আর্কাইভ

Archive for the ‘অপরাধ’ Category

ঢাকা’র এপোলো হাসপাতালে এক ভুক্তভোগী’র তিক্ত অভিজ্ঞতা

apollo hospital dhakaভবিষ্যতে কেউ যদি ঢাকা এপোলো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন তাহলে দয়া করে একটু ভেবেচিন্তে আসবেন। এই হাসপাতাল হাসপাতাল না, এটা চিকিৎসার নামে একটা সম্পূর্ণ অনৈতিক, বাণিজ্যিক ধান্দা বাজির একটা বিশাল দালান।

আমার স্ত্রীকে ভুল তথ্য দিয়ে, ভয় পাইয়ে দিয়ে তারা আমার সম্পূর্ণ সুস্থ শিশুকে এক মাস আগে জন্ম দেয়ালো কোনো কারণ ছাড়াই। বলল বাচ্চার ওজন অনেক বেশি, আর আগে জন্ম হলে তাদের জন্য ম্যানেজ করা সহজ হবে। জন্মের পর দেখা গেল বাচ্চার ওজন অনেক কম এবং তাকে ইনকিউবেটরে রাখতে হবে। পরে বুঝলাম “ম্যানেজ” মানে হল শুধু মাত্র বিল বাড়ানোর জন্য আমাদেরকে আগে বাচ্চা জন্ম দেয়ালো।

একদিনের ভুমিষ্ট বাচ্চাকে এন্টিবায়োটিক, অক্সিজেন ইত্যাদি দিয়ে এক ভীতিকর অবস্থার সৃস্টি করল, বলল ইনফেকশন হতে পারে, ব্লাড কালচারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৭২ ঘণ্টা, পুরা সময় বাচ্চা ইন্টেন্সিভ কেয়ারে থাকবে। ৭২ ঘন্টা পর রিপোর্ট আসলো কোনো ইনফেকশন নাই। কেন একদিনের বাচ্চাকে ইঞ্জেকশন দিয়ে তিনদিন আইসিঊ তে রাখা হল? কোনো উত্তর নাই। ফাইল দেখতে চাইলে বলল রিলিজের আগে দেখানোর নিয়ম নাই। পুরো নাটকটি তাদের সাজানো।

তারাই প্রথমে আমাদেরকে আগাম ডেলিভারী দিতে বাধ্য করল এই বলে বাচ্চার ওজন অতিরিক্ত, যাতে করে কিছু পয়সা অতিরিক্ত খসাতে পারে। কেনো তারা একটা বাচ্চার জীবন বিষিয়ে তুলে এই কাজটা করল? একবার ভাবলাম আমি ভুল করছি। পরে মেটারনীটি ডিপার্টমেন্টে দেখলাম তারা এই কাজ শতকরা ৬০% রোগীকে করাচ্ছে। যেই ডিপার্টমেন্ট সবচেয়ে হাসি খুশির জায়গা হওয়ার কথা সেখানে বিরাজ করছে এক ভীতিকর পরিস্থিতি। প্রত্যেক নতুন বাবা মার চোখে ব্যপক আতংক।

অন্য একজনের সাথে পরিচিত হলাম, বল্লেন তার ভাইকে অস্ত্রপচার করতে প্রাথমিক ভাবে অসফল হয় হাসপাতাল, পরে ভুল স্বীকার করে আবার করে। কিন্তু বিল ঠিকই ডাবল করছে। এখানে এমনও অভিযোগ আছে মৃত রোগি আনলে তারা তাকে দুইদিন ইন্টেন্সিভ কেয়ারে রেখে দেয়, এবং এর প্রমানও পাওয়া গেছে। পরে একটু অনুসন্ধান করতে বার্ষিক রিটার্ণ দেখলাম, চক্ষু চড়ক গাছ। তারা ২০১১ সালেই মুনাফা করে ২৬ কোটি টাকা! আয়ের শতকরা ৪০% আসে গাইনি ও অবস্ট্রেট্রিকস ডিপার্টমেন্ট থেকে!

সুতরাং উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার এপোলো হাসপাতালে যারা আসবেন তারা দয়া করে ভেবেচিন্তে আসবেন। এই কসাইখানা ব্যবসা চট্টগ্রামে যাওয়ার পায়তারা করছে এবং স্বল্প মূল্যে সিডিএ থেকে জমিও কিনেছে মানবিক প্রতিষ্ঠান নাম করে। এই এপোলো হাসপাতাল হল ব্যবসায়ী এম পি টিপু মুন্সি, শান্তা গ্রুপের মালিক, আর লংকা বাংলা ফাইনান্সের যৌথ প্রযোজনার এক ধান্দা বাজির দোকান যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম এস টি এস হোল্ডিং লিঃ তারা ভারতের তৃতীয় শ্রেনীর কিছু ডাক্তার এপোলো গ্রুপের সাথে যৌথ চুক্তির আওতায় এনে জনগণের সাথে ভাওতাবাজির এক ব্যাপক আয়োজন করেছে।

ভারতে এই ডাক্তারগুলোকে কেউ চেনা দুরে থাক চাকরি ও দেবে না। দূর্ভাগ্যের বিষয়,এই ব্যপক লূটতরাজ দেখার, নিয়ন্ত্রন করার সংস্থা (বিএমডিসি, ডীজি হেলথ) একেবারই নিস্ক্রিয়। তাই ঢাকা এপোলো হাসপাতালে আসার আগে সুচিন্তিত স্বিদ্ধান্ত নিন।

Advertisements

পদ্মাবতী বিতর্ক: শিল্পের স্বাধীনতায় উগ্রবাদীদের হামলা

Padmavati_movie 2017চিন্ময় মুৎসুদ্দী: পদ্মাবতী নিয়ে ভারতের উগ্রবাদীদের কর্মকা- শিল্পের স্বাধীনতায় নয়া হস্তক্ষেপ। তুচ্ছ বিষয়কে সামনে এনে তারা তুলকালাম বাধিয়েছে শ্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। তবে পদ্মাবতী নিয়ে সর্বশেষ সুসংবাদ হলো সিনেমাটি নিষিদ্ধের আবেদন তৃতীয় বারের মতো খারিজ করে দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আর দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে বলেছেন, ‘এর নাক কাটব, ওর মুণ্ডু কাটব, এ জন্য পুরস্কার দেব, গণতন্ত্রে এসব বরদাশত করা হয় না। দেশের আইন এভাবে কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।’

ছবিটি মুক্তির ব্যাপারে বাধা দেওয়া আর ছবির পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যান্ড টিভি ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইএফটিডিএ) ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে ১৫ মিনিটের ব্ল্যাক আউট কর্মসূচি পালন করে। চলচ্চিত্র এবং দূরদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ২০টি সংস্থা ওই দিন বিকেল সোয়া ৪টা থেকে ১৫ মিনিট চলচ্চিত্র ও টিভি সংক্রান্ত সব ধরনের কাজ করা থেকে বিরত থাকে। ২৮ নভেম্বর কলকাতার টালিগঞ্জের ছবিপাড়ায় ১৫ মিনিটের জন্য প্রতীকী ধর্মঘট পালন করা হয় ফেডারেশন অব সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কারস অব ইস্টার্ন ইন্ডিয়া এবং ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে।

এর আগে হরিয়ানা রাজ্যের বিজেপি নেতা সুরুজ পাল আমু পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাক কেটে নেওয়ার হুমকি দেন। মমতা পশ্চিমবঙ্গে চলচ্চিত্রটিকে স্বাগত জানিয়ে এর প্রিমিয়ার কলকাতায় করার প্রস্তাব দেন। মমতার প্রস্তাবটি আসে গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই ছবির মুক্তির ওপর রাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরিপ্রেক্ষিতে। ওইসব রাজ্যে উগ্রবাদীরা মিছিল সমাবেশ করে ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি ও অভিনেত্রী দীপিকা পাড়–কোনের নাক, কান, মাথা কর্তনকারীদের জন্য বিশ কোটি টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। এই ডামাডোলে এরই মধ্যে এক সাধারণ নাগরিকের প্রাণ গেছে। নিহত ২৩ বছরের তরুণ চেতন সাহনি জয়পুরে গয়নার ব্যবসা করতেন। জয়পুরের বিখ্যাত নাহারগড় দুর্গের বুরুজ থেকে তার মরদেহ ঝুলছিল। তার মৃতদেহের পাশে লেখাছিল ‘আমরা শুধু কুশপুতুল লটকাই না।’ আর একটি পাথরে লেখা ছিল ‘পদ্মাবতীর বিরোধিতা’।

পদ্মাবতী মুক্তি পাওয়া দূরে থাক, এখনও সেন্সর বোর্ড থেকে এ সিনেমা সম্পর্কে কোনো মন্তব্যই করা হয়নি। শুধুমাত্র একটা ধারণা থেকেই মাঠে নেমেছে উগ্রবাদী বিজেপি, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা বলছেন ‘আমাদের জাত্যাভিমানে চুনকালি লেপা হয়েছে, আমাদের দেবী মা পদ্মাবতিকে মন্দিরের পাদপিঠ থেকে নামিয়ে করে তোলা হয়েছে বাহরওয়ালি নাচনি, তাই পরিচালকের মুণ্ডু চাই.. ..’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সারা ভারতে ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে তারা। বানসালির পদ্মাবতী অচ্ছ্যুত হলে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (পদ্মিনী উপাখ্যান, ১৮৫৮), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ, ১৮৭৫), ক্ষিরোদাপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (পদ্মিনী, ১৯০৬) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রাজকাহিনী, ১৯০৯) প্রমুখের এসব রচনা নিষিদ্ধ করতে হয়। কারণ তারাও ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি। ইতিহাসকে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন। ইতিহাসকে ভিত্তি করে তারা গল্প বুনেছেন।

সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে ইতিহাস কি কেউ ভিন্ন দৃষ্টিতে এখন দেখতে পারবে না? অতীতে এমন হয়েছে। সেজন্যই শিল্পের স্বাধীনতা মুক্তচিন্তার আলোকে বিবেচনা করা হয়। তথ্যই কেবল ইতিহাস নয়, কিংবদন্তিও ইতিহাসের অংশ। কোনো শিল্প মাধ্যমই ইতিহাসকে প্রামাণ্য হিসেবে পেশ করে না। রানি পদ্মাবতী হয়তো তার জীবনে নাচেননি। নাচলেও এতটা ডিজিটাল ভেল্কি ছিল না। সিনেমার অনেকটাই পরিচালকের কল্পনা। আর ছবিটিও বানসালির ‘লাগ ঝমাঝম’ ভঙ্গিতে বলা একটি বলিউডি উপাখ্যান মাত্র। যেটা আমরা তার আরেকটি চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’-এ দেখেছি। পাঠককে এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, চলচ্চিত্রটিতে তিনি পার্বতী এবং চন্দ্রমুখীকে একসঙ্গে নাচিয়েছেন। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এ কিন্তু এই ঘটনা ছিল না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- দেবদাস সাহিত্য, পদ্মাবতী ইতিহাস। সেক্ষেত্রে এই ইতিহাসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। অনেক ঐতিহাসিকই পদ্মাবতীর অস্তিত্ব স্বীকার করেননি।

দূরদর্শনের সভাপতি রজত শর্মা একটি কথা বলেছেন যেটি প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বানসালীর গবেষণা পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর, বর্ণে বর্ণে বাস্তবনিষ্ঠ। কোনো বিকৃতি নেই।’ আর পরিচালক সুভাস ঝা বলেছেন, ‘সত্যিই সে সময় রমণীরা নাচতেন, অন্তরালে জেনানা রানিবাসে। সেখানে রাজা ছাড়া আর কোনো দর্শক থাকত না। সিনেমায় যে ‘ঘুমার’ নাচের দৃশ্য আছে, তাতে কোনো বাইরের মরদ নেই। তাই, ইতিহাস বিকৃতি ঘটেনি। এখন তিনটি পক্ষ। উগ্রবাদীরা বিপক্ষে। বানসালীকে সমর্থনকারী পক্ষ বলছেন বিকৃতি হয়নি। আরেক পক্ষ বিকৃতি হয়েছে কি হয়নি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছেন না, তারা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন- শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে। পদ্মাবতীর সমর্থনে তাই ইতিহাস বিকৃত হয়নি বলে সাফাই দিলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিল্পের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটিকেই মূখ্য করে দেখতে হবে। ইতিহাসকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অধিকার সমুন্নত রাখা জরুরি।

বাস্তব ও কল্পনার মিশেল নিয়ে তৈরি আশুতোষ গোয়ারিকর’র ‘যোধা আকবর’ (২০০৮) ছবিতে আকবরের সঙ্গে যোধাবাঈয়ের প্রেমের কাল্পনিক ঘটনা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেও ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠেনি। তখন ইউপিএল আমল। এখন কেন্দ্রে বিজেপি, বিভিন্ন রাজ্যে ক্রমে তারা ক্ষমতার হাত প্রসারিত করছে। ১৮ রাজ্য তাদের শাসনে। দেখা যাচ্ছে ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক শক্তি জোরেসোরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ইমেইজ আর থাকছে না। গত তিন বছরে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অসংখ্য হামলা সেটাই প্রমাণ করে। মুসলমানদের খাদ্যের ওপরও তারা বাধ সাধছেন। উত্তর প্রদেশে গরুর ব্যবসা করার দায়ে প্রাণ দিতে হয়েছে এক মুসলমান তরুণকে। এবার তারা শিল্পের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। বানসালী এরই মধ্যে বলেছেন, আলাউদ্দিন খিলজির স্বপ্নের রানি পদ্মাবতীর সঙ্গেঅহপযড়ৎ প্রেমের দৃশ্যটি ছবিতে নেই। এরপরও উগ্রবাদীদের এ ধরনের জঙ্গী আচরণ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির নীরবতা মুক্ত চিন্তা ও গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত বলেই মনে করি।

স্বাধীনতা মানে কী?

তসলিমা নাসরিন : ডিসেম্বরের ১ তারিখ চলে গেলো, ‘পদ্মাবতী’ মুক্তি পেলো না ভারতে। হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে হেরে গেলো গোটা ভারতবর্ষ। তাদের তাণ্ডব আর হুমকির সামনে মাথা নোয়ালো সেক্যুলার ভারত। ‘পদ্মাবতী’ নামে আদৌ কেউ ছিল, কোনও ঐতিহাসিকই বলেননি। সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জয়সীর লেখা কবিতা ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে তৈরি ‘পদ্মাবতী’। ‘পদ্মাবতী’ নামে হয়তো কেউ ছিল না কোনও কালে। মালিক মোহাম্মদ জয়সীই রচনা করেছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী পদ্মাবতীকে, যে পদ্মাবতীকে জয় করার লোভ করেছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি। রাজপুত হিন্দু রমণী মুসলিম শাসকের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়ার চেয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেওয়াকে শ্রেয় মনে করেছিলেন। এইরকম একটি গল্প নিয়েই সঞ্জয় লীলা বানসালি ‘পদ্মাবতী’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন। কিন্তু হিন্দু মৌলবাদীরা ক্ষুব্ধ, কারণ তারা শুনেছে ছবিতে দেখানো হয়েছে খিলজি আর পদ্মাবতীর ঘনিষ্ঠতা। ছবি না দেখে কী করে আমরা বলবো কী দেখানো হয়েছে। ‘গুজব’-এর যে কী অবিশ্বাস্য গুণ! মানুষ চোখ-কান বুজে গুজবকে অনায়াসে বিশ্বাস করে ফেলে।

সঞ্জয় লীলা বানসালি সহ আরও অনেকে, যারা পদ্মাবতী ছবিটি ঘরে বসে দেখেছেন, বলেছেন, ‘ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই, যে দৃশ্য দেখে হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে’। তারপরও শান্ত হয়নি হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠী। প্রথম দিকে না মানলেও, ধীরে ধীরে সরকারি দলের লোকেরাও মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিচ্ছেন। পদ্মাবতীকে নিষিদ্ধ করছেন। সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়া ছবিটিকে অযথাই শেকল পরানো হয়েছে।

আমি আর সবার মতো বলতে চাইছি না ছবিতে খিলজি আর পদ্মাবতীর কোনও অন্তরঙ্গ দৃশ্য নেই। আমি বলতে চাইছি, যদি থাকেই, তাহলে ক্ষতি কী? ইতিহাসে পদ্মাবতীর কোনও উল্লেখই নেই, কিন্তু কাব্যে আছে বলে পদ্মাবতীকে আজ ঐতিহাসিক চরিত্র বলে ভেবে নেওয়া তো ঠিক নয়। সত্যিকার ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকেই শিল্পী সাহিত্যিকরা নতুন করে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে চিরকালই লিখেছেন, এঁকেছেন। চলচ্চিত্রে, নাটকে, গানে চরিত্রগুলো বারবার এসেছে, সবসময় যে একই রূপে, একই গল্পে তা নয়। ইতিহাস নিয়ে প্রচুর চলচ্চিত্রই নির্মিত হয়েছে, যেগুলোতে রয়ে গেছে প্রচুর ভুল। ১৯৯৮ সালে শেখর কাপুর এলিজাবেথ নামে একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন, ওই ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন রানী এলিজাবেথ তাঁর  উপদেষ্টা স্যার উইলিয়াম সেসিলকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করেছেন। বাস্তবে কিন্তু উল্টোটা ঘটেছিল, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্যার উইলিয়াম সেসিল রানীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে রানীর পাশে ছিলেন। পাশ্চাত্যের উচ্চাঙ্গ সংগীত তারকা পিয়ানোবাদক মোজার্টের জীবন কাহিনি নিয়ে ‘আমেডিউস’ নামের চলচ্চিত্রে মোজার্টকে দেখানো হয়েছে একটা নষ্ট ছোঁড়া হিসেবে, বাস্তবে মোজার্ট মোটেও তা ছিলেন না। সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি  টাইটানিক ছবিতে জাহাজ দুর্ঘটনা সত্য , কিন্তু  জ্যাক ডোসন আর রোজের প্রেম কাহিনি সত্য নয়। ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ ছবিতে ব্রিটিশ  ট্রুপের কথা উল্লেখ করা হয়নি। ‘ইউ-৫৭১’ ছবিতেও ব্রিটিশের বদলে আমেরিকান সৈন্য দেখানো হয়েছে। এসব নেহাতই ইতিহাস বিকৃতি। ইতিহাস বিকৃতি আরও কত যে ছবিতে প্রকট, গ্ল্যাডিয়েটর, ব্রেভহার্ট, দ্য পেট্রিয়ট, মারি আন্তোয়ানেত, সেক্সপিয়র ইন লাভ…। সমালোচকরা বিকৃতির এবং ভুল তথ্যের নিন্দে করেছেন। কেউ কেউ আবার শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ছবি নিষিদ্ধ করেননি, কেউ পরিচালকের মাথার মূল্য ঘোষণা করেননি, কেউ অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নাক-কান কেটে ফেলার ফতোয়া দেননি। এসব দেওয়া হচ্ছে ভারতের মতো নানা ধর্মের, নানা ভাষার, নানা রঙের মানুষের গণতন্ত্রে। আর কোনও দেশে না  হোক, খাজুরাহো আর ইলোরা অজন্তার দেশে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস না করাটা দেশকেই, দেশের শিল্পকেই, চরম অপমান করা।

ইতিহাসের রদ-বদল এবং বিকৃতি হামেশাই হচ্ছে। কেউ যখন আমরা সঠিক করে জানি না ঠিক কী ঘটেছিল সুদূর অতীতে, আমরা কল্পনা করে নিই অনেক ঘটনা। চার্লস ডিকেন্সকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘দ্য লাস্ট ডিকেন্স’, এডগার অ্যালেন পোকে নিয়ে ‘দ্য পো শ্যাডো’, এসব তো আছেই, আলেক্সান্দ্র দুমা লিখেছেন ‘কুইন মারগো’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লেখা হয়েছে ‘প্রথম আলো’। এরকম নানা বইয়ে মেশানো হয়েছে সত্যের সঙ্গে মিথ্যে, অথবা খানিকটা সত্যের সঙ্গে অজস্র কল্পনা। বইয়ে কতটুকু সত্য আর কতটুকু কল্পনা তা নিয়ে বিতর্ক হয় হোক। ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে শুধু তথ্যচিত্র হতে পারে, কোনও চলচ্চিত্র নয়। এ নিয়ে হোক বিতর্ক। হোক কলরব। আবারও বলছি, বিতর্ক হওয়া ভালো, কিন্তু বই বা চলচ্চিত্র, বা কোনও শিল্পকর্ম নিষিদ্ধ করা আর গণতন্ত্রকে নিষিদ্ধ করা একই জিনিস। আমরা গণতন্ত্র নিষিদ্ধ হোক চাই না।

মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে এখনও অধিকাংশ মানুষের কোনও ধারণা নেই। তারা গণতন্ত্র মানে এখনও বোঝে নির্বাচন, ভোটে হারা, ভোটে জেতা। মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে এখনও অধিকাংশ মানুষ রায় দেয়, মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অধিকার কারোর নেই। তারা বলতে চায়, কারওরই এমন কোনও কথা বলা বা কাজ করা উচিত নয়, যা দেখে বা পড়ে বা শুনে অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। এর মতো অগণতান্ত্রিক মন্তব্য আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। কেউই, বিশেষ করে প্রতিভাবান কেউ, সবাইকে খুশি করে বা সুখী করে চলতে পারে না। ভিন্ন মতে বিশ্বাস করে যারা, তাদের হয় মুখ বুজে থাকতে হবে অথবা মরে যেতে হবে।

পদ্মাবতী ইতিহাসের অংশ নয়। অংশ হলেও তাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করার অধিকার সবার আছে। সাধারণ মানুষের আছে, কবি সাহিত্যিকদের আছে, চলচ্চিত্র পরিচালকদের আছে। আর যদি ইতিহাসের অংশ না হয়, তাহলেও পদ্মাবতীকে  যেমন ইচ্ছে গড়ার স্বাধীনতা শিল্পীদের আছে। শিল্পীদের হাত থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিলে তাদের আর কিছুই থাকে না। একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক এবং কতটা সভ্য, তা নির্ভর করে সেই সমাজের নারীরা এবং শিল্পীরা কতটা স্বাধীন। পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে ভারতবর্ষের সমাজ এখনও পড়ে আছে অগণতন্ত্রের অন্ধকারে। ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের নাম ভারত’ –  এই  স্লোগান না দিয়ে বরং ‘গণতন্ত্র কাকে বলে’ তা শিখতে হবে ভারতবাসীকে। এও বুঝতে হবে,  তোমার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, তোমার রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে–এ সমস্যা তোমার, অন্য কারোর নয়। এই সমস্যার সমাধান তোমাকেই করতে হবে, অনুভূতির আঘাত নিয়ে ঝামেলা হলে নিজের অনুভূতির আঘাত নিজে সারাও। কিন্তু সহিংস হয়ে নয়, অন্যকে হুমকি দিয়ে নয়, অন্যকে শারীরিক আঘাত দিয়ে নয়।

মৌলবাদীদের যুক্তি অনেকটা ধর্ষকদের যুক্তির মতো। মেয়েরা ছোট পোশাক পরলে আমরা উত্তেজিত হই, সুতরাং আমরা ধর্ষণ করি। একইভাবে চলচ্চিত্রে এমন দৃশ্য দেখিয়েছ যা আমাদের অসন্তুষ্ট করে, উত্তেজিত করে, রাগান্বিত করে, সুতরাং তোমার চলচ্চিত্র আমরা নিষিদ্ধ করবো, তোমার মুন্ডু কেটে নেবো, তোমার নাক কেটে নেবো।

মৌলবাদীদের যুক্তিতে পদ্মাবতীর নিষিদ্ধকরণ আর মাথার মূল্য ধার্যকরণ মেনে নেওয়া মানে–ধর্ষকের যুক্তিতে ধর্ষণ মেনে নেওয়া। এ দুটোতে তফাৎ কিছু নেই। নারীর এবং শিল্পীর স্বাধীনতা অধিকাংশ মানুষ না মানলে সমাজে নারী এবং  শিল্পীদের বিরুদ্ধে যে বর্বরতা দেখি, সেই বর্বরতাই আজ দেখছি ভারতবর্ষে।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি বলছে মানবিক সংহতি মিথ্যা

Tawakkol Karmanতাওয়াক্কুল কারমান : মিয়ানমারে কী ঘটছে, তা নিয়ে কেউ আর বিতর্ক করছে না। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং বিশ্বের বড় দেশগুলো- সবাই একমত যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা জাতিগত নিধন ও গণহত্যার সুস্পষ্ট উদাহরণ।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন মোতাবেক রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে কেবল অক্টোবর পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ। এ সংকট ক্রমাগতভাবে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। একদিকে মিয়ানমার সরকারের অসহিষ্ণুতা এবং বর্ণবাদী নীতিগুলো অটলভাবে চালিয়ে নেয়ার জোর অবস্থান আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে; অন্যদিকে বাস্তবতা হচ্ছে মিয়ানমারে কী ঘটছে তার প্রতি বিশ্বের আগ্রহ যথেষ্ট গভীর ও আন্তরিক নয়। সবচেয়ে মারাত্মক সত্য, যা রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি উন্মুক্ত করেছে তা হল- ‘মানবিক সংহতি’র আইডিয়া সম্ভবত বড় ধরনের একটি মিথ্যার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

যারা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও আদর্শ বিবেচনা না করে (আমিও তাদের একজন) মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে, তারা কঠিন ধাঁধার মোকাবেলা করছে। কেন এটি ঘটছে? কেন আপনার চোখের সামনে ঘটতে থাকা মানবিক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি বন্ধ হচ্ছে না? নির্দিষ্ট একটি জাতির ভোগান্তি বন্ধে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয়া ও মানবিক সংহতি প্রকাশের জন্য কি অবশ্যই পূরণ করতে হবে এমন কোনো অদৃশ্য শর্ত আছে?

আমি ভয় করছি, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ভয়ংকর কিছু হবে। কেবল ধনী ও শক্তিশালীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই কি

মানবিক সংহতি?

অনেকে বুঝতে শুরু করেছেন, মানবিক সংহতি মুসলিম পর্যন্ত বিস্তৃত হয় না। এ মত কতটুকু সঠিক, তা বিবেচনা ছাড়াই বলা যায়, এটি সন্দেহের একটি নির্দেশক এবং এটি কোনো ভালো বিষয় নয়। এর বাইরেও মিয়ানমার প্রশাসন প্রতিদিন ভয়ংকর যে সহিংসতা সংঘটিত করার পরও এমন মিত্র খুঁজে পাচ্ছে। যারা তাদের কৃতকর্মকে সমর্থন ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, তা-ও একটি সমস্যা। রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য মিয়ানমার প্রশাসনের দায়িত্ব স্পষ্ট এবং যা কিছু ঘটছে তা অস্বীকার করে দেয়া মিয়ানমারের বিবৃতি সর্বৈব মিথ্যা।

অত্যাচারের মুখেও মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য নিজের অতীতকে উৎসর্গ করা যোদ্ধা, মিয়ানমার সরকারের নেতা ও সাবেক নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি- একজন মানুষ নিজেকে কত ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলতে পারে তার বড় উদাহরণ যার বিষয়ে আমাদের ধারণা ছিল, যা কিছুই ঘটুক তিনি নিজের মূলনীতি সমুন্নত রাখবেন।

এটি সত্যিকারার্থেই বিয়োগান্ত, সু চি বাস্তবতার প্রকাশ্য বিরোধিতা করছেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সহিংসতা ও জাতিগত নিধনের বিষয়গুলো অস্বীকার করছেন। সু চি অন্তত মানবাধিকারের বা তার নিজের সম্মানের জন্য লড়াই ও বিজয় অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের জাতি ও এর সামরিক বাহিনীর জন্য লড়াই করাকেই বেছে নিলেন, যাদের একটি ভিশন হল বৈচিত্র্যকে বর্জন, প্রান্তিকীকরণ ও প্রত্যাখ্যান করা। অনেক বেশি মর্যাদা দেয়া হতো এমন একজন নারীর কী বিয়োগান্ত সমাপ্তি!

সারা বিশ্ব দেখেছে কীভাবে গোটা গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং গ্রামবাসীদের হত্যা বা বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে; গণহত্যা চালানো হয়েছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে। কে এমন যুক্তি গ্রহণ করতে পারে? আমি মনে করি, কেউ সেটা পারে না।

সত্য হল, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধী ও প্রতিপক্ষকে শোষণ এবং অত্যাচারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘাঁটিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য। এটি একটি পুরনো ধোঁকা, যা সবাই প্রকাশ্যে বুঝতে পারে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাহসী হতে হবে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের দিকে।

নিজেদের আখের গোছানোর জন্য ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা থেকে একনায়ক শাসকদের বিরত রাখতে হবে। কেবল তা-ই নয়, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ সংঘটন করছে, তাদের সত্যিকারের জবাবদিহিতার আওতায় অবশ্যই আনতে হবে। এখনই রোহিঙ্গাবিরোধী সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে, এমন বহু আহ্বান জানানো হয়েছে। একে ইতিবাচক উন্নতি হিসেবে দেখা যায়, যদিও তা এসেছে অনেক পরে- একেবারে না হওয়া থেকে দেরিতে হওয়া তো ভালো।

এমন বাস্তবতা সত্ত্বেও মিয়ানমার প্রশাসন সম্ভবত এমন আহ্বানে সাড়া দেবে না, যতক্ষণ না সেখানে ঘটতে থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসী ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করবে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এমন একটি বাহিনী, যারা এখনও সেখানে হামলা-গুলি করে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা কোনো অপরাধ দেখতে পাচ্ছে না।

রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি আমাদের দেখিয়েছে জাতিসংঘের একটি সদস্য দেশ কীভাবে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ নীতি তৈরি করতে পারে আন্তর্জাতিক কোনো পারিপার্শ্বিকতা ছাড়াই। ফলে যদি সত্যিকারের শুদ্ধতার গতিপথ আমাদের দেখতে হয়, তবে মিয়ানমার প্রশাসনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অবশ্যই বাড়াতে হবে।

এটিই সঠিক সময় মিয়ানমার বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নেয়ার। যে দেশটি বর্ণবাদী নীতিমালার প্রসার ঘটাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে আমাদের শান্ত হয়ে থাকা কোনোভাবেই উচিত নয়। এটিই সঠিক সময় এমন একটি মানবিক ট্র্যাজেডি বন্ধ করার, যা কিনা কয়েক দশক ধরে চলছে অযৌক্তিকভাবে।

কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে; যে শরণার্থীরা মাত্র দুই মাস আগে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিপীড়নমূলক অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কিন্তু এ চুক্তি (যদি তা বাস্তবায়িত হয়ও) যথেষ্ট নয়, যাতে মনে হচ্ছে কোনোকিছুই ঘটেনি।

এটি সত্য, মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির বিরুদ্ধে চলমান ট্র্যাজেডি বন্ধ করতে হলে প্রত্যাবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু মিয়ানমার সরকার এমন কী নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, জাতিগত নিধন অভিযান তারা পুনরায় ঘটাবে না?

মানবতা ও ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ না জেনেই রোহিঙ্গারা যুগের পর যুগ বেঁচে আছে। এর কিছু অংশ যদি তারা এখনও খুঁজে না পায়, তবে কি তা আশ্চর্যজনক হবে না? এটি উপলব্ধি করতে নিজেদের সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের অবশ্যই কাজ করতে হবে, কেবল তাদের জন্য নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই।

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

তাওয়াক্কুল কারমান : নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইয়েমেনের সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

সিনাই এত ঝুঁকিপূর্ণ কেন?

২০১৪ সালে ওলিয়াত সিনাই নামে স্থানীয় একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান হয়। তারা আইএসের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করে। সিনাইয়ের বেদুইনরা বহু বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অবহেলিত ছিল। তাদের সেই ক্ষোভকেও কাজে লাগায় উগ্রবাদীরা।

সংঘবদ্ধ হয়ে এই পর্যন্ত বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। তাদের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। গত সেপ্টেম্বরে সিনাইয়ের আল-আরিস এলাকায় পুলিশের গাড়িবহরে আইএস সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের হামলায় ১৮ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছিলেন।

আর যেই মসজিদে হামলা হয়েছে তা সুফিবাদে বিশ্বাসী লোকদের কেন্দ্রস্থল। আইএস এবং এর অনুসারীরা সালাফিপন্থী। সুফিবাদের সমালোচক। এর আগেও সিনাইয়ে সুফিবাদে বিশ্বাসীরা মাঝেমধ্যে উগ্রবাদী হামলার শিকার হয়েছেন। সুফি মতবাদে বিশ্বাসী এক নেতাকে অপহরণের পর শিরশ্ছেদ করা হয়েছে।

sufi attacked in egypt

লিবিয়ায় নিলামে দাস হিসেবে বিক্রি হচ্ছে!

libya slave trade market

লিবিয়ায় আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসীদের দাস হিসেবে নিলামের ভিডিও ফুটেজ দেখে বিশ্বনেতারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে হয়ত দেরি করেননি, কিন্তু মানবাধিকার কর্মীরা কয়েক মাস আগেই এ বিপদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যদিও তাতে কেউই কর্ণপাত করেননি।

সাহায্য কর্মী, মানবাধিকার গ্রপ ও বিশ্লেষকগণ বলছেন, তারা যুদ্ধ কবলিত লিবিয়ায় অভিবাসীদের ধর্ষণ, নির্যাতন ও জোরপূর্বক কাজ করানোর ব্যাপারে চিৎকার করে আসছেন।

সিএনএন গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে ত্রিপোলির কাছে তরুণ আফ্রিকান অভিবাসীদের দাস হিসেবে নিলামে বিক্রি করার ছবি তুলেছে। ১৪ নভেম্বর সে ফুটেজ সম্প্রচার করার পর পশ্চিমা ও আফ্রিকান নেতাদের মধ্যে নিন্দার জোয়ার শুরু হয়।

এ ছবি দেখে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুয়েটেরেস মন্তব্য করেছেন ভয়াবহ। আফ্রিকান ইউনিয়ন প্রধান বলেছেন- অপমানজনক। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এ নিলামকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ফ্রান্স এ ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এনজিও ও বিশেষজ্ঞরা বিশ^নেতাদের ভন্ড বলে অভিযুক্ত করেছে।

থিংক ট্যাংক লা আফ্রিক দ্য আইদিস-এর সেনেগালি বিশ্লেষক হামিদু অ্যান বলেন, সাধারণ মানুষের সাথে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যেকেই ব্যাপারটি জানেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পশ্চিম আফ্রিকা পরিচালক আলিউন টাইন বলেন, লিবিয়াতে জিম্মিকরণ, সহিংসতা, নির্যাতন ও ধর্ষণ সংঘটিত হচ্ছে। তাছাড়া আমরা অভিবাসীদের দাসত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছি।

২০১১ সালে মোয়াম্মর গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার পর লিবিয়া গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিপতিত হওয়ার পাশাপাশি ইউরোপগামী সাব সাহারান আফ্রিকানদের এক বিশাল ট্রানজিট কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

ইইউ উদ্বাস্তু স্রোত ঠেকাতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ২০১৫ সাল থেকে ১৫ লাখেরও বেশি উদ্বাস্তু লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। তবে নেতৃবৃন্দ ভূমধ্যসাগরের অপর পারে আশ্রয় প্রার্থীদের জন্য সমাধান খুঁজে বের করতে হিমসিম খাচ্ছেন।

এ মাসে লিবিয়ার কোস্টগার্ডদের প্রশিক্ষণ দেয়া নিয়ে ইইউ জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান বলেন, এর ফলে অভিবাসীদের ভয়ংকর কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।

ইইউর সমর্থনে ইতালি এক বিতর্কিত চুক্তির অংশ হিসেবে অভিবাসী বহনকারী বোটগুলোকে বাধা দেয়ার জন্য লিবিয়ার কোস্টগার্ডকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এর ফলে জুলাই থেকে ইউরাপে অভিবাসী আগমন ৭০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু জাতিসংঘ অভিযোগ করেছে যে এ নীতির ফলে অভিবাসীদের লিবিয়াতে ফিরিয়ে নেয়ার পর তারা নির্যাতন, ধর্ষণ, বলপূর্বক শ্রমদান ও চাঁদাবাজির ঝুঁকির শিকার হচ্ছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন বলেন, লিবিয়াতে অভিবাসীরা যে অকল্পনীয় ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সে ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না।

ব্রাসেলস থেকে ইইউ জাতিসংঘকে পাল্টা জানিয়েছে যে তাদের কোস্টগার্ড প্রশিক্ষণ অভিবাসীদের জীবন রক্ষায় সাহায্য করছে। এ বছর ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ৩ হাজারেরও বেশি অভিবাসী সাগরে ডুবে মারা গেছে। ইইউ লিবিয়া থেকে ১০ হাজার অভিবাসীকে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যেতে সাহায্য করেছে বলে দাবি করা হয়।

লিবিয়ায় শ্রমদাসসহ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার পর গাম্বিয়ায় কারামো কেইটা দেশে ফিরে ইউরোপ গমনের ব্যাপারে তরুণদের সতর্ক করার জন্য একটি গ্রæপ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেপ্টেম্বরে এএফপিকে তিনি বলেন, লিবিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গদের কোনো অধিকার নেই। তিনি বলেন, আমাদের বিভিন্ন কৃষি খামারে নিয়ে যাওয়া হত যেখানে লিবীয়রা আমাদের দাস হিসেবে বিক্রি করত। আমরা বিনা পয়সায় খামারে কাজ করেছি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসী বিষয়ক সংস্থা এপ্রিল রিপোর্টে এমন বাজারের কথা বলে যেখানে অভিবাসীদের বিক্রির পণ্য করা হয়। কয়েকমাস পর চিকিৎসা সেবা সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স -এর প্রধান জোয়ানে লিউ ইউরোপীয় সরকারগুলোর কাছে লেখা খোলা চিঠিতে বিকাশমান অপহরণ, নির্যাতন ও চাঁদাবাজি ব্যবসা সম্পর্কে সতর্ক করেন।

তিনি প্রশ্ন করেন, অভিবাসী স্রোত রোধে তাদের প্রচেষ্টায় ব্যস্ত ইউরোপীয় সরকারগুলো কি ধর্ষণ, নির্যাতন ও দাসত্বের মূল্য দিতে রাজি? আমরা এ কথা বলতে পারি না যে আমরা এ ব্যাপারে জানতাম না।

অ্যামনেস্টির টাইন বলেন, যে কোনো মূল্যে অভিবাসীদের আগমন রোধের প্রচেষ্টা নেয়া ইউরোপ লিবিয়ার ভয়াবহ পরিস্থিতির মৌলিক দায় বহন করে। এমনকি অন্যরাও। তিনি বলেন, আফ্রিকার দেশগুলো তাদের তরুণদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশে রাখার জন্য কিছু করছে না।

বিশ্লেষক হামিদু অ্যান আরো বলেন, আফ্রিকার মাগরেব দেশগুলোতে ধারাবাহিক বর্ণবাদের পাশাপাশি উন্মোচিত বিপর্যয়ের জন্য আফ্রিকান নেতারা আংশিক দায়ী। এটা চলতে পারে না। তিনি বলেন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সম্মুখীন হয়ে আপনারা তার নিন্দা করছেন না।

এ কেলেংকারি জানাজানি হওয়ার পর ক্ষুদ্র দেশ রুয়ান্ডা লিবিয়া থেকে ৩০ হাজার আফ্রিকানকে গ্রহণ করেছে।

অভিবাসী কমিশনার দিমিত্রিস আভরামোপুলাস বৃহস্পতিবার এএফপিকে বলেন যে ইইউ গুরুত্ব দিয়ে এ সমস্যার সমাধান বের করার জন্য কাজ করছে।

টাইন বলেন, ২৯-৩০ নভেম্বর আবিদজানে অনুষ্ঠেয় ইইউ-এইউ শীর্ষবৈঠকে দাসত্বের বিষয়টি আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকা প্রয়োজন। নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদু ইসুফু ইতোমধ্যেই এ ধারণা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমাদের নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে যে কিভাবে মানব পাচার সংগঠিত করা হয় এবং এর পিছনে কে। তিনি বলেন, প্রত্যেককে অবশ্যই তার দায়িত্ব নিতে হবে।

সন্ত্রাস ও হান্টিংটনের ভবিষ্যদ্বাণী

এ কে এম এনামুল হক : মানব ইতিহাসের আদিকাল থেকে মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, গোত্রে গোত্রে সংঘর্ষ, হত্যা-নির্যাতনের সাথে মানবগোষ্ঠী পরিচিত। ধরাপৃষ্ঠে এসব অপরাধ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কখন মানবসমাজে প্রবর্তিত হলো তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। কখন থেকে পৃথিবীতে মানুষ অত্যাচারীকে অত্যাচার করতে, সবলকে দুর্বলের ইজ্জত লুণ্ঠন করতে দেখেছে তা অজানা। অত্যাচার ও আধিপত্যের এ কাহিনী মানব ইতিহাসে কখনো সাম্রাজ্যবাদ, কখনো উপনিবেশবাদ আবার কখনো বিশ্বায়ন হিসেবে পৃথিবীতে প্রবর্তিত হয়। এটা Survival of the fittest-এর বাস্তবায়ন। সাম্রাজ্যবাদ তা যেকোনো পরিমণ্ডলে হোক এবং যেকোনো আকৃতিতে হোক, জুলুম ও অত্যাচারের ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত। ভিন্ন জাতিকে গোলাম বানানোর পরিকল্পনা, দুনিয়াকে অধীন করার উচ্চাভিলাষ এবং অন্যের ওপর নিজ কৃষ্টিকালচার চাপিয়ে দেয়ার বাসনা, অর্থনৈতিক শোষণ ইত্যাদি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। মহাবীর আলেকজান্ডার প্রাচীন দুনিয়াকে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ‘গ্রিস বানানো’র সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। বিশ্বের কোণে কোণে গ্রিক সভ্যতার রাজত্ব চলবে, এ ছিল তার স্বপ্ন। আলেকজান্ডারের পর রোম সাম্রাজ্য, সামরিক শক্তির মাধ্যমে গোটা দুনিয়ায় নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি চালু করতে চেয়েছিল। রোম ও পারস্যের মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধের মূল কারণ ছিল নিজেদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাদানীন্তন বিশ্বের এ দুই পরাশক্তি স্বীয় আধিপত্য, দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরস্পরের সাথে লড়াইরত ছিল। কিন্তু ইসলামের আগমন এ দুই পরাশক্তির অহমিকা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে পৃথিবীর বুকে এক নতুন আবহ সৃষ্টি করে।

ফলে ইউরোপের বুকে রাষ্ট্রীয় ধর্মযাজকেরা এ নতুন সভ্যতার জোয়ারকে স্তিমিত করতে ক্রুসেড নামে ধর্মীয় উন্মাদনার সৃষ্টি করে। ইউরোপের রাজরাজড়া ও সামন্ত প্রভুরা এ ধর্ম যুদ্ধে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রায় ৩০০ বছর ইউরোপ ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সঙ্ঘাতের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ, রক্তপাত ও লুণ্ঠনের এক বীভৎস কাহিনী রচনা করে, যা ছিল খ্রিষ্টীয় ইউরোপের ধর্মান্ধতার ফল এবং সন্ত্রাসবাদের একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। ১৫০০ শতকের পরে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব আরম্ভ হয়। নিত্যনতুন কারিগরি বিদ্যার প্রসারে নিত্যনতুন যন্ত্র উদ্ভাবিত এবং কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। দেশে বিপুল পরিমাণে পণ্যদ্রব্য তৈরি হতে থাকে। এসব পণ্যের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে কাঁচামাল ও ফিনিশড গুডসের বাজার। ইতোমধ্যে স্টিমইঞ্জিন আবিষ্কার হওয়ায় মানুষের কর্মকাণ্ডের গতিবেগ বৃদ্ধি পায়। জাহাজে এ ইঞ্জিন ব্যবহার করে ইউরোপের মানুষ দূর-দূরান্তে কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য এবং কারখানায় তৈরী পণ্যের বাজারের অনুসন্ধানে দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। তাদের যান্ত্রিক প্রাধান্যের মাধ্যমে তারা দুনিয়ার বুকে উপনিবেশ স্থাপনে অনায়াসে কৃতকার্য হয়। ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, বেলজিয়াম, ইতালি, জার্মানি, স্পেনীয় ও পর্তুগাল রাষ্ট্র ও জাতিগুলো সাম্রাজ্যবাদের পুরোধা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে। আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কৃত হলে সে দেশের যারা ছিল আদিবাসিন্দা তাদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়। পাশ্চাত্যের এ নতুন উপনিবেশে কৃষিকাজ ও বসতি স্থাপনের জন্য আফ্রিকা মহাদেশ থেকে প্রায় ১৪ মিলিয়ন মানুষকে গোলাম বা দাস বানিয়ে আমেরিকায় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়েছিল। মোটকথা, সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সাম্রাজ্যবাদের শিকার হয়। ঊনবিংশ শতাব্দী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থানের কাল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সাম্রাজ্যবাদের সূর্য অস্তগামী হতে শুরু করে। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে তাদের উপনিবেশগুলোর ওপর তাদের হাতের মুঠো ঢিলে হতে থাকে। ইতোমধ্যে পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে এক নতুন আদর্শের আর্বিভাব হয়, যা কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র নামে খ্যাতি লাভ করে। প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ার জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লব সফল হয়।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তিতে যখন অক্ষশক্তি সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত এবং মিত্রশক্তির ইউরোপীয় অংশীদাররা রণক্লান্ত, তখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জাপানের নাগাসাকি হিরোশিমায় আণবিক ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে নিজেদের পৃথিবীর একমাত্র সুপার পাওয়ার হিসেবে জানান দিয়ে বিশ্বে আবির্ভূত হলো। তারা তখন থেকে নির্দ্বিধায় পৃথিবীর বুকে মোড়লিপনার ছড়ি ঘোরানো আরম্ভ করে। তখন প্রতিদ্বন্দ্বী কমিউনিস্ট রাশিয়া যুদ্ধের ধকলে ধুঁকছিল। কিন্তু এ অবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। অল্প দিনের ব্যবধানে সোভিয়েত রাশিয়া আণবিক বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক সুপার পাওয়ার হওয়ার দাবির প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তখন থেকে এ দুই পরাশক্তি বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা পরস্পরবিরোধী আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে ‘ঠাণ্ডা’ যুদ্ধের উষ্ণ আবহ সৃষ্টি করে।

এটা প্রায় ৪০ বছর পৃথিবীর বুকে এক অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। গত শতকের ৯০-এর দশকের প্রারম্ভে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়। ইতোমধ্যে আমেরিকার চিন্তাবিদ হান্টিংটন এক নতুন ঠাণ্ডা যুদ্ধের বার্তা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নব্য মতবাদ প্রচার করেন। এটাকে তিনি Clash of Civilizaition নামকরণ করেছেন।

হান্টিংটন তার মূল বক্তব্যে বলতে চেয়েছেন, ঠাণ্ডাযুদ্ধের অবসানে নতুনভাবে যে প্রভাব বিস্তারের লড়াই শুরু হচ্ছে, তা হবে পাশ্চাত্য শক্তির সাথে প্রাচ্যের সভ্যতার লড়াই। যদিও আগামীতে পাশ্চাত্য বহু দিন প্রভাবশালী সভ্যতা হিসেবে টিকে থাকবে, তারা তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অন্য সভ্যতার কাছে হারাতে থাকবে। আর এ সময় মুসলিম সভ্যতা সর্বব্যাপী অগ্রসরমাণ থাকবে। এ সময় পাশ্চাত্যের নেতৃত্বে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। তার এ বক্তব্যকে লুফে নেয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনেরা বিশেষ করে বুশ (সিনিয়র ও জুনিয়র) আমলে। তারা মুসলমানদের প্রধান টার্গেট বানিয়ে তাদের শায়েস্তা করার প্রোগ্রাম গ্রহণ করে। এর প্রতিফলন দেখা যায় ইরাক-ইরান যুদ্ধে এবং এরপর ইরাক ও আফগানিস্তানে ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনায়। অপর দিকে ইহুদি ইসরাইলের রাষ্ট্রের আণবিক বোমা এবং তাদের মুসলিম ফিলিস্তিনিদের ওপর অকথ্য অত্যাচারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মৌন সম্মতি মধ্যপ্রাচ্যে এক ভারসাম্যহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তারা ওয়ার অন টেরর ও বিশ্বায়নের নামে প্রাচ্যে তাদের আগ্রাসী তৎপরতা শুরু করে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

পাশ্চাত্যের খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের হিংসাত্মক সন্ত্রাসী কার্যক্রম, অত্যাচার, রক্তপাতের ইতিহাস বিকৃত করে মুসলিম সভ্যতার বিরুদ্ধে অসত্য কথনে লিপ্ত হয়। যেমন তারা অতীতে নানা স্লোগানের সৃষ্টি করেছিল, তেমনি এবারো স্লোগান দিয়ে ষড়যন্ত্র কার্যকর করা আরম্ভ করে। All muslims are not terrorists, but most of the terrorists are muslims, war on terror ইত্যাদি স্লোগানের দ্বারা পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র মুসলমানদের টেররিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছে। প্রবাদবাক্যে বলা হয়ে থাকে- Give the dog a name and kill it.

’৮০-এর দশকের শেষের দিকে কমিউনিস্ট সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে লাগল এবং মার্কিনিরা বিশ্বমোড়ল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। তখন পৃথিবীর বুকে তিনটি শক্তি কাজ করছিল : (১) পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদ (২) কমিউনিস্ট ব্লক ও (৩) তৃতীয় বিশ্ব। কমিউনিস্ট ব্লকের মূলোৎপাটনের পর মানবজাতির বিভক্তির ভিত্তি আর আদর্শ, রাজনীতি বা অর্থনীতি রইল না।

বরং মানবজাতি সভ্যতা সংস্কৃতির নিরিখে নিজেদের পরিচিত করা আরম্ভ করল। জাতিগুলো পূর্বপুরুষদের পরিচয়ে নিজেদের প্রকাশ করতে শুরু করল। তাদের ধর্ম, ভাষা, মূল্যবোধ, রীতিনীতি, প্রতিষ্ঠানাদি এবং সভ্যতা তাদের পরিচিতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। আগের মতো রাষ্ট্রের জোটবদ্ধতা তিনটি ব্লকে সীমাবদ্ধ রইল না; বরং তা পৃথিবীর সাত-আটটি সভ্যতায় বিভক্ত হয়ে যায়। অপশ্চিমা দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নতি করতে লাগল, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। তারা পাশ্চাত্যের পতিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো প্রত্যাখ্যান করতে লাগল।

বর্তমানের নতুন পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানবগোষ্ঠীর সঙ্ঘাত সামাজিক শ্রেণী-বিভাজনের জন্য হচ্ছে না। অর্থাৎ ধনী দরিদ্র অথবা অন্যান্য অর্থনৈতিকভাবে চিহ্নিত বিভাজন মানুষের মধ্যে হচ্ছে না। বরং তা হচ্ছে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে বিভাজিত মানুষের মধ্যে। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময় পৃথিবী তিনটি ব্লকের পরিবর্তে সাতটি সভ্যতা এবং বিভিন্ন ধরনের স্বার্থের অনুকূলে বিভক্ত হয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো বিভিন্ন সভ্যতার অংশ।

প্রতিটি সভ্যতা প্রধানত একে অপর থেকে ভিন্ন; তাই প্রতিটি সভ্যতা একে অপর থেকে প্রধানত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে ভিন্ন। ক্ষমতার বলয়ও আবার পশ্চিমা দেশগুলো থেকে অপশ্চিমা দেশগুলোতে সরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি মাল্টিপোলার থেকে মাল্টি-সিভিলাইজেশনাল হয়ে যাচ্ছে।

প্রায় সব আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ স্বীকার করেন, ইসলামি সভ্যতা অপর সব সভ্যতা থেকে ভিন্ন। সপ্তম শতকে আরব উপদ্বীপে হজরত মুহাম্মদ সা: ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। সাম্য, মৈত্রী ও তৌহিদের ধর্ম ইসলাম অতি দ্রুত উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে সাইবেরীয় উপদ্বীপ এবং পূর্ব দিকে মধ্যএশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত প্রসার লাভ করে।

দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ থাকার পর এসব মুসলিম দেশ তাদের উপনিবেশবাদী শাসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকে। এ দিকে দলে দলে মানুষ বিভিন্ন দেশে ইসলামে দীক্ষিত হতে থাকে। ইসলামের এ পুনরুত্থানে মুসলিম সমাজে নবদীক্ষিতদের ইসলামি জীবন বিধানের প্রতি আকর্ষণ এবং মুসলিম দেশগুলোতে যুবকদের সংখ্যা বৃদ্ধি মুসলমানদের মধ্যে নব জাগরণ সৃষ্টি করে।

১৯৭০-এর দশক থেকে মুসলমানেরা তাদের ইসলামি প্রতীক ব্যবহার, বিশ্বাসজাত ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার প্রভৃতি লক্ষণীয়। ১.৫ বিলিয়ন মুসলমান রয়েছে সুদূর মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া আর নাইজেরিয়া থেকে কাজাখস্তান পর্যন্ত। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে অপরাপর সভ্যসমাজ মুসলমানদের পুনরুত্থানকে বিস্মিত নয়নে দেখছে। এটাই অধ্যাপক হান্টিংটন তার ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন অ্যান্ড দ্য মেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার নামক বইতে উপস্থাপন করেছেন। তার এই সাবধানবাণীর কারণে আমেরিকা আজ মুসলিম দেশগুলোতে হামলে পড়ছে। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, মিসর ও সিরিয়া, মার্কিন সন্ত্রাসে পর্যুদস্ত এবং পাকিস্তান, লেবানন, ফিলিস্তিন খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার আশঙ্কা জেগেছে।

প্রফেসর হান্টিংটনের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে, মুসলিম মিল্লাতের পুনর্জাগরণ ও পুনরুত্থানের সম্ভাব্য সব সম্ভাবনা অঙ্কুরে ধ্বংস করে দেয়ার প্রচেষ্টায় পশ্চিমা বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে, মুসলিম বিশ্বে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রুসেড শুরু করেছে। এ ধ্বংসযজ্ঞ কখন শেষ হবে, আর কত লোক যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী কূটকৌশলের শিকার হবে; তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আবির্ভাবের পর বলা কঠিন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লিডার, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী

সিরিয়ায় ওয়াহাবি সন্ত্রাসীদের ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কাহিনী

IS militantsআরটিএনএন : সিরিয়ায় উগ্রবাদী ওয়াহাবি সন্ত্রাসীদের পরাজয়ের পর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে সৌদি আরব এখন উন্মাদ হয়ে উঠেছে। দামেস্কের বিরুদ্ধে সৌদি আরব একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরির পর তার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত বাশার আল-জাফারি এক বিবৃতিতে একথা বলেন।
সিরিয়ার এ প্রতিনিধি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেয়া বিবৃতিতে বলেন, সিরিয়ায় মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি করা ওই খসড়া প্রস্তাব হচ্ছে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের ইচ্ছা বা খেয়ালখুশির বহিঃপ্রকাশ যারা বিদ্রোহ উসকে দেয়, বিভিন্ন দেশ ধ্বংস করে, হাজার হাজার মানুষ হত্যা ও দেশ দখল করে। তিনি সৌদি আরবের তৈরি করা খসড়া প্রস্তাবকে ‘আশ্চর্যজনক বৈপরীত্য’ এবং মানবাধিকারের প্রতি ‘অপমান’ বলে উল্লেখ করেন।
এছাড়া, এ ঘটনা জাতিসংঘের জন্য কেলেঙ্কারি বলে তিনি মন্তব্য করেন। ইয়েমেনে সৌদি আরবের যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে জতিসংঘের নীরবতারও সমালোচনা করেন বাশার আল-জাফারি। তিনি সুস্পষ্ট করে বলেন, মানবাধিকারের বিষয়ে সৌদি আরবের নিজেরই কালো রেকর্ড রয়েছে; ফলে এ নিয়ে তার কথা বলা মানায় না।
জাতিসংঘে নিযুক্ত সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত বাশার আল-জাফারি
তিনি বলেন, নিজের নাগরিক ও বিদেশি শ্রমিকদেরকে দাস বলে মনে করে সৌদি আরব। জাফারি সৌদি সরকারকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক স্বৈরচার বলে উল্লেখ করেন। সিরিয়ায় উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের জন্য সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার খরচ করার বিষয়ে কাতারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামাদ বিন জসিমের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তিমূলক তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
সিরিয়া-ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দিচ্ছে সৌদি ও আমিরাত
কূটনৈতিক ছদ্মাবরণসহ নানা পন্থায় সিরিয়া এবং ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্রের যোগান দিচ্ছে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। বুলগেরিয়ার অনুসন্ধানী সাংবাদিক দিলয়ানা গেতানদজিয়েভের প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
পূর্ব ইউরোপে তৈরি এসব অস্ত্র পাচারের জন্য আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা সিল্ক ওয়ে এয়ারলাইন্সকে ব্যবহার করা হয়েছে।
বুলগেরিয়ার বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র ট্রুডে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, ইউএই এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীসহ আরো অনেক দেশ অস্ত্র পাচারের জন্য এ বিমান সংস্থাকে ব্যবহার করেছে। পাচার করা অস্ত্র শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের তাকফিরি জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস, কুর্দি গেরিলা গোষ্ঠী এবং আফ্রিকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে পড়েছে।
খবরে আরো বলা হয়, গত তিন বছরে বিশ্বের যুদ্ধ এবং গোলযোগপূর্ণ এলাকায় অস্ত্র পৌঁছে দেয়ার জন্য সিল্ক ওয়ে এয়ারলাইন্সের অন্তত সাড়ে তিনশ কূটনৈতিক ফ্লাইট ব্যবহার করা হয়েছে।
কূটনৈতিক ফ্লাইটের ছদ্মাবরণে হাজার হাজার টন ভারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে সিল্ক ওয়ে। এতে আরো বলা হয়েছে, পূর্ব ইউরোপ থেকে বিপুল পরিমাণে অস্ত্র কিনে সৌদি আরব তা রফতানি করেছে কূটনৈতিক ফ্লাইটের ছদ্মাবরণে। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে এভাবে বুলগেরিয়া, সার্বিয়া এবং আজারবাইজান থেকে অস্ত্র গেছে জেদ্দা ও রিয়াদে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজের জন্য এসব অস্ত্র কিনেনি সৌদি আরব। সৌদি সেনাবাহিনী কেবলমাত্র পাশ্চাত্যের অস্ত্র ব্যবহার করে এবং দেশটির সামরিক মানের সঙ্গে এসব অস্ত্র মোটেও খাপ খায় না।
ফলে এসব অস্ত্র শেষপর্যন্ত সিরিয়া এবং ইয়েমেনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে পড়েছে। এসব গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিক ভাবেই সৌদি সমর্থন পেয়ে আসছে।
ফাঁস হয়ে যাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে এতে আরো বলা হয়েছে, কূটনৈতিক ফ্লাইটের ছদ্মাবরণে পাঠানো এমন একটি কার্গোতে এসপিজি-৯ এবং জিপি-২৫ গ্রেনেডসহ ট্যাংক বিধ্বংসী গ্রেনেড এবং মর্টার ছিল। একমাস আগে মসুলে আইএসের একটি অস্ত্র গুদামে এসব অস্ত্রের খোঁজ মিলেছে।