আর্কাইভ

Archive for the ‘অপরাধ’ Category

ভিন্নরূপে দাসত্ব আধুনিক বিশ্বে

modern day slavery 4modern slavery 3

Advertisements

যেভাবে হাতছাড়া স্বাধীন আরাকান

burma ethnic groups

মুফতি হুমায়ুন রশিদ : আজকের নির্যাতিত আরাকানের মুসলমানদের রয়েছে গৌরবময় অতীত। এক সময় আরাকান রাজ্যের রাজা বৌদ্ধ হলেও তিনি মুসলমান উপাধি গ্রহণ করতেন। তাঁর মুদ্রায় ফারসি ভাষায় লেখা থাকত কালেমা। আরাকান রাজদরবারে কাজ করতেন অনেক বাঙালি মুসলমান। বাংলার সঙ্গে আরাকানের ছিল গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক।

১৪০৬ সালে আরাকানের ম্রাউক-উ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নরমিখলা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে বাংলার তৎকালীন রাজধানী গৌড়ে চলে আসেন। গৌড়ের শাসক জালালুদ্দিন শাহ নরমিখলার সাহায্যে ৩০ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে তাঁকে বিতাড়নকারী বর্মি রাজাকে উত্খাতে সহায়তা করেন। নরমিখলা ইসলাম কবুল করেন ও মোহাম্মদ সোলায়মান শাহ নাম নিয়ে আরাকানের সিংহাসনে বসেন। ম্রাউক-উ রাজবংশ ১০০ বছর আরাকান শাসন করেছে। এর ফলে সেখানে মুসলিম ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, কবি ও শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পায়। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল রোসাং রাজদরবার।

মহাকবি আলাওল রোসাং দরবারের রাজকবি ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন মহাকাব্য পদ্মাবতী। এছাড়া সতী ময়না ও লোর-চন্দ্রানী, সয়ফুলমুলক, জঙ্গনামা প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ রচিত হয়েছিল রোসাং রাজদরবারের আনুকূল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায়। (সূত্র : রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস, এন এম হাবিব উল্লাহ্)

সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানিদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তী সময়ে চাটগাঁইয়া, রাখাইন, আরাকানি, বার্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের মিশ্রণে এই জাতি ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

রোহিঙ্গাদের বসবাসস্থল রাখাইন রাজ্য। এর আদি নাম আরাকান। এ নামকরণ স্মরণ করিয়ে দেয় মুসলিম ঐতিহ্যের কথা। কারণ ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তিকে একত্রে বলা হয় আরকান। আর এই আরকান থেকেই মুসলমানদের আবাস ভূমির নামকরণ করা হয়েছে আরাকান।

আরাকানে মুসলমানরা বার্মিজ মগদের চেয়ে সুপ্রাচীন। বর্মিদের কয়েক শ বছর আগে থেকে সেখানে মুসলমানদের বসবাস। আরাকানি সূত্রে জানা যায়, আরাকানে দশ কিংবা বারো শতকের আগে বর্মি অনুপ্রবেশ ঘটেনি। (Harvey, G E, History of Burma. p-137-313)

সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন পার্শ্ববর্তী উপকূলে আশ্রয় নেন। তাঁরা বলেন,‘আল্লাহর রহমতের বেঁচে গেছি।’ সেই ‘রহম’ থেকেই রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। কিন্তু আগে রোসাং ও রোয়াং শব্দ অধিক পরিচিত ছিল। এককালে চট্টগ্রামের মানুষ ‘রোয়াং’ যেত উপার্জনের জন্য। চট্টগ্রাম দীর্ঘ সময় আরাকানের অধীন ছিল। ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন,‘চট্টগ্রাম গোড়া থেকেই সম্ভবত আরাকানী শাসনে ছিল। আর ৯ শতকের শেষপাদে ৮৭৭ অব্দের পূর্বে কোনো সময়ে সমগ্র সমতট আরাকানী শাসনভুক্ত ছিল।’ (আহমদ শরীফ, চট্টগ্রামের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৯)

আরাকানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। ইতিহাস বলছে, রোহিঙ্গারা আরাকানের ভূমিপুত্র। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। ১৭৮৫ সালের প্রথম দিকে মিয়ানমারের রাজা ভোধাপোয়া এটি দখল করে বার্মার (মিয়ানমার) করদ রাজ্যে পরিণত করে।

১৭৯৯ সালে প্রকাশিত ‘বার্মা সাম্রাজ্য’তে ব্রিটিশ ফ্রাঞ্চিজ বুচানন হ্যামিল্টন উল্লেখ করেন, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসারীরা (মুসলিম), যারা অনেক দিন ধরে আরাকানে বাস করছে, তাদের রুইঙ্গা (Rooinga) বা আরাকানের স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা আরাকানের মূল নিবাসী (Native of Arakan) বলা হয়। মগ জাতি কখনোই নিজেদের আরাকানের স্থানীয় বাসিন্দা বা আরাকানের মূল নিবাসী (Native of Arakan) উল্লেখ করেনি।

আরাকান ছিল বরাবরই স্বাধীন ও অতিশয় সমৃদ্ধ একটি দেশ। বাংলার প্রাচুর্যের কারণে যেমন ১৫০০ সালের শুরুতে এখানে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে, তেমনি ১৫০০ ও ১৬০০ সালে আরাকানে পর্তুগিজ ও ওলন্দাজদের আগমন ঘটে। ১৬০০ সালে ওলন্দাজরা আরাকান থেকে দাস ও চাল ক্রয় করত। তারা সেখানে নিয়ে আসত লোহা ও লৌহজাতসামগ্রী।

মিয়ানমারের বর্তমান বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের আগের নাম মগ। মগরা ঐতিহাসিকভাবেই বর্বর। মগ দস্যুরা বাংলার উপকূল থেকে লোকজন ধরে নিয়ে তাদের কাছে বিক্রি করত। মগদের বর্বরতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায় ড. আহমদ শরীফের লেখায়। তিনি লিখেছেন,‘মগ জলদস্যুরা জলপথে বাঙলাদেশের ভুলুয়া, সন্দ্বীপ, সংগ্রামগড়, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, বাকলা, যশোর, ভূষণা ও হুগলী লুণ্ঠন করত। তারা হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ ও বড়-ছোট-নির্বিশেষে ধরে নিয়ে যেত। হাতের তালু ফুঁড়ে বেত চালিয়ে গরু-ছাগলের মতো বেঁধে নৌকার পাটাতনে ঠাঁই দিত। মুরগীকে যেভাবে দানা ছিটিয়ে দেওয়া হয়, তাদেরও তেমনি চাউল ছুড়ে দেওয়া হত খাবার জন্যে। এ অবহেলা ও পীড়নের পরেও যারা বেঁচে থাকত তাদেরকে ভাগ করে নিত মগে-পর্তুগীজে।’ (চট্টগ্রামের ইতিহাস, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫১)

১৫৩১ সালে আরাকানের রাজা জেবুক শাহ পর্তুগিজ নৌসেনাদের সহায়তায় আরাকানে নৌবাহিনী গঠন করেন। উদ্দেশ্য ছিল, মোগলদের থেকে আরাকানকে রক্ষা করা। নৌসেনা গঠনের উদ্দেশ্য ছিল যেহেতু মোগল মুসলিম সেনাদের মোকাবেলা, তাই জেবুক শাহ তার নৌবাহিনীতে আরাকানের মুসলমানদের পরিবর্তে মগদের স্থান দেন। কিন্তু পরে এরা মানবিকতাবিবর্জিত হিংস্র জলদস্যুতে পরিণত হয়।

আরাকানের পতনকাল শুরু হয় ১৬৬০ সালে আরাকানের রাজা চন্দ্র সু ধর্মা কর্তৃক মোগল রাজপুত্র শাহসুজাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আরাকানে বিরাজ করে অস্থিরতা। মাঝখানে শান্তি ফিরে এলেও আরাকানি সামন্ত রাজাদের মধ্যে কোন্দল দেখা দেয়। সে সুযোগে ১৭৮৪ সালে বর্মি রাজা ভোধাপোয়া আরাকান দখলে নেন। ভোধাপোয়ার অত্যাচারে আরাকানের রাজা ঘা থানবি পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়ে বর্মিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সিনপিয়ার নেতৃত্বে আরাকান বিদ্রোহ তুঙ্গে পৌঁছে। ১৮১১ সালে সিনপিয়ার বাহিনী রাজধানী ছাড়া গোটা আরাকান দখলে নিলেও পরে পরাজিত হয় বর্মি রাজার সেনাদের কাছে।

আরাকানের বিদ্রোহ দমনের জন্য বর্মি রাজা ১৮১১ সালে গোটা বার্মায় প্রত্যেক পরিবার থেকে একজন যুবক, ২৫০ টাকা, একটি বন্দুক, ১০টি চকমকি পাথর, দুই সের বারুদ, সম ওজনের সিসা, দুইটি কুঠার, ১০টি লম্বা পেরেক সরবরাহের নির্দেশ জারি করেন। এভাবে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে তৎকালীন বর্মি রাজা সিনপিয়ার বাহিনীকে পরাজিত করে। ১৮১৫ সালে সিনপিয়ারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় আরাকানের স্বাধীনতা উদ্ধার আন্দোলন।

১৮২৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি বার্মা দখল করে। এরপর দীর্ঘ ১০০ বছর পর্যন্ত আরাকানিরা অনেকটা স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু ১৯৪২ সালে আরাকান জাপানিদের অধীনে চলে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মায় জাপানি সেনাদের দ্বারা এক লাখ ৭০ হাজার থেকে দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। নিহতদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা ছিল মুসলমান।

অবশেষে ১৯৪৫ সালে আবার ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে বার্মা। কিন্তু স্বাধীনতার মাধ্যমে বার্মা ব্রিটিশমুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুনভাবে আরাকানের ওপর হত্যা, নির্যাতন আর উচ্ছেদে মেতে ওঠে বর্মিরা। আরাকানবাসীদের বহিরাগত আখ্যা দিয়ে শুরু করে চরম হত্যাযজ্ঞ। বলা যায়, বার্মার স্বাধীনতা আরাকানের রোহিঙ্গাদের জন্য বয়ে আনে অভিশাপ।

‘রোহিঙ্গাদের উৎস ও বিকাশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন,‘রাজা ভোধাপোয়া আরাকান দখল করে বার্মার সঙ্গে যুক্ত করার আগে ১৪০৪ সাল থেকে ১৬২২ সাল পর্যন্ত ১৬ জন মুসলিম রাজা আরাকান শাসন করেন।’

১৭৮২ সালে ‘থামাদা’ আরাকানের রাজধানী ‘ম্রোহং’ দখল করে নিজেকে রাজা ঘোষণা করে। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত স্বাধীন আরাকান রাজ্য এরপর একেবারে ভেঙে পড়ে।

১৭৮৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বার্মার রাজা ভোধাপোয়া আরাকান আক্রমণ করে আরাকানকে বার্মার একটি প্রদেশে পরিণত করেন। সে সময় দুই লক্ষাধিক রাখাইনকে হত্যা করা হয়। পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়, যাতে এ জাতির পুনরুত্থানের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

ভোধাপোয়ার উচ্চ কর আরোপ আর বর্মি বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মগ-মুসলিম-নির্বিশেষে আরাকানের জনগণ পালিয়ে এসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বসবাস শুরু করে। মগরা একজোট হয়ে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল থেকে বর্মিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।

জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভুল

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জিন্নাহ আরাকানের ব্যাপারে সঠিক ভূমিকা গ্রহণ করলে আজ রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে আরাকান মিয়ানামার থেকে আলাদা হতে চেয়েছিল। কেননা ঐতিহাসিকভাবে আরাকান মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল না। বার্মিজরা এক সময়ের স্বাধীন আরাকান দখলে নেয়। ব্রিটিশ উপনিবেশে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) সঙ্গে একীভূত হতেও মত দেয় আরাকান নেতৃত্ব। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে ১৯৪৬ সালে ‘আরাকান মুসলিম লীগ’ গঠন করে তারা। কিন্তু জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আরাকান বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেনি। পারেনি তার স্বাধীন অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনতে। পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত না করলেও সে সময় তাদের স্বাধীন থাকার সুযোগ করে দেওয়া যেত। কিন্তু এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। এর দায় জিন্নাহর। তিনি আদৌ মুসলিম ছিলেন কি না, সে ব্যাপারেই অনেকের সন্দেহ! জিন্নাহ ছিলেন খোজা মুসলিম। হিন্দু লোহানা জাতি থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছে তারা। এরা শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। বার্নার্ড লিউইস খোজাদের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন,‘এরা মুসলিম আচ্ছাদনের তলায় হিন্দু মনোভাবাপন্ন। (যশোবন্ত সিংহ,‘জিন্না ভারত দেশভাগ স্বাধীনতা’, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৬২)

লেখক : শিক্ষক, দারুল আরকাম,টঙ্গী, গাজীপুর।

ট্রাম্পের বই-এ ‘৯-১১’ হামলার ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো !

trump 911 bookমুহাম্মাদ আলী রেজা : সাম্প্রতিক সাড়া জাগানো খবর : টুইন টাওয়ার হামলার প্রায় দুই বছর আগেভাগে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বইতে ‘The America We Deserve’ প্রকাশ জানুয়ারি ২০০০ Nostrodomas -এর মতো ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- ওসামা বিন লাদেন টুইন টাওয়ারে হামলা চালাবেন। US Presidential hopeful Donald Trump “warned” of the horrific September 11 attack on the World Trade Center in a book published less than two years before the world’s worst terror strikes happened, it is being claimed. By JON AUSTIN PUBLISHED: 03:42, Tue, Feb 23, 2016। ট্রাম্পকে এখন বলা হচ্ছে ‘মডার্ন ডে নসট্রডোমাস।’ Alex Jones Radio Show সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন,‘আমি ওই বইতে বলেছি, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এই ব্যক্তি ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে।’

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, আসলে টুইন টাওয়ারে হামলা ছিল অভ্যন্তরীণ বিষয় (পরিকল্পনা) মাত্র। ‘নয়-এগারো’তে ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম হামলা হলেও এর নীলনকশা শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একই প্রতিষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এভাবে তখন এটা প্রমাণ করার চেষ্টা চলে যে, বিশ্বে জাতি হিসেবে মুসলমানরাই সন্ত্রাসী। তখন রিডার্স ডাইজেস্ট এক নিবন্ধে লিখেছিল, হামলার জন্য বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্র বাছাই করার লক্ষ্য হলো, এটা দেখানো যে, এটা মূলত সমগ্র বিশ্বসম্প্রদায়ের ওপরই আক্রমণ। কারণ,এখানে সব দেশের, সব জাতির এবং সব ধর্মের লোকেরা অবস্থান করেন। সিএনএনের প্রথম রিপোর্টে স্বীকার করা হয়- যদি বোমা হামলাকারীরা বাণিজ্যকেন্দ্র সমূলে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করত, তাহলে বিস্ফোরক রাস্তার সমতলে বসাত। ফলে শত শত মানুষ নিহত বা জখম হতো।

বাল্টিমোর নিউ ট্রেন্ড পত্রিকা লিখেছেন, বোমা হামলাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়, যার ফলে সবচেয়ে কম ক্ষতি হয়েছে এবং এর আওতার মধ্যে পড়েছে সবচেয়ে কম লোক। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্রে প্রথম হামলাটি আসলেই ছিল এক আগাম কৌশল। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল, প্রচারমাধ্যমে স্পর্শকাতর অনুভূতি সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী’ ব্রান্ডে চিহ্নিত করে তাদের ব্যাপারে আমেরিকানদের সতর্ক ও উত্তেজিত করা। ১৯৯৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে বিরামহীন ‘মিডিয়া ক্রুসেড’, যার লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী জাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা। ‘জিহাদ ইন আমেরিকা’ নামে এক ঘণ্টার ডকুমেন্টারি ফিল্ম পাবলিক টেলিভিশনে দেখিয়ে উত্তেজিত করা হলো আমেরিকানদের।‘ওয়াগ দ্য ডগ’ও ‘সিজ’ নামে তিন ঘণ্টার মুভি প্রেক্ষাগৃহে দেখান হয় সেই উদ্দেশ্যে। এগুলো আমার নিজেরই দেখা বলে এখানে উল্লেখ করছি।

৯-১১-এর একটা গোপন স্যাটেলাইট ইমেজ রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে। এমনটাই দাবি করলেন রাশিয়ান কূটনীতিকেরা। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে জঙ্গি হামলার এমন এক ছবি তার কাছে রয়েছে যা দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব যে, কাজটা আসলে করিয়েছিল আমেরিকাই। এই ছবি প্রমাণ করবে, বিশ্বের ভয়ঙ্করতম জঙ্গি হামলার দায় আসলে মার্কিন প্রশাসন ও মার্কিন গোয়েন্দাদের। এমনটাই দাবি করেছে রাশিয়া। আরো দাবি করা হয়েছে, এই হামলার পুরো দায়ভার পড়ে বুশ প্রশাসনের ঘাড়ে। আর এই হামলায় ওসামা বিন লাদেনের লোকজনকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল মাত্র।

রহস্য উদঘাটন : কেন বুশ ৯-১১ সুপার ড্রামা মঞ্চস্থ করার পরিকল্পনা করেছিলেন?

তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সুদূর পরিকল্পিত ৯-১১ সুপার ড্রামা মঞ্চস্থ হওয়ার প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়ায় প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হয়ে যায় : [সর্বনাশ!] ইসলাম এ দেশে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্ম। এটি আরো তীব্র হয়ে ওঠে যখন ক্লিনটন সরকার হোয়াইট হাউজে স্থায়ীভাবে ইসলামের প্রতীক চাঁদ-তারা পতাকা ওড়ায়। যেদিন ইসলামের এই পতাকা উত্তোলন করা হয়, পরের দিনই পতাকাটি হাইজ্যাক হয়ে যায়। মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়লে পরের দিন আবার চাঁদ-তারা পতাকা শোভা পায়। আর মিডিয়া খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, হোয়াইট হাউজ জানেই না- কে বা কারা এ কাজটি করেছে। তাদের অগোচরে এটাও কি সম্ভব হতে পারে? একই যুক্তিতে বলা যায়, বিশ্বের শীর্ষ সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে এক সাথে চারটি বিমান ছিনতাই করে হামলা চালানো ক্ষুব্ধ আরব মুসলমানদের পক্ষে কোনো পরিস্থিতিতেই কি সম্ভব? এটা কি বিশ্বাস করা যায়? আফগান গুহায় বসে কিছু লোক এবং ১৯ জন বিমান ছিনতাইকারী বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়ে ‘নয়-এগারো’র মতো নজিরবিহীন ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার এমন ঘটনা কখনো ঘটাতে পারে কি? এসব বিশ্বাসযোগ্য হওয়া তো দূরের কথা, কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বর্ণনা এরকমই দেয়া হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর থেকে দু’টি ধর্মীয় পতাকা হোয়াইট হাউজে ওঠানো হতো। দেখতে দেখতে মুসলমানদের সংখ্যা ইহুদিদের টপকিয়ে যেতে দেখা যায়। সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে তিন ধর্মের পতাকা হোয়াইট হাউজে উড়বে। জন্স হপকিন্স যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। বাল্টিমোরে এর দু’টি ক্যাম্পাস। হোমউড ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির নিচ তলার দেয়ালে পরিবেশিত একটি নিউজ আমার নজরে পড়েছিল : প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এক লাখ ইসলাম গ্রহণ করছে। মিডিয়ায় দেখি : এই ধর্মান্তরিতদের মধ্যে বেশির ভাগই মহিলা। এ সময় একটি বই হাতে পাই : ‘ডটার অব অ্যানাদার ওয়ে’। লিখেছেন একজন খ্রিষ্টান মা। বইটিতে বিবৃত হয়েছে লেখিকা মিসেস অ্যানওয়ের অভিজ্ঞতাসহ নিজ কন্যা ও আমেরিকান অন্যান্য নারীর মুসলমান হতে চাওয়ার কাহিনী।

আমার সাথে যেসব মহিলার কথা হয়েছে, তারা জানেনই না এ রকম বই বাজারে আছে! এক মহিলা জানালেন, সবাই প্রশ্ন করে, কেন মুসলমান হলাম? আমিও ভাবছি এ সম্পর্কে বই লিখব। কিন্তু এ রকম বই দেখছি বাজারে এসে গেছে। তিনি এক সৌদি ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করেছেন। সৌদি আরবেও গিয়েছেন। বললেন : সৌদি আরবে মহিলারা আমাদের মতো ইসলাম সম্পর্কে এত ভালো জ্ঞান রাখে না। মূলত এর কারণ হচ্ছে- এখানে যারা মুসলমান হন, সব ধর্ম পড়াশোনা করে তার পরই ধর্মান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইন্টারনেটে একজন লিখেছেন : বইটি পেয়ে পড়ে দেখি, এ তো আমারই কথা। সাথে সাথে আব্বা-আম্মাকে কপি দিয়ে বলি, দেখ কেন আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। একজন আইরিশের সাথে পরিচয়, তিনি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে যতটা জানেন আমি তার মতো জানি না, যদিও আমার বাড়ি গোপালগঞ্জে হিন্দুপ্রধান এলাকায়। তিনি বললেন : সব ধর্মের তুলনামূলক পড়াশোনা করে তার পরে মুসলমান হয়েছি। বললেন, তার স্ত্রী তখনো খ্রিষ্টান থাকলেও জেনে শুনে পড়াশোনা করে অনেক পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

‘ডটার অব অ্যানাদার ওয়ে’ বইটি বিশ্বে বেশ সাড়া জাগায়। দেশে এসে এর বাংলা অনুবাদ “অন্য পথের কন্যারা” দেখতে পাই।

বর্তমান দুনিয়ায় একটি অপ্রকাশিত বিষয় হচ্ছে : আগে বিশ্বের সবাই প্রধানত কমিউনিজম, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক, আলোচনায় মেতে থাকত। ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানে দুনিয়াব্যাপী বর্তমানে কিন্তু জমে উঠেছে তুলনামূলক ধর্মের বিষয় বা বক্তব্য নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিতর্ক। এ কারণে বিশ্বের সব দেশে দেখা যাচ্ছে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাচ্ছেই।

পিউ রিসার্চ সেন্টার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনমত জরিপ পরিচালনাকরী একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এখন তুলনামূলকভাবে বিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল একমাত্র ধর্মবিশ্বাস হচ্ছে ইসলাম, যদিও বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হলো ইসলাম আর সবচেয়ে বেশি অনুসারী হলো খ্রিষ্টান ধর্মের।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বুশের প্রতিদ্বন্দ্বী আল গোর

সে নির্বাচনের বিতর্ক প্রতিযোগিতাটি ছিল রোমাঞ্চকর। বিতর্কের একটি বিষয় থেকে এটা স্পষ্ট যে, পরবর্তীকালে কেন বুশ সেই বিতর্কিত ক্রুসেডের ঘোষক এবং নাইন-ইলেভেনের পরিকল্পক হলেন? প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোর ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নিলেন গোঁড়া ইহুদি লিবারম্যানকে। বুশের কাছে স্পষ্ট হলো, ইহুদি সব ভোট অবশ্যই গোরের পাল্লায় যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবি খুবই সক্রিয় ও সুসংগঠিত। সে দেশে সাধারণত খ্রিষ্টান ভোট দুই ভাগে প্রায় সমানভাবে বিভক্ত হয়ে ভোটের ভারসাম্য বজায় রাখে দুই দলের মধ্যে। এতদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, ইহুদি ভোট যে দিকে মোড় নেয়, তারাই বিজয়ের হাসি হাসে। বুশ দেখলেন, কথা ঘুরিয়ে বললে সব মুসলমান ভোটারের ভোট অতি সহজে অনায়াসে পাওয়া যাবে। বিতর্কের সময় তিনি সরাসরি বললেন : ‘নিরাপত্তা আইনে সিক্রেট এভিডেন্সকে বৈষম্যমূলক মনে করি। ক্ষমতায় গেলে এটি বাতিল করব।’ জবাবে আল গোর বলেন : ‘আমি এটাকে বৈষম্যমূলক মনে করি না।’ এই লেখক তখন যুক্তরাষ্ট্রে বসে টিভিতে বিতর্কটির দর্শক ছিলেন।

মুসলমান ভোটারদের মনে হলো, বুশ তাদের পক্ষ নিয়েছেন। এই প্রথম মুসলমানেরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে জোটবদ্ধভাবে একদিকে ভোট প্রয়োগ করেন। এমনকি, বুশের পক্ষে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রচারে জড়িয়েও পড়েন। শেষে ইহুদি লবির সাথে প্রতিযোগিতায় বিজয় ছিনিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হলো, মুসলমানরাও মার্কিন মাটিতে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনে সক্ষম। মুসলিম ভোট ব্যাংকের শক্তির মহড়াকে বরং দেখা হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে। প্রচারমাধ্যম এটা লুফে নিলো। ইনভেস্টরস বিজনেস ডেইলি এক নিবন্ধে লিখেছিল ‘আমেরিকান মুসলমানদের জন্য এটা ছিল বিজয়ের চেয়ে অনেক বেশি।’ ক্ষমতা পেয়ে বুশ অবশ্য তার কথা আদৌ রক্ষা করেননি, বরং কার্যত নাইন-ইলেভেনের রূপকার হলেন।

নাইন-ইলেভেনে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দু’টি যাত্রীবাহী বিমান আছড়ে পড়েছিল নিউ ইয়র্কের বিশ্ববাণিজ্যকেন্দ্রে। অতঃপর আগুন, ধোঁয়া; তাসের ঘরের মতো দু’টি টাওয়ার ভেঙে পড়ে। ‘নয়-এগারো’র ভয়াল সন্ত্রাসী হামলার দশক পূর্তির পরও বিবিসি, রয়টার, এএফপি পরিবেশিত সংবাদে প্রশ্ন করা হলো : আসলে কী ঘটেছিল ২০০১-এর এই দিনে? সত্যিই কি আলকায়েদা মার্কিন শৌর্যে আঘাত হেনেছিল, নাকি সবই পাতানো?

যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভেন জোন্সের নেতৃত্বে ৭৫ জন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীর অভিযোগ : নিউ ইয়র্ক ও পেন্টাগনে সে হামলা যাত্রীবাহী বিমানের নয়, এটা ছিল ‘ভেতর থেকেই’ সংঘটিত। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাকে অধ্যাপক স্টিভেন বলেন, ভেঙে পড়া টুইন টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষার পর নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে সেখানে ভবন ধসিয়ে দেয়ার বিস্ফোরক ব্যবহারের।

কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতে, ৯-১১ ঘটনাটি ছিল একটি ষড়যন্ত্র। পেন্টাগনে আসলে বিমান নয়, রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কারণ, বিমানের যাত্রীদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, যাত্রী ও ক্রুদের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। মৃতদেহ পাওয়া গেলে উঘঅ পরীক্ষা করে অবশ্যই তাদের শনাক্ত করা হতো। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে ইরানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘নয়-এগারো’ হামলা ছিল গোয়েন্দা সংস্থার জটিল দৃশ্যকল্প ও কর্মকাণ্ড। আর পেন্টাগনে যে বিমানটি হামলা করেছিল, তার ধ্বংসাবশেষের খোঁজ পাওয়া গেল না’ কিংবা আরোহীদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের খোঁজ মিলল না কেন? একই দিনে আর একটি বিমান যুক্তরাষ্ট্রের একটি খেলার মাঠে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও এর কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি-এ কথা উল্লেখ করে মাহাথির বলেন, বিমানটি কি শেষ পর্যন্ত হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? মার্কিন গণমাধ্যম ‘৯-১১’ ঘটনা সম্পর্কে রহস্যজনক নীরবতা বজায় রাখে। এর উদ্দেশ্য কী?

বিশ্বকে ফাঁকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নতুন কৌশলে চলমান রয়েছে বুশের সেই নাইন-ইলেভেন ক্রুসেড। এ কাজে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অগ্নিতে ঘৃত সংযোগ করছেন।

সিএআইআরের মুখপাত্র উইলফ্রেডো আমর রুইজ আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ‘এই কর্মকাণ্ডটি এখন একটি শিল্পের রূপ নিয়েছে। ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়ানোর এ কাজ থেকে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করা হচ্ছে। তারা কখনো কখনো নিজেদের ইসলামি বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করছে।’ ‘তারা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করছে যেন, মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। তারা আমেরিকানদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, মুসলমানেরা আমেরিকান কমিউনিটির অংশ নয় এবং তারা আমেরিকার বিশ্বস্ত নাগরিকও নয়।

তিনি বলছিলেন, এর দু’টি বিপজ্জনক দিক : একটি, ঘৃণা থেকে অপরাধ বৃদ্ধি করছে এবং অন্যটি হলো, মুসলমানদের বিপক্ষে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

লেখক : সাবেক পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে সৌদি আরবের আওয়ামিয়া শহর

awamiya destroyedগত মে মাস থেকে সৌদি আরব নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটির আওয়ামিয়া শহর। দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিকসহ বহু মানুষ হতাহতের শিকার হয়েছে।

আওয়ামিয়া শহরের যেকোনো দৃশ্য দেখলে এখন মনে হয় সেটি ইরাক বা সিরিয়ার কোনো দৃশ্য। শহরটি বর্তমানে বাইরের লোকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সম্প্রতি অনুমতি পায় সংবাদ সংস্থা বিবিসি।

বিবিসির সংবাদদাতা স্যালি নাবিলকে আওয়ামিয়া শহরে নেয়া হয় নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁজোয়া যানে করে।

বিবিসির প্রকাশিত একটি ভিডিওতে শহরের ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরা হয়েছে।

সৌদি সরকার বলছে, বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে এখনো উত্তেজনা আছে।

তবে আওয়ামিয়াতে বসবাসরত শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বহুদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

মে মাসে প্রকল্প চালুর জন্য নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে হস্তক্ষেপ করলে শিয়া গোষ্ঠীগুলো আপত্তি জানায়। কিন্তু তাতে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে জোরপূর্বক উচ্ছেদ চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ শিয়াদের। সরকার ও শিয়াদের দ্বন্দ্বের কারণে বিষয়টি সহিংসতায় রূপ নেয়। ফলে সাধারণ নাগরিকসহ বহু হতাহত হয়।

ভারতের ভণ্ড ধর্মগুরুদের কাহিনী

ramমাহমুদ ফেরদৌস |কেউ নম্র, আর কেউ উগ্র। কেউ আধ্যাত্মিক, কেউ আবার বাটপার। যাদুকরী, মাফিয়া — ভারতে সব জাতের ধর্মগুরুর ছড়াছড়ি। গত ২০ বছরে অন্ধবিশ্বাসের এই রমরমা ব্যবসা মাশরুমের মতো বিস্তৃত হয়েছে ভারতজুড়ে। লাখ লাখ সহজ সরল মানুষের কাছে মিথ্যার বেসাতি বিক্রির কারবার এখন পুরোমাত্রার একটি ইন্ডাস্ট্রি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুরমিত রাম রহিম সিং নামে এমন এক ধর্মগুরুকে ধর্ষণের দায়ে কারাদণ্ড ও এর পরে সংঘটিত ব্যাপক সহিংসতা এই ইস্যুটি আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

ভারতে এই স্বঘোষিত ‘গডম্যান’দের ধাপ্পাবাজি সবচেয়ে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে ধরা হয়েছিল আমির খান অভিনীত আলোচিত ছবি ‘পিকে’তে। সাধারণত, স্যাফ্রন রঙ্গের ঢিলেঢালা পোশাকে তাদের চেনা যায়। গলায় ঝুলানো থাকে মালা আর মুখে লম্বা দাড়ি। কিন্তু এসব ধর্মগুরুরা বসবাস করেন দুই জগতে। প্রকাশ্যে তারা থাকেন একরকম। আরেক জগৎ অন্ধকারে ভরা। যৌনতা সেখানে অবাধ, আর অর্থকড়ি অঢেল।

আশ্রমে ভক্তি নিয়ে নিজের সাধ্যমতো টাকাপয়সা ঢেলে যায় ভক্তরা। অর্থ আসে আরও অজানা উৎস থেকে। এই বিপুল অর্থের নেই কোনো জবাবদিহিতা। আরও ভয়াবহ ব্যাপার হলো, এই ধরণের ‘স্বামী’ আর ধর্মগুরুদের তোয়াজ করে চলতে হয় প্রায় সব রাজনৈতিক দলকে। উপায়ই বা আর কী? এই ধর্মগুরুদের অনুসারীর সংখ্যা এত বেশি থাকে যে তারাই অনেক নির্বাচনে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।

গুরমিত রাম রহিমের বিরুদ্ধে শিখ ও হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ব্যঙ্গ করার অভিযোগ উঠেছিল। পরে উঠে ধর্ষণ, খুন ও লিঙ্গচ্ছেদের অভিযোগও। শেষপর্যন্ত ২৫শে আগস্ট বিশেষ সিবিআই আদালত ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে। এরপরই ব্যপক হারে দাঙ্গা শুরু হয়। অনেক শহরে রীতিমতো যুদ্ধাবস্থা দেখা দেয়। পুলিশের সঙ্গে তার অনুসারীদের সহিংসতায় ৩৮ জন নিহত হয়। আহত হয় ৩ শতাধিক মানুষ। ২৮শে আগস্ট তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আরেক আধ্যাত্মিক গুরু স্বামী নিথিয়ানন্দের সঙ্গে এক তামিল অভিনেত্রীর ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য ক্যামেরায়ও ধারণ করা হয়। অথচ, এই নিথিয়ানন্দ নিজেকে চিরকুমার বলে দাবি করে থাকেন। তারও আগে দুই নারীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ অবস্থার দৃশ্যও আলোচনার ঝড় তোলে ভারতে। এসব ছবি ও ভিডিওকে ভুয়া বললেও, নিথিয়ানন্দ নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ করেন।

অনেক ধর্মগুরুর বিরুদ্ধেই বিভিন্ন পতিতা চক্র পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। শিব মুরাত দ্বিবেদি ওরফে ইচ্ছাধারী বাবা নামে এক ধর্মগুরুকে সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে গ্রেপ্তার করা হয়। নিজের আধ্যাত্মিকতার ছদ্মবেশ তো ছিলই, অর্থ, দামি উপহার ও গাড়ি দিয়ে তরুণীদের প্রলুব্ধ করে তাদেরকে বাধ্য করতেন পতিতাবৃত্তিতে। এসব থেকে তার আয় হতো কোটি কোটি টাকা। তদন্তকারীরা খুঁজে পান যে, দ্বিবেদী দক্ষিণ দিল্লির খানপুরে নিজের মন্দিরে গুহা বানিয়েছিলেন এই নির্বিঘেœ এই কারবার পরিচালনা করতে। বাদরপুরে সাঁই বাবার নামে ছোট একটি মন্দির বানিয়ে তার যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে নিজের বানানো মন্দির প্রাঙ্গনেই তিনি দেহব্যবসা চালু করেন।

গুজরাটের ধর্মগুরু আশারাম বাপুর নাকি সম্মোহনী ক্ষমতা আছে। এই ক্ষমতার কারণে বিশ্বজুড়ে তার লাখো ভক্ত জুড়েছে। গুজরাট সরকার সম্প্রতি বিধানসভায় স্বীকার করেছে যে, আশারামের আশ্রম আহমেদাবাদে ৬৭ হাজার ৯৯ বর্গমিটার জমি দখল করেছে! বলে রাখা ভালো যে, আশারামের এমন ২২৫টি আশ্রম রয়েছে! বিশ্বজুড়ে রয়েছে ১৫০০ যোগ বেদান্ত সেবা সমিতি।

মুম্বইয়ের ধর্মঘুরু রাধা মা একটু ব্যতিক্রমী। কারণ, তিনি হলেন নারী ধর্মগুরু। জন্মের সময় নাম ছিল সুখভিন্দর কৌর নামে। পরমহাঁস ডেরায় যোগদানের পর নিজেকে একজন হিন্দু দেবী হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন রাধা মা। নিজেকে এমনকি একবার দুর্গা দেবীর সাজেও সাজান। এ নিয়ে ফাগবারা নামে এক হিন্দু সংগঠন আপত্তি জানালে, তিনি ক্ষমা চান। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে নিকি গুপ্ত নামে এক নারী রাধা মার বিরুদ্ধে শারিরীক নির্যাতনের অভিযোগ আনেন। বাইরে তার এক রূপ হলেও, ভেতরে আরেক। তার স্বল্পবসনা পোশাক পরা কিংবা অশ্লীল কার্যকলাপ করার ছবি ও ভিডিও একবার ছয়লাব হয়েছিল।

হরিয়ানার রামপাল সিং জতীন একসময় ছিলেন প্রকৌশলী। পরে আশ্রম খুলে হয়ে যান আধ্যাত্মিক গুরু। ধরতে গেলে তিনি নতুন ধর্মই বের করে বসেন। তার ধর্মে মন্দিরে যাওয়া, মূর্তিপূজা, যৌনতা, অশ্লীল গান ও নাচ নিষিদ্ধ। রামপালের মতে, সব বড় ধর্মীয় গ্রন্থেই জনৈক কবির পীরকে দেবতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আর তিনি ওই কবিরেরই উত্তরসূরি। ২০০৬ সালে আর্য সমাজ নামে এক হিন্দু সংগঠনের সমালোচনা করেন। এরপরই তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। কিন্তু তিনি ৪ বছরে ৪২ বার আদালতে হাজিরা দিতে ব্যর্থ হন। শুধুমাত্র ‘আইন শৃঙ্খলা রক্ষা’র স্বার্থে তাকে হাজিরা দেওয়া থেকে আদালত অব্যাহতি দেয়। কিন্তু ২০১৪ সালে তার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। আর এরপরই আর্য সমাজ ও তার অনুসারীদের মধ্যে সহিংস সংঘাত সৃষ্টি হয়। আর্য সমাজের এক অনুসারীর মৃত্যু হলে রামপালের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনা হয়। পরে তিনি গ্রেপ্তার হন। মাসকয়েক পর বেরও হয়ে যান জেল থেকে। কিন্তু এরপর আবার আদালতে হাজিরা দেননি তিনি। ফের পরোয়ানা জারি হলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে যায়, কিন্তু তার অনুসারীরা পুলিশকে ঠেকিয়ে দেয়। ২০১৪ সালের নভেম্বরে তাকে শেষমেশ আটক করা হয়। সঙ্গে আটক হয় তার ৪৮২ জন অনুসারী। হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ষড়যন্ত্র, অবৈধ অস্ত্র বহন, আত্মহত্যা প্রবণ মানুষকে উস্কানো সহ বহু অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগ থেকে আদালত তাকে খালাস দিয়ে দেয়! এমনই ক্ষমতা এই ধর্মগুরুদের।

আশারাম থেকে রাম রহিম কিংবা নিথিয়ানন্দ সবার বিরুদ্ধেই ধর্ষণ সহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেক অনুসারীও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা দিয়েছেন ধর্ষণ সহ অনেক অনৈতিক কাজের। কিন্তু খুব কমই বিচারের কাঠকড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে এই প্রচণ্ড প্রভাবশালী গুরুদেরকে।

সূফীবাদে বিশ্বাসী আরেক আধ্যাত্মিক গুরু অরবিন্দ গুরুজির ভাষ্য, ‘ধর্ম আর রাজনীতির মিশ্রণ অনেকটা মদের মতো। কিন্তু ধর্ম আর যৌনতার মিশেলটা আশ্চর্য্যজনক, বিশেষ করে বিশ্বাসীদের কাছে। এটা সত্য যে, আধ্যাত্মিকতা এখন অপবিত্র কাজকর্মের পবিত্র লেবাসে পরিণত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী লাখো অনুসারী আছে এমন বহু গুরুর বিরুদ্ধে এখন ধর্ষণ, যৌন ব্যবসা আর অনৈতিক কাজকর্ম করার অভিযোগ উঠছে। কিন্তু সহজ সরল মানুষেরা এরপরও তাদের পায়ে মাথা ঠেকায়। আর পরে ওই গুরুর প্রতারণা ফাঁস হলে সবচেয়ে বড় ভয়টাই সত্য হয়ে ধরা দেয় এই অন্ধ ভক্তদের কাছে।’

মজার ব্যাপার হলো, অকাট্য প্রমাণ হাজির করা সত্ত্বেও অনেক ভক্তের মোহ কাটে না। নিথিয়ানন্দের এক ভক্ত যেমন তার সেক্স টেপ দেখার পরও তার সত্যতা মানতে রাজি হননি। নিজের গুরুর প্রতি এখনও অগাধ আস্থা তার। তার মতে, ওইসব সেক্স টেপের কোনো ভিত্তি নেই।

অতীব দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও অশিক্ষা- সব মিলিয়ে ভারত যেন সব ধরণের ভণ্ড ধর্মগুরুদের চারণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অনেকেই অবশ্য বলেন, সব ধর্মগুরুকেই কিছুমাত্রায় জবাবদিহিতার আওতায় আনা দরকার। ভুয়া ধর্মগুরুদের উত্থান রুখতে, আরেক আলোচিত ইয়োগা-গুরু বাবা রামদেব প্রস্তাব দিয়েছেন, ‘বাবা’ হতে গেলে কিছুনা কিছু যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। তার বক্তব্য, ‘এসব গুরুদের প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর মতো ক্ষমতাধর লোকেরা তোয়াজ করেন। এর ফলেই তারা ধনী হয়, আর নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।’

অরভিন্দ গুরুজি বলছিলেন, ‘অর্থ এই ক্ষেত্রে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এই গুরুরা তাদের ভক্তদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। আর গুরুকে অর্থ দিতে পেরে অনুসারীরা মনের ভেতর এক ধরণের স্বস্তি ভোগ করে থাকেন। অন্য কথায় বলতে গেলে, এই গুরু আর তার অনুসারীরা একে অপরের পরিপূরক।’

(গালফ নিউজে প্রকাশিত নিবন্ধ ইন্ডিয়াজ গুরুজ অর কনম্যান? শীর্ষক নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।)

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

মিয়ানমারে গণহত্যা, আমরা কী করতে পারি?

rohingya stop genocideমিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যে সুপরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ নির্যাতন চলছে, তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, আসল ঘটনা গণহত্যা। নির্বিচারে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলছে, পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, আর চলছে নারী ধর্ষণ। কেউ কেউ বলতে চাইছে, এটি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, বৌদ্ধদের সঙ্গে মুসলমানদের বিরোধ। মোটেই তা নয়, রোহিঙ্গাদের মধ্যে হিন্দুও আছে, তারাও একইভাবে নির্যাতিত হচ্ছে।

মিয়ানমার সরকার প্রচার করছে, রোহিঙ্গারা জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত। ভাবটা এ রকমের যে এরা আইএসের সঙ্গে যুক্ত, তাই দমন করাটা কর্তব্য। সরকার যে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তা বর্ণবাদী গণহত্যা, যার চরিত্র ফ্যাসিবাদী। মিয়ানমারের সংখ্যাগুরুরা চায় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করে তাদের ভৌত সম্পদ, জায়গাজমি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরবাড়ি—সবকিছু দখল করে নিজেদের সম্পদ বাড়াবে। এরা লুণ্ঠনকারী।

রোহিঙ্গা বিতাড়নের ঘটনা নতুন নয়। এ কাজ মিয়ানমারের সামরিক স্বৈরশাসকেরা আমোদের সঙ্গেই করত; আশা করা গিয়েছিল যে গণতন্ত্র এলে নিপীড়নের অবসান ঘটবে। বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক চাপ ও ভেতরের গণ-আন্দোলনের মুখে সামরিক শাসকেরা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের দখলদারি থেকে পশ্চাদপসরণ করেছে, ক্ষমতায় এসেছেন নির্বাচিত জননেত্রী, ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’, শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারে বিভূষিত অং সান সু চি। কিন্তু তাতে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি; তাদের ওপর নিপীড়ন বরং বেড়েছে। সামরিক সরকারের উদ্বেগ ছিল সু চির দলের শক্তি ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতার মোকাবিলা করা। তারা সে কাজকেই কর্তব্য করে তুলেছিল। এখন যে নির্বাচিত সরকার এসেছে, দেশে-বিদেশে তার কোনো প্রতিপক্ষ নেই, তাই দুর্বল রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে নিজেদের লোকদের বসানোর কাজে তারা মহা উৎসাহে অবতীর্ণ হয়েছে। জবাবদিহির ক্ষেত্রে অবৈধ, দখলদার ও স্বৈরাচারী সামরিক শাসকদের তবু একটা আত্মসচেতনতা ছিল; বৈধ, নির্বাচিত ও জনপ্রিয় সরকারের চিত্তাকাশে সেটুকুও নেই।

অং সান সু চি নিজে প্রথমে নীরব ছিলেন, যেন দেখতে পাচ্ছেন না; পরে তিনি সরব হয়েছেন। উৎপীড়িতের পক্ষে নয়, উৎপীড়কের পক্ষে। তাঁর রূপ এখন জাতীয়তাবাদীর। এই জাতীয়তাবাদ বর্ণবাদী, এর স্বভাবটা পুঁজিবাদী। অতীতে হিটলার ছিলেন এর শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই পথেরই পথিক। ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত ইয়াহিয়া খানকে আমরা ওই রূপেই দেখেছি। সামরিক জান্তার হাতে বন্দী অবস্থায় সু চি নিঃসঙ্গ ছিলেন, এখন আর তা নন; এখন তিনি মুক্ত এবং সারা বিশ্বে যত পুঁজিবাদী-ফ্যাসিবাদী শাসক আছেন, সবাই তাঁর সঙ্গী। পুঁজিবাদ এখন রূপ নিয়েছে সংকোচহীন ফ্যাসিবাদের। বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদী সুবিধাভোগীরা সুবিধাবঞ্চিতদের ওপর যতভাবে পারা যায় নিপীড়ন করছে। মিয়ানমারেও ওই একই ঘটনা, পোশাকটাই যা আলাদা।

নিপীড়নকারী সরকার বলছে, রোহিঙ্গারা দুষ্কৃতকারী। একাত্তর সালে পাঞ্জাবি হানাদারদের চোখে বাংলাদেশের সব মানুষই ছিল প্রকাশ্য অথবা ছদ্মবেশী দুষ্কৃতকারী। মুষ্টিমেয় লোক ছিল তাদের সহযোগী; তাদেরও তারা সম্ভাব্য দুষ্কৃতকারী বলেই জানত, মুখে যা-ই বলুক না কেন। ‘দুষ্কৃতকারী’দের দমনকাজ একাত্তরে ভীষণভাবে চলেছে। সেটা ছিল গণহত্যা। মিয়ানমার সরকার এখন যা করছে, সেটাও গণহত্যাই। প্রাণভয়ে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল এক কোটি। শরণার্থীদের এই বিপুল বোঝা বহন করা ভারতের পক্ষে মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। তাদের কষ্ট হয়েছে। কিন্তু বিপন্ন মানুষদের তারা আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, যত্ন œনিয়েছে। তারা জানত যে শরণার্থীরা শখ করে আসেনি, প্রাণভয়ে পালিয়ে এসেছে। ভারত সরকারের চেষ্টা ছিল, বাংলাদেশিরা যাতে নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরে যেতে পারে, সেটা দেখা। সে জন্য তারা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে, বিশ্ববাসীকে সমস্যাটা কী তা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি সংগ্রহ করেছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তাদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছে। আশা করেছে শরণার্থীরা শিগগিরই ফিরে যেতে পারবে। ঘটেছেও সেটাই। নয় মাসেই সমস্যার সমাধান পাওয়া গেছে।

সেদিন বিপন্ন বাংলাদেশিদের সংখ্যা ছিল অনেক। কিন্তু তবু পুঁজিবাদী বিশ্বের সরকারগুলো সাড়া দেয়নি। সেসব দেশের মানুষ ছিল বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বের মানুষ নির্যাতনের সবটা খবর পায়নি, যেটুকু পেয়েছে, তা-ও খণ্ডিত। মিডিয়ার পক্ষে যথোপযুক্তরূপে সাড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। মিডিয়া ছিল পুঁজিবাদীদের নিয়ন্ত্রণে এবং পুঁজিবাদীদের ছিল একই রা; সেটি হলো দুষ্কৃতকারীরা রাষ্ট্রের অখণ্ডতা নষ্ট করতে তৎপর হয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করাটা দরকার। মিডিয়ার কর্মীরা ছিলেন সহানুভূতিশীল; নির্যাতনের খবর যতটুকু সম্ভব তাঁরাই বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্য একাধিক। সংখ্যায় তারা অধিক নয়; তারা খুবই দরিদ্র এবং বিশ্বের অবহেলিত একটি প্রান্তে তাদের বসবাস। বিশ্ব তাদের খবর রাখে না, বিশ্ব তাদের গুরুত্ব দেয় না। তাদের পক্ষে বলবে এমন মানুষের ভীষণ অভাব। তদুপরি যে সরকার তাদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে, সেটি গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত। গণতান্ত্রিক কেবল এই অর্থে যে এটি ক্ষমতায় এসেছে নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচিত মানেই যে গণতান্ত্রিক নয়, এটি বহুবার বহু ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে, প্রমাণিত হচ্ছে মিয়ানমারেও। ওদিকে বাংলাদেশিদের পাশে তবু ভারত ছিল, রোহিঙ্গাদের পাশে প্রতিবেশী বাংলাদেশও নেই। এমনই তাদের দুর্ভাগ্য।

রোহিঙ্গাদের দুর্দশা পরিসংখ্যানের হিসাবে পরিণত হয়েছে। কতজন এল, কতজন রয়েছে নো ম্যানস ল্যান্ডে, কত লাশ দেখা গেছে নাফ নদীতে ভাসতে—এসব খবর তা–ও পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে কী ঘটছে, তা জানার উপায় নেই। সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে, তাদের উৎসাহও সীমিত, তদুপরি তাদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না পরিদর্শনের। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক থেকে হাজার হাজার শরণার্থী যাচ্ছে ইউরোপে, কোথাও পথ খোলা, কোথাও বন্ধ; পানিতে ডুবে ও রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। তাদের মানবিক দুর্দশার খবরটা তবু জানছে বিশ্ববাসী, কিন্তু রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে কী ঘটছে, তা জানানোর উন্মুক্ত উপায় নেই। সিরিয়ার শরণার্থী পরিবারের একটি শিশু অমানবিক বিপদের মধ্যে মুখ থুবড়ে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিল সমুদ্রের ধারে; তার ছবি সারা বিশ্ব দেখেছে। শিউরে উঠেছে, ধিক্কার দিয়েছে শিশু হত্যাকারীদের। এমন বর্বরতা রোহিঙ্গাদের একটি-দুটি নয়, বহু শিশুর ভাগ্যে ঘটেছে; কিন্তু তাদের খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছায়নি, পৌঁছালেও তারা প্রাণবন্ত শিশু থাকে না, প্রাণহীন সংখ্যায় পরিণত হয়।

২.

উৎপাটিত রোহিঙ্গারা স্রোতের মতো চলে আসছে বাংলাদেশের সীমান্তে। আগেও এসেছে, শত শত; এখন আসছে হাজার হাজার। বাংলাদেশের পক্ষে এত শরণার্থীকে জায়গা দেওয়া কঠিন কাজ। বাংলাদেশ তাহলে কী করবে? নিস্পৃহভাবে যে দেখবে সে উপায় নেই। এই স্রোতকে প্রতিহত করার, আর্ত মানুষকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা বাংলাদেশ করছে, কিন্তু সক্ষম হচ্ছে না। হবেও না। বাংলাদেশের পক্ষে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিয়ে উপায় নেই। প্রথম কারণ, কাজটা হবে অমানবিক; দ্বিতীয় কারণ, কাজটা অসম্ভব।

মানুষ কেন শরণার্থী হয়, বাংলাদেশের মানুষ সেটা জানে। একাত্তরের কথা তাদের পক্ষে কোনো দিনই এবং কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। লাখ লাখ বাঙালি যে সেদিন শরণার্থী হয়েছিল, তা কাজের খোঁজে বা সুবিধার লোভে নয়, প্রাণের ভয়ে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। গণহত্যার মুখোমুখি হয়ে তারা বিষয়-সম্পত্তি, ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল, এমনকি আপনজনকেও ফেলে রেখে প্রাণ বাঁচাতেই পালিয়ে আসছে। তারা মারা পড়ছে, হারিয়ে যাচ্ছে, দগ্ধ হচ্ছে। মৃতের লাশ, আহত মানুষ, বিপন্ন শিশু ও বৃদ্ধকে মাথায় করে, কোলে করে নিয়ে তারা ছুটছে আশ্রয়ের সন্ধানে, নৌকা ডুবে যাওয়ায় অনেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের আশ্রয় না দিলে তারা যাবে কোথায়? আমরা আজ যদি বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিই, তাহলে কেবল নিজেদের ইতিহাস থেকেই নয়, অন্তর্গত মনুষ্যত্ব থেকেও বিচ্যুত হব।

কিন্তু আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারটা তো সাময়িক। দেখতে হবে গণহত্যা যাতে থামে এবং শরণার্থীরা যাতে নিরাপদে ও সসম্মানে নিজেদের দেশে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর জন্য প্রথম ও প্রধান কাজ ঘটনার বাস্তবতা ও ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। বিষয়টিকে জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের কাছে নিয়ে যাওয়া চাই। ঘটনা যে মোটেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়, সুপরিকল্পিত গণহত্যা, সেটা বুঝিয়ে দিতে হবে। কথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করা চাই, তারা যাতে মিয়ানমারের স্বৈরাচার সরকারের ওপর সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করে গণহত্যা থামিয়ে শরণার্থীদের ফেরত নিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারে। শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলা করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সব সাহায্য ও পুনর্বাসন সংস্থার কাছ থেকে বস্তুগত সহায়তা চাওয়াটাও যে আশু ও জরুরি কর্তব্যের মধ্যেই পড়বে, সেটা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না।

মূল দায়িত্ব সরকারেরই। কিন্তু সরকারকে উদ্বুদ্ধ করা চাই, যাতে তার আলস্য ভাঙে, সরকার যাতে কালবিলম্ব না করে তার কর্তব্যে ব্রতী হয়। কারা করবেন এ কাজ? নিশ্চয়ই তাঁরা করবেন না, যাঁরা মনে করেন যে রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য একটা উটকো ঝামেলা, অথচ বলতে পারবেন না আমাদের পক্ষে করণীয়টা কী। বড়জোর বলবেন, সীমান্ত প্রহরা আরও জোরদার করতে হবে, ঠেলা-ধাক্কাটা আরও শক্ত হাতে দেওয়া চাই। কিন্তু তাতে তো সমস্যার কোনো সমাধান নেই। প্রাণভয়ে পালানো এসব মানুষ বন্যার স্রোতের মতোই প্রবল, বাঁধের ওপর তারা তো আছড়ে পড়বেই; আর বাঁধটা তো শেষ পর্যন্ত মানবিকই, যতই সে নিশ্ছিদ্র হওয়ার চেষ্টা করুক না কেন। ‘অনুপ্রবেশ’ বলি আর যা-ই বলি, ঘটনা ঘটবেই, এখন যেমন ঘটেছে। শক্ত হৃদয় ওই দলের একাংশ বলবে যে রোহিঙ্গারা নিচু সংস্কৃতির মানুষ, তারা এসে মাদক ব্যবসা করবে, জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত হবে, চুরি-ডাকাতি বাদ রাখবে না, এমনকি ভোটার সেজে রাজনীতিতে পর্যন্ত ঢুকে পড়বে।

এরা ভুলে যায় যে বিপন্ন রোহিঙ্গারা ওই সব কাজ করার জন্য শরণার্থী হয়নি। শরণার্থী হয়েছে বর্ণবাদী সরকারের বন্দুকের মুখে। রোহিঙ্গারা অপরাধ করার জন্য বাংলাদেশে পাড়ি জমায়নি, তাদের স্থানীয় মুনাফালোভীরা নিজেদের স্বার্থে অপরাধে জড়িত করছে। শরণার্থীদের জন্য কাজ নেই, উপার্জনের উপায় নেই, তাই তারা শিকার হচ্ছে মুনাফালোভীদের চক্রান্তে। প্রকৃত অপরাধী হচ্ছে মিয়ানমারের সরকার, যারা এই গণহত্যায় লিপ্ত। পাকিস্তানের বর্তমান শাসকেরা যেভাবে তাদের রাষ্ট্রকে হিন্দুশূন্য করার কাজটা সম্পন্ন করে এখন খ্রিষ্টানশূন্য করার কাজে নেমেছে। মিয়ানমার সরকারও হয়তো তার চেয়েও দ্রুত ও প্রকাশ্য পদ্ধতিতে তাদের রাষ্ট্রকে রোহিঙ্গাশূন্য করার ব্রত নিয়েছে। এ কাজে তারা বিলক্ষণ সফল হবে, যদি না তাদের নিবৃত্ত করা যায়।

বাংলাদেশ সরকারকে তাদের কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্বটা তাই নিতে হবে দেশের বিবেকবান মানুষকেই। অর্থাৎ তেমন মানুষদের, যাঁরা পুঁজিবাদকে চেনেন এবং জানেন যে বিশ্বের অন্যত্র যেমন, মিয়ানমারেও তেমনি শরণার্থী সমস্যাটা মুনাফালোভী ও মনুষ্যত্ববিরোধী পুঁজিবাদীরাই তৈরি করে। তাঁরা জানেন যে ১৯৭১-এর পাকিস্তানি হানাদার ও ২০১৭-এর মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগকর্তাদের ভেতরে নামেই যা পার্থক্য, ভেতরে তারা একই। এ-ও তাদের জানা আছে যে জলবায়ু পরিবর্তনে ধরিত্রী যে এখন বিপন্ন, তার কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বের উন্নয়ন তৎপরতা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। পুঁজিবাদবিরোধী মানুষের এখন অনেক কর্তব্য; মূল কর্তব্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে ভেঙে সামাজিক মালিকানার ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করা। মিয়ানমারের অসহায় মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই দাঁড়ানো বটে। এক কথায় এ দায়িত্ব বামপন্থীদেরই, সারা বিশ্বে এবং বাংলাদেশে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদ্‌যাপন জাতীয় কমিটি।

===

# এখানে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছাড়া অার কোন উপাদান নেই। অার সেই বিদ্বেষই বিজেপি অার সূচিকে এক সূরে কথা বলাচ্ছে। এই বিদ্বেষ বাংলাদেশের মানুষের জন্য উদ্বেগজনক।

# আমাদের মেরুদন্ড থাকলে আমরা অনেক কিছুই করতে পারি । সর্বশেষ আপডেটেড স্যাটেলাইট থেকে তোলা গণহত্যা এবং ঘর বাড়ি জালিয়ে দেবার ছবি ইউটিউবে রয়েছে যা জাতিসংঘের কাছে তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে দাত ভাংগা জবাব দিতে পারি ।

# রোহিঙ্গারা গোষ্ঠীগতভাবে গভীর সমস্যায় আছে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যাওয়াটা আমাদের সরকারের জন্য সুবিবেচনা হবে না যদি এই দাঙ্গার পিছনে রোহিঙ্গাদের অন্তর্গত ইন্ধন থাকে। বিশেষত কফি আনানের রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক্কালে ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের ২০ টি সেনা চৌকিতে রোহিঙ্গা সলিডারিটি আর্মির হামলার অভিযোগের বিষয়টি রোহিঙ্গা নেতাদের পরিষ্কার করতে হবে। মুদ্রার উভয় পাশ না দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা বাংলাদেশের জন্য বুমেরাং হতে পারে।

# দেশে যখন খাদ্য সংকট তখন মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে আমরা কী বা ভূমিকা গ্রহন করতে পারি ! শক্ত কথা বলার, শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার শক্তিই বা কোথায় যখন আমাদের খাদ্যমন্ত্রী মহাদয় মিয়ানমারে গিয়েছেন চাল আমদানির চুক্তি করতে !! আগে তো চাল কেনা তারপর না হয় মানবতার কথা বলা !!

জেরার ভয়ে আদালতে যেতে চায় না ধর্ষিতারা

raped womanজান্নাতুল মাওয়া সুইটি ॥ ২০০৮ সালে তামান্না (ছদ্মনাম) নিজ এলাকার একটি হোটেলে গণধর্ষণের শিকার হন। পরবর্তীতে পুলিশী মামলার পর যখন তিনি বিচারের আশায় উৎসাহ প্রকাশ করে আদালতের শরণাপন্ন হন তখনই তিনি মানসিকভাবে আরও নির্যাতিত হতে থাকলেন। কারণ, আইনজীবীদের নানা আপত্তিকর প্রশ্নের মুখে সে জর্জরিত। বিরুদ্ধ পক্ষের উকিলের মন্তব্য, ‘তিনি ধর্ষণের শিকার হননি। কারণ, তার আগে দু’বার বিয়ে হয়েছিল এবং সে যে কোন যৌন সম্পর্কে অভ্যস্ত।’ পরবর্তীতে তামান্না তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচার পেলেন না এবং অপরাধীরাও বেঁচে গেল।

শুধু তামান্না নয় বেশিরভাগ ধর্ষণ মামলার বাদীরা ধর্ষণের শিকার হয়ে আদালতে বিচার চাইলেই বিরুদ্ধ পক্ষ তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকে। বাদীকে মানসিকভাবে হেনস্তা করতেই মূলত প্রতিপক্ষ এমনটা করে থাকে। আর আইনও অর্থাৎ ১৯৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারা ওই নারীকে ‘দুশ্চরিত্রা’ বলে আখ্যায়িত করার অনুমতি দিয়ে রেখেছে প্রতিপক্ষকে। আদালতে এভাবে মান-ইজ্জত নিয়ে টানাহেঁচড়া দেখে অনেকেই বিচার চাইতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়। সওয়াল-জবাবের নামে আইনজীবীর ‘আপত্তিকর জেরা’ এড়াতে তারা আদালতের দ্বারস্থ হতে চায় না। এজন্য অনেক ধর্ষণ মামলার বিচার সম্পন্ন হয় না বরং অপরাধী পক্ষের কারণে ভীত হয়ে অনেক বাদীরা মামলা তুলে নিতে অথবা মীমাংসা করতে বাধ্য হয়। মানবাধিকারকর্মী এমনকি বিচারপতিরাও এই সাক্ষ্য আইনের বিশেষ ধারাটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

রবিবার একটি ইংরেজী দৈনিকের কনফারেন্স হলে ব্লাস্ট আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বিচারে চারিত্রিক সাক্ষ্যের ব্যবহার’ বিষয়ক এক পরামর্শ সভায় উপস্থিত আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা ১৮৭২ সালে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারা বাতিলের দাবি জানান। অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতি নিজামুল হক (অব.)। সভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মানবাধিকারকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।

পরামর্শ সভায় সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার নারীরা আদালতে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হন যেটা আদালতে উপস্থিত বিচারক ঠেকাতে পারেন। বিরুদ্ধ পক্ষের উকিল যেন বাদীর চরিত্র নিয়ে বাজে কটূক্তি না করেন এ বিষয়টি তার আয়ত্তে থাকে। কিন্তু সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারার কারণে অনেক আইনজীবী বলেন, এটা আইনেই বলা আছে বাদীর চরিত্র নিয়ে কথা বলার বিষয়টি। আমার মতে, এই ১৫৫ (৪) ধারাটি থাকা উচিত নয়। ধর্ষণের শিকার নারীকে বিচারের সময় মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করার জন্য বিজ্ঞ আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক লুৎফা বেগম বলেন, ‘সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিতে সাহায্য করে। অভিযোগকারীর চরিত্র কোন অবস্থাতেই ধর্ষণের অভিযোগ বিচারে বিচার্য বিষয় হওয়া কাম্য নয়।’ ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৫-এর পিপি আলী আসগর স্বপন বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার নারীরা বিচারের আশায় অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা করলেও আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার সময় সে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। যৌতুকসহ নারীর প্রতি অন্যান্য সহিংসতার বিচারের ক্ষেত্রেও সাক্ষ্য আইনের এই ধারাটির প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে, যা ন্যায়বিচারের অন্তরায়।

জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা বলেন, ‘বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলা একটি দ্বৈত নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও এই আইনটি নারী প্রসঙ্গে ঔপনিবেশিক ‘অধস্তন যৌনতার’ ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।’ ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে রাজধানীর কুড়িলে চলন্ত মাইক্রোবাসে আদিবাসী তরুণী ধর্ষণের ঘটনার পর প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ধারাটি বাতিলের পক্ষে মত দেন। ওই সময় এক অনুষ্ঠানে তিনি সাক্ষ্য আইনের ওই ধারাটিকে কালো আইন হিসেবে উল্লেখ করে ব্লাস্টের পক্ষে ব্যারিস্টার নাওমি নাজ চৌধুরী বলেন, ‘এটি সংশোধনের দাবি তোলা দরকার।