আর্কাইভ

Archive for ডিসেম্বর 13, 2016

বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডঃ বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করাই ছিল লক্ষ্য

ডিসেম্বর 13, 2016 মন্তব্য দিন

azad-27-12-71ডা. সারওয়ার আলী : মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লাখ মানুষ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী ধর্মভিত্তিক দলের সদস্যদের গণহত্যার শিকার হয়। এই শহীদদের ব্যাপকতম অংশ ছিল নিরস্ত্র সাধারণ জনগণ, বাঙালি সেনাইপিআরপুলিশ সদস্য, প্রাথমিক পর্যায়ে শরণার্থী শিশু ও নারী এবং অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা।

৯ মাসে সারা দেশে সংঘটিত এই গণহত্যায় নিহতদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবীরা। সব হত্যাকাণ্ডই সমান গুরুত্ববহ এবং স্বজনহারা সবার বেদনা দেশবাসীকে সমভাবে বহন করতে হবে। তাই প্রতিবছর, বিশেষ করে মার্চ ও ডিসেম্বরে আমরা সব শহীদের আত্মদানের প্রতি সম্মান জানাই। তবে আমরা বিজয়ের আগ মুহূর্তে শনাক্ত করে বিশিষ্ট সাংবাদিক, ডাক্তার, শিক্ষক ও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর স্মরণে ১৪ ডিসেম্বর আলাদাভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করি। এর তাৎপর্য সম্যক উপলব্ধির জন্য পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ভাবাদর্শ এবং একাত্তরে গণহত্যার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী ও ধর্মাশ্রয়ী নেতৃত্বের রণনীতির বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। এর ফলে বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতাও বিবেচনা করা সম্ভব হবে।

সব দেশে নানা ধর্ম ও জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে, এমনকি ভারতবর্ষের মতো বহুজাতিক রাষ্ট্রও রয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে হাজার মাইল দূরত্বে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ‘মুসলমানদের স্বাধীন আবাসভূমি’র অবৈজ্ঞানিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভাবাদর্শে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। উভয় দেশে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে সৃষ্ট পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সম্ভবত এ গরমিলটি উপলব্ধি করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জন্মলগ্নেই ঘোষণা করেন যে আজ থেকে আমরা মুসলমান বা হিন্দু নই, আমরা সবাই পাকিস্তানি। এ ধারণাকে হয়তো স্বায়ত্তশাসিত গণতান্ত্রিক ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে কিছুকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারত। সে পথ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী গ্রহণ করেনি। ঐতিহাসিক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদের ভাষায়—আধুনিক রাষ্ট্রমাত্রই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে জাতিগত বৈষম্য বজায় রাখার জন্য প্রাথমিকভাবে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি এবং পরিশেষে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করে সামরিক শাসনের আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই পাকিস্তানের ভাবাদর্শ রক্ষার জন্য তারা প্রথম আঘাত হানে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর।

এর ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সমর্থক মুক্তচিন্তার ছাত্রনেতা, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের দ্রুত মোহমুক্তি ঘটতে থাকে, যা আমরা লক্ষ করি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সুফিয়া কামাল কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তাধারা ও কার্যক্রমে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯৪৯ সালেই নিবন্ধে জানালেন —আমরা মুসলমান কিংবা হিন্দু সেটি যেমন সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য আমরা বাঙালি। এক বছরের মধ্যে সূচিত হলো ভাষা আন্দোলন। আমাদের ধর্ম পরিচয় ও জাতি পরিচয়ের মধ্যে কল্পিত দ্বন্দ্ব আবিষ্কার করার পাকিস্তানি শাসকবর্গের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হলো। একাত্তর অবধি পাকিস্তানের ভাবাদর্শ প্রত্যাখ্যান করে গড়ে উঠল গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী চরিত্রের রাজনীতিবিদ এবং ছাত্রদের আন্দোলন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার আন্দোলন এই জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গণআন্দোলনকে বেগবান করে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরে গণআন্দোলনের জন্ম দেয়। পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চলে সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের কার্যক্রম, আর তার অগ্রসেনানি মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীরা। তাঁরা প্রায় শিক্ষাগুরুর মতো পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক ভাবাদর্শের মূলে কুঠারাঘাত করে চলেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্ম দেয়।

সমগ্র পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের শাসকরা তাদের পূর্বাঞ্চলের এই সংগ্রাম ভারত ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রচারণার ফসল বলে আখ্যায়িত করে এবং এই চিন্তাধারায় মোহবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিশেষ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের শিক্ষক ও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা; যা যুদ্ধাপরাধের বিচারের অভিযোগনামায় স্পষ্ট হয়েছে। বিদেশি সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় ধর্মাশ্রয়ী আদর্শিক দলের নেতাকর্মীরা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করে হত্যা করে। তারই সর্বশেষ নিদর্শন পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করে হত্যাযজ্ঞ।

তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম নিছক একটি ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের রাষ্ট্রের বিপরীতে একটি সব ধর্মের সমঅধিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। আর এ সংগ্রামে দেশান্তরী ও অবরুদ্ধ দেশে থেকে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। অবশ্য স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও নতুন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পটভূমিতে এই মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। পাকিস্তানের মতাদর্শকে বহন করে এই অপশক্তি পবিত্র ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শের রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের জন্য শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন আজ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

লেখক : ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

সংস্কৃতি ধ্বংসের নীলনকশা হয় একাত্তরে

corpses-foundডা. এম এ হাসান : বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বুদ্ধিজীবী হত্যা শুধু ডিসেম্বর মাসেই হয়েছে বা আলবদর বাহিনীই হত্যা করেছে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যে গণহত্যার সূচনা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী—এরই অংশ ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই এ অঞ্চলে আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণআন্দোলন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের ফলে আইয়ুব খানকে সরিয়ে যখন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নেন তখন তিনি নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু এই নির্বাচন ছিল শুধুই একটি বহিরাবরণ এবং এখানকার গণজোয়ারকে নষ্ট করার একটি কৌশল। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা নানা গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং এখানকার মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহা দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। তাই পশ্চিম পাকিস্তানিরা নানা ছক করছিল। প্রথমত, তারা সমস্যাটাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের চিন্তা করেছিল। এ জন্য তারা দলগুলোকে বিভাজনের চিন্তা করে। তাদের অনুগতদের দিয়ে পাকিস্তানবিরোধীদের একটি তালিকা প্রণয়নের চেষ্টা করে। সেই তালিকায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যাঁরা অংশ নেন তাদের থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় যাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন তাঁদের চিহ্নিত করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ করে তখন তাদের ওপর নির্দেশ ছিল স্থানীয় নেতা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষকদের তালিকা তাদের কাছে প্রেরণ করার।

এই প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চের রাতে গণহত্যার একটি অংশ ছিল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বাহিনীর প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজ। এই তাজ ২৪ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ছিলেন। চট্টগ্রামে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে যেসব বাঙালি সেনা অফিসার ছিলেন তাঁদের ২৫ মার্চ রাতেই হত্যা করেন। তিনি বা তাঁর নির্দেশে সে রাতে প্রায় ৮০০ বাঙালি সেনা সদস্যকে হত্যা করা হয়। এরপর সে রাতেই তিনি চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় এসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ চালান। ২৬ মার্চ ভোরে তিনি জগন্নাথ হলে আসেন। জগন্নাথ হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশনা দেন কোন কোন শিক্ষককে হত্যা করা হবে। সেই শহীদ শিক্ষকদের একজন ছিলেন অধ্যাপক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব। যাঁকে আমি এবং আমার ভাই শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম, আমরা ২৭ তারিখে উদ্ধার করার চেষ্টা করি। ঘটনাটি আমি অত্যন্ত ভালোভাবে জানি, কারণ ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবের পালিত কন্যা ছিলেন আমার খালা। তিনি এবং পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকজনের সাক্ষ্য থেকে আমরা জানতে পারি, এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনোভাবেই তাত্ক্ষণিক ছিল না। এগুলো সবই ‘ভেরি মাচ টার্গেট কিলিং’।

নানা সাক্ষ্য এবং পরে আরো তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজ। আর তাজকে যিনি ওপর থেকে পরিচালনা করেছিলেন তিনি হলেন ব্রিগেডিয়ার জাহান জেড আরবার। এই আরবার ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সার্বিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি দেখছিলেন জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাও ফরমান আলী। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই এমন টার্গেট কিলিং হয়েছে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী। গভর্নর হাউসে তাঁর একটি ডায়েরি পাওয়া গিয়েছিল। সেই ডায়েরির মধ্যে বিভিন্ন অধ্যাপকের নাম এবং নামের পাশে চিহ্ন দেওয়া ছিল। সেখানে অধ্যাপক ছাড়াও কিছু সাংবাদিক, চিকিৎসক ছিলেন। এটি সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা ছিল জেনারেল রাও ফরমান আলীর। আর রাও ফরমান আলী এসব করেছেন আরো সুপিরিয়র কমান্ডের নির্দেশে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড প্রথম দিকে পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা কার্যকর করেন। পরে তাঁরা একটি ‘কিলিং স্কোয়াড’ করেন, সেই কিলিং স্কোয়াডে কাজ করেছে আলবদর বাহিনী। কিন্তু আমরা ধারণা করেছি, বুদ্ধিজীবী হিসেবে যাঁদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল তাঁরা মূলত বাম ঘরানার এবং তাঁরা দেশকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। এছাড়া যাঁরা এই দেশকে আমেরিকাবিরোধী লবির দিকে নিতে পারেন তাঁদেরই বিশেষ করে টার্গেট করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনীর সহযোগিতা ছিল। সে সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্যউপাত্ত আমার কাছে আছে। এখানে সরাসরি দুজন কাজ করেছেন, তাঁদের একজনের নাম আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তিনি একাত্তরের জুনজুলাইয়ের দিকে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন, তাঁর নাম মি. ডুইপ।

বুদ্ধিজীবী হত্যার শেষ সময়টা শুরু হয় নভেম্বর মাসে দুজন ডাক্তারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তাঁরা হলেন ডা. আজহার ও ডা. হুমায়ুন। এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন জামায়াতে ইসলামীর একজন ডাক্তার, যিনি বদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ছিল শেষ টার্গেট। এ দুই দিন যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছিল সেই শহীদদের রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুরের আমবাগান, বাঙলা কলেজ, মিরপুর ৬ নম্বর, জল্লাদখানাসহ প্রায় ২০টি বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল মৌলবাদী শক্তিকে বিকশিত করা। যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আমাদের বিকাশ হয়েছিল আজ যখন তা নানা অপচেষ্টায় আটকে গেছে তখন মনে হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাটা সফল হয়েছে।

লেখক : আহ্বায়ক, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

৩ বছরেও ফেরানো যায়নি মঈনুদ্দীনআশরাফকে, দণ্ড কার্যকর অনিশ্চিত

moinudin-ashrafuzzamanউদিসা ইসলাম : একাত্তরে স্বাধীনতার ঠিক আগে বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে দেশ মেধাশূন্য করার নীলনকশা বাস্তবয়নকারী চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও,বিদেশে অবস্থান করায় তাদের দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানেরা বলছেন, দুই সাজাপ্রাপ্তকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে শক্ত উদ্যোগ নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই আবারও একটি আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা। আর প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা বলছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি এবং পলাতক আসামিদের জন্য গড়ে তোলা সেলএর মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার কাজ দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার উদ্যোগ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে পলাতক আশরাফুজ্জামান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে, আর মঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। এই দুই আসামির অপরাধ ও সর্বোচ্চ সাজা হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য জানার পরও তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। তেমনি,বিভিন্ন দেশে পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সেল গঠনের পরও কাউকেই ফেরানো সম্ভব হয়নি। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতার ঢিলেমিকে দুষছেন কেউ কেউ।

আর এর সুযোগ নিয়ে আশরাফুজ্জামান খান গণমাধ্যমের মুখোমুখি না হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালীন সময়ে, কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন আলজাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে চৌধুরী মঈনুদ্দীন বলেছিলেন, ‘তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হবেন না।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল একটি কৌতুক। তারা একটি সাজানো বিচার করছে।’

বিজয়ের ঠিক আগে ১৯৭১ সালের ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ আলবদর বাহিনীর ‘চিফ এক্সিকিউটর’ ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান। আর চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ছিলেন সেই পরিকল্পনার ‘অপারেশন ইনচার্জ’। রায়ে বলা হয়, ‘আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীন যে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত ছিলেন, তা প্রসিকিউশনের তথ্যপ্রমাণে বেরিয়ে এসেছে।তারা কখনও নিজেরা হত্যায় অংশ নিয়েছে। কখনও জোরালো সমর্থন দিয়েছে ও উৎসাহ যুগিয়েছে।’ সে সময় আলবদর বাহিনীর ওপর ইসলামী ছাত্র সংঘের এই দুই নেতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

এই দুর্ধর্ষ দুই আসামিকে ফিরিয়ে আনতে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার উল্লেখ করে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান তৌহিদ রেজা নূর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তাদের ঔদ্ধত্য দেখে আসছি। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া আসামিদের কেন ফিরিয়ে আনা যাবে না, এনিয়ে দেশে বিদেশে মুক্তিযুদ্ধমনা যারা আছেন, সবার সম্মিলিত একটি আন্দোলনের ডাক আসা জরুরি।’

শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নূসরাত রাব্বী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এতদূর থেকে গিয়েছি বিচারে সাক্ষ্য দেবো বলে। যে দুই লোক দেশকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দিতে চেয়েছিল, তাদের দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে না, এটা খুবই হতাশাজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বিচার কার্যকর করতে দুইদেশের সরকারের মধ্যে একটি কমনআণ্ডারস্ট্যান্ডিং দরকার। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে উদ্যোগী করে তুলতে আমাদের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টির একটা আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সেল গঠন করেছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সেলের সদস্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা বলাবাহুল্য এই অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প নেই।’

এই মামলার প্রসিকিউটর শাহেদুর রহমান বলেন, ‘এই মামলাটি পরিচালনা সবচেয়ে কঠিন ছিল। আমাদের কাছে দালিলিক তথ্যপ্রমাণ ছিল, কিন্তু সেগুলো গুছিয়ে এনে উপস্থাপন করা সহজ ছিল না। আমরা সাজা নিশ্চিত করতে পেরেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামিদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী উদ্যোগ নেবে সেটি তাদের বিষয়। কিন্তু এরজন্য লেগে থাকার বিকল্প নেই।’

অবশেষে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদারকি সেল গঠন করে। এই সেলের অন্যতম সদস্য তদন্ত সংস্থার সিনিয়র তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সেল থেকে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও পরিস্থিতি যা, তাতে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না।’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

১৪ ডিসেম্বরের দাবি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সুবিচার

ডিসেম্বর 13, 2016 মন্তব্য দিন

intel-murder-ittefaqআহমদ রফিক : একাত্তরের গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বরে (১৯৭১) অর্জিত হয় বিজয়। অভ্যুদয় স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। বিজয়ের আনন্দ ম্লান করে দেয় ১৪ ডিসেম্বরকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী হত্যার নিষ্ঠুরতা। বেদনায় মুহ্যমান হয়ে ওঠে স্বাধীনতা। তাই বিজয় দিবসের আনন্দ সমারোহের দুই দিন আগে আমরা নীলবিষণ্নতা নিয়ে নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করি। ভেবে শিউরে উঠি, কী পৈশাচিক নিষ্ঠুরতায় তাদের হত্যা করা হয়েছিল চোখ উপড়ে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে।

বধ্যভূমিতে যে দুএকজনের লাশ পাওয়া গিয়েছিল, ক্ষতবিক্ষত সেসব লাশ ঘাতকদের নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দেয়। বড় কথা, অধিকাংশের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঢাকায় তাঁদের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর পত্রপত্রিকায় তাঁদের সম্পর্কে কিছু লেখা প্রকাশ পায়, আলোচনা হয় টেলিভিশন চ্যানেলে। ওই এক দিনের পর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের, তাদের দুর্বৃত্ত ঘাতকদের কথা আর কারো মনে থাকে না।

এসব আলোচনায় যতটা আবেগ প্রকাশ পায়, হত্যাকাণ্ডের বাস্তব দিকগুলো সে অনুপাতে এখন আর ততটা উঠে আসে না। মনে হয় বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পালন নিছক এক আনুষ্ঠানিকতা; বাঙালির হুজুগ মেটানোর দিন। তা ছাড়া ঢাকায় নিহত বুদ্ধিজীবীদের নামপরিচয় প্রতিবছর সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশ পায় ঠিকই, কিন্তু ঢাকার বাইরে নিহত বুদ্ধিজীবীদের নাম তালিকা ও পরিচিতি এখনো অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে আছে। তাঁরা এখনো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেননি।

প্রকৃতপক্ষে দেশের সর্বত্র সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের লক্ষ্যে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। তাই দীর্ঘকাল পার হয়ে গেলেও সে তালিকা যেমন প্রণীত হয়নি, তেমনি তাদের ঘাতকদের বিচারের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। অপরাধীরা চেনাঅচেনায় অধরাই থেকে গেছে। এ সম্পর্কে বুদ্ধিজীবী মহলে, সরকারি মহলে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করছে। এটা যুক্তিসংগত নয়। বড় কষ্টের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বজনদের জন্য।

দুই.

বুদ্ধিজীবী হত্যা সংগত কারণে দুএকটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। যেমন কারা এই বুদ্ধিজীবী, যাঁদের বেছে বেছে তাঁদের আবাসস্থল থেকে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়? পরে একাধিক বধ্যভূমি হলো তাঁদের ঠিকানা। কাজটা খুব কৌশলে ও বেশ সহজেই করা হয়েছিল। কারণ কাজের দায়িত্বে ছিল স্থানীয় জামায়াতশিবিরের ঘাতকদল, যারা এ সমাজেই বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। সবচেয়ে বড় কথা, এ কাজ তারা সফলভাবে করেছে কারফিউর সময় এবং পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায়। তারাই তাদের জিপপিকআপ ভ্যান দিয়ে সহায়তা দিয়েছে। দিয়েছে আরো নানাভাবে।

কথিত এই বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও অনুরূপ পেশাজীবী বিশিষ্টজন। ঢাকায় এ তালিকায় যাঁদের নাম, তাঁদের সবাইকে আমরা চিনি। তাঁরা বাঙালি সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি, সামাজিক শক্তি ও মননশীলতার প্রতীক। ব্যাপকহারে তাঁদের হত্যা করতে পারলে বাঙালি সমাজকে মেধা ও মননশীলতায় পঙ্গু করা যাবে, এমনটাই ছিল সামরিক শাসকদের বিশ্বাস। কথাটি বিভিন্ন জনের লেখায় একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই সঙ্গে রাজনৈতিক মহলের ভাষ্য, তাঁদের হত্যা করে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করে বাঙালিকে অন্তঃসারহীন জাতিতে পরিণত করা। একই রকম ধারণা সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। এই উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে সামরিক বাহিনীর নীলনকশা অনুযায়ী কাজে নেমে পড়েছিল জাতিদ্রোহী আলবদর, আলশামসের ঘাতকদল। জামায়াতসহ বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিবর্গ এ জাতীয় কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। যেমন মুসলিম ও ইসলামী দলগুলো।

বাঙালি জাতির মেধা ও মননে, এককথায় বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়ে এই আঘাতের তাৎপর্য ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জানা যায় বঙ্গভবনে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে স্থানীয় দেশদ্রোহীদের সাহায্যে তৈরি এ টার্গেট হত্যার তালিকার কথা। বলা বাহুল্য, সে তালিকা দীর্ঘ হওয়ারই কথা। সে তালিকামাফিক সবাইকে হত্যা করতে পারলে হয়তো ঠিকই বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির বড় বিপর্যয় ঘটত। কিন্তু সময়াভাবে তা সম্ভব হয়নি।

বাহাত্তরেই দেখা গেছে, রাও ফরমান আলীর ডেস্ক ক্যালেন্ডারে এ বিষয়ে কিছু মন্তব্য, যা সম্ভাব্য হত্যা পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য পরবর্তী সময়ে লেখা ফরমানের আত্মজীবনীতে সবুজ পূর্ববঙ্গ রক্তে লাল করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। কথাটির ভিন্ন ব্যাখ্যা হাজির করা হয় ওই আত্মজীবনীতে।

সন্দেহ নেই বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা স্থানীয় পাকিস্তানি সেনা দপ্তরেই তৈরি হয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল স্থানীয় বাংলাদেশবিরোধী পাকিস্তানপন্থীদের ওপর। মূলত তরুণদের এ বর্বরতায় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। যেমন সাংবাদিক চৌধুরী মঈনুদ্দীন, যে এখন বহাল তবিয়তে লন্ডনে নানা ব্যবসা জাঁকিয়ে ধনী রাজনৈতিকসামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং তা বেশ কিছুকাল থেকে।

এ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট আরেকটি নাম মওলানা আবদুল মান্নান, যার ছবি ছাপা হয়েছিল বাহাত্তরের প্রথম দিকে দৈনিক বাংলায় এই আর্জিতে : ‘এই নরপিশাচকে ধরিয়ে দিন’। ‘নরপিশাচ’ মওলানা মান্নান ধরাও পড়ে। কিন্তু দুর্বোধ্য কারণে ছাড়া পেয়ে আত্মগোপন করে। পরে তো বাংলাদেশে সাংবাদিক ভুবনে তার কী শ্রীবৃদ্ধি, এমনকি নানা ব্যবসায়ে অঢেল অর্থের মালিক। মন্ত্রিত্ব তার কপালে জুটেছিল এই স্বাধীন বাংলাদেশে দূষিত রাজনীতির টানে। এ প্রসঙ্গে আরেক অপরাধীর নাম ড. ফাতেম সাদেক।

তিন.

দুর্ভাগ্য বাংলাদেশ ও তার রাজনীতির ও রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শবাদের যে স্বাধীন দেশে একাত্তরের গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তানি সেনাদের বিচার হয়নি, এ ঘৃণ্য কাজের প্রমাণাদি থাকা সত্ত্বেও। বিচার হয়নি স্থানীয় ঘাতকদালালদের। তবে সান্ত্বনার বিষয় যে শেষ পর্যন্ত অনেক দেরিতে হলেও সম্প্রতি মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও যুদ্ধপরাধে দায়ী স্থানীয় অপরাধীদের বিচার শেষে শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে এবং হচ্ছে। সে বিচার এখনো চলমান।

কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক তদন্ত যেমন হয়নি, তেমনি হয়নি তার বিচার ও যথাযথ শাস্তি। অথচ ১৯৭২ সাল থেকে নানা ফোরামে ও আলোচনাসভায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে অশ্রুসজল আবেগের প্রকাশ দেখেছি। বাহাত্তরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বটতলার জনসমাবেশে সর্বজন শ্রদ্ধেয় নারীনেত্রী বেগম সুফিয়া কামালকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখেছি।

এভাবে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা সম্পর্কে ব্যাপক আবেগের প্রকাশ ঘটতে দেখা গেছে। কিন্তু অপরাধের সুবিচার ও ঘটনার জন্য দায়ী অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্ত ও তাদের বিচারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। তখন সদ্য রক্তভেজা মাটিতে ছিল প্রতিক্রিয়ার যথেষ্ট উত্তাপ, ছিল অপরাধীদের শাস্তি বিধানের জন্য প্রবল আবেগ। ছিল যথেষ্ট প্রমাণাদি। কিন্তু আবারও বলি, এত সব কিছু থাকা সত্ত্বেও ‘বিচারের বাণী নিভৃতে’ কেঁদেছে দীর্ঘ সময় ধরে।

বুদ্ধিজীবী হত্যা প্রসঙ্গে আরো একটি কথা বলি। এ কাজটি সম্পন্ন করা, সীমাবদ্ধ মাত্রায় হলেও ঘাতকদের পক্ষে সহজ হয়েছিল সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের বিচক্ষণতার অভাবে। অভাব দূরদর্শী বিবেচনার। তাঁরা ভাবতেই পারেননি যে তাঁদের কেন্দ্র করে এমন একটি নিষ্ঠুর, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। তাই তাঁরা নিরাপত্তামূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবেননি।

এমনকি সে ভাবনার কথা বলা হলেও তাঁরা সে পরামর্শে গুরুত্ব দেননি। তাঁরা হয়তো ভেবেছিলেন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাদের হত্যাযজ্ঞ, এত দূর নিয়ে যাবে না যাতে তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এমন ভাবনা যে কতটা ভুল ছিল জীবন দিয়ে তাঁরা তা প্রমাণ করে গেছেন। সে জীবনদানের নিষ্ঠুরতা ছিল অবিশ্বাস্য রকম বর্বরতায় চিহ্নিত।

এ বিষয়ে অন্তত কয়েকটি উদাহরণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়। যেমন চক্ষুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শহীদ আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী শুরু থেকে তাঁর স্বামীকে বারবার অনুরোধ করেছিলেন নিরাপদ স্থানে চলে যেতে। আলীম তা শোনেননি। হয়তো ভেবেছেন, তিনি চিকিৎসক, তাঁকে কে মারতে আসবে? কিন্তু ঘাতক তো তাঁর আবাসস্থলেই ছিল।

তেমনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আমার একান্তজন ফজলে রাব্বীকে আমি নিজে বলেছি তাঁর নিরাপত্তার কথা ভেবে বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে। পরে শুনেছি তাঁর শুভানুধ্যায়ী আরো দুচারজনও তাঁকে অনুরূপ পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু রাব্বী সে পরামর্শ হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ হয়তোবা পূর্বোক্ত ভাবনা—চিকিৎসককে কেন মারতে আসবে! কিন্তু এমন ভাবনা সঠিক ছিল না জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সমর্থক ও প্রকাশ্যে সামরিক শাসকদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় সোচ্চার ফজলে রাব্বীর পক্ষে।

ঠিকই একই কথা সত্য বামপন্থী রাজনীতির সক্রিয় সমর্থক ও দৈনিক ‘পূর্বদেশ’এর সহকারী সম্পাদক আ ন ম গোলাম মোস্তফা সম্পর্কেও। আমার একান্তজন মোস্তফাকেও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে দেখা গেছে। এ সম্পর্কে পূর্বদেশ পত্রিকায় তৎকালে কর্মরত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী হয়তো ভালো বলতে পারবেন। কারণ তাঁরা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পরিণামে মোস্তফাকে তাঁদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। তাঁকেও তুলে নেওয়া হয় কারফিউর মধ্যে।

এ তালিকা দীর্ঘ করার প্রয়োজন নেই। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা প্রসঙ্গে প্রায় সবার জন্য একই ঘটনা তাঁদের অপরিণামদর্শী ভাবনার ফল। অন্তত আমি তাঁদের মধ্যে আরো দুএকজনের কথা জানি, যাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না। যেমন হরগঙ্গা কলেজে আমার সহপাঠী সাংবাদিক নিজামউদ্দিন, ‘শিলালিপি’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক সেলিনা পারভীন বা অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী এবং অনুরূপ আরো দুএকজন।

ভাবতে অবাক লাগে, ২৫ মার্চের বর্বরতা তথা নির্বিচার শিক্ষকছাত্র হত্যার পরও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠুরতার মাত্রা তাঁরা এতটা হালকাভাবে বিবেচনা করতে পেরেছিলেন কী মনে করে? পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তো যথারীতি তাদের নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত। তবু কেন তাদের সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড নিয়ে এতটা বিভ্রান্তি, বিশেষ করে ৯ মাসের হত্যাযজ্ঞের পরও? এসব প্রশ্নের জবাব মেলে না, অথবা যা মেলে তা বড় অপ্রিয়।

যাই হোক, এ বিষয়ে শেষ কথা হলো, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বর্বরতার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দাবি, যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারের প্রাসঙ্গিকতায় বুদ্ধিজীবী হত্যার নির্মমতারও অনুপুঙ্খ তদন্ত অর্থাৎ সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও বিচার শুরু করা হোক। চৌধুরী মঈনুদ্দীনের মতো পরিচিত ঘাতকদের বিচারের জন্য দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলুক। এ বিচার শহীদদের স্বজনদের দাবি পূরণ করবে, তাদের কিছুটা সান্ত্বনা জোগাবে। আমাদের আরো দাবি, এ হত্যাকাণ্ডের শ্রমসাধ্য তদন্ত যেন সংশ্লিষ্ট সংস্থা আন্তরিকতার সঙ্গে যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করে।

সূত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬

panna-kaiser-jg1panna-kaiser-jg2

suchonda-on-zohir-raihansuchonda-on-zohir-raihan-jg2

কিছু বধ্যভূমির নাজুক অবস্থা !

ডিসেম্বর 13, 2016 মন্তব্য দিন

execution-places-pa1e

execution-places-uncaredexecution-places-pa1aexecution-places-pa1bexecution-places-pa1cexecution-places-pa1d

‘৭১-এ হত্যাকান্ডের শিকার কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর পরিচয়

ডিসেম্বর 13, 2016 মন্তব্য দিন

rayerbazar-killing-field

intel-murder-1intel-murder-2intel-murder-3intel-murder-4intel-murder-5

তোমাদের [বুদ্ধিজীবীদের] ঋণ কখনও শোধ হবে না

ডিসেম্বর 13, 2016 মন্তব্য দিন

intels-1জামাতশিবির সমর্থক অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিটুডে ৭১এ বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়ে নীচের প্রবন্ধটি বেছে নিয়েছে তাদের পোর্টালে প্রকাশের জন্য কারণ এতে ড. মাহবুব উল্লাহ বুদ্ধিজীবী হত্যায় জামাতশিবিরের তৎকালীন সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী আলবদর আলশামস বাহিনীর সম্পৃক্ততা তুলে ধরেন নি বা তুলে ধরতে ভুলে গিয়েছিলেন ।

একটু চিন্তা করলেই এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, উর্দুভাষী পাকপ্রশাসন ও পাকসেনাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না খুঁজে খুঁজে (বা বাংলা প্রবন্ধনিবন্ধগবেষণাপত্র পড়ে) বের করা কোন কোন বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা অবিভক্ত পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন । সুতরাং ঐসব বুদ্ধিজীবীদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করতে তারা বাংলাভাষী এদেশীয় আলবদর আলশামস রাজাকারদের (শব্দটির অর্থ সাহায্যকারী) সহায়তা নিয়েছিলো । জামাতশিবির বরাবর চেষ্টা করে এসেছে এই ধরণের প্রপাগান্ডা চালিয়ে যে, তারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিলো না বরং সেগুলো ছিলো ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ । ইসলামের খাতিরে মিথ্যা বলা জায়েয মওদূদীর শেখানো হিকমাতে আমালী” অনুসারে । সুতরাং বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে তাদের যোগসাজোশ অস্বীকার করা তাদের জন্য কাকতালীয় ব্যাপার ।

মাহবুব উল্লাহ : ১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। প্রতিবছর বাংলাদেশের জনগণ এই দিবসটি পালন করেন গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে। ১৯৭১এর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী এই দেশের বিরুদ্ধে ভয়াবহ গণহত্যার সূচনা করেছিল।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় পাকসামরিক বাহিনীর মূল টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানা। পাকিস্তানি শাসকদের দৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানবিরোধী বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়ে এদেশে যত গণআন্দোলন ও গণসংগ্রাম গড়ে উঠেছিল তার কেন্দ্রীয় ভাবনাটি ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধিকার।

এদেশে যত প্রকার আন্দোলন হয়েছে তার গভীরে স্বাধিকারের চেতনাটিই ফলগুধারার মতো সব সময় প্রবহমান ছিল। অবিভক্ত ভারতে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি হিসেবে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান নামে একটি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি করার দাবি উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল। ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের অধিবেশনে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির যে দাবি উত্থাপিত হয়েছিল তার প্রস্তাবক ছিলেন পূর্ব বাংলারই কৃতী সন্তান এবং এদেশের মানুষের অনেক কাছের ব্যক্তি শেরেবাংলা একে ফজলুল হক।

পাকিস্তান প্রস্তাবের মূল দাবি ছিল ভারতের দুই প্রান্তে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পৃথক রাষ্ট্রসমূহ গঠন করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পূর্ব বাংলার জনগণ যেভাবে পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়েছিল ততটা গভীর আগ্রহ ও ঐকান্তিকতা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়নি। ১৯৪৫এ মুসলিম লীগের কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবের মূল চেতনাটি বদলে ফেলা হয়।

দুটি পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের কথা পরিবর্তন করে এক রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সেক্রেটারি আবুল হাশিম সাহেব লাহোর প্রস্তাবের মূল চেতনা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সঙ্গে তার যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু সেই সময় পাকিস্তানের নামে যে আবেগ, উত্তেজনা ছিল তার ফলে এই প্রয়াস রোধ করা সম্ভব হয়নি।

তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারপন্থী নেতারা লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার জন্য স্বাধিকারের দাবি তুলতে থাকেন। প্রকারান্তরে এটি ছিল পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান থেকে পৃথক করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

আমরা ওই সময় লক্ষ্য করেছি, ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাব দিবস এলে পূর্ব বাংলার দৈনিক সংবাদপত্রগুলো লাহোর প্রস্তাবের অবিকৃত এবং অপরিবর্তিত ভাষ্যটিই ফলাও করে বক্সের মধ্যে ছাপাতো। এভাবেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার সংবাদপত্র স্বাধিকারের দাবি এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং কার্যত স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেল যে, কেবল ধর্মের মিল থাকলে একটি একক রাষ্ট্র হতে পারে না। একটি জনগোষ্ঠীর ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও জাতি রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। ১৯৪৭এর আগে রাষ্ট্র গঠনে ধর্ম প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৪৭এর পরে পুরো ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবে পাল্টে যায়। ভাষা ও সংস্কৃতি রাষ্ট্র গঠনের মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। আজকের বাংলাদেশ সেই প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক পরিণতি। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি জাতি রাষ্ট্র।

স্বাধীনসার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে প্রথম থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একক কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষকরা তাদের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা সৃষ্টিতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান দুই অর্থনীতির তত্ত্ব উত্থাপন করে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার দাবিকে তাত্ত্বিক ও নীতিগত যৌক্তিকতা প্রদান করেছিলেন।

লাহোরে পাকিস্তান কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশনের এক সেমিনারে তিনি একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে স্পষ্ট করে তুলে ধরেন যে পাকিস্তান একক অর্থনীতির দেশ নয়। এটি দুই অর্থনীতির দেশ। এর ফলে পূর্ব বাংলার উপর একটি অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক কাঠামো চেপে বসেছে। অবশ্য যারা এই তত্ত্ব নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান করেছেন তাদের মতে, রেহমান সোবহান এই ধারণাটি পেয়েছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ কলিন ক্লার্কের কাছ থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ শুধু আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরেনি। তারা স্বাধীন বাংলাদেশে শ্রেণীশোষণমুক্ত একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ কারণেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শে সাম্যের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের উদ্যোগে যে অর্থনৈতিক প্রদর্শনী ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল তাতে আঞ্চলিক বৈষম্য এবং সমাজতন্ত্র দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্ব পেয়েছিল।

অন্যদিকে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষকদের বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। এসব কারণে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ করে তার শিক্ষকমণ্ডলীকে রাষ্ট্রবিনাশী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করত। এ কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠীর আতংকের উৎস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক পাকিস্তানবিরাধী ছিলেন এমনটিও নয়।

intel-muder-rayerbazarএদের মধ্যে অনেকে পাকিস্তান অনুরাগী ছিলেন এবং পাকিস্তানি ভাবাদর্শে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে তাদের প্রভাব কালক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। প্রগতিপন্থী শিক্ষকরা চিন্তার রাজ্যে প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। পাকিস্তানি শাসক মহল এই পরিবর্তনকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি।

পূর্ব বাংলায় কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা সৃষ্টি হচ্ছে কিনা সেটি ছিল তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব কর্তৃক ক্ষমতা গ্রহণের পরবর্তী বছর প্রাদেশিক গভর্নরদের এক সম্মেলনের জন্য পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি গোপন প্রতিবেদন রচনা করেছিল। প্রতিবেদনের নিচে স্বরাষ্ট্র সচিব এম আনোয়ার আলীর স্বাক্ষর ছিল। প্রতিবেদনটি ইংরেজি ভাষায় রচিত হয়েছিল।

এই প্রতিবেদনের একটি অংশের বাংলা অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় তা হল, ‘একটি সমাজ যখন বড় পরিবর্তনের জন্য তৈরি হয় তখন বুদ্ধিজীবীরা দল ত্যাগ করতে শুরু করে। এমন কোনো সাক্ষ্য নেই যে, পূর্ব পাকিস্তানে এমনটি ঘটছে, বিশেষ করে বৃহৎ আকারে। ১৯৪৭ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একের পর এক বিভিন্ন সরকারের ওপর শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছে।

মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবি সমর্থনের জন্য ছাত্রদের ব্যবহার করেছে এবং পরবর্তীকালে ছাত্ররা এতই শক্তিশালী হয় যে তারা সরকারগুলোকে তাদের হাতে দাবার গুঁটির মতো ব্যবহার করতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ক্ষুদ্র বুদ্ধিজীবী গ্রুপ রয়েছে যাদের মধ্যে তীব্র সংকীর্ণতাবাদী প্রবণতা রয়েছে। এসব প্রফেসর ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে যে নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা খুব গৌরবোজ্জ্বল নয় এবং এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে ছাত্রদের চিন্তাভাবনা এই গ্রুপটির দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

কিছু বুদ্ধিজীবী দল ত্যাগ করলেও বেশিরভাগই সরকারের সঙ্গে রয়েছে। সুতরাং চেষ্টা করা উচিত সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবীদের দলে টানার চেষ্টা করা এবং যারা বিরুদ্ধাচারী হয়েছে তাদের পরিবর্তন করার চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করেছে। পুরনো গ্রুপের পুনর্জাগরণ যা পূর্ববর্তী প্যারাগ্রাফে উল্লেখ করা হয়েছে তা বুদ্ধিজীবীদের আরও ইতিবাচক অবস্থানে টেনে আনবে’ (উৎস : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৩৮)

১৯৬২ সালে ছাত্র আন্দোলনের সময় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এয়ার কমোডর এ আর খান বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা নেই। এসব কিছু প্রমাণ করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বেশ আগে থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। এই সন্দেহ একদিন প্রবল ক্রোধে পরিণত হয়।

১৯৭১এর ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ট্যাংক, কামান ও মেশিনগানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত হয়। বহু ছাত্র প্রাণ হারায়। খুঁজে খুঁজে কিছু শিক্ষককেও হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে দার্শনিক অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, প্রফেসর জোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা এবং পরিসংখ্যানের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান উল্লেখযোগ্য। এ থেকেই বোঝা যায় পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের একটি হত্যা তালিকা করে রেখেছিল।

সবচেয়ে ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দু’দিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের বড় সংখ্যায় হত্যা করা হয়। পাকিস্তান বাহিনীর দোসররা এদেরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজ বাসস্থান থেকে তুলে নিয়ে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে হত্যা করে।

এদের মধ্যে উল্লেখ্য কয়েকজন হলেন. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, . আনোয়ার পাশা, . ফয়জুল মোহি, শহীদুল্লা কায়সার, সাংবাদিক সিরাজউদ্দীন হোসেন, ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. ফজলে রাব্বি, কবি মেহেরুন্নেসা, ডাক্তার মর্তুজাসহ আরও অনেকে। এদের প্রত্যেকের প্রগতিবাদী চিন্তার ক্ষেত্রে অনন্য অবদান ছিল। তারা বহুকাল আগে থেকেই পাকিস্তানি শাসকদের দুশমনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

পরাজয় যখন অত্যাসন্ন, তখন পাকিস্তানি বাহিনী জ্ঞানীগুণী, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে ‘পোড়ামাটি নীতি’ গ্রহণ করছিল। তারা দেখতে চেয়েছিল অভ্যুদয় ঘটলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যেন অকেজো হয়ে পড়ে এবং বুদ্ধিবৃত্তির জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সে রকম একটি অবস্থা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১এর পর তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের অনড় ভূমিকার জন্য বাংলাদেশকে তেমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। জাতি এজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

আমার অনুজপ্রতিম ড. ভূঁইয়া ইকবাল ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক। ১৯৭১এর ১৬ ডিসেম্বরের তিনচারদিন পর তিনি আমাকে জানালেন, ভারতীয় বিমান বাহিনীর স্ট্রেফিংএ বিধ্বস্ত বঙ্গভবনে তিনি একটি ডায়েরি খুঁজে পেয়েছেন। তার বাবা, বঙ্গভবন অর্থাৎ পাকিস্তানি আমলের গভর্নর হাউসে চাকরি করতেন। তার বাসস্থানও ছিল এই গভর্নর হাউসের ভেতরেই।

এই সুবাদেই ভূঁইয়া ইকবাল বিধ্বস্ত গভর্নর হাউসের ভেতরে কৌতূহলবশত ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে একটি টেবিলের ওপর ডায়েরিটি দেখতে পান। ডায়েরিটি ছিল মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর। এতে কিছু সংক্ষিপ্ত নোট ছিল এবং দুচারজন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর নামও তার স্বহস্তে লেখা ছিল। এই নামগুলোর মধ্যে ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

অর্থাৎ তিনিও পাকিস্তানি জেনারেলের সন্দেহের তালিকায় ছিলেন। হাতের কাছে পেলে তাকেও হয়তো হত্যা করা হতো। আজ যেভাবে তিনি বেঁচে আছেন তেমনভাবে বেঁচে থাকতে পারতেন না। ভূঁইয়া ইকবাল সেই সময় দৈনিক বাংলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি আমাকে তার উদ্ধার করা ডায়েরির কথা জানালে আমি তাকে ওই পত্রিকায় রাও ফরমান আলীর লেখার ফ্যাকসিমিলিসহ রিপোর্ট করতে বলি। তিনি আমার পরামর্শ মতো দৈনিক বাংলায় রিপোর্টটি করেছিলেন।

বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মূল হোতা যে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, এই ডায়েরি এবং এতদসংক্রান্ত দৈনিক বাংলার রিপোর্ট একটি জাজ্বল্যমান প্রমাণ। কোনো মূল্যেই আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এভাবে হারানোর ক্ষতি পূরণ হবে না। শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরেও মফস্বল শহরগুলোতে স্বাধীন চিন্তার উদ্গাতা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। সত্যিকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এসব বুদ্ধিজীবীর একটি নির্ভুল বিশ্বাসযোগ্য তালিকা প্রণীত হওয়া উচিত। বুদ্ধিজীবী দিবসে এসব মহাপ্রাণ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে বলব

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই ওরে ক্ষয় নাই।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬