আর্কাইভ

Author Archive

বিশ্বের প্রথম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী মারিয়া মিশেল

maria michelleআজ থেকে ২০০ বছর আগে জন্ম নিয়েছিলেন মারিয়া মিশেল। এই মহিলা গোটা যুক্তরাষ্ট্রে সাড়া ফেলে দেন। মার্কিন ইতিহাসে তিনি একজন পেশাদার নারী জ্যোতির্বিদ ছিলেন। ১৮৪৭ সালে তিনি নতুন ধূমকেতু আবিষ্কার করেন যা ‘মিস মিশেলের ধূমকেতু’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়—

মারিয়া মিশেলের জীবনের গল্পটা করুণ। বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি পান এবং সেই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তার গল্পের গতি যেন ভেনাস গ্রহের মতোই! পেছনের দিকে নিয়ে যায়। মারিয়া যখন ছোট, তখন নারীর বিজ্ঞানচর্চা ছিল স্বাভাবিক। তবে এই চর্চাকে পেশাদারিত্বে রূপ দেওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। আর হ্যাঁ, সে সময় ছিল না কোনো লিঙ্গ বৈষম্য। একদমই ছিল না। বিভিন্ন কারণে আঠারো শতকের শুরুর দিকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে নারীদের উৎসাহিত করা হতো। মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে বলা হতো সুইপিং দ্য স্কাই।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ মারিয়া মিশেল ১৮১৮ সালের ১ আগস্ট ম্যাসাচুসেটসের নান্টউইটে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নান্টউইটের একটি বিদ্যালয়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে অধ্যয়নের আগ্রহ জন্মে বাবা উইলিয়ামের সমর্থনে। মিশেলকে দুরবিনের ব্যবহার সম্পর্কে হাতেখড়ি শিক্ষা দেন বাবা উইলিয়াম। মা লিডিয়া মিশেল ছিলেন সাধারণ মহিলা। তাদের পরিবারকে বলা হতো কোয়াকার পরিবার। বাবা উইলিয়াম ও মা লিডিয়ার পরিবারে ছিল ৯ জন ছেলেমেয়ে। তারা বিশ্বাস করত ছেলে এবং মেয়ে উভয়েরই শিক্ষার প্রয়োজন আছে এবং উভয়কেই স্কুলে যেতে হবে। মিশেলের বাবা ছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং শিক্ষক।

১৮৩৬ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত মিশেল নান্টউইটের এথেনাম লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেন। রাতের অন্ধকার পেরিয়ে সকাল হলেই তিনি সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সৌরগ্রহণ, তারকা, বৃহস্পতি ও শনি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান আহরণের জন্য বিভিন্ন বই পড়তেন। তার বয়স যখন ১২, তখন তিনি সর্বপ্রথম বাবার সঙ্গে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আকাশ পর্যবেক্ষণের গুণাবলিগুলো মারিয়া মিশেল সযত্নে লালন করেছিলেন। মারিয়া ছিলেন তৎকালীন পেশাদার নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে সেরা। মিশেল আকাশের নক্ষত্রগুলোর একটি নকশা তৈরি করেছিলেন। উনিশ শতকে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুরস্কৃতও হন। যা কিনা তার নারী শিক্ষার্থীদের সামনে বিজ্ঞানের দুয়ার খুলে দেয়। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সে সময়ে নারী অগ্রগতির পথ সহজ এবং সুগম ছিল না। কারণ যখনই নারীরা এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখনকার সময়ের সামাজিক এবং আর্থিক প্রেক্ষাপট।

ইতিহাসবিদের মতে, তৎকালীন সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে নারীদের প্রবেশ তেমন কঠিন কিছু ছিল না। সময়টিকে নারীসুলভ বিজ্ঞানের সময় বলা হতো। যেন মহাকাশ ও নক্ষত্র নিয়ে গবেষণায় পুরুষের চাইতে নারীরাই অপেক্ষাকৃত বেশি এগিয়ে ছিল। ‘মারিয়া মিশেল অ্যান্ড দ্য সেক্সটিং অফ সায়েন্স’ বইটির লেখক, সাইমন্স কলেজের প্রফেসর রিনি বার্গল্যান্ড তার বইতে উল্লেখ করেন, ‘উনিশ শতকের শুরুতে আমেরিকার বিজ্ঞানচর্চায় নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করত। বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের মতো পুরুষরা অংশ নিত না। তখন বিজ্ঞানচর্চাকে নারীসুলভ রেওয়াজরীতিও মনে করা হতো।’

বাবার সাহচর্য এবং নিজের আগ্রহের ফলে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে মারিয়া মিশেলের প্রবেশ এবং বিচরণ বেশ সহজেই ত্বরান্বিত হয়েছিল। ১৮৪৭ সালে, পৃথিবী থেকে বহু দূরে অবস্থিত একটি ধূমকেতুর বিবরণ লিপিবদ্ধ করার জন্য সুইডেনের যুবরাজ মিশেলকে মেডেল প্রদান করে পুরস্কৃত করেছিলেন। তখন থেকেই ধূমকেতুটি ‘মিস মিশেলের ধূমকেতু’ নামে পরিচিতি পায়। এর পরের বছরই আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের সর্বপ্রথম নারী জ্যোতির্বিদ নির্বাচিত হন। এরপর যুক্ত হন আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্সের সঙ্গে। ১৮৫৬ সালে চল যান ইতালি। উদ্দেশ্য ভ্যাটিকান অবজারভেটরি থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ। অবজারভেটরি মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হলেও সেখানে নারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এরপর তিনি পিটিশন দাখিল করেন। তার আত্মজীবনীমূলক লেখায় মিশেল বলেন, ‘সন্ন্যাস আশ্রমে থাকার ব্যাপারে আগ্রহ না থাকলেও, নিষেধাজ্ঞা থাকায় মনে জিদ চেপে বসে। দুই সপ্তাহ পর অবজারভেটরির কর্তারা তাকে ভেতরে প্রবেশাধিকার দেন। ১৯৫৪ সালের ২ মার্চ আরেক জার্নালে তার সুইপিং দ্য স্কাই সম্পর্কে জানা যায়, ‘গত রাতে তিন মেয়াদে প্রায় দুই ঘণ্টা যাবৎ ‘স্কাই সুইপ’ করেছিলাম। এটা খুব অসাধারণ একটি রাত ছিল— মেঘমুক্ত, পরিষ্কার এবং সুন্দর একটা আকাশ। আমার কাজ করতে বেশ ভালোই লাগছিল কিন্তু শীতল বাতাসে হঠাৎ আমার পিঠব্যথা করতে শুরু করে। তখন দুটি নেবুলা দেখতে পেয়েছিলাম যা আমার পিঠ ব্যথার কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়েছিল।’

ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সূত্র মতে, যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন তাদের মধ্যে শতকরা ২৬ ভাগ হচ্ছেন নারী এবং আমেরিকার জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রফেসরদের মধ্যে চার ভাগের একভাগই নারী। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই মহীয়সী নারীর এত অবদান থাকলেও ১৮৭০ সালের শুরুতে মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। তবুও বিজ্ঞানচর্চা যখন পেশাদারিত্বে রূপান্তর হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। বিজ্ঞানমনস্ক নারীদের বিজ্ঞানচর্চার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখে মিশেল বসে ছিলেন না। ১৮৭২ সালে তিনি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য এডভান্সমেন্ট অফ উইমেন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে মৃত্যুর এক বছর আগ পর্যন্ত নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে যান। ১৯৩৭ সালে তার সম্মানে একটি গ্রহাণুর (১৪৫৫ মিশেলা) নামকরণ করা হয়। ২০১৩ সালে গুগল মিশেলের ১৯৫তম জন্মদিনে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে একটি ডুডল প্রকাশ করে।

Advertisements

ভারতে মুসলিমদের গরুপালনও দোষের !

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ভারতে সরকারিভাবে গরুজবাই নিষিদ্ধ। আগেও এনিয়ে ঝামেলা ছিল। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এ আইন চূড়ান্ত করা হয়। তবে লুকিয়ে ছাপিয়ে কোথাও না কোথাও গরুজবাই হয়েই থাকে। ঝামেলা বাঁধে এ নিয়েই। গরুর গোশত যে কেবল মুসলিম আর খৃস্টানদেরই প্রিয় এমন নয়। হিন্দু ব্রাহ্মণরা আগেও গরুমাংস খেতেন। এখনও খান। দক্ষিণ ভারতীয় ও কাশ্মিরী ব্রাহ্মণদের কাছে গোমাংস এখনও দারুণ জনপ্রিয় খাবার।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে বেশ কয়েকŸার ভারত গিয়েছি। কোলকাতাসহ ভুপাল, দিল্লি, নাগপুর, লক্ষেè, এলাহাবাদ, জৌনপুর প্রভৃতি শহর ঘুরেছি। সবখানেই গরুর গোশত পাওয়া যেতো। হোটেলে বিফ রান্না হতো। কোলকাতায় দারুণ স্বাদের গরুভুনা আর ক্ষিরিগুর্দা পাওয়া যেতো। ক্ষিরিগুর্দা মানে গাইগরুর দুধের থলেটা খুব চমৎকার করে রান্না হতো কোলকাতার দক্ষিণ ভারতীয় হোটেলগুলোতে। কোলকাতায় মাসের পর মাস অবস্থানকালে আমি প্রায়ই ক্ষিরিগুর্দার লোভে সাউথ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেরে নিতাম। বাঙালরাও গরুভুনা করতো। শুকনো করে। বেশ পোড়া পোড়া। অনেকটা কাবাবের মতো। সস্তায় পাওয়া যেতো। আমি দারুণ উপভোগ করেছি কোলকাতায় সেসময় বিফভুনা। এখন সেদিন নেই। ভয়াবহ সংকটে এখন গরু নিয়ে ভারতীয় মুসলিমরা।

আজকাল ভারতে মুসলিমরা গরুপালনও করতে পারেন না। জবাই তো দূরের কথা। কোনও মুসলিম গরু লালনপালন বা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে আনানেয়া করলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া হয়। এমনকি অনেককে হত্যার শিকারও হতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক এটাই। তবে আসামসহ ভারতের বেশ কয়েক জায়গায় এ অমানবিক আইনের প্রতিবাদে হিন্দুরাই গোহত্যার মাধ্যমে উৎসব করে মদসহযোগে গরুর গোশত ভক্ষণ করেছেন। তাহলে গরু জবাইয়ের অপরাধে মুসলিমদের হত্যা কেন? অথচ ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে গরু জবাই কিংবা গোমাংস ভক্ষণ আদৌ নিষিদ্ধ নয়।

দেখুন, ভারতীয় শাস্ত্রে এ প্রসঙ্গে কী রয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন: “এই ভারতবর্ষেই এমন একদিন ছিল যখন কোনও ব্রাহ্মণ গরুর মাংস না খেলে ব্রাহ্মণই থাকতে পারতেন না। যখন কোনও সন্ন্যাসী, রাজা, কিংবা বড় মানুষ বাড়িতে আসতেন, তখন সবচেয়ে ভালো ষাঁড়টিকে হত্যা করা হতো।” (Collected works of Swami Vivekananda, Advaita Asharama,1963, Vol III, page 172)

ঋগবেদের প্রাচীন ভাষ্যকার হিসেবে সায়নাচার্যের নাম বিখ্যাত। তাঁর আগেও বিভিন্ন ভাষ্যকার, যেমন স্কন্দস্বামী, নারায়ণ, প্রমুখ ঋগবেদের ভাষ্য রচনা করেছেন।

ভাষ্যকার আচার্য সায়ন লিখেছেন তার অনুবাদে, “You (O Indra), eat the cattle offered as oblations belonging to the worshippers who cook them for you. (Atharvaveda 9/4/1)”

হে ইন্দ্র গ্রহণ কর সেসব গরুর মাংস যা তোমাকে তোমার ভক্তরা রন্ধন করে উৎসর্গ করেছে।”

ঋগবেদ ১০/৮৬/১৩ তে গরুর মাংস রান্না করবার কথা পাওয়া যায়।

ঋগবেদের ১০/৮৬/১৪ শ্লোকে আছে, ইন্দ্রের জন্য গোবৎস উৎসর্গ করা হয়েছে।

Rig Veda 10.86.14 [Indra speaks :] The worshippers dress for me fifteen (and) twenty bulls : I eat them and (become) fat, they fill both sides of my belly; Indra is above all (the world).

উপনিষদেও গরু খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভালো সন্তান পাবার জন্য ষাঁড়ের মাংস খাওয়া উচিত।

Brihadaranyak Upanishad 6/4/18 suggests a ‘super-scientific’ way of giving birth to a super intelligent child.

এ ব্যাপারে আরও স্পষ্ট বিধান দিয়েছে মনুসংহিতা। মনুসংহিতা ৫/৪৪ শ্লোকে বলা হয়েছে, “শ্রুতিবিহিত যে পশুহত্যা, তাহাকে অহিংসাই বলিতে হইবে, যেহেতু বেদ ইহা বলিতেছে।”

অগ্নির কাছে নিবেদনে বলদ, ষাঁড় এবং দুগ্ধহীনা গাভী বলিদানের উল্লেখ আছে। (ঋগবেদ সংহিতা, /১৬২/১১১৩, /১৭/১১,১০/৯১/১৪)
মহাভারতেও গরু খাওয়ার কথা আছে, মহাভারত বন পর্ব, খণ্ড ২০৭, অনুবাদ করেছেন কিশোরীমোহন গাঙ্গুলী।

বিষ্ণুপুরাণ বলছে, ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাইয়ে হবিষ্য করালে পিতৃগণ ১১ মাস পর্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। আর এ স্থায়িত্ব কালই সবচেয়ে দীর্ঘ (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬)। বৃষের মাংস [বেদ:/১৬৪/৪৩], মহিষের মাংস [বেদ: /২৯/], অজের মাংস [বেদ:/১৬২/] খাওয়া হতো। তবে বেদে এও আছে যে, পরস্বিনী গাভী মানুষের ভজনীয় অর্থাৎ পূজনীয় [বেদ://]। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন ভিন্ন কথা: “You will be astonished if I tell you that, according to the old ceremonials, he is not a good Hindu who does not eat beef. On certain occasions he must sacrifice a bull and eat it. [The complete works of Swami Vivekananda, Volume 3, Pg 536]”

জগতগুরু আদি শংকরাচার্য, যিনি ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অদ্বৈত বেদান্ত শাখার প্রতিষ্ঠাতা। শংকরাচার্যের গীতাভাষ্য হিন্দু ধর্মীয় পন্ডিতমহলে অত্যন্ত বিখ্যাত। তিনি ব্রাহ্মসূত্র অধ্যায় ৩, পাদ্য ১, সূত্র ২৫ এ লিখেছেন, “যজ্ঞে পশুহত্যা পাপ হিসেবে বিবেচিত হবে না, কারণ শাস্ত্রই এর অনুমোদন দিয়েছে।”

বেদে স্পষ্টভাবে গরুর মাংস খাওয়ার কথা থাকলেও হিন্দুরা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।

হিন্দুরা হাজির করে ঋগ্বেদ (/৫৬/১৭) এই শ্লোক। ঋগবেদের ঐ শ্লোকে নাকি গোহত্যাকে মানুষ হত্যার সমকক্ষ বলা হয়েছে।

নীচে তুলসীরামের উক্ত শ্লোকের অনুবাদ দেখুন তো এ রকম কিছু আছে কিনা।

এরপর আবার হিন্দুরা, অথর্ববেদের (//১৫) এই শ্লোক দেখায়, যেখানে বলা হয়েছে: গোহত্যা ও ঘোড়া হত্যা উভয়ই নিষিদ্ধ। এখানে সত্য লুকিয়ে রেখে ঘোড়াসহ যে কোনও প্রাণির মাংস খেতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু সত্য হলো ঐ শ্লোকে বলা হয়েছে:
যারা বহিঃশত্রু (দেশকে আক্রমণ করবে) এবং প্রাণির মাংস তথা ঘোড়ার মাংস ও মানুষের মাংস খায় তাদের হত্যা কর।

ধারাবাহিকভাবে এই মন্ত্রগুলো যেমন ৭, , ৯ পড়লেই পরিষ্কার বোঝা যাবে।

অথর্ববেদের (//১৫) এই শ্লোকে স্পষ্টভাবে গরুর দুধগ্রহণকারীরও একই শাস্তি দেয়ার কথা আছে। তার মানে কি গরুর দুধ খাওয়াও বেদের নিষেধ ? এটি আরও স্পষ্ট আছে ১৭ নাম্বার মন্ত্রে, এখানে বলা গরুর দুধ যে খায় তার বুকে বর্শা মারার কথা।
এখন এই মন্ত্রগুলোর অর্থ সর্বজনীনভাবে নিলে হিন্দুরা কি বলবেন যে বেদ অনুসারে দুধ খাওয়াও মানা? এরপর হিন্দুরা ঋগবেদের ১/১৬৪/৮০ এবং অথর্ববেদের ৯/১০/২০ ও ৭/৭৩/১১ এইসব শ্লোক দেখিয়ে বলেন এইসব শ্লোকে গরুকে (আঘ্ন্যা) বলা হয়েছে। আঘ্ন্যা মানে যাকে হত্যা করা উচিত নয় । অথচ এসব শ্লোকে শুধুমাত্র মা গরুকে অর্থাৎ যে গরু থেকে দুধ পাওয়া যায় সেই গরুর প্রসঙ্গে (আঘ্ন্যা) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে অর্থাৎ যে গরু দুধ দেয় সেই গরু হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। দেখুন (ঋগবেদ ১/১৬৪/৮০) শ্লোকের তুলসীরামের অনুবাদ। তুলসীরাম লিখেছেন, Invioable (আঘ্ন্যা) as Mother Cow.
তুলসীরাম অথর্ববেদ ৯/১০/২০ শ্লোকেও একই কথা লিখেছেন, Invioable (আঘ্ন্যা) as Mother Cow. হাজির করা হয় ঋগবেদের ৮/১০১/১৫ এই শ্লোক…. (Do not kill the cow. Cow is innocent and aditi– that ought not to be cut into pieces).
মহাত্মা গান্ধী বলেছেন: “I know there are scholars who tell us that cow-sacrifice is mentioned in the Vedas. I… read a sentence in our Sanskrit text-book to the effect that Brahmins of old (period) used to eat beef. ( M.K.Gandhi, Hindu Dharma, New Delhi, 1991, p. 120).”

অর্থাৎ, “আমি জানি (কিছুসংখ্যক পন্ডিত আমাদের বলেছেন) বেদে গোউৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে। আমি আমাদের সংস্কৃত বইয়ে এরূপ বাক্য পড়েছি যে, পূর্বে ব্রাহ্মণরা গোমাংস ভক্ষণ করতেন। (হিন্দুধর্ম, এম.কে. গান্ধী, নিউ দিল্লি, ১৯৯১, পৃ. ১২০)
অতএব এবার নিশ্চয়ই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় গরুর গোশত খাওয়া ধর্মসম্মত।

অবশ্য বৌদ্ধযুগের আগ পর্যন্ত হিন্দুরা প্রচুর গোমাংস ভক্ষণ করতেন এ তথ্যও অনেকেই জানেন। ব্যাসঋষী স্বয়ং বলেছেন, ‘রন্তিদেবীর যজ্ঞে একদিন পাচক ব্রাক্ষ্মণগণ চিৎকার করে ভোজনকারীদের সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘মহাশয়গণ! অদ্য অধিক মাংসভক্ষণ করবেন না, কারণ অদ্য অতি অল্পই গোহত্যা করা হয়েছে; কেবলমাত্র একুশ হাজার গোহত্যা করা হয়েছে।’ (সাহিত্য সংহিতা৩য় খণ্ড পৃষ্ঠা৪৭৬)

বৌদ্ধযুগের পূর্বপর্যন্ত হিন্দুরা যে প্রচুর গরুর গোশত খেতেন ডা. রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রণীত Beef in Ancient India গ্রন্থে, স্বামী ভুমানন্দ প্রণীত ‘সোহংগীত’, ‘সোহং সংহিতা, ‘সোহং স্বামী’ গ্রন্থগুলোতে, আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে পর্যন্ত গোহত্যা, গোভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখন অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেতো।

ডা. রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রণীত Beef in Ancient India গ্রন্থে, স্বামী ভুমানন্দ প্রণীত অনেক গ্রন্থে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে গোহত্যা, গোভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখন অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেতো। তাই অতিথির আরেক নাম ‘গোঘ্ন’।

বৌদ্ধসম্রাট অশোকের সময় থেকে গোহত্যা নিষিদ্ধ করা হয়। সুতরাং বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাব ২০০০ বছর আগে হলেও গোহত্যা আরও অনেক পরে নিষিদ্ধ হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্রাট অশোকের নিষেধাজ্ঞা হিন্দুরা মানছে কেন?

এটাও ধর্মীয় সংঘাতের ফল। বৌদ্ধধর্ম এতোই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, প্রচুর লোক, বিশেষ করে তথাকথিত “নীচ জাতি” আকৃষ্ট হয়েছিল, এই ধর্মের প্রতি । ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং ব্রাহ্মণরা প্রমাদ গুণলেন। তারাও পুরোপুরি মাছমাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়ে ভেকধারী হয়ে গেলেন।

মূলত এটা উত্তর ভারতেই হয়েছিল । তাই এখনও ওটা “গোবলয়” নামে খ্যাত।

বেশিদিনের কথা নয়, আলীবর্দির সময়ে রামপ্রসাদের গুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ একটা বই লেখেন। নাম ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’।

এতেও অষ্টবিধ মহামাংসের মধ্যে গোমাংস প্রথম বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋগবেদে ফিরে আসি। কি দেখছি? প্রথম মন্ডলের ১৬৪ সূক্তের ৪৩ নং শ্লোকে বৃষমাংস খাওয়ার কথা আছে। মহিষমাংসের উল্লেখ আছে পঞ্চমমলের ২৯ নং সূক্তের ৮ নং শ্লোকে।

মোষ বলি আজও হয় । নেপালে যারা মোষের মাংস খায়, তাদের ছেত্রী বলা হয়।

এছাড়া বনবাসকালে রামচন্দ্রের লাঞ্চের মেনু কী ছিল, অনেকেরই জানা নেই।

তিন রকমের মদ বা আসব হয়। যথা: গৌড়ি (গুড় থেকে তৈরি), পৌষ্টি (পিঠে পচিয়ে তৈরি) এবং মাধ্বি (মধু থেকে তৈরি)। এর সঙ্গে প্রিয় ছিলশূলপক্ব বা গোবৎসের মাংস।

উল্লেখ্য, কারুর বিশ্বাস বা অনূভুতিতে আঘাত দেবার জন্য নয়, শুধুমাত্র সত্য অবগতির জন্যই ভারতীয় শাস্ত্রাদির বাণী উদ্ধৃত করা হলো। যাদের ঘরে শাস্ত্রসমূহ আছে, তাঁরা অনুগ্রহ করে সেগুলোর পাতা উলটে দেখতে পারেন। এছাড়া আজকাল ইন্টারনেট বা গুগল সার্চ দিয়েও পরখ করে দেখতে পারেন। আসলে সত্য চিরদিন চেপে রাখা যায় না। এর আগুন বিলম্বে হলেও সর্বভুক হয়ে প্রকাশ পায়। প্রকটাকার ধারণ করে। এই হলো বাস্তবতা এবং সত্যের ধর্ম। এ আগুন ঠেকায় কার সাধ্য?

যাই হোক, ভারতের যে ক’জন গোমাংসের বড় ব্যবসায়ী আছেন, তাঁরা সবাই হিন্দু মাড়ওয়ারি। বিপুল পরিমাণ প্যাকেটজাত গোমাংস রফতানি করে হাজার হাজার কোটি রুপি উপার্জন করেন প্রতি বছর। এতে তাঁদের জাত যায় না। ধর্মেরও অবমাননা ঘটে না। দোষ শুধু মুসলিমরা গরু জবাই করলে। এখন ভারতে গরুপালন করলেও মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে। আগে এসব খবর মিডিয়ায় স্থান পেতো। এখন তাও প্রায় বন্ধ।

উল্লেখ্য, গরুর গোশতের ক্রাইসিস সব দেশেই। আমাদের দেশেও চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম। এমতাবস্থায় ভারতে যদি গরুর গোশত খাওয়া সত্য সত্যই বন্ধ করে তা আমাদের দেশে পাঠানো হয়, তবে কিছুটা হলেও কম দামে পাওয়া যেতো বৈকি।

৮টি কারণে আমরা মূল্যবান দাঁতকে নষ্ট করছি

অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী : প্রতিরোধের সহজ সস্তা নিয়মগুলো না মানার কারণে একটি দাঁতকে চিকিত্সা করে বাঁচাতে কয়েক হাজার টাকা খরচ করি। দাঁতের যত্নে বিশেষ কয়েকটি ভুল সংশোধন করে সময়মত সঠিকভাবে যত্ন নেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতে চাই। যেমন:-

. দাঁত ব্রাশ অনেকক্ষণ এবং অতি জোরে জোরেঃ আপনি যদি অনেকক্ষণ ধরে ব্রাশটি দাঁঁতের উপর ঘষতে থাকেন তবে এই দাঁঁতের উপর শক্ত আবরণ এনামেল ক্ষয় হয়ে যাবে। কয়েক দিনের মধ্যে তখন আপনার দাঁঁত অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি বা গরম পানিতে শিরশির করবে, খেতে পারবেন না কোনো কিছু্। এর ফলে মাড়ি থেকে দাঁঁত সরে আসবে। সুতরাং বাজারের নরম ধরণের ব্রাশ দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে উপর থেকে নিচে সকল দাঁঁতগুলো আস্তে আস্তে পরিষ্কার করতে হবে।

. প্রতিদিন বেশী পরিমাণে এ্যাসিডিক ফুড খাওয়াপ্রতিদিন সোডা, কমলার রস, মদ, খেলাধুলার সময় ব্যবহূত পানীয়, ক্যান্ডি এবং কমলা ইত্যাদি খাবারে থাকে প্রচুর এ্যসিড। একটি বরফের টুকরা যেমন পানিতে ছেড়ে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে গলে অদৃশ্য হয়ে যায় তেমনি আমাদের দাঁঁঁতের সবচেয়ে শক্ত এনামেলও কিন্তু এই ধরণের এ্যাসিডিক ফুডের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যদি এইসব খাদ্যগুলো খাওয়ার সাথে সাথে পানি বা চিজ জাতীয় খাদ্য খাওয়া না হয় তবে মুখের ভিতর লালার পিএইচ লেভেল কমে গিয়ে দাঁঁতের ক্ষয় শুরু হবে। যদি কমলা বা আনারস জুস খাওয়ার সময় স্ট্রো ব্যবহার করা যায় তবে কিছুটা রক্ষা হয়। তবে সবচেয়ে ভাল হয় এই জাতীয় ফলের রস খাওয়ার পর ভালভাবে কুলিকুচি ও সেই সাথে দাঁঁত ব্রাশ করা যায়।

. দাঁঁতকে অতিরিক্ত সাদা করার চেষ্টাআমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে দাঁঁতের রং পরিবর্তন হয়, তখন এগুলো আর সাদা থাকে না। কিন্তু এই দাঁঁতগুলোকে সাদা করার জন্য যদি অতিরিক্ত ব্লিচিং করা হয় তবে দাঁঁতের এনামেল বা আবরণ এ্যাসিডের আক্রমণের শিকার হয় এবং এনামেলের আবরণ ফেটে একটু ফাঁকা হয়ে যায় ফলে দাঁঁত শিরশির করে।

. হট পিজ্জার সাথে ঠান্ডা পানীয়যখনই আমরা অতিরিক্ত গরম পিজ্জা বা সিঙ্গাড়া বা পিঁয়াজুতে কামড় দেই তখনই কিন্তু আমরা আমাদের দাঁঁতের শক্ত আবরণ এনামেল কে বাড়িয়ে ফেলি এবং সেই সাথে সাথে যখন আমরা ঠান্ডা পানীয়তে চুমুক দেই তখনই কিন্তু এনামেলে একটা চুলের চেয়ে সুক্ষ ক্রাক বা ফাটল সৃষ্টি হয়।  হঠাত্ গরম, হঠাত্ ঠান্ডা খাওয়ার ফলে এনামেল কিছুটা প্রসারিত হয় বা বেড়ে যায় এবং ফাটল ধরে। সুতরাং গরম খাবার খাওয়ার সাথে সাথেই আবার ঠান্ডা খাবার খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।

. ভুল টুথপেস্ট ব্যবহারদাঁঁতের সুস্থতার জন্য সবসময় অতিরিক্ত কর্কশ বা রুক্ষ টুথপেষ্ট ব্যবহার করা উচিত নয়। অনেক ধরণের বিজ্ঞাপনেই বলা হয় টুথপেস্ট এর মধ্যে আছে এমন কিছু পদার্থ যা আপনার দাঁঁত রাতারাতি ঝকঝকে সাদা করে দিতে সক্ষম। এই ধরণের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে যারা এই পেস্ট ব্যবহার করবেন তাদের দাঁঁত অতি তাড়াতাড়ি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট না হয়ে টুথপেস্ট ব্যবহারে সবসময় ফ্লুরাইড যুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করা ভালো।

. দাঁঁত দিয়ে বোতলের ছিপি খোলার অভ্যাসঅনেকেই দাঁঁতের শক্তি দেখানোর জন্য দাঁঁত দিয়ে কোল্ড ড্রিংকস এর বোতল খোলার চেষ্টা করেন, তেমনি দাঁঁত দিয়ে শক্ত কিছু ভেঙ্গে কৃতিত্ব নিতে চান। আসলে দাঁঁত আমাদের জন্য প্রয়োজন সৌন্দর্য্যে, শব্দ উচ্চারণে আর খাদ্যদ্রব্যকে পিষিয়ে পাকস্থলীতে পাঠানো। অন্য কিছু কাজে ব্যবহারের জন্য নয়। এই ধরণের বোতলের ছিপি খোলার কারণে অনেক সময় দাঁঁত ভেঙ্গে যায়, ফেটে যায় ও ফাটল ধরে। পরবর্তীতে তার চিকিত্সা জটিলতা ছাড়াও ব্যয়ও কিন্তু বেড়ে যায়। সেই সাথে কমে যায় দাঁঁতের আয়ু।

. নিয়মিত দাঁঁত ব্রাশ ও ফ্লসিং না করাপ্রতিদিন অন্তত: দুইবেলা সকালে নাস্তার পর ও রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত: ৩ থেকে ৪ মিনিট দাঁঁত ব্রাশ করা প্রয়োজন। সেই সাথে দাঁঁতের ফাঁক থেকে ময়লা বা খাদ্যকনা বের করে আনার জন্য ডেন্টাল ফ্লস (এক ধরণের সিল্ক সূতা ) ব্যবহার করা ভালো । যদি

আপনার কর্মস্থলে দাঁঁত ব্রাশ না থাকে তবে বাসার মতো করে সেখানেও একসেট টুথব্রাশ, পেস্ট ও ফ্লস রাখুন। কারণ অনেক সময়ে অফিসেই নাস্তা বা মধ্যাহ্ন ভোজন বা রাতের আহার সারতে হয়। তখন সেখানেও যাতে দাঁঁত ব্রাশ করতে পারেন সেই ব্যবস্থা রাখাটাও জরুরী। তবে ব্রাশের আগে অবশ্যই ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করবেন, পরে নয়। নিয়মিত দাঁঁত ব্রাশ ও ফ্লস না করলে সহজেই দাঁঁতের গর্ত বা ক্যাভিটি হয় এবং ব্যথা ও প্রদাহ থেকে আরও জটিলতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং দাঁঁত ব্রাশ ও ফ্লস করা প্রয়োজন প্রতিদিন অন্তত ২ বার ।

. বছরে অন্তত:একবার দাঁঁত পরীক্ষা করাবিজ্ঞানসম্মতভাবে নিয়মিত বছরে অন্তত: একজন অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনকে দিয়ে দাঁঁতের স্কেলিং করানো যেমন জরুরী, তেমনি দাঁঁতগুলো পরীক্ষা ও সেই সাথে মুখের বিভিন্ন অংশের পরীক্ষা করানোও জরুরী। তাতে মুখ ও দাঁঁতের সামান্য গর্তকে ফিলিং করিয়ে যেমন রক্ষা করা যাবে তেমনি একটি প্রিক্যান্সার ঘা বা প্রদাহকে ক্যান্সারের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যাবে। অতএব, Prevention is better than Cure. প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই শ্রেয়, সস্তা ও নিরাপদ।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিবিধ প্রতারণা

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : যুগ যুগ ধরে এ দেশের মানুষ চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতারিত হয়ে চলেছেন। ১৯৬০এর দশকে দেখেছি একশ্রেণীর ডাক্তারকবিরাজহেকিম নামধারী ব্যক্তি কোর্টকাচারি, হাটবাজারে মজমা জমিয়ে মানুষের হাতে ধুলাবালি ছাই পর্যন্ত ধরিয়ে দিত। বিষয়টা পরিষ্কার করে বলা যাক।

ছেলেবেলায় যখন পাবনা জিলা স্কুলে পড়তাম তখন টিফিন পিরিয়ডে প্রায়ই স্কুলের কাছেই জজকোর্ট প্রাঙ্গণে চলে আসতাম। কারণ হেকিমডাক্তার নামধারী লোকেরা সেখানে মজমা জমিয়ে মানুষকে আনন্দ দানের (Wondering entertainment) মাধ্যমে নিজেদের মতলব হাসিল করত। প্রথমে কিছু মজাদার খেলাধুলা, হাতসাফাই দেখিয়ে তারা লোক জড়ো করে, তারপর ওষুধের বাক্সপেটরা খুলে ধরে মানুষকে বিভিন্নভাবে প্রলোভিত করত। ভিড় জমানো মানুষের বিভিন্ন রোগের সুযোগ গ্রহণ করে তাদেরকে ওইসব ডাক্তারহেকিম নিজেদের তৈরি বিভিন্ন ধরনের সালসা, সিরাপ, হালুয়া, বটিকা, পুরিয়া, তাবিজকবজ ধরিয়ে দিত। আর কোর্টকাচারিতে আসা লোকজনসহ সেখানে জড়ো হওয়া অন্যান্য মানুষও প্রলুব্ধ হয়ে সেসব ওষুধ কিনে নিয়ে ঘরে ফিরত। এভাবে দুপুরের মধ্যে সেখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ওইসব ডাক্তারহেকিম আবার বিকালবেলা একই কায়দায় হাটবাজারে গিয়ে ওষুধ বিক্রি করত। আমার নিজ এলাকার এমন দু’জন ডাক্তারও এ কাজে জড়িত থাকায় তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে আমি অনেকটাই জেনে গিয়েছিলাম। তাদের দু’জনই আমার চেয়ে বয়সে বেশ বড় হওয়া সত্ত্বেও লালু নামের একজনের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠায় একদিন সে আমাকে বলেছিল, ওইদিন ছাই ও মোম দিয়ে ভরা তাবিজকবজ বিক্রি করে সে তিনশ’ টাকা রোজগার করেছে। সে সময়ে একজন দিনমজুরের দৈনিক মজুরি ছিল তিন টাকা! আবার অন্য একজন যাকে এলাকার লোক কাদের বাঙাল বলে জানত ও চিনত, সেও একদিন বলেছিল, খাবার সোডা, আটা ও শুকনো গুড় দিয়ে এক ধরনের পুরিয়া তৈরি করে সে পেটব্যথার রোগীদের কাছে তা বিক্রি করে!

সুধী পাঠক, আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগের একটি মফস্বল শহরের ডাক্তারহেকিম নামধারী চিকিৎসকদের বিষয়ে একটু আলোকপাত করার জন্যই অতীতের উদাহরণ তুলে ধরা হল। কারণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে এ দেশে প্রতারণার রকমফের হয়েছে মাত্র! আর সে রকমফের পাল্টাতে পাল্টাতে এখন যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সে ক্ষেত্রেও প্রচুর প্রতারণা আছে!

৬০ বছর আগে মফস্বল শহরে শিক্ষিত ডাক্তার বলতে আমরা ন্যাশনাল, এলএমএফ পাস ডাক্তারকেই বুঝতাম। কালেভদ্রে একজন এমবি অথবা এমবিবিএস ডাক্তার সে সময়ে কোনো জেলায় থাকলেও থাকতে পারে। এ অবস্থায় বাল্যকালে আমার চিকিৎসা একজন এলএমএফ (লাইসেন্স ইন মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি) ডাক্তার দ্বারাই সম্পন্ন হতো। বিভিন্ন সময়ে তার কাছে গেলে ওই ডাক্তার সাহেব কাচের শিশিতে দাগ কেটে সিরাপ (ওষুধ) বানিয়ে দিতেন। আবার তারও আগে শিশুকালে জ্বর হলে হাতুড়ে গ্রাম্য ডাক্তার গঙ্গারাম (গঙ্গা ডাক্তার) বাবুর কুইনাইন ইনজেকশনে জ্বর সারত। কিন্তু সে কুইনাইনের ধকল আজও শরীরে হয়তো রয়েই গিয়েছে। কারণ কুইনাইন জ্বর সারালেও কুইনাইনকে সারানো যায় না! তাই আজ থেকে ৬০৬৫ বছর আগে আমি যে চিকিৎসা পেয়েছি তা হাটবাজার, কোর্টকাচারিতে মজা দেখানো ডাক্তারহেকিমের মতো না হলেও চিকিৎসার নামে সেসবই যে ছিল অপচিকিৎসা সে কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তাই বলে বর্তমানেও যে খুব ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি সে কথাও জোর দিয়ে বলতে পারছি না। বর্তমানেও আমাদের দেশে বড় বড় প্রাইভেট হাসপাতালে, প্রতিটি জেলায় ক্লিনিকে চিকিৎসার নামে যা চলছে সেসব ক্ষেত্রেও অনেক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ এবং প্রমাণ আছে। এসব প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হলে ছোটখাটো রোগ ধরা পড়লেও প্রতারণার মাধ্যমে পরীক্ষানিরীক্ষার লিস্ট লম্বা করা হয় এবং একদিন বা দু’দিন সেখানে অবস্থানের প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও তা দীর্ঘায়িত করে ৫১০ দিনে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। অর্থাৎ বিপদেআপদে কেউ ওইসব হাসপাতালে ঢুকে পড়লে ছোটখাটো রোগের ক্ষেত্রেও লাখ টাকার নিচে বিল মিটিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসার কোনো উপায় নেই। বড়সড় কোনো অসুখ ধরা পড়লে তো কথাই নেই। সে ক্ষেত্রে ৫৭ লাখ বা ১০১২ লাখ টাকা বিল বানানোও ওইসব হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিচিত্র কিছু নয়! ওইসব হাসপাতাল ধনবান ব্যক্তিদের জন্য বিবেচিত হলেও বিপদেআপদে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজনকেও সেখানে যেতে হয়। এমনই একজন রোগীর সঙ্গে একবার ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে কথা হয়েছিল। মফস্বল থেকে আসা একজন নিম্নমধ্যবিত্ত ব্যক্তি জানিয়েছিলেন, সেখানে ভারত থেকে আগত ডাক্তার আছেন বিধায় এবং ভারতে ডাক্তার দেখাতে গেলে ভিসাসহ সঙ্গীসাথী নিয়ে ভ্রমণের ঝামেলা থাকায় তিনি এখানে এসেছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি এ কথাও জানালেন যে, ৩ লাখ টাকায় এক বিঘা ধানি জমি বিক্রি করে তবেই এখানে চিকিৎসা করাতে এসেছেন। কারণ মানুষমাত্রই বাঁচতে চায়। আর অসুখবিসুখের মতো বিপদে পড়লে সে অবশ্যই ধানি জমি, ভিটে জমি বিক্রি করে হলেও সেসব বিপদের মোকাবেলা করতে চায়। কিন্তু বিপদাপন্ন ওইসব ব্যক্তি আমাদের দেশের হাসপাতালে সুচিকিৎসা পান কিনা সে প্রশ্নটি থেকেই যায়। আর সে প্রশ্নের উত্তরও বোধহয় আমাদের সবারই জানা। আমার এক আত্মীয় মিরপুরের স্বনামধন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হলে তার হার্টে পেসমেকার লাগানোর প্রয়োজন পড়ে। আমি সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, এসব অপারেশন তার কাছে ডালভাতের মতো অত্যন্ত সহজ কাজ। তিনি এ ধরনের অপারেশনসহ দৈনিক ৪০৫০টি এনজিওগ্রাম করে থাকেন। অতঃপর নির্ধারিত অপারেশনের দিন (পেসমেকার লাগানোর দিন) আমি থাকতে না পেরে তিন দিন পর গিয়ে যা শুনেছিলাম, তাতে আমার চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হয়েছিল। কারণ পেসমেকার লাগানোর দিন সেই করিৎকর্মা ডাক্তার সাহেব অসুস্থ থাকায় তার সহকারীরা আমার আত্মীয়ের হার্টে পেসমেকার লাগিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ ওই ডাক্তার সাহেব আমার এক বন্ধুর ছোট ভাই এবং আমি তাকে বিশেষভাবে বলেও এসেছিলাম।

এসব ঘটনা ছাড়াও ঢাকার বড় বড় তিনটি বেসরকারি হাসপাতাল সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত যেসব অভিজ্ঞতা আছে এবং আমার কাছে যেসব প্রমাণপত্র আছে, সেসব উপস্থাপন করলেও বিরাট বড় ধান্দাবাজি ও প্রতারণার প্রমাণ মিলবে। যদিও সেসব কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, যেসব মানুষ ওইসব হাসপাতালে যাচ্ছেন, তারা সঠিক নিয়মে সঠিক খরচে সঠিক সময়ে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন কিনা? নাকি একজন রোগী গেলেই প্রয়োজনেঅপ্রয়োজনে একগাদা পরীক্ষানিরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দিয়ে কয়েকদিন সময় নষ্ট করার পাশাপাশি সিট ভাড়া বাড়িয়ে ভুক্তভোগীর অর্থের শ্রাদ্ধ করা হচ্ছে! যদি তাই হয়, তাহলে ওইসব হাসপাতালে দেশের মানুষ সুচিকিৎসা পাবেন কীভাবে? রোগী গেলেই যদি প্রতারণার মাধ্যমে বিল বাড়ানোর পাঁয়তারা করা হয় এবং বিষয়টি যদি ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এ দেশের রোগীরা যাবেন কোথায়? আর কতকালই বা এ দেশের মানুষ চিকিৎসার নামে বঞ্চনাপ্রতারণার শিকার হবেন? আর কতদিনই বা ডাক্তারি পেশার নামে, হাসপাতালক্লিনিক ব্যবসার নামে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনের ধান্দাবাজি অব্যাহত থাকবে? আর কতকাল ধরে ডাক্তার সাহেবরা রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার খরচের অর্থের ওপর থেকেও কমিশন গ্রহণ করবেন? ডাক্তার সাহেবরা এসব বিষয় স্বীকার করুন আর নাই করুন, যেহেতু বিষয়টি একটি ওপেন সিক্রেট, তাই আমরাও তাদের বিবেককে জাগ্রত করার প্রচেষ্টা হিসেবেই এখানে তা তুলে ধরলাম।

সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবদের কিছু ঘটনা, কিছু কথা তুলে ধরেই লেখাটি শেষ করতে চাই। কয়েকদিন আগে একটি ব্যাংকের একজন ম্যানেজার ভদ্রমহিলা জানালেন, তিনি পরপর দু’দিন আগারগাঁও সরকারি চক্ষু হাসপাতালে গিয়েও সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সাক্ষাৎ পাননি। ডাক্তার সাহেব নাকি সে সময়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকেন। তিনি অভিযোগ করে বললেন, ব্যাংকে চাকরি করে সময় বের করে পরপর দু’বার তার কাছে গিয়ে ফেরত আসার মর্মযাতনায় তিনি কাতর। বলা বাহুল্য, সরকারি হাসপাতালগুলোর ডাক্তার সাহেবদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। হাসপাতালের আশপাশের প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দালাল নিয়োগ করা থেকে শুরু করে যথাসময়ে হাসপাতালে উপস্থিত না থাকা, রোগীদের প্রয়োজনীয় সময় না দেয়া, রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করা ইত্যাদি বিভিন্ন দোষে এসব ডাক্তার সাহেব দুষ্ট। পাবনা মানসিক হাসপাতালের আশপাশ ঘুরে দেখে এলাম সেখানকার ব্যক্তিগত দালানকোঠায় পর্যন্ত মানসিক রোগী ভর্তির সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। প্রশ্ন হল, ওইসব প্রাইভেট ভবনে গিয়ে রোগী দেখেন কারা, সরকারি মানসিক হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবরাই তো, নাকি? আর সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার সাহেবরা অবলীলায় এসব করে চলেছেন, তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে। ড্যাব, এ্যাব ইত্যাদি বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে তারা সংগঠিত হয়ে যখন যে সরকার আসে তখন সেই সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে থাকেন। অনেক দিন আগে সকাল সাড়ে ১০টার সময় একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে নারীপুরুষ মিলিয়ে সেখানে প্রায় শ’খানেক ডাক্তারের উপস্থিতি দেখেই বুঝেছিলাম সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারির নামে আসলে তারা কী করেন? কারণ সকাল সাড়ে ১০টায় ওইসব ডাক্তার সাহেবের হাসপাতালে থাকার কথা।

উপসংহারে বলতে চাই, এসব ঘটনা উল্লেখের উদ্দেশ্য ডাক্তার সাহেবদের বিরুদ্ধে কোনো বিষোদ্গার করা নয়। আমি নিজেও একজন ডাক্তারের পিতা। দেশের ডাক্তারদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের মনে যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে তা বড় একটি সমস্যাই বটে। অবস্থায় আমরা ডাক্তারদের নীতিবোধকে সমুন্নত করার চেষ্টা করছি মাত্র। সেদিন একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে দেখলাম কীভাবে কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই, বাঙ্গালুরু যাওয়ার জন্য দেশের মানুষ বিমানের টিকিটের ওপর হামলে পড়ছেন। দিনের আগে যাওয়াআসার কোনো এয়ারলাইন্সেই টিকিট নেই। ব্যাংককসিঙ্গাপুরেও একই অবস্থা! চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেশের টাকা পানির মতো বিদেশে চলে যাচ্ছে। যার বেশিরভাগই যাচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। আর দেশের ডাক্তাররা তা চেয়ে চেয়ে দেখছেন। বারবারই যে প্রশ্নটি এসে যাচ্ছে তা হল, এখনও কি দেশের মানুষ দেশের ডাক্তারদের ওপর আস্থা রাখতে পারবেন না? সম্মানিত ডাক্তার সাহেবরা প্রশ্নটা আপনাদের কাছেই।

দৌড়াও, কিন্তু থামতে শেখো !

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : একটা গ্রিক উপকথা। আপনারা অনেকে হয়তো পড়েছেন। একটা খুবই সুন্দরী মেয়ে ছিল। দাফনি। অবিশ্বাস্য সুন্দরী। উপকথাতে তাই হয়। উপকথাতে কোনো খারাপ চেহারার মানুষ কখনো দেখা যায় না। কারণ উপকথার মধ্যে মানুষ তার স্বপ্নের পৃথিবীকে তৈরি করতে চায়। সেই স্বপ্নের পৃথিবী কুৎসিত হতে পারে না। তো সেই উপকথায় একটা নদী আছে। দাফনি হলো সেই নদীর রাজার মেয়ে। নদীর পাশে একটা বিশাল জঙ্গল। বিশাল অরণ্য। সেই অরণ্যে সে একা একা ঘুরে বেড়ায়। সেখানে যত সুদর্শন যুবককে দেখে, তাদের সঙ্গে সে প্রেমের অভিনয় করে। সেই যুবক যখন সম্পূর্ণভাবে তার প্রেমে মত্ত হয়ে ওঠে, তখন সে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে একটা পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করে। এ রকমভাবে তার দিন কাটছে। সে থামে না। একজন শেষ হলে আরেকজনের কাছে যায়, আরেকজন শেষ হলে আরেকজনের কাছে যায়।

এমন সময় হলো কী, সে চোখে পড়ে গেল অ্যাপোলো দেবতার। অ্যাপোলো দেবতা তাকে দেখেই তার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে গেল। মানুষই যখন মুগ্ধ, দেবতা তো আরও অনুভূতিশীল, তাই না? তার তো অবস্থা আরও করুণ! সে বলল, ‘দাফনি তুমি দাঁড়াও।’ দাফনি বুঝল যে এ দেবতা, একে সে এড়িয়ে যেতে পারবে না। তখন সে দৌড়াতে লাগল, তার হাত থেকে পালানোর জন্য। সেও দৌড়াচ্ছে, অ্যাপোলোও দৌড়াচ্ছে। কিন্তু অ্যাপোলোর সঙ্গে দৌড়ে তো তার পারার কথা নয়। অ্যাপোলো ক্রমে কাছে চলে এল। একসময় দাফনি টের পেল যে তার পেছনে অ্যাপোলোর ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

এমন সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। অরণ্য শেষ হয়ে গেল এবং দেখল যে সামনে সেই নদী। তখন দাফনি চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা আমাকে বাঁচাও।’ তখন দেখা গেল যে আস্তে আস্তে দাফনির পা মাটির মধ্যে গেড়ে গেল এবং পায়ের আঙুলগুলো শিকড়ের মতো হয়ে মাটির নিচে ছড়িয়ে গেল। তার হাতগুলো ডালের মতো হয়ে, আঙুলগুলো পাতার মতো হয়ে সমস্ত অবয়বটা গাছে পরিণত হলো। সে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল। তখন অ্যাপোলো বলল, দাফনি, তুমি এত দিন অস্থির ছিলে। এত দিন তুমি শুধু ছুটেছ। কাউকে তুমি দাওনি কিছুই। কারণ তোমার নিজেরও কিছু ছিল না। তুমি ছিলে একটা ঊর্ধ্বগতিসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু আজকে দেখো, তুমি দাঁড়িয়েছ। এই জন্য তুমি আজকে একটা বৃক্ষে পরিণত হয়েছ। এই জন্য দেখো আজ তোমার কত ডাল, কত পাতা এবং কত ফুল। আমি তোমাকে আশীর্বাদ করছি, বর দিচ্ছি, তুমি যেহেতু দাঁড়াতে পেরেছ, সুতরাং আজ থেকে এই গ্রিসের সমস্ত বীরদের মাথার মুকুট তোমার এই পাতা দিয়ে তৈরি হবে। দাফনি কী গাছ হয়ে গিয়েছিল? অলিভ। অলিভ গাছের পাতা দিয়ে মুকুট তৈরি হয়। গ্রিসে যত প্রেমিকপ্রেমিকা আছে, তারা তোমার ফুলের দ্বারা তাদের ভালোবাসা পরস্পরকে জানাবে।

ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমারও একটাই কথা—থামো। দৌড়াও, কিন্তু থামতে শেখো। দাঁড়াতে শেখো। গাছ হতে শেখো। গাছের মতো সমুন্নত, গাছের মতো পোশাকআবহ, গাছের মতো পাতায় ভরা, ফুলে ভরা, সৌন্দর্যে ভরা। তাহলে এই পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে কিছু দিতে পারবে। তা না হলে হাততালি এবং শিস দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। ধন্যবাদ।

বিশ্ব কাপে বিশ্ব কাঁপে

ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বজুড়ে তীব্র উন্মাদনা সৃষ্টির কল্যাণে তার পদবি গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ। ১৯৩০ সালে শুরু হয়ে ২০১৮ পর্যন্ত কেটে গিয়েছে ৮৮ বছর। অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বকাপের ২০টি আসর। এ বছর লেভ ইয়াসিনের দেশ রাশিয়ায় বসেছে ২১তম আসরটি। ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর সেই দিনগুলো আর আজকের আধুনিক সময়ের মধ্যে হয়তো শুধু রঙ আর আয়োজনের পার্থক্য; বাকি সব কিছু আছে আদি ও অকৃত্রিম।

ফুটবল ম্যাচ জয় করার জন্য রসিকরাজ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আছে একটি সহজ রেসিপি। তার প্রয়োজন একজন চোখ ট্যারা স্ট্রাইকার আর গোলকিপার! তাতে যা হবেতার স্ট্রাইকার যখন বল নিয়ে আক্রমণে যাবে, বিপক্ষ দলের গোলকিপার ভাববে সে বুঝি ডানে মারবে বল, কিন্তু বল তো মারবে বামে, ব্যাস তাতেই গোল! আবার বিপক্ষ দলের স্ট্রাইকার যখন বল নিয়ে তার গোলকিপারের সামনে আসবে, গোলকিপার বামে তাকিয়ে আছে ভেবে মারবে ডানে কিন্তু গোলকিপার মশাই তো আসলে ডানেই তাকিয়ে ছিল, বল ধরে ফেলবে সে। গোল আর হবে না, ম্যাচ জিতে যাও সহজে! (স্রেফ মজা করার জন্যই এই কৌতুকের অবতারণা। কাউকে আহত করার মনোবাসনা নেই এই লেখকের।)

ফুটবল ম্যাচ তো জিতে গেলেন সহজে; কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের এমন কোনো সহজ রেসিপি কি কেউ আজ পর্যন্ত দিতে পেরেছেন? এক কথায় উত্তরনা। বিশ্বকাপ জয়ের যে কোনো সহজ পথ নেই। বিশ্বকাপের ইতিহাসের দিকে তাকালেই সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে দিনের আলোর মতো। কালো মানিক পেলে হয়তো তিনবার জয় করেছেন বিশ্বকাপ। ম্যারাডোনা একবার হাত দিয়ে আরেকবার পুরো মাঠের প্রায় সব খেলোয়াড়কে কাটিয়ে করেছেন শতাব্দীর সেরা গোল, বিশ্বকাপও জয় করেছেনতাতেও বা কী আসে যায়। বিশ্বকাপ নিজেই তো হিমালয়। যাকে দেখা যাবে, যার কাছে যাওয়া যাবে, ছোঁয়াও যাবে কখনও কখনও; কিন্তু জয় করা সে তো জীবনের সেরা লড়াইটি লড়ার পরেই হয়তো ঘটতে পারে।

বিশ্বকাপ এলেই কেমন যেন হয়ে যায় সব। সবখানেই একটি বিষয়, ফুটবল বিশ্বকাপ। পুরো বিশ্ব আনন্দ আর উত্তেজনায় ভরা একটি মাস আর কখন কাটাতে পারে। প্রতিদিনের যুদ্ধ, মৃত্যু আর হাজারো শোকের খবরে ঢাকা পড়ে যাওয়া আমাদের সবার জীবনে একসঙ্গেই আসে কিছুটা সময়ের আনন্দ।

আনন্দের পাশাপাশি ফুটবল নিয়ে পাগলামিরও কি শেষ আছে? সেটারও উত্তরনা। ২০১০ সালের আফ্রিকা বিশ্বকাপে পল নামের জ্যোতিষ অক্টোপাসের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। স্পেন যে চ্যাম্পিয়ন হবে তার ভবিষ্যদ্বাণী তো পলই করেছে; এবং হয়েছেও তাই। এবারের বিশ্বকাপেও হাতি, বাঘ, ঘোড়া, বিড়াল অনেক কিছু দিয়েই চেষ্টা করা হচ্ছে। দেখা যাক, কতদূর কী হয়।

বিশ্বকাপের চরম সময় কাটছে এখন। বলা যায়, প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছে বিশ্বকাপ। কে জিতবে বিশ্বকাপ? এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই প্রিয় দলের নামই বলছেন। কখনও ঝগড়ায় মেতে উঠছেন, কখনও প্রিয় দলের পতাকা দিয়ে ভরে ফেলছেন ঘরদোররাস্তাঘাট। রাত জেগে, কাজ ফেলে টিভির সামনে বসে খেলা দেখে আর কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেআমার দলটাই যেন পায় বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ। কাদের বাসনা পূর্ণ হবে সেটা জানা যাবে কয়েকদিন পরে।

ফুটবল দলীয় খেলা। ফুটবলের শৈল্পিকতা আর অন্য কোনো খেলায় দেখা যায় না। ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে খেলাটি খেলার মন্ত্রণা দেয় সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা। কখনও সেটা হয় আবার কখনও সেটা হয় না। কিন্তু ফুটবল তো আমাদের ভালোবাসার কথা শেখায়। দেশকালসীমানা ভুলে গিয়ে কয়েকদিনের জন্য হলেও আমরা বিশ্ব নাগরিক হয়ে যাই। বিশ্বমানবের জন্য মানবতা আর সম্প্রতির বন্ধন ঘটুক ফুটবলের কল্যাণে, বিশ্ব কাঁপানো বিশ্বকাপের কাছে আর কিছু চাইবার নেই।

পেনাল্টি কিকের বিজ্ঞান

ফয়সল আবদুল্লাহ : ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা। তবে এ উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপটি দেখা যায় পেনাল্টি কিকের সময়। তবে এর পেছনেও কাজ করে বিজ্ঞান। এ পর্যন্ত হয়েছে ঢের গবেষণাও।

পেনাল্টি শুটআউট মানে ফিফটি ফিফটি। আসলেই কি তাই? এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে ঢের। তবে সবচেয়ে বেশি বলা হয় ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষণাটির কথা। তারা অবশ্য বিজ্ঞানের চেয়ে পরিসংখ্যান ও খেলোয়াড়দের মানসিক গতিবিধির দিকেই বেশি নজর দিয়েছিল। ২০১৪ সালে করা তাদের গবেষণায় বলা হয়েছিল, পেনাল্টিতে আপাতদৃষ্টিতে গোল হওয়া বা হওয়ার চান্স সমান সমান মনে হলেও গোলটিই বেশি হয়। এর কারণ হলো, গোলরক্ষকদের বেশির ভাগই অবচেতনে একটি বিশেষ সূত্র মেনে চলেন। গোলপোস্টের এক পাশে পরপর দুটি কিক হলে তারা ধরেই নেন যে তৃতীয় কিকটি তার বিপরীত পাশে পড়বে। এ ভুল ধারণা অবচেতনেই গোলরক্ষকদের মনে গেঁথে যায়। তবে এও ঠিক যে গোলরক্ষকদের ওই ভুল ধারণাকে পুঁজি করে গোল দেওয়ার বিষয়টিও বেশির ভাগ স্ট্রাইকারের মাথায় থাকে না। ১৯৭৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপ ও ইউরো কাপের মোট ৩৬১টি পেনাল্টি কিকের ভিডিও পর্যালোচনা করে এ বিষয়গুলো ধরতে পারেন গবেষকরা।

ব্রিটিশ কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠান কুইন্টিকও এ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে খুব। প্রতিষ্ঠানটির কাজ হলো, বিভিন্ন খেলার স্লো মোশন ভিডিও করে সেটি নিয়ে গবেষণা করা। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার পল হারিওন নিজে একজন বায়োমেকানিক্যাল বিশ্লেষক। তিনি পর্তুগালের তারকা ফুটবলার রোনালদোর কিক নেওয়ার ভিডিও নিয়েও গবেষণা করেছেন। তাঁর মতে, দক্ষ ও শক্তিশালী স্ট্রাইকাররা যখন পেনাল্টির কিক নেন, তখন বলটি জালে পৌঁছতে সময় নেয় মাত্র দশমিক চার সেকেন্ড। অন্যদিকে গোলকিপার যতই শক্তসমর্থ হোন না কেন, গোলপোস্টের যেকোনো এক পাশ আটকাতে তাঁর সময় লাগবে দশমিক ৬ সেকেন্ড। আর মাটি পর্যন্ত পড়তে লাগবে পাক্কা এক সেকেন্ড। অর্থাত্ স্ট্রাইকার যদি মাপমতো গোলপোস্টের যেকোনো এক কোণে সজোরে কিক ছুড়তে পারেন, তবে গোলরক্ষকের করার কিছুই থাকবে না। কারণ বলে পা ছোঁয়ানোর আগে গোলকিপার নড়তে পারবেন না একেবারেই।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গোলরক্ষকের দক্ষতা দেখানোর জায়গাটা হলো, স্ট্রাইকারের গতিবিধি আগেই আঁচ করতে পারা। কুইন্টিকের গবেষণার সারকথাটি ছিল—গোলরক্ষকের কাজ শুধু যে কিকারের মতিগতি বোঝা তা নয়, কিক যিনি করবেন, তিনি কিন্তু গোলরক্ষককে বিভ্রান্তিতে ফেলতে কিছু ‘ভুল তথ্য’ দেবেন। হতে পারে সেটি আড়চোখে গোলপোস্টের কোনো এক দিকে তাকানো বা কোনো একদিকে পা ঘুরিয়ে কিকের প্রস্তুতির ভান করা। গোলরক্ষকের কাজ হবে, আগের ৯০ মিনিট ওই স্ট্রাইকারের ঝোঁক বুঝতে পারা এবং ইচ্ছাকৃত দেওয়া ভুল তথ্য থেকে সঠিক তথ্যটি আলাদা করা। এর জন্য গোলরক্ষকদের পড়াশোনাও করতে হবে ঢের। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের অতীতের স্লোমোশন ভিডিও দেখে তাকে বুঝতে হবে—বারবার গোলপোস্টের ডান পাশে তাকানোর মানে হলো, স্ট্রাইকার বাঁয়েই কিকটি নেবেন।