প্রথম পাতা > অপরাধ, ইতিহাস, ধর্মীয়, রাজনীতি, সমাজ > ১৯৪৭ : ইতিহাসের রক্তস্নাত পাণ্ডুলিপি

১৯৪৭ : ইতিহাসের রক্তস্নাত পাণ্ডুলিপি

radcliff misdeed১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতে ৩০০ বছর রাজত্ব শেষে বিদায় নিল ব্রিটিশ। এক ভারত নয়, দুই দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটল এখানে- হিন্দুপ্রধান ভারত আর মুসলিমপ্রধান পাকিস্তান। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নতুন বরাদ্দ ভূখণ্ডের কারণে রাতারাতি উদ্বাস্তু হলো দেড় কোটি লোক। মানচিত্রের দুই প্রান্তে আঁকা কল্পিত দুটো দাগ নির্ধারণ করে দিল কারা কোথায় থাকবে। শুরু হলো মানব ইতিহাসের বৃহত্তম অভিবাসন। লাখ লাখ মুসলমান তাদের আদিবাস ছেড়ে রওনা হলো পশ্চিম আর পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) উদ্দেশে, অন্যদিকে, লাখ লাখ হিন্দু আর শিখ অনুরূপ পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে রওনা হলো ভারতের উদ্দেশে। আর দাগের ওপার-এপার এ আসা-যাওয়ার মাঝেই চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল আরো কয়েক লাখ মানুষ।

হাজার বছর পাশাপাশি মিলেমিশে বসবাস করে এসেছে যারা, বিশ শতকের শুরুতে তাদের মধ্যে বিভেদের বীজ বুনলো ব্রিটিশ ক‚টবুদ্ধি। ছিঁড়ে গেল মিলনের সুতো, পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী দাঙ্গায় জড়ালো হিন্দু, মুসলিম আর শিখ।

দেশভাগ ও তার পরের ঘটনা নিয়ে নিশিদ হাজারি তার ‘মিডনাইটস ফিউরি’ বইয়ে এক বয়ানে জানাচ্ছেন, দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ল খুনিরা। সবকিছু ধ্বংসের প্রতিজ্ঞা নিয়ে। জ¦ালিয়ে দিল গ্রামের পর গ্রাম। কুপিয়ে হত্যা করল ছেলেদের। বাদ পড়ল না শিশুরাও। আর অল্পবয়সী মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে গেল গণধর্ষণের উদ্দেশ্যে। ১৯৪৮ সাল নাগাদ কিছুটা স্তিমিত হলো অশান্ত পরিস্থিতি। কিন্তু ইতোমধ্যে বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়েছে দেড় কোটি, মাটিতে মিশে গেছে আরো ২০ লাখ মানুষ।

ইহুদির কাছে যেমন বেদনাগাথা হয়ে আছে হলোকাস্ট, ভারতবাসীর কাছে তেমনি দেশভাগ।

নেপথ্য নটবর : এবার ঘটনার প্রেক্ষিতের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। ১৯৪৫ সাল। সাত বছরের বিশ^যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত ব্রিটিশ। তাদের তখন এমন কোনো সামর্থ্য নেই যা দিয়ে তারা শাসন কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাদের সবচেয়ে সমৃদ্ধ আর সম্পদশালী এ উপনিবেশ। বিদায়ের সব প্রস্তুতি নিতে শুরু করল তারাও। ব্রিটিশদের জন্য এটি ছিল অতি সফল এক প্রত্যাবর্তন। তিনশ বছরের শাসনকালে বারবার স্থানীয় বিদ্রোহের মুখে পড়েছে তারা। অথচ শেষবেলায় একটি গুলি খরচ করতে হয়নি তাদের।

ব্রিটিশ পূর্ব ভারতে মুসলিম পদার্পণ : ১০২১ সালে তুর্কি সেনার পদানত হয় লাহোর। এ পথ ধরে ১১ শতকেই ভারতে রাজনৈতিক শক্তিরূপে আবির্ভাব ঘটে মুসলিমদের। মধ্য আফগানিস্তান থেকে আসা এ শক্তি দিল্লির সিংহাসন দখল করে ১১৯২ সালে। ১৩২৩ নাগাদ পশ্চিমে গুজরাট, দক্ষিণে মাদুরাই এবং পূর্বে বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয় সালতানাত। তখন ধর্মীয় পরিচিত নয়, বরং ভাষিক পরিচিতি দিয়েই চিহ্নিত করা হতো নবাগতদের। সেনারা প্রথম থেকেই রক্তপাত আর ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করলেও শিগগিরই তাদেরও আপন করে নিল ভারত।

উনিশ শতক পর্যন্ত নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর ভাষিক পরিচয়ে পরিচিত হয়েছে অধিবাসীরা। বাংলার একজন মুসলিম জেলে বাংলার একজন হিন্দু জেলের সঙ্গে যতটা একাত্ম অনুভব করবে, তা সে কখনোই করবে না একজন পশতু কিংবা আফগান মুসলিমের সঙ্গে।

অনিবার্য ছিল কি দেশভাগ? : ব্রিটিশ পণ্ডিত প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ তার ‘লিবার্টি অর ডেথ’ বইয়ে খোলাসা করেছেন, ব্যক্তিত্বের সংঘাত কীভাবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বিশেষত, মুসলিম লীগ নেতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ বনাম হিন্দুপ্রধান কংগ্রেস দলের শীর্ষনেতা মোহনদাস গান্ধী এবং জওয়াহেরলাল নেহেরুর মধ্যে। তিন নেতাই পড়াশুনা করেছেন ইংল্যান্ডে, ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত আইনজীবী। জিন্নাহ এবং গান্ধী দুজনই গুজরাটের। বরাবরই সদ্ভাব রয়েছে তাদের মধ্যে। কিন্তু ৪০ দশকের শুরুতে তাদের রেষারেষি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে দুপক্ষকে কখনো এক টেবিলে বসানো পর্যন্ত সম্ভব হতো না। ফ্রেঞ্চ তার লেখায় বলছেন, কারো কাছেই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেননি জিন্নাহ। এমনকি পাকিস্তানিরাও তাকে আটকে রেখেছে শুধু ব্যাংক নোটে ইসলামি লেবাসে তার একখানি ছবি মুদ্রণের মধ্য দিয়েই। হুইস্কি প্রিয় চরম ধর্মনিরপেক্ষ জিন্নাহর প্রিয় পানীয়। জীবনে মসজিদে পা রেখেছেন কদাচিৎ। ক্লিনশেভ স্টাইলিশ লোকটির প্রিয় পোশাক ছিল বিখ্যাত সেভিল-রো স্যুট আর সিল্কের টাই। তিনি বিয়েও করেছিলেন এক অমুসলিম নারীকে, প্যারিসের এক নামজাদা সদাগরের মেয়ে। বিস্ময়কর শোনালেও সত্য এই জিন্নাহর হাত দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান। ১৯১৬ সালে ব্রিটিশদের কাছে তিনিই উপস্থাপন করলেন ভারতবাসীর অভিন্ন দাবিমালা, যা লক্ষেèৗ চুক্তি নামে খ্যাত। তখন তাকে স্বাগত জানানো হয়েছিল ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’ হিসেবে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই গান্ধীর রাজনৈতিক উত্থান আর মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেসের এক সভায় প্রতিদ্ব›দ্বীকে প্রথামতো মহাত্মা গান্ধীর পরিবর্তে শুধু ‘মি. গান্ধী’ হিসেবে অভিহিত করার কারণে সভার ‘দুয়ো’ ধ্বনির মুখে পড়তে হয় তাকে।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ, উলুখাগড়ার প্রাণ : ২০ আর ৩০ দশকের পুরো সময় জুড়ে চালু থাকল এ দ্ব›দ্ব। ১৯৪০-এ সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করল জিন্নাহর মুসলিম লীগ। অথচ এক সময় নিজেই তিনি বিরোধিতা করেছেন এ ধারণার। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সাংবিধানিক পরিষদে ভাষণে তিনি বলেন, আপনি যে ধর্ম, যে বর্ণ, যে বিশ্বাসী হোন না কেন, রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপের এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে, হিন্দু মুসলমানে মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা আর কারো পক্ষে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

এর শেকড় ছড়ায় ১৯৪২ সালে। বিশ^যুদ্ধ চলছে। সিঙ্গাপুর আর রেঙ্গুন দখলে নিয়ে বার্মার ওপর দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের দিকে অগ্রসর হল জাপান। কংগ্রেস শুরু করে ‘কুইট ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন। গ্রেপ্তার হলেন নেহেরু এবং গান্ধী। ব্রিটিশের মিত্র হিসেবে অবস্থান নিলেন জিন্নাহ। বিশ^যুদ্ধ শেষে মুক্ত হলেন কংগ্রেস নেতারা। জেল থেকে বেরিয়ে জিন্নাহ সম্পর্কে নেহেরু বললেন, রুচির ঘাটতি আছে তার মননে। আর গান্ধী তাকে অভিহিত করেন ‘অশুভ প্রতিভা’ হিসেবে।

partition-of-india-2মুখোমুখি হিন্দু-মুসলিম : তখন থেকেই রাস্তাঘাটে হিন্দু-মুসলিম হানাহানির ঘটনা বাড়তে থাকে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতায় জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। মুসলিম দাঙ্গাকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল হিন্দুদের ওপর। সংবাদপত্রেও লিখলেন, রক্তপাত আর বিশৃঙ্খলায় কোনো ঘাট নেই, যদি তা মহৎ উদ্দেশ্যের কারণ হয়ে থাকে। ভন তুজেলমানের বিবরণীতে আছে নিরদ সি চৌধুরীর নিজের চোখে দেখা দাঙ্গাকালীন সংঘটিত নারকীয় পরিস্থিতির কথা। ট্রামলাইনের সংযোগ বক্সের সঙ্গে একজন লোককে বাঁধার পর তার মাথায় ড্রিল মেশিন দিয়ে ছোট্ট ফুটো করা হয়েছে যাতে সেখান থেকে চুইয়ে রক্তপাতের ফলে ধীরে ধীরে তার মৃত্যু ঘটে। ক্রুদ্ধ একদল হিন্দু যুবক কিশোর বয়সী এক ছেলেকে ন্যাংটো করে তার খতনা পরীক্ষা করছে। এরপর চ্যাংদোলা তুলে ছেলেটিকে নিক্ষেপ করা হলো পাশের পুকুরে, বাঁশ দিয়ে মাথাটা চেপে রাখা হলো পানির ভেতর। দলের মধ্যে থাকা ইংল্যান্ড থেকে পাস করে আসা এক বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার বাবু তার হাতের রোলেক্স ঘড়িতে কাঁটা মিলিয়ে দেখতে শুরু করল, কত মিনিট সময় নেয় ‘ব্যাটা’ দম ফুরিয়ে মরতে।

ব্রিটেনের পার্লামেন্টে পাস হলো ভারতের স্বাধীনতা : ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি পার্লামেন্টে ঘোষণা দিলেন, ১৯৪৮ সালের জুন মাসের আগেই ভারত ছেড়ে দেবে ব্রিটিশরা। ১৯৪৭ সালের মার্চে ব্রিটিশ রাজপরিবারের নবীন প্রতিনিধি লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ব্রিটেনের শেষ ভাইসরয় হিসেবে উড়ে এলেন দিল্লি। তার লক্ষ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সুসম্পন্ন করা। কিন্তু জিন্নাহর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পরই তিনি উপলব্ধি করলেন, লোকটি ‘সাইকোপ্যাথিক’ গোছের এবং আলোচনার টেবিলে বসার অযোগ্য। তার ভয় হচ্ছিল, হস্তান্তরের কাজটি বেশি দেরি হলে আবারো গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে ভারতে, যার দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে চাপবে সেই ব্রিটিশদেরই ঘাড়ে। জুনের শুরুতেই সবাইকে চমকে দিয়ে মাউন্টব্যাটেন ঘোষণা দিলেন, অ্যাটলির পূর্বঘোষিত তারিখের ১০ মাস আগে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কেন তিনি এ কাজটি করেছিলেন সেদিন, তা আজো রহস্যাবৃত। হয়তো দুই দলকেই তিনি ভয় দিতে চেয়েছিলেন এটা দেখিয়ে যে, সমাধানে পৌঁছাতে বিলম্বের কারণে কতটা গভীর সংকটের মুখে অবস্থান করছে তারা। কিন্তু বাস্তবে আরো খারাপ হলো তাড়াহুড়োর ফল। সিরিল র‌্যাডক্লিফ নামে এক ব্রিটিশ বিচারক ডেকে আনা হলো নতুন করে ভারতবর্ষের মানচিত্র আঁকার জন্য। ১৪-১৫ আগস্ট স্বাধীনতা অর্জনের দুদিন পর র‌্যাডক্লিফের হাতে ব্যবচ্ছেদ হওয়া মানচিত্রের খবর পৌঁছালো মানুষের কাছে। ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭। রাইসিনা হিলের পাদদেশে ভারতের সাংবিধানিক পরিষদে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন নেহেরু, শুরু করলেন তার বিখ্যাত বক্তৃতা, ‘অনেক বছর আগে নিয়তির সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করেছিলাম আমরা। .. আর আজ মধ্যরাতের ঘণ্টা যখন বেজে উঠবে, যখন পৃথিবী থাকবে সুষুপ্তিতে, ভারত তখন জেগে উঠবে এক নতুন জীবন, নতুন স্বাধীনতার আবাহনে।’

ওদিকে তখন বইতে শুরু করেছে বক্তবন্যা… : সুরক্ষিত দিল্লি নগরীর বাইরে ওদিকে ততক্ষণে শুরু হয়েছে ভয়াবহ দাঙ্গা। ওই সন্ধ্যায়, লাহোরে ব্রিটিশ সেনার শেষ দলটি যখন রওনা হয়েছে রেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে, তাদের চোখে পড়ল রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ। প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখল, হোস পাইপ দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে স্টেশন মাস্টার। ওরা এখানে পৌঁছানোর কিছু আগে সেখানে ঘটে গেছে রোমহর্ষক ঘটনা। শহর থেকে পলায়নরত একদল হিন্দু অপেক্ষা করছিল স্টেশনে ট্রেন ধরবে বলে। আচমকা চারদিক থেকে ঘিরে একদল মুসলিম ঝাঁপিয়ে পড়ে কচুকাটা করেছে তাদের প্রত্যেককে। সৈন্যদের নিয়ে বম্বে এক্সপ্রেস যখন রওনা হয়েছে, তখন জানালা দিয়ে চোখে পড়ল দাউ দাউ জ্বলছে পাঞ্জাব, পুড়ে ছাই গ্রামের পর পর গ্রাম।

সিরিল র‌্যাডক্লিফ : বিভেদের রেখাচিত্র আঁকা হলো যার হাতে

partition 87আজ থেকে ৭০ বছর আগে অভিজাত শ্রেণির এক ব্রিটিশ আইনজীবী ডেকে তার হাতে দায়িত্ব দেয়া হলো ভারত-পাকিস্তানের সীমানারেখা টানার জন্য। ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম হাজার বছর সহাবস্থান আর সম্প্রীতির মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে পাঞ্জাব আর বাংলার বুক চিরে নতুন সীমারেখা আঁকলেন তিনি। ৪০ কোটি ভারতবাসীর ভবিষ্যৎ আঁকা হয়ে গেল ওই দণ্ডে। ব্রিটিশ রাজের পক্ষ থেকে তার ওপর অর্পিত এ দায়িত্ব সম্পন্ন করলেন মাত্র পাঁচ সপ্তাহের ভেতর। যে বিষাদকাণ্ডের জন্ম তিনি দিয়ে গেলেন ওই বিভেদরেখার মাধ্যমে তার বিষবাষ্পে আজো নিত্য পুড়ে চলেছে উপমহাদেশের প্রায় দুইশ কোটি লোক। ব্রিটেনে নন্দিত আর ভারতে নিন্দিত এ লোকটির নাম সিরিল র‌্যাডক্লিফ।

১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট জন্ম নিল হিন্দুপ্রধান ভারত এবং মুসলিমপ্রধান পাকিস্তান। ভারতের উত্তর-পশ্চিমে পাঞ্জাব আর উত্তর-পূর্বে বাংলা, প্রায় সমসংখ্যক হিন্দু-মুসলিমের বসবাস ছিল এ দুটি প্রদেশে। র‌্যাডক্লিফের কাজটি মূলত ছিল এ দুটি প্রদেশের মধ্য দিয়ে ব্যবচ্ছেদ রেখা অঙ্কন। এ কাজের জন্য তাকে নির্ভর করতে হচ্ছিল পুরনো মলিন হয়ে যাওয়া মানচিত্র, জনসংখ্যা বিষয়ক অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য তথ্য এবং কড়াকড়ি বেঁধে দেয়া সময়ের ওপর।

শত শত বছর পাশাপাশি বসবাস করে আসা দুই প্রতিবেশীর মধ্যে রাতারাতি এ জাতীয় বিভাজন রেখা টানা অসম্ভব। অথচ সেটাই করলেন র‌্যাডক্লিফ। হাতে সময় নেই, বুঝতে পারছেন। স্বাধীনতা পাওয়ার দুই দিন পর তার সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলো। মধ্যরাতে স্বাধীনতা প্রাপ্তির আনন্দে উৎসবে মাতল কোটি কোটি লোক, অথচ তখনো তারা জানেই না, কোন দেশের নাগরিকত্ব ইতোমধ্যে জুটেছে তাদের কপালে।

নতুন পরিচয়ে নতুন জীবন শুরুর লক্ষ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ লোক র‌্যাডক্লিফের টেনে দেয়া সীমান্তরেখা অতিক্রম করল। প্রায় ১০ লাখ লোক মারা গেল জাতিগত দাঙ্গায়। একদিকে হিন্দু আর শিখ, অন্যদিকে মুসলমান। নিজের কাজের পরিণতি দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন র‌্যাডক্লিফ। কাজের মজুরি হিসেবে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ৩ হাজার পাউন্ড নিতে রাজি হননি তিনি। ভারত ছাড়ার আগে নিজের সব কাগজপত্র দলিল-দস্তাবেজ পুড়িয়ে দিলেন। দেশে ফেলার পর তাকে ‘নাইট গ্র্যান্ড ক্রস অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ পদকে ভূষিত করে ব্রিটিশ রাজ। তবে পাঞ্জাবি আর বাঙালিরা যে তাকে কোন চোখে দেখবে, তা নিয়ে কখনোই কোনো সংশয় ছিল না তার মনে। ‘প্রায় ৮ কোটি লোক চিরকাল ক্ষুব্ধ হয়ে থাকবে আমার নামের ওপর। আমি চাই না তারা কোনোদিন খুঁজে পাক আমাকে’- বলেছিলেন একবার। এ কারণেই হয়তো বাকি জীবনে আর কখনো ভারত কিংবা পাকিস্তানে পা রাখেননি তিনি।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: