প্রথম পাতা > জীবনযাপন, তথ্যপ্রযুক্তি, সমাজ > ফেসবুক চর্চা নিয়ে কিছু প্রতিক্রিয়া

ফেসবুক চর্চা নিয়ে কিছু প্রতিক্রিয়া

facebook-3আবু তাহের খান : কথিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা এবং একে ঘিরে নানা ধরনের বিতর্ক—দুই-ই দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে জনপ্রিয়তার ক্রমবর্ধমানতা এতটাই তুঙ্গে যে দেশে রাতে ঘুমানো মানুষের সংখ্যা বেশি, নাকি ফেসবুকে কাটানো রাতজাগা মানুষের সংখ্যা বেশি—সে নিয়ে রীতিমতো বিতর্ক হতে পারে। সেই সূত্রে এটাও এখন বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে অবাধ সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টির সুবাদে ফেসবুক থেকে সমাজ যতটা উপকৃত হচ্ছে, এর হুজুগে অপব্যবহারের কারণে এ ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে কি না। আর এ ধরনের দ্বিবিধ বিতর্ক সামনে রেখে সাম্প্রতিক ঈদের ছুটিতে পাওয়া সময়ের সামান্য ফুরসতকে কাজে লাগিয়ে ফেসবুকে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে এর চরিত্র, বৈশিষ্ট্য, প্রবণতা, প্রভাব, প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয় যতটা সম্ভব নির্মোহভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি।

ফেসবুক নিঃসন্দেহে একটি ভালো যোগাযোগ মাধ্যম এবং এখানে মান-মানহীন নির্বিশেষে সব তথ্য ও মত অবাধে প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। অতএব, ধারণাগতভাবে এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক গণতান্ত্রিক চেতনার অনুগামী বিধায় এর বিস্তার অবশ্যই উৎসাহ দানযোগ্য। তা ছাড়া আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির উত্কর্ষপূর্ণ ব্যবহারেরও এটি একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। কিন্তু পাশাপাশি আবার এটাও মানতে হচ্ছে যে তথাকথিত এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় যতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে বা রাখতে পারছে, সে তুলনায় একদল মানুষকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে অনেক বেশি। ফেসবুকে অংশগ্রহণকারী মানুষদের কাছে ওই বলয়টিই তাদের পৃথিবী, তাদের সমাজ। বস্তুত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বলতে সেখানে প্রায় কিছুই নেই। বাস্তবের সমাজ মানুষের চিন্তা ও আচরণকে বিকশিত হতে সহায়তা করে। ফলে ফেসবুকে নিমগ্ন মানুষদের চিন্তা ও আচরণের প্রায় পুরোটাই এক ধরনের আড়ষ্টতা ও আবদ্ধতার দ্বারা আচ্ছন্ন। সেখানে চিন্তা ও আচরণের বিকাশ তো নেই-ই, বরং এ ক্ষেত্রে ক্ষয়িষ্ণুতার ধারাটিই অধিক প্রবল। অতএব, মর্গানের (লুইস হ্যানরি মর্গান) সংজ্ঞায়িত বিকাশমান সমাজের সঙ্গে তথাকথিত ফেসবুক সমাজের কোনো সামঞ্জস্যই নেই এবং সে কারণে এটি আসলে কোনো সমাজই নয়—সমাজবিচ্ছিন্ন একটি ক্ষুদ্র-সংকীর্ণ-গোপনীয় সামাজিক জীবনধারা মাত্র!

ফেসবুক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি হচ্ছে এই যে একে ঘিরে সৃষ্ট জীবনধারা সংশ্লিষ্টদের, বিশেষত তরুণদের একটি সংকীর্ণ আবদ্ধ চক্রের মধ্যে মোহাবিষ্ট করে রাখছে। এ আবদ্ধ চক্রে পড়ে উদ্দেশ্যহীন নিরর্থক কাজে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে, যা তাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজের সময়কেই শুধু ছেঁটে ফেলছে না, নিজেদের মেধা, চিন্তা ও মননশীলতার বোধও নষ্ট করে দিচ্ছে। কারণ ফেসবুক উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার অনুগামী নয়, গতানুগতিক আড়ষ্ট জীবনের মানহীন প্রদর্শনী মাত্র। আর মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে বিষয়টি দাঁড়ায় এই যে আড়ষ্ট জীবন মানুষের আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার জায়গাটিও ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ করে দেয়। যে তরুণ দিনের বেশির ভাগ সময় বাস্তব সমাজে বিচরণ না করে ফেসবুকে কাটায়, তার পক্ষে চাক্ষুষ সমাজের সমস্যা, ক্ষত ও অপূর্ণতাকে বোঝা কিছুতেই সম্ভব নয়। আর তা সে বুঝতে না পারলে তার মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। এবং একজন আকাঙ্ক্ষাবিহীন মানুষের মধ্যে স্বপ্ন ও সৃজনশীলতার বোধ কোনো দিনই গড়ে উঠবে না। উঠতে পারে না। অতএব, ফেসবুকের নানা উপকারিতার কথা মনে রেখেও স্বীকার করতে হবে, এ আচ্ছন্ন জীবন বৃহত্তর জীবনের সম্ভাবনাকে ক্রমেই সংকুচিত করে ফেলছে।

ফেসবুক সমাজের সদস্যদের মধ্যে যেসব তথ্য, মতামত ও চিন্তা-ভাবনার লেনদেন হয়, সেসবের মান নিয়েও সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলি, এসব লেনদেনে যাঁরা অংশগ্রহণ করেন, তাঁদের বেশির ভাগের অপরিপক্ব ও অতি মামুলি চিন্তা-ভাবনার মান বাস্তব জীবনের গড়পড়তা জীবনমানের চেয়ে অনেক বেশি নিম্নবর্তী। ফলে এখান থেকে তরুণদের পক্ষে শেখার বা শিখে অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো প্রায় তেমন কোনো সুযোগই নেই। বরং এ ধরনের মানহীন চিন্তা-ভাবনার লেনদেনের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসবাসের ফলে এটাকেই তারা জীবনের জন্য গ্রহণীয় মান বলে ধরে নেয়, যাকে পুঁজি করে আদর্শ মানের প্রতিযোগিতায় তারা আর নিজেদের যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় না। এটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে তো বটেই, জাতীয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।

ফেসবুক সদস্যদের দৈনন্দিন প্রদর্শনীর প্রধান উপকরণগুলোর মধ্যে থাকছে নিজেদের পোশাক-আশাক, খাওয়াদাওয়া, কেনাকাটা, সাজগোজ, ভ্রমণ ইত্যাদির ছবি ও এসব নিয়ে মন্তব্য। আর কখনো কখনো থাকছে অতীতচারণ। যুক্তি ও বিজ্ঞান বলে যে এসবই হচ্ছে নতুন চিন্তা-ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতায় অক্ষম মানুষের আলস্য ও অসহায়ত্বের ফসল। মানুষ যখন আর নতুন কিছু ভাবতে পারে না বা তার ভাবনায় সে রকম আর কিছু আসে না, তখনই সে ছবি বা আত্মকথনের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে। আর যখন সে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, তখনই সে স্মৃতিবিধূরতার মধ্যে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। আর এ উভয় ধরনের স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছে ফেসবুক গোষ্ঠীর সদস্যরা। এ মন্তব্যের বিপরীতে ভিন্নতর কোনো দৃষ্টান্ত থাকলে সংশ্লিষ্টরা সপ্রমাণ এগিয়ে আসবেন বলে আশা রাখি।

তবে হ্যাঁ, সচেতন ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ হিসেবে ফেসবুকের ইতিবাচক দিকগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা ও ব্যবহার করতে হবে। আর তা করার জন্যই সর্বাগ্রে উপরোল্লিখিত নেতিবাচক অনুষঙ্গগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অতি বয়সী মানুষ নিজেদের শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে ও নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য ফেসবুকের আশ্রয় নিতে পারেন। বস্তুত ফেসবুকের মতো মাধ্যম হওয়া উচিত অতি বয়সীদেরই আশ্রয়স্থল। কিন্তু তরুণরা তাদের জীবনের মূল্যবান সময় প্রায় অযথা এর পেছনে ব্যয় করে নিজেদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা এভাবে বিসর্জন দেবে কেন? এটি তাদের জন্য আত্মাহুতির শামিল। অতএব, তরুণদের প্রতি বিশেষ আহ্বান, ফেসবুকে বয়সীরা যত খুশি সময় ব্যয় করে করুক, তারা (তরুণরা) যেন তা না করে। কারণ তরুণরাই হচ্ছে স্বপ্ন ও সৃজনশীলতার প্রতীক।

খ্রিস্টীয় আঠারো, উনিশ ও বিশ শতকের একটি বড় অংশজুড়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বৃহৎ অংশকে উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল ইংরেজ, ওলন্দাজ ও ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তাদের সে জৌলুস আজ আর বর্তমান পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই। কিন্তু পুঁজিবাদী শক্তি তার নয়া সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের অংশ হিসেবে আমাদের মতো ভোক্তাপ্রধান দেশের মানুষকে ফেসবুকের মতো ভোগ্য উপকরণে বুঁদ করে রেখে (ফেসবুকের প্রান্তিক উপযোগের কথা অস্বীকার করা হচ্ছে না) নিজেদের দেশে উচ্চতর গবেষণা, উদ্ভাবন ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মতো সৃজনশীল কাজে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে ও সফল হচ্ছে। আর তারই ফলে আমরা শুধু তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও উপকরণের ভোক্তা হচ্ছি মাত্র, আবিষ্কারক হতে পারছি না কিছুতেই। অতএব, সে অবস্থা থেকে বেরোতে হলে শুধু ফেসবুক নয়, ফেসবুকের মতো অন্যান্য বুঁদ হয়ে থাকা অনুষঙ্গের ব্যাপারেও আমাদের অবিলম্বে বিশেষত রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সচেতন হতে হবে।

তরুণরা যে ফেসবুকে এত অর্থহীন সময় ব্যয় করছে, তার জন্য তাদের মোটেও দোষ দেওয়া যায় না। সমপরিমাণ সময় এর চেয়ে আনন্দের সঙ্গে ব্যয় করার উন্নততর বিকল্প আমরা তাদের সামনে তুলে ধরতে পারছি না বলেই তারা এটি করছে এবং তারা তা করছে অনেকটাই হুজুগের বশে, তার সমবয়সী অন্যদের সঙ্গে তাল মেলানোর লক্ষ্যে। অতএব, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী পর্যায়ের মানুষদের আশু কর্তব্য হবে আমাদের তরুণদের সামনে ফেসবুকের চেয়েও আনন্দদায়ক কিন্তু চিন্তা ও মননের বিকাশের জন্য সহায়ক উত্তম কোনো বিকল্প তুলে ধরা। কাজটি কঠিন, তবে মোটেও অসম্ভব নয়। আর এটাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে এ লেখা কোনোভাবেই ফেসবুকের বিরুদ্ধে নয়, এর উপযোগ ও অনুপযোগের কার্যকারিতা নিয়ে মাত্র।

লেখক : পরিচালক, সিডিসি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ফেইসবুক যখন শঙ্কার নাম!

facebook-1শাহরীয়া : বিশ্বজুড়ে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ২০০ কোটি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের খুঁটিনাটি তথ্যের অনেক কিছুই আছে ফেইসবুকের কাছে। তাই ফেইসবুক শুধু আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, আদতে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানও। ব্যবহারকারীর গতিবিধির সবটাই নজরে থাকে ফেইসবুকের।

ফেইসবুক কিভাবে আমাদের কাছ থেকে তথ্য সংরক্ষণ করে তার একটি ম্যাপ প্রকাশ করেছে যুগোস্লাভিয়ার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান শেয়ার ল্যাব। বেশ কয়েক বছর ধরেই এখানে কাজ করছেন সার্বিয়ার নোভি সাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ভ্লাদান জোলের। বনলু ও সহকর্মী বেলগ্রেডকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে গবেষণা করছেন ফেইসবুক নিয়ে। সহকারী হিসেবে দলে আছেন সাইবার ফরেনসিক বিষয়ে আরো কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। ফেইসবুকের তথ্যভান্ডারের বিশালতার ব্যাপারে আগেভাগেই কিছুটা ধারণা করতে পেরেছিলেন জোলের। কিন্তু আসল তথ্য হাতে পেয়ে হতভম্ব হয়েছেন তিনি। সদ্য এক যুগ পেরোনো সিলিকন ভ্যালির ফেইসবুক কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে ৩০০ পেটাবাইট (এক হাজার গিগাবাইটে এক পেটাবাইট) ডাটা।

জোলের বলেন, ফেইসবুককে এত লাভবান করার পেছনে সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ব্যবহারকারীদের। ফোনের অ্যাপস, ওয়াই-ফাই সংযোগ ও অডিও রেকর্ডিংয়ের অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে আমাদের লাইক, শেয়ার, কমেন্ট, সার্চ, স্ট্যাটাস, ছবি, বন্ধুসহ বিভিন্ন তালিকা আমরা তুলে দিচ্ছি ফেইসবুকের হাতে। এ কারণে ব্যবহারকারীর পছন্দ-অপছন্দ নির্ভুলভাবে ধরতে পারে ফেইসবুক। কোরিয়ান খাবার পছন্দ না চায়নিজ, কাজের পরিধি কিংবা বাচ্চার বয়স কত তা নির্ণয় করার ক্ষমতাও রাখে ফেইসবুক। কোনো কিছু আপলোড, ট্যাগ ও কমেন্ট পোস্ট করা মানেই আমরা ফেইসবুককে সাহায্য করছি। আমাদের পছন্দ আর অপছন্দের তথ্য তুলে দিচ্ছি সাইটটির হাতে। এ তথ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জটিল অ্যালগরিদমকে (কম্পিউটারসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়) আরো শক্তিশালী করে। জোলেরের মতে, এটা আমাদের আচরণকে একটি পণ্যে রূপান্তরিত করছে। ফেইবুকের হাতে কী কী তথ্য আছে তার একটি চিত্র আঁকতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির যে নথি পাওয়া গেছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য।

যৌনতাবিষয়ক আগ্রহ, রাজনৈতিক যোগাযোগ, সামাজিক অবস্থান, ভ্রমণসূচিসহ আরো অনেক বিষয়ে বিশ্লেষণ করে ফেইসবুক আমাদের জাতিগত মিল খুঁজে বের করে। কোনো কিছু পোস্ট করা থেকে শুরু করে পেইজে লাইক দেওয়া এবং অনলাইনে আমাদের গতিবিধি কী রকম তাও লক্ষ্য করছে ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ফেইসবুকে লগইন করতে বলা সাইটগুলো। আর এ তথ্যগুলোই প্রবেশ করছে অ্যালগরিদম প্রক্রিয়ায়।

এখানেই শেষ নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা অ্যাপগুলোকে ‘অনুমতি’ দেওয়ার মাধ্যমেও  ফেইসবুককে তথ্য দেয়। যেগুলো দিয়ে ফোনের এসএমএস, অনুমোদনবিহীনভাবে ডাউনলোড করা ফাইল এবং আমাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থানও জেনে যায় ফেইসবুক।

কয়েক বছর ধরেই ফেইসবুক বলে আসছে, তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে তারা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাদের দাবি, ফেইসবুকের ডাটা ডেভেলপাররা ব্যবহার করতে পারে না। কারণ প্রতিটি দেশেই তাদের ‘প্রাইভেসি প্রটেকশন আইন’ মেনে চলতে হয়। বিষয়বস্তুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফেইসবুকে হাজার হাজার নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জোলের বলেন, তথ্যের যে ভান্ডার গড়া হয়েছে তাতে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী হবে, সেটা নিয়ে তিনি শঙ্কিত। তথ্যগুলো একটি প্রতিষ্ঠানের হাতেই থাকবে। ফেইসবুকের বর্তমান নেতৃত্ব দায়িত্ববান ও আস্থাভাজন; কিন্তু আগামী ২০ বছর পর যখন নতুন নেতৃত্ব আসবে, তখন কী হবে?

প্রযুক্তি আইন ও পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ জুলিয়া পাওয়েল বলেছেন, টেক জায়ান্টগুলো ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি বা স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষমতাশালী। অনেকেই ভাবতে পারেন, মার্ক জাকারবার্গের রাজত্বে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু সব সময়ই ব্যাপারটি একই রকম থাকবে সে নিশ্চয়তাও দেওয়া যাচ্ছে না। সব কিছুর আগে জনপ্রিয়তাকে বেশি প্রাধান্য দিতে ফেইসবুক আমাদের মানসিকভাবে প্ররোচিত করে। ফলে নিয়ম-কানুনের গুরুত্ব, অনীহা ও পছন্দগুলোর বিকল্প কমে যাচ্ছে। শেয়ার ল্যাব টেক জায়ান্টগুলোর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে যে গবেষণা করছে, তা আসলেই কৃতিত্বপূর্ণ। কিন্তু জোলের এটি স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন, এ সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টগুলোর বাণিজ্যিক গোপনীয়তা ভেদ করে কোনো অ্যালগরিদম প্রক্রিয়া চালছে কি না তাও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

ফেসবুক কৌতুক

Facebook-2আনিসুল হক :বাংলাদেশের তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ব্যবহার করে। সম্প্রতি প্রথম আলো পরিচালিত এক জরিপে এটা জানা গেছে। তথ্য হিসেবে এটা নতুন নয়। শুধু প্রথম আলো ফেসবুক পেজেরই লাইক প্রায় সোয়া কোটি। বাংলাদেশে তাহলে কত কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে? শুধু ঢাকা শহরেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে সোয়া দুই কোটি মানুষ।

ফেসবুক ব্যবহার করা ভালো না খারাপ? এই প্রশ্নের উত্তর দুই কোটি বছর আগে থেকেই প্রাণীদের জানা। যেকোনো জিনিস তুমি ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারো, খারাপ কাজেও ব্যবহার করতে পারো। নির্ভর করছে তোমার ওপর। যেমন…কী ভাবছেন, ছুরির কথা বলব? না, ওটা বেশি পুরোনো। ধরা যাক, অক্সিজেন খুব ভালো। কিন্তু বাতাসে যদি ২০ শতাংশের বদলে ১০০ শতাংশ অক্সিজেন থাকে, আমরা মারা যাব। বা ধরুন, পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু কাউকে যদি ২০ জগ পানি খাওয়ানো যায়, সে মারা যাবে।

ফেসবুক ভালো। এটা দিয়ে পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে পাওয়া যায়, নতুন বন্ধুত্ব হয়; সত্য, সুন্দর, চমৎকার কথা, ছবি, ভিডিও প্রচার করা যায়; রক্তদানের নেটওয়ার্ক গড়া যায়, বন্যার্ত মানুষের সাহায্য করা যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়। ফেসবুক নিঃসঙ্গের সঙ্গী, বন্ধুহীনের বন্ধু, কর্মহীনের কাজ।

আবার ফেসবুক এই দেশে রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার কারণ হয়েছে, সিলেট অঞ্চলে অশান্তি ডেকে এনেছে। ফেসবুকের কারণে ঘর ভেঙেছে, সেলফি তুলতে গিয়ে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে, ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বের করে লোক মারা গেছে।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটা বলেন, কাজের কথা দিয়ে জীবন সুন্দর হয় না, বাজে কথা দিয়েই শিল্প ও সৌন্দর্য তৈরি হয়, তেমনি অপ্রয়োজনেই যদি কেউ একটা সুন্দর ছবি বা ফটো বা কথা প্রকাশ করে, সেটাও তো মূল্যবান। তবে তাই হোক। বাজে কথা হোক। হাসি-তামাশা হোক। কৌতুক বলি। ফেসবুক নিয়ে এই কৌতুকগুলো ইন্টারনেটে পেয়েছি।

১. আমি একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলব। এর নাম হবে ‘নোবডি’। কেউ যখন বিরক্তিকর কিছু পোস্ট করবে, আমি তাতে সবার আগে লাইক দেব। তখন তার দেয়ালে উঠবে, নোবডি লাইকস ইট।

২. প্রতিটা সফল ছাত্রের পেছনে আছে একটা ডি-অ্যাক্টিভেটেড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট।

৩. ফেসবুক একটা কারাগারের মতো। কারণ, তোমার একটা ফটো আইডি আছে, তুমি সারাক্ষণ লিখে থাকো দেয়ালে আর তোমাকে যারা পোক করে, তাদের কাউকেই তুমি চেনো না।

৪. গুগল+ হলো জিমের মতো। আমরা সবাই এতে যোগ দিয়েছি, কিন্তু কেউ এটা ব্যবহার করি না। (হা হা হা। এইটা পড়ে আমি তিন মিনিট হেসেছি। আজকের গদ্যকার্টুন আমি লিখছি জিম ফাঁকি দিয়ে। আর আমারও গুগল+ আছে, যাতে আমি বহুদিন ঢুকি না।)

৫. দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকেরা খুবই চিন্তিত। অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকেরা আশান্বিত। কারণ, কাগজ উঠে যাবে। এক টিসু্য পেপার মিলের মালিক হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, খোকা, তুমি মোবাইল ফোন নিয়ে বাথরুমে যাচ্ছ কেন?

৬. আচ্ছা, আপনি না হয় এখন অফিসে বসে এই লেখাটা পড়ছেন ফেসবুক পোস্ট থেকে। আপনার কি দুশ্চিন্তা হয় না, ফেসবুকের কর্মচারীরা অফিস টাইমে ফাঁকি দেওয়ার জন্য কী করবেন?

এবার কতগুলো সমস্যার সমাধান দিই।

সমস্যা: আমার ঘাড়ে ব্যথা করে।

ফেসবুক ডি-অ্যাক্টিভেট করুন।

সমস্যা: আমার মা ফেসবুক খুলেছেন।

তাঁকে ব্লক করুন।

সমস্যা: আমার বস ফেসবুক খুলেছেন।

তাঁকে লাইক দিতে থাকুন। ইন ফ্যাক্ট, লাভ দিতে থাকুন।

আজকের স্লোগান: ত্যাগের আনন্দ তুলনাহীন। ট্যাগ করার অভ্যাস ত্যাগ করুন।

পুনশ্চ: জাকারবার্গকে ধন্যবাদ। তিনি ফেসবুক আবিষ্কার করেছেন। তা না হলে আজকে ৬৬৭ জনকে ফোন করে জানাতে হতো যে আজকে আমি কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ রেঁধেছি।

আমি এই লেখাটা লিখতে পারলাম, কারণ আমি আমার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডি-অ্যাক্টিভেটেড করে রেখেছি। তবে পেজ চালু আছে।

এবার একটা ধাঁধা। ঢাকা শহরের জনসংখ্যা দেড় কোটি। ফেসবুক ব্যবহারকারী কেন সোয়া দুই কোটি?

যাঁরা উত্তরটা পেরেছেন, তাঁরা এই লেখাটার নিচে লাইক দিন:)

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: