প্রথম পাতা > অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি > রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে

রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে

20আজ থেকে ঠিক ৩৫ বছর আগের কথা। ডোনাল্ড রিগ্যান তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সাইবেরিয়া থেকে পশ্চিম জার্মানি অবধি প্রায় তিন হাজার মাইল দীর্ঘ গ্যাস পাইপলাইনের সোভিয়েত পরিকল্পনা গৃহীত হয় পশ্চিম জার্মানির অর্থানুকূল্যে। বাধ সাধলেন রিগ্যান। তিনি এ প্রকল্পে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জড়িত হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সোভিয়েত পকেট যেমন ভারি হবে, তেমনি একদিন হয়তো এই গ্যাসই হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক হাতিয়ার। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, যিনি ছিলেন রিগ্যানের রাজনৈতিক সমভাবাপন্ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার কট্টর সমর্থক, তিনি পর্যন্ত রিগ্যানের এমন সিদ্ধান্তে চটে গেলেন। তিনি বিবৃতি দিলেন,‘মিত্র বলেই একটি পরাক্রমশালী দেশ ইউরোপের সব ব্যাপারে মাথা ঘামাবে এটি সুশোভন নয়।’

নিয়তির কী পরিহাস! এতকাল পর ঠিক যেন একই নাটক মঞ্চস্থ হল। এবারও ইউরোপ-আমেরিকার মনকষাকষির মূল কারণ রাশিয়া থেকে জার্মানিতে অধিক গ্যাস আমদানির উদ্দেশ্যে নর্ড স্ট্রিম-২ নামক একটি পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ এবং এ নিয়ে রুশ কোম্পানিগুলোর ওপর আমেরিকার অবরোধ আরোপ। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল গত মাসে এ অবরোধ নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে মতামত ব্যক্ত করে বলেছেন,‘ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহ একান্তই ইউরোপের বিষয়, এখানে আমেরিকার নাক গলানোটা অভিপ্রেত নয়।’ তবে এবার এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে আমেরিকার তরলীকৃত গ্যাস রফতানির সিদ্ধান্ত এবং এ সংক্রান্ত জার্মান আশঙ্কা। এ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে জার্মানিতে রুশ গ্যাস রফতানি নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।

গোটা ইউরোপের গ্যাসের চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জোগান আসে রাশিয়া থেকে। আর জার্মানির গ্যাস চাহিদার প্রায় ৪১ শতাংশ পূরণ করে রুশ গ্যাস। এ বাস্তবতায় নর্ড স্ট্রিম-২ নামক যে দ্বিতীয় গ্যাস পাইপলাইনটি নির্মাণ করার কথা চিন্তা করা হচ্ছে, তার সরবরাহ ক্ষমতা হবে প্রথম লাইন নর্ড স্ট্রিমের প্রায় দ্বিগুণ। এ লাইনটি টেনে আনা হবে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ এলাকা থেকে জার্মানির লুবমিনে, বালটিক সাগরের তলদেশ দিয়ে। নিজের ভবিষ্যৎ গ্যাস চাহিদা পুরোপুরি পূরণ হবে ভেবে জার্মানি এ প্রকল্প নিয়ে উচ্ছ্ব¡সিত।

কিন্তু ওদিকে প্রমাদ গুনছে পূর্ব ইউরোপের সাবেক সোভিয়েত ব্লকভুক্ত দেশগুলো ও আমেরিকা। তাদের উদ্বেগের পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। এ মুহূর্তে জার্মানিতে যে রুশ গ্যাস পৌঁছায়, তার একটি বড় অংশ মূলত প্রবাহিত হয় ইউক্রেনের মাঝ দিয়ে পাতা লাইনের মাধ্যমে। কিন্তু নর্ড স্ট্রিম-২ বাস্তবায়িত হলে রাশিয়ার এ লাইনটির প্রতি নির্ভরতা অনেকাংশেই কমে যাবে। ফলস্বরূপ, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বদলা নিতে তারা যখন-তখন এ লাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ কিংবা প্রবাহ সীমিত করার ব্যবস্থা নিতে পারে। এমন কাজ নিকট অতীতে তারা তিনবার করেছে- ২০০৬, ২০০৯ ও ২০১৫ সালে।

অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপ এবং বালটিক পাড়ের দেশগুলো, যারা ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন নিয়ে চিন্তিত এবং এতকাল রুশ প্রভাবের বিরুদ্ধে জার্মানিকে শক্তিশালী প্রতিবেশী হিসেবে পাশে পেয়েছে, তারা ভাবছে- এ পাইপলাইন বাস্তবায়িত হলে জার্মানি হয়তো অনেকাংশেই রুশ ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে বন্দি হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, জার্মানি তথা পশ্চিম ইউরোপে আরও বিশাল বাজার তৈরি হওয়ায় রাশিয়া হয়তো তখন এ তুলনামূলক ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশগুলোতে সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেবে।

জার্মানি তথা পশ্চিম ইউরোপে রাশিয়ার এ গ্যাস-আধিপত্য নিয়ে আমেরিকা বহুকাল আগে থেকেই চিন্তিত। অনেকটা এ কারণেই ওবামার সময়কালে আমেরিকা থেকে ইউরোপে তরলীকৃত গ্যাস (এলএনজি) রফতানির নীতিমালা শিথিল করা হয়। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনও সেই একই পথে হাঁটছে।

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প পোল্যান্ডে আমেরিকার এ গ্যাস রফতানি নিয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, আমেরিকা রাশিয়ার মতো গ্যাসকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করবে না। উল্লেখ্য, গত জুনে সর্বপ্রথম মার্কিন তরলীকৃত গ্যাসবাহী জাহাজ পোল্যান্ডের বন্দরে ভেড়ে। এ সফরে ট্রাম্প ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন; ঠিক হয়েছে ক্রোয়েশিয়ার কির্ক বন্দরে টার্মিনাল নির্মাণ করে সেখানেও মার্কিন গ্যাসবাহী জাহাজ নোঙর করার ব্যবস্থা করা হবে। ওদিকে বালটিক দেশগুলোর মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল আছে শুধু লিথুয়ানিয়ায়। এ দেশটি এর মধ্যেই গত মাসে আমেরিকার সঙ্গে গ্যাস আমদানি নিয়ে একটি চুক্তি করেছে। বালটিক পাড়ের অপর দেশ এস্তোনিয়াও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কথা জোরেশোরে ভাবছে। এ দেশগুলো এখন রুশ গ্যাসের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে মার্কিন গ্যাস আমদানি করতে চাইছে ভূ-রাজনৈতিক কারণে।

তবে তাদের এ উদ্যোগে আবার জার্মানির কপালে ভাঁজ পড়েছে। এতকাল ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর এমন বৃহৎ সিদ্ধান্তের পেছনে অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলন থাকত জার্মানির। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে, এ গ্যাস সংক্রান্ত বিষয়ে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো জার্মানিকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে দেন-দরবার করছে। বিষয়টি জার্মানি দেখছে ইউরোপে তার বিগব্রাদার সুলভ ভাবমূর্তির প্রতি আঘাত হিসেবে।

ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বর্তমানে যে রুশ-মার্কিন দ্বৈরথ, তাতে যে অন্তত নিকট ভবিষ্যৎ পর্যন্ত রাশিয়া সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে, সেটি চোখ বুজে বলে দেয়া যায়। তরলীকৃত গ্যাস আমদানির চেয়ে পাইপের মাধ্যমে আমদানিকৃত গ্যাস অনেক বেশি সস্তা এবং রাশিয়া প্রয়োজনে হয়তো দাম আরও কমিয়ে তার বাজার প্রসারিত করবে।
ওদিকে রুশ প্রভাব থেকে গা বাঁচাতে হয়তো পূর্ব ইউরোপ মার্কিন গ্যাসের দিকে কিছুটা ঝুঁকবে; কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের ধনী ও প্রভাবশালী দেশগুলো আরও বেশি করে রুশ গ্যাসের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তাতে হয়তো আখেরে কপাল পুড়বে ইউক্রেন কিংবা বালটিক পাড়ের দেশগুলোর।

সঞ্জয় দে : যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রবাসী প্রকৌশলী

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: