প্রথম পাতা > ইতিহাস, জীবনযাপন, বাংলাদেশ, সংস্কৃতি, সমাজ > ইংরেজী নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি

ইংরেজী নববর্ষ ও আমাদের সংস্কৃতি

new-years-day-2017অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম : একটি জাতির সংস্কৃতি সেই জাতির নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস, আচারঅনুষ্ঠান, ধ্যানধারণা ইত্যাদি সামগ্রিক পরিচয় স্পষ্টভাবে ধরে রাখে এবং তা বিশ্ব দরবারে সেই জাতির আত্মপরিচয়কে বুলন্দ করে দেয়। মূলত সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির আয়না। সংস্কৃতির বহুবিধ উপাদানের মধ্যে নববর্ষও অন্যতম। আমরা যাকে ইংরেজী সন বা খ্রিস্টাব্দ বলি, আসলে এটা হচ্ছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। বাংলা ভাষায় অব্দ শব্দের চেয়ে সন ও সাল দুটি বেশি পরিচিত ও সর্বাধিক প্রচলিত। সন শব্দটি আরবী এবং সাল শব্দটি ফারসী। সন ও সাল এই শব্দ দুটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যজাত, আমাদের তমদ্দুনীয় উৎস সঞ্জাত।

আমাদের দেশে বর্তমানে তিনটি সন প্রচলিত রয়েছে আর তা হচ্ছে হিজরী সন, বাংলা সন ও ইংরেজী সন। এখানে হিজরী সনের প্রচলন হয় যেদিন এখানে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে তখন থেকেই। এই হিজরী সন মুসলিম মননে পবিত্র সন হিসেবে গৃহীত। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনা মুনওয়ারায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসের সেই দিগন্ত উন্মোচনকারী ঘটনাকে অবিস্মরণীয় করে রেখেছে এই হিজরী সন। ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে হযরত উমর রাদিআল্লাহু তায়ালা আন্হুর খিলাফতকালে তারই উদ্যোগে হিজরতের বছর থেকে হিসাব করে হিজরী সনের প্রবর্তন করা হয়। সেটা ছিল হিজরতের ১৭ বছর। যতদূর জানা যায়, তারই পরের বছর থেকে বাংলাদেশে সাংগঠিকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়আর তখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা)-এর খিলাফতের মধ্য ভাগ। অবশ্য প্রায় ১০/১২ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশে সমুদ্রপথে ইসলামের খবর এসে পৌঁছতে থাকে। ইসলামের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে হিজরী সনেরও আগমন ঘটে, কারণ এই সনের বিভিন্ন মাসে ইসলামী আচারঅনুষ্ঠান, ইবাদতবন্দেগীর নির্দিষ্ট দিনরজনী, তারিখ ও নির্দিষ্ট মাস প্রভৃতি রয়েছে। এই হিজরী সনই বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত সবচেয়ে পুরনো সন।

১২০১ খ্রিস্টাব্দে সিপাহ্সালার ইখতিয়ারুদ্দীন মুহম্মদ বিন বখ্তিয়ার খিল্জী বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের বিজয় নিশান উড্ডীন করেনআর তখন থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরী সন বাংলাদেশে প্রচলিত হয়, যা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সুলতানী আমলে কি মুঘল আমলে রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে, আদানপ্রদান তথা সর্বক্ষেত্রে হিজরী সনই প্রচলিত ছিল। অবশ্য মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে ঋতুর সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সৌর সনের তাকিদ রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে দেখা দেয়ায় হিজরী সনকেই সৌর গণনায় এনে একটি রাজস্ব বা ফসলী সনের প্রবর্তন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, হিজরী সন চান্দ্র সন হওয়ায় ঋতুর সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকে না।

সম্রাট আকবরের নির্দেশে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে আমীর ফতেহ্উল্লাহ সিরাজী সম্রাট আকবরের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বছর ৯৬৩ হিজরী মুতাবিক ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের নির্দিষ্ট তারিখ থেকে হিসাব করে হিজরী সনকে সৌর গণনায় এনে যে সনটি উদ্ভাবন করেন সেটাই আমাদের দেশে বাংলা সন নামে পরিচিত হয়। হিজরী সনের বছরের হিসাব ঠিক রেখেই এর মাসগুলো নেয়া হয় শকাব্দ থেকে। বৈশাখ মাসকে স্থির করা হয় বছরের প্রথম মাস।

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের পর থেকেই সম্রাট আকবরের ফরমানবলে রাজত্বের রাজস্ব আদায়ের সন হিসেবে তা প্রচলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে হিজরী সনের সৌরকরণ পঞ্জিকাটি ব্যাপকভাবে গৃহীত ও সমাদৃত হয়, যা একান্তভাবে বাংলার মানুষের নিজস্ব সন হিসেবে স্থান করে নিতে সমর্থ হয়। আর এখানে ইংরেজী সন এলো সেই ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে। একটা জিনিস লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে কিন্তু এখন পর্যন্ত ইংরেজী সনের গ্রহণযোগ্যতা তেমন একটা নেই। আবার শহর জীবনে বাংলা সনের ব্যবহার নেই বললেই চলে। অবশ্য শহুরে জীবন কি গ্রামীণ জীবনে হিজরী সনের প্রচলন সমানভাবে বর্তমান। বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য ও সংহতির অন্যতম অবলম্বন এই হিজরী সন। আর এই হিজরী সন থেকে উৎসারিত বাংলা সন আমাদের জাতীয় জীবনে নিজস্বতার বৈভব এনে দিয়েছে।

মুসলিম দুনিয়ার অনেক দেশেই হিজরী সনের চান্দ্র হিসাবের বৈশিষ্ট্যেই জাতীয় সন হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এমনকি এই সনের সৌর হিসাব এনে বাংলা সনের মতোই কোন কোন দেশে প্রচলিত রয়েছে, যেমন ইরানে হিজরী সনকে সৌর হিসাবে এনে সেখানে হিজরী সন প্রচলিত রয়েছে। ইরানে নওরোজ পালিত হয় হিজরী সনের শামসী বা সৌরকরণের হিসাবে আনা তাদের নিজস্ব প্রথম মাসের ১ তারিখে। আমাদের দেশে হিজরী সনের সৌর হিসাবের প্রথম মাস যেমন বৈশাখ মাস, তেমনি ওখানে হচ্ছে ফারবারদীন প্রথম মাস। এই মাসের ১ তারিখ ওদের হয় ২১ মার্চ। আর আমাদের ১ বৈশাখ হয় ১৪ এপ্রিল। আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষের যে আনন্দ বৈভব কি গ্রামে কি নগরেগঞ্জে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, ইংরেজী নববর্ষ কিন্তু শহুরে জীবনের মুষ্টিমেয় বিশেষ মহলে ছাড়া তা ব্যাপকভাবে কোথাও আলোড়ন সৃষ্টি করে না। তবুও ইংরেজী নববর্ষ আসে। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টার ঘণ্টা বাজার পর পরই ঘোষিত হয় এই ভিন ঐতিহ্যজাত নববর্ষের সূচনা মুহূর্ত, ঘোষিত হয় ইংরেজী নববর্ষের আগমন বারতা। মধ্যরাতের সেই মুহূর্তটা আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে কোনরূপ আনন্দআবেগ সৃষ্টি না করলেও খ্রীস্টান জগত ওই মুহূর্তে হ্যাপি নিউ ইয়ার উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এক হৈহুল্লোড়ে উল্লাস ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। ঘটে যায় কতই না অঘটন, ঘটে যায় কতই না পৈশাচিক কর্মকান্ড, মদ্যপানের নামে বহু স্থানে জীবন পানের মহড়াও চলে। ইংরেজী নববর্ষ আসে রাতের গভীরে নিকষ অন্ধকারে প্রচন্ড শীতের প্রবাহ মেখে।

ইংরেজী ক্যালেন্ডার যেহেতু আমাদের কাজকর্মের তারিখ নির্ধারণে, হিসাবনিকেষ সংরক্ষণে, আন্তর্জাতিক আদানপ্রদানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তাই এতে যতই ঔপনিবেশিক গন্ধ থাকুক না কেন, যতই এতে প্রায় ২০০ বছরের গোলামির জোয়ালের চিহ্ন থাকুক না কেন, আমরা এর থেকে মুক্ত হতে পারছি না এই কারণেই বোধ করি যে, আমরা স্বকীয়সত্তা সজাগ হওয়ার চেতনার কথা বললেও, আমরা নিজস্ব সংস্কৃতিকে সমুন্নত করার কথা বললেও তা যেন অবস্থার দৃষ্টিতে মনে হয় বাতকা কি বাত তথা কথার কথা। ইংরেজী নববর্ষ আমাদের স্কন্ধে সিন্দবাদের সেই দৈত্যটির মতো, সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে এমনভাবে বসে আছে যে, আমরা একে ছাড়তে পারছি না। ইংরেজী নববর্ষ আমাদের নতুন দিনের হিসাব শুরু করায়, যদিও চিঠিপত্রে বাংলা তারিখ উল্লেখ করার নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু সেটাও কি কার্যত হচ্ছে?

আমরা যাকে ইংরেজী ক্যালেন্ডার বলি আদতে এর নাম গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি প্রাচীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারটির সংস্কার সাধন করেন। এই গ্রেগরির নামে এই ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ লেখার শেষে যে এডি (.) লেখা হয় তা লাতিন এ্যানো ডোমিনি (অহহড় উড়সরহর)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এই এ্যানো ডোমিনির অর্থ আমাদের প্রভূত বছরে অর্থাৎ খ্রিস্টাব্দ। ডাইওনিসিয়াম একমিগুয়াস নামক এক খ্রীস্টান পাদ্রী জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ৫৩২ অব্দে যিশুখ্রিস্টের জন্ম বছর থেকে হিসাব করে এই খ্রিস্টাব্দ লিখন রীতি চালু করেন।

মানুষ আদিকাল থেকেই কোন না কোনভাবে দিনক্ষণ, মাসবছরের হিসাব রাখতে প্রয়াসী হয়েছে চাঁদ দেখে, নক্ষত্র দেখে, রাতদিনের আগমননির্গমন অবলোকন করে, ঋতু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে। সাধারণ কোন বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিন গণনা, মাস গণনা, বছর গণনার রীতি কালক্রমে চালু হয়েছে। তিথি, নক্ষত্র বিশ্লেষণ করার রীতিও আবিষ্কার হয়েছে, উদ্ভাবিত হয়েছে রাশিচক্র। চাঁদের হিসাব অনুযায়ী যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা চান্দ্র সন নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চান্দ্র সনে বছর হয় মোটামুটি ৩৫৪ দিনে আর সূর্যের হিসাবে যে বছর গণনার রীতি চালু হয় তা সৌর সন নামে পরিচিত হয়। সৌর সনের বছর হয় মোটামুটি ৩৬৫ দিনে। আমাদের দেশে ইংরেজী তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার যে ব্রিটিশ বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাত করে আমাদের ওপর গোলামির জোয়াল চাপিয়ে দেয়, সেই ব্রিটিশ এই ক্যালেন্ডার তাদের দেশ গ্রেট ব্রিটেনে চালু করে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। তারা যেখানেই তাদের উপনিবেশ স্থাপন করেছে, সেখানেই তারা তাদের পোশাকআশাক, শিক্ষাদীক্ষা, প্রশাসনিক কাঠামো, সংস্কৃতি যেমন চাপিয়ে দিয়েছে, তেমনি তাদের ক্যালেন্ডারটিও দিয়েছে, তারা প্রভু সেজে বসেছে আর নেটিভদের বানিয়েছে মোস্ট অবিডিয়েন্ট সারভেন্ট। এর থেকে কি আমরা নিজেদের উদ্ধার করতে পারব না? বল বীর/বল উন্নত মম শির/শির নিহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির এই বীরত্বব্যঞ্জক উচ্চারণ কি শুধু আমাদের জাতীয় কবির কবিতায় আবৃত্তির জন্য অনুরণিত হতে থাকবে, নাকি আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঝংকৃত হবে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখতে পারি না?

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরিফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা)

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬

পাশ্চাত্য নয়, দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা চাই

আল ফাতাহ মামুন : আমরা শপথ করিতেছি যে, নববর্ষারম্ভে বিগত বছরের ঋণ শোধ করব এবং কৃষিকাজের যে সব সন্ত্রপাতি ও হাঁড়িবাসন ধার নিয়ে ছিলাম তাও ফিরিয়ে দেব। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে এভাবেই পুরোনো বছরের ঋণ শোধের শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপন হতো নতুন বছরের প্রথম দিনটি। এর পাঁচশো বছর পর অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব দুহাজার সনে ধারদেনা শোধের শপথ অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে নতুনরূপে নববর্ষ উদযাপন হয় ব্যবিলনিয়া দেশের ব্যবিলন নগরে। বর্তমান ইরাকের আল হিল্লা শহরের কাছেই ছিল ব্যবিলন নগরের অবস্থান। এগারো দিন ব্যাপী নববর্ষ উৎসবে নানা আয়োজনে মুখর থাকত ব্যবিলনিয়ার ব্যবিলন। শেষ দিন মারদুকের মন্দিরে থেকে নববর্ষের মিছিল শুরু হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর নববর্ষ ভবনে সামনে এসে শেষ হতো বর্ষবরণ আনন্দ মিছিল। নববর্ষের শুরুর ইতিহাস এমনটিই। এরপর নানান ঘাতপ্রতিঘাত ও সংঘাতসংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশে দেশে বিস্তার হতে থাকে নববর্ষ সংস্কৃতি। এরই ধারাবহিকতায় বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ইংরেজি নববর্ষ।

জানুয়ারি মাসের পহেলা তারিখ ইংরেজি বছরের প্রথম দিন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কল্যাণে (!) ইংরেজি নববর্ষ এখন অশ্লীলতা আর নোংরামির হাতেখড়ি হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। অবশ্য ইংরেজি নববর্ষের সঙ্গে উচ্ছৃংখলতার সম্পর্ক নতুন নয়। স্যার জেমস ফ্রেজার তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য গোল্ডেন বাও লেখেন, নববর্ষ উপক্ষে আমেরিকান আদিবাসী নারীপুরুষদের আচরণ ছিল কান্ডজ্ঞানহীন মানুষের মতো। বিভিন্ন সাজে সজ্জিত নারীপুরুষরা এ বাড়ি ও বাড়ি ছুটে বেড়াতো আর সামনে যা পেত ভেঙ্গে ফেলত। শুধু যে অন্যের সম্পদের ক্ষতি করতো তা নয়; নিজেদের কাপড়চোপড় এবং আসবাবপত্রও ভাঙচুর করতো তারা। পুরোনো বছরের সঞ্চয় ও সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন বছরে নতুন জীবন শুরু করোএ দর্শনই আমেরিকানদের উগ্রপথে বর্ষবরণে উদ্বুদ্ধ করে। সেখানকার আদিবাসীদের দেখাদেখি অভিবাসী আমেরিকানরাও নববর্ষে ভয়াবহ রকমের অস্বাভাবিকতা প্রদর্শন করতে লাগলো। অগ্ন্যুৎসব, শব্দ দূষণসহ নানান কর্মকান্ড করে ভীতিকর পরিস্থিতিতে ৩১ ডিসেম্বর রাত অতিবাহিত করে নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতো তারা।

সময় পাল্টেছে। দিন বদলেছে। এখন আর অন্যের বা নিজের আসবাবপত্র ভেঙ্গে নববর্ষ উদযাপন করা হয় না। এখন নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানানো হয় নিজেকে ধ্বংস করে। একত্রিশ ডিসেম্বর রাত বারোটার পরপরই নিউ ইয়ার উদযাপনে তরুণতরুণীরা ধর্ম নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নাচগান ও মদইয়াবায় মেতে ওঠে। না, ইউরোপআমেরিকা বা অন্য কোনো পাশ্চাত্য রাষ্ট্রের নববর্ষ উদযাপনের কথা বলছি না। বলছি, বারো আউলিয়ার পূণ্যভূমি বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন সম্পর্কে। ভাবতেও কষ্ট হয়! একটি ভিন্ন জাতির উৎসবকে কেন্দ্র করে কীভাবে আরেকটি জাতি নিজের বিশ্বাসসম্পদ ও সংস্কৃতিকে বিলিয়ে দেয়। আমরা বাঙালি। আমাদের আছে নিজস্ব সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফালগুন, নবান্ন উৎসবসহ বিভিন্ন উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় ও ধর্মীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির আকাশপাতাল ব্যধান। থার্টিফার্স্ট নাইট, ভেলেন্টাইনস ডেসহ ইংরেজি বিভিন্ন উৎসবঅনুষ্ঠান পালন করার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশীয় এবং ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠান সংকটাপন্ন করে তুলছি। পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী নয়। ইন্দ্রীয় সুখ লাভ এবং জীবন উপভোগই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। এজন্য তারা কোনো আইন কিংবা বাধানিষেধের ধার ধারে না। তারা আরো বিশ্বাস করে, এ জীবনই শেষ জীবন। এরপর আর কোনো জীবন নেই। নেই জবাবদিহির মতো গুরু দায়িত্বও। অপরদিকে আমাদের দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ ধর্মে বিশ্বাসী। তারা পরজীবনে জবাবদিহির বিষয়টি গভীরভাবে লালন করে এবং বাস্তর জীবনে এর কঠোর অনুশীলনের চেষ্টা করে। সুতরাং আমাদের এবং পশ্চিমাদের জীবনাচার এবং সংস্কৃতির যে বিরাট পার্থক্য থাকবে তা বলাই বাহুল্য।

আমাদের সঙ্গে বিশ্বাস ও চিন্তায় এত বৈপরিত্যপূর্ণ একটি জাতির সংস্কৃতি যখন আমরা চর্চা করতে থাকি তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিশ্বাসও আমাদের মনমননে গেঁথে যেতে থাকে। যে কারণে পাঁচ বছর আগের বাংলাদেশকে পাঁচ বছর পরের বাংলাদেশের সঙ্গে মেলাতে গেলে রীতিমত আঁতকে ওঠতে হয়। কয়েক বছর আগেও দৈনিক কাগজগুলোর একটি নিয়মিত শিরোনাম ছিলম্ভ্রম হারানোর ভয়ে তরুণী/গৃহবধূর আত্মহত্যা আর সাম্প্রতিক সময়ে ইউটিউব বা পর্ণ সাইটগুলোতে আমাদের দেশের মেয়েদের সম্ভ্রম দানের মিছিল দেখে নিজেকেই বিশ্বাস করাতে কষ্ট হয়, একদিন এ দেশের মেয়েরাই সম্ভ্রম বাঁচাতে আত্মাহুতি দিয়েছিল! আজকের এ জাতীয় অধঃপতন যে বিজাতীয় সংস্কৃতিরই পরিণাম ও ফায়দা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

থার্টিফার্স্ট নাইটকে কেন্দ্র করে যে কোন ধরনের নৈরাজ্য রোধে প্রতিবছরই সরকার ও আইনশৃৃংখলা বাহিনী তৎপর থাকেন। তবে আফসোস! অশ্লীলতা এবং কথিত তারুণ্যের উম্মাদনা রোধে কারোই কোনো ভাবনা থাকে না। বরং আইনশৃংখলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানেই নাচগান, মদপান ও শ্লীলতাহানির মতো ঘৃণ্য কাজগুলো ঘটে থাকে। কয়েক বছর আগে টিএসসি চত্বরে নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এসব অপসংস্কৃতি এদেশের তরুণতরুণীদের জন্য কতটা বিপদজনক। নিউ ইয়ার উদযাপনকে কেন্দ্র প্রতি বছরই শ্লীলতাহানির ঘটে, এবারও ঘটবে হয়তো। কিন্তু প্রশ্ন হলোআমরা যাকে শ্লীলতাহানি বলছি, আমাদের নারী সমাজও কি সেটিকে শ্লীলতাহানিই মনে করেন? যদি তাই হয়, তবে তো টিএসসির ঘটনার পর নিউ ইয়ার উৎসবে অংশগ্রহণ করা কোনো নারীর চিন্তায়ও আসার কথা নয়। কিন্তু হায়! ওই ঘটনার পর যেন নারীদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে।

এ লেখা পড়ে কোনো নারীবাদীর নাকে যে মৌলবাদীর গন্ধ লাগবে না, তা হলফ করে বলতে পারি না। তবে যে কথাটি আমি হলফ করে বলতে পারি তা হলোনারীবাদীদের মহান হৃদয়ে এ প্রশ্ন অবশ্যই জাগবে যে, নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে এত কথা বলছেন, কিন্তু যারা নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে সেই সব পশুদের ব্যাপারে কিছু বলছেন না কেন? আসলে যারা এমনটি করেছে তারা মানুষের পর্যায়ে পড়ে নাএ ব্যাপারে আমার কেন খোদ শয়তানেরও দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেদিন কোনো মানুষরূপী পশু তো বাসায় গিয়ে কোনো নারীর সম্ভ্রমহানি করেনি। বরং মেয়েরাই পশুর খাঁচায় এসে নিজ থেকে ধরা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমি শুধু বলছি, বোন! কুকুর হইতে সাবধান। এতে আমার কোনো অপরাধ হয়েছে বলে মনে হয় না।

ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। আমরা বাঙালির পাশাপাশি মুসলিমও। মুসলিম হিসেবে আমাদেরও রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং হিজরি সন। বিজাতীয় (অপ)সংস্কৃতি চর্চায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে দেশীয় এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চায় মুসলিম তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলেমওলামাদের বিশেষ ভূমিকা রাখার আহবান করছি। আরেকটি কথা। সামগ্রীক বিবেচনায় বিদায়ী বছর বিশ্ব মুসলমানের জন্য সুখকর ছিল না। উপভোগ্য তো নয়ই। মিয়ানমার, কাশ্মীর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আলেপ্পোর মুসলমানরা এখনো আঁতকে ওঠছে ১৬ ক্ষত দেখে। নতুন বছর পুরনো ক্ষতে সুখের প্রলেপ দেবে এই আশায় দিন গুনছে নির্যাতিত মুসলমান। মুসলিম বিশ্বের ঘোর অমানিশা দূর করে আলোকিত ভোরসুবহে সাদিক ফিরিয়ে আনুক নতুন বছরের প্রথম সূর্য। স্বাগতম ২০১৭।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: