প্রথম পাতা > অপরাধ, ইতিহাস, বাংলাদেশ, রাজনীতি > তোমাদের [বুদ্ধিজীবীদের] ঋণ কখনও শোধ হবে না

তোমাদের [বুদ্ধিজীবীদের] ঋণ কখনও শোধ হবে না

ডিসেম্বর 13, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

intels-1জামাতশিবির সমর্থক অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিটুডে ৭১এ বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়ে নীচের প্রবন্ধটি বেছে নিয়েছে তাদের পোর্টালে প্রকাশের জন্য কারণ এতে ড. মাহবুব উল্লাহ বুদ্ধিজীবী হত্যায় জামাতশিবিরের তৎকালীন সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী আলবদর আলশামস বাহিনীর সম্পৃক্ততা তুলে ধরেন নি বা তুলে ধরতে ভুলে গিয়েছিলেন ।

একটু চিন্তা করলেই এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, উর্দুভাষী পাকপ্রশাসন ও পাকসেনাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না খুঁজে খুঁজে (বা বাংলা প্রবন্ধনিবন্ধগবেষণাপত্র পড়ে) বের করা কোন কোন বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা অবিভক্ত পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন । সুতরাং ঐসব বুদ্ধিজীবীদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করতে তারা বাংলাভাষী এদেশীয় আলবদর আলশামস রাজাকারদের (শব্দটির অর্থ সাহায্যকারী) সহায়তা নিয়েছিলো । জামাতশিবির বরাবর চেষ্টা করে এসেছে এই ধরণের প্রপাগান্ডা চালিয়ে যে, তারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিলো না বরং সেগুলো ছিলো ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ । ইসলামের খাতিরে মিথ্যা বলা জায়েয মওদূদীর শেখানো হিকমাতে আমালী” অনুসারে । সুতরাং বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে তাদের যোগসাজোশ অস্বীকার করা তাদের জন্য কাকতালীয় ব্যাপার ।

মাহবুব উল্লাহ : ১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। প্রতিবছর বাংলাদেশের জনগণ এই দিবসটি পালন করেন গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে। ১৯৭১এর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এই দেশের বিরুদ্ধে ভয়াবহ গণহত্যার সূচনা করেছিল।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় পাকসামরিক বাহিনীর মূল টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানা। পাকিস্তানি শাসকদের দৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানবিরোধী বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়ে এদেশে যত গণআন্দোলন ও গণসংগ্রাম গড়ে উঠেছিল তার কেন্দ্রীয় ভাবনাটি ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধিকার।

এদেশে যত প্রকার আন্দোলন হয়েছে তার গভীরে স্বাধিকারের চেতনাটিই ফলগুধারার মতো সব সময় প্রবহমান ছিল। অবিভক্ত ভারতে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি হিসেবে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান নামে একটি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি করার দাবি উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল। ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির যে দাবি উত্থাপিত হয়েছিল তার প্রস্তাবক ছিলেন পূর্ব বাংলারই কৃতী সন্তান এবং এদেশের মানুষের অনেক কাছের ব্যক্তি শেরেবাংলা একে ফজলুল হক।

পাকিস্তান প্রস্তাবের মূল দাবি ছিল ভারতের দুই প্রান্তে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পৃথক রাষ্ট্রসমূহ গঠন করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পূর্ব বাংলার জনগণ যেভাবে পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়েছিল ততটা গভীর আগ্রহ ও ঐকান্তিকতা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়নি। ১৯৪৫এ মুসলিম লীগের কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবের মূল চেতনাটি বদলে ফেলা হয়।

দুটি পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের কথা পরিবর্তন করে এক রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সেক্রেটারি আবুল হাশিম সাহেব লাহোর প্রস্তাবের মূল চেতনা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সঙ্গে তার যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু সেই সময় পাকিস্তানের নামে যে আবেগ, উত্তেজনা ছিল তার ফলে এই প্রয়াস রোধ করা সম্ভব হয়নি।

তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারপন্থী নেতারা লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার জন্য স্বাধিকারের দাবি তুলতে থাকেন। প্রকারান্তরে এটি ছিল পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে পৃথক করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

আমরা ওই সময় লক্ষ্য করেছি, ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাব দিবস এলে পূর্ব বাংলার দৈনিক সংবাদপত্রগুলো লাহোর প্রস্তাবের অবিকৃত এবং অপরিবর্তিত ভাষ্যটিই ফলাও করে বক্সের মধ্যে ছাপাতো। এভাবেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার সংবাদপত্র স্বাধিকারের দাবি এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং কার্যত স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেল যে, কেবল ধর্মের মিল থাকলে একটি একক রাষ্ট্র হতে পারে না। একটি জনগোষ্ঠীর ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও জাতি রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। ১৯৪৭এর আগে রাষ্ট্র গঠনে ধর্ম প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৪৭এর পরে পুরো ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবে পাল্টে যায়। ভাষা ও সংস্কৃতি রাষ্ট্র গঠনের মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। আজকের বাংলাদেশ সেই প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক পরিণতি। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি জাতি রাষ্ট্র।

স্বাধীনসার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে প্রথম থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একক কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষকরা তাদের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা সৃষ্টিতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান দুই অর্থনীতির তত্ত্ব উত্থাপন করে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার দাবিকে তাত্ত্বিক ও নীতিগত যৌক্তিকতা প্রদান করেছিলেন।

লাহোরে পাকিস্তান কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশনের এক সেমিনারে তিনি একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে স্পষ্ট করে তুলে ধরেন যে পাকিস্তান একক অর্থনীতির দেশ নয়। এটি দুই অর্থনীতির দেশ। এর ফলে পূর্ব বাংলার উপর একটি অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক কাঠামো চেপে বসেছে। অবশ্য যারা এই তত্ত্ব নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান করেছেন তাদের মতে, রেহমান সোবহান এই ধারণাটি পেয়েছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ কলিন ক্লার্কের কাছ থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ শুধু আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরেনি। তারা স্বাধীন বাংলাদেশে শ্রেণীশোষণমুক্ত একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ কারণেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শে সাম্যের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের উদ্যোগে যে অর্থনৈতিক প্রদর্শনী ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল তাতে আঞ্চলিক বৈষম্য এবং সমাজতন্ত্র দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্ব পেয়েছিল।

অন্যদিকে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষকদের বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। এসব কারণে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ করে তার শিক্ষকমণ্ডলীকে রাষ্ট্রবিনাশী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করত। এ কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠীর আতংকের উৎস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক পাকিস্তানবিরাধী ছিলেন এমনটিও নয়।

intel-muder-rayerbazarএদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তান অনুরাগী ছিলেন এবং পাকিস্তানি ভাবাদর্শে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে তাদের প্রভাব কালক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। প্রগতিপন্থী শিক্ষকরা চিন্তার রাজ্যে প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। পাকিস্তানি শাসক মহল এই পরিবর্তনকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি।

পূর্ব বাংলায় কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা সৃষ্টি হচ্ছে কিনা সেটি ছিল তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব কর্তৃক ক্ষমতা গ্রহণের পরবর্তী বছর প্রাদেশিক গভর্নরদের এক সম্মেলনের জন্য পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি গোপন প্রতিবেদন রচনা করেছিল। প্রতিবেদনের নিচে স্বরাষ্ট্র সচিব এম আনোয়ার আলীর স্বাক্ষর ছিল। প্রতিবেদনটি ইংরেজি ভাষায় রচিত হয়েছিল।

এই প্রতিবেদনের একটি অংশের বাংলা অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় তা হল, ‘একটি সমাজ যখন বড় পরিবর্তনের জন্য তৈরি হয় তখন বুদ্ধিজীবীরা দল ত্যাগ করতে শুরু করে। এমন কোনো সাক্ষ্য নেই যে, পূর্ব পাকিস্তানে এমনটি ঘটছে, বিশেষ করে বৃহৎ আকারে। ১৯৪৭ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একের পর এক বিভিন্ন সরকারের ওপর শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছে।

মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবি সমর্থনের জন্য ছাত্রদের ব্যবহার করেছে এবং পরবর্তীকালে ছাত্ররা এতই শক্তিশালী হয় যে তারা সরকারগুলোকে তাদের হাতে দাবার গুঁটির মতো ব্যবহার করতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ক্ষুদ্র বুদ্ধিজীবী গ্রুপ রয়েছে যাদের মধ্যে তীব্র সংকীর্ণতাবাদী প্রবণতা রয়েছে। এসব প্রফেসর ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে যে নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা খুব গৌরবোজ্জ্বল নয় এবং এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে ছাত্রদের চিন্তাভাবনা এই গ্রুপটির দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

কিছু বুদ্ধিজীবী দল ত্যাগ করলেও বেশিরভাগই সরকারের সঙ্গে রয়েছে। সুতরাং চেষ্টা করা উচিত সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবীদের দলে টানার চেষ্টা করা এবং যারা বিরুদ্ধাচারী হয়েছে তাদের পরিবর্তন করার চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করেছে। পুরনো গ্রুপের পুনর্জাগরণ যা পূর্ববর্তী প্যারাগ্রাফে উল্লেখ করা হয়েছে তা বুদ্ধিজীবীদের আরও ইতিবাচক অবস্থানে টেনে আনবে’ (উৎস : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৩৮)

১৯৬২ সালে ছাত্র আন্দোলনের সময় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এয়ার কমোডর এ আর খান বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা নেই। এসব কিছু প্রমাণ করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বেশ আগে থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। এই সন্দেহ একদিন প্রবল ক্রোধে পরিণত হয়।

১৯৭১এর ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ট্যাংক, কামান ও মেশিনগানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত হয়। বহু ছাত্র প্রাণ হারায়। খুঁজে খুঁজে কিছু শিক্ষককেও হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে দার্শনিক অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, প্রফেসর জোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা এবং পরিসংখ্যানের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান উল্লেখযোগ্য। এ থেকেই বোঝা যায় পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের একটি হত্যা তালিকা করে রেখেছিল।

সবচেয়ে ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দু’দিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের বড় সংখ্যায় হত্যা করা হয়। পাকিস্তান বাহিনীর দোসররা এদেরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজ বাসস্থান থেকে তুলে নিয়ে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে হত্যা করে।

এদের মধ্যে উল্লেখ্য কয়েকজন হলেন. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, . আনোয়ার পাশা, . ফয়জুল মোহি, শহীদুল্লা কায়সার, সাংবাদিক সিরাজউদ্দীন হোসেন, ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. ফজলে রাব্বি, কবি মেহেরুন্নেসা, ডাক্তার মর্তুজাসহ আরও অনেকে। এদের প্রত্যেকের প্রগতিবাদী চিন্তার ক্ষেত্রে অনন্য অবদান ছিল। তারা বহুকাল আগে থেকেই পাকিস্তানি শাসকদের দুশমনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

পরাজয় যখন অত্যাসন্ন, তখন পাকিস্তানি বাহিনী জ্ঞানীগুণী, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে ‘পোড়ামাটি নীতি’ গ্রহণ করছিল। তারা দেখতে চেয়েছিল অভ্যুদয় ঘটলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যেন অকেজো হয়ে পড়ে এবং বুদ্ধিবৃত্তির জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সে রকম একটি অবস্থা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১এর পর তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের অনড় ভূমিকার জন্য বাংলাদেশকে তেমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। জাতি এজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

আমার অনুজপ্রতিম ড. ভূঁইয়া ইকবাল ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক। ১৯৭১এর ১৬ ডিসেম্বরের তিনচারদিন পর তিনি আমাকে জানালেন, ভারতীয় বিমান বাহিনীর স্ট্রেফিংএ বিধ্বস্ত বঙ্গভবনে তিনি একটি ডায়েরি খুঁজে পেয়েছেন। তার বাবা, বঙ্গভবন অর্থাৎ পাকিস্তানি আমলের গভর্নর হাউসে চাকরি করতেন। তার বাসস্থানও ছিল এই গভর্নর হাউসের ভেতরেই।

এই সুবাদেই ভূঁইয়া ইকবাল বিধ্বস্ত গভর্নর হাউসের ভেতরে কৌতূহলবশত ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে একটি টেবিলের ওপর ডায়েরিটি দেখতে পান। ডায়েরিটি ছিল মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর। এতে কিছু সংক্ষিপ্ত নোট ছিল এবং দুচারজন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর নামও তার স্বহস্তে লেখা ছিল। এই নামগুলোর মধ্যে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

অর্থাৎ তিনিও পাকিস্তানি জেনারেলের সন্দেহের তালিকায় ছিলেন। হাতের কাছে পেলে তাকেও হয়তো হত্যা করা হতো। আজ যেভাবে তিনি বেঁচে আছেন তেমনভাবে বেঁচে থাকতে পারতেন না। ভূঁইয়া ইকবাল সেই সময় দৈনিক বাংলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি আমাকে তার উদ্ধার করা ডায়েরির কথা জানালে আমি তাকে ওই পত্রিকায় রাও ফরমান আলীর লেখার ফ্যাকসিমিলিসহ রিপোর্ট করতে বলি। তিনি আমার পরামর্শ মতো দৈনিক বাংলায় রিপোর্টটি করেছিলেন।

বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মূল হোতা যে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, এই ডায়েরি এবং এতদসংক্রান্ত দৈনিক বাংলার রিপোর্ট একটি জাজ্বল্যমান প্রমাণ। কোনো মূল্যেই আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এভাবে হারানোর ক্ষতি পূরণ হবে না। শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরেও মফস্বল শহরগুলোতে স্বাধীন চিন্তার উদ্গাতা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। সত্যিকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এসব বুদ্ধিজীবীর একটি নির্ভুল বিশ্বাসযোগ্য তালিকা প্রণীত হওয়া উচিত। বুদ্ধিজীবী দিবসে এসব মহাপ্রাণ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে বলব

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই ওরে ক্ষয় নাই।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: