প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, বাংলাদেশ, রাজনীতি, সমাজ > কালের গর্ভে বিলীন আরেকটি বছর !

কালের গর্ভে বিলীন আরেকটি বছর !

ডিসেম্বর 31, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

new-year-rhymeশাহ মতিন টিপু : ৩১ ডিসেম্বর। এই বছরের শেষদিন আজ। আজকের দিনটি পার হলেই হারিয়ে যাবে গত এক বছর ধরে দেয়ালে টানানো ক্যালেন্ডারটির গুরুত্ব। সেখানে ঝুলবে আরেকটি নতুন ক্যালেন্ডার।

আজকের দিনটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আরেকটি বছর। স্মৃতির খেরোখাতা থেকে প্রাপ্তিঅপ্রাপ্তির হিসাব মুছে শুরু হবে নতুন বছর। অনেক ঘটনঅঘটন, প্রাপ্তিঅপ্রাপ্তি, চড়াইউৎরাই, উদ্বেগউৎকণ্ঠা ও আনন্দবেদনার সাক্ষী এই বিদায়ী বছর। নানা ঘটনা প্রবাহে আলোচিত ইংরেজি ২০১৬ সাল। সেইন্ট গ্রেগরি প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারের হিসাবে এখন সামনে সমাগত ২০১৭।

সময় এক প্রবহমান মহাসমুদ্র। কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়া, পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। তাই তো জীবন এত গতিময়। যে প্রত্যাশার বিশালতা নিয়ে ২০১৬এর প্রথম দিনটিকে বরণ করা হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার সব কি পূরণ হয়েছে?

বিদায়ী বছর প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির দোলাচলে নিয়েছে অনেক কিছু। তারপরও নতুন বছরের নতুন সূর্যালোকিত দিনের প্রতি অসীম প্রতীক্ষা ও প্রত্যাশা মানুষের মনে। নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন। চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় ধূসর হয়ে আসা গল্পগাঁথার সারি সারি চিত্রপট। কখনো বুকের ভেতর উঁকি দেয় একান্তই দুঃখযাতনা। কখনো পাওয়ার আনন্দে নেচে উঠে হৃদয়। এ বছরটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে আমাদের জীবনে, এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের।

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কথার মতই দুঃখ, কষ্ট সবকিছু কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে যাত্রার প্রেরণা পেতে চায় সবাই। নতুন বছরটি যেন সমাজ জীবন থেকে, প্রতিটি মানুষের মন থেকে সকল গ্লানি, অনিশ্চয়তা, হিংসা, লোভ ও পাপ দূর করে। রাজনৈতিক হানাহানি থেমে গিয়ে প্রিয় স্বদেশ যেন সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

বিদায়ী বছরে ভাল খবর যেমন ছিল, তেমনি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও কম ছিল না । দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রেই বিষ্ময়কর সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। সারা বিশ্বেই বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্ব সভায় বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ আসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দারিদ্র্য মুক্তির সাফল্য দেখতে বিশ্বব্যাংক প্রধানও বাংলাদেশ সফর করেছেন। মুগ্ধ হয়েছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক মানদন্ড বজায় রেখে। বেশ কয়েকজনের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যুদন্ডও কার্যকর করা হয়েছে। এতে জাতি হিসেবে সারাবিশ্বে যেমন আমাদের মর্যাদা বেড়েছে, তেমনি শহীদ পরিবারগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছে। কিছুটা হলেও মোছন হয়েছে জাতির গ্লানি। সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে অবনতির চিত্র লক্ষণীয়।

দুর্নীতি, দলীয়করণ, আমলাতোষণ, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অপকান্ড এখন পূর্বাপেক্ষা বেড়েছে। জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নেই মতৈক্য। সংকুচিত হয়ে গেছে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রগুলোও। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও অনেকের কাছে উপহাসের হয়েছে। তবে নাসিক নির্বাচন আশার আলো জ্বেলেছে। দেশস্বার্থে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক ঐক্য দরকার। তা এমন যে, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ফিরে আসুক গণতন্ত্রের সুস্থ ধারা, সুসংবাদ বয়ে আনুক সবার জন্য।

২০১৬ সালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য ছিল স্থানীয় সরকারের নানা পর্যায়ে এবং দলীয় প্রতীকে নির্বাচন। উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচন ছাড়াও হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুটি দলেরই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বছরের শেষ দিকে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংলাপে বসেছে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো। যা দেশে গণতন্ত্রের চর্চার পথে নতুন আশার আলো।

বছর জুড়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল জঙ্গিবাদ। সারা বিশ্বে যখন জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেখানে এর বিষবাষ্প থেকে মুক্ত ছিল না বাংলাদেশও। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি এবং শোলাকিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠীর বর্বরতা ও হত্যাকাণ্ড অবাক করেছে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বকে।

এ বছর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বিষয়টি সবচেয়ে আলোচিত ছিল, সেটি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। সারা বিশ্বের আলোচিত এই নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। নানা কারণে বিতর্কিত এই প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কী কী প্রভাব পড়বে তার হিসাবনিকাশ চলছে এখনও।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ২০১৫১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭.১১ শতাংশ হওয়ার ঘোষণা আসে ২০১৬ সালে। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও সরেনি আলোচনা থেকে। অর্থনীতিতে স্বস্তির পরশ যেমন ছিল, তেমনি ছিল দুশ্চিন্তার কারণও। মোটা দাগে বলতে গেলে বছরটিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেকগুলো সূচক স্থিতিশীল ছিল। অর্থনীতির যেসব সূচক সরাসরি সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে, সেসব সূচকের বেশ কয়েকটি স্বস্তিদায়কই ছিল । ২০১৬ সালটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্যও ছিল খুব ভালো বছর। রাজস্ব আদায় হয়েছে নিজস্ব কৌশলমতোই। ব্যবসাবাণিজ্য চলেছে স্বাভাবিকভাবে। এর ফলে সারা বছরই রাজস্ব আদায়ের গতি ভালো ছিল।

কূটনৈতিক ও মানবিক দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীরা সেখানকার সেনাবাহিনীর গণহত্যা এবং দমননিপীড়নের মুখে বিভিন্নভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রেবেশ করার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমার সরকারকে চিঠিও দেয়া হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুপল্লীতে হামলার পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সব শেষ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালপল্লীতে আগুন তুলেছে মানবিকতার নতুন প্রশ্ন।

২০১৬ সালে দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ৫০০ স্কুলকলেজকে বেসরকারি থেকে সরকারিকরণ। সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও রয়েছে একটি বিশাল অর্জন। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে আমাদের পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ। এই উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

এত কিছুর পরও এ দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন নানা সমস্যার আবর্তে জর্জরিত। সমস্যা যেমন আছে গ্রামে, তেমনি আছে শহরতলি বা নাগরিক জীবনে। সব সমস্যাকে মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে চায়, এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালে কী ভুল ছিল তা শুধরে নিয়ে নতুন পথচলা শুরু হবে ২০১৭ সালে। নতুন বছর নিয়ে আসবে নতুন কিছুর বারতা। এই কামনা এ দেশের সব মানুষের।

সূত্রঃ রাইজিংবিডি ডট কম

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: