ইংরেজি জানতে হবে। যেহেতু কাজী আইটি আন্তর্জাতিক কাজকে প্রধান্য দিয়েই আগামীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাই, আন্তর্জাতিক বাজারগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হলে ইন্টারন্যাশনাল ভাষায় দক্ষ কিনা তা যাচাই করে নিই।’ তিনি আরো বলেন,‘অনেকেই হয়তো ভুল একটি ধারণার মধ্যে হাঁটছে আর তা হলো- অনেকেই ভাবে কাজী আইটি মনে হয় ট্রেনিং প্রকল্প খুলেছে। সরকার থেকে অনুদান নিয়ে লোক দেখানো কিছু একটা করছে। যাদের এমন ধারণা তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- আমরা কোনো ট্রেনিং প্রকল্প খুলিনি, আমরা সরকারের কাজ থেকে কোনো প্রকার অনুদান গ্রহণ করিনি। কাজী আইটিতে দক্ষ লোকবল নিয়োগের উদ্দেশ্যেই আমরা ট্রেনিং করিয়ে থাকি এবং তাদেরকে আমাদের কাজে নিয়োজিত করি।’

দেশের বিপিও খাতসহ অন্য খাতগুলোতে প্রয়োজন দক্ষ লোকবল। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এখানে কাজী আইটি কী পরিমান লোকবল খুঁজে পেয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে মাইক কাজী বলেন,‘ বাংলাদেশ থেকে আমারা প্রায় ৬০০ লোক নিয়োগ দিয়েছি। আমাদের আরো অনেক দক্ষ লোকবলের প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের ধানমন্ডি অফিসের জন্য ৪০০ এবং রাজশাহী অফিসের জন্য ১০০০ জনবল দরকার আগামী বছরের মধ্যে। যে পরিমান লোকবল পেয়েছি তা আমাদের চাহিদার তুলনায় নগন্য সংখ্যা। আমাদের যত দক্ষ লোকবল দিতে পারবেন ততোই আমাদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে বিশ্ববাজারে।’

দেশের বিভিন্ন যায়গার ভিন্ন ভিন্ন অফিস খুঁলতে শুরু করছে কাজী আইটি। অনেক বড় বড় কোম্পানিকে দেখা যায় একই জায়গার অনেক বড় এলাকা নিয়ে কারখানা/অফিস স্থাপন করা হয় সেখানে কাজী আইটি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অফিস করছে। এই প্রসঙ্গে মাইক কাজী বলেন,‘ ঢাকা একটি পরিচিত জ্যামের শহর। আমাদের অফিসে কর্মরত একজন ব্যাক্তি যদি প্রতিদিন ৪/৫ ঘন্টা জ্যামে সময় নষ্ট করে অফিস করে তাহলে তার প্রতিমাসে অনেক ঘন্টা যাতায়াতেই নষ্ট হয়। আমরা সব সময় আমাদের এখানে কর্মরত ব্যক্তিদের কথা আগে চিন্তা করি। তাদের কথা বিবেচনা করেই যেখান থেকে তাদের অফিস করতে সুবিধা হয় সেখানেই অফিস করার পরিকল্পা করি।’ তিনি আরো জানান, কাজী আইটির প্রতিটি অফিসে দুই শিফটে কাজ হয়ে থাকে। দ্বিতীয় শিফটে যারা কাজ করেন তাদের কাজ শেষ করতে করতে রাত হয়ে যায়, তাই তাদের যাতায়াতের জন্য কাজী আইটি গাড়ির ব্যবস্থা করে থাকে। রাজশাহীতে তাদের আর একটি অফিসের সূচনা ঘটবে খুব শীঘ্রই বলেও জানান মাই কাজী।

কাজী আইটিতে যারা কর্মরত রয়েছে তাদের বেতন বা তাদের আয় সম্পর্কে জানতে চাইলে মাইক কাজী বলেন,‘ আমাদের এখানে যারা কর্মরত রয়েছে তারা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে যথেষ্ট বেশি আয় করেন।’ তিনি একটি উদাহারন দিয়ে বলেন,‘ একজন ফ্রেশার দুই মাস ধরে এখানে কাজ করছে। ঐ ফ্রেশারের গত মাসে আয় হয়েছে ৬৭ হাজার টাকা।

কাজী আইটি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি। এখানে কর্মরতদের মধ্যে ১০ থেকে ১২ শতাংশ বিভিন্ন দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন করে এসেছে। এছাড়াও বেতন কাঠামো, বিনোদনের মাধ্যমে কাজ, পারস্পরিক সম্পর্ক ডেভেলপসহ যাবতীয় বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে অনুসরণ করা হয় বলেও জানান মাইক কাজী।

দেশের বিপিও খাত তথা আইটি খাতে কাজী আইটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন, দেশে দক্ষ লোকবল তৈরি করা, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কাজ নিয়ে আসাসহ যে কাজগুলো তারা করে চলেছে তা নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। বিগত বছরে এই কোম্পানিটি বৈদেশিক বাজার থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার আয় করছে। চলতি বছরে তাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৫০মিলিয়ন মার্কিন ডলারের।

এই খাতকে আরো সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাইলে আমাদের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন,‘ তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন খাতকে আরো শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য খাত হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে দেশের অভ্যন্তরে বিপিও খাত ও আইটি বিজনেস এর আরো প্রচার-প্রসার বাড়াতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজিকে আরো গুরুত্ব দিলে আমাদের এখানে প্রচুর ইংরেজিতে স্কিলড তৈরি হবে। ধরুন-আমি সব কাজ জানি কিন্তু আমার কাজকে বিশ্ববাজারে উপস্থাপন করতে আমি ব্যর্থ হলে আমার কোন কিছুই কাজে আসবে না। তাই এই খাতে কাজ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন হবে ইংরেজিতে দক্ষতার। পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত টিউটেরিয়াল ইংরেজিতে পাওয়া যায়। যদি ইংরেজিতে ভালো না হয় তাহলে সে টিউটেরিয়াল দেখেও শিখতে পারবে না। আইসিটিতে যে ক্যারিয়ার আছে তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তরুণদের এবিষয়ে উত্সাহিত করতে হবে।

আইটি খাত নিয়ে অনেক স্বপ্ন রয়েছে মাইক কাজীর। তিনি আগামী পাঁচ বছরে তার এই কোম্পানিকে বিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে রুপান্তর করতে চান। তার আর একটি স্বপ্ন হলো -আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্ব আইটি বাজারে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিবে। চাকুরী প্রার্থীদের তিনি কাজী আইটির http://www.facebook.com/ilovekaziit ফেসবুক ফ্যান পেজ এ গিয়ে আবেদন করতে বলেছেন। আগ্রহীরা সব ধরণের তথ্য ফেসবুক পেজ থেকে সংগ্রহ করতে পারবে।

ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও জুমার পবিত্রতা

মুফতি শাহেদ রহমানি : “শুক্রবার মুসলমানদের জন্য পবিত্র একটি দিন। খ্রিস্টানদের রবিবার, ইহুদিদের শনিবার।

…শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র দিন বলেই কি আমেরিকানরা ‘কালো শুক্রবার’ আবিষ্কার করল?” এ প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লেখক হুমায়ূন আহমেদ।

‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ শিরোনামে ০৬-১২-২০১১ দৈনিক প্রথম আলোতে তাঁর একটি লেখা ছাপা হয়। পরে সে লেখা ‘নিউ ইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’ গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়।

পবিত্র জুমা, জুমার দিন ও জুমার রাত মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের দৃষ্টিতে সপ্তাহের সবচেয়ে বরকতময় ও ইবাদতময় দিন হলো শুক্রবার বা জুমার দিন। সুতরাং ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সবার মনে কৌতূহল জাগে।

ব্ল্যাক ফ্রাইডে আসলে কী

যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের চতুর্থ বৃহস্পতিবার ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’ (শুকরিয়া দিবস) হিসেবে পালিত হয়। এর পরের দিন—অর্থাৎ প্রতি নভেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ হিসেবে পরিচিত। তবে সেটি একই তারিখে হওয়ার কোনো নিয়ম নেই।

২০১৫ সালে সেটি হয়েছে ২৭ নভেম্বর, ২০১৬ সালে ২৫ নভেম্বর, আর ২০১৭ সালে ২৪ নভেম্বর। তারিখ নয়, বরং নভেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার হওয়াই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

১৮৬৯ সালের দিকে আমেরিকায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল, সেই সময় মন্দা থেকে উত্তরণের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ দিবসের কথা ভেবেছিলেন ব্যবসায়ীরা। ওই বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁরা পণ্যে বিশেষ ছাড় দেন। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, ওই ছাড়ে তাঁদের অনেক লস হয়। পরে দিনটি ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সাধারণত ব্যবসায়ীরা ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’তে পণ্য বিশেষ ছাড়ে বিক্রি করেন। ওই দিন ৭০ থেকে ৯০ ভাগ পর্যন্ত মূল্য ছাড় দেওয়ার নজিরও রয়েছে। ন্যূনতম এক ভাগ হলেও ছাড় দেওয়া হয়। মূলত ২৫ ডিসেম্বর খ্রিস্টানদের বড়োদিন উপলক্ষে কেনাকাটা ওই দিন থেকে শুরু হয়। সে উপলক্ষেই এ ছাড়।

তাহলে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ নামটি কোত্থেকে এসেছে? এ বিষয়ে কয়েকটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়—এক. ১৯৫০ সালে ফিলাডেলফিয়া রাজ্য পুলিশ ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’র পরের দিনকে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ নামে অভিহিত করেছিল। কারণ এই দিনে আমেরিকায় বছরের সবচেয়ে বড় লেনদেন হতো ও বছরের সবচেয়ে উত্তেজনাকর ফুটবল গেম অনুষ্ঠিত হতো। ওই ফুটবল প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত আমেরিকার সেনাবাহিনী। এই খেলার ফলে শহরের রাস্তাজুড়ে থাকত প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। এ ছাড়া ফুটপাতে লেগে থাকত মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। এসব সামলাতে বেশ বেগ পেতে হতো ফিলাডেলফিয়া পুলিশ ও বাস ড্রাইভারদের। তাই দিনটি পুলিশদের জন্য ছিল খুবই বাজে একটা দিন। এ জন্য তারাই এই দিবসের নাম দিয়েছিলেন ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’। (https://www.huffingtonpost.com/2013/11/27/black-friday-originn4346347.html)

দুই. অনেকের মতে,‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ শুরু হয় মধ্যরাত থেকে। মধ্যরাতেই ক্রেতাদের লাইন ধরা শুরু হয়, অন্ধকার থাকতেই স্টোর ওপেন করে দেওয়া হয়। মানুষ হুড়মুড় করে দোকানের ভেতর ঢুকে যে যেটা আগে ধরতে পারে, সে সেটা কিনে নেয়। পণ্য বিক্রির এ ব্যাপারটা শেষ হয়ে যায় দিনের আলো ফোটার আগে। তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল’। তিন. ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা হলো—যেসব বিক্রেতার বিক্রি-বাট্টা কমতে কমতে হিসাবের খাতায় লাল দাগ নেমে যায়, তাঁদের এই দিনের বিক্রির পর পুনরায় তা কালো কালির আঁচড়ে ফিরে আসে। তাই এ শুক্রবারকে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ বলে অভিহিত করা হয়।

(http://articles.islamweb.net/media/index.php?page=article&lang=A&id=201136)

চার. বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে শুক্রবার দিনটিতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সেই দুঃসহ স্মৃতি থেকে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ শব্দের প্রচলন হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। ৮ জুন, ১৬৮৮ সালে কিং জেমস দ্বিতীয় সাতজন ‘অ্যাংলিকান বিশপ’কে গ্রেপ্তার করেন। ১৮ অক্টোবর, ১৮৮১ সালে হারিকেনের আঘাতে স্কটল্যান্ডের আইমাইথে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয়। ১৮ নভেম্বর, ১৯১০ সালে ইংল্যান্ডে নারীর ভোটাধিকারকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়। ২০ অক্টোবর, ১৯১৬ সালে লেইক এরিতে প্রচণ্ড ঝড়ে চারটি জাহাজ ডুবে যায়।

২২ নভেম্বর, ১৯৬৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে গুপ্তহত্যা করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮ সালে ইরানের তেহরানে অবস্থিত ‘ময়দানে জালেহে’ বিক্ষোভকারীদের গণহত্যা করা হয়। ৩১ জুলাই, ১৯৮৭ সালে কানাডায় ভয়াবহ টর্নেডো আঘাত হানে। ১২ মার্চ, ১৯৯৩ ভারতের মুম্বাইয়ে সিরিজ বোমা হামলা হয়। ২৬ জুন, ২০১৫ ফ্রান্স, কুয়েত, সোমালিয়া, সিরিয়া ও তিউনিসিয়ায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়। কাকতালীয়ভাবে উল্লিখিত দিনগুলো ছিল শুক্রবার। তাই অনেকের কাছে শুক্রবার ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ নামে পরিচিত।

ইসলামে জুমার দিনের গুরুত্ব

পবিত্র জুমা, জুমার রাত ও জুমার দিন ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের দৃষ্টিতে এই দিনকে ‘কালো দিন’ আখ্যায়িত করার কোনো সুযোগ নেই। এক হাদিসে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে দিনগুলোতে সূর্য উদিত হয়, ওই দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। ওই দিন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। ওই দিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় এবং ওই দিনই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করা হয়। আর ওই দিনই কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। ’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৮৫৪)

অন্য হাদিসে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমরা পরে আগমন করেও কিয়ামতের দিন (আহলে কিতাবের) অগ্রবর্তী হব। তাদের আসমানি গ্রন্থ দেওয়া হয়েছে আমাদের আগে। আমাদের দেওয়া হয়েছে পরে। আর এই দিন অর্থাৎ জুমার দিনের ব্যাপারেও আমরা অগ্রবর্তী। ইহুদি ও খ্রিস্টানরা এদিন নিয়ে মতভেদ করেছিল। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথ দেখিয়েছেন। ইহুদিরা আমাদের এক দিন পর—অর্থাৎ শনিবার পেয়েছে। আর খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার। ’ (বুখারি : ৮৪৭)

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ তাআলা জুমার দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের আগের লোকদের উদাসীন রেখেছেন। ফলে ইহুদিদের জন্য শনিবার, আর খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার…। ’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৮৫৬)

মহানবী (সা.) আরো ইরশাদ করেছেন, ‘জুমার দিন এমন একটি সময় আছে (ওই সময় বান্দার যেকোনো দোয়া কবুল হয়), কোনো মুসলিম যদি ওই সময়টা পায়, আর তখন সে নামাজে থাকে, তাহলে সে কোনো কল্যাণ কামনা করলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪০০)

মুসলমানরা কি ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ উদ্যাপন করতে পারবে?

বর্তমানে কৌশলী নামে এই ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ মুসলিম দেশগুলোতে ঢুকে পড়ছে। ‘আমাজন’-এর ‘কল্যাণে’ আরব দেশগুলোর কোনো কোনো স্থানে এ দিবস ‘আল জুমুআতুস সাওদা’ বা ‘সাদা জুমা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়! প্রশ্ন হলো, মুসলমানরা কি ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ উদ্যাপন করতে পারবে? এ প্রশ্নের জবাবে আমরা কয়েকটি কথা বলতে চাই। এক. মুসলমানদের দৃষ্টিতে জুমার দিন ‘কালো দিন’ তো নয়ই, বরং সেটি অত্যন্ত বরকতময় দিন। তাই এ শব্দ ব্যবহার মুসলমানদের জন্য সংগত নয়। দুই. এই দিন খ্রিস্টানদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ মর্মে পর্যাপ্ত দলিল-দস্তাবেজ আছে। কাজেই মুসলমানদের জন্য অন্য ধর্মাবলম্বীদের সংস্কৃতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে ওই জাতির দলভুক্ত বলে গণ্য হবে। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫১২)

তিন. তবে ওই দিন ইসলামের সীমারেখা মেনে ব্যবসা-বাণিজ্য করলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। ব্যবসা ও মুনাফা বৈধ বলে গণ্য হবে। কোরআনে এসেছে, ‘… আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় হালাল ও সুদ হারাম করেছেন…। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত :২৭৫)

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘হে ঈমানদাররা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো…। ’ (সুরা : জুমুআ : ৯)

চার. বিভিন্ন কারণে খ্রিস্টানরা এই দিনকে অশুভ মনে করে।  কিন্তু ইসলামে অশুভ বলতে কিছু নেই। ওই দিনে দুর্যোগপূর্ণ অনেক ঘটনা ঘটলেও এর সঙ্গে দিবসের কোনো সম্পর্ক নেই। ওই দিন ছাড়াও তো অন্য দিনের বহু দুর্যোগপূর্ণ ঘটনা আছে! মজার ব্যাপার হলো, খ্রিস্টানদের দৃষ্টিতেও একটি ‘গুড ফ্রাইডে’ আছে। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার স্থান থেকে এই দিনে তাঁর পুনরুজ্জীবন হয়। এর স্মরণে খ্রিস্টানরা উল্লিখিত উৎসব পালন করে। ক্রুশিফিকেশন ডার্কনেস অ্যান্ড একলিপস পদ্ধতি মতে (প্রেরিতদের কার্য; ২:২০-এ প্রেরিত পিতর কর্তৃক বর্ণিত ‘রক্ত চন্দ্র’র বিবরণ অনুসারে), ‘গুড ফ্রাইডে’র তারিখ নিরূপণ করা হয়েছে ৩ এপ্রিল, ৩৩ খ্রিস্টাব্দে। ওই দিনটি খ্রিস্টানদের দৃষ্টিতে ‘শুভ দিন’।

কাজেই কোনো দিন ও কোনো বস্তুকে অশুভ মনে করা অযৌক্তিক। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কুলক্ষণে বিশ্বাস করা শিরক। ’ (আবু দাউদ, তিরমিজি, মিশকাত, হাদিস :৪৫৮৪)

লেখক : সিইও, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

ব্যয়ের লিস্টে গায়েবি থাবা

শামীমুল হক :গৃহবধূ মিনারা ইসলাম দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন ঢাকায়। তার সংসারে দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে সুখেই ছিলেন। হঠাৎ তার সংসারে নেমে আসে কালো মেঘ। অন্ধকারে ঢাকা পড়ে ভবিষ্যৎ। তার স্বামী ব্যাংকার রফিকুল ইসলামের কর্মস্থল ছিল মতিঝিল সোনালী ব্যাংক। একদিন অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে সায়েদাবাদে দুই বাসের মাঝখানে চাপা পড়েন তিনি। এতে মারাত্মক আহত হন। সংজ্ঞা হারানোর আগে মিনারা ইসলামকে ফোনে এতটুকু বলতে পেরেছিলেন ‘আমি এক্সিডেন্ট করেছি।’ আহত রফিকুলকে আশেপাশের লোকজন দ্রুত নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মিনারা ছুটে যান সেখানে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

মিনারা জানান, ওই ঘটনা আমার সংসার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দুটি সন্তানকে নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়ি। হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধপত্র কিনতে খরচ হয় মোটা অঙ্কের টাকা। শুধু তাই নয়, অস্বাভাবিক মৃত্যু বলে করতে হয়েছে পোস্টমর্টেম। সেখানে দিতে হয়েছে ৭০০০ টাকা। তিনি বলেন, এমনিতেই সারা বছর একজনের না একজনের রোগ বালাই লেগেই থাকে। সীমিত উপার্জনের এ সংসারে আমার স্বামীর এক্সিডেন্ট গায়েবি থাবা হিসেবেই আমি দেখি। স্বামীকেও হারালাম। বিশাল অর্থও গেল। এখন শুধু হাহাকার নিয়ে বেঁচে আছি। মিনারা বলেন, তিন জনের সংসারে মাসে নির্দিষ্ট একটা অঙ্কের অর্থ রাখতে হয় চিকিৎসার জন্য। দেশে ৪/৫শ’ টাকার নিচে ডাক্তার ফি নেই। আর ভালো কোনো প্রফেসর দেখাতে গেলে এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা ফি দিতে হয়। এরপর তো রয়েছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সেখানেও বিশাল অর্থ খরচ হয়। ডাক্তার তো আর ধনী-গরিব দেখে রোগী দেখেন না। তিনি গোনেন সংখ্যা। আর অর্থ। এভাবেই নিম্ন মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্তরা সংসার খরচে চিকিৎসা বাবদ বরাদ্দ না রাখলেও প্রতি মাসেই এর পেছনে অর্থ খরচ করতে হয়। ফলে সংসার খরচে টান পড়ে। সেই কষ্টেই চালাতে হয় দিন। শখ বলতে তাদের জীবনে নেই।

দুই মাস আগে প্রবাসী আহাদ মিয়ার সংসারে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তার মেয়ের সন্তান হয় তিন দিন আগে। রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। এ সময় তার স্ত্রী হারিকেন ধরাতে যান। হঠাৎ করে হারিকেন বিস্ফোরণ হয়ে তার স্ত্রীর শরীরে আগুন ধরে যায়। এরপর বাড়ির অন্যরা শরীরের আগুন নিভিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আইসিওতে রাখা হয়। সেখানে তিন দিন চিকিৎসা নেয়ার পর তিনি মারা যান। আহাদ মিয়ার বড় মেয়ে শেফালি জানান, এমন ঘটনার জন্য কেউই প্রস্তুত থাকে না। তারপরও পরিস্থিতি সামলে নিতে হলে টাকার দরকার। সেই টাকা যাদের থাকে না তারা বিনা চিকিৎসায় মারা যান।

দুই মাস ধরে মগবাজার তাকওয়া স্পেশালাইজড হাসপাতালে কানের চিকিৎসা করাচ্ছেন আবদুল আলীম। সেখানে প্রফেসর তরফদার তার চিকিৎসা করান। এক পর্যায়ে তার কানের অপারেশনের কথা বলেন চিকিৎসক। সে অনুযায়ী অপারেশন করান। তিনি বলেন, অপারেশন খরচ নিয়েছেন ৩০ হাজার টাকা। আর ওষুধপত্র আর গ্রামের বাড়ি নরসিংদী থেকে আসা-যাওয়া সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে লাখ টাকার উপরে। এটা তো আমাদের জন্য বিশাল খরচ। এছাড়াও মাসের প্রায় দিনই সংসারের কারো না কারো জ্বর, সর্দি, ঠাণ্ডা লেগেই থাকে। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়ালে ডাক্তার ফি দিতে হয় ৪/৫শ’ টাকা। আর ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কিনে খাওয়ালে ডাক্তার খরচ বেঁচে যায়।

রাজধানীর মিরপুর-২ নাম্বারে বসবাস করেন একটি প্রাইভেট ফার্মে কর্মরত নাজিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আমার প্রতি মাসে ওষুধ খরচ ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। এটা একেবারে বান্ধা। আমার সঙ্গে মা থাকেন। ওনার ডায়াবেটিস। ইনসুলিন দিতে হয়। এছাড়া অন্যান্য ওষুধ তো আছেই। সংসার চালাতে গিয়ে অনেক সময় ফার্মেসি থেকে ওষুধ বাকি আনতে হয়। কি করবো বলুন। ফার্মেসিতে কোনো মাসে কম টাকা দিলে কথা শুনতে হয়। আবার ওষুধ না এনেও পারি না। মাঝখানে রাগ করে এক সপ্তাহ ইনসুলিন আনিনি। মাকে ইনসুলিন দেইনি। পরে দেখি মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দ্রুত তাকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে এক সপ্তাহ থাকার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি আনি। একটি ইনসুলিন না কেনায় আমার কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা চিকিৎসার পেছনে দিতে হয়েছে। এমনিতেই টানাটানির সংসারে কষ্ট করে চলতে হয়। এর উপর চিকিৎসা ব্যয় আমাদের দিশাহারা করে তুলছে। তিনি বলেন, এক বছর আগে যে ক্যাপসুল ১০ টাকায় কিনতাম। এখন সে ক্যাপসুল কিনতে হয় ২৫ টাকা করে। এমনকি নাপা ট্যাবলেটের দামও বেড়ে গেছে।

গত এক বছরে ওষুধের বাজারে এমন কোনো ওষুধ নেই যে, তার দাম বাড়েনি। ফলে এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে প্রতিটি সংসারে। আর নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সংসারের বাজেটে কুলাতে পারছেন না। কেউ কেউ ধারকর্জ করেন। কেউবা খরচ কমিয়ে সংসার চালান। আবার এমনও দেখা গেছে, সংসার খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে গোটা পরিবার।

এমনই একটি পরিবার নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক গ্রামের রহমত আলী। তার কী হয়েছে কোনো ডাক্তারই ধরতে পারছে না। কৃষক রহমত ঢাকার এক স্বজনের দ্বারস্থ হন। তিনি একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার মেডিসিন বিভাগের এক অধ্যাপককে দেখান। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরতে পারেন তার ক্যানসার হয়েছে। এরপর তাকে ক্যামো থেরাপি দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। এ পর্যন্ত আসতে তার জমি বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু ক্যামো ক’টি দিতে হবে? কত টাকা লাগবে এসব হিসাব করে তার পরিবার পিছিয়ে যায়। ডাক্তার বলে দেন ক্যামো দিলে হয়তো কিছুদিন বাঁচতে পারে। আর না দিলে যে কোনো সময় মরে যেতে পারেন। এ অবস্থায়ই নিঃস্ব হয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান। মাস দুয়েক বিছানায় গড়িয়ে তিনি মারা যান।

খাওয়ার পর চিকিৎসা ব্যয় এখন প্রতিটি পরিবারের প্রধান খাত। আর এ খাতে কোনো নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ জানা থাকে না কারোরই। কতবার ডাক্তার দেখাতে হবে। কতদিন ওষুধ খাওয়াতে হবে এরও কোনোদিন তারিখ জানা থাকে না কারো। আর এখন আগের দিন ডাক্তার দেখিয়েছে কেউ আবার পরদিন গেলেও ফি দিতে হয়। এভাবে আয়ের একটা বৃহৎ অংশ খরচ হয়ে যায় চিকিৎসা খাতে। দেশের খুব কম সংখ্যক পরিবারই আছে যে পরিবারে ওষুধ লাগে না। যে পরিবারে রোগ বালাই নেই। এ অবস্থায় কষ্টের বোঝা বাড়তে থাকে। সংসার খরচে টান পড়ে। অভাব থেকে বের হতে পারে না কেউ। আবার হঠাৎ কোনো বড় রোগ হলে বিক্রি করতে হয় সহায় সম্পদ। কেউ কেউ হয়ে যান নিঃস্ব। এভাবেই চলছে কষ্টের জীবন।

পেট্রোডলার না পেট্রোইউয়ান?

yuan-dollarআলমগীর মহিউদ্দিন : ক্ষমতা ও অর্থ প্রায় সব অবস্থাকে প্রধানত প্রভাবিত করে, এমনকি নিয়ন্ত্রণও করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল প্রভাব ও উপস্থিতি অনস্বীকার্য। কারণ তাদের মুদ্রা এবং ক্ষমতাকে বিশ্বের সব দেশ বিশ্বের ‘রিজার্ভ কারেন্সি’ এবং ‘ক্ষমতার মোড়ল’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। অবশ্য এর সাথে তাদের সামরিক শক্তিকেও মনে রাখতে হবে।

এ বিষয়ে চমৎকার মন্তব্য করেছেন এক মার্কিন লেখক- ফেডারিকো পিয়ারসিনি। তিনি বলেছেন,‘মার্কিনিদের বিশ্ব মোড়লিপনার শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হলো তাদের মুদ্রা বা ডলার।’ তিনটি কারণে এই মুদ্রা (ডলার) বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। তা হলো (১) পেট্রোডলার, (২) বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি হওয়া এবং (৩) ১৯৭১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা।

পেট্রোডলার হিসেবে অভিহিত হওয়ার কারণ, তেল মূলত ডলারেই কেনাবেচা হয়। তাই বাজারে বেশির ভাগ ডলারের অবস্থান এ বাণিজ্যের কারণে হওয়ার জন্য নাম হলো পেট্রোডলার।

বিশ্বের মাত্র কয়েকটি দেশ ছাড়া সবাই তাদের সব বৈদেশিক বাণিজ্য, ডলারের মাধ্যমে করে থাকে এবং তারা দেশের রিজার্ভ হিসেবেও ডলারকে গ্রহণ করেছে।

১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঘোষণা করেন ‘দেশের মুদ্রার সমর্থনে (ব্যাকিং) কোনো স্বর্ণের প্রয়োজন পড়বে না। ডলার নিজেই রিজার্ভ হিসেবে অবস্থান করবে।’ এর দুই বছর পর (১৯৭৩), ওপেক (তেল রফতানিকারক ১৪টি দেশের সংস্থা), সৌদি আরব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেল শুধু ডলারে কেনাবেচা হবে বলে এক চুক্তিও করে। সৌদি আরবের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও পৃথক চুক্তিতে বিশ্বের এই বৃহত্তম তেল রফতানিকারক দেশকে বাধ্য করে এ ধরনের অপর একটি চুক্তি করতে। অসুন্ধানকারীরা বলেছেন,‘এর পেছনে ছিল এক গোপন সতর্কবাণী। তা হলো, এ চুক্তি স্বাক্ষর না করলে স্বাধীনতা থাকবে না, সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠিত হবে।’ তখন সৌদি আরবের পক্ষে অন্য মুদ্রা বা নিজের মুদ্রায় তেল কেনাবেচার পথ বন্ধ হলো। ফলে সৌদি আরবকে বিশাল পরিমাণের মার্কিন ট্রেজারি বিল কিনতে হলো। কারণ তাদের বিপুল পরিমাণের উদ্বৃত্ত ডলার বিনিয়োগের আর কোনো পথ খোলা ছিল না। ফলে রাতারাতি মার্কিন সরকারের তহবিলে জমা পড়ল বিশাল অঙ্কের ডলার। অন্য কথায় এভাবে ডলার ফিরে গেল নিজের দেশে।

ডলারকে চলমান শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে রাখার জন্য সৃষ্টি হলো ৪৪ সদস্যের বিশ্বের অর্থনৈতিক মোড়ল, যা আইএমএফ (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) নামে পরিচিত। এ সংস্থাও সৃষ্টি করে নিজস্ব মুদ্রা, যা এসডিআর (স্পেশাল ড্রইং রাইটস) বলে পরিচিত। চারটি মুদ্রা দিয়ে এটা গঠিত (ডলার, ইউরো, ইয়েন ও পাউন্ড), যার আকার হলো ২০৪ বিলিয়ন (২৮৩ বিলিয়ন ডলারের সমান)। প্রয়োজন অনুসারে সদস্যরাষ্ট্রগুলো ওই এসডিআরের সাহায্যে তাদের মুদ্রার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। তবে এখানেও ডলারের উপস্থিতি প্রবল।

মুদ্রার সমর্থনে সোনা মজুদের প্রয়োজনের নিয়মটি রহিত করার পর কাগুজে ডলার ছাপানোর আর কোনো বাধা রইল না। আগে যে কেউ ডলারকে রাখতে না চাইলে স্বর্ণে রূপান্তরিত করতে পারত। যেহেতু কত ডলার ছাপানো হলো তার জবাবদিহিতার প্রয়োজন থাকল না, আর বিশ্ব কারেন্সি রিজার্ভের অবস্থানে থাকায় জবাবদিহিতার বিষয়টি আর্থিক জগতে খানিকটা গৌণ হয়ে পড়ল।

এখন ৪৩ বছর পর এ অবস্থায় ফাটল ধরতে শুরু করেছে বলে বিশেষজ্ঞ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। ডলারের ওপর বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আস্থা শিথিল হয়ে পড়ছে। এই অবস্থা বিশ্লেষণের আগে আবার একটু পেছনে ফিরতে হবে। কারণ কোনো বিশ্বমানের মুদ্রার মৃত্যু হওয়ার জন্য একটু লম্বা সময়ের প্রয়োজন হয়। রাজনীতি, উৎপাদন, বিপণন প্রভৃতি এর সাথে জড়িত। যেমন বিংশ শতাব্দীতে এসে ব্রিটিশ পাউন্ডের পরিবর্তে ডলার আন্তর্জাতিক লেনদেনের বাহন হলো। কারণ তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে আর বাণিজ্য, উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে মার্কিনিরা নেতৃত্বে এসেছে। ১৯১৪ সালে এসে ব্রিটেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তখন পাউন্ডকে কেউ নিতে চাইত না। তখন শুধুই স্বর্ণের আদর ছিল। যুদ্ধাস্ত্র কিনতে ব্রিটেনকে স্বর্ণ দিতে হতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। ব্রিটেন মার্কিন ব্যাংকার রথচাইল্ড ও জ্যাক মরগানের কাছ থেকে বিরাট ধার নিতে বাধ্য হয় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য। (মরগান ইহুদি, আজকের বিশ্বের পাঁচজন ধনীর একজন, যারা বিশ্বের অর্ধেকের বেশি অর্থের অধিকারী)। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো-ইহুদি মার্কিন ব্যাংকাররা এই ধার দেয়ার শর্ত হিসেবে ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির দাবি করে এবং তা বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী রথচাইল্ডের সব সমর্থন ব্রিটেন পায়।

যেসব দেশ মার্কিনবিরোধী তারাও মার্কিন ডলার তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের বাহন হিসেবে ব্যবহার করত। একটি উদাহরণ দেয়া যায়। বলিভিয়া তাদের কলা নরওয়ের কাছে বিক্রি করে ডলারের মাধ্যমে। তখন নরওয়ের কাছে ডলার থাকতে হবে। না থাকলে, তাকে ধার করে এই মূল্য দিতে হবে। আবার বলিভিয়া যে ডলার আয় করল, তা দিয়ে তাদের সব কর্মকাণ্ডে ব্যয় করত। এভাবেই পেট্রোডলার বিশ্বমুদ্রায় পরিণত হয়। তবে এর মূলে ছিল সামরিক শক্তি।

রাশিয়া এবং চীন সর্বদাই এ মার্কিন মোড়লিপনার রাশ টানার চেষ্টা করেছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অফুরন্ত ডলার ব্যয় করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনতে পারে। ঋণ নিতে পারে (মার্কিন সরকারের বর্তমান ঋণ ২১ ট্রিলিয়ন ডলার বা ২১ লাখ কোটি ডলার)। তাদের এই ঋণের ভার নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। কারণ বিশ্বের সব দেশই ডলার চাইছে এবং ধার নিচ্ছে তাদের তথাকথিত বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার হিসেবেও সব আন্তর্জাতিক মূল্য দেয়ার জন্য। এর সাথে বিশ্বের নানা প্রতিষ্ঠান তাদের অর্থের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেও ডলারকে ব্যবহার করে। তবে স্মরণযোগ্য, ডলারের মূল শক্তি তেলের কেনাবেচার মাধ্যমে এবং এর সমর্থনে স্বর্ণের প্রয়োজন নেই বলে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে এবং সঙ্ঘাত সংঘটন বা নিবারণে এটা প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে।

ডলারের সমস্যা শুরু হয় ১৯৯০ সালের দিকে এক বিশাল সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে। তা হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে (যারা নিজেদের অসাধারণ ও ব্যতিক্রমী একসেপশনালিভাবে) সারা বিশ্বের মোড়ল করবে বলে ভাবা হয়েছিল এবং সে নিরিখে তখন কর্মকাণ্ড চলছিল। এমনকি চীন-রাশিয়াসহ সবাই ডলারের মাধ্যমে তাদের সব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল। চীনও বিশাল অঙ্কের অর্থাৎ ১.১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের। মার্কিন ট্রেজারি বিল কিনেছে তাদের নানা উৎপাদনের বুনিয়াদ হিসেবে। সাথে সাথে তারা কিনতে থাকল স্বর্ণ এবং গড়ে তুলল এক বিশাল ভাণ্ডার। চীন এখন ডলারের দ্বিতীয় আবাসস্থল। এ দিকে এই সুযোগকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করতে থাকল চীন-রাশিয়া-ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাববলয়কে সীমিত করার জন্য।

রাশিয়ায় পুতিনের আবির্ভাবের পরে তাদের অর্থনৈতিক চাকা ঘুরল। তারা সব ডলারনির্ভর ঋণ শোধ করল তাদের জমানো ডলার দিয়ে। ঋণমুক্ত হয়ে রাশিয়া ডলারনির্ভর সব চাপকে সরিয়ে ফেলল। এমনকি রাশিয়ার বন্দরগুলোতে কোনো লেনদেন ডলারে হবে না বলে আইন জারি করল। ইরানের জন্য এটা কোনো সমস্যাই হলো না। কারণ দেশটি আগে থেকেই অনুমোদনের (স্যাংকশন) আওতায় ছিল। তারা ডলারকে পাশ কাটিয়ে অন্য মুদ্রা ও দ্রব্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে বৈদেশিক লেনদেন করত।

এভাবে বিশ্ব রাজনৈতিক ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে ডলারের প্রভাবের বলয়কে সঙ্কুচিত করে চলেছে। যেমন ২০০৪ এর বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট, যুগোশ্লাভিয়ার ঘটনাবলি বা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানা সামরিক অভিযানে বিফল হয়। যেমন আফগানিস্তান, জর্জিয়া, ইরান, লিবিয়া, সিরিয়া, ডনবাস, উত্তর কোরিয়া, মিসর, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন ও ভেনিজুয়েলা সম্পূর্ণ দখল বা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। এ দেশগুলোতে অবিরাম নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্যও তাদের অভিযুক্ত করা হয়। ফলে বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। লিবিয়ার গাদ্দাফিকে প্রাণ দিতে হয়, যখন সে ডলারের প্রভাব থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

মার্কিন বিশ্বের প্রচারেও সত্য ঢাকা যাচ্ছিল না। এ দিকে এসব সঙ্ঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে শুরু করেছে। তারা ভাবছে এবং কিছু কিছু কর্মকাণ্ড শুরু করেছে ডলারের বলয়মুক্ত হতে।

এর ফলে কিছু অস্ত্রের দৌড় যে চলছে না তা নয়। এই জটিল অবস্থায় যে বাহনটি সব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল, তা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বলে গবেষকেরা বলছেন। তারা বলছেন, এই বাহনটি হলো ডলার, যা তেল বেচাকেনার বাহন। বিশ্বে প্রধান তেল আমদানিকারক চীন এবং রফতানিকারক প্রধান দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া, সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলা। এর মধ্যে ভেনিজুয়েলাতে আছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেলের রিজার্ভ। এখন রাশিয়া, চীন ও ভারতসহ প্রায় ২০টি দেশ তেল কেনাবেচার জন্য ডলারের সাথে অন্য মুদ্রা ব্যবহার শুরু করেছে। এর বহু কারণের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সুইফটস (সোসাইটি ফর দ্যা ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন যা ব্রাসেলসে ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়) সিস্টেমের মাধ্যমে ইরানসহ কয়েকটি দেশের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা জারি। তবে এই কর্মকাণ্ডের ফলে চীন এবং রাশিয়া স্বর্ণের খনি এবং স্বর্ণ আহরণ জোরদার করে। এ দুটি দেশ বরাবর বলে আসছিল, তারা কোনো মুদ্রা স্বর্ণসমর্থিত (ব্যাকিং) না হলে, তা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে। ঠিক এ সময়ে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ঘোষণা করে, তাদের স্বর্ণের ভাণ্ডার শূন্যের কোঠায় এবং তারা ডলারের পরিবর্তে স্বর্ণ দেবে না।

ডলার ছাপানোর কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় মার্কিন সরকার বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযানে বিশাল খরচ করে। গবেষকেরা বলছেন, শুধু ইরাক এবং আফগানিস্তানে দুই যুগব্যাপী সামরিক অভিযানে খরচ হয়েছে ছয় ট্রিলিয়ন ডলার। এর তুলনায় চীন ও রাশিয়ার অবস্থান পঞ্চম ও দশমে। অর্থাৎ অবাধ ডলার ব্যবহার সংঘর্ষ ও সঙ্ঘাতের কর্মকাণ্ড চালু রাখে। ডলারের ওপর শেষ ধাক্কা এসেছে ভেনিজুয়েলা থেকে। তারা ডলারে তেল বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের জমানো ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ চাইছে। তার সাথে যোগ দিয়েছে চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরান। বিপদে পড়েছে সৌদি আরব। কারণ সে ওয়াশিংটনের সাথে চুক্তিবদ্ধ রয়েছে শুধু ডলারে তেল বিক্রি করবে। চীন সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান তেলের ক্রেতা। চীন বলছে, তেলের মূল্য তাদের মুদ্রা অর্থাৎ ইউয়ানে দেবে। তা না গ্রহণ করলে তারা তেল নাইজেরিয়া-ভেনিজুয়েলা থেকে কিনবে এবং এর মধ্যে তাদের সাথে চুক্তিও করেছে।

এ দিকে, চীন বলছে তাদের মুদ্রার পরিবর্তে সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এক্সচেঞ্জ থেকে স্বর্ণ পাওয়া যাবে। এর মধ্যেই ইউয়ান দিয়ে চীন রাশিয়া থেকে গ্যাস কিনছে। উল্লেখযোগ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৭ সালে যখন ডলার সঙ্কট হয়, তখন তারা সুইস ফ্রাংক ঋণ নিয়ে ট্রেজারি বিল ছেড়েছিল। এমন ঘটনা আরো দুইবার ঘটে।

এখন চীন স্বর্ণসমর্থিত ইউয়ানে তেলের মূল্য নির্ধারণ করেছে। এটা ব্রেল্ট ও ডব্লিউটিআই পশ্চিম টেক্সাসের ইন্টারমিডিয়েট, যারা সাধারণত ৪০ বছর ধরে এ কাজটি করে আসছে। প্রতিপক্ষ বলা যায়। এখন প্রতিদিন ৪৫ মিলিয়ন (চার কোটি পঞ্চাশ লাখ) ব্যারেল তেল বিশ্বে কেনাবেচা হয়।

এর মধ্যে চীন কেনে আট মিলিয়ন (৮০ লাখ) ব্যারেল। তবে ‘বাজারের কেনাবেচা’ হিসেবে (যাকে ফিউচার ট্রেডিং বলা হয়) আরো বেশি। যেমন ডব্লিউটিআই (ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট) প্রতিদিন ১০ লাখ চুক্তি লেনদেন করে এবং ব্রেন্ট করে তার অর্র্ধেক। প্রতিটি চুক্তিতে থাকে এক হাজার ব্যারেল তেল। এ হিসাবে বিশ্বে প্রতিদিন ১৫০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কেনাবেচার চুক্তি হয়।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি হলো ১৬.২ এবং ১৬.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। পার্থক্য খুব সামান্য। অর্থাৎ চীন দ্বিতীয় বিশ্বশক্তি। ডেইলি রেকনিং লিয়াম হালিগান মন্তব্যে বলেছেন,‘পার্থক্যটি খুরের ধারের মতো। যেন আগামীকালকেরটা আজকেই।

সারা বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো গভীর মনোযোগের সাথে এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে এবং নানা ব্যবস্থাও নিচ্ছে। তিনটি প্রতিষ্ঠান আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড অরগানাইজেশনের সাথে শত শত প্রতিষ্ঠান আছে যারা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নজর রাখে। এরা নানাভাবে শঙ্কা প্রকাশ করছে, বিশ্ব অর্থব্যবস্থার আর একটি নতুন অবয়ব আসছে এবং তার সাথে নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন। এর চিত্র আঁকা এখনি সম্ভব নয়। তবে একটি বক্তব্য সবার মুখে মুখে। তা হলো-বিশ্ব কি এখন পেট্রোডলারের পরিবর্তে পেট্রোইউয়ানের জন্য প্রস্তুত?

সৌদিতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানঃ সর্ষের ভেতর ভূত!

mohd desperateyacht_mohd

সৌদি যুবরাজ ৪৫০ মিলিয়ন ডলারে কিনলেন এক ছবি!

vinci artসৌদি আরবকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে যাওয়া যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন। বিশেষত তার বাবার পর নিজের ক্ষমতা লাভের পথ সুগমের জন্য সৌদি প্রিন্স ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আটকের ঘটনায় তিনি বেশ সমালোচিত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।

তবে এবার খোদ সৌদি যুবরাজের বিরম্নদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি তিনি নাকি ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির একটি পেইন্টিং ক্রয় করেছেন। এই ক্রয়ে সৌদি প্রিন্স সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তবে তার এক কাজিন নাকি পেইন্টিংটি কেনার দায়িত্বে ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে ডেইলি পাকিস্তান।

mohd corruption

MBS ransomerdogan on mohd