প্রথম পাতা > অপরাধ, অর্থনীতি, ইতিহাস, বাংলাদেশ, রাজনীতি > এখনো ক্ষমা চায়নি পাকিস্তান !

এখনো ক্ষমা চায়নি পাকিস্তান !

ডিসেম্বর 17, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

মির্জা মেহেদী তমাল : পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ৩২ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতার পর থেকে এই পাওনার বিষয়ে বার বার পাকিস্তানের কাছে দাবি উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ।

কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি দেশটির। অবশ্য শুধু টাকার এই অঙ্ক নয়, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত তিন ইস্যুর বিষয়েই কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম দাবি গণহত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, দ্বিতীয়টি ক্ষতিপূরণ এবং তৃতীয় দাবি, এ দেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেওয়া। কিন্তু দেশটি কৌশলে এ তিন ইস্যু এড়িয়ে গেছে। উল্টো তারা বাংলাদেশের কাছে ৭০০ কোটি টাকা পায় বলে দাবি করেছে। বাংলাদেশের এই পাওনা আদায়ে কমিশন গঠনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, বাংলাদেশ তার পাওনা বুঝে নেওয়ার খবরে পাকিস্তান নতুন করে ফন্দি আঁটছে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতা তুলে ধরতে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়াতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, শিগগিরই কূটনৈতিক তত্পরতা শুরু করবে বাংলাদেশ সরকার। এর আগে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালেও পাকিস্তান সরকারকে এ পাওনা পরিশোধ করতে বলেছিল। দ্বিতীয় দফা ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাকিস্তানের কাছে পাওনা আদায় নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যায়ে মৌখিকভাবে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচারকাজ নিয়ে তাদের অভিযোগের পর এ পাওনা আদায়ে আরও সক্রিয় হয়েছে সরকার। এদিকে স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা আদায় না করতে পারায় সরকারের প্রতি বিভিন্ন মহলের চাপ বাড়ছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট বলা আছে, একটি রাষ্ট্রের কাছে যদি আরেকটি রাষ্ট্র পাওনা থাকে তাহলে সে পাওনা দিতে ওই রাষ্ট্র বাধ্য। ফলে এ আইন ব্যবহার করেও দ্বিপক্ষীয়ভাবে বাংলাদেশ পাওনা আদায় করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২৪ বছরের অর্থনৈতিক বঞ্চনা পেরিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও বাংলাদেশের বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস ফুরায়নি এখনো। বাংলাদেশের সম্পত্তির হিস্যা বুঝিয়ে দেয়নি পাকিস্তান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৮ সালের মধ্যেই দাতা দেশগুলোকে সমস্ত ঋণ দিয়ে দেয় এই শর্তে যে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্পদের হিস্যা পাবে। আমরা তখন জনসংখ্যার দিক দিয়ে ৫৪ শতাংশ ছিলাম। সেই হিসাবে আমরা ৫৪ শতাংশ সম্পত্তি দাবি করতে পারি। ’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কমনওয়েলথ সম্মেলনে এটা উপস্থাপনের পর আজ পর্যন্ত এ দাবি আর কেউ তোলেনি। তবে নীতিগতভাবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটা তোলার সুযোগ এখনো আছে। তিনি বলেন, সরকারকে এখনই এ উদ্যোগ নিতে হবে। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে কমিশন গঠন করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করবে কমিশন। আর এটি নির্ধারণ করা হলে ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা সফরে এলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৪ হাজার মিলিয়ন ডলার পাওনা দাবি করেন। তখন ডলারের মূল্য ছিল ৮ টাকা। ৪৪ বছরে যা দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকায়। এর মানে, পাকিস্তানের কাছে আমাদের এখনকার পাওনা ৪০ হাজার মিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে ৩২ হাজার কোটি। এ ছাড়া দেশিবিদেশি বেশকিছু গবেষণাপত্রের হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের কাছে তৎকালীন হিসাবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া পাকিস্তানের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা, জাতিসংঘের হিসাবে যা ১.২ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরগুনা, ভোলাসহ দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় গোর্কি নামের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা যায়। নষ্ট হয় শত কোটি টাকার সম্পদ। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তখন কোনো সহায়তা দেয়নি পূর্ব পাকিস্তানকে। ঘূর্ণিঝড়ের পর পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য আসে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিদেশি মুদ্রাগুলো তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকার শাখায় রক্ষিত ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে বৈদেশিক মুদ্রাগুলো স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের লাহোর শাখায় স্থানান্তর করা হয়। এই অর্থ সরাসরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জোর দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পাকিস্তানের দাবি করা পাওনা টাকার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশকে তার দাবি উপস্থাপনে আরও তত্পর হতে হবে।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর সর্বপ্রথম ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের কাছে তিনটি দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবি জানানো হয় বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার। ১৯৮১ সালে জাতিসংঘের ঘোষিত ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে কম সময়ে বেশি গণহত্যা করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ঢাকা সফরে এসে একাত্তরকে তৎকালীন সময়ের একটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীল ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেন। তবে ২০০২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ঢাকায় এসে ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে গণহত্যার দায় স্বীকার করেননি তিনি। অবশ্য পাকিস্তানের সরকার ক্ষমা না চাইলেও ২০০২ সালে পাকিস্তানের নাগরিক সমাজের ৫১টি সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশের কাছে আরও আগেই ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। সূত্র জানায়, পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের আরেকটি দাবি আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেওয়ার। ২০০৬ সালে জাতিসংঘে শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) সমীক্ষা অনুযায়ী সে সময় বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানির সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার। গত চার দশকের মধ্যে নওয়াজ শরিফের সরকার সৌদি আরবভিত্তিক জামাতুদদাওয়ার অর্থায়নের মাধ্যমে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বাংলাদেশে বসবাসরত পাকিস্তানিদের নিজ দেশে পুনর্বাসন করার জন্য নওয়াজ শরিফের সরকার একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, যেখানে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আটটি জেলায় ১০ মিলিয়ন রুপি ব্যয়ে ৫ হাজার ইউনিটের একটি আবাসন প্রকল্প তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু জামাতুদদাওয়া অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ার পর আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেওয়াও থেমে যায়। যদিও এর আগেই পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধুর জনগণ বিহারিদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বিরোধিতা করে। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে লাহোর হাইকোর্ট এক ঘোষণায় বলে, বাংলাদেশে যেসব পাকিস্তানি বসবাস করছে তারা বাংলাদেশের নাগরিক।

সূত্রমতে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বিশেষ করে সিমলা চুক্তির পর পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ নিয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন। অনেকটা গুছিয়েও এনেছিলেন। তার সময়েই পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কূটনৈতিক দূরদর্শিতাতেই ১৯৭৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। কিন্তু ’৭৫ সালে তাকে সপরিবারে হত্যার পর এগুলো আর তেমনভাবে এগিয়ে যায়নি। শুরুর দিকে পাকিস্তান এ বিষয়গুলো স্বীকার করলেও পরে আলোচনায় আর আগ্রহ দেখায়নি।

কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ অনুসারে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে ক্ষমতা আরোহণের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বকে শুভেচ্ছা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত। ওই সময় জিয়া এম ইস্পাহানিকে বাংলাদেশের তিন দাবির কথা স্পষ্টই জানিয়ে দেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সে বছর একই কথা জানানো হয় ঢাকার পাকিস্তানের হাইকমিশনার আলমগীর বাশার খান বাবরের কাছে। পরের বছর ২০১০ সালে ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র সচিবদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বাংলাদেশের দাবির কথা পুনরায় উল্লেখ করা হয়। আর সর্বশেষ ২০১১ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের নতুন হাইকমিশনার আফরাসিয়াব মেহদি হাশমির কাছেও পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়। পরে ২০১২ সালে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার ঢাকায় এলে বাংলাদেশের দাবির কথা জানানো হয়। তখন হিনা রাব্বানি একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর আর তেমন আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ শুরু করে পাকিস্তান। শুরু হয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উত্তেজনা।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৬

pak-admission-of-war-crimes

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: