আর্কাইভ

Archive for ডিসেম্বর 15, 2016

সৌদির বিরুদ্ধে জার্মানিতে সালাফিদের সহযোগিতার অভিযোগ

salafist-demo-solingen-germany-010512

A Salafist demo in Solingen, Germany dated May 1, 2012

সরাফ আহমেদ : জার্মানিতে উগ্রপন্থী সালাফি আদর্শের অনুসারী ইসলামি সংগঠন বা দ্য ট্রু রিলিজিয়নকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর ওই ধর্মীয় সংগঠনটিকে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে আর্থিকভাবে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। চার সপ্তাহ আগে জার্মানিতে এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার পর জার্মানি সরকার সৌদি আরবকে এই ধরনের সন্ত্রাসী ইসলামি সংগঠনগুলোকে আর্থিক অনুদান বা সহযোগিতা না করতে অনুরোধ করেছে।

জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছেন, দেশটিতে সালাফি আদর্শের ন্যূনতম ১০ হাজার অনুসারী রয়েছে। এরা মসজিদ নির্মাণ, ধর্মীয় প্রশিক্ষণ, ধর্মীয় প্রচার ও গবেষণা কাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দীর্ঘদিন থেকে আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থা আরও জানিয়েছে, সালাফি অনুসারীদের দ্বারা যেন জার্মানিতে অবস্থানরত শরণার্থীরা সেদিকে ঝুঁকে না পড়ে সেদিকে তাদের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।

জার্মানির দুটি গোয়েন্দা সংস্থা সালাফিদের আর্থিক সহযোগিতার ব্যাপারে কুয়েতের রিভাইভাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি, কাতারের শেখ ঈদ চ্যারিটি ফাউন্ডেশন ও সৌদি আরবের মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ নামের সংগঠনগুলোকে শনাক্ত এবং আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে। সালাফি আন্দোলন বা দ্য ট্রু রিলিজিয়ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে জার্মানির ছোটবড় শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে ধর্মীয় বইপুস্তক বিতরণ এবং ধর্মীয় বিষয় নিয়ে জনসাধারণের সঙ্গে আলোচনা করে আসছিলেন।

সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোথার ডা ম্যাজেয়ার গত মাসে বলেছিলেন, জার্মানির মতো গণতান্ত্রিক দেশে মৌলবাদী কোনো আন্দোলনকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিপূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্য ট্রু রিলিজিয়ন সংগঠনটির বিরুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো এবং সিরিয়া ও ইরাকে গিয়ে আইএসের পক্ষে লড়াই করতে ১৪০ জন জার্মান তরুণকে প্ররোচিত করার অভিযোগ রয়েছে।

german-salafists

দৈনিক প্রথম আলো, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements

একাত্তরের বন্ধু সাংবাদিক মার্ক টালি

mark-tullyসাইফ ইমন : একাত্তরের বিবিসি বলতে তৎকালীন সবাই মার্ক টালিকেই জানত। মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি ছিলেন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আশার আলো। যুদ্ধ চলাকালীন হারিকেন বা কুপির মিটি মিটি আলো জ্বালিয়ে রেডিওর এরিয়াল তুলে সকালসন্ধ্যা বিবিসিতে মার্ক টালির কথা শোনার জন্য উৎকণ্ঠিত থাকত পুরো দেশ। তিনি যখন কথা বলতেন পিনপতন নীরবতা সবদিকে। কী বলছেন তিনি! মুক্তিযোদ্ধারা নাকি একে একে নাজেহাল করে চলেছে পাকবাহিনীকে। তার কণ্ঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত প্রতিটি বাঙালির বুকে। ১৯৭১এ মার্ক টালির বয়স ছিল ৩৫ বছর। জীবনের ১০টি বছর বাঙালি পরিবেষ্টিত আঙিনায় কাটলেও পড়াশোনা করেন মার্লবরো ও ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। পাদ্রি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভর্তি হলেন লিঙ্কন থিওলজিক্যাল কলেজে, কিছু দূর এগোলেনও। তারপর বুঝতে পারলেন তার চাই গতিময় ও অনুসন্ধিত্সু জীবন। জীবনে চাই পদে পদে চ্যালেঞ্জ! তাই ১৯৬৪তে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বিবিসি রেডিওতে যোগ দেন মার্ক টালি। ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৫তে চলে এলেন দিল্লিতে। তখন থেকেই শুরু হলো তার পূর্ব পাকিস্তান পর্যবেক্ষণ।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিবিসি টিমে যারা কাজ করতেন তাদের অগ্রনায়কের আসনে ছিলেন এই মার্ক টালি। প্রতি মুহূর্তে বাঙালিদের চাঙ্গা করতে তার কণ্ঠের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রতি মুহূর্তে নিয়ে আসতেন তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা ভরপুর খবরাখবর। তার দাবি, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর হামলা চালানোর আগে হিসাবে ভুল করেছিল। এ প্রসঙ্গে মার্ক টালি বলেন, একাত্তরে বাঙালিদের ওপর আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিশাল ভুল করেছিল। আমি রাজশাহী গিয়েছিলাম এবং দেখেছিলাম সব গ্রাম আগুনে ভস্মীভূত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পুরো দেশকে ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করেছিল। পুরোদেশ যেন ভূতের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। খুব কাছ থেকে দেখছিলাম মানুষের সেই নিদারুণ কষ্ট। দগদগে ক্ষতগুলো! বাংলাদেশের অকৃতিম বন্ধু স্যার উইলিয়াম মার্ক টালিকে আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে আসছে বাংলাদেশের মানুষ।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্মাননা

সত্যিই অবিশ্বাস্য! চমৎকার লাগছে! বাংলাদেশের মানুষ আমাকে এই বিরল সম্মানে ভূষিত করেছে। আমি আমার সাধ্যমতো শিশু বাংলাদেশকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। এই সম্মাননা আমাকে আমার অতীতের সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে! এক কথায় বলতে গেলে অনেক উত্তেজনাকর মুহূর্ত ছিল সেই দিনগুলো। এভাবেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্মাননা পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অকৃতিম এই বন্ধু। বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্মাননা নিতে ২০১২ সালের ১৮ ক্টোবর ঢাকায় আসেন স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি। এ ছাড়াও তিনি আরও কিছু সম্মাননায় ভূষিত হন। মার্ক টালি ১৯৮৫ সালে ওবিই পদবিতে ভূষিত হন। এরপর ১৯৯২ সালে পদ্মশ্রী পদক লাভ করেন। ২০০২ সালে নতুন বছরের সম্মাননা স্বরূপ নাইট উপাধি লাভ করেন। ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ পদক লাভ করেন। ভারতে অবস্থান করে তিনি ১৯৮৫ সালে তার প্রথম গ্রন্থ অমৃতসর : মিসেস গান্ধীজ লাস্ট ব্যাটেল প্রকাশ করেন। এতে তিনি তার সহকর্মী ও বিবিসি দিল্লির প্রতিনিধি সতীশ জ্যাকবকে নিয়ে এ গ্রন্থটি রচনা করেন। এ ছাড়াও ১৯৯২ সালে টালির অন্যতম সেরা গ্রন্থ নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া প্রকাশিত হয়।

বাঙালি মায়ের সন্তান

মার্ক টালির জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৫ অক্টোবর ধনাঢ্য ইংরেজ পরিবারে হলেও জন্মস্থান কিন্তু কলকাতায়। মার্ক টালির কেন এই বাংলাদেশের প্রতি নাড়ির বাঁধন অনেকেই হয়তো জানেন না। মার্ক টালির মা ছিলেন বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার মেয়ে। বাবা ব্রিটিশ রাজত্বে ব্যবসার সুবাদে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে পাট কিনতে আসতেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থায়িত্ব বেড়ে যায় তার মা বাঙালি বলে। তার পিতা ব্রিটিশ রাজের নিয়ন্ত্রণাধীন শীর্ষস্থানীয় অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ছিলেন। শৈশবের প্রথম দশকে ভারতে অবস্থান করেন। কিন্তু ভারতীয়দের সঙ্গে সামাজিকভাবে মেলামেশার সুযোগ পাননি তিনি।

ইংল্যান্ডের বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। টাইফোর্ড স্কুলে পড়ার পর ভর্তি হন মার্লবোরো কলেজে। এরপর ট্রিনিটি হলে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে বেশ কিছু দিন পড়াশোনা করেছেন তিনি। এরপর তিনি ক্যামব্রিজের চার্চ অব ইংল্যান্ডে পাদ্রি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লিঙ্কন থিওলজিক্যাল কলেজে দুই মেয়াদে পড়াশোনার পর এ চিন্তাধারা স্থগিত করেন। এখানে ভর্তি হয়ে খ্রিস্টান পাদ্রিদের আচরণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন।

ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন বা বিবিসির নয়া দিল্লি ব্যুরোর সাবেক প্রধান। ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে প্রধান পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। এর আগে বিবিসিতে প্রায় ৩০ বছর কর্মরত ছিলেন। দিল্লি ব্যুরোর প্রধান পদে ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন মার্ক টালি।

এছাড়াও তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। মার্ক টালি লন্ডনের ওরিয়েন্টাল ক্লাবের সদস্য।

সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৫ ডেসেম্বর ২০১৬

বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস এবং এখনকার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থা

rayerbazar-5তসলিমা নাসরিন : বয়স অল্প ছিল একাত্তরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি নতুন পতাকা হাতে নিয়ে হাটে মাঠে ঘাটে স্বাধীনতার উৎসব করতাম। প্রতি বছর ষোলোই ডিসেম্বর এলে ভোররাত্তিরে উঠে বাড়ির ছাদে পতাকা উড়িয়ে দিতাম, আমার দেশের পতাকা। দেশটিকে একাত্তরের পর থেকে নিজেরই ভেবেছি। আমার দেশটি এখন আর আমার নয়। মনে মনে যদিও একে আমার বলেই ভাবি। খুব গোপনে, সন্তর্পণে ভাবি একে আমার বলেই। দেশের শত্রুরা আমাকে দেশ থেকে সেই দুদশক আগে তাড়িয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিল এ দেশ আমার নয়। এরা দেশের সেই শত্রুদেরই বান্ধব অথবা সন্তান যে শত্রুরা এ দেশের স্বাধীনতা চায়নি, যে শত্রুরা একাত্তরে ধর্ষণ করেছে আমাদের নারী, যে শত্রুরা হত্যা করেছে দেশের বুদ্ধিজীবী, হত্যা করেছে অগণিত নিরপরাধ মানুষ।

বর্বর শত্রুসেনা নির্যাতন করেছে আমাদের পরিবারের সবাইকে। লুট করেছে আমাদের বাড়িঘর, সহায় সম্পদ। শুধু প্রাণটুকু বাঁচাতে একাত্তরের নমাস এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে পালিয়ে বেড়িয়েছি। গভীর অন্ধকারে মোষের গাড়িতে চেপে অনাত্মীয় অপরিচিত বাড়িতে গিয়েছি, আশ্রয় চেয়েছি। শত্রুদের আগুনে গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে যেতে দেখেছি। যে শত্রুরা পাকিস্তানি বর্বর সেনা দিয়ে আমাদের বাড়ি লুট করিয়ে ছিল, অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছুঁড়ে দিয়েছিল আমাদের তারাই আজ দেশের আপনজন। আর আমি এবং আমার মতোরা আপাদমস্তক নিষিদ্ধ।

ওরা চট জলদি হত্যা করেছিল বুদ্ধিজীবীদের। আজ ওরা নিরাপদে, নিশ্চিন্তে, ভেবেচিন্তে বুদ্ধিজীবী হত্যার ছক আঁকে এবং এক এক করে বুদ্ধিজীবী হত্যা করে। ওরা ধরা পড়ে না, ওরা ধিকৃত হয় না, লাঞ্ছিত হয় না। সত্য বলতে কী, ওদের কোনও শাস্তি হয় না। আমি যদি দেশে থাকতাম, অনেক বছর আগেই ওরা আমাকে কুপিয়ে মেরে ফেলত। বাংলাদেশ যখন প্রতিবছর চৌদ্দই ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পালন করে, তখন আমি ভাবি এই দিবস শুধু একটি দিনে বা দিবসে কেন সীমাবদ্ধ? মুক্তচিন্তা বা মুক্তবুদ্ধির মানুষদের দেশের সর্বত্র প্রায়ই হত্যা করা হচ্ছে কুপিয়ে। নৃশংসতার সাধারণত সীমা থাকে, এই নৃশংসতা সীমাহীন। বছরের যে কোনো দিনেই খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা, আমাদের মুক্তচিন্তকরা। শুধু মৌলবাদীরাই যে আমাদের নির্যাতন করছে তা নয়, বাকস্বাধীনতাবিরোধী আইন বানিয়ে মুক্তচিন্তকদের গ্রেফতার করছে সরকার, জেলেও পুরছে।

একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে, লক্ষ করছি, তারাও আজ কাঁদছে, যারা এখনকার মুক্তচিন্তকদের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি। এর নাম ভণ্ডামো নয়তো? একাত্তরে মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম আমরা বাঙালিরা। যুদ্ধ করেছিলাম পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন করেছিলাম, বাংলাদেশ তার নাম। বাংলাদেশ এই নামটি উচ্চারণ করলেই এক সময় ময়ূরের মতো নাচতো মন। সেই মন কোথায় আজ? সেই মন কিন্তু ভিনভাষী ভিনদেশি কেউ এসে নষ্ট করেনি, নষ্ট করেছি আমরাই। আমরাই স্বাধীনতার শত্রুদের আদর আপ্যায়ন করেছি। আমরাই আমাদের ধর্ষক আর খুনিদের বড় আসন দিয়েছি বসতে। প্রতিদিনই তো আমরা আমাদের অসাম্প্রদায়িক আদর্শকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দেখছি, কিন্তু কিছু বলছি না। যে সন্ত্রাসীরা আমাদের হত্যা করেছিল, তাদের পুনর্বাসন আমরাই করেছি, আমরাই এখন ওদের হাতে নিজেদের খুন হয়ে যাওয়া দেখছি। দেখছি কিন্তু কিছু বলছি না। বলছি না কারণ আমরাও ভেতরে ভেতরে একটু আধটু মৌলবাদী, আমরাও ভেতরে ভেতরে একটু আধটু সাম্প্রদায়িক। এই আমরাটা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি মাননীয় মন্ত্রীবৃন্দ।

সাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্রটি নিজেকে অনেকটাই বদলে নিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার দিকে বলে কয়েই যাত্রা শুরু করেছে। আজ তার একটি রাষ্ট্রধর্ম আছে। স্বাধীন আর পরাধীন রাষ্ট্রের শাসকে আজ আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে, শাসকেরা জানে, মৌলবাদীদের আশীর্বাদের প্রয়োজন। আমাদের ক্ষমতালোভী শাসকেরা গদি রক্ষার্থে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে ওলামা লীগ, হেফাজতে ইসলাম নামক ভয়ংকর মৌলবাদী দলগুলোকে। এর শুরুটা অবশ্য হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। আমার বিরুদ্ধে যখন লাখো মৌলবাদীর মিছিল হল, আমার মাথার মূল্য নির্ধারণ করা হল, প্রকাশ্যে আমাকে হত্যার হুমকি দেয়া হল তখন সরকার মৌলবাদীদের পক্ষ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিল এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করল। সরকারের না হয় গদির লোভ ছিল। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করেছিলাম তখনকার সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী সমাজ সরকারের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ তো করেননি উল্টো কী দরকার ছিল ওভাবে লেখার জাতীয় মন্তব্য করে বিষয়টিকে আমার ব্যক্তিগত সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গেছেন। আজকের বাংলাদেশ সেই এড়িয়ে যাওয়ারই ফল। একের পর এক প্রগতিশীল ব্লগার, লেখক, শিক্ষক, ছাত্র হত্যার পরও তাঁরা নীরব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। দেশ মৌলবাদীদের দখলে যাচ্ছে যাক, তাতে তাঁদের কিচ্ছু যায় আসে না। তাঁরা মেতে আছেন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক এবং নানা পদক পুরস্কার নিয়ে। অঢেল অর্থ থাকার পরও তাঁরা চিকিত্সার জন্য সরকারি অর্থের আশায় থাকেন। এঁদের বুদ্ধিজীবী বলতে আমার বাঁধে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, গুলশান ক্যাফেয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী ঘটনার পর সরকারের তত্পরতা দেখে ভেবেছিলাম এবার অন্তত তারা মৌলবাদজঙ্গিবাদ তোষণ বন্ধ করবে। অথচ ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই অন্যতম আসামি হাসনাত ও তাহমিদ মুক্তি পেয়ে যায়। নিজেদেরকে জিম্মি দাবি করলেও ঘটনার বিভিন্ন ছবি ভিডিওতে তাদের হাতে অস্ত্র ও জঙ্গিদের সাথে নিশ্চিন্তে হেঁটে বেড়াতে দেখা গেছে। এ রকম ভয়ংকর অপরাধীদেরও জামিন মঞ্জুর হয়ে যায়। অথচ বই সম্পাদনার দায়ে রোদেলা প্রকাশনীর মালিক শামসুজোহা মানিকের এখনও জামিন মঞ্জুর হয় না। হত্যাকাণ্ড মেনে নিচ্ছে সরকার, কিন্তু ভিন্নমত মানছে না। কতটা অসভ্য হলে, অজ্ঞ হলে, অশিক্ষিত হলে এ সম্ভব, তা অনুমান করতে পারি।

কাল বাংলাদেশে বিজয় দিবস পালন করা হবে। যে মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমরা নমাস লড়াই করে জয়ী হয়েছিলাম, আমাদের স্বাধীন দেশে সেই মৌলবাদী অপশক্তিই আজ স্বাধীনতা উপভোগ করছে। তাদের আছে শতভাগ বাকস্বাধীনতা। আর আমরা যারা সমাজকে সুস্থ করতে চাই, নারী পুরুষের সমানাধিকার চাই, মানবাধিকার চাই, মানুষে মানুষে সমতা চাই, তারা আজ দেশের শত্রু, আমাদের বাকস্বাধীনতা নেই বললেই চলে। আমাদের পুরনো শত্রুরাই আজ দেশের হিতাকাঙ্ক্ষী সেজে বসে আছে, তারাই আজ জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট। তারা আজ বুদ্ধিজীবীদের গালি পাড়ুক, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করুক, তাদের সাত খুন মাফ।

তাদের বাক স্বাধীনতায় কেউ বাধা দিয়েছে? এই যে সগৌরবে লেখকের মাথার দাম ঘোষণা করছে ওরা, কেউ বলেছে ওদের যে এ অন্যায়, কেউ ওদের গ্রেফতার করেছে? আমার মাথার দাম যে লোকটি ঘোষণা করেছিল প্রথম, তাকে আওয়ামী লীগ আমন্ত্রণ জানিয়ে দলে ভিড়িয়েছে, বড় নেতা বানিয়েছে। আর কত অকল্যাণ দেখতে হবে বেঁচে থেকে? এ দেশকে এখন আমার দেশ বলতে লজ্জা হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস, আর বিজয় দিবস নিতান্তই অর্থহীন দুটো দিবস আজ।

আমরা দেশটির আদর্শই ধরে রাখতে পারিনি। যারা সেই আদর্শকে কুপিয়ে হত্যা করেছে, তারাই আজ সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি কোন পথে যাবে, তারাই সিদ্ধান্ত নেয় এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা কী লিখবেন, কী লিখবেন না, কী বলবেন, কী বলবেন না। দেশটিতে কে বাস করবেন, কে করবেন না। কে বাঁচবেন, কে বাঁচবেন না। তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তাদের সিদ্ধান্তের বিপরীত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষমতাসীনদেরও নেই।

মত প্রকাশঅপ্রকাশ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এসে যদি দেখি আমাদের অর্জন কী—তাহলে নিঃসন্দেহে অনেক পরিসংখ্যান চলে আসবে। অর্থনৈতিকভাবে আমাদের দৃঢ় অবস্থানই বারবার আলোচনায় আসবে। কিন্তু গণতন্ত্রের পথে চলার ঘাটতিগুলো কতটা দূর করতে পেরেছি, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে।

মত প্রকাশের যে অধিকার, তাই এখন সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে বলে মনে করছি। লিখতে গিয়ে, বলতে গিয়ে কত অভিজিৎ রায়কে মরতে হলো, কতজনকে দেশ ছাড়তে হলো! সরকারের বাইরেও যে মত প্রকাশের ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো শক্তি থাকে, এটা তার প্রমাণ। সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল বা মহল, যারাই মানুষের নিজের কথা বলা এবং জানানোর অধিকারকে অস্বীকার করে, তারা চরিত্রে অত্যন্ত হিংস্র হয়ে থাকে। মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার প্রচণ্ড ক্ষমতা আছে তাদের।

অবশ্য অনেকেই বলবেন, মত প্রকাশের একটা সীমা থাকতে হয়। যা খুশি বলার অধিকার দেওয়া হয়নি কোথাও। কোনও কথা বা বক্তব্য, যদি বড় আকারের সহিংসতা, রক্তপাত বা নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে এবং তার ফলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, তবে হয়তো তার প্রচার বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা দরকার। তবে বাংলাদেশে বেশি উদ্বেগ ধর্ম নিয়ে লেখালেখিতে। যারা এই বিষয়ে লেখালেখি করেন, তাদের প্রতি প্রায় সবার উপদেশ থাকে, তারা যেন কারও অনভূতিতে আঘাত না করেন। যারা এমন নসিহত করছেন, তারা তাদের নিজস্ব ধর্মের বাইরে অন্য ধর্ম নিয়ে বিরামহীন কটাক্ষ করে যাচ্ছেন বা কটাক্ষ দেখে চুপ করে থাকেন। তখন এই অনুভূতির প্রশ্ন ওঠে না।

যারা ধর্মীয় রাষ্ট্র করতে চায় বাংলদেশকে, তারা কিংবা সরকারে থাকা ব্যক্তিবর্গ, তারা খুব কমই মানতে চান যে, কেউ যে কোনও মত প্রকাশ করতে পারেন স্বাধীনভাবে যদি না তিনি তা করতে গিয়ে সহিংসতার পথ বেছে নেন। বাংলাদেশের সংবিধানে মত প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত। আছে তথ্য অধিকারের মতো আইনও। এরপরও মত প্রকাশের পথে প্রতিবন্ধক অনেক আইন আছে কিংবা নতুন নতুন আইন প্রণীত হচ্ছে। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা রয়েছে সেটির অপব্যবহার দেখছি প্রতিনিয়ত। এই আইন ব্যবহার করে যখনতখন যাকে তাকে ইচ্ছামতো বিপদে ফেলার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। এই রকম ধারা মত প্রকাশের অধিকারকে খর্ব করার অস্বাভাবিক ক্ষমতা দিয়েছে বলা যায়।

ব্লগার, লেখকদের যারা হত্যা করছে তার পেছনে আছে বৃহত্তর রাজনৈতিক তৎপরতা, যে রাজনীতি বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়। এই চক্রটা খুবই শক্তিশালী ও সক্রিয়। মত প্রকাশের পথে এরাই বড় বাধা। এদের হাতে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব গেলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? দেশকে বাঁচিয়ে রাখাই কষ্টকর হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে যে কেউ যখনতখন হরানির শিকার হতে পারেন।

ধর্মীয় অনুভূতির নামে যারা গলা টিপে ধরে বা হত্যা করে যে কোনও কিছুতেই এই ভাবাবেগ ব্যবহার করতে পারে। আর ক্ষমতাসীনরা পারে রাষ্ট্রদ্রোহের ব্যাখ্যা খুঁজতে। বিরুদ্ধ মত ও সমালোচনা দমনের অনেক ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে আছে। আমাদের ৪৫ বছরের স্বাধীনভাবে পথ চলার এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমনে নানা ধারা ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

তবে বড় সমস্যা হলো ক্ষোভ প্রকাশের সংস্কৃতি। আমরা ক্রমেই একটা ক্ষুব্ধ জাতিতে পরিণত হচ্ছি। যে কোনও ছুঁতোয় ক্ষোভের সহিংস প্রকাশ এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়াটির ভয়ঙ্কর সহিংস প্রকাশ আমরা দেখে চলেছি। আর এদের ভয়ে রাষ্ট্র ভীত কিংবা এদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এদের দাপটে বই নিষিদ্ধ হয়, বই মেলা থেকে বই প্রত্যাহার হয়ে যায়, সেই প্রকাশক জেল খাটেন। এদের দাবির মুখে দাউদ হায়দার, তসলিমা নাসরিনসহ অনেক লেখককে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। লেখার জবাব লেখার মাধ্যমে না দিয়ে হুমকি আর পেশিশক্তির জোরে সবকিছু করে এই গোষ্ঠী। স্বাধীনতার এত বছর পর এসে এই সমস্যাকে গণতন্ত্রের পথে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে হয়। আর আছে রাজনীতির দাপট। আইনের বাইরে শুধু রাজনীতির পরিচয়ের কারণে অনেকের দাপট চোখে পড়ার মতো। রাজনীতির ভেতরে এমনসব চরিত্র আছে, যারা অতিমানবে পরিণত হয়েছেন এবং তারা সমস্ত সমালোচনার ঊর্ধ্বে।

ইতিহাস কিংবা ব্যক্তি কোনও বিষয়েই নির্মোহভাবে, নিরপেক্ষভাবে কোনও কিছু প্রকাশ করা যায় না এখন। সমাজে বহু ধর্মের মানুষ থাকে। দেশের ইতিহাসে নানা রাজনীতি নানা সময় প্রভাব ফেলেছে। মানুষের অনুভূতির বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার সবারই। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কিংবা ইতিহাসের কোনও বিষয়ে বা চরিত্র সম্পর্কে যদি খোলামেলা আলোচনা করা না যায়, তাহলে কোন পথে হাঁটছি আমরা? আমরা কেবলই স্পর্শকাতর, অসহিষ্ণু ও রসবোধহীন হয়ে উঠছি?

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি