প্রথম পাতা > বিজ্ঞান > ওয়ার্মহোল ও মহাকাশ ভ্রমণ

ওয়ার্মহোল ও মহাকাশ ভ্রমণ

worm-holeআফরিন জাহান :ওয়ার্মহোল হলো তত্ত্বীয়ভাবে পাওয়া এমন একটি সংক্ষিপ্ত গমনপথ যা স্থান-কালের ভেতর দিয়ে মহাবিশ্বের এক স্থান থেকে দীর্ঘ দূরত্বে অন্য স্থানে ভ্রমণ অনুমোদন করে। কিন্তু মানুষের জন্য এই ভ্রমণ কাজটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে, কারণ উচ্চমাত্রার বিকিরণ এবং বাইরের পদার্থের সঙ্গে বিপজ্জনক সংযোগের দরুন এসব ওয়ার্মহোল যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সমীকরণগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও নাথান রোজেন ১৯৩৫ সালে প্রস্তাব করেন, স্থান-কালের অভ্যন্তরে এক প্রকার সেতুর (নৎরফমবং) অস্তিত্ব রয়েছে। এ পথগুলোকেই বলা হয় আইনস্টাইন রোজেন সেতু অথবা ওয়ার্মহোল যা স্থান-কালের দুটি বিন্দুকে সংযুক্ত করে। তত্ত্বীয়ভাবে দীর্ঘ পথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই গমনপথগুলো ব্যবহার করে দূরত্ব এবং সময় দুটোই ব্যাপক হারে হ্রাস করা যায়।

ওয়ার্মহোলে লম্বা একটা গলার দুই প্রান্তে দুটি মুখ থাকে। এগুলো অনেকটা উপগোলাকার আর গলাটি সোজাসুজি বিস্তৃত কিন্তু ভেতরে একটু মোচড়ানোও হতে পারে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব গাণিতিকভাবে ওয়ার্মহোলের অস্তিত্বের ভবিষ্যদ্বাণী করে যেখানে ওয়ার্মহোলের দুই মুখে দুটি বস্ন্যাকহোল থাকবে। যা হোক, একটি মৃত্যুকালীন নক্ষত্র চুপসে গিয়ে বস্ন্যাকহোলে পরিণত হওয়ার সময় নিজে থেকে কোনো ওয়ার্মহোল সৃষ্টি করতে পারে না।

ওয়ার্মহোল শুধু মহাবিশ্বের দুটি পৃথক অঞ্চলকেই সংযুক্ত করে না বরং দুটি মহাবিশ্বকেও সংযুক্ত করতে পারে। কয়েকজন বিজ্ঞানী অনুমান করেছেন, যদি ওয়ার্মহোলের কোনো মুখ একটি নির্দিষ্ট উপায়ে গতিশীল হয় তবে এর দ্বারা সময় পরিভ্রমণ সম্ভব। তবে ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং এমনটি সম্ভব নয় বলে যুক্তি দেখিয়েছেন। ওয়ার্মহোল তত্ত্বটি এখনো একটি তত্ত্বীয় প্রকল্প। আজ পর্যন্ত কেউ এর অস্তিত্ব পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।

বিজ্ঞানীরা মৌলিক পদার্থগুলোর জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসেছেন । এককালে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়া বাকি সব মৌলিক পদার্থ তৈরি হয়েছে নক্ষত্রগুলোর মধ্যেই। সুপারনোভা বিস্ফোরণের উদাহরণ টেনেছেন তারা। এ বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রের ভেতর সৃষ্টি হয় অকল্পনীয় মাত্রায় তাপ ও চাপ। এ বিরাট চাপ ও তাপশক্তির কারণে সেখানে অনবরত নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া সংঘটিত হচ্ছে। ফিউশন প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রের ভেতরে মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসগুলো পরস্পরের যুক্ত হয়ে তৈরি হয় নতুন নতুন মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াস। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে নিউক্লিওসিনথেসিস। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি লাল দৈত্যের ভেতরেও নিউক্লিওসিনথেসিস লক্ষ্য করেছেন।

মাঝেমধ্যে লাল দৈত্যের গভীরতম অঞ্চল থেকে নির্গত হয় গ্যাস। সেই গ্যাসে কার্বন এবং নানা রকম উদ্ভট ধরনের মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এদের মধ্যে কিছু কিছু নিউক্লিয়াস একেবারে বিরল মৌলের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় টেকনেসিয়াম। এ মৌলটির কোনো স্থিতিশীল অতেজস্ক্রিয় আইসোটোপ নেই। এর তেজস্ক্রিয়তার অর্ধায়ু মোটামুটি ২০ লাখ বছর। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, যেসব লাল দৈত্যে এ টেকনেসিয়ামের দেখা মিলেছে তাদের বয়স হাজার কোটি বছরের মতো। সুতরাং বলা যায়, ওইসব নক্ষত্রের যখন জন্ম হয়, তখন সেগুলোয় টেকনেসিয়ামের অস্তিত্ব ছিল না। টেকনেসিয়ামের জন্ম হয়েছিল অনেক পরে। তা না হয়ে যদি নক্ষত্রগুলোর জন্মের সময় এ মৌল সৃষ্টি হতো, তাহলে লাল দৈত্যের পৃষ্ঠের দিকে যেসব গ্যাস আছে তাতে টেকনেসিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া যেত! এ ধরনের ব্যাপার লক্ষ্য করেই বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, লাল দৈত্যের মৌলিক পদার্থ তৈরির ক্ষমতা আছে।

মহাবিশ্ব সৃষ্টির গোড়ার দিকে পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিল মহাজাগতিক মেঘ। হাইড্রোজেনের মেঘ। সেসব মেঘ মহাকর্ষ বলের আকর্ষণের প্রভাবে প্রথমে পুঞ্জীভূত এবং পরে ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করে। ফলে পুঞ্জীভূত হাইড্রোজেনের ঘনত্ব এবং তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। একসময় তাপমাত্রা এমন অবস্থায় আসে যখন এর প্রভাবে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলো পরস্পর যুক্ত হতে শুরু করে। এভাবে দুটো হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস যুক্ত হয়ে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। এভাবে হাইড্রোজেন পুঞ্জীভূত হয়ে তৈরি করে ফেলে বিরাট বিরাট সব নক্ষত্র। নিউক্লিয়ার ফিউশনের ফলে গ্যাস নিউক্লিয়াসগুলো যুক্ত হওয়ার সময় বিরাট পরিমাণ তাপশক্তি নির্গত হয়। এ কারণে হাইড্রোজেনের যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে হাইড্রোজেনের প্রজ্বলনও বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাজাগতিক গ্যাস সংকুচিত হয়ে আমাদের সূর্যের নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৩ কোটি বছর।

একটা নক্ষত্র কতকাল জ্বলবে, তা নির্ভর করে নক্ষত্রের ভেতরকার হাইড্রোজেনের মোট পরিমাণের ওপর। শুধু হাইড্রোজেনই নক্ষত্রের জন্মকালের সঙ্গী,তখন যে নক্ষত্রের ভেতর হাইড্রোজেন যত বেশি, তার ভরও তত বেশি। তাহলে এক কথায় হিসাবটা দাঁড়াচ্ছে,যে নক্ষত্রের ভরের ওপর নির্ভর করছে সে কতকাল জ্বলবে। সূর্যের কথাই ধরা যাক, এর বয়স ৪৫০ কোটি বছর। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা, সূর্যের জন্মকালে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন এর ভেতর পুঞ্জীভূত হয়েছিল, স্বাভাবিক প্রজ্বলনে তা নিঃশেষ হতে ১ হাজার কোটি বছর সময় লাগবে। বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখেছেন, কোনো নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের তিনগুণ হয়, তাহলে সেই নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের জ্বলন মাত্র ২ কোটি বছরেই ফুরিয়ে যাবে। কারণ ভর বেশি হলে মহাকর্ষীয় শক্তিও বেড়ে যায়। ফলে কেন্দ্রীয় অঞ্চলের হাইড্রোজেনের ওপর আরো বেশি মাত্রায় চাপ পড়ে। তাই হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসগুলো দ্রুত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়। সেই অনুপাতে তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পায় প্রচ-ভাবে। সে কারণে হাইড্রোজেনের জ্বলন চলে খুবই দ্রুততালে।

Advertisements
বিভাগ:বিজ্ঞান
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: