প্রথম পাতা > আন্তর্জাতিক, ইতিহাস, ইসলাম, জীবনযাপন, ধর্মীয়, নারী, বাংলাদেশ, বিনোদন, মিডিয়া, সংস্কৃতি, সমাজ > ‘সুলতান সুলেমান’ নিয়ে গোলাম মাওলা রনি’র ভাবোচ্ছ্বাস !

‘সুলতান সুলেমান’ নিয়ে গোলাম মাওলা রনি’র ভাবোচ্ছ্বাস !

ডিসেম্বর 12, 2016 মন্তব্য দিন Go to comments

sultan-suleman-still-4জামাতশিবিরের অর্থায়নে প্রকাশিত দৈনিক নয়াদিগন্তে গোলাম মাওলারা সুলতান সুলেমান টিভি সিরিয়ালে চৌম্বক শক্তি আবিষ্কার করেছেন তার ভাষায় – “নাটকটিতে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক উপাখ্যান, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদবকায়দার প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি। রয়েছে নির্মল বিনোদন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জীবনধর্মী আরো অনেক বিষয়, যা দর্শকদের চৌম্বক শক্তির মতো টানতে থাকে। এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেগাসিরিয়াল থেকে আমাদের যেমন অনেক কিছু শেখার রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যও রয়েছে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ।সুলতান সুলেমান নিয়ে মাওলা বাবার এহেন মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায় তার রুচি জ্ঞানের বহর ! আজ দৈনিক যুগান্তর সুলতান সুলেমান নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে যা পড়লে এই টিভি সিরিয়াল দেখা থেকে বিরত থাকা উত্তম বলে মনে হবে । আমার পরের পোষ্টে যুগান্তরের প্রতিবেদনটি হুবহু উপস্থাপন করলাম পাঠকদের সুবিধার্থে ।

তুরস্ক ও এরদোগানের অন্ধ সমর্থক জামাতশিবির কর্মীরা বাংলাদেশের মানুষের ভেতর তুরস্কপ্রীতি জাগৃতিকরণে এই টিভি সিরিয়াল দেখার জন্য উৎসাহ যোগাবে তাতে সন্দেহ নেই যদিও এদের নেতাকর্মীদের জন্য এই সিরিয়াল দেখা শরীয়াহসম্মত হবে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চুপতা অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে !

আহলান! ওয়া সাহলান! ইয়া সুলতান সুলেমান!

sultan-suleman-actressগোলাম মাওলা রনি : বাংলাদেশের সর্বস্তরের টেলিভিশন দর্শকদের পক্ষ থেকে তুর্কি সুলতান সুলেমানকে স্বাগত জানাচ্ছি। সুলতান যখন আরব মুল্লুকে যেতেন, তখন রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা শাসক সুলেমান দ্য গ্রেট বা সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টকে আহলান! ওয়া সাহলান অর্থাৎ আমাদের গৃহে স্বাগতম বলে অভ্যর্থনা জানাতেন। হাজার হাজার সৈন্যের কুচকাওয়াজ, নহবতের সুরলহরী এবং কৃতজ্ঞ জনগণের হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে এগোতে গিয়ে মহামতি সুলেমান তার সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের হৃদয়ে কতটুকু আনন্দ সঞ্চারিত করতে পারতেন তা বলা না গেলেও তার মৃত্যুর ৪৫০ বছর পর তাকে নিয়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে যা হচ্ছে তা যদি তিনি জানতেন, তবে নিশ্চয়ই অতি মাত্রায় বিমুগ্ধ ও আনন্দিত হতেন।

তুর্কি অটোমান সালতানাতের গর্ব এবং ইসলামি তাহজিব তমদ্দুন ও কানুনের অন্যতম প্রধান রত্ন মহামতি সুলতান সুলেমানের রাজত্বকাল ছিল ৪৬ বছর। আধুনিক তুরস্ক, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার বৃহদংশ, পুরো মধ্যপ্রাচ্য, ইরানের কিয়দংশ, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, আলবেনিয়াসহ বলকান অঞ্চল এবং রোডসসহ পুরো ভূমধ্যসাগরে তার ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড তার অধীনতা মেনে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। অস্ট্রিয়া, ইতালি, এমনকি জার্মানি মূলত তার ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকত। পারস্য সম্রাট তাহমাউসপের সাথে সুলতানের বিরোধ ছিল বটে। কিন্তু সম্মুখ সমরে তিনি কোনো দিন সুলতানের মুখোমুখি হননি সব সময় পালিয়ে গেছেন নতুবা এড়িয়ে গেছেন। ফলে তৎকালীন দুনিয়ার একমাত্র সুপারপাওয়ার অটোমান সাম্রাজ্যের তলোয়ার, ঘোড়ার খুরের আওয়াজ এবং কামানের গোলার সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো বীর ধরাভূমে ছিলেন না।

সুলতান সুলেমানের জীবদ্দশায় সুবেবাংলা অথবা দিল্লি সালতানাত কেমন ছিল, তা ইতিহাসের পাঠকেরা খুব ভালো করেই জানেন। সুলতান যদি ভারতবর্ষে আসতেন তবে আমাদের রাজাবাদশাহ, নওয়াব এবং জঙ্গবাহাদুরেরা কী করতেন, জানি না। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে যারা সুলতান সুলেমানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন তাদের কথাবার্তা, দাবিদাওয়া ও আবদারগুলো জনমনে ভারী কৌতূহলসংবলিত কৌতুকের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির কোনো নেতানেত্রী কিন্তু এই সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন একদল অভিনেতাঅভিনেত্রী ও কলাকুশলী। তারা দলবেঁধে গলা ফাটিয়ে আপত্তি সংবলিত আবদার জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কোনো বিদেশী সিরিয়ালের বাংলা ডাবিং, অর্থাৎ বাংলায় রূপান্তরিত সংলাপসহ সম্প্রচার করা যাবে না।

sultan-suleman-still-2বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের নাটকে রঙতামাশা, হাস্যরস ও কৌতুকাভিনয়ে বলতে গেলে দুর্ভিক্ষ লেগেছিল অথবা ওলাওঠা বিবির অভিশাপে মড়ক লেগেছিল। এক সময়ের খান জয়নুল, হাবা হাসমত, আলতাফ, টেলিসামাদ, রবিউল, আনিস প্রমুখের অনবদ্য অভিনয় এবং লোক হাসানোর প্রকৃতি প্রদত্ত গুণাবলির বদলে ইদানীংকালের জোর করে হাসানোর কাতুকুতু মার্কা সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গি দেখে দর্শকদের রুচি যখন বিচ্যুতির প্রান্তসীমায় পৌঁছে গিয়েছিল, তখন একশ্রেণীর দর্শক বেঁচে থাকার তাগিদে ভারতীয় চ্যানেলের ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে পড়েন এবং অন্য শ্রেণীর দর্শকেরা টেলিভিশন দেখাই ছেড়ে দিলেন।

ভারতীয় চ্যানেলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যে ও দৌরাত্ম্যে আমাদের সাহিত্যসংস্কৃতি, সমাজসংসার ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। হত্যা, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ব্যাংক লুট, লোক ঠকানো, মিথ্যাচার প্রভৃতি কবিরাহ গুনাহ রীতিমতো শৈল্পিক মর্যাদা পেয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে প্রচারিত হচ্ছে, যার মরণনেশায় পড়ে স্ত্রী স্বামীকে ত্যাগ করছে, স্বামী স্ত্রীকে মেরে ফেলছে। মা তার শিশুসন্তানকে মেরে ফেলছে টিভি সিরিয়াল দেখার সময় কান্না করার অপরাধে। অথবা স্ত্রী গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহনন করেছে এ কারণে যে, তার স্বামী তাকে টিভি সিরিয়াল দেখতে দেয়নি অথবা টিভি সিরিয়ালের এক নায়িকার মতো একটি জামা কিনে দেয়নি।

কতিপয় ভারতীয় চ্যানেলের কিছু অনুষ্ঠানের নেশা ভয়াল মাদক ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, মারিজুয়ানা, গাঁজা ইত্যাদির চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ব্যভিচার, পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা, ধর্ষণ, পরকীয়া, অবাধ যৌনাচার, অসম দৈহিক সম্পর্ক, অনৈতিক কিংবা অকল্পনীয় সম্পর্কগুলো প্রকাশ্যে এবং অবাধে এমনভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে, যা দেখে মানবিকতা আর অমানবিকতা, মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব একাকার হয়ে নারকীয় রূপ ধারণ করছে। বাবার ষাট বছর বয়সী বন্ধুর সাথে স্কুলপড়ুয়া কিশোরী কন্যার যৌনতা, সন্তানের চেয়েও কম বয়সী ছেলেদের সাথে ষাটোর্ধ্ব মহিলার ব্যভিচার হিন্দি চ্যানেলের দর্শকদের কাছে ভাতমাছ হয়ে গেছে। পূতপবিত্র পারিবারিক সম্পর্কের অনাদিকালের বিশুদ্ধতা ও নির্মলতাকে এক শ্রেণীর লম্পট কুলাঙ্গার এমনভাবে কলুষিত ও কলঙ্কিত করে তুলছে, যা প্রকাশ করার মতো রুচি এই নিবন্ধকারের নেই। আইয়ামে জাহেলিয়াতের জঘন্য যুগেও যেসব সম্পর্ককে পবিত্র ও বিশুদ্ধ মনে করা হতো, সেগুলোর মূলেও জ্ঞানপাপী নরাধমরা একের পর এক আঘাত হেনে চলেছে।

ভারতীয় সিরিয়ালগুলো আমাদের নীতিনৈতিকতা এবং মনমানসিকতার স্তর কতটা নিচে নামিয়ে ফেলেছে তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ঢাকার এক মধ্যবিত্ত দম্পতির ছয় বছরের ফুটফুটে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। স্বামীর বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের মতো আর স্ত্রী ত্রিশ। দুজনেই কথিত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং দেখতে উভয়েই বেশ সুন্দর। তারা প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন এবং বিবাহিত জীবনে মোটামুটি দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখেন। হঠাৎ তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক সমস্যা দেখা দিলো। এক রাতে স্ত্রী ঘুম থেকে জেগে দেখলেন স্বামী বিছানায় নেই। তিনি চুপি চুপি ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখলেন স্বামী হিন্দি সিরিয়াল দেখছেন এবং অত্যন্ত গর্হিত একটি অপকর্ম করছেন। লজ্জায় স্ত্রী কিছু বলতে পারলেন না। তিনি শোয়ার ঘরে ফিরে শিশু সন্তানটিকে জড়িয়ে ধরে বহুক্ষণ কাঁদলেন। পরের দিন রাগ করে বাবার বাড়ি চলে এলেন। স্ত্রীর ধারণা, তার স্বামীর মানসিকতা এমন পর্যায়ে বিকৃত হয়েছে যে, তার পক্ষে শিশু সন্তানকেও ধর্ষণ করা অসম্ভব নয়। অতএব, বিচ্ছেদ।

নাটক, সিনেমা, রিয়েলিটি শো, গেম শোর পাশাপাশি নৃত্য প্রতিযোগিতার নামে যা দেখানো হয় তা অশ্লীলতা ও নোংরামির মাত্রা অতিক্রম করে চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সাতআট বছরের বালকবালিকা বা তেরোচৌদ্দ বছরের কিশোরকিশোরীদের নৃত্য প্রতিযোগিতায় যে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেখানো হয় তা শৈল্পিক বিচারে কোনোমতেই নৃত্য হতে পারে না। বিকৃত মানসিকতা সৃষ্টি এবং একটি প্রজন্মকে নষ্ট করার সুগভীর চক্রান্ত ছাড়া ওসব বেহায়াপনার অন্য কোনো মূল্য রয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

sultan-suleman-still-5বাংলাদেশের সুলতান সুলেমানবিরোধীরা কোনো দিন কোনোকালে ভারতীয় অপসংস্কৃতির ভয়াবহ আগ্রাসন এবং বেলাগাম বিস্তার রোধে রাস্তায় নেমেছিলেন, এমন কথা কেউ কোনো দিন শোনেননি। বরং তাদের মধ্যে অনেকে ভারতীয় চ্যানেলের বিভিন্ন সিরিয়াল এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান নকল করে দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে প্রচার করছিলেন, যা দেখে সুস্থ সবল মানুষের দৈহিক ও মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে নামতে পারে তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠানের মানের অধোগতি এবং ভারতীয় চ্যানেলগুলোর নেশাময় বিকৃত অনুষ্ঠানমালার কারণে দর্শকেরা যখন হতাশার প্রান্তসীমায়, ঠিক সেই সময়ে দেশীয় একটি অটোমান সুলতান সুলেমানের জীবনের ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত কাহিনীনির্ভর মেগাসিরিয়াল বাংলায় অনুবাদ করে সম্প্রচার করে যাচ্ছে।

সুলতান সুলেমান বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত দশ বছরে যারা টিভি দেখেননি তারাও কাজকর্ম ফেলে বাংলায় ভাষান্তরিত সিরিয়াল দেখার জন্য যথাসময়ে টিভির সামনে হাজির হয়ে যান। পুরো পরিবার নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে টিভি দেখার, বিশেষ করে মাসের পর মাস ধরে একই আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগের ঐতিহ্য এ সমাজে খুব কমই দেখা গেছে। ধারাবাহিক নাটকটির নির্মাণশৈলী, সাজসজ্জা, অভিনেতাঅভিনেত্রীদের অনবদ্য অভিনয়, কাহিনী, সংলাপ এবং মঞ্চায়নের নিখুঁত মুনশিয়ানার কারণে দর্শকেরা নাটকটির প্রতিটি পর্ব দেখার সময় মনোজগতের ডানায় ভর করে চলে যান মহামতি সুলেমানের শাসনামলে। তার হেরেমে, রাজপ্রাসাদে অথবা অটোমান যুগের পথপ্রান্তর, রাস্তাঘাট, হাটবাজার কিংবা দরবার ও আদালতে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, তুরস্কে নির্মিত সুলতান সুলেমাননামক টিভি সিরিয়ালটি সারা দুনিয়ায় এযাবৎকালে নির্মিত মেগা সিরিয়ালগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের দর্শকপ্রিয়তা যোগ করলে এটি এক নম্বরে পৌঁছে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাটকটিতে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক উপাখ্যান, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদবকায়দার প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি। রয়েছে নির্মল বিনোদন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জীবনধর্মী আরো অনেক বিষয়, যা দর্শকদের চৌম্বক শক্তির মতো টানতে থাকে। এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেগাসিরিয়াল থেকে আমাদের যেমন অনেক কিছু শেখার রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যও রয়েছে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ।

বাংলাদেশের অভিনেতাঅভিনেত্রী, প্রযোজকপরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীরা কেন সুলতান সুলেমানের মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক বন্ধের জন্য রাজপথে নেমেছেন, তা বোধগম্য নয়। তবে দেশের জনগণ যে তাদের নিজ নিজ গৃহে সম্মানিত মেহমান হিসেবে সুলতান সুলেমান নাটকের পাত্রপাত্রীদের বরণ করে নিয়েছেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের অভিনেতাঅভিনেত্রীরা জনগণের সেই ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে যত তাড়াতাড়ি নিজেদের সংশোধন করে নেবেন, ততই সবার জন্য মঙ্গল।

টেলিভিশন নাটক নিয়ে পুরো মিডিয়াপাড়ায় যে তেলেসমাতি চলছে, তা বন্ধ না করে ডাবিং করা সিরিয়াল বন্ধের দাবির আওয়াজ ধোপে টিকবে না। অতীব নিম্নমানের নাটক নির্মিত হচ্ছে। অন্য দিকে পুরো মিডিয়া জগতের বিনোদন ক্ষেত্রটি স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে। মাত্র এক থেকে দেড় লাখ টাকা দেয়া হয় একটি নাটক নির্মাণের জন্য। ঈদের বিশেষ নাটকের বাজেট দুই লাখ থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকার মধ্যে। এই স্বল্প বাজেটের সাথে সামাল দেয়ার জন্য পুরো নাটকপাড়া এবং শুটিং স্পটগুলোতে যে কী হয় তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই বলতে পারেন। নির্মিত নাটকগুলো কথিত সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়া প্রচারিত হয় না। পরিস্থিতি এতটাই অবনতির দিকে গেছে যে, ওই সিন্ডিকেট নাটকের নায়কনায়িকাসহ প্রধান পাত্রপাত্রীদের পর্যন্ত মনোনীত করে দেয়।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবর ও টকশোর অনুষ্ঠানগুলোর মান এখন আর কোনো মানদণ্ডে নেই। একটু শিক্ষিত ও সজ্জনরা বিবিসি, আলজাজিরা, সিএনএন, ফক্স নিউজ, ভারতের এনডিটিভি দেখেন। অনেকে আবার বিটিভির খবরের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। করপোরেট হাউজের মালিকানাধীন চ্যানেলগুলো নিজ নিজ মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী সব কিছু পরিচালনা করে থাকে। নাটকের চেয়েও বিশ্রী অবস্থার মধ্যে পড়েছে টকশোর অনুষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রেও বহু অভিযোগ শোনা যায়। শত অভিযোগের বিপরীতে রূঢ় বাস্তবতা হলো, টকশোর নামে যা দেখানোর চেষ্টা করা হয় তা আসলে কেউ দেখে না। কারণ ওগুলো আসলে দেখা যায় নাএমনকি দেখা উচিতও নয়।

আমার ধারণা, কোনো টিভি চ্যানেল যদি বিখ্যাত ল্যারি কিং লাইভ, ক্রিস্টিনা আমানপোর, বিবিসি হার্ড টক, সিমি গাড়োয়াল, কফি উইথ করণ, রজত শর্মার আপ কি আদালত ইত্যাদি সাড়া জাগানো বিদেশী টকশোগুলোর বাংলা ডাব প্রচার আরম্ভ করে, সেগুলো সুলতান সুলেমানের তুলনায় কম জনপ্রিয়তা পাবে না। আমরা এর আগে সাড়া জাগানো কিছু ইরানি ছবি, অস্কারপ্রাপ্ত ইংরেজি ছবিসহ নামকরা বিদেশী ছবি বাংলা ডাব অথবা বাংলা সাব টাইটেলসহ বিভিন্ন টিভিতে প্রচার হতে দেখেছি। ছবিগুলোর মান, শৈল্পিক আবেদন এবং বিনোদন কোনো দর্শকই ভুলতে পারেননি। সাউন্ড অব মিউজিক, দি মেসেজ, দি মেসেঞ্জার, স্বর্গীয় শিশু, বৃদ্ধাশ্রম প্রভৃতি শিল্পসম্মত ছবি থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি ওগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হয় তাহলে আর যাই হোক, লাভ হবে না।

সূত্রঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: