প্রথম পাতা > অপরাধ, ইতিহাস, বাংলাদেশ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ > বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডঃ বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করাই ছিল লক্ষ্য

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডঃ বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করাই ছিল লক্ষ্য

ডিসেম্বর 13, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

azad-27-12-71ডা. সারওয়ার আলী : মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লাখ মানুষ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী ধর্মভিত্তিক দলের সদস্যদের গণহত্যার শিকার হয়। এই শহীদদের ব্যাপকতম অংশ ছিল নিরস্ত্র সাধারণ জনগণ, বাঙালি সেনাইপিআরপুলিশ সদস্য, প্রাথমিক পর্যায়ে শরণার্থী শিশু ও নারী এবং অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা।

৯ মাসে সারা দেশে সংঘটিত এই গণহত্যায় নিহতদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবীরা। সব হত্যাকাণ্ডই সমান গুরুত্ববহ এবং স্বজনহারা সবার বেদনা দেশবাসীকে সমভাবে বহন করতে হবে। তাই প্রতিবছর, বিশেষ করে মার্চ ও ডিসেম্বরে আমরা সব শহীদের আত্মদানের প্রতি সম্মান জানাই। তবে আমরা বিজয়ের আগ মুহূর্তে শনাক্ত করে বিশিষ্ট সাংবাদিক, ডাক্তার, শিক্ষক ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর স্মরণে ১৪ ডিসেম্বর আলাদাভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করি। এর তাৎপর্য সম্যক উপলব্ধির জন্য পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ভাবাদর্শ এবং একাত্তরে গণহত্যার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী ও ধর্মাশ্রয়ী নেতৃত্বের রণনীতির বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। এর ফলে বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতাও বিবেচনা করা সম্ভব হবে।

সব দেশে নানা ধর্ম ও জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে, এমনকি ভারতবর্ষের মতো বহুজাতিক রাষ্ট্রও রয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে হাজার মাইল দূরত্বে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ‘মুসলমানদের স্বাধীন আবাসভূমি’র অবৈজ্ঞানিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভাবাদর্শে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। উভয় দেশে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে সৃষ্ট পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সম্ভবত এ গরমিলটি উপলব্ধি করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জন্মলগ্নেই ঘোষণা করেন যে আজ থেকে আমরা মুসলমান বা হিন্দু নই, আমরা সবাই পাকিস্তানি। এ ধারণাকে হয়তো স্বায়ত্তশাসিত গণতান্ত্রিক ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে কিছুকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারত। সে পথ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী গ্রহণ করেনি। ঐতিহাসিক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদের ভাষায়—আধুনিক রাষ্ট্রমাত্রই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে জাতিগত বৈষম্য বজায় রাখার জন্য প্রাথমিকভাবে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং পরিশেষে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করে সামরিক শাসনের আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই পাকিস্তানের ভাবাদর্শ রক্ষার জন্য তারা প্রথম আঘাত হানে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর।

এর ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সমর্থক মুক্তচিন্তার ছাত্রনেতা, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের দ্রুত মোহমুক্তি ঘটতে থাকে, যা আমরা লক্ষ করি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সুফিয়া কামাল কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তাধারা ও কার্যক্রমে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯৪৯ সালেই নিবন্ধে জানালেন —আমরা মুসলমান কিংবা হিন্দু সেটি যেমন সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য আমরা বাঙালি। এক বছরের মধ্যে সূচিত হলো ভাষা আন্দোলন। আমাদের ধর্ম পরিচয় ও জাতি পরিচয়ের মধ্যে কল্পিত দ্বন্দ্ব আবিষ্কার করার পাকিস্তানি শাসকবর্গের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হলো। একাত্তর অবধি পাকিস্তানের ভাবাদর্শ প্রত্যাখ্যান করে গড়ে উঠল গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী চরিত্রের রাজনীতিবিদ এবং ছাত্রদের আন্দোলন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার আন্দোলন এই জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গণআন্দোলনকে বেগবান করে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরে গণআন্দোলনের জন্ম দেয়। পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চলে সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের কার্যক্রম, আর তার অগ্রসেনানি মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা প্রায় শিক্ষাগুরুর মতো পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক ভাবাদর্শের মূলে কুঠারাঘাত করে চলেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্ম দেয়।

সমগ্র পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের শাসকরা তাদের পূর্বাঞ্চলের এই সংগ্রাম ভারত ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচারণার ফসল বলে আখ্যায়িত করে এবং এই চিন্তাধারায় মোহবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিশেষ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের শিক্ষক ও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা; যা যুদ্ধাপরাধের বিচারের অভিযোগনামায় স্পষ্ট হয়েছে। বিদেশি সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় ধর্মাশ্রয়ী আদর্শিক দলের নেতাকর্মীরা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করে হত্যা করে। তারই সর্বশেষ নিদর্শন পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করে হত্যাযজ্ঞ।

তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম নিছক একটি ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের রাষ্ট্রের বিপরীতে একটি সব ধর্মের সমঅধিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। আর এ সংগ্রামে দেশান্তরী ও অবরুদ্ধ দেশে থেকে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। অবশ্য স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও নতুন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পটভূমিতে এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। পাকিস্তানের মতাদর্শকে বহন করে এই অপশক্তি পবিত্র ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শের রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের জন্য শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন আজ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

লেখক : ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

সংস্কৃতি ধ্বংসের নীলনকশা হয় একাত্তরে

corpses-foundডা. এম এ হাসান : বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বুদ্ধিজীবী হত্যা শুধু ডিসেম্বর মাসেই হয়েছে বা আলবদর বাহিনীই হত্যা করেছে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যে গণহত্যার সূচনা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী—এরই অংশ ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই এ অঞ্চলে আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণআন্দোলন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের ফলে আইয়ুব খানকে সরিয়ে যখন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নেন তখন তিনি নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু এই নির্বাচন ছিল শুধুই একটি বহিরাবরণ এবং এখানকার গণজোয়ারকে নষ্ট করার একটি কৌশল। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা নানা গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং এখানকার মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহা দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। তাই পশ্চিম পাকিস্তানিরা নানা ছক করছিল। প্রথমত, তারা সমস্যাটাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের চিন্তা করেছিল। এ জন্য তারা দলগুলোকে বিভাজনের চিন্তা করে। তাদের অনুগতদের দিয়ে পাকিস্তানবিরোধীদের একটি তালিকা প্রণয়নের চেষ্টা করে। সেই তালিকায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যাঁরা অংশ নেন তাদের থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় যাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন তাঁদের চিহ্নিত করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ করে তখন তাদের ওপর নির্দেশ ছিল স্থানীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষকদের তালিকা তাদের কাছে প্রেরণ করার।

এই প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চের রাতে গণহত্যার একটি অংশ ছিল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বাহিনীর প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজ। এই তাজ ২৪ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ছিলেন। চট্টগ্রামে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে যেসব বাঙালি সেনা অফিসার ছিলেন তাঁদের ২৫ মার্চ রাতেই হত্যা করেন। তিনি বা তাঁর নির্দেশে সে রাতে প্রায় ৮০০ বাঙালি সেনা সদস্যকে হত্যা করা হয়। এরপর সে রাতেই তিনি চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় এসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ চালান। ২৬ মার্চ ভোরে তিনি জগন্নাথ হলে আসেন। জগন্নাথ হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশনা দেন কোন কোন শিক্ষককে হত্যা করা হবে। সেই শহীদ শিক্ষকদের একজন ছিলেন অধ্যাপক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব। যাঁকে আমি এবং আমার ভাই শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম, আমরা ২৭ তারিখে উদ্ধার করার চেষ্টা করি। ঘটনাটি আমি অত্যন্ত ভালোভাবে জানি, কারণ ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবের পালিত কন্যা ছিলেন আমার খালা। তিনি এবং পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকজনের সাক্ষ্য থেকে আমরা জানতে পারি, এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনোভাবেই তাত্ক্ষণিক ছিল না। এগুলো সবই ‘ভেরি মাচ টার্গেট কিলিং’।

নানা সাক্ষ্য এবং পরে আরো তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজ। আর তাজকে যিনি ওপর থেকে পরিচালনা করেছিলেন তিনি হলেন ব্রিগেডিয়ার জাহান জেড আরবার। এই আরবার ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সার্বিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি দেখছিলেন জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাও ফরমান আলী। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই এমন টার্গেট কিলিং হয়েছে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। গভর্নর হাউসে তাঁর একটি ডায়েরি পাওয়া গিয়েছিল। সেই ডায়েরির মধ্যে বিভিন্ন অধ্যাপকের নাম এবং নামের পাশে চিহ্ন দেওয়া ছিল। সেখানে অধ্যাপক ছাড়াও কিছু সাংবাদিক, চিকিৎসক ছিলেন। এটি সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা ছিল জেনারেল রাও ফরমান আলীর। আর রাও ফরমান আলী এসব করেছেন আরো সুপিরিয়র কমান্ডের নির্দেশে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড প্রথম দিকে পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা কার্যকর করেন। পরে তাঁরা একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’ করেন, সেই কিলিং স্কোয়াডে কাজ করেছে আলবদর বাহিনী। কিন্তু আমরা ধারণা করেছি, বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাঁদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল তাঁরা মূলত বাম ঘরানার এবং তাঁরা দেশকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। এছাড়া যাঁরা এই দেশকে আমেরিকাবিরোধী লবির দিকে নিতে পারেন তাঁদেরই বিশেষ করে টার্গেট করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনীর সহযোগিতা ছিল। সে সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যউপাত্ত আমার কাছে আছে। এখানে সরাসরি দুজন কাজ করেছেন, তাঁদের একজনের নাম আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তিনি একাত্তরের জুনজুলাইয়ের দিকে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন, তাঁর নাম মি. ডুইপ।

বুদ্ধিজীবী হত্যার শেষ সময়টা শুরু হয় নভেম্বর মাসে দুজন ডাক্তারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তাঁরা হলেন ডা. আজহার ও ডা. হুমায়ুন। এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন জামায়াতে ইসলামীর একজন ডাক্তার, যিনি বদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ছিল শেষ টার্গেট। এ দুই দিন যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছিল সেই শহীদদের রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুরের আমবাগান, বাঙলা কলেজ, মিরপুর ৬ নম্বর, জল্লাদখানাসহ প্রায় ২০টি বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল মৌলবাদী শক্তিকে বিকশিত করা। যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আমাদের বিকাশ হয়েছিল আজ যখন তা নানা অপচেষ্টায় আটকে গেছে তখন মনে হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাটা সফল হয়েছে।

লেখক : আহ্বায়ক, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

৩ বছরেও ফেরানো যায়নি মঈনুদ্দীনআশরাফকে, দণ্ড কার্যকর অনিশ্চিত

moinudin-ashrafuzzamanউদিসা ইসলাম : একাত্তরে স্বাধীনতার ঠিক আগে বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে দেশ মেধাশূন্য করার নীলনকশা বাস্তবয়নকারী চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও,বিদেশে অবস্থান করায় তাদের দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানেরা বলছেন, দুই সাজাপ্রাপ্তকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে শক্ত উদ্যোগ নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই আবারও একটি আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা। আর প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা বলছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি এবং পলাতক আসামিদের জন্য গড়ে তোলা সেলএর মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার উদ্যোগ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে পলাতক আশরাফুজ্জামান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে, আর মঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। এই দুই আসামির অপরাধ ও সর্বোচ্চ সাজা হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য জানার পরও তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। তেমনি,বিভিন্ন দেশে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেল গঠনের পরও কাউকেই ফেরানো সম্ভব হয়নি। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতার ঢিলেমিকে দুষছেন কেউ কেউ।

আর এর সুযোগ নিয়ে আশরাফুজ্জামান খান গণমাধ্যমের মুখোমুখি না হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালীন সময়ে, কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন আলজাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে চৌধুরী মঈনুদ্দীন বলেছিলেন, ‘তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হবেন না।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল একটি কৌতুক। তারা একটি সাজানো বিচার করছে।’

বিজয়ের ঠিক আগে ১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ আলবদর বাহিনীর ‘চিফ এক্সিকিউটর’ ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান। আর চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ছিলেন সেই পরিকল্পনার ‘অপারেশন ইনচার্জ’। রায়ে বলা হয়, ‘আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীন যে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত ছিলেন, তা প্রসিকিউশনের তথ্যপ্রমাণে বেরিয়ে এসেছে।তারা কখনও নিজেরা হত্যায় অংশ নিয়েছে। কখনও জোরালো সমর্থন দিয়েছে ও উৎসাহ যুগিয়েছে।’ সে সময় আলবদর বাহিনীর ওপর ইসলামী ছাত্র সংঘের এই দুই নেতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

এই দুর্ধর্ষ দুই আসামিকে ফিরিয়ে আনতে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার উল্লেখ করে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তাদের ঔদ্ধত্য দেখে আসছি। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া আসামিদের কেন ফিরিয়ে আনা যাবে না, এনিয়ে দেশে বিদেশে মুক্তিযুদ্ধমনা যারা আছেন, সবার সম্মিলিত একটি আন্দোলনের ডাক আসা জরুরি।’

শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নূসরাত রাব্বী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এতদূর থেকে গিয়েছি বিচারে সাক্ষ্য দেবো বলে। যে দুই লোক দেশকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দিতে চেয়েছিল, তাদের দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে না, এটা খুবই হতাশাজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বিচার কার্যকর করতে দুইদেশের সরকারের মধ্যে একটি কমনআণ্ডারস্ট্যান্ডিং দরকার। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে উদ্যোগী করে তুলতে আমাদের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টির একটা আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সেল গঠন করেছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সেলের সদস্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা বলাবাহুল্য এই অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প নেই।’

এই মামলার প্রসিকিউটর শাহেদুর রহমান বলেন, ‘এই মামলাটি পরিচালনা সবচেয়ে কঠিন ছিল। আমাদের কাছে দালিলিক তথ্যপ্রমাণ ছিল, কিন্তু সেগুলো গুছিয়ে এনে উপস্থাপন করা সহজ ছিল না। আমরা সাজা নিশ্চিত করতে পেরেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামিদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী উদ্যোগ নেবে সেটি তাদের বিষয়। কিন্তু এরজন্য লেগে থাকার বিকল্প নেই।’

অবশেষে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদারকি সেল গঠন করে। এই সেলের অন্যতম সদস্য তদন্ত সংস্থার সিনিয়র তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সেল থেকে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও পরিস্থিতি যা, তাতে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না।’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: