প্রথম পাতা > ইতিহাস, জীবনী, নারী, বাংলাদেশ > দেশের প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা

দেশের প্রথম নারী বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা

nazmun ara sultana 5বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা দেশের ইতিহাসে আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি। হাইকোর্টেও তিনি ছিলেন প্রথম নারী বিচারপতি।

১৯৫০ সালের ৮ জুলাই মৌলভীবাজারের চৌধুরী আবুল কাশেম মঈনুদ্দীন ও বেগম রশীদা সুলতানা দীন দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন নাজমুন আরা সুলতানা। তারা তিন বোন ও দুই ভাই। ভাইবোনের সঙ্গে শৈশব-কৈশোরের সময়টা কেটেছে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে।

ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে এসএসসি, ১৯৬৭ সালে মুমিনুন্নেসা উইমেন্স কলেজ থেকে এইচএসসি এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।

মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। বাবার ইচ্ছা ছিল তার সন্তানদের কেউ একজন আইনজীবী হবে। বাবার স্বপ্নপূরণে বিএসসি পাসের পর তিনি মোমেনশাহী ল কলেজে ভর্তি হন। মা রশীদার উৎসাহে প্রতিকূলতা জয় করে বাবার স্বপ্ন পূরণে ১৯৭২ সালে এলএলবি পাস করেন তিনি।

১৯৭২ সালের জুলাইয়ে ময়মনসিংহ জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। স্বাধীন দেশে নারীদের বিচারক হওয়ার বিধান ছিল না। ১৯৭৪ সালে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। নাজমুন বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৫ সালের ২০ ডিসেম্বর মুনসেফ হন।

নিম্ন আদালতে দেশের প্রথম নারী বিচারক হিসেবে নাজমুন খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে সাবজজ হন। কয়েক দফা পদোন্নতির পর ১৯৯১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা জজ হন। কোনো নারীর জেলা জজ হওয়ার ঘটনা সেটাই ছিল প্রথম।

২০০০ সালের ২৮ মে তিনি হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। এর দুই বছর পর হাইকোর্টে স্থায়ী হন তিনি। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। দূরদর্শী এ বিচারপতি বাংলাদেশ মহিলা জজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

হাইকোর্ট বিভাগে তাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে নাজমুন আরা সুলতানা ফতোয়া বিষয়ক মামলা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ির মামলা, চারদলীয় জোট সরকার আমলে বাদপড়া ১০ বিচারপতির মামলা, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল সংক্রান্ত বিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলা এবং উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ বিষয়ক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিচারক ছিলেন।

নারী বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ উইমেন জাজেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডব্লিউজেএ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক নারী আইনজীবী সংস্থায় দু’বার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা সুদীর্ঘ কর্মজীবনে ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইতালি, জাপান, আমেরিকা, চীন, ইরান, ইরাক, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ড, পানামা ও হংকং সফর করেন।

ভুল বিচার করিনি কখনই

nazmun ara sultana 3বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতান :আল্লাহ আমাকে বিচারক বানিয়েছেন, এদেশের প্রথম নারী বিচারক। তবে আমার বিচারক হওয়ার পেছনে আমার মরহুম আব্বার ইচ্ছা ও আমার আম্মার প্রেরণা বড় ভূমিকা রেখেছে। আমার আব্বা আমাদের ৫ ভাই-বোনকে ছোট রেখেই মারা যান। আব্বার ইচ্ছা ছিল তার সন্তানদের মধ্যে একজন ব্যারিষ্টার হবে। কিন্তু আমার মায়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি তার কোন সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে ব্যারিষ্টারি পড়ানোর। আমার মনে হয়েছিল আমি আইন পড়লে আমার আব্বার ইচ্ছা খানিকটা পূরণ হবে। আমি ল’ কলেজে ভর্তি হলাম আম্মার উত্সাহে। মফস্বল শহরের ল’ কলেজ। রাত্রে ক্লাস হয়। ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত ৯ টার বেশি হয়ে যায়। ঐ সময় মফস্বল শহরে অল্প বয়সের কোন অবিবাহিত মেয়ে রাত ৯ টায় একা রিক্সায় করে বাড়ি ফিরবে-এটা খুব একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু আমার মায়ের সাহস ও প্রেরনায় আমি আইন পড়া চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম। ল’ পাশ করে ময়মনসিংহ জেলার প্রথম নারী আইনজীবি হিসেবে আমি আইন পেশায়ও যোগ দেই আমার অসীম সাহসী মায়ের প্রেরণায়।

ময়মনসিংহের জজ কোর্টে আমি প্রথম যেদিন আইনজীবি হিসাবে যোগদান করি সেদিনটির কথা আমার হূদয়ে গেঁথে আছে। ঐ দিনই বোধহয় আমার মনের কোণায় ইচ্ছাটা উঁকি দিয়েছিল -‘আমি কি জজ হতে পারি না?’ কিন্তু জানলাম আমি জজ হতে পারি না। বাংলাদেশে নারীরা জজ হতে পারে না। কিন্তু আমার মনের জজ হওয়ার প্রবল ইচ্ছাটা হয়তো জগত্কর্তাকে ছুঁয়েছিল। আমি ওকালতি শুরু করার বছর দেড়েকের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার নারীদের বিচারক না হওয়ার বিধানটি তুলে নেয়।

১৯৭৪ সালে সরকার বিচারক (মুন্সেফ) পদে নিয়োগের জন্য দরখাস্ত আহ্বান করে কাগজে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলো। আমি আবেদন করলাম। কিন্তু বেশ কিছুদিন হয়ে যায় কোন সাড়া পাইনা। ইতিমধ্যে আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমি স্বামীর সাথে তাঁর কর্মস্থল খুলনায় চলে যাই। খুলনায় যাওয়ার ১৪ দিন পরেই খবর যায় আমার মা খুব অসুস্থ। মার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমি সাথে সাথেই ময়মনসিংহ চলে আসি। আম্মা একটু সুস্থ হলে, আমি আম্মার বাসায় ঝুলানো লেটারবক্স  খুলে আমার অ্যাডমিট কার্ড পাই। কার্ডটি টি খুলে দেখলাম আর মাত্র ৬/৭ দিন পরেই আমার বি, সি, এস, লিখিত পরীক্ষা, ১০০০ মার্কস্ এর। ভয় পেলাম-এত অল্প সময়ের মধ্যে প্রিপারেশন নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া কি করে সম্ভব! আমার মা আমাকে সাহস জোগালেন। আমরা ঐ ব্যাচে মোট ১৮ জন নিয়োগ পেয়েছিলাম। আমি তৃতীয় হয়েছিলাম। তবে আমার ওপরের দুই জনের একজন চাকুরিতে যোগ না দেওয়ায় এবং অন্য জন অল্প কিছুদিন পরেই চাকুরি ছেড়ে দেওয়ায় আমি আমার ব্যাচের 1st man হিসাবেই ছিলাম। আমার আম্মা যদি ঐ সময় অসুস্থ হয়ে না পড়তেন তাহলে ঐ বিশেষ সময়টায়, বিয়ের মাত্র ১৫/২০ দিন পর, আমার খুলনা থেকে ঢাকায় আসা হতো না, বি, সি,এস, পরীক্ষাটা হয়তো দেওয়া হতো না-বিচারকও হওয়া হতো না। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাকে বিচারক করবেন বলেই হয়তো আমার আম্মা ঐ সময়টায় অসুস্থ হয়েছিলেন।

দেশের প্রথম নারী বিচারক হয়ে আমি খুলনার জজশীপে মুন্সেফ হিসাবে যোগদান করি ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে। ঐ সময়টায় এটি একটি বেশ গুরুত্ব্বপূর্ণ খবর হিসাবে দেশের খবরের কাগজগুলোতে ছাপা হয়েছিল। প্রতিক্রিয়া দুরকমেরই হয়েছিল। কেউ কেউ স্বাগত জানিয়েছিলেন আবার অনেকে নাক সিঁটকেছিলেন-‘নারী আবার বিচারক হতে পারে না কি-নারী আবার কী বিচার করবে?’ কর্মক্ষেত্রেও আমি এই দুরকমের আচরণই পেয়েছিলাম। অনেকের  কাছ থেকে অবজ্ঞা পেলেও অনেকের কাছ থেকেই আমি খুবই ভাল আচরণ পেয়েছি, উত্সাহ পেয়েছি, সাহায্য পেয়েছি। ঐ উত্সাহ, সাহায্যটুকু না পেলে হয়তো আমার বিচারক হিসাবে টিকে থাকাই সম্ভব হতো না।

প্রথম নারী বিচারক হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যাইনি – আল্লাহর কাছে তাই আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রথম নারী বিচারক হিসেবে আমি ব্যর্থ হলে হয়তো আজ বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ নারী বিচারক হতো না। বাংলাদেশের নারী বিচারকরা অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছু অসুবিধা-বিপদের সম্মুখীন হন যা দুর করার দায়িত্বে  উর্ধবতন যে পুরুষ বিচারকরা আছেন – তাঁরা অনেক সময়ই সে অসুবিধা, বিপদ বুঝতেই পারেন না বা বুঝতে চানই না। নারী বিচারকদের সুবিধা-অসুবিধা, বিপদ-সংকট ইত্যাদি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার জন্যই মূলত আমি ১৯৯০ সনে আমার কিছু নারী সহকর্মীদের সহযোগিতায় গঠন করি বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশন -যা এখন সারা বিশ্বের নারী বিচারকদের কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত সংগঠন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী বিচারকদের নিয়ে গঠিত হয়েছে International Association of Women Judges (IAWJ) যার বর্তমান সদস্য সংখ্য প্রায় ৫০০০। বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশন- International Association of Women Judges এর জন্মলগ্ন থেকেই এই সংগঠনটির সদস্য।

আমি বিশ্বাস করি আল্লাহর পরেই ন্যায় বিচারকের স্থান-যা সহীহ্ হাদিসে বর্ণিত আছে। জেনে বুঝে অবিচার করা বা অমনোযোগী হয়ে বা অবহেলা করে ভুল বিচার করা আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না। পক্ষাশ্রিত হয়ে বা কোন কারণে বা কারো দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে বিচার করা মহাপাপ। আমার আত্মতৃপ্তি-আমি জেনেবুঝে বা অবহেলা করে বা অমনোযোগী হয়ে বা পক্ষাশ্রিত বা প্রভাবান্বিত হয়ে ভুল বিচার, অন্যায় বিচার করিনি কখনই।

বিচারকদের সঠিক বিচার করার কাজে সহায়তা করার দায়িত্ব আইনজীবিদের। আইনজীবিদের সহায়তা ছাড়া একজন বিচারকের পক্ষে সঠিক বিচার করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। একজন বিচারক তাঁর জ্ঞান সমৃদ্ধ করেন আইনজীবীদের জ্ঞান থেকেই। বিজ্ঞ আইনজীবিরাই গড়ে তোলেন একজন দক্ষ বিচারক। আমার যেটুকু অর্জন তার সবটাই আইনজীবীদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞানের জন্যই।

(অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দেয়া সংবর্ধনার জবাবে। সংক্ষেপিত)

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: