Archive

Archive for the ‘অর্থনীতি’ Category

সালতামামি ২০১৬ – প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন

text-saltamami-%e0%a7%aa

2016-review-12016-review-22016-review-32016-review-4

বেকারত্বের জ্বালা মেটাতে চাইলে পড়ুন…

ডিসেম্বর 19, 2016 মন্তব্য দিন

unemployment-problem

এখনো ক্ষমা চায়নি পাকিস্তান !

ডিসেম্বর 17, 2016 মন্তব্য দিন

মির্জা মেহেদী তমাল : পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ৩২ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতার পর থেকে এই পাওনার বিষয়ে বার বার পাকিস্তানের কাছে দাবি উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ।

কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি দেশটির। অবশ্য শুধু টাকার এই অঙ্ক নয়, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত তিন ইস্যুর বিষয়েই কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম দাবি গণহত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, দ্বিতীয়টি ক্ষতিপূরণ এবং তৃতীয় দাবি, এ দেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেওয়া। কিন্তু দেশটি কৌশলে এ তিন ইস্যু এড়িয়ে গেছে। উল্টো তারা বাংলাদেশের কাছে ৭০০ কোটি টাকা পায় বলে দাবি করেছে। বাংলাদেশের এই পাওনা আদায়ে কমিশন গঠনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, বাংলাদেশ তার পাওনা বুঝে নেওয়ার খবরে পাকিস্তান নতুন করে ফন্দি আঁটছে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতা তুলে ধরতে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়াতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, শিগগিরই কূটনৈতিক তত্পরতা শুরু করবে বাংলাদেশ সরকার। এর আগে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালেও পাকিস্তান সরকারকে এ পাওনা পরিশোধ করতে বলেছিল। দ্বিতীয় দফা ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাকিস্তানের কাছে পাওনা আদায় নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যায়ে মৌখিকভাবে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচারকাজ নিয়ে তাদের অভিযোগের পর এ পাওনা আদায়ে আরও সক্রিয় হয়েছে সরকার। এদিকে স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা আদায় না করতে পারায় সরকারের প্রতি বিভিন্ন মহলের চাপ বাড়ছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট বলা আছে, একটি রাষ্ট্রের কাছে যদি আরেকটি রাষ্ট্র পাওনা থাকে তাহলে সে পাওনা দিতে ওই রাষ্ট্র বাধ্য। ফলে এ আইন ব্যবহার করেও দ্বিপক্ষীয়ভাবে বাংলাদেশ পাওনা আদায় করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২৪ বছরের অর্থনৈতিক বঞ্চনা পেরিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও বাংলাদেশের বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস ফুরায়নি এখনো। বাংলাদেশের সম্পত্তির হিস্যা বুঝিয়ে দেয়নি পাকিস্তান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৮ সালের মধ্যেই দাতা দেশগুলোকে সমস্ত ঋণ দিয়ে দেয় এই শর্তে যে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্পদের হিস্যা পাবে। আমরা তখন জনসংখ্যার দিক দিয়ে ৫৪ শতাংশ ছিলাম। সেই হিসাবে আমরা ৫৪ শতাংশ সম্পত্তি দাবি করতে পারি। ’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কমনওয়েলথ সম্মেলনে এটা উপস্থাপনের পর আজ পর্যন্ত এ দাবি আর কেউ তোলেনি। তবে নীতিগতভাবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটা তোলার সুযোগ এখনো আছে। তিনি বলেন, সরকারকে এখনই এ উদ্যোগ নিতে হবে। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে কমিশন গঠন করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করবে কমিশন। আর এটি নির্ধারণ করা হলে ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা সফরে এলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৪ হাজার মিলিয়ন ডলার পাওনা দাবি করেন। তখন ডলারের মূল্য ছিল ৮ টাকা। ৪৪ বছরে যা দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকায়। এর মানে, পাকিস্তানের কাছে আমাদের এখনকার পাওনা ৪০ হাজার মিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে ৩২ হাজার কোটি। এ ছাড়া দেশিবিদেশি বেশকিছু গবেষণাপত্রের হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের কাছে তৎকালীন হিসাবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া পাকিস্তানের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা, জাতিসংঘের হিসাবে যা ১.২ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরগুনা, ভোলাসহ দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় গোর্কি নামের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা যায়। নষ্ট হয় শত কোটি টাকার সম্পদ। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তখন কোনো সহায়তা দেয়নি পূর্ব পাকিস্তানকে। ঘূর্ণিঝড়ের পর পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য আসে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিদেশি মুদ্রাগুলো তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকার শাখায় রক্ষিত ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে বৈদেশিক মুদ্রাগুলো স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের লাহোর শাখায় স্থানান্তর করা হয়। এই অর্থ সরাসরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জোর দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পাকিস্তানের দাবি করা পাওনা টাকার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশকে তার দাবি উপস্থাপনে আরও তত্পর হতে হবে।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর সর্বপ্রথম ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের কাছে তিনটি দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবি জানানো হয় বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার। ১৯৮১ সালে জাতিসংঘের ঘোষিত ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে কম সময়ে বেশি গণহত্যা করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ঢাকা সফরে এসে একাত্তরকে তৎকালীন সময়ের একটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীল ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেন। তবে ২০০২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ঢাকায় এসে ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে গণহত্যার দায় স্বীকার করেননি তিনি। অবশ্য পাকিস্তানের সরকার ক্ষমা না চাইলেও ২০০২ সালে পাকিস্তানের নাগরিক সমাজের ৫১টি সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশের কাছে আরও আগেই ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। সূত্র জানায়, পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের আরেকটি দাবি আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেওয়ার। ২০০৬ সালে জাতিসংঘে শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) সমীক্ষা অনুযায়ী সে সময় বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানির সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার। গত চার দশকের মধ্যে নওয়াজ শরিফের সরকার সৌদি আরবভিত্তিক জামাতুদদাওয়ার অর্থায়নের মাধ্যমে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানিদের নিজ দেশে পুনর্বাসন করার জন্য নওয়াজ শরিফের সরকার একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, যেখানে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আটটি জেলায় ১০ মিলিয়ন রুপি ব্যয়ে ৫ হাজার ইউনিটের একটি আবাসন প্রকল্প তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু জামাতুদদাওয়া অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ার পর আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেওয়াও থেমে যায়। যদিও এর আগেই পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধুর জনগণ বিহারিদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বিরোধিতা করে। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে লাহোর হাইকোর্ট এক ঘোষণায় বলে, বাংলাদেশে যেসব পাকিস্তানি বসবাস করছে তারা বাংলাদেশের নাগরিক।

সূত্রমতে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বিশেষ করে সিমলা চুক্তির পর পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ নিয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন। অনেকটা গুছিয়েও এনেছিলেন। তার সময়েই পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কূটনৈতিক দূরদর্শিতাতেই ১৯৭৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। কিন্তু ’৭৫ সালে তাকে সপরিবারে হত্যার পর এগুলো আর তেমনভাবে এগিয়ে যায়নি। শুরুর দিকে পাকিস্তান এ বিষয়গুলো স্বীকার করলেও পরে আলোচনায় আর আগ্রহ দেখায়নি।

কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ অনুসারে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে ক্ষমতা আরোহণের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে শুভেচ্ছা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত। ওই সময় জিয়া এম ইস্পাহানিকে বাংলাদেশের তিন দাবির কথা স্পষ্টই জানিয়ে দেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সে বছর একই কথা জানানো হয় ঢাকার পাকিস্তানের হাইকমিশনার আলমগীর বাশার খান বাবরের কাছে। পরের বছর ২০১০ সালে ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র সচিবদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বাংলাদেশের দাবির কথা পুনরায় উল্লেখ করা হয়। আর সর্বশেষ ২০১১ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের নতুন হাইকমিশনার আফরাসিয়াব মেহদি হাশমির কাছেও পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়। পরে ২০১২ সালে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার ঢাকায় এলে বাংলাদেশের দাবির কথা জানানো হয়। তখন হিনা রাব্বানি একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর আর তেমন আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ শুরু করে পাকিস্তান। শুরু হয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উত্তেজনা।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬

pak-admission-of-war-crimes

মধ্যপ্রাচ্যের পুরাকীর্তি ও নারীরা যেভাবে পাচার হচ্ছে

ডিসেম্বর 10, 2016 মন্তব্য দিন

yazidi-womenমক্কা ও মদিনায় পবিত্র দুই মসজিদের খাদেম ( কাস্টডিয়ান) হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে সৌদি আরব। পবিত্র মসজিদের খতিব মাঝে মধ্যেই বিশ্বের মুসলমানদের উদ্দেশ্যে খুৎবায় বাণী দিয়ে থাকেন। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন বা ওআইসির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সৌদি আরবের একজন স্বনামধন্য নাগরিক। এরপরও সৌদি আরব মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সৌদি আরবের মত অন্যান্য আরব দেশগুলো এ ব্যাপারে নিশ্চুপ।

কিন্তু কেন? এর সহজ উত্তর হচ্ছে সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনে মুসলিম হত্যাযজ্ঞে আইএস জঙ্গিদের পেছনে অস্ত্র ও অর্থ দানে নিজেরাই জড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে অথবা রাজতন্ত্র বহাল রাখার খায়েশে দোর্দপ্রতাপ থাকা সত্ত্বেও একদিকে বিলাসবহুল জীবন যাপন ও গণতন্ত্রবিহীন স্বচ্ছতা ও জবাদিহীতার অভাবে যে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা জেঁকে বসেছে তার ফলেই রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের মত ঘটনায় এসব আরব দেশ কোনো উদ্যোগই নিতে পারছে না। এমনকি মিয়ানমারের সামরিক শাসক ও তল্পিবাহক সুচি সরকারের মত একই অবস্থা বিরাজ করছে আরব দেশগুলোর মধ্যে। ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তি দেশগুলোর কোনো ইচ্ছার বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো বিন্দুমাত্র কোনো উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতা নেই। উপরন্তু বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনে আরব দেশগুলো বাহরাইন, ইয়েমেনে নিজেদের পছন্দসই সরকার রক্ষার জন্যে জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই প্রভাব সৃষ্টি ছাড়াও আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।

এমনি এক সময় মিসরের সামরিক শাসক ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল আব্দেল আল সিসি বলেছেন, তার দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের মতপার্থক্যই মধ্যপ্রাচ্যের মূল সংকটের কারণ। সে থাক, কিভাবে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠী আরব শেখদের অস্ত্র ও অর্থের বিনিময়ে প্রতিদান দিচ্ছে তা জানলে আপনার শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠবে। ইয়াজিদি নারীদের দাস হিসেবে সৌদি আরবে বিক্রির মাধ্যমে উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিচ্ছে আইএস জঙ্গিরা। যাদের এর আগে তারা পাঠিয়েছে অন্যান্য দেশেও। পশ্চিমা মিডিয়ার একাধিক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ইয়াজিদি নারী ছাড়াও চুরি করে ইরাকের তেল বিক্রির পাশাপাশি দেশটি থেকে ঐতিহাসিক ও প্রাচীন নিদর্শন বস্তু যেভাবে চোরাচালানের মাধ্যমে কালোবাজারে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়েছিল তা এখন হচ্ছে সিরিয়া ও ইয়েমেনে।

বিশ্বের কাছে এটা এখন জলের মত পরিস্কার হয়ে গেছে যে সৌদি আরব ও কাতারসহ বেশ কয়েকটি আরবদেশ আইএস জঙ্গিদের অস্ত্র ও অর্থায়ন করে আসছে। কাতার ইতিমধ্যে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যদি সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেও নেয় তবুও দেশটি সেখানে বিদ্রোহীদের সহায়তা অব্যাহত রাখবে। দুই বছর আগে ২০১৪ সালে উইকিলিকস যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ক্যাম্পেইন ম্যানেজার জন পোডেস্টার কাছে পাঠানো একটি ইমেইলের বিষয়বস্তু ফাঁস করে দিয়ে বলেছে, সৌদি আরব ও কাতার সরকার আইএস জঙ্গিদের গোপনে অর্থ ও অন্যান্য কৌশলগত উপকরণ সাহায্য দিচ্ছে। তবে এ দুটি মুসলিম দেশের কোন কোন শেখ এধরনের সহায়তা দানের সঙ্গে জড়িত তা ওই ইমেইলে বলা হয়নি।

এধরনের তহবিল আরব দেশগুলো দেয়ার ফলেই আইএস জঙ্গিরা তা সন্ত্রাস, নারী ধর্ষণ ও ঘৃণ্য অপরাধে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে আসছে। একই সঙ্গে আইএস জঙ্গিরা ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে যে ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে শুরু করে যাদুঘরগুলো ধ্বংস করে আসছে এবং সেখান থেকে ঐতিহাসিক মিনার, প্রাচীন ও পুরাকালের নিদর্শনগুলো লুটপাট করে কালোবাজারে বিক্রি করছে। এসব পণ্যের বড় ক্রেতা হচ্ছে ইউরোপ। তুরস্ক ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেও আইএস জঙ্গিরা পুরাকীর্তি লুট করে পাচার করছে।

সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকা দি গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সুইস কর্তৃপক্ষ কিছুদিন আগে সিরিয়ার প্রাচীন নগরী পালমিরা, লিবিয়া, ইয়েমেন থেকে পাচারকৃত পুরাকীর্তির একটি বড় ধরনের চালান জেনেভার মুক্ত বন্দর থেকে উদ্ধার করেছে।

ফরেন পলিসি সাময়িকীতে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রান্সিস তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার লোভি ও অনৈতিক পুরাকীর্তি সংগ্রাহকরা আইএস জঙ্গিদের কাছ থেকে এসব পণ্য কালোবাজারে কিনে নিচ্ছে। তুরস্কের একটি মাফিয়া গোষ্ঠী কিলিস ও উরফা শহরকে দীর্ঘদিন ধরে পালমিরা থেকে চুরিকৃত এসব পুরাকীর্তি পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। এর আগে ইরাক আগ্রাসনে বাগদাদ যাদুঘর থেকে ১৫ হাজার পুরাকীর্তি চুরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে এসব চুরিকৃত পুরাকীর্তির মাত্র ২৫ ভাগ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

বিশ্বের প্রত্নতাত্ত্বিকরা আশঙ্কা করে বলেছেন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে এধরনের পুরাকীর্তি যেভাবে লুঠতরাজ হচ্ছে, বেহাত হয়ে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে আইএস জঙ্গিদের হাত দিয়ে, শুধু দামাস্কাস ও হোম থেকে পাচারকৃত পুরাকীর্তির মূল্য হবে ৩৬ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু আসলে এর মূল্য আরো বেশি কারণ কালোবাজারে চুরির মাল হিসেবেই এগুলো বিক্রি হচ্ছে ঐতিহাসিক মূল্য বিবেচনা করে নয়। আর হলেও সে মূল্য তালিকা অজানা থেকেই যাচ্ছে।

অবাক হওয়ার ব্যাপার যে আইএস জঙ্গিদের সন্ত্রাস শুরু হওয়ার পর তুরস্ক, ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেলেও পণ্য আনা নেওয়ার পরিমাণ তুরস্কের সঙ্গে এসব দেশের বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ধারণা করা খুবই সহজ যে কালোবাজারের ডিলাররা ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের মাধ্যমেও পুরাকীর্তি পাচার জায়েজ করে নিয়েছে। প্রথমে সিরিয়া থেকে পুরাকীর্তি পাচার শুরু হলেও পরে তা নিরাপদ মনে না করে অন্যান্য পথ ধরা হয় যেখানে পাচারকারীরা আইএস জঙ্গিদের নিয়মিত কর দিয়ে থাকে।

যাহোক, আরব ও পারস্য উপসাগরের শেখদের কাছে আইএস জঙ্গিরা অর্থ ও অস্ত্র পাওয়ার বিনিময়ে শুধু পুরাকীর্তি ঋণ শোধ হিসেবে পাঠাচ্ছে তা নয়। ইরাকের মসুল শহরের দক্ষিণে একটি ভিডিও উদ্ধারের পর দেখা গেছে সৌদি আরবে ইয়াজিদি নারীদের দাস হিসেবে বিক্রির ব্যবসা জমাজমাট হয়ে উঠেছে। একজন আইএস জঙ্গিকে হত্যার পর তার সেল ফোন থেকে ওই ভিডিও উদ্ধার করা হয়। ২০১৪ সালে মসুলে আইএস জঙ্গিরা হাজার হাজার ইয়াজিদি নারীকে অপহরণ করে। তাদের অনেককে ধর্ষণ করে জঙ্গিরা, বিক্রি করে ফাল্লুজায় এমনকি সিরিয়ায়। কিন্তু পরিস্থিতি সঙ্গীন হয়ে উঠায় এখন সৌদি আরবে অপহৃত ইয়াজিদি নারীদের চালান যাচ্ছে।

ব্রিটিশ পত্রিকা দি সান ইয়াজিদি নারীদের দুর্দশা নিয়ে এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে আইএস জঙ্গিদের কাছে সৌদি আরবের অস্ত্র ও অর্থ সাহায্যের কড়া সমালোচনা করা হয়। যদিও লন্ডন এখনো আইএস জঙ্গিদের পক্ষেই অবস্থান নিয়ে আছে এবং সিরিয়া ও রাশিয়ার মিলিত আক্রমণে আইএস জঙ্গিরা পিছু হটে নরকে অবস্থান নিচ্ছে। এই যখন অবস্থা তখন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞে আরব দেশগুলোর নজর দেয়ার সময় কি আদৌ আছে?

সূত্রঃ আমাদের সময়, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

মূল শিরোণামঃ রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞে যে কারণে নিশ্চুপ আরব দেশগুলো

রুপার্ড মারডক সাম্রাজ্যে কর্মী ছাটাই !

ডিসেম্বর 8, 2016 মন্তব্য দিন

আয় কমায় কর্মী বিদেয় করছে নিউজ করপোরেশন অস্ট্রেলিয়া

news-limited-newspapersএকটি প্রতিষ্ঠানের দুজন কর্মী। একজন ছবি তুলতে পারেন, সংবাদ লিখতে পারেন, আবার নির্ভুলভাবে সম্পাদনা করে সেটি প্রাযুক্তিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ বা প্রচার করার ব্যবস্থা করতে পারেন। আরেকজন কেবল ছবি তুলতে পারেন, অথবা কেবল লিখতে পারেন, কিংবা কেবল সেটি নির্ভুলভাবে সম্পাদনা করতে পারেন, অথবা প্রকাশের মতো করে এনে দিলে কেবল প্রাযুক্তিক প্রক্রিয়ায় সেটি প্রকাশ করতে পারেন।

যেহেতু প্রথমজন ছবিও তুলতে পারছেন, লিখতেও পারছেন, নির্ভুলভাবে সম্পাদনাও করতে পারছেন এবং প্রাযুক্তিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে ফেলতে পারছেন, অপরদিকে দ্বিতীয় জন কেবল ছবি তুলতে পারছেন, অথবা কেবল লিখতে পারছেন, কিংবা কেবল সম্পাদনা করতে পারছেন অথবা কেবল প্রাযুক্তিক প্রক্রিয়ায় প্রকাশ করতে পারছেন, সেহেতু প্রথমজনকে মাল্টিটাস্কার বা সকল কাজের কাজী বিবেচনা করে দ্বিতীয়জনকে অপ্রয়োজনীয় বোঝা হিসেবে দেখার চর্চা শুরু হয়েছে উন্নত দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এই চর্চারই অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় মিডিয়া গোষ্ঠী নিউজ করপোরেশন অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ৪২ সাংবাদিক, চিত্রকর ও চিত্রগ্রাহককে অপ্রয়োজনীয় চিহ্নিত করে নিজেদের পথ খুঁজতে বলেছে।

অস্ট্রেলিয়ানআমেরিকান মিডিয়া মুঘল রপার্ট মারডকের এ মিডিয়া গোষ্ঠীর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে দ্য অস্ট্রেলিয়ান, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, দ্য হেরাল্ড সান ও দ্য কুরিয়ার মেইল। এই চারটি প্রতিষ্ঠানেরই ওই ৪২ কর্মীকে স্বেচ্ছায় বিদায় (প্রাপ্য আর্থিক সুবিধাদিসহ) নেওয়ার কথা বলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ফুলটাইম কর্মরত এই কর্মীরা চলে গেলে প্রতিষ্ঠানের খরচ অনেকাংশে কমে যাবে।

নতুন করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কেনায় নিউজ করপোরেশন অর্থ ব্যবস্থাপনায় খানিকটা টানাপোড়েনে পড়ে গেছে। এরমধ্যে গত নভেম্বরে প্রকাশিত তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নিউজ করপোরেশন অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞাপনী আয় ১১ শতাংশ পড়ে গেছে। এই আয় পতনে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে খরচ কমানোর চাপ আসছে। খরচ কমানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪০ মিলিয়ন (৪ কোটি) ডলার। অবশ্য কেবল এবারই খরচ কমানোর লক্ষ্যে অপ্রয়োজনীয় লোকদের সরাচ্ছে না নিউজ করপোরেশন। গতবছর ক্রিসমাসের আগে ৫৫ কর্মীকে অপ্রয়োজনীয় চিহ্নিত করে বিদায় দেওয়ার লক্ষ্য নেয় তারা। তার আগের বছর মিডিয়া গোষ্ঠীটি জানায়, ২০১২১৩ অর্থবছরে তাদের ১ হাজার কর্মী বিদায় নিয়ে গেছেন। নিউজ করপোরেশন বলেছে, যদি প্রতিষ্ঠানগুলো ৪২ অপ্রয়োজনীয় কর্মীকে স্বেচ্ছায় বিদায় দিতে অসমর্থ হয়, তবে তাদের বিদায়ে বাধ্য করা হবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমকর্মীদের সংগঠন মিডিয়া, এন্টারটেইনমেন্ট ও আর্টস অ্যালায়েন্স। তারা বলেছে, নিউজ করপোরেশন মাথাপিছু ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের কাটছাঁট করার পর ফুলটাইম পজিশনের ৪২ কর্মীকে বিদায় নেওয়ার পথ খুঁজছে। অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, নিউজ করপোরেশন তাদের বলেছে, এই ৪২ কর্মীর মধ্যে কয়েকজন কর্মী প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতা বুঝে আগেই স্বেচ্ছা বিদায়ের (প্রাপ্য আর্থিক সুবিধাদিসহ) জন্য নাম লিখিয়েছিলেন, এখন সে কজনসহ অন্যদেরও এ সুযোগটা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেউ না মানলে প্রতিষ্ঠানেরই স্বার্থে ওই কর্মীদের বিদায়ে বাধ্য করা হবে।

কৃষিতে নীরব বিপ্লব ঘটেছে বাংলাদেশে !

ডিসেম্বর 5, 2016 মন্তব্য দিন

চাল, মাছ ও ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়

paddy-harvesting-sunamganjতানভীর আহমেদ : স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যত অর্জন আছে, তার মধ্যে কৃষিতে অর্জন উল্লেখ করার মতো। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সঙ্গে দিন দিন কমছে আবাদযোগ্য জমি। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা উৎপাদনে বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। আর তা সম্ভব হয়েছে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নীতি ও বিনিয়োগের কারণে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের সুপ্রসারিত কৃষিনীতিতে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাণিজ্যিক কৃষি উন্নয়ন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং উন্নয়নসহ কৃষির আধুনিকীকরণ, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও স¤প্রসারণে গবেষণা সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া। অপরদিকে কৃষি জমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয় আর চাল ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম।

বর্তমান সরকারের পরপর দুই মেয়াদে চার দফায় সারের দাম কমানো হয়। ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, সেচের পানির ভর্তুকির টাকা সরাসরি কৃষকের একাউন্টে ট্রান্সফার করা হয় এবং সেই সঙ্গে ১ কোটি ৮২ লাখ কৃষকের মাঝে উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। যুগান্তকারী এসব পদক্ষেপের ফলে কৃষিতে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন তিন গুনেরও বেশি, গম দ্বিগুন, সবজি পাঁচ গুন এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১০ গুন। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। সরকারের যুগোপোযোগী পরিকল্পনা, পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষি বিজ্ঞানী ও স¤প্রসারণবিদদের যৌথ প্রয়াসেই এ সাফল্য।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. সেকেন্দার আলী ভোরের কাগজকে বলেন, কৃষক, কৃষিবিদ, কৃষি মন্ত্রণালয় ও সরকারের বাস্তব পদক্ষেপের ফলে দেশের কৃষি ক্ষেত্রে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছে। নতুন নতুন জাতের কৃষিবীজ উৎপাদনের ফলে পরনির্ভরশীলতা কমেছে আমাদের। আধুনিক পদ্ধতি ও যন্ত্রাংশ ব্যবহারও দেশের কৃষি বিপ্লবের অন্যতম কারণ। কৃষিক্ষেত্রে বর্তমানের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লব বিশ্বের মডেল হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোশারক হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ জন্য কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় বর্তমান সরকার। এরই অংশ হিসেবে সরকার কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নেয় এবং তা স্বল্পসময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করে। এছাড়া উন্নতমানের বীজ ব্যবহার করে কীভাবে বেশি উৎপাদন করা যায় সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।

চাল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে বাংলাদেশ : আমন, আউশ ও বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলনে বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। কৃষির এ সাফল্য সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বে গড় উৎপাদনশীলতা প্রায় তিন টন। আর বাংলাদেশে তা ৪ দশমিক ১৫ টন। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কায় চাল রপ্তানি শুরু করে সরকার। দুই দফায় প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রপ্তানি করা হয়। এছাড়া গত বছর ভয়াবহ ভূমিকম্পকবলিত নেপালে ১০ হাজার টন চাল সাহায্য হিসেবে পাঠানো হয়। এটা দেশের চাল উৎপাদনের সামর্থ্যরেই বহিঃপ্রকাশ।

সবজি উৎপাদনে তৃতীয় : দেশে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটে গেছে গত এক যুগে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। এক সময় দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের যশোরেই কেবল সবজির চাষ হতো। এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই সবজির চাষ হচ্ছে। এখন দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, এ কৃষক পরিবারগুলোর প্রায় সবাই কমবেশি সবজি চাষ করেন।

জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়ারবুকতথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হারে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে বাংলাদেশে, বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। পাশাপাশি একই সময়ে সবজির মোট উৎপাদন বৃদ্ধির বার্ষিক হারের দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে ২০ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক সবজি খাওয়া বা ভোগের পরিমাণ ছিল ৪২ গ্রাম।

মাছ ও ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ বাংলাদেশ : মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ। এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। জাটকা সংরক্ষণসহ নানা উদ্যোগের ফলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ৫২ হাজার টন বেড়ে সাড়ে তিন লাখ টন হয়েছে। মাছের দাম সাধারণ ক্রেতার সামর্থ্যরে মধ্যে থাকায় গত ১০ বছরে দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ শতভাগ বেড়েছে। অপরদিকে ছাগল উৎপাদনেও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে পঞ্চম। বাংলাদেশের ব্লুাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিশ্বের সেরা জাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

ফল উৎপাদন : বিভিন্ন ধরনের ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০০৬০৭ অর্থবছরে দেশে আমের উৎপাদন ছিল ৭ লাখ ৮১ হাজার টন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে ৫০ প্রজাতির ফল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদনে বিস্ময়কর সাফল্যই কেবল নয়, আলু এখন দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসলও। এফএওর স¤প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৮২ লাখ ১০ হাজার টন আলু উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে অষ্টম স্থানে। কিছুদিন আগেও যেখানে বিশ্বের ২০টি দেশ থেকে বাংলাদেশকে আলু আমদানি করতে হতো। গত বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের আলু রপ্তানি হয়েছে।

ফসলের জাত উদ্ভাবন : ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা মোট ১৩টি প্রতিক‚ল পরিবেশে সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম জেনেটিকেলি মোডিফাইড ফসল বিটি বেগুনের চারটি জাত অবমুক্ত করে। যার মধ্যে বেগুনের প্রধান শত্রু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী জিন প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মাধ্যমে আলুর নাবি ধসা রোগের প্রতিরোধী জিন প্রতিস্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।

তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ইকৃষি : গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ইকৃষি খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার জানালা। কৃষি তথ্য সার্ভিস দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে ২৪৫টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র (এআইসিসি) স্থাপন করেছে। এছাড়া ২৫৪টি উপজেলার ২৫৪টি আইপিএম/ আইসিএম কৃষক ক্লাবকে এআইসিসিতে রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষি তথ্যকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনলাইনে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে মুঠোফোনের জোয়ারে ভাসছে এদেশ। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ১৬১২৩ নম্বরে যে কোনো মোবাইল থেকে ফোন করে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য বিষয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট অফলাইন/অনলাইনে সার সুপারিশ নির্দেশিকা প্রদান করছে। আখ চাষিরা মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে ইপুঁজিসেবা গ্রহণ করছেন। এমনকি ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেশবিদেশের কৃষি তথ্যসেবা পাওয়া যাচ্ছে।

পুষ্টিতে বাঙালি : এক সময় বলা হতো ‘দুধে ভাতে বাঙালি’ কিংবা বলা হতো ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। বর্তমান সরকার তার সুপ্রসারিত কৃষি নীতিতে শুধু দুধে ভাতে বা মাছে ভাতে সীমিত নয়, পুষ্টিতে বাঙালি হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত হতে চায়। সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ অনুয়ায়ী ২০১৩ সালের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও বর্তমান জনগণবান্ধব সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

এফএও স্বীকৃতি : দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বিশ্বের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে। এফএওর জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষির অভিযোজনবিষয়ক প্রতিবেদন বলেছে, আগামী দিনগুলোয় বিশ্বের যে দেশগুলোতে খাদ্য উৎপাদন বাড়তে পারে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও এরই মধ্যে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে।

একটি বাড়ি একটি খামার : অর্থনৈতিক উন্নয়নে পল্লী অঞ্চলে নতুন ধারা চালু করার লক্ষ্যে এক হাজার একশ ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প শুরু করে সরকার। প্রকল্পটি চালু থাকবে আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত। সমন্বিত গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িকে অর্থনৈতিক কার্যাবলীর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলাই হচ্ছে এই প্রকল্পের লক্ষ্য। দেশের ৬৪ জেলার চারশ ৯০ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

সূত্রঃ দৈনিক ভোরের কাগজ, ৫ ডিসেম্বর ২০১৬

কবুতর পালন করে ভাগ্য ফিরিয়েছে গ্রামের নারীরা…

ডিসেম্বর 1, 2016 মন্তব্য দিন

women-rearing-pigeons