আর্কাইভ

Archive for ডিসেম্বর 21, 2016

বিয়ের বয়স নিয়ে সরকারের শুভংকরের ফাঁকিবাজি !

child-marriage-3-art. তৌফিক জোয়ার্দার : ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে কন্যাশিশু সন্মেলনে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৯৭১ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ২২৩, যা বর্তমানে মাত্র ৩৭.এ নেমে এসেছে। শুধু শিশুমৃত্যুই নয়, বাংলাদেশ প্রায় সবগুলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয়েছ এবং এক্ষেত্রে বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এসব অর্জনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার ধন্যবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু এতসব অর্জনের পরও একটি বিষয়ে বাংলাদেশ আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। এটি হল, মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাড়ানো।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) রিপোর্ট, ২০১৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স হল ১৬.৬ বছর। শুধু এই একটি ইন্ডিকেটরে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ায় বিভিন্ন সামাজিক সূচকের পরিমাপকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, উন্নয়নকর্মী ও গবেষকদের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলেছিল। একজন সচেতন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনেতা হিসেবে এটা খুবই স্বাভাবিক।

এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল, কিন্তু ২০১৪ সালে সরকার হঠাৎ করেই সব উন্নয়ন প্রপঞ্চের বিপরীত স্রোতে নৌকা ভাসাল। ঘোষণা করা হল, বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের লিগ্যাল বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা হবে। উন্নয়ন সেক্টরে কাজ করা একজন গবেষক হিসেবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অন্য অনেকের মতো আমিও চিন্তাভাবনা না করে পারিনি।

এ ঘোষণার পেছনে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য তারাই ভালো বলতে পারবে, তবে আমার ধারণা হচ্ছেকেউ হয়তো সরকারকে বুঝিয়েছেন, বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিলে বাল্যবিবাহিত মেয়েদের সংখ্যাও পরিসংখ্যানে কম দেখাবে। তখন কৃত্রিমভাবে হলেও বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ হ্রাসে সরকারের আপাত ব্যর্থতা আর আলাদাভাবে চোখে পড়বে না।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বিয়ের বয়স কম বলে এত যে সমালোচনা এবং সে সমালোচনা ধামাচাপা দিতে গিয়ে এতসব আয়োজন, বিয়ের সে বয়সটিই সঠিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছে কিনা? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এশিয়ান পপুলেশন স্টাডিজ নামক জার্নালে প্রখ্যাত গবেষক পিটার কে স্টিটফিল্ড, নাহিদ কামাল, কারার জুনায়েদ আহসান এবং কামরুন নাহার এমনটিই দাবি করেছেন।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে করা জরিপের সঙ্গে বাংলাদেশ উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) স্বাস্থ্য ও জনমিতিক অতন্দ্র তত্ত্বাবধান (ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভেইলেন্স) উপাত্তের তুলনা করে তারা দেখিয়েছেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের প্রায় দুইতৃতীয়াংশই বিয়ের সঠিক বয়স উল্লেখ করেননি। ৫৬% নারী বিয়ের বয়স কমিয়ে বলেছেন এবং ৭% বলেছেন বাড়িয়ে।

বিবাহিত নারীদের মধ্যে করা জরিপের ফল অনুযায়ী, তাদের উল্লেখ করা প্রথম বিয়ের বয়সের গড় পাওয়া গেছে ১৬.৮ বছর, যা বিডিএইচএস রিপোর্ট, ২০১৪তে উল্লিখিত ১৬.৬ বছরের খুবই কাছাকাছি। যেহেতু আইসিডিডিআরবি তাদের সার্ভেইলেন্স ব্যবস্থার অন্তর্গত প্রত্যেক মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও স্থানান্তরের তথ্য সেই ১৯৬৬ সাল থেকে সংরক্ষণ করে আসছে, তাই তাদের এলাকায় জরিপকৃত ১৯৬৬ বিবাহিত নারীর প্রকৃত বয়সও তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকে জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের প্রকৃত বয়স বের করে জরিপে উল্লিখিত বয়সের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, তাদের বিয়ের প্রকৃত গড় বয়স মোটেও ১৬.৮ বছর নয়, বরং ১৮.৬ বছর।

এমন একটি চমকপ্রদ ফলাফল গবেষকদের স্বভাবতই অত্যন্ত কৌতূহলী করে তোলে। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারলেন, যেসব নারীর প্রকৃত বিয়ের বয়স যত বেশি, বিয়ের বয়স ভুল বলার বা কমিয়ে বলার প্রবণতাও তাদের তত বেশি। তারা আরও দেখলেন, যেসব নারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং যারা অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বলবিয়ের বয়স ভুল বলার প্রবণতাও তাদের বেশি। সবকিছু বিচারবিশ্লেষণ করে তারা তাদের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেনআমাদের সমাজে এখনও যৌতুকের প্রকোপ ব্যাপকভাবে রয়েছে, কাজেই যেসব মেয়ের বয়স যত বেশি, যৌতুকের পরিমাণও তত বেশি হয়। তাই যৌতুক দিতে হয়েছেএমন নারীরা তাদের প্রকৃত বিয়ের বয়স কমিয়ে বলে থাকতে পারেন, যাতে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কোনোভাবে জরিপ থেকে তার প্রকৃত বয়স জেনে বেশি বয়সের জন্য অধিক যৌতুকের জন্য চাপ দিতে না পারে (যদিও গবেষণার উপাত্ত গোপন রাখা হয়, তবে গ্রামের নারীরা এ বিষয়ে সম্ভবত নিশ্চিত হতে পারেনি)

গবেষণার প্রসঙ্গ এ কারণে উত্থাপন করলাম, যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকার উপলব্ধি করতে পারেবিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিমভাবে দেশ ও বিশ্ববাসীকে লিগ্যাল বয়সের নিচে বিয়ে হওয়া মেয়েদের সংখ্যা যে বাংলাদেশে কম, তা প্রমাণের চেয়ে কার্যকর উপায়ে এ লক্ষ্যটি অর্জিত হতে পারে।

প্রথমত, বর্তমানে সরকারের গৃহীত নানা সামাজিক পদক্ষেপ প্রকৃতই কাজ করছে, ফলে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স বাস্তবিকপক্ষেই অনেক বেড়েছে (১৯৯৪ সালের বিডিএইচএস রিপোর্ট অনুযায়ী ১৪.১ বছর)। কিন্তু নানা জরিপে যে কারণে এ উন্নয়ন প্রতিফলিত হতে পারছে না, তা অ্যাড্রেস করা বিয়ের লিগ্যাল বয়স কমিয়ে দেয়ার থেকেও অধিক কার্যকর ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মান নিয়ন্ত্রণ করা। যে কোনো নাগরিকের প্রকৃত বয়স নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে জন্ম নিবন্ধন সনদ।

দ্বিতীয়ত, নারীরা তাদের বয়স কমিয়ে বলার তাগিদ অনুভব করছেকারণ অধিক বয়সে বিয়ের ব্যাপারে সমাজে এক ধরনের ‘স্টিগমা’ বিরাজ করছে। এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে আছে বিয়ের বয়স ও যৌতুক সংক্রান্ত সামাজিক মূল্যবোধ। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ পরিবর্তনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটলে দেশের নারীরা আর বয়স লুকানোর প্রয়োজন অনুভব করবে না।

সরকার সম্প্রতি ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ প্রণয়ন করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। এ আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি এবং বাবামায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, যদিও সাধারণভাবে বিয়ের লিগ্যাল বয়স আগের মতোই মেয়েদের জন্য ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে যেখানে বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে হয় না, সেখানে ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ কম বয়সে বিয়ের সুযোগটির অপব্যবহার ঘটতে পারে। তাই এ অনুবিধিটি বাতিল করার অনুরোধ জানাই।

সহকারী অধ্যাপক

জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements

নিম্ন রক্তচাপ-ও সমস্যা তৈরী করতে পারে…

low-blood-pressure

খাবারের রেসিপিঃ কয়েক পদের কেক

recipe-cake-puddingcakes

বিভাগ:খাদ্য

কমলালেবুর যতোসব গুণাগুণ…

orange

বিভাগ:খাদ্য

ইউটিউব-এর টুকিটাকি

youtube-spread