স্টালিনের করুণ পরিণতি !

josef stalin 11সাইফ ইমন :রুশ সমাজতন্ত্রী রাজনীতিবিদ জোসেফ স্টালিন। সাধারণ দরিদ্র মুচি পরিবারের সন্তান ছিলেন। ১৬ বছর বয়সে জর্জিয়ান অর্থাডক্স বৃত্তি পান। স্কুল ছাড়ার পর বিপ্লবী লেনিনের লেখা পড়ে মার্কসবাদী বিপ্লবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্টালিন। শুরুতে সমাজতান্ত্রিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সচিব হিসেবে স্টালিনের ক্ষমতা সীমিত ছিল। ধীরে ধীরে স্টালিন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নেন এবং পার্টির নেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের কারণে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। সমালোচিত এই শাসককে অনেকে বলেছেন,‘লৌহমানবখ্যাত নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক’। নিজের গুণকীর্তন করে বদলে দিতে চেয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস। তবে ইতিহাস তাকে ক্ষমা করেনি। ইস্পাত-কঠিন মনের এই মানুষটির করুণ মৃত্যু হয়েছিল।

জোসেফ স্টালিন একজন রুশ সমাজতন্ত্রী রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯২২ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে ওই সময়ে স্টালিনের নেতৃত্বে প্রচলিত রাজনৈতিক মতবাদ ‘স্টালিনবাদ’ নামে পরিচিত। এ মতবাদ গোটা বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয়। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে স্টালিনবাদ। শুরুতে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সচিব হিসেবে স্টালিনের ক্ষমতা সীমিত ছিল। ধীরে ধীরে স্টালিন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নেন এবং পার্টির নেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের কারণে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। ১৯৩০-এর দশকে স্টালিন নিজের ক্ষমতা শক্ত করার জন্য জনসাধারণের ওপর নিপীড়ন শুরু করেন। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায় এই নেতা প্রায় ১৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। শুধু ১৯৩২ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ মানুষ মারা যায় সরকারি বাহিনীর অত্যাচারে।

josef stalin 12ছদ্মনামে

লৌহমানবখ্যাত নিষ্ঠুর শাসক জোসেফ স্টালিন। ১৮৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বরে তার জন্ম। তিনি একজন সাধারণ দরিদ্র মুচি পরিবারের সন্তান ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ডানপিটে। স্টালিনের আসল নাম ‘জোসেফ বেসারিওনি জুগাসভিলি’। ‘স্টালিন’ ছিল তার ছদ্মনাম। এর আগে তাকে ‘কোবা’ এবং ‘সোসেলো’ নামেও ডাকা হতো। ১০ বছর বয়সে মিশন চার্চ স্কুল দিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন তিনি। তখন স্কুলে জর্জিয়ান শিশুদের রুশ ভাষা শিখতে বাধ্য করা হতো। কৈশোরের শুরুতেই মারাত্মক আঘাত আসে স্টালিনের জীবনে। মাত্র ১২ বছর বয়সে গাড়ি দুর্ঘটনায় স্টালিনের বাম হাতটি চিরদিনের জন্য অচল হয়ে যায়। একসময় স্টালিনের অত্যাচারী বাবা তার স্কুলে যওয়া বন্ধ করে তাকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্টালিনের মা তাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্টালিন ১৬ বছর বয়সে জর্জিয়ান অর্থাডক্স বৃত্তি পান। কিন্তু সেখানে তিনি সাম্রাজ্যবাদ ও ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধাচরণ করেন। ১৮৯৯ সালে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকায় তিনি বহিষ্কার হন। তবে সোভিয়েত নথি থেকে জানা যায়, তৎকালীন নিষিদ্ধ বই পড়ার দায়ে এবং গণতান্ত্রিক পাঠচক্র গড়ে তোলায় তাকে বহিষ্কার করা হয়। স্কুল ছাড়ার পর বিপ্লবী লেনিনের লেখা পড়ে মার্কসবাদী বিপ্লবী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্টালিন।

রাজনৈতিক উত্থান

১৯০৩ সালে লেনিনের বলশেভিকে যোগ দেন স্টালিন। কিছুকাল পরেই তার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য জারের সিক্রেট পুলিশের নজরে পড়েন। এরপর গড়ে তোলেন গুপ্ত প্রতিরোধ। বলশেভিক থেকে তাকে ককেশাস অঞ্চলের বিপ্লবী প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেখানেই তিনি গড়ে তোলেন গুপ্ত আধা-সামরিক বাহিনী। তার নেতৃত্বে গুপ্তহত্যা, ব্যাংক ডাকাতিসহ নানা ঘটনা ঘটে। ১৯০৭ সালে ‘তিফিলস’ ব্যাংক ডাকাতির জন্য চরমভাবে নিন্দিত হন তিনি। এতে স্টালিনের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপ্লবের সময় তিনি বহুবার ধরা পড়েছিলেন। এমনকি সাইবেরিয়াতে নির্বাসিত জীবন যাপন করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি কোনো না কোনোভাবে পালিয়ে আসতে সমর্থ হন। শেষবার যখন তিনি আটক হন তখন তাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাধ্যতামূলক রুশীয় সেনা দলে যোগদানের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তার অচল বাম হাতের জন্য সেই যুুদ্ধে যেতে হয়নি। ১৯১৮-১৯২২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার সিভিল ওয়ারের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের আধা সামরিক সংগঠনকে বলা হতো রেড আর্মি যা ১৯৩০ সালে বিশ্বের বৃহৎ সেনাবাহিনীর স্বীকৃতি পায়। ১৯২১ সালের রেড আর্মি দ্বারা জর্জিয়া আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন স্টালিন। ওই সফলতায় লেনিনের সঙ্গে স্টালিনের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। পরবর্তীতে পার্টির প্রতি আনুগত্য, দৃঢ় প্রত্যয়ী স্টালিনকে পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

১৯২২ সালে লেনিনের প্রথম স্ট্রোকের পর স্টালিন পার্টির প্রায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি লেনিনকে বাইরের পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এতে পার্টির অন্য বড় নেতারা বিরাগভাজন হন। লেনিনও ধীরে ধীরে স্টালিনের স্বেচ্ছাচারিতা, অসুলভ আচরণ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়েন। পরিশেষে পার্টির সর্বোচ্চ পদ থেকে সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেন। কিন্তু ধূর্ত স্টালিনের কূটচালে তা আর কখনো সম্ভব হয়নি। জনসম্মুখে লেনিনের শেষ ইচ্ছাপত্র সম্পূর্ণরূপে আর কখনো প্রকাশ হতে দেননি স্টালিন। উল্টোদিকে স্টালিন হয়ে ওঠেন চরম প্রভাবশালী নেতা। তার বিরুদ্ধাচরণ করলেই নেতাদের বহিষ্কার করেন। ট্রটেস্কির মতো নেতাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। সেই থেকে স্টালিনের দাম্ভিকতা শুরু। শুরু হয় চরম স্বেচ্ছাচারিতা আর নৃশংসতা। চলে ক্ষমতার শেষ দিন পর্যন্ত। তার তৈরি রুশ সিক্রেট পুলিশ ১৯৫৪ সালে কেজিবি বা কমিতেত গসুদারস্তবিন্নি বেজাপাদনোস্তি জন্ম নেয়। স্টালিন লেনিনের পাশাপাশি নিজের একটা ভিন্নধর্মী ইমেজ তৈরি করতে সচেষ্ট হন। তিনি নিজের নামে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক শহর ও গ্রামের নামকরণ করেন। স্টালিন শান্তি পুরস্কার নামে একটি পুরস্কারের প্রবর্তন করেন। স্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়নে কেন্দ্রীয় অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রচলন করেন। তদানিন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় সবটুকুই অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ছিল।

স্টালিন দ্রুত শিল্পায়ন ও কৃষিকার্যের কেন্দ্রীয়করণের মাধ্যমে পুরো দেশটি অল্প সময়ের মধ্যে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করেন। কিন্তু একই সময়ে অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের দরুন কোটি কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যান। স্টালিনের শাসনকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয় এবং নািস জার্মানির পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্টালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের দুই পরাশক্তির একটিতে পরিণত হয়, যা ৪০ বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্টালিন জাতীয় সংগীতে নিজের নাম ঢুকিয়ে দেন। নিজেকে মহৎ রূপে মানুষের হৃদয়ে প্রথিত করার জন্য সে সময়ের কবিতা, সাহিত্য, নাটক, সিনেমায় তাকে ভক্তি ভরে উপস্থাপন ও তার কর্মকাণ্ড মহান করে ফলাও করে প্রচার করতে বাধ্য করেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, স্টালিন ১৯৪৮ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন!

স্টালিন নতুন করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস লিখতে বাধ্য করেন যা ১৯১৭ বিপ্লব থেকে শুরু করে পরবর্তীকাল পর্যন্ত তাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। স্টালিনের মতে ‘ভাষা’ সামাজিক ভিত্তির কোনো অবকাঠামো নয়। সমাজের ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক, দার্শনিক, আইনগত, ধর্মীয়, শিল্পসাংস্কৃতিক বিভিন্ন মত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহ সেই অর্থনৈতিক কাঠামোর অবকাঠামো।

স্টালিনের ভয়াবহতা

স্টালিন কেজিবির মাধ্যমে মেক্সিকোতে অবস্থানরত সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিভা ও লেনিনের ঘনিষ্ঠ সহচর লিওন ট্রটেস্কিকে হত্যা করেন। ট্রটেস্কি ছিলেন রুশ বিপ্লবের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং লেনিনের শিষ্য। রেড আর্মি গঠনেও ট্রটেস্কি প্রশংসিত ভুমিকা রেখেছিলেন। ১৯২০ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হলে স্টালিনের সঙ্গে ট্রটেস্কির বিরোধ শুরু হয়েছিল। ১৯৩০-এর দশকে স্টালিন নিজের ক্ষমতা শক্ত করার জন্য নিপীড়ন শুরু করেন। যার ফলে কমিউনিস্ট পার্টির শত্রু সন্দেহে লাখো মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়।

আবার সাইবেরিয়া ও কেন্দ্রীয় এশিয়ার নির্যাতন কেন্দ্রে নির্বাসিত করা হয় অনেক মানুষকে। রাশিয়ার অনেক জাতিগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি থেকে উত্খাত করে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়। স্টালিনের কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এই অত্যাচার নিপীড়নে পরিবারের কেউ তাকে সমর্থন করত না। স্টালিনের শাসনামলে চার্চের ওপর দুর্যোগ নেমে আসে। ১৯১৭ সালে হিসাব মতে চার্চের সংখ্যা ছিল ৫৪ হাজার যা পরবর্তীতে মাত্র কয়েকশতে নেমে আসে। বহু চার্চ স্টালিনের নির্দেশে ধ্বংস করা হয় বলে মনে করেন ইতিহাস গবেষকরা। রোমান ক্যাথলিক চার্চ ব্যালস্টি, ইসলাম ও বৌদ্ধ ধর্মসহ অন্যান্য ধর্ম নিগৃহীত হয়। হাজার হাজার চার্চ, ইহুদি, গির্জা, মসজিদ, মন্দির হাজারো বৌদ্ধবিহার মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার পুরোহিত, যাজকদের হত্যা এবং আটক করা হয়। তার সময়ে অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সাইবেরিয়া, মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলে বহু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর গতানুগতিক জীবন ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়। এ ছাড়া কথিত জাতীয়তাবাদী উত্থান দমন অভিযান চালায় স্টালিন। যার ফলে সোভিয়েত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ উদ্বাস্তু হয়ে নানা দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্নতাবাদ, সোভিয়েত শাসনের বিরোধিতা এবং জার্মানদের সঙ্গে সহযোগিতা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে জড়িত হিসেবে নির্বাসনে পাঠানো হয় সেসব জাতিগোষ্ঠীকে। জাতীয় পরিচয় নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক লোককে সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। স্টালিনের শাসনামলে কত লাখ লোকের মৃত্যু ঘটেছে তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। ১৯২৬-৩৭ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

russia famine 1931-34১৯৩১ থেকে ১৯৩৪ সালের দুর্ভিক্ষে অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ১৯২৬ সালের আদমশুমারি তথ্য বলছে সোভিয়েত ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৭০ লাখ যা ১৯৩৭ সালের আদমশুমারিতে লোকসংখ্যা হয় আগের লোকসংখ্যার চেয়ে ১ কোটি ৪০ লাখ বেশি। এ আদমশুমারিকে চৌর্যবৃত্তির শুমারি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। গণনাকারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে আবার আদমশুমারি করা হয়। অনেকেই বলেন, স্টালিনের সরাসরি হস্তক্ষেপে এ আদমশুমারির লোকসংখ্যা ১৭ কোটি বলে অপপ্রচার করা হয়। বিশাল অঙ্কের মানুষের মৃত্যুতে জনসংখ্যা হ্রাস পায়। যার ফলে সত্যতা ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

হিটলার বনাম স্টালিন

josef stalin 14মানুষ হত্যা করে অথবা ভয় দেখিয়ে নিজের ক্ষমতার আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে হিটলার, স্টালিন দুজনেই ছিলেন পারদর্শী। দুজনকেই নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে পৃথিবীর মানুষ জানে। দুজনের বাল্যকাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কিছু মিল রয়েছে দুজনের মধ্যে। স্টালিন এবং হিটলারের বাল্যকালে কিছু অদ্ভুত মিল রয়েছে। দুজনেই অত্যাচারী মদ্যপ পিতার সন্তান।

মায়েরাই অনেক কষ্টে মানুষ করেছেন এবং জীবনের প্রথম থেকে দুজনই ব্যক্তিগত জীবনে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন। স্টালিনের মদ্যপ পিতা বেসেরিয়ান তাকে ১২ বছর বয়সে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে জুতার ফ্যাক্টরিতে কাজে দিয়েছিলেন। স্টালিনের মা কিটোভেন স্টালিনকে আবার স্কুলে ভর্তি করান। এই ঘটনায় স্টালিনের বাবা তার মাকে চিরতরে ত্যাগ করেন। অথচ স্টালিন ১৯৩৩ সালে মার মৃত্যুর পরও মাকে দেখতে যাননি। একবারের জন্যও তার মনে আসেনি তার শিক্ষার পেছনে তার মা কিটোভেনের আত্মত্যাগের কথা।

হিটলারের পিতা আলিয়জ হিটলার স্টালিনের বাবার মতো সমান অত্যাচারী ছিলেন। স্টালিন তবুও স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিলেন। তবে হিটলার হাইস্কুল পাসই করতে পারেননি। স্টালিনের মতো হিটলারের বাবাও চাইতেন ছেলে কাজে যোগ দিক। হিটলার বাবার হাতে প্রচণ্ড মার খেতেন। এক কথায় ছোটবেলা থেকে ফ্যামিলি ভায়োলেন্সের মধ্যেই বড় হয় এই দুই নিষ্ঠুর শাসক। হিটলারকে অনেকটা গণতান্ত্রিক পথেই হাঁটতে হয়েছে। কিন্তু স্টালিনকে রীতিমতো বিপ্লবী আন্দোলন করে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়েছিল। স্টালিন ছিলেন জর্জিয়ান আর হিটলার ছিলেন অস্ট্রিয়ান। দুজনই পৃথিবীর ইতিহাসে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে সমালোচিত হয়েছেন।

করুণ পরিণতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হঠাৎ করেই শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয় জোসেফ স্টালিনের । অতিরিক্ত ধূমপানের জন্য ‘অথেরোসেক্লরোসিস’ রোগে আক্রান্ত হন! ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজে তিনি মস্তিষ্ক প্রদাহে আক্রান্ত হন। ১৯৫৩ সালের পয়লা মার্চে রাতে এক রেস্ট হাউসে ঘুমোতে গেলে তার ম্যাসিভ ব্রেইন স্ট্রোক হয়। তার দেহরক্ষী ও পাহারাদাররা ভেবেছিল রাত জাগরণের কারণে তিনি দীর্ঘক্ষণ ঘুমাচ্ছেন। আর তাকে ঘুমের মধ্যে ডাকাও নিষেধ ছিল কঠোরভাবে। তাই কেউ সাহস পায়নি স্টালিনের খোঁজ নেওয়ার বা তার শোবার ঘরে প্রবেশ করার। অনেক পরে সাহস করে এগিয়ে আসেন রেস্ট হাউসের এক কমান্ডার। রাত তখন ১০টা শয়ন কক্ষের দরজা খোলার পর দৃশ্যটা সত্যিই আতঙ্কিত করার মতো ছিল। কমান্ডারের চিৎকারে সবাই প্রবেশ করেন স্টালিনের শয়ন কক্ষে। দেখা যায় লৌহমানব স্টালিন তার নিজের মুত্র গায়ে মেখে মেঝেতে জবুথবু হয়ে পড়ে আছেন। কিন্তু তিনি তখনো বেঁচে ছিলেন। জোসেফ স্টালিনের শরীর পরিষ্কার করে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়। ২ মার্চ সকালে ডাক্তার এসে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ৫ মার্চ ১৯৫৩ সালে ৭৪ বছর বয়সে স্টালিন মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে ১৯৪৫ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে পয়লা মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিয়া, ভাবী প্রধানমন্ত্রী জর্জি মালেকভ ও নিকিতার সঙ্গে সারা রাত আড্ডা ও মুভি দেখেছিলেন জোসেফ স্টালিন। আড্ডা শেষে মস্কো সেন্টার থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে তার কুন্তোসভো রেস্ট হাউসে ঘুমাতে যান। তারপরই ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এক করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে জীবনাবসান ঘটে এই স্বৈরশাসকের।

প্রেমিক স্টালিন

josef stalin 13স্টালিনের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ দেখলে মনে হওয়ার কথা নয় এই মানুষটার মনেও দয়ামায়া কিংবা প্রেম বলতে কিছু একটা থাকতে পারে। অসীম ক্ষমতাশালী এই মানুষটির জীবনে যুদ্ধবিগ্রহ ছাপিয়ে প্রেমও এসেছিল। বলা হয়ে থাকে স্টালিন যখন ৩০ বছরের তরুণ তখন ১৩ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে তার প্রেম হয়েছিল। অবশ্য অনেকে দাবি করেন মেয়েটিকে স্টালিন ধর্ষণ করেছিল। লিডিয়া নামের এই মেয়েটিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত এই গল্পকে স্টালিন বিরোধীদের প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও স্টালিনের ব্যক্তিগত জীবন পর্যলোচনা করলে প্রেমের অনেক চিহ্ন নজরে আসবে। ব্যক্তি জীবনে স্টালিন দুটি বিয়ে করেন। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন ক্যাটরিনা ভ্যানিজ এবং আর দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যাডিজডা অ্যালিয়েভা। এর মধ্যে ক্যাটরিনার সঙ্গে মাত্র এক বছরের দাম্পত্যজীবন হলেও দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে মোটামুটি এক যুগ সংসার করেন স্টালিন। যার ঘরে তার প্রথম সন্তান ‘ইয়াকভ’ এর জন্ম হয়। কিন্তু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অল্প সময়েই মারা যায় ইয়াকভ। পরবর্তীতে এক মেয়ে এবং তিন ছেলের জন্ম দেন এই দম্পতি।

শৌখিন স্টালিন

josef stalin 15স্টালিন মদ খেতেন প্রচুর কিন্তু কখনোই মাতাল হতেন না। তার রাশিয়ান ভদকার থেকে জর্জিয়ান ওয়াইন অনেক প্রিয় ছিল। তবে রাশিয়ান ঐতিহ্যবাহী খাবার তিনি বেশ পছন্দ করতেন। তার প্রিয় ছবির ক্যাটাগরিতে ছিল আমেরিকান ‘ওয়েস্টার্ন ফিল্ম’। ছুটির অবসরে তিনি তার উচ্চ পদমর্যাদার রাজনৈতিক সহচরদের নিয়ে ‘ক্রেমলিন মুভি থিয়েটারে’ সিনেমা দেখতে যেতেন। স্টালিনের প্রিয় মুভির তালিকায় ছিল ‘চার্লি চ্যাপলিন’। তবে তিনি কখনোই চলচ্চিত্রে নগ্নতাকে পছন্দ করতেন না। স্টালিনের বিশ হাজার বইয়ে ঠাসা একখানা ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। দিনে সর্বোচ্চ ৫০০ পৃষ্ঠা অবধি পড়তেন বলে জানা যায়।

সর্বকালের সেরা ধনীর তালিকায় তার নাম

জোসেফ স্টালিন সর্বকালের সেরা ধনীর তালিকায় প্রথম সারিতেই অবস্থান করছেন। তার যে পরিমাণ সম্পদ ছিল যা দিয়ে তিনি বৈশ্বিক জিডিপির ৯.৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। বার্মিংহামের আলাবামা ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক জর্জ’ও লিবার বলেন, কোনো রকম চেক বা নগদ অর্থ ছাড়াই স্টালিন এই পৃথিবীর ছয় ভাগের একভাগ ভূমি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি পুরো দেশের সব সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতেন।

জোসেফ স্টালিন ছিলেন এমন একজন স্বৈরশাসক যার ছিল প্রবল ক্ষমতা। সেই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলকেও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। অবশ্য স্টালিনের সম্পদ আর গোটা সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পদকে দৃশ্যত আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। পরিসংখান অনুযায়ী স্টালিনের মৃত্যুর তিন বছর আগে অর্থাৎ ১৯৫০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির ৯.৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত সোভিয়েত ইউনিয়ন। ২০১৪ সালের হিসাবে এই সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। যার নিয়ন্ত্রণ ছিল জোসেফ স্টালিনের হাতে। যদিও এসব অর্থ সরাসরি স্টালিনের ছিল না তবে যে কোনো সময় তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থ ব্যবহার করতে পারতেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে তার সর্বময় ক্ষমতাবলে তিনি যা ইচ্ছা তাই পেতে পারতেন।

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: