প্রথম পাতা > জীবনযাপন, নারী, বাংলাদেশ, সমাজ > নারী-পুরুষের সম্পর্কে চিড় ধরলে …

নারী-পুরুষের সম্পর্কে চিড় ধরলে …

ডিসেম্বর 23, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

মানুষ আমি, আমার কেন পাখির মতো মন!

ফারজানা হুসাইন

extra-marital-4. গত সপ্তাহে কাজের ফাঁকে আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে কফি খাচ্ছি। হঠাৎ করে সে বলে উঠলো, আচ্ছা তোমার পার্টনার যদি তোমার সঙ্গে চিট করে তুমি কি এরপর আর তার সঙ্গে থাকবে?

আমি মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম, নাহ!

সে মাথা নাড়িয়ে বিষাদ বদনে বললো, এতই কি সহজ সিদ্ধান্ত নেওয়া? এত সহজে অনেকদিনের একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কি যায়?

না, একদমই সহজ নয়, তবে সামটাইস ইউ হ্যাভ টু বি ক্রুয়েল টু বি কাইন্ড টু ইউরসেলফ।

চিট করা বা সঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করা বলতে সোজাসুজিভাবে আমরা অন্য কারও সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বুঝি, আমাদের সনাতন সংস্কৃতিতে হয়তো অন্য কোনও নারী বা পুরুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়াও বোঝায়। আমার দৃষ্টিতে শঠতা মানে সততার অভাব, তা সে যে ধরনের অসততাই হোক। যে বিষয় বা বিষয়গুলো দু’জনের সম্পর্কের ভিত্তি তার প্রতি প্রবঞ্চনাকেই আমি মোটামুটিভাবে শঠতা বলব।

সঙ্গী যখন প্রতারণা করে, সেটা জেনে যাওয়ার পর স্বাভাবিক মানুষ যা করে তা হলো প্রশ্ন, হাজারটা প্রশ্ন, একের পর এক প্রশ্ন। কেন করলে এ রকম? কবে করেছ, কোথায় করেছ, কতবার করেছ, কার কার সঙ্গে করেছ—ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনও উত্তরগুলো পাওয়া যায়, কখনও যায় না। তবে এই প্রশ্নগুলো করার পেছনের কারণ উত্তর খুঁজে পাওয়া নয় মোটেই। বরং ঘটনার আকস্মিকতায় তীব্র ঘৃণা আর অপমানকে উগরে দেওয়া মাত্র।

এরপর শুরু হয় নিজেকে প্রশ্ন করা। আমার কোথায় খামতি ছিল যে, সে এমন করলো, এতদিনের সম্পর্কের কথা একবারও সে ভাবলো না? এত মায়াভালোবাসা তার কাছে তুচ্ছ?

এত এত প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে যায় হাসি, খাওয়ার ইচ্ছে, বিছানায় এপাশওপাশ করাই কেবল সার হয়—ঘুম সে তো কবেই গেছে দেশান্তরে। বই খোলা থাকে সামনে কিন্তু পাতা উল্টানো হয়ে ওঠে না, গরম চায়ের মগ ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়—ফ্যাকাশে স্তর জমে মগের ওপরে। খোলা টিভির চরিত্রগুলো নেচেগেয়ে যায় আপন মনে—কে তার খবর রাখে?

এক কথায় জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। সব শাস্তি আমরা নিজেকেই দেই, অথচ অপরাধটা আমরা করিনি একদমই। আমরা ভুলে যাই এ সময়ের প্রথম এবং প্রধান কাজ নিজেকে একেবারেই কষ্ট না দেওয়া বরং প্রিয় মানুষ শঠতা করলে ওই মুহূর্তে নিজেকে ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি দরকার। ভালোবাসার মানুষটা যে ভালোবাসতে ভুলে গেছে!

. একগামিতা প্রাণীর সহজাত বৈশিষ্ট্য নয়, জীবজগতে একগামী প্রাণীর দেখা মেলা ভার। আমাদের গুহাবাসী পূর্বপুরুষেরা বহুগামী ছিল। গোত্রসমাজ গড়ে ওঠার কালে ধর্মের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় একটি সুশৃঙ্খল সমাজ কাঠামো গড়ে দেওয়া, ভালোমন্দের সীমানা প্রাচীর গড়া। সেই মহৎ নির্মাতার ভূমিকায় ধর্ম সভ্য সমাজের ভিত্তি হিসেবে একগামিতার কথা শোনায়। আব্রাহামিক তিন ধর্মের মতো বাকি প্রায় সব বহুল প্রচলিত ধর্মই নারীর ওপর একগামিতার বোঝা চাপিয়েছে, অথচ পুরুষ পেয়েছে বৈবাহিক সূত্রে বহুগামিতার স্বীকৃতি।

ইসলাম সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করার অনুমোদন দেয়। রাধাকেবল কৃষ্ণের প্রেয়সী, হাজারখানেক স্ত্রী তার। ওদিকে মহাভারতের দ্রৌপদীর পাঁচস্বামীর কারণ বেচারির একাধিক পতিঈপ্সা নয় বরং ভাইদের সঙ্গে সবকিছু ভাগ করে নেওয়ার অর্জুনের প্রতিজ্ঞা।

মজার বিষয় হলো, বেশির ভাগ পুরুষই তার নারী সঙ্গীকে অন্য কারও সঙ্গে প্রেম করাকে হয়ত ক্ষমা করতে পারে যদি না সেই মেয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। নারীর শারীরিক শুচিতা (!) পুরুষের আজীবনের আরাধ্য বস্তু। সীতার অগ্নিপরীক্ষা আর আয়েশার সতীত্বের প্রমাণের কথা পাওয়া যায় ধর্মগ্রন্থে। অথচ, বেশিরভাগ নারী আবার পুরুষের অন্য নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করাকে পুরুষ মানুষের শরীরের চাহিদা একটু বেশিই হয় বলে ধরে নেয় কিন্তু অন্য কোনও নারীর সঙ্গে তার পছন্দের পুরুষের অশারীরিক প্রেমকে মানতে পারে না একদমই। সুতরাং শরীর মনের সংঘাত নারী পুরুষ ভেদে ভিন্নতর।

সেই আদ্দিকালের শুধু নারীপুরুষের সম্পর্ক কেবল আর নেই আজ, পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রগতিপন্থী আমরা ও সচেতনভাবেই স্বীকার করে নিচ্ছি সমলিঙ্গের সম্পর্কগুলোকে। লিঙ্গ পরিচয় আর অভিযোজন এক বিস্ময় যেন আজ।

কথায়কথায় আমার কৈশোরের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমাদেরই সমবয়সী দু’জন কিশোরকিশোরী প্রেমে পড়ল স্কুলের শেষ ক্লাসেই। দু’জনই ভিন্নভিন্ন আবাসিক এক স্কুলকলেজের স্টুডেন্ট হওয়াতে প্রেম চলল পত্রালাপে। ছুটিতে বাড়ি ফিরলে দুজন কারও তোয়াক্কা না করেই শহরে রিকশা করে ঘুরে বেড়াতো, প্রেম করতো। তখন ছোট্ট মফস্বল শহরে এই লোক দেখানো প্রেম খুব ভালো চোখে দেখা হয়নি। মূল কাণ্ড ঘটলো কলেজের শেষ দিকে। মেয়েটিকে তার কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো সেই আবাসিক কলেজের আরেকটি মেয়ের সঙ্গে সমপ্রেমের ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়ার জন্য। গল্পের ডালপালা ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগেনি একদমই। স্বভাবতই বন্ধুমহলে বেশ কানাঘুষো চললো। শুনেছি পরের ছুটিতে ছেলেটি বাড়ি ফিরলে মেয়েটিকে হাতেকলমে পরীক্ষা দিতে হয়েছে তার বিষমকামিতার। হোক কিশোর, তবু সে প্রেমিক তো! ষোলসতেরোর দুই কিশোরকিশোরীর প্রগলভাময় প্রেম আর প্রমাণের নিষ্ঠুরতার সেই ঘটনা মনে পড়লে এখনও বিবমিষা জাগে। সেই ঘটনার বেশ কিছু মাস পর্যন্তও ছেলেটি আর মেয়েটির মধ্যে যোগাযোগ ছিল।

একটি বিষমকামী সম্পর্কে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে হয়ত মোটামুটি মেনে নেওয়া হয়। আর যাই হোক মেয়েটি অন্য কোনও ছেলের সঙ্গে তো আর সম্পর্ক করেনি; তাই প্রেমিকের চোখে প্রেমিকার সতীত্ব অটুট থাকে।

যাই হোক, গল্পের শুরুতে ফিরে আসি। যারা মনে করে হৃদয়ের ভাঙন কেবল আমাদেরই হয়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ফ্রিডম অব সেক্সস নয়, কেবল ফ্রি সেক্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জন্য বলি—শুরুর গল্পের আমার এই সহকর্মী গত তিন সপ্তাহজুড়ে ভয়াবহ মনোকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ঠিক বিষমকামী আমাদেরই মতোই। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—এই ভদ্রলোক একটি সমকামী ও সমপ্রেমী সম্পর্কে আছেন।

হায় হৃদয়ের ক্ষরণ! নারীপুরুষসমকামীসমপ্রেমী কাউকেই সে ছাড় দেয় না!

লেখক: আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও মানবাধিকারকর্মী

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ২২ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: