প্রথম পাতা > অপরাধ, আন্তর্জাতিক, ইসলাম, ধর্মীয়, রাজনীতি > সিরিয়ায় মানবতাবিরোধী যুদ্ধ চলছে !

সিরিয়ায় মানবতাবিরোধী যুদ্ধ চলছে !

Raqqa

বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য :ইরাকের মসুলের পর এবার সিরিয়ায় ইউফ্রেটিস নদীর তীরের রাক্কা শহর। রাক্কা হলো আইএসের সিরিয়ার রাজধানী। রাক্কাকে আইএসমুক্ত করার যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘স্বেচ্ছায়’ নিয়োজিত। যে আইএসকে একসময় অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে লাগাতার সাহায্য করেছে আমেরিকা, আজ তাদের বিনাশযজ্ঞেই সারি সারি মার্কিন বোমারু বিমান, নৌ যুদ্ধজাহাজ একটানা অক্লান্তভাবে আগুনের গোলা ছুড়ে চলেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাক্কা ও এর সন্নিহিত অঞ্চলের সাধারণ নিরীহ মানুষ।

রাক্কায় যুদ্ধরত মার্কিন কমান্ডার গর্বিত এই ভেবে যে আইএসকে হারিয়ে তাঁরা ‘ইতিহাসের একটি মহৎ অধ্যায়’ লিখছেন। কিন্তু সিরিয়ার সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের রিপোর্ট ও ফটো থেকে দেখা যাচ্ছে যে এই লাগাতার বোমাবর্ষণে আইএসের তেমন কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, চূড়ান্ত ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষেরই। ফলে এটাই বোঝা যাচ্ছে না যে আমেরিকা ঠিক কাদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে নেমেছে!

সিরিয়ার মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে শেষ দুই মাসে আমেরিকার ছোড়া বোমার আঘাতে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়েছে মোট ১২টি স্কুল, দুটি হাসপাতাল, একটি বিজ্ঞান কলেজ, দুটি পোস্ট অফিস, ১৫টি মসজিদ, গ্যাস স্টেশন, পানির ট্যাংক, ১৫টি ব্রিজ ও অসংখ্য নাগরিক মহল্লা। তালিকা দেখেই বোঝা যাচ্ছে মার্কিন ধ্বংসলীলা কতটা ভয়ংকর ও আগ্রাসী। আমেরিকা আসলে আইএসের বিরুদ্ধে নয়, সিরিয়ায় মানবতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধে নেমেছে, যেটা ওরা বরাবরই করে থাকে। রাষ্ট্রসংঘের সিরিয়াসংক্রান্ত মানবাধিকার কমিটির একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকে চলে আসা এই সিরিয়া সংকটে সবচেয়ে বেশি সাধারণ অসামরিক মানুষ মারা গেছে শেষ দু-তিন মাসেই।

সিরীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ড. ফাদেল আবদুল ঘনি আমেরিকার এই একটানা আক্রমণ সম্পর্কে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন,‘আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি যে আমেরিকা খুব দ্রুত জয়ের লক্ষ্যে মানবাধিকারের কোনো তোয়াক্কাই করছে না। সাধারণ মানুষকে বাঁচানোর কোনো প্রয়াসই নেই তাদের। কোনো রকম সতর্কীকরণ ছাড়াই লাগাতার বোমাবর্ষণ চলছে। এটা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে।’

আসলে আমেরিকার কাছে আইএস সন্ত্রাসী এবং সাধারণ নিরীহ মানুষ—দুই শ্রেণির মধ্যে কোনো তফাত নেই। রাক্কায় প্রতিদিন কমপক্ষে এক ডজন বোমা হামলার ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁদের প্রতি মুহূর্তেই অনিশ্চয়তা। এই বুঝি মাথার ওপর থেকে আগুনের গোলা পড়ল।

রাক্কায় আসলে সাধারণ মানুষ দুই দিক থেকেই মৃত্যুর জাঁতাকলে আটকে পড়েছেন। একদিকে আইএসের সন্ত্রাসীরা তাঁদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে, রাক্কা শহরের বাইরে চারপাশে ল্যান্ড মাইন পুঁতে রেখেছে, আরেক দিকে আকাশের ওপর থেকে একটানা মার্কিন বোমারু বিমান হামলা চালাচ্ছে। এর মধ্যেও জুন মাসে প্রায় ২০০ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে চুপিসারে ইউফ্রেটিস নদীর উত্তর তীরে জড়ো হয়ে নৌকার ব্যবস্থা করে এলাকা ছেড়ে পালাতে যাচ্ছিলেন। মার্কিন বোমারু বিমান ওপর থেকে চক্কর কেটে প্রায় ৩৫ বার বোমা ফেলে সব কিছু ধ্বংস করে দেয়। ওই ২০০ মানুষের সলিল সমাধি ঘটে। ইউফ্রেটিসের জল রক্তে লাল হয়। এই বর্বরোচিত ঘৃণ্য কাজের পরও নিউ ইয়র্ক টাইমসে নির্লজ্জ মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল গর্বের সঙ্গে বলেছেন,‘আমরা সেদিন যে কয়টি নৌকা দেখতে পেয়েছিলাম তার প্রতিটিই ধ্বংস করে দিয়েছি।

রাক্কা শহর শেষ তিন বছর ধরে আইএসের কবজায়। সেখানে এমনিতেই মানবাধিকারের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আইএস কবজায় যখন-তখন ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে দেওয়া হয়েছে বহু নিরীহ নাগরিকের। নারীদের ওপর চলেছে চরম পৈশাচিক নির্যাতন। আর বর্তমানে আমেরিকার হামলার পরে আইএসের নির্যাতন আরো বেড়েছে। ফলে এমনিতেই জেলজীবন চলছে রাক্কার মানুষদের আর তার সঙ্গে জুটেছে যখন-তখন পুরো পরিবারসহ বোমার আঘাতে প্রাণহানিরও আশঙ্কা। আবার শুধু বোমাই নয়, সাদা ফসফরাসের ধোঁয়াও রাক্কায় ব্যবহার করছে আমেরিকা। জুন মাসের ৮ ও ৯ তারিখ রাক্কার প্রধান বাণিজ্যিক অঞ্চলে এই ফসফরাস হামলা চালায় আমেরিকা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই নিয়ে চূড়ান্ত সতর্কবার্তাও দিয়েছে আমেরিকাকে।

শেষ দুই মাসে আমেরিকা মোট চার হাজার ৪০০ বোমা রাক্কা ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে ফেলেছে। কাতারের মার্কিন সেনাঘাঁটি থেকে বি-৫২ বোমারু বিমান একটানা এ কাজ করে চলেছে। এছাড়া ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন মার্কিন নৌ জাহাজ থেকেও বিমান উড়ে এসে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প আসার পরই সিরিয়া ও ইরাকে মার্কিন বোমারু বিমান হামলার পরিমাণ এক ধাক্কায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। মার্কিন সেনা জেনারেল ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই হামলা চলতি মাসে আরো বৃদ্ধি পাবে। রাক্কায় এ মুহূর্তে আইএসের অত্যাচার ও মার্কিন বিমান হামলার জোড়া সংকট নিয়ে বাস করছেন ১০ হাজারের বেশি অসামরিক মানুষ। শেষ অবধি এদের ১০ শতাংশও বাঁচবে কি না সন্দেহ। আসলে এই ধরনের ব্রাশফায়ার ও বম্বিং আইএসকে ধ্বংস করার বদলে সিরিয়ার পরিকাঠামো ধ্বংস ও নিরীহ মানুষগুলোকে শেষ করতেই ব্যস্ত।

লেখক :পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতিবিদ

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: