প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, রাজনীতি > পাকিস্তানে গণতন্ত্র চলে সেনাবাহিনীর দয়ায়

পাকিস্তানে গণতন্ত্র চলে সেনাবাহিনীর দয়ায়

পাকিস্তানে গণতন্ত্র চলে সেনাবাহিনীর দয়ায় আর জনগণের স্বার্থ বরাবরই জলাঞ্জলি যায়। এটি ফের প্রমাণিত হয়েছে বিচার বিভাগীয় নির্দেশ মেনে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রকাশ্যে না হলেও ভারত সরকারের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে ‘বিচার বিভাগের করাতে রক্তপাতহীন ক্যু’বলেই মনে করেন। তাদের মতে, এ ঘটনায় পাকিস্তান নিয়ে ভারতের প্রচলিত সেই পুরনো বুলিকেই নতুন করে প্রমাণ করল। কথাটি হলো, সেনাবাহিনীই সব সিদ্ধান্ত নেয় আর তা নিয়ে বেসামরিক প্রধানমন্ত্রীর বলতে গেলে কিছুই করার থাকে না।

নওয়াজ গতকাল সোমবার বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারের আগেই আমাকে অযোগ্য করার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। আদলত কেবল একে যুক্তিসিদ্ধ করার কাজ করেছে। এরপর তিনি সুপ্রিম কোর্টকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, আদালত কি সেনাশাসক জেনারেল মোশাররফের বিচার করতে পারবে! এ দিন সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজের আপিল আবেদন বাতিল করে দেয়। নওয়াজ এর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আদালত তার পরিবারের সদস্যদের আপিলের অধিকার খর্ব করেছে।

নওয়াজ শরিফও গত রোববার সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে দেশটির সেনাকর্তৃত্ব ও এর সাক্ষীগোপাল বিচার বিভাগের সমালোচনা করেছেন। রাওয়ালপিণ্ডিতে পাঞ্জাব হাউসে নিজের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতাকর্মীদের বৈঠকে মন্তব্য করেছেন, দেশটির বর্তমান ব্যবস্থায় ‘ভাইরাস’ রয়েছে। এর কারণেই কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেন না। তিনি আরও বলেন, দেশটির যে কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী গড়ে দেড় বছর ক্ষমতায় থাকতে পারেন, আর সে জায়গায় সেনাশাসকরা গড়ে নয় বছর করে দেশ শাসন করে থাকেন। তিনি বলেন, প্রচলিত ব্যবস্থার ত্রুটি শনাক্ত করে ভাইরাসমুক্ত করা জরুরি। তার পদচ্যুতি নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে, তবে তিনি এখন মুখ খোলার সময় নয় বলেই মনে করেন।

ইসলামাবাদে দীর্ঘ সময় ভারতের সাবেক কূটনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জি পার্থসারথী। তিনি সাম্প্রতিক পাকিস্তানের হালচাল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্তব্য করেন, নওয়াজের কথা যদি বলেন, তিনি সেনাবাহিনীকে এড়িয়ে অন্তত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা ভাবতেন।

আপনি যদি তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা ভাবেন, তাহলে এ সদিচ্ছার প্রশংসা না করে পারবেন না।

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে নওয়াজকে টেনে এনে বেনজির ভুট্টোর জায়গায় বসান জেনারেল জিয়াউল হক। এর বিনিময়ে নওয়াজ কি-না সেনাবাহিনীরই চরম শত্রুতে পরিণত হলেন। আর সেনাবাহিনী ১৯৯৯ সালে দেখতে পেল, কারগিল নিয়ে বিরোধের মধ্যেই লাহোর সফর করছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী। ১৯১৫ সালেও ভারতের পাঠানকোট সেনাঘাঁটিতে জঙ্গি হামলা নিয়ে দুই দেশের বিরোধ যখন চরমে, সে বছরের ১৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও লাহোরে পা রাখেন।

ভারতের সাবেক সংসদীয় বিশেষ সচিব তিলক দেবাশের বলেন, পাকিস্তানের ভারত সম্পর্কীয় পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির সেনাবাহিনী। আফগানিস্তান সম্পর্কীয় পররাষ্ট্র নীতির বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। তাই জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এলেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এ দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বলতে গেলে কিছুই করা থাকে না।

আফগানিস্তানে নিয়োজিত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ভিভেক কাতজু বলেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বদ্ধমূল ধারণা, ভারত সব সময় তাদের জন্য বড় হুমকি। যতদিন এ ধারণায় পরিবর্তন না আসবে, দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করবে সেনাবাহিনী। আর দেশটির যে কোনো নির্বাচিত সরকারকে নিজেদের পায়ের তলে ফেলে রাখবে।

==

নওয়াজের পতন, আড়ালে কে?

দাউদ হায়দার : বাইশ গজের ক্রিকেট মাঠে কতজনকে বোল্ড আউট করেছেন- হিসেব জানা নেই। এও অজানা, কত সুন্দরী-তরুণী-যুবতি নারীর হৃদয় ভেঙেছেন ইমরান খান। অবশ্যই লড়াকু তিনি ক্রিকেটে, প্রেমে ও রাজনীতির খেলায়। হাল ছাড়লে চলবে না, লড়েই জিততে হয়। জিতেছেন নওয়াজ শরিফকে কাঠগড়ায় পাঠিয়ে। ইমরান খানের এই বাউন্ডারি ফাঁকা মাঠে নয়, প্রতিপক্ষও ছিল দক্ষ খেলোয়াড়। আম্পায়ার লক্ষ্য রেখেছেন দক্ষতা সত্ত্বেও খেলায় মূল গলদ কোথায়।

আম্পায়ারের সংখ্যা ছয়। অবশ্য, একজনই আসল। নাম আসিফ সাঈদ খান খোসা। তিনিই প্রধান বিচারপতি। পক্ষপাতহীন বিচারক হিসেবে বহুমান্য, সম্মানিত। বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত। ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকেও ছাড়েননি।

আসিফ সাঈদ খান খোসা একজন লেখকও। গোটা চারেক বই লিখেছেন। লাহোরের এক দৈনিকের সাংবাদিক রাবেয়া কুরেশি এখন বার্লিনে, দেখা করতে এসেছিলেন গতকাল বিকেলে। মানবাধিকার নিয়েও সরব, সংগঠনেও। খোসা-বিষয়ে মজার গল্প শোনান,‘তিনি কেবল প্রধান বিচারক নন, ক্রাইম থ্রিলার-রগরগে উপন্যাসেরও পাঠক। নওয়াজ শরিফের বিচারের রায়ে মারিও পুজোর উপন্যাস ‘গডফাদার’ থেকে বিস্তর কোট করেছেন, হুবহু।’

তা হলে, একজন ক্রিমিনালকে সঠিক শনাক্ত করতে ক্রাইম-উপন্যাসও সহায়ক।

[ফুটনোট: ওই যে বলেছিলাম, আম্পায়ারের সংখ্যা আরও ছয়, জানা দরকার কার কী অতীত ও বর্তমান। ওয়াজিদ জিয়া (ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির অতিরিক্ত মহাপরিচালক)। আমির আজিজ (এনআইবিএএফ-পাকিস্তানের ব্যাঙ্কার ও আর্থিক বিভাগের প্রশিক্ষণ বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক)। বিলাল রসুল (অর্থনৈতিক সংস্থা- সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্বাহী পরিচালক)। ইরফান নঈম মাহির (পাকিস্তানের শীর্ষ দমন বিভাগের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো- বেলুচিস্তান শাখার পরিচালক)। ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ নোমান সাঈদ (পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা-আইএসআই এর অভ্যন্তরীণ-শাখার প্রাক্তন পরিচালক, গত বছরই অবসর নিয়েছেন পরিচালকের পদ থেকে)। ব্রিগেডিয়ার কামরান খুরশিদ (পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের মিলিটারি ইনটেলিজেন্সে ‘স্পেশাল অফিসার’। বলা হয়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে তার ক্ষমতা এতটাই, চিফ থেকে শুরু করে সব জেনারেলই তাকে সমীহ করেন, তার কথায় উঠবস করেন)।

বাকি চার আম্পায়ারের ডিসিশন বাহুল্য, দুই ব্রিগেডিয়ার আম্পায়ারকে উপেক্ষা করা কি সহজ খোসার? যতই বলা হোক, খোসার বিচার সিদ্ধান্তই পয়লা, নওয়াজকে গদিচ্যুৎ করার, ভিতরের ঘটনা ভিন্ন। ইমরান খান যতই আস্ফালন করুন, তিনি শিখণ্ডী। যদি মারতে হয় ভীষ্মকে, দরকার পাণ্ডববাহিনী, সর্বাগ্রে কৃষ্ণকে, মন্ত্রণাদাতা।

পাণ্ডব বাহিনীতে পাঁচজন নয়, গুনেগেঁথে ছয়জন, পঞ্চপাণ্ডবের বদলে ষষ্ঠপাণ্ডব, শিরে দুই ব্রিগেডিয়ার। মন্ত্রক পাক মিলিটারি। কৃষ্ণের ভূমিকায়-আমরা নিশ্চয় ভুলিনি, পাকিস্তানের কুরুক্ষেত্র রচনায় মিলিটারির কী ভূমিকা। নেপথ্যে কৃষ্ণ তথা আমেরিকা।

[ফুটনোট: ওবামার আমল থেকেই পাকিস্তান না-পসন্দ। কারণও বহুবিধ। পাকিস্তান একটি অবিশ্বাসী, বদমাইশ, দুষ্ট, হারামি খচ্চর দেশ। জন্ম থেকেই। খচ্চর পিটিয়ে গাধা করার দায় নিয়েছিল আমেরিকা। ওবামা বুঝতে পারেন, খচ্চর গাধা হয় না। তালিবানের সঙ্গ ছাড়বে না। লাদেনকে খতম করতেই হবে। খতম করার পরেও পাকিস্তানের তথা কৌরবের আক্কেল হয় না। নওয়াজ শরিফ চরিত্রে মূলত জাবালি। শায়েস্তা করার জন্য পানামা পেপারসই যথেষ্ট। লক্ষ করুন, পানামা পেপার্সের নথি-তালিকায় দুর্নীতি কত ফাইল ফাঁস হয়েছে! ১৫ মিলিয়ন। পৃথিবীজুড়ে এত মানুষের (ধনী) দুর্নীতি? ১৪৩ জন রাজনীতিক? ১২ জন রাষ্ট্রনেতা? প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী? কতজন সাজাপ্রাপ্ত? ইরাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট আয়াদ আলায়ি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেট্রো পরোসেঙ্কো, মিশরের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মুবারক, আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডর, এমনকি ব্রিটিনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের বাবা-ও কী?]

নওয়াজ শরিফ ভুল করেছেন ঘুঁটির চালে। আমেরিকার সঙ্গে বিটলেমি, সেনাবাহিনীর সঙ্গে কানামাছি খেলা সহ্য নয় ‘বিগ বসদের’। কাশ্মির নিয়ে যুদ্ধ চায় সেনাকর্তারা। নওয়াজ অরাজি। কাশ্মির সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে উদ্যোগী, কিন্তু সেনাকর্তাদের নিষেধ।

নওয়াজের ঘাড়ে কি দুটি মাথা?-অন্তত এতদিন তাই জেনেছেন। পাকিস্তানের কোনও প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী একবার কুর্সিচ্যুৎ হলে ফিরে পাননি। নওয়াজ পেয়েছেন,পরপর তিনবার। নেপথ্যে অবশ্য সেনাবাহিনী। এবার পাশা উল্টেছে। পানামা পেপার্স, দুর্নীতি উপলক্ষ। পাকিস্তানে সেনাকর্তারা নাখোশ হলে কী হয়, ঢাউস ইতিহাস।

ঠিক যে, পাকিস্তান আবার ইনস্ট্যাবিলিটি, আগামী বছরে, নির্বাচনে আরও ঘন হবে। নওয়াজের পাকিস্তান মুসলিম লিগ যদি জয়ী হয় নির্বাচনে, সংবিধান ওলোটপালোট করে নওয়াজকেই ফিরিয়ে আনবে, জনমত তোয়াক্কা না করে। পাকিস্তানে সবই সম্ভব। গণতন্ত্র উছিলা মাত্র। যেমন উছিলা পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি, দুর্নীতির কেচ্ছা। কলকাঠি নাড়ার কর্তা সেনাবাহিনী। বিচারক নন।

===

পাকিস্তান: বিচার বিভাগের শক্তিও একে-৪৭?

মাসুদা ভাট্টি :পাকিস্তানের তিন তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ আবারও দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর পদত্যাগ করেছেন। পাকিস্তানের ৭০ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীই তার মেয়াদ পূরণ করতে সক্ষম হননি, এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। আগামী বছরের নির্বাচনের আগে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে নাজেহাল করে দেওয়ার যে পাঁয়তারা নওয়াজের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই শুরু হয়েছিল, তা একটি বিশেষ অন্তে পৌঁছারই ইঙ্গিত দিচ্ছে আদালতের এই রায়। ইতোমধ্যেই নওয়াজ শরিফ পদত্যাগ করেছেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচন করে তার ভাই শাহবাজ শরিফ বা অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেওয়া হবে, কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা অর্থাৎ পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়া টিকবে কিনা, তা নিয়ে সর্বত্রই প্রশ্ন উঠেছে। কেন এই প্রশ্ন উঠেছে, তা একটু বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।

শুরুতেই বলে রাখা ভালো—নওয়াজ শরিফ ধোয়া তুলসি পাতাটি নন। ২০১৬ সালে প্রকাশিত পানামা পেপার্সে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম উঠে আসে; যাতে বলা হয়, বিদেশে তাদের বিপুল পরিমাণে অবৈধ অর্থ রয়েছে, যা কর ফাঁকি দিয়ে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি পাকিস্তানের মতো দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন রাষ্ট্রের জন্য খুব বড় কোনও বিষয় নয়। ধারণা করা যায় যে, পাকিস্তানের অদৃশ্য ও নির্বাচিত সরকারের চেয়েও ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর সঙ্গে নওয়াজ শরিফ যদি ‘ভাঁজ দিয়ে’ চলতেন, তাহলে এই অভিযোগ এতদিনে তামাদি হয়ে যেত। কিন্তু নওয়াজ শরিফকে এর আগেও বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে নির্বাচিত হয়ে আসার পর আদালতের নির্দেশে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং সে সুযোগটি গ্রহণ করে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির ক্ষমতা দখল করে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ক্ষেত্রেও। তাকেও আদালতের নির্দেশেই ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরও আগে বেনজির ভুট্টোর বাবা জুলফিকার আলি ভুট্টোকে সামরিক আদালতে বিচার করে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই বিচার নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ভুট্টোর বিচার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই আইনসঙ্গত ছিল না। কিন্তু তাতে কোনোই অসুবিধা হয়নি, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি এসব অনাচার নিয়েই টিকে আছে।

উল্লিখিত অতীত অভিজ্ঞতার আলোকেই এখন এ প্রশ্ন জোরেশোরে উত্থাপিত হচ্ছে যে, নওয়াজকে তো সরানো হলো, এরপর তাহলে রাষ্ট্র ক্ষমতা কার হাতে যাচ্ছে? সরাসরি সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেবে? নাকি সেনাবাহিনী শক্তিশালী ছায়া হয়ে একটি ‘কায়া সরকার’ পরিচালনা করবে? মজার ব্যাপার হলো, পাকিস্তানে নির্বাচিত সরকারের বাইরে তিনটি শক্তিশালী পক্ষ রয়েছে। এক. সেনা বাহিনী, দুই. বিচার বিভাগ ও তিন. পাকিস্তানের উগ্র ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এবং শেষোক্ত দু’টি পক্ষই প্রথম পক্ষ অর্থাৎ সেনাবাহিনীর আজ্ঞাবহ দাসানুদাস। এবার যখন নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেখানে যে যৌথ ইনভেস্টিগেশন টিম গঠন করা হয়েছে সেখানে মূল নেতৃত্বে আসলে ছিলেন সেনাবাহিনীর শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। যারা নওয়াজের বিরুদ্ধে কেবল ব্যক্তিগত নয় প্রথাগত শত্রুতাও পোষণ করেন। এবারও যে রায়ে নওয়াজকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলো, তাতে সরাসরি তাকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। বরং পারভেজ মোশাররফের সেনা শাসনকালে সংবিধানে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তাতে ৬২ ও ৬৩ ধারায় সরকার পরিচালনাকারীদের শরিয়াভিত্তিক ‘সাদিক’ (সৎ)ও‘আমিন’ (পূর্ণাঙ্গ মুসলিম) থাকার নির্দেশনা সংযোজিত হয় এবং নওয়াজ শরিফের ক্ষেত্রে এই দু’টি শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ এনেই তাকে প্রধানমন্ত্রী থাকার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। আরও মজার ব্যাপার হলো, সংবিধানে যখন এই আইন সংযোজিত হয়, তখন সুপ্রিম কোর্ট থেকেই এর তীব্র সমালোচনা করা হয় একে ‘ভেগ’ বা মূল্যহীন বলে উল্লেখ করা হয়। অথচ এই আইনেই আবার দেশটির সর্বোচ্চ আদালত নওয়াজ শরিফকে সাজাও দিলেন, যা দেশটির বিচার বিভাগকে পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুললো বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কারণ,নওয়াজের বিরুদ্ধে এই রায় যে সেনাবাহিনীর নির্দেশেই দেওয়া হয়েছে, সেটা এখন আর কোনও গোপন বিষয় নয়। পাকিস্তানের প্রতিটি সেনাশাসনই আদালত দ্বারা বৈধতা পেয়েছে এবং সেনা বাহিনী যখনই গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করতে চেয়েছে, তখনই তারা মূলত আদালতকেই ব্যবহার করেছে। এমনকি নওয়াজ শরিফকে যখন এর আগের বার ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, তখনও তার পক্ষে আদালতের যে সব বিচারপতি দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেককে সেনা সরকার অবৈধভাবে আদালত থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় ফিরে সেই সব বিচারপতিকে আদালতে পুনঃনিয়োগ দিয়েছিলেন। এখন আবার তাদের দুর্দিন শুরু হলো বলে সংবাদ মাধ্যমগুলোর তথ্য থেকে জানা যায়।

প্রশ্ন হলো, এবার নওয়াজের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ক্ষিপ্ত হওয়ার মূল কারণটি আসলে কোথায়? এই প্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর নেই। সবাই ধারণা থেকে এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তবে একেবারে প্রাথমিক ধারণাটি হচ্ছে, পাকিস্তানের কোনও নির্বাচিত সরকারকেই দেশটির সেনাবাহিনী তার মেয়াদ পূরণ করতে দেবে না। তাই নির্বাচনের মাত্র এক বছর বাকি থাকতেই বার বার সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় আসা নওয়াজ শরিফকেও মেয়াদ পূরণ করতে দেওয়া হবে না। এটি একটি ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রধান ইস্যুটি আসলে উপমহাদেশের শান্তির জন্য অত্যন্ত জরুরি। একথা কারোরই অজানা নয় যে, পাকিস্তান ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসবাদের সূতিকাগার। দীর্ঘ সত্তর বছরের ইতিহাসে পাকিস্তান উপমহাদেশকে কেবল অশান্তই করেছে, কোনোভাবে এই দেশটির পক্ষ থেকে এই ভূখণ্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠান কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। উপরন্তু দেশটির উগ্র ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক নেতারা দেশটির সেনা বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশে আফগান সীমান্তে অস্থিরতাসহ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে স্থায়ী শত্রুতার জন্য সরাসরি দায়ী। এমনকি বাংলাদেশেও অগণতান্ত্রিক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থা বরাবরই অংশ নিয়ে থাকে। এমনকি এদেশের ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী শক্তিকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতারও অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতাসীন হলেই এদেশের ভূখণ্ডকে ভারতবিরোধিতার স্বার্থে পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এদেশে তখন ধর্মাশ্রয়ী মৌলবাদী শক্তিটিও অস্ত্র, অর্থ ও ক্ষমতায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু নওয়াজ শরিফ ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এমনকি এর আগেও পাকিস্তানে যখনই নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তখনই উপমহাদেশ একটু হলেও শান্ত থাকে, ধর্মাশ্রয়ী উগ্রবাদের আওয়াজ একটু হলেও দমিত থাকতে দেখা যায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেহেতু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় সেহেতু এখানে পাকিস্তানি সেনাচক্রটি তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হচ্ছে বার বার, সে কারণে শেখ হাসিনার সরকার তাদের টার্গেট হয়ে রয়েছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নওয়াজ শরিফ প্রাদেশিক সরকারগুলোকে একটু হলেও ক্ষমতাবান করে তাদের হাত দিয়ে দেশটির মৌলবাদী শক্তিকে দমন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছিলেন। তিনি কতটা সফল হয়েছিলেন তা আসলে বলা মুশকিল কিন্তু বাহ্যত নওয়াজ-সরকার পাকিস্তানকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তকমা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছিল। চীনের সঙ্গে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে নওয়াজ সরকার পাকিস্তানের অর্থনীতিকেও সুদৃঢ় করায় প্রয়াসী ছিল। সর্বোপরি ভারতের সঙ্গে চির বৈরিতার অবস্থান থেকে সরে এসে দু’দেশের মধ্যেকার সম্পর্কোন্নয়নে নওয়াজ-সরকার একটু হলেও এগিয়েছিল। এসবের কোনও কিছুই পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। কারণ তাতে তাদের ক্ষমতাকে খর্ব করা ছাড়াও গণতান্ত্রিক সরকারকে জনগণের সামনে শক্তিশালী করে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে নওয়াজ-সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর দূরত্ব বাড়তে শুরু করেছিল একেবারে প্রথম থেকেই এবং এখন তো প্রমাণিত হলো, এই দূরত্ব যুদ্ধে আসলে সেনাবাহিনীরই জয় হলো। যেমনটি হয়েছিল বেনজির ভুট্টোকেও আদালতের নির্দেশে ক্ষমতাচ্যুত করার মাধ্যমে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় নিয়ে নওয়াজ শরিফের ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনাকেও যে এই রায়ের মাধ্যমে শেষ করে দেওয়া হলো, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এরপর পাকিস্তানের জন্য দু’টি সম্ভাবনাই খোলা রইলো, এক. সরাসরি সেনা শাসন অথবা দুই. সেনা-সমর্থিত রাজনৈতিক সরকার। যে জন্য সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান ও  আরও কয়েকটি ইসলামপন্থী দল তো শেরওয়ানি পরেই রয়েছে, ডাকলেই তারা পাকিস্তানের গভর্নর হাউসে চলে যাবেন শপথ পড়ার জন্য।

আগেই বলেছি যে, নওয়াজ শরিফ নির্দোষ নন। কিন্তু তাকে সরানোর প্রক্রিয়াটিও যে ভয়ঙ্করভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, সেটাও চরম এক সত্য। কিন্তু নওয়াজকে সরানোর ফলে পাকিস্তানের মতো দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রশংসায় বাংলাদেশের অনেক বোদ্ধাই মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন। কে জানে, হয়তো এখানেও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন কোনও অদল-বদলের! তাদের উদ্দেশ্যে একটি কথাই বলতে চাই, একটু ধীরে বন্ধু একটু ধীরে। সাদা চোখে যা সাদা দেখায় তা যে কাদায় চুবিয়ে আনা পাকিস্তান সেটি বার বার প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস ৯০-এর পরে আসলে বদলে গেছে, এখন আর ক্ষমতালোভীদের পক্ষেও অঘটন ঘটিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ আগের মতো নেই। পাকিস্তানকে উদাহরণ হিসেবে না টেনে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে সব দেশ শক্তিশালী করেছে তাদের দিকে বরং তাকাই আমরা। আদালতের পেছনে একে-৪৭ বা কালাশনিকভ নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করার উদাহরণ হতে পারে না, এটা বুঝলেই বাকিটুকু বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। অপেক্ষা করুন, নওয়াজের বিদায় নতুন কোনও মোশাররফ বা জিয়াউল হককে ডেকে আনে কিনা, সে পর্যন্ত গ্যালারিতে দর্শক হিসেবে থেকেই দেখা যাক না হয়।

===

নওয়াজ শরিফের পতন থেকে সবারই শিক্ষা নেয়ার আছে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী : পাকিস্তানে একটি রাজনৈতিক মাফিয়া পরিবারের প্রধান দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে ক্ষমতা থেকে সরে গেছেন। কিন্তু তার মাফিয়া পরিবারটি ক্ষমতায় রয়ে গেছে। পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারিতে দুর্নীতি ও জালিয়াতির দায়ে সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে নওয়াজ শরিফ সরে গেছেন বটে। কিন্তু তারই ছোট ভাই শাহবাজ শাসক মুসলিম লীগের (নওয়াজ) মনোনয়নে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। পাকিস্তানে এখন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত দুটি বিত্তশালী পরিবারের মধ্যে। একটি জারদারি (বেনজির ভুট্টোর স্বামী) পরিবার। অন্যটি শরিফ পরিবার। এই দুই পরিবারের কোনটি কখন ক্ষমতায় থাকবেন, তা নিরূপণের মালিক নেপথ্যে আর্মি। কেউ কেউ বলেন, আর্মির সহযোগী জুডিশিয়ারিও।

লন্ডনের গার্ডিয়ানের ২৯ জুলাইয়ের সংখ্যায় তারিক আলী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগ সম্পর্কে যে কলাম লিখেছেন, তার হেডিং দিয়েছেন- Sharif has gone but pakistan’s huge corruption problem stays (শরিফ গেছেন কিন্তু পাকিস্তানের পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতির সমস্যা রয়েই গেছে)। জারদারির শাসনামলে তার বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তিনি একবার দুর্নীতির দায়ে নওয়াজ শরিফকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। শরিফ ক্ষমতায় এসে জারদারিকে করেছেন দেশছাড়া।

পাকিস্তানের পলিটিশিয়ান, আর্মি, এমনকি জুডিশিয়ারির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাহাড় সমান। দুর্নীতি সম্পর্কে পাকিস্তানের জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদেরও মনোভাব কী সে সম্পর্কে তারিক আলী তার গার্ডিয়ানের নিবন্ধে একটি চমৎকার তথ্য দিয়েছেন। বেনজির ভুট্টো যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তখন তারিক আলীকে একদিন প্রশ্ন করেছিলেন,‘দেশের মানুষ তার সম্পর্কে কী বলে? তারিক আলী বলেছেন, দেশের মানুষ বলে আপনার স্বামী জারিদারি একজন চরম দুর্নীতিবাজ। কিন্তু স্বামীর এই দুর্নীতির কথা আপনি কতটা জানেন, তা তারা জানে না।’

এরপর তারিক আলী লিখেছেন,‘স্বামীর দুর্নীতির কথা বেনজির সবই জানতেন। সেজন্য তিনি কিছুমাত্র লজ্জিত ছিলেন না। হেসে তারিক আলীকে বলেছেন,‘তুমি একজন প্রুডিস (নীতিবাগিশ)। সময় বদলে গেছে। প্রত্যেক রাজনীতিবিদ এ কাজটা করছেন, প্রতিটি পশ্চিমা দেশেও। এই হল দুর্নীতি সম্পর্কে পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর মতো রাজনৈতিক নেতার মনোভাব। সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক হত্যাকাত সম্পর্কে পাকিস্তানের শাসক রাজনৈতিক দলগুলোর এবং বেনজির ভুট্টোর মনোভাব কী তা তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘ডটার অফ ইস্ট’ (প্রাচ্যকন্যা) বইটি পড়লেই বোঝা যায়। ’৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যায় এবং ’৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যায় তার পিতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সংশ্লিষ্টতা যেভাবে তিনি চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, তাতে তার রাজনৈতিক সততার পরিচয় পাওয়া যায়নি।

পাকিস্তানে বেপরোয়া দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত আর্মি। শুধু দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নয়, আফগানিস্তানে তালেবান রাজত্বকালে অবৈধ পপিচাষ ও ড্রাগস ব্যবসায়ে পাকিস্তানের আর্মি জেনারেলরা কতটা ফুলে ফেঁপে উঠেছিলেন, তার বিবরণ পশ্চিমা মিডিয়াতেই প্রকাশ করা হয়েছে। তারিক আলীর মতে,‘পাকিস্তানে যদি সৎ ও আন্তরিক রাজনীতিবিদ খোঁজা হয়, তাহলে দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি স্থায়ীভাবে শূন্য থাকবে।’ এই যেখানে পাকিস্তানের অবস্থা, সেখানে নওয়াজ শরিফকে বেছে বেছে শাস্তি দেয়া হল কেন? এই শাস্তি দেয়ার পেছনে একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত আছে। জাতীয় প্রেক্ষিতটির ব্যাপারে পরে আসছি, আগে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতটির ওপর আলোকপাত করি।

‘গার্ডিয়ান’ তার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলেছে,A Pakistani Prime minister falls, but this is an international affair (একজন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর পতন হয়েছে, কিন্তু এটা একটা আন্তর্জাতিক ব্যাপার)। পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি অপ্রত্যাশিতভাবে ফাঁস হওয়া শুধু নওয়াজ শরিফ ক্ষেত্রে নয়, বিশ্বের আরও কোনো কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতার বেলায় ঘটেছে। বিদেশে পাচার করা (ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া) অর্থ এবং অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয়ের যে বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকেও কয়েকদিনের মধ্যে সে কারণে পদত্যাগ করতে হয়। ব্রিটেনের সাবেক টোরি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও তার ফ্যামিলি ট্যাক্স সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তের সম্মুখীন হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত একই ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফও ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেন।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নওয়াজ শরিফের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল। চীনের সঙ্গে তিনি যতই ঘনিষ্ঠ হচ্ছিলেন, ততোই মার্কিন প্রশাসন তার ওপর ক্ষুব্ধ হচ্ছিল। সৌদি আরবের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রতিবেশী ইরানকে রুষ্ট করেছে। আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীবিরোধী তৎপরতায় সাহায্য দানে মার্কিন প্রশাসনের ক্রোধ এবং পাকিস্তানে ড্রোন হামলার হুমকি নওয়াজ শরিফের ভাগ্য অনেকটা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। পাকিস্তানকে উপেক্ষা করে আমেরিকায় ওবামা এবং ট্রাম্প দুই প্রশাসনই ভারতের বন্ধুত্বের জন্য ঝুঁকে পড়ায় নওয়াজ শরিফ পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে দহরম-মহরম করার যে নীতি গ্রহণ করেন, তাতে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো আমেরিকা প্রয়োজন মনে করেছে।

নওয়াজ শরিফ হয়তো বুঝতে পারেননি, ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে সম্পর্কের গুজব সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক, মার্কিন এস্টাবলিশমেন্ট পুতিন ও রাশিয়াকে ট্রাডিশনাল শত্রু মনে করে। এজন্য আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়া ট্রাম্পকে সহায়তা করেছে কিনা তার ব্যাপক তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ট্রাম্পের ভাগ্যে কী ঘটবে তা অনুমান করা কঠিন নয়। নওয়াজ শরিফের আগে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছে, আমেরিকার নিষেধ না শুনে চীনের সাহায্যে আণবিক বোমা বানানোর উদ্যোগ নিতে গিয়ে।

ভুট্টোকে ফাঁসি দেয়ার কাজে পাকিস্তানের জুডিশিয়ারিও সাহায্য জুগিয়ে ছিল। এজন্য ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যাকে অনেকে জুডিশিয়াল কিলিং আখ্যা দেন। ভুট্টোর সময় থেকেই জুডিশিয়ারি ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। নওয়াজ শরিফের সময় সেই বিরোধ তুঙ্গে উঠেছিল। সুতরাং এখন অনেকেই মনে করেন, কেবল ন্যায়বিচার ও দুর্নীতি দমনের জন্য পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্ট শরিফের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে, তা সর্বাংশে সঠিক নয়। এর পেছনে প্রতিশোধ স্পৃহা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও কাজ করেছে। নওয়াজ শরিফের ভাগ্য ভালো, নিজেকে অতি চালাক মনে করে ভুট্টোর মতো তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হয়নি; দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে কিন্তু প্রাণে বেঁচে গেছেন। ক্ষমতা তার একেবারে হাতছাড়া হয়েছে তা নয়। তার মুসলিম লীগই এখন ক্ষমতায় থাকবে। তার ভাই শাহবাজ শরিফ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী। তার দলের মনোনয়নে কোনো একটা নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হতে পারলেই তিনিই হবেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

জাতীয় রাজনীতিতে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের দল নওয়াজ শরিফের প্রতিপক্ষ। পাকিস্তানের অঞ্চল বিশেষে এই দলের জনপ্রিয়তা আছে; কিন্তু শরিফের মতো অর্থবল নেই। ইউরোপের মাফিয়া সর্দাররা যেমন বিরাট অর্থবল থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারে না, তেমনি শরিফ পরিবার অর্থের পাহাড়ের ওপর বাস করলেও পরিবারের প্রধানকে রক্ষা করতে পারেনি। তারিক আলী তাই ঠাট্টা করে লিখেছেন-‘his billions could not byu a single judge this time.’ (নওয়াজের কোটি কোটি টাকা একজন বিচারককেও ক্রয় করতে পারেনি) আমার ধারণা, তার কারণ পাকিস্তানের বিচারকদের সততা নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূল পরিবেশের দরুন এই বিচারপতিরা ন্যায়বিচারের প্রতীক সাজতে বাধ্য হয়েছেন।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতি নওয়াজ শরিফ নিজেই সৃষ্টি করেছেন। তার এবং তার পরিবারের দুর্নীতি, জেহাদিস্টদের দমনের ব্যাপারে তার অনাগ্রহ, বরং নিজের ক্ষমতার স্বার্থে তাদের ব্যবহার করার চেষ্টা, আর্মির টপ অফিসারদের দুর্নীতি দমনে তার অক্ষমতা জনমনে তার সম্পর্কে বিরাট আস্থাহীনতা তৈরি করে। চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় তার দ্বিমুখী নীতি- অর্থাৎ একদিকে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং অন্যদিকে ভারতের মোদি সরকারের মনোরঞ্জনের জন্য আকুল প্রচেষ্টা মোদি সরকারের বিশ্বাস অর্জন করেনি, অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক ও অসামরিক ভারতবিরোধী অংশকে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সক্রিয় করে তোলে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নওয়াজবিরোধী সব মহলের ইচ্ছাকে পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্ট পূরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচারে তাদের ‘সাহসী ভূমিকা’ দেখিয়ে।

পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের এই পতন থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকদেরও সতর্ক হওয়া উচিত। বাংলাদেশে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের দুর্গ একটি হাওয়া ভবন আমরা দেখেছি। এখন দেশে ছোট-বড় অসংখ্য হাওয়া ভবন গড়ে উঠেছে। এই হাওয়া ভবনের অধীশ্বররা ভাবছেন, তাদের কোনোদিন বিচার হবে না, সেই বিচার ব্যবস্থা দেশে নেই। কিন্তু তারা জানে না পাপ একদিন নিজের শরীরের ভারেই ভূমিশয্যা নেয়। তার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি থাকে না। যে পাপের ভারে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের পতন ঘটে।

পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আরেকটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। সরকারের নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব কোনো দেশে সুশাসন নিশ্চিত করে না। সুশাসন নিশ্চিত করে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমঝোতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ না করা। নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগকে ক্রমাগত কোণঠাসা করার নীতি গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু বিচার বিভাগ সুযোগ পেলে কী ধরনের প্রতিশোধ নিতে পারে, পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে দেশের সুপ্রিমকোর্টের সর্বসম্মত রায় তার একটি বড় প্রমাণ। কথায় বলে, কেউ দেখে শেখে, কেউ শেখে ঠেকে, বাংলাদেশ দেখে শিখলে ভালো হয়।

লন্ডন ৩০ জুলাই, রবিবার, ২০১৭

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: