আর্কাইভ

Archive for ডিসেম্বর 12, 2016

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কেন পক্ষপাতদুষ্ট?

blind-justice-lady-sketchইকতেদার আহমেদ : যুক্তরাষ্ট্র ৫০টি স্টেট (রাজ্য) সমন্বয়ে গঠিত একটি বিরাট দেশ। এ স্টেটগুলোর অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া, অর্থাৎ ওয়াশিংটন ডিসিকে স্টেটের মর্যাদা দেয়ায় সর্বমোট স্টেট ৫১টি। প্রতিটি স্টেটের অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থাসংশ্লিষ্ট স্টেটের আইন দ্বারা পরিচালিত হলেও কোর্ট অব আপিল ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা ফেডারেল ব্যবস্থার আওতায় সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত।

যুক্তরাষ্ট্র অভ্যুদয়পরবর্তী দীর্ঘকাল ধরে ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান এ দু’টি দল দেশটি শাসন করে আসছে। রিপাবলিকান দল রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন, অপর দিকে ডেমোক্র্যাটদের ভাবা হয় উদার। যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীদের দেশ হলেও ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গরা দেশটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর পরের অবস্থান রয়েছে হিস্পানিক বা ল্যাটিনো, কালো আফ্রিকান ও এশিয়ানদের। শ্বেতাঙ্গদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রিপাবলিকানদের সমর্থক। অপর দিকে হিস্পানিক বা ল্যাটিনো, কালো আফ্রিকান ও এশিয়ানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক। অভিবাসন বিষয়ে শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যবিশিষ্ট রিপাবলিকানরা সব সময় রক্ষণশীল আর ঠিক এর উল্টোটি পরিলক্ষিত হয় হিস্পানিক বা ল্যাটিনো, কালো আফ্রিকান ও এশিয়ানদের প্রাধান্যবিশিষ্ট ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদের মেয়াদ চার বছর এবং একজন ব্যক্তি একাদিক্রম বা একাদিক্রম ব্যতীত দুই মেয়াদের অধিক প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে পারেন না। যুক্তরাষ্ট্রের সংসদকে বলা হয় কংগ্রেস। এটি সিনেট ও হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস সমন্বয়ে গঠিত। সিনেটের সদস্য সংখ্যা ১০২ আর হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্য সংখ্যা ৪৩৬। দেশটির প্রেসিডেন্ট সাধারণ ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ (পপুলার ভোট) ভোটের পরিবর্তে একটি বিশেষ পদ্ধতির ইলেকটোরাল ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। যেকোনো স্টেটে সিনেটর ও হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্যদের বিজয়ী হওয়ার জন্য সাধারণ ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট অত্যাবশ্যক হলেও একটি স্টেটের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট যে দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর অনুকূলে যাবে, সে দল রাজ্যটির সব ইলেকটোরাল ভোট প্রাপ্ত হয়।

য্ক্তুরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক ৫৪তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিজিত প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে ২৫ লক্ষাধিক সাধারণ ভোট কম পেলেও এ বিষয়ে ইলেকটোরাল ভোটের হিসাব মুখ্য বিধায় এবং সর্বোপরি সাধারণ ভোটে পরাভূত প্রার্থীর ইলেকটোরাল ভোট অধিক হওয়ায় পদ্ধতিগতভাবে তিনি বিজয়ী ঘোষিত হলেন। এর আগে চারটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘটনা প্রত্যক্ষ করা গেলেও ইতঃপূর্বে কখনো বিজিত ও বিজয়ী প্রার্থীর মধ্যে এবারকার মতো সাধারণ ভোটের এত ব্যাপক ব্যবধান প্রত্যক্ষ করা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যে দল থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না কেন, তিনি ফেডারেল সরকারের সাত হাজার পদে নতুনভাবে নিয়োগদান করেন। একই দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পুনর্নির্বাচিত হলে সচরাচর এ পদগুলোতে নতুনভাবে নিয়োগের আবশ্যকতা দেখা দেয় না। উপরি উক্ত সাত হাজার পদের মধ্যে এক হাজার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের অনুমোদনের আবশ্যকতা রয়েছে। এই এক হাজার পদের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা, ১৩টি আপিল কোর্টের বিচারকেরা এবং ৯৪টি ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের ডিস্ট্রিক্ট জাজ পদে আসীন বিচারকেরা অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে কিছু ম্যাজিস্ট্রেট এবং দেউলিয়া আদালতের বিচারক ফেডারেল পদধারী হিসেবে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। যেকোনো ফেডারেল বিচারক পদত্যাগ, মৃত্যু অথবা অভিশংসনজনিত কারণ ব্যতীত সুস্থ থাকা সাপেক্ষে আমৃত্যু স্বপদে আসীন থাকতে পারেন। আর এ কারণে নির্বাচনে একটি দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পরাভূত হলে শুধু ফেডারেল বিচারকের পদ ব্যতীত অপরাপর ফেডারেল পদে পরিবর্তন ঘটে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এ পদ্ধতিটিকে বলা হয় স্পয়েল সিস্টেম। এ সিস্টেমটির অর্থ হলো ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যেকোনো দল প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হতে ব্যর্থ হলে আগেকার প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ফেডারেল বিচারিক পদ ব্যতীত অপর সব ফেডারেল পদে নিয়োগ বাতিল হবে এবং নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এসব পদে নতুনভাবে নিয়োগদান করবেন। সচরাচর দেখা যায়একটি নির্বাচনে যেসব সমর্থক একজন প্রেসিডেন্টের বিজয়ের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করে থাকেন তাদের মধ্য থেকে যোগ্যতা ও অবদান বিবেচনায় ফেডারেল পদে নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে।

ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগের সময় ডেমোক্র্যাটিক বা রিপাবলিকান দল থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সব সময় দলের প্রতি অনুগতদের প্রাধান্য দিলেও তারা সুস্থতা সাপেক্ষে আমৃত্যু পদে বহাল থাকেন বলে প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তন হলেও তাদের চাকরির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটে না।

যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ফেডারেল বিচারককে নিয়োগ দেয়ার সময় একজন প্রেসিডেন্ট তার নিজ দলের সমর্থক নয় অথবা নিজ দলের নীতি ও আদর্শের প্রতি অনুগত নয়, এমন ব্যক্তিকে নিয়োগদান করেন না। এসব নিয়োগ যদিও সিনেট কর্তৃক অনুমোদিত হওয়া অত্যাবশ্যক, কিন্তু সিনেটে এ সংক্রান্ত শুনানির সময় নৈতিক স্খলনজনিত কারণ ব্যতীত অপর কোনো কারণ অযোগ্যতা নির্ধারণে বিবেচিত হয় না। সুতরাং এ বিষয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অনুসৃত নীতির ফলে দেখা যায়, দলীয় সমর্থক হওয়া বা দলের নীতি ও আদর্শের প্রতি অনুগত হওয়া কখনো ফেডারেল বিচারক পদে নিয়োগের পথে বাধা হিসেবে দাঁড়ায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টসহ যেকোনো ফেডারেল কোর্টে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাটিক দলের রাজনীতিসংশ্লিষ্ট কোনো মামলা বিচারকালে দেখা যায়সংখ্যাগরিষ্ঠ বা একজন বিচারক দলীয় সমর্থক ও অনুগত হিসেবে যে দল কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত, তাদের বা তার সিদ্ধান্তটি সে দলের অনুকূলে যায়। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফ্লোরিডা স্টেটের ২৯টি ইলেকটোরাল ভোট ছয় শ’র কম সাধারণ ভোটের ব্যবধানে রিপাবলিকান প্রার্থীর অনুকূলে গেলে সে সময় স্টেটটির গভর্নর পদে আসীন বিজয়ী প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ইলেকট্রনিক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। অতঃপর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ালে সে সময় সুপ্রিম কোর্টে রিপাবলিকান বিচারকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সে দেশের মানুষের পক্ষে আগাম বলে দেয়া সম্ভব হয়, সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী রিপাবলিকান প্রার্থীর অনুকূলে যাবে। সে নির্বাচনেও বর্তমান নির্বাচনের মতো সাধারণ ভোটে বিজিত প্রার্থী বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন।

এবার নির্বাচনে গ্রিন পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর পক্ষ থেকে তিনটি স্টেট যথাউইসকনসিন্স, ম্যাসাচুসেটস ও পেনসিলভেনিয়ায় ইলেকট্রনিক ও কাগুজে ভোটের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান পরিলক্ষিত হওয়ায়, কাগুজে ভোট পুনঃগণনার দাবি জানিয়ে আবেদন করা হলে তা গৃহীত হয়েছে। পুনঃগণনার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটির টেলিভিশন বিতর্ক চলাকালে রিপাবলিকান প্রার্থী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেনতিনি বিজয়ী হলে ইমেইল কেলেঙ্কারির দায়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে বিচারের সম্মুখীন করবেন এবং তাতে তিনি কারা অন্তরীণ হবেন। নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীর বিজয় লাভের পর তাকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অভিনন্দন জানালে তিনি তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরবিষয়ক অবস্থান থেকে সরে আসেন। কিন্তু যখনই দেখা গেল, তিনটি রাজ্যের ভোট পুনঃগণনা বিষয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সরাসরি আবেদন না করলেও এর অবস্থান গ্রিন পার্টি থেকে ভিন্ন নয়, তখন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত রিপাবলিকান প্রার্থী পুনঃডেমোক্র্যাট প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের হুমকি দেন।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন অনুসৃত হয়, পৃথিবীর এমন সব দেশে যেকোনো ফৌজদারি মামলার তদন্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার মতো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়। এ ধরনের তদন্তকাজে কখনো রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপের ঘটনা পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু রিপাবলিকান দলের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তিনটি রাজ্যের ভোট পুনঃগণনার বিষয়ে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কর্তৃক পরাজয় স্বীকার করে তাকে অভিনন্দন জানানো সত্ত্বেও পুনঃভোট গণনার পক্ষে অবস্থান গ্রহণকে সহজভাবে মেনে না নিয়ে নিজের বিজয়ের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। এর প্রধান প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত হয়ে সিনেটের অনুমোদন সাপেক্ষে নিয়োগ লাভ করেন। বেশির ভাগ দলীয় প্রেসিডেন্ট সাধারণত এফবিআইয়ের প্রধান পদে মনোনয়নে দলীয় সমর্থক নয় বা দলীয় অনুগত নয়, এমন ব্যক্তির বাইরে কারো ব্যাপারে চিন্তা করেন না। আর এরূপ চিন্তা করলে তা যে বিপর্যয় ডেকে আনার অবকাশ ঘটায়, সেটি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকালে প্রত্যক্ষ করা গেছে। বর্তমান এফবিআই প্রধান বতর্মান ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রেসিডেন্ট ওবামা কর্তৃক মনোনীত হয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও তিনি যখন নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণের ১০ দিন আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর ইমেইল কেলেঙ্কারির বিষয়ে পুনঃতদন্ত হতে পারে এমন তথ্য প্রকাশ করেন, তখন তা যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর জনমতের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে এ বিষয়টি অস্বীকার করা যাবে না। এফবিআই প্রধান পুনঃতদন্তবিষয়ক তথ্য প্রকাশের পর তার অতীত উদঘাটনকালীন সময়ে দেখা যায়, তিনি মূলত একজন রিপাবলিকান সমর্থক ও দলটির প্রতি অনুগত। সুতরাং এ ধরনের স্পর্শকাতর নিয়োগে দলীয় সমর্থক বা দলীয় অনুগত ব্যতীত যথাযথ যাচাই না করে বিপক্ষ দলের সমর্থক ও অনুগত কাউকে নিয়োগ দেয়া হলে তা যে বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, এফবিআই প্রধানের সাম্প্রতিক আচরণ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

পৃথিবীর যেকোনো দেশে ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে তদন্তকাজকে বলা হয় ‘মামলার প্রাণ’। পক্ষপাতদুষ্ট ও ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ন্যায়বিচারের পথে অন্তরায়। এ ক্ষেত্রে একজন বিচারকের সততা ও ন্যায়পরায়ণতা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার জন্য তদন্তকার্য ও বিচার পরিচালনায় সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও ন্যায়নিষ্ঠ এবং প্রকৃত অর্থেই নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে উপরি উল্লিখিত ঘটনাবলি বিশ্লেষণে দেখা যায় তদন্ত ও বিচারকাজ দলীয় সমর্থক ও দলীয় অনুগত ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় তা যে বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের জন্য ন্যায়পরায়ণতার বিপরীত, এ সত্যটি সে দেশবাসী অনুধাবন করতে সক্ষম।

সব গণতান্ত্রিক দেশেই আইনের দৃষ্টিতে সমতার মৌল নীতিটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। আইনের দৃষ্টিতে সমতা অর্থ, অবস্থানভেদে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলার তদন্ত ও বিচারে একই আইন ও পদ্ধতি অনুসৃত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত প্রার্থী নির্বাচনে বিজিত প্রার্থীর বিষয়ে মামলা দায়েরবিষয়ক যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার অন্তরায়। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাটিক যখন যে দল ক্ষমতায়, সে দলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলায় দলীয় সমর্থক ও অনুগত বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকেরা যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হিসেবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম বিভিন্ন সময়ে তারা এটি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হওয়ায় তারা যে আজ পক্ষপাতদুষ্ট, এটি আর অত্যুক্তি নয়।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

Advertisements

আল্লামা আহমদ শফীকে তার কাছের লোকেরাই ডোবাচ্ছে ?!

allamah-safi-4মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্পর্কীয় বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দেশের আলেম উলামা, পীরমাশায়েখের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি হলেও কাক্সিক্ষত বিষয়ে তাদের ঐক্য তেমন দেখা যায় না। এদিক দিয়ে গত ১০ ডিসেম্বর হাটহাজারিতে অনুষ্ঠিত উলামা সম্মেলন ছিল ব্যতিক্রম। এতে দীর্ঘদিন যাবত বিচ্ছিন্ন মেরুতে অবস্থানকারী আলেম নেতৃবৃন্দ হঠাৎ করেই যেভাবে কথিত ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেলেন তা মূলত দেশ ও জাতির জন্য এক অশনিসংকেত ছাড়া আর কিছু নয়। গতকাল ইনকিলাবে প্রেরিত এক বিবৃতিতে তওহীদি জনতা বাংলাদেশের যুগ্ম আহ্বায়ক মোসাদ্দেক বিল্লাহ এসব কথা বলেন। তিনি হেফাজতে ইসলামের আমির, হাটহাজারি মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফীর সভাপতিত্বে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ, মাওলানা আবদুল হালীম বোখারী প্রমুখের বৈঠক এবং কিছু প্রমাণিত ধর্ম ও সমাজবিরোধী আলেমের সমন্বয়ে কওমী মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সংবাদে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, শাহবাগে গমনকে যিনি তার জীবনের সেরা পুণ্যময় কাজ বলে মন্তব্য করে, ১৬ কোটি মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কার কুড়িয়ে, এক অবাঞ্ছিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন তাকে সাথে নিয়ে আল্লামা শফী ঈমানদার জনগণের কী স্বার্থ উদ্ধার করবেন তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। যেসব দালাল আল্লামা শফীর দস্তখত নকল ও তার নামের অন্যায় ব্যবহার করে কওমী কমিশনের নামে প্রতারণা করল, যারা আলেমউলামা, পীরমাশায়েখের বিরুদ্ধে গিয়ে নাস্তিকমুরতাদ চক্রের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে অভিশপ্ত দরবারি আলেম সাব্যস্ত হল, তারা কি হাটহাজারি গিয়ে আল্লামা শফীসহ দেশের শীর্ষ আলেমদের সামনে ভুল স্বীকার করে, জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করেছে ? যদি না হয় তাহলে এদের সাথে নিয়ে কিসের ঐক্যবদ্ধ কমিটি আর সরকারের সাথে কিসের লিয়াজোঁ কমিটি হল ? কারা কোন অধিকার বলে শাহবাগ ও শাপলা চত্বরকে একাকার করে দিল ? অসংখ্য শহীদের রক্ত, লাখো মানুষের কষ্ট, ঘাম ও সংগ্রাম আর ধর্মপ্রাণ কোটি মানুষের আহাজারি আর চোখের পানিকে তারা কী মূল্য দিলেন। আল্লামা শফী কি করে নাস্তিকমুরতাদদের আস্থাভাজন ইমাম ও পছন্দের আলেম ফরিদউদ্দিন মাসুদ গংএর সাথে হাত মিলাতে পারলেন। বিপরীত দুই মেরুর আলেমরা কোন নেপথ্য শক্তির ইংগিতে কোন উদ্দেশ্যে এক হয়ে যাচ্ছে, ধর্মপ্রাণ জনগণ তাও জানতে চায়। শীর্ষ আলেমরা অতীতে ঈমানী আবেগ নিয়ে জাতিকে যত কথা বলেছেন, যত উদ্বুদ্ধ করেছেন সবই কি তাহলে মিথ্যা ? শাপলা চত্বরে ভীত সন্ত্রস্ত মজলুম মানুষের কষ্ট ও জীবনদান, অগণিত মানুষের রক্ত, ঘাম, অশ্রু ও হাহাকার পেছনে ফেলে আল্লামা শফী এবং তার উপদেষ্টা ও সহকর্মীরা কোন হাতের ইশারায় তাদের চির আদর্শিক প্রতিপক্ষের সাথে হাত মিলালেন। কোন শক্তির কলকাঠিতে ‘বাঘেমোষে এক ঘাটে পানি খাওয়ার’ পরিবেশ তৈরি হল তওহীদি জনতা তাও জানতে চায়।

বিষয়টি নিয়ে আরো কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন বিবৃতি দিয়েছেন। অনেকেই ইনকিলাবকে দুই বিপরীত মতাদর্শের আলেমদের ঐক্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অনুরোধ করেছেন। এ বিষয়ে নেপথ্যের সব কাহিনী নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের অনুরোধও করেছেন তারা। ইনকিলাব এ বিষয়ে বিশদ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করবে। এ পর্যায়ে কথা হয় রাজধানীর বিশিষ্ট আলেম ও খতীব, মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা কামাল উদ্দিন গাজীর সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, আল্লামা আহমদ শফী আমাদের সকলের মুরব্বী, তিনি কেন কী করছেন তা সঠিকভাবে না জেনে আমাদের মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে ১০ তারিখের বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ আমরা এখনও পাইনি। শুনেছি, সরকার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানেই দীর্ঘদিন ধরেই শাহবাগ ও শাপলা চত্বরের দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা চলছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট, হেফাজতে ইসলাম এখন সম্পূর্ণরূপে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কওমী মাদরাসাও সরকারের আওতায় নেয়া হবে। দেশের আলেমউলামা ও তওহীদি জনতাকে আল্লামা আহমদ শফীর মাধ্যমে সরকার তাদের সমর্থক বানাতে চাইছে। কওমী মাদরাসাগুলোও সরকার তার আয়ত্তে নেয়ার জন্য আল্লামা শফীর মাধ্যমে বিপরীত মেরুর সব আলেমকে ঐক্যবদ্ধ করে আগামী নির্বাচনের মাঠ সমান করার কাজে নিয়োজিত করতে চাইছে। এ যোগাযোগগুলো তদারক করছেন প্রধানমন্ত্রীর দফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগের ধর্ম সম্পাদক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে দায়িত্ব প্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি। বেফাক ও হেফাজতের কিছু দায়িত্বশীলের সাথে আমরা কথা বলে জানতে পেরেছি ৬ এপ্রিল, ২০১৩’র পর থেকে গত তিন বছর ঈমানী আন্দোলন তথা নাস্তিকমুরতাদবিরোধী গণজাগরণের গোটা বিষয়টিকে পুঁজি করে হেফাজতের এক শ্রেণীর লোক নিজেদের পকেট ভারী করেছে। দফায় দফায় কর্মসূচি দেয়া ও স্থগিত করা, মামলা খাওয়া ও রেহাই পাওয়া, সরকারী নানা কর্তৃপক্ষ ও সংস্থার কাছ থেকে সুযোগসুবিধা নেওয়া ইত্যাদি কাজ খুব নিপুণ ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। এসব নিয়ে মিডিয়া একসময় সোচ্চার থাকলেও বর্তমানে অনেকটাই নীরব। বলা হয়, আল্লামা শফীর খুব কাছের লোকেরা নানাভাবে অর্থ সম্পদ ও সুযোগসুবিধা গ্রহণ করে বর্ষীয়ান এ অভিভাবকের ব্যক্তিত্ব ও ইমেজের মারাত্মক ক্ষতি করে ফেলেছেন। সরকারী মহলেও এখন হেফাজত নেতার সে প্রথম দিককার ভাবগাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধাবোধ নেই। সরকারের এক ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও পুলিশের উপর মহল থেকে রাজধানীর শীর্ষ আলেমদের বৈঠকে মন্তব্য করা হয়েছে যে, আল্লামা শফীর লোকজনের পেছনে আমরা অনেক বড় বিনিয়োগ করে ফেলেছি। যার ফলে আন্দোলনের আর কোন পথ খোলা নেই। এসব প্রসঙ্গ হেফাজতের কেন্দ্রীয় ফোরামে তোলেন না কেন প্রতিবেদকের এ প্রশ্নের জবাবে মাওলানা জামালউদ্দিন গাজী বলেন, এ সবই ‘ওপেনসিক্রেট’। আমরা শত সহস্র ছাত্র, ভক্ত আল্লামা শফীকে তার খোদাপ্রদত্ত জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার আসনেই আমৃত্যু দেখতে চাই। কিন্তু তার কাছের লোকেরাই যদি তাকে ছোট করে তখন আমাদের আর কী করার থাকে ? আল্লামা শফীকে তার কাছের লোকেরাই ডোবাচ্ছে। এ বিষয়ে বেফাক ও হেফাজতের মুরব্বীদের খোঁজখবর রাখতে হবে, খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে আল্লামা শফীর ইমেজ রক্ষায় ভূমিকা নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কওমী ইসলামী আন্দোলনের আহ্বায়ক শায়খুল হাদীস মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ৬ এপ্রিল, ২০১৩’র পর থেকে আল্লামা শফীর যে আপসকামী ভূমিকা তার উপযুক্ত কারণ রয়েছে। তিনি নিজ প্রতিষ্ঠান, সন্তান ও সম্পদের সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের ধর্মীয় পরিবেশপরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্যই ‘সরকারের সাথে শত্রুতা নয়’ নীতি বেছে নিয়েছেন। কিন্তু তার উচিত ছিল ‘আন্দোলন ও সংগ্রাম’ নামক কঠিন কাজগুলো অতীত জীবনের মতই সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা। হঠাৎ তিনি আন্দোলনে নামলেন, কিন্তু নেতাসুলভ সাহস দেখাতে পারলেন না। তিনি একজন নীতিবান আদর্শ ব্যক্তি, কিন্তু আল্লাহর পথে জীবন দেয়ার বা পদবী, সম্মান, সন্তানসম্পদ ইত্যাদি কোরবানী করার মত সাহস তার নেই। তার সন্তান ও কাছের লোকদের উপরও তার নিয়ন্ত্রণ নেই। যে জন্য শাপলা চত্বর ট্রাজেডির পর থেকে তার ভূমিকা জাতিকে শুধু হতাশই করেছে। বর্তমানে তিনি যে শাহবাগী গ্রুপের সাথে একীভূত হয়ে কওমী মাদরাসার নিয়ন্ত্রণ ইসলাম বিদ্বেষী বিশ্বশক্তির হাতে তুলে দেয়ার পথে এগুচ্ছেন, এ নিয়ে জাতি তার অনুপুংখ ব্যাখ্যা আশা করে। সরকারের লোকজনের সাথে তার যে নিঃশর্ত গভীর সম্পর্ক এর ভিত্তি কী তা তাকেই স্পষ্ট করতে হবে। সরকার কি তার ১৩ দফা মেনে নিয়েছে ? সংবিধানে কি আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপিত হয়েছে ? তার দেয়া পাঠ্যসূচি সংশোধনের দাবি কি পূরণ করা হয়েছে? যদি জবাব নেতিবাচক হয়ে থাকে তাহলে তিনি কোন হিসাবে সরকারের এত প্রিয়ভাজন হয়ে গেলেন। সরকারও তার এতটা আস্থাভাজন কিসের ভিত্তিতে হল ? কোন নেপথ্য ইশারায় তার মাদরাসা ও অফিস এখন শাহবাগ ও শাপলা চত্বরের মিলনকেন্দ্র? শহীদের রক্ত ও আহতের কান্না কি এত দ্রুতই তার স্মৃতি থেকে মুছে গেল।

সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

নফরদের [অর্থাৎ পাকিস্তানপন্থীদের] মন

pak-sympathমুনতাসীর মামুন : বিজয়ের ৪৫ বছর পরও এই লেখা লিখতে হচ্ছে। তাতে মনে হচ্ছে, প্রায় দু’দশক আগে যে লেখা লিখেছিলাম ক্ষুব্ধ হয়ে তার যৌক্তিকতা আছে। লিখেছিলাম, বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ছিলেন, বিধ্বস্ত দেশটিকে একটি ভিত্তি দিয়ে গেছেন। কিন্তু তখনও তো ছিল ষোড়শ বাহিনী, তখনও তো ছিল দখল আর লুটপাট আর হিংস্রতা এবং বঙ্গবন্ধু বিরোধিতা। ঐ জটিল ও সংঘাতময় সময়ে যদি তিনি না থাকতেন তাহলে দেশের অস্তিত্ব থাকত কিনা সন্দেহ। তবে তাতে অবশ্য খুশি হত পাকিস্তান ও তার মিত্ররা এবং বাঙালী নফররা।

এই নফরদের সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তানী সময়েই। হ্যাঁ, আমরাও পাকিস্তানে ছিলাম কিন্তু পাকিস্তানত্ব ছুড়ে ফেলতে আমরা দ্বিধা করিনি। কিন্তু যারা নফর থাকতে চেয়েছে তারা নফরই রয়ে গেল। খাঁচার পাখি ছেড়ে দিলেও নাকি খাঁচায় ফিরে আসে বা উড়ে গেলেও বেশিদিন বাঁচে কিনা সন্দেহ। এই নফররাও স্বাধীনতায় বাঁচতে চায়নি। নফরত্ব ধরে রাখতে চেয়েছে, এমনকী যারা স্বাধীন হয়েছেন বলে মনে করেন তাদের মনের এক কোণেও সেই নফর যুগের প্রতি একটু ভালোবাসা রয়ে গেছে। যেন সেই হিন্দি ফিল্ম ‘দিল দিয়া দর্দ লিয়া’র মতো। কোথায় যেন একটু বেদনা কুরে কুরে খায় ঘুণপোকার মতো। নূরজাহানের সেই একটি গান ছিল না ‘দিল দিলই তো হ্যায় পাথ্থর তো নেহি।’ গণহত্যা করেছ, ধর্ষণ করেছ, পৃথিবীতে যত রকমের নিপীড়ন আছে তাও করেছ, বুট দিয়ে লাথি মেরে ‘শূয়ারকা বাচ্চা’ বলেছ, তারপরও দিল তো পাথর নয়, ভালোবাসা যায় না।

তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জিয়াউর রহমান যিনি নফরদের রাজত্ব বা নফররাজ কায়েম করেছিলেন এবং এই রাজত্ব হস্তান্তর করেছিলেন এরশাদের কাছে। তারপর খালেদা জিয়া ও নফরদের নেতা নিজামীর কাছে। মাঝে মাঝে মনে হয় ২৫ বছর আমরা নফরদের অধীনে থাকলাম কীভাবে? না, শুধু রাজনীতিবিদদের দোষ দিলে চলবে না। আমরাও কমবেশি দায়ী। আমরা কি নিজ নিজ অবস্থান থেকে নফররাজ অস্বীকার করতে চেয়েছি। হত্যা, বুদ্ধিজীবীদের যতটুকু সম্ভব তারা করেছেন, সেটি এ দেশের বৈশিষ্ট্য, ব্যতিক্রমও বটে কিন্তু নিয়ম তো নয়। এরা করেছেন, ক্ষমতার কাছেধারে যাননি কিন্তু সব আমলেই অনাদৃত থেকেছেন। তবে, হ্যাঁ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ক্ষমতার বাইরে থাকলে তাদের কদর বাড়ে।

এই নফররা তো জনগণের একটি বেশ বড় অংশ। নফর নেতারা কমপক্ষে শতকরা ৩০ ভাগ ছোটা ছোটা নফর সৃষ্টি করতে পেরেছেন। জিয়াউর রহমানের কথা মনে হলে তাদের চোখে আঁসু আসে। তিনি যে শুধু মুক্তিযোদ্ধা নিধন নয়, পাকিস্তানী টুপি পরিয়ে দিতে চাইলেন বাঙালীদের সেটি মনে আসে না।

নফররা তাদের স্মৃতি অমলিন রাখার জন্য সুক্ষ্ম স্থ’ূল অনেক কাজ করে গেছে। তার একটি হলো জাতীয় সংসদ ভবন এলাকাকে গোরস্থানে পরিণত করা। তাদের পাশে নানা ভবন, স্থাপনা, বিদ্যাপিঠ, সড়ক করে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কারও এমনকি সরকারেরও মনে হয়নি এত বছরে যে, স্বাধীন দেশে তাদের নামে কিছু থাকার মানে তাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা।

আজ থেকে বছর বিশেক আগে শাহরিয়ার কবির ও আমি খুলনা গিয়েছিলাম একসঙ্গে, নির্মূল কমিটির সভা করতে। এর আগেও খুলনা গিয়েছি, কিন্তু সেবার দেখলাম, যে প্রধান সড়ক দিয়ে যাচ্ছি তার নাম খান এ সবুর রোড। প্রেসক্লাবে পৌঁছে সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা এত কিছুর প্রতিবাদ করেন। এটির প্রতিবাদ করলেন না।’ এখানে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি সড়ক নেই, চার নেতার নামে নেই কিন্তু সবুর খানের নামে আছে। আওয়ামী লীগ, বামপন্থী, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন কতোজনকে জিজ্ঞেস করলাম। সবার একই উত্তর, উনি খুলনাকে পাকিস্তানে এনেছেন। সবুর খান কীভাবে আনলেন খুলনাকে পাকিস্তানে? তিনি ছিলেন মুসলিম লীগের মাস্তান। কিন্তু মিল সৃষ্টি করে গেছেন। সেই মিল এখনও চালু। তখনই মনে হল, দিল দিয়া দর্দ লিয়া। শাহরিয়ারকে বললাম, ঘাতকদালাল নির্মূল করবে কীভাবে এরা যে মনের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

এলো আওয়ামী লীগ আমল, এদিকে কারও খেয়ালই হল না। বিষয়টি যে গুরুত্বপূর্ণ তাও মনে হয়নি কারও। তারপর যখন আওয়ামী লীগের পপুলার মেয়র হলেন, তখন আমি আর শাহরিয়ার রিট করলাম। তখন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী ছিলেন বেঞ্চে। তিনি বললেন, খান এ সবুর রোডের এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজ হলসহ স্বাধীনতা বিরোধী সবার নাম মুছে ফেলতে হবে। খুব সম্ভব তার পর পরই তাকে রিটের বেঞ্চ থেকে অবমুক্ত করা হয়।

আমরা তো মহাখুশি। কিন্তু নাম বদল হয় না। আওয়ামী মেয়রের কাছে অনেক দেনদরবার হল। খুলনার বিএমএর সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলমের নেতৃত্বে অনেক মিছিলটিছিল হল, তিনিও আওয়ামী নেতা, কিছু হল না। আমি তখন ডা. বাহারুলকে বলেছিলাম, যিনি ভোটের কারণে পাকিস্তানী এজেন্ডা পূরণ করতে চান তিনি পরের বার জিতবেন না। জেতেনওনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এজেন্ডাটা পূরণ করলেন না ক্ষমতায় থাকাকালীন। কারণ, সবুর খানের প্রতি দরদ। অনেক মুক্তিযোদ্ধার গহীন গভীরে এরকম নফর মন লুক্কায়িত থাকে।

সরকারের যেসব সচিবকে এসব বিষয়ে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছিল তারা বিষয়টিকে পাত্তাও দিলেন না। হাইকোর্ট জনস্বার্থমূলক এ রকম অনেক রায় দেয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা অগ্রাহ্য হয় এবং অগ্রাহ্য যে হচ্ছে তা দেখার মতোও কোন মনিটরিং সেল নেই। খুলনার কোন রাজনৈতিক দল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোন সংস্থা এ আদেশ মানতে রাজি হয়নি। তাদের মনোভাব, ‘দিল দিলই তো হ্যায় পাত্থর তো নেহি।’ আজ যখন এ লেখা লিখছি, তখন পৃথিবীতে অনেক দেশে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী দিবস। বিশ্ব হাত ধোওয়া দিবসও পালিত হয় বাংলাদেশে নিয়মিত, গণহত্যা দিবস পালিত হয় না। এ বিষয়ে আমাদের দেয়া বিবৃতিও কোন পত্রিকা ছাপেনি। অথচ এই গণহত্যার কারণে সৃষ্টি বাংলাদেশের। দক্ষিণাঞ্চলেও সবচেয়ে নৃশংস ও বড় বড় গণহত্যা হয়েছে ১৯৭১ সালে।

সে কারণেই বাংলাদেশের প্রথম গণহত্যানিপীড়ন আর্কাইভ ও জাদুঘর আমরা খুলনায়ই শুরু করি। ভাড়া বাড়িতে আমরা আর কার্যক্রম চালাতে পারছিলাম না। তখন পরিত্যক্ত একটি বাড়ির জন্য আবেদন করি। খুলনার প্রশাসনের কর্তারা সবচেয়ে ভগ্নপ্রায় বাড়িটি এর জন্য নির্দিষ্ট করে এবং আমরা যাতে সেটিও না পাই তার জন্য প্রক্রিয়াগত যত রকমের বাধা সৃষ্টি করা দরকার তা করে। এরা সব মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আমলা। আসলে তাদের দোষ দিই না। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের অবস্থা কী হয়েছিল তারা তা দেখেছেন। যে বিচার বিভাগের হম্বিতম্বি আজকাল শুনি তারাও ১/১১এর বিচারকের অবিচার সম্পর্কে মুখ খোলেন না। আওয়ামী লীগ আমলে যে কদিন মন্ত্রী হয়েছেন তার থেকে বেশিদিন বিপাকে থেকেছেন। সুতরাং নিরপেক্ষ বা বিএনপির পক্ষে থাকা যে বেহ্তর তা তারা জানেন। অথচ প্রচুর চেষ্টার পর যখন এ সংক্রান্ত ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কাছে যায় তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা বরাদ্দ করেন। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ হয়ত মনে কষ্ট পাবেন, জননেত্রী শেখ হাসিনাও হয়ত, কিন্তু কথাটা বলেই ফেলি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সমর্থকদের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে আলাদা করে দেখেন যতই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হন না কেন। হয়ত এসব কারণেই।

খান এ সবুরের নামে সড়ক বাতিল করার জন্য আবারও আমি সম্পূরক রিট করি। এবার আদালত ক্ষুব্ধ হন এবং সেই পুরনো আদেশ পুনর্ব্যক্ত করে। শাহ আজিজের নাম বাতিল হয় কিন্তু সবুরের নয়। আরও পরে, সেই ডাঃ শেখ বাহারুল ও ছাত্রলীগের কিছু কর্মী এখন সবুর খানের নামের ফলক উপড়ে ফেলে। সাইন বোর্ডে কালো কালি লেপে দেয়। তখন অনেকে নাম বাতিল করে।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ভবন চাঁদা তুলে ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কিছু অনুদানে সংস্কার করে আমরা জাদুঘর চালু করেছি। প্রশাসনের কর্তাদের অনেক অনুরোধ করেছি, এমপিদেরও, কেউ আসেননি। সপ্তাহ দুয়েক আগে এইচটি ইমাম সেই জাদুঘর পরিদর্শনে গেলে সমস্ত কর্মকর্তা ও ছোটখাটো নেতারা সময় পেয়েছিলেন জাদুঘরে আসার। আমাদের সান্ত¡না, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আমাদের প্রধান দর্শক। এটাই তো আমরা চেয়েছিলাম।

না, সম্পূরক আদেশ দেয়ার পরও সরকার কোন নির্দেশ দেয়নি এসব নাম মুছে ফেলার। অথচ সারা দেশে অনেক স্থাপনা, ভবন, বিদ্যাপিঠে বাঙালীর শত্রুদের, পরাজিত শক্তির আন্ডাবাচ্চাকাচ্চাদের নামগুলো জ্বলজ্বল করছে। এ শর্তই দেয়া হচ্ছে এরা শত্রু নয়, ১৯৭১ সালে মিথ্যা মিথ্যা ‘কেচ্ছা’ এদের নামে বানান হয়েছে। ১৯৭১ সালের এইসব ‘কেচ্ছা’ সত্যি হলে এসব নাম থাকে কি করে? বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া স্বাধীন দেশে কেউ পরাজিতগণহত্যাকারীদের নাম অম্লান রাখার জন্য ‘সৌধ’ করে?

আমি জানি, এর উত্তর কারও পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়।

নফররাজের বৃত্ত থেকে বেরুবার জন্য বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে না, তা কিন্তু নয়। কিন্তু সেগুলো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা, সামগ্রিক নয়। যেমন, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অভাবিতভাবে বৃদ্ধি, তাদের প্রচুর সুযোগসুবিধা দেয়া ইত্যাদি। অন্যদিকে, জামায়াত নিষিদ্ধে আগ্রহ নেই তাদের। শিক্ষার ক্ষেত্রে মাদ্রাসাকে গুরুত্ব দেয়া, একদিকে জঙ্গীমৌলবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, অন্যদিকে মাদ্রাসায় জঙ্গীবাদ ও জিহাদ কেন প্রয়োজন তা পড়ানো। জামায়াতবিএনপি নফররাজ দৃঢ় করার জন্য নানা ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং নিচ্ছে। সেগুলো এখন ফল পাচ্ছে। ধর্মকে ব্যবহার এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধের সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি ইসলামীকরণ ও সামরিকায়ন হচ্ছে। সেনাবাহিনীর তিনটি সংস্থা প্রশাসন ভাগ করে নিয়েছে। উড্ডয়ন সব বিমান বাহিনী, জলপথ সব নৌবাহিনী, বাকি সব সেনাবাহিনী। নফররাজের মূল দর্শন হচ্ছে পাকিস্তানকে মানা। আমাদের পোশাক, ক্ষমতায় সামরিকদের ক্ষমতায়ন, বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ, দৃষ্টিভঙ্গিতে এ নফররাজের বিভিন্ন বিষয় পরিস্ফুট হচ্ছে। এখন সারাদেশে বিজয়সেনা থেকে ওয়াজ মাহফিল বেশি হচ্ছে। এবং সেখানে নেতৃত্বে আছেন আওয়ামী নেতাএমপিরা। পরিসংখ্যান ব্যুরো সংখ্যাতত্ত্ব বলে, দেশের ৫২ ভাগ মানুষ জানেন না বিজয় দিবস কি? এর কারণ কিছু নয়, সর্ব পর্যায়ে, সর্বস্তরে ইতিহাস পড়ানোতে অনীহা। কারণ, পাকিস্তানে ইতিহাস পড়ানো হয় না। এখানে কেন হবে? তথাকথিত ইসলামী হুঙ্কার উঠলেই সরকার হাঁটু গেড়ে বসে। এটি খুবই ইন্টারেস্টিং যে, ১৪ দল বিভিন্নভাবে জামায়াতবিএনপির এজেন্ডাই পালনে আগ্রহী। বিএনপিজামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়ার কী দরকার? আরও অনেক কিছুর উল্লেখ করা যায়। কিন্তু স্পেসের অভাব ও ভীতু হওয়ার কারণে পরিধি বাড়ালাম না।

এটা মানি, বাংলাদেশে আবার অন্যায্য বা অন্যায় কিছু একেবারে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেয়া হয় না। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। নফরদের নাম উজ্জ্বল করার বিপরীতেও দু’ একজন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

হাইকোর্টের আদেশও যখন দু’বার মানা হলো না এবং যখন প্রায় ব্যর্থ, তখন দেখি নতুন একটি সংবাদপত্র ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ ‘রাজাকারের দিবস’ নামে প্রথম পাতায় একটি কলাম শুরু করে। পত্রিকাটির সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমি নফরদের কিছু নাম যোগাড় করি সেগুলো বিজয় দিবসেও জ্বলজ্বল করবে। এবং আরেকটি সম্পূরক রিট করি। আদালত আবারও একই নির্দেশ দেয় আগেও যখন তা কার্যকর হয়নি এখনও হবে কিনা সন্দেহ। তবুও আশা করতে দোষ কি! আমার জানা মতে যে কুড়িজনের নামে সড়কস্থাপনাফলক আছে তারা হলেন স্বাধীনতাবিরোধী। তারা হলেন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দপ্রাপ্ত বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও নেতা আবদুল আলিম, মৃত্যুদকার্যকর করা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতা সৈয়দ কায়সার আলী, মৌলভীবাজারের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এনএম ইউসুফ আলী। অপরদিকে সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া খান মজলিস, ফরিদপুরের আবদুর রাজ্জাক মিয়া, মৌলভীবাজারের মাহতাব উল্লাহ, গাইবান্ধার আবদুল আজিজ (ঘোড়া মারা আজিজ) ও আবদুল জব্বার, নোয়াখালীর তরিকুল্লাহ, ঝিনাইদহের মিয়া মনসুর আলী, কুমিল্লার রেজাউর রহমান, নাটোরের আবদুর সাত্তার খান মধু মিয়া ও কাছির উদ্দিন, ঢাকা দক্ষিণের মোঃ তামিমুল এহসান ও মোহাম্মদ উল্লাহ (হাফিজ্জি হুজুর), নেত্রকোনার আবদুর রহমান, মেহেরপুরের মিয়া মনসুর আলী ও সাবদার আলী এবং ঝিনাইদহের সফি আহমেদ। পরের দিন মানবকণ্ঠ ও জনকণ্ঠের সংবাদ অনুযায়ী শাহজাদপুরে সাইফুদ্দিন এহিয়া খান মজলিসের নামফলক অপসারণ করে ছাত্রলীগ। সারাদেশে তরুণদের এ ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল যা পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল নামে যে সংস্থা আছে তাদের এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়া উচিত ছিল। দেয়নি, কারণ তারা শুধু সুবিধা পেতে আগ্রহী, আদর্শিক বিষয়ে নয়। বামপন্থী বা কি বলে যেন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোও নয়। কারণ, মফস্বলের কোন কিছু নিউজ হয় না।

এসব বোধ থেকে নতুন প্রজন্ম কতটা দূরে চলে গেছে এটি তার উদাহরণ। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, মুক্তিযোদ্ধা বলে যারা পরিচিত তারাও। তবে আশার খবর, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে [আবারও সেই প্রধানমন্ত্রী] ৯টি কলেজের নাম পরিবর্তনের কথা বলা হয় যেগুলো নফরদের নামে করা হয়েছে। সেগুলো হলো টাঙ্গাইলের বাসাইলের এমদাদ হামিদা ডিগ্রী কলেজ, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ধর্মপুর আবদুল জব্বার ডিগ্রী কলেজ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের মাওলানা সাইফুদ্দিন এহিয়া ডিগ্রী কলেজ, নাটোরের নলডাঙ্গার ডাঃ নাসির উদ্দিন তালুকদার কলেজ, সাতক্ষীরা সদরের বাটকেখালী এমএ গফুর মডেল কলেজ, মেহেরপুরের মুজিবনগর আনন্দবাস মিয়া মনসুর একাডেমি, হবিগঞ্জের মাধবপুরের সৈয়দ সঈদ উদ্দিন ডিগ্রী কলেজ, চট্টগ্রামের লোহাগড়ার মোস্তাফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং রাঙ্গুনিয়ার সেলিনা কাদের চৌধুরী ডিগ্রী কলেজ। [যুগান্তর, .১২.১৬]

একটি বিষয় নিজেদের কাছে পরিষ্কার হওয়া উচিত। নফর সংস্কৃতি ও উন্নয়ন এজেন্ডা একসঙ্গে চলে কিনা। পদ্মা সেতু হলো, জিডিপি বাড়ল, একটার জায়গায় বছরে দুটি জামা পরলাম কিন্তু মানসিকভাবে নফরই রয়ে গেলাম, সমাজসংস্কৃতিতে নফর সংস্কৃতি পরিপুষ্ট করলাম বা পাকিস্তানী মানসকেই পুষ্ট করলাম তা হলে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে, নফরই যদি থাকব তাহলে ১৯৭১ সালের দরকার কি ছিল?

সূত্রঃ দৈনিক জনকন্ঠ, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

‘সুলতান সুলেমান’ নিয়ে দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন

অবিলম্বে ‘সুলতান সুলেমান’র সম্প্রচার বন্ধের দাবি

দেশীয় সংস্কৃতিতে ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

sultan-suleman-bangla-dubbingশনিবার রাত দশটা। দীপ্ত টিভির পর্দায় শুরু হল বাংলায় ডাবিং করা তুর্কি সিরিয়াল ‘সুলতান সুলেমান’। শাহজাদা মুস্তফার জন্য হেরেমখানায় আনা হয়েছে এক দাসীকে। সাজিয়েগুছিয়ে তাকে রাত্রিযাপনের জন্য পাঠানো হয় শাহজাদার কাছে।

বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক ছাড়াই তারা একসঙ্গে রাত্রিযাপন করেন। সকালের দৃশ্যে দেখানো হয় সেই দাসী এবং শাহজাদা বিছানায় শুয়ে একই চাদরের নিচে অন্তরঙ্গ আলাপ করছেন। শাহজাদার গভবর্তী স্ত্রী কেঁদে কেঁদে যখন তার শাশুড়িকে দাসীর সঙ্গে এভাবে রাত্রিযাপন নিয়ে অনুযোগ করেন তখন শাশুড়ি উল্টো তার বউমাকে ভর্ৎসনা করেন।

আর এক দৃশ্যে দেখা যায়, সুলতান সুলেমানের এক স্ত্রী সুলতানা তার খাসবাঁদীকে হত্যার চেষ্টা করছেন। কারণ সুলেমান এখন এই খাসবাঁদীর প্রেমে পাগল এবং তার সঙ্গেই বেশি রাত্রিযাপন করেন। আর এটা সহ্য করতে পারছেন না সুলতানা।

এছাড়া সিরিয়ালটির শুরুর দিকে দেখানো হয়েছে, সুলতান সুলেমানের মাও এভাবে ছেলের ঘরে দাসীদের পাঠাতেন। তিনি নিজে এবং তার পিতাও বিয়ের আগে বহু দাসীকে ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করেন।

এভাবে প্রায় প্রতিদিনই হেরেম থেকে নারীদের (যারা দাসী নামে পরিচিত) শাহজাদা ও সুলতানের মনোরঞ্জনে রাত্রিযাপনের জন্য পাঠানো হয়। এই ধরনের নেতিবাচক কুরুচিকর কাহিনীতে ভরপুর দৃশ্যই দেখানো হচ্ছে দীপ্ত টিভির নিয়মিত সিরিয়াল ‘সুলতান সুলেমান’এ।

sultan-suleiman-episode-67তাই ইসলাম ধর্ম ও দেশের সংস্কৃতিবিরোধী এই সিরিয়াল বন্ধের দাবি উঠেছে দেশের বিশিষ্টজন, ইতিহাসবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন দর্শকদের মহল থেকে। তারা বলছেন, দেশীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এই সিরিয়াল। কেউ কেউ মনে করেন, এটিও দেশীয় সংস্কৃতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র।

শুধু তাই নয়, প্রশ্ন উঠেছে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে একজন মুসলমান শাসকের জীবনের এই ধরনের চরিত্র উপস্থাপন করা সিরিয়াল সম্প্র্রচারের যৌক্তিকতা নিয়েও। এছাড়া এর সত্যতা নিয়ে তো প্রশ্ন রয়েছেই।

দর্শকদের অনেকে অভিযোগ করেন, ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের অন্যতম দিকপাল সুলতান সুলেমানকে নিয়ে মেরাল ওকেয় ও ইয়িল্মায শাহিন রচিত সুলতান সুলেমান নির্মাণের সময় বিনোদন উপস্থাপন করতে গিয়ে শাসক সুলতান সুলেমানকে অনেকটাই আড়ালে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

বিপরীতে হেরেমের কূটচাল, যৌনতা, দাসদাসীদের দৈনন্দিন জীবনাচার এবং সুলতানাদের স্নায়ুযুদ্ধ দিয়ে বিনোদন জোগান দেয়ার স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে হেরেমের নানা বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে খোলামেলাভাবে।

সিরিজজুড়ে অন্দরমহলের প্রাধান্যের কারণে একজন সুশাসক সুলতানকে আড়াল করে রমণীকাতর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। আর এসব দেখে শুরুর দিকে দর্শকের অনেকে এক ধরনের বিনোদন অনুভব করলেও এখন তা ক্ষোভঅসন্তোষে রূপ নিয়েছে।

বেসরকারি চ্যানেল দীপ্ত টিভিতে গত বছর নভেম্বর মাসে শুরু হওয়া এই সিরিয়ালটি এবং পরে আরও কিছু ডাবিং করা সিরিয়াল দেশের অভিনয় শিল্পী, নির্মাতা ও কলাকৌশলীদের আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দেশের শিল্পী কলাকৌশলীদের যে আন্দোলন গণজাগরণ তৈরি করেছে তার পেছনে এসব সিরিয়াল অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া জানা গেছে, সিরিয়ালটি নিয়ে খোদ তুরস্কে নানা অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে।

sultan-suleman-still-1সুলতান সুলেমান প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘তুর্কি শাসনের অন্তরালের জগৎ নৈতিকতার দিক থেকে নানাভাবে এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ। সেগুলোর প্রতিফলন সুলতান সুলেমান নামের এই সিরিয়ালে রয়েছে, আমি দেখেছি। কিন্তু এটা কোনো রুচিশীলতার পরিচয় বহন করে না। আমার কাছে অন্তত ভালো লাগেনি। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য অনেক কিছুকেই বাণিজ্যিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে।’

বিশিষ্ট নাট্যজন ও নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, ‘ইসলামের নাম দিয়ে অশ্লীলতা প্রদর্শন করা হচ্ছে। মা আর মেয়ে একসঙ্গে হেরেমখানায় প্রবেশ করছে। এটা কি আমাদের সংস্কৃতি? এটা কোনোভাবেই আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। এসবের খুব বাজে প্রভাব পড়ছে সমাজে। ডিভোর্সের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কিশোরতরুণরা এগুলো দেখে বিপথগামী হচ্ছে। অবিলম্বে সুলতান সুলেমানসহ ডাবিং করা সব সিরিয়ালের সম্প্র্রচার বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।’

নাট্যজন আতাউর রহমান বলেন, ‘সুলতান সুলেমানে আমাদের সংস্কৃতি শেকড়ের কিছু নেই। তবে সব ডাবিং সিরিয়াল বন্ধ করার কথা আমি বলছি না। ডাবিং করা ভালো, কিছুও তো আমরা দেখেছি। মনে রাখতে হবে আমাদের ভালো নাটক দিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আমাদের নাটকের মান পড়েছে। সেখানেই ভালো করার ব্যাপারে আমাদের জোর দেয়া উচিত।’

এ ব্যাপারে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর যুগান্তরকে বলেন, আমি একটি কথাই বলব, দেশে মানসম্মত প্রযোজনা থাকলে এই ধরনের ডাবিং করা সিরিয়াল দেখা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্য আমাদের কোয়ালিটি প্রডাকশনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এদিকে দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ সুলতান সুলেমানের মতো সিরিয়াল কিভাবে সম্প্রচারের অনুমতি পেল সে ব্যাপারে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে জানার চেষ্টা করলে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করা হলে কেউ কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

sultan-suleiman-meriem-uzeril-hurremতবে সিরিয়ালটি প্রচারে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার দিকনির্দেশনা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪এর তৃতীয় অধ্যায়ের সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার অধ্যায়ের ৩..১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, দেশীয় সংস্কৃতি, ঐহিত্য ও ভাবধারার প্রতিফলন এবং এর সঙ্গে জনসাধারণের নিবিড় যোগসূত্র স্থাপন ও আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ধারাকে দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে সংস্কৃতি বিকাশের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।

আরেক জায়গায় ৩..৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দেশীবিদেশী ছবি অনুষ্ঠানে অশ্লীল দৃশ্য, হিংসাত্মক, সন্ত্রাসমূলক এবং দেশীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। ৫..১২ এর অনুচ্ছেদে বলা হয়, অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন দেশের প্রচলিত আইন, রীতিনীতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কিন্তু সুলতান সুলেমানের ক্ষেত্রে এসবের অনেক কিছুই মানা হচ্ছে না

ধানমণ্ডি এলাকার বাসিন্দা সাবরিনা মিশু নামে একজন গৃহিণী যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘শুরুতে সুলতান সুলেমান দেখতাম। কিন্তু পরে যখন দেখলাম এখানে নারীকে ভোগ্য পণ্যের মতো হেরেমের মধ্য দিয়ে দেখানো হচ্ছে তখন দেখা বন্ধ করে দিই। আরও ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে এই সিরিয়ালে একাধিক স্ত্রী রাখার বিষয়টিকে উৎসাহ দিয়ে দেখানো হয়েছে।’

এদিকে এসব অভিযোগের ব্যাপারে দীপ্ত টিভির সিইও কাজী উরফি আহমদ বলেন, ‘আমরা দর্শকদের পছন্দের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই সিরিয়ালটি প্রচার করছি এবং মানুষ স্টার জলসা বা ভারতীয় অন্যান্য চ্যানেল না দেখে এটি দেখছে। তবে আমি স্বীকার করছি, আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে কিছু কিছু বিষয় যায় না।’

তিনি দাবি করেন, বাস্তবতা হচ্ছে, ইতিহাসে এমন তথ্যই রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নাটকীয়তা আনতে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা এসেছে, এটা ঠিক। তবে একটি সিরিয়াল সংস্কৃতিসহ সব ধ্বংস করছে আমি এমনটা মানতে নারাজ।’

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

‘সুলতান সুলেমান’ নিয়ে গোলাম মাওলা রনি’র ভাবোচ্ছ্বাস !

sultan-suleman-still-4জামাতশিবিরের অর্থায়নে প্রকাশিত দৈনিক নয়াদিগন্তে গোলাম মাওলারা সুলতান সুলেমান টিভি সিরিয়ালে চৌম্বক শক্তি আবিষ্কার করেছেন তার ভাষায় – “নাটকটিতে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক উপাখ্যান, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদবকায়দার প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি। রয়েছে নির্মল বিনোদন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জীবনধর্মী আরো অনেক বিষয়, যা দর্শকদের চৌম্বক শক্তির মতো টানতে থাকে। এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেগাসিরিয়াল থেকে আমাদের যেমন অনেক কিছু শেখার রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যও রয়েছে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ।সুলতান সুলেমান নিয়ে মাওলা বাবার এহেন মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায় তার রুচি জ্ঞানের বহর ! আজ দৈনিক যুগান্তর সুলতান সুলেমান নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপিয়েছে যা পড়লে এই টিভি সিরিয়াল দেখা থেকে বিরত থাকা উত্তম বলে মনে হবে । আমার পরের পোষ্টে যুগান্তরের প্রতিবেদনটি হুবহু উপস্থাপন করলাম পাঠকদের সুবিধার্থে ।

তুরস্ক ও এরদোগানের অন্ধ সমর্থক জামাতশিবির কর্মীরা বাংলাদেশের মানুষের ভেতর তুরস্কপ্রীতি জাগৃতিকরণে এই টিভি সিরিয়াল দেখার জন্য উৎসাহ যোগাবে তাতে সন্দেহ নেই যদিও এদের নেতাকর্মীদের জন্য এই সিরিয়াল দেখা শরীয়াহসম্মত হবে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চুপতা অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে !

আহলান! ওয়া সাহলান! ইয়া সুলতান সুলেমান!

sultan-suleman-actressগোলাম মাওলা রনি : বাংলাদেশের সর্বস্তরের টেলিভিশন দর্শকদের পক্ষ থেকে তুর্কি সুলতান সুলেমানকে স্বাগত জানাচ্ছি। সুলতান যখন আরব মুল্লুকে যেতেন, তখন রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা শাসক সুলেমান দ্য গ্রেট বা সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টকে আহলান! ওয়া সাহলান অর্থাৎ আমাদের গৃহে স্বাগতম বলে অভ্যর্থনা জানাতেন। হাজার হাজার সৈন্যের কুচকাওয়াজ, নহবতের সুরলহরী এবং কৃতজ্ঞ জনগণের হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে এগোতে গিয়ে মহামতি সুলেমান তার সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের হৃদয়ে কতটুকু আনন্দ সঞ্চারিত করতে পারতেন তা বলা না গেলেও তার মৃত্যুর ৪৫০ বছর পর তাকে নিয়ে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে যা হচ্ছে তা যদি তিনি জানতেন, তবে নিশ্চয়ই অতি মাত্রায় বিমুগ্ধ ও আনন্দিত হতেন।

তুর্কি অটোমান সালতানাতের গর্ব এবং ইসলামি তাহজিব তমদ্দুন ও কানুনের অন্যতম প্রধান রত্ন মহামতি সুলতান সুলেমানের রাজত্বকাল ছিল ৪৬ বছর। আধুনিক তুরস্ক, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার বৃহদংশ, পুরো মধ্যপ্রাচ্য, ইরানের কিয়দংশ, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, আলবেনিয়াসহ বলকান অঞ্চল এবং রোডসসহ পুরো ভূমধ্যসাগরে তার ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড তার অধীনতা মেনে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। অস্ট্রিয়া, ইতালি, এমনকি জার্মানি মূলত তার ভয়ে সব সময় তটস্থ থাকত। পারস্য সম্রাট তাহমাউসপের সাথে সুলতানের বিরোধ ছিল বটে। কিন্তু সম্মুখ সমরে তিনি কোনো দিন সুলতানের মুখোমুখি হননি সব সময় পালিয়ে গেছেন নতুবা এড়িয়ে গেছেন। ফলে তৎকালীন দুনিয়ার একমাত্র সুপারপাওয়ার অটোমান সাম্রাজ্যের তলোয়ার, ঘোড়ার খুরের আওয়াজ এবং কামানের গোলার সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো বীর ধরাভূমে ছিলেন না।

সুলতান সুলেমানের জীবদ্দশায় সুবেবাংলা অথবা দিল্লি সালতানাত কেমন ছিল, তা ইতিহাসের পাঠকেরা খুব ভালো করেই জানেন। সুলতান যদি ভারতবর্ষে আসতেন তবে আমাদের রাজাবাদশাহ, নওয়াব এবং জঙ্গবাহাদুরেরা কী করতেন, জানি না। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে যারা সুলতান সুলেমানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন তাদের কথাবার্তা, দাবিদাওয়া ও আবদারগুলো জনমনে ভারী কৌতূহলসংবলিত কৌতুকের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির কোনো নেতানেত্রী কিন্তু এই সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন একদল অভিনেতাঅভিনেত্রী ও কলাকুশলী। তারা দলবেঁধে গলা ফাটিয়ে আপত্তি সংবলিত আবদার জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কোনো বিদেশী সিরিয়ালের বাংলা ডাবিং, অর্থাৎ বাংলায় রূপান্তরিত সংলাপসহ সম্প্রচার করা যাবে না।

sultan-suleman-still-2বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের নাটকে রঙতামাশা, হাস্যরস ও কৌতুকাভিনয়ে বলতে গেলে দুর্ভিক্ষ লেগেছিল অথবা ওলাওঠা বিবির অভিশাপে মড়ক লেগেছিল। এক সময়ের খান জয়নুল, হাবা হাসমত, আলতাফ, টেলিসামাদ, রবিউল, আনিস প্রমুখের অনবদ্য অভিনয় এবং লোক হাসানোর প্রকৃতি প্রদত্ত গুণাবলির বদলে ইদানীংকালের জোর করে হাসানোর কাতুকুতু মার্কা সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গি দেখে দর্শকদের রুচি যখন বিচ্যুতির প্রান্তসীমায় পৌঁছে গিয়েছিল, তখন একশ্রেণীর দর্শক বেঁচে থাকার তাগিদে ভারতীয় চ্যানেলের ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে পড়েন এবং অন্য শ্রেণীর দর্শকেরা টেলিভিশন দেখাই ছেড়ে দিলেন।

ভারতীয় চ্যানেলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যে ও দৌরাত্ম্যে আমাদের সাহিত্যসংস্কৃতি, সমাজসংসার ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। হত্যা, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ব্যাংক লুট, লোক ঠকানো, মিথ্যাচার প্রভৃতি কবিরাহ গুনাহ রীতিমতো শৈল্পিক মর্যাদা পেয়ে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে প্রচারিত হচ্ছে, যার মরণনেশায় পড়ে স্ত্রী স্বামীকে ত্যাগ করছে, স্বামী স্ত্রীকে মেরে ফেলছে। মা তার শিশুসন্তানকে মেরে ফেলছে টিভি সিরিয়াল দেখার সময় কান্না করার অপরাধে। অথবা স্ত্রী গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহনন করেছে এ কারণে যে, তার স্বামী তাকে টিভি সিরিয়াল দেখতে দেয়নি অথবা টিভি সিরিয়ালের এক নায়িকার মতো একটি জামা কিনে দেয়নি।

কতিপয় ভারতীয় চ্যানেলের কিছু অনুষ্ঠানের নেশা ভয়াল মাদক ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, মারিজুয়ানা, গাঁজা ইত্যাদির চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ব্যভিচার, পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা, ধর্ষণ, পরকীয়া, অবাধ যৌনাচার, অসম দৈহিক সম্পর্ক, অনৈতিক কিংবা অকল্পনীয় সম্পর্কগুলো প্রকাশ্যে এবং অবাধে এমনভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে, যা দেখে মানবিকতা আর অমানবিকতা, মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব একাকার হয়ে নারকীয় রূপ ধারণ করছে। বাবার ষাট বছর বয়সী বন্ধুর সাথে স্কুলপড়ুয়া কিশোরী কন্যার যৌনতা, সন্তানের চেয়েও কম বয়সী ছেলেদের সাথে ষাটোর্ধ্ব মহিলার ব্যভিচার হিন্দি চ্যানেলের দর্শকদের কাছে ভাতমাছ হয়ে গেছে। পূতপবিত্র পারিবারিক সম্পর্কের অনাদিকালের বিশুদ্ধতা ও নির্মলতাকে এক শ্রেণীর লম্পট কুলাঙ্গার এমনভাবে কলুষিত ও কলঙ্কিত করে তুলছে, যা প্রকাশ করার মতো রুচি এই নিবন্ধকারের নেই। আইয়ামে জাহেলিয়াতের জঘন্য যুগেও যেসব সম্পর্ককে পবিত্র ও বিশুদ্ধ মনে করা হতো, সেগুলোর মূলেও জ্ঞানপাপী নরাধমরা একের পর এক আঘাত হেনে চলেছে।

ভারতীয় সিরিয়ালগুলো আমাদের নীতিনৈতিকতা এবং মনমানসিকতার স্তর কতটা নিচে নামিয়ে ফেলেছে তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ঢাকার এক মধ্যবিত্ত দম্পতির ছয় বছরের ফুটফুটে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। স্বামীর বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের মতো আর স্ত্রী ত্রিশ। দুজনেই কথিত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং দেখতে উভয়েই বেশ সুন্দর। তারা প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন এবং বিবাহিত জীবনে মোটামুটি দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখেন। হঠাৎ তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক সমস্যা দেখা দিলো। এক রাতে স্ত্রী ঘুম থেকে জেগে দেখলেন স্বামী বিছানায় নেই। তিনি চুপি চুপি ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখলেন স্বামী হিন্দি সিরিয়াল দেখছেন এবং অত্যন্ত গর্হিত একটি অপকর্ম করছেন। লজ্জায় স্ত্রী কিছু বলতে পারলেন না। তিনি শোয়ার ঘরে ফিরে শিশু সন্তানটিকে জড়িয়ে ধরে বহুক্ষণ কাঁদলেন। পরের দিন রাগ করে বাবার বাড়ি চলে এলেন। স্ত্রীর ধারণা, তার স্বামীর মানসিকতা এমন পর্যায়ে বিকৃত হয়েছে যে, তার পক্ষে শিশু সন্তানকেও ধর্ষণ করা অসম্ভব নয়। অতএব, বিচ্ছেদ।

নাটক, সিনেমা, রিয়েলিটি শো, গেম শোর পাশাপাশি নৃত্য প্রতিযোগিতার নামে যা দেখানো হয় তা অশ্লীলতা ও নোংরামির মাত্রা অতিক্রম করে চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সাতআট বছরের বালকবালিকা বা তেরোচৌদ্দ বছরের কিশোরকিশোরীদের নৃত্য প্রতিযোগিতায় যে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেখানো হয় তা শৈল্পিক বিচারে কোনোমতেই নৃত্য হতে পারে না। বিকৃত মানসিকতা সৃষ্টি এবং একটি প্রজন্মকে নষ্ট করার সুগভীর চক্রান্ত ছাড়া ওসব বেহায়াপনার অন্য কোনো মূল্য রয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

sultan-suleman-still-5বাংলাদেশের সুলতান সুলেমানবিরোধীরা কোনো দিন কোনোকালে ভারতীয় অপসংস্কৃতির ভয়াবহ আগ্রাসন এবং বেলাগাম বিস্তার রোধে রাস্তায় নেমেছিলেন, এমন কথা কেউ কোনো দিন শোনেননি। বরং তাদের মধ্যে অনেকে ভারতীয় চ্যানেলের বিভিন্ন সিরিয়াল এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান নকল করে দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে প্রচার করছিলেন, যা দেখে সুস্থ সবল মানুষের দৈহিক ও মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে নামতে পারে তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠানের মানের অধোগতি এবং ভারতীয় চ্যানেলগুলোর নেশাময় বিকৃত অনুষ্ঠানমালার কারণে দর্শকেরা যখন হতাশার প্রান্তসীমায়, ঠিক সেই সময়ে দেশীয় একটি অটোমান সুলতান সুলেমানের জীবনের ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত কাহিনীনির্ভর মেগাসিরিয়াল বাংলায় অনুবাদ করে সম্প্রচার করে যাচ্ছে।

সুলতান সুলেমান বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত দশ বছরে যারা টিভি দেখেননি তারাও কাজকর্ম ফেলে বাংলায় ভাষান্তরিত সিরিয়াল দেখার জন্য যথাসময়ে টিভির সামনে হাজির হয়ে যান। পুরো পরিবার নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে টিভি দেখার, বিশেষ করে মাসের পর মাস ধরে একই আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগের ঐতিহ্য এ সমাজে খুব কমই দেখা গেছে। ধারাবাহিক নাটকটির নির্মাণশৈলী, সাজসজ্জা, অভিনেতাঅভিনেত্রীদের অনবদ্য অভিনয়, কাহিনী, সংলাপ এবং মঞ্চায়নের নিখুঁত মুনশিয়ানার কারণে দর্শকেরা নাটকটির প্রতিটি পর্ব দেখার সময় মনোজগতের ডানায় ভর করে চলে যান মহামতি সুলেমানের শাসনামলে। তার হেরেমে, রাজপ্রাসাদে অথবা অটোমান যুগের পথপ্রান্তর, রাস্তাঘাট, হাটবাজার কিংবা দরবার ও আদালতে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, তুরস্কে নির্মিত সুলতান সুলেমাননামক টিভি সিরিয়ালটি সারা দুনিয়ায় এযাবৎকালে নির্মিত মেগা সিরিয়ালগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের দর্শকপ্রিয়তা যোগ করলে এটি এক নম্বরে পৌঁছে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাটকটিতে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক উপাখ্যান, নীতিনৈতিকতার শিক্ষা, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদবকায়দার প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়াদি। রয়েছে নির্মল বিনোদন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং জীবনধর্মী আরো অনেক বিষয়, যা দর্শকদের চৌম্বক শক্তির মতো টানতে থাকে। এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেগাসিরিয়াল থেকে আমাদের যেমন অনেক কিছু শেখার রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যও রয়েছে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত শিক্ষার উপকরণ।

বাংলাদেশের অভিনেতাঅভিনেত্রী, প্রযোজকপরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীরা কেন সুলতান সুলেমানের মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক বন্ধের জন্য রাজপথে নেমেছেন, তা বোধগম্য নয়। তবে দেশের জনগণ যে তাদের নিজ নিজ গৃহে সম্মানিত মেহমান হিসেবে সুলতান সুলেমান নাটকের পাত্রপাত্রীদের বরণ করে নিয়েছেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের অভিনেতাঅভিনেত্রীরা জনগণের সেই ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে যত তাড়াতাড়ি নিজেদের সংশোধন করে নেবেন, ততই সবার জন্য মঙ্গল।

টেলিভিশন নাটক নিয়ে পুরো মিডিয়াপাড়ায় যে তেলেসমাতি চলছে, তা বন্ধ না করে ডাবিং করা সিরিয়াল বন্ধের দাবির আওয়াজ ধোপে টিকবে না। অতীব নিম্নমানের নাটক নির্মিত হচ্ছে। অন্য দিকে পুরো মিডিয়া জগতের বিনোদন ক্ষেত্রটি স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে। মাত্র এক থেকে দেড় লাখ টাকা দেয়া হয় একটি নাটক নির্মাণের জন্য। ঈদের বিশেষ নাটকের বাজেট দুই লাখ থেকে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকার মধ্যে। এই স্বল্প বাজেটের সাথে সামাল দেয়ার জন্য পুরো নাটকপাড়া এবং শুটিং স্পটগুলোতে যে কী হয় তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই বলতে পারেন। নির্মিত নাটকগুলো কথিত সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়া প্রচারিত হয় না। পরিস্থিতি এতটাই অবনতির দিকে গেছে যে, ওই সিন্ডিকেট নাটকের নায়কনায়িকাসহ প্রধান পাত্রপাত্রীদের পর্যন্ত মনোনীত করে দেয়।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবর ও টকশোর অনুষ্ঠানগুলোর মান এখন আর কোনো মানদণ্ডে নেই। একটু শিক্ষিত ও সজ্জনরা বিবিসি, আলজাজিরা, সিএনএন, ফক্স নিউজ, ভারতের এনডিটিভি দেখেন। অনেকে আবার বিটিভির খবরের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। করপোরেট হাউজের মালিকানাধীন চ্যানেলগুলো নিজ নিজ মালিকের ইচ্ছা অনুযায়ী সব কিছু পরিচালনা করে থাকে। নাটকের চেয়েও বিশ্রী অবস্থার মধ্যে পড়েছে টকশোর অনুষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রেও বহু অভিযোগ শোনা যায়। শত অভিযোগের বিপরীতে রূঢ় বাস্তবতা হলো, টকশোর নামে যা দেখানোর চেষ্টা করা হয় তা আসলে কেউ দেখে না। কারণ ওগুলো আসলে দেখা যায় নাএমনকি দেখা উচিতও নয়।

আমার ধারণা, কোনো টিভি চ্যানেল যদি বিখ্যাত ল্যারি কিং লাইভ, ক্রিস্টিনা আমানপোর, বিবিসি হার্ড টক, সিমি গাড়োয়াল, কফি উইথ করণ, রজত শর্মার আপ কি আদালত ইত্যাদি সাড়া জাগানো বিদেশী টকশোগুলোর বাংলা ডাব প্রচার আরম্ভ করে, সেগুলো সুলতান সুলেমানের তুলনায় কম জনপ্রিয়তা পাবে না। আমরা এর আগে সাড়া জাগানো কিছু ইরানি ছবি, অস্কারপ্রাপ্ত ইংরেজি ছবিসহ নামকরা বিদেশী ছবি বাংলা ডাব অথবা বাংলা সাব টাইটেলসহ বিভিন্ন টিভিতে প্রচার হতে দেখেছি। ছবিগুলোর মান, শৈল্পিক আবেদন এবং বিনোদন কোনো দর্শকই ভুলতে পারেননি। সাউন্ড অব মিউজিক, দি মেসেজ, দি মেসেঞ্জার, স্বর্গীয় শিশু, বৃদ্ধাশ্রম প্রভৃতি শিল্পসম্মত ছবি থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি ওগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হয় তাহলে আর যাই হোক, লাভ হবে না।

সূত্রঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬

কী ভীষণ [সাংস্কৃতিক] আগ্রাসন!

হানিফ সংকেত : বিশ্বায়ন বা মুক্ত অর্থনীতির যুগে আমরা অর্থনীতির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি যে আগ্রাসনের শিকার হচ্ছি তা হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। বিশেষ করে এই আগ্রাসন ঘটছে পরিবারগুলোতে। কৃত্রিম মোহে ভেঙে যাচ্ছে অনেক সুখের সংসার। এসবের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত চাকচিক্যময় এক অদ্ভুত সামাজিক চালচিত্র। গ্রাস করার ত্রাস সৃষ্টিতে উদ্যত এসব বিদেশি সিরিয়াল সিরিয়াল কিলারের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ, এরা ধ্বংস করছে ঘরসংসারসামাজিকতা এবং আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।

যৌথ পরিবারের একটি গৌরবময় ঐতিহ্য আছে আমাদের। ২০১৪ সালের ৫ ডিসেম্বর বিটিভিতে ইত্যাদি একটি পর্ব প্রচারিত হয়। ওই পর্বে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার একটি গ্রামের একটি যৌথ পরিবারের ওপর প্রতিবেদন দেখানো হয়। ওই পরিবারের গৃহকর্তা আবদুর রহমান। বয়স ১০৪ বছর। তাঁর পাঁচ সন্তান। সবাই বিবাহিত। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৪০। ২৫ কক্ষবিশিষ্ট বিরাট বাড়ি। এই বাড়িতেই পরিবারের সবাই থাকেন। এই বিশাল কিন্তু সুখসচ্ছলতায় ভরা পরিবারটির প্রধান আয়ের উৎস মত্স্য খামার।

এই পরিবারের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, রহমান সাহেবের পুত্রবধূ এবং নাতিনাতনিরা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে আনন্দিত চিত্তে রান্নাবান্নার কাজ করেন। প্রতিনিয়তই মনে হয় তাঁরা যেন বনভোজনের আমেজে আছেন। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই পরিবারের কয়েকজন সদস্যের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বিদেশি চ্যানেলের প্রভাবে অনেক পরিবারেই ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এই কুপ্রভাব থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? তাঁদের সোজাসাপটা জবাব ছিল, ওই চ্যানেলগুলো বন্ধ কইরা দেওয়া উচিত। এভাবে চলতে থাকলে ওই সব চ্যানেলের প্রভাবে একসময় যৌথ পরিবারই দেখা যাবে না। সে জন্য আমরা ওই সব চ্যানেল দেখি না।

এই উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির যুগে তাদের চ্যানেল বন্ধ করার দাবি পূরণ করা হয়তো সম্ভব নয়, তবে আমাদের দেশে এসব চ্যানেল অবাধে প্রচারের ব্যাপারে যে উদার ও উন্মুক্ত নিয়মনীতি রয়েছে, সেগুলোকে বোধ করি রোধ করা সম্ভব। এসব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মিডিয়ায় অনেক আলাপআলোচনা, সভাসমাবেশ, গোলটেবিল বৈঠক, টক শো, সংহতি সমাবেশ, শিল্পী সমাবেশ, মামলামোকদ্দমাসহ নানা ঘটনা ঘটে গেছে।

ত্রিশালের ওই একান্নবর্তী পরিবারের মতোভিনদেশি সিরিয়ালের আগ্রাসন আর ভীতি থেকেইঅনেকের দাবি, ভিনদেশি এসব চ্যানেল বন্ধ হোক গত কয়েক দিনের মিডিয়াসংশ্লিষ্ট আন্দোলনেও অনেকের মুখে এই কথা উচ্চারিত হয়েছে। চ্যানেলের ক্ষেত্রে যখনই এই বন্ধ শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখনই বলা হয় উন্মুক্ত আকাশ। বিশ্বায়নের যুগে এই বন্ধ সংস্কৃতি ঠিক নয়। স্বভাবতই তখন প্রশ্ন ওঠে, ভারতও একটি গণতান্ত্রিক দেশ। সেখানে কেন বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যাবে না। আমরাই বা এত উদার কেন? ওরা না দেখালে আমাদের দেখাতে হবে কেন? বিষয়টি আরও জটিল হলো যখন জানা গেল, ভারতে আমাদের চ্যানেল চালাতে হলে পাঁচ কোটি রুপি দিতে হবে আর আমাদের এখানে ওই সব চ্যানেল চলছে মাত্র দেড় লাখ টাকায়। কী অসম বাণিজ্য! ডিসেম্বরের ৩ তারিখে হাঙ্গেরি থেকে ফিরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনেও এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তিনি নিজেই এই অসম হার দেখে বিস্মিত হয়েছেন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলেছেন।

আশা করি, আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো ভারতে প্রদর্শন এবং ভারতীয় চ্যানেলগুলোর বাংলাদেশের প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ বৈষম্য রয়েছে, সেটা দূর হবে এবং আমাদের শিল্পীকলাকুশলী ও টিভি চ্যানেলের মালিকেরা এ ব্যাপারে একটি সুফল পাবেন। চ্যানেল প্রদর্শনের এই অসম বাণিজ্যের সঙ্গে আর একটি মারাত্মক অপরাধমূলক বেআইনি বাণিজ্য ছিল বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিদেশি চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন প্রচার। মিডিয়া ইউনিটির আন্দোলনের কারণে এদের কর্মকাণ্ড সরকারের নজরে আসে। ২০০৬ সালে এ সম্পর্কিত স্পষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও বিগত ১০টি বছরেও এই অপরাধ কারও নজরে এল না কেন, এই প্রশ্নটি অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাহলে প্রতিটি বিষয়ই কি আন্দোলন করে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করতে হবে? তবে আশার কথা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপের ফলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই বিষয়টির সুরাহা হয়েছে। এই দুটি বিষয়ই মিডিয়া জগতের জন্য আশার খবর ও সুখবর। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে দুদক ও এনবিআর এই চক্রের সন্ধানে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ। মিডিয়ার একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে খুবই কষ্ট হয় যখন শুনি সরকারি পুরো বাজেটের মধ্যে মিডিয়ার জন্য বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। এই বাজেট দিয়ে মিডিয়ার কী কল্যাণ হবে? অনেকেই বলেন, আমাদের কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু দুর্বল, বাইরের কনটেন্ট ভালো। এই কথাটিও পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়। কনটেন্ট ভালো করার পেছনে বাজেটও একটি কনটেন্ট। সুলতান সুলেমানএর সুলতান সাহেবের পোশাকের যে বাজেট, আমাদের এখানে পুরো এক ঘণ্টার নাটকেরও সেই বাজেট নেই। অন্যান্য বিষয় তো রয়েছেই। তা ছাড়া, মিডিয়া সম্পর্কিত জ্ঞান লাভ কিংবা উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের দেশে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানও নেই। ডাবকৃত বিদেশি সিরিয়াল বন্ধের ব্যাপারে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্সের যৌক্তিক হার পুনর্নির্ধারণসহ শিল্পীকলাকুশলীদের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণেও কর্তৃপক্ষের আন্তরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

আর এই সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন সুষ্ঠু নীতিমালা। যে নীতি মালায় আবদ্ধ না থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ২০০৬ সালের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইনের মতো ফাইলের জন্য আইন না করে এর যথার্থ প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি চ্যানেলগুলোরও বিজ্ঞাপননির্ভরতা কমাতে হবে। সে জন্য রয়েছে অনেক পথ। এ ব্যাপারে পেচ্যানেলের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, শিল্প এবং শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আগে এই ক্ষেত্রটাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আমরা সেই আশ্বাসও পেয়েছি মিডিয়া ইউনিটির তৃতীয় সংহতি সভায় মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। সুতরাং এ কথা বলা যায়, মিডিয়ার সুদিন আসছে। কোনো অনৈতিক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি ও প্রতারণা মিডিয়ার এই অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দিতে পারবে না। আমাদের শিল্পসংস্কৃতিইতিহাসঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে মিডিয়া একটি বড় ভূমিকা রাখে। তাই টেলিভিশনশিল্পকে রক্ষার জন্য ভিনদেশি আগ্রাসন প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

এই দেশ আমাদের, এই মাটি আমাদের। আকাশ সংস্কৃতির এই উন্মুক্ত আগ্রাসনে পরাজিত হয়ে গা ভাসিয়ে দেবে পরধন লোভী পরাশ্রয়ী দুর্বলেরা। কিন্তু আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অনন্ত অক্ষয় সম্পদ এবং সামাজিকতা আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়। এই আত্মপরিচয়ের অহংকার আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন শিল্পীকলাকুশলীচ্যানেলের মালিকসবার সম্মিলিত উদ্যোগ ঐক্য। আসছে নতুন বছর। ভবিষ্যতে আমরা যাবতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা, বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ভুলে লালন করব দেশীয় সংস্কৃতিকে। সব আগ্রাসনকে দূরে ঠেলে দিয়ে দেশকে ভালোবেসে, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারায় জেগে উঠব আমরা নিরন্তর।

হানিফ সংকেত: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী।

সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬