প্রথম পাতা > রাজনীতি, বাংলাদেশ, সমাজ, বিনোদন, সংস্কৃতি > কী ভীষণ [সাংস্কৃতিক] আগ্রাসন!

কী ভীষণ [সাংস্কৃতিক] আগ্রাসন!

হানিফ সংকেত : বিশ্বায়ন বা মুক্ত অর্থনীতির যুগে আমরা অর্থনীতির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে আগ্রাসনের শিকার হচ্ছি তা হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। বিশেষ করে এই আগ্রাসন ঘটছে পরিবারগুলোতে। কৃত্রিম মোহে ভেঙে যাচ্ছে অনেক সুখের সংসার। এসবের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত চাকচিক্যময় এক অদ্ভুত সামাজিক চালচিত্র। গ্রাস করার ত্রাস সৃষ্টিতে উদ্যত এসব বিদেশি সিরিয়াল সিরিয়াল কিলারের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ, এরা ধ্বংস করছে ঘরসংসারসামাজিকতা এবং আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।

যৌথ পরিবারের একটি গৌরবময় ঐতিহ্য আছে আমাদের। ২০১৪ সালের ৫ ডিসেম্বর বিটিভিতে ইত্যাদি একটি পর্ব প্রচারিত হয়। ওই পর্বে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার একটি গ্রামের একটি যৌথ পরিবারের ওপর প্রতিবেদন দেখানো হয়। ওই পরিবারের গৃহকর্তা আবদুর রহমান। বয়স ১০৪ বছর। তাঁর পাঁচ সন্তান। সবাই বিবাহিত। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৪০। ২৫ কক্ষবিশিষ্ট বিরাট বাড়ি। এই বাড়িতেই পরিবারের সবাই থাকেন। এই বিশাল কিন্তু সুখসচ্ছলতায় ভরা পরিবারটির প্রধান আয়ের উৎস মত্স্য খামার।

এই পরিবারের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, রহমান সাহেবের পুত্রবধূ এবং নাতিনাতনিরা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে আনন্দিত চিত্তে রান্নাবান্নার কাজ করেন। প্রতিনিয়তই মনে হয় তাঁরা যেন বনভোজনের আমেজে আছেন। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই পরিবারের কয়েকজন সদস্যের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বিদেশি চ্যানেলের প্রভাবে অনেক পরিবারেই ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এই কুপ্রভাব থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? তাঁদের সোজাসাপটা জবাব ছিল, ওই চ্যানেলগুলো বন্ধ কইরা দেওয়া উচিত। এভাবে চলতে থাকলে ওই সব চ্যানেলের প্রভাবে একসময় যৌথ পরিবারই দেখা যাবে না। সে জন্য আমরা ওই সব চ্যানেল দেখি না।

এই উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির যুগে তাদের চ্যানেল বন্ধ করার দাবি পূরণ করা হয়তো সম্ভব নয়, তবে আমাদের দেশে এসব চ্যানেল অবাধে প্রচারের ব্যাপারে যে উদার ও উন্মুক্ত নিয়মনীতি রয়েছে, সেগুলোকে বোধ করি রোধ করা সম্ভব। এসব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মিডিয়ায় অনেক আলাপআলোচনা, সভাসমাবেশ, গোলটেবিল বৈঠক, টক শো, সংহতি সমাবেশ, শিল্পী সমাবেশ, মামলামোকদ্দমাসহ নানা ঘটনা ঘটে গেছে।

ত্রিশালের ওই একান্নবর্তী পরিবারের মতোভিনদেশি সিরিয়ালের আগ্রাসন আর ভীতি থেকেইঅনেকের দাবি, ভিনদেশি এসব চ্যানেল বন্ধ হোক গত কয়েক দিনের মিডিয়াসংশ্লিষ্ট আন্দোলনেও অনেকের মুখে এই কথা উচ্চারিত হয়েছে। চ্যানেলের ক্ষেত্রে যখনই এই বন্ধ শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখনই বলা হয় উন্মুক্ত আকাশ। বিশ্বায়নের যুগে এই বন্ধ সংস্কৃতি ঠিক নয়। স্বভাবতই তখন প্রশ্ন ওঠে, ভারতও একটি গণতান্ত্রিক দেশ। সেখানে কেন বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যাবে না। আমরাই বা এত উদার কেন? ওরা না দেখালে আমাদের দেখাতে হবে কেন? বিষয়টি আরও জটিল হলো যখন জানা গেল, ভারতে আমাদের চ্যানেল চালাতে হলে পাঁচ কোটি রুপি দিতে হবে আর আমাদের এখানে ওই সব চ্যানেল চলছে মাত্র দেড় লাখ টাকায়। কী অসম বাণিজ্য! ডিসেম্বরের ৩ তারিখে হাঙ্গেরি থেকে ফিরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তিনি নিজেই এই অসম হার দেখে বিস্মিত হয়েছেন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেছেন।

আশা করি, আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো ভারতে প্রদর্শন এবং ভারতীয় চ্যানেলগুলোর বাংলাদেশের প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ বৈষম্য রয়েছে, সেটা দূর হবে এবং আমাদের শিল্পীকলাকুশলী ও টিভি চ্যানেলের মালিকেরা এ ব্যাপারে একটি সুফল পাবেন। চ্যানেল প্রদর্শনের এই অসম বাণিজ্যের সঙ্গে আর একটি মারাত্মক অপরাধমূলক বেআইনি বাণিজ্য ছিল বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিদেশি চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন প্রচার। মিডিয়া ইউনিটির আন্দোলনের কারণে এদের কর্মকাণ্ড সরকারের নজরে আসে। ২০০৬ সালে এ সম্পর্কিত স্পষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও বিগত ১০টি বছরেও এই অপরাধ কারও নজরে এল না কেন, এই প্রশ্নটি অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাহলে প্রতিটি বিষয়ই কি আন্দোলন করে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করতে হবে? তবে আশার কথা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপের ফলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই বিষয়টির সুরাহা হয়েছে। এই দুটি বিষয়ই মিডিয়া জগতের জন্য আশার খবর ও সুখবর। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে দুদক ও এনবিআর এই চক্রের সন্ধানে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ। মিডিয়ার একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে খুবই কষ্ট হয় যখন শুনি সরকারি পুরো বাজেটের মধ্যে মিডিয়ার জন্য বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। এই বাজেট দিয়ে মিডিয়ার কী কল্যাণ হবে? অনেকেই বলেন, আমাদের কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু দুর্বল, বাইরের কনটেন্ট ভালো। এই কথাটিও পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়। কনটেন্ট ভালো করার পেছনে বাজেটও একটি কনটেন্ট। সুলতান সুলেমানএর সুলতান সাহেবের পোশাকের যে বাজেট, আমাদের এখানে পুরো এক ঘণ্টার নাটকেরও সেই বাজেট নেই। অন্যান্য বিষয় তো রয়েছেই। তা ছাড়া, মিডিয়া সম্পর্কিত জ্ঞান লাভ কিংবা উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের দেশে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানও নেই। ডাবকৃত বিদেশি সিরিয়াল বন্ধের ব্যাপারে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্সের যৌক্তিক হার পুনর্নির্ধারণসহ শিল্পীকলাকুশলীদের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণেও কর্তৃপক্ষের আন্তরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

আর এই সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন সুষ্ঠু নীতিমালা। যে নীতি মালায় আবদ্ধ না থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ২০০৬ সালের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইনের মতো ফাইলের জন্য আইন না করে এর যথার্থ প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি চ্যানেলগুলোরও বিজ্ঞাপননির্ভরতা কমাতে হবে। সে জন্য রয়েছে অনেক পথ। এ ব্যাপারে পেচ্যানেলের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, শিল্প এবং শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আগে এই ক্ষেত্রটাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আমরা সেই আশ্বাসও পেয়েছি মিডিয়া ইউনিটির তৃতীয় সংহতি সভায় মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। সুতরাং এ কথা বলা যায়, মিডিয়ার সুদিন আসছে। কোনো অনৈতিক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি ও প্রতারণা মিডিয়ার এই অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দিতে পারবে না। আমাদের শিল্পসংস্কৃতিইতিহাসঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে মিডিয়া একটি বড় ভূমিকা রাখে। তাই টেলিভিশনশিল্পকে রক্ষার জন্য ভিনদেশি আগ্রাসন প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

এই দেশ আমাদের, এই মাটি আমাদের। আকাশ সংস্কৃতির এই উন্মুক্ত আগ্রাসনে পরাজিত হয়ে গা ভাসিয়ে দেবে পরধন লোভী পরাশ্রয়ী দুর্বলেরা। কিন্তু আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অনন্ত অক্ষয় সম্পদ এবং সামাজিকতা আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়। এই আত্মপরিচয়ের অহংকার আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন শিল্পীকলাকুশলীচ্যানেলের মালিকসবার সম্মিলিত উদ্যোগ ঐক্য। আসছে নতুন বছর। ভবিষ্যতে আমরা যাবতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা, বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ভুলে লালন করব দেশীয় সংস্কৃতিকে। সব আগ্রাসনকে দূরে ঠেলে দিয়ে দেশকে ভালোবেসে, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারায় জেগে উঠব আমরা নিরন্তর।

হানিফ সংকেত: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

Advertisements
  1. কোন মন্তব্য নেই এখনও
  1. No trackbacks yet.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: